অনীশ দেব

ওরা চারজন—
তাস খেলার গোল টেবিলটাকে ঘিরে বসে আছে ওরা চারজন।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে ‘পোকার’ খেলার প্লাস্টিকের চাকতি। দুটো অ্যাশট্রে। পোড়া সিগারেটের টুকরোয় ঠাসা। এক বোতল হুইস্কি; আর তার পাশে চারটে শূন্য কাচের গেলাস।
ঘরটা আলো-আঁধারিতে ঢাকা। শুধু মাথার ওপরে ঝোলানো একটা শেড দেওয়া আলো টেবিলের একটা বৃত্তাকার অংশকে সবুজ আলোয় আলোকিত করে তুলছে। সিগারেটের সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী সেই সবুজাভ আলোর বৃত্ত ছাড়িয়ে ভেসে চলেছে অন্ধকারের উদ্দেশ্যে।
চারজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দশাসই চেহারার লোকটা তার হাতের চারটে তাস টেবিলে চিৎ করে নামিয়ে রাখল। তারপর চেয়ারে গা এলিয়ে ভাবলেশহীন মুখে অন্য তিনজনের দিকে তাকাল। তার ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমা চঞ্চল হয়ে উঠল টেবিলের ওপর। আঙুলের টোকায় সৃষ্টি হল এক বিচিত্র ছন্দোময় শব্দের।
অন্য তিনজন কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসে রইল। তিনজোড়া চোখই টেবিলে পড়ে থাকা চারটে সাহেবের দিকে নিবদ্ধ। অবশেষে বিরক্তিভরে তারা নিজেদের তাসগুলো টেবিলে ছুড়ে ফেলল।
ফ্ল্যাঙ্ক মরগ্যানের চঞ্চল, শীতল চোখের তারা হয়ে উঠল আরও চঞ্চল। পাতলা ঠোঁটে ফুটে উঠল বিজয়ীর হাসি; সে হাসি বুঝি ধূর্ত নেকড়ের হাসির সঙ্গেই তুলনীয়।
‘জিপো, আরও একবার তাহলে আমার কাছে তোমাদের হারতে হল?’ তার বিপরীত দিকে বসে থাকা জিশেপ ম্যানডিনির দিকে তাকিয়ে কৌতুক ভরে প্রশ্ন করল মরগ্যান।
জিশেপ ম্যানডিনির কালো কোঁকড়ানো চুলে রগের কাছে সামান্য পাক ধরেছে। ছোট তীক্ষ্ণ নাক। গায়ের রঙ বাদামি। মরগ্যানের কথায় সে ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি বের করে বিষণ্ণভাবে হাসল। তারপর অস্বাভাবিক স্থূলকায় শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে তার প্লাস্টিকের চাকতিগুলো ঠেলে দিল মরগ্যানের দিকে, ‘আমি আর নেই, ফ্রাঙ্ক। আজ আমার ভাগ্য-টাগ্য সব খরচের খাতায় জমা পড়ে গেছে। শালা, সন্ধে থেকে একটা নওলার বেশি কোনও তাস পেলাম না।’
এডওয়ার্ড ব্লেক মরগ্যানের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের চাকতিগুলোর দিকে তাকাল; আলতো করে আঙুল চালাল সাজানো চাকতির স্তূপে। তারপর চারটে চাকতি টোকা মেরে এগিয়ে দিল মরগ্যানের দিকে। তার মুখ ভাবলেশহীন, নির্বিকার।
এডওয়ার্ড ব্লেক লম্বা, সুদর্শন। সূর্যস্নাত দেহের রঙ ঈষৎ বাদামি। তার সৌন্দর্যের আতিশয্য মহিলাদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও পুরুষের মনে জাগিয়ে তোলে সতর্কতার সংকেত। ব্লেকের পরনে নিভাঁজ রঙের স্যুট। গাঢ় সবুজ টাইয়ের ওপর আঁকা সোয়ালো পাখির ছবি।
উপস্থিত চারজনের মধ্যে তার বেশবাসই একমাত্র চোখে পড়ার মতো।
চারজনের চতুর্থজন কিটসন—আলেক্স কিটসন। বয়েস বছর তেইশ হবে। শক্ত সমর্থ বলিষ্ঠ চেহারা। কঠিন চৌকো চোয়াল। ভাঙা গালের হনু দুটো সামান্য উঁচু। নাকটা পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধাদের মতোই চ্যাপ্টা। কালো চোখের তারায় সতর্ক ভাব। মোটের ওপর তেইশ বছরের সরলতা তার মুখ থেকে একেবারে মিলিয়ে গেছে।
কিটসনের পরনে একটা বুক-খোলা শার্ট এবং সস্তা দামের মোটা সুতির প্যান্ট। সে তার অবশিষ্ট চাকতিগুলো মরগ্যানের দিকে ঠেলে দিয়ে মুখভঙ্গি করল, ‘আমিও আর নেই। ভেবেছিলাম এ দানটা জিতে যাব। শালা, চারটে বিবি পড়েছিল, কিন্তু...’ কথা শেষ না করেই মাঝপথে থেমে গেল কিটসন। হঠাৎই তার নজরে পড়ল ব্লেক এবং জিপো তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মরগ্যানকে লক্ষ করছে। কিটসন কথা ওদের কানেও ঢুকছে না।
জিপো, ব্লেক এবং কিটসনের এগিয়ে দেওয়া চাকতিগুলোকে মরগ্যান ততক্ষণে তিনটে ভাগে সাজিয়ে ফেলেছে। তার পাতলা ঠোঁটের কোনা থেকে অবহেলাভাবে ঝুলে রয়েছে একটি জ্বলন্ত সিগারেট। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ অন্য তিনজন পরিষ্কার শুনতে পেল।
নিজের খুশিমতো চাকতিগুলোকে সাজানো হয়ে গেলে মরগ্যান চোখ তুলে তাকাল। তার সাপের মতো কালো, শীতল চোখজোড়া প্রত্যেকের মুখে খেলে বেড়াতে লাগল।
ব্লেক আর সইতে পারল না। অবৈধভাবে বলে উঠল, ফ্র্যাঙ্ক, তোমার মতলবটা কী খুলে বলো তো? সেই সন্ধে থেকে দেখছি কিছু একটা বলার জন্যে তুমি উসখুস করছ!’
মরগ্যান কোনও জবাব না দিয়ে টেবিলের ওপর টোকা মেরে বাজিয়ে চলল বাজনার ছন্দ। তারপর হঠাৎই একসময় প্রশ্ন করল, ‘দু-লাখ ডলার করে পেলে তোমরা নিতে রাজি আছ?’
ওরা তিনজনেই চমকে উঠল। কঠিন হল ওদের মুখভাব। কারণ মরগ্যানকে ওরা চেনে। ওরা নিশ্চিতভাবে জানে, এরকম একটা ব্যাপার নিয়ে মরগ্যান কখনও ঠাট্টা করছে না—কখনও করেওনি।
আগ্রহে অবিশ্বাসে সামনের দিকে ঝুঁকে এল জিপো। চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কী বললে?’
‘দু-লাখ ডলার করে প্রত্যেকে।’ শেষ শব্দটার ওপর অযথাই জোর দিল মরগ্যান, ‘টাকাটা বলতে গেলে সাজানো রয়েছে নাকের ডগায়, কিন্তু কাজটায় প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে।’
ব্লেক নিঃশব্দে পকেট থেকে বের করে আনল এক প্যাকেট সিগারেট। আঙুলের স্বচ্ছন্দ টোকায় একটা সিগারেট বের করে চোখ তুলে তাকাল মরগ্যানের দিকে। নিষ্প্রাণ স্বরে প্রশ্ন করল, ‘তার মানে, মোট টাকার পরিমাণ আট লক্ষ ডলার?’
‘না, দশ লাখ। এবং সে টাকাটা ভাগ হবে পাঁচ ভাগে ... অর্থাৎ তোমরা যদি এ ব্যাপারে আমার সঙ্গী হও।’
‘পাঁচ-ভাগে!...তা পঞ্চম ব্যক্তিটি কে? তীক্ষ্ণস্বরে জানতে চাইল ব্লেক।
‘সে কথায় আমরা পরে আসছি।’ কথা শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মরগ্যান। তার ফ্যাকাসে মুখমণ্ডল সুপ্ত উত্তেজনায় টলমল। দু-হাতের লোমশ থাবায় সে টেবিলে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ল, ‘এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ, এড—যদিও কাজটা নেহাত সোজা নয়। কিন্তু ভেবে দ্যাখো ওই দশ লাখ ডলারের কথা; যে টাকা আমরা পরম নিশ্চিন্তে পকেটে রেখে ঘুরতে পারব, যে টাকায় নেই কোনও বিপদের সম্ভাবনা! কারণ দশ ডলারের চেয়ে বড় নোট ওতে নেই। ...তবে একটা বিষয়ে তোমরা নিশ্চিত থেকো; কাজটা কিন্তু সত্যিই কঠিন।
‘দশ-লক্ষ-ডলার!’ জিপো অবাক বিস্ময়ে তখন মরগ্যানের দিকে তাকিয়ে, ‘অসম্ভব! গোটা পৃথিবী চষলেও অত টাকা পাওয়া সম্ভব নয়।’
মরগ্যান হাসল; ক্ষুধার্ত হায়েনার হাসি, ‘বললাম তো, এই আমাদের সবচেয়ে বড় দাঁও মারার সুযোগ। দু-লক্ষ ডলার করে পেলে এই পৃথিবী থাকবে আমাদের হাতের মুঠোয়।’
‘ফ্র্যাঙ্ক, তুমি কি রকেট রিসার্চ স্টেশনের সাপ্তাহিক মাইনের কথা বলছ?’ আচমকা প্রশ্ন করল ব্লেক।
মরগ্যান বসল। মুখে বিজ্ঞের হাসি। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল ব্লেকের কথায়, ‘তোমার বুদ্ধি আছে ,এড। হ্যাঁ ...আমি ওই টাকার কথাই বলছি। তুমি তো জানো, রকেট রিসার্চ স্টেশনের মাইনের টাকায় দশ ডলারের চেয়ে বড় কোনও নোট থাকে না; অথচ মোট টাকার পরিমাণ দশ লক্ষ ডলার! কেমন, রাজি!
কথা শেষ করে মরগ্যান কিটসনের দিকে তাকাল। কিটসনের দু-চোখের তারায় হতচকিত, শূন্য দৃষ্টি।
‘কী হল, আলেক্স, একেবারে বোবা হয়ে গেলে যে!’
আলেক্স কিটসনের বলিষ্ঠ আঙুল উত্তেজনায় হাওয়া আঁকড়ে ধরল, ‘তুমি কি পাগল হয়েছ, ফ্র্যাঙ্ক! আর যাই করি, এ কাজে আমরা নামছি না। নেহাত বুদ্ধিভ্রংশ না হলে এ ধরনের কথাও কেউ চিন্তা করতে পারে না!’
মরগ্যান হাসল; সে হাসি ছোটদের নির্বুদ্ধিতায় বয়স্ক অভিভাবকের করুণার হাসি। তার চোখ কিটসনের মুখ থেকে পিছলে গেল ব্লেকের চোখে। এ কাজে ব্লেকের যদি সম্মতি থাকে তাহলে বুঝতে হবে কাজটা একেবারে অসম্ভব নয়। কারণ বুদ্ধি-সুদ্ধি বলতে যা কিছু, তা এদের মধ্যে একমাত্র ব্লেকেরই আছে। কিটসন ছেলেটা সাহসী বটে, কিন্তু ঘুঁষি আর গাড়ি ছোটানো ছাড়া ওর মাথায় আর কিছু ঢোকে না। অথচ এ কাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বুদ্ধির। সুতরাং মরগ্যান প্রশ্ন করল ব্লেককেই, ‘তুমি কী বলো’ এড? কাজটা করা কি আমাদের পক্ষে অনুচিত হবে?’
মাথা ঝুঁকিয়ে সিগারেট ধরাল ব্লেক। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল মরগ্যানের দিকে, ‘টাকার ওজন যতই হোক না কেন, এ ধরনের কাজে অন্তত আমি হাত দিতাম না, ফ্র্যাঙ্ক। কিন্তু তোমার যদি কোনও প্ল্যান থেকে থাকে, তাহলে আমি সানন্দে শুনতে রাজি আছি।’
এই হচ্ছে এডওয়ার্ড ব্লেক। সমস্ত ঘটনা না জেনে সম্ভব-অসম্ভব কোনওরকম মতামতই প্রকাশ করতে রাজি নয়।
জিপো তার স্থূলকায় শরীরটাকে টান টান করে সোজা হয়ে বসল। কিটসনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে। চোখের দৃষ্টিতে অনিশ্চয়তার ছায়া। অস্বস্তিভরে সে প্রশ্ন করল, ‘কাজটার মধ্যে গণ্ডগোলটা কোথায়?’
মরগ্যান সে প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়েই হাত দুলিয়ে দেখাল কিটসনের দিকে, ‘তুমিই বলো, আলেক্স। তোমারই তো জানার কথা! তুমি কিছুদিন চাকরিও তো করেছিলে ওদের ওখানে—।’
‘হ্যাঁ, করেছিলাম, ‘নিস্পৃহস্বরে বলল কিটসন, ‘সুতরাং আমি জানি—এবং ভালোভাবেই জানি গণ্ডগোলটা কোথায়। মাসের পর মাস প্রত্যেকেই এই রকেট রিসার্চ স্টেশনের টাকাকে সযত্নে এড়িয়ে গেছে। কেন জানো? কারণ তারা সকলেই সুস্থ মাথার বুদ্ধিমান লোক; আমাদের মতো বোকা আর পাগল নয়।’ কিটসন আলতো করে একেবারে চোখ বুলিয়ে নিল তিনজন শ্রোতার ওপর । কয়েকজন বয়স্ক লোকের সামনে এভাবে কথা বলতে তার অস্বস্তি লাগছিল; কিন্তু সে নিরুপায়। এই কাজটায় যে কতখানি বিপদের সম্ভবনা, সেটা কিটসন ওদের বেশ ভালো করেই সমঝে দেবে।
‘না, আমি ঠাট্টা করছি না । ফ্র্যাঙ্ক জানে, ‘ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির’র প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে বিপদের অশুভ সংকেত। আমাদের নিয়তির করাল ইঙ্গিত।’
জিপো গালে হাত ঘষল। তারপর ভুরু উঁচিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে, ‘তুমি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে কিছু একটা ভেবেছ, ফ্র্যাঙ্ক?’
মরগ্যান জিপোর কথা কানেই তুলল না। স্থিরচোখে চেয়ে রইল কিটসনের দিকে, ‘থামলে কেন, আলেক্স? বলে যাও—ওদের জানিয়ে দাও এ কাজে কতটা ঝুঁকি আছে?’
কিটসন নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে মরগ্যানের সামনের থেকে তুলে নিল একটা পোকারের চাকতি। মনোযোগ সহকারে সেটাকে দু-আঙুলে ঘোরাতে লাগল। মুখমণ্ডলে দ্বিধার ছায়া।
‘আমি ওই এজেন্সির চাকরি যখন ছেড়ে দিই, সেই সময়ে ওরা একটা নতুন ধরনের ট্রাক আমদানি করে।’ হঠাৎই মুখ খুলল কিটসন, ‘তার আগে ওরা যে ট্রাকটা ব্যবহার করত, নতুন ট্রাকটার তুলনায় সেটাকে একটা রদ্দি টিনের বাক্স বললেও বেশি বলা হয় না। আর যাতে থাকত সশস্ত্র চারজন রক্ষী। তারা তীক্ষ্ম নজর রাখত টাকার বাক্সর দিকে।...কিন্তু এই নতুন ট্রাকের মজাটা কী জানো?’ মুচকি হাসল কিটসন। সে হাসিতে বুঝি সামান্য ব্যঙ্গের ছোঁয়া, কোনও সশস্ত্র রক্ষীর প্রয়োজন এ ট্রাকে নেই। তার ওপর ওয়েলিং কোম্পানি এই ট্রাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে এতই নিশ্চিন্ত যে টাকাটাকে আগের মতো ইনসিওর করার কথাও ওরা আর ভাবে না।’
‘তাহলে ট্রাকটার কিছু বিশেষত্ব আছে, কী বলো?’ মরগ্যান জানতে চাইল।
কিটসন আলগোছে আঙুল চালাল চুলের ফাঁকে। কিছুটা অস্বস্তি হলেও সে মরগ্যানের কাছে প্রমাণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে কাজটা তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব। মরগ্যানের সান্নিধ্যে এতদিন কাটিয়ে কিটসন তাকে বিশ্বাস করতে শিখেছে । পেরেছে মরগ্যানের কথায় ভরসা করতে। কিন্তু তবুও এ কাজে সে মন থেকে মরগ্যানকে সায় দিতে পারছে না।
মরগ্যান, ব্লেক, জিপো, কিটসন—ওরা চারজন জোট বেঁধেছে গত ছ-মাস আগে; এবং এর মধ্যেই ছোটখাটো বেশ কয়েকটা কাজ নির্বিঘ্নে গুছিয়ে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওদের সাহস জুগিয়েছে দলনেতা মরগ্যানের ক্ষুরধার, নিখুঁত পরিকল্পনা। না, দু-লাখ ডলারকে কিটসন কখনই পায়ে ঠেলবে না ...তবে এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে ওই টাকা লুট করার কথা চিন্তা করাই একরকম বোকামি৷ মরগ্যান বলছে বটে কাজটা তেমন কঠিন নয়, কিন্ত কিটসন নিশ্চিত, মরগ্যান ভুল করছে, এতবড় ভুল সে বোধহয় সারা জীবনেও করেনি? টাকার অঙ্ক শুনে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ নইলে প্রকৃতিস্থ অবস্থায় এ ধরনের প্রস্তাব কখনই সে করত না৷
‘কী হল ছোকরা—থামলে কেন?’ ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করল মরগ্যান৷ দু-চোখের তারায় পলকের জন্যে ঝিলিক মারল উপহাসের হাসি৷
কিটসন বুক ভরে শ্বাস নিল৷ মনস্থির করে আবার বলতে শুরু করল, ‘দশলাখ ডলার তো দূরের কথা, তুমি ওই ট্রাকের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে না, ফ্র্যাঙ্ক৷’ কিটসনের স্বর কেঁপে উঠল দৃঢ়তায়, ‘একটা নতুন ধরনের শঙ্কর ধাতুর চাদর দিয়ে তৈরি ওই ট্রাকটা৷ বাইরে থেকে সেই ধাতব দেওয়াল কেটে ভেতরে ঢোকা সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ হয়তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করলে সে দেওয়ালকে গলানো যেতে পারে, কিন্তু তাতেও সময় লাগবে কম করে এক সপ্তাহ৷ দ্বিতীয়ত, ট্রাকটার দরজায় লাগানো আছে, একটা সময়-নির্ভর তালা৷ ট্রাকে টাকা বোঝাই করার পর ওরা দরজায় তালা দিয়ে দেয়৷ তুমি তো জানো, এজেন্সি থেকে রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা৷ সুতরাং সেই সময়-নির্ভর তালাকে এমন যান্ত্রিক উপায়ে বন্ধ করা হয়, যাতে চার ঘণ্টার জন্যে সেই তালা হয়ে পড়বে সম্পূর্ণ অকেজো৷ কেবলমাত্র চার ঘণ্টা পরেই খোলা যাবে সেই অদ্ভুত তালাকে৷ বুঝতেই পারছ, ড্রাইভারের সুবিধের জন্যেই এক ঘণ্টা সময় বেশি দেওয়া হয়৷’
পোকারের চাকতিটা টেবিলে নামিয়ে রাখল কিটসন৷ চোখ বুলিয়ে নিল উৎকণ্ঠিত ব্লেক ও জিপোর মুখে৷ অসীম আগ্রহে ওরা দুজনেই ঝুঁকে পড়েছে টেবিলের ওপর৷ মুখের প্রতিটি পেশি টান-টান৷ ‘এছাড়া ট্রাকের ড্যাশবোর্ডে রয়েছে একটা বিশেষ বোতাম, যার সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে ওই বিশেষ তালার৷ কোনও বিপদের সামান্যতম আভাস পেলেই ড্রাইভারের কাজ হল ওই বোতামটি টিপে দেওয়া, এবং তাহলেই চিত্তিরি!’
“তার মানে?’ মরগ্যান কপট কৌতূহলে জানতে চাইল৷
‘অর্থাৎ ওই সময়-নির্ভর তালা চিরতরে বন্ধ হয়েই থাকবে৷ চার ঘণ্টা কেন, চার বছর অপেক্ষা করলেও সে তালা আর খুলবে না৷ হ্যাঁ, উপায় একটা আছে—তবে সে কাজ কোনও যে সে লোকের নয়৷ একজন রীতিমতো দক্ষ কারিগরের পক্ষেই সে তালা আবার খোলা সম্ভব!’ কিটসন সিগারেট ধরিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল? হাত নেড়ে ব্যাপারটা সকলকে বোঝাতে চাইল, ‘শুধু এই নয়, আরও আছে৷ এতসব বন্দোবস্ত সত্ত্বেও সব সময় ওদের সঙ্গে থাকে একটা শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটার৷ এজেন্সি থেকে ট্রাক বেরোনো মাত্রই ট্রাক ড্রাইভার ও এজেন্সির সঙ্গে চলে ট্রান্সমিটারের মাধ্যম কথাবার্তা৷ আর সেই যোগাযোগ বন্ধ হয় একেবারে রিসার্চ স্টেশনে ট্রাক পৌঁছনোর পর৷ কিটসন চোখ না তুলেও বুঝতে পারল মরগ্যান তার দিকে চেয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে৷ কিছুটা অপমানিত ও উত্তেজিত হয়ে সে জিপোর দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল, শোনো জিপো, মনে করো কোনও গর্দভ এই ট্রাকটা লুট করতে চায়৷ তারপর মনে করো সেই অতিবুদ্ধিমান ব্যক্তিটি রাস্তা আটকে যে করে হোক ট্রাকটাকে থামাল৷ তারপর?... তখন ড্রাইভার ও রক্ষী এজেন্সির নিদের্শমতো ওদের কর্তব্য করে যাবে৷ প্রথমেই ড্রাইভার বোতাম টিপে সময়-নির্ভর তালাটার বারোটা বাজিয়ে দেবে, আর একই সঙ্গে ড্রাইভারের সঙ্গী টিপে দেবে আরও একটা বোতাম, যার ফলে ট্রাকের জানলা, দরজা, উইন্ডশিল্ড—সব ঢাকা পড়ে যাবে দুর্ভেদ্য ইস্পাতের চাদরে৷ অর্থাৎ ট্রাকটা হয়ে দাঁড়াবে একটা অভেদ্য ধাতব বাক্স—যা কোনও মানুষের পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়৷ এরপরও বাকি থাকবে আর একটা বোতাম৷ ওটা টিপলে ওদের শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটার প্রচার করে যাবে এক অদৃশ্য সংকেত, যার কোনও বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই৷ তখন পুলিশের যে কোনও ওয়্যারলেস ভ্যানই ট্রাকটাকে খুঁজে বের করতে পারবে৷ মোটের ওপর ড্রাইভার ও তার রক্ষীর কাজ হচ্ছে সন্দেহজনক কিছু দেখলেই ওই তিনটে বোতাম টিপে নিজেদের জায়গায় গ্যাঁট হয়ে বসে থাকা—এবং পুলিশের অপেক্ষা করা৷’ টোকা মেরে সিগারেটের ছাই ঝাড়ল কিটসন৷ স্নায়বিক উত্তেজনায় তার কপালে ঘামের ফোঁটা, কাঁপছে হাতের আঙুল, ‘সুতরাং বুঝতেই পারছ, এ ধরনের ট্রাক থেকে দূরে থাকাই বাঞ্চনীয়৷ তা টাকার পরিমাণ যাই হোক না কেন, ইলেকট্রিক চেয়ারে যাবার ইচ্ছে আমার নেই, তোমাদের আছে কি না জানি না৷’
জিপোর মুখে নেমে এল হতাশার কালো মেঘ। মুখ ব্যাজার করে সে ঘাড় চুলকোতে লাগল। ব্লেক এক প্যাকেট তাস নিয়ে আনমনাভাবেই ভেঁজে চলল; কিন্তু তার স্বচ্ছ চোখের তারা মরগ্যানের চোখে নিবদ্ধ।
‘আচ্ছা, ড্রাইভার আর রক্ষীটাকে কোনওরকমে কায়দা করা যায় না?’ মরগ্যান প্রশ্ন করল কিটসনকে।
কিটসন জোরালোভাবে হাত নাড়ল, ‘কায়দা?! ওদের সঙ্গে? তুমি কি পাগল হয়েছ, ফ্র্যাঙ্ক? কে তোমাকে বলেছে যে ওদের কায়দা করার ব্যাপারটা এতই সহজ?’
মরগ্যানের চোখজোড়া হঠাৎই ঝলসে উঠল কুৎসিত ক্রোধে, ‘আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি, আলেক্স—জ্ঞান দিতে বলিনি। আমি পাগল হয়েছি কি না সেটা আমি বুঝব। বেশি মুখ না ছুটিয়ে কথার জবাব দাও।’
মরগ্যানকে চটতে দেখে তড়িঘড়ি বলে উঠল ব্লেক, ‘রাগ কোরো না, ফ্র্যাঙ্ক। ছোকরার কোনও দোষ নেই। ও যতটুকু জানে সেইটুকুই বলছে। তাই বলে ওর চিন্তাধারার সঙ্গে যে আমাদের মিল থাকতে হবে, তার কী মানে আছে?’
মরগ্যান সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল, ‘ ঠিক আছে এড, আগে আলেক্সের কথাই তাহলে শেষ হোক।’ তারপর কিটসনের দিকে ফিরে তাকাল মরগ্যান, ‘বল হে ছোকরা, ওই ড্রাইভার আর প্রহরীকে কাবু করতে অসুবিধেটা কোথায়?’
আলেক্স কিটসন ততক্ষণ ঘামতে শুরু করেছে। ঘামের ছোট ছোট ফোঁটাগুলো তার থ্যাবড়া নাকে চকচক করছে।
‘আমি একসময় ওদের সঙ্গে কাজ করেছি।’ কঠিন চোখে মরগ্যানের দিকে চেয়ে বলতে শুরু করল কিটসন, ‘ওদের আমি ভালোমতোই চিনি। ড্রাইভারের নাম ডেভ টমাস, আর বন্দুকবাজ প্রহরীর নাম মাইক ডার্কসন। ওরা দুজনেই রিভলভার চালাতে ওস্তাদ, এবং বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ ওদের চোখের নজর। এ ছাড়া, ওই ট্রাকলুটের যে কোনও পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করতে পারলেই ওরা প্রত্যেকে পাবে দু-হাজার ডলার করে পুরস্কার। ওরা জানে, কারও পক্ষেই ট্রাকের তালা ভেঙে ওই দশ লাখ ডলার হাতানো সম্ভব নয়; সুতরাং ওরা যে টাকার লোভে আমাদের দলে যোগ দেবে, সেরকম চান্সও কম। মানে টমাস ও মাইক ডার্কসন আমাদের পক্ষে এক শক্ত বাধা। ওদের সঙ্গে মোকাবিলা হলেই তোমরা সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারবে।’
কিটসনকে বাধা দিয়ে জিপো হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওরে বাবা, এত ঝামেলা থাকলে ও টাকায় আমার কোনও প্রয়োজন নেই। মানছি দু লাখ ডলার অ-নে-ক টাকা, কিন্ত সে টাকায় ফুর্তি করার জন্যে যদি বেঁচেই না থাকি, তবে দু-ডলার আর দু-লাখ ডলারে তফাতটা রইল কী?’
জিপোর কথায় হেসে ফেলল মরগ্যান।
জিপোর যথেষ্ট গুণ আছে। কিন্ত সাহস আর বুদ্ধির ব্যাপারে সে আর সকলের চেয়েই পিছিয়ে। তাছাড়া যখন সে বোঝে, জয়ের কোনও সম্ভাবনাই নেই, তখন পরাজয়কে মেনে নিতে সে দ্বিধা বোধ করে না। কিন্তু তালা খোলার ব্যাপারে জিপো পয়লা নম্বরের ওস্তাদ। তার পেশাদার অভিজ্ঞ আঙুলের কাছে পরাজিত না হয়েছে এমন তালা পৃথিবীতে নেই। তবে এ পর্যন্ত যত তালা জিপো খুলছে, সবই নিজের খুশিমতো, ধীরে সুস্থে, ঠান্ডা মাথায়। কখনও তাড়াতাড়ি খোলার জন্যে চাপ দেওয়া হয়নি; সে যেমন ভালো বুঝেছে সেভাবেই খুলেছে। কিন্ত মরগ্যান জানে, এবারের কাজটায় জিপোকে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হবে। তাই মরগ্যান চিন্তিত। জিপো কি পারবে সফল হতে? অবশ্য ওকে বলে কয়ে রাজি করাবার ব্যাপারে মরগ্যান একটুও ভাবছে না। কারণ জিপো কখনওই তার কথা ফেলাতে পারবে না। কিন্ত তাতে লাভ হবে কতটুকু? যখন সময় আসবে জিপোর আসল অগ্নিপরীক্ষার, তখন কিছুই যাবে আসবে না। তখন যদি জিপো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তাহলে তাদের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে—মিলিয়ে যাবে করুণ হতাশায়।
চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, জিপো৷’ মরগ্যান জিপোর কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিল, ‘যেদিন থেকে আমরা চারজন এক হয়েছি, তোমাদের সমস্ত দায়িত্ব আমিই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি, তোমাদের জুতসই কাজের সন্ধান দিয়েছি, তোমাদের পরিচালনা করেছি—তাই তো?’
জিপো ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷ কিটসন ও ব্লেক অপলকে মরগ্যানের দিকে তাকিয়ে৷
‘কাজগুলো খুব বড় ছিল না বটে, কিন্তু মোটামুটি তোমরা প্রত্যেকেই বেশ কিছু করে টাকা পেয়েছ৷ কিন্তু আজ হোক, কাল হোক, পুলিশের নজর আমাদের ওপর পড়বেই৷ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে আমরা এইসব ছোটখাটো লুটপাট চালিয়ে যেতে পারি না৷ তাতে টাকাও আসবে কম, এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার চান্সও বেশি৷ সুতরাং আমার মনে হয়, একচোটে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে যে যার রাস্তায় কেটে পড়াই ভালো৷ তাতে ভবিষ্যতে আর বিপদের মুখোমুখি হতে হবে না৷ দুলক্ষ ডলার নেহাত কম-টাকা নয়৷ বলতে গেলে, আমরা হব দুনিয়ার সম্রাট৷ আমি আবারও বলছি, এই কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়৷ এর পেছনে আমাদের প্রচুর মাথা খাটাতে হবে৷ আলেক্স মোটামুটি তোমাদের সবই বলেছে৷ ওর কথা মিথ্যে তা আমি বলছি না, কিন্তু একটা ব্যাপার ও একেবারে বাদ দিয়ে গেছে৷’ মরগ্যান একবার দেখল তিনজনকে৷ জিপো অস্বস্তিভরে উসখুস করছে৷ কিটসনের মুখে এখনও সেই একরোখা ছাপ৷ হয়তো কিছুটা আশঙ্কাও৷ ব্লেক নির্বিকার৷ কারণ একমাত্র গ্রহণযোগ্য যুক্তি পেলেই সে মরগ্যানের কথা মানতে রাজি৷’
‘যা বলেছিলাম আলেক্স এ কথা একবারও বলেনি যে ট্রাকটা গত পাঁচ মাস ধরে প্রতি সপ্তাহেই টাকা আনা-নেওয়া করছে৷ এবং প্রত্যেকেই ট্রাকটাকে দুর্ভেদ্য বলে মেনে নিয়েছে৷ যেমন, আমাদের আলেক্স কিটসন৷ ওর মতো আরও অনেকেরই ধারণা, ওই ট্রাকটাকে লুট করার চিন্তা পাগল হওয়ার পূর্বলক্ষণ৷ এ ধরনের কোনও বদ্ধমূল ধারণাকে নাছোড়বান্দার মতো আঁকড়ে বসে থাকা মানেই প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নিজেকে অরক্ষিত করা৷ তারপর প্রয়োজন শুধু একটা ক্ষিপ্র রাইট হুক—ব্যস্! চতুর সুযোগসন্ধানী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নির্বোধ মুষ্টিযোদ্ধার শোচনীয় পরাজয়৷’
মরগ্যান ইচ্ছে করেই কিটসনকে ঠেস দিয়ে উদাহরণ দিল এই মুষ্টিযুদ্ধের৷ কারণ জিপোর মতো কিটসনকেও তার নিজের দলে টানা দরকার৷ সে লক্ষ করল, কিটসনের মুখে চোখে ঝিলিক মারছে কৌতূহল৷ একরোখা ভাবটা আগের চেয়ে অনেকটা কমে এসেছে৷ মরগ্যান বুঝল, কিটসনকে রাজি করাতে হলে এই সুবর্ণসুযোগ৷ সুতরাং এক মুহূর্ত ও সময় নষ্ট না করে সে বলে চলল, ‘আলেক্স তোমাদের যা যা বলেছে সবই আমি খবরের কাগজে মাসকয়েক আগে পড়েছি৷ ওয়েলিং কোম্পানি এই বিশেষ ট্রাকটা নিয়ে প্রচারের লোভটুকু পর্যন্ত সামলাতে পারেনি৷ অবশ্য নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার এমন সুযোগ কেউই ছাড়ে না৷ তাছাড়া ওরা ভাবছে, ওদের এই দুর্ভেদ্য ট্রাকের কথা খবরের কাগজে পড়ে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই তাদের টাকা পয়সা আনা নেওয়ার ব্যাপারে ওদের সাহায্য নেবে৷ যাকগে, যা বলছিলাম যেদিন থেকে ওই ট্রাকটার কথা আমি কাগজে পড়েছি, সেদিন থেকেই ওটাকে লুট করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরছে৷ আমাদের পক্ষে কাজটা মোটেও অসম্ভব নয়৷ তোমারা যদি সামান্য সাহস এবং দক্ষতা দেখাতে পার, তবে পৃথিবীর নবম আশ্চর্য ওই ট্রাকটাকে কিভাবে বোকা বানাতে হয় তা এই শর্মা তোমাদের দেখিয়ে দেবে৷ ভুলে যেও না, তোমাদের সাফল্যের দাম দু-লক্ষ ডলার৷
ব্লেক সিগারেটের টুকরোটাকে টেবিলে ঘষে নিভিয়ে ফেলল৷ এবং পরক্ষণেই অভ্যস্ত হাতে ধরিয়ে ফেলল আর একটি৷ তার চোখজোড়া মরগ্যানের মুখে স্থির৷ যেন মরগ্যানের অভিসন্ধি বুঝতে চাইছে৷
‘অর্থাৎ এই বক্তব্যের সপক্ষে তোমার কোনও জোরালো প্ল্যান আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে৷’ মরগ্যান সিগারেট ধরিয়ে শ্রান্তভাবে ধোঁয়া ছাড়ল৷ আবছা সবুজাভ ধোঁয়া ভেসে চলল বিপরীত দিকে বসে থাকা জিপোর মুখের দিকে, ‘মোটামুটি একটা পরিকল্পনা আমি ছকে রেখেছি৷ কিন্তু সেটাকে বার-বার যাচাই করে নিখুঁত করতে হবে৷ তাছাড়া আমার পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাববার সময় পাব যথেষ্ট৷ কারণ এখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই ট্রাকটা রকেট রিসার্চ স্টেশনের মাইনের টাকা নিয়ে যাবে৷ আর এইভাবে যত দিন যাবে, ওরা ততই নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অসাবধানী হয়ে পড়বে৷ তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারলেই কাজ হাসিল!’
আর সহ্য করতে পারল না কিটসন৷ সামান্য ঝুঁকে পড়ে কর্কশস্বরে বলে উঠল, ‘থামো ফ্র্যাঙ্ক! গাঁজায় দম দিয়ে আর উল্টো পালটা বোকো না! একটা বোতাম টিপতে কতটা সময় লাগবে জান? কোনও লোক যদি ঘুমিয়েও থাকে, তাহলে জেগে উঠে বোতাম টিপতে তার ন-সেকেন্ডের বেশি সময় লাগতে পারে না৷ অর্থাৎ তিনটে বোতাম টিপতে মাত্র ছ-সেকেন্ড—ব্যস! তারপর ট্রাকটা হয়ে দাঁড়াবে একটা ইস্পাতের চৌকা বাক্স, আমাদের কফিনের শেষ পেরেক! তোমরা কি ধারণা মাত্র ছ-সেকেণ্ডের মধ্যেই ট্রাক থামিয়ে, দরজা খুলে টমাস আর ডার্কসনকে তুমি কাবু করতে পারবে? হুঁ ঃ উর্বর মস্তিষ্ক ছাড়া এ ধরনের দিবাস্বপ্ন দেখা অসম্ভব৷’
‘তোমার তাই মনে হয় বুঝি?’ ঠাট্টার সুরে প্রশ্ন করল মরগ্যান৷
‘মনে হয়’ নয়, আমি নিশ্চিতভাবে জানি বলেই বলছি৷ ট্রাক থামিয়ে তার দিকে এক পা-এগোনোর আগেই পুরো ট্রাকটা ঢাকা পড়ে যাবে ইস্পাতের চাদরে, সময় নির্ভর তালা হয়ে যাবে ওলট-পালট, ট্রান্সমিটারে শুরু হবে সাহায্য-প্রার্থী অবিরাম বিপদ সংকেত৷’
‘সত্যি বলছ আলেক্স?’ কপট বিস্ময় ভুরু উঁচিয়ে জানতে চাইল মরগ্যান৷ কিটসনের ইচ্ছে হল সপাটে একখানা ঘুঁষি বসিয়ে দেয় মরগ্যানের নাকে৷
‘হ্যাঁ—সত্যি৷’ অতিকষ্টে রাগ চেপে চিৎকার করে উঠল কিটসন, ‘তুমি যতই বল না কেন, এই অসম্ভব ব্যাপারকে বিশ্বাস করতে আমি কোনওরকমেই রাজি নই৷
‘অনেক হয়েছে, আলেক্স৷ জ্ঞানদানের কাজটা তুমি ভালোই পার দেখছি৷ তা, এখানে না এসে পাদ্রিগিরি করলেই পারতে৷’ ব্লেকের ব্যঙ্গের ছুরি যেন কেটে বসল কিটসনের গায়ে, ‘আর ফ্র্যাঙ্কের চেয়ে নিজেকে যখন এত বেশি বুদ্ধিমান বলেই মনে করছ, তাহলে আজ থেকে তুমিই দলের ভার গ্রহণ করে আমাদের বাধিত করো!’
অপমানে কিটসনের মুখ লাল হয়ে উঠল৷ রাগতভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল৷ গম্ভীরভাবে একবার ব্লেককে, আর একবার মরগ্যানকে দেখতে লাগল৷ অবশেষে সংক্ষিপ্তভাবে সে বলল, ‘ঠিক আছে৷ কিন্তু আমি আবারও বলছি, কাজটা অসম্ভব৷’
ব্লেক সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে ধরল মরগ্যানের দিকে, ‘এবারে ঝেড়ে কাশো ফ্র্যাঙ্ক৷’
‘গতকাল আমি এজেন্সি থেকে রিসার্চ স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিলাম৷’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘গাড়ির মাইলমিটার অনুসারে দুটো জায়গার দূরত্ব ঠিক তিরানব্বই মাইল৷ তিরানব্বইয়ের মধ্যে সত্তর মাইল বড় রাস্তা, দশ মাইল সাধারণ রাস্তা, দশ মাইল একটা নির্জন কাঁচা সড়ক এবং শেষ তিন মাইল রিসার্চ স্টেশনের নিজস্ব রাস্তা: যে রাস্তা ধরে সোজাসুজি রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছনো যায়৷ আমি ট্রাকটাকে থামাবার জন্যে একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলাম৷ সুতরাং প্রথমেই বড় রাস্তা এবং দশ মাইল সাধারণ রাস্তাকে একেবারে বাদ দিতে হয়৷ কারণ ওই দুটো রাস্তায় লোকজন এবং যানবাহন বেশি৷ রকেট রিসার্চ স্টেশনের নিজস্ব রাস্তাটায় দিন রাত, সবসময় সশস্ত্র প্রহরা থাকে৷ সুতরাং হাতে রইল দশ মাইল লম্বা কাঁচা সড়কটুকু৷’ সিগারেটের ছাই ঝাড়ল মরগ্যান৷ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে একবার দেখল তিনজনকে। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘সাধারণ রাস্তা থেকে কাঁচা সড়ক ধরে চার মাইলটাক এগিয়ে গেলে পড়বে দশ নম্বর জাতীয় সড়কে যাবার একটা শর্টকাট রাস্তা। এই রাস্তাটাই রিসার্চ স্টেশন হয়ে দশ নম্বর বড় রাস্তায় গিয়ে মিশেছে৷ অনেক গাড়িই, যদিও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, সময় কম লাগে বলে এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করে৷ এই রাস্তাটা কাঁচা সড়কের মতো অতটা খারাপ নয়৷ কিন্তু রিসার্চ স্টেশনের মাইল দুয়েক আগে রাস্তাটার প্রস্থ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে৷ পাথর ছাড়াও জায়গাটা ছোট বড় নানান ঝোপে ছেয়ে আছে৷ অর্থাৎ লুকোনোর করার অথবা কোনও মোটর দুর্ঘটনার পক্ষে জায়গাটা একটা আদর্শ জায়গা৷’
ব্লেক সমর্থন জানাল মরগ্যানের কথায়, ‘ঠিক বলেছ, ফ্র্যাঙ্ক। একবার ওই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আমি শালা আরেকটু হলেই গিয়েছিলাম আর কী! মোড় ঘোরবার সময় সামান্য অসর্তক হলেই খেল খতম?...এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে এখানে ওখানে বিপদসূচক রোড-সাইন লাগানো হয়েছে।’
‘হ্যাঁ, দেখেছি।’ সম্মতি জানাল মরগ্যান, ‘আচ্ছা, এবার ট্রাকে বসে থাকা টমাস এবং ডার্কসনের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখা যাক।’এখনকার যা আবহাওয়া তাতে ওই বদ্ধ ট্রাকে গরম হবে অসহ্য। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে ওই একই রাস্তা ধরে যাতায়াত করার ফলে ওদের রাস্তার সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যন্ত মুখস্থ হয়ে গেছে। এককথায় বিরক্তি, ক্লান্তি আর একঘেয়েমি ওদের ট্রাকভ্রমণের নিত্যসঙ্গী। মনে করো ওরা এসে পৌঁছল সেই বিপজ্জনক বাঁকের মুখে। এবার মোড় ঘুরেই ওরা দেখতে পাবে এক অভাবনীয় দৃশ্য। একটা গাড়ি পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে রাস্তার ধারে উলটে পড়ে আছে। বলা বাহুল্য গাড়ির অবস্থা শোচনীয়। আর রাস্তার ঠিক মাঝখানে ভেসে যাওয়া রক্তের সমুদ্রে পড়ে আছে একটি সুন্দরী যুবতী। তার সর্বাঙ্গ রক্তে ভেজা। জামাকাপড়ের অবস্থা তথৈবচ।’ আচমকা ব্লেকের মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ে মরগ্যান। চাপা স্বরে হিসহিস করে বলে উঠল, ‘এখন একটা কথা আমি জানতে চাই, এড। টমাস ও ডার্কসন এ অবস্থায় কী করবে? ওরা কি মেয়েটাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে, না নেমে দেখবে বেঁচে আছে কি না, বা কতখানি আহত হয়েছে?’
সাদা দাঁতের সারি বের করে শয়তানের হাসি হাসল ব্লেক। তাকাল কিটসনের দিকে, ‘কী হে স্বামী জ্ঞানানন্দ, শুনছ তো? উর্বর মস্তিষ্কের দিবাস্বপ্ন—কী বল?’
‘বলো, ওরা কী করবে?’ মরগ্যানের প্রশ্নে কিটসন নড়েচড়ে বসল। তার রক্তিম মুখে পরাজয়ের ইঙ্গিত।
অগত্যা ব্লেকই উত্তর দিল, ‘ওরা নামতে বাধ্য। সম্ভবত একজন নেমে মেয়েটাকে দেখতে যাবে, আর অন্যজন ট্রাকে বসেই ট্রান্সমিটারে সাহায্য চেয়ে পাঠাবে—অর্থাৎ কিটসনের কথা অনুযায়ী সত্যিই যদি ওরা অতটা সাবধানি চরিত্রের লোক হয়।’
মরগ্যান ফিরল কিটসনের দিকে, ‘তোমার কী মনে হয়? কী করবে টমাস আর ডার্কসন?’
কিটসন বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। অবশেষে অনিচ্ছাভরে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘এড ঠিকই বলেছে। টমাস নিজের জায়গাতেই বসে থাকবে, আর ডার্কসন নেমে দেখতে যাবে পড়ে থাকা মেয়েটাকে। রাস্তার মাঝখান থেকে তাকে সরিয়ে ওরা ট্রান্সমিটারে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠাবে। তারপর ট্রাকে উঠে আবার চলতে শুরু করবে রিসার্চ স্টেশনের দিকে।’
‘আমারও তাই ধারণা।’ বলল মরগ্যান। এ ব্যাপারে জিপোর মতামত নেওয়ার কোনও প্রয়োজন সে অনুভব করল না। কারণ তালা বা সিন্দুক খোলার ব্যাপার ছাড়া অন্য কোনও ব্যাপারে জিপো সাধারণত কোনও মতামত প্রকাশ করে না। আর করলেও মরগ্যানের কাছে সে মতামতের মূল্য সামান্যই। সুতরাং সে বলে চলল, ‘তাহলে অবস্থাটা মোটামুটি কী দাঁড়াচ্ছে? টমাস রইল গাড়ির ভেতরে, ডার্কসন রইল রাস্তায়। এবার আমার আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দাও, আলেক্স—‘মরগ্যানের চোখ সরাসরি কিটসনের দিকে, ‘টমাস কি এক্ষেত্রে ড্যাশবোর্ডের বোতাম টিপে সময় নির্ভর তালাকে অকেজো করে দেবে? নাকি ইস্পাতের আড়ালে ট্রাকটাকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করবে?’
কিটসন পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল৷
‘সম্ভবত নয়৷’ ধীরস্বরে জবাব দিল সে৷
মরগ্যান ঘুরে তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘তোমার কী মনে হয়, এড?’
‘কক্ষনও টিপবে না!’ দৃঢ়স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘কিটসনের কথা অনুযায়ী অকেজো সময়-নির্ভর তালাকে আবার ঠিক করতে একজন দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন৷ সুতরাং যতক্ষণ না টমাস বুঝতে পারছে যে ওরা বিপদে পড়েছে, ততক্ষণ সে কিছু করবে না৷ বরং খোলা জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে চেষ্টা করবে ডার্কসন কী করছে, বা মেয়েটা বেঁচে আছে কি না৷’
মরগ্যান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘যাক, অবশেষে আমরা কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি৷ কারণ ট্রাকটাও থামানো গেছে, এবং টমাসও বোতাম টেপেনি৷ তাহলে আমরা দেখছি, আলেক্সের কথামতো সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপারটাকে আমরা সম্পূর্ণ সম্ভব করতে সক্ষম হয়েছি৷’ কিটসনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল মরগ্যান, ‘তুমি বলেছিলে, সবটাই আমার উর্বর মস্তিষ্কের উদ্ভট দিবাস্বপ্ন! তাহলে এখন কী মনে হচ্ছে তোমার?’
‘এতে এত হাসাহাসি করার কী আছে বুঝতে পারছি না!’ রাগতস্বরে বলে উঠল কিটসন, ‘মামলায় তুমি জিতেছ, কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী?’
মরগ্যান মুখ তুলে হালকা ধোঁয়া ছাড়ল৷ তাকে দেখে মনে হল, কিটসনের হতবুদ্ধি অবস্থাটা সে বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে৷
‘তার মানে আমার বক্তব্য তুমি মেনে নিচ্ছ?’ হাসল মরগ্যান, ‘যাক, তাহলে ট্রাকটাকেও আমি থামিয়েছি, এবং ডার্কসনকেও গাড়ির বাইরে বের করেছি৷ আচ্ছা, এবার তোমরা ভাব সেই বিপজ্জনক বাঁকটার কথা৷ ট্রাকটাকে ঠিক ওই জায়গাতেই আমি থামাতে চাই৷ তার কারণ অবশ্য একটা আছে৷ তা হল, ওই জায়গাটা রাস্তার দু-পাশ ছেয়ে আছে ছোট বড় অসংখ্য বুনো ঝোপে৷ তার আড়ালে দু-তিনজন লোক অনায়াসেই লুকিয়ে থাকতে পারে৷ এবার ডার্কসন নিশ্চয়ই নেমে এগিয়ে যাবে পড়ে-থাকা মেয়েটার দিকে৷ এখন কথা হচ্ছে, টমাস কি জানলা বন্ধ করে দেবে? কী মনে হয় তোমার?’ প্রশ্নটা কিটসনকে লক্ষ করেই৷ সুতরাং অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মাথা নাড়ল কিটসন, ‘এই গরমে জানলা বন্ধ করে তিরানব্বই মাইল ওরা পাড়ি দেবে বলে মনে হয় না৷’
শুধু ‘মনে হয় না’ নয়, জানলা খোলা রাখতে ওরা বাধ্য৷ কারণ বাইরের চেয়ে ইস্পাতের তৈরি ট্রাকের ভেতরে গরম হবে আরও বেশি৷ অতএব ট্রাকটা থামছে রাস্তার ধারের ঝোপগুলোর কাছে, যার আড়ালে দুজনে লোক সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে, ড্রাইভার উইন্ডশিল্ড দিয়ে তার সঙ্গীর কার্যকলাপ লক্ষ করছে এবং ডার্কসন এগিয়ে চলেছে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে৷ ওরা দুজনের কেউই বিপদের আশঙ্কা করছে না; কারণ এই বিপজ্জনক বাঁকের কথা ওরা ভালোভাবেই জানে৷ জানে, যে গত ছ-মাসে এখানে পাঁচ-পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ অতএব এই দুর্ঘটনাটাও ওদের কাছে নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার৷ ট্রাক থেকে ফুটদশেক দূরে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকব আমি৷ ডার্কসন যেই পড়ে থাকা মেয়েটার ওপর ঝুঁকে পড়বে, আমি ঝোপের আড়াল ছেড়ে ট্রাকের জানলার কাছে গিয়ে ড্রাইভারের রগে একটা রিভলভার চেপে ধরব৷ এবং ওই একই সময়ে পড়ে থাকা মেয়েটা লাফিয়ে উঠে ডার্কসনের পেটে রিভালভার ঠেসে ধরবে৷’ হাত বাড়িয়ে সিগারেটের ছোট টুকরোটা ছাইদানে গুঁজে দিল মরগ্যান, ‘এবার বলো, ডার্কসন এবং টমাস কী করবে? আত্মসমর্পণ করবে, না গুলি-ভরা রিভলভারের সামনেও ওরা বীরত্ব দেখাতে যাবে?’
‘যেতেও পারে, ওদের বিশ্বাস নেই৷’ শান্তস্বরে জবাব দিল কিটসন, ‘টমাস এবং ডার্কসন বড় সাংঘাতিক লোক?’
‘হতে পারে সাংঘাতিক, কিন্তু পাগল তো আর নয়৷ খোলা রিভলভারের সামনে অহেতুক বীরত্ব দেখানোর নির্বুদ্ধিতার পরিচয়৷ এবং সেটা ওরা ভালোভাবেই জানে৷’
কিছুক্ষণ কেটে গেল অখণ্ড জমাট নিস্তব্ধতায়৷ অবশেষে কাঁপাস্বরে বলে উঠল জিপো, ‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, এত সহজে যদি ওরা হার না মানে?’
মরগ্যান চোখ রাখল জিপোর চোখে৷ শয়তানি জিঘাংসায় পলকের জন্যে চকচক করে উঠল তার কালো চোখের তারা, ‘তাহলে ওদের দুঃখজনক ভবিষ্যতের কথা ভেবে সমবেদনা জানানো ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই!...যেখানে আমরা প্রত্যেককে দু-লক্ষ ডলার করে টোপে গাঁথছি, সেখানে সামান্য একটু আধটু রক্তপাত কিস্যু নয়!’
আরও কিছুক্ষণ নিটোল নিস্তব্ধতা৷ অবশেষে জিপোই আমার মুখ খুলল, ‘ফ্র্যাঙ্ক এসব আমার ঠিক ভালো লাগছে না৷ আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত এ কাজটা হয়তো আমরা পেরে উঠব না৷’
মরগ্যান অধৈর্যভাবে হাত নাড়ল, ‘ঘাবড়ে যেও না, জিপো, তোমাকে অকুস্থলে থাকতে হবে না৷ তোমার জন্যে আমি একটা বিশেষ কাজ ঠিক করে রেখেছি, এবং সে কাজ তোমার সামর্থ্যের বাইরে নয়৷ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি৷’
কিটসন ঝুঁকে এল টেবিলের ওপর ‘আর আমি? ওসব খুনোখুনির ঝামেলায় জড়াতে আমি একেবারেই রাজি নই, সেটা কিন্তু তোমাকে আগে থাকতেই বলে দিচ্ছি!’
মরগ্যান ফিরল ব্লেকের দিকে৷ সে তখন মাথা নিচু করে একটা সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত৷
‘তোমরা বক্তব্য কী, এড? দু-দুজন বীরপুরুষের কথা তো শুনলাম, এবার তোমারটা শুনি?’ কেটে কেটে বলল মরগ্যান৷
ব্লেক ঠোঁক বেঁকিয়ে হাসল৷ জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠিটাকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ছুড়ে দিল অন্ধকারে৷
‘দুধের খোকাদের কথা ছেড়ে দাও, ফ্র্যাঙ্ক৷ তবে আমার মনে হচ্ছে টমাস আর ডার্কসন কোনও ঝামেলা করবে না৷ আর নেহাতই যদি সাহস দেখাতে যায়, তাহলে একটা ট্র্যাজিক নাটকের শেষ দৃশ্যের জন্যে ওদের প্রস্তুত থাকতে হবে৷’
ব্লেকের কথায় মরগ্যান খুশি হল, বলল, ‘বাস্তবকে অস্বীকার করার মতো নির্বোধ আমি নই, এড৷ টমাস এবং ডার্কসনের নিয়তি স্বয়ং ভগবানের হাতে, আমরা নিমিত্ত মাত্র৷ তাহলে তুমি, আমি এবং মেয়েটি—এই তিনজনেই ট্রাক থামানোর ব্যাপারটা সামলাব৷ জিপো আর কিটসনের জন্যে কোনও হালকা কাজ ঠিক করা যাবে—তবে একটা কথা, সেই সঙ্গে ওদের পাওনা টাকার পরিমাণও কিন্তু কমে যাবে৷ কারণ আমরাই যখন সমস্ত ঝুঁকি নিচ্ছি, তখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের পাওনা কিছু বেশি হওয়া উচিত, তাই না?’
কিটসনের ভুরু কুঞ্চিত হল সংশয়ে৷ দু-লক্ষ ডলারের ভাবনা এর মধ্যেই তার মনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে৷
‘তাহলে আমাদের ভাগে কত করে পড়ছে জানতে পারি?
‘নিশ্চয়ই৷’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল মরগ্যান, ‘এক লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার পাবে তুমি৷ আর জিপোর কাজ যেহেতু কলকবজা সংক্রান্ত—’ হাত দিয়ে চাবি ঘোরানোর ইশারা করল মরগ্যান, ‘তাই সে পাবে এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার৷ তোমাদের দুজনের থেকে যে এক লক্ষ ডলার বাঁচবে, সেটা ভাগ হবে আমার আর এডের মধ্যে৷’
কিটসন ও জিপোর মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হল৷ সবাই নীরব৷ শেষে কিটসনই উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, ‘কিন্তু ওরা যদি কোনও ঝামেলা বাধায়, তাহলে আমাদের কেউ মারা যেতে পারে, মারা যেতে পারে টমাস অথবা ডার্কসন৷ নাঃ, কাজটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না৷ এতদিন যে সব কাজ আমরা করে এসেছি, সেগুলো ছোট হলেও তাতে কোনও ঝঞ্ঝাটের ভয় ছিল না৷ ধরা পড়লে বড়জোর বছর দুয়েক জেল খাটতাম৷ কিন্তু এবার ধরা পড়লে আমাদের আর নিস্তার নেই, সোজা ইলেকট্রিক চেয়ার! না, এসব খুনোখুনির মধ্যে আমি নেই৷’
‘আলেক্স ঠিকই বলেছে, ফ্রাঙ্ক,’ ভয়ার্তস্বরে বলল জিপো, খুনের দায় বড় দায়! আমি তাতে জড়াতে চাই না৷’
মরগ্যান হিংস্রভাবে হাসল, ‘ঠিক আছে, তাহলে ভোট হোক৷ কোনও কাজ নিয়ে মতের ফারাক দেখা দিলে আমরা বরাবরই ভোটের মাধ্যমে তার মীমাংসা করেছি৷ এক্ষেত্রেও তাই করা যাক৷’
‘তার আর কোনও প্রয়োজন নেই,’ তীক্ষ্ণ বলে উঠল কিটসন, ‘এড যদি তোমার পক্ষেও যায় তবু তুমি জিততে পারবে না, ফ্র্যাঙ্ক৷ কারণ তাহলে ভোটের ফলাফল দাঁড়াবে দুই-দুই৷ এবং তোমারই তৈরি নিয়ম অনুযায়ী কোনও কাজে ভোটের ফলাফল সমান-সমান হলে সে কাজটা আমরা করি না৷ আশা করি নিয়মটা তুমি ভুলে যাওনি?’
মরগ্যানের দাঁতের সারি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল৷ অর্ধস্ফুট শব্দে হেসে উঠল সে, ‘না, ভুলিনি৷ কিন্তু তাতে ভোটাভুটি করায় বাধাটা কোথায়? নিয়মমাফিক সব কাজ করাই আমি পছন্দ করি৷ তারপর নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে আমাদের সিদ্ধান্ত, রাজি?’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আমার কোনও আপত্তি নেই৷ শুধু শুধু সময় নষ্ট হবে বলেই বলছিলাম...’
মরগ্যান চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷ তার সুগঠিত পেশিবহুল দেহের বিশাল ছায়া টেবিলে আচমকা আছড়ে পড়ল৷
‘ভোটের কাগজগুলো তৈরি করো, জিপো৷’
জিপোর বৃত্তাকার মুখে পরিষ্কার হতবুদ্ধি ভাব৷ একটা নোটবই বের করে তার একটা পাতা ছিঁড়ল সে৷ তারপর সেটাকে ছুরি দিয়ে সমানভাবে চার-টুকরো করে কাটল৷ টুকরো কাগজগুলো এগিয়ে দিল টেবিলের ওপর, ‘এই নাও—’
মরগ্যান হালকা স্বরে কয়েকটা শব্দ ছুড়ে মারল, ‘মাত্র চারটে কাগজ কেন, জিপো?’
জিপো শূন্য চোখ মেলে তাকাল মরগ্যানের দিকে, তাকিয়েই রইল, ‘কেন, আমাদের তো বরাবর চারটেই কাগজ লাগে?’
মরগ্যান হাসল নরম করে, ‘দশ লক্ষ ডলার হবে পাঁচ ভাগ—মনে আছে? সুতরাং মেয়েটারও ভোট আছে একটা৷’
কথা শেষ করে মরগ্যান এগিয়ে গেল দরজার দিকে৷ এক ঝটকায় দরজা খুলে সে উষ্ণস্বরে কাউকে আহ্বান জানাল, ‘ভেতরে এসো জিনি৷ ওরা ওই কাগজটার ব্যাপারে ভোটাভুটি করতে চায়৷ সুতরাং বুঝতেই পারছ, তোমার ভোটটা আমার একান্ত প্রয়োজন৷
অন্ধকারের ছায়া ছায়া আবর্ত থেকে যেন হাওয়ায় ভর দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল জিনি৷ চোখ ঝলসানো সবুজ আলোর বৃত্তে মরগ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ও দেখতে লাগল হতবাক তিনজনকে৷ তারা অপলকে জিনিরই দিকে তাকিয়ে৷
জিনির বয়স খুব বেশি নয়; বাইশ তেইশের মধ্যে৷ সাধারণের তুলনায় লম্বা একটু বেশিই হবে৷ মাথার একরাশ তামাটে চুল যত্ন-সহকারে ফিতে দিয়ে বাঁধা৷ ওর আয়ত ধূসর-সবুজ চোখ সমুদ্রের মতোই গভীর অথচ অভিব্যক্তিহীন,স্ফুরিত ওষ্ঠাধরে এক অদ্ভুত নেশা৷ উদ্ধত চিবুকে দৃঢ়তার ভাষা সোচ্চার৷ সব মিলিয়ে এক জীবন্ত চাবুক৷
জিনির পরনে একটা রঙচঙা রেশমি শার্ট, আর কালো স্কার্ট৷ স্ফীত বক্ষসৌন্দর্যের তুলনায় কটিদেশ অত্যন্ত ক্ষীণ৷ সুঠাম নিতম্বের ঢাল গিয়ে মিশেছে আকষর্ণীয়; সুগঠিত দুপায়ের প্রান্তে৷ রুই মাছের টোপ গেলার মতো বিস্ফারিত চোখে ব্লেক, জিপো এবং কিটসন তখনও জিনির দিকে তাকিয়ে৷ যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোনও ইতালীয় অভিনেত্রীর দেহসৌষ্ঠব৷
মরগ্যানের শীতল কালো চোখজোড়া খেলে বেড়াল হতভম্ব তিনজনের মুখে, হেসে উঠল সে৷ মরগ্যান জানত, জিনির আকস্মিক উপস্থিতি ওদের স্বাভাবিক চিন্তাধারাকে পঙ্গু করে দেবে৷ সেই আকস্মিক মানসিক সংঘর্ষের পরিণতি দেখার জন্যে মরগ্যান যথেষ্ট কৌতূহলী ছিল, এখন দেখল৷
জিপোর ডান হাত যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গেল তার লাল টাইয়ের দিকে৷ টাইয়ের নটটাকে নেড়েচেড়ে ঠিক করল৷ আর একই সঙ্গে পুরু ঠোঁটের আবরণ সরিয়ে তার ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি আত্মপ্রকাশ করল। বাঁকা চোখে জিনির দিকে চেয়ে হেসে উঠল জিপো।
ব্লেক এরকম অবস্থার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে ভুরু উঁচিয়ে ঠোঁট কুঁচকে শিস দেওয়ার ভঙ্গি করল। তার বিবর্ণ চোখের তারায় শূন্য দৃষ্টি।
কিটসনের অবস্থা পুরোপুরি আচ্ছন্ন। যেন একটা বিশমনি হাতুড়ি কেউ সপাটে বসিয়ে দিয়েছে তার ব্রহ্মতালুতে। সে যেন নীরবে গুনে চলেছে আসন্ন মৃত্যুর প্রহর।
মরগ্যানের স্বরে ওদের চমক ভাঙল, ‘এই হল জিনি গর্ডন।’
এক মুহূর্তের দ্বিধা। পরক্ষণেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ব্লেক, দেখাদেখি জিপোও। কিন্তু কিটসন বসে রইল। তার বলিষ্ঠ হাতের আঙুল উৎকণ্ঠায় মুষ্টিবদ্ধ। চোখের তারা স্বচ্ছ কাচের মতো, মুখের ভাব তখনও হতচকিত, অনিশ্চিত।
‘ডান দিক থেকে শুরু করছি।’ বলে চলল মরগ্যান, ‘এ হল এডওয়ার্ড ব্লেক। আমার অনুপস্থিতিতে দলের ভার থাকে ওরই হাতে।...জিপো ম্যানডিনি, আমাদের কলকবজা বিশারদ প্রতিভাধর—‘মরগ্যান হাসল, ‘আর সবশেষে আলেক্স কিটসন—গাড়ি চালাতে ওর জুড়ি নেই।’
বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে পেল কিটসন। এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ধাক্কায় আরেকটু হলেই উল্টো পড়ছিল টেবিলটা। কিন্তু কিটসন সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপই করল না। সম্মোহিতের দৃষ্টি নিয়ে সে তখনও জিনিরই দিকে তাকিয়ে, হাতের তালু মুষ্টিবদ্ধ।
জিনির চঞ্চল চোখ পলকের জন্যে থামল তিনজনের চোখে। তারপর একটা চেয়ার টেনে সে বসল মরগ্যানের পাশে।
‘প্ল্যানটা আমি মোটামুটি ওদের খুলে বলেছি।’ জিনির পাশে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘ওদের দুজনের ধারণা কাজটা নাকি আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমাদের নিয়ম হল,কোনও কাজ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতের ফারাক হলে আমরা ভোটের সাহায্যে ব্যাপারটা মেটাই। সুতরাং এক্ষেত্রেও ভোট নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’
জিনিস মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল সংশয়ের রেখা, সেই সঙ্গে একটু অবিশ্বাসের হাসি, ‘ তার মানে? তুমি বলতে চাও, দুলাখ ডলার নিতে রাজি নয় এমন গর্দভও পৃথিবীতে আছে?’ জিনির স্বর শীতল, অচঞ্চল।
‘না, ঠিক তা নয়,’ হাসল মরগ্যান, ‘ওদের ধারণা, এ কাজটায় রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই...’
জিনি গর্ডন অবাক চোখে তাকাল জিপোর দিকে, তারপর ওর ধূসর-সবুজ চোখের তারা স্থির হল ব্লেকের চোখে; সবশেষে গিয়ে থামল কিটসনের মুখমণ্ডলে। যেন মনে মনে প্রত্যেককে জরিপ করে দেখল, ‘ও—তোমার দলের যে এই অবস্থা তা কে জানত?’ কথাটা মরগ্যানকে লক্ষ করেই। কিন্তু তার খোঁচা গিয়ে লাগল কিটসনের পৌঁরুষে। সে অস্বস্তিভরে মুখ ফিরিয়ে নিল; অপমানে তার কান দিয়ে যেন ছুটল আগুনের হলকা।
সেটা তো আমিও ভাবছি।’ মরগ্যানের হাসি আরও বিস্তৃত হল, ‘আমাদের হাতে এই প্রথম একটা বড় কাজের সুযোগ এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন, জিপো আর কিটসনের কাজটা মোটেই পছন্দ হচ্ছে না।’
এবার উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে উঠল জিনি, ‘হ্যাঁ শুধু সুযোগ নয়—সুবর্ণ সুযোগ। দশ লক্ষ ডলার ছেলেখেলার কথা নয়! তুমি বলছিলে, এ কাজে তোমার দল আমাকে সবরকমের সাহায্য করবে। এবং তাও বিনাস্বার্থে নয়; কিন্তু এখন যা দেখছি, তাতে বুঝতে পারছি এখানে আসাই আমার ভুল হয়েছে। এখন তুমি আবার ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছ কাজটা করবে কি না? হুঁ যত সব ন্যাকামো!’
ওরা তিনজনে চমকে উঠল। মেয়েটার মুখে এমন রুক্ষ, অপমানজনক কথা শুনে মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
মেয়েদের সঙ্গে পশুসুলভ আচরণের ব্যাপারে ব্লেকের যথেষ্ট কুখ্যাতি আছে। সে আর থাকতে না পেরে বলে উঠল,—‘বক্তৃতার পরিমাণটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, সুন্দরী! এবার দয়া করে একটু চুপ করো দেখি!’
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জিনি ওর সুন্দর মুখে বরফের কাঠিন্য।
‘মনে হয় এখানে এসে আমি ভুল করেছি।’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল, ‘আচ্ছা—তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হোক। এই প্ল্যানটা নিয়ে আমি সাহায্য চাইব এমন লোকের কাছে, যাদের শরীরের প্রতিটি শিরায় বইছে রক্ত। তোমাদের মতো অপদার্থ কাপুরুষদের সঙ্গে কথা বলে আমি খামোখা সময় নষ্ট করতে চাই না।’
কথা শেষ করে দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগোল জিনি।
হাত বাড়িয়ে ওর হাত চেপে ধরল মরগ্যান—ওকে থামাল৷
‘উত্তেজিত হয়ো না, জিনি৷’ হাসল সে, ‘এতে ওদের কোনও দোষ নেই৷ এ ধরনের কাজ একেবারে প্রথম বলে একটু অস্বস্তি বোধ করছে৷ কিছু সময় দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷ এই জিপো ম্যানডিনি তালা খোলায় এ শহরের সবচেয়ে সেরা কারিগর৷’ জিপোর পিঠে হাত রাখল মরগ্যান, ‘এড বুদ্ধি-বিবেচনায় আমার চেয়ে কিছু কম যায় না৷ আর আলেক্সের মতো গাড়ি চালাতে জানে এমন লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই৷ তবে রক্তারক্তি ব্যাপারটা ওরা ঠিক পছন্দ করে না৷’
‘তাই নাকি?’ অপলকে তিনজনের মুখে চোখ বুলিয়ে নিল জিনি, ‘তাহলে দশ লাখ ডলারের বেলায় ওদের পছন্দ-অপছন্দ যাচ্ছে কোথায়? বুক পকেটে? ... হুঁ, এইসব হরিদাস পালের গোয়াল নিয়ে তুমি দল তৈরি করেছ? তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, ফ্র্যাঙ্ক!’ জিনির কর্কশ স্বর প্রত্যেকের কানে ঢেলে দিল গরম সীসে, ‘এ দু-দশ ডলারের ব্যাপার নয়, পুরো দশ লক্ষ ডলার৷ সেক্ষেত্রে কার কী হল না হল, অত দেখতে গেলে চলে না, সেটা ওদের ভালো করে বুঝিয়ে দাও৷’
মরগ্যানের হাত ছাড়িয়ে আলোর আওতায় এসে দাঁড়াল জিনি৷ সরাসরি চোখ রাখল কিটসনের চোখে, ‘দু-লক্ষ ডলারের চেয়ে আহত হবার ভয়টাই কি তোমার কাছে বেশি হল? উত্তর দাও আমার প্রশ্নের?’
জিনির আগুনঝরা অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে গেল কিটসন৷ মৃদুস্বরে জবাব দিল, কাজটা আমাদের পক্ষে অসম্ভব৷ ওয়েলিং কোম্পানিতে আমি কিছুদিন চাকরি করেছিলাম৷ সুতরাং টমাস এবং ডার্কসনকে আমি ভালোমতোই চিনি৷ এত সহজে ওরা হার মানবে না৷...যেখানে খুনোখুনির সম্ভাবনা আছে, সেখানে আমি নেই৷’
‘ঠিক আছে, তাহলে তোমাকেও আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷’ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল জিনি, ‘অতএব তোমার এই হারকিউলিস মার্কা চেহারা নিয়ে নিঃসঙ্কোচে কেটে পড়তে পার৷ আমরা কেউ বাধা দেব না৷’
কিটসনের মুখে নেমে এল অপমানের কালো ছায়া৷ উত্তেজিতভাবে সে বলে উঠল, ‘মুখ সামলে কথা বলো৷ আমি বলছি এ কাজটা অসম্ভব৷ তোমরা মিথ্যে স্বপ্ন দেখছ৷
হাওয়ায় তর্জনী নাচিয়ে দরজার দিকে ইশারা করল জিনি, ‘দেখছিই তো! নইলে তুমি এখনও এখানে বসে রয়েছ কেমন করে? যাও, বাড়ি গিয়ে মায়ের কোলে বসে ‘ডুডু’ খাও৷ তোমাকে আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷’
চেয়ার ঠেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল কিটসন৷ তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ স্পষ্ট কানে এল৷ দাঁতে দাঁত চেপে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল জিনির কাছে৷ ও তখনও একইভাবে সোজা হয়ে দৃপ্তভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে৷ চোখের দৃষ্টি কিটসনের চোখে নিবদ্ধ৷
অবশিষ্ট তিনজন রুদ্ধশ্বাসে ওদের দেখতে লাগল৷ ব্লেকের চোখে চিন্তার ছায়া৷ কারণ সে জানে, উত্তেজিত হলে কিটসনের আর মাথার ঠিক থাকে না৷ জিপো ভুরু কুঁচকে অস্বস্তিভরা দৃষ্টিতে ওদের লক্ষ করছিল৷ কিন্তু মরগ্যানের মুখের হাসি তখনও মিলিয়ে যায়নি৷
কোনও শালা আজ পর্যন্ত এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে সাহস পায়নি৷’ জিনির মুখোমুখি এসে থামল কিটসন৷ দু-হাতের আঙুল অস্থির উত্তেজনায় হাওয়া আঁকড়ে ধরছে৷
কিটসনের বিশাল চেহারার কাছে জিনি যেন এক ছোট্ট পুতুল৷ কিন্তু ওর দৃপ্ত চাবুকের মতো ভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় কেউটের শীতল চাউনিকে৷ আর আলেক্স কিটসনের অপমানিত পৌঁরুষ বুঝি আহত বাঘের মতোই ক্ষিপ্ত ভয়ঙ্কর৷ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!
ঘৃণাভরা চোখে কিটসনকে দেখল জিনি৷ শান্তস্বরে বলে উঠল, ‘তুমি যদি আমার কথা বুঝতে না পেরে থাক, তাহলে আবার বলছি৷ যাও, বাড়ি গিয়ে মায়ের কোলে বসে ‘ডুডু’ খাও৷ তোমাকে আমাদের কো-ন-ও প্রয়োজন নেই৷’
এক চাপা গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে কিটসনের ডান হাত ক্ষিপ্রবেগে এগিয়ে এল জিনির দিকে—কিন্তু মাঝপথেই সে নিজেকে সামলে নিল, নামিয়ে নিল, তার উদ্যত হাত৷
‘কী হল, থামলে কেন, মারো৷’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল জিনি, ‘তোমার মতো অত প্রাণের ভয় আমার নেই!’
মরগ্যান হঠাৎ হেসে উঠল হো হো করে৷
কিটসন মাথা নিচু করেই আপন মনেই কী যেন বিড় বিড় করল৷ তারপর শ্লথপায়ে এগিয়ে চলল ঘরের দরজার দিকে৷
‘কিটসন!’ মরগ্যানের কর্কশ স্বরে সকলে চমকে উঠল, ‘এখানে এসে বসো৷ ভোট তোমাকে দিতেই হবে৷ তুমি যদি এই মুহূর্তে দল ছেড়ে চলে যাও, তবে এর পরিণতির জন্যে আমি কিন্তু দায়ী থাকব না!’
কিটসন ইতস্তত করল কিছুক্ষণ তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এল টেবিলের কাছে৷ বসল চেয়ারে৷ মুখভাব গম্ভীর দ্বিধাগ্রস্ত৷
মরগ্যান ঘুরল জিপোর দিকে, ‘আর একটা ভোটের কাগজ জিপো—’
নোট বইয়ের পাতা কেটে আর এক টুকরো কাগজ মরগ্যানের দিকে এগিয়ে দিল জিপো৷
ব্লেক বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিল, এবারে বলে উঠল, ‘ভোট দেবার আগে কাজটা সম্বন্ধে আরও কয়েকটা কথা আমি জানতে চাই, ফ্র্যাঙ্ক৷ এই মেয়েটা এ সবের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল কেমন করে?’ জিনির দিকে বুড়ো আঙুল ঝাঁকিয়ে ইশারা করল ব্লেক৷
‘গত পাঁচ মাস ধরে আমি শুধু এই ট্রাকটাকে সাফ করার মতলব ভেঁজেছি!’ মরগ্যান বলল, কিন্তু অনেক ভেবেও কোনও উপায় খুঁজে পাইনি৷ হঠাৎ মাস তিনেক আগে জিনি এল আমার কাছে৷ এবং ট্রাক লুটের একটা সাজানো-গোছানো প্ল্যান ফেলে দিল আমার কোলে৷ সত্যি বলতে কী এর পুরো কৃতিত্বই জিনির৷ যে কারণে দশ লাখ ডলারকে ভাগ করা হচ্ছে পাঁচ ভাগে৷ ও সমস্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাপারটাকে ভেবেছে এবং সেই অনুযায়ী তৈরি করেছে ওর নিখুঁত প্ল্যান৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওর প্ল্যানে কোনও ফাঁক নেই৷’
ব্লেক একবার তাকাল জিনির দিকে৷ বলল, ‘তোমার বাড়ি কোথায়, খুকি... আর এই ট্রাক-লুটের দুর্বুদ্ধিই বা তোমার মাথায় এল কেমন করে?’
মেয়েটি ওর সস্তা ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে আনল। সেই সঙ্গে একটা দেশলাই। সিগারেট ধরিয়ে অভিব্যক্তিহীন শীতল দৃষ্টিতে ও তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘আমার বাড়ির খবর জেনে তোমার কী লাভ হবে তা বুঝতে পারছি না?’ দৃঢ়স্বরে বলল জিনি, ‘আর ট্রাক লুটের পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করছ?...টাকার প্রয়োজন হঠাৎ খুব বেড়ে ওঠায় প্ল্যানটা হঠাৎই মাথায় গজিয়ে উঠেছে। এবং আমাদের যখন পরস্পরের নামটা অজানা নয়, তখন নাম ধরে ডাকাটাই আমি পছন্দ করি। ওই ন্যাকা-ন্যাকা স্বরে খুকু বলাটা ছাড়ো দেখি!’
ব্লেক দাঁত বের করে হাসল। মেয়েমানুষের তেজ বরাবরই তাকে আকর্ষণ করেছে।
‘নিশ্চয়ই, তুমি যখন পছন্দ করো না সেটা কি আমার করা সাজে? কিন্তু একটা কথা—আমাদের দলের খবর তোমাকে কে দিল? আর আমরাই যে এই কাজের জন্যে সবচেয় উপযুক্ত লোক, সেটাই বা জানলে কেমন করে?’
আঙুল তুলে জিনি দেখাল জিপোর দিকে, ‘তার কারণ জিপো। আমি খোঁজ-খবর করে জেনেছিলাম, তালা খোলার ব্যাপারে ওর চেয়ে ওস্তাদ কারিগর এ শহরে আর নেই; এবং এ কাজে আমাদের সব থেকে প্রয়োজন সেটাই। আর শুনলাম তোমার কথা। তোমার মতো ঠান্ডা রক্তের দুঃসাহসী লোক নাকি খুব কমই আছে। মরগ্যানের আছে বুদ্ধি, সেই সঙ্গে দল পরিচালনার অদ্ভুত ক্ষমতা। তাছাড়া গাড়ি চালানোর কথা ওঠায় কিটসনের নামটাই সব আগে ওদের মনে এসেছে। সুতরাং তোমাদের এখানে না এসে পারি কী করে?’
জিপোর মুখমণ্ডলে অস্বস্তির মেঘ কেটে গিয়ে ফুটে উঠল হাসির রেখা। প্রশংসা শুনতে সে বরাবরই ভালোবাসে; বিশেষত একজন সুন্দরী তরুণীর মুখ থেকে। নাঃ, জিনি মিথ্যে বলেনি—ভাবল জিপো। তার সঙ্গে অন্য কোনও কারিগরের কোনওরকম তুলনাই হয় না। কারণ জিপো ম্যানডিনি তালার লাইনে একমেবাদ্বিতীয়ম!
কিটসনের মুখ থেকে ক্রোধের ইশারা মিলিয়ে গেল। অপ্রতিভভাবে সে চোখ নামিয়ে নিল টেবিলের দিকে। চেয়ে রইল হুইস্কির গ্লাসের বৃত্তাকার ভিজে ছাপটার দিকে।
‘ওরা, মানে কারা?’ সন্দেহাকুলকণ্ঠে জানতে চাইল ব্লেক।
‘বহু জায়গায় আমি উপযুক্ত লোকের খোঁজ করেছি। তারপর জেনেছি তোমাদের নাম। সেক্ষেত্রে বেছে বেছে কারও নাম করা মুশকিল।’ ডিনি ব্লেকের এই অর্থহীন অবান্তর প্রশ্নে বিরক্তি হল, ‘আমরা শুধু শুধুই সময় নষ্ট করছি । আমি ভেবেছিলাম বুঝি ঠিক লোকের কাছেই এসেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার হয়তো ভুল হলেও হতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে আমাকে অন্য কোথাও দেখতে হবে!’
জিনির দিকে চোখ রেখে একটি সিগারেট ধরাল ব্লেক ‘আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি। ওই ট্রাকটাকে থামাতে তোমাকেই যদি রাস্তায় শুয়ে অভিনয় করতে হয়, তাহলে মানতে দ্বিধা নেই, সবচেয়ে দুঃসাহসিক কাজটাই তুমি নিজের জন্যে বেছে নিয়েছ৷ এটাও কি তোমারই প্ল্যান নাকি?’
‘নিশ্চয়ই!’
‘আচ্ছা, আবার দেখা যাক তোমাকে কী-কী করতে হবে৷... তুমি রাস্তার ঠিক মাঝখানে শুয়ে থাকবে৷ তোমার কাছে লুকোনো থাকবে একটা রিভলভার৷ ডার্কসন যেই তোমার কাছে এগিয়ে আসবে, অমনি তুমি রিভলভার চেপে ধরবে ওর তলপেটে—তাই তো?’
জিনি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল৷
‘এতে কিন্তু যথেষ্ট বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে৷ এবং ব্যাপারটা যতটা সহজ ভাবছ, ততটা সহজ নাও হতে পারে৷’ ব্লেক বলল, ‘এক্ষেত্রে দুটো জিনিস ঘটতে পারে৷ হয় ডার্কসন সরাসরি হাত তুলে তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো তোমাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে রিভলভারটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করবে৷ ডার্কসন সম্বন্ধে আমি যতটুকু শুনেছি অত সহজে হাল ছাড়ার লোক সে নয়৷ ও হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ে তোমার রিভলভারটা কেড়ে নিতে চাইবে’ তখন?
জিনি শান্তভাবে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল৷
‘দশ লক্ষ ডলার নেহাত অল্প নয়—’ শীতল, নির্বিকার স্বরে জবাব দিল জিনি গর্ডন, ‘অতএব ডার্কসন যদি ভালোয় ভালোয় পোষ না মানে, তবে ওকে গুলি করা ছাড়া আমার আর উপায় থাকবে না৷’
জিপো পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল৷ জিভটাকে একবার বুলিয়ে নিল শুকনো ঠোঁটের ওপর, অস্বস্তিভরে একবার দেখল মরগ্যানের দিকে, তারপর তাকাল কিটসনের দিকে৷
‘জিনি ঠিকই বলেছে৷’ মরগ্যান ওদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, ‘দশ লক্ষ ডলারের জন্যে ওসব সামান্য ব্যাপারে নজর দিলে চলে না৷ তাছাড়া বাস্তবকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই৷’
ব্লেক গভীর দৃষ্টিতে জিনিকে লক্ষ করছিল৷ না, মেয়েটা মিথ্যে কথা বলছে না৷ বাপ রে! এ যে দেখছি কেউটের বাচ্চা। ডার্কসন যদি কিছু গড়বড় করার চেষ্টা করে, তবে ওর কপালে অশেষ দুর্গতি আছে দেখছি৷ অবশ্য মেয়েটার চোখের দিকে তাকালেই সে বুঝতে পারবে মেয়েটা রিভলভার হাতে নিছক মশকরা করছে না৷ আর একান্তই যদি বুঝতে না পারে তবে যিশুই ভরসা৷ অন্তত আমি হলে সে চেষ্টা করতাম না৷ নড়াচড়া তো দূরের কথা, ওর রিভলভারের সামনে নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় পেতাম৷
‘না, তা নয়—আমি শুধু খোলাখুলি ব্যাপারটা জানতে চাইছি৷’ একটা সিগারেট নিয়ে টেবিলে বার কয়েক ঠুকল ব্লেক, ‘এবার তোমার মতলবের বাকিটা শোনা যাক, ফ্র্যাঙ্ক৷’
মরগ্যান মাথা নাড়ল, ‘উঁহু, ভোট দেওয়ার আগে সে বিষয়ে আর একটা কথাও জানার উপায় নেই৷ জিনির সঙ্গে আমার সেইরকম শর্তই হয়েছে৷ তবে ও বলেছে, ট্রাক-লুটের প্ল্যান নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই৷ সবটাই ও দাবার ছকের মতো পরিষ্কার করে সাজিয়ে রেখেছে৷ আমি তোমাদের এখন যা বললাম সেটা মোটামুটি প্ল্যানের মূল ব্যাপারটা৷ যদি আমরা জিনিকে সাহায্য করতে রাজি থাকি, তবেই ও বাকি অংশটা আমাদের শোনাবে; তার আগে নয়৷ আর যদি আমরা রাজি না হই, তবে তো মিটেই গেল৷ ও তখন অন্য কোনও দলের কাছে যাবে৷... আমি তো এই প্রস্তাবে আপত্তি করার কিছু দেখছি না৷ তোমরা কী বল?’
‘কিন্তু সত্যিই কি প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে?’ ব্লেক প্রশ্ন করল, ‘আমার তো মনে হয় সেটা সম্ভব নয়৷ এখন পর্যন্ত আমরা শুধু ট্রাকটা থামাতে পেরেছি, আর টমাস আর ডার্কসনকে কব্জা করেছি, তার বেশি কিছু নয়৷ অবশ্য খানিকক্ষণ আগে এটাকেও আমরা অসম্ভব বলে মনে করছিলাম৷ কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তোমার কথা যদি সত্যি হয়, মানে ট্রাকটা যদি ট্রান্সমিটারের সাহায্যে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে থাকে, তাহলে তো ব্যাপারটা ভীষণ ঘোরালো হয়ে দাঁড়াবে৷ যে মুহূর্তে ট্রাকের সঙ্গে ট্রান্সমিটারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে এজেন্সির লোকেরা পুলিশে খবর দেবে৷ আর ওরা তো জানেই ট্রাকটাকে কোথাও পাওয়া যাবে৷ তাছাড়া শুধু পুলিশ নয়, সেনাবাহিনীর লোকেরা পর্যন্ত আমাদের পেছনে লাগবে৷ মানে শয়ে শয়ে লোক হেলিকপ্টার ও গাড়ি নিয়ে আমাদের খুঁজে বেড়াবে৷ আর এই সামান্য তিরানব্বই মাইল চক্কর দিয়ে আমাদের খুঁজে বের করতে একটা হেলিকপ্টারের মিনিট কয়েকের বেশি লাগবে না৷ তুমি তো ভালোভাবেই জানো, ওই রাস্তায় ট্রাক নিয়ে লুকোবার কোনও জায়গাই নেই, যাও আছে, তাও প্রায় পঁচিশ মাইল দুরে৷ আমি তো বুঝতেই পারছি না, কেমন করে আমরা ট্রাক লুট করে টাকা নিয়ে সরে পড়ব৷ নাঃ, ওদের চোখে ধুলো দেওয়া একেবারেই অসম্ভব৷’
মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকল, ‘আমিও সেই কথাই ভাবছিলাম৷’ কিন্তু জিনি বলছে, জিনির দিকে মাথা নেড়ে ইশারা করল মরগ্যান, ‘ও নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোনও দরকার নেই৷ সমস্ত কিছু ও ছকে রেখেছে৷’
ব্লেক তাকাল জিনির দিকে, ‘তাই নাকি? এই জটিল সমস্যার উত্তরও তুমি জানো?’
‘হ্যাঁ, নির্বিকার শীতলস্বরে বলল জিনি, ‘এইটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই জিতেছি৷ আমি জানি ট্রাকটাকে নিয়ে কিভাবে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে হবে৷’
জিনির আশ্বাসভরা দৃঢ়স্বরে কিটসন পর্যন্ত বিচলিত হল৷ সে এতক্ষণ নির্বিকারভাবে চুপচাপ বসে শুনছিল ওদের কথাবার্তা৷ কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে হল নাঃ, কাজটা জিনির পক্ষে অসম্ভব নাও হতে পারে!
ব্লেক সামনে হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকা, ‘ঠিক আছে৷ ঠিক আছে৷ তোমার কথাই আমি বিশ্বাস করলাম৷ কিন্তু এই অদ্ভুত সমস্যার সমাধান কেমন করে করলে তাই ভাবছি৷...অবশ্য এখনও দুটো জিনিস আমরা ভেবে দেখিনি৷ এক নম্বর হল, আমরা ট্রাক থামিয়ে যখন টমাস আর ডার্কসনকে কায়দা করব, তখন যদি অন্য কোনও গাড়ি ঘটনাস্থলে এসে পড়ে, তাহলে? মানছি, এমনিতে ওই রাস্তা দিয়ে খুব একটা গাড়ি-টাড়ি যায় না, কিন্তু হঠাৎ এসে পড়তে কতক্ষণ৷ ব্যস, তাহলেই চিত্তির৷’
জিনির মুখে নেমে এল বিরক্তির আভাস৷ ভাবলেশহীন মুখে ও চেয়ারে গা এলিয়ে দিল৷’ আঁটোসাঁটো লাল শার্টের নীচে প্রকট হয়ে উঠল ওর উদ্ধত বুক৷
‘সে নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই৷ তুমি তো জানো, দুটো রাস্তা পাশাপাশি গিয়ে দশ নম্বর সড়কে মিশেছে৷ এখন ট্রাকটা যেই ওর রোজকার রাস্তায় ঢুকবে, অমনি আমরা একটা রোড-সাইন বসিয়ে দেব জোড়া রাস্তার মুখে৷ তাতে তীরচিহ্ন দিয়ে অন্যান্য গাড়িদের নির্দেশ করা হবে পাশের রাস্তা ব্যবহার করার জন্যে, তাহলেই অন্য আর কোনও গাড়ি ওই রাস্তা দিয়ে আসবে না৷ অর্থাৎ, ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন নয়, তাই না?’
ব্লেক একগাল হাসল৷ খুশি উপচে পড়ল ওর চোখমুখে৷
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, একেবারে জলের মতো সহজ৷ কিন্তু মেহেবুব, এই সমস্যাটার সমাধান করো দেখি ঃ ধরে নিলাম ট্রাকটা দখল করে আমরা বেশ একটা জুতসই জায়গায় গা ঢাকা দিলাম৷ কিন্তু তারপর ট্রাকের তালাটা খুলব কী করে? ফুসমন্তরে? কিটসন বলছে, ওটার তালা খোলার চেয়ে যুদ্ধ জয় করা অনেক সহজ৷ তাছাড়া আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে৷ উঁহু, ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়!’
জিনি মাথা ঝাঁকাল৷
‘সেটা ওর মাথাব্যথা ও বুঝবে৷’ জিপোর দিকে ইশারা করে বলে উঠল জিনি, তালার ব্যাপারে ও একজন ওস্তাদ! সুতরাং সে দায়িত্বটা ওরই, আমাদের নয়৷ আমরা শুধু ট্রাকটা ওর কাছে এনে দেব, তারপর যত সময় লাগে লাগুকা ইচ্ছে হলে এক মাস, চাই কী দু-মাসও জিপোকে দেওয়া হবে৷’ জিনির ডাগর সবুজ চোখ ঘুরল জিপোর দিকে, ‘কী হে,পারবে না এক মাসে ওই ট্রাকের তালাটা খুলে ফেলতে?’
জিপোর অবস্থা তখন দেখে কে! প্রশংসায়-প্রশংসায় সে যেন রঙিন শূন্যে ভাসছে৷ জিনির প্রশ্নের উত্তরে সাততাড়াতাড়ি ঘাড় নাড়ল সে, ‘পারব না মানে? এক মাস সময় পেলে আমি নক্স দুর্গের সমস্ত দরজা খুলে ফেলতে পারব৷’
‘তোমাকে একমাস সময়ই দেওয়া হবে৷’ বলল জিনি, ‘এবং তাতেও যদি না হয়, তবে আরও এক মাস৷ সময় আমাদের ভাবনার কারণ হবে না৷’
‘ব্যস, এ নিয়ে আর কথা নয়৷’ মরগ্যান বলল, ‘আগেই তো বলেছি, জিনি সব সমস্যার সমাধান করে রেখেছে, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওর প্ল্যানে কাজ হবে৷ এসো, এবার ভোট দেওয়া যাক৷ তবে আবারও বলছি, একটু-আধটু রক্তপাতের জন্যে প্রত্যেককেই তৈরি থাকতে হবে৷ অর্থাৎ দু-পক্ষেরই কেউ-না-কেউ আহত হতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে৷ যদি টমাস বা ডার্কসনের কেউ মারা যায় তবে, আমরা জড়িয়ে পড়ব খুনের জালে৷ অথবা যদি সামান্য কোনও ভুলের জন্যে আমরা ধরা পড়ি, তবে নির্ঘাত দশ থেকে বিশ বছরের জেল—সে বিষয়ে আমার একটুও সন্দেহ নেই৷ আর অন্যদিকে রয়েছে সোনালি দুনিয়ার হাতছানি ঃ নগদ দু লাখ ডলার৷ মোটামুটি আমাদের অবস্থাটা এই৷... তোমাদের যদি আর কোনও প্রশ্ন না থাকে, তাহলে এবার ভোট নেবার কাজ শুরু করা যাক৷’ মরগ্যান থামল৷ একবার দেখন তিনজনের দিকে৷ ‘তবে একটা কথা মনে রেখো, ভোটের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত আমরা নেব, সেটাই কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত৷ আমাদের দলের নিয়ম-কানুন তো তোমরা ভালোমতোই জানো, ভোটে যে পরাজিত হবে, তাকে আমাদেরই সঙ্গে কাজ করতে হবে, নয়তো চিরদিনের জন্যে দল ছেড়ে চলে যেতে হবে৷ তোমাদের তাড়াহুড়ো করার কোনও প্রয়োজন নেই৷ বেশ ধীরেসুস্থে ভেবেচিন্তেই তোমরা সিদ্ধিান্ত নাও৷ মনে রেখো জমার খাতায় দু-লাখ ডলার, আর খরচের খাতায় দশ-বিশ বছরের জেল—হয়তো বা ইলেকট্রিক চেয়ার! অতএব ইচ্ছে করলে তোমরা আরও কিছুক্ষণ সময় নিতে পার—পুরো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখো ভালো করে৷’
কথা শেষ করে মরগ্যান প্রথমে তাকাল ব্লেকের দিকে, সে তখন জিনির দিকে তাকিয়ে—দুচোখে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দনের দীপ্তি৷ জিপোর দিকে ফিরল মরগ্যান৷ জিপো মাথা নিচু করে, ভুরু কুঁচকে, এক গভীর চিন্তায় মগ্ন৷ শূন্য দৃষ্টি টেবিলে নিবদ্ধ৷
আলেক্স কিটসন একদৃষ্টে চেয়ে আছে জিনির দিকে৷ কানে আসছে তার ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ৷
‘এসো তাহলে ভোট দেওয়া যাক৷’ ব্লেক আহ্বান জানাল, এবং একই সঙ্গে হাত বাড়িয়ে এক টুকরো কাগজ তুলে নিল।
জিনিও নিঃশব্দে তুলে নিল এক টুকরো কাগজ। বাকি তিন টুকরো কাগজ হাতে তুলে নিল মরগ্যান। একটা এগিয়ে দিল কিটসনের দিকে, আর একটা জিপোর দিকে, তারপর পকেট থেকে একটা কলম বের করে অবশিষ্ট কাগজের টুকরোয় কী যেন লিখতে লাগল। লেখা হয়ে গেলে কাগজটা ভাঁজ করে রাখল টেবিলের মাঝখানে।
জিনি ফ্র্যাঙ্কের কলমটা চেয়ে নিল। লেখা শেষ করে কাগজটা এগিয়ে দিল মরগ্যানের রাখা কাগজের পাশে।
হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে মুহূর্ত কয়েক কী যে ভাবল জিপো। অবশেষে একটা ভোঁতা পেনসিল বার করে দ্রুত হাতে লিখতে শুরু করল। লেখা হয়ে গেলে কাগজটা ভাঁজ করে টোকা মেরে এগিয়ে দিল অন্য কাগজগুলোর কাছে।
রইল বাকি শুধু কিটসন। দ্বিধাগ্রস্তভাবে সে তখনও তার হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে। জিনি এবং অন্য তিনজন তাকে একাগ্র দৃষ্টিতে লক্ষ করছে।
‘সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাব, আলেক্স। তাড়াহুড়ো করে কিছু করে বসো না।’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘ভাববার জন্যে এখনও গোটা রাতটাই পড়ে আছে!’
কিটসন চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। তারপর চোখ রাখল জিনির মুখে। কয়েক মুহূর্ত ওরা চেয়ে রইল পরস্পরের দিকে; তারপর হঠাৎ মরগ্যানের কলমটা তুলে নিল কিটসন। হিজিবিজি কী সব লিখে কাগজটা ভাঁজ করল, রাখল অন্য কাগজগুলোর ওপর।
কিছুক্ষণ বরফ-শীতল নিস্তব্ধতা। তারপর একসময় মরগ্যানই হাত বাড়িয়ে দিল কাগজগুলোর দিকে। খুলে দেখল একটা। ‘রাজি।’
অনেকটা কাগজ খুলল মরগ্যান।
‘রাজি। চমৎকার! এবার দেখা যাক অন্যগুলো কী বলে।’
ক্ষিপ্রহাতে অন্য কাগজগুলো খুলে ফেলল মরগ্যান। পড়ে দেখল, ‘রাজি, রাজি এবং রাজি।’
মরগ্যান চোখ বুলিয়ে নিল প্রত্যেকের মুখ। তার মুখে ফুটে উঠল নেকড়ের হিংস্র হাসি, ‘তাহলে এই কাজটার ব্যাপারে কারোরই আপত্তি নেই দেখছি। আমিও সেরকমই ভাবছিলাম। দু-লক্ষ ডলারকে পায়ে ঠেলার মতো লোক এই পৃথিবীতে নেই—আমাদের এখানে তো দূরের কথা! কাজটা কঠিন মানছি, কিন্তু টাকাটাও যে নেহাত অল্প নয়-!’
কিটসন চোখ রাখল জিনির চোখে। জিনিও তাকাল তার দিকে, উদ্ধত চিবুকের কঠিন রেখা সামান্য নরম হল। কিটসনের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল জিনি। নীরব অথচ কোমল হাসি।
পরদিন সকাল। প্রায় আটটা বাজে। ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির প্রবেশ পথের কাছে এসে থামল একটা ধূলিধূসর বুইক সেঞ্চুরি।
রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে কালো গাড়িটার একটুও সময় লাগল না।
গাড়ির চালকের আসনে বসেছিল ফ্রাঙ্ক মরগ্যান। মাথায় তেলচিটে ময়লা টুপিটা চোখের ওপর নামানো। পাতলা ঠোঁটে অলসভাবে ঝুলছে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। তার পাশে স্থিরভাবে বসে এড ব্লেক।
এজেন্সির উঁচু কাঠের দরজার দিকে দেখল তারা: দরজার ওপরে কাঁটাতারের বেড়া। ডানদিকের পাল্লার ঘন্টি বাজাবার ঝকঝকে পেতলের বোতাম, এবং তার পাশেই একটা বড় সাদা পেরেক দিয়ে আঁটা। তাতে লাল রঙের বড় বড় হরফে পরিষ্কার করে লেখা :
দ্য ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সি
আপনার নিরাপত্তা আমাদের নিতে দিন৷ পৃথিবীর
সবচেয়ে সেরা এবং নিরাপদ ট্রাক পরিবহন ব্যবস্থা৷
‘নিজেদের সম্বন্ধে ওরা একটা বিরাট ধারণা করে বসে আছে দেখছি৷’ ফলকের লেখা পড়ে বলল, ব্লেক, ‘ঠিক আছে, আর কটা দিন৷ তারপরেই ওরা দেখবে ওস্তাদের কেরামতি৷’
‘বলা যায় না এর উল্টোটাও ঘটতে পারে—’ ব্যঙ্গের হাসি হাসল মরগ্যান।
‘তো পারে, তবে আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, এ কাজটায় আমরা সফল হবই, ‘ব্লেক বলল, ‘মেয়েটা এমন সুন্দরভাবে প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান করে রেখেছে যে ভাবলে অবাক হতে হয়, তাই না?’
‘হ্যাঁ৷’ ঠোঁট থেকে সিগারেট আলতো করে তুলে নিল মরগ্যান, ‘ওর প্ল্যানে কোনও খুঁত নেই, কিন্তু সেই অনুযায়ী সবকিছু করতে পারলে হয়৷ কারণ আমাদের কতকগুলো জটিল ঝামেলার মোকাবিলা করতে হবে৷ বিশেষ করে জিপোকে নিয়েই আমরা ভাবনা৷ মেয়েটা বলছে বটে আমাদের হাতে অফুরন্ত সময়, কিন্তু সেটা নিছকই একটা কথার কথা, বড়জোর বলতে পার, ট্রাকের তালা ভাঙবার জন্যে আমরা বেশ কিছুদিন সময় পাব, তার বেশি কিছু নয়৷ একবার যদি পুলিশ আমাদের খোঁজ শুরু করে, তাহলেই হাতের সময় কমতে থাকবে৷ তখন যত তাড়াতাড়ি তালা খোলা যায় ততই মঙ্গল৷ অর্থাৎ জিপোকে মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হবে, যা সে আগে কখনও করেনি৷ বলা যায় না, এতে ওর মনের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যেতে পারে৷’
‘জিপোর যাতে সে অবস্থা না হয়, তার দায়িত্ব আমাদের৷’ ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল ব্লেক, ‘জিপোর জন্যে আমি একটুও চিন্তিত নই৷’ ব্লেক আড়চোখে দেখল মরগ্যানের দিকে৷’ বিবর্ণ চঞ্চল চোখের তারায় কঠিন দৃষ্টি, ‘বুঝলে ফ্র্যাঙ্ক, ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভাবছি, ততই মনে হচ্ছে টমাস আর ডার্কসনকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না৷ কারণ, যদি ওরা পরে পুলিসের কাছে আমাদের চেহারার বর্ণনা দেয়, তাহলে স-ব গুবলেট হয়ে যাবে৷’
মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকাল, ‘হুঁ—আমি ও তাই ভাবছি৷ কিন্তু এ কথা যেন আর কাউকে বোলো না৷ খুনের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে ওরা দুজন এখন থেকেই তটস্থ হয়ে আছে, তার ওপর এ কথা জানতে পারলে ওদের সামলানো মুশকিল হয়ে পড়বে৷’
‘কিন্তু জিনির তো সে ভয় নেই৷’ ব্লেকের ঠোঁটের কোণে হাসির ছোঁয়া৷
‘তা ঠিক৷’
‘মেয়েটা কে, ফ্র্যাঙ্ক?’
মরগ্যান ঠোঁট উল্টো কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী করে বলব? যদ্দূর জানি এ শহরে থাকে না৷ তবে একটা কথা বাজি রেখে বলতে পারি, ও এর আগেও অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেছে৷’
‘আমারও তাই মনে হয়৷’ ব্লেক চোখ নামিয়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখল, ‘তবে একটা ব্যাপার কী জান? এই ট্রাক-লুটের প্ল্যানটা যে জিনির একার মাথা থেকে বেরিয়েছে আমার মোটেই বিশ্বাস হয় না৷ ওর বয়েসি একটা কচি মেয়ের মাথায় এ মতলব আসতেই পারে না৷ আর যেভাবে সমস্ত জটিল সমস্যাগুলো ও সমাধান করেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য৷ যদি শুনি যে এই ট্রাকটার ব্যাপারে অন্য কোনও দলও মাথা ঘামাচ্ছে, তাহলে আমি একটুও অবাক হব না৷ কারণ, আমার ধারণা, অন্য কোনও দলের কাছ থেকে জিনি এই ট্রাক-লুটের প্ল্যানটা চুরি করেছে৷ হয়তো বেশি বখরার লোভেই ও সেই দল ছেড়ে আমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছে৷ অতএব জিনি সম্বন্ধে সর্তক থেকো, ফ্র্যাঙ্ক৷ পরে হয়তো দেখা যাবে আমাদের মতো অন্য আরেকটা দলও একই দিনে, একই সময়ে ট্রাকটাকে খালি করার মতলব ভাঁজছে—সেটা আমাদের পক্ষে খুব একটা সুবিধের হবে না, বিশেষ করে যদি তারা সে ব্যাপারে আমাদের টেক্কা দেয়৷’
‘হুঁ৷ অস্বস্তিভরে টুপিটাকে মাথার পিছনে ঠেলে দিল মরগ্যান৷ ভুরু কুঁচকে তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘সবই আমি ভেবেছি৷ কিন্তু তবু আমাদের একটা সুযোগ দিতে হবে আগামী শুক্রবারের আগে কিছুতেই একাজে হাত দেওয়া সম্ভব নয়৷ কারণ এর পেছনে প্রচুর প্রস্তুতি দরকার৷... আচ্ছা, কটা বাজল?’
‘ঠিক সাড়ে আটটা৷’
‘তাহলে তো বাস এসে পড়ার সময় হল৷’
‘হ্যাঁ৷’
সামনের বাসস্টপে অপেক্ষারত লোকগুলোর দিকে তাকাল ওরা৷ সেদিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইল ব্লেক৷ অস্ফুটস্বরে বলল, ‘যাই বল ফ্র্যাঙ্ক, জিনির চেহারায় চটক আছে৷... ওফ, একখানা জিনিস বটে৷’ অন্যমনস্কভাবেই ঠোঁট কামড়াল ব্লেক৷’
মরগ্যানের মুখ থেকে নেমে এল বরফের কাঠিন্য৷ তার কালো সাপ-চোখজোড়া ধীরে ধীরে এসে স্থির হল ব্লেকের চোখে৷ কর্কশস্বরে সে বলে উঠল, ‘কথা যখন উঠলই তখন একটা কথা ভালো করে জানিয়ে দিই এড৷ জিনির কাছে ঘেঁষবার চেষ্টা তোমরা কোরো না৷ কারণ, ওকে নিয়ে কোনও রকম বাঁদরামি আমি সহ্য করব না৷ সপ্তা-দুয়েক, কি তারও বেশি ও আমাদের সঙ্গে থাকবে৷ দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই হয়তো ওকে আমাদের পাশে কাটাতে হবে—কিন্তু তাই বলে ওর সম্বন্ধে কোনওরকম ভুল ধারণা তোমাদের মনে গড়ে উঠুক, তা আমি চাই না৷ সুতরাং প্রথম থেকেই ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো৷ কোনওরকম লক্কাবাজি আমি সহ্য করব না৷’
ব্লেক ভুরু উঁচিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ তার সুন্দর মুখমণ্ডল ঘৃণায় বিকৃত, ‘তাহলে কি আমি ধরে নেব, জিনিকে তুমি নিজের জন্যে রেখেছ?’
মরগ্যান মাথা নাড়ল, ‘না! আমি তোমাকে আবার সাবধান করে দিচ্ছি, এড—জিনির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু লেনদেনের, তাছাড়া কোনও নারীঘটিত ঝঞ্ঝাট নিয়ে আপাতত আমরা মাথা ঘামাতে চাই না—আমাদের সামনে রয়েছে এক বিশাল ঝুঁকি, এক বিরাট কাজের দায়িত্ব। সুতরাং এই রিপুসংক্রান্ত ব্যাপারে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই৷ যদি কারও মধ্যে সামান্যতম বেচাল দেখি, তাহলে চাবকে ছাল ছাড়িয়ে নেব৷ জিনিকে নিয়ে তোমার যদি ফষ্টি-নষ্টি করার কোনও মতলব থেকে থাকে, তাহলে এক্ষুনি মতলব ঝেড়ে ফ্যালো৷ কারণ তার পরিণতি খুব একটা সুখের হবে না৷’
মরগ্যানের শীতল নিষ্প্রাণ কালো চোখের তারা যেন ঝিলিক মেরে উঠল৷ সেদিকে চেয়ে অস্বস্তিভরে হাসতে চেষ্টা করল ব্লেক, ‘আমাকে এসব না বলে কিটসনকে গিয়ে বলো৷ যদি কিছু করার হয় ও-ই করবে, আমি নয়৷ কাল রাতে কিরকম করে জিনিকে দেখছিল মনে আছে?’
‘তোমাদের তিনজনের ওপরেই নজর রাখা দরকার৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল মরগ্যান, ‘তুমি কিংবা জিপো—কিটসনের চেয়ে এমন কিছু সাধু নও৷’
ব্লেকের চোখে ফুটে উঠল ক্রোধের ঝলক৷
‘তোমার মাথা থেকে দেখছি যিশুখ্রিস্টের মতো জ্যোতি বেরোচ্ছে৷’
মরগ্যান ক্রুদ্ধভাবে কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাসটাকে আসতে দেখে চুপ করে গেল৷
‘ওই যে বাস আসছে৷ চুপচাপ নজর রাখো!’
দুজনেই ঝুঁকে পড়ল উইন্ডশিল্ডের ওপর৷ একদৃষ্টে চেয়ে রইল সামনের রাস্তার দিকে৷ বাসটা এজেন্সির সামনে এসে থামল৷ তার থেকে নেমে দাঁড়াল দুজন লোক৷ একজনের চেহারা খাটো, রোগা, কিন্তু অন্যজন প্রায় ছ-ফুট লম্বা—বৃষস্কন্ধ, শক্তসমর্থ চেহারা৷ চলাফেলার ভঙ্গি সাপের মতো ক্ষিপ্র অথচ নিশ্চিত৷ তার পরনে ওয়েলিং আর্মাউ ট্রাক এজেন্সির ইউনিফর্ম৷ মাথায় লম্বা টুপি—তাতে বসানো চকচকে ইস্পাতের ব্যাজ৷ কোমরে ঝোলানো পিস্তল৷ অভ্যাসবশতই বাঁ হাতটা পিস্তলের খাপের ওপর রাখা৷
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চারপাশে দেখল৷ তারপর ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে গেল এজেন্সির দরজার কাছে৷ আঙুল চেপে ধরল ঘণ্টির বোতামে৷
‘এই নাকি?’ ব্লেক প্রশ্ন করল৷
‘হ্যাঁ৷’ মরগ্যান তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লোকটার আপাদমস্তক লক্ষ করতে ব্যস্ত৷ অস্বস্তিভরে সে জবাব দিল, হ্যাঁ, এই মাইক ডার্কসন৷ টমাস হয়তো এর পরের বাসেই এসে পড়বে৷’
‘শালাকে দেখে তো মনে হচ্ছে এক নম্বরের হারামজাদা৷’ ডার্কসনকে দেখে ব্লেক ঠিক খুশি হতে পারল না৷ এক অজানা আশঙ্কায় তার মন দুলে উঠল, ‘নাঃ, ব্যাটা যে সাহসী, তা ওর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়৷’
ডার্কসন ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবেই কালো বুইকটাকে দেখছিল৷ ওর বয়স বছর পঁচিশের বেশি বলে মনে হল না৷ দেখতে সুশ্রী না হলেও ডার্কসনের মুখে রয়েছে সাহস ও দৃঢ়তার আভাস, এবং সেটা মরগ্যানেনর চোখ এড়াল না৷
‘ডার্কসনকে খুন করা ছাড়া জিনির আর কোনও উপায় নেই৷’ ধীরে ধীরে কথাকটা উচ্চারণ করল ব্লেক৷ হঠাৎ সে যেন মাথা ঘামাতে শুরু করেছে, ‘আচ্ছা, জিনি কি ডার্কসনকে একবারও দেখেছে?’
‘হ্যাঁ, গতকাল দেখেছে৷ কিন্তু একবারও মেয়েটা ভয় পায়নি৷ বার বারই বলেছে, ডার্কসনকে ও ঠিক কবজা করতে পারবে৷ তারপর জানি না কী করবে৷’
এমন সময় খুলে গেল এজেন্সির দরজা৷ ডার্কসন ঢুকে পড়ল ভেতরে৷ তারপর আবার দরজা বন্ধ হয়ে গেল৷ ‘কিটসন দেখছি ঠিকই বলেছে’ এ-তো সহজে হার মানবার পাত্র নয়৷’ শান্তস্বরে বলল ব্লেক, ‘প্রথমেই একে শায়েস্তা করতে হবে, ফ্র্যাঙ্ক৷ তা নইলে, পরে বিপদ হতে পারে৷’
‘হ্যাঁ, এবং সেই শায়েস্তা করার দায়িত্বটা তোমার৷’ জিনির ওপর এ দায়িত্ব দেওয়া যাবে না, কারণ ও হয়তো ডার্কসনের ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ঠিক পেরে উঠবে না৷’ সামনের দিকে চেয়ে মরগ্যান বলে চলল, ড্রাইভারকে আমিই টিট করব৷ তোমার কাজ হবে৷ একটা রাইফেল নিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা৷ ডার্কসন যেই ট্রাক ছেড়ে বেরোবে তখনি তুমি রাইফেল তাক করবে ওর দিকে৷ এক মুহূর্তের জন্যও অন্যমনস্ক হবে না৷ জিনির রিভলভারের সামনে ওর চালচলনের এতটুকু এদিক-ওদিক দেখলেই গুলি করবে৷ কোনওরকম ইতস্তত করবে না, বুঝেছ?’
ব্লেকের মনে হল তার গলাটা হঠাৎ যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ একটা তিক্ত স্বাদ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে শুকনো জিভটাকে মুখের চারপাশে বুলিয়ে নিল সে, ঘাড় নাড়ল, নিশ্চয়ই, সেজন্য তুমি ভেবো না৷ ডার্কসনকে আমি চোখে-চোখে রাখব৷’
‘ওই যে দ্বিতীয় বাসটা আসছে৷ সেই সঙ্গে আসছে আমার শিকার—ডেভ টমাস৷’ দাঁতে দাঁত চেয়ে বলল মরগ্যান৷
ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাক ড্রাইভার টমাস বেশ লম্বা-চওড়া লোক৷ মুখভাব এবং চলাফেরায় ডার্কসনের সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে৷ সেই একই রকম উদ্ধত চিবুক, শীতল-অচঞ্চল চোখ৷ পাতলা টানা ঠোঁট৷ কিন্তু টমাসের বয়স একটু বেশিই হবে—তিরিশ বত্রিশের কাছাকাছি৷ বাস থেকে নেমে সেও এগিয়ে চলল এজেন্সির দরজার দিকে৷
টমাসের দৃঢ় বলিষ্ঠ পদক্ষেপে মুহূর্তের জন্যে অনিশ্চয়তার দোলায় দুলে উঠল মরগ্যানের মন৷ একদৃষ্টে, সরীসৃপ শীতল চোখে মরগ্যান টমাসকে দেখতে লাগল৷ তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল৷
‘এই হল দু-নম্বর হারামজাদা৷’ বিরক্তিভরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘নাঃ, লোক বাছাই করার ব্যাপারে ওয়েলিং এজেন্সির তুলনা নেই! কোথেকে যে এই লোক দুটোকে জোগাড় করল কে জানে? তবে একটা ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ এড, টমাসকে আমাদের খুনই করতে হবে, তাছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই৷’
মাথা থেকে টুপি নামিয়ে কপালের ঘাম মুছল এড ব্লেক৷ তার বুকের স্পন্দন যেন হঠাৎ বেড়ে উঠল৷
‘আমাদের এই প্ল্যানের একটু এদিক-ওদিক হলেই আমরা কিন্তু জালে আটকা পড়ব ফ্র্যাঙ্ক৷ সুতরাং আমাদের ভীষণভাবে সাবধান হতে হবে৷’
‘এ কাজে সাফল্যের পুরস্কার দশ লক্ষ ডলার৷’ স্বপ্নাচ্ছন্ন স্বরে বলে চলল মরগ্যান, ‘আর সেই কারণে আমার দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা৷ এড, আমার বয়েস এখন বিয়াল্লিশ বছর—তার মধ্যে পনেরো বছরই কেটেছে জেলের আবদ্ধ বাতাসে৷ যে ক-বছর বাইরে ছিলাম, সে কটা-বছরও পুলিসের নজর বাঁচিয়ে লুকিয়ে চলতে হয়েছে৷ এই করে জীবনের প্রতি আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ এত দিনে সার যা বুঝেছি, তা হল টাকা৷ টাকা না থাকলে তোমাকে কেউ পুঁছবেও না৷ কিন্তু যদি তোমার গাড়ি, বাড়ি, অঢেল টাকা থাকত—লোকে তোমাকে সম্মান করত, এ সমাজে তুমি হয়ে উঠতে একজন কেউকেটা৷ দু-লক্ষ ডলার আমার নোংরা জীবনে হবে এক পূর্ণচ্ছেদ, বাঁচার মতো করে আমি বাঁচতে পারব৷ তা যদি না পারি তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কী? অতএব ওই ট্রাকের টাকা হাতানোর ব্যাপারে কোনও বাধাই আমাকে রুখতে পারবে না—টমাস, ডার্কসন তো দূরের কথা! তোমার কথা আমি মেনে নিচ্ছি৷ মেনে নিচ্ছি ধরা পড়লে আমাদের ভাগ্যে আছে চরম দণ্ড৷ কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছ এড, আমরা এখন ঠিক কী অবস্থায় আছি৷ আমরা মরলাম কি বাঁচলাম, তাতে কার কী এসে যায়? সূর্য যেমন উঠছিল তেমনি উঠবে, শহরের কর্মব্যস্ত জীবনে এতটুকু চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে না৷ আমরা একেবারে ফালতু৷ কিন্তু যখন দু-লক্ষ ডলারকে আমরা নিজেদের সঙ্গী করব, তখনই আমাদের রঙিন চোখের তারায় এই দুনিয়ার চেহারাটাই পালটে যাবে৷ আমরা হয়ে উঠব দশজনের একজন—ব্লেকের মুখের কাছে এগিয়ে এল মরগ্যানের ঘর্মাক্ত লালচে মুখ, ‘আর আমি তাই হতে চাই...তুমি চাও না?’
টুপিটা আবার পরে নিল ব্লেক৪। শান্তস্বরে বলল, ‘চাই না যে তা নয়। তবে আমি কী ভাবছি জান? আমি ভাবছি কিটসন আর জিপোর কথা। জিনির সামনে বাহাদুরি দেখাবার জন্যে ওরা তো রাজি হল—ভোটও দিল আমাদের সপক্ষে, কিন্তু পরে কী হবে সেটা কি চিন্তা করে দেখেছ?’
‘ও নিয়ে ভাববার কী আছে? রাজি যখন ওরা হয়েছে, তখন কাজটা ওদের করতেই হবে।’ মরগ্যানের কণ্ঠে দৃঢ়তার সুর।
‘অবশ্য যদি শেষ পর্যন্ত ওদের মাথার ঠিক থাকে—’
‘থাকতেই হবে। না হলে...’
‘তোমার কথা যেন সত্যি হয়।’ হাওয়ায় হাত নাড়ল ব্লেক, ‘তবে বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত হয়তো ওরা...’
মরগ্যানের অচঞ্চল চোখের তারা স্থির হল ব্লেকের চোখে। কর্কশ স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে সে উচ্চারণ করল, ‘একবার যদি ট্রাকটা আমরা দখল করতে পারি,তবে ওটা আমরা খুলবই–ওদের দুজনের সাহায্য নিয়েই হোক, বা না নিয়েই হোক! এতটা পথ এসে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান কোনও মতেই হাল ছাড়তে রাজি নয়।’
ব্লেক মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘কিন্তু এ ছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে, ফ্র্যাঙ্ক। এই কাজের প্রাথমিক খরচ হিসেবে অন্তত দু-হাজার ডলার আমাদের দরকার। কাল রাতে আলোচনার সময় আমরা কিন্তু এ কথাটা একবারও ভেবে দেখিনি। টাকাটা জোগাড় হবে কোত্থেকে বলো দেখি?’
‘আমাদের একটা ছোট কাজে হাত দিতে হবে—যে কাজে বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ আমাদের সামনে পড়ে রয়েছে আসল কাজ—দশ লক্ষ ডলার; তার আগেই যদি পুলিশ আমাদের পিছু নেয় তবে এত পরিশ্রম, এত সাবধানতা সব পণ্ড হবে। সেই জন্যেই আমরা যে ছোট কাজটায় হাত দেব, সেটা সহজ, সরল, নির্ঝঞ্ঝাট হওয়া দরকার। আমি কাল রাত থেকেই এ নিয়ে ভাবছি—’
ব্লেক সিগারেটে এক জোরালো টান দিল, ‘দশ নম্বর সড়কের পেট্রল পাম্পটা লুট করলে কেমন হয়? ওই যে ডুকাস যাবার পথে—’
‘হ্যাঁ, করা যায়। তবে আমি ভাবছিলাম আরও নির্জন কোনও জায়গার কথা—মানে ঠিক বড় রাস্তার ওপর কোনওরকম ঝামেলা করতে চাইছি না। আচ্ছা এড, ম্যাডক্স স্ট্রিটের ওই কাফেটার কথা তোমার মনে পড়ছে, যেটা সারারাত খোলা থাকে—?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু কেন?’
‘আমি ওটার কথাই মনে মনে ভাবছি। রাত্রিবেলা থিয়েটার-সিনেমার শেষে বেশির ভাগ লোকই ওই কাফেটায় যায়; আর পকেট তাদের ভারীই থাকে। ঠিক সেই সময় আমরা যদি ওদের ওপর গিয়ে পড়তে পারি, তাহলে দু-হাজার কেন, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকাই আমাদের হাতে আসবে। তাছাড়া কাজটায় কোনও উটকো ঝামেলার ভয় নেই।’
ব্লেক আমতা-আমতা স্বরে বলল, কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, কাজটা কি সত্যিই সহজ? আমার তো মনে হয় না। হঠাৎ যদি কোনও খদ্দের অতিমাত্রায় সাহসী হয়ে ওঠে, তাহলে?’
‘তাহলে তো খুব ভালো হয়, আমরা আসল কাজের মহড়া দিতে পারব।’ ধূর্ত হাসি হাসল মরগ্যান, ‘কারণ তুমি ভালোভাবেই জানো, টমাস ও ডার্কসন—ওরা দুজনেই খোলা রিভলভারের সামনে দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া জিনিকেও একটু পরীক্ষা করা যাবে৷ মুখে তো খুব লম্বা চওড়া কথা বলছিল, এই কাজের সময় দেখা যাবে ওর কত সাহস৷’
‘তার মানে মেয়েটা এ কাজেও আমাদের সঙ্গে থাকবে?’
‘হ্যাঁ৷ আর থাকবে কিটসন, ওর ওপরে থাকবে গাড়ির দায়িত্ব৷ রিভলভার নিয়ে তুমি এবং আমি কাফের লোকগুলোকে সামলাব, জিনির কাজ হবে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকাগুলোর আদায় করা—ব্যস!
ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করল ব্লেক, ‘ট্রাকের ব্যাপারটা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু জিপো কি এই কাজেও কোনও গতর খাটাবে না, ফ্র্যাঙ্ক?’
‘শোনো এড, জিপোকে নিয়ে তোমার এই চুকলিপনা বন্ধ করো৷ এ কাজে জিপোকে আমাদের প্রয়োজন হবে না৷ কেবলমাত্র এজেন্সির ট্রাকের তালা খুলতে আমরা ওর সাহায্য নেব৷ কারণ জিপো ছাড়া আর কারও পক্ষে যে ওই তালা খোলা সম্ভব নয়, সেটা তুমি বেশ ভালোভাবেই জানো৷ সুতরাং এই সব ছোটখাটো ঝামেলায় ওকে না জড়িয়ে আসল কাজের জন্যে রেখে দেওয়াই ভালো৷ তুমি কী বলো?’
‘নিশ্চয়ই৷ তবে ভাবছি, জিপোর মতো আমিও যদি তালা-বিশারদ হতাম তাহলে বেশ পায়ের ওপর পা তুলে আয়েস করে দিন কাটাতে পারতাম৷’ কাঁধ ঝাঁকাল ব্লেক, ‘যাক গে, এবার বলো ক্যারাভানটা আমরা কোত্থেকে জোগাড় করছি?’
‘শুনেছি মার্লোয় একটা দোকান আছে, তারা ক্যারাভ্যান বিক্রি করে৷ টাকাটা হাতে আসামাত্রই আমি কিটসন আর জিনিকে সেখানে পাঠিয়ে দেব৷ ওরা গিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেবে; বলবে হানিমুন কাটানোর জন্যে একটা ক্যারাভান ওদের দরকার৷’
ব্লেক হাসল, ‘কিটসনের দিকে নজর রেখো, ফ্র্যাঙ্ক৷ ও যেন এই হানিমুনের ব্যাপারটাকে আবার সত্যি বলে না ভেবে বসে৷’
‘এক কথা বার বার বলা আমি পছন্দ করি না, এড৷ ‘খিঁচিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘এমনিতেই আমাদের হাতে সমস্যার অন্ত নেই, তা সত্ত্বেও যদি কেউ জিনির ব্যাপারে কৌতূহল দেখাতে যায় তবে ভুল করবে৷ তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছিঃ কোনওরকম লক্কাবাজি আমি বরদাস্ত করব না৷ কিটসন আমাদের চেয়ে বয়েসে ছোট, সুতরাং সদ্য-বিবাহিত স্বামীর ভূমিকায় সে-ই অভিনয় করবে৷ তবে সেটা কেবলমাত্র অভিনয়, তার বেশি কিছু নয়৷ আর আলেক্সের মাথায় যদি এই ব্যাপারটা না ঢোকে, তবে সবার আগে ওকে আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে৷’
‘কিন্তু জিনি?’ ব্লেক প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি এ সম্বন্ধে ওকে সাবধান করে দিয়েছ? বলেছ, কিভাবে ওকে সংযত হয়ে চলতে হবে?’
মরগ্যান ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিল৷
‘আমি জানতাম, একসময় কথাটা উঠবে৷’ চাপা হিংস্র স্বরে উত্তর দিল সে, ‘যখনই জিনিকে আমি দেখেছি, তখনই জানি তোমরা তিন ভেড়্য়া ওর পেছনে লাগবে৷ সেইজন্যে প্রথম থেকেই আমি বলেছি, কোনওরকম ছেনালিপনা দেখলেই সোজা তাড়িয়ে দেব৷’ ঠোঁট বেঁকিয়ে ব্যঙ্গভরে হাসল মরগ্যান, ‘আমার কথায় ও কী বলেছিল জানো?’ ‘ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না৷ আমার শুধু টাকার দরকার৷ অতএব তোমার পেয়ারের কুত্তাদের তুমি সামলাবে৷’ সুতরাং বুঝতেই পারছ, টাকা ছাড়া মেয়েটা আর কিছু বোঝে না! তার মানে জিনির দিক থেকে তোমরা খুব একটা উৎসাহ পাবে না৷ ওর জীবনে প্রথম এবং শেষ কথা টাকা৷ কিটসন যদি মেয়েটাকে নিয়ে কোনও গণ্ডগোল বাধাতে চায়, তবে ও নিজেই বিপদে পড়বে৷ তোমার আর জিপোর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হবে না৷ সুতরাং মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দাও৷...আশা করি কথাগুলো এবারে তোমার মাথায় ঢুকেছে৷
ব্লেক জোরালো গলায় হেসে উঠল, নিশ্চয়ই৷ আমারও মনে হয় এক্ষেত্রেও সেরকম কিছু ঘটবার কোনও চান্স নেই৷’
বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মরগ্যান শীতল, সরু পাঁচ আঙুলে আঁকড়ে ধরল ব্লেকের কবজি৷ চমকে উঠে সে চোখ রাখল মরগ্যানের কালো হায়েনা চোখে৷
‘আমি ঠাট্টা করছি না, মিস্টার এডওয়ার্ড ব্লেক৷’ নরম স্বরে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল মরগ্যান, ‘আমার ছকে বাঁধা অন্ধকার জীবন থেকে বেরিয়ে আসার এই একমাত্র সুযোগ৷ এবং সম্ভবত শেষ সুযোগ৷ তুমি যদি ভেবে থাক একটা বিশ বছরের মেয়ের সঙ্গে লেপটা-লেপটি করে আমার প্ল্যানে ফাটল ধরাবে, তবে আরও একটা কথা তোমার মনে রাখা দরকার৷ যদি আমি দেখি, তোমার রিপুসংক্রান্ত দুর্বলতার জন্যে আমাদের এই সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হতে যাচ্ছ, তবে তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারব৷ মনে কোরো না, তোমার, জিপোর বা কিটসনের যৌন-তাড়নার জন্যে আমি আমার ভবিষ্যতের গোড়ায় কুড়ুল মারব৷ আশা করি আমার কথা বুঝতে তোমার অসুবিধে হচ্ছে না?’
ব্লেক প্রাণপণ চেষ্টায় শুকনো মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল, বলল, ‘তোমার হল কী, ফ্র্যাঙ্ক? আমি এমনি ইয়ারকি করছিলাম৷’
মরগ্যান সামান্য ঝুঁকে এল ব্লেকের দিকে৷ তার তামাকের গন্ধভরা নিঃশ্বাস ঝাপটা মারল ব্লেকের মুখে, ‘ইয়ারকিই যেন হয়!’
এক দীর্ঘ উৎকণ্ঠাময় নিস্তব্ধতা৷ দুজনের স্থির, কঠিন দৃষ্টি পরস্পরের ওপর নিবদ্ধ৷ অবশেষে পরিস্থিতি হালকা করার উদ্দেশ্যে ব্লেক বলে উঠল, ‘তোমার কি মনে হয় এই গাড়িটা ক্যারাভানটাকে টানতে পারবে?’
‘পারতেই হবে—অবশ্য ক্যারাভানটা যে ভারী হবে না তা আমি বলছি না৷’ মরগ্যান সিটে গা এলিয়ে দিল৷ তার নিকোটিনের তোপে-ভরা আঙুল গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বাজনা বাজিয়ে চলল, ‘তবে রাস্তাও খুব একটা উঁচু-নিচু নয় যে ক্যারাভানকে টেনে নিয়ে যেতে গাড়িটার অসুবিধে হবে৷ শুধু প্রথম তিরিশ-চল্লিশ মিনিট আমাদের একটু কষ্ট হবে৷ কারণ ওই সময়ের মধ্যেই অকুস্থল থেকে যতটা দুরে যাওয়া যায় আমাদের সরে পড়তে হবে৷ তারপর ভাবনার আর কিছু নেই৷... শোনো এড, তুমি এই গাড়িটাকে একবার ভালো করে পরীক্ষা করে রেখো৷ নয়তো রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ যদি খারাপ হয়ে পড়ে তাহলে বিপদের আর কিছু বাকি থাকবে না৷ একেবারে খুঁটিনাটি সমস্ত পরখ করে দেখবে৷’
‘নিশ্চিন্ত থাকো: গাড়ি নিয়ে কোনও গোলমালে আমাদের পড়তে হবে না৷ কিন্তু জিনির জন্যে একটা গাড়ি যে আমাদের দরকার? সেটা জোগাড় হচ্ছে কী করে?’
‘আসল কাজের দিন-দুয়েক আগে কোনও একটা কার-পার্ক থেকে একটা গাড়ি লোপাট করলেই হবে৷ তুমি দুটো নকল নাম্বার-প্লেট আগে থাকতেই তৈরি করে রেখো, আর জিপোর কাজ হবে চোরাই গাড়িটার রং-পালটে নতুন রঙ লাগানো৷ জিনি যখন গাড়িটা চালাবে, তখন যেন ওটা চোরাই গাড়ি বলে কোনও পুলিশের চোখে ধরা না পড়ে৷’
হঠাৎ ব্লেক কনুই দিয়ে মরগ্যানের পাঁজরে এক খোঁচা মারল৷ মরগ্যান চমকে ফিরে তাকাতেই এজেন্সির কাঠের দরজার দিকে ইশারা করল ব্লেক, ‘ওই যে ট্রাকটা আসছে...’
আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির চওড়া কাঠের দরজা হাট করে খুলে গেল৷ তখনই চোখে পড়ল ট্রাকটা৷
মরগ্যান বা ব্লেক আগে কখনও ট্রাকটাকে স্বচক্ষে দেখেনি৷ ওরা ট্রাকের প্রতিটি অংশের ছবি নিখুঁত করে মনে এঁকে নিল৷
ব্লেক ভেবেছিল এই অদ্ভুত যুগান্তকারী জিনিসটা বেশ বড়-সড়ই হবে৷ কিন্তু ওটার আকৃতি ওকে অবাক করল৷ চারটে চাকার ওপর বসানো একটা ছোট ইস্পাতের বাক্স—আর তার সামনে ড্রাইভারের কেবিন—ব্যাস! টমাসের হাতজোড়া স্টিয়ারিংয়ের ওপর সহজ অথচ পেশাদারি ভঙ্গিতে আলতো করে রাখা; চোখের সতর্ক দৃষ্টি সামনের রাস্তার ওপর৷ টমাসের পাশেই টান-টান হয়ে বসে আছে মাইক ডার্কসন৷
ট্রাকটা আস্তে আস্তে নেমে এল রাস্তায়৷ মরগ্যানও তার গাড়ির ইঞ্জিন চালু করল৷ রাস্তাটায় এমনিতেই হাজারও গাড়ির জটলা৷ মরগ্যান অনেক চেষ্টায় চলন্ত ট্রাকটার কাছাকাছি এগিয়ে গেল—মাঝখানে শুধু দুটো গাড়ির ব্যবধান৷
‘আমি ভেবেছিলাম ট্রাকটা অনেক বড় হবে৷’ কথা বলতে বলতে ব্লেক উঁচু হয়ে সামনের লিংকন গাড়িটার বাধা কাটিয়ে ট্রাকটাকে দেখতে চেষ্টা করল, ‘দেখে তো জিনিসটাকে খুব একটা শক্ত-পোক্ত বলে মনে হচ্ছে না৷’
‘তাই নাকি? তোমার মতো অনেকেই ট্রাকটার এই ছোট আকার দেখে ভুল করে৷’ হাসল মরগ্যান৷
রাস্তা একটু ফাঁকা হতেই অভ্যস্ত ক্ষিপ্রতায় লিংকন গাড়িটার পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল মরগ্যান৷ এবারে ট্রাকের পিছনটা পরিষ্কার দেখতে পেল, কারণ মরগ্যানের বুইক আর ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকের মধ্যে এখন ব্যবধান শুধু একটা হুড-খোলা স্পোর্টস কার৷
ট্রাকের পিছনের দরজায় ছাপা হরফে লে খাঃ
দ্য ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক সার্ভিস
—আবিষ্কারের জগতে এক নতুন আলোড়ন—
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে নিরাপদ
ট্রাক আপনার সামনে উপস্থিত৷
মূল্যবান জিনিসপত্র পরিবহনের দায়িত্ব
আমাদের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন৷
ব্লেকের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এল৷ মসৃণ দ্রুতগতিতে ছুটে-চলা ট্রাকটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল সে৷ দূর থেকে মনে হল যেন একটা নিরেট ইস্পাতের বাক্স চার চাকার ওপর গড়িয়ে এগিয়ে চলেছে৷ ব্লেকের মনে হল, এই ছোট্ট ইস্পাতের বাক্সটা শুধু তার ভবিষ্যৎ নয়, তার জীবনের বিরুদ্ধেও এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ৷
‘ডানদিকে দ্যাখো৷’ বলে উঠল মরগ্যান৷
ব্লেকের বিবর্ণ চোখ চকিতে ফিরে তাকাল ডানপাশে৷
একজন মোটর বাইক পুলিশ গাড়ির ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে অপসৃয়মান ট্রাকের দিকে৷
‘এবার কেটে পড়াই ভালো৷’ মরগ্যান বলল, ‘এই শালা এখন থেকে শহরের শেষ পর্যন্ত ট্রাকটার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকবে৷ আর আমরা যদি এখুনি ওই ট্রাকের পিছু না ছাড়ি, তবে মোটরবাইকওয়ালা সন্দেহ করবে৷’
‘গাড়ি ঘুরিয়ে পাশের একটি রাস্তায় ঢুকে পড়ল মরগ্যান?
শেষবারের মতো ব্লেকের চোখে পড়ল ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকটা—তার পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে সেই মোটর বাইক পুলিশ অফিসার৷ দৃষ্টিপথ থেকে ট্রাকের দৃশ্য সরে যেতেই অনেকটা নিশ্চিন্তবোধ করল সে; তার শ্বাস-প্রশ্বাস আবার সহজ হয়ে এল৷
সামনে একটা গাড়ি রাখার জায়গা খালি দেখে বুইকটা সেখানে থামাল মরগ্যান, ‘যাক, ট্রাকটা তাহলে তোমার দেখা রইল...’
‘তা রইল; কিন্তু তাতে সুবিধে কিছু হল বলে তো মনে হয় না। শুধু একটা ইস্পাতের বাক্স—ব্যস! ওহ-হো, তুমি সময়টা লক্ষ করেছিলে তো, কখন ট্রাকটা এজেন্সি ছেড়ে বেরোল?’
‘হ্যাঁ। ঠিক আটটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিট।’ মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল, ‘এখন থেকে মোটামুটি তিন ঘণ্টা ট্রাকটা সেই বিপজ্জনক বাঁকের কাছে পৌঁছবে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, জিপো আর কিটসন এই গরমে ঝোপের পেছনে বসে গলদঘর্ম হয়ে ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করছে।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ, ফ্র্যাঙ্ক, কাজটা যে বড় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই—তবে একেবারে সোজা নয়। এর জন্যে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হব।’
‘যদি ভাগ্য সহায় থাকে, তাহলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। ভালো কথা—এখন একবার সেই কাফেটায় গিয়ে চোখ বুলিয়ে আসতে হবে। কারণ ওটা লুট করার পর আমরা কোন রাস্তা দিয়ে পালাব সেটা আগে থাকতেই দেখে রাখা দরকার।...শোনো এড, এই ছোট কাজটায় আমাদের কোনও রকম—কোনও রকম ভুল করলে চলবে না; এর ওপরেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’
‘শুধু এটা কেন, আসল কাজেও আমাদের কোনও গলতি হবে না।’ আধবোজা চোখে মরগ্যানকে দেখল ব্লেক, ‘এখন থেকে আর কোনও ভুল নয়।’
মরগ্যান মাথা নাড়ল, তারপর গাড়ি ছুটিয়ে দিল সামনের রাস্তা ধরে...।
সাড়ে এগারোটার কিছু পরে কিটসন আর জিপো পৌঁছল সেই বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷ রিসার্চ স্টেশন থেকে বাঁকের দূরত্ব মাইল দুয়েক হবে৷ কিটসন গাড়ি থামাতেই জিপো নেমে পড়ল৷ ঝরঝরে লিংকনটা চালিয়ে নিয়ে কিটসন চলল আশ্রয়ের খোঁজে৷ কিছুদূর গিয়ে একরাশ বুনো ঝোপের আড়ালে জিপোর গাড়িটা লুকিয়ে ফেলল সে৷ তারপর ধীরে ধীরে আবার পা-বাড়াল বাঁকের দিকে—যেখানে দাঁড়িয়ে জিপো তার জন্যে অপেক্ষা করছে৷
সূর্যের প্রখর রোদের তাপ কিটসনের কাছে অসহ্য বলে মনে হয়৷ অল্পক্ষণের মধ্যে সে ঘামাতে শুরু করল৷
কিটসনের পরনে বুক-খোলা গাঢ় নীল রঙের শার্ট, আঁটোসাঁটো কালো প্যান্ট৷ এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকার পর হাত-পা ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে তার ভালোই লাগল৷ স্বচ্ছন্দ পদক্ষেপে সে এগিয়ে চলল ধুলোভরা রাস্তা ধরে৷
বাঁকটার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল কিটসন৷ চারিদিকে চোখ বুলিয়ে জায়গাটাকে কৌতূহলভরে দেখতে লাগল৷
রাস্তাটা সোজা এসে এই জায়গায় হঠাৎ খানিকটা সরু হয়ে গেছে৷ রাস্তার দু-ধারে পড়ে রয়েছে দুটো বিশাল পাথর, সম্ভবত দু-পাশের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে এসেছে রাস্তায়৷ পাথরগুলো ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা—অর্থাৎ গা-ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করার পক্ষে চমৎকার জায়গা৷
কিটসনের হঠাৎ খেয়াল হল, জিপোর যেখানে অপেক্ষা করার কথা সেখানে সে নেই৷ কিন্তু একটা হালকা অস্বস্তিকর অনুভূতি তাকে জানিয়ে দিল জিপো আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে—লক্ষ করছে কিটসনকে৷
কিটসন খুশিই হল৷ জিপোর মতো কোনও স্থূলকায় লোকও যে এত নিখুঁতভাবে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে, তা না দেখলে সে বিশ্বাস করতে পারত না৷ তার হারানো আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে এল৷
প্রথম থেকেই এই কাজটায় কিটসনের আপত্তি ছিল৷ কেমন যেন একটা অজানা আতঙ্ক ওর সমস্ত সাহসকে শুষে নিচ্ছিল৷ বারবারই ওর মনে হয়েছে, টমাস অথবা ডার্কসন কিছু একটা গণ্ডগোল না বাঁধিয়ে ছাড়বে না৷
বক্সিং ছাড়বার পর থেকে গত ছ-মাস ধরে কিটসন রয়েছে মরগ্যানের কাছে৷ কিটসনের শেষ লড়াই ছিল একজন বেঁটে-খাটো অনামী মুষ্টিযোদ্ধার সঙ্গে৷ কিন্তু এমনই অদ্ভুত অবাক ব্যাপার, সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই ক্ষিপ্র, খর্বকায় ব্যক্তিটি কিটসনের মতো সা-জোয়ানকে রিংয়ের ভেতর একেবারে তুলোধনা করে ছাড়ল৷
ড্রেসিংরুমে ফেরার পর কিটসনের ম্যানেজার দুটো দশ ডলারের নোট তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল৷ তারপর মুচকি হেসে, ‘বিদায়, মিঃ হারকিউলিস’ বলে বিদায় নিয়েছিল৷ এবং প্রায় একই সঙ্গে ড্রেসিংরুমে উপস্থিত হয়েছিল ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷
ভীষণভাবে আহত কিটসনকে পোশাক পরতে সাহায্য করেছে মরগ্যান৷ তারপর ওকে হাত ধরে নিয়ে গেছে নিজের গাড়িতে৷ গাড়ি করে কিটসনকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে সে৷
‘তাহলে রিংয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক শেষ, কী বলো?’ বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে থাকা অবসন্ন কিটসনকে লক্ষ করে প্রশ্ন করেছে মরগ্যান৷ সে কিটসনের শোবার ঘরে একটা ভাঙা চেয়ারে বসেছিল৷ কিটসন জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না৷ বিষণ্ণভাবে হেসে মাথা নেড়েছে৷
‘তাতে কী হয়েছে?’ মরগ্যানের স্বরে আশ্বাসের সুর, ‘তুমি আর আমি দুজনে এখন থেকে একসঙ্গে কাজ করতে পারি৷ তোমার গাড়ি চালানো আমি দেখেছি: ওরকম গাড়ি চালাতে খুব কম লোকই পারে৷ আমি জনাকয়েক লোক নিয়ে একটা ছোট দল করতে চাই৷ এমন লোক, যারা দ্রুত অথচ নিখুঁতভাবে যে কোনও কাজ হাসিল করতে পারবে, আর সেই সঙ্গে বেশ কিছু টাকাও রোজগার করতে পারবে৷ তোমার কী মত?’
সেই তেইশ বছর বয়েসেই কিটসন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে, তার উচ্চাশার কৃষ্ণচূড়া আলোর অভাবে শুকিয়ে গেছে৷ ওর বড় সাধ ছিল নাম করবে, বক্সিংয়ে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হবে, কিন্তু সে সবই এখন দুঃস্বপ্নের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, অন্য সব ব্যর্থ মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো সেও আজ আশ্রয় নিয়েছে পথপার্শ্বের আবর্জনায়৷ বিবর্ণ ভবিষ্যৎ নিঃসঙ্গ জীবন এবং পকেটের কুড়ি ডলারের কথা ভেবে তার কান্না পেল৷ কিন্তু তবুও তার ইতস্তত ভাব মরগ্যানের চোখ এড়াল না৷
মরগ্যানের কুখ্যাতির কথা কিটসনের অজানা ছিল না৷ মরগ্যান যে পনেরো বছর জেলও খেটেছে, সেকথাও সে জানত৷ তাই সে ইতস্তত করছিল৷ মরগ্যানের দলে যোগ দেওয়া মানে যে অন্ধকার জগতে চিরনির্বাসন সেটা বুঝতে তার দেরি হল না৷ কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর যে অনিশ্চিত, নিঃসঙ্গ জীবন৷ কিটসন একা একা কী করে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াবে৷ কী করে গড়ে তুলবে তার বিবর্ণ ভবিষ্যৎ? সুতরাং নিরুপায় এবং মরিয়া হয়েই মরগ্যানের দলে যোগ দিয়েছিল৷ পরাজিত মুষ্টিযোদ্ধা আলেক্স কিটসন৷
এ পযন্ত যে পাঁচটা কাজ সে মরগ্যানের দলের হয়ে করেছে, তা থেকে তার আর্থিক উন্নতি নেহাত কম হয়নি৷ অবশ্য সে কাজগুলোয় তেমন একটা ঝুঁকি ছিল না; তার ওপর মরগ্যানের সরল অথচ নিখুঁত প্ল্যান সে কাজগুলোকে করে তুলেছিল আরও সহজ। কিটসন জানত, ধরা পড়লে প্রথম অপরাধ হিসেবে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত হালকা : বড়জোর তিন থেকে ছ-মাসের জেল।
এ কাজগুলো যে চূড়ান্ত কাজের মহড়া, সেটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি কিটসনের ছিল। কারণ মরগ্যান সম্পর্কে যতটুকু সে জেনেছে,তাতে মনে হয় না, তার মতো লোক এইসব ছোটখাটো কাজ করেই সন্তুষ্ট থাকবে। আজ হোক-কাল হোক, মরগ্যান একটা বড় কাজে হাত দেবেই; এবং ধরা পড়লে তখন শাস্তির পরিমাণও হবে বিশাল—হয়তো বিশ বছরের কারাদণ্ডও হতে পারে। কিটসনের কেন যেন মনে হয়েছে সেই চূড়ান্ত নিয়তি তাকেও রেহাই দেবে না।
উচ্চাশার শেষ ধাপে পৌঁছবার জন্যে সে যখন প্রাণপণে মুষ্টিযুদ্ধ অভ্যাস করছে, তখনই হঠাৎ ওয়েলিং এজেন্সির ড্রাইভারের চাকরিটা কিটসন পেয়ে যায়। কিন্তু হলে কী হবে, সে চাকরি তার কপালে টিকল মাত্র দশদিন। কারণ এজেন্সির নিয়মশৃঙ্খলার সঙ্গে কিটসন পাল্লা দিতে পারেনি। রোজ সময়মতো কাজে আসা তো দূরের কথা, ট্রাক চালাতে গিয়েও তেমন দক্ষতার পরিচয় সে দিতে পারেনি। রিভলভার ছোঁড়া অভ্যাস করার সময় তার এলোমেলো লক্ষ্যভেদ শিক্ষকের বিরক্তিকর কারণ হয়েছে। সুতরাং অনিবার্যভাবেই এজেন্সির ফোরম্যান একদিন কিটসনকে ডেকে তার হিসেব-পত্তর চুকিয়ে দিল এবং উপদেশ দিল রাস্তা দেখতে। সেইখানেই কিটসনের এজেন্সি-অধ্যায়-এর ইতি।
কিন্তু এজেন্সি সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা লাভের পক্ষে কিটসনের কাছে ওই দশদিনই ছিল যথেষ্ট। এ কাজে হাত দেওয়া মানে যে শঙ্খচূড়ের লেজে পা দেওয়া, সে বিষয়ে তার মনে কোনও সন্দেহ নেই। মরগ্যানের আত্মবিশ্বাস এবং স্পর্ধার কথা ভেবে কিটসনের অবাক লাগল। যেন মুখোমুখি মুষ্টিযুদ্ধে সে জর্জ ফোরম্যানকে চ্যালেঞ্জ করতে চলেছে। সেই লড়াইয়ে কিটসনের জয়লাভের সম্ভাবনা যতটুকু, এই কাজেও মরগ্যানের সাফল্যের সম্ভাবনা ঠিক ততটুকুই—তার বেশি নয়।
কিটসন জানে,টমাস ও ডার্কসন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে হার স্বীকার করবে না, বরং রিভলভার চালাবার চেষ্টা করবে—হয়তো কেউ মারাও পড়বে। আর তারপর যদি কিটসন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে বিশ বছরের জেল, নয়তো সোজা ইলেকট্রিক চেয়ার।
কিটসন ঠিক করেছিল, এ কাজে হাত দেওয়ার চেয়ে সে দল ছেড়েই চলে যাবে৷ চলেও হয়তো যেত, যদি না এর মধ্যে জিনি এসে উপস্থিত হতো৷
জিনির মতো করে কোনও মেয়ে আজ পর্যন্ত কিটসনের সঙ্গে কথা বলেনি, এমন অদ্ভুতভাবে কোনওদিন তাকায়নি৷ মেয়েটার এই বিশেষত্বই কিটসনকে মুগ্ধ করেছে৷ এমন কী প্রথম সাক্ষাতের নেশাটুকুও সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না৷ তার চোখের সামনে ভাসছে জিনির একরাশ তামাটে চুলের জলছবি, ও সাগর-সবুজ চঞ্চল চোখজোড়া...
অর্থাৎ জিনির জন্যে, কেবলমাত্র জিনির জন্যেই সে এই কাজে মরগ্যানকে সমর্থন করছে৷ কিটসন জানে, এই দুঃসাহসের পরিণতি তেমন মধুর হবে না; হয়তো চরম পরিণতির মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতে হবে—কিন্তু তবুও সে পিছিয়ে আসতে পারছে না৷ পারছে না জিনির উপহাসের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে৷
চারদিকে চেয়ে আরও একবার জিপোকে খুঁজল কিটসন, কিন্তু কোথাও ওকে দেখতে পেল না৷’
‘ঠিক আছে, জিপো—এবার বেরিয়ে এসো৷’ কিটসন উঁচু গলায় ডেকে উঠল৷
একটা ঘন ঝোপের আড়াল থেকে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল জিপো৷ কিটসনের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল৷
‘কিরকম লুকিয়েছি বলো? এক্কেবারে হাপিস!’ তুড়ি বাজিয়ে এক অদ্ভুত ইশারা করল জিপো৷
কিটসন এগিয়ে গেল জিপোর কাছে৷
‘লুকোবার একটা জায়গা বটে!’ উবু হয়ে জিপোর পাশে বসে জায়গাটা দেখতে লাগল সে৷ তারপর একপলক হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর মিনিট কুড়ির মধ্যেই ওরা এসে পড়বে—যদি অবশ্য রাস্তায় কোথাও না থামে৷’
জিপো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল মাটির ওপর৷ ওপরের অবতল নীল আকাশের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে একটা কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল৷
‘নীল আকাশের দিকে তাকালেই আমার দেশের কথা মনে পড়ে, আলেক্স৷ মনে পড়ে সেখানকার আকাশ যেন এর চেয়েও সুন্দর এর চেয়েও নীল৷’
‘কিটসন তাকাল জিপোর দিকে৷ জিপোকে তার ভালো লাগে৷ এই সাদাসিধে লোকটার সহানুভূতি ভরা মন সবাইকে কাছে টানে৷ না, জিপোর স্বভাব মোটেই ব্লেকের মতো নয়৷ ব্লেকের মুখে সবসময় মাগী চরানোর গল্প৷ তাছাড়া কথায়-কথায় হাত চলে৷ আর যে সব রসিকতা সে করে, তা সবসময়েই প্র্যাকটিক্যাল জোক৷
এমনিতে এডের সাহস আছে, বুদ্ধি আছে—কিন্তু তার বন্ধুত্ব কিটসন কেন, আরও অনেকেরই কাম্য নয়৷ অথচ জিপো একেবারে আলাদা৷ কারও বিপদে সাহায্য করার জন্যে সে সর্বদা এগিয়ে আসে৷ নিজের পকেটের শেষ ডলারটা পর্যন্ত ধার দিতে সে দ্বিধা করে না৷ কিন্তু ব্লেকের কাছ থেকে কোনও সাহায্য নেওয়া মানে বঁড়শি গেলা৷
‘কোথায় দেশ তোমার জিপো?’ কিটসন উপুড় হয়ে শুয়েছিল৷ অতি সন্তর্পণে মাথা উঁচিয়ে সে সামনের রাস্তার দিকে দেখল৷
‘ফিসোলে৷ ইটালির ফ্লোরেন্সের কাছাকাছি৷’ মুখে গভীর চিন্তার ভাব ফুটিয়ে জিপো বলল, ‘তুমি কোনওদিন ইটালিতে গেছ, আলেক্স?’
‘উঁ—হুঁ—’
‘যাওনি? গেলে বুঝতে পারতে পৃথিবীতে তার চেয়ে সুন্দর দেশ আর নেই৷’ জিপোর বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস, ‘আর বিশ বছর হল আমি দেশের মুখ দেখিনি৷ বি-শ-ব-ছ-র! এই টাকাটা পেলে কী করব জানো? সোজা দেশে ফিরে যাব৷ প্রথমেই জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের একটা টিকিট কাটব৷ ইটালি পৌঁছে একটা চোখ ঝলসানো গাড়ি কিনব৷ সেটা চালিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হব বাড়িতে—মার কাছে। আমাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে যাবে৷...তারপর একটা বাগানবাড়ি কিনব পাহাড়ের ওপরে৷ যেখান থেকে পুরো ফ্লোরেন্স শহরটাকে দেখা যাবে৷ ... আলেক্স, আমার বাবা মারা গেছে প্রায় বারো বছর হল, কিন্তু মা আজও আমার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে৷ ভাবছি, ফিরে গিয়ে একটা বিয়ে-টিয়ে করে ফেলব৷ ছেলে-মেয়ে নিয়ে কাটিয়ে দেব বাকি জীবনটা৷...টাকা থাকলে সবই হয়৷ ফ্র্যাঙ্ক ঠিক বলেছেঃ হাতের মুঠোয় পৃথিবী! সত্যিই তো ইচ্ছে করলে দশ লাখ ডলার দিয়ে আমরা পৃথিবীটাকে কিনে ফেলতে পারি৷’
যদি না পুলিশের গুলিতে মারা যাও—ভাবল কিটসন৷ যদি না জাহাজে ওঠার আগে পুলিশের হাতে ধরা পড়৷
জিপো খুশিভরা চোখে তাকাল কিটসনের দিকে৷ হাতের ওপর মাথা রেখে প্রশ্ন করল, ‘তোমার টাকা নিয়ে কী করবে ভাবছ? কিভাবে খরচ করবে কিছু ঠিক করেছ?’
জিপোর কথা শুনে কিটসনের মনে হল সে যেন কোনও অপরিণতিবুদ্ধি কিশোরের সঙ্গে কথা বলছে৷
‘আমার মনে হয় টাকাটা হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো৷ সাত-তাড়াতাড়ি এতসব পরিকল্পনা করার কোনও মানে হয় না৷ বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা হেরে গেলাম—তখন সমস্ত স্বপ্ন এক ঝাপটায় মিলিয়ে যাবে৷’
জিপো একটু যেন অস্বস্তিবোধ করল, ‘একটা কথা কী জান আলেক্স? জীবনে স্বপ্ন দেখাটাই সবচেয়ে সুন্দর জিনিস৷ জানি, সে স্বপ্ন হয়তো কোনওদিন বাস্তবে রূপ নেবে না৷ কিন্তু তবুও স্বপ্ন দেখার এক অদ্ভুত আনন্দ আছে৷ আমি সবসময় আসন্ন ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল ভাবতে ভালোবাসি৷ এ আমার বহু বছরের স্বভাব৷ স্বীকার করছি, আজ পর্যন্ত আমার সমস্ত স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, কিন্তু এবারের কথা আলাদা৷ দু-লক্ষ ডলার!...এত টাকা কিভাবে খরচ করব ভেবে পাচ্ছি না!’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকল, হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে৷ কিন্তু আসল কথাটা কী জানো? টাকাটাই এখন আমরা হাতে পাইনি৷’ কথা শেষ করে হাসল কিটসন৷
‘আমি বাজি রেখে বলতে পারি তুমি প্রথমেই একটা গাড়ি কিনবে৷’ জিপো শুকনো মাটি মুঠো করে তুলে হাত মেলে ধরল৷ তার মোটাসোটা আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ল ধুলোর ঝরনা৷ সেদিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘বলো আলেক্স, ঠিক বলছি কি না? আমি জানি, তুমি গাড়ি চালাতে ভালোবাস৷ তোমার মতো গাড়ি চালাতে আমি কাউকে দেখিনি৷ সুতরাং প্রথমেই তোমার একটা স্পোর্টস কার কেনা উচিত। তারপর খুঁজে পেতে নিজের জন্যে একটা সুন্দরী বউ জোগাড় করো—তারপর বাকি জীবনটা সুখে কাটিয়ে দাও। মাথা দুলিয়ে হাসল জিপো, ‘আচ্ছা, জিনিকে তোমার কেমন লাগে বলো তো? দারুণ দেখতে, না? একটা কথা শুনে রাখো আলেক্স—ইটালির মতো জায়গাতেও জিনির মতো সুন্দরী খুব কমই আছে। তবে মেয়েটা আমার তুলনায় বড্ড বাচ্চা; তা না হলে ওকে নিয়ে আমি ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতাম।...তোমার সঙ্গে জিনিকে কিন্তু দারুণ মানাবে আলেক্স। ওর রুক্ষ ব্যবহারকে তেমন আমল দিও না। ও সবই ওপর-ওপর। তুমি যদি ওর হৃদয়ে পৌঁছতে পার, তবে দেখবে ওর ভেতরটা আর সব মেয়ের মতোই সুন্দর নরম। আমার তো মনে হয়, তোমাকে ও কিছুতেই ফেরাতে পারবে না ।’
কিটসন চুপচাপ শুনল। উন্মুক্ত ঘাড়ে অনুভব করল উত্তপ্ত সূর্যের পরোক্ষ স্পর্শ। জিপো ছাড়া যদি অন্য কেউ তাকে এ ধরনের কথা বলত,তাহলে সে মোটেই আমল দিত না। কিন্তু জিপো একেবারে তার মনের কথা বলছে। কথাগুলো ভেবে কিটসনের অবাক লাগল। কে জানে, হয়তো জিপোর কথাই ঠিক।
জিনিকে বুঝতে কিটসন হয়তো ভুল করেছে। হয়তো... কিন্তু যখনই জিনির ঠান্ডা সবুজ চোখজোড়া চোখের সামনে ভেসে উঠছে, তখনই কিটসনের মনে দ্বিধার ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। সত্যিই কি জিনি তার আহ্বানে সাড়া দেবে?
‘আলেক্স, আমার একটা কথার খোলাখুলি জবাব দাও তো? ‘সূর্যের আলো সরাসরি মুখে এসে পড়ায় চোখ বুজল জিপো, ‘তুমি সত্যি-সত্যি কি ভাবছ জিনির কথা?—জানো, তোমার জন্যে মাঝে মাঝে আমার চিন্তা হয়। এই কথায় তোমার হয়তো হাসি পাবে, কিন্তু আমি ঠাট্টা করছি না, আলেক্স। কাল রাতে ফ্র্যাঙ্কের কথায় যখন মনে মনে রাজি হলাম, তখনও আমি তোমার কথা ভেবেছি। আমি জানতাম, আমার মতো তোমারও এ কাজে অন্তরের সায় নেই। তুমি এ কাজটা চাওনি,তাই না? আমিও চাইনি। কিন্তু পর মুহূর্তেই তুমি হঠাৎ মনস্থির করে বসলে, তুমি রাজি। কেন? আমাকে সোজাসুজি জবাব দাও।’
হাতের উলটোপিঠ দিয়ে কিটসন কপালের ঘাম মুছল, ‘আগে বলো তোমার রাজি হওয়ায় কারণ কী?’
‘মেয়েটার কথায় কী যেন একটা আছে।’মৃদু স্বরে উত্তর দিল জিপো, ‘ও যখন ঘরে ঢুকল, তখন ওকে দেখে অবাক হলাম। ওর কথা বলার জোরালো ভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস আমাকে অবাক করল। আমি যেন নিজের ওপর আস্থা ফিরে পেলাম। ফ্র্যাঙ্কের কাছে যখন কাজটা সম্পর্কে শুনেছি, তখন একেবারেই রাজি হইনি। সমস্ত প্ল্যানটাকে কেমন খেলো আর অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু জিনি এসে সব ওলট-পালট করে দিল। মনে হল মেয়েটার প্ল্যান নেহাত পলকা নয়। তার ওপর দু-লক্ষ ডলারের হাতছানি আমাকে পাগল করে তুলল। এতদিনকার বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন—সব যেন এসে ভিড় জমালো ব্রেনের কোষে কোষে! আমাকে দামি স্যুট পরে, চোখ-ঝলসানো গাড়ি থেকে নামতে দেখে মায়ের অবিশ্বাস-ভরা খুশি-খুশি মুখটা যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম। কী জানি কী হয়ে গেল, রাজি হয়ে গেলাম।’
‘হুঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। মেয়েটার মধ্যে কী যেন একটা আছে।’ কিটসনের স্বরে অস্বস্তির সুর, ‘তাই তোমার মতো আমিও রাজি হয়ে গেলাম।’
সে যে জিনির ঘৃণার মুখোমুখি দাঁড়াতে না পেরে মরগ্যানের সপক্ষে ভোট দিয়েছে, সে-কথা কিটসন মরে গেলেও স্বীকার করতে পারবে না। জিপোর মতো সে অত আশাবাদী নয়। বারবারই তার মনে হয়েছে, এ কাজে হাত দিয়ে ফ্র্যাঙ্ক ভালো করেনি—এবং এই প্রথম যে তাদের পরাজয় স্বীকার করতে হবে, সে বিষয় কিটসন মোটামুটি নিশ্চিত। শুধু তার দুঃখ হচ্ছে জিপোর জন্যে। গো-বেচারা লোকটা এখন থেকেই খোয়াব দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু কিটসন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, নিয়তি তার সূক্ষ্ম জাল অতি সন্তর্পণে তাদের চারিদিকে গুটিয়ে আনছে।
‘আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না? ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আমাদের রাজি করিয়ে ছাড়ল? এখন মনে হচ্ছে...’ আচমকা থেমে গেল জিপো। মাথা তুলে ক্ষুদে-ক্ষুদে কালো চোখ সতর্কভাবে মেলে ধরল। চকিতে দেখল চারপাশের ঝোপঝাড়ের দিকে।
কিটসন অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কী, ব্যাপার?’
‘কিসের যেন একটা শব্দ হল না?’ জিপোর কান খাড়া করে স্থিরভাবে বলে, ‘যেন কিছু একটা চলে বেড়াচ্ছে? সাপ নয়তো, আলেক্স?’
‘সাপ? তো কী হয়েছে? সাপ আমাদের ধারে কাছেও ঘেঁষবে না৷’ জিপোর বিবর্ণ ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল কিটসন৷ সে চাইছিল জিনি সম্পর্কিত কথাবার্তা চালিয়ে যেতে৷ জিনিই এখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷
‘বলা যায় না, এসব জায়গায় সাপের উপদ্রব থাকতে পারে, আলেক্স৷’ জিপোর জলহস্তী চেহারা ভয়ে কাঠ৷ শুকনো গলায় ও বলে চলল, ‘আর এমনিতেই সাপকে আমি খুব ভয় পাই৷ আমার যেন মনে হল ও-পাশ দিয়ে কী একটা চলে গেল৷’
মুখভাবে বিরক্তি প্রকাশ করে কিটসন ঘুরে তাকাল জিপোর নির্দেশিত জায়গার দিকে৷ কিন্তু কিছুই তার চোখে পড়ল না৷
‘আলেক্স, আমার ছোট ভাই সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল৷ আমি এইমাত্র যেভাবে শুয়েছিলাম সেও ঠিক এইভাবেই শুয়েছিল৷ আর কোত্থেকে হঠাৎ একটা সাপ এসে ছোবল মারল ওর মুখে৷ ওকে কোলে করে বাড়ি পৌঁছবার আগেই ও মারা গেল৷ দশ বছরের মাখন-নরম বাচ্চা ছেলেটা দেখতে দেখতে নীল হয়ে গেল—ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল অমানুষিক যন্ত্রণার ছাপ৷ এই সাপটা...’
কিটসনের রুক্ষ স্বরে চুপ করে গেল জিপো৷
“ভগবানের দোহাই, জিপো৷ দয়া করে তোমার বকবকানি বন্ধ করো৷ কে তোমার ছোট ভাইয়ের কথা শুনতে চেয়েছে? মানলাম সে সাপের কামড়ে মারা গেছে, কিন্তু সাপের কামড়ে কি কেউ মারা যায় না?’
জিপো মুখ তুলে তাকাল কিটসনের দিকে৷ চোখের দৃষ্টিতে ঘৃণা৷
‘তোমার ভাই যদি এইভাবে সাপের ছোবলে মারা যেত, তাহলে তুমি আর এ ধরনের কথা বলতে না, আলেক্স৷ আমার ছোট ভাইয়ের সেই করুণ মৃত্যুর কথা আমি কি কোনওদিন ভুলতে পারব? তারপর থেকেই কেন জানি না, সাপ দেখলেই আমার ভীষণ ভয় করে৷’
‘কোথায় মেয়েটাকে নিয়ে দিব্যি কথা বলছিলাম, আর মাঝখান থেকে তুমি এই সাপের ব্যাপারটা টেনে আনলে!’ অধৈর্য সুরে বলে উঠল কিটসন৷
‘না, আমার মনে হল যেন কিসের একটা শব্দ শুনলাম; তাই।’
‘ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে—মেনে নিলাম তুমি একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছে৷ কিন্তু তাই বলে ধরে নিলে ওটা সাপের চলাফেলার শব্দ? তোমার এই কল্পনার বলিহারি যাই—হুঁঃ!’
জিপো একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বহুদূরে চলন্ত ধুলোর মেঘ চোখে পড়ায় চুপ করে গেল৷ হাত বাড়িয়ে কিটসনের কাঁধে হাত রাখল৷ আঙুল দেখাল ধুলোর কুণ্ডলীর দিকে৷
‘ওরাই আসছে বলে মনে হচ্ছে না৷’
কিটসন একচোখে চেয়ে রইল সুদূরপ্রসারী আঁকাবাঁকা রাস্তার দিকে৷ একটা জমাট আতঙ্কের পিণ্ড তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিতে চাইল৷
সহজাত অনুভূতিবশেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে৷ হাত বাড়িয়ে জিপোকে নিচু হতে বলল৷ জিপো শুনতে পেল তার চাপা উত্তেজিত ফিসফিসে কণ্ঠস্বর, ‘লুকিয়ে পড়ো! ওরাই আসছে!’
পাথরের মতো নিশ্চলভাবে পড়ে থেকে ওরা লক্ষ করতে লাগল দ্রুত এগিয়ে আসা ট্রাকটাকে৷
সামনের একটা বাঁকে ট্রাকটা মুহূর্তের জন্যে অদৃশ্য হল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার হাজির হল ওদের অপলক চোখের সামনে। ওরা লক্ষ করল, এবারে ট্রাকটার গতি যেন কিছুটা কমে গেছে। সম্ভবত বিপজ্জনক বাঁকের কাছে পৌঁছে ওরা কোনওরকম দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ট্রাকটা ওদের অতিক্রম করার সময় কিটসন হাতঘড়িতে সময় দেখল।
হাওয়ায় ঝাপটা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে ট্রাকটা বেরিয়ে যাওয়ার সময় পলকের জন্যে ওরা দেখতে পেল টমাস এবং ডার্কসনকে।
চলন্ত ট্রাকের ছবিটা মনের পরদায় খোদাই করে জিপো উঠে বসল।
ট্রাকটা একটা বাঁকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেতেই ওরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ধুলোর মেঘ থেকে চোখ সরিয়ে অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে।
‘একটা ট্রাক বটে!’ জিপো গাল চুলকোতে লাগল, ‘কিন্তু লোক দুটোকে দেখেছ? যেন শয়তানের চ্যালা!’
চলন্ত ট্রাকে বসে থাকা টমাস ও ডার্কসনকে কিটসন বেশ ভালোভাবেই দেখতে পেয়েছে। মোটামুটি ভালোভাবেই সে ওদের দুজনকে চেনে। তাই মরগ্যানকে বারবার সে সাবধান করে দিয়েছে। এখন ওদের দেখার পর কিটসনের সেই পুরোনো ভয়টা আবার ফিরে এল। উইন্ডশিল্ডের ও-পিঠে বেজির চোখ নিয়ে বসে-থাকা টমাস ও ডার্কসনের ছবি তার মনে টেনে দিল এক আতঙ্কের পরদা। কিটসনের মনে পড়ল, আর কিছুদিনের মধ্যেই ওদের সামনে তাকে মুখোমুখি চ্যালেঞ্জে দাঁড়াতে হবে। কেউ যেন একমুঠো বরফ-কুচি ছড়িয়ে দিল তার মস্তিস্কে।
‘তুমি এ জন্যে ভেবে ভয় পাচ্ছ, জিপো? সহজ হওয়ার চেষ্টা করল কিটসন, ‘তোমাকে তো আর ওদের সামনে আসতে হচ্ছে না! আর তাছাড়া, আমরাই কি কম নাকি? ওরা যদি শয়তানের চ্যালা হয় তবে আমরাও অনুবিসের অনুচর।’
জিপো অস্বস্তিভরে মাথা নাড়ল, ‘ওদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে না ভেবে আমি সত্যিই হালকা বোধ করছি। ওরা নেহাত সহজ লোক নয়!’
কিটসন পকেট থেকে একটা নোটবই বের করল। তাতে ট্রাকের বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করার সময়টা টুকে নিল।
‘তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। মরগ্যান আর ব্লেকই ওদের সামলাবে।’ বিরক্তিভরে জবাব দিল কিটসন।
‘কিন্তু জিনি? ওর কথাটা একবার ভেবে দেখেছ? ওইটুকু একটা মেয়ে, সে বলে কি না দরকার পড়লে গুলি চালাবে! আমার তো বিশ্বাসই হতে চায় না! তোমার কি মনে হয় ও সত্যি-সত্যিই তাই করবে?
কিটসন বারবার এই কথাটাই ভাবছিল। ভাবছিল, জিনি সত্যিই কি তা পারবে। সে যেন দেখতে পেল জিনির অতলান্ত সবুজ চোখ, উৎকণ্ঠাময় অভিব্যক্তি।
ঠোঁট উলটে জিপোর কথায় জবাব দিল কিটসন, ‘কী জানি?’ যাকগে, এবার চলো।’ হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসল সে। চোখ চেয়ে রাস্তাটা একবার এদিক-ওদিক দেখে নিল, কিন্তু জিপো, ট্রাকটাকে তুমি খুলতে পারবে তো?’
‘ফ্র্যাঙ্ক তো বলেছে ট্রাকটা খুলতে আমাকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেবে। তাহলে তো ভাবনার কোনও কারণ নেই। যন্ত্রপাতি আর সময় ঠিক মতো পেলে আমি খুলতে পারব না এমন তালা আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। অতএব ফ্র্যাঙ্ক যদি আমাকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দিতে পারে তবে নির্ভাবনায় থাকো। ওই শালার ট্রাক আমি খুলবই! আমারও নাম জিপো ম্যানডিনি!’
‘ফ্র্যাঙ্কও সেই কথাই বলছিল; কিন্তু মনে করো যদি কিছু একটা গোলমাল হয়ে যায়। যদি তোমাকে তাড়াহুড়োর মধ্যে ট্রাকের তালা ভাঙতে বলা হয় তাহলে কি তুমি পারবে, জিপো?’
জিপোর ভরাট মুখে পলকের জন্যে কেঁপে উঠল অস্বস্তির ছায়া, ‘এ কথা কেন বলছ, আলেক্স? ফ্র্যাঙ্ক তো আমাকে কথা দিয়েছে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেবে। তাহলে আর ভয় কী? এতদিন ধরে তা দেখছি ফ্র্যাঙ্কের কথার কোনও নড়চড় হয়নি! তোমার তালা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলেও বেশ বুঝতে পারছ এই ট্রাকটা খোলা ছেলেখেলার কথা নয়। ধীরে, অথচ নিখুঁতভাবে এই তালা খুলতে হবে—আর তার জন্যে সময় চাই। সুতরাং তাড়াহুড়ো করে সম্ভব নয়।’
‘তুমি এখানে অপেক্ষা করো,আমি গাড়িটা নিয়ে আসছি।’ কিটসন এগিয়ে চলল গাড়ির সন্ধানে।
জিপো চিন্তিতভাবে তাকিয়ে রইল কিটসনের দিকে। কিন্তু মনে মনে ভেবে চলল জিনির কথা, ওর প্রতিটি ভাব-ভঙ্গি, কিটসনের সঙ্গে ওর কথা বলার ধরন। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত বোধ করল জিপো!
এই কাজটা নিয়ে এত আলোচনার কী আছে? ভাবল সে অনুভব করল সূর্যের অসহ্য উত্তাপ। ফ্র্যাঙ্ক যখন ওদের আশ্বাস দিয়েছে, তখন কোনও ভয় নেই। তার ওপর ওই পুঁচকে মেয়েটা যেন ধরেই নিয়েছে দু-লক্ষ ডলার ওর হাতের মুঠোয়। তাছাড়া, এ কাজে জিপোর ভূমিকা খুব একটা বিপজ্জনক নয়! তাকে শুধু ট্রাকের তালাটা খুলতে হবে। আর ফ্র্যাঙ্ক যখন বলেইছে, ওকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে, তখন আর চিন্তার কী আছে? তালা এবং বিভিন্ন ধাতু সম্বন্ধে যাদের একটু অভিজ্ঞতা আছে, তারা ওই সময়ে যে কোনও তালাই খুলে ফেলতে পারবে—তা সে যত শক্তই হোক!
ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক নিঃশব্দে এগিয়ে গেল রিসার্চ স্টেশনের দিকে। তার চালক অথবা রক্ষী, কেউই জানতে পারল না চারজোড়া অনুসন্ধানী চোখ তাদের দৈনন্দিন কর্মপন্থাকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখছে। সাদা ধুলোর কুণ্ডলীকে পিছনে ফেলে ওরা এগিয়ে চলল...
রাত আটটায় মরগ্যান একটা আলোচনা সভা ডেকেছিল লু স্ট্রাইগারের জুয়ার আড্ডায়৷ কিন্তু ব্লেক পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই—সাতটা পঁয়তাল্লিশ৷ কারণ অবশ্য তেমন কিছু নয়; নেহাত তার ঘড়িটা বেয়াড়া সময় দিচ্ছেল বলেই৷
বার-এর লোকজনের ভিড় ঠেলে ব্লেক এগিয়ে চলল। ঘরের বন্ধ আবহাওয়া ভারী হয়েছে সিগারেটের ধোঁয়ায়। অনেক পরিশ্রমের পর সে দেখতে পেল স্ট্রাইগারকে। লালমুখো, মোটা লোকটা জুয়ার বোর্ডের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে।
‘কেউ ভেতরে গেছে নাকি, লু?’ ব্লেক প্রশ্ন করল।
‘উঁহু। দরজা খোলাই আছে। স্বচ্ছন্দে যেতে পার!’
‘আচ্ছা, আমাকে একটা স্কচ খাওয়াও দেখি!’
স্ট্রাইগারের এগিয়ে দেওয়া গেলাসটাকে দু-চুমুকে শেষ করে নামিয়ে রাখল ব্লেক। আনমনাভাবেই এগিয়ে গেল কোনার একটা টেবিলের দিকে। টুপিটাকে পিছন দিক থেকে সামান্য ঠেলে বসে পড়ল সে। টাইয়ের নটটাকে সামান্য আলগা করে গা-এলিয়ে দিল চেয়ারে।
অস্বাচ্ছন্দ্য আর ভাবপ্রবণতা ব্লেকের মন থেকে একমুহূর্তের জন্যও নিষ্কৃতি পায়নি। বিশেষ করে ফ্র্যাঙ্কের ওই রেস্তোরাঁ লুটের ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে—জিনির চিন্তা তো আছেই!
অন্য তিনজনের মতো ব্লেকের জীবন অতটা জটিল ছিল না; বরং সুখ সুবিধা ছিল প্রচুর। ব্লেকের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর ইচ্ছে ছিল একমাত্র ছেলেকে ভালোভাবে মানুষ করবেন, লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার করবেন। কিন্তু এত সুখে থেকেও পড়াশোনার ব্যাপারটা ব্লেকের কাছে বড় একঘেয়ে মনে হল। তাই মেডিকেল কলেজে বছর-দুয়েক কাটানোর পরই সে পড়াশোনার অধ্যায়ে পূর্ণচ্ছেদ টেনে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হল।পরে অনেক কষ্টে একটা চাকরি জোগাড় করল; কমিশনে গাড়ি কেনা-বেচার কাজ; এবং একইসঙ্গে সে আবিষ্কার করল নারী-সঙ্গ তার কাছে হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। সুতরাং অনিবার্যভাবেই আয়ের চেয়ে বিভিন্ন পথে ব্যয়ের পরিমাণই হতে লাগল বেশি। অবশেষে একদিন সে বুঝতে পারল পর্বতপ্রমাণ ঋণের বোঝায় তার শিরদাঁড়া নুয়ে পড়েছে৷ তখনই ব্লেক হাত লাগল কোম্পানির সিন্দুকে৷ সিন্দুক থেকে চার হাজার ডলার সরিয়ে সে চম্পট দিল৷ তার মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা জন্মাল যে পুলিশের চোখে সে সাফল্যের সঙ্গেই ধুলো দিতে পেরেছে৷ তাই গোয়েন্দা-পুলিশের জালে জড়িয়ে পড়ার মুহূর্তই পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ব্লেক একেবারে বোকা বনে গেল৷ তখন পর্যন্ত চার হাজার থেকে সে খরচ করেছে মাত্র দুশো ডলার৷ এরপর যথারীতি সে দোষী সাব্যস্ত হল, এবং শাস্তি পেল ছ-মাসের কারাদণ্ড৷ তখন ব্লেকের বয়েস মাত্র বাইশ বছর৷ পরে আর যে ব্লেক জেল খাটেনি, তা নয়৷ আরও দুবার তাকে যথাক্রমে তিন এবং চার বছরের জন্যে জেলে যেতে হয়েছে৷ ক্রমে-ক্রমে ব্লেকের মনে জেল সম্বন্ধে এক অদ্ভুত ঘৃণা এবং আতঙ্ক গড়ে উঠেছে৷
শেষ বার, যখন সে চার বছরের শাস্তি ভোগ করেছে, তার দেখা হয় মরগ্যানের সঙ্গে—ওই জেলেই৷ মরগ্যান তখন তার পনেরো বছর সশ্রম কারাদণ্ডের শেষ বছরটা কোনওরকমে কাটাচ্ছে৷ কিন্তু পনেরো বছর জেলের কথা শুনেই ব্লেকের শিরদাঁড়া কেঁপে উঠেছে—বুকে বয়ে গেছে হিমেল স্রোত৷
ওরা জেল থেকে ছাড়া পেল একই সঙ্গে৷ ছাড়া পাওয়ার পর মিলেমিশে দল বাঁধার প্রস্তাবটা মরগ্যানই রাখল ব্লেকের কাছে৷ অরাজি হওয়ার কোনও যুক্তি খুঁজে না পেয়ে ব্লেক রাজি হল৷
ব্লেকের রাজি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল গোলমেলে লাইনে মরগ্যানের খ্যাতি৷ জেলে থাকতে অনেকেরই মুখেই সে শুনেছে আজ হোক কাল হোক, মরগ্যান একটা মোটা দাঁও মারবেই৷ এবং তারপর সে একজন কেউকেটা হয়ে বসবে৷ সুতরাং ব্লেক মরগ্যানের প্রস্তাবে রাজি হতে দ্বিধা করেনি৷
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে জীবনের দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে ব্লেকের চোখের সামনে ধরা পড়েছে শুধুই হতাশা এবং ব্যর্থতার ইতিহাস৷ ভবিষ্যতের বিবর্ণ রূপ ও তার অজানা ছিল না৷ তাই জীবনের প্রথম এবং শেষ জুয়ার সে বাজি ধরেছে৷ ভবিষ্যতের রং বদলের চরম চেষ্টা না করে সে হার মানতে রাজি নয়৷ তার মনে হয়েছিল মরগ্যানই তাকে নিয়ে যাবে ঐশ্বর্যের রাজপথে৷ যে পথে কানাগলির আকারহীন বীভৎস প্রবেশের অধিকার নেই৷
ঘরের কোণায় একা একা বসে বসে স্বপ্নের জাল বুনে চলল ব্লেক৷ ভাবতে লাগল তার অংশের দু-লাখ ডলারের কথা৷ দু-লক্ষ ডলার! অত টাকা নিয়ে কী করবে সে? দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে? ব্লেকের মন স্বপ্নের পাখায় ভর করে উড়ে চলল! ওর চোখের সামনের রঙিন পরদায় ভেসে উঠল দেশ-বিদেশের সুন্দরী তরুণীদের ছবি, যাদের সুখ-সঙ্গের জন্যে সে পাগল৷ বেশ কিছুদিন মৌজ করার পর সে যাবে মন্টি কার্লোয়৷ সেখানে ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে আরও কিছু টাকা তাকে হাতাতে হবে৷ তারপর...
এমন সময় সমস্ত দিবাস্বপ্নের জাল ছিঁড়ে ব্লেকের সামনে উপস্থিত হল জিনি গর্ডন৷ ভেসে বেড়ানো ধোঁয়ার পুঞ্জ ভেদ করে ও এগিয়ে এল৷ উদ্ধত চিবুক, চোখের ভাষায় তাচ্ছিল্য৷ বার-এর অন্যান্য মধু-পিয়াসীর দল জিনিকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি, চোখ টেপাটেপি করতে লাগল৷ লুক স্ট্রাইগার তার জুয়ার আড্ডায় নারী সংক্রান্ত কোনওরকম আঠালো ব্যাপার পছন্দ করে না৷ নইলে বার-এ ঢোকার পর জিনির কী অবস্থা হতো বলা মুশকিল৷
ওফ্ একটা জিনিস বটে—ভাবল ব্লেক৷ তার চোখজোড়া অদূরে দাঁড়ানো জিনির শরীরে আটকানো৷ গোপন আলোচনার জন্যে লু স্ট্রাইগারের কয়েকটা বিশেষ ঘর আছে৷ সেগুলো সে মোটা টাকায় খদ্দেরদের ভাড়া দেয়৷ বার থেকে বেরিয়ে দু-তিন ধাপ সিঁড়ি নামলেই ঘরগুলো চোখে পড়ে৷ ব্লেক লক্ষ করল জিনি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত৷
জিনির পরনে আঁটোসাঁটো কালো নাইলনের কালো স্ল্যাক্স, আর শ্যাওলা সবুজ শার্ট—গলার কাছটা সামান্য খোলা৷
কিন্তু মেয়েটাকে বশ করা বড় কঠিন৷ আপন মনেই বলে উঠল ব্লেক৷ কোথায় থাকে, কী করে, কে জানে৷ তবে ওর সঙ্গ লাভে ব্লেকের বিন্দুমাত্রও অনীহা নেই৷ এখন একটু-আধটু মিষ্টি কথা বলে ওকে হাতে রাখা দরকার৷ পরে এই ট্রাক-ফাকের ঝামেলা মিটে গেলে জিনিকে নিয়ে একটু ফুর্তি করা যাবে৷ মেয়েটার মধ্যে প্রাণ আছে, আনন্দ আছে—আর চেহারা তো আছেই৷
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল ব্লেক৷ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে৷ ঘরগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে জিনিকে ধরে ফেলল সে৷
‘এই যে, জিনি—আমরা দুজনেই তাহলে প্রথমে পৌঁছলাম, কী বলো?’ তারপর কয়েক মুহূর্ত ব্লেকের চোখ খেলে বেড়াল জিনির আঁটোসাঁটো স্ল্যাক্সের ওপর, ‘ওফ্, এটা পরে তোমাকে দারুণ দেখাচ্ছে!’
জিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্লেকের আপাদমস্তক দেখল৷ সাগর-সবুজ-চোখ অভিব্যক্তিহীন নিস্পৃহ৷
‘তাই নাকি?’ নিরুত্তাপ স্বরে উত্তর দিল জিনি৷ তারপর দরজা খুলে ঘরে ঢুকল৷ সুইচ টিপে জ্বালিয়ে দিল ঘরের আলোটা৷
আলো জ্বেলে ও এগিয়ে গেল গোল টেবিলের কাছে৷ চেয়ারে বসে হাতব্যাগটা খুলল৷ চিরুনি আর আয়না বের করে অবাধ্য একমাথা তাম্রাভ চুলের বন্যাকে আয়ত্তে আনতে চাইল৷
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ব্লেকও বসল জিনির মুখোমুখি৷ প্রশংসাভরা চোখে অপলকে সে চেয়ে রইল জিনির তরঙ্গায়িত যৌবনের দিকে৷
‘শুনেছ তো, আজ রাতেই আমরা ছোট কাজটা সারছি৷’ হাসল ব্লেক, ‘ভয় পেলে নাকি?’
আয়না আর চিরুনি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল জিনি৷ বের করল এক প্যাকেট সিগারেট৷
‘ভয়? এতে ভয় পাওয়ার কী আছে?’ নিস্পৃহ স্বরে ও পালটা প্রশ্ন করল৷
‘তা অবশ্য ঠিক—অন্তত তোমার বেলায়!’ জিনির দিকে চোখ রেখে ব্লেক বলল, ‘তুমি ভয় পেয়েছ বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না৷’
ব্লেক ঝুঁকে পড়ল টেবিলের ওপর৷ লাইটার জ্বালিয়ে ধরল জিনির ঠোঁটের সামনে৷
কয়েকটি নিটোল মুহূর্ত কেটে গেল নীরবতায়৷ জিনি স্থিরচোখে চেয়ে রইল লাইটারের কম্পমান নীল শিখার দিকে৷ তারপর মাথা নামিয়ে সিগারেটের অগ্রভাগ স্পর্শ করাল লাইটারের আগুনে৷ ওর উষ্ণ, নরম রক্তিম ঠোঁট কুঞ্চিত হল রহস্যময় হাসিতে—কিন্তু সে পলকের জন্যে৷ এই দুর্জ্ঞেয় হাসির অর্থ ব্লেকের কাছেও রয়ে গেল অস্পষ্ট৷
‘হঠাৎ হাসবার কী হল?’ তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চাইল ব্লেক৷
জিনির চোখজোড়া আবার এসে থামল জ্বলন্ত লাইটারের ওপর৷ তাকাল ব্লেকও৷ এবং সবিস্ময়ে সে লক্ষ করল, তার হাত থরথর করে কাঁপছে৷ এক ঝটকার লাইটার নিভিয়ে দিল ব্লেক, চেয়ারে টান-টান হয়ে বসল, হাসল কষ্টকৃত হাসি৷
‘ঠিকই ধরেছ, জিনি, আমি ভয় পাচ্ছি৷ কিন্তু কেন জান?” টেবিলে আড়াআড়ি হাত রেখে, তার ওপর ভর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে এল ব্লেক, ‘আমার ভয় হচ্ছে, আজ রাতের ছোট কাজটায় কোনওরকম গোলমাল বাঁধিয়ে আসল কাজটাকে আমরা না কেঁচিয়ে ফেলি! তার ওপর এই রেস্তোরাঁ লুটের মতলবটা আমার ঠিক পছন্দসই নয়৷ ফ্র্যাঙ্ককে বহুবার আমি বারণ করেছি৷ এর চেয়ে ডুকাসের ওই পেট্রোলপাম্পটা কায়দা করা আমাদের পক্ষে অনেক সোজা এবং নিরাপদ ছিল—কিন্তু কে শোনে কার কথা৷ তাছাড়া ভেবে দেখো, এই রেস্তোরাঁর ব্যাপারটায় কোনও খদ্দের হঠাৎ বেশি সাহসী হয়ে উঠতে পারে—তখন? বুঝতেই পারছ, সে ক্ষেত্রে আমাদের গুলি চালানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না৷ আর সেই গুলিতে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে আসল কাজে হাত দেবার আগেই পুলিশ আমাদের পেছনে লাগবে৷’
ব্লেকের চোখে চোখ রেখে জিনি নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে কেউ যাতে সাহস দেখাতে না যায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷’
‘কাজে করার চেয়ে রেখে জিনি নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে কেউ যাতে সাহস দেখাতে না যায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷’
‘কাজে করার চেয়ে মুখে বলা অনেক সোজা৷’
ভুরু উচিয়ে অবাক চোখে তাকাল জিনি, ‘তাই নাকি? ঠ্যাঙানির কাছে ক্ষ্যাপা কুকুরও পোষ মানে; তেমনি রিভলভারের সামনে বীরত্ব দেখাতে গেলে তার ফল যে ভালো হয় না, সেটা বেশ ভালো করে প্রত্যেকের সমঝে দিতে হবে৷ তাহলেই আর গোলমালের কোনও ভয় থাকবে না৷’
ব্লেকের ভুরু কুঁচকে উঠল সংশয়ে, ‘তোমাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, জিনি৷...আচ্ছা, এর আগে কি কখনও কোনও দলের হয়ে তুমি কাজ করেছ?’
জিনির সবুজ চোখে নেমে এল ঘন মেঘের ছায়া৷
‘তাহলে আমাকে বোঝবার চেষ্টা কোরো না৷’ সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিল ও৷
ব্লেক অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে৷ তুমি যদি নিজেকে পরদার আড়ালেই রাখতে চাও, রাখো—আমার কোনও আপত্তি নেই৷ তবে একটা কথা তোমাকে জানিয়ে রাখা ভালো, আজ রাতে সবচেয়ে কঠিন কাজটা পড়েছে তোমারই ওপর৷ অর্থাৎ রেস্তোরাঁর খদ্দেরদের কাছ থেকে তাদের মানিব্যাগগুলো তোমাকেই জোগাড় করতে হবে৷ সেই সময়ে কেউ হয়তো তোমাকে বাধা দিতে পারে৷ সুতরাং সাবধান থেকো৷
ব্লেক মনে মনে জিনিকেও তার অবস্থার অংশীদার করতে চাইল৷ কিন্তু সে অবাক হল জিনির জবাব শুনে৷
‘আমার রিভলভারের সামনে সে চেষ্টা কেউ করবে বলে তো মনে হয় না৷’ নির্বিকার অভিব্যক্তিহীন মুখে বলল ও৷
এমন সময় দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকুল জিপো ও কিটসন।
ব্লেকের সঙ্গে জিনিকে ঘরের মধ্যে আবিষ্কার করে ভীষণ অবাক হল কিটসন৷ তার মনের চাপা ক্রোধ প্রতিফলিত হল রক্তিম মুখমণ্ডলে৷
‘এই যে, জামাইবাবু এসে গেছেন দেখছি৷’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল ব্লেক৷ তারপর বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল, ‘এ ব্যথা কী যে ব্যথা, বোঝে কী আন জনে...’
জিপো আর হাসি চাপতে পারল না৷ সশব্দে হেসে উঠল সে৷ তার কালো চোখের তারা নেচে উঠল উপচে পড়া খুশিতে৷ ব্লেকের রসালো টিপ্পনিতে সে দোষের কিছু দেখল না৷ কিন্তু কিটসনের মুখমণ্ডল হয়ে উঠল ফ্যাকাসে৷ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘থামো৷’ তোমার এই ছাগল-মার্কা রসিকতা পকেটে পুরে রাখো৷’
ব্লেক গান বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল৷ মুখে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি, ‘চটছ কেন, আলেক্স? ফ্র্যাঙ্কই তো বলল, তুমি আর ও... ...’ আঙুল তুলে নির্বিকারভাবে বসে থাকা জিনির দিকে দেখাল ব্লেক, ‘নব-বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী সাজতে যাচ্ছ, ক্যারাভানে চড়ে যাচ্ছ হানিমুন কাটাতে৷’
‘আমি তোমাকে থামতে বলেছি, এড৷’ দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল কিটসন৷
‘আরে, এতে তোমার আপত্তিটা কিসের? হালকা সুরে জানতে চাইল ব্লেক, ‘কেন, তুমি কি জিনির সঙ্গে হানিমুন কাটাতে রাজি নও৷ এমনিতেই ট্রাক-লুটের ব্যাপারে তোমার ভূমিকাটা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ তার ওপর জিনির মতো একটা চামর যন্তরকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালানোর চেয়ে মজা আর কী হতে পারে? অবশ্য সে সময়টুকু তোমাকে কাজে লাগাতে হবে, মানে...’
গুটিকয়েক পা ফেলে চকিতে ব্লেকের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল কিটসন৷ বিদ্যুৎচমকের মতো ঝলসে উঠল তার ডান হাত৷ আধমনি হাতুড়ির মতো সপাটে আছড়ে পড়ল ব্লেকের চোয়ালে৷
গোটা ঘরটা যেন কেঁপে উঠল প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে৷ চেয়ারসুদ্ধ মেঝেতে উলটে পড়ল ব্লেক ডিগবাজি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল কয়েক মুহূর্ত৷ তারপর চোখ তুলে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকাল তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে৷
‘ওঠ শালা ভেড়ুয়ার বাচ্চা৷ তোর সবকটা দাঁতই আমি উপড়ে নেব৷!’ কিটসনের বিশাল শরীর রাগে কাঁপছে৷ ‘এই আলেক্স—শোনো—’ জিপো ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল৷ কিটসনের হাতের এক ঝটকায় সে ছিটকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল দেওয়ালে৷
ব্লেক বারকয়েক মাথা ঝাঁকিয়ে ঘৃণাভরা চোখে দেখল কিটসনকে, ‘বহুদিন ধরে শুধু এই রকম একটা সুযোগের অপেক্ষাই করছিলাম৷ শালা, এবার তোর বক্সিং করার শখ চিরকালের জন্যে ঘুচিয়ে দেব!’
ব্লেক সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঘরে এসে ঢুকল মরগ্যান।
তাকে দেখে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল জিপো, ‘ওদের আটকাও, ফ্র্যাঙ্ক! ওরা এক্ষুনি একটা মারপিট বাঁধাবে!’
মরগ্যান দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে থামল দুজনের মাঝখানে৷ কিটসনের দিকে পিছন ফিরে ব্লেকের মুখোমুখি দাঁড়াল সে, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’ কৃত্রিম নম্রস্বরে তিরস্কার করল মরগ্যান৷ তার সরীসৃপ কালো চোখ ধক্ ধক্ করে জ্বলছে৷
ব্লেক ইতস্তত করল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল৷ কোটটাকে টেনেটুনে ঠিক করল, আঙুল চালাল অবিন্যস্ত চুলের ফাঁকে৷ একটা চেয়ার হ্যাঁচকা মেরে টেনে নিয়ে তাতে বসল৷ মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে চোখ রেখে আহত চোয়ালে হাত বেলাতে লাগল সে৷
মরগ্যান এবার ফিরল কিটসনের দিকে, ‘দলের মধ্যে কোনওরকম গোলমাল করবার চেষ্টা কোরো না, আলেক্স, তাহলে তুমি নিজেই গোলমালে পড়বে৷ এই শেষ এই নিয়ে আর দ্বিতীয় দিন তোমাকে আমি সাবাধান করব না৷ নাও—বোসো!’
জিনি এবং ব্লেকের থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা চেয়ার দিয়ে বসে পড়ল কিটসন৷
জিপো তখনও অস্বস্তির ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি৷ টেবিলের কাছে এসে জিনির পাশে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করল, ‘তোমার পাশে বসলে কোনও আপত্তি আছে?’
জিনি মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—স্বচ্ছন্দে বসতে পার৷’
বিব্রত হয়ে কপট হাসি হাসল জিপো৷ বসল জিনির পাশে৷
মরগ্যান ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল৷ ঠোঁটের কোনায় অলস ভঙ্গিতে ঝুলছে একটা জ্বলন্ত সিগারেট; মাথার টুপি চোখের ওপর টেনে নামানো৷
‘শোনো তাহলে—’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘আজ রাত ঠিক বারোটা বেজে দশ মিনিটের সময় আমরা সেই রেস্তোরাঁটা লুট করছি; অর্থাৎ যখন কাফে থাকবে খদ্দেরদের ভিড়ে জমজমাট—এবং অন্য কেউ যে হঠাৎ এসে পড়ে আমাদের কাজ পণ্ড করে দেবে সে সম্ভাবনাও কম৷ স্বাভাবিকভাবে গাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ত্ব থাকবে কিটসনের ওপর!’ মরগ্যান থামল, এক পলক দেখল কিটসনকে, ‘তুমি তো জানো রেস্তোরাঁটা কোথায়! সুতরাং পালাবার পথ খুঁজে নিতে তোমার কোনওরকম অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ গাড়ির ইঞ্জিন চালু রেখে আমাদের জন্যে তুমি রাস্তার অপেক্ষা করবে৷ যদি শেষ পর্যন্ত কাজটা পণ্ড হয়ে যায় তাহলে তোমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি ছোটাতে হবে—আর কোনও গাড়ি যদি আমাদের পিছু নেয় তবে তাকে ঝেড়ে ফেলার ভার আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম—কী বলো?’
গুম হয়ে বসেছিল কিটসন৷ মরগ্যানেরে কথায় সে শুধু মাথা হেলাল৷
‘জিনি, তুমি, এড আর আমি—’ পায়চারি করতে করতেই বসে চলল মরগ্যান, ‘এই তিনজন রেস্তোরাঁয় ঢুকব৷ লু আমাকে একটা মেশিনগান ধার দেবে বলেছে৷ তাছাড়া তোমার আর এডের হাতে রিভলভার থাকবে৷ আমার পেছনে পেছনে তুমি ভেতরে ঢুকবে৷ আমরা ঢুকলেই এড দরজার পরদা ফেলে দেবে—খোলা রিভলভার হাতে দরজাটা পাহারা দেবে৷ ‘আমি সোজা গিয়ে দাঁড়াব বার-এর ওপর যাতে মেশিনগান দিয়ে গোটা ঘরটাকেই কবজা করতেই পারি৷ আশা করি মেশিনগান দেখে কেউ আর বিশেষ চেঁচামেচি করবে না৷ যাকগে, এইভাবে লোকগুলোর চুপ করানোর পর শুরু হবে তোমার কাজ৷ অর্থাৎ প্রত্যেকের মানিব্যাগগুলো তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে৷ ক্যাশ টাকা ছাড়া আর কিছু আমরা চাই না৷ কিন্তু এড, সেই সময় যদি কেউ কাফেতে ঢোকবার চেষ্টা করে, তবে তাকে বাধা দেওয়ার দায়িত্ব তোমার৷ ঠিকমতো যদি আমরা সব কাজ করতে পারি, তাহলে মিনিট পাঁচেকের বেশি সময় লাগবে না৷ অবশ্য সেটা নির্ভর করছে তোমার ওপর৷’ জিনির দিকে আঙুল দেখাল মরগ্যান, ‘কাজ করার সময় তোমাকে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে—কারণ মানিব্যাগ তোলার সময় হয়তো কোনও মাতাল আচমকা তোমার রিভলভার কেড়ে নেবার চেষ্টা করতে পারে৷ আর নেহাত প্রয়োজন না পড়লে আমরা বন্দুক ব্যবহার করতে চাই না৷’
জিপোর কালো চোখ অস্বস্তিতে চঞ্চল হয়ে উঠল৷ এ কাজে তার কোনও ভূমিকা নেই ভেবে তার আশ্বস্ত লাগল৷
কিটসন একদৃষ্টে টেবিলের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটতে লাগল৷ গাড়ির দায়িত্ব দেওয়ার জন্যে ফ্র্যাঙ্ককে সে মনে মনে ধন্যবাদ দিল৷ ওঃ কাফেতে সটান ঢুকে চল্লিশ-পঞ্চাশজন লোককে সামাল দেওয়া নেহাত চাট্টিখানি কথা নয়! তার নিজের অতখানি সাহস আছে কি না সে বিষয়ে কিটসনের যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷
ব্লেক ভেতরে ভেতরে তখনও কিটসনের ওপর রাগে জ্বলছে৷ কিন্তু মরগ্যানের কথায় তার মন থেকে কিটসনের চিন্তা একেবারে উবে গেল৷ একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে তার পাকস্থলীটা যেন কুঁকড়ে যেতে চাইল৷
‘ঠিক আছে’, বলল ব্লেক, ‘তুমি যদি এ ভাবেই কাজটা করবে বলে ঠিক করে থাক তবে আমার আর কিছু বলার নেই৷ কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছে, এর চেয়ে একটা সহজ কাজ নিলেই আমরা ভালো করতাম—এ কাজটা আমার একেবারেই মনপসন্দ নয়৷’
মরগ্যান পায়চারি থামিয়ে থমকে দাঁড়াল, ‘আমি তা জানি এড৷ কিন্তু এ-কাজের আগে এটা মোটামুটিভাবে আমাদের একটা পরীক্ষা৷ এই কাজ থেকেই আমি বুঝতে পারব, আসল কাজের সময় তোমরা মাথা ঠান্ডা রেখে এগোতে পারবে কি না৷ সেই জন্যে এই কাঠে লুটের প্ল্যানটা আমার মাথায় এসেছে—’ মরগ্যান টেবিলের কাছে এগিয়ে এল, সরাসরি চোখ রাখল জিনির চোখে, ‘এটা তোমারও পরীক্ষা জিনি৷ প্রথম থেকেই তুমি বড় বেশি কথা বলেছ, এবং আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করেছি৷ এখন আমি দেখতে চাই তোমার কথার মধ্যে সত্যের পরিমাণ কতটুকু৷ সেইজন্যেই এ কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তোমার—সবচেয়ে কঠিন কাজটাই আমি তোমার জন্যে রেখেছি৷’
জিনির স্থির চোখকে মোকাবিলা করল মরগ্যানের দৃষ্টি৷
‘নিশ্চিন্ত থাকো, ফ্র্যাঙ্ক৷ কাজটাকে তুমি যতটা কঠিন ভাবছ ততটা কঠিন নয়৷ আমি ঠিক পারব৷’ থামল জিনি৷
মরগ্যান হাসল, ‘সময় এলেই সেটা বোঝা যাবে৷ ঠিক আছে, এবার বাকিটা তোমরা শুনে নাও৷ কিটসন, তুমি জিপোর গাড়িটা নিয়ে ঠিক বারোটা দশ মিনিটে কাফের সামনে হাজির থাকবে৷ তোমার ঘড়িটা ঠিক আছে তো? কটা বাজে দেখো তো?’
‘আটটা কুড়ি৷’ হাতঘড়ি দেখে জবাব দিল কিটসন৷
‘আর আমার ঘড়িতে আটটা বেজে তেইশ মিনিট৷’ নিজের ঘড়ি দেখে সময় বলল মরগ্যান,
‘লু-র কাছ থেকে তুমি মেশিনগানটা নেবে৷ সেটাকে রাখবে গাড়ির পেছনের সিটে৷ তারপর কাফেতে তুমি একাই যাবে৷ আমি আর এড হেঁটেই যাব৷ কাফেতে ঢোকার সময় আমি পেছনের সিট থেকে মেশিনগান তুলে নেব৷’ মরগ্যান ফিরল জিনির দিকে, ‘তুমি ম্যাডক্স স্ট্রিট ধরে আসবে৷ কাফের কাছে ঠিক বারোটা দশেই পৌঁছবে—যেন দেরি না হয়৷ সময়ের ব্যাপারে আমাদের ভুল করলে চলবে না৷ তোমার কাছে ঘড়ি আছে তো?’
জিনি সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল;
‘ঠিক আছে৷ তা হলে আলেক্স, যাবার সময় লু-র কাছ থেকে তুমি মেশিনগানটা নিয়ে যেও৷ জিপো, তুমিও ওর সঙ্গে যাও৷ দেখো তোমার সাধের পক্ষীরাজ আবার ইঞ্জিন বিগড়ে না বসে থাকে৷ বারোটা বেজে দশ মিনিটে আবার আমাদের দেখা হবে, কেমন?’
কিটসন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল! অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল মরগ্যানের দিকে; তারপর দেখল জিনিকে৷ হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে সে এগিয়ে চলল দরজার দিকে; জিপো তাকে অনুসরণ করল৷
ওরা চলে যেতেই মরগ্যান বলল, ‘তুমি ঠিক আছ তো?’ সে প্রশ্ন করল জিনিকে৷
ভুরু উঁচিয়ে তাকাল জিনি, ‘কেন, ঠিক না থাকার কোনও কারণ ঘটেছে নাকি?’
‘দেখো, আমার সামনে বেশি বড় বড় কথা বোলো না৷’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘এ ধরনের কাজ আমি বহু করেছি, কিন্তু তবুও আমি যে একেবারেই ভয় পাই না তা নয়৷ আমাকে ধোঁকা দেবার চেষ্টা কোরো না, জিনি৷ আমি জানতে চেয়েছি—তুমি ঠিক আছ কি না? এখনও ভেবে দেখো, এ কাজটা তুমি পারবে তো!’
জিনি হাত বাড়িয়ে ধরল মরগ্যানের দিকে৷ ওর আঙুলের ফাঁকে একটা জ্বলন্ত সিগারেট৷ একটা সূক্ষ্ম রেখায় স্থিরভাবে এঁকেবেকে উঠছে সিগারেটের ধোঁয়া৷ জিনির আঙুলের সিগারেট নিথর, নিষ্কম্প৷
‘আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে, ভয় পেয়েছি?’ শান্তস্বরে জানতে চাইল জিনি৷ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷
মরগ্যান ও ব্লেক চোখ তুলে তাকাল জিনির দিকে৷
‘বারোটা দশে আমাদের দেখা হবে৷’ মরগ্যানের চোখে চোখ রেখে বলল জিনি৷ তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে হেঁটে চলল দরজার দিকে৷ স্বাভাবিকভাবেই ওর নারীসুলভ বিশেষত্ব ব্লেকের চোখ এড়াল না৷ বাইরে বেরিয়ে নিঃশব্দে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল জিনি৷
‘মেয়েটার সাহসের প্রশংসা করতে হয়৷’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল ব্লেক৷
‘কে জানে৷’ মৃদুস্বরে উত্তর দিল মরগ্যান, ‘অনেক সাহসী লোককেই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে আমি ভেঙে পড়তে দেখেছি৷ আসল কাজের সময়েই আমরা জিনির সত্যিকারের পরিচয় পাব৷’ মরগ্যান উঠে দাঁড়াল, ‘আচ্ছা—তাহলে এবার ওঠা যাক৷’
রাত ঠিক বারোটা বেজে পাঁচ মিনিটের সময় মরগ্যান এবং ব্লেক এসে উপস্থিত হল ম্যাডক্স স্ট্রিটের মোড়ে৷ রাস্তা পার হয়ে একটা অন্ধকার দোকানঘরের সামনে ওরা থমকে দাঁড়াল৷ চোখের শ্বাপদ দৃষ্টি প্যালেস অল-নাইট কাফের দিকে৷
পরদা-ঢাকা জানলার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে উজ্জ্বল আলোর রেখা৷ কাচের দরজার ওপারে অবস্থিত বার-এর একাংশ ওদের নজরে পড়ল৷
আধ-খাওয়া সিগারেটের টুকরোটা টোকা মেরে রাস্তায় ছুঁয়ে দিল মরগ্যান, ‘ওই যে কাফে৷’
‘আমি বাজি রেখে বলতে পারি, এ কাজের হাত থেকে রেহাই পেয়ে জিপো মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিচ্ছে৷’ বন্ধ হাতের মুঠোয় ঘামের তৈলাক্ত অনুভূতি এবং হৃৎপিণ্ডের অসংলগ্ন, ক্লান্ত পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ব্লেক বলে উঠল৷
‘এবং জিপোকে এ কাজ থেকে বাদ দিতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি৷’ বলল মরগ্যান৷ কিন্তু বুকের ঢিপঢিপ শব্দ উৎকটভাবে তার কানে বাজল৷ ঠোঁট দুটোতে শুকনো জিভ বুলিয়ে সে সহজ হতে চাইল, ‘কিটসন গাড়ি নিয়ে হাজির হওয়ামাত্রই আমরা রাস্তা পার হয়ে কাফেতে ঢুকছি৷’
‘হু, কথা বলতে বলতেই প্যান্টের পিছনের পকেটে হাত ঢোকাল ব্লেক৷ অনুভব করল .৩৮ রিভলবারের শীতল স্পর্শ৷ এমন সময় সে লক্ষ করল, জিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কাফের দিকে৷ ওর পরনের পোশাকের কোনও পরিবর্তন হয়নি—সেই কালো স্ল্যাক্স আর শ্যাওলা সবুজ শার্ট৷ কিন্তু ওর তামা-রঙ চুলের ঢল একটা সবুজ স্কার্ফের আবরণে ঢাকা৷ রাস্তার স্বল্প আলোয় ওর মুখের যতটুকু ব্লেকের নজরে পড়ল, তাতে তার মনে হল জিনির সৌন্দর্যকে অনেকাংশ ম্লান করে দিয়েছে ওর মাথার সবুজ স্কার্ফ; যার আড়ালে অদৃশ্য হয়েছে জিনির রেশমি চুল৷
‘ওই যে, জিনি এসে গেছে৷’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলে উঠল ব্লেক৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জিপোর ঝরঝরে লিংকন গাড়িটা এসে থামল কাফের দরজার সামনে৷
‘চলো, এবার যাওয়া যাক৷’ ব্লেকের আস্তিন ধরে টান মারল মরগ্যান৷ তারপর দ্রুত লম্বা পা ফেলে রাস্তা পার হতে লাগল৷
কাফের সামনের রাস্তাটা একেবারে নির্জন—নিঃশব্দ৷ ওদের কানে এল কাফের জ্যুক-বক্স থেকে ভেসে আসা ওয়ালস্ সংগীতের হালকা সুর৷
মরগ্যান গিয়ে থামল লিংকনের পাশে৷ চারপাশে একনজর দেখে হাত বাড়িয়ে পিছনের সিট থেকে তুলে নিল মেশিনগানটা৷
‘ঠিক সময়ের জন্যে প্রস্তুত থেকো আলেক্স৷’ গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা কিটসনের দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো ছুড়ে মারল মরগ্যান, পালাবার সময় এক সেকেন্ড সময়ও আমি নষ্ট করতে চাই না৷’
কিটসন একটা অস্ফুট শব্দ করে সায় জানাল৷ ওর হাতে শক্তভাবে আঁকড়ে রইল স্টিয়ারিং হুইলটা৷
ব্লেক ইতিমধ্যে একটা রুমাল বের করে মুখের নিম্নাংশ ঢেকে ফেলেছে৷ রুমালের গিঁট বাঁধতে গিয়ে সে টের পেল উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় তার হাত অস্থির হয়ে উঠেছে৷
জিনি তখন মুখ ঢাকার পালা সেরে কাফের দরজার কাছে চুপটি করে দাঁড়িয়ে৷ হাতে ধরা .৩৮ পুলিশ স্পেশালটা ওর শরীরের পাশে সমান্তরাল ভাবে ঝুলছে৷
মরগ্যান মুখোশ ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন অনুভব করল না৷ এ লাইনে এতদিন থেকে তার যা যৎসামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে সে ভালোভাবেই জানে কাফের কোনও খদ্দেরই পুলিশের কাছে তাদের চেহারার সঠিক বর্ণনা দিয়ে উঠতে পারবে না৷ কারণ এই আতঙ্কের মুহূর্তে ওদের চিন্তাক্ষমতা সম্পূর্ণ লোপ পাবে৷
‘এসো ভেতরে ঢোকা যায়৷’ দ্রুত গভীর শ্বাস টেনে বলল মরগ্যান৷ তারপর এগিয়ে গেল জিনির কাছে, ‘তুমি দরজাটা খুলেই পাশে সরে দাঁড়াবে৷’
‘জানি৷’ জিনির শীতল, নির্বিকার উত্তর মরগ্যানকে অবাক করল৷ সে তাকাল জিনির দিকে৷ নিষ্পলক চোখে মেয়েটা তারই চোখে তাকিয়ে৷
‘হুঁ, মেয়েটার নার্ভের প্রশংসা করতে হয়৷ ভাবল মরগ্যান৷ কিন্তু আমি ভেবেছিলাম বুঝি... অবিশ্বাস্য! এইটুকু একটা কচি মেয়ের পক্ষে এতখানি ঠান্ডা মাথায় কাজ করা কখনই সম্ভব নয়? অথচ...
জিনি দরজার খুলে তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল৷ মরগ্যান ওর পাশ কাটিয়ে ঢুকল ভেতরে৷ বার-এর কলগুঞ্জন এবং উত্তপ্ত আবহাওয়া যেন চোখেমুখে এসে ঝাপটা মারল৷
জিনি মরগ্যানকে অনুসরণ করতেই ব্লেক এগিয়ে গেল দরজার কাছে৷ মুখে বাঁধা রুমাল ঘামে ভিজে উঠেছে৷ ঘেমে উঠেছে হাতের রিভলভারও৷ ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে৷ পরদা টেনে দিল কাচের ওপর৷
বার কাউন্টারে দুজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়েছিল৷ বাইরের ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকতেই তারা ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে দেখল৷ প্রথমে তাদরে নজর পড়ল মরগ্যানের মুখের দিকে—তারপর তার হাতের মেশিনগানটার দিকে৷ এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যের আকস্মিকতায় তাদের চোখজোড়া গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল; মুখের রং মিলিয়ে গিয়ে ভেসে উঠল একটা ফ্যাকাসে ভাব৷ তখনই ওরা দেখতে পেল রুমালে ঢাকা জিনিকে৷
মরগ্যান চিৎকার করে উঠল, ‘সাবধান, পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ান আপনারা৷’ তার হাতের মেশিনগান আদেশের ভঙ্গিতে আন্দোলিত হল৷
ঘরের কলকুঞ্জন নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল৷ অখণ্ড নীরবতা ভঙ্গুর আসবারের মতো ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে৷ মরগ্যানের তীক্ষ্ণস্বর রেশমি কাপড়ে ছুরির ঝলকের মতো কেটে বসল সেই জমাট নিস্তব্ধতার ওপর৷
বুড়ো লোক দুটো পিছোতে গিয়ে একজন আরেকজনের ঘাড়ের ওপর উলটে পড়ল৷
বার কাউন্টারে এত হাতের ওপর ভয় দিয়ে মরগ্যান শূন্যে লাফিয়ে উঠল৷ পরমুহূর্তেই তাকে দেখা গেল পা-ফাঁক করে, দুহাতে মেশিনগান আঁকড়ে কাউন্টারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে৷
এলোপাথাড়ি লাথি চালিয়ে মরগ্যান কাউন্টারের ওপর সাজানো বোতলগুলো চারিদিকে ছিটকে ফেলল৷ কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দের সঙ্গে ভেসে এল কোনও তরুণীর ভয়ার্ত চিৎকার৷ কাফের চেয়ারে বসে থাকা প্রতিটি লোক চমকে উঠে দাঁড়াল৷ শুরু হল পরস্পরের মধ্যে চাপা গুঞ্জন৷
‘খবরদার!’ গর্জে উঠল মরগ্যান৷ সেই সঙ্গে নেচে উঠল তা হাতের মেশিনগান, কেউ নিজেদের জায়গা ছেড়ে নড়বেন না; চুপচাপ বসে পড়ুন৷ আপনারা চুপ থাকলে আমার মেশিনগানও চুপ থাকবে৷ কারও একটু বেচাল দেখলেই একেবারে সীসের বস্তা করে ছাড়ব!’
বুকের খাঁচায় আবদ্ধ হৎপিণ্ডের আকুল দাপাদাপি ব্লেকের কানে যেন দামামার মতো বাজতে লাগল৷ ঘামের বন্যায় তার দৃষ্টি হয়ে এল অবরুদ্ধ৷ নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টায় এক হ্যাঁচকায় রুমালটা খুলে ফেলল ব্লেক৷’ বুক ভরে শ্বাস নিল৷ জনাকীর্ণ কাফের চারপাশে চোখ বুলিয়ে রিভলভারটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে৷ কিন্তু অবাধ্য হাতের কাঁপুনি সে বাঁধনকে শিথিল করে দিতে চাইল৷ ব্লেক তখন মনে মনে প্রার্থনা করছে, যেন ওদের কোনও বিপদের মুখোমুখি না পড়তে হয়৷
একটা বুড়ি ভাঙা গলায় চিৎকার করে উঠল৷ দুজন লোক চেয়ার ছেড়ে ওঠবার চেষ্টা করতেই তাদের সঙ্গিনীরা হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল৷ ঘরের সকলেই যেন নিটোল পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে৷
গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে বলে উঠল মরগ্যান, ‘ভালো করে কান দিয়ে শুনুন আমাদের শুধু ক্যাশ টাকা চাই! অতএব চটপট আপনাদের মানিব্যাগগুলো বের করে টেবিলে রাখুন৷ চটপট—তাড়াতাড়ি করুন!’
বেশির ভাগ লোকই তাদের ব্যাক পকেট হাতড়াতে লাগল৷ একই সঙ্গে জিনিও তৈরি হল ওর দায়িত্ব পালনের জন্যে৷ মরগ্যানের দেওয়া ক্যাম্বিসের থলেটা স্ল্যাক্সের পকেট থেকে বের করল ও৷ তারপর বাঁ হাতের থলেটা ঝুলিয়ে, ডানহাতের .৩৮ নাচিয়ে এগিয়ে চলল টেবিলের সারির মধ্যে দিয়ে৷ প্রত্যেক টেবিলের কাছে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়িয়ে ও তুলে নিতে লাগল পড়ে থাকা মানিব্যাগগুলো, এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে ঢুকিয়ে রাখতে লাগল বাঁ হাতের থলেতে৷
দরজার কাছে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে ব্লেক ওকে লক্ষ করতে লাগল৷ ধীরে অথচ অত্যন্ত সাবধানে জিনি এগিয়ে চলল৷ যেন ভঙ্গুর বরফের চাদরে পা রেখে ও হেঁটে চলেছে৷ কিন্তু ওর চলার মধ্যে দ্বিধার ছায়া সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য৷ যান্ত্রিকভাবে কাজ করে চলল জিনি৷
মরগ্যান আবার হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল, ‘চটপট করুন! মানিব্যাগ বের করতে ফালতু সময় নষ্ট করবেন না৷ বলা যায় না, আমার আঙুলের চাপে মেশিনগান থেকে হয়তো... কিন্তু তা আমি চাই না৷ সুতরাং মানিব্যাগগুলো চটপট মেয়েটার হাতে তুলে দিন!’
এতক্ষণে ব্লেক কিছুটা স্বস্তি বোধ করল৷
মরগ্যান আর জিনিই বলতে গেলে কাজটা হাসিল করল—ভাবল সে৷ ওঃ সাহস আছে বটে ওদের৷
মরগ্যানের স্বরের কাঠিন্য ও শীতলতা সারা ঘরে ছড়িয়ে দিল হিমেল আতঙ্ক৷ তার দাঁড়াবার দৃপ্তভঙ্গি, সেই সঙ্গে শক্ত মুঠোয় ধরা কালো চকচকে মেশিনগানটা যেন শিয়রে দাঁড়ানো মৃত্যুদূতের প্রতিমূর্তি৷’
ওর যান্ত্রিক পরিক্রমার মধ্যে হঠাৎই একটা টেবিলের সামনে থমকাল জিনি৷ টেবিলে বসেছিল একজন সুন্দরী তরুণী; পরনে দামি লোমের কোট৷ তার পাশে বসা স্থূলকায় চেহারার একটি লোক, চোয়ালের রেখা কঠিন, চোখের দৃষ্টি ক্রূর৷ টেবিলের ওপর কোনও মানিব্যাগের চিহ্নমাত্র নেই৷
জিনি তাকাল লোকটার দিকে৷ ওদের চোখাচোখি হল৷ লোকটার ধূসর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল৷
‘ব্যাগটা চটপট বের করে দিন, স্যার৷ শুধু শুধু সময় নষ্ট করবেন না৷ নরম স্বরে বলল জিনি৷
‘দুঃখিত৷ আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই৷ তাছাড়া তোমার মতো কোনও বাজারের মাগীকে দেবার জন্যে আমি টাকা সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না৷’ নির্বিকারভাবে জবাব দিল লোকটা৷
ব্লেক ঘামতে শুরু করল৷ সে যেন বিপদের গন্ধ পেল৷ বিচলিত হয়ে সে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ সে একইভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে৷ স্থির তার হাতের মেশিনগানও তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মরগ্যান তখন লক্ষ করছে জিনিকে। ঠোঁট সরে গিয়ে তার দাঁতের সারি আংশিক উন্মুক্ত—সারা মুখে নেকড়ের হিংস্রতার ছাপ৷
‘ব্যাগটা বের করে দাও৷’ জিনির স্বর উঁচু পরদায় উঠল৷
‘শালা কুত্তির বাচ্চা! আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই!’ জিনির দিকে চোখ রেখে উত্তর দিল লোকটা৷
লোকটার সঙ্গিনীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠল৷ আতঙ্কে তার চোখজোড়া বুজে এল৷ ধীরে ধীরে সে ঢলে পড়ল লোকটার গায়ে৷ কিন্তু লোকটা অধৈর্যভাবে মেয়েটিকে ঠেলে সরিয়ে দিল৷
এবার রিভলভার উঁচিয়ে ধরল জিনি, ‘চটপট বের করে ফ্যাল মোটা, নইলে একেবারে ঝাঁঝরা করে দেব!’
জিনির কর্কশ ধমকানিতে এতটুকু চমকাল না লোকটা৷ তার মুখের পেশি কঠিন হল, দাঁতে দাঁত ঘষে সে বলল, আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই!! বেরো এখান থেকে!’
মরগ্যান মেশিনগানের নল ঘুরিয়ে লোকটার দিকে লক্ষ করল৷ কিন্তু সে জানত এ প্রচেষ্টা নিরর্থক৷ কারণ লোকটা এবং মরগ্যানের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিনি৷ মরগ্যান যে এ অবস্থায় গুলি চালাতে পারে না, সেটা লোকটাও বেশ বুঝতে পারল৷
সুতরাং এই অবস্থাকে সামলানোর দায়িত্ব পুরোপুরি জিনির৷ তাই মরগ্যান তীক্ষ্ণতে ওদের লক্ষ করতে লাগল৷ সে জানত এটাই জিনির চরম পরীক্ষা৷ এই স্নায়বিক চাপের মুহূর্তে ও কি ভেঙে পড়বে?
মরগ্যান তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই৷
জিনি লোকটার দিকে চেয়ে হাসলঃ সে হাসির ঝলকানি রুমালের আড়ালে পলকের জন্যে আবির্ভূত হয়েই মিলিয়ে গেল৷ তার ক্ষণস্থায়ী রেশ ফুটে উঠল জিনির সবুজ চোখে৷ পরমুহূর্তে সাপের ছোবলের মতো ওর পিস্তলসুদ্ধ হাত আছড়ে পড়ল লোকটার মুখে৷ ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে লোকটা বাধা দেওয়ার কোনও সুযোগই পেল না৷ .৩৮-এর নলটা আড়াআড়িভাবে আঘাত করল তার নাকে এবং গালে৷ গাল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল৷ মুখে দু-হাত চাপা দিয়ে পিছন দিকে হেলে পড়ল লোকটা৷ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা অস্ফুট আর্তনাদ৷
টেবিলের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল জিনি; রিভলবার ঘুরিয়ে দ্বিতীয় বার আঘাত হানল৷ এবার .৩৮-এর নলটা সরাসরি গিয়ে বাধা পেল লোকটার ব্রহ্মতালুতে৷ লোকটা অবসন্নের মতো আচমকা হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে৷
পাশের মেয়েটা বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল৷ এবং সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে৷
‘সাবধান নিজের জায়গা ছেড়ে এতটুকু নড়ার চেষ্টা করলে কাউকেই আমি রেহাই দেব না৷’ মরগ্যানের চিৎকারে সকলে আবার ফিরে তাকাল তার দিকে৷ সারা ঘরে ভেসে বেড়াতে লাগল জমাট আতঙ্কের আবহাওয়া, এমন কী ব্লেক পর্যন্ত মুহূর্তের জন্যে শিউরে উঠল মরগ্যানের হাড়-কাঁপানো চিৎকার৷
জিনি হুমড়ি খেয়ে পড়ে-থাকা লোকটার কাছে এগিয়ে গেল৷ কলার ধরে টেনে তাকে সোজা করল৷ তারপর ভেতরের পকেট হাতড়ে বের করে আনল লোকটার মানিব্যাগটা৷ ব্যাগটা থলেতে ভরে তাকে সজোরে এক ধাক্কা মারল৷ লোকটা আবার আছড়ে পড়ল মেঝেতে৷
এতেই যথেষ্ট কাজ হল৷
কোনও যাদুমন্ত্রবলে একের পর এক মানিব্যাগ আবির্ভূত হতে লাগল টেবিলে৷ জিনি শুধু চটপট সেগুলোকে থলেতে ভরে ফেলতে লাগল৷
সাফল্যের উল্লাসে ব্লেক দরজার দিকে আর নজর রাখেনি৷ তাই দরজা খুলে একজন দোহারা চেহারার বলিষ্ঠ লোক যখন হঠাৎ তার সামনে এসে হাজির হল, তখন সে একেবারে বোবা হয়ে গেল৷
নির্বোধের মতো শূন্য দৃষ্টিতে সে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল৷ বিশাল চেহারার আগন্তুক প্রথমে তাকাল ব্লেকের মুখের দিকে৷ তার পরেই চোখে পড়ল ব্লেকের হাতের আলগা মুঠোয় ধরা রিভলভারের ওপর৷ বিদ্যুৎগতিতে আগন্তুকের বলিষ্ঠ হাতে কাটারির মতো নেমে এল ব্লেকের কবজির ওপর; রিভলভারটা সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের হাতছাড়া হয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেতে, গড়াতে গড়াতে গিয়ে থামল বার-কাউন্টারের সামনে৷ আগন্তুকের ক্ষিপ্রতায় হতভম্ব ব্লেক তখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে৷
লোকটা ব্লেককে লক্ষ করে ঘুঁষি তুলতেই মরগ্যান মেশিনগান তাক করল তার দিকে, চিৎকার করে উঠল, ‘খবরদার! মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াও! নইলে...’
লোকটা ফিরে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ তার হাতের মেশিনগানটার ওপর চোখ পড়তেই লোকটার সাহস কর্পূরের মতো উবে গেল৷ ব্লেকের কাছ থেকে পিছিয়ে গিয়ে সে মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াল৷
জিনি একটা টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে একজন বেঁটে-খাটো বলিষ্ঠ লোকের কাছ থেকে মানিব্যাগটা নিচ্ছিল৷ লোকটা মরগ্যানের মেশিনগানটা অন্য দিকে ফেরাতে দেখেই জিনির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ জিনি ব্যাগটা থলেতে ভরতে যাচ্ছিল, এমন সময় বেঁটে লোকটার দুটো হাত আঁকড়ে ধরল ওর হাতের রিভলভারটা—মরিয়া হয়ে রিভলভারটা কেড়ে নিতে চাইল৷ শুরু হল ধস্তাধস্তি৷
জিনিও শক্ত হাতে ধরে রইল .৩৮-এর বাঁট৷ এক পলক দেখল লোকটার ভয়ার্ত, চঞ্চল চোখের দিকে৷ তারপর ধস্তাধস্তির মধ্যেই ট্রিগার টিপল৷ একটা বিকট শব্দ করে গর্জে উঠল রিভলভারটা৷ কাফের সমস্ত জানলা ঝন্ঝন্ করে কেঁপে উঠল৷ লোকটা তড়িৎস্পৃষ্টের মতো এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল৷ গুলিটা তার জামার আস্তিন ছিঁড়ে, হাত ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে৷ চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে৷ জিনি রিভলভার নাচিয়ে দু-পা পিছিয়ে এল৷ লোকটা তখন বাঁ-হাতে তার আহত ডান হাত চেপে ধরেছে৷
‘জলদি করো, জিনি৷ আমাদের হাতে আর সময় নেই!’ মরগ্যান কর্কশস্বরে চিৎকার করে বলল৷
শান্তভাবে নির্বিকার মুখে জিনি কাজ করে চলল! চলাফেরায় নেই কোনও ব্যস্ততার ছাপ৷ কাফের প্রতিটি লোক নিশ্চলভাবে যার-যার জায়গায় বসে৷ তাদের ফ্যাকাসে, বিবর্ণ মুখে আতঙ্কের মুখোশ যেন পেরেক ঠুকে বসানো৷ নিঃশব্দে ওরা লক্ষ করছে জিনির প্রতিটি কার্যকলাপ৷
বাইরের গাড়িতে অপেক্ষারত কিটসনের কানে এল গুলির কান-ফাটানো শব্দ৷ চমকে উঠল কিটসন৷ তবে কি...? অসাধারণ সংযম এবং প্রচেষ্টায় সে গিয়ারের কাছ থেকে তার শঙ্কাতুর হাতকে সরিয়ে আনল৷
স্থির হয়ে বসে রইল কিটসন৷ দুহাতের থাবা আঁকড়ে ধরেছে হুইলটাকে৷ তার সারা মুখ ঘামে চকচক করছে, উৎকণ্ঠার শিকার হয়ে কাঁপছে তার উত্তাল হৃৎপিণ্ড : ধক্...ধক্ ধক্...৷
হঠাৎই অবসান হল তার আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার৷ কিটসনের কানে এল দৌড়ে আসা ভারী পায়ের শব্দ৷ একটু পরেই খুলে গেল লিংকনের পিছনের দরজা৷ দুদ্দাড় করে কারা যেন ঢুকে পড়ল গাড়িতে৷ লিংকনটা সামান্য দুলে উঠল৷ একটা উতপ্ত ঘামে ভেজা দেহ কিটসনের শরীরে এসে আঘাত করতেই সে পাশ ফিরে তাকাল৷ ব্লেক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সামনের সিটে—তার পাশে৷ যান্ত্রিকভাবে কিটসনের হাত এগিয়ে গেল গিয়ারের দিকে৷ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে সচল হল গাড়িটা৷
‘শিগগির, আলেক্স!’ পিছনের সিট থেকে কিটসনের কানের কাছে মুখ এনে গলা ফাটিয়ে বলে উঠল মরগ্যান, ‘যত জোরে পার গাড়ি ছোটাও!’
দাঁত দাঁত চেপে কিটসন গাড়ি ছুটিয়ে দিল তীরবেগে? চাকার কাতর আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা ঘোরাল কিটসন৷ সরু একটা গলি পার হয়েই বড় রাস্তায় পড়ল৷
সহজাত দক্ষতার সঙ্গে সে বড় রাস্তা নিমেষে পার হয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল আর একটা গলিতে৷ গাড়ির গতি এবার সামান্য কমিয়ে, হেডলাইটের সংকেত দিয়ে সে একের পর এক চৌরাস্তা পার হয়ে চলল৷
মরগ্যান ঘুরে বসে পিছনের জানলা দিয়ে দেখতে লাগল কেউ তাদের অনুসরণ করছ কি না৷ এমনিভাবে আধ মাইলটা যাওয়ার পর হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘যাক, বাঁচা গেছে৷ কেউ আমাদের পিছু নেয়নি৷ তাহলে চলো, জিপোর ওখানেই যাওয়া যাক৷’
সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল৷ দম আটকানো আবহাওয়া ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে এল৷
‘ওঃ একটা সময় গেল বটে!’ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বলে উঠল ব্লেক, ‘মেশিনগানটা না থাকলে আজ ভীষণ বিপদে পড়তে হত৷ আর যখন ওই হারামজাদাটা জিনির হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, তখন...’
‘কী হয়েছিল?’ কাঁপা গলায় জানতে চাইল কিটসন, ‘গুলি চালানোর শব্দ শুনতে পেলাম! কেউ কি আহত হয়েছে নাকি?
‘উঁহু! একটা লোক জিনির রিভলভার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল—এমন সময় ধস্তাধস্তির রিভলভার থেকে গুলি বেরিয়ে যায়৷ অবশ্য তাতে সেরকম একটা কেউ আহত হয়নি; তবে লোকটা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ আবার অন্য আর একটা লোক আচমকা এসে হাজির হয়ে আমার হাত থেকে বন্দুকটা ছিটকে ফেলে দিল৷ তারপর তাকে সামলাতে অনেক ঝক্কি পোয়াতে হয়েছে৷’
জিনি মরগ্যানের ঠিক পাশেই বসেছিল৷ মরগ্যান অনুভব করল, ওর শরীর কাঁপছে৷ চোখ ফিরিয়ে ওকে দেখল মরগ্যান৷ রাস্তার আলোয় তার চোখে পড়ল জিনির মুখ ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য, যেন এক প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে৷
ওর হাঁটুর ওপর হাত রাখল মরগ্যান, তোমার কাজে আমি খুশি হয়েছি জিনি৷ সত্যিই তোমার সাহস আছে৷ বিশেষ করে ওই মোটা লোকটাকে যেভাবে শায়েস্তা করলে৷ ওঃ, আমি তো ভাবতেই পারিনি...’
পা সরিয়ে নিল জিনি৷
‘দয়া করে চুপ করো ফ্র্যাঙ্ক৷’ মরগ্যানকে অবাক করে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে কাঁদতে শুরু করল মেয়েটা৷
সামনের সিটে বসা কিটসন অথবা ব্লেক কিছুই টের পেল না৷ মরগ্যান জিনিকে একা থাকতে দিয়ে সরে বসল৷
জিপোর কারখানার কাছাকাছি এসে পড়াতে খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালাতে লাগল কিটসন৷ মুখ না ফিরিয়ে সে প্রশ্ন করল, ‘মোট কত টাকা হাতালে?’
‘মন্দ নয়৷ কম করে গোটা পঞ্চাশেক মানিব্যাগ তো হবেই, তাছাড়া কাফের ক্যাশবক্সও প্রায় ঠাসা ছিল৷’ কথা শেষ করে মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল৷ নিজের অকম্পিত হাতের দিকে তাকিয়ে সে গর্ব অনুভব করল৷
মরগ্যান তখনও বেশ শুনতে পাচ্ছে ব্লেকের হাঁপানোর শব্দ৷ কাফেতে ঢোকার পর সে প্রায় সর্বক্ষণই ব্লেকের ওপর নজর রেখেছে৷ এবং তার মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ জন্মেছে যে ব্লেক সংশয়ের মুহূর্তে আচমকা ভেঙে পড়তে পারে৷ মরগ্যানের কাছে এ এক নতুন দুশ্চিন্তা৷ এতদিন ধরে ব্লেকের সাহস ও দৃঢ়তা সম্পর্কে তার গভীর আস্থা ছিল৷ কিন্তু আজ সেভাবে নির্জীবের মতো সে ওই জোয়ান লোকটার মোকাবিলা করল, তাতে সে ভরসা মরগ্যানের উবে গেছে৷ নাঃ, এখন থেকে ব্লেকের ওপরেও তাকে কড়া নজর রাখতে হবে৷
এমন কি কিটসনও আজ মুহূর্তের জন্যে তার বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল৷ কথা ছিল ওরা গাড়িতে উঠে বসলেই সে তীরবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দেবে৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি৷ মরগ্যান যদি ওর কানের কাছে চিৎকার না করত, তা হলে হয়তো কিটসন অত জোরে গাড়ি ছোটাতে পারত না৷ অর্থাৎ কাফে থেকে কেউ না কেউ বেরিয়ে এসে পলায়নরত গাড়িটাকে দেখতে পেত, এবং পুলিশের কাছে গাড়িটার একটি বর্ণনাও দিয়ে ফেলত৷
নাঃ, বড় কাজের আগে প্রত্যেককে ঠিকমতো প্রস্তুত করতে হবে৷তবে জিনির জন্যে তার কোনও চিন্তা নেই৷ ওর আজকের কাজের ধরন মরগ্যানকে ভীষণ খুশি করেছে৷ বলতে গেলে দলের মধ্যে জিনির মূল্যই তার কাছে সবচেয়ে বেশি৷
মরগ্যান আবার দেখল জিনির দিকে৷ ও এখন কান্না থামিয়ে সোজা হয়ে বসেছে৷ ওর ঘষা কাচের চোখে রাস্তার আলোগুলো প্রতিফলিত হয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে৷ কাঠখোদাই অভিব্যক্তিহীন মুখে ও বাইরের দিকে তাকিয়ে৷
মরগ্যান তার সিগারেটটা এগিয়ে দিল ওর দিকে৷
‘নাও, ধরো৷’ সংক্ষিপ্তভাবে সে বলল৷
জিনি নিঃশব্দে সিগারেটটা ধরাতেই গাড়িটা উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তায় পড়ল৷ কিটসন বুঝল জিপোর কারখানার আর খুব বেশি দেরি নেই৷
কারখানা বলতে একটা বড় টিনের একচালা; তার পাশে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি একটা বড় টিনের চালা দেওয়া জায়গাটাই জিপোর কর্মস্থল৷ সাধারণত ছোটখাটো ওয়েলডিং, লোহার দরজা তৈরি বা তালা-চাবিসংক্রান্ত টুকটাক কাজ করেই জিপোর সময় কাটে৷ এবং এই কাজের অজুহাত দেখিয়েই সে গোটা কতক অ্যাসিটিলিন গ্যাসের সিলিন্ডার তার কারখানায় রাখবার অনুমতি পেয়েছে৷ কিন্তু সেই সঙ্গে দু-একটা হাইড্রোজেন সিলিন্ডার রাখতেও সে ভোলেনি৷ কারণ সিন্দুক খোলার কাজে হাইড্রোজেন গ্যাস নিতান্তই অপরিহার্য৷ কারখানা থেকে জিপোর যা লাভ হয়, তাতে তার পেট চলা তো দূরের কথা, ঘর-ভাড়াই মেটে না৷
লিংকনের হেড লাইটের আলো কারখানার দরজায় পড়তেই জিপো বেরিয়ে এল৷ সম্ভবত সে ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিল৷ তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলতে গিয়ে বার কয়েক হোঁচট খেল জিপো৷ অবশেষে পাল্লা দুটোকে হাট করে খুলে গাড়ি ঢোকার রাস্তা করল৷ তাকে দেখে মনে হল, সে ভীষণ ভয় পেয়েছে৷
দরজা বন্ধ করে দ্রুতপায়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়াল জিপো, উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার? সব ঠিক আছে তো?’
‘হ্যাঁ, কিছু ভেব না৷’ উত্তর দিল মরগ্যান, ‘এখন বোতল আর গেলাস বের করো দেখি! আলেক্স, তুমি চটপট এই নাম্বার প্লেট দুটো পালটে ফেল৷’ লিংকনের দিকে নির্দেশ করল মরগ্যান৷ ‘আর রেডিয়েটরের জলটা পালটে ঠান্ডা জল ভরে দাও৷ বলা যায় না কখন পুলিশ এসে আবার এখানে হানা দেয়৷ কী হল জিপো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ঝটপট গেলাস নিয়ে এসো৷’ ব্লেক অদূরে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছিল, তাকে ডাকল মরগ্যান, ‘এড তুমি কিটসনকে একটু সাহায্য করো?’
মরগ্যান এবার এগিয়ে গেল জিনির কাছে, হাসল, ‘কেমন আছ এখন?’
জিনির মুখভাব কঠিন হল৷ ওর গায়ের চামড়া হয়ে উঠেছে ঈষৎ নীলাভ, মুখমণ্ডল পাণ্ডুর৷ বিরক্তিভরা স্বরে জবাব দিল ও, ‘আমার জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না৷’
‘এ কাজটার মতো আসল কাজের বেলায় যদি ওতরাতে পার, তবেই বুঝব৷’
‘ওঃ, তখন থেকে খালি এক কথা৷ আমি কি কচি খুকি নাকি?’ অসহিষ্ণু স্বরে কথাগুলো বলে মুখ ফিরিয়ে নিল জিনি৷ এগিয়ে গিয়ে বসল যন্ত্রপাতি রাখার টেবিলের ওপর৷ উদ্দেশ্যহীনভাবে আঙুল দিয়ে যন্ত্রপাতিগুলো নাড়াচাড়া করে চলল৷
মরগ্যান ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল৷ এমন সময় এক বোতল হুইস্কি এবং পাঁচটা গেলাস নিয়ে হাজির হল জিপো৷ গেলাসে হুইস্কি ঢেলে সে নিয়ে গেল জিনির কাছে৷ একটা গেলাস বাড়িয়ে ধরল, ‘নাও খেয়ে নাও৷ ধকল তো কিছু কম গেল না৷’
জিনি গেলাসে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়েই মুখ কোঁচকাল৷ ওর মুখের বিবর্ণ ভাবটা কেটে গিয়ে ফিরে এল আগের সেই লাবণ্য৷
‘কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম, ততটা নয়৷ আরেকটু হলেই আমার হয়েছিল!’
জিনির কথায় পিঠে বলে উঠল মরগ্যান, ‘কিন্তু তা যখন হয়নি, তখন আর ও নিয়ে ভাবছ কেন?’ এক চুমুকে বাকি হুইস্কিটা গলায় ঢেলে বলে চলল সে, ‘তাছাড়া, সবার চেয়ে তোমার কাজই ভালো হয়েছে৷ যাকগে, এবার দেখা যাক কিরকম আমদানি হল৷’
মরগ্যান এগিয়ে গিয়ে থলেটা উপুড় করে দিল টেবিলের ওপর৷ জিনি তাকে সাহায্য করতে লাগল৷ জিপো, কিটসন এবং ব্লেক তখন একমনে গাড়িটাকে নিয়ে পড়েছে৷
‘এই ব্যাগটা সেই মোটা লোকটার৷’ একটা কালো রঙের ছক-কাটা মানিব্যাগ তুলে নিয়ে বলল জিনি, ‘যাকে রিভলভার দিয়ে মেরেছিলাম৷’
জিনি ব্যাগ হাতড়ে বের করে আনল দশ দশটা একশো ডলারের নোট৷ সেগুলো বিছিয়ে দিল টেবিলের ওপর৷
হুঁ—লোকটাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ হাজার ডলারের মায়ায় যে কোনও লোকই তোমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করত৷’
গাড়িটার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে ওরা তিনজন এসে দাঁড়াল টেবিলের কাছে৷ চুপচাপ দেখতে লাগল মরগ্যান আর জিনির কার্যকলাপ৷ মিনিটখানেক পরে সমস্ত টাকা টেবিলে স্তূপীকৃত হওয়ার পর মরগ্যান আয়েস করে বসল একটা বাক্সের ওপর; গুনতে শুরু করল লুটের পরিমাণ৷
চারজনের চারজোড়া উৎকণ্ঠিত চোখ স্থিরভাবে লক্ষ করে চলল৷
শেষ টাকাটা গোনা হয়ে গেলে মরগ্যান মুখ তুলে তাকাল, ‘দু-হাজার ন-শো পঁচাত্তর ডলার৷ যাক, তাহলে আমাদের মূলধন জোগাড় হয়ে গেল৷ সুতরাং এবার আমরা স্বচ্ছন্দে এগোতে পারি৷’
‘ফ্র্যাঙ্ক, সত্যিই কি জিনি একটা লোককে মেরেছে?’ চোখ গোল গোল করে প্রশ্ন করল জিপো৷
‘হ্যাঁ, প্রয়োজন ছিল তাই মেরেছে৷’ ডলারের নোটগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল মরগ্যান, ‘লোকটাকে ও যেভাবে শায়েস্তা করেছে দেখার মতো৷’ তুমি আমি বোধ হয় ওর চেয়ে ভালোভাবে পারতাম না৷’
জিনি গম্ভীর মুখে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল গাড়ির দিকে৷
ওরা চারজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করল৷
‘ওকে দিয়ে কাজ হবে৷’ শান্তস্বরে বলল মরগ্যান, ‘আর তোমরাও যদি ওর মতো কাজ করে দেখাতে পার, তাহলে আর চিন্তা নেই৷ ধরে নাও দশ লাখ ডলার আমরা পেয়ে গেছি৷’
ওর কথা শেষ করে মরগ্যান সরাসরি তাকাল ব্লেকের দিকে৷ ব্লেক সে চাউনির মোকাবিলা করতে বার কয়েক ব্যর্থ চেষ্টা করল৷ তারপর পকেট থেকে সিগারেট বের দেশলাইয়ের খোঁজে এ পকেট সে পকেট অসহায়ের মতো হাতড়াতে লাগল৷ অনুভব করল মরগ্যানের ঝিলিক মারা চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি৷
‘আমার কথা শুনতে পেয়েছ, এড?’
ব্লেক কোনওরকমে আগুন ধরাল তার সিগারেটে, ‘নিশ্চয়ই৷’
পরিস্থিতির সন্দেহজনক ইঙ্গিত জিপোর চোখ এড়াল না৷ সে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার, ফ্র্যাঙ্ক? কোনও গোলমাল হয়েছে নাকি?’
‘তেমন কিছু নয়... একটা লোক হঠাৎই এডের কাছ থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়েছিল৷ অল্পের জন্যে আমরা সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছি৷ নইলে কী হতো বলা যায় না!’
ব্লেক থমথমে মুখ কাঁধ ঝাঁকাল, ‘লোকটার জন্যে আমি ঠিক তৈরি ছিলাম না৷ আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তারও ঠিক একই অবস্থা হতো৷’
মরগ্যান যে খুব একটা মিথ্যে বলছে না, সেটা কিটসন বেশ বুঝতে পারল৷ কাফের ভেতর থেকে ভেসে আসা বন্দুকের শব্দটাই তার সমস্ত কিছু ওলট-পালট করে দিয়েছিল৷ সে ভেবেছিল, কাফের কোনও লোককে ওরা বুঝি খুন করেছে৷ আর এই খুনের দায়ে জড়াবার আশঙ্কাটাই তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে একেবারে স্থবির করে দিয়েছিল৷
‘জিনি...’
মরগ্যানের ডাকে ফিরে তাকাল জিনি৷ তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এল ওদের কাছে৷
‘শোনো, এইবার আমরা বড় কাজের প্রস্তুতি শুরু করব’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘তুমি আর কিটসন কাল মার্লোয় যাবে ক্যারাভ্যানটা কিনে আনতে৷ কী মাপের কিনতে হবে সেটা জিপোই তোমাদের বলে দেবে৷’ মরগ্যান এবার বসল টেবিলে৷ তার সিগারেটের ধোঁয়া সাপের মতো এঁকে বেঁকে উড়ে চলেছে শূন্যের দিকে৷ ধোঁয়ার আড়ালে মরগ্যানের চোখ ঝাপসা দেখাচ্ছে৷
‘ক্যারাভানটা দামটা যত কম রাখতে পার ততই ভালো৷ কারণ এই তিন হাজার ডলারের প্রতিটি সেন্ট আমাদের কাছ এক-এক ফোঁটা রক্তের চেয়েও দামি৷ অবশ্য সেটা তোমাকে নতুন করে বলার দরকার নেই৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে, ‘ক্যারাভান কিনতে গিয়ে তোমাকে কী বলতে হবে মনে আছে তো? বলবে যে, তুমি আর জিনি সম্প্রতি বিয়ে করেছ; হানিমুন কাটানোর জন্যে একটা ক্যারাভান তোমাদের দরকার৷ এতে সন্দেহ করার কিছু থাকবে না; কারণ আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর হরদম ক্যারাভান কিনছে৷ তবে একটা বিষয় লক্ষ রেখো যে লোকটা তোমাদের ক্যারাভান বেচবে, সে যেন তোমাদের আর শনাক্ত করতে না পারে!’
কিটসন সন্দেহের চোখে তাকাল ব্লেকের দিকে৷ কিন্তু ঠাট্টা করার মতো মেজাজে ব্লেক ছিল না, কারণ কাফে লুটের ব্যাপারটায় সে খুব একটা কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি৷ তাই নিজের ওপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল৷
‘ওঃ—এই ভ্যাবাগঙ্গারাম মার্কা ভাবটা মুখ থেকে তাড়াও দেখি৷’ কিটসনকে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘তোমার চাল চলনে মনে হচ্ছে না জিনিকে নিয়ে তুমি হানিমুন কাটাতে যাচ্ছ৷ নাঃ ক্যারাভান কিনতে গেলে দোকানদার তোমাকে নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷’
জিপো মনে মনে হাসল, বলল, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, ফ্র্যাঙ্ক? ধরো—আলেক্সের জায়গায় আমিই না হয় গেলাম ক্যারাভান কিনতে? প্রথমত স্নেহ ভালোবাসার ব্যাপারটা আমার সহজাত, তাছাড়া জিনির সঙ্গে আমাকে মানাবে দারুণ!’
জিপোর কথায় জিনি পর্যন্ত হেসে ফেলল৷
‘জিনির সঙ্গে তোমার বয়েসের তফাতটা বড্ড বেশি, জিপো৷ তাছাড়া, তোমার এই প্রকাণ্ড ভুঁড়িটা দোকানদারের স্মৃতিশক্তিকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে,’ হেসে জবাব দিল মরগ্যান, ‘সুতরাং কিটসন ছাড়া আমাদের গতি নেই৷’
টেবিলের ওপর থেকে টাকার গোছা তুলে নিয়ে তা থেকে দু-হাজার ডলার কিটসনকে গুনে দিল মরগ্যান৷
‘দরাদরি করে দামটা একটু কম সম করার চেষ্টা কোরো৷ কাল সকাল এগারোটায় আমি বুইক আর ক্যারাভান টানার শেকল তোমার ওখানে পৌঁছে দেব৷’ মরগ্যান তাকাল জিপোর দিকে, ‘তুমি লিংকটনকে নিয়ে আমাকে ফলো করবে৷ কারণ বুইকটা কিটসনের ওখানে ছেড়ে দিয়ে তোমার গাড়িতেই আমাকে ফিরতে হবে৷’
‘ঠিক আছে৷’
‘আচ্ছা, এবার তাহলে ওঠা যাক৷ লু-কে ওর মেশিনগানটা এখনই ফেরত দিতে হবে৷ এড, তুমি আমার সঙ্গে চলো৷’ মরগ্যান এবার দেখল জিনি ও কিটসনের দিকে, ‘তোমরা দুজনে বাসে করেই রওনা দাও৷ কারণ আমাদের চারজনকে একসঙ্গে যত কম দেখা যায় ততই ভালো৷’
বাকি টাকাটা মরগ্যান ব্যাক-পকেটে ঢুকিয়ে রাখল৷ তারপর জিনিকে লক্ষ করে বলল, ‘তোমরা কোথায় দেখা করবে সেটা নিজেরাই ঠিক করে নিও৷ তবে কাল বিকেলের মধ্যেই ক্যারাভ্যানসুদ্ধ তোমাদের এখানে ফিরে আসতে হবে৷’ ব্লেকের দিকে মাথা ঝাঁকাল মরগ্যান, ‘চলে এসো এড৷’
ওরা চলো গেলে জিনি মাথা থেকে সবুজ স্কার্ফটা খুলে ফেনল৷ আড়ষ্ট চুলের গোছাকে আঙুলের আলতো আঁচড়ে স্বচ্ছন্দ করে তুলল৷
বিব্রতভাবে ওকে দেখতে লাগল কিটসন; জিনির সৌন্দর্য সম্পর্কে সে আবার সচেতন হয়ে উঠল, টেবিলে হেলান দিয়ে অপ্রতিভভাবে নখ খুঁটতে লাগল৷
‘আর এক গেলাস হবে নাকি?’ জিগ্যেস করল জিপো৷
জিনি মাথা নাড়ল ‘উহুঁ—ধন্যবাদ৷’ তারপর ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ঠোঁট রাখল, তাকাল কিটসনের দিকে৷
কিটসন পকেট হাতড়ে দেশলাই বের করে জ্বালাল৷ জ্বলন্ত কাঠিটা কাঁপা হাতে এগিয়ে ধরল জিনির মুখের কাছে৷ আগুনের শিখাকে স্থির করতে জিনি দু-হাতে আঁকড়ে ধরল কিটসনের চঞ্চল হাত৷ মুখ নামিয়ে সিগারেটের অগ্রভাগ ডুবিয়ে দিল আগুনের আওতায়৷ কিটসনের শিরা-উপশিরায় উষ্ণ রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ল৷’
‘আচ্ছা, তাহলে চলি—’ জিপোর দিকে কথা কটা ছুড়ে দিয়ে দরজার দিকে এগোল জিনি৷
‘পরে আবার দেখা হবে৷’ কিটসনকে লক্ষ করে চোখ টিপল জিপো৷ কিটসন তাতে কোনওরকম ভ্রুক্ষেপ না করে জিনিকে অনুসরণ করল৷
বাইরে বেরেতেই রাতের উত্তপ্ত হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল ওদের শরীরে৷ পাশাপাশি পা-ফেলে ওরা এগিয়ে চলল বড় রাস্তার দিকে৷
বাস-স্টপে পৌঁছে জিনি হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘তুমি থাক কোথায়?’
‘লেনেক্স স্ট্রিট৷’ উত্তর দিল কিটসন৷
ঠিক আছে, কাল এগারোটার সময় আমি লেনেক্স স্ট্রিটের মোড়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করব৷’
‘যদি বলো, তাহলে গাড়ি নিয়ে আমিও যাব তোমার ওখানে—’
‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই৷’
কিটসন আড়চোখে দেখতে লাগল পাশে দাঁড়ানো জিনিকে৷ একসময় হঠাৎ বলে উঠল, ‘সেদিন রাতে—আমি কখনওই তোমার গায়ে হাত তুলতাম না৷ হঠাৎ কেন যে অমন রেগে উঠলাম, কে জানে!... আমি দুঃখিত৷’
জিনি হাসল, ‘আমি তো ভাবছিলাম, ‘তুমি বোধ হয় আমাকে মেরেই বসলে, খুব ভয় করছিল আমার৷’
কিটসন লজ্জা পেল, ‘না, না—শুধু শুধু তুমি ভয় পেয়েছিলে৷ এমনিতেই আমার চেয়ে ছোট কারোর গায়ে আমি হাত তুলি না৷ তার ওপর তুমি তো মেয়ে৷’
‘তা ঠিক, তবে পরে ভেবে দেখলাম, তোমার হাতের ওই চড়টা খেলে আমার উপযুক্ত শিক্ষা হতো৷ বলতে গেলে আমিই তো সাধ করে গাল বাড়িয়ে দিয়েছিলাম৷’ সিগারেটের ছোট টুকরোটা টোকা মেরে ফেলে দিল জিনি৷ দু-একটা ফুলকি ছড়িয়ে সেটা গিয়ে পড়ল রাস্তায়৷ ‘কিন্তু ব্লেকের গায়ে হাত তোলাটা তোমার কি উচিত হয়েছে?’
কিটসন গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, ব্যাটা বড্ড বেশি বেড়ে উঠেছিল, তাই একটু দাওয়াই দিলাম৷ তাছাড়া, ও-ই তো গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধাল৷ সেই প্রথম দিন থেকে... মাঝপথে থেমে গেল কিটসন৷
তা হোক, তবুও ওর গায়ে হাত তুলে তুমি ভালো করোনি৷ এখন থেকে ব্লেকের ওপর সব-সময় তোমাকে নজর রাখতে হবে৷ কারণ, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে ও ভুলবে না৷’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ব্লেককে অমি ভয় করি না৷’
‘আমারও তাই ধারণা৷ বছর খানেক আগে তোমার একটা লড়াই আমি দেখেছিলাম৷ ওই যে যে লড়াইয়ে জ্যাকি ল্যাজার্ডকে একেবারে ময়দার বস্তা করে ছাড়লে—মনে পড়ছে? ওঃ, দারুণ জমেছিল লড়াইটা!’
কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷ ওর বলিষ্ঠ মুখে ফুটে উঠল উজ্জ্বল হাসি৷ সত্যিই দারুণ জমেছিল, সেই লড়াইটা৷ জ্যাকি ল্যাজার্ডকে সে যে হারাতে পেরেছিল, তা নেহাতই ভাগ্যের জোরে৷ ন-টা রক্তাক্ত, ক্লান্ত রাউন্ডের ল্যাজার্ডকে কিটসন কাত করেছিল৷ ভাগ্য সহায় থাকলে সে লড়াইয়ে ল্যাজার্ডও জিততে পারত৷
‘জ্যাকি খুব ভালো লড়িয়ে ছিল!’
‘তুমিও নেহাত খারাপ ছিলে না৷ তা হঠাৎ বক্সিং-টক্সিং ছেড়ে দিলে যে?’
এই প্রশ্নে কিটসন ভীষণ বিব্রত বোধ করল৷ কোনওরকমে একটা মনগড়া জবাব দিয়ে দিল, ‘শেষ লড়াইয়ের পর হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার চোখের ক্ষমতা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে—কাছের জিনিস খুব ভালো দেখতে পাচ্ছি না৷’ মাথার কোঁকড়ানো চুলে আঙুল চালাল কিটসন, ‘ব্যাপার-স্যাপার দেখে তো খুব ভয় পেয়ে গেলাম৷ তাড়াতাড়ি গেলাম ডাক্তারের কাছে৷ তিনি বললেন বক্সিং ছেড়ে দিতে৷ আমার কিন্তু সেরকম ইচ্ছে একেবারেই ছিল না৷ একেই চ্যাম্পিয়ন হবার খুব সাধ ছিল, তাছাড়া প্রচুর সম্ভাবনাও ছিল... ...কিন্তু, ডাক্তারের মতামতকে তো আর অবহেলা করতে পারি না? তাই...’
কিটসনের ম্যানেজার উপস্থিত থাকলে তার বক্তব্য হয়তো একেবারেই অন্যরকম হতো৷
কিটসন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল জিনির দিকে! বুঝতে চাইল, বক্সিং ছাড়ার গল্পটা সম্পর্কে ওর মনে কোনওরকম সন্দেহ আছে কি না৷ কিন্তু জিনির ভাবলেশহীন নির্বিকার মুখে কোনওরকম অভিব্যক্তির আভাস সে দেখতে পেল না৷
দীর্ঘস্থায়ী নীরবতার পর সে প্রশ্ন করল, ‘তুমি হঠাৎ ফ্রাঙ্কের দলে এসে ভিড়লে কেন?’
‘তাছাড়া কার কাছেই বা যেতাম—’ উত্তর দিল জিনি৷ তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলে উঠল, ওই যে—বাস আসছে৷’
বাস থামল, ওরা উঠে পড়ল৷ পাশাপাশি একটা আসনে বসল দু’জনে৷ কিটসন দুটো টিকিট কাটল৷ তারপর নীরবে চেয়ে রইল কাচের জানলায় প্রতিফলিত জিনির মুখের দিকে৷ বাসের কোনও আসনই খালি নেই৷ কিছু কিছু কৌতূহলী লোক মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে জিনিকে৷ কিটসন কেমন অস্বস্তি অনুভব করল৷
বাস চাপা গর্জন তুলে এগিয়ে চলল শহরের দিকে৷ রেল রোড স্টেশনের সামনে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল জিনি, ‘আমি এখানেই নামব৷’
কিটসন উঠে দাঁড়িয়ে ওকে যাওয়র রাস্তা করে দিল৷ জিনির শরীরের আলতো স্পর্শে মুহূর্তের জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠল কিটসন৷ বাস থামতেই নেমে পড়ল জিনি৷
বাস আবার চলতে শুরু করতেই কিটসন জানলার ঠান্ডা কাচে মুখ চেপে ধরল তাকাল বাইরের অন্ধকারের দিকে৷ জিনিকে এক পলক দেখার আশায় তার উৎসুক চোখের দৃষ্টি বৃথাই মাথা খুড়ল অন্ধকারের নরম পরদায়৷’
পরদিন সকাল এগোরোটায় কিটসনকে দেখা গেল মরগ্যানের বুইক নিয়ে ছুটে চলেছে মার্লো অভিমুখে৷ দশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে টানা ষাট মাইলের রাস্তা মার্লো৷ কিটসনের হাতে বুইক যেন উড়ে চলল শহরতলি ছাড়িয়ে৷
কিটসনের পাশে বসে জিনি গর্ডন৷ কিন্তু এ জিনির সঙ্গে বুঝি আগের জিনির কোনও মিলই নেই৷ রঙিন আঁটোসাঁটো ফ্রকটা পরে জিনিকে মনে হচ্ছে কোনও উচ্ছল কিশোরী৷ ওর সুন্দর সতেজ মুখে অবাধ খুশির রাজত্ব: যেন নববিবাহিত কোনও বধূ মধুচন্দ্রিমার আসন্ন সুখস্বপ্নে বিভোর! ওর চোখের ইশারায় উদ্দাম চঞ্চলতা, মুখের ভাব হয়ে উঠেছে কোমল, আর সেই সঙ্গে তোতাপাখির মতো অনর্গল কথা বলে চলেছে৷
জিনির এই অভাবনীয় আকস্মিক পরিবর্তনে কিটসন একেবারে হতবাক৷ নিজেকে এক সদ্যবিবাহিত যুবকের ভূমিকায় খাপ খাওয়াতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে৷ তবে এখন কিটসনকে দেখলে মনে হবে, কোনও মধ্যবিত্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক বিয়ের পরে স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে মধুচন্দ্রিমা যাপনের উদ্দেশ্যে৷ এবং ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার ভয়ে সে বেশ চিন্তিত৷
সকালবেলা মরগ্যান তার বুইক এবং ক্যারাভ্যান টানার শেকল বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে; এবং কথামতো জিপোও মরগ্যানকে অনুসরণ করে লিংকন নিয়ে যথাসময়ে হাজির হয়েছে৷ তারপর জিনি ও কিটসন যখন মরগ্যানের বুইকে চড়ে রওনা দিল, তখন কোনও এক অজ্ঞাত কারণে জিপো হঠাৎই ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ল৷
দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া বুইকের দিকে তাকিয়ে সে মরগ্যানকে লক্ষ করে বলে উঠল, ‘ওদের দুটিকে ভারী সুন্দর মানিয়েছে, তাই না?’ আসলে জিনিকে আমরা যতটা কঠিন ভাবি ততটা ও নয়৷ ওর চেহারার মতো কোনও মেয়ে ভালোবাসা ছাড়া থাকতে পারে না...ওদের দেখাচ্ছিলও ঠিক নতুন বিয়ে করা বর-বউয়ের মতো, তাই না ফ্র্যাঙ্ক?’
‘তুমি তো দেখছি বুড়ি বিধবার মতো উল্টোপাল্টা ভাবতে শুরু করেছ, অ্যাঁ? তোমার হল কী জিপো? হঠাৎ কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?’
জিপো দুপাশে হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে আমার না হয় মাথা খারাপ হয়েছে, প্রলাপ বকছি—কিন্তু বলতে পার ফ্র্যাঙ্ক, ভালোবাসা ছাড়া এই দুনিয়ার সুখটা কোথায়?’
‘ও হো—এসব রাখো এখন!’ প্রায় ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘আমাদের অনেক কাজ পড়ে রয়েছে...শুধু শুধু সময় নষ্ট কোরো না; চলো, এডের ফ্ল্যাটে আমাকে নিয়ে চলো৷
জিপোর এই ধরনের মেয়েলি ভাবপ্রবণতা খুব একটা ভালো কথা নয়, ভাবল মরগ্যান৷ তাদের সামনে রয়েছে দুরূহ, দুঃসাহসিক কাজ৷ সুতরাং, সে ক্ষেত্রে ভাবাবেগের পিছনে নষ্ট করার মতো সময় তাদের নেই৷
নদীর খুব কাছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের তৈরি একটা বিশাল বাড়ি৷ এই বাড়িতেই একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে এড ব্লেক৷
লিফটে করে পাঁচতলায় পৌঁছল মরগ্যান৷ নির্জন বারান্দায় জুতোর মস্ মস্ শব্দ তুলে সে এগিয়ে চলল ব্লেকের ঘরের দিকে৷ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অধৈর্যভাবে কলিংবেলের বোতাম টিপে ধরল মরগ্যান৷
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে গেল৷ এড ব্লেক দরজায় দাঁড়িয়ে৷
ব্লেকের পরনে কালো পাজামা, শার্ট৷ তার বুকের কাছটায় সাদা সুতোয়
লেখা ঃ এ, বি—অর্থাৎ এড ব্লেক৷ এডের মাথার চুল উসকো খুসকো, চোখের পাতা ভারী, দৃষ্টি আংশিক আচ্ছন্ন৷
‘আরে কী ব্যাপার?! তোমারা এত সকাল-সকাল?’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল সে, ‘কটা বাজে এখন?’
মরগ্যান সামনে এগিয়ে গেল৷ ব্লেককে ঠেলে নিয়ে ঢুকল বসবার ঘরে৷ ঘরটা ছোট হলেও আধুনিক ভাবে সাজানো-গোছানো৷ কিন্তু ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা জিন এবং হুইস্কির খালি বোতল ঘরের চেহারা পালটে দিয়েছে৷
সিগারেটের ধোঁয়া আর সেন্টের গন্ধে ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠেছে৷ মরগ্যান সেটা টের পেতেই নাক কোঁচকাল, ‘ওঃ ঘর তো নয়, যেন বেশ্যাবাড়িতে এসে ঢুকেছি! একটা জানলা খুলে রাখলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?’
‘তা কেন?’ বলে এগিয়ে গিয়ে একটা জানলা ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল ব্লেক৷ দেওয়াল-ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে সে সময় দেখলঃ এগারোটা কুড়ি৷ ‘তোমরা দেখছি অনেক আগেই এসে পড়েছ!...তা কিটসন কি রওনা হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ, ওরা অনেকক্ষণ বেরিয়ে পড়েছে৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল শোবার ঘরের দরজার দিকে৷ প্রশ্ন করল, ‘শোবার ঘরে কে আছে?’
ব্লেক চতুর হাসি হাসল, ‘ওর জন্যে ভেব না—মেয়েটি এখন ঘুমে অচেতন৷’
মরগ্যান ঝটিতি আঁকড়ে ধরল ব্লেকের জামা৷ এক হ্যাঁচকায় তাকে সামনে টেনে আনল, ‘শোনো এড, আমাদের সামনে এক বিরাট কাজের দায়িত্ব৷ তাছাড়া, কাল রাতে তুমি খুব একটা ভালো ফল দেখাতে পারনি৷ মনে রেখো, আসল কাজের সময় তোমাকে ওর চেয়ে বেশি সাবধান হয়ে কাজ করতে হবে; নইলে তোমার সাহায্য আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷ যদ্দিন পর্যন্ত না আমরা ওই ট্রাকের ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করছি, তদ্দিন মদ খাওয়া আর মাগী চরানো ছাড়ো৷ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা সীমা আছে!’
ব্লেক ঝটকা মেরে নিজেকে সরিয়ে নিল, ওর মুখের রেখা হয়ে উঠল কঠিন৷
‘মুখ সামলে কথা বলো, ফ্র্যাঙ্ক৷’
‘তাই নাকি?’ যদি মিষ্টি কথায় চিঁড়ে না ভেজে, তবে অন্য রাস্তা নিতে হবে দেখছি...৷ মিঃ এডওয়ার্ড ব্লেক, আমার কথা তোমার মগজে ঢুকলে ভালো, নইলে গলা ধাক্কা দিয়ে দল থেকে মেরে তাড়াব এ-কথা মনে রেখো৷ ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান কারও চোখ রাঙানিকে ভয় করে না৷’
মরগ্যানের স্থির, উজ্জ্বল কালো চোখের সংকেত ব্লেকের সমস্ত সত্তাকে যেন বরফ করে দিল৷ তাড়াতাড়ি সে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—তোমার কথা আমার মনে থাকবে৷’
‘থাকলেই ভালো৷’
ব্লেক একটু সরে দাঁড়াল, বলল, ‘খবরের কাগজে গত রাতের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লিখেছে নাকি?’
‘সাধারণত যা লেখে তাই৷ কাফেতে প্রত্যেকে এত ভয় পেয়েছিল যে পুলিশের কাছে আমাদের চেহারার কোনও সঠিক বর্ণনাই দিতে পারেনি৷ আমার মনে হয় এ ব্যাপারে নিয়ে শত মাথা ঘামালেও পুলিশ আমাদের খোঁজ পাবে না৷ আচ্ছা, এবার কাজের কথায় আসা যাক৷ তুমি এখন সোজা চলে যাও জিপোর ওখানে, ওকে কাজে সাহায্য করো গিয়ে৷ আমাকে একটু ডুকাসে যেতে হবে৷’
ঠিক আছে, ‘যাচ্ছি’ গজগজ করতে করতে জবাব দিল ব্লেক৷ আজ যে তার কাজ করার মেজাজ নেই, সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল তার মুখভাবে৷
‘নাও চটপট করো৷ ফালতু দেরি কোরো না৷’ খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘আমি চললাম, আর্নির সঙ্গে দেখা করতে৷’ ওর কাছে একটা অটোমেটিক রাইফেল আছে; সেটা ও বেচতে চায়৷ দেখি, যদি দরে পোষায় তাহলে কিনে নেব৷’
‘আমি তৈরি হয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ছি৷’ তড়িঘড়ি বলে উঠল ব্লেক৷
মরগ্যান চলে যেতেই ব্লেক চাপা স্বরে একটা অশ্রাব্য খিস্তি করল, তারপর এগিয়ে গেল শোবার ঘরের দিকে৷ আধো আঁধারিতে ডুবে থাকা ঘরের পরিবেশ তার কাছে এই মুহূর্তে বিরক্তিকর মনে হল৷ বিছানার কাছাকাছি একটা জানলা খুলে দিতেই রোদের উষ্ণ ঝলক এসে পড়ল বিছানার ওপর শুয়ে থাকা মেয়েটির মুখে৷
‘ওঃ-হো... এডি, জানলাটা বন্ধ করে দাও৷’ প্রতিবাদ ও বিরক্তির সুরে বলে উঠল মেয়েটি, বিছানায় উঠে বসে পিট-পিট করে তাকাল ব্লেকের দিকে৷’ মেয়েটির গায়ের রং ঘোর বাদামি, মাথায় কালো চুলের গুচ্ছ কপালের ওপর নেমে এসেছে৷ আয়ত চোখের তারা ঘন নীল৷ পরনে হলদে রাত্রিবাস৷ তার ফিকে আচ্ছাদনের আড়ালে ওর সুঠাম তনুর ইঙ্গিত৷
‘চটপট লম্বা দাও সোনা, এক্ষুনি আমাকে কাজে বেরোতে হবে৷’ রাত্রিবাস ছেড়ে পোশাক পরতে পরতে বলল ব্লেক, ‘নাও পা-দুটোকে একটু কাজে লাগাও।’
‘কিন্তু এড, আমার ভী-ষ-ণ ক্লান্ত লাগছে৷ তোমার কাজ থাকলে তুমি যাও না, আমি না হয় একটু ঘুমিয়েই নিলাম৷ কী, আপত্তি আছে?’
‘পুরোপুরি৷ তোমাকে এখানে একা থাকতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ এসো জলদি উঠে পড়ো৷’
মেয়েটা বিরক্তসূচক শব্দ করে গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলল পায়ের কাছে৷ তারপর ঘুম চোখে টলতে টলতে নেমে দাঁড়াল মেঝেতে৷ হাত টান-টান করে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল ও৷ শ্লথ পায়ে এগোল বাথরুমের দিকে৷
‘কিন্তু হঠাৎ এত তাড়াহুড়ো কেন এডি?’ ঘন কালো চুলে আলতোভাবে আঙুল চালাতে চালাতে প্রশ্ন করল মেয়েটা, ‘তোমাকে কে ডাকতে এসেছিল?’
ব্লেক তখন ইলেকট্রিক রেজার দিয়ে একমনে দাড়ি কামাচ্ছে৷ উষ্ণ স্বরে বলে উঠল, ‘জামাকাপড় পরে যত তাড়াতাড়ি পার কেটে পড়ো সোনা৷ কতবার বলব আমাকে এক্ষুনি কাজে বেরোতে হবে?’
রাত্রিবাস ছেড়ে জলের ঝাঁঝরির নীচে দাঁড়াল মেয়েটা৷ কল খুলে দিল৷
‘মাঝে মাঝে ভাবি, সব জেনেশুনেও কেন বার বার তোমার কাছে ফিরে আসি৷’ জলের একঘেয়ে ঝির-ঝির শব্দকে ছাপিয়ে বাথরুম থেকে ভেসে এল মেয়েটার কণ্ঠস্বর, ‘সেই বহু প্রচলিত ছকে বাঁধা রাস্তায় তোমার নাটক শুরু; যন্ত্র-সংগীতের হালকা সুর, নরম আবছা আলো, কানের কাছে ফিসফিস করে কত কথা...তারপর হঠাৎ জামাকাপড় পরে রাস্তা দেখো৷ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার কী ছিরি! অথচ, এডি, তুমিই আবার আমার স্বপ্নের রাজপুত্র! হৃদয়ের নায়ক৷’
ব্লেক বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘ছেনালি রাখো, গ্লোরি! যা করছ জলদি করো৷ ফালতু সময় নষ্ট কোরো না৷’
দাড়ি কামানো হয়ে গেলে ব্লেক চলল রান্নাঘরের দিকে কফি তৈরি করতে৷ তার মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, মুখ শুকিয়ে কাঠ—যেন কেউ একমুঠো তুলো গুঁজে দিয়েছে৷ কাল রাতে অত মদ না গিললেই পারতাম—ভাবল ব্লেক৷ কিন্তু না গিলেও কোনও উপায় ছিল না৷ কারণ গত রাতের ব্যর্থতা তার আত্মবিশ্বাসকে দলে পিষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে৷...না গ্লোরিকে কাল রাতে না ডাকলেই ভালো করত৷ মরগ্যান যে ব্যাপার-স্যাপার দেখে খুব একটা খুশি হয়নি, তা সে ভালোই বুঝতে পারল৷
একটা কাপে কফি ঢালল ব্লেক৷ অ্যাসপ্রোর শিশি বের করে তিনটে ট্যাবলেট খেয়ে নিল৷ সেই সময় অস্বস্তির সঙ্গে সে লক্ষ করল, তার হাত কাঁপছে৷ ব্লেক কফির কাপে শেষে চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রান্নাঘরে এসে ঢুকল গ্লোরি ডসন৷ পোশাক থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—সবই ওর সম্পূর্ণ৷
‘উম-ম...কফি৷’ আমার জন্যে এক কাপ ঢালো, এডি৷’ আবদারের সুরে বলল গ্লোরি৷
‘উঁহু—এখন সময় নেই৷ যাবার সময় পথে কোনও রেস্তোরাঁ থেকে অনায়াসেই কফি খেয়ে নিতে পারবে৷ চলো—এবার যাওয়া যাক৷’
‘এক মিনিট, এডি৷’ গ্লোরির স্বরের তীক্ষ্ণতায় চমকে ওর দিকে ফিরে তাকাল ব্লেক, ‘একটু আগে তোমার কাছে মরগ্যান এসেছিল, তাই না? কী যেন বলছিল সে... কী সব বিরাট কাজের দায়িত্ব... ব্যাপার কী, এড? খারাপ কিছু নয়তো?’
ব্লেক চমকে উঠল৷ কয়েক মুহূর্ত সে অবাক চোখে চেয়ে রইল গ্লোরির দিকে৷ তারপর দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, ‘আমার ব্যাপারে নাক গলাতে এসো না, গ্লোরি৷ নিজের চরকায় তেল দাও৷ এ ব্যাপারে দ্বিতীয়বার কৌতূহল দেখাতে গেলে ফল ভালো হবে না৷’
‘এডি, লক্ষ্মীটি আমার কথা শোনো৷’ গ্লোরি আঁকড়ে ধরল ব্লেকের হাত, ‘মরগ্যান সংঘাতিক লোক৷ তার সম্বন্ধে নানা কথাই আমার কানে এসেছে৷ সারাটা জীবন সে পুলিশের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে কাটিয়েছে৷ মানুষ খুন ছাড়া হেন কাজ নেই যা মরগ্যান করেনি৷ তবে যেভাবে সে এগোচ্ছে, তাতে খুনটা খুব বেশিদিন বাকি থাকবে বলে আমার মনে হয় না৷ এডি, আমার এই একটা কথা রাখো; মরগ্যানের সঙ্গ তুমি ছেড়ে দাও৷ নইলে শুধু-শুধু তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনবে—৷’
গত তিনমাস ধরে ব্লেকের একমাত্র নৈশসঙ্গিনী এই গ্লোরি ডসন৷ ওকে যে ব্লেকের তেমন একটা অপছন্দ তা নয়৷ তাছাড়া গ্লোরিই প্রথম—এবং সম্ভবত শেষ মানুষ যে ব্লেকের মঙ্গল কামনা করে, ওর ভালোমন্দের জন্যে চিন্তা করে, নিছক ব্লেককে ভালোবাসে বলেই, অন্য কোনও কারণে নয়৷ কিন্তু তবুও গ্লোরির এই গায়ে পড়ে উপদেশ দেওয়ার ব্যাপারটা ব্লেকের একেবারেই পছন্দ হল না৷ সে খেঁকিয়ে উঠল, ‘যাক, আর লম্বা-চওড়া উপদেশ দিতে হবে না৷ আমার ভালোমন্দ আমিই বুঝব৷ নাও, চলো—৷’
গ্লোরি নিরুপায় হয়ে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে, তোমার যা ইচ্ছে তাই করো৷ অনুরোধ করা ছাড়া আর কী-ই বা আমি করতে পারি? কিন্তু আবারও বলছি এডি, মরগ্যান মোটেই ভালো লোক নয়৷ ওর দলে যোগ দিলে তুমি নিজেরই বিপদ ডেকে আনবে৷’
‘আচ্ছা বাবা, আচ্ছা—এবার থামো দেখি৷’ অধৈর্য হয়ে গ্লোরিকে বাধা দিল ব্লেক, ‘দোহাই তোমার এবারে চলো৷ আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে৷’
‘আজ রাতে কি তাহলে তোমার সঙ্গে দেখা হবে না৷’
‘না৷ এ কটা দিন আমি কাজে ব্যস্ত থাকব৷ কাজ মিটে গেলে তোমাকে ডেকে পাঠাব৷ হয়তো সামনের সপ্তাহেই সব চুকে বুকে যাবে—তবে তার আগে নয়৷’
মেয়েটি তাকাল ব্লেকের চোখে৷ মুখের ভাবে সংশয় ও সন্দেহ, ‘তুমি আর মরগ্যান মিলে কোনও বদ মতলব আঁটছ না তো? ওঃ এডি ভগবানের দোহাই...’
গ্লোরির হাত ধরে চেপে ধরল ব্লেক৷ টানতে টানতে ওকে নিয়ে এল ফ্ল্যাটের বাইরে৷ চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল ফ্ল্যাটের দরজা৷ চাবিটা পকেটে ভরে সে বলল, ‘তুমি একটু থামবে? বার বার এক কথা বলা আমি পছন্দ করি না৷ ভেব না, তুমি না হলে আমার চলবে না! এই বাজারে ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না৷ কথাটা মনে রেখো৷’
‘ঠিক আছে এডি৷ তোমার ভালোর জন্যেই আমি তোমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু তাতে যদি তুমি বিরক্ত হও, তাহলে...’
‘হ্যাঁ, আমি বিরক্তই হচ্ছি৷’ প্রায় ভেংচে উঠল ব্লেক৷ তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল, ‘এখন দয়া করে একটু থামবে?’
সদর দরজায় পৌঁছে গ্লোরি বলল, ‘তোমার জন্যে আমি কিন্তু অপেক্ষা করে থাকব৷ বেশিদিন দেরি করো না লক্ষ্মীটি৷’
‘আচ্ছা, আচ্ছা!—’ অধৈর্যভাবে হাত নেড়ে নিস্পৃহ স্বরে জবাব দিল ব্লেক৷ তারপর দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল বাসস্টপের অভিমুখে৷
বাসে বসে ব্লেকের মনে হল জিনির কথা৷ চোখ-মুখে সোনালি রোদের উষ্ণতা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে, জিনি ও গ্লোরির মধ্যে বিশাল পার্থক্যটা তার কাছে ধরা পড়ল! জিনির চেহারা এবং সাহসের কথা ভেবে সে আরও একবার অবাক হল৷ ওকে পাশে নিয়ে পথ চলার স্বপ্ন দেখল ব্লেক৷ এই মুহূর্তে গ্লোরিকে তার ঘৃণা করতে ইচ্ছে হল৷
কিটসনের অবস্থাটা মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করল ব্লেক৷ জিনির পাশে একা বসে নব-বিবাহিত স্বামী হিসেবে কেমন অভিনয় করছে সে, সেটা দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করল তার৷ তার মানে অবশ্য এই নয় যে ঘুষি খাওয়া, থ্যাবড়ামুখো ছোঁরাটাকে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে৷ নিছক কৌতূহলভরেই ব্লেক জানতে চাইল কিটসনের অবস্থাটা৷
আনমনাভাবে আহত চোয়ালে হাত বোলাল ব্লেক৷ যন্ত্রণার অনুভব তাকে মনে করিয়ে দিল গত রাতে কিটসনের সঙ্গে তার মারামারির কথা৷ ব্লেকের চোখজোড়া প্রতিহিংসার জ্বালায় জ্বলে উঠল, দৃষ্টি হয়ে উঠল ক্রূর৷ না এই অপমানের কথা কোনও দিনই সে ভুলবে না৷ এর শোধ এডওয়ার্ড ব্লেক তুলবেই তুলবে, আর সেদিন কিটসনকে দুঃখ করতে হবে তার ভুলের জন্যে৷
জিপোর কারখানার কাছে বাস যখন থামল, তখনও ব্লেক জিনির ভাবনায় মগ্ন৷ কারখানায় যাওয়ার উঁচু-নিচু রাস্তা ধরে পথ চলতে চলতে সে ভাবল কিটসনের কথা জিনির পাশে বসে সে কী নিয়ে কথা বলছে মেয়েটার সঙ্গে?
জিনির সঙ্গে কথাবার্তা খুব কমই বলছিল কিটসন৷ ষাট মাইল রাস্তা এইভাবে চুপচাপ ওর পাশে বসে পাড়ি দিতে হবে ভেবে সে হতাশ হল৷ সাধারণত মেয়েদের সামনে কিটসন একেবারেই চুপচাপ থাকে না৷ বরং প্রগল্ভতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবেই হাজির হয় ওদের কাছে৷ কিন্তু জিনির পাশে বসে নিজের এই অভাবনীয় পরিবর্তনে কিটসন নিজেও অবাক হল৷ সম্ভবত জিনির তেজস্ক্রিয় ব্যক্তিত্বের কাছে হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়েছে—তাই তার জিভ আড়ষ্ট৷ অথচ জিনির মতো করে আর কোনও মেয়ের সঙ্গ সে কোনওদিন কামনা করেনি৷
জিনি কিন্তু একনাগাড়ে বকবক করেই চলেছে৷ হঠাৎ হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে কিটসনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে৷ বেশিরভাগ প্রশ্ন কিটসনের মুষ্টিযোদ্ধার অধ্যায় সংক্রান্ত৷ বিভিন্ন মুষ্টিযোদ্ধা সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত মতামত, এবং তাঁদের সম্ভাবনাময় জীবনে হঠাৎ ইতি পড়ার কারণ—এই সব জানতে চেয়ে ও কিটসনকে ভীষণ বিব্রত করে তুলল! কিটসন বারকয়েক ইতস্তত করে বুদ্ধিদৃপ্ত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে৷ চোখেজোড়া গভীর একাগ্রতায় সামনের রাস্তার দিকে নিবদ্ধ৷ পরবর্তী তিন-চার মাইল হয়তো কেটে গেল অখণ্ড নীরবতায়৷ তারপর আবার হয়তো শুরু হল জিনির অস্বস্তিকত প্রশ্নবাণের পালা৷
একসময় জিনি আচমকা বলে উঠল, ‘দু-লাখ ডলার পেলে সেটা নিয়ে কী করবে ভাবছ?’
কিটসনের মুখের দিকে উৎসুকভাবে চেয়ে ও পায়ের ওপর পা-তুলে বসল৷ এক ভগ্নমুহূর্তে দেখা গেল জিনির সুঠাম উরু৷ নিখুঁত ভঙ্গিমায় অবাধ্য স্কার্টকে আবার যথাস্থানে স্থাপন করল ও ব্যাপারটা কিটসনের চোখ এড়াল না৷ মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দিগভ্রান্ত বুইকের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আবার আয়ত্তে আনল সে৷
‘এখনও তো টাকা পাইনি৷ সুতরাং এত আগে থেকে স্বপ্ন দেখার কোনও মনে হয় না৷’
‘তার মানে আমাদের এই প্রাপ্তিযোগ সম্পর্কে তোমার মনে এখনও সন্দেহ আছে?’ একটু অবাক হল জিনি৷
সে ইতস্তত করল, রাস্তার দিকে নজর রেখে ধীর স্বরে জবাব দিল, ‘যদি সত্যিই আমরা টাকাটা পাই, তবে নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করব৷ কারণ টমাস আর ডার্কসনের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, আমি ওদের ভালো করেই চিনি৷ ওরা আমাদের সহজে রেহাই দেবে না৷’
‘সেটা পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভর করছে৷’ শান্তস্বরে বলল জিনি, ‘টমাস ও ডার্কসনকে যদি ঠিকভাবে সমঝে দেওয়া যায় যে আমরা নেহাত ছেলেখেলা করতে আসিনি, তাহলে ওরা আর বাধা দেবে বলে মনে হয় না৷...তাছাড়া, ওদের জন্যে আমি এতটুকু চিন্তিত নই৷ প্ল্যানমাফিক কাজ হলে আর কোনও ভয় নেই৷ টাকা আমরা পাবই—অন্তত আমি এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত৷’
‘বললাম তো সে ক্ষেত্রে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷’ কিটসন একই কথার পুনরাবৃত্তি করল, ‘আমাদের প্ল্যানটা যে খারাপ তা আমি বলছি না৷ বিশেষ করে একটা গোটা ট্রাককে একটা ক্যারাভ্যানের মধ্যে লুকিয়ে ফেলার বুদ্ধিটা তো এক কথায় অপূর্ব! কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে তাহলেই আমরা ট্রাকটার তালাটা খুলে ফেলতে পারব! আচ্ছা ধরে নেওয়া যাক, যেভাবেই হোক ট্রাকটা আমরা খুললাম এবং যার-যার টাকা ভাগ করে নিলাম৷ তারপর? দু-লাখ ডলার নেহাত চাট্টিখানি ব্যাপার নয়? অত টাকা তুমি ব্যাঙ্কে রাখতে পারবে না, কারণ পুলিশ সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকবে৷ সুতরাং ওই এক বস্তা ক্যাশ টাকা নিয়ে আমরা করব কী?’
‘কেন? টাকাটা একটা সেফটি ভল্টে রেখে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়! তাতে তো আর পুলিশের ভয় নেই৷’
‘নেই যে তা বলি কেমন করে? গত বছর সেই ব্যাঙ্ক লুটের ব্যাপারটা তোমার মনে আছে? তারাও ঠিক তোমার কথামতো লুটের টাকা সেফ ডিপোজিট ভল্টে লুকিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু পুলিশ তো আর ঘাস খায় না৷ ওরা শহরের প্রতিটি ভল্ট একে একে খুলে দেখতে লাগল, এবং শেষ পর্যন্ত ঠিক খুঁজে পেল ব্যাঙ্ক লুটের সমস্ত টাকা৷’ কিটসনের আঙুল চেপে ধরল স্টিয়ারিং হুইলের ওপর৷ চোখের দৃষ্টি স্থির৷
‘তাই যদি হয়, তবে টাকাটা নিয়ে সোজা চলে যাব ন্যু-ইয়র্ক অথবা সানফ্রানসিসকোয়—অথবা তার চেয়েও আরও দূরে, ছোট্ট কোনও শহরে৷ সেখানে তো পুলিশ আর আমাদের খোঁজ পাবে না৷ তা ছাড়া পুলিশের পক্ষে গোটা আমেরিকার প্রতিটা ভল্ট খুলে দেখা তো সম্ভব নয়৷’
‘সে না হয় হল; কিন্তু অবস্থাটা একবার ভেবে দেখো; দু-লক্ষ ডলার সঙ্গে নিয়ে তোমাকে দেশান্তরী হতে হবে৷ অর্থাৎ টাকাটা সঙ্গে করে বইতে গেলে একটা বড় সুটকেস ভর্তি হয়ে যাবে৷ মনে কর সুটকেস নিয়ে ট্রেনে ওঠার পর পুলিশ হঠাৎ ট্রেনের তল্লাশি নিতে শুরু করল, তখন? কারণ ট্রাক লুটের পর পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে দশ লক্ষ ডলার উদ্ধার করতে৷ সুতরাং...’
‘ওঃ তুমি দেখছি ভীষণ ভীতু!” জিনির কথায় সহানুভূতির আভাস পেয়ে কিটসন অবাক হল, ‘অতই যদি ভয় তাহলে এ কাজের পক্ষে ভোট দিলে কেন?’
এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছে কিটসনের বিন্দুমাত্রও ছিল ন৷ তাই আলোচনায় পূর্ণচ্ছেদ টানতে চাইল সে, ‘যাকগে ওসব কথা বাদ দাও৷ ফ্র্যাঙ্ক আমার কথা শুনলে হয়তো বলে বসত, প্রলাপ বকছি৷ তাছাড়া আমার মনে হয় একাজে আমরা সফল হব৷’ অস্বস্তিকর চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিয়ে জিনিকে আশ্বাস দিল কিটসন, ‘এবার তুমি বলো তোমার টাকা নিয়ে তুমি কী করবে?’
সিটের গায়ে হেলান দিয়ে বসল জিনি৷ ওর উদ্ধত চিবুক এগিয়ে এল সামনের দিকে৷ উইন্ডশিল্ডের গায়ে জিনির সুন্দর মুখমণ্ডলের প্রতিটি প্রতিবিম্ব কিটসনকে আরও একবার মুগ্ধ করল৷
‘ও, সে সব অনেক আগে থেকেই আমার ঠিক করা আছে৷ অবশ্য তোমার তা ভালো নাও লাগতে পারে৷ টাকা থাকলে মানুষ যা খুশি তাই করতে পারে, যা খুশি!...গত বছর আমার বাবা মারা গেছেন৷ যদি বাবার কিছু টাকা থাকত, তাহলে বোধহয় তিনি আজ বেঁচে থাকতেন৷ বাবা মারা যাওয়ার সময় আমি কাজ করতাম একটা সিনেমা হলে, অতি সাধারণ চাকরি৷ সুতরাং দামি ওষুধ-পত্রের সংস্থান করা সম্ভব ছিল না৷ বাবা মারা যাওয়ার পর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, টাকার অভাবের জন্যে এ পৃথিবীকে ছেড়ে যেতে আমি রাজি নই৷ বাবার মতো শুয়ে থেকে নির্জীবের মতো হার মেনে নিতে আমি রাজি নই৷ তাই অনেক মাথা খাটিয়ে এই ট্রাক-লোপাটের প্ল্যানটা আবিষ্কার করলাম৷’
জিনির অভাবিত অপ্রত্যাশিত এই আত্ম-উন্মোচনে কিটসন বিচলিত হল। এই ট্রাক-লোপাটের ব্যাপারে জিনির মন যে স্থির প্রতিজ্ঞ, তা জানতে পেরে সে যেন স্বস্তিবোধ করল। কিটসন বুঝল, জিনি ক্রমশই তার ওপরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
‘কিন্তু এই ট্রাক ও দশ লাখ ডলারের খবর তুমি পেলে কেমন করে?’ সে প্রশ্ন করল।
কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল জিনি।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর কিটসন চোখ ফেরাল ওর দিকে। দেখল, ওর মুখে ফিরে এসেছে আগের সেই বরফ-কঠিন নির্বিকার অভিব্যক্তি। কিটসন হঠাৎ যেন দমে গেল। সাত তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘ভেব না আমি তোমার হাঁড়ির খবর জানতে চাইছি! এমনি কৌতূহল হল, তাই জিজ্ঞেস করলাম৷ যাক গে, কিছু মনে কোরো না—কোনও ভুল হয়ে থাকলে মাপ চাইছি৷’
জিনি তাকাল কিটসনের চোখে৷ ওর সমুদ্র-সবুজ চোখে শূন্য দৃষ্টি৷ তারপর ঝুঁকে পড়ে ও অন করল রেডিওর সুইচ৷ কিছুক্ষণ নবগুলো নাড়াচাড়া করার পর রেডিওতে ভেসে এল আধুনিক যন্ত্র-সংগীতের সুর৷ সিটে গা এলিয়ে বাজনার তালে তালে পা নাচাতে লাগল জিনি৷
কিটসন বুঝল, তাদের আলোচনায় পূর্ণচ্ছেদ টানার এ এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত৷ নিজের ওপর মনে মনে বিরক্ত হল সে; অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল কিটসন৷
মিনিট কুড়ি পর ক্যারাভ্যান-মার্ট-এর সামনে এসে থামল কিটসনের বুইক৷ দোকানের নাম ‘দ্য কোয়ালিটি কার অ্যান্ড ক্যারাভ্যান সেন্টার৷’ মার্লো থেকে মাইলখানেক দূরে বড় রাস্তার ওপরেই অবস্থিত দোকানটা৷
কিটসনের চোখে পড়ল একটা সবুজ-সাদা রঙের কাঠের ঘর—সম্ভবত অফিসঘর৷ তার পাশেই বিরাট গ্যারেজ—পুরোনো গাড়ি, লরি, ক্যারাভ্যান সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড় করানো৷ ওদের গাড়ি দোকানের কাছে থামতেই অফিস ঘর থেকে পড়িমড়ি করে দৌড়ে এল এক অল্পবয়সি যুবক৷ তাকে দেখেই কিটসনের বিরক্তি আরও বেড়ে গেল৷ যে ধরনের ছেলেদের সে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে, লোকটা দুর্ভাগ্যবশত সেই দলের৷ তার মুখশ্রী সাধারণের চেয়ে সুন্দর, গায়ের রঙ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ, মাথায় কোঁকড়ানো কালো চুল, গভীর নীল চোখের তারা সজীব, প্রাণবন্ত৷ লোকটার পরনে সাদা গরম স্যুট, একটা ঘিয়ে রঙের শার্ট এবং একটা রক্ত-লাল টাই৷ ডান হাতের শক্ত কবজিতে একটা দামি ওমেগা ঘড়ি সোনার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো৷
লোকটা কিটসনের গাড়ির কাছে উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে এল৷ একটা মোটা দাঁও মারার প্রত্যাশায় তার মুখে চোখে আশার আলো জ্বলজ্বল করছে৷
গাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল৷ তারপর চট করে এগিয়ে গেল ওপাশের দরজার দিকে—যে দিকে জিনি বসে আছে৷ লোকটা দরজা খুলে ধরতে জিনি গাড়ি ছেড়ে নামল৷ তার একগাল হাসি ভরা প্রিয়জনসুলভ অভ্যর্থনার বহর দেখে কিটসনের মুষ্টিবদ্ধ হাত নিশপিশ করতে লাগল আক্রোশে৷
‘ক্যারাভ্যান সেন্টারে এসেছেন বলে ধন্যবাদ ম্যাডাম৷’ মাথা ঝুঁকিয়ে লোকটা নাটকীয় ঢঙে বলে উঠল, ‘এখানে এসে ভালোই করেছেন৷
আপনাদের একটা ক্যারাভ্যান চাই, এই তো? আমাদের চেয়ে ভালো ক্যারাভ্যান এ চত্ত্বরে কোত্থাও পাবেন না! আসুন—দেখবেন আসুন—’
কিটসন ইতিমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে৷ লোকটার কথায় সে মুখ দিয়ে হুম করে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল৷ লোকটার গায়ে পড়া স্বভাব দেখে তার অস্বস্তি হল৷
‘আমার নাম হ্যারি কার্টার৷’ নিজের পরিচয় দিল লোকটা৷ বুইকের চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে কিটসনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে—কাঁধ ঝাঁকাল৷
‘আপনি ঠিকই ধরেছেন মিঃ কার্টার, আমরা একটা জুতসই ক্যারাভ্যানের খোঁজ করছি—তাই না, আলেক্স?’ জিনির স্বর কিশোরীর মতো খুশি খুশি শোনাল৷
হ্যারি কার্টার জিনির হাসির প্রত্যুত্তরে আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসল, ‘তাহলে বলতে হবে, আপনারা ঠিক উপযুক্ত জায়গাতেই এসেছেন৷ আপনাদের জীবনে এ এক স্মরণীয় অধ্যায়—এর গুরুত্ব আপনাদের কাছে অনেকখানি,... কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, ক্যারাভ্যান নিয়ে আপনাদের এতটুকু অসুবিধেয় পড়তে হবে না৷ যেটা পছন্দ হয় সেটা বেছে নিন—সব রকম ক্যারাভ্যান আমাদের দোকানে রয়েছে৷ আপনাদের কিরকম চাই, সেটা খালি আমাদের বলুন৷’
কার্টারের হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে কিটসন গম্ভীরভাবে বলে উঠল, ‘একটু কম দামের মধ্যে চাই৷’
‘দাম নিয়ে বিন্দুমাত্রও ভাববেন না,’ তড়িঘড়ি কিটসনকে বাধা দিল কার্টার৷ কিন্তু তার চোখ-জোড়া জিনির সুঠাম পায়ের দিকে, ‘কম দামের ক্যারাভ্যানও এখানে অনেক আছে৷ আসুন না, ঘুরে ফিরে দেখবেন৷ যেটা আপনাদের পছন্দ হয় বলুন, দামের জন্যে ভাববেন না৷’
কার্টারকে অনুসরণ করে ওরা এগিয়ে গেল দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানগুলোর দিকে৷
মনমতো ক্যারাভ্যানটাকে খুঁজে পেতে কিটসনের বেশ কিছু সময় লাগল৷ কারণ জিপোর নির্দেশমতো ক্যারাভ্যানটা কম করে ষোলোফুট লম্বা হওয়া দরকার, এবং তাতে অতিরিক্ত সাজ-সরঞ্জাম না থাকাই বাঞ্চনীয়৷ কিটসন বেশ কিছুটা ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানটাকে হঠাৎই লক্ষ করল৷ সে থমকে দাঁড়াল ওটা পরীক্ষা করে দেখার আশায়৷
ক্যারাভ্যানটা সাদা রঙের, কিন্তু ছাদের রং আকাশ-নীল৷ দু-পাশে এবং সামনে পিছনে দুটো করে জানলা৷
‘এটায় কাজ চলতে পারে৷’ জিনিকে লক্ষ করে বলল কিটসন৷ জিনি প্রত্যুত্তরে সংক্ষিপ্ত মাথা দোলাল৷ ‘মিঃ কার্টার, এটার মাপ কত?’
‘কোনটা? এই সাদাটা?’ কার্টার যেন অবাক হল, ‘আমার মনে হয় আপনাদের পক্ষে তেমন জুতসই হবে না, মিঃ...’ কার্টার চোখ রাখল কিটসনের চোখে, ‘আপনার নামটা কিন্তু এখনও জানি না, মিঃ...’
‘হ্যারিসন৷’ কিটসনের মুখে কোনওরকম ভাব পরিবর্তন হল না, ‘মাপ কত ক্যারাভ্যানটার?’
‘সাড়ে ষোলো বাই ন-ফুট৷ সত্যি বলতে কী মিঃ হ্যারিসন, এই ক্যারাভ্যানটা আসলে শিকার-টিকার করার জন্যে তৈরি—এবং সেই কারণেই বেশ শক্তপোক্ত৷ তাছাড়া ভেতরে সেরকম কোনও সুব্যবস্থাও নেই—বুঝতেই তো পারছেন৷ আপনার স্ত্রী সম্ভবত এটা একেবারেই পছন্দ করবেন না, তাই না মিসেস হ্যারিসন?’ কার্টারের চোখজোড়া আবার গিয়ে থমকাল জিনির সুগঠিত পায়ের ওপর, ‘অবশ্য এটার মতো অন্য ক্যারাভ্যানও আছে—তাতে সবরকম বন্দোবস্তই করা রয়েছে—দেখবেন আসুন, একেবারে ‘এ’ ক্লাস জিনিস৷’
কিটসন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখতে লাগল ক্যারাভ্যানটার চাকা, স্বয়ংক্রিয় ব্রেক... বুঝল ক্যারাভ্যানটার ওজন বইবার ক্ষমতা৷ তাছাড়া জিপো বার বার বলে দিয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ব্রেকের কথা৷ নাঃ, এ জিনিসই তাদের চাই৷
‘আমার স্বামী দেবতা হাতের কাজে ওস্তাদ৷’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল জিনি, ‘আমাদের আসল মতলবটা তাহলে আপনাদের খুলেই বলি, মিঃ কার্টার৷’ কার্টারের নীল চোখে কপট কৌতূহল৷ আমরা ঠিক করেছি, একটা ক্যারাভ্যান কিনে সেটাকে নিজের মনমতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নেব৷ এর ভেতরটা একবার দেখতে পারি?’
কার্টার কিছুটা দমে গেলেও চটপট জবাব দিল, ‘ও নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ তবে এটা দেখা হয়ে গেলে আরও একটা ক্যারাভ্যান আপনাদের কষ্ট করে দেখতে হবে৷ তাহলেই বুঝবেন আমি ‘এ’ ক্লাস বলতে কী বোঝাতে চাইছি৷ এটা নিছকই একটা বাক্স বুঝলেন কি না?’
কার্টার ক্যারাভ্যানের দরজা খুলতেই জিনি ও কিটসন ভেতরে উঁকি মারল৷
সেই মুহর্তেই কিটসন তার ধারণা সম্পর্কে নিশ্চিত হল৷ ক্যারাভ্যানের ভেতরে দু-একটা হালকা শেলফ, র্যাকে দিয়ে সাজানো৷ এগুলোকে মিনিট কয়েকের চেষ্টাতেই খুলে সাফ করে দেওয়া যায়৷ কিটসন এবার ঢুকল ক্যারাভ্যানের ভেতর৷ নাঃ, মেঝেটা ভীষণ মজবুত; তাছাড়া দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও কিটসনের মাথার ওপর প্রায় ইঞ্চিকয়েক জায়গা রয়েছে৷
এরপর হ্যারি কার্টারের অনুরোধে দ্বিতীয় ক্যারাভ্যানটাও ওরা দেখল, এবং সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিল, প্রথমটাই ভালো৷
নীল-সাদা ক্যারাভ্যানটা দিকে পা চালাতে চালাতে কিটসন জানাল, ‘মিঃ কার্টার, প্রথমটাই আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে৷ কত দাম পড়বে ওটার?’
ক্যারাভ্যানটার পাশে দাঁড়িয়ে ওটার ওপর চোখ বোলাতে লাগল কার্টার৷ বোধহয় মনে মনে কিটসনের পকেটের জোর আন্দাজ করতে চাইল৷
‘এই ক্যারাভ্যানটা বেশ মজবুত, মানে টেঁকসই, বুঝলেন মিঃ হ্যারিসন৷’ কার্টার তার গৌরচন্দ্রিকা শুরু করল, ‘বহু বছর পর্যন্ত এটা আপনাদের কাজে আসবে৷ না, এটা নিয়ে আপনারা ঠকবেন না৷ এটার নতুন দাম হচ্ছে তিন হাজার আটশো ডলার৷ তবে এটা তো আর নতুন নয়, তাই দামটা না হয় কিছু কমানো যাবে৷ কিন্তু দেখতেই তো পাচ্ছেন, এর গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত নেই, মানে, যারা এটা নতুন কিনেছিল তারা পুরো ছ’মাসও জিনিসটা ব্যবহার করেনি৷ আর আপনাদের জিনিসটা যখন পছন্দ হয়েছে, মানে হানিমুনের ব্যাপার—তখন আর বেশি দাম বলি কী করে, বলুন? নিন, মাত্র আড়াই হাজারেই ক্যারাভ্যানটা আপনাদের দিয়ে দিচ্ছি৷ একেবারে জলের দর মশাই, এক্কেবারে জলের দর!’
‘উঁহু, অত দাম তো আমরা দিতে পারব না৷’ কিটসন কিছু বলার আগেই জিনি বলে বসল৷ ‘তাহলে মনে হচ্ছে এটা আর আমরা নিতে পারলাম না, মিঃ কার্টার৷ চলো আলেক্স, অন্য কোথাও যাওয়া যাক৷’
কার্টার বিজ্ঞের হাসি হাসল, ‘আমি এমন কিছু বেশি দাম বলিনি, মিসেস হ্যারিসন৷ এ এলাকায় আর কোথাও আপনি ক্যারাভ্যান পাবেন না৷ সেই এক পাবেন সেন্ট লরেন্সে গেলে—তবে সেখানে জিগ্যেস করলে বুঝতে পারবেন আমাদের চেয়ে সেখানে দাম কত বেশি! যদি আপনাদের এটার দাম বেশি মনে হয়, তাহলে আসুন, একটু কম দামের মধ্যে অন্য ক্যারাভ্যান আপনাদের দেখাই৷ ওই তো ওটা দেখছেন—ওটার দাম মাত্র পনেরোশো ডলার—ওটা অবশ্য তেমন মজবুত নয়, কিন্তু শৌখিনভাবে সাজানো৷’
‘আঠারোশো ডলার পর্যন্ত আমি উঠতে পারি, মিঃ কার্টার৷’ কিটসন নির্বিকারভাবে বলল, ‘তার বেশি দেওয়া আমাদের ক্ষমতার বাইরে৷’
অনুকম্পার হাসি কার্টারের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল, ‘আপনার শর্তে রাজি হতে পারলে খুশি হতাম, মিঃ হ্যারিসন, কিন্তু আমি নিরুপায়৷ বিশ্বাস করুন আঠারোশো ডলার একদম পোষায় না৷ জিনিসটা আপনার পছন্দ হয়েছে বলেই আপনাকে ফিরিয়ে দিতে খারাপ লাগছে—ঠিক আছে, নিন, পুরোপুরি তেইশশো ডলারই দেবেন৷ এর চেয়ে কম করতে বলবেন না৷’
কিটসনের মেজাজ ক্রমশ তিরিক্ষে হয়ে উঠতে লাগল৷ কার্টারকে কলার ধরে দুটো ঝাপ্পড় দেবার ইচ্ছেকে সে অতিকষ্টে দমিয়ে রাখল৷
কার্টারের মোলায়েম, ভদ্র কথাবার্তা, তার সুন্দর ব্যবহার, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ কিটসনকে ঈর্ষান্বিত করে তুলল৷ কারণ জীবনে যে সফলতার স্বপ্ন সে দেখেছিল তার চেহারা অনেকটা কার্টারের মতো৷ ব্যর্থতা ও হতাশা মিশে কিটসন অনুভব করল এক অদ্ভুত জ্বালা৷
‘কিন্তু অত টাকা দিয়ে ক্যারাভ্যান কেনার ক্ষমতা আমাদের নেই, মিঃ কার্টার৷’ জিনি বলে উঠল৷ ওর সবুজ চোখে এক বিশেষ মাদকতার দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল কার্টারের চোখে৷ কিটসনের চোখজোড়ায় খেলে গেল ক্রোধের বিদ্যুৎ৷ জিনির এই মোহিনী ভঙ্গিমায় যেন ঝরে পড়ছে যেন আবেদন, আর কার্টার সেটা ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো চোখ দিয়ে চাটছে৷ এমন করে ও তো কোনওদিন কিটসনকে দেখিনি! ‘ওটাকে দু-হাজারই করুন না৷ বিশ্বাস করুন ওর চেয়ে বেশি টাকা আমাদের সঙ্গে নেই!’
কার্টার চিন্তিতভাবে গোঁফে হাত বোলাল৷ অসীম কৌতূহলভরে জিনির দেহের প্রতিটি বাঁক জরিপ করল৷ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আপনার অনুরোধকে আগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, মিসেস হ্যারিসন৷ অন্য কেউ হলে এ প্রস্তাবে আমি কখনই রাজি হতাম না৷ সত্যি কথা বলতে কী, দু-হাজারে ক্যারাভ্যানটা বেচলে আমার অন্ততপক্ষে একশো ডলার লোকসান যাবে—কিন্তু টাকাটাই তো বড় কথা নয়৷ ঠিক আছে, এটাকে আপনাদের বিয়ের উপহার বলেই ধরে নিন; আপনাদের জন্যে ওটার দাম আমি দু-হাজারেই নামিয়ে দিলাম৷
বুঝলেন মিসেস হ্যারিসন, সম্পর্কটাই আসল, টাকা-পয়সার কোনও দামই সেখানে নেই৷’
কিটসনের ফরসা মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল৷ উত্তেজনায় তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হল৷
‘শুনুন, মশায়...’ কিটসনের উত্তেজিত স্বরকে বাধা দিল জিনি, ‘ধন্যবাদ, মিঃ কার্টার, আপনার সহযোগিতার জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ৷ দু-হাজারে আমরা রাজি৷’ জিনির মনকেড়ে নেওয়া, ইঙ্গিতময় হাসি নিছক ব্যর্থ হল না৷
কান এঁটো করা হাসি হেসে কার্টারের দৃষ্টি জিনির দিকে তীক্ষ্ণ হল, ‘এতে আর ধন্যবাদের কী আছে মিসেস হ্যারিসন৷ নেহাত আপনি বললেন, ‘তাই খাতির করলাম৷ আমার লোকেদের বলে দিচ্ছি ক্যারাভ্যানটা আপনার গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেবে৷ আসুন, অফিসে বসে লেনদেনটা সেরে ফেলা যাক৷’ এবার কিটসনের দিকে ফিরল কার্টার—মুখে অনুগ্রহের হাসি, ‘আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন মিঃ হ্যারিসন৷ দরাদরির ব্যাপারে আপনার স্ত্রীর জুড়ি নেই—আমার মতো ব্যবসাদারকে পর্যন্ত তিনি রাজি করিয়ে ফেললেন! সত্যি এমন স্ত্রী পাওয়া ভাগ্যের কথা৷’
অফিসে এসে ওদের লেনদের সম্পূর্ণ হল৷ কার্টার যেন ছল-ছুতোয় দেরি করতে চাইল৷ বিলটা দু-আঙুলে ধরে সে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে জিনির দিকে তাকাল, ‘হানিমুন কাটাতে কোথায় যাচ্ছেন, মিসেস হ্যারিসন? প্যারিসে?’
‘উহুঁ! আমার স্বামী মাছ ধরতে খুব ভালোবাসেন৷ তাই ভাবছি কোনও পাহাড়ি এলাকাতেই যাব৷ তারপর কী হয় পরে দেখা যাবে৷’
কিটসন হাত বাড়িয়ে কার্টারের হাত থেকে বিলটা ছিনিয়ে নিল৷ কার্টারের লোলুপ দৃষ্টি সে একেবারেই সহ্য করতে পারছে না; অথচ জিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার৷
‘চলো, এবার ওঠা যাক৷ ওদিকে আবার একগাদা কাজ পড়ে রয়েছে৷’ জিনিকে লক্ষ করে কিটসন বলে উঠল৷
কার্টার কৃপার হাসি হাসল, উঠে দাঁড়াল, ‘আপনাদের শুভ মধুচন্দ্রিমা কামনা করি৷ পরে যদি কোনওদিন এই ক্যারাভ্যানটা পালটে নতুন কিছু কেনার ইচ্ছে হয়, লজ্জা করবেন না—সোজা আমার কাছে চলে আসবেন৷’ কথা শেষ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নিয়ে জিনির সঙ্গে হাত ঝাঁকাল কার্টার৷
কিটসন বিরক্ত হয়ে পকেটে হাত ভরে রাখল৷ কার্টারের সঙ্গে হাত ঝাঁকাতে তার গা রি-রি করছিল৷ নিজেকে সংযত করে সে এগিয়ে চলল—দরজার দিকে৷
ক্যারাভানটা ততক্ষণে বুইকের পিছনে লাগানো হয়ে গেছে৷ কার্টার জিনির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল, পিছনে কিটসন৷
জিনিকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার ভঙ্গি দেখে কার্টারের ওপর কিটসনের রাগ যেন দপ করে জ্বলে উঠল৷ কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে নিল৷ কার্টার তার পিঠে এক সশব্দ চড় মেরে আসন্ন মধুচন্দ্রিমা সম্পর্কে শুভেচ্ছা জানাল৷
ক্যারাভ্যান মার্ট ছেড়ে ওদের গাড়ি ছুটে চলতেই জিনি বলল, ‘যাক জিনিসটা বেশ সস্তায় পাওয়া গেছে—মরগ্যান খুশিই হবে৷’
কিটসন চাপা স্বরে ফেটে পড়ল, ‘ওই হতভাগাকে কষে ধোলাই দেওয়া উচিত ছিল৷ ব্যাটা যেভাবে তোমার দিকে তাকাচ্ছিল...’
জিনি চট করে মুখ ফিরিয়ে তাকাল কিটসনের দিকে; ওর সবুজ চোখে বিরক্তি এবং ঘৃণা৷
‘তার মানে?’
‘না, ওই কার্টারের কথা বলছি৷ ব্যাটা যে রকম জুলজুল করে তোমাকে দেখছিল, ইচ্ছে করছিল ওর নাকে একখানা বসিয়ে দিই!’
‘কে আমার দিকে কিভাবে তাকাল, তাতে তোমার কী?’ জিনির স্বর বরফ শীতল, ‘আমি তোমার বিয়ে করা বউ নই; তবে মিছিমিছি উত্তেজিত হচ্ছ কেন?’
কিটসনের মুখে কেউ যেন সজোরে চড় মারল৷ অপমানে তার মুখ হয়ে উঠল রক্তিম৷ শক্ত মুঠোয় স্টিয়ারিং চেপে ধরে একমনে গাড়ি ছুটিয়ে চলল৷
জিপোর কাখানায় পৌঁছনো পর্যন্ত সে একেবারের জন্যেও মুখ খুলল না৷
সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই আসল কাজের জন্যে ক্যারাভ্যানটাকে তৈরি করে ফেলল জিপো, ব্লেক ও কিটসন৷
ওই এগারো দিন ধরে জিপোর কাছ ছেড়ে নড়েনি ব্লেক৷ এমনকী জিপোর নোংরা আস্তানাতেই সে রাত কাটিয়েছে৷ ব্লেকের এতটা কর্মঅন্ত-প্রাণ হওয়ার একটা বিশেষ কারণ আছে৷ সে জানে, মরগ্যান তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে৷ তাই প্রাণপণ পরিশ্রম করে সে মরগ্যানকে দেখাতে চাইছে, এ কাজ সম্পর্কে তার উৎসাহ কম নয়; এবং তার ওই ব্যর্থতা সাময়িক, সেটাও মরগ্যানকে বুঝিয়ে দিতে সে বদ্ধপরিকর৷
জিপোর কাছে শুয়ে রাত-কাটানো যে কী দুঃসহ ব্যাপার সেটা একদিনে ব্লেক বেশ বুঝতে পেরেছে৷ আসল কথা হল, জিপোর মতো নোংরামি ও কষ্টসহ্য করার ক্ষমতা তার একেবারেই নেই৷ ইটালিতে চাষ-বাসের কাজ করত বলে জিপো সবরকম অবস্থাতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে৷ তাই বিভিন্ন অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি ওর নির্লিপ্ততায় ব্লেক অবাক হয়েছে—সেইসঙ্গে হয়েছে বিরক্তও৷
কিটসন প্রতিদিন সকালে ঘড়ি ধরে আটটার সময় কারখানায় আসে, আর রাত বারোটায় ফিরে যায় ঘরে৷ ওরা তিনজন সারাদিন ধরে ক্যারাভ্যানটার পিছনে লেগে থাকে৷ ওটা যাতে ট্রাকটাকে বইতে পারে, সেজন্য আপ্রাণ পরিশ্রম করে চলে৷
এই ক্যারাভ্যানটা নিয়ে কাজ করার সময়েই ব্লেক এবং কিটসন উপলব্ধি করল জিপোর কর্মদক্ষতা৷ ওর বু্দ্ধি এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাহায্য না পেলে কাজ যে এতটুকু এগোত না, সেটা ওরা দুজনে বেশ বুঝতে পারল৷
ব্লেক এমনিতে জিপোকে বিশেষ পাত্তা দিত না৷ কিন্তু এই কাজের সময় সে আবিষ্কার করল যন্ত্র-সংক্রান্ত ব্যাপারে জিপোর তুলনায় তারা নিতান্তই এক-একটি গর্দভ৷ জিপোর সাহায্য ছাড়া যে এই ট্রাক-লুট করার কথা ভাবা যায় না, সেটা ব্লেকের মগজে ঢুকল৷ সেইসঙ্গে ঈর্ষা এবং বিরক্তি তাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল৷
কিন্তু কিটসন এই সরল সাদাসিধে ইটালিয়ানের কাজ দেখে ভীষণ খুশি হল৷ মনে-মনে জিপোকে শ্রদ্ধা করতে আরম্ভ করল সে৷ তার মনে হল, জীবনে এই প্রথম সে একটা কাজ শিখছে৷ তাছাড়া জিপোর একাগ্রতা ও ধৈর্য তাকে মুগ্ধ করল৷
মঙ্গলবার রাতে ক্যারাভ্যানের কাজ শেষ হল, এবং সেই রাতেই জিপোর কারখানায় মরগ্যান এক আলোচনা সভার আহ্বান জানাল৷
গত এগারো দিন ধরে জিনি একেবারে বেপাত্তা৷ ও মরগ্যানের কাছে একটা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিল, যদি পরিকল্পনার কোনও পরিবর্তন হয় তবে ওকে যেন ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়৷ কিন্তু ও কোথায় থাকে—কী করে, সে সম্পর্কে কারোরই কোনও ধারণা নেই—এমন কী মরগ্যানও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে৷
জিপোর সঙ্গে কিটসন কাজে ব্যস্ত থাকলেও কিটসন সর্বদাই জিনির কথা ভেবেছে৷ সে যে নিজের অজান্তেই জিনিকে ভালোবেসে ফেলেছে, সেটা কিটসন আর অস্বীকার করতে চাইল না৷ অবশ্য এ ভালোবাসা যে নিতান্তই হাস্যকর ও অর্থহীন, সে বিষয়ে কিটসনের মনে কোনওরকম ভুল ধারণা নেই৷ যেমন সে জানে, ওয়েলিং কোম্পানির ট্রাক-লুটের পরিকল্পনা তাদের টেনে নিয়ে যাবে অসাফল্য ও একরাশ বিপর্যয়ের মধ্যে৷
কিন্তু জিনির প্রতি তার আকর্ষণ এতই উদ্দাম যে তাকে রোধ করা কিটসনের অসাধ্য৷ অসংখ্য বীজানুর মতো সেই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিটি শিরা উপশিরায়—মিশে গেছে রক্তের সঙ্গে৷
এ কদিন মরগ্যান ক্যারাভ্যান নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায়নি৷ সে কেবল এজেন্সি থেকে রকেট রিসার্চ স্টেশন পর্যন্ত যাতায়াতের রাস্তাটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বারবার ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছে৷ ম্যাপের পর ম্যাপ এঁকে শুধু চিন্তা করেছে মরগ্যান৷ কোন পথ দিয়ে ঠিক কখন পালালে সুবিধে হবে, সেই মতলব ভেঁজেছে বসে-বসে৷ আর পরিকল্পনাটার আগাপাস্তলা যাচাই করেছে প্রতিটি মুহূর্তে৷
মরগ্যানের চিন্তাধারা কখনওই খাপছাড়া ভাবে এগোয়ে না৷ সে জানে, ট্রাকটাকে দখলে আনবার পর পালাবার ব্যাপারটাই হয়ে উঠবে প্রধান৷ অর্থাৎ পুলিশ কোনওরকম খবর পাওয়ার আগে অকুস্থল থেকে ক্যারাভ্যানের দুরত্ব যতই বাড়ানো যায় ততই নিশ্চিন্ত৷ সুতরাং অনিবার্যভাবেই সারা শহরতলির ভৌগোলিক বিবরণ নিয়ে তাকে প্রাণপণ মাথা ঘামাতে হচ্ছে৷
রাত প্রায় আটটার সময় জিপোর কারখানায় এসে পৌঁছল মরগ্যান৷ এ কাজের সফলতা সম্পর্কে সে বর্তমানে মোটামুটি নিশ্চিন্ত৷ শুধু দু-একটা ছোটখাটো ব্যাপারের জন্যে তাকে একটু চিন্তায় পড়তে হচ্ছে—অবশ্য সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়৷ আর যদি দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, তবে তাকে রোধ করার ক্ষমতা মরগ্যান কেন, পৃথিবীর কারোরই নেই৷
মাসের মধ্যে এই প্রথম বর্ষার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল৷ বৃষ্টির ফোঁটা একঘেয়েভাবে ঝরে চলেছে৷ সেইসঙ্গে নাকে ভেসে আসছে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ৷
বাঁধানো রাস্তা থেকে যেন অনুভূত হচ্ছে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস—বহুদিন প্রতীক্ষার পর সে যেন আজ প্রাণভরে তেষ্টা মেটাচ্ছে বর্ষার শীতল জলে৷ মরগ্যানের এই আবহাওয়া ভালো লাগল৷
অদূরে জিপোর কারখানা অন্ধকারে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছে৷ সমস্ত জানলা দরজা সযত্নে বন্ধ থাকায় ভেতরের আলোর আভাস বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না৷ পুরো এলাকাটা যেন জনশূন্য এক পরিত্যক্ত স্থান৷
বুইকের দরজা খুলে বাইরে পা রাখল মরগ্যান৷ হেডলাইট নেভাতে যাবে, শুনতে পেল কারও পায়ের শব্দ৷ কেউ যেন দৌড়ে আসছে তারই দিকে৷ অন্ধকারের দিকে অনুসন্ধানী চোখ মেলে ধরল মরগ্যান৷ নিষ্কম্প হাত যান্ত্রিকভাবে আঁকড়ে ধরল .৩৮-এর কঠিন বাঁট৷
অন্ধকারের এলাকা থেকে আলোর বৃত্তে আবির্ভূত হল জিনি গর্ডন৷ ওর পরনে একটা নীল বর্ষাতি৷ জলে ভেজা থাকায় চকচক করছে৷ ওর মাথায় একটা নীল টুপি৷ তার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে তামা রঙ চুলের গুচ্ছ৷
‘বহুদিন পর বৃষ্টির মুখ দেখা গেল’, বলল মরগ্যান, ‘তোমার ঠিকানা জানা থাকলে আসার পথে তোমাকে তুলে নিতাম—’
‘তাতে কী হয়েছে৷’ সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দিল জিনি৷
মরগ্যান এগিয়ে গেল ওর কাছে, মুখোমুখি দাঁড়াল৷ বৃষ্টির ছাঁটতে আড়াল করে আচমকা প্রশ্ন করল, ‘তুমি থাক কোথায়, জিনি?’
জিনি থমকে দাঁড়াল৷ বৃষ্টির বেগকে উপেক্ষা করে চোখ রাখল মরগ্যানের চোখে, ‘সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷’
মরগ্যান তার থাবা দিয়ে আঁকড়ে ধরল মেয়েটার হাত৷ সামনের দিকে সামান্য টেনে আনল ওকে, ‘আমার সঙ্গে কথা বলার সময় সমঝে কথা বলবে খুকি৷ তোমার ব্যবহার, চালচলন প্রথম থেকেই আমার কাছে একটু ধোঁয়া-ধোঁয়া ঠেকছে৷ আমি এখনও জানি না, তুমি কে, তোমার আসল পরিচয় কী, কোথায় থাক, কী করে এই ট্রাক-লুট করার দুর্বুদ্ধি তোমার মাথায় এল—মানে, বলতে গেলে তুমি আমাদের কাছে এক রহস্যময়ী৷ তবে তোমার ইচ্ছে আমার অজানা নয়৷ তুমি ভাবছ, যদি ওই ট্রাক-লুটের ব্যাপারটা আমরা কেঁচিয়ে ফেলি তাহলে তুমি ভোল-চাল পালটে টুপ করে হাপিস হয়ে যাবে৷ জিনি গর্ডন নামে যে কেউ ছিল, সেটা পুলিশ ধরতেই পারবেন না, প্রমাণ করা তো দূরের কথা৷’
এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল জিনি, ‘সেটা করা কি খুব অন্যায় হবে?’ মরগ্যানের পাশ কাটিয়ে ও এগিয়ে গেল কারখানার দরজার কাছে৷ অধৈর্যভাবে টোকা মারল বারকয়েক৷
কয়েক মুহূর্তে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মরগ্যান; তার অভিব্যক্তিহীন কালো চোখে সংশয় ফুটল৷ কিটসন কারখানার দরজার খুলে দিতেই সে জিনির পাশে গিয়ে দাঁড়াল, ওরা একই সঙ্গে কারখানায় ঢুকল৷
‘এই যে আলেক্স, এদিকের খরব কী?’ বর্ষাতির জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল মরগ্যান৷
‘এদিকের কাজ সব শেষ৷’ মরগ্যানের প্রশ্নের উত্তর দিলেও কিটসনের চোখ কিন্তু জিনির দিকে৷ জিনি ওর ভিজে বর্ষাতিটা ছুড়ে রাখল টেবিলের ওপর৷ ওর পরনে একটা ধুসর কোট, স্কার্ট আর সবুজ ব্লাউজ৷ এই পোশাকে ওকে সামনে দেখে কিটসনের বুকে যেন ধাক্কা লাগল৷ সে আরও একবার আবিষ্কার করল জিনির আগুন ঝরানো রূপের অনিবার্য প্রভাব৷ আশান্বিত উৎসুক চোখে সে জিনির দিকে চেয়ে রইল৷
কিটসনের দিকে এক পলক ফিরে দেখল জিনি, কিন্তু তাকে তেমন আমল দিল না৷ বর্ষাতির পকেট হাতড়ে ও একটা বাদামি কাগজে মোড়া প্যাকেট বের করল৷ সেটা হাতে দিয়ে ক্যারাভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জিপোর কাছে গিয়ে হাজির হল ও বলল, ‘এই যে পরদাগুলো নিয়ে এসেছি৷’
মরগ্যান জিপোর দিকে এগিয়ে এল, ‘কী খরব?’ মরগ্যানের দৃষ্টির প্রত্যুত্তরে স্বভাবসিদ্ধ একগাল হাসি হেসে জিপো তাকে অভ্যর্থনা জানাল৷ তার গোলাকার ভারী মুখমণ্ডলে আত্মপ্রসাদের ছাপ স্পষ্ট৷
‘কাজ সব শেষ—আর কাজ দেখলে তুমি খুশি হবে ফ্র্যাঙ্ক৷’ পরদার প্যাকেটটা খুলতে লাগল জিপো, ‘দাঁড়াও, পরদাগুলো আগে লাগিয়ে দিই, তারপর দেখো শালার ক্যারাভ্যানের চেহারা—একেবারে যন্তর৷’
একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছতে মুছতে ছায়ার আওতা থেকে বেরিয়ে এল এড ব্লেক৷ জিনিকে দেখে তার দৃষ্টি ওর শরীরে বাঁধা পড়ল—কিটসনের অবস্থাও তথৈবচ৷
ব্লেক এই এগারো দিন বলতে গেলে কোনও মেয়ের মুখ দেখেনি৷ তাই আজ জিনিকে সামনে পেয়ে ওর মনের সেই পুরোনো ইচ্ছেটা অদম্য হয়ে উঠল৷ কিটসনকে জিনির দিকে মোহগ্রস্তভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ব্লেক ভীষণ মজা পেল৷ থ্যাবড়ামুখো ছোঁড়াটা ভাবছে কী? ও কি সত্যিই-সত্যিই মনে করে যে জিনিকে ও কবজা করতে পারবে? হুঁ’, বামন হয়ে চাঁদ ধরার শখ৷
‘কী ব্যাপার, কোথায় ছিলে অ্যাদ্দিন?’ জিনির সামনে এগিয়ে গেল ব্লেক, ‘একেবারে এগারো দিন নিপাত্তা৷ তা, এই লুকোচুরির কারণটা জানতে পারি?’
জিনি হাসল—ব্যাপারটা কিটসনের কাছে নিঃসন্দেহ অপ্রত্যাশিত৷ ব্লেকও ভেবেছিল জিনির সামান্য এক চিলতে হাসির জন্যে তাকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে৷ কিন্তু তার হাসির উত্তরে জিনির সহজ মিষ্টি হাসি ব্লেককে খুশি করল৷
জিনি হালকা স্বরে জবাব দিল, ‘ছিলাম কাছাকাছিই, তবে লুকোচুরি মোটেই খেলছিলাম না!’
‘তাহলে মাঝে মাঝে এখানে এলেই পারতে?’ ব্লেক তার সিগারেট কেস এগিয়ে দিল ওর দিকে, ‘আমরা কাজে বেশ একটু নতুন করে উৎসাহ পেতাম৷’
জিনি সিগারেট ঠোঁটে রাখল৷ ব্লেক লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিল ওর সিগারেটটা৷
‘আসতে আমার আপত্তি ছিল না, তবে ওই যে উৎসাহ টুৎসাহ কী সব বললে, ওতে আমার একটু আপত্তি আছে৷’
ওদের কথোপকথন চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনছিল কিটসন৷ আর সেইসঙ্গে বুকের মধ্যে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করছিল৷ ওদের সহজ, ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা কিটসনের মনে বিরক্তি জাগিয়ে তুলল৷ সে জানত, জিনির সঙ্গে কোনওদিন এ ধরনের কথাবার্তা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ এবং ব্লেকের কথাবার্তায় ওকে খুশি হতে দেখে সে আরও দুঃখ পেল৷
‘তাহলে অন্তত একটিবার এসে দেখা করে যেতে পারতে৷ আমি এখানে চুপচাপ একা একা দিনের পর দিন কাজ করে চলেছি...ওঃ৷ ভেবে দেখো, দশ-দশটা রাত আমাকে জিপোর মতো জলহস্তীর সঙ্গে কাটাতে হয়েছে...বাপরে বাপ!’
জিনি সশব্দে হেসে উঠল৷ ‘ভালোই হয়েছে৷ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে মাঝে মধ্যে একট আধটু পরিবর্তন দরকার৷’ কথা শেষ করে জিনি ক্যারাভ্যানের দিকে পা-বাড়াল৷ মরগ্যান তখন ক্যারাভ্যানের চারিদিকে ঘুরে ফিরে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ওটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে৷
পরদাগুলো ক্যারাভ্যানের জানলায় লাগিয়ে জিপো গলদঘর্ম অবস্থায় বেরিয়ে এল, ‘এসো ফ্র্যাঙ্ক—ভেতরটা দেখবে এসো৷’
মরগ্যান একইভাবে ক্যারাভ্যানের দিকে চেয়ে রইল, ‘দরজাটার কী করছ, জিপো?’
জিপো হাসল—আকর্ণবিস্তৃত গর্বের হাসি৷ তারপর কিটসনকে চেঁচিয়ে ডাকল, ‘আলেক্স, এদিকে এসো একবার—ফ্র্যাঙ্ককে কলকবজা নেড়ে দরজার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দাও দেখি!’
কিটসন জিপোর নির্দেশমতো ক্যারাভ্যানের সামনের দিকে গিয়ে দাঁড়াল৷ মরগ্যান ও জিপো পিছন দিকে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে লাগল৷
দরজাটা বার দুয়েক নেড়েচেড়ে দেখল মরগ্যান৷ তার কাছে ওটা বেশ মজবুত বলেই মনে হল৷
‘কী হে, কী রকম বুঝছ?’ সাফল্যের উত্তেজনায় জিপোর স্বর আগ্রহে ফেটে পড়ছে৷
‘দেখে তো মন্দ লাগছে না৷’
‘আসল কাজটা এখুনি দেখতে পাবে৷ আলেক্স, যন্তর চালু করো।’ কিটসনকে লক্ষ করে হাঁক দিল জিপো৷
কিটসন একটা হাতলে চাপ দিতেই ক্যারাভ্যানের পিছনটা একটা বাক্সের ঢাকনা মতো ওপরে উঠে গেল৷ এবং একই সঙ্গে ক্যারাভ্যানের মেঝের কিছুটা অংশ বাইরে বেরিয়ে এল; অনেকটা পাটাতনের মতো৷ সেটা মাটিতে ঠেকতেই, ক্যারাভ্যান থেকে কারখানার মেঝে পর্যন্ত তৈরি হল একটা ঢালু মজবুত রাস্তা৷
‘দেখেছ এবার আসল কায়দাটা? তুমি যেমনটি বলেছিলে ঠিক তেমনটি হয়েছে!’ হাতে হাত ঘষতে ঘষতে মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল, জিপো, ‘পেছনের ঢাকনা আর ক্যারভ্যানের মেঝে দুটোকে একসঙ্গে কাজ করাতে গিয়ে কি কম অসুবিধে ভোগ করতে হয়েছে? শেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জিনিসটাকে দাঁড় করিয়েছি৷ ওই ঢালু পাটাতনটা যাতে ট্রাকের ওজন বইতে পারে তার জন্যে ইস্পাতের পাত দিয়ে এটাকে পুরোটা মুড়তে হয়েছে—বুঝলে ফ্র্যাঙ্ক, পরিশ্রম নেহাত কম করিনি৷’
ব্লেক ও জিনি ক্যারাভ্যানের কাছে এগিয়ে আসতেই মরগ্যান জিপোর কথায় ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানাল, ‘নাঃ তোমার ক্ষমতা আছে—সত্যিই একটা যন্তর তৈরি করছে! তবে এই কলকবজার ব্যাপারটা আরও বার কয়েক চালাও দেখি?’
মরগ্যানকে সন্তুষ্ট করতে কিটসনকে কম করে বার দশেক হাতল টিপতে হল৷ অবশেষে ক্ষান্ত দিল মরগ্যান, ‘হুঁ, ভালোই হয়েছে কায়দাটা৷’ বলতে বলতে ঢালু পাটাতন বেয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতর ঢুকল সে৷
জিপো চটপট মরগ্যানকে অনুসরণ করল৷ পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরে যেসব পরিবর্তন সে করেছে সেগুলো ফ্র্যাঙ্ককে দেখাতে লাগল, যেন পাড়া-প্রতিবেশীকে ডেকে এনে নিজের বাড়ি দেখাচ্ছে!
‘হাইড্রোজেন আর অ্যাসিটিলিনের সিলিন্ডারগুলোকে রাখবার জন্যে ওপর দিকে এই কাঠের র্যাক গুলোকে লাগিয়েছি৷ যন্ত্রপাতি রাখবার জন্যে তৈরি করেছি ওই কাবার্ডটা৷ আর দুধারে যে কাঠের টাকা তাক রয়েছে, সেগুলো আমরা মালপত্র রাখবার জন্যে ব্যবহার করব৷ মেঝেটাকে তো যথাসম্ভব মজবুত করেছি, অতএব চট করে ভেঙে পড়ার কোনও ভয় নেই৷’
মরগ্যান ধীরেসুস্থে ক্যারাভ্যানের প্রতিটি অংশ যাচাই করে দেখতে লাগল৷ বিশেষ করে সে নজর দিল ক্যারাভ্যানের মেঝের দিকে৷ তারপর ক্যারাভ্যান থেকে নেমে চিৎ হয়ে শুয়ে ওটার তলায় ঢুকল মরগ্যান৷ টর্চ লাইট জ্বেলে জিপোর কথার সত্যতা পরীক্ষা করতে লাগল৷ ক্যারাভ্যানের মেঝের তলায় আড়াআড়িভাবে বল্টু দিয়ে আটকানো ইস্পাতের চওড়া পাতগুলো তার চোখে এড়াল না৷
জিপো উৎকণ্ঠিতভাবে মরগ্যানকে লক্ষ করতে লাগল৷
অবশেষে একসময় মরগ্যান বেরিয়ে এল ক্যারাভ্যানের নীচ থেকে৷ হাত দুটোকে ঝেড়ে পকেটে রাখল সে৷ উত্তেজনায় ভরা চক্চকে চোখজোড়া জিপোর দিকে রেখে সন্তুষ্ট স্বরে বলল মরগ্যান, ‘সাবাস জিপো! আমার কথার এতটুকু নড়চড় হয়নি দেখছি! কিন্তু ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানে ঢোকানোর পর বুইকটা কি ঠিকমতো টানতে পারবে?’
‘কেন পারবে না? আমি বলছি না যে ওর ওজন খুব কম হবে, তবে যদি আমাদের পাহাড়ি রাস্তায় না উঠতে হয়, তাহলে ওই ট্রাকসমেত ক্যারাভ্যানটা তোমার বুইক অতি সহজেই টেনে নিয়ে যাবে৷’
‘হুঁ—পাহাড়ের দিকে না এগোলে আর চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ তবে...’ মরগ্যান মাঝপথে থমকাল, চোয়ালে হাত বোলাল কিছুক্ষণ, ‘সমস্ত কিছুই তোমার ওপর নির্ভর করছে, জিপো—কত তাড়াতাড়ি তুমি ট্রাকের তালা খুলতে পার তার ওপর৷ যদি তোমার সময় খুব বেশি লাগে, তাহলে হয়তো বাধ্য হয়ে আমাদের ছুটতে হবে পাহাড়ি এলাকায়—নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে৷ কিন্তু তা আমি চাই না৷ কারণ পাহাড়ি এলাকার রাস্তাগুলো একেই বিপজ্জনক, তার ওপর অসম্ভব খাড়া৷ আমার মনে হয় বুইকটা অত ওজন পেছনে নিয়ে ওই খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে পারবে না৷’
মুহূর্তে জিপোর মুখে নেমে এল অস্বস্তির ছায়া৷
‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তুমি বলেছিলে ট্রাকের তালা খোলার জন্যে আমি অফুরন্ত সময় পাব?’ ঘেমে-ওঠা হাতদুটো প্যান্টে ঘষে নিয়ে বলল সে, ‘নাকি ট্রাকের তালা ফুসমন্তরে পাঁচ মিনিট খুলে যাবে বলে মনে করছ?’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন?’ মরগ্যান জিপোকে আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করল৷ জিনি, কিটসন, ব্লেক চমকে ফিরে তাকাল জিপোর দিকে৷ ‘তোমাকে আমি বলছি না যে ট্রাকটা পাঁচ মিনিটেই তোমাকে খুলতে হবে৷ হয়তো দু-তিন সপ্তাহ সময় পাবে তুমি—তবে তার পরে আমাদের পাহাড়ে গিয়ে লুকোতে হতে পারে৷’
জিপো নড়েচড়ে দাঁড়াল, ওর ছোট-ছোট চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত৷
‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তুমি বলেছিলে আমাকে এক মাস সময় দেওয়া হবে তালা খোলার জন্যে; আর এখন তুমি দু-তিন হপ্তার গীত গাইছ? ওয়েলিং কোম্পানির ট্রাকটা আমি দেখেছি, ওর তালা খোলা নেহাত ছেলেখেলার ব্যাপার নয়৷ তাড়াহুড়ো করে ওই তালা খোলা অসম্ভব৷’
ট্রাক উধাও হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ক-শো লোক যে তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়বে, তা ভেবে মরগ্যান অবাক হল৷ তার ওপর রয়েছে মিলিটারি হেলিকপ্টার—প্রতিটি রাস্তা ওরা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবে৷ দ্রুতগামী পুলিশের দল মোটর বাইকে চড়ে প্রত্যেকটা গাড়ি পরীক্ষা করে দেখবে৷ যদি সত্যিই তাদের দু-লক্ষ ডলার করে পেতে হয়, তবে জিপোকে একটু তাড়াহুড়ো করতেই হবে—তাছাড়া উপায় নেই৷
মরগ্যান জানে আগে থাকতে এসব কথা জিপোকে জানালে সে ভয় পেয়ে যাবে—হয়তো একেবারে বেঁকে বসবে৷ তার চেয়ে বরং ট্রাকটা আগে ক্যারাভ্যানে চড়ুক, তখন জিপোকে তাড়াহুড়ো করার জন্যে চাপ দেওয়া যাবে৷ তখন আর ও রাজি না হয়ে পারবে না৷
‘আমারও তাই মনে হয়—তাড়াহুড়ো করে ওই তালা খোলা যাবে না৷’ মরগ্যান জিপোর কথায় সমর্থন জানাল, ‘দেখা যাক, যদি ভাগ্যের জোর থাকে, তবে হয়তো এক মাস সময় পেলেও পেতে পারি৷ কে বলতে পারে, হয়তো প্রথম চেষ্টাতেই তুমি ট্রাকের তালা খুলে ফেলবে৷’
মরগ্যানের হালকা সুর জিপোর কোনও ভাবান্তর ঘটল না৷ গম্ভীরভাবে সে-বলল, ‘ওদের ট্রাকটা খুব মজবুত, ওটা খুলতে গেলে কম সময় হবে না৷’
মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল, ‘তাহলে আসল কাজের জন্যে আমরা প্রস্তুত?’
তার মুখোমুখি দাঁড়ানো তিনজনের চোয়াল কঠিন হল—মুখে ফুটে উঠল একটা বিচলিত ভাব৷
জিনি ক্যারাভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল—ওর চোখজোড়া হঠাৎই সতর্ক হয়ে উঠল৷
‘আজ মঙ্গলবার৷ সুতরাং ফাইনাল রেডি হওয়ার জন্যে আমরা পুরো তিনটি দিন হাতে পাচ্ছি;...মানে আসল কাজের জন্যে শুক্রবারটাকেই আমি বেছে নিয়েছি৷ কারও কোনও আপত্তি আছে?’
শ্বাসনালীটি কুঁকড়ে গিয়ে কিটসনের যেন দমবন্ধ হয়ে এল৷ গত এগারো দিন ধরে ক্যারাভ্যানের কাজে সে এতই ব্যস্ত ছিল যে আসল কাজের কথা তার মনেও ছিল না৷ দিব্যি মনের আনন্দে প্রাণ ঢেলে পরিশ্রম করছে—একমুহূর্তের জন্যেও তার মনে হয়নি, এ সবই আসল কাজের প্রস্তুতি৷
মরগ্যানের কথার সঙ্গে-সঙ্গে কিটসন যেন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল পার্থিব জগতে৷ আতঙ্কে তার হাত-পা পলকের জন্যে স্থবির হয়ে পড়ল৷
ব্লেক অনুভব করলে তার শিরদাঁড়ায় কোনও সরীসৃপের শীতল পিচ্ছিল উপস্থিতি৷ কিন্তু এই অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না৷ কারণ সে জানে, কপালের জোর থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই সে মস্ত বড়লোক হয়ে উঠবে৷ দু-লক্ষ ডলার থাকবে তার হাতের-মুঠোয়৷ উত্তেজনায় ব্লেকের হৃৎস্পন্দন দ্রুত হল৷
জিপোর অস্বস্তির সম্পূর্ণ অন্য কারণ৷ ট্রাক খোলার সময়-সম্পর্কিত ওই ভাসা ভাসা ধারণাটাই তার মনের জোরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে৷ ট্রাক লুট করার ব্যাপারে সে জড়িত থাকছে না—অতএব সেদিক থেকে সে বিন্দুমাত্রও চিন্তিত নয়৷ কিন্তু মরগ্যান তার হাতযশ সম্পর্কে এক বিরাট ভ্রান্ত ধারণা করে বসে থাকবে, তা সে চায় না। বলা যায় না, হয়তো ওই ট্রাকের তালা জিপোর পক্ষে খোলাই সম্ভব হবে না! সুতরাং আগে থাকতে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ফ্র্যাঙ্ক তখন বিপদে পড়বে৷
‘ঠিক আছে, শুক্রবারই ঝঞ্ঝাট মিটে যাক৷’ জোরালো স্বরে জবাব দিল ব্লেক! সে চাইল, তার একাগ্রতা দেখে মরগ্যান খুশি হোক৷
‘আমি রাজি৷’ জিনি বলল৷
মরগ্যান তাকাল কিটসন ও জিপোর দিকে৷
ওরা দুজনেই কিছুক্ষণ ইতস্তত করল৷ কিন্তু কিটসন যেই বুঝল জিনি একদৃষ্টে তাকে লক্ষ করছে, অমনি ভাঙা গলায় জবাব দিল, ‘শুক্রবারই হোক, ক্ষতি কী?’
জিপো তার বিশাল কাঁধ নাচিয়ে বলে উঠল, ‘আমার কোনও আপত্তি নেই৷’
মরগ্যান এগিয়ে গিয়ে বসল যন্ত্রপাতি রাখার টেবিলে৷
‘তাহলে এই যদি আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, তবে অসম্পূর্ণ কাজগুলো এবারে সেরে ফেলা যাক৷’ চারজনের মুখের ওপর একে একে চোখ বুলিয়ে নিল মরগ্যান৷
ওরা চারজন কারখানার এখানে সেখানে পড়ে থাকা কয়েকটা প্যাকিং বাক্সের ওপর বসে একমনে শুনতে লাগল মরগ্যানের কথা৷ উৎকণ্ঠাময় নিথর আবহাওয়া আরও জমাট বাঁধল!
‘জিনির ব্যবহারের জন্যে আমাদের আরও একটা গাড়ি দরকার৷’ বলে চলল মরগ্যান, ‘খোলামেলা, টু-সিটার স্পোর্টস-কার হলেই ভালো হয়৷’ এই গাড়িটা জোগাড় করার দায়িত্ব আমি কিটসন ও ব্লেকের ওপরেই ছেড়ে দিলাম৷’ ওদের দিকে ফিরল মরগ্যান, ‘গাড়িটা তোমারা কায়দা করামাত্রই সোজা নিয়ে আসবে এই কারখানায়৷ জিপো গাড়িটার রঙ নম্বর, সব পালটে দেবে—কেউ ধরতেই পারবে না৷ এই গাড়িটাকে আমরা বিপজ্জনক বাঁকের মুখে উলটে দেব৷ ওই বাঁকটার কাছাকাছি রাস্তার ধারে একটা বড়সড় গাড্ডা আছে৷ ফুট দশেক লম্বা দুটো শাবল দিয়ে আমরা গাড়িটাকে ওই গর্তে উলটে দেব৷ তোমার ওপরে শাবল দুটো জোগাড় করার ভার রইল জিপো৷’
‘ঠিক আছে৷... আর ফ্র্যাঙ্ক, ওই রোড-সাইন দুটো আমি তৈরি করে ফেলেছি৷’
‘দেখি, কোথায়?’
জিপো উঠে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই রোড-সাইন দুটো নিয়ে এল৷ মরগ্যান দেখে খুশিই হল—সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়ল, ‘ভালোই হয়েছে৷ এবার তাহলে পুরো প্ল্যানটা আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক৷ তোমরা কেউ একজন কাগজ পেনসিল নিয়ে লিখতে শুরু করো৷ কারণ কাকে ঠিক কী কী করতে হবে, সে সম্বন্ধে পরে যেন কোনওরকম সংশয় সন্দেহের সৃষ্টি না হয়৷ জিনি, তুমিই লিখতে শুরু করো, কেমন?’
‘আমাকে একটা কাগজে আর পেনসিল দাও আমি লিখে নিচ্ছি৷’
জিপো ওর ঘরের দিকে পা চালাল কাগজ আর পেন্সিল আনতে।
জিপো কারখানার বাইরে যেতেই ব্লেক বলে উঠল, ‘জিপো মনে হয় ভয় পেয়েছে, ফ্র্যাঙ্ক৷ আমার তো ওকে নিয়ে রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে৷’
মরগ্যানের মুখে নেমে এল কঠিনতার ছায়া৷
‘জিপোকে নিয়ে আমি চিন্তিত নই৷ ট্রাক দখলে আনার আগে পর্যন্ত ওর সঙ্গে আমরা নরম ব্যবহার করব, কিন্তু তারপরও যদি দেখি ও বেগড়বাঁই করছে, তাহলে ওকে চাপ দিয়ে কাজ আদায় করতে হবে, তাছাড়া উপায় নেই৷ সুতরাং জিপোকে নিয়ে ভয় পাওয়ার মানে হয় না৷’
‘তুমি ঠিকই বলেছ—এইভাবেই ওকে দিয়ে কাজ করাতে হবে৷’
মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে৷
‘এবার বলো, আলেক্স... কীরকম লাগছে তোমার? কীভাবে টাকাটা খরচ করবে সে নিয়ে কিছু ভেবেছ?’
‘এখনও টাকাটা আমার হাতে আসেনি৷’ ধীর স্বরে জবাব দিল কিটসন ‘ওটা হাতে পাওয়ার পর মতলব ভাঁজার ঢের সময় পাওয়া যাবে৷’
মরগ্যান কিছুক্ষণ চিন্তিতভাবে দেখল কিটসনকে, তারপর ফিরল জিনির দিকে, ‘কেমন লাগছে, জিনি?’
জিনির গভীর সবুজ চোখে ভাবলেশহীনতার পরশ, কেন, ‘খারাপ কী?’
এমন সময় একটা প্যাড ও পেনসিল নিয়ে জিপো ফিরে এল৷ ও দুটো সে তুলে দিল জিনির হাতে৷
‘প্ল্যানটার আগাপাস্তালা আমি আবার বলছি৷’ মরগ্যান শুরু করল, ‘কেউ যদি কোনও জায়গায় বুঝতে না পার, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে, কোনওরকম দ্বিধা করবে না৷ কারণ প্রত্যেকেরই নিখুঁতভাবে জানা দরকার কাকে কী করতে হবে৷ সুতরাং প্রশ্ন করতে ইতস্তত করবে না৷’ মরগ্যান থামল৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করল, ‘শুক্রবার সকাল আটটায় আমরা এখানে এসে জমায়েত হচ্ছি৷ কিটসন ও জিনির থাকবে সেইরকম পোশাক, যে পোশাকে নতুন বর-বউ ছুটি কাটাতে যায়৷ বুইকটা চালাবে কিটসন; আর স্পোর্টস কারটা চালাবে জিনি৷ আমরা থাকব বুইকের লাগোয়া এই ক্যারাভ্যানটার ভেতরে—সম্পূর্ণ অদৃশ্য৷ জিনি গাড়ি নিয়ে সোজা যাবে ওয়েলিং এজেন্সির কাছে৷ সেখানে ও ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করবে৷ এদিকে কিটসন বুইক নিয়ে আর ক্যারাভ্যান নিয়ে সোজা পড়বে সেই কাঁচা সড়কের মুখে৷ সেইখানে একটা রোডসাইন সমেত জিপোকে আমরা নামিয়ে দেব৷’ মরগ্যান হঠাৎ জিনির দিকে আঙুল দেখাল, ‘এইখানে লিখে রাখো, রোড-সাইন দুটো জায়গামতো লাগানোর জন্যে আমাদের দুটো ভারী হাতুড়ি দরকার৷’ মরগ্যান তারপর ফিরল জিপোর দিকে, কাঁচা সড়কের মুখে আমরা তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছি৷ সেখানে লুকোবার জন্যে প্রচুর ঝোপঝাড় রয়েছে—সুতরাং তোমার কোনওরকম অসুবিধে হবে না৷ তোমার কাজ হচ্ছে ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করা৷ যেই ওটা কাঁচা সড়কে ঢুকে পড়বে, অমনি তুমি রোড-সাইনটা রাস্তার মুখে লাগিয়ে দেবে—যাতে অন্য গাড়ি আর সেই রাস্তায় না ঢোকে৷ বুঝতেই পারছ, এইভাবে ট্রাকটাকে আমরা একলা পাচ্ছি৷... আচ্ছা—এবার কাজ হয়ে গেলে তুমি কাঁচা সড়ক ধরে হাঁটতে শুরু করবে; যাতে আসল কাজের সময় তোমাকে আমরা তুলে নিতে পারি—বুঝেছ?’
উত্তেজিতভাবে মাথা ঝাঁকাল জিপো, ‘হ্যাঁ—’
‘এরপর কিটসন গাড়ি থামাচ্ছে বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷ সেখানে এড আর আমি ক্যারাভ্যান থেকে নেমে পড়ব—তারপর আশপাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আমরা ট্রাকের আসার অপেক্ষায় থাকব৷ কিটসন কিন্তু গাড়ি চালিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে মরগ্যান বলে চলল, ‘ক্যারাভ্যানটা কোনও জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে রেখে তুমি শুধু বুইকটাকে নিয়ে কাঁচা সড়কের অন্য মুখটায় পৌঁছবে৷ সেখানে দ্বিতীয় রোড-সাইনটা লাগিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবে৷ ক্যারভ্যানটা আবার বুইকের পেছনে জুড়ে গাড়িটা ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা আসবার কথা, অর্থাৎ আমাদের দিকে মুখ করে রাখবে৷ তারপর সিগন্যালের জন্যে চুপচাপ অপেক্ষা করবে৷রাস্তা বেশ চওড়া আছে, ক্যারাভ্যানসুদ্ধু গাড়ি ঘোরাতে তোমার কনেও অসুবিধেই হবে না৷ তারপর সিগন্যাল পেলেই তুমি গাড়ি ছুটিয়ে আবার আমাদের কাছে এসে হাজির হবে৷ গাড়িটাকে আগের মতো গোল করে ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা আসবার কথা, অর্থাৎ আমাদের দিকে মুখ করে রাখবে। তারপর সিগন্যালের জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করবে। রাস্তা বেশ চড়া আছে, ক্যারাভ্যানসুদ্ধু গাড়ি ঘোড়াতে তোমার কোনও আসুবিধেই হবে না। তারপর সিগনাল পেলেই তুমি গাড়ি ছুটিয়ে আবার আমাদের কাছে এসে হাজির হবে। গাড়িটাকে আগের মতো গোল করে ঘুরিয়ে ক্যারাভানের পেছনটা সামনের দিকে মুখ করে রাখবে। রাস্তার মাটি যথেষ্ট শক্ত, সুতরাং গাড়ি ঘোরানোর সময় ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবে একটা কথা—সিগন্যাল শোনার পর তুমি আর ক্যারাভ্যানের পেছনটা সামনের দিকে মুখ করে রাখবে৷ রাস্তার মাটি যথেষ্ট শক্ত, সুতরাং গাড়ি ঘোরানোর সময় ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ তবে একটা কথা—সিগন্যাল শোনার পর তুমি আর এক মুহূর্তও দেরি করবে না—বিদ্যুৎগতিতে গাড়ি ছোটাবে৷ এ ব্যাপারে যেন কোনওরকম ভুলচুক না হয়৷’
‘কিন্তু সিগন্যালটা কী, সেটা তো বললে না? কী করে বুঝব কখন গাড়ি ছোটাতে হবে?’ কিটসন প্রশ্ন করল৷
মরগ্যান সিগারেটটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে একদৃষ্টে তার জ্বলন্ত প্রান্তটা লক্ষ করতে লাগল৷ চিন্তায় তার ভুরু ঈষৎ কুঞ্চিত হল, ‘হুঁ—আমার মনে হয় রাইফেল বা রিভলভারের শব্দ অতি সহজেই তুমি শুনতে পাবে৷ যদি সে ধরনের গুলি-গোলার ব্যাপার না ঘটে, তবে আমি বাঁশি বাজিয়ে তোমাকে সিগন্যাল পাঠাব৷ বাঁশির একটানা সিগন্যাল শোনামাত্রই তুমি তোমার কাজ শুরু করবে, কেমন?’
কিটসনের মুখ আচমকা গম্ভীর হল, ‘তোমার কী ধারণা যে রিভলভার বা রাইফেল ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে?’
মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী জানি! আগে থাকতে কিছুই বলা সম্ভব নয়; তবে আমার ধারণা, সেরকম ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে৷’
ব্লেকের দিকে একপলক দেখে আবার কিটসনকে লক্ষ করে বলল সে, ‘সে যাই হোক, মোট কথা—বাঁশির শব্দ শুনলেই তুমি চলে আসবে৷’ জিপোর দিকে ফিরে তাকল মরগ্যান, ‘তোমার কাজটা খুবই সহজ মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবে, তোমার শেষের কাজটুকু হয়ে দাঁড়াবে সবচেয়ে কঠিন—কথাটা মনে রেখো৷’
জিপো অস্বস্তিভরে ঘাড় নাড়ল৷ তবে কোনওরকম মারপিটের মধ্যে তাকে জড়াতে হবে না দেখে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷ তাছাড়া এটা তো নিতান্তই স্বাভাবিক, সে যখন মরগ্যানের প্রধান কারিগর, তখন যন্ত্রপাতির কাজ ছেড়ে সে কেন যাবে সাধারণ হাতাহাতির মধ্যে! তার কাজ হচ্ছে ট্রাকের তালা খোলা, ব্যাস!
কিটসনকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল মরগ্যান, ‘তোমাকে কী করতে হবে এখন বুঝতে পারছ?’
‘হ্যাঁ!’
নিজেকে খুনের দায়ে-জড়ানোর ভয় থেকে বাঁচাতে পেরে কিটসন আশ্বস্ত হল৷
‘এবার তাহলে জিনির কথায় আসা যাক৷’ মরগ্যান ঘুরে তাকাল জিনির দিকে৷ ও অভিব্যক্তিহীন মুখে একমনে তার কথা শুনছিল, ভুরু উঁচিয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ও তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ ট্রাকটা বেরিয়ে আসা পর্যন্ত তুমি গাড়ি নিয়ে এজেন্সির দরজার কাছে অপেক্ষা করবে৷ ‘ট্রাকটা রাস্তায় নেমে চলতে শুরু করলেই তুমি ওটাকে সাবধানে ফলো করবে৷ ড্রাইভার যেন কোনওমতেই তোমাকে দেখতে না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখবে৷ ট্রাকটা যখন মাঝারি রাস্তায় পড়বে, তখন তুমি হাজির হবে ওটার ঠিক পেছনে৷ ঘন-ঘন হর্ন বাজাতে শুরু করবে৷ তোমাকে যাবার রাস্তা দেবার জন্যে ট্রাকটা তখন একপাশে সরে যাবে৷ এরপর তোমাকে ড্রাইভারে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবেঃ অর্থাৎ ট্রাক ড্রাইভার যেন তোমাকে মনে রাখে৷ অতএব যখন ট্রাকের পাশ কাটাবে, তখন খুব জোরে হর্ন বাজাবে, চাই কী ড্রাইভারের দিকে মুখ ফিরিয়ে দু-চার বার হাতও নাড়বে; তারপর তীরবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দেবে৷ আমি চাই, ওই ড্রাইভার যেন মনে করে তোমার ভীষণ তাড়া রয়েছে৷ তুমি যদি ঠিকমতো ট্রাকের পাশ কাটাতে পার, তবে সামনে তখনও মাইলখানেক সোজা রাস্তা পাবে৷ যে গাড়িটা তোমাকে এনে দেব, সেটা ঘণ্টায় কম করে একশো মাইল দৌড়বে—সুতরাং তুমি যত জোরে পার গাড়ি ছুটিয়ে যাবে৷ যাতে টমাস এবং ডার্কসন পরস্পরের মধ্যে বলাবলি করে, ‘‘মেয়েটা একটা দুর্ঘটনা না করে বসে!’’ আশা করি আমার মতলবটা তুমি ধরতে পেরেছ?’
জিনি সম্মতি জানাল৷
‘কাঁচা সড়কের কাছে বাঁক ঘুরতেই ওরা আর তোমাকে দেখতে পাবে না৷ কিন্তু তাই বলে তুমি গাড়ির গতি কমাবে না৷ দুর্ঘটনার কোনও ভয় নেই৷ কারণ মুখোমুখি আসা কোনও গাড়ির দেখা তুমি পাবে না৷ অর্থাৎ কিটসন ততক্ষণে কাঁচা সড়কের অন্য প্রান্তে ‘প্রবেশ নিষেধ’ রোড-সাইন লাগিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু তবুও তুমি সাবধান থাকবে, যাতে কোনও বিপদ না হয়৷ আমরা শাবল নিয়ে তোমার জন্যে বিপজ্জনক বাঁকের মুখেই অপেক্ষা করব৷ এড আর আমি গাড়িটাকে উলটে ফেলে দেব রাস্তার ধারের গর্তে৷ ট্রাকটা এসে পৌঁছবার আগে দৃশ্যসজ্জার জন্যে আমরা মোটামুটি মিনিট পনেরো সময় পাব৷ অবশ্য সেটা নির্ভর করছে, কত জোরে তুমি গাড়ি চালাতে পারবে তার ওপর৷ দুর্ঘটনার দৃশ্যটাকে বিশ্বাসযোগ্য এবং বাস্তব করে তোলার জন্যে তোমার গাড়িতে আমরা আগুন ধরিয়ে দেব৷ পেট্রল-ট্যাঙ্কে ডোবানোর জন্যে একটা লম্বা, ছেঁড়া কাপড় আমাদের দরকার পড়বে—আগুন ধরানোর জন্যে ওটাকেই পলতে হিসেবে ব্যবহার করা হবে৷ কাগজে কাপড়ের টুকরোটার কথা লিখে নাও—পরে ভুলে না যাই৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে, ‘তুমি যাবে ডুকাসের একটা মাংসের দোকানে৷ সেখান থেকে বোতল দুয়েক শুয়োরের রক্ত নিয়ে আসবে৷ রক্ত কেনার কারণ হিসেবে বলে দিও তোমার বাগানের কাজে লাগবে৷ জিনি, তুমি সঙ্গে করে একপ্রস্থ পোশাক নিয়ে যেও৷ কারণ তোমার পরনের পোশাক রক্তে একেবারে ভর্তি করে দেওয়া হবে৷ আমরা চাই ট্রাক থামিয়ে টমাল ও ডার্কসন মনে করুক তুমি অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছ৷ তোমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে ওরা ট্রাক ছেড়ে নামতে আর দেরি করবে না৷’ একটু হেসে প্রশ্ন করল মরগ্যান, ‘কোনও প্রশ্ন আছে৷’
জিনি মাথা নাড়ল, ‘না৷ এখনও পর্যন্ত সবই ঠিক আছে৷’
‘আচ্ছা, তাহলে রক্ত-সমুদ্রের মাঝে অচেতন হয়ে তুমি পড়ে রয়েছ—গাড়িটা রাস্তার ধারে দাউ দাউ করে জ্বলছে৷ এড আর আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে—এডের হাতে অটোমেটিক রাইফেল৷ ট্রাকটা এসে এই দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখে থামল৷’ মরগ্যান সিগারেটটা টেবিলে ঘষে নিভিয়ে ফেলল, ‘এইখানে আমাদের কিছুটা আন্দাজের ওপর চলতে হবে৷ আর এর পরের কাজগুলো অবস্থা বুঝে করতে হবে৷ কারণ জিনিকে পড়ে থাকতে দেখে টমাস ও ডার্কসন ঠিক কী করবে বলা মুশকিল৷ তবে একটা ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে জিনির ওপর দিয়ে ওরা ট্রাক চালিয়ে যাবে না; সুতরাং ওরা থামবে৷ তারপর হয়তো দুজনেই নেমে পড়বে ট্রাক থেকে—অবস্থাটা ভালো করে বুঝতে চাইবে৷ অবশ্য আমার তা মনে হয় না৷ আমার ধারণা প্রহরীটা এগিয়ে যাবে জিনির দিকে, আর ড্রাইভার ট্রাকেই বসে থাকবে৷তাহলে ডার্কসন যেই জিনির ফুট খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে, অমনি ট্রাকের পেছন দিক থেকে আমি এগিয়ে আসব৷ এড তখন তার লুকোবার জায়গা থেকে ডার্কসনকে লক্ষ করে রাইফেল তাক করে রাখবে৷ ডার্কসন যেই জিনির ওপর ঝুঁকে পড়বে, আমি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে হাজির হব ট্রাকের জানলার কাছে—ড্রাইভারের মুখে রিভলভার ঠেসে ধরব৷ এবং একই সঙ্গে ডার্কসনের পেটে বন্দুক চেপে ধরবে জিনি৷’
ওরা চারজন একাগ্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মরগ্যানের দিকে৷
‘এরপর ঠিক কী ঘটবে, সে সম্বন্ধে আমার ধারণাও তোমাদেরই মতো৷’ মরগ্যান বলে চলল, ‘হয় টমাস ও ডার্কসন আত্মসমর্পণ করবে, নয় তো গোলমাল বাধাতে চাইবে৷ সুতরাং আমাদের সব রকম পরিস্থিতির জন্যেই তৈরি থাকতে হবে৷ ডার্কসনের কোনওরকম বেচাল দেখলেই এড ওকে গুলি করবে৷ টমাসের ক্ষেত্রে আমাকেও ওই একই পথ নিতে হবে৷ মানে, পুরো ব্যাপারটাই একটা চান্সের ওপর নির্ভর করছে৷ আমরা আগে থাকতে কোনওরকম ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি না৷ তবে যাই ঘটুক না কেন, টমাসকে আমি বোতাম টেপবার সময় দিচ্ছি না৷ তোমরা প্রত্যেকে যদি মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে পার তবে বিপদের কোনও কারণ নেই৷’ মরগ্যান তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘যদি একান্তই তোমাকে রাইফেল ব্যবহার করতে হয়, তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই৷ কারণ ডার্কসন খুব বেশি হলে তোমার থেকে মাত্র বিশ ফুট দূরে থাকবে; আর তোমার হাতে থাকবে অটোমেটিক রাইফেল—তা দিয়ে একশো গজ দূরের একটা মানুষকেও মেরে ফেলা যায়৷ তবু মনে রাখবে, রাইফেল যেন একবারের বেশি ব্যবহার করতে না হয়: স্থির এবং নিশ্চিত লক্ষ্যে গুলি করবে৷’
‘সে বিষয়ে আমার কোনও ভুল হবে না৷’ মরগ্যানের দৃষ্টির মুখোমুখি তাকাতে পারল না ব্লেক৷
‘আচ্ছা, তাহলে টমাস, ডার্কসনকে কুপোকাত করে আমি বাঁশিতে ফুঁ দেব৷ তুমি আমাদের থেকে শ’পাঁচেক গজ দূরে থাকবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে বলল মরগ্যান, ‘বাঁশির শব্দের জন্যে একমনে কান পেতে অপেক্ষা করবে৷ সিগন্যাল শোনামাত্রই ঝড়ের গতিতে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসবে৷’
কিটসন ঘাড় নাড়ল৷ ইতিমধ্যেই সে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে, তার ভাঙা নাকের জন্যে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পরিষ্কার কানে আসছে৷
‘এরপর আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে৷ কিটসন গাড়ি ঘুরিয়ে ক্যারাভ্যানটাকে ট্রাকের সামনের দিকে মুখ করে রাখবে৷ আমি ট্রাকটা চালিয়ে ঢালু পাটাতন বেয়ে ক্যারাভ্যান ঢুকিয়ে দেব৷ জিনি, তুমি ওই সময়ের মধ্যে তোমার পোশাক চটপট পালটে নেবে৷ এড শাবল দুটো এবং রাইফেলটা নিয়ে ক্যারাভ্যানে ঢুকিয়ে রাখবে, তারপর ট্রাকে আমার পাশে এসে বসবে৷ আর জিনি ও কিটসন বসবে বুইকে পাশাপাশি৷ কিটসন আবার গাড়ি ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা এসেছে সেদিকে ছুটবে৷ জিপো ততক্ষণে রাস্তার ধারে আমাদের দিকে হেঁটে আসছে৷ অতএব খুব সহজেই আমরা ওকে ক্যারাভ্যান খুলে ট্রাকের ভেতরে তুলে নেব৷ তাহলে কিটসন আর জিনি রইল বুইকে, আর আমরা তিনজন রইলাম ক্যারাভ্যানের ভেতরে দাঁড়ানো ট্রাকের মধ্যে সম্পূর্ণ আড়ালে৷ এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বড় রাস্তার দিকে ছুটব৷ অবশ্য তার মানে এই নয় যে কিটসনকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে৷ ভাগ্য সহায় থাকলে আমরা মিনিট পনেরোর মধ্যে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ব৷ ওই সময়ের মধ্যে এজেন্সি জানতে পারবে তাদের ট্রাক মাঝ রাস্তায় গায়েব হয়ে গেছে৷ হয়তো প্রথমে ওরা ভাববে ট্রান্সমিটার কোনও অজানা কারণে খারাপ হয়ে গেছে; তাই হয়তো খোঁজ করবে রিসার্চ স্টেশনে৷ আমার ধারণা, এই ট্রাক উধাও হওয়ার ব্যাপার নিয়ে হট্টগোল বাধাতে সময় লাগবে মোটামুটি আধ ঘণ্টা৷ বড় রাস্তায় পড়ে কিটসন তিরিশ মাইলের বেশি জোরে গাড়ি ছোটাবে না৷ আর ওই সময়ে রাস্তায় গাড়ি-টাড়ির ভিড়ও থাকবে প্রচুর, সুতরাং এই ক্যারাভ্যানটার কথা কারও মনে আসবে না—বিশেষ করে যখন লোকে দেখবে নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রী ছুটি কাটাতে চলেছে৷ এ পর্যন্ত কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’
‘কিন্তু ড্রাইভার আর রক্ষীর কী হবে? ওদের কি আমরা ওই বাঁকের কাছেই রেখে আসব?’ হাতে হাত ঘষে প্রশ্ন করল কিটসন৷
বিব্রতভাবে মাথার চুলে হাত দিল মরগ্যান, ‘ও নিয়ে শুধু শুধু তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না৷ এড আর আমি ওদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করব৷’
কিটসন ঘামতে শুরু করল৷ টমাস ও ডার্কসনকে নৃশংসভাবে খুন করা হবে, সে বিষয়ে তার মনে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ রইল না৷
‘কিন্তু ওরা তো ক্যারাভ্যানটাকে দেখবে৷ এমন কী আমাদের চেহারার বর্ণনাও দেবে পুলিশের কাছে—বলবে ট্রাকটা আমরা ক্যারাভ্যানে লুকিযে রেখেছি৷’ ভাঙা গলায় বলে উঠল কিটসন৷ কারণ টমাস ও ডার্কসনের ব্যবস্থার ব্যাপারটা সে খোলাখুলি মরগ্যানের মুখ থেকে শুনতে চায়৷
বিরক্ত হয়ে জবাব দিল মরগ্যান, ‘সেটা যাতে না হয় সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে, তাই না? অতএব তুমি নিশ্চিন্তে থাকো৷ আমি আর এড ওদিকে খেয়াল রাখব, হয়েছে?’
কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷ ওর নির্বিকার মুখভাব তার মনের আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলল৷ তার মনে নিঃশব্দ চিৎকারে কে যেন বলে উঠল, ‘সাবধান আলেক্স, ভালো চাও তো এখনও এসব ছেড়ে চলে এসো! কিটসন বুঝল, এই ট্রাক লুটের চুড়ান্ত পরিণতি মৃত্যু৷ এর শেষ অধ্যায় রক্তিম অধ্যায়৷ একজন অন্ধও এটা স্পষ্ট বুঝতে পারবে৷ কারণ টমাস ও ডার্কসনকে জীবিত অবস্থায় ছেড়ে আসার সাহস তাদের নেই৷...হঠাৎ কিটসনের চমক ভাঙল মরগ্যানের কণ্ঠস্বরে৷’
মরগ্যান তখন বলছে, ‘তোমাদের যদি কোনও প্রশ্ন না থাকে, তাহলে আমি আবার শুরু করছি৷’
জিপো কাঁপা স্বরে বাধা দিল তাকে, ‘দাঁড়াও ফ্র্যাঙ্ক৷ ব্যাপারটা যেন আমার কাছে কেমন কেমন ঠেকছে৷ আমি তোমার কাছে সোজাসুজি জানতে চাই টমাস, ডার্কসনের কী ব্যবস্থা করবে তোমরা? কী করে তোমরা নিশ্চিত হবে যে ওরা পুলিশের কাছে মুখ খুলবে না?’
মরগ্যানের চোখে নেমে এল আকস্মিক বিবর্ণ ছায়া, চোয়ালের রেখা হল কঠিন৷
‘তোমাকে কি জিনিসটা ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিকে হবে? দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল সে, ‘কী করে লোকের মুখ বন্ধ করতে হয় তা তুমি জানো না, ন্যাকা—? শোনো জিপো, তুমি আর আলেক্স সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেয় এ কাজের সপক্ষে ভোট দিয়েছ৷ তার আগে আমি তোমাদের বার বারই সাবধান করে দিয়েছিলাম—বলেছিলাম এ কাজে প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে৷ চাই কি গরম চেয়ার পর্যন্তও ব্যাপার গড়াতে পারে৷ অনেক ভেবেচিন্তেই তোমরা এ কাজে সম্মত হয়ে আমার পক্ষে ভোট দিয়েছিলে৷ অতএব কী পন্থায় টমাস বা ডার্কসনের মুখ বন্ধ করর, সে নিয়ে এখন আর ন্যাকামি কোরো না! তুমিও যেমন জানো, তেমনি আমিও জানি কিভাবে মানুষের মুখ বন্ধ রাখতে হয়৷ কিন্তু তোমাকে আমি সে কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি না? বরং আমি আর এড যেচে সে ঝুঁকি নিচ্ছি৷ সুতরাং তুমি যদি এখন দলছুট হবার মতলবে থাক, তো ভীষণ ভুল করবে! আমরা সবাই একসঙ্গে জলে নেমেছি, ডুবলে সবাই একসঙ্গে ডুবব৷ তোমার আর কিটসনের হঠাৎ ধম্মোভাব জেগেছে বলে কাজ ভেস্তে দেবে, অত বোকা আমি নই৷ বুঝেছো?’
জিপো বার কয়েক ঢোক গিলল৷ মরগ্যানের কালো চোখে ভেসে ওঠা নৃশংতার পরশ তার শিরদাঁড়া যেন বরফে ডুবিয়ে দিয়েছে৷ সেই মুহূর্তে হঠাৎই তার মনে হল, দ্বিতীয়বার কোনওরকম প্রতিবাদ করলে মরগ্যান তাকে কুকুরের মতো গুলি করে মেরে ফেলতে এতটুকু দ্বিধা করবে না৷
‘ঠিক আছে, তুমি যা বলবে তাই হবে, ফ্র্যাঙ্ক৷’ মৃদুস্বরে উত্তর দিল জিপো৷
‘আলবাত তাই হবে!’ মরগ্যান এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল কিটসনের দিকে—স্থির চোখে চেয়ে রইল, ‘তুমি কী বলো?’
কিটসন মরগ্যানকে ততটা ভয় না করলেও জিনিকে আরও বেশি ভয় করে৷ কারণ সে জানে, এই চরম মুহূর্তে পরাজয় স্বীকার করলে সে জিনির কাছে হয়ে দাঁড়াবে উপহাস্যাস্পদ! তাছাড়া একটা মেয়ের কাছে সাহসের পরীক্ষায় কিছুতেই সে হার স্বীকার করতে পারবে না৷
‘আমি একটা প্রশ্ন করেছি তার জন্যেও কি আবার জবাবদিহি করতে হবে নাকি?’ মরগ্যানের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল কিটসন৷
‘আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে গেছ?’ শান্ত স্বরে বলল সে, ‘যদি আর সময় নষ্ট করতে না চাও, তাহলে আমি বলতে শুরু করি?’
‘বলো৷’ কিটসনের মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে৷
‘বড় রাস্তায় পড়ে আমরা সোজা ছুটব ফন হ্রদের দিকে৷ কারণ, সেখানে একটা ক্যারাভ্যানের ঘাঁটি রয়েছে; আমরা সেখানেই রাখব আমাদের ক্যারাভ্যানটা৷ দুশো ক্যারাভ্যানের মধ্যে ওটাকে খুঁজে বার করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়—সন্দেহ করা তো দূরের কথা! দুপুরের মধ্যেই আমরা ফন হ্রদে পৌঁছে যাব৷ সেখানে হ্রদের চারদিকে অসংখ্য ছোট ছোট ঘর রয়েছে—কিটসন সেরকম একটা ঘর ভাড়া করবে৷’ মরগ্যানের কর্কশ স্বরে চাপা ক্রোধের আভাস এখনও উপস্থিত৷ সে দেখল কিটসনকে, ‘ভাড়া নেওয়া ঘরটার কাছে তুমি ক্যারাভ্যানটা রাখবে৷ এবং তুমি আর জিনি নতুন বিয়ে করা বর-বউ-এর অভিনয় করবে৷ সাঁতার কাটাবে, মাছ ধরবে, ঘুরে বেড়াবে অর্থাৎ চুটিয়ে আনন্দ করবে৷ অন্যান্য লোকেরা যেন বুঝতে পারে তুমি হানিমুন কাটাতে এখানে এসেছ এবং তোমার নিজেদের মধ্যেই সারাক্ষণ থাকতে চাও৷ তুমি যখন এই ধরনের পরিবেশ তৈরি করছ, তখন আমি, জিপো আর এড ট্রাকটাকে নিয়ে পড়ব—’
‘আশ্চর্য ফ্র্যাঙ্ক৷’ উত্তেজিত স্বরে ব্লেক চেঁচিয়ে উঠল, ‘কিটসন শালা দেখছি দিব্যি আরামের কাজ নিয়েছে৷ খালি ফুঁর্তি আর ফুঁর্তি!’
কিটসন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল৷ উত্তেজিত রক্তিম মুখে সে হাত মুঠো করে এগিয়ে এল—রাগে চোখজোড়ার যেন আগুন জ্বলছে৷
‘থামো৷’ রুক্ষস্বরে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান৷ কিটসন থমকে দাঁড়াল মরগ্যানের রুষ্ট আদেশে৷’ ‘শোনো এড, তোমাকে আবারও বলছি, আমরা এই কাজটা দল বেঁধে করছি৷ কিটসনের কাজ গাড়ি চালানো আর একটু অভিনয় করা—এ দুটো সে আমাদের চেয়ে ভালোই পারে৷ অতএব তুমি কথায় কথায় ওকে নিয়ে ঠাট্টা, রসিকতা করা ছাড়ো! নয়তো শেষে আমরাও বিপদে পড়ব৷ তোমাদের নিজেদের মধ্যে এই খেয়োখেয়ি দেখতে দেখতে আমার ঘেন্না ধরে গেল৷ এক জিনিই যা চুপচাপ থাকে৷ যদি আমাদের সত্যিই এ কাজটা মতলব মাফিক হাসিল করতে হয়, তাহলে এই ছেলেমানুষিগুলো পকেটে পুরে রাখো৷ এ কথা আমি আর দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করব না—সেটা বুঝে চুপচাপ থেকো!”
ব্লেক কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা—ঠিক আছে৷ ওঃ, একটা সামান্য মন্তব্য করলেও দেখছি বিপদ!’
মরগ্যান একচোখে তাকিয়ে রইল ব্লেকের দিকে—ব্লেক চোখ সরিয়ে নিল একসময়৷ তখন সে আবার বলতে শুরু করল, ক্যারাভ্যান ফন হ্রদে গিয়ে থামামাত্রই জিপো ওর কাজ শুরু করবে৷ অবশ্য ক্যারাভ্যানের ভেতর ওই অল্প জায়গায় আর ভ্যাপসা গরমে ট্রাকের তালা খোলার কাজটা নেহাত সহজ হবে না, কিন্তু আমরা নিরুপায় জিপো, ওটুকু কষ্ট তোমাকে করতেই হবে৷ আমি আর এড থাকব ট্রাকের ভেতরে—তোমারই সুবিধের জন্যে৷ যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয় তাহলে ডাকামাত্রই আমরা হাজির হব৷ আমাদের তিনজনকে একটু বেশিই কষ্ট সহ্য করতে হবে কারণ অন্ধকার নেমে আসার আগে আমরা ক্যারাভ্যান ছেড়ে বেরোতে পারছি না৷ রাত হলেই আমরা ক্যারাভ্যান ছেড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকব, আবার সকাল হওয়ামাত্রই সকলের অলক্ষ্যে আবার ক্যারাভ্যানে ফিরে আসব৷ কেউ যাতে আমাদের দেখতে না পায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷ জিপো যদি মনে করে তালা খোলার কাজ খুব অল্প সময়ে হবে না, তাহলে আমাদের হয়তো ফন হ্রদ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে—সম্ভবত পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে৷ কিন্তু সেটা এড়াতে পারলেই আমি খুশি হব৷ কারণ পাহাড়ি রাস্তায় বুইকের পক্ষে বোধ হয় ক্যারাভ্যানটাকে টেনে তোলা সম্ভব হবে না...তার ওপর গাড়ি যদি বিগড়ে যায়, তাহলেই তো চিত্তিরি!’ মরগ্যান তাকাল জিপোর দিকে, ‘কোনও প্রশ্ন আছে?’
‘তাহলে তুমি বলতে চাও ট্রাকের ভেতর বসেই ক্যারাভ্যানের ওপর কাজ চালাতে হবে?’ জিপো প্রশ্ন করল, ‘তাহলে তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করা মুশকিল হয়ে পড়বে৷ প্রথমত ক্যারাভ্যানের পরদার ভেতর দিয়ে কেউ সেই আগুন দেখে ফেলতে পারে৷ আর দ্বিতীয়ত, ক্যারাভ্যানে আগুন লেগে যাওয়ার চান্সও যথেষ্ট!’
‘হয়তো তোমাকে এই অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে নাও হতে পারে৷ সময় নির্ভর তালাটা যে ওই সময়ের মধ্যে খুলে যাবে না, তাই বা কে বলতে পারে? অথবা কম্বিনেশনের নম্বরটাও হয়তো অতি সহজেই তুমি বের করে ফেললে, তখন?’
জিপোর মুখমণ্ডল থেকে যেন অস্বস্তির কালো ছায়াটা মিলিয়ে গেল৷ মরগ্যানের কথার সমর্থনে সে ঘাড় নাড়ল৷
মরগ্যান টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল৷ হাত-পা ছড়িয়ে শিথিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সজীব করতে চাইল, ‘তাহলে এই হল মোটামুটি আমাদের প্ল্যান৷ এতে কোনওরকম সম্ভাবনাকেই আমরা বাদ দিইনি, কিন্তু তবুও এটা নিখুঁত নয় : কোনওদিন কোনও প্ল্যান নিখুঁত হয় না৷ তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত—ট্রাকটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে আমরা অতি সহজেই দিনের পর দিন লুকিয়ে রাখতে পারব! ক্যারাভ্যানের সমুদ্রে কোনও একটা বিশেষ ক্যারাভ্যানের ভেতর ট্রাকটার থাকার কথা কেউ কোনওদিন ধরাণাতেও আনতে পারবে না৷ আমাদের প্ল্যানের এটাই হল সবচেয়ে মার-কাটারি অংশ!’ উৎফুল্ল মুখে মরগ্যান তাকাল জিনির দিকে, ‘জিনি, এর জন্যে আমি তোমার কাছে ঋণী৷ তোমার এই মতলবটা এককথায় অপূর্ব!’
‘যার যার কাজ সে সে ঠিকমতো করলেই আমাদের কাজ চোখ বুজে হাসিল হবে৷’ জিনির অকম্পিত কণ্ঠস্বরে নেই কোনও উচ্ছলতার আভাস৷
‘আমারও তাই মনে হয়৷’ মরগ্যান এবার ঘড়ি দেখল, বলল, ‘এড তুমি আর কিটসন জিপোর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ো—গাড়ি রাখবার জায়গাগুলো একবার চক্কর দিয়ে এসো৷ একটা স্পোটর্স-কার আমার আজ রাতেই চাই৷ গাড়িটা পেলেই জিপো এখানে নিয়ে আসবে৷ জিপো ওটার রং পালটে নতুন রং-করে দেবে৷ যাও, বেরিয়ে পড়ো৷’
একটু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল কিটসন৷ বলাবাহুল্য ব্লেকের সঙ্গই তার যত বিরক্তির কারণ৷ কিন্তু তবু সে রাজি হল৷ মাথা নিচু করে গম্ভীর মুখে এগিয়ে চলল দরজার দিকে৷
শিস দিতে দিতে ব্লেক ওকে অনুসরণ করল৷ জিনিকে পাশ কাটাবার সময় অর্থবহভাবে চোখ টিপল সে৷ জিনি শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল; কিন্তু ব্লেক একটু হেসে দরজার কাছে এগিয়ে গেল৷ হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে ওকে লক্ষ করে আরও একবার চোখ মারল—তারপর বেরিয়ে গেল কারখানা ছেড়ে৷
কয়েক মুহূর্ত পরে ওরা শুনতে পেল লিংকনে স্টার্ট দেওয়ার শব্দ৷ একটু পরেই সে ইঞ্জিনেরে শব্দ দূর থেকে আরও দূরে মিলিয়ে গেল৷
‘জিনি, তোমাকে যা করতে হবে তা হল খাবারের ব্যবস্থা৷’ জিনিকে লক্ষ করে মরগ্যান বলে উঠল, গোটা দুয়েক বাক্স কিনে তাতে টিনে ভরা খাবার কিনে নিও৷’ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ওর হাতে দিল সে, ‘যা যা দরকার মনে করে, বুঝে শুনে কিনে রেখো—আর হ্যাঁ, দু-বোতল স্কচ কিনতে ভুলো না যেন! যাও, তোমার আর কোনও কাজ নেই৷ শুক্রবার সকালে আবার আমাদের দেখা হবে—ঠিক আটটার সময় কেমন?’
‘ঠিক আটটার সময়৷’ প্যাড থেকে লেখা পৃষ্ঠা-দুটো ছিঁড়ে ও তুলে দিল মরগ্যানের হাতে! সে কাগজদুটোকে এক পলক দেখে পকেটে রাখল৷
‘বাইরে তো এখনও বৃষ্টি হচ্ছে! বলো তো তোমাকে আমার গাড়িতে পৌঁছে দিই?’ উত্তর কী হবে তা জেনেশুনেই প্রশ্নটা করল মরগ্যান৷
প্লাস্টিকের বর্ষাতিটা গায়ে চাপিয়ে নিল জিনি, মাথা নাড়ল, ‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই৷ আমি বাসেই যেতে পারব৷’ হঠাৎই ও চোখ রাখল মরগ্যানের চোখে, ‘তোমার ধারণা এ কাজে আমরা জিতবই, তাই না?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু তোমারও তো ওই একই বিশ্বাস?’
‘হুঁ’—কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ও মাথা নাড়ল, ‘আচ্ছা, তাহলে চলি’ জিপো ও মরগ্যানের দিকে পর্যায়ক্রমে ঘাড় হেলিয়ে বিদায় নিল জিনি৷ দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল খোলা দরজার দিকে৷
জিপো কিন্তু ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছে৷ শুধু দু-লক্ষ ডলারের লোভ এবং মরগ্যানের নীরব শাসানি তার মুখ বন্ধ করে রেখেছে৷ এখন এই ট্রাক লুটের কাজটাকে সে রীতিমতো ভয় করতে শুরু করেছে৷ যদি তাদের কোথাও ভুল হয়ে যায়? যদি সে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে? ওঃ ভগবান! তার মা শুনলে কী ভাববে?
মরগ্যান জিপোর কাঁধে আশ্বাসের ভঙ্গিতে হাত রাখল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই, জিপো৷ আর মাত্র এক সপ্তাহ—তার পরেই তোমার ভাগ্য ফিরে যাবে! দু-লক্ষ ডলারের জন্যে এর চেয়ে রিরাট ঝুঁকি নেওয়া যায়, তাই না? যাকগে, কাল সকালে আমি আবার আসব৷ ক্যারাভ্যানের ওপর তোমার কাজ দেখে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি৷ যাও, একটু গলা ভিজিয়ে নাও—এত মুষড়ে পড়ার কী আছে?... আচ্ছা, তাহলে চলি।’ জিপোর পিঠে বারদুয়েক মৃদু চাপড় মেরে মরগ্যান চলে গেল৷ জিপো তখনও একই ভাবে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় চিন্তামগ্ন৷
গমন্ট সিনেমার কাছাকাছি বিশাল গাড়ি রাখার জায়গা লক্ষ করে গাড়ি চালাতে চালাতে নিজের মনের ভেতর এক সুপ্ত দ্বন্দ্বের আভাস পেল কিটসন৷ এই বিপজ্জনক কাজে সাফল্যলাভের কোনও আশাই সে করছে না; বরং মাঝখান থেকে ও খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়তে চলেছে৷ এ কাজ থেকে পিছিয়ে আসতে সে পারত, যদি না মরগ্যান আজ তার ভূমিকা সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করত৷ জিনি ও সে করবে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়৷ তাদের একসঙ্গে থাকতে হবে, ঘুরতে হবে... তারা সাঁতার কাটবে, মাছ ধরবে—আনন্দে কাটিয়ে দেবে কয়েকটা দিন৷ আর জিনি অভিনয়ের ব্যাপারে বাস্তবঘেঁষা, তাতে মনে হয় না কিটসনকে ওই কটা দিন ও এড়িয়ে চলবে৷ তাছাড়া জিনি নিখুঁত অভিনয় করতে ভালোবাসে৷
সুতরাং জিনির একান্ত সঙ্গলাভের এই সহজ সুযোগ তার মন থেকে বিপর্যয়ের আশংকাকে একেবারে মুছে দিল৷ নাঃ, জিনির কাছাকাছি আসার এই সুযোগ সে ছাড়তে পারবে না—মরে গেলেও না৷
লিংকনে কিটসনের পাশাপাশি বসে ব্লেক আড়চোখে তাকে লক্ষ করছিল, হঠাৎই বলে উঠল, শোনো আলেক্স, তোমাকে আগে থাকতেই জানিয়ে রাখা ভালো—জিনিকে নিয়ে যেন বেশি স্বপ্ন দেখো না! ওর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ বোঝাপড়া হয়ে গেছে৷ এই কাজের ঝামেলা মিটে গেলে আমরা দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ব—ঘুরে আসব প্যারিস, লন্ডন—নানান দেশ৷ ভাবলাম, তোমার যদি কোনও মতলব ছকা থাকে—তাই আগে থাকতেই বলে রাখলাম৷’
আরেকটু হলেই একটা ট্রাকের গায়ে ধাক্কা মারছিল কিটসন৷ চৌমাথায় লাল আলোর সিগন্যাল দেখে সে গাড়ি থামাল৷ তার মনে হল, কেউ যেন একটা বিরাশি সিক্কার ঘুষি তার পাঁজরে বসিয়ে দিয়েছে৷ সে আগুনঝরা চোখে ফিরে তাকাল ব্লেকের দিকে৷ চাপা স্বরে গর্জে উঠল, ‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ! তোমার মতো একটা গাড়োলের সঙ্গে জিনি কখনও কোথাও যাবে না৷ অতএব, ফালতু তাপ্পি দিয়ে লাভ নেই!’
কিটসনের জান্তব ক্রোধে ব্লেক খুশিই হল৷ তার টোপ ফেলা সফল হয়েছে জেনে সে গলা ছেড়ে হেসে উঠল, ‘তাই নাকি? তাহলে ওইখানেই তুমি ভুলটা করেছ! জ্ঞান দানের অভ্যেসটা তোমার সাধারণ বুদ্ধিকে পর্যন্ত ভোঁতা করে দিয়েছে৷ জিনির আমার সঙ্গে না যাওয়ার কোনও কারণ নেই, আছে কি? আমি তবু কিছু লেখাপড়া জানি, তোমার তো ক অক্ষর গো-মাংস! আর...তাছাড়া ও পেটেন্ট নাক নিয়ে তুমি জিনির সঙ্গে প্যারিসে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখ—হুঁঃ!’
ব্লেকের তাচ্ছিল্যের হাসি কিটসনের কানে ঢেলে দিল সীসে৷ উত্তেজিত হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘থামো বলছি! নইলে এক—’
‘তোমার জায়গায় আমি হলে মোটেও সে চেষ্টা করতাম না৷’ ব্লেকের জিভে হঠাৎই জেগে উঠল ক্ষুরের ধার, ‘সেইদিন আচমকা ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ায় আমি ঠিক প্রস্তুত হতে পারিনি৷ কিন্তু আলেক্স, সে চেষ্টা এখন কোরো না—একটি ঘুষিতে তোমার দাঁত কটা উপড়ে ফেলে দেব৷’
কিটসন বিদ্যুৎগতিতে পাশ ফিরল... কিন্তু সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে ভেসে এল অধৈর্য হর্নের শব্দ৷ সামনে চেয়ে সে দেখল লাল আলো সবুজে পালটে গেছে৷ কিটসন যেন সম্বিত ফিরে পেল৷ গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শোনা গেল তার চাপা গজরানির শব্দ—লিংকন আবার চলতে শুরু করল৷
‘হ্যাঁ—যা বলছিলাম’ কিটসনকে রাগাতে পেরে খুশি হল ব্লেক, ‘জিনির সঙ্গে এই সেদিন গল্প করছিলাম, তা কথায় কথায় প্যারিসের কথা উঠল৷ তুমি তো জানো, আমি বছর দুয়েক আগে প্যারিসে গিয়েছিলাম৷ সুতরাং ওখানকার সমস্ত কিছু আমার নখদর্পণে৷ জিনি হঠাৎ বলে উঠল, ওর প্যারিসে যাবার খুব শখ; তখন...’
‘দয়া করে একটু চুপ করবে!’ কিটসন বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘নইলে গাড়ি থামিয়ে তোমাকে চুপ করাতে হবে দেখছি!’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’—পৃষ্ঠপোষকতার সুরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তোমাকে শুধু মনে করিয়ে দিতে চাইছি, যে জিনির ওপর প্রথম দাবিটা আমার৷ তুমি তো আবার ওর স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করছ, সুতরাং তখন যদি এ কথাটা ভুলে যাও তাহলে গণ্ডগোলের আশঙ্কা আছে৷’
ভেবেচিন্তে উপযুক্ত একটা জবাব দেওয়ার আগেই কিটসন এসে উপস্থিত হল এক বিরাট গাড়ি রাখবার জায়গার কাছে৷ হঠাৎই সে যেন মুষড়ে পড়ল৷ জিনির মতো মেয়ের পক্ষে ব্লেকের মতো বদমাইস লোকের ফাঁদে পা-দেওয়া সহজ৷ তার ওপর ব্লেক হয়তো প্যারিসের ব্যাপারটা বানিয়ে বলছে না৷ এই আকস্মিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়ে কিটসন যেন হোঁচট খেল৷
ব্লেকের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বৈরথে নিজের জয় সম্পর্কেও তেমন স্থির নিশ্চিত নয় কিটসন৷ প্রথমত ব্লেক তার চেয়ে ওজনে চোদ্দো পাউন্ড বেশি এবং তার স্বাস্থ্য খারাপ নয়৷ একবার এক ঘরোয়া মারপিটের সময় ব্লেকের লড়াই দেখেছিল কিটসন৷ ওর লড়াইয়ের স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি কিটসনকে অবাক করেছিল৷ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর জন্যে যে কোনও কুটিল উপায় অবলম্বন করতে সে দ্বিধা করে না৷ তাছাড়া তার নৃশংস, নিষ্ঠুর লড়াইয়ের পদ্ধতি তো আছেই!
গাড়ি রাখার জায়গার কাছে থেমে ওরা দেখল,গাড়ি পাহারা দেওয়ার কোনও লোকই সেখানে নেই৷ লম্বা-লম্বা দুটো সারিতে গাড়িগুলো পর পর দাঁড়িয়ে আছে৷
গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ব্লেক, ‘তুমি ও পাশের সারিটা দেখতে থাকো; আমি এ-পাশেরটা দেখছি৷ যদি পছন্দমতো মালের সন্ধান পাও, শিস দিয়ে জানাবে৷’
ওরা দুজনে আলাদাভাবে এগিয়ে চলল গাড়িগুলোর পাশ দিয়ে৷ কিটসনের চোখ গাড়ির ওপর নিবদ্ধ হলেও মনে তখন বিক্ষুব্ধ ঝঞ্ঝা৷
ব্লেকের কথা আগাগোড়া মিথ্যে ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলেও কোথায় যেন একটা অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করতে লাগল কিটসনের৷ সত্যিই কি জিনি তাহলে ব্লেকের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে? তবু ভালো, যে সে অন্তত দুটো কী তিনটে দিন ওর সঙ্গে একান্তে কাটাতে পারবে এবং তখন সে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে৷ জিনি যে বড় কঠিন ঠাঁই সে বিষয়ে তার মনে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু তাই বলে হাল ছাড়তে সে রাজি নয়৷ মাঝে মাঝে জিনির নির্বিকার, অচঞ্চল অভিব্যক্তি তাকে সন্দেহগ্রস্ত করে তুলেছে৷ জিনির মন জয় করা অদৌ কোনও পুরুষের পক্ষে কি সম্ভব?
একটা এম জি স্পোটর্স-কারের সামনে এসে থমকাল কিটসন! একটা ক্যাডিলাক এবং একটা জাগুয়ারের ফাঁকে গাড়িটা দাঁড় করানো৷
প্রথম দেখাতেই কিটসন বুঝল এইরকম একটা গাড়িই তাদের প্রয়োজন৷ আড়চোখে এ-পাশ ও-পাশ তাকিয়ে সতর্কভাবে সে এগিয়ে গেল গাড়িটার কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে দেখতে লাগল ওটাকে৷
কিটসনের সঙ্গে একটা ছোট টর্চ ছিল৷ সেটা জ্বালিয়ে সে ভালো করে পরীক্ষা করল গাড়িটা৷ একটু খোঁজাখুঁজি করতেই পাওয়া গেল গাড়ির চাবিটা৷ সুতরাং শিস দিয়ে সে ইশারা করে ব্লেককে ডাকল৷ ব্লেক অন্য সারির গাড়িগুলো জরিপ করে দেখছিল, কিটসনের ডাকে ফিরে এল তার কাছে৷
‘মনে হচ্ছে এই গাড়িটায় কাজ হবে৷’ বলল কিটসন, ‘এই যে গাড়ির চাবি৷’
ব্লেক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গাড়িটাকে কয়েক মুহূর্ত দেখল, ঘাড় নাড়ল, ‘হুঁ চলবে৷ তা তুমি দেখছি দিনকে দিন সেয়ানা হয়ে উঠছ, ব্যাপারটা কী?’ বিদ্রুপের হাসি হেসে ঠাট্টা করল ব্লেক, ‘যাও—তাহলে গাড়িটা জিপোর কারখানায় পৌঁছে দাও৷ কারণ প্রথমত তুমি গাড়ি চালানোর দিগ্গজ, তার ওপর খুব একটা ভারী কাজের দায়িত্ব তোমার ওপর পড়েনি৷ সুতরাং এই যৎকিঞ্চিৎ ঝুঁকির কাজটুকু তোমায় করতেই হবে, তার পরে না হয় জিনির সঙ্গে ঢলাঢলি কোরো৷’
কথাটা কিটসনের সহ্যশক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেল৷ কোনওরকম ভালোমন্দ না ভেবেই সে বিদুৎগতিতে ঘুষি চালাল ব্লেকের মুখ লক্ষ করে৷
ব্লেক বোধ হয় এই ধরনের কিছুই প্রত্যাশা করছিল, এবং সেই কারণেই সে আগে থেকেই এর জন্যে প্রস্তুত ছিল৷ পলকের মধ্যে সে মাথা হেলাল বাঁ-দিকে৷ কিটসনের ঘুষি লক্ষ্যহীন অবস্থায় তার কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ ভারসাম্য হারিয়ে কিটসন ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের ডানহাতি জোরালো ঘুষি আছড়ে পড়ল আলেক্সের তলপেটে৷ ব্লেক ইচ্ছে করেই সমস্ত ক্ষমতা খরচ করল এই ঘুষির পিছনে—কিছুটা প্রতিহিংসাবশত, কিছুটা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে৷ সংঘর্ষের আকস্মিকতার কিটসন মুহূর্তের জন্যে পঙ্গু হয়ে পড়ল৷ প্রচণ্ড ব্যথা লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে মাটিতে বসে পড়ল৷
বহুদিন মুষ্টিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় কিটসন কিছুটা ধীরগতি হয়ে পড়েছে, শরীরের পেশি হয়ে পড়েছে শ্লথ৷ তাই ধাক্কাটা সামলে উঠতে তার সময় লাগল৷
ব্লেক নৃশংস হাসিতে মুখ ভরিয়ে কয়েক পা-পিছিয়ে দাঁড়াল, ‘এক মাঘে শীত যায় না, চাঁদু৷ তাই আজ সুদে-আসলে তোমার সেদিনকার বেইজ্জতি ওয়াপস করে দিলাম৷ এরপর আর বেশি পাঁয়তারা করার চেষ্টা কোরো না, তাহলে নিজেই বিপদে পড়বে৷ যাও, চটপট গাড়িটা নিয়ে কেটে পড়ো৷ কারখানায় জিপো তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে৷’
কথাটা শেষ করেই লিংকনের দিকে পা-চালাল ব্লেক৷ কিটসন তখনও একইভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট ফুসফুসে হাওয়া টানার চেষ্টা করছে৷
ব্লেকের জোরালো ঘুষির আঘাত কিটসনকে আরও কয়েক মুহূর্ত আচ্ছন্ন করে রাখল৷ অবশেষে সে কোনওরকমে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ শ্লথ, টলায়মান পদক্ষেপে সে এম জি স্পোর্টস-কারে গিয়ে উঠল৷ পরাজয়ের গ্লানি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে দিয়েছে একটা বিজাতীয় রাগ৷ ইঞ্জিন চালু করে গাড়ি রাখার জায়গা ছেড়ে রাস্তায় এসে পড়ল কিটসন৷
আজ সে বলতে গেলে গাল বাড়িয়ে ব্লেকের হাতে চড় খেয়েছে নিজেকে বিরক্তিভরে ধিক্কার দিল কিটসন, তবে পরের বার আর ব্লেককে সে সুয়োগ দিচ্ছে না৷ লড়াই করার শখ একেবারে চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দেবে৷
এ গলি, ও গলি করে জিপোর কারখানা অভিমুখে গাড়ি ছুটিয়ে চলল কিটসন৷
ব্লেক ও তার মধ্যে এক চরম যুদ্ধ যে আসন্ন, সেটা কিটসন বেশ বুঝতে পারল৷ দিনের পর দিন ব্লেক তাকে উপহাস করে এসেছে—কিন্তু কিটসন কোনও জবাব দেয়নি৷ আর এখন যদি যে মনে করে থাকে, জিনিকে কিটসনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে, তবে ব্লেক একটা মারাত্মক ভুল করবে৷ কারণ আজকের মতো সেদিন কিটসন আর অপ্রস্তুত থাকবে না৷ অবশ্য ব্লেকের ডানহাতি ঘুষির জন্যে তাকে সতর্ক হতে হবে—এবং সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে৷ কারণ লড়াইয়ের ব্যাপারে ব্লেক নেহাত আনকোরা খিলাড়ি নয়৷ তারা দুজনেই পরস্পরকে আচমকা ঘুষিতে অবাক করেছে—একবার কিটসন, আর আজ ব্লেক৷ কিন্তু সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না৷ কারণ আজ থেকে তারা পরস্পরের জন্যে সর্বদাই প্রস্তুত থাকবে৷
কিটসন যখন এলোমেলো ভাবনাকে সঙ্গী করে জিপোর কারখানার দিকে এগিয়ে আসছে, তখন দলপতি ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান তার বুইক নিয়ে ফিরে চলেছে নিজের ডেরায়৷
মরগ্যানের মনে ভেসে চলেছে চিন্তার কুয়াশা আসন্ন কাজের ভাবনায় সে মগ্ন৷ এই কাজটাকে সে অন্য তিনজনের চেয়েও গভীরভাবে নিয়েছে—যেন এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার জীবন-মরণের প্রশ্ন৷ অবশ্য কথাটা মিথ্যে নয়৷ তাই মরগ্যান তাদের পরিকল্পনাকে বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যাচাই করে দেখছে৷ বড় রাস্তায় গাড়ির সমুদ্রে গা-ভাসিয়ে সে ভাবল—এই আমার জীবনের শেষ কাজ৷
বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে৷ কিন্তু রাস্তায় এখনও জলের আস্তরণ৷ তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে আলোর ইশারা৷ বুইকের হেডলাইটের আলো ভিজে রাস্তাকে যেন আয়না করে তুলেছে৷ সর্তক হাতে গাড়ি ছুটিয়ে চলল মরগ্যান৷
ওই দশ লাখ ডলার হাতে পাওয়ামাত্রই তারা পাঁচজন যার যার ভাগের টাকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরবে৷ নিজের ভবিষ্যতের ব্যবস্থা মরগ্যান আগেই করে রেখেছে৷ এই মুহূর্তেই তার পকেটে রয়েছে মেক্সিকো যাওয়ার টিকিট৷ এই টিকিটের বিশেষত্ব হল, যে কোনও দিন, যে কোনও সময়, যে কোনও প্লেনে মরগ্যান মেক্সিকো যেতে পারবে৷ সেজন্যে টাকা কিছু বেশি লেগেছে বইকি! মেক্সিকোয় এক আধা-গ্রাম, আধা-শহরে সে একটা ভল্ট ভাড়া করে রেখেছে৷ তাতেই সে রাখবে তার লুটের টাকা৷ তারপর শুরু হবে অনির্দিষ্ট প্রতীক্ষা৷ যখন মরগ্যান বুঝবে ট্রাক লুটের চাঞ্চল্য কমে এসেছে, তখন সে দু-লাখ ডলার দিয়ে ধীরে ধীরে বন্ড কিনতে শুরু করবে৷ সমস্ত টাকাটা যখন তমসুকে পরিণত হবে, তখন তাকে আর দেখে কে? এই পৃথিবীটাকে শুধু সে-যে হাতের মুঠোয় পাবে তা নয়, পৃথিবী তখন থাকবে তার পায়ের তলায়৷
অবশ্য মরগ্যানের মনে এমন কোনও ভুল ধারণা নেই যে এ কাজে সে নিশ্চিতভাবে সফল হবে৷ কারণ সে ভালোভাবেই জানে, এতে সাফল্য ও অসাফল্যের সম্ভাবনা সমান সমান—অর্থাৎ পঞ্চাশ, পঞ্চাশ৷ কারণ এ ক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষ নেহাত দুর্বল নয়৷ বরং তাদের চেয়ে অ-নে-ক বেশি শক্তিশালী৷ পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনির লোকেরা পুরো শহরটা গোরু-খোঁজা করে ছাড়বে৷ ট্রাকটা পুনরুদ্ধারের জন্যে তারা যে কোনও পথকেই অবলম্বন করবে৷ প্রয়োজন হলে নৃশংস রাস্তা নিতেও ছাড়বে না৷ ব্লেক, জিপো বা কিটসনের ওপর তার বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস নেই৷ যতক্ষণ সে তাদের পরিচালনা করছে ততক্ষণ ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ কিন্তু যেই মরগ্যান তাদের মাঝ থেকে সরে পড়বে অমনি তারা দিশেহারা হয়ে নির্বোধের মতো ধরা পড়বে৷ শুধু এই কথা ভেবে মরগ্যানের দুঃখ হল, যে দশ লাখ ডলারের জন্যে এত বুদ্ধি খরচ করে সে কাজে নামতে চলছে, সেখানে সে পাচ্ছে মাত্র দু-লাখ ডলার৷ তার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তত ছ-লাখ ডলার পুলিশ উদ্ধার করবেই—যদি রক্ষা পায় তো জিনিই পাবে৷
জিনির কথায় তার চিন্তাধারা ভিন্ন পথে বাঁক নিল৷ মেয়েটা তার সঙ্গে এক হয়ে মাথা খাটাচ্ছে ঠিক, কিন্তু একই সঙ্গে ও মরগ্যানের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷
ট্রাকটাকে ফাঁদে ফেলা থেকে শুরু করে লুট পর্যন্ত যে মতলব জিনি তার কাছে দাখিল করেছে, তা এককথায় অপূর্ব৷ কিন্তু জিনির মাথা থেকেই যে সে মতলব বেরিয়েছে, সেটা মরগ্যান কিছুতেই মানতে রাজি নয়৷ তাহলে কেউ কি আছে জিনির পিছনে? নাকি কাউকে বৈঠকি চাল দিচ্ছে মেয়েটা?
কিন্তু অবান্তর ভেবে সে চিন্তাকে মরগ্যান মন থেকে সরিয়ে রাখল৷ কারণ সাজানো গোছানো, পরিপাটি করা মতলবটা জিনিই তার হাতে তুলে দিয়েছে৷ এবং তাতে মরগ্যান যে লাভবান হয়নি তা নয়৷ তাছাড়া এই কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশের দায়িত্ব নিয়েছে জিনি নিজে৷ সুতরাং ওকে সন্দেহ করে লাভ কী?
চিন্তিত মুখে কাঁধ ঝাঁকাল মরগ্যান৷ জিনিকে মন থেকে সরিয়ে সে আরও একবার পরিকল্পনার ছকে মন দিল...
শুক্রবার ভোর ছটায় ঘুম ভাঙল জিপোর৷ গত রাতে সে ভালোমতো ঘুমোতে পারেনি৷ সম্ভবত অসহ্য মানসিক উৎকণ্ঠাই এই অনিদ্রার কারণ৷ বিছানা ছেড়ে খোলা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে৷ দূরে ধূসর পাহাড়ের অন্তরাল থেকে ক্রমশ আত্মপ্রকাশ করছে ভোরের সূর্য৷
আর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই সেই কাজ শুরু হবে—যা নিয়ে এ কদিন তারা সর্বক্ষণ মাথা ঘামিয়েছে, আলোচনা করেছে—যতক্ষণ না চিন্তার ভারে মস্তিষ্ক হয়ে পড়েছে আচ্ছন্ন৷ আজ থেকে শুরু হবে পৃথিবীর চতুরতম এবং কঠিনতম তালার সঙ্গে জিপোর বুদ্ধি ও দক্ষতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷ জিপো কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল৷ যদি সে পরাজিত হয়, তাহলে? মরগ্যানের ক্রোধোম্মত্ত রূপের কথা মনে পড়ায় সে শিউরে উঠল৷
উত্তেজিত স্নায়ুমণ্ডলীকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে এগিয়ে গেল একটা টিনের গামলার দিকে৷ গামলা থেকে ঠান্ডা জল নিয়ে, আঁজলা ভরে চোখে মুখে ছিটিয়ে নিল৷ তারপর দাড়ি কামাতে গিয়েই সে বুঝল তার হাত বাঁশ পাতার মতো থরথর করে কাঁপছে৷ গালে দু-এক জায়গায় রক্তও বেরিয়ে পড়ল৷ তাড়াতাড়ি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছল জিপো৷ ট্রাকের সময়-নির্ভর তালা খোলার সময় তাকে ভীষণ সতর্ক হতে হবে৷ কম্বিনেশন চক্রটাকে ঘোরাতে হবে এক চুল, এক চুল করে৷ কারণ কখন যে নম্বর মিলবে কেউ বলতে পারে না৷ সেই সময় যদি এভাবে তার হাত কাঁপতে থাকে, তাহলে তো বিপদের কিছু বাকি থাকবে না!
নিজের কাঁপা হাতের দিকে চেয়ে গভীর শ্বাস টানল জিপো৷ নাঃ, এই উৎকণ্ঠা, উত্তেজনাকে যে করে হোক রুখতেই হবে! বারবার সে তার অচঞ্চল, স্থির দক্ষ হাতের জন্যে গর্ব অনুভব করেছে৷ কিন্তু আজ তার শিল্পীসুলভ আঙুল, আস্থা এবং আশ্বাসময় হাত—সব কি ম্যালেরিয়ার শিকার হয়েছে? আসল কাজের এত আগে থেকেই সে যদি সাহস হারিয়ে ফেলে তবে তার পরাজয় সুনিশ্চিত!
চোখ ফিরিয়ে জিপো তাকাল দেওয়ালে ঝোলানো কাঠের ক্রুশটার দিকে৷ এই সুন্দর কাজ করা জিনিসটা তাকে তার মা দিয়েছিল দেশ ছাড়ার সময়ে৷ হঠাৎই তার প্রার্থনা করার ইচ্ছে জাগল৷ তার মনে হল, এই মুহূর্তে তার প্রর্থানা করা একান্ত প্রয়োজন৷
কিন্তু হাঁটু গেড়ে ক্রুশের নীচে বসে, বুকে ক্রশচিহ্ন এঁকে যখন যে প্রার্থনার জন্যে প্রস্তুত হল, তখন সবিস্ময়ে সে আবিষ্কার করল, প্রার্থনার একটি শব্দও তার মনে নেই৷ জিপো উপলব্ধি করল, এ কাজে ঈশ্বরের সাহায্য চাইবার ক্ষমতা তার নেই৷ অসংলগ্ন, অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে একই কথা বলে চলল জিপো, ‘ক্ষমা করো...আমাকে ক্ষমা করো...’
শহরতলি এলাকার একটি ছোট ঘরে কফি গরম করছিল কিটসন৷ এইমাত্র সে বিছানা ছেড়ে উঠেছে৷ একটা শীতল আতঙ্কের নাগপাশ যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷
গত রাতে উসখুশ করেই তার সময় কেটেছে৷ চিন্তায় চিন্তায় ক্লান্ত মস্তিষ্ক একটি মুহূর্তের জন্যেও রেহাই পায়নি৷ এখন সে স্পষ্ট বুঝেছে, পিছিয়ে আসার সময় আর নেই৷ ঠিক আটটার সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী একের পর এক কাজ শুরু হবে নিয়তির লিখন স্পষ্ট অক্ষরে আঁকা হয়ে গেছে তার চিন্তাকুল ললাটে৷ সম্মোহিত শিকারের মতোই সে এগিয়ে চলেছে ক্ষুর্ধাত অজগরের অন্ধকার মুখ-গহ্বরে৷ শুধু যদি জিনি না থাকত, তাহলে কিটসন কিছুতেই এ কাজে সায় দিত না৷ এতক্ষণে মালপত্তর কাঁধে করে সে চলে যেত দূরে, বহুদূরে—যেখানে মরগ্যানরা তার খোঁজ পাবে না৷ কিন্তু...
সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে, এ কাজে তারা বিফল হবেই হবে৷ কিন্তু জিনির আকর্ষণ, এবং ওর প্রতি তার একাগ্র, অবুঝ ভালোবাসার নেশা কিটসনকে এ কাজে রাজি হতে বাধ্য করেছে৷
কফি তৈরি করে কাপে ঢালল কিটসন৷ কিন্তু চুমুক দিতে গিয়েই কফির গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল৷ কাপটাকে ঝাটিতি সে উপুড় করে ধরল বেসিনের ওপর৷
অন্য এক রাস্তায় অন্য এক ঘরে জানলার কাছে বসেছিল মরগ্যান৷ তার ঠোঁটের কোণ থেকে অলস ভঙ্গিতে ঝুলছে একটা সিগারেট৷ চোখের দৃষ্টি বাইরের রক্তিম আকাশে নিবদ্ধ৷ গত রাতের চরম প্রস্তুতিগুলোর কথাই তার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে৷
যে কোনও যুদ্ধেই সেনাপতির ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ তাই আক্রমণ পরিকল্পনার প্রতিটি অংশ সে কষ্টিপাথরে ঘষে-ঘষে যাচাই করে দেখেছে, কোথাও কোনও গলদ আছে কি না৷ এখন নিয়তিকে মেনে নিতে মরগ্যান প্রস্তত—তাতে যদি পরাজয় আসে, তবুও তার দুঃখ নেই৷ কারণ সে জানে, তার তরফ থেকে কোনওরকম ভুলের সুযোগ সে রাখেনি৷ তার পরিকল্পনাকে এর চেয়ে নিখুঁত করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷
এখন সাফল্য অসাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রত্যেকের নিজের নিজের দক্ষতার ওপর৷ জিনি যদি হঠাৎ ভয় পেয়ে যায়, যদি ব্লেক ঠিকমতো গুলি চালাতে না পারে, কিটসন যদি বিপদে পড়ে তার গাড়ি ও ক্যারাভ্যান নিয়ে, অথবা যদি জিপো তালা খুলতে সক্ষম না হয়...একগাদা ‘যদি’র মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার কিছু করার নেই৷ মরগ্যান কিন্তু একবারও ভাবল না নিজের পারদর্শিতার কথা৷ কারণ নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে সে স্থিরনিশ্চিত৷ মাথা নিচু করে, স্থির অনড় হাতের দিকে চেয়ে চোখ রাখল মরগ্যান৷ নিজের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় সে সন্তুষ্ট হল৷ না, কোনওরকম ভুলকে সে নিজে অন্তত প্রশ্রয় দেবে না৷
শহরের অন্য প্রান্তে, নিজের ফ্ল্যাটে ব্লেক তখনও বিছানায় শুয়ে৷ চিৎ হয়ে শুয়ে সে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে দেওয়াল বেয়ে এগিয়ে চলা একটুকরো রোদের দিকে৷ সে জানে, যখন ওই আলোর টুকরোটা ঘরের ছাদ স্পর্শ করবে তখনই হবে তার বিছানা ছাড়ার সময়৷
কাল রাতে তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল গ্লোরিকে ডেকে পাঠাতে; কিন্তু তাতে বিপদের সম্ভাবনা আছে জেনে সে ইচ্ছে ব্লেক ত্যাগ করেছে৷ তার দরকারি জিনিসপত্র সব গোছানো হয়ে গেছে৷ অন্যান্য মালপত্র সে ভাঁড়ার ঘরে ঢুকিয়ে তালা এঁটে দিয়েছে৷ গ্লোরি এসেই বুঝতে পারত, তার পেয়ারের এডি শহর ছেড়ে লম্বা দেওয়ার মতলবে আছে৷ এবং সে নিয়ে ও নানান রকম প্রশ্ন করত৷ শেষে হয়তো একটা কাণ্ডই বাঁধিয়ে বসত৷ তাই গত-রাতে ব্লেককে একাই ঘুমোতে হয়েছে৷ এবং অনভ্যাসের ফলে যথারীতি তার ঘুম আসেনি; রাতটাকেও অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হয়েছে৷
একফালি রোদের শম্বুকগতিকে লক্ষ করতে করতে সে ভাবল, আচ্ছা ডার্কসনকে খুন করার পর তার কেমন লাগবে? কারণ অপরাধজীবনে সেটাই হবে তার চরম পদক্ষেপ৷ এর আগে কোনওদিন সে কাউকে খুন করেনি৷ বরাবরই লুটপাটের মতলবগুলো এমন কায়দায় ফেঁদেছে, যাতে কেউ হতাহত না হয়৷ কিন্তু আজকের ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা৷
না, ডার্কসনের খুন হওয়াটাকে ব্লেক তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না৷ কারণ যা বাস্তব, তাকে স্বীকার করতেই হবে৷ কাজে সাফল্যের প্রয়োজনে ডার্কসনের মৃত্যুর প্রয়োজন আছে৷ তাকে না মারলে গোটা পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে৷ কিন্তু তবুও ব্লেকের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্যঃ সে আস্তে আস্তে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাকিয়ে রইল নিহত—ডার্কসনের দিকে—তার কপালের লাল ফুটোটার দিকে৷ যদিও সে জানে, কাউকে খুন করতে তার হাত কাঁপবে না, তবুও ব্লেক যেন শিউরে উঠল৷ জেলে থাকতে অনেক রকম খুনির সঙ্গেই তার আলাপ হয়েছে৷ তারা বেশ গর্বের সঙ্গে নিজেদের পাপের কাহিনি বললেও ব্লেক লক্ষ করেছে একটা অস্বস্তি-আতঙ্কের ছায়া তাদের চোখের তারায় ক্রমাগত ঢেউ তুলেছে৷ ব্লেক স্পষ্ট বুঝেছে, ওরা নিজেদের আর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাবতে পারে না৷ কোথায় যেন ওদের ঘিরে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য কাচের দেওয়াল৷ তাদের চোখের যে অভিব্যক্তি, তা একেবারেই আলাদা৷ অন্য কোনও লোকের চোখে ব্লেক সে দৃষ্টি দেখেনি৷ এই কি তাহলে খুনির চোখ? ডার্কসনকে খুন করার পর তার চোখেও কি ফুটে উঠবে এই একই দৃষ্টি? তাকেও তাহলে বন্দি হতে হবে কাচের খাঁচায়? আমৃত্যু তাকে আতঙ্কের শিকার হয়েই কাটাতে হবে?
না, এ ঘটনার পর ব্লেক আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না৷ দরজায় কড়া নাড়ার আকস্মিক শব্দে তাকে চমকে উঠতে হবে, কোনও পুলিশি পোশাক তার মনে তুলবে শঙ্কার তুমুল আলোড়ন, রাতের ঘুম হয়ে পড়বে দুঃস্বপ্ন কণ্টকিত৷ ভবিষ্যতের হাতের পুতুল হয়েই তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে৷
রোদের টুকরোটা ঘরের ছাদ স্পর্শ করতেই গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় উঠে বসল ব্লেক৷
খাট থেকে নেমে সে এগিয়ে গেল অদূরে রাখা একটা স্কচের বোতলের দিকে—বোতলে তখনও কিছুটা তরল অবশিষ্ট আছে৷ বোতল উপুড় করে গলায় ঢালল ব্লেক৷ একটা তীব্র জ্বালার অনুভূতি নেমে এল তার কণ্ঠনালী দিয়ে৷
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ব্লেক৷ অবশেষে যখন স্কচের হালকা আমেজটা সে টের পেল, তখন এগিয়ে গেল কলঘরের দিকে৷ ঝাঁঝরিটা খুলে দিয়ে তার ঝরনার নীচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল এড ব্লেক৷
শহরের আরেক প্রান্তে, ওপর তলার একটা অপরিষ্কার ছোট ঘরে কাজে ব্যস্ত জিনি গর্ডন৷ নিজের সমস্ত জিনিসপত্র গোছগোছ করে ও তখন স্যুটকেসের ঢাকনা বন্ধ করছে৷ একবার হাতঘড়ির দিকে চোখ রাখল ও সাতটা বাজতে কুড়ি৷
জিপোর কারখানার রওনা হওয়ার জন্যে ওর হাতে এখনও আধঘণ্টার ওপর সময় আছে—ভাবল জিনি; তারপর এগিয়ে এসে বসল জানলার কাছে৷ দেখতে লাগল বাইরের নোংরা, অপরিসর রাস্তা—তার দু-ধারের জঞ্জাল৷ এ সবই ওর বাসস্থানের পারিপার্শ্বিক, সুতরাং নোংরা হলেও কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে৷
ভাগ্য যদি ওদের সহায় থাকে, তবে আর কয়েকদিনের মধ্যেই এই দুঃখ কষ্টের জীবনকে সে অতীতের পরিসীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে৷ পারবে নতুন করে জীবনের পথে পা বাড়াতে৷ তখন ওর কাছে থাকবে অজস্র টাকা, ও যেতে পারবে ওর স্বপ্ন-নগরী ন্যু-ইয়র্কে, কিনবে দামি দামি সব পোশাক, প্রকাণ্ড বাড়ি ভাড়া নিয়ে রানির হালে থাকবে ওর এতদিনকার দেখা স্বপ্ন, বাস্তবে রূপ নেবে৷
যদি ভাগ্য ওদের সহায় থাকে...
কিন্তু মরগ্যানের ওপর যথেষ্ট বিশ্বাস আছে জিনির৷ এবং মরগ্যানের ধারণাও অনেকটা তারই মতো৷ মরগ্যানের একটা কথা ওর ভীষণ ভালো লেগেছেঃ হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷ এই তিনটে শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জিনির স্বপ্নের আসল রূপ৷ ওর ইচ্ছেকে এর চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা বোধহয় কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷ আর সে ইচ্ছেকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে চাই প্রচুর টাকা৷
নাঃ, ট্রাক লুট করা যদি কারও পক্ষে সম্ভব হয়, তবে নিঃসন্দেহে সে লোক মরগ্যান৷ কিন্তু ওই তিনজন...
জিনির মুখে নেমে এল সংশয়ের ছায়া৷
কাজের মূল চাবিকাঠিই নির্ভর করছে জিপোর ওপর৷ আর সে যেভাবেই অল্পেতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তাতে মাঝে মাঝে জিনির ভয় হয়৷ জিপো পারবে তো ওই ট্রাকের তালাটা খুলতে? কিন্তু এখন জিপোর জন্যে মরগ্যানের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই৷
ব্লেককে নিয়েও জিনির ভাবনা কম নয়৷ তার চোখের দৃষ্টি ওর মোটেই ভালো লাগেনি৷ আর যেভাবে সর্বক্ষণ ছোঁক ছোঁক করে! নাঃ, ফন হ্রদে গিয়ে জিনিকে সতর্ক থাকতে হবে—কোনওমতেই যেন ওই লোকটার সঙ্গে তাকে একা থাকতে না হয়৷
কিটসনের কথা মনে পড়তেই জিনির মসৃণ কপালে ভাঁজ পড়ল৷ ছেলেটা তার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে৷ জিনির যুক্তিনির্ভর, আঙ্কিক মনের শীতলতা বুঝি কমে এল কিটসনের চিন্তার উষ্ণতায়? মালো যাওয়ার পথে তাকে খুশি করার জন্যে ছেলেটার আপ্রাণ প্রয়াসের কথা মনে পড়ে ওর মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি৷
জিনির হাতে টাকা আসামাত্রই নেকড়ের দল ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর৷ চাইবে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিতে৷ নাঃ, এ বিষয়ে জিনি একেবারে নিশ্চিত৷ তাই ও ভাবছে, কাজের শেষে কিটসনের সঙ্গে যোগ দিলে কেমন হয়৷ ওদের দুজনের মিলিয়ে মোট টাকা হবে চার লাখ ডলার৷ তাছাড়া কিটসনের স্বভাব ভালোই, এবং অনায়াসেই জিনি ওর ওপর নির্ভর করতে পারে৷ তাহলে সবদিক দিয়েই ও নিশ্চিন্ত হতে পারবে৷ নইলে লোকে সন্দেহ করবে, একটা বিশ বছরের ছুঁড়ি এত টাকা পেল কোত্থেকে! সাধারণত কোনও সঙ্গীহীন মেয়েকে সব মানুষই সন্দেহের চোখে দেখে৷”
নাঃ, ব্যাপারটা নিয়ে জিনিকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে৷
মরগ্যানই এসে পৌঁছল সবার আগে৷
জিপোর কারখানার সামনে সে যখন বুইক থামাল তখন গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ঘড়িতে আটটা বাজতে দশ মিনিট৷
গত রাতে সে, ব্লেক ও জিপো—তিনজন মিলে বুইক গাড়িটার ওপর প্রচুর খেটেছে! বার বার পরখ করে দেখেছে কতটা ধকল গাড়িটা সইতে পারে৷ কাজের শেষে মরগ্যান গাড়িটাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে তার ফ্ল্যাটে—চালিয়ে দেখেছে গাড়িটার অবস্থা৷
কারখানায় ঢুকেই মরগ্যানের চোখে পড়ল, জিপো ক্যারাভ্যানের কাবার্ডে রাখা যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে৷
প্রায় একই সঙ্গে সে লক্ষ করল, জিপোর মুখমণ্ডল বিবর্ণ, শ্বাস-প্রশ্বাস হাঁপানি রুগির মতো যন্ত্রণাক্লিষ্ট৷ ওর যন্ত্রপাতি ধরা হাত দুটো অনিশ্চয়তার শিকার হয়ে কাঁপছে৷
প্রথম প্রথম তো, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে—ভাবল মরগ্যান৷ তা যদি না হয়, তাহলে বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর৷
জিপো তো জিপো, এই মুহূর্তে মরগ্যান নিজেও কি সুস্থির থাকতে পারছে! পরিকল্পনার প্রথম পর্বে পৌঁছে সে নিজে খুব টেনশানে পড়েছে জিভ শুকনো, বিস্বাদ৷ সুতরাং জিপো যে একটু বিচলিত হয়ে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
কিন্তু এই অনিশ্চিত ভাবটা জিপোর কাটিয়ে ওঠা একান্ত প্রয়োজন; নইলে এই সামান্য দুর্বলতা থেকেই রূপ নেবে বিরাট ফাটল—সেটা কিছুতেই হতে দেবে না৷ মরগ্যান৷
‘এই যে, জিপো—ঠিক আছ তো?’ এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল সে৷
হ্যাঁ—হ্যাঁ, ঠিক আছি৷’ মরগ্যানের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে জবাব দিল জিপো, ‘মনে হচ্ছে, আজ আর বৃষ্টি হবে না৷ হুঁঃ, প্যাচপেচে বর্ষার চেয়ে রোদ্দুর অনেক ভালো৷’
এমন সময় একটা স্যুটকেস ও একটা পিকনিক বাস্কেট নিয়ে জিনি এসে ঢুকল কারখানায়৷ ওকে দেখে মরগ্যানের মনে হল, গত রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি৷ ওর চোখের কোলে কালি, রঙ মাখা মুখমণ্ডলের আনাচে-কানাচে বিবর্ণতার আভাস৷
‘কী খবর? ভয় করছে নাকি?’ জিনির কাছে গিয়ে থমকাল মরগ্যান৷ হালকা সুরে জানতে চাইল৷
ও তাকাল মরগ্যানের চোখে—সাগর-সবুজ চোখ শীতল, অভিব্যক্তিহীন৷
‘তোমার মতোই—তার বেশি নয়৷’
হাসল মরগ্যান, ‘তাহলে তো ভয় করছে বলতে হয়৷ কারণ আমিও যে একেবারে নিশ্চিত তা নয়৷’
এবার কারখানায় উপস্থিত হল কিটসন—তার পিছনেই ব্লেক৷
ব্লেককে দেখেই মরগ্যানের হঠাৎ সন্দেহ হল ও নেশা করেছে৷ ব্লেকের মুখে লালচে আভা, চলাফেরার মধ্যে কেমন আলস্য, অবসাদ৷ অস্বস্তির বিদ্যুৎ এই প্রথম ঝলসে উঠল মরগ্যানের মনে৷
কিটসনকে কিছুটা নার্ভাস মনে হলেও জিপো বা ব্লেকের তুলনায় আজ সে নিজের ওপর অনেক বেশি আস্থাশীল৷ এই ব্যাপারটাই মরগ্যানকে অবাক করল৷
আটটা বাজতে ঠিক দু-মিনিট বাকি৷ সুতরাং, শুধু শুধু আর সময় নষ্ট করতে চাইল না মরগ্যান৷ কারণ এতে অযথাই তাদের স্নায়ুর ওপর চাপ পড়বে৷
‘ঠিক আছে, তাহলে এবার বেরোনোর জন্যে রেডি হও৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল সে, ‘তোমরা তিনজন ক্যারাভ্যানটা বের করো বাইরে৷ আর জিনি, তুমি এম জিটা নিয়ে সোজা চলে যাও এজেন্সিতে৷’
জিনিকে অনুসরণ করে ছোট এম জি গাড়িটার দিকে এগোল মরগ্যান৷ জিনি উঠে বসল চালকের আসনে৷ মরগ্যান ঝুঁকে দাঁড়াল ওর ওপর৷ জিনির অচঞ্চল, নির্বিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ওর প্রশংসাই করল সে৷
‘তুমি তো জানোই কী করতে হবে৷ দেখো, যেন কোনও ভুল না হয়৷ গুড লাক!’
কিটসন চটপট পা-চালিয়ে এগিয়ে এল জিনির কাছে, ‘গাড়ি চালাবার সময় সাবধানে থেকো, এম জিটা দারুণ জোরে ছোটে৷ গুড় লাক৷’
কিটসনের চোখে চোখ রেখে মাথা নাড়ল জিনি, ‘ধন্যবাদ৷ তুমিও সাবধানে থেকো৷’ ক্লাচ টিপে, গিয়ার দিয়ে এম জিটা কারখানায় বাইরে নিয়ে চলল ও৷
মিনিট পাঁচেক পরে ক্যারাভ্যানটাকে সঙ্গী করে বুইকটা আস্তে আস্তে জিপোর কারখানা ছেড়ে বেরোল৷
মরগ্যান ও ব্লেক ক্যারাভ্যানের মেঝেতে বসে—আর গাড়ির চালক কিটসন৷ বাইরে এসে জিপো কারখানার দরজা বন্ধ করে দিল৷ তারপর তালার ওপরে ঝুলিয়ে দিল একটা কাঠের ফলক৷ তাতে লেখা; গরমের ছুটিতে কারখানা বন্ধ থাকবে৷
জিপোর কেন জানি না মনে হল, তার এই সাধের জীর্ণ কারখানাকে সে আর কোনওদিনই দেখতে পাবে না৷ এই কারখানার থেকে তার লাভ খুব একটা হয় না ঠিকই, কিন্তু পনেরো বছর এটাকে সুখ-দুঃখের সঙ্গী করার ফলে আজ কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে৷ ক্যারাভ্যানে ওঠার সময় জিপোর দৃঢ়তার প্রতিরোধ ভেঙে তার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল৷ একজন ভাবপ্রবণ ইটালিয়ানের মতোই সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল৷
‘কী হল আবার তোমার, ন্যাকামো?’ ব্লেক নিষ্ঠুর স্বরে খেঁকিয়ে উঠল৷ তার স্নায়ুতন্ত্র যেন পাক খেয়ে উঠল, ‘হঠাৎ ছিঁচকাঁদুনির কী হল?’
‘থামো এড৷’ দাঁত খিঁচিয়ে গর্জে উঠল মরগ্যান৷ সরে গিয়ে জিপোর জন্যে জায়গা করে দিল৷ তার বিপজ্জনক সাপ চোখের শীতল দৃষ্টি ব্লেকের মুখে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল—সে মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে৷ মরগ্যান জিপোর পাঁজরে হালকাভাবে খোঁচা মারল, ‘জিপো, তুমি কারখানার জন্যে কাঁদছ? ভুলে যাচ্ছ কেন, এর থেকে অনেক ভালো ভালো জিনিস তোমার হাতে আসবে ঃ নিজের বাংলো, জমিজমা, গাড়ি—কত কী? ভেবে দেখো তো, সব মেয়েরা তোমার চারদিকে কেমন ভিড় করবে! তোমার পকেট থাকবে দু-লাখ ডলারে ঠাসা৷’
জিপো ঘাড় নাড়ল, বিষণ্ণমুখে ফুটিয়ে তুলল কষ্টকৃত হাসির রেখা৷
‘তাই যেন হয়৷ কিন্তু সত্যি সত্যি আমরা পারব তো, ফ্র্যাঙ্ক?’
‘নিশ্চয়ই৷ সে সব ভার তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও৷ প্রত্যেকটা কাজের বেলাতেই তোমরা আমার নির্দেশ মেনে চলেছ—তাতে কোনও বিপদ হয়েছে কি?’
ওরা তিনজন যখন কাঁচা সড়কের মুখে পৌঁছল, তখন প্রত্যেকেই একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছে, মেজাজ হয়ে উঠেছে তিরিক্ষি৷
কিটসন মোটামুটি জোরেই গাড়ি চালাচ্ছিল, এবং ক্যারাভ্যানের ভেতর ওরা তিনজনই একই সঙ্গে এপাশ ওপাশ ভীষণভাবে ঝাঁকানি খেতে লাগল৷ ক্যারাভ্যানের চাকায় কোনওরকম স্প্রিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় দোলানির পরিমাণও হয়ে উঠল সাংঘাতিক৷
রাস্তার মুখেই একটা রোড-সাইন ও একটা হাতুড়ি দিয়ে জিপোকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ একা একা নামতে জিপোর ইচ্ছে করছিল না ঠিকই, কিন্তু পরর্বতী বিপজ্জনক বাঁক-সংক্রান্ত ব্যাপারে তাকে কোনওরকম দায়িত্ব নিতে হবে না ভেবে সে স্বস্তি পেল৷
‘শালা, একেবারে অপদার্থ!’ ক্যারাভ্যানটাকে নিয়ে বুইকটা রাস্তায় ঢুকে পড়তেই চাপা স্বরে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যদি ওই ট্রাকের তালা হারামজাদাটা না ভাঙতে পারে, তবে আমিও ওকে ভেঙে তক্তা করব৷’
মরগ্যান উঠে দাঁড়িয়ে ক্যারাভ্যানের ছাদ থেকে অটোমেটিক রাইফেলটা হ্যাঁচকা মেরে নামিয়ে নিল৷ ওটাকে ঠেসে দিল ব্লেকের হাতে৷
‘জিপোর চিন্তা ছেড়ে এবার এদিকে মন দাও৷’ মরগ্যানের স্বর যেন বরফে ডোবানো, ‘তোমার কাজটুকু ঠিকমতো করবার চেষ্টা করো৷ রাইফেলের নিশানা যেন ঠিক থাকে!’
ব্লেক রাইফেলটা কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরল, ‘আমার একটু গলা ভেজাতে ইচ্ছে করছে, ফ্র্যাঙ্ক৷ দেখো, জিনির বাস্কেটে বোধ হয় স্কচের বোতল আছে!’
‘ওসব পরে হবে, এড৷ প্রথমে তোমার কাজটুকু তুমি ঠিকমতো করো, তারপর বোতলের কথা ভাবা যাবে৷’
আস্তে আস্তে গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে এল...একসময় থামল ক্যারাভ্যানটা৷ কিটসনই খুলল পিছনের দরজাটা৷
ওরা এসে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷
ব্লেক ও মরগ্যান রাস্তায় নেমে দাঁড়াল৷ ব্লেকের হাতে রাইফেল, মরগ্যানের হাতে .৪৫৷ কয়েক সেকেন্ড ওরা থমকে রইল, নিঃশ্বাস নিল বুক ভরে৷ ভোরের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপ অনুভব করল ওরা৷
মরগ্যান কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘তোমার কাজ তুমি জানো, অতএব বাঁশির সিগন্যালের জন্যে রেডি থেকো, আসতে যেন একমুহূর্তও দেরি না হয়৷’
কিসটন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল৷ প্রথমে তাকাল ব্লেকের দিকে, তারপর মরগ্যানের দিকে, ‘গুড লাক৷’
‘শালা এমনভাবে বলছে যেন ভাগ্য টাগ্যের ব্যাপারটা ওর দরকার নেই৷’ মরগ্যানের দিকে ফিরে বিদ্রূপ-মাখানো স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তোমারও বেশ খানিকটা ভাগ্যের দরকার, আলেক্স! শুধু শুধুই আমাদের জন্যে তুমি দুঃখ করছ৷’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, গিয়ার দিয়ে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে চলল৷ হঠাৎই মরগ্যানের মনে পড়ল, ক্যারাভ্যান থেকে শাবল দুটো নামাতে ওরা ভুলে গেছে৷
‘এই! এই আলেক্স—থামো!’ হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে উঠল মরগ্যান৷
কিটসন গাড়ি থামিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল, ‘কী হল?’
‘প্রত্যেকটা জিনিসই কি আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে, এড? গাধার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? যাও শাবল দুটো নামিয়ে নাও গাড়ি থেকে৷৷’
কিসটন গাড়ি থেকে নেমে ক্যারাভ্যানের দরজাটা খুলল, শাবল দুটো তুলে দিল ব্লেকের হাতে৷ মরগ্যানের চোখজোড়া রাগে জ্বলছে৷ সে হাত নেড়ে বিদায় জানাল কিটসনকে৷ বুইক ও ক্যারাভ্যানটা চলতে শুরু করতেই মরগ্যান রাস্তার ধার বেয়ে ওপরে উঠলে লাগল৷ ব্লেক তাকে অনুসরণ করল৷
এই জায়গাটা মরগ্যান এতবার, এতভাবে ঘুরে দেখেছে যে এর প্রতিটি ঝোপঝাড়ের অবস্থান তার নখদর্পণে৷ ব্লেকের হাত থেকে একটা শাবল নিয়ে ওকে লুকেবার জায়গাটা দেখিয়ে দিল মরগ্যান৷ ব্লেকের থেকে গজ ছয়েক দূরে সে তার লুকোবার জায়গা বেছে নিল৷
ওরা দুজনেই উপুড় হয়ে রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে প্রতীক্ষায় রইল৷
নাঃ, লুকোবার জায়গাটা ভালোই হয়েছে—ভাবল ব্লেক৷ রাইফেলটা কাঁধে ঠেকিয়ে রাস্তার দিকে তাক করল সে৷ না, রাইফেল-নিশানার পথে কোনওরকম বাধাই পড়ছে না; তাছাড়া রাস্তা থেকেও কারও পক্ষে তাকে দেখে ফেলা সম্ভব নয়৷ ব্লেকের অস্বস্তি কমে এল অনেকটা... কিন্তু এক চুমুক স্কচের অভাবে তার শুকনো ফুসফুসটা আনচান করতে লাগল৷ ফ্ল্যাট ছাড়ার আগে যে তিন গেলাস স্কচ সে গিলছে, তার আমেজটা এখন যাই যাই করছে৷ বেলা খুব বেশি না হলেও সুর্যের তাপ প্রচণ্ড৷ শরীরের সর্বত্র ঘামের উপস্থিতি অনুভব করে শুকনো জিভটা একবার ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিল সে৷
‘কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?’ মরগ্যান ঝোপের আড়াল থেকেই প্রশ্ন করল৷
‘নাঃ, দারুণ আছি৷’ রাইফেলের মাছিটা ঠিক করতে করতে বলে উঠল ব্লেক৷ তারপর রাইফেলটা নামিয়ে রাখল পাশে৷ রুমাল বের করে ঘর্মাক্ত হাত দুটো মুছল৷
মরগ্যান টাই খুলে জামার বোতাম খুলল৷ তাকাল হাতঘড়ির দিকে৷ এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি৷ টমাস যদি রোজকার মতোই জোরে ট্রাক চালায়, তবে সাড়ে এগারোটা নাগাদ এই বাঁকের কাছে ওদের পৌঁছে যাওয়া উচিত৷ তাহলে জিনি বোধ হয় মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে পড়বে—মরগ্যান ভাবল৷
হাতে এখনও সময় আছে দেখে মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল৷
ব্লেকও এই সুযোগ হাতছাড়া করল না—সেও সিগারেট ধরাল৷ একবার সে চোখ রাখল রাইফেলের ওপর রাখা তার বাঁ-হাতের ওপর—তার হাত কাঁপছে৷ শত চেষ্টাতেও ব্লেক ওটাকে স্থির রাখতে পারছে না৷ নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে মুখভঙ্গি করল সে৷ বুকের ভেতর শোনা যাচ্ছে উত্তাল হৃৎপিণ্ডের উন্মত্ততা৷ এই দুঃসহ প্রতীক্ষা ব্লেকের স্নায়ুর ওপর যেন জেঁকে বসল৷
পাঁচ মিনিট অখণ্ড নীরবতার পর আচমকা মরগ্যান মাথা তুলল, যেন কিছু শোনবার চেষ্টা করল৷
‘মনে হচ্ছে একটা গাড়ি আসছে৷’
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গেল ব্লেক৷ সঙ্গে সঙ্গেই চাপা স্বরে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘বসে পড়ো, বোকা কোথাকার! এটা জিনির গাড়ি নয়—লুকিয়ে পড়ো শিগগির!’
তাড়াহুড়ো করে ব্লেক আমার বসে পড়ল—ঝোপের আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করল৷
আধ মাইলটাক দূরে ওদের নজরে পড়ল সাদা ধুলোর মেঘ উড়িয়ে একটা গাড়ি ছুটে আসছে৷ আরও কাছে আসতেই ওরা দেখল গাড়িটা একটা সৈন্যবাহিনীর ট্রাক৷ ড্রাইভারের পাশে বসে তিনজন সৈনিক৷ ট্রাকটা একটুও না থেমে ওদের সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল৷
‘ও আজকের ডাক গেল৷’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মরগ্যান, ‘আজ ওদের অন্য দিনের চেয়ে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে৷’
ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ এগিয়ে চলল৷ এগারোটা কুড়ির সময় মরগ্যান এই প্রথম দুশ্চিন্তায় চঞ্চল হয়ে উঠল৷ তাহলে কি জিনি কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে? নাকি ভয় পেয়ে তাদের দল ছেড়েই পালাল মেয়েটা?
ব্লেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, ‘ওফ, আর পারছি না৷ এতক্ষণ ধরে করছে কী মেয়েটা?’
‘বোধহয় গাড়ি-টাড়ির ভিড়ে রাস্তায় আটকে পড়েছে৷’ চিন্তাকুটিল মুখে জবাব দিল মরগ্যান৷
‘টমাস যদি জিনিকে আগে যেতে না দেয়, তাহলে?’ উৎকণ্ঠায় উঠে বসলে ব্লেক, ‘ওই শালারা যদি ট্রাক নিয়ে মেয়েটার আগে চলে আসে, তখন আমরা কী করব?’
‘কিছুই করব না৷ কাল আবার নতুন করে চেষ্টা করব৷’
‘কিন্তু জিনিকে যদি ওরা কাল একই সময় আবার দেখতে পায়, তাহলে নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷ তখন পুরো প্ল্যানটা ভেস্তে যাবে৷’
‘থামো, যত সব আজগুবি চিন্তা’ ব্লেককে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘সে সব ভাববার জন্যে যথেষ্ট সময়...’
দূরাগত কোনও গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে মাঝপথেই থমকে গেল মরগ্যান৷
‘এইবার ও আসছে!’
কয়েক সেকেন্ড পরেই ওরা দেখতে পেল বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে-আসা এম জি গাড়িটাকে৷ তখনও তার দূরত্ব বাঁকের কাছ থেকে প্রায় এক মাইল৷
‘ও দেখি পাগলের মতো গাড়ি ছোটাচ্ছে!’ অস্ফুটস্বরে বলে উঠল ব্লেক৷ তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল ঝোপের আড়াল থেকে, ‘দেখো, কী সাংঘাতিক জোরে ছুটে আসছে৷’
মরগ্যানও তখন উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ আগ্রহভরে দেখছে রাস্তার দিকে৷
‘হয়তো ট্রাকটা ওর গাড়ির থেকে খুব বেশি দূরে নেই৷ শিগগির এসো৷ শাবল দুটো চটপট তুলে নাও!’
পকেট থেকে এক ফালি বড় ন্যাকড়া বের করে রাস্তার ওপর গিয়ে দাঁড়াল মরগ্যান৷ ন্যাকড়াটা পাকিয়ে দড়ির মতো করে, বাঁ-পকেট থেকে বের করল একটা বেনজিনের শিশি৷
বিপজ্জনক বাঁকের কাছাকাছি আসতেই গাড়ির গতিবেগ কমে এল—পর মুহূর্তেই বাঁক ঘুরেই গাড়িটা হাজির হল মরগ্যানের দৃষ্টির আওতায়৷ হাত নেড়ে সে জিনিকে উপযুক্ত জায়গায় গাড়িটা থামাতে নির্দেশ দিল৷ গাড়িটাকে এক ঝটকায় রাস্তার ধারে নিয়ে গিয়ে থামাল জিনি৷
ওর মুখ আতঙ্কে বির্বণ, চোখের দৃষ্টিতে ক্রোধ ও উত্তেজনায় ছোঁয়া। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল জিনি।
‘ওঃ, ওরা কিছুতেই আমাকেই আগে যেতে দিচ্ছিল না! শেষে অতিকষ্টে পাশ কাটিয়ে এসেছি। আরেকটু হলেই রাস্তা থেকে ছিটকে যাচ্ছিলাম নালার মধ্যে! শিগগির করো!’ জিনির মুখমণ্ডল রক্তশূন্য, কাগজের মতো ফ্যাকাসে। স্বর উটকণ্ঠায় অস্থির; ওরা ঠিক আমার পিছন পেছনেই আসছে!’
গাড়ির যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স থেকে ছোঁ-মেরে একটা রিভলভার বের করে আনল জিনি৷ তারপর গাড়ির মেঝে থেকে শুয়োরের রক্ত-ভরা বোতলটা তুলে নিল৷
‘কোন জায়গায় আমাকে শুতে হবে?’
মরগ্যান আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল জায়গাটা।
বোতলের ঢাকনা খুলে জিনি যখন রাস্তায় রক্ত ঢালছে, মরগ্যান ও ব্লেক তখন তড়িঘড়ি জিনির গাড়িটাকে শাবলের চাড় দিয়ে ওলটাতে ব্যস্ত!
ওদের দুজনের একত্রিত শক্তির প্রচেষ্টায় মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির একপাশ শূন্যে উঠল৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দ করে নালার মধ্যে আছড়ে পড়ল গাড়িটা৷
‘যাও, শাবল দুটোকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ো!’ ব্লেককে লক্ষ করে কথা কটা ছুড়ে দিয়েই মরগ্যান পেট্রোল ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷
শাবল দুটোকে নিয়ে ব্লেক একছুটে ফিরে গেল নিজের জায়গায়—লুকিয়ে পড়ল৷ ওদিকে জিনি রক্ত ঢেলে চলেছে ওর হাতে, গায়ে, জামায়—ঘেন্নায় মুখ বিকৃত৷
মরগ্যান ন্যাকড়ায় দড়িটার ওপর বেনজিন ঢেলে দিল৷ শিশিটা ঝোপের আড়ালে ছুঁড়ে দিয়ে ভেজা দড়ির একমাথা ঢুকিয়ে দিল পেট্রোল ট্যাঙ্কের ভেতরে৷ অন্য মাথাটা পড়ে রইল রাস্তার ওপর৷
‘ওই যে, ওরা আসছে! ওদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে৷’ ব্লেক চেঁচিয়ে উঠল, ‘জলদি ফ্র্যাঙ্ক!’
মরগ্যান এক ঝটকায় ফিরে দেখল জিনির দিকে৷
এক গ্যালন রক্তের সমুদ্রে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জিনি৷ ও মুখ তুলে তাকাল ফ্র্যাঙ্কের দিকে... বর্ণহীন মুখে উৎকণ্ঠায় ভরা বিস্ফারিত সবুজ চোখজোড়া বেমানান লাগছে!
‘রিভলভার নিয়েছ তো?’ মরগ্যান জানতে চাইল৷
‘হ্যাঁ৷’
‘ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ আমরা তো আছি৷’
ক্ষিপ্রহাতে দেশলাই জ্বালাতেই আচমকা দ্বিধায় পড়ল মরগ্যান৷ ওলটানো গাড়িটা জিনির বড় বেশি কাছে রয়েছে না? যদি সে এখুনি গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দেয় তাহলে জিনির গায়ে আঁচ লাগবে না তো! কিন্তু সে সব চিন্তা করার সময় আর তখন ছিল না৷
‘জলদি করো, ফ্র্যাঙ্ক!’ আতঙ্ক ঝিমঝিম স্বরে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷
জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠিটা ন্যাকড়ার একপ্রান্তে স্পর্শ করাল মরগ্যান৷ পরমুহূর্তেই তীরবেগে জিনিকে অতিক্রম করে ঝোপের আড়াল লক্ষ করে ছুটল৷
আগুনের শিখা বেনজিন ভেজা ন্যাকড়া বেয়ে পলকের মধ্যে প্রবেশ করল গাড়ির পেট্রোল ট্যাঙ্কে৷ এক কান-ফাটানো বিস্ফোরণ! গরম হাওয়ার হলকা এসে ঝাপটা মারল মরগ্যানের মুখে যেন তার শ্বাসরোধ করে দিতে চাইল৷
ঘন কালো ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান রক্তিম শিখা আবহাওয়াকে আচ্ছন্ন করে তুলল৷ বাঁকের সামনের রাস্তাটা প্রায় ঢাকা পড়ে গেল ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায়৷
‘জিনি নির্ঘাত পুড়ে মরবে৷’ হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে চেঁচিয়ে বলল ব্লেক৷ কারণ এত দূর থেকেও আগুনের অসহ্য উত্তাপ সে অনুভব করতে পারছে৷
মরগ্যান জানে, এখন আর কিছু করার সময় নেই৷ জিনির কথা না ভেবে সে সামনের রাস্তার দিকে চোখ রাখল৷ দেখল, ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকটা সামনের বাঁকে মোড় নিয়ে এগিয়ে আসছে অকুস্থলে৷
‘ওরা এসে পড়েছে!’
এক ঝটকায় রাইফেল তুলে নিয়ে বাঁটটাকে কাঁধে চেপে ধরল ব্লেক৷ আপ্রাণ চেষ্টা করল নিশানা স্থির রাখতে, কিন্তু সামনের পটভূমি ওর চোখের সামনে স্তরে-স্তরে কাঁপতে লাগল৷
আগুনের উত্তাল শিখা এখন অনেকটা কমে এসেছে—ধোঁয়াও কেটে গেছে অনেকটা৷ গাড়িটা তখনও ভীষণভাবে জ্বলছে—আবহাওয়ার উত্তাপে যেন চামড়া ঝলসে যাচ্ছে৷ রাস্তার মাঝখানে স্থির পাথরের মতো পড়ে রয়েছে জিনি৷
ব্লেকের মনে হল, এর চেয়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনার বাস্তব চিন্তা কারও পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়৷
নিশ্চলভাবে পড়ে থাকা মেয়েটা, ওর জামা-কাপড়ের রক্ত, জ্বলন্ত গাড়িটা—সব মিলিয়ে যেন চূড়ান্ত দুর্ঘটনার এক বিশ্বাসযোগ্য নিখুঁত ছবি রূপ নিয়েছে৷ জিনিকে দেখে বোঝা শক্ত, ও বেঁচে আছে কি মরে গেছে৷
ইস, গাড়িটাকে আর একটু দূরে রাখলেই ভালো হতো৷ আপসোসের ধিক্কারে মনে মনে ফেটে পড়ল মরগ্যান৷
সে যেখানে লুকিয়ে আছে, সেখানেই তাপের প্রচণ্ডতা অসহ্য৷ তার ওপর জিনি রয়েছে মরগ্যানের চেয়ে জ্বলন্ত গাড়িটার অন্তত কুড়ি ফুট কাছে৷ ওর জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারল না মরগ্যান৷ সত্যিই যদি...? কিন্তু জিনির নিথর হয়ে পড়ে থাকার ভঙ্গি দেখে ওর যন্ত্রণার কোনওরকম আভাসই বাইরে থেকে পাওয়া যাচ্ছে না৷
ট্রাকটা এসে ঢুকল বিপজ্জনক বাঁকের মুখে৷
মরগ্যানের সর্পিল আঙুল চেপে বসল .৪৫-এর বাঁটের ওপর৷ সে এখানে থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ড্রাইভার ও রক্ষীকে৷ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা জ্বলন্ত গাড়িটাকে ও রক্তাক্ত জিনিকে দেখেই ওদের মুখে ভাবান্তর ঘটল৷ ব্রেক কষে গাড়ি থামাল ট্রাক-ড্রাইভার টমাস৷ জিনির থেকে প্রায় ফুট পনেরো দূরে থমকে দাঁড়াল কালান্তক ট্রাকটা৷
এরপর ওরা কী করবে? মরগ্যানের মনে প্রশ্নের ঝড় বইল৷ ওরা কি গাড়ি ছেড়ে নামবে? নাকি...? এখন সমস্ত কিছুই নির্ভর করছে এই মুহূর্তটার ওপর: মরগ্যানের মতলব, আশা-ভরসা, সবকিছুই তুলাদণ্ডে দুলছে এই একটা মুহূর্তকে আশ্রয় করে৷
ডার্কসন তখন সামনে ঝুঁকে পড়ে ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখতে চেষ্টা করছে৷ আর টমাস ট্রাকের গিয়ারকে ঠেলে দিল নিউট্রালে৷
মরগ্যান দেখল, ট্রাকের দু-ধারের জানলাই খোলা৷ যাক, এখনও পর্যন্ত সবকিছুই তার মতলব মাফিকই ঘটছে৷
ট্রাক ড্রাইভার ও রক্ষী উইণ্ডশিল্ডের ভেতর দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে চাইল৷ এই মুহূর্ত কয়েকের বিরতিকে মরগ্যানের মনে হল কয়েক মিনিট৷ সে যখন অধৈর্য হয়ে পড়েছে, তখন ডার্কসন টমাসকে কী যেন বলল৷ জবাবে টমাল ঘাড় নাড়ল৷
ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করল মরগ্যান৷ সামনের এই নৃশংস দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখেও ওরা বরফের মতো ঠান্ডা মাথায় বসে বসে ভাবছে ওদের কর্তব্য৷ ওদের এই অবিচলিত মনোভাবে প্রমাদ গুনল মরগ্যান৷
সে দেখল, টমাস হাত বাড়িয়ে একটা ছোট রিসিভার তুলে দিল৷
সর্বনাশ! ভাবল মরগ্যান৷ ও কি নির্দেশ চেয়ে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে?
হঠাৎই আড়াল থেকে রিভলভার দিয়ে ওদের দুজনের দিকে ছুটে যাওয়ার ইচ্ছে হল মরগ্যানের টমাসকে বাধা দিতে হলে এখুনি একটা কিছু করা দরকার৷ সে যদি আগে থেকে এটা ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করত, তাহলে ব্লেককে সে কখনই রাস্তার এ-পাশে রাখত না৷ কারণ ব্লেক আর সে রাস্তার দু-পাশে থাকলে এই মুহূর্তেই তারা টমাস ও ডার্কসনকে আক্রমণ করতে পারত৷ কিন্তু ওদের দুজনের সামনে একা-একা ঝুঁকি নেওয়া নেহাতই অপরিণামদর্শিতা৷
জিনির ভাবনাকে কল্পনা দিয়েই স্পর্শ করার চেষ্টা করল মরগ্যান৷ধীরে ধীরে আগুনের আঁচে পুড়ছে মেয়েটা৷ ও কি বুঝতে পারছে না, ওর কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে এসে দাঁড়িয়েছে ট্রাকটা৷ শুয়ে শুয়ে ও নিশ্চয়ই ডার্কসনের আগমনের প্রতীক্ষা করছে৷
এই সংকটময় মুহূর্তেও মরগ্যান জিনির সাহসের প্রশংসা না করে পারল না৷ ওই অবস্থায় একরাশ উৎকন্ঠিত অনুভূতি নিয়ে অন্ধ হয়ে পড়ে থাকা সাধারণ মানুষের কর্ম নয়৷ মরগ্যান দেখল, টমাসের হাত থেকে যন্ত্রটা নিয়ে ডার্কসন তাতে কথা বলছে৷ তার গলার স্বর আংশিক মরগ্যানের কানে এলেও তার পক্ষে বক্তব্য অনুমান করা সম্ভব হল না৷
তাহলে দেখা যাচ্ছে, তাদের পালাবার সময় ধীরে ধীরে কমে আসছে—ভাবল মরগ্যান৷ যেই ট্রাকটা রাস্তা থেকে হাপিস হবে, সঙ্গে সঙ্গেই এজেন্সি সর্তকবাণী ছড়িয়ে দেবে বেতার তরঙ্গে৷
কথা শেষ করে যন্ত্রটা নামিয়ে রাখল ডার্কসন৷ টমাসকে কী যেন বলে দরজা খুলে ট্রাকের বাইরে নামল সে৷
টমাস একইভাবে ট্রাকের ভেতর বসে উইন্ডশিন্ডের মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করতে লাগল৷
মরগ্যান যেখানে লুকিয়ে সেখান থেকে আর ব্লেককে দেখা যাচ্ছে না৷ ব্লেক কী করছে ভেবে সে অবাক হল৷
জিনির দিকে এগিয়ে যাওয়া ডার্কসনকে নিশানা করে রাইফেল তুলে ধরল ব্লেক৷ কিন্তু তার হাত অস্বাভাবিকভাবে থরথর করে কাঁপতে লাগল৷ চাপা স্বরে একটা খিস্তি দিয়ে সে হাত স্থির করার চেষ্টা করল, কিন্তু কোনও ফল হল না৷ আতঙ্কের হিমেল হাওয়া ঝাপটা মারল ব্লেকের ফুসফুসে৷
রক্ষীটি ততক্ষণে জিনির দশ ফুটের মধ্যে পৌঁছে গেছে৷ ব্লেক জানে, এবার যে কোনও মুহূর্তে মরগ্যান রিভলবার নিয়ে তার ঝোপের আড়াল ছাড়বে৷
ব্লেকের রাইফেলের নিশানা অনিশ্চিতভাবে কাঁপতে লাগল: একবার ডার্কসনের ওপর, পর মূহূর্তেই তার বাইরে৷
ঝোপঝাড়ের খসখস শব্দে চোখ ফেরাতেই সে দেখল মরগ্যান রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়েছে৷ এবং সেইখানেই চরম ভুল করল ব্লেক৷ ডার্কসনের দিক থেকে নজর সরিয়ে সে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷
মরগ্যান তখন .৪৫ বাগিয়ে ধরে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ, ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রাকের জানলার দিকে৷
ওদিকে ডার্কসন জিনির শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়েছে কিন্তু তখনও ওকে স্পর্শ করেনি৷ হয়তো তার মনের কোণায় ক্ষীণ সন্দেহ ছিল যে এই দুর্ঘটনার ব্যাপারটায় কোথাও একটা গোঁজামিল আছে৷ হয়তো তার সামান্য সন্দেহ হল যে কেউ তার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে৷ হঠাৎই মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল ডার্কসন৷
মরগ্যান ইতিমধ্যে ট্রাকের জানলায় উঠে পড়েছে৷ ওর হাতের রিভলভার বিচলিত, হতবুদ্ধি টমাসের মাথা লক্ষ করে স্থির৷
আচমকা উঠে বসল জিনি৷
ডার্কসন বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ঘুরে দাঁড়াল৷ ওর ডান হাত কাটারির মতো আছড়ে পড়ল জিনির রিভলবার-ধৃত হাতে! ব্যাপার-স্যাপার বুঝে ওঠার আগেই জিনির হাত থেকে রিভলভার ছিটকে পড়েছে রাস্তায়৷ প্রায় একই সঙ্গে ডার্কসনের বাঁ হাতের প্রচণ্ড আঘাতে মুখ থুবড়ে উলটে পড়ল ও৷ ডান হাতের এক আপাত অদৃ্শ্য আন্দোলনে কোমরের খাপ থেকে রিভলভার বের করে আনল ডার্কসন৷ অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র গতিতে চোখের পলক ফেলার আগেই ঘটে গেল ব্যাপারটা৷
উত্তেজিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের ট্রিগার টিপল ব্লেক! মরগ্যানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ট্রিগারে চাপ দেওয়ার বদলে হ্যাঁচকা টান মারল সে৷ ঝাঁকুনির ফলে রাইফেলের নল হয়ে পড়ল ঈষৎ ঊর্ধ্বমুখী এবং একই মুহূর্তে হল তার বিস্ফোরণ৷ সুতরাং কোনওরকম ক্ষতি না করেই ডার্কসনের মাথার অনেক ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল গুলিটা৷
ব্লেকের গুলি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকের মধ্যে হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকা টমাস পাশে ঝাঁপ দিল৷ ওর হাত ছোবল মারল ড্যাশবোর্ডের বোতাম তিনটের দিকে৷
মরগ্যান সরাসরি ওর মুখ টিপ করে গুলি করল!
একই সঙ্গে ডার্কসন মরগ্যানের দিকে তাক করে গুলি চালাল৷ সেই মুহূর্তে জিনি আঘাত করল ডার্কসন রিভলভার ধরা হাতে৷ ডার্কসনের লক্ষ সামান্য বিচলিত হলেও বিফলে গেল না৷ কারণ তার হাতের আঘাতে আচ্ছন্ন জিনির শক্তি তখন নিঃশেষিত৷
মরগ্যান তার পাঁজরে অনুভব করল এক বিরাট ধাক্কা, পরমুহূর্তেই বুক খাক করে দেওয়া এক জ্বলন্ত যন্ত্রণা৷ গুলির আচমকা সংঘর্ষে সে পড়ে গেল রাস্তায়, কিন্তু খুব সহজেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্থির লক্ষ্যে গুলি করল ডার্কসনকে৷ জিনি তখন কোনও রকম ডার্কসনের রিভলভার ধরা হাত আঁকড়ে ঝুলছে৷
অনিবার্যভাবে মরগ্যানের গুলি সরলরেখায় গিয়ে আঘাত করল প্রহরীর কপালে, এবং মুহূর্তে মৃত ডার্কসনের নিষ্প্রাণ দেহটা জিনিকে নিয়ে আছড়ে পড়ল রাস্তায়৷
যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে ট্রাকের গা-ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ল মরগ্যান৷ উঠেই দেখল, আহত, অবসন্ন টমাসের ডান হাত অতিকষ্টে ড্যাশবোর্ড আঁকড়ে এগিয়ে চলেছে একটা বোতামের দিকে৷ মরগ্যান কিছু একটা করে ওঠার আগেই টমাসের অনুসন্ধানী আঙুল খুঁজে পেল বোতামটা, এবং বোতামে চাপ দিল৷
মুহূর্তে ইষ্পাতের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল গোটা ট্রাকটা৷ কেউ ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটা পরিণত হল একটা নিশ্ছিদ্র ইষ্পাতের বাক্সে৷
একটা মুখখিস্তি করে টলতে টলতে সোজা হয়ে দাঁড়াল মরগ্যান৷ আক্রোশ হতাশায় .৪৫-এর বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল ইস্পাতের পরদায়৷ সংঘর্ষের ধাতব শব্দ মরগ্যানকে ব্যঙ্গ করে যেন হেসে উঠল৷ হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকাল সে৷ এমন সময় ট্রাকের ভেতরে শোনা গেল গুরুভার কিছু পতনের শব্দ—সেই সঙ্গে একটা চাপা-অস্ফুট আর্তনাদ৷ সম্ভবত নিজের আসন থেকে ট্রাকের মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছে টমাস৷
ঝোপের আড়াল ছেড়ে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল ব্লেক৷ দু-হাতে অটোমেটিক রাইফেলটা সে খামচে ধরে আছে—মুখে একরাশ অন্ধকার এসে ভিড় করেছে৷
মরগ্যান পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাল তার দিকে৷ মরগ্যানের চোখে চোখ পড়তেই অজানা আতঙ্কে থমকে দাঁড়াল ব্লেক—যেন জমাট পাথরের মূর্তি৷
‘শালা কুত্তির বাচ্চা!’ হিংস্র স্বরে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘তোকে আমি খুন করে ফেলব৷’
রাইফেল ফেলে দিয়ে দু-হাত শূন্যে রেখে অনুনয়ের ভঙ্গিতে বোঝাতে চাইল ব্লেক৷ প্রাণভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘ফ্র্যাঙ্ক, বিশ্বাস করো, আমি ওকে মারতে চেয়েছি, কিন্তু মাছিটা গোলমাল থাকায় ফসকে গেছে, তারপর তো ট্রিগারটাই বিগড়ে গেল!’
হঠাৎ মরগ্যান অনুভব করল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ কোটের বোতাম খুলে ফেলতেই চোখে পড়ল রক্তাক্ত জামাটা৷ ক্ষতস্থান ঘিরে এক বিশাল চক্রাকার দাগ তৈরি হয়েছে জামার ওপর৷
বেতালা পা-ফেলে দৌড়ে এল জিনি৷ জ্বলন্ত গাড়ির আঁচে ওর মুখ টকটক করছে৷ বাদামি চুলের কয়েক গুচ্ছ পুড়ে গিয়ে জড়িয়ে গেছে৷
‘খুব বেশি লেগেছে?’ চিন্তিতভাবে প্রশ্ন করল জিনি৷
‘ও কিছু নয়!’ তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেও মরগ্যানের মাথা ঝিমিঝিম করতে লাগল, একটা শীতার্ত অনুভূতি তাকে আঁকড়ে ধরল৷ পকেট থেকে বাঁশিটা বের করে জিনির প্রসারিত হাতে গুঁজে দিল সে, ‘শিগগির ডাকো কিটসনকে!’
জিনি বাঁশিতে ফুঁ দিল : লম্বা একটানা কর্কশ সুরে বাজাল বাঁশিটা৷ কয়েক মুহূর্ত থেমে একই সুরের পুনরাবৃত্তি করল ও৷
‘টমাস? টমাসের কী হল?’ মরগ্যান ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেই প্রশ্ন করল জিনি৷ ও পরিষ্কার শুনতে পেল মরগ্যানের হালকা, কষ্টকৃত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷
‘টমাসকে আমি শেষ করে দিয়েছি৷ একটা বোতাম ও টিপেছে বটে, কিন্তু অন্য দুটোর নাগাল পায়নি—তার আগেই ওর গড়িয়ে পড়ার শব্দ আমার কানে এসেছে৷’
ব্লেক ইতিমধ্যে মরগ্যানের কাছে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু হতবুদ্ধি হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল৷ হঠাৎই যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে সে বলে উঠল, ‘ফ্র্যাঙ্ক! তোমার বুক থেকে রক্ত পড়ছে!’
‘সরে যা আমার সামনে থেকে—শালা, ভেড়ুয়া কোথাকার৷’ দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল মরগ্যান, তোর জন্যেই আমাদের সমস্ত মতলব ফেঁসে গেল৷ এখন আমরা ডুবতে বসেছি৷’
‘না৷’ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল জিনি, ‘এখনও একটা উপায় আছে৷ এদিকে এসো, ফ্র্যাঙ্ক, বসো৷ আগে তোমার রক্তটা বন্ধ করি!’
মরগ্যান বসতেই জিনি টান মেরে খুলে ফেলল তার কোট ও শার্ট৷
ব্লেক একইভাবে দাঁড়িয়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইল—যেন ঘটনাগুলোর আকস্মিকতায় তার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে৷
মরগ্যান বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছ? যাও, যা হোক কিছু একটা করো৷’
জিনি প্রথমে মরগ্যানের ক্ষতটা পরীক্ষা করে দেখল—প্রায় ইঞ্চি তিনেক লম্বা একটা চেরা দাগ৷ অল্পের জন্যে গুলি পাঁজর ভেদ করে যায়নি৷ চটপট স্কার্ট তুলে পেটিকোটের সেলাই বরাবর লম্বা এক ফালি কাপড় ছিঁড়ে নিল জিনি৷ তারপর মরগ্যানের শার্টটা নিয়ে রক্ত-ভেজা অংশটা ছিড়ে বাদ দিল৷ বাকি কাপড়টা ভাঁজ করে একটা নরম প্যাডের মতো করে মরগ্যানের ক্ষতস্থানে চাপা দিল, সেটাকে কাপড়ের ফালিটা দিয়ে শক্ত করে বাঁধল৷
‘যাক, এতেই মোটামুটি কাজ হবে৷ তবে ফন হ্রদে পৌঁছনো মাত্রই এটার উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে৷ কেমন লাগছে এখন?’
মরগ্যান আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল৷ কোটটা গায়ে দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল, ‘আমি ঠিক আছি৷ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করা বন্ধ করো৷’ চোখ তুলে ট্রাকের দিকে তাকাল মরগ্যান, ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল৷ এখন আর ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানে ঢোকানো সম্ভব নয়—এদিকে সময়ও চলে যাচ্ছে৷ চলো পালাতে হলে আর দেরি করা ঠিক হবে না—শিগগির!’
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যারাভ্যান ও বুইক নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হল কিটসন৷ ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে ওদের কাছাকাছি এসে থমকাল সে৷ বিবর্ণ, উৎকণ্ঠা ভরা মুখে বুইক থেকে নামল কিটসন৷ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একবার তাকাল ট্রাকের দিকে, তারপর মরগ্যানের দিকে৷
একটা ঝোপের পিছনে ডার্কসনের মৃতদেহটা লুকিয়ে ফেলে ব্লেক ফিরে এল৷
‘কী হয়েছে?’ উত্তেজিতভাবে প্রশ্ন করল কিটসন, ‘যেন গুলির শব্দ শুনলাম৷’
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে!’ মরগ্যান জবাব দিল, ‘এক্ষুনি আমাদের পালাতে হবে৷’
‘দাঁড়াও৷’ ওদের বাধা দিয়ে বলে উঠল জিনি, ‘এখনও একটা উপায় আছে৷ বুইকটা চেষ্টা করলে ট্রাকটাকে ঠেলে ক্যারাভ্যানে তুলতে পারে৷ আমার মনে হয় তা অসম্ভব নয়৷ আমরা একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব৷ দশ লাখ ডলারের ট্রাকটাকে বিনা চেষ্টায় হাতছাড়া করতে আমি রাজি নই৷’
মরগ্যান চোখ কুঁচকে তাকাল জিনির দিকে, ‘হুঁ তাইতো... শালা, আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই পারা যাবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে তাকাল সে, ‘আলেক্স, চটপট ক্যারাভ্যানটাকে বুইকের ল্যাজ থেকে ছাড়িয়ে নাও৷’
ঘটনাবলির সম্পর্কে অন্ধকারে থাকলেও মরগ্যানের স্বরের তীক্ষ্ণতা কিটসনের কান এড়াল না৷ হতভম্ব হয়ে সে ছুটে গেল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ বুইক থেকে ওটাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল শেকল খুলে৷
ব্লেককে লক্ষ করে গর্জে উঠল মরগ্যান, ‘যাও, ওকে সাহায্য করো! জিনি বুইকটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল ট্রাক ছাড়িয়ে তারপর ব্যাক গিয়ার দিয়ে গাড়িটাকে আস্তে আস্তে পিছিয়ে এনে স্পর্শ করল ট্রাকের গায়ে৷ অর্থাৎ বুইকের পিছনের বাম্পার ও ট্রাকের পিছনের বাম্পার পরস্পরকে স্পর্শ করে রইল৷
কিটসন ও ব্লেক ক্যারাভ্যানটাকে টানতে টানতে নিয়ে এল ট্রাকের সামনের দিকে৷
‘এক কাজ করো এড, ক্যারাভ্যানের চাকার সামনে কয়েকটা আধলা ইঁট বসিয়ে দাও, যাতে ওটা নড়তে না পারে৷’ মরগ্যান নির্দেশ দিল, ‘আর শাবল দুটো বের করে আনো৷ ও দুটো দিয়ে ক্যারাভ্যানের সামনেটা ঠেকা দাও—যাতে ট্রাকটা ফেলে তোলার সময় ওটা উলটে না যায়!’
ঝড়ের বেগে কাজ করে চলল কিটসন৷ মুহূর্তের মধ্যে কতকগুলো বড়-বড় পাথরের টুকরো তুলে ক্যারাভ্যানের চাকা ও রাস্তার ফাঁকে গুঁজে দিল সে৷ ওদিকে শাবল দুটো দিয়ে ব্লেক ক্যারাভ্যানের সামনেটায় জোরালো ঠেকা দিয়েছে—যাতে ওটা উল্টে না যায়৷
‘ঠিক আছে৷’ জিনির দিকে হাতের ইশারা করল মরগ্যান৷
কিটসন ট্রাকের সামনের দিকে এসে দাঁড়াতেই মরগ্যান ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা খুলে দিল৷
‘সাবধান! ধীরে ধীরে জোর বাড়বে৷’ জিনিকে উদ্দেশ্য করে বলল সে৷ বুইকের ইঞ্জিন চালু করে ট্রাকটাকে ঠেলতে শুরু করল জিনি৷ ট্রাকের হ্যান্ড ব্রেক দেওয়া থাকলেও বুইকের ক্রমবর্ধমান চাপে নড়তে শুরু করল ট্রাকটা৷
কিটসন ও ব্লেক ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের পাটাতন বেয়ে ঠিকমতো তোলার জন্যে ওটার সামনের চাকা জোড়ায় মুহুর্মুহু লাথি মেরে ট্রাকের গতিপথ ঠিক রাখল৷ ধীরে ধীরে ট্রাকটা ঢুকে পড়ল ক্যারাভ্যানে৷ ওটাকে শেষ বারের মতো ধাক্কা দেওয়ার জন্যে বুইকটা ঠেলতে ঠেলতে উঠে গেল ক্যারাভ্যানের পাটাতনে৷
‘থামো’ মরগ্যান ডেকে বলল জিনিকে, ‘কাজ হয়ে গেছে৷ এড, শিগগির শাবল দুটো আর রাইফেলটা গুছিয়ে নাও৷ কিটসন, চটপট বুইকের সঙ্গে ক্যারাভ্যানটাকে জুড়ে দাও৷ জলদি৷ আমাদের হাতে নষ্ট করার মতো একমুহূর্তে সময় নেই৷’
জিনি বুইকটা ঘুরিয়ে চালিয়ে নিয়ে এল ক্যারাভ্যানের সামনের দিকে, তারপর গাড়িটা পিছিয়ে ক্যারাভ্যানের কাছ ঘেঁষে থামতেই কিটসন দুটোকে আবার শেকল দিয়ে আগের মতো জুড়ে দিল৷
জিনি চালকের আসন থেকে সরে বসতেই কিটসন বুইকে উঠে বসল, স্টিয়ারিং ধরল৷ গাড়ি ও ক্যারাভ্যানকে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে যেদিক থেকে জিপোর আসার কথা সেদিকে মুখ করে দাঁড়াল৷
মরগ্যান ও ব্লেক লাফিয়ে ঢুকল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷
কিন্তু ট্রাকটা যে এতটা জায়গা নিয়ে নেবে সেটা ওরা ভাবতেই পারেনি৷ কারণ ট্রাক ও ক্যারাভ্যানের মাঝে পাশের দিকে দেড় ফুট এবং পিছনে মাত্র ফুট দুয়েক জায়গা রয়েছে৷ বিস্ময় ও সংশয় ওদের মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে তুলতে চাইল৷
আগে থেকেই ঠিক ছিল মরগ্যান ও ব্লেক ট্রাকের সামনে ড্রাইভারের কেবিনে বসবে৷ কিন্তু ঘটনাচক্র বাধ্য করেছে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে৷ সুতরাং বাধ্য হয়েই ওদের চলতে হবে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ও ট্রাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে৷ নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক এবং অনিশ্চয়তায় ভরা প্রচণ্ড ঝুঁকি৷ কিন্তু ওরা নিরুপায়৷ কিটসন যদি দ্রুতবেগে কোনও বাঁক নেয় তাহলে ট্রাকটা ছিটকে সরে আসতে পারে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালের দিকে, হয়তো, থেঁতলে দেবে ওদের দেহকে৷
ক্যারাভ্যানে উঠেই মরগ্যান বলল, ‘সাবধান৷ যে কোনও মুহূর্তেই ট্রাকটা সরে আসতে পারে৷ তাহলে...’
কিটসন গাড়ি ছেড়ে উঠে এসেছে ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করতে৷ ও মরগ্যানের কথায় ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে, আমি সেদিকে লক্ষ রাখব—’
‘এক কাজ করলে হতো না?’ ইতস্তত করে বলেই ফেলল ব্লেক, ‘ট্রাকের চাকাগুলোকে পাথরের টুকরো দিয়ে আটকে দিলে কেমন হয়?’
‘না, না—ওসবের কোনও সময় নেই৷’ খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘দোহাই তোমার, ভেতরে ঢুকে এসো৷ কিটসন, গাড়ি ছেড়ে দাও জলদি৷’
হাতলে চাপ দিয়ে ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে কিটসন ছুটে গিয়ে বসল বুইকের চালকের আসনে৷
জিনি ততক্ষণ ওর রক্তমাথা স্কার্ট, ব্লাউজ খুলে ফেলে নতুন একটা ধুসর পোশাক পরে নিয়েছে৷
কিটসন আড়চোখে ওকে দেখল, জিনির মুখমণ্ডলে মৃতের ছায়া৷ গিয়ার দিয়ে গাড়ি ছোটাল কিটসন৷ অনুভব করল, ট্রাকসুদ্ধ ক্যারাভ্যানটা টানতে গিয়ে বুইকের ক্ষমতা কমে আসতে চাইছে৷
ব্লাউজ পরে স্কার্টের চেন টেনে বন্ধ করতেই জিনিকে শুধোল কিটসন, ‘কী হয়েছিল?’
শঙ্কিতস্বরে পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে কিটসনকে জানাল ও৷
‘তার মানে ট্রাকের ভেতরে একটা লোক মরে পড়ে রয়েছে?’ ভীষণ ভয় পেল কিটসন৷
‘যদি সে মরে না থাকে, তাহলে এতক্ষণে বেতারে সংকেত পাঠিয়ে আমাদের বিপদে ফেলত৷ মরগ্যান তো বলেছে যে ও টমাসকে একেবারেই শেষ করে দিয়েছে! কী জানি৷’
‘তাহলে একটা মড়াকে সঙ্গে বয়ে আমরা ক্যারাভ্যানের ঘাঁটিতে যাচ্ছি?’
‘ওঃ, তুমি থামবে?’ ভাঙা উত্তেজিত স্বরে ওকে বাধা দিল জিনি৷ তারপর পাশ ফিরে মুখ ঢুকল দু-হাতে৷
ওদিকে ক্যারাভ্যানের ভেতরে শান্তভাবে তার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ নিরাপত্তার প্রয়োজনে পা-দুটো ঠেসে ধরেছে ট্রাকের পিছনের চাকায় তার মনের ভেতরে বয়ে চলেছে অশান্ত ঢেউ...
যাক, শেষ পর্যন্ত তাহলে কাজটা হল৷ এখন বাকি কাজটা ঠিকমতো সারতে পারলেই হয়৷ এর জন্যে দু-দুজন লোককে আমি খুন করেছি৷ অবশ্য সেটা তাদের নিয়তি৷ নাঃ, টমাস, ডার্কসনের সাহস আছে৷ বিশেষ করে ড্রাইভারটার৷ কারণ সে জানত যে আমার রিভলভারের সামনে সামান্যতম বেচাল মানেই মৃত্যু৷ কিন্তু তবুও সে বোতাম টেপার চেষ্টা করেছে৷ নাঃ, আমি হলে অন্তত সে চেষ্টা করতাম না৷ অথচ টমাস তাই করেছে—এবং আংশিকভাবে সফলও হয়েছে৷ এই ইস্পাতের চাদর নিয়ে এখন আমাদের প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাটে পড়তে হবে৷ তাছাড়া টমাসের দেহটাও পড়ে আছে ট্রাকের ভেতর৷ বাইরের পাটাতন ভেঙে ওর দেহটা আমাদের বের করতে হবে৷ মনে হয় টমাস মারাই গেছে৷ কিন্তু তা যদি না হয়, তাহলে? হয়তো জ্ঞান ফিরে এলে ও বেতারে সংকেত পাঠাতে চেষ্টা করবে এবং সেই সঙ্গে আমাদের বাড়া ভাতে ছাই দেবে!
মজবুত ইস্পাতের ট্রাকটার দিকে চোখ রাখল মরগ্যান৷ ভাবল, সামান্য ইস্পাত-প্রাচীরের ওপিঠেই রয়েছে তার এতদিনের স্বপ্ন—দশ লক্ষ ডলার৷ তার হাতের এত কাছে স্বর্ণমৃগের মাদকতাময়, নেশা-ধরানো, উপস্থিতি মরগ্যানকে ভুলিয়ে দিল তার বুকের ক্রমবর্ধমান, অসহ্য যন্ত্রণার কথা৷ সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে৷
মরগ্যানের চোখের আড়ালে, ট্রাকের অন্য দিকে নিচু হয়ে বসে আছে ব্লেক৷ ওর চোখ দুটো ট্রাকের গায়ে আঠার মতো আটকে আছে—লক্ষ করছে ট্রাকের প্রতিটি সূক্ষ্ম আন্দোলন৷ অধীর সংশয়ে তার চোখ-মুখে দুঃস্বপ্নের ছায়া—এই বুঝি ছিটকে এল তার দিকে৷
এখন ব্লেক তার সাহস ফিরে পেয়েছে—কিন্তু দু-দুবারের ব্যর্থতার গ্লানি সে যেন কিছুতেই ভুলতে পারছে না৷
ট্রাকটাকে ওরা হাতিয়েছে অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্লেককে কোনও খুন করতে হয়নি৷ ব্লেক স্বস্তির শ্বাস নিল৷ ওঃ, একটুর জন্যে সে তার অপরাধ জীবনের চরম অপরাধ থেকে রক্ষা পেয়েছে৷ প্রথম থেকে এই খুন করার ভাবনাটা তার সমস্ত সাহস শুষে নিয়েছে৷ কিন্তু এখন যে কোনও পরিস্থিতির জন্যেই সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত৷ এমনিতে ভীরু বা কাপুরুষ সে নয়; অথচ ব্লেক জানে এ ঘটনার পর মরগ্যান তাকে আর একটি মুহূর্তের জন্যেও বিশ্বাস করবে না৷ সুতরাং ব্লেককে ফ্র্যাঙ্কের ওপর নজর রাখতে হবে৷ ব্লেক নিজের দু-লাখ টাকা অত সস্তায় ছাড়তে রাজি নয়৷
মাইল ছয়েক গাড়ি ছোটাবার পর কিটসন দেখল জিপো দ্রুতপায়ে রাস্তা ধরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে৷
কিটসন গাড়ি থামাতেই সে ছুটে এল বুইকের কাছে৷
‘কী হল? সব ঠিক আছে তো?’ গোল গোল চোখ করে প্রশ্ন করল জিপো, ‘কোনও গোলমাল হয়নি?’
‘না, সব ঠিক আছে৷ যাও, ক্যারাভ্যানের ভেতর ঢুকে পড়ো৷’
হাতল ঘুরিয়ে বুইক থেকে নেমে ক্যারাভ্যানের দরজার দিকে এগিয়ে গেল কিটসন৷ জিপোকে ডাকল ‘এসো এদিকে৷’
জিপো ক্যারাভ্যানের ভেতর উঁকি মারতেই তার চোখ পড়ল মরগ্যানের ওপর৷
‘সব ঠিক আছে তো, ফ্র্যাঙ্ক?’ মরগ্যান যন্ত্রণায় ঠোঁট টিপে বসে—মুখে ধূসর পাণ্ডুর প্রলেপ৷ জিপোর কথায় কোনওরকমে অস্ফুট স্বরে সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ...এখন চলো! এসো, চটপট ভেতরে ঢুকে পড়ো জিপো৷’
হঠাৎই থমকে দাঁড়াল জিপো৷ স্থির অবাক চোখে সে বলে উঠল, ‘তুমি এখানে কী করছ, ফ্র্যাঙ্ক? তোমার তো ট্রাকের ভেতর বসার কথা?’
‘ভেতরে এসো৷’ গর্জে উঠল মরগ্যান ‘নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই৷’
‘না! আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল জিপো৷ বিস্ফারিত চোখে চাইল কয়েক পা পিছিয়ে যেতে যেতে, ‘ওভাবে আমি ক্যারাভ্যানে চড়তে পারব না৷ ট্রাকটা যদি সামান্য নড়ে তাহলেই তোমরা মাছির মতো থেঁতলে মারা যাবে!’
মরগ্যান তার কাঁধে ঝোলানো খাপ থেকে বের করে আনল .৪৫টা৷ রিভলভার বের করার সময় তার কোট খানিকটা সরে গেল৷ জিপোর চোখে পড়ল, মরগ্যানের বুকে আড়াতাড়িভাবে বাঁধা রক্তে-ভেজা পট্টিটা৷
‘এসো ভেতরে!’ রিভলবার উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান৷
কিটসন জিপোকে ধরে এক ধাক্কা মারল৷ জিপো ছিটকে গিয়ে পড়ল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ সঙ্গে সঙ্গে কিটসন দৌড়ে গেল সামনের দিকে৷ হাতলে চাপ দিতেই বন্ধ হয়ে গেল ক্যারাভ্যানের দরজা৷
তারপর চালকের আসনে বসে গাড়ি চালু করল সে৷
গাড়ি এবং ক্যারাভ্যান হাওয়ার বেগে ছুটে চলল প্রধান সড়কের দিকে৷
নিজেকে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত করে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিপো৷ ক্যারাভ্যানের অসম দোলানির সঙ্গে-সঙ্গে ওর বৃত্তাকার চোখে কেঁপে কেঁপে উঠছে উলঙ্গ আতঙ্কের ছায়া। ওর শরীর থেকে মাত্র ইঞ্চিকয়েক দূরেই একটি ছন্দে দুলছে ট্রাকের ইস্পাত আবরণ।
ব্লেক ট্রাক ছেড়ে এখন আশ্রয় নিয়েছে পিছনের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে লক্ষ করছে, ট্রাকের একপাশে নির্লিপ্তভাবে অপেক্ষারত মরগ্যান ও জিপোকে।
বুইকের প্রচণ্ড গতিবেগের সঙ্গে তাল রেখে ছুটে চলা ক্যারাভ্যানের ভেতর ভারসাম্য বজায় রাখতে ওরা তিনজন আপ্রাণ চেষ্টায় কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ক্রমাগত ঝাঁকুনি আর দোলানির সঙ্গে সঙ্গে দুলছে ওদের শরীর তিনটে।
‘তাহলে একটা লোক এখনও এই ট্রাকের ভেতরে রয়েছে?’ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল জিপো।
‘হ্যাঁ, রয়েছে—কিন্তু ভয়ের কোনও কারণ নেই, লোকটা মারা গেছে। যাকগে, শোনো জিপো, তোমাকে এই ইস্পাতের চাদরটা যে করেই হোক খুলতে হবে কারণ টমাস যে বেতার সংকেত চালু করেনি, সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিত হওয়া দরকার।’
কাজের শুরু থেকে এই প্রথম একটা প্রস্তাবের মতো প্রস্তাব করল ব্লেক, ‘আচ্ছা, বেতার সংকেত পাঠানোর যন্ত্র তো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে! তা-এক কাজ করলে হয় না? ট্রাকের তলায় ঢুকে ব্যাটারির তার দুটো যদি কেটে দিই?’
‘ঠিক বলেছ।’ মরগ্যান যেন হাতে চাঁদ পেল, ‘জিপো, তুমি তাহলে চটপট ট্রাকের নীচে ঢুকে পড়ো; ব্যাটারির তার দুটো কেটে দাও। তাড়াতাড়ি করো?’
জিপোর মুখ গম্ভীর হল, ‘ট্রাকের নীচে কাজ করা সম্ভব নয়, ফ্র্যাঙ্ক। যে কোনও মুহূর্তে ট্রাকটা দুলে উঠতে পারে—তাহলে আমাকে চাপা পড়তে হবে ভারী ট্রাকটার তলায়।’
‘আশা করি আমার কথা তোমার কানে গেছে।’ হায়েনার স্বরে গর্জে উঠল মরগ্যান, ‘জলদি কাজ শুরু করো!’
আপন মনেই গজগজ করতে করতে যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সের ঢাকনা খুলল জিপো। একটা স্ক্রু ড্রাইভার এবং একটা তার কাটার কাঁচি বের করে নিল বাক্স থেকে।
মরগ্যান তার পাশের জানলার পরদা সরিয়ে সতর্কভাবে বাইরে উঁকি মারল। ওরা এখন মাঝারি রাস্তায় এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কিটসন। ক্যারাভ্যানটা বিপজ্জনকভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে। রাস্তায় যদি কোনও মোটরবাইক পুলিশ উপস্থিত থাকত তাহলে সে নির্ঘাত মোটরবাইক নিয়ে ওদের তাড়া করত। কিন্তু কিটসনকে আস্তে চালানোর জন্যে অনুরোধ করারও কোনও উপায় নেই। থাকলে মরগ্যান তাকে সাবধান করে দিত। সুতরাং প্রধান সড়কে পৌঁছে বুইকের গতিবেগ যে কমাতে হবে, সে ব্যাপারেও কিটসনের বিচারবুদ্ধির ওপরেই তাদের নির্ভর করতে হবে।
জিপো তখন মেঝেতে উপুর হয়ে ট্রাকের নীচে ঢোকবার চেষ্টা করছে। প্রথমত স্বল্পপরিসরের জন্যে সে অসুবিধেয় পড়েছে—তার ওপর মস্তিষ্কে চেপে বসা ভয়টা তো আছেই। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সে ট্রাকের তলায় নিজের শরীরটাকে প্রবেশ করাল, তখন মরগ্যান একটা টর্চ এগিয়ে দিল ওর হাতে।
চিৎ হয়ে ট্রাকের ইঞ্জিনের তলায় পৌঁছতেই পাটতনের গায়ে একটা বিশ্রী লাল দাগ চোখে পড়ল। ওর মুখ থেকে ইঞ্চি কয়েক ওপরেই স্যাঁতসেঁতে ভিজে দাগটা যে রক্তের দাগ, সেটা ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই কয়েকটা আঠালো উত্তপ্ত রক্তের ফোঁটা এসে পড়ল জিপোর মুখের ওপর।
শিউরে উঠে মুখ সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল সে। ট্রাকের মেঝের ওপিঠেই পড়ে থাকা টমাসের রক্তাক্ত দেহের সান্নিধ্য তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল।
কাঁপা হাতে অন্ধের মতো মরিয়া হয়ে সে খুঁজতে লাগল ব্যাটারির তার দুটো। শত চেষ্টাতেও অসহ্য কাঁপুনিকে সে থামাতে পারল না—চুপচাপ ঘামতে লাগল জিপো। মরগ্যান এখন হাঁটু গেড়ে ট্রাকের নীচে মাথা এনে জিপোর কার্যকলাপ লক্ষ করছে। তা যদি না হতো, তাহলে সেই মুহূর্তেই জিপো বেরিয়ে আসত ট্রাকের তলা থেকে—সাফ বলে দিত ব্যাটারির তার সে কেটে দিয়েছে। কিন্তু মরগ্যানের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। তাই সে চেষ্টা আর করল না।
অবশেষে একটা তারের সন্ধান পেল জিপো, কিন্তু সেটা আবার নাগালের অনেক বাইরে। তাই হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে উঠল, ‘আমি হাত পাচ্ছি না, ফ্র্যাঙ্ক। আমাদের ওপর থেকে চেষ্টা করে দেখতে হবে।’
‘ওপর থেকে দেখবে কোন দিক দিয়ে? সব বন্ধ। ঠিক আছে, এক মিনিট অপেক্ষা করো।’ মরগ্যান এগিয়ে গেল যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সের দিকে। ধাতু কাটার একটা লম্বা হাতলওলা কাঁচি বের করে আনল।
‘এই নাও,এটা দিয়ে কাটো!’ কাঁচিটা ট্রাকের তলায় ঠেলে দিয়ে সে বলল।
কাঁচিটাকে জুতমতো বাগিয়ে ধরতে জিপোকে টর্চটা নামিয়ে রাখতে হল! কিন্তু কিছুক্ষণ পরিশ্রমের পর যখন সে কাঁচিটাকে উঁচিয়ে ধরল, তখন তারের খুঁটটাকে সে আর দেখতে পেল না।
‘এখানে একটু আলো ফেলার ব্যবস্থা করো, ফ্র্যাঙ্ক!’ হাঁপাতে-হাঁপাতে বলে উঠল জিপো।
‘যাও, নীচে ঢুকে আলোটা ধরো।’ একপাশে সরে গিয়ে ব্লেককে বলল মরগ্যান। আঙুল তুলে ইশারা করল ট্রাকের নীচে ঢুকতে।
অতি সহজেই ট্রাকের নীচে ঢুকে পড়ল ব্লেক। টর্চটা উঁচিয়ে ধরতেই তার চোখে পড়ল ট্রাকের পাটাতনের রক্তে-ভেজা অংশটা—সেই সঙ্গে চোখে পড়ল জিপোর ভয়ার্ত মুখে কাঁচা রক্তের ফোঁটা।
জিপো ব্যাটারির তারটা কাটল।
‘হয়ে গেছে। এবার আমাকে বেরোতে দাও।’
ব্লেক হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, হঠাৎই একটা অস্ফুট শব্দে তার হাত-পা যেন বরফ হয়ে এল, ঘাড়ের ওপর শজারুর মতো দাঁড়িয়ে উঠল চুলগুলো।
ট্রাকের পাটাতনের ওপিঠ থেকে ভেসে এল একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস, সেই সঙ্গে এক অস্ফুট গোঙানি—যেন কোনও অশরীরীর হাত তাকে স্পর্শ করতে আসছে।
জিপো উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘সরে যাও-যেতে দাও আমাকে! সরে যাও!’ পায়ের এলোপাথাড়ি ধাক্কায় ব্লেককে সরাতে চাইল সে। অন্ধ আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে বুকের খাঁচায়।
খেঁকিয়ে উঠে ওর পাঁজরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল ব্লেক, ‘থাম, শালা!’ জিপোর দম বন্ধ হয়ে এল আচমকা আঘাতে। বুকে হেঁটে আস্তে আস্তে ট্রাকের তলা তলা থেকে বেরিয়ে এল ব্লেক। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোট ঝাড়তে লাগল।
ব্লেকের ছাই-রঙা মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল মরগ্যান।’ কী হয়েছে?’ জানতে চাইল সে।
এমন সময় পাগলের মতো চেঁচাতে-চেঁচাতে ট্রাকের নীচ থেকে পড়িমড়ি করে বেরিয়ে এল জিপো। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েই ট্রাকের গায়ে লেগে ওর জামাটা আড়াআড়িভাবে অনেকটা ফেঁসে গেল। জিপোর মুখে রক্তশূন্যতার রাজত্ব, আঠালো রক্তের ফোঁটাগুলো হাতের ঘষা লেগে ওর গালে গলায় বিশ্রীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
‘ও-ও বেঁচে আছে!’ কোনওরকমে উচ্চারণ করল সে। গলা দিয়ে যেন স্বরই বেরোতে চায় না, ‘আমি স্পষ্ট শুনেছি! ও নড়ছে ট্রাকের ভেতরে!’
মরগ্যানের মুখভাব কঠিন হল!
‘তাহলেও টমাস এখন আর ট্রান্সমিটার ব্যবহার করতে পারছে না, তালাও বিকল করতে পারছে না। কারণ আমার মনে হয়, ওই তালা বা ট্রান্সমিটার চালু করার বোতামগুলো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে। আপাতত ব্যাটারিই যখন অকেজো, তখন আর ভয় কী? যাকগে, এসো জিপো, এই ইস্পাতের চাদরটা এবার ভাঙা যাক। তা না হলে টমাসকে শেষ করা যাবে না!’
‘না, না-আমি নয়!’ শিউরে উঠে পিছিয়ে গেল জিপো, ‘টমাসের কাছে রিভলভার আছে; আছে না? ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙলেই ও আমাকে গুলি করবে!’
মরগ্যান দোনামনা হয়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। জানলা দিয়ে আবার বাইরে চোখ রাখল সে। প্রধান সড়ক ও মাঝারি রাস্তার চৌমাথায় এসে পৌঁছেছে ওদের গাড়ি। কিটসন বুইকের গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে লাগল ...একসময় একেবারে থেমে গেল। মরগ্যান দেখল, তাদের সামনে প্রধান সড়কের ওপর দ্রুতগামী গাড়ির আধিক্য। রাস্তা আর আগের মতো নির্জন নয়।
যদি টমাস এখন রিভলভার চালিয়ে একটা হট্টগোলের সৃষ্টি করে, তাহলে রাস্তার লোকে নির্ঘাত সেই শব্দ শুনতে পাবে—এবং ওরা বিপদে পড়বে।
না, এ সমস্যার উত্তর মরগ্যানের জানা নেই।
ব্লেক বলল, ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক, ফ্র্যাঙ্ক। এই বড় রাস্তায় সব সময়েই পুলিশ টহল মারে। যদি গুলির শব্দ হয়, তাহলে ওরা শুনতে পাবে...’
‘হ্যাঁ—অপেক্ষা করতে হবে।’
জিপো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ক্যারাভ্যানের মেঝেতে উবু হয়ে বসল। ওর স্নায়ুর কাঁপুনি তখনও পুরোপুরি থামেনি। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের রক্ত মুছল সে। ঘেন্নায় তার গা-গুলিয়ে উঠেছে।
মরগ্যান এগিয়ে গেল ট্রাকের সামনের দিকে। ইস্পাত আবরণীর ওপর কান চেপে ধরে শুনতে চাইল শব্দ। কিন্তু কিছুই কানে এল না। কয়েক মুহূর্ত একইভাবে একাগ্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল মরগ্যান, তারপর তাকাল ব্লেকের দিকে।
‘উঁহু—কিছুই তো শুনতে পাচ্ছি না?’ তোমরা কী ঠিক শুনেছ?
‘হ্যাঁ—টমাসের নড়াচড়ার শব্দও পরিষ্কার শুনেছি।’
‘জিপো!’ ঘুরে দাঁড়াল মরগ্যান, ‘শুধু শুধু বসে থেকো না। উঠে একটু ট্রাকের তালাটা নেড়েচেড়ে দেখো। যত তাড়াতাড়ি তুমি কাজ শুরু করবে, তত তাড়াতাড়িই টাকাটা আমাদের হাতে আসবে।’
জিপো উঠে দাঁড়াল; মরগ্যানের পাশ কাটিয়ে এগোল ট্রাকের পিছন দিক লক্ষ করে।
বুইক ততক্ষণে আবার চলতে শুরু করেছে। পরদা সরিয়ে মরগ্যান দেখল অন্যান্য দ্রুতগামী গাড়িগুলো একের পর এক তাদের বুইক ও ক্যারাভ্যানকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে। কিটসন গাড়ির গতি ঘণ্টায় তিরিশ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে দেখে মরগ্যান স্বস্তি অনুভব করল। সমতল পিচ ঢালা রাস্তা ধরে মসৃণ গতিতে বুইক ও ক্যারাভ্যান নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে।
ট্রাকের পিছনটা পরীক্ষা করেই জিপো হতাশ হয়ে পড়ল। সে যা ভেবেছিল ঠিক তাই : ট্রাকের তালা খোলা যার তার কর্ম নয়। পিছনের দরজাটা এত নিখুঁতভাবে আঁটা যে কারও পক্ষে সেটাকে চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। দরজার ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটা গোলাকার চাকতি—সাধারণ সিন্দুকে যে ধরনের চাকতি থাকে অনেকটা সেইরকম। চাকতির পাশেই একটা ছোট্ট জানলা—গুলি প্রতিরোধকারী কাচে ঢাকা। সেখানে চোখ রাখতেই একটা সংখ্যা জিপোর নজরে পড়ল। সে জানে—বাইরে চাকতি ঘোরালেই ওই সংখ্যার পরিবর্তন ঘটবে—আসবে নতুন সংখ্যা। দরজা খুলতে গেলে কম্বিনেশন সংখ্যাটা তার জানা দরকার;—অর্থাৎ সেটা জানতে গেলে অনিবার্যভাবে প্রয়োজন হবে সুদক্ষ,নিশ্চিত, অচঞ্চল হাতের কাজ—এবং সেই সঙ্গে একাগ্র, ঘনীভূত শ্রবণ ক্ষমতার।
‘কী রকম মনে হচ্ছে?’ ট্রাকের পিছন দিকে এগিয়ে এল মরগ্যান। জিপোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।
‘তালাটা যে মজবুত তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক ঠিক কম্বিনেশন বের করতে গেলে প্রচুর সময় দরকার।’
‘দরজা ভাঙার কোনও পথ আছে?’
‘উঁহু—তা সম্ভব নয়। দেখেছ, কী জিনিস দিয়ে তৈরি? অত সহজে এ জিনিস ভাঙার নয়। হয়তো প্রচুর সময় পেলে দরজা কেটে খোলা সম্ভব।’
‘তুমি বরং কম্বিনেশন নম্বরটা চেষ্টা করে দেখো—যদি বের করতে পার। ক্যারাভ্যানের ছাউনিতে পৌঁছতে এখনও কম করে চল্লিশ মিনিট লাগবে; শুধু শুধু এ সময়টা বসে বসে নষ্ট করবে কেন? এখন থেকেই কাজ শুরু করে দাও।’
জিপো অবাক চোখে মরগ্যানের দিকে চেয়ে রইল—যেন মরগ্যানের মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে সে সন্দিহান।
‘এখন? এখন কী করে হবে? এই গোলমাল, গাড়ির দোলানির মধ্যে কাজ করা সম্ভব নয়।’ জিপোর স্বরে আকুতি ঝরে পড়ল! মরগ্যানকে ব্যাপারটা বোঝাতে চাইল সে, ‘তুমি বুঝতে পারছ না, ফ্র্যাঙ্ক চাকতি ঘোরানোর সময় আমাকে একমনে কান খাড়া করে শুনতে হবে। কিন্তু এই গাড়ি ঘোড়ার গোলমালের মধ্যে তা কি সম্ভব—তুমিই বলো?’
মরগ্যান হাতের একটা অধৈর্য ভঙ্গি করে কী একটা বলতে যাচ্ছিল—নিজেকে সামলে নিল। তার বুকের যন্ত্রণাটা ক্রমশই বাড়ছে, সেই সঙ্গে আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছে মরগ্যান। সে জানে, এখন জিপোকে চাপ দিলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না। তাই জিপোর ভাবনাকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে সে ভাবতে লাগল আহত টমাসের কথা—সত্যিই কি লোকটা বেঁচে আছে? নাঃ... একের পর এক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। আস্তে আস্তে বসে পড়ল মরগ্যান। বলা যায় না, কাজটাকে সে প্রথমে যতটা কঠিন মনে করেছিল, হয়তো কার্যক্ষেত্রে দেখা যাবে কাজটা তার চেয়েও বেশি জটিল।
আচমকা উন্মাদের মতো ইস্পাতের প্রাচীরে ঘুষি মেরে চলল মরগ্যান, চেঁচিয়ে উঠল অসহায়ভাবে, ‘এর মধ্যে রয়েছে দশ লক্ষ ডলার! ভেবে দেখো একবার! ঠিক এই দেওয়ালের ও পিঠেই আছে কুবেরের সম্পদ! দশ লাখ ডলার! যে করে হোক টাকাটা আমরা নেবই! তার জন্যে জাহান্নমে যেতেও আমি প্রস্তুত!’
ওদিকে কিটসন তখন বুইককে নির্দেশিত আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে, অন্যান্য গাড়ির গতিপথ বাঁচিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে সে গাড়ি চালাচ্ছে—জিনির দিকে নজর দেওয়ার সময় তার ছিল না : কিন্তু প্রধান সড়কে পৌঁছেই সে দেখল, তার সামনে নির্জন রাস্তা। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ির গতিপথ ঠিক করে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
জিনি সিটের গায়ে গা-এলিয়ে বসে ছিল। ওর চোখের দৃষ্টি বাইরে রাস্তার দিকে। ওদের অতিক্রম করে ছুটে চলা দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে ও আনমনা হয়েই লক্ষ করছিল। মুখের বিবর্ণতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি; শরীরের কাঁপুনিকে গোপন করলেও হাত দুটোকে আড়াল করেছে হাঁটুর ফাঁকে।
কিটসন ভাবছিল ট্রাকের ভেতরে পড়ে থাকা লোকটার কথা। ট্রাকের প্রতিরোধ ভেঙে ওই লোকটার দেহকে টেনে হিঁচড়ে বার করবার কথা মনে পড়তেই সে শিউরে উঠল। একটা মিশ্র অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল তার শরীরে। কিন্তু লোকটা কি বেতারে সাহায্য চেয়ে সংকেত পাঠিয়েছে?... হয়তো ওরা এখন সরাসরি এগিয়ে চলেছে পুলিশের পাতা-ফাঁদে ধরা দিতে!
‘টমাস যদি ইতিমধ্যে বেতারে খবর পাঠিয়ে থাকে, তাহলে’—মনের দুশ্চিন্তাকে মুখে প্রকাশ করতে পেরে অনেকটা হালকা বোধ করল কিটসন,—‘তাহলে হয়তো আমরা পুলিশের জালে ধরা দিতেই চলেছি।’
জিনি কাঁধ ঝাঁকাল। ঠোঁট উলটে জবাব দিল, ‘কিন্তু আমাদের কী করবার আছে বলো?’
‘কিছুই নেই।’ সহজভাবে কথাটা বললেও একটা অস্বস্তির কাঁটা কিটসনের মনে খচখচ করতে লাগল, ‘যাকগে, ক্যারাভ্যানে চড়তে হয়নি দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। নইলে গাড়ি চড়ার মজাটা টের পেতাম! ওর ভেতরে ওদের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে।’
‘শুনতে পাচ্ছ?’ আচমকা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল জিনি।
কিটসনের হৃৎপিণ্ড আচমকা এক ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল—-কাঁপতে লাগল থরথর করে! না, শব্দটা ও স্পষ্টই শুনতে পেয়েছে—দ্রুতবেগে ধেয়ে আসা পুলিশের সাইরেনের কান-ফাটানো আর্তনাদ ওদের দিকেই আসছে।
সমস্ত গাড়িই তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ধীরগামী যানবাহনের জন্যে নির্দিষ্ট পথের দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেল পলক ফেলতেই ।
সাইরেনের একটানা আর্তনাদ এবার আরও জোরে শোনা গেল। তারপরেই কিটসনের চোখে পড়ল দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা পুলিশের গাড়িটার ওপর। তার পিছন পিছন সার বেঁধে ছুটে আসছে চার-চারটে মোটর বাইক চড়া দ্রুতগামী পুলিশ, এবং তাদের পিছনে আরও দুটো পুলিশের গাড়ি। ঘণ্টায় আশি মাইলেরও বেশি বেগে গাড়িগুলো তাদের অতিক্রম করে ছুটে গেল মাঝারি সড়কের দিকে।
জিনি ও কিটসন, পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় করল।
ভাঙা গলায় বলল কিটসন, ‘একটুর জন্যে আমরা ওই রাস্তাটা পার হয়ে এসেছি। আর সামান্য দেরি করলেই পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হতো।’
জিনি ঘাড় নেড়ে তার বক্তব্যকে সমর্থন করল।
ওরা এগিয়ে চলল। আরও মাইলখানেক যাওয়ার পর ওরা হঠাৎই লক্ষ করল, ওদের সামনের গাড়িগুলো ক্রমশ গতিবেগ কমিয়ে আনছে। আরও দূরে নজর চালাতেই ওরা দেখল গাড়ির এক লম্বা সারি ধীরে ধীরে নিজেদের গতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
‘সামনের রাস্তা বন্ধ। নিশ্চয়ই পুলিশ রাস্তা আটকেছে।’ কিটসন অনুভব করল হৃৎপিণ্ডের অশান্ত, উত্তেজিত স্পন্দন, ‘তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি নেই দেখছি!’
‘চুপচাপ বসো; এখন সাহস হারালে চলবে না।’ জিনি ভরসা দিল তাকে। ওদের বুইকের সামনে গাড়িগুলো আস্তে আস্তে একেবারে থেমে গেল।
বহু সময় অপেক্ষা করার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করল। ঘর্মাক্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল কিটসন। দূরে রাস্তার অবরোধটা সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে দু-দুটো পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের ফাঁক দিয়ে ঠিক একটি একটি করে গাড়ি শম্বুকগতিতে এগিয়ে চলেছে। গাড়ি দুটোর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে ছজন পুলিশ অফিসার। প্রতিটি গাড়ি থামতেই ওদের মধ্যে একজন অফিসার ঝুঁকে পড়ছে গাড়ির ভেতর, চালকের সঙ্গে দু-একটা কথা বলেই তাকে এগোতে নির্দেশ করছে।
‘সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দাও আমিই ওদের সঙ্গে কথা বলব।’ জিনি বলল।
ওর সাহস দেখে অবাক হয়ে কিটসন ফিরে তাকাল জিনির দিকে। ক্যারাভ্যানের ভেতর ওরা তিনজন কী ভাবছে, সেটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করল সে। কারণ ওরা এই রাস্তা অবরোধের ব্যাপারটা দেখতেই পাবে না। সুতরাং বুইকের এই শম্বুকগতির কারণ অনুমান করতে গিয়ে ওরা বার বার ব্যর্থ হবে, সেই সঙ্গে হয়ে পড়বে সংশয়াচ্ছন্ন। ক্যারাভ্যানের ভেতরে তাকে যেতে হয়নি দেখে আরও একবার স্বস্তি পেল কিটসন। মনে মনে প্রার্থনা করল, ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওরা যেন কোনওরকম গোলমাল বাঁধিয়ে না বসে।
দশ মিনিট ব্যাপী স্নায়ু ছেঁড়া উৎকণ্ঠার পর ওরা এসে পৌঁছল অবরোধের সামনে। নির্বিকার মুখে, নিছক উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্কার্টটাকে হাঁটুর ওপরে তুলে ধরল জিনি। পায়ের ওপর পা-তুলে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।
কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারটি এগিয়ে এল জিনির দিকে। প্রথমে ওর মুখে ... তারপর ওর নগ্ন হাঁটুর দিকে চোখ রাখল সে। তার রোদে-পোড়া তামাটে মুখে ফুটে উঠল প্রশংসার হাসি। কিটসনের দিকে সে তাকাবারই প্রয়োজন মনে করল না।
‘কোত্থেকে আসছেন আপনারা জানতে পারি?’ বুইকের গায়ে হেলান দিয়ে, সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে জিনির দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল সে।
‘ডুকাস থেকে।’ বলল জিনি, ‘আমরা হানিমুন কাটাতে বেরিয়েছি। তা ব্যাপার কী, অফিসার? এত হই চই কিসের জন্যে?’
‘আপনারা কি ওয়েলিং কোম্পানির একটা ট্রাককে রাস্তায় দেখেছেন?’প্রশ্ন করল অফিসার, ‘ট্রাকটাকে দেখলে ভোলার কথা নয়; কারণ ওটার গায়ে বড় বড় হরফে ওয়েলিং কোম্পানির নাম লেখা আছে।’
‘কই, না তো! কোনও ট্রাকই আমাদের চোখে পড়েনি, তাই না আলেক্স?’ কিটসনের দিকে ফিরে সমর্থন খুঁজল জিনি।
কিটসন মাথা নাড়ল। তার হৃৎপিণ্ডের আছাড়ি-পিছাড়ি এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছল যে সে শব্দ অফিসারের কানে যাওয়ার আশঙ্কায় কিটসন নির্বাক হয়ে পড়ল।
‘কেন, আপনারা ট্রাকটা হারিয়ে ফেলেছেন বুঝি?’ হাস্য-তরল কণ্ঠে জানতে চাইল জিনি। বিনা কারণেই খুশি খুশি হয়ে হেসে উঠল।
জিনির হাঁটু থেকে চোখ না সরিয়েই অফিসারটি হাসল।
‘যাকগে, ছেড়ে দিন ওসব কথা। এবার আপনারা যেতে পারেন। আপনাদের হানিমুন শুভ হোক।’ কিটসনের দিকে চেয়ে চোখ টিপল অফিসার, ‘শুভ হওয়া সম্পর্কে আমার অন্তত কোনও সন্দেহই নেই, মশায়—জানি না আপনার আছে কি না! আচ্ছা, এবার তাহলে এগোন।’
গাড়ি নিয়ে সামনে এগোল কিটসন। একটু পরেই ওরা পুলিশের অবরোধ পার হয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়ল।
‘ওফ্,খুব জোর বেঁচে গেছি!’ হাঁফ ছাড়ল কিটসন। শক্ত মুঠোয় সে আঁকড়ে ধরল বুইকের স্টিয়ারিং, লোকটাকে তুমি দারুণ ঘোল খাইয়েছ, জিনি।’
স্কার্ট ঠিক করে হাঁটু ঢাকল জিনি, অধৈর্যভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।’ এসব লোককে বোকা বানানো খুব সহজ। দেখবার মতো কিছু একটা পেলেই হল; কাজ-টাজ ভুলে শুধু সেদিকে চেয়ে থাকবে।’ কথা বলতে বলতে হাতব্যাগ খুলে এক প্যাকেট সিগারেট বের করল ও। কিটসনের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘চলবে নাকি?’
‘দাও একটা।’
‘ঠোঁট চেপে সিগারেট ধরাল জিনি। তারপর সেটা তুলে দিল কিটসনের ঠোঁটে। সিগারেটের শেষ প্রান্তে জিনির লিপস্টিকের হালকা আস্তরণ কিটসনের চোখে পড়ল। এ সিগারেটে জিনির নরম ঠোঁটের ছোঁয়া আছে জেনে সে এক অদ্ভুত সুখ অনুভব করল। আমেজ ভরে এক গভীর টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়ল।
নিজের জন্যে আর একটা সিগারেট ধরাল জিনি।
পরবর্তী দশ মাইল ওরা দুজনেই চুপচাপ। একসময় জিনিই নীরবতা ভাঙল, ‘সামনের চৌ-মাথায় ডানদিকে ঘুরবে। সেই রাস্তাটাই ফন হ্রদের রাস্তা।’
কিটসন মাথা হেলাল। সামনের রাস্তায় নজর রাখতেই আকাশের দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সে দেখল, একটা হোভার প্লেন তাদের লক্ষ করে উড়ে আসছে। রাস্তা থেকে বড়জোর শ-তিনেক ফুট ওপর দিয়ে উড়ে আসছে প্লেনটা।
‘ওই দেখো!’
হাওয়ায় চড়া শিসের ঝাঁপটা তুলে হোভার প্লেনটা বুইক ও ক্যারাভ্যানের ঠিক ওপর দিয়েই বেরিয়ে গেল।
‘হুঁ, তাহলে দেখছি কাজ শুরু করতে খুব একটা দেরি করেনি!’ বলল জিনি। তারপর চোখ রাখল হাতঘড়ির দিকে। বারোটা বেজে দশ মিনিট। অথচ সেই পঁয়তাল্লিশ মিনিট জিনির কাছে ঠেকল পঁয়তাল্লিশ বছর?
ক্যারাভ্যানের ভেতরে মরগ্যান, জিপো ও ব্লেক—তিনজনেই শুনল হোভার প্লেনের বাতাস কেটে, শিস তুলে বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ার্ত জিপো হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ল মেঝেতে, ওর শরীর কুঁকড়ে গেল আতঙ্কে । শব্দ শোনামাত্রই সে বুঝেছে প্লেনটা তাদেরই খোঁজ করছে।
পুলিশি অবরোধের কাছে পৌঁছনোমাত্রই ওরা তিনজন উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিল মেঝেতে। মরগ্যান দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় বের করে এনেছিল ওর .৪৫। যদি কেউ ক্যারাভ্যানে ঢোকবার সামান্য চেষ্টাও করে, তবে তাকেই প্রথম মরতে হবে মরগ্যানের গুলিতে। বিনা যুদ্ধে ধরা দিতে সে রাজি নয়।
বুইক আবার যখন তার গতি ফিরে পেল, তখন ওরা তিনজনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। উৎকণ্ঠার পাষাণ ভার নেমে গেল ওদের বুক থেকে।
মরগ্যান কোট খুলে ক্ষতস্থানটা একবার দেখল। জিনির বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজটা রক্তে-ভিজে লাল হয়ে উঠেছে; সেইসঙ্গে ক্ষতস্থান থেকে আবার রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে।
মরগ্যানের সুনজরে আসার দুশ্চিন্তায় ব্লেক প্রথম থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল। এখন সুযোগ পেয়েই সে উঠে দাঁড়াল। জিপোকে ডিঙিয়ে এগিয়ে গেল ক্যারাভ্যানের তাকে রাখা ফার্স্ট এইড বক্সটার দিকে। বাক্সটা সর্বদা হাতের কাছে রাখার জন্যে শুরু থেকেই পীড়াপীড়ি করেছে মরগ্যান।
‘দাঁড়াও ফ্র্যাঙ্ক, আমি এখুনি ব্যান্ডেজটা ঠিক করে দিচ্ছি।’ বাক্সটা খুলতে খুলতে ব্যস্ত-স্বরে ব্লেক বলল।
মরগ্যানের মাথা তখন ঝিমঝিম করছে। একটা নিকষ-কালো পরদা যেন ঘিরে ফেলতে চাইছে তার চেতনাকে। রক্তপাতের পরিমাণ দেখে মনে মনে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে মরগ্যান। ব্লেকের কথায় কোনওরকমে মাথা হেলাল। তারপর ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে হেলান দিয়ে আরও আয়েশ করে বসতে চেষ্টা করল।
জিপো অস্বস্তি ও আশঙ্কা ভরা চোখে দেখতে লাগল মরগ্যানকে। ভাবল : ফ্র্যাঙ্ক যদি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহলে আমরা কী করব? যে কোনও জটিল পরিস্থিতিতেই মাথা ঠান্ডা রেখে সমাধান খুঁজে বের করার ব্যাপারে ওর জুড়ি নেই। সুতরাং ফ্র্যাঙ্ক মারা গেলে আমরা গিয়ে পড়ব অথৈ জলে।
মরগ্যানের সামনে ঝুঁকে বসে চিকিৎসার কাজ শুরু করল ব্লেক। মিনিট কয়েক পরে নতুন একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্ত বন্ধ করতে সক্ষম হল সে।
‘এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছল ব্লেক, ‘এক গেলাস চলবে নাকি?’
‘চলুক, ক্ষতি কী?’ তিক্তস্বরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘এখন তো মজা লোটবার সময়। অতএব খোলো বোতল...!’
তিনটে গেলাসে বেশ খানিকটা করে নির্জলা হুইস্কি ঢেলে জিপো ও মরগ্যানের দুটো এগিয়ে দিল ব্লেক।
যার-যার গেলাসে সবেমাত্র চুমুক দিয়েছে, এমন সময় হঠাৎই ওরা অনুভব করল ওদের বুইক বড় রাস্তা ছেড়ে আচমকা বাঁক নিল। পরমুহূর্তেই অসমতল রাস্তার প্রতিক্রিয়ায় ক্যারাভ্যানটা প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি খেয়ে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলল।
ওরা তিনজন চটপট নিজেদের গেলাস শেষ করে ফেলল। মরগ্যান দাঁতে দাঁত চেপে ক্যারাভ্যানের অনিশ্চিত দোলনি ও বুকের জমাট, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা সহ্য করে চলল। ক্যারাভ্যানের সঙ্গে সঙ্গে একই ছন্দে দুলতে লাগল তার অসহায় দেহটা!
মিনিটখানেক পরে বুইকের গতি ক্রমশ কমে এল। একসময় একেবারে থেমে গেল গাড়িটা।
কিছুক্ষণ পর খুলে গেল ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে জিনি ও কিটসন।
‘কোনও রকম অসুবিধে হয়নি তো?’ চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল কিটসন। মরগ্যানের মুখের বিবর্ণ পাণ্ডুর প্রলেপ তার মনে জাগিয়ে তুলল দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।
মরগ্যান কিটসনকে অতিক্রম করে চোখ রাখল বাইরের পরিবেশে। ওরা এখন রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়েছে এক ফার বনের শীতল ছায়াঘন রাজত্বে। তিরিশ ফুট দূরে মৃত অজগরের আঁকাবাঁকা শরীর নিয়ে শুয়ে আছে নির্জন রাস্তাটা। পাহাড়কে পাকে-পাকে জড়িয়ে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ফন হ্রদের দিকে। এখান থেকে ফন হ্রদের দূরত্ব খুব বেশি হলে ছ-মাইল।
মাথার ওপর শোনা যাচ্ছে কোনও উড়োজাহাজের বিরক্তিকর গর্জন। এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলে যে বিপদের সম্ভাবনা আছে, সেটা ওই শব্দ শুনেই বুঝতে পারল মরগ্যান।
‘টমাস এখনও বেঁচে আছে!’ ট্রাকের দিকে লক্ষ্য করে আঙুল ঝাঁকাল মরগ্যান, ‘ওকে যে করে হোক একেবারে শেষ করতে হবে।’ কিটসন মনে মনে টমাসের অবস্থাটা কল্পনা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল, ‘এই জায়গাটা বেশ নির্জন-সুতরাং টমাসকে খতম করার পক্ষে উপযুক্ত পরিবেশ।’ হিংস্র ব্যঙ্গে বিকৃত হল মরগ্যানের মুখ, ‘ক্যারাভ্যান বন্ধ করে তোমরা সরে পড়ো। তুমি বরং বুইকের একটা চাকা খুলে এমন ভান করো, যেন লোকে মনে করে তোমাদের গাড়ির চাকা ফেঁসে গেছে। যদি কোনও গাড়ি-টাড়ি আসতে দেখো, ক্যারাভ্যানের গায়ে টোকা মেরে আমাদের সাবধান করে দেবে। জিনি,তুমি রাস্তার ধারে গিয়ে বোসো। সঙ্গে খাবারের বাক্সটা নিয়ে যাও। ওখানে গিয়ে এমন ভাব করবে, যেন তুমি পিকনিকে এসেছ, সময় হওয়াতে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করছ তোমাদের দুজনের জন্যে। যাও, চটপট কাজে লেগে পড়ো।’
নির্বিকার মুখে খাবারের বাক্সটা জিনির হাতে তুলে দিল ব্লেক।
কিটসন এতক্ষণে যেন প্রতিবাদ করার শক্তি ফিরে পেল, ‘টমাসকে নিয়ে কী করবে তোমরা? খুন করবে ওকে?’
মরগ্যানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল নিষ্ঠুর বাঁকা হাসি।
‘নয়তো কি জামাই আদর করব? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে যা বলছি তাই করো।’
‘থামো!’ তীক্ষ্ণ কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো, ‘আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। টমাসকে খুন করার মধ্যে আমি নেই। আমার কাজ ট্রাকের তালা খোলা—তাই খুলব, ব্যস! অন্য কিছুর মধ্যে আমি নাক গলাতে রাজি নই...’
‘চুপ করো!’ খিঁচিয়ে উঠল মরগ্যান। .৪৫ পলকে উঠে এল তার হাতে, শাসাতে লাগল ভয়ার্ত জিপোকে, ‘ইস্পাতের চাদরটা তোমাকেই খুলতে হবে, জিপো! ভালো চাও তো-যা বলছি তাই করো! নইলে তোমার ওই ভুঁড়িকে সীসে দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেব।’
মরগ্যানের মুখের নৃশংস কুটিল অভিব্যক্তি জিপোর ফুসফুসে যেন বরফ ছড়িয়ে দিল। দু-হাত সামনে ছড়িয়ে ককিয়ে উঠল জিপো, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, ফ্র্যাঙ্ক। আমাকে এখান থেকে বেরোতে দাও।’
মরগ্যান ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘আমার কথা তোমার কানে যায়নি? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে বুইকের চাকা খুলতে শুরু করো!’
কিটসন ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে ফিরে চলল। মানসিক উত্তেজনা ওর স্নায়ুমণ্ডলীকে অস্থির করে তুলছে, মুখের রং-কাগজের মতো সাদা। বুইকের পিছনের ঢাকনা তুলে ও একটা স্ক্রু-জ্যাক বের করে আনল। আসন্ন নৃশংস অধ্যায়ের কথা ভেবে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। কিটসন জ্যাক নিয়ে এগিয়ে গেল বুইকের সামনের চাকার দিকে। জ্যাক ঘুরিয়ে গাড়িটাকে মাটি থেকে তুলতে লাগল সে...
মরগ্যান নির্লিপ্ত শীতল স্বরে তখন জিপোকে সাবধান করে দিচ্ছে, ‘শোনো জিপো, এখন থেকে তুমি তোমার টাকার অংশ উপার্জন করার চেষ্টা করো! এ পর্যন্ত তো শুধু হাওয়ায় গা-লাগিয়ে ঘুরেছ। কিন্তু এখন আর ওটি হচ্ছে না। সুতরাং এবার কঠিন কাজের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নাও। ইস্পাতের এই হতচ্ছাড়া ঢাকনাটা তোমাকে খুলতেই হবে!’
সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে জিপো এগিয়ে এল ইস্পাত আবরণীর কাছে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওটার দিকে।
ব্লেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে জিপোকে লক্ষ করতে লাগল। একবার সে দেখছে জিপোর দিকে, আবার মরগ্যানের দিকে...আবার জিপোর দিকে। চোখের ভাষায় অস্বস্তির ইঙ্গিত।
জিপো দেখল, ইস্পাতের চাদরটা তেমন মজবুত নয়; ট্রাকের দরজার মতো এটার পিছনে তেমন যত্ন নেয়নি ওয়েলিং এজেন্সি।
দু-পলক দেখে মরগ্যানও সেটা বুঝতে পারল।
‘যাও, ছোট শাবল আর হাতুড়িটা নিয়ে এসো! এটাকে ভেঙে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না।’
জিপোর সারা শরীর কুঁকড়ে গেল। ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙার পরের মুহূর্তটার কথা মনে পড়ল ওর। কর্কশ স্বরে সে বলে উঠল, ‘টমাস ভেতরে বসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। আমাকে দেখামাত্রই ও সরাসরি গুলি করবে, এক সেকেন্ডও দেরি করবে না।’
মরগ্যান খেঁকিয়ে উঠে জবাব দিল, ‘যা বলছি, চটপট করো!’
যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স খুলে হাতুড়ি নিল জিপো। তারপর থেকে একটা ছোট শাবল নিয়ে এগিয়ে এল। ওর হাত এত বিশ্রীভাবে কাঁপছে, মনে হচ্ছে এখুনি বোধ হয় শাবল আর হাতুড়িটা ওর হাত থেকে খসে পড়বে।
‘শিগগির করো! জলদি!’ অধৈর্য স্বরে চেঁচিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘এত ভয় পাওয়ার কী আছে তা-তো বুঝতে পারছি না!’
‘টমাস যদি আমাকে গুলি করে তাহলে ট্রাক খুলবে কে?’ উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল জিপো; অস্ত্র হিসেবে মরগ্যানের নাকের ডগায় ছুড়ে মারল ওর তুরুপের তাস। কাজ হল।
ক্রোধে, বিরক্তিতে গভীর নিঃশ্বাস নিল মরগ্যান, ‘দাও, ও দুটো আমার হাতেই দাও!...শালা, ভিতুর ডিম ‘হিংস্রভাবে দাঁত বের করল সে, ‘দাঁড়াও, তোমাকে আর তোমার ওই নদের চাঁদ ইয়ারকে আমি শায়েস্তা করছি। তোমরা দুজন যদি মনে করে থাক,পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকলেই দু-লাখ ডলার করে পাওয়া যাবে, তবে ভীষণ ভুল করবে!’
সেই মুহূর্তে যদি জিপোকে এই ভয়াবহ পরিবেশ থেকে মুক্তি দিয়ে পৌঁছে দেওয়া হত ওর শান্ত নির্জন কারখানায়, তাহলে খুশি মনেই ও নিজের টাকার অংশ ছেড়ে দিয়ে ফিরে যেত ওর অভাব-অনটনের সংসারে—সুখের সংসারে।
হাতুড়ি আর শাবলটা জিপোর হাত থেকে হ্যাঁচকা মেরে কেড়ে নিল মরগ্যান। শাবলটাকে ইস্পাতের ঢাকনা ও জানলার জোড়ের মুখে ঠেকিয়ে হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করল। শাবলটা ইস্পাতের চাদরকে সামান্য ঠেলে ঢুকে গেল ভেতরে। ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা-মেরে শাবলটা যখন ভেতরে ইঞ্চি ছয়েক ঢুকে গেল, তখন থামল মরগ্যান। হাতুড়ি ফেলে ব্লেকের দিকে ঘুরে তাকাল।
‘জিপোর মতো তুমিও কি ভয়ে কেলিয়ে পড়লে?’
কাঁধের খাপ থেকে .৩৮ রিভলভারটা হাতে নিয়ে মরগ্যানের কাছে সরে এল ব্লেক, ‘তুমি রেডি হলেই আমি রেডি।’ নির্বিকার কঠিন মুখে জবাব দিল সে। চোখজোড়ায় দৃঢ় সিদ্ধান্তের সুনিশ্চিত আভাস।
মরগ্যান দাঁত বের করে বাঁকাভাবে হাসল, ‘কী ব্যাপার, তুমি কি এখন নিজের দু-লাখ ডলারকে বাঁচাতে চাইছ?’
‘বাজে কথা ছাড়ো, ফ্র্যাঙ্ক; কাজ শুরু করো। টমাসের মোকাবিলা করার জন্যে আমি রেডি।’
মরগ্যান শাবলের প্রান্তে সবলে চাপ দিতে যাবে, ভেসে এল পরপর তিন বার ক্যারাভ্যানের গায়ে টোকা দেওয়ায় শব্দ। মুহূর্তে মরগ্যান যেন জমে পাথর হয়ে গেল।
‘সাবধান! কেউ আসছে!’ চাপা স্বরে বলে উঠল সে।
জানলার কাছে সরে গিয়ে পরদা সরিয়ে উঁকি মারল ব্লেক।
জিনি ঠিক রাস্তার ধারেই গুছিয়ে বসেছিল; ওর কাছ থেকে গজ কয়েক দূরেই এসে দাঁড়িয়েছে একটা গাড়ি, তার পিছনে একটা ক্যারাভ্যান। সম্ভবত, তাদের মতোই আরও কেউ ক্যারাভ্যান নিয়ে চলেছে ফন হ্রদের দিকে।
একজন রোদে-পোড়া লালমুখো মধ্যবয়স্ক লোক খুশি খুশি মুখে নেমে এল গাড়ি থেকে। তার সঙ্গিনী একজন সুশ্রী মহিলা ও একটি বছর দশ-বারোর বাচ্চা ছেলে। ওরা গাড়িতে বসেই বুইক ও ক্যারাভ্যানকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে লক্ষ করতে লাগল। ব্লেকের কানে এল মধ্যবয়স্ক লোকটার হেঁড়ে গলা, ‘কী ব্যাপার? চাকা বিগড়েছে মনে হচ্ছে?’ জিনিকে লক্ষ করে বলল সে, ‘বলেন তো সাহায্য করি—’
জিনি তার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল, ‘না, না—তার কোনও দরকার। আমার স্বামী একাই পারবেন। ধন্যবাদ;’
‘আপনারা কী ফন হ্রদের দিকেই যাচ্ছেন?’ জানতে চাইল লোকটা!
‘হ্যাঁ।’
‘আমরাও সেখানেই যাচ্ছি; গত গ্রীষ্মের ছুটিতেও গিয়েছিলাম। আপনারা আর কোনওদিন ওখানে গেছেন নাকি?’
‘উহুঁ।’ মাথা নাড়ল জিনি।
‘দেখবেন, খুব ভালো লাগবে জায়গাটা। এক কথায় চমৎকার! তার ওপর সুব্যবস্থা তো আছেই! ওহ্ হো,আমার নামটাই আপনাকে বলা হয়নি—’ লজ্জায় জিভ কাটল লোকটা! যেন ভীষণ একটা অপরাধ করে ফেলেছে, ‘আমার নাম ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড। ওই যে গাড়িতে বসে আছে—আমার স্ত্রী—মিলি, আর ওঁর পাশেই আমার ছেলে। আপনাদের ছেলেমেয়েদের দেখছি না?’
ব্র্যাডফোর্ডের কথায় জিনি খোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। ওর হাসির স্বাভাবিকতা ব্লেককেও অবাক করল। সত্যি, মেয়েটা অভিনয় জানে বটে!
জিনির হাসিতে ব্র্যাডফোর্ড অপ্রস্তুতে পড়তেই ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না, এখনও পর্যন্ত নেই। আমরা হানিমুন কাটাতে ফন হ্রদে যাচ্ছি।’
এবার ব্র্যাডফোর্ডের হাসবার পালা। সে নিজের ঊরুতে এক প্রচণ্ড চাপড় কষিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসির দমকে তার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল।
‘ও—দারুণ দিয়েছেন! আরে শুনছ, মিলি! ওরা কোথায় হানিমুন কাটাতে যাচ্ছ, আর আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করছি ওদের ছেলেমেয়ে আছে কি না! হোঃ-হোঃ-হোঃ...।’
‘তোমার সব সময়েই ওই রকম।’ গাড়ি থেকে বলে উঠলেন মহিলাটি। স্বামীর নির্বুদ্ধিতায় তিনি যে যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন, সেটা তার কোঁচকানো ভুরু দেখলেই বোঝা যায়, ‘চলে এসো, ফ্রেড—তুমি শুধু শুধু ওকে বিরক্ত করছ।’
ব্র্যাডফোর্ড সরলভাবে একগাল হাসল, ‘হ্যাঁ—ঠিক বলছ। আমার ও তাই মনে হয়...আচ্ছা, তাহলে চলি মিসেস...এই দেখুন কাণ্ড, আপনার নামটা তো একেবারেই জানা হয়নি!’
‘হ্যারিসন। আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’
তাতে কী হয়েছে। হয়তো ফন হ্রদে গিয়েই আমাদের আবার দেখা হবে, তখনই এই বকেয়া আলাপের পালাটা সেরে নেওয়া যাবে। আর নিতান্তই যদি দেখা না হয়, তাহলে আপনাদের শুভ মধুচন্দ্রিমা কামনা করি।’
‘ধন্যবাদ!’
ব্র্যাডফোর্ড পায়ে পায়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল। হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল পাহাড়ি রাস্তা ধরে।
মরগ্যান ও ব্লেক অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে।
‘এখন যদি টমাস রিভলবার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে।’ ব্লেক চিন্তিতভাবে বলে উঠল।
‘পেলে পাক।’ মরিয়া হয়ে বলল মরগ্যান, ‘এই বনে কেউ শিকার করে না? ওরা ভাববে কোনও শিকারী শিকারের পিছনে ছুটছে।’ শাবলটা শক্ত হাতে চেপে ধরল সে, ‘এসো, কাজ শুরু করা যাক।’
এমন সময় জানলা দিয়ে ডেকে উঠল কিটসন, ‘কী ব্যাপার, কী ব্যাপার, কী হচ্ছে ভেতরে?’
মরগ্যান চাড় দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, তুমি যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। কাউকে এদিকে আসতে দেখলেই আমাদের সাবধান করে দেবে। আমরা আর দেরি করতে পারছি না!’
কিটসন শিউরে উঠে কয়েক পা-পিছিয়ে গেল। ওর সারা শরীর যেন হঠাৎ গুলিয়ে উঠল।
মরগ্যান ক্যারাভ্যানের জানলাগুলো বন্ধ করে দিল, ব্লেকের দিকে ফিরে ঘাড় নাড়ল, ‘এসো এড—তাহলে শুরু করা যাক।’
‘চলো।’
মরগ্যান শাবলটা ধরে নীচের দিকে এক হ্যাঁচকা মারতেই জিপো ভয়ে মুখ ঢাকল দু-হাতে।
ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাক চালক ডেভ টমাস পড়ে ছিল ট্রাকের মেঝেতে। চৌচির, রক্তাক্ত চোয়ালের যন্ত্রণা এখন সমস্ত অনুভূতিকে অসাড় করে দিয়েছে। শুধু অপরাজিতের একরোখা সাহসকে সম্বল করে সে কোনওরকমে বেঁচে আছে।
মরগ্যানের রিভলভারের গুলি তার মুখের নিম্নাংশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যাওয়ার পথে টমাসের চোয়ালের হাড় চুরমার করে, জিভকে দু-ফালি করে সরাসরি বেরিয়ে গেছে গুলিটা।
এই আকস্মিক আঘাত ও যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়া টমাসের মস্তিস্কের দীর্ঘ সময়ের জন্যে আচ্ছন্ন রেখেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তার জ্ঞান ফিরেছে। সঙ্গে সঙ্গেই টমাস অনুভব করেছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সে ভীষণ দুর্বল পড়েছে।
চেতন ও অচেতন জগতের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে চেষ্টা করল টমাস। চালকহীন ট্রাকটা কী করে ছুটে চলেছে, ভেবে সে অবাক হল।
আয়ু যে ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সেটা বুঝতে দেরি হল না তার। কারণ এইভাবে এক নাগাড়ে রক্তপাত হওয়ার পরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যে অত্যন্ত ক্ষীণ তা টমাস জানে। তবে মরতে সে ভয় পায় না। এখন যদি কোনও বিচিত্র মন্ত্রবলে সে বেঁচেও ওঠে, তবুও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না৷ কারণ একটা ফাটা চৌচির চোয়াল নিয়ে ও আধখানা জিভ নিয়ে লোকসমাজে কী করে মুখ দেখাবে সে? তাছাড়া বোবা হয়ে বাকি জীবনটা কাটানোর যন্ত্রণা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না৷
এবার টমাসের মনোযোগ আকৃষ্ট হল ট্রাকের এপাশ-ওপাশ টলমল দোলানির দিকে৷ কিছুক্ষণ চিন্তার পর সে সিদ্ধান্ত নিল, ট্রাকটাকে কোনও গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ নাঃ, মতলবটা মন্দ নয়, কিন্তু এরা কি পারবে শেষ রক্ষা করতে? আপাতত তার কর্তব্য হল পুলিশকে সিগন্যাল পাঠানো, পুলিশকে জানানো ট্রাকের অবস্থিতির কথা৷ যেখানেই ওটা লুকোনো থাকুক না কেন, পুলিশ ঠিক খুঁজে বের করবেই৷
টমাসের মনে হল, বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে এখুনি তার কাজটা করা উচিত। কিন্তু বেতার যন্ত্রটা ঠিক তার পিছনে-ওপর দিকে। অর্থাৎ ওটার নাগাল পেতে হলে তাকে একপাশে হাত বাড়াতে হবে ওপরে।
এতক্ষণ চুপচাপ পড়ে থাকার ফলে যন্ত্রণার অনুভূতিটা ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছিল, কিন্তু পাশ ফেরামাত্রই আবার নতুন করে শুরু হবে অসহ্য যন্ত্রণা।
সুতরাং চোখ বুজে একইভাবে নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল টমাস। ভাবতে লাগল নেকড়ের হিংস্রতায় ভরা মুখটার কথা, সাপ কালো, শীতল চোখ জোড়ার কথা—সেই লোকটার কথা, যে তাকে গুলি করেছে। লোকটার পরিচয় ভেবে অবাক হল টমাস। আর ওই মেয়েটা, যে স্পোর্টস কারটা চালাচ্ছিল সেও নিশ্চয়ই এর মধ্যে আছে। ওদের পুরো মতলবটা প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে ওই দুর্ঘটনার দৃশ্যটা। কিন্তু তবুও ডার্কসন কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চায়নি। ও সরাসরি বেতারে খবর দিয়েছিল এজেন্সিতে, জানতে চেয়েছিল তাদের কর্তব্য। তা না হলে এজেন্সি তাদের কর্মদক্ষতা ও বিচারবুদ্ধির ওপর সন্দিহান হয়ে পড়ত। মোটের ওপর, এজেন্সির নির্দেশ পেয়েই তারা ওই দুর্ঘটনার তদন্ত করতে এগিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য তাতে পরিণতির খুব একটা অদল-বদল কিছু হয়নি।
কিন্তু ওই ফুলের মতো কচি মেয়েটা কী করে এই নৃশংস ভয়ঙ্কর কাজে জড়িয়ে পড়ল! তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে ভাবল টমাস।
মেয়েটার কথায় টমাসের মনে পড়ল ক্যারির কথা—তার তেরো বছরের ছোট্ট মেয়েটার কথা।
ক্যারির মাথার চুল অনেকটা ওই মেয়েটার মতোই, তামাটে। কিন্তু ওর মতো ক্যারি অতটা সুন্দরী নয়। অবশ্য ক্যারির বয়েস এখনও অনেক কম—বড় হলেও যে আরও সুন্দরী হবে না সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। সেটা নেহাতই ভাগ্যের ব্যাপার।
ক্যারি তাকে খুব শ্রদ্ধা করে, বলে, ওর বাবার মতো সাহসী লোক আর নেই। নইলে দশ লক্ষ ডলার ভর্তি একটা ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা!
টমাস ভাবল : ক্যারি যদি আমাকে এই অবস্থায় এখানে পড়ে থাকতে দেখত; তাহলে আমাকে ঘিরে ওর কাচের আবরণে ঢাকা সমস্ত স্বপ্নই ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। সামান্য একটু ব্যথার ভয়ে, আমি পাশ ফিরে বেতারে খবর পাঠাতে পারছি না দেখলে লজ্জায় ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসত।
ট্রাকের টাকা রক্ষা করার জন্যে টমাস যদি জীবনও দিয়ে দেয়, তবুও ক্যারি এতটুকু দুঃখ পাবে না৷ বরং বন্ধুদের বলবে তার বাবা কিভাবে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে৷ না, ওর কাছে ছোট হতে টমাস পারবে না৷
এখন ট্রাক বাঁচাতে তার করণীয় কাজ দুটো: প্রথমত, বেতারে বিপদ সংকেত ছড়িয়ে দেওয়া৷ দ্বিতীয়ত, বোতাম টিপে সময়-নির্ভর তালাকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে অকেজো করে দেওয়া৷
তালাকে অকেজো করার বোতামটা রয়েছে স্টিয়ারিং হুইলের ঠিক পাশে৷ ওটার নাগাল পেতে হলে টমাসকে উঠে বসে সামনে ঝুঁকে পড়তে হবে৷ কিন্তু সেই সামান্য নড়াচড়ায় তার ভাঙা চোয়ালের যে কী হাল হবে, সেকথা ভেবে সে ঘামতে লাগল৷
ক্যারি ট্রাক রক্ষা করার ব্যাপারে টমাসকে সমর্থন করলেও, হ্যারিয়েট—তার স্ত্রী যে করবে না, সেটা টমাস ভালোই জানে৷ হ্যারিয়েট বুঝবে টমাসের বর্তমান অবস্থাটা, কিন্তু ক্যারি যে ছোট, ক্যারি যে অবুঝ! এজেন্সিও চাইবে টমাস আগে ট্রাক রক্ষা করুক, পরে তার শরীর নিয়ে ভাববে, কিন্তু তার অবস্থাটা ওরা কেউ বুঝতে চাইবে না৷ তবে সে যদি মরিয়া হয়ে ট্রাক বাঁচানোর চেষ্টা করে, তবে এজেন্সি হয়তো তার কাজে খুশি হয়ে হ্যারিয়েট ও ক্যারির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে৷ অবশ্য সে বিষয়ে টমাস পুরোপুরি নিশ্চিত নয়৷ কিন্তু তার অকর্মণ্যতার ফলে যদি এই লুটেরার দল ট্রাকের তালা ভেঙে সমস্ত টাকা হাতিয়ে নেয়, তবে এজেন্সি মনে করবে ট্রাক রক্ষা করার যথাযথ চেষ্টা টমাস করেনি, এবং তার ফলে হ্যারিয়েটকে বাকি জীবনটা কষ্ট করেই কাটাতে হবে৷ হয়তো পেনসনের কোনও টাকাই ওরা তার স্ত্রীকে দেবে না!
সে ভাবল: অতএব, নাও এবার একটু সাহসী হও৷ বেতার সংকেত পাঠানোই যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তখন সেটাই প্রথমে চালু করার চেষ্টা করো৷ শুধু তো পাশ ফিরে হাত উঁচু করে চাবিটা টিপে দেওয়া, ব্যস! বোতামটা ঠিক তোমার মাথার ওপরেই৷ সুতরাং অসুবিধের কিছু নেই: ওটা চালু করে দাও, তার দেখতে দেখতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশের গাড়িতে ছেয়ে যাবে গোটা এলাকাটা৷ তখন লোকের চোখে তুমি হয়ে থাকবে সাহসিকতার এক জ্বলন্ত নিদর্শন৷ একবার চেষ্টা করেই দেখো না, সামান্য একটু কষ্ট—এই তো?
কিন্তু সাহস করে প্রস্তত হতে হতেই টমাসের লেগে গেল মিনিট পাঁচেক৷ অবশেষে সে যখন পাশ ফিরতে চেষ্টা করল, সঙ্গে-সঙ্গেই যন্ত্রণার তীব্র ছুরি কেটে বসল তার হৃৎপিণ্ডে৷ সে মুহূর্তে আবার জ্ঞান হারাল টমাস৷ স্থির হয়ে পড়ে রইল তার অসাড় দেহটা৷ হাতুড়ি পেটার অপ্রত্যাশিত বিকট শব্দে টমাসের ঘুম ভাঙল৷ জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলল সে৷ তার চোখের সামনেই ড্রাইভারের জানলার ওপর ইস্পাতের ধাতব আবরণ৷ তার চোখে পড়ল, জানলা ও ইস্পাতের পাতের ফাঁক দিয়ে এসে পড়া এক চিলতে মধ্যাহ্নের আলো৷ দৃষ্টি ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে আসতেই সে দেখল, একটা শাবল আংশিক ঢুকে রয়েছে ইস্পাত আবরণী ও জানলার ফাঁকে৷
তাহলে ওরা আমাকে শেষ করতে আসছে৷ ভাবল টমাস৷ যাক, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই৷ কিন্তু যদি একটা সুযোগও আমি পাই, তাহলে আমার সঙ্গে ওদের একজনকেও স্বর্গের সিঁড়িতে পা-রাখতে হবে৷ আমার পক্ষে এ অবস্থায় এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়৷ তাছাড়া মাইকের মৃত্যুর প্রতিশোধ যদি আমি না নিই, তাহলে সে আমার সম্বন্ধে ভাববে কী! ওদের জনা দুয়েককে শেষ করতে পারলে খুশিই হতাম, কিন্তু যে অবস্থায় আমি পড়ে আছি, তাতে একজনকে খতম করতে পারলেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব৷
দুর্বল হাতে সে নিজের রিভলভার বের করার চেষ্টা করল৷ মরগ্যান গুলি করার সময় রিভলভার ব্যবহারের সুযোগ টমাস পায়নি৷ তাই এবারে সে আগে থেকেই প্রস্তুত হতে চায়৷
টমাসের রিভলভার .৪৫ অটোমটিক কোল্ট৷ সুতরাং স্বভাবতই একটু ভারী৷ কিন্তু খাপ থেকে রিভলভারটা হাতে নিতেই তার মনে হল যেন অসহ্য-ভারে হাত ভেঙে পড়তে চাইছে৷ আরেকটু হলেই পড়েও যাচ্ছিল বন্দুকটা৷ অতিকষ্টে হাত নামিয়ে সে ওটাকে নামিয়ে আনল তার ডান পাশে৷ বন্দুকের নলটা তাক করে রইল ট্রাকের জানলার দিকে৷ যে জানলায় দেখা যাচ্ছে শাবলের আংশিক অগ্রভাগ৷
ঠিক আছে শালা, এসো এবার! ভাবল টামাস, আমার একদিন কি তোমার একদিন! এমন চমকে দেব, জীবনভর ইয়াদ রাখবে! আর বেশিক্ষণ আমি অপেক্ষা করতে পারছি না৷ তাড়াতাড়ি করো! মরবার আগে জীবনের শেষ যুদ্ধে আমি জিততে চাই৷
এমন সময় তার কানে এল কারও চাপা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর, ‘সাবধান! কেউ আসছে!’
এরপর দীর্ঘ নীরবতা৷ টমাস অনুভব করল, আচ্ছন্ন অনুভূতি ক্রমশ তার মস্তিষ্ককে স্থবির করে দিতে চাইছে৷ একমাত্র মনের জোরকে সম্বল করে লড়ে চলল সে৷ কোনওরকমে জাগিয়ে রাখল তার মনের চেতনা৷
আপন মনেই উচ্চারণ করল টমাস, ‘তাড়াতাড়ি করো! তাড়াতাড়ি! এ অবস্থা আমি আর সইতে পারছি না!’
হঠাৎই টমাস শুনতে পেল কারও উত্তেজিত স্বর, ‘এখন যদি টমাস রিভলভার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে৷’
আরেকজন বলে উঠল, ‘পেলে পাক৷ এই জঙ্গলে কেউ কি শিকার করে না? ওরা ভাববে কোনও শিকারী শিকারের পেছনে ছুটছে৷ এসো, কাজ শুরু করা যাক৷’
টমাসের হাতে কোল্ট রিভলভার ক্রমশ ভারী ঠেকছে৷ সে বুঝল, আর বেশিক্ষণ জানলা লক্ষ করে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হবে না৷ ওরা ট্রাকের সাইড-ডোর না খোলা পর্যন্ত তাকে এইভাবে অপেক্ষা করতে হবে৷ তারপর দরজা খুললেই টমাস সরাসরি গুলি চালাবে৷ তখন আর সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না৷
তার কানে এল শাবলে চাড় দেওয়ার ধাতব শব্দ৷ টমাস প্রতীক্ষায় রইল৷ যন্ত্রণায় তার শ্বাস-প্রশ্বাস বুঝি রুদ্ধ হয়ে আসবে৷ কিন্তু কোণঠাসা হিংস্র, চিতার মতো সে একাগ্রভাবে অপেক্ষা করে চলল৷
‘আরেকটা শাবল নিয়ে এসো৷’ কারও স্বর শোনা গেল, আমাকে সাহায্য করো৷’
আর একটা শাবলের অগ্রভাগ জানলার ফাঁকে অবির্ভূত হল৷ বেশ কিছুক্ষণ ঠুকঠাক শব্দের পর সড়াৎ করে ওপরে উঠে গেল ইস্পাতের চাদর৷ না, দুটো শাবলে কাজ হয়েছে৷ ভাবল টমাস৷ চার চোখের দৃষ্টি আবদ্ধ হল ট্রাকের খোলা জানলায়৷
মরগ্যান আর ব্লেক দুজনেই সরে দাঁড়াল জানলার কাছ থেকে। দরজার দুপাশে ওরা কান খাড়া করে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কোনওরকম শব্দই ওদের কানে এল না। ওরা তাকাল পরস্পরের দিকে—মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
‘শালা চালাকি করছে না তো?’ হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল ব্লেক।
‘হতে পারে।’
দরজার কাছ থেকে নিজের দেহকে যথাসম্ভব সরিয়ে রেখে জানলা দিয়ে ভেতরে হাত গলিয়ে দিল মরগ্যান। হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজে চলল দরজার খোলার হাতলটা।
টমাস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করতে লাগল মরগ্যানের কার্যকলাপ। তার চোখ আধবোজা; তর্জনী চেপে বসেছে রিভলভারের ট্রিগারে; সাফল্যের অনিশ্চয়তায় তার মন সামান্য শঙ্কিত।
অবশেষে দরজাটা খুলে ফেলল মরগ্যান। দরজার পাল্লাটা ঘুরে গিয়ে থামল ব্লেকের সামনে। সুতরাং ইচ্ছে করলেও ব্লেকের পক্ষে ট্রাকের ভেতরে নজর চালানো সম্ভব হল না। একদিকে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল,অন্যদিকে ট্রাক, এবং সামনে ট্রাকের খোলা দরজার পাল্লা-একরকম বন্দিই হয়ে পড়ল ব্লেক।
মরগ্যান ট্রাকের ভেতর চোখ রাখল৷ বিদ্যু্গতিতে ভেতরে উঁকি মেরেই বাইরে বের করে আনল শরীরটাকে৷
সেই কয়েক মুহূর্তে সে দেখল, একটা লোক বিশ্রস্তভাবে ট্রাকের মেঝেতে পড়ে রয়েছে, চোখ তার বোজা, মুখের রং ছাইয়ের মতো ফ্যাকাসে৷
মরগ্যানের শ্বাস-প্রশ্বাস দাঁতের ফাঁক দিয়ে শোনা গেল৷ ব্লেকের দিকে ফিরে চাপা স্বরে সে বলল, ‘কোনও ভয় নেই; ও মারা গেছে৷’
টমাস মনে মনে ভাবল: পুরোপুরি নয়, বন্ধু৷ একটু পরেই তুমি সেটা জানতে পারবে৷ যমের দুয়ারে এক পা-বাড়িয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু ভেতরে এখনও ঢুকিনি৷
প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জোরে রিভলভার ধরা হাতটা ঈষৎ উঁচিয়ে ধরল টমাস৷ বন্দুকের হিমালয়প্রমাণ ভারে সে যেন নুয়ে পড়বে৷ ঠিক সেই মুহূর্তে আস্তে আস্তে, সতর্ক ভঙ্গিতে ট্রাকের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল মরগ্যান৷
মরগ্যানের বন্দুকটা টমাসের দিকে নিশানা করা; কিন্তু সেটা নিছকই অতিরিক্ত সাবধানতাবশে৷ কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস টমাস মৃত৷ ওই রকম একটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মুখ নিয়ে, আর মৃতের মতো রক্তহীন, পাণ্ডুর শরীর নিয়ে কারও পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়৷
‘ওকে এখান থেকে বের করে বাইরে কবর দেওয়া যাক, কী বলো?’ ব্লেকের দিকে ফিরে তাকাল মরগ্যান৷ ব্লেক তখন কৌতূহলভরে জানলা নিয়ে ভেতরে ঝুঁকে পড়ে টমাসকে দেখছে৷ কিন্তু খোলা দরজার পাল্লাটা তার সামনে অবরোধের সৃষ্টি করায় ট্রাকের ভেতরে সে ঢুকতে পারছে না৷
এমন সময় টমাস চোখ খুলে তাকাল৷
‘সাবধান!’ প্রচণ্ড চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার বের করতে চেষ্টা করল ব্লেক৷ কিন্তু দরজাটা তার শরীরে চেপে বসায় সে অসুবিধেয় পড়ল৷
মরগ্যান ওকে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই টমাস ট্রিগার টিপল৷
দুটো বন্দুকের শব্দ ঠিক এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হল—যেন একটা গুলিরই শব্দ৷ মরগ্যানের রিভলভার নিক্ষিপ্ত গুলিটা বিঁধল গিয়ে টমাসের গলায়—সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল সে৷
কিন্তু টমাসও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি৷ তার গুলি সোজা গিয়ে আঘাত করেছে মরগ্যানের পেটে৷ হাঁটু ভেঙে ট্রাকের ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ল মরগ্যান৷ তার দেহ গিয়ে পড়ল টমাসের কোলে৷
ভাঙা কর্কশ গলায় এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল জিপো৷
এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে স্থির হয়ে রইল ব্লেক৷ তারপর চটকা ভাঙতেই ট্রাকের দরজাটা ঠেসে ধরল মরগ্যানের বেরিয়া থাকা পায়ে৷ কোনওরকমে একপাশ হয়ে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ও ট্রাকের দরজার ফাঁক দিয়ে এদিকে এসে দাঁড়াল সে৷
ঘষা কাচের মতো স্বচ্ছ, ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকাল মরগ্যান, ‘শেষ পর্যন্ত আমি হেরে গেলাম এড৷’ বিড়বিড় করে বলতে চেষ্টা করল সে৷ তার স্বর এতই অস্পষ্ট যে ব্লেকের বুঝতে বেশ কষ্ট হল, ‘তবে টাকাটা তোমাদের কাজে আসবে৷ তোমাদের প্রত্যেকেরই কাজে লাগবে এই দশ লাখ ডলার...গুড লাক...৷’
ব্লেক সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ হঠাৎই তার খেয়াল হল, সে এক অদ্ভুত চিন্তা করে চলেছে, যদি শেষ পর্যন্ত ট্রাকের তালা ভাঙতে পারে, তাহলে দু-লাখ ডলারের জায়গায় তারা প্রত্যেকে আড়াই লাখ করে পাবে৷ কারণ পাঁচের জায়গায় তাদের অংশীদারের সংখ্যা এই মুহূর্ত থেকে চারজন!
একটা শোবার ঘর, একটা বসবার ঘর, একটা ছোট রান্নাঘর, এবং তার চেয়েও ছোট একটা স্নানঘর—এ নিয়েই গোটা কেবিনটা৷
শোবার ঘরে দুটো বিছানা—আধুনিকভাবে সাজানো-গোছানো, তাছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তো আছেই৷ বসবার ঘরটাও চেয়ার, সোফা ইত্যাদিতে ছিমছামভাবে সাজানো৷ অর্থাৎ সামান্য কষ্ট সহ্য করলে চারজনের শোবার পক্ষে কোনওরকম অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷
হ্রদের একপান্তে অবস্থিত এই কেবিনটা; এবং অন্যান্য কেবিনগুলোর থেকে একেবারেই বিছিন্ন৷ কেবিন ভাড়া দেওয়ার জন্যে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি বেশ সবজান্তার হাসি ফুটিয়ে জিনিকে বলেছে, এই কেবিনটা বিশেষভাবে মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্যই তৈরি৷ নেহাত ওদের ভাগ্য ভালো, তাই খালি পেয়েছে৷ কারণ এই কেবিনে আগে যারা ছিল, তারা গতকাল রাতেই ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে৷
কর্মচারীটির নাম হ্যাডফিল্ড৷ জিনি আর কিটসন যখন এখানে এসে পৌঁছল, তখন সে সোজা বুইকে, ওদের পাশে এসে বসেছে৷ রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেছে ওদের ঈপ্সিত কেবিনের দিকে৷
মাঝে মাঝে অবাক চোখে কিটসনের দিকে দেখছিল হ্যাডফিল্ড৷ ভাবছিল, ভদ্রলোককে কেমন যেন উত্তেজিত দেখাচ্ছে, সেই তখন থেকে প্রায় চুপচাপ বসে রয়েছেন—ব্যাপার কী? কে জানে, হয়তো আসন্ন ফুলশয্যার রাতের কথা ভেবে বিব্রত হয়ে পড়েছেন৷ কিন্তু এরকম সুন্দরী বউয়ের সঙ্গে একান্ত সহবাসে বিব্রত বোধ করার কোনও কারণ খুঁজে পেল না হ্যাডফিল্ড৷
মেয়েটাও যেন কেমন বিচলিত হয়ে পড়েছে৷ অবশ্য সেটা স্বাভাবিক৷ কারণ প্রত্যেক সুন্দরী মেয়েই মধুচন্দ্রিমার নামে কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে৷ আবেগভরে ভাবল হ্যাডফিল্ড৷ জিনিকে সহজ করার অনেক চেষ্টাই করল সে৷ ওদের দেখিয়ে দিল কোথায় ক্যারাভ্যান রাখতে হবে, কোথায় হ্রদে বেড়ানোর জন্যে নৌকা ভাড়া পাওয়া যাবে—কেবিনটা তো দেখিয়ে দিলই৷ আরও বলল, কেউ কখনও তাদের বিরক্ত করবে না৷ মোটের ওপর নিজেদের খুশিমতো তারা দিন কাটাতে পারবে৷
‘এখানকার লোকেরা বেশ মিশুকে মিসেস হ্যারিসন৷’ দরজা খুলে কেবিনটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওদের দেখাল হ্যাডফিল্ড৷ জিনিকে যেন আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, ‘তারা সবসময়েই আপনাদের সুখ-সুবিধের দিকে নজর রাখবে, গল্প-সল্প করবে... তবে আমার মনে হয়, আপনার বোধ হয় নির্জনতাই বেশি পছন্দ করবেন—অন্তত প্রথম কয়েকদিন, কী বলেন?’ কিটসনের দিকে ফিরে চোখ টিপল হ্যাডফিল্ড৷ কিন্তু কিটসন নির্লিপ্তভাবে অপলকে তার দিকে চেয়ে রইল৷ হ্যাডফিল্ড বলে চলল, ‘যাকগে ও নিয়ে ভাববেন না, কেউই আপনাদের বিরক্ত করবে না৷’
একমাত্র অন্ধকারের প্রতীক্ষা করা ছাড়া ওদের চারজনের আর কোনও উপায় ছিল না৷ এবং ঘটনাবহুল সারাদিনে ওই প্রতীক্ষার সময়টুকুই তাদের কাছে অসহ্য এবং ক্লান্তিকর বলে মনে হয়েছে৷ জিনি কেবিনে পৌঁছেই সোজা শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকেছে: সটান শুয়ে পড়েছে বিছানায়৷ সারাদিনের পরিশ্রমে অল্পক্ষণের মধ্যেই ও গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে৷ কিটসন বাইরে বসে পাহারায় থেকেছে৷ একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করেছে, আর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে ক্যারাভ্যানের ওপর৷ ব্লেক ও জিপোকে নিরুপায় হয়েই ক্যারাভ্যানের ভেতর থাকতে হয়েছে৷ সেখানে ওদের সঙ্গী হয়েছে টমাস ও মরগ্যানের মৃতদেহ, না সময়টা খুবই খারাপ কেটেছে ওদের৷
অন্ধকার নেমে আসার পর জিপো বা ব্লেক আর দেরি করেনি৷ চলে এসেছে কেবিনের ভেতর৷
পরিশ্রান্ত জিপোর অবস্থা তখন ব্লেকের চেয়েও খারাপ৷ সে এসেই ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে দু-হাতে মুখ ঢাকল৷ চার চোয়ালের পাশ বরাবর একটা লম্বা কাটা দাগ৷ ব্লেকের আঘাতের ফলেই ওই ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে৷ ফন হ্রদে আসার পথে জিপো হঠাৎ ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে বাইরে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিল৷ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সে ক্যারাভ্যানের ধাতব দেওয়ালে পাগলের মতো মাথা খুঁড়ছে৷ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো একরোখাভাবে ব্লেকের সঙ্গে সমানে যুঝে গেছে৷ কোনও বাধা শোনেনি৷
অবশেষে ব্লেক তার চোয়ালে লক্ষ করে সজোরে ঘুষি মেরেছে৷ এছাড়া জিপোকে সামলানোর কোনও উপায় ছিল না৷ তারপর যখন তার জ্ঞান ফিরছে, সে চুপচাপ অবসন্নভাবে বসে থেকেছে ক্যারাভ্যানের মেঝেয়৷ আটটি ঘণ্টা ওদের কাটাতে হয়েছে ক্যারাভ্যানের ভেতরে—অন্ধকারের প্রতীক্ষায়৷ মাছির দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ওরা শক্ত করে এঁটে দিয়েছে ক্যারাভ্যানের জানলাগুলো৷ তারপর বসে বসে সময় গুনছে৷ না, এ অভিজ্ঞতার কথা ওরা সহজে ভুলবে না৷
মরগ্যান ও টমাসের মৃতদেহ নিয়ে ব্লেক আর কিটসন গেছে অন্ধকার ঘন জঙ্গলের ভেতরে৷ ওদের করব দেওয়ার জন্যে খুঁজে বের করছে উপযুক্ত জায়গা৷ জিপোর নানান যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল একটা বেলচা—সুতরাং জায়গা খুঁজে বের করার পর ওরা পালা করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে—বলা বাহুল্য ওই বেলচা দিয়েই৷
বিষণ্ণ চাঁদের মরা আলোয় ব্লেক ও কিটসন চুপচাপ, নিঃশব্দে কাজ করে চলল৷ কিন্তু দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠাকে সঙ্গী করে সর্বদাই ওদের সতর্ক থাকতে হল৷ কারণ অদূরেই খোলা হ্রদের নীল জলে নৈশবিহারে ব্যস্ত দম্পতিদের কথোপকথন নৌকো থেকেই স্পষ্ট কানে আসছে৷ তাছাড়া হ্রদের পাড়ে পায়চারিরত অতিথিদেরও তারা দেখতে পাচ্ছে৷ হঠাৎই ওরা কাজ থামিয়ে মাথা নিচু করে লুকিয়ে পড়ল—বুকের ধুকপুক শব্দ আচমকা বেড়ে উঠল৷ ব্লেক ও কিটসনের ঠিক পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল একজোড়া তরুণ-তরুণী৷ এই স্বপ্নিল আঁধারে ওরা জঙ্গলের নির্জনতাকেই বেছে নিয়েছে৷ ওরা চলে যেতেই আবার কাজ শুরু করল কিটসন৷ ব্লেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল...৷
ওদের কাজ যখন শেষ হল, তখন মাঝরাত৷ ওপরের মাটি সমান করে তার ওপর ভাঙা ডালপালা ও শুকনো পাতা ছড়িয়ে দিল ব্লেক৷ যখন বুঝল, সন্দেহ করার মতো কিছুই নজরে পড়ছে না, তখন ওরা শ্রান্ত দেহে ফিরে চলল কেবিনের দিকে৷
.৩৮ রিভলভারটা কোলের ওপর রেখে একটা আরাম কেদারায় গা-এলিয়ে অপেক্ষা করছিল জিনি৷ আর লক্ষ রাখছিল সোফার ওপর ঘুমন্ত জিপোর দিকে৷
কেবিনে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিল ব্লেক৷ তারপর এগিয়ে এসে বসল একটা চেয়ারে৷
কিটসনও বিনা বাক্যব্যয়ে আর একটা চেয়ার বেছে দিল৷ তার মুখের রং ঠান্ডা চর্বির মতো ফ্যাকাসে—রক্তহীন৷ তার গালের একটা পেশি থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে৷ মুখে ঘামের ফোঁটা চকচক করছে৷
‘কোনও গোলমাল করেনি তো?’ জিনিকে প্রশ্ন করল ব্লেক৷
জিনির মুখমণ্ডল পাণ্ডুর, চোখের নীচে কালি! দেখে মনে হচ্ছে, ওর বয়সে যেন অনেক বেড়ে গেছে, শরীরের জৌলুসও কমে এসেছে অনেকটা৷ কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময় ওর স্বর এতটুকু কাঁপল না৷ বরাবরের মতোই নির্বিকার শীতল স্বর, ‘না,... তবে বারবারই বলছিল, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি বাড়ি যাব—৷’
‘ট্রাকের তালা খোলার পর বাড়ি কেন, ও নরকে গেলেও আমার কোনও আপত্তি নেই৷’ কঠিন স্বরে বলে উঠল ব্লেক৷
ওদের কথাবার্তার শব্দে জিপো পাশ ফিরে হঠাৎই চোখ খুলল৷ ঘরের উজ্জ্বল আলোয় কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে চারপাশে দেখল৷ তারপর ওদের তিনজনের দিকে চোখ পড়তেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসল সোফার ওপর৷ জিপোর হাত কাঁপতে লাগল উত্তেজনায়, মুখের মাংসপেশি সংকুচিত হল৷
‘এড, আমাকে তোমারা ছেড়ে দাও...’ শব্দগুলো যেন ছিটকে পড়ল জিপোর মুখ থেকে, আমারে ভাগের টাকা আমি চাই না, ওটা তোমরাই নিয়ে নিও৷ আমি এতক্ষণ ধরে শুধু এই কথাই ভাবছি! ওই হতচ্ছাড়া ট্রাকের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না৷ তাই বলছি, আমার প্রাপ্য দু-লাখ ডলার নিয়ে আমাকে তোমরা রেহাই দাও৷ ফ্র্যাঙ্ক যদি এত করে না বলত, তাহলে এ কাজে আমি হাতও দিতাম না৷ ও আমাকে একরকম জোর করেই রাজি করিয়েছিল৷ তোমাদের যদি এখনও রাজা হবার সাধ থাকে তো লেগে থাকো—আমি ওর মধ্যে নেই৷ আমি সোজা আমার কারখানায় ফিরে যাচ্ছি৷’
ব্লেক কিছুক্ষণ ধরে জিপোর আপাদমস্তক জরিপ করল, ‘কিন্তু আমার তা মনে হয় না, জিপো৷’ শান্তস্বরে সে বলল৷
জিপো হাঁটুতে হাত ঘষল৷ ওর থলথলে মুখমণ্ডল ঘামে চকচক করছে৷ ঈষৎ আশঙ্কার ইঙ্গিত৷
‘শোনো—এড, একটু ভালো করে ভেবে দেখো৷ আমার অংশের সমস্ত টাকাই আমি তোমাদের দিয়ে দিচ্ছি৷ দু-লাখ ডলার নেহাত কম কথা নয়৷ কিন্তু তার বদলে আমি শুধু বাড়ি যেতে চাইছি৷’
একইভাবে শান্তি, নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দল ব্লেক, ‘উঁহু—আমার ধারণা, সেরকম ছেলেমানুষি তুমি করবে না৷’
জিপো এবার কিটসনের দিকে ফিরল, আবেদন জানাল করুণ সুরে, ‘আলেক্স, তুমি তো জানো এ কাজটা কিরকম বিপজ্জনক! আমরা কেউ প্রথমে রাজি হইনি, মনে আছে? কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক আমাদের একথা সেকথা বলে রাজি করিয়েছিল৷ চলো, আমরা চলে যাই৷ এড আর জিনিই ট্রাকের সমস্ত টাকা ভাগ করে নিক৷ ও টাকায় আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷ তুমি আর আমি দুজনে একসঙ্গে কাজ করব, আমাদের কোনও অসুবিধেই হবে না৷ তুমি আমার সঙ্গে কারখানায় কাজ করবে৷ আমাদের দিন সচ্ছলভাবেই কেটে যাবে... বিশ্বাস করো আলেক্স, বাকি জীবনটা আমরা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারব৷’
‘ন্যাকামো ছাড়ো, জিপো!’ ব্লেক নরম স্বরে বলল, ‘তুমি এখানেই থাকছ, এবং ট্রাকের তালা খুলছ—এই আমার শেষ কথা৷’
জিপো পাগলের মতো মাথা নাড়িয়ে চলল, ‘না, না—এড, আমাকে যেতেই হবে! এই কাজের শেষ দেখার মতো সাহস আমার নেই; তবে কী করে ট্রাকের তালা খুলতে হয় সে আমি তোমাদের বলে দিয়ে যাব৷ তখন তুমি আর জিনি সহজেই ওই ট্রাকের তালা খুলে ফেলতে পারবে, কিন্তু আমাকে আর থাকতে বলো না। আমাদের ভাগের পাঁচ লাখ ডলার তোমরা এমনিতেই পেয়ে যাচ্ছ, কারণ আমার টাকাটা আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি: আর আলেক্স ওর অংশটা জিনিকে দিয়ে যাবে৷ আমাদের তুমি ছেড়ে দাও, এড৷ আমরা চলে যাচ্ছি...৷’
ব্লেক ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘তুমিও কি চলে যেতে চাও?
মরগ্যানের আকস্মিক ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে কিটসন সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সাহস৷ রাত্রির অন্ধকারে দু-দুটো মৃতদেহকে কবর দেওয়ার দুঃস্বপ্নের প্রভাবকে সে ক্রমশ কাটিয়ে উঠেছে৷ এবং এই আকস্মিক উৎকণ্ঠাময় ঘটনাগুলো কিটসনকে দুর্বল করার পরিবর্তে যেন বেপরোয়া করে তুলেছে৷ সে বেশ বুঝতে পারছে, এখন তারা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ একমুখী রাস্তা ধরে তারা এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে৷ এখন কিটসনের নিজের প্রাণ ছাড়া আর কিছু হারাবার নেই, কিন্তু লাভের দিকে রয়েছে আড়াই লাখ ডলার, সোনালি ভবিষ্যৎ আর জিনির সঙ্গ৷ না, সে এখন চাক বা না চাক, ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন এখন অবান্তর৷
‘নাঃ’ ব্লেকের চোখে-চোখ রেখে নিষ্কম্প জবাব দিল কিটসন৷
‘শোনো, আলেক্স—তুমি কী বলছ, তা তুমি নিজেই জানো না৷’ মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল জিপো, ‘তুমি এদের সঙ্গে এই বিপদের মধ্যে থেকে কী করবে? তার চেয়ে চলো আমার সঙ্গে—আমার কারখানায়৷ মনে কোরো না এ কাজ করে তোমরা রেহাই পেয়ে যাবে৷ শেষ পর্যন্ত বিপদে তোমরা পড়বেই! তার চেয়ে এখনই সংস্রব ত্যাগ করা ভালো৷ আলেক্স, তুমি চলে এসো আমার সঙ্গে—৷’
‘না জিপো, তা হয় না৷’ জিনির দিকে আড়চোখে তাকাল কিটসন৷ জিপো গভীরভাবে সশব্দে শ্বাস নিল, ‘তাহলে আমি চললাম৷ কিন্তু মনে রেখো, এখানে থেকে তোমার ভালো কোনওদিনই হবে না৷ তিন তিনটে লোক এই ট্রাকের কারণেই মারা গেছে, তাদের রক্তের দাম কোনওদিনই তোমরা শুধতে পারবে না—পারবে? ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল, ‘পৃথিবীটাকে ধরবে এই হাতের মুঠোয়৷ হুঁ... ওর অন্তিম পরিণতির কথা তোমাদের কি দ্বিতীয়বার মনে করিয়ে দিতে হবে? একরাশ ভিজে মাটির নীচে স্যাঁতস্যাঁতে একটা গর্তে ও নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে৷ ওর রাজা হবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে৷ এখনও কি তুমি বুঝতে পারছ না, আলেক্স? তোমরা কেউ কি বুঝতে পারছ না, যে এসবের শেষ কোনওদিনই ভালো হয় না, হতে পারে না?’ হঠাৎই উত্তেজিত হয়ে উঠল জিপো, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও—আমি চললাম৷’
ব্লেক চট করে হাত বাড়িয়ে জিনির কোলে পড়ে থাকা .৩৮ টা তুলে দিল৷ নিষ্ঠুরভাবে উঁচিয়ে ধরল জিপোর বুক লক্ষ করে৷
‘ট্রাকটা তোমাকে খুলতেই হবে, জিপো৷ নইলে ফ্র্যাঙ্কের পাশে তোমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব৷’
ব্লেকের শান্ত স্বরে চরম, শীতল সুর জিপোর কান এড়াল না৷ সে বুঝল, ব্লেক ঠাট্টা করছে না৷
এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে জিপো একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল, স্থির চোখে চেয়ে রইল .৩৮ এর কালো নলটার দিকে৷ তারপর নিরাশ হয়ে হতাশার একটি ভঙ্গি করে ধপ করে বসে পড়ল৷
‘আচ্ছা তাহলে তাই হোক৷’ জিপোর মুখে অপ্রসন্নতার স্পষ্ট ছায়া, ‘তুমি আমাকে গায়ের জোরে আটকাতে চাইছ, কিন্তু এতে কিছু লাভ হবে না৷ কারণ আমি জানি, এ কাজের শেষ পরিণতি মোটেই ভালো হবে না—হতে পারে না৷’
বন্দুকটা নামিয়ে রাখল ব্লেক৷
‘তোমার বকবকানি শেষ হয়েছে৷’ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল সে৷
‘আমার আর কিছু বলার নেই৷’ জিপো মাথা ঝুঁকিয়ে বসল, ‘কিন্তু আমি তোমাকে বার বার সাবধান করে দিয়েছি, এড; সেটা মনে রেখো৷ এ কাজের শেষ পরিণতি কখনওই ভালো হতে পারে না৷’
‘ঠিক আছে৷’ অন্য দুজনের দিকে চোখ রাখল ব্লেক, ‘তাহলে জিপো যখন রাজি হয়েছে, এবারে আমরা আলোচনায় বসতে পারি৷ এখন আমরা মোট চারজন৷ তার মানে আমরা প্রত্যেকে যা পেতাম তার চেয়ে এখনও আরও পঞ্চাশ হাজার ডলার বেশি পাব৷ কারণ ফ্র্যাঙ্কের ভাগের টাকাটা আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছি৷ আর পরিকল্পনা যা ছিল সেই মাফিকই কাজ চলবে৷ কিটসন—তুমি আর জিনি নতুন বিয়ে করা স্বামী-স্ত্রী মতোই অভিনয় চালিয়ে যাও৷ আমি আর জিপো ক্যারাভ্যানের ভেতরে ট্রাক নিয়ে লড়ে যাব৷ টাকাটা হাতে আসামাত্রই আমরা চারজন চারদিকে কেটে পড়ব রাজি?’
ওরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷
‘ঠিক আছে, তাহলে এই কথাই রইল৷’ ব্লেক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ এগিয়ে গেল দরজার দিকে৷ তালা থেকে চাবিটা বের করে পকেটে রাখল, ‘আচ্ছা আমি তাহলে শুতে চললাম৷ আজকের মতো যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে৷’ ব্লেক এগিয়ে গেল জিপোর কাছে৷ পেটে খোঁচা মারল, ‘ওঠো মোটুরাম—চেয়ারে গিয়ে শুয়ে পড়ো৷ সোফাটা আমাকে ছেড়ে দাও৷ আমার মনে হয় সোফাতে শোবার অধিকার বর্তমানে একমাত্র আমারই আছে৷’
জিপো উঠে শ্লথ পায়ে একটা চেয়ারের দিকে এগিয়ে চলল৷ ব্লেক বসে পড়ল সোফার ওপর৷ নিচু হয়ে পা থেকে জুতো খুলতে খুলতে কিটসনকে লক্ষ করে সে বলে উঠল, ‘পাশের ঘরে তোমার জন্যে খাট পাতা আছে, আলেক্স৷ যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো—স্বামীর কর্তব্য পালনে মন দাও৷’
ব্লেকের টোপ গেলবার মতো মনের অবস্থা কিটসনের ছিল না৷ সে পরিশ্রান্তভাবে একটা চেয়ারে গা-এলিয়ে দিল—হাই তুলে ঘুমোবার চেষ্টা করল৷
পাশের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল জিনি৷ ওরা শুনতে পেল দরজায় চাবি দেওয়ার শব্দ৷’
‘তোমার দুর্ভাগ্য, আলেক্স!’ ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল ব্লেক৷ হাত বাড়িয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল, ‘মনে হচ্ছে, তোমার মতো স্বামীকে জিনির ঠিক পছন্দ হয়নি৷’
‘ও—তুমি থামবে!’ বিরক্তিভরে ধমকে উঠল কিটসন৷
পরদিন সকাল সাতটার কিছু পরেই জিনির ঘুম ভাঙল৷ বসবার ঘরে এসে ও জানলার পরদাগুলো সরিয়ে দিল৷ বাইরের আলো এসে ঘরে ঢুকতেইে ওরা তিনজন জেগে উঠল৷
একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে পলকের মধ্যে উঠে বসল ব্লেক, রিভলভারের খোঁজে পকেট হাতড়াতে শুরু করল৷
কিটসনের ঘুমের আমেজ তখনও কাটেনি৷ সে মাথা তুলে পিটপিট করে তাকাল জিনির দিকে৷ ও তখন নির্বিকারভাবে এগিয়ে চলেছে রান্নাঘরের দরজা লক্ষ করে৷
জিপো শরীরের ম্যাজম্যাজে ভাবটা কাটাতে আড়মোড়া ভাঙল৷ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আহত চোয়ালে হাত বোলাতে লাগল৷ একটা অস্ফুট যন্ত্রণার শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে৷
জিনি রান্নাঘর থেকে ডেকে বলল, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি ক্যারাভ্যানে যাবার তোড়জোড় করো, এর মধ্যেই কিন্তু হ্রদের ধারে লোকজন ভিড় করতে শুরু করেছে৷’
ব্লেক একটা দুর্বোধ্য শব্দ করে পা-বাড়াল কলঘরের দিকে৷ মিনিট দশেক পরে সে দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে বেরিয়ে এল৷ জিপোকে লক্ষ করে বলল, ‘যাও স্নান সেরে নাও৷ তোমার গা-থেকে মোষের মতো বোটকা গন্ধ বেরচ্ছে৷’
জিপো থমথমে মুখে ব্লেককে একবার দেখল, তারপর এগিয়ে গেল কলঘরের দিকে৷
জিপো স্নান সেরে সোজা ঘরে ঢুকতেই সে দেখল, একটা ট্রেতে প্রাতরাশ সাজিয়ে বসবার ঘরে নিয়ে এসেছে জিনি৷
‘এগুলো নিয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরেই তোমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে নাও৷’ ট্রে-টা ব্লেকের হাতে ধরিয়ে দিল জিনি৷
ব্লেক এক-পলকে দেখল ট্রের মধ্যে কফি, ডিম সেদ্ধ কমলালেবুর রস ও স্যান্ডউইচের দিকে৷ তার চোখে নেমে এল কুৎসিত ঝলকানি৷ ট্রে-টা জিনির হাত থেকে নিল সে, শোনো সুন্দরী, এখন থেকে তোমরা আমার কথামতো চলবে৷ কারণ এ দলের পরিচালনার ভার এখন আমার!’
জিনির চোখে খেলা করল তাচ্ছিল্যের কৌতুক৷
‘পরিচালনার ভার? তার মানে?...এ দলের পরিচালনার দায়িত্ব কারোরই নেই—মরগ্যানেরও ছিল না৷ আমরা শুধু প্ল্যান মাফিক কাজ করে যাব৷ প্রথম থেকেই ঠিক ছিল, তুমি আর জিপো কেবলমাত্র রাত্রিবেলাতেই কেবিনে আসবে৷ এবং সারাটা দিন তোমাদের ক্যারাভ্যানের ভেতরই লুকিয়ে থাকতে হবে৷ এখন যদি তুমি তোমার মত বদলে থাকো, তো সে কথা বলো৷’
‘আচ্ছা—খুব কথা শিখেছ দেখছি!’ ব্যঙ্গভরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তার মানে ক্যারাভ্যানে বসেই আমাদের খানাপিনা সারতে হচ্ছে? ব্যাপার কী, তোমাদের দাম্পত্য জীবনযাত্রায় অসুবিধে ঘটাচ্ছি বলেই কি আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছ?
জিনি কোনও জাবাব না দিয়েই ঘুরে দাঁড়াল, ফিরে চলল রান্নাঘরের দিকে৷
‘এড, সব সময়ে জিনির পেছনে লাগাটা আমি পছন্দ করি না৷’ উঠে দাঁড়াল কিটসন৷
‘থামো! আর সাফাই গাইতে হবে না!’ খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যাও, বাইরে গিয়ে দেখো, আশেপাশে লোকজন আছে কি না৷ না থাকলে ক্যারাভ্যানের দরজাটা চটপট খুলে দেবে৷’
সামান্য ইতস্তত করে বাইরের রোদ্দুরে গিয়ে দাঁড়াল কিটসন৷ তাকাল চারপাশে৷ না, কেউই তাকে লক্ষ করছে না৷ তখন সে ডাকল ব্লেককে, আর সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দিল ক্যারাভ্যানের পিছনটা৷
ব্লেক আর জিপো ক্ষিপ্রগতিতে ঢুকে পড়ল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷
‘যাও, এবার মৌজ করো গিয়ে৷’ ব্লেকের চোখ চকচক করে উঠল, ‘সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তুমি ছাড়বে বলে তো মনে হয় না৷’
কিটসন হাতলে চাপ দিয়ে সশব্দে বন্ধ করে দিল ক্যারাভ্যানের দরজা৷ ব্লেক ও জিপো বন্দি হল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ কাজ শেষ হলে কিটসন ফিরে এল কেবিনে৷
জিনি তখন আরও কয়েকটা স্যান্ডউইচ তৈরি করছে৷
কিটসন এসে সোজা গিয়ে ঢুকল কলঘরে৷ স্নান করে, দাড়ি কামিয়ে নতুন পোশাক পরে সে বেরিয়ে এল৷
বসবার ঘরে এসেই সে দেখল, জিনি টেবিলের ওপর ডিম সেদ্ধ ও স্যান্ডউইচ সাজিয়ে রাখছে৷
‘ও—চমৎকার হয়েছে৷’ নাক দিয়ে গভীর শ্বাস টানল কিটসন, ‘কিন্তু কার জন্যে তা তো ঠিক বুঝতে পারছি না৷ তোমার—না আমার?’
‘সকালে আমার কিছু খাওয়ার অভ্যেস নেই৷’ সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিল জিনি৷ এক কাপ কফি ঢেলে গিয়ে বসল অদূরেই একটা আরাম কেদারায়৷ কিটসনের দিকে আংশিকভাবে পিছন ফিরে৷
কিটসন টেবিলের কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল৷ এমনিতেই সে বেশ ক্ষুধার্ত ছিল, তার ওপর স্যান্ডউইচের লোভনীয় সুবাস তাকে যেন পাগল করে তুলল৷ চটপট খেতে শুরু করল সে৷ মনে মনে জিনির রান্নার প্রচুর তারিফও করল৷
‘ভাবছি, খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে একটু বেরব৷’ প্রস্তাবের সুরে বলল কিটসন, নৌকো করে হ্রদটা একটা চক্কর দেওয়া যাবে—কী বলো?’
‘হুঁ৷’
জিনির সংক্ষিপ্ত উত্তরে হতাশ হল কিটসন৷
‘ক্যারাভ্যানে ওদের দুজনের খুব কষ্ট হবে৷’ জিনির সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিটসন, ‘বাইরে তেমন ছায়া-টায়াও নেই৷ দুপুরের মধ্যেই ক্যারাভ্যানের ভেতরটা উনুনের মতো গরম হয়ে পড়বে৷’
‘সে ওরা বুঝবে৷’ নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল জিনি৷
‘হ্যাঁ—তা ঠিক৷...আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? জিপো ট্রাকের তালা খুলতে পারবে?’
হাতের একটা অধৈর্য ভঙ্গি করল জিনি, ‘সে আমি কী করে জানব?’
‘না—মানে, বলছিলাম শেষ পর্যন্ত জিপো যদি সেটা পেরে না ওঠে তাহলে আমরা কী করব?’
‘সে কথা আমাকে জিগ্যেস করছে কেন? নিজে যদি বুঝতে না পার তবে ব্লেককে গিয়ে জিজ্ঞেস করো৷’
আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল জিনি৷ কফির কাপ হাতে তুলে দিয়ে চলে গেল রান্নঘরে৷
কিটসন অনুভব করল, অসহ্য উত্তাপ যেন তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে৷ হঠাৎই তার খাওয়ার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে গেল৷ বিকৃত মুখে কয়েক চুমুকে কাপের কফিটা শেষ করল সে৷ কাপ-প্লেটগুলো হাতে তুলে নিয়ে এগোল রান্নঘরের দিকে৷
রান্নাঘরের টেবিলে এঁটো বাসনগুলো নামিয়ে রাখল কিটসন, ‘শোনো, জিনি, আমি কিন্তু তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনি৷ তবে ভেবে দেখো, আমাদের একসঙ্গে অন্যান্য লোকেদের সামনে একটু ঘোরাফেরা করা দরকার৷ কারণ ওদের বোঝাতে হবে, আমরা হানিমুনে এসেছি৷ আমাদের আসল সম্পর্কটাকে কয়েকদিনের জন্যে ভুলে থাকা যায় না? বুঝতেই পারছ, শুধু...’ খেই হারিয়ে আচমকা থেমে গেল কিটসন৷
‘দোহাই তোমার৷ আমাকে একটু একা থাকতে দাও৷ দয়া করে পাশের ঘরে যাও৷’ জিনি কিটসনের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল৷ ওর গলার স্বর শেষ দিকটায় কেমন কেঁপে গেল৷
জিনির কথা বলার সুরে দুঃখ পেল কিটসন৷ সে ঘুরে এসে দাঁড়াল জিনির মুখোমুখি৷ তখনই তার নজরে পড়ল জিনির বাহ্যিক পরিবর্তনটা৷ ওর মুখটা কেমন লম্বাটে, চোয়াড়ে দেখাচ্ছে৷ সজীবতার রেশটুকু মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠেছে গ্রীষ্মের আকাশের বিবর্ণতা৷ নাঃ, মেয়েটা নিজেকে যতটা সমর্থ মনে করে ততটা নয়—ভাবল কিটসন৷ গত দিনের বীভৎস ঘটনাগুলো ওর মনে ভীষণভাবে আঘাত করেছে৷ যেমন করেছে কিটসনের মনকে৷
‘ঠিক আছে আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি৷’ বসবার ঘরে এসে বসল কিটসন৷ মাথার কালো চুলে আলতো করে আঙুল চালাল৷
দীর্ঘ এক নীরব মুহূর্তের পর জিনির কান্না শুনতে পেল কিটসন৷ কিন্তু সে বসেই রইল৷ এ কাজের হতাশ পরিণতির ইঙ্গিতেই যেন বয়ে এল সেই হালকা, অস্ফুট কান্নার সুর৷ শেষ পর্যন্ত জিনিও তাহলে কাঁদছে? কিটসন বুঝল, তাদের সাফল্যের আশা এখন সুদূর পরাহত৷
কিটসন নীরবে ধূমপান করে চলল৷ মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে গেল অস্বস্তিকর প্রতীক্ষায়৷ হঠাৎ একসময় রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল জিনি৷ কিটসন ভালো করে ওকে দেখবার আগেই ও সোজা গিয়ে ঢুকল শোবার ঘরে৷
আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ অবশেষে শোবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল জিনি৷
‘চলো, যাওয়া যাক৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল ও৷
কিটসন মুখ ফিরিয়ে তাকাল জিনির দিকে৷
জিনির সাজসজ্জায় কোথাও কোনও খুঁত নেই, শুধু ওর সবুজ চোখের অস্বাভাবিক দ্যুতি এবং দাঁড়াবার সংযত ভঙ্গি জানিয়ে দিচ্ছে ওর অস্থির মানসিক অবস্থার কথা৷
কিটসন উঠে দাঁড়াল৷
‘একটা খবরের কাগজ পেলে মন্দ হতো না৷’ ইচ্ছে করেই জিনির দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাখল কিটসন৷
‘হ্যাঁ, মনে হয় বাইরেই পাওয়া যাবে৷’
বসবার ঘর অতিক্রম করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল জিনি৷ ওর পরনে একটা হালকা সোয়েটার এবং শ্যাওলা-সবুজ স্ল্যাক্স৷ এই পোশাকে ওর নিখুঁত কমনীয় দেহ-সৌন্দর্য যেন ফুটে বেরচ্ছে৷ আজ এই মুহূর্তে জিনিকে আরও ভালো লাগল কিটসনের৷
সে ওকে অনুসরণ করে বাইরে এল৷
কেবিনের বাইরে পা-রাখতেই সূর্যের প্রখর তাপ ওদের শরীরে আছড়ে পড়ল৷ ওরা একবার তাকাল রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানটার দিকে৷ মনে মনে অনুমান করার চেষ্টা করল ক্যারাভ্যানের আভ্যন্তরীণ উত্তাপ৷
সামনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে হ্যাডফিল্ডের অফিসের দিকে৷ তার অফিসের পাশেই আছে একটা মুদিখানার দোকান৷ জঙ্গলের ছায়াঘেরা অঞ্চল পার হয়ে ওরা যখন কাঠের অফিসে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন জিনি একহাতে আঁকড়ে ধরল কিটসনের হাত৷ ওর ঠান্ডা স্পর্শে কিটসনের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এল এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় অনুভূতি৷ সে চমকে ঘুরে তাকাল জিনির দিকে৷
জিনি বিষণ্ণভাবে হাসতে চেষ্টা করল, ‘আমার ব্যবহারের জন্যে কিছু মনে করো না৷ মাঝে মাঝে আমার অমনি হয়৷ এখন বেশ আছি৷’
‘না না—ঠিক আছে৷ সত্যিই তো, কাল সারাটাদিন ধরে কম ধকল গেছে!’ জিনির নরম হাতে চাপ দিল কিটসন৷
এমন সময় হ্যাডফিল্ড বেরিয়ে এল তার অফিস থেকে৷ ওদের দেখেই আকর্ণ বিস্তৃত হাসিতে মুখ ভরিয়ে কাছে এগিয়ে এল, ‘এই যে মিঃ হ্যারিসন,’ কিটসনের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরল হ্যাডফিল্ড, ‘কেমন লাগছে জায়গাটা, বলুন...আমি বেশ বুঝতে পারছি মশায়, আপনি দারুণ সুখে রয়েছেন৷ হুঁ-হুঁ—আপনি না বলতেই কিরকম ধরে ফেলেছি দেখলেন? আরে মশায়, আপনার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জায়গাটা আপনার খুব ভালো লেগেছে৷ আর, তাছাড়া—মিসেস হ্যারিসনের মতো সুন্দরী স্ত্রী পেলে আপনি কেন, যে কোনও স্বামীই সারাটা জীবন সুখে কাটিয়ে দেবে—কী বলেন মিসেস হ্যারিসন?’
‘আপনাকে ধন্যবাদ, মিঃ হ্যাডফিল্ড৷’ হাসতে-হাসতেই বলল জিনি, ‘এত প্রশংসাও করতে পারেন আপনি!...যাকগে, আমরা কিন্তু খবরের কাগজের খোঁজে এসেছিলাম৷ আছে নাকি?’
‘খবরের কাগজ?’ হ্যাডফিল্ডের ঘন ভুরুজোড়া ঊর্ধ্বমুখী হল, ‘বলেন কী মিসেস? আজ পর্যন্ত কোনও খদ্দেরকে আমি খবরের কাগজের খোঁজ করতে শুনিনি? কারণ হানিমুন কাটাতে এসে কেউ বাইরের খবরে নজর দেয় না৷ তবে খবরের কাগজ যে নেই তা নয়, আছে৷ আর আজকের সবচেয়ে জোর খবর ওই ট্রাক লুটের ব্যাপারটা৷’ হ্যাডফিল্ডের খুশি খুশি মুখে ফুটে উঠল দোঁতা হাসি, ‘আপনাকে চুপি চুপি বলে রাখছি মিঃ হ্যারিসন, আমি কিন্তু লোকগুলোকে তারিফ না করে পারছি না৷ একেবারে নিঃশব্দে দশ লাখ ডলার নিয়ে চম্পট! একবার ভেবে দেখুন তো! দশ লক্ষ ডলার! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, টাকাটা নিয়ে ওরা কোথায় গেল, কী করল তা কেউই আন্দাজ করতে পারছে না৷ মানে গোটা ট্রাকটা একেবারে বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷ নাঃ, সাহস আছে লোকগুলোর৷’ মাথার টুপিটা পিছন দিকে সামান্য ঠেলে দিয়ে হাসল হ্যাডফিল্ড, ‘এরকম ঘটনা আমার জীবনে এই প্রথম শুনছি৷ খবরের কাগজে যখন ব্যাপারটা পড়লাম, তখন ভাবছিলাম, কী পরিমাণ বুদ্ধি আর সাহস থাকলে ওই ট্রাককে হাওয়া করা যায়৷ একেবারে উবে গেল? অতবড় একটা ট্রাক, তার ওপর পুলিশ আর সৈন্যবাহিনীর লোকেরা এখনও একশো মাইল জায়গা জুড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে, তবু তার কোনও সন্ধান নেই? আশ্চর্য!”
খবরের কাগজ আনতে অফিসের দিকে পা-বাড়াল হ্যাডফিল্ড৷
জিনি ও কিটসন অর্থপূর্ণ চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে৷
কিছুক্ষণ পরেই চার চারটে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ওদের সামনে এসে হাজির হল হ্যাডফিল্ড৷
‘ভাবলাম, আপনারা হয়তো সবক’টাই দেখতে চাইবেন, তাই নিয়ে এলাম৷ তবে সাচ্চা খবর যদি পেতে চান, তাহলে পাবেন হোরাল্ড-এ৷’
‘না, আমি সবকটা কাগজই নেব৷’ রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল কিটসন ‘মানে—খবরগুলো একটু যাচাই করে দেখব আর কি৷’
বিনাবিলম্বে হ্যাডফিল্ডকে কাগজের দাম মিটিয়ে দিল সে৷
‘আপনাদের কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে না তো মিসেস হ্যারিসন?’ হ্যাডফিল্ড তাকাল জিনির শরীরের বিশেষ অংশের দিকে, ‘কিছু করার থাকলে বলুন, আমি এখুনি—’
‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই, মিঃ হ্যাডফিল্ড৷’ হ্যাডফিল্ডকে বাধা দিল জিনি, ‘আমাদের কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না৷’
কথা শেষ করে জিনি গিয়ে ঢুকল সামনের মুদি দোকানের দিকে, আর কিটসন কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার জোরদার খবরগুলোর ওপর চোখ বোলাতে লাগল৷
প্রতিটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছে ট্রাক লুটের খবর৷ সেই সঙ্গে ট্রাকটার ছবিও ছাপা হয়েছে৷ এমন কি ডার্কসন ও টমাসের ছবিও বাদ যায়নি৷ সৈন্যবাহিনীর তরফ থেকে ট্রাক উদ্ধারের সম্পর্কিত খবরের জন্যে এক হাজার ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে৷
পুলিশের তরফ থেকে ট্রাকের ড্রাইভার ডেভ টমাসকে লুটেরাদের একজন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে৷ বলাবাহুল্য টমাসের নিরুদ্দেশ হওয়াটাই এই সন্দেহের একমাত্র কারণ৷
কিটসন একমনের কাগজ পড়ছিল, বুকের দ্রিম দ্রিম শব্দ ক্রমশ বেড়েই চলেছে—হঠাৎ ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ডের ডাকে তার চমক ভাঙল৷ গতকাল এই ভদ্রলোকই তাকে চাকা পালটানোর কাজে সাহায্য করতে চেয়েছিল৷ সম্ভবত সেও তার খবরের কাগজ সংগ্রহ করতে এ সময়ে হ্যাডফিল্ডের অফিসের দিকে এসেছে৷
‘এই যে—মিঃ হ্যারিসন, কেমন লাগছে এখানে? সুন্দর জায়গা তাই না?... তা খবরের কাগজ এর মধ্যেই পেয়ে গেছেন দেখছি?’
‘হ্যাঁ, এইমাত্র পেলাম৷’
‘আপনি নিশ্চয়ই ট্রাক লুটের খবরটা পড়ছিলেন? আজ সকালেই আমি রেডিওতে পুরো ঘটনাটা শুনলাম৷ ওরা সন্দেহ করছে, ট্রাকটাকে নিশ্চয়ই আশেপাশের কোনও জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে৷ তাই সার্চ-টিম বের করা হচ্ছে ট্রাকের খোঁজে৷ হেলিকপ্টারে করে প্রতিটি রাস্তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে—কিন্তু কোথায় কী? ট্রাকের কোনও পাত্তাই নেই!’
‘হুঁ৷’ কাগজগুলো ভাঁজ করে ফেলল কিটসন৷
‘কিন্তু আমি এখনও ভেবে পাচ্ছি না, মিঃ হ্যারিসন, যে এতগুলো চোখকে ফাঁকি দিয়ে কী করে ওরা ট্রাকটাকে লুকিয়ে রেখেছে? আমার কিন্তু সন্দেহ হয় ওই ড্রাইভারটাকে—ব্যাটা নিশ্চয়ই ওদের লোক৷ আপনার কী মনে হয়?’
‘হতে পারে৷’ নিষ্পৃহ স্বরে জবাব দিল কিটসন৷
কিন্তু রক্ষীটার কী দশা হল দেখুন তো! কী নাম যেন লোকটার? ...ওঃ, হ্যাঁ, ডার্কসন,... আমার মতে ওয়েলিং কোম্পানির তরফ থেকে ওর পরিবারকে নিয়মিত সাহায্য করা উচিত৷’
হ্যাডফিল্ড এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ব্র্যাডফোর্ডের কথাগুলো গিলছিল৷ হঠাৎ বলে উঠল, ‘পুলিশের ধারণা ওই গাড়ি দুর্ঘটনার ব্যাপারটা নাকি পুরোপুরি সাজানো৷ তার মানে, লুটেরাদের দলে একটা সোমত্ত মেয়েও আছে৷ ডার্কসন মারা যাবার আগে বেতারে ওই দুর্ঘটনার কথা এজেন্সিকে জানিয়েছিল৷ তাই পুলিশ টমাসের ব্যক্তিগত জীবন আতিপাতি করে খুঁজে দেখছে, যদি কোনও নারীঘটিত ব্যাপারের আভাস পাওয়া যায়৷ অবশ্য ওর স্ত্রী জানিয়েছে, টমাস সেরকম চরিত্রের লোকই নয়—কে জানে শেষ পর্যন্ত কী হবে!’
‘নাঃ, ওই পুরস্কারের টাকাটা পেলে নেহাত মন্দ হয় না৷’ ব্র্যাডফোর্ড তার মনের ইচ্ছে খুলে জানাল, ‘আমার ছোট ছেলেটা তো ভীষণ লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে৷ বলছে, ও নাকি জঙ্গলের ভেতর টহল মেরে ট্রাকটাকে খুঁজে বার করবে৷’ হাসল সে, ‘যাক, তবু কদিনের জন্যে ওর বায়নাক্কার হাত থেকে একটু রেহাই পাওয়া যাবে৷ যা-দুরন্ত ছেলে মশাই কী বলব! ওর মাকে একেবারে অস্থির করে ছাড়ে৷’
হ্যাডফিল্ড মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—ট্রাকটা এখানকার জঙ্গলে লুকিয়ে রাখার মতো বোকামি ওরা করবে না৷ কারণ সময়ে অসময়ে, সব সময়েই এই জঙ্গল দিয়ে লোকজন চলাফেরা করে৷ আমার মনে হয় ট্রাকটাকে ওরা অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে৷ হয়তো এখান থেকে আরও ওপরে, ফক্সউডেই লুকিয়ে রেখেছে৷৷ ওই রাস্তায় লোকজনের চলাচলও অনেক কম, আর বড় রাস্তা থেকে জায়গাটা অনেক দূরেও বটে৷’
‘কিন্তু খবরদার৷ ভুলেও আমার ছেলেকে এ সংবাদ দেবেন না, মশাই! শেষ পর্যন্ত পাহাড় বেয়ে সে হয়তো ফক্সউড পর্যন্তই ছুটবে৷ কী যে ভূত চেপেছে মাথায়...’
জিনিসপত্র ভর্তি একটা প্যাকেট নিয়ে মুদিখানার দোকান থেকে বেরিয়ে এল জিনি৷
‘সুপ্রভাত, মিসেস হ্যারিসন৷’ টুপি খুলে জিনিকে অভিবাদন জানাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘পথে আর কোনও অসুবিধে হয়নি তো?’
‘না৷’ হাসল জিনি৷ জিনিসপত্রের প্যাকেটটা কিটসনের হাতে দিয়ে অন্তরঙ্গভাবে তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল৷ আঁকড়ে ধরল কিটসনের বাহু৷ ভুরু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল, ‘হ্রদে বেড়াবার জন্যে নৌকো পাওয়া যাবে, মিঃ হ্যাডফিল্ড?’
‘নিশ্চয়ই; কেন নয়৷ এই তো বেড়াবার সময়৷ একটু পরেই রোদের তাপ অসহ্য হয়ে উঠবে৷ আপনি তো জানেন কোথায় নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়, সেখানে চলে যান, জো আপনাকে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে৷’
‘আচ্ছা, তাহলে চলি৷’
‘দরকার মনে করলেই চলে আসবেন, মিসেস হ্যরিসন৷’ আমন্ত্রণ জানাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কুড়ি নম্বর কেবিনেই আমরা আছি৷ আপনাদের ঘর থেকে বড় জোর সিকি মাইল দূর হবে৷ মিলি খুব খুশি হবে আপনাদের দেখলে৷’
হ্যাডফিল্ড কনুইয়ের খোঁচা মারল ব্র্যাডফোর্ডকে, ‘আরে মশাই, আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? কোথায় ওনারা এসেছেন হানিমুনে আর আপনি বলছেন কি না আপনার ঘরে গিয়ে সময় নষ্ট করতে?’
হেসে কিটসনের হাত ধরে এগিয়ে গেল জিনি৷ কিটসনের কাঁধে মাথা রেখে রাস্তা ধরে হেঁটে চলল৷
ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যাডফিল্ড একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওদের গমন পথের দিকে৷ সম্ভবত কিছুটা ঈর্ষাও বোধ করল কিটসনের সৌভাগ্যে। নাঃ, জিনির মতো সুন্দরী-স্ত্রী পেলে হ্যাডফিল্ড এই মুহূর্তেই কিটসনের সঙ্গে জায়গা বদল করতে রাজি।
ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যাডফিল্ড পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল৷
ঘরে পৌঁছে জিনিসপত্রের প্যাকেট রান্নাঘরে নামিয়ে রাখল জিনি৷ কিটসন অতি সন্তর্পণে বাইরে ক্যারাভ্যানের পাশে এসে দাঁড়াল৷ যখন দেখল কেউ তাকে লক্ষ করছে না, তখন আস্তে আস্তে টোকা মারল জানলায়৷
ঘর্মাক্ত রক্তিম মুখে জানলা খুলে ধরল ব্লেক, ‘কী চাই?’ দাঁত খিঁচিয়ে উঠল সে, ‘ওঃ, ভেতরে যা গরম! তার ওপর হতচ্ছাড়া মাছিগুলোর জ্বালায় একটু স্থির হয়ে কাজ করার জো নেই! তা—কী চাই তোমার?’
‘তোমাদের জন্যে খবরের কাজ নিয়ে এসেছি৷’ কাগজগুলো জানলা দিয়ে ভেতরে গুঁজে দিল কিটসন, ‘আর কিছু দরকার থাকলে বলো৷’
‘না, কিছু দরকার নেই৷ যাও কাটো৷’ কথা শেষ করেই সশব্দে জানলা বন্ধ করে দিল ব্লেক৷
সে ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল ট্রাকের পিছন দিকে—দরজার কাছে৷ কেবিন থেকে নিয়ে আসা একটা টুলে বসে জিপো তখন একমনে কাজ করে চলেছে৷ তার দক্ষ আঙুল নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে কম্বিনেশন চাকতির ওপর ট্রাকের দরজার গায়ে কান পেতে সে ঈপ্সিত শব্দের প্রতীক্ষা করছে৷
ক্যারাভ্যানের ভেতরে অসহ্য গরম৷ ব্লেক বাধ্য হয়েই খুলে ফেলেছে তার কোট, জামা—সব৷ তার লোমশ বুক ঘামে সপসপ করছে৷ কয়েক সেকেন্ড সে লক্ষ করল জিপোকে তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বসে পড়ল ক্যারাভ্যানের মেঝেতে, কাগজ পড়তে শুরু করল৷
প্রায় আধঘণ্টা পর কাগজপত্তর একপাশে ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷ জিপোর কাজ দেখতে লাগল৷
চোখ বুজে, একাগ্র মুখে, পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রয়েছে জিপো৷ কান খাড়া করে সে এক মনে শুনে চলেছে৷ অতি সন্তর্পণে সে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলেছে কম্বিনেশন চাকতি৷
‘সেই তখন থেকে কী শুরু করেছ?’ বিরক্তিতে ফেটে পড়ল ব্লেক, ‘তুমি কি মনে করছ, টানা দশ দিন ধরে শুধু এই করে যাবে?’
চমকে উঠে চোখ খুলল জিপো৷ রাগত কণ্ঠে বলল, ‘থামো! কানের কাছে এমনি বকবক করলে কী করে কাজ করব বলতে পার?’
‘আমি আর এই বন্ধ ক্যারাভ্যানে থাকতে পারছি না৷ একটু হাওয়া না পেলে আমি মারা যাব৷’ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখের ঘাম মুছল ব্লেক, ‘আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না, জানালার পরদাটাকে ক্যারাভ্যানের গায়ে সেঁটে, যদি জানলাটাকে খুলে দিই? তাহলে হাওয়াও আসবে অথচ মাছিও ঢুকতে পারবে না—’
‘যা করবার তুমি করো৷ যদি আমাকে দিয়ে ট্রাকের তালা খোলাতে চাও, তাহলে আর বিরক্ত কোরো না৷’
ব্লেক আগুনঝরা চোখে তাকাল জিপোর দিকে৷ তারপর যন্ত্রপাতি রাখার তাকের কাছে এগিয়ে গেল৷ সেখান থেকে একটা হাতুড়ি আর কিছু পেরেক বের করে সে পরদাটাকে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে গেঁথে দিল৷ হাত-বাড়িয়ে খুলে দিল জানলার পাল্লা৷
পরদার ফাঁক দিয়ে ব্লেকের চোখে পড়ল অদূরে বিশাল হ্রদ৷ পরমুহূর্তেই সে দেখতে পেল জিনি ও কিটসন একটা নৌকোয় উঠছে; কিটসন বলিষ্ঠ হাতে বৈঠা চালিয়ে নৌকো নিয়ে এগিয়ে চলল আর তখনই ঈর্ষার অন্ধ ক্রোধ আছড়ে পড়ল ব্লেকের মনের গহনে৷
‘শালা, খুব ফুর্তি লুটছে৷’ চাপা আক্রোশে ফেটে পড়ল ব্লেক, ‘ওর জায়গায় আজ আমারই থাকা উচিত ছিল৷ ওই যে শালা জিনিকে নিয়ে মৌজ করছে...’
জিপো গলা বাড়িয়ে ট্রাকের পাশ দিয়ে তাকাল৷ কর্কশ স্বরে বলে উঠল, ‘তুমি কি দয়া করে একটু চুপ করবে!’ এভাবে বিরক্ত করলে কাজ করব কী করে?’
‘আচ্ছা, আচ্ছা বাবা—ঠিক আছে৷’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘ষাঁড়ের মতো আর চেঁচিয়ো না!’
যন্ত্রণাক্লিষ্ট আঙুলগুলোকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার ইচ্ছায় প্যান্টের গায়ে হাত ঘষতে লাগল জিপো; স্থির চোখে চেয়ে রইল কম্বিনেশন চাকতিটার দিকে৷
এতক্ষণ ধরে শুধু তার পরিশ্রমই সার হয়েছে কম্বিনেশনের একটা নম্বরও সে মেলাতে পারেনি৷ হয়তো এইভাবে দিনের পর দিন তাকে এই কম্বিনেশনের চাকতি নিয়েই পড়ে থাকতে হবে—শেষ পর্যন্ত ক্লান্তি ও হতাশার শিকার হয়ে পড়বে জিপো৷ হয়তো কোনওদিনই এই ট্রাকের তালা সে খুলতে পারবে না৷
‘নাঃ, এবারে একটু বিশ্রাম নেওয় দরকার৷ হাতের আঙুলগুলোয় যেন খিল ধরে গেছে৷’
এগিয়ে এসে খোলা জানলার সামনে দাঁড়াল জিপো৷ বাইরের বাতাসের স্পর্শ পেয়ে বুকভরে শ্বাস নিল সে৷ বায়ু চলাচলের ফলে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে৷
‘ওই তালাটাকে অন্য কোনওভাবে তাড়াতাড়ি খোলা যায় না?’ জানতে চাইল ব্লেক, কিন্তু তার চোখজোড়া হ্রদে ভাসমান বিশেষ নৌকোটার ওপর নিবদ্ধ৷ কিটসনের বলিষ্ঠ হাতের চালনায় জল কেটে নৌকোটা দ্রুত বেগে এগিয়ে চলেছে৷
‘ফ্র্যাঙ্ককে তো আমি আগেই বলেছিলাম, তালা খোলার কাজটা নেহাত সহজ হবে না৷ হয়তো শেষ পর্যন্ত আমি নাও পেরে উঠতে পারি৷’
‘তাই নাকি?’ জিপোর চোখে-চোখ রাখল ব্লেক, ‘তবে আমার মনে হয়, তালাটা খুললেই তুমি ভালো করবে, জিপো! আমার কথা তোমার কানে ঢুকেছে? তালা তোমাকে খুলতেই হবে!’
ব্লেকের চোখের করাল দৃষ্টির সামনে যেন কুঁকড়ে গেল জিপো৷ কোনওরকমে বিড়বিড় করে সে জবাব দিল, ‘আমি তো আর ম্যাজিক জানি না—!’ হয়তো এ তালা পৃথিবীর কারও পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়৷’
‘অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে ম্যাজিক তোমাকে দেখাতেই হবে, জিপো৷’ হিংস্র স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘যাও৷ কাজ শুরু করো৷ যত বেশি সময় কাজ করবে তত তাড়াতাড়িই খুলবে ট্রাকটা তালাটা... যাও৷’
জিপো আবার ফিরে গেল ট্রাকের দরজার কাছে৷ বসে পড়ে কান চেপে ধরল দরজার গায়ে৷ তারপর সেই আগের মতো আবার ঘোরাতে শুরু করল কম্বিনেশন চাকতি প্রথম নম্বরটা মেলানোর আশায়৷
সন্ধ্যার আগেই জিপো পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়ল৷ টুলে বসে ট্রাকের দরজায় হেলান দিয়ে সে চুপচাপ বসে রইল৷ তালা খোলার আর কোনও চেষ্টাই করল না৷
জিপোর উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে ব্লেক তাকে আর বিরক্ত করল না৷ কিন্তু ট্রাকের তালার ব্যাপারে ভেতরে ভেতরে সে বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ল৷
এই গরমে একটানা বারো ঘণ্টা কাজ করে গেছে জিপো৷ মাঝখানে শুধু বিশ্রাম পেয়েছে মাত্র এক ঘণ্টা৷ এখনও পর্যন্ত সে কেবল একটা নম্বর মেলাতে সক্ষম হয়েছে৷ তার অনুমান, কম করে আরও পাঁচ পাঁচটা নম্বর তাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ কিন্তু তবু ভালো যে বারো ঘণ্টা পরিশ্রম একেবারে বৃথা যায়নি৷ এবং সেই কারণেই জিপোর সাফল্য সম্পর্কে ব্লেক হয়ে উঠেছে আরও আশাবাদী৷ হয়তো আগামীকালই আরও দুটো নম্বর জিপো খুঁজে পাবে৷ হয়তো এ সপ্তাহেই খুলে যাবে ট্রাকের তালা৷
অন্ধকার একটু ঘন হয়ে আসতেই কিটসন ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে দিল৷ ওরা ক্ষিপ্রগতিতে ঢুকে গেল কেবিনের ভেতরে।
জিনি ওদের খাবার ব্যবস্থা করেই রেখেছিল, সুতরাং দেরি না করে খেতে বসল ওরা। গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। মাঝে মধ্যে গম্ভীরভাবে কিটসনকে দেখছিল ব্লেক। কিটসনের মুখ সারাদিনের উত্তাপে তামাটে হয়ে উঠেছে। তার মানে জিনিকে নিয়ে সারাটা দিনই বাইরে বাইরে কাটিয়েছে। মুহূর্তের জন্য ঈর্ষা ও ক্রোধের তরঙ্গ ছুঁয়ে গেল ব্লেকের মনকে।
জিপো একমনে খেয়ে চলল। খাওয়া শেষে ওর মুখমণ্ডল থেকে মিলিয়ে গেল ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ। সে আবার আগের মতোই সুস্থ, সতেজ হয়ে উঠল।
খাওয়া শেষ করে একটা আরাম কেদারায় গা-এলিয়ে দিল ব্লেক। একটা সিগারেট ধরিয়ে চোখ ফেরাল অবশিষ্ট তিনজনের দিকে, ‘শোনো, আজ কিছু না হলেও সামান্য এগোনো গেছে। একটা কম্বিনেশন নম্বর মেলাতে পেরেছে জিপো। কিন্তু আমার মনে হয়, এখন থেকে রাতেও ক্যারাভ্যানের পাহারায় থাকা দরকার। কারণ, কেউ অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ক্যারাভ্যানের জানলা দিয়ে উঁকি মারুক, বা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করুক তা আমরা চাই না। কিটসন, এই রাতে পাহারা দেবার দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে। সারাদিন তোমার কোনও কাজই থাকে না, সুতরাং আশা করি রাতে এই সামান্য কষ্টটুকু তুমি সইতে পারবে।’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল; বোঝাতে চাইল, এ আর বেশি কথা কী।
সে উপলব্ধি করল, ব্লেকের কথায় যুক্তি আছে। রাতে কোনও চোর-ছ্যাঁচোড়ের মাথায় ক্যারাভ্যান লুট করার মতলব গজিয়ে ওঠাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আর সত্যিই যদি কেউ সে মতলব করে, তাহলে তাদের সমস্ত পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে।
‘ঠিক আছে।’ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল কিটসন, ‘আমি তাহলে ক্যারাভ্যানেই যাচ্ছি।’
কিটসন বিনা প্রতিবাদে তার কথা মেনে নেওয়ায় ভীষণ অবাক হল ব্লেক। সে চেয়ে রইল প্রস্থানরত কিটসনের দিকে। বাইরে বেরিয়ে দরজাটা আবার টেনে বন্ধ করে দিল কিটসন। আজ সকালটা তার ভালোই কেটেছে। বাইরের লোকের সামনে অভিনয় হলেও সে অন্তরঙ্গভাবে জিনিকে কাছে পেয়েছে। তার মনের কোণে একটা ক্ষীণ আশাও শেষ পর্যন্ত জন্মাতে শুরু করেছে : জিনি কি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে?
কিন্তু সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর কিটসন পায়নি। একেক সময় জিনির চোখে চেয়ে তার মনে হয়েছে এর সবটাই বুঝি অভিনয়—তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু তবুও হাল ছাড়েনি কিটসন। এখন তার একমাত্র নেশা জিনি গর্ডন।
কিটসন বেরিয়ে যেতেই ব্লেক ফিরে তাকাল জিনির দিকে, ‘আজ আমি আর জিপো বিছানায় শোব; তুমি সোফায় শোবে। কারণ সারাদিন ধরে আমরা কম পরিশ্রম করিনি—সুতরাং আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। তোমার এতে আপত্তি আছে নাকি?’
নির্লিপ্তভাবে কাঁধ ঝাঁকাল জিনি, ‘না—আপত্তি থাকবে কেন?’
ব্লেক অচঞ্চল চোখে চেয়ে রইল, ‘অবশ্য জিপো যদি সোফায় শুতে চায়, তবে—’
‘ধন্যবাদ—তার কোনও প্রয়োজন হবে না; আমি সোফাতেই শুতে পারব।’ সংক্ষিপ্ত স্বরে বাধা দিল জিনি। ব্লেকের ইঙ্গিত ধরতে তার অসুবিধে হয়নি।
ব্লেক হাসল, ‘তোমার যা ইচ্ছে।’ উঠে দাঁড়াল সে। ঘরের তাকে রাখা তাসের একটা প্যাকেট নামিয়ে নিয়ে এল। চেয়ারে বসে তাস ভাঁজতে শুরু করল, ‘কী এক হাত হবে নাকি?’
‘না, আমি এখন একটু বাইরে হাঁটতে যাব। ফিরে এসে এ ঘরটা যেন খালি পাই।’
ঘরের থমথমে পরিবেশ জিপোর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। একমনে সে শুনতে লাগল ওদের কথাবার্তা।
‘নিশ্চয়ই খালি পাবে।’ ব্লেক তখনও হাসছে, ‘এই জিপো, চলো আমরা শোবার ঘরে গিয়ে তাস খেলি। বিছানায় বসেই তাস পাতা যাবে—।’
জিপো উঠে গেল শোবার ঘরে।
‘যাক, তোমার ঘর তাহলে খালি করে দিলাম, জিনি। কিন্তু আলেক্সের সঙ্গে দিনটা কী রকম কাটল বলো, শুনি। শেষ পর্যন্ত কি ওর গলায় ঝুলেই পড়লে?’
জিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, দু-চোখে নগ্ন ঘৃণা, ‘আমার সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কের কি সেই কথাই ছিল?’ শান্ত স্বরে পালটা প্রশ্ন করল ও।
‘না, তা নয়, কিন্তু বলা তো যায় না, তোমার কোমল হৃদয়ের মধ্যে কখন কী ঘটে যায়৷ অবশ্য কিটসনকে পছন্দ করার মতো মেয়ে এই আমেরিকাতে খুব কমই আছে৷ তবে সে যে তোমাকে মন প্রাণ সঁপে দিয়ে বসে আছে তাতে কোনও সন্দেহই নেই৷’
জিনি উঠে এগিয়ে গেল সদর দরজার দিকে৷
ব্লেকের চোখ ওকে অনুসরণ করল, ‘আমরা দুজনে জুটি বাঁধলে কেমন হয়, সুন্দরী? ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখলে হয় না?’ দরজা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল জিনি৷
‘তোমার মাথার ঠিক নেই৷’ কথাটা বলেই ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাইরের অন্ধকার পরিবেশে৷ একবার পিছন ফিরে তাকাবার প্রয়োজনও অনুভব করল না৷ যাওয়ার আগে সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে গেল দরজাটা৷
দু-চোখে শীতল, কুৎসিত দ্যুতি নিয়ে ইতস্তত করল ব্লেক৷ একবার মনে হল, এখুনি ছুটে যায় জিনির পিছনে, তার সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলার পরিণতি যে ভালো নয়, সেটা ভালো করে ওকে সমঝে দেয়—কিন্তু... কিন্তু কিটসন তাহলে বেরিয়ে আসবে ক্যারাভ্যান থেকে; আর কিটসনের সঙ্গে চরম বোঝাপড়ার জন্যে ঠিক এই মুহূর্তে সে প্রস্তুত নয়৷
সুতরাং নিজেকে সংযত করে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷ কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে এল শোবার ঘরে৷
জিপো বিছানার ওপরেই বসে ছিল৷ সে যে খুব একটা স্বস্তি বোধ করছে না, সেটা তার মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷
ব্লেককে দেখেই সে বলে উঠল, ‘এড, তুমি মেয়েটাকে ছেড়ে দাও৷ একেই আমাদের হাতে সমস্যার অন্ত নেই, তার ওপর আবার এই মেয়ের ঝামেলা!’
‘ওঃ থামো দেখি!’ খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷ তারপর বিছানায় বসে তাস বাঁটতে শুরু করল৷
রাত এগারোটা নাগাদ ওরা জিনির ফিরে আসার শব্দ পেল৷ মিনিট কয়েক পরেই ওদের কানে এল কলঘরে জল পড়ার শব্দ—সম্ভবত জিনি স্নান করছে৷
সিগারেটের টুকরোটা ঘষে নিভিয়ে তাসগুলো প্যাকেটে ভরে ফেলল ব্লেক, ‘এসো জিপো, এবার শুয়ে পড়া যাক, কাল অন্ধকার থাকতে থাকতেই আমরা ক্যারাভ্যানে ঢুকে পড়ব৷’
জিপো একেই ভীষণ ক্লান্ত ছিল, সুতরাং আলো নিভিয়ে দেওয়ার মিনিট দশেক পরেই সে নাক ডাকতে শুরু করল৷
অন্ধকারে চোখ মেলে কান খাড়া করে শুয়ে রইল ব্লেক৷ বসবার ঘরে জিনির নড়াচড়ার শব্দ সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্চে৷ মিনিট কয়েক পরেই পাশের ঘর থেকে আলো নেভানোর শব্দ পেল সে৷
নারী-সংক্রান্ত ব্যাপারে সরাসরি পদ্ধতিতেই ব্লেকের বিশ্বাস, তার মতে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা সময়ের অপব্যবহারেরই নামান্তর৷ সুতরাং—
সুতরাং গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে উঠে বসল ব্লেক৷ নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে চলল ঘরের দরজার দিকে৷ একমুহূর্তে থমকে সে ফিরে তাকাল নিদ্রামগ্ন জিপোর দিকে৷ তারপর আশ্বস্ত হয়ে দরজার হাতল ঘোরাতে শুরু করল৷ অতি সন্তপর্ণে দরজা খুলে বসবার ঘরে পা-রাখল ব্লেক৷ আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিল শোবার ঘরের দরজা৷
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে উঠল ঘরের আলো৷ জিনি উঠে বসল সোফায়৷ ওর পরনের ফিকে নীল রাত্রিবাস ব্লেকের কামনাকে করে তুলল দুর্দম৷ সে একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে এগিয়ে গেল জিনির দিকে... সোফার কাছে গিয়ে থামল ব্লেক৷ চোখ নামিয়ে তাকাল জিনির তেইশ বসন্তের যৌবনের দিকে৷
‘ভাবলাম, তোমার সঙ্গে একটু গল্প গুজব করি৷ দেখি—সরে বোসো একটু৷’ হাতের একটা ভঙ্গি করে সোফায় জিনির পাশে বসতে গেল ব্লেক৷
জিনি স্থির ভাবে বসে রইল; ওর সাগর-সবুজ চোখ ভাবলেশহীন, নিষ্পলক৷
‘বেরিয়ে যাও৷’ চাপা স্বরে আদেশ দিল জিনি৷
‘ওহ-হো—তুমি দেখছি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছ?’ সোফার হাতলে বসে পড়ল ব্লেক, ‘কিন্তু জানো, তোমার জন্যে আমি কত কী ভেবে রেখেছি? লক্ষ্মীটি, জিনি, একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো৷ নিজেদের ভাগের টাকা পেয়ে গেলে আমরা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াব৷ আমি তোমাকে নিয়ে যাব লন্ডনে, প্যারিসে৷ তুমি কি আমার সঙ্গী হতে রাজি নও?’
‘আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলেছি৷’ জিনি আবার বলল৷ ওর মুখের নির্লিপ্ত, শান্ত ভাব ব্লেকের উত্তেজনাকে আরও অধৈর্য করে তুলল৷
‘না, তেমন করে না বললে তুমি শুনবে না দেখছি...’ ব্লেক হাত বাড়িয়ে জিনিকে জড়িয়ে ধরল৷ ওকে কাছে টানতে যেতেই সে অনুভব করল, তার বুকে কোনও ধাতব বস্তুর কঠিন পরশ৷
চোখ নামাতে তার হৃৎপিণ্ডর গতি পলকের জন্যে স্তব্ধ হয়েই উন্মাদের মতো ছুটতে শুরু করল৷ তার বুকে একটা .৩৮ চেপে ধরেছে জিনি৷
‘আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে নাও৷’ ইস্পাত শীতল স্বরে আদেশ করল জিনি৷ ব্লেক ভয় পেল৷ ‘খুব ধীরে ধীরে হাত সরাবে—নয়তো একেবারেই ঝাঁঝরা করে দেব৷’
অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে জিনির শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিল ব্লেক৷ আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ৷ কেন যেন তার মনে হল, এতটুকু বেচাল দেখলেই জিনি সত্যি সত্যি তাকে নৃশংসভাবে খুন করবে৷ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে হাত তুলে ধরল ব্লেক, চোখের দৃষ্টি .৩৮ এর শীতল নলের ওপর৷
‘এবার উঠে দাঁড়াও৷ আস্তে, আস্তে—হাত দুটো মাথা থেকে নামাবে না৷’
ধীরে-ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল ব্লেক৷ পায়ে-পায়ে পিছোতে শুরু করল৷
‘বেরও ঘর থেকে!’ রিভালভারটা সোজাসুজি ব্লেকের বুক লক্ষ করে উঁচিয়ে ধরল জিনি, ‘যদি দ্বিতীয় দিন এরকম সুযোগ নেবার চেষ্টা করো, তাহলে তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারব৷ এবারে নিজের ঘরে কেটে পড়ো, দরজার বাইরে আর এসো না৷’
ব্লেক গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘আচ্ছা, সুন্দরী৷ তোমাকে আমি দেখে নেব৷ এখন থেকে সাবধান থেকো৷ এডওয়ার্ড ব্লেক কখনও অপমানের বদলা নিতে ছাড়ে না৷’
‘থাক, থাক—অনেক হয়েছে৷’ জিনি ব্যঙ্গভরে বলে উঠল, এখন রাস্তা দেখুন, শ্রীমান৷ এরপর থেকে প্রস্তুত হয়ে অভিসারে আসবেন৷’
শোবার ঘরে ফিরে এসে ব্লেক দরজা বন্ধ করে দিল৷ রাগে অপমানে তার সর্বশরীর কাঁপছে৷
জিনি যদি এরপরও ভেবে থাকে যে ওর ভাগের দু-লাখ ডলার ওকে দেওয়া হবে, তাহলে ভীষণ ভুল করবে৷ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল ব্লেক৷
জিনিকে সে উচিত শিক্ষা দেবে৷ তাকে বন্দুক দেখানোর পরিণাম যে কত ভয়ঙ্কর, সেটা সে ওকে হাড়ে-হাড়ে সমঝে দেবে৷
কিটসনকেও ব্লেক ছাড়বে না৷ জিনি আর ওই মাথামোটা কিটসনকে সে এমন দাওয়াই দেবে, যা ওরা কোনওদিনই ভুলবে না৷
হঠাৎই অন্ধকারের মধ্যে হিংস্রভাবে দাঁত বের করে হেসে উঠল ব্লেক৷
আড়াই লাখ ডলারের চেয়ে সাড়ে সাত লাখ ডলারের আবেদন যে কোনও মানুষের কাছেই অনেক বেশি—ব্লেকের কাছে তো গোটা সাম্রাজ্য৷
টাকাটা নিয়ে সে কিভাবে খরচ করবে, সেটা শুয়ে-শুয়ে বহুক্ষণ ধরে ভাবল ব্লেক৷
হঠাৎ একসময় আরও একটা অদ্ভুত চিন্তা ব্লেকের মাথায় এসে জমাট বাঁধল৷ জিপোকেও যদি সে সরিয়ে দেয়, তাহলে কেমন হয়? তখন পুরো টাকাটাই সে একা ভোগ করবে—কোনও অংশীদারই থাকবে না৷
সাড়ে সাত লাখের চেয়ে পুরোপুরি দশ লাখ অনেক বেশি৷ ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল পৃথিবীকে সে রাখবে হাতের মুঠোয়৷
‘হুঁঃ...দশ লাখ ডলার থাকলে এই পৃথিবীটাকে এক হাটে কিনে আরেক হাটে বেচতে পারে ব্লেক৷ সে সহজেই হতে পারে এই পৃথিবীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট৷
পরবর্তী দুটো দিন একই ভাবে কেটে গেল৷ প্রতিদিন খুব ভোরে ব্লেক আর জিপো চলে যায় ক্যারাভ্যানে, আর কিটসন ফিরে আসে কেবিনে৷ ঘণ্টাকয়েক বিশ্রামের পর সে আর জিনি বেরিয়ে পড়ে কেবিনের বাইরে—তাদের দৈনন্দিন অভিনয় পর্বকে বাস্তবানুগ করে তুলতে তারা হাতে-হাত রেখে ঘুরে বেড়ায় হ্রদের ধারে, নৌকো করে ভেসে বেড়ায় হ্রদের নীল জলে, অথবা সাঁতারে হয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী৷
জিপো সারাটা দিন লেগে থাকে ট্রাকের দরজার পিছনে৷ আর সেই সময়টা খবরের কাগজ পড়েই কাটিয়ে দেয় ব্লেক৷
দৈনন্দিন খবরগুলো ব্লেকের মনে রীতিমতো আশার উদ্রেক করল৷ কারণ পুলিশ ও সৈন্যবাহিনীর লোকেরা উধাও ট্রাকটাকে খুঁজতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে৷ অবশ্য তারা এখনও অনুসন্ধানে ক্ষান্ত হয়নি, কিন্তু কাগজওলাদের কাছে পুলিশের বক্তব্যে হতাশার সুরটাই প্রকট হয়ে উঠেছে৷ শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, ট্রাকটাকে অন্য কোনও গাড়িতে উঠিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ কিন্তু অতবড় জিনিসটা কী করে যে বেমালুম অদৃশ্য হল সেটা তারা এখনও ভেবে পাচ্ছে না৷ তাদের ধারণা, ইতিমধ্যেই ট্রাকটাকে আমেরিকার বাইরে পাচার করে ফেলা হয়েছে৷ প্রায় পাঁচশো মাইল জায়গা জুড়ে তারা তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে পাঁচ হাজার ডলার৷
দুশো সৈনিক ও পুলিশ মিলে ফক্স উডকে চিরুনির মতো আঁচড়ে দেখেছে, উধাও ট্রাকের কোনও হদিশ পাওয়া যায় কি না৷ তাছাড়া রাস্তায়-রাস্তায় শ্যেনচক্ষু মেলে টহল দিচ্ছে উড়ন্ত হেলিকপ্টার৷
সৈন্যবাহিনীর প্রধান কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, আজ হোক কাল হোক, ট্রাক তারা খুঁজে বের করবেই৷ কারণ ট্রাকটা যেভাবে অদৃশ্য হয়েছে, এবং এখনও পর্যন্ত হয়ে আছে, তা বাস্তবে সম্পূর্ণ অসম্ভব৷
পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী যে হারে পরিশ্রম করে চলেছে, সেই একইভাবে পরিশ্রম করে চলেছে ব্লেক ও জিপো—ক্যারাভ্যানের ভেতরে, লোকচক্ষুর আড়ালে৷
গত দু-দিন ধরে জিপোর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে৷
সারাদিন সে ক্যারাভ্যানের বদ্ধ আবহাওয়ায়, অসহ্য গরমের মধ্যে ধৈর্য ধরে কাজ করে গেছে৷ টুলে বসে ঘর্মাক্ত দেহে একমনে কান পেতে থেকেছে৷ মাঝে মাঝে বিরক্তিভরে ট্রাকের তালাকে অভিসম্পাত করেছে জিপো৷ কিন্তু কোনও ফল হয়নি৷ দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা তার অজ্ঞাতই থেকে গেছে৷
খবরের কাগজ পড়া আর জিপোর কার্যকলাপ লক্ষ করা ছাড়া ব্লেকের আর কোনও কাজ ছিল না৷ সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই যতই সময় গেছে, সে ততই চিন্তিত হয়ে পড়েছে৷ ক্যারাভ্যানের প্রচণ্ড গরম, তালা খোলার সমস্যা—ইত্যাদি চিন্তায় ব্লেকের স্নায়ুমণ্ডলী একেই ভারাক্রান্ত, তার ওপর জিনি ও কিটসনের কথা মনে হতেই সে অন্ধ ক্রোধে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে৷ কোথায় এখানে তারা গলদঘর্ম হয়ে পরিশ্রম করে চলেছে, আর কিটসন কি না জিনিকে নিয়ে ঘুরে ফিরে মজা লুটছে৷
কিটসন যতই নির্বোধ হোক না কেন, একদিনের একান্ত অবসরে জিনির মনের ওপর মোটামুটি একটা ছাপ সে রাখতে পেরেছে বলেই ব্লেকের ধারণা৷ কারণ পুরো তিন-তিনটে দিন হাতে পেয়ে কোনও মানুষই এমন সুযোগ হাতছাড়া করবে না৷ ব্লেক নিজে যদি মাত্র বারো ঘণ্টাও সময় পেত, তাহলে ওই সময়ের মধ্যেই জিনি তার কাছে আত্মসমর্পণ করত৷ সুতরাং বিরক্তি ও মানসিক অস্বস্তির মধ্যেও জিনি-কিটসনের ভাবনা তার মনে ঈর্ষা জাগিয়ে তুলল৷
তৃতীয় দিন সন্ধে ছটা নাগাদ জিপো ভেঙে পড়ল৷ অপরাহ্নের সূর্য তখন সুদুর পর্বতশ্রেণির আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছে৷ বেলাশেষের রক্তিম আভা প্রতিফলিত হয়েছে হ্রদের স্বচ্ছ জলে৷ ঠিক সেই সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে উন্মাদ হয়ে পড়ল জিপো৷
গত তিনদিন ধরে এই অসহনীয় পরিবেশে জিপো একটানা কাজ করে গেছে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করল, সে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়েছে৷
দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা সে মেলাতে পারেনি৷ কম্বিনেশন চাকতিটা সে একচুল-একচুল করে পুরোটা ঘুরিয়েছে, কিন্তু তবুও দ্বিতীয় নম্বরটা মেলেনি৷ কারণ জিপোর তীক্ষ্ণ কানে নম্বর মেলানোর অস্ফুট ধাতব শব্দটা ধরা পড়েনি৷ অর্থাৎ চাকতিটাকে সে প্রয়োজনমতো সতর্ক হাতে ঘোরাতে পারেনি৷ যার ফলে দ্বিতীয় নম্বরের বিশেষ জায়গাটা সে বরাবরই পার হয়ে গেছে৷ অর্থাৎ যে দক্ষ হাতজোড়া জিপোর গর্বের বস্তু ছিল, তারা কম্বিনেশন চাকতিকে তেমন সূক্ষ্মভাবে ঘোরাতে পারেনি৷
‘না, এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়৷’ হঠাৎই চিৎকার করে উঠেছে জিপো৷ ট্রাকের দরজার গায়ে অবসন্নভাবে গা-এলিয়ে দিয়েছে৷ ‘এ তালা খোলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এড! এভাবে বেগার খেটে কোনও লাভ নেই৷ বিশ বছর ধরে চেষ্টা করলেও এই ট্রাকের দরজা আমি খুলতে পারবও না! আমাকে ছেড়ে দাও, এড৷ আর কিছুক্ষণ থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব৷’
জিপোর কণ্ঠস্বরে অপ্রকৃতিস্থতার আভাস ব্লেককে চঞ্চল করে তুলল৷ চট করে উঠে দাঁড়াল সে, রিভলভার হাতে এগিয়ে এল জিপোর কাছে৷
‘থামো!’ রিভলভারের নলটা জিপোর পাঁজরে চেপে ধরে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যদি এই ট্রাকের তালা তুমি না খোলো, তাহলে তোমাকে আমি খুন করব!’
জিপো অসহায়ভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ তার স্থূল দেহ কান্নার দমকে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল৷
‘তাই করো! খুন করো আমাকে৷ তুমি কি ভেবেছ মরতে আমি ভয় পাই?’ ভাঙা কর্কশ স্বরে জিপো চিৎকার করে উঠল, ‘কিন্তু এই শালার ট্রাকের তালা তুমি আমাকে খুলতে বোলো না! তার চেয়ে মেরেই ফেলো আমাকে! আমি আর পারছি না!’
রিভলভারের নল দিয়ে নৃশংসভাবে জিপোকে আঘাত করল ব্লেক—সরাসরি মুখের ওপর৷ জিপো ছিটকে পড়ল মেঝেতে৷ তার গাল কেটে দরদর করে রক্ত বেরোতে লাগল৷ সেই রক্তের ধারা গলা বেয়ে নেমে এল তার বুকের ওপর৷ ট্রাকের পাশেই অবসন্নভাবে পড়ে রইল সে চোখ দুটো যন্ত্রণায় বোজা৷
‘মেরে ফেলো! শেষ করে দাও আমাকে৷ আমি এসব আর সইতে পারছি না?’ জিপো হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল৷ তার রক্তাক্ত মুখ বীভৎস হয়ে উঠেছে৷
‘থাম বলছি শাল কুত্তির বাচ্চা৷ নয়তো গলা টিপে তোকে শেষ করে দেব?’ মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল ব্লেক৷ জিপোর অবস্থা দেখে সে তখন চিন্তিত হয়ে পড়েছে৷ সত্যিই যদি জিপো শাসনের বাইরে চলে যায়, তাহলে তাদের সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে৷ তাছাড়া এই চেঁচামেচির শব্দ বাইরের লোকের কানেও তো যেতে পারে৷
‘আমি আবারও বলছি এড, আমাকে তুমি ছেড়ে দাও৷ এ তালা আমি খুলতে পারব না৷’ কান্নাভেজা স্বরে আকুতি জানাল জিপো৷ তারপর দু-হাতে মুখ ঢাকল৷
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যারাভ্যানের দরজায় কে যেন টোকা মারল একবার... দু-বার৷ ব্লেকের হৃৎপিণ্ড যেন হোঁচট খেল৷ কে এল এই অসময়ে?
জিনি আর কিটসনকে সে দেখেছে বুইক নিয়ে শহরের দিকে যেতে—সম্ভবত কিছু কেনাকাটা করতে৷ না, বর্তমান আগন্তুক যে ওদের দুজনের কেউ নয়, সে বিষয়ে সে নিশ্চিত৷ তাহলে...?
জিপো আবার তার গোঙানি শুরু করতেই ব্লেক তার হাত চেপে ধরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিল, হিংস্র ফিসফিস স্বরে ধমকে উঠল, ‘চুপ করো৷ ক্যারাভ্যানের দরজায় কেউ এসেছে!’
জিপোর সারা শরীর আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল সে৷
ওরা দুজন নিশ্চল; শুধু কান খাড়া করে পরবর্তী ঘটনার অপেক্ষায় রইল৷
আবার শোনা গেলে দরজায় টোকা মারার শব্দ৷
হাতের ইশারায় জিপোকে তার জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে বলল ব্লেক৷ তারপর রিভলভারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে পা টিপে-টিপে এগিয়ে চলল পরদা-ঢাকা জানলার দিকে৷ একপাশে দাঁড়িয়ে অতি সন্তর্পণে পরদার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল সে৷
ক্যারাভ্যানের দরজায় দাঁড়িয়ে একটা বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে৷ ক্যারাভ্যানটার দিকে সংশয়াপন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাঝেমাঝেই সে টোকা মেরে চলেছে৷ তার হাতে একটা খেলনা পিস্তল, দরজার দিকে তাক করা৷
ব্লেক চুপচাপ ছেলেটাকে লক্ষ করতে লাগল৷ তার ঠোঁটজোড়া নৃশংস হাসিতে সরে এসেছে দাঁতের ওপর থেকে৷ চোখে ক্রূর দৃষ্টি৷
ছেলেটার পরনে সুতির প্যান্ট, আর সাদা লাল ডোরাকাটা একটা জামা৷ পায়ে জুতো বা চটি কিছুই নেই৷ মাথায় অবহেলাভরে বসানো একটা ভাঙাচোরা শোলার টুপি৷ কৌতূহলভরা স্থির চোখে ছেলেটা তাকিয়ে আছে ক্যারাভ্যানের দরজার দিকে৷ তার সূর্যস্নাত মুখে কেমন একটা হতবুদ্ধি ভাব৷
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ছেলেটা অবাক চোখে ক্যারাভ্যানটার দিকে চেয়ে রইল৷ তারপর যেন মনস্থির করে দরজার আরও কাছে এগিয়ে এল৷ হাত বাড়িয়ে জানলার চৌকাঠ চেপে ধরল সে৷ হাতের চাপে নিজের শরীরটাকে জানলা পর্যন্ত তুলতে চেষ্টা করল—সম্ভবত জানলা দিয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা দেখবার আশায়৷
ব্লেকের মুখের ভয়ার্ত, হিংস্র ভাব জিপোর চোখ এড়াল না৷ কিছু একটা বিপদের আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে উঠল৷ ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে ব্লেকের কাছে এগিয়ে এল সে৷ ছেলেটাকে দেখেই জিপো যেন আঁতকে উঠল৷ তার হাত সজোরে আঁকড়ে ধরল ব্লেকের রিভলভার ধরা হাতের কবজি৷
‘না! একটা বাচ্চাকে তুমি গুলি করতে যাচ্ছ? তুমি কি পাগল হয়েছ, এড?’ জিপো তীব্রস্বরে ফিসফিস করে বলল৷
প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনিতে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল ব্লেক৷ কিন্তু যখন সে দেখল, ছেলেটা শত চেষ্টাতেও জানলা পর্যন্ত উঠতে পারছে না, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷
ছেলেটা জানলার চৌকাঠ ছেড়ে মাটিতে নেমে পড়ল৷ আবার অবাক চোখে তাকাল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ চোখে মুখে হতাশা৷
কয়েক মুহূর্ত ক্যারাভ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল৷ ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে হ্রদের কিনারা ধরে হাঁটতে শুরু করল৷ বারকয়েক চিন্তিত ভাবে মাথা নেড়ে এগিয়ে চলল ছেলেটা৷
‘তোমার কি মনে হয় ও আমাদের কথা শুনতে পেয়েছে?’ উদগ্রীব স্বরে জানতে চাইল ব্লেক৷
‘কী জানি!’ ছেলেটার আকস্মিক উপস্থিতির মানসিক সংঘাতে জিপোর বিচার বিবেচনা হঠাৎই আবার ফিরে এসেছে৷
‘ওঃ, আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷’ হাতের উলটোপিঠ দিয়ে মুখ মুছল ব্লেক, ‘জিপো তুমি এখানে এসে বসো; একটু বিশ্রাম নাও, আমি বরং তালাটা খোলবার চেষ্টা করি৷’
‘তুমি খুলবে তালা?’ অবিশ্বাস-বিরক্তিতে জিপো মুখ বিকৃত করল, ‘খবরদার বলছি, ওই তালায় তুমি হাত দেবে না৷ কাজের কাজ তো কিছুই পারবে না, উলটে যে নম্বরটা মিলিয়েছি সেটাকেও নষ্ট করে দেবে৷’
ব্লেক ক্ষিপ্রগতিতে হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল জিপোর জামা৷ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুমিও খুলবে না, আমাকেও খুলতে দেবে না, তাহলে তালাটা খুলবে কে?’
‘তুমি কি এখনও বুঝতে পারছে না, এড? এ তালা আমরা কোনওদিনই খুলতে পারব না৷ গত তিনদিন ধরে আমি এই তালাটার পেছনে লেগে থেকেছি৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা পরিশ্রম করেছি৷ কিন্তু তাতে লাভ কী হল? শুধু একটা নম্বর মিলল, আর বাকিগুলো যেমনকে তেমনই রয়ে গেল, অথচ এই তালাটায় কম করে ছ-টা নম্বর আছে৷ অর্থাৎ পাঁচ-পাঁচটা নম্বর এখনও আমাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ মেনে নিলাম, হয়তো সপ্তাহের চেষ্টার পর-একটা নম্বর আমি মেলাতে পারলাম—অবশ্য পারবই যে তেমন কোনও কথা আমি দিতে পারছি না৷ যদি খুঁজে পাই, তবে তখনও বাকি থাকবে চারটে সংখ্যা৷ ততদিনে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব, এড!’ এই প্রচণ্ড গরমে কারও পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়৷ আমার পক্ষে তো নয়ই৷ অতএব, আমাকে বিদায় দাও৷ আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে; আর নয়৷ শত টাকা দিলেও এ কাজ আমার পোষাবে না, বুঝেছো? এই অমানুষিক পরিশ্রমের মূল্য কখনও টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না—যাবে না!’
‘আঃ থামো তুমি!’ ভীষণভাবে চিৎকার করে উঠল ব্লেক, ‘কী সব বকছ আবোল-তাবোল!’
কিন্তু ব্লেকের আত্মবিশ্বাসও টলে উঠল জিপোর কথায়৷ সে বুঝল, জিপোর কথায় যুক্তি আছে৷ ক্যারাভ্যানের ভেতরে এই উত্তপ্ত পরিবেশে তিন-চার সপ্তাহ কাটানোর কথা চিন্তা করতেই শিউরে উঠল ব্লেক৷
জিপো হতাশভাবে বসে পড়ল টুলে৷ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে হাত চাপা দিয়ে, নিরাশ চোখে চেয়ে রইল কম্বিনেশন চাকতিটার দিকে৷
‘দরজাটা কেটে ফেলা যায় না? জানতে চাইল ব্লেক৷
‘এই ক্যারাভ্যানে বসে? অসম্ভব৷ লোকেরা বাইরে থেকে অ্যাসিটিলিন টর্চের আলো দেখতে পাবে৷ তাছাড়া কিরকম গরম হবে একবার ভেবে দেখো তো৷ আর তার ওপর ক্যারাভ্যানে আগুন লাগবার ভয় তো রয়েছেই!’
‘আচ্ছা, ক্যারাভ্যানটাকে যদি পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাওয়া যায়? ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল, প্রয়োজন হলে ক্যারাভ্যানটাকে আমরা পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাব৷ এখন আমারও মনে হচ্ছে, ও ছাড়া আর উপায় নেই৷ সেখানে তুমি ক্যারাভ্যানের দরজা খোলা রেখেই বেশ নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে৷ কোনও অসুবিধে হবে না কী বলো?’
রক্ত বন্ধ করার আশায় রুমাল বের করে গালের ক্ষতস্থান চেপে ধরল জিপো, ‘আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে৷ আর নয়৷ এবারে আমি বাড়ি ফিরতে চাই৷ এই হতচ্ছাড়া তালা খোলা কারোর কম্মো নয়? এ তালাকে কেউই শায়েস্তা করতে পারবে না!’
‘ঠিক আছে, ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাক৷’ ব্লেকের গলায় হঠাৎই ফুটে উঠল শ্লেষের সুর, ‘কিন্তু তোমার সাহস গেল কোথায়? এই ট্রাকের ভেতরে রয়েছে দশ লক্ষ ডলার! দশ লাখ ডলার! একবার ভালো করে ভেবে দেখো, জিপো!’
‘ঢের ভেবে দেখেছি৷ দশ লাখ কেন, দশ কোটি হলেও আমি এর মধ্যে নেই৷’ জিপোর গলা উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল, ‘তোমাকে তো বার বার একই কথা বলছি৷ তুমি কি বাংলাও বোঝ না?’
ব্লেক বসে পড়ল ক্যারাভ্যানের মেঝেতে, ‘থামো, অনেক হয়েছে৷ আগে ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলে দেখি৷’
ওদিকে জিনি আর কিটসন পনেরো মাইল দুরের শহরে সারা বিকেল ধরে কেনাকাটা করে ফিরে আসছে বুইক চালিয়ে৷ ওরা জানেও না ক্যারাভ্যানে ঘটে যাওয়া নাটকের কথা৷
স্থানীয় দোকান থেকে খাবার জিনিসপত্র কেনাকাটায় যে বিপদের সম্ভাবনা আছে, সেটা জিনি সহজেই বুঝতে পেরেছিল৷ কারণ দোকানদার খাবারের পরিমাণ দেখেই আন্দাজ করতে পারবে এ খাবার স্বামী-স্ত্রীর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি৷ তখনই প্রশ্ন উঠবে অতিরিক্ত লোক সম্পর্কে৷ অর্থাৎ ব্লেক ও জিপোর উপস্থিতি সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়বে৷ তাই ওরা ঠিক করেছিল, রোজকার কেনাকাটা ওরা শহরে গিয়েই নিশ্চিন্তে সেরে আসবে৷
গত দুদিন ধরে কিটসন ও জিনি পরস্পরকে সঙ্গদান করেছে৷ এসেছে পরস্পরের মনের কাছাকাছি৷
নিজের অংশের টাকা পাওয়ার পর ও কিটসনের সঙ্গিনী হবে কি না, এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে গেছে জিনি৷ ও জানে, কিটসন ওকে ভালোবাসে৷ এবং ক্রমে ক্রমে জিনিও আবিষ্কার করেছে, কিটসনকে ও ভালোবেসে ফেলেছে৷ কারণ ব্লেকের মতো কিটসনের ব্যবহার অভদ্র বা রুক্ষ নয়৷ বরং কিটসনের সান্নিধ্য ওকে নিরাপত্তার ইঙ্গিত এনে দেয়৷
ওরা গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে বড় রাস্তা ধরে—ফন হ্রদ অভিমুখে৷ থেকে থেকেই আড়চোখে কিটসনকে দেখছে জিনি৷ না, ভাঙা নাক বাদ দিয়ে কিটসনকে সুদর্শনই বলা চলে—ভাবল ও৷ হঠাৎই ওর ভীষণ ইচ্ছে হল আলেক্সকে সব কথা খুলে বলে—যে কথা বারবারই জানতে চেয়েছে সে, কিন্তু জবাব পায়নি৷
‘আলেক্স...’
কিটসন এক পলক দেখল জিনির দিকে; তারপর আবার চোখ রাখল সামনের রাস্তায়৷ জিনি পাশে থাকলে সে খুবই সতর্কভাবে গাড়ি চালায়৷
‘কী ব্যাপার? কিছু বলবে?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ—’ ইতস্তত করে কাঁধ ঝাঁকাল জিনি৷ কাঁধের ওপর বিশ্রস্তভাবে পড়ে থাকা চুলের গোছা হাত দিয়ে সরিয়ে নিল স্বস্থানে, ‘একদিন তুমি জানতে চেয়েছিলে কী করে ট্রাক বা তার টাকার খবর আমি পেলাম তাইতো?’
‘হ্যাঁ৷’
‘তুমি কি এখনও জানতে চাও, আলেক্স?’
কিটসন অবাক হল৷ আমতা আমতা করে জবাব দিল সে, ‘না মানে আমার এমনিই মনে হয়েছিল৷ তাছাড়া তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার নাক গলানো উচিত হয়নি৷...কিন্তু এখন আবার তোমার সে কথা মনে হল কেন?’
‘তুমি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করেছ, আলেক্স৷ তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে আমার কাছে অসহ্য ও বিরক্তিকর হয়ে উঠত৷ কিন্তু তোমার মার্জিত, ভদ্র ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে৷ তাই আমার সব কথা আমি তোমাকে খুলে বলতে চাই৷...আলেক্স, এর আগে আমি অন্য কোনও দলের হয়ে কখনও কাজ করিনি—’
কিটসন মাথা নাড়াল, ‘আমি তো কখনও তা ভাবিনি৷’
‘তুমি ভাবনি, কিন্তু মরগ্যান ভাবত৷ সে ভাবত, আমি অন্য কোনও দলের কাছ থেকে ট্রাক লুটের এই মতলবটা চুরি করে বেশি বখরার লোভে তোমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছি: সে মুখে কখনও প্রকাশ না করলেও আমি জানতাম মরগ্যান মনে মনে কী ভাবছে৷’
অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসল কিটসন৷ কারণ সে জানে, জিনির ধারণা বর্ণে-বর্ণে সত্যি৷ সত্যিই মরগ্যান তাই ভাবত৷
‘কী জানি। হতে পারে। তবে আমি কখনও ভাবিনি, তুমি আগে অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেছ।’
‘আমি ওই ট্রাক এবং দশ লক্ষ ডলারের কথা জানতে পারি আমার বাবার কাছ থেকে। আমার বাবা ছিলেন রিসার্চ স্টেশনের প্রহরী।’ শান্ত স্বরে বলল জিনি।
‘তাই নাকি!’ চকিতে জিনির দিকে দেখল কিটসন, ‘তবে তো সবই তোমার জানা থাকার কথা।’
‘মনে কোরো না, আমি নিজেকে সতী সাধ্বী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।’ গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিল জিনি। চোখের দৃষ্টি সামনের রাস্তায় স্থির। ‘আমার মায়ের স্বভাব চরিত্র খুব একটা ভালো ছিল না। তার কিছু কিছু দোষ আমি যে পাইনি তা নয়।আমার বয়েস যখন দশ বছর, তখন মা বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। মা সর্বদাই আমাকে বলত, টাকা ছাড়া এই দুনিয়া ফাঁকা। দিন-রাত সব সময় মায়ের মুখে কেবলই টাকার কথা শুনেছি। আমার বাবা ছিল ভালো লোক; কিন্তু হলে কী হবে, তার আয় ছিল খুব সামান্য। বাবা কোনওদিন আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি; কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার টাকার লোভ ক্রমশ বেড়ে চলল। যত বড় হতে লাগলাম, মনের সেই অদম্য লোভ ক্রমশ ততই বিরাট আকার ধারণ করতে লাগল। আমার মনে বয়ে যেত চিন্তার ঝড়—শুধুই ঐশ্বর্য কামনায়। ভালো জামাকাপড় কাকে বলে জানতাম না। ন-মাসে ছ-মাসে মাত্র একবার সিনেমা দেখার সুযোগ পেতাম। বেশির ভাগ সময়ই আমার কেটে যেত বিভিন্ন মনোহারি দোকানের শো-কেসের দিকে তাকিয়ে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম দামি দামি জিনিসগুলো—সেগুলো চিরকালই থেকে যাবে আমার নাগালের বাইরে; আর ঈর্ষা করতাম সেই লোকগুলোকে, যারা গোছা গোছা ডলারের নোট বের করে কিনে নিয়ে যেত শৌখিন প্রসাধনের জিনিসগুলো। আমার বাবা প্রায়ই বলত এই দশ ডলারের কথা। যতই শুনতাম ততই স্বপ্ন দেখতাম ওই দশ লক্ষ ডলারের। এমন সময় এল ওই নতুন ট্রাকটা। তখন এজেন্সি টাকাটাকে বিমা করবার প্রয়োজনও মনে করল না। বাবা বলত, নতুন ট্রাকের ওপর এত ভরসা করা ভালো নয়; কারণ ওই ট্রাকটাকে লুট করা এমন কিছু দুরূহ ব্যাপার নয়। আমি আর বাবা প্রায়ই ট্রাক লুটের ব্যাপারে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতাম। ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের ভেতরে ঢুকিয়ে চম্পট দেবার মতলবটা বাবারই। কিন্তু তা বলে ভেব না, বাবা সত্যি সত্যিই ট্রাক লুটের মতলবে ছিল। নেহাত সময় কাটানোর জন্যেই আমরা ও নিয়ে আলোচনা করতাম। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে গভীরভাবে ভাবতাম ট্রাকটা লুট করার কথা। এবং ক্রমে ক্রমে ওই সর্বনাশা চিন্তা আমার মস্তিষ্ককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।’
কিটসন গাড়ির গতি অনেক কমিয়ে এনেছে। একমনে সে শুনছে জিনির কথা। দূরে পাহাড়ের মাথায় গোলাকার রক্তাক্ত সূর্য যেন শেষবারের মতো খুশির আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে ওদের মনে। একসময় পাহাড়ের আড়ালে আশ্রয় নিল বেলাশেষের ক্লান্ত সূর্য।
‘আমার বাবা অত্যন্ত রুগ্ন ছিল।’ হাঁটুর ওপর আঙুল চালাতে-চালাতে বলে চলল জিনি, ‘চাকরি থেকে অবসর নিতে তখনও তার বছর দুয়েক বাকি ছিল। ওই অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারল না কোম্পানি তাকে ছুটি দিল কয়েক মাসের। কিন্তু নির্ধারিত ছুটির পরও ভালো হল না বাবার শরীর। কোম্পানি দিনকয়েক অপেক্ষা করে বাবাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিল; এবং একই সঙ্গে বাবার পেনসন পাওয়ার আশাও শূন্যে মিলিয়ে গেল। আমি কোম্পানির ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে তাকে বুঝিয়ে বলতে চেয়েছিলাম, আমাদের অবস্থাটা; কিন্তু সে আমার কথায় কোনও কানই দিল না। আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করল, যেন আমি কোনও রাস্তার ভিখিরি। সুতরাং বাবা যখন মারা গেল, তখন স্থির করলাম, এ অবিচারের প্রতিশোধ আমি নেবই। তাই মনে মনে এক ঢিলে দু-পাখি মারার মতলব করলাম : বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে, আর সেইসঙ্গে আমিও হয়ে উঠব টাকার কুমির। সমস্ত প্ল্যানটাই আমার ছকে রাখা ছিল, কিন্তু সাহায্যের অভাবে অপেক্ষায় রইলাম। একদিন রাতে একটা কাফেতে বসে আছি, কানে এল দুজন লোকের কথাবার্তা। ওরা মরগ্যান সম্পর্কে কথা বলছিল। তাদের কথা শুনে বুঝলাম, মরগ্যানের মতো লোকের সাহায্যই আমার দরকার। সুতরাং তার কাছেই গেলাম। এই হল আমার কাহিনি। ট্রাক লুটের প্ল্যানটা বাবার মাথাতেই এসেছিল, কিন্তু ওটাকে কাজে লাগাবার কথা স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবেনি।’
‘তোমার বাবার কথা শুনে দুঃখ পেলাম, জিনি।’
‘হ্যাঁ—পাওয়ারই কথা।’ কিটসন দেখল উত্তেজনায় জিনির হাত মুষ্টিবদ্ধ, ‘আলেক্স, এতসব ঝঞ্ঝাট বাধানোর জন্যে আমি দুঃখিত। আমি জানি, আমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, খারাপ মেয়ে; অর্থ-লালসায় আমার নারীসুলভ কোমলতা পর্যন্ত আচ্ছন্ন। এতসব জেনেশুনেও আমি তোমাদের এ কাজে নামতে বাধ্য করেছি। কিন্তু কখনও ভাবিনি অবস্থা এত খারাপের দিকে যাবে, এত জটিল হয়ে উঠবে। একটা লোককে খুন করার কথা বলা কত সহজ। আমরা সিনেমায় যখন নৃশংস হত্যার দৃশ্য দেখি, তখন সেটা আমাদের মনে বিন্দুমাত্রও রেখাপাত করে না। কিন্তু সত্যি-সত্যি যখন চোখের সামনে কোনও লোককে খুন করা হয়...।’
‘শোনো, জিনি, কিটসনের স্বরে ফুটে উঠল আগ্রহের সুর, ‘তুমি আর আমি এ কাজ ছেড়ে দেব। কী, রাজি? আমরা চলে যাব মেক্সিকোয়। এখনও বাঁচবার সময় আছে, জিনি। একবার ভেবে দেখো—।’
জিনি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মাথা নাড়ল, ‘না এখন আর তা হয় না। টমাস ও ডার্কসনকে খুন করার আগে আমাদের এ কথা ভাবা উচিত ছিল। ভাবা উচিত ছিল মরগ্যান মারা যাবার আগে। এখন এর শেষ দেখা ছাড়া আমার উপায় নেই, আলেক্স। কিন্তু ইচ্ছে হলে তুমি ছেড়ে দিতে পার। তুমি ছেড়ে দিলে আমি অন্তত খুব খুশি হব। আমার জন্যে তুমি ভেব না। আমার মনে হয়, দশ লাখ ডলার পাওয়ার আশা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাছাড়া, আমি এখন চরম সীমায় এসে পৌঁছেছি। এর চেয়ে বেশি ক্ষতি আর আমার কী-বা হবে? কিন্তু তুমি ছেড়ে দাও, আলেক্স। তোমার এর মধ্যে আসাই উচিত হয়নি।’ জিনি তাকাল কিটসনের দিকে, ‘কিন্তু কেন তুমি এলে, আলেক্স? তুমি তো এ কাজে মন থেকে সায় দাওনি,আমি জানি। তুমি কেন আমাদের হয়ে ভোট দিলে, আলেক্স?’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ‘একমাত্র তোমার জন্যে৷ যে মুহূর্ত থেকে তোমাকে দেখেছি, আমি আমার মন প্রাণ সব হারিয়ে বসে আছি৷’
‘আমি দুঃখিত, আলেক্স৷ আমি সত্যিই দুঃখিত৷’
‘আচ্ছা জিনি, টাকাটা পাওয়ার পর আমরা পরস্পরের সঙ্গী হলে কেমন হয়?’ সামনের ছুটে আসা পিচ ঢালা পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে প্রশ্ন করল কিটসন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, জিনি৷ তোমার আগে কাউকে কোনওদিন এমন করে ভালো লাগেনি৷’
‘কী জানি...হয়তো তাই৷ টাকাটা পাওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব, আলেক্স৷ যে কোনওরকম জটিলতাকে আমি ভীষণ ভয় করি৷ তুমি যদি আমাকে ব্যাপারটা ভাববার জন্যে কয়েকদিন সময় দাও, তাহলে খুব ভালো হয়৷’
আরেকটু হলেই বুইকটা রাস্তার ধারের পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা মারছিল! কিটসনের আকস্মিক অফুরন্ত আনন্দ, বিস্ময় যেন আর বাঁধ মানতে চাইছে না৷
‘তার মানে,—তার মানে তুমি...৷’
‘হ্যাঁ আলেক্স—’ কিটসনের হাতে হাত বোলাল জিনি, আমাকে একটু ভাববার সময় দাও৷’
ক্যারাভ্যানের ঘাঁটিতে ওরা যখন ফিরে এল, তখন সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে৷
কিটসন কিনে আনা জিনিসপত্রগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রাখল৷ তারপর চলল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ খুশিতে তার মনে আর ধরে না৷ জিনি যে তার প্রস্তাবে সম্মত হবে তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি৷
হ্রদের কাছটা এখন একেবারে নির্জন৷ সুতরাং ব্লেক ও জিপোকে বাইরে আনায় কোনও ভয় নেই৷
ক্যারাভ্যান থেকে ওরা দুজন যখন বেরুল, কিটসন বুঝল, কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷
কারণ জিপো শ্লথ, অবসন্ন পায়ে মাথা নিচু করে এগিয়ে চলেছে কেবিনের দিকে৷ তার ডান গালে একটা লম্বা ক্ষত, তার থেকে এখনও অল্প-অল্প রক্ত বেরচ্ছে৷
কিটসন এ সবের কারণ জানতে চাইলে, জিপো কোনও জবাব দিল না৷ সোজা কেবিনে ঢুকে একটা আরাম-কেদারায় ধপ করে বসে পড়ল৷
ব্লেক বিবর্ণ মুখে সোফার দিকে বসল৷ তার চোখে এক কুৎসিত দ্যুতি৷ হাত বাড়িয়ে হুইস্কির বোতল আর একটা গেলাস তুলে নিল সে৷ কিছুটা নির্জলা তরল সে এক চুমুকে শেষ করে দিল৷ গা-এলিয়ে দিল সোফায়৷
‘একটা বাচ্চা ছেলে আমাদের ক্যারাভ্যানের চারপাশে ঘুরঘুর করছিল৷’ কিটসনকে লক্ষ করে বলল ব্লেক, কিটনস তখন কেবিনের দরজা বন্ধ করে তাতে তালা এঁটে দিচ্ছে, ছোঁড়াটা দরজা বেয়ে উঠে ভেতরটা দেখবার চেষ্টা করছিল৷’
আবহাওয়ার অস্বস্তির আভাস পেয়ে প্রশ্ন করল জিনি, ‘কিন্তু ট্রাকের তালার কী হল?’
ব্লেক হতাশভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কিছুই হয়নি৷’ জিনির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে চলল সে, ‘দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা মেলার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না৷ তাছাড়া জিপোও আর প্রকৃতিস্থ নেই৷’
‘প্রকৃতিস্থ? তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো, ‘আমি এই মুহূর্তেই এ সব ছেড়েছুড়ে চলে যাচ্ছি৷ এ তালা খোলা আমার কর্ম নয়৷ আমার কথা তোমার কানে ঢুকেছে? আমি এর মধ্যে নেই৷’
জিনি শান্ত স্বরে জবাব দিল, ‘এখন আর তা হয় না, জিপো৷...কিন্তু ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো?’
‘ব্যাপার?’ চেয়ারের হাতলে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল জিপো, ‘এই প্রচণ্ড গরমে ওই বদ্ধ ক্যারাভ্যানের ভেতরে কাজ করা কারও সাধ্য নয়৷ সে যে কী অসহ্য গরম তা তুমি বুঝতে পারবে না৷ গত তিনদিন ধরে একটানা আমি তালার পেছনে লেগে থেকেছি, কিন্তু কোনও ফল হয়নি৷ সুতরাং এর ভেতরে আমি আর নেই৷’
‘তুমি ফ্র্যাঙ্ককে বলেছিলে তালাটা খুলতে প্রায় মাসখানেক লাগবে৷ কিন্তু এখন মাত্র তিনদিনের চেষ্টার পরই তুমি হাল ছেড়ে দিতে চাও?’
‘যাকগে, ওকে আর ঘাঁটিয়ো না৷’ জিনিকে লক্ষ করে বলল ব্লেক, ‘সকাল থেকে এই এক কথা নিয়ে বকর বকর করে আমি হন্যে হয়ে গেছি৷ তবে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা বীভৎস গরম—ওই গরমে কাজ করা যায় না৷ আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত হয়তো ফ্র্যাঙ্কের কথামতো আমাদের পাহাড়ের দিকে যেতে হতে পারে৷ ওই নির্জন জায়গায় ক্যারাভ্যানের পেছনটা খোলা রেখেই আমরা কাজ করতে পারব৷ নইলে এভাবে ওই বদ্ধ জায়গায় কারও পক্ষেই কাজ করা সম্ভব নয়—অন্তত আমাদের পক্ষে তো নয়ই৷’
‘কিন্তু পাহাড়ের ওপরে ওঠাতে বিপদের সম্ভাবনাও প্রচুর,’ জিনিকে যেন একটু চিন্তিত দেখাল, ‘এখানে কয়েকশো ক্যারাভ্যানের মধ্যে অতি সহজেই আমরা গা-ঢাকা দিতে পারি, কিন্তু ওই নির্জন পাহাড়ি এলাকায় কেউ যদি আমাদের সন্ধান পায় তবে সন্দেহ করতে বাধ্য৷’
‘কিন্তু সে ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আর তো উপায় দেখছি না৷’ ব্লেক অধৈর্য স্বরে বলে উঠল৷ ‘জিপো যদি একান্তই ওই তালা খুলতে না পারে, তাহলে বাধ্য হয়েই আমাদের হয়তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে হবে—এবং সেটা এই ফন হ্রদ এলাকায় বসে করা সম্ভব নয়৷’
‘পুলিশ এখনও প্রতিটি রাস্তায় টহল দিচ্ছে৷’ অস্বস্তিভরে বলল কিটসন, ‘রাস্তায় তারা আমাদের বাধা দিতে পারে, এড৷ তাছাড়া আরই একটা অসুবিধে আছে, আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না, বুইকটা অতো ভারী ক্যারাভ্যানটাকে পেছনে নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে পারবে কি না৷ ওই রাস্তায় আমি আগেও গেছি৷ রাস্তাট ঢালু তো আছেই, তার ওপর এবড়ো-খেবড়ো—কিছুদিন আগে রাস্তাটার কিছু অংশ ঝড়ে ভেঙে গেছে বলে শুনেছি৷’
‘আমাদের দ্বিতীয় কোনও পথ নেই, আলেক্স৷ এ ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে৷ আগামীকাল দুপুরে যদি আমরা রওনা দিই, তাহলে সন্ধে নাগাদ আমরা পাহাড়ি রাস্তায় পৌঁছে যাব৷ কিন্তু আমাদের একটা তাঁবু আর কিছু খাবারের প্রয়োজন৷ অর্থাৎ জিপো ট্রাকের তালা না খোলা পর্যন্ত আমাদের বেশ কষ্ট করেই দিন কাটাতে হবে৷’
‘আমি থাকছি না, এড৷’ ভয়ঙ্কর স্বরে চেঁছিয়ে উঠল জিপো, ‘আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি৷’
ব্লেক কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় শোনা গেল দরজায় কারও টোকা মারার শব্দ৷
কিছুক্ষণ উৎকণ্ঠাময় নিস্তব্ধতা৷ তারপর রিভলভার উঁচিয়ে ধরে আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷
জিপো বিবর্ণ মুখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, দেখতে চেষ্টা করল দরজার দিকে৷
জিনি চাপা উত্তেজিত স্বরে ফিসফিস করে উঠল, ‘লুকিয়ে পড়ো৷ যাও, শিগগির তোমরা শোবার ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ো৷’
ব্লেক জিপোর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে দাঁড় করাল তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেল শোবার ঘরে৷ কিটসন দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেলে কেবিনের দরজার দিকে৷ খুলে দিল দরজা৷
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড৷
‘এই যে, মিঃ হ্যারিসন, অসময়ে বিরক্ত করলাম বলে মাপ চাইছি৷ মিসেস হ্যারিসন কোথায়? রান্নাঘরে বুঝি?’
‘হ্যাঁ৷’ দরজাটা পুরোপুরি আগলে দাঁড়াল কিটসন, ‘কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো?’
‘সামান্যই৷ চলুন, ভেতরে গিয়ে বসি, বেশিক্ষণ আপনাকে আটাকাব না৷’
কিটসনকে ইতস্তত করতে দেখে জিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল দরজার কাছে, মিঃ ব্র্যাডফোর্ডকে অভ্যর্থনা জানাল জিনি৷
ব্র্যাডফোর্ড এসে ঢুকল বসবার ঘরে৷ তাকে দেখে একটু দ্বিধাগ্রস্ত মনে হল৷
‘বলুন কী খাবেন? হুইস্কি না জিন?’ কিটসন ভদ্রতার খাতিরে প্রশ্ন করল৷
‘ধন্যবাদ৷ এখনই ঠিক ভালো লাগছে না৷’ ব্র্যাডফোর্ড বসল একটা চেয়ারে৷ হাঁটুতে হাত ঘষতে লাগল একমনে৷ ‘শুধু শুধু আপনাদের দেরি করাব না, মিঃ হ্যারিসন৷ আমার ছেলে বিকেলের দিকে হ্রদের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছিল৷’ ব্র্যাডফোর্ড সরাসরি চোখ রাখল কিনসনের চোখে, ‘ও বলছে, আপনাদের ক্যারাভ্যানের ভেতরে নাকি দুজন লোক ছিল৷’
কিটসনের হৃৎপিণ্ড আচমকা লাফিয়ে উঠল গলার কাছে৷ সে বিহ্বল চোখে তাকাল জিনির দিকে৷ ব্র্যাডফোর্ডের কথার কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না৷
শান্তস্বরে জবাব দিল জিনি, হাসল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে, ‘তারা আমাদের পরিচিত লোক, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড৷ আমরা তাদের বলেছিলাম, ছুটি কাটানোর জন্যে আমাদের ক্যারাভ্যানটা তাদের দিনকয়েকের জন্যে ব্যবহার করতে দেব৷ হয়তো আমরা যখন বাইরে ছিলাম তখন তারা এসেছিল ক্যারাভ্যানটা ঘুরেফিরে দেখতে৷’
ব্র্যাডফোর্ডের মুখ থেকে সংশয়ের ছায়াটা মিলিয়ে গেল, ‘আরে আমিও তো তাই বলছিলাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা? ও ঘুরিয়ে ফিরিয়েই কেবলই বলছে, লোক দুটো নাকি চিৎকার করে বিশ্রীভাবে ঝগড়া করছিল৷ বাচ্চা ছেলে তো, তাই একটুতেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ ও ভেবেছে ওরা বোধ হয় কোনও ডাকাত-টাকাত হবে৷’
জিনি হাসল, ‘না, ডাকাত-টাকাত না হলেও ওই লোক দুজনের স্বভাবচরিত্র তেমন ভালো নয়৷ অন্তত আমি তো ওদের একটুও বিশ্বাস করি না৷ দিন-রাতই কেবল নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে!...কিন্তু তা হলে কী হবে, বেড়াতে যাবার সময় দুজনেই হরিহর আত্মা!’
‘কিন্তু আমার ছেলে ওদের দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ তাই ভাবলাম, ব্যাপারটা আপনাদের জানিয়েই যাই৷ বলা যায় না, কী থেকে কী হয়ে যায়; জানেন, এই ফন হ্রদের মতো জায়গাতেও বেশ কয়েকবার ডাকাতি হয়ে গেছে৷ অবশ্য ওরা যখন আপনাদের পরিচিত লোক বলছেন, তখন আর...’
‘চিন্তার কিছু নেই৷’ ব্র্যাডফোর্ডের কথার খেই ধরে দিল জিনি, ‘তবু আপনি এসে ব্যাপারটা জানিয়ে ভালোই করেছেন৷ কিন্তু আপনি কি একেবারে শুধু মুখেই ফিরে যাবেন?’
‘না, না, ওর জন্যে ব্যস্ত হবেন না৷ পরে একদিন হবেখন৷’ নাকে বার দুয়েক হাত ঘষে ভুরু কোঁচকাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘যাক, আর আপনাদের সময় নষ্ট করব না, মিসেস হ্যারিসন, এখন চলি৷ বাচ্চা ছেলে তো, তাই সবকিছুতেই রহস্যের গন্ধ পায়৷ এই যে কাগজে ট্রাক লোপাটের যে খবর দিয়েছে, সেটা পড়ে আমার ছেলে কী ভাবছে জানেন? বলছে, ট্রাকটা কোথায় লুকোনো আছে তা ধরে ফেলেছে৷ ট্রাকটাকে নাকি লুটেরার দল একটা বড়সড় ক্যারাভ্যানে লুকিয়ে রেখেছে...বুঝুন কাণ্ড! হাঃ, হাঃ৷’
ব্র্যাডফোর্ডের হালকা কথাগুলোর কিটসনের কানের কাছে যেন বাজ পড়ল৷ আচমকা মুষ্টিবদ্ধ হল তার হাত৷ চটপট পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে টান-টান হয়ে দাঁড়াল৷
জিনির নির্বিকার মুখে নেমে এল কাঠিন্যের সামান্য আভাস৷ নিষ্প্রাণ স্বরে ও বলে উঠল, ‘ক্যারভ্যানের ভেতরে? এ ধারণা তার কেমন করে হল?’
সাধে কি আর বলি এঁচোড় পাকা ছেলে! হাসতে-হাসতেই জবাব দিল ব্র্যাডফোর্ড, ‘আমার মনে হয়, এখানে এসে এই ক্যারাভ্যানের ছয়লাপ দেখে আমার সুপুত্তুরের মাথায় বুদ্ধি গজিয়েছে৷...কিন্তু একটা কথা কী জানেন, ওর ধারণাটা খুব একটা অযৌক্তিক নয়৷ ও বলছে, এই ক্যারাভ্যানগুলো খুঁজে দেখার কথা পুলিশ ভেবেও দেখবে না৷ না দেখাটা খুব একটা আশ্চর্য নয়, কী বলেন৷’
‘হ্যাঁ, আমার তাই ধারণা৷ তবে মিঃ ব্র্যাডফোর্ড, আপনার ছেলের কল্পনাশক্তির তুলনা নেই!’
‘তা সত্যি বলেছেন৷ ও কেবলই আমাকে বলছে, পুলিশের কাছে গিয়ে এই সন্দেহের কথা জানাতে৷ ও ভাবছে, ট্রাকটাকে যদি কোনও ক্যারাভ্যানের ভেতরে লুকোনো অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে পুরস্কারের টাকাটা সেই পাবে৷ কাগজে দেখেছেন, পুরস্কারের টাকাটা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার করে দেওয়া হয়েছে? নাঃ, টাকার পরিমাণটা নেহাত কম নয়৷’
কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর জিনি মুখ খুলল, ‘পুরস্কারের টাকাটা পুলিশ ওকে দেবে বলে তো মনে হয় না৷ আপনার কি মনে হয়? শেষে বাচ্চা ছেলে বলে ঠকাবে না তো?’ জিনির হাসিতে ঈষৎ যান্ত্রিক ছোঁয়া৷’
হ্যাঁ—-তা বলতে পারেন৷’ ইতস্তত করে বলল ব্র্যাডফোর্ড, ‘আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না পুলিশে খবর দেওয়া উচিত হবে কি না৷ তবে আপনাকে বলে রাখছি, মিসেস হ্যারিসন, ছোঁড়াটা কিছু না কিছুর সন্ধান পেয়েছেই৷ অবশ্য পুলিশ এসব কথাকে বিশেষ পাত্তা দেবে বলে মনে হয় না৷’
‘আপনারও তো একটা ক্যারাভ্যান আছে, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড, তাই না?’ তাহলে পুলিশ যদি ট্রাক লুটের ব্যাপারে আপনাকেই সন্দেহ করে বসে, তবে আমি কিন্তু অবাক হব না৷ শেষে হয়তো আপনার ক্যারাভ্যান নিয়েই ওরা টানাটানি করবে৷... জানেন, একবার বাবারও অমনি হয়েছিল৷ তিনি কতকগুলো মুক্তো খুঁজে পেয়ে থানায় জমা দিতে গিয়েছিলেন; ভেবেছিলেন কিছু পুরস্কার টুরস্কার পাওয়া যাবে, কিন্তু উল্টো পুলিশ তাঁকেই গ্রেপ্তার করল৷ তারপর মাসখানেক ধরে কোর্ট-কাছারি, টানা-হ্যাঁচড়ার পর তিনি ছাড়া পান৷ তারপর থেকে বাবা ভুলেও কোনওদিন পুরস্কারের কথা উচ্চারণ করেননি৷’
ব্র্যাডফোর্ডের চোখ বিস্ফারিত হল বিস্ময়ে, ‘বলেন কী? আমি তো এদিকটা একেবারেই ভাবিনি৷ না ম্যাডাম, আমি আর ওর মধ্যে নেই৷ ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে আলোচনা করছিলাম৷ শখ করে জেলে যাওয়ার সাধ আমার নেই৷’
ব্র্যাডফোর্ড চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷
‘এই বোধ হয় আমাদের শেষ দেখা’, মিঃ ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে হাসল জিনি, ‘কারণ কালই আমরা এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷’
‘তাই নাকি কেন, ফন হ্রদ বুঝি আপনাদের ভালো লাগল না? আমার কিন্তু বেশ লাগে জায়গাটা—কেমন খোলামেলা, সুন্দর—’
‘না, জায়গাটা আমাদের ভালোই লেগেছে, তবে আরও অনেক জায়গায় তো বেড়াবার কথা আছে, তাই৷ এবারে আমরা যাব স্ট্যাগ হ্রদের দিকে, তারপর ডিয়ার হ্রদে বেড়াতে যাব৷’
‘তাহলে তো আপনাদের বিরাট প্ল্যান রয়েছে দেখছি! যাক, আপনাদের দিনগুলো সুখে কাটুক সেই কামনাই করি৷’ জিনির সঙ্গে হাত ঝাঁকাল ব্র্যাডফোর্ড৷ দরজায় দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল ওর সঙ্গে৷ কিটসন তখন অধৈর্য হয়ে উঠেছে৷ মনে মনে চাইছে, ব্র্যাডফোর্ড এখুনি চলে যাক৷ কিন্তু ভবি ভোলবার নয়৷
অবশেষে, মিনিট দশেক পর হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেল ব্র্যাডফোর্ড৷ চাঁদের আলোয় আলোকিত বাঁধানো রাস্তা ধরে সে এগিয়ে চলল তার কেবিনের দিকে৷
দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে দিল জিনি, ‘তাহলে আর দ্বিতীয় কোনও চিন্তার অবকাশ নেই৷ চলে আমাদের যেতেই হবে৷’
‘হ্যাঁ—তাছাড়া উপায় নেই৷’ কিটসন চিন্তিত মুখে জবাব দিল, ‘কিন্তু ব্র্যাডফোর্ডের তুমি দারুণ বোকা বানিয়েছ! সত্যি, তোমার তুলনা নেই৷’
‘থাক্, থাক্—অনেক হয়েছে৷ শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এড ব্লেক, ‘অত বেশি উচ্ছ্বাসের প্রয়োজন নেই, আলেক্স৷ ওই ব্র্যাডফোর্ডের ব্যাটাই আমাদরে সমস্ত পরিকল্পনাটা ওলট-পালট করে দিল৷ ও বোধ হয় আমাদের গলা শুনতে পেয়েছিল৷’
জিপো এগিয়ে এল শোবার ঘরের দরজায়, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল৷
‘তাহলে কালই আমরা রওনা দিচ্ছি৷’ ব্লেক বলে চলল, নইলে ওই ছোঁড়াটা আবার কিছু গণ্ডগোল বাঁধিয়ে বসতে পারে৷’ সে ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘আলেক্স, তুমি বরং ক্যারাভ্যানে গিয়ে থাকো৷ বলা যায় না, ওই হতচ্ছাড়া ছোঁড়াটা হয়তো রাতের অন্ধকারে ফিরে আসতে পারে—হয়তো ক্যারাভ্যানের ভেতরে ঢোকবার চেষ্টা করবে৷’
কিটসন সম্মতি জানিয়ে এগিয়ে গেল দরজার কাছে৷ চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল৷
জিপো নিলিপ্ত স্বরে বলে উঠল, ‘আগামীকাল আমি বাড়ি যাচ্ছি৷ বুঝেছ? অনেক সহ্য করেছি... আর নয়৷ আমি এখন শুতে চললাম৷’
শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল জিপো৷
‘কালই শালাকে টিট করব৷’ ব্লেকের চোখের তারায় ঝলসে উঠল কুৎসিত ক্রোধ, ‘তখন থেকে ওর বকবকানি শুনে আমি একেবারে হদ্দ হয়ে গেছি৷’
জিনি ফিরে গেল রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরি করতে৷
ব্লেক এসে দাঁড়াল দরজার কাছে, হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘ব্র্যাডফোর্ডকে তুমি বেশ কায়দা করেই বোকা বানিয়েছ, জিনি—তোমার বুদ্ধি আছে৷...কিন্তু আমার প্রস্তাব সম্পর্কে তুমি কি কিছু ভেবে দেখেছ? তোমার এবং আমার মধ্যে বেশ মিল আছে৷ সুতরাং আপত্তির কী আছে তা-তো বুঝতে পারছি না৷—কী বলো, রাজি?’
দুটো স্টেক ফ্রাইং প্যানে ছেড়ে দিল জিনি৷
‘তুমি যদি পৃথিবীর শেষ জীবিত পুরুষ হও, তবুও তোমার সম্পর্কে আমি বিন্দুমাত্রও কৌতূহলী হব না!’ ব্লেকের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল জিনি৷
‘আচ্ছা—সময় এলেই দেখা যাবে—’
হাসতে হাসতে আরাম-কেদারায় গিয়ে বসল ব্লেক, তার হাসির অন্তরালে বুঝি কোনও গোপন রসিকতার ইঙ্গিত৷
পরদিন খুব ভোরে কিটসন গাড়ি নিয়ে গেল শহরের দিকে৷ জিনি রইল ক্যারাভ্যানের পাহারায়; ব্লেক ও জিপো তখন কেবিনে৷
এতে ঝুঁকি আছে জেনেও ব্লেক কেবিনেই থেকেছে৷ কারণ ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওই স্বল্প পরিসরে জিপোর গোঁয়ার্তুমির মোকাবিলা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
জিপোর মানসিক অবস্থা এতই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শেষ পর্যন্ত কিটসন ও ব্লেক বাধ্য হয়েছে তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখতে৷ এমন কি মুখে কাপড় গুঁজে দিতেও ভোলেনি৷
জিপোকে বিছানার সঙ্গে বাঁধা হয়ে গেলে হাঁপাতে-হাঁপাতে উঠে দাঁড়িয়েছে ব্লেক৷ মুখে এক নৃশংস অভিব্যক্তি৷ কিটসনের দিকে ফিরে হাত নেড়ে ইশারা করেছে সে, ‘তুমি যাও৷ ওকে আমি দেখছি৷ কী করে ওর মত বদলাতে হয়, সেটা ওকে হাড়ে হাড়ে সমঝে দেব৷ তুমি ফিরে এসেই হয়তো শুনবে, জিপো আমাদের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় যেতে এক পায়ে খাড়া৷’
অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে কিটসনকে চলে যেতে হয়েছে৷ জিপোকে ওইভাবে ব্লেকের কাছে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হল৷ কিন্তু কিটসন জানে জিপোর সাহায্য ছাড়া ওই ট্রাকের তালা খোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ আর জিপো সাময়িকভাবে বেহেড হয়ে পড়ায়, ওকে সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছে ব্লেক৷ কিটসন যেন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল৷
শহরে গিয়ে একটা বড়সড় তাঁবু কিনল কিটসন, এবং সেই সঙ্গে নিল প্রচুর খাবার৷ কারণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর ওরা বুঝেছে পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছনোর পর শহরে গিয়ে রোজকার কেনাকাটা সেরে ফিরে আসা তাদের পক্ষে অসম্ভব, এবং একই সঙ্গে বিপজ্জনক৷ অতএব যদ্দিন না জিপো ট্রাকের তালা খুলছে, তদ্দিন তাদের অপেক্ষা করতে হবে ওই পাহাড়ি অঞ্চলেই৷ সেই বুঝে পর্যাপ্ত খাবার সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কিটসন৷
কেনাকাটা সেরে কেবিনে ফিরে এল কিটসন৷ বুইকের পিছনটা জিনিসপত্রে ঠাসা৷ সে গাড়ি থেকে নামতেই জিনি এগিয়ে এল তার কাছে৷
‘কোনও গণ্ডগোলো হয়নি তো?’ কিটসন প্রশ্ন করল৷
মাথা নাড়ল জিনি, ‘না৷ কিন্তু তুমি ফিরে আসতে আমি খুশি হয়েছি৷ তখন থেকে কেবলই ভাবছি ওই ছেলেটার কথা৷ আমার মনে হয়, যত তাড়াতাড়ি আমরা এখান থেকে সরে পড়তে পারি ততই ভালো৷’
ওরা দুজনে একসঙ্গে এসে ঢুকল কেবিনে৷
একটা আরাম কেদারায় বসে রয়েছে জিপো৷ মুখ শুকনো ঘাসের মতো বিবর্ণ, কোটরাগত চোখের কোলে কালি৷ ওদের ঢুকতে দেখেও একইভাবে মাথা নিচু করে বসে রইল সে৷
ব্লেক উত্তেজিতভাবে ঘরময় পায়চারি করছে—হাতে জ্বলন্ত সিগারেট৷
‘সব ঠিকমতো হয়েছে৷’ কিটসনকে লক্ষ করে প্রশ্ন করল সে৷
‘হ্যাঁ—জিনিসপত্র সবই কিনেছি৷’
কিটসন তাকাল জিপোর দিকে তারপর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চোখ রাখল ব্লেকের চোখে৷
‘জিপোর মত বদলেছে৷’ গম্ভীরভাবে ব্লেক জবাব দিল কিটসনের নীরব প্রশ্নের, ‘ওর সঙ্গে আমার খোলাখুলি কথা হয়েছে৷ ট্রাকের তালা খুলতে ও রাজি৷’
‘তোমরা আমাকে দিয়ে গায়ের জোরে কাজ করিয়ে নিতে চাইছ৷’ কাঁপা স্বরে ব্লেকের কথার প্রতিবাদ করল জিপো, ‘এর ফল কখনওই ভালো হবে না৷ আমি এ কথা তোমাদের আগেও বলেছি—এখন বলছি৷’ হঠাৎই কিটসনের দিকে মুখে তুলে তাকাল জিপো, ‘তুমি আমার বন্ধু ছিলে আলেক্স৷ হুঁঃ—বন্ধুই বটে৷ তুমি আর আমার কাছে এসো না৷ তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের এখানেই শেষ৷’
‘কী হয়েছে? ব্যাপার কী, এড?’ ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্লেককে লক্ষ করে বলে উঠল কিটসন৷
‘ওর সঙ্গে একটু খারাপ ব্যবহার করতে হয়েছে৷ ও আমাদের ট্রাকের তালা খোলায় সাহায্য না করলে যে ভীষণ বিপদে পড়বে সেটা ওকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিয়েছি৷’
‘এড বলেছে ট্রাকের তালা না খুললে ও আমার হাত ভেঙে ফেলবে৷’ চাপা গলায় অনিশ্চিত সুরে কিটসনকে বোঝাতে চাইল জিপো, ‘হাত ছাড়া কোনও মানুষ কি কখনও বাঁচতে পারে?’
কিটসন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ব্লেক মাথা নেড়ে ইশারা করতেই সে চুপ করে গেল৷
‘চলো, যাওয়া যাক৷ দেখো তো, বাইরে কেউ আছে কি না৷’
জিনি ও কিটসন কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়াল৷
সামনের হ্রদে যথারীতি ভাসমান নৌকোর ইতস্তত আনাগোনা৷ তবে খুব একটা কাছাকাছি কেউই নেই৷
কিটসন ক্যারাভ্যানটা বুইকের সঙ্গে জুড়ে চালিয়ে নিয়ে এল কেবিনের দরজার সামনে৷ গাড়ি ঘুরিয়ে ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা রাখল কেবিনের মুখোমুখি৷
‘এড, তোমরা প্রস্তুত?’
ব্লেক জিপোকে সঙ্গে নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে এল৷
কিটসন হাতলে চাপ দিয়ে ক্যারাভ্যানের দরজা খুলতেই জিপো আর ব্লেক চটপট ঢুকে পড়ল ভেতরে৷ কিটসন আবার বন্ধ করে দিল ক্যারভ্যানের দরজা৷ পুরো কাজটা করতে সেকেন্ড কয়েকের বেশি লাগল না৷
‘আমি এখানেই আছি, তুমি অফিসে গিয়ে বরং হিসেব-পত্তর চুকিয়ে এসো৷’ পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে জিনির হাতে তুলে নিল কিটসন৷
ক্যারাভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে৷ তারপর জিনির ফেরবার অপেক্ষায় রইল৷ কিটসনের প্রতিটি স্নায়ু এখন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ভাবনায় উত্তেজিত৷ এবার তারা গিয়ে পড়বে সম্পূর্ণ খোলা জায়গায়—যেখানে নেই সহস্র ক্যারাভ্যানের আড়াল৷ এ যেন যেচে বিপদকে ঘরে টেনে আনা৷ কিন্তু ট্রাকের তালা খুলতে গেলে এ ছাড়া আর কোনও উপায়ও তাদের হাতে নেই৷
‘এই যেন শুনুন!’
কিটসন চমকে উঠল৷ পলকে ঘুরে দাঁড়াল৷
একটা বাচ্চা ছেলে তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে৷ পরনে সুতির প্যান্ট, লাল সাদা ডোরাকাটা জামা৷ মাথায় একটা শোলার টুপি৷ সম্ভবত ক্যারাভ্যানের পাশ ঘুরেই তার সামনে এসে হাজির হয়েছে ছেলেটা৷
‘কী ব্যাপার—’
ছেলেটা ঘাড় কাত করে কিটসনকে দেখতে লাগল৷
‘আমার বাবা আপনাকে চেনে৷ আমি ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷’
‘তাই নাকি!’ কিটসন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল৷
ছেলেটা ভুরু কুঁচকে তাকাল কিটসনের দিকে, তারপর চোখ ফেরাল ক্যারাভ্যানে৷
‘এটা আপনার?’ ক্যারাভ্যানের দিকে আঙুল ঝাঁকিয়ে শ্রাগ করল ছেলেটা৷
‘হ্যাঁ৷’
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ক্যারাভ্যানটাকে পরখ করল ছেলেটা৷ করতে লাগল৷ এতক্ষণ ধরে কী করছে ও! সে মনে প্রাণে চাইল, জিনি যেন এখুনি ফিরে আসে, তাহলে তারা এই মুহূর্তে ফন হ্রদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারে৷
ছেলেটা এবার উবু হয়ে ঝুঁকে পড়ল মাটিতে৷ ঘাড় কাত করে দেখতে চেষ্টা করল ক্যারাভ্যানের তলাটা৷
‘ওরে বাপ৷ আপনাদের ক্যারাভ্যানের তলাটা দেখছি লোহার চাদরে মোড়া!’ কিটসনের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে, এত লোহা দিয়েছেন কেন? শুধু শুধু এটার ওজন বাড়ছে, তাই না?’
‘কী জানি, জানি না৷ যখন এটা কিনেছি তখন এই রকমই ছিল৷’ অস্বস্তিভরে চোয়ালে হাত বোলাল কিটসন৷
‘বাবা বলছিল, গতকাল আপনাদের দুজন বন্ধু এর মধ্যে ছিল; সত্যি?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কিন্তু ওদের মধ্যে একটা গোলমাল আছে৷’
‘না তো—’
ছেলেটা কিটসনের আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল৷ কিটসন লক্ষ করল, ছেলেটার চোখের দৃষ্টি আশ্চর্যরকম সপ্রতিভ৷
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছিল, নয়তো ওরকমভাবে ঝগড়া করছিল কেন?’
‘ওরা সব সময়েই ওরকম ঝগড়া করে—ও কিছু নয়৷’
ছেলেটা কয়েক পা পিছিয়ে ক্যারাভ্যানটাকে ভালো করে দেখতে লাগল৷
‘এর ভেতরটা আমাকে একবার দেখতে দেবেন?’
‘ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই৷’ কিটসনের স্বর ঈষৎ উত্তপ্ত, ‘কারণ চাবিটা আমার স্ত্রীর কাছে৷’
ছেলেটা যেন অবাক হল৷
‘আমার বাবা কিন্তু মাকে কখখনো চাবি রাখতে দেয় না৷ মা সব সময় চাবি হারিয়ে ফেলে৷’
‘আমার স্ত্রী চাবি-টাবি খুব সাবধানে রাখে৷ কখনও হারায় না৷’
ছেলেটা আবার উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে৷ সবুজ ঘাসগুলো দু-হাতে টেনে ছিঁড়তে লাগল৷ ঘাসের শিষগুলো ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ল৷
‘আপনার বন্ধুরা কি এখনও এর ভেতরেই আছে?’
‘না৷’
‘তাহলে কোথা আছে?’
‘বাড়িতে৷’
‘বাড়ি কোথায়?’
‘সেন্ট লরেন্স—’
‘তারা তাহলে একসঙ্গেই থাকে?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কিন্তু ওরা যেরকম বিশ্রীভাবে ঝগড়া করছিল, আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷’
ছেলেটা মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে নিল৷ তারপর সেটাকে ঘাস দিয়ে ভর্তি করতে লাগল৷
‘ওদের একজন আর একজনকে কিছু করতে পা পারার জন্যে গালাগাল দিচ্ছিল৷ কী করতে বলছিল আপনি জানেন?’
‘উঁহু—’ কিটসন নতুন করে আর একটা সিগারেট ধরাল৷
‘ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, এখুনি বোধ হয় একটা মারপিট বাঁধিয়ে বসবে৷’
‘ওদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ ওদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের—অত সহজে ভাঙবার নয়৷’
টুপিটা ঘাসে ভর্তি হয়ে গেলে ছেলেটা সামনে মাথা ঝাঁকাল৷ টুপিতে মাথা ঢুকিয়ে সেটা চেপে মাথায় ঢুকিয়ে দিল৷
‘এতে আমার মাথা ঠান্ডা থাকে৷’ কিটসনকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে সে ব্যাখ্যা করল, ‘এটা আমারই আবিষ্কার। এই আবিষ্কার থেকে বেশ কিছু টাকা রোজগার করা যেতে পারে৷’
‘হুঁ৷’ কিটসন নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল, ‘শোনো খোকা, তুমি এবারে বাড়ি যাও৷ তোমার বাবা হয়তো তোমাকে খুঁজে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন৷’
‘না, আমি বাবাকে বলেই এসেছি৷ বলেছি, আমি চুরি যাওয়া ট্রাকটাকে খুঁজতে বেরোচ্ছি—ওই যে, যেটা প্রচুর টাকাসুদ্ধ উধাও হয়ে গেছে৷ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাবা আমার খোঁজ করবে না৷ আপনি কাগজে ওই ট্রাক লুটের খবরটা পড়েছেন?’
‘হ্যাঁ, পড়েছি৷’
‘জানেন, আমি কী ভাবছি?’
‘হ্যাঁ—তোমার বাবা আমাকে বলেছে৷’
ছেলেটো ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘বাবার বলা উচিত হয়নি৷ এইভাবে যদি শহরসুদ্ধ লোককে বলে বেড়ায় তাহলে পুরস্কারের টাকাটা আমি পাব কী করে?’
হঠাৎ কিটসনের নজর পড়ল, সামনের রাস্তা ধরে জিনি দ্রুতপায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে৷
‘যে করেই হোক পুরস্কারের টাকাটা আমার চাই৷’ ছোট ব্র্যাডফোর্ড বলে চলল, ‘পাঁচ হাজার ডলার৷ টাকাটা পেলে কী করব জানেন?’
কিটসন মাথা নাড়ল, ‘না তো—’
‘বাবাকে আমি ওর একটা পয়সাও দিচ্ছি না—আমি আগে থাকতেই ঠিক করে রেখেছি৷’
জিনি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে৷
‘এই যে ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷’ কিটসন জিনিকে বলল৷
‘কেমন আছ?’ হেসে প্রশ্ন করল জিনি৷
‘আপনার কাছে কি ক্যারব্যানের চাবিটা আছে?’ ছেলেটা পালটা প্রশ্ন করল, ‘ইনি আমাকে বলেছেন ভেতরটা দেখতে দেবেন৷’ কিটসনের দিকে আঙুল দেখাল সে৷
জিনি ও কিটসন পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় করল৷
‘আমি দুঃখিত!’ ছোট ব্র্যাডফোর্ডকে লক্ষ করে বলল জিনি, ‘চাবিটা আমি স্যুটকেসে ভরে ফেলেছি৷ এখন বের করা খুব মুশকিল৷’
‘আপনি নিশ্চয়ই চাবিটা হারিয়ে ফেলেছেন৷’ অবজ্ঞার সুরে সে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে চলি৷ বাবা বলছিল, আপনারা নাকি এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!’
‘হ্যাঁ৷’
‘এখুনি?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আচ্ছা, বিদায়৷’ হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটা৷ তারপর রাস্তা ধরে হেঁটে চলল৷ হাত দুটো প্যান্টের পকেটে ঢোকানো৷ বেসুরোভাবে শিস দিতে দিতে সে এগিয়ে চলল৷
‘তোমার কি মনে হয়...’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল কিটসন, ‘ঠিক আছে, চলো৷ আর দেরি না করে রওনা হওয়া যাক৷’
ওরা উঠে বসল বুইকে৷
ওদের গাড়ি ছেড়ে দিতেই ঝোপের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল ছোট ব্র্যাডফোর্ড৷ সম্ভবত রাস্তার মোড় ঘুরেই জঙ্গলের মধ্যে সে আবার ফিরে এসেছে৷ অপসৃয়মান বুইক ও ক্যারাভ্যানের দিকে তাকিয়ে সে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ তারপর পকেট থেকে একটা ময়লা নোটবই বের করল সে৷ একটুকরো পেনসিল দিয়ে বুইকের লাইসেন্স নম্বরটা লিখে নিল নোট বইয়ের পাতায়৷
ছটি রাস্তায় ভাগ করা চওড়া বড় সড়কটা এমনিতেই গাড়ির ভিড়ে জমজমাট, তার ওপর বেশ কয়েকটা গাড়ি তাদের পিছনে একটা করে ক্যারাভ্যান টেনে নিয়ে চলেছে৷
থেকে থেকেই উড়ন্ত হোভার প্লেন নেমে আসছে মাথার ওপর—উড়ে চলেছে প্রধান সড়ক ধরে—যেন চলমান যন্ত্রযানদের প্রত্যেকটিকে সে পরখ করে দেখছে৷ এবং পরখ করার প্রতিটি মুহূর্তেই কিটসনের বুক দুরুদুরু করে কেঁপে উঠছে৷
মাঝে মাঝে কয়েকটা বড়সড় ট্রাকের ওপর ঢাকনা খুলে অনুসন্ধান করে দেখছে পুলিশের দল৷ কিন্তু একটা ক্যারাভ্যানকেও তারা সন্দেহবশে থামাল না৷ হয়তো তাদের ধারণা, অত ভারী ট্রাকটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া ক্যারাভ্যানের মতো কোনও হালকা জিনিসের পক্ষে সম্ভব নয়৷
তবু ওই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে, ঠিক তিরিশ মাইল বেগে গাড়ি চালানো কঠিন বইকি! অসীম প্রচেষ্টায় দুঃসাহসী ইচ্ছাকে সংযত করে গাড়ি চালাতে লাগল কিটসন৷
দীর্ঘ ছ-ঘণ্টা ধরে ওরা গাড়ি ছুটিয়ে চলল৷
জিনি কিটসনের পাশে নির্বাকভাবে বসে; কিটসনও যেন কথা বলার কোনও আন্তরিক তাগিদ খুঁজে পাচ্ছে না৷
রাস্তায় যখনই কোনও পুলিশের গাড়ি অথবা মোটর বাইকে চোখে পড়েছে, তখনই ওরা আতঙ্কে সিঁটিয়ে উঠেছে৷ মোটের ওপর সহজ সাবলীলভাবে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে এই সময়টুকু তাদের কাছে নিতান্তই অনুপযুক্ত মনে হয়েছে৷
পাহাড়ি রাস্তায় ওরা যখন পৌঁছল, তখন সন্ধে সাতটা৷
সূর্য অস্ত গেছে দূর পাহাড়ের আড়ালে, এবং একই সঙ্গে অন্ধকার নেমে এসেছে৷ কিটসন ততক্ষণে বিপরীতমুখী বাঁকের প্রথম সারি অনায়াসেই পার হয়ে গেছে৷
পথ যতই যেতে লাগল, গাড়ি চালানো ততোই দুরূহ হয়ে উঠতে লাগল৷ কিটসন জানে, বাঁকের দূরত্ব অনুমানে সামান্যতম ভুলচুক হলেই ক্যারাভ্যান সমেত গড়িয়ে পড়তে হবে অতল খাদে৷ বাঁচবার কোনও আশাই থাকবে না৷
সে বুঝল, ক্যারাভ্যান ও ট্রাকের পিছুটান বুইকের গতিকে ক্রমশই শ্লথ করে তুলেছে৷ অ্যাকসিলেটারের কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছে না কিটসন। সে চিন্তিত হয়ে পড়ল৷ কারণ কিটসন জানে আরও কুড়ি মাইল পরেই দেখা মিলবে রুক্ষ, খাড়াই রাস্তার, সে রাস্তা আরও অ-নে-ক বিপজ্জনক৷
কিটসন চোখ ফেরাল থার্মোমিটারের দিকে—ডায়ালের পয়েন্টার ক্রমশ স্বাভাবিক থেকে উত্তপ্ত অংশের দিকে এগোচ্ছে৷
‘আর কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটা গরম হয়ে পড়বে৷’ জিনিকে জানাল সে, ‘ট্রাক ও ক্যারাভ্যানের ওজনের জন্যেই এই অবস্থা হচ্ছে৷ আমাদের সামনের কুড়ি মাইল রাস্তা মোটামুটি এইরকম—তারপরেই শুরু হবে আসল বিপদ৷’
‘কেন, এর চেয়েও খারাপ রাস্তা?’ জিনি প্রশ্ন করল৷
কিটসন সতর্কভাবে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা বাঁকে মোড় নিল৷ গাড়িটাকে আবার আয়ত্তে এনে জিনির দিকে চোখ ফেরাল, ‘খারাপ? সেই রাস্তার তুলনায় এই রাস্তা তো শ্বেতপাথরে বাঁধানো৷ গত সপ্তাহে এক প্রচণ্ড ঝড়ে সেই রাস্তা একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে৷ সারানো আর হয়ে ওঠে—নি। হবেও না৷ অবশ্য এই রাস্তাটা কেউ কখনও ব্যবহার করে না৷ সকলেই ডুকাসের সুড়ঙ্গ পথটা ধরে যাতায়াত করে৷’
আরও মাইল তিন-চারেক যাওয়ার পর থার্মোমিটার এসে থামল স্ফুটনাঙ্কের ঘরে৷ অগত্যা বাধ্য হয়েই গাড়ির গতি কমিয়ে আনল কিটসন, তারপর একসময় দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার পাশে৷
‘গাড়িটা কিছুক্ষণ ঠান্ডা হোক, তারপর আবার চালানো যাবে৷’ গাড়ি ছেড়ে নেমে পড়ল কিটসন৷ গোটাকয়েক বড় বড় পাথরের টুকরো নিয়ে গাড়ির চাকায় আটকে দিল সে৷ জিনি হাতল ঘুরিয়ে খুলে দিল ক্যারাভ্যানের দরজা৷
কিটসন ঘুরে গিয়ে উঁকি মারল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ ঘন অন্ধকারে ব্লেক বা সে, কারও পক্ষেই কাউকে দেখা সম্ভব ছিল না৷ কিন্তু ওরই মধ্যে ব্লেক অনুভব করল কিটসনের উপস্থিতি৷
‘কী হল, থামলে কেন?’ সে জানতে চাইল৷
‘ইঞ্জিন ভীষণ গরম হয়ে পড়েছে৷ একটু ঠান্ডা হওয়া দরকার, তাই থামালাম৷’
ব্লেক আড়ষ্ট দেহে নেমে দাঁড়াল ক্যারাভ্যান থেকে৷ এগিয়ে গেল রাস্তার ধারে৷ বুক ভরে শ্বাস নিল ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাসে৷
‘হুঁ, আমরা তাহলে অনেকটা পথই এসে পড়েছি৷ ওপরে পৌঁছতে আর কতটা পথ বাকি?’
‘প্রায় ষোলো মাইল৷ খারাপ রাস্তার এখনও সবটাই বাকি৷’
‘কী মনে হয়, শেষটুকু নির্বিঘ্নে পার হওয়া যাবে তো?’
কিটসন মাথা নাড়ল, ‘কী জানি! এই ক্যারাভ্যান ও ট্রাকের ওজন তো নেহাত কম নয়! শুধু ক্যারাভ্যানটা টেনে তোলাই সমস্যা হয়ে উঠবে, ট্রাকের কথা তো ছেড়েই দিলাম৷’
জিনি এসে দাঁড়াল ওদের পাশে।
‘এক কাজ করা যাক। ট্রাকটা বের করে চালিয়ে নিয়ে চলো।’ ও প্রস্তাব দিল, ‘এখন যথেষ্ট রাত হয়েছে, সুতরাং বিপদের কোনও ভয় নেই।’
ব্লেক ইতস্তত করল।
‘ট্রাকটাকে ওপরে তোলার এটাই একমাত্র পথ।’ জিনির প্রস্তাবে সায় দিল কিটসন, ‘এবং এ কাজটা যে খুব একটা সহজ হবে তা আমি বলছি না।’
‘তাই করা যাক তাহলে, কিন্তু কেউ যদি আমাদের দেখে ফেলে তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না।’
জিপো এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ক্যারাভ্যানের পাশে, চুপচাপ শুনছিল ওদের কথা এখন সে মুখ খুলল, ‘কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়? আর কতদূর?’
পাহাড়ের একেবারে ওপরে একটা হ্রদ আছে—আর আছে ঘন জঙ্গল। যদি আমরা সেখানে পৌঁছতে পারি,তাহলে সমস্ত সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।’
কিটসন জবাব দিল।
‘কিন্তু ট্রাকটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে গেলে প্রথমে ব্যাটারির তার দুটোকে আবার লাগিয়ে নিতে হবে—জিপো, এদিকে এসো! ভূতের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থেকে একটু কাজের কাজ করো। ব্যাটারির তার দুটোকে লাগিয়ে দাও চটপট।’ ব্লেক খেঁকিয়ে উঠল জিপোকে লক্ষ করে।
একটা শাবলের সাহায্যে ট্রাকের বনেট ভেঙে যখন ওরা ব্যাটারির তার-লাগানোর কাজ শেষ করল, ততক্ষণে বুইকের ইঞ্জিন অনেকটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
‘বুইকের সঙ্গে ট্রাকটাকে আরও কিছুক্ষণ টেনে নিয়ে গেলে কেমন হয়?’ ব্লেক বলল। কারণ ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের বাইরে আনার ব্যাপারে সে নিতান্তই অনিচ্ছুক।
‘সেটা না করলেই ভালো হয়।’ কিটসন জবাব দিল, ‘কারণ রাস্তার খাড়াই ক্রমশ বাড়ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর বুইকের ইঞ্জিন আবার গরম হয়ে উঠবে, তখন আবার আমাদের রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে হবে।’
ব্লেক কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর উঠে বসল ট্রাকের ভেতরে। ইঞ্জিন চালু করে ট্রাকটাকে পিছিয়ে আনতে লাগল ক্যারাভ্যানের পাটাতন বেয়ে।
‘তোমরা আগে আগে বুইক নিয়ে চলো।’ কিটসনকে লক্ষ করে সে বলল, ‘জিপো আর আমি ট্রাক নিয়ে তোমাদের পিছু পিছু আসছি। আমি ট্রাকের হেডলাইট জ্বালছি না। তোমাদের গাড়ির পেছনের লাল আলো দেখেই আমি পথ চিনতে পারব।’
কিটসন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর উঠল গিয়ে বুইকে, জিনির পাশে। সে গাড়ি চালু করতেই জিনি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ট্রাকটাকে দেখতে চেষ্টা করল।
আবার শুরু হল ওদের পথ চলা। ট্রাকের ক্লান্তকর ওজনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বুইকটা সহজ গতিতে, সগৌরবে চড়াই রাস্তা বেয়ে উঠতে লাগল।
‘ওরা ঠিকমতো ফলো করছে তো?’ কিটসন প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ। কিন্তু একটু আস্তে চালাও; বাঁক নেওয়ার সময় ওরা পিছিয়ে পড়ছে।’
এইভাবে মিনিট কুড়ি চলার পর ওরা এসে পৌঁছল রাস্তার সেই বিধ্বস্ত অংশের কাছে।
কিটসন হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি থামাল।
‘তুমি গাড়িতেই থাকো। আমি সামনে গিয়ে রাস্তার অবস্থাটা দেখছি।’
কিটসন গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল ট্রাকের কাছে। ব্লেককে জানাল, সে সামনের রাস্তাটা একবার পরীক্ষা করতে যাচ্ছে।
বুইকের হেডলাইটের আলোয় ওরা তাকাল রাস্তাটার দিকে। রাস্তাটা সোজা উঠে গেছে ওপরে—প্রায় লম্বভাবে। বড় বড় পাথর, নুড়ি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রাস্তার ওপর।
‘আরে সর্বনাশ!’ ব্লেক অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল, ‘আমাদের কি এই রাস্তা বেয়ে উঠতে হবে?’
‘হ্যাঁ।’ কিটসন মাথা নাড়ল, ‘কাজটা যে কঠিন তাতে সন্দেহ নেই—তবে অসম্ভব নয়। প্রথমে আমাদের ওই বড় বড় পাথরগুলোকে রাস্তার মাঝখান থেকে সরাতে হবে।’
সে এগিয়ে চলল রাস্তা ধরে৷ বড় পাথরগুলোকে ধাক্কা দিয়ে গড়িয়ে দিতে লাগল রাস্তার ধারে৷
সমস্ত বড় পাথরগুলো সরিয়ে, পথ পরিষ্কার করতে ওদের তিনজনের প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল৷ প্রায় পাঁচশো গজ ধরে রাস্তাটার ওই রুক্ষ অবস্থা, তারপর থেকেই সেটা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে৷
‘যাক, মনে হয় এতেই কাজ হবে৷’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কিটসন, ‘এই পর্যন্ত আসতে পারলেই বাকিটা আমরা সহজে পার হতে পারব৷’
ওরার তিনজনে আবার ঢাল বেয়ে নেমে চলল দাঁড়িয়ে থাকা বুইকের কাছে৷
‘খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাবে৷’ ব্লেককে বলল কিটসন, আর সবসময় গাড়িকে প্রথম গিয়ারে রাখবে৷ হেডলাইট জ্বালাতে ভুলো না যেন৷ তবে আর যাই করো গাড়ি এক মুহূর্তের জন্যেও থামবে না৷ যদি একবার থামো, তাহলে নতুন করে আর চাকার জোর পাবে না৷
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—’ বিরক্ত হয়ে বলে উঠল ব্লেক, ‘কী করে গাড়ি চালাতে হয় সেটা আর তোমাকে শোখাতে হবে না, তুমি তোমারটার দিকে খেয়াল রেখো, আমি আমরাটা দেখব৷’
‘আমি একেবারে ওপরে না ওঠা পর্যন্ত তুমি কিন্তু ট্রাক নিয়ে উঠতে শুরু কোরো না৷ হয়তো প্রথমবারের চেষ্টায় আমি সফল নাও হতে পারি৷ আর যদি আমাকে গাড়ি পেছিয়ে নেমে আসতে হয়, তাহলে তোমার ট্রাক আমার রাস্তা বন্ধ করুক তা আমি চাই না৷’
‘ঠিক আছে, এখন বেশি বকবক না করে কাজ শুরু করো৷’ কিটসনকে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷
কিটসন কাঁধ ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গেল বুইকের দিকে৷ উঠে বসল গাড়িতে৷
হেডলাইট জ্বালিয়ে সে গিয়ার নামিয়ে দিল প্রথম ঘরে৷ তারপর অ্যাকসিলারেটারে প্রয়োজনীয় চাপ দিয়ে সে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে চলল খাড়াই রাস্তা ধরে৷
প্রয়োজনের তুলনায় বুইকের শক্তির কমতি নেই৷ কিন্তু পিছনে বাঁধা ক্যারাভ্যানের—খালি হলেও—ওজন সে শক্তি হ্রাসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল৷ থেকে থেকেই গাড়ির পিছনের চাকা দুটো নিরালম্ব হয়ে বিদ্যুবেগে ঘুরতে লাগল৷ সেইসঙ্গে পাথরের টুকরো, শুকনো মাটি ছিটকে পড়তে লাগল চাকার দু-পাশে৷
জিনি সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছিল—চোখের দৃষ্টি রইল রাস্তার দিকে৷ গাড়ির গতিপথে কোনও বড় পাথর পড়লেই জিনি কিটসনকে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছে৷
বুইকের গতি এখন আরও কমে গেছে৷ স্টিয়ারিং হুইল শক্ত হাতে চেপে আপন মনেই শাপশাপন্ত করছে কিটসন৷ তার পা নির্মমভাবে চেপে বসেছে অ্যাকসিলারেটারে৷ গাড়ির প্রচণ্ড কাঁপুনি অনুভব করছে সে৷
যে মুহূর্তে তারা থামবে, সেই মুহূর্তেই ঘটবে চরম সর্বনাশ৷ ভাবল কিটসন! সে আচমকা বাঁক নিল ডানদিকে, যাতে ক্যারাভ্যানের সরাসরি পিছুটানটা কিছুটা কমে যায়৷ এবং পরমুহূর্তেই আবার বাঁ-দিকে বাঁক নিল সে৷ ওইভাবে সেই সরু রাস্তায় একবার ডান দিক, একবার বাঁ-দিক করে সহজাত দক্ষতার সঙ্গে রাস্তার ধার বাঁচিয়ে সে বুইক নিয়ে এগিয়ে চলল৷
গাড়ির গতি ক্রমশ বেড়ে উঠল৷
রেডিয়েটারের জল ইতিমধ্যেই ফুটতে শুরু করেছে, সেইসঙ্গে গাড়ির ভেতরটাও হয়ে উঠেছে, অসহ্য গরম৷ হেডলাইটের আলোয় চোখে পড়ল সামনের স্বাভাবিক রাস্তা৷
‘ওঃ আর একটু৷’ উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল জিনি, ‘আমরা প্রায় এসে গেছি৷’
সম্ভবত এই বিশেষ মুহূর্তের জন্যেই বুইকের কিছুটা শক্তি কিটসন সংরক্ষিত রেখেছিল৷ এবার সে অ্যাকসিলারেটার চেপে ধরল গাড়ির মেঝের ওপর৷ গাড়ির পিছনের চাকা প্রথমটা নিরালম্ব হয়ে ঘুরতে লাগল, তারপর গাড়ির পিছন দিকটা সামান্য ডান দিকে সরতেই চাকায় জোর পাওয়া গেল৷ একটা প্রকাণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি এবং ক্যারাভ্যান রাস্তার স্বাভাবিক অংশে উঠে পড়ল—এবং সঙ্গে-সঙ্গেই তার গতিবেগ বাড়তে শুরু করল৷
গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করাল কিটসন৷
‘যাক, আমরা তাহলে শেষ পর্যন্ত পেরেছি৷’ কিটসন সাফল্যের হাসি হাসল, ‘ওফ্৷ আমি তো ভাবলাম বোধ হয় হয়ে গেল৷’
‘তোমার এলাম আছে, আলেক্স৷ এরকমভাবে গাড়ি চালানো নেহাত সোজা ব্যাপার নয়৷’
কিটসন ওর দিকে চেয়ে হাসল৷ ব্রেক আটকে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে৷
ব্লেক ততক্ষণে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু কিটসনের বুইকের মতো প্রয়োজনীয় শক্তি তার ট্রাকের ছিল না। অবশ্য বুইকের মতো একটা ভারী ক্যারাভ্যানকেও তাকে টেনে তুলতে হচ্ছে না।
‘ও বড্ড বেশি তাড়াতাড়ি উঠছে।’ কথাগুলো বলে কিটসন ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতে শুরু করল—সোজা ট্রাকের হেডলাইট লক্ষ করে।
ওপরে ওঠার জন্যে ব্লেকের তাড়াহুড়োর অন্ত ছিল না। সে অ্যাকসিলারেটার চেপে ধরেছে গাড়ির মেঝেতে—প্রয়োজনীয় মুহূর্তের জন্যে সামান্যতম শক্তিও সে অবশিষ্ট রাখছে না।
হেলতে দুলতে লাফাতে-লাফাতে ট্রাকটা বন্ধুর পথ ধরে ওপরে উঠতে লাগল। ব্লেকের পাশে বসা জিপো ট্রাকের ঝাঁকুনিতে বারবারই ছিটকে পড়তে লাগল দরজার গায়ে।
‘ওঃ—সাবধানে চালাও!’ জিপো আর্তনাদ করে উঠল, ‘তুমি বড্ড বেশি জোরে চালাচ্ছ!’
‘থামো!’ ব্লেক চিৎকার করে বলল, ‘আমার সে খেয়াল আছে।’
ট্রাকের হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোয় জিপো দেখল ওদের সামনে রাস্তায় পড়ে এক বিশাল পাথর।
‘সাবধান!’ বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো।
কিন্তু ব্লেক সাবধান হওয়ার আগেই ট্রাকের সামনে ডান দিকের চাকাটা ধাক্কা মারল পাথরটার গায়ে। এই আকস্মিক সংঘর্ষে ট্রাকটা ছিটকে গেল বাঁ-দিকে। ব্লেক সামাল দেওয়ার আগেই গাড়িটা হেলে পড়ল খাদের দিকে; আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির ইঞ্জিন।
ট্রাকটাকে একটা বিপজ্জনক কোণে হেলে পড়তে দেখে জিপো ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘গাড়িটা উলটে পড়ছে।’ পাগলের মতো ট্রাকের ডানদিকে দরজা ধরে টানাটানি শুরু করে দিল সে। কিন্তু ট্রাকটা হেলে থাকার দরুন, এবং দরজার অস্বাভাবিক ওজনের জন্য জিপোর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল।
‘চুপ করে বসে থাকো, গাধা কোথাকার!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘তোমার নড়াচড়ার জন্যেই গাড়িটা এবার ওলটাবে!’
কিটসন ছুটে এল ওদের কাছে।
ট্রাকটার এই বিপজ্জনক অবস্থা তাকে শঙ্কিত করে তুলেছে। সে লাফ দিয়ে উঠল দরজায় লাগোয়া পাটাতনের ওপর। শরীরের সমস্ত ওজন দিয়ে ডান দিকের ঊর্ধ্বাভিমুখী চাকা দুটোকে স্থির রাখবার চেষ্টা করল।
‘ইঞ্জিন চালু রেখে গাড়ি আবার পেছতে শুরু করো।’ ব্লেককে বলল সে।
ব্লেকের মুখ উত্তেজনা, আতঙ্কে ঘর্মাক্ত, রক্তিম। কিটসনের কথায় চাপা স্বরে সে খিঁচিয়ে উঠল, ‘এতটুকু নড়বার চেষ্টা করলেই ট্রাকটা খাদে উল্টে পড়বে।’
‘এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷ খুব আস্তে-আস্তে ডান দিক চেপে গাড়ি চালু করো৷’
অস্থির হাতে ইঞ্জিন চালু করল ব্লেক৷ তারপর ব্যাক গিয়ার দিয়ে ক্লাচ ছাড়তে শুরু করল৷
‘খুব ধীরে-ধীরে ক্লাচ ছাড়বে৷ যেন ঝাঁকুনি না লাগে৷ তারপর গাড়িটা চলতে আরম্ভ করলেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পেছতে শুরু করবে৷’
চাপা স্বরে খিস্তি করে ক্লাচ ছাড়ল ব্লেক, ট্রাকটা সচল হতেই সে বাঁ-দিকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে শুরু করল৷
এক সংক্ষিপ্ত আতঙ্কিত মুহূর্তের জন্যে ব্লেক অনুভব করল ট্রাকের ডান দিকের চাকা দুটো মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়ছে, কিন্তু কিটসনের ওজন চাকার ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করল এবং ধীরে-ধীরে ট্রাকটা পিছিয়ে এসে আবার খাড়াই রাস্তার সোজাসুজি দাঁড়াল৷
ব্লেক এবার ব্যাক গিয়ার থেকে ফাস্ট গিয়ারে গাড়ি আনবার চেষ্টা করতেই ট্রাকটা রাস্তার ঢালের জন্যেই পিছন দিকে গড়াতে শুরু করল৷ সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক চেপে ধরল ব্লেক৷
এবং অনিবার্যভাবেই ট্রাকের সচল ইঞ্জিন স্তব্ধ হল৷
‘ঠিক আছে৷ তুমি বেরিয়ে এসো, আমি দেখছি৷’ কিটসনের স্বরে তিরষ্কার ও আদেশের আভাস৷
গজ গজ করতে করতে বাইরে নেমে এল ব্লেক৷ কিন্তু ট্রাক চালানোর দায়িত্ব থেকে রেহাই পেয়ে সে যেন স্বস্তি বোধ করল৷
কিটসন কিছুক্ষণ ধরে ট্রাকটার অবস্থাটা দেখল৷ তারপর মাথা নাড়ল ৷
‘কয়েকটা পাথর নিয়ে এসো৷ পেছনের চাকা দুটো ঠেকা দিতে হবে৷ নইলে ইঞ্জিন চালু করা যাবে না৷’ কথা শেষ করে রাস্তার ধারে এগিয়ে গেল সে৷ একটা বড় পাথরকে কোনওরকমে টানতে-টানতে নিয়ে এল ট্রাকের কাছে৷ তারপর পিছনের চাকার গায়ে নরম মাটিতে ঠেসে ধরল পাথরটা৷
আরেকটা পাথর নিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে এল ব্লেক৷ অন্য চাকাটায় ঠেকা দিল৷
কিটসন এবার ট্রাকের ভেতর উঠে বসল, ইঞ্জিন চালু করল৷
জানলা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে সে বলল, ‘যদি হঠাৎই ইঞ্জিন থেমে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তুমি আর জিপো পেছনের চাকায় ঠেকা দেবে৷ যাতে ট্রাকটা আবার গড়াতে না পারে৷ হয়তো এইভাবেই আমাকে ওপরে উঠতে হবে, কারণ এই মাটিতে ট্রাকের চাকা ভালোভাবে ধরবে না৷’
‘নাও এবার কাজ শুরু করো৷’ ব্লেক বিরক্তিভরে খেঁকিয়ে উঠল, ট্রাকের চাকা নরম মাটিতে বসিয়ে দেওয়ার জন্যে মনে মনে নিজেকেই দায়ী করল সে৷ তার বিরক্তিও অনেকটা সেই কারণেই৷
কিটসন কিছুক্ষণ ধরে ইঞ্জিন চালু রাখল৷ তারপর হ্যান্ড-ব্রেকটা খুলে দিল৷ ট্রাকটা পিছনের পাথরে ভার রেখে দাঁড়িয়ে রইল৷
‘এবার তাহলে সামনে এগোচ্ছি৷’ ব্লেক ও জিপোর উদ্দেশ্যে কথা কটা ছুড়ে দিয়ে আলতা করে ক্লাচ ছাড়তে শুরু করল কিটসন৷
ট্রাকটা ধীরে-ধীরে সামনে এগোতে লাগল৷ ওটার পিছনের চাকা দুটো তেমন জোরালো অবলম্বন না পেয়ে পিছলে গেল, বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল৷ একই সঙ্গে মাটি, পাথরের টুকরো ছিটকে গিয়ে আঘাত করল পিছনের দাঁড়ানো জিপো ও ব্লেকের গায়ে৷
ওরা সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে পিছন ফিরে দাঁড়াল আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায়৷
কিটসন ট্রাকটাকে সোজা রাখবার চেষ্টা করল, অ্যাকসিলারেটারে পুরো চাপ দিয়ে চেষ্টা করল সামনে এগোতে; কিন্তু ট্রাকের ইঞ্জিনের পক্ষে এতখানি ওজন সামলে রাখা সম্ভব হল না৷ ইঞ্জিন স্তব্ধ হল৷ তড়িঘড়ি ব্রেকে চাপ দিল কিটসন৷ এতক্ষণে সে মাত্র গজ দুয়েক দূরে এগিয়েছে৷’
কিন্তু ব্রেক দেওয়া সত্তেও ট্রাকটা গড়িয়ে-গড়িয়ে পিছোতে শুরু করল৷ কিটসন চিৎকার করে ব্লেক ও জিপোকে ডাকল ট্রাক সামলানোর জন্য৷ ওরা এসে পিছনের চাকায় পাথর লাগাতে লাগাতে ট্রাকটা প্রায় গজখানেক পিছিয়ে এল৷
দ্বিতীয় প্রয়াসে কিটসন আরও চার গজ এগিয়ে গেলে, কিন্তু তারপরেই যথারীতি ইঞ্জিন বন্ধ হল৷ এবার ব্লেক, জিপো প্রস্তুত ছিল৷ ইঞ্জিন থামতেই ওরা দৌড়ে এসে পিছনের চাকায় পাথর দিয়ে ঠেকা দিল৷
এইভাবে আধঘণ্টা ধরে চলল ট্রাক চালানোর কাজ৷ কিটসন হ্যাঁচকা মেরে একটু একটু করে এগোয়ে আর ব্লেক ও জিপো এসে পাথরের ট্রাকের পতন রোধ করে৷
অবশেষে ওরা ট্রাক নিয়ে বুইকের পঞ্চাশ গজের মধ্যে পৌঁছে গেল৷ কিন্তু ততক্ষণে তিনজনেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ তাই ব্লেক কিছুক্ষণ বিরতির প্রস্তাব করল৷
‘থাক, কিছুক্ষণ পরে আবার শুরু করা যাবে৷ শালার ইঞ্জিনটা একটু ঠান্ডা হোক৷’ ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগল ব্লেক৷
কিটসন ট্রাকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল৷
‘যাক আর খুব বেশি রাস্তা বাকি নেই৷ এই রাস্তটুকু পার হলেই আর কোনও ভয় নেই৷ ট্রাক ঠিক চলবে৷’
এমন সময় ছুটতে-ছুটতে জিনি নেমে এল ওদের কাছে, কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘সত্যি, তোমার গাড়ি চালানোর তুলনা নেই৷’
কিটসন খুশি ভরা মুখে ওর দিকে চেয়ে হাসল৷
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার কী বলো?’ ব্লেক ব্যঙ্গ করে উঠল, ‘নিঃসন্দেহে নবম আশ্চর্য!’
জিনি তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘তোমার তো সে ক্ষমতাটুকুও নেই৷ তবে আর মিছিমিছি ঠাট্টা করে লাভ কী?’
ব্লেক জিনিকে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল, ‘আর কারও না পাক, এ ব্যাপারে আলেক্স অন্তত তোমার সাপোর্ট পাবে৷ অতএব, মত পালটে ওকে নিরাশ কোরো না৷’
কথা শেষ করে ব্লেক এগিয় গেল রাস্তার পাশের দিকে৷ একটা পাথরের ওপর বসে সে একটা সিগারেট ধরাল৷
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কিটসনের যখন মনে হল ট্রাকটার ইঞ্জিন যথেষ্ট ঠান্ডা হয়েছে, তখন সে ব্লেককে ডাকল, উঠে বসল ট্রাকের ভেতরে৷
দশ মিনিট পরে ট্রাকটাকে দেখা গেল বুইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে৷
‘এখন এটাকে ক্যারাভ্যানে ভরে ফেলা যেতে পারে৷’ কিটসন বলল, ‘বুইকের যখন টানতে অসুবিধে হবে না তখন ট্রাকটাকে আড়ালে রাখাই ভালো৷’
সে ট্রাকটাকে চালিয়ে ঢুকিয়ে দিল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ ব্লেক আর জিপো একই সঙ্গে ক্যারাভ্যানে আশ্রয় নিল৷
ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে কিটসন বুইকের কাছে এগিয়ে গেল৷ স্টিয়ারিং ধরে বসল চালকের আসনে—জিনির পাশে৷
‘তোমার দক্ষতায় আমি অবাক হয়ে গেছি আলেক্স৷ তুমি না থাকলে এ রাস্তা আমরা কোনওদিনই পার হতে পারতাম না৷’
জিনি ঝুঁকে এল সামনের দিকে৷ ওর উষ্ণ ঠোঁট আলতোভাবে কিটসনের গাল স্পর্শ করল৷
তাঁবুর পরদার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ব্লেকের ঘুম ভাঙল৷ চোখ খুলে সে নির্বিকারভাবে তাকিয়ে রইল ওপরের চালু ক্যাম্বিসের ছাদের দিকে৷ সে কোথায় আছে, এই সামান্য কথাটা মনে করতেই তার কয়েকটা দ্বিধাভরা মুহূর্ত কেটে গেল৷
চোখ বন্ধ করল ব্লেক। অনুভব করল সারা শরীরে ক্লান্তির অবসাদ। সারারাত রুক্ষ মেঝেতে শোয়ার ফলে তার হাত-পা সব আড়ষ্ট হয়ে গেছে। ভুরু কুঁচকে পরিস্থিতি অনুমান করার চেষ্টা করল ব্লেক।
যাক, অন্তত লুকোবার জন্য একটা ভালো জায়গা ওরা পেয়েছে। যদি কপাল ভালো থাকে, তাহলে জিপো ট্রাক না খোলা পর্যন্ত বেশ নিরাপদেই এখানে লুকিয়ে থাকা যাবে।
কাছাকাছিই রয়েছে একটা ঝরনা—সুতরাং জলের অভাব নেই। তাছাড়া, তাদের আড়াল করে রেখেছে ঘন জঙ্গল। উড়ন্ত কোনও এয়ারক্র্যাফট যে তাদের দেখে ফেলবে, সে সম্ভবনাও কম। আর বড় রাস্তা থেকে তারা রয়েছেও প্রায় পাঁচশো গজ দূরে।
এই বিধ্বস্ত পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে যে ট্রাকটাকে ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটা কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না। সুতরাং কেউ যে এখানে এসে হারানো ট্রাকের খোঁজ করবে সে সম্ভবনাও কম।
এখন সবকিছু নির্ভর করছে জিপোর ওপর। যদি এমনিতে সে তালা খুলতে না পারে, তাহলে বাধ্য হয়েই তাদের অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে হবে।
চার চারদিন ধরে ট্রাকটাকে হাতের মুঠোতে পেয়েও দশ লাখ ডলার এখনও তাদের নাগালের বাইরে, এ কথা ভাবতেই ব্লেক রাগে জ্বলে উঠল।
চোখ খুলল ব্লেক। চোখ কুঁচকে ঘড়ি দেখার চেষ্টা করল। ছটা-পাঁচ। এবার মাথা তুলে ব্লেক তাকাল শুয়ে থাকা জিনির দিকে। একটা কোটকে ভাঁজ করে, তার ওপরে মাথা রেখে চাদর মুড়ি দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে ও।
কিটসন শুয়েছে জিনি ও ব্লেকের ঠিক মাঝখানে—এখনও গভীর ঘুমে অসাড়।
তাঁবুর ভেতর জায়গা খুব একটা বেশি নেই। কিন্তু তবুও ওরই মধ্যে জায়গা করে কোনওরকমে শুয়েছে ওরা। কারণ বাইরের অসহ্য ঠান্ডায় কারও পক্ষে রাত কাটানো সম্ভব নয়।
ব্লেক এবার চোখ ফেরাল জিপোর দিকে৷ এখনও বোধ হয় ব্যাটা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে—ভাবল সে৷ কিন্তু চোখ ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে লাফ দিয়ে উঠে বসল৷ তার মুখের পেশি অনিশ্চয়তায় টান-টান৷
তাঁবুতে জিপো নেই৷
এক মুহূর্তের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল ব্লেক৷ কিন্তু পরক্ষণে জিপোর এই অনুপস্থিতির একটা সম্ভাব্য সমাধান মনে পড়ায় কিছুটা নিশ্চিন্ত হল সে৷ হয়তো জিপো বাইরে গেছে—তাদের জন্যে প্রাতরাশ তৈরি করছে৷
কিন্তু তাকে নিশ্চিত হতে হবে৷ সুতরাং গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে ব্লেক কিটসনকে পা দিয়ে এক ধাক্কা মারল৷ কিটসনের ঘুম ভাঙতেই সে বলে উঠল ‘শিগগির ওঠো! জিপো এর মধ্যেই কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে৷ আমাদের হাতে আজ প্রচুর কাজ৷’
কিটসন মাথা তুলে চোখ পিটপিট করে ব্লেকের দিকে তাকাল৷ তারপর উঠে আড়ামোড়া ভাঙল৷ তাঁবুর দরজার সব থেকে কাছাকাছি থাকায় সেই-ই প্রথম হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল৷ সূর্যের প্রখর আলোয় চোখ পিটপট করতে লাগল কিটসন৷
ব্লেক কিটসনের ঠিক পরেই এল৷ ইতিমধ্যে জিনির ঘুম ভেঙেছে৷ চোখ কচলাতে কচলাতে ও উঠে বসল৷
বাইরের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বোলাল কিটসন, জানতে চাইল, ‘জিপো কোথায়?’
ব্লেক চকিতে তাকাল অদূরে গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো ক্যারাভ্যানের দিকে৷ তারপর দেখল ঝরনার দিকে৷
কোথাও জিপোর চিহ্নমাত্র নেই৷
দু-হাতের চেষ্টায় মুখ আড়াল করে সর্বশক্তি দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল ব্লেক, ‘জিপো ও—ও—’
কোনও উত্তর নেই৷ কিটসন ও ব্লেক, তাকাল পরস্পরের দিকে৷
‘হতভাগাটা আমাদের ছেড়ে সরে পড়েছে৷’ জিঘাংসা-নিষ্ঠুর স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘মনে হয় পালিয়েই গেছে৷ ওর ওপর আমাদের নজর রাখা উচিত ছিল৷’
জিনি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল৷
‘কী হয়েছে?’
‘জিপো পালিয়েছে৷’ কিটসন জবাব দিল৷
‘তাহলে ও খুব বেশিদূর যেতে পারেনি৷ কারণ মিনিট কুড়ি আগেও ওকে আমি ঘুমোতে দেখছি৷’
‘যে করেই হোক ওকে ফিরিয়ে আনতেই হবে৷’ ব্লেকের গলা ভয়ঙ্কর শোনাল, ‘জিপোকে ছাড়া আমরা অথৈ জলে পড়ব৷ নাঃ, ওর বোধহয় মাথার ঠিক নেই৷ নইলে কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা পায়ে হেঁটে কেউ পালাবার মতলব করে৷ এখান থেকে বড় রাস্তায় পৌঁছতেই ওর ঘণ্টা দশেক লেগে যাবে৷’
কিটসন রাস্তা লক্ষ করে ছুটতে শুরু করল৷ দেখাদেখি ব্লেকও তার সঙ্গ যোগ দিল৷
ঘাসজমির শেষ প্রান্তে গিয়ে তারা থামল৷ তাকাল নীচের আঁকাবাঁকা সরু রাস্তার দিকে৷ পাহাড়ের গাঢ় রঙের পটভূমিকায় রাস্তাটাকে সাদা সুতোর মতো দেখাচ্ছে৷
কিটসন হঠাৎ খামচে ধরল ব্লেকের হাত, আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওই যে, জিপো যাচ্ছে৷’
ব্লেক চোখের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করল কিটসন নির্দেশিত দিকে৷ কিছুক্ষণ লক্ষ করার পর সে দেখতে পেল দেড় মাইল নীচে রাস্তা বেয়ে নেমে চলেছে, একটা ছোট সচল বস্তু—জিপো৷
‘ওকে এখনও ধরা যাবে?’ ব্লেকের স্বর উত্তেজিত, ‘একবার ধরতে পারলে ওকে পালানোর ঠেলাটা হাড়ে-হাড়ে বুঝিয়ে দেব৷ চলো, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷’
‘না৷ রাস্তাটা অসম্ভব সরু৷ ওকে ধরতে পারলেও ওই রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসা অসম্ভব৷ তার চেয়ে চলো পাহাড়ের দিক দিয়ে নামতে থাকি, তাহলে দু-মাইল রাস্তা আমরা এক মাইল হেঁটেই পৌঁছে যাব৷’
কথা শেষ করে কিটসন পাহাড়ের গা-বেয়ে নামতে শুরু করল৷ কখনও লাফিয়ে, কখনও বুকে হেঁটে সে খাড়াই বেয়ে ধীরে ধীরে নামতে লাগল৷
ব্লেক ইতস্তত করল৷ এই দুঃসাহসিক কাজটাকে তার ভীষণ বিপজ্জনক মনে হল৷ কিন্তু নিরুপায় হয়েই সে কিটসনকে অনুসরণ করল—তবে তার চেয়ে অনেক ধীর গতিতে সে নামতে লাগল৷
কিছুক্ষণ বাদেই কিটসন রাস্তায় পৌঁছল৷ কিন্তু রাস্তা পেরিয়ে আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগল৷ এখানে পাহাড়ের গা আরও খাড়া, আরও ভয়ঙ্কর৷ সুতরাং সতর্কভাবে, আস্তে-আস্তে নামছে কিটসন৷ একবার আরেকটু হলেই সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ছিল, কিন্তু কোনওরকমে শরীরকে পিছন দিকে ছিটকে ফেলে ভারসাম্য রাখল সে এবং গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পড়ল রাস্তায় পরবর্তী পাকে৷ একই সঙ্গে কতকগুলো ছোট-বড় পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ল নীচে৷ সামান্য আহত হলেও চটপট সে আঘাত সামলে উঠল কিটসন৷ তাকাল নীচের দিকে৷
জিপোকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷
ঢালু রাস্তা ধরে বেশ দ্রুতগতিতে সে এগিয়ে চলেছে৷
ব্লেক এসে দাঁড়াল কিটসনের পাশে৷
‘ওই যে, ও যাচ্চে!’ কিটসন আঙুল তুলে জিপোকে দেখাল৷
দাঁত খিঁচিয়ে রিভলভার উঁচিয়ে ধরল ব্লেক৷
‘কী করছ কী?’ কিটসন ব্লেকের কবজি চোপ ধরল, ‘এখন জিপো আমাদের ট্রাক খোলার একমাত্র ভরসা, আর ওকে তুমি খুন করতে চাইছ?’
ব্লেকের মুখমণ্ডল ঘামে ভেসে যাচ্ছে৷ সামান্য শ্বাস নেওয়ার জন্যে তাকে ভীষণভাবে হাঁপাতে হচ্ছে৷ হিংস্রভাবে এক ঝাঁকুনি দিয়ে সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রিভলভারটা আবার খাপে গুঁজে রাখল৷ তারপর আবার পরের খাড়াই বেয়ে নামতে শুরু করল৷
কিটসন ব্লেককে অনুসরণ করতে যাবে, হঠাৎই ওর চোখে পড়ল জিপোর ওপর৷ সে থমকে দাঁড়িয়েছে৷ চোখ তুলে পাহাড়ের দিকে তাকাল জিপো৷ একমুহূর্ত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তারপর ছুটতে আরম্ভ করল৷
‘ও আমাদের দেখে ফেলেছে৷’ চিৎকার করে ব্লেককে জানাল কিটসন৷ তারপর গলা চড়িয়ে সে ডেকে উঠল, ‘জিপো! জিপো! থামো! ফিরে এসো!’
কিন্তু কে শোনে কার কথা! জিপো মরিয়া হয়ে ছুটে চলল৷ ওর পা দুটো যেন সীসের মতো ভারী ঠেসছে, অতিরিক্ত পরিশ্রমে ফুসফুস যেন ফেটে পড়তে চাইছে৷
তার পালানোর এই চেষ্টা যে মূর্খামির ফল, তা সে যেন এতক্ষণে উপলব্ধি করল৷
সকালে তাঁবুতে যখন জিপোর ঘুম ভেঙেছে, তখন ব্লেক, কিটসন ও জিনি তিনজনেই গভীর ঘুমে মগ্ন৷ ওদের ঘুমোতে দেখে এই পালাবার চিন্তা হঠাৎই ওর মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে৷ হঠাৎ বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে৷
ওদের তিনজনের ঘুম না ভাঙিয়ে সে যে নিরাপদে তাঁবুর বাইরে বেরোতে পারবে, জিপো ভাবতে পারেনি৷ অবশ্য সেজন্য চেষ্টার কসুর করেনি জিপো৷ গায়ের চাদর সরিয়ে অতি সন্তর্পণে উঠে বসেছে৷ হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেছে তাঁবুর পরদার দিকে৷ কিটসনের ঘুমন্ত দেহকে অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ সূর্যের পরশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে তার সহজ, সরল সাফল্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি৷
কিছুক্ষণ ইতস্তত করেছে জিপো৷ সে জানে বড় রাস্তায় পৌঁছতে তাকে কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা পার হতে হবে৷ তারপর সেখান থেকে কারও গাড়িতে চোপে সে পৌঁছে যাবে তার কারখানায়৷ কিন্তু কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা!
তখন ঘড়িতে পৌনে ছটা৷ সুতরাং জিপো ভেবেছে, কম করে সাতটা আটটার আগে ওদের তিনজনের ঘুম ভাঙবে না৷ তার মানে সে পালাবার জন্যে অন্তত ঘণ্টা দেড় দুই সময় পাবে৷ সে যে ওদের ছেড়ে পালিয়েছে, সেটা বুঝতেও ব্লেক ও কিটসনের কিছু সময় লাগবে৷
সুতরাং সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই রওনা দিয়েছে জিপো৷ দ্রুতপায়ে ঢালু রাস্তা ধরে চলতে শুরু করেছে৷
এই আধঘণ্টায় সে প্রায় দু-মাইল রাস্তা পার হয়েছে৷ তারপর হঠাৎই অনেক ওপর থেকে ভেসে এসেছে ছোট বড় পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷
চমকে মুখ তুলে তাকাতেই তার চোখে পড়েছে কিটসন আর ব্লেককে৷
ওরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে নেমে আসছে, কখনও বুকে হেঁটে, কখনও গড়িয়ে কখনও বা একটুর জন্যে পড়তে পড়তে বেঁচে যাচ্ছে৷
ওদের দেখেইে আতঙ্কে হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে গেছে জিপোর৷
সে শুনতে পেল কিটসনের চিৎকার, ‘জিপো! থামো! ফিরে এসো৷’
অন্ধের মতো দৌড়তে শুরু করল জিপো৷
কয়েক শো গজ যাওয়ার পরই জিপো বুঝতে পেরেছে, এভাবে সে ওদের সঙ্গে যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রাখতে পারবে না৷ তাই আবার সে পিছনে ফিরে দেখল৷
ব্লেক তখন পাহাড়ের গা-বেয়ে নামছে৷ তারপর জিপোর দৃষ্টি সামনেই রাস্তায় পৌঁছল সে৷ কিটসন তার পিছন-পিছন গোড়ালিতে ভয় দিয়ে সরসর করে নেমে আসছে৷ সেইসঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে অজস্র পাথরের টুকরো, শুকনো ধুলোর মেঘ কিটসনকে যেন আড়াল করে দিতে চাইছে৷
ফাঁদে পড়া ভয়ার্ত শিকারের মতো রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ঢালের দিকে ছুটে চলল জিপো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য হারিয়ে মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়ল সে। হাত দিয়ে পতনজনিত আঘাত রোধ করল জিপো। কিন্তু ওর ভারী শরীরটা পাহাড়ের রুক্ষ, অসমতল গা-বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছে জিপোর আহত দেহটা থামল। হাঁপাতে-হাঁপাতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল সে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওপর দিকে।
না, এখান থেকে কিটসন বা ব্লেক কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা বড় বড় ঝুলন্ত পাথরগুলোই জিপো ও তাদের মাঝে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেখতে না পেলেও ওদের এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ সে স্পষ্টই শুনতে পেল।সুতরাং মুহূর্তের জন্যে নিশ্চিন্ত বোধ করলেও আবার সচকিত হয়ে পড়ল জিপো। ওদের পায়ের শব্দ যেন অনেক বেশি কাছে মনে হচ্ছে।
জিপো উন্মত্তের মতো চারদিকে তাকাল। একটা আশ্রয় তার দরকার। নইলে মিনিট খানেকের মধ্যেই ওরা এসে পড়বে।
সামনেই ডানদিকে সুবিস্তৃত ঘন বুনো গাছের ঝোপ-ঠিক পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে। শুধু একটা ভয়ার্ত চিন্তাই জিপোর মাথায় পাক খেতে লাগল; লুকোতে হবে। সুতরাং পরক্ষণেই ঝোপ লক্ষ করে তীরবেগে দৌড়ল সে। ঝোপের উচ্চতা বেশি নয়-জিপোর উরু পর্যন্ত। তারই মধ্যে দিয়ে টলতে-টলতে পড়িমড়ি করে ছুটে চলল সে। কাঁটাঝোপে লেগে তার প্যান্ট ছিঁড়ে গেল-পা কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। ঝোপের মাঝামাঝি পৌঁছে উপুড় হয়ে হাঁপিয়ে পড়ল জিপো। মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইল। ঝোপের ডালপালা আবার ফিরে এল নিজেদের জায়গায়, নিষ্পাপভাবে জিপোকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিরাপত্তার চাদরে ভয়ার্ত জিপোকে আগলে রাখতে চাইছে।
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল সে। উৎকর্ণ হয়ে নিশ্চিলভাবে পড়ে রইল।
কিটসনই প্রথম রাস্তায় এসে পৌঁছল৷ কিন্তু সামনে পিছনে তাকিয়ে জিপোকে দেখতে না পেয়ে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল৷ আচমকাই থমকে দাঁড়াল কিটসন৷
হাঁপাতে-হাঁপাতে একটা অশ্রাব্য কটূক্তি ছুড়ে ব্লেক এসে দাঁড়াল তার পাশে৷
‘কোথায় গেল ও?’ শ্রান্ত স্বরে জানতে চাইল সে৷
‘মনে হয় কোথাও লুকিয়ে পড়েছে৷’ চিন্তিতভাবে জবাব দিল কিটসন৷
ওরা দুজনেই তাকাল সামনের ঝোপের দিকে৷ কারণ এই রুক্ষ ধু-ধু পাহাড়ি এলাকায় লুকোবার এক এবং একমাত্র জায়গা ওই কাঁটাঝোপ৷
‘শালা ওখানেই লুকিয়েছে৷’ আঙুল তুলে ঝোপের বিস্তৃতির দিকে নির্দেশ করল ব্লেক৷ তারপর গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘জিপো! বাইরে বেরিয়ে এসো৷ আমরা জানি তুমি ওখানে লুকিয়ে আছ!’
ব্লেকের স্বরে জিপো যেন আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল৷ নরম বেলে মাটিতে সে নিজেকে আর মিশিয়ে দিল, শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে অনড় হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷
ব্লেক ফিরল কিটসনের দিকে, ‘চলো, ওকে ধরে বাইরে টেনে আনি৷ তুমি ওপাশ দিয়ে ভেতরে ঢোকো, আমি সামনে দিয়ে ঢুকছি৷’
দু-হাতে কাঁটাগাছ সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে শুরু করল ব্লেক৷ কিন্তু এইভাবে গজ দশেক যাওয়ার পর সে থমকে দাঁড়াল৷ ব্লেক বুঝল, এভাবে শত পরিশ্রম এবং সময় নষ্ট করেও তার পক্ষে জিপোকে খুঁজে বের করা অসম্ভব৷ কারণ গোটা এলাকাটাই ঘন ঝোপে ঠাসা৷ সুতরাং এর মধ্যে জিপোর অবস্থান নির্ণয় করা কোনও গণৎকারের পক্ষেও সম্ভব নয়, নেহাত ভাগ্য সহায় না হলে জিপোকে সে কোনওদিনই খুঁজে পাবে না৷
ওদিকে ক্রম অগ্রসরমান কিটসনও একই সময়ে অবস্থাটা উপলব্ধি করল৷ সুতরাং একরাশ বুনো ঝোপের মাঝে সে থমকে দাঁড়াল৷
সাগর-সবুজ বুনো ঝোপের বিস্তৃতিকে অতিক্রম করে ওরা দুজনে পরস্পরের দিকে তাকাল৷
‘জিপো৷’ ব্লেক চিৎকার করে উঠল৷ রাগে তার স্বর কাঁপছে, ‘এই শেষবার তোমাকে বলছি৷ যদি এক্ষুনি বেরিয়ে না আস তাহলে পিটিয়ে তোমাকে ময়দার বস্তা করে ছাড়ব—এমন মার মারব, কোনওদিন ভুলবে না! বেরিয়ে এসো বলছি!’
ব্লেকের স্বরে ক্রোধ ও হতাশার আভাস জিপোকে নিশ্চিন্ত করল, সে বুঝল যদি সে সাহস করে নিশ্চলভাবে পড়ে থাকতে পারে, তাহলে তার সাফল্য লাভের সম্ভাবনা যথেষ্ট৷ শুধু একটু সাহস...আর কিছু নয়৷
হতাশ হলেও সামনের দিকে আরও কয়েক পা-এগিয়ে গেল ব্লেক৷ জিপো শুনতে পেল ঝোপঝাড় ঠেলে তার এগিয়ে আসার শব্দ—কিন্তু সে চলেছে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দিকে৷ কিটসনের অবস্থাও তথৈবচ সেও ব্লেকেরই মতো ভুল নিশানায় এগিয়ে চলল৷ জিপো দাঁতে-দাঁত চেপে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল৷ তার হৃৎপিণ্ডের গতি ক্রমশ স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল৷
বেশ কয়েক মিনিট পর যখন কিটসন ও ব্লেকের পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল, তখন জিপো লুকোনো জায়গা ছেড়ে এগোতে মনস্থ করল৷
কারণ ওরা যদি এইভাবে পুরো এলাকাটা তন্ন তন্ন করে চক্কর দেয়, তাহলে লুকোনো জায়গা ছেড়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলাই তার পক্ষে নিরাপদ৷
সুতরাং বেলে মাটির ওপর ঘষটে সে এগোতে লাগল৷ খুব সতর্কভাবে কাঁটাগাছগুলোকে বিসদৃশভাবে না নড়িয়ে সে তার স্থূল দেহ নিয়ে এগিয়ে চলল৷ কারণ কাঁটাঝোপের সামান্য আন্দোলনই কিটসন ও ব্লেককে জানিয়ে দেবে তার অবস্থিতির কথা৷
এইভাবে বুকে হেঁটে প্রায় তিরিশ চল্লিশ গজ যাওয়ার পর জিপো অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করল৷ কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই সে দেখতে পেল সাপটাকে৷
সবে সে তার ডান হাতটা সামনে বাড়িয়েছে, নিজেকে সামনে এগোবার প্রয়াসে তার আঙুলগুলো আঁকড়ে বসেছে নরম মাটিতে, এমন সময় সামনে চোখ পড়তেই জিপো দেখতে পেল সাপটাকে তার হাতের আঙুল থেকে ইঞ্চি কয়েক দূরেই ওটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে রয়েছে৷ চ্যাপটা বাঁকানো ফণাটা শূন্যে স্থির৷
বোবা আতঙ্কে দ্রুত শ্বাস টানল জিপো৷ তার সারা শরীর যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল, সমস্ত চেতনা হয়ে গেল আচ্ছন্ন৷ পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে পড়ে রইল সে রক্তের মধ্যে অনুভব করল বরফ শীতল আতঙ্কের সূক্ষ্ম স্রোত৷ হৃৎপিণ্ডের দুর্দম গতি বুঝি তার কণ্ঠনালী রোধ করে দিতে চাইছে৷
সাপটাও নিশ্চলভাবে ফণা তুলে প্রতীক্ষায় রইল৷
কয়েকটা যন্ত্রণাও উৎকণ্ঠাময় মুহূর্তের পর জিপো দাঁত দাঁত চেপে, মরিয়া হয়ে বিদ্যুগতিতে ফিরিয়ে আনল তার ডান হাত৷
এবং সেই মুহূর্তেই সাপটা তার হাতে ছোবল মারল৷
ডান হাতের চেটোয় অমানুষিক যন্ত্রণা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে জিপো লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ উন্মাদের মতো কর্কশ গলায় এক অপার্থিব চিৎকার করে অন্ধের মতো ঝোপঝাড় ভেদ করে দৌড়তে শুরু করল৷
ব্লেক ও কিটসন তখন বুনো ঝোপের একাংশের অনুসন্ধান সমাধা করে খোলা জায়গায় পৌঁছেছে৷ ওরা ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার অনুসন্ধান শুরু করতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল জিপোর মৃত্যুযন্ত্রণা-কাতর আর্তনাদ৷
ওরা চমকে উঠল, থমকে দাঁড়াল৷
দেখল, জিপো রক্ত-জমানো আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হাওয়ায় হাত ছুড়তে ছুড়তে উন্মাদের মতো ছুটে চলেছে৷
‘শালা একেবারে পাগল হয়ে গেছে!’ বলেই ব্লেকও জিপোর পিছন-পিছন ছুটতে শুরু করল৷ ঝোপঝাড় ঠেলে কিটসনও তাকে অনুসরণ করল৷
জিপোর আতঙ্কিত মস্তিষ্ক তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল ঝোপঝাড় ছাড়িয়ে, পাহাড়ের খাড়াই ঢালের দিকে৷ কিন্তু সেখানে পৌঁছনোমাত্রই ভারসাম্য হারিয়ে পিছলে পড়ল জিপো৷ পাহাড়ের গা-বেয়ে গড়াতে-গড়াতে অসহায়ভাবে নেমে চলল নীচের রাস্তার দিকে৷ পড়বার সময় ইতস্তত পরে থাকা পাথরের টুকরোগুলো তার শরীরের ধাক্কায় ছিটকে পড়ল নীচে, শুকনো ধুলোর মেঘ উড়িয়ে জিপোর স্থূলকায় শরীরটা গড়িয়ে চলল...
ব্লেককে পিছনে ফেলে কিটসনই আগে পৌঁছল জিপোর কাছে৷ নীচের রাস্তার কাছে একটা বড় পাথরের গায়ে পড়েছিল সে৷ কিটসন ঝুঁকে পড়ল জিপোর ওপর৷
‘জিপো!’ কিটসন হাঁপাতে লাগল, ‘কোনও ভয় নেই৷ ব্লেক তোমাকে কিছু করবে না৷ কিন্তু তোমার হয়েছেটা কী!’
জিপোর কালশিটে পড়া মুখ দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল কিটসন৷ ওর চোখ দুটো যেন সাদা ধূসর কাগজে দুটো বীভৎস ফুটো৷
‘একটা সাপ...’ কোনওরকমে দম নিয়ে উচ্চারণ করল জিপো৷
পড়িমড়ি করে এসে পৌঁছল ব্লেক৷ এতখানি পথ দৌড়ে আসার ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে৷ জিপোকে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়ল, ‘শালা ভিতু কোথাকার! তোকে আমি খুন করে ফেলব!’
জিপোর স্থবির দেহ লক্ষ করে এক প্রচণ্ড লাথি চালাল ব্লেক৷ কিন্তু বাঁ-হাতে সে আঘাত রোধ করল কিটসন, ‘থাক, এসব পরে হবে৷ দেখতে পাচ্ছ না, জিপোর কী অবস্থা হয়েছে৷’
‘সাপ... একটা সাপ...’ জিপো ফুঁপিয়ে উঠল৷ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাতটা তুলে ধরে কিটসনকে আঘাতটা দেখাতে চাইল সে৷
কিটসন সামনে ঝুঁকে এল৷ দেখল, জিপোর রক্তিম ডান হাত অস্বাভাবিক রকম ফুলে উঠেছে—সমস্ত রক্ত এসে যেন জমা হয়েছে তার হাতে৷ সে জিপোর স্ফীত হাতের ওপর আঙুল ছোঁয়াতে সে যন্ত্রণায় হৃদয়বিদারী এক আর্তনাদ করে উঠল৷ কিটসনের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল একটা শীতল শঙ্কার স্রোত৷
জিপোর পাশে পা-ছড়িয়ে বসে পড়ল কিটসন, প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে, জিপো?’
‘সাপ...একটা সাপ...’ জিপো শ্বাসকষ্টে হাঁপাতে লাগল, ‘...আমাকে ছোবল... মেরেছে...’
জিপোর হাতের স্ফীত পেশির ওপর পাশাপাশি দুটো তীক্ষ্ণ দাঁতের দাগ কিটসনের চোখে পড়ল৷ সুতরাং বুঝতে তার আর কিছু বাকি রইল না৷
‘ভয় নেই জিপো৷’ ওকে আশ্বাস দিল কিটসন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আমি এক্ষুনি সব ব্যবস্থা করছি৷’
‘আমাকে...হাসপাতালে নিয়ে চলো৷’ জিপো ভাঙা স্বরে অনুনয় করল, ‘আমি আমার ভাইয়ের মতো সাপের কামড়ে মারা যেতে চাই না...আলেক্স...’
কিটসন পকেট থেকে রুমাল বের করল৷ সেটাকে একটা দড়ির মতো পাকিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল জিপোর কবজিতে৷
‘তার মানে ওকে সাপে কামড়েছে?’ উত্তেজিত হয়ে কিটসনের কাঁধ চেপে ধরল ব্লেক ‘তাহলে তাহলে আমরা ট্রাকের তালা খুলব কী করে?’
কিটসন বিনা বাক্যব্যয়ে কাঁধ থেকে ব্লেকের হাত সরিয়ে দিল৷ পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করে তার ফলা খুলে ধরল৷
‘জিপো, এতে তোমার একটু ব্যথা লাগবে’ বলতে বলতে জিপোর কবজি চেপে ধরল সে, ‘কিন্তু কিছুটা আরাম পাবে৷ এ ছাড়া, এখন আর দ্বিতীয় কোনও পথ নেই৷’
ছুরির ধারালো অগ্রভাগ জিপোর উত্তপ্ত, স্ফীত হাতে বসিয়ে দিল সে৷ লম্বা করে চিরে দিল খানিকটা৷
জিপো চিৎকার করে বাঁ হাতে কিটসনকে আঘাত করল৷ আপ্রাণ চেষ্টা করল হাত ছাড়িয়ে নিতে৷
ওর হাতের ক্ষতস্থান থেকে ধীরে ধীরে রক্ত বেরোতে শুরু করল৷ একইভাবে শক্ত হাতে জিপোর কবজি ধরে রইল কিটসন৷ হাতে চাপ দিয়ে ক্ষতমুখ দিয়ে বিষটা বের করার চেষ্টা করল সে৷ জিপোর বিবর্ণ, পাণ্ডুর মুখ দেখে সে চিন্তিত হয়ে পড়ল৷ মনে হল, জিপো যেন আসন্ন মৃত্যুর জন্যে নির্বিকারভাবে অপেক্ষা করছে৷
‘আলেক্স... তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধু৷ তোমার সঙ্গে সেদিন যে দুর্ব্যবহার করেছি, সে সব ভুলে যেও৷ আমাকে... আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো...৷’
‘ভয় পেয়ো না, জিপো৷ আমি সব ব্যবস্থা করছি৷’ রুমালটাকে জিপোর কবজিতে আরও শক্ত করে বেঁধে দিল কিটসন—উঠে দাঁড়াল, ‘দাঁড়াও, বুইকটা আগে নিয়ে আসি৷’
‘কী-কী বললে?’ কিটসনের কথা শেষ হতে না হতেই খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক৷
‘গাড়িতে করেই জিপোকে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাব৷ ওর অবস্থাটা একবার দেখো৷ বাঁচে কি না বাঁচে, ঠিক নেই৷’ ঘুরে দাঁড়িয়ে কিটসন পাহাড়ের গা-বেয়ে উঠতে শুরু করল৷
‘কিটসন!’ ব্লেকের স্বরের তীব্রতায় কিটসন থামল, ঘুরে দাঁড়াল৷
‘আবার কী হল?’
‘ফিরে এসো এখানে!’ ব্লেক চিৎকার করে বলল, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? দেখো ওপরে!’ আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল ব্লেক৷ একটা উড়োজাহাজ ধীর বেগে, চক্রাকারে পাহাড়ের ওপর দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ‘তুমি গাড়িটা আড়াল থেকে বাইরে আনলে ওরা দেখতে পাবে৷ তারপর পুলিশ নিয়ে এসে এ জায়গাটা গোরু-খোঁজা করতে ওদের কি খুব বেশি সময় লাগবে ভেবেছ?’
‘তাতে কী হয়েছে?’ রাগত স্বরে জবাব দিল কিটসন, ‘একটা মানুষকে তো আর বসে বসে মরতে দেওয়া যায় না৷ জিপোকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে না গেলে ওর বাঁচার কোনও সম্ভাবনা নেই তুমি কি সেটা বুঝতে পারছ না?’
‘গাড়িটা তুমি লুকোনো জায়গা থেকে বাইরে আনতে পারবে না, ব্যাস৷’
‘এখন থেকে হাসপাতাল কম করেও তিরিশ মাইল দূরে৷ এতটা রাস্তা আমি কি জিপোকে কাঁধে করে নিয়ে যাব?’
‘তাতে আমার বয়েই গেলে!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘মোটমাট গাড়িটা তুমি দিনের আলোয় রাস্তায় বের করবে না৷ জিপোকে এখন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে৷ উপায় কী!’
‘নিকুচি করেছে তোমার উপদেশের?’ বলে কিটসন ঘুরে দাঁড়াল৷ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে রাস্তার দিকে উঠতে শুরু করল সে৷
‘কিটসন!’
ব্লেকের শাসানির সুরে থমকে দাঁড়াল কিটসন, ঘুরে তাকাল৷
ব্লেকের রিভলভার তার হাতে উঠে এসেছে—কিটসনের শরীর লক্ষ করে স্থির হয়ে আছে কালো নলটা৷
‘এখানে ফিরে এসো৷’ ব্লেক নিষ্প্রাণ স্বরে আদেশ করল৷
‘দেরি হলে জিপো মারা পড়বে, এড৷ তুমি সেটা চোখে দেখছ না?’
‘তুমি আগে এখানে ফিরে এসো৷’ ভয়ঙ্কর স্বরে শাসিয়ে উঠল সে, ‘গাড়ি বের করার কথা ভুলে যাও৷ জলদি এদিকে এসো৷ আমি আর দ্বিতীয়বার বলব না৷’
হৃৎপিণ্ডের অশান্ত স্পন্দনকে সঙ্গী করে ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এল কিটসন৷ এতদিন বাদে তাহলে সময় এসেছে! সে ভাবল৷ আজই তাহলে একটা ফয়সালা হয়ে যাক৷ তবে ওর ডান হাতের দিকে আমাকে নজর রাখতে হবে৷ এই আমাদের চূড়ান্ত বোঝাপড়া৷ জিপোকে সে কিছুতেই অসহায়ভাবে মরতে দেবে না৷
‘কিন্তু আমাদের কিছু একটা করা উচিত৷’ ব্লেকের দিকে সহজ, স্বাভাবিক পদক্ষেপে এগিয়ে এল কিটসন৷ ‘এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে জিপোকে আমরা মরতে দিতে পারি না৷ ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার৷’
‘ওর দিকে তাকিয়ে দেখো, গদর্ভ কোথাকার৷ যতক্ষণে তুমি ওপরে যাবে, গাড়ি বের করবে, গাড়ি নীচে নিয়ে এসে ওকে গাড়িতে তুলবে, তারপর হাসপাতালে রওনা হবে, ততক্ষণে ও মারা যাবে৷’
‘কিন্তু তাই বলে চুপচাপ বসে থাকলে তো চলবে না৷’ ব্লেকের দিকে না তাকিয়েই তাকে অতিক্রম করে গেল কিটসন, শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান৷ আড়চোখে সে দেখল, ব্লেক রিভলভারটা সামান্য নামিয়ে নিল।
কিটসন পলকে ঘুরে দাঁড়াল৷ তার হাত কাটারির মতো বিদ্যুৎবেগে নেমে এল ব্লেকের কবজির ওপর৷
ব্লেকের হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে গিয়ে পড়ল ঝোপের মতো৷ এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে কিটসনের মুখোমুখি দাঁড়াল সে৷
কয়েকটা নীরব মুহূর্ত ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল৷ তারপর দাঁত বের করে নিঃশব্দে হেসে উঠল ব্লেক৷
‘তাহলে তাই হোক৷’ হালকা স্বরে কথাগুলো উচ্চারণ করল ব্লেক, ‘তুমিই যখন আগ বাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনলে তখন আমি কী করতে পারি৷ তোমাকে টিট করার ইচ্ছেটা আমার বরাবরের৷ সুতরাং সুযোগ যখন পেয়েছি, আজ তোকে সমঝে দের লড়াই কাকে বলে! শালা—’
সঙ্কুচিত চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে অপেক্ষা করতে লাগল কিটসন৷
চোয়াল নামিয়ে, দু-পাশে হাত রেখে ব্লেক সন্তর্পণে এগিয়ে আসতে লাগল৷
কিটসন একটা বাঁ-হাতি ঘুষি চালাল ব্লেকের মুখ লক্ষ করে৷ কিন্তু চকিতে মাথা সরিয়ে নিল ব্লেক৷ কিটসনের ঘুষিটা তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল, সে চট করে বসে পড়ল৷ কিটসনের ডান হাতর আড়াল কাটিয়ে তার বজ্রমুঠি সশব্দে আছড়ে পড়ল প্রতিদ্বন্দ্বীর পাঁজরে৷ আকস্মিক আঘাতে কিটসনের দম যেন বন্ধ হয়ে এল৷ সে কয়েক-পা পিছিয়ে গেল৷
ব্লেক আরও এগিয়ে আসতেই কিটসনের বাঁ-হাতি ঘুষি তার মাথায় আঘাত করল৷ মুহূর্তের জন্য টলে উঠল ব্লেকের শরীর৷
ওরা দুজনে আবার সরে গেল পরস্পরের কাছে থেকে৷ তারপর একই সঙ্গে এগিয়ে আসতে লাগল৷ কাছাকাছি আসতেই ওরা অন্ধ লক্ষ্যে ঘুষি চালাতে শুরু করল৷ কয়েকটা গায়ে মুখে আঘাত করল, কিন্তু তেমন জোরালো নয়৷ পরমুহূর্তেই ওরা ছিটকে সরে গেল পরস্পরের নাগাল থেকে৷ এইভাবে সতর্ক সাবধানি ভঙ্গিমায় চলল ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷
হঠাৎই একটা সরাসরি সুযোগ পেয়ে ব্লেকের চোয়াল নিশানা করে একটা বাঁ-হাতি ঘুষি চালাল কিটসন৷ কিন্তু ব্লেকও এর জন্যে প্রস্তুত ছিল, পলকে সে মুখ সরিয়ে নিতেই ঘুষিটা তার কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ হিংস্রভাবে দাঁত বের করে কিটসনের বুক লক্ষ করে ডান হাতে জবাব দিল সে৷ ঘুষিটা সমস্ত শক্তি নিয়ে আঘাত করল প্রতিদ্বন্দ্বীর পাঁজরে৷
জোরালো ঘুষির নিরেট আঘাত সইতে পারল না কিটসন৷ আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে৷
হিংস্রভাবে হেসে এগিয়ে এল ব্লেক, আর একখানা ঘুষি বসিয়ে দিল কিটসনের ঘাড়ে৷ কিটসন মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল, ওর মন ভরে গেল আকস্মিক শূন্যতায়৷
ব্লেক পিছিয়ে দাঁড়াল৷
হাতে এবং হাঁটুতে ভর দিয়ে কোনওরকমে উঠে বসল কিটসন৷ মাথা ঝাঁকিয়ে মস্তিষ্কের আচ্ছন্ন ভাবটা কাটাতে চাইল৷ দেখল, ব্লেক তার দিকে আবার এগিয়ে আসছে—সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের হাঁটু লক্ষ করে সে ঝাঁপ দিল৷ দু-হাতে ব্লেকের পা-দুটো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সে৷
কিটসনকে নিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল ব্লেক৷ কয়েক মুহূর্ত ওরা দুজনেই শিথিল ভঙ্গিতে হাত-পা এলিয়ে পড়ে রইল৷ তারপর কিটসন আচ্ছন্নভাবে ব্লেকের গলা টিপে ধরতে চাইল৷ কিন্তু ব্লেকের ঘুষি রগের পাশে এসে পড়তেই কিটসনের হাত আলগা হয়ে গেল৷ গড়িয়ে তার আওতার বাইরে চলে গেল ব্লেক৷
একই সঙ্গে ব্লেক ও কিটসন উঠে দাঁড়াল৷ কিন্তু হাত উঁচিয়ে প্রস্তুত হতে কিটসনের বোধ হয় এক পলক দেরি হয়ে গিয়েছিল, কারণ ব্লেকের ডান হাতি ঘুষিটা তার চোয়ালে আঘাত করল৷ ঘুষির প্রচণ্ড শক্তিতে কেমন যেন দুর্বল বোধ করল কিটসন৷ সামনের দিকে অনিশ্চিতভাবে ঝুঁকে পড়ে ব্লেকের হাত চেপে ধরল সে৷ এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে চলল ওদের ধস্তাধস্তি৷ ব্লেক প্রাণপণে কিটসনের বাঁধন ছাড়াতে চেষ্টা করল, কিটসনও মরিয়া হয়ে ধরে রইল ব্লেকের হাত—সেই স্বল্প সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইল৷
অবশেষে নিজেকে মুক্ত করে নিল ব্লেক৷ সঙ্গে সঙ্গেই চালাল বাঁ-হাতি ক্ষিপ্র ঘুষি৷ কোনওরকমে ঘুষিটাকে এড়াল কিটসন, ডান হাতে ব্লেকের উন্মুক্ত পাঁজরে একখানা বসিয়ে দিল, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল ব্লেক৷
সাফল্যের আশায় উদ্দীপ্ত হয়ে আরও এগিয়ে গেল কিটসন৷ এলোপাথাড়ি ঘুষি চালাল ব্লেকের মাথা লক্ষ করে৷
কয়েকটা অস্ফুট শব্দ করে পিছিয়ে গেল ব্লেক৷
এবার কিটসনের বাঁ-হাতি ঘুষি তার মাথায় গিয়ে বসতেই চোখে অন্ধকার দেখল ব্লেক৷ দু-হাত শূন্যে তুলে স্খলিত হয়ে আরও কয়েক পা-পিছিয়ে গেল৷ বিন্দুমাত্র দেরি না করে কিটসনের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত আশ্রয় নিল ব্লেকের পেটে৷ হাঁপাতে-হাঁপাতে ছিটকে পড়ল ব্লেক৷ যন্ত্রণায় বেঁকে উঠল ওর সারা শরীর৷
শিকারকে বাগে পেয়ে একরোখাভাবে অধৈর্য হয়ে এগিয়ে এল কিটসন৷ তার হাতে আঘাত করতে উদ্যত হতেই সে বুঝতে পারল শূন্যে ভেসে আসছে প্রতিদ্বন্দ্বীর ডান হাতি ঘুষি! কিন্তু তখন দেরি করে ফেলেছে৷
সংঘর্ষটা কিটসন অনুভব করল তার চোয়ালে৷ তারপরই তার মস্তিষ্কে শ্বেত তপ্ত কিছুর বিস্ফোরণ ঘটল৷ সে বুঝল, নির্বোধের মতো ব্লেকের মার্কামারা ঘুষিকে আহ্বান জানিয়ে সে তার পরাজয়কে নিশ্চিত করে তুলেছে৷ অসহায়ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল কিটসন৷ পাথরের টুকরোর তীক্ষ্ণ আঘাতে তার মুখ জায়গায় জায়গায় কেটে গেল৷ যন্ত্রণায় চাপা আর্তনাদ করে গড়িয়ে চিৎ হল সে৷ তার ক্ষতবিক্ষত মুখমণ্ডলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সূর্যের উত্তপ্ত সোনা রোদ৷
কয়েক মুহূর্তে অথর্ব হয়ে সে পড়ে রইল৷ তারপর আপ্রাণ চেষ্টায় মাথা তুলে দেখল ব্লেকের দিকে৷
সে জিপোর দেহের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে—একদৃষ্টে চেয়ে আছে তার মুখের দিকে৷
কিটসন মাথা ঝাঁকাল, তারপর টলতে-টলতে উঠে দাঁড়াল৷ বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে সে ব্লেকের কাছে এগিয়ে এল৷ পায়ের শব্দে ব্লেক পিছনে মুখ ফেরাল—নির্লিপ্ত মুখের প্রতিটি পেশি টান টান৷
‘ও মারা গেছে৷’ ব্লেকের স্বর শীতল, নির্বিকার, ‘শেষ পর্যন্ত হতভাগাটা আমাদের এভাবে বোকা বানাল!’
কিটসন হাঁটু গেড়ে বসল জিপোর পাশে৷ ওর ঠান্ডা, ভিজে হাতটা তুলে নিল দু-হাতে৷
জিপোর মুখমণ্ডলে প্রশান্তির ছাপ৷ ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক হয়ে আছে৷ ক্ষুদে ক্ষুদে কালো চোখজোড়া পরম নিশ্চিন্ততায় ওপরের অবতল নীলাকাশে নিবদ্ধ৷
শরীরের অসহনীয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে কিটসন ভাবলঃ জিপোর মৃত্যুর পর ট্রাকের তালা খোলার ক্ষীণতম আশাও কি আর অবশিষ্ট আছে! দশ লক্ষ ডলার এক ছলনাময়ী মরীচিকা! হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷
হুঁ, তাই বটে! মরগ্যান যখনই এ কাজে হাত দিয়েছে তখনই সে করে বসেছে চরম গলদ, আজ যদি ফ্র্যাঙ্ক থাকত, তাহলে সে দেখত তার ভুলের নিষ্ঠুর পরিণতি৷
‘চলে এসো’৷ ব্লেক ডাকল কিটসনকে ‘ও মারা গেছে৷ ওর জন্যে আমাদের তার কিছু করার নেই৷’
কিটসন কোনও কথা বলল না৷ মৃত জিপোর মুখে তাকিয়ে চুপচাপ ধরে রইল তার হাত—যেন শেষ সান্ত্বনা দিতে চাইল৷
ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল ব্লেক৷ তারপর দীর্ঘ পথ ধরে চলতে শুরু করল ট্রাকের উদ্দেশ্যে৷
হ্রদের কাছেই বসে ছিল ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড, একমনে খবরের কাগজ পড়ছিল৷ এমন সময় দুজন লোককে সামনের সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল৷
ব্র্যাডফোর্ড সবেমাত্র প্রাতরাশ সেরে একটু বিশ্রাম করছিল৷ একটু আগেই তার স্ত্রী ও ছেলে হ্রদের দিকে বেড়াতে গেছে৷ সেও যাবে—তবে একটু পরে, এমন সময় তার চোখে পড়ল আগন্তুক দুজনের ওপর৷ অবাক হল ব্র্যাডফোর্ড, এরা কারা!
আগন্তুকদ্বয়ের একজনের পরনে সৈন্যবাহিনীর মেজরের পোশাক, দ্বিতীয় জনের পরনে সস্তা ছাই রঙের স্যুট, মাথায় সযত্নে বসানো টুপি৷
মেজরের চেহারা বেঁটেখাঁটো৷ তামাটে লম্বা ধরনের মুখ৷ ঠোঁটের ওপর টানা মিলিটারি মার্কা গোঁফ৷ নীল চোখে অন্তর্ভেদী কঠিন দৃষ্টি!
মেজরের সঙ্গী যথেষ্ট লম্বা, চেহারা ভারীর দিকে৷ রক্তিম মুখমণ্ডল যেন পাথর খোদাই করে বসানো৷ চোখে-মুখে তীক্ষ্ণতার ছাপ সুষ্পষ্ট; ব্র্যাডফোর্ড অনুমান করল, এই দ্বিতীয় ব্যক্তি সাদা পোশাকে পুলিশের কোনও অফিসার৷
‘মিঃ ব্র্যাডফোর্ড?’ বসে থাকা ব্র্যাডফোর্ডের সামনে পৌঁছে প্রশ্ন করলেন মেজর৷
‘হ্যাঁ, কিন্তু’...উঠে দাঁড়াল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’
‘ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড, জুনিয়র?’ মেজর জানতে চাইল।
ব্র্যাডফোর্ড হাঁ-করে মেজরের মুখের দিকে চেয়ে রইল৷
‘না, সে আমার ছেলে—’ বিব্রতভাবে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে চেয়ারে রাখল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কিন্তু ওর সঙ্গে আপনাদের কী দরকার?’
‘আমি মেজর ডিলেনি, ফিল্ড সিকিওরিটি৷’ এবার সঙ্গীর দিকে আঙুল দেখাল মেজর, ‘আর ইনি হলেন লেফটেন্যান্ট কুপার, সিটি পুলিশ৷’
ব্র্যাডফোর্ড অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল দুজনের দিকে৷
‘আপনাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে খুশি হলাম৷ কিন্তু আপনারা কি আমার ছেলের সঙ্গেই দেখা করতে চান?’
‘হ্যাঁ, কোথায় সে?’ কুপার প্রশ্ন করল৷
‘ও তার মার সঙ্গে হ্রদের ধারে বেড়াতে গেছে৷ কিন্তু কী হয়েছে বলুন তো?’ ব্র্যাডফোর্ডের স্বরে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট৷
‘চিন্তা করার কিছু নেই, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড৷’ ডিলোনি তাকে আশ্বাস দিল, ‘আমরা শুধু ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে চাই৷’
এমন সময় সামনের রাস্তা ধরে বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে তীক্ষ্ণস্বরে শিস দিতে দিতে এসে হাজির হল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷ কিন্তু বাবার সামনে দাঁড়ানো লোক দুজনকে দেখেই সে শিস দেওয়া বন্ধ করল তার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এল, মুখমণ্ডলে হঠাৎই ফুটে উঠল একটা সতর্ক ভাব৷
‘ওই যে, ও এসে গেছে৷’ ব্র্যাডফোর্ড ফিরল তার ছেলের দিকে, ‘এই—জুনিয়র, এদিকে এসো৷ তোমার মা কোথায়? তাকে দেখছি না!’
‘মা হ্রদের ধারে বসে আড্ডা মারছে৷’ বিরক্ত স্বরে জবাব দিল ছেলেটা৷
‘তুমিই কি ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র?’ ডিলোনিই প্রথম প্রশ্ন করল৷
‘ঠিকই ধরেছেন৷’ ওদের দুজনের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে৷
‘এটা কি তোমার লেখা?’ পকেট থেকে একটা খাম বের করল ডিলোনি৷ খামের ভেতর থেকে একটা চিঠি বার করে দেখাল ছেলেটাকে, ‘এই চিঠিটা?’
ব্র্যাডফোর্ড সহজেই তার ছেলের আঁকাবাঁকা হাতের লেখা চিনতে পারল৷ কিন্তু কী লিখছে সেটা বুঝতে পারল না৷
‘হ্যাঁ—আমারই লেখা৷’ গম্ভীরভাবে জুনিয়র জবাব দিল৷
এবার মাটিতে উবু হয়ে বসল সে, মাথা থেকে শতছিন্ন শোলার টুপিটা খুলে তার মধ্যে ঘাস ভরতে লাগল৷
ব্র্যাডফোর্ড বিস্ময়ে হতবাক৷ কোনওরকমে সে প্রশ্ন করল, ‘আমার ছেলে আপনাদের চিঠি লিখেছে?’
‘হ্যাঁ, সে পুলিশ সদরে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, লুকোনো ট্রাকটার হদিশ সে জানে৷’ ডিলোনি জবাব দিল৷
ব্র্যাডফোর্ড হাঁ-করে তার ছেলের দিকে চেয়ে রইল৷ তার দু-চোখে চরম অবিশ্বাসের দৃষ্টি৷
‘জুনিয়র! এ কী করেছ তুমি! তুমি ভালোভাবেই জানো, লুকোনো ট্রাকের হদিশ তুমি জানো না৷ তবে কেন...?”
অবজ্ঞাভরে বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাল ছেলেটা, তারপর আবার টুপিতে ঘাস ভরার কাজে মন দিল৷ টুপি ভর্তি হয়ে গেলে সে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে, মাথাটা ঢুকিয়ে দিল টুপির ভেতর৷ মাথা সোজা করে ঘাসভর্তি টুপিটা ভালো করে চেপে বসাল৷ তারপর গম্ভীরভাবে উঠে দাঁড়াল৷
‘এইভাবে টুপি পরা ছাড়া উপায় নেই৷’ নির্দিষ্ট কাউকে সম্বোধন না করেই সে বলে চলল, ‘নইলে সব খসে পড়ে যেত৷ এতে আমার মাথা ঠান্ডা থাকে৷ এটা সম্পূর্ণ আমার আবিষ্কার৷’
ডিলেনি ও কুপার পরস্পরের দিকে তাকাল৷ তারপর ডিলেনিই আদর-মাখানো সুরে প্রশ্ন করল, ‘ট্রাকটা কোথায় আছে, খোকা?’
ছেলেটা আবার বসে পড়ল, পায়ের ওপর পা-রাখল। টুপিটা টেনেটুনে আরও শক্ত করে বসাল মাথায়।
‘ট্রাকটা কোথায় লুকোনো আছে আমি জানি।’ গম্ভীর সুরে ঘোষণা করল সে।
‘সে তো ভালো কথা।’ অসীম প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রেখে উৎসাহভরে বলল ডিলেনি, ‘কোথায় আছে ওটা?’
‘কিন্তু পুরস্কারের কী হবে?’ চকিতে মুখ তুলে তাকাল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র। স্থির, সপ্রতিভ চোখে চেয়ে রইমেল জরের দিকে।
‘শোনো জুনিয়র,’ অস্বস্তিতে ঘামতে শুরু করেছে ব্র্যাডফোর্ড, ‘তুমি বেশ ভালো করেই জানো, ট্রাকের কোনও খবরই তুমি জানো না। তাহলে শুধু-শুধু কেন এঁদের সময় নষ্ট করছ? এতে তুমি নিজেই বিপদে পড়বে-।’
‘ট্রাকটা কোথায় আছে সেটা আমি ভালো করেই জানি,’ ব্র্যাডফোর্ডকে ব্যঙ্গ করে শান্ত স্বরে ছেলেটা জবাব দিল, ‘কিন্তু পুরস্কারের টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত একটা কথাও আমি বলছি না।’
‘শোনো খোকা,’ বিরক্তিতে ডিলেনির স্বর তীক্ষ্ণ হল, ‘যদি সত্যি সত্যিই ট্রাকের কোনও খবর তোমার কাছে জানা থাকে তো চটপট বলে ফেলো। তোমার বাবা ঠিকই বলেছেন; শুধু শুধু আমাদের সময় নষ্ট করার মতলব থাকলে তুমি ভীষণ বিপদে পড়বে।’
ছেলেটা ডিলেনির স্বরের তীক্ষ্ণতাকে সরাসরি অগ্রাহ্য করে জবাব দিল, ‘ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানে লুকোনো আছে।’
‘ওঃ, আবার সেই একই কথা।’ ব্র্যাডফোর্ড অধৈর্য হয়ে পড়ল, ‘ও ব্যাপারটা নিয়ে কম করেও হাজারবার তোমার সঙ্গে আমি আলোচনা করেছি। যেমন আমিও জানি, তেমন তুমিও জানো যে...।’
‘এক মিনিট, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড,’ ডিলেনি বাধা দিল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কথা বলার সুযোগটা আমাকেই দিন।’ সে ফিরল ছেলেটার দিকে, ‘খোকা, তুমি বুঝলে কী করে যে ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানের ভেতর লুকোনো আছে।’
‘আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ জুনিয়র উত্তর দিল, ‘ক্যারাভ্যানটা যাতে ট্রাকের ওজন বইতে পারে, সেজন্যে ওরা ক্যারাভ্যানের তলায় দুটো ইস্পাতের চওড়া পাত লাগিয়ে নিয়েছে।’
‘ওরা’? তার মানে—কারা?’
‘যারা ট্রাকটাকে চুরি করেছে, আমি তাদের কথাই বলছি।’
ডিলেনি ও কুপার পরস্পরের চোখে-চোখ রাখল। ডিলেনির চোখে মুখে উত্তেজনার মৃদু আভাস।
‘তার মানে তুমি ট্রাকটাকে নিজের চোখে দেখেছ?’
মাথা নাড়ল ছেলেটা। তারপর চিন্তিত মুখে মাথা থেকে টুপি খুলে নিল।
‘প্রথম প্রথম এটা বেশ ঠান্ডা থাকে,’ আন্তরিক সুরে বলল সে, ‘কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ঘাসগুলো গরম হয়ে যায়!’ টুপির ভেতর থেকে ঘাসগুলো সে ঝেড়ে-ঝেড়ে বাইরে ফেলতে লাগল, ‘নাঃ আবার নতুন করে ঘাস ভরতে হবে দেখছি—’
সুতরাং আবার সে স্ব-আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে মনোযোগ দিল।
‘ট্রাকটাকে তুমি কোথায় দেখেছ?’ উত্তেজনায় তীব্র হল ডিলেনির কণ্ঠস্বর!
ছেলেটা মেজরের প্রশ্নের কোনও ভ্রূক্ষেপ করল না। মুঠো-মুঠো ঘাস ছিঁড়ে টুপিতে ভরতে লাগল।
‘আমার কথা তোমার কানে গেছে?’ খেঁকিয়ে উঠল ডিলেনি।’
কী বললেন?’ থমকে গিয়ে চোখ তুলে তাকাল জুনিয়র।
‘আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি ট্রাকটা কোথায় রয়েছে?’
ছেলেটা ঘাস ভরতে -ভরতেই জবাব দিল, ‘আমার বাবা বলছিল, পুলিশ নাকি আমাকে পুরস্কারের টাকাটা দেবে না; নিজেরাই ওরা মেরে দেবে।’
কুপার কটমট করে তাকাল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে। ব্র্যাডফোর্ড অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে দাঁড়াল। তীব্রস্বরে ছেলেকে তিরস্কার করল, ‘মোটেই আমি এই কথা তোমাকে বলিনি। এভাবে কথা বলার জন্যে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।’
ছেলেটা বাবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর শিস দেওয়ার মতো একটানা এক বিচিত্র শব্দ করল।
‘কী মিথ্যেবাদী?’ শিস থামিয়ে বলে উঠল সে, ‘তুমিই তো বললে, ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানে লুকোনো আছে একথা পুলিশকে জানালে ওরা ভাববে আমরাই সেটা চুরি করেছি। তারপর বললে না, সব পুলিশই এক-এক নম্বরের চোর —’
ডিলেনি বহুক্ষণ একদৃষ্টে ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে রইল। তারপর মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল, ‘হুম–’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’ কুপার গর্জন করে উঠল, ‘তোমার বাবা কী বলেছে না বলেছে সেটা বাদ দাও৷ ট্রাকটাকে কোথায় দেখেছে সে কথাই আগে বলো!’
অত্যন্ত ধীরে, অত্যন্ত সতর্কভাবে ছেলেটা ঝুঁকে পড়ল টুপির ওপর, মাথাটা গুঁজে দিল ভেতরে৷ তারপর সোজা হয়ে টুপিটা শক্ত করে এঁটে দিল মাথায়৷
‘পুরস্কারের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত আমি আর কিছুই বলব না৷’ ছেলেটা উঠে দাঁড়াল, সরাসরি তাকাল লেফটেন্যান্টের চোখে৷
‘তাই নাকি৷ আচ্ছা, দেখা যাবে৷’ কুপারের মুখভাব কঠিন হল, ‘তোমরা দুজন আগে থানায় তো চলো, তারপর দেখব৷ যদি দেখি যে এতক্ষণ ধরে তুমি শুধু আমাদের সময় নষ্ট করেছ, তাহলে...৷’
‘দেখি সরো, আমাকে কথা বলতে দাও৷’ কুপারকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিল ডিলেনি৷ শান্ত স্বরে বলল, ‘শোনো খোকা, ট্রাকটা খুঁজে বার করার ব্যাপারে যে পুলিশকে সাহায্য করবে, সেই-ই পুরস্কারের টাকাটা পাবে৷ এর মধ্যে একচোখোমির কোনও প্রশ্নই নেই৷ তোমার দেওয়া খবর যদি আমাদের ট্রাকটাকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করে তবে তুমিই পুরস্কারের টাকাটা পাবে৷ এতে অবিশ্বাসের কী আছে?’
কয়েক সেকেন্ড ধরে মেজরকে জরিপ করল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়ার৷
‘সত্যি বলছেন?’
মেজর ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘সত্যি বলছি৷’
‘পুরস্কারের টাকাটা আমার বাবাকে দেবেন না তো? আমার হাতেই দেবেন?’
‘হ্যাঁ, তোমাকেই দেব৷’
‘পাঁচ হাজার ডলার?’
‘হ্যাঁ—’
ছেলেটা গুম হয়ে বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করতে লাগল৷ তারা তিনজন একদৃষ্টে ওকে লক্ষ করতে লাগল৷
‘ঠিক বলছেন তো? ট্রাকের খবর দিলে টাকাটা আপনি আমাকেই দেবেন?’ মেজরের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ছেলেটা আবার প্রশ্ন করল৷
মেজর ঘাড় নাড়ল, মুখে আকর্ণবিস্তৃত হাসি৷
‘আমি ঠাট্টা করছি না খোকা৷ মিলিটারির লোকেরা কখনও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় না৷ তাদের কথার দাম আছে৷
আবার কিছুক্ষণের জন্যে চিন্তায় পড়ল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷ অবশেষে মনস্থির করে বলল, ‘আচ্ছা তাহলে বলছি৷ ওরা মোট চারজন আছে, তিনজন পুরুষ একজন মেয়ে৷ তিনজনের মধ্যে দুজন সারাদিন ধরে ক্যারাভ্যানে থাকত৷ শুধু রাত্রি হলেই বাইরে বেরোত৷ একদিন রাতে আমি ওদের দুজনকে ক্যারাভ্যান ছেড়ে বেরোতে দেখেছি৷ ওদের গাড়ির নম্বরও রয়েছে আমার কাছে৷ ওরা বলছিল, এরপর স্ট্যাগ হ্রদে দিয়ে বেড়াতে যাবে, কিন্তু সব মিথ্যে কথা৷ ওরা রওনা হবার সময় আমি দেখেছি, স্ট্যাগ হ্রদের যাবার রাস্তায় না গিয়ে বড় রাস্তার দিকে গেছে৷ ক্যারাভ্যানের রং সাদা, কিন্তু ছাদটা নীল রঙের৷’ পকেট থেকে একটা ময়লা নোট বই বার করে তার একটা পাতা ছিঁড়ল ছেলেটা৷ ডিলেনির দিকে এগিয়ে দিল কাগজটা, ‘ওদের গাড়ির নম্বরটা এই কাগজেই লেখা আছে৷’
‘কিন্তু ট্রাকটা যে ক্যারাভ্যানে আছে, সেটা তুমি জানলে কী করে?’ নোট বইয়ের ছেঁড়া পাতাটা সযত্নে পকেটে রাখতে-রাখতে ডিলেনি প্রশ্ন করল?
‘ওদের দুজন যখন ভোরবেলা ক্যারাভ্যানে ঢুকছিল তখন আমি দেখেছি৷ ট্রাকটা দেখবার জন্যেই তো অত ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম—৷’
‘কিন্তু ওটা যে হারানো ট্রাক সেটা তুমি বুঝলে কী করে?’
ছেলেটা ধৈর্যসহকারে মেজরকে পর্যবেক্ষণ করল৷ তারপর জবাব দিল, ‘হারানো ট্রাক কেমন দেখতে তা আমি খবরের কাগজে পড়েছি৷ ওই ট্রাকটাই সেই হারানো ট্রাক; আমি স্পষ্ট দেখেছি৷৷’
‘এ জায়গা ছেড়ে কখন রওনা হয়েছে ওরা৷?’
‘কাল দুপুরে৷ ওরা যখন যায় তখন আমি ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে, লুকিয়ে দেখছিলাম৷ স্ট্যাগ হ্রদের রাস্তার দিকে ওরা যায়নি৷ গেছে পাহাড়ি এলাকার দিকে৷’
‘ওঃ তাহলে অনেক সময় আমরা নষ্ট করে ফেলেছি৷’ ডিলেনি কঠিন চোখে তাকাল, ‘তুমি তোমার বাবাকে বলে আমাদের সদরে একটা ফোন করতে পারতে—!’
‘বাবাকে বলেছিলাম৷ কিন্তু বাবা নিজেও ফোন করবে না, আমাকেও করতে দেবে না৷ তাই শেষ পর্যন্ত চিঠি দিতে হল৷ বাবা খালি বলছিল, সব পুলিশের লোকই এক এক নম্বরের চোর৷’
ডিলেনি ও কুপার একই সঙ্গে ফিরে তাকাল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে৷ কটমট করে কয়েক মুহূর্তে চেয়ে রইল৷
ঢোঁক গিলল ব্র্যাডফোর্ড৷ রক্তিম মুখে নিচু স্বরে জবাব দিল, ‘আমি এমনি ঠাট্টা করছিলাম৷ ওর ধারণাকে অপরিণত মস্তিষ্কের কল্পনা ভেবে...৷’
‘থাক হয়েছে৷’ রূঢ় স্বরে ব্র্যাডফোর্ডকে থামিয়ে দিল ডিলেনি৷ ফিরল জুনিয়রের দিকে, ‘ওই লোকগুলোর চেহারার বর্ণনা তুমি দিতে পারবে, খোকা?’
‘নিশ্চয়ই—’ বলল সে, এবং কিটসন, জিনি, জিপো ও ব্লেকের নিখুঁত শারীরিক বর্ণনা গড়গড় করে বলে গেল৷
একটা ছোট নোট বইয়ে ওদের চেহারার বর্ণনা টুকে নিল কুপার৷
‘এই তো লক্ষ্মী ছেলে৷’ ডিলেনি উৎসাহ ভরা সুরে বলে উঠল, ‘তুমি একটা কাজের মতো কাজ করেছ৷ যদি ট্রাকটা আমরা খুঁজে পাই, তাহলে তুমি যাতে পুরস্কারের টাকাটা পাও সেজন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব৷’
নিশ্চিন্ত থাকুন—ট্রাক আপনারা খুঁজে পাবেনই৷’ মাথা থেকে টুপিটা খুলে ঝেড়ে ঝেড়ে ঘাসগুলো ফেলে দিল ছেলেটা, ‘উহু, এই কায়দাটাই তেমন জুতসই নয়৷ বড্ড তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যাচ্ছে৷’
কুপার দাঁত বের করে হাসল, ‘এক কাজ করো, ঘাসের বদলে বরফ দিয়ে দেখো কাজ হবে৷’
জুনিয়রের মুখে হতাশা নেমে এল৷
‘একেবারে আজব প্রস্তাব৷’ গম্ভীর স্বরে বলল সে, ‘বরফ গলে যাবে না?’
ডিলেনি ওর কাঁধ চাপড়ে দিল, ‘আমি একটা পথ বাতলাতে পারি৷ তোমার টুপির ওপরটা কেটে ফেলো৷ তাহলে স্বাধীনভাবে হাওয়া চলাচল করতে পারবে, মাথাও ঠান্ডা থাকবে। তাছাড়া, কে বলতে পারে কালকে এটাই একটা ফ্যাশান হয়ে দাঁড়াবে না!’
ছেলেটা কিছুক্ষণ প্রস্তাবটা ভেবে দেখল, তারপর মাথা নাড়ল, ‘এটার মধ্যে বেশ নতুনত্ব আছে৷ দেখি, এই কায়দাটাই চেষ্টা করে দেখতে হবে৷ হয়তো এর থেকে বেশ কিছু টাকাও কামিয়ে ফেলতে পারি—৷’
গাড়ির দিকে ফিরে যেতে যেতে ডিলেনি বলল, ‘পাহাড়ের ওপরে...একমাত্র ওই জায়গাটাই আমরা এখনও খুঁজতে বাকি রেখেছি৷ ওখানে ওরা থাকলেও থাকতে পারে৷’
‘অসম্ভব৷’ কুপার দৃঢ় স্বরে বলে উঠল, ‘আমার যদি একবারও মনে হতো যে ওরা ওখানে লুকিয়ে, তাহলে এতদিনে ও জায়গাটা তুলোধোনা করে ছাড়তাম৷ কারণ ওই রাস্তা বেয়ে কারও পক্ষেই ওপরে ওঠা সম্ভব ন্য—ভারী ট্রাক নিয়ে তো দূরের কথা! কয়েক সপ্তাহ আগে প্রচণ্ড ঝড়ে ওই রাস্তার কিছুটা অংশ একেবারে ধুয়ে গেছে৷
‘কিন্ত একমাত্র ওই পাহাড়ি এলাকা ছাড়া আর কোনও জায়গাই তো আমরা খুঁজতে বাকি রাখি নি৷...হোক অসম্ভব, তবু আমি একবার খুঁজে দেখতে চাই৷ হয়তো ভাগ্যের জোরে ওরা ট্রাকটা নিয়েই ও রাস্তাটা উতরে গেছে৷’
গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন চালু করল৷
‘তুমি পুরস্কারের জন্যে সত্যি-সত্যিই ওই বাচ্চাটার নাম সুপারিশ করবে নাকি?’ সে প্রশ্ন করল৷
ডিলেনি কুপারের পাশে আয়েশ করে বসল৷ তার চোখে দূরাভিসারী শূন্যদৃষ্টি, ‘একটা দশ বছরের বাচ্চা ছেলে পাঁচ হাজার ডলার নিয়ে কী করবে বলতে পারো? মাঝখান থেকে ওর গেছো বাপটা ওই টাকাগুলো পকেটস্থ করবে৷’ কুপারের দিকে ফিরে তাকাল ডিলেনি, মুখে দুর্জ্ঞেয় হাসি, পুরস্কারের টাকাটা কে পাবে সেটা আমরা ভালোভাবেই জানি, তাই না? পুরষ্কারের শর্তে স্পষ্টই লেখা আছে, যে বা যারা ট্রাকটা খুঁজে বের করবে টাকাটা তারাই পাবে৷ আমরা ধারণা তুমি আর আমিই সেটা খুঁজে বের করতে চলেছি, অতএব...’
কুপার সশব্দে হাঁপ ছাড়ল, ‘ওঃ তুমি যেভাবে ওই বাচ্চাটাকে বোঝাচ্ছিলে, আমি তো ভাবলুম বুঝি সত্যি সত্যিই...’
ডিলেনি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘বাচ্চাদের পেট থেকে কিভাবে কথা আদায় করতে হয় সেটা আমি মোটামুটি জানি৷ ওদের সঙ্গে কথা বলার সময় তোমাকে একাগ্র এবং আন্তরিক হতে হবে; নইলে ওরা তোমার কোনও কথাই বিশ্বাস করবে না৷ তাছাড়া, তুমি তো জানো, আমি বরাবরই একাগ্র এবং বিশ্বস্তভাবে কাজ করতে ভালোবাসি৷’ উঁচু গলায় হেসে উঠল সে৷
কিটসন যখন তাঁবুতে ফিলর তখন ন’টা বেজে গেছে৷ জিপোর বেলচাটা কাঁধে ফেলে শ্লথ ভঙ্গিতে সে এগিয়ে এল৷ গায়ের জামা ঘামে ভেজা৷
গাছের ছায়ায় একটা পাথরের ওপর বসেছিল জিনি৷ মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে, সবুজ চোখে জল চিকচিক করছে৷
ব্লেক এরই মধ্যে ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের বাইরে বের করে ফেলেছে৷ ট্রাকের দরজায় কান পেতে সে ডান হাতে কম্বিনেশন চাকতিটা ঘুরিয়ে চলেছে৷ অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে, ধীরে ধীরে সে চাকতিটা ঘোরাচ্ছে—সম্ভবত জিপোর পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে চাইছে৷
কিটসন বেলচাটা নামিয়ে রেখে জিনির দিকে এগিয়ে গেল৷ ওর পায়ের কাছে মাটিতে বসল, কাঁপা হাতে সিগারেট ধরাল একটা৷
জিনি আলতোভাবে হাত রাখল কিটসনের কাঁধে৷
‘ওঃ কী ভাবেই না বেচারা মারা গেল’, জিনির হাতের ওপর হাত রাখল কিটসন, ‘কিন্তু ওর জন্যে আমাদের করার কিছুই ছিল না৷ জিপো যখন মারা যায় তখন আমি আর ওই ছুঁচোটা মারামারিতে মত্ত৷ অবশ্য এমনিতেই ওকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না, তার আগেই ও মারা যেত৷’
‘ওসব নিয়ে আর ভেব না, আলেক্স৷’
‘তারপর শেয়াল কুকুরের মতো ওর দেহটা কবর দেওয়া—জিপো বড় ভালো লোক ছিল, জিনি৷ ওর কথা আমার শোনা উচিত ছিল৷ এ কাজে জিপো হাত দিতে চায়নি৷ আমাকেও নিরস্ত করার জন্যে কম চেষ্টা করেনি৷ এখন ভাবছিঃ ওর কথা শুনলে বোধ হয় ভালো হতো৷’
‘হ্যাঁ৷’
‘ও বলেছিল, এ কাজের ফল কোনওদিনই ভালো হবে না: সেটা যে কত বড় সত্যি কথা, তা আজ এ মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছি৷ চলো, জিনি—আমরা এখান থেকে চলে যাই; তুমি আর আমি৷ অন্ধকার হলেই আমরা রওনা হব৷’
‘তাই চলো৷ এ সবই আমার দোষ, আলেক্স৷ এর জন্যে আমি নিজেকে কোনওদিনই ক্ষমা করতে পারব না৷ এতসব গণ্ডগোলের মূলে একমাত্র আমি৷ তুমি যখন জিপোকে কবর দিতে নীচে গেলে, তখন থেকে আমি বসে-বসে খালি ভাবছি৷ এখন বুঝতে পারছি কত বড় ভুল আমি করেছি, কত অন্যায় করেছি৷ এখন যদি ট্রাক খোলাও হয়, তবু আমি এর একটা টাকাও ছোঁব না৷ মনে হচ্ছে, আমি যেন এতদিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম৷’
‘তাহলে তুমি আমার সঙ্গে আসতে রাজি?’ জিনির দিকে মাথা না তুলেই বলল কিটসন, ‘আবার নতুন করে জীবন শুরু করব, জিনি৷ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’
‘তুমি চাইলে আমার আপত্তি নেই৷’ অস্ফুট স্বরে জবাব দিল ও, ‘কিন্তু পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে সত্যিই কি আমরা পালাতে পারব? আজ হোক-কাল হোক ওরা আমাদের ধরে ফেলবেই৷’
সিগারেটটা নিভিয়ে দিল কিটসন, টোকা মেরে ফেলে দিল৷
‘কে জানে, হয়তো পারতেও পারি৷ একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী৷ আমরা বুইকটা নিয়ে সোজা মেক্সিকো সীমান্তের দিকে রওনা দেব৷ পুলিশ তো আর আমাদের চেহারার বিবরণ জানে না৷ যদি একবার আমরা মেক্সিকোয় পৌঁছতে পারি...৷’
‘এই কিটসন! এদিকে এসো!’ চিৎকার করে ডেকে উঠল ব্লেক, ‘কী হচ্চে ওখানে বসে? এখানে এসে কাজে হাত লাগাও, আমাকে সাহায্য করো৷’
কিটসন ও জিনি দৃষ্টি বিনিময় করল৷ তারপর কিটসন উঠে দাঁড়াল৷ এগিয়ে চলল ট্রাকের দিকে৷
‘তুমি অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করেতে জানো?’ ব্লেক প্রশ্ন করল৷ তার মুখমণ্ডল কঠিন, যেন পাথরে খোদাই করা চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি৷
‘না জানি না৷’
‘তাহলে এখন থেকেই শিখতে শুরু করো৷ এই হতচ্ছাড়া বাক্সটা আমাদের তালা গলিয়ে খুলতে হবে৷ এসো, সিলিন্ডারগুলো একটু ঠিক করে ধরো৷’
‘ও আমার দ্বারা হবে না৷’ শান্ত স্বরে জবাব দিল কিটসন৷
ব্লেক অগ্নিক্ষরা চোখে তাকাল তার দিকে, ‘তার মানে? এই ট্রাকটা আমাদের যে করেই হোক খুলতে হবে, তাই না?’
‘ওতে আমার কোনও উৎসাহ নেই৷ আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে, আর নয়৷ প্রথম থেকেই আমার এ কাজে হাত দেওয়া ঠিক হয়নি৷ তোমার দরকার থাকে তুমি খোলো৷ যদি খুলতে পারো তো সমস্ত টাকাই তোমার৷ কেউই ওতে ভাগ বসাতে যাবে না৷ আমি এই ঝামেলায় আর থাকতে চাই না৷’
ব্লেক গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘শালা ভিতুর ডিম! বুঝতে পারছ না, এটা আমার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়৷ ফালতু না বকে এসে হাত লাগাও, আমাকে সাহায্য করো!’
‘অন্ধকার হওয়ামাত্রই আমি আর জিনি এখান থেকে চলে যাচ্ছি৷ তুমি তোমার খুশিমতো পথ বেছে নাও, কিন্তু আমরা যে চলে যাচ্ছি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থেকো৷’
‘ও—তাই বুঝি!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘তোমরা দুজন...ও শেষ পর্যন্ত তাহলে জিনিকে কবজা করেছ?’ কিন্তু তাই বলে দশ লক্ষ ডলারকে পায়ে ঠেলে চলে যাবে এ কেমন কথা! তোমার নিশ্চয়ই মাথার ঠিক নেই৷’
‘আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি!’ কিটসন শান্ত স্বরে পুনরাবৃত্তি করল৷
‘তাহলে এক দীর্ঘ পদযাত্রার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করো৷’ ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল ব্লেক৷
‘আমরা বুইকটা নিয়ে যাচ্ছি৷’
‘সে তো তুমি ভাবছ! কিন্তু বুইকটা আমার কাজে লাগবে, আর এই মুহূর্তে আমি যাবার জন্যে প্রস্তুত নই৷’ ট্রাকের গায়ে বারকয়েক চাপড় মারল ব্লেক, আর কিছু করি না করি, এই ট্রাকের তালা আমি খুলবই৷ ভেব না, তোমার মতো কোনও ডরপোক ভেড়ুয়া বা তার পেয়ারের তওয়ায়েফ আমাকে রুখতে পারবে৷ যদি কেটে পড়তে চাও তো সোজা কেটে পড়ো৷ আমি বাধা দেব না৷ তবে বুইক নয়, শ্রীচরণ ভরসা করেই বিদেয় হও৷ গাড়ি আমি অত সহজে ছাড়ছি না৷’
চোখের কোণ থেকে ব্লেকের নজর পড়ল জিনির দিকে৷ ও হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে৷
ব্লেক বুঝল, সে একা—এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক৷ তাছাড়া, জিনির কাছে হয়তো রিভলভারও আছে৷
কিটসন তখন শান্ত স্বরে বলে চলেছে, ‘আজ রাতেই আমরা চলে যাচ্ছি, এবং গাড়ি নিয়েই যাচ্ছি৷ তুমি যদি চাও তো আমাদের সঙ্গে বড় রাস্তা পর্যন্ত আসতে পার, কিন্তু তারপরে তোমাকে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করতে হবে৷ এবার যেটা পছন্দ বেছে নাও৷’
ব্লেক ইতস্তত করল তারপর তাকাল জিনির দিকে৷ ও এখন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে, ডান হাত শরীরের পাশে নামানো সকলের চোখের আড়ালে৷
এখন যে যদি ঠিকমতো প্যাঁচ না কষতে পারে তাহলে ওরা দুজন তাকে খুন করবে—ভাবল ব্লেক৷
অতএব সে কাঁধ ঝাঁকাল, কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি যা বলছ তাই হবে৷ তাহলে সন্ধে পর্যন্ত আমরা ট্রাকটা খোলার চেষ্টা করতে পারি৷ বলা যায় না, এ বারো ঘণ্টার চেষ্টায় ট্রাকের তালা হয়তো খুলে যেতেও পারে৷ আশা করি এই সময়টা তুমি বসে-বসে কাটাবে না? এসো সিলিন্ডারগুলো ধরো—কাজের সাহায্য হবে৷’
ব্লেকের এই আকস্মিক আত্মসমর্পণে কিটসন অবাক হল; কিছুক্ষণ ইতস্তত করল সে৷
‘ঠিক আছে৷ কিন্তু তাতে কিছু লাভ হবে বলে মনে হয় না৷ বারো ঘণ্টা কেন, বারো বছর ধরে চেষ্টা করলেও এই ট্রাকের তালা গলানো সম্ভব হবে না৷’
‘দেখাই যাক না৷’ ব্লেক একপলক দেখল জিনির দিকে৷ ওর নজর এখনও ব্লেকেরই ওপর, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে৷ ‘তোমার বড় বেশি উপদেশ দেওয়ার স্বভাব, আলেক্স৷ এসো, কাজে হাত লাগাও৷’
কিটসন ব্লেককে পাশ কাটিয়ে ক্যারাভ্যানের দিকে পা-বাড়াতেই ব্লেক তার রিভলভার বের করে কিটসনের দিকে চেপে ধরল৷
‘রিভলভার ফেলে দাও!’ জিনিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘নইলে তোমার ভাতারের পেট ফুটো করে ছাড়ব!’
জিনির ডান হাতের মুঠো আলগা হল, রিভলভারটাও খসে পড়ল ঘাসের ওপর৷
ওদের দুজনকে রিভলভার আওতায় রেখে পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল ব্লেক৷ জিনিকে লক্ষ করে খিঁচিয়ে উঠল, ‘সরে যাও রিভলভারের কাছ থেকে!’
জিনি কিটসনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷
ব্লেক বৃত্তাকার পথে ওদের অতিক্রম করে তুলে নিল জিনির রিভলভারটা৷ ছুড়ে ফেলে দিলে হ্রদের জলে৷
‘এবার শোনো৷ এই ট্রাকটা আমরা খুলবই৷ মনে কোরো না, তোমাদের দুজনকে আমি সামলাতে পারব না, ট্রাক না খোলা পর্যন্ত এ জায়গা ছেড়ে আমরা নড়ছি না৷ তোমরা এ টাকা না চাইতে পারো, কিন্তু আমি চাই৷ এবং শেষ পর্যন্ত টাকা আমি নেবই৷’ কিটসনকে লক্ষ করে রিভলভার নাচাল সে, ‘যাও৷ ভেতরে গিয়ে সিলিন্ডারগুলো বের করো৷’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিটসন পা-বাড়াল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ ব্লেক তাকে অনুসরণ করল৷
‘এ কাজ আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়৷’ কিটসন বলল, ‘গাড়িতে এগুলো তোলবার সময় জিপো আমাকে সাহায্য করেছিল৷ কারণ সিলিন্ডারগুলোর ওজন খুব একটা কম নয়৷ তুমি অন্য দিকটা না ধরলে হবে না৷’
ব্লেক দাঁত বের করে হাসল৷ রিভলভারটা খাপে ঢুকিয়ে রাখল৷
‘কোনওরকম চালাকি করার চেষ্টা কোরো না আলেক্স৷ তার ফল খারাপই হবে!’
হাত বাড়িয়ে সিলিন্ডারের এক প্রান্ত চেপে ধরল কিটসন৷ টেনে কিছুটা বের করে আনল তাক থেকে৷ ব্লেক সিলিন্ডারের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁধ পাতল৷ তারপর দুজনে অতি সাবধানে এক-পা করে ক্যারাভ্যানের বাইরে এল৷
ক্যারাভ্যানের বাইরে এসেই কিটসন সিলিন্ডারের এক প্রান্ত আচমকা ফেলে দিল কাঁধ থেকে৷ সিলিন্ডারের প্রান্তটা সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ল৷ এই অতর্কিত আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল ব্লেক৷
কিটসন সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ ওর ডান হাতি ঘুষি ব্লেকের ঘাড়ে সজোরে আঘাত করল—চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে৷
একটা মুখখিস্তি করে রিভলভার বের করার চেষ্টা করল ব্লেক৷ কিন্তু কিটসনের শরীরের তেরো স্টোন ওজন তার ওপর চেপে বসল৷
কয়েক মুহূর্ত ধরে ওরা বন্য জন্তুর মতো যুঝে চলল৷ তারপর একসময় ব্লেক হাঁটু ভাঁজ করে আঘাত করল কিটসনের বুকে—ছিটকে ফেলে দিল ওকে৷ তারপরে সে রিভলভার বের করতেই কিটসন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার হাত লক্ষ করে৷
কিটসন ডান হাতে ব্লেকের রিভলভার ধৃত হাত আঁকড়ে ধরল, এবং একই সঙ্গে তার বাঁ-হাত সপাটে আঘাত করল ব্লেকের মুখে৷
একটা অস্ফুট আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারটা খসে পড়ল ব্লেকের হাত থেকে৷
সে ঘুষির আঘাত সামলে ওঠার আগেই কিটসন কুড়িয়ে নিয়েছে ব্লেকের রিভলভার। উঠে দাঁড়িয়ে উঁচিয়ে ধরেছে ব্লেকের দিকে৷
ব্লেক কোনওরকমে উঠে বসল৷ ওর চোখের নীচে কাটা জায়গাটা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ ঠোঁট সরে গিয়ে তার আংশিক দাঁতের সারি এক বীভৎস জিঘাংসায় প্রকট হয়ে পড়েছে৷
‘এর বদলা আমি নেবই৷’ নৃশংস স্বরে হিসহিস করে উঠল ব্লেক৷
‘তোমরা বদলা নেবার দিন চলে গেছে এড৷’ হাঁপাতে-হাঁপাতে জবাব দিল কিটসন৷
হঠাৎ, কোনওরকম পূর্বাভাস না দিয়েই ভেসে এল প্লেনের ইঞ্জিনের শব্দ৷ সৈন্যবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটা ছোট এয়ারক্র্যাফট হাওয়ার ঝাপটায় ঘাসের শিষগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে উড়ে গেল উপত্যকার দিকে৷
ব্লেক টলতে টলতে সোজা হয়ে দাঁড়াল, হাঁ-করে চেয়ে রইল ক্রম অপসৃয়মান প্লেনের দিকে৷
‘ওরা আমাদের দেখতে পেয়েছে!’ চাপা স্বরে বলে উঠল সে, ‘ওরা নির্ঘাত আমাদের দেখে ফেলেছে! এখুনি ওরা উঠে আসবে এই পাহাড়ে, আমাদের পেছু নেবে৷’
ওরা তিনজন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ দেখল বহুদূরে একটা ছোট বৃত্তাকার পথে বাঁক নিয়ে প্লেনটা আবার ফিরে আসছে তাদেরই দিকে৷
‘শিগগিরি লুকিয়ে পড়ো৷’ ব্লেক চিৎকার করে উঠল, অন্ধের মতো দৌড়ে গেল সামনের জঙ্গলের দিকে৷
কিটসন আর জিনি ছুটল জঙ্গলের দিকে, তবে একসঙ্গে নয়, ভিন্ন পথে৷ কিন্তু ইতিমধ্যেই প্লেনটা ওদের মাথার ওপর এসে পড়েছে৷
বিকট গর্জন করে, হাওয়ার ঝাপটা তুলে মাত্র একশো ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গেল প্লেনটা! ওরা স্পষ্ট দেখতে পেল, খোলা ককপিট দিয়ে দুজন লোক বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সোজাসুজি তাকিয়ে আছে ওদেরই দিকে৷ একটু পরেই দূরত্ব বৃদ্ধির ফলে স্তিমিত হয়ে এল প্লেনের গর্জন৷
কিটসন ও জিনি তাকাল পরস্পরের দিকে, ওদের চোখে উলঙ্গ আতঙ্কের ছাপ৷
ব্লেক গলা ফাটিয়ে ডেকে উঠল, ‘লুকিয়ে পড়ো গর্দভ কোথাকার৷ বোকার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না!’
ব্লেকের কথায় কর্ণপাত করল না কিটসন, বলে উঠল, ‘ওরা আমাদের দেখে ফেলেছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা এসে পড়বে, জিনি৷’
‘হ্যাঁ, আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওরা আমাদের ধরে ফেলবেই৷’
কিটসন চকিতে পা বাড়াল রাস্তার দিকে৷ শরীরকে যথাসম্ভব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাস্তা পার হল সে৷ চোখ রাখল ঘাসবন ছাড়িয়ে দূরের আঁকাবাঁকা সরু পথের দিকে৷ উপত্যকার কোল ঘেঁষে বেয়ে ওঠা রাস্তার ক্ষীণ সাদা পটভূমিতে তার নজরে পড়ল বিপদের যান্ত্রিক রূপ৷
প্রায় মাইল দশেক নীচে তিনটে গাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে ছুটে আসছে৷
কিটসন তার হৃৎপিণ্ডে অনুভব করল আচমকা আতঙ্কের ধাক্কা৷ সে ছুটে এল জিনির কাছে৷
‘ওরা আসছে৷’
বিকৃত মুখে বনের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল ব্লেক, ‘ওদের দেখা যাচ্ছে?’ প্রশ্ন করল সে৷
‘হ্যাঁ৷ যেভাবে ওরা গাড়ি ছুটিয়ে আসছে তাতে এখানে পৌঁছতে ওদের মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না৷’
‘আমাদের এখনও পালাবার সুযোগ আছে৷’ কাঁপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘শিগগিরি বুইকটা নিয়ে এসো৷ আমরা যদি একবার পাহাড়ের মাথায় চড়তে পারি,তাহলে এখনও বাঁচবার উপায় আছে৷’
কিটসন মাথা নাড়ল, এখান থেকে মাইলখানেক ওপরে রাস্তা একেবারে সরে গেছে৷ আমাদের হয়তো পাহাড় বেয়েই উঠতে হবে...৷’
ব্লেক দৌড়ে গেল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ অটোমেটিক রাইফেলটা নিয়ে ফিরে এল, ‘আমি প্রাণ থাকতে ওদের হাত ধরা দিচ্ছি না৷’ ব্লেকের চোখ হিংস্রতায় চকচক করে উঠল, ‘কারণ ইলেকট্রিক চেয়ার আমার একবারেই না-পসন্দ৷’
কিটসন বুইকের দরজা খুলে ধরল৷ জিনি উঠে বসল তার পাশে৷ সে অনুভব করল জিনির শরীর কাঁপছে৷ ওর হাঁটুতে হাত রেখে সে আশ্বাস দিল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷ আমরা একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব৷’
ব্লেক জিনির পাশে বসতেই কিটসন গাড়ি চালু করল৷ রুক্ষ ঘাসজমি পেরিয়ে রাস্তায় নিয়ে এল গাড়িটাকে৷
ওরা তিনজন একবার ফিরে তাকাল দূরে গায়ের ছায়ায় দাঁড়ানো ট্রাকটার দিকে৷
‘ওই শালারা বলেছিল ওটা পৃথিবীর নিরাপদতম ট্রাক৷’ ট্রাকটার দিকে আঙুল দেখিয়ে নৃশংস স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘এখন দেখছি কথাটা কেবলমাত্র প্রচারের জন্যে নয়৷’
কিটসনের সুদক্ষ হাতে বুইক অসমান রাস্তা ধরে ছুটে চলল!
ট্রাকটাকে শেষবারের মতো দেখার জন্যে বুইকের জানলা দিয়ে বাইরে ঝুঁকে পড়ল ব্লেক৷ ট্রাকের ভেতরে আবদ্ধ টাকার পরিমাণ দশ-লক্ষেরও অনেক বেশি—ভাবল সে৷ ওই ট্রাকের ভেতরে একই সঙ্গে বন্দি হয়ে রয়েছে আমার ভবিষ্যৎ, আমার জীবন৷
ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে চলল কিটসন৷ তার মুখের প্রতিটি পেশি টান-টান৷ চোখের দৃষ্টি সামনের রাস্তার দিকে নিবদ্ধ৷ প্রচণ্ড গতিবেগের জন্যে রাস্তার বাঁকে গাড়ির চাকা পিছলে যেতে লাগল৷
প্রথম বিপরীতমুখী বাঁকের কাছে পৌঁছে গাড়ির গতি কমিয়ে আনল কিটসন৷ কিন্তু তার অনুমান সঠিক না হওয়ায় সে গাড়ি থামাতে বাধ্য হল৷ ব্লেক অধৈর্য হয়ে তাকে শাপশাপান্ত করতে লাগল৷ গাড়িটা কিছুটা পিছিয়ে আবার সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল কিটসন৷
কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় আবার উঠতে শুরু করামাত্রই সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজটা চঞ্চল হাউন্ডের মতো তার মাথার ওপরে, আকাশে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে লাগল৷
‘ওই ব্যাটাকে যদি একবার নাগালের মধ্যে পাই—৷’ উড়ন্ত প্লেনের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷ শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল অটোমেটিক রাইফেলটা৷
ওরা শুনতে পেল দূর থেকে ভেসে আসা পুলিশ সাইরেনের একটানা কাতর আর্তনাদ৷
জিনি ভয়ে কেঁপে উঠল৷ ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ হল উত্তেজনায়৷
গাড়িকে রাস্তার ওপর সচল রাখতে কিটসনকে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছিল৷ কারণ রাস্তাটা কয়েকশো গর্ত এবং আলগা পাথরে কণ্টকিত৷ হয়তো অতীতের সেই প্রচণ্ড ঝড়ের সাক্ষ্য বহন করছে৷
ওদের বাঁ দিকে খাড়া পাহাড়, যেন একটা গ্রানাইট পাথরের দেওয়াল সোজা ওপরে উঠে গেছে৷ আর ডান পাশে অতল খাদ—নীচের উপত্যকা এখান থেকে দেখাচ্ছে একটা ছোট বোতামের মতো৷
‘এভাবে আমরা আর বেশি দূর যেতে পারব না৷’ গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে আনল কিটসন, আর একটু পরেই আমরা সেই বিধ্বংসী অংশের মুখোমুখি হব৷’
পরের বিপরীতমুখী বাঁকে মোড় নিতেই, আচমকা ব্রেক কষল কিটসন৷ থমকে দাঁড়াল বুইক৷
অসংখ্য ছোট বড় পাথর, বুনো ঝোপ রাস্তার ঠিক মাঝখানেই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে৷ সে বাধা অতিক্রম করে বুইককে নিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই৷
অটোমেটিক রাইফেলটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ব্লেক৷ অন্য দুজনের দিকে সে ফিরেও তাকাল না৷ ছুটে গেল পাথরের ঝোপে ঢাকা রাস্তার মাঝখানে ঢিবিটার দিকে৷ ওটা বেয়ে উঠতে লাগল৷
কিটসন চোখ তুলে ওপরে তাকাল৷
ওপরে, অনেক ওপরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের শুভ্র তুষারবৃত চূড়া৷ একমুহূর্ত ইতস্তত করল সে৷ তারপর জিনির হাত আঁকড়ে ধরে ওপর দিকে আঙুল তুলে দেখাল, ‘জিনি, আমরা ওই পথ বেয়ে ওপরে উঠব৷ ওখানে হয়তো লুকোবার যথেষ্ট জায়গা থাকতে পারে৷ তাছাড়াও আমরা যদি ব্লেকের সঙ্গে যাই, তাহলে ধরা আমরা পড়বই—বাঁচবার কোনও আশাই থাকবে না৷’
পাহাড়ের বিস্তৃত আকারের দিকে তাকিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে গেল জিনি৷
‘ও আমি পারব না, আলেক্স৷ তুমি একাই যাও৷’
কিটসন জিনিকে টেনে নামাল গাড়ি থেকে৷ ওকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল৷
‘গেলে আমরা দুজনেই একসঙ্গেই যাব৷’ বলে সে পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে উঠতে লাগল৷ প্রথম একশো গজ সহজেই ওঠা গেল ঃ জিনিরও তেমন অসুবিধে হল না৷ থেকে থেকেই কিটসন পিছন ফিরে জিনিকে উঠতে সাহায্য করছে৷ হাত বাড়িয়ে ওকে টেনে তুলল ওপরে৷
সাইরেনের শব্দ এখন আগের চেয়ে অনেক তীব্র, অনেক কাছে৷ ওদের আরোহণের গতি ক্রমশ কমে আসতে লাগল, কারণ ক্রমশই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে পাহাড়ে ঢাল৷
পাহাড়ের বন্ধুর তলের পটভূমিতে ওরা নিজেদের বড় বেশি অরক্ষিত এবং অসহায় বোধ করল৷ কিন্তু আরও পঞ্চাশ ফুট ওপরে দেখা যাচ্ছে গোটাকয়েক বিশাল পাথর, যার আড়ালে ওরা সহজেই আত্মগোপদ করতে পারে৷ তাই কিটসন তাড়াতাড়ি ওঠার জন্যে জিনিকে বারেবারেই তাড়া দিতে লাগল৷
হঠাৎ একসময় আতঙ্কে পিছলে গেল জিনির ডান হাত৷ কিন্তু বিদ্যুৎগতিতে কিটসন ওকে আঁকড়ে ধরল৷ আবার টেনে নিল নিরাপদ আশ্রয়ে৷ সেখানে থেকে ওরা আবার শুরু করল ওদের পবর্তারোহণ৷
অবশেষে ওরা পৌঁছল পাথরগুলোর আড়ালে৷ আর প্রায় একই সঙ্গে ওরা শুনতে পেল কতকগুলো গাড়ি এসে থামল রাস্তায় ওদের ঠিক নীচেই৷
পাশাপাশি উপুড় হয়ে শুয়ে ওরা নীচের দিকে উঁকি মারল৷ অত্যধিক পরিশ্রমে ওদের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ গভীর হয়ে উঠেছে৷
নীচের রাস্তার একটা অংশকে কিটসনের দৃষ্টিপথ থেকে আড়াল করে রেখেছে সামনের একটা বিশাল ঝুলন্ত পাথর৷ কিন্তু ডানদিকে চোখ রাখতেই কিটসন দেখল, ব্লেক পাগলের মতো হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ছুটে চলেছে: আর মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তাকাচ্ছে৷ সামনের বাঁকে মোড় ঘুরতেই কিটসন তাকে আর দেখতে পেল না৷
কিটসন চোখ তুলে তাকাল৷ সম্ভবত বাঁচবার কোনও নতুন আশায়৷
তাদের কাছ থেকে আরও অনেকটা ওপরে ছোট ঝোপঝাড়ের পরদায় ঢাকা একটা চওড়া পাথরের আড়াল তার নজরে পড়ল৷ সে ভেবে দেখল, যদি তারা একবার ওই পাথরের আড়ালে পৌঁছতে পারে তাহলে পুলিশের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অতি সহজেই সে ও জিনি পরম নিশ্চিন্তে ওখানে আত্মগোপন করতে পারবে৷
সে হাত বাড়িয়ে জিনির বাহু স্পর্শ করল, ‘এখন ওপরে উঠতে পারবে?
জিনি ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘হ্যাঁ চলো৷’
কিটসন জিনির ঘর্মাক্ত মুখের দিকে চেয়ে হাসল৷ ওদের চোখজোড়া পরস্পরের খুব কাছাকাছি৷ সামান্য কাছে সরে এল জিনি, উষ্ণ ঠোঁট জোড়ার মাধ্যমে নিজের শরীরের মিশ্র অনুভূতি সঞ্চালিত করল কিটসনের দেহে৷
‘আমি দুঃখিত আলেক্স, এ সমস্তই শুধুমাত্র আমার দোষে৷’
‘উহুঁ, আমি নিজের ইচ্ছেতেই ফ্র্যাঙ্কের কথায় রাজি হয়েছিলাম৷ তবে দুঃখ এই, আমরা শেষ পর্যন্ত জিততে পারলাম না৷’
নীচ থেকে লোকজনের উত্তেজিত ভাসাভাসা কথোপকথন ওদের কানে এল৷
‘ওরা নিশ্চয়ই বুইকটা খুঁজে পেয়েছে৷’ কিটসন ফিসফিস স্বরে বলল, ‘চলো এগোনো যাক৷’
ওরা আবার পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল৷
জিনির কাছে পুরো ব্যাপারটাই যেন একটা বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন বলে মনে হল৷ কিটসন যদি প্রতি পদে ওকে সাহায্য না করত, তাহলে হয়তো ওর পক্ষে ওই খাড়াই বেয়ে ওপরে ওঠা কোনওমতেই সম্ভব হতো না৷
পাহাড়ের আড়ালটার কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকাল জিনি৷ ওপরের একটা ছোট ছুঁচলো পাথরকে দু-হাতে আঁকড়ে, একটা গাছের শেকড়ে পা-রেখে ও হাঁপাতে লাগল৷ দু-চোখ বোজা৷
‘আমি আর পারছি না, আলেক্স৷ আর এক পা ওঠারও সামর্থ্য আমার নেই৷ তুমি একাই ওপরে উঠে যাও, আমার জন্যে সময় নষ্ট কোরো না৷’
কিটসন চোখ তুলে তাকাল৷ আর মাত্র ফুটখানেক ওপরে রয়েছে পাথরের আড়ালটা৷
তারপর আবার জিনির দিকে চোখ নামাতেই, সে দেখল, দূরে—বহুদূরে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় অতল গভীরতার হাতছানি৷ একটা আচ্ছন্নতার বিক্ষুব্ধ ঢেউ এসে ঝাপটা মারল কিটসনের মস্তিষ্কে৷
একটা ছোট কাঁটাঝোপের শেকড়কে অবলম্বন করে ঝুলতে লাগল কিটসন৷ ভয়ে চোখ বুজল সে৷ অনুভব করল তার মসৃণ মুখমণ্ডলে স্বেদবিন্দুর উপস্থিতি৷
ওপরে তাকাতেই কিটসনের অবস্থা দেখে চমকে উঠল জিনি৷ ওর মনে হল, কিটসন বুঝি এখনই হাত ফসকে নীচে পড়ে যাবে৷
‘আলেক্স!!’
‘কোনও ভয় নেই৷’ রুদ্ধশ্বাসে জবাব দিল কিটসন, ‘হঠাৎই কিরকম মাথাটা ঘুরে উঠেছিল৷ তুমি আর নীচের দিকে তাকিও না, জিনি৷ এক মিনিট অপেক্ষা করো—আমাকে একটু সামলে নেবার সময় দাও৷’
মসৃণ দেওয়ালের গায়ে লেপটে থাকা দুটো নিঃসঙ্গ মাছির মতো ওরা স্থির হয়ে রইল৷ তবে সে কয়েক মুহূর্তের জন্যে৷ তারপরেই পরিপূর্ণ সাবধানতা নিয়ে আবার উঠতে শুরু করল কিটসন৷ পা-রাখবার একটা জুতসই প্রশস্ত জায়গা খুঁজে পেতে তার দেরি হল না। নিজে প্রস্তুত হয়ে সে হাত বাড়াল জিনির দিকে৷
‘দেখি হাত ধরো৷... এবার আস্তে আস্তে ওঠার চেষ্টা করো৷ ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই, আমি তো ধরে আছি৷’
‘না, আলেক্স! এত করে তুমি আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে তুলতে পারবে না, আমি তার আগেই হয়তো নীচে...৷’
‘যা বলছি, করো৷ হাতটা বাড়িয়ে দাও৷’ কিটসনের স্বরে অধৈর্য আদেশের সুর৷
‘ও আলেক্স, আমার ভীষণ ভয় করছে৷ আমি আর এভাবে ঝুলে থাকতে পারছি না৷ যে কোনও মুহূর্তেই আমার হাতের বাঁধন হয়তো খুলে যাবে—৷’
পাথরের গা-থেকে ওর হাতের বাঁধন আলগা হতেই কিটসন ঝট করে জিনির কবজি চেপে ধরল৷ জিনির আর্ত চিৎকার হাওয়ার মাতাল ঝাপটায় মুহূর্তে মিলিয়ে গেল৷ ওর দু-বাহুর শেষ প্রান্তে অসহায়ভাবে ঝুলতে লাগল জিনি৷ ওর স্কার্ট হাওয়ায় উড়তে লাগল; লম্বা, সুগঠিত পা-দুটো অবলম্বন পাওয়ার আশায় শূন্যে এলোপাথাড়ি মাথা খুঁড়ছে৷
জিনির শরীরের সমস্ত ওজন নিজের হাতে নিয়ে ঝুলে রইল কিটসন৷
‘জিনি! সাবধান!’ হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে উঠল কিটসন, ‘আমি পাহাড়ের গা ঘেঁষে তোমাকে ধরে থাকছি, তুমি কোনও পাথরের খাঁজে-টাজে পা-রাখবার চেষ্টা করো৷ তারপর তোমাকে সহজেই আমি টেনে তুলতে পারব৷ কোনও ভয় নেই, শুধু আমাকে একটু সাহয্য করো, তাহলেই হবে৷’
কিটসন জিনির শরীরটা সামান্য পাশে ঘোরাতেই ওর পায়ের আঙুল পাহাড়ের গায়ে এক অমানুষিক উন্মত্ততায় আশ্রয় খুঁজতে চাইল৷ একটু পরেই কিটসন অনুভব করল তার হাতের ওপর জিনির শরীরের ওজন আর নেই—অর্থাৎ ও কোনও অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে৷
একইভাবে ওর হাত ধরে রেখে কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷
ওরা সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল৷ ধীরে ধীরে কেটে গেল এক দীর্ঘ মিনিট৷ তারপর শোনা গেল কিটসনের স্বর, ‘আচ্ছা, এবার এসো৷’ বলে সে ওকে টেনে তুলতে শুরু করল৷
চওড়া পাথরটার ওপরে পৌঁছেই শ্লথ, অবসন্নভাবে কিটসনের পাশে বসে পড়ল জিনি৷
সেই মুহূর্তেই ওরা শুনতে পেল গুলির শব্দ৷ শব্দের তীব্রতা অবিশ্বাস্য রকম বেশি, এবং তার প্রতিধ্বনি সে তীব্রতাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িতে তুলল৷
জিনি ভয়ে যেন কুঁকড়ে গেল৷ ওর হাত আঁকড়ে ধরল কিটসনের কবজি৷
গুলির শব্দটা এসেছে নীচ থেকেই, এবং ওদের ডান পাশ থেকে৷
অত্যন্ত সাবধানে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল কিটসন, উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখতে চেষ্টা করল৷ নীচের রাস্তাটা এখান থেকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে৷ বুইকটা এবং তার কাছাকাছি দাঁড়ানো পুলিশের গাড়ি তিনটেও তার নজরে পড়ল৷
রাস্তার অবরোধের ঠিক পিছনেই অতি সন্তর্পণে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে দশজন সৈনিক ও তিনজন পুলিশ অফিসার৷
সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দুরে একটা বাঁকের আড়ালেই রয়েছে ব্লেক৷ দুটো ছোট ছোট গোলাকার পাথরকে সে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে সামনে রেখেছে৷ তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে তার অটোমেটিক রাইফেলের নল৷
ব্লেকের কাছ থেকে আরও পঞ্চাশ গজ দুরে দাঁড়িয়ে একটা জিপ, তার পাশেই দাঁড়িয়ে তিনজন সৈনিক—ব্লেকের দৃষ্টির সম্পূর্ণ আড়ালে৷
কিটসন বুঝতে পারল, জিপটা নিশ্চয়ই পাহাড়ের অন্য দিক দিয়ে উঠে এসেছে এবং ব্লেককে ফাঁদে ফেলেছে৷ সে যে ব্লেককে অনুসরণ না করে পাহাড় বেয়ে উঠে এসেছে, সেজন্য মনে মনে অনেকটা স্বস্তি বোধ করল কিটসন৷
ব্লেকের সোজাসুজি, রাস্তার বাঁকের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে একজন সৈনিক৷ তার মাথার একটা ক্ষত থেকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে৷ আশপাশের মাটি রক্তের সংস্পর্শে ভিজে, কালচে হয়ে উঠেছে৷
রাস্তা ধরে এগিয়ে আসা সৈনিকের দল বাঁকটার কাছে এসে থামল, ব্লেকের দৃষ্টিপথের আড়ালে৷ ব্লেকের কাছ থেকে ওদের দূরত্ব এখন মাত্র কুড়ি ফুট৷
একজন বেঁটেখাটো তৎপর মেজর তার সোনালি চুলে ঢাকা মাথা অতি সাবধানে সামনে ঝুঁকিয়ে উঁকি মারল৷ কিন্তু মৃত সৈনিকটিকে দেখামাত্রই ব্যস্তসমস্তভাবে সে মাথাটা ভেতরে টেনে নিল৷
গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে সে চিৎকার করে উঠল, ‘আমি জানি, তুমি ওখানেই লুকিয়ে রয়েছ! অতএব মাথার ওপর হাত তুলে বাইরে বেরিয়ে এসো! তোমার বাঁচার আর কোনও আশাই নেই! চুপচাপ বেরিয়ে এসে ধরা দাও!’
কিটসনের নজর পড়ল, ব্লেক যেন নিজেকে মাটির সঙ্গে আরও মিশিয়ে ফেলতে চাইছে৷
জিনি আস্তে আস্তে সরে এল কিটসনের পাশ থেকে, নীচে তাকাল৷
রাস্তায় দাঁড়ানো সৈনিকদের চেয়ে প্রায় দুশো ফুট ওপরে থাকলেও, ওদের মনে হল লোকগুলো যেন ওদের বড় বেশি কাছে রয়েছে৷
‘তুমি নিজেই বেরিয়ে আসবে, না আমরা গিয়ে তোমাকে টেনে বার করব?’ মেজর চিৎকার করে জানতে চাইল৷
‘আয় শালা আমাকে ধরবি আয়৷’ ব্লেক চিৎকার করে জবাব দিল৷ ওর স্বরে একটা নৃশংস, আতঙ্কিত সুর৷ ‘আয় ধরবি আয়—তারপর দেখ, কেমন দাওয়াই তোদের দিই!’
মেজর একজন পুলিশ অফিসারকে ডেকে কী যেন বলল৷ উত্তরে অফিসারটি ঘাড় হেলাল৷
তারপর মেজর এগিয়ে এল একজন সৈনিকের কাছে৷ তার সঙ্গে কিছুক্ষণ ধরে আলোচনা করার পর সৈনিকটা তার হাতের রাইফেলটা তুলে দিল আর একজন সহকর্মীর হাতে৷ তারপর পোশাকের পকেট থেকে ক্ষুদ্রাকৃতি কী একটা জিনিস হাত নিয়ে অতি সন্তর্পণে সে এগতে শুরু করল৷
কিটসন রুদ্ধশ্বাসে সব লক্ষ করে চলল৷ তার হৃৎপিণ্ডের গতি হয়ে উঠেছে টলমল, উত্তাল৷
রাস্তার বাঁকের কাছে পৌঁছেই সৈনিকটা থামল৷
‘এই তোমার শেষ সুযোগ!’ মেজর চিৎকার করে বলল, ‘এখনও বাইরে বেরিয়ে এসো৷’
উত্তরে ব্লেক একটা অশ্রাব্য খিস্তি করে উঠল৷
মেজর একই স্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘ঠিক আছে, তাহলে তাই হোক!’
সৈনিকটি সেই ছোট জিনিসটাকে সহজ ভঙ্গিতে বাতাসে ছুড়ে দিল৷ অলসভাবে পাক খেতে-খেতে ওটা নীচে পড়তে শুরু করল৷
কিটসনের কাঁধে মুখ ঢাকল জিনি৷
কিটসন চিৎকার করে ব্লেককে সাবধান করে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল৷ কারণ সামান্য শব্দ করামাত্রই সে নীচে দাঁড়ানো পুলিশ দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে! তখন এই লুকোনো জায়গার আর কোনও গুরত্বই থাকবে না৷
যে পাথর দুটোর আড়ালে ব্লেক আত্মগোপন করেছিল গ্রেনেডটা গিয়ে পড়ল ঠিক তার সামনে৷
কিটসন দু’হাতে চোখ ঢাকল৷
গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দটা অস্বাভাবিক তীব্র শোনাল৷ বিস্ফোরক টুকরোগুলোর হাওয়ায় শিস কেটে উড়ে যাওয়ার শব্দ কিটসনের কানে এল৷ কানে এল ছোট ছোট আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷
এক হাতে জিনির শারীরকে আঁকড়ে ধরে সে আস্তে আস্তে ভেতরে পিছিয়ে এল; চোখ তখনও তার বোজা৷
জিনি কিটসনকে দুহাতে জাপটে ধরে কাঁপছে থরথর করে৷ ওরার নিজেদের ভয়ার্ত শরীরকে পরস্পরের সংস্পর্শে এনে হয়তো চাইছে ঝুটো আশ্বাস৷
হঠাৎ একটা লোক চিৎকার করে উঠল, ‘এখানে তো মাত্র একজন৷ আর দুজন তাহলে গেল কোথায়? মেয়েটাও তো দেখছি এখানে নেই৷’
‘ভয় পেয়ো না, ওরা আমাদের খুঁজে পাবে না!’ কিটসনের চঞ্চল আঙুল তখন জিনির তাম্রাভ চুলে বিলি কাটছে, ‘এই পাথরের আড়ালে আমাদের খোঁজ করার কথা ওদের মাথাতেও আসবে না৷’
ঠিক তখনই সে শুনতে পেল কোনও এয়ারক্র্যাফট উড়ে আসার শব্দ৷ কিটসন জানত, ওপর থেকে নজর ফেললে তাদের খুঁজে পেতে কারোর পক্ষেই খুব একটা সময় লাগবে না৷ কারণ মসৃণ পর্বতের গায়ে তাদের শরীর দুটো খোলা মাঠে দাঁড়ানো মিনারের মতোই প্রকট৷
ওরা তাকাল পরস্পরের দিকে৷ জিনি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল নিজের শরীরটা কিটসনের শরীরে মিশিয়ে ফেলতে৷ যেন কোনও আতঙ্কিত পশু দিশাহারা হয়ে তার গর্তে ঢোকবার চেষ্টা করছে৷
আতঙ্কের শীতল নাগপাশ কিটসনের হৃৎপিণ্ডকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷ সম্মোহিতের মতো সে চেয়ে রইল দূরাগত এয়ারক্র্যাফটের দিকে৷
সূর্যের রশ্মিকে অতিক্রম করে, তাদের ভয়ার্ত শরীরে ছায়া ফেলে, ওদের ঠিক ওপর দিয়েই উড়ে গেল প্লেনটা৷ ওপরে চোখ রাখতে কিটসন দেখল, প্লেন চালক জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাদের দিকেই দেখছে৷
এয়ারক্র্যাফটের ডানা দুটো এদিক-ওদিক হেলিয়ে ওরা চলে গেল৷ কিটসন বুঝল, প্লেনচালক যে তাদের দেখতে পেয়েছে সেটাই সে যাওয়ার আগে ডানা নেড়ে তাকে জানিয়ে দিয়ে গেল৷ কিটসন মানসচক্ষে যেন দেখতে পেল, প্লেনচালক তার বেতার যন্ত্রে তারস্বরে খবর পাঠাচ্ছে৷ নীচের রাস্তায় দাঁড়ানো লোকগুলোকে জানিয়ে দিচ্ছে পলাতকদের সন্ধান সে পেয়ে গেছে৷
‘জিনি! আমার কথা শোনো!’ জিনির মুখটা আলতো করে তুলে ধরল সে৷ তাকাল ওর ভয়ার্ত চোখজোড়ার দিকে, ‘ব্লেক ঠিকই বলেছিল৷ কারণ এখন দেখছি মরণ কারাগারে যাওয়ার ইচ্ছে আমারও নেই৷ কিন্তু তোমার এখনও বাঁচার সুযোগ আছে৷ নেহাতই তোমার ভাগ্য যদি মন্দ হয়, তাহলেও ওরা তোমাকে দশ বছরের বেশি জেলে রাখতে পারবে না৷ তোমার বয়েস অনেক কম৷ জুরিরা তোমার জন্যে সহানুভূতি দেখাবে৷ দশ বছর সময় কিছুই নয়; দেখতে-দেখতে কেটে যাবে৷ তারপর জেল থেকে বেরিয়ে তুমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে৷ তুমি বরং এখানেই থাকো, পুলিশের লোক এসে তোমাকে নামিয়ে নিয়ে যাবে৷’
‘আর তুমি?’ জিনি কিটসনের বাহু আঁকড়ে ধরল৷
কিটসন কষ্টকৃত হাসি হাসল, ‘আমি এখান থেকে হাওয়ায় গা–ভাসিয়ে দেব৷ এই অবস্থায় সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এ পৃথিবী ছেড়ে পালানোর পথ৷ আমি কিছুতেই মরণ কামরায় পা-রাখতে পারব না৷’
জিনি গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘আমরা একইসঙ্গে যাব, আলেক্স৷ এতে আমি ভয় করি না৷ কিন্তু দশ বছর জেল আমার কাছে অসহ্য৷ দশ বছরের নিঃসঙ্গ জীবনকে আমি ভয় পাই৷ আমরা একসঙ্গেই যাব৷’
হঠাৎই কোনও লাউডস্পিকারে ভেসে এল এক কর্কশ আদেশ, ‘এই তোমাদের বলছি৷ নীচে নেমে এসো৷ আমরা জানি তোমরা পাথরের ওপরেই লুকিয়ে রয়েছে৷ আমরা কোনও রক্তপাত চাই না বলেই বলছি, চুপচাপ নেমে এসো৷’
‘তুমি থাকো, জিনি—’
‘না৷ তা হয় না৷’
কিটসন সামনে ঝুঁকে এল৷ জিনিকে সর্বশক্তি দিয়ে জাপটে ধরে আবেগভরে চুমু খেল, ‘জিনি মনে আছে ফ্র্যাঙ্ক কী বলেছিল? হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷ কে জানে, আমাদের সেই ইচ্ছার বাস্তব রূপ বোধ হয় এই পরণতি, হয়তো সে ইচ্ছাপূরণ এই পৃথিবীতে সম্ভব নয়, তার জন্যে রয়েছে অন্য কোনও পৃথিবী—যে পৃথিবীর সন্ধানে আমরা চলেছি৷’
হাত ধরাধরি করে ওরা দুজন উঠে দাঁড়াল৷
ওরা সোজাসুজি তাকাল নীচের রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়ানো পুলিশ ও সৈন্যদের দিকে৷ তাদের রাইফেলের নল ঊর্ধ্বমুখী, তাক করা ওদের দুজনের দিকেই৷ যে কোনও মুহূর্তেই নিরাপদ আড়াল লক্ষ করে দৌড়নোর জন্যে তাদের শরীরের প্রতিটি পেশি টান-টান৷
‘ঠিক আছে’ কিটসন চিৎকার করে উঠল৷ তার স্বর নীচে দাঁড়ানো সশস্ত্র সৈনিকদের কাছে দুর্বল, ক্ষীণ শোনাল, ‘আমরা আসছি৷’
সে চোখ ফেরাল, জিনির দিকে, ‘তুমি তৈরি?’
জিনি আরও শক্ত করে কিটসনকে আঁকড়ে ধরল, ‘আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো, আলেক্স৷ আমি তৈরি৷’
নীচে দাঁড়ানো লোকগুলো ওদের লক্ষ করেছিল৷ তারা দেখল, ওরা হঠাৎই মসৃণ পাথরের আশ্রয় ছেড়ে হাওয়ায় গা-ভাসিয়ে দিল, পাহাড়ের পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেতে-খেতে এলোপাথাড়িভাবে সত্যি-সত্যিই ওরা নেমে আসতে লাগল দুশো ফুট নীচের রুক্ষ রাস্তায়৷
দ্য ওয়ার্ল্ড ইন মাই পকেট
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন