শুধু যাওয়া আসা

অনীশ দেব

লেখক ও রচনা প্রসঙ্গে

আধুনিক ইংরেজি রহস্যগল্পের জগতে জেমস্ হেডলি চেজ (আসল নাম রেনি রেমণ্ড, জন্ম—১৯০৬) অতি বিখ্যাত একটি নাম৷ শুধু সে-দেশেই নয়, ইংরেজি-পড়া দুনিয়ায় হেডলি চেজের সমকক্ষ জনপ্রিয় লেখক বিশেষ চোখে পড়ে না৷ অনেকগুলি কাহিনীর লেখক তিনি, তার মধ্যে বেশ কিছু পৃথিবীর নানা ভাষায় অনুদিত হয়েছে৷

হেডলি চেজের কাহিনীগুলোতে সচরাচর কোন গোয়েন্দা-নায়কের ডিটেকসনের ব্যাপার থাকে না৷ দীর্ঘকাল ধরে প্রধান রহস্যকাহিনীতে এদিকেই সব জোরটা দেওয়া হয়েছে৷ চেজ লক্ষ্যভেদ করেছেন পাপীর মনের ভিতরে ঢুকে তার কামনা-বিবেক-অনুশোচনার বিশ্লেষণ করে৷ প্রায়ই এই সব পাপীরাই তার কাহিনীর নায়ক, তারা একই সঙ্গে পাঠকের ঘৃণা এবং সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে৷

প্রায়ই নায়কের নিষ্করুণ মৃত্যুতে কাহিনী শেষ হয়৷

চেজের লেখায় ঘটনা ও মনস্তত্ত্বের, আবেগের ও ক্রিয়ার এমন একটি অচ্ছেদ্য যোগ থাকে, কাহিনীর গতি এমন দ্রুত বিস্ময়চকিত ও শ্বাসরোধী হয়ে ওঠে যে রহস্য গল্পপাঠের তীব্র উত্তেজনা থেকে এক মুহূর্তও মন ছাড়া পায় না৷ এখানেই হেডলি চেজের সাফল্যের চাবি৷

এক

এগারোটা বাজতে মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি, হাতের কাগজপত্তর সব গুছিয়ে অফিস থেকে কেটে পড়ার তাল করছি, এমন সময় বেরসিকের মতো বেজে উঠল টেলিফোনটা৷ আর যদি মিনিট পাঁচেক পরেও ফোনটা আসত, তবে ওটা ধরার জন্য আমার মাথাব্যথা থাকত না৷

আমি লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশনের নৈশ-বিভাগের কর্মচারী৷ রাত এগারোটা বাজলেই আমার ছুটি, অর্থাৎ ডিউটি শেষ হতে এখনও পাঁচ মিনিট বাকি৷ তা ছাড়া, নৈশ-টেলিফোনটা একটা টেপরেকর্ডারে যোগ করা থাকে, ফোন বাজতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়-রেকডিং শুরু হয়ে যায়, সুতরাং না ধরলেই নয়৷

‘মালিকের শ্যেনচক্ষু সবসময় তোমাকে লক্ষ্য করছে’—এ কথাটা যাতে আমাদের অর্থাৎ কর্মচারীদের মনে থাকে, তার জন্যই এই অদ্ভুত রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা৷ কাজে একটু ফাঁকি দেবার জো নেই৷

অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলাম, ‘লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশন—নৈশ-বিভাগ৷’

‘কি, ব্যাপার কি! অফিসসুদ্ধ, ঘুমোচ্ছে নাকি সবাই?—ফোন ধরতে এত দেরি হয় কেন?’ টেলিফোনে ঝংকৃত হল বিরক্ত উদ্ধত কণ্ঠস্বর৷ নিঃসন্দেহে কোন লাখপতির৷

‘আপনি কে কথা বলছেন?—’

‘হেনরি কুপার, অ্যাশলি আর্মস থেকে বলছি৷ চটপট একজন লোক আমার এখানে পাঠিয়ে দিন৷ সিন্দুকটা নিয়ে বড্ড অসুবিধেয় পড়েছি৷’

বুঝলাম, আজ রাতে জ্যানিকে সঙ্গে নিয়ে বেরোবার যে প্রোগ্রাম করেছি, তার বারোটা বেজে গেল৷ আর এ নিয়ে, এই এক মাসে তিন-তিনবার ওর সঙ্গে কথার খেলাপ করতে হল৷ রাগে বিরক্তিতে মেজাজ খিঁচড়ে উঠল৷ একটা অপ্রিয় কথা বলতে গিয়েও টেপটার কথা মনে রেখে জিভকে সংযত করলাম৷

একবার এই টেপের কথা খেয়াল না থাকায় একজন খদ্দেরকে খেঁকিয়ে উঠেছিলাম৷ তার জন্য পরদিন ‘বস’ আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন৷ তাই এবারে আর সে ভুলটা করলাম না৷ গলার স্বর যতটা সম্ভব মোলায়েম করলাম, ‘সিন্দুকটা নিয়ে কি অসুবিধেয় পড়েছেন যদি বলেন—’

‘সিন্দুকের চাবিটা আমি হারিয়ে ফেলেছি৷ শীগগিরই লোক পাঠাবার ব্যবস্থা করুন৷’ সশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ হল৷ আমিও ঠকাস করে নামিয়ে রাখলাম রিসিভারটা৷ যাঃ-শা-লা—

জ্যানিকে কথা দিয়েছিলাম, ওকে সোয়া এগোরোটার সময় ওর বাড়ির কাছ থেকে তুলে নেব৷ তারপর দুজনে মিলে একটা নতুন ক্লাবে যাব নাচবার জন্য৷ এতক্ষণে ও হয়ত সেজেগুজে আমার জন্য অপেক্ষা করছে৷

শহরের একেবারে অপর প্রান্তে একটি প্রকাণ্ড ফ্ল্যাটবাড়ি—অ্যাশলি আর্মস৷ শহরের নাম-ডাকওয়ালা ধনী মহাজনদের বসবাস এই বাড়িটিতে৷ ওখানে গিয়ে, ওই হতচ্ছাড়া সিন্দুক খুলে, ফিরে এসে বাস ধরে জ্যানির বাড়ি যেতে যেতে সাড়ে বারোটা বেজে যাবে৷ আর জ্যানি ততক্ষণে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে বলে মনেও হয় না৷ ও আমাকে বলেছিল, আর কোনদিন যদি এভাবে কথার খেলাপ করি, তবে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সেইখানেই ইতি৷

ভাবলাম, অফিস থেকেই জ্যানিকে একটা ফোন করি৷ কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারে অফিসের ফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ৷ সুতরাং সামনের রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে যে ফোন-ঘরটা আছে, সেখান থেকেই ফোন করতে হবে জ্যানিকে৷

অগত্যা যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম৷ অফিস বন্ধ করে যখন গ্যারেজ থেকে অফিসের ট্রাক বের করছি, বাইরে তখন ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে৷ বর্ষাতি না আনার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিলাম৷

ফোন-ঘরের কাছে পৌঁছেই দেখি মহা বিপদ! গাড়ি দাঁড় করাবার মতো একটু জায়গাও খালি নেই৷ গোটা রাস্তাটাই গাড়িতে গিজগিজ করছে৷ গাড়ি রাখবার আশায় এ-রাস্তা ও-রাস্তা ঘোরাঘুরি করতে শুরু করলাম৷ প্রায় দশ মিনিট বাদে একটা গাড়ি তার জায়গা ছেড়ে বেরোতেই, গোটা কয়েক গাড়িকে রেসে হারিয়ে ট্রাকটা সেইখানে দাঁড় করালাম৷ তারপর রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে চললাম ফোনঘরের দিকে৷

জ্যানির ফোন-নাম্বার ডায়াল করে হাতঘড়ির দিকে তাকালাম৷ এগারোটা কুড়ি৷ ফোন বাজামাত্রই ওপ্রান্ত থেকে জ্যানির কণ্ঠস্বর ভেসে এল৷ ও যেন সারা সন্ধে বসে আমার ফোনটারই অপেক্ষা করছিল৷

আমি যে কেন যেতে পারছি না, সেকথা ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলবার আগেই ও রাগে ফেটে পড়ল, ‘তুমি না এলে না আসবে, কোন ক্ষতি নেই৷ আমি আর একজনকে চিনি, যাকে সিন্দুক সারাতে যেতে হচ্ছে না৷ শেট, আমি গতবারই সাবধান করে দিয়েছিলাম৷ রোজ রোজ তোমার এই কথার খেলাপ আমি আর বরদাস্ত করতে পারছি না৷ তোমাকে বলেছিলাম, পরের বারই শেষ বার—অর্থাৎ এটাই!’

‘কিন্তু—জ্যানি, আমার—আর কোন—৷’ আমি আবার রিসিভারের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ জ্যানি অনেকক্ষণ আগেই লাইন কেটে দিয়েছে৷ ওকে আবার ফোন করলাম৷ কিন্তু ফোন বেজেই চলল, কেউ ধরল না৷ মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে নামিয়ে রাখলাম৷ ফোন-ঘর ছেড়ে শ্লথ পায়ে এগিয়ে চললাম ট্রাকের দিকে৷

এদিকে তখন তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে৷ অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে বড় বড় জলের ফোঁটা৷ অবসাদে ভরা মনে ট্রাক ছুটিয়ে চললাম অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷ মনে মনে লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশনকে আর হেনরি কুপারকে যথেচ্ছ খিস্তি করলাম৷ শালার একটা সময়জ্ঞান পর্যন্ত নেই! অফিসে ফিরে, সেখান থেকে বাড়িতে আমাকে হেঁটেই যেতে হবে৷ এসব জেনেও কেন যে বর্ষাতিটা আনলাম না৷

শহরের অভিজাত অঞ্চলে বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘অ্যাশলি আর্মস’৷ ট্রাক থেকে নেমে বৃষ্টির মধ্যেই বাড়িটার দিকে পা বাড়ালাম৷

দালান ধরে সোজা এগোলাম দ্বাররক্ষীর ঘরের দিকে৷ তার কাছ থেকেই জানা গেল, মি. কুপার চারতলায় থাকেন৷

লিফটে চারতলায় পৌঁছে, ফ্ল্যাটের বেল বাজালাম৷ দরজা খুললেন স্বয়ং হেনরি কুপার৷ লম্বা, বিশাল চেহারার পুরুষ৷ ভাবভঙ্গিতে ঔদ্ধত্যের প্রকাশ সুস্পষ্ট৷ অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রভাবে মুখে ঈষৎ নীলচে আভা৷ তার স্ফীত উদর ভোজনবিলাসের সাক্ষ্য বহন করছে৷ আমি ঘরে ঢোকামাত্রই বাজখাঁই গলায় ফেটে পড়লেন, ‘এই সামান্য রাস্তা আসতে তোমার এতক্ষণ লাগল?’

বৃষ্টিতে রাস্তায় যে প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে আসতে হয়েছে, সেকথা জানিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলাম৷ তিনি সেকথা গায়েই মাখলেন না৷ আপন মনেই গজগজ করতে করতে বসবার ঘরের দিকে এগোলেন৷ আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম৷ শৌখিনভাবে সাজানো ঘরের সর্বত্রই আভিজাত্যের ছাপ৷

কুপার দ্রুতপায়ে দেওয়ালে টাঙানো একটা অয়েল-পেন্টিং-এর দিকে এগিয়ে গেলেন৷ ছবিটা জনৈক স্থূলকায় মহিলার নগ্‌গ্ন-মূর্তি৷ দেখে রুবেনস-এর আঁকা মনে হলেও সম্ভবত নকল৷ ছবিটাকে একপাশে সরিয়ে ধরতেই চোখে পড়ল, আমাদের কোম্পানির তৈরি একটা সুপার-ডি-লাক্স দেয়াল-সিন্দুক৷

যন্ত্রপাতির ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে রাখার সময় লক্ষ্য করলাম, পাশের লম্বা সোফাতে একটি মেয়ে শুয়ে আছে৷ পরনে সাদা সান্ধ্য পোশাক৷ পোশাকের গলার কাছটা এত বেশি উন্মুক্ত যে মেয়েটির উদ্ধত গোলাপী স্তনের ঊধর্বাংশ সহজেই নজরে পড়ছে৷ মেয়েটি একটি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল৷ মাদকতায় পরিপূর্ণ রক্তিম ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট৷ চোখ তুলে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকাল৷

মেয়েটিকে দেখে আমার মনে পড়ল জ্যানির কথা৷ কারণ ওর চুলের রং ও পায়ের সুন্দর গড়ন অনেকটা জ্যানিরই মতো৷ কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে এমন একটা আভিজাত্যের ছাপ লক্ষ্য করলাম, যা জ্যানির মধ্যে নেই৷ মানছি, জ্যানির দৈহিক গঠন চঞ্চল করে তোলে দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা৷ ওর ব্যক্তিত্ব, ভারী নিতম্বের ছন্দোময় হিল্লোল পুরুষের হৃদয়ে তোলে তুমুল ঝঞ্ঝা৷ রাস্তার লোকে স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকে জ্যানির গমনপথের দিকে৷ সবই মানলাম, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণই নিছক সস্তা চটক৷

এই মেয়েটির মধ্যে সেরকম কিছু নজরে পড়ল না৷

‘এটা খুলতে তোমার কতক্ষণ লাগবে? আমার হাতে একদম সময় নেই?’ কুপারের বাজখাঁই গলায় আমার চমক ভাঙল৷

প্রায় একরকম জোর করেই মেয়েটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘কম্বিনেশনটা পেলে বেশিক্ষণ লাগবে বলে মনে হচ্ছে না—৷’

একটুকরো কাগজে কম্বিনেশনটা খসখস করে লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি৷ তারপর সোজা এগিয়ে গেলেন বিপরীত দিকের দেওয়ালে গাঁথা ছোট একটা কাঠের আলমারির কাছে৷ পাল্লা সরাতেই চোখে পড়ল ভিতরের তাকে সাজানো সারি সারি মদের বোতল৷ একটা গেলাস টেনে নিয়ে নিজের জন্য হুইস্কি আর সোডা মেশাতে লাগলেন কুপার৷

যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছি, এমন সময় পাশের কোন ঘর থেকে টেলিফোনের শব্দ ভেসে এল৷ ক্রি—রি—রি—রিং—রি—রি—রিং—

‘মনে হয় জ্যাক ফোন করছে,’ মেয়েটিকে লক্ষ্য করে কুপার বললেন৷ এবং দরজা খোলা রেখেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

কুপার বেরিয়ে যেতেই মেয়েটি চাপা স্বরে হিসহিস করে উঠল, ‘চটপট হাত চালাও, চাঁদ৷ ব্যাটা বুড়ো আজ একটা মুক্তোর নেকলেস কিনে দেবে বলেছে৷ ভয় হচ্ছে, এর মধ্যে বুড়ো আবার মত না পাল্টে ফেলে!’

আমি অবাক হয়ে, হাঁ করে চেয়ে রইলাম৷ মেয়েটির কাছ থেকে এ-ধরনের কথা আশা করিনি৷ ও সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিল৷ ওর চোখজোড়ায় সাপের চাউনি৷ জ্যানি যখন আমার কাছ থেকে কোন দামী উপহার আদায়ের চেষ্টা করত, তখন ওর চোখও ঠিক একই চাউনি লক্ষ্য করেছি৷

‘মিনিট তিনেকের বেশি লাগবে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷’ হেসে ওকে আশ্বাস দিলাম৷

তিনি মিনিটের কিছু কম সময়ের মধ্যেই সিন্দুকটা খুলে ফেললাম৷

‘হুঁঃ, ভারি তো একটা সিন্দুক! এ তো একটা বাচ্চা ছেলেও খুলতে পারে!’ মেয়েটির গলায় তাচ্ছিল্যের সুর৷

কিন্তু আমার চোখ তখন লেহন করে বেড়াচ্ছিল সিন্দুকের ভিতরটা৷ তিনটে তাকেই থরে থরে সাজানো একশ ডলার নোটের বান্ডিল৷ একসঙ্গে এত টাকা আমি জীবনে কোনদিন দেখিনি৷ সব মিলিয়ে ঠিক কত হবে তা আন্দাজ করতে না পারলেও, পাঁচ লাখ ডলালের কম হবে না, সেটা বুঝতে পারলাম৷

মেয়েটি সোফা ছেড়ে, ক্ষিপ্র পায়ে সিন্দুকের সামনে এসে দাঁড়াল—ঠিক আমার পাশে৷ ওর গা থেকে সেন্টের একটা উগ্র মিষ্টি গন্ধ এসে ঝাপটা মারল আমার নাকে৷ ও আমার এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছে যে ওর বাহুর স্পর্শ অনুভব করলাম৷

‘উফ্, এত টাকা! এ যে আলাদিনের রত্নগুহা!’ চাপা উত্তেজনায় আমার হাত খামচে ধরল মেয়েটি৷ তারপর হাত ছেড়ে আমার চোখে চোখ রাখল, ‘আচ্ছা, আমরা দুজনেই যদি একটা খালি করার ব্যবস্থা করি, তাহলে কি রকম হয়?’

পাশের ঘরে রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ শুনতে পেলাম—টুং—৷ বুঝলাম কুপারের কথা বলা শেষ হয়েছে৷

‘এই রে, বুড়ো আসছে!’ ও চটপট ফিরে গেল সোফার কাছে৷

আমিও সিন্দুকের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম, সঙ্গে সঙ্গেই কুপার এসে ঘরে প্রবেশ করলেন৷

‘কী হল? এখনও ওটা খুলতে পারনি?’ খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি৷

‘এক সেকেন্ড, স্যর,’ লকটা সরিয়ে দিলাম, ‘এই তো খুলে গেছে৷’

কুপার এগিয়ে এসে হাতল ঘুরিয়ে সিন্দুকের দরজাটা ইঞ্চি কয়েক ফাঁক করলেন, ‘হুম—৷ তুমি বরং একটা নকল-চাবির ব্যবস্থা করে দিও—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব৷’

‘আচ্ছা, স্যর৷’ সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নাড়লাম৷ অতঃপর যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে এগোলাম দরজার দিকে৷

বেরোবার পথে সোফাতে-বসে থাকা মেয়েটিকে শুভরাত্রি জানালাম৷ প্রত্যুত্তরে ও ঘাড় হেলাল৷ দরজার কাছ অবধি পৌঁছে কুপার দুটো এক ডলারের নোট আমার দিকে এগিয়ে দিলেন৷ নোট দুটো নেবার সময় তাঁর মুখের ভাবে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি টাকাটা আমাকে দিচ্ছেন৷

শেষে বললেন, ভবিষ্যতে আবার যদি কখনও তাঁর আমাকে দরকার পড়ে, তবে যেন এবারের মতো এত দেরি না করি৷ আর নকল-চাবিটার কথা বারবার মনে করিয়ে দিলেন৷

ট্রাক চালিয়ে ফিরে চললাম অফিসে৷ কুপারের টাকায় ঠাসা সিন্দুকটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল—ইস্, যদি ওই টাকাগুলো আমার হত—কীভাবে খরচ করতাম—

অফিসের মাইনেতে আমি কোনদিনই সন্তুষ্ট নই, আমি নিরুপায়৷ জানি, ওই মাইনেতে আমাকে চিরকাল এই একই ভাবে কাঁটাতে হবে, ভবিষ্যৎ বলে কোন বস্তু আমার জীবনে নেই৷

‘আচ্ছা! ইচ্ছে করলে কুপারের ফ্ল্যাটে ঢুকে কত নির্ঝঞ্ঝাটেই না হাতানো যায় ওই টাকাগুলো! ভারি তো সিন্দুক! হুঁ,—সিগারেটের কৌটো খোলার মতন টুক্ করে খুলে ফেলব—!’

বারবার মনকে বুঝালাম, এসব চিন্তা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়৷ কিন্তু তবুও মন থেকে ওটাকে মুছে ফেলতে পারলাম না৷

পরদিন রাতে ডিউটি বদলের সময় রয় ট্রেসি এল আমার জায়গায়৷ তখনও কিন্তু ওই সর্বনাশা চিন্তা উঁকি মারছে আমার মনের কোনায়৷

রয়কে আমি অনেকদিন ধরেই জানি৷ ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে সুকলে পড়েছি৷ ওকে এই সিন্দুক-কোম্পানির চাকরিতে ঢুকিয়েছিল ওর বাবা, আর ওই একই দিনে আমার বাবাও, আমার ভবিষ্যতের গাঁটছড়া এই হতচ্ছাড়া কোম্পানির সঙ্গে বাঁধবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে!

এমনিতে আমার সঙ্গে রয়ের চেহারার অনেকখানি মিল আছে৷ রয় লম্বা চেহারার শক্তসমর্থ পুরুষ৷ গায়ের রং বাদামী৷ ঠোঁটের উপর সরু টানা গোঁফ থাকায় মুখে একটা ইতালীর আদল ফুটে উঠেছে৷ এছাড়া দুজনের মধ্যে আর যে মিল, তা হল অসীম অর্থলিপ্সা৷

তবে রয়ের জীবনে মেয়েদের কোন স্থান নেই৷ আমার সঙ্গে একখানেই ওর সবচেয়ে অমিল৷ উনিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল রয়৷ কিন্তু সুখী হতে পারেনি৷ বছরখানেক পরেই মেয়েটা ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়৷ এবং সেইখানেই ওর জীবনের কামিনী-অধ্যায় হয়েছে সমাপ্ত৷ একটা নেশা ওর আছে, তা হল ঘোড়া-রোগ৷ মাইনের প্রায় সব টাকাই উড়িয়ে দেয় ঘোড়ার পিছনে৷ যার জন্য সর্বদাই ওর পকেট খালি থাকে, আর আমার থেকে ধার নেবার চেষ্টা করে৷

ওকে কুপারের টাকার কথা বললাম৷

আমরা দুজন ছাড়া অফিসে আর কেউ নেই৷ বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে৷ জলের ছাট এসে আছড়ে পড়ছে জানলার সার্সির উপর৷ সাপের মতো এঁকেবেঁকে জলের ধারা সার্সি বেয়ে নেমে চলেছে৷ আমার বাড়ি যাওয়ার কোন তাড়া নেই৷ রয়কে কুপারের ফ্ল্যাটে যাওয়া থেকে আরম্ভ করে সব বললাম৷ এমনকি মেয়েটার কথাও বাদ দিলাম না৷

‘দেখে মনে হল সিন্দুকটায় প্রায় পাঁচ লাখ ডলার আছে, জানিস৷ সবই একশো ডলারের নোট৷’ পায়চারি করতে করতে ঘাড় ফিরিয়ে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘ইস্—যদি এত টাকা পেতাম, তবে কি হত একবার ভেবে দেখ তো!’

রয়ের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট৷ ও ডেস্কের কাছে বসে একমনে ধোঁয়া ছাড়ছিল, ‘এরকম ভাগ্য সকলের হয় না৷’

‘হুঁ—, যা বলেছিস৷’ জানালার কাছে এগিয়ে গেলাম৷ বাইরে বর্ষণসিক্ত রাতের দিকে তাকালাম৷ বৃষ্টি তখনও অবিশ্রান্ত ঝরে চলেছে৷ রাস্তার ধারের নর্দমাগুলো জলে ভরে গেছে৷ নির্জন রাস্তায় মধ্যে-মধ্যে জল ছিটিয়ে ছুটে যাচ্ছে দু-একটা গাড়ি৷

‘মনে হয় আর বেশি রাত করা ঠিক হবে না৷ উঃ—যা অবস্থা৷ বৃষ্টি বটে একখানা!’

‘আরে যাবি—যাবি৷ অত তাড়ার কি আছে৷’ রয় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল, ‘পাঁচ লাখ ডলার?’—তুই ঠিক বলছিস?’

‘তার চেয়ে কম হবে বলে তো মনে হয় না৷—তিনটে তাকই ছিল পুরো ভর্তি৷’

‘আয়—বোস৷ ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক৷’

রয়ের চোখের দিকে তাকালাম৷ উৎকণ্ঠার ছায়া কাঁপছে ওর চোখের তারায়৷

‘শেট, ওরকম বেশ কিছু টাকা পেলে আমার কাজে লাগত৷’

‘কাজে আমারও লাগত৷’ ওর কাছে এসে বললাম৷

‘জানিস, মাত্র পাঁচশো ডলারের জন্য আমাকে তাড়া-খাওয়া কুকুরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে?’ টেবিলের ওপর একটা ঘুঁষি মারল রয়, ‘যেমন করেই হোক, কিছু টাকা আমাকে যোগাড় করতেই হবে—আচ্ছা মনে কর যদি আমরা ওই সিন্দুকটা—’ চোখ নাচিয়ে হাতের একটা ভঙ্গি করল রয়৷ তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে সরীসৃপের মতো শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আমার দিকে, ‘শুধু সামান্য একটু হাতের কাজ—’

অসম্ভব কিছু নয়৷’ আমার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল৷

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা৷ আমরা দুজনেই জানলার দিকে চেয়ে রইলাম৷ শুনতে লাগলাম বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ৷

‘আমি বহুদিন ধরে শুধু এইরকম একটা সুযোগের অপেক্ষা করেছি, শেট৷ যেভাবে এখন আমাকে দিন কাটাতে হচ্ছে, তাতে জীবনের ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ তোরও তো এই একই অবস্থা, তাই না?’

‘হ্যাঁ—’

‘তবে আর ভাবছিস কি? তোর কি কাজটা করার ইচ্ছে নেই?’

‘না,—ইচ্ছে ঠিক নেই৷ কিন্তু তবুও করতেই হবে৷ কারণ কাজটা বড্ড বেশি সহজ৷’

রয় দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল, ‘আরে এত ভয় পাওয়ার কি আছে? ঠিকমতো বুদ্ধি করে করতে পারলে, কেউ আমাদের টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না৷’

উত্তেজনায় উঠে বসলাম ডেস্কের উপর, ‘সুতরাং—’

‘ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখা যাক৷ আয়, দুজনে বসে ঠান্ডা মাথায় একটু আলোচনা করি৷’

একটা ঘণ্টা দেখতে দেখতে কেটে গেল৷ যতই আমরা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম, কাজটা ততই সোজা বলে মনে হতে লাগল৷

‘প্রথমেই আমাদের খোঁজ নিতে হবে, এই কুপার লোকটা রোজ ক’টার সময় ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোয়৷ এটা আমাদের জানতেই হবে৷ আর সময়টা জানতে পারলেই আমাদের কাজ শুরু হবে,—অর্থাৎ ফ্ল্যাটে ঢুকে, সিন্দুক খুলে, চটপট মাল হালকা করা৷’ আত্মপ্রত্যয়ের একটুকরো বাঁকা হাসিতে রয়ের ঠোঁট নেচে উঠল, ‘এবার তোকে যা করতে হবে, তা হল ওই নকল-চাবিটা নিয়ে, কুপারের বাড়িতে গিয়ে দরজায় যে দারোয়ানটা থাকে, ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ গপ্পো মারবি৷ কথায় কথায় ওর থেকেই কুপারের বেরোবার সময়টা জেনে নিবি৷ কাজটা খুব একটা শক্ত হবে না৷ কারণ দারোয়ানরা সাধারণত গল্প করতে ভালোবাসে৷ তুই কথা বলার সময় খুব অন্তরঙ্গ ভাব দেখাবি, আর ওর সব কথায় সায় দিয়ে যাবি৷ রয় আমার মুখ লক্ষ্য করে পর পর কতকগুলো ধোঁয়ার রিং ছাড়ল, ‘ব্যস—৷ একবার যদি জানতে পারি কুপার বাড়িতে নেই, তো সোজা ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢুকব এবং—’ উত্তেজনায় প্রায় আস্ত সিগারেটটা ছাইদানে গুঁজে দিল রয়৷

ব্যাপারটা আলোচনা করার পর মনে হল পৃথিবীতে এর চেয়ে সহজ কাজ আর হতে পারে না৷

পরদিন রাতে নকল চবিটা নিয়ে অ্যাশলি আর্মসে গেলাম৷ আমার পরনে অফিসের ইউনিফর্ম—বাদামী রঙের জ্যাকেট আর গাঢ় সবুজ প্যান্ট৷ মাথায় বসানো ব্যাজ-লাগানো টুপি৷

রয় বলেছে, হাতের কাজ শেষ করেই ও অ্যাশলি আর্মসে ট্রাক নিয়ে চলে আসবে৷ বাইরে অপেক্ষা করবে আমার জন্য৷

অ্যাশলি আর্মসে যখন পৌঁছুলাম, সাড়ে দশটা বেজে গেছে৷ ট্রাক ছেড়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম দ্বাররক্ষীর ঘরের দিকে৷ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলাম৷

দেখি, লোকটা বসে একটা পকেট-বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে৷ মুখে বিরক্তির ভাব৷ হয়ত জীবনের একঘেয়েমিই এই বিরক্তির কারণ৷

আমাকে দেখেই চিনতে পারল৷ বই বন্ধ করে ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল, ‘ও—তুমি? মি. কুপারের সঙ্গে দরকার বুঝি?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তোমার কপাল খারাপ,—উনি বেরিয়ে গেলেন৷’

কাউন্টারে হেলান দিয়ে, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলাম, ‘কখন ফিরবেন উনি?’

দ্বাররক্ষী দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কি একটা হিসেব করল, ‘আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরার কথা৷’

‘কি আর করা যাবে—অপেক্ষাই করতে হবে৷ ওনাকে একটা দরকারী জিনিস দেবার ছিল৷’

‘আমার কাছে রেখে যাও—মিঃ কুপার এলে তাঁকে দিয়ে দেব৷’

‘উঁহু,—তা সম্ভব নয়৷—মানে ওঁর সিন্দুকের চাবি তো, আর কাউকে দেওয়াটা ঠিক হবে না৷ একেবারে ওঁর হাতে দিয়ে রসিদ নিয়ে যেতে হবে৷’

দ্বাররক্ষী কাঁধ ঝাঁকাল, ‘তোমার যা ইচ্ছে—৷’

ওর দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলাম, ‘তুমি ঠিক জান, আর আধঘণ্টার মধ্যেই মি. কুপার ফিরে আসবেন?’

‘সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই৷ কোনদিনই তাঁর দেরি হয় না৷ ঠিক আটটার সময় বেরোন আর রাত এগারোটায় ফেরেন৷’

‘হ্যাঁ,—কিছু কিছু লোককে দেখেছি একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে৷’

‘মি, কুপারও ওই দলের৷ তিন তিনটে নাইটক্লাবের মালিক৷ প্রত্যেক দিন রাতে, নিজের ক্লাবে যান এমন কি রোববারও বাদ দেন না৷ দেখাশোনা করে, এগারোটায় ডিনার খেতে আসেন৷ ডিনার সেরে, একটার সময় আবার বেরিয়ে পড়েন৷ দৈনিক বিক্রির হিসেব চুকিয়ে, ক্লাব বন্ধ করে, তারপর ফেরেন৷ কোনদিন এর একটুও হেরফের হয় না৷’

‘তোমাকে কি সারারাতই থাকতে হয় নাকি?’ ঘনিষ্ট হবার চেষ্টায় কপট সহানুভূতি দেখালাম৷

‘না—না৷ একটা বাজলেই আমি দরজায় তালা দিয়ে কেটে পড়ি৷ এ-বাড়ির প্রত্যেকের কাছেই দরজার নকল-চাবি আছে৷’ একটু থেমে অপেক্ষাকৃত নিচু স্বরে ও বলল, ‘আরে, তুমি বিশ্বাস করবে না দোস্ত, কতদিন মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে আমাকে টেনে তুলেছে৷ কি হয়েছে, না কোন শালা মাল টেনে, দরজার চাবি হারিয়ে বসে আছে৷’

এ সুযোগটা আমি হেলায় হারালাম না৷ রয়ে নির্দেশমতো গলায় একটা অন্তরঙ্গ সুর ফুটিয়ে তুললাম, ‘এই তো সেদিন রাতে কুপার ওর সিন্দুকের চাবি হারিয়ে আমাকে ডেকে পাঠাল৷ তখন সবেমাত্র এগারোটা৷ তারপর সিন্দুক সারিয়ে ফিরতে ফিরতে সাড়ে বারোটা বেজে গেল৷ শালা, পুরো সন্ধেটা মাটি!’

‘ও ব্যাটা রোজরোজই চাবি হারাচ্ছে,’ বিরক্তিতে মুখ বেজার করল দ্বাররক্ষী, ‘এই তো গত সপ্তাহেই দরজার চাবি হারিয়ে, আমাকে বিছানা থেকে টেনে তুলল৷ তখন ভোর পাঁচটা৷ হতভাগা চাবি হারানোর আর সময় খুঁজে পেল না! যত্তো সব—৷’

‘কুপার কি পাঁচটার সময় ফেরে নাকি?’

‘হ্যাঁ—৷ তারপর সারাদিন তো পড়ে পড়ে ঘুমোয়৷ একেবারে অপদার্থ—’

আনন্দে আমার চোখ চকচক করে উঠল৷ আমার আশা পূর্ণ হয়েছে৷ যা জানবার ছিল, তা জানা হয়ে গেছে৷ সুতরাং কায়দা করে প্রসঙ্গ পাল্টালাম৷ একথা-সেকথা নিয়ে বকর-বকর করে চললাম৷ ভুলেও দ্বাররক্ষীর কোন কথার প্রতিবাদ করলাম না৷ রয়ের নির্দেশমতো ওর সব কথাতেই সায় দিয়ে গেলাম৷ তারপর একসময় লক্ষ্য করলাম, লম্বা লম্বা পা ফেলে হেনরি কুপার এগিয়ে আসছেন৷ দেয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকালাম৷ এগারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি৷

দ্রুতপায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আপনার নকল-চাবিটা নিয়ে এসেছি, স্যর৷’

মুহূর্তখানেক তিনি তাঁর ছোট ছোট চোখ দিয়ে আমার আপাদমস্তক জরিপ করলেন৷ তারপর চিনতে পেরে বললে, ‘ওহ্—তুমি!—ঠিক আছে, চাবিটা দাও৷’

‘স্যর, আমার মনে হয় চাবিটা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটা একবার পরখ করা দরকার৷ অপনি যদি বলেন—’

‘হ্যাঁ—হ্যাঁ নিশ্চয়ই৷’ আমাকে অনুসরণ করতে বলে তিনি লিফটের দিকে পা বাড়ালেন৷

চারতলায় পৌঁছে কুপার তাঁর ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন৷ চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে আমাকে আহ্বান জানালেন৷ তাঁর পিছন পিছন আমিও বসবার ঘরে প্রবেশ করলাম৷

হেনরি কুপার ছবিটা সরিয়ে, আমাকে চাবিটা পরীক্ষা করার জন্য ইশারা করলেন৷ আমি চাবি ঘুরিয়ে সিন্দুকটা খোলার চেষ্টা করলাম৷ কুপার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়েছিলেন৷ তাঁর খুদে চোখজোড়া সিন্দুকের উপর নিবদ্ধ৷

হাতল ঘুরিয়ে টান মারতেই খুলে গেল সিন্দুকের দরজা৷ চোখের সামনে আবির্ভূত হল চোখ-ধাঁধানো কুবেরের সম্পদ৷ একটা অবাস্তব চিন্তা বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো ঝলসে উঠল আমার মনের আকাশে৷ ঘরে কুপার একা! যদি এখানেই ওকে আক্রমণ করি? ওই ফুলদানিটার বাড়ি মেরে ওকে অজ্ঞান করে, টাকা নিয়ে কেটে পড়তে আমার মিনিট পাঁচেকের বেশি সময় লাগবে না৷ তারপর—কিন্তু না!

অসীম সংযমে দমিয়ে রাখলাম এই অদম্য স্পৃহাকে৷ সিন্দুকটা আবার বন্ধ করে কুপারকে চাবিটা এগিয়ে দিলাম, ‘এই নিন, স্যর৷’

‘হুম—’ চাবিটা তিনি পকেটে রাখলেন৷ আপন মনেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘ঠিক আছে—৷’ তারপর ডান পকেটে হাত ঢোকালেন কিন্তু এই পর্যন্তই৷ তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল৷ পকেটের ভিতরেই থেকে রইল তাঁর ডান হাত, বাইরে আর এল না৷ কুপারের মনের ভাব কিন্তু আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম৷ আগের দিন আমাকে যে দু-ডলার দিয়েছিলেন, সেটার কথাই তিনি এখন ভাবছেন৷ এবং আমার এই সামান্য কাজের বিনিময়ে দু-ডলারই যে যথেষ্ট, সম্ভবত সেকথা বলে মনকে প্রবোধ দিচ্ছেন৷

লোকটার এই মাক্ষিচুসের মতো ব্যবহার দেখে রাগে আমার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে গেল৷ গত চবিবশ ঘণ্টা ধরে আমি শুধু দোমনা হয়ে ভেবেছি, রয়ের কথায় রাজি হব কি হব না৷ শুধু শুধু একটা লোকের সিন্দুক ভেঙে—কিন্তু না! সেই মুহূর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম৷ এরকম হাড়কিপটের সিন্দুক হাতালে কোন পাপ হয় না৷

কুপারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লিফটে পা দিলাম৷ রাস্তায় নেমে বৃষ্টির বেগকে উপেক্ষা করে ক্ষিপ্রপায়ে হেঁটে চললাম৷ বৃষ্টির ফোঁটার ঝাপসা পর্দা ভেদ করেও দেখা যাচ্ছিল, অদূরে দাঁড়ানো ট্রাকটাকে৷

ট্রাকে বসে রয় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল৷ আমাকে দেখেই দরজা খুলে ধরল, ‘ওই লালমুখো মোটা লোকটাই বুঝি কুপার?’

‘হ্যাঁ,’ রয়ের পাশে উঠে বসলাম৷ রয় স্টার্ট দিয়ে ট্রাক ছুটিয়ে চলল বৃষ্টিভেজা রাস্তা ধরে৷

‘রোববার দিনই ব্যাটাকে কোপ দেওয়া যাবে, বুঝলি রয়৷ কোন ঝামেলার ভয় নেই৷’

রোববার দিন আমার এবং রয়ের, দুজনেরই ছুটি৷ তাই ওই দিনটাই ঠিক করলাম৷

দেখতে দেখতে এসে গেল সেই আকাঙ্ক্ষিত, উৎকণ্ঠাময় দিন৷ রয় আগেই একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে রেখেছিল৷ রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় ও আমার বাড়িতে এল৷

আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলাম৷ বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে গিয়ে উঠলাম গাড়িতে৷ মুহূর্তমাত্রও দেরি না করে রয় গাড়ি ছুটিয়ে দিল অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷

বৃষ্টির ফোঁটা নিষ্ফল আক্রোশে মাথা খুঁড়ছে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে৷ রয় একমনে গাড়ি চালাচ্ছে৷ ওর চোয়ালের রেখা কঠিন৷ কেমন একটা নিঃশব্দ উৎকণ্ঠা অনুভূত হচ্ছিল গাড়ির আবহাওয়ায়৷ আমরা দুজনেই চুপ৷ কারো মুখেই কোন কথা নেই৷ শুধু অনুভব করলাম বুকের মধ্যে অশান্ত হৃৎপিণ্ডের দাপাদাপি—ঢিপ ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ৷

বৃষ্টির জন্য আমাদের সুবিধেই হল৷ রাস্তায় জনমানবের চিহ্ণমাত্র নেই৷ ঠিক একটা বাজতে পাঁচ মিনিটের সময় আমরা অ্যাশলি আর্মসে পৌঁছলাম৷

সারি সারি গাড়ি পার্ক করা রয়েছে রাস্তাটায়৷ একটা ক্যাডিলাক এবং একটা প্যাকার্ডের মাঝে গাড়িটা ঢুকিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করল রয়৷ তারপর শুরু হল আমাদের উদ্গ্রীব প্রতীক্ষা! বৃষ্টির ফোঁটা ঝমঝম করে আছড়ে পড়ছে গাড়িগুলোর ছাদে৷

রয়ের দিকে তাকালাম৷ পলকহীন চোখে ও চেয়ে রয়েছে অ্যাশলি আর্মসের সদরদরজার দিকে৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ পরিষ্কার ছন্দে শোনা যেতে লাগল৷

চোখ ফেরালাম অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷ কখন বেরোবে কুপার? উত্তেজনায় শরীরের প্রতিটি স্নায়ু কাঁপছে৷

ড্যাশবোর্ডে লাগানো ঘড়ির দিকে তাকালাম৷ রাত একটা৷ চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম, একজন লোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে৷ আমি রয়ের দিকে ঘাড় ফেরাতেই দুজনের চোখাচোখি হল৷ রয়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷

কুপার রাস্তায় এসেই মাথা ঝুঁকিয়ে দৌড়তে শুরু করল৷ আমাদের গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রাখা ছিল একটা সাদা জাগুয়ার৷ হাত দিয়ে বৃষ্টির বেগ প্রতিহত করতে করতে জাগুয়ারটার দিকে এগিয়ে চলল কুপার৷ কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে উঠে বসল গাড়িতে৷ তারপর গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টিভেজা অন্ধকার গ্রাস করল সাদা জাগুয়ারটাকে৷

‘এখনও আর একজন বাকি—৷’ কাঁপা স্বরে বলল রয়৷

‘হ্যাঁ—৷’ অ্যাশলি আর্মসের থেকে চোখ না সরিয়ে জবাব দিলাম৷ কিন্তু নিজের গলাই কেমন অপরিচিত ঠেকল নিজের কাছে৷

কয়েক মিনিট পর সেই দ্বাররক্ষীকে এগিয়ে আসতে দেখলাম৷ ও এসে দাঁড়াল কাচের দরজার কাছে৷ পকেট হাতড়ে একটা চাবি বের করল৷ তারপর চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল সদরদরজা৷

দরজার কাচের পাল্লার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল লোকটাকে৷ ও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল বাড়ির অপর প্রান্তে৷ সিঁড়ি ভেঙে নামতে শুরু করল৷ বুঝলাম, ও ফিরে যাচ্ছে ওর কোয়ার্টারে৷ হয়ত বৃষ্টিভেজা ঠান্ডার রাতে একটা গভীর ঘুম দেবার মতলব ভাঁজছে৷

‘চল, আর দেরি করে লাভ নেই৷’ চমক ভাঙল রয়ের কথায়৷ কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরলাম যন্ত্রপাতির ব্যাগটা৷ রয় ততক্ষণে দরজা খুলে নেমে দাঁড়িয়েছে৷ অশান্ত মনকে কিছুতেই পারছি না শান্ত করতে৷ শ্বাস-প্রশ্বাসে কেমন একটা কষ্ট অনুভব করছি৷ রয়ের কথায় সায় না দিলেই হত! কিন্তু এখন আর ফিরে যাবার উপায় নেই৷

গাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরোতেই বৃষ্টির জল ঝাঁপিয়ে পড়ল গায়ে, মাথায়৷ ঠাণ্ডা জলের ফোঁটায় সাময়িক ভাবে প্রশমিত হল রক্ত-উত্তাল করা উত্তেজনা৷ আঃ—পরমুহূর্তেই আমরা ছুটলাম সদরদরজা লক্ষ্য করে৷ প্রথমে রয়, আর তার পিছন পিছন আমি৷

আগে থেকেই আমরা সব-কিছু ছকে রেখেছিলাম৷ আমার কাজ হবে তালাটা খোলা, আর রয় চারপাশে লক্ষ্য রাখবে৷ কোন বিপদের আশঙ্কা দেখলেই আমাকে সতর্ক করে দেবে৷

দরজার কাছে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে পকেট থেকে চাবি-ভর্তি রিংটা বের করলাম৷ সদরদরজার কাছ থেকে বাড়ির ভিতরের দরজাটা দেখা যাচ্ছে না৷ যদি কেউ বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসে? একথা ভাবতেই আতঙ্কে অবশ হয়ে গেলাম৷ পাঁচ আঙুলের ফাঁক থেকে স্খলিত হয়ে পড়ে গেল চাবির রিংটা৷

‘কী, করছিস কী?’ রয়ের চাপা ধমকানিতে সংবিত ফিরে পেলাম৷ চটপট রিংটা তুলে নিয়ে তালাটার দিকে মনোযোগ দিলাম৷

এমনিতে এ-ধরনের তালা খোলা আমার কাছে কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার৷ কিন্তু থরথর করে আমার হাত কাঁপছিল৷ তাই প্রয়োজনের অনেক বেশি সময়ই লাগল দরজাটা খুলতে৷ রয় ততক্ষণে উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠেছে৷

হাতল ঘুরিয়ে অতি সন্তর্পণে দরজাটা ফাঁক করলাম৷ তারপর আমি আর রয় নিঃশব্দে ভিতরে পা বাড়ালাম৷ বেড়ালের মতো ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে চললাম সিঁড়ির দিকে৷

আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম, লিফট ব্যবহার করব না৷ কারণ দ্বাররক্ষী যদি হঠাৎই বিছানা ছেড়ে উঠে আসে, তবে লিফটের আলো দেখে ঠিক সন্দেহ করবে৷ আর যদি হই-চই শুরু করে দেয়, তবে তো হয়েই গেল৷

সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে শুরু করলাম৷ ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে, কারণ মাঝপথে কারো মুখোমুখি পড়তে হল না৷

যখন কুপারের ফ্ল্যাটের সামনে উপস্থিত হলাম, তখন আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি৷ পকেট থেকে চাবির রিংটা বের করে, একটা চাবি লাগাতেই খুলে গেল ফ্ল্যাটের দরজা৷ ভয় অনেকটা কমে এসেছিল৷ এতটা যখন নির্বিঘ্নে পার হয়ে এসেছি, তখন—৷

সিন্দুকের টাকার কথা মনে পড়তেই হারানো সাহসের অনেকখানি ফিরে পেলাম৷ হাতের চাপে ফাঁক হয়ে গেল দরজার পাল্লা৷

ঘরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আমাদের গ্রাস করতে এগিয়ে এল৷ দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে, ঘরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালাম৷ কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম সামান্যতম শব্দ৷

শুধু ভেসে এল দেওয়াল ঘড়ির টিক-টিক-টিক—আর রেফ্রিজারেটরের মৃদু টানা গুঞ্জন—

‘কি হল তোর? দাঁড়িয়ে রইলি কেন?’ পিছন থেকে আমাকে ঠেলা মারল রয়৷

বুঝলাম এই অসহ্য উৎকণ্ঠায় ওর স্নায়ু ভেঙে পড়তে চাইছে৷

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ডের কাছে এগিয়ে গেলাম, আলো জ্বেলে দিলাম৷ ধবধবে মার্কারি ল্যাম্পের চোখ-ঝলসানো আলোয় ঘর ভেসে গেল৷ রয় ভিতরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল৷ ইয়েল লক দরজা ‘ক্লিক’ শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল৷

‘একখানা ঘরের মতো ঘর বটে!’ ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল রয়, ‘কুপার ব্যাটা দেখছি টাকার কুমির!—যাকগে, সিন্দুকটা কোথায়?’

কোন জবাব না দিয়ে, অয়েলপেন্টিংটার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম৷ ছবিটা সরিয়ে ধরলাম একপাশে৷ সামনেই সিন্দুকটা—৷

‘নে, চটপট কাজ শুরু কর৷’ ঘরের এককোণে রাখা দামি টেলিভিশন সেটটার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই রয় তাড়া লাগাল৷’

কম্বিনেশন-নম্বরটা আমার মুখস্থই ছিল৷ তা ছাড়া, সঙ্গে ছিল সিন্দুকের নকলচাবি৷ কুপারের চাবিটা তৈরির সময় এটাও তৈরি করিয়ে নিয়েছিলাম৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খুলে ফেললাম সিন্দুকের দরজা, ‘রয়, দেখবি আয়—’

বিস্ময়ে হতবাক দুজন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, হাঁ করে চেয়ে রইলাম টাকার পাহাড়ের দিকে৷

‘একি স্বপ্ন দেখছি!’ রয়ের পাঁচ আঙুল ওর অজান্তেই শক্ত হয়ে চেপে বসল আমার হাতে, ‘শেট বাকি জীবনটা তাহলে পায়ের ওপর পা তুলেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে, কি বলিস?’

‘সত্যিই, পৃথিবীতে এর চেয়ে সহজ কাজ আর হতে পারে না৷ আনন্দের ঢেউ তখন আছড়ে পড়ছে বুকের ভিতরে৷

আড়াই—লাখ—ড—লা—র!—সম্পূর্ণ—আমার—এও কি সম্ভব?

কতক্ষণ যে ওইভাবে একটা ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না হঠাৎ একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেলাম৷ রয়ের দিকে চেয়ে দেখি, ও তখনও লুব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে টাকার বান্ডিলগুলোর দিকে৷ অবচেতন মনে শব্দটাকে ততটা আমল দিইনি৷ কিন্তু পুরমুহূর্তেই, ওই শব্দের অর্থ বুঝতে পেরে আতঙ্কে জমে পাথর হয়ে গেলাম৷ রয়কে এক ধাক্কা মারতেই ও সংবতি ফিরে পেল৷ ঘাড় ঘুরিয়ে আমরা দুজনেই দরজার দিকে তাকালাম৷

একটা ছবির অগ্রভাগ বেরিয়ে আছে চাবির ফুটো দিয়ে৷ আস্তে আস্তে ঘুরছে চাবিটা৷ আমাদের আতঙ্ক-বিস্ফোরিত চোখের সামনেই ‘ক্লিক’ করে একটা শব্দ হল এবং চাবিটা ফুটো থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

আমি তখন জড়পদার্থের মতো অচল, অনড়! দেহের সমস্ত অনুভূতি যেন জমে বরফে পরিণত হয়েছে৷ সাধারণ বুদ্ধিটুকুও যেন লোপ পেয়েছে৷

দেখলাম রয় হঠাৎ পাগলের মতো ছুটে গেল সুইচবোর্ড লক্ষ্য করে, আর একই সঙ্গে ঘুরতে শুরু করল দরজার হাতলটা৷ অর্থাৎ বাইরে থেকে কেউ দরজা খুলছে!

রয় সুইচ অফ করার সঙ্গে-সঙ্গেই একরাশ অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের মধ্যে৷ পরমুহূর্তেই ধীরে ধীরে খুলতে লাগল ফ্ল্যাটের দরজা৷ বারান্দার একফালি আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়ল৷ দরজা যতই খুলতে লাগল, ততই চওড়া হতে লাগল সেই আলোর রেখা৷ ক্রমশ আমার গায়ে এসে পড়ল সেই আলো, এবং আমাকে অতিক্রম করেও বেশ কিছুটা গিয়ে তারপর থামল৷ অর্থাৎ দরজা সম্পূর্ণটাই খুলে গেছে আর ঠিকরে-পড়া বারান্দার আলোর বৃত্তে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি৷

রয়কে অন্ধকারে দেখতে পেলাম না৷ শুধু দেখলাম, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই আগের দিনের দেখা মেয়েটি৷ মুহূর্তমাত্র আমরা তাকিয়ে রইলাম পরস্পরের দিকে৷

পরক্ষণেই মেয়েটির তীক্ষ্ণ আর্ত চিৎকারে চমকে উঠলাম, ‘চোর—চোর! হেনরি—ঘরে চোর ঢুকেছে—৷’ আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে, পা দুটো যেন আটকে আছে মেঝের সঙ্গে৷ মনে হল, কানের ভিতর কেউ যেন ঢেলে দিয়েছে গরম সীসে৷

দেখলাম, কুপার এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির পিছনে৷ এক ঝটকায় ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, কুপার আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ দুহাতের দশ আঙুল যেন চিতার থাবার মতো রক্ত-পিপাসায় বাঁকানো৷ চোখের অগ্নিক্ষরা দৃষ্টিতে জ্বলছে আক্রোশের লেলিহান শিখা৷

আমি তখন বোবা-আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷

মেয়েটা ঝড়ের বেগে ছুটে গেল সিঁড়ি লক্ষ্য করে৷ ওর তীক্ষ্ণ কানফাটানো আর্ত চিৎকারে গোটা বাড়িটা কেঁপে উঠতে লাগল৷

এবার আমি রয়কে দেখতে পেলাম৷ জাগুয়ারের মতো গুঁড়ি মেরে, দেয়াল ধরে ও এগিয়ে চলল দরজার কাছে, কুপারের ঠিক পিছনে৷ কুপার রয়কে দেখতে পায়নি৷ সে সোজা এগিয়ে আসছিল আমারই দিকে৷ দু-হাত বাড়িয়ে সে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কিছু একটা ঝলসে উঠল রয়ের হাতে৷ একটা শব্দ হল—ঠকাস! কুপারের বিশাল দেহ গোড়াকাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ল আমার পায়ের কাছে৷

লক্ষ্য করলাম, রয়ের দুহাতে, বজ্রমুষ্টিতে ধরা রয়েছে সেই ভারী ফুলদানিটা৷ অর্থাৎ হাতের কাছে আর-কিছু না পেয়ে, ওই ফুলদানিটাই কুপারের মাথায় বসিয়ে দিয়েছে রয়৷

‘শেট—’ আমার হাত ধরে ও এক হ্যাঁচকা টান মরল, ‘শীগগির—’

আমি যেন এতক্ষণ দেখা দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে উঠলাম৷ সমস্ত বোধশক্তি লোপ পেয়ে, শুধু একটা চিন্তাই ঘুরতে লাগল মনের মধ্যে—পালাতে হবে৷

কোন-কিছু ভাববার আগেই টের পেলাম, আমি উন্মাদের মতো দরজা লক্ষ্য করে দৌড়চ্ছি৷ পিছন থেকে রয়ের চাপা ধমক শুনতে পেলাম, ‘অ্যাই শেট, নিচে নয়—ওপরে—!’ ভয়ে ওর গলা কাঁপছে৷

আমি তখন আতঙ্কে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে চলেছি৷ নিচ থেকে মেয়েটির গলাফাটানো আর্তচিৎকার তখনও শোনা যাচ্ছে৷ কিন্তু আমার মনে তখন একটাই চিন্তা—যে করে হোক আমাকে গাড়ির কাছে পৌঁছতে হবে৷

‘শেট, নীচে নয়—ওপরে আয়—ওপরে—৷’ রয়ের অধৈর্য চাপা গলা শুনতে পেলেও, ওর কথা আমার আচ্ছন্ন মনে কোন রেখাপাত করল না৷ এক এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি ভেঙে অন্ধের মতো ছুটে চললাম৷

সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই তিনতলায় পৌঁছলাম৷ দোতলায় সিঁড়ি লক্ষ্য করে দৌড়চ্ছি, একটা ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল৷ একজন রোগা, সানাচুলওয়ালা বুড়ো বেরিয়ে এল৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই একলাফে ফ্ল্যাটে ঢুকে, দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল৷ একটুও না থেমে ছুটে চললাম৷

পরের সিঁড়িগুলো তিন লাফে পার হয়ে, দৌড়তে শুরু করলাম নিচের তলার সিঁড়ি লক্ষ্য করে৷ কিন্তু হঠাৎই পা পিছলে যাওয়ায়, মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়লাম মেঝেতে৷ কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়ে, আঘাত গ্রাহ্য না করে আবার দৌড়লাম৷ ছুটতে ছুটতে অবশেষে এসে উপস্থিত হলাম দালানে৷

মেয়েটা তখন দ্বাররক্ষীর অফিসের কাছে দাঁড়িছে, দরজার হাতল ধরে টানাটানি করছে৷ আমাকে দেখে আতঙ্ক-বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ তারপরই ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল হাঁড়িচাঁচা-কণ্ঠে এক অমানুষিক আর্ত চিৎকার৷

এমন সময় লক্ষ্য করলাম, দ্বাররক্ষী ওর কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে আসছে৷ প্রথমে ও চোখ গোল গোল করে কিছুক্ষণ আমাকে দেখল, পরক্ষণেই সংবিত ফিরে পেয়ে, হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে বুনো মোষের মতো ছুটে এসে লাফিয়ে পড়ল আমার ঘাড়ে৷ জাপটাজাপটি করে দুজনেই ছিটকে পড়লাম মেঝেয়৷ ওর শক্ত হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে আমি শুধু কোনরকমে পালাতে পারলেই বাঁচি!

ভয়ে মরিয়া হয়ে, লোকটার চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে সজোরে ঠুকে দিলাম৷ তাতেও যখন কিছু হল না, তখন দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ঘুঁষি বসিয়ে দিলাম ওর মুখে৷ লোকটা আচ্ছন্ন ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আগেই ওকে ঠেলে সরিয়ে টলতে টলতে উঠে, আবার ছুটতে শুরু করলাম—লক্ষ্য সদর দরজা৷

দরজা খুলে ঠিক বাইরে পা দিচ্ছি, এমন সময় বেজে উঠল কানফাটানো এক পুলিশহুইহল্৷ নিশ্চয়ই দ্বাররক্ষীর কাণ্ড! মেয়েটির বীভৎস চিৎকার আর এই হুইশল্-এর কানফাটানো শব্দে তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম৷ পড়িমরি করে দৌড়লাম রাস্তা লক্ষ করে৷

বৃষ্টির মধ্যেই ছুটে চলেছি কানে তখনও ভেসে আসছে সেই চিৎকার৷ কিন্তু তাকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ৷

এই বৃষ্টিতেও আমি তখন কুলকুল করে ঘামছি৷ হৃৎপিণ্ড যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে চাইছে৷ কিন্তু আমার পা আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল৷

‘হে—ই—ই—’ ছুটতে ছুটতেই পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম৷ একটা ছায়ামূর্তি আমার পিছনে পিছনে দৌড়ে আসছে৷ তার মাথায় টুপি কোটের বোতামগুলো অন্ধকারেও ঝকঝক করছে৷—পুলিশ! ভয়ে আমার দেহ অবশ হয়ে এল৷

কিন্তু ওই তো—সামনেই দেখা যাচ্ছে আমাদের গাড়িটা৷ একবার গাড়িতে গিয়ে উঠতে পারলেই—

নতুন উদ্যমে ছুটে চললাম! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেসে এল রিভলভারের শব্দ—ফটাস!

‘উঃ—’ আমার গাল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল একটা আগুনের হালকা৷ গালের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে৷ যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করলাম৷

চট করে মাথা নিচু করে, রাস্তার অপর প্রান্ত লক্ষ্য করে ছুটে চললাম৷ সেদিকটা সম্পূর্ণ অন্ধকার৷ যদি একবার ওখানে পৌঁছুতে পারি, তবে এখনও পালাবার আশা আছে৷

দৌড়তে দৌড়তেই আবার শুনতে পেলাম সেই কালান্তক রিভলবারের শব্দ—উঃ—! পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড এক ধাক্কায় ভিজে রাস্তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম৷ যেন কেউ একটা উত্তপ্ত লৌহ-শলাকা বিঁধিয়ে দিয়েছে আমার পিঠে৷ যন্ত্রণায় চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বরই বেরোল না৷ অজান্তেই হাত চলে গেল পিঠে, আহত জায়গাটা চেপে ধরতে৷ হাত সামনে আনতেই দেখলাম, হাতময় চটচটে ভিজে রক্ত৷ বৃষ্টির জলে ধুয়ে ধুয়ে, সেই রক্ত টপ টপ করে পড়ছে পাঁচ আঙুলের ফাঁক দিয়ে৷—প্রতিটি অনুভূতি অবশ হয়ে আসতে লাগল—

শুনতে পাচ্ছি কয়েক জোড়া ভারী বুটের শব্দ—খট—খট—খট—খট৷ তীরবেগে কারা যেন দৌড়ে আসছে আমারই দিকে—খট—খট—খট—খট—

—উঃ—কি অন্ধকার—!—মাগো—

তারপর আমার আর কিছু মনে নেই৷

দুই

বহুদূর থেকে ভেসে আসা কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেলাম৷ যেন কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে—অনেক—অনে—ক দূর থেকে—

ক্রমশ চেতনা ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকে একটা অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হল৷ যতই সময় যেতে লাগল, ততই যেন তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠল ব্যথাটা৷

আস্তে আস্তে চোখ ফেললাম৷ দুধ-সাদা-চারদেয়ালে-ঘেরা একটা ঘরের মধ্যে আমি শুয়ে আছি৷ আমার মুখের উপর ঝুঁকে রয়েছে একটা মুখ৷ দুটো উদ্গ্রীব চোখ স্থিরলক্ষ্যে চেয়ে আছে আমার দিকে৷ এক সময় সেই মুখের ছবিটা অস্পষ্ট হয়ে, কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে গেল৷ বুকের মধ্যে তীব্রতর হয়ে উঠল সেই অসহ্য যন্ত্রণা৷ থর থর করে কেঁপে উঠলাম৷ আপনা থেকেই চোখ বুঝে এল৷

কিন্তু ঘটে-যাওয়া ঘটনাগুলো, মনের পর্দায় ছবির মতো পর পর ভেসে উঠতে লাগল৷ মনে পড়ল, উন্মাদের মত সিঁড়ি ভেঙে দৌড়নোর কথা৷ দ্বাররক্ষীর সঙ্গে ধবস্তাধবস্তি, মেয়েটির বীভৎস আর্ত চিৎকার, অন্ধের মতো রাস্তা লক্ষ্য করে আমার ছুটে যাওয়া—সব—স—ব একে একে এসে ভিড় করল আমার মনের আয়নায়৷ এমন কি রিভলবারের সেই ভয়ঙ্কর শব্দগুলোও যেন আবার শুনতে পেলাম—

রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে এই হল পরিণতি৷—হুঁঃ—আমি আজ শুয়ে আছি হাসপাতালের বিছানায়—আহত অবস্থায়, আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণদর্শন এক পুলিশ-সার্জেন্ট—একেই বলে নিয়তি!

আপনি তো বলছেন, এর আঘাত নাকি ততটা গুরুতর নয়৷ তাহলে ব্যাটা নিশ্চয়ই মটকা মেরে পড়ে আছে৷ কলার ধরে তুলে, এক লাথি ঝাড়লেই সুড়সুড় করে জ্ঞান ফিরে আসবে—৷’ সাজেন্টের শ্লেষ-ভরা অধৈর্য কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম৷

‘না—না, —তাড়াহুড়ো করাটা ঠিক হবে না, সার্জেন্ট, লোকটা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে৷ গুলিটা আর একটু বাঁদিক ঘেঁষে গেলেই—৷’ শান্ত ভদ্র কণ্ঠস্বর—সম্ভবত ডাক্তারের৷

‘তাই নাকি! আমার তো মনে হয়, আমার দাওয়াই খাওয়ার পর ওর মনে হবে, গুলিটা একটু বাঁদিকে ঘেঁষে গেলেই ওর পক্ষে ভালো ছিল—হাঃ—হাঃ—হাঃ—হাঃ—৷’ হায়েনার হিংস্র হাসি ভেসে এল সার্জেন্টের গলা দিয়ে৷

পরিস্থিতির গুরুত্ব বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছি৷ চোখ পিটপিট করে তাকালাম৷ বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন লোক৷ প্রথমজনের চেহারা মেদবহুল, মুখে প্রশান্তির ভাব৷ গায়ে একটা সাদা আলখাল্লা৷—এ শালাই তাহলে ডাক্তার৷

দ্বিতীয়জন ছোটখাটো পাহাড়ের মতো৷ ভোঁতা নাক, পাতলা, ঠোঁট, আর ছোট ছোট হিংস্র চোখ৷ পরনে তেলচিটে ময়লা পোশাক৷ কিন্তু তার টুপি পরার ধরন দেখেই বুঝলাম, এ ব্যাটা নিঃসন্দেহে পুলিশের লোক—৷

চুপচাপ শুয়ে বুকের যন্ত্রণা সহ্য করছি—হঠাৎ মনে পড়ল রয়ের কথা! শেষ পর্যন্ত ও কি পালাতে পেরেছে? ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম৷

অবশ্য রয় আমার মতো ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েনি৷ বরং বুদ্ধিমানের মতোই উপরে ছুটেছিল৷ আর আমি গাঁথার মতো দৌড়েছিলাম নীচে—সোজা পুলিশের হাতে৷

রয় যদি ঠিকমতো সবার অলক্ষ্যে অ্যাশলি আর্মস ছেড়ে পালাতে পেরে থাকে, তবে ওর আর জড়িয়ে পড়ার কোন ভয় নেই৷ কারণ কুপারের টাকা প্রথম দিন আমিই দেখেছিলাম, দ্বাররক্ষীর সঙ্গে গল্প করেছিলাম আমিই, এবং আমাকেই সিঁড়ি ভেঙে উন্মাদের মতো ছুটতে দেখেছে লোকেরা৷ সুতরাং রয় সম্পূর্ণ বিপদ-মুক্ত৷

তারপরেই মনে হল সেই ‘ঠকাস—’ শব্দটার কথা৷ ভাবতেই পারিনি, রয় ঐ ভারী ফুলদানিটা ওরকম আসুরিক শক্তিতে বসিয়ে দিতে পারবে কুপারের মাথায়৷

এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠলাম৷ কুপারের কি হল? ব্যাটা টেঁসে যায়নি তো—?’

হঠাৎ একটা বিশ্রী ঘামের গন্ধে আর তামাকের ধোঁয়ায় চমকে উঠলাম৷ এত কাছে গন্ধটা—ধীরে ধীরে চোখ খুললাম—আমার সামনেই সার্জেন্টের হিংস্র লালচে মুখ৷

দেখলাম, ঘরে ডাক্তার নেই অর্থাৎ আমরা দুজন একা৷

সার্জেন্টটি তার বীভৎস মুখ আরো নামিয়ে আনল, ‘ঢের হয়েছে! এবার দয়া করে মুখ খুলুন দেখি, বাবা যুধিষ্ঠির! আপনার শ্রীমুখের বাণী শোনার জন্য গত দুদিন ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি!—নে শালা, চটপট মুখ খোল!’ নেকড়ের মতো দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল সে৷ তামাকে কালো হয়ে যাওয়া চকচকে দাঁতের সারি কিড়মিড় করে উঠল৷—শুরু হল পুলিশের হাতে নরক-যন্ত্রণা৷

ওদের একটা অস্পষ্ট ধারণা ছিল, কাজটা আমি একা করিনি৷ তাই হাজার রকম প্রশ্ন করে, ভয় দেখিয়ে, আমার মুখ থেকে সে-কথাটা বের করতে চাইল৷ কিন্তু আমি ঘাড় নেড়েই চললাম৷ কারণ, ওদের কথা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, রয়ের উপস্থিতির কোন প্রমাণই পুলিশের হাতে নেই৷ এমনকি কুপারের খুনের দায়ে আমাকেই পড়তে হবে বলে ভয় দেখালেও, আমি মুখ খুললাম না৷

অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে ওরা ক্ষান্ত হল৷ এ কথাও জানাল, কুপার সেরে উঠেছে৷ কুপারের সেরে ওঠাটা, ওরা যে ভালো চোখে দেখছে না, সেটা বুঝতে কষ্ট হল না৷ কারণ ও বেঁচে যাওয়ার জন্যই, আমি গ্যাস-চেম্বারের হাত থেকে রেহাই পেলাম৷

‘কুপার বেঁচে গেছে বলে ভেব না, তুমি বেঁচে যাবে৷’ সার্জেন্ট দাঁত খিঁচিয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘ওই আঘাতে কুপার মারাও যেতে পারত৷—তবে ঘাড়বার কোন কারণ নেই বাছাধন, তোমার দশ বছরের ঘানি ঘোরানো কেউ রুখতে পারবে না—হাঃ হাঃ—’ হায়েনা-হাসির সঙ্গে সঙ্গে ওর বিশাল দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল৷

হাসপাতাল থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল জেল-হাজতে৷

সেখানে তিন মাস কাটানোর পর জানতে পারলাম, কুপার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে৷ অর্থাৎ, বেশ বহাল তবিয়তেই সে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারবে৷

ক্রমে এগিয়ে এল বিচারের দিন৷ দিনটা আমার চিরকাল মনে থাকবে, কোনদিন ভুলব না৷

আদালতে এসে চারদিকে চোখ বোলালাম৷ যদি কোন পরিচিত মুখ নজরে পড়ে৷ হঠাৎ চোখে পড়ল, দর্শকদের ভিড়ে জ্যানি দাঁড়িয়ে আছে৷ আমাকে দেখেই, ও হেসে ফেলল৷ খুব অবাক হলেও, মুখে একটা চেষ্টাকৃত হাসি ফুটিয়ে তুললাম৷ সত্যি—আর যেই আসুক না কেন, ভাবতেই পারিনি, জ্যানি এখানে আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে৷

তারপরই চোখ পড়ল, আমার বস—ফ্রাঙ্কলিনের উপর আর তার পাশে ভিজে বেড়ালের মতো চুপটি করে বসে আছে রয়৷

রয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হল৷ ওর মুখ পাণ্ডুর, এ তিন মাসে চেহারা অনেক খারাপ হয়ে গেছে৷ হয়তো দিনরাত খালি ভেবেছে ওর নাম আমি পুলিশকে জানিয়েছি কিনা৷

এবার চোখ ফেললাম বিচারপতির দিকে৷ হাড়-বের-করা মুখ৷ কোটরগত অনুভূতিহীন চোখ৷ সারা মুখ জুড়ে একটা অদ্ভুত কাঠিন্য৷

কেন জানি না, হঠাৎ মনে হল, এর হাত থেকে আমার আর নিস্তার নেই! দেখলাম, শাস্তির কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে আসছে কুপার৷ মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, চোখমুখ বিবর্ণ, আগের চেয়ে অনেক রোগা হয়ে গেছে৷

কুপার শপথ নিল৷ তারপর সিন্দুক খোলার জন্য আমাকে ডেকে পাঠানো থেকে শুরু করে,—নকল চাবির কথা, ওকে আক্রমণ করার কথা—একে একে সব বলে গেল৷ কিছুই বাদ দিল না৷

এরপর কাঠগড়ায় এসে উপস্থিত হল, কুপারের ফ্ল্যাটে দেখা সেই মেয়েটি৷ ওর পরনে একটা চাপা আকাশ-নীল পোশাক৷ আদালতের সমস্ত লোক, এমনকি বিচারপতি পর্যন্ত ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল৷

মেয়েটির বিবৃতি থেকে জানা গেল, ও কুপারের একটা নাইট-ক্লাবে গান গায়৷ সেদিন একটা গানের রিহার্সাল দিতে ও কুপারের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল, এরকম ও মাঝেমধ্যেই যায়৷ গানের না কিসের রিহার্সাল, সেটা দর্শকরা বেশ ভালোই বুঝতে পারল৷ সম্ভবত কুপারকে হিংসাও করতে লাগল মনে মনে৷

সেদিন কুপার ফোন ধরতে পাশের ঘরে গেলে, আমি যে সিন্দুক খুলে টাকাগুলো দেখেছিলাম, সে-কথার উপর মেয়েটা একটু বেশি জোর দিল৷

কিন্তু ফ্রাঙ্কলিনের সাক্ষ্য আমাকে অবাক করল৷ তিনি কাঠগড়ায় উঠে আমার প্রশংসাই করলেন৷ আমি যে তার কোম্পানির একজন বিশ্বাসী ও সুদক্ষ কর্মচারী, সে-কথা তিনি বিচারপতিকে বার বার জানালেন৷ কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা! মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম, ফ্রাঙ্কলিনের কথা তার এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে৷

আমার উকিল উঠে দাঁড়িয়ে, আদালতের কাছে আমার জন্য করুণা ভিক্ষা করলেন৷ অর্থাৎ, এই আমার প্রথম অপরাধ৷ সুতরাং বিচারপতি যেন শাস্তির ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখেন৷ তাঁর কৃপা-প্রার্থনার ভঙ্গি দেখে মনে হল, আমি দোষী সাব্যস্ত হওয়াতে তিনি বেশ আনন্দিত হয়েছেন৷ তারপর তিনি চেয়ারে বসে কতকগুলো কাগজপত্র ওল্টাতে লাগলেন৷ দূর থেকে তার লেখাগুলো পড়তে না পারলেও, আমি বাজি রেখে বলতে পারি, ওগুলো তাঁর পরবর্তী মামলার নথি৷ এক কথায় উকিলটি বেশ বুদ্ধিমান৷ আমার মামলা নিয়ে ফালতু সময় নষ্ট করে যে আর লাভ নেই, সেটা তিনি বেশ বুঝতে পেরেছেন৷

এরপরই কানে এল বিচারপতির গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘শেট কারসন, সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণাদি বিচার করে একথাই প্রমাণিত হচ্ছে, তুমি দোষী৷ এ-বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই৷ যেহেতু এটাই তোমার প্রথম অপরাধ, সেহেতু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তোমাকে লঘুদণ্ড দিতে আমি আইনসঙ্গতভাবে বাধ্য৷ তুমি যেভাবে মি. হেনরি কুপারকে আক্রমণ করেছ, তাতে তোমার হিংস্র মনোভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়৷ ভুলে যেও না, তোমার আঘাতে মি. কুপার মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারতেন৷

‘এছাড়া, একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সুনাম তুমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ, কারসন! যে কোম্পানিতে তোমার বাবা এবং ঠাকুর্দা বিশ্বস্তভাবে কাজ করে গেছেন, তুমি তাদেরই বংশধর হয়ে এই হীন-কাজ করেছ, একথা ভাবতেও তাঁরা লজ্জাবোধ করবেন—’

বিচারপতির কোন কথাই আমার কানে ঢুকল না৷ আমি শুধু ব্যাটার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম শেষ লাইনটার অপেক্ষায় যেটা আমার কাছে সবচেয়ে জরুরী৷ অর্থাৎ ক’বছর? পাঁচ—দশ—না পনেরো?

‘—সমস্ত বিচার করে আমি তোমাকে ফার্নওয়ার্থ বন্দীশিবিরে দশ বছরের নির্বাসন দণ্ড দিলাম৷’ বিচারপতি উঠে দাঁড়ালেন৷

থর থর করে কাঁপতে লাগল আমার পা দুটো৷ ফার্নওয়ার্থ?! ওঃ—ভগবান! আমি—আমি তো একথা কল্পনাও করিনি! মনে হল গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠি—দোহাই হুজুর, আমাকে কুড়ি—পঁচিশ—যত বছর খুশি কারাদণ্ড দিন! কিন্তু ফার্নওয়ার্থ—না—না—না!

প্রচণ্ড ক্ষোভ আর আফসোসের রুদ্ধ কান্না যেন সমস্ত সত্তাকে ভেঙে খান খান করে দিল৷ আগামী দশটা বছরের কথা চিন্তা করে, হৃৎপিণ্ড আতঙ্কে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল৷—উঃ—! মাথা রাখলাম কাঠগড়ার রেলিঙের উপর৷

হঠাৎ এক অদ্ভুত চিন্তা ভেসে উঠল আমার ভয়ার্ত হৃদয়ে৷ রয়—রয়ই তো এসবের জন্য দায়ী! ও যদি কুপারকে না মারত, তাতে তো আমাকে ফার্নওয়ার্থে যেতে হত না৷ হয়ত পাঁচ বছর জেল খেটেই রেহাই পেতাম!—শুধু রয়ের জন্যই আজ আমাকে ফার্নওয়ার্থে যেতে হচ্ছে৷

এখনও সময় আছে, কারসন,—মন বলে উঠল, বিচারপতিকে রয়ের নাম বলে দাও৷ এ ছাড়া তোমার মুক্তির আর-কোন পথই খোলা নেই—

মন স্থির করে নিয়ে এক ঝটকায় সিধে হয়ে দাঁড়ালাম৷ মুখ তুলতেই চোখ পড়ল রয়ের চোখে৷ ফ্রাঙ্কলিনের পাশে সোজা হয়ে, রুদ্ধশ্বাসে বসে আছে রয়৷ আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় ওর মুখ মৃতের মতো বিবর্ণ, সমস্ত রক্ত কেউ যেন শুষে নিয়েছে৷ রয়ের দিকে চেয়ে আমার মনে পড়ল আমাদের ছেলেবেলার কথা৷ সেই যখন আমরা একসঙ্গে সুকলে যেতাম—গাছ থেকে ফল পাড়তাম—মাছ ধরতাম৷ এমনি আরও কত ছোট ঘটনা ছবির মতো ভেসে উঠল মনের পর্দায়৷—রয়ই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু—এবং এখনও আছে৷ ওর দিকে চেয়ে আশ্বাসের হাসি হাসলাম৷ বোঝাতে চাইলাম, ‘তোর কোন ভয় নেই রে, রয়! যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, এতটুকু বিপদের ছোঁয়া তোর গায়ে লাগতে দেব না৷—আচ্ছা রয়,—মনে পড়ে, একবার আমরা পাশের সেই জঙ্গলটায় শিকার করতে গিয়েছিলাম? তারপর—অবাধ্য চোখের জল গাল বেয়ে পড়ল৷ রয়েরর দিকে চেয়ে হেসে হাত নাড়লাম৷ ওর মুখ ঝাপসা হয়ে এল৷

পিছন থেকে কে যেন একটা ধাক্কা মারল, ‘এই চল্ চল্—৷’ তাকিয়ে দেখি একজন কনস্টেবল৷ ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম আদালত ছেড়ে৷ শেষবারের মত জ্যানির দিকে তাকালাম৷ ও কাঁদছে—৷ হ্যাঁ—হ্যাঁ, সত্যিই ও আমার জন্য কাঁদছে—! জ্যানি! ডুকরে কেঁদে উঠলাম৷ জলভরা চোখে ফিরে তাকালাম রয়ের দিকে৷ ওর চোখেও জল৷ মুখে কৃতজ্ঞ হাসি৷ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, ও মুক্ত—আমি ওকে রেহাই দিয়ে গেলাম৷

বোধহয় মুহূর্তের জন্য নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম৷ কনস্টেবলের ধাক্কায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এগিয়ে চললাম৷ স্পষ্টই দেখতে পেলাম, সামনে অপেক্ষা করছে অন্ধকার ভবিতব্য আর অসীম নরকযন্ত্রণা—ফার্নওয়ার্থ—! রক্তজমানো একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে৷ ইচ্ছে হল, কনস্টেবলের হাত ছাড়িয়ে এখুনি ছুট লাগাই—কিন্তু—৷

একটা কথা ভেবে সান্ত্বনা পেলাম—আমার বন্ধু রয়ের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি৷ আমি ওকে বাঁচাবার সুযোগ দিয়েছি৷ নিজের বিবেকের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না৷ পরিষ্কার অনুভব করলাম ঃ এই একটা কথাই আমাকে ফার্নওয়ার্থের নরক-যন্ত্রণায় সান্ত্বনা দেবে৷ —রয়ের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি—ও আমার বন্ধু ছিল—আছে—এবং থাকবে—৷

জমাট দুঃস্বপ্নের কুৎসিত নরক এই ফার্নওয়ার্থ বন্দীশিবির৷

কাগজপত্রে এর বীভৎসতা নিয়ে বহুবার লেখালেখি হয়েছে৷ রাষ্ট্রপ্রধানকে বারংবার অনুরোধ করা হয়েছে, এই অমানুষিক বন্দীশিবির বন্ধ করার জন্য৷ তিনি ব্যাপারটা ভেবে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন৷ ভাবতে ভাবতে বছর তিনেক এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে৷ কিন্তু রাষ্টপ্রভধানের ‘ভেবে দেখা’ আজ আজও শেষ হয়নি৷

জার্মান-সৈন্যরা নাৎসী বন্দীশিবিরের জন্য আজও বিখ্যাত৷ সেখানে তারা অকথ্য অমানুষিক অত্যাচরের যেসব উপার বের করেছিল, তা শুনে আজও সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে৷

কিন্তু এহেন কুখ্যাত নাৎসী বন্দীশিবিরকেও হার মানতে হয়েছিল ফার্নওয়ার্থের কাছে৷ এর বীভৎসতা নাকি কল্পনা করা যায় না৷

খবরের কাগজে লেখা প্রবন্ধগুলো আমি পড়েছিলাম৷ সে-লেখার অর্ধেকও যদি সত্যি হয়, তবে ফার্নওয়ার্থকে নরক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না৷ সাধারণ জেলের মতো ফার্নওয়ার্থের চারদিকে বিশাল উঁচু পাঁচিল এবং কয়েদীদের কুঠরি আছে, একথা ভাবলে ভীষণ ভুল করা হবে৷ ওসবের কোন বালাই ফার্নওয়ার্থের নেই৷ এখানে কয়েদখানা বলতে, ধু-ধু করছে এক বিশাল তেপান্তরের মাঠ—তার মাঝে একটা ঘর৷ পঞ্চাশ ফুট লম্বা, দশ ফুট চওড়া৷ ঘরে ঢোকবার একটাই দরজা৷ নিরেট লোহার তৈরি৷ এছাড়া মোটা লোহার গরাদ বসানো একটা ছোট্ট জানলা আছে—তাও প্রায় মাটি থেকে বিশ ফুট উঁচুতে৷ সেটা দিয়ে যা আলো আসে, তা আর কহতব্য নয়৷

পাহারাদার হিসেবে দিনের বেলায় আছে বন্দুক-বাজ প্রহরী দল এদের মধ্যে ছ-জন অশ্বারোহী৷ তাদের শক্তিশালী রাইফেল দিয়ে দু-মাইল দূর থেকেও লক্ষ্যভেদ করা যায়৷

বাইরের মাঠে লুকোবার ছিটেফোঁটা জায়গাও নেই৷ দূরে—বহুদূরে দেখা যায় এক চিলতে রুপোলী রেখা—নদী৷ তার তীরে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত নলখাগড়ার ঝোপ৷ এছাড়া আর-কিছু চোখে পড়ে না৷ অর্থাৎ দিনের বেলা যদি কেউ ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার চেষ্টা করে, তবে পিছন পিছন হাওয়ার বেগে ধেয়ে যাবে ঘোড়ার চড়া প্রহরী৷ চারদিকের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ছুটে যাবে রাইফেলের গুলি—ফটাস—৷ নাঃ—দিনের বেলা ফার্নওয়ার্থ ছেড়ে পালানো অসম্ভব৷

আর রাতের প্রহরী? রাতের প্রহরী একপাল রক্তলোলুপ, হিংস্র শিকারী কুকুর৷ তাছাড়া কয়েদীদের পায়ে তলা দিয়ে লাগানো থাকে ভারী লোহার শেকল৷

এ সব জেনেও, প্রথমদিন ফার্নওয়ার্থে পা দিয়েই ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক এই জীবন্ত নরক ছেড়ে আমাকে পালাতেই হবে৷ এখানে দশ বছর থাকলে, আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব৷ এই নরককুণ্ডে দশ বছর কাটানোর চেয়ে মৃত্যুও অনেক ভালো—নাঃ—পালাতে আমাকে হবেই—সে যেমন করেই হোক—কিন্তু কেমন করে?—

দেখতে দেখতে দশটা দিন কেটে গেল৷ দশ-দশটা বীভৎস দুঃস্বপ্নের দিন! সকাল হলেই প্রহরীরা এসে আমাদের নিয়ে যায় মাঠে৷ প্রত্যেকের নাম ডাকা হয়ে গেলে পোশাক ছেড়ে খালি গায়ে আমাদের যেতে হয়৷ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! সাতাত্তর জন বিভিন্ন চেহারার কয়েদী, সার বেঁধে এগিয়ে চলেছি—আর আমাদের দু-পাশে ঘোড়ার চড়ে তিনজন করে ছ-জন প্রহরী৷

এরপর চলে পাথর ভাঙার কাজ৷ কাটফাটা রোদ্দুরে, খালি গায়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাঙতে হয় পাথর৷ দূরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই ছ-জন ঘোড়ায়চড়া প্রহরী৷ এছাড়া আর যে ছ-জন আছে, তারা পায়চারি করে বেড়ায়, হাতে তাদের শঙ্করমাছের লেজ দিয়ে তৈরি লিকলিকে চাবুক৷ কারো কাজে সামান্যতম ঢিলেমি দেখলেই, সেই চাবুক সপাং করে এসে আছড়ে পড়ে তার পিঠে৷ চামড়া কেটে দরদর করে রক্ত ঝরে পড়ে৷ উঃ—কি পৈশাচিক!

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রমের পর, শ্রান্ত ক্লান্ত আমরা, রক্তাক্ত দেহে ফিরে চলি, কয়েদখানার দিকে—তেলচিটে পোশাকে, শ্লথ পায়ে, টলতে টলতে৷ বেলা শেষের আলো ক্রমশই স্তিমিত হতে থাকে৷ তারপর একসময় চিল তার ডানা থেকে রোদ্দুরের গন্ধ মুছে ফেলে আশ্রয় নেয় নীড়ে৷ চারদিকে কেমন একটা শ্রান্ত অথচ স্নিগ্দভাব ফুটে ওঠে৷ দূরের কোন গির্জা থেকে ভেসে আছে—ঢং—ঢং—ঢং সাতটা বাজে৷ ঠিক সেই কন্যাসুন্দর বেলায় ফার্নওয়ার্থকে ততটা নৃশংস মনে হয় না—৷

কিন্তু সামনে পড়ে থাকা লম্বা রাতের কথা ভেবে শিউড়ে উঠি৷ রাত কাটানোর কথা চিন্তা করলেই গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে আতঙ্কে৷ কারণ ফার্নওয়ার্থের দিনগুলো যেমন বীভৎস, তার চেয়ে ভয়াবহ এর রাতগুলো!

কয়েদখানার ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে, দেওয়ালে গাঁথা, লোহার জালের তৈরি শোবার তাক৷ একটার নীচে একটা—এরকম অসংখ্য তাক৷ ঘরে টিমটিম করে জ্বালা থাকে কয়েকটা মাত্র লণ্ঠন৷ যার আলো কয়েদখানার পরিবেশকে আরো করে তোলে ভয়ঙ্কর৷ লোহার জালের ছায়াগুলো, ঘরের নোংরা তেলচিটে দেওয়ালে কেঁপে উঠে একটা অমানুষিক নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে৷

সাতাত্তর জন কয়েদীকে গরু-ছাগলের মতো ঢোকানো হয় সেই ঘরে৷ দুর্গন্ধে ভরে ওঠে গোটা ঘরটা৷ স্নানের অভাবে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রত্যেককেই তখন পাগলের মতো দেখায়৷ একরাশ ধুলো-ভরা মাথার চুলে জট, গালভরা খোঁচাখোঁচা দাড়ি-গোঁফ৷ চোখে-মুখে হতাশা৷

যে যার তাকে উঠে পড়ে শোবার আশায়৷ অবশ্য যদি সেটাকে শোওয়া বলা যায়৷ প্রহরীরা এগিয়ে এসে প্রত্যেকের পায়ে শেকল লাগিয়ে তালা এঁটে দেয়৷ তারপর লণ্ঠনগুলো নিয়ে তারা চলে যায়৷ রেখে যায় ঘরভর্তি জমাট, নিঃসীম অন্ধকার৷

তার বের করা লোহার জালের উপরেই গা এলিয়ে দিতে হয়৷ এতটুকু নড়বার উপায় নেই৷ কারণ প্রত্যেকের পায়ের শেকলই একটা বিরাট লম্বা শেকলের সঙ্গে বাঁধা৷ এই বিরাট শিকলটা, কয়েকটা আংটার সাহায্যে, সেই পঞ্চাশ ফুট লম্বা ঘরের চার দেওয়ালের গায়ে আটকানো—এমনভাবে, যে কেউ যদি একটুও নড়াচড়া করে, তবে বড় শেকলের টান পড়ার জন্য, অন্যান্য সমস্ত কয়েদীর পায়েই টান পড়বে, এবং তাদের ঘুম ভেঙে যাবে৷ নরকেও বোধ করি এর চেয়ে আরামে থাকা যায়!

সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর, ঘুমের ঘোরে কোন কয়েদী যদি আচমকা পাশ ফেরে, তবে শেকলে টান পড়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য, পাশের কয়েদী হিংস্রভাবে তার সঙ্গে মারামারি শুরু করে দেয়৷ ক্রমে এক তাক থেকে আরেক তাকে ছড়িয়ে পড়ে সেই মারামারি৷ ওই অন্ধকারেই, পা-বাঁধা অবস্থায়, যে যার তাকে বসেই অন্যকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি ঘুঁষি চালায়৷ আঁচড়ে, কামড়ে, গলা টিপে, তারা জন্তু-জানোয়ারের মতো লড়াই করে চলে৷ অন্ধকারেই ভেসে আসে গর্জন,—আর্তচিৎকার—হাঁপানির শব্দ—৷

না, প্রহরীরা এসব মারপিট নিয়ে একদম মাথা ঘামায় না৷ যদি কেউ মরে যায়, তবে ভোরবেলা এসে, ওরা সেই লাশটাকে একটা জায়গায় নিয়ে ফেলে দেয়৷ আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে লাশটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ করে দেয় শকুনের দল৷ অর্থাৎ ফার্নওয়ার্থ থেকে বেঁচে ফেরার আশা আর নেই!

সুতরাং পালাবার চিন্তাটা মনের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে লাগল৷

ফার্নওয়ার্থে রক্ষীর সংখ্যা মোট বারোজন৷ রাত হলে ওরা সকলেই ঘরে ফিরে যায়—শুধু একজন বাদে৷ তার নাম বাইফ্লিট৷ ওর কাজ, কুকুরগুলোকে দেখাশোনা করা৷ বাইফ্লিটের চেহারায় এমন একটা আদিম হিংস্র ভাব আছে যে রক্ত-লোলুপ হাউন্ডগুলো পর্যন্ত ওকে দেখলে ভয় পায়৷

দিনের বেলা কুকুরগুলো একটা বড়সড় লোহার খোঁয়াড়ে বন্ধ থাকে৷ আর ওদের খাওয়ানো হয় দিনে মাত্র একবার৷ যার জন্য হাউন্ডগুলো বাঘের চেয়েও হিংস্র হয়ে থাকে৷

রাত আটটার সময় অন্য প্রহরীরা চলে গেলে বাইফ্লিট পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় কুকুরের খোঁয়াড়ের দিকে৷ ওর হাতে তখন থাকে একটা ভারী মোটা লাঠি৷ সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে ও গিয়ে খুলে দেয় খোঁয়াড়ের দরজা৷ একে একে বেরিয়ে আসে হিংস্র হাউন্ডের দল৷ ওদের ক্ষুধার্ত, হিংস্র শ্বাপদের মতো চোখ ধকধক করে ওঠে রক্ত লালসায়৷

বাইফ্লিটের চেহারা চৈত্যের মতো বিশাল, শুয়োরের মতো বীভৎস, কুৎসিত মুখ, নিশাচরের মতো জ্বলজ্বলে চোখ৷ রাত্রিবেলাটা যেন ওরই রাজত্ব৷ খেয়ালখুশিমতো ও কুকুরগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়৷ কারোর সাহস হত না, সেই রাজত্বে অনধিকার প্রবেশ করে৷

ভোর সাড়ে চারটের সময় বাইফ্লিট কুকুরগুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ওদের খোঁয়াড়ে৷ তারপর অন্যান্য প্রহরীরা আসে তাদের দৈনন্দিন প্রহরায়৷

ঘুম আমার আসে না৷ তাই রাতের পর রাত জেগে কাটাই, আর শুনি ক্ষুধার্ত সারমেয়দলের রক্ত-হিম করা গর্জন৷ তখন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় আমার পালাবার স্বপ্ন৷ ইস্—শুধু যদি কুকুরগুলো না থাকত, তাহলে—

পায়ের তালা-লাগানো শেকল বা ঘরের লোহার দরজা এ দুটোর কোনটাই আমার কাছে কোন সমস্যা নয়৷ কারণ প্রথম রাতেই, আমার লোহার জাল দিয়ে তৈরি শোবার তাক থেকে অতিকষ্টে ইঞ্চিতিনেক লম্বা একটুকরো তার ভেঙে রেখেছিলাম৷ আঙুল কেটে রক্ত বেরোলেও মন ভরে গিয়েছিল আনন্দে৷ ওই তার এবং সামান্য সময় পেলে, ফার্নওয়ার্থের যে-কোন তালাই আমি খুলে ফেলতে পারি৷ সিন্দুক কোম্পানি আমার মন ভরার মতো পয়সা নিতে দিতে পারলেও, পৃথিবীর কঠিনতম তালা কিভাবে খুলতে হয়, সেটা শিখিয়ে দিয়েছে৷ তারপর থেকেই পালাবার চিন্তাটা আরো জমাট বেঁধেছে আমার উর্বর মস্তিষ্কে৷ বারবার মনে হয়েছে, তালা খুলে ছুটে পালাই৷ রক্ষীদের গুলি খেয়ে যদি মরেও যাই, কোন দুঃখ নেই কিন্তু এই ফার্নওয়ার্থ আমার পক্ষে অসহ্য! আমি পাগল হয়ে যাব!

রাতে শুয়ে শুয়ে পালাবার কথা চিন্তা করলেই, শুনতে পাই হাউন্ডগুলোর হিংস্র গর্জন৷ নাঃ—যে করে হোক এই কুকুরগুলোকে বোকা বানাতেই হবে৷ নয়তো পালানো অসম্ভব! দিনরাত খালি ভাবি, কিভাবে কুকুরগুলোর একটা ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু নিরেট মাথা থেকে কিছুই আর বেরোয় না৷

রোজ ভোরবেলা নাম-ডাকার সময়, খোঁয়াড়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে অসহায় ভাবে অর্ধভুক্ত কুকুরগুলোর দিকে চেয়ে দেখি৷ আমাদের দেখেই ওরা শিকার দেখার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ধোঁয়াড়ের গরাদের রগায়ে৷

চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্য—একটা লোক রাতের অন্ধকারে ছুটছে আর তার পিছন পিছন নিঃশব্দে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলছে দশটা হাউন্ড! মুহূর্তের মধ্যে কুকুরগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর৷ দাঁতে নখে ফালা ফালা করে ফেলল তার দেহ৷—ওঃ—কি ভয়ানক!

ফার্নওয়ার্থে প্রায় একমাস কাটানোর পর মুশকিল আসান হল৷ সমাধান হল সারমেয়-সমস্যার৷

আমাকে বাইরের কাজ থেকে রেহাই দিয়ে ঢোকানো হল রান্নাঘরের কাজে৷ সেখানে আমাকে জল তুলতে হয়, বাসন মাজতে হয়, মসলা পিষতে হয়—মসলা বলতে শুধু মরিচ৷

প্রত্যেকটি কয়েদীই ভয় করে এই কাজটাকে৷ এর চেয়ে বাইরে পাথর ভাঙাই ওদের কাছে শ্রেয়ঃ মনে হত৷

বন্দীদের জন্য যা খাবার তৈরি হয়, তা আর বলার নয়৷ রোজ দু-বেলা একই খাবার চলে৷ অখাদ্য পচা আলুর পাতলা ঝোল, আর তার মধ্যে ভাসছে আধপচা বাসী মাংসের ডেলা৷ অসহ্য গরম এবং রান্না-করা খাবারের বিটকেল দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে৷ তবুও ওর মধ্যেই ঠায় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়৷ সে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা৷

মাংসের পচা গন্ধটাকে চাপা দেওয়ার জন্য, পাচক ওই ঝোলের মধ্যে প্রাণভরে মরিচ ঢালে৷ কিন্তু তবু কি সেই পচা বিটকেল গন্ধকে চাপা দেওয়া যায়?—একদিন এই মরিচ পিষতে পিষতেই কুকুরগুলোকে বোকা বানানোর মতলব আমার মাথায় এল৷—সত্যি,—ভাগ্যিস এই রান্নাঘরের কাজটা আমাকে দিয়েছিল,—তা সে যত খারাপরই হোক! মনে মনে বেশ উৎসাহ পেলাম৷ এতদিনে খুঁজে পাওয়া গেল একটা উপায়ের মতো উপায়৷

পরপর কয়েকদিন, রান্নাঘরের কাজ সেরে কয়েদখানায় ফেরার সময় লুকিয়ে পকেটভর্তি করে মরিচের গুঁড়ো নিয়ে এলাম৷ পাচক ব্যাটা জানতেই পারল না৷ সেই মরিচকে একটা ছোট পুঁচলি করে, আমার শোবার তাকের এককোণায় লুকিয়ে রাখলাম৷ কারণ এই মরিচই এখন আমার প্রাণ৷

এইভাবে পালাবার পথে দু-ধাপ এগিয়ে গেলাম৷ প্রথমত, দরজা খুলতে আমার অসুবিধে হবে না৷ আর দ্বিতীয়ত, কুকুরগুলোকে অনুসরণ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য আমার সঙ্গে রয়েছে মরিচ৷ অতএব এ দুটো জিনিসের সাহায্যে আমি মাঠ ছাড়িয়ে অন্তত দূরে নদীর কাছে পৌঁছতে পারব৷ আর তারপর লুকোবার জন্যে নদীর পারেই তো রয়েছে ঘন নলখাগড়ায় ঝোপ৷ সুতরাং ফাঁকা মাঠ পার হয়ে নদী পর্যন্ত আমাকে পৌঁছতেই হবে৷ তারপর ভরসা ওই নলখাগড়া৷

কিন্তু কুকুরগুলো যদি পালাবার সময় আমাকে দেখতে পায়, তবে আর মরিচ-ফরিচ দিয়ে কোন কাজই হবে না—ছুটে এসে ওরা আমাকে ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলবে৷ কিন্তু কোনরকমে যদি ওই হিংস্র জীবগুলোর অলক্ষ্যে পালাতে পারি, তবেই মরিচে কাজ হবে৷ কারণ মরিচের উগ্রগন্ধে, কুকুরগুলো আমার গন্ধ আর পাবে না ওদের অনুসরণের হাত থেকে রেহাই পাব৷

হাউন্ডগুলোর অলক্ষ্যে আমাকে নদী পর্যন্ত পৌঁছতেই হবে৷ কিন্তু কী করে—? শুধু এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলেই আমি পালাতে আর দ্বিধা করব না৷

ভাবতে ভাবতে চার রাত্তির পার হয়ে গেল৷ কোন সমাধানেই পৌঁছতে পারলাম না৷ তারপর একদিন—রয়ের কাছ থেকে শেখা, দারোয়ানকে পটানোর বুদ্ধির কথা মনে পড়ল—আর দেরি করলাম না৷

পরদিন সকালে রান্নাঘরে পৌঁছেই রাধুঁনি ব্যাটার সঙ্গে সুযোগ বুঝে

সুখ-দুঃখের গল্প জুড়ে দিলাম৷ লোকটা এই পচা রান্নাঘরের পচা মাংস রেঁধে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল৷ দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷ আমার জানবার ছিল শুধু রাতের প্রহরায় ব্যাপারটা—বাইফ্লিটের গতিবিধির কথা৷ ওর থেকেই কায়দা করে জেনে নিলাম৷

প্রতিদিন রাত আটটায় অন্যান্য প্রহরীরা বাইফ্লিটের ঘাড়ে সব দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে ঘুমোতে চলে যায়৷ বাইফ্লিট কয়েদখানার দরজায় তালা দিয়ে, খোঁয়াড়ে গিয়ে কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়৷ তারপর এগিয়ে যায় অদূরেই অবস্থিত একটা ছোট্ট কুড়েঘরের দিকে৷ সেখানে গিয়ে শুয়ে পড়ে—সম্ভবত ঘুমিয়েও পড়ে৷ কারণ দশ-দশটা হিংস্র জীব সেখানে পাহারা দিচ্ছে, ষেখানে মানুষের আর কী দরকার?

রাত পৌনে চারটের সময় বাইফ্লিট কুড়েঘর ছেড়ে বেরিয়ে রান্নাঘরে যায়৷ সেখানে কুকুরগুলোর জন্যে দুটো ঝুড়িতে মাংসের ছাঁট রাখা থাকে৷ সেই ঝুড়ি দুটো নিয়ে বাইফ্লিট খোঁয়াড়ে যায়৷ কুকুরগুলোও ওকে অনুসরণ করে৷ খোঁয়াড়ের ভিতর ঢোকার পর ওদের খাওয়া শুরু হয়৷

রাঁধুনির কথামতো, শুয়ে শুয়ে শুনতে পাই কুকুরগুলোর বীভৎস চিৎকার৷ নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করার ফ্যাঁসফ্যাঁসে চাপা গর্জন শুনে বুঝতে পারি, ওরা মাংসের টুকরো নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে৷ আর মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বাইফ্লিট ওদের ধমক দিচ্ছে৷ কেঁউ কেঁউ চিৎকার শুনলেই বুঝি, বাইফ্লিট লাঠি দিয়ে প্রয়োজন মতো ওদের ঠ্যাঙাচ্ছে৷ এমনি করে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর চারটে কুড়ির সময় ও খোঁয়াড় বন্ধ করে দেয়৷ তারপরেই শোনা যায় বৈদ্যুতিক বাঁশির কানফাটানো শব্দ—একবার-দুবার, এটা ছিল বাইফ্লিটের রোজকার সংকেত৷ অর্থাৎ, অন্যান্য রক্ষীদের জানানো কুকুরগুলো খোঁয়াড়ে ফিরে গেছে৷ সেই সঙ্গে কয়েদীরাও জেগে ওঠে—

এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয় না৷ ঠিক করলাম, যখনই বাইফ্লিট পৌনে চারটের সময় কুকুরগুলোকে খাওয়াতে শুরু করবে, তখনই কয়েদখানার দরজা খুলে ছুট লাগাব—সোজা নদীর দিকে—৷

পালাবার জন্য সময় খুবই কম পাওয়া যাবে বড়জোর আধঘণ্টা—কি তার চেয়েও কিছু কম৷ তবু তার মধ্যেই পালাতে হবে৷ এখনও পর্যন্ত আমার শরীর বেশ সুস্থ সবল আছে, তাছাড়া প্রচণ্ড জোরে ছুটতেও পারি৷ মাথা ঠিক রেখে দৌড়তে পারলে, নদী পর্যন্ত পৌঁছতে মিনিট কয়েকের বেশি সময় লাগবে না৷ তার পর থেকেই কুকুরগুলোকে ধোঁকা দেবার জন্য মরিচের গুঁড়ো কাজে লাগাব—তার আগে নয়৷

প্রহরীরা যদি খুঁজতে বেরোয়, তখনকার মতো নলখাগড়ার ঝোপে গা ঢাকা দেব৷ তারপর যদি বরাত জোরে ওদের হাত থেকে রেহাই পাই, তবে আমার পথ চলা শুরু হবে৷ সকলেরই চোখ এড়িয়ে চলার পক্ষে, রাতের অন্ধকার আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করবে৷ এইভাবে, শুধুমাত্র রাতের অন্ধকারেই পথ চলে, পৌঁছতে হবে রেললাইন পর্যন্ত৷ জানি না ক-রাত লাগবে! ফার্নওয়ার্থ থেকে রেললাইনের দূরত্ব কুড়ি মাইল৷ সেখানে পৌঁছতে পারলে আর কোন ভয় নেই৷ যে-কোন একটা চলতি ট্রেনে সোজা গিয়ে নামব ওকল্যান্ডে৷ এই জেলার মধ্যে ওকল্যান্ডই সবচেয়ে বড় শহর৷ সেখানে লোকের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগবে না৷

কিন্তু এখনও একটা বিরাট সমস্যা আমার সামনে রয়েছে৷

পায়ে লাগানো শেকলের তালা খুলতে আমার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে৷ কিন্তু কয়েদখানার ভারী দরজা—উঁহু—ওটা তো আর অল্পসময়ে হবে না৷ ওই দরজা খোলার সময় অন্য কোন কয়েদী যদি জেগে উঠে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়?—আর সেই চিৎকার যদি বাইফ্লিট শুনতে পায় তাহলেই সর্বনাশ! তীরে এসে তরী ডুববে—৷ আর এছাড়াও নিজের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য,আরও একটা লোক আমার বিশেষ প্রয়োজন, যার পিছনে হাউন্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করাব৷ কিন্তু কাকে?—নাঃ—এ ব্যাপারটার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে—

পালাবার পথে এতটা এগিয়ে আমি কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতে চাইছি না৷ প্রথম থেকেই যখন এত কষ্ট করে, এত নির্ভুলভাবে পালাবার জন্য তৈরি হয়েছি, তখন এই সামান্য সমস্যার নিখুঁত সমাধান না করে এক পা-ও এগোচ্ছি না৷ তা দু একদিন যদি দেরি হয় তো হোক!

হঠাৎ মনে হল বয়েডের কথা৷—ওকে দিয়েই কাজ হবে!

প্রত্যেক কারাগারেই এমন একজন কায়েদী থাকে, যাকে অন্যান্য কয়েদীরা তার দৈহিক শক্তির জন্য ভয় পায়৷ মাস্তান গোছের আর কি! এখানেও এমনি একটি মাস্তান আছে৷ তার নাম জো বয়েড৷

বয়েড লম্বায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির বেশি হবে না, কিন্তু চওড়ায় সাধারণ মানুষের দ্বিগুণ৷ মুখভর্তি কাটা দাগ৷ সমস্ত ছুরির আঘাতেই হয়েছে৷ নাকটা মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো চ্যাপটা—মুখের উপর ছড়ানো, যেন লেপটে আছে৷ লোমশ ভুরু জোড়ার নিচে জ্বলজ্বলে কুতকুতে চোখ৷ মোটের উপর বয়েডের চেহারা অনেকটা গরিলার মতো৷ এবং গরিলার মতো শক্তিও রাখে দেহে৷

ওর চেহারা দেখেই বোঝা যায়, বাকি কয়েদীরা কেন ওকে এত ভয় করে৷ বয়েডের শোবার তাক আমার ঠিক নিচেই৷ জানতাম, যদি ভজিয়ে ভাজিয়ে ওকে আমার সঙ্গে টানতে পারি, তবে দরজার তালা খোলার সময় কেউ যদি জেগেও যায়, বয়েডকে দেখলে আর চেঁচাতে সাহস করবে না৷

কিন্তু বয়েডকে কি বিশ্বাস করা চলে?—ও যদি রাজি না হয়?—যদি ডেকে পাঠায় বাইফ্লিটকে?

বয়েডকে বোঝা মুশকিল৷ কারণ ও কারো সঙ্গেই কথা বলে না৷ সবসময় নিজের মনে চুপচাপ বসে থাকে৷ দু-একজন শক্তি দেখিয়ে ওর উপরে টেক্কা দিতে চেয়েছিল কিন্তু বয়েডের ঘুঁষি খেয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ তাতে কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল৷ সেই থেকে কেউ আর ওর কাছ ঘেঁষে না৷

ভাবতে ভাবতে অর্ধেক রাত হয়ে গেল৷ শুয়ে শুয়ে বয়েডের শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ শুনতে লাগলাম৷ ওকে কি বলব আমার মতলবের কথা? হাজার হলেও বন্দী তো! মুক্তির স্বাদগ্রহণের ইচ্ছে কি ওর হবে না?—কিন্তু—

রাত প্রায় দুটোর সময় ঠিক করলাম বয়েডকে বলব৷ এটুকু ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে, নয়ত পালানো অসম্ভব৷

মনস্থির করে পায়ে লাগানো শেকলের তালা খুলে ফেললাম৷ উপুড় হয়ে লোহার জালের ফাঁক দিয়ে তাকালাম৷ নিকষ মিসমিসে অন্ধকারে কিছু চোখে পড়ে না৷ শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে আর তেলচিটে দুর্গন্ধে বুঝলাম বয়েড ওর তাকে শুয়ে আছে৷

‘অ্যাই—বয়েড!’ চাপা ফিসফিস স্বরে ওকে ডাকলাম৷

সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল শ্বাস-প্রশ্বাসের ভারী শব্দ—বয়েড জেগেছে! এক ডাকেই ও উঠে পড়বে, ভাবতে পারিনি একটু অপেক্ষা করলাম—

‘বয়েড! শুনতে পাচ্ছ?’ অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও বুঝলাম ওর সন্দিগ্দ ঘন জ্বলজ্বলে চোখজোড়া আমারই দিকে চেয়ে আছে৷

‘কী ব্যাপার?’ চাপা হালকা স্বরে ভেসে এল কথাগুলো৷

‘আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমি এখান থেকে পালাচ্ছি৷ তুমি কি আমার সঙ্গে আসবে?’

‘পা-লা-চ্ছ?’ বয়েড যেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারছে না৷

‘হ্যাঁ, বাইফ্লিট যখন কুকুরগুলোকে খাওয়াতে শুরু করবে, তখন৷—কি, আসবে?’

‘তুমি কি পাগল! কয়েকখানা থেকে বেরোবে কেমন করে?’

‘পায়ের শেকল আমি এর মধ্যেই খুলে ফেলেছি! তুমি রাজি থাকলে বল তোমারটাও খুলে দিই—আর দরজা? ওটা খুলতে আমার মিনিট দুয়েকের বেশি লাগবে না৷ তুমি কি আসছ?’

‘কিন্তু বাইরের কুকুরগুলো?’

‘বললাম না, বাইফ্লিট যখন কুকুরগুলোকে খাওয়াবে, তখন আমরা পালাবো৷’

‘কিন্তু পালিয়ে যাবটা কোথায়?’

‘নদীর দিকে৷ সেখান থেকে রেললাইন৷ তারপর ভাগ্য ভালো থাকলে, কোন চলতি ট্রেনে উঠে—যাকগে, তুমি রাজি কিনা বল?’ উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগলাম৷

‘এই শালার শেকলটা তুমি খুলতে পারবে৷’ বয়েড শেকলটা ধরে আস্তে টান মারল৷

‘হ্যাঁ—’

‘তাহলে আগে এটা খোল!’

তাকে ভর দিয়ে নিঃশব্দে মেঝেয় নামলাম৷ অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে, হাত পড়ল বয়েডের পায়ে—ওর লোমশ পেশীবহুল পা—এই তো শোকলটা! তারের টুকরোটা দিয়ে কাজ শুরু করলাম৷ অন্ধকারে অসুবিধে হলেও, মিনিটখানেকের মধ্যেই তালাটা খুলে ফেললাম৷ শেকলটা খুলে ঠং করে জালের ওপর পড়ল৷

তালাটা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই, দুটো উত্তপ্ত ঘামে ভেজা বলিষ্ঠ হাত এসে পড়ল আমার গায়ে৷ ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সেই থাবা আমার কণ্ঠদেশ স্পর্শ করল৷ পরমুহূর্তেই একটা অসহ্য চাপা অনুভব করলাম গলায়৷ কানে এল বয়েডের চাপা গর্জন, ‘শোন্ শালা, যদি আমাকে বিপদে ফেলার কোন মতলব করে থাকিস, একেবারে খাল খিঁচে নেব!’ অন্ধকারেই চোখে পড়ল ওর সাদা ঝকঝকে দাঁতের সারি৷

দমবন্ধ থাকায় বুকে বাতাস নেবার জন্য খাবি খাচ্ছিলাম৷ হাঁপাতে হাঁপাতে ওর শক্ত হাতের বাঁধন ছাড়াবার চেষ্টা করলাম, ‘ফোট শালা গরিলার বাচ্চা! তুই না-যাবি তো সেকথা বল্—আমি তাহলে একাই যাব৷’

আমার চাপা ক্রুদ্ধ হিসহিসে স্বরে বয়েড একটু থতিয়ে গেল৷ এরকম জবাব ও কারো কাছ থেকেই আশা করেনি৷ ওর হতভম্ব ভাবটার সুযোগে, এক ঝটকায় নিজেকে ছানিয়ে নিলাম৷ ফেরার উপক্রম করতেই, কানে এল, ‘অ্যাই—আমিও যাব!’

‘তাহলে শোন্, বাইরে বেরিয়েই আমরা একসঙ্গে নদীর দিকে ছুটব৷ সেখানে পৌঁছে দুজনে দুদিকে যাব৷ বাইফ্লিট সম্ভবত কুকুরগুলোকে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দেবে, কিন্তু কোনরকমে যদি নদীটা পার হতে পারি, তবে কুকুরগুলো আর আমাদের গন্ধ পাবে না—তুই সাঁতার জানিস?’

‘আমি কি জানি না জানি, সেটা তোকে ভাবতে হবে না, শালা৷’ বয়েড খেঁকিয়ে উঠল, ‘তুই শুধু দরজাটা খুলবি, তারপর আমারটা আমি বুঝব৷’

আর কথা না বাড়িয়ে শোবার তাকে উঠে পড়লাম৷ শুয়ে শুয়ে গলায় হাত বোলাতে লাগলাম, আর অপেক্ষায় রইলাম আসন্ন মাহেন্দ্রক্ষণের৷

ভোরের হালকা রুপোলী আলোর আভা, জানলা দিয়ে এসে পড়েছে কয়েদখানার দেওয়ালে৷ আর ঘণ্টাখানেক পরেই দরজার তালায় হাত লাগাব৷

মরিচের পুঁটলিটা তাকের কোনা থেকে বের করে জামার ভিতর গুঁজে নিলাম৷ ভুলেও এর একটি কণা আমি বয়েডকে দিচ্ছি না৷ কুকুরগুলোকে বোকা বানাতে হয়তো এর প্রতিটি কণাই আমার কাজে লাগবে৷ এই মরিচের গুঁড়োর উপরেই নির্ভর করছে আমার মরণ-বাঁচন৷

স্থিরচোখে চেয়ে আছি জানলার দিকে৷ কখন দেখতে পাব সোনালী রোদের আভা৷ কানে আসছে বয়েডের শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ৷

হঠাৎ ওর ফিসফিসানি শুনতে পেলাম, ‘দরজাটা কি তুই সত্যিই খুলতে পারবি?’

আমি ঘুরে উপুড় হয়ে শুলাম, ‘কোন ভয় নেই, ঠিক খুলতে পারব৷’

‘তোর কি মনে হয়, আমরা পালাতে পারব?’

‘এই নরকে দিন কাটানো ছাড়া, আমি সব-কিছু করতে রাজি আছি—তাছাড়া একবার চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?’

‘হুঁ—’

অনেকক্ষণ চুপচাপ৷ কানে এল হাউন্ডগুলোর হিংস্র গর্জন৷ ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল৷

‘ওই—ওই হাউন্ডগুলো—’ বয়েডের স্বর ভয়ে কাঁপছে৷

‘বাইফ্লিট ওদের খাওয়াতে শুরু করলে, ওরা আর ঝামেলা করবে না৷’

‘সেটা তুই ভাবছিস—কিন্তু যদি—’ বয়েডের গলা দিয়ে স্বর বেরোল না৷ বুঝলাম, ও ভীষণ ভয় পেয়েছে৷ আশ্চর্য! বয়েডের মত বুনো গরিলা পর্যন্ত এই কুকুরগুলোকে ভয় পায়!

সময় যেন আর কাটতেই চায় না৷ এক একটা মিনিট মনে হয় এক এক ঘণ্টার সমান৷ ক্রমে অবসান হল উৎকন্ঠিত প্রতীক্ষার৷ কয়েদখানার ছোট্ট জানলা দিয়ে, ঘরের ভিতরে ঠিকরে পড়ল এক ফালি সোনালী রোদ৷ যতই সময় যেতে লাগল, ততই জোরালো হল সেই রশ্মি-রেখা৷ একসময় বুঝলাম, পালাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে৷

মুঠো-করা হাত ঘামে ভিজে উঠেছে৷ উত্তাল হৃৎপিণ্ড আছড়ে পড়ছে বুকের খাঁচায়—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ৷ আর অপেক্ষা করতে হল না৷ কানে এল কুকুরগুলোর উল্লসিত চিৎকার৷ অর্থাৎ বাইফ্লিট ওর কুড়েঘর ছেড়ে রান্নাঘরে যাচ্ছে৷ না—আর দেরি নয়—!

লাফিয়ে ঘরের মেঝেয় নামলাম, ‘বয়েড, লক্ষ্য রাখিস—যখন দরজা খুলব, তখন যেন কেউ চেঁচামেচি না করে৷’

‘ঠিক আছে, তুই চটপট হাত লাগা,’ বয়েডও তাক থেকে মাটিতে নামল৷

ঘরসুদ্ধ সব কয়েদীই ঘুমে অচেতন৷ যদি কেউ আচমকা জেগে ওঠে, তবে বয়েডই তাকে রুখবে, আমাকে আর ভাবতে হবে না৷

বেড়ালের মতো নিঃসাড়ে দরজার দিকে এগোলাম৷

নাঃ—তালাটা যতটা শক্ত হবে ভেবেছিলাম, ততটা নয়৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল৷ ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, কারণ কয়েদীরা কেউ জেগে উঠল না৷ বাইরে বাইফ্লিটের ধমকানির শব্দ শুনে বুঝলাম, কুকুরগুলো এখন খেতে ব্যস্ত৷

‘বয়েড—তাড়াতাড়ি—৷’ আস্তে আস্তে দরজা ফাঁক করে,বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় পা রাখলাম৷ ডানদিকে, গজ পঞ্চাশেক দূরে দেখা যাচ্ছে কুকুরের খোঁয়াড়টা৷ বাইফ্লিট আমাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, ঝুড়ি থেকে মাংসের ছাঁট একটা পাত্রে ঢালছে৷ আর কুকুরগুলো খাওয়ার রজন্য পরস্পরকে আঁচড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে,—মাংসের টুকরো নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে৷

আমার পিছন পিছন বয়েড বাইরে এল৷ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দূরে খোঁয়াড়ের দিকে তাকাল৷ ও যে মুহূর্তের জন্যে ভীত হয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরেই ওকে এক ধাক্কা মারলাম, ‘বয়েড, চটপট—৷’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু করলাম দৌড়৷ জীবনে কখনও এত জোরে দৌড়োইনি৷ লম্বা লম্বা পা ফেলে হাওয়ার বেগে ছুটে চললাম৷

শুনতে পাচ্ছি, পিছন পিছন ধুপধাপ করে ছুটে আসছে বয়েড৷ ওর হাঁপানোর শব্দ পর্যন্ত আমার কানে আসছে৷ ও আমার মতো জোরে দৌড়তে পারে না, যার জন্য অনেক পিছিয়ে পড়েছে৷

চারদিকে ধু-ধু প্রান্তর৷ তার উপর দিয়েই ছুটে চলেছি৷ লক্ষ্য দূরের নদী৷ নিজেকে বড্ড বেশী অসহায় মনে হতে লাগল৷

দূরে অস্পষ্ট নলখাগড়ার ঝোপ ক্রমেই স্পষ্টতর হয়ে চোখে ধরা দিচ্ছে৷ প্রতি মুহূর্তেই নতুন আশায় উদ্দীপিত হয়ে, যথাসম্ভব জোর দৌড়বার চেষ্টা করছি—হঠাৎ—

ভোরের শান্ত পরিবেশের নিস্তব্ধ পর্দা বিদীর্ণ করে ভেসে এল রিভলবারের শব্দ—ফটাস৷

ছুটতে ছুটতেই চকিতে পিছনে তাকালাম৷

বাইফ্লিট খোঁয়াড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে৷ ওর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা একটা .৪৫ বোবের রিভলবার৷ ও আবার গুলি করল—ফটস৷

বয়েড এঁকেবেঁকে দৌড়চ্ছিল৷ ওর ঠিক হাত পাঁচেক দূরে, ধুলো উড়িয়ে গুলিটা বেরিয়ে গেল৷ ও আরও জোরে ছুটতে শুরু করল৷

বাইফ্লিটের রিভলবারের তাক যদি আর-একটু ভালো হত, তবে বয়েডকে আর দৌড়তে হত না৷

আরও জোরে ছুটতে শুরু করলাম৷ নলখাগড়ার ঝোপ আর বেশি দূরে নেই—পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে—নলখাগড়ায় ছাওয়া নদীর তীর—আমার বিপদের আশ্রয়স্থল৷

ছুটতে ছুটতে আর-একবার পিছনে তাকালাম৷ বয়েড প্রায় দু-শ গজ পিছিয়ে পড়েছে, কিন্তু উন্মাদের মতো পড়িমরি করে দৌড়ে আসছে—

পরমুহূর্তেই কানে এল সেই বৈদুতিক বাঁশির কানফাটানো শব্দ—বেজেই চলল, আর থামে না৷ অর্থাৎ আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই অশ্বারোহী রক্ষীরা আমাদের পিছনে ধেয়ে আসবে!

হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে৷ তাড়াতাড়ি ঝোপ ভেদ করে নদীর কিনারায় পৌঁছে, বাঁদিকে এগিয়ে চললাম৷ পাড় ধরে এক-শ গজ মতো গিয়ে আমার ঢুকে পড়লাম দুর্ভেদ্য নলখাগড়া-ঝোপে৷ লুকিয়ে পড়লাম৷

কয়েক সেকেন্ড বাদে বয়েড ঝোপ ভেদ করে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল৷ আমার থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে৷ এদিকে-ওদিক চাইতে লাগল, সম্ভবত আমাকে খুঁজছে৷ কিন্তু নলখাগড়ার ঝোপ এত ঘন, ওর পক্ষে আমাকে দেখা সম্ভব হল না৷

হাঁপাতে হাঁপাতে চাপা স্বরে ও ডাকল, ‘অ্যাই! অ্যাই কারসন,—তুই কোথায়?’

পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলাম৷ বয়েড আমার সঙ্গে আসুক তা আমি মোটেই চাই না৷ কারণ, প্রহরীরা যখন বয়েডের পিছু নেবে, তখন আমি পালাবার সুযোগ পাব৷ আর ওরা যদি আমাকে দেখতেই পায়, তবে বয়েড থাকলেই বা কী, আর না থাকলেই বা কী৷

বয়েড নদীতে নামতে শুরু করল৷ দু-একবার থেমে পিছনে তাকাল৷ তারপর জলে পা দিল—বলিষ্ঠ হাতে জল কেটে, সাঁতরে এগিয়ে চলল ওপারে৷

এবার মরিচের পুঁটলিটা বের করে, প্যান্টের গোড়ালির ভাঁজগুলো ওই গুঁড়ো দিয়ে ভর্তি করলাম৷ যাতে ছোটবার সময় মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে আর পায়ের গন্ধ ঢেকে দেয়৷

ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চললাম৷ বেশ কিছুটা যাবার পর নিঃসন্দেহ হলাম, বয়েড আমার পায়ের শব্দ আর শুনতে পাবে না৷ তখন আবার ছুটতে শুরু করলাম৷

মুহূর্ত পরেই কানে এল ঘোড়ার ঘুরের শব্দ৷ ঝড়ের বেগে নদীর দিকে ছুটে আসছে প্রহরীরা৷ এখুনি লুকোতে হবে৷ চারদিকে চোখ বুলিয়ে লুকোবার একটা ভালো জায়গা খুঁজতে লাগলাম—ওই তো!—

তড়িৎগতিতে এগিয়ে চললাম নলখাগড়া-ঝোপের দিকে৷ ঝোপের যে-জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ঘন সেদিকে ছুটলাম৷ বুকপেছলা দিয়ে আশ্রয় নিলাম ঝোপের অনেকটা ভিতরে, উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম৷ বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে—ঘামে ভিজে উঠেছে সর্বাঙ্গ৷ অপেক্ষা করতে লাগলাম প্রহরীদের—ওরা কি খুঁজে পাবে আমাকে?

একটু পরেই শুনতে পেলাম খস-খস শব্দ৷ অশ্বরোহী রক্ষীরা দুদ্দাড় করে, ঝোপ ভেদ করে নদীর পাড়ে আসছে৷ শব্দ শুনে বুঝলাম, আমি যেখানে লুকিয়ে আছি, সেখান থেকে দূরে ওর নেই৷ রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষায় রইলাম৷ ওরা কি এদিকেই এগিয়ে আসছে৷

হঠাৎ এক প্রচণ্ড উল্লসিত চিৎকারে চমকে উঠলাম৷ পরক্ষণেই কানে এল জলে কারুর ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ৷ হয়ত কোন প্রহরীর ঘোড়া নিয়ে নদী পার হয়ে ওপারে যাচ্ছে৷

‘ওই তো—ওই তো শালাকে দেখা যাচ্ছে—৷’ গলা ফাটিয়ে একজন চিৎকার করে উঠল৷—ফটাস—নিঃসন্দেহে রাইফেলের শব্দ৷

আর-একটা ঘোড়া নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ কানে ভেসে এল একাধিক গুলির শব্দ৷—উৎকণ্ঠায়-আতঙ্কে মাথা গুঁজে পড়ে রইলাম৷

ওরা কি তাহলে বয়েডকে দেখতে পেয়েছে?

অদম্য কৌতূহলে মাথা তুললাম৷ বয়েড কি শেষে ধরাই পড়ল? নলখাগড়াঝোপের গোড়ার দিকের আগাছা আর সরিয়ে উঁকি মারলাম৷ দেখি, একজন অশ্বারোহী প্রহরী ঘোড়া নিয়ে সাঁতরে ওপারে যাচ্ছে—হাতে তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেল৷

ওপারে পৌঁছে সে পাড় বেয়ে উপরে উঠতে লাগল৷ সঙ্গে সঙ্গে কানে এল একটা কানফাটানো শব্দ—আগের চেয়ে অনেক কাছে৷ প্রহরীরা কি আমার দিকেই আসছে? হঠাৎ দেখি, বয়েড ওর লুকোনোর জায়গা ছেড়ে এক লাফে নদীতে এসে পড়ল৷ উন্মাদের মতো সাঁতরে—আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, সেদিক লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে লাগল৷ দুরু-দুরু বুকে, চোখ গোল-গোল করে চেয়ে রইলাম৷ বয়েড যদি এপারে এসে ওঠে, তাহলে আবার আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হবে৷

কিন্তু লক্ষ্য করলাম, ওপারের রক্ষীটি তার ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছে৷ হাঁটু গেড়ে বসে, রাইফেল বাগিয়ে তাক করছে বয়েডকে লক্ষ্য করে৷ সাঁতরাতে থাকলেও, বয়েড বোধহয় আন্দাজ করেছিল এই আসন্ন বিপদের কথা৷ কারণ হঠাৎ-ই জলের মধ্যে ডুব দিল৷ সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গর্জন—গুলির আঘাতে খানিকটা জল ছলকে উঠল শূন্যে৷

আর-একজন প্রহরী নলখাগড়া-ঝোপ ভেদ করে এপারে এসে দাঁড়াল৷ তাকে দেখেই প্রথম জন চিৎকার করে উঠল, ‘ব্যাটা সাঁতরে ওপারে ফিরে যাচ্ছে৷ শীগগিরই জলে নেমে শালাকে তাড়া কর! আমি এখান থেকে ব্যাটাকে লক্ষ্য রাখছি—৷’ ততক্ষণে নিশ্চিত হলাম, মাত্র-দুজন প্রহরীই আমাদের ধরতে এসেছে, তার বেশি নয়৷

এপাশের প্রহরীটি দেরি না করে ঘোড়া নিয়ে জলে নেমে পড়ল৷ ঘোড়াটা সাঁতরে বেশ কিছুটা এগিয়েছে, এমন সময় বয়েড ভেসে উঠল৷ প্রহরীটি বয়েডকে দেখতে পেয়েই ঘোড়াটাকে সেদিকে এগিয়ে নিয়ে চলল৷ মুহূর্তমধ্যে বয়েড আবার ডুব দিল৷ বেশ বুঝলাম, এভাবে ও আর বেশিক্ষণ যুঝতে পারবে না৷

বয়েড বোধহয় বুঝতে পেরেছিল, এভাবে সাঁতরে ও নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পারবে না৷ তার আগেই প্রহরীটি ওকে ধরে ফেলবে৷ সেইজন্যই ও ডুবসাঁতার দিয়ে প্রহরীটির দিকে এগিয়ে আসছিল৷ কারণ, একটু পরেই দেখলাম, ও লোকটার ঠিক পিছনে ভেসে উঠেছে৷—সাবাস! মনে মনে বয়েডের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না৷

প্রহরীটি বয়েডকে দেখতে পায়নি, কিন্তু ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা ওকে দেখতে পেয়েই বিকট চিৎকার করে উঠল, ‘ওই যে, তোর পেছনে—৷’ বয়েড অশ্বারোহী রক্ষীর এত কাছে ভেসে উঠেছে, যে ওপার থেকে সে গুলিও করতে পারছে না, পাছে নিজের লোকের গায়ে লেগে যায়৷

জলের অশ্বারোহী রক্ষীটি বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে রাইফেলের বাঁট সজোরে নামিয়ে আনল বয়েডের মাথায়৷ কিন্তু বয়েড অসামান্য ক্ষিপ্রতায় মাথা সরিয়ে নিয়ে, লোকটার কব্জি করে এক হ্যাঁচকায় জলে নামিয়ে আনল৷ জল তোলপাড় করে শুরু হল ধবস্তাধবস্তি—৷

কিন্তু বয়েডের পশু-শক্তির কাছে লোকটা অসহায় হয়ে পড়ল৷ যেন কোন বেড়াল ইঁদুর নিয়ে খেলা করছে৷ ওরা দুজনেই জলে তলিয়ে গেল৷ ভীষণ ভাবে জল তোলপাড় শুরু হল৷ বয়েড কি লোকটাকে ডুবিয়েই মারবে?

একটু পরে বয়েড একা ভেসে উঠল৷ তাড়াতাড়ি গিয়ে সাঁতরে-যাওয়া ঘোড়াটাকে ধরে, এমনভাবে তার আড়ালে ভেসে এগিয়ে চলল, যাতে ওপারের প্রহরীটি গুলি করতে না পারে৷ মাঝে মাঝে, তাড়াতাড়ি সাঁতরাবার জন্যে ঘোড়াটাকে খোঁচা মারতে লাগল৷

লোকটা বয়েডের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই একলাফে ঘোড়ায় চাপল৷ তীরের বেগে ঘোড়াসুদ্ধ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বয়েডকে অনুসরণ করল৷

ওদিকে বয়েড তখন ওর ঘোড়াটাকে নিয়ে ভীষণ অসুবিধায় পড়েছে৷ বারবার ধাক্কা মেরে ওটাকে প্রহরীর দিকে ফিরিয়ে নিজেকে আড়াল করছে৷

আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, ঠিক তার সামনে দিয়ে বয়েড ভেসে এগিয়ে চলল৷ ওর বীভৎস মুখ আতঙ্কে পাণ্ডুর—চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে৷ ভিজে চুল থেকে জলের ফোঁটা টপটপ করে মুখের উপর গড়িয়ে পড়েছে৷ মাঝে মাঝে খিস্তি দিয়ে ঘোড়াটাকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাবার জন্য ধাক্কা মারছে৷

ওদিকে অনুসরণরত রক্ষীটি বয়েডের দিকে বেশ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেও ঘোড়াটার আড়াল থাকার জন্য গুলি করতে পারছে না৷ তাই চেষ্টা করছে পাশে সরে যেতে৷ যদি সেখান থেকে বয়েডকে গুলি করা যায়৷

হঠাৎ ঘোড়া ছেড়ে জলের মধ্যে ডুব দিল বয়েড৷ কী ব্যাপার? আগের প্রহরীর মতো এটাকেও শেষ করবে নাকি?

ও ডুব দেওয়ামাত্রই অনুসরণরত অশ্বারোহী প্রহরীটি সতর্ক হয়ে হাতে রাইফেল তুলে নিল৷ চারদিকে নজর রাখতে লাগল—কোথায় বয়েড ভেসে ওঠে৷

বয়েড ডুব-সাঁতারে প্রহরীর দূরত্বটা ঠিক আন্দাজ করতে পারেনি৷ ভুলক্রমে ও লোকটার ঠিক পাশেই ভেসে উঠল৷ মাথা ঝাঁকিয়ে জল ঝেড়ে, বিদ্যুৎগতিতে তাকে ধরতে গেল৷ কিন্তু আগের ব্যাপারটার পর লোকটা খুবই সতর্ক ছিল৷ উদ্যত রাইফেলের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল বয়েডের মাথায়৷ বয়েড মাথা সরিয়েও সে আঘাত এড়াতে পারল না৷ সোজা তলিয়ে গেল৷ ক্রমে সেখানকার জল ফিকে লাল—লাল—গাঢ় লাল হয়ে উঠল৷

লোকটা ঘোড়া নিয়ে চটপট এপারে এসে উঠল৷ অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে বয়েডের ভেসে ওঠার অপেক্ষা করতে লাগল৷

খানিকক্ষণ পরেই বয়েডকে দেখা গেল৷ ওর দেহটা উপুড় হয়ে ভাসছে—এগিয়ে চলেছে স্রোতের টানে৷ ভাসতে ভাসতে কিছুদূর গিয়ে দেহটা নদীর পাড়ে ঠেকে রইল৷

ওদিকে অন্য প্রহরীর মৃতদেহটাও ওপারে ভেসে উঠেছে৷

অপেক্ষামাণ রক্ষীটি চোখ বুলিয়ে মৃতদেহ দুটো দেখল৷ তারপর চুকচুক শব্দ করে নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটাকে ডাকল৷ ঘোড়াটা উঠে আসতেই সে গিয়ে তার লাগাম চেপে ধরল—দুটো ঘোড়াই ছুটিয়ে দিল৷

নলখাগড়ার ঝোপ ভেদ করে, ঝড়ের বেগে ওরা ছুটে চলল৷ ছুটে চলল ফার্নওয়ার্থের দিকে৷

ঘোড়ার খুরের শব্দ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম৷ তারপর অতি সন্তর্পণে লুকনো জায়গা ছেড়ে বাইরে এলাম৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী পার হয়ে পালাতে হবে৷ কারণ এই মৃতদেহ দুটোর ব্যবস্থা করেই ওরা সদলবলে আমার পিছু নেবে৷ নিঃসন্দেহে সঙ্গে থাকবে ওই কালান্তক হাউন্ডগুলো৷

তা ছাড়া, বেতারে ছড়িয়ে পড়বে আমার পালানোর কথা৷ জেলার প্রতিটি পুলিশ আমাকে খুঁজে বেড়াবে৷ রাষ্ট্রের প্রতিটি পুলিসফাঁড়িকে আমার চেহারার বিবরণ জানিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে—নাঃ, দেরি করা চলবে না, যেমন করেই হোক একটা নিরাপদ আশ্রয়ের পৌঁছতে হবে৷

প্যান্টের ভাঁজে ছাড়া যে অবশিষ্ঠ মরিচটুকু পুঁটলিতে ছিল, সেটাকে ভালো করে বাঁধলাম৷ এর মধ্যে সূর্য মাথার উপর চলে এসেছে৷ রোদের অসহ্য উত্তাপ এমনই অনুভব করতে পারছি৷ আর দেরি না করে ছুটলাম৷ প্যান্টের ভাঁজ থেকে মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়তে লাগল৷ যাক, কুকুরগুলোর জন্য আর চিন্তা নেই৷ অক্লান্তভাবে ছুটে চললাম৷

নদীর পাড় ধরে মাইল দুয়েক দৌড়বার পর ঠিক করলাম, এবার নদী পার হতে হবে৷ এখান থেকে রেললাইন প্রায় ষোল মাইল দূরে৷

হাঁপাতে হাঁপাতে প্যান্ট খুলে, তার মধ্যে মরিচের পুঁটলিটা রেখে, ভালো করে ভাঁজ করলাম৷

অন্তর্বাস পরেই পায়ে পায়ে এগোলাম নদীর দিকে৷ ভাঁজ-করা প্যান্টটা মাথার উপর রেখে, কোমরের বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বাঁধলাম৷ মরিচটুকু ভিজলে চলবে না৷ কারণ এখনও এর প্রয়োজন আছে৷

গা ভাসিয়ে দিলাম নদীর শীতল জলে—সর্ব শক্তি দিয়ে সাঁতরে চললাম—নদী পার হয়ে পালাতে হবে৷—তবে জানি না, সফল হব কিনা!

তিন

বিকেল হয়ে গেছে৷ রোদের তাপ অনেকটা কমে এসেছে৷ একটা বিশাল গাছের ছায়ায় অবসন্ন দেহে শুয়ে আছি৷ সামনেই পাহাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে—তার কোল ঘেঁষে বড় রাস্তা৷ মাঝে-মাঝে দু একটা মালবোঝাই ট্রাক হাওয়ার বেগে ছুটে যাচ্ছে৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একজন পুলিশ অফিসার মোটরবাইকে চড়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে তাঁর পিছন পিছন একটা ওয়্যারলেসের গাড়ি—সম্ভবত আমারই খোঁজে—

ঝোপঝাড়ের আড়ালে থেকে, অন্যের চোখ বাঁচিয়ে এতখানি রাস্তা পার হয়ে এসেছি, কেউ আমাকে অনুসরণ করেনি৷ মরিচের গুঁড়ো সত্যিই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে৷

রেললাইন এখনও পাঁচ মাইল দূরে৷ অপেক্ষা না করে দৌড়লে হয়ত অনেক আগেই ওখানে পৌঁছে যেতাম, কিন্তু দিনের বেলায় এ জায়গাটা পার হওয়া উচিত হবে না৷ চারিদিক খাঁখাঁ করছে৷ অদূরে একটা গোলাবাড়ি ছাড়া লুকোবার আর কোন জায়গাই নেই৷ অগত্যা রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করলেই নয়৷

চারদিকে বুকসমান উঁচু কাঠের বেড়ার মাঝখানে অবস্থিত এই গোলাবাড়িটা আর তার পাশেই টিনের চালা-দেওয়া একটা গুমটিঘর৷ চারদিকের বেড়ার এককোণে একটা কাঠের দরজা৷

হঠাৎ দেখি সেই গোলাবাড়ি থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসছে৷ প্রথমে মেয়েটিকে ততটা গুরুত্ব দিইনি—কিন্তু ওর হাতের দিকে নজর পড়তেই আমার জিভে জল এল৷—সেই সকাল থেকে না খেয়ে আমি—একবিন্দু জল পর্যন্ত পেটে পড়েনি—তরমুজের ঝুড়িটা দেখে মনে হল ছুটে যাই মেয়েটির কাছে৷ ও তরমুজের ঝুড়িটা নিয়ে গুমটিঘরে ডুকে পড়ল৷ একটু পরেই খালি হাতে বেরিয়ে এল৷ আবার ফিরে চলল গোলাবাড়ির দিকে৷

ঠিক করলাম, সন্ধ্যার অন্ধকারে ওই গুমটিঘরে ঢুকে গোটাকয়েক তরমুজ সাবাড় করতে হবে৷ কারণ, পেটে কিছু না পড়লে পথ চলা অসম্ভব৷

সময় গড়িয়ে চলল—

এমনি করে আরও ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেল৷ সন্ধ্যার ধূসর ছায়া নেমে এল চারদিকে৷ বড় রাস্তার যানবাহনের চলাচল ফিরে হয়ে এল৷ গোলাবাড়ির ভিতর কতকগুলো ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে৷ আকাশে তাকালে চোখে পড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অসংখ্য তারা৷

এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি আর চোখে পড়েনি৷ হয়ত অন্য কোন অঞ্চলে ওরা আমার খোঁজ করছে৷

অন্ধকারে কারুর নজরে পড়ার ভয় নেই দেখে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে এগিয়ে চললাম৷ পাহাড়ি ঢালু জমি ধরে একছুটে গিয়ে পৌঁছলাম বড় রাস্তায়৷ নাঃ—কোন গাড়িই নজরে পড়ছে না৷ ক্ষিপ্রগতিতে রাস্তা পার হয়ে মেঠো পথ ধরলাম৷ বিকেল থেকেই লক্ষ্য করেছি, বাড়িটায় কোন পোষা কুকুর নেই৷ সুতরাং নির্ভয়ে এগিয়ে চললাম৷ বেড়ার কোনায় কাঠের দরজাটা বন্ধ ছিল৷ একটুও দ্বিধা না করে ওটা টপকে ভিতরে নামলাম৷ ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিলাম টিনের চালা-দেওয়া গুমটিঘরে৷ অন্ধকারেই নাকে এল তরমুজের সুস্বাদু গন্ধ৷ খিদেটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল৷

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এগোলাম৷ একটু এগিয়েই হাত ঠেকল তরমুজের স্তূপে৷ এতক্ষণে বুঝলাম, এ ঘরটায় তরমুজ রাখা হয়৷ এরা বোধহয় তাহলে তরমুজের চালানদার৷ একটা বড়সড় তরমুজ তুলে নিয়ে দাঁত বসালাম৷ অসুবিধে হলেও, সে অসুবিধে বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধার কাছে হার মানল৷

গোটা তিনেক তরমুজ শেষ করার পর, পেটের খিদে শান্ত হল৷ কিন্ত ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম৷ চোখের পাতা ভারী হয়ে এল৷ ভাবলাম, একটু ঘুমিয়ে নিই নয়ত এই ক্লান্ত অবসন্ন দেহে রেললাইন পর্যন্ত পৌঁছতে পারব না৷

হাতড়ে হাতড়ে, তরমুজের স্তূপের পিছনে আশ্রয় নিলাম৷ শুয়ে পড়তেই চোখ বুঝে এল৷ কানে এল বাড়ির ভিতর ভেসে-আসা কোন যন্ত্রসঙ্গীতের সুর৷ শুয়ে শুয়ে মনে পড়ল ফার্নওয়ার্থের কথা৷ এতখানি পথ নির্বিঘ্নে পালিয়ে এসেছি, কোন বিপদের মুখোমুখি হইনি৷ ভাগ্য ভালো থাকলে হয়ত কোন ট্রেনেও উঠতে পারব—তারপর—যদি—

হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলাম৷ উঠে দাঁড়ালাম একলাফে৷ গুমটিঘরের খোলা দরজা দিয়ে চোখে পড়ল দূরের ধূসর পাহাড়৷ তার পিছন থেকে উঁকি মারছে ভোরের সূর্য৷ আবিরে রাঙানো আকাশে গা ভাসিয়ে উড়ে চলেছে একঝাঁক পাখি৷ ভোরের বিবর্ণ আলো এসে ঠিকরে পড়েছে ঘরের ভিতরে৷

একটা অজানা ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ সেই সন্ধ্যা থেকে মড়ার মতো ঘুমিয়েছি৷ কেউ আমাকে দেখে ফেলেনি তো?

আমার পরনে কয়েদীর ডোরাকাটা পোশাক৷ এই পোশাকে যদি দিনের বেলায় বেরোই, তবে নির্ঘাৎ ধরা পড়তে হবে৷ সুতরাং রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে উপায় নেই৷ ইতিমধ্যে চারদিকের খোঁজ-খোঁজ বর অনেকটা ঠান্ডা হয়ে আসবে৷ বেশ নিশ্চিন্তেই পথ চলতে পারব৷

আরও কয়েকটা তরমুজ সাবাড় করে, একটা ছেঁড়া বস্তা মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে ঘুম নেমে এল৷

—ঘণ্টাখানেক পরে আচমকা জেগে উঠলাম৷ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বলে উঠল—ঘরে কেউ ঢুকেছে৷

কানে এল কারও নড়াচাড়ার শব্দ৷ অতি সপ্তর্পণে মাথা তুলে উঁকি মারলাম৷ আগের দিন দেখা মেয়েটি তরমুজগুলোকে বেছে, একপাশে সরিয়ে রাখছে৷ ওর বয়স বছর সতেরো হবে৷ গায়ের রঙ বাদামী, দেখতে খুব একটা সুন্দরী না হলেও কেমন যেন একটা আলগা আকর্ষণ আছে৷ হয়তো ওর উদ্দাম সপ্তদশী যৌবনই এর জন্য দায়ী৷ চটপটে অভ্যস্ত হাতে মেয়েটি কাজ করে চলল৷ আমাকেও দেখতে পায়নি৷ ঝুঁকে পড়ে, বড় তরমুজগুলো ও আলাদা করে রাখছে৷ ওর লম্বা ছাই-রঙা চুল কাঁধ বেয়ে ঝুলে পড়েছে বুকের কাছে৷

মেয়েটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে করতে লাগলাম৷ ওকে কি আমার উপস্থিতির কথা জানাব? হঠাৎ বুঝলাম, সেকথা জানানোর আর-কোন প্রয়োজন নেই৷ ও বুঝতে পেরেছে, আমি ওকে লক্ষ্য করছি৷ মেয়েটির কাজের নিটোল ছন্দ কেটে গেল৷ পলকের জন্য ওর হাত দুটো থেমে রইল—পরমুহূর্তেই আবার কাজ করতে শুরু করল৷ কিন্তু আগের মতো অভ্যস্ত হাতে নয়৷ পরিষ্কার বুঝলাম, ও ভয় পেয়েছে৷

এখুনি কিছু করা দরকার৷ নয়তো বাইরে বেরিয়ে মেয়েটি যে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করবে, তাতে আর সন্দেহ নেই৷ ওর মুখে কেমন একটা চাপা উত্তেজিত ভাব৷

আড়াল ছেড়ে বাইরে এলাম, ‘ভয় পেয়ো না৷’

বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটি৷ ওর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে৷ আতঙ্কে ওর গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোল না—ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল৷

আমার মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, গায়ে ছেঁড়া, নোংরা পোশাক—এসব দেখে মেয়েটা আরও বেশি ভয় পেয়েছে৷ মনে মনে ওর জন্য দুঃখ হল৷

‘ভয় নেই, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না৷’ স্থির চোখে ওকে লক্ষ্য রেখে আশ্বাস দিলাম৷ কিন্তু ও এক পা এক পা করে পিছিয়ে চলল৷ টিনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকতেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল৷ যেন দেওয়ালের গায়ে মিশে যাবে৷

মেয়েটির পরনে একটা চাপা প্যান্ট আর লাল-সাদা চেক-টানা শার্ট৷ ও দেওয়ালে হেলান দিয়ে উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ওর পীবর স্তনদ্বয় একবার উঠছে, একবার নামছে৷

‘খবরদার, আমার কাছে এসো না!’ চাপা তীক্ষ্ণ স্বরে ও আর্তনাদ করে উঠল৷

‘তুমি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছ?—আমিও তা তোমাকে দেখে ভয় পেয়ে ছিলাম৷’ আশ্বাসের নরম সুরে ওকে বোঝাতে চাইলাম, ‘পুলিশ আমাকে খুঁজছে—আমিই ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে এসেছি৷ তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?’ কথা বলে কোনরকমে ওকে আটকে রাখার চেষ্টা করলাম৷ ভয় হচ্ছে, হঠাৎ না আবার বাইরে দৌড় লাগায়—তাহলেই সর্বনাশ!

‘আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে,—তাছাড়া কিছু জামাকাপড়ও দরকার,—তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?’

দেখলাম, এতক্ষণে মেয়েটির ভয় অনেকটা কমে এসেছে৷ ও সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘তুমি এখানে কি করতে ঢুকেছ?’

‘দূর থেকে তরমুজগুলো দেখে, খিদের জ্বালায় নিজেকে আর সামলাতে পারিনি৷ খাওয়াদাওয়ার পর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ ভেবেছিলাম, রাতের অন্ধকারে রেললাইন পর্যন্ত গিয়ে, কোন চলতি ট্রেনে উঠে পালাব, কিন্তু—’

‘পুলিশ রেললাইন পাহারা দিচ্ছে—’ আমাকে বাধা দিয়ে ও বলে উঠল, ‘গত রাতে রেডিয়োতে বলেছে, তুমি রেললাইনের দিকে যাবে বলেই পুলিশ সন্দেহ করছে—৷ কিন্তু ফার্নওয়ার্থে যাবার মতো তুমি কী করেছিলে?’ মেয়েটা তার সন্দেহকুটিল দৃষ্টি আমার চোখে রাখল৷

‘তাহলে শোন—’ ওকে একে একে সব খুলে বললাম৷ কিছুই গোপন করলাম না৷ মেয়েটি চোখ গোল গোল করে, স্তব্ধ বিস্ময়ে, হাঁ করে শুনতে লাগল৷ শুনতে শুনতে ওর মুখে কেমন একটা করুণার ভাব ফুটে উঠল৷ মমতায় ছলছল করে উঠল ওর দুই গভীর চোখ৷ সব বলতে পেরে মনটা যেন হালকা হল৷

‘ফার্নওয়ার্থে আমি কিছুতেই ফিরে যাব না৷ তুমি যদি সাহায্য না কর, তাহলে আমার আর-কোন উপায় নেই৷ ওখানে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আমি আত্মহত্যা করব৷’

মেয়েটি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল৷ তারপর আস্তে আস্তে কাছে এগিয়ে এল, ‘ফার্নওয়ার্থ সম্বন্ধে আমিও কাগজে পড়েছি৷ সব কথা শোনার পর তোমাকে ওখানে ফেরত পাঠাতে আমার বিবেকে বাঁধছে৷ আমি তোমাকে সাহায্য করব—তোমার কি খিদে পেয়েছে?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম৷

‘তাহলে এখানে অপেক্ষা কর, আমি এখুনি আসছি৷’ গুমটিঘর ছেড়ে ও বেরিয়ে গেল৷ মুহূর্তের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত মন ভয় পেল—ওকে বিশ্বাস করা কি ঠিক হল? কিন্তু এছাড়া কোনও পথ তো আমার নেই৷ ও যদি পুলিশে খবর দেয়, তবে সেটাকে দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি? দেখা যাক—

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, মেয়েটি আর ফেরে না৷ একবার মনে হল, গিয়ে দেখব নাকি, ও কী করছে? এমন সময় মেয়েটি আসছে৷ ডান হাতে ঝোলানো একবালতি গরম জল, আর বাঁ-হাতে একটা তোয়ালে, সাবান, ক্ষুর আর কিছু জামাকাপড়৷

বালতিটা সামনে রেখে, জামাকাপড়গুলো ও আমার হাতে দিল, ‘হাত-পা ধুয়ে এগুলো পরে নাও৷ আমি খাবার নিয়ে আসছি৷’

মিনিট দশেক পরে ও ফিরে এল৷ ততক্ষণে আমার হাত-পা ধোয়া, দাড়িকামানো—সব হয়ে গেছে৷ কয়েদীর পোশাক ছেড়ে, ওর দিয়ে-যাওয়া পোশাকগুলো পরে ফেলেছি৷ লক্ষ্য করলাম, ওর হাতে খাবারের ট্রে৷ তাতে মাংস, ডিমসেদ্ধ আর কফি৷ আমার কাছে সেটাই যথেষ্ট মনে হল৷ হুমড়ি খেয়ে, গোগ্রাসে গিলে চললাম৷ ও একটা ভাঙা প্যাকিং বাক্সের উপর বসে আমাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷

খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে, মেয়েটি আমার দিকে একপ্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দিল৷ সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লাম৷ নিজেকে বেশ সুস্থ সতেজ মনে হল৷ এতদিন পরিশ্রমের পর বোধহয় এই বিশ্রামটুকু প্রয়োজন ছিল৷

‘তুমি রেললাইনের দিকে গেলেই ধরা পড়বে৷—যদি ওকল্যান্ডে যেতে চাও তো তোমাকে সাহায্য করতে পারি৷’

‘আমি ট্রেন ধরে ওকল্যাণ্ডেই যাব ঠিক করেছিলাম৷ ওখানে যেতে চাওতো তোমাকে সাহাহ্য করতে পারি৷’

‘আমি ট্রেন ধরে ওকল্যান্ডেই যাব ঠিক করেছিলাম৷ ওখানে যেতে পারলে আমার পক্ষে খুব সুবিধে হয়৷—কিন্তু যাব কি করে?’

‘ঘণ্টাখানেকের মধ্যে, এই তরমুজগুলো নিয়ে যাবার জন্য, একটা ছেলে ট্রাক নিয়ে আসবে৷ রোজ এই একই সময়ে ও এখানে আসে৷ এখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে আবার ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে৷ সোজা যায় ওকল্যান্ডের বাজারে৷ সেখানে ট্রাক রেখে, টাকার তাগাদায় যায়৷ ও এসে যখন বাড়িতে খেতে ঢুকবে, তখন তুমি গিয়ে ওর ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে পড়বে৷ তারপর ওকল্যান্ডে পৌঁছে, চুপিসাড়ে নেমে পড়বে৷’

মেয়েটির কথা রাজি হলাম৷

রাজি না হয়ে উপায়ই বা কি! ও একটা পাঁচ ডলারের নোট এনে আমার হাতে দিল—আর তার সঙ্গে দু-প্যাকেট সিগারেট৷ ওকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে চোখ সজল হয়ে উঠল৷

একটু পরে ট্রাকটা এসে পৌঁছল৷ চালক একটি অল্পবয়সী ছেলে৷ সে ট্রাক রেখে ভিতরে যেতেই,গাড়ির পিছনে উঠে পড়লাম৷

তারপর একসময় ট্রাক ছেড়ে দিল৷

কিছুক্ষণ পর তরমুজের বাক্সগুলো সরিয়ে, অতিসন্তর্পণে তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলাম—বিকেলের রোদ তখন ঝিমিয়ে এসেছে—দূরে দেখা যাচ্ছে সেই গোলাবাড়িটা৷ তার দরজায় দঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটি৷ পড়ন্ত রোদ ওর লাল-সাদা ডোরাকাটা শার্টের গা থেকে ঠিকরে পড়ছে৷ মেয়েটি আস্তে আস্তে হাত তুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে নাড়তে লাগল৷ ট্রাক ক্রমশ এগিয়ে চলল—ক্রমে মিলিয়ে আসতে লাগল—মেয়েটি—গোলাবাড়ি৷ ট্রাক ছুটে চলল৷

নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু-ফোঁটা অশ্রু৷

এই সুন্দর স্মৃতিটুকু একান্ত আমার করেই সযত্নে তুলে রাখব মনের মণিকোঠায়৷ অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনের পথে এ স্মৃতিটুকুই হোক আমার একমাত্র সঙ্গী৷

ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার চারদিন পরে লিটল ক্রিকে এসে পৌঁছলাম৷ ওকল্যান্ড থেকে একটা মালগাড়ি ধরে প্রায় এক হাজার মাইল পার হয়ে, এসে উপস্থিত হয়েছিল এই লিটল ক্রিকে৷

মাথার উপর দুপুরের চড়া রোদ৷ রাস্তাঘাট নির্জন৷ মাঝে মাঝে দু-একজন পথচারী চোখে পড়ছে৷

মেয়েটি যে পাঁচ ডলার দিয়েছিল, তা থেকে এখন অবশিষ্ট মাত্র এক ডলার৷ ওকল্যান্ড থেকে ট্রেনে করে এখানে আসবার পথে কিছুই পেটে পড়েনি৷ চারপাশে চোখ বোলালাম—যদি কোন দোকান চোখে পড়ে৷ অদূরেই একটা স্ন্যাক-বার দেখতে পেলাম৷ এগিয়ে চললাম পায়ে পায়ে—দেখি সামান্য কিছু যদি পেটে দেওয়া যায়৷ সম্বল তো মাত্র এক ডলার!

ঢুকে পড়লাম দোকানে৷ কোণের দিকের একটা চেয়ার দখল করে বেয়ারাকে স্যান্ডউইচ আর কফি আনতে বললাম৷

—এরপর কোথায় যাব? এই শহরের সীমান্তে যে পাহাড় আছে, তার ওপারেই ট্রপিকা স্প্রিংস৷ যদি একবার ওখানে পৌঁছতে পারি, তবে আর-কোন ভয় নেই—একেবারে নিশ্চিন্ত৷ কিন্তু যাব কেমন করে?

ট্রপিকা স্প্রিংসের দূরত্ব এখান থেকে দু-শ মাইল৷ সেখানে পৌঁছবার একমাত্র উপায় কোন চলতি গাড়ি বা ট্রাকে আশ্রয় নেওয়া৷ কিন্ত আমার এই নোংরা পোশাক, মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল—নাঃ—এ অবস্থায় কারো গাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার আশা আমাকে ছাড়তে হবে৷ তার চেয়ে দেখি, কোন ট্রাকে যদি জায়গা পাই৷

খাওয়া-দাওয়া সেরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকটির দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আচ্ছা ভাই, এখান থেকে ট্রপিকা স্প্রিংস যাব—কোন গাড়ি-টাড়িতে জায়গা পাওয়া যাবে?’

‘উঁহু—’ লোকটি মাথা নাড়ল, ‘সেরকম আশা খুবই কম৷ এখান দিয়ে অনেক গাড়িই যায় বটে, কিন্তু কেউ থামে না৷ আর থাকবে—সে-আশাও খুব কম৷ তুমি বরং এক কাজ কর—এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে একটা পেট্রল-পাম্প আছে—তার নাম ‘পয়েন্ট অফ নো রির্টান’৷ তুমি সোজা সেখানে চলে যাও৷ ওখানে প্রত্যেকটা গাড়িই তেল, মোবিল নেবার জন্য থামে৷ দেখ, যদি কোন ড্রাইভারকে বলেকয়ে রাজি করাতে পার—’

‘পেট্রল-পাম্পটার অদ্ভুত নাম তো!’

‘তা বটে, কিন্তু তার একটা কারণও আছে৷ এর পরের পেট্রল-পাম্পটা একেবারে পাহাড়ের ওপারে—একশ ষাট মাইল দূরে৷ সেইজন্যই এর মালিক কার্ল জেনসন এর নাম দিয়েছে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’—অর্থাৎ, ‘শেষ সীমান্ত’৷ তা ছাড়া, এর সঙ্গে লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁও আছে—জেনসনই তার মালিক৷

‘তুমি তো বলেই খালাস কিন্তু এতটা রাস্তা কি হাঁটব নাকি?’

লোকটা হাসল, ‘আরে না, না,—হাঁটতে যাবে কোন দুঃখে? মি. জেনসন প্রতিমাসে পুরোনো লোহালক্কড় কিনতে শহরে আসেন৷ প্রতিবারই ফেরার পথে আমার দোকান হয়ে যান৷ তোমার ভাগ্য ভালো, আজই তিনি এদিকে এসেছেন৷ ফেরার পথে আমার দোকানে এলে, তাঁকে বরং একবার বলে দেখো—তিনি খুব ভালো লোক, আমাকে বহুবার সাহায্য করেছেন৷ দেখ, হয়তো তোমাকে সঙ্গে করে নিতেও যেতে পারেন৷’

‘কখন আসবেন তিনি?’

লোকটা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, ‘এই এসে পড়লেন বলে—৷’

অল্পক্ষণের মধ্যেই দোকানের খোলা দরজায় আবির্ভূত হল এক বিশাল চেহারার পুরুষ৷ যে কাউন্টারের দিকে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল, ‘ঝটপট এক কাপ কফির ব্যবস্থা কর মাইক, এখুনি আবার বেরিয়ে পড়তে হবে৷’ কথা শেষ করে লোকটি আমার দিকে এক পলক তাকাল৷ তারপর আবার চোখ ফেরাল মাইকের দিকে, ‘ তোমার বউ কেমন আছে হে? তাকে যে দেখছি না?’

‘ও ওয়েন্টওয়ার্থে গেছে, মি. জেনসন৷ আপনার সঙ্গে দেখা হল না বলে খুব দুঃখ পাবে৷’ মাইক আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল৷ অর্থাৎ, এই কার্ল জেনসন৷

জেনসন লম্বায় প্রায় সাড়ে ছ-ফুট৷ গায়ের রঙ তামাটে৷ মুখ দেখে বেশ হাসিখুশি মনে হয়৷ বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি হবে৷ কিন্তু হলে কি হবে—দেখে মনে হয়, এখনও দু-জন লোকের মহড়া নেবার ক্ষমতা রাখে৷

মাইকে কফির কাপ এগিয়ে দিল জেনসনের দিকে, ‘মি, জেনসন, এই লোকটি পাহাড় পেরিয়ে ট্রপিকা স্প্রিংসে যেতে চায়৷ আমি বলেছি, আপনার ওখানে যেতে,—সেখানে যদি কোন ট্রাক ধরতে পারে৷ এখানে তো আর-কোন গাড়ি থামবে না৷’

জেনসন আমার দিকে ফিরে হাসল, ‘মাইক ঠিক বলেছে৷ ও ছাড়া তোমার উপায় নেই৷ তুমি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে যেতে পার, কিন্তু ওই পর্যন্তই—! কোন ট্রাক-চালকের রাজি করানোর ভার তোমার৷ জানই তো, কেউই আজকাল অচেনা লোককে ট্রাকে তুলতে চায় না—দেখ, যদি ভাগ্য ভালো থাকে—৷’

‘কিন্তু আপনার কোন অসুবিধে হবে না তো?’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জেনসন, ‘পাগল নাকি! এতখানি রাস্তা যে একজন সঙ্গী পাব, তাই যথেষ্ট৷’

হঠাৎ কি মনে হতেই জেনসন আর পেশীবহুল হাত আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল, ‘আমার নাম কার্ল জেনসন—৷’

জেনসনের হাতে হাত মেলালাম, ‘আমি জ্যাক প্যাটমোর—৷’ প্রথমেই যে নামটা মনে এল, সেটাই বলে দিলাম৷

‘চল, আর দেরি করে লাভ কি?’ জেনসন কফির কাপ নামিয়ে রাখল, পকেট থেকে একটা দশ সেন্ট বের করে মাইকের হাতে দিল, ‘চলি মাইক—আবার দেখা হবে—’ তারপর দরজার দিকে এগিয়ে চলল৷

মাইককে ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম৷

বাইরে একটা বড়সড় ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল৷ জেনসন এগিয়ে গিয়ে তার চালকের আসনে বসল৷ আমিও তার পাশে গিয়ে বসলাম৷ ওঠবার সময় লক্ষ্য করলাম—ট্রাকটা পুরোনো লোহালক্কড়ে ভর্তি৷

ট্রাকের ভিতরটা অসহ্য গরম৷ আমরা দুজনেই গায়ে কোট খুলে ফেললাম৷ জেনসন সিগারেট বের করে নিজে ধরাল, আমার দিকে একটা এগিয়ে দিল৷ তারপর স্টার্ট দিয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল৷

শহরের বাইরে পৌঁছতেই চোখে পড়ল দিগন্তপ্রসারী মরুভূমি৷ চারদিকে শুধু বালি আর বালি৷ মাঝের সরু পিচঢালা রাস্তা ধরে জেনসন ট্রাক ছুটিয়ে চলেছে৷ দূরে—বহুদূরে চোখে পড়ছে পাহাড়—তার ওপারেই ট্রপিকা স্প্রিংস৷ মাথার উপরে সূর্য কিছুটা ঢলে পড়লেও গরম কমেনি৷ ট্রাকের চলন্ত চাকা উড়িয়ে দিচ্ছে ধুলোর মেঘ—

হঠাৎ জেনসন প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি এখানে এই প্রথম এলে?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কোত্থেকে আসছ?’

‘ওকল্যান্ড থেকে—’

স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে আড়চোখে আমাকে দেখল জেনসন, ‘যদি কিছু মনে না কর জ্যাক, তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করি—তুমি কোথায় কাজ কর?’

‘আমাদের তালার ব্যবসা আছে, আমার বাবাও এই ব্যবস্থা করতেন৷’ সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে একটা জবাব দিলাম৷

‘তালার ব্যবসা? তাহলে তো লোহা সম্বন্ধে তোমার বেশ জ্ঞান আছে,—কি বল?’

‘হ্যাঁ—তা একটু আছে৷’

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ একসময় জেনসনই প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা জ্যাক, তুমি গাড়ির ইঞ্জিন-টিঞ্জিনের ব্যাপার বোঝ?’

‘খুবই সামান্য—’ তার একটানা প্রশ্নে বিব্রত বোধ করলাম, ‘দু-একবার কয়েকটা গাড়ির কাজ করেছি—এ সেলফ ঠিক করা, ডিস্ট্রিবিউটর হেডের পয়েন্ট সারানো—এরকম সামান্য কয়েকটা কাজ৷’

জেনসন তার নীল চোখের দৃষ্টি স্থিরভাবে মেলে ধরল আমার দিকে, ‘তার মানে গাড়ির কাজ জান—৷—তুমি কি ট্রপিরকা স্প্রিংসে থাকবে বলে ঠিক করেছ, জ্যাক?’

‘হ্যাঁ—’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম৷ রোদ-ঝলসানো উজ্জ্বল আকাশে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে গোটাকয়েক চিল৷

‘ওখানে কোন চাকরি নিয়ে যাচ্ছ নাকি?’

এবার আমার মুখে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল৷ সেটা লক্ষ্য করে জেনসন একটু বিব্রত হল, ‘মানে—যদি কোন চাকরির ব্যাপারে হয়, তবে আমিই তোমাকে একটা চাকরি দিতে পারি৷’

অবাক হয়ে জেনসনের দিকে তাকালাম, ‘আপনি আমাকে চাকরি দেবেন? কি চাকরি?’

‘লোহালক্কড় সম্বন্ধে অভিজ্ঞ, গাড়ির কাজও জানে, এমন একজন লোকই আমার দরকার৷ আমি আর আমার স্ত্রী—লোলা—সব কাজ সামলে উঠতে পারি না৷ তোমার মতো একজন লোকই আমি খুঁজছি৷ তবে সপ্তাহে তিন-চারদিন কিন্তু রাত্তিরে কাজ করতে হবে—অবশ্য দিনে বিশ্রাম পাবে৷ আমার ওখানেই থাকবে, খাবে৷ আমার বউ ভারি চমৎকার রান্না করে৷ সে তুমি খেলেই বুঝতে পারবে—আর হ্যাঁ, মাইনে সপ্তাহে চল্লিশ ডলার—কি রাজি?’

ভাবলাম—গা-ঢাকা দেবার এমন একটা সুযোগ ছাড়ি কেন! এই পাণ্ডব-বর্জিত মরুভূমির দেশে পুলিশ আমার খোঁজও পাবে না৷ আর এখানে মাইনের টাকা কিসেই বা খরচ করব! বরং জমাতে পারলে, কিছু অন্তত সঙ্গে নিয়ে পালানো যাবে—ভালোই হবে!

হেসে জেনসনের চোখে চোখ রাখলাম, ‘রাজি—অবশ্য আমার কাজ যদি আপনার পছন্দ হয়—’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জেনসন, প্রচণ্ড এক চাপড় কষিয়ে দিল আমার ঊরুতে, ‘ওসব বিনয়-টিনয় ছাড় জ্যাক—আজ থেকে তুমি আমার ওখানে চাকরিতে ঢুকলে—কোন আপত্তি চলবে না৷’

অদ্ভুত নামের এক পেট্রল-পাম্পে অদ্ভুতভাবেই চাকরি পেলাম!

চার

সামনের একটা উঁচু ঢিবি পেরোতেই, চোখে পড়ল পাহাড়ি ঢালু রাস্তা৷ যেদিকে চোখ যায়, শুধু বালি আর বালি৷ বিকেলের চড়া রোদ বালির সমুদ্রকে করে তুলেছে উজ্জ্বল, তার গা থেকে ঠিকরে-আসা সোনালী আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে৷ দূরে—বহুদূরে চোখে পড়ল একটা অস্পষ্ট বিন্দু—সরু ঢালু রাস্তা ধরে ট্রাক ছুটে চলল—এবারে চোখে পড়ছে গোটাকয়েক ঘর—

‘ওই যে দেখা যাচ্ছে—’ জনসন আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওটাই আমার পেট্রল-পাম্প—‘‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’’৷’

ঘরগুলোকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ রাস্তার বাঁ দিকে একটা ছোট বাংলো৷ তার সঙ্গে লাগোয়া গোটাদুয়েক একচালা ঘর—আর একটা অপেক্ষাকৃত বড় গুমটিঘর৷ পেট্রল নেবার তিনটে পাম্পও চোখে পড়ছে৷

এ ছাড়া রাস্তার ওপারে, বাংলোর ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে একটা ঘর৷ রাস্তা ক্রমে মিলিয়ে গেছে পাহাড়ের ওপিঠে—

সবকটা ঘরের রঙই আকাশ-নীল৷ ধুধু করছে দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির বুকে সেই ঘরগুলো—যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা নীল রঙের কয়েকটা আঁচড়৷

‘রাস্তার ওই ডানদিকের ঘরটা তোমার৷ আর এদিকের বাংলোটায় আমি আর লোলা থাকি৷ ব্যস—৷ জায়গাটা এমনিতে নির্জন আর বিরক্তিকর শুধু লোলা আছে বলেই সব-কিছু ভুলে থাকতে পারি৷ যাকগে, এখন তুমি এসেছ—আমাদের কাজের অনেক সুবিধে হবে৷—ওঃ, রোজ মাঝরাতে ট্রাক-ড্রাইভারগুলো কি কম জ্বালাতন করে!’

আমরা পেট্রল-পাম্পে প্রায় পৌঁছে গেছি৷ জেনসন দুবার টানা হর্ন বাজিয়ে আমার দিকে তাকাল, হাসল, ‘আমি যে আসছি, সেটা লোলাকে জানালাম৷ তোমাকে দেখে কিরকম অবাক হয়ে যায় দেখবে৷ আগে যতবার লোকের কথা বলেছি, ততবারই ও বারণ করেছে৷ কি—না, টাকা খরচ হবে! আরে বাবা, এত টাকা আমি করবটা কী? একজন লোক রাখলে কত সুবিধে হয়৷ রাত্রিবেলাটা আর বিছানা ছেড়ে ওঠাউঠি করতে হয় না—তা কে শোনে! বেশি বলাবলি করলে, সোজা মুখের ওপর বলে দেবে, ‘আমি যদি মাঝরাতে উঠতে পারি, তো তুমিও পারবে’—বুঝলে জ্যাক, এই পঞ্চান্ন বছর বয়সে এত খাটাখাটনি আর পোষায় না! ছিল একদিন, যখন টাকার জন্য দিনে সতেরো ঘণ্টা করে কাজ করেছি! আজ আমার টাকার অভাব নেই৷ তা এখন যদি একটু ফুর্তিই না করব, তো করব কবে?—তুমিই বল জ্যাক, লোকে টাকা জমায় কিসের জন্য, অ্যাঁ?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল জেনসন৷

‘আমার নমে হয়, প্রথমে দুঃসময়ের জন্য কিছু সঞ্চয় করা দরকার৷ আর সেটা হয়ে গেলে একটু ফুর্তি না হয় করলেনই—ক্ষতি কী?’

‘ঠিক বলেছ!’ উল্লাসে আমার হাঁটুর উপর সশব্দে চাপড় মারল জেনসন, ‘সেসব ব্যবস্থা আমার হয়ে গেছে৷ হেসেখেলে বাকি দিন ক-টা আমি কাটাতে চাই৷ এখন তুমি আছ, আর-কোন চিন্তা নেই৷ আমি আর লোলা প্রায়ই ওয়েন্টওয়ার্থে বেড়াতে যেতে পারব, কী বল?’

জেনসন বেশ দিলদরিয়া মেজাজেই কথা বলছিল, কিন্তু তার ভিতরেও কোথায় যেন একটা চাপা সংশয় রয়েছে মনে হল৷ ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম৷ জেনসনের চোখ সামনের রাস্তায় স্থির হয়ে আছে৷ ট্রাক এগিয়ে চলেছে—রাস্তার ধারে একটা বড় কাঠের ফলক চোখে পড়ল—

—পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন—

প্রত্যেককে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে—পরের একশ ষাট মাইলের মধ্যে কোন পেট্রল-পাম্প নেই৷ তেল, মোবিল নেবার এই শেষ সুযোগ!

গাড়ির মেরামতের যাবতীয় কাজ করা হয়৷

আপনাদের সুবিধার্থে রেস্তোরাঁ আছে৷

ফলকের ঠিক পিছনেই দেখা যাচ্ছে পেট্রল নেবার তিনটে পাম্প৷ তাদের চারপাশে বাহারী ফুলের গাছ৷ তাতে ফুটে রয়েছে রঙ-বেরঙের ফুল৷ কেউ যেন অবহেলাভরে ছুড়ে দিয়েছে একরাশ রঙ৷ অদূরেই চোখে পড়ছে বাংলো৷ তার দরজার রঙ সাদা৷ আর জানালাগুলো গাঢ় নীল পর্দায় ঢাকা৷ বাংলোর সামনে একটা বারান্দা তার থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি নেমে একটা মেঠো পথ এগিয়ে এসেছে রাস্তা পর্যন্ত৷ তার দু-পাশে পাথর বসানো৷ সেগুলো আবার সাদা রঙ-করা৷ বাংলোর পাশেই যে লম্বা একচালা ঘর, সেটাই সম্ভবত রেস্তোরাঁ৷ এর থেকে একটু দূরেই একটা গ্যারেজ, আর তার পাশেই একটা একচালা গুমটিঘর৷

রাস্তার ডানদিকে আমার থাকবার ঘর৷ একটা পাথরবসানো মেঠো পথ চলে গেছে ঘরের দরজা পর্যন্ত৷

এককথায়, পুরো জায়গাটা যেন ছবির মতো৷ জেনসনের ভাষায় ‘নির্জন, বিরক্তিকর জায়গা’ যে এত সুন্দর হতে পারে, তা ভাবতে পারিনি৷

‘বাঃ, ভারি চমৎকার জায়গা তো!’ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল৷

‘শুনে খুব খুশি হলাম, জ্যাক৷’ জেনসন একগাল হাসল, ‘কিন্তু এর পেছনে কি আমাকে কম খাটতে হয়েছে! অবশ্য এরপর আমরা দুজনে মিলে এটাকে আরও ভালো করে তুলব, কী বল?’ গাড়ির দরজা খুলে জেনসন নেমে পড়ল৷ পিছন পিছন আমিও নামলাম৷ বালি ভীষণ গরম হয়ে উঠেছে—এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাই দায়৷

একটা ব্যাপারে আশ্চর্য হলাম৷ জেনসন আগেই দুবার হর্ন বাজিয়েছে৷ কিন্তু কই, তা শুনে ভিতর থেকে লোলা তো বেরিয়ে এল না?

কিন্তু আমি যদি জেনসন হতাম, আর ওইভাবে হর্ন বাজাতাম, তবে আশা করতাম, আমার স্ত্রী হর্ন শুনে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে বেরিয়ে আসবে৷

অথচ এতে জেনসনের কোন বিকারই দেখলুম না৷ যেন এরকম ব্যবহার পেতেই সে অভ্যস্ত৷ ও আমার ঘরটার দিকে আঙুল দেখাল, ‘জ্যাক, তুমি আর দেরি করো না৷ যাও, হাতমুখ ধুয়ে, দাড়ি কামিয়ে চলে এস৷ আমি এদিকে তোমার খাবার ব্যবস্থা করছি৷—যাও, যাও—আর বেশি দেরি করো না!’ জেনসন আমাকে আস্তে ঠেলা দিল৷ ওর হাতের ওই সামান্য ধাক্কা খেয়েই পড়ে যাচ্ছিলাম, নিজেকে সামলে নিলাম, ‘আমাদের কোথায় দেখা হবে, মি. জেনসন?’

‘খাবার ঘরে’—রেস্তোরাঁটা দেখিয়ে সে বলল৷ তারপর বালিতে ঢাকা মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে৷

আমিও পা বাড়ালাম ঘরের দিকে৷ দরজা খুলতেই বসবার ঘর৷ বেশ ছিমছাম ভাবে সাজানো—ঘরের এককোনায় একটা টেলিভিশন সেটও রয়েছে৷ বসবার ঘর পেরোলেই একটা ছোট্ট শোবার ঘর৷

শোবার ঘরে জামাকাপড় ছেড়ে বাথরুমে গেলাম—হাত-মুখ ধুয়ে দাড়ি কামাতে শুরু করলাম৷ এক-দিনে আমার গোঁফ বেশ ঘন হয়েছে৷ ঠিক করলাম—গোঁফটা কামাব না—রাখব৷ দাড়ি কামানো হয়ে গেলে আয়নায় নিজের চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম—গোঁফটার জন্য আমার চেহারা অনেকখানি বদলে গেছে৷ খবরের কাগজে যদি আমার ছবিও ছাপা হয়ে থাকে, তবু কারও পক্ষে আমাকে চেনা সম্ভব হবে না৷

জামাকাপড় পরে বেশ উৎফুল্ল চিত্তে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম জেনসনের বাংলোর দিকে৷ তারপর দু-পাশে তাকালাম৷ পিচ-ঢালা রাস্তা এঁকেবেঁকে মিলিয়ে গেছে পাহাড়ের ওপারে৷ আর সামনে পিছনে তাকালে বালি ছাড়া আর-কিছুই চোখে পড়ে না৷

মনে মনে আশ্বত হলাম৷ পুলিশ হয়ত ওকল্যান্ড বা অন্য-কোন শহরে আমার খোঁজ করবে, কিন্তু এই মরুভূমিতে—উঁহু, এখানে খোঁজ করার কথা ওরা চিন্তাই করবে না৷ ঠিক করলাম, যতদিন পারা যায়, এখানেই থাকব৷

রাস্তা পেরিয়ে রেস্তোরাঁয় গিয়ে ঢুকলাম৷ ঘরের একপাশে সাজানো পাঁচটা টেবিল আর কতকগুলো চেয়ার৷ এছাড়া কাউন্টারের সামনে গোটা দশেক টুল৷ কাউন্টারের উপর সাজানো সারি সারি বীয়ার ও সোডার বোতল৷ একপাশে গোটাদুয়েক আচারের শিশি৷ তার সঙ্গে রয়েছে একগাদা কাঁচের গ্লাস, ছুরি, কাঁটা-চামাচ আর কাগজের রুমাল৷ প্রতিটি জিনিসই পরিষ্কার ঝকঝক করছে৷ দেওয়ালের গায়ে টাঙানো একটা ফলকে ছাপা হরফে লেখা রয়েছে—

—আজকের খাদ্য-তালিকা—

*

ফ্রায়েড চিকেন

ভিল স্টেকস

বীফ হ্যাশ

ফ্রুট পাই

কাউন্টারের পিছনে আধ-ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে রান্নার সুস্বাদু গন্ধ ভেসে আসছে৷ ভাবছি, কাউন্টারের উপর শব্দ করে কাউকে ডাকব, কানে এল জেনসনের গলা, ‘এই, লোলা শোন, অবুঝ হয়ো না৷ অনেক ভেবেচিন্তেই আমি জ্যাককে এখানে নিয়ে এসেছি৷ ও এখানে কাজ দেখাশোনা করলে, আমরা সপ্তাহে দু-চারদিন করে ওয়েন্টওয়ার্থে বেড়াতে যেতে পারব৷ ওয়েন্টওয়ার্থে তোমারএকা যাওয়াটা আমি পছন্দ করি না৷ কোন স্ত্রীলোকেরই একা একা সিনেমা যাওয়া ঠিক নয়—বিশেষ করে ওয়েন্টওয়ার্থের মতো একটা বাজে শহরে—৷’

‘কেন, ঠিক নয় কেন?’ লোলার তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এল, ‘একা সিনেমায় গেলে তাতে ক্ষতিটা কি হয়েছে?’

‘শোন, লোলা—’, জেনসন বোঝাতে চাইল, ‘তুমি একজন সম্ভ্রান্ত বিবাহিতা মহিলা৷ তোমার পক্ষে একা যাওয়াটা ভালো দেখায় না৷ তা ছাড়া ওয়েন্টওয়ার্থে বহু বাজে লোক আছে যারা—’

‘তুমি কি বলতে চাও, কার্ল? ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে আমি বাজে লোকের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই?’

‘ছি ছি, লোলা,—তুমি আমার কথা বুঝতে পারনি৷ আমি শুধু বলেছি, তোমার একা যাওয়াটা ভালো দেখায় না৷ জ্যাক এখানে থাকলে, তুমি আর আমি মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতে পারব—তাই না?’

‘দ্যাখ কার্ল, একটা কথা তোমাকে হাজারবার বলেছি, আজও বলছি—কোন উটকো লোককে আমি এখানে রাখব না, ব্যস৷’

‘হ্যাঁ, জানি তুমি বলেছ৷ কিন্তু এটা বুঝতে পারছ না, একজন লোক রাখা আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন৷ ভেবে দেখো তো, কাল রাতে তোমাকে ক-বার বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়েছে? ছ-বার—ছ-বার তোমাকে উঠে এসে এই হতচ্ছাড়া ট্রাকগুলোকে পেট্রল দিতে হয়েছে!—তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন, লোলা৷ জ্যাক যদি রাত্রিবেলাটা কাজ করে, তবে আমরা একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি—এ সহজ কথাটা তুমি বুঝতে পারছ না?’

‘তোমাকে এক কথা কতবার বলতে হবে, কার্ল?’ লোলা ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘কোন অচেনা লোককে এখানে আমি রাখতে দেব না৷ আর তাছাড়া ওই লোকটা নিশ্চয়ই বিনা পয়সায় কাজ করছে না?—হুঁ—যত্তসব,—কবে থেকে এরকম টাকা ওড়াতে শুরু করেছ?’

‘অভদ্রের মতো চেঁচিয়ো না!’ জেনসনের চাপা স্বর শুনতে পেলাম, ‘দু-চারদিন দেখাই যাক না৷ তারপর তোমার যদি পছন্দ না হয়, তো জ্যাককে বারণ করে দিলেই হবে৷ দেখ, ওর কাজে তুমি অখুশি হবে না৷ এখন এসব ঝগড়াঝাঁটি বাদ দাও—এস, কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাক৷’

‘তুমি কি করে জানলে লোকটা বিশ্বাসী? ওকে এখানে রেখে আমরা ওয়েন্টওয়ার্থে যাব, আর ও হাত গুটিয়ে থাকবে মনে করেছ? সিন্দুক ভেঙে টাকা হাতিয়ে সোজা কেটে পড়বে! তোমার মাথা ঠিক থাকলে ওকে আনতে না৷’

লোলার মনোভাবে অস্বস্তি বোধ করলাম৷ ওর অমতে এখানে কথাটা কি ঠিক হবে?—সে যা হোক, পরে একটা কিছু ভেবেচিন্তে ঠিক করা যাবে৷ কিন্তু—আপাতত সাড়া দেওয়া দরকার৷

রেস্তোরাঁর দরজার কাছে চুপিসাড়ে ফিরে গেলাম৷ দরজাটা খুলে সশব্দে বন্ধ করলাম—যেন এইমাত্র ঢুকলাম৷ তারপর গটমট করে এগিয়ে এলাম কাউন্টারের দিকে, ‘কেউ আছেন নাকি?’

রান্নাঘরের ভিতর থেকে ভেসে-আসা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল৷ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ একসময় দরজার খুলে জেনসন বেরিয়ে এল, মুখে কেমন একটা অপ্রতিভ হাসি, ‘এস, জ্যাক৷ ঘরে কেমন লাগল? পছন্দ হয়েছে তো?’

আমার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চেহারা দেখে জেনসন আশ্বস্ত হয়েছে মনে হল৷ অর্থাৎ লোলার কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া চলতে পারে৷

মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুললাম, ‘পছন্দ হয়নি মানে? সত্যি মি. জেনসন, আপনার ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এর তুলনা নেই৷’

জেনসন মাথা নাড়ল৷ কিন্তু সেই গর্বের হাসি তার মুখ থেকে মিলিয়ে গেছে৷ সম্ভবত, সে লোলার সঙ্গে তার ঝগড়ার কথা ভাবছিলাম৷

‘জ্যাক, তোমার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিদে পেয়েছে? দাঁড়াও, আমি এখুনি ব্যবস্থা করছি৷’ জেনসন আমার কাছে যেন মুক্তি পেল, চটপট এগিয়ে চলল রান্নাঘরের দিকে৷ তার অস্বস্তি দেখে দুঃখ অনুভব করলাম৷

কিন্তু জেনসন রান্নাঘরে পা বাড়াতেই কানে এল বাইরে থেকে ভেসে-আসা কোন গাড়ির হর্নের শব্দ৷

‘আমি যাব নাকি, মি. জেনসন?’ রেস্তোরাঁর দরজার দিকে পা বাড়ালাম৷

‘না জ্যাক,—তোমাকে যেতে হবে না, আমিই দেখছি৷ আগে খেয়ে নাও৷ তারপর কাজ করার অনেক সময় পাবে৷’ জেনসন বাইরে চলে গেল৷

ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে—বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে একটা জীর্ণ ধূলিমলিন প্যাকার্ড৷ চালকের নির্দেশে জেনসন গাড়িটার ট্যাঙ্কে পেট্রল ঢালতে লাগল৷

হঠাৎ পেছনে সামান্য শব্দ হতেই চমকে ফিরে দাঁড়ালাম৷

রান্নাঘরের খোলা দরজার দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে৷ ওর চোখের দৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে সীমাহীন কৌতূহল৷

মেয়েটির মাথাভর্তি একরাশ লাল চুল৷ কামনা-মদির পুরু ঠোঁট৷ তিরিশ বসন্তের শরীরে ভরন্ত যৌবন৷ তার পান্না-পবুজ টলটলে চোখ রক্তে নেশা ধরায়৷ মেয়েটিকে দেখার পর কোন পুরুষের পক্ষেই ওর যৌবনের হাতছানিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব৷ ওর পরনে একটা সাদা গাউন—শরীরের সঙ্গে যেন ভেজা কাপড় হয়ে লেপটে আছে৷

মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে এল৷ লক্ষ্য করলাম, ওর গাউনের নিচে কোন অন্তর্বাসের বালাই নেই৷

স্থিরদৃষ্টিতে দুজনেই চেয়ে রইলাম পরস্পরের দিকে৷ কারুর মুখে কথা নেই৷

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানি না, একসময় খেয়াল হল জেনসন আমার পাশে দাঁড়িয়ে, ‘এই যে লোলা, তুমি এসেছ, আলাপ করিয়ে দিই—এই জ্যাক—জ্যাক, এ হচ্ছে লোলা—আমার স্ত্রী৷’

মেয়েটি ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ল—গভীর সবুজ চোখে শুধুই ঘৃণা৷

জেনসন অপ্রতিভভাবে দাঁড়িয়ে গালে হাত বোলাতে লাগল তারপর হঠাৎ কি মনে হতে একগাল হেসে দু-পা এগিয়ে এল, ‘লোলা, জ্যাকের বোধহয় ক্ষিদে পেয়েছে৷ আর আমারও তো দুপুর থেকে কিছু পেটে পড়েনি, দেখ না, যদি কিছু ব্যবস্থা করা যায়৷’

ভাবলেশহীন মুখে লোলা জবাব দিল, ‘অপেক্ষা কর, আমি আসছি৷’

ও ফিরে চলল৷ চলার সময় স্পষ্ট হয়ে উঠল ওর ভারী নিতম্বের সুডৌল রেখা৷ নিটোল ছন্দে হিল্লোল তুলে ও এগিয়ে চলল রান্নাঘরের দিকে৷

আমার সারা মুখ তখন ঘেমে উঠেছে৷ একটা কাগজের রুমাল টেনে নিয়ে মুখ মুছলাম৷

‘ভীষণ গরম, কী বল জ্যাক?’ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে একটু হাসল জেনসন৷

‘সত্যিই বড্ড গরম—’ প্রত্যুত্তরে হাসতে গিয়ে অনুভব করলাম গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,—চোখের সামনে এখনও হাতছানি দিয়ে ডাকছে লোলার পাগল করা যৌবন!

খাওয়াদাওয়া সেরে আমি আর জেনসন বাইরে এলাম৷ আমাকে কোন্ কোন্ দিন কাজ করতে হবে, সেটা তার থেকে জেনে নিয়েছি৷

সপ্তাহে তিনদিন আমাকে রাতে কাজ করতে হবে৷ গাড়ি ব্রেকডাউনের ব্যাপার হলে আমাকেই সামলাতে হবে৷ আর গ্যারেজ এবং পাম্পের কাজটা সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে৷

এসব কাজ আমার কাছে সামান্যই মনে হল৷ তা ছাড়া সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলে ভালোই হবে—লোলাকে মন থেকে সরিয়ে রাখতে পারব৷

বাইরে এসে জেনসন আমাকে দেখিয়ে দিল, কিভাবে পাম্প থেকে পেট্রল দিতে হয়৷ মোবিল আর পেট্রলের দাম কীভাবে হিসেব করতে হবে, তা-ও বুঝিয়ে দিল৷ তারপর লোহা-বোঝাই ট্রাকটা খালি করার জন্য আমাকে ডাকল৷

এরই মধ্যে সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে৷ দিনের অসহ্য গরম আর নেই৷ মরুভূমির ঠান্ডা হাওয়ায় ভেসে আসছে অসংখ্য বালুকণা৷ গোধূলির আলোয় দূরের ধূসর পাহাড় হয়ে উঠেছে রক্তাভ৷ একটা শান্ত সমাহিত ভাব নেমে এসেছে দিনের উত্তপ্ত মরুভূমিতে৷

আমি আর জেনসন মিলে লোহালক্কড়গুলো একে একে নামাতে লাগলাম৷ কাজ করতে করতে হঠাৎই জেনসন আমার দিকে তাকাল, ‘লোলার ব্যবহারে কিছু মনে করো না জ্যাক,—ও ওইরকমই৷ কেউ এখানে কাজ করুক, তা ও চায় না—কে জানে কেন? হয়ত সব মেয়েরাই ওইরকম—’ জেনসনের মুখে চিন্তার ছায়া৷ কথা বলতে বলতে একটা পুরোনো মরচে-পড়া গাড়ির ইঞ্জিন ও এক হ্যাঁচকায় মাটিতে নামল৷ ওর শক্তি দেখে অবাক হয়ে গেলাম৷ অত ভারী ইঞ্জিনটাকে এমনভাবে বয়ে নিয়ে চলল, যেন পালকের তৈরি খেলনা৷ গুমটিঘরে ওটা রেখে সে ফিরে এল, ‘জ্যাক, নাও, একটা সিগারেট ধরা—’ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সে আমার দিকে এগিয়ে দিল, ‘—অনেক পরিশ্রম গেছে৷—হ্যাঁ, যা বলছিলাম,—প্রথম প্রথম লোলা হয়ত তোমাকে ভালো চোখে দেখবে না—কিন্তু দেখ, কয়েকদিন পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷’

কোন উত্তর দিলাম না৷

‘তা লোলাকে কেমন দেখলে, সুন্দরী না?’

‘হ্যাঁ৷’ ভয় হচ্ছিল বুকের ঢিপঢিপ শব্দ বুঝি জেনসন শুনে ফেলবে৷

‘কীভাবে যে লোলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, হুঁঃ—,’ জেনসন হাসল, ‘ভাবতে অবাক লাগে৷—সে ভীষণ মজার ব্যাপার, বুঝলে জ্যাক৷ আজ থেকে বছর দুয়েক আগের কথা৷ আমার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ায়, তখন একাই সব সামলাচ্ছি৷ মন মেজাজ খুব খারাপ থেকে থেকেই বউয়ের কথা মনে পড়ছে৷ সমস্ত পরিবেশ যেন আমার মতোই বিষন্ন—নিঃসঙ্গ৷ চুপচাপ বসে আছি, এমন সময় একটা বাস এসে দাঁড়াল সামনের রাস্তায়৷ যাত্রীরা সব একে একে নেমে এল প্রায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ জন হবে৷ তার মধ্যে লোলাও ছিল৷ কি অদ্ভুত দেখ, এখনও আমার ছবির মতো সব মনে পড়ছে৷ এমন কি লোলা কি রঙের পোশাক পরে ছিল, তা-ও মনে আছে৷ রেস্তোরাঁর কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যাত্রীরা সব হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল৷ সবাই তখন ক্ষুধার্ত, অথচ হাতে সময় মাত্র কুড়ি মিনিট, তারপরই বাস ছাড়বে৷ আমার তো সাংঘাতিক অবস্থা৷ একবার রান্নাঘর, আর একবার খাওয়ার টেবিল—এই করে একেবারে হিমসিম খেয়ে যাবার যোগাড়৷ হঠাৎ দেখি, সবুজ পোশাকে সজ্জিতা একটি সুন্দরী তরুণী আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ অভ্যস্ত হাতে যাত্রীদের দিকে খাবারের প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে—

‘যখন বাস ছাড়বার সময় হল, ততক্ষণে সবাইর খাওয়া হয়ে গেছে৷ মেয়েটি সাহায্য না করলে কি যে করতাম তাই ভাবি! বাস ছাড়ার সময় ওকে জিগ্যেস করলাম, ও আমার এখানে চাকরি করবে কিনা৷ মেয়েটি তো এক কথায় রাজি৷ বাস ছেড়ে দিল—কিন্তু ও থেকে গেল৷

‘তারপর থেকে দুজনে কাজ করি৷ বেশ ভালোভাবেই দিন যায়—, হঠাৎ একদিন ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে কানে এল দু-চারটে কথা—আমাকে আর লোলাকে জড়িয়ে৷ অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার৷ ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো, এভাবে আমাদের দুজনের থাকাটা ভালো দেখায় না৷ সুতরাং ফিরে এসেই ওর কাছে বিয়ের প্রস্তাব করলাম৷ আমার থেকে তেইশ বছরের ছোট হলেও, ও রাজি হয়ে গেল৷

‘এমনিতে মাঝে মাঝে মান-অভিমান করে বটে, কিন্তু লোলা খুব কাজের মেয়ে৷ ওর মতো মেয়ে আমি আর দুটি দেখিনি৷ এখন কয়েকদিন একটু অভিমান করে থাকবে৷ তারপর দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে৷’

এমন সময়ে একরাশ ধুলো উড়িয়ে একটা ক্যাডিলাক এসে দাঁড়াল৷ জেনসন আমাকে ওটা দেখতে বলে রেস্তোরাঁয় ফিরে গেল৷

পেট্রল দিতে দিতে গাড়ির আরোহীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করলাম৷ কথায় কথায় জানলাম, এখানে রেস্তোরাঁও আছে, ইচ্ছে করলে তাঁরা খেয়ে নিতে পারেন৷ কারণ এরপর ট্রপিকা স্প্রিংস পর্যন্ত রাস্তায় কোন দোকান নেই৷ আমার কথায় রাজি হয়ে ওরা গাড়ি থেকে নেমে রেস্তোরাঁয় দিকে এগিয়ে চলল৷

এইভাবে শুরু হল আমার প্রথম কর্মব্যস্ত সন্ধ্যা৷ গাড়ির পর গাড়ি আসতে লাগল—কাজ করে চললাম, তার সঙ্গে সঙ্গে চলল রেস্তোরাঁর গুণগান—একসময় জেনসন রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে এল, ‘জ্যাক, চমৎকার! তোমার জবাব নেই! আমাদের ডিনার সব শেষ৷ আর-কোন খদ্দেরকে খাবার জন্য অনুরোধ করো না৷ অন্যদিন বড়জোর দু-চারজন এখানে ডিনার খেতে নামে, কিন্তু আজ তোমার পাল্লায় পড়ে প্রায় বিশজন খদ্দের ডিনার খেয়েছে—’

‘আপনি কি তা চান না, মি জেনসন?’ একটু অবাকই হলাম৷

‘চাই না আবার!—আরে, আগে কি ছাই বুঝেছি, তুমি এলে বিক্রি পাঁচগুণ বেড়ে যাবে? ঠিক আছে, কাল থেকে দেখা যাবে৷ কুড়িজন কেন, চল্লিশজন এলেও তুমি আমাকে হারাতে পারবে না!’ জেনসন গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল, ‘—এখন শুধু স্যান্ডউইচ, ডিম আর ফ্রুট পাই শেষ হতে বাকি৷ দেখ, ওগুলোর যদি কোন ব্যবস্থা করতে পার—’ জেনসন খাবার ঘরে ফিরে চলল৷

এবার ট্রাকের ভিড় বাড়তে শুরু করল৷

এইভাবে ঘণ্টাদুয়েক চলার পর রাত প্রায় দশটার সময়ে তা-ও কমে এল৷ একনাগাড়ে আধঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন কোন গাড়ির হেডলাইট চোখে পড়ল না, তখন ফিরে চললাম খাবার ঘরে৷

গিয়ে দেখি, দুজন ট্রাক-চালক কাউন্টারের সামনে টুলে বসে৷ তাদের সামনের প্লেটে ফ্রুট পাই৷ আর জেনসন এঁটো প্লেটগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে একপাশে সাজিয়ে রাখছে৷ লোলাকে কোথাও দেখলাম না কিন্তু রান্নাঘরের ভিতর থেকে বাসনপত্র নাড়াচাড়ার শব্দ কানে আসছে—অর্থাৎ লোলার৷

‘মি. জেনসন, আমাকে দিন, আমিই এগুলো ধুয়ে রাখছি৷’ জেনসনের হাতের প্লেটগুলো দেখালাম৷

‘না, না—ঠিক আছে৷ ও আমরা করে দিতে পারব৷ তুমি আর দেরি করো না,—যাও, শুয়ে পড় গিয়ে৷—আজ রাতে আমার পালা, কাল থেকে তোমাকে রাত্তিরে কাজ করতে হবে৷ যাও, চটপট শুয়ে পড়—’

দরজার দিকে এগিয়ে চললাম৷ চৌকাঠ পেরোতেই জেনসন পিছু ডাকল, ‘জ্যাক!’ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম, ‘তোমার কাজে আমি যেমন সন্তুষ্ট, আশা করি তুমিও একাজে অসন্তুষ্ট নও?’

‘আপনি যে আমার কাজে খুশি হয়েছে, তাতেই আমি খুশি৷’ রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে চললাম ঘরের দিকে৷

জামাকাপড় ছেড়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম৷ ক্লান্তিতে শরীর যেন ভেঙে পড়ছে৷ কিন্তু চোখে ঘুম নেই৷ অজস্র চিন্তায় মন ভারাক্রান্ত৷ থেকে থেকেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে লোলার ছবি—ও যেন হেঁটে চলেছে রান্নাঘরের দিকে, পরনে সেই সাদা গাউন৷

লোলা পরস্ত্রী৷ ওর কথা এভাবে ভাবা আমার উচিত নয়, কিন্তু তবুও ওর চিন্তা মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল৷

ঘরের জানালার ঠিক পাশেই আমার শোবার খাট৷ অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে-থাকা বাংলোটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ নির্নিমেষে চেয়ে রইলাম বাংলোর দিকে—ঘুম কিছুতেই আসছে না৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক এভাবে শুয়ে থাকার পর, একসময় বাংলোর একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠল৷ জানালার নীল পর্দা সরানো থাকায় আলোকিত ঘরটা পরিষ্কার চোখে পড়ছে—ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোলা৷ ওর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট৷ তার ধোঁয়ায় ওর মুখটা ঝাপসা দেখাচ্ছে৷ একটু পরেই শ্লথ পায়ে ড্রেসিং-টেবিলের কাছে গিয়ে, ও সিগারেটটা একটা ছাইদানে গুঁজে দিল৷ আয়নার মুখোমুখি বসে বাঁ হাতে খুলে ফেলল চুলের কাঁটা৷ একরাশ চুল বাঁধ-ভাঙা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল কোমরের কাছে৷

উঠে বসলাম, দেখতে লাগলাম লোলাকে৷ অনুভব করলাম হৃদয়-তোলপাড়-করা উত্তেজনা৷

একটা চিরুনি নিয়ে লোলা চুল আঁচড়াতে লাগল৷ প্রায় মিনিট পাঁচেক পর ও চেয়ার ছেড়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এল, উপরের ঢাকনাটা তুলে সরিয়ে রাখল এক পাশে৷ তারপর জানালার কাছে এসে, ও গাউনের বোতাম খুলতে শুরু করল—সাদা গাউনটা খসে পড়ল মেঝেতে—ও হাত বাড়িয়ে জানলা বন্ধ করে দিল৷ ঘষা কাচের পাল্লায় ভাসতে লাগল ওর নগ্ন শরীরের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি৷

অন্ধকারে কতক্ষণ ওভাবে বসেছিলাম জানি না৷ এক সময় খেয়াল হল বাংলোর আলো নিভে গেছে—কানে এল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ৷ চোখ ফিরিয়ে দেখি, একটা ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে সামনের রাস্তায়—আর বাংলোর দরজা খুলে জেনসন ওটার দিকে এগিয়ে আসছে৷

অপেক্ষা না করে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু সে-রাতে আর ঘুম এল না৷

পাঁচ

পরদিন সকালে যখন খাবার ঘরে এলাম, তখন সাতটা বাজে৷ দেখি, লোলা এক টুকরো কাপড় দিয়ে কাউন্টারের ওপরটা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে৷ ওর পরনে খুব খাটো একটা লাল প্যান্ট, গায়ে হলদে চোলি৷ এই পোশাক লোলাকে যেন আরও দশগুণ বেশি আকর্ষণীয়া করে তুলছে৷ আমার চোখ খেলে বেড়াতে লাগল ওর দেহের উপর৷ এই স্বল্প পোশাকের বিরুদ্ধে যেন বিদ্রোহ করছে ওর উদ্ধত যৌবন! মনে মনে জেনসনকে হিংসা করলাম৷ ওফ্-যে-কোন মুহূর্তে তার সঙ্গে জায়গা বদল করতে আমি রাজি!

লোলা প্রথমে আমাকে দেখতে পায়নি৷ হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে চোখ তুলে তাকাল—মুখে বিরক্তির ভাব৷ তারপর আবার কাজে মন দিল৷

‘সুপ্রভাত, মিসেস জেনসন—দিন, আমিই ওটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি৷’

ঘৃণাভরা চোখে আমাকে দেখল লোলা, ‘প্রয়োজন হলে তোমাকে বলা হবে৷’

কাউন্টারের উপর ঝুঁকে পড়ে ও সামনের দিকটা ঘষতে লাগল৷ ঝুঁকে পড়ায় চোখের পড়ল ওর সুগঠিত দুই স্তন—অন্তর্বাসের অনুপস্থিতি৷

হঠাৎ কি মনে হতে লোলা মুখ তুলে তাকাল, বুঝতে পারল আমার মনোযোগের কারণ, ‘হাঁ করে কী দেখছ?’

‘কই, কিছু না তো?’ চটপট কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম৷

রান্নাঘরের টেবিলের কাছে জেনসন বসেছিল৷ টেবিলের উপর স্তূপীকৃত নোট আর খুচরো পয়সা৷ একপাশে একটা খালি প্লেট, ছুরি, কাঁটা-চামচ, আর এক কাপ কফি৷ আমাকে দেখে সে হাসল, ‘এস, জ্যাক, ভেতরে এস৷ কী খাবে বলো? স্যান্ডউইচ, ডিম?’

‘না, মি. জেনসন, শুধু এক কাপ কফি৷’ স্টোভে বসানো কফির কেটলির দিকে এগিয়ে গেলাম৷

‘এদিকের সব কাজ সারা হয়ে গেলে, আমি আর লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে যাব, কিছু জিনিসপত্র কেনার আছে৷ গতকাল যা বিক্রি হয়েছে, গত ক-বছরের কোন দিন ওর অর্ধেকও বিক্রি হয়নি৷ জ্যাক, ঠিক করেছি এবার থেকে রেস্তোরাঁর বিক্রির ওপর তোমাকে পাঁচ পার্সেন্ট কমিশন দেব, খুশি তো?’

‘ধন্যবাদ, মি জেনসন৷’ কফির কাপ নামিয়ে রাখলাম৷

‘ওয়েণ্টওয়ার্থ থেকে ফেরার সময় একটা অ্যাপ্রণ নিয়ে আসব— তোমার কাজ করার সুবিধে হবে৷ আর-কিছু লাগবে’

‘কিছু জামাকাপড়ের প্রয়োজন ছিল—থাকগে, ও আমি নিজে গিয়েই কিনে আনব৷’

‘সেই ভালো৷ কাল গাড়ি নিয়ে যেও তোমার পছন্দমতন কিনে এনো৷ এই নাও—এই একশ ডলার রাখ৷ রেস্তোরাঁর কমিশন হিসেবে আগাম দিলাম৷ এতে হবে তো?’ পাঁচটা বিশ ডলারের নোট সে আমার দিকে এগিয়ে দিল৷

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—খুব হবে৷ আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব—’ হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিলাম৷

‘আরে ধন্যবাদের কি আছে? এ তো তোমারই পাওনা টাকা থেকে দিলাম!—তাহলে কালই তুমি ওয়েন্টওয়ার্থে যাচ্ছ?’

‘হ্যাঁ৷’

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল জেনসন, ‘জ্যাক, কাল যে পুরোনো ইঞ্জিনটা দেখলে, ওটা ওজন-দরেই কিনে এনেছি, কিন্তু ভাবছি ইঞ্জিনটার পেছনে একটু খাটলে, হয়তো ওটাকে চালু করা যাবে৷ তুমি কি বল?’

‘আমি একটু পরেই যাচ্ছি—ওটাকে নেড়েচেড়ে দেখব’খন৷’

‘কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যে আমি আর লোলা বেরিয়ে পড়ছি, তুমি একা কি পারবে?’

‘কেন পারব না?’

কফির কাপটা ধুয়ে রাখলাম৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে খাবার ঘরে গেলাম৷

লোলা পিছন ফিরে ফ্রুট পাই-এর জারে লেবেল লাগিয়ে রাখছিল—যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম৷ শরীরের রক্ত-চলাচল দ্রুত হয়ে উঠল৷ যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, গত রাতে জানালায় দাঁড়িয়ে-থাকা লোলাকে৷

ও হয়তো আমার উপস্থিতি টের পেয়েছিল৷ কারণ লেবেল লাগাতে লাগাতে ওর হাত থমকে গেল,—কিন্তু ঘুরে তাকাল না৷ আর অপেক্ষা না করে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷

সকালে হালকা রোদে বেশ ভালোই লাগছে৷ রাতের ঠান্ডা আমেজটা যেন যাই-যাই করেও যায়নি৷ একটা ঝাঁটা নিয়ে পাম্পের কাছটা ঝাঁট দিতে শুরু করলাম৷

একটু পরেই দুটো ট্রাক এসে দাঁড়াল তেল নেবার জন্য৷ তেল দেওয়া হয়ে গেলে ট্রাক-চালকদের ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে অনুরোধ করলাম, কিন্তু তাড়া থাকায় ওরা রাজি হল না৷

ঝাঁট দেওয়া শেষ করে গুমটিঘরে গেলাম—সেখানে ইঞ্জিনটা নিয়ে পড়লাম৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে জেনসন আমার পাশে এসে দাঁড়াল, ‘আমরা বেরোচ্ছি, জ্যাক৷ তোমার কোন অসুবিধে হবে না তো?’

‘না, না আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি ঠিক পারব৷’

জেনসন ওর পেশীবহুল হাত আমার কাঁধে রাখল, ‘আগে মরচেটা তুলে ফেলার ব্যবস্থা কর, তারপর বাকিটা আমি দেখব৷ আচ্ছা জ্যাক—তাহলে চলি৷’

জেনসনের পিছন পিছন গুমটিঘরের দরজা পর্যন্ত এলাম৷ দেখি, বাংলো থেকে লোলা বেরিয়ে আসছে৷ পরনে একটা সবুজ রঙের আঁটসাঁট সুতী পোশাক৷

জেনসন আমার কোমরে এক খোঁচা মারল, ‘কি হে, একেবারে বোবা হয়ে গেলে যে! দেখেছ, কিরকম সেজেছে আমার বউ?’

বোকার মতো হাসলাম, ‘আপনার স্ত্রী সত্যিই সুন্দরী, মি. জেনসন৷’

‘সবাই তো তাই বলে’ জেনসনের মুখে গর্বের হাসি, ‘যাক্‌ গে, চলি—আবার দুপুরে দেখা হবে৷’

ওদের গাড়ি একরাশ ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল৷

একটা সিগারেট ধরিয়ে চারপাশে তাকালাম—খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্নকে’৷ সত্যিই, এরকম একটা জায়গা যদি আমার থাকত! আর থাকত লোলার মতো সুন্দরী স্ত্রী!

নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল৷ আবার ইঞ্জিনটার কাছে ফিরে গেলাম৷—কি হবে এসব ভেবে? কিন্তু নাঃ, লোলার চিন্তাকে মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব৷ গত রাতের কথা বারে বারেই মনে পড়ছে—কিছুতেই স্থিরভাবে কাজ করতে পারছি না৷

এইভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে গেল৷ এক সময় দেখি, একটা লড়ঝড়ে শেভ্রলে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গুমটিঘরের দরজায়৷ আরোহী গাড়ি থেকে নামল৷ বয়স বছর চল্লিশেক হবে৷ লম্বা, রোগা চেহারা৷ পরনে রঙ-ওঠা একটা নীল প্যান্ট, ময়লা কালো জামা৷ গলায় বাঁধা একটা লাল রুমাল৷ মাথার বাদামী রঙের টুপি—রোদে তার রঙ জ্বলে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে৷

আগন্তুক গুমটিঘরে এসে ঢুকল৷ কাছ থেকে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখলাম—রোদে-পোড়া চেহারা, হনু বের করা মুখ, চোখ নাক, পাতলা ঠোঁট৷ ঘন ভুরুজোড়ার নিচে স্থির অন্তর্ভেদী চোখ৷

তাকে দেখেই কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করলাম৷ মনে হল, লোকটার চেহারার কেমন একটা পুলিশি ভাব৷ বিশেষ করে, ওই অন্তর্ভেদী, সন্দেহে ভরা শিকারী চোখজোড়ায়৷

আমরা পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলাম৷ শেষে আমিই চোখ সরিয়ে নিলাম, ইঞ্জিনটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘কী চাই?’ তার চোখে সেই একই চাউনি—যেন আমার ভিতরটা তন্নতন্ন করে দেখছে৷

লোকটা আয়েশ করে দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, ওর পায়ের কাছে, চুপটি করে লেজ গুটিয়ে বসে আছে একটা হলদে কুকুর, রোগা হাড়জিরজিরে চেহারা, লাল চোখ দুটোয় বিষাদভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে৷ গলায় বকলসও রয়েছে একটা৷

প্যান্টের পকেটে দু-হাত ঢুকিয়ে ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকাল লোকটা, ‘চাই তো অনেক কিছুই! যেমন ধর, জানতে চাই তোমার পরিচয় এখানে তুমি কী করছ,—হয়ত জানতে চাই—মি. জেনসন এখন কোথায় আছেন৷—হয়ত তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই, ‘নিজের চরকায় তেল দিন’ উপদেশটা, কী বল?’ শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল লোকটা৷

রাগে আমার আপাদমস্তক জ্বলে গেল৷ কিন্তু না,—লোকটা কে, সেকথা না জেনে কিছু বলে বসা ঠিক হবে না৷ ঠান্ডা স্বরেই জবাব দিলাম, ‘মি. জেনসন ও মিসেস জেনসন ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন৷ আর আমি জ্যাক প্যাটামোর, এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছি৷’

‘তাই নাকি!’ দরজা ছেড়ে সে দু-পা এগিয়ে এল৷ ‘তার মানে কার্ল তোমাকে চাকরি দিয়েছে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘হুঁ—ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! আমি তো ভাবতেই পারিনি ওর বউয়ের অমতে কার্ল এখানে লোক রাখবে৷’ কথা বলার সময় তার সন্দেহভরা চোখ আমার ময়লা পোশাক, ছেঁড়া জুতো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, এমন সময় আপমনমনেই মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—ভারি আশ্চর্য!’ চোয়ালে হাত বুলিয়ে কি যেন ভাবল, তারপর বলল, ‘আমি কার্লের শ্যালক৷ আমার নাম রিক্স—জর্জ রিক্স৷’

অনুমানে মনে হল, এ নিশ্চয়ই জেনসনের মৃতা স্ত্রীর ভাই, লোলার কেউ নয়৷ সুতরাং বাজে কথায় সময় নষ্ট করে লাভ নেই ভেবে ইঞ্জিনটার দিকে মনোযোগ দিলাম৷

‘কার্লের সঙ্গে ওর বউও ওয়েন্টওয়ের্থে গেছে?’ পিছন থেকে রিক্সের স্বর ভেসে এল৷

‘হ্যাঁ৷’ মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিলাম৷

‘তার মানে তুমি এখানে একা?’

‘ঠিক ধরেছেন৷’

শ্লেষটা রিক্স বুঝতে পারল কিনা জানি না, হঠাৎ ঘাড়ের উপর তার উত্তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করলাম৷ গিয়ার-বক্সের উপর থমকে দাঁড়াল আমার কর্মব্যস্ত হাত৷

‘এসবে পুরোনো মাল কেনা-বেচার ব্যাপারে কার্লের বুদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষ চিনতে ওর সময় লাগে—সেরকম বুদ্ধি ওর নেই?’

ইঞ্জিনটার উপর ঝুঁকে থাকায় সে আমার মুখের পরিবর্তন দেখতে পেল না৷ কারণ, রিক্স কি করে জানবে, সবসময় আমি শুধু লোলার কথাই ভাবছি!

‘ভালোই—’ স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে ক্লাচ-প্লেট খুলতে শুরু করলাম৷

‘ভালো? তোমার তাই মনে হয়? কিন্তু জেনে রেখো চাঁদ, লোলা তোমাকে পছন্দ তো করেই না, এখানেই কেউ কাজ করুক তা-ও সে চায় না—আমাকেই বলে তাড়াতে পারলে বাঁচে! হু—ওরমক একটা উটকো মেয়েকে কার্ল যে হুট করে বিয়ে করে বসবে তা ভাবতেই পারিনি৷ কিন্তু লোলা সেয়ানা মেয়ে৷ কার্লের মতো পয়সাওয়ালা লোককে ও হাতছাড়া করতে চায়নি৷ তাই ওর সামনে যৌবনের মায়াজাল বিছিয়ে টোপ ফেলেছে৷ আর কার্লটাও তেমনি বুড়ো গর্দভ, সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে করে বসল,—কিন্তু, তুমি সাবধানে থেকো বৎস, মনে রেখো, তোমাকে বেশিদিন এখানে থাকতে হচ্ছে না৷ কার্লকে যেমন করে হোক রাজি করিয়ে, ও তোমাকে তাড়াবেই—কেন জান?’

যেন খুব অবাক হয়ে গেছি, এরকম একটা ভাব করে, বোকা-বোকা চোখে বেশ কিছুক্ষণ রিক্সের দিকে চেয়ে রইলাম, ‘আপনি কী বলছেন! কিছুই তো বুঝতে পারছি না!— আমি এখানে শুধু চাকরিতে ঢুকেছি৷’

রিক্স দাঁত বের করে হাসল, পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে আবার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘হ্যাঁ, তুমি এখানে চাকরিতে ঢুকেছ ঠিক কথা, কিন্তু কেউ কার্লের টাকায় ভাগ বসাক, তা লোলা চাইবে না৷ সমস্ত টাকা ও একাই নিতে চায়৷—আমি জানি৷ আমার চোখকে ও ধোঁকা দিতে পারবে না৷ শুধু টাকার জন্যই ও কার্লকে বিয়ে করেছে৷ লোলাকে চিনতে তোমার এখনও অনেক বাকী আছে৷’

‘তাছাড়া, তুমি হয়ত জানা না, কার্ল অত্যন্ত মিতব্যয়ী৷ বছরের পর বছর ও শুধু টাকা জমিয়ে গেছে৷ বিনা প্রয়োজনে একটা পয়সাও খরচা করেনি৷ তাই বলে ভেব না ও কঞ্জুস৷ কারুর উপকার করার সুযোগ পেলে, কার্ল টাকা ছড়াতে কখনোই দ্বিধা করবে না, আর লোলা সেটা ভালোভাবেই জানে৷ তাই সবসময়—তুমি জান, লোলা এখানে আসার আগে কার্ল আমাকে কত খাতির করত৷ এমনকি ডেকে খাওয়াত পর্যন্ত! কিন্তু আজ? —হুঁ আমি এলেই শ্রীমতী লোলা বিরক্ত হন৷ আর, কার্ল যদি ওর অমতে আমাকে খেতে দেয়—তবে কি হয় জান? রাত্রিবেলা শোবার ঘরের দরজা লোলা বন্ধ করে দেয়৷’ রিক্স হাত দিয়ে চাবি ঘোরানোর একটা ভঙ্গি করল, ‘কার্লটাও তেমনি ভোঁদাই, বউয়ের সঙ্গে এক খাটে জড়াজড়ি করে না শুলে ওর না ঘুমই আসে না! এবার বুঝেছ, প্যাঁচটা কোথায়? লোলার অমতে কোন কাজ করলেই শোর ঘরের দরজায় তালা, ব্যস!’ আবার শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল রিক্স, ‘তবে তুমিও এখানে আর বেশিদিন নেই৷ লোলা হয়ত ভাবছে, ওর মতো তুমিও কার্লের টাকা হাতানোর ধান্দায় আছ৷’

কোন জবাব না দিয়ে কাজ করে চললাম৷ ক্লাচ-প্লেটগুলো পেট্রলে ভিজিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম৷ যন্ত্রপাতির তাক থেকে একটা কাপড় নিয়ে হাতের কালি মুছতে লাগলাম৷

রিক্স তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ্য করছিল, কিন্তু আমার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে যেন একটু অস্বস্তি বোধ করল৷

‘আচ্ছা—শুধু শুধু আর তোমার সময় নষ্ট করব না,’ দরজা ছেড়ে রিক্স এগিয়ে এল, ‘বাড়িতে একটা কাজের জন্য আমার কয়েকটা যন্ত্রপাতি দরকার৷ অন্য সময় কার্লের থেকেই নিয়ে যাই—কিন্তু সে তো এখন নেই, কি আর করা—,’ বলতে বলতে সে যন্ত্রপাতির তাকের কাছে এগিয়ে গেল, ‘দেখি, কোনটা লাগবে—৷’ হাত বাড়িয়ে রিক্স দুটো স্ক্রু-ড্রাইভার আর একটা হাতুড়ি তুলে নিল, তারপর হাত বাড়াল একটা ড্রিল-এর দিকে৷

‘মি. রিক্স, ওগুলো আপনাকে দিতে পারছি না বলে দুঃখিত৷’

থমকে দাঁড়াল রিক্স, ভাবলেশহীন মুখে ফিরে তাকাল, ‘তার মানে?’

‘মি. জেনসন তো এখানে নেই, তাঁর অনুমতি ছাড়া যন্ত্রপাতি দেওয়াটা ঠিক হবে না৷ আপনি অপেক্ষা করুন, তিনি ফিরে এলে তাঁকে বলে নিয়ে যাবেন৷’

রিক্স আমার কথায় কর্ণপাত না করে ড্রিলটা তুলে নিল৷ আবার হাত বাড়াল একটা করাতের দিকে, ‘ওর জন্য ভেব না, দোস্ত৷ আমি কার্লের আত্মীয়৷ হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ অচেনা কাউকে যন্ত্রপাতি দেওয়াটা ঠিক নয়—কিন্তু আমার কথা সম্পূর্ণ আলাদা৷ আমি এগুলো নিলে কার্ল কিচ্ছু মনে করবে না৷’

আমার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল৷ রাগে, বিরক্তিতে রিক্সের দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আমি দুঃখিত, মি. রিক্স! মি. জেনসনের অনুমতি ছাড়া আমি কোন জিনিস কাউকে দিতে পারি না৷

দপ করে জ্বলে উঠল রিক্সের শিকারী চোখজোড়া, ‘শোন দোস্ত, তুমি এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছ সেটা কি খোয়াতে চাও? আমি যদি কার্লকে বলি—’

‘দয়া করে তাই বলুন গিয়ে! মি. জেনসন না বললে একটা যন্ত্রপতিও আপনি নিয়ে যেতে পারবেন না—আমি নিরুপায়৷ আর আপনার যদি সেরকম দরকার থাকে, তবে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, মি. জেনসন এসে পড়বেন৷’

‘ও—এই ব্যাপার!’ রিক্সের সারা মুখ ঘেমে উঠেছে, মুখটা যেন হয়ে উঠেছে আরও কুংসিত৷ আর কুকুরটা ভয় পেয়ে গাড়ির দিকে ছুটল, ‘তাহলে তুমিও লোলার সঙ্গে ভিড়েছ, অ্যাঁ? কার্লের টাকার লোভ তোমার আছে বলে তো মনে হচ্ছে না! তাহলে কি লোলার সঙ্গে খাটবাজি করছ?’

মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল৷ খামচে ধরলাম রিক্সের জামার কলার৷ দুবার ঝাঁকানি দিয়ে এক ঝটকায় দরজার দিকে ছিটকে ফেলে দিলাম, ‘বেরো শালা এখান থেকে! বেরো—’

রিক্সের হাত থেকে যন্ত্রপাতিগুলো ছিটকে পড়ল৷ গলায় হাত বোলাতে বোলাতে সে উঠে দাঁড়াল৷ মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, চোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি, ‘ঠিক আছে!—দাঁড়া শালা, কার্লকে তোর ব্যবস্থা করছি—’

কিন্তু আমি তেড়ে যেতেই, ও ছুট লাগাল গাড়ির দিকে৷ কুকুরটা তখন লেজ গুটিয়ে গাড়িতে বসে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে৷ রিক্স মুহূর্তমাত্র দেরি না করে গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷ একরাশ ধুলোর মেঘে ওর গাড়িটা ঢাকা পড়ে গেল৷

একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ এ-ব্যাপারটা জেনসনের কানে গেলে কি হবে কে জানে! তবে ভরসা এই, রিক্সের নালিশ শোনার আগেই, আমি আমার সাফাই গাইতে পারব৷

দুপুরের দিকে মালপত্তর কিনে জেনসন ফিরে এল৷ গাড়ি থেকে মাল নামাতে নামাতে তাকে রিক্সের ব্যাপারটা বললাম৷ কিন্তু লোলার সম্বন্ধে যে-কথাগুলো শুনেছি, সেগুলো চেপে গেলাম, ‘—তার সঙ্গে শেষে একটু খারাপ ব্যবহার করতে হয়েছে, মি. জেনসন৷ মি. রিক্স কিছুতেই আমার কথা না শোনায় তাকে আমি তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি৷’

জেনসন সশব্দে হেসে উঠল, ‘ঠিক করেছ৷ জর্জ ব্যাটা এক নম্বরের বদমাশ৷ আগে যতবারই জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, একবারও ফেরত দেয়নি৷ এখন লোলা আসাতে ব্যাটা ঢিট হয়েছে, এদিক আর মাড়ায় না৷ বহুদিন ওর দেখা পাইনি—কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ও আবার আসবে৷—তবে তোমাকে বলে রাখছি জ্যাক, আমি না থাকলে ওকে একটা জিনিসও দেবে না৷’

নিশ্চিন্ত হলাম৷ জেনসন যে আমার উপর রাগ করেনি তাতেই আমি খুশি৷ কিন্তু মনে হল রিক্সকে রাগিয়ে আমি বোধহয় ভালো করিনি—৷ এবার থেকে ওর উপর নজর রাখতে হবে৷ বলা যায় না, কোনদিন হয়তো আমার অজান্তেই ও আমার বিপদ ডেকে আনবে!

পুব আকাশে দেখা দিয়েছে ভোরের সূর্য৷ একটা হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে রয়েছে মরভূমির আবহাওয়ায়৷ তারই আস্তরণ ভেদ করে চোখে পড়ছে ভোরের বিবর্ণ, রক্তিম আভা৷ দূরের ধূসর পাহাড়ের ছায়া যেন পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে মরুভূমির বালির উপর৷ দুপুরের রৌদ্রকরোজ্জ্বল চোখধাঁধানো বালির সমুদ্র এখন আবিরে রাঙানো, স্নিগ্ধ৷

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম গত তিন সপ্তাহের কথা—জেনসনের কথা—লোলার কথা৷ এ তিন-সপ্তাহ এখানে কাটানোর পর ফার্নওয়ার্থকে মনে হয় এক মিথ্যে দুঃস্বপ্ন৷ জীবনের সেই অধ্যায়টা যেন কেউ সযত্নে মুছে ফেলেছে স্মৃতির পৃষ্ঠা থেকে৷ হয়ত ওরাও ভুলে গেছে শেট কারসন নামে কয়েদীর কথা৷ কে জানে?

লোলা আমাকে এখনও সহজভাবে নিতে পারেনি৷ খুব প্রায়াজন ছাড়া কথা বলে না৷ কিন্তু ওর প্রভাবকে আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি—পারব কিনা জানি না৷

জেনসনকে যতই দেখছি, ততই ভালো লাগছে৷ এত চমৎকার, সরল মানুষ আমি জীবনে আর দেখিনি৷ শ্রদ্ধায় মন ভরে গেছে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুজনে কাজ করেছি, আর শুনেছি তার জীবনের কাহিনী৷

একথা ঠিক, লোলাকে জেনসন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে৷ কিন্তু আড্ডা দেওয়া, তাস খেলা ইত্যাদির জন্য কোন পুরুষ সঙ্গী ওর প্রয়োজন ছিল৷ তাই আমাকে নিয়ে একেবারে মেতে উঠেছে৷

নাঃ, এরকম লোকের প্রতি অকৃতজ্ঞ হতে পারব না—মরে গেলেও না৷

জেনসনের মুখ থেকেই শুনেছি, কিভাবে আয়কর ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর সঞ্চয় করে, সে এক লাখ ডলার জমিয়েছে৷ এ টাকাটার একটা মোটা অংশ যে পুরোনো লোহালক্কড় থেকে এসেছে, তা জেনসন নিজেই বলেছে৷ ওর একমাত্র ইচ্ছে, আরও কিছু জমিয়ে, বছর দুয়েক পর এসব ছেড়েছুড়ে, লোলাকে নিয়ে পৃথিবীভ্রমণে বেরিয়ে পড়বে৷ রাজার হালে থাকবে, খাবে৷ তারপর বেড়ানো হয়ে গেলে, ফিরে এসে কিছু মূলধন নিয়ে আবার একটা ব্যবসা ফাঁদবে৷

একদিন মুখ ফসকে বলেই ফেলেছি, ‘মিসেস জেনসন কি একথা জানেন?’

‘কত টাকা জমিয়েছি তা জানে, কিন্তু তা দিয়ে কি করব, সেটা এখনও বলিনি৷ শেষ সময়ে বলে একেবারে চমকে দেব৷’ জেনসন আত্মতৃপ্তির হাসি হেসেছে৷ কিন্তু একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছি মনে পড়েছে রিক্সের কথাগুলো—লোলা টাকার জন্যেই জেনসনকে বিয়ে করেছে!

বিছানা ছেড়ে উঠতেই নজর পড়ল রেস্তোরাঁর বারান্দার দিকে৷ লোলা একটা চেয়ারে বসে ছুরি দিয়ে তরকারি কুটছে৷ এমন সময় দৈনন্দিন জিনিসপত্র নিয়ে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল৷ রোজ সকাল ছ-টায় এই ট্রাকটা এসে রান্নার জিনিসপত্র দিয়ে যায়৷ ট্রাক-চালক জিনিসপত্র-ভর্তি বাক্সটা নিয়ে রেস্তোরাঁর দিকে চলল৷ লোলাও অনুসরণ করল তাকে৷

আজ আমার মাইনের দিন৷

বাথরুমে স্নান করতে করতে ভাবছিলাম, কোথায় ফার্নওয়ার্থ আর কোথায় জেনসনের আন্তরিকতা—নেহাত ভাগ্য আর বুদ্ধির জোরে আজ এই সুখের স্বর্গে পা রাখতে পেরেছি৷ এবং এই ভাবেই বাকি জীবনটা আমি কাটিয়ে দিতে চাই৷

প্রাতরাশ সেরে গুমটিঘরে গেলাম৷ আগের দিন জেনসন একটা পুরোনো মোটর কিনে এনেছিল, সেটা সারাতে বসলাম৷ কিছুক্ষণ বাদেই জেনসন এসে উপস্থিত হল, হাতের মুঠোয় একগোছা নোট, ‘জ্যাক, নাও—ধর৷ এখানে আড়াই-শ ডলার আছে—মাইনের চল্লিশ, রেস্তোরাঁর কমিশন এক-শ দশ, আর সেই খাজা ইঞ্জিনটার জন্য এক-শ৷ —জান, সেই ইঞ্জিনটা আমি দু-শ ডলারে বেচেছি?’

‘কিন্তু—মি. জেনসন—এত টাকা—’

‘শোন ছেলের কথা! আরে, তোমার জন্যই তো আজ আমার ব্যবসা এত ফুলে ফেঁপে উঠেছে! তুমি আসার পর থেকেই লাভের অঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে গেছে—নাও, নাও, যা দিচ্ছি ধর, আর তর্ক করো না!’

‘আপনি যখন বলছেন—’ হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিলাম, ‘কিন্তু—’

‘আবার কিন্তু কি?’

‘না—বলছিলাম, এগুলো নিয়ে আমার কাছে মোট পাঁচ-শ দশ ডলার হল, কিন্তু টাকাগুলো খরচ করার তো কোন রাস্তা দেখছি না৷ বরং, যদি আপনার ব্যাঙ্কের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন, তাহলে টাকাগুলো ওখানেই রাখতে পারি—৷’

‘ব্যাঙ্ক? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—’ জেনসনের হাসির দমক আর থামতেই চায় না—, ‘ব্যাঙ্কে কখনও কেউ টাকা রাখে? পাগল নাকি! কখন কোন ব্যাঙ্ক লালবাতি জ্বালবে কেউ বলতে পারে? আমি আমার সমস্ত টাকা একটা সিন্দুকে রাখি৷ বুঝলে হে, একেবারে হাতের কাছে—যখন ইচ্ছে খরচ করতে পারব৷ তাছাড়া আমার ভালোমন্দ কিছু একটা হলে, লোলা সহজেই টাকাটা পেয়ে যাবে৷ সইসাবুদের কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না৷ তুমি ইচ্ছে করলে তোমারটাও আমার কাছে জমা রাখতে পার, জ্যাক৷ যখন খুশি চেয়ে নেবে৷ এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কি আছে, বল? হয়ত সুদের লোভে ব্যাঙ্কে রাখতে গেলে, আর ব্যাঙ্কও লালবাতি জ্বালাল—ব্যস—পুরো টাকাটাই জলে!’

হাতের কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ালাম, নির্বাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম জেনসনের দিকে৷

‘তার মানে—ওই লাখ ডলার আপনি একটা সিন্দুকে রেখেছেন?’

‘হ্যাঁ, তাতে হয়েছে কি?—হুঁ হুঁ বাবা, যে-সে সিন্দুক নয়, রীতিমতো লরেন্স কোম্পানির সিন্দুক—বাজারের সেরা!’ জেনসনের মুখে গর্বের হাসি আর ধরে না, তুমি তো সিন্দুকের কাজে ছিলে, তুমিই বল—ওর চেয়ে ভালো সিন্দুক আর আছে?’

ভালোই বটে! খুলতে দু-মিনিটের বেশি লাগবে না—ভালো নয়?

কিন্তু জেনসনকে তো আর সেকথা বলা যায় না৷ তাই ওর কথায় সায় দিলাম, ‘সত্যিই, ওর চেয়ে ভালো সিন্দুক বাজারে আর নেই৷’

আনন্দে সে আমার পিঠে এক চাপড় কষিয়ে দিল, ‘যাও, টাকাগুলো নিয়ে এস৷ সিন্দুকে জমা করে একটা রসিদ দিয়ে দিই৷ দরকার পড়লেই চাইবে, লজ্জা করবে না—সঙ্গে-সঙ্গে পেয়ে যাবে৷’

আমি আর কিছু না বলে তোশকের তলা থেকে সব টাকা বের করে এনে জেনসনের হাতে তুলে দিলাম৷ সে আমাকে পাঁচ-শ দশ ডলারের একটা রসিদ দিল৷ রসিদটাও এক পলক দেখে নিয়ে পকেটে ভরলাম৷

টাকাগুলো পকেটে রেখে জেনসন ঘড়ি দেখল, ‘বেলা হয়ে এল৷ একটু পরেই বাস এসে পড়বে৷ প্রায় ৩০-৩৫ জনের খাওয়ার যোগাড় করতে হবে৷ জ্যাক, তুমি বরং রান্নাঘরে গিয়ে লোলাকে সাহায্য কর টাকাটা রেখে এসে আমি এদিকটা সামলাচ্ছি৷ যাও, এখন থেকেই লেগে পড়, পরে আর থৈ পাবে না৷’

সম্মতি জানিয়ে রেস্তোরাঁর দিকে পা বাড়ালাম৷

লোলা ফ্রুট পাইগুলো জারে জারে সাজিয়ে রাখছিল, আমি ঘরে ঢুকতেই পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাল৷ ওর সবুজ চোখে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছে৷ সারা মুখে খেলা করছে একটা চাপা কৌতুক৷

‘কোন কাজ আছে নাকি, মিসেস জেনসন?’

হাসল লোলা৷ সঙ্গে সঙ্গে আমার বুক ধড়াস করে উঠল! কী ব্যাপার? আজ পর্যন্ত একদিনও আমাকে দেখে হাসেনি৷ তাহলে আজ কেন—

‘অনেক-ক কাজ আছে, ——মি-স-টা-র প্যা-ট-মো-র৷’ লোলার হাসি আরো ক্রূর হয়ে উঠল৷

মুহূর্তে বিপদের লাল সংকেত ভেসে উঠল চোখের সামনে৷ মিস্টার প্যাটমোর? কথা বলার সুরটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে না!

‘রান্নাঘরে যাও৷ সকালে যে জিনিসপত্রের বাক্সটা দিয়ে গেছে, ওটা আমি টেবিলের ওপর তোমার জন্য খুলে রেখে এসেছি৷ গেলেই দেখতে পাবে, স—ব রয়েছে,’ লোলা স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইল, ‘ভেতরের জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখ দিয়ে৷’

রান্নাঘরে গেলাম৷ দেখি, টেবিলের উপর ছড়ানো রয়েছে কতকগুলো খাবারের টিন, পলিথিনে মোড়া দু-ডজন মুরগি, তাছাড়া অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র৷

খাবারের টিনগুলোর উপরে রাখা রয়েছে, একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ—সম্ভবত কোন-কিছু মোড়া ছিল৷ ওটা তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করলাম৷ অর্ধেকটা খুলতেই বুকের ভিতর বিস্ফোরণ ঘটল—চোখের সামনে যেন মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে—

কাগজের প্রথম পাতাতেই বড় বড় হরফের লেখা—

—কুখ্যাত সিন্দুক লুণ্ঠনকারী আজও পলাতক—

তার নিচে আমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস৷ ছাপানো ফটোটার দিকে চোখ পড়তেই অনুভব করলাম মৃত্যুর অশরীরী স্পর্শ৷ এমনিতে ফটোটা অত্যন্ত বাজে ছাপা হয়েছে বলতে গেলে আমাকে চেনা যায় না৷ কিন্তু লোলার তাতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি৷

ফটোটার উপর পেন্সিল দিয়ে ও আমার গোঁফটা নিখুঁতভাবে এঁকে দিয়েছে৷

ফার্নওয়ার্থকে আর মিথ্যে দুঃস্বপ্ন বলে মনে হল না৷ চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বীভৎস অত্যচারের দৃশ্য!

ওকল্যাণ্ডের খবরের কাগজ কি করে ওয়েন্টওয়ার্থের দোকানে গেল, তা বলতে পারি না৷ আর সেটা যেভাবে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ এসেছে, তাকে নিয়তির নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কি বলা যায়!

আমার শান্তি, নিরাপত্তার সুখ-স্বপ্ন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল৷

লোলা কি জেনসনকে একথা বলেছে?

না, এখনও বোধহয় বলেনি৷ বলে থাকলে, জেনসনের কথাবার্তায় তা বুঝতে পারতাম৷ এখন তাহলে লোলার ফোন করার অপেক্ষা৷ ফোন পেয়েই পুলিশভ্যান এসে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে ফার্নওয়ার্থে৷ তারপর?—হয়তো বাকি জীবনটা বিকলাঙ্গ হয়েই কাটাতে হবে—

তাড়াতাড়ি খবরের কাগজটা নিয়ে জ্বলন্ত স্টোভে গুঁজে দিলাম৷ দেখতে দেখতে ওটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল৷

কিন্তু এবার কি করব? পালব?—কিন্তু কেমন করে?

তাছাড়া পালানোর পর লোলা যদি ফোন করে পুলিশকে জানিয়ে দেয়, আমি এখানে ছিলাম, তাহলে প্রথমেই ওরা যে-শহরে আমার খোঁজ করবে, তা হল ট্রপিকা স্প্রিং৷ আর ওকল্যান্ডে ফিরে যাব, সে-সাহসও আমার নেই৷ তাহলে উপায়?

না, তার চেয়ে বরং ট্রপিকা স্প্রিংসেই যাওয়া যাক৷ তারপর সেখান থেকে অন্য কোথাও পালানো যাবে৷ পাঁচ-শ ডলার তো আছেই সে-টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ন্যু-ইয়র্কের প্লেন ধরে—৷ কিন্তু পাঁচ-শ ডলার? মনে হল, কেউ যেন বরফশীতল হাতে আঁকড়ে ধরেছে আমার হৃদপিণ্ড! কোথায় টাকা? সে তো জেনসনের হাতে আধঘণ্টা আগেই তুলে দিয়েছি! আমার এখনই যদি টাকা চাই, তবে কি জেনসন সন্দেহ করবে না?

বিস্ময়-বিভীষিকায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম৷ চিন্তাশক্তি যেন লোপ পেয়ে গেছে৷

এমন সময় রান্নাঘরের দরজা খুলে ভিতরে এসে ঢুকল লোলা৷ ওর চোখের স্থিরদৃষ্টি যেন আমার মনোভাব আন্দাজ করতে চাইছে৷

‘কী হল, এখনও ওগুলো গুছিয়ে রাখনি?’ গলার স্বরে কি ব্যঙ্গের আভাস রয়েছে? নাকি আমার শোনবার ভুল?

‘এই যে, রাখছি৷’

হারামজাদী মাগী! তুই কি এর মধ্যেই পুলিশে ফোন করেছিস নাকি?

লোলা এগিয়ে এসে পলিথিনে মোড়া মুরগিগুলোকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখতে লাগল—গুনগুন করে গাইতে লাগল একটা গানের কলি৷

কাজ শেষ করেই ও হঠাৎ ঘুরে তাকাল, ‘আমাদের দুজনের একটা অলোচনা হওয়া দরকার৷ আজ তো তোমাকে সারারাত কাজ করতে হবে, তাই না?’

‘হ্যাঁ৷’ অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ওকে দেখতে লাগলাম৷

‘রাতে কার্ল ঘুমোলে, আমি আসব৷’

বুঝলাম, ও পুলিশে খবর দেয়নি৷ আমার সঙ্গে আলোচনা করে কোন রফা করতে চায়৷ কিন্তু আমার নিরাপত্তার বিনিময়ে ও কি চাইবে?

‘আপনি যা বলবেন, আমি তাতেই রাজি,’ কেমন যেন ভিক্ষে চাওয়ার মতো শোনাল নিজের কথাগুলো—কিন্তু আমি নিরুপায়৷

‘আপাতত রান্নাঘর থেকে কেটে পড়ুন, মি. শেট কারসন৷ আমি একাই সব সামলাতে পারব৷ আপনার সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই৷’

আমি এখন লোলার মুঠোয়৷ ও যা বলবে, তা করতে আমি বাধ্য, এবং লোলাও সেটা জানে৷ তাই বিনা বাক্যব্যয়ে রান্নাঘর ছেড়ে খাবার ঘরে পা বাড়ালাম৷ যাবার আগে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম ওর হলদে চোলি আর লাল প্যান্টের উপর৷ অবশেষে ওর চোখে চোখ রাখলাম, ‘আপনি যা বলবেন—’

লোলা হাসল—বড় নিষ্ঠুর সে-হাসি, ‘হুঁ—ঠিক বলেছ, কারসন৷ এখন থেকে আমি যা—বলব—’

ভারাক্রান্ত মনে বাইরে এলাম৷ লোলার মনে কি আছে তা কে জানে? ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না!

একটু পরেই বাস এসে পড়ায় আমরা তিনজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ রেস্তোরাঁয় খদ্দেরের ভিড় বাড়তে লাগল—

ঘণ্টাখানেক পর বাস চলে গেলে জেনসন ঘাম মুছতে মুছতে আমার দিকে এগিয়ে এল, ‘জ্যাক, এই এঁটো প্লেটগুলো আমি আর লোলা ধুয়ে রাখতে পারব৷ তুমি বরং বাইরে বসে পাম্পগুলোর দিকে খেয়াল রাখ, খাটুনিটা কম পড়বে৷ তোমাকে তো আবার রাতেও জাগতে হবে৷’

জেনসনের কথামতো বাইরে বারান্দায় এলাম৷ এখানে বসে অন্তত একটু ভাববার সময় পাওয়া যাবে৷ এতক্ষণ পর সেই ভয়টা আবার আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ সম্ভব অসম্ভব নানান চিন্তা এসে ভিড় করল মাথার মধ্যে৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম৷

হঠাৎ কেমন একটা অস্বস্তি হতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম৷ দেখি লোলা রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে৷ লোভে চকচক করছের ওর সবুজ চোখ৷ জেনসনসও এসে দাঁড়িয়েছে লোলার পিছনে, হাতে একগাদা প্লেট, চোখে অপ্রস্তুত দৃষ্টি৷

‘এই অপোগণ্ড লোকটাকে এখানে এনেছ কিজন্য? লোলা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাজের নামে দেখা নেই, খালি বসে বসে গিলবে! আমাকে একাই কি সব কাজ করতে হবে নাকি?’

‘ছিঃ লোলা, জ্যাককে সারারাত—’

‘সারারাত কাজ করতে হবে!’ জেনসনকে ভেংচে উঠল লোলা, ‘তাতে আমার বয়েই গেল৷’ তারপর ও আমার দিকে ফিরল, ‘যাও, হাঁ করে দেখছ কি? প্লেটগুলো ধুয়ে ফেলার ব্যবস্থা কর গিয়ে৷ তোমাকে মাইনে দেওয়া হয় গতর খাটানোর জন্য, হাওয়া খাওয়ার জন্য নয়৷’

‘লোলা!’ চাপা স্বরে ধমকে উঠল জেনসন৷

আমি চেয়ার ছেড়ে রেস্তোরাঁর দিকে এগোলাম, ‘ভুল হয়ে গেছে মিসেস জেনসন, এবারকার মতো মাপ করুন৷’

‘লোলা৷’ জেনসন রাগে ফেটে পড়ল, ‘ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখ৷ আমি জ্যাককে বলেছি এখানে বসতে, পাম্পগুলো দেখতে৷’

‘তাহলে আমার কথার কোন দাম নেই? তাতে কি জন্য আমি এখানে রয়েছি? রান্না করা, আর রাতে তোমার পাশে শোবার জন্য?’ লোলার মুখ চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল৷ কথা শেষ করেই ও ঝড়ের মতো চলে গেল বাংলোর দিকে৷ ভিতরে ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিল সদর দরজা৷

লোলা চলে গেলে হাতের প্লেটগুলো নামিয়ে রেখে জনসন ফিরে এল, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ৷ তার মনের ভাব অনুমান করে সান্তনা দিলাম, ‘ওঁর জন্য ভাববেন না, মি. জেনসন৷ সারাটা দিন খাটাখাটনি করে মাথার আর ঠিক নেই, কালই সব ঠিক হয়ে যাবে৷’

‘তুমি তো বলছ, কিন্তু এর আগে লোলা কোনদিন আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি৷’ চোয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে মাথা নাড়ল জেনসন৷

সবই আমি বুঝেছি৷ কিন্তু কি করে জেনসনকে বলি, এ-ব্যাপারটা পুরোটাই একটা সাজানো নাটক, আজ রাতে আলাদা শোবার ব্যবস্থাটা পাকাপাকি করার জন্যই লোলার এই অভিনয়৷

‘যাকগে,—চলুন, প্লেটগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে রাখা যাক৷’

‘তুমি খুব ভালো লোক, জ্যাক৷’ জেনসনের বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, ‘অন্য কেউ হলে এই মুহূর্তে এ-চাকরি ছেড়ে চলে যেত৷ লোলা বলে তোমাকে এমন কথা বলতে পারল৷ এম্মি—আমরা আগের স্ত্রী—কখনও কারুর সঙ্গে এভাবে কথা বলত না—চল, কাজ ফেলে রেখে লাভ নেই৷’

রান্নাঘরে দুজনে কাজ করছি, হঠাৎ কানে এল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ৷ উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম—লোলা গাড়ি নিয়ে বেরোচ্ছে৷ পরনে সেই সবুজ পোশাক৷ ও গাড়ি ছুটিয়ে দিল ওয়েন্টওয়ার্থের দিকে৷

চমকে উঠলাম৷ কোথায় যাচ্ছে লোলা? থানায় না তো?

পাশেই কর্মরত জেনসনকে সেকথা জানালাম, ‘মি. জেনসন, আপনার স্ত্রী গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷’

‘আমার সঙ্গে ঝগড়া হলেই লোলা ওরকম করে৷’ বিষণ্ণ্ স্বরে জবাব দিল, জেনসন, ‘জান জ্যাক, মাঝে মাঝে ওর জন্য আমার দুঃখ হয়৷ ভাবি, প্রথম জীবনে ওকে হয়ত খুব কষ্ট করতে হয়েছে, তাই ওর ব্যবহার এইরকম৷ এখানে আসার আগে ও কোথায় থাকত, কি করত,—সে-কথা অনেকবার জিগ্যেস করেছি, কোন জবাব দেয়নি৷ ভেবে ছিলাম, তুমি আসার পর আমরা দুজনে একটু নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পাব, কিন্তু কোথায় কি? দেখেছ তো, কতদিন ওকে সিনেমায় যাওয়ার জন্য সেধেছি, রাজি হয়নি! হয় মাথাধরা, নয় ক্লান্ত, এমনি নানান অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেছে৷ কিন্তু ও যখন ওয়েন্টওয়ার্থে একা যায়, তখন বড় চিন্তা হয়, জ্যাক৷ মাঝে মাঝে মনে হয়, ও হয়ত অন্য-কোন—যাকগে, বাদ দাও ওসব কথা৷’ দীর্ঘশ্বাস পেলে সে আবার কাজে মন দিল৷

খুলে না বললেও, জেনসন কি বলতে যাচ্ছিল আমি আঁচ করলাম৷ ও হয়ত সন্দেহ করে, লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়৷ হাতেও পারে—অসম্ভব কিছু নয়!

এরপর গাড়ির ভিড় বাড়তে শুরু করায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷

রাত প্রায় সোয়া এগারোটার সময় লোলা ফিরল৷ গাড়ি থেকে নেমে সোজা গিয়ে ঢুকল নিজের ঘরে৷ সশব্দে বন্ধ করে দিল ঘরের দরজা৷

জেনসন আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা নাড়ল, ‘মাঝে মাঝে আমার এমন রাগ হয়, মনে হয়, দুটো থাপ্পড় মেরে লোলাকে ভদ্রতা জিনিসটা শিখাই৷ কিন্তু—যাক, রাত তো অনেক হল, চলি, জ্যাক—শুভরাত্রি৷’ জেনসন ভারী পদক্ষেপে বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল৷ বিষাদের ছায়া তখনও মিলিয়ে যায়নি ওর মুখ থেকে৷

ভাবলাম, লোলার গায়ে হাত তোলা, আর কালো-কেউটের ল্যাজে পা দেওয়ার মধ্যে কোন তফাত নেই! জেনসন জানে না, এক ক্রূর সাপিনীকে ও বিয়ে করে বসেছে৷

রেস্তোরাঁয় বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে শ্রীমতীর অপেক্ষায় রইলাম৷ জেনসন ঘুমিয়ে না পড়লে লোলা আসতে পারবে না৷ সুতরাং সময় লাগবে৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লাম৷ ভাবতে লাগলাম নিজের বর্তমান অবস্থার কথা৷

যদি জেনসনের কাছে টাকাগুলো না রাখতাম, তো কখন হাওয়া হয়ে যেতাম৷ কেউ আমার খোঁজও পেত না৷ কিন্তু এই কপর্দকহীন অবস্থায় পালাবার চিন্তা করা নেহাতই পাগলামি৷

সুতরাং, মাথায় হাজার চিন্তার মেলা নিয়ে লোলার আসার অপেক্ষায় বসে রইলাম৷ চোখদুটো আটকে রইল বাংলোর আলোকিত জানালার দিকে৷

ছয়

হাতঘড়ির দিকে তাকালাম৷ রাত একটা চল্লিশ৷ তিন ঘণ্টার উপর হয়ে গেল, কিন্তু এখনও লোলার পাত্তা নেই৷ ট্রাক-চলাচল একেবারে পাতলা হয়ে এসেছে৷ গত আধঘণ্টার মধ্যে একটা ট্রাকও চোখে পড়েনি৷ চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম—হঠাৎ চোখ পড়ল বাংলোর দরজায়৷ লোলা চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসছে৷ অবসন্নভাবে পা ফেলে ও আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ পরনে একটা সাদা শার্ট আর ফিকে সবুজ রঙের স্কার্ট৷

রেস্তোরাঁর বারান্দা অন্ধকারে ঢাকা৷ মরা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের খোলা উঠোনে৷ লোলা উঠে এল বারান্দায়, একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমার কাছে বসল৷

মনকে প্রস্তুত করলাম৷ জানি না, কি শর্তের বিনিময়ে ও আমার নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখবে৷ সুতরাং সতর্ক থাকা ভালো৷

অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছেণ আমার সিগারেটের অগ্রভাগ৷ তার হালকা লাল আলোর লোলার মুখটা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে৷

‘তোমাকে দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেছি, কারসন৷ প্রথম থেকেই সন্দেহ করেছিলাম তুমি ছদ্ম-পরিচয়ে এখানে আছ৷ কিন্তু তুমিই যে ফার্নওয়ার্থ থেকে পলাতক—শেট কারসন, তা ভাবতে পারিনি—আর, তোমার সিন্দুক-বিশারদ হওয়াটা নিতান্তই ভগবানের আশীর্বাদ৷’ লোলা তার লোভনীয় পা দুটোকে সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে হাসল৷

‘আপনি কি পুলিশে খবর দিতে চান?’

‘এখনও কিছু ঠিক করিনি৷ সেটা তোমার মতামতের ওপর নির্ভর করছে৷ আমার কথায় রাজি হলে ভালো, নয়তো সোজা ফার্নওয়ার্থ৷’

উদ্গ্রীব হয়ে ওর পরবর্তী কথাগুলো শোনার অপেক্ষায় রইলাম৷

‘কাগজে লিখেছে, তুমি ‘লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশন’-এ কাজ করতে—তোমাকে একটা সিন্দুক খুলতে হবে, কারসন!’

‘তার মানে?’ সিগারেটের টুকরোটা ছুড়ে ফেলে নিয়ে সোজা হয়ে বসলাম৷

‘কার্লের একটা লরেন্স-সিন্দুক আছে—তোমাকে সেটা খুলতে হবে৷’ লোলার কণ্ঠে নির্বিকার সুর৷ যেন অত্যন্ত একটা ব্যাপার তার চেয়েও সহজভাবে আমাকে বোঝাচ্ছে৷

তাহলে রিক্স দেখছি মিথ্যে কথা বলেনি৷ লোলা শুধুমাত্র টাকার লোভেই জেনসনকে বিয়ে করেছে৷

‘সিন্দুক থেকে কিছু যদি আপনার নেবার থাকে, তো মি. জেনসনকে বলছেন না কেন?’ বোকা সাজলাম৷ কারণ, লোলার উদ্দেশ্যটা আমি ওর মুখ থেকেই শুনতে চাই৷

‘বেশি চালাক সাজবার চেষ্টা করো না, কারসন৷ বিকেলে কি বলেছিলাম তা আশা করি ভুলে যাওনি? এখন থেকে আমি যা ‘বলব—নয়ত—’

‘রিক্সের কথাই দেখছি সত্যি! শুধু টাকার জন্যই অ্যাদ্দিন এখানে পড়ে ছিলেন?’

‘বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথা এস৷ সিন্দুক তুমি খুলছ কিনা বল?’

‘খোলার পর—?’

লোলা নড়েচড়ে বসল, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল, ‘তুমি এক হাজার ডলার পাবে৷ আর চবিবশ ঘণ্টা সময় দেব পালাবার জন্য৷’

সাবাস লোলা, সাবাস! কে বলে মেয়েদের বুদ্ধি নেই! আমি খুলব সিন্দুক, আর এক লাখ ডলার হাতাবে তুমি! তারপর দয়া করে আমাকে ভিক্ষে দেবে এক হাজার ডলার, আর পালাবার জন্য কিছু সময়! আর তাও কিনা, জেনসন থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত সবাই যাতে ভাবে, আমিই সিন্দুকের টাকা হাতিয়ে কেটে পড়েছি! চমৎকার—তোমার জবাব নেই সুন্দরী!

‘আপনি ওই এক লাখ ডলার চুরি করার মতলবে আছেন, আর মি. জেনসন ভেবেছিলেন আপনাকে নিয়ে পৃথিবীভ্রমণে যাবেন, দু-হাতে খরচ করবেন—সব আপনারই জন্য৷’ শ্লেষে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল আমার স্বর৷ লোলাকে যেন আর সহ্য করতে পারছি না৷ আমার কব্জা করেছে বলে ওর উপর যত না রাগ হল, তার চেয়েও বেশি হল জেনসনের মতো লোককে ও ঠকিয়েছে বলে৷

‘কার্ল? ওই পেটমোটা বুড়োটার সঙ্গে বেড়াতে যাব?’ নৃশংস মনে হল লোলার স্বর, ‘হুঁঃ—ওর সঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থ যেতেই আমার গা ঘিনঘিন করে, তার ওপর আমার পৃথিবীভ্রমণ!—যাকগে, সিন্দুকটা খুলতে তোমার কতক্ষণ লাগবে?’

‘খুলতেই পারব কিনা ঠিক নেই, তার আবার কতক্ষণ লাগবে! এই সিন্দুকগুলো খুব মজবুত হয়৷ কম্বিনেশন নম্বর না পেলে খোলা অসম্ভব৷’

‘কারসন, আমার মনে হয় সিন্দুকটা খুললেই তুমি ভালো করবে৷’ অন্ধকারেই অনুভব করলাম লোলা আমার দিকে অপলকে চেয়ে আছে৷

বেশ বুঝতে পারছি, সিন্দুকটা আমাকে খুলতেই হবে৷ এ ছাড়া কোন দ্বিতীয় উপায় আমার নেই৷ কিন্তু জেনসনের কথা ভাবলেই মন বিদ্রোহ করছে৷ সে আমার একমাত্র বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী—আমার জন্য কত করেছে, আর তাকেই এভাবে পথে বসাব? অথচ ফার্নওয়ার্থের কথা মনে পড়লেই ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠছি৷ ওই দুঃস্বপ্ণের নরকে ফিরে যাবার মতো সাহস আমার নেই৷

‘সিন্দুকটা কোন্ ঘরে আছে?’ লোলাকে প্রশ্ন করলাম৷

‘বাংলোর বসবার ঘরে৷’

‘বসবার ঘরে? তার মানে? আপনি ভাবছেন আমি মি. জেনসনের কোলে বসে সিন্দুক খুলব? আমি টাকার বান্ডিলগুলো বের করব, আর উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেবেন?’ ব্যঙ্গে বিকৃত হল আমার মুখ৷ কথায় কথা বাড়িয়ে সময় নেবার ফিকির খুঁজতে লাগলাম৷ মুখে কথা বললেও, আমার মনের মধ্যে তখন বয়ে চলেছে চিন্তার ঝড়৷

‘না, না, সে ভয় নেই৷ আগামী শনিবার সন্ধেবেলা কার্ল ওয়েন্টওয়ার্থে একটা মিটিংয়ে যাবে৷ তারপর রাত একটায় ফিরবে৷ ওর মধ্যেই তোমাকে কাজটা সারতে হবে৷’

একটা সিগারেট ধরালাম৷ লাইটারের আলোয় দেখলাম, লোলার চোখজোড়া লোভে চকচক করছে৷ কারও আসন্ন মৃত্যুর প্রত্যাশায় যেন অপেক্ষা করছে এক বিশাল শকুনি৷

‘সে না হয় হল, কিন্তু সিন্দুক খোলার সময় আপনি কোথায় থাকছেন?’

‘শনিবার তোমার জায়গায় সারারাত আমি কাজ করব৷ তুমি যখন সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে হাওয়া হবে, তখন আমি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকব৷ টাকা যে চুরি গেছে, সেসব কিছু জানতেই পারব না—অন্তত লোকে তাই জানবে৷ তারপর কার্ল ফিরে এসে সিন্দুক খালি দেখলে, ওকে বলব, আমি কাজে ছিলাম, কখন তুমি টাকা নিয়ে ভেগেছ টেরই পাইনি৷’ আধো-আঁধারিতে ঝকঝক করে উঠল লোলার সাদা দাঁতের সারি৷ পৈশাচিক হাসিতে ওর সবুজ চোখ নেকড়ের মতো জ্বলছে৷

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মতলবটা আমার মাথায় এল৷ এমনিতেই তো আমাকে পালাতে হবে, ক্ষতির মধ্যে শুধু চাকরিটা—, তা যাকগে, কিন্তু জেনসন যাতে আমাকে ভুল না বোঝে, সে-ব্যবস্থা আমাকেই করতেই হবে৷ মতলবটা যে কার্যকর হবে, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই৷

আমি সিন্দুক খোলার পর লোলা যখন টাকাগুলোর নিতে থাকবে, তখন এক ঘুঁষিতে ওকে অজ্ঞান করে সমস্ত টাকা নিয়ে পালাব৷ যাবার আগে কেটে দিয়ে যাব টেলিফোনের তার৷ তারপর ট্রপিকা স্প্রিংস থেকে জেনসনের সমস্ত টাকা ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করব৷ সঙ্গে লিখব একটা চিঠি৷ জানাব, কিরকম একটা বাজারে-মাগীকে সে বিয়ে করেছে৷ তাহলে নিশ্চয়ই জেনসনের ভুল ভাঙবে৷

মনে মনে হাসলাম৷ দাঁড়া শালী, তোকে আমি আঁটি চোষাব! শেট কারসনকে চিনতে তোর এখনও অনেক দেরি আছে৷

কিন্তু মুখে ন্যাকা সাজলাম, ‘দেখুন, মিসেস জেনসন—মি. জেনসনকে ঠকানোটা আমার ঠিক ভালো লাগছে না৷ তিনি আমার জন্য কত করেছেন, তা ছাড়া—৷’

‘ওসব ন্যাকামো ছাড়, কারসন৷ সোজাসুজি বল, সিন্দুক খুলছ, না ফার্নওয়ার্থে ফিরে যাবে?’

‘আর যেখানেই যাই, ফার্নওয়ার্থে আমি ফিরছি না৷’

‘তাহলে শনিবার দিনই?’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম৷ যেন মনস্থির করতে চাইছি৷

অবশেষে কাঁধ ঝাঁকালাম, ‘অগত্যা রাজি না হয়ে উপায়ই বা কী!’

লোলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, ‘ভেব না আমি ইয়ার্কি করছি৷ সিন্দুক না খুলে দেখ কী হয়৷’

লোলার দিকে চোখ তুলে তাকালাম, ‘অতবার করে আপনাকে বলতে হবে না৷ যখন বলেছি খুলব, তখন খুলব৷

‘তাই যেন হয়, মিস্টার শেট কারসন৷’ সিঁড়ি ভেঙে ও বালির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে৷ চাঁদের আলোর পরিষ্কার দেখলাম, যেতে যেতে ও একবার ঘুরে তাকাল—মুখে জয়ের হাসি৷

সিগারেটের টুকরোটা ছুড়ে দিলাম বালির উপর, ‘দেখা যাক সুন্দরী, কে হারে কে জেতে! তবে মনে রেখো, তোমার রঙের সাহেবের উত্তরে আমার হাতের পাঞ্জায় লুকোনো রয়েছে রঙের টেক্কা!’

পরদিন লোলাকে রান্নাঘরে একা পেয়ে সিন্দুকের নম্বরটা এনে দিতে বললাম৷ কারণ ওটা না পেলে সিন্দুকটা কি ধরনের তা বোঝা যাবে না আর সিন্দুক ভাঙতে হলে সেটা জানা বিশেষ প্রয়োজন৷

পরে বেলার দিকে জেনসনের অনুপস্থিতির সুযোগে, ও একটুকরো কাগজা এনে আমার হাতে দিল৷ নম্বরটা দেখেই বুঝলাম, সিন্দুকটা অত্যন্ত পুরোনো মেডেলের৷ বাজারে এখন আর পাওয়াই যায় না৷ এ-ধরনের সিন্দুকগুলোর দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনা থেকে তালা এঁটে যায়, চাবির আর দরকার হয় না৷ বেশির ভাগ লোকই এ-ধরনের চাবি ছাড়া সিন্দুক অপছন্দ করার কোম্পানি এই সিন্দুক তৈরি বন্ধ করে দেয়৷ তার উপর এই সিন্দুকগুলো খুলতে চোর-ছ্যাঁচড়দের খুব একটা কষ্ট করতে হয় না৷

খুশিই হলাম৷ সিন্দুকটা খুলতে আমার বড় জোর দশ মিনিট লাগবে৷ আর সময় যত কম লাগবে, ততই ভালো—পালাবার জন্য সময় কিছু বেশি পাওয়া যাবে৷

বৃহস্পতিবার সকালবেলা—আমি আর জেনসন গ্যারেজে কাজ করছি, হঠাৎ কাজ থামিয়ে ও বলে উঠল, জ্যাক, শনিবার সাতটায় আমাকে ওয়েন্টওয়ার্থে যেতে হবে—একটা মিটিং আছে৷ ফিরতে ফিরতে ধর, একটা-দেড়টা বাজবে৷—লোলা সেদিন রাত্তিরে কাজ করবে বলছিল, তুমি পার তো ওর দিকে একটু লক্ষ্য রেখ, কেমন? বলা তো যায় না, কখন কোন মাতাল ড্রাইভার উল্টোপাল্টা কাজ করে বসে৷’

বুকের ভিতর একটা চাপা দুঃখ অনুভব করলাম৷ জেনসন আমাকে এতখানি বিশ্বাস করে? একবারও ভাবল না, লোলাকে একা পেয়ে আমিও তো কোন মাতাল ড্রাইভারের মতো কাজ করতে পারি!

মুখে আশ্বাস দিলাম, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, মি. জেনসন, আমি নজর রাখব’খন৷’

জেনসন হাসল, ‘তোমার মতো একজন বিশ্বাসী লোক পেয়ে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে, জ্যাক—তোমাকে চিনতে আমি ভুল করিনি৷’

শুক্রবারে আমার ছুটি থাকায় জেনসনের কাজ থেকে ওর গাড়িটা ধার চাইলাম৷ আর চাইলাম একশ ডলার—বললাম, ট্রপিকা স্প্রিংসে কয়েকটা জিনিস কেনার আছে৷ জেনসন একটু অবাক হলেও টাকাটা এনে দিল, আর কিছু উপদেশও দিল, ‘দেখো জ্যাক, ওখানে গিয়ে সাবধানে থেক৷ রাস্তায় ওত-পেতে-থাকা সুন্দরীদের খপ্পরের যেন পড়ো না৷’

হেসে অভয় দিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম৷ দেখি, লোলা হাসিমুখে রেস্তোরাঁর দরজার দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে৷ যদি জানত ওর জন্য আমি কি ফাঁদ পেতেছি হতে হয়তো অমন করে হাসত না৷ জেনসনের কাছ থেকে তখনকার মতো বিদায় নিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম৷

ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছতে প্রায় ঘণ্টাচারেক লেগে গেল৷ সেখানে পৌঁছে খোঁজ নিলাম, ন্যু-ইয়র্কের ট্রেন-ক-টায় ছাড়ে৷ প্লেনে করে পালানোর মতলব অনেক ভেবেচিন্তেই ত্যাগ করেছি৷ কারণ লোলা পুলিশে আমার পালানোর খবর দেওয়ামাত্রই ওরা ট্রপিকা-স্প্রিংসের এয়ারপোর্টে আমার খোঁজ করবে৷ তা ছাড়া, রাত্রিবেলা কোন প্লেন পাব কিনা, তারও যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ খোঁজ নিয়ে দেখলাম, রাত সাড়ে বারোটায় ন্যু-ইয়র্কে যাবার একটা ট্রেন আছে৷ অতএব চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই৷ জেনসন সাতটায় ওয়েন্টওয়ার্থে রওনা হবে৷ আর সাড়ে সাতটার মধ্যে সিন্দুক খুলে লোলাকে ল্যাং মেরে আমিও কেটে পড়ব৷ তাহলে ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছে ট্রেন ধরার জন্য আধঘণ্টারও বেশি সময় পাওয়া যাবে৷

কিন্তু এ-ও আমি জানতাম, লোলা পুলিশে খবর দেবার সময় আমার চেহারার বর্ণনা তো দেবেই, সাজ-পোশাকের বিবরণ দিতেও ছাড়বে না৷ সুতরাং ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ থেকে পালানোর পরই আমাকে ছদ্মবেশ ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে হবে৷

তাই ট্রেনের খোঁজখবর নিতে গেলাম একটা দোকানে৷ একটা হালকা বাদামী প্যান্ট আর একটা চাইরঙের কোট কিনলাম৷ কোটের সামনের পকেটদুটো গাঢ় সবুজ রঙের—যাতে বহুদূর থেকে চোখে পড়ে৷ আরও কিনলাম একজোড়া জুতো, বাদামী রঙের একটা টুপি, এক শিশি কলপ ও একটা গগল্স্৷ এই জিনিসগুলো একটা সুটকেস কিনে তাতে ভরে ফেললাম৷ গাড়ির ক্যারিয়ারে স্যুটকেসেটা বন্ধ করে ফিরে চললাম ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ৷

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে মরুভূমিতে এসে পড়লাম৷ দূরে বালিয়াড়ির উপর ইতস্তত ছড়ানো ঘন ক্যাকটাসের ঝোপ৷ গাড়ি থামিয়ে ক্যারিয়ার থেকে স্যুটকেসটা বের করে এগিয়ে চললাম ক্যাকটাস-ঝোপের দিকে৷ একটা ঘন ঝোপের ভিতর ওটাকে লুকিয়ে ফেললাম৷ একমাত্র আমি ছাড়া অন্য কারুর পক্ষে এটা খুঁজে বের করা একেবারেই অসম্ভব৷ ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ ছেড়ে পালাবার পথে এখানে নেমে চেহারা এবং বেশবাস, সব পালটে নেব৷ তারপর ট্রপিকা স্প্রিংস থেকে ট্রেন ধরে সোজা ন্যু-ইয়র্ক৷ লোলা আমার চেহারার বর্ণনা দিলেও পুলিশ আমাকে ছদ্মবেশে চিনতে পারবে না৷

নিশ্চিন্ত মনে আবার গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম৷ সত্যিই, যে নিখুঁত প্ল্যান আমি এঁটেছি, তাতে ভুল হওয়ার কোন জো নেই৷ এখন শুধু শনিবারের অপেক্ষা—

ফিরে এসেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ আমি, জেনসন এবং লোলা—তিনজনেই কাজ করে চললাম যান্ত্রিক ক্ষিপ্রতায়৷ খদ্দেরদের চেঁচামেচিতে রেস্তোরাঁ জমজমাট৷ এইভাবে চলতে চলতে রাত প্রায় এগারোটার সময় রেস্তোরাঁ একেবারে খালি হয়ে গেল৷ শেষ-খদ্দেরটি চলে যাবার পর আমাকে পেট্রল-পাম্পগুলো দেখতে বলে জেনসন শুতে গেল৷ আর, লোলা রান্নাঘরে ঢুকল এঁটো কাপ-প্লেটগুলো ধুয়ে রাখতে৷

একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে এসে বসলাম৷ কিছুক্ষণ পর লোলা সামনে এসে দাঁড়াল, ‘ট্রপিকা স্প্রিংসে কি করতে গিয়েছিলে?’

‘তাতে আপনার কী দরকার?’ রুক্ষস্বরে জবাব দিলাম৷

লোলা কাঁধ ঝাঁকাল, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি, ‘না, দরকার কিছু নেই! তুমি শুধু সিন্দুক খুললেই আমি খুশি৷’

‘সে তো বলেইছি খুলব—’ ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকালাম৷

লোলা বাংলোর দিকে ফিরে চলল, মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিল, ‘না খুললে তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে৷’

চেয়ারে হেলান দিয়ে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’কে আর-একবার ভালো দেখলাম৷ একটা দিন! আর মাত্র একটা দিন! তারপরই এ-জায়গা ছেড়ে আমাকে চিরকালের জন্য চলে যেতে হবে৷ শুধু স্মৃতিটুকু বেঁচে থাকবে মনের পাতায়—শেষে একদিন তাও মুছে যাবে৷ আজই অনুভব করলাম, ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-কে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷ এ-জায়গা ছেড়ে যেতে আমার মন চাইছে না৷

শনিবার সন্ধ্যা সাতটা৷ গুমটিঘরে সেই পুরোনো মোটরটা নিয়ে কাজ করেছিলাম, পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালাম৷ সামনেই দাঁড়িয়ে জেনসন৷

‘জ্যাক, আমাকে এখনই যেতে হবে৷ সাতটা বাজে, আর দেরি করা ঠিক হবে না৷ ফিরতে ফিরতে হয়তো দুটোও বেজে যেতে পারে৷ জানই তো, এসব মিটিংয়ের শেষে একটু-আধটু—’ জেনসন চোখ টিপল, বুড়ো আঙুল তুলে মুখে কিছু ঢালার ভঙ্গি করল, ‘দেখো, লোলাকে আবার এসব বল না যেন?’

তার দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘না, না—আপনি যান, ঘুরে আসুন৷ আমি আর মিসেস জেনসন ঠিক সামলাতে পারব, কোন অসুবিধে হবে না৷’

জেনসন রেস্তোরাঁর দিকে পা বাড়াল৷ সম্ভবত লোলার কাছ থেকে বিদায় নিতে৷ একটু পরেই সে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এসে সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠল৷

ঝড়ের বেগে ছুটে চলল জেনসনের মার্কারি৷ যতদূর দেখা গেল চেয়ে রইলাম৷ তারপর একসময় দূরের বালিয়াড়ির আড়ালে গাড়িটা মিলিয়ে গেল৷

যে স্টেশন-ওয়াগনে করে পালাব ঠিক করেছি, সেটার পেট্রল, মোবিল আর-একবার পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট মনে পা বাড়ালাম বাংলোর দিকে৷

প্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এইবার শুরু হবে৷ খুলতে হবে সেই অভিশপ্ত সিন্দুক৷ অভিশপ্ত ছাড়া আর কি? এর জন্যই তো আমাকে জেনসনের মতো লোককে বন্ধুত্ব হারাতে হচ্ছে!

লোলা বাংলোর দরজায় দাঁড়িয়ে আমারই অপেক্ষা করছিল৷ উত্তেজনায় উৎকণ্ঠায় ওর মুখমণ্ডল বিবর্ণ৷ কিন্তু চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল৷ আমাকে দেখেই চাপা স্বরে ও বলে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি শুরু কর, কারসন৷’

‘কোথায় আছে সিন্দুকটা?’

‘বসবার ঘরে—সোফার ঠিক পেছনে৷’

‘ঠিক আছে, আপনি বরং পাম্পের কাছে থাকুন৷ বলা যায় না, হয়তো তেল নেবার জন্য কোন ট্রাক-ফাক এসে পড়তে পারে৷ তা ছাড়া, ঘণ্টা দুয়েকের কমে সিন্দুকটা খোলা যাবে বলে তো মনে হয় না৷’

সন্দেহের কুটিল ছায়া নেচে উঠল লোলার সবুজ চোখের তারায়, ‘অতক্ষণ—?

‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, এই সিন্দুকগুলো খুব মজবুত হয়৷ তা ছাড়া মি. জেনসনের কাছ থেকে কম্বিনেশনটাও তো যোগাড় করতে পারেননি৷ অতএব তর্ক না করে যা বলছি তাই করুন গিয়ে৷’

বসবার ঘরে গিয়ে সোফাটা সরিয়ে সিন্দুকটাকে এক নজর দেখলাম৷ যা ভেবেছি ঠিক তাই৷ শুধু কম্বিনেশন ঘোরালেই—সিন্দুকটা খুলে যায়—চাবির আর দরকার হয় না৷ লোলো দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল৷ ওকে বললাম, ‘গ্যারেজ থেকে কয়েকটা যন্ত্রপাতি আনতে হবে৷ আপনি বরং রেস্তোরাঁটা বন্ধ করে দিন৷ নয়তো কোন খদ্দের এসে খাওয়ার জন্য চেঁচামেচি শুরু করে দেবে৷’

‘সে আমি আগেই বন্ধ করে দিয়েছি৷’

আর-কোন কথা না বলে, ওকে পাশ কাটিয়ে বাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ গ্যারেজ থেকে গোটা কয়েক যন্ত্রপাতি নিয়ে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে ভরে বাংলোয় ফিরে চললাম৷ টাকাগুলো এই ব্যাগে করে নিয়েই পালাতে হবে৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একটা পুরোনো ঝরঝরে প্যাকার্ড ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে আসছে৷

লোলা বাংলোর দরজা থেকেই গাড়িটাকে দেখতে পেয়ে পাম্পের দিকে এগিয়ে এল৷ ততক্ষণে গাড়িটা পাম্পের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷

আর অপেক্ষা না করে বাংলোর দিকে পা বাড়ালাম৷ যাবার আগে নিছক কৌতূহলবশে গাড়িতে বসে-থাকা লোকদুটোর দিকে একপলক তাকালাম—হাজার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরায়—পা দুটো মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল, যেন কেউ আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে মেঝেতে—শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম—

গাড়িতে বসে দুজন পুলিশ! সাদা পোশাকে থাকলেও ওদের চিনতে অসুবিধে হওয়ার কোন কারণ নাই৷ রোদে-পোড়া বিশাল চেহারা, চৌকো চোয়াল, সতর্ক চোখজোড়া বেজীর মতো চঞ্চল৷

আমি তখন ঘামতে শুরু করেছি৷ অসাড় হাত-পা বশে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম৷ পায়ে পায়ে বাংলোর দিকে এগোলাম, যেন ওদের খেয়ালই করিনি৷

‘অ্যাই—শোন—’ বাজখাঁই গলায় ডেকে উঠল ওদের একজন৷

সঙ্গে সঙ্গে মনে হল ছুট লাগাই৷ দৌড়ে পালানোর একটা দুর্দম ইচ্ছা আমাকে গ্রাস করল৷ কিন্তু অনেক চেষ্টায় অবাধ্য পা দুটোকে সংযত করে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালাম৷

ওরা দুজনেই তখন গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে৷

লোলাও বুঝতে পেরেছিল লোকদুটোর আসল পরিচয়৷ দেখলাম, ও ভয়ার্ত চোখে ওদের দিকে চেয়ে আছে৷

ধীরে ধীরে ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম৷ কিছুটা ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে৷ নয়তো, দৌড়ে পালাবই বা কোথায়!

‘আমাদের একটা চাকা আসবার পথে ফেঁসে গেছে৷ গাড়ির ক্যারিয়ারে আছে—এই নাও চাবি,’ লোকটা ক্যারিয়ারের চাবিটা আমার হাতে দিল, ‘চটপট সারাবার ব্যবস্থা কর৷ এখনও অনেকটা রাস্তা যেতে হবে, একটা চাকা হাতে রাখা ভালো৷’

ক্যারিয়ার খুলে চাকাটা বের করলাম৷ অপরজন লোলার দিকে তাকাল, আঙুল দিয়ে দেখাল গাড়িটাকে, ‘এটাতে পেট্রল ভরার ব্যবস্থা কর, আর দেখো, খাবার-দাবার কিছু আছে কিনা৷’

চাকাটা গড়িয়ে গড়িয়ে গুমটিঘরের দিকে নিয়ে গেলাম৷ বাঁ হাতে রইল ক্যাম্বিসের ব্যাগটা৷

লোলা দ্বিতীয় জনের কথায় কিছুক্ষণ ইতস্তত করল৷ রেস্তোরাঁ যে বন্ধ, সে কথা বলতে সাহস করল না৷

‘স্যান্ডউইচ হলে চলবে?’ লোলা প্রশ্ন করল৷

‘খুব চলবে৷ কিন্তু তাড়াতাড়ি কর, এমনিতেই আমাদের অনেক দেরি হয়ে যাবে৷’

আটটা দশের সময় হতচ্ছাড়া পুলিশ দুটোর হাত থেকে রেহাই পেলাম৷ যদি ওরা না আসত, তবে এতক্ষণে স্টেশন-ওয়াগন নিয়ে কোথায় চলে যেতাম! মনে হচ্ছে, ন্যু-ইয়র্ক যাবার ট্রেন বোধ হয় আর ধরা হল না!

শেষ পর্যন্ত তাই হল৷ গাড়ির পর গাড়ি আসতে লাগল৷ খদ্দেরের আর বিরাম নেই৷ অবশেষে বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ খুলতে হল৷ আমি আর লোলা অক্লান্ত ভাবে খেটে চললাম—

রাত প্রায় দশটার সময় নিশ্বাস ফেলার একটু সুযোগ পেলাম৷ এই গরমে এত পরিশ্রম করে নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হল৷ আজকের গরমটা যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশি লাগছে৷ ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে৷ সামনে এঁটো কাপ-প্লেটের স্তূপ৷ পাশেই দাঁড়িয়ে লোলা৷

‘আমি এগুলো ধুয়ে রাখছি, তুমি সিন্দুক খোল গিয়ে৷’

‘আজ আর হবে না, মিসেস জেনসন, অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ আমাদের পরে অন্য একটা দিন ঠিক করতে হবে৷’

লোলা আগুন-ঝরা চোখে আমার দিকে তাকাল, ‘আশা করি আমার কথাটা তোমার কানে গেছে, কারসন৷’

‘আর ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই তো মি. জেনসন ফিরে আসবেন, তাহলে পালাবার সময়টা আমি পাব কখন?’

লোলা কোন জবাব না দিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ ওকে অনুসরণ করলাম৷ ও সোজা এগিয়ে গেল দেওয়ালে লাগানো টেলিফোনের দিকে, ‘সিন্দুক খুলবে, না পুলিশে ফোন করব?’

‘আপনি বলেছিলেন, আমাকে চবিবশ ঘণ্টা পালাবার সময় দেবেন—’

‘সে-সময় তুমি ঠিকই পাবে৷ কাল সকাল আটটার আগে কার্ল কিছুই জানতে পারবে না—তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার৷’ লোলা হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলে নিল, ‘এখনও ভেবে দেখ, কী করবে৷’

বুঝলাম, ও মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছে না৷ সুতরাং আর দ্বিরুক্তি না করে গ্যারেজে গেলামে৷ যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে আবার ফিরে চললাম বাংলোর দিকে৷

এখন দশটা বেজে দশ মিনিট৷ অর্থাৎ তিনটের আগে ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছনো অসম্ভব৷ সেখানে গিয়ে প্রথমেই আমাকে স্টেশন-ওয়াগনটার ব্যবস্থা করতে হবে৷ কারণ, জেনসন পুলিশকে যখনই জানাবে আমি স্টেশন-ওয়াগনে করে পালিয়েছি, ওরা ট্রপিকা স্প্রিংসে এসে আগে ওটারই খোঁজ করবে৷ তারপর আমাকে অপেক্ষা করতে হবে ট্রেনের জন্য৷ ভাগ্য সহায় থাকলে হয়তো পুলিশের চোখে ধুলো দিতে পারব৷

বসবার ঘরে গিয়ে প্রথমেই আলো জ্বেলে দিলাম৷ তারপর যন্ত্রপাতি নিয়ে সিন্দুকের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম৷

নম্বর-বসানো চাকতিটা একটু একটু করে ঘোরাতে শুরু করলাম৷ ঝুঁকে পড়ে কাপ চেপে রইলাম সিন্দুকের ইস্পাতের দরজায়৷ একটু পরেই ‘খুট’ করে একটা শব্দ হল৷ অর্থাৎ, প্রথম নম্বরটা মিলে গেছে৷ সিন্দুক সম্বন্ধে যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা এই সামান্য শব্দ শুনেই বুঝতে পারে নম্বরটা ঠিকমতো মিলেছে কিনা৷ এবার দ্বিতীয় সারির চাকতি নিয়ে পড়লাম৷

মিনিট দশেক পর হাতল টেনে সিন্দুকের দরজা খুলে ফেললাম৷ চোখের সামনে থাকে থাকে সাজানো এক-শ ডলার নোটের বান্ডিল৷ এক লাখ ডলার—জেনসনের সারা জীবনের সঞ্চয়!

ক্যাম্বিসের ব্যাগটা টেনে নিয়ে নোটের বান্ডিলের দিকে হাত বাড়ালাম৷

‘এ কি! জ্যাক!! তুমি এখানে কী করছ!!!’

একটা উত্তপ্ত ইস্পাতের ফলা যেন আমার বুকটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল—সেকেন্ড দুয়েক নিশ্চল হয়ে বসে রইলাম—একটা হাত নোটের বান্ডিলের উপর স্থির—সময়ের তরঙ্গ থেমে রইল এই একটি বিশেষ মুহূর্তে৷ আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম৷

দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জেনসন, চোখদুটো যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷

আমি তখন অসাড় হয়ে গেছি৷ ফ্যালফ্যাল করে জেনসনের বিশাল চেহারার দিকে চেয়ে রইলাম৷ জেনসন ভারী পা ফেলে ঘরের ভিতর এসে দাঁড়াল, ‘জ্যাক! এ তুমি করছ কী?’ সমস্ত যন্ত্রণা, হতাশা ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে৷ লজ্জায় ঘৃণায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল৷ জেনসনের বিশ্বাসের স্বর্গ আমি নিষ্ঠুরভাবে পায়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছি৷

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত, মি. জেনসন৷ আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি আপনার টাকা চুরি করছে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তা নয়৷ যদিও জানি, একথা বিশ্বাস করা আপনার পক্ষে খুব কঠিন, তবু দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না৷’

এমন সময় ঘরের দরজায় লোলা এসে দাঁড়াল৷ ওর মুখ মড়ার মতো সাদা, সারা শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে৷ জেনসনকে দেখেই তীক্ষ্ণস্বরে ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী হয়েছে, কার্ল?—একি? ও সিন্দুক খুলছে? আমি আগেই জানতাম৷ তোমাকে বারবার সাবধান করেছি—অচেনা লোককে কখনও বিশ্বাস করো না৷ এখন দেখছ তো! আমি রান্নাঘরে ছিলাম, আর এদিকে—’

লোলার কথাগুলো জেনসনের কানে ঢুকল বলে মনে হল না৷ সে তখন একইভাবে আমার দিকে চেয়ে আছে, ‘জ্যাক! তুমি—তুমি এভাবে—’ তার অর্ধসমাপ্ত কথাগুলো চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল আমার বিবেকের উপর৷

‘কিন্তু মি. জেন—’

‘এরপরেও কি তোমার বলার কিছু আছে?’

‘হ্যাঁ, আছে৷ আমার নাম জ্যাক প্যাটমোর নয়, শেট কারসন৷ দেড় মাস আগে আমিই ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে এসেছি৷’

জেনসনের চওড়া কপালে ভাঁজ পড়ল৷ সে এগিয়ে গিয়ে একটা সোফায় বসল, ‘ও, তুমিই তাহলে কারসন কাগজে দেখেছিলাম বটে৷’

‘হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন৷ একটা কাগজে আমার ছবি দেখে মিসেস জেনসন আমাকে চিনতে পারেন, এবং আমি যদি আপনার সিন্দুক না খুলি, তবে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন বলে ভয় দেখান৷’

‘চোর, মিথ্যেবাদী কোথাকার!’ লোলা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘কার্ল! তুমি এই লোকটার কথায় কান দিও না৷ নিজেকে বাঁচাবার জন্য ও মিথ্যে কথা বলছে! আমি এখনই পুলিশে ফোন করছি৷’

জেনসন ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল লোলার দিকে, ‘তুমি এর মধ্যে নাক গলাতে এস না, লোলা৷ পুলিশ ডাকব কি না ডাকব, সেটা আমিই বুঝব৷’

লোলা দেওয়ালে হেলান দিয়ে গোখরো সাপের মতো ফুঁসতে লাগল৷ ওর সবুজ চোখের তারায় ভয়ার্ত সতর্ক দৃষ্টি৷

জেনসন এবার আমার দিকে তাকাল, ‘তারপর?’

একে একে সমস্ত জানালাম৷ টাকাটা যে তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিতাম, তা-ও বললাম৷

জেনসন অপলক চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ আমিও স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার চোখের তারায়৷

তারপর একসময় সে চোখ ফেরাল লোলার দিকে৷ তার অনুসন্ধানী তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে লোলা যেন কুঁকড়ে গেল৷

‘লোলা, তুমি বলছ, জ্যাক মিথ্যে কথা বলেছে?’

‘নিশ্চয়ই!’ লোলা চোখ সরিয়ে নিল৷

‘তাহলে আমার দিকে তাকাও!’

কিন্তু লোলা পারল না৷ বারবার ও চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই জেনসনের অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে ও হেরে গেল৷ জেনসনের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হল৷

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল জেনসন৷ এই কয়েক মিনিটেই তার বয়স যেন অনে-ক বেড়ে গেছে৷ শালপ্রাংশু চেহারা যেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে৷

‘শুয়ে যাও, লোলা,’ থমথমে গলায় জেনসন বলল, ‘এ ব্যাপার নিয়ে কাল আলোচনা করা যাবে৷ আজ আর তোমাকে রাত জাগতে হবে না, আমিই থাকব৷ যাও শুয়ে পড় গিয়ে৷’

‘কিন্তু এ-লোকটার কী হবে? তুমি কি ওকে পুলিশে দেবে না? আমি এখনি ফোন করছি৷’

জেনসন পায়ে পায়ে লোলার কাছ এগিয়ে গেল, ওর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারল, ‘শুতে যাও! ফোন করার ব্যাপারটা আমিই ভাবব৷’

ঘর থেকে এক ধাক্কায় ওকে বের করে দিয়ে জেনসন ফিরে এসে সোফায় বসল৷

তখনও আমি খোলা সিন্দুকের কাছে দাঁড়িয়ে আছি৷

‘কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখ, জ্যাক! আমাদের সভাপতি হঠাৎ হার্টফেল করায় মিটিং মাঝপথেই ভেঙে গেল৷ আশ্চর্য! কোথায় একজন মারা গেল, আর তার জন্য আমি আবিষ্কার করলাম, আমার বউ একটি বাজারের-মেয়ে৷’ জেনসন আপন মনেই মাথা নাড়ল৷

তার কথায় চমকে উঠলাম, ‘তার মানে—আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন?’

জেনসন হাঁটুতে হাত ঘষে চোখ তুলে তাকাল৷ একটা বিষণ্ণ বেদনার ছায়া ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷ চোখের মণির উপর অশ্রুর আস্তরণ৷ সে মৃদুস্বরে বলল, ‘জ্যাক, তোমাকে আগেই বলেছিলাম, লোক চিনতে আমি ভুল করি না৷ কিন্তু স্ত্রীলোকের ব্যাপারে আমি যে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, তা এখন বুঝতে পারছি৷’

‘আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, মি. জেনসন৷ বুঝতেই তো পারছেন, এ ছাড়া আমার আর-কোন উপায় ছিল না৷’ অনেকক্ষণ বাদে বুকভরে শ্বাস নিলাম৷ মনটা যেন অনেক হালকা হল৷

জেনসন খোলা সিন্দুকের দিকে এক পলক দেখে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কিন্তু তোমাকে এ-জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে, জ্যাক৷ এখানে থাকাটা তোমার পক্ষে আর নিরাপদ নয়৷ লোলা তোমার কথা পুলিশে জানাবেই—এ-বিষয়ে তুমি নিশ্চিত থেকো৷’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷’

‘তোমাকে কিছু টাকা দিচ্ছি৷ স্টেশন-ওয়াগনটা নিয়ে এখনি বেরিয়ে পড়, নয়তো বিপদে পড়বে৷ লোলাকে বিশ্বাস নেই, কে জানে এর মধ্যেই হয়তো—তা কোথায় যাবে ঠিক করেছ?’

‘ন্যু-ইয়র্ক৷ যেখানে পৌঁছতে পারলে, পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ হবে৷’

‘তাহলে এক কাজ কর তোমাকে তিরিশ হাজার ডলার দিচ্ছি, সেখানে গিয়ে যা-হোক একটা ব্যবসা শুরু করতে পারবে—ভালোই হবে৷’

মাথাটা কেমন টলে উঠল৷ আমি কি ভুল শুনছি৷ তি-রি-শ হা-জা-র ডলার! ওই তো জেনসন এখনও হাসছে, কিন্তু বড় বিষণ্ণ সে-হাসি৷ আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যেতেই আমি উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘না, মি. জেনসন, না! এ টাকা আমি নিতে পারব না, কিছুতেই না!—ভাববেন না, আমি অকৃতজ্ঞ৷ কিন্তু এত টাকা নেবার জন্য দয়া করে আমাকে অনুরোধ করবেন না৷’

‘জ্যাক, আমি যখন বলেছি, এ-টাকা তোমাকে নিতেই হবে৷ পৃথিবীভ্রমণের শখ আমার মিটে গেছে৷ সুতরাং এ-টাকা দিয়ে আমি কি করব? কিন্তু তোমার এখন টাকার প্রয়োজন, তাই তোমাকে দিচ্ছি৷ আর একটা কথা মনে রেখ, জ্যাক, তোমাকে আগে যেমন ভালোবাসতাম, এখনও তেমনি বাসি৷’ জেনসনের চোখের কোণে চিকচিক করছে দু-ফোঁটা অশ্রু৷ সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল, ‘তোমার মতো লোককে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সহজ হবে না৷’

ঠিক তখনই লোলাকে দেখলাম৷ ও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ পরনে একটা সবুজ পোশাক৷ মুখ শুকনো পাতার মতো বিবর্ণ, চোখদুটো বেড়ালের মতো জ্বলছে৷ আর—

—আর, ওর হাতের মুঠোয় রয়েছে একটা .৪৫ রিভলভার৷ তার নিকষ কালো নলটা যেন নরকের দরজার চাবিকাঠি৷

সাত

মুহূর্তে ঘরের পরিবেশে নেমে এল মৃত্যুর নিস্তব্ধতা৷ শুধু টেবিল-ঘড়ির টিক টিক, আর লোলার উত্তেজিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জেনসন—চোখে ভূত দেখার চাউনি, ‘এ কি? লোলা!—’ বলার সঙ্গে সঙ্গে জেনসন ওর দিকে এগোতে গেল৷

‘খবরদার! এক পা নড়বে না! কর্কশ স্বরে শাসিয়ে উঠল লোলা, ‘সিন্দুকের সমস্ত টাকা আমি নেব৷ কাউকে এর একটা পয়সাও আমি দিচ্ছি না৷’

‘লোলা! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? গুলি-ভরা রিভলভার নিয়ে আর ছেলেমানুষি করো না—ওটা নামিয়ে রাখ৷’

‘শোন কার্ল, তোমার ওই ন্যাকামো আমি বহুদিন সহ্য করেছি,—আর নয়৷ মনে করো না, তোমরা আমাকে আটকাতে পারবে৷ চুপচাপ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাক, নয়তো—’

জেনসনের চোয়ালের রেখা কঠিন হল, ‘ছি, ছি—তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, লোলা৷ দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে এ-টাকা আমি কার জন্য সঞ্চয় করছি? শুধু তোমার আর আমার জন্যই তো! আর তুমি কিনা—নাও, এসব পাগলামি ছেড়ে বন্দুক নামিয়ে রাখ৷’

‘ওসব বাজে ফিরিরে কোন কাজ হবে না, কার্ল! আমাকে আটকালে পরে কি হবে ভেবে দেখেছ? আমি পুলিশকে বলে দেব—একজন জেল-পালানো কয়েদীকে তুমি এতদিন ধরে জেনেশুনে আশ্রয় দিয়েছ৷ জানাব, আয়কর ফাঁকি দিয়ে জমানো এই একলাখ ডলারের কথা, তখন?’

রাগে জেনশনের চোখমুখ লাল হয়ে উঠল৷ সে এক পা এক পা করে লোলার দিকে এগোতে লাগল, ‘ছেনাল মাগী, দাঁড়া—তোকে এমন শিক্ষা দেব, জীবনে ভুলবি না! এতদিন ভালো ব্যবহারের এই প্রতিফল? জুতিয়ে আমি তোকে লম্বা করব!’

‘সাবধান, মি. জেনসন—’, তীক্ষ্ণ চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুকের দরজার হাঁটু দিয়ে মারলাম এক ধাক্কা৷ দরজা সশব্দে বন্ধ হওয়ামাত্রই স্বয়ংক্রিয় তালা ‘ক্লিক’ করে এঁটে গেল৷

লোলা হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে৷ পলকে বুঝতে পাল, সিন্দুকের দরজায় স্বয়ংক্রিয় তালা এঁটে গেছে৷ অন্ধ ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে, হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগিণীর মতো হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ও এগিয়ে এল—ফটাস—রিভলভারের বিকট শব্দে জানালার সার্সীগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল৷

জেনসন লোলার সামনেই দাঁড়িয়েছিল৷ ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকালাম৷ কয়েক সেকেন্ড পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে রইল জেনসনের বিশাল দেহ, পরমুহূর্তেই হাঁটু ভেঙে দড়াম করে আছড়ে পড়ল মেঝেতে৷ পড়বার সময় হাতদুটো পাশের টেবিলটা আঁকড়ে ধরার সেটাও হুড়মুড় করে উলটে পড়ল৷ গোটা বাংলোটাই কেঁপে উঠল থরথর করে৷

লোলা ভয়ার্ত চিৎকারে সংবিৎ ফিরে পেলাম৷ তখন ওর হাত থেকে কুৎসিত দর্শন রিভলভারটা খসে পড়েছে৷ পিছন ফিরে দু-হাতে মুখ ঢেকে ও বসে আছে—যেন নিষ্ঠুর বাস্তবকে অস্বীকার করতে চাইছে৷

কাঁপতে কাঁপতে জেনসনের উপর ঝুঁকে পড়লাম৷ ওর বুকের বাঁ দিকটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷ দেহ নিথর নিষ্পন্দ৷ সামান্য সীসের টুকরো ওর জীবনীশক্তি নিঃশেষে শুয়ে নিয়েছে৷ প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা, হাসিখুশি কার্ল জেনসন যে আর বেঁচে নেই, এই সরল সত্যটুকু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না৷

‘তুমি—তুমি ওকে মেরে ফেলেছ!’ আমার গলা দিয়ে ভাঙা-বিকৃত স্বর বেরিয়ে এল৷

লোলা একটা আর্তনাদ করে উঠল৷ তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল৷ পরমুহূর্তেই অন্ধের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ কানে এল ওর শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দ৷

বিমূঢ়ভাবে জেনসনের মৃতদেহের কাছে বসে রইলাম৷ কী করব এখন? পুলিশে খবর দেওয়ার মতো গর্দভ আমি নই৷ লোলা যদি বলে বসে, জেনসনকে আমিই গুলি করেছি, আর আমার আসল পরিচয়টা জানিয়ে দেয়, তবে ওরা—আর কোন প্রমাণ চাইবে না৷

হঠাৎ বাইরে একটা গাড়ি দাঁড়ানোর শব্দ পেলাম৷ পরক্ষণেই অধৈর্যভাবে তার হর্ন বেজে উঠল—একবার—দুবার—তিনবার৷

চটপট উঠে দাঁড়ালাম৷ বাইরে যেই আসুক না কেন, তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার৷ নয়তো, ঘরের আলো দেখে কেউ যদি জানালা দিয়ে উঁকি মারে, তবে সর্বনাশের আর-কিছু বাকি থাকবে না৷

দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগোতেই পায়ে ঠেলক রিভলভারটা৷ ওটা কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে রাখলাম৷ বাংলো থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম পাম্পের দিকে৷

বাইরে বেরুতেই চোখে পড়ল একটা বিরাট সবুজ রঙের ক্রাইসলার পাম্পের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ গাড়ির আরোহী একজন মোটাসেটা বয়স্ক লোক, সঙ্গিনী একটি অল্পবয়সী মেয়ে৷ আমাকে আসতে দেখেই লোকটা গাড়ি থেকে নেমে এল, ‘বিশ লিটার পেট্রল আর দু-লিটার মোবিল—আচ্ছা, খাবার-দাবারের কিছু ব্যবস্থা হবে?’

লোকটার একটা কথাও আমার কানে ঢুকল না৷ আচ্ছন্নের মতো যান্ত্রিকভাবে গাড়ির ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে শুরু করলাম৷

‘কী হল?’ দাঁত বের করে খেঁকিয়ে উঠল লোকটা, ‘কানে গেল না আমার কথা? আমাদের ক্ষিদে পেয়েছে৷’

‘দুঃখিত, আজ রেস্তোরাঁ বন্ধ আছে৷’ সবিনয়ে তাকে জানালাম৷

‘বন্ধ আছে বললেই হবে! ক্ষিদে পেয়েছে, খাবার চাই—ব্যস!’

ট্যাঙ্কের ঢাকনা বন্ধ করে বিরক্তি দৃষ্টিতে বুড়োটার দিকে তাকালাম৷ যেমন করেই হোক এই লোকটাকে তাড়াতে হবে৷ যত সব ঝুট-ঝামেলা—

‘আমার কথা কানে যায়নি আপনার?’ ঠিক ওর মতো করেই খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘রেস্তোরাঁ এখন বন্ধ আছে!’

‘ও—’ কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে আমাকে দেখল সে৷ তারপর বলল, ‘তোমার মনিবকে ডাক৷ আমি খোদ মালিকের সঙ্গেই দেখা করতে চাই৷’

‘হ্যারি, কী করছ—’ মেয়েটি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল৷

‘তুমি চুপ করবে? আজ ওর একটা হেস্তনেস্ত আমি করবই! মালিকের সঙ্গে কথা না বলে আমি যাচ্ছি না৷’

লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে বাংলোর দিকে এগোতে লাগল৷ জানলার আলো দেখে হয়তো ভেবেছে ওটাই মালিকের ঘর৷ সর্বনাশ!!

দৌড়ে গিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়ালাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—উত্তেজিত হবেন না৷ দেখছি, আপনাদের খাওয়ার কী ব্যবস্থা করা যায়৷ মি. জেনসন এখন ঘুমোচ্ছেন—৷’

লোকটা কটমট করে আমার দিকে চাইল, যেন গিলে ফেলবে৷ আমার আপাদমস্তক ভালো করে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ঘুমোচ্ছেন?—ঠিক আছে, কি করছেন সেটা গিয়েই দেখছি৷’

সে পা বাড়াতেই আবার বাধা দিলাম, ‘আসুন, আসুন—রেস্তোরাঁয় চলুন৷’

অনেক কষ্টে ওদের খেতে বসিয়ে বাইরে এলাম৷ ঠান্ডা হাওয়ায় বসে একটু ভাববার সময় পেলাম৷

যেভাবেই ধরা যাক না কেন, আমার অবস্থা এখন কলে-পড়া ইঁদুরের মতো৷ অবশ্য লোলারও একই অবস্থা৷ তবে জেনসনের মৃত্যুটাকে নেহাত আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া আর-কিছু বলা যায় না৷ লোলা হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসার সময় আচমকা ট্রিগার চাপ পড়ে গুলি বেরিয়ে গেছে৷ নিঃসন্দেহে দুর্ঘটনা৷ কিন্তু পুলিশ কি তা মানবে? ওরা জানতে চাইবে, লোলা রিভলভার নিয়ে অত রাতে কি করেছিল? তখনই লোলাকে টাকার কথা বলতে হবে, আর তাহলেই একে একে স—ব বেরিয়ে পড়বে৷ লোলা খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়বে৷

তবে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একটা উপায় ওর আছে? তা হল, জেনসনের হত্যার দায়টা স্রেফ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া৷ এবং ও যে তাই-ই করবে, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ তার উপর আমার আসল পরিচয় ফাঁস হওয়ার পর পুলিশ আর একটুও দেরি করবে না৷ সোজা নিয়ে জেলে পুরে দেবে৷

ইচ্ছে হল, স্টেশন-ওয়াগন নিয়ে এখুনি পালাই৷ কিন্তু লোলা যদি পুলিশে ফোন করে জানিয়ে দেয়? অতএব প্রথমেই ফোনের তার কাটতে হবে৷ তারপর ওর হাত-পা বেঁধে রেখে কেটে পড়বে—কিন্তু না, তাতেও বিপদ আছে৷ হয়তো কোন গাড়ির চালক তেল নিতে এসে কাউকে না দেখে, বাংলোয় গিয়ে খোঁজ করতে পারে৷ তারপর লোলাকে হাত-পা বাঁধা-অবস্থায় দেখতে পেলেই ফোনের তার কাটার আর কোন মূল্য থাকবে না৷ ওই ড্রাইভার ব্যাটাই পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করবে৷

হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় ভর করল৷ লোলা যদি আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়, দিক না৷ আমিও তাহলে পুলিশকে এই এক লাখ ডলারের কথা জানিয়ে দেব৷ বলব, ওই টাকার কোন আয়কর জেনসন দেয়নি৷ তাহলেই লোলার বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন হু-উ-স করে মিলিয়ে যাবে৷ আর লোলার যা টাকার লোভ, ও কখনই এটা চাইবে না৷ তাছাড়া বন্ধ সিন্দুক খোলার জন্য লোলার এখন আমাকে প্রয়োজন৷ কারণ সিন্দুকের কম্বিনেশনটা জেনসন ছাড়া আর-কেউই জানে না৷ সুতরাং সিন্দুক ভাঙতে হলে আমি ছাড়া উপায় নেই৷

এই প্যাঁচেই লোলাকে কায়দা করব ঠিক করলাম৷ কিন্তু জেনসনের মৃতদেহটা কি হবে? নাঃ, দেশেশুনে কোন-একটা জায়গায় পুঁতে ফেলব৷ আর সেই সঙ্গে ওর অনুপস্থিতির জন্য একটা সুতসই গল্প ফাঁদতে হবে৷ খদ্দেরদের শোনাতে হবে না? নয়তো ওরা সে সন্দেহ করবে, রাতারাতি জেনসন গেল কোথায়!

বসে বসে ভাবছি এমন সময় সেই বুড়োটা আর মেয়েটা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এল৷ টাকা-পয়সা মিটিয়ে ওরা গাড়ি ছেড়ে দিল৷ যাবার আগে বুড়োটা বলে গেল, ‘ওহে, তোমার এই এঁড়ে রেস্তোরাঁয় আমি আর কোনদিন আসছি না৷’

‘কে তোমাকে আসতে বলছে, বাবা?’ মনে মনে জবাব দিলাম৷

ওদের হাত থেকে রেহাই পেতেই ছুটলাম বাংলোর দিকে৷ দরজা ঠেলে ঢুকতেই কানে এল রিসিভার তুলে নেওয়ার শব্দ—টুং—দেখি, লোলার হাতে টেলিফোনের রিসিভার৷

ও পুলিশে ফোন করছে৷

আমাকে দেখেই টেলিফোন ডায়ালের উপর থমকে দাঁড়াল ওর হাত৷

এই মধ্যেই লোলার চেহারা ভেঙে পড়েছে৷ ভয়ার্ত চোখজোড়া কোটরাগত৷ ঠোঁটদুটো পর্যন্ত সাদা শরীরের সমস্ত রক্ত কেউ যেন শুষে নিয়েছে৷

পাথরের চোখের মতো স্থিরদৃষ্টিতে একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে রইলাম৷ যেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আসন্ন সঙ্কেতের অপেক্ষা করছে সামান্য অঙ্গুলি-হেলনেই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে পরস্পরের উপর৷

লোলার হাতে রিসিভার, আর আমার হাতে .৪৫ রিভলভার—ওরই দিকে তাক করা৷

‘রিসিভার নামিয়ে রাখ, লোলা৷’ দাঁতে দাঁত ঘষে বলে উঠলাম, ‘না হলে—’

সিভলভারের দিকে চোখ পড়তেই লোলা শিউরে উঠল৷ মুহূর্তের জন্য হয়তো ভাবল, আমি ওকে নৃশংসভাবে খুন করব৷ কাঁপা হাতে ও রিসিভার নামিয়ে রাখল৷

‘শোবার ঘরে চলো, তোমার সঙ্গে কথা আছে৷’ রিভলভার নাচিয়ে ওকে এগোতে ইশারা করলাম৷ ও আস্তে আস্তে পিছোতে শুরু করল—

শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম৷ লোলা এগিয়ে গিয়ে খাটের উপর বসল৷ হাঁটুতে হাত রেখে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে রইল আমার হাতের রিভলভারের দিকে৷

‘তুমি কোথায় ফোন করছিলে, লোলা—পুলিশে?’ দাঁত বের করে হাসলাম, ‘ভালো—ভালো! হয়তো ভেবেছ, জেনসনকে খুন করার দায়টা আমার ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে, কি বলো না, ফন্দিটা মন্দ নয়! কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছ, পুলিশে খবর দিলে তোমার অবস্থাটা কী হবে? ওরা যদি আমাকে এই খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করে, তবে ওই টাকার কথা আমাকে বলে দিতে হবে৷ আর, ওরা সমস্ত আয়কর হিসেব করে বুঝে নেওয়ার পর, তোমার ভাগ্যে থাকবে লবডঙ্কা! তোমাকে আঙুল চুষতে হবে!’

লোলার চাউনি দেখে বুঝলাম, আমার কথায় ও ভয় পেয়েছ৷ অত টাকা হারাবার আশঙ্কায় ওর মনের ভিতর শুরু হয়ে গেছে প্রচণ্ড সাইক্লোন৷

‘এ ছাড়া আর-একটা উপায় আছে৷ তা হল জেনসনের দেহটা লুকিয়ে ফেলতে হবে৷ রটিয়ে দিতে হবে, ও জরুরি কাজে হঠাৎ বাইরে গেছে৷ তারপর যখন নিরাপদ মনে করব, সিন্দুক খুলে দিয়ে আমি এখান থেকে চলে যাব, এবং তোমার টাকা তুমি পেয়ে যাবে৷—এবার যাও,ইচ্ছে হলে পুলিশে ফোন করো, আর সেই সঙ্গে নিজের পায়েও কুড়ুল মারো৷’

‘কার্ল দুর্ঘটনায় মারা গেছে!’ লোলা চাপাস্বরে ফিসফিস করে উঠল, ‘আমি—আমি—’

‘দুর্ঘটনা? তুমি প্রমাণ করতে পারবে? উঁহু—৷ ওটা যে দুর্ঘটনা নয়, তার সাক্ষী আমি৷ আমি স্বচক্ষে দেখেছি, তুমি নৃশংসভাবে কার্লকে খুন করেছ৷ অতএব ওসব বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথায় এসো৷ তুমি যদি টাকা না চাও—তো ফোন করো পুলিশে—আমি বাধা দেব না আর যদি টাকা পেতে চাও, তবে আমার কথায় তোমাকে রাজি হতেই হবে৷’

লোলা ইতস্তত করল হয়তো আমার উদ্দেশ্য বুঝতে চাইল৷ ধৈর্য ধরে ওর উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম—উত্তেজনায় স্নায়ুতন্ত্রী যেন ছিঁড়ে পড়ছে৷ জানতাম, এত সবের পর ও আর পুলিশে খবর দেবে না, তবু রিভলভার হাতে সতর্ক রইলাম যদি—

অবশেষে ও মুখ খুলল, ‘টাকাগুলো এখনই দিয়ে দাও, আমি এখনই চলে যাচ্ছি৷ কথা দিচ্ছি, কাউকে তোমার কথা বলব না৷’

‘না! আমি যখন ভালো বুঝব, তখনই তুমি টাকাগুলো পাবে—তার আগে নয়৷ আর যদি এটুকু ধৈর্য না ধরতে পার, তো যাও, পুলিশকে ডাকো—৷’

এতক্ষণে নিজের বর্তমান অবস্থাটা ও বোধহয় উপলব্ধি করতে পারল৷ বুঝল, একটা অদৃশ্য ফাঁদ ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, যার হাত থেকে ওর আর মুক্তি নেই৷ হতাশা, ক্ষোভ, ক্রোধ একসঙ্গে জড়িয়ে পড়ল ওর মুখের উপর৷ প্রাণপণ শক্তিতে ও চিৎকার করে উঠল, ‘বেরিয়ে যাও ঘর থেকে৷’ ওর গলার শিরা রাগে উত্তেজনায় ফুলে উঠল-কাঁপতে লাগল তিরতির করে৷ উপুড় হয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লোলা কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ থেকে থেকে কেঁপে উঠতে লাগল ওর বিস্রস্ত দেহ৷ এবারের যুদ্ধে লোলা হেরে গেছে৷

ওকে কিছুক্ষণ সময় দেবার জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ আগে আঘাতটা সামলে উঠুক, তারপর দুজনে মিলে জেনসনের মৃতদেহটার ব্যবস্থা করব৷

ঘড়ি দেখলাম—সাড়ে এগারটা৷ নাঃ, অন্ততপক্ষে রাত একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে৷ তার আগে ট্রাকের ভিড় কমবে বলে মনে হয় না৷ সময় কাটাবার জন্য রেস্তোরাঁয় গিয়ে কাজে লেগে গেলাম৷

রাত সোয়া একটায় আবার বাংলোয় ফিরে এলাম৷ গত একঘণ্টায় আর-কোন ট্রাক বা গাড়ি আসেনি৷ সুতরাং এই উপযুক্ত সময়৷

লক্ষ্য করলাম, লোলার ঘরে এখনও আলো জ্বলছে৷ ঘরের দরজায় পৌঁছে হাতল ঘোরাতেই বুঝলাম, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷

‘লোলা! আর দেরি করো না—এসো—’ ওকে ডাকলাম৷

‘চলে যাও! চলে যাও এখান থেকে!’ বন্ধ দরজার ও-পিঠ থেকে ওর চিৎকার ভেসে এল, ‘আমি ওসবের মধ্যে নেই! তোমার যা ইচ্ছে তাই করো!’

বুঝলাম, ও এখনও প্রকৃতিস্থ হয়নি৷ কিন্তু আর সময় নষ্ট করলে চলবে না৷ ও যখন আসবে না, তখন একাই সব করতে হবে৷

প্রথমে ভেবেছিলাম, জেনসনকে বাইরে মরুভূমির মধ্যে কোথাও পুঁতে ফেলব৷ কিন্তু ভেবে দেখলাম গর্ত খোঁড়ার সময় কেউ আমাকে দেখে ফেলতে পারে৷ তারই ঠিক করলাম, গুমটিঘরেই ওকে কবর দেব৷ তাহলে, কেউ যে দেখে ফেলবে, এমন সম্ভাবনা কম৷

একটা কোদাল আর একটা বেলচা নিয়ে গুমটিঘরে গেলাম৷ কোণের দিকে পুরোনো লোহালক্কড়ের স্তূপের পাশে একটা জায়গা দেখে খুঁড়তে শুরু করলাম৷

প্রায় সাড়ে তিনটের সময় গর্ত খোঁড়া শেষ করে ফিরে চললাম ঘরের দিকে৷ এই অমানুষিক পরিশ্রমে একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছি৷ ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে কাজ করার ঢোলা অ্যাপ্রনটা গায়ে চড়িয়ে বাংলোয় ফিরে গেলাম৷

বসবার ঘরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে আলোর সুইচ জ্বেলে দিলাম৷ জেনসনের পর্বতপ্রমাণ দেহ তখনও একইভাবে পড়ে রয়েছে৷ গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম, মৃতদেহ শক্ত হতে শুরু করেছে৷ আর ঘণ্টাখানেক দেরি হলেই নড়ানো কঠিন হবে৷

তাই আর দেরি না করে গুমটিঘরে ফিরে গেলাম৷ ভারী-ভারী ইঞ্জিনগুলোকে নাড়াচাড়া করার জন্য একটা ছোট ঠেলাগাড়ি ছিল৷ সেটাকে ঠেলে নিয়ে চললাম৷ তার লোহার চাকাদুটো ঢিলে থাকায়, বিশ্রী ঘড়-ঘড় শব্দ হতে লাগল৷ বাংলোর কাছে পৌঁছে ওটাকে টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে তুললাম৷ তারপর বারান্দা পার হয়ে এগোলাম বসবার ঘরের দিকে৷ চাকাদুটোর বিরক্তিকর শব্দের এতটুকু বিরাম নেই৷ কিন্তু আমি কি করছি লোলা একবারও দেখতে এল না৷

বসবার ঘরে পৌঁছে জেনসনের ভারী দেহটাকে অনেক কষ্টে টেনে গাড়িতে তুললাম৷ উফ, কম করে তিন মণ ওজন হবে৷ রক্ত এর মধ্যেই জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে৷ ওর মরা-মুখে নেমে এসেছে প্রশান্তির ভাব৷ আর-একবার বুঝি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল৷ কিন্তু দুঃখ করে লাভ নেই৷ এ তো সামান্য একটা মৃতদেহ! এর মধ্যে কোন কার্ল জেনসন নেই!

গাড়িটা বসবার ঘরে রেখে, বাইরে এসে দুপাশে তাকালাম৷ না, কোন গাড়িই দেখা যাচ্ছে না৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম৷ দূরের কোথাও কোন আলো চোখে পড়ছে না৷ শুধু বিষণ্ণ চাঁদ ভেসে রয়েছে পাহাড়ের মাথায়৷

ফিরে এসে গাড়িটা দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে চললাম৷ সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই মহা বিপদ! গাড়িটাকে এক-এক ধাপ নামানোর কোন সাড়া পাওয়া গেল না৷ একটু ভয় পেলাম৷ মনে হল, কেউ হয়তো শুনে ফেলছে এই হতচ্ছাড়া শব্দগুলো৷ উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে গাড়ি নিয়ে গুমটিঘরের দিকে এগোলাম৷

গর্তের পাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে, জেনসনের দেহটা ঠেলে ফেললাম গর্তের ভিতর৷ বেলচা দিয়ে মাটি চাপা দিতে শুরু করলাম৷

গর্ত ভরাট করে, উপরটা সমান করতে করতে প্রায় একঘণ্টা লেগে গেল৷ তারপর কাজ করার যে বড় ভারী টেবিলটা ছিল, সেটাকে টেনে নিয়ে এসে রাখলাম জেনসনের কবরের উপর৷ কারুর পক্ষে জানা তো দূরের কথা, আন্দাজ করাও সম্ভব নয় যে ওটার তলায়—মাটির চার ফুট নিচে জেনসন শুয়ে আছে৷

গুমটিঘরের আলো নিভিয়ে ঘরে ফিরে গেলাম৷ স্নান করে, জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম৷ এর মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে৷ পাহাড়গুলোকে আকাশে পটভূমিকায় আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে৷ আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দেবে ভোরের সূর্য৷

শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম৷ জেনসনের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প তৈরি করতে হবে৷ যদি তেমন বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে কেউ হয়তো সন্দেহ করে পুলিশে যেতে পারে৷ না, গল্পটা ভালো হওয়া চাই-ই—

সকাল সাড়ে ছ-টার সময় ট্রপিকা স্প্রিংসে যাবার প্রথম ট্রাকটা এসে দাঁড়াল৷ ট্যাঙ্কে তেল ভরছি, ড্রাইভারটা হঠাৎ জিগ্যেস করে বসল, ‘মি. জেনসনকে যে দেখছি না?’

এরকম অবস্থায় যে পড়তে হবে, জানতাম৷ এখান থেকে দিনের পর দিন শুনতে হবে এই একই প্রশ্ন—‘জেনসন কোথায়!’

‘মি. জেনসন এখানে নেই, অ্যারিজোনায় গেছেন৷ ওখানে আরেকটা পেট্রল-পাম্প খুলবেন, তাই জায়গা দেখতে গেছেন৷’

গত রাতে ভেবে ভেবে এই গল্পটাই তৈরি করেছি৷ এর চেয়ে ভালো কিছু আর মাথায় আসেনি৷

‘তাই নাকি?’ লোকটাকে বেশি কৌতূহলী মনে হল, ‘তাহলে এটা এখন কে দেখাশোনা করবে, তুমি?’

‘হ্যাঁ—’ একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললাম, ‘আমি আর মিসেস জেনসন৷’

‘মিসেস জেনসন!’ লোকটা চমকে উঠল৷ চকিতে ভুরু কুঁচকে মুখ তুলে তাকাল—যেন ওর কানে কেউ একটা জ্যান্ত সাপ ঢুকিয়ে দিয়েছে, ‘তার মানে—উনি এখানে রয়েছেন? বাঃ, বেশ—বেশ৷ —জেনসনের বউটা ভালোই দেখতে—কি বলো?’ আমার দিকে আড়চোখে চেয়ে ব্যাটা মুচকি হাসল৷

রাগ হলেও চেপে গেলামে৷ এ তো সবে শুরু—এভাবেই চলবে দিনের পর দিন—মাসের পর মাস৷ ভাব শালা, যা খুশি ভাব! ভাবতে তো আর পয়সা লাগে না! তবে প্রমাণ তুমি করতে পারছ না৷

লোকটা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া সেরে, দাম মিটিয়ে ট্রাকে এসে উঠল৷ একথা-সেকথা বলতে বলতে আমিও ট্রাক পর্যন্ত এলাম৷ আর ঠিক তখনই ঘটে গেল চরম বিপর্যয়৷

বাংলোর দরজা খুলে লোলা বেরিয়ে এল৷ পরনে সেই ছোট্ট লাল প্যান্ট, গায়ে সাদা চোলি৷

লোলাকে দেখেই লোকটা সড়াৎ করে জিভে জল টানল৷ বিরাট হাঁ করে চেয়ে রইল ওর দিকে৷ তারপর আমার দিকে চেয়ে হাসল—কান-এঁটো-করা হাসি৷ ‘তোমার জায়গায় কাজ করতে পারলে আমি খুশি হতাম, দোস্ত৷ চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও! তোমার কাজটা বেশ রসালো মনে হচ্ছে!’

দড়াম করে ট্রাকের দরজা বন্ধ করে সে আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপল, তারপর গাড়ি ছেড়ে দিল৷ লোলার পাশ দিয়ে যাবার সময় তীক্ষ্ণ কান-ফাটানো শব্দে শিস দিয়ে উঠল হতচ্ছাড়া ড্রাইভারটা৷

আট

লোলার দিকে একনজরে তাকিয়ে বুঝলাম, গত রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি৷ চোখের কোলে কালি, মুখে কেমন একটা শ্রান্ত, অবসন্ন ভাব৷

ও যে ওইরকম স্বল্প পোশাকে কোন অচেনা লোকের সামনে বেরিয়ে আসবে, ভাবতে পারিনি৷ এখন ড্রাইভারটা পাঁচজনকে একথা-সেকথা বলে বেড়াবে৷ ঠিক যে ভয়টা করছিলাম, তাই হয়েছে৷

টেবিলের উপর রাখা গাউনটা নিয়ে ওর মুখের উপর ছুড়ে দিলাম, ‘নাও, দয়া করে এটা পরে নাও৷ এই পোশাকে বেরিয়ে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে না, তুমি মেয়েছেলে৷ গাউনটা পরা থাকলেও লোকে সেটা বেশ বুঝতে পারবে!’

‘কেন, কি হয়েছে?’ ওর চোখে শূন্য দৃষ্টি—আমার কথা যেন কিছুই বুঝতে পারেনি৷

‘দোহাই তোমার, একটু মাথা খাটাবার চেষ্টা করো৷’ অধৈর্য স্বরে থমকে উঠলাম, ‘ড্রাইভারটা একটু আগেই তোমাকে ওই পোশাকে দেখেছে৷ তারপর আমাকে কি বলেছে জান? আমার কাজটা নাকি খুব রসালো! এভাবে কথাগুলো ছড়াতে ছড়াতে, কোন্দিন দেখবে পুলিশ এখানে এসে হাজির হয়েছে!’

মুখ গোমড়া করে ও গাউনটা পরে নিল৷ তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করল, ‘কার্লের কি করলে?’

‘ওর দেহটা আমি পুঁতে ফেলেছি৷—যাকগে, শোনো—এখন থেকে আমরা দুজনে মিলেই এ জায়গাটা দেখাশোনা করব৷ কিন্তু কেউ কারুর ব্যাপারে নাক গলাব না৷ যখন সময় হবে, আমি চলে যাব৷ যাবার আগে সিন্দুক খুলে দিয়ে যাব৷’

লোলার চোখে ঝিলিক দিল হায়েনার লোভাতুর দৃষ্টি, ‘কিন্তু সেটা কবে?’

‘তা বলা সম্ভব নয়৷ যদ্দিন না পুলিশ আমার খোঁজ করা বন্ধ করছে, আমি এ জায়গা ছেড়ে নড়ছি না৷’

মুহূর্তই বড় হতাশ দেখাল লোলাকে৷ বুঝলাম, টাকার জন্য একটা দিনও অপেক্ষা করতে ও রাজি নয়৷

‘কিন্তু কার্লের বন্ধু-বান্ধব আছে, তারা জানতে চাইবে কার্ল কোথায় গেছে৷’

‘সেসব আমার অকে আগেই ভাবা হয়ে গেছে৷ তোমাকে কেউ কিছু জিগ্যেস করলে বলবে, সে অ্যারিজোনায় গেছে৷ মাস দুয়েকের আগে ফিরবে না৷ এ ক-মাস তুমিই এসব দেখাশোনা করবে, আর আমি তোমাকে সাহায্য করছি৷’

‘সে না হয় হল৷ কিন্তু দুমাস পর কি হবে? কার্লকে তো ওরা আর ভুলবে না তখনও একই কথা বার বার জিগ্যেস করবে৷ কি জবাব দেব তখন?’

‘দু’মাস পর তুমি কার্লের একটি চিঠি পাবে৷ তাতে লেখা থাকবে, সে ওখানে গিয়ে আরেকটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে এবং তাকে শিগগিরই বিয়ে করছে৷ এখানে সে আর ফিরবে না৷ তোমাকে যাতে খাওয়া-পরার কষ্টে না পড়তে হয়, সেজন্য এখানকার পেট্রল-পাম্পটা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছে৷ এই দুঃসংবাদটা প্রত্যেকেই নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করবে৷ ব্যস—ঝামেলা চুকে গেল৷ তারপর চারদিক ঠান্ডা হলে আমিও কেটে পড়ব৷ তখন ইচ্ছে করলেও এ জায়গাটা বেচে, তুমি অন্য কোথাও চলে যেও৷’

‘তার চেয়ে এক কাজ করো কার্ল তোমাকে যে তিরিশ হাজার ডলার দিচ্ছিল, সে-টাকাটা তুমি এখনই সিন্দুক খুলে নিয়ে নাও৷ তাহলে ন্যু-ইয়র্কে পৌঁছতে তোমার অসুবিধে হবে না৷ তারপর বাকি টাকাটা—’

‘না৷ জেনসনের একটা টাকাও আমি ছোঁব না৷ তা ছাড়া এ জায়গাটা আমার পক্ষে বেশ নিরাপদ৷ আর কিছুদিন না দেখে পালানোটা ঠিক হবে না৷ বলেছি তো, যখন যাব তোমার টাকা তুমি পেয়ে যাবে—তার আগে নয়৷’

লোলা উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে একটা গাড়ির শব্দ পেলাম৷ চটপট রান্নাঘর ছেড়ে বেরোতেই দেখি, একজন লম্বা, থলথলে চেহারার পুরুষ রেস্তোরাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে—চুলের রঙ সোনালী, গাঢ় নীল চোখ, বয়স আন্দাজ চল্লিশ হবে৷

লোকটা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে দেখল৷ তারপর দরজা ছেড়ে কয়েক পা এগিয়ে এল, ‘জেনসন কোথায়?’

আচমকা এই সরাসরি প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলাম৷ কোনরকমে জবাব দিলাম, ‘তিনি—তিনি বেরিয়েছেন৷’

‘বেরিয়েছেন!! এই সাতসক্কালে!! কোথায় গেছে ও?’

‘কিছু দরকার থাকলে আমাকে বলতে পারেন৷’ তারপর কি মনে হতেই আবার বললাম, ‘মিসেস জেনসনকে ডেকে দেব?’

কথাবার্তার শব্দ শুনে লোলা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল৷ আগন্তুকের দিকে চোখ পড়তেই মিষ্টি হাসিতে ওর মুখ ভরে গেল, ‘ও, মি. ল্যাশ! এত সকাল সকাল যে—কি ব্যাপার?’

লোলাকে দেখে ল্যাশের মুখ থেকে সন্দেহের ছায়াটা মিলিয়ে গেল৷ সে টুপি খুলে লোলাকে অভিবাদন জানাল, সুপ্রভাত মিসেস জেনসন৷ ওয়ালেসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারে কার্লের সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল৷ ও বোধ হয় আপনাকে বলেছে, আমাদের সভাপতি ওয়ালেস কাল রাতে হার্টফেল করে মারা গেছে৷ তাঁর শোকসভায় কার্লেরই বক্তৃতা দেবার কথা৷ কিন্তু এ আমাকে বলল, কার্ল নাকি এখানে নেই!’

চোখ ফেরালাম লোলার দিকে৷ ওয়ালেসের মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্রই, হাসি মিলিয়ে গিয়ে ওর মুখে একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব ফুটে উঠল৷ ওফ, অভিনয় জানে বটে মেয়েটা!

‘হ্যাঁ, ও ঠিকই বলেছে৷ একটু আগেই এলেই কার্লের সঙ্গে আপনার দেখা হত৷ এই আধঘণ্টা হল ও ট্রপিকা স্প্রিংসে রওনা হয়েছে৷’

ল্যাশ অবাক হয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকাল, ‘অসম্ভব! এই তো ঢুকবার সময় দেখলাম, ওর গাড়িটা গ্যারেজেই রয়েছে, তাহলে—’

ল্যাশের কথায় হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল গলার কাছে! তাই তো, গাড়িটার কথা তো ভাবিনি!

কিন্তু দেখলাম মিথ্যে কথা বলতে লোলার জুড়ি নেই৷ ল্যাশের কথায় ওর মুখের ভাবে এতটুকু পরিবর্তন হল না৷ ও হাসল—ছোটদের নির্বুদ্ধিতায় বড়রা যেমন হাসে, সেইরকম হাসি৷ ‘ঠিকই দেখেছেন, মি. ল্যাশ৷ কার্ল বলে গেছে, ফিরতে ওর মাস দুয়েক লাগবে৷ এতদিন গাড়ি ছাড়া আমার অসুবিধে হবে ভেবে, গাড়িটা আর নিয়ে যায়নি৷ অ্যাডাম ওকে তার ট্রাকে করে ট্রপিকা স্প্রিংসে নিয়ে গেছে৷’

‘ও—!’ ল্যাশ চোয়ালে হাত বোলাতে লাগল৷ বুঝলাম, সে ভীষণ অবাক হয়ে গেছে৷ কার্লের হুট করে উধাও হয়ে যাওয়াটা তার কাছে ভালো ঠেকছে না৷

‘কেন গেছে কিছু জানেন?’ একটা ক্ষীণ সন্দেহ কি ল্যাশের মনে উঁকি মারছে?

‘গতরাতে মিটিং থেকে ফেরার পর কার্লের একটা ফোন আসে৷ কে যেন খবর দেয়, অ্যারিজোনায় একটা পেট্রল-পাম্প নাকি জলের দরে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে৷ ব্যস, এই খবর পেয়েই ও সাত-তাড়তাড়ি বেরিয়ে পড়েছে৷ কাউকে জানাবার আর সময় পায়নি৷’

‘অ্যারিজোনা! সে তো অনেক দূর! তা— ওকি জায়গা ছেড়ে একেবারে চলে যাবার মতলব করছে নাকি?’

‘না, না৷ আমার মনে হয়, ওখানে দেখাশোনার জন্য কোন লোক ঠিক করেই ও ফিরে আসবে৷ এসে হয়ত আপনাকে সব বলবে৷’

সত্যি, লোলার প্রশংসা করতে হয়৷ গল্পটা এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে আমিও পারতাম না৷

লোলার উত্তরে ল্যাশ যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হল, ‘মানে—ব্যাপার কি জানেন, আমি ভাবতেই পারিনি, কার্ল এমনি না বলে-কয়ে হুট করে চলে যাবে৷ যাকগে, ও ফিরে এলেই আমাকে ফোন করতে বলবেন—’

যেতে গিয়েও ল্যাশ থমকে দাঁড়াল, ঘুরে তাকাল আমার দিকে, ‘একে তো চিনলাম না, মিসেস জেনসন?’

‘ওর নাম জ্যাক প্যাটমোর—আমাদের এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছে৷ কার্লই ওকে এনেছে৷’

‘হুঁ—’ ল্যাশের চাউনি দেখে বুঝলাম, আমাকে তার একটুও পছন্দ হয়নি৷ একটু ইতস্তত করে সে দরজার দিকে পা বাড়াল, ‘আচ্ছা—মিসেস জেনসন, চলি—৷ কার্ল ফিরে এলে আমাকে অবশ্যই খবর দেবেন৷’

ল্যাশ চলে যেতেই লোলা রান্নাঘরে ফিরে গেল৷ এতক্ষণে সাহস ফিরে পেলাম৷ জেনসনের অ্যারিজোনায় যাওয়ার গল্পটা ল্যাশ যখন বিশ্বাস করেছে, অন্য লোকেও করবে৷ তবে আমার সঙ্গে লোলাকে জড়িয়ে যে অনেক কথা উঠবে, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ অতএব সাবধান থাকতে হবে৷

আজ রবিবার৷ কাজের চাপ অত্যধিক৷ সারা দিনে লোলা আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি৷ রাত বারোটার সময় কাজের হাত থেকে রেহাই পেলাম৷ একটু ফুরসত হওয়ায় গেলাম রান্নাঘরে৷

গিয়ে দেখি রান্না শেষ হয়ে যাওয়ায় লোলা ওর গাউনটা খুলতে শুরু করেছে৷ আমাকে দেখেই ও থমকাল৷ কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য৷ আবার গাউন খোলায় মন দিল৷

হঠাৎ যেন প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম৷ শরীরে বয়ে গেল বিদ্যুতের স্রোত৷ বুকের মধ্যে লকলক করে জ্বলে উঠল কামনার লেলিহান শিখা৷ মুহূর্তে বিদ্রোহ করতে চাইল আমার অশান্ত যৌবন৷ কিন্তু প্রচণ্ড চেষ্টায় নিজেকে সংযত করলাম৷

লোলা গাউনটা খুলে একটা বাক্সে রাখল৷ তারপর রান্নাঘরের খিড়কি-দরজা খুলে বেরিয়ে গেল৷

আলো নিভিয়ে ঘিরে ফিরে গেলাম৷ দেখা যাক এইভাবে কদ্দিন চলে! শোবার আগে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম৷

লোলার শোবার ঘরে জানালা হাট করে খোলা৷ ঘরে আলো জ্বলছে৷ শুধু তাই নয়, লোলা দাঁড়িয়ে রয়েছে আলোর ঠিক নিচেই৷ পরনের চোলিটা ওর বাঁ ঝুলছে৷ একটু পরেই ও ঝুঁকে পড়ে প্যান্টটা মেঝে থেকে তুলে নিল৷ বোধহয় প্রয়োজনের একটু বেশিই অপেক্ষা করল৷ তারপর লঘুছন্দে এগিয়ে চলল বাথরুমের দিকে—বন্ধ হয়ে গেল বাথরুমের দরজা৷

অবশ হাতকে প্রাণপণ চেষ্টায় জানলা বন্ধ করতে বাধ্য করলাম৷

এভাবে আর কতদিন? মনে মনে প্রশ্ন করলাম নিজেকে৷

একই ভাবে দিন যায়৷

সারাটা দিন লোলার রান্নাঘরেই কাটে৷ আমার দিকে একবার তাকানো তো দূরের কথা, একটা কথাও বলে না৷ অর্থাৎ, রান্না ছাড়া সব কাজ আমাকে একাই করতে হয়৷

রাতের নিয়মেরও কোন হেরফের নেই৷

রাত এগারটা বাজলেই লোলা বাংলোয় ফিরে যায়৷ ওর শোবার ঘরের জানালা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয় না৷ এই চূড়ান্ত প্রলোভন এড়াবার জন্য এই সময়টা রেস্তোরাঁ ছেড়ে একদম বেরোই না৷ যখন দেখি বাংলোর আলো নিভে গেছে, তখন শুতে যাই৷ কিন্তু শয়নে-স্বপনে-জাগরণে চোখের সামনে যদি একই ছবি ভাসতে থাকে—ঘুমোব কখন?

এইভাবে চারদিন কেটে গেল৷ গরমটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে৷ উত্তপ্ত মরুভূমির হাওয়া হয়ে উঠল অসহ্য৷ ট্রাক-গাড়ির চালাচল কমে আসতে লাগল৷ কারণ মালপত্র পরিবহনের পক্ষে এইরকম আবহাওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর৷ অতএব স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপ একেবারে কমে এল৷ অলসভাবে বসে থাকার ফলে মাথায় শয়তান এসে বাসা বাঁধে৷ অতিকষ্টে তাকে মন থেকে সরিয়ে রাখি৷

জেনসন মারা যাবার পর আটদিনের দিন লোলা গাড়ি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে গেল৷ সম্ভবত সাপ্তাহিক কেনাকাটা করতে৷ একবারও ভাবল না কাজকর্ম আমি একা সামলাব কেমন করে!

ও চলে যাওয়ার পর যা হোক কিছু-একটা করার জন্য, স্টেশন-ওয়াগনটার ডিস্ট্রিবিউটর হেড নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম গুমটিঘরের দরজায় একটা মানুষের ছায়া৷ চমকে মুখ তুলে তাকালাম৷ মুহূর্তে পায়ের নীচে মাটি যেন দুলে উঠল৷

দরজায় দাঁড়িয়ে জর্জ রিক্স৷

এতদিন ওর কথা আমার মনেই ছিল না৷ আসন্ন বিপদের জন্য মনে মনে সতর্ক হলাম৷ রিক্সের পরনে সেই নোংরা পোশাক৷ পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ওর সেই কুকুরটা—বিষণ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে৷

রিক্সের চোখে শকুনের চাউনি—ঝুঁকে পড়ে যেন কোন মড়া খুঁজে বেড়াচ্ছে৷

‘সুপ্রভাত!’ আড়চোখে আমার দিকে তাকাল সে, ‘কার্ল কোথায়?’

ঘর্মাক্ত হাতদুটো কাপড়ে মুছতে মুছতে জবাব দিলাম, ‘মি. জেনসন এখানে নেই, বাইরে গেছেন৷’

‘বাইরে!’ ঘরের ভিতর কয়েক পা এগিয়ে এল রিক্স, ‘কি বলছ তুমি?—বাইরে গেছে?’

‘কী চাই আপনার?’

‘শোন ছোকরা, বেশি ফড়ফড় করো না৷ আমার দরকার আমি বুঝব৷ তুমি এখানে চাকরি কর বলেই তো জানতাম! নাকি হঠাৎ মালিক হয়ে বসেছ?’

‘আমি তো তা বলিনি৷ আপনার কি দরকার, তা জানতে চেয়েছি৷’ মেপে মেপে উত্তর দিলাম৷ কারণ, একে চটালে চলবে না৷

‘তা রঙ্গিণী কোথায়? এখানে নেই নাকি?’

‘রঙ্গিণী? আপনি কী বলছেন—’

‘আমার কাছে আর ন্যাকা সেজ না৷ কার্লের বউয়ের কথা বলছি—কোথায় সে?’

‘কিছুক্ষণ আগে ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন—’

রিক্স ঝুঁকে পড়ে কুকুরটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল৷ কিন্তু কেন জানি না, কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে সরে যেতে চাইল৷

‘কার্ল কোথায় গেছে?’

‘ব্যবসার ব্যাপারে অ্যারিজোনায় গেছেন৷’

‘অ্যারিজোনা! কি কাজে?’

বলার সঙ্গে সঙ্গে সে কুকুরটার পেটে ক্যাঁৎ করে লাথি মারল৷

‘সেটা মি. জেনসনকেই জিগ্যেস করবেন৷’

‘কবে ফিরবে ও?’

‘ঠিক জানি না৷ হয়ত মাস দুয়েক লাগবে৷’

‘দু মাস?’ বিস্ময়-রহস্য যুগপৎ খেলে গেল রিক্সের চোখে, ‘অথচ ওর বউ এখানে পড়ে রইল! ব্যাপারটা কী?’

‘দেখুন, আমার কাজ আছে৷’ বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আপনার কিছু দরকার থাকলে তাড়াতাড়ি বলুন৷’

‘কার্লের সঙ্গে আমায় দেখা করা ভীষণ জরুরি—ওর ঠিকানাটা আমাকে দাও৷’

‘ঠিকানা আমি জানি না৷’

‘তাহলে মিসেস জেনসন নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, হুঁ?’

‘বলছি না, ঠিকানা আমরা জানি না৷ শুধু জানি, তিনি অ্যারিজোনায় গেছেন৷’

‘আমরা!’ রিক্সের চোখে মুখে ব্যঙ্গের কৌতুক নেচে উঠল, ‘এর মধ্যেই ‘আমরা’! কার্ল যে বোকা তা জানতাম, কিন্তু এতবড় গর্দভ, তা তো ভাবিনি! নাঃ, তোমার ভাই বুদ্ধি আছে৷ ওজনদার আস্লি মাল চিনতে তোমার জুড়ি নেই৷’ জিভটা ঠোঁটের উপর একবার বুলিয়ে নিল রিক্স, শেয়ালের চাউনি নিয়ে হাসল, ‘যাকগে, ওসব তোমাদের ব্যাপার তোমরা বুঝবে—কার্লের ঠিকানাটা শুধু আমাকে দাও৷ আমার পেনসনের কাগজে ওর সই দরকার৷ সবসময় কার্লই ওটা সই করে৷ তাই ওর সই না হলে পেনসনের টাকা পাওয়া যাবে না৷’

‘তার আমি কি করতে পারি? ঠিকানা জানা থাকলে আপনাকে আগেই দিয়ে দিতাম, একবারের বেশি দুবার বলতে হত না৷ মি. জেনসন না ফেরা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে৷’

রিক্স টুপি খুলে মাথায় হাত বোলাল—চোখের মণি অচল, অনড়৷ কুকুরটাও অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল৷

‘তার মানে দু-মাস অপেক্ষা করতে হবে?—তা, এতদিন কি হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকব?’

‘সে আমি কি জানি, হাওয়া খাবেন কি জল খাবেন!’ রাগে বিরক্তিতে অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই স্বরকে সংযত করে বললাম, ‘এ ক দিন একটা কাজ-টাজও তো করতে পারেন!’

‘তোমার কাছ থেকে কোন উপদেশ শুনতে আমি আসিনি, খোকা!’ দাঁত কিড়মিড় করে উঠল রিক্স, ‘আমার হার্টের অসুখ আছে৷ কোনরকম কাজ করা ডাক্তারের বারণ—তাহলে ঠিকানা লোলাও জানে না?’

‘কতবার আপনাকে বলতে হবে! আমরা কেউই জানি না৷’

রিক্স ঝুঁকে পড়ে কুকুরটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল৷ হঠাৎ যেন জবাব খুঁজে পেয়ে চোখ তুলে তাকাল, ‘মনে কর যদি সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে যায়? যদি লোলা অসুস্থ হয়ে পড়ে? ধর, এই পেট্রল পাম্পে যদি আগুন লাগে, তাহলে? কখন কার্লকে নিশ্চয়ই খবর দেবে? জরুরী প্রয়োজনে খবর দেওয়ার জন্যে কার্ল নিশ্চয়ই একটা ঠিকানা দিয়ে গেছে?’

‘না! মিসেস জেনসনও অসুস্থ হচ্ছেন না, আর এখানে আগুনও লাগছে না! অতএব ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ো! আমার কাজ আছে৷’

‘কিন্তু সই না পেলে পেনসনের টাকা তো পাব না!’ ভাঙা ফ্যাঁসফ্যাঁসে স্বরে রিক্স যেন আবেদন জানাল৷

দিয়ে দিই না গোটা কয়েক ডলার, ব্যাটার হাত থেকে যদি নিষ্কৃতি পাওয়া যায়?—কিন্তু নাঃ, আজ যদি টাকা দিই, তবে রিক্স যেরকম নাছোড়বান্দা, রোজ এসে টাকার জন্য ঘ্যানঘ্যান করবে৷ ভাগিয়ে দেওয়াই ভালো৷

‘যাও, যাও—কেটে পড়! আর ঝামেলা করো না৷’ একটু বেশিই রুক্ষ হলাম৷

তারপর স্টেশন-ওয়াগনটার কাছে ফিরে গিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর হেডটা আটকে বনেট বন্ধ করে দিলাম৷

‘মিসেস জেনসন কখন ফিরবে?’

‘বলতে পারছি না—তবে মনে হয় দেরি হবে৷’

কিছুক্ষণ নীরবতা৷ অবশেষে রিক্সের ভাঙা স্বর কানে এল, ‘আমাকে কুড়িটা ডলার ধার দিতে পারবে?’

‘টাকা তো আর আমার নয়, সে ইচ্ছেমতো ধার দেব! যাও, আর বিরক্ত করো না৷’

কিন্তু রিক্সের নড়বার কোন লক্ষণ দেখা গেল না৷

উবু হয়ে বসে রেঞ্চ দিয়ে গাড়িটার একটা চাকা খুলতে শুরু করলাম৷ চাকাটায় একটু টাল থাকায় গাড়ি চালাবার সময় স্টিয়ারিং কাঁপে, তাই—

‘ভাবছি অ্যারিজোনা পুলিশকে খবর দেব৷ ওরা হয়ত কার্লের ঠিকানা খুঁজে বের করতে পরবে৷’

একটা শক্ত নাট প্রাণপণ শক্তিতে খোলার চেষ্টা করছিলাম, রেঞ্চটা নাটের গা থেকে পিছলে যেতেই সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম৷ রিক্স বলে কি!

ও কিন্তু কথাগুলো অত্যন্ত সাধারণভাবেই বলেছে৷ হয়তো তেমন কিছু ভেবে বলেনি৷ কিন্তু পুলিশ যদি রিক্সের কথায় সত্যি সত্যি জেনসনের খোঁজ শুরু করে দেয়! তাহলেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে! মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল৷ সব-কিছু যেন গুলিয়ে যেতে লাগল৷

‘তাই কর!’ গলারস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করলাম, ‘পুলিশ দিয়ে খোঁজ করাচ্ছ শুনলে মি. জেনসন হয়তো বেশি খুশি হবেন—হয়তো তোমার কাগজে একটার জায়গায় দুটো সই করে দেবেন!’

ছড়ে-যাওয়া আঙুলটা চুষতে চুষতে রিক্সের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম৷

‘তা কি আর করব! তুমি যখন কার্লের ঠিকানা জানই না, তখন এ ছাড়া আর উপায় কি! কার্ল যা খুশি ভাবে ভাবুক, ওর সই আমাকে পেতেই হবে৷—তবে আমার কি মনে হয় জান? লোলা হয়ত জানে৷ তোমার কাছে চেপে গেছে৷ লোলা ফিরলে ওকে বলো৷ শেষ পর্যন্ত ও যদি ঠিকানা না-ই দেয়, তবে অ্যারিজোনা পুলিশকেই জানাব৷ কার্লকে খুঁজে বের করতে ওদের বেশি সময় লাগবে না৷’

এবার রিক্সের দিকে ঘুরে তাকালাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—মিসেস জেনসন ফিরলে তাঁকে বলব৷ আমি যতদূর জানি—ঠিকানা তিনিও জানেন না,—তবু একবার জিগ্যেস করব৷’

রিক্সের মতো লোককে একথা বলা মানে, হার স্বীকার করে নেওয়া৷ কিন্তু কি করব? কোন পুলিশ অফিসার এখানে এসে জেনসনের খোঁজ করবে, একথা ভাবলেই হাত পা অসাড় হয়ে আসছে৷

আমার কথায় রিক্স হাসল৷ ধূর্ত শেয়ালের হাসি, ‘তাই বলো৷ আমি কাল রাতে আবার আসব৷ ঠিকানাটা জোগাড় করে রেখো কিন্তু—’

রিক্স ওর কুকুরটাকে নিয়ে গাড়িতে ফিরে চলল৷

ওরা চলে যেতেই ভীষণ ক্লান্ত লাগল নিজেকে৷ তাড়াতাড়ি চাকাটা সারিয়ে রেস্তোরাঁয় গেলাম৷ একটা গ্লাসে কিছুটা হুইস্কি ঢেলে, চুমুক দিলাম৷ রিক্সের কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল৷

হুইস্কি শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে লাগলাম৷ সত্যি, মহা বিপদে ফেলল এই বুড়ো শকুনটা!

অ্যারিজোনা পুলিশ কি রিক্সের চিঠির কোন গুরুত্ব দেবে? হয়তো দেবে না৷ কিন্তু ও যদি জানায়, জেনসন উধাও, আর—তার স্ত্রী ওর কর্মচারীর সঙ্গে রাত কাটাচ্ছে, তাহলে? অনেক সময় এরকম সামান্য খবর পেয়েই পুলিশ তদন্ত শুরু করে৷ ওরা যদি জেনসনকে অ্যারিজোনায় খুঁজে না পায়, তাহলে নির্ঘাত এখানে লোক পাঠাবে৷ তারপর এখানে এসে আমার ঠিকুজি-কুষ্ঠি জানতে চাইবে—অর্থাৎ আমার চিতা সাজাবে৷

নাঃ, যেভাবে হোক, রিক্সের মুখ বন্ধ করতেই হবে৷ এবং তার একমাত্র পথ ওকে টাকা দেওয়া৷ এভাবে টাকা দিয়ে হয়ত মাস দুয়েক ওকে ঠকিয়ে রাখা যাবে৷ তারপর? জেনসন যে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ভেগে পড়েছে, সেকথা কি ও বিশ্বাস করবে? উঁহু—রিক্স যেরকম স্বভাবের লোক, নিঃসন্দেহে চিঠিটা দেখতে চাইবে৷ কিন্তু চিঠিটা জাল বলে কি বুঝতে পারবে? মনে হয় চিনে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি৷ কারণ ওর পেনসনের কাগজে সবসময় জেনসনই সই করত! সুতরাং ও সহজেই বুঝতে পারবে চিঠিটা জেনসনের লেখা নয়৷ স্রেফ জালিয়াতি! তারপর!—

যতই ভাবছি, পরিস্থিতি ততই জটিল মনে হচ্ছে৷ রিক্সের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে বুঝে শুনে প্রতিটি পা ফেলতে হবে৷ হঠাৎ সাময়িক উত্তেজনাবশে কিছু করে বসা ঠিক হবে না৷

লোলার সঙ্গে এ নিয়ে একটা আলোচনা করা দরকার৷ কারণ জর্জ রিক্স আমাদের দুজনেরই শত্রু৷

রাত দশটায় লোলা যখন ফিরল, তখনও রিক্সকে ঠেকাবার কোন সমাধান আমি খুঁজে পাইনি৷

রান্নাঘরে কাজ করছিলাম৷ লোলার গাড়ির আওয়াজে বাইরে এলাম৷ গাড়ির থেকে নেমেই ও হনহন করে বাংলোর দিকে হেঁটে চলল৷ ছুটে ওর পাশে গিয়ে হাজির হলাম, ‘তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে৷’

কোন ভ্রূক্ষেপ না করেই ও দরজা খুলে বাংলোয় ঢুকে পড়ল৷ পিছন পিছন আমিও ঢুকলাম৷ লোলা ঘাড় ফেরাল, ওর সবুজ চোখজোড়ায় যেন সবুজ আগুন ঠিকরে বেরোল, ‘বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও!’

‘তাই নাকি! কপট কৌতুকে ওর দিকে তাকালাম, ‘তোমার পেয়ারের দোস্ত—রিক্স—আজ সকালে এখানে এসেছিল যে!’

লোলা ভীষণভাবে চমকে উঠল৷ ওর মুখের রেখা কঠিন হল৷ রাগের বদলে চোখে ফুটে উঠল একটা সতর্ক ভাব৷ আমি নির্বিকারভাবে বসবার ঘরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম৷ লক্ষ্য করলাম, কার্পেটের উপর যে রক্তের দাগ ছিল, সেটা লোলা পরিষ্কার করে ফেলেছে৷ চোখ তুলে তাকাতেই দেখি ও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ টুপিটা মাথা থেকে খুলে, ও চুলের ভেতর আঙুল চালাল৷ সবুজ পোশাক আর লাল চুল—দুয়ে মিলিয়ে ওকে দেখাচ্ছে দারুণ!

‘রিক্স মি. জেনসনের খোঁজ করছিল৷ ওর পেনসনের কাগজে তার সই দরকার—তাই কার্লের ঠিকানা চাইছিল৷’

লোলা নির্বিকার—যেন শুনতে হয় তাই শুনছে৷

‘ঠিকানা জানি না বলার পর ও বলেছে, অ্যারিজোনা পুলিশকে জেনসনের খোঁজ করতে বলবে৷ কারণ তাঁর সই না হলে রিক্স পেনসনের টাকা পাবে না৷’

লোলা এবার একটু চিন্তিত হয়েছে মনে হল৷ ও দরজা বন্ধ করে আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে এসে বসল৷

‘তোমার এই মাথামোটা বুদ্ধির জন্যেই এ অবস্থা হয়েছে!’ ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘এখন বোঝ ঠ্যালা!’

‘ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না৷ রিক্স আমাদের দুজনেরই শত্রু৷ ও কাল রাতে আবার আসবে বলেছে৷ এর মধ্যেই আমাদের ভেবে ঠিক করতে হবে রিক্সকে নিয়ে কি করব৷’

লোলা শান্তভাবে একটা সিগারেট ধরাল, নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘এতে ভাববার কী আছে? সিন্দুকটা খুলে তোমার টাকা নিয়ে তুমি ভেগে পড় বাকি টাকাটা নিয়ে আমিও কেটে পড়ব৷ রিক্স এসে দেখবে, আমরা কেউ নেই৷’

‘বাঃ, চমৎকার বুদ্ধি! কে বলে তোমার বুদ্ধি মাথামোটা!’ অধৈর্য হয়ে খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘কিন্তু ভেবে দেখছ কি, কোন লোক পেট্রল নিতে এসে যদি দেখে জায়গাটা খালি তবে কী হবে? রিক্স যখন দেখতে আমরা কেউ নেই, ও কি পুলিশে খবর দেবে না মনে করছ? আর তখনই আমাদের পেছনে ফেউ লাগবে৷’

‘জায়গাটা বিক্রি করে দিলে কেমন হয়?’

ওর নির্বুদ্ধিতায় মাথায় রক্ত চড়ে গেল, ‘এ কি তোমার বাপের জায়গা, বেচে দেবে? তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, জেনসন মৃত৷ প্রমাণ করতে হবে সে উইল করে জায়গাটা তোমাকে দিয়ে গেছে৷ পারবে প্রমাণ করতে? তখন আর জানতে কারা বাকি থাকবে না, কার্লকে তুমি খুন করেছ!’

‘না না—ওকে আমি খুন করিনি! আচমকা গুলি বেরিয়ে গিয়ে—’

‘পুলিশকে তাই বলে দেখ কি হয়!’

লোলার দু-হাতের চেটো চেয়ারের হাতলদুটোকে নিষ্ফল আক্রোশে নিষ্পেষিত করতে লাগল৷ ওর মুখের ভাব দেখে বুঝলাম, ও হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে, কি ফাঁদে আমরা জড়িয়ে পড়েছি৷

‘তাহলে তুমি এখানে থাক, আর সিন্দুক খুলে আমার টাকা আমাকে দিয়ে দাও— আমি চলে যাব৷ কেউ জিগ্যেস করলে বলো, আমি অ্যারিজোনায় কার্লের কাছে গেছি—না ফেরা পর্যন্ত এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এর দায়িত্ব তোমার ওপরেই রয়েছে৷’

‘তুমি কি ভেবেছ রিক্সের মতো লোক সে-কথা বিশ্বাস করবে? প্রথমে জেনসন উধাও হল, তারপর তুমি—পেট্রল-পাম্পে আমি একা৷ ও সোজা পুলিশকে গিয়ে বলবে, আমি তোমাদের দুজনকে খুন করে এখনকার মালিক হয়ে বসেছি৷ রিক্সের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও, ওরা তদন্ত করতে এখানে আসবেই৷ তারপর হয়তো জানতে পারবে আমার পরিচয়—খুঁজে পাবে জেনসনের মৃতদেহ৷’

লোলা তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল, ‘কী! তুমি কার্লকে এখানে কবর দিয়েছ? পাগলামোর একটা সীমা থাকা দরকার!’

‘তা ছাড়া আর কোথায় কবর দেব?—তুমি কি আমাকে সাহায্য করেছিলে? ভেবেছিলে, এই তিনমণী লাশটাকে আমি একা স্টেশন-ওয়াগনে তুলে নিয়ে যাব? চমৎকার! কার্লকে আমি গুমটিঘরে পুঁতে ফেলেছি৷ পুলিশ যদি রিক্সের কথায় এখানে এসে খোঁড়াখুড়ি শুরু করে দেয়, তবে নির্ঘাত ওর দেহ খুঁজে পাবে৷’

লোলা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তার মানে! তোমার সঙ্গে আমাকে এখানে চিরদিন থাকতে হবে?’

‘চিরদিন কিনা জানি না, তবে থাকতে হবে৷’ দৃঢ়স্বরে জবাব দিলাম, ‘এ ছাড়া আমাদের আর-কোন পথ নেই৷’

‘তুমি থাকলে থাক, আমি এখানে এক মুহূর্তও থাকছি না৷’ লোলা চেয়ারের হাতলে এক ঘুষি বসিয়ে দিল, ‘অনেক সহ্য করেছি, আর নয়৷ এখুনি আমার টাকা আমাকে দিয়ে দাও৷’

হাত বাড়িয়ে সিন্দুকটাকে দেখালাম, ‘তাহলে যাও, আর দেরি করছ কেন? সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে চলে যাও!—তবে আমার কথাগুলো আর-একটু ভেবে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে, এ ছাড়া আমাদের আর পথ নেই৷’

বাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ লোলা চেয়ারেই বসে রইল—চোখে আতঙ্ক আর ঘৃণা নিয়ে৷

রাত বারোটা পর্যন্ত পাম্পের কাছে বসে রইলাম৷ রিক্সের চিন্তাকে কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছি না৷ চেয়ে দেখি বাংলোর আলো জ্বলছে, অর্থাৎ লোলার মনেও একই ভাবনা৷ অবশেষে চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ঘরে ফিরে গেলাম৷ হাতমুখ ধুয়ে, জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম৷ কিন্তু বুঝলাম ঘুমোবার চেষ্টা নিরর্থক৷

হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার মৃদু শব্দে চমকে উঠলাম৷ রিক্সের চিন্তা মুহূর্তে মন থেকে মিলিয়ে গেল৷ কাঠ হয়ে শুয়ে দরজার দিকে চেয়ে রইলাম—

দরজা-পথে ঘরে এসে ঢুকল এক ছায়ামূর্তি৷ জানালা দিয়ে ঠিকরে-পড়া চাঁদের আলোয় তাকে চিনতে পারলাম—লোলা!

ওর গায়ে সবুজ সিল্কের চাদর৷ চাঁদর রুপোলী আলো সেটা গায়ে পড়ে পিছলে যাচ্ছে৷ লোলা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসল৷ ওর চাপা ফিসফিস স্বর কানে এল, ‘শেট, যদি আমাদের একসঙ্গেই থাকতে হবে, তবে আর মিছিমিছি শত্রুতা করে লাভ কী?’

ও আমার দেহের উপর ঝুঁকে এল—আমার মুখের উপর নামিয়ে আনল ওর মুখ—ওর তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আমার ঠোঁটে—

নয়

সকালের সোনা-রোদ সরাসরি চোখে এসে পড়তেই ঘুম ভাঙল৷ শরীরে এক বিচিত্র অবসাদ৷ আড়মোড়া ভেঙে, মাথা তুলে বিছানার পাশে-রাখা ঘড়ির দিকে তাকালাম—ছ-টা বেজে কুড়ি মিনিট৷ লোলা কখন চলে গেছে জানি না, কিন্তু ওর সেন্টের নেশা-ধরানো মিষ্টি গন্ধ এখনও বিছানায় মিশে রয়েছে৷

আমাদের যখন একসঙ্গেই থাকতে হবে, তখন আর শত্রুতা করে লাভ কী?

লোলার কথাগুলো মনে পড়ায় হাসি পেল৷ না মিসেস লোলা জেনসন, শেট কারসনকে আপনি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি৷ আপনার বড়লোক হওয়ার সুখ-স্বপ্ন ওই সিন্দুকের ভিতর যেমন বন্ধ আছে—তেমনি থাকবে৷ শেট আর যাই হোক, বোকা নয়৷

বিচানা ছেড়ে বাথরুমে গেলাম৷ দাড়ি কামিয়ে, স্নান সেরে জামা-কাপড় পরে নিলাম৷ আজ সকালে লোলার মনোভাব কিরকম আছে, জানা দরকার৷ সুতরাং আর দেরি না করে পা বাড়ালাম রেস্তোরাঁর দিকে৷

কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরের দরজায় হাত রেখে আস্তে চাপ দিলাম৷ না, অন্যান্য দিনের মতো দরজা আজ বন্ধ নয়৷ ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল কর্মরত লোলাকে৷ ও কাজ করার সাদা গাউনটা পরে ডিমের ওমলেট করতে ব্যস্ত৷ পায়ের শব্দে ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, ‘ও, হুজুরের ঘুম তাহলে ভেঙেছে! আমি তো ভাবছিলাম, আজ সারাটা দিনই বুঝি পড়ে পড়ে ঘুমোবে!’

আস্তে আস্তে ওর পিছনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, কাছে টেনে নিলাম, মুখ ডুবিয়ে দিলাম ওর আগুন-রঙা চুলের বন্যায়৷

‘এই, এই—এ কি হচ্ছে! তোমার ওমলেট নষ্ট হয়ে যাবে যে!’ কিন্তু মুখ সরিয়ে নেবার জন্য ও একটুও ব্যস্ত হল না৷ বরং নিজেকে এলিয়ে দিল আমার গায়ে, ‘কাল রাতের জন্যে তুমি নিশ্চয়ই আমার ওপর রাগ করেছ?’

ওকে কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড় করালাম, হাসলাম, ‘তাহলে আরও একবার আমাকে রাগ করতে দাও৷’ এক ঝটকায় ওকে টেনে নিলাম আমার বুকে, ঠোঁট নামিয়ে আনলাম ওর ঠোঁটের উপর৷ অনুভব করলাম ওর হৃদস্পন্দন, ওর যৌবনের উষ্ণস্পর্শ৷ লোলার আঙুল খেলা করে বেড়াতে লাগল আমার চুলে৷

একসময়ে আমার বাঁধন ছাড়িয়ে ও প্রাতরাশের আয়োজন করতে লাগল৷ একটা চেয়ারে বসে লক্ষ্য করছিলাম লোলাকে৷ কিরকম সুপটু হাতে ও একটার পর একটা কাজ করে চলেছে৷

প্রাতরাশ তৈরি শেষ করে লোলা খাবারের প্লেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল, ‘কফিটা নিজে কাপে ঢেলে নাও৷ তারপর ও আমার মুখোমুখি বসে একটা সিগারেট ধরাল৷ ওর চোখের দৃষ্টি আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত—সম্পূর্ণ নতুন৷

‘শেট, প্রথম থেকেই তোমার সঙ্গে আমি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি৷ কিন্তু কাল রাতেই আমার মত পালটেছে৷ ভেবে দেখলাম, কার্ল মারা যাবার পর আমরা যেভাবে এতদিন কাটিয়েছি, তার কোন মানে হয় না৷ বিশেষত—তুমি যখন একজন সুপুরুষ আর—’ একটু থামল লোলা, ‘কোন মেয়ের জীবনে তোমার মতো পুরুষের সঙ্গলাভ-নিঃসন্দেহে একটা অভিজ্ঞতা৷ তুমি বরং তোমার জিনিসপত্র নিয়ে বাংলোয় চলে এসো—এখন আলাদা থেকে লাভ কী?’

মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করলাম৷ মৃত জেনসনের ধোঁয়াটে মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল৷ কিন্তু সেটা মন থেকে সরিয়ে ফেলে লোলার দিকে তাকালাম, ‘ঠিকই বলেছ—তুমি তো জান, প্রথমদিন থেকেই তুমি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছ৷ তা ছাড়া, গত রাতের পর আলাদা থাকা কি আমার সাধ্যে কুলোবে?’

লোলা মিষ্টি করে হাসল, মুখ নামাল লজ্জায়৷

বাইরে থেকে ভেসে এল কোন ট্রাকের শব্দ—পর পর দুবার তার হর্ন বেজে উঠল৷

‘আমি দেখছি৷’ লোলা উঠে দাঁড়াল, ‘তুমি খেয়ে নাও৷’ ও রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

খাওয়া শেষ হতেই আমার মন সক্রিয় হয়ে উঠল৷ বৎস কারসন, সাবধান! লোলার অভিনয়ের ফাঁদে খবরদার পা দিওনা—ক্রূর সাপিনীর এ এক নতুন অভিসন্ধি!

কিন্তু অবচেতন মনে একটা ক্ষীণ আশা উঁকি মারছিল—হয়তো ও সত্যিই আমাকে ভালোবাসে৷

এমন সময় লোলা রান্নাঘরে ফিরে এল৷ চোখেমুখে সামান্য পরিশ্রান্ত ভাব, কিন্তু ঠোঁটে মোহিনী হাসি৷ ও আমার কাছে এসে দাঁড়াল৷ আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘রিক্সের কথা কিচু ভেবেছ? ও তো রাত্তিরে আবার আসবে—’

‘ওর জন্যে আমি একটুও ভাবছি না৷ কিছু টাকা দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—আর আসবে না৷’

‘তাই কি?— রিক্স যেরকম চরিত্রের লোক, তাতে মনে হয়, একবার টাকার গন্ধ পেলেই ও রোজ আসবে৷’

লোলা ঘাড় নাড়ল, ‘কিছু ভেবো না, রিক্সকে সামলানোর ভার আমার৷’

‘কিন্তু সাবধান থেকো, ব্যাটা গণ্ডগোল করতে পারে৷’

‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো৷’

গত ক-দিনের অসহ্য আবহাওয়া বর্তমানে অনেকটা সহনীয় হয়ে উঠেছে৷ মরুভূমির হাওয়ার আগের মতোই অনুভূত হচ্ছে শীতল আমেজ৷ গাড়ি-ট্রাকের যাতায়াত অনেক বেড়ে গেছে৷ ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ আবার হয়ে উঠেছে কর্মচঞ্চল৷

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও, দু-এক মুহূর্তের অবসরে রান্নাঘরে গিয়ে লোলার উষ্ণ সান্নিধ্য অনুভব করেছি৷ প্রতিবারই ওকে আগের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়া বলে মনে হয়েছে৷ কাজের মাঝে ওকে বিরক্ত করার জন্য শুনতে হয়েছে কপট অনুযোগ, কিন্তু কোনবারই আমাকে ও নিরাশ করেনি৷—তবুও কেন জানি না, ও যে অভিনয় করছে, এ ধারণাটা আমার মনে আরও বদ্ধমূল হয়েছে৷

সন্ধে সাতটার সময় যানবাহন চলাচল একেবারে কমে এল৷ অতএব মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে গেলাম রান্নাঘরে৷

লোলা ভীল কাটলেটগুলো সাজিয়ে রাখছিল—আমি ঢুকতেই ঘুরে দাঁড়াল, আবার এখানে এসেছ! কী চাই?’

কোন জবাব না দিয়ে ওকে সোজা বুকে টেনে নিলাম৷

‘এই, ভালো হবে না বলছি৷ কী করছ, ছাড়—’ ও আমার বাঁধন ছাড়িয়ে মুক্ত হবার চেষ্টা করল—যেন একটা তুলতুলে নরম পালকে ঢাকা পাখি তার ছোট্ট ডানা ঝটপট করছে৷

আমিও ওকে জাপটে ধরে রইলাম, ‘ছাড়ব না৷ দেখি তুমি কেমন করে ছাড়াও—’ আমাদের এই একান্ত ব্যস্ততার মুহূর্তে একটা হাল্কা শব্দ কানে এল—রান্নাঘরের দরজা খোলার শব্দ! চমকে উঠে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালাম৷ কিন্তু এতক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে—আমরা দুজনেই দাঁড়িয়ে রিক্স৷ ও হাসছে—ধূর্ত-বিষাক্ত হাসি কুৎসিত মুখের চেহারা হয়ে উঠেছে ভয়াল-কুটিল! বুঝতে আর বাকি রইল না, ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেছে৷ ইস! রিক্স এই সময়ে আসবে জেনেও কি বোকার মতো কাজই না করেছি! লোলার দিকে তাকালাম৷ কিন্তু ও এতটুকু বিচলিত হয়নি৷ মুখ ভাবলেশহীন, চোখের ভাষায় এক নীরব প্রশ্ন৷

মনের অপরাধবোধ সম্ভবত প্রতিফলিত হয়েছিল আমার মুখের দর্পণে৷ কারণ রিক্স কৌতূহলভরে আমাকে একবার দেখল, তারপর ফিরে তাকাল লোলার দিকে, ‘তোমাদের বিরক্ত করার কোন উদ্দেশ্য আমার ছিল না৷ বলেছিলাম এ-সময়ে আসব, তাই এসেছি৷’

আমার ঠোঁটদুটো কেউ যেন সেলাই করে আটকে দিয়েছে৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঘামছি—দেখছি রিক্সকে৷

‘কী ব্যাপার, জর্জ?’ লোলার স্বর একেবারে স্বাভাবিক, ‘এ সময়ে কী দরকার?’

রিক্সের ক্ষুদে চোখজোড়া আমাদের মুখের উপর খেলে বেড়াতে লাগল, ‘আমি যে এ সময়ে আসব, তা বলেনি?’ আঙুল দিয়ে আমাকে দেখাল সে৷

লোলা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷

‘কার্লের কোন খবর পেয়েছ? আমার পেনসনের কাগজে ওর সই দরকার৷’

‘না, এখনও পাইনি৷ হয়তো ওখানে গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ তুমি তো এক কাজ করতে পার—কোন উকিল বা ব্যাঙ্ক-ম্যানেজারকে দিয়ে তোমার কাগজে সই করাতে পার৷’

রিক্স আড়চোখে আমার দিকে চেয়ে ভ্রূকুটি করল, ‘উহুঁ, তাতে হবে না৷ কার্লের সই না হলে, ওরা টাকা আটকে দেবে৷ আমার তাহলে চলবে কী করে?’

লোলা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কি আর করা যাবে, কার্ল তো নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা দিয়ে যায়নি৷ ও না ফেরা পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষাই করতে হবে৷’

লোলার স্থির নির্বিকার দৃষ্টির কাছে রিক্স যেন অস্বস্তি বোধ করল৷ যে-কথাগুলো বলবে, সেগুলো হয়তো মনে মনে আর-একবার ভেবে নিল৷

‘তাহলে অ্যারিজোনা পুলিশকে লিখে জাননোই ভালো৷ কারণ পেনসনের কাগজে কার্লের সই না হলে আমার চলবে না৷’

কথাগুলো বলার সময় ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোলাকে লক্ষ্য করছিল৷ কিন্তু লোলার মুখে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখে একটু হতাশ হল৷

‘ইচ্ছে হলে তাই কর, তাতে আমার কিছু যাবে-আসবে না৷ তবে কার্ল অ্যারিজোনায় হয়তো না-ও থাকতে পারে৷ একবার কোলোরাডো যাবে বলছিল—কে জানে!’ লোলা টেবিলে হেলান দিয়ে মাথার চুলে হাত চালাতে লাগল, ‘তা এ নিয়ে এত ঝামেলা করার কি আছে, জর্জ? আমার মনে হয়, কোন ব্যাঙ্ক-ম্যানেজারকে দিলেই সে সই করে দেবে৷—অবশ্য যদি তোমার টাকার খুব প্রয়োজন থাকে, তো বল, দু-পাঁচ ডলার না হয় ধারই দেওয়া যাবে৷’

লোলা এত সহজ আর স্বাভাবিকভাবে ধারের প্রসঙ্গ তোলায়, রিক্স সন্দেহ করার কোন সুযোগ পেল না৷ আমিও হয়তো এত সুন্দরভাবে রিক্সকে বোকা বানাতে পারতাম না৷

‘কত?’ দ্বিধাগ্রস্ত মনে রিক্স জানতে চাইল৷ কিন্তু ওর অতি-আগ্রহের সুরটা লোলার কান এড়াল না৷

‘অত বেশি ব্যস্ত হয়ো না, জর্জ৷’ ঘৃণাভরে ও উত্তর দিল, ‘বড়জোর ডলার দশেক দিতে পারি৷’

‘রিক্স যেন আশাহত হল, ‘ওতে কি হবে! আমারও তো খরচ-খরচা আছে৷ অন্তত বিশ ডলার পেলে ভালো হত৷’

‘তোমার টাকার খাঁই কোনদিন কমবে না, জর্জ৷ সুযোগ পেলেই খালি নিংড়ে নেবার চেষ্টা কর৷’ ও রিক্সকে কাটিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷

একটু পরে ও ফিরে এল—হাতে তিনটে ডলারের নোট৷ নোট তিনটে লোলা রিক্সের হাতে গুঁজে দিল, ‘নাও, ধর—৷ এই শেষ, এর চেয়ে বেশি আমার কাছ থেকে আর পাবে না অতএব, শুধু শুধু আর এস না৷ তোমাকে টাকা দিয়েছি শুনলে কার্ল হয়তো অসন্তুষ্ট হবে৷’

রিক্স টাকাগুলো চটপট পকেটে ভরে ফেলল, ‘লোলা, তুমি বড় নির্দয়৷’ ও দাঁত বের করে হাসল, ‘আমি যে তোমার স্বামীদেবতা নই, সেজন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি৷ আশা করি কয়েকদিনের মধ্যেই কার্ল ওর ভুল বুঝতে পারবে৷ তারপর চোখের জলে বুক ভাসাবে, অ্যাঁ!’ রিক্স শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল৷

‘বাজে কথা না বলে কেটে পড়৷ কার্লের ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না৷ লোলার স্বরে কাঠিন্য, ‘ভবিষ্যতে আর এদিকে মাড়িয়ো না৷’

‘হুঁ, দুয়ে গুঞ্জন তিনে হাট! না, তোমাদের প্রেমগুঞ্জনে আর বাধা দেব না৷ তবে একটু সাবধানে থেকো, লোলা৷ কার্ল হয়তো একটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করবে না৷’ রিক্স ওর চোখজোড়া আমার মুখের উপর একবার বুলিয়ে নিল৷

লোলা ঘুরে তাকাল আমার দিকে, ‘একে লাথি মেরে বের করে দাও, জ্যাক—অনেকক্ষণ ওর বকবকানি সহ্য করছি৷’

আমি রিক্সের দিকে এগোতেই ও ঘুরে দৌড় লাগাল৷

ওর গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা চুপচাপ অপেক্ষা করলাম৷ তারপর লোলা টেবিলের কাছে গিয়ে আবার কাজে মন দিল৷

‘রিক্স নিশ্চয়ই আমাদের দেখেছে৷’ ওকে বললাম৷

‘তো হয়েছে কী? বলেছি না, আমিই ওকে সামলাব—তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না৷’

‘টাকার জন্যে ও আবার আসবে, দেখো৷’

কাটলেটগুলো লোলা প্লেটে সাজিয়ে রাখতে লাগল, ‘ওহ্ হো! বলছি না, ও নিয়ে ভেব না৷ আসুক না জর্জ, আমি তো আছি৷’

একদিন দুদিন করে দু-সপ্তাহ কেটে গেল, রিক্স আর এল না৷ কিন্তু ও না এলে কি হবে, এ দু-সপ্তাহে কম করে একশ লোকের কাছে জেনসনের অনুপস্থিতির জন্য জবাবদিহি করতে হয়েছে৷ দু-একজন সামান্য সন্দেহ প্রকাশ করলেও, অ্যারিজোনায় যাওয়ার গল্পটা মোটামুটি সকলেই বিশ্বাস করেছে৷ কয়েকজন একটু অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে থেকেছে৷ তাদের চোখে একই নীরব প্রশ্ন ঃ ‘কি বাবা, জেনসনের বউকে নিয়ে ফষ্টিনস্টি শুরু করনি তো?’ মনে মনে অস্বস্তি হলেও, প্রকাশ্যে সহজ হবার চেষ্টা করেছি সবিনয়ে জানিয়েছি আমি এখানকার কর্মচারী মাত্র৷ অবশ্য তাতে কোন ফল হয়েছে কিনা বলতে পারি না৷

রোজ রাত একটায় রেস্তোরাঁ বন্ধ করে আমি লোলা শুতে যাই বাংলোয়৷ মাঝেমাঝে জেনসনের কথা ভেবে অস্বস্তি হয়৷ ওরই বিছানায় ওরই বউয়ের সঙ্গে শুয়ে আছি দেখলে সে কি ভাবত কে জানে! কিন্তু লোলার দুর্নিবার আকর্ষণের কাছে এসব চিন্তা ধুয়ে-মুছে বিলীন হয়ে যায়৷ ওকে সোহাগে আদরে জড়িয়ে চুমোয় চুমোয় অস্থির করে তুলি৷ সমস্ত পৃথিবী কেন্দ্রীভূত হয় আমাদের—একান্ত আমাদের অস্তিত্বে৷

একসময় পূর্ণ পরিতৃপ্তির অবসাদ নিয়ে ক্লান্ত দেহে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে থাকি৷ জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় মায়াময় পরিবেশে আরও একবার মনে পড়ে কবরে শুয়ে-থাকা জেনসনের কথা৷ তখন নিজেকে ভীষণ অপরাধী বলে মনে হয়৷ কিন্তু লোলা? কই, মুহূর্তের জন্যও তো ওকে অপরাধবোধের শিকার হতে দেখিনি! বরং ওর ভাবসাব দেখে মনে হয়, কার্ল জেনসন নামে ব্যক্তিপূর্ণ পুরুষটি ওর স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে—তার একদা-অস্তিত্ব আজ ওর কাছে নেহাতই অবাস্তব৷

তবে এই দু-সপ্তাহে একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি৷ সেটা হল—লোলাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷ যেভাবে আমরা দিনের পর দিন কাটিয়েছি, তাতে হয়তো এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক৷ যদিও লোলাকে দেখার প্রথম দিন থেকেই অনুভব করেছিলাম ওর প্রতি অনিবার্য দুর্দম আকর্ষণ৷ কিন্তু এও মনে হয়েছিল—সেটা নিতান্তই নারীর যৌবনের প্রতি পুরুষের যে চিরন্তন লিপ্সা, তারই তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ৷ কিন্তু এখন দেখছি তা নয়৷ কামনা-বাসনার শেষ পর্যায়ে ঘিরে সুখী-সংসরের সুখ-স্বপ্ন দেখি৷ তা ছাড়া ওকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে ওর প্রতি আমার সন্দেহ-সতর্ক ভাবটা অনিবার্যভাবে ক্রমশই ফিরে হয়ে এসেছে৷ কখনো কখনো আচ্ছন্ন মনকে বিবেকের কশাঘাতে সচেতন করেছি—সাবধান! মনে রেখ কারসন, তুমি সাপ নিয়ে খেলছ! কিন্তু বৃথাই৷ পরমুহূর্তেই ওর যৌবনের সাজানো ডালিতে নিজের সত্তাকে নিঃশেষে অর্পণ করেছি৷

লোলা কিন্তু একবারের জন্যও সিন্দুকের কথা তোলেনি৷ টাকার কথাও যেন একেবারে ভুলে গেছে৷ মনে মনে আশ্বস্ত হয়েছি, বিশ্বাসও অনেকটা বেড়েছে৷ শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, লোলাও আমাকে সমান ভালোবাসে৷

অতীতের সব কথা ভুলে গিয়ে চিরটা জীবন কি আমরা এভাবে কাটিয়ে দিতে পারি না?

এমনি এক মিষ্টি সকাল৷ বিছানায় আমরা পাশাপাশি শুয়ে আছি৷ জানালা দিয়ে চোখে পড়ছে পাহাড়ের সারি, ভোরের সিঁদুর-রাঙা সূর্য—হঠাৎ লোলা প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, শেট, কাজকর্ম দেখাশোনার জন্যে একজন লোক রাখলে কেমন হয়? আমরা বেশ মাঝেমাঝে ছুটি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে বেড়াতে যেতে পারি—’

প্রস্তাবটা নিঃসন্দেহে লোভনীয়, কিন্ত একই সঙ্গে বিপজ্জনক৷ আালস্যে আড়মোড়া ভেঙে ওর দিকে তাকালাম, ‘তা হয় না, লোলা৷ ওয়েন্টওয়ার্থে আমরা একসঙ্গে বেড়াতে গেলে, লোকে নানান কথা বলবে৷—না, এখনও আমাদের মাস দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে৷ জেনসন যে আর ফিরছে না, সে-গল্পটা রটিয়ে দেওয়ার পর লোক রাখার কথা ভাবা যাবে৷’

‘এখানে এভাবে থাকতে আমার ভালো লাগছে না৷’

‘আর কিছুদিন কষ্ট কর—সব ঠিক হয়ে যাবে৷’

লোলা বিছানা থেকে নেমে, এগিয়ে গিয়ে সিল্কের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল৷ পাশ ফিরে শুয়ে ওকে লক্ষ্য করছিলাম৷ চোখাচোখি হতেই ও হাসল, ‘ঠিক আছে তোমার কথাই থাক আর কিছুদিন না হয় অপেক্ষাই করা যাবে৷’ হঠাৎ কি মনে পড়ায় আমায় বলল, ‘শেট, তুমি আজ ওয়েন্টওয়ার্থে যেতে পারবে? অনেক জিনিসপত্র কেনার আছে৷ আমিই যেতাম, কিন্তু ফ্রুট-পাই তৈরি নিয়ে ব্যস্ত থাকব বলে যেতে পারছি না৷ তুমিই না হয় ঘুরে এস৷—আমি পাম্পগুলোর দিকেও খেয়াল রাখব— কোন অসুবিধে হবে না৷’

আরেকটু হলেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেতাম আর কি! আচমকা এক সন্দেহের ঝাপটায় সচেতন হয়ে উঠলাম৷ আমাকে সরানোর জন্য এটা কি লোলার কোন নতুন মতলব? হয়তো আমাকে ওয়েন্টওয়ার্থে পাঠিয়ে, ট্রপিক স্প্রিংসে ফোন করে কোন সিন্দুক সারানোর লোক ডেকে আনবে—তাকে দিয়ে সিন্দুক খোলাবে৷ তারপর আমি ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরতে ফিরতে টাকা নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবে৷

ওর দিকে তাকালাম৷ নির্বিকারভাবে ও চুল আঁচড়াচ্ছে, আনমনে গুনগুন করছে কোন গানের কলি৷ কিন্তু তার মানে এই নয়, ও উদ্দেশ্যহীনভাবে কথাগুলো বলেছে৷ কারণ রিক্সের সঙ্গে কথা বলার সময় ওর মুখে লক্ষ্য করেছি এই একই নির্বিকার ভাব৷

গলার স্বরকে অত্যন্ত স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে জবাব দিলাম, ‘আমার ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না, লোলা৷ ওখানে গেলে বিপদের সম্ভাবনা আছে—কেউ আমাকে চিনে ফেলতে পারে৷—তার চেয়ে বরং তুমিই যাও, আমি এদিকটা দেখাশোনা করব৷ সেটাই মনে হয় নিরাপদ হবে৷’

লোলার মুখের ভাবে একটা পরিবর্তন আশা করেছিলাম, কিন্তু আমার সন্দেহের সমর্থনে কোন প্রতিক্রিয়াই ওর মুখে লক্ষ্য করলাম না৷ ও আমার কথায় কাঁধ ঝাঁকাল, চিরুনিটা নামিয়ে রাখল, ‘ঠিক আছে, তুমি যা ভালো বোঝ তাই কর৷’ ও পায়ে পায়ে বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল, সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, ‘শেট, সত্যিই কি ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়া তোমার পক্ষে বিপজ্জনক?’

‘তা জানি না, তবে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইছি না৷’

‘তাহলে না যাওয়াই ভালো৷ তোমার ভালোমন্দ কিছু একটা হোক, তা আমি চাইব না৷’

‘শুনে সুখী হলাম৷’

‘ঠাট্টা নয় শেট, সত্যি বলছি৷’ লোলা সলজ্জ হাসি হাসল, ‘তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷’

আনন্দে বিছানা থেকে নেমে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘সত্যি? এতদিন তোমার মুখ থেকে শুধু এই কথাটাই শুনতে চেয়েছি, লোলা৷’

ও আঙুল দিয়ে আমার বুকের দাগ কাটছিল, হেসে ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ, সত্যি৷ জীবনে কোন পুরুষকে নিয়ে সুখী হব, তা ভাবিনি৷ কিন্তু তুমি সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছ৷—এ জায়গায় থাকতে আমার ভালো লাগছে না, শেট—আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে৷ সারাটা দিন শুধু কাজ আর কাজ! কোথাও যে বেড়াতে-টেড়াতে যাব, তারও একটু উপায় নেই৷’

‘আর কয়েকটা দিন ধৈর্য ধর, লোলা—তারপর আমরা অন্য কোথাও চলে যাব৷ এখানে থাকতে ভালো কি আমারও লাগছে? কিন্তু এখুনি এ জায়গা ছাড়লে বিপদের সম্ভাবনা আছে যে! তা ছাড়া, জায়গাটা যে বিক্রি করে দেব, তারও তো উপায় নেই!’

লোলা আমার বাহুর বাঁধন খুলে হঠাৎ সরে দাঁড়াল, ‘যাই, ফ্রুট-পাইগুলো এখনই শুরু না করলে, পরে আবার দেরি হয়ে যাবে৷’ ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

জামা কাপড় পরতে পরতে ভাবতে লাগলাম—লোলা আমাকে ভালোবাসে৷ ও নিজের মুখে বলেছে৷ আজ আমার আনন্দের দিন—লোলা আমাকে ভালোবাসে৷

ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই ওকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম৷

রান্নাঘরে গিয়ে কফি তৈরি করে চুমুক দিলাম৷ লোলা ফ্রুট-পাই নিয়ে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ ডাকল, ‘শেট—’ ও ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘এরপর কী করবে কিছু ঠিক করেছ?’

‘হ্যাঁ৷ এসব ঝামেলা মিটে গেলে প্রথমেই তোমাকে আমি বিয়ে করছি—‘না’ বললেও শুনছি না৷’

ও হাসল, ‘না’ বলতে আমার বয়ে গেছে৷—কিন্তু কার্ল যে মৃত, সেটা তো আগে প্রমাণ করতে হবে!’

‘সেটা প্রমাণ করতে গেলে বিপদ আছে৷—নাঃ, যে-কোন উপায়ে আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে৷ কিন্তু কীভাবে, তা এখনও ভেবে পাচ্ছি না৷ যদি একবার এখান থেকে পালাতে পারি, তবে আর চিন্তা নেই৷—আচ্ছা, ফ্লোরিডায় আমাদের একটা পেট্রল-পাম্প খুললে কেমন হয়?’

‘ভালোই হবে৷—তার মানে সিন্দুকের টাকাগুলো কাজে লাগানো যাবে, কি বলো?’

এতদিন পর এই প্রথম ও টাকার কথা উচ্চারণ করল৷ খুব সহজভাবে কথাটা বললেও, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম৷ কিন্তু কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না৷ বরং ওর দৃষ্টি নিষ্পাপ বলেই মনে হল৷

‘হ্যাঁ, তাই তো করব৷ তা ছাড়া উপায় কি?’ ওর কথা সমর্থন করলাম৷

‘খুব ভালো হবে, তাই না শেট?’ লোলার সবুজ চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘কেউ থাকবে না, শুধু তুমি আর আমি৷ আমি কিন্তু বেশিদিন অপেক্ষা করব না বলে রাখছি৷’ আদরমাখানো স্বরে ও বলে উঠল৷

‘হুঁ, প্রথমে আমাদের এ জায়গাটা বেচতে হবে—৷ কিন্তু কীভাবে!’ আত্মগতভাবে বললাম৷

‘যেভাবে হোক!’

এমন সময় একটা ট্রাকের শব্দ পেয়ে বাইরে গেলাম৷ আর কাজে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে লোলার সঙ্গে কথা বলার কোন সুযোগই পেলাম না৷

একসময় দেখি, লোলা অপরূপ সাজে সেজে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, ‘আমি চললাম, দুপুরের দিকে ফিরব৷ ফ্রুটপাইগুলো ঠিক করে রাখতে ভুলো না যেন৷’ ও গাড়ি চালিয়ে চলে গেল৷

কিছুক্ষণের মধ্যে হাতের কাজ সেরে রেস্তোরাঁয় গেলাম৷

লোলা টাকার উল্লেখ করার বেশ খুশিই হয়েছি৷ ওর সম্বন্ধে যেটুকু অস্বস্তি-অবিশ্বাস ছিল, তাও মন থেকে মিলিয়ে গেছে৷ ও যে আমার সঙ্গে অভিনয় করছে না, সেটা ভেবে ভালো লাগল৷ কিন্তু এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এর হাত থেকে মুক্তি পাই কেমন করে? লোকের মনে সন্দেহ না জাগিয়ে, কীভাবে এর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, তাই ভাবতে লাগলাম৷

কিন্তু যত ভাবছি, সমস্যাটা ততই যেন জটিল হয়ে উঠছে৷ ভাবতে ভাবতে একসময় নিষ্ঠুর সত্যের মতো উপলব্ধি করলাম, আমাদের অবস্থা মাকড়সার জালে আটকানো মাছির মতো৷ মুক্তির কোন পথই আমাদের সামনে খোলা নেই৷ নিশ্চিন্তে, নিরাপদে থাকতে গেলে, সারাটা জীবন আমাদের এখানেই কাটাতে হবে৷ ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’কে ছেড়ে যাবার ক্ষমতা আমাদের নেই৷

এসব ভাবনায়, কখন একসময় উত্তেজিত হয়ে খাবার-ঘরে পায়চারি শুরু করে দিয়েছি, হঠাৎ একটা গাড়ির শব্দে চমক ভাঙল৷ জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল রিক্সের ঝরঝরে গাড়িটা৷ রিক্স গাড়ি থেকে নেমে গুমটিঘরের দিকে এগোল৷ পিছন পিছন গুটিগুটি পায়ে চলল ওর কুকুরটা৷

এতদিন বাদে রিক্সকে দেখে চমকে উঠলাম৷ ও কি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে কে জানে! হঠাৎ মনে পড়ল, গুমটিঘরেই পোঁতা রয়েছে জেনসনের দেহ! মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ছুটলাম গুমটিঘরের দিকে৷ বুকের ভিতর যেন দামামা বাজতে শুরু করেছে৷ রিক্স অথবা ওর কুকুর যদি খুঁজে পায় কার্লের দেহ!

গিয়ে দেখি, রিক্স গুমটিঘরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে যন্ত্রপাতিগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে৷ কুকুরটাও যেন ওর পায়ে লেগে রয়েছে৷ আমাকে দেখেই কুকুরটা কুঁকড়ে গেল৷ সুড়সুড় করে রিক্সের পায়ের ফাঁকে ঢুকে পড়ল৷

‘কী চাই?’ গলার স্বরকে যতটা সম্ভব রুক্ষ এবং কঠোর করলাম৷

রিক্স থমকে দাঁড়াল৷ কুকুরটাকে এক লাথিতে সরিয়ে দিয়ে আড়চোখে তাকাল, ‘কার্ল কোন খবর-টবর দিয়েছে?’

‘না৷’

‘লোলা কোথায়?’

‘তিনি ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন৷ কী চাই তোমার?’

‘রিক্সের কুকুরটা হঠাৎ উৎসুক হয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে কাজ করার টেবিলটার দিকে তাকাল৷ তারপর ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে চলল জেনসনের কবরের দিকে৷ সীমাহীন আগ্রহে ওখানকার মাটি শুঁকতে লাগল৷ মাঝে মাঝে পা দিয়ে আঁচড়াতে চেষ্টা করল৷

বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, হৃৎপিণ্ড যেন আচমকা হোঁচট খেল!

রিক্স কুকুরটাকে লক্ষ্য না করেই বলল, ‘আমার কিছু টাকার দরকার৷ পেনসনের টাকা এখনও পায়নি৷’

‘আমাকে ওসব কথা বলে কোন লাভ নেই৷’ আমার কিন্তু পড়ে আছে হতচ্ছাড়া কুকুরটার দিকে৷

কুকুরটা তখন মাটি আঁচড়াতে শুরু করেছে৷ মাটি স্বাভাবিকভাবেই আলগা হওয়ায়, আঁচড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসতে লাগল৷ কুকুরটাও উৎসাহের সঙ্গে থাবা দিয়ে আরও পূর্ণোদ্যমে আঁচড়াতে শুরু করল৷

রিক্স হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে কুকুরটাকে দেখল৷ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল, ‘আরে, ব্যাপার কী! আগে কোনদিন সীজারকে এরকম অদ্ভুত কাজ করতে তো দেখিনি৷’ ও এগিয়ে গিয়ে সীজারের পেটে ক্যাঁৎ করে এক লাথি কষিয়ে দিল৷ সীজার কেঁউ কেঁউ করতে করতে, ছিটকে গিয়ে পড়ল গুমটিঘরের দরজার কাছে৷

রিক্স আবার আমার কাছে ফিরে এল, ‘আমার এখনে কপর্দকহীন অবস্থা৷ কিছু টাকা ধার দিতে পারবে? পেনসনের টাকা পেলেই শোধ করে দেব৷’

রিক্সের কথা বলার সুযোগে সীজার সন্তর্পণে আবার এগিয়ে এল৷ আড়চোখে রিক্সের দিকে লক্ষ্য রেখে আবার আঁচড়াতে শুরু করল৷

‘আচ্ছা, কুকুর তো!’ একটা বড় কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে সীজারকে লক্ষ্য করে সজোরে ছুড়ে মারলাম৷ কুকুরটা ঘ্যাঁক করে একটা চাপা চিৎকার করে দরজার দিকে পালাল৷

রিক্সের চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল, ‘একটা বোবা জানোয়ারকে ওভাবে মারতে তোমার লজ্জা করে না!’

‘বেরোও এখান থেকে! তোমার এই হতচ্ছাড়া কুত্তাকে নিয়ে এখুনি কেটে পড়ো!’ দাঁত খিঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠলাম৷

রিক্স কিন্তু আমার কথা কানেই তোলেনি৷ ও তখন সীজারের খোঁড়া গর্তের দিকে চেয়ে আছে—সারা মুখে একটা হতবুদ্ধি ভাব৷

‘তুমি কি এখানে কিছু পুঁতেছ!’

কেমন যেন শীত-শীত করতে লাগল—সারা মুখে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম—কোনরকমে মুখে হাত বোলালাম, ‘কিচ্ছু পুঁতিনি৷—যাও, যাও, এখন কেটে পড়ো!’

আমার কথা কানে তোলা তো দূরের কথা, রিক্স আস্তে আস্তে গর্তটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল৷ ওর শকুন-চোখজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে৷’

‘দেখে মনে হচ্ছে, এ জায়গাটা আগে কেউ খুঁড়েছে!’ রিক্স ওর নোংরা লিকলিকে আঙুলগুলো আলগা মাটিতে ডুবিয়ে দিলে৷ কুকুরটা যেন সমর্থন পেয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল, আবার আঁচড়াতে শুরু করল৷

অধৈর্য হাতের এক ধাক্কায় রিক্স কুকুরটাকে সরিয়ে দিল, আপনমনেই বলে উঠল, ‘কার্ল হয়তো ওর জমানো টাকা এখানেই লুকিয়ে রেখেছে৷ নাঃ, ব্যাটা সত্যিকারের বোকার চূড়ান্ত! এভাবে কেউ টাকা লুকোয়!—যাকগে, তবু একবার দেখা যাক৷’ রিক্স আমার দিকে ফিরল, ‘বেলচা আছে?’

আমার হাত-পা যেন ভয়ে পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যেতে চাইল৷ রিক্সের দিকে এক পা এক করে এগিয়ে গেলাম৷ আমার মুখের ভাবে রিক্স ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল৷ পায়ে পায়ে পিছোতে লাগল, ‘আরে আরে, এতে রাগ করার কি আছে?’ পিছতে পিছতে আমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল রিক্স৷ কুকুরটাও ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পিছোতে লাগল৷

‘হঠাৎ মনে হল, তাই বললাম৷ এর জন্যে কিছু মনে করো না৷’

‘বেরোও! আর কোনদিন এখানে আসবার চেষ্টা করলে ঠ্যাঙ ভেঙে দেব!’ চেঁচিয়ে ওকে সাবধান করলাম, ‘যাও—বেরোও!’

‘পাঁচটা ডলার ধার দিতে পারবে?’ রিক্স ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে৷ রোদের তেজ এর মধ্যেই বেড়ে উঠেছে৷ মরুভূমির বালি-মেশানো গরম হাওয়া চোখে মুখে এসে ঝাপটা মারছে৷

‘একটা পয়সাও তুমি পাবে না৷’ ওকে তাড়িয়ে নিয়ে চললাম, ‘গাড়িতে উঠে সোজা কেটে পড়৷’

পিছোতে পিছোতে রিক্স ওর গাড়ির কাছে পৌঁছল৷ গাড়ির দরজায় হাত রেখে ও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, আড়চোখে ঘৃণাভরা চাউনি নিয়ে তাকাল আমার দিকে, ‘আচ্ছা, তুমি তাহলে সোজা করার মানুষ নয়!’ ওর গলায় যেন বিষ ঝরে পড়ল, ‘শেষ পর্যন্ত পুলিশেই খবর দিতে হবে দেখছি৷ ওদের বলব কার্লের খোঁজ করতে৷ নয়তো, তুমি আর ওই বেশ্যাটা যেভাবে লেপটালেপটি, ঘা-ঘষাঘষি শুরু করেছ—’

অন্ধক্রোধে রিক্সের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷ আমার ডান হাতের ঘুষি সপাটে গিয়ে আছড়ে পড়ল ওর চোয়ালে৷ রিক্স ছিটকে গিয়ে পড়ল বালির উপর৷ আমি তখন রাগে উন্মাদ৷ পাম্পের কাছে যখন যে একটা ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে, দেখতেই পাইনি৷ রিক্সকে মারতে দেখে ড্রাইভারটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘অ্যাই, কী হচ্ছে?’

সংবিৎ ফিরে পেয়ে নিজেকে সংযত করলাম৷ ড্রাইভারটা না এলে এই বুড়ো শকুনটাকে আজ রামঠ্যাঙানি দিতাম৷

রিক্সের দুরবস্থা দেখে কুকুরটা একলাফে গাড়িতে উঠে বসল৷ জুলজুল করে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগল৷

‘কী দোস্ত৷ বুড়ো পেয়ে খুব প্যাঁদাচ্ছ?’ ড্রাইভারটা ট্রাক থেকে নেমে এল, ‘একটা সমবয়েসী জোয়ানের সঙ্গে লড়তে, তো বুঝতাম!’

ইচ্ছে হল, দিই ব্যাটার নাকে একখানা বসিয়ে! কিন্তু তাতে ব্যবসার ক্ষতি হবে ভেবে নিজেকে সামলে নিলাম৷ দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াতেই, রিক্স ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে কোনরকমে উঠে দাঁড়ালাম৷ টলতে টলতে গাড়িতে গিয়ে উঠল৷ বাঁ হাতে আহত চোয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে গাড়িতে স্টার্ট দিল৷ আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করতে লাগল৷

পকেটের মানি-ব্যাগ থেকে একটা দশ ডলার নোট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, ‘ঠিক আছে৷ নাও, ধর—এদিকে আর এসো না৷’

রিক্স কাঁপা হাতে ওটা নিল৷ তারপর ওটাকে হাতের মুঠোয় দলা পাকিয়ে ছুড়ে মারল আমার মুখের উপর৷ ঘৃণাভরে থুতু ছেটাল মাটিতে, ‘আজকের কথা আমি ভুলব না৷’ রাগে, ঘৃণায় ওর মুখ বীভৎস হয়ে উঠল, ‘আমি সোজা পুলিশে যাচ্ছি৷ ওরাই তোমার খবর নেবে৷’

অ্যাকসিলারেটরে জোরে চাপ দিয়ে ক্লাচ ছাড়তেই গাড়িটা এক ঝটকায় ছুটে বেরিয়ে গেল৷ যাবার সময় আরও একবার আগুনঝরা চোখে ও আমাকে দেখল৷

সেই মুহূর্তে বুঝলাম, একটা ভীষণ ভুল করে ফেলেছি৷ রিক্সকে মারা আমার উচিত হয়নি৷ ভেবেছিলাম দশ ডলার দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু ওর মতো মেরুদণ্ডহীন লোক যে ওভাবে টাকাটা মুখের উপর ছুড়ে মারবে, ভাবতেই পারিনি৷

নিচু হয়ে নোটটা তুলে, আবার ব্যাগে ভরলাম৷ রিক্স-আতঙ্ক মনের মধ্যে আরও চেপে বসল৷

দাঁড়িয়ে-থাকা ট্রাকটায় তেল দিলাম৷ ড্রাইভারটা দাম দেবার সময় অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল৷ কিন্তু কোন প্রশ্ন করল না৷

ট্রাকটা চলে যাওয়ার পর গুমটিঘরে গিয়ে টেবিলটা সরালাম৷ মাটি দিয়ে গর্তটা ভরাট করে, একগাদা পুরনো লোহালক্কড় এনে এর উপরে জমা করলাম৷ কারণ কুকুরটা আবার এসে জায়গাটা আঁচড়াক, তা আমি চাই না৷ আধঘণ্টা বাদে কাজ শেষ করে খাবারঘরে গেলাম৷

রিক্স যে এবার পুলিশেই যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ তাহলে কি পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করার আগেই কেটে পড়ব? কিন্তু কীভাবে?

ভেবে ভেবে কোন পথ পেলাম না৷ হঠাৎ জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি, একটা জরাজীর্ণ লিংকন গাড়ি পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ নিজের সমস্যায় এত ব্যস্ত ছিলাম, কখন যে ওটা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালও করিনি৷ খাবারঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷

গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসে থাকা লোকটিকে যেন চেনা-চেনা ঠেকল৷ সে গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ তার পরনে একটা পুরনো ময়লা স্যুট৷ মাথায় জীর্ণ টুপি৷ লোকটি মুখের উপর টুপির ছায়া পড়ায়, তাকে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না৷

কিন্তু সে আরও কয়েক পা এগিয়ে আসতেই, তাকে চিনতে পারলাম৷ মুহূর্তে স্তব্ধ হল হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন—কিন্তু পরক্ষণেই ছুটে চলল পাগলা ঘোড়ার মতো উদ্দাম গতিতে—ধকধকধক—

আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমার বন্ধু রয় ট্রেসি!

দশ

আমি আর রয়—দুজনে পরস্পরকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম৷ নিমেষে ও থমকে দাঁড়াল৷ এই হঠাৎ দেখার বিস্ময়কে ওর চোখে যেন মেনে নিতে পারছে না৷ ওর মুখ রক্তহীন, বিবর্ণ৷

কতক্ষণ যে ওইভাবে পরস্পরের দিকে চেয়ে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, একসময় রয়ই প্রথমে সংবিৎ ফিরে পেল৷ ওর মুখের বিবর্ণ ভাবটা কেটে গিয়ে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য—ঠোঁটের কোনায় ফিরে এল সেই অতি-পরিচিত হাসি৷ ও দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বুকে৷ সর্বশক্তি দিয়ে আমাকে জাপটে ধরল৷

আমাদের তখন আর কথা বলার শক্তি নেই৷ এক প্রচণ্ড আনন্দ-উল্লাসের অনুভূতি যেন আমাদের কণ্ঠরোধ করল৷

একসময় আমাকে ছেড়ে দিয়ে রয় সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘শেট! তুই—তুই এখানে! আমি কি ভুল দেখছি?’

ঠিক সেই মুহূর্তেই উপলব্ধি করলাম, রয়কে আমি কতটা ভালোবাসি৷ এতদিন ওর অনুপস্থিতিতে আমার বুকটা যেন খালি ছিল৷ এই অবাধ্য মনটাকে কত কষ্ট করেই না রয়ের কথা ভুলিয়ে রেখেছিলাম৷ এখন বুঝতে পারছি, রয় আমার জীবনের কতখানি অংশ জুড়ে রয়েছে৷ ওকে কাছে পেয়ে সাময়িকভাবে লোলার কথাও ভুলে গেলাম৷ ওর কাঁধে এক চাপড় মেরে ওকে জড়িয়ে ধরলাম৷ কপট তিরস্কারের সুরে বললাম, ‘শালা, সিন্দুকের বাচ্চা! কোথায় ছিলি অ্যাদ্দিন?’

আমার হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে ও আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল৷ শেষে অস্ফুটে বলল, ‘কিন্তু শেট, তুই এখানে কি করছিস? আমি তো ভেবেছিলাম তুই কোন শহরে কেটে পড়েছিস!’

‘পুলিশও তাই ভাবছে৷’ কথা বলতে বলতে আনন্দে আমার চোখ সজল হয়ে উঠল৷ ওকে হাত ধরে রেস্তোরাঁয় টেনে নিয়ে চললাম, ‘আগে চল, একটু গলা ভেজানো যাক৷—কিন্তু তুই এখানে কোত্থেকে এলি?’

‘লিটল ক্রীক—শালা একেবারে জঘন্য জায়গা! সে যাকগে—বললি না তো, তুই এখানে কি করছিস?

খাবারঘরে ঢুকে কাউন্টারের কাছে দুটো টুল নিয়ে আমরা বসলাম৷ রয় ঘরটার চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল৷

দুটো গেলাসে হুইস্কি আর সোডা মিশিয়ে রয়ের দিকে একটা এগিয়ে দিলাম৷ অন্যটায় নিজে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তুই জানতে চাইছিস এখানে আমি কী করছি?’

মাঝপথে কথা থামিয়ে একটু ভাবলাম—রয়কে সব বলাটা কি ঠিক হবে? উহুঁ, আপাতত কিছু না জানানোই ভালো৷ অতএব সত্যি-মিথ্যে মিলিয়ে একটা জবাব দিলাম, ‘আমি এখানে চাকরি করছি৷ তা ছাড়া, গা ঢাকা দেবার পক্ষে জায়গাটা বেশ নিরাপদ৷’

‘নিরাপদ যে সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু তুই মেক্সিকো বা ক্যানাডায় গেলে, সেটা কি আরও ভালো হত না?’

‘ভাই বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়৷ টাকা কোথায়, যে যাব? এখানে যে টিঁকে আছি তাই আমার সাতপুরুষের ভাগ্যি!’

‘এ জায়গাটা তাহলে সত্যিই নিরাপদ বলছিস?’

‘হ্যাঁ৷ কারণ, যে-ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছি, তাতে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না৷’

রয় আমার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল, ‘ফানওয়ার্থ থেকে তোর পালানোর কথা আমি কাগজে পড়েছি৷ তোর সাহস আছে বলতে হবে! এ ক-মাস সবসময় খালি তোর কথাই ভেবেছি৷ কোনদিন ভাবতেই পারিনি, তোর সঙ্গে এভাবে দেখা হবে!’

ওর দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘সেটা আমিও ভাবিনি৷’

রয় হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে আমার হাত চেপে ধরল, ‘শেট, তোকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না৷ তুই আমার জন্যে যা করেছিস, তার কোন তুলনা হয় না৷ তুই যদি ওভাবে—’

‘ওসব কথা বাদ দে৷ ওরকম হলে তুইও আমার জন্যে তাই করতিস৷’

রয় হাঁফ ছাড়ল, ‘ওফ! তোকে যখন ওরা ধরল, আমি তো ভাবলাম তুই বোধ হয় আমার কথা বলেই দিবি৷ কিন্তু—না, শেট, তুই-ই আমার বন্ধুর মতো বন্ধু৷’

‘সে তোর আর দোষ কি! নিজের বোকামির জন্যেই তো আমি ধরা পড়লাম৷ তোর কথা শুনলে কি আর এ অবস্থা হত? তা ছাড়া দেখলাম, আমি যেখানে একাই ধরা পড়েছি, সেখানে তোকে টেনে এনে আর লাভ কী! আসল কথা, তখন ভয়ে আমার মাথার ঠিক ছিল না৷’

রয় এক চুমুক পুরো হুইস্কিটা গলায় ঢেলে দিল, ‘শালা—ভয় কি আমিই কম পেয়েছিলাম? ওঃ কোনরকমে পালিয়ে বেঁচেছি!—সত্যি, কেন যে ওই হতচ্ছাড়া মতলবটা মাথায় এসেছিল৷ দিনের দিন খালি আফসোস করেছি—কেন কুপারের ফ্ল্যাটে গেলাম! সে যাকগে—এখন কি করছিস বল্? আর এখানেই বা কেমন করে এলি?’

রয় ওর খালি গেলাসটা আমার দিকে এগিয়ে দিল৷ গেলাসটা ভর্তি করে ওর হাতে তুলে দিলাম৷ ও দু-চার ঢোঁকে হুইস্কিটা শেষ করে হাত দিয়ে মুখ মুছল, ‘এখন আমাকে সেলসম্যান হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, শেট৷ অর্থাৎ লরেন্স কোম্পানি এখন কোনরকমে আমাকে তাড়াতে পারলে বাঁচে! ফ্রাঙ্কলিন থেকে আরম্ভ করে সব বড়কর্তারাই সন্দেহ করছে—কুপারের ব্যাপারটায় তোর সঙ্গে আমিও জড়িয়ে ছিলাম৷ আর তার ওপর এক শালা আবার বলে বসেছে, পাঁচশো ডলারের দেনায় আমি নাকি পালিয়ে বেড়াচ্ছি৷ ব্যস, ফ্রাঙ্কলিন আমায় ডেকে বলল, আমার আর সিন্দুক-টিন্দুক সারানোর দরকার নেই৷ তার চেয়ে, যেসব খদ্দেরের পুরনো লরেন্স সিন্দুক আছে, তাদের ধরে ধরে নতুন সিন্দুক গছানোর কাজটা আমি নাকি ভালোই পারব৷ এবং তাতে নাকি আমার অভিজ্ঞতাও বাড়বে৷ তারপরেই আমার হাতে খদ্দেরদের নামের ইয়া বড় একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল, আর দিল কিছু লম্বা-চওড়া উপদেশ৷ শা—লা!—অ্যাদ্দিন ধরে ঘুরে ঘুরে জুতোয় শুকতলা খইয়ে ফেললাম, তবু কোন ব্যাটা একটা নতুন সিন্দুক নিল না৷ আশ্চর্য মাইরি!’

রয় পকেট থেকে একটা লম্বা কাগজের টুকরো বের করল, ‘এই তো—‘‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’’—মালিক—কার্ল জেনসন৷ তাই তো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘এখন আমার কাজ হল মি. জেনসনকে পটিয়ে-পাটিয়ে একটা নতুন সিন্দুক গছানো—আচ্ছা, এই জেনসন লোকটাকে, তোর মনিব নাকি?’

বাইরে থেকে একটা ক্যাডিলাকের হর্ন কানে আসায় উঠে পড়লাম, ‘তুই একটু বোস, আমি এখুনি আসছি৷’

রয়ের কাছ থেকে কিছুক্ষণের জন্য রেহাই পেয়ে মনে মনে খুশিই হলাম৷ ওকে কতটা কি বলব না-বলব, সেটা ভাববার কিছুটা সময় পাওয়া যাবে৷

ক্যাডিলাক গাড়িটায় তেল ভরতে ভরতে চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷

অনেক ভেবেচিন্তে স্থির করলাম, রয়কে সবকিছু খোলাখুলি বলাটা ঠিক হবে না—বিশেষ করে জেনসনের খুনের কথা৷ সেটা লোলার ব্যাপার, লোলাই বুঝবে৷ তার চেয়ে বরং সবাইকে যে গল্পটা বলেছি, ওকে তাই বলব৷ সেটাই নিরাপদ হবে৷

কাজ শেষ করে আবার রেস্তোরাঁয় ফিরে গেলাম৷

রয় সিগারেট ধরিয়ে খাবারঘরে পায়চারি করছিল, আমাকে ঢুকতে দেখেই থমকে দাঁড়াল, ‘তোকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে, শেট৷ এরকম একটা চমৎকার জায়গায় তুই চাকরি পেলি কেমন করে? নাঃ, তুই ভাগ্যবান বলতে হবে!’

‘যতটা চমৎকার ভাবছিস, ততটা না হলেও, জায়গাটা খারাপ নয়৷—হ্যাঁ, ভালো কথা, তুই জেনসনের কথা জানতে চাইছিলি? সে এখানে নেই—ব্যবসার কাজে অ্যারিজোনা গেছে৷ কবে ফিরবে কিছু বলে যায়নি৷’

‘যাঃ শালা!’ হতাশায় ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল রয়, ‘তাহলে অ্যাদ্দুর এসে কোন লাভই হল না? তা তুই একবার মিসেস জেনসনেকে বলে দেখ না, তিনি হয়ত নতুন সিন্দুকের অর্ডার দিতে পারেন!’

‘উহুঁ—কোন আশাই নেই৷ এখানে মি. জেনসনের কথা ছাড়া কেউ এক পা চলে না৷ তোর কপাল ফুটো—কী আর করবি!’

রয় হাত বাড়িয়ে কাউন্টারের উপর রাখা ছাইদানে সিগারেটের টুকরোটা গুঁজে দিল, ‘তাহলে তোকে একটা কথা বলা দরকার, শেট৷ একটু আগেই তোকে বলেছি গত দুমাসে একটা সিন্দুকও আমি বেচতে পারিনি৷ এতএব, যখনই আমি কোম্পানিতে ফিরে যাব, সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমাকে রাস্তা দেখাবে৷ কারণ, শুধু মুখ দেখবার জন্যে ওরা আমাকে রাখেনি৷ অর্থাৎ চাকরি খতম!’ রয় বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকাল৷

‘এতে তোর ভাবনার কী আছে? অন্য-কোন সিন্দুক কোম্পানি তোর মতো কারিগর পেলে একেবারে লুফে নেবে৷ তুই ‘‘হেওয়ার্ডসে’’ চলে যা না৷ ওদের কোম্পানির সিন্দুক লরেন্স কোম্পানির থেকে অনেক বেশি বিক্রি হয়৷

রয় মাথা নাড়ল, ‘উহুঁ, হেডয়ার্ডস কেন, কোন সিন্দুক কোম্পানিই আমাকে কলকে দেবে না৷ ওরা জানতে চাইবে, কেন আমি চাকরি ছাড়লাম৷ তখন শালা ফ্রাঙ্কলিন ওদের স-ব বলে দেবে৷ বলবে, আমি ঠিক বিশ্বস্ত কর্মচারী নই—ব্যস, হয়ে গেল! চাকরি না পাওয়ার পক্ষে এই কথা ক-টাই যথেষ্ট!’

একটু অবাক হয়ে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘তার মানে? ফ্রাঙ্কলিন তো আর প্রমাণ করতে পারছে না কুপারের ব্যাপারটায় তুই জড়িয়ে ছিলি!’

‘প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন নেই৷ ফ্রাঙ্কলিনের কথাকেই ওরা বেদবাক্য বলে মনে করবে৷ আর সঙ্গে সঙ্গে হেডয়ার্ডস থেকে অর্ধচন্দ্র৷’

‘তাহলে কি করবি ভাবছিস?’

রয় ঠোঁট উলটে কাঁধ নাচাল, ‘কি জানি, কিছু তো বুঝে উঠতে পারছি না৷ সিন্দুকের কাজ ছাড়া আর-কোন কাজই আমি জানি না৷ তা ছাড়া, বয়েসও তো পঁয়ত্রিশ হল এই বয়েসে নতুন চাকরিই বা কে দেবে?’ কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘড়ি দেখল রয়, ‘আরে, একটা বাজে! অ্যাই, কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা কর মাইরি—ভীষণ খিদে পেয়েছে৷’

আজ কি কি রান্না করেছি, ওকে জানালাম৷ এই সময় দুজন ট্রাক ড্রাইভার এসে খাবারের অর্ডার দিল৷ রান্নাঘরের গিয়ে তাদের খাবার তৈরি করছি, রয়ের গলা কানে, ‘শেট, ফ্রায়েড চিকেন থাকলে আমাকে তাই দে৷’

‘ঠিক আছে, বোস—একটু পরেই নিয়ে আসছি৷ আগে খেয়ে তারপর বলিস, কি জানিস! আমি বাজি ফেলতে পারি, আগে কখনও এরকম রান্না তুই খাসনি৷’

‘সবই বুঝলাম বাবা—কিন্তু আর দেরি করিস না তাহলে ক্ষিদের চোটে টেবিল চেয়ার কামড়াতে শুরু করব!’ নিজের রসিকতায় ও নিজেই হেসে উঠল, ‘শালা, সেই কখন থেকে না খেয়ে আছি৷’

কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই জানলা দিয়ে বাইরে দেখছি—লোলা এল কিনা৷ এতক্ষণে তো ওর ফিরে আসার কথা৷ কেন এত দেরি হচ্ছে বুঝতে পারছি না৷

যখন রয়ের জন্য প্লেটে ফ্রয়েড চিকেন সাজিয়ে নিয়ে আসছি, দেখলাম দূরের বালিয়াড়ির পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটে আসছে লোলার মার্কারি৷

খাবারের প্লেটটা এনে রয়ের সামনে রাখলাম, ‘মিসেস জেনসন আসছেন৷’ তারপর গলার স্বরকে অপেক্ষাকৃত নিচু করলাম, ‘এখানে আমার নাম শেট কারসন নয়—শেট প্যাটমোর৷ ভুলিস না যেন!’

রয় ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেট নামে ডেকে অভ্যস্ত৷ তাই জ্যাক প্যাটমোর বললেও, ও হয়তো ভুল করে শেট নামেই আমাকে ডেকে বসবে৷ তার তা শুনে লোলা যদি অবাক না হয়, তাহলে ও ভাববে, লোলা আমার আসল পরিচয় জেনেও আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছে৷ এবং এতে রয় নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷ হয়তো বুঝতে পারবে জেনসনের উধাও হওয়ার পিছনে আমাদের হাত আছে৷ এইসব ভেবেই এই নামটা বললাম৷

রয় ঘাড় নেড়ে চোখ টিপল, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, মি. শেট প্যাটমোর৷ আমার কোন ভুল হবে না৷’

রেস্তোরাঁর পিছন দিকে এসে লোলা গাড়ি থামাল৷ একটু পরেই, রান্নাঘরের পিছন দিকে যে খিড়কি দরজা আছে, সেটা খোলার শব্দ পেলাম৷ রয়কে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলে গেলাম রান্নাঘরে৷

‘আমার ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল, এদিকে সবকিছু ঠিক আছে তো?’ রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল লোলা৷ রোদে একটানা গাড়ি চালানোর ফলে ওর মুখ হয়ে উঠেছে রক্তাভ৷

‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে—কোন অসুবিধে হয়নি৷’ ওকে কাছে টেনে নিয়ে ওর গালে ছোট্ট করে চুমু খেলাম, ‘তবে একটা ব্যাপার হয়েছে, লোলা৷ আমার এক ছোটবেলাকার বন্ধু আজ হঠাৎ এখানে এসে হাজির হয়েছে৷ কার্লের সঙ্গে ওর কিছু ব্যবসার কথাবার্তা ছিল৷ ওকে বলেছি, কার্ল অ্যারিজোনা থেকে মাস দুয়েকের আগে ফিরছে না৷’

লোলা যেন চমকে উঠল, ‘তোমার বন্ধু? কিন্তু ও যদি পুলিশে তোমার কথা—’

‘না, না৷ সে-সবের কোন ভয় নেই৷ বলছি না, আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে৷’

একসময় খাবার ঘর থেকে, কাউন্টারের উপর অধৈর্যভাবে টোকা মারার শব্দ কানে এল৷

‘দাঁড়াও—দেখে আসি, কে ডাকছে৷ পরে বরং গাড়ি থেকে সব মালপত্র নামানো যাবে৷’ লোলার লোভনীয় সঙ্গ ত্যাগ করে খাবার ঘরে ফিরে এলাম৷

দেখি, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মোটাসেটা বয়স্ক লোক৷ পরনে ফিকে বাদামী রঙের স্যুট৷ টুপিহীন মাথায় চুলের স্বল্পতা চোখে পড়ছে৷ সারা মুখে একটা পরিশ্রান্ত ভাব৷

‘জনা বিশেক লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা হবে?’ আমাকে ঢুকতে দেখে লোকটি প্রশ্ণ করল৷

‘নিশ্চয়ই হবে তাঁদের ভেতরে নিয়ে আসুন৷’

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল পাম্পের কাছে দাঁড়ানো একটা যাত্রীবাহী বাস৷ মোটা লোকটির নির্দেশে বাস থেকে যাত্রীরা একে একে নেমে আসতে লাগল৷

চট করে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মারলাম৷ লোলাকে আসন্ন ভিড়ের কথা জানিয়ে, তাড়াতাড়ি হাত চালাতে নির্দেশ দিলাম৷ ও হেসে ঘাড় নাড়ল৷

কাউন্টারের কাছে ফিরে আসতে-না-আসতেই খাবার ঘর খদ্দেরে ভরে গেল৷ শুরু হল কাজ আর কাজ৷ একে দম নেবার সময় পাওয়া যাচ্ছে না, তার উপর কয়েক ট্রাক তেল নেবার জন্য অনবরত হর্ন দিতে লাগল৷

রয়ের তখন খাওয়া-দাওয়া শেষ৷ ও বসে বসে দেখছিল, আমি খদ্দেরদের চাপে পড়ে কিরকম হিমসিম খাচ্ছি৷ হঠাৎই টুল ছেড়ে ও আমার কাছে এগিয়ে এল, ‘আমি সাহায্য করলে তোর আপত্তি আছে? বল্ তো বাইরে গিয়ে ট্রাকগুলোকে পেট্রল দিই৷’

‘তাহলে তো আমার অনেক সুবিধে হয়৷’ খুচরো পয়সা-ভরা থলেটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, ‘পাম্পের মিটারেই দাম লেখা আছে দেখতে পাবি—কোন অসুবিধে হবে না৷’

থলেটা নিয়ে রয় পাম্পের দিকে চলে গেল৷

দেড়টি ঘণ্টা টানা ব্যস্ত থাকার পর কাজের চাপ হালকা হল৷ যাত্রীদের নিয়ে বাস চলে গেল৷ এতক্ষণ কাজের ভিড়ে রয়ের কথা আমার মনেই ছিল না৷ এখন হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷

পাম্পের কাছে এখনও তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ রয় একমনে তাদের উইন্ডস্ক্রীন পরিষ্কার করছে৷

রান্নাঘর ছেড়ে লোলা যে কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, লক্ষ্যই করিনি৷ ও রয়কে একদৃষ্টে দেখতে লাগল৷ একসময় আমার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘শেট, এ লোকটা কে? তোমার সেই বন্ধু নাকি?’

‘হ্যাঁ, আমার বন্ধু রয় ট্রেসি৷’ জানালা দিয়ে আমি তখনও রয়কে দেখছি, ‘কাজের চাপ দেখে নিজে থেকেই সাহায্য করতে চাইল, তাই—বেশ ভালোই কাজ করছে কী বলো?’ বন্ধু-গর্বে গর্বিত হয়ে লোলার দিকে চেয়ে হাসলাম৷

‘হুঁ—’ লোলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল, যার শুনে চোখ ফেরাতে গিয়েও থমকে গেলাম৷ খুঁটিয়ে লোলাকে দেখতে লাগলাম৷ ও কিন্তু তখনও একইভাবে জানালা দিয়ে চেয়ে আছে—রয়কে দেখছে৷

হঠাৎ ওর সবুজ চোখ কোন-এক কুটিল চিন্তায় কুঁচকে উঠল, ‘তোমার বন্ধু কি এখানে কাজ করবে বলেছে, শেট? তাহলে ওকে রাখলে কেমন হয়? তুমিই তো বলছিলে, আমাদের একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী দরকার৷’

ওকে জড়িয়ে ধরে আস্তে চাপ দিলাম, ‘আমিও তোমাকে ঠিক এই কথাই বলতে যাচ্ছিলাম, লোলা৷ রয় আমার ভাইয়ের মতো, আর খুবই বিশ্বাসী৷ ওকে তো আগেই বলেছি জেনসন এখানে নেই৷ এখন জানিয়ে দিলেই হবে, কার্ল অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ভোগে পড়েছে৷ ও কোন সন্দেহই করবে না৷—কিন্তু রয় কি এই নির্জন জায়গায় থাকতে চাইবে?’

‘সেটা ওকে বলেই দেখ!’ লোলা রয়ের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিল৷

লোলার কাঁধে হাত রেখে হাসলাম, ‘তবে একটা কথা বলতে পারি, লোলা—তোমার দিকে রয় কখনোই হাত বাড়াবে না৷ উনিশ বছর বয়সে ওর বউ পালানোর পর থেকে, ও কোন মেয়েকেই সহ্য করতে পারে না৷’

‘এই, রয় আসছে৷ এলে ওকে জিগ্যেস করো থাকবে কিনা৷’ রয়কে আসতে দেখে চাপা স্বরে লোলা বলল৷

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রয় খাবার ঘরে এসে ঢুকল৷ লোলাকে দেখেই ও থমকে দাঁড়াল—অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ অন্য কেউ লোলার দিকে এভাবে চেয়ে থাকলে হয়ত অস্বস্তি বোধ করতাম৷ কিন্তু রয়কে আমি চিনি—তাই হেসে ওর সঙ্গে লোলার পরিচয় করিয়ে দিলাম, ‘রয়, ইনিই মিসেস জেনসন৷ লোলা, এ আমার বন্ধু—রয় ট্রেসি৷’

‘যে কাজের চাপ পড়েছিল! তুমি সাহায্য না করলে হয়তো ভীষণ অসুবিধেয় পড়তাম৷’ লোলা রয়ের দিকে চেয়ে হাসল, ‘সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ৷’

‘ও কিছু নয়৷’ রয় হেসে লোলার হাসি ফিরিয়ে দিল, ‘সত্যি, মিসেস জেনসন, এই জায়গাটা ভারি চমৎকার!’

‘জায়গাটা সত্যিই আপনার ভালো লেগেছে?’

‘নিশ্চয়ই! না হলে আর বলছি?’

‘তাহলে এখানে থেকেই যা না৷’ সুযোগ বুঝে রয়কে বললাম, ‘রাস্তার ওপারে একটা ঘর আছে, ওখানে থাকতে পারিস৷ আর সপ্তাহে চল্লিশ ডলার করে মাইনে পাবি৷ কি রে, রাজি?’

রয় আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে লোলার দিকে তাকাল৷ মূর্খের ধূর্ত হাসিটাকে আরও ধূর্ত করল, ‘আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে আর আপত্তি করি কেন, মিসেস জেনসন?’

‘রাজি না হওয়ার কি আছে?’ এই তো সেদিন শেটকে বলছিলাম, আমাদের একজন লোকের দরকার৷’

‘তাহলে থাকব৷’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে রয় হাসল৷

এমন সময় একটা ফোর্ড স্টেশন-ওয়াগন একরাশ ধুলো উড়িয়ে পাম্পের কাছে এসে থামল৷ সেটাকে একনজর দেখে নিয়ে রয় আমার দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসল, ‘কী স্যর, বলেন তো এই গাড়িটাকে দিয়েই আমার চাকরি শুরু করি?’

ওর কপট ঠাট্টার সুরে হাসলাম, ‘এত তাড়াতাড়ির কিছু নেই৷ লোলার সঙ্গে আলাপ-সাপাল কর, জায়গাটা ঘুরে-ফিরে দেখ্, তারপর কাজ শুরু করবি৷—এ গাড়িটা আমিই দেখছি৷’

খাবার ঘর ছেড়ে বেরোবার আগে লোলাকে বললাম, ‘ভালো করে ওর যত্ন-আত্তি করো—সেই সুকল থেকে ও আমার বন্ধু শুধু বন্ধু কেন, একেবারে ভাইয়ের মতো৷’

রয় হেসে আমার পাঁজরে এক খোঁচা মারল, ‘ঠিক বলেছিস৷’ ও ফিরে তাকাল লোলার দিকে—ওর চোখে চোখ রাখল, ‘একেবারে ভাইয়ের মতো!’

রাত দশটায় গাড়ি-ট্রাকের ভিড় কমলে আমরা খেতে বসলাম৷ ডিনার টেবিলের একদিকে আমি আর লোলা৷ আমাদের মুখোমুখি, টেবিলের অপরদিকে বসেছে রয়৷ রয়ের উপস্থিতি আমার কাছে কিছুটা অস্বস্তির কারণ হলেও লোলাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল৷ নতুন চাকরির আনন্দে রয় উদ্বেলিত খেতে খেতে অনর্গল বকবক করছে৷

‘জায়গাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে শেট! কে ভেবেছিল বল্, এভাবে হুট করে তোর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা লোভনীয় চাকরি পেয়ে যাব৷ ঘুরে ঘুরে সিন্দুক বেচার চেয়ে এখানে চাকরি করা অনেক ভালো৷’

লোলা খেতে-খেতে থমকে রয়ের দিকে তাকাল, ‘তুমি বুঝি সিন্দুক কোম্পানিতে কাজ করতে?’

‘আপনার কাছে কিছুই গোপন করব না, মিসেস জেনসন,’ রয় দাঁত বের করে হাসল, ‘সিন্দুকের লাইনে আমার আর শেটের চেয়ে ভালো কারিগর বেশি নেই৷’

কথা শেষ করে আমার দিকে ফিরল সমর্থনের আশায়, ‘কি রে, মিথ্যে বলছি?’

‘না, মানে—মোটামুটি আর কি! এই সিন্দুক-লাইনে আমাদের চেয়েও বাজে কারিগর অনেক দেখেছি৷’

‘জানেন মিসেস জেনসন, আমি আর শেট একই দিনে, একই কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলাম৷ অবশ্য ও আমার চেয়ে অনেক ভালো কারিগর, তবে সিন্দুকের তালার ব্যাপারে ওর চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা বেশি৷ কিন্তু ওকে নিয়ে মুশকিল হল, ও বড্ড বেশি সাধুপুুরুষ৷ ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার দিন থেকে আজ পর্যন্ত ও শুধু আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেই গেছে৷ সবসময়ে আমিই ওকে ঝামেলায় জড়িয়েছি, আর শেষ পর্যন্ত ও-ই আমাকে বাঁচিয়েছে৷’

‘এখানে কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয় নেই, রয়৷’ শীতল স্বরে ওকে বললাম, ‘দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার আছে বলে তো মনে হয় না৷’

‘আমার তাতে বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই,’ রয়ের মুখের ভাব হঠাৎই গম্ভীর মনে হল, ‘কিন্তু মি. জেনসন ফিরে এসে আমাকে দেখলে কি বলবেন?’ ও লোলার দিকে তাকাল, ‘মিসেস জেনসন, চাকরিটা স্থায়ী হলেই ভালো হয়৷’

‘কার্ল ফিরবে বলে আমার মনে হয় না৷’ লোলার বিষণ্ণ ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল, ‘আর যদিও বা ফিরে আসে, তোমাকে দেখলে খুশিই হবে৷’

রয় চমকে মুখ তুলে তাকাল লোলার দিকে, ‘মি. জেনসন ফিরবেন না? কি বলছেন আপনি!’ ও একপলক আমাকে দেখল, তারপর আমার চোখ ফেরাল লোলার দিকে, ‘কিছু গণ্ডগোল হয়েছে নাকি, মিসেস জেনসন?’

‘হ্যাঁ, সাধারণত যা হয়, তাই৷’ কথার পিঠে কথা বলার ভঙ্গিতে লোলা জবাব দিল, ‘আমি কাউকে এখনও বলিনি৷ চিঠিতে কার্ল পরিষ্কার করে না লিখলেও, আমার মনে হয়, ও আর ফিরবে না৷ অ্যারিজোনায় গিয়ে কার্ল এমন আর-একটা মেয়ের সন্ধান পেয়েছে, যাকে ওর আমার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লেগেছে৷’ কথা শেষ করে লোলা মাথা নিচু করল, কাঁটা-চামচটা আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল৷

রয় হঠাৎ যেন অস্বস্তিবোধ করল, ‘আমি দুঃখিত, মিসেস জেনসন—’

লোলা মুখ তুলে হাসল, ‘এতে দুঃখিত হওয়ার কী আছে—’ ও হাত রাখল আমার হাতে, ‘এখন আমি আর শেট—’ লোলা মাঝপথেই থামল, আমার হাতে আস্তে চাপ দিল, ‘কার্ল যে শেটকে এখানে রেখে গেছে, তাতেই আমি খুশি৷ আর-কিছু আমার চাই না৷’

রয় আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, ‘শেট, তোর ভাগ্য সত্যিই অসাধারণ!’

‘তাই তো দেখছি৷’ ঠাট্টার সুরে জবাব দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘চল্, তোকে তোর ঘর দেখিয়ে দিই৷’

রয় খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল, ‘এত চমৎকার রান্নার জন্যে ধন্যবাদ, মিসেস জেনসন৷’

লোলা রয়ের দিকে চেয়ে হাসল, ‘আমাকে লোলা বলেই ডাকবে৷ এখানে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে নাম ধরেই ডাকি তার ওপর তুমি আবার শেটের বন্ধু৷’

‘তাই সই৷ বল তো প্লেট ধোবার ব্যাপারে সাহায্য করি—হুঁ?’

‘নাঃ, তার কোন দরকার নেই৷ ও আমি একাই পারব৷ তুমি বরং শেটের সঙ্গেই যাও৷’

চাঁদের আলোয় ভেজা বালির রাস্তা ধরে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম৷

‘খুকিখানা পেয়েছিস জববর! তোর জন্যে আমার সত্যিই আনন্দ হচ্ছে, শেট৷ এখনও ভেবে দেখ, আমি থাকাতে তোর কোন অসুবিধে হবে না তো৷’

‘একটুও না, তাছাড়া, সারাটা দিন ধরে একটা মেয়ের সঙ্গে কাটাতে ভালো লাগে? গল্প ইয়ার্কি করবার জন্যে কারও সঙ্গ চাই তো৷’

রাস্তার ওপারে পৌঁছে ঘরের দরজা খুলে আমরা ভেতরে ঢুকলাম৷

‘এ যে সাংঘাতিক কাণ্ড দেখছি! শালা, টেলিভিসন পর্যন্ত রয়েছে!’ রয় ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে একেবারে অবাক হয়ে গেল৷ তারপর ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা জেনসনের বাংলোর দিকে তাকাল, ‘তুই কি এখন ওখানে থাকিস?’

‘হ্যাঁ৷ তা ছাড়া কোথায় থাকব?’ হেসে জবাব দিলাম৷

‘হুঁ, মেয়েদের ব্যাপারে তুই মাইরি গুরুদেব! আমার বাবা ওসব আসে না—’ রয় ওর মালপত্রের ব্যাগটা একটা চেয়ারে নামিয়ে রেখে সিগারেট ধরাল, ‘এই জেনসন লোকটা দেখছি নিতান্তই বোকার চূড়ান্ত৷ নয়তো এরকম একটা জায়গা ছেড়ে চলে যায়! আর তাও কিনা সামান্য একটা মেয়ের জন্যে! নাঃ, আমার মাথায় শালা কিছুই ঢুকছে না৷ ওই মেয়েটার কাছে জেনসন এমন কি পেল বল্ তো, যা লোলার নেই?’

‘আমার মনে হয়, কার্ল কোন মোটাসোটা সমবয়সী বুড়ির প্রেমে পড়েছে৷ লোলা ওর চেয়ে বিশ বছরের ছোট হওয়ায় ওদের একদম বনিবনা হত না৷’

রয় সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল৷ তারপর ফুরফুর করে একটানা ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে তো একটা সহজ উপায়ই ছিল৷ লোলাকে ভাগিয়ে দিয়ে জেনসন নিজেই এখানে থাকতে পারত! আমি হলে অন্তত তাই করতাম৷’

রয়কে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি৷ ও আর যাই হোক, বোকা নয়৷ ব্যাপার-স্যাপার দেখে ওর সন্দেহ হয়েছে, তা বুঝতে পেরে সতর্ক হলাম৷ যেভাবে হোক ওকে বিশ্বাস করাতেই হবে৷ না হলে ও হয়ত আসল ব্যাপারটাই ধরে ফেলবে—জেনসন আর বেঁচে নেই!

‘ভাগিয়ে দেব বললেই হল? অত সোজা নয় রে, রয়! আর লোলাই বা নিজের পাওনা ছাড়বে কেন?’

ওর সন্দেহাতুর চোখ আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, ‘জেনসন গেছে কদ্দিন হল?’

‘মাসখানেক হবে৷’

‘এর মধ্যে লোলা ওর কাছ থেকে কোন চিঠিপত্তর পেয়েছে?’

‘উহুঁ৷’

‘তাহলে জেনসন যে ওখানে গিয়ে অন্য মেয়ের প্রেমে পড়েছে, সে-সম্বন্ধে লোল নিশ্চিত হল কেমন করে?’

‘ও কার্লকে অনেকদিন ধরে জানে—সে যে ওখানে গিয়ে অন্য কোন মেয়ের প্রেমে পড়েছে, সে-বিষয়ে লোলা নিঃসন্দেহ৷’

রয় মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু জেনসন যদি হঠাৎ ফিরে আসে? তোকে আর লোলাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে?’

‘জেনসন আর ফিরবে না, রয়৷’ আমার গলায় সিদ্ধান্তের সুর৷

রয় চমকে মুখ তুলে আমাকে দেখল৷ তারপর আবার চোখ ফেরাল অন্যদিকে, ‘তুই যে ঝামেলায় জড়িয়ে আছিস, সে-কথা লোলাকে বলেছিস?’

উত্তর দিতে কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করলাম৷ কি উত্তর দেব এ প্রশ্নের? লোলা আমার সম্বন্ধে সবই জানে, তা কি বলব? কিছুক্ষণ চিন্তার পর ঠিক করলাম, রয়কে একথা জানানোর কোন বিপদ নেই৷ হাজার হলেও ও আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ তাই সম্মতি জানিয়ে জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, বলেছি৷’

আমার উত্তরে রয় একটুও অবাক হল না৷ হয়তো এই উত্তরই ও আশা করেছিল৷

রয় একমনে ওর ব্যাগ খালি করে জিনিসপত্রগুলো বিছানার উপর ছড়িয়ে রাখতে লাগল, ‘এ জায়গাটাকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে, তুই রাজা হয়ে যাবি৷ সপ্তাহে কি রকম আমদানি হয়, শেট?’

জেনসন মারা যাবার পর থেকে সাপ্তাহিক আয় একেবারে কমে গেছে৷ কারণ, ওর পুরোনো লোহালক্কড়ের ব্যবসা থেকেই একটা মোটা টাকা আসত৷ আর এই লোহালক্কড়ের ব্যাপারে আমি আর লোলা সমান দিগগজ৷ তাই কার্ল মারা যাবার পরই লোহালক্কড়ের ব্যবসা একেবারে মুখ থুমড়ে পড়েছে৷ বর্তমানে আমাদের ভরসা রেস্তোরাঁ, পেট্রল এবং গাড়ি মেরামত৷ কিন্তু হলে কি হবে, যা আশা করেছিলাম, আয়-পত্তর তার ঢের কম হয়৷ টেনেটুনে সপ্তাহে মাত্র শ-দুয়েক ডলার লাভ হয়৷ সে-টাকাটা আমি আর লোলা ভাগাভাগি করে নিই৷ অর্ধেক আমার, আর বাকী অর্ধেক ওর৷

জেনসন মারা যাবার পর, ওর সিন্দুকে আমার জমানো টাকা ঠিক যেমন ছিল তেমনই আছে৷ ওতে আর হাত দিইনি, কারণ টাকাটা খরচ করবই বা কিসে? তাই এখনও প্রতি সপ্তাহে, আমার ভাগের একশো ডলার ওই সিন্দুকেই জমিয়ে রাখি৷ লোলা ওর ভাগের টাকাটা দিয়ে কি করে জানিও না, জিগ্যেসও করি না৷

‘কীরে শেঠ, বললি না তো আমদানি কেমন হয়?’

রয়ের কথায় আমার চমক ভাঙল৷ ভাবনা-চিন্তা ছেড়ে সাত-তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, ‘তুই যত ভাবছিস, তত নয়৷ এই—শ-দুয়েক আসে আর কি?’

রয় হতাশায় মুখ ব্যাজার করল, ‘কী বলছিস তুই! এত কম!—আমি তো ভেবেছিলাম দু-শ ডলারের বেশি৷’ ও পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ বাইরেটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারালে, এরকম একটা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে মোটা টাকা আমদানি করা যায়৷’

‘উহুঁ—সেরকম কোন আশা নেই৷ এই বিশাল মরুভূমির মাঝে, এই হতচ্ছাড়া জায়গা কি কাজেই বা লাগবে?’

‘আরে, মরুভূমির মাঝে বলেই তো বলছি!’ রয় উৎসাহভরে আমার দিকে তাকাল, ‘কোন ব্যবসার ব্যাপারে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর যে হতে পারে না, এটুকু তুই বুঝতে পারছিস না?’

‘তার মানে, কী ব্যবসা?’

‘তুই কি এই নির্জন শ্মশানেই চিরজীবন পড়ে থাকতে চাস, শেট? ছোটবেলা থেকেই আমরা সবসময় ভেবে এসেছি কি করে বড়লোক হব, দুটো পয়সার মুখ দেখব!—তাই তো বললাম, এ-জায়গাটা কাজে লাগাতে পারলে তুই রাজা হয়ে যাবি৷’ রয় ফিরে এসে আমার মুখোমুখি বসল৷

বিছানায় বসে ভুরু কুঁচকে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘কী কাজে? খুলে বল্৷’

‘এই—ধর্—মেক্সিকো চেড়ে যারা পালাতে চায়, তাদের হেলিকপ্টারে করে এখানে নিয়ে আসা যায়৷ এ জায়গাটা তাদের ভালোই লাগবে৷ আর আমরাও মাথাপিছু দু-শ ডলার করে মোটা টাকা খিঁচতে পারব!’

‘রয়, তুই যদি মাস দুয়েক ফার্নওয়ার্থে থাকতিস, তবে আর এ-ধরনের কথা বলতিস না৷’ শান্ত স্বরে ওকে বললাম৷

রয় মাথার চুলে হাত চালিয়ে নির্লজ্জের মতো হাসল৷ কিছুটা অস্বস্তিভরেই বলল, ‘সে-কথা ঠিক, শেট৷ তোর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি৷ কিন্তু কুপারের এই কাজটা আমরা ঠিকভাবে করতে পারিনি৷ বোকার মতো, মাত্র দুদিনের অনুসন্ধানেই কাজে নেমে পড়েছি৷ আমাদের উচিত ছিল, অন্তত এক সপ্তাহ কুপারের গতিবিধি লক্ষ্য করা৷ ওর সমস্ত ভাব-গতিক জেনে, তারপর আসল কাজে হাত দেওয়া—কিন্তু কোথায় কি? নিজেদের দোষেই আমরা বিপদে পড়লাম৷’

‘ওসব দুদিন-ফুদিন নয়৷ কাজটা আমাদের করাই উচিত হয়নি৷ নিজেরাই বিপদ ডেকে এনে নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরেছি—তুই না হলেও অন্তপক্ষে আমি তোকে সোজাসুজি জানিয়ে দেওয়াই ভালো, রয়—আর-কোন ঝামেলায় আমি নিজেকে জড়াতে চাই না৷’

‘সে আমি বুঝতে পারছি, শেট, কিন্তু বড়লোক হওয়ার আশা ছাড়তে আমি রাজি নই৷ আজ হোক, কাল হোক, বেশ কিছু টাকা আমার চাই-ই চাই৷’

‘সেই ‘‘বেশ কিছু টাকা’’ যে এখান থেকে পাবি না, সে-বিষয়ে তুই নিশ্চিন্ত থাকিস৷’

রয়ের সেই বিশেষ হাসিটি তখনও ওর ঠোঁটে লেগে রয়েছে, ‘আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে৷ কোন ঝামেলার তোকে আর জড়াচ্ছি না৷’

রয় উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ একটা ড্রয়ার খুলে কতকগুলো শার্ট, প্যান্ট তাতে রাখল৷ তারপর মুখ ফিরিয়ে তাকাল, ‘শেট, সত্যিই কি তোর আর বড়লোক হওয়ার সাধ নেই?’

‘না, রয়—ফার্নওয়ার্থের দাওয়াই খেয়ে সে-সাধ আমার মিটে গেছে৷ তুই খেলে তোরও যেত!’

‘শুনেছি, ওরা নাকি কয়েদীদের কাছে খুব নৃশংস ব্যবহার করে—’ গোটাকয়েক রুমাল বিছানা থেকে তুলে দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলল৷ কিন্তু সেগুলো রাখতে গিয়েই তীক্ষ্ণস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, রয়, ‘আরে! এটা কী?’

ওর কথার সুরে চমকে উঠলাম৷ অশান্ত হৃৎপিণ্ড যেন ধাক্কা খেল এক অদৃশ্য কাচের দেওয়ালে, ‘কীসের কথার বলছিস?’ দুরু দুরু বুকে প্রশ্ন করলাম৷ তাহলে কি রয়—?

আমার আশঙ্কা যে মিথ্যে নয়, পরমুহূর্তেই তার প্রমাণ পেলাম৷ রয় .৪৫ কোন্ট রিভলভারটা ততক্ষণে ড্রয়ার থেকে বের করে ফেলেছে যে রিভলভারের গুলিতে মারা গেছে কার্ল জেনসন৷

চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল৷ ভীষণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মস্তিষ্কের প্রতিটি চিন্তা-কোষ—কী জবাব দেব ওকে?

সেই ঘটনার পর রিভলভারটা লোলার কাছ থেকে নিয়ে, পরে কখন যে ওই ড্রয়ারটায় রেখে দিয়েছিলাম, মনেও নেই৷ এতদিন ওটার কথা একেবারেই ভুলে ছিলাম৷ কিন্তু এখন? কি বলব রয়কে! একটা সরীসৃপ যেন আস্তে আস্তে শিরদাঁড়া বেয়ে উঠতে লাগল৷

হঠাৎ ইচ্ছে হল, একলাফে রয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলভারটা কেড়ে নিই, কিন্তু অনেক কষ্টে দমন করে কোনরকমে জবাব দিলাম, ‘ওঃ, ওটা জেনসনের রিভলভার৷ ও চলে যাবার পর, একদিন রিভলভারটা পেয়ে এই ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম৷’ যতটা সম্ভব সহজ হবার চেষ্টা করলাম৷

রয় নিষ্পলক চোখে রিভলভারটার দিকে তাকিয়ে ছিল৷ গুলি ভরার সিলিন্ডারটা ও আঙুল দিয়ে ঘোরাল৷ রিভলভারের নলটা নাকের কাছে এনে শুকল, ‘খুব সম্প্রতি এটা থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে দেখছি৷’ ও ম্যাগাজিন খুলে খালি কার্তুজের খোলটা বের করে বিছানায় উপর ফেলল, ‘দেখেছিস?—তুই জানতিস না এটা থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে?’—হুঁ—গুলিটা ছোড়া হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি দেখছি৷’ আত্মগতভাবে শেষ কথাগুলো বলে, রয় ওর অন্তর্ভেদী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ধরল আমার চোখে, ‘এই গুলিতে কে মারা গেছে, শেট?’

বহু কষ্টে ওর চোখে চোখ রাখলাম৷ অপরাধবোধের ছায়াকে মুখের আয়না থেকে সরিয়ে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, ‘কেউ মারা যায়নি রয়৷ জেনসন এটা দিয়ে চিল শিকার করত৷ হয়তো গুলি করার পর রিভলভারটা পরিষ্কার করতে ভুলে গেছে৷’

‘.৪৫ রিভলভার দিয়ে কেউ যে পাখি শিকার করে, তা তো জানতাম না!’ রয় রিভলভারটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল, ‘তাহলে জেনসনের টিপ বলতে হবে৷’

‘গুলি করত, এই পর্যন্ত৷ কোনদিন কোন চিলের গায়ে লাগাতে তো দেখিনি৷’ এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে রিভলভারটা তুলে নিয়ে পকেটে রাখলাম, ‘যাকগে, অনেক দেরি হয়ে গেল—আমি চলি৷ তোর সব-কিছু ঠিক আছে তো?’

‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে৷’ রয়ের গলায় কেমন যেন একটা নিষ্প্রাণ সুর৷ কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলাম৷

‘আজ রাতে কে জাগছে, শেঠ?’ রয় হঠাৎ প্রশ্ন করল৷

‘আমি৷ কিন্তু কাল রাতে তোর ডিউটি৷ আমরা দুজনেই পালা করে চালাব, কী বলিস?’

‘হুঁ৷ —শেট, আমার সৌভাগ্যকে আমি কিন্তু এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না৷ কি অদ্ভুতভাবেই না তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তাই না?’

ওর কাঁধে হাত রাখলাম, ‘সৌভাগ্য তো আমারও৷ আমিও কি জানতাম, তোর সঙ্গে এতদিন পরে আবার এভাবে দেখা হবে? নে, শুয়ে পড়্—’ পা বাড়ালাম দরজার দিকে৷

‘শেট!’

থমকে দাঁড়ালাম৷

ঘাড় ফেরাতেই চোখে পড়ল রয়ের স্থির চোখজোড়ায়৷ ও একমনে চোয়ালে হাত বোলাচ্ছে৷

‘কি বলছিস বল্৷’

‘.৪৫টা পরিষ্কার করে রাখিস৷ যে-বন্দুকে বারুদের গন্ধ লেগে থাকে, সে বন্দুককে কখনও বিশ্বাস নেই!’

ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম, ‘ঠিকই বলেছিস৷ আচ্ছা—চলি৷

‘ভালোভাবে থেকো, দোস্ত!’ রয়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷

ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোতেরই লক্ষ্য করলাম—রেস্তোরাঁয় কোন আলো নেই, কিন্তু বাংলোয় লোলার ঘরে আলো জ্বলছে৷ সুতরাং বাংলোর দিকে এগোলাম৷

লোলা বিছানায় বসে পা থেকে মোজা খুলছিল৷ পরনে সানদো অন্তর্বাস ও নাইলনের প্যান্টিস৷ আমি ঘরে ঢুকতেই ও ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে একবার দেখল, তারপর আবার মোজা খোলায় মন দিল৷

‘ওঃ, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে৷’ লোলা হাই তুলল৷ তারপর মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, ‘শেট, তোমার বন্ধুকে আমার ভালো লেগেছে৷’

‘তা লাগবারই কথা৷ কারণ, রয় আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷’ পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে টেবিলের একদম উপরের ড্রয়ারটায় রাখলাম৷ লোলা আমার দিকে পিছন ফিরে থাকায় কিছু দেখতে পেল না৷ ঠিক করলাম, কালই রিভলভারটা পরিষ্কার করে রাখব৷

ড্রয়ার বন্ধ করে লোলাকে বললাম, ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকলে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটবে৷ তবে একটা কথা কি জান, রয় মেয়েদের ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও কৌতূহলী নয়৷ মাঝে-মাঝে ভারি অবাক লাগে৷ সেই যে একবার উনিশ বছর বয়েসে ওর বউ পালাল—ব্যস, ওই শেষ! তারপর থেকে রয়কে কোন মেয়ের দিকে তাকাতে পর্যন্ত দেখিনি৷’

লোলা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ অবশিষ্ট জামাকাপড় ছেড়ে রাত্রিবাস পরতে লাগল, ‘শেট, পৃথিবীতে এমন কোন পুরুষ নেই, যে মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় না—সেটা শুধু নির্ভর করে, কি রকম মেয়ে, তার ওপর৷’ লোলার কথায় যে একটা ঔদ্ধত্যের সুর লুকিয়ে আছে, সেটা আমার কান এড়াল না৷

‘লোলা, রয়কে আমি তিরিশ বছর ধরে জানি৷ আজ পর্যন্ত মাত্র একটি মেয়ের প্রতিই ও আকৃষ্ট হয়েছিল৷ সে ওর বউ৷ কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই সেসব আকর্ষণ-টাকর্ষণ ধুয়ে-মুছে মিলিয়ে গেছে৷’

লোলা বিছানায় শুয়ে পড়ল, ‘তাহলে ওর বউ নিশ্চয়ই তেমন সুন্দরী ছিল না—’ অ্যামেজে হাত ছাড়িয়ে ও হাই তুলল, ‘উ—ম্—ম্! তুমি একটা বাজলেই চলে এসো, কেমন?’

‘হ্যাঁ৷’ ঝুকে পড়ে ওকে চুমু খেলাম, ‘চুপচাপ ঘুমোও৷ আমি ফিরে এসে তোমাকে আর জাগাব না—৷’

‘সেই ভালো৷ আমার ভীষণ ক্লান্তি লাগছে৷’ লোলা চাদর টেনে নিল বুক পর্যন্ত, তারপর আমার দিকে চেয়ে হাসল, ‘ওহো, আমার তো মনেই নেই৷ সকালে কোন অসুবিধে হয়নি তো?’

কেউ যেন পাঁজরে এক লাথি বসিয়ে দিল৷ রিক্স! রিক্সের কথা তো একেবারে ভুলেই গেছি! রয়কে নিয়ে আনন্দে এত মেরে ছিলাম, ঐ বুড়ো শকুনটার কথা আমার মনেই পড়েনি৷

লোলা আমার মুখের ভাবে চমকে উঠে বসল, ‘কী হয়েছে, শেট?’

‘রিক্স আজ সকালে এসেছিল৷ ওর গায়ে হাত তুলতে ও আমাকে বাধ্য করেছে৷’

‘তুমি—তুমি ওকে মেরেছ?’ লোলার স্বর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল৷

‘তা ছাড়া আর-কোন উপায় ছিল না৷’

লোলা উত্তেজনায় আমার হাত চেপে ধরল, ‘আমাকে সব খুলে বল৷ রিক্স কি করেছিল?’

ওকে সব খুলে বললাম৷

এক হাতে চাদরটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে, লোলা একমনে শুনতে লাগল৷ ওর সবুজ চোখজোড়া ভয়ে উত্তেজনায় বিস্ফারিত৷ সারা শরীর চাবুকের মতো টান-টান৷

‘ওকে দশ ডলার দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা ও আমার মুখের ওপর ছুড়ে মেরেছে৷ বলেছে, ও এবার পুলিশেই যাবে৷’

লোলা আশ্বস্ত হয়ে ধপাস করে আবার শুয়ে পড়ল, ‘কোন ভয় নেই, শেট—রিক্স পুলিশে যাবে না৷ আর গেলেও পুলিশ ওর কথা বিশ্বাস করবে না৷ ওরা রিক্সকে ভালোভাবেই চেনে৷’

‘সেটা হলেই ভালো৷’

‘কিন্তু তুমি ওকে মারতে গেলে কেন?’

‘বুঝতে পারছি, ওকে মারাটা ঠিক হয়নি, কিন্তু কি করব—!’

‘যাকগে, ও নিয়ে আর চিন্তা করো না৷ পুলিশের কাছে গেলে, ওরা রিক্সকে সোজা তাড়িয়ে দেবে৷’

লোলাকে কপালে চুমু খেলাম, ‘শুয়ে পড়ো, সোনা—আমি কাজ সেরে একটার মধ্যেই ফিরে আসব৷’

‘কাল রাতে কিন্তু আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব৷ রয়কে বলো রাতে কাজ করতে৷’

হেসে ওর রেশম-নরম চুলে হাত চালালাম, ‘যথা আজ্ঞা, মহারানী!’

এগার

পরদিন সকাল প্রাতরাশ খাবার সময় রয়কে রিক্সের কথা জানালাম৷

‘ওর কাছ থেকে সাবধানে থাকিস৷ শালা এক নম্বরের বিচ্ছু—যখন-তখন হুট্হাট্ করে এখানে ঢুকে পড়ে৷ এই তো কালই এসেছিল—একেবারে, অসহ্য৷ কাল তো রাগের মাথায় ব্যাটাকে মারধোর দিয়ে ফেলেছি৷ তারপর ও বলেছে, পুলিশে খবর দেবে—দিক্‌গে!’

রয় চমকে মুখ তুলে তাকাল, ‘পুলিশ? তার মানে!’

‘রিক্স একদিন আমাকে আর লোলাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে৷ জেনসন যে অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে সটকে পড়েছে, সে খবর ও জানে না৷ তাই এখন ও কার্লকে খুঁজে বের করতে চায়—ওর পেনসনের কাগজে কি সব সই-টইয়ের ঝামেলা আছে—তাছাড়া রিক্স আমাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না৷’

কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাল রয়৷ খাবার ঘরে শুধু আমরা দুজন—লোলা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি৷ রয় অ্যাশট্রেতে ছাই ঝেড়ে আমার দিকে ফিরল, ‘তাহলে লোলা ওকে বলছে না কেন, জেনসন আর ফিরবে না?’

‘প্রথমত, সেটা রিক্সকে বলার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না৷ আর দ্বিতীয়ত, বললেও রিক্স সে-কথা বিশ্বাস করবে না৷’

‘হুঁ—’ রয় চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু শেট, এটা কিছুতেই আমার মগজে ঢুকছে না যে একটা লোক কি করে এমন সুন্দরী বউ, আর এরকম একটা জায়গা ছেড়ে চলে যেতে পারে! নাঃ, জেনসন ব্যাটা বোকার হদ্দ!’

‘হ্যাঁ,—শোন্—যা বলছিলাম—আমরা যখন থাকব না, তখন যদি রিক্স এখানে আসে, সোজা তাড়িয়ে দিবি৷ এখান থেকে কোন জিনিস নিয়ে যেতে দিবি না—বুঝলি?’

‘হ্যাঁ, বুঝলাম৷ কিন্তু রিক্স পুলিশে যাবে বলেছে? অদ্ভুত তো!’

রয় কি আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে?

‘না না—পুলিশে ও যাবে বলে মনে হয় না৷ আর যদিও বা যায়, পুলিশ ওর কোন কথাতেই কান দেবে না৷’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘যাকগে—আয়, ঘরটা পরিষ্কার করে ফেলা যাক৷ প্রত্যেকদিন সকালে এটা লোলাই পরিষ্কার করে, কিন্তু, এখন তুই এসেছিস—’ রয়ের দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘তাই লোলা এখনও ঘুমোচ্ছে—’

খাবার ঘর ঝাঁড়-পোঁচ করতে করতে রয় বলল, ‘শেট, ফার্নওয়ার্থ থেকে তুই কেমন করে পালালি বল্ তো? কাগজে লিখেছিস, তুই-ই হলি একমাত্র কয়েদী যে ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে৷—বল্ না, পালালি কেমন করে?’

রয় উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকাল৷

ওকে ধীরে ধীরে জানালাম আমার পালানোর ইতিহাস৷

ঝাঁট দেওয়া বন্ধ করে রয় একমনে শুনতে লাগল৷ ওর মুখ দেখে মনে হল, এই অবিশ্বাস্য কাহিনীকে ও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না৷ মাঝে-মাঝে অস্ফুট স্বরে বিস্ময়ও প্রকাশ করল৷

আমার কথা শেষ হতেই ও আমাকে জাপটে ধরল, ‘শালা! তোর সাহস আছে বলতে হবে! আমি হলে এই সর্বনেশে কুকুরগুলোর ধারেকাছেও ঘেঁষতাম না৷ আশ্চর্য, কী করে যে পালালি! একবার ভয়ও করল না?’

‘ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার জন্যে কুকুর কেন, বাঘের মুখোমুখি হতেও কোন কয়েদী পেছপা হবে না৷ মোদ্দা কথা, ফার্নওয়ার্থে আমি আর ফিরছি না৷ তার চেয়ে আমার মৃত্যুও ভালো৷’

কথা বলতে বলতে হয়তো একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম৷ সেটা লক্ষ্য করে রয় বলল, ‘এখন আর তোর ভয়ের কোন কারণ নেই৷ এখানে তোর খোঁজ করার কথা পুলিশের মনেও আসবে না৷’

‘আমারও তাই মনে হয়৷’

হঠাৎ জানালা দিয়ে বাংলোর দরজায় চোখ পড়তেই, দেখলাম লোলাকে৷ ও রেস্তোরাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে৷ পরনে সেই চোলি, আর একটা খাটো প্যান্ট৷ মাথার একরাশ তাম্রাভ চুল একটা সবুজ ফিতে দিয়ে অগোছালোভাবে বাঁধা৷

ওকে দেখামাত্রই কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করলাম৷ কারণ, সেদিন বারণ করার পর থেকে লোলা এই পোশাকে আর বাইরে বেরোয় না৷ তাহলে আজ কেন?—ও বুঝেছি, ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এ যেই একজন অপরিচিত পুরুষের আগমন ঘটেছে, অমনি লোলা ওর ভরা যৌবনের পসরা সাজিয়ে বেরিয়ে পড়েছে৷ আড়চোখে রয়কে দেখলাম৷ ও কিন্তু লোলাকে দেখেনি, তখনও একমনে কাউন্টার পরিষ্কার করছে৷

লোলা চটুল হাসিতে চোখ নাচিয়ে খাবার ঘরে এসে ঢুকল৷ এক কথায় যাকে বলে নাটকীয় আবির্ভাব৷

‘কী ব্যাপার? সকাল হতে-না-হতেই আমার কর্মচারীরা কাজে লেগে গেছে৷’

আমি একদৃষ্টে রয়কে লক্ষ্য করছিলাম৷ ও কাজ করতে করতে থমকাল, চোখ তুলে তাকাল লোলার দিকে৷ ও তখন দরজার গায়ে হেলান দিয়ে স্থির চোখে রয়ের দিকে চেয়ে আছে৷

লোলা আজ যেন আরও বেশি উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷ রয়ের চোখের সামনে নিজেকে করে তুলেছে অনেক বেশি লোভনীয়৷

কিন্তু রয়ের মুখের ভাবে বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন হল না৷ ও শূন্যদৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ তারপরই মাথা ঝুঁকিয়ে আবার কাজে মন দিল৷ নিস্পৃহ স্বরে জবাব দিল, ‘তাই নাকি! আমরা খিদমতগার, আর তুমি কি?’

রয়ের অপ্রত্যাশিত রুক্ষ জবাবে লোলার মুখ থমথমে হয়ে উঠল—যেন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস৷ কারণ ও রয়ের থেকে এ ধরনের জবাব কখনোই আশা করেনি৷ হয়ত ভেবেছিল, ওর এই উচ্ছল বালিকা-সুলভ ব্যবহার রয়ের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করবে৷ কিন্তু যখন দেখল, ওর যৌবনের আকর্ষণ রয়ের উপর এতটুকু প্রভাব বিস্তার করেনি, তখন স্বভাবতই রুদ্ধ আক্রোশে মাথা খুঁড়েছে লোলার অপমানিত, আহত নারীত্ব৷

আমার মন থেকে অস্বস্তির ভাবটা কেটে গেল৷ লোলার অবস্থা দেখে মুখ ফিরিয়ে হাসলাম৷ নাঃ, রয় সেই একই আছে—এতটুকু বদলায়নি৷ ওর জীবনে নারীর ভূমিকা এখনও সবার শেষে৷

লোলা চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে এগোল৷ কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে একবার ঘাড় ফিরিয়ে রয়কে দেখল৷ রয় তখনও সেই একই ভাবে কাজ করে চলেছে, আর আপনমনেই হালকা সুরে শিস দিচ্ছে৷ রয় লোলার দিকে পিছন ফিরে থাকায় ওর মুখের ভাব দেখতে পেল না৷ কিন্তু লোলা রান্নাঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করতেই ওর মুখ ফিরিয়ে একবার রান্নাঘরের দিকে তাকাল৷ তারপর আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপল, ‘শালা, রমণীর মন দেবা না জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ! কোনদিন কোন মেয়েকে সন্তুষ্ট হতে দেখলাম না, মাইরি!’

‘আমারই দোষ৷’ হেসে রয়কে বললাম, ‘আমিই তোর কথা ওকে বলেছি৷ বলেছি যে মেয়েদের সম্বন্ধে তুই এতটুকু কৌতূহলী নোস৷ ব্যস, লোলা তো কিছুতেই বিশ্বাস করবে না৷ বলে, এ নাকি হতেই পারে না৷’

‘এবার বোধ হয় বিশ্বাস করবে৷’ রয় হেসে জবাব দিল৷

এমন সময় বাইরে থেকে একটা ট্রাকের শব্দ কানে এল৷ ড্রাইভারের হর্ন দেবার ধরন শুনে বুঝলাম, তার প্রয়োজনটা জরুরী৷ রয় কাউন্টার পরিষ্কার করার কাপড়টা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘তুই থাক, আমিই যাচ্ছি৷’

ও বেরিয়ে যেতেই রান্নাঘরে গেলাম৷

লোলা মুখ গোমড়া করে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়েছিল৷ এর মধ্যেই ও কাজ করার গাউনটা পরে নিয়েছে৷ আমাকে ঢুকতে দেখেই বলল, ‘শেট, আজ রাতে আমরা সিনেমায় যাব৷ রয় এখানে দেখাশোনা করবে, কোন অসুবিধে হবে না৷ বারটার শো দেখে, রাত তিনটের মধ্যেই আমরা আসতে পারব, কী বলো?’

একটু ইতস্তত করলাম৷ আমাদের দুজনের একসঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

‘লোলা, আমার মনে হয়, আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন—’

‘তার মানে?’ চট করে ঘুরে তাকাল লোলা—মুখের ভাব কঠিন৷

‘না, বলছিলাম—জেনসন যে অ্যারিজোনায় গিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে ভিড়ে গেছে, সে-গল্পটা এখনও তো কেউ জানে না—তাই ভাবছিলাম, লোকে আগে গল্পটা শুনুক, তারপর আমরা একসঙ্গে যেখানে-সেখানে ঘুরব—কারুর কিছু বলার থাকবে না৷ কিন্তু তার আগে আমাদের দুজনের—’

আমার কথা শেষ হতে-না হতেই লোলা মুখঝামটা দিয়ে উঠল, ‘তোমার ওই এক কথা শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল৷ ওসব বাজে কথা আমি শুনতে চাই না৷ আজ রাতে আমি সিনেমায় যাব, এবং তুমিও আমার সঙ্গে যাচ্ছ—ব্যস!’

‘ঠিক আছে, এত করে যখন বলছ, যাব, বারোটার শো তো, কেউ যে আমাদের দেখে ফেলবে সে-সম্ভবনা কম৷’

‘দেখে ফেললেই বা—আমাদের তাতে বয়েই গেল!’ লোলার কণ্ঠস্বরে অধৈর্য৷

‘কিন্তু তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ লোলা, কার্লকে আমরা এখানেই করব দিয়েছি৷ যদি সন্দেহের বশে পুলিশ এখানে আসে, তাহলে—’

‘যদি পুলিশ এখানে আসে! যদি কার্লের দেহ খুঁজে পায়! যদি আমাদের সন্দেহ করে—’ লোলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ব্যঙ্গের সুর, ‘তার মানে বাকি জীবনটা আমাকে পুলিশের ভয়ে ভয়েই কাটাতে হবে এই তো তোমার বক্তব্য?

‘তোমার যা খুশি বলো৷ তোমাকে তো আর ফার্নওয়ার্থে যেতে হয়নি!’

এমন সময় রয় এসে ঢুকল রান্নাঘরে৷

রয়কে দেখেই লোলা বলল, ‘রয়, আমি আর শেট রাতে সিনেমায় যাচ্ছি৷ তুমি একা সব সামলাতে পারবে তো?’

রয় একবার আমার দিকে তাকাল, হয়তো একটু অবাকও হল, কিন্তু মুখে সে-কথা প্রকাশ করল না, ‘না না,—আমার কোন অসুবিধে হবে না৷’

লোলা ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার কাজে মন দিল৷

রয় এবার আমাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শেট, এক মিনিট বাইরে আয় তো—আমার গাড়িটা একটু দেখবি৷ শালা গাড়িটার সব ক-টা প্লাগই খারাপ হয়ে গেছে৷ তুই তো জানিস, গাড়ির ইঞ্জিনের ব্যাপার-ট্যাপার আমার মাথায় একদম ঢোকে না!’

‘এবার একটু গাড়ির কাজ শেখ্৷ মনে কর, আমি আর লোলা বেড়াতে গেলাম, আর একটা গাড়ি ব্রেকডাউনের কাজ এসে পড়ল—তখন কী করবি?’

রয় হাসল, ‘সে আগে আসুক তো, তখন দেখা যাবে৷ চল্, গাড়িটা দেখবি চল—’

রয় রান্নাঘরের দরজার দিকে এগোল৷ ওর পিছন পিছন আমিও চললাম৷ কিন্তু রান্নাঘরের দরজা খুলেই ও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ব্যাপারটা আচমকা ঘটে যাওয়ায় নিজেকে সামলাবার আর সময় পেলাম না৷ সোজা ওর গায়ে গিয়ে ধাক্কা খেলাম৷

‘দ্যাখ, কে আসছে!’ চাপা উত্তেজিত স্বরে রয় বলে উঠল৷

রয়ের কাঁধের উপর দিয়ে তাকালাম৷ রান্নাঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে খাবার ঘরের জানলা৷ আর সেই জানলা দিয়ে বেশ দেখতে পেলাম বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটাকে৷

গাড়ির আরোহী দুজনের পরনেই কালো স্যুট এবং স্টেটসন হ্যাট৷ দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মোটাসোটা লোকটা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল—থলথলে, পেটমোটা জলহস্তীর মতো চেহারা৷ তার কোটের উপর বুকের কাছে লাগানো রয়েছে একটা রুপোর। তারা প্রখর সূর্যের আলো সেই তারার গায়ে পড়ে ঠিকরে পড়ছে৷

গাড়ি থেকে নামার সময়, লোকটার কোটটা একটু ফাঁক হতেই চোখে পড়ল তার কোমরের বেল্টে আঁটা .৪৫ রিভলভারটা৷

‘পুলিশ!’ রয় চাপাস্বরে ফিসফিস করল৷

ততক্ষণে আমিও সেটা বেশ বুঝতে পেরেছি৷ মেরুদণ্ড দিয়ে একটা বরফ শীতল স্রোত বয়ে গেল৷ পুলিশ কেন? তাহলে কী—

পাগলের মতো ঘুরে তাকালাম লোলার দিকে৷ অদ্ভুত মনে হলেও, সেই মুহূর্তে একটা আশ্চর্য ভয়ার্ত অনুভূতি আমার মনকে ছেয়ে ফেলল৷ মনে হল, এই আসন্ন বিপদ থেকে একমাত্র লোলাই আমাকে উদ্ধার করতে পারবে—আর কেউ নয়৷ ক্ষিপ্র পায়ে লোলার কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘লোলা, শেরিফ এখানে আসছে!’

লোলা এক টুকরো কাপড় নিয়ে হাত মুছতে লাগল, ‘কোনভয় নেই, শেট৷ শেরিফের সঙ্গে আমিই কথা বলেছি৷’

লোলার ব্যবহারে অবাক হয়ে গেলাম৷ ও এত শান্ত, সহজ, নির্বিকার ভাবে কথাগুলো বলল, যে বিশ্বাসই হতে চায় না৷

অবশ্য শেরিফের আগমনে লোলার ভীত হওয়ার কোন কারণ নেই৷ ভয়টা আমার—কারণ ফার্নওয়ার্থ থেকে আমিই পালিয়ে এসেছি, লোলা নয়৷ আর ধরা পড়লে আমাকেই ফার্নওয়াথে ফিরে যেতে হবে৷ অশরীরী এক আতঙ্ক আমার হৃৎপিণ্ডকে সজোরে আঁকড়ে ধরল৷

আমাকে এবং রয়কে পাশ কাটিয়ে লোলা ঘরে গেল৷ ও চলে যেতেই রান্নাঘরে দরজাটা আস্তে বন্ধ করে দিলাম৷ সঙ্গে সঙ্গেই কানে এল লোলার অকম্পিত কণ্ঠস্বর, ‘কী ব্যাপার, শেরিফ? হঠাৎ এই অবেলায় কী মনে করে?’

রান্নাঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে শুনে চললাম৷ ভয়ে আমার হাত-পা তখন ঘেমে উঠেছে৷ রয়ও দেওয়ালে কান পেতে ওদের কথাবার্তা শুনছে, আর মাঝে মাঝে আড়চোখে আমাকে দেখছে৷

এবার কানে এল শেরিফের স্পষ্ট ভরাট কণ্ঠস্বর, ‘কেমন আছেন মিসেস? বহু দিন পর আপনার সঙ্গে দেখা হল—’

উত্তরে লোলার অস্পষ্ট স্বর শুনতে পেলাম, ‘আছি একরম—’

‘মি. জেনসনকে একটু ডেকে দিন তো—কয়েকটা কথা আছে৷’

‘কার্ল তো এখানে নেই, বাইরে গেছে৷’ লোলার স্বর অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক৷ কল্পনার চোখে যেন দেখতে পেলাম, শেরিফের মুখোমুখি লোলা দাঁড়িয়ে আছে—সবুজ চোখে শূন্য নিষ্পাপ দৃষ্টি৷ অভিব্যক্তিহীনমার্কা শেরিফের পক্ষে তো নয়ই৷ কিন্তু কেন জানি না, শেরিফের দেখার পর থেকে কিছুতেই সহজ হতে পারছি না৷

‘মি. জেনসন এখানে নেই?’ লোলার কথায় শেরিফ অবাক হয়েছেন মনে হল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার! মি. জেনসন কোনদিন এ জায়গা ছেড়ে গেছেন বলে তো আমার মনে পড়ে না!—আচ্ছা, কোথায় গেছেন বলুন তো?’

‘কী জানি কোথায় গেছে!’ লোলার কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল নিস্পৃহ অবহেলার সুর, ‘বলে তো গিয়েছিল, কয়েক জায়গায় ঘোরাঘুরি করবে৷ হয়তো অ্যারিজোনা কিংবা কোলোরাডোয় আছে—ঠিক জানি না৷ ও তো গিয়ে পর্যন্ত একটা চিঠিও দেয়নি৷’

‘কবে ফিরবে, সে-সম্বন্ধে কিছু বলে গেছে?’

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ তারপর কানে এল লোহার শীতল স্পষ্ট উত্তর, ‘আমার তো মনে হয় কার্ল আর ফিরবে না!’

শেরিফের মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে এল৷ অবাক হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ফিরবে না? কী বলছেন আপনি?’

‘হ্যাঁ, ঠিক বলছি৷ কার্ল আমাকে ছেড়ে চলে গেছে৷’

অনেকক্ষণ কারুর মুখে কোন কথা নেই৷ বুঝলাম, শেরিফ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে লোলার মুখের দিকে চেয়ে আছেন—ওর কথার সত্যতা যাচাই করছেন৷ আর লোলাও মুখে পরে রয়েছে শূন্য করুণ দৃষ্টির মুখোশ যা ভেদ করে ওর মনোভাব বোঝা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷

এবার রয়ের দিকে তাকালাম৷ রয়ও আমার মতোই উদ্গ্রীব হয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিল৷ আমার চোখে চোখ পড়তেই ও ভ্রুকুটি করে মাথা নাড়ল৷

এবার শুনলাম, শেরিফ একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলছেন, ‘ও, তাই নাকি?—কিন্তু মিসেস জেনসন, আপনি কি করে বুঝলেন, মি: জেনসন আপনাকে—’

শেরিফকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে লোলা বলে উঠল, ‘কোন স্বামী তার স্ত্রীকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে, এ-ঘটনা তো আজ নতুন নয়!’ লোলার কণ্ঠস্বর এবার ধারালো হয়ে উঠল, ‘কিন্তু এসবে আপনার কি দরকার বলুন তো, শেরিফ? কার্ল কি করল না করল, সে আমি বুঝব—আপনি এতে নাক গলাচ্ছেন কেন?’

শেরিফ বোধ হয় একটু থতিয়ে গেলেন৷ কারণ কানে এল তাঁর অস্বস্তিভরা কণ্ঠস্বর, ‘আমি দুঃখিত, মিসেস জেনসন৷ মি. জেনসন যে আপনার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করতে পারেন, তা আমার মনেও আসেনি তাই আপনাকে জিগ্যেস করছিলাম—’

‘না, এতে কার্লের খুব একটা দোষ নেই—দোষ আমারই৷ কারণ, ওর মতো বয়স্ক লোককে বিয়ে করে আমি খুব ভুল করেছি৷ বিয়ের পর থেকেই ওর সঙ্গে আমার বনিবনা হত না৷ এতদিন যে আমরা কি করে একসঙ্গে কাটালাম, ভাবতেই অবাক লাগছে—তবে কার্ল আমাকে এ জায়গাটা দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে৷ না হলে, আমাকে হয়তো না খেয়েই মরতে হত!—কিন্তু কার্লের সঙ্গে আপনার কী দরকার তা তো বললেন না, শেরিফ? অবশ্য আমাকে বলতে যদি আপনার অসুবিধে না থাকে—’

শেরিফ সশব্দে গলা ঝাড়লেন, ‘আপনার এখানে জ্যাক প্যাটমোর নামে একটা লোক কাজ করে শুনলাম—?’

ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল৷ তাড়াতাড়ি একটা হাতিয়ারের সন্ধানে রান্নাঘরের চারদিকে একবার চোখ বোলালাম৷ মাংস কাটার ছুরিটা টেবিলের উপরেই পড়েছিল৷ চটকরে হাত বাড়িয়ে ওটা তুলে নিলাম৷ যা ঘটে ঘটুক—ফার্নওয়ার্থে আমি কিছুতেই যাব না! ওই জলহস্তী শেরিফ ব্যাটা যদি ভেবে থাকে, আমাকে জ্যান্ত গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে, তবে ভীষণ ভুল করবে!

রয় আমাকে ছুরিটা তুলতে দেখেই ইশারায় বারণ করল৷ দেখলাম, বিপদের আশঙ্কায় ওর মুখ সাদা হয়ে গেছে৷ আমার মুখের ভাবে ও বোধ হয় বুঝতে পারল, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি কিছুতেই ধরা দেব না৷ কিন্তু শেরিফের রিভলভারের কথা চিন্তা করেই ও আমাকে নিরস্ত করতে চাইল৷ কিন্তু একবার বুঝল না আমার মনের অবস্থা বুঝল না, ফার্নওয়ার্থের চেয়ে যে-কোন মৃত্যু আমার কাছে শ্রেয়৷

এবার শুনতে পেলাম লোলার উত্তর, ‘প্যাটমোর? হ্যাঁ, ও এখানে কাজ করে৷ কার্ল যাবার আগে ওকে এখানে চাকরিতে ঢুকিয়ে ছিল—আর আমার কাজের সাহায্যের জন্যে একজন লোক তো এমনিতেই দরকার, তাই ওকে আর ছাড়াইনি—৷’

‘ও—৷ আচ্ছা, ওকে একবার ডাকুন তো৷ ওর সঙ্গে আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই৷’

‘তা বেশ তো—দেখুন, ও বোধহয় গুমটিঘরে রয়েছে—’ লোলার স্বর অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বাভাবিক৷ সম্ভবত আমাদের শোনবার জন্যই৷

রয় নিঃশব্দে আমার কাছে এগিয়ে এল, ফিসফিস করে বলল, ‘তুই এখানে থাক, আমি দেখছি৷’

‘মনে রাখিস, জ্যাক প্যাটমোর—শেট নয়৷’

ও আমাকে আশ্বাস দিয়ে পিঠে আস্তে করে চাপড় মারল, ‘কোন ভয় নেই৷’

কথা শেষ করে রয় রান্নাঘরের খিড়কি-দরজার দিকে এগোল৷ দরজা খুলে বাইরের গরম বালির উপর দিয়ে রয় গুমটিঘরের দিকে হেঁটে চলল৷

লোলা তখন শেরিফকে বলছে, ‘যান, জ্যাকের সঙ্গে কথা বলে দেখুন৷ আমি আপনাকে বাধা দেবার কে!’

‘হ্যাঁ, দেখছি৷’ শেরিফের পায়ের শব্দ দরজার দিকে এগিয়ে চলল৷

এমন সময় লোলা বলে উঠল, ‘রিক্স কি প্যাটমোরের নামে আপনাকে কিছু বলেছে, শেরিফ?’

‘হ্যাঁ—কেন বলুন তো?’ শেরিফ থমকে দাঁড়ালেন৷

‘কী বলেছে? প্যাটমোর ওকে মেরেছে?’

কিছুক্ষণ নীরবতার পর শেরিফের জবাব কানে এল, ‘হ্যাঁ৷’

লোলার স্বর এবার রুক্ষ হল, ‘প্যাটমোর কেন ওকে মেরেছে, সে-কথা জর্জ আপনাকে বলেছে?’

‘না৷ রিক্স বলছিল, এই প্যাটমোর লোকটা নাকি অকারণেই ওকে মেরেছে৷ তা ছাড়া প্যাটমোরের স্বভাব-চরিত্রও খুব—’

‘তাহলে আসল কারণটা রিক্স আপনাকে বলেনি৷ প্যাটমোর কেন ওকে মেরেছে জানেন? রিক্স আমাকে বেশ্যা বলেছে বলে৷’ লোলার কণ্ঠে অভিযোগের রূঢ় সুর, ‘প্যাটমোরের জায়গায় যদি আপনি হতেন, তবে আপনিও রিক্সকে মারতেন, তাই না?’

শেরিফ কাশলেন, একটু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ—তবে আসল কথা কী জানেন, রিক্সের কথা আমি যে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছি, তা নয়—’

এমন সময় খাবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেলাম৷ পরক্ষণেই কানে এল রয়ের গলা, ‘সুপ্রভাত, শেরিফ৷’

‘তোমার নামই জ্যাক প্যাটমোর?’

‘হ্যাঁ—কী হয়েছে?’

দরজার গায়ে কান পেতে একাগ্রচিত্তে শুনতে লাগলাম ওদের কথোপথন৷ এর পর শেরিফ রয়কে কি প্রশ্ন করবেন কে জানে!

কিন্তু শেরিফের পক্ষে কেবল রিক্সের বর্ণনা শুনে রয়কে চিনে ফেলা অত্যন্ত কঠিন হবে৷ কারণ বর্তমানে গোঁফ রাখার ফলে, আমার এবং রয়ের চেহারা দাঁড়িয়েছে প্রায়ই এক রকম৷ সুতরাং রয়কে প্যাটমোর বলে ভুল করা শেরিফের পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক৷

শেরিফ তাঁর জলদ-গম্ভীর স্বরে রয়কে প্রশ্ন করলেন, ‘রিক্স বলছিল, তুমি নাকি ওকে মেরেছ—সত্যি নাকি?’

লোলা অত্যন্ত চতুরভাবে রয়কে ঘটনার সূত্র ধরিয়ে দিল৷ শেরিফের কথা শেষ হতে-না-হতেই ও বলে উঠল, ‘এইমাত্র শেরিফকে বলছিলাম, রিক্স আমাকে বেশ্যা বলে গালাগাল দিয়েছে বলেই তুমি ওকে মেরেছ৷’

‘হ্যাঁ, মেরেছি৷’ রয় হালকা স্বরে জবাব দিল, ‘এবং আর একটা কথা আপনাকে বলে রাখি, শেরিফ—রিক্স যদি আবার এখানে কোনদিন আসে, তাহলে শুধু যে ওকে মারবই তা নয়, ঠ্যাঙদুটো পর্যন্ত ভেঙে দেব৷’

শেরিফ হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বললেন, ‘এখানে চাকরিতে ঢোকার আগে তুমি কোথায় থাকতে প্যাটমোর?’

মাংসকাটা ছুরির বাঁটে আমার পাঁচ আঙুল সজোরে চেপে বসল৷ দাঁতে দাঁত চেপে রুদ্ধশ্বাসে চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলাম৷

কিন্তু রয় বেশ ব্যঙ্গের সুরেই জবাব দিল, ‘ওকভিল, ক্যালিফোর্নিয়া৷ শুনুন শেরিফ, আমাদের গ্রামে কোন ভদ্রঘরের মেয়েকে রিক্সের মতো কোন ছুঁচো যদি গালাগাল দেয়, তবে আমরা তা সহ্য করি না৷ যদি প্রয়োজন মনে করেন, আপনি আমার হাতের ছাপ নিতে পারেন—’

‘হয়েছে, হয়েছে—তোমাকে আর বেশি চালাক সাজতে হবে না৷’ বিরক্তস্বরে শেরিফ রয়কে বাধা দিলেন, ‘এ অঞ্চলে কোন নতুন লোক এলে, তার সম্বন্ধে আমার খবর রাখা দরকার বলেই জিগ্যেস করছি৷’

লোলা সঙ্গে সঙ্গে অযাচিতভাবে বলে উঠল, ‘লোহালক্কড়ের ব্যবসার মাধ্যমে কার্লের সঙ্গে প্যাটমোরের পরিচয় হয়৷ তারপর কার্লই ওকে এখানে নিয়ে আসে৷’

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শেরিফ উত্তর দিলেন, ‘সবই মানলাম, কিন্তু প্যাটমোর, তুমি একটু সাবধানে থেক৷ একটু ঘুষি খরচা করার আগে দশবার ভেব, বুঝলে?’

‘আপনি তাহলে রিক্সকেও বলে দেবেন—একটা কথা বলার আগে যেন একশবার ভাবে!’ একটু রুক্ষ স্বরেই রয় জবাব দিলেন৷

‘ঠিক আছে, রিক্সকে আমি সাবধান করে দেব৷’

‘ওকে আরও বলবেন, এদিকে যেন আর না আসে৷ জর্জ সবসময়েই খালি টাকার জন্যে আমাকে জ্বালাতন করে৷’ লোলা বিরক্তস্বরে বলল৷

‘হ্যাঁ, আমি জানি৷ মি. জেনসনও আমাকে অনেকবার এই কথা বলেছিলেন—রিক্স নাকি টাকার জন্যে দিনরাত তাঁকে জ্বালাতন করে—’

অনেকক্ষণ সব চুপচাপ৷ তারপর শেরিফের সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘মি. জেনসন আপনাকে ছেড়ে চলে গেছেন শুনে আমি আন্তরিক দুঃখিত, মিসেস জেনসন—’ একটু কাশলেন শেরিফ, ‘আশা করি অল্পদিনের মধ্যেই মি. জেনসন তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন—’

কিন্তু লোলার নিস্পৃহ স্বর শেরিফকে নিরাশ করল, ‘সে নিয়ে আপনারা আর ভেবে কি করবেন৷ কার্ল যদি আমাকে ছেড়ে সুখে থাকতে পারে, তো আমিও পারব৷’

‘সে তো খুব ভালো কথা৷’ কিন্তু শেরিফের কথার সুরে তা মনে হল না, ‘তবে মি. জেনসন যে এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবেন, ভাবতেই পারিনি—শুনেছি এখানেই নাকি তাঁর জন্ম হয়েছিল—’

এতক্ষণ ধরে শেরিফের কথা শুনে শুনে লোলা বোধ হয় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল, কারণ শেরিফের কপট সহানুভূতির উত্তরে ও ধারালো স্বরে জবাব দিল, ‘এতে অবাক হওয়ার কী আছে, শেরিফ? কিছু কিছু মেয়ে আছে, যারা পুরুষদের সহজেই, বোকা বানাতে পারে৷ তার ওপর কার্ল যেরকম নির্বোধ—ভাবছি, এখানে আর বেশি দিন থাকব না৷ কিছু টাকাপয়সা জমলেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যাব৷ এর মধ্যে কার্ল যদি খবর-টবর দেয়, তো ভালো৷ ওকে জানাব এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷ তাতেও যদি ও না ফেরে, তবে এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ বিক্রি করে আমি চলে যাব৷ মোটের ওপর, এখানে আমি আর বেশিদিন থাকছি না৷’

‘হ্যাঁ,—সত্যিই তো৷ আপনার স্বামী যদি আর না ফেরেন, তবে একা-একা দিন কাটাতে আপনার খারাপ তো লাগবারই কথা৷ তার ওপর এ জায়গাটা অত্যন্ত নির্জন৷

‘ঠিকই বলেছেন৷’ লোলা শেরিফের কথায় সায় দিল৷ তারপর শেরিফের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বলল, ‘অনেকদিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা হল, শেরিফ৷ সময় সুবিধে পেলেই এদিকে চলে আসবেন—’

শেরিফ লোলার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘হ্যাঁ—সময় তেমন পাই না৷ তবে আপনার কোন দরকার পড়লেই আমাকে খবর দেবেন, মিসেস জেনসন—কোন দ্বিধা করবেন না৷’

‘ধন্যবাদ৷’

শেরিফের ভারী পায়ের শব্দ দরজার দিকে এগোল, ‘চলি প্যাটমোর—’

‘আবার দেখা হবে, শেরিফ৷’ রয় উত্তর দিল৷

তারপর কানে এল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ৷ ক্রমশ সে-শব্দ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল৷

মাংস-কাটা ছুরিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে রুমাল দিয়ে মুখ মুছলাম৷ ভয় ও উত্তেজনা কেটে গিয়ে অনেকটা স্বস্তি ফিরে পেলাম৷

একটু পরেই লোলা আর রয় রান্নাঘরে এসে ঢুকল৷

‘তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস৷’ আনন্দে রয়ের হাত চেপে ধরলাম, ‘তুই না থাকলে আজ কি যে হত—’

‘তুমি মিছিমিছি ভয় করছিলে,’ লোলা অধৈর্যভাবে বলে উঠল, ‘তোমাকে তো বলেছিলাম, শেরিফকে আমিই সামলাব—’

রয় আমার পক্ষে নিয়ে উত্তর দিল, ‘তা হোক৷ আমি যদি শেট হতাম, তবে আমিও ভয় পেতাম৷ তা ছাড়া শেটের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল৷’

‘ওঃ, তোমরা পুরুষেরা দেখছি সব সমান!’ লোলা এগিয়ে গিয়ে মুরগিগুলোর দিকে আবার মনোযোগ দিল৷

রয় মুচকি হেসে দরজার দিকে পা বাড়াল৷

‘সত্যি রয়, তোর জন্যই আজ এই বিপদের হাত থেকে—’

রয় থমকে ঘুরে তাকাল, ‘তুই এমনভাবে বলছিস, যেন তুই আমার জন্য কোনদিন কিছু করিসনি৷—আরে শালা, কৃতজ্ঞতাবোধ বলেওতো কিছু একটা আছে!’

ও চলে যেতেই লোলার কাছে গেলাম৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ ওকে লক্ষ্য করলাম তারপর বললাম, ‘আজ রাতে আমার আর সিনেমায় যাওয়া হবে না, লোলা৷’

লোলা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে ফিরে তাকাল, ‘তার মানে?’

‘আমি আজ আর ওয়েন্টওয়ার্থে যাব না৷’

‘কেন?’

‘বুঝতেই তো পারছ! শেরিফ যদি হঠাৎ আমাদের দেখে ফেলেন, তবে?’ ওর নির্বুদ্ধিতার আমার ভীষণ রাগ হল, ‘শেরিফ এখন জানেন রয়ই প্যাটমোর৷ তাহলে, তার সঙ্গে দেখা হলে আমার পরিচয় কি দেব?’

‘তার সঙ্গে দেখা যে হবেই, একথা তুমি ভাবছ কেন?’

‘কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে গিয়ে আমি নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাই না—এবং তুমি সেটা ভালোভাবেই জান৷’

‘তাতে কী হয়েছে? ওই পেটমোটা শেরিফটার সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ে তুমি ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে না? এর কোন মানে হয়?’

‘তুমি বুঝতে পারছ না—শেরিফের মাথায় যদি একবার ঢোকে, এখানে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে, তাহলে বিপর্যয়ের কিছু বাকি থাকবে না৷’ গলার স্বর নীচু করে লোলাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ‘মনে কর, যদি ও জেনসনের দেহ খুঁজে পায়? তখন তুমি কি করবে? পারবে এমন নিশ্চিন্ত থাকতে?—আমি জানি তুমি পারবে না—কারণ জেনসনকে তুমি গুলি করেছ৷’

‘তাই বুঝি? তোমার ওই শেরিফ সেটা প্রমাণ করতে পারবে?’

অবাক চোখে লোলার দিকে চেয়ে রইলাম৷ মনে মনে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করলাম৷ লোলা বলে কী!

‘যাকগে, এসব কথা এখন বাদ দাও৷ আমরা দুজনেই যখন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি, তখন দুজনেই সাবধান থাকতে হবে৷ তুমি চাইলেও কোন ঝুঁকি আমি নিতে পারব না৷’

লোলা নিস্পৃহভাবে ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল৷ তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে আবার কাজে মন দিল, ‘ঠিক আছে—আমি তাহলে একাই যাব৷’

ওর কথার একটা চাপা অভিমান লক্ষ্য করলাম৷ তাই এগিয়ে গিয়ে ওকে কাছে টেনে নিলাম, ‘রাগ করো না, লক্ষ্মীটি—কেন বুঝতে পারছ না—’

লোলা আমার হাত ছাড়িয়ে নিল, ‘কাজের সময় বিরক্ত করো না৷ তোমার কোন কাজ না থাকতে পারে, কিন্তু আমার আছে৷’

‘ঠিক আছে, তোমার যা খুশি তাই কর৷’

লোলা মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল—ওর সবুজ চোখদুটো যেন পাথরে খোদাই করা—বরফের মতো শীতল, নিষ্প্রাণ৷ ‘শেট, আজ রাতে বাংলোয় আমি একা থাকতে চাই৷ তুমি রয়ের ঘরে গিয়ে থেকো৷’

‘শোন, লোলা—’

‘আমি কি বলছি, তা আশা করি বুঝতে পারছ? তুমি হয়তো ভুলে গেছ, আমিই এ জায়গাটার মালিক—তুমি নও৷ রয়ের সঙ্গে তোমার যখন এতই বন্ধুত্ব, তো যাও—ওর কাছে গিয়েই রাত কাটাও৷’

লোলার চোখের তারায় অতলান্ত ঘৃণার ছায়া৷ মনে মনে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম৷ বিশ্বাসই হতে চাইল না, লোলা আমাকে এই কথাগুলো বলছে৷

‘ঠিক আছে, আমাকে যদি তোমার এত অসহ্যই মনে হয়, তবে—’

‘আর বিরক্ত করো না—যাও৷ কোন পুরুষত্বহীন কাপুরুষের সঙ্গে আমি রাত কাটাতে চাই না৷ যাও, রয়ের সঙ্গে গল্প কর গিয়ে৷’

রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ সশব্দে বন্ধ করে দিলাম ঘরের দরজা৷

লোলার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতার শেষ হল সেই দিনই৷ কিন্তু আশ্চর্য, রয়ের সদাহাস্যময় উপস্থিতি আমাকে ভুলিয়ে দিল এই বিচ্ছেদের কথা৷ লোলার সঙ্গ আমার কাছে আর আগের মতো অপরিহার্য ঠেকল না৷ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে যখনই বাংলোয় গেছি, অনুভব করেছি জেনসনের অশরীরী অপস্থিতি৷ লোলার মোহময় সান্নিধ্য আর তত ভালো লাগেনি৷ জেনসনের বিছানায় শোওয়ামাত্রই মনে হয়েছে, যেন অনধিকার প্রবেশ করেছি৷ কিন্তু পরক্ষণেই লোলার উষ্ণ আলিঙ্গনে পারিপার্শ্বিক পৃথিবী লুপ্ত হয়েছে মনের আকাশ থেকে৷ তবু রোজ রাতে বাংলোয় ঢুকবার সময় কখনও কখনও মনে হয়েছে, ফিরে যাই৷

সুতরাং, লোলার সিদ্ধান্ত একরকম আমাকে খুশিই করল৷ জিনিসপত্র সব বাংলো থেকে সরিয়ে রয়ের ঘরে নিয়ে তুললাম৷ ও আমার অবস্থা দেখে ঠাট্টা করতে ছাড়ল না, ‘কিরে, আবার তাহলে পুনর্মূষিক ভব?—সত্যি, মেয়েদের মন বুঝে ওঠা ভীষণ কষ্টকর৷ এখন বুঝতে পারছি, জেনসন কেন লোলাকে ছেড়ে কেটে পড়েছে৷ মাইরি, এরকম খাণ্ডারণী বউকে নিয়ে ঘর করা মুশকিল৷—শালা, আমি একা আছি—বেশ আছি৷’

সারাটা দিন লোলা মুখ গোমড়া করে রইল৷ আমার সঙ্গে একটা কথাও বলল না৷ বেলা দশটার সময় ও গাড়ি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে চলে গেল৷ লোলা চলে যাওয়ার পর বাংলো থেকে আমার অবশিষ্ট জিনিসপত্রগুলো নিয়ে এলাম৷ কাজ করতে করতে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি৷ ভেবেছি, দু-এক দিনেই লোলা ওর ভুল বুঝতে পারবে—আমার কাছে আবার ফিরে আসবে৷

রয় বাইরে একটা গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাংলোয় আমি একাই ছিলাম৷ হঠাৎ .৪৫ রিভলভারটার কথা মনে পড়ায় ড্রয়ারের কাছে গেলাম৷ একদম উপরের ড্রয়ারটা খুলতেই চমকে উঠলাম৷ চোখের সামনে যেন একটা কালো পর্দা নেমে এল৷ কোন এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলাম৷

.৪৫ রিভলভারটা ড্রয়ারে নেই৷

একমাত্র লোলা ছাড়া ওটা কেই বা নেবে! সুতরাং সারা ঘর আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম৷ যেন রিভলভারটার উপরেই নির্ভর করছে আমার জীবনমরণ৷

সারা বাংলো তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওটার সন্ধান পেলাম না৷ রিভলভারটা যেন সম্পূর্ণ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷ কিন্তু রিভলভারটায় লোলার কি প্রয়োজন! নিতান্ত উদ্দেশ্যহীনভাবেই কি ও .৪৫টা সরিয়েছে!

বাকিদিনটুকু ও রিভলভারের চিন্তাতেই কেটে গেল৷ কাজ করতে করতে খালি ভেবেছি .৪৫টার কথা৷ খুঁজেছি ওটাকে সরানোর কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ—কিন্তু সবই নিষ্ফল হয়েছে৷ চোখের সামনে ভেসে উঠেছে লোলার ঘৃণাভরা কুটিল চোখ৷ মনে হয়েছে, আমাদের অন্তরঙ্গতার দিনগুলো মিথ্যে স্বপ্ন৷ লোলা ওর চতুর অভিনয়ে আমাকে বোকা বানিয়েছে৷

রাত একটা পর্যন্ত রয়ের সঙ্গে বাইরে কাটালাম৷ কিন্তু লোলার ফিরবার কোন লক্ষণই দেখা গেল না৷ অবশেষে কিছুটা হতাশ হয়েই রয়কে নিয়ে ঘরে ফিরে চললাম৷

আমার বিছানা ঠিক জানালার পাশে৷ রাত প্রায় তিনটের সময় একটা গাড়ির শব্দ কানে আসায় জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম৷ দেখি লোলার মার্কারি বাইরে বালির উপর দাঁড়িয়ে আছে৷ আর লোলা শ্লথ পায়ে ফিরে চলেছে বাংলোয়৷ একবার ইচ্ছে হল, বাংলোয় গিয়ে রিভলভারের কথাটা ওকে জিগ্যেস করি—কিন্তু কি ভেবে সে ইচ্ছে ত্যাগ করলাম, কাল সকালেই ওকে রিভলভার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করব৷ আবার শুয়ে পড়লাম, কিন্তু রাতে ঘুম এল না৷

পরদিন সকালে লোলা যখন খাবার ঘরে এল, তখন এগারোটা বাজে৷ রয় আলুর খোসা ছাড়ানোয় ব্যস্ত ছিল, আর আমি গত রাতে এঁটো প্লেটগুলো ধুয়ে রাখছিলাম৷ লোলা গম্ভীরমুখে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল৷ রয়ের দিকে চেয়ে একবার হাসল৷ আমাকে যেন দেখেও দেখল না৷

রয় আমাকে লক্ষ্য করে মুচকি হেসে চোখ টিপল৷ তারপর হাতের কাজ ফেলে রেখে উঠে দাঁড়াল—চোখের একটা ইশারা করে এগিয়ে চলল দরজার দিকে৷ রয় চলে যেতেই লোলাকে প্রশ্ণ করলাম, ‘রিভলভারটা কোথায়?’

লোলা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,‘ওটা আমি লুকিয়ে ফেলেছি৷’

‘কোথায়?’

‘ওয়েন্টওয়ার্থে সাবার পথে রাস্তার পুঁতে ফেলেছি৷—কেন, তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে?’

লোলা মিথ্যে বলছে কি সত্যি বলছে কে জানে!

‘কেন— পুঁতে ফেলেছ কেন?

‘তোমার তো কারণটা বোঝা উচিত, শেট৷ পুলিশ যদি রিভলভারটা খুঁজে পেত, তাহলে কি আমাকে ছেড়ে দিত মনে করছ? ওরা সহজেই বুঝতে পারত, ঐ রিভলভারের গুলিতেই কার্ল মারা গেছে, তাই না?’

লোলার কথাগুলো পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত৷ কিন্তু তবু কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে৷ বার বার মনে হচ্ছে, ও হয়তো মিথ্যে বলছে৷

‘আর—শেট, আমি আর একটা কথা ভাবছিলাম—’

‘কী কথা?’

‘এখন তোমার বন্ধু রয় তো এখানে রয়েছে, সুতরাং এ জায়গা দেখাশোনা করতে তোমার আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ তাই ঠিক করেছি, আমি এ জায়গা ছেড়ে চলে যাব৷’

‘সেটা কী ঠিক হবে?’

‘কেন, ঠিক না হওয়ার কী আছে? তোমাকে তো আমি প্রথম থেকেই বলেছি, এখানে থাকতে আমার ভালো লাগছে না৷ এতদিন কোন লোক না পাওয়ায় তোমাকে একা রেখে যেতে পারিনি৷ কিন্তু এখন রয় এসেছে৷ সুতরাং, তোমার আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়—’

‘শেরিফ যখন শুনবে, তুমি এ জায়গা ছেড়ে চলে গেছ, তখন কি সন্দেহ করবে ভেবে দেখেছ?’

‘কিছুই সন্দেহ করবে না৷ তুমি ওকে বলবে, আমি কার্লের কাছে গেছি৷ আর এখানকার দেখাশোনার ভার তোমার আর রয়ের ওপরেই রয়েছে৷’

‘তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ, লোলা৷ এখানকার প্রতিটি পুলিশ-ফাঁড়িতে আমার চেহারার বিবরণ—এমন কি ফটো পর্যন্ত রয়েছে৷ তুমি চলে গেলে আমার পক্ষে নিরাপদে থাকা অসম্ভব৷ অতএব, এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া তোমার হবে না৷’

লোলার চোখজোড়া হায়েনার মতো জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘কার্লের সিন্দুক তোমাকে খুলতেই হবে, শেট—কারণ আমার টাকা আমি চাই৷ টাকা পেলেই, আমি এ সপ্তাহের শেষে ‘‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’’ ছেড়ে চলে যাব৷ দেখি কে আমাকে আটকায়!’

‘ওসবে কোন লাভ হবে না, লোলা৷ তিনটে কারণে এ জায়গা ছেড়ে তোমার যাওয়া চলবে না৷ প্রথমত, এখানে সবসময় আমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে৷ তুমি চলে গেলে সবাই মনে করবে রয় একাই এ জায়গা দেখাশোনা করছে৷ আর তাতে শেরিফ যদি সন্দেহ করে বসে, তবে অবাক হবার কিছুই নেই৷ তারপর শেরিফ এসে আমাকে দেখলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে৷ দ্বিতীয়ত জেনসনের মৃতদেহ আশেপাশেই কবর দেওয়া হয়েছে৷ পুলিশ যদি খোঁড়াখুঁড়ি করে সে মৃতদেহ খুঁজে পায়, তবে তোমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ তোমাকে জেলে নিয়ে ঘানি ঘোরাতে হবে৷ কারণ কার্লকে গুলি যখন তুমিই করেছ, তার ফলও তোমাকেই ভোগ করতে হবে৷ আর তৃতীয়ত, সিন্দুক আমি খুলছি না—এবং টাকাও তুমি পাবে না৷ কারণ, টাকা পেয়ে গেলেই তুমি আমার বিপদ ডেকে আনবে৷ হয়তো পুলিশকে বলবে, জেনসনকে আমিই খুন করেছি৷ কিন্তু এ-কথাটা তুমি যাতে পুলিশকে না বলতে পার, সেদিকে আমি বিশেষ যত্ন নেব, বুঝেছ৷’

আমার উত্তরের প্রতিটি শব্দ মিছরির ছুরির মতো লোলার গায়ে কেটে বসল৷ ভেবেছিলাম, রাগে হতাশায় অন্ধ হয়ে ও হয়তো ভীষণ কিছু একটা করে বসবে৷ কিন্তু লোলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল গায়ের রং ফ্যাকাশে, চোখে অন্ধকারের ছায়া, মুখে কষ্টকৃত প্রশান্তির ভাব৷

‘এ ব্যাপারে এই কি তোমার শেষ কথা, শেট?’ শান্ত স্বরে লোলা প্রশ্ন করল৷ ওর চোখের দৃষ্টি আমার চোখে স্থির৷

‘হ্যাঁ৷’

‘তাহলে তোমাকে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো৷ তিন-তিনটে বছর এই হতচ্ছাড়া জায়গায় আমি পড়ে থেকেছি—ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করেছি৷ আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে আমি পারব৷ অধৈর্য হওয়ার মতো ছেলেমানুষ আমি নই৷ এ জায়গা ছেড়ে চলে আমি যাবই—আর যখন যাব, তখন তোমার হয়তো দুঃখ হবে পরিণতির কথা ভেবে৷ হয়তো মনে হবে, আমাকে এখন যেতে দিলেই ভালো করতে—’

‘তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ, লোলা? তবে শোন, রয় যে কার্লের সিন্দুক খুলতে পারবে না, তা নয়৷ কিন্তু ভুলক্রমেও ওকে দিয়ে সিন্দুক খোলানোর কথা চিন্তা করো না৷ কারণ, রয় যদি সিন্দুক খুলে দেখে ওতে কি আছে, তবে সব টাকা ও-ই নিয়ে নেবে৷ এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্তে থেক৷ ভেব না, ও তোমার যৌবনের মায়াজালে ধরা দেবে৷ তা যদি হত, তবে আমি রয়কে এখানে চাকরি দিতাম না৷ ওকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি৷ মেয়েদের উপস্থিতিই রয়ের কাছে অসহ্য এবং বিরক্তিকর৷ তুমিও তো বারকয়েক চেষ্টা করে দেখেছ, কোন লাভ হয়েছে কি? রয়ের জীবনে সবচেয়ে প্রথমে যার স্থান, তা হল টাকা৷ সিন্দুক খুলে টাকাগুলো দেখলেই ও তোমাকে খুন করবে৷ তারপর সমস্ত টাকা নিয়ে চলে যাবে৷ ও টাকা তুমি আর কোনদিন পাবে না৷ অতএব, তোমার যদি এতই টাকার প্রয়োজন থাকে, তবে যাও—রয়কে সিন্দুক খুলতে বলো৷’

কথা শেষ করে বাইরে পা বাড়ালাম৷ লোলা তখনও একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে৷

রয় বাইরে পাম্পের কাছটা ঝাঁট দিচ্ছিল, আমাকে আসতে দেখেই মুখ তুলে দেঁতো হাসি হাসল, ‘কীরে, মানভঞ্জন-পালা শেষ হল?’

‘উহুঁ৷ লোলা বড় কঠিন ঠাঁই৷’ আমি নতুনভাবে, রয়কে দেখতে লাগলাম৷ মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলাম—সত্যিই কি রয়কে বিশ্বাস করা চলে! ও যদি এতদিনকার সংযম ভুলে লোলার যৌবনের ফাঁদে পা দেয়! কিন্তু ওর নির্বিকার, কঠোর ভাব আমাকে আশ্বস্ত করল৷ মনে হল রয়কে আমি বিশ্বাস করতে পারি৷

‘মেয়েদের সঙ্গে কখন নরম ব্যবহার করবি না, শেট৷ তাহলেই ওরা পেয়ে বসবে৷ শুধু শুধু একটা মেয়ের জন্য তুই নিজে কষ্ট পাবি৷ ছেড়ে দে, ও নিয়ে আর ভাবিস না৷ লোলার সঙ্গে তোর যদি বনিবনা না হয়, তো অন্য মেয়ে দেখ৷ বাজারে মেয়ের অভাব নেই৷’

‘তুই ঠিকই বলেছিস, রয়—তবে আমার কি মনে হয় জানিস? এবার লোলা হয়তো তোর সঙ্গে ভাব জামাবার চেষ্টা করবে৷ তোমাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম৷ দেখিস, সাবধানে থাকিস৷’

রয় হেসে উঠল, ‘ভীষণ মজার ব্যাপার তো! ঠিক আছে, আসুক লোলা৷ এ থেকে ওর বিশেষ সুবিধে হবে না৷ তুই তো আমাকে জানিস—কিন্তু ওর উদ্দেশ্যটা কি বল্ তো? আমার সঙ্গে ভাব জমিয়ে, তোকে উল্লু বানাবার চেষ্টা? না অন্য কিছু?’

একবার মনে হল, রয়কে সিন্দুকের কথা বলে দিই৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই সে ইচ্ছে ত্যাগ করলাম৷ কারণ, রয় যদি একবার জানতে পারে সিন্দুকে কি আছে, তবে ওর পক্ষে স্থির থাকা মুশকিল হবে৷ হয়তো সিন্দুক খোলার জন্য আমাকেই চাপ দেবে৷ আর যাই করি, সিন্দুক আমি খুলছি না!

‘সম্ভবত আমাকে একটু ঈর্ষাকাতর করে তুলতে চায়—অন্য কিছু নয়৷’

রয় আপনমনেই মাথা নাড়ল, ‘ওঃ, মেয়েদের পক্ষে সব সম্ভব!’

পর পর তিনটে দিন লোলা একাই কাটাল৷ আমার সঙ্গে কথাবার্তা একেবারেই বন্ধ করে দিল৷ কিন্তু আমার তাতে একটুও অসুবিধে হল না৷ কারণ, এখন রয়ই হল আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী৷

রোজ রাতে বাইরের উঠোনে আমরা তাস খেলে সময় কাটাতাম৷ মাঝে-মাঝে দরকার পড়লে খেলা ছেড়ে উঠে গিয়ে গাড়িতে তেল-মোবিল দিয়ে আসতাম৷ তারপর ফিরে এসে আবার শুরু করতাম৷ খেলাটা নিরামিষ না হলেও, টাকা-পয়সার লেনদেন ঠিক তখনই হত না৷ একটুকরো সাদা কাগজে আমরা পরস্পরের দেখাপাওনার হিসেব টুকে রাখতাম৷

একেই রয় আমার চেয়ে ভালো খেলে, তার উপরে ভালো তাস পড়ায় ও রোজই জেতে৷ চারদিনের দিন রাতে খেলার সময় ও হঠাৎ ঠাট্টার সুরে বলল, ‘শেট, এর মধ্যেই তোর পাঁচশো ডলার দেনা হয়ে গেছে৷ এখন থেকে সাবধান না হলে কিন্তু বিপদে পড়বি৷’

‘ভয় নেই, টাকা ঠিক পেয়ে যাবি৷’ ওর দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘আপাতত খেলায় মন দে৷ নয়তো বেশিক্ষণ আর জিততে পারবি না৷’

‘জানিস, আমি এই পাঁচশো ডলার পেলে কী করব? তাস ভাঁজতে ভাঁজতে রয় বলল, ‘সামনের সপ্তাহেই রেস শুরু হচ্ছে৷ একটা দারুণ ঘোড়া ওই রেসে দৌড়চ্ছে৷ ওটার পেছনে যদি এই পাঁচশো ডলার লাগাতে পারি, তবে আমার পাঁচ হাজার ডলার আমদানি ঠেকায় কে!’ উত্তেজনায় রয় শিস দিয়ে উঠল, ‘চিরকাল আমি একটা বড়সড় দাঁও মারার আশঙ্কায় অপেক্ষা করেছি৷ এতদিনে বোধ হয় আর আমার সে আশা পূর্ণ হবে৷’

আমার মনে পড়ল সিন্দুকের পড়ে-থাকা এক লাখ ডলারের কথা৷ রয় যদি ওই টাকার কথা জানত, তবে কি ভাবত কে জানে৷

‘মনে কর তুই এত টাকা পেলি৷ তারপর ওই টাকা দিয়ে কী করবি?’

রয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, ‘সেসব আমি অনেক আগেই ভেবে রেখেছি, শেট৷ পাঁচ হাজার ডলার পেলে আমি একটা নামী ক্যামেরা-কোম্পানির অংশীদার হয়ে যেতে পারব৷ সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয়ও আছে৷ তার বর্তমানে আর কিছু মূলধনের প্রয়োজন৷—আর আমি যদি হাজার পনেরো ডলার দিতে পারি, তো একাই মালিক হয়ে বসতে পারব৷ ওফ শেফ, যদি হাজার পনেরো ডলার পেতাম৷

‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে৷ ও-সব ক্যামেরার ব্যবসা-ট্যাবসা করে কখনও কেউ বড়লোক হতে পারেনি—পারবেও না৷ বিশেষ করে ওই সামান্য পুঁজি নিয়ে৷’

‘আমি ঠাট্টা করছি না, শেট৷ সত্যি বলছি, পাঁচ হাজার ডলারে বিশেষ সুবিধে হবে না—কিন্তু পঞ্চাশ হাজার পেলে আমাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না৷’

রয়ের কথায় চেয়ারে নড়েচড়ে বসলাম৷ অস্বস্তিভরে জবাব দিলাম, ‘পঞ্চাশ হাজার ডলার! অত টাকা কোত্থেকে পাবি, শুনি?—ও-সব আজগুবি চিন্তা ভুলে যা৷’

‘ইচ্ছে করলে ছ-মাসেই আমরা টাকাটা যোগাড় করতে পারি, শেট৷’ রয় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আমার চোখে চোখ রাখল, ‘তোকে যে-ব্যবসার কথা বলেছিলাম, মনে আছে?—আমরা হেলিকপ্টারে করে সেইসব লোকদের এখানে নিয়ে আসব৷ তারপর এখান থেকে তাদের ট্রপিকা স্প্রিংস আর ওয়েন্টওয়ার্থে পাঠাবার ব্যবস্থা করব৷ তাহলে আর দেখতে হচ্ছে না৷ দু-দিনের আমরা লাল হয়ে যাব৷’

‘রয়, মনে আমার আছে৷ কিন্তু আমার উত্তরটা বোধহয় তোর মনে নেই৷’ দৃঢ়স্বরে রয়কে জানালাম, ‘কোন ঝামেলায় আমি নিজেকে আর জড়াতে চাই না৷ তোর যদি এখানে ভালো না লাগে, তো খোলাখুলি বল্৷ তুই থাকাতে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু তুই যা চাইছিস, তা আমি এখানে হতে দেব না৷ তোকে অন্য জায়গা দেখতে হবে৷’

রয় তাস বাঁটতে শুরু করল৷ ও মুখ নীচু করে তাস দিতে থাকায় ওর মুখের ভাব দেখতে পেলাম না কিন্তু কানে এল ওর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘সেটা তোর খুশি৷ তবে আমাকে বেশ কিছু টাকা জোগাড় করতেই হবে৷ এ ছাড়া বড়লোক হওয়ার আর তো উপায় দেখছি না৷ হয়তো আরও কিছুদিন এখানে থাকতে পারি, কিন্তু তার বেশি নয়—অনন্তকাল ধরে আমি এখানে পড়ে থাকতে পারব না৷ কিছু টাকা রোজগারের উপায় আমাকে যে করে হোক বের করতেই হবে৷’

‘বোকার মতো কাজ করিস না!’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলাম, ‘তুই প্রথমবারের মতো আবার বিপদে পড়বি৷ এখানে তোর অসুবিধেটা কী? নিজের খুশিমতো কাজ করছিস, থাকছিস, খাচ্ছিস—কেউ কোন কথা বলতে আসছে না৷ কথায় বলে না, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! তোর টাকার লোভ বড় বেশি৷ যদি একবার ফার্নওয়ার্থ থেকে ঘুরে আসতিস—’

‘সে-কথা আমি জানি শেট৷’ আমাকে হাত তুলে বাধা দিল রয়, ‘কিন্তু ফার্নওয়ার্থে তোকে যেতে হত না৷ তুই সেদিন বোকার মতো রাস্তার দিকে ছুটেছিলি বলেই—’

‘বাদ দে ওসব কথা৷ যদি খেলার ইচ্ছে থাকে তো খেল৷’

আমরা আরও কয়েক দান খেললাম৷ খেলার প্রতি রয়ের মনোযোগ না থাকায় শেষ দান ক-টা আমিই জিতলাম৷ বেশ বুঝলাম রয় তখনও সেই ব্যবসার কথাই ভাবছে৷ একসময় হঠাৎ ও হাতের তাস টেবিলের উপর ফেলে দিল, ‘ছেড়ে দে, আজ আর খেলব না৷ ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, যাই শুয়ে পড়ি গিয়ে৷’

আজ রাতে কাজ করার দায়িত্ব আমার৷ কিন্তু অন্যান্য দিন রয় সবসময় আমার কাছেই থাকে৷ গাড়ির ভিড় কমলে আমরা একসঙ্গেই শুতে যাই৷ কিন্তু আজ এই প্রথম একা শুতে যাচ্ছে৷

ওকে মনের কথা না জানিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, ‘ঠিক আছে—যা৷’

রয় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল, ‘সকালে আবার দেখা হবে, শেট৷ আমি চললাম৷’

রয় হেঁটে চলল ওর ঘরের দিকে৷ চুপচাপ বসে ওকে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ একটু পরেই ওর ঘরের আলো জ্বলে উঠল৷ চোখ ফিরিয়ে দেখি, বাংলোয় লোলার ঘরে তখনও আলো জ্বলছে৷

দুটো আলোকিত জানালা আমার কাছে বয়ে নিয়ে এল এক অনুচ্চারিত ইঙ্গিত৷ মনে হল, রয় হঠাৎ আমার বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ও যেন আমাকে একা ফেলে রেখে হাত মিলিয়েছে লোলার সঙ্গে৷ মনে হল এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ আমি বড় একা—বড় নিঃসঙ্গ৷

বার

রয় সম্বন্ধে আমার রাতের আশঙ্কা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, পরদিন সকালেই সেটা বুঝতে পারলাম৷ কারণ দেখলাম, ওর ব্যবহার আবার সেই আগের মতোই হাসি খুশি ও উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷

গতকাল ওর সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ও আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিল৷ কাল সারারাত শুয়ে শুয়ে রয় হয়তো এই ব্যবসার কথাই ভেবেছে শেষে হয়তো বুঝেছে আমার কথাই ঠিক—ওসব ঝামেলার জড়িয়ে আখেরে কোন লাভ হবে না৷

রোজকার মতো আজও সন্ধেবেলা আমরা তাস নিয়ে বসলাম৷ নিজেদের মধ্যে হার-জিত নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কিও করলাম৷ গতদিনের আলোচনা বাদ দিয়ে অন্য সবরকম আলোচনাই হল৷ রয়ও দেখলাম সে-কথা একেবারেই ভুলে গেছে৷

রয় আবার ওর পুরনো হাসি-খুশি মেজাজ ফিরে পাওয়ার অনেকটা স্বস্তিবোধ করলাম৷ তাছাড়া নিশ্চিন্ত হওয়ার আরও একটা কারণ ছিল৷ তা হল, আমার প্রতি লোলার ব্যবহার আবার ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠেছে৷ সারাদিনে বার দুয়েক ও আমার সঙ্গে কথা বলেছে—যদিও পুরোপুরি ব্যবসা-সংক্রান্ত কথা—তবু কথা যে বলেছে, এতেই আমি খুশি৷

রাত প্রায় দশটার সময় লোলা বাইরের বারান্দায় এল৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল আমাদের তাস খেলা৷

ওকে দেখেই আহ্বান জানালাম, ‘চলে এসো, লোলা৷ একটা চেয়ার নিয়ে বসে যাও৷’

‘না, শুধু শুধু তাস খেলে আর সময় নষ্ট করব না৷ আমি শুতে চললাম৷ কাল আবার সকাল সকাল উঠতে হবে৷ ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে অনেক কেনাকাটা করার আছে৷ তোমাদের মধ্যে একজন যদি আমাদের সঙ্গে যাও তো ভালো হয়৷’

একটু অবাক হলাম৷ কারণ, এ পর্যন্ত কেনাকাটার ব্যাপারগুলো লোলা একাই সেরেছে৷ তাই আজ ওর এই অনুরোধে মনে সন্দেহের দোলা লাগল৷ এর পিছনে লোলার কী কোন উদ্দেশ্য আছে?—কে জানে!

আমার ইতস্তত করার সুযোগে রয় বলে উঠল, ‘তোর যদি অসুবিধে থাকে, তো বল্—আমিই না হয় যাব৷ এখানে এসে থেকে আজ পর্যন্ত কোনদিনও তো কোথাও গেলাম না৷ ওয়েন্টওয়ার্থে গেলে আমার সুবিধেই হবে৷ কিছু জিনিসপত্র কেনার আছে—কিনে আনতে পারব৷ কী বলিস?’

আমি চমকে রয়ের দিকে তাকালাম৷ ও একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল৷ লাইটারের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ওর মুখ৷ কিন্তু সে-মুখের ভাব নিস্পৃহ, নিরাসক্ত, অভিব্যক্তিহীন৷ তাহলে কি এই অস্বস্তি নিতান্তই আমার দুর্বল মনের কল্পনা?

‘ঠিক আছে, যাবি তো যা না৷ তবে দুপুরের আগেই ফিরে আসিস৷ নয়তো আমি একা সামলাতে পারব না৷’

‘আমি কিন্তু সকাল আটটায় বেরোয়৷ শুভ রাত্রি৷’ বিদায় জানিয়ে লোলা বাংলোয় ফিরে চলল৷’

‘গোটাকয়েক জামা, আর একজোড়া জুতো আমাকে কিনতে হবে,’ হাতের তাসে চোখ বোলাতে বোলাতে রয় বলল৷

সঙ্গে সঙ্গে আমার মন থেকে মিলিয়ে গেল সন্দেহের ছায়া৷ সত্যিই তো, আজ পর্যন্ত রয় একদিনের জন্যও কোথাও যায়নি৷ তা ছাড়া জামা-জুতোর প্রয়োজন তো প্রত্যেকেরই হতে পারে৷ কিন্তু তবু মনে হল, লোলার সঙ্গে ও না গেলেই পারত৷

লোলার সঙ্গে রয়ের যাওয়াটাকে আমি কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছি না৷ কারণ আমি নিশ্চিত, সুযোগ পেলেই লোলা ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করবে তার উপর এখান থেকে ওয়েন্টওয়ার্থে যাবার কুড়ি মাইল রাস্তা লোলা চুপচাপ বসে কাটাবে বলে তো মনে হয় না!

‘আরে, ঘাবড়াস না৷’ রয় হাত বাড়িয়ে আমার হাঁটুর এক চাপড় মারল, ‘আমি জানি, তুই কি ভাবছিস৷ কিন্তু নিশ্চিন্ত থাক, লোলা আমার সঙ্গে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না৷’

কাষ্ঠহাসি হেসে জবাব দিলাম, ‘না না—এতে ভাববার কী আছে৷’

মুখে একথা বললেও, পরদিন সকালে যখন দেখলাম রয় আর লোলা মার্কারি নিয়ে রওনা হচ্ছে, তখন আর একবার নিঃসঙ্গতাবোধ আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ মনের কোনায় ঘুরতে লাগল একই সন্দেহ, একই আশঙ্কা৷

এসব চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য স্টেশন-ওয়াগানের ইঞ্জিন নিয়ে কাজে লেগে গেলাম৷ কিন্তু তবু কি স্থির হয় আমার অশান্ত মন! লোলা ও রয়ের চিন্তা ছাড়া আর-কোন কথা আমার মনেও আসছে না৷ শেষে আমার অবস্থাও কী হবে সেই একচক্ষু হরিণের মতো!

এই সময় একটা বড় ট্রাক তেল নেবার পাম্পগুলোর কাছে এসে দাঁড়াল৷ ট্রাকে সার বেঁধে সাজানো বড় বড় কাঠের প্যাকিং বাক্স৷ ট্রাক-চালক একজন মোটাসোটা বয়স্ক লোক৷ মাথায় সোনালী চুলের কোথাও কোথাও শুভ্রতার আভাস৷ ভারী মুখমণ্ডল রোদের তাপে রক্তবর্ণ৷ মাথায় একটা স্টেটসন হ্যাট৷

ট্যাঙ্কে তেল দিচ্ছি, ড্রাইভারটা হঠাৎ ট্রাক থেকে নেমে এল৷ একটা ময়লা রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে লোকটা কৌতূহলভরে আমার দিকে তাকাল, ‘তুমি বোধহয় এখানে নতুন এসেছ, তাই না?—জেনসন গেল কোথায়?’

লক্ষ্য করলাম, জেনসনের মতো এ লোকটাও সুইডেনের অধিবাসী৷ সুতরাং, এ যদি জেনসনের বন্ধুও হয়, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই৷ তাই, খুব সতর্কভাবে ওকে জেনসনের অ্যারিজোনা যাওয়ার গল্পটা শোনালাম৷

কী কারণে জানি না, লোকটা এই গল্পটা ঠিক সহজভাবে গ্রহণ করল না৷ ওর মুখের রেখা কঠিন হয়ে উঠল, চোখদুটো হয়ে উঠল সংকীর্ণ৷

‘জেনসন কোনদিন এ জায়গা ছেড়ে গেছে বলে তো মনে পড়ে না৷ জান, গত বিশ বছর ধরে আমি এ রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াত করি৷ যতবারই গেছি, কার্লের সঙ্গে প্রতিবারই আমার দেখা হয়েছে৷—অ্যাজিজোনায় নতুন পেট্রল-পাম্প খুলে ওর যে কি সুবিধে হবে কে জানে!—তাহলে কি ও আর এখানে ফিরবে না?’

‘হ্যাঁ, ফিরবেন৷ এখানকার সব-কিছুগোছগাছ করার জন্য তাকে একবার আসতে হবে৷’

‘ওর বউ কি ওর সঙ্গে গেছে?’

‘না, এখন উনিই এসব দেখাশোনা করছেন৷ আর আমি তাকে সাহায্য করি৷’

পেট্রল-ট্যাঙ্কের ঢাকনা লাগাচ্ছি, লোকটা হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি কার্লের বউয়ের পরিচিত কেউ?’

‘না, আমি এখানে চাকরি করি৷ কিন্তু কেন বলুন তো?’

‘না—বলছিলাম—জেনসনের বউয়ের স্বভাব-চরিত্র খুব একটা ভালো নয়৷ যখন প্রথম মেয়েটাকে দেখলাম যে জেনসনকে বিয়ে করে এখানে বসে আছে—তোমাকে কি বলব ভাই, ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম৷ কারণ মেয়েটাকে আমি আগে থেকেই চিনি৷’ লোকটা ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট তৈরি করতে লাগল৷ আমি হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম, যাতে ওর একটা কথাও আমার কান না এড়ায়৷ লোকটা ধীরেসুস্থে সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল, ‘বছর পাঁচেক আগেকার কথা৷ তখন মেয়েটা কারসন সিটিতে থাকত৷ ফ্রাঙ্ক ফিনি নামে একটা লোককে ও বিয়ে করেছিল৷ ফিনি একটা গাড়ির কারখানা দেখাশোনা করত, আর সেই সঙ্গে একটা স্ন্যাক-বারের ম্যানেজারও ছিল৷ জান, শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?’

রুদ্ধশ্বাসে লোকটার কথা শুনতে লাগলাম৷ কারণ লোলার অতীত ইতিহাস বর্তমানে আমার কাছে অমূল্য৷

‘একদিন ফিনিকে স্ন্যাক-বারে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল৷ ওর ডান হাতে ধরা ছিল একটা রিভলভার৷ আর মাথাটা ফেটে চুরমার হয়ে সারা মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে৷ লোলার বক্তব্য—ও নাকি ওপরের ঘরে কাজে ব্যস্ত ছিল, এমন সময় নিচের তলা থেকে রিভলভারের নিকট শব্দ ওর কানে আসে৷ তারপর ও নীচে এসে দেখে, ফিনি মরে পড়ে রয়েছে৷ কাউন্টারের ওপর যে ক্যাশবাক্স ছিল, দেখা গেল তা থেকে প্রায় দু হাজার ডলার অদৃশ্য হয়েছে৷ সকলের মোটামুটি ধারণা হল ফিনি প্রায় ক্যাশবাক্স থেকে দোকানের টাকা সরাত৷ তাই জানাজানি হয়ে যাবার ভয়ে আত্মহত্যা করেছে৷ যা হোক, সেই হারিয়ে-যাওয়া টাকাগুলো আর খুঁজে পাওয়া গেল না৷ কিন্তু পুলিশের ধারণা, সে-টাকাটা নাকি লোলাই নিয়েছিল৷ অথচ তার সপক্ষে কোন প্রমাণই ওরা দাখিল করতে পারল না৷ একজন অফিসার সন্দেহ করল, লোলাই হয়ত ফিনিকে গুলি করেছে৷ কারণ, ওরা নাকি প্রায়ই এটা-সেটা নিয়ে তুমুল ঝগড়া করত৷ কিন্তু সেটাও প্রমাণ করতে পারল না৷ এ ঘটনার কিছু দিন পরে লোলা কারসন সিটি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেল৷—তাহলেই বুঝে দেখ, যখন দেখলাম ও এখানে এসে জেনসনের মতো একজন লোককে বিয়ে করে বসেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ অবাক হলাম!’

‘আশ্চর্য আমি তো কিছুই জানতাম না!’ চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে ওকে বললাম৷

‘না জানবারই কথা৷ লোলা তো আর এ গল্প ঢাক পিটিয়ে বেড়াবে না৷ আশা করি জেনসন ভালোই আছে৷—আচ্ছা ভাই, ও সত্যি সত্যি অ্যারিজোনাতে আছে তো?’

হঠাৎ কেমন শীত-শীত করে উঠল৷ লোকটা বলে কী! এ যে দেখছি রিক্সের থেকেও বিপজ্জনক!

‘হ্যাঁ, উনি অ্যারিজোনাতে ভালোই আছেন৷’ অসীম চেষ্টায় ওর অন্তর্ভেদী দৃষ্টির মোকাবিলা করলাম, ‘এই তো সেদিনই মি. জেনসনের একটা চিঠি এসেছে৷ লিখেছেন নতুন পেট্রল-পাম্প নিয়ে উনি বেশ ভালোই আছেন৷ হয়তো সামনের বারই আপনার সঙ্গে মি. জেনসনের দেখা হবে৷’

লোকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, ‘জেনসন ভালো আছে শুনে খুশি হলাম, ভাই৷ নয়তো, তুমি প্রথমেই যখন বললে জেনসন এখানেই নেই, আমি তো ভাবলাম—মানে—ও হয়তো মারাই গেছে৷ যাক, ও ভালো আছে শুনে নিশ্চিন্ত হলাম৷’

আমি তখন ঘামতে শুরু করেছি৷ কোনরকমে ওকে প্রশ্ণ করলাম, ‘আচ্ছা, ফিনিকে যে ওর স্ত্রী—মানে মিসেস জেনসন—গুলি করেছিলেন তার কোন প্রমাণ নেই না?’

লোকটা হঠাৎ কেমন অস্বস্তি বোধ করল, ‘না, তা নেই—কিন্তু এ নিয়ে অনেক কথা উঠেছিল৷’

‘কিন্তু আমি যতদূর জানি, মি. জেনসন মিসেস জেনসনকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন৷ আপনার এই কথাগুলো মি. জেনসনের কানে গেলে তিনি খুব অসন্তুষ্ট হবেন৷ অতএব, এ নিয়ে আর বেশি আলোচনা না করাই ভালো৷’

‘জেনসন তাহলে ওর বউকে নিয়ে সুখে আছে বলছ?’ লোকটা যেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারল না৷

‘কেন, আপনার কি অবিশ্বাস হচ্ছে?’

‘না—মানে—যাকগে, আমার কথার কথায় কিছু মনে করবেন না৷ মিসেস জেনসনকে চিনি বলেই এত কথা বললাম৷ জেনসনের কাছে এসব কথা আবার বলো না যেন!’

কথা শেষ করে লোকটা তেলের দাম বাবদ কয়েকটা নোট আমার দিকে এগিয়ে ধরল৷ টাকাগুলো পকেটে রেখে বললাম, ‘পাগল নাকি৷ এসব কথা মি. জেনসনের কানে গেলে বিপদ আছে?’

লোকটা ট্রাকে উঠে সশব্দে দরজা বন্ধ করল৷ তারপর পূর্ণ-গতিতে ট্রাক ছুটিয়ে দিল৷ যাবার সময় ওর মুখের ভাবে বুঝলাম, আমাকে লোলা-সম্বন্ধীয় কথাগুলো বলার জন্য ও এখন আফসোস করছে৷

কিন্তু লোকটার বলে-যাওয়া কথাগুলো আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল৷

ছুটন্ত ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম৷ মনের মধ্যে বয়ে চলল চিন্তার ঝড়৷ তাহলে লোলা আগেওএকবার বিয়ে করেছে! ওর স্বামী মারা গেছে রিভলভারের গুলিতে! আর সেই সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছে দু-হাজার ডলার! এ কথা ভাবতেই হৃৎপিণ্ডটা কে যেন খামচে ধরল৷ জেনসনও তো মারা গেছে রিভলভারের গুলিতে! আর আমি যদি সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে না দিতাম, তাহলে হয়তো অদৃশ্য হত ওই এক লাখ ডলার৷

এই ঘটনাদুটোর মধ্যে কি কোন যোগসূত্র আছে? রেস্তোরাঁর বারান্দায় গিয়ে বসলাম৷ একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে টের পেলাম, আমার হাত ভীষণভাবে থরথর করে কাঁপছে৷

সন্দেহ-আতঙ্কের সুতোয় মনটা দুলতে লাগল পেণ্ডুলামের মতো৷

ঐ ট্রাক-ড্রাইভারের কথা যদি সত্যি হয়, তবে কারসন সিটির পুলিশ লোলাকে শুধু টাকা চুরির জন্যই সন্দেহ করেনি—ফিনিকে খুন করার জন্যও সন্দেহ করেছে৷ তার মানে—

ছ-টা শব্দ বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল মনের পর্দায়৷

তাহলে কি জেনসনকে লোলা খুন করেছে?

মনকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম ভয়াবহ রাতের দৃশ্যে৷ সব-কিছু আবার যেন আমার চোখের সামনে নিখুঁতভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল পরিষ্কার দেখতে পেলাম, লোলা রিভলভার উঁচিয়ে বসবার ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে৷ উত্তেজনায় ওর বুক উঠছে নামছে৷ তারপরই শুনতে পেলাম লোলার সেই অবিশ্বাস্য কর্কশ শাসানি৷ মনে পড়ল, জেনসনের উঠে দাঁড়ানোর কথা৷ রাগে চোখমুখ লাল করে ও লোলার দিকে এগোতে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গেই আবার যেন শুনতে পেলাম সিন্দুকের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ—লোলার সেই হিংস্র দৃষ্টি—রিভলভারের বিকট আওয়াজ৷—

এতদিন ধরে ভেবে এসেছি ঃ সিন্দুকের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে লোলা চমকে ওঠায়, ট্রিগারে আচমকা চাপ পড়ে গুলি বেরিয়ে গেছে৷ আর তাতেই জেনসন মারা গেছে—এক আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে৷

এখন ওই লোকটার কথা শোনার পর সব আবার নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলাম৷

ট্রিগারে আচমকা চাপ পড়ে? সত্যিই কি তাই?

সিগারেটের বাকিটুকু ফেলে দিলাম৷ হাতের উলটোপিঠ দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে যেতেই পরিষ্কার বুঝলাম, আমি ভয় পেয়েছি!

এখন এই ‘আচমকা’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জেনসনের মৃত্যুরহস্যের চাবিকাঠি৷

প্রথম স্বামীকে খুনের ব্যাপারে পুলিশ লোলাকে সন্দেহ করেছিল—তাহলে কি জেনসনকে লোলা নৃশংসভাবে খুন করেছে!

কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটাকে আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া আর-কিছু মনে হয় না৷ ব্যাপারটা যদি সত্যি সত্যি খুনই হয়, তাহলে তো অনায়াসেই খুনের দায়টা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারত! তারপর—হঠাৎ একটা বিচিত্র সম্ভাবনা আমার সমস্ত চিন্তাশক্তি ওলটপালট করে দিল৷ হৃৎপিণ্ডের গতি স্তব্ধ হল মুহূর্তের জন্য!

সেদিন লোলা যখন রিভলভার হাতে ঘরে এসে ঢোকে, তখন সিন্দুকের দরজা খোলাই ছিল৷ তাহলে কি লোলার উদ্দেশ্য ছিল জেনসনের পর আমাকে গুলি করে সিন্দুকের টাকা গুছিয়ে নেওয়া? হয়তো আগে থেকেই ও সব-কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছিল৷

লোলার গুলিতে আমি আর জেনসন মারা গেলে পর, ও হয়তো টাকাগুলো লুকিয়ে ফেলে পুলিশে খবর দিত৷ তারপর পুলিশ এলে পরে, ফ্রাঙ্ক ফিনির সময় যেরকম গল্প শুনিয়েছিল, এবারও সে-রকম কিছু একটা শোনাত৷ বলত, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সিন্দুক খুলছিলাম, এমন সময় ও আর জেনসন এসে আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে৷ আমি তখন কোন পথ না পেয়ে জেনসনকে খুন করেছি৷ তারপর লোলা অসমসাহসিকতায় পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে আমার কাছ থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়ে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আমাকে গুলি করেছে৷

ওয়েন্টওয়ার্থের এই পেটমোটা শেরিফটা লোলার এই কাহিনী অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করত৷ কারণ, আমার আসল পরিচয় জানার পর তায় মনে আর কোনরকম সন্দেহ থাকত না৷

কিন্তু লোলার এই নিখুঁত পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাওয়ার একটাই যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে৷ তা হল, জেনসনকে গুলি করামাত্রই আমি সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম৷ সেই মুহূর্তেই লোলা বুঝতে পেরেছিল, ও যদি আমাকে গুলি করে, তবে সিন্দুক চিরকাল বন্ধই থেকে যাবে৷ কারণ আমি ছাড়া সিন্দুক খোলার লোক এই পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ আর নেই৷ তাই সঙ্গে সঙ্গেই ও এমন অভিনয় করেছে, যেন আচমকা গুলি বেরিয়ে জেনসন মারা গেছে৷ তারপরই লোলা যখন বুঝতে পারল, ব্ল্যাকমেল করে আমাকে দিয়ে সিন্দুক খোলানো যাবে না, তখন ও অন্য রাস্তা ধরল৷ এমন ভাব দেখাল, যেন ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে৷ কিন্তু আমি ওর ফাঁদে পা দিইনি৷

আর যখনই ও টের পেয়েছে, এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ সিন্দুক খোলার লোক আর আমি একা নই, তখনই আমার প্রতি ওর ব্যবহার হয়ে উঠে রূঢ় এবং নির্বিকার৷ কারণ, এখন আর আমার প্রয়োজন নেই যেহেতু রয়ও সিন্দুক খুলতে জানে৷ তাই লোলা এখন রয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করছে৷

এত চিন্তার পর আমি নিশ্চিন্ত হলাম, লোলার রিভলভার লুকিয়ে ফেলার গল্পটা সর্বৈব মিথ্যে৷ জেনসনের .৪৫ বর্তমানে লোলার কাছে, একথা ভাবতেই আমার গলা শুকিয়ে এল৷

তার মানে আমার এবং রয়ের—দুজনের জীবনই বিপন্ন৷ লোলা হয়তো রয়কে যা-হোক করে রাজী করিয়ে সিন্দুক খোলাবে৷ তারপর নির্বিকারচিত্তে ওকে খুন করবে৷ হয়তো আমাকেও আর জীবিত রাখবে না৷ পুলিশকে ও সেই একই গল্প শোনাবে—শুধু জেনসনের বদলে রয়ের নামটা বসিয়ে দেবে৷ আবার সব-কিছু ওর পরিকল্পনামাফিক ঘটতে থাকবে৷

নাঃ, এর একটা বিহিত করা দরকার৷ স্বীকার করছি, পুরো ব্যাপারটা আমার আন্দাজ ছাড়া আর-কিছু নয়৷ সেই ড্রাইভারটার কথা শোনার পরই এসব উদ্ভট চিন্তা এসে আমার মনে বাধা বেঁধেছে৷ হয়তো খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ফিনি সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা করেছে, এবং জেনসনের মৃত্যুটাও দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে আমি যেতে চাইছি না৷ কারণ লোলার সেই রক্তলোলুপ হিংস্র দৃষ্টি—সেটা তো আর মিথ্যে নয়!

লোলাকে জব্দ করার একটামাত্র উপায় আছে৷ তা হল, সিন্দুক থেকে সমস্ত টাকা অন্য কোথাও সরিয়ে সিন্দুক খোলা রেখে দেওয়া৷ তাহলে সেই খোলা সিন্দুক দেখলেই লোলা বুঝতে পারবে, রয়কে কব্জা করে বা আমাকে খুন করে ওর কোন লাভ হবে না৷

কিন্তু ওই টাকাগুলো লুকোবার জন্য আমাকে প্রথমেই ভালো দেখে একটা জায়গা খুঁজতে হবে৷ হাতঘড়িতে চোখ রাখলাম দশটা বেজে দশ মিনিট৷ অর্থাৎ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ওদের ফিরতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি, সুতরাং, টাকাগুলো লুকোবার যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে৷ অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, টাকাগুলো সিন্দুক থেকে নিয়ে জনসনের সঙ্গেই কবর দেব৷ তাতে লোলা যদিও বা লুকনো টাকার সন্ধান পায়, তাহলেও শান্তিতে সে-টাকা ভোগ করতে পারবে না৷ টাকার সঙ্গে সঙ্গে ওকে খুঁড়ে তুলতে হবে জেনসনের গলিত বিকৃত মৃতদেহ৷

কিন্তু এই পরিকল্পনাকে কার্যকর রূপ দেবার আগেই এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম৷ বারান্দা ছেড়ে বাংলোর দিকে এগোচ্ছি, চোখে পড়ল একটা ট্রাক ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে৷ তার পিছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা পুরনো প্যাকার্ড গাড়ি৷ বুঝলাম, এবার এই বিকল প্যাকার্ডের পিছনেই আমার সময়ের শ্রাদ্ধ হবে৷ এবং ঠিক তাই হল৷

প্যাকার্ডের ড্রাইভার অত্যন্ত খিটখিটে স্বরে জানাল, তার গাড়ি এখুনি ঠিক করে দিতে হবে৷ নয়তো, ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছতে তার দেরি হয়ে যাবে৷

নাছোড়বান্দা ড্রাইভারটার পাল্লায় পড়ে ওই ঝরঝরে প্যাকার্ডের পিছনে লাগতে হল৷

দুপুরবেলা রয় আর লোলা যখন ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরে এল, তখনও আমি ওই হাতচ্ছাড়া প্যাকার্ডের সঙ্গে রেঞ্চ নিয়ে ধস্তাধস্তি করছি৷

এভাবে কেটে গেল তিন দিন তিন রাত৷ কিন্তু এর মধ্যে একবারও সিন্দুকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলাম না৷

লোলা সর্বদাই আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল৷ রাতে আমি আর রয় যখনই তাস খেলতে বসি, ও বাংলোয় চলে যায়৷ আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে৷ সুতরাং, সিন্দুক যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেল৷

লোলা আজকাল আমার সঙ্গে কথা বলে ঠিকই, কিন্তু ওর নিস্পৃহ ব্যবহার সব সময় আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে৷ এমনভাবে ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, যাতে আমার বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি, আমাদের আগের সম্পর্ক আর কোনদিনই আমরা ফিরে পাব না৷ অতীতের অন্তরঙ্গতার সূত্র ছিঁড়ে গিয়ে আমাদের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক সুদৃঢ় দ্বন্দ্বের পাঁচিল৷

প্রথম প্রথম অসুবিধে হলেও অস্বস্তিকর পরিবেশকে আমি মেনে নিলাম৷ এবং কয়েক দিনের মধ্যেই অনুভব করলাম, লোলাকে স্পর্শ করতেও আমার প্রচণ্ড অনীহা৷ সত্যকে অস্বীকার যদি না করি, তাহলে বলতে বাধা নেই, লোলাকে আমি ঘৃণা করি৷

সবসময় ওকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ যদি একবারও আমার অনুমানের সপক্ষে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাই৷ কিন্তু বৃথাই৷ লোলার চলনে বলনে মুহূর্তের জন্যও কখনও প্রকাশ পেল না, ও আমাকে নৃশংসভাবে খুন করতে চায়৷ সুতরাং, অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে লাগলাম৷

রয়কেও আমি বহুভাবে লক্ষ্য করেছি৷ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফেরার পর লোলার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা বুঝতে চেয়েছি৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাকে হতাশ হতে হয়েছে৷

এক-একসময়ে হঠাৎ মনে হয়েছে, রয়কে সব কথা খুলে বলি৷ কিন্তু পরক্ষণেই আবার কি মনে করে চুপ করে গেছি৷ কেন জানি না মনে হয়েছে, সিন্দুকে এক লাখ ডলার আছে শুনলেই রয়ের বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে৷ তারপর ওকে ঠেকিয়ে রাখা মুশকিল হবে৷ সুতরাং মুখ বুজে দিন কাটাতে লাগলাম৷ এখন এই কঠিন সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় রয় ও লোলার অনুপস্থিতি৷ তাই বসে বসে দিন গুনতে লাগলাম, কবে লোলা রয়ের সঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে—আমাকে এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন-এ রেখে যাবে সম্পূর্ণ একা!

প্রায় এক সপ্তাহ পরে এল সেই প্রতীক্ষিত সুযোগ৷

একদিন সন্ধ্যায় খাবার ঘরে আমি আর রয় কাজে ব্যস্ত, এমন সময় লোলা ঘরে এসে ঢুকল, ‘ওয়েন্টওয়ার্থে ব্রিজিত বার্দোর একটা ভালো ছবি এসেছে৷ আমি আজ রাতে দেখতে যাব৷ তোমরা কেউ যাবে?’

রয় ঘাড় নাড়ল, ‘উহুঁ—আমি আবার মারপিটের ছবি ছাড়া দেখি না৷’

ভেবে দেখলাম, এই সুযোগ৷ এখন যদি কোনরকমে রয়কে লোলার সঙ্গে যেতে রাজি করাতে পারি, তাহলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে৷ কারণ ওয়েন্টওয়ার্থে সিনেমা দেখে ফিরতে ফিরতে ওদের রাত তিনটে হয়ে যাবে৷ আর ওই সময়ের মধ্যেই আমি সিন্দুক থেকে টাকাগুলো সরিয়ে গুমটিঘরে পুঁতে ফেলব৷ রাত বারোটার পর এমনিতেই গাড়ি আর ট্রাকের ভিড় কমে আসে৷ সুতরাং, ওই সামান্য কাজটুকু সেরে ফেলতে আমার কোন অসুবিধে হবে না৷ তাই রয়কে বললাম, ‘তুই লোলার সঙ্গে যা না৷ এমনিতেই আজ রাতে আমার কাজ করার কথা তাছাড়া আরও কয়েকটা মেরামতের কাজও সেরে ফেলতে পারব৷ ছবিতে মারপিট না হয় নাই থাকল, ব্রিজিত বার্দোকে তো দেখতে পাবি?’

রয় অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল৷ ও হয়তো ভেবেছিল, আমিই লোলার সঙ্গে যাব৷

‘না—ভাবছিলাম আজ একটু তাস-টাস খেলব৷’ ইতস্তত করে রয় জবাব দিল৷

‘কিন্তু এই কুড়ি মাইল গাড়ি চালিয়ে লোলা একেবারে একা ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে—তাই বলছিলাম—’

লক্ষ্য করলাম, লোলা একদৃষ্টে আমাকে দেখছে৷ ভয় হল, ও বোধহয় আমার উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছে৷ কিন্তু আমি মরিয়া৷ যে করে হোক, এই সুযোগের সদ্ব্যবহার আমাকে করতেই হবে৷ কারণ, এরকম সুবর্ণসুযোগ মানুষের জীবনে বার বার আসে না৷

লোলা আমাকে লক্ষ্য করে হঠাৎ বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, তোমাদের যখন যাবার ইচ্ছে নেই, তখন আর কষ্ট করে যেতে হবে না৷ আমি একাই চললাম৷’

রয় লোলার দিকে আড়চোখে চেয়ে হাসল, ‘আচ্ছা—তোমার কথাই থাক৷ চল, কি ছবি দেখাতে নিয়ে যাবে—বান্দা হাজির৷’ রয় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল৷ লোলা প্রত্যুত্তরে হেসে পা বাড়াল বাংলোর দিকে৷

সাড়ে ন’টা বাজতে-না-বাজতেই লোলা সেজেগুজে বাংলো থেকে বেরিয়ে এল৷ ওর পরনে একটা দুধ-সাদা পোশাক৷ আগে কোনদিন ওকে এ পোশাক পরতে দেখিনি৷

লোলা যেন আজ প্রাণভরে সেজেছে৷ ওর রূপযৌবনের সমস্ত ছলাকলা প্রকট করে ও এগিয়ে চলল মার্কারির দিকে৷ ওর ভাবসাব দেখে বুকের মধ্যে বেজে উঠল বিপদের সংকেত—মনে নেমে এল অস্বস্তির ছায়া৷

লোলা ওর স্বভাবসিদ্ধ ছন্দে এগিয়ে গিয়ে রয়ের পাশে উঠে বসল৷ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রয় আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল, ‘শেট, আমি কিন্তু যেতে চাইনি৷ নেহাত তুই বললি বলে—’ লোলাকে আড়াল করে চোখ টিপল রয়৷

রয়ের মন্তব্য আমার কানে বাজাল৷ কারণ ওর চরিত্রের সঙ্গে এ ধরনের কথা ঠিক খাপ খায় না—কিন্তু ওর কথা আমি গায়েই মাখলাম না৷ মিষ্টি করে জবাব দিলাম, ‘আশা করি সময়টা তোর ভালোই কাটবে৷’

আমি ভালোভাবেই জানি না, যদি একবার সিন্দুকের টাকাটা পরিল্পনামতো লুকিয়ে ফেলতে পারি, তবে লোলা আর রয়—দু-জনেই থাকবে আমার বুড়ো আঙুলের তলায়—সম্পূর্ণ আমার আজ্ঞাধীন৷

লোলা গাড়িতে বসে আমাকে লক্ষ্য করছিল, ব্যঙ্গের সুরে জবাব দিল, ‘সে-বিষয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ তুমি শুধু ঠিকমতো চারদিকে খেয়াল রেখ৷’

রয় গীয়ার দিয়ে ক্লাচ ছাড়তেই ছুটে চলল লোলার মার্কারি৷ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা গেল গাড়ির পিছনে লাল আলো৷ শেষে তাও মিলিয়ে গেল মরুভূমির অন্ধকারে৷

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ তারপর রওনা দিলাম বাংলোর দিকে৷ মনে মনে একটু যে ভয় না পেলাম, তা নয়৷ কারণ, কাজটাকে যতটা সহজ ভাবছি, হয়ত তত সহজ নয়—কে জানে!

বাংলোর কাছে পৌঁছেই লক্ষ্য করলাম সদর দরজা বন্ধ৷ ঠেলাঠেলি করেও যখন খুলল না, বুঝলাম দরজায় লোলা তালা দিয়ে গেছে৷ সুতরাং গুমটিঘরের দিকে চললাম একটুকরো তারের সন্ধানে৷

তারের মাথাটা সামান্য বাঁকিয়ে চাবির ফুটো দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম৷ সেকেন্ড দুয়েকের চেষ্টাতেই খুলে গেল বাংলোর দরজা৷ বসবার ঘরে পৌঁছে সিন্দুকের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম৷ গত কয়েক সপ্তাহের অভ্যাসে বর্তমানে সিন্দুক খুলতে আমার বড়জোর মিনিট তিনেক লাগে৷ কিন্তু আজ সময় কিছু বেশি লাগল—সম্ভবত আমার মানসিক উৎকণ্ঠাই তার জন্য দায়ী৷

সিন্দুকের দরজা খোলামাত্রই নির্মম রসভঙ্গের মতো কানে এল কোন গাড়ির হর্নের শব্দ৷ উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি, পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা হলদে ক্যাডিলাক৷

অতএব কম্বিনেশন ডায়াল ঘুরিয়ে, সিন্দুক বন্ধ করে বাইরে এলাম৷ কিছুটা হতাশ হয়েই গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলাম৷

এই যে গাড়ি আসতে শুরু করল, ব্যস—সিন্দুক সিন্দুকের জায়গাতেই পড়ে রইল, আর আমি অক্লান্তভাবে খেটে চললাম৷

আমি কিন্তু এতে অবাক হয়নি৷ এই সময়টা রোজই গাড়ি ও ট্রাকের ভিড় থাকে৷ কিন্তু সে শুধু রাত বারোটা পর্যন্ত৷ তার পরই গাড়ির ভিড় কমে আসে৷ অর্থাৎ, তখনও আমার হাতে তিন ঘণ্টা সময় থাকবে৷ এই সময়ের মধ্যে বেশ নির্বিঘ্নেই কাজ সারতে পারব৷

প্রায় বারোটা নাগাদ গাড়ি-চালাচল একেবারে কমে এল৷ বারান্দায় বসে পরবর্তী গাড়ির অপেক্ষায় রইলাম৷ চাঁদের আলোয় ধোয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা যতদূর চোখ যায় সম্পূর্ণ নির্জন—কোন গাড়ির হেডলাইটও চোখে পড়ছে না৷ অতএব নিশ্চিন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম৷ বাংলোর দিকে এগোতে যাব, চোখে পড়ল দূরাগত কোন গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো৷ এতক্ষণ প্রতীক্ষার পর এই গাড়িটার আলো চোখে পড়তেই অধৈর্য হয়ে উঠলাম৷ কিছুটা বিরক্ত হয়ে পাম্পের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ জানতাম, এই হতচ্ছাড়া গাড়িটা যে-কোন কারণেই হোক এখানে থামবেই৷ এবং আমার ধারণাকে নির্ভুল প্রমাণিত করে গাড়িটা পাম্পের সামনে এসে দাঁড়াল৷

গাড়িটা একটা পুরোনো মডেলের বুইক৷ মরুভূমির মধ্যে দিয়ে এতটা রাস্তা আসার ফলে বুইকের সারা গায়ে ধুলোর আস্তরণ৷ গাড়ির আরোহী দুজনের একজন জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমার দিকে তাকাল৷

লোকটার বয়স প্রায় আমার মতোই৷ মাথায় কালো টুপি, পরনে কালো জামা, আর একটা সাদা টাই৷ হনু বের করা লম্বাটে ভাবলেশহীন মুখ৷ ক্ষুদে ক্ষুদে কাল চোখজোড়া যেন নিষ্প্রাণ দু-টুকরো কাচ৷

তার স্থূলকায় সঙ্গীকে দেখে মেক্সিকোর অধিবাসী বলেই মনে হল৷ তার গায়ের রঙ রোদে পোড়া—তামাটে৷ ঠোঁটের উপর লম্বা টানা গোঁফ৷ পরনে তেলচিটে ময়লা স্যুট৷ মাথায় মেক্সিকান হ্যাট—চামড়ার ফিতেদুটো চিবুকের নীচে গিঁট দেওয়া৷

কেন জানি না, লোকদুটোকে দেখেই ভীষণ অস্বস্তি বোধ করলাম৷ ষষ্ঠেন্দ্রিয় যেন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘সাবধান—সাবধান!’

এতদিন পরে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম, ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সত্যিই বড় নির্জন—এবং এখানে আমি সম্পূর্ণ একা৷

মোটা লোকটা আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল৷ কিন্তু তার সঙ্গী গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল৷ হয়তো দেখল, এখানে আমি ছাড়া আর-কেউ আছে কিনা৷

পাম্পের গা থেকে তেল দেবার পাইপটা খুলে নিলাম, ‘ক লিটার দেব?’

‘দশ৷’ মোটা লোকটা নির্বিকার সুরে জবাব দিল৷ কিন্তু উত্তর দেবার সময় ওর সতর্ক দৃষ্টি সাদা টাই-পরা লোকটাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷

ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে ঢালতে সাদা টাই-পরা লোকটার দিকে আড়চোখে তাকালাম৷ সে তখন গাড়ি ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক চাইছে, যেন কারুর খোঁজ করছে৷ লোকটা মাথা থেকে টুপি খুলে নিজেকে হাওয়া করতে লাগল৷ ওর মাথার বাদামী চুল ঘামে ভিজে টাকের সঙ্গে লেপটে আছে৷

নিছক কথা বলার জন্যই বললাম, ‘ওঃ, আজ ভীষণ গরম পড়েছে—একেবারে অসহ্য!’

লোকদুটো জবাব দিল না৷ আমার উপস্থিতি ওদের কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল৷

হঠাৎ আমার সন্দেহ হল, এ লোকদুটো হয়তো রেস্তোরাঁর ক্যাশ লুট করতে এসেছে৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই অন্য একটা চিন্তা দশমনী হাতুড়ির মতো আমার মস্তিষ্কে আঘাত করল৷ যদি ওরা বাংলোয় গিয়ে সিন্দুকটা খুঁজে পায়! যদি লুঠ করে সিন্দুকের সমস্ত টাকা!

সাদা টাই-পরা লোকটা কোট থেকে একটা পিন খুলে দিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল৷ অনুভব করলাম, ওর ক্ষুদে ক্ষুদে অভিব্যক্তিহীন চোখজোড়া আমার ওপরেই নিবদ্ধ—কিন্তু আমার মুখে নেয়, নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে আমার উন্মুক্ত গলার দিকে৷ ভয়ে শিউরে উঠলাম৷

‘কী হে, তুমিই এখানকার মালিক নাকি?’ হালকা সুরে আচমকা প্রশ্ন করল সাদা-টাই, ‘একা থাক, না বউ-ছেলেমেয়ে আছে?’

প্রশ্নটা অত্যন্ত নির্দোষ এবং সাধারণ৷ যে-কোন খদ্দেরই এ ধরনের প্রশ্ণ করতে পারে৷ কিন্ত লোকটার টেনে টেনে কথা বলার সুরে কেন যেন ভয় পেলাম৷

‘না, আমি এখানে চাকরি করি৷’ পাম্পের মিটারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে জবাব দিলাম, ‘মালিক এবং তাঁর আর একজন কর্মচারী একটু বাইরে গেছেন৷ এখুনি এসে পড়বেন৷ ওঁদের আসার সময় অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে—’

লোকটা এবার পিন দিয়ে মাড়ি খোঁচাতে লাগল৷ তারপর পিনটা চুষে পরিষ্কার করে আবার কোটের গায়ে আটকে রাখল৷

আমি তেল দেওয়া শেষ করে বালতি থেকে ভিজে স্পঞ্জটা তুলে নিলাম৷ এগিয়ে গিয়ে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রীন মুছতে লাগলাম৷

কাজ করতে থাকলেও আমার দৃষ্টি কিন্তু সর্বদাই লোকদুটোর দিকে৷

বন্ধ বাথরুমে স্নানরত অবস্থায় বুকে হেঁটে এগিয়ে-আসা কোন সাপকে লোকে যেভাবে লক্ষ্য করে, ঠিক সেভাবে ওদের চালচলন লক্ষ্য করতে লাগলাম৷

‘সল, চলো কিছু খাওয়া যাক৷’ সাদা-টাই তার মোটা সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলল৷ তারপর আমার দিকে ফিরল, ‘খাওয়ার মতো কি কি আছে বল দেখি?’

‘এত রাতে শুধু স্যান্ডউইচ ছাড়া আর-কিছুই নেই৷’

‘দুর দুর, শুধু স্যান্ডউইচে কী হবে? ভারী কিছু চাই—আমাদের ভীষণ খিদে পেয়েছে৷’

আড়চোখে হাতঘড়ির দিকে তাকালাম—বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট৷ অর্থাৎ লোলাকে ফিরতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি৷ সুতরাং, এ লোকদুটোর হাত থেকে আর নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না৷

নিরুপায় হয়ে খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম৷ সল এবং সাদা-টাই সতর্ক পা ফেলে আমাকে অনুসরণ করল৷

খাবার ঘরে ঢুকেই ওরা থমকে দাঁড়াল, ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল৷

‘তুমি কি এখানে একা নাকি?’ সাদা-টাই জানতে চাইল৷

বুঝলাম মিথ্যে বলে লাভ নেই৷ কারণ, ওরা একটু ঘুরেফিরে দেখলেই জানতে পারবে, আমি এখানে একা কী দোকা৷ সুতরাং সত্যি কথাই বললাম, ‘হ্যাঁ৷’

‘এবারে খাওয়া-দাওয়া করা যাক৷—কী আছে?’

‘যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, তবে ফ্রায়েড চিকেনের ব্যবস্থা করতে পারি৷’

সল আমাকে অতিক্রম করে কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল৷ রান্নাঘরের দরজা খুলে ভিতরে উঁকি মারল৷ কিন্তু একটু পরেই ও ফিরে এল৷ সাদা-টাইকে উদ্দেশ করে মাথা নেড়ে জানাল, রান্নাঘরে কেউ নেই৷

ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি বিপদে পড়েছি৷

সাদা-টাই পায়ে পায়ে দেওয়ালে-গাঁথা টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল৷ টেলিফোন ডায়ালের ওপর আঙুলের টোকা মরল, ‘তোমার এখানে টেলিফোন কি একটাই?’

‘হ্যাঁ৷’ হাতদুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ কারণ, সামান্যতম নড়াচাড়াও বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা আমার অজানা ছিল না৷

লোকটা টেলিফোনের রিসিভারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে এক হ্যাঁকচা টান মারল৷ সিরিভারটা তার ছিঁড়ে দেওয়াল থেকে আলগা হয়ে বেরিয়ে এল৷ সাদা-টাই সরীসৃপের মতো স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করতে লাগল, ‘যাও, ফ্রায়েড চিকেনের ব্যবস্থা করো গিয়ে৷ সল, তুমিও ওর সঙ্গে যাও—ওর দিকে নজর রেখো৷’

রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম৷ কানে অনুসরণরত সলের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷ ফ্রাইং প্যানে মুরগি চাপিয়ে সলকে প্রশ্ন করলাম, ‘কী ব্যাপার—তোমরা কী চাও?’

‘ভয় পেও না, দোস্ত৷’ সল এগিয়ে গিয়ে টেবিলের উপর রাখল৷ ওর পাঁচ আঙুল রিভলভারের বাঁটের গায়ে খেলে বেড়াতে লাগল ‘চুপচাপ কাজ করে যাও৷’

বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর সল আবার মুখ খলল, ‘তোমার এ জায়গাটা ভালো লাগে? একা একা থাকতে খারাপ লাগে না?’

‘অভ্যেস হয়ে গেছে৷’ ঠোঁট শুকিয়ে আসার অস্পষ্টভাবে জবাব দিলাম৷ বুকের কাঁপুনি হঠাৎ যেন আরও বেড়ে গেল৷

‘বিয়ে করেছ?’

‘উহুঁ৷’

‘তাহলে একা রাত কাটাও কেমন করে—যাঁ৷’

‘এই—চলে যায়৷’

এমন সময় সাদা-টাই এসে রান্নাঘরে ঢুকল৷ ওর হাতে এক প্লেট স্যান্ডউইচ৷ সম্ভবত খাবার ঘরের আলমারি থেকে তুলে নিয়েছে৷

‘এই নাও, সল৷ খেয়ে দেখ, খুব মিষ্টি খাবার৷ সাদা-টাইয়ের মুখ স্যান্ডউইচে ঠাসা৷ তাই ওর কথাগুলো কেমন যেন অস্পষ্ট শোনাল, ‘খোকার দিকে লক্ষ্য রেখো৷ দেখ যেন উল্টো-পাল্টা কিছু করে না বসে৷ আমি একবার চারপাশটা ঘুরে দেখে আসি৷’ কথা শেষ করে সাদা-টাই রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

সল প্লেট থেকে একজোড়া স্যান্ডউইচ তুলে নিয়ে মুখে পুরে বলল, ‘এডি এমনিতে খুব ভালো লোক৷ তবে রিভলভারের ট্রিগার দেখলেই ওর ভীষণ টিপতে ইচ্ছে করে৷ সুতরাং, ওর সঙ্গে সমঝে ব্যবহার করো! নয়তো—’

সলের কথার কোন জবাব দিলাম না৷ তাছাড়া জবাব দেবই বা কি! কিন্তু আমার কোণঠাসা মন ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷

সলকে কায়দা করতে আমাকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না৷ ওর ওই থলথলে চেহারা নিয়ে ও আমার সঙ্গে যুঝে উঠতে পারব বলে মনে হয় না৷ সুতরাং, একবার যদি ওকে কাবু করতে ফেলতে পারি, তবে এডির সঙ্গে আমার লড়াই হবে সমানে সমানে৷

ভেবে দেখলাম, যদি সাহস করে সল আর এডির মোকাবিলা করতে পারি, তবে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রয় ও লোলা ফিরে আসার আগেই সিন্দুকের টাকাটা সরিয়ে ফেলতে পারব৷

‘ক্যাশে টাকা-পয়সা কীরকম আছে?’ সল হঠাৎ প্রশ্ন করল৷

‘বেশি নেই৷ আজ বিকেলেই ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেওয়া হয়ে গেছে৷’

তাই নাকি? তাহলে তো ভারি চিন্তার কথা!’

একমুহূর্তে চুপ করে থেকে বলল, ‘টাকাপয়সা তো নানা জায়গা থেকে আমদানিই হয়৷ তাহলে আমাকে কি ধাপ্পা দিচ্ছ নাকি?— চটপট বলে ফেল দেখি, রূপচাঁদগুলো কোথায় ছুপে রেখেছ?’

‘ক্যাশবাক্সে একশো-ডলার আছে—ওটাই সব৷’

উহুঁ, অত কম টাকায় তো চলবে না৷ আরও কিছু ব্যবস্থা করতে পার তো বল, নইলে তোমার প্রাণ-পাখি ডানা মেলবে৷’

দুটো খালি প্লেট নিয়ে টেবিলে রাখলাম৷ উত্তেজনায় শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততম হয়ে উঠল৷ এই মোটাটাকে ঢিট করতে হলে এটাই উপযুক্ত সময়৷

গরম ফ্রায়েড চিকেনসুদ্ধ ফ্রাইং প্যানটা তুলে নিয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘ক্যাশের টাকা ছাড়া পেট্রল বিক্রির পঞ্চাশ ডলার আছে৷ সত্যি বলছি, এ ছাড়া আর-কোন টাকা-পয়সা নেই৷’

সল ধীরেসুস্থে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল৷ শিকারীর চোখে আমাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷ আমি ফ্রাইং প্যান থেকে ভাজা মুরগিগুলো প্লেটে রাখার জন্য প্রস্তুত হলাম৷

‘ওই দেড়শো ডলারে কিছু হবে না দোস্ত, আরও জোগাড় করার ব্যবস্থা করো৷ এডির সঙ্গে প্যাঁচ খেলার চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না৷’

সলের কথা শেষ হতে না হতেই ফ্রাইং প্যানের গরম মুরগিগুলো সজোরে ছুড়ে দিলাম ওর মুখে৷ এক বিকট চিৎকার করে সল টলতে টলতে কয়েক পা পিছিয়ে গেল৷ গরম তেল ছড়িয়ে পড়ল ওর চোখেমুখে, ভাজা মুরগির কিছু অংশ ওর টুপির উপর, আর বাকিটা ওর কোটের গায়ে লেগে মেঝেতে ছিটকে পড়ল৷

সল এক হাতে মুখ চাপা দিয়ে অন্য হাতে কোমর থেকে রিভলভারটা বের করার চেষ্টা করতে লাগল৷ আর দেরি না করে ফ্রাইং প্যানটা ঘুরিয়ে সপাটে বসিয়ে দিলাম ওর মুখে৷ সে আঘাতে সল আরও কয়েক পা পিছিয়ে কোনরকমে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল৷ ওর এক হাত তখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে .৪৫ রিভলভারের বাঁট৷

ফ্রাইং প্যানের আর এক আঘাতেই সল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল৷ ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা চাপা গোঙানি৷

সলের ওপর ঝুঁকে পড়ে ওর রিভলভারটা বের করে নিলাম৷ কিন্তু এর পরেও ও উঠে বসবার চেষ্টা করতে লাগল৷ সুতরাং বিনা দ্বিধায় .৪৫-এর বাঁট দিয়ে সজোরে ওর মাথায় আঘাত করলাম৷ এবারে ও চোখ উল্টে , হাত-পা ছাড়িয়ে আবার মেঝেতে আছড়ে পড়ল৷

ওর রিভলভারটা শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম৷

ঠিক সেই মুহূর্তে কানে এল খাবার ঘরের দরজা খোলার মৃদু শব্দ৷ আর দেরি না করে বিদ্যুৎ বেগে ছুটলাম আলোর সুইচ লক্ষ্য করে৷ সুইচ অফ করতেই একরাশ অন্ধকারে ভরে গেল ছোট্ট রান্নাঘরটা৷

বুঝলাম, এডিকে কাবু করা এতটা সহজ হবে না৷ কারণ এডি পেশাদার খুনে৷ তবু আশার কথা, আমিও নিরস্ত্র নই৷

সুতরাং রিভলভার বাগিয়ে ধরে অন্ধকার রান্নাঘরে ঘাপটি মেরে পড়ে রইলাম৷

‘সল—?’

অন্ধকারে ভেসে এল এডির সতর্ক ফিসফিসে কণ্ঠস্বর৷

খুব সাবধানে হালকা পায়ে এগিয়ে গেলাম রান্নাঘরের খিড়কি-দরজার কাছে৷ জীবনে কোনদিন পিস্তল ব্যবহার করিনি৷ তাই .৪৫ রিভলভারটা আমার হাতে বেখাপ্পা ঠেকতে লাগল৷ কিন্তু তা হলেও মনে যেটুকু সাহস, আশা-ভরসা তা কেবল ওই পিস্তলটার জন্যই৷

এমন সময় খাবার ঘরে আলোটা হঠাৎ নিভে গেল৷ কানে এল কাঠের পাটাতনে পা ফেলার খসখস শব্দ৷

‘সল, তুমি কোথায়?’

খিড়কি-দরজায় হাত রেখে আস্তে চাপ দিলাম৷ কয়েকদিন সেই কব্জাগুলোতে তেল দেওয়ায়, দরজা খোলার সময় কোন শব্দ হল না৷

দরজা খুলতেই কানে এল সলের চাপা গোঙানি, এবং সেই সঙ্গে ওর নড়াচড়ার শব্দ৷ নাঃ, সলের মাথাটা দেখছি লোহার তৈরি! ভেবেছিলাম, অন্তত ঘণ্টাখানেক ও অজ্ঞান হয়ে থাকবে আর সেই সময়ে এডির সঙ্গে আমার বোঝাপড়া শেষ হবে৷ কিন্তু এখন দেখছি সমূহ বিপদ৷ এড়ির ব্যবস্থা যদি চটপট না করতে পারি, তাহলে সল জেগে উঠবে৷ আর, তারপর ওরা দুজনে মিলে ধীরেসুস্থে আমাকে শেষ করবে৷

খিড়কি-দরজা পুরোটা খুলতেই অনুভব করলাম মরুভূমির উত্তপ্ত বাতাসের ঝাপটা৷ ভেবে দেখলাম, বাইরে বেরোতে পারলে এডির সঙ্গে মোকাবিলা করতে আমার অনেক সুবিধে হবে৷ তাই .৪৫টা রান্নাঘরের দরজার দিকে কোনরকমে তাক করে পায়ে পায়ে পিছোতে লাগলাম৷

হঠাৎ চোখে পড়ল বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো নীল আগুনের রেখা আর তার পরমুহূর্তেই রিভলভারের কান ফাটানো বীভৎস শব্দ৷ একটা গরম সীসের টুকরো ‘সুইস’ শব্দ তুলে আমার রগ ঘেষেঁ বেরিয়ে গেল৷ ভয়ে আমার সারা শরীর ঘেমে উঠল৷ হৃৎপিণ্ডের গতি হয়ে উঠল দুর্বার—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ

এক লাফে তিনটে সিঁড়ি পার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম বালির উপর৷ মুহূর্তের মধ্যে আত্মগোপন করলাম অন্ধকারের আশ্রয়ে৷

এডির লক্ষ্য যে এতটা নির্ভুল, তা আশা করিনি৷

হৎপিণ্ডের অশান্ত স্পন্দনকে একমাত্র সঙ্গী করে অন্ধকারে অপেক্ষায় রইলাম৷ কিন্তু চারদিকের বরফ-শীতল নিস্তব্ধতা পরিবেশকে আরও ভয়াবহ করে তুলল৷

আস্তে আস্তে মাথা তুলে ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তার দিকে তাকালাম৷ কিন্তু সে ক্ষীণ আশাতেও ছাই পড়ল—চাঁদের আলোয় আলোকিত রাস্তা শুভ্র বিতানের মতোই নিষ্কলঙ্ক৷ সে-নির্জনতাকে চুরমার করে এগিয়ে আসছে না কোন গাড়ির হেডলাইট৷ পরিস্থিতি যেন আমাকে বারবার জানিয়ে দিচ্ছে, আমি একা৷ এই বিপদের মুহূর্তে কেউ এগিয়ে আসবে না আমাকে সাহায্য করতে৷ সম্পূর্ণ নিজের উপরেই আমাকে নির্ভর করতে হবে৷

সামনের পাম্পগুলো চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ কিন্তু গুমটিঘর, রেস্তোরাঁ আর বাংলোর চারদিকে অন্ধকারে জমাট আস্তরণ৷ যেভাবে হোক আমাকে বাংলোয় পৌঁছতেই হবে৷ অর্থাৎ পার হতে হবে সামনের আলোকিত উঠোনটুকু৷

রেস্তোরাঁর দেওয়াল ঘেঁষে পায়ে পায়ে পিছোতে লাগলাম৷ অন্ধকারে আড়াল থেকে বাংলোর যতটা কাছে যাওয়ার সম্ভব এগিয়ে গেলাম৷

এমন সময় নরম স্বরে কেউ বলে উঠল, ‘ওহে খোকা, পিস্তল ফেলে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এস৷ শুধু শুধু কেন নিজের বিপদ ডেকে আনছ৷

অন্ধকারে কণ্ঠস্বরের উৎসস্থল ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না৷ কিন্তু এডির সাদা টাইয়ের ঝিলিক মুহূর্তের জন্য চোখে পড়তেই গুলি করার একটা দুর্দম ইচ্ছে আমাকে পেয়ে বসল৷ কিন্তু পরক্ষণেই সে-নির্বুদ্ধিতার পরিণতির কথা চিন্তা করে নিরস্ত হলাম৷ কারণ এডি অত্যন্ত চতুর৷ ও জানে, আমি বোকার মতো ওকে লক্ষ্য করে গুলি করব, আর আমার পিস্তলের কৃশানু সংকেত ওকে জানিয়ে দেবে আমি কোথায় লুকিয়ে আছি৷ আমি যদিও বা ফসকাই, এডি যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না, সেবিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ সুতরাং ওর ফাদে পা না দিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম৷ অন্ধকারের মধ্যেই দেখতে চেষ্টা করলাম এডির সাদা টাই, কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না৷

ভীষণ ভয় পেলেও স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি আমি তখনও হারায়নি৷ তাই যখন আরও একবার কানে এল এডির নেশা-ধরানোর হালকা স্বর, আমি যেমন বসে ছিলাম তেমনি রইলাম৷ কিন্তু মনে হল, এডির কণ্ঠস্বর যেন আরও অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে৷ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলাম৷ এডি যদি কোনরকমে একবার বুঝতে পারে আমি কোথায় লুকিয়ে আছি, তাহলে আমাকে খুন করতে ও এতটুকু দ্বিধা করবে না৷

খুব সাবধানে বালিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম৷ বুকে হেঁটে এগোতে যেতেই হাতে ঠেকল একটা পাথরের টুকরো৷ অতি সপ্তর্পণে ওটা তুলে নিয়ে বিপরীত দিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলাম৷ পাথরটা রেস্তোরাঁর দেওয়ালে গিয়ে সশব্দে আঘাত করল৷ সঙ্গে সঙ্গে চোখ-ধাঁধানো নীল আলো, আর পিস্তলের বিকট গর্জন—মাথার ইঞ্চিখানেক উপর দিয়ে বাতাস কেটে শিস তুলে বেরিয়ে গেল একটা গুলি৷ যদি বালির উপর শুয়ে না থাকতাম, তাহলে সলের কথামতো হয়তো ওই গুলিতেই আমার প্রাণ-পাখি ডানা মেলত৷

এবারে বুঝলাম, এডিকে আমি কত ভুল বুঝেছি৷ কারণ, ও পাথরের শব্দ শুনে সেদিকে গুলি না করে, তার বিপরীত দিকে—অর্থাৎ আমাকে লক্ষ্য করেই গুলি করেছে৷ এডির দীর্ঘদিনের পেশাদারী অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করে যে কী ভীষণ ভুল করেছি, তা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলাম৷

পিস্তলের আলোটা ঝলসে উঠেছে ঠিক খিড়কি-দরজার কাছ থেকে৷ কিন্তু আমি রিভলভার তুলতে গিয়েই থমকে গেলাম৷ কারণ এডি আমাকে গুলি করার পরমুহূর্তেই সিঁড়ির পিছনে বালির উপর লাফ দিল৷ দেখতে না পেলেও, ধপ করে শব্দ হওয়ার ব্যাপারটা অনুমান করতে অসুবিধে হল না৷ বুঝলাম, এডি গুঁড়ি মেরে আক্রমণোদ্যত জাগুয়ারের মতো সিঁড়ির ধাপের আড়ালে আমার জন্য অপেক্ষা করছে৷

খুব সাবধানে নিঃশব্দে পিছোতে শুরু করলাম৷ প্রতিমুহূর্তেই আশা করতে লাগলাম, এখুনি হয়তো শুনতে পাব পিস্তলের গর্জন অনুভব করব বুলেটের নিঃশ্বাস৷

এই সংকটময় মুহূর্তে হঠাৎই এডিকে দেখতে পেলাম৷

আমার কাছ থেকে গজ পনেরো দূরে চোখে পড়ল অন্ধকারে ওর সাদা টাইয়ের ঝিলিক৷ কোন পেশাদার বন্দুকবাজের পক্ষে সাদা টাই পরা নেহাতই অবিবেচনার কাজ৷ এরকম একটা স্থূল লক্ষ্য আমার মতো একজন আনাড়ীও যে অনায়াসে ভেদ করবে সে-বিষয়ে এডির তো সন্দেহ থাকার কথা নয়৷ তাহলে কি প্রতিপক্ষকে অবহেলা করার দরুণই এডির এই চরম অসাবধানতা৷

সপ্তর্পণে একটু একটু করে রিভলভার শক্ত করে ধরে এডির ঝাপসা সাদা টাইয়ের উপর তাক করলাম৷ অস্থির ভয়ার্ত আঙুল ট্রিগারের উপর ক্রমশ চেপে বসতে লাগল৷

কিন্তু হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা মনে আসতেই ট্রিগারের উপর হালকা হয়ে এল আঙুলের চাপ৷

যদি এডি আমার গুলিতে মারা যায়? কী হবে তাহলে?

ভাবতে অবাক লাগল, এই নিদারুণ সংকটময় মুহূর্তেও কী অদ্ভুতভাবেই না বিভিন্ন সম্ভাবনার বিশদ বিবরণ ভেসে উঠল মনের পর্দায়!

যদি এডিকে আমি খুন করি, তাহলে লাশটা লুকোব কোথায়? তাছাড়া, রান্নাঘরের মেঝেতে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে সল৷ ওরও তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে৷ হয়তো শেষ পর্যন্ত সলকেও একেবারে শেষ করতে হবে৷ তারপর!

এডি আর সলের কথা জানিয়ে পুলিশে খবর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ কারণ, এবারে আর রয় আমার পরিচয় নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না৷ পোস্টমর্টেম রিপোর্টেই ধরা পড়ে যাবে, এডি আর সলের মৃত্যুর সময় রয় এবং লোলা দুজনেই ওয়েস্টওয়ার্থে ছিল৷ তখন পুলিশ জানতে চাইবে এডি এবং সলের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? সুতরাং, আমাকেই অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে ওরা সোজা ফার্নওয়ার্থে চালান দেবে৷ কোন কথাই শুনতে চাইবে না৷

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে রিভলভার নামিয়ে নিলাম৷ এবং সেটাই হল আমার চরম নির্বুদ্ধিতা৷

কারণ, রিভলভার নামানোর এই সামান্য নড়াচাড়া এডির শিকারী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারল না৷

আগুনের ঝলক আর রিভলভারের গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বুকে অনুভব করলাম এক প্রচণ্ড ধাক্কা৷ সারা শরীর বাঁশ পাতার মতো থরথর করে কেঁপে উঠল৷ কিন্তু কোন যন্ত্রণাই অনুভব করলাম না৷ শুধু মনে হল, আমার মস্তিষ্কের ভিতর কেউ যেন একটা সুইচ অফ করে দিয়েছে, আর তারই ফলস্বরূপ নির্বাপিত হয়েছে কোন শক্তির উৎস শরীরের নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হয়েছে অকেজো৷

বালির উপর মুখ থুবড়ে পড়তেই অনুভব করলাম উষ্ণ উত্তাপ৷ দু-হাতে ধরা রিভলভারটা যেন অকস্মাৎ ময়দানবের প্রাসাদের মতোই ভারী ঠেকল৷ শত চেষ্টায়ও আর ধরে রাখতে পারলাম না৷

রিভলভারটা হাত থেকে স্খলিত হয়ে বালিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছুঁচলো জুতোর কঠিন অগ্রভাগ সপাটে এসে আছড়ে পড়ল আমার পাঁজরে৷

মনে হল, একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের কাছে আমি দাঁড়িয়ে আছি৷ তার উত্তাপে আমার ভিতরটা পর্যন্ত পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে৷ সেই সঙ্গে রক্তসমুদ্রের বিশাল ঢেউ যেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছে৷ আমি আস্তে আস্তে তার মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি৷ শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতে লাগল৷ চিৎকার করতে গিয়ে টের পলাম, সে-ক্ষমতাও আমি হারিয়েছি৷

ঘড়ির কাঁটা হঠাৎ উদ্দাম গতিতে ছুটে চলল বিপরীত দিকে—অন্ধকার চোখের সামনে ফিরে এল অতীতের সেই দৃশ্য—

কুপারের বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে আমি উন্মাদের মতো দৌড়চ্ছি৷ নিচে আসতেই আবার সেই দ্বাররক্ষীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি৷ তারপরই দেখলাম, আমি বৃষ্টি-ভেজা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছি৷ পিছনে ধুপধাপ করে দৌড়ে আসছে সেই কালান্তক পুলিশটা—হঠাৎ কানে এল গুলির শব্দ—পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড ধাক্কা—মুখ থুবড়ে রাস্তার পড়তেই টের পেলাম বৃষ্টির ফোঁটা ঝিরঝির করে ঝরে পড়ছে আমার চোখে-মুখে—আঃ—

পরে রয়ের কাছেই সমস্ত ঘটনা শুনেছিলাম৷ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরে এসে ওরা লক্ষ্য করে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা৷ তাই দেখে রয়ের মনে কেমন যেন সন্দেহ হয়৷ ও আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করতে থাকে৷ কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করতেই বাইরে বালির উপর রয় আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে৷ প্রথমে ও ভেবেছিল, আমি হয়তো আর বেঁচে নেই৷ কিন্তু পরে আমার অবস্থা বুঝতে পেরে, ও আর লোলা মিলে আমাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে আসে—রয়ের বিছানায় শুইয়ে দেয়৷ তার কিছু পরেই নাকি আমার জ্ঞান ফিরে আসে৷

জ্ঞান যখন ফিরল, দেখি রয় আমার দেহের উপর ঝুঁকে রয়েছে৷ ওর মুখ ভয়ে সাদা হাত-পা থরথর করে কাঁপছে৷ রয়ের ঠিক পিছনেই স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে লোলা৷ উত্তেজনায় ওর মুখের রেখা কঠিন—চোখের তারায় কৌতূহল৷

আস্তে পাশ ফেরার চেষ্টা করতেই বুঝলাম, সে শক্তিও আমার নেই৷

আমাকে চোখ মেলাতে দেখেই লোলা রয়ের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে এল৷ ঝুঁকে পড়ল আমার মুখের উপর—কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল, শেট? কে তোমার এ অবস্থা করেছে?’

শত চেষ্টাতেও আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না৷

রয় আমার অবস্থা দেখে লোলাকে নিরস্ত করল, ‘থাক, লোলা৷ ও এখন বিশ্রাম করুক৷ তুমি যাও আমি ওর পাশে বসছি৷’

আমি আবার ভেসে চললাম অন্ধকারের রাজ্যে৷ একরাশ কালো অন্ধকার যেন উন্মক্ত আক্রোশে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর৷ মনে হল, এই বোধহয় শেষ অন্ধকার—জীবনের ওপিঠ—মৃত্যু! কিন্তু আশ্চর্য, এই মৃত্যুভয় আমার মনে আশঙ্কার পরিবর্তে এনে দিল এক বিচিত্র প্রশান্তি৷ চেতনার সীমারেখা পার হতেই যন্ত্রণার রেশ ক্রমশ ফিকে হয়ে মিলিয়ে গেল৷ জমাট অন্ধকারের বিশাল টুকরো এসে আশ্রয় নিল দুচোখের পাতায়—

দ্বিতীয় বার চোখ মেলতেই জানালা দিয়ে ঠিকরে-আসা সোনালী রোদে কেমন অস্বস্তি বোধ করলাম৷ কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকার পর তাকিয়ে দেখি রয় তখনও আমার পাশেই বসে আছে৷ চোখের চিন্তাকুল দৃষ্টি আমার মুখমণ্ডলে নিবদ্ধ৷ কিন্তু লোলাকে কোথাও দেখলাম না৷ সম্ভবত ও বাংলোয় ফিরে গেছে৷

‘এখন কেমন আছিস?’ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে রয় প্রশ্ন করল৷

‘ভালোই৷’

মনে হল, এই একটা শব্দ উচ্চারণ করতে শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হয়েছে৷ নিজেকে এত দুর্বল লাগল, যেন দু-পাখার ভর করে অসীম শূন্যের দিকে ভেসে চলেছি৷ খাট, ঘর—সব যেন আস্তে আস্তে দুলছে—দুলছে—

‘শোন্ শেট,’ রয় খুব ধীরে অথচ স্পষ্ট করে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল, ‘তোর শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়৷ তাই আমি ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু লোলা বারণ করল৷ ও বলল, তোর নাকি ডাক্তারের দরকার হবে না?’

‘লোলা ঠিক বলেছে, রয়৷’ আপ্রাণ চেষ্টায় ক্ষীণস্বরে জবাব দিলাম৷

‘কিন্তু আমার মনে হয়, ডাক্তার না ডাকলে যে-কোন সময় তোর কিছু একটা হয়ে যেতে পারে৷’ রয়ের কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন মনে হল, ‘আমার যথাসাধ্য আমি করেছি, শেট, কিন্তু আমি তো আর ডাক্তার নই!’

শরীর দুর্বল হলেও আমার চিন্তাশক্তি কিন্তু আচ্ছন্ন হয়নি৷ ডাক্তার ডাকার পরিণতি আমার অজানা নেই৷ ডাক্তার এসে যখনই দেখবে, আমি রিভলভারের গুলিতে আহত হয়েছি, তখনই সে পুলিশে খবর দেবে অর্থাৎ সেই ফার্নওয়ার্থ!

এমন সময় জানালা দিয়ে ভেসে এল হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ৷

আপনমনেই গজগজ করতে করতে রয় উঠে দাঁড়াল, ‘শালা, এই ট্রাক-ড্রাইভারগুলো দেখছি আমাকে পাগল করে ছাড়বে! তুই শুয়ে থাক শেট, আমি এখুনি আসছি৷’

চোখ বুঝে শুয়ে রইলাম৷ কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম জানি না, হঠাৎ এক মৃদু শব্দে চমকে চোখ মেললাম৷ সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে৷ পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ৷ দেখি, আমার মুখের ঝুঁকে রয়েছে লোলা৷

‘শেট, কারা তোমাকে গুলি করেছে?’

‘দুজন লোক ওদের কাছে রিভলভার ছিল,’ অস্পষ্টস্বরে জবাব দিলাম৷

লোলা মাথা আরও নামিয়ে আমার ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে এল, ‘তুমি চেন ওদের?’

‘না—আগে কোনদিন দেখিনি৷’

‘ওরা সিন্দুক খোলেনি তো, শেট?’

অতিকষ্টে চোখ ফিরিয়ে লোলার দিকে তাকালাম৷ ওকে আর আগের লোলা বলে চেনাই যায় না৷ গাল ভেঙে গেছে চোখের কোলে কালি এই ক-দিনে লোলার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে৷ ওর ঠোঁটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম সূর্যের পড়ন্ত আলোয় চকচক করছে৷ মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাশে সাদা৷

‘জানি না খুলেছে কিনা৷’

বিছানায় শুয়ে সেই বিচিত্র শূন্যতার অনুভূতি সিন্দুকের চিন্তা আমার মন থেকে একেবারে মুছে দিল৷

‘ওরা কি সিন্দুকের কথা জিগ্যেস করেছিল?’ লোলার স্বর উৎকণ্ঠায় কাঁপছে৷

‘উহুঁ—’

‘শেট, সিন্দুকটা বাইরে থেকে বন্ধই আছে দেখে মনে হচ্ছে না ওটা কেউ খুলেছিল৷ কিন্তু তবু আমার নিশ্চিতভাবে জানা দরকার৷ যদি ওরা টাকাগুলো নিয়ে সিন্দুক বন্ধ করে দিয়ে থাকে, তাহলে?—শেট—শেট, আর একবার ভালো করে ভেবে দেখ!’ উত্তেজনায় লোলার সুডৌল স্তন সাদা গাউনের নিচে একবার উঠছে—একবার নামছে৷ সিন্দুকের চিন্তায় ও একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছে৷

আমার মনে পড়ল এডির কথা৷ এডির মতো পেশাদার লোক যদি সিন্দুকটা খুঁজে পেয়ে থাকে, তবে সেটা খুলতে ওর বেশি সময় লাগবার কথা নয়৷ কারণ সিন্দুক সম্বন্ধে সামান্যতম অভিজ্ঞতা যার আছে, সে-ই এক তুড়িতে ওই সিন্দুক খুলে ফেলবে৷

‘জানি না৷ সিন্দুকটা দেখে থাকলে হয়তো নিতে পারে—৷’

কথা বলার পরিশ্রমে মন আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে লাগল৷ আবার যেন ভেসে চললাম সেই শূন্যতার মধ্যে দিয়ে৷

‘আমার জানা দরকার, শেট৷ সিন্দুকটা কী করে খুলতে হয় আমাকে বলে দাও৷’

লোলার ফ্যাকাশে মুখে লোভ, উৎকণ্ঠার ছায়া—ওর ঘর্মাক্ত মুখ ঝুঁকে রয়েছে আমার মুখের উপর৷ নাকে আসছে ওর ঘামের গন্ধ৷ ওর কথাগুলো যেন শব্দতরঙ্গের প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘর ভরে ফেলল—আমাকে বলে দাও, আমাকে বলে দাও, আমাকে বলে দাও—

চোখের সামনে এসে দাঁড়াল সেই অন্ধকার, আমাকে ঘিরে ধরল চারদিক থেকে৷ ভেসে এল লোলার কণ্ঠস্বর, ‘বলো শেট—চুপ করে থেকো না৷ সিন্দুকটা কি করে খুলতে হয়, আমাকে বলে দাও৷ শেট—শেট—!’

লোলার স্বর, রয়ের ঘর—আর অস্তায়মান সূর্যের ম্লান আলোয় আলোকিত জানালা—সব-কিছুর সামনে কে যেন হঠাৎ টেনে দিল এক নিকষ কালো পর্দা৷

জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তার দোলায় কেটে গেল তিনটে দিন৷ নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শুধু শুধু আর পঙ্গু হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করিনি৷ সব-কিছু ছেড়ে দিয়েছি ভবিতব্যের হাতে৷

রয় যদি জীবনপণ করে এভাবে আমার সেবা না করত, তাহলে হয়তো এই তিনটে সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্যও আমার হত না৷ রাত নেই, দিন নেই—সব সময় রয় বসে থেকেছে আমার পাশে৷ জ্বরের সময় সারারাত ও আইস-ব্যাগ নিয়ে বসেছিল আমার মাথার কাছে৷ এক সেকেণ্ডের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করিনি৷

জ্বরে যখন গা পুড়ে যাচ্ছে, যন্ত্রণায় চোখে অন্ধকার দেখছি, এমন সময় দেখলাম, আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কার্ল জেনসন৷ বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে সে আমাকে দেখছে৷ যেমন দেখেছিল খোলা সিন্দুকের সামনে আমাকে আবিষ্কার করার পর৷ আমি জেনসনকে কি যেন বলতে গেলাম, কিন্তু ঠোঁট কেঁপে উঠলেও, হল না কোন শব্দের সৃষ্টি৷ আমার কথা বলার নীরব প্রয়াসকে অবহেলা করে জেনসন মিলিয়ে গেল অন্ধকারে৷

পরে রয়ের কাছে শুনেছিলাম, সেই সময়েই নাকি আমার অবস্থা চরমে উঠেছিল৷ এমনকি রয়ও আমার জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল৷ কিন্তু তারপরই কোন-এক অলৌকিক শক্তিবলে আমার অবস্থা আবার ভালোর দিকে মোড় নিল৷ ধীরে ধীরে সেরে উঠতে লাগলাম৷

সাত দিনের দিন ফিরে পেলাম কথা বলার শক্তি৷ তখন রয়ের সঙ্গে এডি এবং সলের ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম৷

কথা শেষ হলে রয় বলল, ‘ওরা ক্যাশ-বাক্স আর পেট্রল বিক্রির টাকা, সমস্ত ঝেড়ে পুঁছে নিয়ে গেছে৷ এমন কি খাবারগুলো পর্যন্ত বাদ দেয়নি৷’

আবার মনে পড়ল সিন্দুকের কথা৷ এডি কি সিন্দুকটাকে রেহাই দিয়ে গেছে? কে জানে—

কিন্তু রয়কে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করলাম না৷

‘তোর আর-কোন ভয় নেই, শেট—এবারে তুই ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠবি৷ নেহাত কপালজোরে এ যাত্রা বেঁচে গেছিস৷ রয়ের শীর্ণ মুখে বিবর্ণ হাসির আভাস৷ এ ক-দিনের অনিদ্রায় ওর চোখ লাল—চোখের কোলে কালি৷

‘এবারেও সেই তোর জন্যই বেঁচে উঠলাম, রয়৷ আমাকে দু-দুবার বাঁচিয়ে তুই আগের সমস্ত ঋণ শোধ করে দিলি৷ তোকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না—’

‘থাম্ শালা, থাম্—ঢের হয়েছে!’ কপট তিরস্কারের সুরে আমাকে বাধা দিল রয়, ‘কী আমার ভারি ইয়ে, তার আবার—৷ এ ক-টা দিন ভীষণ পরিশ্রম গেছে মাইরি৷ একবার তোকে দেখছি, আর একবার বাইরে গিয়ে গাড়িগুলোকে তেলমোবিল গেলাচ্ছি৷ ওফ—একটু ঘুমোতে পর্যন্ত পারিনি! দেখি, আজ একটা লম্বা ঘুম লাগাতে হবে৷’

আট দিন আট রাত আমি অসহায়ভাবে বিছানায় পড়ে ছিলাম৷ কিন্তু লোলা একবারের জন্যেও আমার কাছে আসেনি৷ জানি না, এ ক-দিনে রয়ের সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷

‘লোলার সঙ্গে তোর চলছে কেমন?’ ঠাট্টাচ্ছলে রয়কে প্রশ্ন করলাম৷

ও নিস্পৃহভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ওর সঙ্গে তো বলতে গেলে দেখাই হয় না৷—কি করে হবে বল্ না, দিন-রাত তো তোর কাছেই পড়ে আছি!’

রয়ের জবাব দেবার ধরন দেখে বুঝলাম, ও মিথ্যে বলছে৷ এমনকি আমার দিকে তাকাতে পর্যন্ত ওর বিবেকে বাধছে৷

‘আমি তোকে বারবার সাবধান করেছি, রয়৷ লোলা সাপিনীর মতো খল—ওকে তুই এখনও চিনিসনি৷’

‘নিশ্চিন্ত থাক্৷ লোলা যাই করুক না কেন, আমার কাছে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না৷’

কিছুক্ষণ আমরা পরস্পরের চোখে চোখ রাখলাম৷ হয়তো বোঝবার চেষ্টা করলাম একে অপরের অন্তরের কথা৷ একসময় রয়ই হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘শেট, সত্যি করে বল্ তো, জেনসনের আসলে কী হয়েছে?’

যদি না বুঝতাম, লোলাও ওর রূপযৌবনের প্রভাবে রয়কে আচ্ছন্ন করেছে, তাহলে হয়তো রয়ের কাছে জেনসন-নিরুদ্দেশ-রহস্য ফাঁস করতাম না৷ কিন্তু এখন যে করে হোক রয়কে নিরস্ত করার জন্য আমি মরিয়া৷ লোলার কাছ থেকে ওকে সরিয়ে আমি আনবই—তা সে যেভাবেই হোক৷ তাই ওকে সত্যিই কথাই বললাম, ‘লোলা কার্লকে খুন করেছে—আর আমি বোকার মতো লোলার কথায় রাজি হয়ে সেই মৃতদেহটা করব দিয়েছি৷’

একথা বলামাত্রই রয়ের চোখে ফিরে এল নির্বিকার শূন্য দৃষ্টি৷ পরিষ্কার বুঝলাম, আমার বক্তব্য ওর একেবারেই মনঃপূত হয়নি৷ অর্থাৎ, লোলা-বিরোধী কোন কথা শুনতে ও বিন্দুমাত্র রাজি নয়৷

‘ জেনসনের আগে লোলা আরও একটা বিয়ে করেছিল,’ রয়ের উপেক্ষাকে অগ্রাহ্য করেই বলে চললাম, ‘এবং সেই স্বামীকেও লোলা নৃশংশভাবে খুন করেছিল৷ তুই সাবধান থাকিস, রয়, লোলার রক্তে মিশে আছে খুন করার নেশা৷ প্রয়োজন হলে তোকে খুন করতেও ওর হাত এতটুকু কাঁপবে না৷’

‘কী উল্টোপাল্টা বকছিস?’ রয় আমার মুখের কাছে ঝুঁকে এল৷ বিস্ময়ে ওর চোখ বিস্ফারিত৷ চোয়ালে রেখা কঠিন৷

‘যা বলছি, ঠিকই বলছি৷ তোকে আমি সব খুলে বলতে চাই, যাতে তুই সময় মতো সাবধান হতে পারিস৷’

রয় উঠে দাঁড়াল, ‘এসব বাজে কথা শোনার সময় আমার নেই—আমি চললাম৷’

‘আমি তোকে তোর ভালোর জন্য বলছি, রয়৷ লোলাকে আমি যতখানি চিনি, তুই তা চিনিস না৷’

রয় দরজার দিকে পা বাড়াল, ‘যাই, ওদিকে আবার হাতের কাজ ফেলে এসেছি— বেশি দেরি করা ঠিক হবে না৷ তুই চুপচাপ শুয়ে পড়, এসব নিয়ে আর ভাবিস না, কথা শেষ করে রয় আর দেরি করল না৷ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

যাক, ওকে যে আগে থাকতে সাবধান করে দিতে পেরেছি, তাতেই আমার সান্ত্বনা৷ আমাকে আর জেনসনকে লোলা যত সহজে বোকা বানিয়েছে, রয়ের বেলায় ব্যাপারটা ততটা সহজ হবে না৷ কারণ, এখন থেকে রয়ও যথেষ্ট সাবধান হবে—লোলার প্রতি সবসময় লক্ষ্য রাখবে৷

কিন্তু তখনও বুঝিনি, আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে, রয়কে সাবধান করার আর প্রয়োজন নেই৷ কারণ, পরদিন রাতেই আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম৷

আমার অসুখের পর থেকে রয় শোবার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বসবার ঘরে গিয়ে রাত কাটাত৷ সম্ভবত আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেই৷ কিন্তু জেনসনের মৃত্যুর কথা রয়কে খুলে বলার পরই আমাদের মাঝে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য পাঁচিল৷ জানতাম, আমাদের মনের এই দূরত্ব পরস্পরকে চিরকাল দূরেই সরিয়ে রাখবে৷ আমাদের বোঝাপড়ার নিটোল ছন্দ সেই মুহূর্ত থেকেই বেসুর হয়ে গেছে৷ রয়ের নির্বিকার, অভিব্যক্তিহীন মুখভাবে সেটা আরও বেশি করে বুঝতে পারি৷ কিন্তু তার চেয়েও অস্বস্তিকর ঠেকে এই ঘরের পরিবেশ৷

লোলার কথা নিয়ে আমরা কখনও আলোচনা করি না৷ কিন্তু মাঝেমাঝেই জানালা দিয়ে দেখি, রেস্তোরাঁ থেকে বাংলোর দিকে হেঁটে যায়৷ অথচ ভুলেও কোনদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি৷

সেদিন রাত প্রায় এগারোটা বাজতেই দেখি, লোলা বাংলোয় ফিরে চলেছে৷ তার একটু পরেই নিভে গেল বাংলোর আলো৷ কিন্তু রেস্তোরাঁর আলো তখনও জ্বলছে—অর্থাৎ রয় এখনও কাজে ব্যস্ত৷

রাত প্রায় বারোটার সময় রয় আলো নিভিয়ে রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল৷ তারপর রেস্তোরাঁ বন্ধ করে ঘরে এল৷ বাইরে বসবার ঘরে ওর চলাফেরার শব্দ পেলাম৷ একটু পরেই ও হঠাৎ আমার ঘরের দরজা খুলে উঁকি মারল৷ কিন্তু আমাকে জেগে থাকতে দেখে কেমন থতিয়ে গেল, ‘শেট—মানে তোর কোন দরকার হলে আমাকে ডাকিস৷ আমি পাশের ঘরেই আছি—একটু ঘুমোবার চেষ্টা করি৷’

বুঝলাম, এ ক-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রয়ের আজ ঘুমোনো একান্ত প্রয়োজন৷ তাই ওকে বললাম, তেমন দরকার আমার হবে না৷ ও যেন নিশ্চিন্তমনেই ঘুমোয়৷

রয় চলে যেতেই আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম৷

জানি না রাত তখন কত হবে, হঠাৎ কানে এল শোবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ৷ অন্ধকারে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম৷ কানে এল রায়ের চাপা কণ্ঠস্বর, ‘শেট, তুই কি ঘুমিয়ে পড়েছিস?’

কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলাম৷ অন্ধকারে চোখে পড়ল দরজায় দাঁড়ানো রয়ের ছায়ামূর্তি৷

ওর কথা বলার হাল্কা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর আমাকে ভাবিয়ে তুলল৷ তাহলে কি?—

নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলাম৷ একটু পরেই শুনলাম দরজা বন্ধ করার মৃদু শব্দ৷ বুঝলাম, রয় ঘর থেকে চলে গেছে৷

সব-কিছু জেনেশুনেও মনেপ্রাণে চাইলাম, আমার অনুমান যেন মিথ্যে হয়৷ রয় সম্বন্ধে আমার ধারণা যে এই অসুস্থ চিন্তার কলঙ্কিত না হয়৷ কিন্তু জানি, নিজেকে স্তোক দিয়ে লাভ নেই৷ কারণ, বাস্তবকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার কেন, এ পৃথিবীতে কারুরই নেই!

একে একে গড়িয়ে চলল এক-একটি উৎকণ্ঠাময় মুহূর্ত৷ জানালা দিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম উঠোনের দিকে৷ একটু পরেই রয় অন্ধকার ছায়ার আশ্রয় ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল৷ নিঃশব্দে অথচ ক্ষিপ্রপায়ে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে৷ যেতে যেতে একবার ও ঘুরে তাকাল, দেখল আমার ঘরের দিকে—কিন্তু পরমুহূর্তেই বাংলোর দরজা খুলে সন্তর্পণে ভিতরে ঢুকে পড়ল৷

আমার বোঝা উচিত ছিল, একটানা এই আট রাত লোলা শুধু শুধু নষ্ট করেনি৷ আমার অনুপস্থিতির সুযোগে রয়কে বোকা বানিয়েছে৷ আর, সঙ্গকামনায় চঞ্চল রয়, সে-প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারেনি৷ সুতরাং ওকে দোষ দিয়ে লাভ কি!

অন্ধকারে শুয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হল৷ ঈর্ষার বদলে অনুভব করলাম আতঙ্কের অস্তিত্ব৷ লোলা একবার যখন রয়কে কব্জা করেছে, তখন ওকে দিয়ে সিন্দুক লোলা খোলাবেই৷ তারপর ও রয়কে খুন করবে৷—না, এ বিষয়ে এতটুকু সংশয়-সন্দেহ আমার মনে নেই৷

রয়ের পর আমাকেও লোলার শিকার হতে হবে৷ তারপর টাকাগুলো জায়গা মতো লুকিয়ে ফেলে ও খবর দেব সেই শেরিফকে৷ পায়জামা পরে বিছানায় শোওয়া অবস্থায় আমার মৃত্যুর ব্যাখ্যা ও কি দেবে, ভেবে পেলাম না৷ তার উপর পুলিশ এসে দেখবে, আমি আগে থেকেই এডির গুলিতে আহত হয়ে অসুস্থ ছিলাম৷

কিন্তু লোলা এতে থমকাবে বলে ভাবলে ভীষণ ভুল হবে৷ এই আট দিনেও হয়তো জুতসই একটা গল্পও তৈরি করে ফেলেছে—আমার এবং রয়ের মৃত্যুর ব্যাখ্যা হিসেবে৷ এডি এবং সলের চেহারার বর্ণনা আমি রয়কে দিয়েছি৷

ইতিমধ্যে লোলা হয়তো সেই বিবরণ রয়ের থেকে জেনে নিয়েছে৷ পরে পুলিশ এলে ও বলবে, এই এডি এবং সলই আমাকে আর রয়কে খুন করেছে৷ আর সেই সময়ে লোলা নিজে ওয়েন্টওয়ার্থে ছিল৷ সুতরাং সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে৷

লোলার স্বরূপ আমি জানি—ওর অসাধ্য কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না৷

বুকের যন্ত্রণা উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানান চিন্তায় ভেসে চললাম৷ কিন্তু চোখজোড়া বাংলোর দরজায় নিবদ্ধ৷ রাত প্রায় দুটো নাগাদ রয় বাংলোর দরজা খুলে বেরিয়ে এল৷ দরজা বন্ধ করে ঘরের দিকে আসতে লাগল৷

নিঃশব্দে বসবার ঘরে এসে ঢুকল রয়৷ একই সঙ্গে আমিও হাত বাড়ালাম আলোর সুইচের দিকে৷ রয় আমার ঘরের দরজা খুলতেই আলো জ্বেলে দিলাম৷

আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ও স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে৷ ওর পরনে গেঞ্জি, পায়জামা৷ পায়ে জুতো বা চটি পর্যন্ত নেই৷

‘আমি তোকে জাগাতে চাইনি, শেট৷ দেখলাম, তুই ঠিকমতো ঘুমোচ্ছিস কিনা৷’

‘আয়, ভেতরে আয়৷ তোর সঙ্গে কথা আছে৷’

রয়ের চোখে অস্বস্তির ছায়া কেঁপে উঠল, ‘না রে, এখন নয়৷ রাত প্রায় শেষ হতে চলল—একটা ঘুম দিয়ে নিই৷’

‘তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে, রয়৷’ আমার কথার সুরে রয় চমকে উঠল, এগিয়ে এসে আমার পাশে বসে ও একটি সিগারেট ধরাল, ‘বল্, কী বলবি৷’

‘লোলা তোকে তাহলে শেষ পর্যন্ত ফাঁদে ফেলেছে, হুঁ?’

রয় কোন জবাব দিল না৷ হাতের সিগারেটে একটা গভীর টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল৷ ধোঁয়ার পর্দার ওপিঠ থেকে ভেসে এল ওর কর্কশ কণ্ঠস্বর, ‘শেট, তোর শরীর ভালো নেই৷ এসব আজেবাজে ভাবনা ছেড়ে শুয়ে পড়৷ কাল সকালে কথা হবে—আমার এখন ঘুম পাচ্ছে৷’

‘আমি অসুস্থ ঠিক কথা৷ কিন্তু তা বলে ভাবিস না আমি জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছি৷ আমার কথায় তুই যদি এখন থেকেই সাবধান না হোস, তবে তোর নিজের কবর তুই নিজেই খুঁড়বি৷ কিন্তু তুই আমার কথার জবাব দিল না তো?’

রয়ের অভিব্যক্তিহীন মুখে ফুটে উঠল একটা হিংস্র ভাব৷ নিজের বুকে আঙুলের টোকা মেরে ও বলল, ‘কোন মেয়ের ফাঁদে এই রয় ট্রেসি কোনদিন পা দেয়নি—দেবেও না৷’

‘তুই কি নিজেকে স্তোক দিয়ে ভোলাতে চাইছিস৷ নাকি আমাকে নেহাত বোকা ঠাউরেছিস?’

আমার কাটা-কাটা কথা রয়ের মোটেই ভালো লাগল না৷ অধৈর্য হয়ে ও বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, তুই যখন না শুনেই ছাড়বি না—লোলার ফাঁদে আমি যে পা দিয়েছি, তা নয়—ওর দান আমি গ্রহণ করেছি বলতে পারিস্৷ এ বান্দাকে ফাঁদে ফেলা এত সহজ নয়৷’

‘লোলা কি তোকে কোন সিন্দুক খুলতে বলেছে?’

রয়ের ভুরু কুঁচকে উঠল সংশয়ভরা চোখে ও আমার দিকে তাকাল, ‘সিন্দুক! কীসের সিন্দুক!’

‘জেনসনের সিন্দুক৷’ ধীর স্বরে জবাব দিলাম৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলাম৷

রয় হতভম্ব চোখে চেয়ে রইল৷ চিন্তান্বিতভাবে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘এমন কি আছে জেনসনের সিন্দুকে যে—?’

‘তোকে খুলতে বলেছে কিনা বল্!’

রয়ের মুখ দেখে বুঝলাম, লোলা এখনও ওকে সে-কথা বলেনি৷ আমার উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস আর স্বাভাবিক হল৷ যাক, অন্তত এবারে লোলা আমাকে হারাতে পারবে না৷ আগেই রয়কে আমি সাবধান করে দেব৷

‘না, লোলা সে-রকম কথা তো কিছু বলেনি৷’ অবাক হয়ে জবাব দিল রয়৷

‘এখনও বলেনি—তবে বলবে৷ সে-বিষয়ে তুই নিশ্চিত থাকতে পারিস৷’

রয় অধৈর্য হয়ে হাতের একটা ভঙ্গি করল, ‘কী এত ধানাই-পানাই করছিস?’ আসল কথাটা খুলে বল্ দেখি!

‘শোন্ তাহলে জেনসনের সিন্দুকে একটা এমন একটা জিনিস আছে, যেটা না হলে লোলার চলবে না৷ আর সেটা পাওয়ার জন্য হেন কাজ নেই যে লোলা করতে রাজি নয়—এমন কি খুন করতেও ওর বিবেকে বাধবে না৷

‘ওই জিনিসটার জন্যই ও জেনসনকে খুন করেছে ভয় দেখিয়ে আমাকে দিয়েও সিন্দুক খোলাতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি৷ আর এখন যেই তোকে হাতের কাছে পেয়েছে, ওমনি ওর কাজ শুরু হয়ে গেছে৷ লোলা জানে তুই সিন্দুক খুলতে জানিস তাই তোর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করছে৷ তোকে দিয়ে যে করে হোক সিন্দুক খুলিয়ে, ও তোকে খুন করবে৷

‘জানি, ব্যাপারটা তোর কাছে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ঠেকছে, কিন্তু এর প্রতিটি বর্ণ সত্যি৷ যে-মেয়ে ইতিমধ্যেই দু-দুটো খুন করেছে, তার কাছে আর একটা খুন করা কিছুই নয়! জেনসনকে খুন করার দিন আমাকেও খুন করত৷ শুধু অল্পের জন্য বেঁচে গেছি! আমার কথা বিশ্বাস কর—ওই সিন্দুকটা তুই কিছুতেই খুলিস না!’

কথা বলার পরিশ্রমে আমার সারা শরীর ঘেমে উঠল৷ বুকের যন্ত্রণায় নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসবে৷ আশা আর নিরাশার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়কে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ কিন্তু ওর অভিব্যক্তিহীন মুখে নিস্পৃহতার মুখোশ৷ শুধু চোখের তারায় ঈষৎ কালো ছায়া৷ অধৈর্য হয়ে ও প্রশ্ন করল, ‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? সিন্দুকে কি এমন আছে যে লোলার সেটা না হলে চলবে না?’

সিন্দুকে যে এক লাখ ডলার আছে, সে-কথা ওকে বলার মতো বুদ্ধিভ্রংশ তখনও আমার হয়নি৷ তাই একটা বিশ্বাসযোগ্য কাল্পনিক গল্প ওকে শুনিয়ে দিলাম, ‘তোকে তো আগেই বলেছি, ওর প্রথম স্বামীকে খুন করার ব্যাপারে পুলিশ লোলাকে সন্দেহ করেছিল৷ এবং সে-সন্দেহ একেবারে মিথ্যে নয়৷ তাই লোলাকে বিয়ে করার আগে জেনসন ওকে দিয়ে ফিনির খুনের একটা স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেয়৷ তারপর নিজের নিরাপত্তার খাতিরে জেনসন সেটা সিন্দুকে বন্ধ করে রাখে৷ স্বীকারোক্তি লেখা সেই কাগজটা আমি দেখেছি—বিশ্বাস কর লোলা জানে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ও সে কাগজটা হাতে পাচ্ছে, ততক্ষণ ওর জীবন বিপন্ন৷ যে-কোন সময় পুলিশ ওকে গ্রেপ্তার করতে পারে৷ পারে খুনের দায়ে চালান দিতে৷’

রয় ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘শেট, তুই কি এগুলো সব বানিয়ে বলছিস, না সত্যি?’

‘এর এক বর্ণও মিথ্যে নয়, রয়৷ সেদিন জেনসনকে গুলি করার পর লোলা আমাকেও খুন করত৷ কিন্তু ও দ্বিতীর বার ট্রিগার টেপার আগেই আমি সিন্দুকের দরজাটা বন্ধ করে দিরই৷ ও জানত, আমার সাহায্য ছাড়া ওর পক্ষে সিন্দুক খোলা অসম্ভব তাই এতদিন আমাকে জিইয়ে রেখেছে৷ কিন্তু এখন অবস্থা হয়ে উঠেছে আরও জটিল’—তুই যে সিন্দুক খুলতে জানিস সেটা জানার পর থেকেই লোলা আরও তৎপর হয়ে উঠেছে৷ ও জানে এখন আর আমার প্রয়োজন নেই৷—সিন্দুকটা তুই কিছুতেই খুলিস না, রয়—আমার কথা শোন!’

‘তোর কথামতো লোলা যদি তোকে খুনই করতে চাইবে, তাহলে এতদিন ওর সঙ্গে রাত কাটালি কেমন করে?’

রয় যে এ প্রশ্ন তুলবে তা জানতাম৷ কারণ কোন সুস্থমস্তিষ্ক সাধারণ মানুষের পক্ষেই এ প্রশ্ন করা অত্যন্ত স্বাভাবিক৷

‘এর উত্তর খুব সোজা৷’ সহজ স্বরে রয়কে বললাম, ‘লোলা জানত, যতদিন সিন্দুক বন্ধ আছে, ততদিন ওর পক্ষে আমার কোন ক্ষতি করা সম্ভব নয়৷ তাই আমাকে ওর দলে টানতে চেয়েছে৷ জেনসন মারা যাবার পর পাঁচটা সপ্তাহ আমরা চুপচাপ, একা একা কাটিয়েছি৷ তারপর একদিন রাতে লোলা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হল—তারপর যা হবার তাই হল ঠিক তোর বেলা যেমনটা হয়েছে৷ কিন্তু বিশ্বাস কর, তার আগে সে-রকম কোন চেষ্টাই আমি করিনি৷’

হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে কথা শেষ করলাম৷ অনুভব করলাম মেরুদণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামের শীতল স্রোত৷

রয় বোধহয় আমার অবস্থা বুঝতে পারল৷ তাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল আমার কাছে, ‘কীরে, কী হল তোর?—নে, চুপচাপ শুয়ে পড়্৷ একে তোর শরীর ভালো নয়, তার ওপর শুধু শুধু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিস৷’

আমি রয়ের হাত চেয়ে ধরলাম, ‘যদি তুই সিন্দুকটা খুলিস, তাহলে আমরা কেউই লোলার হাত থেকে রেহাই পাব না! আমি তোকে বারবার বলে রাখছি, রয়—সিন্দুক খোলা মানে নিজেদের মৃত্যুকে ডেনে আনা৷’

‘আচ্ছা, আচ্ছা—ঠিক আছে৷ কিছু তুই মিছিমিছি ভয় পাচ্ছিস, শেট৷ লোলা সিন্দুক খোলার বিষয়ে এখনও আমাকে কিছুই বলেনি৷’

ক্লান্ত দেহে বিছানার গা এলিয়ে দিলাম৷ অবসাদে চোখ বুঝে এল৷ আমার কর্তব্য আমি করেছি৷ রয়কে খোলাখুলি সব জানিয়ে সাবধান করে দিয়েছি৷ এখন বাকিটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ তবে মনে হয়, এবারের যুদ্ধে লোলা পরাজিত হবে৷ কিন্তু সে শুধু আশা ছাড়া আর-কিছু নয়; যে-আশা অন্ধ, যে আশা কুহকিনী৷

সে-রাতে ঘুম না আসা পর্যন্ত রয় আমার পাশেই বসে রইল৷

পরদিন সকলে যখন ঘুম ভাঙল, তখন টেবিল-ঘড়িতে দশটা বাজতে কুড়ি মিনিট৷ একটানা লম্বা বিশ্রামের পর নিজেকে অনেক সবল মনে হল৷ মাথাটাও যেন আগের চেয়ে হালকা ঠেকল৷ কিন্তু বুঝলাম, উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা এখনও আমার হয়নি৷ পরে বেলার দিকে রয় এসে আমার দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দিল৷ ও চুপচাপ থাকায় আমিও কোন প্রসঙ্গের উত্থাপন করলাম না৷ কিন্তু জানতাম, সিন্দুকের ব্যাপারটা আমাদের দু-জনের মনকেই ভারাক্রান্ত করে রেখেছে৷ আমরা যেন হাঁপিয়ে উঠেছি৷

ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলল আরও একটা দিন৷ জানালার ধারে শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগলাম বাইরের কর্মচাঞ্চল্য৷ লোলা আর রয় পরিশ্রম করে চলেছে অক্লান্তভাবে৷ রেস্তোরাঁ খদ্দেরের ভিড়ে জমজমাট৷

রাত প্রায় দশটায় সময় হাতের কাজ হালকা হতেই রয় আমার ঘরে এল—হাতে এক বাটি স্যুপ৷ ‘শালা, দিন গেল বটে একটা!’ বাটিটা আমার হাতে দিয়ে ও পরিশ্রান্তভাবে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘তুই তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ কোট৷’

‘হ্যাঁ, আর ক-টা দিন সবুর কর৷’ ম্লান-হাসিতে মুখ ভরিয়ে জবাব দিলাম৷

হঠাৎ রয়ের চোখে কেমন অস্বস্তিকর ভাব লক্ষ্য করলাম৷ নাকে একবার হাত বুলিয়ে ও বলে উঠল, ‘একটু আগে খাবার সময় লোলা সিন্দুকের কথা বলেছে৷ জিগ্যেস করেছে একটা লরেন্স সিন্দুক আমি খুলতে পারব কিনা৷’

আমার হাত কেঁপে গিয়ে খানিকটা স্যুপ বিছানায় চলকে পড়ল, ‘লোলা তাহলে সিন্দুকের কথা তোকে বলেছে?’

‘হ্যাঁ৷ তারপর আমি বললাম যে সিন্দুকটা না দেখা পর্যন্ত আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়৷’

আমার বুকের ভিতর তখন শুরু হয়ে গেছে তুমুল আলোড়ন৷ শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম, ‘তারপর?’

‘তারপর একটা ট্রাক-ড্রাইভার এসে পড়ায় আর কথা বলার সুযোগ হয়নি৷’

‘তোকে আবারও বলছি রয়, সিন্দুকটা যতক্ষণ বন্ধ আছে, ততক্ষণ আমরা নিরাপদ৷ কিন্তু—’

‘জানি তুই কি বলবি৷’ আমাকে হাত তুলে বাধা দিল রয়, ‘এতই যদি তোর ভয়, তাহলে জেনসনের সেই রিভলভারটা আমাকে দে না কেন?’

‘রিভলভারটার আমার কাছে আর নেই৷ ওটা লোলা হাতিয়েছে৷’

রয় ভীষণভাবে চমকে উঠল৷ কী একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল৷

‘ লোলা আমাকে বলেছে, রিভলভারটা ও ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তায় পুঁতে ফেলেছে—কিন্তু আমার ধারণা অন্যরকম৷’

‘হুঁ—’ চিন্তিতভাবে রয় জবাব দিল৷ তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘যাক, এখনও পর্যন্ত যখন সিন্দুকটা আমাকে খুলতে বলেনি, তখন এসব ভেবে লাভ কি?’

‘আমি জানি লোলা বলবে৷ তখন আরও একবার আমার কথাগুলো ভেবে দেখিস৷’ এরপর ও-বিষয়ে আমাদের আর কথা হল না৷

পরবর্তী চারটে দিন সাধারণভাবেই কেটে গেল৷ রয় আমাকে বলেছে, লোলা এখনও ওকে সিন্দুক খোলার কথা বলেনি৷ জানি না, সত্যি কি না মিথ্যে!

ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও, বিছানা ছেড়ে নামার শক্তি এখনও আমার হয়নি৷ তবে সান্ত্বনার কথা, রয় আজকাল আর বাংলোয় শুতে যায় না৷ কেন জানি না, এতে আমি অনেকটা স্বস্তি বোধ করি৷ রয়ের এই হঠাৎ-উদাসীনতার কারণ সম্ভবত লোলার প্রতি ওর প্রচ্ছন্ন আতঙ্ক৷ অর্থাৎ আমার কথা ওর মনে ধরেছে ঃ লোলা যে দু-দুটো খুন করেছে, সে-বিষয়ে রয়ের মনে আর সংশয় নেই৷

কিন্তু পাঁচ দিনের দিন রাত তিনটের সময় আচমকা ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি, বাংলোর বসবার ঘরের আলো জ্বলছে৷ বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠল৷ বার কয়েক ঢোক গিলে রয়ের নাম ধরে আস্তে আস্তে ডাকলাম৷ কিন্তু কোন উত্তর নেই৷ অর্থাৎ রয় এখন বাংলোর বসবার ঘরে—সেখানে ওর সঙ্গে রয়েছে লোলা, আর সেই অভিশপ্ত সিন্দুক!

মনে হলে বিছানা ছেড়ে এখনই ছুটে যাই বাংলোয় কিন্তু জানি, আমার এই অসুস্থ দেহ নিয়ে তা সম্ভব নয়৷ সুতরাং নির্নিমেষে বসবার ঘরের আলোকিত জানালার দিকে চেয়ে গুনতে লাগলাম হৃৎপিণ্ডের উন্মত্ত স্পন্দন৷

রাত প্রায় চারটের সময় বাংলো আলো নিভে গেল৷ এবং তার একটু পরেই রয় বাংলো থেকে বেরিয়ে এল৷ সোজা হেঁটে আসতে লাগল ঘরের দিকে৷

সদর-দরজা খোলার শব্দ হতেই চাপাস্বরে রয়কে ডাকলাম৷ একটু পরেই আমার ঘরের দরজা খুলে গেল৷’ ভেসে এল রয়ের গলা, ‘আলো জ্বালাস না৷ আলো দেখতে পাবে৷’

অন্ধকারের আস্তরণ ভেদ করে রয়কে দেখতে চেষ্টা করলাম৷ কিন্তু কিছুই নজরে এল না৷ ‘এতক্ষণ কি করছিল বাংলোয়?’

‘লোলা আমাকে সিন্দুকটা দেখিয়ে খুলতে বলছিল৷ আমি বললাম, এটা খুব পুরোনো মডেলের—আমার পক্ষে খোলা সম্ভব নয়৷’

আমার বুক ভেদ বেরিয়ে এল স্বস্তির নিশ্বাস৷ ‘তারপর কী হল?’

‘লোলা বলল, কম্বিনেশন নম্বর ছাড়া অন্য কোনভাবে হয়তো ওটা খোলা সম্ভব৷ সিন্দুকের দরজাটা ডিনামাটই দিয়ে উড়িয়ে দিলে কেমন হয়৷ তখন আমি বললাম, সেটা বিপজ্জনক হবে৷ তাছাড়া ডিনামাইট ব্যবহারে আমি ঠিক অভ্যস্ত নই৷’

‘ও তোর কথা বিশ্বাস করল?’

‘কেন করবে না? আমি এমনভাবে বলেছি—’

‘সিন্দুকে কি আছে, কেন ও সিন্দুক খুলতে চায়, সে-বিষয়ে তোকে কিছু বলেছে?’ আমার উদগ্র কৌতূহল আর বাধ মানতে চাইছে না৷ অশান্ত তরঙ্গের মতোই আছড়ে পড়ছে মনের ভিতর৷

‘হ্যাঁ, বলেছে৷’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রয় বলল, সিন্দুকে নাকি প্রচুর টাকা আছে, সিন্দুক খুললে লোলা আমাকেও সে-টাকার ভাগ দেবে বলেছে৷’ আরও কিছুক্ষণ নীরবতার পর রয় মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল, ‘শেট, সত্যিই কি সিন্দুকে টাকা আছে?’

এক্ষেত্রে ওকে সত্যি কথা বলা মানে সর্বনাশ ডেকে আনা৷ সুতরাং বাধ্য হয়েই মিথ্যে বললাম, ‘আছে, তবে মাত্র তিনশো ডলার৷ জেনসন দুঃসময়ের সঞ্চয় হিসেবে এই টাকাটা সিন্দুকে জমিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু লোলা ওই তিনশো ডলারের জন্য নয়, ও চায় সেই স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা৷’

‘কিন্তু ও যে বলল সিন্দুকে প্রায় এক লাখ ডলার আছে?’ রয়ের মুখে বিস্ময়ের ছায়া৷

‘লোলা মিথ্যে কথা বলছে৷ তোকে দিয়ে সিন্দুকটা খোলানোর জন্য ও এই টাকার টোন ফেলেছে৷’

‘হুঁ—’ চিন্তান্বিতভাবে রয় জবাব দিল, ‘তাই যদি হয়, তাহলে লোলাকে হতাশ হতে হবে৷’ শেষদিকে ওর গলায় স্বর কঠিন মনে হল৷

পরদিন সকালে শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে ছিলাম৷ দেখছিলাম পাম্পের কাছে কর্ম-ব্যস্ত রয়কে৷ এমনসময় কানে এল দরজা খোলার শব্দ৷ চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই দেখি, লোলা দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে৷ উত্তেজনায় ওর শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর৷ সবুজ চোখজোড়া স্থিরভাবে আমারই দিকে চেয়ে আছে৷

আজকের লোলাকে চিনতে আমার কষ্ট হল৷

কোথায় ওর সেই সুললিত কোমল যৌবন? তার বদলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে শীর্ণ চেহারার একটি অপরিচিতা মেয়ে৷ মুখের রেখা কঠিন৷ গাল ভেঙে চোয়ালের হাড় হয়ে উঠেছে প্রকট৷ কোটরাগত চোখের কোলে কালি৷ এ ক-দিনে ওর শরীরের উপর যেন বয়ে গেছে এক প্রচণ্ড মানসিক ঝড়৷

লোলা ওর অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ মেলে আমার দিকে চেয়ে রইল৷ না, আর সব-কিছু অচেনা লাগলেও লোলার এই সাপিনী-সবুজ চোখ আমার অনেকদিনের চেনা৷

‘কী করে সিন্দুক খুলতে হয় আমাকে বলে দাও৷’ কর্কশ-কাঁপা গলায় লোলা বলে উঠল, যদি না বল তাহলে আমি এখুনি পুলিশে ফোন করব৷ তোমাকে আবার ফিরে যেতে হবে সেই ফার্নওয়ার্থে৷’

কিন্তু লোলা জানে না ব্ল্যাকমেলের ভয় আমি আর এখন করি না৷ ভাগ্যচক্রে রঙের তাস এখন আমার হাতে৷

‘তবে আর দেরি করছ কেন? যাও, পুলিশে খবর দাও৷ ওই এক লাখ ডলারের আশা তুমি আর করো না৷ তাছাড়া, পুলিশকে আমিও বলে দেব জেনসনের মৃতদেহ কোথায় লুকোনো আছে৷ ভেব না, পুলিশ আমার কথা অবিশ্বাস করবে, আর তোমার কথায় সায় দেবে৷ কারণ তুমিও তো আর ধোয়া তুলসীপাতাটি নও! ওদের যদি জানিয়ে দিই ফ্র্যাঙ্ক ফিনির কথা, তাহলে তোমাকে আর রক্ষা পেতে হবে না!’

আমার শেষ কথাটা লোলাকে ভীষণভাবে আঘাত করল৷ ওর শরীরটা পলকে যেন পাথর হয়ে গেল৷ হঠাৎ পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করল লোলা৷ কিন্তু দরজার গায়ে ধাক্কা লাগতেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা চাপা আর্তচিৎকার৷ অন্ধ-আতঙ্কের নিবিড় ছাড়া কেঁপে উঠল ওর সবুজ চোখে৷

‘ফ্র্যাঙ্ক সম্বন্ধে তুমি কি জান!’ আগুনঝরা চোখে জানতে চাইল লোলা৷

‘আর-কিছু না জানলেও, তুমি যে ওকে খুন করেছ, তা জানি৷ মিথ্যে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই, লোলা৷ দুজনেই এখন ফাদে জড়িয়ে পড়েছি৷ ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, বাকি দিন ক-টা আমাদের এভাবেই একসঙ্গে কাটাতে হবে৷ এছাড়া আর কোন পথ আমাদের নেই৷ সেই সঙ্গে আর একটা কথা মনে রেখ৷ জেনসনের সিন্দুকটা যেমন আছে, তেমনই থাকবে৷ কেউই ওটা খুলতে যাচ্ছে না৷ রয়কে আমি তোমার সম্বন্ধে সব কথা জানিয়ে সাবধান করে দিয়ে দিয়েছি৷ তাছাড়া, সিন্দুক কি করে খুলতে হয়, তাও জানে না ও৷ সুতরাং, শুধু শুধুই তুমি রয়ের পেছনে সময় আর বুদ্ধি খরচা করছ৷’

বহুক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল লোলা৷ জ্বলন্ত সবুজ চোখে শুধুই ঘৃণা৷ তারপর একসময় ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল! যাবার সময় খুলে রেখে গেল ঘরের দরজা৷

এই পরাজয়কে সাময়িকভাবে মেনে নিলেও লোলা আমাকে সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না৷ আহত নাগিনীর মতোই ও হয়ে উঠেছে ক্রূর, প্রতিহিংসাপরায়ণ৷ সতর্ক না থাকলে যে-কোন মুহূর্তেই লোলা চরম আঘাত হানবে৷

মানসিক অস্বস্তি ও উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে এর পরের দুটো দিন নির্বিঘ্নেই কেটে গেল৷ কিন্তু তৃতীয় দিনের দিন রয় হঠাৎ আমাকে এসে বলল, লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে৷

সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে দপ্ করে জ্বলে উঠল বিপদের রক্তর-সংকেত৷ ‘তার মানে ও তোকে এখানে রেখে যাচ্ছে?’ রয়ের দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকালাম৷ রয় অস্বস্তিভরে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘তুই তো জানিস, লোলা সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসে৷ ও আমাকেও যেতে বলেছিল, কিন্তু তোকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে আমি কী করে যাই বল? তাছাড়া, জায়গাটা দেখাশোনা করার জন্যও তো একজনের থাকা দরকার—৷’

‘নিজেকে ছলনা করার চেষ্টা করিস না, রয়৷ তুই ভালোভাবেই জানিস, লোলা সিনেমায় যাচ্ছে না৷ তোর সামনে টোপ ফেলে তোকে সেটা গেলবার একটা সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে৷’

রয় অধৈর্যভাবে হাত নাড়ল, ‘কী আবোল-তাবোল বকছিস? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? একটু থেমে ও আবার বলল, ‘শেট, তুই সত্যি সত্যি কি ভাবছিস বল্ তো?’

‘লোলা তোকে বলেছে, সিন্দুকে অনেক টাকা আছে, কেমন? এতদিনে ও বুঝে গেছে, এই দুনিয়ায় টাকাই তোর কাছে সব৷ সুতরাং তোর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ও তোকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে৷ লোলা জানে, ও সিনেমায় যাওয়ামাত্রই তুই সিন্দুক খুলতে চেষ্টা করবি৷ তাই ও সিনেমায় যাওয়ার ছল করে কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকবে৷ তারপর হঠাৎ ফিরে এসে লোলা খোলা-সিন্দুকসুদ্ধ তোকে হাতেনাতে ধরে ফেলবে৷ বুঝতেই পারছিস, তোকে বোকা বানিয়ে কার্যোদ্ধার করার এই একটাই মাত্র পথ আছে! তাই লোলা মরিয়া হয়ে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে চায়৷ এত সহজে ও হার মানতে রাজি নয়৷’

‘তোকে তো বলেছি শেট, সিন্দুক আমি খুলছি না৷’

‘ভালো কথা৷ তবে লোলা সিনেমায় যাওয়ার পরও যেন কথাটা মনে থাকে৷’

রাত দশটার কিছু পরেই দেখি লোলা মার্কারির দিকে এগিয়ে চলেছে, আর রেস্তোরাঁর কাছ থেকে ওকে লক্ষ্য করছে রয়৷ লোলা গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পরও রয় কোমরে হাত দিয়ে একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম, ওর মুখ উত্তেজনায় কঠিন৷ স্থির দুই চোখে ও তাকিয়ে আছে মার্কারির মিলিয়ে-আসা লাল আলোর দিকে৷ শেষে বালিয়াড়ির আড়ালে সে আলো মিলিয়ে গেলেও রেস্তোরাঁয় ফিরে চলল৷

রয় রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম৷ জানালা দিয়ে চেয়ে রইলাম আকাশের দিকে৷ আসন্ন কোন দুর্ঘটনার প্রতীক্ষায় সময় গুনে চললাম৷ একটা আবছা শীতল অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরল৷ যেন কানে কানে বলল, এই আমার জীবনের শেষ রাত৷ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম জীবন-পথের শেষ মাইলস্টোনের পাশে পরিশ্রান্ত দেহে, অবসন্ন মনে আমি দাঁড়িয়ে আছি৷ ওপারের চিরশান্তির জগৎ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷

মানসচক্ষে পরিষ্কার দেখতে পেলাম, রান্নাঘরে পায়চারিরত চঞ্চল রয়কে৷ ওর বিচক্ষণ, লোভাতুর মন অত্যন্ত সতর্কভাবে আমার আর লোলার কথাগুলো বুদ্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখছে৷ সত্যিই কি এক লাখ ডলার আছে জেনসনের সিন্দুকে? নাকি রয়েছে শুধু লোলার স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা? ওকে দিয়ে সিন্দুক খোলানোর জন্যই কি আজ রাতে লোলা ফাঁদ পেতে গেছে?

এইসব জটিল সমস্যা সমাধানের দুরূহ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রয়ের সুযোগসন্ধানী মন৷ এইভাবে এক ঘণ্টা কেটে গেল, কিন্তু কিছুই ঘটল না৷ সময় আর কাটতেই চায় না৷ ঘড়ির কাঁটা যেন এগিয়ে চলেছে শম্বুক গতিতে৷

একসময় হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা ট্রাক এদিকে এগিয়ে আসছে৷ ট্রাকটা ধীরে ধীরে পাম্পের কাছে এসে থামল৷

গাড়ির শব্দে রয় রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এল৷ ট্রাকের ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে ঢালতে দু-একটা কথাও বলল ড্রাইভারটার সঙ্গে৷ তারপর তেলের দাম মিটিয়ে লোকটা ট্রাক ছেড়ে দিল৷

বুঝলাম, এই সেই সংকটময় মুহূর্ত৷ রয়ের দ্বিধাগ্রস্ত মন এই মুহূর্তেই নেমে এক চরম সিদ্ধান্ত৷ হঠাৎ বুকের মধ্যে যেন দুন্দুভি বেজে উঠল৷ গলাটা কেমন যেন শুকনো ঠেকল৷ রয় পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ওয়েন্টওয়ার্থের পাহাড়ী রাস্তার দিকে চেয়ে রইল৷ মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করেও যখন কোন গাড়ির হেডলাইট ওর নজরে পড়ল না, তখন ও দ্রুতপায়ে হেঁটে চলল বাংলোর দিকে৷

ওর অসীম অর্থলিপ্সা লোলার প্রলোভনকে এড়াতে পারল না৷ বুঝলাম, রয় টোপ গিলেছে৷ ও এখন যাচ্ছে সেই অভিশপ্ত সিন্দুক খুলতে৷

বাংলোর দরজার কাছে পৌঁছে রয় একটু থামল৷ ও নিশ্চয়ই আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিল৷ কারণ মিনিটখানেক কি-সব খুটখাট করেই বাংলোর দরজা খুলে ফেলল৷ তারপর পিছনে এক পলক নজর বুলিয়ে বাংলোয় ঢুকে পড়ল৷

কিন্তু একটু পরেই ও আবার বেরিয়ে এল৷ বাংলোর দরজায় দাঁড়িয়ে ওয়েনন্টওয়ার্থের আঁকাবাঁকা রাস্তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ সম্ভবত দেখছে, লোলা ফিরে আসছে কিনা! তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ঢুকে পড়ল বাংলোয়৷

রয়ের এই অতিরিক্ত সাবধানতায় আমার হাসি পেল৷ লোলাকে ও এখনও ঠিক চিনতে পারেনি৷ ফিরে লোলা আসবেই, এবং সম্পূর্ণ রয়ের অজ্ঞাতে৷

একটু পরেই বাংলোর বসবার ঘরে আলো জ্বলে উঠল৷

সিন্দুক খুলতে রয়ের হয়তো মিনিট চারেক লাগবে৷ তারপরই ও বুঝতে পারবে লোলার কথাই সত্যি৷ দেখবে, সিন্দুকে সাজানো রয়েছে এক লাখ ডলার৷ না, এখন আর ওকে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়৷ আমার যথাসাধ্য আমি করেছি৷ কিন্তু এই তাসের জুয়ায় শেষ পর্যন্ত আমি লোলার কাছে হেরে গেছি৷

এমন সময় লোলাকে দেখতে পেলাম৷ রয় রেস্তোরাঁয় ঢুকবার পরেই ও হয়তো গাড়ি থামিয়েছে পাহাড়ি রাস্তায়৷ তারপর হেডলাইট নিভিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে অতি সপ্তর্পণে ফিরে এসেছে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ৷ নাঃ, লোলার দক্ষতার প্রশংসা করতেই হবে! কারণ আমি সারাক্ষণই জানালা দিয়ে চেয়েছিলাম বাইরের রাস্তায়৷ কিন্তু ওকে ফিরে আসতে বা গাড়ি থামাতে আমিও দেখিনি৷

কিন্তু ওই তো লোলা বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে চলেছে বাংলোর দিকে৷ চন্দ্রালোকে আলোকিত বালির উঠোনটুকু পার হওয়ার সময় দেখলাম ওর সবুজ পোশাক৷ জেনসনকে খুন করার সময়ও ওর পরনে এই একই পোশাক ছিল৷ হয়তো এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে রয়ের মৃত্যুসঙ্কেত!

শেষ পর্যন্ত লোলার ফাঁদে রয় ধরাই পড়ল৷

যেন দেখতে পেলাম সিন্দুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে-থাকা রয়কে৷ ও হতভম্ব হয়ে চেয়ে রয়েছে থাকে থাকে সাজানো এক লাখ ডলারের দিকে৷ ওই অবস্থায় বসবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ ওর কানেও ঢুকবে না৷ তারপরই লোলা ওকে খুন করবে৷ না, এ-বিষয়ে আমার মনে এতটুকু সন্দেহ নেই৷ রয় এখন জানে না মৃত্যু গুড়ি মেরে ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে চলেছে৷ বসবার ঘর এখন লোলার কাছ থেকে আর মাত্র কয়েক গজ দূরে৷

আর সহ্য করতে পারলাম না৷ এক ঝটকায় গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে বিছানায় উঠে বসলাম৷ টলতে টলতে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে৷ মাথাটা অসম্ভব ভারী ঠেকল৷ দরজার হাতলে ভর দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালাম৷ বুকের ভিতর যেন আগুন জ্বলছে৷ কিন্তু আমার তখন ওসব ভাববার সময় নেই৷ মনের মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা—বাংলোয় গিয়ে যে করে হোক রয়কে বাঁচাতে হবে৷

কোনরকমে দরজা খুলে বসবার ঘরে এলাম৷ সদর-দরজা খুলে বাইরে বালিতে পা রাখতেই বুকের কাছটা কেমন উষ্ণ, ভিজে ঠেকল৷ বুঝলাম, পুরোনো ক্ষত থেকে আবার রক্তস্রাব শুরু হয়েছে৷ কিন্তু সেসব গ্রহ্য না করে পা বাড়ালাম৷ কিন্তু লোলাকে বাইরে কোথাও দেখলাম না৷ তাইলে কি?

হাঁপাতে হাঁপাতে, টলতে টলতে এগিয়ে চললাম বাংলোর দিকে৷ আমার বুক, পেট ঊরু তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷ সর্পিল রেখায় গা বেয়ে এগিয়ে চলেছে রক্তের উষ্ণ ধারা৷ কিন্তু আমি না থেমে এগিয়ে চললাম৷

বাংলোর দরজার কাছে পৌঁছতেই কানে এল রিভলভারের চাপা গম্ভীর শব্দ৷ হৃৎপিণ্ড ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল বুকের ভিতর৷ ভিজে চড়ুইয়ের মতো কাঁপতে লাগলো থরথর করে৷ সেই সঙ্গে গুরুভার কিছু পতনের শব্দে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম৷ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে এক ধাক্কায় খুলে ফললাম বাংলোর ভেজানো দরজা৷ টলতে টলতে বসবার ঘরে ঢুকলাম৷

দেখি, রয় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে—ওর হাতের মুঠোয় জেনসনের .৪৫ রিভলবারটা৷ সিন্দুকের দরজা হাট করে খোলা৷ পরিষ্কার নজরে পড়ছে থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিলগুলো৷ রয়ের পায়ের কাছে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে লোলা৷ ওর কপালের বিশ্রী কালো ফুটোটা জানিয়ে দিচ্ছে রয়ের নির্ভুল লক্ষ্যভেদের কথা৷

লোলা যে বেঁচে নেই, এ-কথাটা বুঝতে আমার দেরি হল না৷ কারণ, কপাল ওইরকম বীভৎস ফুটো নিয়ে কেউ কখনও বেঁচে থাকতে পারে না৷

আমি আর রয় পরস্পরের দিকে চয়ে রইলাম৷ ওর মুখ রক্তহীন, পাণ্ডুর, নাকের উপর জমে-ওঠা ঘামের ফোঁটা ঘরের উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে৷

‘তুই ঠিক বলেছিলি, শেট৷’ ভাঙা ফিসফিসে স্বরে রয় বলে উঠল, ‘তুই যদি আগে থাকতে আমাকে সাবধান করে না দিতিস, তাহলে এখানে লোলার জায়গায় আমিই পড়ে থাকতাম৷

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার হাত-পা সব শক্তির অভাবে শিথিল হয়ে আসছে৷ কোনরকমে গিয়ে একটা চেয়ার গা এগিয়ে দিলাম৷ আমার গেঞ্জি, পায়জামা, সব রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে৷ বুকের ব্যান্ডেজের কাছটায় কেমন একটা কালচে ভাব৷ রয় নির্বাক হয়ে লোলার মৃতদেহের দিকে চেয়ে রইল৷ আমিও যে ঘরে উপস্থিত রয়েছি সে-কথা ও যেন ভুলেই গেল৷

‘রয়, আমাদের পালাতে হবে!’ বুকের রক্তে-ভেজা ব্যান্ডেজ দু-হাতে চেপে ধরলাম, ‘শিগগির গাড়িটাকে বাংলোর কাছে নিয়ে যায়! পুলিশ এসে গেলে আমরা বিপদে পড়ে যাব! নে, টাকাগুলো চটপট গুছিয়ে নে! এখনও সময় আছে!’

রয় ঘড় ফিরিয়ে একবার খোলা সিন্দুকের দিকে তাকাল, তারপর আচ্ছন্ন স্বরে বলে চলল, ‘লোলা, ঘরে ঢুকতেই আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কাছ থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিয়েছি৷ কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি ওখে খুন করতে চাইনি৷’

‘যা গাড়িটা নিয়ে আয়! শিগগির! আমাদের যে করে হোক পালাতে হবে!’ কথাগুলো আমার নিজের কানেই কেমন অস্পষ্ট ঠেকল৷ যেন বহুদূর থেকে কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে৷ রক্তপাতের পরিণতি হিসেবে চোখজোড়া শ্রান্তিতে বুঝে আসতে চাইল৷

‘হুঁ, যাচ্ছি৷’ বলে রয় সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেল৷ এক হাতে টেবিলক্লথটা টেনে নিয়ে নোটের বান্ডিলগুলো তার উপর রাখতে লাগল৷

‘রয়, আমার ব্যান্ডেজটা একটু ঠিক করে দে আর কোটটা নিয়ে এসে আমার গায়ে জড়িয়ে দে৷ নয়তো এভাবে রক্ত পরেই হয়তো মারা যব৷’

রয় ফিরে তাকাল আমার দিকে৷ ওর মুখে এমন একটা অদ্ভুত ভাব, যা আমি আগে কোনদিন দেখিনি৷ রয়কে আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হল৷

টাকাগুলো টেবিলক্লথ দিয়ে বেঁধে ও উঠে দাঁড়াল৷ কর্কশ লোভাতুর স্বরে বলে উঠল, ‘তুই আর কদ্দিন বাঁচবি বলে তোর ধারণা, শেট? এখন আর তোর কোন দাম নেই৷ তুই চিরকালের মতো শেষ হয়ে গেছিস৷ আর এই টাকা নিয়ে আমি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারব—যেভাবে চিরকাল আমি বাঁচতে চেয়েছি৷ গাড়িতে তোকে জায়গা দিতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত, শেট৷ না—না ওমনি করে আমার দিকে তাকাস না৷ তুই কি ভাবছিস তোর দাম এক লাখ ডলারের চেয়েও বেশি? উহুঁ এই পৃথিবীতে কোন মানুষের দামই এক লাখ ডলারের চেয়ে বেশি নয়৷’ রয় টাকার পুঁটলিটা আমার চোখের সামনে বারকয়েক ঝাঁকাল, ‘তুই-ই তো সেদিন বলেছিলি, তোকে দু-বার বাঁচিয়ে তোর সব ঋণ আমি শোধ করে দিয়েছি, তাই তো? অতএব এবারে আমি চললাম৷ পরে আবার বলিস না যেন, রয় নিষ্ঠুর, রয় অকৃতজ্ঞ!’

হঠাৎ আমার উত্তেজিত মন ভীষণ শান্ত হয়ে পড়ল৷ রয়কে একটুও বাধা দেবার চেষ্টা করলাম না৷ জানালা দিয়ে দেখলাম, মার্কারির হেডলাইট জ্বলে উঠল৷ তারপর গাড়িটা মোড় দিয়ে ছুটে চলল পাহাড়ের দিকে! যে-পাহাড়ের ওপারেই রয়েছে আমার কল্পনায় আশ্রয়স্থল—ট্রপিকা স্প্রিংস৷

চোখ নামিয়ে লোলার দিকে তাকালাম৷ অসহায়ভাবে ও মেঝেতে শুয়ে—সারা মুখ রক্তাক্ত৷ চোখ-মুখ আতঙ্কে বিকৃত৷ ভাবতে অবাক লাগল, এই কুৎসিত, ভয়ঙ্কর মেয়েটার শরীরে আমি আমার প্রেমকে জলাঞ্জলি দিয়েছি৷

চেয়ারের হাতল দুটো সজোরে আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলাম৷ শরীরের সব শক্তি মিলিয়ে গিয়ে চোখে নেমে আসছে নিঃসীম অন্ধকার৷ জানি, আজ নয় কাল, কেউ-না-কেউ আসবে এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ৷ দেখতে পাবে এই ঘরের আলো৷ তারপর জানালায় উঁকি দিয়ে আবিষ্কার করবে আমাকে আর লোলাকে৷

যদি ততক্ষণ বেঁচে না থাকি তো চিন্তার কিছু নেই৷ কিন্তু যদি ওরা আমাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে বাঁচিয়ে তোলে, তাহলে আবার ফার্নওয়ার্থ!

ওরা বিশ্বাস করবে না, লোলাকে আমি খুন করিনি! আমাকেই জেনসনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করবে! ভুলেও ভাববে না রয়ের কথা, লোলার কথা৷

সুতরাং বুকভরা আশা নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় রইলাম৷ আসুক সেই চির অন্ধকার, আমার কপালে এঁকে দিক মৃত্যুর স্নেহ-চুম্বন৷ সেই হবে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার৷

আশ্চর্যভাবেই হঠাৎ এল হারিয়ে-যাওয়া অতীতের স্মৃতি৷ জীবনের এই প্রথম মনে পড়ল মায়ের কথা, মনে পড়ল আমাদের ছোট্ট বাড়িটার কথা—কিন্তু রয়ের কথা মনে পড়তেই ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল৷ আমাদের ছোটবেলার সেই খুশির দিনগুলো আরও একবার ভেসে উঠল আর হঠাৎই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল নিদারুণ বাস্তবের কঠিন আঘাতে৷ ছেলেবেলার রয় আর আজকের রয়, এই দুয়ের মধ্যে কি বিশাল ব্যবধান! বুকের যন্ত্রণা যেন আরও বেড়ে উঠল৷ শুনতে পাচ্ছি মৃত্যুর হালকা পায়ের ছন্দ—সে যেন এগিয়ে আসছে নিঃশব্দ চরণে—আসছে—সে আসছে—সে আসছে৷

কাম ইজি—গো ইজি

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%