সেদিন চৈত্র মাস

অর্ণব মণ্ডল

শারদ্বত হাজরার সঙ্গে আমার আলাপ কীভাবে হল সে কথা বলতে গেলে সাত কাণ্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। কাজেই আজ থাক। আজ অত সময় নেই। আজ আপনাদের সঙ্গে ওর আলাপের পালা। সুতরাং আজ বরং সেই কথা বলা যাক যে শারদ্বতকে কীভাবে চিনল সবাই।

সেদিন চৈত্র মাস। না তবে কারও চোখে আমাদের সর্বনাশ দেখিনি। তবে কারও একটা সর্বনাশের খবর পেয়েছিল শারদ্বত। না হলে ওর কাছে খুব একটা ফোন আসে না!

সেদিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বলল, “চলো।”

ঘুমটা কাটেনি তখনও। চোখ ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করলাম, “কেস? ফ্রি হোম ডেলিভারি নাকি?”

বলল, “ক্যাশ অন ডেলিভারিরও সম্ভাবনা আছে।”

একদম যেতে ইচ্ছে করছে না এত সকালে। হাই তুলতে তুলতে একবার শেষ চেষ্টা করলাম।

“আমায় কি যেতেই হবে?”

শারদ্বত বলল, “না গেলেও অসুবিধে নেই। তবে মঞ্জুলিকা চৌধুরীর কেস। তাই ভাবলাম তোমায় ডাকি।”

কথাতেই কাজ হল। আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। বললাম, “মঞ্জুলিকা চৌধুরী মানে? বিখ্যাত লেখিকা মঞ্জুলিকা চৌধুরী?”

“খুব বিখ্যাত কি না জানি না। তবে হ্যাঁ, লেখিকা এটুকু শুনেছিলাম। তোমার কাছে কিছু বইও দেখেছিলাম। তবে ওঁর স্বামীর লেখা বরং বেশি ভালো লাগত আমার।”

“কিন্তু ওঁর স্বামী তো মারা গেছেন বছরখানেক আগে। সেই নিয়েই কি তোমাকে...”

শারদ্বত পকেট থেকে সিগারেটটা বের করে বলল, “বলেননি। সামনাসামনি বলবেন বললেন। আটটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তুমি কি যাচ্ছ?”

মানেটা কী? মঞ্জুলিকা চৌধুরীর কেস আর আমি যাব না? ওঁর প্রত্যেকটা উপন্যাস পড়া আমার। এত সুন্দর প্লট সাজান উনি! প্রত্যেকটা চরিত্রকে সমান জায়গা দিয়ে একটা অদ্ভুত বুনোট তৈরি করেন। অসাধারণ লাগে পড়তে।

বললাম, “যাব না মানে? যেতেই হবে। এটা মিস করা যাবে না।”

শারদ্বত সিগারেট ধরিয়ে বলল, “বেশ তাহলে তাড়াতাড়ি রেডি হও। রাস্তায় ব্রেকফাস্ট করে নেব।”

কিছু না বলে ঢুকে গেলাম বাথরুমে। একটু পরেই বেলের আওয়াজ শুনলাম। দরজা খুলল শারদ্বত। আমি ভেতরের ঘরে রেডি হচ্ছিলাম। গলা শুনেই বুঝলাম আজও সেই এক ঝামেলা।

দমদমের এই ফ্ল্যাটটা আমাদের ভাড়া নেওয়া। আগে শারদ্বত একাই থাকত। তারপর আমি এসে ঢুকি। কীভাবে এলাম সেই গল্প আর-একদিন হবে। যাই হোক, তো ফ্ল্যাটের মালিক সঞ্জয় মণ্ডল। লোকাল প্রোমোটার বোধহয়। আশেপাশের আরও অনেকগুলো ফ্ল্যাট উনি ভাড়া দিয়ে রেখে দিয়েছেন। থাকেন আমাদের বিল্ডিং-এরই ওপরতলায়। আজ মাসের ১৬ তারিখ হয়ে গেল। এখনও ভাড়া পাননি। তাই রোজ এসে একবার মনে করিয়ে যান।

শারদ্বতর আসলে এখন একটু হাতটান যাচ্ছে। কেস নেই খুব একটা হাতে। আমি ওর টাকাটা দিয়ে দিতাম এই মাসে। কিন্তু ও ব্যাটা নেবে না আমার থেকে। কাজেই আমাদের দুজনের ভাড়াই বাকি।

দরজা খুলেই, শারদ্বত বলল, “আরে সঞ্জয়বাবু যে? সুপ্রভাত!”

সঞ্জয়বাবু বললেন, “প্রভাতটা আর সু কী করে হবে ভাই? বলছিলাম যে আমার ভাড়াটা এবার একটু দিয়ে দিলে ভালো হয় না?”

শারদ্বত বলল, “আরে সে তো কত কিছু করলেই ভালো হয়? কিন্তু ভালো আর হয় কোথায় বলুন! তা বউদি কবে ফিরবেন?”

প্রশ্নটায় একটু থতোমতো খেয়ে গিয়েছিলেন সঞ্জয়বাবু। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “এই তো দু-দিন বাদেই ফিরবে। আমার টাকাটা...”

শারদ্বত বলল, “টাকা দিয়ে দেব আর দু-এক দিনের মধ্যেই। তারপর বেডরুমের খাটটা সারিয়ে নেবেন।”

ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে বললেন, “খাটটা?”

শারদ্বত হাতের সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে দরজার পাশের টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে বলল, “খাটটা মানে খাটের গদিটা। মাটিতে হামাগুড়ি দিতে অসুবিধে হচ্ছে না?”

ভদ্রলোক এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ধুর মশাই। কী সব বলছেন? আমি আজ আসি। টাকাটা রেডি রাখুন কাল। অনেকদিন হল।”

শারদ্বত কিছু না বলে দরজা বন্ধ করে দিল। আমি তখন ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছি। আবার জিজ্ঞেস করতে হবে নাকি? শেষ অবধি করেই ফেললাম, “কথাগুলো কি বানিয়ে বললে?”

“বানিয়ে আমি বলি না অনিরুদ্ধ। সবটাই শার্লক হোমস-এর কৃপা এবং অল্পবিস্তর খুঁটিয়ে দেখার ক্ষমতা।” শারদ্বত বলল।

“শার্লক হোমস তোমায় বলে দিলেন বউদি বাইরে কোথাও গিয়েছেন?”

শারদ্বত মুচকি হেসে বলল, “কাল ব্যাগ নিয়ে বেরোতে দেখলাম। আর আজ ওঁর গায়ে এনগেজ পারফিউমের গন্ধ পেয়ে বুঝলাম বউদি ফেরেননি কাল।”

জিজ্ঞেস করলাম, “কেন? বউদি কী পারফিউম মাখেন সেটাও তুমি জানো নাকি?”

“না সেটা জানি না। তবে বউদি থাকলে ওঁর গা থেকে কোনও পারফিউমেরই গন্ধ পাই না।”

“আর খাটের ব্যাপারটা কী করে বললে? উনি তো চারতলায় থাকেন। আর আমরা দোতলায়। আওয়াজ পাওয়ারও তো চান্স নেই।”

“বারমুডা আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে নিচে নেমেছিলেন। হাঁটু দুটো দেখলাম লাল হয়ে গিয়েছে। সুতরাং কাল হামাগুড়ি দিয়ে কিছু একটা করছিলেন। কী করছিলেন সেটা নাহয় চাপাই থাক। খাটের গদি ভালো থাকলে হাঁটুর ওই অবস্থা হত না। আর নয়তো মেঝেতেই যা হওয়ার হয়েছে।”

“বাবা! সব বুঝে গেলে তুমি হাঁটু দেখে?”

শারদ্বত বলল, “চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যায় ভায়া। শুধু মঞ্জুলিকা চৌধুরী পড়লে এসব হবে না।”

মঞ্জুলিকা চৌধুরীর বাড়িটা খুব বড়ো না। তবে বেশ শৌখিন। দোতলা বাড়ি। খুব সাজানো গোছানো বাগান। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা যখন পৌঁছোলাম তখন বাজে আটটা বেজে পাঁচ। মঞ্জুলিকা চৌধুরী সামনেই বাগানে বসেছিলেন। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। তারপর স্মার্টফোনের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “পাঁচ মিনিট লেট।”

শারদ্বত আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিল। বলল, “আপনার ভক্তকে ঘুম থেকে তুলতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল।”

মঞ্জুলিকা চৌধুরি হাসলেন। বললেন, “বসুন।” তারপর বাড়ির ভেতরের দিকে মুখ করে বললেন, “চা দাও!”

শারদ্বত বলল, “প্রথমেই আলাপটা করিয়ে দিই। ইনি আমার বন্ধু এবং সহকারী অনিরুদ্ধ সেন।”

আমি তখন কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। চোখের সামনে মঞ্জুলিকা চৌধুরীকে দেখছি। অবাক লাগছে খুব। আসলে একজন মানুষের লেখা পড়ে পড়ে মানুষটা সম্পর্কে একটু মনগড়া ধারণা হয়ে যায়। কিন্তু সামনে এলে সবটা যেন পালটে যায়। যেমন মঞ্জুলিকা চৌধুরীর লেখা পড়লেই মনে হত ওঁর বয়স খুব কম। কলেজ জীবন কিংবা ২০-২২ বছরের টানাপোড়েন উনি যেভাবে তুলে ধরেন গল্পে বা উপন্যাসে, সেটা খুব সহজ কথা নয়।

শারদ্বত বলল, “এবার বলুন। হঠাৎ প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের দরকার পড়ল কেন আপনার?”

প্রশ্ন করার পরেই দেখলাম একজন অল্পবয়সি মহিলা চায়ের কাপ নিয়ে আসছেন। বেশভূষা দেখে মনে হল কাজের লোক।

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “শুরুতেই বরং পেমেন্টের ব্যাপারে কথা বলে নি। আপনি চার্জ কত নেন?”

শারদ্বত বলল, “আমি শুরুতে আট হাজার অ্যাডভান্স নিই। কেস শেষ হলে আরও আট হাজার।”

- আর কেস যদি সলভ করতে না পারেন?

- সলভ করতে না পারলে আর টাকা নিই না।

- না আমি বলতে চাইছি যে, সলভ করতে না পারলে বা কালপ্রিটকে ধরতে না পারলে কি টাকাটা ফেরত দেওয়া হয়?

শারদ্বত বলল, “না দেওয়া হয় না। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই কালপ্রিটকে ধরতে না-পারাটা গোয়েন্দার অক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না।”

চায়ের কাপগুলো টেবিলে রাখতে গিয়ে মেয়েটার হাতটা হঠাৎই যেন কেঁপে গেল একটু। চা চলকে পড়ল টেবিলে। মঞ্জুলিকা দেবী চেঁচিয়ে উঠলেন, “আহ! কী করছিস? দেখে!”

মেয়েটা মাথা নিচু করে চলে গেল। শারদ্বত দেখলাম ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটার দিকে। বিরক্ত হয়েছে কি? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একটা খুব চেনা গন্ধ হঠাৎ নাকে লাগল। কিন্তু কীসের গন্ধ কিছুতেই মনে পড়ল না।

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “নিন। চা নিন।”

শারদ্বত চায়ের কাপটা তুলতে তুলতে বলল, “এবার আপনার সমস্যাটা বলুন।”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “দেখুন সমস্যা বলতে, আমি বেশ কয়েকদিন ধরেই কিছু হুমকি মেসেজ পাচ্ছি। সেইজন্যেই আপনাকে ডাকা।”

“পুলিশে জানাননি?” আমি ফস করে জিজ্ঞেস করে বসলাম।

শারদ্বত কটমট করে আমার দিকে তাকাল। এমনিতেই পুলিশ বস্তুটা খুব একটা পছন্দ না ওর। ও ভাবে ওরা সবাই খালি অকর্মার ঢেঁকি।

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “না দিইনি। তবে আমি জানি কাজটা কে করছে।”

“জানেন?” শারদ্বত একটু অবাক হল।

- জানব না? ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা হচ্ছে মেসেজগুলো। নাম ছবি সবই দেখা যাচ্ছে।

শারদ্বত বলল, “একবার দেখা যাবে?”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “হ্যাঁ নিশ্চয়।” বলেই স্মার্টফোনটা নিয়ে নিজের ইনবক্সটা খুলে আমাদের দিলেন। ইন ফ্যাক্ট ওই ছেলেটার মেসেজটাই খুলে দিলেন দেখলাম। ছেলেটার নাম দেখলাম, রাজেশ মাইতি। মেসেজগুলোও দেখতে পেলাম। ছেলেটা লিখেছে, “আপনি একটা শয়তান মহিলা। আপনার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দেব আমি।”

তারপর আর-একটা মেসেজেই লিখেছে, “আজ জানলার কাচ ভেঙেছি। কাল এবার আপনার মাথা ভাঙব ইট দিয়ে।”

এইরকমই আরও দু-তিনটে মেসেজ। শারদ্বত ফোনটা ফেরত দিয়ে বলল, “আপনি পুলিশে খবর কেন দেননি? মানে আপনি যখন জানেন কে কাজটা করছে!”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “দেখুন বিষয়টা হল, ছেলেটার ছবি দেখে মনে হচ্ছে ছেলেটার বয়স খুব কম। কেন এসব করছে জানি না। পুলিশে খবর দেওয়া মানে ছেলেটার বাকি জীবনটাকে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। আমি চাই না এটা হোক।”

- আচ্ছা আপনি ছেলেটাকে চেনেন? ব্যক্তিগতভাবে?

- না। একেবারেই না।

- কখনও দেখেননি?

- এই রে! নাহ। দেখিনি কখনও।

শারদ্বত নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “যদি আপনি একে নাই-ই চেনেন, তাহলে এর আপনাকে বিরক্ত করার মোটিভটা কী?”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “সে তো আমিও ভাবছি। এখন বলুন আমার কী করণীয়?”

শারদ্বত একটু ভেবে বলল, “দেখুন আপনি যদি চান তাহলে আমি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি একবার। কেন সে এরকম করছে খোঁজ নিতে পারি।”

মঞ্জুলিকা দেবী এবার উৎফুল্ল হলেন খুব। বললেন, “বাহ! তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হই। আপনি দেখুন ব্যাপারটা একটু।”

শারদ্বত বলল, “ঠিক আছে, আমি দু-দিনের মধ্যেই আপনাকে জানাচ্ছি। ছেলেটা কোথায় থাকে জানেন?”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “না, তা জানি না। তবে ফেসবুকে দেখলাম ঠিকানা লেখা আছে, বারাসাত।”

“ঠিক আছে, দেখছি আমি।”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “আচ্ছা, এক মিনিট বসুন আপনি। আপনার অ্যাডভান্সটা দিয়ে দিই। চেক চলবে তো?”

শারদ্বত ঘাড় নাড়ল। অর্থাৎ চলবে।

মঞ্জুলিকা দেবী এবার বাড়ির ভেতরের দিকে ফিরে বললেন, “মিনু, চেকবইটা দিয়ে যাও।”

তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, “কোল্ড ড্রিংক খাবেন?”

আমি বলতে যাচ্ছিলাম, “হ্যাঁ, খেতেই পারি।”

শারদ্বত হঠাৎ বলে বসল, “অনিরুদ্ধর আসলে ঠান্ডার ধাত! কোল্ড ড্রিংকটা বরং থাক।”

সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমার মোটেই ঠান্ডার ধাত না। ওর নিজেরই ঠান্ডার ধাত রয়েছে। গল্পের নায়ক তো, তাই সেটা আর ফাঁস করলাম না সর্বসমক্ষে।

শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ইফ য়ু ডোন্ট মাইন্ড মি আস্কিং, আপনার স্বামী কীভাবে... মানে...”

“হার্ট অ্যাটাক। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই।”

“কেমিস্ট্রি নিয়ে ওঁর কয়েকটা রিসার্চ পেপার বেরিয়েছিল না?”

“ওহ বাবা! আপনি এটাও জানেন!” একটু অবাক হলেন মঞ্জুলিকা দেবী।

“হ্যাঁ, আসলে ফলো করতাম ওঁর লেখা। খুব ভালো লিখতেন উনি।”

“আর আপনার লেখাও আমাদের খুব প্রিয়। সব উপন্যাস আমার পড়া।” আমি বলেই ফেললাম এবার।

মঞ্জুলিকা দেবী কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন।

এর মধ্যেই মেয়েটা চেকবুক নিয়ে এল। সঙ্গে আবার সেই অদ্ভুত একটা গন্ধ। আমি শারদ্বতর দিকে তাকালাম। ও কি পাচ্ছে না গন্ধটা? ও দেখলাম পাত্তাই দিল না ব্যাপারটা। চেকে ঠিক নামের বানান লেখা হচ্ছে কি না সেটা নিয়ে ও বেশি চিন্তিত মনে হল। আমরা যেখানে বসে আছি সেখান থেকে বাইরের গেটটা পরিষ্কার দেখা যায়। সেদিকে চোখ পড়তেই দেখলাম একটা কালো মাথা হঠাৎ যেন খুব দ্রুত সরে গেল। এর মধ্যেই নজরদারি শুরু হয়ে গেল নাকি? ইট ছুড়বে না তো!

মঞ্জুলিকা দেবীর বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটা ছোট্টো রাস্তা। সেখান থেকে একটু এগিয়েই একটা বড়ো রাস্তা পড়ছে। আমাদের যেতে হত ডানদিকে। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা একবার বের করেই আবার পকেটে রেখে দিল শারদ্বত। তারপর এগিয়ে গেল বাঁদিকে।

বললাম, “আমাদের ডানদিকে যেতে হত।”

শারদ্বত উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। ও যে গোয়েন্দা সেটা মাঝেমধ্যে প্রমাণ করার একটা মরিয়া চেষ্টা করে গল্পের মাঝে। এমন ভাব করে যেন গোপন কিছু দেখতে পেয়েছে। কিন্তু অনেক সময়ই সেটা অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। একটু গিয়েই শারদ্বত ঢুকে গেল বাঁদিকের একটা গলিতে। তারপর একটু গিয়েই আবার ডানদিক দিয়ে উঠল সেম রাস্তায়। আমি চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতো পিছু নিচ্ছি। আমি জানি এখন গোয়েন্দা মোড অন হয়ে গেছে। কথা বললে উত্তর দেবে না ইচ্ছে করে। তাই কিছু বললাম না।

এই রাস্তায় গাড়ি কম। শারদ্বত পা টিপে টিপে পেরোল রাস্তাটা। তারপর আবার অন্য ফুট দিয়ে চলল বড়ো রাস্তার দিকে। অর্থাৎ মঞ্জুলিকা চৌধুরীর বাড়ির দিকেই। শুধু আমরা ফুটপাথটা চেঞ্জ করলাম নিজেদের। সেটাই বা এত লুকিয়েচুরিয়ে কেন করলাম? কাউকে কি দেখতে পেয়েছে শারদ্বত?

একটু পরেই জবাব মিলল। মঞ্জুলিকা চৌধুরীর বাড়ির উলটোদিকে একটা অন্ধকার গলির কাছে দেখা যাচ্ছে একটা মাথা। কালো মাথা। যেরকমটা আমি দেখেছিলাম। শারদ্বত এবার গতি বাড়িয়ে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটার সামনে।

আরে! এ তো আমাদের কালপ্রিট। রাজেশ মাইতি। বয়স বেশি না। ছবিতেও অবশ্য তাই মনে হচ্ছিল। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বাড়ির ওপর নজর রাখছিল। ছেলেটা প্রথমে আমাদের দেখে একটু হকচকিয়ে গেছিল। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। শারদ্বত রাস্তা আটকাল। বলল, “একটু কথা আছে তোমার সঙ্গে”

ছেলেটা বলল, “আপনাদের আমি চিনি না। সুতরাং কথা বলার প্রশ্নও ওঠে না।”

শারদ্বত বলল, “তাহলে বারাসাতের বাড়িতে গিয়ে নাহয় পুলিশই কথা বলুক।”

পুলিশ শব্দটায় মাঝেমধ্যে দেখেছি ম্যাজিকের মতো কাজ হয়। এখানেও তাই হল। ছেলেটা ঘুরে বলল, “আপনারা পুলিশ?”

শারদ্বত বলল, “ইস! না। আমরা ইনটেলিজেন্ট। তাই কথা আগে বললাম। পুলিশ হলে লাঠির ঘা পড়ত আগে।”

ছেলেটা কিছু বলল না। তবে আমাদের কথা শুনতে ইন্টারেস্টেড বোঝা গেল।

শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “ওই বাড়িটার ওপর নজর রাখছ কেন?”

ছেলেটি বলল, “নজর কেন রাখতে যাব! এমনি ঘুরছি এখানে। সেটা কি অন্যায়?”

“অন্য কেউ বলেছে নজর রাখতে?”

“বললাম তো নজর রাখছি না। এমনি ঘুরছিলাম এখানে।”

শারদ্বত হেসে বলল, “বারাসাত থেকে টালিগঞ্জ এসেছ ঘুরতে?”

ছেলেটি বলল, “আমি তো বারাসাতে থাকি না। ওখানে মা বাবা থাকেন। আমি টালিগঞ্জেই থাকি। মেসে।”

“ওই বাড়ির কাচ ভাঙতে গেলে কেন? মঞ্জুলিকা চৌধুরীর ওপর কীসের এত রাগ তোমার?”

ছেলেটি কিছু বলল না। শারদ্বত আরও কয়েকবার চেষ্টা করল, ছেলেটাকে খুব বেশি কথা বলানো গেল না।

শারদ্বত বলল, “দ্যাখো যদি তোমার কোনও সমস্যা থেকে থাকে মঞ্জুলিকা চৌধুরীকে নিয়ে, তাহলে তুমি আমায় বলতে পারো। আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলে সেটা মিটিয়ে দিতে পারি। তোমার সামনে বাকি জীবনটা পড়ে আছে। পুলিশে জানানো হলে সেটাও থাকবে না। সুতরাং...”

ছেলেটা তাও কিছু বলল না। শারদ্বত এবার পকেট থেকে নিজের একটা কার্ড বের করে রাজেশের হাতে দিল। বলল, “কিছু বলতে ইচ্ছে হলে ফোন কোরো এই নাম্বারটায়।”

ছেলেটা কিছু না বলে কার্ডটা নিয়ে নিল। তারপর ভুরু কুঁচকে তাকাল ওর দিকে। এটার কারণ অবশ্য আমিই বলে দিতে পারি। শারদ্বতর কার্ডে ওর কোনও নাম নেই। শুধু ইনিশিয়াল আছে। S.H.। আর আছে ফোন নাম্বার, ইমেল আইডি আর ওয়েবসাইট। স্বভাবতই লোকজন কার্ডে নাম না দেখে একটু অবাক হয়।

ছেলেটি চলে যাচ্ছিল। শারদ্বত বলল, “আর হুমকি মেসেজ পাঠানোটা এবার বন্ধ করো। যাই উদ্দেশ্য থাক তোমার। ওটা খুব ডাম্ব একটা মুভ।”

ছেলেটা চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল, বলল, “হুমকি মেসেজ? কাকে?”

আমি বললাম, “কাকে আবার? মঞ্জুলিকা চৌধুরীকে?”

রাজেশ যেন আকাশ থেকে পড়ল, “কিন্তু আমি তো কোনও হুমকি মেসেজ পাঠাইনি।”

ফ্ল্যাটে ফিরে সকালের কথাগুলোই ভাবছিলাম। শারদ্বতও সেই যে নিজের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে, আর বেরোচ্ছে না। দুপুরের পর হঠাৎ বলল, “দাঁড়াও একবার লাইব্রেরি থেকে ঘুরে আসি। অবশ্য তার আগে একবার ব্যাংকে যাই। চেকটা ড্রপ করে আসি।”

আমি এই সময়গুলো যাই না ওর সঙ্গে। জানি গেলে ওর মনোযোগে বিঘ্ন ঘটানো ছাড়া আর-কোনো কাজ আমি করতে পারব না। খুব খিদে পাচ্ছে। অনলাইনে খাবার অর্ডার করব কি না ভাবছিলাম।

সকালে রাজেশ ছেলেটির সঙ্গে যে কথোপকথন হল, তাতে আমার নিজেরই খুব অবাক লেগেছে। ছেলেটি বলল, ও নাকি হুমকি মেসেজ পাঠায়নি।

তাহলে কি ওকে কেউ ফাঁসানোর চেষ্টা করছে? কিন্তু কেনই বা করবে? মোটিভ কী? আর ও-ই বা কেন এরকম করছে সেটাও বলতে চাইছে না। কীসের এত রাগ ওর মঞ্জুলিকা চৌধুরীর ওপর?

শারদ্বত জিজ্ঞেস করেছিল ওকে আবার।

- পাঠাওনি মানে? তোমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ গিয়েছে। আর তুমি বলছ পাঠাওনি?

- আমি সত্যি পাঠাইনি। অতটা বোকা আমি নই।

- কেউ পাসওয়ার্ড জানে তোমার?

- না। কেউ জানে না।

শারদ্বত আবার একবার জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, মঞ্জুলিকা চৌধুরীকে তুমি এত বিরক্ত কেন করছ? কেউ বলেছে তোমায়?”

আবার কোনও উত্তর নেই। শারদ্বত বুঝেছিল সময় নষ্ট করে লাভ নেই। এ ছেলে নিজে না চাইলে ওকে কেউ বলাতে পারবে না। আর-একটা উপায় আছে আমি জানি। কিন্তু শারদ্বত নিজমুখে সেটার কথা বলবে না। আমাকেই কিছু একটা করতে হবে।

* * *

রাত্রে সাড়ে নটা নাগাদ ঢুকল শারদ্বত। হাতে খাবারের প্যাকেট। জিজ্ঞেস করলাম, “কেস সলভ হয়ে গেল নাকি?”

শারদ্বত বলল, “কেস সলভ হলে বিরিয়ানি খাওয়াব। আপাতত রুটি মাংস এনেছি।”

আমি বললাম, “এতক্ষণ লাইব্রেরিতে ছিলে নাকি?”

- নাহ। সাতটায় বন্ধ হয়ে গেল তো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলাম।

- একা একা?

- তো কি দোকা দোকা ঘুরব?

- সে তো ঘুরতেই পারো। মানে যদি ওই গার্লফ্রেন্ড...

- রক্ষে করো আমায়। একটা ন্যাকা ছেলে নিয়ে ঘর করছি, আবার একটা মেয়ে। আমি কি পাগল না পুলিশ?

আমি বললাম, “আচ্ছা পুলিশের ওপর এত কীসের রাগ তোমার? এর আগে কতবার তুমি ওদের সাহায্য পেয়েছ সেটা স্বীকার করো।”

শারদ্বত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল ওর। অচেনা নাম্বার দেখলাম।

- হ্যালো। শারদ্বত বলছি।

ও প্রান্ত থেকে কী বলল কিছু শুনতে পেলাম না। খালি এদিকেরগুলো শুনতে পেলাম আমি। ফোন রাখার পর আমি হাঁ করে বসেছিলাম শারদ্বত কী বলে শোনার জন্য। সে ব্যাটা আমার দিকে ফিরে বলল, “এই, দুটো প্লেট নিয়ে এসো। খিদে পেয়ে গেছে।”

আমি এবার বিরক্ত হয়ে বললাম, “আরে কে ফোন করল সেটা বলো?”

শারদ্বত খুব ভাবলেশহীন ভাবে বলল, “রাজেশ। রাজেশ মাইতি।”

আমার তখন কৌতূহল চরমে। বললাম, “কী বলল?”

- বলল কাল আসবে। সব খুলে বলতে চায়।

- হঠাৎ মাইন্ড চেঞ্জ? এত সোজা?

- বাচ্চা ছেলে হয়তো ভেবেছে বিপদ বাড়তে পারে, তাই যোগাযোগ করেছে। এত জটিল করে ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই।

আমি আর কিছু বললাম না। কিন্তু মনের মধ্যে কেমন যেন একটা খটকা রয়ে গেল।

পরের দিন বেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙল। শারদ্বত তখনও ওঠেনি। অনেক রাত অবধি ওর ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছি। কাজ করছিল বোধহয়। চোখ ঘষতে ঘষতে দরজা খুললাম। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। গেটের বাইরে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁকে হঠাৎ এই কেসের মাঝে দেখতে পাব ভাবিনি।

গেট খুলে ভেতরে ডাকলাম ওকে। দেখলাম অফিসের ড্রেসেই এসেছে। বললাম, “আয়। বোস। কী ব্যাপার এত সকালে?”

দাদা বলল, “তোর রুমমেটকে থানায় নিয়ে যেতে এলাম।”

এই হল দাদার সমস্যা। শারদ্বতকে একদম পছন্দ করে না। আর শারদ্বত যেভাবে সবসময় পুলিশকে ঠেস দিয়ে কথা বলে, তাতে দাদাকেও ঠিক দোষ দেওয়া যায় না। ও হ্যাঁ, এখানে বলে নি। যিনি এইমাত্র ঢুকলেন ফ্ল্যাটে, তিনি আমার জ্যাঠতুতো দাদা, নীলাদ্রি সেন। পুলিশ কমিশনার। লালবাজার।

বললাম, “কেন, কী করেছে সে? আবার কোনও কেস সলভ করে দিয়েছে তোদের?”

দাদা বলল, “এই হচ্ছে তোদের ভুল, বুঝলি তো! তোরা ভাবিস পুলিশরা হচ্ছে অকর্মার ঢেঁকি। আর প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটররা সব কাজ করে। তোর গল্পগুলোতেও এই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা থাকে।”

আমি এবার একটু অবাক হয়ে বললাম, “তুই আমার গল্প পড়িস?”

দাদা বলল, “ওই, পড়েছি দু-একটা।”

কথা বলার আওয়াজ পেয়েই বোধহয় শারদ্বত বেরিয়ে এল দরজা খুলে। বলল, “সক্কাল সক্কাল কে জ্বালাতে এল অনিরুদ্ধ?” তারপর দাদাকে দেখে বলল, “ওহ নীলাদ্রিদা, আপনি। তা কী ব্যাপার, এত সকালে?”

দাদা বলল, “তোমায় থানায় নিয়ে যেতে এলাম।”

শারদ্বত বলল, “এক্ষুনি যাবেন কি? না হলে বড়ো বাথরুমটা সেরে নিতাম।”

দাদা কিছু বলল না। বিরক্ত হয়েছে মুখ দেখে বুঝলাম। আমি এবার বললাম, “সকাল থেকে খালি বলছিস থানায় নিয়ে যাবি। কী হয়েছে?”

দাদা বলল, “রাজেশ মাইতিকে চিনিস তোরা?”

শারদ্বত বাথরুমে ঢুকতে গিয়েও থেমে গেল। আমিও চুপ।

দাদা বলল, “মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বোঝা যাচ্ছে যে চিনিস। তা ও আজ সকালে মারা গেছে।”

আমার মুখ থেকে অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল। শারদ্বতও দেখলাম স্থির হয়ে গেছে।

- মৃত্যুটা অস্বাভাবিক। তাই থানা থেকে লোক গিয়েছিল ওর মেসে। তোরা কিছু জানিস এই ব্যাপারে?

শারদ্বত উত্তর না দিয়ে বলল, “পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কী বলছে?”

দাদা বলল, “এখনও আসেনি রিপোর্ট। ওর পকেটে তোমার কার্ড দেখে বুঝলাম যে তোমরা চেনো। এবার বলো তো তোমরা কী জানো এটা সম্পর্কে?”

আমি বললাম, “আমরা আসলে একটা কেসের ব্যাপারে কাল...”

শারদ্বত বলল, “অনিরুদ্ধ।”

বুঝলাম আমায় থামতে বলা হচ্ছে। তারপর দাদার দিকে ফিরে বলল, “সরি নীলাদ্রিদা, ক্লায়েন্ট প্রাইভেসি। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা একটু জানতে পারলে সুবিধে হত।”

দাদা চেয়ার থেকে উঠে পড়ল, “সরি ভাই। কনফিডেনশিয়াল। ঠিক আছে আসি আজ। দেখা হবে।”

কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আমি জাস্ট কিছু ভাবতে পারছিলাম না। একটা বাচ্চা ছেলে চলে গেল পৃথিবী থেকে। এর সঙ্গেই তো কথা হল কাল। আর তা ছাড়া আজ তো এর আসার কথা ছিল আমাদের কাছে। সেই কারণেই কী?

শারদ্বত হঠাৎ বলল, “মঞ্জুলিকা চৌধুরীর নাম্বারটা তুমি সেভ করেছিলে না?”

আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। বললাম, “কী?”

“মঞ্জুলিকা চৌধুরীর নাম্বার? তোমার কাছে তো? একবার ফোন করে বলো, আমরা আসছি। অল্প একটু সময় নেব ওঁর।”

“এক্ষুনি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম অবাক হয়ে।

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। এক্ষুনি। ফোন করে দাও। তারপর রেডি হও। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বেরোব।”

আজ গরমটা একটু বেশি। তাও মঞ্জুলিকা চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম উনি বসে আছেন ঘরের বাইরেটাতেই। খুব রোদ নেই জায়গাটায়। তবু হালকা একটা গরম ভাপ তো লাগছেই। ওঁকে সব বলায় উনি বললেন, “হাউ আনফরচুনেট! কিছু জানতে পারলেন আপনারা?”

শারদ্বত বলল, “আপাতত না। তবে যাই হোক, আপনার সমস্যা মিটল এই আর কি।”

আমি বললাম, “কাল আসলে আমরা বাড়ি থেকে বেরোনোর পর ওকে দেখেছিলাম।”

মঞ্জুলিকা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন, “কখন?”

শারদ্বত বলল, “ওই এখান থেকে বেরোনোর ঠিক পরেই। এই বাড়ির ওপর নজর রাখছিল।”

মঞ্জুলিকা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “দাঁড়ান। আপনার বাকি টাকাটা দিয়ে দিই।”

শারদ্বত বলল, “না না। ওটা আর লাগবে না। আমায় তো কিছু করতেই হয়নি।”

- আরে ধুর, তা বললে কী হয়? ওটা আপনার প্রাপ্য।

- আরে প্লিজ। এরকম বলবেন না। ওটা আমি নিতে পারব না... তবে...

- তবে?

শারদ্বত বলল, “আমার এই বন্ধুটিও লেখালেখি করে, বুঝলেন। ওর একটা ইচ্ছে রয়েছে আমি জানি। যে, ওর লেখাগুলো যদি আপনি একটু দেখেন।”

মঞ্জুলিকা দেবীর গলায় একটা জিজ্ঞাসা, “আমি?”

আমি তখন কী বলব ভাবছি। শারদ্বত সত্যিই যে আমার মনের কথা বুঝে ফেলবে সেটা আমি ভাবিনি। তবে এটা যদি সত্যি ঘটে আমি ওর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। আপনি। আপনাকে আসলে ও আইডল মনে করে। তাই আসলে...”

মঞ্জুলিকা দেবী এবার খুব খুশি হলেন বোঝা গেল, বললেন, “বেশ তো। তাই হবে নাহয় একদিন। কবে আসতে চান বলুন।”

আমি বললাম, “আপনার যেদিন সময় হবে। তাড়া নেই।”

- ঠিক আছে। কাল একবার চলে আসুন ফোন করে। কেমন?

ঘাড় নাড়লাম আমি। আমার তখন প্রচণ্ড আনন্দ হচ্ছে। মনে মনে বলছি, থ্যাংক য়ু সো মাচ শারদ্বত।

শারদ্বত বলল, “একটু জল খাওয়াবেন?”

“হ্যাঁ নিশ্চয়”, বললেন মঞ্জুলিকা দেবী। তারপর বাড়ির দিকে ফিরে বললেন, “মিনু জল দিয়ো এঁদের।”

শারদ্বত বলল, “আপনার কোনও ছেলেমেয়ে...”

মঞ্জুলিকা দেবী মাথা নেড়ে বললেন, “নাহ। সে সৌভাগ্য হয়নি।”

মিনিটখানেক পরেই মিনু নামের মেয়েটি দু-গ্লাস জল দিয়ে গেল আমাদের। সঙ্গে ফেলে গেল সেই চেনা গন্ধ।

পরে শারদ্বতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এটার ব্যাপারে। ও বলেছিল, গন্ধটা বোরোলিনের। সম্ভবত কাজ করতে গিয়ে হাত-টাত কেটে ফেলেছে। তাই হয়তো বোরোলিনের উপস্থিতি। সেইজন্যেই এত চেনা লাগছিল গন্ধটা।

আর কথা না বাড়িয়ে আমরা দুজন উঠে পড়লাম। শারদ্বত বলল, “তুমি বাড়ি যাও। আমি একটু লাইব্রেরি যাব।”

- আবার? কেস তো শেষ হয়ে গেল।

শারদ্বত হেসে বলল, “বলো কী ভায়া! এই তো সবে শুরু।”

শারদ্বত ফিরল সাড়ে দশটায়। মেসেজ করে দিয়েছিল যে খাবার নিয়ে ফিরবে, তাই আমি আর বেরোইনি। ওর জন্য অপেক্ষা করলাম সারাদিন। তারপর যে লেখাগুলো নিয়ে যাব সেগুলো প্রিন্ট করে রাখলাম। প্রিন্ট করলাম, কারণ আমার সব লেখাই কম্পিউটারে থাকে। হাতের লেখা এতটাই খারাপ যে মনে হয় পায়ে করে লিখেছি। তাই রিস্ক নিই না।

জিজ্ঞেস করলাম, “শেষ হয়ে যাওয়া কেস নিয়ে ভেবে ভেবে তো মুখে গ্লানির রেশ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”

শারদ্বত বলল, “কোথায় গ্লানি? আজ তো বিরিয়ানি।”

অবাক হয়ে বললাম, “হয়ে গেল সলভ?”

শারদ্বত বলল, “অলমোস্ট। কাল যবনিকা পতন।”

- এত তাড়াতাড়ি? তিন দিনে কেস নামাচ্ছ? কী ব্যাপার ব্যোমকেশ?

- আহ! গুরুদের নিয়ে ঠাট্টা না।

- আচ্ছা ঠিক আছে। এবার বলো।

- কী বলব?

- কী জানতে পারলে বলো। কালপ্রিট কে?

শারদ্বত বিরিয়ানিটা প্লেটে ঢালতে ঢালতে বলল, “রয়েল বেঙ্গল রহস্য পড়েছ? সত্যজিৎ রায়ের লেখা?”

আমি বললাম, “আবার আমার গুরুকে টানছ কেন?”

শারদ্বত বলল, “শোনো অনিরুদ্ধ। হাতিয়ার সবার হাতে বাগ মানে না। এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা মনে রেখো।”

আমি বললাম, “আরে হেঁয়ালি না করে বলো না কী ব্যাপার।”

- এই তো বলেই দিলাম কতটা। বাকিটা কাল হবে। তুমি কাল মঞ্জুলিকা চৌধুরীর কাছে গিয়ে নিজের কাজ সেরে এসো। তারপর যবনিকা পতনে বেরোব আমরা।”

- ওঁকে জানাবে না?

- ধুর! ওঁকে বিব্রত করে কী লাভ? তুমি আমি থাকলেই হবে। এক মিনিট। তুমি খেতে শুরু করো। আমি আসছি।

কথাটা বলেই ফোন নিয়ে উঠে গেল শারদ্বত। কাকে করল জানি না। তবে এদিককার কথাগুলো লিখে দিচ্ছি। যদিও তাতে আপনাদের কিছু সুবিধে হবে বলে মনে হয় না।

- হ্যালো

- ...

- শারদ্বত বলছিলাম।

- ...

- হ্যাঁ আমি জানি। সেজন্য ফোন করিনি। জাস্ট একটা জিনিস যদি কনফার্ম করেন খুব সুবিধে হয়।

- ...

- ঠিক আছে। শুধু এটা মনে রাখবেন একটা খুনি কলকাতার রাস্তায় ঘুরবে শুধু আপনার জন্য। রাখলাম।

বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা যেভাবে আশা করেছিল সেভাবে গেল না। জিজ্ঞেস করলাম, “দাদাকে ফোন করলে?”

শারদ্বত ঘাড় নাড়ল। কিছু বলল না। বুঝতে পারলাম এবার বোধহয় বিকল্প রাস্তা খুঁজছে। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটু পরেই ফোন এল। ধরার আগে জিজ্ঞেস করলাম, “দাদা?”

বলল, “হুম।” বলে উঠে গেল নিজের ঘরে।

আবারও যা যা কথা শুনতে পেলাম। লিখে দিচ্ছি আপনাদের জন্যে।

- বলুন।

- ...

- হ্যাঁ। দুটো প্রশ্ন রয়েছে।

- ...

- ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট আছে?

- ...

- আর ইনজেকশনের দাগ?

- ...

- অনুমান করলাম। ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেক্ট না করলে উদ্দেশ্যসাধন হবে না।

- ...

- সব বলব আপনাকে। কাল সকালে ফোন করছি। যবনিকা পতন হবে।

- ...

- কীসের সেটা কাল বুঝতে পারবেন। রাখি।

রাত্রে শারদ্বত আর বেশি কথা বলল না। শুধু বলল, “কাল চলে যেয়ো তুমি সকালে। আমায় ডেকো না। একটু ঘুমোতে দিয়ো।”

একটু বেলা করেই বেরোলাম আমি পরের দিন। শারদ্বতের ঘর বন্ধ ছিল। তাই আর ডাকিনি ওকে। একটা টেক্সট করে দিলাম আমি বেরোচ্ছি বলে। আজ আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। আজ স্বয়ং মঞ্জুলিকা চৌধুরী আমার লেখা পড়বেন। তারপর আবার যবনিকা পতনে যেতে হবে শারদ্বতর সঙ্গে। কে জানে কোন চুলোয় হবে সেটা।

সেদিন মঞ্জুলিকা দেবীর বাড়িতে গিয়ে একটু খটকা লাগল। উনি সেই একইভাবে বসে আছেন বাড়ির বাইরে। সবসময় এখানে বসে থাকেন নাকি?

আমায় দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আসুন অনিরুদ্ধবাবু। বসুন। কোল্ড ড্রিংক খাবেন নাকি? আজ তো বেশ গরম।”

বললাম, “হ্যাঁ। সে খেতেই পারি।”

ভেতর থেকে মিনু নামক মেয়েটি আদেশমতো কোল্ড ড্রিংক দিয়ে গেল গ্লাসে করে। সঙ্গে রেখে গেল বোরোলিনের গন্ধ। মেয়েটা রোজ রোজ এত বোরোলিন মাখে কেন?

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “তারপর? আপনার কি লেখক হওয়ার ইচ্ছে?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। ছোটোবেলা থেকে এই একটাই ইচ্ছে।”

- খুব ভালো। তা বাড়িতে আর কে রয়েছে?

- বাড়িতে বলতে এখন তো আমি আর শারদ্বত থাকি একসঙ্গে। নিজের বাড়িতে বাবা-মা... জেঠু-জেঠিমা রয়েছেন। আর দাদা-বউদি।

- তা আপনারা, মানে আপনি আর শারদ্বত কি... কাপল?

আমি হেসে ফেললাম প্রশ্নটা শুনে। ভদ্রমহিলাকে বলতেই হল, আমি ১০০% স্ট্রেট। আর আমরা কাপল নই। উফফ! ২০১৮-এর কী মহিমা। সত্যি!

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “না, আসলে আজকাল তো এসব হামেশাই হয়। তাই আর কি... দিন, আপনার কী লেখা দেখতে হবে দিন।”

আমি আর কথা না বলে আমার একটা পাণ্ডুলিপি এগিয়ে দিলাম। মঞ্জুলিকা দেবী গল্পের নামটা দেখে বললেন, “ইন্দ্রজাল রহস্য! বাহ খুব সুন্দর নাম তো!”

আমি হাসলাম। ওটাই শারদ্বত আর আমার প্রথম কেস।

মঞ্জুলিকা দেবী লেখাটা পড়ছিলেন। আমি কোল্ড ড্রিংকটার সদ্ব্যবহার করছিলাম। হঠাৎ ভেতরে একটা বাসনজাতীয় কিছু পড়ার আওয়াজ হল।

মঞ্জুলিকা দেবী চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী ভাঙলি আবার?”

কোনও সাড়া নেই ভেতর থেকে। আবার একটু থেমে উনি ডাক দিলেন, “মিনু?”

আবারও কোনও আওয়াজ নেই। মঞ্জুলিকা দেবীর ভুরুটা দেখলাম কুঁচকে গিয়েছে। পাণ্ডুলিপিটা রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। আমিও উঠছিলাম। কিন্তু উনি আমার দিকে ফিরে বললেন, “আপনি বসুন। আপনাকে আসতে হবে না!”

উনি আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। আমি কী করব ভাবছি, এমন সময় যেটা ঘটল সেটা দেখে আমি মিনিটখানেক পুরো থ হয়ে রয়ে গিয়েছিলাম। মঞ্জুলিকা চৌধুরীর বাড়ির সামনের দরজা হেঁটে বেরিয়ে এল শারদ্বত। হাতে ফোন। কিছু একটা করছে ফোনে মন দিয়ে। তারপর ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে বলল, “আরে? কী ব্যাপার? গল্প কতদূর?”

মঞ্জুলিকা দেবী দেখলাম হঠাৎ রেগে গেলেন। বললেন, “আপনি? আপনি না বলে আমার বাড়িতে ঢুকেছেন কেন?”

শারদ্বত বলল, “আসলে কোল্ড ড্রিংক খেতে ইচ্ছে করছিল। তাই ঢুকেছিলাম। চলুন বসি।”

আমি বুঝতে পারছিলাম না কেসটা কী হচ্ছে! মঞ্জুলিকা দেবী তখনও রাগে ফুঁসছেন। “আমি পুলিশ ডাকব। আপনি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর বলে কি যা ইচ্ছে তাই করবেন নাকি?”

শারদ্বত বলল, “সে নাহয় ডাকবেন খন। আপাতত একটু বসি চলুন। অনিরুদ্ধ নতুন একটা গল্প লিখবে, সেটা একটু শুনি চলুন।”

আমি থতোমতো খেয়ে বললাম, “তাই? আমি... নতুন গল্প লিখব?”

শারদ্বত বলল, “সে কী? লিখবে না? এই কেসটা?”

আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। শারদ্বত এগিয়ে গেল বাড়ির সামনে রাখা চেয়ারগুলোর দিকে।

চেয়ারে বসলাম আমরা। মিনিটখানেক পর নিরুপায় হয়ে মঞ্জুলিকা চৌধুরীও বসলেন সেখানে। আমি একটু পর গলা ঝেড়ে বললাম, “আমরা কখন যাব?”

শারদ্বত বলল, “কোথায় যাব?”

আমি বললাম, “ওই যে যবনিকা পতন হবে যে।”

- সে তো এখানেই হবে?

- এখানে? কিন্তু খুনি?

শারদ্বত মঞ্জুলিকা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল, “খুনি তো আমাদের সামনেই বসে।”

মানে? মঞ্জুলিকা চৌধুরী খুন করেছেন? ওই ছেলেটাকে? কেন? হুমকি মেসেজ পাঠাচ্ছিল বলে? তাহলে আমাদের এত টাকা দিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার কী মানে?

মঞ্জুলিকা দেবী চেঁচিয়ে বললেন, “একদম বাজে কথা বলবেন না। পাঁচ টাকার গোয়েন্দার আবার মুখে বড়ো বড়ো কথা!”

শারদ্বত এখনও হালকা মেজাজে। একবার ঘড়ির দিকে দেখল, তারপর বলল, “আমি একটা গল্প বলি। দুজনেই শোনো মন দিয়ে। কিছু ভুল হলে মঞ্জুলিকা দেবী ধরিয়ে দেবেন।”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “আপনার গাঁজাখুরি গল্প শোনার সময় আমার নেই। আপনারা কি যাবেন না পুলিশ ডাকব?”

শারদ্বত বলল, “আরে ডাকবেন তো! দাঁড়ান না! গল্পটা শুনে নিন। আমরা জেলে চলে গেলে এই গল্পের প্লটটা তো আপনারই হয়ে যাবে। আর অন্যের গল্প নিজের নামে চালানো আপনার চেয়ে ভালো আর কে পারে বলুন।”

মঞ্জুলিকা দেবী এবার চেঁচিয়ে উঠলেন, “আপনি কিন্তু এবার নিজের সীমা ছাড়াচ্ছেন শারদ্বতবাবু।”

শারদ্বত বলতে শুরু করল, “আমার যতদূর ধারণা আপনি একসময় অনেক গল্পের বই পড়েছেন। হয়তো বারকয়েক লেখার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু পারেননি ঠিকমতো। তারপর স্বামীর কিছু রিসার্চ পেপার পড়ার পর আপনার আবার গল্প লেখার শখ হয়। কিন্তু লিখতে তো আপনি পারেন না। কিন্তু সেটা পারেন আপনাদের পরিবারেরই আর-একজন। আপনাদের মেয়ে মৃণালিকা চৌধুরী।”

মঞ্জুলিকা দেবী বললেন, “আপনাকে তো বললাম আমি নিঃসন্তান। কেন আজেবাজে কথা বলছেন?”

শারদ্বত বলে চলল, “মৃণালিকা দেবীর এত কম বয়সে এত সুন্দর লেখার হাত, সত্যি অবাক করার মতো। অনিরুদ্ধ, তুমি মঞ্জুলিকা চৌধুরীর যতগুলো উপন্যাস পড়েছ, সেই সবগুলোই মৃণালিকা চৌধুরীর লেখা।”

আমি তখন চুপ। কিছু বলার নেই। কারণ অবাক হওয়া ছাড়া আর-কোনো কাজ আমার করার নেই এই মুহূর্তে।

শারদ্বত এবার বলল, “এখন বিষয় হল, দিগ্বিজয় চৌধুরী, মানে মঞ্জুলিকা দেবীর স্বামী এই ব্যাপারটা মানতে পারছিলেন না। প্রায়ই গৃহযুদ্ধ হত এটা নিয়ে। সেইজন্যেই উনি প্রথম খুন করেন নিজের স্বামীকে।”

“কী সব আবোলতাবোল বকছেন আপনি?” মঞ্জুলিকা দেবী এবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “আমার স্বামী হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছেন। কেন অকারণে আপনি...”

শারদ্বত বলল, “বছরখানেক আগে আপনার স্বামী একটা রিসার্চ পেপার লেখেন। বিষ নিয়ে। কী কী কেমিক্যালকে মারণ ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং কীভাবে বানানো যায়, এটা নিয়ে। সেখানেই ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেটের কথা উনি বলেন। তবে এটা খাওয়ার সময় খেলে কোনও লাভ হয় না। ইনজেক্ট করতে হয়।”

- আমার স্বামীকে আমি বিষ ইনজেক্ট করলাম আর কেউ জানতে পারল না?

- যেদিন উনি মারা যান, শুনলাম ওঁর নাকি পা কেটে গিয়েছিল সেদিন সকালে। জুতোর মধ্যে পেরেক ছিল। এই জং ধরা পেরেকে কেটে যাওয়ার জন্য নাকি টিটেনাস নিতে হয়।

- আরে ধুর মশাই। সে তো ডাক্তার ইনজেকশন দেবে। আমাকে বলছেন কেন?

বাইরে একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। এখন আবার এ বাড়িতে কে এল?

শারদ্বত গেটের দিকে একবার দেখে নিল। তারপর বলল, “আমি তো বলছি না আপনি একা সবকিছু করেছেন। একজন পার্টনার ছিল আপনার। সে-ই সম্ভবত রাজেশ মাইতির মৃত্যুর জন্য দায়ী। তবে আমার কাজ এখানেই শেষ। পার্টনারের নাম বের করার দায়িত্ব ওরা নেবে।”

কথাটা বলার পরেই গেটের দিকে চোখ গেল। দাদা ঢুকছে দুজন মহিলা কনস্টেবল নিয়ে।

মঞ্জুলিকা চৌধুরী তখনও রাগে ফুঁসছেন, “রাখুন আপনার মনগড়া গল্প। কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে? কোর্টে আপনার এই অনুমান গ্রাহ্য হবে না, বুঝেছেন?”

শারদ্বত বলল, “এই রে! প্রমাণটা বাড়ির ভেতর ফেলে এসেছি। এক মিনিট দাঁড়ান।”

তারপর চেঁচিয়ে ডাকল শারদ্বত, “মৃণালিকা দেবী? একটু কষ্ট করে বাইরে আসবেন প্লিজ?”

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল মনে হল। তবে তখনও বুঝিনি আমার অবাক হওয়ার বাকি ছিল। একটু পর বাড়ির ভেতর থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন, তাঁকে এতদিন আমি বাড়ির কাজের মেয়ে বলেই জানতাম। কাছে আসার পর আজও বোরোলিনের গন্ধটা পাচ্ছি। এই রহস্যটা কখন উদ্ঘাটন হবে কে জানে!

দাদার দিকে ফিরে এরপর শারদ্বত বলল, “নীলাদ্রিদা, এই যে আপনার খুনি। তবে শুধু রাজেশ মাইতির নয়। বছরখানেক আগে খুন হওয়া গবেষক ডক্টর দিগ্বিজয় চৌধুরীর খুনিও এই মঞ্জুলিকা চৌধুরী।”

দেখলাম মৃণালিকা দেবীর চোখে জল। মাকে নিয়ে চলে যাওয়া হচ্ছে বলে কি? কিন্তু রাজেশের মোটিভ কী ছিল? অনেক কিছুই পরিষ্কার নয় আমার কাছে এখনও।

১০

আমরা বসে আছি আমাদের ফ্ল্যাটে। একটু আগেই ফ্ল্যাটমালিক এসে ভাড়া নিয়ে গিয়েছে। বউদিও এসে গিয়েছেন। শারদ্বত একটা সিগারেট ধরাল। আমি বললাম, “যবনিকা পতন তো হল? এবার কীভাবে তুমি সলিউশনে পৌঁছোলে সেটা একটু বলো।”

শারদ্বত বলল, “কেন? এই অবধিই থাক না। তোমার ওয়ার্ড লিমিট ক্রস করে যাবে না? অলরেডি ৫০০০ হয়ে গেছে তো!”

বললাম, “সে হোক। তবু বলো। অনেক কিছুই ধোঁয়াশার মতো ঠেকছে এখনও।

- বলো, কী প্রশ্ন আছে বলো। উত্তর দিচ্ছি।

- মঞ্জুলিকা দেবীর ওপর সন্দেহ হল কখন?

শারদ্বত সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুরু করল, “কেসটার শুরু থেকেই সবটা কেমন ঘেঁটে ছিল। প্রথমে রাজেশ ছেলেটাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি। তারপর বাড়ি ফিরে দেখলাম ওর নামে দুটো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তখন বুঝলাম যে একটা ফেক প্রোফাইল আর একটা রিয়েল। এখন ফেসবুক প্রোফাইল কবে খোলা হয়েছে সেই ইনফোটাও দেয়। সেটা দেখে বুঝলাম প্রোফাইলটা একেবারেই নতুন। আর পুরোনোটা বছর তিনেকের পুরোনো। তখনই বুঝলাম রাজেশকে ফাঁসানো হচ্ছে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, এই রাজেশের ভূমিকাটা কী? মানে ও কেনই বা মঞ্জুলিকা দেবীর বাড়িতে ঢিল ছুড়তে গেল?”

- রাজেশের আসল মানে পুরোনো প্রোফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি ফ্রেন্ডলিস্টে একটা মুখ দেখতে পাই, যাকে তক্ষুনি আমার চেনা বলে মনে হয়। গেস করো তার কী নাম?

- মৃণালিকা?

- ইয়েস। মৃণালিকা চৌধুরী। ছবিটা দেখেই চেনা লাগে। দেখলাম দুজনের স্কুল একই। সেন্ট জেভিয়ার্স। এবং মৃণালিকা চৌধুরী প্রোফাইল পিকচারে যে ড্রেসটা পরে আছে সেটা খুব একটা কমদামি নয়। আমার ধারণা মৃণালিকার লেখা যে এভাবে মঞ্জুলিকা দেবী নিজের বলে চালাচ্ছেন, এটা ও বলে দেয় রাজেশকে। আর সেটা জানতে পেরেই মেয়ের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেন মঞ্জুলিকা দেবী। আর তার সঙ্গে চলে অকথ্য অত্যাচার। সেই কাটাকাটিগুলোতেই সম্ভবত রোজ বোরোলিন লাগানো হত।

- এতটা স্যাডিস্টিক মানুষ হতে পারে?

- বিখ্যাত হওয়ার বাসনা মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে সেটা তো তোমার রোদ্দুর রায় বা স্যান্ডি সাহাকে দেখে বোঝা উচিত।

- কিন্তু রাজেশকে যদি মারতেই হয় তাহলে আমাদের ডাকার কারণ কী?

- আরে বুঝতে পারছ না, সন্দেহটা যাতে ওর ওপর না পড়ে, সেইজন্যেই।

- আর রাজেশকে মারলেন কীভাবে?

- আমার ধারণা মহিলার একজন পার্টনার-ইন-ক্রাইম রয়েছেন। যিনি হাতটা নোংরা করেন ওঁর হয়ে।

আমি একটু চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “ওই ক্যালসিয়াম না কী একটা বললে, সেটার কথা কোথায় পেলে তুমি?”

শারদ্বত সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে বলল, “এটার কথা তো বললাম মঞ্জুলিকা দেবীর বাড়িতে। দিগ্বিজয় চৌধুরীর একটা লেখায় পেলাম এটা। এই ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে মারা যায় না কেউ। কিন্তু ইনজেক্ট করলেই এটা শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম আর ক্লোরিনের সাধারণ মাত্রাটা ওলটপালট করে দেয়। যার ফলে হার্ট অ্যাটাক অনিবার্য। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল কারও বোঝার উপায় নেই। সেই কারণেই নীলাদ্রিদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পোস্টমর্টেম রিপোর্টে এটা পাওয়া গিয়েছে কি না। আর ইনজেকশনের দাগ রয়েছে কি না। ”

- আচ্ছা, এবার আমি বাকি যেগুলো জানি না সেগুলো বলো।

- আরে, তুমি কোনগুলো জানো না আমি কী করে জানব?

- তুমি সব জানো। এবার বলো।

শারদ্বত একটু ভেবে বলল, “ও হ্যাঁ। লাইব্রেরি গিয়েই প্রথম এই বিষ নিয়ে রিসার্চ পেপারটা পাই। আর পাই একটা পুরোনো খবরের কাগজ। যাতে ডক্টর দিগ্বিজয় চৌধুরীর মৃত্যুর খবর রয়েছে। সেখানেই একটা ছবিতে দেখলাম মা আর মেয়ের ছবি। তখন কনফার্ম হয়ে গেলাম যে ওই ভদ্রমহিলা কাজের মেয়ে নন। উনি ওঁর নিজেরই মেয়ে।”

- আর তুমি সেদিন বাড়িতে ঢুকলে কেন না বলে? আর কীভাবেই বা ঢুকলে?

- দ্যাখো যতবার গেছি, উনি একবারও আমাদের ভেতরে ডাকেননি। সব দিনই বাইরে বসিয়েছেন। এটা নিয়েও একটা খটকা ছিল মনের মধ্যে। তাই ওঁকে বাড়ির বাইরে বের করার জন্য তোমায় পাঠালাম তোমার লেখা নিয়ে। আর সেই ফাঁকে পেছনের প্রাচীর টপকে ঢুকলাম ওঁর বাড়িতে। ওর মেয়ের সঙ্গে একা কথা বলার দরকার ছিল। উনি থাকলে সেটা হতে দিতেন না।

- আর কী একটা আওয়াজ হল জোরে? কী ভাঙল?

- ওটা কিছু না। আমি এন্ট্রি নেব। তাই একটা বাসন ফেলে অ্যালার্ট করে দিলাম তোমাদের।

- হোয়াট? তুমি ভায়া বদ্ধ পাগল।

- সব জিনিয়াসরাই হয়।

শারদ্বত শো অফ করল। আমি পাত্তা দিলাম না। আরও খানিকক্ষণ ভাবলাম আমি। অনেক ভেবেও কিছুতেই মনকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে নিজের নামে লেখা ছাপানোর লোভে একজন মানুষ কত নিচে নামতে পারে। নিজের মেয়ের ওপর দিনের পর দিন অত্যাচার কীভাবে করতে পারে?

শারদ্বত বলল, “তাহলে অনিরুদ্ধ? বুঝলে তো হাতিয়ার সবার হাতে বাগ মানে না। আর তোমার চেয়ে ভালো কে-ই বা জানে, কলমের চেয়ে বড়ো হাতিয়ার, আর আছে নাকি?”

নাহ, নেই। থাকতেই পারে না। কে যেন বলে গেছে, “আ পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান দ্য…”

অধ্যায় ১ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%