বুদ্ধদেব গুহ

তোকে যা-দেখাবে না রুন! দুর্দান্ত! আসল দিনে।
বিশু বলল।
দেখাবে নাইই-বা কেন? আমার চেহারাখানা কী খারাপ?
বলেই, হেসে ফেলল রুন। নিজের-ই প্রতি, ঠাট্টায়।
চেহারাটাই বড়োকথা নয়। স্টেজে যখন উঠবি, সুপ্রতীপ আলো ফেলে স্টেজটাকে একেবারে স্বপ্নময়, জীবন্ত করে দেবে, নবাব বাজবাহাদুর-এর মেকআপ নিয়ে তোর চেহারাই বদলে যাবে তখন। মনে হবে, তুই যেন সত্যিই নবাব।
কী জানি!
রুন বলল। হয়তো তাই-ই হবে। পোশাকটাও তো কম কথা নয়! মানুষ যখন যেমন পোশাক পরে, তখন মনও বোধ হয় তার তেমন-ই হয়ে যায়। ভিখারির পোশাকে ভিখারি; নবাবের পোশাকে নবাব।
ডিরেক্টর বোকাদা চেঁচিয়ে উঠল : এই। বড্ড কথা হচ্ছে। এই বিশু! রুন!
ওরা নিজেরা নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে অন্যকে চুপ করতে বলল। চা-খাওয়া মাটির কুলহার দুটো ঘরের কোণের ঝুড়িটার মধ্যে ফেলে দিল। সিগারেট ধরাল একটা করে। বড়োলোকের একমাত্র ছেলে বিশু ‘গোল্ড ফ্লেক’। রুন ‘চার্মস’। সিগারেটে বড়ো একটা টান লাগিয়ে ধুঁয়োর রিং বানিয়ে ঘাড় পেছনে করে শূন্যে ছুড়ে দিল রিংটা রুন!
মানুষের নামের সঙ্গে চেহারার বা ক্রিয়াকলাপের কিছুই মিল থাকে না হয়তো। স্বপন যার নাম তার মতো প্র্যাকটিকাল, লেগে-থাকা মানুষ হয়তো খুব কম-ই দেখা যায়। আর বিনয় যার নাম, তার মতো দুর্বিনীত হয়-ই না হয়তো। এবং বোকাদার মতো চালাকও। বুঝলি?
বিশু বলল, সিগারেটের ছাই ঝেড়ে। হাঁসীর মতো গ্রীবা তুলে মুখটি পনেরো ডিগ্রি ডান দিকে ঘুরিয়ে তখন মাণ্ডুর রূপমতীর ডায়ালগ বলছিল রীতি।
রীতিকে ভারি সুন্দর দেখায়। সুন্দরীর নানারকম আছে। রীতি অন্যরকম সুন্দরী। যখন ডায়ালগ বলে না তখনও, ওকে দারুণ দেখায়। দীপ্তবুদ্ধির দ্যুতি সবসময়ে কোনো অদৃশ্য হাত যেন, মাখিয়ে রাখে তার ডিমের মতো মুখটিতে। মালোয়াঁর নবাব বাজবাহাদুরের সখী, রূপমতীর ভূমিকায় অভিনয় করছে ও!
স্টার্ট! সাইলেন্স! সাইলেন্স!
বোকাদা বলল।
আরম্ভ হল মহড়া আবার।
এই দৃশ্যে রূপমতী, মানে রীতি, গোপনে তার প্রেমপ্রার্থী, মাণ্ডুর নবাবের সেনাপতি একরাম খাঁকে বলছে, ‘সেনাপতি, আপনি সারাজীবন রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করলেন তো অনেক-ই। অনেক যুদ্ধ জিতলেনও। হারালেনও কম নয়। কিন্তু নিজের সঙ্গে যে-যুদ্ধ, তাতে জেতার কথা কি ভেবেছেন কখনো? সেই যুদ্ধর কথা, আদৌ কি জানা আছে আপনার সেনাপতি?’
গোপেন, সেনাপতি একরাম খাঁর চরিত্রে অভিনয় করছে। গলাটা ‘নাকি নাকি’। গতবছর ওকে নিয়ে দারুণ কেলো হয়েছিল। ব্যঞ্জন বর্ণ ‘র’ ‘প’ উচ্চারণ করতে গেলেই ওর জিভ স্লিপ করে যাচ্ছিল বার বার। ঘাট-কেটে-যাওয়া ‘সেভেন্টি—এইট আর—পি—এম’ রেকর্ডের মতো। গতবছরে ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ করার সময়ে একজন ব্যাধের রোল করেছিল ও। দেখ দেখ দুটো পাখি বসেছে গাছে’ এই কথা ক-টিই শুধু বলতে হত। কিন্তু যতবার-ই বলতে যেত, বলতে যেতেই ‘পাখি’ শব্দটাতে এসেই প-প-প-প, করে পাখির মতো ফরফর করত গোপেন। মুখ দিয়ে লাল গড়াত তখন ওর। এদিকে পার্টও ছেড়ে দেবে না কাউকে। ওর এককালীন গার্লফ্রেণ্ড পরি বলেছিল যে, ‘ওর দ্বারা কিসসু হবে না’।
কেসটা আসলে তোতলামির নয়। বোকাদা বলেছিল। পুরোপুরিই মেন্টাল কেস। মানসিক কমপ্লিকেশনের।
হতেও বা পারে। পিম্পল ঝারির ‘পরি’ নামের, সেই ছিপছিপে কালো মেয়েটাকে গোপেন সত্যিই ভালোবাসত। সে ডিচ করার পর থেকেই পরির ‘প’-তে এসেই আটকে গেছিল ও। জীবনে কখনো তোতলামি ছিল না ওর আগে। মঞ্জরি নামের এক নতুন গার্লফ্রেণ্ড এই বছরে হওয়ার পর থেকেই ‘প’ থেকে ‘ম’ অবধি স্মুদলি বলছে। তবে, মাঝে মাঝে ‘প’-তে এখনও আটকায়। পুরোনো প্রেমের পেতনি ঘাড় থেকে নামেনি এখনও। সেনাপতি একরাম খাঁ, ওরফে গোপেন; বলল, বাই রূপমতী, নিজের যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। এই নীরব অদৃশ্য এবং অন্তর্জগতের যুদ্ধে হার বা জিত কোনোটাই বড়োকথা নয়। নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ চালিয়ে না গেলে যেকোনো মানুষের-ই অবস্থা হয়, মরচে পড়া তরোয়ালের-ই মতো। মানুষ হয়ে জন্মেছি বলেই এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। চালাব, যতক্ষণ জ্ঞান থাকে; আমৃত্যু। থামাতে চাই না কখনোই।
রূপমতী—অতিউত্তম। কিন্তু নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধেও তো হার-জিত থাকার কথা। পরিণামহীন যুদ্ধের কথা তো শুনিনি কখনো।
রূপমতী রীতি বলল, ভুরু তুলে, চোখ নামিয়ে।
একরাম খাঁ—সার্থকতা কিছু থাক আর নাই-ই থাক, যে, এই যুদ্ধে লিপ্ত নয়, সে, বোধ হয় ‘মানুষ’ বলতে যা বোঝায়; তাই-ই হয়ে ওঠেনি।
রূপমতী—বা:। শুনে, খুব-ই খুশি হলাম সেনাপতি যে, আপনি নিজে অন্তত নিজেকে মানুষ বলে মনে করেন। যুদ্ধ করার চেয়ে কথাতেই আপনি বোধ হয় বেশি দড়। নইলে রানি দুর্গাবতীর সঙ্গে যুদ্ধে আপনাদের-ই অসীম সাহসের কারণে সুলতান বাজবাহাদুর সে-যুদ্ধে মান-সম্মান হারিয়ে আসতেন না, এমন করে।
রুন, রীতির মুখে চেয়েছিল মুগ্ধদৃষ্টিতে। যখন-ই ও ভুরু তুলে চোখ নাচিয়ে কথা বলে তখন-ই রুনের খুব ইচ্ছে করে দৌড়ে গিয়ে রীতির দুই বুকের মধ্যিখানের কাঁঠালি চাঁপার গন্ধকে শুষে নেয় নাক ভরে। গন্ধটা কীরকম যে, সে-সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই ওর। কল্পনায়, কাঁঠালি-চাঁপার মতো হবে ভেবেই সুখী থাকে। কিন্তু....
একজন আধুনিক, শিক্ষিত ছেলের এই তো দোষ! তার আধুনিকতা—ভাবাবেগকে, স্বতঃস্ফূর্ততাকে চেপে রাখতে, এমনকী গলা টিপে মেরে ফেলতে পর্যন্ত শিখিয়েছে। নিজেকে কী অমন করে ছোটো করা যায়? কাউকে কি বলা যায়, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’? ইডিয়ট বা হাফ-উইটদের পক্ষেই অমন বলা সম্ভব।
না:, শুধু কষ্ট, শুধুই...মিছিমিছি...
রীতির দিদি, গীতির বিয়ে হয়েছে এই ছোট্ট সাব-ডিভিশনাল শহরের এস-ডি-পি-ও সীতেশ সেনের সঙ্গে। রীতি ও গীতির দিদি, নীতির স্বামী এখন পাটনায় মস্ত উকিল। বনেদি পরিবারের ছেলে। রোজগারও প্রচুর। কে জানে? রীতিও শেষপর্যন্ত কোনো ব্যাঙ্ক-অফিসার বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা আই. এ. এস. ফাঁসাবে। ওদের পরিবারের মেয়েদের ‘ছেলে-ধরা’র ব্যাপারে খুব-ইনাম-ডাক আছে। অনেক-ই বিবাহ-যোগ্য ছেলেকে বেদেনিরা যেমন করে সাপ ধরে নাড়েচারে, তেমন-ই নেড়েচেড়ে তারপর হঠাৎ অন্যদের সম্পূর্ণ অপরিচিতি একজনের গলা ধরে ঝুলে পড়ে। অন্যরা তখন একেবারেই গাধা বনে যায়। এই ঝিরাটোলিতে ওদের বাড়ির প্রত্যেকটি মেয়েই সকলের বিপন্ন-বিস্ময়।
গীতি-রীতির মৃতা মায়ের নামেও এখনও অনেক রসের গল্প আছে। রীতির মায়েরও ‘সুন্দরী’ বলে খুব-ই খ্যাতি ছিল ঝিরাটোলিতে। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়েসে হঠাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা যান উনি। পঞ্চাশ বছর বয়েসেও ওঁর শরীরের বাঁধন এমন ছিল যে, মনে হত বুঝি ফার্স্ট-ইয়ারের ছাত্রী।
রীতির বাবা প্রসূনবাবু পাটনাতে অধ্যাপনা করতেন। ফিজিক্স-এর অধ্যাপক ছিলেন। বই-পাগল মানুষ। মাইনাস টেন চোখের পাওয়ার। রিটায়ার করার পর তবুও এখনও সব সময়েই বই-এর মধ্যেই ডুবে থাকেন। মা যতদিন ছিলেন ততদিন, রীতির তাও শাসন ছিল, বাড়িতে একটু। মা তো নেই-ই, তার ওপরে দিদিদের বিয়ের পর ও এখন একেবারেই স্বাধীন হয়ে গেছে। ভয় করে রুন-এর খুব-ই রীতির জন্যে। এ-কারণেই। তবে মনে হয়, রীতির মতো মেয়েরা ‘স্বাধীনতা’কে নির্বিঘ্নে রেখে জীবন উপভোগ করতে জানে। নিজেকে বাঁচাতেও। প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব ওর। পড়াশুনোতেও ভালো ছিলো খুব-ই। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল ইংরেজিতে। অথচ এম. এ. পড়ল না ঝিরাটোলিতে বাবাকে একা রেখে পাটনাতে গিয়ে পড়তে হবে বলে।
মেয়ে হয়ে জন্মালে বেশ ভালোই হত। রুন ভাবে মাঝে মাঝেই। ছেলেরা আর মেয়েরা সবাই-ই তো সমান-ই আজকাল। তবুও মেয়ে হয়ে জন্মালে অনেক-ই সুবিধে, অ্যাডভান্টেজ; গীতি বা রীতির মতো মেয়েলিপনাকে যদি কোনো মেয়ে পুরোপুরি কাজে লাগাতে জানে। এখনকার বেশিরভাগ মেয়েই তো মেয়ে নয়। ন্যাকামি, মেয়েলিপনা এসব যে, একমাত্র মেয়েদের-ই মানায় এবং তাতে যে, লজ্জার কিছুই নেই —এই কথাটাই আজকালকার মেয়েরা ভুলে গেছে একেবারে। সাজে, পোশাকে, চেহারাতে ওরা পুরুষ হয়ে ওঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। করতে করতে ‘মেয়েলিপনা’ই যে, মেয়েদের বড়ো গুণ তাই-ই ভুলে গেছে। এবং অন্যরা পুরুষ হওয়ার চেষ্টা করছে বলেই গীতি-রীতিরা এমন করে হ্যাণ্ডস-ডাউন জিতে যায় ওইসব মেয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতাতে। হরিণীরা বাঘছাল পরলেই কী বাঘ হয়ে উঠতে পারে? মেয়েরা অনেকেই ভাবে যে, পারে। প্রত্যেক পুরুষ-ই মেয়েদের মধ্যে মেয়েলিপনা ও ন্যাকামি স্বাভাবিকভাবেই যে, প্রত্যাশা করে এ-কথাটা বেশির ভাগ মেয়েই মনে রাখেনি।
তবে, রীতির কথাই আলাদা। ও সবসময়ই দোনলা বন্দুক নিয়ে ঘোরে। এক নলে পোরা থাকে প্রাচীন মেয়েলি ন্যাকামির গুলি, যে-গুলি খেয়ে পুরুষমাত্রই নির্ঘাত কুপোকাত। আর অন্য নলে থাকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিকতার স্ফেরিক্যাল বুলেট। সেই গুলি খেয়েও পুরুষেরা সবাই ‘হলদে সবুজ ওরাংওটাং ইট-পাটকেল চিৎপটাং’।
রীতি যদি সত্যি-ই কোনো পুরুষকে মারতে চায় তবে, সেই পুরুষের বাঁচা প্রায় অসম্ভব-ই।
হঠাৎ-ই বোকাদা বলল, ‘ওক্কে। আজকের মতো রিহার্সাল শেষ।’
বোকাদারা দুই-ভাই। তার দাদার নাম চালাক। চালাকদার বয়স প্রায় পঞ্চাশ হল। নাটক যিনি লিখেছেন, সেই তক্ষদার; তক্ষ রায়ের-ই কাছাকাছি বয়েস। নামে চালাক হলে কী হয়, আজ অবধি চালাকির কিছুমাত্র নমুনাও তিনি দেখাতে পারেননি। অথচ বোকাদা বহু চালাককেই, ইনক্লুডিং চালাকদা; টুপি পরিয়ে ছেড়ে দিতে পারে। পারিবারিক সম্পত্তিও সাবড়ে দিয়েছে, নিজে চালাকদাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। বাংলা পড়িয়ে বেড়ায় সকাল-বিকেল রাজ্যের লোককে। লেখাপড়া তেমন জানে না। কিন্তু বি.এ. এবং ‘ল’-এর ডিগ্রি আছে। লোকে বলে, অন্য লোককে দিয়ে পরীক্ষার খাতা লিখিয়েছিল। সংসারে কিছু অত্যুৎসাহী লোক থাকে যারা, তাদের ঐশ্বরিক উৎসাহ এবং ক্ষমতার জোরেই অন্য অনেক কিছুর ঘাটতি পূর্ণ করে নেয়। বোকাদা হচ্ছে সেই শ্রেণির লোক। প্রত্যেক ক্লাবে বা সংস্থায় বোকাদার মতো লোকেরাই যাত্রাদলের অধিকারীর মতো সমস্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ধরে রাখে। বাঙালিদের প্রতি-প্রতিষ্ঠানেই যে, রাজনীতি এবং দুর্নীতি থাকে তার চাবিকাঠি থাকে বোকাদাদের-ই হাতে। নিজেরা ভালোমানুষের মতো মুখ করে বসে, অন্যদের ভোটের মাধ্যমে নি:শব্দে রাজা-উজির মারে। সেই মারামারিতে রক্তপাত হয় না। সততা মরে, ভালোত্ব মরে; গুণ নষ্ট হয়ে যায়। নীজে নির্গুণ হওয়া সত্ত্বেও, অনেক মানুষকে এক শামিয়ানার নীচে একত্রিত করার ‘দুর্লভ’ ক্ষমতা দিয়েই এই স্বল্পসংখ্যক মানুষেরাই অনবরত দল-ভাঙা বাঙালিদের কাতর নড়বড়ে প্রতিষ্ঠানগুলিকে জিইয়ে রাখে।
নিজেদের-ই স্বার্থসিদ্ধির জন্যে।
বোকাদা বলল, এই বিশু এদিকে আয়, তোর কিসসু হসসে না। তুই হলি গিয়ে সুলতান। মাঁলোয়ার বাজবাহাদুর। তোর চলা, ফেরা, কথা—সব, সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের ‘আভিজাত্য’ থাকবে। নবাব বাজবাহাদুরের চরিত্রে তোকে ঠিক একটা গুড়ের হাঁড়িতে-পড়া নেংটি ইঁদুরের মতো মনে হচ্ছে। আরে যুদ্ধে-হারা সুলতানও সুলতান-ই! মরা হাতি লাখ টাকা। তা ছাড়া তুই রীতির কাছে এসেই এমন কুঁকড়ে যাচ্ছিস কেন? রীতি কী তোর বউদি? শালা! ও হচ্ছে, তোর ওয়াইফ। বিবাহিতা, কী নয়, তা নিয়ে ঐতিহাসিকরা একমত নন যদিও। কিন্তু হাজব্যাণ্ড-ওয়াইফের রিলেশান তোদের। পিঠে-ফিঠে হাত দিয়ে কথা বল। শখের থিয়েটার করতে এসে, এইসব পার্কুইজিটসও যারা নিতে শেখেনি তাদের আর কী বলব?
রীতি বিব্রতমুখে মুখ ঘুরিয়ে রইল বোকাদার কথাতে।
রুন বলল। সম্পর্ক যদি স্বামী-স্ত্রীরই হয় তাহলে খামোকা পিঠে খামচা-খামচি করবেই বা কেন? রোমান্টিক সম্পর্ক তো! স্বামী-স্ত্রী কি...
বিবাহিতা স্ত্রী! ছো:! বিয়ে যখন করবি, তখন বুঝবি। তার সঙ্গে এত রোমান্টিক হওয়ার দরকার-ই নেই। বউয়ের সঙ্গে কারো প্রেম থাকে? এই হাঁদাদের নিয়ে কী যে, করি আমি! রীতির সঙ্গে ডায়ালগ বলার সময়ে সর্বদা মনে করবি, মাছ নিয়ে, কেরোসিন তেল নিয়ে, ছেলের পরীক্ষা, ছোট্টমেয়ের হরলিক্স, এইসব নিয়ে প্রচন্ড টেনশান চলছে তোদের। কাঠ কাঠ কথা বলবি। ডাঁটের মাথায়। তুই হচ্ছিস গিয়ে সুলতান, তোর শালা যাচ্ছে-আসছে কী? যার হারেমভরতি পৃথিবীর সব দেশের মেয়ে, চকচকে জিয়োনো-শিঙির মতো ফরফর করছে সবসময়ে। বিরক্তিতে নাগরা ঠুকবি মাটিতে। তোর শরীরে আফগানি ব্লাড বইছে। বাজনা তোদের রাবাব। মেজাজে সবসময় রোয়াবি। অবলা রমণীর অবিমিশ্রীকারিতায়...
বোকাদাকে বাক্য সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে, থামিয়ে দিল রুন। বলল অবিমিশ্রীকারিতায় নয়, অবিমৃশ্যকারিতায় বোকাদা। তালব্য ‘শ’। মিশ্রীও নয়। বুঝেছ?
রীতি মুচকি হাসল রুনের দিকে তাকিয়ে একঝলক।
বিশু বলল, ‘এত কঠিন কঠিন শব্দ বলার-ই বা দরকার কী তোমার বিনা কারণে? যে-ভাষায় কথা বলা অভ্যেস সেই ভাষাতেই কথা বলতে পারো। আমরা কী তোমাকে বুঝি না? না, জানি না? তুমিও কি তক্ষদার-ই মতো পন্ডিত? এইকথা কি মানাতে চাও নাকি, আমাদের দিয়ে। যদি তাই-ই চাও, তো সে গুড়ে বালি।’
ধমকে বোকাদা বলল, ‘দেখ বিশে, বাবা মা আমার নামটাই বোকা দিয়েছিলেন। আসলে তা নই। কথাটার বানান এবং মানে ঠিক-ই জানি। শুধু তাড়াতাড়ি বলতে গিয়েই জিভ জড়িয়ে গেল। তোর টাকাতে প্রোডাকশান হচ্ছে বলে কী তোকে ভয় করতে হবে নাকি?’
অপ্রস্তুত হয়ে বিশু বলল, ‘এ আবার কী কথা? বোকার মতো কথা বোলো না বোকাদা। এ-কথা আর একবার উচ্চারণ করলে, আমি আর আসছি না রিহার্সালে। এভরিথিং হ্যাজ আ লিমিট।’
বিপদ বুঝে, অপমানটা নিজের থুথুর সঙ্গে গিলে ফেলে; বোকাদা বলল, ‘বেশ! ও-কথা না হয় আর বলব না, কিন্তু তুই? তুইও এরকম ভুল করিস না? তুই তোর ডায়ালগ বলবার সময়ে উলটোপালটা বলছিস না? বলছিস না, যে, ‘হানিফ ভীষণ ঝড় আসছে জিগগির জেহাজ মেহলের জরজা জানলা সব বন্ধ করতে বলে দাও।’ কী? বলিসনি?’
বিশু হেসে ফেলল। বলল, রাইট। কিন্তু সে তো আমি স্লাইট তোতলা বলে। তাড়াতাড়িতে দরজা, জানলা—‘জরজা-জানজা’ হয়ে যায়-ই অনেক সময়ে।
আমারও তাই-ই। এত স্ট্রেইন করতে হলে, তোদের মতো গোরু-গাধাদের নিয়ে, অনেকেই তোতলামি করত। সেটা দোষের নয়। ফর নাথিং আমার পেছনে লাগবি না। এইকথা রইল। মনে থাকে যেন।
তারপর-ই কথা ঘুরিয়ে বোকাদা হাততালি দিল। হঠাৎ।
তিনবার চেঁচিয়ে বলল, অ্যাটেনশান। সক্কলে শোনো। আজ এই অবধিই থাক। এবার থেকে সপ্তাহে কিন্তু তিনদিন করে রিহার্সাল না দিলে চলবে না। নেক্সট দিন তক্ষদা নাটকটিকে মেজে-ঘষে ফাইনাল স্ক্রিপ্ট দেবেন। মাদার-স্ক্রিপ্ট ওঁর কাছে দিয়ে এসেছি। অনেক জায়গা হয়তো একটু-আধটু বদলেও যাবে। তবু নাটকের সঙ্গে তোদের পরিচিত করবার জন্যে, রিহার্সাল দেওয়ালাম এই দু-দিন। পুজো এবারে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে। কলকাতা থেকে খুব নামি যাত্রাপার্টি আনছে ইয়াং ক্লাব। তারা যাত্রা করবে একাদশীর দিন। আমাদের শো দ্বাদশীতে। পরের দিন বেঙ্গলি ক্লাব, ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারকে দিয়ে ফাংশান করাচ্ছে। মধ্যিখানে আমরা একেবারে স্যাণ্ডউইচড। ‘ভ্রাতৃ সংঘ’-র মান একদম থাকবে না আমাদের এই নাটক ঝুলে গেলে। তা ছাড়া, পাটনার নাট্যজগতের অনেক মান্য-গণ্য লোক আসবেন এই নাটক দেখতে। তক্ষ রায়ের লেখা নাটক যে, সে-কথা ভুলে গেলে চলবে না। তোরা তোদের নাতিপুতিদের গর্ব করে বলতে পারবি যে, তক্ষ রায়ের লেখা নাটকে অভিনয় করার সুযোগ তোদের জীবনে একবার অন্তত এসেছিল। এ তো আর বটতলার লেখকের লেখা কোনো নাটক নয়। রগরগে বাজার-চলতি বেস্ট সেলার গল্প উপন্যাস লিখে যারা নাম করে তেমন সব কোনো লেখকেরও লেখা নয়। এ-নাটকের প্রেস্টিজ-ই আলাদা।
বোকাদার বক্তৃতা থামাবার জন্যে বিশু বলল, কখন হবে রিহার্সাল? আর কবে কবে, তাই-ই তো বললে না।
সকাল ন-টা থেকে তো হবেই, যেমন হচ্ছে। রবিবারে। আর মঙ্গল এবং শুক্র সন্ধে সাতটা থেকে। শেষ হতে রোজ-ই রাত হবে। মেয়েরা বাড়িতে বলে আসবে, যেন, চিন্তা না করেন।
এমন একটা প্লে বেছেছ-না, বোকাদা!
গোপেন বলল, বিরক্তির গলায়।
এটা কি নাটক হয়েছে?
যিশু বলল।
ফু:।
রীতি কলকলিয়ে বলল, সত্যি!
ওর সঙ্গে গলা মেলাল মুন্নী এবং মিনিও।
কী বলিস কী তোরা? ইডিয়টস নাকি? এই নাটকের তোরা বুঝবি কী রে? ব্রেখট, ইবসেন, পিরানদিল্লো, সব ম্লান হয়ে গেছে। নাটকটা খারাপ কী লিখেছে তক্ষদা? লজ্জা হওয়া উচিত তোদের। তা ছাড়া, তক্ষদার সঙ্গে সমস্ত প্রেসের এবং ‘অশনি’ সাপ্তাহিকের যোগাযোগের কথা জানিস না তোরা? নাটক আমাদের যদি ঝুলও হয়, পাটনার সব কাগজে তবুও ‘ধন্যি ধন্যি’ পড়ে যাবে। ছবি ছাপা হবে। রিপোর্টাররা লিখবে, আহা! কী নাটকীয় গুণসম্পন্ন নাটক! কী অভিনয়! কী সংলাপ! কী গান! বলবে, তক্ষ রায়ের মতো এতবড়ো বহুমুখী-প্রতিভা এই বিহারবাসী বাঙালিদের মধ্যে, এর আগে আর দেখাই যায়নি।
তবে আর ভয় পাচ্ছ কেন? রিহার্সাল দেওয়ার দরকার-ই বা কী?
আরে ভয়টা পাচ্ছি, ঝিরাটোলির মানুষদের-ই জন্যে। তোরা সত্যিই ইডিয়টস। ইয়াং ক্লাবের মেম্বারদের এবং বেঙ্গলি ক্লাবের মেম্বারদের জন্যেও। বাঙালি হয়ে জন্মেছ আর ‘খেয়োখেয়ি’ কাকে বলে জান না? দ্যাখোওনি কি কখনো? বাঙালিই একমাত্র কাকের জাত, যে-কাকেরা নিজেদের মাংস খায়। এ দুই ক্লাবের মেম্বারেরা তো নিজেদের চোখেই দেখবে নাটক। খবরের কাগজ, পত্রিকা, বাজেকেও ভালো বলে চালাতে পারে। কিন্তু যারা এই নাটক দেখবে না, শুধুমাত্র তাদের-ই কাছে। কিন্তু ‘সত্যি’ তো সত্যিই থাকবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে। তাই-ই তো এত ভাবনা। নাটকটা তক্ষদা অসাধারণ-ই লিখেছেন। তোরা এখন কী করিস তা নিয়েই ভয় এত আমার। ভালো হলে, সকলের-ই মুখ থাকে। মিথ্যে প্রশংসা পেতে কার-ই বা ইচ্ছে করে বল? ‘বিবেক’ বলে তো ব্যাপার আছে একটা!
আছে বুঝি? তোমারও?
সামু বলল।
বি কেয়ারফুল সামু। বোকাদা বলল।
খবরের কাগজে যাই-ই লেখা হয় তাই-ই তো সত্যর শেষকথা। পেপারে লিখলেই হল। কার সাধ্য তাকে মিথ্যে ভাবে? তবে তুমি যাই-ই বলো, এই নাটকটা বেশ যাত্রা-ঘেঁষা হয়েছে। আধুনিক নাটক বলে মনেই হচ্ছে না। অন্তত এখনও। জানি না, ঘষে-মেজে কী দাঁড় করাবেন তক্ষদা। এখন পর্যন্ত এই নাটকের মধ্যে নাটকীয় কোনো ব্যাপার-ই দেখতে পাচ্ছি না।
রুন বলল, বাজে কথা বলিস না। নাটকের কী বুঝিস রে তোরা? এ-পর্যন্ত তো শুধু একটা সিনের-ই রিহার্সাল হচ্ছে। নাটক যদি, গল্প-উপন্যাসের মতো গড়গড় করে পড়ে যাস তাহলে তার কিছুই বোঝা যায় না। ছাপা বা লেখা নাটক হচ্ছে খড়ের প্রতিমার-ই মতো। মহড়ার আখড়াতে এনে ফেললে তখন-ই সেই খড়ের ওপর মাটি লাগে, রিহার্সালের রং-তুলিতেই তার চোখ-নাক ফোটে। দেখতে দেখতে, সেই নাটক-ই জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভালো করে রিহার্সাল দে, একসঙ্গে যেদিন পুরো নাটকের রিহার্সাল হবে সেদিন-ই পুরো ব্যাপারটা তোরা ভিসুয়ালাইজ করতে পারবি। লেখা নাটক দেখে নাটকের কোনো গুণ বোঝা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কতখানি সময় নেবে, তাও না। গভীরে গেলে বুঝবি, কী হাইলি ই-ই--ই-ই-ন টলেকচু....
রীতি হেসে ফেলল বলল, ইশ। একচুলের জন্যে ‘ইনটেলেকচ্যুয়াল’ হল না বোকাদা।
বোকাদা লজ্জিত মুখ নেড়ে বলল, এইজন্যেই বলে ‘লিটল লার্নিং ইজ ডেনজারাস’। যে-নাট্যকার থিম বা পুরোনো মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে নতুন কিছু বলতে বা করতে পারবেন, তিনিই তো আসল নাট্যকার। তক্ষদার কী দোষ? আমার-ই বা কী দোষ? আসলে, তোদের অনেকের-ই পক্ষে এই নাটকের বাইরের সহজ ঢিলেঢালা পাঁচ-শো বছরের পুরোনো মোড়কের ভেতরে যে, প্রচন্ড ‘আধুনিক’ ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে তা বোঝাই সম্ভব হচ্ছে না। এই নাটক, তোদের দিয়ে করানোও মুশকিল। তবু, চেষ্টা করতে তো হবে। বোকা পাল, পাঁঠাদের অত সহজে ছাড়ে না।
সকলেই চুপ করে রইল। কেউ কেউ কথাটা মনে মনে মানল। কেউ বা মানল না। নিজেকে অন্য কেউ পাঁঠা বললে, সেইকথা মানতে কার-ই বা ইচ্ছে যায়। তার ওপর তাও যদি কোনো দুঁদে বোকাতে বলে। ওরা অনেকেই বোকা পালকে আড়ালে ‘দুঁদে বোকা’ বলে ডাকে।
রীতি বলল, হি হ্যাজ মেড আ পয়েন্ট।
রুন বলল, সত্যিই! বোকাদা যা-বলল, সেটা ভেবে দেখার। আমরা সত্যিই বিনা কারণে বেশি ফ্লাশ করছি বোধ হয়।
বোকাদা বলল, যা বললাম তা পরে মিলিয়ে নিস। তক্ষদাকে তোরা না চিনলেও আমি চিনি। যে-কাজ সে পারবে না, তা কখনোই হাতে নেয় না। ঠিক আছে। এর পরের দিন রিহার্সাল শুরু হওয়ার আগে এই নাটকের ইন্টারপ্রিটেশন নিয়েও আলোচনা করা যাবে তোদের সঙ্গে। দেখি, তক্ষদা যদি নিজেই তোদের বুঝিয়ে দেন তো খুব-ই ভালো হয়। এটা খুব-ই দরকার। তোরা সকলে নিজেরা কী বুঝেছিস না বুঝেছিস ভেবে আসবি। কে জানে, তক্ষদা বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন কি না সেদিন। আমার-ই অনুরোধে-না, তিনি এত খাটনির একটা কাজে হাত দিলেন। তোরা কোথায় ওঁকে অ্যাপ্রিশিয়েট করবি, ধন্যবাদ দিবি, তা-না ওঁকে নিয়েই পড়লি। ওঁর কী দরকার ছিল রে? তক্ষ রায়ের কী আরও নামের দরকার ছিল? ধন্য হব আমরাই। যে-নাটক করতে যাচ্ছিস সেই নাটকে নাট্যকার কী বলতে চাইছেন, সেটা সম্বন্ধেই যদি তোদের সন্দেহ থাকে, ব্যাপারটা ভালো করে না বুঝিস; তাহলে তোরা অভিনয় করবি কী করে? অভিনয় বা আবৃত্তি আজকাল আর, পাড়ার মস্তানদের তাস পেটা, বিড়ি-ফোঁকা ভ্যাগ্যাবণ্ডদের টাইম কিল করার ক্লাবের সভ্যদের ছেলেখেলা নেই। বুঝেছিস? আজকের নাটক, অ্যাজ এ মিডিয়াম একটা অন্য হাইটে উঠে গেছে। বাংলা নাটককে আমাদের বাঁচাতেই হবে। বাঙালি-ই একদিন পথ দেখিয়েছে সারাভারতকে এই নাটকের ক্ষেত্রেই। আর আজকে তোরাই ব্রেখট আর ইবসেন করে মরছিস। ছি: ছি:।
বা: রে:, আমরা কোথায় করছি? আমরা তো ‘চলচিত্তচঞ্চরী’ করতে চেয়েছিলাম। নয়তো ‘ফাঁদ’।
সত্যি! কী করে বোঝাই তোদের যে, ফার্স্ট হ্যাণ্ড ওরিজিন্যাল জিনিস বাজে হলেও সেটা ওরিজিন্যাল-ই! পুরোনো, তা যতই ভালো হোক-না-কেন; তা কখনো নতুনের সঙ্গে তুলনীয় হয়? ভাবতে শেখ। তোরা সব শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে, তোরাও যদি এমন বলিস তাহলে সত্যিই দুঃখ হয়। তেণ্ডুলকারের হাবিব তানবীরের নাটক দেখে এসেছে আমাদের প্রদ্যুম্ন, কলকাতা থেকে। ওকে জিজ্ঞেস করিস দেখা হলে। কী অসাধারণ! কী ওরিজিন্যাল!
তক্ষদাকে কোনো রোল দিলে না?
উত্তেজিত-গলা নামিয়ে বোকাদা বলল, রাজি হচ্ছে না। তক্ষদা নিজেই বলেন, ‘আমার যেমন চেহারা, ভিলেইন-এর রোল ছাড়া আর কোনো রোলে মানাবে না আমাকে।’ এই নাটকে ভিলেইন তো বাদশা আকবরের মোগল সেনাপতি আধম খাঁ। তার চরিত্র যেমন-ই হোক-না-কেন, মোগলাই ফিচার্স তো থাকতেই হবে। এ-জীবনে মঞ্চের আড়ালেই আমার জায়গা। পাদপ্রদীপের সামনে সকলের দাঁড়াবার ভাগ্য হয় না।
কিছুই করবেন না?
না। অভিনয় কোনো ভূমিকাতেই করবেন না। তবে মাণ্ডুর জেহাজ মেহালের চাঁদনি রাতের ম্যায়ফিলের দৃশ্যে হয়তো পুরুষ গায়কের ভূমিকায় একটি গান গেয়ে দেবেন। দেখি। সেই সিনে আলো এত কম থাকবে যে, মেকআপ নেওয়ার পর চেহারাটা যে, কেমন তা আর বোঝাই যাবে না। পুরুষমানুষের চেহারা লম্বা-চওড়া শক্তসমর্থ হলেই হল। মুখ দিয়ে কী হবে? তক্ষদা কি শোনপুরের মেলার সুলক্ষণা গাই?
রীতি বলল, গান নেই কোনো? এই নাটকে?
সৌম্য শুধোল।
ইয়ার্কি মেরো না সৌম্য।
বোকাদা বলল।
নাচ থাকা উচিত ছিল।
আবার নাচ? নাচবে কে? পায়ে ঘুঙুর-পরা আমাদের মোমফুলিওয়ালা? এইসব কথা তক্ষদার কানে গেলে আমার আর সাহিত্যিক হওয়া হবে না। এরপরের বছরে, পূজাসংখ্যার, ‘একবিংশ শতাব্দী’-তে আমার একটা উপন্যাস ছাপা হবে। তক্ষদা সম্পাদককে বলে দেবেন বলেছেন। কথা প্রায় হয়েই আছে একরকম।
আজকাল কী লেখক আর এল. আই. সি-র এজেন্টে কোনো তফাত নেই? এর চেয়ে কম কাঠখড় পুড়িয়েই তো লাখ টাকার পলিসি গছিয়ে এসেছে হাঁদু। এইসব করার পরও কি তোমার ‘লেখকত্ব’ বাঁচিয়ে রাখতে পারবে বোকাদা?
হা:! হা:! ইন লাইফ, নাথিং সাকসিডস লাইক সাকসেস।
লেখা হয়ে গেছে?
রীতি শুধোল।
কব্বে। দু-বছর হয়ে গেল। তক্ষদার সম্পাদকীয় আলমারিতেই তোলা আছে। ছাপাবার সুযোগ-ই দিয়ে দেখুক-না একবার। দেখাব, ‘প্রতিভা’ কাকে বলে। সুযোগ-ই যদি না পাই তো প্রতিভার কথা লোকে জানবে কী করে? চেপে রেখেছে দুনিয়া। কিন্তু ছেড়ে একবার দিলে, একেবারে ক্যান্টার করে বেরিয়ে যাব।
নাম কী দিয়েছ, তোমার উপন্যাসের? রুন শুধোল।
‘ঘটোৎকচ’।
মিথোলজিকাল?
স্টুপিড! এক্সপেরিমেন্টাল!
কীসের এক্সপেরিমেন্ট?
দেখবি দেখবি, ছাপা হোক।
তারপর-ই কথা ঘুরিয়ে বোকাদা বলল, তক্ষদা নিজে তো আর নাট্যকার নন। আমাদের কলকাতার সব নামিদামি গল্পকার আর ঔপন্যাসিকরা তো আমাদের জন্য দু-একটা নাটক লিখলেই পারতেন। কই? সে এলেম তো কারোর-ই দেখি না? তবু তো, আমি ধরে-করে একটা লেখালাম তক্ষদাকে দিয়ে।
আমি কিন্তু এবার যাচ্ছি বোকাদা।
সিরিয়াস, আলোচনার মধ্যে হঠাৎ-ই রসভঙ্গ করে রুন বলে উঠল।
কেন? এত তাড়া কীসের? ঘোড়ায় কি জিন দিয়ে এসেছ?
একটু হেসে রুন বলল, প্রায় সেরকম-ই। বাবার শরীরটা খারাপ হয়েছে। বাড়ি ফিরতে রোজ-ই দেরি করছি। ঝাড় খাব মায়ের কাছে আজও দেরি হলে।
রুন যাওয়ার কথা বলতেই ওকে, একপাশে ডেকে নিয়ে রীতি বলল ; গলা নামিয়ে, অ্যাই! আমি কিন্তু তোর সঙ্গে যাব। নিয়ে যাবি তো? চারছকের মোড়ে কতকগুলো লোক নেশাটেশা করে থাকে। রাত হয়ে গেলে, একা একা চারছক দিয়ে যেতে ভয় করে। কী রে?
চল।
যেন, গভীর অনিচ্ছাতেই ওকে নিয়ে যাবে, এমন একটা ভাব করল রুন।
বাইরে বেরিয়েই ওর সাইকেলটা দঙ্গল থেকে টেনে বের করল রুন। বড়ো শিমুল গাছটার গোড়াতে সাইকেলগুলো সব একসঙ্গে হেলান দেওয়ানো ছিল। অনেকেই সাইকেলে আসে। দু-একজনের অবশ্য সাইকেলরিকশা ঠিক করা আছে। বিশেষ করে মেয়েদের। সময়ে এসে নিয়ে যাবে। তাদের আসার সময় এখনও হয়নি। বিশু আসে ওর জিপে। মাহিন্দ্রর জিপ। বোকাদা পাশে উঠে পড়ে। বিশু নিজেই চালায়।
ধাতব শব্দ হল সাইকেলে সাইকেলে ঠোকাঠুকি লেগে। এমন সময় একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ফিয়াট। সাদা রঙের। গান্ধারীদির কি? না তো! ফিয়াট তো নেই ওঁর।
রুন পেছন দিয়েই বেরিয়ে যাবে। তাই-ই আর সামনের গেটে যাওয়ার গা করল না। গান্ধারীদি যখন ঝিরাটোলিতে থাকেন তখন রিহার্সালে চলে আসেন রিহার্সাল দেখতে। তাঁর গাড়িতে, সঙ্গে শিঙাড়া কী কাটলেট, কী দই-বড়া নিয়ে আসেন। সব-ই আছে গান্ধারীদির জীবনে। অথচ বড়ো একলা উনি। সবসময়েই হাসছেন, কিন্তু মনের মধ্যে কী-এক গভীর দুঃখ মাখামাখি হয়ে থাকে সবসময়ে। রীতির মুখে যেমন, বুদ্ধিমেশানো সৌন্দর্য, গান্ধারীদির মুখে দুঃখমেশানো। পাটনা থেকে গাড়ি করেই আসেন উনি এখানে। বছরে আট-দশবার আসেন। বিরাট বড়োলোকের একমাত্র মেয়ে। বিরাট ভদ্রলোকের বউও। ছেলে-মেয়েও নেই। মাসিমা এখানেই থাকেন। তাই-ই আসেন মাসিমাকে দেখতে। এখন পক্ষাঘাতে একেবারেই শয্যাশায়ী। গান্ধারীদি কিন্তু খুব ভালো অভিনয় করতেন। ঝিরাটোলির সব মানুষ এখনও সে-কথা বলেন। পড়াশুনো গান-বাজনা সবেতেই দারুণ ছিলেন। বিয়ের পর কিছুই করেন না আর। ধার না দিলে, গুণেও বোধ হয় ‘মরচে’ পড়ে যায়। গান্ধারীদির চেহারাটা ভালো। কিন্তু ফিগারটা দারুণ। ছেলেরা বলে, সেক্সি। মেয়েরা বলে, ঢঙি। কিন্তু অসাধারণ সুন্দরী যে, এ-কথা সকলেই স্বীকার করে।
সাইকেলটা সেই জমায়েত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, ঠেলে ঠেলে সেটাকে পেছনের গেটের কাছে নিয়ে এল রুন।
ফিয়াট গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিল ড্রাইভার।
আজ সত্যিই তাড়া আছে ওর। মুখ ফিরিয়ে আর দেখারও সময় নেই।
রীতিও ততক্ষণে পেছনের গেটের কাছে পৌঁছে গেছে।
রুন বলল, আয়; ওঠ।
বলল, যেন, খুব বিরক্তির সঙ্গেই।
রীতি এসে সাইকেলের সামনের রড-এ বসল। সাইকেলটাতে ক্যারিয়ার নেই। ইচ্ছে করেই রাখেনি। পাছে ক্যারি করতে হয় একে-ওকে। ওর দু-টি পা-ই বাঁ-দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে বসল রীতি। হ্যাণ্ডেলের মাঝখানে হাত দু-টি রেখে। রুনের নাকে রীতির চুলের গন্ধ এল। নাম-না-জানা কোনো ফুলের গন্ধের-ই মতো। ভালো লাগল খুব।
রুন বলল, দেখিস! শাড়ি আবার চেনে লেগে ছিঁড়ে না-যায়। তুই তো আবার পা দোলাস রডে বসে বসে। দস্যি মেয়ে আর কাকে বলে?
চুপ কর। ধমক দিল রীতি।
একটা মেরুন-রঙা শাড়ি পড়েছে। চাঁদের আলোয় কালো রঙের বলে মনে হচ্ছে সেটাকে। ছোটোহাতার সাদা ব্লাউজ। খাটো। নাভির কাছটা খোলা। নাভির নীচে শাড়ি পরে ও। ঝিরাটোলির মেয়েদের মধ্যে নাভি দেখাবার সাহস আর কারোর-ই নেই রীতির ছাড়া। এ তো আর কলকাতা নয়!
যখন-ই রীতির পেট থেকে শাড়ি সরে যায় তখন-ই রীতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দু-হাতে কোমর জড়িয়ে ওর নূপুরের মতো নাভিতে চুমু খেতে ইচ্ছে করে রুনের। নাভির কিছুটা নীচেই যে, মসৃণ রোমশ কাঠবিড়ালিটির বাস, তার গায়ে আদরে হাত বোলাতে ইচ্ছে করে। কী পাউডার, কী সেন্ট মাখে রীতি; জানে না রুন। রুনের মা ও দিদি চিরদিন-ই ‘কিউটিকুরা’ পাউডার মেখে এসেছেন। আর, ক্যালকাটা কেমিক্যালের কী যেন, একটা সেন্ট। নামটা মনে করতে পারছে না! কোনো মেয়ের গায়ে অন্যরকম গন্ধ পেলেই নতুন নতুন লাগে। ওর মা আর দিদিও যে, নারীজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং তার দিদির গায়ের গন্ধও যে সুবীরদা, মানে ওর জামাইবাবুর কাছে প্রাণঘাতী, এই খবর রুনের কাছে অজানাই। নতুন সবকিছুতেই সব মানুষের-ই ঔৎসুক্য। নতুন মানেই অজানা; নতুন মানেই অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ। নতুন মুখ, নতুন শব্দ, নতুন ঘ্রাণ এবং সঙ্গও। তাই...
পিচরাস্তা ছেড়ে কাঁচারাস্তায় পড়ল রুন। প্যাডল করা থামিয়ে ঢালু-কাঁকরের পথটা জোরে ‘কির কির’ করে নেমে গিয়ে সমতলে পড়ে বলল, তোর জামাইবাবু সীতেশদাকে বলে দিস-না কেন, একদিন যে, চারছকের মোড়ে মাতালগুলো ঝামেলা করে?
বলি না...
রীতি বলল দ্বিধাগ্রস্ত গলায়।
কেন? বলিস না কেন?
বলি না, এমনিই...
কেন? এস. ডি. পি. ও-র শালিকে কার্নিক মারে, এমন মাতালদের হাড্ডি তো আস্ত থাকার কথা নয়, কোনো সাবডিভিশনাল টাউনে? বলিস নাই-ই বা কেন?
আমি আমার নিজের সব সমস্যা নিজের হাতে, নিজেই সমাধান করতে ভালোবাসি।
বা: ঘরে ঘরে এমন মেয়ে হোক।
না রে রুন। সত্যিই বলছি। তা ছাড়া, জানিস; বলার অসুবিধাও আছে। মানে, কী যে, বলব...
কীসের অসুবিধে? সে কী রে?
অবাক হওয়া গলায় শুধোল রুন।
মানে, আজকাল কী হয়েছে জানিস? কারো কাছ থেকে একটু ফেভার নিলেই বদলে একটু ফেভার দিতেও হয়। চারছকের মোড়ের মাতালদের টিটকিরির হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে যদি, আবার অন্য কোনো বিপদে গিয়ে পড়ি? এইসব ভেবেই...
বলিস কী রে? সীতেশদার কথা বলছিস তুই? উনি না, তোর নিজের জামাইবাবু?
রীতি হাসল, ফিক করে।
বলল, হ্যাঁ। আমিও তো ওর নিজের-ই শালি।
তাহলে?
হলে কী হয়? তোদের-ই তো জাত! পুরুষমানুষ-ই তো রে। তা ছাড়া, স্ত্রীর সঙ্গে মানুষের যে-সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক শালির সঙ্গে হওয়া তো সবচেয়ে সহজ। ক্লোজেস্ট টু ওয়াইফ। সীতেশদা তো আর একসেপশান নয়। তোরা, এই দেশের পুরুষরা যে, কোন ইডিয়টিক রোমান্টিক অথবা সেক্স-স্টার্ভড জগতে বাস করিস এই স্যাটেলাইট আর কম্পিউটারের যুগেও; সত্যিই তা ভাবা যায় না। অবশ্য সকলেই যে, ফেভার করলে ফেভার চাইবেই বদলে, এমন কোনো কথা নেই। তবে জানিস তো, শালি-জামাইবাবুর সম্পর্ক বলে ব্যাপার! আমার দিক দিয়েও আধখানা ‘হ্যাঁ’ তো করেই আছি। তার ওপরে কি পারব সামলাতে নিজেকে, বাঁশি শুনলে? বল?
তুই বড়ো ফালতু কথা বলিস রীতি। নিজের জামাইবাবুর সম্পর্কে এইরকম বলা ঠিক নয়।
নিজের জামাইবাবু সম্বন্ধে তো বলিনি। জামাইবাবু ইন জেনারেল সম্বন্ধে বলেছি। আজকের পৃথিবীতে সবাই-ই বদলে চায়-ই রে কিছু-না-কিছু। সব সম্পর্কই এখন ‘গিভ অ্যাণ্ড টেক’-এর হয়ে গেছে। শুধু দেওয়া বা পাওয়ার দিন কবে যে, শেষ হয়ে গেল! ভাবলেও খারাপ লাগে। কী সুন্দর ছিল সেইসব দিন। নারে! একদিন তো ছিলই। তেমন বড়োকিছু নয়। তবুও পাঁচনয়াও কে ছেড়ে দেয় বল? এই দেখ-না, যেমন তুই-ই! যেই এগিয়ে দিতে, রিকোয়েস্ট করলাম তোকে, সঙ্গে সঙ্গে কেমন ঘোরাপথ ধরলি। তোর ধান্দা কী বুঝি না আমি? আমার চুলে নাক ডুবিয়ে বেশ উড়তে উড়তে যাবি নির্জন-পথে। বল? এই পথে বাড়িতে পৌঁছোতে পনেরো মিনিট বেশি তো লাগবেই কমসে কম। এই পনেরো মিনিট-ই তোর লাভ। তোর সামনে, তোর সাইকেলের রডে বসে থাকলে, তোর বুক আমার পিঠের সঙ্গে লাগিয়ে, তোর সুখ একটু বাড়বে না? কী রে? বাড়বে কি না, তা তো তুই জানিস-ই বল? বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে, এই পনেরোটা মিনিট বেশি তুই নিলি কি না আমার কাছ থেকে? বদলে? এই রাস্তায় আলো নেই। তার ওপর পদ্মবিল পড়বে পথের বাঁ-দিকে। ডানদিকে গভীর শালবন। সাপখোপ। চাঁদের আলো। সঙ্গী কে? না, রুন। একেবারে সোনায় সোহাগা। বিপদ কী আর আমার একটা? যাইহোক, এমন চাঁদের আলোয় মরি যদি, সেও ভালো। কী বল?
রুন অস্ফুটে কী একটা বলল। শোনা গেল না।
কী রে! কথা বল। এরকম গম্ভীর হয়ে থাকলে ভালো লাগে না আমার।
বেশ তো তুই! যখন পিচের রাস্তাটা ছাড়লাম তখন এইসব তো বললি না। তোর মতো বাজে মেয়ে দেখিনি আমি। কী ভাবিস তুই আমাকে?
রাগ রাগ গলায় রুন বলল।
তুই যা তাই-ই! যা আমি ভাবি, ঠিক-ই ভাবি।
আমি সকলের মতো নয়। বরং তুই-ই অন্যরকম। সব মেয়েই বাজে।
স্বগতোক্তির মতো বলল রুন।
রীতি ফুলে ফুলে হেসে উঠল। কিন্তু সামান্য শব্দ করে। বলল, বা: রে! যখন-ই তোকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম, তখন-ই তো জানতাম-ই যে, তুই এই-ই করবি। তোকে আমি চিনি না? শুধু তুই কেন? যাকেই বলতাম, সেই-ই এ-পথ ধরত। কিন্তু তবু যেহেতু, তুই সকলের মতো নোস তাই-ই তোকে আমি—। তোকে আর কেউ না চিনুক, আমি চিনি।
আমাকে চিনিস? তুই আমাকে খুব-ই চিনিস দেখছি।
বিরক্তি ও অভিমানের গলায় বলল রুন।
পুরো কী আর চিনি? পুরো কে-ই বা কাকে চেনে বল? তুই কি নিজেকেই চিনিস?
রুন বলল, বেশি ডায়ালগ ঝাড়িস না। বলেই, প্যাডেল করা বন্ধ করে দিল ও। সাইকেলটা আবারও ঢালুতে গড়িয়ে যেতে লাগল। স্পোকে হাওয়া লেগে শব্দ উঠতে লাগল। চাকার তলায় সরে-যাওয়া কাঁকর মাটিতে ‘কির কির’ করে ফিসফিসে আওয়াজ হল। ‘পিউকাঁহা’ পাখির ঝাঁকি-দেওয়া ডাকের মধ্যে রীতি হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি জানতাম’।
কী জানতিস?
তুই যে, এই পথে আমাকে নিয়ে আসবি সে-কথা জানতাম।
জানতিস-ই যদি, তবে তুই এলি কেন আমার সঙ্গে? কত লোক-ই তো ছিল? তুই বললেই তো সকলে লাফিয়ে উঠত। বিশুর জিপেও আসতে পারতিস।
ধুস! জিপ মেয়েদের বাহন-ই নয়।
তবে কী? মেয়েদের বাহন সাইকেল? আমাকে আর কোনোদিনও তুই পৌঁছে দিতে বলবি না।
রুন বলল।
রীতি দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, কী যে, বলিস। সকলে আর তুই এক হলি? তোকে না বললে কাকে বলব?
তারপর-ই বলল, সত্যিই রে রুন। তুই এত বোকা না! তুই কিচ্ছু বুঝিস না।
যা: যা:, আমি আবার একটা মানুষ নাকি?
অভিমানের গলায় বলল রুন।
তা অবশ্য ঠিক। মাঝে মাঝে আমারও সেরকম সন্দেহ হয়। সন্দেহ হয় যে, তুই মানুষ-ই নোস। যাকগে, আই. এ. এস. পরীক্ষায় বসবি কবে? এম. এ. পরীক্ষা দিয়ে কী এমনভাবে বাড়ি এসে বোকাদার ডিরেকশানে থ্যাটার করেই দিন যাবে? ওঃ বয়! মেক হে, হোয়াইল দ্যা সান শাইনস। বুঝলি?
জানি না। দাদা যদি কানাডা থেকে না ফেরে আর সংসারে টাকা না পাঠায়, তবে বাবার ব্যাবসাই দেখতে হবে। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে কোয়ালিফাই করলেও কোথায় পোস্টিং দেবে তার ঠিক তো নেই। এখন কয়েক বছর তো বিহারের বাইরেই থাকতে হবে। বিহারে যখন আনবে তখনও যে, মুজাফরপুর বা পূর্ণিয়া বা হাজারিবাগে পাঠাবে না, তা কে জানে? আমিও চলে গেলে বাবা-মাকে দেখবে কে?
বা:। এই তো ভালো ছেলে। মহৎ ছেলে। ঘরে ঘরে এরকম ছেলে হোক। কিন্তু ম্যা-গো! বাঁশের ব্যাবসা। ভাবতেও পারি না। শেষকালে বাঁশের ব্যাবসা? ছি: তুই....রুন...? ক্লাসের ফার্স্ট বয়...। তা ছাড়া...
দেখ রীতি। বেশি ‘ম্যাগো ম্যাগো’ করিস না।
কেন করব না? তোর দাদা কি বাবা-মাকে দেখছেন? কানাডা থেকে বছরে ক-টা চিঠি দ্যান? আজকালকার বাবা-মায়েদের দেখতে হবে, তাঁদের ‘নিজেদের’-ই। একটা ছোকরা লোক রেখে দিবি। টাকা পাঠাবি। কার্ড পাঠাবি পয়লা বৈশাখে। নিউ-ইয়ার্সে। আর কী করার আছে? ইয়োর লাইফ ইজ ইয়োর লাইফ। ইউ মাস্ট লিভ ইয়োর লাইফ। আগেকার দিনের মতো ম্যাদামারাভাবে জীবন কাটানোর দিন চলে গেছে।
‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। রুন বলল। ব্যাবসা, যেকোনো চাকরির চেয়েই ভালো। তা ছাড়া, ক্লাসে অনেকেই তো ফার্স্ট হয়। ‘জীবন’-এ কে কী হয়, সেটাই আসল কথা।
তাই বলে আই. এ. এস, আই. পি. এস-দের চাকরির চেয়েও বাঁশের ব্যাবসা ভালো বলছিস? তোর বোধ হয় মাথাটাই গেছে।
নিশ্চয়ই ভালো। ঘুস-ঘাস যদি না খাই। আর ঘুস-ঘাস যদি খেতেই হয়, তবে তো পিলাটিলা স্টেশনের টিকিট, চেকারের চাকরি করলেই হয়। রাত জেগে পড়াশুনো করে কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসার হ্যাপা পোয়ানোর দরকার কী?
তা অবশ্য ঠিক। রীতি বলল। আজকাল ঘুস না খেয়ে ভদ্রলোকের মতো বাঁচাও যায় না। বাঁচা উচিতও নয়। চোরের ওপর রাগ করে মাটিতেই ভাত খাওয়া হয়, তা না হলে।
আচ্ছা রীতি, তোর সীতেশদা। মানে তোর জামাইবাবু; ঘুস-ঘাস খায়? না-রে? নইলে ওই তো মাইনে। এত ফুটানি কী করে করে বল তো? না খেলে?
জানিস রুন, আমাদের কলেজের অমিতাদি না; একটা কথা বলতেন প্রায়-ই। বলতেন: ‘ইফ ইউ ওয়ান্ট টু বি আ লেডি ডোন্ট ডিসকাস রিলিজন, সেক্স অ্যাণ্ড পলিটিকস।’ এরসঙ্গে আমারও একটা সংযোজন আছে। সেটা হল, ডোন্ট ডিসকাস ঘুস-ঘাস। ঘেঁটে দিলে, পদ্মফুলেরও বাহার থাকে না। বুঝলি। আর এ তো, আমার সামান্য এস. ডি. পি. ও জামাইবাবু! বেচারি। তা ছাড়া, তোর এত্তসব খবরে দরকার-ই বা কী? তুই বড়োই ইনকুইজিটিভ। মেয়েদের মতো।
তুই কী? তুই তো ছেলেদের-ই মতো চ্যা-টাং চ্যটাং কথা বলিস সবসময়ে। মেয়েরা মেয়েদের মতো না-হলে ভালো লাগে?
‘মেয়ে মেয়ে’ করবি না বলছি বোকার মতো? কীসের লেখাপড়া শিখলি তা হলে? এই যুগে ছেলে আর মেয়েতে তফাত কীসে?
সব যুগেই ছিল। নইলে আমাদের না-হলে তোদের চলে না কেন?
ভাবিস তোরা তাই। সিলি। মেল শভিনিস্ট পিগস। ইডিয়টিক—
অন্য কথা বল। রুন বলল।
কী কথা? প্রেমের কথা? গান গাইব? ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে?’
এখন কি বসন্ত? ওটা তো বসন্তের গান। তাও জানিস না?
রাখ-না। চিত্তে যখন-ই সুখ তখন-ই বসন্ত। মন যখন-ই উথাল-পাতাল তখন-ই—তুই আর আমি যখন-ই একসঙ্গে; তখন-ই—।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে প্যাডল করতে করতে রুন বলল, ‘বসন্ত’র মানে জানিস?
তা আবার জানি না? একবার আসল, আর দু-বার জল-বসন্ত হয়েছিল।
হেসে বলল, রীতি।
এমন ফাজিল না তুই।
অ্যা-ই! দেখ দেখ কী চমৎকার দেখাচ্ছে রে দেখ বাঁ-দিকে পদ্মবিলটাকে চাঁদের আলোতে। আহা! দারুণ! দাঁড়াবি একটু এখানে? অ্যাই রুন!
ব্রেক করে সাইকেলের গতি আস্তে করে পা-দুটি ঠেকাল মাটিতে রুন।
বলল, এখানে বসবি কোথায়? আচ্ছা ডাকসাইটে মেয়ে যা-হোক।
কেন? বিলের পাশেই বসব।
না, না। সাপখোপ থাকতে পারে। বর্ষা সবে শেষ হয়েছে, একদম-ই নয়। অত কাব্যিতে কাজ নেই।
রীতি, সাইকেলের রড থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল। রুনের মুখের দিকে তাকাল চাঁদের আলোয় চোখ তুলে। বলল, সাপখোপ না ছাই। আসলে তোর আমাকেই ভয়। মাসিমা জানলে বলবেন, রুন! ছি: ছি: রীতির সঙ্গে চাঁদনি রাতে পদ্মবনে? তোমার এতবড়ো অধঃপতন?
রুন কোনো উত্তর দিল না। বলল, এরমধ্যে আমার ভালোমানুষ মাকে একদম টানবি না।
বেশ! কিন্তু তুই কি জানিস পশ্চিমের দেশের ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে দু-জনে মিলে পৃথিবী ঘোরে? একঘরে থাকে।...
এটা তো নিউ-ইয়র্ক বা টোরোন্টো নয়। এটা আমাদের ঝিরাটোলি। একটু ডাউন-টু-আর্থ হ। এই ইংরিজি ম্যাগাজিন আর সিনেমাগুলোই খেল তোদের। ঝিরাটোলির মতো মফসসল শহর থেকে গেছে বলেই তো আমার দাদাটার আদিখ্যেতার শেষ নেই। সাদা মেম দেখে যেন, সাপের পাঁচ-পা দেখেছে। নিজের বাবা-মা-ভাইয়ের কথা আর মনেও পড়ে না।
মন্দ কী! অন্য দেশ, অন্য জীবন; কত্ত স্বাধীনতা। এই ঝিরাটোলির জীবন আবার জীবন নাকি? হুস। তোর দাদাটা বড্ড কালো। আর তোর চেয়েও ক্যাবলা। নইলে তাকেই বিয়ে করে আমিও চলে যেতাম। আমার মায়ের তো আপত্তি থাকত না। ছেলেবেলা থেকেই অমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। তোর মায়েরও থাকত না, বল রুন? এখন ভাবি, গেলেই হত। তোর দাদার ঘাড়ে চেপে ওখানে একবার পৌঁছে গিয়ে তারপর নিজের পছন্দসই কোনো ব্যাচেলার বা ডিভোর্সিকে পাকড়ে নিতাম। নইলে কারো ঘর-ই ভাঙতাম। যারা ঘর না বাঁচাতে জানে, তাদের ঘর তো ভাঙেই। কী বল? ভাঙা উচিত। কী মেয়ে, আর কী ছেলে। আজকের পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী; পার্মানেন্ট নয়। বদলের আর এক নাম-ই তো ‘জীবন’।
তা, গেলি না কেন? আমার মা-বাবার তো আপত্তি হত না কোনোই তোকে বড়োছেলের বউ করতে। গেলেই পারতিস।
পারলাম কই? আসল ব্যাপারটা কী জানিস? তোর কথা ভেবেই যাওয়া হল না।
রুন হেসে ফেলল। রীতির কথার ধরনে। হয়তো কথার হাস্যকরতাতেও।
মুখে বলল, ফাজিল।
কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে জেনেও, মনে মনে খুশি হল খুব-ই।
একটু চুপ করে থেকে রীতি আবার বলল, বুঝেছি। তোর এলেম আমার জানা আছে। নে, চল। হ্যাণ্ডেল শক্ত করে ধরে, উঠছি আবার। এবার সোজা বাড়ি চল। তাড়াতাড়ি। মিছিমিছিই ঘোরাপথ ধরতে গেলি।
সাইকেলের প্যাডলে দু-পা দিয়ে চাপ দিতেই গড়িয়ে গেল চাকা সামনে।
রুন বলল, তুই রাগ করলি রীতি? আমার ওপর?
আমি? কোন দুঃখে? তোর-ই বরং নাম লেখা থাকবে ইতিহাসে।
ইতিহাসে? কেন?
অবাক গলায় রুন বলল।
পুরুষজাতের কুলাঙ্গার বলে, আর কেন? এমন সুযোগ কোনো পুরুষে ছাড়ে? একটা চুমু পর্যন্ত খেলি না তুই? তুই-না...সত্যি। অন্য যেকোনো ছেলে হলে কত কীই করতে চাইত। এমন নির্জনতা, ইন আ লাইফটাইম। তোর বোধ হয়, শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক নেই। কী রে? যাকগে, তুই যাই-ই বলিস, তোর সঙ্গে আমার কলকাতার ন-জ্যাঠাইমার স্বভাবের কিন্তু খুব-ই মিল আছে।
তিনি আবার কে? দেখিনি তো কখনো, তোর...?
তুই আমার কতটুকু-ই বা দেখেছিস?
তোর ন-জ্যাঠাইমার কথা বল। তিনি তো মহিলা।
হ্যাঁ। তাই-ই তো। কিন্তু স্বভাবের খুব মিল তোর সঙ্গে। শুচিবায়ুগ্রস্ত! সবসময়েই সব কিছু ‘গেল গেল’ ভাব। নিয়মিত নীলের উপোস করেন। বাথরুমে গেলেই শাড়ি বদলান। বাথরুমে তো যান, খালি গায়েই গামছা পরে। সে কী দৃশ্য। কেলেঙ্কারি একেবারে। এমন চাঁদনি রাতে পদ্মবিলের পাশে পরপুরুষের সঙ্গে তিনি যদি আসতেন তবে হয়তো তোর-ই মতো বিহেভ করতেন। হুবহু।
আমি তোর ন-জ্যাঠাইমার সঙ্গে চাঁদনি রাতে পদ্মবিলে আসতে যাব কোন দুঃখে। আমার মাথা তো খারাপ হয়নি?
তোর সঙ্গে নাই-ই বা এলেন। ধর আমার সঙ্গেই যদি আসতেন, বলতেন বোস বোস রীতি, যাত্রা, মোটেই শুভ হয়নি। এখন যাওয়া একেবারেই নয়। তারপর-ই ‘গড় গড়’ করে বলে যেতেন:
মঙ্গলে উষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা।রবি শুরু মঙ্গলের উষা আর সব ফাসাফুসা।ডাকয়ে পাখি না ছাড়ে বাসা,উড়িয়ে বসে খাবে করি আশা।খনা ডেকে বলে সেই সে উষা,উড়ে পাখি খায় না। তখনও কেন যায় না?
কী বলছিস তুই এসব? রুন বলল বিস্ময়ের গলায়।
ন্যাকা! হিন্দুর ছেলে, খনার বচন জানিস না? সাধে কি দেশের আজ এই হাল!
তোর ন-জ্যাঠাইমা তোর সঙ্গে এলে, সত্যিই এইসব বলতেন? এখনও এমন মহিলা আছেন দেশে!
ইয়েস স্যার। ভারতীয় গন্ডার এবং খাণ্ডার রমণী যতই দুষ্প্রাপ্য হোক, কিছু কিছু স্যাম্পেল ঠিক-ই রয়ে যাবে। চিরদিন-ই। তবে শুধুই কি খনার বচন? হয়তো শনির পাঁচালি, সত্যনারায়ণের পাঁচালিও পড়তেন। এইখানে বসেই। ভূত-ডামরতন্ত্র থেকেও কিছু মন্ত্র ঝেড়ে দিতেন হয়তো, পদ্মবনের ভূত তাড়াবার জন্যে।
ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, ওর কথা শুনতে শুনতে মুগ্ধতা পেল রুনকে। ঠিক যে-মুহূর্তটিতে রুন নরম সুন্দর কিছু বলবে ভাবছিল রীতিকে, ঠিক সেই সময়েই রীতি বলে উঠল যাকগে যাক। বাজে কথা। একটা চুমু খাবি তো খা তাড়াতাড়ি। আমার সময় বড়ো কম। বলেই, মুখ বাড়িয়ে দিল রুন-এর দিকে।
ই-ই-ই ইয়ার্কি মারিস না! দেখ...
মুখ সরিয়ে নিয়ে, ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ভালো ছেলে রুন।
তারপর-ই একটু সামলে নিয়ে বলল, পরের বাড়ির মেয়ে, তার ওপর এস. ডি. পি. ওর শালি। চুমু খেয়ে মরি আর কী? চল চল যাই। তোকে নিয়ে এই পথে, আসাই ঠিক হয়নি। তুই কখন যে, কী করিস, তার কোনোই ঠিক-ঠিকানা নেই। তা ছাড়া, চিতি সাপের তো আর এস. ডি. পি. ও-র ভয় নেই। সুন্দরীদের পরোয়াও ওরা করে না। ওরা কী করে জানবে যে, তোর সুন্দর পায়জোরপরা পা দু-খানি কোনো জেলে কী চাষির, কী কাঠুরের পায়ের থেকে একটু আলাদা? যদি বা বুঝতেও পারত যে, তুই মেয়ে, তবুও জানত কী করে যে, তুই অন্য দশটা মেয়ের থেকে অনেক-ই আলাদা?
চিতি সাপের কথা ছাড়। তুই নিজেও কি জানিস?
ঠাট্টার গলায় রীতি বলল।
কী?
অবাক হয়ে বলল। রুন।
যে, আমি অন্য দশটা মেয়ের থেকে আলাদা?
ভাগ। আমি কি তোকে কামড়াতাম নাকি?
সত্যিই! তুই একটা ফার্স্ট-ক্লাস ইডিয়ট। মেয়েদের ব্যাপারে অন্তত। পরের বাড়ির মেয়েকে চুমু না খেয়ে, নিজের বাড়ির মেয়েকে চুমু খেতে চায় এমন ছেলে তোর মতো আর দেখিনি। নিজের বাড়ির মেয়েটি কে? মাসিমা ছাড়া আর দ্বিতীয় মহিলা তো নেই বাড়িতে। সহেলি নাকি?
কে সহেলি?
চমকে উঠে বলল রুন। তারপর-ই বলল, কী রুচি! তা ছাড়া ওর নাম ঝারিয়া। ছি:।
সরি। তবু নাম, যাইহোক। বেশ তো চেহারাটি। তোর সঙ্গে তাকে বাজারে দেখিনি সেদিন? সহেলির মতো ব্যবহার যে, করে সেই তো ‘সহেলি’।
তোর রুচি বড়ো খারাপ হয়ে গেছে, রীতি।
তা গেছে। নইলে তোর সঙ্গে এই পথে আসি? রিহার্সাল যারাই এসেছিল, তারা সকলে তো বলবেই, তুই আমাকে একেবারে চেটেপুটে খেয়েছিস, এই পথে একা পেয়ে। তারা কি আর বলতে ছাড়বে? তোর জন্যে মিছিমিছি আমার মানও গেল অথচ লাভও হল না কিছুই।
ঠিক এমন সময় পেছনে দ্রুত-আসা সাইকেলের চাকার ‘সর সর’ শব্দ শোনা গেল। তিন-চারটে সাইকেল একসঙ্গে আসছে।
কারা রে? রিহার্সালের দল-ই কি?
ভয়ে, লজ্জায় মুখ শুকিয়ে গেল রুন-এর।
না। আহীরদের সাইকেল। বোধ হয় গাড়োয়াড়িতে দুধ বিক্রি করে ফিরে আসছে।
ওরা জোরে প্যাডল করে চলে যেতে যেতে, কৌতূহলে তাকালই শুধু! মুখে কোনো কথাই বলল না।
কলেজের ছেলেরা হলে বিচ্ছিরি আওয়াজ দিত না রে? আজকাল যারা লেখাপড়া শেখে, যারা শিক্ষিত; তারাই সব ছোটোলোক। আর যারা অশিক্ষিত, তারাই ভদ্রলোক। ব্যাপারগুলো কেমন উলটেপালটে গেছে।
রীতি বলল, স্বগতোক্তির মতো।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রুন জোর প্যাডল করে বড়োরাস্তার দিকে এগোতে লাগল। এবারে আলো দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে শহরের ওপরের আকাশে একটি বৃত্ত আলোর আভাসে আভাসিত দেখা যায়। মনে হয় যেন, হাজার হাজার এমনি আর লাল-নীল দেশলাই জ্বালিয়েছে নীচে কেউ। রাতের বেলায়, বড়ো ছোটো সব শহরকেই দূর থেকে তাদের ওপরের আকাশের বলয়ের রং দেখে চেনা যায়।
রীতি বলল, অনেক ধন্যবাদ। এখানেই নামিয়ে দে। শহরে ঢুকে আর কাজ নেই। কলঙ্ক যা লেগেছে তা অন্ধকারেই ফেলে যাই।
কেন? বড়োরাস্তায় পৌঁছোই, তারপর-ই নাম না হয়।
যা বলছি, তাই-ই কর তো! বেশি বুঝিস তো তুই! আমার সঙ্গে বড়োরাস্তায় তোকে এই সাইকেলে এই পদ্মবিলের পথ থেকে এতরাতে উঠে আসতে দেখলে। তোর বদনাম হয়ে যাবে। বিয়ে হবে না কোনোদিনও! আমার তো বদনাম আছেই। আমার জন্যে তোর চরিত্রটা নষ্ট করবি কেন?
রুন ব্রেক করে সাইকেলটা থামাল।
রীতি লাফিয়ে নেমে পড়ল।
বলল, তুই এখানেই থাক। অন্ধকারে। আমি চলে গেলে তার পাঁচ মিনিট পরে এসে উঠিস রাস্তাতে। ততক্ষণে সিগারেট খেয়েনে একটা। ভেবেছিলাম আমিও খাব একটা। সময় নেই।
ধন্যবাদ। কী করব না করব সে, আমি বুঝব। এখন যা।
যাওয়া নেই রে রুন। আসি! ভালো থাকিস। চরিত্র সবসময়ে এমন-ই অকলঙ্ক রাখিস। ঘরে ঘরে তোর মতো ছেলে হোক। সিরিয়াসলি বলছি। যা তোর দোষ তাই-ই তোর গুণ। সত্যিই রে।
বলেই, রীতি চলে গেল।
পেছন থেকেও রীতিকে দেখতে দারুণ লাগে। ওর হাঁটা, চলা, কথা বলা, চোখ তাকানো, গলার স্বর, রুনকে বড়ো আচ্ছন্ন, অভিভূত করে দেয়। কে জানে? একেই ‘ভালোবাসা’ বলে কি না? ওকে রোজ-ই একবার অন্তত না দেখতে পেলে মন বড়ো খারাপ লাগে। আর দেখা হলে, ওর কাছ থেকে চলে আসতেও ইচ্ছে করে না। জেগে থাকার সময়ে, ঘুমের মধ্যে, ঘুমিয়ে পড়ার আর ঘুম ভাঙার মুহূর্তটিতেও রীতি। রীতিময় জীবন রুন-এর। অথচ মুখ ফুটে একটা কথাও বলতে পারে না। মন যা-কিছুই বলতে চায় মুখ ঠিক তার উলটোটাই বলে।
ভীষণ কষ্টে আছে রুন। কিন্তু রীতি যদি নিজেই না বোঝে, মানে রুনের মনের কথা, রুন কোনোদিন-ই বলতে পারবে না।
বলতে পারবে না মুখ ফুটে যে, আমি তোমাকে...
অনেক-ই রিহার্সাল দিয়েছে। দেয় প্রতিদিন-ই। কী করে কী বলবে রীতিকে কিন্তু বলতে পারে না কিছুতেই। রীতি হয়তো হেসেই গড়িয়ে পড়বে। হয়তো ওর মাথায় মেরে দেবে এক চাঁটিই। ওকে কিছুই বিশ্বাস নেই। ওকে তো বোঝা যায়-ই না, নিজেকেও যে, মেলে ধরবে ওর কাছে তাও হয়ে উঠল না...।
বলতে পারব না মুখ ফুটে যে...
দিন চলে যাচ্ছে একটার পর একটা। সপ্তাহ...মাস...বছরও।
তক্ষ রায় ‘চার্মস’ সিগারেটের অবশিষ্টাংশটি অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিল। তারপর-ই তার বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীতে যতখানি বিরক্তি ও হতাশা ধরে তার সবটুকু দিয়ে সিগারেটের শেষাংশটিকে টিপে ধরে থেকে দমবন্ধ আগুনের প্রাণকে নি:শেষ করে দিয়ে, চেয়ারটাতে এলিয়ে দিল নিজেকে। দু-টি হাত মাথার ওপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙল দু-বার। চেয়ারে, সেই সকাল থেকেই বসে আছে। ব্যথা করছে কোমরটা।
জানলা দিয়ে সামনের ঝাঁটি জঙ্গল-ভরা মাঠটি দেখা যাচ্ছে। এই মাঠ কিছুদূর ঢালুতে গড়িয়ে গিয়েই খোয়াইয়ে পৌঁছেছে। তারপর-ই ‘কারো’ নদীতে গিয়ে মিশে গেছে গাছগাছালির মধ্যে মধ্যে। মাঠ থেকে একঝাঁক শালিকের ‘কিচিরমিচির’ ডাক উঠে আসছে শুকিয়ে যাওয়া গোবরের গন্ধের সঙ্গে। হাওয়ায় ভেসে নয়; কারণ হাওয়া এখন নেই। নদী থেকে জলের গন্ধ উড়ছে আলতো ডানায়। ছল-মেশানো গ্লাস থেকে রামের গন্ধ যেমন করে ওড়ে। শেষভাদ্রর সকালবেলায় ঝিকমিকে রোদকে তার গাঢ় নীল ডানা দুটি-র চকিত চমকে হেলাফেলায় হঠাৎ-ই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিল মাছরাঙাটি। তারপর-ই হিরের-ই মতো ছিটকে-ওঠা জলের অসংখ্য কণাতে ভিবজোরের সাতরঙা রামধনু তুলে সেই তরুণী তার শিশুর জন্যে একটি পুঁচকি রুপোলি পাহাড়ি কুচোমাছ উড়িয়ে নিয়ে গেল ঠোঁটে করে বহুপুরোনো আমগাছটার গভীর কোটরের দিকে; এত রঙিন আলো ছেড়ে, প্রায়ান্ধকার কালো কোটরে, সেখানে তার নরম পালকভরা আত্মজা, পুলক-ভরে মুখ ‘হাঁ’ করে আছে মাছরাঙার গায়ের গন্ধে ‘ম-ম’-করা কোটরভরা উষ্ণতায়।
‘রূপমতী’ নাটকের সংলাপের নবীকরণে গভীরভাবে ডুবে-থাকা তক্ষ রায়ের ক্লান্ত, অবসন্ন, বিরক্ত একা-মনকে এই প্রভাতি প্রকৃতির ছবিটি হঠাৎ-ই এক অনাবিল আনন্দে ভরে দিল। ভালো লাগল খুব-ই। অথচ এই আনন্দে তার এক্তিয়ার কিছুমাত্রই ছিল না।
আনন্দ, তক্ষ রায়ের এই একাকী জীবনে যে নেই, তা নয়; কিন্তু তার অনেকখানিই আবিলতা মাখা। এমন অনাবিল আনন্দ শুধু গর্ভধারিণী মা আর প্রকৃতি-ই কোনো মানুষকে দিতে পারে। উদাস হয়ে এল ওর চোখের দৃষ্টি। জানলার মধ্যে দিয়ে প্রতিসৃত হয়ে আসা সকালবেলার আলোছায়ার ছবি আস্তে আস্তে ফেড-আউট করে যেতে লাগল মণি থেকে। আউট-অফ-ফোকাস হয়ে গেল সব।
তক্ষ রায়কে যখন ভাবনাতে পায়, অলস ভাবনায়; তখন এমন-ই হয়।
রীতি আজ আসবে বলেছিল।
কে জানে? আসবে কি? যদি আসে, হয়তো খেয়েদেয়েই আসবে। থাকবে, সারা দুপুরটাই।
বয়েসে, তক্ষ রীতির চেয়ে অনেক-ই বড়ো। কিন্তু ও বুঝতে পারছে ক্রমশই এই নবীন যুবতী রীতির প্রতি ওর এক তীব্র আসক্তি জন্মে যাচ্ছে। ওকে কেমন এক অসহায়তার বোধ আচ্ছন্ন করে ফেলে যখন-ই রীতি একা থাকে ওর কাছে। এই বোধ, কোনো রোমান্টিক আসক্তির নয়। শারীরিক। পুরোটাই। এবং সেটাই ভীষণ ভয়ের। তক্ষর কাছে।
এক নির্জনে, একা-বাড়িতে একা-পুরুষের শরীরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রুখু, উপোসি তক্ষকটা যেকোনো মুহূর্তেই যে, ওকে ছোবল দিতে পারে তা যে, রীতি বোঝে না এমনও নয়। খুব-ই বুদ্ধি ধরে ও। মাঝেমাঝেই তক্ষর গোলমাল হয়ে যায় যে, রীতি মেয়েটিকেই ও পছন্দ করে, না তার বুদ্ধিকে!
রীতি আসে। ভয়ডর নেই ওর। রীতি কোনো রীতিনীতির-ই পরোয়া করে না।
তবু এই বেলা না এসে ভালোই করেছে। এই নাটকটা নিয়ে তক্ষ বড়োই কষ্টে আছে। বেশিটাই বিভ্রান্তি এবং সামান্য ভয়েও। অথচ কষ্ট থাকে বলেই, সৃষ্টিশীলতার কাজমাত্রতেই এত আনন্দ। টাকা রোজগার করতেও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়। অনেক মানুষকেই অনুক্ষণ টাকার পেছনে হাঁস-ফাঁস করে দৌড়ে বেড়াতে দেখে, তাদের কষ্টর কথাটাও বোঝে তক্ষ। কিন্তু একটি উপন্যাস বা গল্প বা নাটক লেখার যে-কষ্ট, সেটা একেবারেই অন্যরকম কষ্ট। আনন্দময়; অনিকেত কষ্ট; যে-কষ্ট হৃদয়নন্দনবন থেকে উঠে হৃদয়নন্দনবনেই হারিয়ে যায়।
এই কষ্টে ও ক্লিষ্ট থাকে সবসময়েই অথচ ভাবে এই কষ্টটুকু না থাকলে, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার কোনো বিশেষ দাবি কী থাকত আদৌ?
যার মহড়া দিচ্ছে বোকারা তার স্ক্রিপ্টটাই ঘষা-মাজা করে দিচ্ছে ও। মাঁলোয়ার শাসকদের ওপরেই এই নতুন নাটকটির খসড়া করেছিল। বিশেষ করে রূপমতী আর বাজবাহাদুরকেই মুখ্য করে। কিন্তু এই নাটকে পুরোপুরি নতুন কিছু কথাও বলতে চেয়েছিল ও। এ নিছক-ই একটি ঐতিহাসিক নাটক নয়। অবশ্য প্রত্যেক নাটকেই নাট্যকারোত্রের নতুন কিছু বলতে চান। কিন্তু শেষপর্যন্ত বলতে পেরে ওঠেন কি না এবং যা বলতে চাইছেন তা, দর্শকদের কাছে পৌঁছোচ্ছে কি না সেইটাই প্রশ্ন।
এই ছোট্ট নাটকটির ঘটনাকাল মাত্র চোদ্দো বছরের। পনেরো-শো সাতচল্লিশ থেকে পনেরো-শোএকষট্টি খ্রিস্টাব্দ। পিরিয়ড-কস্টিউমের-ই বা পিরিয়ড-ফার্নিচারের-ই মতো পিরিয়ড ড্রামারও এক বিশেষ ছাপ তক্ষ রায় এই নাটকে ফেলতে চেয়েছিল। এবং এই ঘষা-মাজা করার সময়েও সে-কথা মনে রাখছে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন ভূমিকায় দেখেছেন রূপমতীকে। এবং বাজবাহাদুরকেও। রূপমতীর মৃণালভুজে আশ্রয় নেওয়া বাজবাহাদুরকে ঐতিহাসিকেরা কেউই ক্ষমা করেননি। মাণ্ডুর অপরূপ সুন্দর এবং প্রায়-দুর্ভেদ্য পৃথিবীবিখ্যাত দুর্গের বিস্তীর্ণ এলাকার সুপ্রাচীন খুরসানি ইমলি বা বাওবাব গাছগুলি এখনও সেইসব কথা এবং স্মৃতি মনে করে রেখেছে। তাদের মসৃণ অতিকায় বুকের গভীর সব গহ্বরে জমিয়ে রেখেছে রূপমতী আর বাজবাহাদুরের প্রণয়গাথা, গান-বাজনা, বর্ষারাতের জেহাজ-মেহালের আলো-জ্বালা-রূপ। রাবাবের গম্ভীর আওয়াজ আর রূপমতীর গলার গান আজ ইতিহাস-ই হয়ে গেছে। মাঁলোয়ার গ্রামে-গঞ্জে আজও রূপমতী-বাজবাহাদুরের স্মৃতি লোকগীতি হয়ে বেঁচে আছে সাধারণ মানুষেরও কাছে। স্বয়ং জাঁহাপনা জাহাঙ্গিরও অনেকবছর পরে মাণ্ডুর রূপবর্ণনা করে গেছেন তাঁর রোজনামচাতে।
আর্নেস্ট বার্নস-এর ‘ধার অ্যাণ্ড মাণ্ডু’, এল. এম. ক্যাম্পের বিখ্যাত বই ‘দ্যা লেডি অফ দ্য লোটাস’, ফরিস্তার ‘তারিখ-ই-ফরিস্তা’, ডাবলু হেইগের ‘দ্যা কিংডম অফ মাঁলোয়া’, মেজর লুয়ার্ডের ‘ধার অ্যাণ্ড মাণ্ডু’ এবং জি. ইয়াজদানির ‘মাণ্ডু’ পড়ে দেখেছে তক্ষ এই নাটক লেখার আগে।
পড়ে দেখেছে, কারণ ও বুঝেছে যে, ঐতিহাসিক নাটক লেখা যত সহজ ভেবেছিল, তত সহজ নয়। একটি বিশেষ সময়কে, সেই সময়ের তুচ্ছ এবং মহৎ ঘটনাবলি, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুষঙ্গ, আবহাওয়া, নর-নারীর চেহারা, পোশাক, মেজাজ সবকিছুর-ই পটভূমিতে নাটকের মূলবক্তব্য বা ‘প্রতিপাদ্য’ বিষয়কে নিপুণভাবে প্রতিভাত এবং প্রতিষ্ঠিত না করতে পারলে, নাটক লেখার মানেই হয় না কোনো।
সম্পাদক এবং নিউজ-চিফ-এর নির্দেশে পাতার পর পাতা লিখে যায় যে-হাতে, যে-হাত দিয়ে সব অর্ডারি অর্থহীন লেখালেখি করে, সেই হাতের মধ্যে বোধ হয়, কোনো অদৃশ্য ব্যাটারিই লাগানো আছে। তক্ষ রায়ের সমালোচকেরা অন্তত তাই-ই বলেন। কিন্তু সেই হাতটিকে তো জীবিকার জন্যে বিকিয়েই দিয়েছে ও। ওর সমালোচকেরা যা, জানেন না, তা হচ্ছে, এই-ই যে, তার ডান হাতটির-ই বাইরের অবয়বের মধ্যে একটি, অন্য হাতও লুকোনো আছে। যেবিশেষ হাতে ও কখনোই অর্ডারি লেখা লেখে না। লেখে না, অসুস্থ ‘তোল্লাই’ এবং ‘ফেল্লাই’ সমালোচনাও। সে হাতে ও ভাত মেখে খায় না। এমনকী আত্মরতিতেও লিপ্ত হয় না কোনোদিন। সিগারেটও ধরে না, সে-হাতে। সেই হাতে কোনো উচ্চাশা বা হতাশা লাগে না আজ পর্যন্ত। যে-হাত শুধুমাত্রই অনাবিল আনন্দ গ্রহণ ও বিকীরণের-ই হাত, সেই হাতটি দিয়েই ও মাঝে মাঝে অখ্যাত লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে অবিজ্ঞাপিত কোনো ক্বচিৎ ধ্রুপদি উপন্যাস লেখে; অথবা লিখতে চায়। আর এই ‘রূপমতী’ নাটকের-ই মতো কোনো নাটক।
সেই দ্বিতীয় হাতটির কথা, সে নিজে আর প্রথম হাতটি ছাড়া তৃতীয় কেউ-ই কিছুমাত্র জানে না।
তক্ষ রায় ‘রূপমতী’ নাটকের মূল ‘প্রতিপাদ্য’ বিষয় হিসেবে যা, প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তা কিন্তু রূপমতী-বাজবাহাদুরের প্রণয়গাথা নয়। তা একেবারেই অন্য। চোদ্দো বছরের ঘটনাকাল অথবা মূলঘটনাগুলিও এই নাটকের মধ্যে আসলে গৌণই করে তুলেছে ও। যা তক্ষ, এ নাটকে দর্শকদের বোঝাতে চাইছে তা হল, কোনো মানুষ-ই খারাপ নয় প্রত্যেক মানুষের-ই একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘পয়েন্ট অফ ভিউ’ আছে। সেটি বুঝতে পারলে, তাকে আর খারাপ বলে মনে হয় না।
এ ছাড়াও ‘বাজবাহাদুরের’ চরিত্রর মধ্যে দিয়ে ও বোঝাতে চেয়েছে, কোনো পুরুষ-ই আসলে কোনো নারীকে কোনোদিনও স্বার্থহীনভাবে ভালোবাসেনি। সেই ধরনের ভালোবাসা, যুগে যুগে শুধুমাত্র মেয়েরাই বেসে এসেছে পুরুষদের। মেয়েরা যা পারে; পুরুষরা তা কোনোদিনও পারেনি।
দিল্লির বাদশা আকবরের পাঠানো সেনাপতির তাড়া খেয়ে বাজবাহাদুর যখন মাণ্ডু ছেড়ে পালিয়ে গেলেন প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তখন, রূপমতীকে সঙ্গে নিয়ে যাননি। তাঁর গায়িকা সঙ্গিনী, তাঁর নর্মসহচরী হিন্দু রূপমতীকে সহজেই ভুলে গেছিলেন তিনি। রূপমতীর দাম যে, কত ছিল তাঁর কাছে তা, এ থেকেই বোঝা যায়।
বাজবাহাদুর একজন পুরুষ-ই তো!
চেয়ার ছেড়ে এবার উঠল ও। বুঝতে পারছে যে, চিন্তা বড়োই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাইরের প্রকৃতি যেদিন এমন শান্ত থাকে, স্নিগ্ধ সুগন্ধি নির্জনতা চারদিকে; কাছেও কেউ-ই নেই, থাকে না, তখন ঠিক সেই সময়েই, তার ভেতরে এমন এলোপাথাড়ি আঁধি বইতে থাকে।
নাটকের ‘প্রতিপাদ্য’ বিষয়ের-ই মতো একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চিন্তাও যদি ‘প্রেমাইসলেস’ হয়ে ওঠে অথবা ‘অফ ডুয়াল-প্রেমাইস’, তাহলে নাটকের-ই মতো, চিন্তাও স্বভাবতই ‘কনফিউজড’ হয়ে যায়।
যেকোনো নাটকের-ই ‘থিম’ বা বক্তব্যটাই আসল। নাট্যকারেরা ও নাট্যশাস্ত্রবিদেরা বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করেছেন নাটকের এই ‘প্রতিপাদ্যকে’। ডাবলু. টি. প্রাইস. ব্রাণ্ডার ম্যাথুজ এবং উইলিয়াম আর্চার তিনজন-ই এর নাম দিয়েছেন ‘থিম’। হাওয়ার্ড লসন বলেছেন, ‘রুট আইডিয়া’। লাগোস এগরি আবার একেই বলেছেন, ‘প্রেমাইস’। মেলেভিনস্কি বলেছেন, ‘বেসিক ইমোশান’। কিন্তু যিনি যে-নামেই ডাকুন-না কেন, সকলেই একবাক্যে মেনে নিয়েছেন যে, ‘আ প্লে উইথ মোর দ্যান ওয়ান প্রেমাইস ইজ নেসেসারিলি কনফিউজড’। এ-কথা তক্ষও ভালো করে জানে। এবং জানে বলেই ‘রূপমতী’ নাটকের মূলপ্রেমাইসটি করেছে এইরকম: পুরুষ, সে রাজাই হোক কী প্রজাই হোক, গুণীই হোক কী নির্গুণ-ই হোক ভালোবাসার বোঝে না কিছুই। মেয়েরা তাদের চোখে শুধুমাত্রই ভোগ্যপণ্য। রাবার ডল। পুরুষ, নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই ভালোবাসেনি কোনোদিনও।
এই প্রেমাইসটিকেই চোদ্দো বছরের সময়কালে নিবদ্ধ মাণ্ডুর পটভূমিতে মাঁলোয়ার নবাবদের উত্থান, পতন, খুনখারাপি, ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র-ফাঁস, মৃত্যুদন্ডাদেশ; ভোগ-বিলাস ইত্যাদি অনুষঙ্গর মধ্য দিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছে ও।
সাধারণ দর্শক টিকিট কেটে দেখে যাবেন মাণ্ডুর অনিন্দ্যসুন্দর সেট, রূপমতীর রূপের ছটা। সুরেলা গান। বাজবাহাদুরের নবাবি বিলাসের রকমসকম। নাটক দেখে বেরিয়ে তাঁরা উৎফুল্ল মুখে বলবেন: ‘পয়সা উসুল’।
কিন্তু অসাধারণ, বাহ্যিক অভিব্যক্তিহীন; মুষ্টিমেয় দর্শক কিছু ভাবতে ভাবতে বাড়ি যাবেন। তাঁদের জন্যই নাটক লেখেন কোনো সিরিয়াস নাট্যকার। যেমন এইরকম মুষ্টিমেয় অসাধারণ পাঠকদের জন্যেই সৃষ্টি করেন সাহিত্য; একজন সৎ সাহিত্যিক।
তক্ষ রায় সেই শ্রেণির আঁতেলদের দলে কোনোদিন-ই পড়তে চাননি, যাঁদের সৃষ্টির অসাধারণত্বর বর্ম সাধারণ পাঠক বা দর্শকদের পক্ষে একেবারেই দুর্ভেদ্য। যাঁদের মানসিকতার কণ্টকাকীর্ণতা সাধারণের অন্বিষ্ট তো নয়ই বরং রীতিমতো অগম্যই। তাই-ই সাধারণ এবং অসাধারণ সবরকম দর্শকের জন্যে দুই-স্তরে ফুটিয়ে তুলতে চায় ‘রূপমতী’ নাটকটিকে তক্ষ।
যাঁর মস্তিক যতটুকু নিতে পারে, ততটুকু নিয়েই ফিরে যাবেন তিনি। কিন্তু খুশি হবেন সকলেই।
তবেই না নাটক, নাটক হয়ে উঠবে।
‘নাটক’ ব্যাপারটির মধ্যে একধরনের সর্বজনীনতার গন্ধ পায় ও। লেখালেখির ক্বচিৎ ক্ষেত্রে ওর সাহিত্য তবু নাক-উঁচু, সাধারণের কষ্টবোধ্য হলেও বা হতে পারে; কিন্তু নাটক যখন লিখল, তেমন নাটক কখনোই লিখতে চায়নি যা সকলের পক্ষে একসঙ্গে বসে উপভোগ করা সম্ভব নয়। দ্বিস্তর হলেও; নাটক যেন, ছোঁয় সকলকেই, এই বাসনা ছিল।
সত্যিই খুব নার্ভাস লাগছে। নবীকরণের কাজ সবে শেষ হল। এরপর ফেয়ার করবে। তারপর একে মহড়াতে নিয়ে গিয়ে ফেলতে হবে। মহড়ার ধোপে না ফেললে কোনো নাটকেই রং পাকা কী কাঁচা তা বোঝা পর্যন্ত যায় না। তার ওপরে বোকার ‘বোকা বোকা’ উত্তেজনাও থাকবে। ব্যাপারটাকে তালগোল পাকাবার জন্যে যা যথেষ্ট। অনেক-ই কথা বলবে বোকা, নাটক এবং পরিচালনা সম্বন্ধে, যেসবের মানেই হয় না। যেমন ও বলবেই যে, পনেরো দিন রিহার্সালের পর নাটক বদলাবার কি মানে হয়? ইত্যাদি ইত্যাদি...
যাই-ই হোক। যা হবে, তা হবে। ওর নাটক-ই যদি ভ্রাতৃসংঘ করতে চায় তবে এই ‘রূপমতী’ নাটক-ই করতে হবে তাদের। না করলে, অন্য আর কোনো নাটক-ই লিখে দেবে না বোকাদের কোনোদিনও।
এতখানি শক্ত ও পিটপিটে না হলেও চলত এ-ব্যাপারে। কিন্তু তক্ষর ব্যক্তিগত জীবন-ই তাকে, এমন অবুঝ, জেদি এবং একগুঁয়ে করে তুলেছে। জীবনে সে অনেক কিছুই পায়নি। অন্যভাবে বলতে গেলে ওর সমস্ত জীবনটাই ‘সমঝোতা’-রই সংজ্ঞা যেন। অথচ জীবনে শান্তি চেয়ে কেবল যুদ্ধই পেল। তবুও সাদা পতাকা তুলে পিছিয়ে আসতে আসতে এখন একেবারেই দেওয়ালে পিঠ লাগিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আর একটুও পেছোনোর জায়গা নেই। জীবনের বেশিক্ষেত্রেই হেরে গেল বলেই সামান্য কিছুক্ষেত্রে অন্যর জমির জবরদখল নিয়ে একধরনের ভারসাম্য আনতে চায় তক্ষ ওর জীবনে।
ভেতরে গিয়ে এবারে র্যাপারটা নিয়ে এল। ঋতু বদলাচ্ছে। কিশোরীর মতো মেজাজ তার। সমীহ না করলেই নির্ঘাত জ্বর।
কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল। সকালে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ঝকঝকে রোদও উঠেছিল। হাওয়াও ছিল না একটুও। এই সময়ে হাওয়া থাকার কথাও নয়। কিন্তু কিছুক্ষণ হল আবারও মেঘলা করে এসেছে। ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে একটা। ভাদ্র-আশ্বিনের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কেউ কলিংবেল টিপছে। দরজা খুলে দেবে কি সে? কাকে?
শরৎ এসে গেল। ‘এসো শরতের অমল মহিমা।’
বাবা। খেতে এসো। রীতি ডাকল প্রসূনবাবুকে।
আসছি মা।
সাবধানে এসো। রসিয়ার হাত থেকে সরষের তেল পড়ে গেছিল খাবার ঘরের দরজার কাছে। মেঝেটা এখনও পেছল হয়ে আছে।
সারাদিন-ই বইপত্রর মধ্যেই ডুবে থাকেন প্রসূনবাবু। যতদিন অধ্যাপনা করেছিলেন ততদিন যে-বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন সেই বিষয়ের মধ্যেই গভীরভাবে ডুবে থাকতেন। যেসব ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে নিতে চাইত কিছু, তাদের যাতে অদেয় কিছুমাত্রই না থাকে; তার-ই আপ্রাণ চেষ্টা করতেন!
অধ্যাপনা আর অন্য জীবিকার মধ্যে যে-তফাত আছে গভীর, তা জেনেশুনেই তিনি অধ্যাপনার জীবন-ই বেছে নিয়েছিলেন। অন্য জীবিকাতে, কে কতটুকু নিংড়ে নিতে পারে জীবিকা থেকে তার-ই ক্রুর এবং নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতাতে লিপ্ত হওয়ার আর এক নাম-ই ‘সাফল্য’। আর অধ্যাপনাতে অধ্যাপক কত নি:স্বার্থভাবে একটুও বাকি না রেখে, নিজেকে ‘নি:স্ব’ করে দিতে পারেন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাই-ই সাফল্যর সমার্থক। ইনক্রিমেন্ট নয়, পারকুইজিটস নয়, মুনাফা নয়, অর্থের জন্য, স্বাচ্ছল্যর জন্য, ক্ষমতার জন্য যূথবদ্ধ জানোয়ারদের মধ্যে, কে ‘যূথপতি’ হবে, সেই যুদ্ধে পণ করা নয়; এ-জীবিকা, মানুষ গড়ার জীবিকা। সভ্যতার সংস্কৃতির জিগীষার পতাকাকে অসংখ্য উজ্জ্বল চোখের আর উন্মুখ মনের তরুণ-তরুণীদের মনের মধ্যে প্রোথিত করে দেওয়ার-ই জীবিকা।
এইসব নরম রঙের পতাকা দেখা যায় না। হাওয়াতে এই পতাকাগুলি আন্দোলিত হয় না কখনোই। পর্বত চুড়োয় অথবা সুমেরু কুমেরুর তুষারের ওপর গর্বভরে দাঁড়িয়ে রঙিন উইণ্ডচিটার আর সানগ্লাসপরা ফোটোতে কোনো ফোটোগ্রাফার বা ভিডিয়ো ক্যামেরাম্যান-ই তাঁদের দামি ক্যামেরার লেন্সে গেঁথে রাখেন না, সেই দুর্মর কৃতিত্ব। কলেজ ছেড়ে যাওয়ার দশ, বা কুড়ি বা ‘তিরিশ বছর পরেও কোনো রেলগাড়ির কামরাতে, কোনো ধূলিধূসরিত পথে বা বাজারের চিৎকারের মধ্যে হঠাৎ কোনো কৃতী ছাত্র বা ছাত্রী মলিন বেশ-পরা, ছিঁড়ে-যাওয়া চটি-পরা, বাহ্যিকভাবে জরাজীর্ণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মতো প্রসূনবাবুর পায়ে যখন, হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করে, শুধোয়; কেমন আছেন স্যার? তখন মাইনাস টেন পাওয়ারের চশমা-পরা প্রসূনবাবু সেই ছাত্র বা ছাত্রীর ভুলে-যাওয়া তরুণ মুখচ্ছবিকে খুঁজতে চেষ্টা করেন শেষযৌবন বা প্রৌঢ়ত্বর আঁচলাগা সামনে দাঁড়ানো মুখটির মধ্যে। মস্তিষ্কের মধ্যে আচম্বিতে ফ্ল্যাশব্যাক ঘটে যায়। অস্ফুটে বলেন, কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে কে তুমি? সুগত কি? প্রণতি?’
না স্যার, আমি ধরণী।
আমি মৈত্রেয়ী স্যার।
জড়িয়ে ধরেন প্রাচীন বটবৃক্ষ তাঁর অলক্ষ্যে বেড়ে-ওঠা পুষ্ট ঝুরিগুলিকে! হাসিমুখে বলেন : কেমন আছ? আছ কেমন তোমরা?
কেউ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার। কেউ বা কোনো ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ। কেউ বা ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার। কেউ মস্ত বড়োডাক্তার। হাসি ফুটে ওঠে প্রসূনবাবুর মুখে। বলেন, ‘বা: বা:।’ তাঁর সমস্ত জীবনের সাধনা এঁদের মধ্যে প্রতিফলিত দেখতে পান।
এই-ই তাঁর পুরস্কার।
‘আপনার জন্যে কি কিছু করতে পারি স্যার?’ কেউ হয়তো বলে!
আমার জন্যে?
অবাক হয়ে মুখ তুলে, চশমার মধ্যে দিয়ে তাকান প্রসূনবাবু!
ওরা কি ওঁর মলিন বেশ আর ধূলিধূসরিত ছেঁড়া চটিটুকুই দেখতে পেল? তাঁর বুকের মধ্যে কী অসীম ধনরত্ন, কত যে, মণিমাণিক্যের ভান্ডার এখনও সজাগ মস্তিষ্কর মণিকোঠায় তা কী অনুভব করতে পারল না? মানুষ কী ধনী বা দরিদ্র শুধুমাত্র অর্থ দিয়েই হয়? ‘অর্থ’ই কি সার্থকতার একমাত্র মাপকাঠি? হয়তো এ-যুগে তাই-ই। প্রসূনবাবুদের যুগে তেমন ছিল না। তখন গুণীরা সম্মান পেতেন। নির্গুণ অর্থবানকে তার যথার্থ আসনেই বসাত সমাজ-সংসার। অধ্যাপক জামাতা পেলে শ্বশুর-শাশুড়ির গর্বে পা পড়ত না সেদিন।
দেশ যখন স্বাধীন হল, তখন প্রসূনবাবু প্রথম বর্ষর ছাত্র কলেজের। সেই সময়ে ভারতের বড়োলাট, ইংল্যাণ্ডের রাজা জর্জ দ্যা সিক্সথকে ভারতের স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে একটি রিপোর্টে বলেছিলেন : ‘উই হ্যাভ ডান দ্যা ওয়ারস্ট ইন দ্যা ফিল্ড অফ এডুকেশন ইন ইণ্ডিয়া। উই হ্যাভ গিভিন দেম এডুকেশন অফ লেটার্স বাট নট অফ ক্যারেক্টার।’
বিদেশি শাসকের মুখপাত্রর লেখা এই কথা ক-টি পড়ে হাসি পেয়েছিল প্রসূনবাবুর। চরিত্র তৈরি হয়ে গেলে তো সেইসব চরিত্রবান মানুষদের প্রজা করে রেখে, শোষণ করতে তাদের-ই বড়ো অসুবিধে হত! এবং সে-কারণেই এদেশীয়দের মধ্যে চরিত্র গঠনের কোনো চেষ্টাই ছিল না তাঁদের। প্রসূনবাবু যখন অধ্যাপক হলেন, স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন এই-ই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। ‘চরিত্র’ তৈরি করা, নিছক ভালো ছাত্র-ছাত্রী, তোতাপাখি তৈরি করা নয়।
এই ‘চরিত্র’ শব্দটার প্রতিও প্রসূনবাবুর কোনো মধ্যযুগীয় শুচিবায়ুগ্রস্ততা ছিল না। কোনোদিনও। আজকের আমূল পরিবর্তিত সামাজিক ও অর্থনেতিক অবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রাকবিবাহ সহবাসকে তিনি যতখানি-না দূষণীয় মনে করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দূষণীয় মনে করেন যখন লক্ষ করেন অন্যান্য স্খলন। প্রসূনবাবু যখন দেখেন যে, ছাত্র-ছাত্রীরা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বাবা-মাকে দেখে না; যখন দেখেন, কোনো স্বাস্থ্যবান ছাত্র ভিড়ের বাসের একটি সিট খালি হতেই, নিজের শারীরিক বলের কারণেই কোনো অশক্ত, বৃদ্ধা বা অবলা অপরিচিতা নারীকে কনুইয়ের গুঁতোয় সরিয়ে দিয়ে, সেই সিটে বসে পড়ছে, তখন-ই তাঁর মনে হয় যে, এরা চরিত্রহীন। ‘চরিত্র’ কথাটার অর্থ, এই আধুনিক যুগে একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেছে। এই বাসযাত্রী ছাত্র, তাঁর চোখে অনেক-ই বেশি চরিত্রহীন। প্রাকবিবাহ সহবাসে দোষী ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে।
বোসো বাবা।
রীতি চেয়ারটা টেনে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
বসলেন, প্রসূনবাবু।
রসিয়া! খাবার আমি গরম করে এনেছি। তুমি রুটিগুলো গরম গরম সেঁকে আনো। বাবার রুটি পাতলা হবে কিন্তু। খুব কড়া করে সেঁকবে। মনে আছে তো! রুটি হয়ে গেলে বাবার দুধটাও গরম করে দেবে। বুঝেছ?
জি দিদি!
রসিয়া রান্নাঘর থেকে গলা তুলে বলল।
ও-কি পারবে এতসব? নতুন লোক!
প্রসূনবাবু চিন্তার গলায় বললেন।
পারবে না কেন? শিখিয়ে নেব সব। এক এক বাড়ির এক একরকম নিয়ম। শিখে নিতে একটু সময় লাগে বই কী! মঞ্জুরিদিদির স্বামী মরে গেল তো কী করবে বেচারি? দ্যাখো, আর ফিরে আসতে পারে কি না আদৌ। এখন তো ছেলে-বউ যা বলবে, তাই-ই শুনতে হবে। হয়তো নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করতে বাড়িতেই রেখে দেবে তারা মঞ্জুরিদিদিকে। দু-জনে, কামাই তো করে ভালোই। কারখানায় কাজ করে যে!
ভালোই তো রে! মঞ্জুরিও তো পঁয়তিরিশ বছর কাজ করল আমাদের বাড়ি, ক-টি টাকা আর মোটা ভাত-কাপড়ের জন্যে। আমি রিটায়ার করে কেমন ইতিহাসের রাজ্যে ডুবে গিয়ে, রোদ পুইয়ে আরামে আছি, তোর হাতের সেবাযত্ন পাচ্ছি। আহা! ওরও তো ইচ্ছে করতে পারে যে, নাতি-পুতি নিয়ে রোদ-টোদ পুইয়ে, একটু আরামে স্বাধীনভাবে শেষজীবনটা কাটায়! আহা! কাটাক, কাটাক।
বলছ বটে তুমি বাবা।
প্রসূনবাবুর প্লেটে তরকারি আর ছানার ডালনা তুলে দিতে দিতে রীতি বলল, আরাম; এ-দেশের মেয়েদের কপালে নেই, যদি না, সে নিজে ‘স্বাধীন’ হয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাই বলছি। মঞ্জুরিদিদির তো কোনো সেভিংস-ই নেই। ছেলে-বউয়ের সংসারে তাকে সুখ করতে হলে সেও হবে আর এক আয়ার চাকরি; দাসত্বই। আমাদের সংসারে তবু সে, কাজের লোক হয়েও মালিকন-ই ছিল। এক বিশেষ সম্মানের আসনেই বসেছিল চিরদিন। মা তো কোনোদিনও কিছু দেখেনি সংসারের। শুচিবাইগ্রস্ত বলে, চেঁচামেচি করাকেই সংসার করা বলে জেনে এসেছিল চিরদিন। মঞ্জুরিদিদিকেই তো অনেক ব্যাপারে আমরা ছেলেবেলা থেকে মা বলেই জেনে এসেছিলাম। সেই-ই তো ছিল সব।
থাক! থাক! মা। আবার মরা মানুষটাকে নিয়ে পড়লি কেন?
রীতি গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে বলল, মরা মানুষকে তো কেউই ফিজিকালি টানাটানি করতে পারে না, এক, যদি-না কোর্টের অর্ডারে বডি তোলা হয় কবর থেকে। মরা মানুষের দোষ-গুণই থেকে যায় মৃত্যুর পরে। সেইগুলো নিয়ে টানাটানি হয়-ই। কেউ চাক আর নাই-ই চাক। মানুষ, আসলে ‘মরে-বাঁচে’ তো মৃত্যুর পরেই। তাই-না, বাবা? অথচ যতদিন বেঁচে থাকি, এ-কথাটা একবারও মনেই হয় না।
প্রসূনবাবু বললেন, সেটা হয়তো ঠিক-ই। তবে, আমার সামনে তোর চলে যাওয়া মায়ের দোষের কথা নাই-বা বললি। সে মানুষটা কবে ছাই হয়ে গেছে।
কেন না? মা তোমার জন্যে কী করেছে? তোমার চাওয়ার মধ্যে তো ছিল এইটুকুই। তুমি যতটুকু সময় বাড়িতে থাকতে, তোমার ঘরে যাতে নিরিবিলিতে পড়াশুনো করতে পারো সে-জন্যে শুধু একটু ‘শান্তি’র পরিবেশ চাইতে। অন্য কোনোকিছু পাওয়ার কথা ছেড়ে দিলাম, সেই শান্তিটুকুও কি তুমি পেয়েছিলে কোনোদিন? তোমার চেয়ে, বাড়ির একটি আরশোলা অথবা পেতলের ছাইদানের প্রতিই মায়ের মনোযোগ ছিল অনেক বেশি। মা তোমার স্ত্রী বলে তো আর সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে না।
আরে। থাক। থাক রীতি! খেতে বোস মা।
মায়ের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়, তাও তো তোমার ছিল না কোনোদিনও। আমি এখন বড়ো হয়েছি বলেই বুঝি। তখন খুব-ই ছোটো ছিলাম।
প্রসূনবাবু কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
বলতে চেয়েছিলেন; দাম্পত্য সম্পর্কটা যে, কেমন তা স্বামী এবং স্ত্রী ছাড়া বাইরের কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় রে। এসব বিষয়ে তোর কথা না বলাই ভালো। আমার নিজের তো কোনোই অনুযোগ নেই, ছিলও না কখনো তার প্রতি। আজ যে-মানুষ নেই, যার প্রতিবাদ করার কোনো উপায়-ই নেই; তাকে নিয়ে পড়া কেন?
কিন্তু মুখে কিন্তু বললেন না কিছুই। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই জীবনের একমাত্র স্বাধীনতা নয়। সেই স্বাধীনতা থাকলেও, বৃদ্ধ, অশক্ত মানুষের পরাধীনতা থাকে অনেক-ই। অপত্য স্নেহ এবং হয়তো প্রেমও অনেক মানুষকেই অনেকই বেশি পরাধীনতার জীবনযাপন করতে বাধ্য করে। এসব কথা রীতিকে বললেও এখন ও বুঝবে না। সবকিছু সব বয়েসে শেখা যায় না, শিখতে চাইলেও ‘জীবন’-এর কাছ থেকেই শিখতে হয়। জীবনের নিয়মকানুন রীতির কাছে যত সোজা মনে হয়, আসলে তা তো নয়।
কিন্তু ওকে এসব বলেও লাভ নেই কোনোই।
রসিয়া গরম গরম রুটি নিয়ে এল! রীতি নেড়েচেড়ে দেখে বলল, আরও একটু পাতলা হবে রসিয়া, বাবার রুটিগুলো। অন্যটা ঠিক-ই আছে। বাবা, মোটা রুটি একদম-ই হজম করতে পারেন না। আরও একটু কড়া করেও সেঁকতে হবে। নীচেরটা আমি নিচ্ছি, তুমি বরং বাবার জন্য আরও একটা রুটি নিয়ে এসো, যেমন করে বললাম তেমন করে বেলে ও সেঁকে।
প্রসূনবাবু রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, ব্যাপারটা আসলে কী জানিস? আমি আর তোর মা সারাজীবন-ই একটা দারুণ মিষ্টি, রোমান্টিক নাটকের রিহার্সাল-ই দিয়ে গেলাম। প্রত্যেক নাটকের রিহার্সালেই যা হয়, এই রিহার্সালেও তাই-ই হত। ভুল বোঝাবুঝি, ঝগড়া, মনের মধ্যে যে, অন্য মানুষটা বাস করে তার প্রম্পটিং-এর ভুল, চা আনতে দেরি, পার্ট ভুলে যাওয়া, অ্যাফেক্টেড ডিকশন, যা বলতে চাই, নাটকে যা আমার চরিত্র তাকে ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে না পারা ইত্যাদি...ইত্যাদি..আমাদের জীবনের নাটকের রিহার্সালেও ঠিক তাই-ই হত। সমস্ত বিবাহিত জীবনটাই দারুণ কল্পনার সুখ ও শান্তিতে ভরপুর এক সুন্দর জীবনের রিহার্সাল দিয়েই কেটে গেল। সে-নাটক স্টেজ করার আগেই হঠাৎ-ই নায়িকা চলে গেল। আ ট্র্যাজেডি। আ রিয়াল ট্র্যাজেডি ইনডিড!
রীতি অবাক হওয়া চোখে বাবার চোখে চেয়ে রইল।
মুখে কিছু বলল না।
ও-ওর বাবার গ্রেটেস্ট অ্যাডমায়ারার। ‘ইলেকট্রা-কমপ্লেক্স’ বলে যে-কথাটা আছে তা, বোধ হয় সত্যিই। চোখের সামনে বাবাকে দেখে, বাবার কথা শুনে, বাবার পান্ডিত্যর গভীরতা ও শিশুসুলভ সারল্য দেখে ও মনে মনে ওর বাবার প্রেমে পড়ে আছে ছেলেবেলা থেকেই। এই জীবনে, অন্য কোনো পুরুষকেই ও দেখতে পাবে, বা জানতে পাবে বলে মনে হয় না, সে নিতান্তই জৈবিক শারীরিক দিক ছাড়া, অন্য কোনো দিক দিয়েই তার বৃদ্ধ, সুন্দর, পাকা চুলের বাবার ধারে-কাছেও আসতে পারে। রীতি জানে যে, ওর কপালে দুঃখ আছে। বাবার ঘনসান্নিধ্যে থেকেছে বলেই ও, ওর দুই দিদিদের মতো শুধুই শরীর-সর্বস্ব সুন্দরী হয়নি। ওর দিদিদের চরিত্রের সঙ্গে ওর মায়ের চরিত্রর মিল-ই ছিল বেশি। রীতি ব্যতিক্রম। বাবার চরিত্রই ও বেশি করে পেয়েছে। তা ছাড়া, মাকে তো বেশিদিন পায়ওনি কাছে। দিদিরাই পেয়েছিল। মায়ের সম্বন্ধে অনেক কথাই দিদিদের কাছে এবং কানাঘুসোয়ও শুনেছে। সেইসব শুনেও বাবার প্রতি, ওর সমবেদনা বেড়েছে বই কমেনি। বাবার মতো স্বামীকেও যে-মহিলা দাম দেননি, তাঁর প্রতি ‘অনুকম্পা’ ছাড়া আর কিছুই নেই রীতির। মা তো কী? প্রত্যেক মানুষকেই নিজের ‘যুক্তি’ দিয়ে ভালো করে যাচাই করে নিয়ে, তারপর-ই তাঁর বা তার সম্বন্ধে মতামত গড়ে ও। সেই মানুষ যিনি-ই হোন-না-কেন। তিনি তাঁর অবর্তমান মা-ই হোন অথবা অনাগত স্বামীই হোক।
নিজের সঙ্গে নিজের কথা থামিয়ে প্রসূনবাবুকে বলল, রসিয়া কেমন রেঁধেছে বাবা? ছানার ডালনাটা? আমি দেখিয়ে দিয়েছি অবশ্য। তবে, রসিয়া তো আগে পান্ডেবাবুদের বাড়িতে কাজ করত। অনেকদিন-ই করেছে। রান্নাবান্না তাই বিহারিদের মতোই হয়ে গেছে।
প্রসূনবাবু হেসে বললেন-আমরাও কি আর বাঙালি আছি? আমরা তো এখন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানদের-ই মতো ব্যাংলো-বিহারি। ইকনমিকস ডিপার্টমেন্টের শুভেন বলত কথাটা। ওদের বাড়ি ছিল ভাগলপুরে। মজার ছেলে ছিল। এ-বছরই তো ফাল্গুনে ওর মেয়ের বিয়ে দিল। চিঠিও পাঠিয়েছিল।
বলেই পুরোনো কথা মনে পড়াতে পুরোনো দিনেই ফিরে গেলেন যেন, মনে মনে।
রুটি চিবোতে চিবোতে, জল খেয়ে, একটু পরে বললেন কোন পান্ডেবাবুর বাড়ি? ঝুমরিটোলির?
না, না। ঝুমরিটোলির নয় বাবা। ওই যে। গিরধারী পান্ডে। পলিটেকনিক-এর ডিরেক্টর যিনি।
ও। তা, ছাড়ল কেন কাজ রসিয়া? পান্ডেবাবুই ছাড়িয়ে দিলেন?
রীতি হাসল। বলল, সে নাই-ই বা শুনলে। অনেক কথা।
কেন?
ওসব নোংরা কথা। তোমার ভালো লাগবে না।
এইসব নোংরা-ঘাঁটা স্বভাবও নয় রীতির। অন্য দশজন মেয়ের মতো ‘পরনিন্দা পরচর্চা’ করতে ভালোবাসে না আদৌও।
প্রসূনবাবু বললেন, তা হয়তো লাগবে না। নোংরা কথা শুনতে বা বলতে কোনো সুরুচিসম্পন্ন মানুষের-ই ভালো লাগে না। তবে মানুষ তো আর ভগবান নয়। সব মানুষের মধ্যেই নোংরা থাকে। খারাপ থাকে। খারাপ অথবা ভালোর ভারটা যেদিকে বেশি ভারী, মানুষকে আমরা সেই দলেই ফেলি। সেই তকমাই দিই। কিন্তু সংসারে অবিমিশ্র ভালো অথবা অবিমিশ্র খারাপ মানুষ কি সত্যিই একজনও আছে? আমি তো দেখিনি। যে, খুব ভালো, তারও অনেক খারাপ দিক থাকে! আবার যে, খুব-ই খারাপ তারও অনেক ভালো দিক থাকে। বল-ই শুনি, রসিয়া ছাড়ল কেন কাজ?
পান্ডেবাবু নাকি রসিয়াকে খুব-ই উত্যক্ত করত।
সে কী? কেন?
ওর শরীরের জন্যে। মেয়েদের যে অনেক-ই বিপদ!
তা ঠিক।
আর একটি রুটি তুলে নিয়ে প্রসূনবাবু বললেন, তবে ব্যাপারটা কী জানিস, তুই নিজে মেয়ে বলেই শুধু মেয়েদের দিকটাই বুঝিস। পুরুষদের বিপদও খুব কম নয়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখব না যে, পান্ডেসাহেবের মতো এমন, পন্ডিত মানুষ ঠিক কতখানি অসহায় ও বিপদগ্রস্ত হলে তাঁর তুলনায় সবদিক দিয়েই নগণ্য রসিয়ার মতো একজন যুবতীর শরীর-প্রত্যাশী হতে পারেন? বিধাতা পুরুষদের বড়োই দুর্বল, ভঙ্গুর, পরনির্ভর করে গড়েছেন রে মা! আমাদের দুর্বলতাটাই তোদের বল।
এমন করে অবশ্য কখনো ভেবে দেখিনি।
স্বগতোক্তির মতো বলল রীতি।
হ্যাঁ মা। ভাবিই না আমরা। কোনো মানুষকেই ‘বাতিল’ করার আগে তাকে বোঝার চেষ্টা করিস। কে, কোন দুর্বলতম মুহূর্তে কী করেছিল, সেটাই তার একমাত্র পরিচয় নয়। গিরধারী পান্ডেকে আমি জানি। একাহাতেই উনি হাটচামারিয়ার পলিটেকনিক গড়ে তুলেছেন। কত ছেলে যে, ওঁর-ই জন্যে, আজ সুস্থ স্বচ্ছল জীবিকাতে নিয়োজিত করতে পেরেছে নিজেদের, সে তো তোর আমার মতো বহুমানুষ-ই জানে। তিনি হয়তো তাঁর স্ত্রী-র কাছ থেকে ন্যূনতম যা-প্রত্যাশা ছিল, তাও পাননি। অনেকের কাছেই শুনেছি যে, তাঁর স্ত্রী রাগি, রগচটা এবং অসভ্য প্রকৃতির একজন রমণী ছিলেন। অথচ সবসময়েই ‘সবজান্তা’ ভাব করতেন। রসিয়ার কাছে এসব কথা শোনা উচিত হয়নি মা। আর শুনলেও, সেই একতরফের কথা বিশ্বাস করা উচিত হয়নি আদৌ।
রীতি চুপ করেছিল। উত্তর দিল না কোনো। ভাবছিল, পুরুষরা বড়োই গোষ্ঠীবদ্ধ জীব। একে অন্যকে সবসময়েই সাপোর্ট করে। মেয়েরা কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। একজনের মধ্যে খারাপ কিছু আছে শুনলেই, তা নিয়ে সরস আলোচনায় মাততে তাদের জুড়ি নেই। ভাবছিলই। বাবাকে মুখে কিছু বলল না। রীতি ছাড়া, কথা বলার লোক আজকাল বিশেষ পান-ই না, তাই বাবা আজকাল বেশ, বেশি কথা বলেন। বড়োই লম্বা লম্বা সেন্টেন্স।
রীতির বাবাও কি একদিন সেনাইল হয়ে যাবেন?
প্রসূনবাবু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললেন, তোদের রিহার্সাল কেমন হল? কী নাটক করছিস তোরা এবারে?
‘রূপমতী’। তক্ষ রায় লিখে দিয়েছেন ‘ভ্রাতৃসংঘর’ জন্যে। বোকাদা ডিরেক্টর।
কোন বোকা? চালাকের ভাই?
হ্যাঁ।
তা, এ কোন রূপমতী? মাঁলোয়ার মাণ্ডুতে একজন রূপমতী ছিলেন। ইনি কি সেই রূপমতী?
হ্যাঁ। তুমি জান? রীতি আগ্রহের সঙ্গে শুধোল।
জানি মানে, পড়েছি। ইনফ্যাক্ট গতসপ্তাহ থেকেই ‘মাঁলোয়া’ শুরু করেছি। সারাজীবন তো পড়ালাম অন্য বিষয়। রিটায়ার করার পর যে-বিষয় পড়াতাম, সে-বিষয় সম্বন্ধে কিছু পড়তে বা লিখতে আর ভালো লাগে না। কোনো বিশেষ বিষয়ে বিশেষ পান্ডিত্য অর্জন করেছি— এমন-ই এক মিথ্যেশ্লাঘা যখন-ই জন্মাল তক্ষুনি, সেই বিষয় ত্যাগ করা উচিত বলে মনে করলাম। একজন অধ্যাপকের জীবনের মূলপরিচয়, তাঁর জীবনের হংসধ্বনিই হচ্ছে এই-ই যে; তিনি একজন ছাত্র। যে-অধ্যাপকের ‘ছাত্র’ পরিচয় ঘুচে গেছে তাঁর সব-ই গেছে। তাই তো এখন ইতিহাসের ছাত্র হয়েছি বুড়ো বয়েসে এসে। এখন মনে হয়, প্রথম জীবনে ‘ইতিহাস’কেই কেন বেছে নিইনি বিষয় হিসেবে। ইতিহাস পড়লে, মানুষকে, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বল ও দৌর্বল্য, কামনা-বাসনা এবং নিবৃত্তি-নির্লিপ্তি সম্বন্ধেও যেমন ধারণা হয়, তেমন বোধ হয় সাহিত্য পড়েও হয় না।
রীতি বলল, সাহিত্যও তো ইতিহাস-ই।
কথাটা অবশ্য ঠিক-ই। এবং সমসাময়িক সাহিত্যও, যদি তা যথার্থ সাহিত্য হয়ে ওঠে; একদিন ক্লাসিক্স হয়ে ইতিহাসের পর্যায়েই পৌঁছে যায়।
আমার ভীষণ-ই বাজে লাগে। সন, তারিখ; কে কার পর রাজা হল? কে কাকে খুন করে গদিতে বসল। শুধু এই-ই সব।
রীতি বলল।
খুনখারাপি তো আমাদের চারদিকে নি:শব্দেই ঘটে যাচ্ছে সবসময়েই। ‘গদি’র জন্যে যুদ্ধ তো শুধু রাজাদের-ই একচেটিয়া ব্যাপার নয়! সে-যুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার নিয়েও হয়। তোরা জানতে পাস না, এই-ই যা। সাহিত্য বাদ দিয়ে তো মানুষের ইতিহাস হয় না। আমাদের আজকের এই আধুনিকতার সবচেয়ে বড়োবিপদ কী জানিস?
কী বাবা?
পেছন দিকে মুখ না ফেরানো। ‘অতীত’কে ভুলে যাওয়া। পরের ভুল দেখে নিজে না শেখা।
বাবার বক্তৃতায় রীতি ক্লান্ত বোধ করছিল, বলল, রূপমতী সম্বন্ধে কিছু বলো। আমাকে রূপমতীর ভূমিকাতেই অভিনয় করতে বলা হয়েছে। চরিত্রটি সম্বন্ধে ভালো করে জানলে তবেই তাকে ফুটিয়ে তোলা সহজ হবে।
বাজবাহাদুরের ভূমিকাতে কে করছে?
বিশু।
কে বিশু?
তুমি চিনবে না। মিত্তির বাড়ির ছেলে। ওই, যাদের লোহা-লক্কড়ের এবং রডের ব্যাবসা আছে। কনস্ট্রাকশনের ব্যাবসাও আছে। বিহার-শরিফ না কোথায়, কীসের যেন, কারখানাও।
করে কী ছেলেটি?
কী করে? ব্যাবসা করে। বি. কম. পাশ করেছে বছর পাঁচেক হল। বাবার পার্টনার হয়েছে। ভালো ব্যাবসা ওদের। তুমি চেনো না, কিন্তু এখানের সবাই-ই চেনে।
চেহারা কেমন? সুলতান-এর ভূমিকাতে মানাবে তো?
খারাপ নয়। আমাকে যদি রূপমতীর ভূমিকায় মানিয়ে যায় তবে, ওকেও বাজবাহাদুরের ভূমিকায় মানাবে।
তা নয়। তুই তো আমার সুন্দরীই! কেউই কি তা অস্বীকার করবে? ব্যাবসাদারের পরিবারের ছেলেরা তো টাকা রোজগার করার জন্যে, যে-অভিনয়, শুধুমাত্র তাতেই নিজেদের দড় করে তোলে ছেলেবেলা থেকে। শুনে ভালো লাগল যে, নাটক-টাটক ককারো শখ আছে ছেলেটির। কী নাম বললি যেন? বিনু?
বিশু। একটু বিরক্তির গলায় বলল রীতি।
ও, পাঁচ হাজার টাকাও দিয়েছে বোকাদাকে। প্রোডাকশানের খরচ হিসেবে। শুনলাম, সবসুদ্ধু পনেরো হাজার দেবে। মাণ্ডুর সেট-এ নাকি খরচ অনেক। তার বদলেই নায়কের রোল পেয়েছে। টাকা না হলে নাটক হত না, আর নাটক করতে হলে নায়কও চাই।
বা:। ভালো বলেছিস। তবে টাকা আছে বলেই যে, ছেলেটি নির্গুণ হবেই, এমন কোনো মানে নেই। লক্ষ্মী থাকলেই যে, সরস্বতী পালাবেন এমন ক্লিশেতে বিশ্বাস করিস না। যাদের ওপর সরস্বতীর ভর আছে, তাদের ওপর লক্ষ্মীরও ভর থাকলে তার সমূহই বিপদ। সরস্বতীর পূজারিরা এদেশে, চিরদিন-ই লক্ষ্মীর কৃপাহীন। তাই-ই, তারা দলবদ্ধ হয়ে, পরম আক্রোশে এবং ঈর্ষায়, তেমন ক্বচিৎ ভাগ্যবানের পেছনে লেগে যায়, একথাই প্রমাণ করতে যে, সে-হতভাগার শুধুমাত্র লক্ষ্মীর দয়াই আছে; সরস্বতীর দয়ার ছিঁটে-ফোঁটাও নেই। বিশুকে এদেশের লক্ষ্মীহীন সরস্বতীসাধকদের চেয়ে অনেক-ই বড়োমাপের সাধক হতে হবে তাদের স্বক্ষেত্রে হারাতে হলে। অনেক উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনার জন্যেও তৈরি থাকতে হবে। কিন্তু আসল ব্যাপারটা, মানে অভিনয়টা করছে কেমন?
নাটক এখন ফাইনালি লেখাই হয়নি। তক্ষদা আগামী সপ্তাহে ফাইনাল স্ক্রিপ্ট দেবেন।
তক্ষদাটি কে?
বা:। বলিনি বুঝি? তক্ষ রায়। নাম শোনোনি? কবি, প্রবন্ধকার ; সাংবাদিক, নাট্যকার।
ওঃ। সেই তক্ষ রায়? তিনি তো বিখ্যাত লোক।
হ্যাঁ।
তা ভালো। তবে তুই নায়িকা, তাই তোর যে নায়ক, তার অভিনয়ক্ষমতার ওপরেই কিন্তু তোর নিজের অভিনয় অনেকখানিই নির্ভর করবে। ছেলেবেলায় আমিও কিছুদিন রমেন চাটুজ্যের পাল্লায় পড়ে অভিনয় করেছিলাম। অভিনয়ের মতো এমন ‘সুষম পরিপূরক’ বিদ্যা আর বোধ হয় নেই; বুঝলি রীতি। সত্যিকারের-ই গণতান্ত্রিক শিল্পমাধ্যম এটি। কোনো শিশির ভাদুড়ি বা অহীন্দ্র চৌধুরী কোনোদিনও একা একা কোনো নাটকের উৎকর্ষ আনতে পারতেন না। পুরোটাই টিম-ওয়ার্ক। তোর নায়ক, কী যেন, নাম বিনু, সে নিজে যদি অভিনয়ের কিছু না বোঝে, নিজের অভিনয়কে এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দিতে না পারে; তবে তুই তোর সব অভিনয়ক্ষমতা নিয়েও ভালো অভিনয় করতে পারবি না। তোর প্রতিযোগীর সমতলেই এসে থেমে যাবি। এইখানেই সাহিত্য, বা সংগীত বা চিত্রকলার সঙ্গে নাটকের তফাত। অন্যর যোগ্যতার ওপরে তোর পূর্ণতা নির্ভর করে না সেইসব জগতে। এখানে করবে। বুঝলি মা।
রীতির ঘুম পাচ্ছিল। বাবা বড়োই কথা বলেন আজকাল খেতে বসে। হাই তুলল দুটো। বলল, রসিয়া সন্ধেবেলা তোমাকে প্রেশারের ওষুধটা দিয়েছিল?
অ্যাঁ? না তো। দেয়নি তো। সেইজন্যেই মাথাটা ভার ভার লাগছে না তো! ঘাড়টাও ব্যথা ব্যথা করছে।
দেখেছ! এতকরে বুঝিয়ে গেলাম! দাঁড়াও, ওকে ভালো করে তালিম না দিয়ে, আমি আর একটুর জন্যেও বাড়িছাড়া হচ্ছি না।
বলেই, চেয়ার ঠেলে উঠে, ঘরে গেল ওষুধ আনতে। হার্টের ওষুধটা এনে, রান্নাঘরে গেল, রসিয়ার কাছ থেকে প্রেশারের ওষুধটা আনতে। ওকেই জিম্বা করে দিয়েছিল রিহার্সালে যাওয়ার সময়ে।
রসিয়া বলল, বাবুর ওষুধ তো দিয়েছি, প্রেশারে।
মানে?
সরেজমিনে তদন্ত করে জানা গেল, প্রেশার কুকারে কালকের জন্যে, যে-মাংস রান্না করেছে তাতেই ফেলে দিয়েছে ওষুধটি রসিয়া।
ইরি বাবা! কী লোক গো তুমি?
হাসতে হাসতে খাওয়ার ঘরে এসে রীতি বলল, শুনেছ বাবা! রসিয়া কী করেছে?
কী?
হাসতে হাসতে, বলতে বলতে রীতি আবার বাবার ঘরে গেল, প্রেশারের আর একটি ট্যাবলেট আনতে।
আজকাল ওষুধ না খেলেই, প্রেশার বেড়ে যায় প্রসূনবাবুর।
রীতি যখন হাঁটে, যখন হাসে; তখন-ই প্রসূনবাবুর কেবল-ই মন্দিরার কথা মনে পড়ে যায়। উনি যখন ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হয়ে প্রথম ঢোকেন তখন মন্দিরা সেনও বাংলার লেকচারার হয়ে ঢোকেন। লম্বা, তম্বী; ভারি শার্প ফিচারসও ছিল তার। কালোর মধ্যে ভারি মিষ্টি চেহারা ছিল। ‘বুদ্ধি’র প্রসাধনে সবসময়েই প্রসাধিত থাকত তার কালো মুখটি। খুব মজার মজার কথা বলত। সেই সময়ের মেয়েদের তুলনায় অত্যন্ত সপ্রতিভও ছিল। হাসত, হাসাত সকলকে অনুক্ষণ। প্রেমে, জীবনে একজনের সঙ্গেই পড়েছিলেন প্রসূনবাবু। ওই মন্দিরার সঙ্গে। কিন্তু মুখে মন্দিরাকে সে-কথা বলার সাহস তো বটেই, সময় ও সুযোগও আসেনি। ‘ভালোবাসি’ কথাটা বলে ফেলার রিহার্সাল দিলেন দীর্ঘ তিনমাস মন্দিরার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরদিন থেকেই। তবু বলে ওঠা হল না। এরইমধ্যে বাবা, ছেলের বিয়ে ঠিক করে ছুটি নিয়ে এলেন পাটনাতে; প্রসূনবাবুর বিয়ে দেওয়ার জন্যে। বাবার-ই বন্ধুর ছোটোমেয়ে। বয়েসে প্রসূনবাবুর চেয়ে বছর বারোর ছোটো। মনের বয়েসেও আরও অনেক বেশি। শরীর, বড়োই প্রবল ছিল, রীতির মায়ের মধ্যে। কিছু কিছু মেয়ের মধ্যে থাকে। যেমন থাকে পুরুষেরও মধ্যে। মিল হল না তাই-ই। তবু দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘর করলেন। সহবাস করলেন। তিন মেয়েও জন্মাল। মেয়েরা দেখতে দেখতে বড়োও হল। কী করে যে, চলে গেল এতগুলো বছর জীবনের রিহার্সালেই, ভাবলে অবাক লাগে। এ-জীবনে বাঁচা হল না। পরের জীবনে বাঁচার মতো বাঁচবেন, যদি পরজন্ম থাকে। এই বুড়ো বয়সের ছোটোমেয়ে রীতিটা তাঁর-ই মনের মতো হয়েছে। আশ্চর্য! ওর মধ্যে আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগের পরিচিতা মন্দিরা সেনের মিল হল কী করে? কস্তুরীর সঙ্গে মিলনের সময়ে অন্ধকার ঘরে, দূর থেকে ভেসে আসা মহুয়ার গন্ধে, রাত-পাখিদের ডাক শুনতে শুনতে মন্দিরার মুখটিই কী ভাবছিলেন উনি? রীতির জন্ম হয়ে ছিল বৈশাখী-পূর্ণিমার দিনে। এক প্রথম বৃষ্টির রাতে কনসিভ করেছিলেন প্রসূনবাবুর স্ত্রী, রীতিকে।
বেচারি পান্ডে! গিরধারী পান্ডে! পরিচারিকার শরীর পেতে চেয়ে, এই ঝিরাটোলির সমাজের চোখে হাসির-ই পাত্র হয়ে উঠলেন। আর শ্রদ্ধাস্পদ অধ্যাপক প্রসূনবাবুর যে-এক বৃষ্টির রাতে জেগে-থাকা স্বপ্নে পরস্ত্রী মন্দিরার সঙ্গে সহবাস করে নিজের স্ত্রীর শরীরের কোরকেই এক সুগন্ধি বীজ গোপনে পুঁতে দিয়েছিলেন তার খোঁজ এতবছর কেউই রাখল না।
একদিন নয়। বিবাহিত জীবনের অসংখ্য রাতে প্রসূনবাবু মন্দিরা সেনের সঙ্গেই সহবাস করেছেন। স্বস্তির কথা, এটুকুই যে; সেইকথা ভেবে কোনো অপরাধবোধ জাগে না মনে। জাগে না; কারণ, সেই মুহূর্তটিতে রীতির জননীও তাঁর অসংখ্য পুরুষবন্ধুর মধ্যে কারো সঙ্গে যে, মনে মনে সহবাস করছিলেন না, সে-কথা প্রসূনবাবু জোর করে বলতে পারেন না।
সত্যিই মস্তবড়ো স্বস্তির কথা এই-ই যে, এই জীবনে দু-জনের পাপ, দু-জনের দোষ ক্রমান্বয়ে প্রতিনিয়ত কাটাকুটি হয়ে যেতে যেতে, হাতে থাকে শূন্য। শূন্য পবিত্রতা। অথবা পবিত্র শূন্যতা কী?
শূন্যমাত্রই বোধ হয় অসীম। শূন্য দিয়ে সহস্রবার গুণ করলেও, ভাগ্য ভালো! গুণফল শূন্যেই ফেরে। যে-অন্যায়, যে-পাপ, নজরসীমা অথবা শ্রবণসীমার মধ্যে ঘটে; শুধু সেইটুকুই ক্ষমার অযোগ্য। চাঁদের রাতে, অথবা জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে; রাতকানা, কান-ময়লা সমাজের অনুভূতির আঙুলের আওতার বাইরে অথবা প্রত্যেক মানুষ ও মানুষীর মননেও যা-কিছু, অপরাধ-ই ঘটুক-না-কেন, তাদের গুণের গণনকে কোনোভাবেই কলঙ্কিত করে না। ভাগ্যিস।
নইলে এ-জীবন বড়োই কেলেঙ্কারির হত।
প্রত্যেক মানুষ ও মানুষীর-ই জীবন।
বউদি বলল, আজকে কফি খাবে তো?
বোকা বলল না। তোমার কাছে ক্যাম্পোজ আছে? পাঁচ মিলিগ্রাম যদি থাকে তো দেবে একটা?
কেন? তোমার এমনিতেই ইসকিমিয়া অ্যাঞ্জাইনার ট্রাবল একবার হয়েছিল। ক্যাম্পোজ-ট্যাম্পোজ এরকম হুট-হাট করে খাওয়া উচিত নয়। ড. সর্বাধিকারী কি বলেছেন খেতে?
যাইনি বহুদিন ডাক্তারবাবুর কাছে।
তবে?
তুমি কেন খাও? তোমাকেও কি বলেছেন খেতে?
আমার কথা ছাড়ো ঠাকুরপো। আমি আর তুমি কী এক হলাম? মরলেই বেঁচে যাই। আমার এই জীবন কী জীবন নাকি?
কারো জীবন-ই জীবন নয়। মানে, জীবনের মতো জীবন কারোর-ই নয়। কেউ জীবনকে তার মনোমতো, পছন্দসই করে নিতে পারে; কেউ বা পারে না। নইলে, যে-জীবন এমনিতে সব মানুষ-ই পায়, ফুটপাথে-কেনা জামার-ই মতো; তবে বেশির ভাগ-ই গায়ে হয় খাটো, নয় বড়ো। আঁটে না তারা জীবনে। অথবা, জীবন তাদের গায়ে।
রমলা বলল, জীবনকে মনোমতো করে গড়তে আর পারলাম কোথায়? এতগুলো বছর তো সেই জীবন পাওয়ার চেষ্টা করতে করতেই কেটে গেল।
এত তাড়াতাড়ি পেতে চাও তুমি? কী-বা তোমার বয়স! রিহার্সাল দিয়ে যাও। থেমো না। জীবনে রিহার্সালটাই হচ্ছে আসল। হয়তো জীবনের সবটুকুই। যারা মনোমতো জীবনের পিপাসায় মরে, প্রতিনিয়ত রিহার্সালও দিয়ে যায়, তাদের মধ্যেও ক-জনই বা সেই জীবনকে জীবনের স্টেজে মঞ্চস্থ করতে পারে বলো? তা বলে কি চেষ্টা না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে?
রমলা একটু চুপ করে রইল।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জানি না আমি।
দাদা কোথায়? বোকা বলল। আজও ফেরেনি বাড়িতে? খাওয়া কি কমিয়েছে একটু? ওই চিমসে দিদিমণির মধ্যে কী যে, দেখেছে বলো তো দাদা? আমি তো ভেবেই পাই না। আর মহিলারও কী লাজ-লজ্জা বলে কিছু নেই? তোমার না-হয় ছেলে-মেয়ে নেই। তার তো মেয়ে আছে একটি।
বেশি লাজ-লজ্জা থাকলে জীবনে কিছু পাওয়া হয় না ঠাকুরপো। তা ছাড়া কে যে, কার মধ্যে কী দেখে, তা কী বলা যায়? ঘাটতি আমার মধ্যেও ছিল নিশ্চয়ই কিছু!
ঘাটতি তোমার কিছুমাত্রই নেই। তোমার মতো স্ত্রী, ক-জন পায় বলো তো?
স্ত্রীর কথা, শুধুমাত্র স্বামীরাই জানে। আর স্বামীদের কথা স্ত্রীরা, বাইরে থেকে বোঝা যায় আর কতটুকু?
বলেই, রমলা দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল; তোমার ভাষায় বললে তো বলতে হয়, তোমার দাদার জীবনটাও তার গায়ে ছোটো অথবা বড়োই হয়েছিল, তাই, সেও তার মনোমতো জীবন পাওয়ার জন্যই রিহার্সাল দিচ্ছে। এতে দোষের কী? মন তো সকলের সমান নয়। মনোমতো ব্যাপারটা যে, বড্ডই ব্যক্তিগত; গোপনীয়।
বোকা বলল, জানি না। মণিদীপা মেয়েটিকে তো আমি দেখেছি। চেহারাতে বা গুণে তোমার পায়ের নখেরও যুগ্যি নয়।
আবার হাসল রমলা। হাসলে, ওকে খুব-ই সুন্দর দেখায়। বলল, কার কী যোগ্যতা আছে সেটা অবান্তর! যে যাকে চায়, অথবা না চেয়েই যে, যাকে পায়, আমাদের এই সম্বন্ধ-করা বিয়েরই মতো, সে অন্যজনের যোগ্য বা মনোমতো হয়ে উঠতে পারল কি না এটাই প্রশ্ন। এক একজনের যোগ্যতার চাহিদা এবং যোগ্যতাও এক একরকম হয় তো!
জানি না। দাদাকে আমি একটুও বুঝি না। লজ্জাশরমের মাথাও খেয়েছে। তোমার কথা কিংবা আমার কথা কি ভাবেও না একবারও?
নিজের কথা বেশি ভাবলে, অন্যর কথা ভাবার-ই যে, সময় পাওয়া যায় না। নিজের কথা বেশি করে সবসময়ই ভাবার আর এক নাম-ই হয়তো মনোমতো জীবন পাওয়া।
তুমিও তাহলে ভাবা শুরু করো এবার থেকে। দাদার কথা আর ভেবো না। তুমি যদি কাউকে বিয়ে করো বা কারো কাছে গিয়ে থাকো, তাহলে আমি কিন্তু তোমাকে সবরকম মদত-ই দেব বউদি। দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেব তোমার।
সত্যি!
এবার শব্দ করেই হাসল রমলা।
পাগল তুমি একটা! নতুন করে এখন আবার কার কাছে গিয়ে থাকব? তোমার কাছে তো আছিই ঠাকুরপো। আমার তো কোনো দুঃখ নেই। তুমিও যদি তাড়িয়ে দাও, সে-কথা আলাদা।
বাজে কথা বোলো না। দুঃখ নেই কি না তা, আমিই জানি।
তুমি কিছুই জানো না। তোমার দাদা আমার জীবনে একটা ভারী, সেকেলে ফার্নিচার হয়ে গেছে। শাল কাঠ দিয়ে তৈরি। যাতে কেউ বসে না। যাকে নড়ানোও যায় না। সে যেখানে বসে আছে, সেখানেই থাকবে বসে, বাকিজীবন। সেইসব ফার্নিচার ব্যবহারের জন্যও নয়। পুরোনো দিনের জিনিস। অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি-সেন্টিমেন্ট মাখা। এইটুকুই ভূমিকা তার। তোমার দাদা হচ্ছে, আমার সেই অব্যবহারের ফার্নিচার। অব্যবহার-ই এখন অভ্যেস আমার।
আর আমি?
বোকা শুধোল, শিশুর মতো।
তুমি হচ্ছ, আমার এই দমবন্ধ জেলখানার সকালবেলার পাখি, শেষবিকেলের আলো; সবুজ বাগান, একফালি চাঁদের আলোতে করুণ হয়ে ওঠা। তুমি আমার গন্ধ-ওড়ানো নরম ফুল, আমার চান-ঘরের গান; তুমি-ই তো সব। অথচ তুমি কেউ নও-ও।
কী সুন্দর করে বললে বউদি। তুমি একজন কবি। ‘অশনি’-তে একটা কবিতা পাঠাও-না। নিজের নামেই।
রমলা হাসল। বলল পাঠাইও যদি; তবে লেখিকার নাম দেব কী জান? নাম দেব বন্দিনি।
তারপর বলল, না গো বেশ তো আছি। আমার চেয়ে যে, আরও কত বেশি দুঃখী কত মানুষকে দেখি চারপাশে, তার ঠিক নেই। অন্যলোকের ‘দুঃখ’ সকলে ঠিক বুঝতে পারে না। নিজের নিজের দুঃখকেই তাই মস্ত করে দেখে। সকলের সেসব বোঝার বা দেখার চোখ-ই নেই। আমি খুব-ই কৃতজ্ঞ ভগবানের কাছে এ-জন্যে যে, সবাকার দুঃখ নিজের করে নিতে চাই। পারি।
তুমি বিনাদোষে এমন করে, নিজেকে নষ্ট কোরো না। আমার জন্যেই বা তোমার জীবনটা নষ্ট করবে কেন? আমি তোমার কে? কতটুকু দিতে পারি তোমাকে? কোথাও চলে যাও তুমি বউদি। সিরিয়াসলি বলছি।
যাওয়ার জায়গা থাকলে যেতামও হয়তো। বাড়ি বলতেও তো কিছু নেই। দাদাদের পরিবারে গেলে, তারা তো গলগ্রহ বলেই মনে করবে। তা ছাড়া, লেখাপড়াও তো শিখিনি তেমন বেশি যে, আজকালকার দিনে ভদ্র চাকরি করে পেট চালাব। আজকাল তো বি-এ, বি-এড-এ দেশ-ই ছেয়ে গেছে। আমি বিশেষ কী?
তাদের বেশির-ই ওই ডিগ্রিটুকুই আছে। তোমার মতো সত্যিকারের ‘শিক্ষা’ আছে কি?
কথা ঘুরিয়ে বলল, রমলা; তার চেয়ে, এখানে তুমি তো আছ। তোমার দাদা নাই-ই বা বুঝল, তুমি তো তাও বোঝো আমাকে। সংসারের এই তো নিয়ম ঠাকুরপো। যেখান থেকে পাওয়ার কথা সেখান থেকে, সকলে যে, পাবেই সবকিছু, তেমন ভাগ্য করে আসে কম মানুষ-ই। আবার যেখান থেকে পাওয়ার কথা ছিল না, সেখান থেকেই হয়তো পেয়ে যায়। সেটাই উপরি। হিসেবের বাইরে। হরে-দরে নিক্তি সমান হলেই হল। আমার কাছে এই-ই তো অনেক। তুমি আমাকে যতটুকু বোঝো, যতটুকু ভাবো আমার জন্যে, ততটুকুই বা, কে বুঝত বা ভাবত বলো?
আমার কিন্তু মনে হয়, এ, তোমার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। এত অপমানিত হয়েও তবু এখানে থাকতে ভালো লাগে তোমার? মুখ দেখাতে লজ্জা করে না? বোকা বলল।
রমলা গম্ভীর হয়ে গেল।
বলল, তুমি ছাড়া; এই মুখ আর দেখেই বা কে? কাজের লোকজন আর পথের দুখিয়া পাগলা। তুমিও যেদিন, আমাকে অপমান বা লজ্জা দেওয়ার মতো কিছু করবে, সেদিন-ই চলে যাব বাড়ি ছেড়ে। দরকার হলে, ঘুঙ্ঘটটোলিতে গিয়েই উঠব তোমার চালাক দাদার ওপর প্রতিশোধ নিতে। এসব কথা থাক ঠাকুরপো। সুন্দর কিছু বলো, আনন্দের কিছু; ভালো লাগে না এই কথা আর।
দাদা তোমাকে যা দিতে পারত, তার অনেক কিছুই তো আমি দিতে পারি না; পারিনি। দেওয়ার উপায়ও যে, নেই কোনো বউদি।
আমি কি চেয়েছি কখনো কিছু? তোমার কাছে?
তোমার কথা নয়। আমিই পারি না। আর কখনো দিতে চাইলেও, তুমি তো নিতেও পারবে না; নেবে না, তা আমি জানি। এমন করে সারাটা জীবন কাটাবে কী করে, এই কথাটাই আমি ভেবে পাই না।
শরীরের কথা বলছ ঠাকুরপো?
রমলা, রহস্যময় হাসি হেসে বলল।
তারপর জানলার কাছে সরে গিয়ে নির্জন পথ-পাশের প্রাচীন মেহগনি গাছগুলোর দিকে চেয়ে বলল, শরীরের দাবিটা আর কতটুকু? মানুষ হয়ে জন্মেছি, মনের দাবিটাই যদি মিটিয়ে থাকো তুমি; তাই-তো যথেষ্ট। এই সুন্দর সম্পর্কের মধ্যে শরীর এসে পড়লে আমরা দু-জনেই ছোটো হয়ে যেতাম দু-জনেরই কাছে। ছোটো হয়ে যেতাম তোমার দাদার কাছেও। বাইরের লোকে হয়তো মন্দ বলবে, হয়তো বলেও; কিন্তু আমরা দু-জনে তো জানি যে, আমাদের সম্পর্কটা কীরকম। নিজেদের সুখের জন্যে নিজেদের ছোটো বা ভ্রষ্ট করিনি আমরা কেউই নিজেদের। বলো? করেছি কখনো?
বোকা চুপ করেই থাকল। টেবল থেকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিল।
টেবলের ওপরে রাখা টাইম-পিসটা ‘টিক-টিক-টিক-টিক’ করে কোনো অদৃশ্য তক্ষকের জিভের-ই মতো নিস্তব্ধ রাতের প্রতিটি মুহূর্তের গায়ে, নীরবে থাকা বোকা ও রমলার গায়ে; সময়ের থুথু ছিটোতে লাগল।
অনেকক্ষণ পর রমলা বলল, দু-জনে, দু-জনের বিভিন্নরকমের কষ্টর নীরব সাক্ষী হয়ে থেকে মানুষ হিসেবে অনেকের চেয়েই বেশি মাথা উঁচু করে বেঁচেছি আমরা। তুমি কি মনে করো না তা? যদি তোমার দাদার হাত থেকে সম্পত্তিগুলো সরিয়ে নিতে না পারতে, তবে তো এতদিনে পথের ভিখিরিই হয়ে যেতাম আমি। আমার সঙ্গে; বিনাদোষে তুমিও। তুমি যা করেছ আমার জন্যে, অন্য কেউই কি তা করত?
লাভ কী হল, বলো বউদি? আজকে ঝিরাটোলির সব মানুষ-ই জানে যে, দাদাকে নাকি আমিই ঠকিয়েছি। পৈত্রিক সব সম্পত্তি আমিই তাকে ঠকিয়ে নিজের নামে নিয়েছি। ‘জোচ্চোর’, ‘ঠগবাজ’, ‘ফোর-টোয়েন্টি’, ‘চালু’ বলে আমাকে। বলে, নামেই বোকা; আসলে ‘চালাক দ্য গ্রেট।’ কাকে বলতে যাব বলো যে, কেন কী করেছি। দাদা যে, কোথায় নেমে গেছে, এইকথাটা কি হাটের মাঝে গিয়ে বলতে পারি আমি? যারা জানে; তারা জানুক। কিন্তু অনেকেই তো জানে না। এসব কী শুধু তোমার একার জন্যেই করেছি? দাদার ভালোর জন্যেও করিনি কী? ওই সম্পত্তি তার হাতে থাকলে তো হনুমান শাহুর দোকানের মদের বিলেই সব চলে যেত। মণিদীপা দিদিমণির গয়নাতেও। এসব কথা বলব কাকে বল? প্রায়-ই ভাবি বউদি, তোমার আগেই মরি যদি আমি, তবে মরে যাওয়ার পর আর তো তোমাকে কলঙ্ক থেকে বাঁচাতে পারব না। তোমার জন্যে কিছু করতেও পারব না। লোকে বলবে: তোমার সঙ্গে আমার নিশ্চয়ই ‘কিছু’ ছিল। কোনো মহিলাকে নিজের স্ত্রী-কন্যা ছাড়া, কোনো পুরুষ মানুষ যে-সম্পত্তি দিতে পারেন বা দেন, কোনো ‘কিছু’ না থাকলেও এমন কথা বিশ্বাস করার মতো বড়োমন বা শিক্ষা কারোর-ই নেই যে!
রমলা আবার হাসল। এবার আরও সুন্দর দেখাল। হাসলে, এখনও টোল পড়ে ওর কমলা-রঙা গালে।
বলল, কথাটা কিন্তু সত্যি বললে না, ঠাকুরপো। তোমার সঙ্গে আমার ‘কিছু’ কি সত্যিই নেই? শারীরিক সম্পর্কই কি একমাত্র ‘কিছু’?
বোকা, জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল!
রমলার কথার জবাব দিল না।
শোনো, ঠাকুরপো। তুমিই যদি আমার আগে মরে যাও, তবে তো মরতে আমাকে এমনিই হবে। তখন কলঙ্ক লাগলেই বা কী, আর না লাগলেই বা কী। তুমি যে মস্ত বড়োমনের কত্ত ভালো পুরুষমানুষ এবং সত্যিই যে, তুমি কী পরিমাণ বোকা আজকের পৃথিবীর মানুষের তুলনায়, সে-কথা তোমার চালাক দাদা কখনো স্বীকার করুন আর নাই-ই করুন, আমি চিরদিন-ই করব। তোমার ‘বোকা’ নাম তুমি সত্যিই সার্থক করেছ। বোকা অনেক-ই দেখেছি, তোমার মতো বোকা দেখিনি আর। অথচ ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র তোমার দাদাই। মেধাবী ছাত্র। আর তোমাকেই লোকে অশিক্ষিত, পাড়ার মস্তান, মেয়েদের সঙ্গে মেশার লোভে থিয়েটার করো বলে গালাগালি দেয়। ‘শিক্ষা’ ব্যাপারটার সঙ্গে কলেজ বা ইউনিভার্সিটির ছাপের বোধ হয় কোনো যোগাযোগ-ই নেই। জানো। কেন যে-মরতে ডিগ্রিগুলো নিতে গিয়েছিলাম। শিক্ষা বা বিদ্যা কিছুই তো আসলে নেই-ই, উলটে যাদের ডিগ্রিটা নেই, তাদের নিজের চেয়ে ছোটো বলে মনে করতে ইচ্ছা হয় মাঝে মাঝেই। ‘ডিগ্রি’ই দম্ভ জন্মায়, প্রকৃত শিক্ষা নয়।
বোকা বলল, আমি তো অশিক্ষিতই। লোকে তো মিথ্যে বলে না। স্কুলের দিন থেকেই বিড়ি খাই, ক্লাস ফাঁকি দিই, বায়োস্কোপ দেখতে যাই দশমাইল সাইকেলে ডবল-ক্যারি করে। যখন নিজেকে তৈরি করার ছিল, ঠিক তখন দু-হাতে নিজেকে নষ্টই করেছি শুধু। আর এখন, যখন দু-হাত দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইছি ‘মানুষ’ পরিচয়ে, তখন দেখছি দেরি হয়ে গেছে অনেক-ই। জানো বউদি, বাবা, দাদাকেই বেশি ভালোবাসতেন। স্কুল ও কলেজের পরীক্ষায় দাদা সব সময়েই ভালো রেজাল্ট করত। বাবা বলতেন, আমি একটা কুলাঙ্গার, অপদার্থ, পরিবারের কলঙ্ক আমি। তখন সত্যিই কলঙ্ক ছিলাম। এখনও মিথ্যে কলঙ্ক। আর দাদা ছিল কুলভূষণ।
একটু থেমে বলল, জান? নাটকের রিহার্সালে অল্পবয়েসি ছেলেমেয়েগুলো আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে প্রায় রোজ-ই। আমি যে, লেখক হতে চাই, তা নিয়েও ওরা বিদ্রূপ করে আমাকে। আজ তক্ষদাও সকলের সামনে কী অপমানটাই যে করল, কী বলব।
তক্ষ রায়? কেন? কী অপমান?
রমলার ভুরু কুঁচকে গেল। বোকাকে কেউ বোকা বললে বা অপদস্থ করলে রমলা বাঘিনি হয়ে ওঠে। সারল্য আর বোকামি যে, এখন সমার্থক হয়ে গেছে তা জানে বলেই।
তক্ষদা বলল, সক্কলের সামনেই, আমার লেখা উপন্যাস, পরের পুজোর সময়ে ছাপা হবে বলে, আমার নাকি সম্পাদকের জন্যে নানারকম খিদমদগারি করতে হবে। আরও নানা অপমানকর কথা বলল।
রমলা হাসল।
বলল, আর তুমি সে-কথা বিশ্বাস করলে? সত্যিই বোকা তো তুমি! তক্ষ রায়কে আমি জানি। মানুষটার রসিকতা অমন-ই। ওর যেকোনো কথার-ই কমপক্ষে তিনটে মানে হতে পারে। এমনকী বেশিও হতে পারে। ওঁকে বোঝা তোমার কম্মো নয়। ওই মানুষটি আসলে সবসময় নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলেন। নিজেকে চিরে চিরে দেখেন, ল্যাবরেটরির ইঁদুরের মতো। ওই একধরনের মানুষ!
সে কী! তুমি তক্ষ রায়কে চিনলে কী করে?
চিনব না কেন? উনি তো তোমার দাদার-ই বয়েসি। তুমি যখন, চাঁইবাসায় কাঠের ব্যাবসা করতে গেলে তোমার বাবার ওপর রাগ করে, আমাদের বিয়ের ঠিক পর পর-ই; তখন তোমার দাদার সঙ্গে উনি তো প্রায়-ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। তোমার দাদার সঙ্গে কোন ডিবেটিং-এর আসরে নাকি আলাপ হয়েছিল। মানুষটির মুখটির দিকে তাকানো যায় না বটে, কিন্তু অমন বিদ্বান, রসিক মানুষ বড়ো একটা দেখিনি। ওঁর কথায় রাগ কোরো না। কোনটা যে, ওঁর রসিকতা আর কোনটা নয়; তা বুঝতে আমাদের দু-জনেরই হিমসিম খেতে হত। তোমার দাদা তো আর তখন এইরকম ছিলেন না। ছিলেন তক্ষ রায়ের-ই মতো, সত্যিকারের মেধাবী, কৃতী একজন মানুষ। বড়ো দুঃখ হয় মানুষটার জন্যে। তোমরা পুরুষরা, বড়ো সহজে নষ্ট হয়ে যাও।
তক্ষদা, দারুণ; না? বউদি?
নিশ্চয়ই দারুণ। আর ভারী সুন্দর কথা বলতে পারেন ভদ্রলোক।
কথা শুনেই প্রেমে পড়ে গেছিলে নাকি?
তা প্রেমে তো কথা শুনেই পড়ে মানুষ। অথবা বাঁশি শুনে বা লেখা পড়ে। সে লেখা, চিঠিই হোক; কী অন্যকিছুই হোক। প্রেমমাত্রই ‘কথা’রই মধ্যে জন্মায়। তবে সে-কথা যদি, শুধু ‘কথার’-ই কথা’ হয় তবে অবশ্য সে-প্রেম টেকে না।
কথায় কথায় রাত বাড়ছে বউদি। ‘ক্যাম্পোজ’ দাও একটা।
না। ক্যাম্পোজ দেব না। অরুণদা কেমন করে চোখের সামনে চলে গেলেন দেখলে-না। কেবল-ইবলতেন, ‘লোডশেডিংকে ভয় কী? লোডশেডিং হলেই দু-টি ক্যাম্পোজ মুখে ফেলে দিয়ে শুয়ে পড়ো। না গরম বুঝতে পারবে; না অন্ধকার। ঘুম; গভীর ঘুম।’ বাহান্ন বছর বয়েসে একেবারেই ঘুমিয়ে পড়লেন একদিন ব্রিজ খেলতে খেলতে তাসের টেবিলে। এসব ওষুধ, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান ছাড়া অমন মুড়ি-মুড়কির মতো খেলে হার্টের ওপর সত্যিই খুব খারাপ এফেক্ট হয়।
ক্যাম্পোজ যখন দিলেই না, তখন একটু লেখাপড়াই করি। কফি করে দেবে তো এক কাপ?
আজ শুয়েই পড়ো-না। মশারিটা গুঁজে দিয়ে যাই? সেই সকাল থেকে বিকেল অবধি সারাটা দিন তো রিহার্সালই দিয়ে এলে। ক্লান্তিও লাগে নাকি তোমার?
লাগে। কিন্তু ভালোও লাগে। কিছু নিয়ে, মানে কোনো সাংস্কৃতিক ব্যাপার নিয়ে তবু তো ব্যস্ত আছি। এতগুলো বছর তো বাবার এই হোলসেল স্টেশনারি ব্যাবসা দেখেই কাটিয়ে দিলাম। একনম্বর খাতা, দু-নম্বর খাতা সেলস-ট্যাক্স, ইনকাম-ট্যাক্স; যত্ত ঝুট-ঝামেলা। দাদা লেখা-পড়ায় ভালো হওয়ায় এই জোয়াল কাঁধে নিতে হল না। মরলাম আমি। গায়ে তেল-সাবান, শ্যাম্পু, ‘থিন-অ্যারারুট’ বিস্কুট আর ডিমের গন্ধ মাখামাখি হয়ে আছে। তাও রিটেইল শপ হলেও হত। সুন্দরী মেয়েরা মাঝে মাঝে এসে বলত, ‘আচ্ছা। চুলের কাঁটা আছে? আইব্রো পেনসিল? কত করে? পিঙ্ক লিপস্টিক, ল্যাকমের? আমাকে দিন-না?’ তা নয়। সব কেঁদো কেঁদো ব্যবসায়ীরা, সাব-এজেন্টরা টেম্পো আর লরি করে ‘হই হই রই রই’ করে মাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কী বউদি, বয়েস হল ছত্রিশ আর কাজ হয়ে গেল কুড়ি বছর। আর এইরকম কাজ! এবারে রিটায়ার-ই করে যাব।
রমলা হাসছিল তার পাগল কিন্তু বড়ো সরল, ভালোমানুষ দেওরের দিকে তাকিয়ে। বোকাই রমলার জীবনের সব। ভাবছিল ও, এই ‘সব’ কথাটার কত্তরকম হয়, না? কোনো ‘সব’, শব ; কোনো সব, সর্বস্ব।
বলছি, একটা বিয়ে করো, তা কথা তো শুনবে না।
বিয়ে তো আর যাকে-তাকে করতে পারব না! চোখের সামনে তুমি সবসময়ে থেকে তো আমার ‘ইহকাল পরকাল’ সব-ই ঝরঝরে করে দিলে। তোমার মতো দ্বিতীয় কেউ কী আর আছে? তাও যদি একটা ছোটোবোনও থাকত তোমার। সব দিক দিয়েই ডুবিয়ে দিলে তুমি আমাকে। বোকা বলল, কপট রাগের সঙ্গে।
তারপর-ই টেবলের ওপর দু-পা তুলে বলল, বিয়ে-ফিয়ে নয়, আমি লেখালেখি করব। বছরে ব্যাবসায় পঞ্চাশ হাজার প্রফিট করাতে যা-না আনন্দ পাই আমি, তার চেয়ে অনেক-ই বেশি আনন্দ পাই একটা ভালো গল্প লিখে। তবে এখনও বানান যে, ভুল হয়! ব্যাকরণও জানি না। ইংরিজি বা বাংলার। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতে দোষ কী? শেখার তো কোনো বয়েস নেই। কী বলো তুমি? এবার আমি শুধু লেখাপড়া নিয়েই থাকব। প্রথম উপন্যাস তো লিখে ফেলেছিই, এবার নাটকও লিখব একটা। নামও ঠিক করে ফেলেছি।
কী নাম?
কৌতুকের চোখে বলল রমলা।
গান্ধারী।
ওমা! কোন গান্ধারী সে? ঝিরাটোলির গান্ধারীই নাকি? কী ব্যাপার? সেই গিরিডিতে যার ঠাকুরদার অভ্রখনি ছিল? সে তো বয়েসে তোমার চেয়ে অনেক-ই বড়ো। পাটনাতে বিয়ে হয়েছে না?
সে নয়। তবে, সেও বটে। সব মানুষের মধ্যেই নাটকের উপাদান থাকে। সব আধুনিক মানুষ-ই পৌরাণিকও বটে। এখন কিছুই জিজ্ঞেস কোরো না নাটকটা সম্বন্ধে।
থিমটা মাথায় ঘুরছে ক-দিন থেকেই। যদি লিখে ফেলতে পারি, তবে গান্ধারীদিকে দিয়েই নায়িকার চরিত্রটি করাব। ফাটাফাটি হবে। প্রোডাকশান খরচও সেই-ই দেবে। বড়োলোকের বিটি। এই দ্বাদশীর দিন তক্ষদার ‘রূপমতী’কে মানে মানে পার করি তারপর ‘গান্ধারী’ সিরিয়াসলি শুরু করব।
এবারে বোকা তাড়াতাড়ি বলল, যাও যাও বউদি। দাদা এসে যাবে কখন। এতরাতে তোমাকে আমার ঘরে দেখলে তুলকালাম কান্ড করবে।
যার যেমন মন সে, পৃথিবীকে তেমন ‘চোখ-এই দেখে। তুমি-আমি কী করব বলো? তবে তোমার দাদার আসার সময় হয়নি এখনও। কোনোদিন একটা, কোনোদিন দেড়টা। ওখানেই যে, থাকে না কেন তাও বুঝি না। সব-ই আমার কপাল।
বোকা ড্রয়ার খুলে একটি ইনল্যাণ্ড লেটার বের করে রমলাকে দিয়ে বলল পড়ে দ্যাখো! ছোটোবোনকে সব দিয়ে বিয়ে দিলাম, কী না করলাম তার জন্যে; আর এই দ্যাখো কী ভাষায় চিঠি লিখেছে আমাকে। কে বলবে যে, আমি ওর দাদা। ওর স্বামী আর শ্বশুরবাড়িই সব। আশ্চর্য লাগে ভাবলেও।
ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে রমলা বলল, সরমা কী লিখেছে চিঠিতে? বাপের বাড়িকে ভুলে না গেলে যে, মুশকিলও!
নাও। কালকে চিঠিটা ফেরত দিয়ো কিন্তু। ওকে একটা যোগ্য জবাব দেব। বড়োই সাহস হয়ে গেছে ওর। সবাই-ই কী পেয়েছে, আমাকে জানি না। আমি এবার থেকে সত্যিই সকলকেই শিখিয়ে দেব। যে-যে ব্যবহারের যোগ্য, তাকে ঠিক সেই ব্যবহার-ই দেব। সংসারে এক তরফা কিছুমাত্রই চিরদিন চলে না; চলতে পারে না। এবার আমিও কাঁদিয়ে দেব সবাইকে। টাইট করে ছেড়ে দেব একেবারে।
কোরো, কোরো। করতে পারলে, আমি খুব-ই খুশি হব। ভগবান তোমাকে কঠোর করুন। শক্ত করুন।
ফিসফিসে গলায় প্রায় স্বগতোক্তির-ই মতো কথা ক-টি বলে রমলা চলে গেল।
বউদি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ে তার চোখের কোণায় যেন, একটু কৌতুকের আভাস দেখতে পেল বোকা। বউদি জানে যে, যতই লম্ফ-ঝম্প করুক, বোকা আসলে নরম মানুষ। ওকে চিরদিন-ই এমনি করেই দুঃখ পেতে হবে। বোকা ভাবছিল, এই বোকাকে নিয়ে সকলেই কি শুধু কৌতুক-ই করবে? একজন মানুষও কী ওকে সিরিয়াসলি নেবে না? ওর যা-পাওয়ার ছিল, এই জীবনে, এই পৃথিবী থেকে তা কি কারো কাছ থেকেই পাবে না? ও যে, নরম এটা সকলেই জেনে গেছে। এবার সকলকেই ও জানিয়ে দেবে যে, ও কী! দাদাকেও জানাবে, জানাবে ছোটোবোন সরমাকেও। এই সংসারে সকলেই হচ্ছে ‘শক্তর ভক্ত, নরমের যম’।
ঘরের আলোটা নিবিয়ে দিল বোকা। দিয়ে, পুরোনো লম্বা হাতলআলা বেতের ইজি চেয়ারটাতে শুয়ে পা দু-টি তুলে দিল। বারান্দার দরজাটা খোলা ছিল। পথের দু-পাশের বহুপুরোনো গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন, ঘরের বাইরেই জঙ্গল। গভীর। সামনের গাছটাতে কতগুলো চিলের বাসা আছে। ওরা গভীর রাতে নিজেদের মধ্যে কীসব কথা বলে অস্ফুটে, উঁচু ডালে নড়ে-চড়ে বসতে বসতে। দুখিয়া পাগলা, পথ-পাশের ঝুপড়ির মধ্যে থেকে রাত গভীর হলেই বুক কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে:
হায়! হায়! ক্যা কিয়া? ঔর ক্যা মিলা?
কী করলাম? আর কী পেলাম!
এইটা বোকারো কথা। হয়তো সব মানুষের-ই কথা। যে যা করে, তার বদলে যে-প্রত্যাশা থাকে তার কিছুমাত্রই ফেরত পায় না কেউই এই সংসার থেকে। জীবন এইরকম-ই।
ক-দিন আগে এক রবিবার সকালে দুখিয়াকে শুধিয়ে ছিল বোকা, রাতভর তুমি জেগে থাকো কেন? খালিপেটে থাকো বলেই কি ঘুম আসে না তোমার? বউদির কাছে যাও না খাবারের জন্যে? বউদি তো তোমার জন্যে রোজ-ই খাবার করে রাখেন।
যাই খাই। বহুজির জন্যেই তো বেঁচে আছি। আমার হাতের রেখাটা যদি, সত্যি সত্যিই সত্যি হয়, মানে, গয়ার সেই সাধুবাবা যা-লিখে দিয়ে গেছেন, আমার জনমপত্রী দেখে; তাহলে তো শেষজীবনে আমি গবর্নর হব। কেউই ঠেকাতে পারবে না। তখন তোমরা দেখো, বহুজিকে আমি কী সম্মান দিই। কিন্তু কথা সেটা নয়।
খাই-ই তো। রোজ-ই খাই। শরীরকে জ্বালায় যে-খিদে, সেই খিদে নিবৃত্তি সহজেই হয়। কিন্তু মন? মনকে যে, জ্বালায় চিন্তা। সারারাত মনকে আমি ধূপের মতো জ্বালিয়ে রাখি গাঁজায় দম দিয়ে। রাতে যারা ঘুমোয়, তারা এখনও বড়ো হয়নি। হয়তো মানুষও নয়। অবোধ শিশু, মাথামোটা, টাকার গর্বে ফোলা, হুলো হুলো মানুষ; স্বামীর আদরে পরিতৃপ্ত সাধারণ নারী; অতিনিকৃষ্ট শ্রেণির পুরুষ, যারা তামসিক, তারা এবং জন্তুজানোয়ারেরাই শুধু রাতে ঘুমোয়। যাদের মস্তিষ্কর বয়েস হয়েছে একটুও, রাত-ভর তারা জেগে বসে থাকে; ‘চিন্তা’ করে। এই সমুদ্রে অন্যরা যখন ঘুমোয়, রাতের থির জলে-চলা নৌকোর-ই মতো নৌকোর তারাই বসে হালে। মানুষের জীবনের হাল ধরে। মানুষ কোন দিকে যাবে, কোন ঘাটে তার যাওয়ার ছিল, তা ঠিক করে দেয়, সেইসব রাত-জাগা পুরুষরাই যুগে যুগে।
বোকা, দুখিয়া পাগলাকে অনেক দিন শুধিয়েছে, ‘হায়! হায়! ক্যা, কিয়া? ঔর ক্যা মিলা’ বলে চেঁচিয়ে ওঠো কেন, তুমি রোজ রাতদুপুরে? আমার হার্ট ভালো না। কোনদিন হার্ট-অ্যাটাক হয়ে মারাই যাব তোমার জন্যে।
দুখিয়া পাগলা এই প্রশ্নের জবাবে শুধুই হাসে। ওপরের সারির গোটা আটেক আর নীচের সারির গোটা দশেক দাঁত হাওয়া হয়ে গেছে। আধ-ফোকলা মুখে হাসে পাগলা। ওর মুখে চেয়ে, বোকার মনে হয়; যেন ভগবানের-ই হাসি দেখল।
পাগলা বলে, ‘ক্যা কিয়া? ক্যা মিলা?’ সে-কথা শুনে তুমি কী করবে ছোটোবাবু? সেসব ছোটোকথা, নোংরা কথা। নিন্দার কথা। সেসব কথা সব সংসারেই থাকে। সব গৃহীর-ই কোনো-না-কোনো সময় মনে হয়, হায়! হায়! কী করলাম। আর কী পেলাম! কিন্তু আমি তো গৃহী নই। যতদিন আমার এই অনুযোগ থাকবে সংসারের প্রতি, ততদিন আমি সাধক হতে পারব না। দুঃখটা তো এই-ই। সে যতবার-ই হরিদ্বার আর প্রয়াগ আর কেদারবদরীতে যাই-না-কেন! আর যত কোটিবার-ই তাঁর নাম করি না কেন। প্রতিরাতেই নিজেকে বলি, জানো ছোটোবাবু; বলি, আজ আর বলব না। কিন্তু শালা, ঠিক মুখ-ফসকে দাঁত-পিছলে বেরিয়ে যায়-ই। অনুযোগ নিয়ে, ক্ষোভ নিয়ে, পরিতাপ নিয়ে কেউ কখনো সাধক হতে পারে না। আমার ‘সিদ্ধি’ আটকে আছে শুধু ওইটুকুর-ই জন্যে। নইলে সিদ্ধির সাধনা, এইজন্যে মহড়া তো দিয়ে চলেছি, গত পনেরো বছর ধরেই। ঠিক চল্লিশ বছর বয়েসে সংসার ছেড়েছিলাম।
কোনটুকুর জন্যে?
ওই যে! ‘হায়! হায়! ক্যা কিয়া? ঔর মিলা ক্যা!’ যেদিন মন বলবে, সবাই ভালো থাকো গো। প্রত্যেকেই। আমার শত্রু-মিত্র, আমার আত্মীয়-অনাত্মীয়, পৃথিবীর সব ভোগী-ত্যাগী, গুণী-নির্গুণ, সকলকেই ক্ষমা করে দিয়েছি আমি, কারো কাছেই পাওনা নেই কিছুমাত্রই, ছুটি দাও, ছুটি দাও চিরকালের মতো, আমি যার চরণাশ্রয়ের লোভে ছুটে এসেছিলাম, সংসার স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে একদিন; তাঁর পায়েই লুটোতে দাও আমাকে...
বোকা চুপ করে চেয়েছিল ফোকলা, পাগলা, ছেঁড়া-ধুতি, আর খালি গায়ের দুখিয়ার দিকে। পথের মাঝে দুখিয়ার ঝুপড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে অভিভূত হয়ে গেছিল ওর কথাতে। নিজের জীবন, ব্যাবসা, কালচার-ফালচার, সাহিত্য-টাহিত্য এমনকী তার শিরে-সংক্রান্তি রূপমতী নাটকের কথাটা পর্যন্ত মাথা ছেড়ে উড়ে গেছিল, হঠাৎ-ই কুকুরে তাড়া-করা চড়ুই পাখির ঝাঁকের মতো।
বোকার মন বলছিল: এইখানেই আসল আনন্দ রে বোকা। হিরে-জহরত সব ঝলমল করছে। এখনও ভাব। ভেবে দেখ। কী চাস? কিন্তু সিদ্ধি তো দূরস্থান ওর কপালে শান্তিও নেই দু-দন্ডের। ঠিক সেই সময়েই গিদারাম সিং কয়লার ব্যবসায়ী; বাজারের দিকে যাচ্ছিল তার নতুন কেনা ‘হণ্ডা’ মোটরবাইকে। দু-হ্যাণ্ডেলে লাল-সবুজ ক্যাটক্যাটে রঙের প্লাস্টিকের ঝুরি নামিয়েছে। জোরে ব্রেক করে ওর প্রায় গায়ের-ই ওপর দাঁড়িয়ে বলল, ‘ক্যা বাবু? পাগলকি পাস ক্যা গাঞ্জেকে ধান্দেমে?’
বোকা উত্তর দেওয়ার আগেই ‘ভটভট’ আওয়াজ করে ঝকঝকে বাইকটা দেখিয়ে বলল, পাটনা সে, কালহি লেত্বে আয়া। কেইসা?
বোকা চকচকে চোখে বলল, ফার্স্টক্লাস।
গিদারাম দু-বার জোরালো হর্ন বাজিয়ে শোনাল ‘পিকঁপিকঁ’ করে, তারপর-ই রুপোর মতো ঝকঝকে সাইলেন্সারটা ল্যাজের-ই মতো পেছনে ফুলিয়ে বীরদর্পে এঁকে বেঁকে কেরদানি মেরে চলে গেল, বোকার মনে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় লোভ জাগিয়ে।
বোকার মাথায় যে-উচ্চ মার্গের ভাব ক্ষণিকের জন্যে হলেও চাড়িয়ে গেছিল, একটা লাল-রঙা মোটরসাইকেলে চড়ে-আসা ব্ল্যাক-ডায়মণ্ড মার্চেন্ট গিদারাম সিং তা ধূলিসাৎ করে দিয়ে গেল।
দুখিয়া পাগলার ফোকলা মুখ এক রহস্যময় হাসি খেলে গেল। বোকার মুখ লক্ষ করে। বলল, যাও যাও ছোটোবাবু, দোকান খোলো গিয়ে। তোমার হাতে অতগুলো চাবি: সবই কি দোকানের-ই?তোমার দোকানের?
বোকা বলেছিল, হাতের চাবির ভারী গোছাটা নেড়ে, হ্যাঁ।
ইস বেচ্চারি।
দুখিয়া পাগলা বলেছিল নিজের মনে। বিড় বিড় করে বলেছিল, শেষে পৌঁছে, দরকার হবে শুধুমাত্র একটার-ই। বোঝো তো! একথা কেউই বোঝে না। ব্যোম শংকর।
বোকাও জানে যে, ‘চাবির বোঝা, বড়োবোঝা।’ ওর অবচেতনে ও সবসময়েই রিহার্সাল দেয়, একদিন ও এই চাবির বোঝা ছুড়ে ফেলে দুখিয়া পাগলাই হয়ে যাবে, যদি তক্ষদা নাও হতে পারে। কিন্তু অনেক-ই যে, ভারী চাবিগুলো। বাবা বয়েছেন পঞ্চাশ বছর। প্রতিদিন সকালে রামফল রিকশাওয়ালার সাইকেল-রিকশায় চেপে দোকানে গিয়ে তালাগুলো খুলেছেন। প্রতিসন্ধ্যায় আবার আগুন জ্বেলে, পুজো করে সেগুলো বন্ধ করেছেন। আজ বাবা নেই। রামফল রিকশাওয়ালাও নেই। একা বোকা চাপা পড়ে গেছে অতগুলো চাবির গোছার নীচে।
পেঁচা ডেকে উঠল একটা। বাড়ির মধ্যের লিচুগাছটাতে একটু বসেই ডানা-ঝাপটিয়ে উড়ে গেল।
ওর উপন্যাসের নামটা ‘ঘটোৎকচ’ শুনে নাটকের মহড়া দেওয়া ছেলে-মেয়েরা হাসাহাসি করছিল। ওরা জানে না, ওর বুক নিংড়ে লিখেছে ও সেই উপন্যাসটি। আসলে তা ওর জীবন নিয়েই লেখা। মহাভারতে কুরু ও পান্ডবদের মহারথীদের-ই জয়-জয়াকার। ঘটোৎকচ নামেও যেমন হাস্যোদ্দীপক, তার জীবনও তেমন-ই। বেচারি উল্লেখযোগ্য কেউই নয়। বোকা যে, আসলে বোকাই— একথাটাই কেউ বিশ্বাস করল না, অথচ প্রদ্যুম্ন সবসময়ই নিজেকে বুদ্ধিমান, সপ্রতিভ, আঁতেল, সাহিত্য-কাব্য-নাটক জগতের একজন পথিকৃৎ বলে মনে করে অথচ সকলেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, মাল নেই ভেতরে কিছু, শুধুই মিডিয়ার জোরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রদ্যুম্ন সে-কথা জানে। আর জানে বলেই আরও বেশি আঁতেলপনা করে। আসলে বোকার আর প্রদ্যুম্নর দুঃখটা এক-ই ধরনের। একজন বোকা হওয়া সত্ত্বেও লোকে তাকে ‘ধূর্ত’ ভাবে, অন্যজন বুদ্ধিমান ও গুণী হওয়া সত্ত্বেও লোকে তাকে আমল-ই দেয় না।
পান্ডবদের দ্বিতীয় ভাই ভীমের ঔরসে আর হিড়িম্বা রাক্ষসীর গর্ভে ঘটোৎকচের জন্ম। জন্ম থেকেই সে, এক মহাবলী রাক্ষস। রাক্ষসীরা গর্ভবতী হওয়ামাত্রই প্রসব করে, খেয়েই বমি করার মতো; তাই হিড়িম্বা রাক্ষসীর ছেলে ঘটোৎকচ জন্মানোর ক্ষণ থেকেই যুবক। বেচারার না ছিল শৈশব; না কৈশোর। আজকালকার বাচ্চাদের মতোই। ‘ঘট’ মানে হাতির মাথা, আর ‘উৎকচ’ মানে হচ্ছে টেকো। হাতির মতো টেকো মাথা নিয়েই বেচারি জন্মায়, তাই-ই তার নাম ঘটোৎকচ। যেহেতু একজন পান্ডবের ঔরসে তার জন্ম, অতএব সে, পান্ডবদের দাসানুদাস। জন্মের পরমুহূর্তেই, তাকে প্রয়োজনে স্মরণ করামাত্রই সে, উপস্থিত হবে তাদের খিদমদগারিতে শামিল হতে এই প্রতিজ্ঞা করে সে উধাও হয়ে যায়। রাক্ষসীর অমন কুদর্শন ছেলেকে তো আর কেউ নাড়ু খাওয়ার জন্যে স্মরণ করে না; করে ‘ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো’র দরকার হলে। দ্রৌপদী যখন বদরিকা-পথে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন ভীম তাকে স্মরণ করামাত্র ঘটোৎকচ উদয় হল। ভীম বললেন, দ্রৌপদীকে কাঁধে করে পৌঁছে দিতে বদ্রিকাশ্রমে, অতএব বেচারা তাই-ই করল। তারপর কৌরবদের সঙ্গে যখন, পান্ডবদের যুদ্ধ বাধল তখন আবার ডাক পড়ল ঘটোৎকচের। প্রলয়ংকরী যুদ্ধ করে কুরুসেনা সে লন্ডভন্ড করে দিল। কৌরবদের মধ্যে আতঙ্ক উঠল। যুদ্ধের চোদ্দোদিনের মাথায় ঘটোৎকচের সঙ্গে কিছুতেই পেরে না উঠে কৌরবদের হাতজোড়-করা অনুরোধে কর্ণ, অর্জুনকে মারার জন্যে ইন্দ্রর সাপ্লাই-করা যে, স্পেশ্যাল ‘বৈজয়ন্তী’ রকেট স্টকে রেখেছিলেন তাই ঝেড়ে দিলেন বেচারি ঘটোৎকচের ওপর। ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার মতো মরল ঘটোৎকচ। এমনকী মরবার মুহূর্তেও মেরে মরল। যখন সে, মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর তখন তার নিজের শরীরকে প্রকান্ড বেলুনের মতো ফুলিয়ে ইয়াব্বড়ো করে মরে যখন পড়ল, তখন কৌরবদের সৈন্যদলের সৈন্যদের ওপর-ই ঢলে পড়ল। মৃত শরীরের চাপেই পিঁপড়ের মতো চেপটে মারা গেল অসংখ্য কুরুসৈন্য। এতেও হল না। ঘটোৎকচের ছেলে, বেচারা অঞ্জনপর্বাকে পর্যন্ত সেই যুদ্ধে শামিল করালেন মহান পান্ডবেরা। অপরাধ? ভীমবাবু হিড়িম্বা রাক্ষসীকে একবার আদর করেছিলেন। সে-আদরে ভীমবাবুর যেন, কোনোই সুখ ছিল না, ভাগ ছিল না। বেচারা অঞ্জনপর্বাও মারা গেল অশ্বত্থামার হাতে।
পান্ডবরাও সৎ, ধার্মিক, মহান। কৌরবেরাও মস্ত বীর। তাদের সকলের নাম থাকল, সোনার অক্ষরে আর বেচারি অঞ্জনপর্বা আর তার বাবা ঘটোৎকচকে সকলেই বেমালুম ভুলে গেল, বোকাকে যেমন ভুলে গেছে তার ব্রিলিয়ান্ট দাদা আর একমাত্র বোন সরমা। এও জাতপাতের-ই ব্যাপার। ভারতবর্ষে জাতপাত নতুন কিছু নয়। যারাই সদবংশজাত, যারাই ধনী; যারাই ক্ষমতাবান তারাই চিরদিন ঘটোৎকচদের দিয়ে ক্রীতদাসের মতো তাদের নিজেদের নানা উদ্দেশ্যসাধন করিয়ে নিয়েছে। না দিয়েছে তাদের মান, না পিতৃপরিচয়, না ধনসম্পত্তি, না একটু ভালোবাসা। তারা শুধুমাত্র ‘নীচকুলসম্ভূত’ বলেই তাদের শোষণ করেছে, ব্যবহার করেছে নির্দয়ভাবে।
‘ঘটোৎকচ’ উপন্যাসে বোকা শুধু তার নিজের জীবনের দুঃখই ফুটিয়ে তোলেনি, ব্লো-আপ করেছে, হাটে হাঁড়ি ভেঙেছে উচ্চকুলের এইসব নীচ মানুষদের। ঘরে-বাইরে এই নীরব বিদ্রোহকে মূর্ত করে তোলার মহড়া দিয়ে চলেছে বোকা বহুদিন থেকেই। এই মিথ্যে, মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে অর্জন করা মান-সম্মান শৌর্য-বীর্যকে ও ছিঁড়েখুঁড়ে দিতে চায় ওর একা হাতেই।
পারবে কি? ওর এই সংগোপনের, ব্যক্তিমানসের নাটক, জীবনের নাটক কোনোদিনও কি এদেশের শিক্ষিত উচ্চকুলের মানুষদের সামনে মঞ্চস্থ করতে পারবে বোকা?
নে, নে। আজ তাড়াতাড়ি চা খেয়েনে সবাই। অনেক গেঁজিয়েছিস। এবার শুরু করা যাক। আজ তক্ষদা আসবেন কিন্তু রিহার্সাল দেখতে। মহালয়ার আর পনেরো দিনও বাকি নেই। সিরিয়াস হ সকলে।
বোকাদা বলল।
কখন?
রুন শুধোল। তক্ষদা কখন আসবে?
এই, এগারোটা নাগাদ। আজ বিশুর মা আমাদের জন্যে, বিরিয়ানি পোলাও পাঠাবেন ক্লাবের বাবুর্চিকে দিয়ে রাঁধিয়ে। ভালো করে রিহার্সাল দে। কারো পার্ট ভুল হলে সে, বিরিয়ানি পাবে না। দুপুরে না খেয়েই থাকতে হবে। ঠিক আছে? মনে করবি স্টেজ রিহার্সাল। প্রম্পটাররা, তোমরা এমন করে প্রম্পট করবে যেন, অডিটোরিয়াম থেকে একটুও শোনা না যায়। ওককে। স্টার্ট নাউ।
শ্যামলের বেগুন-ভাতে-ভাই আর মানিকের চিচিঙ্গার মতো দেখতে মেয়েলি গলার দাদা, প্রম্পটার। দু-দিকের উইংসের আড়াল থেকে দু-জনে প্রম্পট করছে। একজনের গলা ভ্যাতভ্যাতে। অন্যজনের গলা এমন ‘চিঁ চিঁ’ করে যে, এই পোড়োবাড়ির কার্নিশে-বসা পায়রাগুলো পর্যন্ত ভয় পেয়ে ডানা ধড়মড়িয়ে উড়ে যায়।
বোকাদা বলল, তৃতীয় অঙ্ক। রীতি, রুন, বিশু, সূর্য, গোপেন, চামেলি সব ক্যারেকটারস রেডি? থ্রি, টু, ওয়ান স্টার্ট। প্রথম দৃশ্য। তৃতীয় অঙ্ক। বাজবাহাদুর এবং রূপমতী। লোকেশান, মাণ্ডুর রূপমতী মেহাল।
রূপমতী—সুলতান! কিছুদিন থেকেই আপনাকে বড়ো ছটফট করতে দেখছি। আমার গান কি আর ভালো লাগে না আপনার?
বাজবাহাদুর—সে-জন্যে নয়, সে-জন্যে নয়।
একটু চুপ করে থেকে, রূপমতী মেহালের ছাদে পায়চারি করতে করতে নীচের ঘন জঙ্গলাবৃত নিমারের উপত্যকার দিকে চেয়ে ডায়ালগ বলতে যাবে বিশু, ঠিক সেই সময়েই বোকাদা চেঁচিয়ে উঠল :
হাত পেছনে, হাত পেছনে।
অ্যাঁ?
চমকে উঠল বিশু।
সুলতান বাজবাহাদুর যখন-ই চিন্তা করেন তখন-ই দু-খানি হাত পেছনে রেখে, ডান হাত দিয়ে বাঁ-হাতের কবজি ধরে রাখেন। মনে থাকে যেন। ভুল না হয়। আবার কর পায়চারি! আরে! একটু সুলতান সুলতান ভাব আন।
বলেই, বোকাদা বলল, এই রমেশদা! কোথায় গেলেন রমেশদা? মিউজিক! মিউজিক! আজকে একেবারে স্টেজ রিহার্সালের মতো হবে। সিরিয়াসলি এখনও না করলে হবে কী করে? পুজোর আর দেরি ক-দিন?
রমেশবাবু সবে জম্পেশ করে পানটা মুখে দিয়েছিলেন। কিছুটা জর্দা ‘হাঁ’-করা মুখে ফেলে দিয়ে টুলটা টেনে এসরাজ কাঁধে উইংসের পাশে গিয়ে বসে পড়লেন!
স্টার্ট এগেইন। সরি ফর দ্যা ইন্টারাপশান।
বোকাদা বলল।
বাজবাহাদুর—গানও যেদিন ভালো লাগবে না রূপমতী, বিশেষ করে তোমার গান; সেদিন বাঁচা আর মরাতে তফাত থাকবে কি কোনো?
রূপমতী—তবে? সুলতান সবসময়ে কোন চিন্তা আপনাকে এমন অন্যমনস্ক করে রাখে আজকাল?
বাজবাহাদুর—রাজা বা সুলতান এমন, কি কখনো কেউ ছিলেন মাঁলোয়ার ইতিহাসে, যাঁর চিন্তা ছিল না কোনো? মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হতেন না যিনি? এই তখত বড়োই অসুখের, বড়োই অস্বস্তির এবং ক্ষণকালের আসন রূপমতী। এই আসনকে যে, নিজের মস্তজোর, শঠতা, নিষ্ঠুরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে অনুক্ষণ কুবেরের ধনের-ই মতো আগলে বসে না থাকতে পারে, তাকে আসনচ্যুত হতেই হয়। এই তখত-এ অধিকার থাকে না তার আর। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম...
এমন সময় ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যাবে; চারজন অশ্বারোহী আসবার আওয়াজ। দূর থেকে। রূপমতী মেহালের দিকে।
বাজবাহাদুর ওইদিকে চেয়ে হঠাৎ-ই কথা থামিয়ে দেবেন। রূপমতী ওই দূরাগত অশ্বারোহীদের দিকে যেন, চেয়ে থাকবেন কিছুক্ষণ। এখনও দূরে আছে অনেক-ই। সুলতানের ডাকহরকরা, ভালো করে লক্ষ করে, যেন, তাদের ধ্বজা দেখেই বুঝলেন। বুঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যাবেন রূপমতী। রূপমতী মেহালের নীচে অমলতাস গাছেরা ফুলের স্তবকে স্তবকে ভরে গেছে। সামান্য প্রভাতি হাওয়ায় একটু একটু দুলছে, সেই স্তবকগুলি।
রূপমতী—কী সুন্দর, না?
বাজবাহাদুর—কী?
রূপমতী—এই ফুলগুলি। এই সকাল, নিমারের আদিগন্ত এই উপত্যকা, দূরের নর্মদা নদী, পুণ্যতোয়া, উত্তরবাহিনী। অথচ আপনার সময়ই নেই এসব দেখবার। এমনকী, গানও শোনবার।
দুড়দাড় করে সরু সিঁড়ি বেয়ে ঘোড়া থেকে একলাফে নেমে একজন অশ্বারোহী ছাদে উঠে এল। অন্যরা দাঁড়িয়ে রইল। কুর্নিশ করল সবাই বাজবাহাদুরকে। হ্রেষারব এবং অস্থির ঘোড়াদের পা ঠোকার আওয়াজে মন্থর প্রভাতি হাওয়া অবিন্যস্ত হয়ে উঠল। অশ্বারোহী এসে পাকানো এবং হলুদ রেশমি সুতোয় বাঁধা বার্তা তুলে দিল সুলতানের হাতে, মাথা ঝুঁকিয়ে। বলল, হোশাঙ্গাবাদ থেকে সেনাপতি লড্ডন খাঁ পাঠিয়েছেন।
বাজবাহাদুর বার্তাটি খুলে পড়লেন। ভ্রূ-যুগল কুঞ্চিত হল তাঁর। বললেন, সেনাপতি একরাম খাঁকে দেখা করতে বলো আমার সঙ্গে বড়া মসজিদে। এক্ষুনি। আমি যাচ্ছি।
অশ্বারোহী চলে গেল, আবারও দুড়দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে।
রূপমতী—কী খবর সুলতান? খারাপ কিছু?
বাজবাহাদুর—খবর খুব-ই খারাপ। দিল্লি থেকে মোগল সম্রাট আকবর, সেনাপতি আধম খাঁকে পাঠিয়েছেন মাঁলোয়া দখল করার জন্যে। তাঁর বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছে ক্রমশই। লড্ডন খাঁ খবর পাঠিয়েছেন হোশাঙ্গাবাদ থেকে যে, সারাংপুরে আধম খাঁকে রুখতে না পারলে মাণ্ডু বাঁচানো যাবে না কোনোক্রমেই। তাকে তো ‘ধার’ পেরিয়ে মাণ্ডুতে উঠে আসতে দেওয়া যায় না!
একটু চুপ করে থেকে অন্যকিছু মুখ ফিরিয়ে বললেন: হেস্তনেস্ত যা হবার, তা ধারের সমতলেই হোক। আমার মাণ্ডু আর আমার রূপমতীর গায়ে যেন, আঁচড়টিও না লাগে।
রূপমতী—সর্বনাশ! বড়োই খারাপ খবর এ, সুলতান। আধম খাঁর বাহিনী যে, বিরাট। সম্রাট আকবর তো ছেলেখেলা করার জন্যে সেনাবাহিনী পাঠান না। আপনি যদি হেরে যান, তাহলে কী হবে আমার?
বাজবাহাদুর—হারার কথা বোলো না আমাকে রূপমতী। বোলো না, হারার কথা।
রূপমতী—না, না। হারার কথা আমি ভাববও না একবারও। সুলতানের জীবনে যুদ্ধ তো মাঝে মাঝে আসবেই। তাকে ভয় করলে চলবে কেন? জিততে আপনাকে হবেই। মানুষ গায়ের জোরে যুদ্ধ জেতে না, জেতে ‘মনের জোরে’। মনের সাহসটাই আসল সাহস, সুলতান। ভয় পাবেন না।
বাজবাহাদুর—ভয়? ভয়ের কথা কী করে উচ্চারণ করলে তুমি, রূপমতী? তুমিও কি আমাকে ভীরু বলে জানো?
রূপমতী—তা জানি না। কিন্তু সুলতান, এই কথা কি মিথ্যে? আমার কথা নয়, সকলেই বলে যে, নবাব মালিক বায়জাদ, যখন তখতে বসলেন, নিজের নাম বদলে যখন হলেন, সুলতান বাজবাহাদুর, তখন থেকেই দেখা গেছে যে, তাঁর মধ্যে শেরশাহর দুর্ধর্ষ সেনাপতি, তাঁর পিতা শুজ্জাত খাঁর বীরের রক্তর আভাস নাকি ছিল না। আমাকে মার্জনা করবেন সুলতান। আপনি কি আপনার পিতার সন্তান নন সুলতান? গোণ্ডায়ানার হিন্দু রানি, রানি দুর্গাবতীর কাছে যুদ্ধে লজ্জাকরভাবে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই নাকি আপনার মধ্যে যোদ্ধাসত্তাটি মরে যায়? তারপর থেকেই সুরা, গান আর রূপমতীর মধ্যেই আপনি ডুবে যান। আমার গায়েও তো কম বাজে না এ-কলঙ্ক! আমাকে পেয়েই নাকি সব হারিয়েছেন আপনি! আমিই নাকি আপনার অধঃপতনের মূলে? একজন পুরুষকে ঘরমুখো, এমনকী ভীতু করে তুললাম, শুধু এই দুর্নামটুকুই কি আমার প্রাপ্য ছিল সুলতান? আমি নিজে তো ভীতু নই। এ ছাড়া আর কিছুই কি পাওয়ার ছিল না আমার? আর কোনো প্রশস্তি?
পূর্ণদৃষ্টিতে বাজবাহাদুর একবার তাকালেন রূপমতীর দু-চোখে। কাছে এগিয়ে এলেন। অনেকক্ষণ নীরবে তাঁর দু-চোখের তারায় কী যেন, খুঁজতে লাগলেন। নবাবের দু-চোখ যেন, বলতে লাগল, তুমিও? তুমিও রূপমতী? তারপর-ই চোখের দৃষ্টি কঠোর হয়ে এল নবাবের। এবং পরমুহূর্তেই উদাস।
বাজবাহাদুর—সুলতান হুমায়ুঁ, মাঁলোয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পর-ই, খলজি বংশের কর্মচারী মান্নু খাঁ একদিকে নর্মদা আর অন্যদিকে ভিলসা শহর অবধি মালোঁয়ার ভূখন্ড সব-ই অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং এই মাণ্ডুতেই নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন কাদির শা নাম নিয়ে পনেরো-শো ছত্রিশ খ্রিস্টাব্দে। দিল্লির শের শা এসে তাদের তাড়িয়ে দিলেন। গদিতে বসলেন আমার বাবা শুজ্জাত খাঁ পনেরো-শো চুয়ান্নতে।
রূপমতী—এসব কথা বলছেন কেন সুলতান? এর কিছুই তো অজানা নয় আমার। আমি...
বাজবাহাদুর—বলছি, কারণ তোমার কথার উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। একথা ঠিক-ই, যে, আমি রানি দুর্গাবতীর কাছে হেরে গেছিলাম যুদ্ধে। নবাব হওয়ার পর। বাজবাহাদুর হেরে গেছিল। জীবনে হারকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু, কে জানে? হয়তো জিততেও পারতাম। যুদ্ধে হার এবং জিত দুই-ই থাকে। যুদ্ধ হলেই একপক্ষের জিত হয়, অন্যপক্ষের হার। জানি আমি যে, হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসে লেখা থাকবে —হেরো বাজবাহাদুর যুদ্ধে হেরে গান-বাজনা আর রূপমতীকে নিয়ে তার রূপেই আর তার গানেই নষ্ট হয়ে গেল, ভ্রষ্ট করে দিল মাঁলোয়ার নবাবি তখত। কিন্তু ইতিহাসে কতটুকুই বা লেখা থাকে রূপমতী? শুধুমাত্র সন, তারিখ আর ঘটনার-ই যারা কারবারি, তাদের মধ্যে বেশির-ই তো দেখার চোখ, অনুভূতির গভীরতা এবং কল্পনার শক্তি থাকে না।
রূপমতী—আপনি বড়োই উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন সুলতান। যাঁকে কিছুদিনের মধ্যেই জীবন-মরণের যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে তাঁর পক্ষে এমন মানসিকতা আদৌ স্বাস্থ্যকর নয়।
বাজবাহাদুর—রূপমতী, সব-ই জানি আমি। তবু যে, প্রশ্ন তুমি তুলেছ তার জবাব আমাকে দিতে দাও। পরে সময় আর নাও পেতে পারি। তা ছাড়া, এই প্রশ্নের জবাব শুধু তোমাকেই যে, দিচ্ছি তাও নয়, আমার নিজের বুকের মধ্যেও এই প্রশ্ন বহুবছর চিৎকার করে উঠেছে। মাথার মধ্যে শিরা-উপশিরায় ঝংকার তুলেছে। আমার ভেতরের সেই—আমিকেও শুনতে দাও এই প্রশ্নের উত্তর।
রূপমতী—বলুন সুলতান। আসুন, তার আগে আমরা পুবের আলসেতে গিয়ে বসি। আপনাকে কি কোনো পানীয় দেবে সুলতান? আয়েষা!
বাজবাহাদুর—না। না। চলো। তুমি শোনো রূপমতী, আমি কী বলি না বলি। শুনে রাখো। যদি কেউ এ-কথা তোমার কাছ থেকেও শোনে, তাহলেও জানবে যে, সব সুলতান-ই একধাতু দিয়ে গড়া হয় না। যুদ্ধের পর যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য দেখানোই কোনো সুলতানের অস্তিত্বের একমাত্র বহি:প্রকাশ নয়।
রূপমতী—বসুন সুলতান। এইখানে বসুন, আসন পেতে দিলাম।
বাজবাহাদুর—হ্যাঁ। বসছি। আমার তাড়া নেই কোনো। অনন্তকাল অপেক্ষা করে আছে আমার জন্যে, আমার অনন্ত জীবন, রূপমতী!
রূপমতী—বলুন, কী বলবেন আমাকে জাঁহাপনা?
বাজবাহাদুর—জানি না। কী করে যে বলব! জানো রূপমতী, আমি সম্পূর্ণই অন্য ধরনের, এক নতুন যুগের, নতুন জগতের সুলতান হতে চেয়েছিলাম। পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে তুমি দেখবে, অনেক নবাব, জাঁহাপনা, সুলতান-ই রাজ্য শাসন করেছেন, ক্রমাগত যুদ্ধ করে, প্রতিপক্ষকে হত্যা করে অথবা যাবজ্জীবন বন্দি করে রেখে। অন্য রাজ্যের নৃপতিদের রাজ্য কেড়ে নিয়ে। সেই রক্ত-ঝরানো স্বাচ্ছল্যর অর্থ দিয়ে, কেউ কেউ প্রজার মঙ্গল করেও নাম কিনেছেন। কেউ আবার অত স্বচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও প্রজাদের নিপীড়ন-ই করেছেন। সবাই তো রাজা ভোজ বা রাজা মুঞ্জ-এর মতো হন না। কেউ গান-বাজনা, সাহিত্য, অথবা স্থাপত্য যাতে মূল্য পায়, যাতে সেই সুলতানের আমলেই সেইসব গুণ এবং শিল্প যথার্থ প্রস্ফুটিত হয় তাও দেখেছেন...
রূপমতী—সেটা কি খারাপ সুলতান?
বাজবাহাদুর—শেষ হয়নি কথা আমার। শেষ করতে দাও, রূপমতী। ওঁরা যা-কিছুই করেছেন, সবকিছুই করেছেন নিজেদের যশের-ই জন্যে। ইতিহাসে নিজের নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকে যাতে, শুধুমাত্র সেইজন্যেই। সাহিত্যকে, গান-বাজনাকে, স্থাপত্যকে ভালো তাঁরা বাসেননি। নিজেদের ছাড়া আর কাউকেই, কোনো-কিছুকেই ‘দামি’ করেননি আসলে। মাইনে করা ঐতিহাসিকদের দিয়ে, তাঁদের জাগির দিয়ে, ধন-দৌলত দিয়ে কিনে নিয়ে, নিজের নামে জয়ধ্বনি দিইয়েছেন। এই-ই ঘটেছে যুগের পর যুগ। ঐতিহাসিকেরা যে, রূপোপজীবিনীদের চেয়ে, কিছু কম বিকিয়েছেন নিজেদের কিছুমাত্র, মাঁলোয়ার তো বটেই; সমস্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তা বলে না।
রূপমতী—সে তো নতুন কিছু নয়, সুলতান। সে তো চিরদিন-ই হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। ইতিহাসমাত্র বিশ্বাসযোগ্য তো এই কারণেই হয় না। ইতিহাসে চিরদিন-ই মিথ্যের বেসাতি।
বাজবাহাদুর—যে সুলতান, ঐতিহাসিককে চাকর বানাতে পারেননি বা চাননি, তাঁর সম্বন্ধে ভালোকথা বেশি কি লেখা আছে ইতিহাসে?
রূপমতী—তা নাই-ই বা থাকল। কিন্তু সৎ, সত্য ইতিহাস-ই তো একমাত্র প্রণিধানযোগ্য ইতিহাস। যে-সুলতান বা জাঁহাপনার সব-ই গুণ, দোষ কিছুমাত্রই নেই; তিনি তো মানুষ হিসেবেও অবিশ্বাস্য। তাই-না? মাইনে করা ঐতিহাসিকরা মিথ্যে কথা লিখে গেলেও তাতে সবকিছু তো সত্যি হয়ে ওঠে না। সত্যি—ইতিহাস জানার যাঁদের জিজ্ঞাসা আছে, আগ্রহ আছে, তাঁরা সত্যকে ঠিক-ই খুঁড়ে বের করেন। সময় হয়তো লাগে ঠিক-ই; কিন্তু সত্য চাপা থাকে না জাঁহাপনা।
বাজবাহাদুর—যা বলতে চাইছিলাম তা থেকে অনেক-ই সরে এলাম আমি রূপমতী। যেমন, জীবনে যা করতে চেয়েছিলাম; তা থেকেও। সময় হাতে বেশি নেই। আমাকে বলতে দাও। আমি চেয়েছিলাম, এমনই এক সুলতান হতে, এই সুন্দর মাণ্ডুর ব্যতিক্রমী সুলতান; যিনি কোনো রাজ্য জয় করবেন না কোনো অন্য রাজার। জয় করবেন সংগীতজগতের সমস্ত রাজ্য; জাগির; জানবেন, সেই আশ্চর্য জগতের ঝংকৃত অলিগলিকে, আবিষ্কার করবেন নারী ও পুরুষের প্রেমকে নতুনতর, শান্ত স্নিগ্ধ আলোয়। কী বলো তুমি? এও কি এক ধরনের রাজত্ব নয়? সাম্রাজ্য নয়? এই সাম্রাজ্যের গভীরে যাওয়ার চেষ্টাও কি রাজকার্য নয়? ‘রাজকার্য’ মানে কি শুধুই মৃত্যুদন্ড? কারাগার? যুদ্ধ? রক্তপাত? নারী ও শিশুর ক্রন্দন?
রূপমতী—রাজ্যই যদি না থাকে সুলতান, তবে কোনোরকম রাজকার্যই যে, করার অধিকার থাকবে না আপনার। এটাও তো ভাবতে হবে। রাজত্বর সঙ্গে যুদ্ধ যে, ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েই থাকে। যে-সুলতান বলেন, ‘যুদ্ধ আমি করব না’, গদি যে— তাঁর জন্যে কোনোদিনও নয়। এই তখত-এ বসার জন্যে আপনি নিজেও কি নিজের অন্য দুই ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হননি সুলতান? তাঁদের অভিশাপ এবং আর্তনাদ কি কলঙ্কিত করেনি আপনাকেও? এই তখতও তো আপনার পিতা শুজ্জাত খাঁ আপনাকে একা দিয়ে যাননি। ইতিহাস তো তাই-ই বলে।
বাজবাহাদুর—আঃ! তুমি বুঝছ না, রূপমতী। বড়ো পুরোনো কথা টেনে আনছ। পুরোনো কথা! যুদ্ধ আমি করেছিলাম, সে তো প্রাথমিক যুদ্ধই, ক্ষমতাতে আসীন হওয়ার-ই যুদ্ধ সে। যা নইলে, আমি সুলতান হতাম না মাঁলোয়ার; মাণ্ডুর।
রূপমতী—(হেসে) সুলতানদের জীবনে ‘প্রাথমিক’ যুদ্ধ বলে কোনো কথা নেই। যুদ্ধই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড়োসঙ্গী। তাঁদের জীবন মানেই নিত্যযুদ্ধ। প্রাথমিক অথবা শেষযুদ্ধ বলে কিছুই নেই। এবার বরং গান ছেড়ে, ভোগ ছেড়ে, রূপমতীর কোল ছেড়ে ঘোড়ায় উঠুন জাঁহাপনা? যে-পুরুষ যুদ্ধ করতে ভয় পান, কোনো নারীই তাঁর জন্যে নয়। অবশ্য নারীর শরীর পেতে নবাব বাদশাহের বাধা কিছুই নেই। তেমন তেমন নারীর, মনের কথাই শুধু বলছি আমি। সাহসী হোন সুলতান; অন্যদের-ই মতো!
বাজবাহাদুর—তুমি খুব সাহসী, না রূপমতী? তুমি একা একা বাঘ মারো, ঘোড়ায় শিকার করতে যাও, খুব-ই সাহসী, সন্দেহ নেই।
বলেই, বাজবাহাদুর উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে, তাঁর ঘোড়া আনতে বললেন, রূপমতী-মেহালের নীচে।
রূপমতী—আজ কী সুন্দর দেখাচ্ছে সবকিছু, না, জাঁহাপনা? আপনাকেও। চারদিকের এই প্রভাতি প্রকৃতিকে। আঃ! কত ফুল। কত্ত পাখি চারদিকে। জৌনপুরিতে গান ধরব একটা? এই গম্ভীর রাগ এই মুহূর্তে আমার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ধরি? সুলতান?
বাজবাহাদুর—না। আমি মসজিদে যাব। সেনাপতি একরাম খাঁ অপেক্ষা করছেন সেখানে, আমার জন্যে। চলি আমি, রূপমতী। সন্ধেবেলায় জেহাজ-মেহালে বরং দেখা হবে। আজ গভীর রাতে মালকোশ শুনব তোমার গলায়। জানি না, আর কতদিন শুনতে পাব তোমার গান! এ-পৃথিবীতে গান, প্রেম সব-ই বাহুল্যর জিনিস; উপছে-পড়া ‘ধন’ এসব। ক-জনে এর কদর জানে বলো?
এবারে একটা গুঞ্জরন উঠল চারধার থেকে।
তৃতীয় অঙ্কর প্রথম দৃশ্য শেষ হল।
বোকাদা চেঁচিয়ে বলল। ফাইন। যদিও ইম্প্রুভমেন্টের অনেক স্কোপ আছে। রীতি, তোর কি কোনো রাগ আছে বিশের ওপর?
রীতি হাসল, যেমন করে হাসে।
বলল, আমার নেই। রূপমতীর থাকতে পারে বাজবাহাদুরের ওপর।
বোকাদা বলল, কোথায়? শ্যামলদা কোথায়? আরে, শিঙাড়াটা না-হয় পরেই খেতে! তোমাদের নিয়ে পারি না সত্যিই! টেপরেকর্ডারে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ অমন ফাটা-বাঁয়ার আওয়াজের মতো ‘থপ থপ’ করছে কেন গো? যখন ডাকহরকরারা এল, তখনও তো শোনা গেল না কিছুই? তারাও তো ঘোড়া চড়েই এল। নাকি? আর বাজবাহাদুরের ঘোড়ার পায়ে কি পোঁটলা বাঁধা ছিল? কী শ্যামলদা? ব্যাপারটা কী? খুলে বলো তো একটু। এ কী চিত্তির!
আররে। মান্তু সিং-এর ঘোড়াটাই যে, ঠ্যাং ভেঙেছে! সেই তিন ঠ্যাঙের-ই ল্যাগ ব্যাগে আওয়াজ তুলেছিলাম টেপে। ছ্যা: ছ্যা:। এখন দেখছি, ওতে চলবে না। এই মরাদের ঝিরাটোলিতে তো জ্যান্ত ঘোড়াও আর নেই। শালা এমন-ই জায়গা, চারাগাছ ঘোড়া পর্যন্ত জোটে না! থ্যাটার হয় ককনো একানে? প্রোডাকশানের শ্যামল বলল।
গাধায় হবে না?
সূর্য বলল, ভলান্টিয়ারি করে।
বোকাদা বলল, হলেও হতে পারে। তোকে দিয়ে যখন, সেনাপতি আধম খাঁর রোল করানো যাচ্ছে তখন, গাধা দিয়ে ঘোড়ার কাজ চালাতে পারা তো বাচ্চোকা খেল।
বলেই বলল, ইডিয়ট।
দেকেচো! উপায়-ই বা কী? ভালো বলতে গেলাম আর...। ‘ইডিয়ট ফিডিয়ট’ বলবে না বলছি...কেচাইন করে দেব কেস।
গোপেন বলল, অ্যাই বোকাদা! গুড আইডিয়া! ভোপালি সার্কাস এসেছে। ওখানে গিয়ে ঘোড়ার পায়ের শব্দ রেকর্ড করে আনো। ওদের ফাস্ট ক্লাস চারটে ঘোড়া আছে। টগবগায় সবসময়ে।
তাহলে তাই-ই করো। যার যার দায়িত্ব, সে সে পালন করো। যেমন করে পারো। সকলের পেছনেই আমি ধামা ধরতে পারি না আর।
ফ্রাস্ট্রেটেড গলায় বলল, বোকাদা।
তারপরেই রমেশবাবুর দিকে ফিরে বলল, রমেশদা! ফাস্ট ক্লাস! তুমি একাই ক্যান্টার করে দিলে। চমৎকার ফুটেছে সিনটার ম্যুড। তোমার এসরাজ-এর যেন, ‘প্রাণ’ আছে। তুমি একটি রিয়্যাল জিনিয়াস মাইরি।
বোকাদার চকিত উল্লাসে সকলেই খুশি হল।
তক্ষদা আসছে। তক্ষদা।
কে যেন বলল, ফিস ফিস করে। গুঞ্জরন উঠল একটা।
রীতি দেখল। স্কুটারটা শিমুল গাছের গোড়ায় রেখে তক্ষ রায় আসছে।
মানুষটার মুখের দিকে চাওয়া যায় না। এত কুৎসিত মুখ সে, জীবনে দেখেনি! অথচ লম্বা, সুগঠিত পেটা শরীর। চমৎকার গলার স্বর। কত বিষয়ে যে-‘জ্ঞান’ রাখে মানুষটা? আর কথা শুনলে তো যেকোনো মেয়েই প্রেমে পড়বে। সত্যিই চমৎকার কথা বলেন। অথচ মুখটাই...রীতির চেয়ে বয়সে বছর বারোর বড়োই হবেন তিনি। তক্ষ রায়কে এই ভ্রাতৃসংঘের ছেলে-মেয়েরা অনেকেই ‘তক্ষক’ বলেই ডাকে আড়ালে। চামেলি একদিন বলেছিল, কাঁঠাল গাছের তক্ষকও সুন্দর দেখতে তক্ষদার চেয়ে।
হেসেছিল, সকলে মিলে চামেলির রসিকতায়।
বুকপকেট থেকে চার্মস-এর প্যাকেট উঁচু হয়ে আছে। একটা সাদা ফ্রেডপেরির টেনিস-গেঞ্জি আর জিনের ট্রাউজার। কোমরে চামড়ার মোটা বেল্ট। নিকেলের বাকলস।
কতদূর?
মুখ থেকে ধুঁয়ো ছেড়ে বললেন, তক্ষ রায়।
এই তো তৃতীয় অঙ্ক হল এক্ষুনি। প্রথম দৃশ্য। তুমি কিন্তু ঘাবড়িয়ো না তক্ষদা। আমরা ঠিক তুলে দেব। এরপরের সিনটা তুমি নিজেই দেখে বলো কেমন হচ্ছে।
বোকাদা বলল।
না। আমার আর ভাবনার কী আছে?
বা:। ভাবনা নেই? প্রেস, রেডিয়ো, টি. ভি.?
আমি কাউকেই আসতে বলব না। তা ছাড়া, আমি বললেই কী তারা আসবে? আমার তেমন জানাশোনা কেউই নেই কোথাও।
সে কী?
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল প্রায় বোকাদা।
তক্ষদা অবাক গলায় বলল, কেন? সেরকম কথা ছিল নাকি? আমি তো জানতাম না।
ছিল না?
ছিল?
তাহলে তোমার এই গোলমেলে নাটক করতেই বা যাব কেন আমরা? ‘চলচ্চিত্তচঞ্চরী’, বা ‘ব্যাপিকা-বিদায়’ বা ‘গণশার বিয়ে’ করতাম। ঝিরাটোলির পাবলিক নিতও! বাপের জন্মে ঝিরাটোলির পাবলিক এমন নাটক দেখেছে, মানে তোমার রূপমতীর মতো? ইট-পাটকেল না, পড়ে শেষে।
তক্ষ রায় অনেকক্ষণ বোকাদার মুখে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। তারপর চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, এখনও সময় আছে অনেক। তোমরা এই নাটক ড্রপ করে দাও।
না, না। আমরা এইটেই করব। কীসব পুরোনো মান্ধাতার আমলের নাটক বার বার। পচে গেছে।
চারদিক থেকে গুঞ্জরন উঠল ছেলে-মেয়েদের।
বোকাদা একটু অস্বস্তিতেই পড়ল। চারদিকে তাকিয়ে কিছু আর বলল না।
সিগারেটটা মাটির কুলহার-এ গুঁজে দিয়ে তক্ষ রায় বোকাদাকে বললেন, তোমার জন্যে ভালো খবর আছে বোকা। কী খাওয়াবে বল?
কী? কী ক্কী খবর? বল?
উত্তেজিত দেখাল খুব-ই বোকাদাকে। পৃথিবীর সব সুলতান এবং বোকা এবং চালাকরাই নিজেকে যত ভালোবাসে, তেমন অন্য কাউকেই বাসে না। উত্তেজনা অকারণের নয়।
তোমার ‘ঘটোৎকচ’ উপন্যাসটি ছাপা হচ্ছে আগামী বৈশাখে। বৈশাখী সংখ্যায়। তবে একটা কাজ করতে হবে তোমায়।
ক্বী-খি...? ক্বী খি?
সম্পাদককে একটা সংবর্ধনা দিতে হবে।
সংবর্ধনা? কোথায়?
যেখানেই হোক। এই শীতেই। একটি ভালো কাশ্মিরী মলিদা এবং একহাজার টাকার একটি তোড়া দেবে ফুলের তোড়ার সঙ্গে।
আমার নিজের নামেই কি দেব? লোকে জানবে না? ছ্যা:!
ছ্যা: ছ্যা: কোরো না বোকা। ‘লজ্জা, মান, ভয়, তিন থাকতে নয়।’
তা নয়। কে দেবে? বোকাদা চিন্তান্বিত গলায় বলল।
ইডিয়ট। ভ্রাতৃসংঘ-ই দেবে। ভ্রাতৃসংঘ না দিলে, কোনো একটা নাম বানিয়ে নেবে, দেবে আসলে তুমিই। কিন্তু সংস্থার নাম দেবে ‘আগমনি’, ‘সনাতনি’, ‘সুনয়নী’, অথবা ‘বিনোদিনী।’ ঠেকাচ্ছেটা কে? সংবর্ধনাই তো এখনকার ফ্যাশান। ক্রেজ অফ দ্য ডে।
টা, টা—টাকা? টাক্কা কে দেবে?
যার লেখা ছাপা হবে, সে-ই। নিয়ম তো তাই-ই।
মানে? সে কী? কত টাকা পাব লিখে?
কম নয়। তা প্রায় দেড় হাজার। এই বাজারে মন্দ কী? তাও সাহিত্যকম্মো করে।
কম্মো ফতে! তবে তো সে-টাকার সবটাই চলে যাবে।
বেশি। এখন এই-ই রেট যাচ্ছে ঝিরাটোলির ওই সম্পাদকের। যদি লেখা উতরে যায়, কখনো নামি-দামি লেখক হয়ে উঠতে পারো তখন পুষিয়ে নিয়ো চালাকের মতো। সব-ই ইনভেস্টমেন্টের ব্যাপার। বুঝলে-না। লগ্নি করলে, তবেই না সুদে আসবে।
তখন কিছুই দিতে হবে না? মানে, ফিউচারে?
বিপদগ্রস্ত বোকাদা বলল।
বা: কী বলছ তুমি? যে-মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধ নেই সেও কি মানুষ? তখনও দেবে বই কী। তবে, মাঝেমধ্যে সম্পাদকের যখন যা-দরকার হবে তাই-ই আর কী?
বিশু বলল, এ যে, কনট্রাক্টরি ব্যাবসার চেয়েও এককাঠি ওপরে গেল দেখছি, তোমাদের সাহিত্যের লাইন! শালা কী দিনকাল।
বোকাদা বলল, চুপ কর তো। বড়োবেশি কথা বলিস তোরা। কিন্তু টাকা? টাকাটা কে দেবে?
ফিনান্সিয়ার জোগাড় করো।
‘হায়ার-পারচেজ’ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করব? যারা গাড়ি, ট্রাক এইসব কিনতে টাকা দেয়? দেবে কি তারা?
ওরা বোধ হয় এখনও ধার দেওয়া শুরু করেনি হবু-সাহিত্যিকদের। তবে যেভাবে দিনকে দিন এই ব্যাবসা বাড়ছে তাতে শিগগির-ই দেওয়া আরম্ভ করবে বলেই মনে হয়। সাহিত্য তো আর প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ নেই, রীতিমতো ইণ্ডাস্ট্রিই হয়ে উঠেছে।
কী সাংঘাতিক!
বোকাদা বলল।
কী?
এই সিস্টেম।
ওঃ। আমি ভেবেছিলাম তুমি তোমার উপন্যাস ‘ঘটোৎকচ’-এর কথাই বলছ। না বোকা, কোনোই উপায় নেই। যদি ওই কাগজে লিখতেই চাও, তবে বড়োবাবু ছোটোবাবুদের সঙ্গে শামিল হও। দলে ভিড়ে যাও। টাকা খরচ করো। চামচেগিরি করো; তোমার হবে। এমন করে, কত অপোগন্ড বড়ো লেখক হয়ে গেল আমার নিজের চোখের সামনে। ‘নাথিং সাকসিডস লাইক সাকসেস।’ বুঝলে বোকা! ‘ঘটোৎকচ’কে মেডিয়া এবং তোমার দল ‘জ্ঞানপীঠ’ পুরস্কার তো সামান্য কথা, নোবেল প্রাইজ পর্যন্ত পাইয়ে দিতে পারে। এখন ভালো লেখালেখির দিন আর নেই। ওসব গৌণ হয়ে গেছে। মুখ্য হচ্ছে জানাশোনা; কানেকশানস। মেডিয়া।
তা, তুমি করলে না কেন? তক্ষদা? নাম?
আমি? আমার নামের ‘মোহ’ নেই বলে। আমি, আমি বলে। মাথা নীচু করে জীবনে, যা-কিছুই পেতে হয়, বা চামচেগিরি করে; তাতে আমার একটুও প্রয়োজন নেই বলে। এই প্রান্তরে, এই তক্ষ রায় হচ্ছে, লাস্ট অফ দ্যা মোহিকানস। বুঝলে-না!
ইডিয়ট।
ফস করে বলে ফেলল বোকাদা।
সকলেই তাকাল তক্ষদার দিকে।
বোকাদা সঙ্গে সঙ্গেই তক্ষদার পায়ে হাত দিয়ে বলল, মা-মাইরি বলছি। শালা মুখ ফসকে ইডিয়টটা বেরিয়ে গেল। বলতে চাইনি।
তক্ষ রায়ের মুখে একটি স্মিতহাসি ফুটে উঠল। রাগ নয় কিন্তু। রুন-এর দিকে চেয়ে বললেন, তোদের চা-টা সব শেষ বুঝি? কী রে? খাওয়া-না একভাঁড়।
তারপর-ই বোকাদার দিকে ফিরে বলল, ইডিয়টকে ইডিয়ট বলেছিস তারজন্যে এত অ্যাপলোজি কীসের? আমি জানি যে, আমি ইডিয়ট। একমাত্র ইডিয়টরাই জানে ‘ইডিয়সি’র আনন্দ। একজন কবিকে কোট করে বলতে ইচ্ছে হয় আমি ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়।’ আমার কিছু হবে না; জানি আমি। না নাম; না প্রাইজ। তবু, আমি, ‘আমি’-ই থাকতে চাই।
গান্ধারী বোধ হয় আজও এল না।
মাসখানেক আগে নবাবগঞ্জের বাজারে দেখা হয়ে গেছিল অনেকদিন পরে হঠাৎ-ই। ওর স্বামীর বিস্কিট-রঙা কন্টেসা গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল মকবুল মিয়ার লুঙ্গির দোকানের সামনে। ড্রাইভার বোধ হয়, তার নিজের জন্যে লুঙ্গি কিনতে নেমেছিল। বাজার হয়ে গেছিল গান্ধারীর। ওর স্বামী ছিল না সঙ্গে।
কতগুলো গাড়ি ওদের কে জানে? মানে ওর নিজের আর ওর স্বামীর মিলিয়ে। গোটা সাতেক তো হবেই।
অনেক বছর বিয়ে হয়েছে গান্ধারীর। পাটনাতে। বিয়ের পরদিন থেকেই কখনোই ওর স্বামীর সঙ্গে দেখেনি ওকে তক্ষ। ওর স্বামী এখন বিরাট কন্ট্রাক্টর, পাটনার। প্রাসাদোপম বাড়ি। একবার কোনো ব্রিজ বা রাস্তার নামকরণের বা উদবোধনের জন্যে, কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এসেছিলেন পাটনাতে। তখন গান্ধারীর স্বামীর বাড়ির প্রকান্ড হলে এই প্রেস কনফারেন্সটা হয়। ফলোড বাই ককটেইলস অ্যাণ্ড ডিনার। স্কচ খাইয়েছিল ওর স্বামী। অতজনকে। সেদিন-ই প্রথম দেখেছিল ওর স্বামীকে। বিয়ের দিনে তক্ষ ছিল না এখানে। হৃষ্টপুষ্ট হাসি-খুশি ভালোমানুষ চেহারা। জীবনের কোনো যুদ্ধে হারতে হয়নি ভদ্রলোককে। ভাগ্যবান। এবারে জোর গুজব যে, অ্যাাসেম্বলি ইলেকশনে টিকিট পাবেন উনি। সাংবাদিকদের কাছেই শোনা যে, চাণক্যপুরীতে ভদ্রলোকের একজন নেপালি রক্ষিতাও আছে। হয়তো হবে। গান্ধারীর মুখের মধ্যে কেমন যেন, গভীর দুঃখ মাখানো আছে। স্বামীর রক্ষিতা না থাকলেও স্ত্রীর নানারকম দুঃখ থাকতেই পারে। স্বামীরও পারে। বিয়ে করেনি নিজে যদিও, তবু জানে যে, দাম্পত্য ব্যাপারটা বড়ো গোলমেলে। বাইরে থেকে উঁকি মেরে কখনোই ঠিক বোঝা যায় না। সাংবাদিকদেরও কিছু কিছু ব্যর্থতা থাকে খবর সংগ্রহের ব্যাপারে। দাম্পত্যের খবর তারমধ্যে অন্যতম। এই এলাকাটুকুতে ওরা বিশুদ্ধ কল্পনা ও রসালো গুজবের ওপর নির্ভর করেই বোমাবাজি করে যায় অবলীলায়।
কে জানে, গান্ধারীও হয়তো তক্ষর মতোই সেক্স-স্টার্ভড। কে জানে, কেন সেদিন তক্ষর কাছে আসতে চেয়েছিল ও? ওকে দেখেই গাড়ি থেকে নেমে গান্ধারী বলেছিল, ঝিরাটোলিতে এসেছিলাম কাল। মাকে দেখতে। এক্ষুনি পাটনা ফিরে যাচ্ছি। আগামী শনিবার আসব আবার। প্রায়-ই তো আসি। থাকো কোথায় তুমি? দেখতেই পাই না। তুমিই সেই কারো নদীর পাশের পোড়ো বাড়িটাতেই থাকো তো এখনও? বিয়ে করেছ?
হুঁ। ওই বাড়িতেই। বিয়ে? না।
তক্ষ বলেছিল।
এখনও ব্যাচেলার? হেসে বলেছিল গান্ধারী। তারপর বলেছিল জানো তো একটা কথা আছে! ‘আ ব্যাচেলার ইজ দ্যা স্যুভেনির অফ আ উইম্যান হু হ্যাড ফাউণ্ড আ বেটার ওয়ান অ্যাট দ্যা লাস্ট মোমেন্ট।’
তারপর চোখ থেকে সানগ্লাসটা নামিয়ে চোখে চোখ রেখে বলেছিল, তাহলে তো তুমি আগের-ইমতো একা।
হ্যাঁ। আর তুমি? তুমি কি নও? আমরা সকলেই একা। আধুনিক শিক্ষিত মানুষমাত্রই একা। সে বিবাহিতই হোক কী অবিবাহিত। ভীষণ-ই একা।
তোমার কাছে আসব ডে-স্পেণ্ড করতে একদিন।
আসবে? এসো। খুশি হব।
বিব্রত হবে না তো? কলঙ্ক-টলঙ্কর ভয় কি এখনও করো?
হাসল তক্ষ। অনেক দিনের পুরোনো একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।
ও কিছু বলার আগেই গান্ধারী বলেছিল, রবিবারে যাব?
হ্যাঁ। ওঃ না, না রবিবারে নয়, মঙ্গলবার।
মঙ্গলবারে কি তোমাদের ছুটি?
হ্যাঁ।
তাহলে মঙ্গলবারেই আসব। সারাদিন থাকব।
আসবে কীসে? আমার ওখানে তো গাড়ি যায় না। খোয়াইয়ের পথ। স্কুটারটা কোনোক্রমে পার করিয়ে নিয়ে যাই আমি। তবে সাইকেলরিকশা যায় হেলতে-দুলতে।
গাড়ি কেন? আমি সাইকেলরিকশা করেই যাব।
তাই-ই এসো গান্ধারী। ফেরার সময় না-হয় আমি স্কুটারে নামিয়ে দিয়ে আসব এখন।
টেবলে-এর সামনে এসে বসে সিগারেট ধরাল একটা তক্ষ। মঙ্গলবারেও এল না তবে। না এলে; না এল। গান্ধারীর বয়স এখন আটত্রিশ-উনচল্লিশ হবে। আর তক্ষর বেয়াল্লিশ। শুধু গান্ধারীই কেন, তার জীবনে সতেরো বছর বয়স থেকে বিহার-বাংলা এবং দিল্লিরও বিভিন্ন শহরে, গ্রামে এবং গঞ্জে অনেকেই তার কাছে আসবে বলে কথা দিয়ে, আজ অবধি আসেনি। থাকবে বলে, থাকেনি। এখন এই না-আসাটাতে অভ্যস্তই হয়ে গেছে। বিধাতা তক্ষকে কুৎসিততম করে গড়েছেন। মেয়েরা তার চেহারার কদর্যতা দেখেই চিরদিন-ই তাকে এড়িয়ে গেছে, দূরে রেখেছে; মিথ্যাচার করেছে চিরদিন তার সঙ্গে। তার মনের ‘সৌন্দর্য’র খোঁজ কেউই নেয়নি। কহবতই আছে : ‘পহিলে দর্শনধারী, পিছলে গুণবিচারি।’ তার কাছ থেকে হাজারো সুবিধে নিয়েছে। ছেলেবেলায় তাকে দিয়ে নানা ধরনের জিনিস বইয়েছে। আর বড়ো হওয়ার পর বদনাম। তাদের প্রেমিকের পাংচার হয়ে-যাওয়া সাইকেল, অথবা তাদের বিজাতীয় ঘামের গন্ধ-ভরা নেভি-ব্লু গরম-ব্লেজার। একজন মেয়ে তো তার নিজের সন্তানের পিতৃত্বর দায় পর্যন্তও বইয়েছিল তক্ষকে দিয়ে। অবশ্য অল্পদিন। পরে বীরপুঙ্গব জেনুইন পিতা এসে তার ভার লাঘব করে। তাতেও আপত্তি করেনি তক্ষ রায়। ও সর্বংসহ হয়ে গেছে। তবুও এখনও ভালোবাসে ও মেয়েদের। এতরকম বঞ্চনা, শঠতা সত্ত্বেও মেয়েদের ‘ভালোত্ব’ সম্বন্ধে তক্ষ রায় যতখানি নি:সন্দেহ, হয়তো খুব কম পুরুষমানুষ-ই ততখানি।
গান্ধারী আসবে না। জানত ও।
ইদানীং দাড়ি কামাবার সময়ে মাঝে মাঝেই আয়নাতে নিজের মুখটা দেখে ও। মাস ছয়েক হল এই বদভ্যাস হয়েছে। বেয়াল্লিশ মাইনাস ষোলো; মানে গতছাব্বিশ বছর দাড়ি কামাবার সময়ে চোখ বন্ধ করেই কামিয়েছে প্রায়। ওর শোয়ার ঘরে তখন থেকেই কোনো আয়না রাখা নেই। মানে ষোলো বছর বয়স থেকে। আজও নেই। বাবা ও মা মারা যাওয়ার পর যখন, কুহমিতলির বাড়ি বিক্রি করে দেয় তক্ষ তখনও শুধু মায়ের ঘর থেকেই একটি আয়না পাওয়া গেছিল। তক্ষর বাবাও অত্যন্ত কুৎসিত মানুষ ছিলেন। ফর্সা গায়ের রঙের গ্রেস নাম্বার পুরো পাওয়া সত্ত্বেও যে, কোনো মানুষের মুখের দিকে চেয়েই অন্যে আঁতকে ওঠে এমন করে, তা তক্ষ নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতে না জানলে হয়তো জানতই না। সুন্দর নয়, মোটামুটি চলনসই একটি মুখ নিয়ে জন্মালেও বিধাতার কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ থাকত না। বেয়াল্লিশ বছর বয়স অবধি কোনো নারীর শরীরের ভাগীদার না হতে পারার যে, কী মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা তা, তক্ষর মতো কেউই জানে না। কে জানে? জানে কি কেউ? পুরুষদের কষ্ট, পুরুষরাই জানে।
শরীরের যন্ত্রণার লাঘব সহজেই করতে পারত। যে-পথ দিয়ে ও বাড়ি ফেরে সেই পথের বাঁ-দিকের গলি দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই ঝিরাটোলির কুখ্যাত টোলি। লোকে বলে ঘুঙ্ঘটটোলিতে যাওয়ার কথা, তক্ষ ভাবতে পর্যন্ত পারে না। ছি: ছি:। কী করে যে, যায় মানুষে? শিক্ষিত মানুষে? ‘রুচি’ কী পথ আগলে দাঁড়ায় না তাদের? আগে-পরে কত লোক-ই না যায়, সেইসব শরীরে। এমন কোনো লোক, যার হয়তো কোনো রোগ আছে। এমন কোনো লোক, যাকে ‘সুরজসেনা’র সম্পাদক ভার্মার-ই মতো তীব্রভাবে অপছন্দ করে তক্ষ। অথবা হয়তো এমন কেউ, যে হয়তো সুদে টাকা খাটিয়ে বড়োলোক। কোনো দাদআলা মানুষ।
ভাবাই যায় না।
ভাবতে পারে না ও আরও অনেক কিছুই। তাই-ই সপ্তাহে একদিন বা কখনো দু-দিনও যখন শরীরটা খুব-ই গরম লাগে, রাতে ঘুম কিছুতেই আসতে চায় না; তখন চেনা-জানা কোনো নারীকে মনে করে তক্ষ। চোখ বুজে গভীর অন্ধকারে ভরা অথবা ছমছমে চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া ঘরে তার সঙ্গে চুটিয়ে সহবাস করে। একাকী পুরুষমাত্রই জানে এইসব রাতের কথা।
তার আত্মরতির রানি কে যে, কবে হবে তার কোনো ঠিক থাকে না। গতকাল রাতে, যেমন ‘সুরজসেনা’ সাপ্তাহিকের সম্পাদকের স্ত্রী ববিতা কাপুর হয়েছিল। আবার গতমঙ্গলবারে, তার চাকর নাগেশ্বরের বউ মুঙ্গলী। সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা এই স্বপ্নের রাজ্যে। অথচ করজোড়ে ভোটভিক্ষা ছাড়াই সে নির্বাচিত করে নিজেকে, কোনো বিশেষ নারীর সঙ্গী হিসেবে। এ, যেমন এক গভীর অভিমানের জীবন। তেমন লজ্জারও। এবং শাস্তিরও। স্বপ্নের স্ত্রীদের খেতে-পরতে তো দিতে হয় না। তারা ঝগড়াও করে না কখনো। তারা অন্য কারো সঙ্গে, তক্ষর জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সহবাসও করে না। স্বপ্নে তারা শুধুই হাসে, কেউ কালো, কেউ ফর্সা, কেউ শিক্ষিতা, কেউ অশিক্ষিতা, কেউ লম্বা, কেউ বেঁটে, কারো কোমর-সমান চুল, কারো বা বব করা, কারো চুলের রং কালো, কারো খয়েরি, কারো বা ঈষৎ লালচে। তক্ষ কল্পনা করে, যেহেতু চোখে দেখেনি কখনো সে, যে নারীর মাথার চুলের যে-রং, তার জঘনের নরম রেশমি চুলের রং-ও নিশ্চয়ই সেই রঙের-ই হবে। কল্পনায়, পুলকিত তাদের, খুশি বা অখুশি হওয়া কিছু স্ফুট বা অর্ধোস্ফুট শব্দের শিঞ্জনেও অভ্যস্ত করে নিয়েছে নিজেকে। ‘উঃ। মরে গেলাম।’ ‘আঃ তক্ষ।’ ‘ইঃ তক্ষদা!’ ‘অসভ্য!’ ইত্যাদি শব্দ; ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্য। যার মুখে, যে-কথা মানাতে পারে বলে মনে করে, তার মুখে সেইরকম কথাই বসায়। কল্পনায়, বৈচিত্র্য আনতে কারো মুখে বা বসায়, ‘কিচ্ছু পারে না,’ ‘ওয়ার্থলেস একটা।’ এক আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য কল্পনার জগতে বিচরণ করে হতভাগ্য তক্ষ, রাতের পর রাত, অ্যালিসের মতো। ভাগ্যবতী অ্যালিস। সে শিশু। ‘শিশু’রা ভগবানের-ই মতো পবিত্র। যুবতী হলে তার ওয়াণ্ডারল্যাণ্ড অন্যরকম হত।
তবু, সবকিছু সত্ত্বেও কল্পনাতে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, এইভাবে পুরুষের বড়োই যন্ত্রণার শরীরের পাপ বয়ে বেঁচে থাকা বড়োই কষ্টের। মেয়েদের কথা তারাই বলতে পারেন। পুরুষদের কথাই জানে শুধু ও। পুরুষমাত্রই তক্ষর এই সরল স্বীকারোক্তির ন্যাংটো অসহায়তার কথা বুঝে তক্ষর প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। ও ভাবে।
কিছুদিন আগে একজন সাবএডিটর এসেছিল এলাহাবাদ থেকে বদলি হয়ে। পাঞ্জাবি। নামটা বলা ঠিক হবে না। সে তক্ষকে সমকামিতাতে হাতখড়ি দিতে চেয়েছিল। সভয়ে, তা প্রত্যাখ্যান করেছিল তক্ষ।
ওই শব্দটা শুনলেই বা মনে এলেই গা গোলায় ওর। ভাবতে পর্যন্ত পারে না।
যা পারে, তাই-ই ভাবে।
তার জীবনে কোনো নারী কি কখনো আসবে? সত্যি নারী? রক্তমাংসর? কোনো প্রাপ্তবয়স্কা নারীকে নগ্ন দেখেনি তক্ষ কোনোদিনও। একবার এক বৃদ্ধাকে দেখেছিল কুয়োতলায় চান করতে। হাড়-সর্বস্ব। তক্ষ, শত উপোসি হলেও একজন শিল্পী, লেখক; নাট্যকার। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই। রবিঠাকুরের ‘কেন সে দেখা দিলো রে, না দেখা ছিল ভালো’ গানটির কথা মনে হয়েছিল। স্যরি।
তবুও ওর প্রত্যাশার শেষ নেই। প্রতিরাতেই শোয়ার সময়ে এই প্রত্যাশা নিয়েই ঘুমোতে যায় ও যে, কালকের দিনটা নিশ্চয়ই অন্যরকম হবে। কিছু মানুষের প্রত্যাশার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না।
এলাহাবাদ থেকে আসা সেই পাঞ্জাবি অ্যাসিস্ট্যান্ট-অডিটর তাকে ঠাট্টা করে বলেছিল: ‘কোনো রক্তমাংসের নারী এসে একদিন সত্যিই তোমার খাটে উঠবে এই প্রত্যাশা তোমার পক্ষে সত্যিই বড়োবেশি প্রত্যাশা মিস্টার রায়। দু-জন একসঙ্গে-থাকা সমকামীর প্যারাম্বুলেটর কিনে ফেলার-ই মতো প্রায়! হাইট অফ এক্সপেকটেশন।’
শুনে, হাসেনি তক্ষ। দুঃখিত হয়েছিল।
নারীর শরীর, এদেশে তো বটেই, কোনো দেশেই সমস্যা নয়। কিন্তু যে-সে নারীকে তো চায়নি ও কোনোদিন। তার চেয়ে এমনি করেই কাটিয়ে দেবে দিন, পরিচিতা, সামান্য-পরিচিতা, সদ্য পরিচিতা নারীদের সঙ্গে কল্পনার সহবাসে ভেসে ভেসে। বিধাতা প্রত্যেক পুরুষ ও নারীকে এই দু-টি মাত্র দান দিয়েছিলেন কোনো বিশেষ লিঙ্গের প্রতি বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্ব না করে। একটি হচ্ছে ঘুম। দ্বিতীয়, আত্মরতির স্বয়ম্ভরতা। বিধাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তক্ষর।
তবে, ও এটুকু জানে যে, ওর এই একাকিত্বর জীবন, বান্ধবহীন, আত্মীয়হীন, নারীহীন জীবন ছিল বলেই, তক্ষ রায় আজকে ‘তক্ষ রায়’ হয়ে উঠতে পেরেছে। ওর ব্যক্তিগত জীবন যেমন, অন্য দশজনের মতো পূর্ণ নয়, ওর শিল্পর এবং সৃষ্টিশীলতার জীবনও অন্য দশজনের মতো ‘শূন্য’ নয়। সমস্তটুকু উদবৃত্ত সময়ই তক্ষ পড়াশুনোয়, লেখালেখিতে এবং গান-বাজনা শোনায় ভরিয়ে রাখে! ওর একাকিত্ব, ওর স্বজনহীনতায় নানারকম কষ্ট থাকা সত্ত্বেও, যেসব নারী ও পুরুষ ওর নিজের চেয়েও বেশি একা, নির্জন, এবং ওর চেয়েও বেশি নিরুপায়, তাদেরও জীবন নানাবিধ আনন্দে ভরিয়ে দিতে পেরেছে ও।
এইটে ভেবেই খুব ভালো লাগে ওর।
আরও ভালো লাগে ভেবে যে, যে-নারীরা তাকে পুরুষের মর্যাদাটুকু পর্যন্ত দেয়নি শুধু তার কুরূপ এবং অর্থহীনতার জন্যে, তাদের-ই কারণে সে, নিজেই জীবনপাত করে গেল। নারীমুক্তির প্রবক্তারা যদি, একজনও জানতেন যে, তাদের প্রজাতির একজনের মাত্র অপেক্ষায় বসে থাকা একজন নারীমুগ্ধ-পুরুষ এক নি:সঙ্গ বন্দিত্বের জীবনযাপন করছে?
একজনও কি জানেন না? এই ‘মুক্তি’ নিয়ে কী করবেন তাঁরা? তক্ষর স্বপ্নর কারাগার থেকে মুক্তি নেই কোনো নারীর। চিরদিন-ই তাঁরা তক্ষর বন্দিনি হয়েই থাকবেন।
বেলা পড়ে এল। ‘আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে’ কিন্তু সুরে সুরে সুর মেলাতে তো কেউই এল না। ঝাঁটি জঙ্গলের আড়াল ছেড়ে বাইরে এসে, তিতিরগুলো গলার শিরা ফুলিয়ে ডাকাডাকি শুরু করেছে। পুবে, কারো নদীর মধ্যে একটি দহ-মতো আছে। সেখান থেকে একদল ছন্দবদ্ধ গো-বক তাদের মসৃণ রেশমি সাদা ডানাগুলি শেষবিকেলের রোদের সিঁদুরে রাঙিয়ে নিয়ে নি:শব্দে উড়ে যাচ্ছে বিছিয়ার জঙ্গলের দিকে।
এই তিতিরগুলোর-ই ক্ষুদে ক্ষুদে বাচ্চা হয়েছিল, গত চৈত্রের শেষে। তারাই এখন দিব্যি ডাগর-ডাগরটি হয়ে উঠেছে। তক্ষ এই জানলার সামনে বসে থেকেই জেনেছে যে, প্রকৃতির মধ্যে নানারকম জিনিস লক্ষ করার আছে। প্রাণী, সরীসৃপ বা পাখিমাত্রই নীড় বাঁধে, ডিম পাড়ে। কয়েক ধরনের স্তন্যপায়ী জন্তু, যেমন হাতি, বাইসন, বুনোমোষ, শম্বর ইত্যাদির একরারা ছাড়া অন্যরাও কি ওর-ই মতো একলা কাটিয়ে দেয় সারাজীবন, প্রাণীজগতেও? নারী-সঙ্গহীন হয়ে? তা হয়তো যেমন হয় না, ওদের বাছাবাছি ব্যাপারটাও যে-নেই। এই বাছাবাছির অবাধ অধিকার সঙ্গিনী অথবা সঙ্গী-নির্বাচনের ব্যাপারে, তা কি একমাত্র মানুষের-ই একচেটিয়া? যুদ্ধে দল থেকে পরাজিত, রক্তাক্ত হয়ে একা একা অপমানের সঙ্গে বিতাড়িত না হয়েও, একমাত্র মানুষ পুরুষ-ই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, এমন একা জীবন কাটাতে পারে। এবং অনিচ্ছাতেও। যেমন তক্ষ কাটায়। অভিমান, আবেগ, কল্পনা-শক্তি এসব শুধুমাত্র মানুষের-ই। অনেক সুখের মধ্যে কিছু দুঃখও আছে যা, অন্য প্রাণীর নেই।
এই আসন্ন সন্ধ্যার মুখে, অন্ধকার হয়ে-আসা ঘরে, রাশ-রাশ বইপত্রর মধ্যে লেখার টেবলের সামনে বসে, বাড়ির চারপাশের গাছেদের হ্রস্ব, দীর্ঘ এবং দীর্ঘতর হয়ে-আসা ছায়াগুলিকে শিশুর কপালের কাজলের-ই মতো, পৃথিবীর কপালে ক্রমশ লেপটে-যাওয়া দেখতে লাগল তক্ষ, শিশুর-ই কৌতূহলে। নারীহীন পুরুষে আর শিশুতে তফাত বেশি নেই। ঠিক সেই সময়েই একটি সাইকেলরিকশা এসে দাঁড়ানোর ‘কিরকির’ আওয়াজ শোনা গেল কাঁকর-মাটির ওপর।
রিকশাওয়ালা একবার ঘণ্টা বাজাল।
গান্ধারী বাইরে থেকেই বলল, তক্ষদা, আছ তুমি? আমি এসেছি।
তক্ষর হৃৎপিন্ড লাফিয়ে মুখে উঠে এল যেন। চেয়ার পেছনে ঠেলে দিয়েই দৌড়ে এল দরজার কাছে। ‘আমি এসেছি! আমি এসেছি! আমি এসেছি!’ —ঝংকৃত হতে লাগল ওর সত্তার অলিগলিতে।
গান্ধারী তক্ষর কথার জবাব না দিয়ে, রিকশাওয়ালাকে দুটো টাকা দিয়ে বলল, বাজার সে চায়ে পিকর আনা! ঠিক ন বাজে লওটকে আনা। সমঝা?
জি মাইজি।
খুশি হয়ে বলল রিকশাওয়ালা।
আমিই পৌঁছে দিতাম স্কুটারে।
গান্ধারী হেসে বলল, পরপুরুষের গায়ের সঙ্গে গা লাগালেই আমার সুড়-সুড়ি লাগে। এবং তারপর-ই সারাগায়ে ঘামাচির মতো অ্যালার্জি বেরোয়। জান?
অবাক হয়ে চেয়েছিল গান্ধারীর মুখে ও। ইয়ার্কি কি না, বোঝবার চেষ্টা করছিল।
গান্ধারী চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, সত্যি গো তক্ষদা। বিশ্বাস করো। স্কুটারে বসে গেলে তো ছোঁয়া-বাঁচানো কিছুতেই যাবে না।
তা অবশ্য ঠিক। তক্ষ বলল।
তারপর বলল, এরকম কোনো রোগের কথা তো শুনিনি আগে। আমাদের সাপ্তাহিকে কাউকে দিয়ে লিখিয়ে দেব নাকি এই রোগ সম্বন্ধে? উইকলি নোটবুকেও যেতে পারে। ইন্টারেস্টিং নিউজ আইটেম। নিউজ হিসেবেও দিতে পারি আমার উইকলিতে।
না-আ-আ।
মুখটি অকারণে হাঁ করে বলল, গান্ধারী। মেয়েরা এমন কাকের ছানার মতো মুখ-‘হাঁ’ করলে দেখতে ভালো লাগে না। তক্ষর সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধ ধাক্কা খেল।
বোসো। তাহলে ওই চেয়ারটাতেই বোসো। ওই কোণার চেয়ারটাতে। আমারটাতে বোসো না। শেষে যদি আবার...।
থ্যাঙ্ক ইউ।
তা, এই রোগের সিমটমটা কী?
তক্ষ বলল।
ওই তো, বললাম যে! কী করে কনটাক্টেড হয় তাও তো বললাম। ‘এইডস’—এর মিনি সংস্করণ আর কী।
ডাক্তাররা কোনো নাম দেননি এখনও এই রোগের? এই রোগের কোনো চিকিৎসাও বেরোয়নি?
উহুঁ।
তবে? কোনো প্রতিষেধক?
প্রিভেনটিভ বলতে কোনো ওষুধ নেই, মানে এখনও বেরোয়নি। তবে, একটা কোড-অফ-কনডাক্ট আছে।
সেটা কী?
‘সতীত্ব’ বজায় রাখা। পরপুরুষের ছোঁয়া এক্কেবারেই না-লাগানো।
‘এইডস’-এর প্রিভেন্টিভের মতোই।
তাই-ই....?
তক্ষ বলল।
চোখজোড়া অন্যমনস্ক হয়ে গেল ওর। বুকের মধ্যে ভীষণ কষ্ট হতে লাগল। ভাবল, আমি তো শিশুই। এমনকী কাউকে কোনো প্রাপ্তবয়স্কদের রোগও দিতে পারার ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত আমার নেই।
গান্ধারী চেয়ারে গিয়ে বসল।
বলল, তোমার এই ঘরটাতে আলো বড়ো কম।
তুমি এসেছ। আলোতে তো ভরেই উঠল।
তক্ষ বলল।
তুমি না ঠিক আগের মতোই আছ তক্ষদা। সবসময়ই সকলকে খুশি করার চেষ্টা সমান-ই আছে। কী পেলে এমন করে? নিজে কি খুশি থাকো? সুখী হলে? আমার তো মনে হয়, সবাইকে যে, সুখী করতে চায়, সে, একজনকেও সুখী করতে পারে না।
গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে তক্ষ বলল, সবসময়ে করি না। সকলকে তো নয়ই! চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দু-দিনের তো পৃথিবী! কার কাছ থেকে কতটুকু পেলাম আর পেলাম না সেটাই তো বড়োকথা নয়। কিছু লোককে খুশি করতে পারলে, আনন্দ দেওয়বার চেষ্টা করতে পারলে, সেইটেই বা কম কী? জানো গান্ধারী, আমার মা বলতেন, তকু, তোর কপালটা বড়োই মন্দ। তুইও তোর বাবার-ই মতো কুৎসিত হলি। কিন্তু কুশ্রী, সুশ্রী চেহারাতে হয় না বাবা; ‘ব্যবহার’-এই হয়। সবসময়ে হাসবি, কথা বলতে তো পয়সা খরচ হয় না! সুন্দর করে কথা বলবি। তোর আশেপাশে যারাই থাকে, তাদের সকলকে খুশি রাখবি। এই বা কম কী! এও তো চমৎকার একধরনের বেঁচে থাকা। অন্যদের বাঁচিয়ে রাখা। তোর চেহারা যেরকম-ই হোক-না-কেন, দেখবি কত মানুষে তোকে ভালোবাসবে, কত মেয়ে তোর প্রেমে পড়বে...’
তক্ষর গলার স্বর স্তিমিত হয়ে এল। মা কি জেনেশুনেই ওকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন? অন্য সবাইকেই তো ও বাঁচাতে চায়, বাঁচিয়ে রাখে, ওকে তো একজনও বাঁচাল না! এমনকী বাঁচাবার চেষ্টাটুকু পর্যন্ত করল না।
বা:। তোমার মা তো চমৎকার মানুষ। তবে তোমার প্রেমে কি পড়েছিল অনেক মেয়ে?
তক্ষ হাসল।
মানে, হাসবার চেষ্টা করল।
সবে-অন্ধকার-হওয়া ঘরে টেবল ল্যাম্পটার স্বল্পআলোতে ওর কুৎসিত মুখের হাসি দেখা গেল না।
মুখ ঘুরিয়ে বলল, কী জানি! হয়তো পড়েছে। মেয়েদের ভালোবাসা! বোঝা বড়ো কঠিন। আর সময়ে বোঝা না গেলে, তা যে, ফিরে যায় নি:শব্দ চরণে। শব্দ পেয়ে ধেয়ে গিয়েও তাকে ধরা যায় না। সে তো তখন ছায়া, স্বপ্নকায়াবিহীন। রবিঠাকুরের গানের মতোই সত্যি!
এইজন্যেই তোমার প্রেম হল না। তোমাদের রবিঠাকুর পড়তে ভালো, শুনতে ভালো, কিন্তু কোনো কাজের নয়। রবিঠাকুর জমিদারি বুঝতেন, ঈশ্বর বুঝতেন, মেয়েদের যে, খুব একটা বুঝতেন বলে, আমার কিন্তু মনে হয় না।
বলো কী? ছি: ছি: অমন করে বোলো না। ঠিক নয়। ঠিক নয়।
আলোটা এবার জ্বালো প্লিজ। অন্ধকার ঘরে ভয় করে আমার। গান্ধারী নেকু-নেকু গলায় বলল নেকু পুষুমুনুর মতো।
উঠে গিয়ে, ঘরের বড়োআলোটা জ্বালাতে জ্বালাতে তক্ষ বলল, অন্ধকারের সঙ্গে কোনো দুঃস্বপ্ন জড়িয়ে আছে বুঝি? তোমার হয়তো নেই, অনেকের থাকে।
না, তা নেই। তবে দুঃস্বপ্নময় ঘটনা ঘটাতে কতক্ষণ? সেইজন্যেই ভয়। তেমন কিছু ঘটার সময় বা বয়েস এখনও তো যায়নি। তোমার এবং আমারও।
গান্ধারী গোল তেপায়াতে নামিয়ে রাখা তার হাত-ব্যাগটা খুলে একটি বড়োপ্যাকেট বের করল। বিদেশি র্যাপিং-পেপারে মোড়া। তারপর তক্ষর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ও ব্যাংককে গেছিল গতসপ্তাহে। এনেছিল। তোমার জন্যেই নিয়ে এলাম।
কী? কী?
একটু অবাক হয়েই তুতলে বলল তক্ষ।
খুলে দ্যাখোই না।
বেশ ভারী চৌকো ও লম্বাটে প্যাকেটটি খুলে দেখল যে, কালো বাক্সে মোড়া একটি হুইস্কি। জনি ওয়াকার! ব্ল্যাক-লেবেল।
বাবা:। এর তো নাম-ই শুনেছি। এই প্রথম চোখে দেখলাম। তা ছাড়া, আমি তো কালেভদ্রেই খাই এসব। তুমি তো জানোই। সেই তোমাদের পাটনার বাড়ির ককটেইলস-এ জোর করলে তুমি। মনে আছে?
শুধু কি হুইস্কি খেতেই জোর করেছিলাম? থাকতেও কি বলিনি পাটনাতে তোমাকে কয়েকদিন?
বা:। তখন কি থাকতে পারতাম নাকি? মা ছিলেন-না? মা থাকতে একরাতও কোথাও থাকার জো-টি ছিল?
আর এখন?
এখন তো মুক্ত পুরুষ। মা নেই। বন্ধন নেই কোনো। কিন্তু যে, পিছুটান চর্মচোখে দেখা যায় না, তা বড়ো ভীষণ। অক্টোপাসের-ই মতো জড়িয়ে থাকে সবসময়ে। তার বাঁধন ছাড়িয়ে কোথাও যাই, তার উপায়-ই নেই!
কী সে, পিছুটান?
কাজ।
আহা! বেশি বেশি কাজ দেখিয়ো না। কাজ যেন, আর কেউ করে না।
সে তো চাকরি, ব্যনবসা...।
তুমিও তো তাই-ই করো।
আমি আমার চাকরির কাজের কথা বলিনি। প্রত্যেক পুরুষমানুষ এদেশে, কিছু-না-কিছু তো করেই জীবিকা হিসেবে, কিছু কিছু মেয়েরাও করে। জীবিকার কথা বলিনি আমি।
কীসের কথা বলছ তাহলে? তোমার লেখালেখি?
হ্যাঁ!
তা কত লেখক তো লিখেই বাড়ি-গাড়ি করেন। লেখা তো তাঁদেরও জীবিকা। জীবিকা বলে তো তাঁদের মানসম্মান তোমার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়।
সে-কথাও বলিনি আমি। মানসম্মান, লেখক হিসেবে আমার একটুও নেই। চাইও না। টাকাপয়সাও নয়। যা-কিছু হতে চাই তা আমার অন্তরের গভীরে। কাউকে ইম্প্রেস করবার জন্যে নয়, টাকা রোজগারের জন্যেও নয়, কী করে বোঝাব তোমাকে জানি না, এই লেখালেখিই আমার ব্রত; পুজো। এই অন্তরের ‘ইমারত’ মনের ভেতরে গড়ে ওঠে, বাইরে থেকে দেখা যায় না তা। পুজোকে যদি জীবিকা করি ভগবান কী দেখা দেবেন?
গান্ধারী ডান পা-টা বাঁ-পায়ের ওপর তুলল। পায়জোর-পরা সুন্দর মসৃণ, নিয়মিত লোশন-মাখা, পেডিকিয়োর-করা গাড়িতে ঘোরা বড়োলোকের বউ-এর চকচকে, মসৃণ উজ্জ্বল গোড়ালি বেরিয়ে পড়ল। ওদিকে চোখ পড়তেই তক্ষর শরীরের মধ্যে তোলপাড় উঠল একটু। গান্ধারী যেন, ইচ্ছে করেই শাড়িটা হাঁটুর কাছে ডান হাত রেখে একটু তুলল। যেন, অনবধানে।
চোখ সরিয়ে নিল তক্ষ।
ঠাট্টার গলায় গান্ধারী বলল, আজকাল কি ভগবান-টগবানও মানছ নাকি? সমস্ত পৃথিবী যখন, দ্রুত এগিয়ে চলেছে সামনে তখন, তুমিই একা একা পেছনে ফেরার সাধনা করছ?
হাসল তক্ষ। বলল ভগবান আমি মানি না। আমি পাগলও নই; ইডিয়টও নই। বললাম; নেহাত কথার কথা। কমিউনিস্টরা ভগবান মানে না।
শুধু তারাই কেন? আঁতেলরাও মানেন না।
‘কমিউনিস্ট’ এবং ‘আঁতেল’ তো প্রায় সমার্থক-ই। দু-দলই অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে ভাবেন। তক্ষ বলল।
তাও ভালো। ভাবলাম, এই পোড়োবাড়িতে দীর্ঘদিন একা থেকে, তোমার মাথার-ই গোলমাল হল বুঝি! তা আর একটু খোঁজ করলে এর চেয়ে ভালো এবং শহরের আর একটু কাছে একটা ভাড়াবাড়ি পাওয়া কি যেত না? আমার নিজের নামেই এক বিঘা জমি পড়ে আছে। তুমি চাও তো নিতে পারো। ছোট্টবাড়ি করবে একটা, সামনে ফুলের বাগান। সবুজ লন, চেরি গাছ, ঘুঘু আর টিয়ারা এসে বসবে। একটা কাচের ঘর থাকবে তোমার। তারমধ্যে বসে তুমি লিখবে। পয়সা দিয়েই নেবে। জলের দামে কিনেছিলেন বাবা আমার নামে, আমার যখন পাঁচ বছর বয়স। নেবে তো বলো।
কাচের স্বর্গ কেউ অত ঝঞ্ঝাট করে বানায়? ধুস...।
স্মিত হেসে তক্ষ বলল।
নেবে কি না বল?
না, না।
কেন? না কেন?
আমার ওসব ভালোই লাগে না!
ওইসব বাড়ি-টাড়ি তাও আবার জমি কিনে সেই জমিতে বানিয়ে নেওয়া। ওসব আমার জন্যে নয়। বিশ্বাস করো গান্ধারী, কোনোরকম বৈষয়িক ব্যাপার-ই আমার আসে না। জানাশোনা কতলোকেই তো বাড়ি করে ফেলল। বিয়ে করল, ছেলে-মেয়ে হল, অনেকে গাড়িও কিনল। টমসন্স কোয়ার্টারের দিকের ‘পল’-মহল্লায় উঠে গেল নতুন বাড়ি নিয়ে। ঝিরাটোলি ক্লাবে প্রতিশনিবারে তারা অনেক-ই যায়, অল্পস্বল্প মদ্যপান করে। হি-হি, হা-হা; সোশ্যাল লাইফ। এর বাড়ি ও যায়, ওর বাড়ি সে, অসুখ করলে খোঁজ নেয়, বন্ধুর বাচ্চার পেট ব্যথা হলে ডাক্তার নিয়ে দৌড়ে আসে। আমি পারি না। সভ্য, সামাজিক অন্য দশজনের মতো হতে পারলাম না।
সভ্য, সামাজিক না হতে পারো, না হলে অন্তত একটু স্বাভাবিক হতেই বা অসুবিধে কীসের। অস্বাভাবিকতাটা কোনো গুণ নয়।
দোষ-গুণের কথা নয় গান্ধারী। স্বাভাবিক না হওয়াটাই আমার স্বভাব।
সে তো লক্ষ করেছি ছোটোবেলা থেকেই। কিন্তু কেন?
আমি অন্যরকম। এই-ই...কেন যে, তা বলতে পারব না। সব মানুষ-ই কি একরকম হয় বল?
তোমার কোনো কাজের লোক নেই?
হ্যাঁ। আছে তো। নাগেশ্বর। সে আজ ছুটি নিয়েছে। ওর মেয়ের নাকি খুব জ্বর।
মেয়ে কত বড়ো?
এই তিন-চার বছরের।
বাড়ি কতদূর এখান থেকে?
নদী পেরিয়ে মাইলটাক। ওইদিকে। বলে, হাত তুলে দেখাল তক্ষ।
বর্ষার সময়ে যাতায়াতের অসুবিধে হয় না?
হয় তবে তা আর কতক্ষণ। পাহাড়ি নদী তো। বান মরে গেলেই পেরিয়ে যাওয়া-আসা করা যায়। বর্ষায় এমনিতে যেটুকু জল থাকে তা পেরোতে অসুবিধে হয় না।
তার বউ-বাচ্চাকে তোমার এখানে এনে রাখলেই তো পারো। তাহলে ছুটি নিয়ে তার তোমাকে একা ফেলে যেতে হয় না বার বার। এমন নির্জনে একা থাকতে হয় না। সেও দৌড়োদৌড়ি থেকে বাঁচে।
সামান্য সময় চুপ করে থেকে তক্ষ কিছু বলবার আগেই গান্ধারী বলল, নাগেশ্বর না কী নাম বললে তোমার কাজের লোকের, তার বউটি কি খুব-ই খারাপ দেখতে?
চমকে উঠে তক্ষ বলল, হঠাৎ? একথা? কেন? খারাপ নয়তো। বরং খুব-ই সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতীও।
তাহলে?
তাহলে কী?
এখানে এনে রাখো না কেন?
বারে: ওরা কী আমার মতো? ওদের কাঁড়া-বয়েল, মুরগি-ছাগল, খেতি-জমিন আছে। কত্ত শেকড়-বাকড়। শেকড় তুলে কেউ কী আসে? নেহাত-ই নিরুপায় না হলে? ওদের বরং আরও অনেককে দেখেই তো শেকড় সম্বন্ধে ভীতি জন্মেছে আমার। জীবনের মতো ফেঁসে গেছে ওরা। পা আটকে গেছে মাটিতে।
যদি কেউ সব শেকড় তুলে আসে তোমার কাছে, তুমি কি থাকতে দেবে তাকে?
চমকে উঠল তক্ষ। মুহূর্তের জন্য। তারপর-ই ভয়ার্ত গলায় বলল, না না। আমি কাউকেই থাকতে দেব না। তা ছাড়া, শিকড় কেউ তুলুক, ছিঁড়ুক, তা আমি চাই না। আমার যখন পাঁচবছর বয়েস তখন ফরিদপুরের গ্রাম ছেড়ে বিধবা মায়ের হাত ধরে এসেছিলাম আমি একদিন বিহারের এই ছোট্টশহরে, মায়ের এক দূর সম্পর্কের দাদার কাছে। দূর এবং দুঃ—ও ছিল সম্পর্কটা। তবুও আসতে হয়েছিল। গান্ধারী, শিকড় ছিঁড়ে আসতে যে, কেমন লাগে, তা আমি জানি। আমাকে পূর্ণ করার জন্যে কেউ তার শেকড় উপড়ে অন্য কোথাও গহ্বর সৃষ্টি করে আসুক তা আমি অন্তত চাই না। এই প্রক্রিয়ায় যদি কেউ পূর্ণ করতে চায় নিজেকে তবে সে যে, অন্য কাউকে শূন্য করেই করে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।
নাটক লিখে, আর নাটক পড়ে তোমার কথাবার্তাও এখন কেমন ‘নাটুকে নাটুকে’ হয়ে গেছে। জানো তক্ষ, নাটক করতে মঞ্চ লাগে, মেক-আপ লাগে, রাজা-মহারাজার পোশাক লাগে, মুখের এবং চোখের ওপর তীব্র আলো ফেলতে হয়। এমন পোড়োবাড়িতে মেক-আপ-হীন তোমার সঙ্গে কোনোরকম নাটক করতেই রাজি নই আমি। তুমি নাট্যকার হতে পারো, জীবন আর নাটক একে অন্যর সঙ্গে কোথায় যে, মেলে তাই-ই তুমি জানো না। থাকগে। এবারে দুটো গেলাস আনো। হাতে করে নিয়ে এলাম জিনিসটা। তোমার জন্মদিনে একটু ভালো জিনিস খাই।
আজ আমার জন্মদিন?
তাই-ই তো জানি আমি। তুমি জান না?
তক্ষর কুৎসিত মুখ বিধুর হয়ে এল এক, আশ্চর্য উচ্ছলতায়।
কুৎসিতদেরও সৌন্দর্য থাকে। শারীরিক সৌন্দর্যও। ভাবল, গান্ধারী। শুধু দেখার চোখ চাই। ঠিক মুহূর্তটিতে দেখা চাই।
তক্ষ বলল, ‘মা থাকতে পায়েস রেঁধে রাখতেন।’ মনে পড়ে যেত তখন। অনেক-ই বছর ভুলেছিলাম এই দিনটিকে। সেসব তো ছেলেবেলার-ই কথা। তা ছাড়া জন্মদিন তো পালিত হয় বড়ো বড়ো মানুষদের। কৃতী মানুষদের, আমার আবার জন্মদিন!
আমরা ব্রাহ্ম। কৃতী-অকৃতী সকলের-ই জন্মদিন করি আমরা। এটা একটা ট্র্যাডিশন। সকলের-ই মানা উচিত। কী সুন্দর জিনিস বলো তো। একজন মানুষ, সে যত সামান্য, যত অকিঞ্চিৎকর-ইহোক-না-কেন, বছরে অন্তত একটি দিন সে, বিশেষ কেউ হয়ে ওঠে। জীবনে, এই অনেক এবং অনেক-ইরকম দুঃখ-কষ্টর জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই করার একটা মানে খুঁজে পায়। তার চারপাশের জগতের মধ্যে হঠাৎ সে যেন, তাকে নিজের নিজস্ব মূল্যে আবিষ্কার করে। সে-মূল্য কম হতে পারে, তবু যত কম-ই হোক-না-কেন, নিজের কাছে নিজেকে কখনো-কখনো দামি না করে তুললে, কোনো মানুষ কি বাঁচতে পারে? বলো? এই কঠিন পৃথিবীতে? এই জীবনে?
এটা ঠিক নয়। তুমি নিজেকে বড়োই হেলা করো। নিজেকে একটুখানি ভালোবেসো। তোমার জগতেও তুমিই তো সব। সকলের জগতেই সকলে। তুমি আছ বলেই তো পৃথিবী আছে। তোমার ছোট্ট এই জগতে তোমাকে ঘিরেই তো সবকিছু। সকালে উঠে রোজ আয়নায় একবার মুখ দেখবে, বুঝেছ। নিজেকে ভালোবাসবে। যে নিজেকে ভালো না বাসে, সে অন্য কাউকেও ভালোবাসতে পারে না।
চমকে উঠে তক্ষ বলল, তাই-ই?
তাই-ই তো! বলছি আমি। কথা শোনো।
আচ্ছা একটু বোসো। গ্লাস নিয়ে আসি। ঝাল লেড়ে বিস্কুট আছে। খাবে? হুইস্কির সঙ্গে ভালো লাগবে বোধ হয়।
আনো। আমি কি সাহায্য করব তোমাকে?
না না ঠিক আছে। আনো, তাড়াতাড়ি আনো, তোমার জন্মদিনে আমি ড্রাঙ্ক হব আজ।
তাই-ই? আমি জানতাম, ভালোলাগার জন্যেই খায় এইসব মানুষ। নেশা করে লাভ কী?
ভালোলাগাই যখন বেশি হয়, তখন ই তো তাকে ‘নেশা’ বলে। তুমি বড়ো ব্যাক-ডেটেড।
তাই-ই কি? আমি জানি না! নিজেকে ঠিক রাখা তো উচিত-ই। সবসময়ে।
কখনো বা একটু বেঠিক হলেই! জলে তো আর পড়োনি। নিজের বাড়িতে বসেই তো খাচ্ছ। আমার-ই বরং রিকশা ঠেঙিয়ে যেতে হবে এতখানি পথ।
তবু, তুমি আছ তো। তোমার সামনে নেশা করাও কি ভালো? মেয়েদের সামনে অসভ্যতা!
তক্ষ বলল।
তাতে কী? আমিও নেশা করব। মাঝে মাঝে সবকিছুকে ভুলে যেতে হয়। নিজেকে মাঝে মাঝে ভুলতে ইচ্ছে করে না তোমার?
নিজেকে মনেই রাখি না, তাই ভোলার প্রশ্নই ওঠে না।
ভোলা দরকার। মাঝে মাঝে অসভ্যতা না করলে, আমরা যে সভ্য, সেই কথাটাই তো ভুলে যেতে বসব।
কী জানি। তাই-ই? ভেবে দেখতে হয় কথাটা।
ভাবোই তুমি! চিয়ার্স। বলে, বড়ো এক চুমুক দিল গ্লাসে গান্ধারী।
‘চিয়ার্স’। বলল তক্ষও। মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। অনেকদিন পরে হুইস্কি খেল ও। আজকাল কোথাও যায়ও না; খায়ও না এসব।
তক্ষ গান্ধারীর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, যেকোনো মানুষ-ই, এই অভাবী দেশে, গান্ধারীকে ঈর্ষা করবে দূর থেকে। ওর স্বাচ্ছল্য, ওর বাড়ি-গাড়ি, ওর শাড়ি দেখেও, মানুষ গরিব-ই হোক আর বড়োলোক-ই হোক, ভেতরে যে, তারা একইরকম, সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার মানুষ এটা বোধ হয়, বোঝা পর্যন্ত যায় না।
বড়োলোকেরা যে, এক বিশেষ ধরনের মনুষ্যেতর জীব, শুধুমাত্র তাদের স্বাচ্ছল্যরই কারণে— এই মেকি ও মিথ্যে কথাটা পৃথিবীর সব রাজনীতিকরা গরিবের ভোট-পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে চিরদিন প্রচার করে এসেছে। রাজনীতিকরা মানুষকে কোনোদিনও ভালোবাসেনি, বেসেছে তাদের ভোটকে। তাই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে জুড়ি নেই তাদের।
গান্ধারীর যে, দুঃখ, অথবা তক্ষরও; সেটা আর্থিক অবস্থা-নির্ভর আদৌ নয়। বেশিরভাগ দুঃখের-ই মতো, বেশিরভাগ সুখ-ই আর্থিক অবস্থার তারতম্য নির্ভর নয়। মানুষের সুখ-দুঃখ মানুষেরই। গরিব বড়োলোকে কোনোই তফাত নেই।
গান্ধারী হঠাৎ-ই বলল, তোমার জন্যে আমি কি কিছু করতে পারি তক্ষ? জয়সোয়ালরা যে, ট্রাস্ট করেছে তা থেকে প্রতিবছর তরুণদের মধ্যে থেকে একজন ক্রিয়েটিভ মানুষকে একটা অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে ওরা। জয়সোয়ালরা তিন ভাই-ই আমার কথায় ওঠে-বসে। পাটনাতে এক সংবর্ধনায় এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে দেওয়ালির সময়ে। তুমি কি সেই অ্যাওয়ার্ডটি চাও? ওদের মায়ের নামে দিচ্ছে। ‘মানী দেবী’ পুরস্কার। ট্রাস্টি বোর্ড-এর আমিই প্রেসিডেন্ট। মিটিং বসছে মহালয়ার দিনে। আমার ভেটো পাওয়ারও আছে। বলো, চাও কি না।
না, না। আমি কেন চাইব? ছি:। ওদের কোনো কমিটি-টমিটি নিশ্চয়ই আছে, মানী-জ্ঞানী মানুষের। মানে, যাঁরা নাম রেকমেণ্ড করেন। তাঁরাই নিশ্চয়ই ঠিক করেন, কাকে দেবেন, না দেবেন এবং কোন কাজের জন্যে দেবেন।
তা আছেন, তবে নামকাওয়াস্তেই। আসলে, আমরা যাকে দিতে বলব, তাকেই দেবেন ওঁরা। ওই কমিটির মেম্বাররাও যে, প্রত্যেকে হাজার টাকা করে পাবেন মিটিং ফি। ওঁদের আবার মতামত। কারো ছেলের চাকরি করে দিয়েছেন বড়ো জয়সোয়াল, কারো মেয়ের বা পুত্রবধূরও। তা ছাড়া মানী-জ্ঞানী? আজকালকার মানী-জ্ঞানীদের ‘মেরুদন্ড’ বলে আছে নাকি কিছু? সরীসৃপ-ই তো বেশি! ঠাণ্ডা রক্তর। সে-রক্ত কিছুতেই গরম হয় না। বশংবদ ল্যাজ নাড়ানো কুকুরের-ই মতো অধিকাংশ। শুধু এই অ্যাওয়ার্ডের ব্যাপারেই নয়, অন্যান্য নানা ব্যাপারেই ওদের সঙ্গে মিশে তো দেখলাম। ঘেন্না ছাড়া কিছু নেই। ওঁদের দেওয়া পুরস্কার?
তক্ষ বলল, তোমার হাতে যদি, সত্যিই কোনো ক্ষমতা থাকে তাহলে, সবচেয়ে আগে বিন্দেশ্বর ঝা-কেই দেওয়া উচিত। খুব ভালো কবিতা লিখছে ছেলেটি। মিয়া সামসুদ্দিনকেও দেওয়া উচিত ওর উর্দু ‘রুবাইয়াত’-এর জন্যে। গানে পেতে পারেন, মোহিনী দেবী। ওঁর ঠুংরির তুলনা নেই। বয়েস হয়েছে, কবে মরে যাবেন, তারও ঠিক নেই। নাটকে দিলে, জগদীশ মির্ধার অবশ্যই আমার অনেক-ই আগে পাওয়া উচিত। ওর আদিবাসী-ওঁরাও নাটক ‘সারহুল’ নিশ্চয়ই অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য। নয়তো ঔপন্যাসিক রভীন্দ্র শর্মাকে। দারুণ উপন্যাস লিখছে ও একবারে চমকে দেওয়া ভাষায়। বলবার মতো কিছু আছে বলেই লিখছে। পাতা ভরাচ্ছে না। একেবারে নতুন স্টাইল, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি! আর কী জোরালো ভাষা! তা ছাড়া, শেষে বলি, আমি কি এখনও তরুণ আছি?
হেসে বলল তক্ষ।
তরুণ নও? এদেশে রাজনীতি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ষাট বছর অবধি সকলেই তরুণ থাকে। যদিও মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি এবং অরক্ষণীয়াও। তা ছাড়া, তোমাকে তো অন্যর হয়ে ওকালতি করতে বলিনি আমি। তুমি চাও কি না, তাই-ই বলো।
গান্ধারী, যে-পুরস্কার উমেদারি করে, কাঠ-খড় পুড়িয়ে পেতে হয়, তা পেলে সে পুরস্কার কি পুরস্কার আদৌ থাকে আর? সে তো আত্মবঞ্চনাই। আয়নার সামনে দাঁড়ানো কি যায় তারপরেও? জানি না।
যদি আদৌ পেতে হয় তাহলে এমন করেই পেতে হবে। ‘লজ্জা, মান এবং ভয়’ এই তিন যার আছে, এদেশীয় খুব কম পুরস্কার-ই তার জন্যে। তা ছাড়া, তোমার বাড়িতে তো আয়নাই নেই। তোমার আবার কী প্রবলেম?
সে তো আমার মুখটি কুৎসিত বলেই। আমার বাইরের মুখ-ই। দেওয়ালের আয়না ছাড়াও প্রত্যেক মানুষের মনের মধ্যেও একটি করে আয়না তো থাকে। সেই আয়না? তার সামনে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দাঁড়াতে তো হয়-ই! প্রত্যেককেই। সেই আয়না অস্কার ওয়াইল্ডের ‘পিকচার অফ ডরিয়ান গ্রে’র সেলারে-রাখা ছবির-ই মতো মিথ্যে বলে না কোনোদিনও।
তাহলে, তুমি চাও না?
না:। এমন প্রক্রিয়ায় পুরস্কার পেতে হলে কোনো পুরস্কার-ই চাই না আমি। সত্যিই না। কোনোদিনও না।
ভয় নেই। পাবেও না কোনোদিন। কারণ এমন প্রক্রিয়ায় যারা পুরস্কার পায়, তারাই সব পুরস্কারের বিচারকও। অন্যর প্রতি তাদের বিচারও, তাদের নিজেদের যাচাই-এরই মতো আর কী! বেশ। তাহলে আর কী চাও? আমার কাছ থেকে তোমার চাইবার কি আর কিছুই নেই, তক্ষ? তুমি অনেক-ই বদলে গেছ।
কী করে বলব গান্ধারী? কী তুমি দিতে পারো আর দিতে পারো না, তা না জেনে বলি কী করে? বলে ফেলার পর যদি না দাও? তাহলে বড়োই ছোটো হয়ে যাব যে, তোমার কাছে।
মনে মনে তক্ষ বলল, আমাকে দেবে? দিতে চাও? গান্ধারী? একটিবারের জন্যে? দিতেই কি এসেছ আজ সন্ধ্যায়? দেবে? তোমার এই সুন্দর শরীরকে? যা, তুমি এলেবেলে অবহেলায় কত অংসখ্যবার তোমার স্বামীকে দাও, দিয়েছ, দিয়ে দিয়ে শূকরী হয়ে গেছ; আমাকে দেবে তা? একবারের জন্যে? কতটুকু আর হারাবে তোমার তাতে? চিরদিন মনে করে রাখব গো তোমাকে। এই ভাদ্রশেষের হিমহিম রাতে, শিউলিফুলের গন্ধের মধ্যে; দেবে আমাকে? গান্ধারী? একটিবার?
গান্ধারী একবারে গ্লাস শেষ করে টকাস করে তেপায়াতে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল, নাও, তুমিও শেষ করো। দু-জনের জন্যেই ঢালো। আবার।
এত তাড়াতাড়ি? মাথায় চড়ে যাবে যে।
ভালো হুইস্কি কারো মাথায় চড়ে না। এ কী বাজে দিশি হুইস্কি পেয়েছ? আর যদি চড়েই তো চড়বে। তোমাকেও যে, মাথায় চড়াচ্ছি আমি, তা কী তুমি বুঝছ না?
গান্ধারী যেন, কী বলতে চাইছে তক্ষকে, কিন্তু পারছে না বলতে। তক্ষর-ই মতো। এই লেখাপড়া শেখাই ওদের কাল হয়েছে। সব স্বাভাবিকতাই নষ্ট হয়ে গেছে। বড়ো বক্র, কুটিল, জটিল হয়ে গেছে জীবন। ছেলেবেলার নি:সংকোচে, বিনা লজ্জায় চকোলেট আর আইস্ক্রিম চেয়ে খাবার দিনগুলোই ছিল ভালো।
কী হল, তক্ষ, কথা বলছ না যে। তোমাকেও যে, মাথায় চড়াচ্ছি তা তুমি বুঝছ না?
বুঝছি তো। বুঝছি, বলেই তো বুঝছি না।
বোকার মতো বলল তক্ষ।
গান্ধারী বলল মনে মনে, একবার মুখ ফুটে বলো তক্ষ। প্লিজ একবার চাও। এগিয়ে এসো। হাত পাতো। তুমি যে, পুরুষ! তুমি একবারটি চাও গো। লক্ষ্মীসোনা। আমি যে, মেয়ে। আমরা যে, অন্য প্রজন্মের মেয়ে। বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। একবার চাও তুমি। যে-নাটকের জন্যে এতভাবে এত সময়, রিহার্সাল দিয়ে তৈরি করলাম নিজেকে, আজ সকালে ঘুম ভাঙার পরমুহূর্ত থেকে তা কি...
তক্ষ দু-জনের গ্লাসেই হুইস্কি ঢালতে ঢালতে মনে মনে বলল, আমি খুব-ই বুঝতে পারছি গান্ধারী, কেন তুমি এসেছ আমার কাছে। শুধু একবার চাও। সোজাসুজি নাইবা চাইলে, আকারে ইঙ্গিতেই চাও। আমাকে ধন্য করো গান্ধারী। কৃপা করো। আমি যে, চাইতে শিখিনি। আমার শিক্ষা, আমার আত্মসম্মান, আমার শ্লাঘা যে, আমাকে সমস্ত সহজপ্রাপ্তির দোরগোড়া থেকে বারে বারেই ফিরিয়ে এনেছে! ঘুঙ্ঘটটোলিতেও যেতে পারলাম না, এপর্যন্ত একদিনও! আমার বড়ো সংকোচ হয় নিজেকে খুলে-মেলে ধরতে। ভারি ভয় হয়; ‘সস্তা’ হয়ে যাব। এতকষ্ট করে দামি করে তুলেছি নিজেকে, সব মূল্য ধুলোয় লুটিয়ে দেব?—চাও তুমি, লক্ষ্মীটি গান্ধারী। একবারটি চাও।
গান্ধারী একদৃষ্টে তক্ষর মুখে চেয়েছিল। তক্ষও গান্ধারীর মুখে। গান্ধারীর ঈষৎ-রক্তিম চোখ দু-টি তক্ষর দু-চোখে স্থির। দু-জনের মুখ দেখে দু-জনেই বুঝতে চেষ্টা করছিল দু-জনকে। এইসব মনের গাঙে অনেক-ই জল, ‘বুদ্ধি’র লগি তল পায় না তার। হেরে যাবে, অন্যর চোখে সস্তা হয়ে যাবে বলে মুখে কিছুই বলতে পারল না কেউই।
পাছে সস্তা হয়ে যায়, তাই ‘দাম’ দিতে হল অনেক-ই!
কথা ঘুরিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে গান্ধারী বলল, তোমার এমন বিদঘুটে নাম কে রেখেছিল? মানে কী এর?
বা:। তক্ষও যেন, হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ এক গভীর যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। বলল, তক্ষ যে, কার নাম জান না? যার নাম তক্ষশীলা। মহারাজ দশরথের নাতি। ভরতের-ই এক ছেলে তক্ষ। ‘রামায়ণ’ পড়োনি?
না। আমি পাটনার ইংলিশ মিডিয়াম কনভেন্টে পড়েছিলাম। ওসব ট্র্যাশ আমি পড়িনি।
তোমার নাম কে রেখেছিলেন? ও নাম তো মহাভারতের-ই একটি চরিত্রর।
কে জানে? তাই-ই?
তোমার নামের মানে জানো?
না:। জানতে চাই-ও না। যে নিজেকেই জানে না, সে নামের মানে জেনে কী করবে?
নিজেকে কেই-ই বা জানে!
কেউই কি জানে না?
কেউ হয়তো জানে। মানে, কেউ কেউ। আমরা জানি না বলেই মনে হয়।
তোমার কোনো কষ্ট নেই তক্ষ?
কষ্ট?
চমকে উঠল তক্ষ।
একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘কষ্ট’ নেই, এমন মানুষ কী একজনও আছে?
কী সে কষ্ট?
নিজের কষ্টর কথা অন্যকে বলতে নেই। একজন শিক্ষিত, আধুনিক মানুষ তো নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারে না কারো কাছেই। তাহলে তো সে, ‘ভিখিরি’ই হয়ে গেল। নি:স্ব একেবারে। ভিখিরি হয়ে বাঁচার চেয়ে, না বাঁচাই ভালো। আমরা প্রত্যেকে হিমবাহই হয়ে গেছি। যতটুকু দেখা যায় সেটুকু কিছুই নয়। প্রায় সবটাই থাকে চোখের এবং মনের গভীরে।
তাই-ই? কী জানি। হয়তো তাই-ই। কিন্তু এত কষ্ট নিয়ে বাঁচাও কি বাঁচা?
কী করবে বলো? আমরা যে, মানুষ। জানোয়ারদের আত্মসম্মানের, আত্মাভিমানের বালাই-ই নেই। ওরা তাই-ই সহজে সুখী।
জানোয়ার হয়ে যেতে বাধা কোথায়? যদি তাতেও সুখী হওয়া যায়।
সে-সুখ তো ক্ষণিকের সুখ গান্ধারী। জানোয়ার হয়ে গেলেই মানুষ জলে-ডোবা মানুষের-ই মতো প্রাণপণে মনুষ্যত্বর খড়কুটো আঁকড়ে আবারও মানুষ হয়ে উঠতে চায়, যদি তার মনুষ্যত্ব তখনও পুরোপুরি নষ্ট না হয়ে গিয়ে থাকে।
সেই চেষ্টা মানে; মানুষে ফিরে-আসা বড়োই করুণ। তার চেয়ে মানুষ হয়েই থেকে মানুষের কষ্ট বুকে করে বাঁচাই ভালো।
তুমি খুব সুন্দর করে কথা বলো কিন্তু।
হুঁ। অনেকেই বলে। কিন্তু শুধু কথাই।
সুন্দর করে কথা বলার চেয়ে সুন্দরভাবে বাঁচা অনেক বেশি কঠিন। এবং জরুরিও।
সুন্দর কথাও তো কম নয়! ক-জন এমন সুন্দর করে কথা বলতে পারে?
ভাষা এবং ভাষার এমন ঐশ্বর্য তো মানুষের-ই একার। নিজের মনের ভাবকে স্পষ্ট করে লক্ষ লক্ষ শব্দর মধ্যে থেকে, ঠিক শব্দটি বেছে নিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে তো একমাত্র মানুষ-ই পারে। কবিতা বলো, গান বলো, গদ্য বলো, নাটকের সংলাপ, ফিলমের ডায়ালগ যাই-ই বলো না কেন, এসব-ই তো ‘শব্দ’ নিয়েই নি:শব্দ খেলা। এই স্তূপীকৃত শব্দ নিয়েই তো বাক্য গড়ে মানুষ, আজ রাতে ফোটা শিউলি ফুলের-ই মতো শব্দ কুড়িয়ে মালা গেঁথে বাক্য বানাই আমরা। আমি, তুমি...সকলেই, তাই-না?
হুঁ। বাক্য।
গান্ধারী বলল।
তারপর বলল, জানি না, তক্ষ। শুধুই কি শব্দ? বাক্যবিন্যাস? সুন্দর করে নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করা? এইটুকুই কি সব? এইজন্যেই কি শুধু মানুষের আসা এখানে, বেঁচে থাকা? শব্দের আর বাক্যের সুগন্ধর আড়ালে যদি মানুষ হাহাকার করে বুভুক্ষুর মতো জীবন কাটায়, তবে এই বাক্যবিন্যাসের তাৎপর্যই বা কী? কতটুকু?
আমিও জানি না। তুমি হয়তো ঠিক। অন্যদের কথা জানি না, নিজের কথাই বলতে পারি শুধু। আমি এই শব্দের-ই কারাগারে বন্দি এক মানুষ। অনেক আশীর্বাদের-ই মতো বোধ হয় মানুষের এ-এক অভিশাপ। এই অভিশাপ নিয়েই একজন আধুনিক মানুষ জন্মায়।
হুইস্কির নেশাটা বেশ চাড়িয়ে গেছে মাথার কোষে কোষে। মন, জাপানি মেয়েদের জবরজং পরতের পর পরতের পোশাক খুলতে শুরু করেছে, এক এক করে। মোড়কে চিড় ধরেছে। মনকে নিরাবরণ না করে শরীরকে নিরাবরণ করা যাবে না, তক্ষর সামনে। পারবে না ও। হুঁশ থাকতে পারবে না। অন্যমনস্ক মনে ভাববার চেষ্টা করছিল যে, আজপর্যন্ত তাকে কতজন পুরুষ শারীরিকভাবে পেতে চেয়েছিল বিয়ের আগে এবং পরে। তার হিসেব রাখলে খাতা ভরে যেত, এতদিনে। তাদের মধ্যে পায়েও ধরেছিল কেউ কেউ। কী না করেছিল তারা! পুরুষেরা বড়োই, ছোটো করতে পারে নিজেদের। অনেকে এখনও করে। তবু, উপবাসী শরীরটিকে তার স্বামীর ছাড়া আর কারো হাতেই তুলে দিতে পারেনি সে। ঘৃণায়, বিরক্তিতে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের। সেইসমস্ত জানোয়ার পুরুষদের-ই। অনেক সুপুরুষ, সুবেশ, সবল পুরুষকেই। কিন্তু গান্ধারী যে, নিছক একজন মেয়ে নয়। দশজনের মতো যে, নয় সে। ‘মানুষী’ যে, কেবল যথার্থ মানুষের কাছেই নিজের সম্মান খোয়াতে পারে। নিজের শরীর-মনের নিভৃততম নিভৃতিকে দলিত হতে দিতে পারে। সে যে সুন্দরী, শিক্ষিতা এবং সুরুচিসম্পন্না। কেউকেটা এক পুরুষের স্ত্রীও। বড়োনারীকে ভ্রষ্টা হতে হলে, তাকে নষ্ট করার মতো বড়ো পুরুষেরও যে, দরকার। যা তার ‘দেয়’, তা সে, যাকে-তাকে দিতে পারবে না। যার-তার কাছ থেকে নিতেও না। তার চেয়ে তোলা থাক, এ-জন্মের মতো সবকিছু। মনের আর শরীরের কুলুঙ্গিতে নিভৃতপ্রাণের দেবতা হয়েই থাকুক তার চাওয়া।
তক্ষ ঠিক-ই বলেছিল, কষ্ট ছাড়া কী মানুষ হয়?
আর একটা দাও। গান্ধারী বলল।
আরও খাবে?
গান্ধারী নিজে ভ্রষ্টা না হতে পেরে ওর হাসিটাকে ভ্রষ্ট করল। করল হুইস্কিই। এক একজন মানুষের ওপর এক একরকম প্রভাব হয় ‘হুইস্কির’। সাংঘাতিক জিনিস এ। ভাবল গান্ধারী। বলল, ও বুঝেছি! তোমার নিজের-ই জন্যে কি এটাকে পুরোপুরি বাঁচিয়ে রাখতে চাও?
নিজের জন্য? অবাক হল তক্ষ। হেসে বলল, নিজের জন্যে নিজেকেই বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না। আর এই বোতলের লালচে জল?
তবে আর কী? ঢালো ঢালো। আমাকে দাও বড়ো করে, তুমিও নাও। দেখেছ! ন-টা প্রায় বেজে গেল! এর-ই মধ্যে? ভাবছিল, সময় বড়োই দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ঘণ্টা, দিন, জীবন। যা-করবার তাড়াতাড়ি করতে হয়। গান্ধারী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, একবার জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে।
তক্ষ বলল, সত্যি। সময় বড়ো কম, বড়ো কম আমাদের আয়ু, বড়ো, ছোটো এই জীবন।
তারপর হুইস্কি ঢালতে ঢালতে নিরুচ্চারে বলল, বেশিরভাগ মানুষের-ই জীবনের সবটাই কেটে যায়, এমনি করেই সুখের প্রার্থনায়, ‘সুখ’-এর জন্যে তৈরি হতে হতেই। এটাই ঘটনা।
হুইস্কিটা একচুমুকে গিলে ফেলল গান্ধারী। তক্ষকেও বলল, বটমস আপ।
তারপর-ই বলল, দেখেছ! তোমাকে তোমার জন্মদিনের আসল প্রেজেন্টটাই দেওয়া হল না।
আসল প্রেজেন্ট?
হ্যাঁ।
তক্ষও একচুমুকে গ্লাস শেষ করল। ওর নিজস্বতা, আমিত্ব, অহং, আত্মাভিমান সব ছানা—না—হওয়া কেটে—যাওয়া দুধের-ই মতো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। নেশা হয়ে গেছে। দু-কানের লতিতে গরম।
গান্ধারী ইশারায় ওকে কাছে উঠে আসতে বলল। তারপর বলল, জন্মদিনে কিসি দিতে হয় যে, তাও জানো না বুঝি? এসো, কাছে এসো।
তক্ষর সারাশরীর অবশ হয়ে গেল, ভালো লাগায়। হাঁটু কাঁপতে লাগল থরথর করে। অব্যবহারে অব্যবহারে ওর শরীরের যন্ত্রপাতি, কী সব মরচে ধরে নষ্ট হয়ে গেল? কী যেন, বলতে গেল, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো তক্ষ, অস্ফুটে...। শোনা গেল না কথাটা। বলল, গান্ধারী...
ঠিক সেই সময়েই, জানলার গরাদ দিয়ে মুখ-বাড়িয়ে একজন দাড়িঅলা লোক চেঁচিয়ে বলল, ‘রিকশাওয়ালা! ন বাজ গ্যয়ি মাইজি!’
তক্ষুনি, তক্ষকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ি জামা ঠিক করে নিতে নিতে ও বাথরুমের দিকে দৌড়ে গেল। ইচ্ছুক, উন্মুখ শরীর একটু ছোঁয়াতেই গলে যায়; যা ঘটে না, স্বামীর নিয়ত অভ্যাসের চরম বন্য আদরেও। বিয়ের পর পর ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে সে, শূকরীই হয়ে গেছিল। অনেক বছর পর মানুষী হয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্যে হলেও।
তবু অপরাধবোধে জর্জরিত লাগছিল ওর। সংস্কার এখনও অনেক গভীর।
গান্ধারী চকিতে একবার তক্ষর চোখে তাকাল। ঘৃণা, অনুকম্পা এবং অসহায়তা মিশেছিল সে-চাউনিতে। বাথরুম থেকে ফিরে এসে রিকশাওয়ালাকে বলল, চলো। রিকশায় উঠতে উঠতে তক্ষকে বলল, ‘মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে। দেখা হবে। চলি তক্ষ।’
তক্ষ রিকশার পাশে দাঁড়িয়ে লজ্জিত, ক্ষুব্ধ মুখ নামিয়ে বলল, আবার কবে আসবে?
শিউলি আর হিমের গন্ধ ভাসছিল তখন বাইরের আশ্বিনের রাতের আকাশে। একলা ‘টি-টি’ পাখি ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে ঝাঁটি জঙ্গলে ভরা টাঁড়ের ওপরে উড়ে উড়ে ডাকছিল। ওরাও একলা দু-জনেই। টি-টি পাখি।
গান্ধারী চুলটা ঠিক করে নিল, রিকশাতে বসেই। অনেক বেশি বিস্রস্ত হলেই খুশি হত। তবু, ঠিক করে নিল। একটু পর-ই আলোকিত পথে গিয়ে পড়বে।
তক্ষ আবারও বলল, কবে আসবে?
গাল থেকে অলক সরাতে সরাতে গান্ধারী বলল, দেখি।
ঘরের আলো, খোলা দরজা দিয়ে এসে পড়েছিল, তক্ষর মুখের একপাশে। বড়ো কুৎসিত সেই মুখটি। কুৎসিত মুখকে কাম আরও কুৎসিততর করে তুলেছিল। কী করে? কী করে সে, এই মানুষটার কাছে, কী চাওয়ার জন্যে এসেছিল, ভেবেই পেল না, সেই মুহূর্তে গান্ধারী। বড়োই ঘেন্না হল নিজের ওপরে। কেমন করে কামদংশিত হয়ে যে, নিজেকে এত ছোটো করতে এসেছিল, এই জন্তুর-ই মতো ভাবাবেগহীন জানোয়ারটার কাছে, তা বলা বড়োই মুশকিল। বড়ো লজ্জা।
মুখে বলল, চলি। তক্ষ।
নিরুত্তাপ গলায়।
রিকশার চাকা গড়িয়ে গেল কাঁকরে। ‘কিরকির’ শব্দ করে মোড় নিল রিকশাটা। টি-টি পাখিটা তখনও ডাকছিল ‘ডিড-ইউ-ড্যু-ইট? ডিড-ইউ’?
অন্ধকার ঝাঁটি জঙ্গলের দিকে আর তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে শরীরের একপাশে অন্ধকার মেখে দাঁড়িয়েছিল তক্ষ। প্রাচীন, কোনো কুৎসিত যক্ষর-ই মতো। জলের গন্ধ আসছিল, অন্ধকারে হেঁটে আসছিল ‘কারো’ নদী থেকে। নদীপারে কাশফুল ফুটেছে থোকা থোকা। এখন দেখা যাচ্ছে না। তবে হিমের রাতের গন্ধর সঙ্গে আলতো হয়ে মিশে ভেসে আসছে সে-গন্ধ। আশ্বিনে পড়েছে বছর। এই আশ্বিনে, দু-তিন-মাস হল বিয়ে-হওয়া মেয়েদের মতোই এক, খুশি-খুশি আদুরে-আদুরে ভাব থাকে। গন্ধ পেল নাকে, তাদের তাঁতের শাড়ি আর পারফিউমের।
গান্ধারী আর কোনোদিনও আসবে না তার কাছে। ভাবছিল, কেনই যে, মানুষ অন্যর কাছে আসে, আর কেন যে, এমন করে ফিরে যায়!
রিকশাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চলছিল এবড়ো-খেবড়ো পথে। গান্ধারীর সিক্ত জরায়ুতে ঝাঁকি লাগছিল। নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছিল ও। চুমু খাওয়ার কথাতেই এই! একটু হলে কী অঘটন-ইনা ঘটতে যাচ্ছিল। তৈরি হয়েও তো আসেনি। আর ওই কালচারড কথাসর্বস্ব ইডিয়টটা তো একটা স্টুপিড ব্যাচেলার। ওর কাছে থাকার কথাও ছিল না কিছুই। পাটনার গান্ধারী, কী করে মুখ দেখাত, সেখানের হাইসোসাইটিতে? কিছু একটা ঘটে গেলে! ছি:। আর কখনো এমন দুর্মতি হবে না ওর। এইসব কালচারড ন্যাকাবোকার চেয়ে, জংলি পশু-মার্কা প্র্যাকটিকাল অভিজ্ঞ পরপুরুষও বোধ হয় অনেক ভালো। মেয়েদের তারা বোঝে, কদর করে।
রিকশাটা ক্রমশই দূরে চলে যাচ্ছিল এঁকে-বেঁকে। সেদিকে তাকিয়ে তক্ষ ভাবছিল, প্রেম, কাম, সব-ই বোধ হয় এমনি করেই একেবারে বিনা নোটিশে বিনা প্রস্তুতিতে সাইক্লোনের মতো হঠাৎ-ই আসে। বোঝবার আগেই হঠাৎ-ই চলে যায় আবার। হয় বিধ্বস্ত করে দিয়ে যায়, নয়; একটু শুঁকে পর্যন্ত দেখে না। তারপর আর আসে না কোনোদিনও।
রিকশাটা অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যাকগে যাক। আজ রাতে গান্ধারীকে খুব, খু-উব-ই আদর করে দেবে তক্ষ। উলটেপালটে, চেটে-পুটে খাবে। এবং খাওয়াবেও। যা-কিছুই বেচারি চেয়েছিল মনে মনে সব-ই ওকে দেবে! একটুও বাকি না রেখে। যে-ভুল করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত অমনভাবেই করবে। ভুল-ই কি? কে জানে?
যাও গান্ধারী, যাও তুমি। তোমার নিরাপদ আত্মপ্রবঞ্চনার জগতে। আমিও ফিরে যাই আমার লেখার টেবলে, আমার অশান্তি যেখানে ‘শান্তি’ হয়ে ওঠে। ফিরে যাই আমার কাজে, যেখানে সব জ্বালার নিবৃত্তি। কাজের মতো পুজো, এতবড়ো প্রেম এবং কাম আর কীই-ই বা আছে? গান্ধারী! তুমি যাও। আমার অপেক্ষায় রূপমতী দাঁড়িয়ে আছে অধীর আগ্রহে। পাঁচ-শো বছর থেকেই সে, দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রদেশের দার জেলার উঁচু পাহাড়ের ওপরের দুর্গম দুর্গ মাণ্ডুতে। রূপমতীকে স্বপ্নে প্রায়-ই দেখছে তক্ষ, যেদিন থেকে নাটকটি লেখা শুরু করেছে। স্বপ্নে আদরও করে দিয়েছে তাকে দু-তিনদিন। রূপমতীর কোনো ছবি দেখেনি ও। ইতিহাসের কোনো বইতেই স্পষ্ট ছবি নেই। তবে, ঐতিহাসিক আর পরিব্রাজকদের লেখায় তার রূপগুণের বর্ণাঢ্য বর্ণনা পড়ে, মনে মনে তাকে গড়ে নিতে একটুও অসুবিধে হয়নি ওর। লেখক, কবি, নাট্যকার তারা তো আসলে কুমোর-ই! কল্পনায় যে-রাতে যেমন, রূপমতীকে সে-গড়ে নেবে তার প্রয়োজনমতো রূপমতী সেই আকার-ই নেবে। যে শাড়ি খুশি পরাবে তাকে, স্বপ্নে খুলে নেওয়ার জন্যেই। এ-রূপমতীকে হরণ করে নেয় সাধ্য নেই কোনো আধম খাঁ-এর। এর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে সে, সাধ্যও নেই কোনো বাজবাহাদুরের।
কল্পনা করে নেবে কোনো, বর্ষার রাতকে। মুঞ্জতালাও-এর জল এখন কানায় কানায় ভরা। পদ্ম আর কুমুদিনী, সারস, আর জলপিপিরা, এখন রাত, তাই-ই নির্বাক। স্বপ্নে আছে তারাও। সেই তালাও-এর পাশের জেহাজ মেহালের ওপর থেকে গম্ভীর আফগানি খানদানি রাবাবের রিওয়াজের মেজাজভরা আওয়াজ ভেসে আসছে। ভেসে আসছে নানারকম ধূপ, গুলগুল আর ইত্বরের মিশ্রগন্ধ। খুশবু উড়ছে মাণ্ডুর ভেজা বাতাসে। আলোর মালা-পরা জেহাজ মেহালকে মনে হচ্ছে সত্যিই যেন এক ভেসে-যাওয়া জাহাজ-ই। এইমুহূর্তে জেহাজ মেহালও স্বপ্নে আছে। রূপমতীর সখীদের কন্ঠের গান। কী গান গাইত তারা কে জানে? গজল কি তখন ছিল? রাগ-রাগিণী তো ছিলই, ঠুংরি গাইত কি তারা? মেঘ রাগের উদাস পর্দাগুলি জলে হয়তো তিরতির করে কাঁপন তুলছে এখন। প্রতিটি কোমল ও শুদ্ধ পর্দা পানজর্দা আর জাফরানের গন্ধ-ভরা গোলাপি ঠোঁটে ভরপুর সুরে বলছে। একটুও খামতি নেই সেই সুরে, দ্রুত পায়ে ঝরোকার মধ্যবর্তী অলিগলি দিয়ে দ্রুতসঞ্চরমাণ রূপমতী চলে যাচ্ছে। আলো-আঁধারিতে, নূপুর আর রাবাব আর তবলার আর তানপুরার আর সারেঙ্গির আওয়াজের মধ্যে মধ্যে যেন, তালফাঁকের-ই মতো আলতো পায়ে। বাজবাহাদুরের সঙ্গে পারস্য-দেশীয় রেশমি গালচেতে ফুলের চাদরের ওপরে আশ্লেষে মিলিত হবে বলে।
আহা! কল্পনা ভাগ্যিস ছিল। ‘কল্পনা’ই হচ্ছে আর্টের গোড়ার কথা। রক্তমাংসের পুরুষ ও নারী ছাড়াই কোনো মানুষ বা মানুষীর এই একটা ছোট্টজীবন দিব্যি চলে যায়, যদি কল্পনার কামধেনু, তার মনের দুয়ারে বাঁধা থাকে।
দরজা বন্ধ করে টেবলে ফিরে এসে বসে অনেকক্ষণ ধরে একটা সিগারেট খেল তক্ষ। তার আগে আরও একটা হুইস্কি ঢালল। বেশ লাগছে ভাবতে। একজন পরস্ত্রী, পরমা সুন্দরী নারী তার দুয়ারে শরীর ভিক্ষা চাইতে এসেছিল উপঢৌকন নিয়ে। যদি দিত, তবে সুন্দর কল্পনা বেড়ালে-ছেঁড়া সাদা কবুতরের-ই মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। গান্ধারী তার চোখে আর সুন্দরী থাকত না। বাস্তব, বড়োই কদর্য! তা যত সুন্দর-ই হোক-না-কেন। কারণ বাস্তবের সৌন্দর্য একদিন ফুরিয়ে যায়-ই যায়। বার্ধক্য একদিন এসে তাকে গ্রাস করেই। কল্পনা কোনোদিনও ফুরোয় না। বুড়ো হয় না। মরেও না। কারণ, তা থেকে যায় কাগজে-কলমে, রঙে-তুলিতে; কন্ঠস্বরে।
নাটকের শেষটুকু পড়ল আবারও। মন কিছুতেই ভরছে না। অথচ কাল-ই, দিয়ে দিতে হবে বোকাকে। পুজোর দেরি তো আর বেশি নেই।
না:। মন ভরছে না কিছুতেই। নানা তত্ত্ব এসে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ তো আর কলকাতা নয় যে, কাউকে দেখিয়ে নেয়, বা পরামর্শ করে এ-নিয়ে।
কোনো কিছু সৃষ্টির আনন্দে বড়োই দুঃখ। দুঃখটাই আনন্দ না আনন্দটাই দুঃখ, বুঝতে পারে না তক্ষ।
শেষ করেও তবু শান্তি পাচ্ছে না। ক্লাইম্যাক্সটি কোথায় তুলবে সেটাই এখন ভাববার। তা ছাড়া, এ নাটক তো সাধারণ নাটক নয়। সাদামাটা একটি ঐতিহাসিক ছক বা গল্পের মধ্যে দিয়ে চিরন্তন-ই কিছু বলতে চাইছে যে, তক্ষ।
জন হাওয়ার্ড লসন, তাঁর ‘থিয়োরি অ্যাণ্ড টেকনিক অফ প্লে-রাইটিং অ্যাণ্ড স্ক্রিন রাইটিং’ বইয়ে বলেছেন; ‘অ্যাজ ফার অ্যাজ দ্যা প্রসেস ইজ ক্রিয়েটিভ, নো পার্ট অফ দ্যা স্টোরি ইজ রেডি-মেড; এভরিথিং ইজ পসিবল (উইদিন দ্যা লিমিটস অফ দ্যা প্লে-রাইটার্স নলেজ অ্যাণ্ড এক্সপিরিয়েন্স) অ্যাণ্ড নাথিং ইজ নোন’।
গল্পটা তো সাদামাটাই। মাঁলোয়ার আফগান নবাব বাজবাহাদুর তাঁর প্রেমিকা অথবা রক্ষিতা অথবা স্ত্রী অসীম রূপমতী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী ও দারুণ গায়িকা রূপমতীকে কাপুরুষের মতো ফেলে শাহানশা আকবরের সেনাপতি আধম খাঁর সঙ্গে সারাংপুরের যুদ্ধে হেরে তার নিজের প্রাণের ভয়ে মাণ্ডু ছেড়ে যেমন পালিয়েছিলেন তেমন অসংখ্য পুরুষ-ই পালিয়েছেন ইতিহাসে। এই ছোট্ট সাবডিভিশনাল শহর ঝিরাটোলিতে এমন পালানোর ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে সামনে রেখে এবং আনুষঙ্গিক অনেক ঘটনা কল্পনা করে নিয়েই তক্ষ ঘটনা-পরম্পরাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে রূপমতী ও বাজবাহাদুরের চরিত্রটিকে গড়ে তুলতে চাইছিল নিজের মনোমতো, একেবারে ‘নিখুঁত’ করে কিন্তু নাটকের পরিভাষায় যাকে ‘রুট-অ্যাকশন’ বলে, তাকে অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি করে তুলতে পারল কি?
এখানে নাটক নিয়ে আলোচনা করার মতো একজনইমাত্র মানুষ ছিলেন। রমেন চাটুজ্যে। তিনি তো চলে গেলেন গতবছরের এই সময়ে। খালি পেটে মদ খেয়েই!
বৃত্তটিকে নিপুণভাবে সম্পূর্ণ করতে পারার ওপরও নির্ভর করছে নাটকের সাফল্য। আরও নির্ভর করছে, কীভাবে এবং কোথায় ‘ক্লাইম্যাক্স’ আনবে ও। ‘ক্লাইম্যাক্স’ যে, নাটকের ঘটনার অনিবার্য ও স্বাভাবিক পরিণতি হয়ে উঠবেই এমন কোনো কথা নেই। লসন-এর মত ছিল, ‘দ্য ওভার সিমপ্লিফিকেশন অফ দ্যা রুট-অ্যাকশন মিনস দ্যাট দ্যা সিস্টেম অফ কজেশন লিডিং টু ইট ইজ নট ফুললি ডেভেলাপড।’ ‘পয়েন্ট অফ রেফারেন্স’ তো ক্রমশই সরে আসছে। ইবসেনের নাটকের নোরা যখন, তার স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছে সেই মুহূর্তটি অথবা অন্য একটি বিদেশি নাটকে হেড্ডার আত্মহত্যা, এই দুই ঘটনাই হয়তো হিস্টোরিক্যাল। কিন্তু কনটেমপোরারি নয়। আজকে যেভাবে নাটকের মূল্যায়ন বা বিশ্লেষণ করা হয় তাতে ওই দুই নাটকের দুই ঘটনার কোনোটিই আনঅ্যাভয়ডেবল নয়। এগরি লাজোস এবং জন হাওয়ার্ড লসন এই দু-জনের সঙ্গেই মতের অমিল আছে তক্ষর নিজের। ‘পয়েন্ট অফ হায়েস্ট টেনশন’ এবং ‘পয়েন্ট অফ ইনটেন্স স্ট্রেইন’...‘পয়েন্ট অফ রেফারেন্স’ অথবা ‘দ্যা মোস্ট মিনিংফুল মোমেন্ট’ এর কোনোটিই তক্ষর মতে ‘কালমিনেটিং পয়েন্ট’ নয়। ও কালমিনেটিং পয়েন্টটির মধ্য দিয়ে রূপমতীর মতো ‘কনক্রিট ইভেন্টস’ ভরা নাটকটির অ্যাবস্ট্রাক্টটা আইডিয়ার ভাবটিকে এমনভাবেই উপস্থাপিত করতে চায়, যাতে যাঁরা নাটক বোঝেন, তাঁরা এ-নাটক শেষ হওয়ার পর ‘ক্লাইম্যাক্স’ কোথায় যে, লুকিয়েছিল আসলে, তা নিয়েই তর্কে মাতবেন।
তক্ষ, করে দেখাতে চায় যে, এই অঞ্চলেও নাটক নিয়ে ভাবাভাবি চলেছে। ঝিরাটোলির ‘ভ্রাতৃসংঘ’ তাকে নাটক লিখতে বলেছে বলেই এবং বোকা সে-নাটক পরিচালনা করবে বলেই যে, ঝিরাটোলির স্থায়ী বাসিন্দারা আর পুজোর সময় বেড়াতে আসা, মাথায় বাঁদুরে টুপি এবং গলায় মাফলার-বাঁধা, ঠাণ্ডা-লাগার ভয়ে সর্বদাই ভীত কিছু চেঞ্জাররা দেখে ‘ধন্য ধন্য’ করবেন বলে যে, নাটকটি ও লিখেছে, তা নয়। এই নাটকের ঘটনাপরম্পরা, মঞ্চসজ্জা, আলো, সংলাপ সাধারণ দর্শক উপভোগ করবেন যে, তাতে কোনো সন্দেহই নেই ওর। শেষ হলে, খুশি-মনে বাড়িও ফিরবেন তাঁরা। কিন্তু তক্ষ রায়, নিজে অপ্রস্ফুটিত মস্তিষ্কর বালক নয় বলেই, বালখিল্যদের আনন্দ দেওয়ার জন্যেই শুধু, এ-নাটক লিখতে বসেনি।
‘রূপমতী’ নাটকের ক্লাইম্যাক্স নাটকের শেষদৃশ্যে নয়। ইচ্ছে করেই করেনি তা। শেষদৃশ্যর তিনটি দৃশ্য আগে ক্লাইম্যাক্সকে লুকিয়ে রেখেছে। যেখানে ‘রূপমতী মেহাল’-এর ওপরের মিনারআলা ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছেন রূপমতী পুবে চেয়ে। সেই মেহাল থেকে মাণ্ডুর প্রায় তিন-শো মিটার খাড়া নীচে নিমারের বিস্তীর্ণ উপত্যকা। ঘনজঙ্গলাবৃত। সূর্য উঠছে। দূরের সোনালি আঁকা-বাঁকা সাপের মতো নর্মদার জল চিকচিক করে উঠছে, প্রথম সূর্যর আলোর সোনার ছটা গায়ে মেখে। ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা গেল দ্রুত। ঘোড়া থেকে নেমে, রূপমতী মেহালের সরু সিঁড়ি দিয়ে দ্রুতপদে উঠে এলেন সুলতান বাজবাহাদুর। মিথ্যে কথা বললেন রুপমতীকে, যেমন চিরকাল পুরুষেরা বলে এসেছে নারীদের। বললেন, ‘লড়াই করতে যাচ্ছি। আকবরের বাহিনী পৌঁছে গেছে সারাংপুরে’।
ধার্মিক হিন্দু রূপমতী স্নান করে এসেছিলেন। পুণ্যতোয়া নর্মদা নদীর ওপরে সূর্য না-দেখা অবধি জলগ্রহণ করতেন না পর্যন্ত উনি। চুমু খেলেন বাজবাহাদুরকে। রূপমতীর-ই কায়দায়। বললেন, অপেক্ষা করে থাকব তোমার জন্যে। যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরে এসো।
মিথ্যুক, ভীতু, ভোগবিলাসী, গোন্দদের গোণ্ডোয়ানার রানি দুর্গাবতীর কাছে যুদ্ধে গো-হারান হেরে গিয়ে যার ভেতরের, সামান্য পৌরুষটুকুও উবে গেছিল অনেকদিন-ই আগে, সেই বাজবাহাদুর আবারও মিথ্যা বললেন রূপমতীকে। কয়েকজন অনুচর নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন বাজবাহাদুর। পুরুষরা যে, মেয়েদের তুলনায় চিরদিনের মিথ্যুক, চিরদিনের ভীতু, চিরদিনের ভন্ড; এইটাই দেখাতে চায় তক্ষ।
এবার উঠল ও। বোতলটা তুলে রাখল। রুটি আর মেটের তরকারি রেখে গেছিল নাগেশ্বর। একটু গরম করে খেয়ে শুয়ে পড়ল।
আজ রাতে রূপমতীকে নয়, গান্ধারীকেই আদর করবে ও।
রূপমতী তো ঐতিহাসিক নারী। তার বয়েস হবে না কোনোদিনও। ফুলওয়ালির বেশ নিয়ে, ফুলের গয়না পরে মসলিনের ওড়নাতে মুখ ঢেকে যখন, হোশাঙ্গাবাদের দিকে মাণ্ডুর দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন রূপমতী নিমারের ঘন অরণ্যর মধ্যে দিয়ে, তার প্রিয় নদী নর্মদার জলের গন্ধ নাকে নিয়ে, সেই রূপেই তক্ষর চোখে থেকে যাবেন রূপমতী সারাটা জীবন। তক্ষ একদিন বৃদ্ধ হবে, লোলচর্ম, গলিত-নখদন্ত হবে, কিন্তু রূপমতী রয়ে যাবেন তেমন-ই রূপমতী। তেমন-ই রইবে তাঁর পদক্ষেপ। তাঁর ব্রীড়াভঙ্গি। তাঁর গানের গলা। বয়েস লাগবে না কিছুতেই। রূপমতী ক্লাসিক্স-এর পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। সময় তাঁদের ছুঁতে পাবে না। ন্যুট হামসনের ‘গ্রোথ অফ দ্যা সয়েল,’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’-এর মতোই। তক্ষদের মতো অগণ্য প্রতিভা আসবে যাবে, রীতি বা গান্ধারীর মতো সুন্দরীও; তারা সবাই-ই সমসাময়িক কালের চোখে আসাধারণ, কিন্তু সময়ের কবলে পড়ে তারা মিলিয়ে যাবেই একদিন না একদিন।
মাঝে মাঝেই এমন ‘ক্লাসিক’ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তক্ষরও। ওই পর্যায়ে না পৌঁছোতে পারলে সৃষ্টিশীলতার বাজারে লুঙ্গি আর চটি পরে ছেঁড়া থলে হাতে কুচোমাছ কিনতে এসে লাভ-ই বা কী?
জোড়াখাটে নিজের পাশেই গান্ধারীর জন্য জায়গা করে দিল সযতনে, পরমআদরে তক্ষ। জিজ্ঞেস করল, তুমি একটা বালিশ নাও? না দুটো? পায়ের কাছে কাঁথা থাকল। মাঝরাতের পর লাগবে। এখন না লাগলেও। শেষরাতে হিম পড়ে। কই? জামাকাপড় খুললে না? সত্যি! জামাকাপড়ে নিজেদের এত জটিল করে তোলো-না তোমরা! পাশের আলনায় খুলে রাখো। এখন বাঁ কাত-এ শোও। আমি তোমায় জড়িয়ে ধরে, তোমার ডান বুকে হাত রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প করি, তোমাকে পাশবালিশ করে।
কী গল্প?
কত গল্প আছে। নববিবাহিত দম্পতিরা যেসব গল্প করে। অর্থহীন প্রলাপ। মানে নেই কোনো। নববধূটি কবে কুল পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গেছিল ছেলেবেলায়, অথচ কিছুই হয়নি কিন্তু তার। কিছুমাত্র চোট না-লাগাটাই গল্প। নতুন বর ফুটবল খেলতে গিয়ে কুড়ি বছর আগে পেনাল্টি কিক থেকে দারুণ একটি হেড করে গোল করেছিল। সেই হেড করার ব্যথা তার বাঁ-কপালে নাকি এখনও আছে। নতুন বউ কি টিপে দেবে একটু?
আর কী কথা?
আরও কত্ত কথা। যত্তসব অর্থহীন মিথ্যেকথা, যেসব কথার একটিও মনে রাখবে না তাদের দু-জনের কেউই পাঁচবছর পর। টাকাপয়সা, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, বাপের-বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, ট্রিপল-অ্যান্টিজেন, এনকেফেলাইটিস তাদের পুরোপুরিই ভুলিয়ে দেবে যে, রাতে তারা একে অপরের কানে মুখ রেখে রুদ্ধশ্বাসে বলেছিল, ‘অ্যাই! তুমি-না, আমার আগে কক্ষনো মরে যেয়ো-না কিন্তু। তুমি মরে গেলে, আমি আর বাঁচব না একদিনও।’ বিয়ের পনেরো বছর পরে এরাই একে অন্যকে রাগের মাথায় বলবে, ‘মরো মরো। তুমি মরলে হাড় জুড়োয়।’ এর নাম-ই সংসার করা। যারা করেনি, তারা এর অসারতা জানে না বলেই, ঈর্ষা করে এত।
আসলে দিব্যিই বাঁচে। মানুষ বা মানুষী নিজের চেয়ে বেশি ভালো আর কাউকেই বাসে না। মোটা ইনশিয়োরেন্স থাকলে তো স্ত্রী মনেই রাখে না স্বামীকে। না থাকলে, ছেলে-মেয়ের অনাদরে অবহেলায় পড়ে মনে, মাঝে মাঝে মৃতদারের যদি বাত না থাকে, হাঁপানি না থাকে, সেরিব্রাল বা হার্টঅ্যাটাক না হয়ে থাকে এবং অবস্থা স্বচ্ছল থাকে, ছেলে-জামাইদের ওপর নির্ভরও করতে না হয়, কোনো ব্যাপারে, তবে তিনিও দিব্যি বেঁচে থাকেন। রিটায়ার্ড লাইফের-ই মতো, মৃতদার জীবনের মুক্তির হাওয়াও তিনি পুরোপুরিই উপভোগ করেন। ক্লাবে যান। নয়তো বেয়ানদের সঙ্গে প্রেম করেন। প্রেম সব বয়সেই করা চলে। প্রেম-ই তো জীবন। তবে পঁচাত্তর বছরের বেয়াই-এর সঙ্গে সত্তর বছরের বেয়ানের প্রেমের রকমটা, কুড়ি বছরের যুবক আর পনেরো বছরের যুবতীর প্রেমের চেয়ে কিছু আলাদা, এই-ই যা।
গান্ধারী পাশে শুয়ে উশখুশ করছিল।
বলল, নতুন জায়গায়, প্রথম রাতে; ঘুম হয় না ভালো।
হবে হবে। ঘুমপাড়ানি ওষুধ দেব আমি। আদর। খেলেই ঘুম। গাঢ়।
তোমার নামের মানে জান তুমি গান্ধারী?
নামের মানে? না তো!
কে রেখেছিল তোমার নাম?
বাবা।
হঠাৎ এই নাম?
পরে জানি, কেন। নামের মানে জানি না যদিও। বাবা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সেখানের এক প্রবীণ অধ্যাপকের মেয়ের নাম ছিল গান্ধারী। সে ‘টমটম’ চড়ে বেড়াতে যেত। অমন রূপ নাকি, এই মর্ত্যভূমিতে আর হয় না। প্রেমে পড়েছিল বাবা। বাবাদের প্রেম তো বুঝতেই পারছ। দূর থেকে দেখেই প্রেম। কথা হল না, আলাপ হল না। মেজাজ কেমন? রাগি না ঠাণ্ডা, স্বভাব কেমন? দয়ালু না কঞ্জুষ। চরিত্র কেমন? রক্ষণশীল না ঢিলে, মানে আমার মতো; এসবের কোনো খোঁজেই দরকার ছিল না তখন। দূর থেকেই প্রেম। রক্তমাংসের মানুষটাকে কখনো হাত দিয়ে ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয়নি।
প্রেম তো সেরকম-ই হয়। হওয়া উচিত। প্রেম, দু-টি রক্তমাংসের মানুষের মিলন কখনোই নয়। প্রেম এক মানসিক অবস্থা। দু-পক্ষেরই সবচেয়ে বেশি মানবিক এই বোধ, মানুষের সব বোধের মধ্যে। প্রেম করতে, হাত ধরতে বা চুমু খেতে হয় না। রূপমতীর সঙ্গে আমার প্রেম যেমন। অবয়বের মধ্যে প্রেমকে বাঁধলেই প্রেম মরে যায়, জলের ওপরে তোলা ইলিশ মাছের মতো। যেমন গান্ধারী, তোমার আমার প্রেমও মরে যাবে আজ রাতের শারীরিক মিলনের পর।
মিলনের পর? মনে মনে বলল, তক্ষ।
বাবা, তাই আমি যখন হলাম; আমার নাম রাখলেন গান্ধারী। মায়ের কাছ থেকেই শোনা গল্প। মা কিন্তু রাগ করতেন না, করেননি।
করবেন-ই বা কেন? প্রেম তো রাগের নয়। ওইরকম প্রেম শুধুমাত্র আনন্দর-ই। তখন মনে হয় দুঃখ। তীব্র দুঃখ। কিন্তু বয়েস বাড়লে, সময় বয়ে গেলে, জীবনের ঘোলা জল থিতু হলে জানা যায় যে, যা দুঃখ বলে জানা গেছিল তা গভীর আনন্দই। সেই আনন্দরস্বরূপ যিনি বুঝেছেন জীবনে তাঁকে দুঃখিত করে, এমন কিছুই নেই। সেই আনন্দই আস্তে আস্তে বিশ্বপ্রকৃতির প্রেম হয়ে ওঠে, কুয়াশার মতো ছড়িয়ে যায় চারদিকে তারপর একদিন বাষ্প হয়ে উঠে, ঈশ্বর-প্রেমে পর্যবসিত হয়। তোমার বাবার মতো, দূর থেকে দেখা টমটম-এ চড়া অধ্যাপক-কন্যাকে যিনি ভালোবাসতে পারেন তাঁর মতো মানসিকতার মানুষ-ই ঈশ্বর-প্রেম যে কী, তা জানতে পারেন। সকলের জন্যে সব জিনিস নয়, গান্ধারী। তক্ষ বলল।
আদর করো এবারে। ঘুম পেয়ে যাচ্ছে আমার ঠাণ্ডায়।
এখনও নয়। মধ্যরাতে যখন শেয়ালরা ডেকে উঠবে ঝাঁটি জঙ্গল থেকে, কারো নদীতে লণ্ঠন জ্বেলে পাহাড়ি মাছ ধরবে যখন মুণ্ডারা সারারাত জেগে, তাদের বিক্ষিপ্ত কথার টুকরো-টাকরা রাতের শিশিরভেজা নিস্তব্ধতা পিছলে যখন, প্রতিসরিত হয়ে আসবে আমার এই ঘরে; তখন। এখন গল্প করো গান্ধারী। আমাদের যেন, আজ-ই বিয়ে হয়েছে। কেমন? আমরা যেন নতুন বর-বউ। বেশ?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল গান্ধারী।
তোমার স্বামীর কথা মনে হচ্ছে বুঝি?
যে, আমার কাছে থাকে যখন, যে, আমার স্তনে মুখে ছোঁয়ায়, জঘনে যতনে হাত রাখে; সেই-ই আমার স্বামী। যে, যখন আমার আত্মার কাছে থাকে সেই-ই আমার আত্মীয়।
বাঁধন যদি শক্ত না হয়ে থাকে, এত বছরেও তাহলে ছিঁড়ে ফ্যালো-না কেন? তুমি তো স্বাবলম্বী। তোমার স্বামীর ওপর তো নির্ভরশীল নও তুমি।
পারি না, অভ্যেস হয়ে গেছে। বাঁধন কোনো বিয়েতেই তেমন শক্ত হয় না। শক্ত বলে যেটুকু থাকে তা অভ্যেস-ই। প্রয়োজন। ভুলভুলাইয়া।
অভ্যেস ভাঙতে পারো না? জোর পাও না? তোমার তো ছেলে-মেয়েও নেই।
না। তারজন্যে নয়। থাকলেও কিছু যেতে আসত না। আমি জেনে গেছি অনেককে দেখে যে, একটি অভ্যেসের বাঁধন ছিঁড়ে, অন্য আর একটি অভ্যেসের ফাঁস গলায় পরে, মুক্তি পাওয়া যায় না কখনো। এই বাঁধনের মধ্যে বাঁধা থেকেও মুক্তির স্বাদ যে, যতটুকু পেতে পারে সেই-ই পেল; না পেলে, পেল না। অভ্যেসের ভারে চাপা পড়ে কাটিয়েই যেতে হবে তাকে এই একটামাত্র জীবন। তাকে, আমাকে; প্রায় সবাইকেই।
‘ফেউ’ ডেকে উঠল নদীর দিক থেকে। অথচ এদিকে বাঘ নেই। লেপার্ড বা হুণ্ডারপ নেই। ফেউটা দু-নম্বর। মিথ্যেমিথ্যি ভয় দেখায় মানুষকে। ফেউও দু-নম্বর হয়ে গেছে।
কী দিনকাল হল!
ভাবল, তক্ষ।
এদিকে বেশ জঙ্গল। তোমার ভয় করে না?
গান্ধারী বলল।
দুর। একে কী জঙ্গল বলে? এ তো জঙ্গলের আভাস-ই মাত্র। তোমাদের ব্লাউজের ফাঁকের স্তনসন্ধির-ই মতো। কিশোরের চোখ তাকেই ‘পূর্ণ’ বলে জানে। পূর্ণ স্তনের সৌন্দর্য আর তার আভাসে তফাত আছে। শুনেছি, এই কারো নদী গিয়ে পালামৌতে, কোথাও কোয়েলে মিলেছে। কোয়েলের অববাহিকায় গভীর জঙ্গল আছে। যেখানে চাঁদের রাতে ঘাই হরিণীর যোনির গন্ধ ভাসে। জিন-পরিরা খেলে বেড়ায় এখনও।
গেছ? কখনো সে-বনে?
না।
ইচ্ছে করে না? যেতে? চলো, গাড়ি করে, আমি আর তুমি যাই সেখানে। থাকি গিয়ে কোনো নির্জন বাংলোতে।
না:।
কেন? না কেন?
এই ছোট্টজীবনে কতটুকুই বা দেখা যায় গান্ধারী? সবকিছু দেখতে যাওয়ার চেষ্টা করাও মূর্খামি। তা ছাড়া, কল্পনার চোখে যা, দেখা যায়, অনুভব করা যায়, সেই সৌন্দর্যর কাছে বাস্তব তো হাস্যকরভাবে খেলো। বাস্তবে বাস করে মুদিরা। আমি কবি; লেখক, নাট্যকার, গায়ক আমি। আমার বাস কল্পনাতেই। ভারি সুখে আছি গো। সুখেই থাকি। একটু বাঁ-দিকে ফেরো।
কেন? হঠাৎ?
তোমার বাম স্তনে, যে-তিলটি আছে তাতে চুমু খাব একটা।
বড়োবেশি রোমান্টিক তুমি।
জানি। চিতায় ওঠার মুহূর্ত অবধি যেন এমন-ই...।
এই যে। এই নাও, তক্ষ।
উঁ...।
রুন নিজের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল।
স্টেজ রিহার্সাল আছে বিকেল তিনটে থেকে। আজ রবিবার। থিয়েটার দ্বাদশীর দিনে। বেঙ্গলি ক্লাবের হলে। পুজোও এসে গেল। নাটকটা কিন্তু মন্দ দাঁড়ায়নি। বিশু নাকি আজও পাঁচহাজার দিয়েছে এবং বোকাদাও, সত্যি বোকার-ই মতো দশহাজার। সেট-ফেট দারুণ হয়েছে। তেমন হয়েছে কস্টিউমও। ইতিহাসের বই থেকে দেখে দেখে, তক্ষদা ছেলেদের ও মেয়েদের পোশাক বানিয়েছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আজাহারউদ্দিন দর্জিকে দিয়ে। সুরম আর ইত্বর আনিয়েছেন পাটনা থেকে। রাবাবও জোগাড় করতে দিল্লিতে লোক পাঠিয়েছেন। আজ সকালেই পৌঁছে যাবে। মোটকথা ঝিরাটোলির ইতিহাসে এইরকম যত্ন সহকারে, শিক্ষিত সমঝদার লোকেদের প্রত্যেকের সহায়তায়, উৎসাহে এবং অভিনয়েও ‘রূপমতী’ একটা নাটকের মতো নাটক-ই হবে! সমস্ত ঝিরাটোলি উৎসুক হয়ে আছে। প্রথম শো-টার ইমপ্যাক্ট দেখেই কলকাতার কলামন্দির বা রবীন্দ্রসদনে একটা শো করা হবে। স্পনসর করবে দে’জ মেডিক্যাল। কথা হয়ে গেছে পাটনার ম্যানেজারের সঙ্গে বোকাদার। আর সেই শো লেগে গেলে তো পর পর কল-শো।
দাদা লিখেছে কানাডা থেকেও আসবে ডাক।
একদিন রিহার্সালও হয়েছে পুরোদমে। অত্যন্ত সিরিয়াসলি। বোকাদা মানুষটা সম্বন্ধে যা-জানত তার অনেকটাই যে-শোনা কথা তেমন সন্দেহ হচ্ছে এখন রুনের মনে। নিজের অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি দিয়ে যাচাই না করে নেওয়া পর্যন্ত কারো মুখের কথাই বিশ্বাস করা উচিত নয় বোধ হয়। বেশ মানুষ এই বোকাদা। ‘রূপমতী’-র কারণেই কাছে আসার সুযোগ হল। ঝিরাটোলির অনেকের মুখেই শুনেছিল যে, দাদার সব সম্পত্তি ঠকিয়ে নিয়ে বউদিটিকে পর্যন্ত কবজা করে এখন বাবার ব্যাবসা এবং দাদার বউকে ভোগ করছে সে একা। যা ‘রটে’, তার কিছুটাই শুধু ‘বটে’।
বাবা একবার কাশলেন পাশের ঘর থেকে। মা রান্নাঘরে। উনুনে খেসারির ডালে হিং সম্বার দিলেন। তার গন্ধে পুরোবাড়ি ভরে গেল। দু-বার রুন নিজেও কাশল। এই হিং-এর গন্ধ ওর একদম-ই সহ্য হয় না। তা ছাড়া খেসারির ডাল খেলে, চোখ নষ্ট হয়ে যায়, আরও নানা রোগ হয় এ-কথা এক-শোবার বলে বলেও লাভ হল না কোনো, মা-কে। বাবাকে তো নয়ই।
বাবা খেসারির ডালের ভীষণ ভক্ত। আর মা তো হচ্ছেন বাবার সেবাদাসী। ছায়া। এ-বাড়িতে বাবার ইচ্ছেই সব। হিজ উইশ ইজ আ কম্যাণ্ড টু হার।
পূর্ববঙ্গে দেশ ছিল ওদের। সেটা বিশেষ কোনো ব্যাপার নয়। রুনের জানাশোনা বহুমানুষের-ই আদিবাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে। রুন অবশ্য নিজে কোনোদিনও থাকেনি সেখানে। এমনকী মায়ের গর্ভে থাকাকালীনও নয়। দাদা শিশুকালে বোধ হয় দু-বছর বয়স থাকতেই চলে আসে, মা-বাবার সঙ্গে। শুনেছে। রুনের জন্ম-কর্ম সব-ই বিহারের এই ঝিরাটোলিতেই। ওরা প্রায় বিহারিই হয়ে গেছে। অনেক ব্যাপারেই। কিন্তু অনেক ব্যাপারে বাংলার বাঙালিদের চেয়ে অনেক-ই বেশি বাঙালি আছে। ইস্ট-পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ রুনের কাছে ইংল্যাণ্ড আমেরিকার মতো অন্য একটি অদেখা বিদেশ-ই মাত্র। এখন অবশ্য বাংলাদেশ।
বাবা মায়ের কান্ড দেখে মাঝে মাঝেই রীতিমতো বিরক্ত বোধ করে ও। আজ চল্লিশ বছর দেশ ছেড়ে চলে এসেছেন, শিকড় বহুদিন হল এখানেই দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে, তবু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ওঁরা যেন ইস্ট-পাকিস্তানেই রয়ে গেলেন।
নস্টালজিয়া ভালো। কখনো-কখনো মধুর ব্যাপারও। কিন্তু যে-স্বপ্ন কোনোদিনও সত্যি হবে না, যা এ-জীবনের মতো পুরোপুরিই অতীত, বাতিল, তামাদি হয়ে গেছে তার-ই মধ্যে মা-বাবা অনুক্ষণ বেঁচে আছেন। যদি একে বাঁচা বলা চলে আদৌ। ওঁদের আলোচনা, যা-কিছু উত্তেজনা, সব-ই শুধু একটি বিষয়কেই ঘিরে। কবে ওঁরা দু-জনে ‘দ্যাশ’-এ ফিরে যাবেন, কী করে যাবেন, সেখানে কার বাড়িতে উঠবেন, মকবুল ভাই চিনতে পারবেন কি না? কার কার সঙ্গে দেখা করবেন সেখানে, এসবের-ই নিরন্তর জল্পনা-কল্পনা করে দিন ও রাতের অনেকখানি সময়ই কাটে রোজ-ই। এই-ই শুনে আসছে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই। যদিও জানে রুন যে, তাঁদের এই পুণ্য তীর্থযাত্রা কোনোদিন-ই হয়ে উঠবে না। সত্যি সত্যিই গেলে, তা-নিয়ে এত স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন ছিল না।
বাকি সময়টা কাটে মা ও বাবার কোমরের ব্যথা, বাত, শ্লেষ্মা, পূর্ণিমা, অমাবস্যার এবং একাদশীর প্রভাবের আলোচনায়। কত পাপ করলেই যে, এমন সোনার দ্যাশ ছেড়ে এমন বাজে জায়গায় এসে জীবনটা নষ্ট করতে হয় তার-ই প্রাত্যহিক আলোচনা।
রুনের মনে হয়, কিছু কিছু মানুষ এমন-ই থাকেন। তাঁরা দ্যাশই থাকুন আর উদবাস্তু হয়ে এসে, ভারতে কী থাইল্যাণ্ডে, কী নেপালে কী কামাচ-কাটকাতেই থাকুন-না-কেন, ‘বাঁচা’ কাকে বলে তাই-ই না জানার ফলে, এমনি করেই শুধু খেয়ে এবং আত্ম এবং পরনিন্দা করেই চলে যান। বাবা এবং মাকে কখনো কোনো বই পড়তে দেখেনি রুন। পড়ার বই ছাড়া অন্য বইপড়া, এ-বাড়িতে অপরাধ বলে গণ্য হয়ে এসেছে চিরদিন-ই। জীবিকাই সব এখানে। জীবন বলে কিছুই নেই। দাদা, সশরীরে কানাডাতে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেছে। আর মা মৃন্ময়ী এবং বাবা মণিমোহন অশরীরেই থাকেন ইস্ট-পাকিস্তানে। সবসময়েই। রুনকেই শুধু বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে এই ‘বিদেশি’দের বাড়িতে থেকে নিজের ভবিষ্যৎকে জলাঞ্জলি দিয়ে এখন মণিমোহনের বাঁশের ব্যাবসার ভার নিতে হচ্ছে। পারিবারিক কারণে। বংশের স্বার্থে। কথাটা দ্ব্যর্থক। একসময় ভেবেছিল, বিদ্রোহ করবে। একসময় নয়, গত পাঁচবছর ধরেই ভেবে আসছে তা। মা-বাবাকে মুখের ওপর-ই বলে দেবে একদিন যে, আমাকে তোমরা পৃথিবীতে এনেছিলে তোমাদের-ই আনন্দর জন্যে। তোমাদের বণ্ডেড-লেবার করে। সেজন্যে আমি আমার জীবনের সব ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সাধ, আহ্লাদ, আমার মনুষ্যোচিত ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিতে পারি না। দেবও না। আজকে পাঁচবছর ধরে প্রতিমুহূর্তই এই কথাটাই বলার মহড়া দিয়ে চলেছে ও, কিন্তু বলে উঠতে পারল না আজ অবধি। জানে না কখনোই পারবে কি না! নিজের বাবা ও মায়ের চেয়ে তক্ষদা অথবা বোকাদা ওর অনেক-ই কাছের মানুষ। মা বাবা যে বন্ধুত্ব করেননি কখনো, প্রজা শাসন করেছেন। একবার ‘বংশারূঢ়’ এবং ‘বংশোদ্ভব’ হয়ে গেলে আর কী পারবে ও পালাতে? বংশলোচন হয়েই কেটে যাবে বাকি জীবনটা। কী যে করে ও!
রুনের মনমেজাজ এমনিতেই খুব-ই খারাপ দিন দশেক হল। রীতিটার জন্যেই ওই তক্ষক, বৃদ্ধ ভাম, তক্ষ রায়, যেন, রীতিকে অজগরের চোখের-ই মতো সম্মোহন করে রেখেছে। যতক্ষণ তক্ষ রিহার্সালে থাকে ততক্ষণ-ই লু-লাগা তিতিরের মতো ছটফট করে ও। কেন, কে জানে? রীতি যেন ওর শরীরের মধ্যে কী-এক অস্বস্তিবোধ করে, চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যায়। মাণ্ডুর ‘রূপমতী’ ঠিক সেইক্ষণেই আবার অভিনয় ক্ষমতার অন্য এক উচ্চমার্গে উঠে যায় যে, এটাও সত্যি। লক্ষ সব-ই করেছে রুন। তক্ষদা রিহার্সাল ছেড়ে চলে গেলেই আবার আস্তে আস্তে নিজের ওপর দখল ফিরে পায় মেয়েটা। সম্মোহনটা কেটে যেতে থাকে। কে জানে, তক্ষকটা হিপনোটিজম জানে কি না।
রীতি মেয়েটাও সত্যি অদ্ভুত। ওকে বোঝা ভারি মুশকিল। ও যে, রুনকে এক বিশেষ চোখে দেখে তা রুন, ভালো করেই বোঝে কিন্তু সেই ‘বিশেষত্ব’র স্বরূপটা বুঝে উঠতে পারে না। ইতিমধ্যেই দু-দিন রুন দেখেছে যে, তক্ষদার স্কুটারের পেছনে করে রীতি আসছে ‘কারো’ নদীর দিক থেকে। একবার দেখেছিল কী যেন, একটা ছুটির দিনের বিকেলে। আর একবার রাত ন-টা নাগাদ গত শুক্রবারে। কাগজের অফিসের লোকদের তো ডিউটি-আওয়ার্স-এর কোনো মাথা-মুন্ডু নেই। নিশ্চয়ই তক্ষকের নদীপাড়ের নির্জন পোড়োবাড়ির ভূতুড়ে গর্তেই গিয়েছিল ও। সেখানে কী করতে যায়, কে জানে: একটা লালপাড় সাদা-শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পরেছিল। আর রাতে যেদিন দেখেছিল, সেদিন পরেছিল জিন্স-এর ট্রাউজার। গায়ে, প্রলিনের হলুদ গেঞ্জি। ঝিরাটোলিতে রীতিই একমাত্র মেয়ে যে, জিন্স পরে, হাঁসের বাচ্চার মতো গুবলু-গাবলু হলুদ-রঙা টেনিস বলের-ই মতো গোলাকৃতি দু-টি বুক ব্রেসিয়ার-হীন গেঞ্জির নীচে নীচে নাচাতে নাচাতে আঁটো-গেঞ্জিকে প্রায় ফাটো-ফাটো করে তক্ষ রায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে, তার স্কুটারের পেছনে বসে, ঝিরাটোলির বাজারের পথে ঘুরে বেড়াতে পারে, ওর টেনিস বলের মতো দু-টি বুকে বল যে যথেষ্ট-ই আছে, সে-বিষয়ে সন্দেহর অবকাশ নেই ঝিরাটোলির একজনেরও। অথচ ও নিজে না চাইলে ওর কাছাকাছি আসার হিম্মত ধোবি-মহল্লার ভিগু গুণ্ডারও নেই। রীতি বেঁচে আছে পুরোপুরিই ডোন্ট-কেয়ারে। ওর এই ‘ডোন্ট-কেয়ার’ ভাবটাই মাটি করবে সব। মানে, রুনের ভবিষ্যৎ! যদি ভবিষ্যৎ বলে থেকে থাকে ওর কিছুমাত্র।
বাবা সেইক্ষণেই লাঠি হাতে চ্যবনপ্রাশ আর ইসবগুল কিনতে গিয়ে গোলবাজারে দেখেও ফেলেছিলেন, এ-পোশাকে রীতিকে, তক্ষদার স্কুটারে উপচে-পড়া কথা, ছলাৎ-ছলাৎ-বুকে উছলোতে উছলোতে চলে যেতে। দেখেই, বাড়ি ফিরে এসে মাকে জ্বরগ্রস্ত গলায় বলেছিলেন: ‘শুনতাছো। তোমার প্রিন্সরে কইয়া দিয়ো য্যান এসব বাজাইরা মাইয়াগো লইয়া যাত্রা-টাত্রা ফিউচারে আর না করে। এই পরথম। এই শ্যাষ। হঃ। কইয়া দিয়ো।’
রুন শুনেছিল ওর ঘর থেকে।
কী বিচ্ছিরি ভাষা! যে মানুষেরা চল্লিশ বছর ধরে অমন বাজে একটা বিজাতীয় প্রাকৃত ভাষা ক্রমান্বয়ে ব্যবহার করে করে, আধুনিক পশ্চিমবঙ্গর ভব্য বাংলা ভাষাকে কোতল করতে পারেন এমনভাবে, তাঁদের আর যাই-ই বলা যাক ‘সিভিলাইজড’ বলা যায় না। খুব-ই রাগ হয় রুনের। কিছুটা রীতির ওপর, কিছুটা তক্ষদার ওপর আর বেশিটাই মা-বাবার ওপর। কেন যে, তার এমন অশিক্ষিত বাঙাল মা, বাবা হল!
‘ম্যাদা’ যদি কোনো জায়গার নাম হয়, তবে সে-জায়গা যে, কেমন তা রুনের অনুমান করে নিতেও কষ্ট হয় না কোনোই। কোন জেলার কোন শহরে সে-জায়গা তা জানবারও কোনো আগ্রহ নেই। বাবা-মা এখনও রুচিতে, মানসিকতায়, আধুনিকতায় চল্লিশ বছর আগের ‘ম্যাদা’তেই বাস করে যাচ্ছেন। সভ্য সমাজের কোথাও প্রেজেন্টও করা যায় না ওঁদের। রুনকে দেখে যদিও কারো ভালো লাগে একটুও; মা-বাবাকে দেখলেই সে, ভালোলাগা কেটে যাবে। দাদাটা তো হাওয়া হয়ে গিয়ে কানাডাতে ফুর্তি মারছে। একা রুন-ই পড়ে আছে। এই খোঁদলে জন্মের মতো একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাচীন, ‘বিদেশি’ দম্পতির সঙ্গে ফেঁসে। বাবা-মায়ের শেকড়ে-ফেরার স্বপ্ন যে, সত্যি হবে না, তা রুন জানে। হয়তো তাঁরা নিজেরাও জানেন। সব দেশেই সব সমাজেই কিছু মানুষ থাকেন সবসময়েই যাঁরা মহড়া দেন; নাটক কোনোদিনও মঞ্চস্থ করবেন না জেনেও। অথচ জেনেশুনেও একদিনের জন্যেও ঝিরাটোলির অন্য দশজন শিক্ষিত, আধুনিক, রুচিসম্পন্ন মানুষের মতো বাঁচতে পারলেন না ওঁরা। অথবা বাঁচলেন না। ওঁদের অসামাজিক বললেই সব বলা হয় না, বলতে হয় অ্যান্টি-সোশ্যাল। এইরকম এক অলীক জীবন নিয়ে, দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলে, নাড়ি-উলটে-আসা দুর্গন্ধ শুঁটকিমাছ খেয়ে, একজন মানুষ আর একজন মানুষী প্রায় অন্ধর-ই মতো কী করে যে, গত চল্লিশটা বছর, রুনের জন্মর অনেক আগে থেকেই, এইভাবেই কাটিয়ে দিলেন তা সত্যিই ভেবে পায় না ও। এক ধরনের অন্ধ বোধ হয় থাকেন, যাঁদের হস্তী দর্শনের ইচ্ছেটা পর্যন্ত জাগে না মনে।
বাবা, আজকাল কানে বেশ-ই কম শোনেন। মা, নাকে যেমন, শুঁটকি মাছের গন্ধ পান না; ফুলেরও পান না। অবশ্য এইরকম মানসিকতায় ফুলের গন্ধ খোঁজেনওনি কখনো। পূতি-গন্ধ আবর্জনার দিকেই নাক ছিল; ঘ্রাণ-শক্তি জন্মাবার পর থেকেই। কিন্তু তাতে তাঁদের ‘দ্যাশ’ বিলাসে কিছুমাত্রও ভাটা পড়ে না।
সত্যিই ক্লান্ত হয়ে গেছে রুন।
বাবা বললেন, অ-বউ। আজ রাঁধলা কী?
বাবা নিজের ঘরে খাটে শুয়ে তারাতে কথা বলছেন। মা উঠোন পেরোনো রান্নাঘর থেকে তারস্বরে উত্তর দিচ্ছেন।
এ-বাড়িতে লাউডস্পিকারের দরকার পড়বে না কোনোদিনও।
যা যা কইছিলা কাল রাতে। পাট পাতার ঝোল, লোত লোত কইর্যা, চিতল মাছের মুইঠ্যা। কলমি ফুলও ভাইজ্যা দিমু অনে! গরম ভাতে গাওয়া ঘি দিমু। আর গ্যান্দাল পাতার বড়া।
গ্যান্দাল পাতা পাইল্যা কোত্থিকা?
তা শুইনা কী কাম। দিমু, খাইবা।
রুন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকোয়েজ-এর ‘হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড’ বইটা পড়ছিল শুয়ে শুয়ে, কাগজ পড়া শেষ করে! রীতিই পড়তে দিয়েছিল। গতবারে সাহিত্যে ‘নোবেল’ পাওয়া বই। বলেছিল, সাহিত্যে নোবেল, অনেকে অনেক কারণেই পান। নোবেল পাওয়া লেখক মাত্রই যে, ভালো সাহিত্যিক হবেন-ই, এমন কথা কেউই আজকাল আর বিশ্বাস করেন না। এবং সেইজন্যই, শুধু নোবেল-ই বা কেন, সমস্ত প্রাইজ পাওয়া বই-ই পড়ে দেখা উচিত। প্রাইজটা, পোলিটিক্যাল কারণে পেলেন লেখক, না পেলেন; যা, অর্ডার অব দ্যা ডে সেই স্ট্রিং-পুলিং করে; অথবা সত্যি সত্যিই লেখার-ই গুণে!
কী কইল্যা? কলসখান ভাইঙ্গা ফ্যালাইছো? দ্যাখছো কান্ডডা। কী ফ্যাস্টোকেলাস কলস খান।
বাবা তারস্বরে চেঁচিয়ে বললেন মাকে। বাবা কানে না শোনায়, সবসময়েই তারস্বরে চেঁচান আজকাল। এবং ধান শুনতে কান শোনেন।
আঃ কই কী, আর শুনতাছো কী। তোমারে লইয়া আর পারন যায় না। কইতাছিলাম, আমারে একখান কলম কিন্যা দিয়ো। নিবটা ভাইঙ্গা গ্যাছে গিয়া। যাইবো? পাওন?
পাওন যাইবো না ক্যান। ভাঙছো তো ভাঙছো! বাজারে যখন যামু তখন, একখান আমি লইয়া আইব অনে। এইসব দোকান বাজার করনের মতন প্রেস্টিজ-পাংচার কাম তো আবার তোমার প্রিন্সরে দিয়া অইব না। প্রিন্স তো প্রিন্স-ই, প্রিন্স অব ওয়েলস। আমরা যখন পোলাপান আছিলাম, তখন জাম্বুরা দিয়া ফুটবল খেলছি আর খাকি প্যান্ট পইরা উদলা গায়ে পাঠশালায় পড়ছি। এহনে প্রিন্সদের ফুটানিটা দ্যাহো একবার।
একটু আসতে কও, পোলায় শুইন্যা ফেলাইব অনে।
ওই প্রজন্মর প্রত্যেকটি মানুষ-ই ভন্ড। ভাবছিল রুন। ‘ভন্ডামি’ বড়ো অসহ্য দোষ। রক্ত গরম হয়ে যায়, রুনের ভন্ডামি দেখলেই।
না, না, ঝোলায় কইর্যা যে, আনোন যাইব না কলস, তা কী আর আমি জানি না? বাহাত্তর বছর বয়স হইয়া গেল গিয়া কি অ্যামনেই? ম্যাঘে ম্যাঘে?
হঃ। এরেই কয় বাহাত্তরে ধরন। মরণ। মরণ। আমি খালি খালি কইতাছি, ‘কলম’ আর হে শুনতাছে ‘কলস’।
নীচু গলায় মা বললেন।
শুনতাছো! এই যে। কই গ্যালা, অ-বউ।
আরে, ডাল পুইড়া যাইব্যো গিয়া। কইবা কী, তা কও না ক্যান। শুনতা তো আছিই! আমারে তো তোমার দশায় ধরে নাই। ঠসা তো আর হই নাই এহনও পর্যন্ত।
শোনলা। ছাইন্যা পোসটোকার্ড পাঠাইছে ‘ম্যাদা’ থিক্যা, একখান। তাতে লিখছে, ক্যানালের পারে এরশাদ মিয়ায় নাকি এয়ারপোর্ট না হ্যালিক্যাপ্টারের লইগ্যা প্যাড বানাইতে আছেন। আমাগো যাওনের আর কোন চিন্তাডা? কও বউ? কলকাতায় যাইয়া ‘গট গট’ কইর্যা জেট প্লেনে উঠুম আর এক্কেরে সোজা নামুম গিয়া দ্যাশের এয়ারপোর্টে। কী কও?
আমি আর কী কম্যু? যাবা যাবা তো রোজ-ই কও, পেরকিতোই কি আর যাইবা তুমি?
রুন, হাতে কাগজ ধরেই শুয়ে শুয়ে মনে মনে বলল, প্রকৃত যাওয়া এই জীবনে নয়। তোমাদের পা চিরদিন-ই রেডি, গেট-সেট এর চকের গুঁড়ো মেখে উত্তেজনায় কাঁপবে থরথর করে, ‘গো’ কখনো সত্যি হয়ে উঠবে না জীবনে।
দ্যাখবা। এই তো। এই চৈত্র-সংক্রান্তিটা পার কইর্যাই দোকানের হাল-খাতাটা সাইরা ফ্যালাইয়াই আমরা দুইজনে, মিয়া আর বিবি গ্যাঁট হইয়া বসুম গিয়া প্ল্যানে।
তুমি প্ল্যানে চড়ছ কখনো?
না, বউ। আমাগো যুগে কয় হালায়াই বা প্ল্যানে চড়ছিল? এহনে তো তেলাপোকা ছুঁচারাও প্ল্যানে চইড়া ফুরফুরায়। সুযোগডা হইল কই কও? এইবার অইব। তোমারে ফ্যালাইয়া কি চড়তে পারি? কও? বোজলা, শুনছি নাকি প্ল্যানে খাবার-টাবারও দ্যায়। শুদামুদা এতগুলান টাহা তো লয় না বাংলাদ্যাশ বিমান। যামু যহন, তহন বাংলাদেশ বিমানেই যামু। আমাগো দ্যাশি পেলেন। কী কও তুমি? আরে, আমাগো কী খাতির না কইর্যা পারে? দ্যাশের ছাওয়াল মাইয়া নিজেগো দ্যাশে ফিরুম, দেইখ্যো অনে আদরের ঘটাখান। মালা পরাইয়া চন্দন লাগাইয়া এক্কেরে ওয়েলকাম কইরা লামাইব অনে লাল গালচা পাইত্বা। হ। কইয়া দিতাছি। দেইখ্যা লইও তুমি।
হ। তা ঠিক।
ডালের হাঁড়িটা নামাতে নামাতে মৃন্ময়ী ভাবছিলেন, কত চৈতসংক্রান্তিই গেল, কত অক্ষয়-তৃতীয়া, কত পুজো, সত্যি দেশে আর যাওয়া হল না। গেলে একবার নিজের দেশটাও ঘুরে আসতেন। ইচ্ছে ছিল খুব-ই। দেশ ছেড়ে আসার পর এই ঝিরাটোলি ছেড়ে কোথাও যাননি। মানুষটা খাওয়া আর টাকা রোজগার ছাড়া জানল না কিছুই। গতজন্মে কি শুয়োর-টুয়োর ছিল? কিছুই জানে না। খাওয়ার ব্যাপারে ছাড়া সব ব্যাপারেই হাড়কিপটে। একদিনের জন্যেও এই ঝিরাটোলির বাইরে বেড়াতেও যাননি মৃন্ময়ী গত চল্লিশ বছর। শখ, যা-ছিল, সব-ই মরে গেছে।
মণিবাবুরা পদ্মাপারের লোক। প্রমত্তা পদ্মাকে ওঁদের মন্দভাগ্য পদ্মাতীরবর্তী গ্রাম নাকি গর্ভবতী করেছিল। ওঁরা দেশ ছেড়ে আসার পর-ই। বাবার কাছেই শুনেছে রুন!
মৃন্ময়ীদের বাড়ি ছিল চাঁটগায়ে। মৃন্ময়ীর কাছেই শুনেছিল রুন যে, পার্টিশান হওয়ার বেশ কিছুদিন পর-ই আসামের গোয়ালপাড়া জেলার এক গ্রামে তাঁর ছোটোভাইয়েরা এসে বসেন। ওঁরা এসেছিলেন ষাটের দশকের মাঝামাঝি। পশ্চিমবঙ্গে তখন জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট সবকিছুর-ই দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছিল। আসামের দিকে জায়গা-জমি তখনও সস্তা ছিল সেই তুলনায়। চাটগাঁর জমি-বাড়ি জলের দামে বিক্রি করে হুণ্ডি করে যেটুকু, টাকা পয়সা আনতে পেরেছিলেন তাই নিয়েই মামারা আসামে এসে থিতু হয়ে বসেন। পঁচাশির আসাম চুক্তির জন্যে আবারও উদবাস্তু হতে হবে হয়তো তাঁদের। কারণ, তাঁরা ‘বিদেশি’।
রুনের ছোটোমামা ব্যাচেলার। মায়ের কাছে তাঁর অনেক গল্পই শুনেছিল। একটু কবি-প্রকৃতির মানুষ। অত দুঃখ-কষ্টের পরও কবিতা লেখা সমানে চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন। নাম ‘অজানা’। চাটগাঁর মুসলমান জেলেদের নিয়ে লেখা। চমৎকার উপন্যাসটি। পড়েছিল রুন। ছোটোমামাকে চোখে কখনো না দেখলেও ওর মনে হয় উনি যেন ওর খুব-ই কাছের লোক। বাবা-মায়ের থেকেও কাছের। যিনি ‘আত্মা’র কাছে থাকেন, তিনিই তো ‘আত্মীয়’! নাড়ুমামা মাকে চিঠি লিখেছিলেন একটি, আসামের বঙ্গাইগাঁও থেকে। চিঠিটা মা পড়তেও দিয়েছিলেন রুনকে। বালিশের নীচেই রেখে দিয়েছিল রুন।
মা আবার বললেন, বাবাকে, নাড়ুর চিঠিখান পড়ছিল্যা?
ঝাড়ু ফাড়ু লইয়া আমারে ডিস্টার্ব কইর্যাে না। ভাবছটা কী তুমি? আমি ব্যাবসা থিক্যা রিটায়ার করছি বইল্যা কী আমারে দিয়া ঝাড়ু কলস কিনাইবা? আমার কী স্টেটাস নাই কোনোই? স্টেটাস?
রিটায়ার থোড়াই করেছেন। টাকা-পয়সার ব্যাপারটা পুরোপুরিই নিজের কবজায় আছে। খাটনিটাই রুনের। এই প্রকৃতির মানুষের কপালে বানপ্রস্থ নেই।
ভাবছিল রুন।
হায় ভগবান! কই কী, আর মানুষডা শোনে কী? ঝাড়ুর কথা কই নাই। কইতাছিলাম নাড়ুর চিঠির কথা।
অঃ। তোমার হেই ছোটোব্রাদারের চিঠি? না, পড়ি নাই। তোমার সব-কয়টা ভাই-ই মাইয়া। দ্যাশ তো গেছিল গিয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের-ই কিন্তু এমন প্যানপ্যানানি কাউরেই করতে দেহি নাই; সিচুয়েশান ফেস করন লাগে! তবেই না মরদের পোলা! আমি, ও চিঠি পড়ি নাই, পড়বার টাইমও নাই। তুমি নিজে লিইখ্যা দিয়ো, নইলে তোমার প্রিন্সরে কইয়ো লিখ্যা দিবে, আমার কিসসুই করণীয় নাই। ছুটকির বিয়ায় আমি আড়াই-শো টাহা দিছিলাম না। আজ তিরিশ বছর আগের আড়াই-শো টাহার দাম আজ হইল গিয়্যা আড়াই হাজার টাহা, কম কইর্যাই যদি ধরন যায়। যা দিছি দিছি। আর এক পয়সাও আমি পারুম না, দিমুও না। ফাইট করুক। লইড়্যা খাউক। অমন ম্যাদামারা মানুষগুলানের না-খাইয়া মরণও ভালো।
রুন ভাবছিল, নিজেদের দ্যাশ ‘ম্যাদা’তে অথচ ম্যাদামারা বলছেন ছোটোমামাকে। মাঝে মাঝেই রুনের প্রচন্ড রাগ হয় মণিমোহনের ওপর। মণিমোহন-ই যে, ওর বাবা সে-কথা মানতে পর্যন্ত ইচ্ছা করে না। দাদাও এই কারণেই পালিয়ে ছিল, এই পরিবেশ ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি পারে। বেঁচেছে গিয়ে। টাকাও যে, পাঠায় না, তাও হয়তো এই রাগেই। দাদার পড়াশুনোর পথে বাবা চিরদিন-ই বাধাই দিয়েছেন। বলেছেন, হায়ার সেকেণ্ডারিটা পাশ কইরাই ব্যাবসায় লাইগ্যা পড়ো। বেশি পড়াশুনা, মানুষের গুমোর বাড়াইয়া দ্যায়। আর গুমোর লইয়া ব্যাবসা করন যায় না। কোনো ব্যাবসাই না। ব্যাবসা হইল মুখ-বেইচ্যা খাওন। মুখে ‘মধু’ যার নাই, তার ব্যাবসা অইব না!
ছোটোমামার চিঠিটা পড়ে খুব-ই অভিভূত হয়েছিল রুন। বড়ো করুণ সে-চিঠি। ছোটোমামা লিখেছিল—
পূজনীয়া দিদি,
আজ থেকে কুড়ি বছর আগে একবার উদবাস্তু হয়ে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম আসামের বঙ্গাইগাঁওতে। দেশ তুইও ছেড়ে ছিলি, কিন্তু বিয়ে করে। এদেশের মেয়েরা বোধ হয় শিশুকাল থেকেই শ্বশুরবাড়ি যাবার জন্যে তৈরি হয়েই থাকে। শ্বশুরবাড়িটাই তাদের আসল বাড়ি। কারণ, জীবনের বেশিটা ভাগ তাদের কাটে সেখানেই। আস্তে আস্তে সেটাই নিজের বাড়ি হয়ে ওঠে, আর যখন ঠিক এমন-ই সময় এল এই ফরমান। আমরা আবারও বিদেশি হয়ে গেলাম। চলে যেতে হবে আসাম ছেড়ে।
কিন্তু যাব কোথায়?
সমুদ্রের জলে? আমি জানি না রে বড়দি, হয়তো ভবিষ্যতে একদিন বাঙালিরাও ইহুদিদের-ই মতো নিপীড়িত, নির্যাতিত, অপমানিত হতে হতে একদিন এক নতুন ইজরায়েল গড়বে। তাদের ইজরায়েল। কিন্তু এও জানি যে, এ নিছক কথার-ই কথা। ‘ইহুদি’ জাতটা খাঁটি সব মানুষ দিয়ে তৈরি ছিল। তারা মেধাবী, পরিশ্রমী, আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন। কোনো দেশের-ই পরিচয় নিছক মানুষ দিয়েই হয় না, মানুষের মতো মানুষ সে-দেশে ক-জন তা দিয়েই হয়। বাঙালিরা সংখ্যায় গিনিপিগের মতোই বাড়ে প্রতিবছরে কিন্তু মানুষের মতো ‘মানুষ’ পাওয়া যায় না খুঁজে, দশ লক্ষেও একজন। অপেক্ষা করতে হবে আমাদের আরও কতদিন একজন নেতার জন্যে, কে জানে রে দিদি? নেতা কি আসবে? কুকুর-বেড়ালদের নেতা কুকুর-বেড়ালই হয়, বাঘ-সিংহ আসবে কোত্থেকে? পুরো জাতটা যেদিন বাঘের বা সিংহের জাত হয়ে উঠতে পারবে, সেদিন নেতাও হবে বাঘ-সিংহর মতো।
অপেক্ষায় আছি রে দিদি। স্বদেশ পাব, থিতু হব এই বাসনা ছিল। রয়ে গেলাম বিদেশে। সারাজীবন ধরে তোড়-জোড়, জোগাড়-যন্ত্র, ম্যারাপ বেঁধেও যা হবার নয়, তা হয় না। এই কথাটাই মেনে নিতে শেখাচ্ছি এখন মনকে। আর সেই কারণেই নিজেকে মানুষ বলে মানতে ভারি লজ্জা করে রে!
ছোটোমামা শেষে লিখেছিলেন : তোরা সব ভালো থাকিস। আমি এক মধুর স্মৃতিমাত্র। তোরা ঠিক বুঝবি না দিদি!
আমার হাতে লাগানো আকাশমণি গাছ, বুধি বাছুর লাল; রাই গাইয়ের তৃতীয় বিয়োন, মেটে-রঙা; তার গায়ের গন্ধ, এখনও আমার নাকে লেগে আছে রে। তার উজ্জ্বল কালো চোখের চাউনিতে চোখ ভরে আছে। সমুদ্রের পারের ‘হু হু’-বওয়া নোনা গা-চিটচিট করা হাওয়ায় মেশা বালিতে শুকোতে দেওয়া ‘বম্বে-ডাক’ আর ইলিশের শুঁটকির গন্ধ। আরও কত কী! স্বদেশ কোনো বাড়ি নয়, আরাম নয়, নিরাপত্তা নয়, স্বদেশ-কাক জ্যোৎস্নার রাতে চেনা রাত-পাখির অস্ফুট ডাক, বসন্তের ভোরে শিমুলের ডালে-বসা জলের মধ্যে নকশি-কাঁথা সেলাই-করা কোনো চিকন-গলার অনাঘ্রাত অচুম্বিতা কিশোরীর জল-ভেজা চুলের গন্ধ; তার হাতছানির স্নিগ্ধস্বাদ। এইসব নিয়েই স্বদেশ।
বঙ্গাইগাঁওকেই স্বদেশ করে নিলাম! দাদার সংসারে যতটুকু পারি সাহায্য করতাম। নিজের সংসার ভাগ্যিস করিনি। বাকি সময়ে কচুগাঁও, রাইমানা, যমদুয়ারের জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। সে ভারি গহন অরণ্য সব। জঙ্গলে গিয়ে গিয়েই দেশ ছাড়ার দুঃখটা ভুলেই গেছিলাম পুরোপুরি। নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম যে, এই গ্রহ, এই সমস্ত পৃথিবীটাই আমার দেশ, সমস্ত আধুনিক মানুষের দেশ। তা ছাড়া, বঙ্গাইগাঁওতেও গাছ পুঁতেছিলাম। গাছ আর মাটি এ, বড়ো ভীষণ জিনিস। বড়ো মারাত্মক মায়াজাল তাদের মানুষের ওপর। সেইসব গাছেও ফুল ফুটত, পাখি ডাকত, কাঠবিড়ালি দৌড়ে যেত দুষ্টু শিশুর মতো। জীবিকার বন্দোবস্তও একটা হয়েছিল। দুই ভাইয়ের রোজগারে চলে যাচ্ছিল দিন। মনটা, ‘দ্যাশ’-এর স্মৃতি ভুলে বঙ্গাইগাঁওকেই দেশ বলে মানতে শুরু করল। ভগবানের কাছে খুব-ই কৃতজ্ঞ, কারণ আমি একজন লেখক। লেখকের জীবনে কোনো অভিজ্ঞতাই ফেলা যায় না। যা-কিছুই ঘটনা তার জীবনে ঘটুক-না-কেন, সুখাবহ, দুঃখাবহ, সম্মানের-অসম্মানের সবকিছুই তার লেখার মধ্যে দিয়ে, একদিন-না-একদিন ফুল হয়ে ফুটে ওঠেই ওঠে। কখনো ফুল, কখনো রক্তাক্ত ক্ষত। সে যদি, সত্যিকারের লেখক হয়; নামেই শুধু লেখক না-হয়।
রুন অবাক হয়ে ভাবে! এই ছোটোমামার মতো একজন মানুষ, তার মায়ের আপন ভাই! জীবন, পরিবেশ একজন মানুষকে কতই না বদলে দেয়। মা এখন ডাইল-ছড়ানো তরকারি, কুচা শিঙ্গির পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা-বেগুন দিয়ে রাঁধা বাবার মুখরোচক রসসা, হালুয়া আর পাঁপড়ভাজা আর, ভেটকি মাছের কাঁটাচচ্চড়ির ছোট্টজগতে কেমন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে লীন হয়ে গেছেন। অথচ ছোটোমামার জগৎ কত উদার, কত বড়ো। বাবার জন্যেই মা এমন হয়ে গেছেন। অথচ মায়ের সে, বোধটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই যে, একজন মানুষের ঠিক এইভাবে বেঁচে থাকা কখনোই উচিত নয়, ক্রীতদাসীর মতো, নিজের সমস্ত ‘নিজস্বতা’ তিলে তিলে নি:শেষ করে দিয়ে। নাতসিদের জার্মানির কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পেও বোধ হয় মানুষ এতখানি অত্যাচারিত হত না, বাংলার লক্ষ লক্ষ ঘরে ঘরে মেয়েরা যেভাবে আজও অত্যাচারিতা হয়।
বাঙালি জাতটাকে ভগবান-ই স্বাধীনতার পর দাবা-খেলার ঘুঁটি করে ছেড়ে দিয়েছেন। এখন দাবাড়ুরা তাদের যেখানে খুশি তুলছে আর ফেলছে। মানুষ তারা আর নেই। অনেকেই নিজেরা সুযোগসন্ধানী, ধূর্ত, খল, মিথ্যাচারী, ফাঁকিবাজ, দালাল হয়ে গেছে। হাতি, ঘোড়া, নৌকো, পদাতিক এইসব-ই হয়ে গেছে, তারা সুন্দর সাদা-কালো এই বিরাট জাতীয় দাবার ছকে।
কী করছিস রে? দেখ। কীরকম তোর বাড়ি চলে এলাম। এত্ত বছরে একদিনও তো বলিসনি আসতে! খাওয়াসনিও কোনোদিন।
রুন চমকে উঠে তাকাল, রীতির গলার স্বরে।
সত্যিই রীতি! তার ঘরে! একটা কালো শাড়ি পরেছে আজ। সাদা ব্লাউজ। কাজল দিয়েছে চোখে। কালো টিপ। কালো দুল। শ্রাবণের দুপুরের আকাশের মতো দেখাচ্ছে। কানে হাট থেকে কেনা দেহাতি রুপোর দুল আর গলার রুপোর হারকে বিদ্যুতের ঝলকের-ই মতো মনে হচ্ছে সেই আকাশে।
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল রুন রীতির দিকে। সৌন্দর্যর আলাদা একটা আকর্ষণ আছেই। মুগ্ধ করে দেওয়ার নিজস্ব প্রক্রিয়া। যেমন হয়তো আছে, অর্থেরও।
রীতির রুনের উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলল, দিদির বাড়ি গেছিলাম। সীতেশদা জিপ দিল পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। বাবা আবার অফিসের গাড়ি-টাড়ি পার্সোনাল কাজে ব্যবহার করা একেবারেই পছন্দ করেন না। বলেন, এ-হচ্ছে হাইট অফ ডিসঅনেস্টি; এক ধরনের মিসডিমেন্যুর। তাই সাহস করে আর বাড়ি অবধি গেলাম না। তোদের বাড়ির সামনে জিপটা আসতেই নেমে পড়লাম। ভাবলাম, সারপ্রাইজ দেব তোকে জোর। আজ তো স্টেজ রিহার্সাল। তারপর দ্বাদশীর দিনে থিয়েটার। ব্যস সব শেষ। আউট অব সাইট, আউট অফ মাইণ্ড। কলেজের পরে তাও বেশ তোর সঙ্গে দেখা হত, ঘন ঘন এই দেড় মাস। আর হবে না। ভাবতেই মনটা খারাপ লাগছে রে। তাই-ই তো এলাম এমনি করে। থিয়েটারের পর দেখা করবি তো আমার সঙ্গে? না ভুলেই যাবি?
কিছু বলতে পারল না রুন। চুপ করে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ।
রীতির ‘ব্যক্তিত্বটি’ই অমন। লেসলি এবারকম্বির একটি কবিতা পড়েছিল অনেকদিন আগে। ‘শি, শি; লাইক আ ভিজিটিং সি, হুইচ নো ডোর ক্যুড এভার রেসট্রেইন।’ রীতি যে-দরজা দিয়েই ঢুকুক-না-কেন, যখন-ই ও, যে-ঘরে ঢোকে, সে-ঘরের সবকিছু সমুদ্রের ঢেউ হয়েই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বাধা কাকে যে বলে, ওর জানা নেই। দ্বিধাও নয় কোনোরকম। ‘পরাধীনতা’ কথাটা তো ও জানেই না। ও মুক্তির প্রতীক।
রুন চেয়ারটা টেনে বলল, বোস।
তোর সঙ্গে রিহার্সালে তো কথাই হয় না। আজকাল সকলেই এত সিরিয়াস হয়ে গেছে যে, বলার নয়। সকলের-ই যেন ধারণা যে, সবাই বড়ো বড়ো অভিনেতা। হাসি পায় আমার। অভিনয়ই যেন, আমাদের জীবনের এক বিশেষ ব্রত। হাইট অফ হিপোক্রিসি! বল রুন?
এক বিশেষ বিদ্যা, সে শিল্পই হোক, কী সাহিত্যই হোক বা অভিনয়ই হোক সারাজীবন লেগে যায় তা শিখতে। সাধনার জিনিস এসব। চালাকির নয়। ‘ব্রত’, সত্যিই ব্রত করাই তো ভালো। যখন যেটা করবি সেটা প্রফেশনালদের মতো করে করতে চেষ্টা করাটা তো ভালোই। চাওয়াটা বড়ো হলে, পাওয়াটা তার কাছাকাছি আসে।
তুই আজকাল বড্ডবেশি জ্ঞান দিস রুন। ফর্ম ফিল-আপ করেছিস? কাজের কথা বল।
কীসের?
বা:। কমপিটিটিভ পরীক্ষার কোচিং ক্লাসের। পান্ডে সাহেবের ক্লাস রে!
আমি পরীক্ষাতে বসব না।
মুখ নামিয়ে বলল, রুন।
কেন? অবাক গলায় বলল, রীতি। উত্তেজিত দেখাল ওকে।
বাবা-মায়ের ইচ্ছা নয়। তা ছাড়া...
তাই-ই। তাহলে বংশীবাদন বংশলোচন-ই হবি?
বৃষ্টি হয়ে যেন, ভেঙে পড়ে বলল। শ্রাবণের দুপুর, রীতি; হতাশ আর আক্ষেপের গলায়।
আর তুই? তুই-ই বা বসছিস-না কেন? রুন বলল, উলটো অনুযোগ করে।
আমি কী করে বসব? বুড়ো বাবাটা চোখে দেখে না। আমার ভরসাতেই তো আছে। বাবা যতদিন আছেন, পরীক্ষায় পাশ করে চাকরি নিয়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার কথা ছেড়েই দে, এদেশের মেয়েদের পক্ষে যেটা করা সবচেয়েই সোজা, সেই বিয়েটা পর্যন্ত করা সম্ভব নয়। আমি ছাড়া বাবার কাছে কে আছে বল?
কেন? বিয়ে করতে অসুবিধে কী?
করতে পারি, যদি ঘরজামাই হয়ে থাকতে রাজি থাকে কেউ। কিন্তু ঘর-জামাই তো রাজা-মহারাজাদের হয়। আমার বাবার তো সামান্য পেনশন আর কিছু এফ ডি আর ইউনিট ট্রাস্ট-ই ভরসা। আমাদের দু-জনেরই টায় টায় চলে বলে।
রুন মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়েছিল রীতির দিকে। মনে মনে বলল, ‘টায়-টায়’? তা নয়, তা নয়। রীতি যেখানেই থাকে, সে-জায়গাই পূর্ণতা পায়। শুধু তাই-ই নয়, পূর্ণ করে উপচে দেওয়ারও স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে ওর মধ্যে।
হঠাৎ-ই সীতেশদার বাড়ি গেলি? চারছকের মোড়ের মাতালদের নামে নালিশ করতে নাকি? করলি সেই শেষকালে?
দুস। তা, না। তা ছাড়া হঠাৎ আবার কী? শালি, জামাইবাবুর বাড়ি যাবে এরমধ্যে হঠাৎ-এর কী দেখলি তুই? মেজদি গেছে বড়দির কাছে বেড়াতে, পাটনাতে। বড়দিদের বিয়ের দশবছর হবে কালকে। পার্টি হবে বড়ো। তাতেই বড়দিকে মদত দিতে গেছে। সীতেশদাটা একা আছে, তাই-ই ভাবলাম, সেজেগুজে গিয়ে একটু, কার্নিক মেরে আসি। জামাইবাবু বলে ব্যাপার।
একটু চুপ করেই বলল, তোরা এই পুরুষমানুষগুলো না, পেট-কাট্টি ঘুড়ির চেয়েও হালকা-পলকা। তোদের কোনোই ওয়েট নেই। একটু কার্নিক খেলেই তোরা গোঁত্তা মেরে পড়িস মুখে থুবড়ে। সবাই একইরকম। একটু চুপ করে থেকে বলল, না, সবাই নয়, এক্সেপশানও থাকে অবশ্য। ‘অ্যাণ্ড এক্সেপশান প্রুভস দ্যা রুল’।
থাকে বুঝি?
রুন ঈর্ষার গলায় বলল, ঈর্ষাটাকে ওর পরিচিত এবং অনুপস্থিত একজন মানুষের জামার বুকপকেটে রেডক্রসের ফ্ল্যাগ-ডে’র ছোট্ট লাল ফ্ল্যাগের-ই মতো আলপিন দিয়ে, মনে মনে সেঁটে দিয়ে।
রীতি ওর চোখেই বুঝল সে-কথা।
বুঝল বলেই, জোর গলায়-ই বলল; থাকে বই কী। নিশ্চয়ই থাকে। ‘ব্যতিক্রম’-ই সব নিয়মকে বাঁচিয়ে রাখে। ব্যতিক্রম না থাকলে নিয়মমাত্রই মাঠে মারা যেত।
হঠাৎ বাবার গলা শুনল রুন।
ক্ষুধা লাগছে কইলাম না তোমারে! চূড়া ভাজাটা কী হইল? ঝারিরে কওনা লইয়া আসবোনে। গলাটাও খুশ খুশ করতাছে। আদা দিয়া একগ্লাশ সরেস চা কইর্যা দাও দেহি। অ, অ বউ। তোমার প্রিন্স তো আজ বাড়িতেই আছে বোদয়, তাঁরেও এট্টু দিয়ো।
কোথায় স্যা? তার তো গলা শুনি নাই সকাল থিক্যাই! বাইরাইছে বোদয়।
দ্যাখো যাইয়া, ঘরে শুইয়া রিটায়ার্ড মানুষের মতো ঠ্যাং-এর উপর ঠ্যাং তুইল্যা প্যাপার পড়তাছে বোদয়।
বাবা নিজে কানে কম শোনেন বলে এতই চেঁচিয়ে কথা বলেন যে, পথের লোকও শুনতে পায়। যেমন ভাষা তেমন-ই গলা।
ভীষণ-ই লজ্জা করতে লাগল রুনের! অথচ রীতির বাবা কীরকম আস্তে আস্তে কথা বলেন। কী জ্ঞান ভদ্রলোকের। কত বিষয়ে জ্ঞান। গেলেই, বন্ধুর মতো ব্যবহার করেন। নিজে যা খান তাই-ই খাওয়ান, কত বিষয়েই যে, আলোচনা করেন উনি। প্রকৃত শিক্ষার প্রভাব একজন মানুষের ওপর যে কী, সুন্দর হতে পারে, প্রসূনবাবু যেন, তার-ই এক চমৎকার উদাহরণ। আর তার বাবা? মণিমোহন? অশিক্ষার প্রভাবের সাইনবোর্ড। জীবনে সাহিত্যের বই কিছুমাত্রই পড়েননি। খবরের কাগজ, নয়তো রহস্য-রোমাঞ্চ বিষয়ক কোনো রগরগে বই। পঞ্জিকা। একটামাত্র ইংরিজি বই বাবার ঘরে দেখেছিল। একটা নয়; দুটো। কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ম্যানুয়াল একটা। আর বাঁশের জঙ্গলের সুন্দর ছবি দেওয়া আর্টপেপারে ছাপা কভারের একটি ইংরিজি বই; ‘হাউ টু মেক মানি অন ব্যাম্বুজ’।
মা উত্তর দিলেন, তেমন-ই গলা তুলে; নইলে বাবা শুনতে পাবেন না।
ঘরে আছে, না, দ্যাখো গিয়া হেই প্রফেসরের বাড়ি পৌঁছাইছে সক্কালে সক্কালে? সেই নষ্ট ছেমড়িটা তো পোলাডার মাথাটাই এক্কেরে চিবাইয়া খাইতাছে। কী যে অইব, ভগবান-ই জানেন।
আরে অত্ত ইসপেকুলেশানে কামডা কী! সাইকেলডা আছে না, নাই দ্যাহো দেহি উঠানে।
একটু পরেই মা বললেন, আছে ত দেহি।
তবে তো তোমার প্রিন্স প্যালেসেই আছেন। দিয়ো তারেও, চূড়া ভাইজ্জা। মধ্যে একটু বাদাম, একমুঠ ডালমুট, ধইনা পাতা আর শুকনা লঙ্কা। মুচমুইচ্যা কইর্যা ভাইজ্জা দিতে ভুইলো না য্যান। বোঝলা বউ!
রীতি, ভীতা হরিণীর চোখে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ রুনের দিকে। ওর কাছে, এই ভাষা ল্যাটিন বা জার্মান বা ফ্রেঞ্চের-ই মতো বিজাতীয়। তবু একমুহূর্ত চুপ করে থেকে রুনকে বলল, ‘‘ছেমড়ি’’ মানে কী রে?’
রুন চুপ করে রইল। ওর দু-টি কান গরম হয়ে লাল হয়ে গেছিল।
তোর সঙ্গে এত বছরের আলাপ, তুই কিন্তু একদিনও আমাকে তোর বাড়িতে নিজে আসতে বলিসনি। ভাবতাম, তুই খুব-ই অভদ্র। তাই আমি নিজেই এলাম। তোদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল জিপটা।
অপরাধীর গলায় নীচুস্বরে বলল রীতি।
বলল, ভেবেছিলাম, তুই, তোরা; বোধ হয় খুশি হবি।
বাবা আবার বললেন, ওই প্রফেসরের বউটাও তো এক্কেরনম্বরের ক্যারেকটারলেস আছিলো। তার মাইয়াও তার-ই মতো অইব যে, ইতে আর আশ্চর্য হওনের আছেটা কী?
রীতি বলল, আমি তোর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে যাই? প্রণাম করে যাই? প্রথম দিন এলাম।
রুন বলল, কথাটা বলতে ওর বুক ফেটে গেল; তবু বলল, রীতি। আমার বাড়ি নেই রে! আমার কিছু নেই। আমি বড়ো একা। তুই চলে যা রীতি। তোর জন্যেই বলছি। তোকে আমি সম্মান করি। তোর বাবাকে সম্মান করি, তোকে আমি...তুই এক্ষুনি চলে যা রীতি; আমি কোনোদিক দিয়েই যোগ্য নই তোর। তুই আমার সঙ্গেও কথা বলিস না কোনোদিন আর। আর, তুই আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করে দিস রে। আমি ক্ষমা চাইছি, ওঁদের হয়ে।
রীতি সামান্য সময় পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে রইল রুনের মুখের দিকে। এক আশ্চর্য রহস্যময় এবং হয়তো ক্ষমাময়ও, হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, সহনশীলতা, ভদ্রতা, শিক্ষা সব সেই হাসিতে মাখামাখি হয়ে গেল।
বলল, তোর মাথা-ফাথা খারাপ হয়ে গেছে। তোর বাবা-মা তোর গুরুজন। তাঁদের হয়ে তুই আমার মতো একটা বাজেমেয়ের কাছে ক্ষমা চাইলি? কী রে তুই? ক্যারাকটারলেস একজন মহিলার ক্যারাকটারলেস মেয়ে আমি। আমিও তো জানি তা। তুইও জানিস। তবু কী সুন্দর, ভদ্র, তোর ব্যবহার আমার সঙ্গে প্রথমদিন থেকেই, বল? তুই অন্য কারো মতোই না রে রুন। তাই-ই তো তোকে এত...
তুই এখনও গেলি না?
তাড়িয়ে দিচ্ছিস আমাকে?
আমার বাড়ি নেই। আমার কিছু নেই!
বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এল রুনের গলা!
তাহলে, যাচ্ছি। কিন্তু যদি যাই তো চল তুইও চল। তোর এখন এখানে থাকা ঠিক নয়। উত্তেজিত হয়ে থাকবি তুই। বাড়ি গিয়ে বাবার জন্যে ব্রেকফাস্ট করব। তুই তো খাসনি কিছুই সকালে। চল বাবার সঙ্গে খাবি। আমিও বসব তোদের সঙ্গে।
রুন কী ভাবল একমুহূর্ত। তারপর-ই বলল, চল। তাড়াতাড়ি চল।
এগো, বলেই, আলনা থেকে আলোয়ানটা তুলে নিয়ে গায়ে দিতে দিতেই দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল রীতির সঙ্গে! যেন, চুরি করে পালাচ্ছে পরের বাড়ি থেকে।
পথে পড়েই, কিছুটা হেঁটে এসে রুন বলল, একটা রিকশা করি?
না। কেন? চল-না হাঁটতে হাঁটতে যাই। চল, পাচুয়া হয়ে যাই। কী সুন্দর শিউলির গন্ধ এখন পথে। রোদটা কেমন ‘পুজো পুজো’ হয়েছে! কাশ ফুটেছে খুব, ফুলকির মাঠে। যাবি? থাক, ব্রেকফাস্ট খেয়ে তারপর যাব। শিশিরের গন্ধে এখনও মাঠ, গাছ সব ভেজা। বেশ, তোর সঙ্গে তোর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে যাব। তোর ভালো লাগবে-না? আমার দারুণ লাগবে।
রুন কথা না বলে, পাচুয়ার পথ-ই ধরল। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ‘চার্মস’ এর প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল দেশলাই জ্বেলে।
অ্যাই। আমাকে একটা দে তো। সীতেশদা মেজাজটাই খিঁচড়ে দিয়েছে সাতসকালে।
কেন?
ধ্যাত। যাচ্ছেতাই। একলা পেল, একটা চুমু খেয়ে দিল জাপটে ধরে। তার আগে এমন করে পায়ে ধরল যেন, আমি কোনো দেবীটেবীই! পায়ে সুড়সুড়ি লাগছিল। দিয়ে দিলাম ভিক্ষা। মেজদিটার বর বলে কথা। বেশি শক্ত হতে পারলাম না। কিন্তু দেখ, চুমু খাওয়ার রকম আছে অনেক-ই। চুমু তো খেল না; যেন আধ-সেদ্ধ পাঁঠার মাংস ছিঁড়ছে দাঁত দিয়ে। এমন জ্বালা করছে না!
এ কী! লাল হয়ে ফুলেও তো গেছে।
রুন বলল।
রীতি ঠোঁটে হাত দিয়ে দেখে বলল, তাইতো। থাকগে। তুই তো সঙ্গে থাকবি। বাবা কিছু বলবে না। বুঝবে যে, নিশ্চয়ই তুই খেয়েছিস। তোকে বাবা ভালোবাসে, সীতেশদাকে দেখতে পারে না। দাঁত চেপে বলে, ও ছেলেটি ডিসঅনেস্ট। নীতিও তাই। জীবনে দেবীরা তাঁদের-ই যোগ্য দেব খুঁজে পান। তবে এইটুকুই বাঁচোয়া যে, বাবা ঠোঁট দেখতে পাবেন না। মাইনাস টেন পাওয়ারে মেয়ের ঠোঁটের চুমু দেখা যায় না। বাবারা চোখে কম দেখলে কিছু সুবিধেও আছে। কী বল?
ঠোঁটে আবার একটু হাত বুলিয়ে বলল, বিবাহিত পুরুষমাত্রই জংলি। আমার ঘেন্না লাগে। দুস, মুখটাই তেতো করে দিয়েছে রে! এমন আশ্বিনের সকালবেলায়। তিন বছর বিয়ে হয়েছে এখনও একটা চুমু কী করে খেতে হয় শিখল না? আর এইরকম একজন মানুষের ওপর, সাব-ডিভিশনের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার ভার? দেশের ভবিষ্যৎ একেবারেই অন্ধকার।
কেউ যদি দেখে ফেলে?
কী?
তুই সিগারেট খাচ্ছিস?
ছাড় তো। ক্যারেকটারলেস মহিলার ক্যারেকটারলেস মেয়ের আর বেশি বদনাম কী হবে?
তুই ক্ষমা করিসনি, না রে?
রুন বলল।
কাকে?
আমার মা-বাবাকে?
মা-বাবা তো গুরুজন। তাঁদের ক্ষমা করার যোগ্যতা আমার আছে, এমন ভাবার ধৃষ্টতাও যেন, আমার কখনো না হয়। আমার বাবা আমাকে তেমন শিক্ষা দেননি। আমি কিন্তু তোকে ক্ষমা করিনি রুন। তুই ক্ষমার অযোগ্য।
আমি? কেন?
এদেশের মেয়েরাই পরাধীন জানতাম। আর্থিক স্বাধীনতা নেই তাদের। আজকে জানলাম যে, আর্থিক স্বাধীনতাই একমাত্র স্বাধীনতা নয়। তুই বড়োই পরাধীন। তুই বড়োই একা। বড়ো কষ্ট হল তোর জন্যে। ওই বাড়িতে তুই থাকিস কী করে? দমবন্ধ হয়ে আসে না তোর? তোর জীবনটা তো নিজের-ই! আর মোটে একটামাত্র জীবন।
বাবা-মায়ের আমি ছাড়া কেউই যে, নেই। দাদা আসবে না। কে দেখবে ওঁদের?
ইডিয়ট। তুই-ই দেখবি। বাবার ব্যাবসায় না ঢুকলে, কি কোনো মানুষের বেঁচে থাকা, সুখে থাকা বন্ধ হয়ে যায়? তোর মা-বাবা অন্য জগতের মানুষ, তুই অন্য জগতের। ভালো-মন্দর কথা আমি বলছি না, ভিন্ন জগতের কথা। বুঝলি? তোর নিজের জগতে বাঁচতে না পারলে মরে যাওয়াও ভালো। খাওয়া-পরা, আর বেঁচে থাকা কী এক? এই সিরাটোলিতেই থাক তুই। তবে অন্য কিছু কর। একটা বইয়ের দোকান দে-না। তুই যদি দিস, আমিও তোর ওয়ার্কিং-পার্টনার হব। বেশ অনেক ইংরেজি আর বাংলা বই থাকবে। রেকর্ডও রাখতে পারিস। বাংলা, ইংরিজি। আবদুল করিম খাঁ, বড়ে গোলাম আলি, আমির খাঁ, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, রবিশংকর, আলি আকবর, নিখিল ব্যানার্জি, বাখ, বিটোভেন, মোৎজার্ট, চাইকোভস্কি। তা ছাড়া রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদ, আর নিধুবাবুর গানের। পল রোবসন থেকে বনি-এম, আব্বা; মাইকেল জ্যাকসন। মানে, এমন একটা দোকান কর বইয়ের আর রেকর্ডের যেখানে, সবরকম রুচির মানুষের মনের জিনিস থাকবে। ঝিরাটোলিতে শিক্ষিত মানুষ অসংখ্য আছেন কিন্তু বইয়ের দোকান, রেকর্ডের দোকান সব অশিক্ষিত মানুষদের হাতে। মানে, ওঁরা শিক্ষিত পাঠক বা শ্রোতা আজকে যে, ঠিক কী ধরনের বই বা রেকর্ড চান, সে-সম্বন্ধে নিজেরা বিশেষ ওয়াকিবহাল নন। আমার ইচ্ছে আছে, তার সঙ্গে ফুলও রাখব নানারকম। সারাবছরের মতো অ্যাডভান্স নিয়ে কার্ড সই-করিয়ে, জন্মদিনে, ম্যারেজ-অ্যানিভার্সারিতে আমরা নিজেরা আমাদের তরফ থেকেও একগুচ্ছ ফুল নিয়ে তাঁদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেব শুভদিনে। যদি সত্যিই শিক্ষিত মানুষ হন তবে সেই খুশির দিন পেরিয়ে গেলে তিনি একদিন আমাদের দোকানে না এসেই পারবেন না। রুচিটা তো ব্যক্তিগত ব্যাপার। যতদিন ইণ্ডিভিজুয়াল থাকছে, তার দাম থাকছে। যতদিন দেশ রাশিয়া না হয়ে যাচ্ছে পুরোপুরি, ততদিন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণ এবং ব্যক্তিগত রুচির দাম থাকবেই।
বা: কিন্তু তোর ভাবনা বড়ো দ্রুতগতির। তোর কল্পনার কোনো রাশ নেই।
রুন বলল।
বলল বটে, কিন্তু ওর নাক নতুন বইয়ের গন্ধে ভরে গেল। ‘এল-পি’ রেকর্ডের কাভারের ছবিগুলো ভাসতে লাগল চোখের সামনে।
রীতি বলল, শুধু কল্পনাতে কেন? আমার জীবনেও কোনো রাশ নেই। আমি জীবনেও বল্গাহীন বল্গাহরিণের মতো বাঁচতে চাই।
কোথায় করব?
কী? চমকে উঠে বলল রীতি।
দোকানটা?
কেন? তোদের বাড়ির বাইরের ঘরে কর।
বাবা মেরে বের করে দেবেন।
আমাদের বাড়ির বাইরের ঘরে কর তাহলে। তোদের বাড়ির চেয়ে আরও ভালো লোকেশন। বাবার ছাত্র-ছাত্রীরা মাস্টারমশাই-এর বাড়ি চেনেন-ই। সেটাও একটা অ্যাডেড ফ্যাক্টর। কী বল?
বাবা-মাকে দেখব না? ওঁরা একা মরবেন?
গাধা, নিজের বিজনেসে যা-প্রফিট হবে, নিজের খরচ রেখে সব-ই মা-বাবাকেই দিয়ে আসবি। যতদিন না বিয়ে করছিস, বাবা-মাকে নিয়ে হলিডে করতে যাবি প্রতিবছর। ছেলের সব কর্তব্যই করবি। ‘কর্তব্য’ করেও নিজের মতো বাঁচা যায়। বাবা-মার যোগ্য ছেলে হতে হলেই যে, বাবার বাঁশ, কী গামছা, কী ঠিকেদারিকে আঁকড়ে ধরে, নিজের ঘাড়ে চাপাতেই হবে, এমন কথা যেসব ছেলে ভাবে সেগুলো পুরুষ-ই নয়। একটা ছেড়ে অন্যটা ধরার সাহস যার নেই, সে...। বড়ো হ রুন। আর কবে বড়ো হবি বল? সময় তো চলে যাচ্ছে। অ্যাডাল্ট হ।
টাকা দিলেই হয়ে যাবে? বাবা-মায়ের কাছে থাকব না? বুড়ো বয়সে তাঁদের দেখব না? অসুখ-বিসুখ। টাকা দিলেই কী সব হয়?
আঃ। এক-শোবার দেখবি। তোর বাড়িতেই তো থাকবি তুই। সকালে ব্রেকফাস্ট করে সাইকেল নিয়ে এসে দোকান খুলবি। দুপুরে বন্ধ করে বাবা-মায়ের সঙ্গেই বসে খেয়ে আসবি, মায়ের হাতের সুক্তো আর বড়ি ভাজা, আঃ। বাঙালরা দারুণ রান্না জানে রে! খুব শখ ছিল যে, আমার শাশুড়ি বাঙাল হবেন আর সারাদিন এটা-ওটা রেঁধে খাওয়াবেন। কনসিভ করেছি শুনলেই দশরকম আচার বানাবেন বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে। থাকগে। যা বলছিলাম! তুই খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম-টিশ্রাম করে তারপর ফিরে এসে তিনটে নাগাদ আবার দোকান খুলবি। রাতে বাড়ি যাবি। বাবা-মায়ের কোল জুড়ে শুয়ে থাকবি। বুড়ো খোকা।
ক্যাপিটাল? চিন্তিত গলায় রুন বলল।
এইজন্যেই বাঙালির ব্যাবসা হয় না। ব্যাবসা মানেই, বাঙালি ভাবে, প্রথমেই এয়ার-কণ্ডিশনড অফিস। উর্দিপরা-ড্রাইভার। দারুণ ইংরিজি-বলা সুন্দরী রিসেপশনিস্ট। গবেট। তোর হাতঘড়ি, সাইকেল, কলম যা-কিছু আছে বিক্রি করে দে। আমি গয়না বিক্রি করব। ভারী ভারী সোনার গয়না কোনো সত্যিকারের শিক্ষিতা মেয়েরা পরে? শিক্ষাই আমার গয়না, গয়না, আমার গলার গান। আরও যদি দরকার হয় তো ফুলের গয়না আছে, দেহাতি গয়না। আছে, রুপোর গয়না। কত দামি। গয়না তো, সোনা দেখানোর জন্যে নয়, নিজেকে সুন্দর করে তোলার-ই জন্যে। যাদের শিক্ষা নেই, তারাই সোনা দেখিয়ে বেড়ায় গয়না পরে। তোকে দেব যত টাকা পারি, সব বিক্রি করে দেব। যত জঞ্জাল!
তুই! তুই কেন দিবি রীতি?
বা: তুই আমার বন্ধু বলে। তোকে আমি পছন্দ করি বলে। আবার কেন? কারো উপকার করব, তারজন্যেও এত্ত কৈফিয়ত। যা:। যা:। বিদ্যাসাগর মশাই লক্ষ লক্ষ বাঙালি মেয়েদের বাঁচিয়েছেন, আমি না-হয় একজন অবোধ, অবলা পুরুষকেই বাঁচালাম। মানে, বাঁচার হদিশ দিলাম। এই-ই আমার আনন্দ। পুরুষদের ওয়েলফেয়ারে কনট্রিবিউশন। তারপর বাঁচা-মরা তোর-ই ব্যাপার।
ব্যাবসা জমে গেলে ব্যাবসার প্রফিট থেকে আমার গয়না-বেচা টাকা উইথ ইন্টারেস্ট ফেরত দিয়ে দিবি। আমি একটা লাল মারুতি কিনব সেই টাকা দিয়ে। মাথায় লাল স্কার্ফ বেঁধে খুব জো-ও-ও-রে গাড়ি ছুটিরে দাপিয়ে বেড়াব।
মুখ ঘুরিয়ে রীতি, রুনের দু-চোখে তাকাল পূর্ণদৃষ্টিতে।
ওর ভুরু দু-টি কুঁচকে এল। সিগারেটে একটি টান লাগিয়েই ‘খুক খুক’ করে কাশল দু-বার। বিষম খেল। ধুঁয়ো ছেড়ে বলল, শুধু এই-ই। সত্যি বলছি রে। আর কিছু করতে হবে না তোকে।
অবাক গলায় রুন বলল, এত্তসব তুই আমার জন্যে করবি এমনি এমনিই। আর কিছুর জন্যে নয়?
আর কীসের জন্যে? প্রশ্নটাকে বুমেরাং করে দিল রীতি। বলল, ‘ইয়েস স্যার। এমনিই’।
রুন, যে-কথাটি আজ অবধি বলতে পারেনি রীতিকে, অনেক চেষ্টা করেও, এখনও, এমন শিউলির গন্ধ-ভরা আশ্বিন-শেষের সকালেও বলতে পারল না। যা বলতে পারল না আজও, তা কী আর কোনোদিনও পারবে বলতে? কিছু কথা থাকে জীবনে, কিছু মহড়া দেওয়া নাটকের-ই মতো, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে না বলে ফেলতে পারলে বা মঞ্চস্থ না করতে পারলে আর কখনোই বলা বা করা হয়ে ওঠে না।
গান্ধারী স্নান করছিল।
তক্ষর লেখা নাটক ‘রূপমতী’ দেখতে যাবে আজ। সাতটাতে আরম্ভ। পুজো দেরিতে ছিল বলে ‘শীত শীত’ ভাব এসে গেছে এরইমধ্যে। হালকা নীল বাথটাবে গরম জলের কল খুলে দিয়ে সামান্য বাথ-সল্ট ছড়িয়ে নেমে পড়ল নগ্না গান্ধারী অতিকায় একটি রাঁজহাসের মতো।
গরম জলের ধুঁয়ো ফিস ফিস করে কিছু বলে এখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। আয়নাটা ঝাপসা। ওর শরীরের ছায়াকে চেনা যাচ্ছে না। দীর্ঘশ্বাস পড়ল গান্ধারীর। এমনিই পড়ে, যখন-ই ও একটু মনোযোগের সঙ্গে স্নান করে। এই গরম অথবা ঠাণ্ডা জল-ভরা বাথটাবেই ওর জীবনের অনেক স্বপ্নই গলে গেছে বাথ-সল্টেরই মতো। হয়তো, অনেক মেয়ের-ই যায়। ছেলেরা নির্লজ্জ। তাই তাদের ভাবনা বা তাদের জীবনের উদোম, হাহাকার তারা হয়তো প্রকাশ করে কখনো-কখনো, কিন্তু মেয়েরা পারে না। ন্যাংটো কথাটার প্রতি এক গভীর অসূয়া নিয়েই তারা বড়ো হয়। ‘ন্যাংটো’ কথাটা যে, শুধু উলঙ্গ শরীরের-ই সমার্থক নয় একথা তারা অনেকেই ভুলে যায়। ন্যাংটো যা, তাই-ই আড়ালহীন সত্যি। ন্যাংটো শরীরের-ই মতো এই ন্যাংটো জীবনও কাউকেই দেখাতে বড়োই অনীহা ওদের। প্রফেসর প্রসূনস্যারের মেয়েরা হয়তো অন্যরকম হবে। হতে পারবে! গান্ধারীর এত শিক্ষা, এত বিত্ত, এত অর্থ নিয়েও জীবনটা এই বাথটাবে ভাসানো প্লাস্টিকের রঙিন প্রাণহীন কোনো সুন্দর পরিযায়ী হাঁসের-ই মতো কাটিয়ে গেল। অথচ ছেলেবেলা থেকেই ভেবেছিল যে, বিদ্রোহ করবে। ওর নিজের মতো করে সম্পূর্ণ ইচ্ছায় নিজের আনন্দে ভর করেই বাঁচবে জীবনে। কিছুই হল না। তার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করার মতো সাহসও হল না আজ অবধি লোকে কী বলবে ভেবে। মাকেও বলা হল না স্পষ্ট করে একদিনও যে, মা তোমার দাস-দাসী অর্থ সব-ই আছে অথচ নিজেও কখনো বাঁচার মতো বাঁচোনি জীবনে, বাবার পাশের গাধাবোট হয়ে এক নদী থেকে অন্য নদীতে ভেসেই বেড়িয়েছ। ‘জীবন’ কাকে যে বলে, এই একটা জীবন কেমন করে কাটানো উচিত সেসব সম্বন্ধে তোমার কখনো ভাববার অবকাশটুকুও হল না। অথচ দাঁড়িয়ে আছ, দাঁড়িয়ে নয়; এখন শুয়ে আছ মৃত্যুর চৌকাঠে। না, বাঁচলে তুমি নিজে; না, বাঁচতে দিলে আমাকে।
মা কী ভাববে, মনে দুঃখ পাবে বলেই মাকে সে-কথা কোনোদিনও বলতে পারল না।
আর তার স্বামী? সে এতই বেশি আত্মবিশ্বাসী, সংসারে যে, একজন নারীর গাড়ি-বাড়ি স্বামী-পরিচয়, স্বাচ্ছল্য ছাড়াও আরও কিছুমাত্র চাওয়ার থাকতে পারে, এই ভাবনাটুকু তার পক্ষে ভাবা অসম্ভব। সে অনেক কৃতী পুরুষমানুষের মতোই মনে করে যে, সেও স্বয়ম্ভু। স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার মধ্যেও যে, কোনোরকমের অপূর্ণতা থাকতে পারে এমন হীনম্মন্যতা তার কোনোদিনও হবে না। এই উচ্চম্মন্যতাটাই ওর একমাত্র অসুখ। তাই-ই পারেনি গান্ধারী। গান্ধারী নিজে মানুষ নিতান্ত ভালো এবং নরম বলেই পারেনি তার ভালোমানুষ কিন্তু স্থূল শরীর এবং বুদ্ধির স্বামীর অহমিকার কাচের স্বর্গকে ভেঙে দিতে। এই ধরনের মানুষকে ঘেঁটে দিলে তারা আর বাঁচে না। এদের মেরুদন্ড সাপের মেরুদন্ডের-ই মতো হয়। তাতে একটু আঘাত লাগলেই সমস্ত শরীরে বৈকল্য আসে। পারেনি গান্ধারী। পারবে পারবে ভেবেই পার করে দিল এতগুলো বছর। পারা হল না। ছেলেবেলার শুকনো পাতা-ওড়া অবুঝ প্রত্যাশায় ভরা দুপুরবেলায় ভাঁড়ার ঘরে বসে লুকিয়ে আচার খাওয়ার মতো ছিঁচকে চুরির জীবন এই বড়োবেলায় এসে আর ভালো লাগে না। এই জীবনের ভাঁড়ারে ছেলেবেলার সুন্দর সব গন্ধ এবং রং নেই। জলপাই বা কুল জম্পেশ করে ধনেপাতা, শুকনো বা কাঁচালঙ্কা আর একটু নুন আর একটু চিনি দিয়ে মাখলে যে-গন্ধ বেরোত, জিভ যেমন করে ভরে আসত জলে সেইসবের কিছুই আর নেই, এই পরিণত বয়সের ভাঁড়ারঘরে।
জিভে জল আসে না আর। শুধু চোখে আসে।
গান্ধারীর নাম ‘গান্ধারী’ রেখেছিলেন তার মা। হয়তো জেনেশুনেই রেখেছিলেন। গান্ধার-রাজ সুবলের কন্যা ছিলেন গান্ধারী। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন সুবল রাজা গান্ধারীর। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের হাতে স্বেচ্ছায় তাঁর পিতা সমর্পণ করেছিলেন গান্ধারীকে। দুর্যোধন এবং অন্যান্যদের জন্ম দেন তিনি। সুন্দরী এবং শিক্ষিতা হলেও, বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তিই করেননি গান্ধার-দুহিতা গান্ধারী। এই ঝিরাটোলির গান্ধারীও করেনি। জন্মান্ধ স্বামীকে অতিক্রম করে যাবেন না বলে, মহাভারতের গান্ধারী সবসময়েই কাপড়ের টুকরো দিয়ে নিজের চোখ বেঁধে রাখতেন। এই গান্ধারীও রাখে অদৃশ্য কাপড়ের টুকরোতে। ব্যাসদেব বর দিয়েছিলেন যে, গান্ধারীর শতপুত্র হবে। চোখবাঁধা নারীর সঙ্গে জন্মান্ধ পুরুষের মিলনে চক্ষুষ্মান সন্তান জন্মাবার কথা নয়। চোখ থেকেও যাদের ‘চোখ’ থাকে না, তেমন-ই হওয়ার কথা ছিল তাদের। বাথটাব-এ শুয়ে থাকা এই গান্ধারীর একটিও সন্তান নেই। জানে না, কোন দেবতা বা অপদেবতার বরে বা শাপে এমন হল।
নিজের নগ্ন শরীরের বিভিন্ন প্রদেশে সুগন্ধি জলের উষ্ণতা ও চাপ অনুভব করতে করতে তক্ষ রায়ের কথা ভাবতে লাগল গান্ধারী। মুখহীন তক্ষ রায়। শুধুমাত্র মুখহীন তক্ষ রায়কেই ভালোবাসতে পারে গান্ধারী শুধু তার শক্ত সুগঠিত দারুণ শরীরটার জন্যেই। নিশ্চয়ই তার মনের জন্যেও। মন কি মাথার ভেতরে থাকে? না, বুকের ভেতরে? কে জানে?
বিশু পায়চারি করছিল স্টেজের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বেশ হয়েছে কিন্তু সেটগুলি। সত্যিই যেন মাণ্ডুর দুর্গ। সুপ্রতীপের আলো ফেলার কায়দায় জেহাজ-মেহালের আলোজ্বলা রাত, রূপমতী-মেহালের পেছনে নিমারের উপত্যকায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের রঙের খেলা যেন, জীবন্তই হয়ে উঠেছিল স্টেজ-রিহার্সালের দিনে। পুরো ঝিরাটোলিতে ‘রূপমতী’ নাটক যেমন, সাড়া জাগিয়েছে তেমন, সাড়া ইদানীংকালে কোনো কিছুই জাগায়নি। ক্লাবের হলে পাঁচ-শোজন লোকও হয় না কখনো। সাত-শো টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে কাল অবধি। আজকের খবর রাখে না। একস্ট্রা চেয়ারও আনতে হয়েছে। পাঁচটাকা, তিনটাকা, দু-টাকার টিকিট। ঘর থেকে পনেরো হাজার টাকা দিয়েছিল। আর দিতে হবে না বলেই মনে হচ্ছে। উলটে ক্লাব-ফাণ্ডে মোটা টাকা জমে যাবে।
নাটক আরম্ভ হতে আর দু-ঘণ্টা বাকি। সকলেই এসে গেছে বোকাদার নির্দেশমতো। গোপেন, সূর্য আর রীতির কিছু কিছু ডায়ালগ ওরা বসে বসে প্লে-রিডিং করে নিচ্ছে। স্টেজ রিহার্সালের দিনে ওদের ডায়ালগ-এ গোলমাল হয়েছিল।
এ ক-টা দিন যেন এক ঘোরের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল। রিহার্সাল দিতে দিতে একরকমের নেশা ধরে গিয়েছিল। একে, অন্যের আত্মীয়ই হয়ে উঠেছিল যেন। কাল থেকে সন্ধেগুলো একেবারে ফাঁকা ঠেকবে। ওরা সকলেই যেন, এক ঠাস-বুনোন পরিবারের সভ্য। সব পরিবারেই যেমন, মাঝে মাঝে ভুলবোঝাবুঝি, মন-কষাকষি, রাগারাগি হয়-ই; এ-পরিবারেও হয়েছিল। এখন নাটক আরম্ভর আগে সকলেই একজোট। সকলের মনেই চাপা উত্তেজনা। কী হবে? কেমন হবে? নিখুঁত করা চাই। এই-ই ভাবনা প্রত্যেকের।
একটা দিন রীতিকে কাছাকাছি এবং মঞ্চে প্রেমিকা হিসেবে পেয়েই বিশু যেন, বর্তে গেছে। ওর পরিবারে ঐশ্বর্য অঢেল। কিন্তু রুচি নেই। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, এসব-ই ওদের পরিবারে পাপ; অন্যায়। বিশুই প্রথম এই পরিবারের ঐতিহ্যবিরোধী কাজ করল। রীতি যে, ওকে পছন্দ করে না, এমন হয় না। ও নিজে তো করেই। কিন্তু রীতিকে বিয়ের প্রস্তাব সে, কখনোই দিতে পারবে না। বুড়হাটিলায় যাওয়ার পথের দু-পাশের বনে বনে, কত সুন্দর সব ফুল ফুটে থাকে। তাই বলে কী সব ফুল-ই ছিঁড়তে আছে? যে-ফুলের যোগ্য ফুলদানি তার নেই, সে-ফুল বনেই ফুটে থাকুক, বনপথের শোভা বাড়াক; মুগ্ধ করুক পথচারীকে। রীতি ওর পরিবারের পরিবেশে একেবারেই বেমানান হবে। মুক্ত, উদার, খোলামেলা আবহাওয়ায় বড়ো হয়েছে মেয়েটি। বিশুদের বাড়ির টাকাপয়সা, এক-নম্বর, দু-নম্বর হিসেবের খাতা, কর্মচারী ঠকানোর নানারকম প্রক্রিয়ায় কালো হয়ে থাকা আবহাওয়াতে বেচারির এমন ফুলের মতো মনটাতে কালি লেগে যাবে। রীতিকে সত্যিই ভালোবাসে বলেই, রীতিকে বিয়ে করতে পারবে না বিশু।
হত, যদি ও আলাদা হয়ে গিয়ে অন্য বাসা নিয়ে থাকত। পারত যদি। কিন্তু বিশুর পয়সাসর্বস্ব, দাম্ভিক অথচ অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ বাবা এবং করুণাময়ী মা, ও আলাদা হয়ে চলে গেলে হয়তো হার্ট-অ্যাটাক হয়েই মারা যাবেন। এই ভয়েই রীতিকে দূরে রাখে সবসময়ে। মনে মনে।
সেদিন সকালের রিহার্সালের পর রীতি ওর সঙ্গে ফিরছিল। হঠাৎ-ই বলেছিল, ওর জিপে করে পৌঁছে দেওয়ার কথা। অসময়ের বৃষ্টি নেমেছিল। তাও হঠাৎ-ই। ভিজে-ধুলো থেকে গন্ধ উঠছিল সোঁদা-সোঁদা। বিশু ভাবছিল, হয়তো রীতির ঠোঁটের গন্ধও এমন। রীতিই বলেছিল, হঠাৎ। পদ্মবনের পথেই চলুন। ঘোরা হলে হবে। এই শরতের হঠাৎ বৃষ্টিতে পদ্মবিলের রূপ দেখে যাই চলুন।
বলে, জিপের স্টিয়ারিং-ধরা হাতে হাত ছুঁইয়ে বলেছিল, দাঁড়ান। একটু দাঁড়ান এখানে।
প্লিজ। দারুণ! না?
জিপটা দাঁড় করিয়েছিল বিশু। অবাক হয়ে বলেছিল এখানে? হঠাৎ?
বা:। না দাঁড়ালে, পদ্মবিলের কথা শুনবেন কী করে? শুনুন শুনুন। কী সুন্দর পাখি ডাকছে একটা বিলের মধ্যে থেকে। কী পাখি ওটা?
কে জানে? ওসব পাখি-টাখির কথা তক্ষদাই জানে। বিশু বলেছিল।
কী সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, না? পদ্মবনের জলে বৃষ্টির জল মিশে। ফড়িং উড়ছে। আহা! চরের কাশফুলগুলো সব বুড়ির চুলের মতো লেপটে রয়েছে ডাঁটির সঙ্গে। দেখছেন? এই বৃষ্টিতে কারো লাভ আবার কারো ক্ষতি! তাই-না? অন্যরকমও তো হতে পারত। সকলের-ই লাভ হতে পারত তো? কী?
বিশু একটা সিগারেট ধরিয়েছিল পকেট থেকে লাইটার বের করে। আগেকার দিনের যাত্রায় যেমন স্বগতোক্তি করতেন, নায়ক-নায়িকারা দর্শকদের শুনিয়ে শুনিয়ে, রীতিও যেন, তেমন-ই করছিল। রীতি ওর দিকে সরে এসে গায়ে গা-ছুঁইয়ে বলল, ও মা! ওটা কী? আপনার ডান কাঁধে ওটা কী?
চমকে উঠে বিশু দেখেছিল, হলুদ প্রজাপতি একটি।
রীতি হাততালি দিয়ে বলেছিল, শিশুর মতো; কী মজা। এবার নির্ঘাত বিয়ে হবে আপনার। বড়োলোকের ছেলের বিয়ে। কত কী ভালোমন্দ খাওয়া যাবে!
বিশু প্রজাপতিটাকে সিগারেটের ধুঁয়োয় ফু দিয়ে, উড়িয়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখে রীতির দিকে চেয়েছিল!
রীতি অপ্রস্তুত মুখে বলেছিল, হাসছেন যে!
এমনি!
সরে গেছিল রীতি সিটের ও-পাশে। বিশু জানে যে, রীতির ব্যবহারে কোনো সস্তা ব্যাপার নেই। অনেক ঢলানি মেয়ের মতো গায়ে পড়ে না ও। রীতি, অনেক প্রচলিত মেয়েলি রীতির-ই ব্যতিক্রম। রীতির প্রতি যে, ওর বিশেষ এক দুর্বলতা আছে, সেটা প্রকাশ করতে চায় না বিশু। কী লাভ? যে-স্বপ্ন সত্যি হবে না, এ-জীবনে সেই স্বপ্ন সত্যি করার মিথ্যে চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করলে নিজেকে অপমানও তো করা হয়! বিশেষ করে ভালোবাসার ক্ষেত্রে। বিশু তো একা নয়। ওরাই তো গরিষ্ঠ সংখ্যায়। মানুষ হয়ে জন্মাবার দুঃখ অনেক। এবং অনেকরকম।
রীতি আয়নার সামনে বসেছিল, মেয়েদের গ্রিনরুমে।
মুখের মেক-আপও নেওয়া হয়ে গেছিল। নিজের দিকে আয়নায় চেয়ে ওর বিশ্বাস-ই হচ্ছিল না যে, ও রীতি। ও যে, রূপমতীই সে-সম্বন্ধে ওর নিজের আর একটুও সন্দেহ ছিল না। তার বয়েস যেন পাঁচ-শো কত বছর হল! নাকি ছ-শোই? যেন, রূপমতী হয়েই জন্মেছিল ও নবাব-বাদশাদের অঙ্কশায়িনী হবে বলে। মাণ্ডুর জেহাজ-মেহালের আর রূপমতী-মেহালের অলিন্দ আর ঝরোকার মধ্যে দিয়ে বড়ো বড়ো পল্লবমন্ডিত দিঘল কালো সুরমা টানা চোখ মেলে অতীতের ঘরে বসে ভবিষ্যৎকে চোখ দিয়ে ছোঁবে বলেই।
বাজবাদাদুর-বেশি বিশুকেই প্রথমে দেখল গ্রিনরুম থেকে বেরিয়ে। বিশুও চমকে উঠল রূপমতীকে দেখে। রূপমতীও তাই। দু-জনে মুগ্ধ হল, দু-জনকে এই নবরূপে দেখে। পোশাক কি মানুষের মানসিকতাকে বদলে দেয়? হয়তো দেয়।
বিশু বলল, আপনি কী বলেন রীতি, বাকি জীবনটা বাজবাহাদুর আর রূপমতী হয়ে কাটাতে পারলে বেশ হত, তাই-না?
রূপমতী হাসল। বলল, আমার আপত্তি ছিল না কোনোই। রোজকার আটপৌরে জীবন একেবারেই অসহ্য। দমবন্ধ লাগে আমার। রূপমতী হতে পারলে, আধম খাঁদের হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করতে সহজে রাজি ছিলাম। তারপর একমুহূর্ত থেমে, একটু দ্বিধা করে বলল; এমনকী ধর্ষিতা হতেও।
বিশু কিছু বলার আগেই, বোকাদা দৌড়োতে দৌড়োতে এল উলটোদিকের উইংসের মধ্যে থেকে। এবং স্টেজের কোণাতে সেটের একটি অংশের সঙ্গে, পা লেগে যাওয়ায় দড়াম করে আছাড় খেল।
নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে গেল।
বোকাদা বলল, ডেটল! ডেটল!
কে যেন, দৌড়ে গেল ডেটল আনতে। পাঁচুডাক্তারকে ডাকতে।
তক্ষদা বলল, এত এক্সাইটেড হওয়ার কী আছে, বোকা?
আঁছে। আঁছে। মাঁত্র এঁকঘণ্টা বাঁকি। দেঁয়ার ইজ মেঁনি এঁ স্লিঁপস বিঁটুইন দাঁ কাঁপ এঁণ্ড দ্যা লিঁপস। পঁড়োনি? উঁ, উঁ। যঁতক্ষণ না আঁচাচ্ছি বিঁশ্বাস নেই। বঁদনাম হঁলে তোঁ আঁমার-ই হঁবে।
লাগেনি তো বোকা?
এঁখন লাঁগার সঁময় নেঁই। গোঁপেনটা এঁখনও এঁসে পৌঁছোল না দেঁখেছ। এঁত্ত ইঁরেসপঁনসিবল নাঁ। বাঁঙালির কিঁসসু হঁবে না। কিঁসসু হঁবে না। ডেঁটল।
বলেই, বোকাদা সেটের পেছনের রহস্যময় অন্ধকারে হারিয়ে গেল। এবং তার পেছনে পেছনে পাঁচুডাক্তারের কম্পাউণ্ডার ডেটলের শিশি আর তুলো হাতে। এইসব ইভেনচুয়ালিটির জন্যেই তাকে ধার চেয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল পাঁচুডাক্তারের কাছ থেকে।
তক্ষ রায় বাঁ-দিকের উইংসের গভীরের প্রায়ান্ধকারে হাতল-ভাঙা চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল। কোনো গুহাবাসী জানোয়ারের-ই মতো তক্ষও অন্ধকারে, নইলে নিদেনপক্ষে প্রায়ান্ধকারেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে অনেক বেশি।
জোরে ধোঁয়া ছাড়ল। আঃ।
একহাতের কেটলিতে গরম চা আর অন্য হাতের আর ওর বুকের মধ্যে গোঁজা ভাঁড়-এর পাহাড় নিয়ে, চা দিতে এল ছেলেটা।
রুন বলল, সামোসাভি লাওরে। এ ছোঁওড়া!
লায়া বাবু। আভভি লায়া। ইকদম গরম গরম নিকাল রহা হ্যায় উস্তাদ।
হ্যাঁ। লেতে আনা। বোকাদা সবাইকেই বলেছিল যে, যে, যেমন পারে সঙ্গে হেল্পিং হ্যাণ্ডস নিয়ে আসতে। নানারকম কাজে সাহায্য হবে। রুন কাউকেই আনতে পারেনি। বোকাদা এনেছে দুখিয়া পাগলাকে। পাগলা অনেক কাজ করে দিয়েছে। সেট টানাটানি করা থেকে চেয়ার সাজানো। গাঁজায় দম দিয়েই এসেছে বোধ হয়। শো-এর পরে এখানেই লুচি-মাংসর বন্দোবস্ত আছে আজ। আর কালাকাঁদ। সকলেই পেট ভরে খেয়ে যাবে।
তক্ষ রায়ের পাশে চেয়ার টেনে বসল রুন। তক্ষ লক্ষ করল যে, ও নিজে এবং গাধ্বা পাঁড়ের দোকানে দিনে একটি টাকা এবং দু-বেলা খাওয়ার বিনিময়ে আঠারো ঘণ্টা কাজ করা এই ল্যাংড়া শিশুটি ছাড়া এইমুহূর্তে প্রত্যেকেই নাটকের পোশাকে সেজে রয়েছে। রীতি, বিশু, রুন এরা সকলেই তাদের নিজেদের নিজস্বতাকে কিছু সময়ের জন্যে হলেও বাসি-কাপড়ের মতো ছেড়ে ফেলে যেন, অন্য কেউই হয়ে উঠেছে। জীবনে ঠিকাদারি-করা বিশু নবাব। জীবনে কাউকেই ভালো না-বাসতে-পারা রীতি সেই নবাবের প্রেমিকা। ভীরুতম-মানুষ সূর্য দুর্ধর্ষ সেনাপতি। এইসব অল্পবয়স্ক অনভিজ্ঞ ছেলে-মেয়েদের পবিত্র মুখগুলিতে শরতের শেষরাতের শিশিরের গন্ধ-মাখা স্বপ্নর-ই মতো মঞ্চের লাল-নীল আলোরা স্বর্গের পাখির মতো খেলা করবে একটু পরেই। নিজেদের গমগমে গলার-স্বর অ্যামপ্লিফায়ারে শুনে নিজেরাই চমকে চমকে উঠবে। ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে নিজেদের গলার স্বরকে। নিজেদের অস্তিত্বকে জীবনে যত না বাসে, তার চেয়েও অনেক বেশি করে।
এই মঞ্চ এক দারুণ ব্যাপার। ভাবছিল তক্ষ রায়। জীবনের সঙ্গে মঞ্চের মতো এমন গভীর ‘মিল’ বড়ো কম জিনিসের-ই আছে। প্রত্যেকেই তো পৃথিবীতে আসে কোনো কোনো বিশেষ ভূমিকাতে জীবনের মঞ্চে অবতীর্ণ হয়ে কানফাটানো হাততালি পেয়ে ফিরে যেতে। অন্তত প্রত্যেকের-ই কাম্য তাই-ই থাকে। পাদপ্রদীপের আলো কাউকে-বা তার নিজের মাপের চেয়েত অনেক-ই বড়ো করে তোলে; আবার কোনো জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বকেও নিষ্প্রভ।
এই মঞ্চ বড়ো এক গোলমেলে জায়গাও বটে।
কেউ কেউ কোনো বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেই চলে যায়। অনেক সময়ে নিজেরও অজান্তে। কেউ কেউ সে, ভুল ধরতে পারে, অনেক-ই দিন মহড়া দেওয়ার পর। কেউ, বা চিতাতে পৌঁছেও পারে না। তবে, তক্ষ রায় একটা কথা নি:সন্দেহেই মানে যে, নিজের বহুল-মহড়ার নাটক, আধুনিক মানুষদের মধ্যে খুব কম মানুষ-ই সত্যি সত্যি মঞ্চস্থ করতে পারে, বা হয়েছে বলে দেখে যেতে পারে। আসলে এই নিরবধি-মহড়ার আর এক নাম-ই হয়তো ‘জীবন’। ঝিরাটোলির প্রতিঘরে-ঘরেও এই মুহূর্তে অসংখ্য অসহায় মানুষ ও মানুষী তাদের নিরুক্ত যন্ত্রণায় বা'য় হয়ে মরা-গাছের মতো চোখ মেলে বিভিন্ন ভূমিকাতে উঁচু বা নীচু গ্রামের স্বরে মহড়া দিয়ে যাচ্ছে। আজ সন্ধেতে যে, ‘রূপমতী’ নাটক মঞ্চস্থ হবে তারসঙ্গে এই দৈনন্দিনতায় স্নান; অগণ্য গার্হস্থ্য নাটকের অমিল অনেক-ই আছে। সেইসব বর্ণহীন দৈনন্দিনতার মঞ্চে এত সাজসজ্জা নেই, নকল-হিরের গয়নারও ঝিকিমিকি নেই; নারীরা পাঁয়জোর পরা পায়ে রুনুঝুনু তুলে হাঁটে না সেখানে, নেই ঝলমল পোশাকও। হৃদয়ের ধুকপুকুনি আর চোখের অস্বস্তি পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়ার জন্যে তীব্র রং-বেরঙের আলো আর প্রলেপের পর প্রলেপের সুগন্ধি প্রসাধনও অনুপস্থিত সেখানে। সেইসব মহড়া বড়ো ন্যাড়া, ন্যাংটোত্ব ভারি করুণ।
তা ছাড়া, ‘রূপমতী’ তো একটু পর-ই মঞ্চস্থ হবে। কিন্তু ওইসব নাটকের মহড়াই সার। হাজারে মঞ্চস্থ হবে একটি বা দু-টি।
রুনের মেক-আপ নেওয়া শেষ হল। রীতিমতো উত্তেজিত বোধ করছে ও। চেঞ্জার যাঁরা এসেছেন এবার পুজোয়, তাঁরাও অনেক টিকিট কেটেছেন। তক্ষ রায়ের লেখা নাটক শুনেই এত উৎসাহ তাঁদের। বড়োশহরের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই সাহিত্য, সংগীত, বা সংস্কৃতির কোনো প্রভাব বিশেষ না থাকলেও তাঁরা মনে করে থাকেন, তাঁরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন সেইসব রুগণপ্রাণের প্রাণীদের! বিহারের এই মফসসল শহরে এসে তাঁরাই যদি, তক্ষ রায়ের নাটক না দেখে যান তাহলে কলকাতা ফিরে অফিস আর বসবার ঘরে চায়ের কাপে তুফান তুলবেন কীকরে? সকালে বিকেলে মিষ্টি আমেজের শীতকে উপভোগ না করে, উলটে তাতে আতঙ্কিত হয়ে গলায় কম্ফর্টার, মাথায় বাঁদুরে টুপি এবং পায়ে গলফ শু পরে, মাইল দুয়েক হেঁটে যে, ক্যালোরি ক্ষয় করলেন তা অচিরেই ঠোঙা-ভরতি শিঙাড়া ও জিলিপি কিনে এবং গোগ্রাসে খেয়ে পুরিয়ে নিয়ে গায়ে জোর করে যাচ্ছেন তাঁরা অনুক্ষণ। ক্যালোরি যতটা-না পুড়ছে, পূরিত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। কিছু সুন্দরী মেয়েও এসেছে এবারে। তবে শহরের সুন্দরীরা বড়োই ফ্যাকাশে। ইট-চাপা ঘাসের মতো। ঝিরাটোলির মেয়েদের মতো রোদ-বৃষ্টির আশীর্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত। আজ অবধি অনেক সুন্দরীই দেখল, রুন। তবে রীতির মতো একজনও না।
তক্ষদার পাশে চেয়ারে বসে রুন ভাবছিল, রীতি যতই বলুক তার পক্ষে মা-বাবাকে দুঃখ দিয়ে বই আর রেকর্ডের ব্যাবসা করা সম্ভব হবে না! বাঁশের ব্যাবসাই করবে ও।
পারল না। সংস্কার বড়োগভীরে শিকড় নিয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে তার জন্মসূত্র ছাড়া আর কোনো সূত্রের-ই মিল নেই। সে একটা একেবারে আলাদা মানুষ। আলাদা মনের, আলাদা শিক্ষার; আলাদা মানসিকতার। তবু যতদিন তাঁরা আছেন ওই দমবন্ধ গর্তেই কাটাতে হবে বাকি জীবন।
বাবা বলেছেন, ওসব যাত্রা-টাত্রা দেখে সময় নষ্ট করেন না তিনি। মা দয়াপরবশ হয়ে রাজি হয়েছেন আসতে, পাশের বাড়ির ফুলুপিসিকে নিয়ে। ফুলুপিসি খুব ভালো বড়ি দেন মুগ ডালের। ভালো পাটিসাপটা পিঠেও বানাতে পারেন। মায়ের কাছে শুনেছে, ফুলুপিসিমাদের দেশ ছিল নাকি, বরিশালে। সাঁতার কাটতে কাটতে জলের মধ্যে নকশিকাঁথাও নাকি বুনতে পারতেন তিনি, কিশোরী বয়েসে। জলের সূচ, জলের সুতো, জলের কাঁধা। এখন সব-ই জলের তলে। মাঝে মাঝে স্মৃতির মাছে ঘাই মেরে যায়। বুড়বুড়ি ওঠে। স্বগতোক্তি। ঝিরাটোলির যত কেচ্ছা সব-ই ফুলুপিসির মুখস্থ। তক্ষ রায়ের আধুনিক নাটক ‘রূপমতীর’ প্রকৃত গুণগ্রাহী হবেন তাঁরাই। ভাগ্যিস তক্ষদা জানে না।
আরও দুটো কার্ড পেয়েছিল। স্নিগ্ধ আর সৌম্যকে দিয়েছে। ওরা নাটক সম্বন্ধে ভাবে-টাবে। তবে যতখানি বোঝে, বাত্তেলা দেয় তার চেয়ে বেশি। যারা আসলে বোঝে, তারা অতকথা বলে না।
তক্ষদা বললেন, চাওয়ালা ছোঁড়াটা কোথায় গেল, দ্যাখো তো ভায়া। শিঙাড়াও আনবে বলল গরম গরম। আজ দুপুরে খাওয়াও হয়নি।
কেন?
পেজ-মেকআপের দিন ছিল আজ। ক্যান্টিনে যাওয়ার সময়ই পেলাম না। এদিকে বোকা বলেছিল, চারটের মধ্যে না এলে ওর নার্ভাস ব্রেক-ডাউন হবে। কাজ শেষ করতে করতেই বেলা হয়ে গেল। সময়ই পেলাম না খাবার।
ওই যে, এসে গেছে।
রুন বলল, ল্যাংড়া ছেলেটাকে দেখিয়ে।
ডাকসাইটে ইন্টেলেকচুয়াল তক্ষ রায়েরও যে, খিদে নামক অতিসাধারণ কোনো মানডেন বোধ থাকতে পারে এবং উনিও অমন গোগ্রাসে খেতে পারেন নিজের চোখে না দেখলে, বিশ্বাস হত না রুন-এর।
রুনও নিল দুটো শিঙাড়া। খেতে খেতে বলল নার্ভাস তো হওয়ার-ই কথা। আমরা ছোট্টরোলে অভিনয় করছি তাতেই এত নার্ভাস। আর বোকাদা তো ডিরেক্টর-ই!
নার্ভাসনেসের কী আছে?
নেই? স্টেজ থেকে সামনে অডিটোরিয়ামের দিকে চাইলেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। প্রথম লাইনেই দেখব হয়তো, আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল চৌরাশিয়াজি বসে আছেন ইয়া ব্বড়া গোঁফ নিয়ে।
তক্ষদা শিঙাড়াগুলো খেয়ে আর এক কাপ চা হাতে নিয়ে বলল, একটা নিয়ম আছে।
কী নিয়ম?
অডিটোরিয়ামের প্রথম সারিতে যারা বসে থাকবেন তাদের মনে করবে ছাগল। দ্বিতীয় সারির মানুষদের ভেড়া। তারপরের লাইনের মানুষদের গোরু। তারপরের লাইনে গাধা। এইরকম আর কী। আসলে, যতদূর অবধি তাকালে মুখ চেনা যায় চোখদুটি সেই সীমাটি পার করিয়ে অন্ধকারে তুলে রাখতে হয়। যে-সীমান্তর ওপারে শত্রু-মিত্র নারী-পুরুষ সব শুধুমাত্র কালো কালো অস্পষ্ট মুন্ডু হয়ে ফুটে থাকে; সেখানে। দেখবে নার্ভাস লাগছে না। তা ছাড়া, মনে করবে তুমিই ধন্য করে দিচ্ছ সকলকে অভিনয় করে। তোমার নার্ভাসনেস আসবে কেন?
হাত দুটোও কম গোলমাল করে না।
রুন বলল। হ্যাঁ। তা ঠিক কিন্তু।
মনে করবে তুমি জগন্নাথ।
তা তো আর হয় না।
তাহলে একটা হাত সেনাপতির জোব্বার ভেতরে চালান করে দেবে। একটামাত্র বাইরে থাকলে সেটা ম্যানেজ করা অত কঠিন হবে না।
বলেই বললেন, বাজে ক-টা?
রুন লক্ষ করল তক্ষ রায়ের হাতে ঘড়ি নেই। নিজের হাতঘড়িও খুলে রেখে এসেছে গ্রিনরুমে। তাই বলল, দেখে আসছি। আর বোধ হয় মিনিট পঁয়তাল্লিশ আছে। লোক আসতে শুরু করবে একটু পরেই। আপনি ঘড়ি পরেন না?
পরি-না তা নয়, পরি কখনো-সখনো। আসলে, ঘড়ি তো এখন পুরুষের একটি অলংকার বিশেষ হয়ে গেছে। ডাক্তার, বাবুর্চি অথবা সুমেরু-কুমেরু অভিযাত্রীরা ছাড়া ঘড়ি কী এদেশে কারোর-ই খুব একটা দরকার হয়? ঘড়ি তো হাতে বাঁধাই থাকে। তাকায় ক-জন? নিজের সময়মতো অফিসে আসে, নিজের সময়মতো বাড়ি যায়। ঘড়ির দিকে তাকালে দেশের চেহারা এতদিনে অন্যরকম হয়ে যেত।
তবু, অসুবিধে হয় না?
না:। অন্য সবাই তো পরে। সময় জিজ্ঞেস করে নিই দরকার পড়লে। তবে সময়কে আমি ঘেন্না করি বড়ো।
সে কী?
হ্যাঁ। এই ঘড়ির ‘টিকটিক’ মনে করিয়ে দেয় যে, সময় চলে যাচ্ছে। সুযোগ চলে যাচ্ছে। কিছুই করা হল না, পাওয়া হল না; দেওয়া হল না। মিছিমিছিই সময় যৌবন, জীবন সব চলে যাচ্ছে। ঘড়ি দেখতে আমার বিচ্ছিরি লাগে।
বোকাদা দৌড়ে এল ভেতর থেকে লড্ডন খাঁকে সঙ্গে করে। তার ডান গালে দাড়ি লাগানো হয়েছে। ধবধবে বাঁ-গাল চকচক করছে। খুব যত্ন করেই দাড়ি কামিয়েছে অরু আজ। ওর গার্ল-ফ্রেণ্ড ঝরনা আসবে বলেছে। যখন দেখা হবে তার সঙ্গে তখন, এই দাড়ির আঠা লেগে থাকবে চ্যাটচেটে হয়ে সেটা অরু জানে না। রুন জানে। রুন, এর আগেও দু-একবার নাটক করেছে ওদের কলেজের স্টেজে।
কী হল?
তক্ষদা শুধোলেন।
বোকাদা কথা বলল, এখন আর সূর্পণখার মতো নয়।
লড্ডন খাঁ যেখানে, বাজবাহাদুরকে কুর্নিশ করে চলে যাচ্ছে হোশাঙ্গাবাদের লড়াই-এর প্রস্তুতির জন্যে, তখন তার ভঙ্গিটা কীরকম হবে? মানে, নবাবের প্রতি লড্ডনের মনোভাবটা কেমন হবে? আই মিন ফেশিয়াল এক্সপ্রেশান?
বলেই বলল, তাড়াতাড়ি বলো, টাইম নেই।
যদি সেনাপতি জানেই, যে-যুদ্ধ এবং রাজকার্য ছাড়া আর সবকিছুই করেন তাঁর নবাব, হাজার হাজার দিশি-বিদেশি মেয়েমানুষের শরীর নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন, গায়িকা রূপমতীর সঙ্গ এবং গান-বাজনা নিয়েই যিনি থাকেন; সে নবাবের-ই জন্যে যাচ্ছেন আধম খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে, তার মনোভাব কেমন হতে পারে? জাঁহাপনা আকবরের সেনাপতি আধম খাঁর শৌর্য-বীর্যর কথা তো লড্ডন খাঁর অজানা ছিল না!
সংগীত, প্রেম, এসবের কোনোই কী ভূমিকা নেই? তা ছাড়া মিলিটারিতে তো রাজাকে আর ঊর্ধ্বতন অফিসারকে অন্ধভক্তি করতেই শেখানো হয়েছে চিরদিন। হয়নি কি?
মানলাম সব-ই। তবে প্রায় আত্মহত্যাই করতে যাওয়ার আগে, লড্ডন খাঁ নিজের দিকটাই তো ভাববেন? ভাববেন, এই হতভাগার জন্যে নিজের মুন্ডুটিই আকবরের সেনাপতির কাছে জিম্মা দিতে হচ্ছে। সেইমুহূর্তে তো তাঁর মুখে একধরনের ঘৃণা, অবজ্ঞা এবং অসহায়তাই ফুটে ওঠা উচিত। ঘুসখোর অফিসারের সৎ পেশকারের মুখে যেমন, ফুটে ওঠে যখন তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর ঘাড়ে বন্দুক রেখেই অন্যজন শিকার করছেন।
শুনলি তো! যা এবারে। দাড়ি লাগিয়ে নে।
বোকাদাও চলে যাচ্ছিল। তক্ষদা পিছু ডাকল, বলল; বোকা।
বোকাদা ফিরে এল।
এখন কেন, এইসব ডিটেলস নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ? এতে সকলেই কনফিউজড হয়ে যাবে। এ তো আর প্রফেশনাল দল নয়। একটু-আধটু খুঁত না হয় থাকলই।
আমি ‘পারফেকশন’-এ বিশ্বাস করি তক্ষদা। চেষ্টা করছি যতটুকু পারি ভালো করে উতরে দিতে তোমার ‘রূপমতী’কে আমার সাধ্যমতো! এরপর খারাপ হলেও আমার ‘বিবেক’-এর কাছে পরিষ্কার থাকব।
তক্ষদা কিছু না বলে তাকাল বোকাদার দিকে। প্রায়ান্ধকারেও তক্ষদার চোখ দেখে মনে হল রুন-এর, চোখ-দুটিতে অবাক হওয়ার ভাব। কোন মানুষের ওপর যে, অন্য কোন মানুষ কখন এসে জবরদখল নেয়, তা বোধ হয় আমাদের বোঝাবুঝির বাইরে। বোকাদা মানুষটাকে নিয়ে ওরা কম হাসি-ঠাট্টা করেনি। কিন্তু আজ শো-এর দিনে পৌঁছে দেখছে যে, ‘জিনিয়ার্স ইজ নাইনটি পার্সেন্ট পার্সপিরেশন অ্যাণ্ড ওয়ান পার্সেন্ট ইন্সপিরেশন’-এ কথাটা বোধ হয় ঠিক-ই। তা ছাড়া বোকাদা না থাকলে ‘রূপমতী’ কখনোই মঞ্চস্থ করা যেত না। সব ক্লাব, সব প্রতিষ্ঠানেই একজন করে বোকাদা থাকেন-ই। তারাই পুরো সংস্থাটিকে ধরে রাখেন, এগিয়ে নিয়ে যান; অথচ নাম হয় হয়তো তক্ষ রায়দের-ই।
হঠাৎ দুখিয়া পাগলা অডিটোরিয়াম থেকে স্টেজে উঠে আসার জন্যে স্টেজের দু-পাশে যে, ছোটোসিঁড়ি আছে কালো পর্দা ঢাকা, তা দিয়ে উঠে এল। সুপ্রতীপের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, ছেলেটির নাম জানে না রুন; তবে মুখ চেনা, বাহাদুরগঞ্জ-এর দিক থেকে অনেকদিন সাইকেলে আসতে দেখেছে; বলে উঠল, ‘অ্যাই পাগলা! ভাগ ভাগ। তু ক্যা কর রহা হ্যায় হিয়াঁ?’
দুখিয়া ডান হাতের দু-টি আঙুল দিয়ে তার নিজের নাক টিপে ধরে বলল, কোই চিজকি বু অ রহা হ্যায়?
বু? কওনসি বু? খুশবু ইয়া বদবু?
বদবু! বদবু!
মগর কৌওন চিজকি? উত্তর না দিয়ে, ‘বদবু! বদবু’! বলতে বলতে দুখিয়া পাগলা স্টেজের পেছনে চলে গেল।
ছেলেটি হেসে উঠল। রুনও তাকে দেখে হেসে উঠল।
তক্ষদা হাসলেন না। দুখিয়ার দিকে চেয়ে থাকলেন যতক্ষণ না, মিলিয়ে যায় সে। তক্ষ হাসল না কারণ ও লক্ষ করেছে যে, প্রত্যেক পাগলের মধ্যে কিছু ঐশ্বরিক এবং ভৌতিক লীলাখেলা থাকে। চিন্তিত হল ও!
লাইটিং-এর ইনচার্জ সুপ্রতীপ বলল, অ্যাই কাদির, চার নম্বরটা ছোটো কর, আরও ছোটো, বাঁ-দিকে সরা সামান্য। হ্যাঁ-অ্যাঁ! মনে থাকে যেন, তুই কন্সট্যান্টলি রূপমতীকে ফলো করবি। কখন কোন রং মনে আছে তো?
হ্যাঁরে বাবা! বিরক্ত গলায় বলল কাদির। তারপর নীচু গলায় তার সঙ্গীকে বলল, যাতে সুপ্রতীপ শুনতে না পায় এমন করে, রূপমতীকে ফলো করে মরি আর কী! সারাশহর ফলো করছে আর আমি শালা কোন ছাতার লাইট-অ্যাসিস্ট্যান্ট!
কথাটা তক্ষ এবং রুন দু-জনেই শুনল এবং গম্ভীর হয়ে গিয়ে দু-দিকে চেয়ে রইল।
রুন উত্তেজিত বোধ করছিল। সিগারেট ধরাল একটা। স্টেজে ওঠার আগে আরও একটা খাবে। আরম্ভ হতে আর পঁয়ত্রিশ মিনিট টাক আছে। বাইরে গাড়ি, সাইকেল, রিকশা, স্কুটার আর মোটরসাইকেলের মিশ্র আওয়াজ। পুরুষ ও নারী কন্ঠের শোরগোল! বেশিকথা বলছেন চেঞ্জার বাবুরাই। বড়োশহরের ট্রাম-বাসের আওয়াজের মধ্যে কথা বলে ওঁদের গলার স্বরটা বোধ হয় উঁচুগ্রামে বাঁধা হয়ে যায়। ইচ্ছে করলেও আর নীচুতে নামাতে পারেন না, জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে ফেলা মানুষের-ই মতো।
বোকাদা আর একবার গ্রিন-রুম থেকে দুখিয়া পাগলাকে নিয়ে বাইরে এল। এখন উইংসের দু-পাশে নানা লোক! এতলোকে সাহায্য করতে এসে, অসুবিধেই ঘটাচ্ছে। দুখিয়া পাগলাকে ধমকে বলল বোকাদা, এক্ষুনি গেট খুলে যাবে। এখন অডিটোরিয়ামের দিকে যেয়ো না। বরং বাইরের গেটে গিয়ে দাঁড়াও। পরক্ষণেই গলা নামিয়ে বোকা বলল দুখিয়ার কানে কানে, বউদি এল কি না, দেখে আমাকে বলে যেয়ো তো! বুঝলে দুখিয়া?
বোকাদার কথার উত্তর না দিয়ে, দুখিয়া পাগলা প্রচন্ড চিৎকার করে উঠল। বলল, সমঝা আভভি! কওনচি কা বু!
বোকাদা ওর চিৎকারে চমকে উঠল। তারপর-ই সামলে নিয়ে বলল, কওনচি কা?
দুখিয়া পাগলা দু-টি হাত দু-টি কানে ঠেকিয়ে বলল : মওত।
মওত?
জি হাঁ! মওত কা বু! মৃত্যুর গন্ধ।
ঠিক সেই সময়েই প্রচন্ড শব্দ করে একটি মোটরসাইকেল এসে, যেন, স্টেজের মধ্যেই ঢুকে পড়ে; থেমে গেল। বিশুদের ঠিকাদারি ফার্মের ওভারশিয়ার ত্রিপাঠীজি মোটরসাইকেল থেকে নেমেই একহাতে গাঢ় লাল-রঙা হেডগিয়ারটি ধরে জোরে দৌড়ে এলেন বাঁ-দিকের উইংসের মধ্যে। ‘ছোটোবাবু! ছোটোবাবু!’ করতে করতে। প্রথমে বোকাদাকে দেখতে পেয়েই উচ্চস্বরে বললেন, ‘আরে এ বোকাবাবু! খাতরা বন গ্যায়া। মালকিন আভভি গুজর গ্যয়ি।
ছেলেদের গ্রিন-রুম-এর ভেতর থেকে বাজবাহাদুরের পোশাকে বিশু এবং অন্যান্যরাও দৌড়ে এল। মেয়েদের গ্রিন-রুম থেকেও সকলে।
বিশুর মা ও বাবা ছেলেদের থিয়েটার দেখবার জন্যে বেরোচ্ছিলেন। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এসেছে গাড়িবারান্দার নীচে, মোহিনীদেবী গাড়িতে উঠতে যাবেন, দরজাতে হাত রাখা; ঠিক সেই সময়েই বুকে ব্যথা। সিঁড়িতেই পড়ে গেলেন। তাঁকে গাড়িতে তুলে সোজা বদ্রীদাস হাসপাতালে। ডাক্তার দেখেই বললেন, শেষ। গাড়ির পেছন পেছন ত্রিপাঠীজি হাসপাতাল অবধি গেছিলেন। সেখান থেকেই সোজা এখানে। ঘামে কপাল ভেজা।
এদিকে গেট খুলে দেওয়া হয়ে গেছে। পিলপিল করে লোক ঢুকছে টিকিট হাতে করে। অডিটোরিয়ামের মধ্যে থেকে গমগমে আজয়াজ আসছে একটা। স্যুভেন্যির-এর দাম করা হয়েছে দু-টাকা। অনেক অ্যাডভার্টাইজমেন্টও পাওয়া গেছে। কলকাতার এক সোর্সকে দিয়ে তক্ষদা বিখ্যাত লেখকদের শুভেচ্ছাবাণীও আনিয়েছেন। তার সঙ্গে খেলার নতুন ডি এম ইয়াং ওড়িয়া আই এ এস অফিসার মহাপাত্র সাহেবের শুভেচ্ছাও ছাপা হয়েছে। জোর শোরগোল আসছে ভেসে, বাইরে থেকে। এরইমধ্যে বাজবাহাদুর, ওরফে বিশু তার দুর্ধর্ষ মেক-আপ নিয়ে হাঁটু-ভেঙে বসে পড়ল উইংসের কাঠের পাটাতনের ওপর। তারপর দু-হাতে কালো দাড়ি ছিঁড়তে ছিঁড়তে ঝলমলে পোশাক চড়-চড় আওয়াজে খুলতে খুলতে ডুকরে কেঁদে উঠল ‘মা! ও মা!’ বলে। পরক্ষণেই মাটিতে লুটোতে লাগল আধখোলা পোশাক পরে কাটা-পাঁঠার মতো। বাহুতে মুখ ঢেকে।
তক্ষ রায় বিশুকে দেখতে দেখতে নিশ্চল হয়ে বসে আর একটা সিগারেট ধরাল। ধুঁয়ো ছেড়ে ভাবল, ছোঁড়াটার ইন্টেলেকচুয়াল হতে দেরি আছে অনেক। তা ছাড়া, ওর বাবাই বা কেমন লোক? মারাই যখন গেলেন ভদ্রমহিলা, সে-খবরটা তিনঘণ্টা পরে পাঠালেই বা কী হত বিশুর কাছে? এতগুলো মানুষের এতদিনের পরিশ্রম ইনভলভমেন্ট, নিষ্ঠা, এতমানুষের এতদিনের প্রত্যাশা, টিকিট-কেটে আসা; সব-ই মাঠে মারা গেল। ছি:।
পরে যদি কখনো নাটক লেখে তাতে শুধু, একটিমাত্রই চরিত্র রাখবে। সমষ্টিই ব্যক্তির সবচেয়ে বড়োশত্রু।
ভাবছিল তক্ষ।
জানে না, ক-টা বাজে এখন? তবে, অনেক সময় বয়ে গেল। এখন আর কোনো শোরগোল নেই। ভাগ্যিস ডি এম এবং এবং এস পি এসেছিলেন। পুলিশের সাহায্যও নিতে হয়েছিল। বোকাদা মাইকে অ্যানাউন্স করেছেন যে, পনেরো দিন পরে যে শনিবার, সেই শনিবার রাতে ওই টিকিট নিয়ে এলেই ‘রূপমতী’ দেখা যাবে।
তবে চেঞ্জাররা অনেকেই অখুশি। অতদিন ওঁদের মধ্যে অনেকেই থাকবেন না। সেই নিয়ে আলোচনা, গুঞ্জরন করতে করতে চলে গেছেন ওঁরা। বিশুকে গান্ধারীদি নিজেই গাড়ি করে নিয়ে গেছেন। সঙ্গে গোপেন আর সূর্যও গেছিল। বিশু একেবারেই ভেঙে পড়েছে। আসলে সংসারে কোন মানুষের শেকড়-বাকর যে, ঠিক কতখানি গভীরে প্রোথিত থাকে তা, ছিন্নমূল হওয়ার মুহূর্তটিতেই সঠিক বোঝা যায়। তক্ষ রায়ও এই কথাটা বুঝেছিল, যখন তার মা চলে যান।
দুখিয়া পাগলা কীসব বিড় বিড় করতে করতে, একা একা চলে গেছে অনেকক্ষণ। লাল-রঙা গামছাটা মাথায় জড়িয়ে নিয়ে! বিশুর মা মারা যাওয়াতে ওর কষ্ট হয়নি বিন্দুমাত্র। কষ্ট হয়েছে, লুচি-মাংস খাওয়া হল-না বলে। কষ্টর স্বরূপটা এক একজন মানুষের কাছে এক একরকম। তা বলে, কারো কষ্টই ফেলনা নয়। মেক-আপ-ম্যানরাও কিছুক্ষণ আগে নিজেদের জিনিসপত্র গোছগাছ করে চলে গেছেন। যাদের অভিনয় করার কথা ছিল, তারাও প্রায় সকলেই গেছে। প্রায় সকলেই বিশুদের বাড়িতেই; একে একে মাঁলোয়ার রাজন্যদের ঝলমলে পোশাক ছেড়ে আবার সাধারণ সব আটপৌরে মানুষ-মানুষী হয়ে গিয়ে। অডিটোরিয়াম এখন একেবারেই ফাঁকা। আলোও নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাইরের মোঙ্গফুলিওয়ালা, ভেলপুরিওয়ালা, চাটওয়ালারাও মনে মনে, অচেনা বিশুর অচেনা মাকে অভিসম্পাত দিতে দিতে, যার যার জায়গায় ফিরে গেছে। মাথায় বোঝা আর বুকে আশাভঙ্গতা নিয়ে।
তক্ষ রায় এতক্ষণ ক্লাবের পেছনদিকের মাঠটার কোণের দেওয়ালঘেঁষা মহুয়া গাছ তলাটার নীচে চেয়ার পেতে একা একা বসে বসে ওই হঠাৎ ভেঙে যাওয়া খুশির মেলার গুটিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা লক্ষ করছিল, একটার পর একটা সিগারেট খেতে খেতে। একজন লেখকের জীবনের কোনো ‘অভিজ্ঞতা’ই ফেলা যায় না। একসময় অবচেতনের ভাঁড়ার থেকে সবকিছুই অনবধানে কলমের গোড়ায় পৌঁছে যায়। নিজের অভিজ্ঞতাকে কোন লেখক, কেমনভাবে কাজে লাগাতে পারেন তার ওপর-ই নির্ভর করে তাঁর লেখকত্বের মান। তক্ষ ভাবছিল, শুধু গার্হস্থ্যর নাটক-ই নয়, হয়তো বেশির ভাগ নাটকের-ই মহড়া থেকে উঠে এসে, মঞ্চে বাসা বাঁধা হয়ে ওঠে না। ‘রূপমতী’ কী আর কখনো হবে? পনেরোদিন অনেক-ই লম্বা সময়। বোকা, ওর নাক থেঁতো হয়ে যাওয়ার পর নাকি সুরে ঠিক-ই বলেছিল ‘‘দেঁয়ার আঁর মেঁনি এ স্লিপস বিটউইন দ্যাঁ কাঁপ অ্যাণ্ড দ্যাঁ লিপস। যা জমিয়ে তুলেছিল ওরা, সব-ই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। বিজয়া-ম্যুডও চলে যাবে লোকের। বোধ হয় হবে না আর ‘রূপমতী’।
আর তিনদিন বাদেই কোজাগরি পূর্ণিমা। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারধার। আজকে স্কুটারটা আনেনি তক্ষ। কাল সকাল থেকেই হর্নটা বাজছিল না। আনোয়ারের দোকানে দিয়ে দিয়েছিল কাল সন্ধেতেই। কথা আছে, আজ রাতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে আনোয়ার নাগেশ্বরের জিম্মাতে।
বুকের মধ্যেটা যে, একটু ফাঁকা-ফাঁকা লাগছিল না, তা নয়। তবে এই চাঁদের রাতে কাঁকরের ওপর হিম-পড়া মিষ্টি-গন্ধভরা পথে আস্তে আস্তে ভাবতে ভাবতে হেঁটে যেতে বেশ, ভালোও লাগছিল। পথের দু-পাশে শালগাছের ছোটো ছোটো জটলা। গাঢ় হয়ে যেন কানাকানি করছে ওরা! মেহগনিও পুঁতেছিল সাহেবরা। ফাঁক ফাঁক করে। মহিরুহ। আদিবাসী ও অন্যান্য গরিব মানুষেরা এখন প্রাচীন মেহগনির বুক-পিঠ খাবলে খাবলে তুলে নিয়ে গিয়ে, জ্বালানি করে ঝিরাটোলির ভদ্রলোকদের বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে। ইংরিজি খবরের কাগজে জ্বালাময়ী ভাষায় ইকোলজি আর বন-সংরক্ষণ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ লেখা-শিক্ষিত মানুষেরাই সেই জ্বালানির বোঝা কিনে চা এবং ডাল-ভাত রান্না করে খাচ্ছেন দু-বেলা। শিক্ষা ব্যাপারটার মতো একটা বাজেশব্দ আর দ্বিতীয় বোধ হয় নেই। ডিগ্রি এবং ভালো বাংলা বা ইংরিজি লিখতে-বলতে পারার সঙ্গে শিক্ষার কোনোই সাযুজ্য যে নেই, এই দেশে এ-কথাটা বার বার-ই মনে হয় তক্ষর।
কোকিল ডাকছে অসময়ে ডানদিকের ঢালু জমির ওপরের সোনাঝুরি গাছ থেকে। ওর পুলকভরা ডাক শুনে মনে হচ্ছে, ও-ও পাগলা হয়ে গেছে দুখিয়া পাগলার মতোই! সাড়া দিচ্ছে তার দোসর, পথের বাঁ-দিকের একটি মস্ত অমলতাস গাছের ডালে বসে। সময় মানে না এখন কেউই। কোকিলও মানেনি।
এক ঘোরের মধ্যেই হেঁটে চলেছে তক্ষ একা একা। এই মেলা-ভাঙা রাতে নারীসঙ্গর জন্যে ওর হতাশ মনটা আকুলি-বিকুলি করছে। শুনেছে ডাকাতরা ডাকাতি বা মানুষ খুন করে আসার পর তীব্রকামে জরজর হয়। আর ইন্টেলেকচুয়ালরা কি আশাভঙ্গতার পর? কে জানে? আজ গান্ধারী যদি আসে ওর কাছে, একটা কিছু ঘটে যাবে। এই রাতের অনুষঙ্গর ভূমিকাটুকুও খুব কম নয়। পরিবেশের অনুষঙ্গের তারতম্যে কত কীই যে, ঘটে যায় এক একজন মানুষের জীবনে! তক্ষর জীবনে এতদিনেও কেন ঘটল না তেমন কিছু? কল্পনায়, জোড়াখাটে একা শুয়েই কি চিরদিন নারীশরীরের সান্নিধ্যর মহড়া দিয়েই কেটে যাবে এই জীবন? পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ইন্টেলেকচুয়ালও যে, শরীর ছাড়া বাঁচে না। নারীদের কথা নারীরাই বলতে পারে। পুরুষদের শরীর বড়ো কষ্টের। বড়োই!
তক্ষ রায় এই জীবনে কোনো অভিশাপ নিয়েই জন্মেছিল। সেই অভিশাপ তার মুখটিতে আঁকা হয়ে গেছে। এই মুখে চেয়ে পৃথিবীর কোনো কুকুরিরও প্রেম জাগে না মনে।
‘....কেন তারার মালা গাঁথা, কেন ফুলের শয়ন পাতা, কেন দখিন হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে? যদি প্রেম দিলে না প্রাণে কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে? তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন আমার হৃদয় পাগল-হেন তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে...যদি প্রেম দিলে না প্রাণে’।
রীতি এই গানটি বড়ো ভালো পায়। গান খুব-ই ভালো জিনিস। রবীন্দ্রনাথের গান তো বটেই। তবে কখনো কখনো তক্ষ রায়ের মতো ইন্টেলেকচুয়ালেরও শুধুমাত্র গান শুনেই সব খিদে মেটে না। গান, সে যত ভালো গান-ই হোক না কেন, পূর্ণজীবনের একটি দিক-ই মাত্র। পূর্ণতা অনেক-ই বড়ো এবং গভীর ব্যাপার।
ফাঁকা পথে, উলটোদিক থেকে মনে হল, খুব জোরে একটা সাইকেল আসছে চাঁদের আলোয় ভেসে। দূরাগত সাইকেল থেকে একটি নারী ও একটি পুরুষ কণ্ঠস্বর জোর হচ্ছে ক্রমশ। কাছে আসতেই দেখল তক্ষ যে, রীতি আর রুন।
তক্ষদা? এখনও বাড়ি যাননি? সাইকেল জোরে ব্রেক কষে থামিয়ে দু-দিকে দু-পা নামিয়ে দিয়ে বলল রুন।
না:। এই-ই তো যাচ্ছিলাম।
লুকিয়ে ছিলেন কোথায় এতক্ষণ?
রীতি বলল।
লুকোইনি তো! আড়ালে ছিলাম। মহুয়া-তলায়।
মনে মনে বলল, আমার যা রূপ! এ কী লুকোনো যায়? চাঁদের আলোয় তো বিশেষ করে।
মুখে বলল, তোমরা? ফিরলে যে আবার?
আমার হাতঘড়িটা ফেলে এসেছি মেয়েদের গ্রিনরুমে। মেক-আপ ম্যানরা সবাই কি চলে গেছেন?
হ্যাঁ বোধ হয়। কাউকেই তো দেখলাম না। তবে দারোয়ান আছে।
আছে? বা:। আচ্ছা। এগোই তাহলে আমরা। দেখি। পাওয়ার আশা কম। কে নিয়ে গেছে? কাকে ধরব এখন?
পাবে। মানুষের ওপর বিশ্বাস রেখো।
রীতি উত্তর দিল না। না-বলে-বলল, বেশি জ্ঞান দেয়!
রুন প্যাডলে জোরে চাপ দিল। ‘কিরকির’ আওয়াজ করে এগিয়ে গেল সাইকেলটা।
বলল, চললাম।
তক্ষ বলল, এসো।
তক্ষ এখন হিসিডার মোড়ে এসেছে। এখন আর ফিরে-আসা রীতিদের সঙ্গে দেখা হবে না। ওর পথ ওদের থেকে অনেক দূরে বেঁকে গেছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো সেগুন গাছ একটি দ্বীপের মতো ঘিরে আছে জলিমেমের পোড়ো বাংলোটা। ছেলেবেলায় রিফর্মেটরির পাশের মাঠে স্কুলের ফুটবল ম্যাচ খেলে সাইকেল নিয়ে যখন-ই ফিরত, অন্ধকার হয়ে গেলেই; এই জায়গাটায় এসে ভয় করত ওর খুব-ই। মা এবং অন্যান্যদের কাছে শুনেছিল যে, জলি মেমসাহেব নাকি খুব-ই কুশ্রী দেখতে ছিলেন। কোনো অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান-ই তাঁকে বিয়ে করেনি। বান্ধবীও করেননি তাঁকে। তাঁকে চায়নি কোনো শিক্ষিত ভারতীয়ও। সুন্দর পিয়ানো বাজাতেন জলি মেমসাহেব। লেখাপড়া করতেন খুব। দারুণ লাইব্রেরিও ছিল নাকি। গভীর রাতে তাঁর পিয়ানো শুনে অনেক পুরুষ-ই নিশির ডাকের মতো ঘুমঘোরে হেঁটে যেতেন দরজা খুলে। তারপর পাগল হয়ে যেতেন। গান্ধারীর নিজের সেজোমামাও ওইভাবেই পাগল হয়ে গেছিলেন। জলি মেমসাহেব শেষে একদিন নাকি, তাঁর মুণ্ডা পাঙ্খাপুলারকে দিয়ে জোর করে আদর করিয়ে নেন।
মেয়েরাও কি পুরুষদের-ই মতো কষ্ট পায় এই শরীরের জন্যে? জলিমেমও কি তক্ষর মতোই কষ্ট পেতেন? তাকে এই বাড়িটি লিখে দেওয়ার লোভ দেখিয়েই নাকি রাজি করান সেই বিবাহিত মুণ্ডা পাঙ্খাপুলারকে।
সেই আদরে জলি মেমসাহেব গর্ভবতী হয়ে যান। এবং যেদিন তা জানতে পান তার পরদিন-ই রিভলবার দিয়ে সেই পাঙ্খাপুলারকে আগে আর পরে নিজেকে গুলি করে মারেন। এই বাড়িতেই। ওয়ারিশ ছিল না কোনোই তাই এখন চোর-ডাকাতের আড্ডা। খুনজখম ধর্ষণ-ও ঘটে মাঝে মাঝে। রাতের পর এই মোড় সকলেই এড়িয়ে যায়। পদ্মবিলের শুনশান নির্জন পথ দিয়ে যায় লোকে তবুও এদিকে আসে না। তক্ষর আসতেই হল। কারণ ও হেঁটে বাড়ি যাবে। অন্যপথে অনেকই ঘুর হত। আরও আধমাইল হাঁটলে যদি রিকশা পায় কোনো। তা ছাড়া এতবছর জলিমেমের পোড়োবাড়িকে ভয় করত ও। আজকে কেন যেন, এক ধরনের আকর্ষণ-ই বোধ করছে। জলিমেমের সঙ্গে আজ ভারি একাত্মতা বোধ করছে তক্ষ।
ডান দিকে ঘুরে জলিমেমের বাংলোর মোড়। ঠিক সেইসময়-ই হঠাৎ ডানা ফরফর করে একটা সাদা লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে এল ওর মাথার ওপরে সেই পোড়োবাড়িটা থেকে। এসেই, লক্ষ্মীপেঁচাটা ডেকে উঠল মিষ্টিস্বরে: ‘তক্ষদা’!
চমকে উঠল তক্ষ। থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ কে যেন, ওর পিঠে নরম মেয়েলি হাত ছোঁয়াল। অমনি কর্কশ স্বরে পেঁচাটা পেঁচার-ই মতো ডেকে উঠল ‘কিঁচি কিঁচি কিঁচর কিঁচি-কিঁচর’।
খুব-ই ভয় পেয়ে তক্ষ রায় পেছন ফিরতেই দেখে, রীতি। পাশে রুন দাঁড়িয়ে আছে সাইকেল নিয়ে।
আশ্চর্য! ওদের আসার শব্দও পায়নি। জলিমেমের কথা ভাবতে ভাবতে বোধ হয়, অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল তক্ষ।
তোমরা? এ-পথে এলে যে?
আপনি একা যাচ্ছেন। জলিমেমের বাড়ি তো সামনেই। ভাবলাম, দেখেই যাই, পেতনির খপ্পরে পড়লেন কি না।
রীতি বলল।
বাবা:। ভাগ্যিস পেলাম ঘড়িটা। ঠিক জায়গাতেই ছিল। পার্ট-টুতে বিহার থেকে সেকেণ্ড হওয়ায় বাবা কিনে দিয়েছিলেন এই ঘড়িটা। ‘এইচ এম টি’ কোয়ার্টজ। হারালে, দুঃখ হত ভারি। বেচ্চারা বাবা। এই চোখ নিয়েও তক্ষ রায়ের ‘রূপমতী’ দেখতে এসেছিলেন রিকশা চেপে। চ্যাটার্জিকাকা অবশ্য ওঁর গাড়ি করে নিয়ে গেলেন ফেরার সময়। রূপমতী হওয়া হল না আমার।
তক্ষ দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। রুনকেও দিল একটা। রুন অবাক হল একটু। কখনো অফার করেনি তক্ষদা। এই প্রথম। দেশলাই বের করে নিজেরটা জ্বেলে, তক্ষদারটাও জ্বেলে দিল।
সিগারেটের ধোঁওয়া ছেড়ে তক্ষ বলল, মন খারাপ?
প্রশ্নটা করল দু-জনকেই। কিন্তু দু-জনেই বুঝল যে, রীতিকেই করা হল।
রীতি বলল, তা তো হবেই একটু। তবে বেচ্চারি বিশু। একমুহূর্ত পর বলল, কিন্তু আপনার মন-ই তো সবচেয়ে বেশি খারাপ হওয়ার কথা!
তক্ষ বলল, কেটে কেটে; আমার মনের কথা ছাড়ো। কোনো-সময়েই ভালো থাকে না তা।
তাই-ই? মাথার চুল ঝাঁকিয়ে রীতি বলল। এটা স্বাস্থ্যর লক্ষণ নয়। যাই বলুন। মাঝে মাঝে আসবেন আমাদের বাড়ি। আমিও যাব। ইহুদি মেনুহিনের নতুন রেকর্ডটা শোনাবেন তো? গেলে?
নিশ্চয়ই।
রুন বলল, আপনার জন্য কি রিকশা পাঠিয়ে দেব মোড় থেকে?
না:। ঠিক আছে। হেঁটেই যাব।
তাহলে আমরা এগোই?
বেশ।
ওরা দু-জনে কথার টুকরো-টাকরা উড়োতে উড়োতে সাইকেল ঘুরিয়ে নিয়ে ওদের পথে চলে গেল। ওরা তো যাবেই। যৌবনের আশীর্বাদে সম্পৃক্ত ওরা। যৌবন চলে না যাওয়ার আগে, যৌবন যে, কী অমূল্য সম্পদ তা কেউই বোঝে না। তক্ষও বোঝেনি। অবশ্য তক্ষর কথা...
ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল তক্ষ অনেকক্ষণ। যখন একা একা হেঁটে আসছিল এই লক্ষ্মীপূর্ণিমার আগের দ্বাদশীর চাঁদের আলোয় ভেসে ভেসে, তখন ভেবেছিল, আজ রূপমতীকেই শয্যাসঙ্গিনী করবে তক্ষ। বড়ো সুন্দর দেখাচ্ছিল রীতিকে। রূপমতী, কে জানে আরও কত বেশি সুন্দরী ছিলেন! কিন্তু অতবেশিতে প্রয়োজন ছিল না কোনো ওর। মেক-আপ নেওয়া চুমকি বসানো ঘাঘড়া, নকল হিরের সাতনরি হার আর নাকছাবিতে তীক্ষ্ণনাসা দীর্ঘাঙ্গী রীতিকে রূপমতীর থেকে যেন, একটুও আলাদা করা যাচ্ছিল না।
কিন্তু আজ বড়োই আশাভঙ্গতার দিন। মনের মধ্যে যে, এই নাটকটি মঞ্চস্থ না-হওয়াটা কতখানি বেজেছে, তা তক্ষ রীতি ও রুনের চলে যাওয়ার আগের মুহূর্ত অবধিও যেন যথার্থভাবে বুঝতে পারেনি। না:। আর মহড়া দিতে ভালো লাগে না! এক নাটক এবং কল্পনার বহুশয্যাসঙ্গিনী নিয়ে। ভিন্ন রাতে ভিন্নজন। না, না। বেলা বয়ে যায়। বেলা বয়ে যায়। চামদুর রাজবাড়িতে পেটাঘড়িতে ঘণ্টা বাজে। রাত ন-টা বাজল। এই সময় আকবরের সেনাপতি আধম খাঁ যে হোশাঙ্গাবাদে এসে পৌঁছেছে এই খবর নিয়ে ঘোড়া-টগবগিয়ে দূতের আসার কথা ছিল রূপমতী মেহালের ছাদে রূপমতীর সঙ্গে বিশ্রাম্ভালাপে-রত বাজবাহাদুরের কাছে। কত রাত এই নাটক নিয়ে কেটে গেছে। শুধু মহড়াই দেওয়া হল। মিছিমিছি!
সেগুনের পাতাগুলো সার সার ওপরে নীচে, সমান্তরালে হাতির কালো গোলাকৃতি কানের মতো দেখাচ্ছিল রুপোলি রাতে। সেগুনের গায়ের গন্ধ ভাসছে থম-ধরা হিম-পড়া রাতে।
জলি মেমসাহেবের এই বাড়িতে দিনের বেলাতেও বদ-মতলব ছাড়া কেউ কখনো ঢোকার সাহস করে না। কেমন দেখতে ছিলেন এই জলি মেমসাহেব? তক্ষর চেয়েও কুশ্রী কি? যদি তাঁর বয়স বছর ত্রিশেক কম হত আর তক্ষর, বছর-ত্রিশ বেশি অথবা রীতির বছর বারো বেশি? যা হলে হত, তা খুব কম-ই হয়, এ-সংসারে।
আজ বাড়ি যাবে না ঠিক করল তক্ষ। কাঁধের ঝোলা থেকে ডিরেক্টর স্পেশ্যালের বোতলটা বের করল। নাটকের পর সেলিব্রেট করবে ভেবে এনেছিল। বোকাটা এমনিতে খায় না। তক্ষ দিলে হয়তো খেত। তক্ষ নিজে তো নিয়মিত খায় না। গান্ধারীর সঙ্গে খেয়েছিল সেদিন। অনেকদিন পর। আজ আবার।
বোতলটা খুলেই ঢকঢকিয়ে মুখে ঢালল অনেকখানি। নিট। মুখ বিকৃত হয়ে গেল ওর। পেটের মধ্যে ‘চিন চিন’ করে উঠল। সেগুনের ছায়ার ঘন অন্ধকারের মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকে গেল ঘোরের মধ্যে তক্ষ রায় জলি মেমসাহেবের খোঁজে। নেশার ঘোরে নয়। ওর মস্তিষ্কের মধ্যে অন্য ঘোর লেগেছিল। না, না। না। আজ আর কোনো মহড়া নয়। মহড়া দিয়ে দিয়ে বড়োই ক্লান্ত হয়ে গেছে ও। কী পরে আছেন জলি মেমসাহেব এখন তা কে জানে। নাইটি কি? কী রঙের? এখন কি তিনি পিয়ানোর সামনে বসে আছেন? কী বাজাচ্ছেন? মোৎজার্ট? নাকি মেণ্ডহেলসন?
কে যেন, হঠাৎ তক্ষকে বলল সংক্ষিপ্ত নীচুগ্রামের যৌনতামাখা গলায়: ‘হাল্লো! হাল্লো!’
চমকে উঠে, পোড়ো-বাড়ির বারান্দায় তাকাতেই কী একটা, ছোট্টপাখি জংলি কেলাউন্দা ঝোপ ছেড়ে সোজা আকাশের দিকে। আবার বলল ‘হাল্লো! হাল্লো! হাল্লো!’
গা ছমছম করে উঠল তক্ষর। তবু, ও এগিয়ে চলল। বারান্দায় এসে উঠে আবারও বোতলটা খুলে মুখে ঢালল। মস্তিষ্ক অবশ হলে ভয়ও নাম-না-জানা পাখিটার-ই মতো উড়ে যাবে।
গাছগাছালির ফাঁক-ফোকর দিয়ে আসা হিমের রাতের চাঁদের আলো বাদামি-রঙা ইট-বের হয়ে থাকা বারান্দাটার ওপরে আলো-ছায়ার ডোরাকাটা গালচে বিছিয়ে দিয়েছে। লিভিং রুমের সিঁড়ির ওপরে উঠে, সেই ডোরাকাটা গালচের ওপরে আস্তে করে বসল তক্ষ। লাল ধুলো জমে আছে পুরু হয়ে! কুশনের কাজ করল। বা:। বোতলটা হাতে রেখে, ব্যাগটাকে বালিশের মতো করে, পেছনে রেখে হেলান দিল।
ভেতরে কে যেন, কথা বলছে। খুব চাপা গলায়। জলি মেমসাহেব?
কান খাড়া করল তক্ষ।
বাইরের পৃথিবী নির্জন। কিন্তু বা'য়। কত ফিসফাস রাতপাখির দীর্ঘশ্বাস; মেঠো ইঁদুরের গায়ের খুদের গন্ধ এই চাঁদের রাতের সেগুনগন্ধী পোড়োবাড়িতে মিশে রয়েছে। জলিমেমসাহেব-ই কি? কে জানে? তোমার গায়ের গন্ধ কেমন ছিল গো? তুমি কুশ্রী বলে, ‘তুমি যে, নারী’ —এই কথাটি পর্যন্ত কি কোনো পুরুষ স্বীকার করতে চায়নি? তোমার সুন্দর ফিগারের তোমাকে ‘তুমি’ই বলি। যে আত্মার কাছে থাকে সে তো আত্মীয়ই! তোমার ঘুম-পাড়ানো অথবা আগুন-জ্বালানো পিয়ানো-বাজানোতেও কেউ কি আকৃষ্ট হয়নি? যেমন হয়নি, কোনো নারী, তক্ষ রায়ের এত্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও। মুখের দাম, মুখোশের দামের চেয়েও অনেক-ই কম; যদি সে মুখ কুশ্রী হয়। তাই না জলি মেমসাহেব? যা হয়ে গেছে। আর হবে না। তক্ষ রায় আজ থেকে যক্ষ হয়ে পাহারা দেবে তোমাকে। তুমি হয়ে যাবে যখের ধন। কেউই আর অবহেলা করতে পারবে না তোমাকে! তোমার দুঃখ বোঝে, বুঝেছে এমন পুরুষ অন্তত একজন আছে এই নিষ্ঠুর মুখের-সৌন্দর্য-সর্বস্ব পৃথিবীতে। মন কেউই দেখে না, দেখে না গুণ; শুধু মুখ-ই দেখে। এমনকী মুখোশও।
প্রতিমুহূর্তর ঘড়ি-সর্বস্ব মহড়াময় অস্তিত্বর হাত থেকে তক্ষ রায়ও মুক্তি চায়। জলি মেমসাহেবের-ইমতো। কিছু মানুষ সংসারে আসে বটে, কিন্তু তাদের জায়গা দেয় না সংসার। কোল পেতে দেয় না শুতে। ছায়া দেয় না একটুও, তাদের হাতে হাত, ঠোঁটে ঠোঁট, বুকে বুক, রাখে না তারাও; যাদের সে, সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। কোয়াসিমোদোর-ই মতো এসমারেলডারা তাদের দেখে আতঙ্কিতই হয় শুধু। তাদের শুধুই সভাতে মালা পরায়, ঘন ঘন ফোটো তোলে ফ্লাশ-বালব নিয়ে, বাড়ির দরজা অবধি এক-শো নারী এসে পৌঁছে দিয়ে যায়, ঘটা করে পরমবিনয়ের সঙ্গে।
বাড়ির মধ্যে কেউই ঢোকে না। শোয়ার ঘরে তো নয়ই!
বোতলটা ব্যাগ থেকে আবারও বের করতে গিয়ে হাতে কী যেন, ঠেকল। ছুরিটা! রেমিংটনের ছুরি একটা। শেষদৃশ্যে রীতির ওরফে রূপমতীর কোমরে খাপসুদ্ধু এই ছুরিটা থাকার কথা ছিল। ভালো ছুরি প্রোডাকশান ম্যানেজার কানাই জোগাড় করতে পারেনি বলে, তক্ষ নিয়ে এসেছিল ব্যাগে ভরে অফিসে যাওয়ার সময়। খাপটাতে নিজে হাতে রং করেছিল সময়ানুগ করার জন্যে। এটা তক্ষর বাবার ছুরি। বাবার শিকারের শখ ছিল। জানোয়ার মেরে চামড়া ছাড়াতেন তিনি এটা দিয়ে।
আঃ। কী দারুণ যোগাযোগ। ও জলি। কোথায় গেলে তুমি? এ-বাড়ির কোন ঘরে তুমি নিজের এই কষ্টর জীবন নিভিয়ে দিয়েছিলে? এখন কী মজা বলো তো? যক্ষর ঔরসে যক্ষিণী কি গর্ভিণী হবে? জানা নেই। ছেলেমেয়ে কে চায়? আমার ও তোমার সহবাসের সন্তান? সে যে, অসম্ভব কুশ্রী হবে। আমার এবং তোমার কুশ্রীতার আগুন হাওয়া পাবে তাতে। পৃথিবীর সব লোক-ই তাদের দিকে চেয়ে আঁতকে উঠবে ঘেন্নায়। কুশ্রী হওয়ার যে, কী দুঃখ তা, শুধু কুশ্রীরা জানে। নাগো জলি? আর মহড়া নয়। আজ রাতে একটি সত্যি নাটক, দারুণ নাটক, যক্ষলোকের নাটক মঞ্চস্থ হবে এই চাঁদের আলো আর ছায়ার ডোরাকাটা গালচের ওপর মেণ্ডহেলসনের ওপাস চোদ্দোই মেজর এ, পিয়ানোতে। ‘‘রেণ্ডো ক্যাপ্রিসিওসো’’ বাজিয়ে চাঁদের আলোয় ভেজা সেগুনবনে ঝড় তুলবে তুমি; জলি। আমি বাজবাহাদুর হব, তুমি রূপমতী; স্বল্পক্ষণের মধুক্ষরণের মৌমাছি। রানিই হোয়ো তুমি। মৌমাছি রানি।
বোতলটা প্রায় শেষ করে, ছুরিটা খাপ থেকে বের করে ডান হাতে ধরে, বাঁ-হাতের কবজির ওপর চেপে ধরতে যাবে যেই যক্ষ হতে-চাওয়া তক্ষ, ঠিক সেইসময়েই জলি মেমসাহেবের অন্ধকার লিভিংরুমের ভেতর থেকে প্রচন্ড জোরে কে যেন, চিৎকার করে উঠল: ‘ক্যা কিয়া, ঔর মিল্যা ক্যা? হ্যা:। হ্যা:। হ্যা:।’
ভয়ে, চমকে উঠল তক্ষ। যক্ষ হওয়া হল না ওর। অন্ধকারের ভেতর থেকে অন্ধকারতর একটি ছিপছিপে ছায়ামূর্তি উড়ে এসে রুপোঝুরি বারান্দায় পৌঁছেই যেন, রুপোর মূর্তি হয়ে গেল।
দুখিয়া? দুখিয়া পাগলা?
অবসন্ন ক্লান্ত, হতাশ কণ্ঠে বলল তক্ষ।
আবার বলল, স্বগতোক্তির মতো; দুখিয়া?
জি হাঁ। ক্যা কিয়া, ঔর মিলা ক্যা?
বলেই, ওর গাঁজার কলকেটা এগিয়ে দিল তক্ষর দিকে।
সেটাকে হাত বাড়িয়ে নিল তক্ষ। কিছু না ভেবেই। ছুরিটা ব্যাগের মধ্যে রেখে দিল, আস্তে আস্তে।
দুখিয়া বলল, আমি বড়ো পাপী বাবু। ভেবেছিলাম, এই নতুন নির্জন জায়গায় এসে আমার সিদ্ধি হবে। হল না। রোজ-ই যা হয় আজও তাই-ই হল, এই কথাটা...
তক্ষ দুখিয়ার কথা বুঝতে পারল না। বোঝার চেষ্টাও করল না। ওর নেশাও হয়েছিল বেশ, অত তাড়াতাড়িতে অতখানি নিট হুইস্কি খেয়ে। গাঁজার কলকেটা ফেরত দিল দুখিয়াকে।
তারপর উঠে পড়ল বারান্দা থেকে।
দুখিয়া হেসে উঠল। বলল, পালিয়ে যাচ্ছ? পালাবে কোথায়? নতুন জায়গায় যাচ্ছ? হি: হি:। সিদ্ধি নেই। মুক্তি নেই। প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেকটা রাত একইরকম। হুবহু। যা করে যাচ্ছ তাই-ই করে যেতে হবে। যা চাইছ তা চাওয়া হয়েই থাকবে কল্পনায়, সত্যি হবে না কোনোদিনও। যেমন, আজ তোমাদের যাত্রাটা হল না। মাংস-লুচি খাওয়া হল না আমার। কত্তবছর খাইনি।
তক্ষ বলল, চলো দুখিয়া আমার সঙ্গে। খাওয়াব তোমাকে।
সত্যি? লুচি-মাংস? দুখিয়ার দু-চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল লোভে। বলল, হ্যাঁ। চলো। কেন জানি না, লুচি-মাংসর জন্য মন উচাটন হয়েছে আজ। আমি জানি, আমার মুক্তি নেই। এখনও এই ছোটো ছোটো লোভে আটকে আছি।
দুখিয়া বলল, তবু, চলো। একটা স্বপ্ন সত্যি হোক তবু।
দ্বাদশীর চাঁদের মোহময়তায় পোড়োবাড়ির বাগানের ঝুঁকে-পড়া গাছগাছালির ডোরাকাটা সাদা-কালো আলো-ছায়ার গালচে মাড়িয়ে শ্লথপায়ে এগিয়ে চলল দু-জন লক্ষ্যভ্রষ্ট মানুষ।
সেই পাখিটার বাসা বোধ হয় এই বাগানেই। ছায়ামূর্তির মতো ওদের দু-জনকে চলে যেতে দেখে পাখিটা আবার সেই অদ্ভুত ‘হাল্লো। হাল্লো’। বুক চমকানো ডাক ডাকতে ডাকতে ফিরে এল চাঁদের রাতে ভেসে।
ওদিকে তাকাল না আর তক্ষ।
জীবনের খুব বেশি বাকি নেই আর। বার বার, পেছনে ফেরার সময় নেই। নাম না জানা রাতপাখি ছাড়া ওকে ‘‘হাল্লো’’ বলবে না আর কেউই। বড়োই একা লাগে। কুশ্রীমুখটি আর অনুক্ষণ চিন্তাক্ষরিত মস্তিষ্ক নিয়ে অনেক মান-সম্মান যশ-এর বালাপোশে নিজেকে মুড়ে রাখা সত্ত্বেও মানুষের মতো বেঁচে থাকতে বড়োই কষ্ট। এইরকম একাকিত্বর কষ্ট হয়তো বিধাতা শুধু স্বল্পসংখ্যক মানুষদের-ই দিয়েছেন। এই কষ্টর কথা সকলের বোঝারও নয়!
দূরে ঘুঙ্ঘটটোলির আলো দেখা যাচ্ছিল! কয়েকটি সাইকেলরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। পানের দোকানের আয়নাতে পথ-পাশের ফিকে জ্যোৎস্না অন্ধকারের সঙ্গে মিশে প্রতিফলিত হয়েছে। যারা পারে, যাদের মানসিকতা অন্যরকম, তারা কত সহজে তাদের শরীরের একাকিত্ব ঘুচিয়ে নিচ্ছে ঘুঙ্ঘটটোলির দেহ-পসারিনিদের কাছে গিয়ে।
তক্ষ পারে না, পারেনি।
দুখিয়া আবারও নিজের মনেই বলল কী মজা! লুচি-মাংস খাব আজ।
ম্লান হাসি হাসল তক্ষ। বলল, খাবে। চলো।
দুখিয়া কত সহজে সুখী হতে পারে। ঈর্ষা হল ওকে খুব।
মাংসই রেঁধেছে আজ নাগেশ্বর। বেশি করে আনতেও বলেছিল। সকাল থেকেই তক্ষ ঠিক করেছিল যে, ‘রূপমতী’ সাকসেসফুলি মঞ্চস্থ হওয়ার পর বোকার সঙ্গে হুইস্কি খাওয়ার পর এই রাতে...।
ভেবেছিল, এই দ্বাদশীর রাতে সব কাজ শেষ করে কোনো নরম পাখির মতো সাথিকে সঙ্গে করে তার নদীপারের নির্জন বাসে ফিরবে। তার জন্যে আসন পেতে রেখে এসেছিল, লুচি-মাংস খাওয়াবে বলে। বিছানায় বুনোফুল ছড়িয়ে রাখতে বলেছিল নাগেশ্বরকে। ভেবেছিল, ‘রূপমতী’ নাটকের-ই মতো আজ ওর জীবনের মহড়া-ক্লান্ত এক বিশেষ নাটকও মঞ্চস্থ হবে!
ভেবেছিল...
এসেছে সাথি। কিন্তু অন্য সাথি।
বহুদূর থেকে নদীর গন্ধ ভেসে আসছিল। কোজাগরি পূর্ণিমার তিন-চাঁদ আগের চাঁদের চাল-ধোওয়া জলের মতো তরলিমায় পৃথিবীর শরীর ভেসে যাচ্ছে। নাক তুলে গন্ধ নিল তক্ষ। বনজ-গন্ধর সঙ্গে—রাতের গায়ের গন্ধর সঙ্গে নদী থেকে আসা জলজ সব গন্ধ মাখামাখি হয়ে রয়েছে। একটা ‘টি-টি’ পাখি ডেকে ফিরছে ঝাঁটি জঙ্গলের ওপরে ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে।
নারীর আর নদীর গন্ধ অনেক-ই দূর থেকে পায় ও। দূরের গন্ধ দূরে—তবু পায় এখনও—
দুখিয়া লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছিল সামনে সামনে, মাথায় গামছাটা পাক দিয়ে বেঁধে। মুখ ফিরিয়ে বলল ও, পাঁঠার মাংস? পাঁঠার মাংস তো সত্যিই?
হ্যাঁ! পাঁঠার-ই মাংস।
কে রেঁধেছে? তোমার বউ?
না।
দুখিয়া যেন, উড়ে চলেছিল। গাঁজা খেলে বোধ হয় শরীর হালকা হয়ে যায়।
দুখিয়া আবারও বলল, বউ নয় তো কে তবে?
সে আছে একজন।
থাকলেই হল কেউ। গিরস্থি মানুষের আওরাত ছাড়া চলে? আচ্ছা, ঝাল দিয়েছে তো সে মাংসের ঝোলে?
দিয়েছে। দেয় তো।
বড়ো বড়ো আলু থাকবে? ঘি? গরমমশলা? আঃ।
জানি না। বোধ হয় থাকবে।
অন্যমনস্ক গলায় তক্ষ বলল, দুখিয়াকে।
সব সময়েই খুব বেশি করে ঝাল দিতে বলবে রান্নায়। জিভে স্বাদ আসবে। ঝালে; বিস্বাদ পালায়। জানো তো? জিভের; জীবনের।
জানি।
তক্ষ বলল।
বলেই, দুখিয়া পাগলার দিকে চমকে তাকাল। ভাবল, সত্যিই কি জানে?
চাঁদের আলোতে দূরের আঁকা-বাঁকা কারো নদীর দুই পারের আবছা গাছপালা আর ঝাঁটি জঙ্গলের ছায়া, নদীর মধ্যে আলো জ্বেলে মাছ-ধরা মুণ্ডা পুরুষদের কথা-বার্তার ভেসে-আসা টুকরো-টাকরায়, এই রাত, বড়ো মোহময় হয়ে উঠেছে। চলতে চলতে তক্ষর মনে হল যে, এই মোহাবিষ্ট প্রকৃতির মধ্যেও যেন, কোনো নাটকের মহড়া চলছে এই মুহূর্তে। কোনো সর্বলোকের যাত্রার বিবেকের-ই মতো তার-ই মধ্যে একলা ‘টি-টি’ পাখিটা ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে, উড়তে উড়তে প্রায় অসংলগ্ন পা-দুটি নাড়িয়ে-নাড়িয়ে জ্যোৎস্না চাড়িয়ে, চাড়িয়ে ঘুরে ঘুরে তার ভূতুড়ে ডাক ডাকছে বারে বারে: ‘হট্টি-টি-হট-টি-টি-টি-হট’।
পাখিটা নিশ্চয়ই জানে, যেমন তক্ষ জানে যে; ওই চাঁদের রাতের প্রকৃতির মধ্যে, যে-নাটকের মহড়া চলেছে তাও কোনোদিনও মঞ্চস্থ হবে না।
মহড়ার-ই আর এক নাম ‘জীবন’!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন