অরুণোদয় ভট্টাচার্য
‘ডা: প্রণবেশ গুপ্ত-র ফিয়াট গাড়িটা তাঁর লেক প্লেসের বাড়ির কাছাকাছি ফুটপাত ঘেঁষে পার্ক করা ছিল। ডাক্তার স্বয়ং চালকের আসনে দু-হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে বসে ছিলেন। যেন এখুনি গাড়িটা এনে থামালেন। অথবা সবে উঠেছেন, এইবার স্টার্ট দেবেন।’
প্রথম প্রশ্নের উত্তর এই অবধি শুনেই স্বাধীনচেতা প্রাইভেট গোয়েন্দা, অমিত নিয়োগী, দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন: ‘ডা. গুপ্তর ডেড বডিটা প্রথমে কার চোখে পড়ে?’
অমিতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কেস-এর অফিসিয়াল তদন্তকারী সি.আই.ডি. ইনস্পেকটর শুভঙ্কর রায়, বললেন— ‘তখন ভোরের আলো সবে ফুটছে। গুপ্তদের ‘নেবার’, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড অফিসার, দিবাকর দাশগুপ্ত মর্নিং-ওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন। গাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেন: গুড মর্নিং, ডক্টর! এত সকালে?
‘কোনো উত্তর না পেয়ে একটু অবাক হয়ে গাড়ির জানলার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে দেখলেন— ডাক্তারের দু-চোখের দৃষ্টি ভয়ে বিস্ফারিত, স্থির। কপালে একটা কালসিটে। আর বুকের ওপর জমাট রক্তের দাগ! ...উনি সঙ্গে সঙ্গে থানায় ইনফর্ম করেন!’
অমিত— ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কী বলছে?’
—‘সরু, তীক্ষ্ণ কোনো অস্ত্র দিয়ে সজোরে হার্ট এর ওপর আঘাত করা হয়েছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু। নো সাইন অব পয়জন। বডি ডিসকভারড হবার অনেক আগেই রাইগার মর্টিস সেটইন করেছে!’
অমিত— ‘গাড়ির ভিতর বা আশেপাশে এ জাতীয় কোনো অস্ত্রের হদিশ নিশ্চয়ই পাওয়া যায়নি?’
—‘না। গাড়ি থেকে সাত-আট ফুট দূরে একটা চার ইঞ্চি মরচে-ধরা নরুন পাওয়া গেছে বটে, কিন্তু সেটা মার্ডার-ওয়েপন হওয়া অসম্ভব!’
অমিত— ‘অর্থাৎ ইটস আ ক্লিয়ার কেস অব হোমিসাইড। এও বোঝা যাচ্ছে, বাড়ি থেকে খানিক দূরে তাঁকে মার্ডার করে কেউ গাড়িটা ড্রাইভ করে এখানে এনে রেখে গেছে।... প্রথমে কপালে আঘাত করে অচেতন করে। পরে মোক্ষম অস্ত্রাঘাত! ...এনি ফিংগার প্রিন্ট?’
শুভঙ্কর— ‘না, ফিংগার প্রিন্ট ডাক্তার ছাড়া আর কারো পাওয়া যায়নি। তবে তোমার থিয়োরি-ই ঠিক। কারণ মৃতের পকেটে এক টুকরো কাগজে কালো বল-পেন-এ লেখা পাওয়া গেছে : ব্ল্যাকমেলার-এর উপযুক্ত পুরস্কার!’
‘উমমম!’ উৎসাহিত হয়ে ঝুঁকে বসলেন অমিত, ‘ডা. গুপ্ত ব্ল্যাকমেল করছিলেন!’
শুভঙ্কর বললেন, ‘হতেও পারে, আবার এটা মার্ডারের একটা শ্রুড চাল হতে পারে, আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য! ...তবে এখনও পর্যন্ত আমরা অন্য কোনো মোটিভ পাইনি! আর এই ব্যাপারেই স্পেশালি তোমার হেল্প চাই!’
অমিত— ‘আমি ইন্টারেস্টেড। গাড়ির ভিতর ডাক্তারের অ্যাটাচি কেসে যেসব জিনিসপত্র ছিল, সেগুলো একবার দেখা দরকার। আর, ওই বল-পেনে-লেখা অহংসূচক ঘোষণাটি!’
—‘ও, সিওর! সেসব পাবে, আর মিসেস হেনা গুপ্ত এবং ডাক্তারের একমাত্র সন্তান মিস সুমনা গুপ্তর সঙ্গে তোমার কালই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করছি!’
—‘দ্যাটস ফাইন! আজ তাহলে উঠছি।’
মৃত ডাক্তারের স্ত্রী, হেনা গুপ্ত, দক্ষিণ কলকাতার একটা স্কুলে ইতিহাস পড়ান। চেহারায় স্বাভাবিকভাবেই মাস্টারনি ছাপ পড়েছে। মেজাজটাও একটু খিটখিটে মনে হল অমিতের। শোকার্ত যতটা না হয়েছেন, তার থেকে যেন বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ বেশি।
অমিতের প্রথম প্রশ্ন ছিল: ‘আপনাদের কোনো জয়েন্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে?’
উত্তর: ‘ন্যাচারালি! এখন প্রায় সব হাজব্যাণ্ড-ওয়াইফেরই থাকে!’
—‘তাতে কি ইদানিং একটু বেশি টাকা জমা পড়ছিল?’
—‘হোয়াট ডু ইউ মীন?’ ফুঁসে উঠলেন হেনা। তারপর নিজেই বললেন, ‘বলতে আমি বাধ্য নই, তবু বলছি, জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে আমার স্বামী বরাবর মাসে দু-হাজার টাকা রাখত গুনে গুনে, রোজকার ওর যাই হোক: সেটাও এখন বন্ধ হল!’
—‘কারো সঙ্গে ওনার কোনো শত্রুতা ছিল বলে আপনি জানেন, বা সন্দেহ করেন?’
অমিতের এ প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষিকা বললেন, ‘থাকতে পারে। ওকে কেউ ঠকাবার চেষ্টা করলেই খুব রেগে যেত। অনেকবার দেখেছি দোকানদার, ট্যাক্সিঅলা, টিভির মেকানিক, বারোয়ারি পূজার চাঁদাশিকারি, এইসব লোকের সঙ্গে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করতে! এমনকী আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে যেত!...’
অমিত— ‘না, এরকম শত্রুর কথা বলছি না। তারা প্ল্যান করে খুন করে না! ...আচ্ছা, উনি কি রাজনীতি করতেন? পার্টি পলিটিকস? :’
—‘ঘেন্না করত! ও-ও করত। আমিও সমান ঘেন্না করি! ’
—‘রেগুলার কোনো ক্লাব বা কারো বাড়িতে আড্ডা দিতে যেতেন?’
—‘না। অবসর পেলেই ঘুমিয়ে কাটাত।’
—‘সম্প্রতি কোনো অপরিচিত লোককে ঘনঘন আসতে দেখেছেন ওঁর কাছে?’

নিজের গাড়িতেই বসে আছেন নিহত ডা. গুপ্ত....
—‘এসব অবাস্তব, অবান্তর ক্রাইম ফিকশানের প্রশ্ন করবেন না, প্লীজ! আমার মাথা ধরে যায়!’
একটা কড়া জবাব দিতে গিয়েও সামলে নিলেন অমিত। পরবর্তী প্রশ্ন রাখলেন : ‘কোনো টেলিফোন কল কি এসেছিল সেদিন রাতে?’
—‘আসতেই পারে! আমি একটা সভা থেকে ফিরে ক্লান্ত ছিলাম। রেস্ট নিচ্ছিলাম। কোনো কল রিসিভ করিনি। আপনার আর কিছু কোয়েশ্চেন আছে?...’
—‘হ্যাঁ, আরেকটা। কোনো জ্ঞাতি বা যৌবনের সঙ্গী, যার প্রতি উনি গুরুতর অবিচার করেছেন, এমন কিছু জানেন?’
হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত হাসি ফুটল হেনা গুপ্তর মুখে। তারপর লঘু ভ্রূকুটি করে বললেন— ‘ওরা দুই বন্ধু, মানে ও আর ব্রতীশ, দু-জনেই আমার প্রণয়ী ছিল একসময়...’ একটু থেমে জোরে হেসে উঠলেন— ‘আপনি কি ব্রতীশের মত এক নিরীহ কপোতকে মার্ডারার ভেবে তাড়া করবেন?... এর চেয়ে পাগলামো আর কিছু হতে পারে না!...’ খানিকক্ষণ চলল সেই হাসি।
হেনা গুপ্তর হাসিতে কিন্তু বিব্রত হলেন না অমিত। বললেন, ‘লোকটা নিরীহ কপোত না ক্ষিপ্ত সারমেয়, তা একবার নিজের চোখে পরখ করতে চাই, ম্যাডাম! ওনার অ্যাড্রেসটা আপনার জানা আছে?’
বিনা আপত্তিতে ব্রতীশ মিত্রর বাড়ির এবং অফিসের ঠিকানা দিলেন হেনা গুপ্ত। ঠোঁট টিপে বললেন, ‘আশা করি আপনার অভিজ্ঞতাটা স্মরণীয় হবে!’
মিসেস গুপ্তর চেয়ে মিস গুপ্তকে অনেক বেশি শোকাহতা লাগল অমিতের। কথাবার্তার মধ্যদিয়ে স্পষ্টই বুঝল, বাবার প্রতি স্বাভাবিক দরদ ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পারেটিভ লিটারেচার-এর ছাত্রী সুমনার।
—‘হত্যাকান্ডের রাতে তোমার বাবাকে শেষ কখন জীবিত দেখেছিলে’?
—‘রাত দশটা হবে। ...একটা আর্জেন্ট ‘কল’ পেয়ে বেরোচ্ছিলেন।’
সাগ্রহে অমিত শুধোলেন, ‘কলটা ফোনে পেয়েছিলেন না কেউ তাঁকে নিতে এসেছিল?’
সুমনা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ফোনেই হবে। আয়্যাম নট সিওর! ...এখন দেখছি একটু পার্টিকুলার হলে ভালো হত! ...আসলে কী জানেন, কতকগুলো ব্যাপারে বাপি স্টাক টু হিজ ওল্ড হ্যাবিটস! আজকাল কলকাতায় ক-জন ডাক্তার রাত্তিরে পেশেন্টের বাড়ি যায়? ...আমি অনেক দিন বলেছি, ডোন্ট অ্যাকসেপ্ট নাইট কলস! ...বাট ইট ওয়াজ হিজ ডেস্টিনি!...’ একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল সুমনার বুক কাঁপিয়ে!
একটু সময় দিলেন অমিত। তারপর বললেন, ‘তোমার বাবার হত্যাকারী যে চিরকুটটা রেখে গিয়েছিল ডেড বডির পকেটে, তাতে সে ডা. গুপ্তকে ব্ল্যাকমেলার বলে অভিযুক্ত করেছে, শুনেছ?’
—‘হ্যাঁ। একথা পুলিশই জানিয়েছে। এটা আমাকে কী ভীষণ আপসেট করেছে, আপনি বুঝবেন না!...’
অমিত এবার কন্ঠে সহানুভূতি ঢেলে বললেন, ‘দেখো, সুমনা, খুনিকে ধরা এবং পেছনের রহস্যের কিনারা, এই দুটোই নিশ্চয়ই তুমি আন্তরিক ভাবে চাও?’
—‘অফকোর্স! এর জন্য সব রকমে কোঅপারেট করব আমি। বাট ডু ইউ সী এনি লাইট?’
—‘চোখ-কান খোলা রেখে এগলে, আর মগজটাকে অ্যাকটিভেট করতে পারলে মিস্ট্রি উইল বী অ্যাজ ক্লিয়ার এ্যাজ ডে-লাইট! কিন্তু এর জন্য আমার ডা. গুপ্তের পার্সোনাল কাগজপত্র ঘাঁটা একান্ত প্রয়োজন। ইনক্লুডিং একস্ট্রা ব্যাঙ্ক পাস-বুক, যার হদিশ পুলিশ পায়নি! আচ্ছা, তোমার নামে কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে?...’
—‘মানে, আপনি ব্ল্যাকমেলিং এর চার্জটা সত্যি কিনা ভেরিফাই করতে চান, তাই না?’ সুমনার কন্ঠে সাগ্রহ উত্তেজনা।
—‘সেটাই ফার্স্ট রিজনেবল স্টেপ, আর, মোস্ট এসেন্সিয়াল!’
সুমনা চকচকে চোখে অমিতের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওকে, মিস্টার করমচাঁদ, আই অ্যাম রেডি টু প্লে কিটি, অ্যাণ্ড টু শো মাই পাস-বুক!’
—‘বেশ! শুভস্য শুক্রম, আজ বৃহস্পতি, কাল থেকেই আমাদের অপারেশান শুরু!’
‘ন্না!’ —হতাশ ভাবে মাথা নাড়লেন ইনস্পেকটর শুভঙ্কর —‘মার্ডার-ওয়েপন আইডেন্টিফাই করা যায়নি। সরু-মুখ যেকোনো নাইফ হতে পারে, তবে বেশ লম্বা ‘প্রায় চার ইঞ্চি পেনিট্রেশান হয়েছে!...’
বল-পেন-এ লেখা চিরকুটটি নিরীক্ষণ করতে করতে অমিত প্রশ্ন করলেন— ‘হ্যাণ্ড-রাইটিং স্পেসিমেন থেকে কোনো ক্লু পাচ্ছ?’
—‘নাথিং! ডা. গুপ্তের বাড়ির বা তাঁর পরিচিত লোকজনদের কারও হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের হাতের লেখার মিল নেই! তবে এটা ফিমেল হ্যাণ্ড এটা বোঝা গেছে। ডাক্তারের কিছু পুরোনো ফিমেল পেশেন্ট-এর হাতের লেখাও মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ফুটলেস লেবার!’
অমিত ম্যাকাও পাখির মতো ঘনঘন ওপর থেকে নীচে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘খুব স্বাভাবিক। খুনি এভাবে হাতকড়ার দিকে নিজের হাত বাড়ায় না, নেহাত ক্ষিপ্ত না হলে!... তবু এভাবে মার্ডারটা জাস্টিফাই করতে গিয়ে যে সুযোগটা সে দিয়েছে, দ্যাট শুড হেল্প আস!...’
শুভঙ্কর বলে উঠলেন— ‘হাউ? আমরা তো কলকাতার কয়েক কোটি লোকের হাতের লেখার নমুনা নিতে পারি না! ...তা ছাড়া খুনি প্রব্যাবলি শহর থেকে হাওয়া হয়েছে বাই দিস টাইম...’
‘উমমম!’ ঝুঁকে বসলেন অমিত। ‘ওয়ান আইডিয়া!... খানিকটা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া বলতে পারো। কিন্তু লেগে গেলে চিৎকার শোনা যাবে!...’
—‘কীরকম?’
—‘এ লেখাটার কপি ছাপিয়ে সব কাগজে একটা বিজ্ঞপ্তি দাও : যাঁর হাতের লেখা, তিনি অবিলম্বে নাট্যকার অমিত নিয়োগীর সঙ্গে দেখা করুন। ‘ব্লাকমেলার এর উপযুক্ত পুরস্কার’ এই শিরোনামের নাটকের পান্ডুলিপি এই হস্তলিপিতে লেখার জন্য লোভনীয় পারিশ্রমিক।’
শুভঙ্কর হেসে উঠলেন বিদ্রুপভরে। বললেন, ‘তুমি যে ব-এর অ্যামেচার গোয়েন্দাদের চেয়েও অপটিমিস্টিক দেখছি! ভাবছ এই টোপ কেউ সত্যিই গিলবে?’
অমিত খুব খাদে গলা নামিয়ে বললেন, ‘উই হ্যাভ টু বিলীভ ইন ধর্মের কল! ...আমার অনেক পাগলামো তো স্ট্যাণ্ড করেছ, একথাটাও না হয় রাখলে! কালকের পেপারেই এটা বার করো!’
ব্রতীশ মিত্র সাউথ ইস্টার্ন রেলের ইউ ডি ক্লার্ক। বেহালায় বাসাবাড়ি। অমিত অবশ্য গার্ডেনরিচের অফিসেই গিয়ে দেখা করল। যৌবনে যে বেশ সুদর্শন ছিলেন ভদ্রলোক, তা এখনও বোঝা যায়। অমিতকে দেখে নার্ভাস ভাবে বললেন, ‘আপনি কি পুলিশের লোক?’
অমিত বললেন, ‘না, না, হেনা দেবী এবং তাঁর মেয়ে সুমনা এ রহস্য সমাধানের ব্যাপারে আমার হেল্প চেয়েছেন। আপনিও ওদের পরিবারের হিতাকাঙ্ক্ষী, তাই একটু আলাপ করতে এলাম!’
দু-জনে অফিস ক্যান্টিনে বসে দু-কাপ চা নিয়ে কথা বলছিলেন।
একটু গলা ঝেড়ে চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে ব্রতীশ বললেন, ‘ওদের ফ্যামিলি নয়, আমি হেনারই হিতাকাঙক্ষী। ও-ও বোধ হয় বলেছে আপনাকে সেকথা...’
—‘আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড। সেইজন্যই বোধ হয় আপনি আজীবন ব্যাচিলর থেকে গেলেন?’
—‘প্রণবেশের অতিপুরুষালি ব্যক্তিত্ব আর কাঁচা টাকার মোহে হেনা ওকে বিয়ে করেছিল। ওদের বিয়ের পর আমি একটা প্লেটনিক লাভ আঁকড়ে ছিলাম এতদিন। কিন্তু এখন হেনার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে মনে হচ্ছে। আমি ট্রান্সফার নিয়ে চক্রধরপুর চলে যাব ভাবছি!’
দীর্ঘশ্বাসের ঝাপটা এসে লাগল অমিতের চায়ে। সেদিকে একবার চেয়ে অমিত বললেন, ‘কিন্তু হেনার যদি মনে হয় তার জীবনে আপনি অপরিহার্য?’
চকিতে মুখ তুললেন ব্রতীশ। সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে নিয়ে বললেন ‘না, তেমন আভাস সে দেয়নি!’
—‘ব্রতীশবাবু,. আপনার কি মনে হয়, ডা. গুপ্তকে উনি সত্যিই ভালোবাসতেন?’
—‘দেখুন, বাঙালি মেয়েরা — হাজারে দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া— বিয়ের পর স্ত্রীর কর্তব্যে ফাঁকি দেয় না। মনের ভেতর ফাঁক থাকলেও বাইরে কাউকে পারতপক্ষে জানতে দেয় না! বিশেষত আমার মতো বন্ধুকে। স্বামীর কোনো ক্ষতি হোক, এ তারা ভাবতে পারে না!...’
অমিত বুঝলেন, হেনা গুপ্তর কথাই ঠিক। নেহাতই নিরীহ কপোত!
সুমনার সাহায্যে অমিত ব্ল্যাকমেল মোটিভ সম্পর্কে সুনিশ্চিত হলেন। সুমনার ব্যাঙ্কের পাস বুক-এ গত এক বছর এর মধ্যে তিনবার মোটা অঙ্কের ক্যাশ জমা পড়েছে। অঙ্কটা ক্রমশ বেড়েছে : দশহাজার, পনেরো হাজার, বিশ হাজার! গোপন দেরাজে রাখা একটা চকলেট-রঙা ‘পার্সোনাল’ লেখা ডায়রিতে কাছাকাছি তারিখে ওই অঙ্কের উল্লেখ দেখা গেল। প্রতিবার অঙ্কের পাশে লেখা S.B.—সম্ভবত টাকা যে দিয়েছে তার নামের ইনিশিয়াল বা আদ্যক্ষর।
সুমনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘দেন ইটস ট্রু !’
অমিত বললেন, ‘এখন দুটো প্রশ্ন। ব্ল্যাকমেল করার প্রয়োজন হল কেন ডা. গুপ্তের? আর কাকে এবং কী দুর্বলতার জন্য ব্ল্যাকমেল করতে পারছিলেন তিনি?’
সুমনা বলল, ‘প্রথমটার উত্তর অনুমান করতে পারি। আমার বিয়ের জন্য বাপি খুব চিন্তা করত। বোধ হয় সে জন্যই আমার অ্যাকাউন্টে একটা মোটা অ্যামাউন্ট রেখে যাবার চেষ্টা করছিল। অ্যাণ্ড হি ওয়াজ ডুয়িং ইট বাই ব্ল্যাক মেলিং...! ওঃ, আনথিংকেবল! ...আমি কি এতটাই বার্ডেন হতাম বাপির কাছে!...’

সুবিমল নমিতাকে হত্যার চেষ্টা করছে....
অমিত ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কোয়ায়েট, সুমনা! আই অ্যাম কোয়াইট সিওর ইউ হ্যাভ আ ইয়ং ম্যান অব ইয়োর চয়েস! ডা. গুপ্ত হয়তো সেটা অ্যাপ্রুভ করতেন না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি, যাঁরা নিজেরা প্রেম করে বিয়ে করেছেন, তাঁরা ছেলে-মেয়েদের প্রণয়াধিকার দিতে চান না! অব কোর্স এ ব্যাচিলর লাইক মী মে বী রং! ...যাই হোক, আমাদের দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর ভাবতে হবে! তুমি অলরেডি দারুণ সার্ভিস দিয়েছ, এখন রহস্যের কিনারা না হওয়া পর্যন্ত তোমার সাহায্য চাই আমার!’
সামলে নিল সুমনা। কিটির মতো হেসে বলল, ‘ইয়েস, স্যার!’
ব্যাকগ্রাউণ্ড আর মোটিভ খানিকটা পরিষ্কার হলেও হত্যাকারী কে হতে পারে? এই আসল রহস্য-এর কোনো সুরাহার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না অমিত নিয়োগী। দশই ফেব্রুয়ারি রাতে ডা. গুপ্ত খুন হয়েছেন। আজ পনেরো তারিখ। গত পরশু সব বহুল প্রচারিত দৈনিকে ‘নাট্যকার’ অমিত নিয়োগীর চাহিদার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার সমেত। কিন্তু এখনো কোনোরকম সাড়া-শব্দ শোনা গেল না!
বেলা সাড়ে আটটা। প্রাতঃরাশ এবং কাগজে চোখ-বুলোনো শেষ করে একটু হতাশই হয়ে পড়ছিলেন অমিত। হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল।
‘হ্যালো!’
‘অমিত নিয়োগী আছেন?’ নারী-কন্ঠ শুনতে পেলেন অমিত।
‘কথা বলছি!’
—‘কম্পোজিট নার্সিং হোম থেকে বলছি। ...আপনি পরশু কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন?’
—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ ওই হাতের লেখা কি আপনার?’
—‘না আমি নার্সিং হোমেরই ডাক্তার। আমাদের বিশেষ পরিচিত এক ভদ্রমহিলা গুরুতর উন্ড নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছেন। আপনার বিজ্ঞাপনের সঙ্গে নাকি তাঁর এই বিপদের কিছু একটা সংযোগ আছে। উনি আপনার সঙ্গে আর্জেন্টলি দেখা করতে চাইছেন। এখনি একবার আসতে পারেন?’
—‘উমমম!...’ করে উঠলেন অমিত। খুব ইনটারেস্টিং কিছু দেখলে বা শুনলে এরকম শব্দ ওঁর গলা দিয়ে বেরোয়।
লেডি-ডাক্তার লাইনের ওপার থেকে বললেন— ‘কী বললেন?’
সামলে নিলেন অমিত: ‘চার মিনিটের মধ্যে যাচ্ছি। শুনুন, কাইণ্ডলি আমি যাবার আগে রুগীর সঙ্গে আর কাউকে দেখা করতে দেবেন না! কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কেও না!’
সাদার্ন অ্যাভিনিউর কাছে নার্সিং হোমটা সহজেই খুঁজে নিলেন অমিত। মেট্রনকে নিজের নামটা বলতেই তিনি নিয়ে গেলেন পেশেন্টের কেবিনে।
‘আমি অমিত নিয়োগী’ বলে বেডের পাশে চেয়ারে বসলেন অমিত। তারপর একটুও সময় নষ্ট না করে কাগজের টুকরোটা তুলে ধরে শুধোলেন, ‘এটা আপনার হাতের লেখা?’
ডান কাঁধে ব্যাণ্ডেজ-বাঁধা যুবতি বাঁহাতের ওপর ভর দিয়ে আধ-শোয়া অবস্থায় বিহ্বল দৃষ্টিতে দেখল কাগজটা। তারপর সে-দৃষ্টিতে ফুটল বিস্ময়। শেষে বলল, ‘লেখাটা আমার। কিন্তু কাগজটা আপনার কাছে কী করে এল? আর, আমার সব লেখাটা না রেখে শুধু এইটুকুই বা রাখা হয়েছে কেন? কিছুই আমি বুঝতে পারছি না! ...আপনি কি সত্যিই জামাইবাবুর বন্ধু? আপনি কি নাট্যকার? শিগগির বলুন! আমার... আমার ভীষণ ভয় করছে!...’
অমিত বললেন, ‘অত অস্থির হবেন না। আমি থাকতে আপনার কোনো অনিষ্ট হবে না। কাইণ্ডলি আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিন। তারপর আমি আপনার সব সন্দেহ নিরসন করব। প্রথমে বলুন, আপনার নাম কী?’
—নমিতা চ্যাটার্জি।
—বাড়ি?
—ব্যাঙ্ক প্লট, কসবা।
—ঠিকানা?
নমিতা নির্দ্বিধায় বলল। অমিত ডায়রিতে নোট করলেন।
পরবর্তী প্রশ্ন: আপনার জামাইবাবুর নাম?
—সুবিমল ভট্টাচার্য।
—পেশা?
—বিজনেস।
—অ্যাড্রেস?
—১৩/১৭, আর কে ঘোষাল লেন।
অমিত এবার চিরকুটটা দেখিয়ে বললেন, ‘এই কাগজটার তিন ধার থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে, দেখতে পাচ্ছি। আর কী লেখা ছিল এতে? আপনার মনে আছে?’
—‘হ্যাঁ। এই সেন্টেন্সটা লিখেছিলাম ‘ব্ল্যাকমেলার-এর উপযুক্ত পুরস্কার তার হাতের আঙুল সব কেটে ফেলা।’
—‘কেন লিখেছিলেন?’
—‘তখন ভেবেছিলাম এটা খেলা, এখন দেখছি ব্যাপারটা সাংঘাতিক কিছুর সঙ্গে জড়িত...!’
—‘ঠিক বুঝলাম না। খেলাটা মাথায় এল কেন আপনার?’
—‘আমার মাথায় আসেনি। যে আমার এই অবস্থা করেছে, এবং পারলে আমায় একেবারে খুন করত, যে শয়তানটাকে এত দিন নির্ভরযোগ্য বন্ধু মনে করেছি, সেই আমার জামাইবাবু...!’
কান্নায় ভেঙে পড়ল নমিতা। একটু বাদে চোখ মুছে ফের শুরু করল।
‘জামাইবাবুকে আমুদে মানুষ বলেই জানতাম। দশ বারো দিন আগে হঠাৎ আমাদের বাড়ি এসে বলল ‘মিতা, এখন ফ্রী আছ? দু-মিনিট সময় নেব তোমার। একটা সাদা কাগজ আর পেন নিয়ে দুটো ছোট্ট প্রশ্নের এক বাক্যে উত্তর লিখে দাও তো! আমি একটা ‘ওপিনিয়ন পোল’ করছি। ...প্রশ্নগুলো তোমার লিখতে হবে না, শুধু উত্তর দুটো লিখবে। আমি কাগজ-কলম নিয়ে গুছিয়ে বসতে উনি বললেন ‘প্রথম প্রশ্ন, ২০২৪-এ ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে হবে?’ তুমি শুধু লিখবে ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবে...।’ বুঝলে! ...লিখেছ? আচ্ছা, দ্বিতীয় প্রশ্ন শুনে নাও: ‘ব্ল্যাকমেলার-এর উপযুক্ত পুরস্কার কী?’ আরেক বার প্রশ্নটা রিপিট করল। তারপর আমার উত্তর-লেখা কাগজটা দেখে বলল, ‘নীচে একটা সই করো। ভেরি গুড! এটা আমি রাখছি। লটারিতে তুমি একটা প্রাইজও পেয়ে যেতে পারো’। আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম।’
অমিত বললেন, ‘সুবিমলবাবুর প্রথম প্রশ্নটা আসলে একটা ভান। দ্বিতীয়টা দরকার ছিল আপনার হাতের লেখা পাবার জন্য। ...তারপর?’
—‘তারপর কাগজে আপনার বিজ্ঞাপনটা বেরোতে জামাইবাবু আমার কাছে ছুটে এল পরশু দুপুরে। বলল, ‘দেখো, বলেছিলাম একটা প্রাইজ পাইয়ে দেব? তুমি কালই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করবে। আর আজ আমরা এই উপলক্ষ্যে একটু সেলিব্রেট করব!’...’
নমিতা বলতে বলতে চুপ করে গিয়ে কেমন উদাস হয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। অমিতের মনে হল, শ্যালিকার মনে দুর্বলতা তাহলে ভালো মাত্রায় ছিল। মুখে বললেন, ‘তারপর?’
—‘বলছি। চাল কিছু সন্দেহ না করে বিকেলে বেরোলাম ওর সঙ্গে। চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খেয়ে, গল্প করে যখন রাস্তায় নামলাম, ঘড়িতে সাড়ে আটটা।... জামাইবাবু বলল ‘চলো, লেকের মধ্য দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে বাড়ি ফিরি!’ ...লেকের এক নির্জন অঞ্চল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বলল ‘তুমি এই ওয়াকিং স্টিকটা আমার হাতে দেখে অবাক হচ্ছিলে, জানো এটার কী দাম? একশো তিরিশ ডলার! হংকং থেকে এনে দিয়েছে এক বন্ধু। আর এর গুণ জানো? ‘সট করে লাঠিটা দোলাতেই দেখলাম, তার ডগায় ঝকঝকে লম্বা ছুরির ফলা! ...‘ভয় পেয়ে গেলে?’ বলে হাসতে হাসতেই ফলাটা আবার লাঠির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু ওর চোখের চাউনি, হাসি, নির্জন রাত...আমার কেমন আতঙ্ক জাগল। আমি ছুটতে শুরু করলাম...তারপর...অসহ্য যন্ত্রণা! ...মাটিতে পড়ে গেলাম! ...দেখি সেই নরপিশাচ আবার মারার জন্য লাঠি উঁচোচ্ছে! ...কী করে পারলাম জানি না... রক্তাক্ত অবস্থায় কোনো রকমে স্টেডিয়ামের কাছাকাছি ছুটে এলাম। ঈশ্বরের করুণায় এক পরোপকারী ভদ্রলোককে সামনে পেয়ে গেলাম। তাঁর সাহায্য নিয়ে আমার এই পরিচিত নার্সিং হোমে এলাম! ...তারপর কাল সারাদিন আচ্ছন্ন ছিলাম ঘুমের ওষুধ খেয়ে...!’
অমিত বললেন, ‘আমাকে তাড়াতাড়ি খবর দেবার জন্য ধন্যবাদ। তবে পুলিশকে জানাতেই হবে। আপনার জামাইবাবু ইতিমধ্যে এক ডাক্তারকে খুন করেছেন। সেই মৃত ডাক্তারের পকেটে উনি এই চিরকুটটা রেখে গিয়েছিলেন। ...বিজ্ঞাপন আমি দিয়েছিলাম একটা টোপ হিসেবে। আসলে আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ, এই মার্ডার কেসটাতে সাহায্য করছি পুলিশকে। আপনার ভয় নেই। বয়ানে যা সত্য, তাই বলবেন। এখনি আমি ইনস্পেকটর শুভঙ্কর রায়কে ফোন করছি। আপনার নিরাপত্তার সব রকম ব্যবস্থা করা হবে।’
সুবিমলের বাড়ি রেইড করে দেখা গেল, তিনি ভেগে পড়েছেন স্ত্রী-পুত্রকে কিছু না জানিয়ে। তবে তল্লাশি চালিয়ে রান্নাঘরের এক কোণ থেকে পাওয়া গেল গুপ্তি-সংবলিত সেই হংকং -এর ওয়াকিং স্টিক, যা দিয়ে একটি হত্যা এবং একটি হত্যা-প্রচেষ্টা করা হয়েছে। ... পুলিশের জাল এড়িয়ে হত্যাকারী বেশিদিন থাকতে পারল না। তার বউকে জেরায় জেরবার করে কিছু সম্ভাব্য জায়গার সন্ধান পেয়েছিলেন শুভঙ্কর। অবশেষে খুনিকে পাওয়া গেল রানাঘাটে তার এক বন্ধুর আস্তানায়। গ্রেফতার করে কলকাতায় নিয়ে আসা হল।
সুমনাদের বাড়ি গিয়ে অমিত ঘটনার অগ্রগতির বিবরণ জানালেন। তারপর বললেন, ‘এটা বোঝা গেল, তোমার বাবার ডায়রিতে S B বলে এই সুবিমল ভটচাজের উল্লেখ করা হয়েছে। একেই উনি ব্ল্যাকমেল করছিলেন; এবং সেদিন রাতে এই ওঁকে শেষ দফা পেমেন্ট করার অছিলায় কোনো নির্জন স্থানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে। তারপর আচমকা মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে ওই গুপ্তি দিয়ে মারণাঘাত হানে! ...কিন্তু কেন? ব্যাকগ্রাউণ্ডটা কী? কেস সাজাবার জন্য সেটাও জানা দরকার!’
অমিতকে অবাক করে দিয়ে সুমনা বলল, ‘সে-কাজটা আপনার ‘কিটি’ অলরেডি করে ফেলেছে। অ্যাট্টিক থেকে ডিসকাভার করেছি বাপির আরেকটা কনফিডেন্সিয়াল ডায়রি।’ ব্যাগ থেকে সে বার করে দিল একটা কালো রঙের নোটবুক।
‘উমমমম!’ রুদ্ধশ্বাসে পড়তে লাগলেন অমিত নিয়োগী।
‘‘একটা ইনট্রিগ-এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছি নিজেকে। একশো এগারো নম্বর পমরোডের বাসিন্দা নি:সন্তান আনন্দ মুখার্জি আর তাঁর স্ত্রী নীরজা। ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান হিসেবে এই মধ্যবয়সি দম্পতির বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমি। আনন্দবাবু দুর্ভাগ্যক্রমে ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন। যখন ধরা পড়ল ওটা ক্যানসারই, চিকিৎসার আর বিশেষ সুযোগ ছিল না। উনি কিছুতেই হসপিটালে যেতে রাজি হলেন না। নীরজা দেবীও দেহে-মনে ভেঙে পড়েছিলেন। এক রাত্রে স্বামীকে নিশ্চিত মৃত্যু-যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে সাধ্বী স্ত্রী অস্থির হয়ে নিজেই হার্টফেল করে মারা যান। নীরজা দেবীর একমাত্র ভাই সুবিমল ভট্টাচার্য ও বাড়িতেই ছিলেন কয়েক দিন ওঁদের দেখাশোনার জন্য। দিদির অবস্থা আবিষ্কার ক’রে উনি আমাকে আর্জেন্ট কল দেন। আমি পৌঁছোবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আনন্দবাবুরও মৃত্যু হয়।
সুবিমল আমাকে বললেন, ‘ডক্টর, এঁরা দু-জনেই আপনার পুরোনো পেশেন্ট। এখন তো দু-জনের ডেথ সার্টিফিকেটই আপনাকে লিখতে হবে!’
‘বললাম, ‘তা তো বটেই। তবে আধঘণ্টার ব্যবধানে এভাবে যে দু-জনে এক্সপায়ার করবেন, তা আমার পক্ষে অভাবনীয় ছিল!’
‘এবার কন্ঠস্বরে এক বিশেষ ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে সুবিমল বললেন, ডা. গুপ্ত, ডিফারেন্সটা মোটে আধ ঘণ্টার। আর এ নিয়ে অটোপসিও হবে না। কোনো চ্যালেঞ্জও হবে না! তাই না?’
—‘হোয়াট ডু ইউ মীন?’
—‘আমার একটা প্রস্তাব আপনাকে মেনে নিতে হবে। প্লীজ, এতে আপনারও লাভ!’
—‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’
—‘আপনি দুটো ডেথ সার্টিফিকেট দেবেন। সময়টা শুধু উলটে দেবেন। লিখবেন আনন্দ বাবুর মৃত্যু আগে হয়েছে, আর নীরজা দেবী তার আধঘণ্টা বাদে মারা গেছেন! ফর দিস ইউ গেট ফাইভ থাউজাণ্ড ইন ক্যাশ!’ বলতে বলতেই আমার হাতে কারেন্সি নোটগুলো গুঁজে দিলেন সুবিমল। আমি সুড়সুড় করে ওর কথামতো দুটো সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে এলাম!
‘কারণটা পরে জানলাম। নি:সন্তান স্বামী-স্ত্রীর অবর্তমানে তাঁদের বাড়ির মালিকানা কার ওপর বর্তাবে সেটাই ছিল ক্রুশিয়াল পয়েন্ট। নিয়ারেস্ট রিলেশান বলতে আনন্দবাবুর একমাত্র ভাই সমরেন্দ্র মুখার্জি, সিমেন্স কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। আর, নীরজা দেবীর একমাত্র ভাই সুবিমল ভটচাজ, রহস্যময় বিজনেসম্যান। সুবিমল আমাকে দিয়ে যেভাবে ডেথ সার্টিফিকেট এর সময় লিখিয়েছেন, তাতে আনন্দবাবুর ওয়ারিসানের আর বাড়ির ওপর দাবি থাকে না। কারণ আনন্দবাবুর মৃত্যু আগে হয়েছে (এই বয়ান অনুযায়ী), অটোমেটিক্যালি নীরজা দেবী বাড়ির মালিক হয়ে গেছেন। এইবার তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই-ই এটা পাবে।

সুমনা বাবার ডায়েরি পড়ে অবাক হচ্ছে...
সমরেন্দ্রবাবু খবর পেয়েই দৌড়ে এসেছিলেন। ব্যাপার শুনে তিনি সহজে ছাড়লেন না। আদালতে কেস উঠল।
‘আমি দেখলাম, বাড়ির যা ভ্যালুয়েশান এ বাজারে, তাতে পাঁচ হাজার-এর বিনিময়ে সুবিমলকে ওটা হাতাতে দেওয়া যায় না। আমার সাক্ষ্যই এ কেসে মোস্ট ভাইটাল। আমি টাকা দাবি করতে লাগলাম, আর যথাসম্ভব নানা বাহানায় আমার বয়ান দেবার দিন পিছতে লাগলাম।...’
কয়েক পাতা পর আবার লেখা দেখা গেল। এবার তারিখ দেওয়া। একুশে নভেম্বর। ২০০০।
‘কাল ফাইনাল রায় বেরিয়েছে। আমার বয়ানের ভিত্তিতেই সুবিমল ওবাড়ির মালিক হয়েছে। কিন্তু আমার যে আরও টাকা প্রয়োজন। সুমিকে মনের মতো করে বিয়ে দিতে হবে। সে-বিয়েতে খুব ধুমধাম করতে হবে...!’
পরে আরেক পাতায়। ‘এগারোই জানুয়ারি, ২০০১। ফাইনাল পেমেন্ট হিসেবে আরও পঁচিশ হাজার চেয়েছি। বলেছি না দিলে হায়ার কোর্টে আমি সমরেন্দ্রবাবুর পক্ষ নেব এবং সত্যি কথা ফাঁস করে দেব! আমার ডিকটেট না শুনে সুবিমল করবে কী?...’
শেষ এন্ট্রি ওই ফেব্রুয়ারির আট তারিখে। ‘আর মাত্র তিন দিন হাতে। আশা করছি, আজ কাল-এর মধ্যেই S B কনট্যাক্ট করবে, এবং পুরো টাকাটা আমার হাতে তুলে দেবে!’
ডায়রি থেকে অমিত মুখ তুলতেই সুমনা বলল, ‘কী? এরপর আর কিছু রহস্য আছে?’
ডায়রিটা পকেটে ভরতে ভরতে অমিত বললেন, ‘না। মুখার্জি ভার্সাস ভট্টাচার্য কেসের ডিটেলড রিপোর্ট কোর্ট থেকে পেয়ে যাবে পুলিশ। সাক্ষী নমিতা চ্যাটার্জি তো আছেনই। ...আমার একটা কথাই শুধু বলার আছে।’
—কী?
—‘ম্যাডাম, ইউ আর ইনভ্যালুয়েবল! মাই বেস্ট উইশেস টু ইউ অ্যাণ্ড ইওর ইয়াং ম্যান!’
সুমনা হেসে বলে, ‘আপনি কি তাকে চিনে ফেলেছেন?’
—‘না, না! ওটা এখন রহস্যই থাক। শুভবিবাহ-মার্কা মধুর পত্রেই তার সমাধান দেখব, কিন্তু নেমন্তন্ন না পেলে—’
—‘না পেলে কী করবেন?’
—‘ব্ল্যাকমেল!’ হাসতে হাসতে বিদায় নিলেন অমিত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন