হানি ট্র্যাপ - প্রথম পর্ব

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

একটা পুরোনো দোতলা বাড়ির একতলায় থানা, বাইরের দেওয়ালে, টিনের রংচটা বোর্ডে নামটা লেখা। খুব ভালো করে পড়বার চেষ্টা করলে বোঝা যায়, লেখা রয়েছে, মাঝের হাট থানা। রায়গঞ্জ শহরের বাইরে, একপ্রান্তে, খোলা মাঠের মাঝখানে।

চারিদিকে কয়েকটা বড় বড় গাছ,— কদম, বকুল, বট আর অশ্বত্থে ঘেরা। গরমের দিনগুলোতে যখন আগুন ছোটে, বাড়িটা বড় বড় গাছের নিচে বলে, রক্ষা পাওয়া যায়। পুরোনো দিনের বাড়ি, মোটা মোটা দেওয়াল, গাছের ছায়ায় একটু ঠান্ডা থাকে।

বর্ষাকালে, ওই কাদাভারা মাঠ ঠেঙিয়ে থানায় ঢুকতে হয়। সেই সময়টায় আবার চারিদিকে সাপের উৎপাত; ভাঙা কাঠের জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে টেবিলের কাগজপত্র ভিজিয়ে দেয়। তখন, জানালার ধার থেকে সরে আসতে হয় ঘরের মাঝখানে। দোতলার অবস্থাও তথৈবচ। ছাদ ভেঙে পড়ে গেছে কবেই। বহুদিন বাড়িটার সংস্কার হয় না। দোতলায় বেড়ে উঠেছে আগাছা। কয়েকটা বট আর অশ্বত্থের চারা এতই বড় হয়েছে, যে একতলার ছাদেও ফাটল ধরিয়েছে। বেশি বৃষ্টি হলে, দোতলায় জল জমে থাকে। সেই জল চুঁইয়ে পড়ে একতলার ছাদ দিয়ে। তখন আবার নিচে বালতি পেতে রাখতে হয়। দুজন সাব-ইন্সপেক্টর, কয়েকজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর আর কয়েকজন কনস্টেবল—এই নিয়েই থানা। ওসি দ্বিজপদবাবুর বয়েস হয়েছে। চাকরি শেষের আর কয়েক মাস বাকি।

এই থানায় প্রথম জয়েন করে, জেলার অ্যাডিশনাল এস পি-কে কয়েকবার মিন মিন করে বলার চেষ্টা করেছিলেন, থানাটা যদি এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোনো ভালো বাড়িতে নিয়ে আসা যায়— তা, কে আর কার কথা শোনে? প্রোমোশন পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর। চাকরিরও শেষের দিক। তার কথার আর দাম কি? অ্যাডিশনাল এস পি-র বেশি বয়স নয়। ডব্লু বি সি এস, বি গ্রুপে পরীক্ষা দিয়েই একবারে পাশ—বহুদূর যাবেন—বুড়ো সাব-ইন্সপেক্টরের কথায় পাত্তা না দেওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া, তাঁকেও তো বলতে হবে, জেলার এস পি-কে—অত ঝামেলার আবার দরকার কি? তিনিও তো চেয়ে আছেন, আরও ভালো পোস্টিংয়ের দিকে। কাজেই মাঝেরহাট থানার ভাগ্য, ওই পুরোনো ভাঙা বাড়িতেই।

মাথার ওপরের ফ্যানটা আবার ভালো ঘোরে না। ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজ বেরোয়। দ্বিজপদবাবু খাকি জামার ওপরের বোতামদুটো খুলে, কোমরের বেল্টটা আলগা করে, একটা কেস-ডায়েরির দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন—সাক্ষীর বয়ানগুলো, জুতসই করে লেখার চেষ্টা করছিলেন— কিন্তু, কিছুতেই যেন সাজাতে পারছিলেন না।

একটা অল্পবয়সি বউকে, শ্বশুরবাড়িতেই গলায় দড়ি দেওয়া, ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রথমে ইনফর্মেশন পেয়েছিলেন যে—বরটার অন্য বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে লটঘট ছিল। আগের দিন রাতে এই নিয়ে বর-বউতে প্রচণ্ড ঝগড়া-মারপিট হয়েছে। বউটারও সারা গায়ে প্রচুর মারের দাগ রয়েছে। বরটা ওই ঝগড়া-মারপিটের পর বউটাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দিয়ে মেরে ফেলে। ঘটনার সময় পাশের ঘরে অবিবাহিতা ননদ, শ্বশুর-শাশুড়ি জেগেই ছিল। এই ঘটনায় তারাও তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। হয়তো, অ্যাক্টিভলি পার্টিসিপেট করেনি, কিন্তু, বউকে মেরে ফেলায় মদত তো ছিলই।

পাড়ার লোক খবর পেয়ে সাত সকালেই এসে জড়ো হয়, তারপর উত্তেজিত হয়ে আসামীদের বাড়িটা ভাঙচুর করে। দরজা, জানলা, টিভি, ফ্রিজ, আলমারি, কিছুই ভাঙতে বাকি রাখেনি। স্বামীকেও পাবলিক ধরে ফেলে। তাকে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে বেঁধে, পেটাতে শুরু করে, তারপর মাথা ন্যাড়া করতে যাবার সময়েই ফোর্স নিয়ে দ্বিজপদবাবু গিয়ে পৌঁছন স্পটে। স্বামীটাকে রেসকিউ করে ভ্যানে তোলেন। সেই মুহূর্তে স্বামীকে রেসকিউ না করলে, হয়তো, তাকে পাবলিক পিটিয়েই মেরে ফেলত।

তবে, থানায় খবরটা পৌঁছেছিল আরও সকালে। সার্কেল ইন্সপেক্টর, শিবব্রত বাবুকে আরও ফোর্স চেয়ে ফোন করতেই উনি বললেন—'জানি, দ্বিজবাবু, ঘটনাটা আমিও জানি, তা, আপনার আর ক'বছর চাকরি আছে?'

দ্বিজপদ উত্তর দিয়েছিলেন —'বছর নয়, স্যার, কয়েক মাস।' ফোনের ওপার থেকে শিবব্রতবাবু বলে উঠেছিলেন—'রিটায়ার করে, কতটাকা হাতে পাবেন? চলবে তো? মেয়ের তো বিয়ে হয়নি। বিয়েটা তো দিতে হবে। কোথায় পাবেন টাকা-পয়সা? খরচ তো তুলতে হবে।'

দ্বিজপদ ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলেন—'তাহলে ফোর্স নিয়ে কখন বেরোবো স্যার?'

—'দাঁড়ান, দাঁড়ান, এই তো থানায় খবরটা এল। জিডি করেছেন?'

—'না স্যার।'

—'আধ ঘণ্টা পরের টাইম দিয়ে, 'জাস্ট ইনফর্মেশন রিসিভড'—বলে জিডি করবেন। তারও কুড়ি মিনিট পর থানা থেকে বেরোবেন। থানা থেকে স্পটে পৌঁছোতে লাগবে আরও দশ মিনিট। মানে ওই এক ঘণ্টায়, সিচ্যুয়েশন আরও ঘোরালো হবে— যত ঘোরালো—তত দাম—হেঁ হেঁ হেঁ। আর শুধু তো আপনার খরচ নয়। ওপরওয়ালাদের জন্যও তো রাখতে হবে। আপনি তো শ্লা... সারা জীবন কানে পৈতে জড়িয়ে পায়খানায় গেলেন।'

ওপার থেকে মুখ খিস্তি শুনেছিলেন দ্বিজপদবাবু।

—'আর একটা কথা, শুধু স্বামীটাকে তুলবেন। শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদকে পালাতে দেবেন— না হলে টাকাটা সাপ্লাই করবে কে? আপনি স্পটে যান, আমিও আসছি।'

দ্বিজপদ ফোন রেখে দিয়েছিলেন। সত্যি কথাই তো, সারাজীবন তিনি একটা ব্যর্থ অফিসার-সবার কাছ থেকে এই কথাই শুনে এসেছেন, টাকা পয়সাও কামাতে পারেননি। কোনোদিন একটা ভালো পোস্টিং পাননি, ভালো পোস্টিং পেতে গেলে, যা যা করতে হয়, তার কোনোটাই তিনি করতে পারেননি। নিজেকে আদ্যোপান্ত সৎ মানুষ বলে মনে করেন।

সহকর্মীরা অবশ্য বলেন—'সততাটা আপনার অসহায়তা। আপনি, ভীতু বলে ঘুষ নিতে পারেননি, সারাজীবন আপনি করেছেনটা কী?'

দ্বিজপদ মনে করেন—একথা ঠিক, যে, তিনি সারাজীবন ভালো পোস্টিং পাননি, মুঠো মুঠো টাকাও ঘরে আনতে পারেননি। অখ্যাত-গণ্ডগ্রামগুলোতে পোস্টিং নিয়ে পড়ে থেকেছেন। প্রোমোশন পেয়েছেন দেরি করে—স্ত্রীকে গয়নায় মুড়ে দিতে পারেননি। নিজে গরিব ব্রাহ্মণের ছেলে, বড়লোক হবার ইচ্ছে কোনোদিন ছিল না আর বড়লোক হতে চেষ্টাও করেননি।

তবে, তাঁর মনে মনে অহংকার আছে— নিজের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে— মনের মতো করে তাকে পড়িয়েছেন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে দুটোতেই জেলার মধ্যে ফার্স্ট। জয়েন্টে প্রথম সারিতে ছিল—পড়েনি, আই আই টিতেও প্রথম সারিতে। তবে, ওর ইচ্ছে, আই পি এস হবে। দ্বিজপদবাবু জানেন, ওর যা জেদ, আই পি এস,-ও হবেই। আই আই টি শেষ করে, এই বছরেই আই পি এসে বসেছিল। এখন শুধু রেজাল্টের অপেক্ষা।

কাজেই সেদিন যখন সার্কেল ইন্সপেক্টর, শিবব্রতবাবু ওঁকে বলেছিলেন—'মেয়ের তো বিয়ে দিতে হবে, নাকি?' তখন উনি হেসেছিলেন। ঈশ্বরকে স্মরণ করে মনে মনে বলেছিলেন, 'আমার মেয়ের বিয়ের খরচ নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। আমি আমার মেয়েকে যত্ন করে মানুষ করেছি। ঘুষের টাকায়, লোকে বিপদে পড়লে, তার পকেট থেকে জোর করে তুলে নেওয়া টাকায় মেয়েকে মানুষ করিনি, ওই চোখের জল মেশানো টাকায় তার বিয়েও দেবো না।'

শিবব্রতবাবুর ফোন কেটে, অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর রতন পাহাড়ীকে ডেকে বলেছিলেন, 'রতন, ড্রাইভারকে ডাক, আর চল আমার সঙ্গে, স্পটে যেতে হবে।'

রতন বুদ্ধিমান ছেলে, বয়সও কম। শিবব্রতবাবু, কী বলেছেন, আন্দাজ করেই বলেছিল— 'স্যার, এক্ষুনি যাবেন? সি আই সাহেব তো অবস্থা, 'আরও ঘোরালো' হলে, যেতে বললেন।'

দ্বিজপদ, রতনের দিকে সোজা তাকিয়ে বলেছিলেন—'ওদের কথা শুনিনি, বলেই, আমার চাকরিতে কোনও উন্নতি হয়নি, রতন। আমি বড় বাড়ি করতে পারিনি। তোদের বউদিকে গয়নায় মুড়ে দিতে পারিনি। আর কয়েকমাস চাকরি, নতুন করে আর সাহেবদের কাছেও ভালো হতে পারব না। তবে, সি আই শিবব্রতবাবু, আমাকে আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে, কথা শোনালো রে—আমার মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে ওনাকে চিন্তা করতে হবে না। ভগবানের দয়ায় নিজের ভাগ্য সে নিজেই তৈরি করছে।' একটু থেমে আবার বলেছিলেন, 'খবর পেলাম পাবলিক নাকি, আসামীদের বাড়ি ভাঙচুর করছে। বরটাকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পেটাচ্ছে। বরটা মরেও যেতে পারে। শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদের কি অবস্থা জানি না। শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদকে সি আই সাহেব বলছেন, পালাতে দিতে— তারা না পালালে সাহেবদের টাকা সাপ্লাই করবে কে?'

রতন, বুদ্ধিমান, পড়াশোনা জানা। দ্বিজপদর মনের অবস্থাটা ধরতে পেরে বলেছিল—'স্যার, দুঃখ করবেন না। তবে এটাও ঠিক যে, সব পুলিশই খারাপ নয়। পুলিশের মধ্যেও ভালোলোক প্রচুর আছে। আপনি নিজেই তো একজন ভালোমানুষ। আপনার কাছ থেকেই শুনেছি, পঙ্কজ মিত্র, সন্ধি চ্যাটার্জি, বাণীব্রত ঘোষ, পল্লবকান্তি বসুদের মতো অফিসারদের কথা— তাঁরা মানুষ হিসেবেও কত্ত বড় মনের। স্যার, আপনিই তো বলেছিলেন, যে, আপনার মেয়ে, আই আই টি-তে ভালো রেজাল্ট করবার পর, সন্ধি চ্যাটার্জি স্যার নিজে মিষ্টি কিনে আপনার মুখে গুঁজে দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে, ভালো কোম্পানির পেন কিনে এনে আপনার মেয়েকে গিফ্ট করেছিলেন, তখন উনি, ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন। ভাবা যায়? অতবড় পদের মানুষ, আপনার মেয়ের ভালো রেজাল্টের খবরে খুশি হয়ে, আপনার মুখে মিষ্টি গুঁজে দিচ্ছেন?'

দ্বিজপদ নরম মনের মানুষ—বাঁ হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে ধরা গলায় বলেছিলেন, 'আর পঙ্কজ মিত্র সাহেব, আমার হাতে হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন—'মেয়েকে মাংস-ভাত খাইও দ্বিজ। তোমার রোজগার কত আমি জানি। পুলিশের ছেলে-মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করলে আমাদের গর্ব হয়। তোমার মেয়ে, আমাদের পুলিশ ফ্যামিলির মুখ উজ্জ্বল করেছে।'

স্পটে পৌঁছে, দ্বিজপদ আর রতন দেখেছিলেন, একেবারে তুলকালাম কাণ্ড। স্বামীটাকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখে সবাই পেটাচ্ছে। একজন খুর নিয়ে এসেছে মাথা কামিয়ে দেবে বলে। মার খেতে খেতে স্বামীটা নেতিয়ে পড়েছে। অবস্থা দেখে, দ্বিজপদর মনে হয়েছিল, যেকোনও সময়ে মরে যেতে পারে। তাহলে আবার, আর এক ঝামেলা!

এদিকে ফোর্সও বেশি নেই। সার্কেল ইন্সপেক্টর শিবব্রতর কথা অনুযায়ী ফোনে ইনফর্মেশন পাবার এক ঘণ্টা পর, ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে আসার কথা ছিল দ্বিজপদর, কিন্তু, অবস্থার গুরুত্ব বুঝে তিনি রতনকে আর চার-পাঁচজন মারকুটে কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।

পাড়ার মোটা মোটা চেহারার কয়েকজন মহিলা, নাইটির ওপর গামছা জড়ানো, তারাই স্বামীটাকে চটি আর ঝাঁটা দিয়ে পেটাচ্ছিল। ওদিকে কয়েকটা অল্পবয়সি ছেলে, বাড়িটাকে ভাঙচুর করতে ব্যস্ত।

এক্বেবারে নতুন কনস্টেবল রাজু ঘরামি দ্বিজপদর কানে কানে বলেছিল— 'স্যার, বডি এখনও ভেতরে। আর শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদ পাশের বাড়িতে লুকিয়ে আছে। নিয়ে আসব?'

দ্বিজপদ মনে মনে ক্যালকুলেশন করেছিলেন—জনতা যেরকম খেপে আছে, তাতে, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদকে হাতের কাছে পেলে, পিটিয়েই মেরে ফেলবে। তার চেয়ে, যেখানে আছে লুকিয়েই থাক, পরে ওদের রেসকিউ করব। রতনকে বলাতে, রতন বলেছিল, 'খেপেছেন স্যার? পরে রেসকিউ করবেন কি? যা করতে হবে এক্ষুনি, হাতে সময় নেই। সি আই সাহেব এসে পড়লে তো ওদের পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিতে হবে। না হলে, মাল খরচা করবে কে?'

—'দ্যাখ রতন, ঘটনার সময় ওরা পাশের ঘরে ছিল। মার্ডার হয়ে থাকলে, ডাইরেক্টলি না হলেও, ইনডাইরেক্টলি ইনভলভড তো বটেই। তবে, আমরা এখনও মার্ডার কি সুইসাইড জানি না। যাই হোক, আমি ওদের পালাতে দিতেও পারি না, আবার পাবলিকের হাতে মার খেতেও দিতে পারি না। আগে বরটাকে বাঁচাই, তারপর ওদেরও লক আপ করব। ননদটাকেও তুলবি। বরং ভেতরে থাকলেই সেফ থাকবে। বাইরে হায়নারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।'

তারপর একটু থেমে মহিলা কনস্টেবল শ্যামাকে দেখিয়ে বলেছিলেন— 'মিডিয়া এখনও পৌঁছয়নি, শ্যামাকে বল, লাঠি চালিয়ে মেয়েদের ভীড়টাকে সরাতে, আর আমরা আগে বরটাকে বাঁচাই, তারপর, বাকিদের বাঁচাব। এক্ষুণি বরটাকে না বাঁচালে, মরেই যাবে।'

দলে মহিলা কনস্টেবল দুজন, শ্যামা আর লক্ষ্মী। দুজনেই লাঠি চালাতে ওস্তাদ। দ্বিজপদবাবুর ইশারা পেতেই, শ্যামা আর লক্ষ্মী, মাথার হেলমেট ঠিক করে নিয়ে, এক হাতে বেতের ঢাল আর একহাতে লাঠি নিয়ে, চিৎকার করে নাইটি পরা মহিলাদের ভীড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এতক্ষণ যে মহিলারা স্বামীটাকে চটি আর ঝাঁটা দিয়ে মেরে হাতের সুখ করছিল, এবার তারাই লাঠির বাড়ি খেয়ে, কাঁদতে কাঁদতে এদিক ওদিক ছিটকে পড়ছিল।

কনস্টেবল রাজু ঘরামিকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিজপদবাবু গিয়েছিলেন পাশের বাড়িতে, যেখানে শ্বশুর-শাশুড়ি লুকিয়ে ছিলেন। পুলিশ দেখেই, যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন, বয়স্ক ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা। ভদ্রলোক তো হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে দ্বিজপদর পায়ের সামনে এসে পড়েছিলেন—'আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান, আমরা কিছু জানি না। আমরা শম্পাকে মারিনি। দেখুন দেখুন পাড়ার লোক, আমাদের সব শেষ করে দিল। বিশ্বাস করুন, আমরা শম্পাকে মারিনি'—ভদ্রলোক হাঁপাতে শুরু করেছিলেন। দ্বিজপদ ভালো করে তাকিয়ে দেখেছিলেন—প্রায় বৃদ্ধ, খালি গা। কোমরের নিচে বাঁধা লুঙ্গি। ফেটে যাওয়া কপাল থেকে তখনও রক্ত বেরোচ্ছিল। দ্বিজপদ বুঝেছিলেন যে, পাড়ার লোক ওনাকেও মেরেছে।

আটপৌরে, ঘরোয়া ভঙ্গিতে শাড়ি পরা একজন ভারী চেহারার মহিলা কাঁদতে কাঁদতে দ্বিজপদর সামনে এসে হাত জোড় করে বলেছিলেন—'শম্পার সঙ্গে ফেসবুকে আলাপ একটা লোকের। দীর্ঘদিন ধরে শম্পাকে আজেবাজে কথা লিখত। শম্পাও ওর পাল্লায় পড়ে যায়। শম্পা ওকে নিজের বাজে বাজে ছবি পাঠাত। রোজ রাতে গোবিন্দ ঘুমিয়ে পড়লে, ফোনে চ্যাটিং করত। কাল রাতে গোবিন্দ ধরে ফেলে। দুজনের ঝগড়া হয়। গোবিন্দ রেগে গিয়ে সেই লোকটাকে ফোন করে। লোকটা বলে—'আপনি, আপনার বউকে সামলান',বলে শম্পার কিছু খারাপ খারাপ ছবি, গোবিন্দকে মোবাইলে পাঠিয়ে দেয়। গোবিন্দ আর মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। শম্পাকে থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। তারপর ছাদে চলে যায়। ছাদে গিয়ে শুয়ে থাকে। ভোরবেলা ছাদ থেকে নেমে এসে দেখে শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ। সবাই মিলে দরজা ভাঙি, দেখি, গলায় শাড়ি জড়িয়ে ঝুলছে।'

'ও হরি, এতক্ষণে বিষয়টা পরিষ্কার হল'—এই এক হয়েছে মোবাইল ফোন! এই ট্র্যাপে যে কত পরিবার শেষ হয়ে গেল! বিশেষ করে এক শ্রেণির অপরাধী, গৃহবধূদেরই টার্গেট করে। স্বামীরা কাজে বেরিয়ে গেলে, বাড়িতে যখন বউরা একা থাকেন, তখনই এই ধরনের অপরাধীরা তাঁদের সঙ্গে আলাপ জমায়। ভুলভাল বুঝিয়ে, বন্ধুত্ব করার ছলে, বাড়ির বউদের কাছ থেকে তাদের খারাপ খারাপ ছবি নিয়ে নেয়। আজকাল, এই ধরনের চ্যাটিংকে বলে—'ভার্বাল সেক্স'।

স্রেফ ফোনেই বন্ধুত্ব। তারপর, ফোনে কথা বলে বলেই, ওই গৃহবধূটিকে মানসিকভাবে, দুর্বল করে দেওয়া হয়। আর এক দুর্বল মুহূর্তে তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া হবে, তাঁদের নগ্ন, অর্ধ নগ্ন ছবি।

তারপর এই ছবি দেখিয়ে শুরু হয়, ব্ল্যাকমেইলিং!

আচ্ছা! শম্পা তাহলে ওই মহিলাটির নাম, যিনি আত্মহত্যা করেছেন। আর পাড়ার লোক ভেবেছে এটা একটা মার্ডার! তাই, তাঁদের রাগ গিয়ে পড়েছে স্বামী আর তার মা-বাবা-বোনের ওপর!' বিষয়টা অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছিল দ্বিজপদর কাছে।

'আচ্ছা, আপনাদের মেয়ে কই?'

ভদ্রমহিলা এক নাগাড়ে কথা বলা শেষ করে, আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। কথা না বলে তিনি হাত দিয়ে ঘরের একদিকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন—দ্বিজপদর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল—মুহূর্তের জন্য ইন্দুমতীর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, ইন্দুমতী, দ্বিজপদরই একমাত্র মেয়ে। আর এই মেয়েটা ইন্দুমতীর বয়সিই হবে— শ্যামলা গায়ের রং, একঢাল চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ—জলে ভরা। একটা রং ওঠা চুড়িদার পরে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

'বাঁচাতেই হবে, মেয়েটিকে বাঁচাতেই হবে।' কনস্টেবল রাজু ঘরামির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— 'রাজু, এবার তুই পাবলিক সামলা, শ্যামা আর লক্ষ্মীকে ডাক, এনাদের গাড়িতে তোল।' তারপর ভদ্রমহিলার দিকে ঘুরে বলেছিলেন—'দিদিভাই, আপনাদের বাঁচাতে গেলে অ্যারেস্ট করতে হবে। বাইরে থাকলে, পাবলিকও মারবে আর অন্য বিপদও আছে। প্লিজ, কো-অপারেট করুন। আমি থাকতে আপনাদের কোনও ক্ষতি হবে না।'

স্বামীটি অর্থাৎ, গোবিন্দ, তার মা-বাবা আর বোনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল। গোবিন্দর ইনজুরি এত বেশি ছিল, যে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর পণের দাবিতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা চালু করে, বডি সুরতহাল করিয়ে পোস্ট মর্টেমের জন্য মর্গে পাঠিয়ে থানায় ঢুকতে ঢুকতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল।

তবে, যা ভয় করেছিলেন, তাই হয়েছিল, সার্কেল ইন্সপেক্টর শিবব্রত জোয়ারদার, দ্বিজপদকে দেখেই দাঁত কিড়মিড় করে বলেছিলেন—'আপনাকে বলেছিলাম না, হাজব্যান্ডটাকে অ্যারেস্ট করে, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদকে পালাতে অ্যালাউ করতে? সব কটাকে চালান করলেন কেন? আর হাজব্যান্ডের এগেনস্টে মার্ডার কেস চালু করেছেন?'

দ্বিজপদ, শিবব্রত জোয়ারদারের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন—'সেই মুহূর্তে শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদকে অ্যারেস্ট না করে উপায় ছিল না স্যার। পাবলিক ভায়োলেন্ট হয়ে গেছিল। ওঁদের মেরেই ফেলত। তাছাড়া, এটা মার্ডার কেস নয় স্যার। বউটা ঘরের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়জোর আত্মহত্যায় প্ররোচনার কেস আর যেহেতু, বিয়ের সাত বছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়িতেই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, তাই 'ডাউরী ডেথ' বা পণের দাবিতে মৃত্যুর মামলা চালু করা যেতে পারত—আর তা-ই করেছি স্যার। বউটার মাকে থানায় এসে, আলাদা করে একটা কমপ্লেইন দিতে বলেছি। কিন্তু, উনি বলছেন, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির এগেনস্টে ওনার কোনও অভিযোগ নেই, তাই উনি কোনও অভিযোগ জমা দিতেও চান না। উলটে বলছেন, ওনার মেয়েই নাকি বয়ে গিয়েছিল। স্বামীর কোনও দোষ নেই।'

শিবব্রত জোয়ারদার দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলেন—'তাহলে শ্লা—মাল আসবে কোথা থেকে?'

শিবব্রত জোয়ারদার আবার ফরমান দিয়েছিলেন— 'সবার এগেনস্টে মার্ডার চার্জ আনুন।'

দ্বিজপদ উত্তর দিয়েছিলেন—'মার্ডার চার্জ তো আসবেই না। বউটা ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে গলায় কাপড়ের ফাঁস লাগিয়েছে। স্বামী কয়েকজন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী নিয়ে ঘরের দরজা বাইরে থেকে ভেঙেছে, দরজা যে বাইরে থেকে ভাঙা হচ্ছে, তা মোবাইলে ভিডিও করা হয়েছে। তাছাড়া ভাঙা দরজা 'সীজ' করা হয়েছে। সীজার লিস্ট তৈরি হয়ে গেছে স্যার।'

—'তাহলে ডাউরী ডেথ? মানে আই পি সিতে তিনশো চারের বি? অথবা আই পি সি তিনশো ছয়, মানে আত্মহত্যায় প্ররোচনা? কী ধারায় কেস দিচ্ছেন?'

—'স্যার, কেস তো চালু হল, একসঙ্গে, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর ডাউরী ডেথ। দেখা যাক।'

দ্বিজপদ জানেন, এর কোনোটাই টিঁকবে না। বউটার মোবাইলও সীজ করা হয়েছে। সেখানে, নিজের গুচ্ছের নগ্ন ছবি। লোকটাকে পাঠিয়েছিল। লোকটা বা বউটার বয়ফ্রেন্ড, ওই ছবিগুলো দেখিয়েই ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। আত্মহত্যায় প্ররোচনা কেউ দিয়ে থাকলে, ওই বয়ফ্রেন্ডটা দিয়েছে। বয়ফ্রেন্ডটার নাম, সঞ্জয় পাইন, কিন্তু লোকটা ফোন অফ করে দিয়েছে।

আর ডাউরী ডেথ বা 'পণের দাবিতে মৃত্যু' ঘটানোর ধারাও এখানে লাগু হবে না। বউটা, মানে শম্পার শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসছেই না। তাছাড়া, শম্পার মা-ও তো, কোনও অভিযোগ করতে চাইছেন না।

শিবব্রত জোয়ারদার আবার বলেছিলেন— 'আপনি মার্ডারের চার্জটাও লাগান। কেস টিঁকবে কি টিঁকবে না, সেটা কোর্ট বুঝবে। ওরা হাইকোর্টে যাক না। ততদিন কেউ যেন বেল না পায়। লক আপে থাকলেই আসামীরা টাকা অফার করবে।'

—তা, এই হল, দ্বিজপদবাবুর সমস্যা। উপরমহল থেকে বলছে, আসামীরা যেন জামিন না পায়। মার্ডার চার্জ দাও। সেইমতো, কেস ডায়েরি তৈরি করো। আর দ্বিজপদবাবু, এই কেসের তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, এটুকু বোঝেন, যে এই কেসে কিস্যু নেই।

যে বউটা গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরেছে, তার মোবাইল ঘাঁটলে, শরীরের মধ্যেটা রি রি করে উঠবে রাগে— 'শয়তান মহিলা, বরটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে এইসব করা! এই কীর্তিকাহিনী জানলে যে কোনও বরই খেপে আগুন হবে। ওই ছবিগুলো, গোবিন্দর, মানে, শম্পার বরের হাতে পড়ে যায়। তারপর যা হবার তাই হয়েছে, দুজনের মধ্যে গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়। দ্বিজপদ অবশ্য ওই সঞ্জয় পাইন লোকটারও মোবাইল ট্র্যাক করবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, গোবিন্দ, গোবিন্দর বাবা-মা-আর বোনকে আটকাবেন কি করে? মিথ্যা চার্জে, জেলে রাখতে, দ্বিজপদর মন সায় দিচ্ছে না।

গোবিন্দ, গোবিন্দর মা-বাবা আর বোন, চারজনই হাইকোর্টে জামিন চেয়ে মামলা করেছেন। সোমবার হাইকোর্টে কেস ডায়েরি প্রোডিউস করবার তারিখ।

দ্বিজপদ মনে মনে ঠিক করে নিলেন—ওপরমহল থেকে যাই বলুক না কেন, তিনি চলবেন নিজের মতো, তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, নিরপেক্ষ তদন্ত করে যা পেয়েছেন, কেস ডায়েরিতে তাই পাঠাবেন।

দ্বিজপদ অবশ্য পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, গোবিন্দ, গোবিন্দর মা-বাবা আর বোন—সবাই মিলে পণের দাবিতে শম্পার গলায় ফাঁস লাগিয়ে, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ তো নেই-ই। প্রতিবেশীরাও তাদের সাক্ষ্যে সে কথা বলেননি, যদিও, ঘটনার দিন ভোরবেলাতে পাড়ার একজন গৃহবধূর গলায় দড়ি দিয়ে মারা যাবার খবরে, প্রথমে সবাই ভেবেছিল, স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই বোধহয় বউটাকে মেরেছে। স্বাভাবিকভাবেই, কিছু উৎসাহী মানুষও জুটে গিয়েছিল। তারাই গোবিন্দকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রেখে পেটাতে শুরু করে। আর একদল মানুষ আবার গোবিন্দদের বাড়িটাকে ভেঙেচুরে ধ্বংস করে। কিন্তু, যখন শম্পার মা, সবার সামনেই বলেন যে, তাঁর, শম্পার শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তখন সবাই শান্ত হয়।

পাড়ার লোকেদের হাত থেকে বাঁচাতে, দ্বিজপদ অবশ্য, গোবিন্দ সহ বাড়ির সবাইকেই রেসকিউ করে, থানায় নিয়ে আসেন, শুধু তাই নয়, যারা যারা গোবিন্দকে মারধর করেছিল, আর তাদের বাড়ি ভাঙচুর করেছিল, তাদেরও সবার বিরুদ্ধে, মারধর, ভাঙচুর, হত্যার চেষ্টা, জোর করে বাড়িতে ঢুকে লুঠতরাজ করা, ইত্যাদি গুরুতর ধারায় মামলা চালু করে দেন।

ব্যস, যেন জোঁকের মুখে নুন পড়েছিল, পাড়ার লোক চুপচাপ হয়ে সরে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পাড়ার লোক যখন শম্পার সঙ্গে সঞ্জয় পাইনের অবৈধ সম্পর্কের কথা জানতে পারে, তারাও কিন্তু ছি ছি করতে শুরু করে।

যেভাবে, দ্বিজপদ, ফোর্সের জন্য অপেক্ষা না করে, নিজেই খুব তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান, এবং শক্ত হাতে গোটা ব্যাপারটা সামলে দিয়েছিলেন, তাতে স্বয়ং এস পি দ্বিজপদর প্রশংসা করেছিলেন। যদিও দ্বিজপদ, এই এস পি টি-কে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন না, তবুও এস পি-র তারিফ তাঁর চাকরির শেষ দিকে তাঁকে সাহস যুগিয়েছিল।

এই এস পি সাহেবটি দক্ষিণ ভারতীয়, নাম, সথাশিবম মাধবন, সংক্ষেপে এস মাধবন, অল্প বয়েসি, ডাইরেক্ট আই পি এস। টিভি চ্যানেলের সামনে ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ পেলে একদম ছাড়েন না। লাল-নীল টী শার্ট পরে, চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে ইন্টারভিউ দেন।

সেদিনও মিডিয়া আসবার খবর পেয়ে, নিজেই স্পটে চলে আসেন। দ্বিজপদকে পাশে নিয়ে টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দেন, এবং দ্বিজপদ অল্প সংখ্যক পুলিশ নিয়ে কিভাবে একটা 'ভায়োলেন্ট মব'কে সামাল দিয়েছেন, সে কথা বলে দ্বিজপদর ঢালাও প্রশংসা করেন।

এতেই আবার চটেছেন, অ্যাডিশনাল এস পি নাদিম আখতার। শিবব্রত জোয়ারদার তো পরিষ্কার বলে দিয়েছেন—এস পি সাহেবের সঙ্গে এত মাখামাখি ভালো হচ্ছে না। অ্যাডিশনাল এস পি সাহেব ভালো চোখে দেখছেন না। রোজ রোজ কিন্তু এস পি সাহেব বাঁচাতে আসবেন না। দরকার-অদরকারে অ্যাডিশনাল এস পি আর তিনিই ভরসা। তার ওপর এই কেস থেকে 'মাল' আসবার চান্স প্রায় নেই বললেই চলে— একমাত্র সম্ভাবনা থাকছে, যদি দ্বিজপদ মার্ডারের ধারায় কেস চালু করেন, বা এই ঘটনাটাকে 'মার্ডার' দেখিয়ে কেস ডায়েরি তৈরি করেন। একমাত্র, তাহলেই আসামীরা কেঁদে পায়ে এসে পড়বে। তখনই বরং বলা যাবে, যে, 'কেস হালকা করে দেবো, মাল ছাড়তে হবে।'

দ্বিজপদবাবু, মনে মনে হাসেন, এই 'কেস' আবার 'হালকা' করা হবে কিভাবে? কেস তো গোবিন্দদের জন্য যথেষ্টই হালকা। তবু গোবিন্দকে আর গোবিন্দর মা-বাবা-বোনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। এমনিতেই পাবলিকের মারের হাত থেকে ওদের বাঁচাতেই হত। তাছাড়া, এটাও ঠিক, যে, বিয়ের সাত বছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়িতেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু, তদন্ত করতে গিয়ে, গোবিন্দর বউয়ের সঙ্গে অন্য একজনের অবৈধ সম্পর্কের কথা জানা যায়।

তারপর গোবিন্দর বউ শম্পা স্বামীর কাছে ধরা পড়ে গিয়ে, লজ্জায়, নিজের শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে খিল দিয়ে নিজের পরনের শাড়ি খুলে, গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।

ব্ল্যাকমেইলিংটা যদি আত্মহত্যায় প্ররোচনা হয়, তাহলে সেটা লাগু হচ্ছে সঞ্জয় পাইনের বিরুদ্ধে। অবশ্য সঞ্জয় পাইনের বিরুদ্ধেও কেস চালু হয়েছে। কিন্তু সঞ্জয় পাইন এখনও ধরা পড়েনি।

জানা গেছে, সে ফেসবুকে ফেক প্রোফাইল খুলে, ফেক অ্যাড্রেস দিয়ে, অল্পবয়সি বউদের সঙ্গে ভাব জমায়। তারপর, দুপুরবেলায়, স্বামীরা কাজে বেরিয়ে গেলে, বা বাড়ির অন্য সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে, ওই অল্পবয়সি বউরা যখন বাড়িতে এক্কেবারে একা, তখনই ও তাদের সঙ্গে ফোনে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে। তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ঘনিষ্ঠতার বা বন্ধুত্বের আড়ালে তাদের অশ্লীল ছবি চেয়ে নেয়, এবং পরে, তাদের ব্ল্যাকমেইল করে টাকা জোগাড় করে, টাকা না দিলে স্বামীদের ফোনে ছবি পাঠিয়ে দেয় বা পর্ণোগ্রাফিক সাইটে ছবিগুলো ছেড়ে দেয়। এরকম আগেও সে করেছে।

সে যাকগে, সার্কেল ইন্সপেক্টর শিবব্রত জোয়ারদারের কথা মানতে গেলে গোবিন্দ আর তার মা-বাবা-বোনের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা সাজাতে হবে। আর নিরপেক্ষ, সৎ তদন্তের ফল হিসেবে কেস ডায়েরি লিখতে গেলে গোবিন্দদের বিরুদ্ধে যা পাওয়া গেছে, তা-ই লিখতে হবে। সেক্ষেত্রে, গোবিন্দদের জামিন হয়ে যেতেও পারে।

অবশ্য গোবিন্দদের পরিবারটাকে দ্বিজপদর ভালোই লেগেছে। ভদ্র, মার্জিত, এবং রুচিবান। ঘটনার দিন, বিকেল নাগাদ, থানার লক আপে, গোবিন্দর বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, দ্বিজপদ গিয়ে দেখেন, গোবিন্দর বাবা লক আপের গরাদ ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। দ্বিজপদ নরম স্বরে জিজ্ঞেস করেছিলেন—'বাবা, অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, আপনি লক আপের গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, বসুন, শরীর খারাপ করবে যে।'

গোবিন্দর বাবা ছিলেন ছেলেদের লক আপে, গোবিন্দর মা আর বোন-মেয়েদের লক আপে। দ্বিজপদর কথা শুনে গোবিন্দর বাবা ঘাড় ঘুরিয়ে লক আপের ভেতরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে জায়গাটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, 'পাশে মেয়েদের লকআপে, আমার স্ত্রী আছেন, ওঁর দু-হাঁটুতেই অপারেশন হয়েছে, তাছাড়া কোমরে ব্যথা, উঠলে বসতে পারেন না, বসলে উঠতে পারেন না। আমি জানি, উনিও মেয়েদের লক আপে সেই থেকে দাঁড়িয়েই আছেন। আপনি দয়া করে ওর জন্য একটা টুলের ব্যবস্থা করে দেবেন? ও না বসলে, আমিই বা বসি কী করে বলুন?'

দ্বিজপদ, একজন বৃদ্ধ মানুষের এমন কাতর আর্তি শুনে, মেয়েদের লক আপে, গোবিন্দর মা-এর জন্য টুলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। হলেনই বা ছোট্টো থানার ও সি, কিন্তু মানুষ হিসেবে, এটুকু তো করতেই পারেন!!

সেই থেকে গোবিন্দরা চারজন জেলেই আছেন, পাঁচদিন পুলিশ কাস্টডিতে থাকবার পর এখন জেল কাস্টডিতে। প্রায় একমাস হয়ে গেল। এতদিনে তাঁরা জামিন চেয়ে, হাইকোর্টে মামলা করেছেন। হাইকোর্ট কেস ডায়েরি চেয়ে পাঠিয়েছেন।

দ্বিজপদ মনে মনে ঠিক করে নিলেন। তদন্তে যা তিনি পেয়েছেন, কেস ডায়েরিতে তা-ই লিখে হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেবেন। অ্যাডিশনাল এস পি বা সি আই কী বলছে, তা শোনার দরকার নেই।

অল্পবয়সি দুটো মেয়ে সেই সকাল থেকে থানায় এসে বসে আছে। দ্বিজপদ ওদের চেনেন। ইচ্ছা আর খেয়ালী। রতনের টেবিলে, রতনের উলটোদিকের দুটো কাঠের চেয়ারে বসে, এক নাগাড়ে ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছে—'ও স্যার, আপনি তো বলেছিলেন, লোকটাকে অ্যারেস্ট করবেন—কই? অ্যারেস্ট তো করলেন না! ও তো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে—আজও তো পাড়ায় ঘুরছে। সেই কবে কেস করেছি—ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বয়ানও দিলাম— কই? কিছু তো হল না। তাহলে কেস করে কি লাভ হল বলুন? লোকটা আমাকে রেপ করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে?—এর কি কোনও বিচার নেই স্যার?'

ইচ্ছা এমন আর্তি-আকুতি মিশিয়ে রতনের সামনে বসে ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছে যে, দ্বিজপদ কিছুতেই নিজের কাজে মন দিতে পারছেন না। বারবার, মন চলে যাচ্ছে ইচ্ছা আর খেয়ালীর দিকে।

রতনই কেসটা দেখছে। দ্বিজপদ আর ইন্টারফেয়ার করতে চান না। আজকাল এক জ্বালা হয়েছে! ইন্দুমতীর বয়সী কোনো মেয়ে বিপদে পড়েছে দেখলে মনটা কেমন দুর্বল হয়ে যায়—ইন্দুমতীকে তিনি মনের মতো করে মানুষ করেছেন, কিন্তু, যদি কোনোদিন ইন্দুমতীও বিপদে পড়ে? যদি কাউকে পাশে না পায়? তাঁর তো রিটায়ার করার সময় হয়ে এল— আর কয়েকমাস চাকরি। তিনি কি পারবেন, সারাজীবন ইন্দুমতীকে গার্ড করে রাখতে? তাছাড়া, তিনি আর ক'বছরই বাঁচবেন?

ইন্দুমতী সুন্দরী, ধারালো চেহারা, আই পি এসের রেজাল্টের অপেক্ষা করছে। আই আই টি পাশ করে আই পি এস? লোকে, আই আই টি থেকে বেরিয়ে সুখের চাকরি খোঁজে, কিন্তু ইন্দুমতীর স্বপ্ন আই পি এস হবে। কনস্টেবল থেকে প্রমোশন পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর হওয়া বাপের মেয়ে আই পি এস? দ্বিজপদ শুনেছেন, দক্ষিণ ভারতে নাকি, এরকম উদাহরণ কিছু আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এরকম উদাহরণ আর নেই। দ্বিজপদ, ইন্দুমতীকে ক্যারাটেতে ভরতি করেছেন। বক্সিং আর জুডোটা সে আগেই শিখে নিয়েছিল। সে না হয় সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য এগুলো শেখা। কিন্তু, আই আই টি-র চাকরি ছেড়ে আই পি এসে আসার কী দরকার ছিল? চারিদিকে খারাপ লোক। এই তো অ্যাডিশনাল এস পি নাদিম আখতার আর সার্কেল ইন্সপেক্টর শিবব্রত জোয়ারদারের মতো লোকজন নিয়ে ইন্দুমতীকে কাজ করতে হবে! বাবারে বাবা-কী কঠিন কাজ! ভাবতে ভাবতে দ্বিজপদর শরীর ভারী হয়ে এল। সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে গেল!!

আর থাকতে না পেরে, দ্বিজপদ হাঁক পাড়লেন— 'রতন, কী ব্যাপার রে? সকাল থেকে সেই এক ঘ্যান ঘ্যান—ওদের নিয়ে আমার ঘরে আয়।'

রতন, ইচ্ছা আর খেয়ালীকে নিয়ে দ্বিজপদর ঘরে ঢুকল। দ্বিজপদ চোখ তুলে দুজনকে দেখলেন—ইচ্ছা, ছোটোখাটো চেহারা, বেশ স্বাস্থ্যবতী। বয়স কতই বা— বাইশ তেইশ—মুখখানা তো ভারী মিষ্টি। বড় বড় টানা টানা চোখ—কিন্তু, জলে ভরা। মায়াময়, মুখখানার দিকে তাকালেই ভালো লাগে—একটা চুড়িদার পরা, চুলগুলো এলোমেলো, আর খেয়ালী, ইচ্ছার থেকে একটু লম্বা, হয়তো বয়সটা আর একটু বেশি—চব্বিশ-পঁচিশ বা ছাব্বিশ-সাতাশও হতে পারে। খেয়ালীও বেশ সুন্দরী, টিকোলো নাক। ফর্সা। দুজনের মধ্যেই একটা আলাদা সৌন্দর্য্য, ভালো লাগা মিশে রয়েছে, কিন্তু, দুজনের মুখের মধ্যেই কেমন একটা দুঃখ মাখা।

দ্বিজপদ হাতের ইশারায় দুজনকেই সামনে রাখা দুটো কাঠের চেয়ারে বসতে বললেন। রতনও দ্বিজপদর পাশেই একটা চেয়ারে বসল। দ্বিজপদ আবার গলা তুলে হাঁক পাড়লেন—'শ্যামা, দোকানে গিয়ে সবার জন্য চা-বিস্কুট আনা—তোরাও খা। আমরা চা-বিস্কুট খেতে খেতে কথা বলি।'

দ্বিজপদ পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক করতে চাইলেন। মেয়েদুটিকে তিনি চেনেন। পরিবেশটা সহজ না হলে, ওরাও দ্বিজপদকে মনের কথা বলতে চাইবে না—লজ্জা পাবে। দ্বিজপদ নরম গলায় প্রশ্ন করলেন—'বল মা, কী হয়েছে? তোদের দুজনকে তো আমি প্রায়ই থানায় এসে ঘোরাঘুরি করতে দেখি। অবশ্য রতন কেসটা দেখছে। ও খুবই অ্যাক্টিভ আর এফিসিয়েন্ট। ওর ওপর আমি ভরসা করি। তবু, তোদের ঘটনাগুলো আমাকে বলতো? শুনি, দেখি কী করা যায়?'

দ্বিজপদর সঙ্গে, ইচ্ছা আর খেয়ালীর আগে, সরাসরি কোনওদিন কথা হয়নি। দ্বিজপদর কাছ থেকে এত ভালো ব্যবহার পেয়ে, ইচ্ছা আর খেয়ালী দুজনেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। মেয়ের বয়সি কাউকে কাঁদতে দেখলে দ্বিজপদরও চোখে জল চলে আসে। তিনি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে আবার ডাকলেন—'লক্ষ্মী, আছিস? একটু এই ঘরে এসে বোস তো রে—আর আসবার সময় দিদিমণিদের জন্য জল নিয়ে আসিস—।'

লক্ষ্মী, একটা প্লাস্টিকের জগে করে জল আর দুটো গ্লাস নিয়ে এল। ইচ্ছা আর খেয়ালী, দুজনেই লক্ষ্মীর হাত থেকে জগটা নিয়ে, হাঁ করে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা জল খেয়ে, ওড়নার খুঁট দিয়ে মুখ মুছলো। দ্বিজপদ চোখের ইশারায় লক্ষ্মীকেও পাশের ঘর থেকে একটা চেয়ার টেনে এনে বসতে বললেন। অবশ্য থানাতে, একদম হালে, সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। দ্বিজপদ থানার বড়বাবু। সেই হিসেবে দ্বিজপদর ঘরেও ক্যামেরা বসানো আছে। তবুও দুটো অল্পবয়সি মেয়ে কথা বলছে যখন, লক্ষ্মীও থাকুক।

মাঠের ওপারেই চা-এর দোকান থেকে, একটা বাচ্চা ছেলে, থানার সবার জন্য চা-বিস্কুট দিয়ে গেল।

দ্বিজপদ একদৃষ্টে ইচ্ছা আর খেয়ালীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। দুজনেই আতিথেয়তা পেয়ে খুশি। থানায় এসে, এতটুকু আতিথেয়তাও যেন ওরা আশা করেনি। সত্যি মানুষ কী অল্পে খুশি! তবু, থানাগুলো থেকে মানুষ বেশিরভাগ সময়ই ভালো ব্যবহার পায় না।

কী-ই বা তিনি করলেন? একটু মিষ্টি ব্যবহার, একটু জল আর চা-বিস্কুটই তো খাওয়ালেন! থানাগুলো থেকে মানুষ যদি এতটুকুও ভালো ব্যবহার পেত, তাহলে পুলিশের এত বদনাম রটত না। ইচ্ছা আর খেয়ালী একমনে চা-এর গ্লাসে, বিস্কুট ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে—দুজনেই কী যেন ভেবে চলেছে—

বেশ খানিকক্ষণ পর, নীরবতা ভঙ্গ করল ইচ্ছা—'আমার নাম ইচ্ছা রায়'। খেয়ালীকে দেখিয়ে বলল— 'ওর নাম খেয়ালী দত্ত।' ওর সঙ্গে আমার এখানেই আলাপ। কয়েক মাস আগে, আমি থানায় এসেছিলাম, অভিযোগ দায়ের করতে। থানার বাইরে বসে আমি যখন কান্নাকাটি করছি, তখন খেয়ালীও ওর কেসের তদ্বির করতে থানায় ঢোকে। বাইরে বসে, আমাকে কান্নাকাটি করতে দেখে, আমার সঙ্গে ও আলাপ করে। ওর জীবনও আমার মত দুঃখের। আমার সব ঘটনা শুনে, ও বলে, 'বোন, মন খারাপ করিস না, আমি তোর সঙ্গে থাকব। তোকে কেসের ব্যাপারে সব সাহায্য আমি করব। যার কেউ নেই তার তো ভগবান আছেন—আমারও কেউ নেই, তোরও কেউ নেই, এখন থেকে তুই আমার পাশে থাকবি, আমি তোর পাশে থাকব। খেয়ালীই আমাকে, থানায় বসে কমপ্লেইন লিখে দিল। আমি জমা দিলাম। স্যার, আপনি আগে খেয়ালীর ঘটনা শুনুন, তারপর আমি আমার ঘটনা বলছি।' বলেই খেয়ালীকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল— 'বল, তুই আগে বল—'।

খেয়ালী থানার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরেই সবুজ মাঠ। খটখটে রোদ্দুর। রোদের সমুদ্রে মাঠ যেন ভেসে যাচ্ছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। থানার গা ঘেঁষে বড় বড় গাছ। কদম, বকুল, বট-অশ্বত্থ একটা শিরিষ গাছও আছে। কতগুলো কাঠবিড়ালী গাছের গুঁড়ি বেয়ে উঠছে আর নামছে—আর ডাকছে চিড়িক-চিড়িক। থানার পিছনে একটা ডোবা মতন আছে। কুবো পাখি এসে বসেছে বোধহয় —ডেকে উঠল—'কুব-কুব।'

দ্বিজপদ, খেয়ালীর চোখের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। খেয়ালী কথা বলতে শুরু করল। মনে হচ্ছে, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে ওর কণ্ঠস্বর— 'সবকিছু তো ঠিকঠাকই ছিল স্যার, মা-বাবার আমি ছোটো মেয়ে। স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে কলেজে গেলাম। দেখতে শুনতে সুন্দর ছিলাম বলে, মনে মনে গুমরও ছিল। কলেজে পুরুষবন্ধুও জুটে গেল অনেক। বাবা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, আমাদের খাওয়া-পরার অসুবিধা রাখেননি কিছুই। দিদির তখনও বিয়ে হয়নি। দিদির জন্য সম্বন্ধ দেখা হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই আমি যাঁর কাছে পড়তে যেতাম, তাঁর ছেলের সঙ্গে বিয়ের জন্য তিনি আমার বাবার কাছে কথা বলতে এলেন। বুঝতেই পারছেন স্যার, যাঁর দু-দুটো বিয়ের যোগ্য মেয়ে, তাঁর তো চিন্তার শেষ থাকে না! তাই, যদিও বড় দিদির বিয়ে হয়নি, তবুও বাবা রাজি হয়ে গেলেন। বাবা, সাধ্যমত খরচ করে বিয়ে দিলেন।

প্রথম দিকটায় ঠিকই ছিল, কিন্তু, কিছুদিন পর থেকেই গণ্ডগোল শুরু হল। শুধুই যে মানসিক অত্যাচার ছিল তাই নয়। আমার স্বামী আমাকে নিয়মিত মারতেন। যে শ্বশুরমশাই, আমাকে পছন্দ করে বিয়ে দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও কেমন অচেনা হয়ে উঠলেন।

আমার শ্বশুরমশাই যেদিন, বিয়ের প্রোপোজাল নিয়ে, আমাদের বাড়িতে আসেন, সেদিন আমার বাবার একটাই কথা ছিল—'আমার মেয়ে কিন্তু পড়বে।' আমি, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে জেলার মধ্যে ভালো রেজাল্ট করি, বটানি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। স্বপ্ন ছিল প্রফেসর হব।

প্রথমে আমার পড়াশোনা নিয়ে আমার স্বামী আপত্তি করেন। তা সত্ত্বেও আমি বটানিতে অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করি। সে বছরই আমি মাস্টার ডিগ্রিতে ভর্ত্তি হই। একদিন আমি বাথরুম থেকে স্নান করে বেরিয়ে দেখি, আমার স্বামী আমার ফোন ঘাঁটছেন, আসলে আমি যে কলেজে টলেজে যেতাম, উনি সন্দেহ করতেন। উনি ছিলেন এক প্রচণ্ড সন্দেহবাতিক মানুষ। আমার স্বামীকে আমার ফোন ঘাঁটতে দেখে আমি রেগে যাই। স্ত্রীকে সন্দেহ করে, স্ত্রীর ফোন ঘাঁটা, যে একটা অত্যন্ত নীচ মানসিকতার পরিচয়, আমি সেটাই বলি। আমার স্বামী আর শ্বশুরমশাই প্র্যাকটিক্যালি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। আমার শাড়ি, জামাকাপড়, গয়নাগাঁটি, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক, গ্র্যাজুয়েশনের মার্কশীট-সার্টিফিকেট সব আটকে রেখেছিল। এই অবস্থায়, আমি যখন একেবারে দিশেহারা-পাগল, তখন আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল— কলেজের বন্ধু। আমার শ্বশুরবাড়ি যে থানা এলাকায়, সেই থানাতেই সেও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর।

আমি থানায় অভিযোগ জমা করব বলে ঢুকতেই, আমাকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে কথা বলে। আমি তো তার আগে কোনওদিন থানাতেই আসিনি। একা একাই ভয়ে ভয়ে থানায় এসে ঢুকেছি। কাকেই বা সঙ্গে আনব বলুন? অসুস্থ, বয়স্ক বাবাকে? নাকি অবিবাহিতা দিদিকে? আমাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার কথা শুনেই তো বাবার প্রায় একটা স্ট্রোক মতো হয়ে গেল। মা ও বাবা আর দিদিকে নিয়েই ব্যস্ত। আমিও বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার ভাগ্য আমাকেই লড়ে, বুঝে নিতে হবে। কিন্তু, আমি তখন দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, আমার ভাগ্যে আরও কত কিছু খারাপ অপেক্ষা করে আছে।

থানায় অভিযোগ জমা দিতে গিয়ে, কলেজ জীবনের বন্ধুকে দেখতে পেয়ে, আমি তো খুশিতে ডগমগ। হাতে চাঁদ পেলাম, সব কথা খুলে বললাম। ও কিন্তু, সত্যি সত্যিই, আমার পাশে থেকে সাহায্য করল, স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে কেস চালু করে দিল, আমার, গয়নাগাঁটি, টাকা-পয়সা, সব ফেরত পেতে সাহায্য করল। তারপর, ও-ই আমার শ্বশুরবাড়িকে চাপ দিয়ে, অ্যারেস্ট করবার ভয় দেখিয়ে, আমার সঙ্গে, আমার স্বামীর মিউচুয়াল ডিভোর্স করিয়ে দিল। আমি আবার বাপের বাড়িতে ফিরে এলাম।

আমার সেই বন্ধুর নাম ছিল অমিত দাস। দেখতে শুনতে খুবই সুন্দর-সুপুরুষ। আমার বিপদের দিনে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, বিপদের দিনের বন্ধুই তো আসল বন্ধু, বলুন?'

এই অবধি বলে, টেবিলের ওপর রাখা জলের জগটা টেনে নিয়ে, ঢকঢক করে জল খেল। জগটা আবার টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে, ওড়নায় মুখ মুছে ঠোঁটের কোণে হাসির চিহ্ন আনার চেষ্টা করে বলল—'গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল।' তারপর আবার শুরু করল।

'আমরা প্রায় দিনই রাত্রে ফোনে কথা বলতাম। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব আরও বাড়ল—আরও বাড়ল, আমরা বাইরে দেখাও করতাম।

এর মধ্যে বাবা আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন, একদিন, মা আর দিদি, বাবাকে নিয়ে ডাক্তারখানায় গেলেন।

ঠিক সেই সময়েই অমিত ফোন করে। আমিও বলে ফেলেছি, যে, মা আর দিদি, বাবাকে নিয়ে ডাক্তারখানায় গিয়েছেন। দশ মিনিটের মধ্যে মোটরবাইক নিয়ে অমিত এসে হাজির, বলল— 'কাছাকাছিই ছিল।'

আমি দরজা খুলে বসাতেই ও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ও আমাকে ব্রুটালি রেপ করে, খানিকক্ষণের মধ্যে মা-বাবা-দিদিও এসে যান। ওরা তাড়াতাড়ি এসে পড়েন, তাই রক্ষা। নাহলে সেই অসহ্য নির্যাতন কতক্ষণ চলতো কে জানে? ও হাতে নাতে ধরা পড়ে যায়।

আমি বলি, থানায় যাব, কেস করব। ও আমাদের সবার, হাতে পায়ে ধরে। আমরা ওর বাড়িতে ফোন করি। সব জানাই। তাঁরাও এসে পড়েন। আমার বাবাকে বোঝান যে, কেস করলে অ্যারেস্ট হবে। সরকারি চাকরিতে অসুবিধে হবে, কাজেই কেস করবার দরকার নেই। অমিত, আমাকে বিয়ে করে নেবে। আমি আর আমার পরিবারের লোকও খুশি। আমি বললাম— রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করতে হবে কিন্তু।

অমিত, আর অমিতের বাড়ির লোক আমাকে বোঝালো, রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করতে গেলে অনেক ঝামেলা—নোটিশ ফোটিশ দিতে হবে। তার চেয়ে আমরা কালকেই আমাদের বাড়ির কাছের মন্দিরে বিয়ে করে নেব। আগুনের চারপাশে ঘোরা, মালাবদল, সিঁদুর পরানো-সবই হবে। তবে, শর্ত একটাই, তাঁরা আমাকে শ্বশুরবাড়িতে এখন তুলবেন না। এখনই লোক জানাজানি করতে চান না। অমিত, এই সপ্তাহের মধ্যেই, আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা ঘর ভাড়া নিয়ে নেবে। এখন আমরা সেখানেই উঠবো। পরে সময়-সুযোগ বুঝে, লোকজন ডেকে, বড় করে 'রিশেপসন' করা হবে। আর সেদিনই রেজিস্ট্রিও করা হবে।

অমিতের বাড়ি, আমাদের রায়গঞ্জ থেকে বেশ দূরে, ইসলামপুরে। ওখান থেকে আমার মাস্টার ডিগ্রিটা কমপ্লিট করাও অসুবিধে। আমরা বরং ভেবে চিন্তে দেখলাম, যে প্রোপোজালটা খারাপ নয়। আগের বার শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে থাকতে গিয়ে, বেশ বিপদেই পড়েছিলাম। শ্বশুর-শাশুড়ি-স্বামী, সবাই মিলেই অত্যাচার করতেন —এবার না হয় স্বামীকে নিয়ে আলাদা হয়েই থেকে দেখি। তাছাড়া, বাপের বাড়ির কাছাকাছি ঘর ভাড়া নিলে, অসুস্থ বাবার দেখভালও করা সম্ভব হবে।

আমরা কাছাকাছি, একটা ঘর ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম। দেখতে দেখতে প্রায় একবছর কেটে গেল। যত আমি বলি— 'কীগো, তোমরা তো বলেছিলে, বড় করে রিশেপসন হবে, লোকজন, আত্মীয়-স্বজনকে ডাকবে— তা কী হল? অন্তত রেজিস্ট্রিটা তো করো—' অমিত বারবারই বলে—'আমাদের বিয়ে তো হয়েই গেছে। তাছাড়া, এখন তুমি শ্বশুরবাড়িতে যেতে চাইছো— গিয়ে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে তো? আগের বার কিন্তু পারোনি।' এই কথা শুনেই আমি চুপ করে যেতাম। সত্যিই তো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে, আমরা ভালোই আছি। সপ্তাহে তিন-চার দিন অমিতের নাইট ডিউটি পড়ে। সেই রাতগুলোয় ও ঘরে আসে না। আমি তখন বাপের বাড়ি চলে যাই, তারপর অমিতের নাইট ডিউটি সেরে ঘরে ঢোকার আগে, আমিও ফিরে আসি।

কিছুদিন এইভাবে পার হবার পর আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ি। একদিন অমিত অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর খবরটা অমিতকে জানালাম। আমি তো ভেবেছিলাম যে, বাচ্চা হবার খবর পেয়ে অমিত আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠবে।

কিন্তু, হল তার উলটো, খবরটা পাওয়া মাত্র, কেমন যেন ভয়ে সিঁটিয়ে গেল অমিত। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠা তো দূরের কথা, আমার থেকে কেমন যেন দূরে সরে যেতে লাগল— ভালো করে আমার সঙ্গে কথা বলে না, পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়, আগে সপ্তাহে তিন-চারদিন নাইট ডিউটি পড়ত, এখন আরও বেশি করে নাইট ডিউটি নিতে লাগল। বাড়িতে প্রায় আসতই না। একদিন ও আমাকে বলল—'এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা আনবার কী দরকার? অ্যাবরশন করে নাও।'

আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম—এ সব কী বলছে অমিত? অমিতের আচরণও অদ্ভুত হয়ে উঠল। সাধারণত এই অবস্থায় স্বামীরা, স্ত্রীদের খেয়াল রাখেন— সাবধানে রাখেন। কিন্তু, আমি নোটিশ করলাম, অমিত যেন চাইছে যে আমার বাচ্চা না হোক—বাথরুমে ইচ্ছে করেই সাবান জল ফেলে রাখছে —যাতে আমি পা পিছলে পড়ে যাই। আমাকে দিয়ে জোর করে ঘর মোছাতে চাইছে। যে কাজগুলো এই অবস্থায় করা উচিত নয়, সেগুলোই করাতে চাইছে—আস্তে আস্তে ওর আচরণে-ব্যবহারে আমি নিশ্চিত হলাম যে, ও বাচ্চা চায় না।

আমার মনে প্রশ্ন জাগল, যে অমিতের এই রকম আচরণের কারণ কি? অমিতের বাবা-মায়ের বাড়িতে একদিন ফোন করলাম। কথা বলেই বুঝতে পারলাম, আমি যে মা হতে চলেছি, এই খবরটা অমিত তার বাড়িতে দেয়নি। আমি হবাক হলাম, বাড়িতে একটা বাচ্চা আসতে চলেছে, তাঁরা দাদু-ঠাকুমা হতে চলেছেন—আর অমিত, এত বড় খবরটা, তার বাবা-মাকে জানায়নি!!

আমি যেই খবরটা, নিজে থেকেই অমিতের মা-বাবাকে জানিয়েছি, অমিতের মা-বাবা রেগে আগুন হয়ে গেলেন, তাঁরা আমাকে কুৎসিত ভাষায় গালি-গালাজ করতে শুরু করলেন। এবং বললেন, আজকাল অমিত নাকি বেশিরভাগ সময়েই বাবা-মায়ের কাছে এসে থাকে— আর তার কারণ নাকি, আমি!! শুনেই যেন শুকনো ডাঙায় আছাড় খেলাম!

কী! তার মানে, এই যে অমিত বলে আজকাল বেশিরভাগই নাইট ডিউটি পড়ছে—অফিসে খুব চাপ— বাড়িতে আসার সময়ই পাচ্ছে না—সব তাহলে মিথ্যে! ও আমাকে অফিসে নাইট ডিউটির কথা বলে, আসলে ওর বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকে! আমি মুখে আর কিছু বললাম না। বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারপর একদিন, অমিত খেয়ে দেয়ে অফিসে বেরিয়ে গেলে, আমি মা-বাবা, আর কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন মিলে, একটা গাড়ি ভাড়া করে, রায়গঞ্জ থেকে ইসলামপুরে অমিতের বাড়িতে এসে হাজির হলাম।

আগে, আমরা কখনও অমিতের পৈতৃক বাড়িতে আসিনি— সেদিনই প্রথম এলাম। বিরাট পাঁচিল দেওয়া বাড়ি, তিনতলা, বাইরে থেকেই বোঝা যায়, অবস্থাপন্ন। বিরাট মোটা কাঠের দরজা। দরজার কড়া নাড়তেই একজন সুন্দরী, অল্পবয়সি মহিলা দরজা খুলে দিলেন, কোলে একটা এই তিন-চার বছরের বাচ্চা ছেলে। ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন যে, আমরা কারা? যেই বলেছি, আমি অমিতের স্ত্রী, উনি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমাদের গাল দিতে শুরু করলেন। আমরা তো বুঝতেই পারছিলাম না যে, উনি কাঁদছেনই বা কেন? আর গালাগালিই বা করছেন কেন? আমি যেই বলেছি যে, 'খবরদার, একদম গালাগালি দেবেন না, আমি অমিতের স্ত্রী,' উনি আরও গলা চড়িয়ে বললেন যে, 'মিথ্যে কথা, আমি তাহলে কে?'

আমার তো মাথা ঘুরে গেল। চিন্তা করুন, প্রেগন্যান্ট অবস্থায়, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কোনও স্ত্রী যদি দেখে যে, আর একজন মহিলা, কোলে বাচ্চা নিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলছে, যে সে-ই তার স্বামীর আসল স্ত্রী, তাহলে, তার কী অবস্থা হয়!

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে, অমিতের মা-বাবাও বেরিয়ে এসেছেন, আর পেছন পেছন কে এসেছে জানেন? স্বয়ং অমিত! ভেবে দেখুন, যে আমার হাতের রান্না খেয়ে অফিসের নাম করে বেরোলো, সে আসলে অফিসে যায়ই নি! প্রেগন্যান্ট স্ত্রীকে ঘরে রেখে, বাপের বাড়িতে এসে বসে আছে, প্রথম স্ত্রী আর ছেলের আদর খাচ্ছে!!

অমিতের মা-বাবা তো আমাকে ঢুকতেই দেবেন না। তাঁরা পরিষ্কার বলে দিলেন— এ বিয়ে তাঁরা মানেনই না। তাছাড়া, অমিতের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করা বউ ঘরেই আছে— তার চার বছরের ছেলেও আছে— তাছাড়া, আমার তো রেজিস্ট্রি করে বিয়েও হয়নি!'

'এতক্ষণ, আমার কাছেও সব পরিষ্কার হয়ে উঠল— অমিত আমাকে রেপ করার পরে, ওরা ইচ্ছে করে আমার সঙ্গে বিয়ের নাটক করে, যাতে আমি অমিতের বিরুদ্ধে আমাকে রেপ করার অভিযোগ না করি।

আমি মাথা ঘুরে ওদের সদর দরজার বাইরে, রাস্তার ওপরেই ঠাস করে পড়ে যাই। ততক্ষণে পাড়ার লোকও জমতে শুরু করেছে। অমিতরা আমাদের আর ঘরে ঢুকতেই দেয়নি। পাড়ার কয়েকজন, পাশেই একটা ক্লাবঘরে আমাদের বসতে দিলেন। আমি জলটল খেয়ে একটু ধাতস্থ হতে, ক্লাবের ছেলেদের সব খুলে বললাম।

পাড়ার দু-একজন বয়স্ক মানুষ, আমার কথা বিশ্বাস করলেন এবং থানায় যাবার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু, সমস্যা হল অন্য জায়গায়। আমরা ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বুঝতে পারলাম যে, তারা অমিতের বা অমিতের বাড়ির লোকের হাতে। বলতে গেলে, অমিতই ক্লাবটাকে চালায়, ক্লাবের ছেলেদের টাকা-পয়সা দিয়ে হাত করে রেখেছে। তারা পরিষ্কার বলল—'আপনারা দুজনেই মেজর, সাবালক-সাবালিকা, স্বেচ্ছায় ফিজিকাল রিলেশন তৈরি করেছেন— মামলা টামলা করতে যাবেন না—তাতে আপনারই বিপদ হবে।'

পার্টির ছেলেরাও চলে এল— পঞ্চায়েত প্রধান তো বলেই দিলেন—'কেস করে কী করবেন? বছরের পর বছর মামলা চলবে— উকিল বড়লোক হবে। তার থেকে আমরা আপনাকে দু-লাখ টাকা পাইয়ে দেব—পঞ্চাশ হাজার পার্টি ফান্ডে দেবেন—দেড় লাখ আপনার। তাই শুনে, ক্লাবের সেক্রেটারিও বললেন—'তাহলে আমাদেরও পঞ্চাশ হাজার দিতে হবে—আমরা এক্ষুনি আপনাদের মুখোমুখি বসিয়ে দেব।'

আমারও কীরকম রোখ চেপে গেল, জানেন? এরা বলছে কী? প্রথমে অমিত আমাকে রেপ করল। মামলা করব বলাতে, বলল, যে আমাকে বিয়ে করবে। আমরা মন্দিরে বিয়ে করলাম, অমিতের মা-বাবাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন—তাঁরা কথা দিয়েছিলেন—কিছুদিন পরই রিশেপসন হবে—দিনের পর দিন আমরা একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মত থেকেছি—এখন আমি প্রেগন্যান্ট। ক্লাবের ছেলেরা, পার্টির লোকেরা-এরা কী মানুষ?? আমার জীবনের মূল্য, আমার সম্ভ্রমের মূল্য, এরা ধরছে টাকায়? তার ওপরে আবার ক্লাবকে টাকা দিতে হবে? পার্টি ফান্ডে টাকা দিতে হবে?

বিশ্বাস করুন, কেউ আমার পাশে এগিয়ে এলেন না। আমরা ক্লাব থেকে বেরিয়ে এলাম। সেই থেকে ঘুরছি। থানাতেও গেছি। লোকাল থানা কেস নিল না। বলল, 'কজ অফ অ্যাকশন' যেখানে, মানে, ঘটনা যেখানে ঘটেছে, সেই এলাকার থানায় গিয়ে মামলা করতে হবে।

সেদিক থেকে দেখতে হলে আমার বাড়ি তো এই কুলিক নদীর এ পারটায় — মানে, রায়গঞ্জ থানা এলাকায়। তাই ওখানে কমপ্লেইন করেছি। সেই অভিযোগ পড়েই আছে, পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেনি। ওকেও কোনওদিন ধরতে গেছে বলে শুনি নি।'

খেয়ালী চুপ করল, ঘরে, কারোর মুখেই কথা নেই। দ্বিজপদ আর রতন দুজনেই খোলা জানালা দিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে আছেন। থানার ঘরে একটা পুরোনো দিনের দেওয়াল ঘড়ি আছে। তার সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরে চলেছে—শুধু সেই শব্দটাই শোনা যাচ্ছে—টিক টিক টিক।

লক্ষ্মীর কথায় ঘোর কাটল দ্বিজপদর—'আর বাচ্চাটার কী হল?'

দ্বিজপদ তাকালেন খেয়ালীর দিকে— 'অ্যাবরশন করিয়ে নিয়েছি।' দ্বিজপদ চোখের কোন দিয়ে নজর করলেন—খেয়ালীর চিবুক বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে।

'আমার থানায় তোর কী কেস?' দ্বিজপদ প্রশ্ন করলেন।

—'আমি স্যার এখানেই একটা এন জি ওতে কাজ নিয়েছি। সকাল সকাল আসতে হয়। বছর খানেক আগে, যখন আমি এন জি ওর অফিসে আসছিলাম, অমিত আমাকে ডাকে। আমি কথা বলতে চাইনি, আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ায় ও আর ওর ভাই, সুমিত। আমাকে কেস তুলে নিতে বলে। আমি রাজি হইনি। আমি তখন গোটা রাস্তাটায় একা। আমি ওদের এড়াবার জন্য, হন হন করে হাঁটছিলাম। ওরা দুজন ছিল মোটরবাইকে। হঠাৎই পেছন থেকে ওরা অ্যাসিড ছোঁড়ে।

অ্যাসিড পড়ে আমার পিঠে। যন্ত্রণায় আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলাম। শরীর থেকে মাংস গলে গলে পড়ছিল। আমার কোনও জ্ঞান ছিল না, পরে শুনেছি, আমি নাকি, ওই গোটা রাস্তাটা বুকে হেঁটে হেঁটে, কনুইতে ভর দিয়ে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে, বড় রাস্তায় এসে উঠেছিলাম। রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছিল, তাদের পা জড়িয়ে ধরছিলাম, আর বলছিলাম— 'আমাকে বাঁচান, আমাকে হাসপাতালে ভরতি করে দিন'।

কে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, ক'দিন জ্ঞান ছিল না, কিছুই মনে নেই। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমি, অমিত ও তার ভাই-এর বিরুদ্ধে এই থানাতেই অ্যাসিড আক্রমণ, হত্যার চেষ্টা ইত্যাদি ধারায় কেস করি।

সেই কেসের তদ্বিরের জন্যই এখানে আসি। এইখানে আসতে আসতেই ইচ্ছার সঙ্গে আলাপ—তারপর বন্ধুত্ব। এখন একসঙ্গে থানায় আসি, কোর্টে যাই, উকিলের বাড়ি যাই। আমরাই এখন একটা দল, ও আমার পাশে থাকায় আমার সাহস বেড়েছে, আমি ওর পাশে থাকায় ওরও সাহস বেড়েছে। কীরে তাই না?'

খেয়ালী ইচ্ছার দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসবার চেষ্টা করল।

দ্বিজপদ অবাক। রতনের দিকে তাকিয়ে বললেন—

'অ্যাসিড অ্যাটাক কেস আমার থানায়? আমি জানি না তো? এতদিন পেন্ডিং?' রতন মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলল— 'মানে তখন তো কেসের আই ও ছিল গোপাল গুছাইত—ওই দেখত। ও তো বদলি হয়ে গেছে। তাছাড়া সি আই জোয়ারদার সাহেব নিজে দেখছেন ব্যাপারটা — তাই আর কী?'

দ্বিজপদ, রতনের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললেন— 'কেস ডায়েরি বের কর। কালকেই অ্যারেস্ট করতে যাব।' রতন ঘাড় নাড়ল। তারপর কী ভেবে আবার বলল— 'একেবারে অ্যারেস্ট স্যার? মানে, মেইন আসামী, অমিত দাস, পুলিশ তো—সি আই সাহেবও চেপে রেখেছেন কেস ডায়েরিটা— তাই অ্যারেস্ট করতে যাবার আগে, যদি একবার ওনার সঙ্গে কথা বলা যেত—'

দ্বিজপদ আবার থানার খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। জানালার বাইরেই বিশাল ফাঁকা মাঠ। আজ রোদও উঠেছে খুব। চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছে। দ্বিজপদ চোখ সরিয়ে নিলেন—এরা কী? পুলিশে চাকরি নেওয়া মানেই এক ধরনের লোকের কাছে শুধু উপরি কামাবার জায়গা। গোপাল গুছাইত সেইরকমই একটা লোক ছিল। চূড়ান্ত ডিসঅনেস্ট। ওর সম্পর্কে এইরকম অভিযোগ, আগেও অনেক শুনেছেন দ্বিজপদ। তবে, দ্বিজপদকে কেউ এই উপরির ভাগ দেয়নি। উনি চানওনি। উপরির ভাগ পাননি বলে দ্বিজপদর কোনো আফশোসও নেই। কিন্তু আজ দ্বিজপদর, গোপাল গুছাইতের ওপর রাগ হতে লাগল। খেয়ালীকে মারতে অ্যাসিড ছুঁড়তে হল? তারপর সেই কেস ধামাচাপা? পুলিশ বলে, দ্বিজপদর নিজের প্রতি লজ্জা বোধ হতে লাগল।

রতন, দ্বিজপদর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল—'আসলে গোপালবাবু বলছিলেন যে, অমিতবাবু নিজে পুলিশ অফিসার তো— পুলিশের এগেনস্টে ভূরি ভূরি মিথ্যা অভিযোগ আসেই। কাজেই কোনও ড্রাস্টিক স্টেপ নেবার আগে ভালো করে বুঝে নিতে হবে। তারপর যা করার করতে হবে।'

দ্বিজপদ, দু-আঙুলের ফাঁকে ধরা ডটপেনটা টেবিলে অস্থিরভাবে ঠুকতে ঠুকতে আবার জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে গেলেন—রতনের কথা ঠিক। পুলিশের অনেক শত্রু। মিথ্যে অভিযোগও আসে প্রচুর। যে পুলিশ ঘুষ খায় না, তার সম্পর্কেও লোকে অভিযোগ করে, যে, সে ঘুষ খায়। ইন্দুমতীর মুখে শুনেছেন যে, ইন্দুমতী, পুলিশের মেয়ে বলে সারাজীবন নাকি স্কুলে-কলেজে বন্ধুদের কাছ থেকে টিটকিরি শুনে এসেছে যে—'তুই পুলিশের মেয়ে, তোর আবার টাকার অভাব? তোর বাবা, রাস্তায় বেরিয়ে হাত পাতলেই টাকা—।'

ছিঃ ছিঃ, সাধারণ মানুষের পুলিশ সম্পর্কে কী নোংরা ধারণা! পুলিশ মানেই কী তাকে ঘুষ খেতে হবে? দ্বিজপদকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। দ্বিজপদর বাড়িতে তখন এসি ছিল না। প্রচণ্ড গরমে কী কষ্ট! ইন্দুমতী সারারাত ধরে পড়ত। মাথার ওপর ফ্যানের হাওয়াও যেন গরম। তখন দ্বিজপদ অথবা তাঁর স্ত্রী, বালতির জলে তালপাতার পাখা ভিজিয়ে, সেই পাখা দিয়ে ইন্দুমতীকে সারারাত জেগে হাওয়া করতেন। কোনওদিনই দ্বিজপদর তার জন্য ঘুষ নিতে ইচ্ছে হয়নি।

কিন্তু আজ খেয়ালীকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল না। মেয়েটার কথায় জোর আছে। মুখের মধ্যে এমন একটা ভাব আছে, যাতে মেয়েটাকে বিশ্বাস করতে মন চায়। দ্বিজপদ মনে মনে ঠিক করলেন, যদি মেয়েটার ওপর, ওই অমিত বলে লোকটা অত্যাচার করে থাকে, তাহলে তিনি তাকে সাজা দিয়েই ছাড়বেন।

দ্বিজপদ এবার ইচ্ছার দিকে তাকালেন। ছোটোখাটো মিষ্টি চেহারার ইচ্ছা, খেয়ালীর পাশে চুপটি করে বসে ছিল। দ্বিজপদর ইশারা পেয়ে এবার ইচ্ছা বলতে শুরু করল—

'স্যার, আমি কাছাকাছিই থাকি, আমার মা, কোন ছোটোবেলায় মারা গেছেন, ভালো করে মনেও নেই। বাবা, কৃষি দপ্তরে ছোটোখাটো চাকরি করতেন। বাবাই একা হাতে আমাকে মানুষ করেছেন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে, জিওগ্রাফি নিয়ে পড়ব বলে কলকাতায় গেলাম। আশুতোষ কলেজে ভরতি হলাম। সোম থেকে বৃহস্পতি, কলকাতায় মেসে থেকে, শুক্রবার ক্লাস করে, ট্রেন ধরে এখানে আসতাম। শনিবার দিনটা এখানে থেকে, রবিবার রাতে আবার ট্রেন ধরে ভোরবেলায় কলকাতায় পৌঁছে কলেজে ঢুকে যেতাম। এই ছিল আমার রুটিন।

প্রভাতও এখানকারই ছেলে। আমার সঙ্গে ওর আলাপ হয় ট্রেনে, যাতায়াতের পথে। ওরও একই রুটিন। গড়িয়ার কাছে একটা বয়েজ স্কুলে জিওগ্রাফি পড়াত। আমি জিওগ্রাফি পড়ছি শুনে, ওরও আমার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। আমারও ওকে খারাপ লাগেনি। প্রথম প্রথম স্টেশনে বা ট্রেনে হঠাৎ করে দেখা হত। পরে আমরা, নিজেরা কথা বলেই একসঙ্গে ট্রেনে করে আসতাম-যেতাম। যাতায়াতের পথে কখনও কখনও ও আমাকে জিওগ্রাফির কোনও কোনও বিষয় বুঝিয়েও দিয়েছিল। আস্তে আস্তে, আমরা দুজনেই কখন যেন, দুজনকে পছন্দ করতে শুরু করেছিলাম।

প্রভাত, গড়িয়ায় একটা ঘর ভাড়া করে থাকত— আমাকে মাঝে মাঝেই যেতে বলত। আমি কোনওদিনই যাইনি, একদিন প্রভাত আমাকে ফোন করে বলল—আগামী রবিবার ওর জন্মদিন। ও আমাকে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াবে। আমি আর 'না' বলিনি।

সেদিন দুপুরবেলা আমি প্রভাতের ভাড়া বাড়িতে গেলাম। আমার খুব ভালো লাগল। যদিও ছোটো দুটো ঘর, রান্নাঘর, কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজানো। সাধারণভাবে, একটা ব্যাচেলার ছেলের ঘর বলতেই আমাদের চোখে যে নোংরা, অগোছালো ছবি ভেসে ওঠে, মোটেই সেরকম নয়। পরিপাটী করে পাতা, পরিষ্কার বিছানার চাদর। ছোটো একটা টেবিল, দুটো ছোটো চেয়ার, ঘরের কোণে একটা হারমোনিয়াম রাখা, বুঝলাম প্রভাত গান করে, গান ভালোবাসে। আর একটা দাঁড় করানো কাঠের র্যাকে প্রচুর বই রাখা— সব ধরনের বই, মাও সে তুং থেকে তসলিমা নাসরিন। টেবিলের ওপর রাখা কাচের ভাসে টাটকা রজনীগন্ধা, প্রভাত নিজে পড়ে রয়েছে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী। একদম পারফেক্ট আর কী! যেমনটি চেয়েছিলাম, ঠিক তেমনটিই।

প্রভাত খুব যত্ন করে খাবার সাজিয়ে খাইয়েছিল। ও বলেছিল— ও নাকি নিজের হাতে রান্না করেছে। সেদিন আর কেউ নিমন্ত্রিত ছিল না। আমি আর ও।'

এই পর্যন্ত বলে ইচ্ছা থামল। লক্ষ্মীর কাছ থেকে জলের জগটা চেয়ে নিয়ে, জল খেয়ে, হাতের চেটো দিয়ে মুখ মুছে দ্বিজপদর দিকে তাকিয়ে বলল— 'কী ভাবছেন? ভাবছেন তো, প্রভাত সেই দুপুরেই আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করল— আমি বাধা দিতেই আমাকে জোর করে রেপ করল—আমি এইসব বলব? মোটেই না— সেগুলো করলে তো আমি ওকে, ওর ক্যারেক্টারকে চিনে নিতাম, বরং ও সেদিন কিছুই করল না। খাওয়া-দাওয়ার পর ও আমাকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শোনাল, ও একবারের জন্যও আমার কাছে আসবার বা গায়ের কাছে ঘেঁষবার চেষ্টা করেনি। ও যখন আমাকে ইনভাইট করে, তখন, আমিই বরং একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম— কী জানি? ও যদি কিছু ক্ষতি করবার চেষ্টা করে? ওর ব্যবহার দেখে, যাকে বলে আমি একেবারে মুগ্ধ! সত্যিকারের একটা ব্যক্তিত্বময় চেহারা— সহজ, স্বচ্ছ, সরল—আমাকে যে ও পছন্দ করে, সেটা হয়তো, ওর হাবে-ভাবে, আমার প্রতি ওর বেশিমাত্রায় কেয়ারিং অ্যাটিচিউট-এ বোঝা গেছে, কিন্তু, তার বেশি কিছু নয়। সেদিন আমাকে ও বাসে তুলে দিতে, গড়িয়ার বাসস্ট্যান্ডে এল—আমরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ওর ভাড়াবাড়ি থেকে রাস্তা অবধি এলাম—কিন্তু, কোথাও ওর আচারে-ব্যবহারে, এতটুকু বাড়াবাড়ি, বা গায়ের কাছে আসবার চেষ্টা, এসব কিচ্ছু দেখিনি।

আমি বাসে করে আসতে আসতে মনে মনে ভাবলাম, সত্যি, এই ধরনের একজনের ওপর নির্ভর করা যায়— এরকম একটা মানুষের জন্য অপেক্ষাও করা যায়।

ওর সেদিনের সুন্দর ব্যবহার বরং আমাদের আরও বেশি করে আরও তাড়াতাড়ি কাছাকাছি নিয়ে এল। যেহেতু, প্রথম দিন, ও ফাঁকা বাড়িতে, অতক্ষণ একসঙ্গে, একঘরে থাকা সত্ত্বেও এতটুকুও কাছে আসার চেষ্টা করেনি, আমার ওর ওপর বিশ্বাস, আস্থা আর ভালোবাসা ভীষণ বেড়ে গেল।

সত্যিকথা বলতে কি, গড়িয়াতে ওর বাড়িতে অতক্ষণ একসঙ্গে থাকাটা যেন একটা সুন্দর স্বপ্ন। সেই দিনটা আমি কখনও ভুলব না, ও নিজের হাতে রান্না করে, রান্নাঘর থেকে খাবার বাটিতে বাটিতে করে সাজিয়ে আনল। টেবিলে রাখল। আমরা একসঙ্গে বসে খেলাম। ঘরে রজনীগন্ধার গন্ধ। হালকা রবীন্দ্রসংগীত বাজছে, মোবাইলে। খাওয়া দাওয়ার পর একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ড অবধি আসা, টুকটাক কথা বলা—পরস্পরকে চিনে নেবার চেষ্টা—ব্যস, ওইটুকুই।

এরপর থেকেই প্রভাতের প্রতি আকর্ষণ আমার আরও বেড়ে গেল। রোজ অপেক্ষা করে থাকতাম, কখন প্রভাতের সঙ্গে কথা বলব।

সারা সপ্তাহ, অপেক্ষা করে থাকা, কখন শুক্রবার আসবে, আর আমরা একসঙ্গে, ট্রেনে করে রায়গঞ্জে ফিরব। এখানে ফিরেও সারাক্ষণই আমার মন জুড়ে থাকত, প্রভাতকে নিয়ে কল্পনা—সারাদিন আমি ওর কথাই ভাবতাম।

সেবার, আমি প্রভাতকে বললাম—'চলো, তোমাকে আমি খাওয়াবো। রবিবার দুপুরে, আমার বাড়িতে এসো—এবার আমি নিজে হাতে তোমাকে রেঁধে খাওয়াবো। আর বাবার সঙ্গেও তোমার আলাপ করিয়ে দেবো।'

প্রভাত বলল, 'তোমার বাড়ি তো পরেও যাওয়া যাবে। এখন শীতকাল, গোটা রায়গঞ্জের প্রকৃতি খুব সুন্দর হয়ে উঠেছে। রায়গঞ্জেই তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব—সারাদিন আমরা একসঙ্গে থাকব—লাঞ্চ করব, তারপর সন্ধের আগেই তোমাকে আবার বাড়িতে দিয়ে আসব।'

আমি আবদারের সুরে বললাম—'না-আ-আ, আগে বলো, কোথায় নিয়ে যাবে?'

প্রভাত হেসে বলেছিল— 'একটা খুব সুন্দর জায়গায়, তোমার ভালো লাগবে।'

ইচ্ছা, টেবিলে দু-হাতের ভর রেখে ঝুঁকে, মাথা নিচু করে বসে আছে। দ্বিজপদ দেখলেন, ইচ্ছার বড় বড় টানা টানা চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে টেবিলের ওপর। দ্বিজপদর আবার ইন্দুমতীর কথা মনে পড়ল। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।

পাশ থেকে লক্ষ্মী বলে উঠল— 'তারপর? বোন তারপর?' দ্বিজপদ মনে মনে হাসলেন— খেয়ালী আর ইচ্ছার কথা শুনতে শুনতে কখন যেন লক্ষ্মীও ওদের বোন পাতিয়ে ফেলেছে। কে বলে? পুলিশের মন থাকে না?

'প্রভাত আমাকে নিয়ে এল, রায়গঞ্জ শহরের ঠিক বাইরে, পক্ষী নিবাসে— সময়টা শীতকাল, আপনারা নিশ্চয়ই ঐ পক্ষী নিবাসে গিয়েছেন— শীতকালে যে কী তার রূপ! চারিদিকে ফুলে ভরা— আর কী ফুলই বা নেই সেখানে— রকমারী গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা তো আছেই, তার সঙ্গে নাম না জানা আরও হরেক ফুলের মেলা। আমরা দোতলার ছাদে বসে, চারিদিকের গাছে বসে থাকা বিভিন্ন বিদেশি পাখি দেখতে শুরু করলাম— কতরকমের পাখি এসেছিল। আমি তো নামও জানতাম না। প্রভাতই পাখি দেখিয়ে দেখিয়ে ওদের নাম বলছিল—সব বিদেশি পাখি। আমি অবশ্য জানতাম, শীতকালে পক্ষীনিবাসের চারিদিকের বড় বড় গাছগুলোতে হরেক রকম পাখি আসে, কিন্তু, এইভাবে, কেউ আমাকে, বিদেশি পাখি চেনায়নি। আর কী তাদের ডাক, কতরকমের আওয়াজ!

সত্যি সত্যি, আমি সেদিন আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম— আর হব নাই বা কেন বলুন? মনের মানুষের গা ঘেঁষে বসে বসে হরেক বাহারের ফুল আর পাখি দেখছি—আমার বয়সি একটা মেয়ে আর কী চাইতে পারে?

সেদিন আমরা একসঙ্গে পক্ষী নিবাসের রেস্তোঁরায় বসে লাঞ্চ করলাম। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে, সব আমার পছন্দের আইটেম! গরম গরম মসুর ডাল দিয়ে ভাত, পাবদা মাছের ঝোল, বড় বড় পমফ্রেট মাছ ভাজা, চাটনি, দই-মিষ্টি। আমি বুঝলাম আমরা আসব বলে আগে থেকেই, আমার পছন্দের আইটেমগুলো রান্না করে রাখতে বলেছিল প্রভাত। ওর ইন্সট্রাকশন পেয়ে ম্যানজার রান্না করিয়েই রেখেছিল।

পক্ষী নিবাসেই, প্রভাত, আমাদের ফ্রেশ হবার জন্য, একটা ঘরও বলে রেখেছিল।

আমরা খাওয়া-দাওয়ার পর সেই ঘরেই ঢুকেছিলাম ফ্রেশ হতে। সেখানেই প্রভাত আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। বিশ্বাস করুন স্যার, আমি বাধা দিয়েছিলাম। দরজা খুলে পালাতে চেয়েছিলাম। চিৎকার করে লোক ডাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, প্রভাত আমাকে বুঝিয়েছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বিয়ে করে নেব। আজই ও ওর বাড়িতে জানাবে, আমাদের সম্পর্কের কথা। আমি বিশ্বাস করে ওকে আর বাধা দিইনি। কারণ, আমি তো মনে মনে ওকেই চেয়েছিলাম।

ফেরার সময়, আমরা টোটোতে করে একসঙ্গে ফিরেছিলাম। তখন, অন্ধকার হয়ে এসেছে। কুলীক নদীর ধার দিয়ে আমরা ফিরছিলাম। নদীর জলের তির তির শব্দ, ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা — কী অসাধারণ যে লাগছিল। ও আমাকে টোটোতে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল—ওর ছোঁয়ায় আমি যেন থরথর করে কাঁপছিলাম। ও আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।

তারপর থেকে, আমি ওকে মাঝেমাঝেই আমাদের বিয়ের কথা বলতাম। ও এড়িয়ে যেত। 'করছি, করব', এই তো সামনের মাসেই বাড়িতে কথা বলব', এই সব বলে, পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করত।

তখনও আমার সন্দেহ হয়নি। একদিন সম্ভবত বৃহস্পতিবার, কোনও ছুটির দিন ছিল। ওরও গড়িয়াতে, ওর ভাড়া বাড়িতেই থাকবার কথা। ওকে সেখানেই পাব, আন্দাজ করে ওকে কিছু না জানিয়েই ওর গড়িয়ার ভাড়াবাড়িতে চলে যাই।

গিয়ে যা দেখি, তাতে আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে। প্রথমে তো দরজার কড়া নাড়ছি, কিছুতেই দরজা খোলে না, অথচ দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি—হলটা কী? ও কী স্নানে ঢুকেছে? ঘুমোচ্ছে? এতক্ষণ ধরে, এতবার, দরজা ধাক্কাচ্ছি— খুলছে না কেন? আমি তবু হাল ছাড়লাম না।

আমার মন কিন্তু কু-ডাক ডাকতে শুরু করেছিল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট একটানা দরজা ধাক্কা দেবার পর, একটি অল্পবয়সি সাজগোজ করা মেয়ে দরজাটা খুলে একটুখানি ফাঁক করল—আমি তো তাজ্জব! এই সময় তো, কোনও মেয়ের ঘরে থাকার কথা নয়, অন্তত প্রভাত যা বলেছে। তাতে তো, ওর সঙ্গে অন্য কোনও মেয়ের কোনওদিন, কোনওরকম সম্পর্কই হয়নি।

আমি বললাম যে, আমি প্রভাতের খোঁজ করছি। মেয়েটি জড়ানো গলায় ঢুলুঢুলু চোখে আমাকে অবাক করে বলল—'এই বাড়িতে প্রভাত নামে কেউ থাকে না।' আমার সন্দেহ আরও গাঢ় হল। আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলাম। মেয়েটাও প্রাণপণ বাধা দিচ্ছিল— কিছুতেই আমাকে ঢুকতে দেবে না। আমি একটা মফসসলের মেয়ে, গায়ের জোরে, আমার সঙ্গে পারবে কেন? আমি ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই, দেখি প্রায় অন্ধকার প্রভাতের ঘর, ধোঁয়াচ্ছন্ন। একমাত্র প্রভাতই পুরুষ, বাকিরা সবাই মেয়ে। দরজা খুলল, যে মেয়েটি সে ছাড়া আরও তিনটি মেয়ে। কারো গায়ে পোষাক-আশাক নেই বললেই চলে। সবাই নেশা করছে।

আমি বুঝলাম, ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে ড্রাগস নিচ্ছে। আমি যখন চিৎকার করে, প্রভাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে থাপ্পড় মারলাম, বললাম—'এসব হচ্ছে টা কী?'

প্রভাত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হাসতে হাসতে আমাকে বলল, যে, ও শুধু ড্রাগসই নিচ্ছে না, ঘরে পর্ণোগ্রাফির শুটিং-ও চলছে, আমিও চাইলে জয়েন করতে পারি। এই ব্যবসায় এখন মোটা টাকা। সারা পৃথিবীতে এখন বাঙালি তথা ভারতীয় মেয়েদের পর্ণোগ্রাফিক ছবির ভীষণ কদর।

আমি বেশ বুঝতে পারলাম যে, প্রভাতকে নিয়ে দেখা আমার যাবতীয় স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল, এক লহমায়। সেই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া, সুন্দর, সৌম্য চেহারার, ভদ্র-রুচির প্রভাতের সঙ্গে আমার আজকের, চারটে প্রায় উলঙ্গ মেয়ের সঙ্গে শুয়ে থাকা, নেশায় চুর প্রভাতের কোনও মিলই নেই। আজ যদি, কোনওরকম খবর না দিয়ে, হঠাৎ করে, প্রভাতের বাড়িতে চলে না আসতাম, তাহলে প্রভাতের এই কুৎসিত রূপটা আমার কাছে অধরাই থেকে যেত।

শুধু তাই নয়, প্রভাত আমাকে হাসতে হাসতেই বলল, পক্ষী নিবাসের প্রতিটি মুহূর্ত, ওর লুকোনো ক্যামেরায় রেকর্ড করা আছে। আমি যদি বেশি হই চই করি, তাহলে, বিভিন্ন পর্ণোগ্রাফিক সাইটে, আমাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি, ভাসিয়ে দেওয়া হবে।

আমি মুহূর্তে ভয়ে হিম হয়ে গেলাম। আমার পায়ের তলা দিয়ে মাটি সরে গেল। আমি, অসহায়তায় কাঁপতে কাঁপতে প্রভাতের বাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম।

ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম লোকাল থানায়। প্রভাতের বিরুদ্ধে আমাকে 'রেপ'-এর অভিযোগ দায়ের করতে চাইলাম। কিন্তু, থানা আমার অভিযোগ নিল না। বলল— 'দেখুন, আপনি মেজর-সাবালিকা। স্বেচ্ছায় কারো সঙ্গে সহবাস করেছেন। তাছাড়া, সে তো আপনাকে বিয়ে করতে আপত্তি করেনি, আপনি নিজেই তার কাছ থেকে সরে আসতে চাইছেন— এটা 'রেপ' বলে বিবেচিত হবে না।

আর যদি ধরেও নিই, আপনাকে 'রেপ' করা হয়েছে, তাহলে সেটাও হয়েছে, পক্ষী নিবাসে। অর্থাৎ, 'কজ অফ অ্যাকশন', মাঝেরহাট থানায়। কাজেই, সেখানে গিয়েই আপনাকে অভিযোগ দায়ের করতে হবে।

আমি সেই রাত্রেই, ট্রেন ধরে ফিরে এলাম রায়গঞ্জে। ভোরবেলায় রায়গঞ্জ পৌঁছে, সোজা চলে আসি এই থানায়। অভিযোগ জমা দিতে চাই। প্রথমে তো থানার ডিউটি অফিসার যাদব সাঁই, আমার কেস নিতেই চাইছিল না— সেই একই কথা— আপনি স্বেচ্ছায় কারো সাথে সহবাস করেছেন, এটা রেপ কেন হবে? আমি যখন বললাম, ওর মোবাইলে লুকিয়ে আমার ছবি তোলা হয়েছে, তখন তো সে আরেক অজুহাত।— 'ওসব প্রমাণ করা যাবে না', 'ইনফর্মেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট' বা তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করতে হয়। অভিযোগ করতে হবে, ভবানী ভবনে, সেই কলকাতায়। ওখানেই সাইবার সেল আছে, আমাদের এখানে সাইবার সেলও নেই শুধু শুধু অভিযোগ করছেন।'

আমি যাদব সাঁই-য়ের কথা শুনিনি। আমি বলেছিলাম, আপনি যদি আমার অভিযোগ না নেন, কেস না চালু করেন, আমি থানার বাইরে ধর্নায় বসব, মিডিয়ার কাছে যাব।

মিডিয়ার কথা বলতেই, যাদব সাঁই, একটু নরম হল, ভয় পেয়েছিল মনে হয়।

শেষে আমার অভিযোগের ভিত্তিতে, প্রভাতের বিরুদ্ধে রেপ, গোপনে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইলিং ইত্যাদি, আরো বিভিন্ন রকম ধারায় মামলা চালু হয়।

ব্যস, ওই পর্যন্তই। আজ অবধি কিচ্ছু হয় নি। প্রভাতও অ্যারেস্ট হয় নি। ও আজও আমার চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সেদিন আমি টোটোয় করে, পক্ষীনিবাসের সামনে দিয়ে ফিরছি, দেখি, মোটরবাইকের পেছনে একটা অল্পবয়সী মেয়েকে নিয়ে পক্ষীনিবাসের গেস্ট হাউসে ঢুকছে। আমি বুঝলাম, আবার কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে।

এখন আমি বুঝতে পারি, অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে ও সম্পর্ক তৈরি করে, তারপর তাদের ব্যবহার করে, তাদের দুর্বল মুহূর্তের ছবি ও বিভিন্ন সাইটে ছেড়ে দেয়। এটাই ওর ব্যবসা।

কিন্তু স্যার, আজ অবধি প্রভাত ধরা পড়ে নি। পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয় নি। আমিও হাল ছাড়ি নি। নিয়মিত আমি থানায় আসি। এখানেই আমার আলাপ হয় খেয়ালীর সঙ্গে। এখন আমরা আর একা নই। এখন আমরা দুজন— একটা দল, আমাদের একসঙ্গে দেখে, আমাদের মতো অনেক অসহায় মেয়ে, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। আস্তে আস্তে তারাও আসবে আমাদের দলে।'

ইচ্ছা থামল। ওড়নার খুঁটে চোখ-মুখ মুছে, সোজা তাকাল দ্বিজপদর দিকে।

দ্বিজপদ, রতনের দিকে তাকালেন— 'এই কেসে আই.ও. কে?'

রতন মাথা নিচু করে ফিসফিস করে জবাব দিল— 'আমি স্যার'। দ্বিজপদর গলা থেকে হতাশার সুর বেরিয়ে এল— 'তুইও? শেষে— তুইও? তোর ওপরও কি আমি ভরসা করতে পারব না রতন?'

রতন মাথা নিচু করেই রইল— 'আসলে এই কেসটাও সি. আই. জোয়ারদার সাহেব দেখছেন। প্রভাত বলে ছেলেটা ওনার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখে।'

দ্বিজপদ এবার চিৎকার করে উঠলেন— 'কেস-ডায়েরীতে কী দেখাবি রে? এটা রেপের কেস। তার ওপর ইনফর্মেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট। এতদিন হয়ে গেল, একমাত্র আসামিকে ধরা গেল না? তার বাড়ি তো এখানেই। কবার 'রেইড' দেখিয়েছিস? আজ বাদে কাল হাইকোর্ট থেকে কেস-ডায়েরি চেয়ে পাঠাবেই। সেখানে এইসব বদমায়েশি দেখলে, চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে রে।'

একটু থেমে ইচ্ছার দিকে তাকিয়ে বললেন— 'তুই বলছিলি না, প্রভাত একটা ছেলেদের স্কুলে ভূগোল পড়ায়? স্কুলটা কোথায়? গড়িয়ায় না? ও কি এখন স্কুলে যায়? আই. মিন, স্কুলে এখন যাচ্ছে? তাহলে তো ওকে 'অ্যাবসকনডেড' বা 'ফেরার' ও দেখানো যাবে না।'

ইচ্ছা চোখ তুলে বলল— 'প্রভাত মিথ্যা কথা বলেছিল। ও কোনো স্কুলেই পড়ায় না। ড্রাগের কারবার আর পর্ণোগ্রাফিক ছবির ব্যবসা— এতেই ওর খুব রমরমা।'

দ্বিজপদ আবার বললেন— 'হুঁ, এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম।' টেবিলের উপর চাপড় মেরে বলে উঠলেন— 'আমার চাকরির শেষের দিক। আমি কোনো রিস্ক নেব না। আজ না হোক কাল হাইকোর্টে এই মামলা যাবেই, তখন কিন্তু থানার ও.সি. হিসেবে আমাকেই কৈফিয়ত দিতে হবে।'

রতন আবার মিনমিন করে বলবার চেষ্টা করল— 'স্যার, সি.আই. সাহেব, মানে জোয়ারদার সাহেবের সঙ্গে একবার কথা বললে হতো না? ইচ্ছা আর খেয়ালী, দুজনের কেস-ডায়েরীই উনি, ওনার কন্ট্রোলে রেখেছেন। আসলে, আসামিরা খুব স্ট্রং।'

দ্বিজপদ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন— গিয়ে দাঁড়ালেন জানালার সামনে। সামনে খোলা মাঠ।

খেয়ালী আর ইচ্ছা, দুজনের কেসই এই থানাতে অনেকদিন ধরে ঝুলে রয়েছে— অথচ কিভাবে যেন দ্বিজপদর নজর এড়িয়ে গেছে— এটা হওয়া উচিত হয় নি। মেয়েদুটির অসহায় অবস্থার জন্য দ্বিজপদ নিজেকে দোষী মনে করে লজ্জা পেলেন। খানিকক্ষণ মাঠের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার এসে চেয়ারে বসলেন— 'মা, ও.সি. হিসেবে আমিও দায়িত্ব এড়াতে পারি না। আমাকে দুটো দিন সময় দে। কী করা যায় দেখছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আসামিদের আমি অ্যারেস্ট করব। তোদের কথা দিলাম।'

তারপর রতনের দিকে ফিরে বললেন— 'রতন, সোমবার ওই গলায় দড়ি কেসটা মানে গোবিন্দদের কেসটা নিয়ে হাইকোর্টে যেতে হবে। গোবিন্দ, ওর মা-বাবা-আর বোন, জামিন চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছে। হাইকোর্টের পি.পি. সাহেব, কেস-ডায়েরী নিয়ে আমাকেই যেতে বলেছেন। কলকাতা থেকে ফিরে, ইচ্ছা আর খেয়ালীর কেস নিয়ে বসব।'

দীর্ঘ কর্মজীবনে কাজের সুবাদে, হাইকোর্টে অনেকবারই আসতে হয়েছে দ্বিজপদকে। ধীরে ধীরে কেমন করে যেন হাইকোর্টটাকে ভালো বেসে ফেলেছেন। আজও হাইকোর্টে ঢুকে, ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন বিরাট এই স্থাপত্যকীর্তিকে।

কী উঁচু হাইকোর্টের চূড়া, বিরাট চওড়া চওড়া করিডোর, মোটা মোটা থাম। সেগুলোতে আবার কারুকার্য করা। উঁচু উঁচু সিঁড়ি। আগে সিঁড়ি বেয়েই তিনতলায় উঠে সোজা চলে যেতেন পি.পি. অফিসে। এখন বয়স বেড়েছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে একটু কষ্ট হয়। তবে, দ্বিজপদ মোটেই ভুঁড়িওয়ালা হোঁৎকা কোনো পুলিশ নন। ব্যায়াম করা সুগঠিত চেহারা। সামনেই রিটায়ারমেন্ট, কিন্তু দ্বিজপদর সুন্দর স্বাস্থ্য দেখে কেউ মোটেই বলবে না যে আর কয়েকমাসের মধ্যেই, তিনি চাকরি থেকে রিটায়ার করবেন।

দ্বিজপদ একতলায় লিফ্টের সামনে এসে দাঁড়ালেন, একদল অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে উকিলের পোষাকে, কলকল করে কথা বলতে বলতে দ্বিজপদর পেছনে এসে দাঁড়ালো। কী সুন্দর লাগছে সবাইকে। সাদা জামা, কালো প্যান্ট। প্রত্যেকের গায়ে, কালো কোট আর লম্বা ঝোলা গাউন, গলায় সাদা কলার ব্যান্ড। কোনো কোনো মহিলা ল'ইয়ার, সাদা চুড়িদার পরা।

অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ঝাঁকটাকে খুব ভালো লাগলো দ্বিজপদর। তিনি চেয়েছিলেন ইন্দুমতীও ল'ইয়ার হোক। ছিপছিপে, ধারালো চেহারায়, উকিলের পোষাকটা যা মানাতো না! কিন্তু, ইন্দুমতী প্রথমে জয়েন্টে বসল, তাতে টপ করল, তারপর আই. আই. টি-তে ভালো ফল করল, এখন তো আই. পি. এস হবে বলে লাফাচ্ছে। অবশ্য দ্বিজপদ মেয়েকে বার বার বলেছিলেন, 'পুলিশের চাকরি দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে, আসিস না', তা মেয়ে শুনলে তো।

দ্বিজপদর চোখের সামনে ভেসে উঠল— পুলিশের পোষাকে ইন্দুমতী হেঁটে আসছে। দ্বিজপদকে দেখে অ্যাটেনশন হয়ে স্যালুট করল। দ্বিজপদ মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর মেয়ে হাসতে হাসতে নিজের মাথার টুপিটা খুলে দ্বিজপদর মাথায় পড়িয়ে দিল। দ্বিজপদ আঁতকে উঠলেন, 'ওরে সাব-ইন্সপেক্টরের মাথায় এস.পি.র টুপি কী রে? আমার তো চাকরি যাবে রে!'

তারপর বাবা-মা আর মেয়ে একসাথে জড়াজড়ি করে হাসতে লাগলেন।

অধ্যায় ১ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%