প্রথম অধ্যায়

মতি নন্দী

এই একটু আগে মা বাবাকে খুব তিরস্কার করেছে। বকেছে বললুম না, কারণ আমার বাংলার মাস্টারমশাই বলেছেন, ‘সবসময় ভাল ভাল বাংলা শব্দ ব্যবহার করবে। বাংলা যদি শিখতে চাও বাঙালী হও। মাটিতে আসন পেতে কাঁসার থালায় ভাত খাবে, কাঁসার গেলাসে জল খাবে। স্নান করে গামছায় গা মুছবে। গায়ে ঘষে ঘষে সরষের তেল মাখবে। এখন ছোট আছ, হাফপ্যান্ট পরো ক্ষতি নেই। বড় হয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরবে।’

আমি তখন মশারির ভেতর চুপটি করে শুয়ে আছি। ঠিক ভোর পাঁচটায় ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে। আমার দাদু আমাকে জন্মদিনে ঘড়িটা উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘বুড়ো, আমার তো যাবার সময় হল, তোকে আজ আমি তিনটে কথা বলে যাই। তিনটে উপদেশ। রোজ ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে বিছানা ছাড়বি। রোজ ঝড় হোক, জল হোক ব্যায়াম করবি, পরিষ্কার ঠাণ্ডা জলে চান করবি। আর কাজ ফেলে আড্ডা মারবি না।’

এই কথা বলার সাতদিন পরেই সন্ধেবেলা দাদু হাসতে হাসতে মারা গেলেন। বিছানায় বসে আমাকে হরিদ্বারের গল্প বলছিলেন। গল্প আর শেষ হল না। কত দূর অবধি বলেছিলেন, আমার মনে আছে। দাদু যেখানে গেছেন, আমাকেও তো একদিন যেতে হবে সেখানে। গিয়ে দেখব, বিশাল বড় এক বাগানে দাদু বসে আছেন গাছতলায়। আমি গিয়েই তাঁর পাশে বসে পড়ব পা ছড়িয়ে। স্বর্গে তো মানুষের কোনও কাজ থাকে না। শুধু গান আর গল্প। পরীক্ষা দিতে হয় না, চাকরি করতে হয় না। কেউ কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না। ‘ভোট দিন, ভোট দিন,’ বলে ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে না। বোম ছোঁড়ে না। ক্রিকেটে ভারত পাকিস্তানের কাছে গো-হারান হেরে মন খারাপ করে দেয় না। হারবে কি, স্বর্গে তো ক্রিকেট খেলাই হয় না। সেখানে ভগবান শুধু মাঝে-মাঝে দাবা খেলেন। গাছে-গাছে এক রকমের মিষ্টি ফল ঝোলে। যেই খিদে পাবে অমনি পেড়ে খাও। শরবতের নদী। সন্দেশের পাহাড়। নীল-নীল পাখি ডালে বসে শিস দিচ্ছে। এদিক ওদিক দু’চারটে কথা বলেই দাদুকে বলব, ‘গল্পটা বলুন। সেই সন্ধেবেলা চণ্ডীপাহাড় থেকে নেমে এলেন, এসে দেখলেন এক সন্ন্যাসী ধ্যানে বসেছেন। চারপাশে শুধু নুড়ি আর নুড়ি। হড়হড় করে ছুটে চলেছে গঙ্গার জল। শেষ সূর্যের আলোয় পাহাড়টাকে মনে হচ্ছে সোনার পাহাড়⋯’

দাদু আমাকে যা-যা বলেছেন আমি সব সেইভাবে করি। আমার ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজলে, বাবা-মা দু’জনেই উঠে পড়ে। না উঠে উপায় আছে! সে যা অ্যালার্ম! থেমে থেমে সাত বার বাজবে। আর আমার একটা লোমঅলা সাদা কুকুর আছে। ভারী লক্ষ্মী ছেলে। নাম তার পিঙ্কা। সে ওই অ্যালার্ম ঘড়িটাকে একেবারে পছন্দ করে না। তেড়ে তেড়ে যাবে আর ঘেউঘেউ করবে। কারও ক্ষমতা আছে আর ঘুমোয়! আমি তবু শুয়ে ছিলুম। বাবা মুখ ধুয়ে এসে মা’কে বললে, “আমার কাছে কিন্তু বাজার করার মতো আর টাকা নেই।”

মা বললে, “সে আবার কী? পরশু তোমাকে দুশো টাকা দিয়ে বললুম, এই আমার শেষ। মাসের আর সাতদিন আছে, এইতেই কোনও রকমে হিসেবটিসেব করে চালাতে হবে। কী করলে, সে-টাকা?”

বাবা বললে, “বিশ্বাস করো আমি নিজের জন্যে এক পয়সাও খরচ করিনি। টাকাটা একজনকে দিতে হল।”

“একজনকে দিতে হল মানে? কাকে দিলে? কেন দিলে?”

“আমাদের অফিসের পিওন মধুকে দিয়েছি। বেচারা বড় বিপদে পড়েছে। মানুষের যে কতরকম বিপদ হয় বুঝলে! সে তুমি ধারণা করতে পারবে না। হঠাৎ। একেবারে হঠাৎ। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিন বছরের বাচ্চা মেয়েটা খেলছিল। খেলতে খেলতে, সোডা-সাবান গোলা গরমজলের গামলায়। ইস, অতটুকু মেয়ে! কী যে এখন হবে। বাঁচবে তো!”

বাবার মুখটা কাঁদো-কাঁদো হয়ে গেল। আমার মায়ের কিন্তু কিছুই হল না। মা বড়-বড় চোখ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আমি মশারির ভেতর থেকে বললুম, “বাবা, তুমি ভেবো না, ও ভাল হয়ে যাবে। এক মাসের মধ্যে একেবারে ফিট হয়ে যাবে।”

মা তখন গড়গড় করে বাবাকে এক গাদা কথা শুনিয়ে দিলে, “হ্যাঁ, তোমার লোকের জন্যে দরদ একেবারে উথলে ওঠে। প্রতি মাসেই একে দুশো, ওকে একশো। তোমার কি জমিদারি আছে? অ্যাঁ, আমি বলে টেনে-টেনে এত কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছি। আমার দিকে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করো না। আমার শাড়ি ছিঁড়েছে। তোমার জুতো ছিঁড়েছে। ছেলেটার কোথাও পরে যাবার মতো ভাল জামা-প্যান্ট নেই।”

আমি সঙ্গে-সঙ্গে বললুম, “আমার জামা-প্যান্ট দরকার নেই। আমার যা আছে, অনেক আছে।”

আমি বাবার দলে। মা র খালি হিসেব। একটা ডায়েরি আছে, তাতে খালি লিখবে, আলু, এক কেজি। করলা, দুশো। টোম্যাটো, এক কেজি। ডায়েরিতে ওসব কেউ লেখে! লিখে কী হয়? খাব। ফুরিয়ে যাবে। পয়সা থাকে আবার আনব। না থাকে, ভাতে জল ঢেলে নুন মেখে খাব। কী সুন্দর লাগে। আমি তো প্রায়ই তাই খাই। বাবা আমাকে বলেছেন, “দ্যাখ বুড়ো, আমরা কিন্তু বড়লোক নই। আমাদের একটু কষ্ট করেই চলতে হবে। আমার না টাকাপয়সাটা ঠিক আসে না। ওসব আমি পারি না, বুঝলি! আমি না তোকে রোজ মাছ, মাংস, কালিয়া, পোলাও খাওয়াতে পারব না। চুক্তি। সারেণ্ডার।”

আমি বলেছি, “ওসব আমি খেতে চাই না।”

বাবার সে কী আনন্দ? বললে, “হাত মেলাও?”

আমার দাদু ছিলেন শিক্ষক। হরেন্দ্রনাথ বিদ্যানিকেতনের হেডমাস্টার। বাবার মুখেই শুনেছি, খুব কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলত। দাদু বলতেন, কষ্ট না করলে মানুষ হওয়া যায় না। আমি তো মানুষই হতে চাই। খুব বড়। আমার দাদুর চেয়েও বড়। দাদু তো আমাকে বলে গেছেন, ‘তোমাকে আমি ওপর থেকে আশীর্বাদ করব। ভগবানকে বলব, আমার একটাই মাত্র নাতি। নাতিটাকে মানুষ করে দাও ভগবান।’

মা চায়ের কাপ হাতে ঘুরছে। বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না। বকুনি খেয়ে বাবা কোথায় লুকিয়ে পড়েছে। মা আমাকে জিজ্ঞেস করছে, “বাবা কোথায় রে? কোথায় গেল লোকটা!”

আমার মায়ের খুব মজা আছে। যখন রেগে গেল, চোখ-মুখ লাল। যা মুখে আসছে, তা-ই বলে যাচ্ছে। ঠিক পাঁচ-দশ মিনিট পরে সব ঠাণ্ডা। তখন একেবারে মাটির মানুষ। দাদু বলতেন, “বুড়ো, তোর মা টা রাগপ্রধান; কিন্তু উচ্চাঙ্গের। সুর আছে, লয় আছে, তাল আছে!” আমার মায়ের সঙ্গে দাদুর খুব জমত। দাদু তো মা কে পড়াতেন। তখন যে কী সুন্দর দেখাত। মা তখন ছাত্রী। একটু বকুনি-টকুনিও হত। বাবা ওপাশে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আনন্দে নাচত। ‘ঠিক হয়েছে। ঠিক হয়েছে।’ বাবা একদিন বললে, “মাথা মোটা।”

দাদু বললেন, “তুমি দুঃখ পাবে, তা পাও, তবু বলি তোমার চেয়ে আমার বউমা’র মাথা হাজার গুণ ভাল। আর কিছুদিন সময় পেলে ওকে আমি পি. এইচ. ডি. করিয়ে যেতুম।”

দাদুর কথা বলতে বলতে মা যখন-তখন কেঁদে ফেলে। বলে, “ছেলেবেলায় বাবা মারা গিয়েছিল, যাও বা একটা বাবার মতো বাবা পেলুম, ভগবান নিয়ে নিলেন।”

বাবার মন খারাপ হলে কোথায় কোথায় থাকে আমি জানি। আমাদের বাড়ির পেছন দিকে ছোট একটা বাগান-মতো আছে। আমার দাদু খুব যত্ন করতেন। এখন মা করে, বাবা করে, আমি তো খুব করি। বাগানে দাদুর করা দুটো গাছ, একটা কৃষ্ণচূড়া আর একটা রাধাচূড়া বেশ বড় হয়েছে। কৃষ্ণচূড়াকে দাদু বলতেন, ‘আমার বাবা যোগীন্দ্রনাথের স্মৃতি। আর রাধাচূড়াটা হল আমার মায়ের স্মৃতি।’ আমার একটা দিদি হয়েছিল। সে বেশি দিন বাঁচেনি। দাদু তার নামে একটা কামিনী করেছিলেন। সেটাও বেশ গোল-মতো, ঝাঁকড়া-মতো হয়েছে।

আমার মা দাদুর নামে একটা গন্ধরাজ পুঁতেছে। বেশ হয়েছে গাছটা। গন্ধরাজের পাতা আর ফুল, দুটোই সুন্দর। বাবা সেই গাছটার তলায় উবু হয়ে বসে মাটি আলগা করে দিচ্ছে। আপন মনে ঘাসের ফলা একটা একটা করে তুলছে। কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে-ঝরে বাবার মাথায় পড়েছে। পাঁচিলের গায়ে বোগেনভেলিয়া লাল হয়ে আছে। সেই লালের আভা এসে পড়েছে বাবার সাদা গেঞ্জিতে।

আমি বাবার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে বললুম, “তুমি কী করছ বাবা? চা খাবে না? বাজারে যাবে না?”

বাবা উদাস সুরে বললে, “গেলেও হয়, না গেলেও হয়।”

আমি বাবার পাশে উবু হয়ে বসে বললুম, “তোমার রাগ হয়েছে?”

“আমার খুব দুঃখ হয়েছে।”

“তুমি দুম করে দুশো টাকা দিয়ে দিলে কেন? তাই তো মা তোমাকে বকল। সব কিছু তো বুঝেসুঝে করবে!”

“তুই হলে কী করতিস?”

“তুমি যা করেছ তাই করতুম।”

“হাত মেলা। তোর মা’টা একটা থার্ড ক্লাস।”

“মা কে থার্ড ক্লাস বলতে নেই গো। তোমার মাকে তুমি থার্ড ক্লাস বলতে পারতে?”

“তা অবশ্য পারতুম না। তবে তুই তো আমার মা কে দেখিসনি। আমার মায়ের মনটা ছিল গন্ধরাজ ফুলের মতো। ধর, আমাদের খাইয়ে-দাইয়ে মা সবে খেতে বসতে যাচ্ছেন, এমন সময় বাড়িতে অতিথি। তাকে সব বেড়ে দিলেন। মা এইবার কী করলেন, পাছে কেউ বুঝতে পারে উপোস, এক খিলি পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে ঘুরতে লাগলেন। কেউ বুঝতেই পারল না মায়ের উপোস। এই রকম প্রায় হত। প্রায় হত। আমার মা কি যে-সে মা ছিলেন! যাঃ যাঃ।”

“আমার মা ও সাঙ্ঘাতিক মা। তুমি আমার মায়ের কতটুকু জানো? আমার মা বিনা পয়সায় তিনটে মেয়েকে পড়ায়। সেদিন রমলাদির মেয়েকে ষাট টাকা দিয়ে একটা জামা কিনে দিয়েছে। জানো কি তা!”

“সত্যি! অন গড!”

“অন গড।”

আমাদের সব কথা বন্ধ হয়ে গেল। মা আসছে চায়ের কাপ নিয়ে।

“কী, তুমি চা খাবে না?”

আমি বললুম, “কেন খাবে না। চা না খেলে সকাল হয় নাকি?” মা বললে, “তোমাকে আর পাকামো করতে হবে না। এই নাও, ধরো। প্রথম চা টা ফেলে দিয়ে আমি আবার করে নিয়ে এলুম তোমার জন্যে।”

বাবা হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিল। এখনও বাবার মুখে হাসি ফোটেনি। মা একটু দূরে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। দু’ আঙুলে একটা ঘাস ছিঁড়ে দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে বললে, “দুশো টাকায় হবে তো?”

“কী হবে?”

“তোমার ওই পিওনের মেয়ের চিকিৎসা!”

“এ-বাজারে দুশো টাকায় চিকিৎসা হয়! সরকারি আপিসের পিওন আর কত টাকা মাইনে পায় বলো। তার ওপর দু’তিনটে ছেলেমেয়ে।”

“তুমি তা হলে আজ বরং আরও একশো টাকা দিয়ে দাও।”

“আর টাকা কোথায় পাব?”

“যেখান থেকে চিরকাল পাও। একটা জিনিস কিনব বলে কিছু টাকা কী করে যেন জমিয়েছিলুম, তার থেকে তোমাকে দেব। হ্যাঁ গো, মেয়েটা বাঁচবে তো!”

“ভগবানকে ডাকতে হবে। খুব করে ভগবানকে ডাকো।”

মা উঠে রান্না ঘরে চলে গেল। বাবা বললে, “দেখলি? এমন মা তুই দুটো পাবি? আর একটা তুই খুঁজে বের কর, আমার কান কেটে ফেলব।”

আমার খুব আনন্দ হচ্ছে এইবার। বাবার মুখে হাসি ফুটেছে। গম্ভীর হয়ে মন খারাপ করে থাকলে ভাল লাগে নাকি? এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি বাজারের ফর্দ হচ্ছে। বাবা বাজার করতে ভীষণ ভালবাসে, মা ভালবাসে ফর্দ করতে। এই এনো, সেই এনো।

মা বলছে, “কপিতে অরুচি ধরে গেল। কপি আর এনো না। পটল ওঠেনি?”

“উঠবে না কেন, দাম শুনলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে, বলে কুড়ি টাকা কেজি। যে সরকারই গদিতে বসুক, বাজার দরটাকে কেউই ঠিকমতো ধরতে পারছে না। ও একেবারে লাগামছেঁড়া ঘোড়া। আর আমারও ছাই হয়েছে, কিছুতেই রোজগার বাড়াতে পারছি না।”

আমি বললুম, “তুমি একটা লটারির টিকিট কেনো না বাবা!”

“ধুর, এর আগে আমি টানা একবছর লটারির টিকিট কেটেছি, পশ্চিমবঙ্গ, হরিয়ানা, অরুণাচল, কিস্যু হয়নি।”

“ধ্যানেশকাকু গত সপ্তাহে দশ টাকা পেয়েছে জানো?”

“দশ টাকা একটা পাওয়া হল?”

“তা হল না, তবে পেয়েছে তো! এইবার একদিন দশ লাখ টাকা পেয়ে যাবে।”

“আমি দশ লাখ টাকা পেলে একটা ফোয়ারা করব।”

মা বললে, “সে আবার কী?”

“ফোয়ারা। ফোয়ারা দ্যাখখানি! কলকাতার সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে আনব, এনে আমাদের ওই বাগানের মাঝখানটা গোল করে খুঁড়ে নীল পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে সুন্দর একটা ফোয়ারা। ফুস-ফুস করে জল একেবারে দোতলা পর্যন্ত উঠে যাবে, এত ফোর্স। একপাশ থেকে নীল, আর একপাশ থেকে লাল, আর এক পাশ থেকে হলদে আলো ফেলব রাতে। সে একেবারে স্বপ্ন। দুপুরবেলা ঝাঁক-ঝাঁক পাখি আসবে চান করতে। তিনটে গোলমতো গার্ডেন চেয়ার পেতে রাখব। আমরা তিনজন বসে-বসে সল্টেড বাদাম-ভাজা খাব। আর গল্প করব। একটা পাহাড় থাকলে ভাল হত।”

“পাহাড় মানে?”

“পশ্চিমবাংলার কী দুর্ভাগ্য বলো তো?

“পার্টিশান, দেশ বিভাগ?”

“ধুর, সে তো হয়ে গেছে। যা গেছে তা গেছে। পশ্চিমবাংলার আকাশটা বড় ফাঁকা। আকাশের গায়ে কেমন একসার নীল পাহাড় লেগে থাকবে। মাঝে-মাঝে সেই পাহাড়ের মাথায় মেঘ এসে জড়িয়ে যাবে। এত জায়গায় এত সব কাণ্ড হয়, পাহাড় সমুদ্র হয়, সমুদ্র পাহাড় হয়, আমাদের এখানে ছাই কিছুই হতে চায় না। জানো তো একদিন কী হয়েছে, আমি স্বপ্ন দেখছি আমাদের চিলের ছাতে উঠলে উত্তর আকাশে স্পষ্ট একটা পাহাড় দেখা যায়। ভোরের স্বপ্ন এত সত্যি মনে হল, ঠিকই তো, কোনওদিন তো চিলের ছাতে উঠিনি, উঠলে নিশ্চয় পাহাড় দেখা যায়! সেই ভোরে কোনওরকমে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠলুম গিয়ে চিলের ছাতে। ভোরের নীল আকাশ। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। তখনও চোখে ঘুম লেগে আছে। কত আশা নিয়ে উত্তরের আকাশের দিকে তাকালুম, কত ভাবে তাকালুম। কোথায় কী? তবে আমার এখনও বিশ্বাস, এ-পাড়ায় মনুমেন্টের মতো বিশাল উঁচু একটা বাড়ি থাকলে নিশ্চয় পাহাড় দেখা যেত।”

মা বললে! “কী করে তোমার এই ধারণাটা হল। তুমি তো পশ্চিমবাংলার ভূগোল পড়েছ। উত্তরে হিমালয় ছাড়া আর কিছু আছে? দক্ষিণে সমুদ্র। মাঝে সমতল-ভূমি। বাঁকুড়া আর পুরুলিয়ায় ছোটখাটো একটা-দুটো পাহাড় আছে। এখানে তুমি পাহাড় পাচ্ছ কোথায়?”

“তা অবশ্য ঠিক। তবে কখন কী হয়, বলা কি যায়!”

বাবা ঝোলাঝুলি নিয়ে বাজারে বেরিয়ে গেল। মা বললে, “বুড়ো, এবার দয়া করে একটু পড়তে বোসো।”

পড়তে তো আমি বসবই। আমাকে বড় হতে হবে। আমার দাদু কত বড় ছিলেন! এখনও সবাই তাঁর নাম করে।

সিঁড়ির তলায় ছোট্ট একটা ঘর আছে। চোর-কুঠরি। এখানে আমার দাদু ধ্যানে বসতেন। এই ঘরটা এখন আমার পড়ার ঘর। খুরখুরে একটা টেবিল-পাখা আছে। ওইতেই আমার হয়ে যায়। দাদু বলতেন, ‘বুড়ো, শরীরটাকে বেশি আয়েসি করিসনি। বেশ একটু কষ্টে রাখবি। মনের কথা শুনবি না। শুনবি বাস্তব বুদ্ধির কথা। তা হলে আর বিপদে পড়তে হবে না। যেমন ধর, ভীষণ গরম। ঠাণ্ডা আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। বাস্তব বুদ্ধি কী বলছে, গরমে আইসক্রিম খেলে গলায় ঠাণ্ডা লেগে যায়। সর্দি-কাশি হয়। ধর, মন বলছে, খেলতে যাই। পড়ার চেয়ে খেলাই ভাল। বাস্তব বুদ্ধি কী বলছে, পড়াশোনা করে শিক্ষিত না হলে, বড় অবস্থায় জীবন ঘোর অন্ধকার। আর একটা কথা মনে রাখিস, চিরকাল মানুষের সমান যায় না। আজ যে বড়লোক, কাল সে গরিব হয়ে যেতে পারে।’

দাদুর এইসব কথা আমি জীবনে ভুলব না। আমার এই চোর-কুঠরির বাগানের দিকে ছোট্ট একটা জানলা আছে। জানলাটা খুলতেই দেখি, বাবা চুপিচুপি বাগানের পথ ধরে আসছে। হাতে বাজারটাজার নেই। বুকের কাছে দু’হাত দিয়ে তোয়ালে-মোড়া কী একটা ধরে আছে।

আমি একটু জোরেই বলে ফেলেছি, “কী গো বাবা, তোমার বাজার?”

বাবা বললে, “শ্‌শ্‌।”

মুখ দেখে মনে হল, বেশ গোলমেলে ব্যাপার। বাবা আবার একটা কিছু পাকিয়ে বসেছে। আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি কী। করেছ?”

বাবা জানালার একেবারে পাশে এসে তোয়ালে সরিয়ে দেখাল। এইটুকু একটা বেড়ালবাচ্চা। সাদা ফুটফুট করছে। সর্বনাশ করেছে!

“বাবা, মা তোমাকে এইবার ভীষণ বকবে। বাড়িতে বেড়াল ঢুকিও না।”

“কী যে বলিস! কত কষ্টে এটাকে জোগাড় করেছি জানিস। এর মা হল কাবলি বেড়ালের জাত। এর মা কে তুই দেখেছিস? মান্তুবাবুদের বাড়িতে। এই মোটা ল্যাজ। বরফের মতো সাদা। মান্তুবাবুর মেয়ে মল্লিকাকে আমি কত করে বলেছিলুম। আজ দিয়ে দিলে। উঃ, কী ভাগ্য!”

“ভাগ্যে তোমার খুব দুঃখ আছে বাবা। বেড়াল দেখলেই মায়ের অ্যালার্জি হয়।”

“ধুর, সে হল গিয়ে তোর নেঙটি বেড়াল। সরু-সরু ল্যাজ। সিড়িঙ্গে শরীর। এ-সব বেড়াল হল জাতের বেড়াল।”

চমকে উঠেছি আমি। মা একেবারে আমার পেছনে। বেশ চড়া গলায় বললে, “এ কী, তুমি এখনও বাজারে যাওনি? তোমার হাতে ওটা কী?”

বাবা এক গাল হেসে বললে, “দ্যাখো না, তোমার জন্যে কী সুন্দর একটা জিনিস এনেছি।”

“কী ওটা? বেড়াল? ফেলে দাও। ফেলে দিয়ে এসো শিগগির।”

“আরে এটা কাব্‌লের বাচ্চা।”

“কাব্‌লে-মাব্‌লে আমি বুঝি না। বেড়াল এ-বাড়িতে ঢুকবে না। তুমি কি আমাকে রাঁচি পাঠাবার তাল করেছ?”

বাবার হাসি-হাসি মুখ করুণ হয়ে গেল। বেড়ালছানাটা বুকের কাছে লেপটে আছে। পিটপিট করে তাকাচ্ছে। সবে চোখ ফুটেছে।

আমি বাবার হয়ে মা কে বোঝাবার চেষ্টা করলুম, “বাড়িতে একটা বেড়াল থাকা ভাল মা। দেখছ তো ইঁদুরের কী উৎপাত!”

“হ্যাঁ, বাপ-ব্যাটায় মিলে তোমরা বাড়িটাকে একটা চিড়িয়াখানা বানাও। ওকে কুকুরের হাত থেকে কে সামলাবে! তিন মিনিটের মধ্যে পিঙ্কা শেষ করে দেবে।”

“মা, সে-সব তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি সামলাব।”

“যা ভাল বোঝো করো। আমি কিছু বলতে চাই না। বললেই সব রাগ হয়ে যাবে।”

মা চলে গেল। দূর থেকে বললে, “আজ তা হলে দোকান-বাজার বন্ধ। বাঁচা গেছে। আমি উনুনে জল ঢেলে দি।”

বাবা বললেন, “হাত মেলা বুড়ো। তোর মা জিরো রানে আউট হয়ে প্যাভেলিয়ানে ফিরে গেল। একে কী বলে বুড়ো?”

“লেম ডাক।”

“সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। এর এই সোনা-সোনা মুখটা দেখে, বুঝলি বুড়ো, ভদ্রমহিলা কাত। নে, ধর। আমি এইবার একটু সংসারের কাজে মন দি। সংসার তো করিসনি, করলে বুঝতিস কী ঠ্যালা!”

তুলতুলে নরম বেড়ালটাকে প্রথমে রাখলাম আমার বইয়ের টেবিলে। এই বয়েসেই কী বড়-বড় লোম হয়েছে। ল্যাজের কোয়ালিটি দেখেই বুঝতে পারছি বড় হলে ঠিক চামরের মতো হবে। চোখ দুটো কী সুন্দর! যেন একজোড়া বৈদূর্যমণি।

টেবিলে থাকতে চাইছে না। ভাল করে দাঁড়াতে শেখেনি এখনও। চারটে পা-ই দুর্বল। কাঁপতে কাঁপতে একটু করে এদিকে যায়, একটু করে ওদিকে যায়, আর খুব মিহি গলায় মিউমিউ করে। মহা বিপদ হল তো! এই রকম করলে মা আবার রেগে যাবে।

“দু দণ্ড স্থির হয়ে বোস না ভাই।”

পিঙ্কার কান সাঙ্ঘাতিক কান। সামান্য একটু মিউ করেছে, অমনি হ্যাহ্যা করতে করতে ছুটে এসেছে। এসেই টেবিলের ওপর সামনের দুটো পা রেখে খাড়া দাঁড়িয়ে উঠেছে। মুখটা টেবিলের কানায় রেখে জিনিসটাকে ভাল করে দেখে নিল। তারপর একটু করে ফোঁসফোঁস করে আর থেকে-থেকে গোঁ। শেষে কানের পর্দা ফাটানো একটা ডাক, ঘেউ।

ওইটুকু বেড়াল হলে কী হবে! বেশ তেজ আছে। ধনুকের মতো বেঁকে, লোম খাড়া করে, খুদে ল্যাজটা ফুলিয়ে মুখ দিয়ে ফ্যাঁ-ফ্যাঁ শব্দ করতে লাগল। এর ঘেউ, ওর ফ্যাঁস, এই চলতে লাগল। আমি বলি, “ও পিঙ্কা, অমন করে না বাবু, ও তোমার ভাই হয়, ভাই।”

কে কার কথা শোনে। এর ঘেউঘেউ যত বাড়ে, ওর ফ্যাঁসফোঁস তত বাড়ে। আবার পিঙ্কার যা স্বভাব! কোনও কিছু তার থাবার নাগালের মধ্যে না হলে, খসর-খসর করে আঁচড়াবে আর কাঁপতে থাকবে। বেড়ালটা দু’থাক বইয়ের মাঝখানের সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে। পিঙ্কা পা দিয়ে ঠেলে সব বই হুড়মুড় করে মাটিতে ফেলে দিল। ছোট্ট একটা জলচৌকির ওপর বসানো ছিল পিলসুজ আর তেলভর্তি প্রদীপ। বইয়ের ধাক্কায় ছিটকে চলে গেল ঘরের কোণে। প্রচণ্ড শব্দে মা ছুটে এসেছে। অসভ্য পিঙ্কাটা তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করছে।

রাগে মায়ের মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। মা তো ভীষণ ফর্সা। আমার পিসিমা র মুখে শুনেছি, এইরকম রংকে বলে দুধে-আলতা রং।

মা বললে, “কী দক্ষযজ্ঞ হচ্ছে শুনি! এসব কী হয়েছে?”

“আমি করিনি মা, পিঙ্কা করেছে।”

সারা মেঝেতে তেল। প্রদীপটা এক পাশে উপুড়। তেলের ওপর আমার ইতিহাস বই। অঙ্কের খাতা। পিঙ্কাটা তো খুব ওস্তাদ। সে অমনি মায়ের কোমরে পা দুটো তুলে দিয়ে আড়ামোড়া ভেঙে, থুপুস করে পায়ের কাছে নেমে মুখ ঘষতে লাগল। চালু ছেলে!

মা বললে, “আমি আজই চলে যাব। সারদামঠে মাতাজিকে আমার বলাই আছে। খুব আমার সংসার হয়েছে! আমার সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভাল। তোরা বাপ-ব্যাটায় সারাদিন ভূতের নৃত্য কর। আমি বাবা আমার মতো থাকি। অসহ্য, অসহ্য হয়ে উঠেছে।”

বেড়ালটা বইয়ের মাঝখান থেকে মিউ করে উঠল। মায়ের পায়ের কাছ থেকে পিঙ্কা করল গোঁ।

“বুড়ো, তোকে আমি বারবার বলছি, বেড়াল আর কুকুর হল চিরশত্রু। কেন নিরীহ জীবটার মৃত্যুর কারণ হবি?”

“মা, তোমাকে আমি একটা কথা বলছি, দাদু আমাকে বলে গেছেন, ‘বুড়ো, এই বাড়িটাকে একেবারে আশ্রমের মতো করে রাখবি। কারও ওপর হিংসে করবি না।’ তুমি কিন্তু মা বেড়ালটাকে হিংসে করছ।”

“আমি বেড়ালটাকে হিংসে করছি? ও আমার কী এমন পাকা ধানে মই দিতে এসেছে যে, হিংসে করব?”

“পিঙ্কার আদর কমে যাবে ভেবে তুমি হিংসে করছ। আর তুমি হিংসে করছ বলেই পিঙ্কাও হিংসে করছে।”

“খুব কথা শিখেছিস! আমি কিন্তু বলে রাখছি, এরপর কোনও কিছু হলে ‘ম্যা ম্যা’ করে চিৎকার করবে না।”

“আমি তোমাকে বলে রাখছি, পিঙ্কাকে প্রথমে অহিংসা-মন্ত্রে দীক্ষা দেব, তারপর দেখবে আমাদের পুশ ওর পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

“আরও একটা বল্, পুশের পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে ধেড়ে ইঁদুর। অহিংসা যখন হচ্ছে, ভালভাবেই হোক।”

মা চলে গেল। পিঙ্কা আমার চেয়ারের তলায় শুয়ে পড়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলল। যাক, এখন সব শান্ত। দু’সার বইয়ের মাঝখানের গুহায় বেড়ালছানাটা বেশ মজা করে বসে আছে। আমি এবার পড়তে বসি।

আমার দাদু আমাকে বলে গেছেন, ‘যে-কোনও কাজ করার আগে সঙ্কল্প করে নেবে। সেইটাই হল মানুষের ধর্ম। সঙ্কল্প তুমি কাগজে লিখতে পারো, আবার মনেও রাখতে পারো। দিন যখনই শুরু করো, শুরুর আগে সারাদিনে যা করতে চাও, এক, দুই করে কাগজে লিখে চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখো। মনে রাখবে, একটা দিন মানে চব্বিশ ঘণ্টা। এই চব্বিশ ঘণ্টার আট ঘণ্টা তুমি ঘুমিয়ে কাবার করে দিলে। দু’ থেকে তিন ঘণ্টা গেল চান-খাওয়ায়। তা চব্বিশ ঘণ্টার বারো ঘণ্টা এই ভাবেই গেল। হাতে রইল বারো। স্কুলে গেল ছয়। যাওয়া-আসা ধরো এক। হল সাত। হাতে রইল পাঁচ। মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। দু’ঘণ্টা গল্প কি গল্পের বই পড়লে হয়ে গেল। মাত্র তিন ঘণ্টা। সারাদিনে তিন ঘণ্টা।’

একটা কাগজে আজকের তারিখটা লিখলুম; তারপর এক নম্বর, ইতিহাসটা ঝালাতে হবে। দু’নম্বর, ইংরেজি। তিন নম্বর, ফাটাফাটি। অঙ্ক। চার নম্বর, বাংলা প্রশ্নোত্তরের খাতা পুরনো খবরের কাগজের গাদায় খুঁজতে হবে। পাঁচ নম্বর, কাচের জারে যে গোল্ডফিশটা ভরে রেখেছি, সেটাকে কেঁচো দেওয়া। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তার খাওয়া আর খেলা দেখা। ছ’ নম্বর, স্কুলের ব্যাগটাকে গোছানো। সাত নম্বর, ছাত থেকে চিৎকার করে ডেকে শেখরকে জিজ্ঞেস করা, তুই টেনিস বলটা পেয়েছিস? আট নম্বর, চান করতে যাবার আগে গাছের গোড়ায় গোড়ায় খোল-পচা সার এক হাতা করে দিতে হবে। বিশ্রী গন্ধ।

আমার অনেক অনেক কাজ। দাদু বলতেন, ‘বুড়ো, কাজ ছাড়া থাকবি না। অলস মস্তিষ্ক হল শয়তানের বাসা।’ বেড়ালটা গুটিগুটি বইয়ের সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এল। আধবোজা চোখে মিউ-মিউ আরম্ভ করেছে আবার। পিঙ্কার ঘুম ছুটে গেল। চেয়ারের তলা থেকে বেরিয়ে এসে টেবিলের পাশে দু’পা তুলে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার ফোঁসফোঁস। বেড়ালটাকে থাবার নাগালের মধ্যে পাচ্ছে না বলে উঁউঁ কান্না। মহা বিপদ তো!

পিঙ্কার লোমঅলা মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে তিন-চারবার বললুম, “শিব, শিব।” এটা আমার দাদুর কাছ থেকে শেখা। দাদু বলতেন, ‘মন উত্তেজিত হলে নিজের মাথায় হাত রেখে শিব শিব বলবে। দেখবে মন শান্ত হয়ে গেছে।’ সত্যিই তাই। চেয়ারের পায়া ঘেঁষে পিঙ্কা ধুপুস করে শুয়ে পড়ে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মা মনে হল দেখতে এসেছে, আমি পড়ছি কি না! দরজার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করল, “কী করছিস?”

“পড়ার চেষ্টা করছি মা।”

“সেই চেষ্টা কখন সফল হবে?”

মা ঘরে এল। রাগ মনে হয় পড়ে এসেছে। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ফুলের মতো সাদা বেড়ালটাকে দেখছে। জিজ্ঞেস করলে, “হ্যাঁ রে, চোখ ফুটেছে?”

“মনে হয় ফুটেছে, মা। অল্প অল্প।”

“আহা, এতটুকু একটা বাচ্চাকে মায়ের কোলছাড়া করলে! কে এখন তুলোয় করে দুধ খাওয়াবে। আয় আয়, চুক চুক।”

মায়ের ডাক। বেড়াল না-শুনে পারে! এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মা বেড়ালটাকে বুকের কাছে তুলে নিল। মা আজ একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে। সেই হলুদের বুকে সাদা বেড়াল।

আমি বললুম, “মা, তুমি আমার মা, পুশেরও মা।”

“হ্যাঁ, আমার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, পুশের মা হয়ে সারা দিন বুকে করে বসে থাকি।”

মায়ের কোলে বেড়াল দেখে পিঙ্কার মাথা আবার খারাপ হয়ে গেল। লাফিয়ে উঠে ঘেউ-ঘেউ লাগিয়েছে। মা বলছে, “ছিঃ ছিঃ পিঙ্কা, হিংসে কোরো না, হিংসে কোরো না। তোমার ভাই। পুশ তোমার ভাই।”

এমন সময় বাবা বাজার থেকে ফিরে এল। হাতে বিশাল এক কাগজের বাক্স। গায়ে লেখা টিভি। মায়ের কোলে বেড়ালটাকে দেখে বাবা অবাক। আর বাবার হাতে ঢাউস একটা বাক্স দেখে মা অবাক।

বাবা হাসতে হাসতে বললে, “বুঝলে, আজ প্রমাণ পেলুম।”

“কী প্রমাণ পেলে?”

“যে খায় চিনি তারে জোগান চিন্তামণি। বাক্সটা পেয়ে গেলুম।”

“ওটা তোমার কী কাজে লাগবে? আরশোলা পুষবে?”

“না গো, এটা হল আমাদের পুশের বাড়ি। আমি বিলিতি বইয়ে দেখেছি বেড়ালরা সব বাক্সর মধ্যে থাকে। বাক্সর মধ্যে থাকতে ভালবাসে। তা পেয়ে গেলুম জিনিসটা। এইবার এটাকে ঠিকঠাক করে ওকে শুইয়ে দি।”

“আচ্ছা, তোমার বয়েস বাড়ছে না কমছে?”

বাবা এক মুখ হেসে বললে, “বয়েস তো মনের! মনের বয়েস যদি না বাড়ে, আমি কী করতে পারি!”

“লোকে হাসবে যে।”

“লোক! ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলে গেছেন, তোক না পোক। পৃথিবীতে আমি আমার মতো থাকব, সে তার মতো থাকবে।”

এরপর বাবা বেড়ালের বাড়ি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমাকে বললে, “শোন বুড়ো, মানুষের বাড়ির প্ল্যান থাকে, বেড়ালের বাড়ি কী প্ল্যানে হয় রে!”

আমি একটু ভেবে বললুম, “শোনো, বেড়ালের তো আলাদা বাড়ি হয় না, মানুষের বাড়িতেই বেড়াল থাকে।”

“তা অবশ্য ঠিক। পাখির বাসা হয়। সে খুব সিম্পল। গাছের দুটো ডালের মাঝখানে একটা চুবড়ি। একমাত্র বাবুইপাখির বাসার মধ্যে কিছুটা কেরামতি আছে। তুই সাপের বাসা দেখেছিস?”

“গর্ত দেখেছি।”

“গর্ত তো আর বাসা নয়, ওটা হল দরজা। ঢোকার পথ। ভেতরে অনেক ব্যবস্থা থাকে। মণিকোঠা। বেডরুম, বাথরুম, নার্সারি।”

“তুমি দেখেছ বাবা?”

“না রে। আমার কি সে-ভাগ্য হবে! আমার মনে হয়। সাপের অতবড় শরীরটা তা না হলে থাকে কীভাবে? শীতকালে তো বাসা থেকে বেরোয় না। মাটির তলায় নিশ্চয় সেরকম ব্যবস্থা থাকে।”

“তুমি এইসব কী করে জানতে পারো বাবা?”

“বুঝলি বুড়ো, অনেক জিনিস আছে যা জানা যায় না। ঠিকঠাক জানারও চেষ্টা করতে নেই। কল্পনা করে নিতে হয়। যেমন ধর, পরী। পরী কেউ কোনওদিন দেখেছে? অথচ দ্যাখ, কত গল্প লিখে ফেলেছে। সেইসব গল্প পড়ে পড়ে আমার তো এখন মনে হয়, কোনওদিন সত্যিই একটা পরী দেখে ফেলব। চারপাশে ফটফট করছে চাঁদের আলো, নিশুতি রাত। কেউ কোথাও জেগে নেই। দূরে, অনেক দূরে টিসটিসি পাখি ডাকছে।”

“টিসটিসি পাখি কী পাখি বাবা?”

“আমি সে-পাখি দেখিনি। আমি অনেক অনেক রাতে তার ডাক শুনেছি। অন্ধকার পক্ষে সে-পাখি ডাকে না। ডাকে শুক্লপক্ষে। টিসটিস করে। তোরা জানিস না। তোরা ঘুমিয়ে থাকিস বলে কত কী জানতে পারিস না। ফটফটে চাঁদের আলোর রাতে আমি ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে গিয়ে চুপিচুপি দাঁড়িয়ে থাকি। কেন বল্‌ তো?”

“রাত তখন ক’টা হবে বাবা?”

“তা ধর দুটো-টুটো হবে। বুড়ো, আমার কী মনে হয় জানিস? কী বল তো?”

“কী বাবা?”

“সূর্যের আলো হল পাউডার। বালি-বালি। ভীষণ তেজ। আর চাঁদের আলো হল লিকুইড। ভিজে-ভিজে। জলের মিহি কণার মতো। বাষ্পের মতো। অনেকক্ষণ চাঁদের আলোয় থাকলে দেখবি, গা কেমন যেন ভিজে-ভিজে লাগছে। আমার মনে হয়, চাঁদের আলো বরফ দিয়ে রাখলে, জমে মুক্তো হয়ে যায়!”

“মুক্তো তো ঝিনুকের পেটে হয় বাবা।”

“ধুর, ও তো হল বিজ্ঞানীদের কথা। বিজ্ঞান ছাড়াও তো পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে। সবই কি দুই আর দুয়ে চার? আমার বাবার একটা নোটবুক আছে, সেইটা তোকে আমি একদিন চুপিচুপি দেখাব।”

“আমার দাদুর নোটবুক?”

“হ্যাঁ রে, একটা বই বলতে পারিস। কী সুন্দর নাম, ‘অপদার্থ বিজ্ঞান’।”

“তুমি ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াও কেন?”

“যদি কিছু দেখতে পাই!”

“কী তুমি দেখতে পাবে বাবা?”

“ধর, ফুটফুটে ছোট্ট একটা পরী ডানা মেলে উড়ে এল। ফুরফুর করে আপন মনে উড়তে লাগল গাছের মাথায়। এ-ডাল থেকে ও-ডালে। হতেও তো পারে। কে আর রাতের খবর রাখছে বল্। এই যেমন ধর মৎস্যকুমারী, মারমেড। নিশ্চয় আছে। যে দেখেছে, সে দেখেছে। আমি দেখিনি বলে নেই বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। স্নোম্যান, তুষারমানব। নিশ্চয় আছে। পৃথিবীতে কত কী আছে, কে বলতে পারে। তোর দাদুর লেখা অপদার্থ বিজ্ঞানটা পড়বি, পড়লে সব জানতে পারবি। জানিস তো, একদিন শেষ রাতে দেখি কী, তোর দাদু বাগানে ফুল তুলছেন। ঘাসের ওপর গুলঞ্চ ফুল ছড়িয়ে পড়ে আছে। তিনি একটি-একটি করে তুলছেন আর চাদরের আঁচলে রাখছেন। আমি যেই ডাকলুম, বাবা, জায়গাটা কুয়াশার মতো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে দেখি, সব পরিষ্কার। কেউ কোথাও নেই।”

“সত্যি?”

“অন গড।”

“তা হলে আমি তোমাকে বলব, এই ঘরে আমি একদিন দাদিকে দেখেছি।”

“এমন হতে পারে তুই বিশ্বাস করিস?”

“করি বাবা।”

“হাত মেলা।”

“কী করে হয় গো?”

“তা হলে শোন, ভাল করে মন দিয়ে শোন। একটা মানুষ, ধর ষাট বছর কি সত্তর বছর এই পৃথিবীতে বেঁচে গেল, তারপর সে কোথায় গেল?”

“আকাশে চলে গেল।”

“বেশ, ধরে নিলুম আকাশেই গেল। তার মানে কি একেবারেই গেল! অত সহজ! এত বছর বেঁচে থাকাটা একেবারে বাজে হয়ে গেল? যেমন ধর আমি এক্ষুনি ছাতে চলে গেলুম, তার মানে কী, আমি এ-ঘরে নেই, কিন্তু ছাতে আছি। আসলে কী জানিস, মন দিয়ে টেনে রাখলে কেউ যেতে পারে না। তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ঠিকমতো বুঝতে পারিসনি। দাঁড়া, আর-একটু বোঝাই তোকে। আরও সহজ করে। মনে কর, আকাশে আমি একটা ঘুড়ি বেড়েছি। সুতো যদি আমার হাতে থাকে, আমি ঘুড়িটাকে টেনে নামাতে পারি, আবার দূরে বেড়ে যেতে পারি। পারি কি না?”

“হ্যাঁ পারো।”

“ব্যস, আর ভাবনা নেই। বুঝে গেছিস। মন হল সেই সুতো। কী রকম বোঝালুম বল্‌?”

“সত্যি, ভাল বুঝিয়েছ। দারুণ বুঝিয়েছ।”

“আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। ডাকসাইটে শিক্ষক। তোর বাবার মতো এলেবেলে রামছাগল নয়।”

“আহা, আমি যেন জানি না। তুমি খুবই ভাল ছেলে ছিলে। পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হতে। ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে এম. এ. পাশ করেছ। দাদি তোমার কত প্রশংসা করতেন আমার কাছে। বলতেন, ‘আমার ছেলের মতো ছেলে হয় না। তোমাকেও তোমার বাবার মতো হতে হবে।’”

“ধুত, আমি একটা ছেলে! আমার বাবার কোনও সেবা করতে পারলুম না। অপদার্থ। সারাটা জীবন সেই মানুষটি আমার জন্যে কষ্ট করে গেলেন। আমি কিচ্ছু করতে পারলুম না।”

তিন-চার বার, কিচ্ছু করতে পারলুম না, কিছু করতে পারলুম না, বলতে বলতে বাবা কেঁদে ফেললে। আমি উঠে গিয়ে মা কে বললুম, “দ্যাখো গে যাও, বাবা কী রকম কাঁদছে।”

মা ছুটে গেল। দাদি চলে যাবার পর থেকে, বাবা এইরকম প্রায়ই কেঁদে ফেলে। দাদির কথা বলতে বলতে কেমন যেন হয়ে যায়।

এদিকে আর এক কাণ্ড। মা পুশটাকে মেঝেতে ফেলে রেখে বাবার কাছে ছুটে গেছে। আমারও খেয়াল ছিল না। পিঙ্কা ছুটে এসেছে। আমি কোথায় বেড়ালটাকে ঝট করে কোলে তুলে নেব, তা না, চোখ বুজে মনে-মনে বলতে শুরু করেছি, ‘দাদি, পুশকে বাঁচাও। দাদি, পুশকে বাঁচাও।’

ভেবেছিলুম ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক করে একটা আওয়াজ শুনব আর তাকিয়ে দেখব সব শেষ। তার বদলে শুনলুম, পিঙ্কা যেন আদুরে গলায় কাকে অল্প-অল্প ধমকাচ্ছে। আর তার পায়ের খচরমচর শব্দ হচ্ছে। ভয়ে-ভয়ে তাকালুম। ওরে ভাই, দু’জনে বেশ ভাব হয়ে গেছে। খেলা হচ্ছে। পুশ শুয়ে আছে চিতপটাং, আর পিঙ্কা তাকে নাক দিয়ে ঠেলছে, থাবা দিয়ে কাতুকুতু দিচ্ছে। বেশ জমে গেছে। পিঙ্কাকে যখন খেলায় পায়, তখন তার মুখটা বেশ দুষ্টু-দুষ্ট হয়ে ওঠে। এখন সেই মুখ। আমি যেই তাকিয়ে একটু হেসেছি, আমাকে ধমকে উঠল।

এ-দৃশ্য দেখে চুপ করে থাকা যায়? মা আমাকে যদিও বলেছে, ‘বুড়ো, থেকে থেকে আচমকা ষাঁড়ের মতো চেঁচাবি না, তবু আমি চিৎকার করে উঠলুন, “মা, শিগগির দেখবে এসো।”

পিঙ্কা আবার আমাকে ধমকে উঠল। থাবা দিয়ে বেড়ালটাকে বলের মতো ঠেলতে ঠেলতে দেওয়ালের কাছে নিয়ে গেছে। মা ছুটে এসেছে। ভেবেছে, কোনও বিপদ-আপদ হল বুঝি। বাবাও দৌড়ে এসেছে। দু’জনেই অবাক। পিঙ্কা কোলের কাছে বেড়ালটাকে নিয়ে বসে আছে। বসে হ্যা-হ্যা করছে।

বাবা বললে, “আহা, কী উপাদেয় দৃশ্য। আহা, কী স্বর্গীয় দৃশ্য! যেন ঋষির তপোবন, কৃষ্ণের বৃন্দাবন!”

“বাবা, তুমি আজ অফিস যাবে না? ক’টা বেজেছে দেখেছ?”

বাবা ঘড়ি দেখে বললে, “তুই স্কুলে যাবি না?”

“আজ আমাদের ছুটি।”

“ছুটি কেন? আজ আবার কিসের ছুটি?”

“স্পোর্টস।”

“তোর যখন ছুটি, আমিও একটা সি· এল· মেরে দি। রোজ-রোজ অফিস গেলে নিজেকে কেমন যেন ক্রীতদাস-ক্রীতদাস মনে হয়। কী রকমের স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি বল তো। কিছুই তো বুঝি না।”

“তোমার কিন্তু এ-মাসে আজ নিয়ে তিন দিন ছুটি হয়ে যাবে।” মায়ের সব হিসেব থাকে।

“তা হলেও ছ’ দিন পাওনা থাকবে।”

“বাবা, তা হলে ছুটি তো?”

“ছুটি, ছুটি। গরমাগরম রুটি। তুই আমার মনোবল ভেঙে দিয়েছিস। একা-একা অফিস যেতে ভাল লাগে? থার্ড ক্লাস একটা নিরানন্দ জায়গা। পাঁচটা যেন আর বাজতেই চায় না। সব অফিস যদি উঠে যেত, বেশ হত।”

“তা হলে রোজ হরিমটর হত,” মা মনে করিয়ে দিলে।

“জানো, আমিও একদিন স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করব। প্ল্যান প্রোগ্রাম করা হয়ে গেছে। একদিন দেখবে, বিশাল একটা লরি আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তুমি অবাক হয়ে বলবে, ‘ও মা, এ কী! তোমাকে আমি কয়লার দোকানে একমণ কয়লার কথা বলে আসতে বললুম, এ যে দেখছি গোটা একটা লরি পাঠিয়ে দিয়েছে!’ আমি তখন মুচকি মুচকি হাসব। ততক্ষণে লরির পেছন দিকটা খুলে দিয়েছে ঝরঝর করে কয়লা পড়ছে। রাস্তায় একটা কয়লার পাহাড় তৈরি হয়ে গেল। বেলচা মেরে মেরে সব কয়লা বাগানে তুলে দিল।”

বাবা দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে খুশি-খুশি মুখে, আধবোজা চোখে বলে যাচ্ছে।

মা বললে, “পৃথিবীতে এত জিনিস থাকতে এক লরি কয়লা?”

“আহা, শোননই না। প্ল্যানিংয়ের সময় গণ্ডগোল করতে নেই। বাগানের একপাশে একটা কয়লা আর চ্যালা কাঠের দোকান করব। বিশাল বড় একটা দাঁড়িপাল্লা ঝুলবে। ঘণ্টার মতো দেখতে বড়-বড় বাটখারা। দু’তিনটে মাঝারি মাপের বেলচা। দোকানটার নাম দেব, ‘মুক্তির মন্দির’। একটা বাঁশের মাচা তৈরি করাব, তার ওপর চট বিছিয়ে আমি বসব। পরনে পাজামা আর গেঞ্জি। সামনে একটা পালিশ করা কাঠের ক্যাশবাক্স। দোকান খোলার সময় সকাল সাতটা থেকে বেলা একটা, ওদিকে বিকেল চারটে থেকে ছ'টা। চারপাশে কেষ্টকলি গাছ, মাঝখানে কয়লার পাহাড়, আর একপাশে চ্যালা কাঠ। একটা বড় হাতুড়ি। সারাদিন কয়লা ভাঙব। ভেঙে বিক্রি করব। কেন বলো তো? আমি ছেলেবেলায় একটা গল্প শুনেছিলুম। কোনও এক মহিলা কয়লা ভাঙতে ভাঙতে, ইয়া বড় সুপুরির মতো একটা হীরে পেয়েছিলেন। কত হীরে এই রকম উনুনে চলে যাচ্ছে কে বলতে পারে! কে দেখছে! ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, বাড়ি-বাড়ি কয়লা সাপ্লাই দেবার জন্যে একটা ভ্যানগাড়ি, সাইকেল ভ্যান, কিনব। সব কাজ আমি নিজে করব। বড়জোর ছোটখাটো একটা ছেলে রাখব। বেশ হাসিখুশি। জানো তো, এক ডাক্তারবাবু আমাকে বলেছিলেন, তোমার কালো জিনিসের ব্যবসায় প্রভূত অর্থোপার্জন হবে।”

মা বললেন, “ডাক্তারবাবু বলেছেন?”

“ওই হল, ডাক্তারবাবু নয়, বলেছেন এক জ্যোতিষী। ভুল হয়ে গেছে।”

আমি মনে-মনে ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখলুম। মন্দ হবে না। কয়লার ব্যবসাটা বাবা যদি জমিয়ে তুলতে পারে, আমি তা হলে বড় হয়ে একটা কেরোসিনের ডিপো করব। খুব ডিম্যান্ড। কী লাইন পড়ে তেল নেবার জন্যে। পরে যখন আরও পয়সা হবে, তখন একটা পেট্রল পাম্প করব। পেট্রল পাম্পের বাড়িগুলো খুব সুন্দর হয়! চারপাশ কেমন বড়-বড় কাচ দিয়ে ঘেরা। সুন্দর রং করা। সারাদিন রং-বেরঙের গাড়ি আসে। পেট্রলের গন্ধটাও কী সুন্দর! গায়ে সেন্টের বদলে পেট্রল মাখলে কেমন হয়!

বাবা উঠে দাঁড়াল। এইমাত্র যেন স্বপ্ন ভাঙল। চারপাশে তাকিয়ে বললে, “আজ তা হলে ছুটি! আঃ, কী ভাল যে লাগছে? চল বুড়ো, আমরা একটু আশ্রম থেকে বেড়িয়ে আসি। ওখানে গেলে মনটা ভীষণ ভাল হয়ে যায়।”

মা বললে, “বুড়োর লেখাপড়া নেই?”

“থাকবে না কেন? আমারও লেখাপড়া আছে। কত হোমটাস্ক আমার বাকি আছে জানোনা?”

“তোমার হোমটাস্ক?”

“তুমি জানো না। সে খুব গোপন ব্যাপার। আমার বাবা ছিলেন আমার শিক্ষক। এমনই তো তাঁর খুব একটা সময় ছিল না, চলতে-ফিরতে, কথা বলতে-বলতে আমাকে পড়াতেন। ধরো, তেল মাখতে মাখতে টেন্‌সটা শেখানো হয়ে গেল। প্রেজেন্ট, পাস্ট, ফিউচার, প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস, পার্টিসিপ্‌ল। মনে আছে, তোমাকে কীভাবে অঙ্ক শেখাতেন খেতে বসে? ছেলেবেলায় বাবা আমাকে যত হোমটাস্ক দিতেন, সব তো আর করা হত না। ফাঁকি মেরে দিতুম। বাবা তো কখনও আমাকে বকতেন না। তাঁর শাসন করার কায়দাটা ছিল অন্য রকম। শুধু বলতেন, ‘যা বললুম করলি না’, বলে তাকিয়ে থাকতেন। মোটা কাচের চশমার আড়ালে বড়-বড় চোখ। হঠাৎ দেখা যেত দু’গাল বেয়ে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ছে। উঃ, তখন যা কষ্ট হত! ভেতরটা কেমন যেন হয়ে যেত।”

এইবার মা বসে পড়ল। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। আমিও বসে পড়লুম। বাবাও আবার বসে পড়ল। পিঙ্কা ঘুমোচ্ছে। পিঙ্কার কোলের কাছে পুশটা বাচ্চা ছেলের মতো অকাতরে ঘুমোচ্ছে। দক্ষিণের দেওয়ালে আমার দাদির ছবি জ্বলজ্বল করছে। কপালে চন্দনের ছোট্ট একটা ফোঁটা। আঃ কী মজা! আজ ছুটি!

মা বললে, “কত কথাই যে মনে পড়ে! আমার জোরে-জোরে কথা বলা চিরকালের স্বভাব। তা আমাকে একদিন বললেন, ‘মা, তুমি একটু আস্তে কথা বলা অভ্যাস করো। তোমার এত গুণ, শুধু এইটুকু শোধরাতে পারলেই সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে যায়।’ তা আমি চেষ্টা করতুম; কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায়! একদিন খুব জোরে-জোরে শিখার মায়ের সঙ্গে কথা বলছি, উনি ঘরে বসে নোট লিখছিলেন। আমি পরে চা নিয়ে গেছি। আমার দিকে তাকালেন। সেই বড়-বড় চোখ। হঠাৎ দেখি ফোঁটা-ফোঁটা জল। জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী হল বাবা?’ খুব ধীর শান্ত গলায় বললেন, ‘তুমি পারলে না!’ উঃ, সেদিন আমার ভেতরটা যে কী করে উঠেছিল!”

“আমার জীবনে ওই রকম ঘটনা যে কত ঘটেছে! ছেলেবেলার মজা কী জানো তো, লেখাপড়া ছাড়া সবই করতে ইচ্ছে করে; অথচ দ্যাখো, ছেলেবেলায় না পড়লে, সময় তো আর সারাজীবন ছেলেবেলায় তোমার সুবিধের জন্যে আটকে থাকবে না। তোমাকে টানতে টানতে ঠিক বুড়োবেলায় এনে ফেলে দেবে। সময়ের তো দয়ামায়া নেই? সময় হল সময়। এমন এক পথিক, যে-কোনও দিন গাছতলায় বসে দু’দণ্ড বিশ্রাম নিতে জানে না। তুমি তার সঙ্গে চলতে পারো ভাল, না পারলে সময় তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। এইটা যদি ছেলেবেলায় বুঝতে শিখতুম, তা হলে আরও কত ভাল ছেলে হতে পারতুম। ভাল ছেলে হলে আজ আমি ভাল বুড়ো।”

“তুমি এখনও কি হোমটাস্ক করো বাবা?”

“জানিস, আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি। যতদিন একজন ছাত্র, ততদিন বেঁচে থাকায় খুব সুখ। বাঁচার একটা কারণ থাকে। আমি শিখছি, আমি কত কী জানতে পারছি, পৃথিবী আমার হাতের মুঠোয় এসে যাচ্ছে। এক-একটা দিন আসছে আর বেকার চলে যাচ্ছে, তা নয়। প্রতিদিন আমি বাঁচছি কিছু-না-কিছু শেখার জন্যে। প্রতিদিন আমার মনে হচ্ছে, আরও কিছুদিন বাঁচি, আরও কিছু শিখে যাই। আমি এখনও আমার বাবার ছাত্র। তিনি প্রতিদিন আমাকে হোমটাস্ক দেন। অঙ্ক, ইতিহাস, ইংরেজি, ভূগোল। আমার রুটিন আছে, খাতা আছে, বই আছে, পেনসিল আছে, ইরেজার আছে, জ্যামিতির ইনস্ট্রুমেন্ট বক্স আছে, এমনকী ছোট একটা টিফিন বক্স আছে। সেই বাক্সে আমার মা এখনও খাবার ভরে দেন, আর মনে করিয়ে দেন, ‘টিফিনে মনে করে খাস বাবা’। আমার যে কত সুখ, সে আমি বোঝাই কী করে! আমার সব আছে, কিছুই হারায়নি।”

তোমার স্কুলটা কোথায় বাবা?”

“আমাদের চিলেকোঠায়।”

“সেখানে দেওয়ালে আমার ছেলেবেলার স্লেটটা তাই তুমি যত্ন করে ঝুলিয়ে রেখেছ?”

“ওইটা আমার ব্ল্যাকবোর্ড।”

মা বললে, “তাই তুমি রাত একটা-দুটো অবধি ছাদে থাকো?”

“থাকবো না! তখন যে আমার স্কুল চলে।”

“তোমার পরীক্ষা হয় বাবা?”

“খুব হয়। উইকলি, মান্থলি, কোয়ার্টারলি, হাফ-ইয়ারলি, অ্যানুয়াল। এবারের হাফ-ইয়ারলিতে মাত্র একটা নম্বরের জন্যে আমি ফার্স্ট হতে পারিনি।”

“তুমি কবে বড় হবে বাবা? কবে স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকবে?”

“না রে, সারা জীবন আমি স্কুলেই পড়ব। কেন জানিস তো, স্কুলেই মানুষের জীবনের ভিত তৈরি হয়। শিক্ষকমশাইদের খুব কাছাকাছি থাকা যায়। কলেজ হল পাকা ছেলেদের ক্লাব। আমি পাকতে চাই না। সারা জীবন আমি স্কুলের শিশুটি হয়ে, কিশোরটি হয়ে থাকতে চাই। বড় হওয়াটাকে কত কষ্ট করে আগলে রেখেছি জানিস? পাকা-পাকা লোক দেখলে আমি পালিয়ে আসি। ভয় করে। পরচর্চা করবে। টাকাপয়সার কথা বলবে। বিষয়-সম্পত্তির কথা বলবে। লোভের কথা বলবে। এই হল না, ওই হল না বলে মনটাকে একেবারে বিষিয়ে দেবে। আমার বাবা বলতেন, বিষয়ী লোকদের থেকে শত হস্ত দূরে থাকার চেষ্টা করবে। মন হল একটা থলে। তাতে তুমি হীরে, জহরত রাখতে পারো, আবার ইটপাটকেলও রাখতে পারো। তখন তো তাঁর কথা শুনিনি। যেসব কথা শুনিনি, এখন অক্ষরে অক্ষরে সেই সব কথা শোনার চেষ্টা করি। যত দিন ছাত্র থাকতে পারব, ততদিনই সুখ।”

বাবা জামাকাপড় পরতে শুরু করল। মা বললে, “এখন আবার ধরাচূড়ো পরে চললে কোথায়?”

“বুড়োটাকে নিয়ে এক পাক ঘুরে আসি। রোজ তো আর এই সময়টা আমার থাকবে না। অফিস বলে একটা কারাগার আছে, সেইখানে যমের মতো কিছু মানুষ আছে, যারা কফিনে কফিনে মৃত সাজিয়ে রাখে, তাদের হাতে দিয়ে আসতে হয়। বুঝলে, অফিস হল মর্গ। দিনের ডেডবডি সাজানো থাকে।”

আমাদের বাড়ির পেছন দিয়ে নির্জন একটা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। আমাদের বাড়িটার ভারী মজা। সামনেটা শহর। পেছনটা গ্রাম। বড়-বড় মাঠ আছে। জোড়া-জোড়া পুকুর আছে। চালাবাড়ি আছে। এক পাশে গঙ্গা আছে। কিছুটা এগোলেই সেকালের বড়-বড় বাগানবাড়ি। প্রাচীন মন্দির। আশ্রম। কী যে সুন্দর! বাবা থেকে-থেকে বলে, ‘রাজা, রাজা।

বাড়ির বাইরে এসে বাবা জোরে-জোরে নিশ্বাস নিল বারকতক, “ফুলের গন্ধ পাচ্ছিস বুড়ো?”

“পাচ্ছি। কী ফুল বলো তো?”

“কাঠচাঁপা। অসাধারণ গন্ধ। দেখেছিস, ফুল কখনও ফেল করে না। মানুষ কিন্তু করে।”

আমরা দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে জোড়া পুকুরের ধারে চলে এলুম। পাশাপাশি যেন দুটো আয়না পড়ে আছে। আকাশ তাতে মুখ দেখছে। গাছ চান করতে নেমেছে।

“জানিস বুড়ো, এই দিকটায় এলে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। কী বাতাস বইছে বল তো এদিকে?”

“কী বাতাস বাবা?”

“বুঝতে পারছিস না? সুবাতাস। তুই ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথামৃত পড়িসনি!”

“আর একটু বড় হই, তারপর তো পড়ব।”

“এখন তা হলে কী পড়বি?”

“পড়ার বই, গল্পের বই, কমিকস।”

“না না, হল না। এই বয়েস থেকেই তো কথামৃত পড়বি, স্বামী বিবেকানন্দের লেখা পড়বি। গাছ যখন ছোট থাকে তখনই তার গোড়ায় সার দিতে হয়। গাছ বড় হয়ে গেলে, শেকড় মাটির গভীরে চলে গেলে তখন আর ভাবনা নেই। গাছ তখন নিজে-নিজেই সারের সার জিনিস সংগ্রহ করে নিতে পারবে। ঠাকুর কী বলতেন, জানিস, মাটির হাঁড়ি যখন নরম, তলতলে থাকে, কাঁচা থাকে, তখনই তাকে আকার দেওয়া যায়, নকশাটকশা সব করা যায়। পোড়াবার পর যখন সিঁদুরে লাল, ঝনঝনে, খনখনে হয়ে গেল, তখন আর তাতে কিছু করা যায় না। করতে গেলেই ভেঙে যায়। বুঝলি বোকা! অ্যায়সা একটা জীবন বানা, যেন লোকে তোকে একশো বছর, দুশো বছর, তিনশো বছর, পাঁচশো বছর মনে রাখে। তোর ছবি সব ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙানো থাকে। সব মায়েরা যেন বলতে পারে তাদের ছেলেদের, ওই ওঁর মতো হও। ভাবতে পারিস, শ্রীচৈতন্য আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে সেই দূর কোন্ নবদ্বীপে জন্মেছিলেন। আজও তাঁকে সারা পৃথিবীর মানুষ পুজো করে। বিলেতের মানুষ মায়াপুরে ছুটে এসে সন্ন্যাসী হচ্ছে।”

“বাবা, আমি কী হব বলো তো? কী হলে ভাল হয়?”

“চাকরিবাকরি করিসনি, দাসত্ব। আমার বাবা চাকরিকে খুব ঘেন্না করতেন। তুই খুব ভাল করে লেখাপড়া শিখে সন্ন্যাসী হয়ে যা। স্বামী বিবেকানন্দের মতো একটা শরীর তৈরি কর। বেদ, বেদান্ত, গীতা, ভাগবত পড়ে একটা মন তৈরি কর। তারপর গেরুয়া পরে সন্ন্যাসী হয়ে সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে বেড়া, দাপিয়ে বেড়া।”

সন্ন্যাসী হতে আমারও বেশ ভাল লাগে। এই সুন্দর টকটকে চেহারা। মাথায় পাগড়ি। হাতে একটা মোটাসোটা লাঠি। এক দেশ থেকে আর-এক দেশ। আর-এক দেশ থেকে অন্য আর-এক দেশ। আমি ঘুরছি। বক্তৃতা করছি। সবাই আমাকে মহারাজ মহারাজ বলছে। কী মজা! আমি বড় হয়ে লেখাপড়া শিখে আর দশটা-পাঁচটা করব না। সন্ন্যাসীই হয়ে যাব। আমার দাদি বলে গেছেন, “বুড়ো, বাড়িটিকে আশ্রমের মতো করে রাখবি।”

কী একটা বলতে যাচ্ছি, বাবা বললে, “চুপ! ওই দ্যাখ, গাছের ডালে মাছরাঙা কেমন স্থির হয়ে বসে আছে। একেই বলে সাধনা।”

“কিসের সাধনা বাবা?”

“মাছের সাধনা। দ্যাখ না কী হয়।”

মাছরাঙা সত্যিই রাঙা পাখি। হঠাৎ সাঁ করে জল ছুঁয়ে উড়ে গেল। ঠোঁটে একটা রুপোলি মাছ লটপট করছে। কী সুন্দর কায়দা!

আমরা যখন আশ্রমে গিয়ে পৌঁছলুম, মন্দিরে তখন আরতি হচ্ছে। কাচের মন্দির। চূড়াটা আকাশে গিয়ে মণির মতো জ্বলছে। ভেতরে ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা মায়ের মূর্তি পাশাপাশি। পেছনে ত্রিনয়নী মা হাসছেন। একেবারে গঙ্গার ধারে। ঝাঁকড়া চেরি গাছের ডালে-ডালে ছোট-ছোট ঘণ্টা বাঁধা। বাতাসে দুলছে আর টুংটাং শব্দ করছে। এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা যে ঘরে বসে সাধনা করতেন, বাগানের দিক থেকে সেই ঘরের দেওয়ালে হাত রেখে বাবা বললে, “জানিস তো, তিনি যখন সাধনা করতেন, তখন এই ঘরের দেওয়ালে হাত রাখা যেত না। হাত পুড়ে যেত। দেওয়ালে চিড় ধরে যেত। কী সুন্দর! বল্‌ বুড়ো! সাধন-ভজন জিনিসটা কী সুন্দর! আমার কোনওদিন পয়সা হলে একটা মন্দিরা আর একজোড়া কাঠখত্তাল কিনব, আর সকাল-সন্ধে আমাদের বাগানে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় বসে তুলসীদাসের মতো রামনাম করব। করতে করতে রামচন্দ্র একদিন আমাকে এসে দেখা দেবেন। পাশে মা-সীতা আর লক্ষ্মণ ভাই। আমি তখন আর পৃথিবীর কাউকে পরোয়া করব না। চাকরি নয়, বাকরি নয়। বড় কর্তা নয়, ছোট কর্তা নয়। শুধু গাইব, ‘ভবে সেই সে পরমানন্দ যে-জন পরমানন্দময়ীরে জানে।’ লাভ লোকসান পাওয়া না-পাওয়া খাওয়া না-খাওয়া⋯”

বাবার চোখে জল এসে গেছে। হু হু করে জল ঝরতে লাগল দু’গাল বেয়ে। সকালের আশ্রম, বে-বার তাই বিশেষ কেউ নেই। তা না হলে বাবাকে কাঁদতে দেখে লোকে কী ভাবত! ভাবত, আমি একটা বদ ছেলে, বাবাকে খুব কষ্ট দিয়েছি। লেখাপড়া করি না। একটা জানোয়ার। ঠিক এই সময় একটা কাঠবেড়ালি ফোলা লেজ আরও ফুলিয়ে, পিড়িক-পিড়িক শব্দ করতে করতে গাছের গুঁড়ি বেয়ে একবার উঠতে লাগল, একবার নামতে লাগল। কী তার আনন্দ!

বাবা কাঠবেড়ালি ভীষণ ভালবাসে। খুব প্রিয় প্রাণী। আমাকে প্রায়ই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প বলে। তিনি ছিলেন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো। বাগানে বসে থাকতেন, আর কাঠবেড়ালিরা তাঁর এ-কাঁধে ও-কাঁধে লেজ উঁচিয়ে খেলে বেড়াত। মাথায় পাখি এসে বসত। নাকের ডগায় উড়ে আসত প্রজাপতি। আমাদের বাগানেও কাঠবেড়ালি আছে। বাবার একদিন সে কী অভিমান! “আমার কাঁধে কেন কাঠবেড়ালি উঠছে না! ওই তো গাছে-গাছে অত পাখি, আমার মাথায় কেন বসছে না!”

মা বললে, “কী আশ্চর্য! ওরা যদি না বসে, আমি কী করতে পারি?”

বাবা বললে, “আমার মনে একটুও হিংসে নেই। আমি একটা পিঁপড়ে পর্যন্ত মারি না। ওরা কেন আমাকে ভয় পাবে! আর আমি কী করতে পারি। রোজ আমি ওদের জন্যে জল রাখি, ফল রাখি, বাদাম রাখি। এর চেয়ে বেশি আর আমি কী করতে পারি!”

অভিমানে বাবা সেদিন কাঁদো-কাঁদো। শেষে মা বোঝালে, সেকালের পাখি, কাঠবেড়ালি আর একালের পাখি আর কাঠবেড়ালিতে অনেক তফাত। মানুষও বদলেছে, ওরাও বদলেছে। কেন তুমি মিছিমিছি মন খারাপ করছ! অতি কষ্টে মা সেদিন বাবাকে বুঝিয়েছিল। তা না হলে ওই নিয়ে খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। মা বলে, ‘তোর বাবা তোর চেয়েও ছেলেমানুষ। কাঠবেড়ালি কেন গায়ে উঠছে না, এই নিয়ে কেউ কখনও। মাথা খারাপ করে?”

সেই কাঠবেড়ালি বাবার থেকে মাত্র তিন হাত দূরে গাছ বেয়ে একবার করে উঠছে আর একবার করে নামছে। বাবা অবাক হয়ে দেখছে। মুখে-চোখে একটা অন্যরকমের ভাব এসে গেছে। জানি বাবা কী ভাবছে। ভাবছে কাঠবেড়ালিটা এবার হয়তো পা বেয়ে উঠে কাঁধে চেপে বসবে। এত কাছে যখন আসতে পেরেছে, আর একটু কাছে এলে ক্ষতি কী! শেষ পর্যন্ত এল না। পিড়িক-পিড়িক করে লেজ তুলে পাঁচিলের মাথার ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে দূরে আরও কোনও বড় কাজে চলে গেল। কাঠবেড়ালিদের কাজের শেষ আছে?

বাবা আমার দিকে মুখটা কেমন যেন করে তাকাল। বললে, “দেখলি, কাণ্ডটা একবার দেখলি? এসেও এল না।””

“ও যে এখন ভীষণ ব্যস্ত আছে বাবা। জানোই তো, সকালে ওদের অনেক কাজ থাকে। দেখলে না ওর বাবা ওদিক থেকে পিড়িক-পিড়িক করে ডাকল। ওর কী দোষ বললা!”

আমরা দু’জনে গঙ্গার ধারে নাটমন্দিরে এসে বসলুম। চারপাশ খোলা। সামনে গঙ্গা। হুহু করে বাতাস বইছে। কাঁচাপাকা বাতাস। একটু একটু গরম, একটু একটু ঠাণ্ডা। চুর চুর করে সোঁদাল ফুল ঝরে পড়ছে সামনের সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে। আমার ভীষণ দাদির কথা মনে পড়ছে। আমি যখন আরও ছোট ছিলুম তখন এই আশ্রমে দাদির হাত ধরে প্রায়ই বেড়াতে আসতুম। পাশের খোলা মাঠটায় একটা টিবি ছিল। দাদি ভীষণ পাহাড় ভালবাসতেন। আমাকে কত পাহাড়ের গল্প বলতেন। যেসব পাহাড়ে তিনি উঠেছেন। কী দারুণ চেহারা ছিল দাদির। সোজা, খাড়া। কখনও বেঁকে বসতেন না। আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘বুড়ো, কখনও সামনে ঝুঁকে বসবি না। মেরুদণ্ড সবসময় স্ট্রেট রাখবি। মানুষের স্বাস্থ্য মেরুদণ্ড। যত ধনুক হবি, দুর্বল হয়ে যাবি তত। দাদি আমাকে যা, যা বলতেন সব আমি মনে করে করে এখন খাতায় লিখে রাখছি। যে যাই বলুক, আমি আমার দাদির হাত ধরে আছি। এখনও ধরে আছি। আমি আকাশকে বলি, সেই হাত ছাড়িয়ে দিও না। মেঘে যে চাঁদ ভাসে, তাকে বলি। আমি গাছকে বলি। পাখিকে বলি। আমি গঙ্গাকে বলি।

আমাদের চোখের সামনে গঙ্গা যেন টলটলে হাসি। বাবা সোজা হয়ে বসে আছে। যেমন করে মানুষ ধ্যানে বসে।

হঠাৎ বললে, “বুড়ো, লেখ তো, লিখে নে।”

“বাবা, আমার কাছে তো কাগজ-কলম নেই।”

“মনের পাতায় স্মৃতির কলম দিয়ে লেখ।”

“বলো।”

“সৎ হতে হবে। কাজে, কথায়, চরিত্রে। লিখেছিস?”

“লিখেছি।”

“এবার লেখ, নিজেকে ধরতে আর ছাড়তে শিখতে হবে। লিখেছিস?”

“ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে দেবে?”

“অফ কোর্স। ঘুড়ি, লাটাই আর সুতো। মন হল ঘুড়ি, সুতো হল ইচ্ছে আর বিচার হল লাটাই। মন ঘুড়ি উড়তে চাইছে, বাড়তে চাইছে। ইচ্ছের সুতো ভল-ভল করে ছাড়ছি। কোন্ আকাশে, কোন্ বাতাসে ভেসে গিয়ে, কোন বিপাকে পড়বে কেউ জানে না। অমনি বিচারের লাটাই ঘুরিয়ে তাকে টেনে আনো। এটা বোধহয় তোর পক্ষে একটু শক্ত হয়ে গেল।”

“না গো, অনেকটা এই রকম কথাই দাদি আমাকে বলতেন।”

“তবে আর কী! তুই তো অনেকটা এগিয়েই আছিস। নে লেখ। মা হিংসি! হিংসা কোরো না। লেখ, সামনে তাকাও। পেছনে যা রইল, পেছনেই পড়ে থাক। এইবার লেখ, দেহের মাপে মন তৈরি কোরো না। মনের মাপে দেহ তৈরি কোরো।”

“একটু শক্ত হয়ে গেল বাবা।”

“কিচ্ছু শক্ত হয়নি। শক্ত শব্দটা বোকাদের অভিধানেই থাকে। তোকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। তার আগে লেখ, ভুলে যাব। শক্তির চেয়ে বুদ্ধি বড়। লিখেছিস?”

“ইয়েস।”

“এইবার শোন, দেহের মধ্যে মন থাকে তো! থাকে কি না?”

“হ্যাঁ, থাকে।”

“পাঁচ ফুট ছ’ ইঞ্চি, পাঁচ ফুট আট, পাঁচ দশ, বড় জোর ছ’ ফুট, এই তো দেহের মাপ। মনটা ওই কুলফি বরফের খোপের মাপে জমে যেন না যায়। মন হবে দৈত্যের মতো, পাহাড়ের মতো গর্জন গাছের মতো। বিশাল। আর সেই মনকে ধরার চেষ্টা করবে দেহ। মন বলবে চাঁদ ছোঁও, দেহ ছুঁয়ে আসবে। মন বলবে এভারেস্ট ধরো, দেহ ধরে ফেলবে। দেহ তখন ছ’ফুট নয়, ছ’ মাইল ছ লক্ষ মাইল। বুঝলি?”

“ক্লিয়ার।”

“পঙ্গু গিরি লঙ্ঘন করে। মনে আছে?”

“আছে।”

“খাতা বন্ধ কর। শোন বুড়ো, ভেতরটা বড় ছটফট করে। তোর করে?”

“সময় সময় করে।”

“কেন করে?”

“মনে হয় রোজই কী রকম দিনটা রাত হয়ে যায়!”

“হাত মেলা। ধরে ফেলেছিস। দুঃখটা ধরে ফেলেছিস। কী যন্ত্রণা বল তো! সবকিছু বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। আজ যা জন্মাচ্ছে, কাল তার মৃত্যু হচ্ছে। কী করা যায় বল তো?”

“তুমি আর কী করবে বাবা? কেউই তো কিছু করতে পারল না। এই দ্যাখো না, দু’বছর আগেও তো এমন দিনে দাদি ছিলেন। আমরা চারজন ছিলাম, আজ তিনজন। বলো, ভাল লাগে?”

“ধুস কিছুই কি ছাই ভাল লাগে!”

“চলো, এবার তা হলে বাড়ি যাই। মা একলা আছে। পুশটা কী করছে, পিঙ্কা কী করছে?”

“চল তা হলে। এই একটা-দুটো ভাল লাগা নিয়েই তো বেঁচে থাকা।”

যতই রোদ চড়ছে, চারপাশ জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে, ততই বাবার আনন্দ হচ্ছে। কেবলই বলছে, ‘উঃ কী উত্তাপ! এত তাপ সূর্যদেব পেলেন কোথা থেকে।’ মাঝে-মাঝে ধুলো উড়ছে। শুকনো পাতা গোল হয়ে ঘুরপাক খেয়ে আবার নেমে আসছে। বাবা বললে, “বুঝলি বুড়ো, আজ আমরা বাগানটাকে আরও সুন্দর করব। মাঝখানটাকে গোল করে খুঁড়ে ফেলব। ফেলে তাতে জল ঢালব। তলায় ছোট-ছোট নুড়ি পাথর দেব। ধারে ধারে নয়নতারা গাছ। ফোয়ারা তো আর করতে পারব না। সে তোমার অনেক অনেক টাকার ব্যাপার। দুপুরে ওই জলে পাখি এসে চান করবে। তুই দেখতে পাবি। আমি তো আর দেখতে পাব না। আমার সারাটা দিনই তো আটকে থাকবে কলকাতার এঁদো একটা অফিসে।”

“বাবা, তোমার চাকরি করতে খুব খারাপ লাগে, তাই না? তা হলে করো কেন?”

“তোদের জন্য। আমি চাকরি না করলে, তুই বড় হবি কী করে?”

অধ্যায় ১ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%