গল্পের মিনারে পাখি

শৈলেন ঘোষ

বছরগুলো যে কেমন করে দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল! হারিয়ে গেল কেমন করে সেই তার অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিনগুলি, সেই কথা আজ একলাটি বসে ভাবে সেলিম। ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায়। তার যে এখন কত বয়েস হবে, ঠিক ঠিক মনে করতে পারে না সে। তা হলেও আন্দাজ করতে অসুবিধে নেই। তা প্রায় আশির ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। এই বয়সে মানুষকে বুড়ো থুত্থুড়ে ছাড়া আর কী বলবে তুমি! বুড়ো হয়েছে সেলিমও যেমন, তেমনি তার ঘোড়াটাও। তুফান। তুফান নামটা অবশ্য রেখেছিল রহিমচাচা। রহিমচাচা তার কেউ নয়, অথচ সেলিমের জন্য সে কী না-করল। এই ঘোড়াটা তো রহিমচাচাই তাকে দিয়ে গেল। এই তুফান নামে ঘোড়াটাই আজ তার শেষ জীবনের সঙ্গী। তার বন্ধু। একলাটি যখন বসে থাকে, হাজারটা ভাবনা যখন তার মাথায় ঘুরপাক খায়, তখন মাঝে মাঝে সেলিমের ক্ষীণদৃষ্টি দুটিও তুফানের মুখের ওপর আঁতিপাঁতি করে ঘুরে বেড়ায়। তখন ঘোড়াটাকে দেখে বড়ো কষ্ট হয় তার। হায় রে, সময় হয়ে এল। দু-জনকেই বুঝি যেতে হয় এবার! শেষ সাধটি বুঝি আর মিটল না!

বড্ড ইচ্ছে ছিল সেলিমের, একবারটি ওই পাহাড়ের চূড়ায় যাবে। যাবে, কঠিন পাথর ডিঙিয়ে, দুর্গম পথ ধরে। তার সঙ্গী হবে এই তুফান। তা হয়নি। কতদিন যে চলতে চলতে ওই পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকিয়ে কত বার যে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেলিম। দাঁড়িয়ে পড়েছে তুফানও। দেখেছে কঠিন পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেই মিনারটি, তার আম্মার কাছে গল্প শোনা সেই মিনারটি। ওর আম্মা বলেছে, ওখানে কেউ যেতে পারে না। কেউ যায় না। ও শুনেছে ওই মিনারের আকাশ-ছোঁয়া মাথার ওপর একটি পাখি আছে। সেই পাখির গায়ের রং দুধসাদা। নীল আকাশের আলোয় সে উড়ে বেড়ায় একলাটি। গান গায় আর আকাশের ওপর থেকে নীচে পৃথিবীর মাটির দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। এখানে আসতে ভয় পায়। কেননা, এখানে এলেই তার সাদা ঝলমলে পালকগুলি কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়! হারিয়ে যায় তার সব আনন্দ।

এই পাখির গল্প, এই পাহাড়ঘেরা ছোট্ট শহরের কোন মানুষটা-না আর জানে! সেলিম যখন ছোট্ট ছিল, এই শহরে আসার কথা তখন কি সে স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল! সেই ছোট্টবেলা, যখন তার পড়ার চেয়ে খেলতে ভালো লাগত বেশি, কিংবা ঘুমের রাতে আম্মার কাছে গল্প শোনার জন্যে ছটফট করত মন, তখনই সে প্রথম শুনেছিল সেই পাখির গল্প। আম্মার মুখে সেই গল্প শুনতে শুনতে অবাক হয়ে যেত সেলিম। মনে মনে ভাবত, আহা রে, এখনই যদি সেখানে যেতে পারি! যেতে পারি সেই পাহাড়চূড়ার মস্ত মিনারে, পাখির কাছে! কিন্তু যাবে কেমন করে! সে তখন ছোট্ট। তাই মনের কথা মনের ভেতর লুকিয়ে রেখে ভাবত, কবে দিন আসবে? কবে সে আব্বাজানের মতো বড়ো হয়ে যেখানে খুশি যেতে পারবে?

তারপর ক-টা বছর কেটে গেল। সেলিমের পাখির গল্প শোনার দিনগুলি আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। সেলিম বড়ো হচ্ছে—অবিশ্যি আব্বাজানের মতো অত বড়ো হয়নি এখনও। তবে, এখন আর আম্মার কাছে সেই রাত-ঘুমঘুম অন্ধকারে পাখির গল্প শুনতে ভালো লাগে না তার। মনে মনে হাসে আর ভাবে এ শুধুই গল্প, আজগুবি। এই যে ছোট্ট ঘরখানা, এই যে ছোট্ট ঘরে আম্মার হাতে সাজানো খেলনা ছবি, এ দেখে কত ভালো লাগত আগে। এখন আর মন ভরে না। রোজ সকালে সেই যে তার আব্বাজান আনাজপাতির বোঝা মাথায় নিয়ে হাটে-বাজারে বেচতে যেত, সেই দেখে তখন সেই ছোট্টবেলায় কত কষ্ট হত সেলিমের। এখন আর হয় না। এখন সে ঘরে থাকে যতক্ষণ, তার চেয়ে সে বাইরে থাকে অনেকক্ষণ। আব্বা তার কখন ঘরে থাকে, কখন বাইরে যায়, সে-খবর রাখে না সেলিম। সারাদিন খেটে খেটে তার আম্মার যে শরীরটা গেল, হাড়-মাস কালি হচ্ছে, সে নিয়ে তার ভাববার সময় কই? খিদে পেলে ঘরে আসবে, তা না-হলে বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় হল্লা করে বেড়াবে। কখন যে কাকে মারবে, কার নাক ফাটাবে কেউ জানে না। তার সেই ছোট্টবেলার ছবির বইগুলো সব হারিয়ে ফেলেছে সে, নয় ছিঁড়েছে। এখন বই-এর কথা বললে সে হম্বিতম্বি করে ওঠে। পড়ার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এটা-ওটা নিয়ে মাতামাতি করতে পেলে আর কী চায় সে!

এদিকে বুড়ো হচ্ছে সেলিমের আব্বা। বেচারি আর পারে না। রোজ সেই মাথায় মোট চাপিয়ে এতখানি পথ ভাঙতে ভাঙতে নিজের শরীরটা ভেঙে গেল প্রায়। আর পোষায় না। একদিন তো যেতেই বসেছিল সে। মাথায় অত বড়ো একটা বোঝা নিয়ে, হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, আর একটু হলে... খুব রক্ষে। একজন ধরে ফেলেছিল। নইলে সেইদিনই যে কী হত কে বলতে পারে! তার শরীর যেমন অচল হচ্ছে, মনও তেমন ভেঙে পড়ছে। ছেলেটা তার মানুষ হল না। এই কথাটাই ভাবতে ভাবতে যেন মানুষটা নিজেই কেমন নিজঝুম মেরে যাচ্ছে। সেলিমের আম্মাও যেন হতাশায় মুষড়ে আছে। মাথার চুলগুলো পেকে গেছে সব। সেই সুঠাম দেহটা যেন বেঁকে নড়বড় করছে। চিন্তার রেখাগুলো ভারি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মুখের আনাচেকানাচে। ঘুম নেই রাতে, শুয়ে শুয়ে ছটফট করে আর ভাবে, ছেলেকে নিয়ে সে কতই-না স্বপ্ন দেখেছিল। সব খানখান হয়ে গেল। কত আশা একটি একটি ফুলের পাপড়ির মতো গেঁথে রেখেছিল তার মনের মধ্যে, সব ঝরে গেল। ভেবেছিল, সেলিম একদিন বড়ো হবে, লেখাপড়া শিখবে, তাদের দুঃখ ঘোচাবে—তা হল না। ছেলে তাদের মুখের দিকে ফিরেও তাকায় না। যখন খুশি ঘরে আসে। খায়-দায়। আবার মর্জি হলেই চলে যায়। মায়ের মন, তাই ছেলের আশায় ভাতের থালা আগলে বসে থাকে। ছেলে খেলে তবে নিজে দুটো মুখে দেবে। আর ছেলে যদি ঘরে না-ফেরে, তখন কি আর কিছু ওঠে মুখে!

অনেক সহ্য করে করে একদিন অসহ্য হয়ে উঠল। সেদিন সেলিমের আম্মা আর থাকতে পারল না। ছেলেকে বলেই ফেলল, তুই কি শুধু এই করেই বেড়াবি?

ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তর দিয়েছিল সেলিম, কেন, কী করে বেড়াচ্ছি আমি?

আম্মা বলেছিল, সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে বেড়ালেই চলবে! লেখাপড়াও শিখলি না, তোর আব্বাকেও সাহায্য করলি না। দেখছিস তো মানুষটা কত কষ্ট করছে! বয়েস হয়েছে। আর পারে? তুই একটা কিছু কর।

সেলিম আম্মার কথা শুনে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, একটা তো ছেলে। দুটো খেতে দাও বলে এত কথা।

আম্মা উত্তর দিল, তুই এখন বড়ো হয়েছিস সেলিম। তোকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি আমরা দু-জনে। এখন তুই যদি আমাদের না-দেখিস, আমরা কার কাছে দাঁড়াব?

সেলিম ক্রুদ্ধস্বরে জবাব দিয়েছিল, ও আমার দ্বারা হবে না। আব্বার মতো মাথায় আনাজ নিয়ে ফিরি করতে পারব না আমি। লোকে বলবে কী! এমনিতেই তো আব্বার জন্যে কত কথা শুনতে হয় আমায়। জানো, লোকে আমায় কত ঠাট্টা করে?

সেলিম, এ আমাদের স্বাধীন কাজ, শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল আম্মা।

অমন কাজে দরকার নেই! বলে কটমট করে তাকাল সেলিম আম্মার মুখের দিকে এক ঝলক। তারপর দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেল সে ঘর থেকে।

আম্মার চোখ দু-টি ছলছল করে উঠল। মুখ দিয়ে কথা বেরোল না আর। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। যেন নিশ্চল পাথর।

কিন্তু চুপ করে থাকেনি সেলিমের আব্বা। বউকে বলেছিল, ছেলে যখন কিছু করবেই না, তখন আমাদেরই একটা কিছু করতে হবে। চলো, আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই!

অবাক হল আম্মা। জিজ্ঞেস করল, কী বলছ তুমি?

ঠিকই বলছি, রুক্ষস্বরে উত্তর দিল সেলিমের আব্বা, ছেলের জন্যে ঢের হয়েছে। আর নয়। এতবড়ো পৃথিবীতে এই দু-টো প্রাণীর যেখানে হোক একটু জায়গা হয়ে যাবে। যতক্ষণ প্রাণ আছে, দু-টো খেতে দিতে ঠিকই পারব তোমায়।

ঘর-সংসার? উদবেগভরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল আম্মা।

ঘর-সংসার, সে তো আমরা ছেলের জন্যেই গড়েছি। সেই সংসার ছেলের জন্যেই তো আমাদের রেখে যেতে হবে। আমাদের সময় হয়ে এসেছে, ঘর-সংসার নিয়ে আর ভেবে কী করবে। চলো, কোনো তীর্থে গিয়ে জীবনের শেষ ক-টা দিন সেইখানেই কাটিয়ে দিই!

ছেলেকে চিরদিনের মতো ছেড়ে থাকার কথায় কোন মা আর সায় দিতে পারে? তাই অনুনয় করল, আর একবার বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দেখলে হয় না?

হা হা হা! হঠাৎ যেন দমকা বাতাসের মতো ধাক্কা দিয়ে হেসে উঠল সেলিমের আব্বা। পরমুহূর্তেই দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, তোমারও ছেলেকে বোঝানো শেষ হবে না, আমারও শরীরে ঘাম শুকোবে না। ছেলের মায়া তুমি যে ত্যাগ করতে পারবে না, এটা বুঝতে খুব-একটা বুদ্ধি খরচের দরকার হয় না আমার। ঠিক আছে তুমি যা ভালো বোঝো তাই করো। তবে শুনে রাখো বউ, তুমি যা ভাবছ তা হবে না। ছেলে তোমার পোষ মানবে না, গোল্লায় গেছে। যদি পোষ মানে তখন তুমি আমায় বোলো।

সেলিমের আব্বার কথাই বুঝি সত্যি হয়! সেদিন আম্মা সেলিমকে কত বোঝাল। বলল, দ্যাখ বাবা, ঘর-সংসার তো তোকেই দেখতে হবে। তোর জন্যেই তো আমরা কষ্ট করে এই সংসার গড়েছি। আর এখন তুই যদি না-বুঝিস...

না, বোঝেনি সেলিম। আম্মার মুখের ওপর চোটপাট করতে কসুর করেনি সে। ভ্রূক্ষেপ করেনি তার আম্মার কোনো অনুনয়ে। সেদিন কিন্তু সত্যি সত্যি সারাটা রাত আম্মা কেঁদেছিল বসে বসে। হায় রে! তার সব বিশ্বাস নি:শেষ হয়ে গেল নিমেষে। মন থেকে মুছে গেল সব আশা। তারপর সত্যিই একদিন সেলিমের আব্বার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল আম্মাও পথে। দুনিয়ার কোন অজানা রাজ্যে যে তারা পাড়ি দিল কেউ জানতেও পারল না।

যেমন হয়, যেমন প্রতিদিন যখন-তখন ঘরে ফেরে সেলিম, সেদিনও তেমনি ফিরেছিল রাত করেই। অন্যদিন যেমন ঘরে ফিরে দরজা খোলার জন্যে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকে সেলিম, সেদিন তেমন ডাকতে হল না। দরজা খোলা। সে অক্লেশে ঘরে ঢুকে পড়ল। অন্যদিন সে যেমন ঘরে আলো দেখতে পায়, আজ সে দেখতে পেল না। সে চেঁচিয়ে বিদ্রূপ করে আম্মা আর আব্বার উদ্দেশ্যে বলল, অন্ধকারে কি মানুষ বাস করছে না ভূত?

সে কোনো সাড়া পেল না। কোনো সন্দেহও তার মনে উঁকি দিল না। সে বেপরোয়ার মতো দ্বিগুণ জোরে চেঁচিয়ে উঠল। ঘরের দরজায় পা ছুড়ে ঘা দিল। ভীষণ জোরে শব্দ তুলে নড়বড় করে উঠল দরজা। তবু সে কাউকে দেখতে পেল না। রাগে অগ্নিমূর্তি হচ্ছে সে। আবার সে গলা ফাটাল, আমি এসেছি, শুনতে পাচ্ছ না? আমি সেলিম, সেলিম!

তার কথার উত্তর দেবার জন্যে তখন যে তার আম্মা অথবা আব্বা বাড়িতে নেই, এ কথাটা তো আর সে জানে না। তাই ভেতরে ভেতরে আক্রোশে তার মুখখানা ফুলে উঠল। যতই রাগছে, ততই গজরাচ্ছে। এমনই রেগে গেছে, মনে ভাবছে এখনই ধাক্কা মেরে ঘরের জানলাগুলো সব ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে। কখনো ভাবছে, নিজেরই গায়ের জামাটা ছিঁড়ে ফেলে আচ্ছা করে জব্দ করে দেয় তার আম্মা আর আব্বাকে। আবার কখনো মনে হচ্ছে, চিল চেঁচিয়ে তুলকালাম কান্ড শুরু করে দেয়।

হ্যাঁ, ওই শোনো, শেষমেষ সে চিৎকারই শুরু করে দিলে। ঘরের মধ্যে সেই নিথর অন্ধকারে সে হাত-পা ছুড়তে লাগল আর বেহায়ার মতো তার বুড়ো বাপ-মাকে দুষতে লাগল। কিন্তু তবুও সে বুঝতে পারল না, তার আম্মা-আব্বা ঘরে নেই। তারা চলে গেছে অনেক দূরে। আর আসবে না। সেই চিৎকারেও যখন তার আম্মা কিংবা আব্বা বেরিয়ে এল না, তখন সে ঘরের অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে আলোর সন্ধান করতে লাগল। কিন্তু কোথায় আলো সে জানে না! অন্ধকারে ঠাওর করতে না-পেরে সে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। বেটপকা বাসন-কোসনে সে মারল এক ধাক্কা। ঝন-ঝন-ঝনাৎ। প্রথমে থতোমতো খেয়ে গেল, তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেই বাসনের ওপরেই সে পা ছুড়তে লাগল। কিন্তু হায়! বৃথাই তার আস্ফালন। ভোঁ ভাঁ! না আসে তার আম্মা, না তার আব্বা। কিন্তু এবার সে ভয় পেয়েছে। অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এল। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সে গলা ফাটিয়ে ডাকতে লাগল, আম্মা- আ-আ, আব্বা-আ-আ। এক বার, দু-বার, অজস্র বার। রাত বাড়ল। তার গলাও ভাঙল। তখন কী যেন এক অজানা আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসে। তবে কি তার আম্মা-আব্বা নেই! তাকে একা ফেলে চলে গেছে অন্য কোথাও! আর কিছুতেই সে নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। ওই একগুঁয়ে অবাধ্য ছেলেটা অন্ধকারকে অগ্রাহ্য করে আবার ঘরে ঢুকে পড়ল। অন্ধকারে ছিটকে পড়ে সে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে কাতরাতে লাগল— আম্মা, আব্বা, তোমরা কোথায় গেলে! কিন্তু সেই নিস্তব্ধ ঘরে তার নিজের কান্নার শব্দটুকু ছাড়া আর সে কিছুই শুনতে পেল না তখন। সব নিথর।

এখন অনেক রাত। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত সেলিম। তার এখনও পেটে যে কিছু পড়েনি, একথা তার মনেই নেই। এখন সে দুশ্চিন্তায় ছটফট করছে আর ভাবছে এরপর সে কী করবে! কোথায় যাবে! কোথায় গিয়ে খুঁজবে তার আম্মা আর আব্বাকে।

অনেক রাতের ঘণ্টা পড়ল গির্জার ঘড়িতে। বাতাসের দোলনায় দুলতে দুলতে ভেসে এল সেই শব্দ সেলিমের এই ঘরে। উঠে দাঁড়াল সেলিম। বেরিয়ে এল ঘর থেকে আবার রাস্তায়। ক্ষণেক দাঁড়াল। তাকাল ওই জনমানবশূন্য রাস্তাটার দিকে। সারাদিন এই রাস্তায় কত-না মানুষের আনাগোনা। কত গাড়ি, কত বেচা-কেনা। আর এখন? স্তব্ধ। নিজঝুম। রাস্তার একটা কুকুর অজান্তে ওর পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর গন্ধ নেবার চেষ্টা করছে। খেয়াল করেনি সেলিম। হঠাৎ পায়ের ওপর কুকুরের মাথাটা ঠোক্কর খেল। চমক ভাঙল সেলিমের। বুকের ভেতরটা লাফিয়ে উঠল। তড়িঘড়ি সরে গেল সেলিম। চোখ নামিয়ে দ্যাখে, একটা কুকুর। তাকে দেখছে। লেজ নাড়ছে। উফ! স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সেলিম। তারপর হাত ছুড়ে তাড়া দিল। কুকুরটা নড়ল না। লেজ নাড়তেই লাগল দ্বিগুণ জোরে। ঝট করে একটা ইট তুলে নিল সেলিম রাস্তা থেকে। পলক পড়ার আগে কুকুরটাও পালাল। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখতে লাগল চোখ টেরিয়ে। সেই তক্কে সেলিমও ছুড়েছে ইটটা। ধাঁই। একেবারে কুকুরের গায়ে! কিঁউ কিঁউ কিঁউ, লেজ গুটিয়ে কুকুর দে ছুট। গভীর রাতে একটা কুকুর চেঁচালে যা হয়, অমন আরও দশ-পঁচিশটা খেঁকিয়ে উঠল, ঘেউ-উ-উ, ঘেউ-উ-উ। খেঁকাচ্ছে দূর থেকে, কাছ থেকে, আরও দূর থেকে। অনেকক্ষণ। তারপর একটা-দুটো করে থামতে থামতে সব ক-টাই যখন চুপ করে গেল, তখন আবার সেই নিস্তব্ধতা।

দাঁড়িয়ে আছে সেলিম অনেকক্ষণ, এইখানেই। এবার সে বসে পড়ল দরজার পাশে। খিদে নেই, ঘুম নেই। দৃষ্টিও শূন্য। শূন্য ওই রাস্তাটার মতো বুকের ভেতরটাও। ওই রাস্তা দিয়েই ওর আম্মা আর আব্বা হয়তো কোথাও গেছে। ওই রাস্তা দিয়েই হয়তো ওরা আবার ফিরে আসবে! ওই রাস্তা দিয়েই রোজ সকালে তার আব্বা মাথায় আনাজের বোঝা নিয়ে হাটে যায়। আব্বার মুখখানা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই ক্লান্ত ঘামে ভেজা মুখখানা! কী কষ্ট মানুষটার। একসময়ে ভারি পুরুষ্টু ছিল আব্বার গড়নটা। শক্তসমর্থ পেশল দেহ। মনে পড়ে যায় আম্মার মুখখানা। সেই সুন্দর আদরমাখা মুখ। সেলিম তখন কত ছোটো। আব্বা যখন তাকে বুকে তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে বলত, কী রে বাপ, বড়ো হয়ে ডাক্তার-বদ্যি হতে পারবি তো! তোর আব্বার মতো যেন মুখ্যু হোসনি বাপ। বড্ড কষ্ট রে। পারবি তো! সেকথা শুনে সেলিম কী বুঝত এখন তার মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, সে তখন আব্বার বুকখানা দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখত, তখন মনে হত, বুকের ভেতরটা তার আনন্দে লাফাচ্ছে। আবার আব্বার কথা শুনে আম্মা যখন হাসতে হাসতে সেলিমকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলত, আমার ছেলে রেলগাড়ির ইঞ্জিন চালাবে, তখন আনন্দে শিউরে উঠত সেলিম। হ্যাঁ, রেলগাড়িই চালাবে সে। কী মজা রেলগাড়ি চালাতে! ছুটে চলে সবুজ খেতের মাঝখান দিয়ে। চলে মস্ত নদীর সেতু পেরিয়ে। গভীর রাতে গহন বনে তুফান তুলে। কিংবা পাহাড়ের বুকে বুকে ঝংকার বাজিয়ে। আঃ! ভাবলেই আনন্দে কেঁপে ওঠে বুকটা।

কিন্তু হায় রে! এখন সেলিম না হয়েছে ডাক্তার-বদ্যি, না হল সে ইঞ্জিন চালিয়ে। একটু একটু করে বড়ো হল যত, ততই কেমন যেন তার সব তালগোল পাকিয়ে গেল। ইস্কুলে পড়তে পাঠাল আব্বা, সেখানে তার মন বসল না। যতদিন ইস্কুলে যায়, তারও বেশিদিন সে ইস্কুল পালিয়ে বেড়ায়। যার-তার সঙ্গে দোস্তি পাতায়। টোটো করে ঘুরে বেড়ায়, নয়তো হল্লা করে ঝগড়া বাঁধায়। সবাই নিন্দে করে। ওর আব্বার নাম ধরে বলে, ‌শেষকালে হাসানের ছেলেটা বাঁদর হল।

না আ আ! হঠাৎ সেই অন্ধকার পথের ধারে সে আচমকা চিৎকার করে উঠল। বুকের ভেতরটা তার যেন কে খামচে ধরেছে। আচমকা সে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে দিল। অন্ধকার পথ। নির্জন। সেই পথে ছুটতে ছুটতে সে আর্তনাদ করতে লাগল, আম্মা-আ-আ, আব্বা-আ-আ। কোথায় গেলে তোমরা? ফিরে এসো! আমি আর কোনোদিন তোমাদের অবাধ্য হব না। যতই সে আর্তনাদ করতে লাগল, পথও যেন ততই দীর্ঘ হতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল তার ঘর। পড়ে রইল সেলিমের বন্ধুরা। সব মিলিয়ে যাচ্ছে। চোখের পাতায় ভেসে উঠছে শুধু আম্মা আর আব্বার মুখ দুটি। সেই দুটি মুখ, যে দুটি মুখের ওপর সে কত-না চোটপাট করেছে! কত অকথা, কুকথা বলেছে! আর সেই মুখ দুটি তার কথা শুনে হতাশায় থমথম করেছে!

থমকে যায় সেলিম। থামে। পথের শেষ নেই। কিন্তু রাত শেষ হল। সারাটা রাত ছুটতে ছুটতে শেষ হয়ে গেছে তার সব শক্তি। আর পারল না সে। পথের ধারে বসে পড়ল। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগল, আর কাঁপতে লাগল। শুয়ে পড়ল সেই পথের ওপরই। পরক্ষণেই চোখ দুটি তার বুজে গেল। শত চেষ্টাতেও সে চোখের ঘুমকে বাগে আনতে পারল না।

পথে চলছে মানুষ। দেখছে। ভাবছে, এতবড়ো ছেলেটা এত বেলা অবধি কেমন পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। কুঁড়ের বাদশা!

ঘুম তার ভাঙল না। তা সেই সকাল থেকে দুপুর পেরিয়ে গেল, তবু তার ঘুম ভাঙল না। কিন্তু এক জায়গায় অনেকক্ষণ পড়ে থাকলে যা হয়, সন্দেহ হল কারো কারো। কেউ কেউ হাঁক দিয়ে ডাকল তাকে। সাড়া পেল না। শেষে পুলিশ এল। লাঠির ডগা দিয়ে খোঁচা মারল তার ঘাড়ে। মরেনি। সেলিম চোখ চাইল। পুলিশকে দেখে ভয়ে কুঁচকে গেল তার চোখ। উঠতে গেল ধড়ফড়িয়ে। পারল না। আবার পুলিশের লাঠির খোঁচা,—ওঠ!

রাস্তার পাথর খামচে সে আবার ওঠবার চেষ্টা করল। এবার সে পারল। উঠে বসল। হাঁ করে পুলিশটাকে দেখতে লাগল।

পুলিশের ধমক খেল সেলিম,—এখানে পড়ে আছিস কেন?

সেলিম উত্তর দিতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল পুলিশের মুখের দিকেই।

যা ভাগ এখান থেকে! আবার আরেক খোঁচা।

সেলিম উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। তার হাত-পা কাঁপছে। পারল না। সে বুঝতে পারছে, পা তার দাঁড়াতে চাইছে না। সে বসে পড়ল।

পুলিশ এবার নিজেই এগিয়ে এসে সেলিমের ঘাড়টা ধরল। একটা হ্যাঁচকা মেরে টেনে তুলে ফুঁসতে লাগল, যত ব্যাটা চোরছ্যাঁচোড় সারারাত ঘুরঘুর করবে আর দিনের বেলা রাস্তায় পড়ে ঘুম দেবে! ওঠ! দেব এক্ষুনি চালান করে।

সেলিম টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। দেখতে দেখতে অনেক লোকও সেখানে জমে গেছে। সেলিমকে দেখে তারা টিপ্পনীও কাটতে শুরু করে দিল। অসহ্য লাগছে সেলিমের। কিন্তু কিছু করার নেই। অন্যসময় হলে এতক্ষণে কুরুক্ষেত্র শুরু হয়ে যেত।

এখানে একদম দাঁড়াবি না! —বলে পুলিশ সেলিমের ঘাড়ে টেনে এক ধাক্কা দিলে। সেলিম টাল সামলাতে না-পেরে আবার পড়ল হুমড়ি খেয়ে। হো-হো করে হেসে উঠল আশপাশের লোকেরা। সেলিমের রাগে গা রিরি করে উঠল। সে এবার নিজেই উঠে দাঁড়াল। কটমট করে তাকাল এদিক-ওদিক। একটি শব্দও বেরোল না তার মুখ দিয়ে। তারপর টলতে টলতে হাঁটতে লাগল সামনের পথটা ধরে। কিছু লোক আরও কিছুক্ষণ তার পিছু পিছু হাঁটল, টিটকিরি কাটল, তারপর যে যার পথ দেখল।

মোটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে তার কথাগুলো যখন বেরিয়ে আসছিল

রাগ হলেও সেলিম কোনো কথাই বলতে পারছিল না। সে হাঁটছিল আর মনে মনে ভাবছিল এখন কোথায় যাবে সে! এবার পা দুটো তার ভীষণ ভারী হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে আর বুঝি পা চলবে না। অথচ এখানে-ওখানে বিশ্রাম নেওয়ার মতো এতটুকু ঠাঁইও সে দেখতে পাচ্ছে না। সুতরাং এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল।

হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় সেলিম। হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে ওঠে। চোখের দৃষ্টি তার স্থির হয়ে যায়। সে দেখতে পায় এক বৃদ্ধাকে। হবে হয়তো অনেকটা তার মায়ের মতন। মাথায় মোট নিয়ে হেঁটে চলেছে। রোদ উঠেছে আকাশে। তার মুখে পড়েছে। ঘাম ঝরছে, ক্লান্ত নিরাশায় ভরা মুখখানি ঘামে ভিজে গেছে। শিউরে উঠল সেলিম। মনে হল, এমনি করে তার আম্মা আর আব্বাও কত কষ্ট করেছে। এমনি করে সারা শরীরের ঘাম ঝরিয়ে দুটো রুটির জোগাড় করেছে তারা—সে তো তারই জন্যে। একঝলক গরম রক্ত যেন তার সারা শরীরে উছলে উঠল। সমস্ত ক্লান্তি যেন তার নিমেষে মিলিয়ে গেল। চিৎকার করে ডাক দিল সেলিম বৃদ্ধাকে, আমার জন্যে আপনি কি একটু দাঁড়াবেন!

সেই ডাক বৃদ্ধার কানে পৌঁছোল না। আনমনে তিনি হেঁটেই চলেছেন। যে মানুষ মাথায় মোট নিয়ে রাস্তাঘাটে আনাগোনা করে, কে আর ফিরে তাকায় তার দিকে! খুব দরকার না পড়লে কে আর ডাকে!

সেলিম আবার ডাকল, এই যে শুনছেন, আপনাকে ডাকছি। এবার একটু গলা চড়িয়েই সেলিম তাঁকে ডাক দিল। সেই বৃদ্ধাও কেমন যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পিছু ফিরে তাকালেন।

সেলিম তাঁর দিকে ব্যস্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল—এই যে আমি। হাঁটার কষ্টটা সে যেন ভুলে গেল মুহূর্তের জন্যে। শক্ত পায়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সেলিম।

আমায় ডাকছ বাবা? বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।

হ্যাঁ আপনাকে।

কেন বাবা?

আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সেলিম অস্থির গলায় বলল।

কী কথা বাবা? শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধা!

আপনার কষ্ট হচ্ছে না?

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

আপনি কতদূরে যাবেন?

এই কাছেই।

দিন-না, আপনার মাথার ওই মোটটা আমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। বলে সেলিম হাত বাড়াল।

বৃদ্ধা এই অযাচিত সাহায্যের কথা শুনে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ছি ছি, তুমি কেন আমার মোট বইবে বাবা? আমার জন্যে তুমি কেন কষ্ট করবে?

সেলিম উত্তর দিল, তাতে কী হয়েছে? আমি তো আপনার চেয়ে অনেক ছোটো—দিন!

বৃদ্ধা বাধা দিয়ে বললেন, না না, সে কী! তাই কখনো হয়! তা ছাড়া তোমাকে দেখেও তো মনে হচ্ছে খুবই ক্লান্ত তুমি।

সেলিম বৃদ্ধার মুখের দিকে এক পলক তাকাল। সে ভারি করুণ দৃষ্টি। তারপর আবেগের সুরে বলল, মনে করুন-না আমি আপনারই কেউ, আপন।

বৃদ্ধা যেন হতচকিত হয়ে তাকালেন সেলিমের দিকে। তাঁর দৃষ্টি স্থির। ভারি অসহায় সেই চাউনি। তাঁর মুখের সেই চেহারা দেখে সেলিমও কেমন যেন হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে যেন বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মায়েরই মুখের ছবিটা দেখতে পায়। সেই একই মূর্তি। সেই করুণ, অসহায়! সেলিমের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে। সে চকিতে বৃদ্ধার মুখের ওপর থেকে নিজের চোখ নামিয়ে নেয়। ভিজে যায় সেলিমের চোখ দুটি। বৃদ্ধা দেখে ফেলেন। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমার কী হয়েছে বাবা?

সেলিম নিজেকে সামলে নেয়। উত্তর দেয়, না না, কিছু হয়নি। আপনার কষ্ট দেখে আমি বড়ো কষ্ট পাচ্ছি। আপনার মাথার বোঝাটা আমি যতক্ষণ-না আমার মাথায় নিচ্ছি ততক্ষণ আমার কষ্ট ঘুচবে না।

বৃদ্ধা আর কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন, তোমার মতো এমন দয়ালু ছেলে আমি আর দেখিনি। কিন্তু বাবা, তোমার মাথায় আমার বোঝা চাপাতে আমি নিজেই ভারি লজ্জা পাচ্ছি। বলে বৃদ্ধা তাঁর মাথার বোঝাটা সেলিমের মাথায় তুলে দিলেন। বললেন, বেঁচে থাকো বাবা! তাঁরও চোখ দুটি উপচে গেল অশ্রুর ফোঁটায়।

সেলিম মাথায় বোঝা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই রাস্তা?

বৃদ্ধা বললেন, সিধে।

অবিশ্যি সিধে রাস্তায় পা ফেলে হাঁটতে তার একটু কষ্টই হচ্ছিল। কেননা, বোঝাটা একটু ভারীই।

বৃদ্ধা আবার বললেন, বেশি দূরে যেতে হবে না। সামনে, খানিকটা।

খানিকটা হাঁটতেই বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন তাঁর ঘরের সামনে। লতাপাতার ছোট্ট ঘর, ঝুপড়ি।

এই আমার ঘর বাবা।

সেলিম দাঁড়াল। সেও ঘেমেছে।

তাপ্পিমারা চটের পর্দা ঠেলে বৃদ্ধা ঘরে ঢোকার মুখে হাত বাড়ালেন। সেলিমকে বললেন, এবার আমায় দাও!

সেলিম বলল, না না, আমি ঘরের ভেতর দিয়ে আসছি। বলে সেলিম পর্দা ঠেলে ঢুকে পড়ল। থমকে দাঁড়াল। তারপর মাথার থেকে বোঝাটা নামিয়ে হতবাক হয়ে তাকাল ঘরের আর একদিকে। তাকিয়ে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আমার ছেলে, সেলিমের মুখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধা বললেন।

সেলিম দেখল বয়সে তারই মতো হবে একটি ছেলে পড়ে আছে একটা ছেঁড়া চাটাই- এর ওপর। মাথায় একটা তেল চিটচিটে বালিশ। একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে দেহটা তার।

অসুখ করেছে, বৃদ্ধা অস্ফুট স্বরে বললেন।

না-বললেও সেলিম সেটা বুঝতে পেরেছে।

ক-দিন হয়ে গেল, এখনও ভালো হল না। বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর এগিয়ে গেলেন তাঁর ছেলের কাছে। মাকে দেখে রুগণ ছেলের ফ্যাকাশে চোখে যেন জল চিকচিক করে উঠল।

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, আমি এসেছি বাবা ভোলানাথ।

ভোলানাথের অশ্রুভরা চোখ দুটি ঠিক সেইসময়ে ফিরে তাকাল সেলিমের মুখের দিকে।

মা ছেলেকে বললেন, আমার কষ্ট দেখে, আমার মাথার বোঝা বয়ে নিয়ে এসেছে ছেলেটি।

ভোলানাথ তবুও কথা বলল না। মায়ের কথা শুনে সেলিমের মুখের দিকে আর একবার তাকাতেই গাল বেয়ে অশ্রুর ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়ল তার।

সেলিম সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটির চোখের ওপর থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, বাড়িতে আর কেউ নেই?

না। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মা। তারপর বললেন, ওর বাপ যখন ওকে রেখে চলে গেল, আমার ভোলা তখন ছোট্ট। অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে মানুষ করেছি। যেদিন থেকে ও বুঝতে শিখল, সেদিন থেকে আমাকে আর কিছুই ভাবতে হয়নি। নিজেই খেটেখুটে রোজগার করে এনেছে। যা জুটেছে মায়ে-ছেলে ভাগ করে খেয়েছি। ছেলে আমার দিন নেই রাত নেই খেটেছে, অত খাটুনি সহ্য করতে পারল না। ভেবেছিলুম আর ক-দিন পরে এই ঝুপড়ি ছেড়ে একটা ভালো ঘর দেখে উঠে যাব। ভেবেছিলুম সংসারটাকে নতুন করে সাজাব। সে আর কপালে জুটল না।

বৃদ্ধার কথা শুনতে শুনতে সেলিমের বুকের ভেতরটা যেন দগ্ধে দগ্ধে ঝলসে যাচ্ছিল। সে বোবার মতো চেয়ে রইল সেই বৃদ্ধার মুখের দিকে খানিকক্ষণ, খানিকক্ষণ তাঁর ছেলের মুখের দিকে। সেলিমের কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ। মনে হচ্ছে, আহা রে, সেও যদি ওই ছেলেটির মতো হতে পারত! তার আম্মা আর আব্বার সুখের জন্যে সেও যদি শেষ রক্তবিন্দুটি উজাড় করে দিতে পারত! সে কিছুই করেনি। তাদের কষ্ট বেড়েছে, তারা দুঃখ পেয়েছে, তবুও সেলিমের মন এতটুকু টলেনি। ছি ছি, নিজেকে নিজেরই এখন ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে! কী অকৃতজ্ঞ সে! কী নির্দয়!

কী হল বাবা? অমন চুপ করে আছ কেন? তাকে দেখে বৃদ্ধা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন।

অ্যাঁ! চমক ভাঙল সেলিমের। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌আমি আর কী করতে পারি আপনাদের জন্যে?

আর কী করবে বাবা! যা করেছ অনেক করেছ। তোমার দয়ার কথা কোনোদিন ভুলব না।

সেলিম নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অস্পষ্ট গলায় বলল, তা হলে এবার আমি যাই।

বৃদ্ধা বললেন, এমন দুর্দশা আমার, একটা বাতাসাও তোমার হাতে দিতে পারলুম না। বলতে বলতে কান্নায় তাঁর গলাটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

সেলিম বলল, না না, এ আপনি কী বলছেন! আপনার বিপদের সময় আমি এসেছি। আপনি ওসব কথা একদম ভাববেন না—বলে সেলিম এগিয়ে গেল বৃদ্ধার ছেলের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসল তার মুখের সামনে। শীর্ণ মুখখানা। তার কপালে হাত রাখল। তাই তো! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবল এখান থেকে এখনই কি তার চলে যাওয়াটা ঠিক হবে! এই বৃদ্ধার এই বিপদের দিনে সে যদি একটু সাহায্য করতে পারত! কিন্তু উপায় নেই। তাকে যেতেই হবে। তার নিজেরও তো আজ বিপদ! তাকেও যে খুঁজতে হবে তার আম্মা আর আব্বাকে। কিন্তু কী জানি কেন, হঠাৎ তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। মনে হল এখন যদি তারা ঘরে ফিরে থাকে! হঠাৎ যেন সে চেতনা ফিরে পেল! আচমকা সে বৃদ্ধার হাত দু-টি জড়িয়ে ধরে উদবেগ ভরা কন্ঠে বলল, আমায় এবার যেতে হবে!

আবার এসো বাবা!

উত্তর দেবার সময় পেল না সেলিম। ঘর থেকে তড়িৎগতিতে বেরিয়ে এল সে। আর পিছু ফিরে দেখল না। সে ছুটল তার নিজের ঘরের দিকে। হয়তো তার আম্মা আর আব্বা অনেকক্ষণ ধরে তাকে খুঁজছে, তাকে ঘরে না-দেখে। সে যেন উছলে উঠল নদীর মতন। আঃ, ঘরে ঢুকেই সে যদি দেখতে পায় তার আম্মা আর আব্বাকে, তবে তাদের জড়িয়ে ধরে সে চিৎকার করে বলবে, আমি এতদিন ভুল করেছি। এ ভুল আমি আর কক্ষনো করব না। এখন থেকে আমার ঘাম ঝরবে তোমাদের সুখের জন্যে। আমি আনাজের বোঝা মাথায় নিয়ে হাটে যাব। তোমরা যা বলবে আমি তাই শুনব। আমার প্রাণ দিয়ে আমি তোমাদের মুখে হাসি ফোটাব।

হ্যাঁ, ঘরে সে ফিরল। সে দুদ্দাড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু হায় রে! সব মিথ্যে। ঘরে কেউ নেই। শূন্য ঘর খাঁ-খাঁ করছে। তবে কি সত্যিই তারা আর ফিরবে না! সত্যিই কি তারা সেলিমকে ছেড়ে চিরদিনের জন্যে চলে গেছে! এ যেন বিশ্বাস করতে পারে না সেলিম। সেলিম কেঁদে ফেলল এবার অঝোর ধারায়।

সেলিম! হঠাৎ বাইরে কেউ ডাকল তাকে।

সেলিম চমকে উঠল।

সেলিম-ম-ম। আবার ডাকল।

সেলিম বুঝতে পারল তার বন্ধুরা। সেলিম বেরিয়ে এল।

কী রে, সকাল থেকে দেখা নেই, কী ব্যাপার? তার বন্ধুদের একজন জিজ্ঞেস করল।

সেলিম কথা বলল না। দাঁড়িয়ে রইল তাদের মুখের দিকে চেয়ে বোবার মতো।

হল কী তোর? একদম শুকিয়ে যে পাঁকাটি হয়ে গেছিস! —বলে অন্য আর এক বন্ধু টিটকিরি কাটল। আর সবাই হেসে উঠল।

সেলিম তবুও চুপ। শুধু এগিয়ে এল এক পা।

আর একজন বলল, বোধ হয় ওর আব্বার সঙ্গে হয়ে গেছে একচোট। বলতেই সবাই আবার হো-হো করে হেসে উঠল।

হাসিটা যেন কাঁটার মতো বিঁধে গেল তার গায়ে। আচমকা সে চিৎকার করে গর্জে উঠল, হাসি থামা। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। এখান থেকে এখনই তোরা চলে যা। নইলে ভালো হবে না!

বলিস কী রে! তড়পাচ্ছিস!

সেলিম আবার চেঁচিয়ে উঠল, আজ আমায় বিরক্ত করিস না। আজ আমি কোথাও যাব না।

কারণ?

সেটা তোদের শোনার দরকার নেই। সেলিম উত্তর দিল।

ঠিক আছে, তবে আমার পয়সাটা দে, ওর বন্ধু বলল।

কীসের পয়সা?

আকাশ থেকে পড়লি যে। ধার নিয়ে গাপ করতে চাইছিস!

আজ দিতে পারব না, সাফ জবাব দিল সেলিম।

আজই চাই আমার! তেড়ে উঠল বন্ধু।

আমার কাছে না-থাকলে আমি কি চুরি করে দেব?

তোর আব্বার কাছ থেকে চেয়ে দে। নেবার সময় মনে ছিল না!

আমি নিজের জন্যে নিইনি। আমরা সবাই মিলে সেই পয়সায় খেয়েছি। আমি একা দেব কেন? সবাই দেবে।

বা:! মতলবটা খুব ভালো ঠাউরেছিস তো! পয়সা তুই নিজের হাতে নিয়েছিস। বন্ধু ক্রুদ্ধ গলায় দাবি করল।

সেলিম ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‌কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি এখন দিতে পারব না।‌

কবে দিবি?

বলতে পারছি না।

খপ করে সেই বন্ধুটি সেলিমের জামার গলাটা খামচে ধরল। তারপর আর সব বন্ধুরা তাকে টানতে টানতে নিয়ে চলল পাশের নিরিবিলি জায়গাটায়। একজন চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, পারছি না মানে?

সেলিম তার হাতে ঝাপটা মেরে চেঁচিয়ে উঠল, ছাড়!

সে ছাড়ল না। হিংস্র চোখ দুটো তার ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সে বলল, ছাড়ব, আগে পয়সা দে!

সেলিম তেমনি উত্তেজিতভাবেই বলল, পয়সা নেই!

তবে রে! একজন সেলিমের হাতটা মুচড়ে চেঁচিয়ে উঠল, দে, নইলে হাত ভেঙে দেব তোর!

সেলিম যন্ত্রণায় চিৎকার করে লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ের ওপর। তারপর লেগে গেল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

সেলিম পারল না। সেলিম একা, ওরা অতজন। মার খেতে খেতে সেলিম হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। তারপর চলল দমাদ্দম একটার পর একটা ঘুসি, চড়। নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ল সেলিম। মুখ ফেটেছে তার। রক্ত পড়ছে। বন্ধুরা তাই দেখে, দে চম্পট। পড়ে রইল সেলিম একা। পড়ে পড়ে কাতরাতে লাগল।

অনেকক্ষণ পর, অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল সেলিম। টলমল করছে। রক্তের ফোঁটাগুলো জামায় ছড়িয়ে পড়েছে। পা ফেলল এলোমেলো, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে এল খানিকটা। পারল না বেশিক্ষণ, আবার বসে পড়ল রাস্তার ওপর। তেষ্টা পাচ্ছে, কিন্তু এইখানে এখন জল কোথায়? আরও কিছুক্ষণ বসে রইল সেলিম। এখান থেকে ক-পা গেলেই তাদের বাড়ি। ভয় হচ্ছে, যদি দাঁড়াতে গেলেই টলে পড়ে। এই ক-পা যেতেই তার সাহসে কুলোচ্ছে না। অগত্যা সে হাত দিয়ে মাটি আঁকড়ে হামাগুড়ি দিল। একটুখানি পথ, তবু যেন মনে হয় কতটা। দু-চার জন লোক এদিক-ওদিক যাওয়া-আসা করছে, দেখছে সেলিমকে। দাঁড়াচ্ছে না, কিছু জিজ্ঞেসও করছে না। সেলিম ভাবছে, ওরা কিছু না-জিজ্ঞেস করলেই যেন সে বাঁচে!

থামল সেলিম। রাস্তার কাঁকরে হাতটাও কেটেছে। তার বাড়ির দরজাটা সে দেখতে পাচ্ছে। এবার চেষ্টা করে সে উঠে দাঁড়াল। পা কাঁপছে। কোনোরকমে দরজাটা সে ধরে ফেলল, তারপর ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। সে হাতড়াতে লাগল জলের কলশিটা। জল নেই। তেষ্টার যন্ত্রণায় সে ককিয়ে উঠল। তারপর সটান শুয়ে পড়ল ঘরের মেঝের ওপর। পড়ে পড়ে ধুঁকতে লাগল।

আরও কিছুক্ষণ সেলিম সেইভাবে দলা পাকিয়ে পড়ে রইল। আরও কিছুক্ষণ আঘাতের যন্ত্রণায় সে কাতরাতে লাগল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসল। আঘাতে আহত মুখখানা সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল। উঃ! জ্বালা করছে। হাতে রক্ত লাগল তার। মনে হচ্ছে, অনেকটা কেটেছে। সে উঠে দাঁড়াল। ঘরের ভেতর থেকে আকাশটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেলিম দেখতে পেল, আকাশ ভরতি এখন দিনের আলো ঝলমল করছে। হয়তো আরও কিছুক্ষণ এমনি ঝলমলে আলোয় উপচে থাকবে আকাশটা। কিন্তু এখন কী করবে সেলিম! কিছুই ভাবতে পারছে না, যা ভাবছে সবই কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার ভেতর। এখন সে একেবারে নি:সঙ্গ একা। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার আম্মা-আব্বা আর ফিরবে না। ফিরবে না তারই জন্যে। আর যে বন্ধুদের জন্যে সে তার আম্মা আর আব্বাকে এতদিন অবহেলা করে এসেছে, আজ বুঝতে পারছে সেই বন্ধুরাই কত নৃশংস স্বার্থপর। ওর কাছে যদি পয়সা থাকত, তবে কি সেলিম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অমন অপদস্থ হত! ওদের মুখের ওপর পয়সা ছুড়ে দিয়ে সব পাপ চুকিয়ে ফেলত। কিন্তু তার কাছে কিচ্ছু নেই, একটা কানাকড়িও না। সে জানে না এখন কেমন করে চলবে তার! পয়সা না-থাকলে সব যে অন্ধকার, সে খাবে কী!

সেলিম এক-পা এক-পা করে এগিয়ে এল বাইরের দরজাটার দিকে। ফিরে ফিরে তাকাল এপাশে-ওপাশে। ভারি নিষ্প্রাণ সেই দৃষ্টি। পা দুটো টানতে টানতে সে চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। রাস্তায় নামল। নীরব দৃষ্টিতে দেখতে লাগল ঘরের ভেতরটা। যতই দেখছে, মন ততই কেঁদে উঠছে। ভাবছে তার আম্মা আর আব্বা কি আর আসবে না! আর কি তারা ঘরে ফিরে সেলিমকে বকবে না! হ্যাঁ, এখন বকাই খেতে চায় সেলিম। এখন যদি আব্বা তার গলাটা টিপে আচ্ছা করে দু-চার ঘা দিয়ে বলে, হতচ্ছাড়া, তোর জন্যে আমরা বুকের রক্ত জল করছি, আর তুই দস্যিপনা করে বেড়াচ্ছিস! আয় তোকে আজ শেষ করে ফেলি। তা হলেই যেন নিস্তার পেত সেলিম। তখন যেন অনুতাপে মরে যাচ্ছে সে। ছি, ছি! কী তাচ্ছিল্য না করেছে সে তার আম্মা আর আব্বাকে। এর যেন ক্ষমা নেই।

সেলিম হাঁটতে আরম্ভ করল। উদ্দেশ্যহীন তার সেই পথ চলা। সত্যিই তো কোথায় যাবে সে। এমনি করে কতক্ষণই-বা হাঁটতে পারবে তাও জানে না সে। শরীর আর মন দুই-ই বিধ্বস্ত হয়ে গেছে তার। তবুও সে ধীর পায়ে টালমাটাল করতে করতে হেঁটে চলল। এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড়ো বন্ধু এই মস্ত পথটা। এই পথ ভালোবাসে সবাইকে। এখানে প্রাণ ভরে তুমি নিশ্বাস নিতে পার, কেউ মানা করবে না। সেই নিশ্বাসের সঙ্গে দুঃখের দীর্ঘশ্বাস তোমার বুক ভেঙে নীরবে ছড়িয়ে দিতে পার, কেউ বাধা দেবে না।

আনমনেই সে চলে এসেছিল এতখানি পথ পড়ন্ত রোদের সোনালি পর্দা সরিয়ে সরিয়ে। সে যখন এসে দাঁড়াল পথের এইখানে, তখন সন্ধ্যা নেমেছে। এবার সে কী করবে? তবে কি তাকে এই পথেই আশ্রয় নিতে হবে খোলা আকাশের নীচে? তারপর চোখ-ভরতি ক্লান্তি নিয়ে সে কি ঘুমিয়ে পড়বে এই পথেরই ওপর?

সত্যি, ভারি অবসাদ লাগছে সেলিমের। কালকের রাত পেরিয়ে আজকের আরেক রাত ফিরে এসেছে। এই অন্ধকার রাতে আম্মা আর আব্বার কথা বার বার মনে পড়ে যায় সেলিমের। কে জানে তারা এখন কোথায়, কতদূরে! অনুতাপে ভার হয়ে আসে তার মন। কে না-জানে এ তো শুধু তারই জন্যে, তারই অন্যায় জেদে মনের দুঃখে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে তারা! ভাবতে ভাবতে সজল হয়ে যায় সেলিমের চোখ দুটি। ভার হয়ে আসে বুকটা।

এমনসময়ে হঠাৎ কে যেন কাঁদে! সচকিত হয়ে ফিরে তাকায় সেলিম এদিক-ওদিক। হঠাৎ একটি ছোট্ট আলোর বিন্দু সে দেখতে পায়। অস্থির হয়ে ওঠে সেলিম। দ্রুত ক-পা এগিয়ে যায় সেদিকে। তারপর নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। এ যে সেই ছোট্ট ঝুপড়ি ভোলানাথের। হাঁটতে হাঁটতে সে কেমন করে এখানে চলে এসেছে খেয়াল নেই তার। সেলিম বুঝতে পারে এ সেই বৃদ্ধার কান্না। ভোলার মা আর্তস্বরে কাঁদছেন। ছটফট করে ওঠে সেলিম। তবে কি... আরও ক-পা এগিয়ে এল সে। দেখল একদল মানুষ ছিটিয়ে-ছড়িয়ে ঝুপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেলিমও নি:সাড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সেখানে। দেখতে পেল ভোলানাথের মায়ের কান্নার সঙ্গে আলোর শিখাটিও ছায়া ফেলে তিরতির করে কাঁপছে। যে কথাটা তার মন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না, বুঝি-বা তাই-ই সত্যি হয়! একবার ভাবল ঝুপড়ির পর্দা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরক্ষণেই থমকে যায়। কিন্তু অধীর হয়ে ওঠে মনটা, থাকতে পারে না সে। একজনকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

সেলিমের আহত মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল লোকটি। কিছু উত্তর দেবার আগে সেলিমের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে দেখে নিল সে। তারপর বলল, তোর অত দরকার কীসের, যা ভাগ।

সেলিম ধমক খেয়ে টলল না। বুকে জোর আনল সে। আবার জিজ্ঞেস করল, উনি অমন করে কাঁদছেন কেন?

ছেলেটা মরে গেছে। ভারি নির্দয় তার এই রুক্ষস্বর।

না-আ-আ! গলা ফাটিয়ে আচমকা আর্তনাদ করে উঠল সেলিম।

হঠাৎ এমন অস্বাভাবিক চিৎকার শুনে চমকে ওঠে ওই জমায়েত মানুষগুলো। সেলিমের মুখের দিকে তারা তাকাতেই কেমন যেন কুঁকড়ে গেল সেলিম। সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। শেষ শক্তিটুকু উজাড় করে সে পালাতে পারলেই বাঁচে যেন। না না, এ কান্না সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। সে পালাবে সেইখানে, যেখানে গেলে এ কান্না আর সে শুনতে পাবে না। যেখানে সব নিস্তব্ধ।

হ্যাঁ, দূরে, আরও একটু দূরে পৌঁছোতেই মায়ের কান্নার শব্দটা ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল। সামনেই একটা গাছ। ক্লান্ত সেলিম অন্ধকারে সেই গাছটাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁপাচ্ছে সে। তারপর যখন আর দাঁড়াতে পারল না, বসে পড়ল সেই গাছের নীচে। হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে সে ফুঁপিয়ে উঠল আর ভাবতে লাগল, এইখানে বুঝি তারও প্রাণের নি:শেষটুকু ফুরিয়ে যাবে এক্ষুনি।

ছলছল চোখে মুখ তুলল সেলিম। দেখতে পেল এখানে পথ বেঁকে গেছে। এখান থেকে রাতের আকাশটা ভারি স্পষ্ট দেখা যায়। সেলিম আকাশের দিকে চাইল। কত ইদ পেরিয়ে গেছে, তবুও একদিনের জন্যেও সে আকাশের দিকে চেয়ে চাঁদের খোঁজ করেনি। কিন্তু হঠাৎ আজ ওই আকাশের দিকে চেয়ে সেলিমের শিহরন জাগে। কী সুন্দর এই অন্ধকারের ওপারে ওই আলোর ডালি আকাশ। শুধু আলো আর আলো, সূর্য যেন আকাশের কপালজোড়া একটি জ্বলন্ত টিপ। এখন বোধ হয় চাঁদের দিন নয়। দ্যাখে, ঘন অন্ধকারে আকাশ-ভরতি তারার চুমকি কে যেন একটি একটি সাজিয়ে গেঁথে রেখেছে! কে সাজাল ওই আলো! কেমন করে সাজাল! সেই কথা অবাক হয়ে ভাবে সেলিম। আর ভাবে, আহা রে, আকাশের আলোর রাজ্যে সে যদি যেতে পারে! ওখান থেকে সে তো স্পষ্ট দেখতে পাবে নীচের এই পৃথিবীটা, দেখতে পাবে তার আম্মা আর আব্বাকেও। তারা তো তখন সেলিমকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারবে না!

কিন্তু এ যে তার শুধুই কল্পনা। ওই আকাশের শূন্যে সেলিম কেমন করে যাবে! সে কি পাখি?

পাখি! পাখি! হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল সেই পাখির কথা। আম্মার কাছে শোনা সেই দুধসাদা পাখির গল্প। এমন পাখি সত্যিই কি আছে, সেই গল্পের পাখির মতো পাখি! আহা রে, সেই দিনগুলিই বুঝি ভালো ছিল তার, সেই আম্মার কোলে মাথা রেখে গল্প শোনার দিনগুলি। আর কি ফিরে আসবে সেইদিন!

ভাবতে ভাবতে জেরবার হয়ে যায় সেলিম। মাথার ভেতর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে পৃথিবীর মাটি যেন ভীষণ জোরে কাঁপছে। আকাশটা যেন এক্ষুনি ভেঙে পড়বে তার মাথার ওপর। সে শুয়ে পড়ল যেখানে বসেছিল সেইখানে। তার চোখের দৃষ্টিটা বড়ো ঝাপসা হয়ে আসছে। হাত-পাগুলো ঝিমঝিম করছে। তারপর আর কিচ্ছু জানে না সেলিম। বোধ হয় জ্ঞান হারাল।

সকালের শিশিরের ফোঁটাগুলি যখন গাছের পাতা বেয়ে তার কপালে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিল, তখন হঠাৎ তার চোখের পাতা দুটিও কেঁপে ওঠে। সে তাকাল—ভোরের আকাশে আলোর রোশনাই ফুটেছে। বুঝতে পারল এবার তাকে উঠতে হবে। সে হাতের ওপর ভর দিয়ে উঠে বসল। মুখখানা এখনও তার ফুলে আছে। কাল মারামারি করেছে। মুখের এখানে-ওখানে কেটেছে—ব্যথা। চোখ দুটো কোটরে ঢুকেছে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো রুক্ষ। পরনের ফুলপ্যান্টটা এত ময়লা, ফেলে দিলেই যেন ভালো হয়। জামাটাও ছিঁড়েছে, উপায় নেই এখন এই পরেই থাকতে হবে। সামনে একটা জলের কল হঠাৎই দেখতে পেল সেলিম। উঠে দাঁড়াল। পথের পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে অনেক কষ্ট করে সে কলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উফ! একটু জল পেটে পড়লে ও যেন বাঁচে! মুখ-চোখ ভালো করে ধুয়ে ঢকঢক করে একপেট জল খেল সে! মুখের ক্ষতর ওপর জল লাগতেই জ্বালা করে উঠল। ছিটেফোঁটা রক্তের দাগগুলো জলে ধুয়ে গেছে কিন্তু আঘাতের চিহ্নগুলো দগদগ করতে লাগল। এখন সে যেন একটু স্বস্তি পাচ্ছে। বুকখানা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। আবার যেন তার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে ওই কয়েক ঢোঁক কলের জল। এগিয়ে চলল সে। আঃ! পা ফেলতে লাগছে তার। পারে না মনে হচ্ছিল বসে পড়ে সেইখানেই, যে পথ দিয়ে সে চলছিল।

না, বসল না সে। পা টানছে। এগিয়ে চলছে। এলোমেলো পা ফেলে হাঁটছে সে। তাই তো, অমন কষ্ট করে কোথায় চলেছে সে!

চলেছে আবার সেইদিকে, ভোলানাথের সেই ছোট্ট ঝুপড়িটার পথে। কিন্তু এভাবে সে হাঁটবে কতক্ষণ! হাঁপিয়ে যাচ্ছে। পারছে না যখন, সেইখানেই বসে পড়ছে। একটু দম নিয়ে আবার হাঁটছে। এমনি করে সে যখন ঝুপড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন, অনেকখানি রোদ উঠে গেছে। সকালের রোদ—ঝলমল। ঝুপড়ির সামনে কালকের সেই মানুষের ভিড় আজ আর নেই, ফাঁকা। কোনো কান্নার শব্দও তার কানে এল না। সে এগিয়ে গেল ঝুপড়ির সেই ছেঁড়া পর্দার দিকে। হাত বাড়াল, মৃদু ঠেলা দিল পর্দার গায়ে। মুখ বাড়াল পর্দার ফাঁকে, তারপর ঢুকে পড়ল ভেতরে। ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার বুকের ভেতরটা। ঘরটাই আছে শুধু, সেই ভোলানাথ আর নেই। ভোলানাথ যেখানে শুয়ে ছিল, একটি প্রদীপ জ্বলছে সেখানে। নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকে সেলিম সেইদিকে কিছুক্ষণ, তারপর ফিরে তাকায় আরেক দিকে। ভোলানাথের মা, এককোণে যেন দলা পাকিয়ে বসে আছেন মুমূর্ষু মানুষটি। অশ্রুর ফোঁটাগুলি নীরবে গলে পড়ছে গাল বেয়ে। চোখে যেন দৃষ্টিই নেই, শূন্য! খানিক দাঁড়াল সেলিম, তারপর এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। তাঁর সামনে থামল, তারপর বসল। চমকে ওঠেন ভোলানাথের মা। —কে?

সেলিম কথা বলতে পারে না।

কে তুমি? তিনি কান্না ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

তোমার ছেলে। অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল সেলিম।

ভোলানাথের মা ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাঁর সেই কান্না দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় সেলিম। তারও চোখ দুটি ভিজে যায়। সে এগিয়ে যায় তাঁর আরও কাছে। তাঁর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে সেলিম। তারপর বলে, আমার মুখের দিকে তাকান।

ভোলানাথের মা তাকালেন।

চিনতে পারছেন না?

মায়ের চোখ দু-টি বিস্ফারিত হয়ে চেয়ে রইল সেলিমের মুখের দিকে। দেখতে দেখতে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি চিনতে পেরেছেন সেলিমকে। তিনি আর্তস্বরে কেঁদে উঠলেন। তারপর সেলিমের আহতমুখে তাঁর আঙুলগুলি আলতো স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করলেন, ‌তোমার কী হয়েছে বাবা?‌

আমার বন্ধুরা আমাকে মেরেছে।

বিস্ময়ে তাকালেন বৃদ্ধা। জিজ্ঞেস করলেন, কেন?

কেননা, তাদের অন্যায় আবদার আমি শুনিনি, বলে একটু থামল সেলিম। তারপর আবার বলল, আমিও একা। বলতে গিয়ে তার ক্লান্তস্বর কেঁপে উঠল, আমার আম্মা আর আব্বা আমাকে একা ফেলে মনের দুঃখে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। আমি তাদের কথা শুনিনি, তাদের অবাধ্য হয়েছি, অবহেলা করেছি। বলে কাঁদতে কাঁদতে সেলিম আর্তনাদ করে উঠল।

তিনি পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন সেলিমের মুখের দিকে। তিনি নির্বাক।

সেলিমই আবার বলল, আমি খুঁজছি তাদের। খুঁজতে খুঁজতে আপনাকে দেখতে পেয়েছিলুম পথে। আপনি মাথায় বোঝা নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার আব্বাও অমন করে বোঝা নিয়ে হাটে যেত। আমি কোনোদিন আব্বাকে সাহায্য করিনি। আব্বা কষ্ট পেয়েছে, আমি বুঝতে চাইনি। কিন্তু যেদিন আমাকে না-বলে, আমাকে একলা ফেলে তারা চলে গেল, সেইদিনই আমি বুঝেছি কী অন্যায় করেছি আমি। আমাকে কেউ ক্ষমা করবে না, কেউ না।

এবার ভোলানাথের মা কথা বললেন, তোমার এই বিপদের দিনে আমি যে তোমার জন্যে কিছুই করতে পারব না বাবা। আমারও যে কেউ নেই। আমিও যে আজ নি:সঙ্গ। বলতে বলতে তিনিও ফুঁপিয়ে উঠলেন।

আমি আছি। হঠাৎ দৃঢ়গলায় সেলিম উত্তর দিল।

—তুমি কী করবে?

—আপনার এক ছেলে গেছে, আমি আর এক ছেলে।

ভোলানাথের মা নি:শব্দে তাঁর হাতখানি সেলিমের মাথায় রাখলেন। অঝোরধারায় তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়াতে লাগল। সেলিমও কেমন নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ল তাঁর কোলের ওপর। তারপর সেই কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে নিশ্বাস ফেলতে লাগল সেলিম।

অনেকক্ষণ দু-জনেই নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধ এই ছোট্ট ঝুপড়িটা। বোবার মতো থমথম করছে চারদিক। উঠে বসল সেলিম। দ্যাখো কী চেহারা হয়েছে তার। ডিগডিগ করছে। গাল দুটো ভেঙে গেছে, চোখ দুটো কোটরে ঢুকেছে, ধুঁকছে যেন। বুঝি-বা তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। বিহ্বল চোখে সে চেয়ে রইল ভোলানাথের মায়ের দিকে। তখন তাঁর চোখে আর জল নেই। মনে হয় কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের সব কান্না ফুরিয়ে গেছে। সেলিমের মুখের দিকে চোখ পড়তেই তিনি থমকে গেলেন। দেখলেন, ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে সেলিম। ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে। তিনি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কষ্ট হচ্ছে বাবা?

সেলিমের ঠোঁটের ওপর নিষ্প্রাণ হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়েই রইল সে ভোলানাথের মায়ের মুখের দিকে। তারপর বলল, আপনারও তো কষ্ট হচ্ছে।

উঠে দাঁড়ালেন ভোলানাথের মা। জিজ্ঞেস করলেন, অনেকক্ষণ তুমি কিছু খাওনি, না বাবা? মুখখানা শুকিয়ে গেছে!

সেলিম বলল, খিদে নেই। তেষ্টা পাচ্ছে।

ভোলানাথের মা বললেন, একটু বোসো বাবা, আমি এক্ষুনি আসছি।

—কোথায় যাচ্ছেন?

আসছি। বলে তিনি দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলেন।

সেলিম ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারল না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তাঁর পথের দিকে।

অবশ্য একটু পরেই তিনি এলেন। ঠোঙা-ভরতি খাবার নিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন। সেই ঠোঙাটা সেলিমের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, খেয়ে নাও বাবা, আমি জল আনছি।

সেলিম অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকাল, তারপর ধরা ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার?

তিনি জলের গেলাসটা হাতে নিয়ে সেলিমের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, ছেলেটাকে ভালো করে খেতে দিতে পারিনি। সে চলে গেল। আর কোনোদিনই ফিরবে না। আমি তার কষ্ট ঘোচাতে পারিনি, আজ তোমার কষ্টে আমি কেমন করে চুপ থাকতে পারি বাবা।

সেলিম বলল, আপনি কাঁদবেন না মা। আমি আপনার সব দুঃখ দূর করব। আমি যেদিন আমার আম্মা-আব্বাকে খুঁজে পাব, আমার আম্মার সঙ্গে আপনিও আমার আর এক মা হবেন। শরীরকে কষ্ট দিয়ো না মা। এসো এই খাবার দু-জনে ভাগ করে খাই।

তিনি স্নেহের চোখে তাকালেন সেলিমের চোখের দিকে। তারপর বললেন, তোমার নাম কী বাবা?

সেলিম আঁতকে উঠল। তারপর যেন কোন এক অজানা আতঙ্কে গুটিয়ে গেল। সে মুখ নীচু করল।

বললে না বাবা তোমার নাম? তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন।

এবার সেলিম আবার মুখ তুলল। ভয়ার্তকন্ঠে সে বলল, আমার নাম বললে আপনি আমায় অনাদর করবেন না তো মা?

—তিনি অবাক হলেন। একথা কেন বলছ বাবা?

—বলুন, আপনি আমায় দূরে সরিয়ে দেবেন না?

—ছি ছি, এ কী বলছ বাবা তুমি। তোমার নাম শুনলে তোমাকে দূরে সরিয়ে দেব কেন?

তবে শুনুন মা, আপনি যে ঠাকুরকে পুজো করেন আমার ঠাকুর সে নয়। আপনি যে ঠাকুরের নামে আপনার ভোলাকে ডাকতেন, আমার নাম তেমন কোনো ঠাকুরের নয়। এটুকু বলে সেলিম থামল। তার গলাটা দৃঢ় করল। তারপর বলল, আমার নাম সেলিম। বলে তাকাল ভোলানাথের মায়ের মুখের দিকে। তাঁর চোখ তখন ছলছল করছে।

ভোলানাথের মা বসলেন। তিনি আবার সেলিমের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন, ওরে সেলিম, তুই আমায় মা বলেছিস। আজ থেকে তুই আমার ছেলে। পৃথিবীতে মায়ের কাছে ছেলের চেয়ে কি ঠাকুর বড়ো। মায়ের কাছে ছেলের চেয়ে আদরের আর কী আছে বল?

সেলিমের বুকের ভেতরটা এত কষ্টেও ঝলমল করে উঠল। সে যেমন করে তার আম্মাকে ডাকত, তেমনি করে ডাক দিয়ে বলল, মা, তুমি যদি সত্যিই আমায় তোমার ছেলে বলে মনে করো, তবে আমার হাত থেকে এই মিঠাইটা নিয়ে তুমিও খাও।

তিনি মিঠাই নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে যেন আকাশ-ভরতি মুঠো মুঠো আলো ছড়িয়ে গেল সারাঘরে। ছড়িয়ে গেল দু-টি মুখের ওপর। ক্লান্ত দু-টি মুখ, একজন বৃদ্ধা আরেক জন কিশোর। ভোলানাথের মা আর সেলিম।

থেকে গেল সেলিম সেইখানে। নিজের ঘর, নিজের আম্মা আর আব্বার বাড়িতে চাবি দিয়ে সে রইল এই ছোট্ট ঝুপড়িতে ভোলানাথের মায়ের কাছে। কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল সেলিম। কিন্তু কী কাজ করবে সে! কাজ তো সে কিছুই জানে না। সুতরাং সে যেখানেই যায়, সেখানেই সে বিমুখ হয়। ফ্যাসাদে পড়ল সেলিম। এদিকে ভোলানাথের মায়ের হাতে যে ক-টা পয়সা ছিল তাও তো প্রায় শেষ হয়ে এল। এখন একটা-কিছু না করলেই নয়। শেষে একদিন তিনি বললেন, বাবা সেলিম, অনেক চেষ্টা তো করছ, কিছুই তো হচ্ছে না।

সেলিম বলল, তুমি ভাবছ কেন মা, দ্যাখো-না কাজ আমি খুঁজে বার করবই।

—চলো বাবা, কাল থেকে আমিও তোমার সঙ্গে কাজ খুঁজতে বেরোব।

—সে কী! চমকে উঠল সেলিম, তোমাকে আমি আর কষ্ট করতে দেব না মা।

ওরে বাছা, অনেক কষ্ট করেছি জীবনে। কিছু না পারি মোট তো বইতে পারব। তিনি উত্তর দিলেন।

আঘাত পেল যেন সেলিম। বলল, সে কী মা, তুমি মোট বইবে! তুমি আমায় আশ্রয় দিলে, তুমি আমায় ছেলের মতো ভালোবাসলে, আর তুমি মোট বইবে, আমি ছেলে হয়ে দেখব!

তখন তিনি বললেন, তবে শোন রে ছেলে, আমার কাছে যেটুকু সম্বল ছিল তা যে প্রায় শেষ হয়ে এল। এরপর উপায় করতে না-পারলে, তোর মুখে দু-টো অন্ন দেব কেমন করে?‌

মাগো, আমার অন্ন জুটুক আর না-জুটুক, তোমাকে আমি কিছুতেই উপোস করতে দেব না। কাল আমি যদি কিছু-একটা করতে না-পারি, তখন তুমি আমাকে বোলো।‌ দৃঢ় গলায় সেলিম উত্তর দিল।

তুই তো অনেক চেষ্টা করলি বাছা, আর কী করবি? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিম উত্তর দিল, দেখি। বলে সেলিম চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার ভোলানাথ কী কাজ করত মা?

—সে বড়ো কষ্টের কাজ রে। তাঁর চোখ ছলছলিয়ে উঠল।

বলো-না, কী সে কাজ? সেলিম আবদারের সুরে জিজ্ঞেস করল।

—একজন মস্ত বড়োলোকের কাছে কাজ করত ভোলানাথ। তার অনেক কাজ-কারবার। সেইখানে মোট বইত ভোলানাথ।

—তুমি সেই বড়োলোকটিকে চেনো?

—চিনি।

—আমায় নিয়ে যাবে তার কাছে?

—কেন?

—আমিও মোট বইব।

—ওরে বাছা, এ কী কথা বলছিস তুই?

—ঠিক বলছি মা, তুমি আমায় নিয়ে চলো, মোট বইতে আমার একটুও কষ্ট হবে না।

ওরে সেলিম, এ হয় না। উদবেগের গলায় তিনি বললেন, আমার ভোলানাথ যে এই মোট বইতে বইতেই রোগে পড়ল বাবা।

সেলিম সাহস দিয়ে বলল, তুমি একটুও ভয় পেয়ো না মা, আমার কিচ্ছু হবে না। দেখো, আমি ঠিক পারব।

তিনি হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন সেলিমের মুখের দিকে। তাঁর চোখের পাতা দু-টি কাঁপছে। সেলিম তার সাহসী বুকখানা শক্ত করে এগিয়ে গেল ক-পা। তারপর স্পষ্ট গলায় বলল, তুমি মনে সাহস রাখো মা। তুমি দেখো, একদিন তোমার এই সেলিম তোমার দুঃখ ঘোচাবে। তুমি কিচ্ছু ভেব না।

তখন আর তিনি একথা নিয়ে কথা বাড়ালেন না। সারাদিন কাজ করেন আর কী যেন অন্য মনে ভাবেন। কখনো কখনো স্থির হয়ে চেয়ে থাকেন শূন্য ঘরের এদিকে-ওদিকে। তারপর সব কাজ শেষ করে রাতে শোবার আগে তিনি সেলিমকে ডাকেন। বলেন, হ্যাঁ রে বাবা, পারবি তো ঠিক?

সেলিম গলায় তেমনি জোর দিয়ে বলে, কী বলছ তুমি! পারব পারব, নিশ্চয়ই পারব।

—ঠিক আছে। তা হলে তোকে কালই নিয়ে যাব সেই বড়োলোক মালিকের কাছে।

—কাল কখন মা?

—সকালেই।

সেলিমের বুকের ভেতর শিহরন লাগল। খুশিতে সে উছলে উঠে হেসে ফেলল।

কিন্তু একটা কথা বাবা, তিনি ধীর গলায় বললেন।

কী কথা? উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল সেলিম।

—মনে কষ্ট পাবি না তো সেই কথা শুনে?

—তোমার কথায় কষ্ট পাব! তুমি তো আমায় কষ্ট দাও না কখনো।

—কিন্তু আজ যদি পাস? সেই কথা বলতে আজ যে নিজেরই আমার কষ্ট হচ্ছে।

শুনি, এমন কী সেকথা? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সেলিম। মা চুপ করে রইলেন।

বলো? সেলিম আবার ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

মা একটু ইতস্তত করলেন, তারপর সেলিমের চিবুকটি ছুঁয়ে আদর করলেন। তারপর বললেন, ওরে সেলিম, ওখানে কাজ করতে হলে তোর আর সেলিম থাকা চলবে না। তোর নাম পালটে অন্য নাম রাখতে হবে। তুই আমার ছেলের মতো যখন, তখন ভোলানাথের মতো আর কোনো নাম নিতে হবে তোকে।

কেন? সেলিমের কন্ঠে বিস্ময়।

সেলিম নামে কোনো মানুষকে ওরা কাজে নেবে না। বলে তিনি নিজের মুখখানা নিজের হাতে ঢেকে ফেললেন।

সেলিম প্রথমটা কেমন যেন আশ্চর্য হয়ে গেল তাঁর কথা শুনে। এই কথাটার মানে যে কী, সে যেন কিছুক্ষণ চুপ করে সেই কথাটাই ভাবতে লাগল। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল তার সেই ছোট্টবেলার কত কথা! মনে পড়ে গেল আম্মার সেই মুখখানি। সেই আদরমাখা মুখ। সেলিমকে কোলে নিয়ে সেই মুখখানি সেলিমের গালে ঠেকিয়ে কত আদর করে তার নাম ধরে ডেকে বলেছে, সেলিম, সেলিম, আমার বুকের ধন সেলিম। মনে পড়ে গেল আব্বার কথা। সেলিমকে কাঁধে নিয়ে মানুষটা চ্যাঁচাত, আমার সেলিমের মাথা উঠবে আকাশে। ওরে আমার ছেলে হবে হিমালয়।

সেলিমকে অমন বোবার মতো চুপ করে থাকতে দেখে ভোলানাথের মা বললেন, আমিও বলি অমন কাজের দরকার নেই। বাপ-মায়ের দেওয়া নাম কে আর বিসর্জন দিতে চায় বল? না, দেওয়া উচিত?

সেলিম যেন হঠাৎ চেতনা ফিরে পেল। বলল, তুমিও আমার আর এক মা। আমার এক মা যদি সেলিম বলে ডাকে, তবে তুমিও আমায় যে নামে ডাকবে, সেও তো আমার মায়েরই দেওয়া নাম। বলো নতুন কী নাম তুমি দেবে আমায়?

তিনি ভাবলেন মুহূর্ত। তারপর বললেন, আমার দেওয়া নাম তোর যদি পছন্দ না-হয়?

—কী বলছ তুমি? তুমি নাম দেবে, আমার পছন্দ হবে না?

—তবে আমার ভোলানাথের আরেক ভাইয়ের নাম দিই—শম্ভুনাথ। পছন্দ?

হেসে উঠল সেলিম। তারপর বলল, খুব ভালো। আজ থেকে আমি তোমার শম্ভু।

পরের দিনই তিনি সেলিমকে নিয়ে সেই বড়োলোক মালিকের কাছে গেলেন। সেই বড়োলোক মালিককে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন যেন ঘাবড়ে গেল সেলিম। উরিব্বাস! কী চেহারা! যেমন পেটটা মোটা, তেমনি মাথাটা হেঁড়ে। মাথার দু-পাশে কান দুটো চ্যাপটা হয়ে ঠেকে আছে। তেমনি পেল্লাই একখানা গোঁফ। কুতকুতে চোখ, কিন্তু ভীষণ ধারালো চোখের চাউনি। এমন করে তাকাল সেলিমের দিকে, মনে হল সেই দৃষ্টি যেন সেলিমের অন্তস্তলটাও দেখতে পাচ্ছে। মোটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে তার কথাগুলো যখন বেরিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন ঘ্যাং ঘ্যাং করে ব্যাং ডাকছে। একটা খাটিয়ার ওপর গা এলিয়ে বসে আছে, আরেক জন লোক তার গা টিপে দলাই-মলাই করছে। বুঝতে পারা গেল লোকটা মালিকের কাজের লোক। তার রকমসকম দেখে সেলিম আর একটু হলেই হেসে ফেলছিল। কিন্তু তার আগেই মালিক ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করল, তুমহি ভোলানাথের মা আছ না?

হ্যাঁ বাবা। মাথায় এতখানি ঘোমটা টেনে তিনি উত্তর দিলেন।

ভোলানাথ বহুত আচ্ছা লেড়কা ছিল। আফশোস-কি বাত, জলদি জলদি চলে গেল। ভগওয়ান কো যো মর্জি। এইটুকু বলে সেলিমের মুখের দিকে তাকাল মালিক। ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, এ ছেলেটা কে আছে?

আমার আরেক ছেলে বাবা। খুবই সংকোচের সঙ্গে তিনি উত্তর দিলেন।

মালিক অবাক হয়ে উত্তর দিল, এ তো হামি জানতুম না!

ভোলানাথের মা বললেন, আমার ঠিক নিজের ছেলে নয়। ছেলের মতন। আমার আপনজন।‌

লোকটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে একবার সেলিমকে দেখে নিল। তারপর ভোলানাথের মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, এত দিন তো হামি একে নেহি দেখেছি?

ভোলানাথের মা বললেন, আমার কাছে তো ছিল না। ওর বাপ-মার কাছেই থাকত। তা কাজকম্ম নেই তো, তাই আমি নিয়ে এসেছি। তোমাকে বাবা ছেলেটার জন্যে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

কাজ! বলে সেই বড়োলোক মালিকটা এমন জোরে হেসে উঠল, যেন মনে হল একসঙ্গে অনেকগুলো ব্যাং একপশলা বৃষ্টির পর জলের ওপর মুখ তুলে ঘ্যাঙাচ্ছে। হাসতে হাসতেই সে বলল, এ কি লাড্ডু আছে যে, মাঙিলেই মিলে যাবে!

তোমাকে একটা ব্যবস্থা করে দিতেই হবে বাবা। ভোলানাথের মা আকুলিবিকুলি করে বলল।

আরে বাবা, হামার কাছে কাম-উম থাকলে তোবে তো। বলে মালিক মুখ ঘুরিয়ে নিল।

ভোলানাথের মা এবার নাছোড়বান্দা হয়ে বললেন, আমার ভোলা যে কাজটা করত, সেই কাজটাই একে দাও না বাবা!

আবার লোকটা হাসল। তার সারা অঙ্গ হাসির সঙ্গে থলথল করে নাচতে লাগল। হাসতে হাসতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, আরে তুমহার ভোলা আর এই লেড়কা! আরে ভাই ভোলা কিতনা জবরদস্ত লেড়কা ছিল। এ তো একদম তালপাতার সিপাহি।

এতক্ষণ সেলিম চুপ করেই ছিল। যখন সে দেখল মালিক কিছুতেই রাজি হচ্ছে না, সে তখন নিজেই মুখ খুলল। সে বেশ গলায় জোর দিয়েই বলল, হ্যাঁ আমি পারব।

মালিক এক লহমায় সেলিমের মুখখানা দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী কাম কোরতে হোবে তু জানিস?

হ্যাঁ, জানি। জবাব দিল সেলিম।

—শিরে মোট লিয়ে ইধার-উধার করতে হোবে। পারবি?

পারব। দৃঢ়স্বরে উত্তর দিল সেলিম।

—উসমে ভারী ভারী মাল থাকবে!

সেলিম বলল, দু-দিন করলেই আমার অভ্যেস হয়ে যাবে।

মালিক একটু চুপ করে রইল। কিছু ভাবল। কী ভাবল কে জানে। তারপর বলল, ঠিক আছে হামকো জারা শোচনে দেও। হামি কাল বলবে।

কাল কখন আসব? সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল সেলিম।

যোখোন খুশি আসবি।

সেলিমের মনে একটা খুশির তরঙ্গ বয়ে গেল। ভোলানাথের মায়ের মুখখানাও মৃদু হাসির আভাসে উছলে উঠল। তিনি বললেন, তবে আমরা আসি বাবা?

হাঁ হাঁ, ঠিক আছে।

মা আবার বললেন, তুমি তা হলে একটু দেখো বাবা!

দেখবে, দেখবে, বলে মালিক একটু দেখে নিল সেলিমকে।

আর কথা না-বাড়িয়ে দু-জনে পিছু ফিরল। পা ফেলল। হঠাৎ মালিক আবার ডাকল, আরে শুনো, শুনো।

সেলিম মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

—তোমহার নাম কী আছে? নাম তো শুনা হল না! বলে মালিক সেলিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে... বলতে গিয়ে সেলিম থমকে গেছে। খুশিতে সে এতই উত্তেজিত হয়ে গেছিল যে, শেখানো নামটা একেবারে ভুলেই বসেছিল। চকিতে সে ভোলানাথের মায়ের মুখের দিকে হাঁদার মতো তাকাতেই তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, শম্ভু, শম্ভুনাথ।

কী জানি, মালিক ব্যাপারটা বুঝতে পারল কি না। কিন্তু মালিক এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করল না। শুধু মুখে একটা গম্ভীর শব্দ করল, হুম।

তারপর সেলিম আর ভোলানাথের মা হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল।

অনেকটা হেঁটে এসে ভোলানাথের মা-ই প্রথম কথা বললেন, তুই আর একটু হলেই আমাকে বিপদে ফেলেছিলি। আমি তোকে অত করে শিখিয়ে দিলুম, বলবি, শম্ভুনাথ, আর তুই নিজের আসল নামটাই বলে ফেলছিলি!

সেলিম লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে বলল, আমি একদম ভুলে গেছিলুম। আমি এখন থেকে রোজ মুখস্থ করব, শম্ভুনাথ, শম্ভুনাথ। দেখো আর ভুল হবে না।

না, আর ভুল হয়নি সেলিমের। সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সে শম্ভুনাথ নামটা যে কত বার মনে মনে আওড়াল বলে শেষ করা যায় না। রাত্তির বেলায় ছেঁড়া বিছানায় গড়িয়ে গড়িয়েও তার মুখস্থ করা শেষ হয় না।

কী রে, ঘুমোবি না? তাকে ছটফট করতে দেখে ভোলানাথের মা জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিম থতোমতো খেয়ে উত্তর দিল, আমি নাম মুখস্থ করছি।

মা হাসলেন, তারপর বললেন, ঘুমিয়ে পড়, কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।

অন্ধকারে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল সেলিম। নিথর চারদিক।

হঠাৎ সে কথা বলল, জানো মা, একটা কথা আমি যতবারই ভাবছি, ততই আমার কেমন যেন অবাক লাগছে।

মা জিজ্ঞেস করলেন, কী কথা রে?

দ্যাখো, যখন তুমি আমায় সেলিম বলে ডাকছ, তখন আমি সেলিম। আবার তুমি যখন আমায় শম্ভু বলে ডাক, আমি তখন শম্ভু। অথচ...

তুই কী বলতে চাস বল তো?

আমার নামটা অন্য হয়ে গেলেও আমি কিন্তু আমিই থেকে যাচ্ছি। আমার হাত-পা, মুখ-চোখ কিছুই পালটাচ্ছে না। কী আশ্চর্য, না? বলে সেই অন্ধকারে সেলিম মুখ ফিরিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করল।

মা বললেন, দ্যাখ সেলিম, আমরা যখন জন্মাই তখন তো নাম নিয়ে জন্মাই না। তখন আমরা সবাই মানুষ। কিন্তু তারপরে নাম আসে, ধর্ম আসে, দলাদলি আসে। আমরা পালটে যাই।

ঠিক বলেছ। সেলিম সায় দিল। তারপর বলল, এত বড়ো পৃথিবীর সব মানুষ যদি এক থাকত, তাহলে কী মজা হত বলো?

মা বললেন, একটা মস্তবড়ো সংসার হত, মানুষের সংসার।

তখন তো আর তোমায় এই ভাঙা ঘরে থাকতে হত না। হয়তো একটা সুন্দর বাড়িতে থাকতে। তোমার কষ্ট নেই, দুঃখ নেই। সবার জন্যে সবাই ভাবছে, সবার জন্যে সবাই কাজ করছে, ভারি মজা হত, তাই না? বলে চুপ করে রইল সেলিম।

তারপর আবার নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে আবার কথা বলল সেলিম, আচ্ছা, তুমি সেই দুধসাদা পাখির গল্পটা জানো?

কোন পাখি? মা জিজ্ঞেস করলেন।

সেই যে কোন এক পাহাড়ের চূড়ায়, কোন এক মিনারের ওপর সে থাকে! সেলিম বলল।

জানি। মা উত্তর দিলেন।

তোমার কি মনে হয় গল্পটা সত্যি? জিজ্ঞেস করল সেলিম।

গল্পটা সত্যি, কিন্তু পাখিটা সত্যি কি না জানি না। মা উত্তর দিলেন।

সেলিম বলল, গল্পটা সত্যি হলে, পাখিটাও নিশ্চয়ই সত্যি।

হয়তো সত্যি। মা বললেন।

সেই পাহাড়টা কোথায় তুমি জানো?

মা উত্তর দিলেন, কোনোদিন সেই পাহাড়ের কথা নিয়ে ভাবিনি আমি।

জানো, যেদিন আমি আম্মার মুখে প্রথম সেই পাখির গল্প শুনি, তখন আমি কত ছোটো। তখন বার বার ইচ্ছে করত সেই পাখির গল্প শুনতে। শুনতে শুনতে মনে হত, ছুটে যাই সেই পাখির দেশে। তারপর যখন বড়ো হলুম, একটু একটু বুঝতে শিখলুম, তখন পাখির গল্পটা মনে পড়লেই আমার হাসি পেত। কিন্তু যেদিন আমার আম্মা আর আব্বা আমাকে ছেড়ে চলে গেল, যখন আমি একা, আমার কাছে কেউ নেই, সেই তখন থেকে পাখির গল্পটাও কেমন জানি সত্যি বলে আমার মনে হতে লাগল। আমার চোখের ওপর সবসময়ে ভেসে উঠত আম্মার সেই গল্প বলার হাসি-খুশি মুখখানি। আমি যেন দেখতে পেতুম আম্মার সেই আলোর মতো ঝলমলে চোখ দু-টি। সেই চোখ গল্প বলতে বলতে কখনো বড়ো হচ্ছে, কখনো কুঁচকে এইটুকু হয়ে যাচ্ছে, কখনো আদরে উছলে পড়ছে। বলতে বলতে সেলিমের গলাটা ভার হয়ে গেল।

ভোলানাথের মা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, সময় হলে একদিন তোতে আমাতে যাব সেখানে।‌

সেলিম বলল, ‌যাবে কী করে? তুমি তো জানোই না, কোথায় সেই পাহাড়।

—খুঁজে নেব।

—খুঁজে পেলেও শুনেছি সেই পাহাড়ে কেউ উঠতে পারে না।

মা বললেন, ‌মনের জোর থাকলে সব হয়।‌

তাহলে মনের জোর থাকলে একদিন আমি আমার আম্মা আর আব্বাকেও তো খুঁজে পেতে পারি? জিজ্ঞেস করল সেলিম।

মা বললেন, নিশ্চয়ই।

খুশিতে উছলে উঠল সেলিম। বলল, তখন কী মজা হবে বলো, তখন আমরা সক্কলে একসঙ্গে থাকব। তুমি থাকবে, আম্মা থাকবে, আব্বা থাকবে। আমি কাজ করব, পয়সা আনব। সক্কলে কী সুখেই-না থাকব।

ভোলানাথের মা বললেন, ওরে বাছা রাত কমছে না, বাড়ছে। ঘুমিয়ে পড়।

—আজ আমার ঘুম পাচ্ছে না। তুমি একটা গল্প বলো।

মা উত্তর দিলেন, তোর আম্মার মতো আমি তো কোনো গল্পই জানি না।

যা জানো। উত্তর দিল সেলিম।

কিচ্ছু জানি না।

সেলিম চোখের পলকে উঠে বসল। তারপর বলল, আমার কথা তো আমি অনেক বললুম, এবার তোমার কথা আমায় বলো!

সে যে অনেক কথা। মা উত্তর দিলেন।

অনেক কথার খানিক বলো। আবদার করল সেলিম।

সে তোর ভালো লাগবে না।

মায়ের মুখে গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে। উত্তর দিল সেলিম।

উত্তর শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, তাহলে আমার ছোটোবেলার একটা গল্প বলি শোন। আমি তখন তোর চেয়ে অনেক ছোটো। ধর, তোর যদি এখন তেরো কি চোদ্দো হয়, তখন আমার বয়স ছিল ছয় কি সাত। আমার বাবাকে আমি একদম মনে করতে পারি না। আমার যখন জ্ঞান হয়নি, তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। শুনেছি, তিনি কয়লার খনিতে কাজ করতেন। একবার কয়লার খাদ ভেঙে পড়ল। আমার বাবা আটকা পড়লেন। আর উঠে আসতে পারলেন না। আমি মায়ের একমাত্র সম্বল। একদিন দাদু এল। আমার মাকে আর আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর কাছে। আমার দাদুর খুব-একটা বয়স না-হলেও, চুল পেকেছে। চুল পেকেছে দিদিমারও। আমার কোনো মামা ছিল না। আমার মতো আমার মা-ও দিদিমার একটি মেয়ে। ছোটোবেলার কথা মনে পড়লেই দাদামশাইয়ের মুখখানা সব্বার আগে ভেসে ওঠে আমার চোখের সামনে। দাদামশাইকে আমার খুব ভালো লাগত। এমনি লম্বা-চওড়া চেহারা। এতখানি টিকোলো নাক। বড়ো বড়ো দুটো চোখ। ফর্সা টকটক করছে গায়ের রং। আমার দিদিমাকেও খুব সুন্দর দেখতে ছিল, তবে দিদিমা দাদুর মতো অত লম্বা ছিলেন না। ছোটোখাটো মানুষটি। মুখখানা মিষ্টি। তবে আমার দিদিমা একটু চুপচাপ, কথা বলতেন কম। ঘর-সংসার নিয়েই থাকতেন। অবশ্য আমায় যখন আদর করতেন তিনি, আমি দেখেছি তাঁর চোখ ছলছল করছে। গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। হয়তো তখন আমাকে দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে যেত তাঁর। বাবার মুখখানা হয়তো ভেসে উঠত তাঁর চোখের ওপর।

কিন্তু দাদুকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। আমার দাদামশাই তখনও কাজ করতেন। তিনি ছিলেন ফরেস্ট-অফিসার। তাই আমার দাদামশাই আর দিদিমা থাকতেন বনের কিনারায় একটা সুন্দর বাংলোবাড়িতে। চারদিকে গাছ আর গাছ—ফার, পাইন, দেবদারু, ইউক্যালিপ্টাস নানান দেশের নানান গাছ-ভরতি সেই বন। সকাল বেলা ঘুম ভাঙলে আমি শুনতে পেতুম অসংখ্য পাখির ডাকাডাকি, গাছের পাতায় হাওয়ার ঝিরিঝিরি। আবার নিঝুম রাতে জানলার ফাঁকে মুখ বাড়িয়ে আকাশটাকে দেখতে চাইলেও দেখতে পেতুম না। দেখতুম, গাছে গাছে আকাশটা ঢাকা পড়ে গেছে, আর থোকা থোকা জোনাকি আলোর ফুলকি ছড়িয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে নেচে বেড়াচ্ছে। সেই নিঝুমরাতের বনটা আমাকে কেমন জানি হাতছানি দিয়ে ডাকত। এইসময়ে ওই বনের ভেতর আমার খুব হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করত। রাত্তির বেলা মা আর দিদিমা একঘরে শুত, আর আমি দাদামশাইয়ের কাছে থাকতুম। দাদামশাই আমাকে বনের গল্প বলত, সে কত গল্প। একদিন হয়তো বাঘের গল্প, কোনোদিন হাতির গল্প, আবার হয়তো কোনোদিন ডাকাতের গল্প। এক-একদিন গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি কান পেতে থাকতুম, যদি বাঘের ডাক শুনতে পাই। কিন্তু শুনতে পাওয়ার আগেই আমি আবার ঘুমিয়ে পড়তুম। তাই বাঘের ডাক আমার শোনা হয়নি কোনোদিন। অথচ বাঘের ভয়ে আমাকে একা কোনোদিন ঘরের বাইরেও যেতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমার মন মানত না। বার বার মনে হত, এই বনের গভীরে যদি একবার যেতে পাই! মন বলত, বনের ভেতর হারিয়ে গেলে কেমন হয়!

এমন সময়ে হঠাৎ একদিন রাত্রে দাদামশাই গল্প বলছিলেন। একটা সাপ আর নেউলের যুদ্ধের গল্প। গল্প শুনতে শুনতে সেদিন আর আমি থাকতে পারলুম না। বললুম, দাদু, তুমি তো শুধু গল্পই বলো, বনের ভেতরে তো একদিনও নিয়ে গেলে না। একদিন তো দেখালে না কিচ্ছু।

কী দেখালুম না রে? দাদু জিজ্ঞেস করলেন।

আমি বললুম, কেন বন।

দাদু মজা করে হাসল। বলল, এই তো বনেই আছিস তুই।

আমি বললুম, এ আবার কী বন! এখানে বাঘ, হাতি কিচ্ছু নেই।

ও, তুই বাঘ দেখবি? বলে দাদু খুব জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, যদি বাঘ হালুম করে তেড়ে আসে তখন কী করবি তুই?

কেন, তোমার তো বন্দুক আছে। জবাব দিলুম আমি।

বন্দুক যদি ফসকে যায়? জিজ্ঞেস করল দাদু।

তখন তোমার কোলে উঠে পড়ব।

আমার কথা শুনে তক্ষুনি আমায় কোলে তুলে নিয়ে দাদু আরও জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলেছিল, ঠিক আছে, তোকে একদিন বনে নিয়ে যাব। আজ ঘুমো।

আর ঘুম হয় নাকি! দাদু বনে নিয়ে যাবে বলেছে। উত্তেজনায় গায়ে আমার কাঁটা দিচ্ছে। আবার কথা বললে পাছে দাদু রাগ করে, তাই আমি আর কথা কইলুম না। মটকা মেরে চুপটি করে বিছানায় পড়ে রইলুম। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লুম, আমার একদম খেয়াল নেই।

একদিন দাদু সত্যিই আমায় বনে নিয়ে চলল। দাদুকে তো প্রায় রোজই বনের ভেতরে যেতে হয়। তাই দাদুর কাছে বন মোটেই অজানা-অচেনা কিছু নয়। কোনো কোনো দিন দাদুকে দেখেছি পায়ে হেঁটে বনে চলেছে। আর এক-এক দিন ছোট্ট একটা ঘোড়ায় চেপে দাদু বনে যাচ্ছে। আমাকে অবশ্য দাদু ঘোড়ার পিঠে নিয়েই চলল। দু-পাশে ঘন জঙ্গল আর মধ্যিখানে একটা সরু রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে আমাদের ঘোড়া চলেছে। গাছের মাথায় বাতাস বইছে। পাতার শব্দ। মনে হচ্ছে গাছের সঙ্গে গাছেদের হইহই করে কথাবার্তা চলছে। সেকথার যেন শেষ নেই। সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে পাখিরাও গুলতানি শুরু করে দিয়েছে। আমাদের ঘোড়ার পায়ের শব্দ পর্যন্ত সেই গাছ-পাতার শব্দে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি যতই এগোচ্ছি আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা উত্তেজনায় থরথর করছে। আমি চোখ মেলে এদিক-ওদিক দেখছি আর ভাবছি, এখনও তো বাঘের দেখা পেলুম না। আমাকে যদিও দাদু কথা বলতে বারণ করেনি, তবুও আমার মুখে কিছুতেই কথা ফুটছিল না। দাদুও নিশ্চুপ। এক হাতে ঘোড়ার লাগামটা ধরে আছে আরেক হাতে বন্দুক। আমি বুঝতে পারছি না, বাঘ যদি ঝোপের আড়াল থেকে হালুম করে লাফিয়ে পড়ে, দাদু তখন বন্দুক ছুড়বে কী করে! এক হাতে কি বন্দুক দাগা যায়!

আরও খানিকটা এগোতে আমার যেন মনে হল, জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দূর থেকে শব্দটা ভেসে আসছে। আমি কান খাড়া করে শুনছি। ক্রমে ক্রমে শব্দটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি দাদুকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম, দাদু কীসের শব্দ ওটা?

নদী। দাদু ছোট্ট করে উত্তর দিল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ওইখানে আমরা যাব?

দাদু আরও ছোট্ট করে বলল, হুঁ।

আমি বললুম, ওইখানে বাঘ আছে?

দাদু উত্তর দিল, ওইখানে বাঘ জল খেতে আসে।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, বাঘ আমাদের দেখতে পেলে!

দাদু একটু হাসল। তারপর বলল, আমরা লুকিয়ে থাকব।

এই কথা বলতে বলতেই আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি। ঘোড়ার চলা। সে তো আর ঠুক ঠুক করে হাঁটে না। আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, সামনে ওই বনের গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে সূর্য-আলোয় রুপোর মতো ঝিকিমিকি করে উঁকি দিচ্ছে নদীর ঢেউ। আরও একটু এগিয়ে যেতেই একেবারে নদীর মুখোমুখি। নদীটা এক্কেবারে ছোট্ট, পাথর-ভরতি। ইচ্ছে করলে ওই পাথর টপকে টপকে নদীর ওপারে যে-কেউ চলে যেতে পারে। এখানে এসে ঘোড়া থামল। আমি দেখলুম, নদীর ধার বরাবর ওপারে বনটা আরও গভীর। বনের গা দিয়ে নদী ছুটছে। পাথরে পাথরে জল ছলকে উঠছে। বাধা পাচ্ছে যতই, ততই যেন ফেনিল দুধের মতো সেই জলের তরঙ্গ উছলে উঠছে। আমি বেভুল হয়ে দেখছি আর শুনছি নদীর জলতরঙ্গ। এমন দৃশ্য এই প্রথম আমি দেখছি। আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর এখানেই আকাশের সবটুকুই চোখের ওপর ভেসে উঠল। দেখতে পেলুম, আকাশের ছায়াটা নদীর আয়নায় লুটোপুটি খাচ্ছে। নদী যেন আকাশের ছায়ার সঙ্গে মিতালি পাতিয়েছে। দাদু ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। বন্দুকটা কাঁধে নিল। আমাকেও ঘোড়ার পিঠ থেকে নামাবার জন্যে হাত বাড়াল। আমি খানিকটা দাদুর হাতে, খানিকটা ঘোড়ার পিঠে ঘষতে ঘষতে মাটিতে লাফিয়ে পড়লুম। দাদু ঘোড়াটার লাগাম ধরে টেনে এনে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখল। মুখে ঘাস ছিঁড়ে দিল। ঘোড়াটা ঘাস চিবোচ্ছে। একটা-দুটো নাকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ফররর করে ঘোড়াটার নাক দিয়ে এমন একটা শব্দ বেরোচ্ছিল, সেই শব্দ শুনে আমার ভীষণ ভয় করছিল। এক্ষুনি বাঘে যদি শুনতে পায়! দাদু মুহূর্ত আর দাঁড়াল না। আমাকে কোলের কাছে লুকিয়ে নিয়ে পাশের ওই ঝোপটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর বলল, ওইদিকে চেয়ে দ্যাখো!

আমি নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি, অনেকগুলো সাদা বক পাথরের ওপর বসে বসে ঠোঁট বেঁকিয়ে গা চুলকোচ্ছে আর রোদ পোহাচ্ছে, একটা-দুটো জলের ওপর নজর রেখে স্থির হয়ে বসে আছে। তাল খুঁজছে, মাছ দেখতে পেলেই খপাত। উড়তে উড়তে কোনো কোনোটা গাছে এসে বসে পড়ছে। হঠাৎ দেখি দুড়মুড় করে এ-গাছটা ও-গাছটা দুলে ওঠল। আমি চমকে চেয়ে দেখি, একটা মা-বাঁদর পেটের মধ্যে একটা বাচ্চা নিয়ে গাছে গাছে লাফ মারছে। সঙ্গে সঙ্গে আরও তিনটে পুঁচকে বাঁদর তার পেছনে লাফিয়ে গাছ টপকাচ্ছে। একটা কাঠবিড়ালি কোথায় ছিল, নীচের ডাল থেকে সিধে মগডালে দে ছুট। আমি তো বাঁদরগুলোকে হাঁ করে দেখছি। যেমন মজা লাগছে তেমনি হাসি পাচ্ছে। হঠাৎ দূরে ওপারে নজর পড়ে যেতে দেখি, এক দঙ্গল বুনো মোষ। খাড়া খাড়া শিং। কালো কুচকুচ করছে গায়ের রং। ওই বনের গাছে গা ঘষতে ঘষতে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। কী কান্ড! মোষগুলো সব বেরিয়ে এসে ঝুপঝাপ করে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গা ডোবাল। নদীটা যে তেমন গভীর নয়, সে তাদের হাঁটা-চলা দেখলেই বোঝা যায়। কী আশ্চর্য, খানিক পরে তারা যখন জল থেকে উঠল তখন কেউ আর কারও কাছ ছাড়া হয় না। কী জানি, কী বুঝেছে! ডাঙায় উঠে কুতকুতে চোখগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। তারা হাঁটছে যখন, কী সতর্ক! দাঁড়াচ্ছে একসঙ্গে। মুখ ঘোরাচ্ছে একসঙ্গে। এদিক-ওদিক দেখছে একসঙ্গে। একঝাঁক টিয়াপাখি ঠিক এইসময়ে কোত্থেকে উড়ে এসে অনেকগুলো গাছের ডালে বসে পড়ল। একটু পরেই তারা উড়তে উড়তে মোষগুলোর পিঠে, ঘাড়ে, শিংয়ের ওপর বসে পড়ল। বসে ডানা ঝাপটিয়ে মোষগুলোকে ঠোকরাতে লাগল। কালো মোষগুলোর পিঠের ওপর ওই সবুজ রঙের টিয়াগুলো যখন ডানা মেলে ঝটপট করছিল, তখন কী অদ্ভুত লাগছিল আমার। দেখছি মোষগুলোও কিচ্ছু করছে না চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আরাম লাগছে বোধ হয়।

ঠিক এই সময়ে যেন মেঘ ডাকল। একটা বাজখাঁই গলার আওয়াজ—গাঁক-ক-ক! গাঁ-ক-ক!

দাদু সঙ্গে সঙ্গে আমায় হুঁশিয়ার করলে বাঘ আসছে।

দাদুরও কথা শেষ হয়েছে আর তার একেবারে সঙ্গে সঙ্গে মোষগুলো আবার জলের ভেতর ঝপাং ঝপাং করে নেমে পড়ল। এপারে পালিয়ে আসার জন্যে জলের ভেতর তুলকালাম শুরু করে দিল। টিয়াগুলো তো আগেই ফুড়ুত। গাছের সবুজ পাতার আড়ালে নিজেদের গায়ের সবুজ রং লুকিয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করে চ্যাঁচাতে লাগল। বুড়ো মোষগুলোকে জলের মধ্যে অমন নাকানি-চোবানি খেতে দেখে দাদুর ঘোড়াটাও এমন চিঁ-হিঁ-হিঁ করে পা ঠুকতে লাগল যে, তাই দেখে দাদুও ঘাবড়ে গেছে। এদিকে মোষগুলোও আঁকপাক করে জলের ভেতর থেকে ছুটে আসছে। ঘোড়াটাও গাছে বাঁধা লাগামটা টানছে আর দাপাদাপি করছে। গাছের বাঁদরগুলোও এ-গাছ থেকে ও-গাছে পালাচ্ছে। বাঘের গাঁক গাঁকানিতে কাঁপছে। তখন আমারও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। দাদু বোধ হয় বিপদের গন্ধ পেল। দাদু মুহূর্ত আর অপেক্ষা করল না। একেবারে চোখের পলকে গাছে বাঁধা ঘোড়ার লাগামটা খুলে দিলে। আমায় নিয়ে তাড়াতাড়ি দাদু যেই তার পিঠে উঠতে গেছে, বাস, দাদুর হাত ফসকে ঘোড়া দে ছুট! সে কিচ্ছু শুনল না। বাঘের ডাক শুনে এমন ভয় পেয়ে গেছে যে, তার আর দিগবিদিক জ্ঞান রইল না। ঘোড়ার কান্ড দেখে দাদু তো থ। এদিকে সাক্ষাৎ-বিপদ। মোষগুলো ছুটে আসছে। দেখতে পেলে শেষ করে ছাড়বে। ঘোড়াটাও ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে পগারপার। আমাকে ছেড়ে যে দাদু তার পেছনে ছুটবে সে উপায়ও নেই। তখন আমাদের কী অবস্থা! সেখানে যে আর একদন্ডও দাঁড়ানো যায় না, দাদু সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। সুতরাং আর দেরি নয়, দাদুও আমাকে নিয়ে ছুট দিল। জঙ্গল টপকাচ্ছি আর শুনতে পাচ্ছি মোষের ঘোঁৎঘোঁৎ ছুটোছুটি। মোষ খেপে গেলে যা হয়! গাছের ডাল ভাঙছে, শিংয়ের গুঁতো লাগছে। আওয়াজ উঠছে। তাদের ভয়ে দাদুও যেদিকে দু-চোখ যায় আমাকে নিয়ে সেইদিকেই পালাচ্ছে। আমি তো তখন ছোটো। দাদুর মতো ছুটতে পারব কেন? তার ওপরে ঝোপজঙ্গলে ছোটা সেটাও তো আর সহজ কাজ নয়। যেখানে-সেখানে পা পড়ছে, হোঁচট খাচ্ছি, কাটছে কিচ্ছু খেয়াল নেই। এখন শুধু পালাও। বাঁচতে হবে।

বন ভাঙতে ভাঙতে আমারও দম প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, দাদুও হাঁপাচ্ছে। এখানে—এখন যেখানে পৌঁছেছি সেখানটা আরও গভীর। কিন্তু এখানেও দাঁড়াবার উপায় নেই। বাঘের গর্জনটা এখান থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তবে, মনে হচ্ছে মোষগুলো অন্য কোথাও গা-ঢাকা দিয়েছে। এদিকে আসছে না। আমার তো কষ্ট হচ্ছেই, এদিকে দাদুরও দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। আতঙ্কে দাদুর চোখ-মুখের চেহারাই পালটে গেছে। দাদুকে দেখে আমার কেমন মায়া লাগল। আমি উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললুম, দাদু, এখানে একটু দাঁড়াও।

দাদু আমার হাত ধরে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে?

আমি বললুম, আমার না, তুমি বড্ড হাঁপিয়ে গেছ।

দাদু কিন্তু দাঁড়াল না, আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, এখানে দাঁড়াবার যো নেই। এক্ষুনি বিপদ হবে।

সুতরাং ছুটতেই হল। বনের ভেতর বিপদে পড়ে ছোটাছুটি করা যে কী আসাধ্য কাজ, বিপদে পড়ে যে ছুটেছে সে-ই জানে।

এবার আমারই কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। আমি থাকতে পারলুম না। বললুম, দাদু, এবার একটু দাঁড়াও।

বলতে-না-বলতেই দাদু লতাপাতায় পা জড়িয়ে ছিটকে পড়ল। আমি আঁতকে উঠেছি। দাদুর হাত ফসকে আমিও চিতপটাং। তারপর দু-জনেই দু-জনের মুখের দিকে অসহায়ের মতো চেয়ে হাঁপাতে লাগলুম। আমি দেখতে পেলুম দাদু উঠে দাঁড়াবার জন্যে আঁকপাঁক করছে, হাত-পা ছুড়ছে। কিন্তু এমন কিছুতে দাদুর পা-টা আটকে গেছে, ছাড়াতে পারছে না। রক্ষে, আমার তেমন কিছু হয়নি। অবশ্য আমার সারা গা ছড়ে গেছে। জ্বালা করছে, রক্ত পড়ছে। আমি ধড়ফড় করে উঠে পড়লুম। ছুটে গেলুম দাদুর কাছে। হাত ধরে টান লাগালুম, আমার গায়ে যত জোর আছে। তা সেই বয়েসে আমার গায়ে জোর আর কতটুকু। দাদুও আমার হাতটা শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়াবার জন্যে প্রাণপণে লড়াই শুরু করে দিল। কিন্তু এমন করে অবশ্য বেশিক্ষণ হাত-পা ছুড়তে হল না। হঠাৎই দাদুর পায়ে জড়ানো লতাপাতার প্যাঁচটা ছিঁড়ে গেল। দাদু উঠে দাঁড়াল, বুঝতে পারলুম দাদুর খুবই আঘাত লেগেছে। দাদু আমার হাত ধরে আবার ছুটতে গেল, পারল না। আমি আতঙ্কে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, তোমার লেগেছে দাদু?

দাদু উত্তর দিলে, তেমন না।

কিন্তু আমি দেখতে পেলুম, দাদু দাঁড়াতে পারছে না—খোঁড়াচ্ছে। বললুম, তুমি তো খোঁড়াচ্ছ। একটু বোসো।

দাদু আমার মুখের দিকে না চেয়ে ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল, কিন্তু দেখা যায় না কিছুই। জমাট বন। শত চেষ্টা করলেও এখান থেকে কেউ কিছু শুনতে পাবে না। তবুও দাদু কান খাড়া করে রইল। কিন্তু কই বাঘের গাঁকগাঁকানি? কিংবা বুনো মোষের ঘোঁৎঘোঁৎ? শোনা গেল সেই আগেরই মতো পাখির ডাক আর গাছে গাছে হাওয়ার দস্যিপনা। শোনা গেল খুবই অস্পষ্ট নদীর স্রোতের ঝরঝরানি। দাদু যে এখন খুবই বিপদে পড়েছে, সে দাদুর মুখের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। তার আরও বিপদ আমাকে নিয়ে। দাদু কাঁধের বন্দুকটা এবার হাতে নিল। আমাকে কিছু বলতে গেল কিন্তু পারল না। যেন বোবা হয়ে গেছে দাদু। আমি সেই অবস্থায় দাদুকে জড়িয়ে ধরে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম আর মনে মনে আফশোস করতে লাগলুম, বাঘটাকে দেখতে দেখতেও দেখা হল না। ওই বুনো মোষগুলোর ওপর এমন রাগ ধরছে—যত নষ্টের গোড়া তো তারাই। ওরা যদি ওপার থেকে এপারে পালিয়ে এসে ছুটোছুটি না করত তবে বাঘ আমার দেখা হতই। তার বদলে দেখা হল গুচ্ছের মোষ। পরে অবশ্য আমি দাদুর কাছে শুনেছি, ওই মোষগুলোও সাংঘাতিক। কোনো মানুষকে সামনে দেখলে তার আর নিস্তার নেই। ভয়ংকর শিং দিয়ে মুহূর্তে পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। তবে, ইচ্ছে করলে দাদুও বন্দুক ছুড়তে পারত! কিন্তু মোষ একটা তো নয়, একদঙ্গল। একটা ঘায়েল হলে অন্য ক-টা যদি তেড়ে আসত! ক-টা গুলি ছুড়বে তুমি! তার ওপর আমি সঙ্গে আছি। দাদুর সবচেয়ে ভাবনা তো আমাকে নিয়েই। যদি কিছু অঘটন ঘটে যায়! তবে এই মুহূর্তে যা ঘটছে সেটাও কী কম! তাড়া খেয়ে কোনদিকে আমরা ছুটে এসেছি, কোনদিকে বাড়ি ফেরার রাস্তা, তার হদিশ দাদুও জানে কি না আমার সন্দেহ! তার ওপর ঘোড়াটাও বাঘের ভয়ে বনের ভেতর পালিয়ে গেল। কোথায় সেটা লুকিয়ে আছে কে বলবে! এখন এই বনের ভেতর থেকে তাকে খুঁজে বার করা শিবেরও অসাধ্যি। সত্যি বলতে কী, এখন আমরা মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সময় গুনছি। দাদুর এখনকার এই ভয়ার্ত মুখখানা দেখে আমার নিজেরই বড্ড মায়া লাগছিল। আমি তাই দাদুকে যেন সাহস দেবার জন্যে বলে ফেললুম, বাঘটা বোধ হয় চলে গেছে।

দাদু ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ‌সসস‌ করে একটা আওয়াজ করে আমাকে চুপ করতে বলল। আমি বুঝলুম, হয়তো কাছাকাছি কিছু-একটা বিপদের আঁচ পেয়েছে দাদু, তাই কথা বলতে বারণ করল। আমিও সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেছি। আমার চোখ দুটোও থমকে কাঁপতে লাগল। এমনকী, আমার যেন মনে হল আমার দম ফুরিয়ে আসছে। আমি রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলুম। সেই ভয়ংকর মুহূর্তে আমি দেখি কী, দাদু ধীরে ধীরে বন্দুকের নিশানাটা তাক করছে। দৃষ্টি তার একটা ঝোপের দিকে। আমার বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই দাদুর হাতের বন্দুক গর্জে উঠল, গুড়ুম-গুড়ুম। কিছুই দেখতে পেলুম না। শুধু শুনতে পেলুম ঝোপের মধ্যে ঝটাপটি আর গাছের ডালে অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির। দাদু বিদ্যুতের গতিতে আমার হাতটা চেপে ধরল। আমাকে টানতে টানতে ছুট দিল।

আমি দেখতে পাচ্ছি দাদুর ছুটতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু দাদু কষ্ট অগ্রাহ্য করে যেন প্রাণের দায়ে ছুটছে। আর থেকে থেকে এগাছ-ওগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ছে।

দাদু আর পারল না, দাদু আবার হোঁচট খেয়ে ছিটকে পড়ল। আমিও দাদুর সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলুম। হাঁপাতে লাগলুম আর নি:সহায়ের মতো এদিক-ওদিক জুলজুল করে দেখতে লাগলুম।

কিছুক্ষণ সেইখানেই পড়ে রইলুম। তারপর আবার যখন উঠতে গেলুম তখন দাদুই এগিয়ে এল আমার কাছে। আমাকে হাত ধরে তুলল। তারপর বলল, চ। আমি জিজ্ঞেস করতে পারলুম না কোথায়। নি:সাড়ে দাদুর হাত ধরে উঠে দাঁড়ালুম। আবার দাদুর সঙ্গে ঝোপ ডিঙিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলুম আর ভাবতে লাগলুম—বাঘের গর্জনটাই যখন এমন ভয়ংকর, তবে না জানি কী সাংঘাতিক বাঘের মূর্তি।

তারপর অনেক পথ ঘুরে ঘুরে অনেক বন ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে যখন বাড়ি এলুম, তখন আমাদের শরীরে আর কিছু নেই। আমাদের বুকের ভেতরে কোনোরকমে প্রাণটাই শুধু ধুকধুক করে ধুঁকছে। সে-যাত্রা আমরা বেঁচে গেলুম, আর না-বাঁচলে তোর সঙ্গে কথা বলছি কেমন করে! কিন্তু আরেক বার আরেক বিপদ, সে কী ভয়ংকর! শুনলে তোরও গায়ে কাঁটা দেবে। সে-বিপদে আমার সমস্ত আনন্দ, সমস্ত স্বপ্ন চুরচুর করে ভেঙে গেল। সে-গল্পটাও তুই শুনে রাখ।

সেবার ঠিক হল, শীতকালে আমরা তীর্থ করতে যাব। যাব আমি, মা, দাদু আর দিদিমা। শীতকালে তীর্থে যাওয়া মানে সে তো বুঝতেই পারছিস, এলাহি লটবহর। তার ওপর আমরা চার জন। আমি তখন আরও একটু বড়ো হয়েছি, এই ধর বছর দশেক। রেলগাড়িতে চেপে বসেছি। ওই বয়সে রেলগাড়ি চড়া মানে তো বুঝতেই পারছিস, শুধু আনন্দ আর মজা। এর আগেও যে আমি দু-এক বার রেলগাড়িতে চাপিনি, তেমন নয়। সে তো এখান থেকে ওখানে, একটুখানি। কিন্তু এবার যেখানে যাচ্ছি সে অনেক দূরে। সারারাত ধরে রেলগাড়ি ছুটবে, সুতরাং রাতভর রেলগাড়িতে বসে থাকতে যে কেমন মজা লাগে সে তো আমি জানতুম না। তাই দিনের আলো পেরিয়ে রেলগাড়ি যতই রাতের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, ততই আমারও মনের ভেতরে কী ভীষণ শিহরন লাগছিল। আমি জানলার ধারে বসে আছি। আমার চোখ দুটো বাইরে, অন্ধকারে বৃথাই চেষ্টা করছে কিছু খুঁজে পাবার। অন্ধকারে দৃষ্টি আমার হারিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, কে যেন আমার চোখের ওপর মুঠো মুঠো অন্ধকার ছড়িয়ে দিয়ে আমার সব দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। অবশ্য যখনই আকাশের দিকে তাকাচ্ছি, তখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ঝলমলে তারার বিন্দুগুলি। গাড়ি যতই ছুটছে, আমি দেখছি ওই আকাশের আলোর বিন্দুগুলিও ততই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি ছোটো, তাই যেন বার বার মনে হচ্ছিল আকাশটা আমায় অসংখ্য চোখ মটকে ডাক দিচ্ছে। কিন্তু আকাশে পাড়ি দেবার মন্ত্র তো আমার জানা ছিল না তাই আনমনে বসে বসে আকাশের সঙ্গে মনে মনে কথা বলছিলুম। হঠাৎ দাদু ডাকল আমায়। আমি ফিরে তাকাতেই দাদু জিজ্ঞেস করল, ঘুমোবি না?

আমি দেখি, সত্যিই তখন একগাড়ি মানুষ ঘুমের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। কেউ কেউ সটান শুয়ে পড়ে এরই মধ্যে ফোঁস ফোঁস আরম্ভ করেছে। মা আর দিদিমাও আমাদের শোবার ব্যবস্থা করছে। আমি জানি, বাড়িতে আরাম করে যেমন শোবার ব্যবস্থা হয়, এখানে সেকথা কেউ ভাবে না। তার ওপর গাড়ির ঝিকঝিক দোলানি তাতে কি আর চোখে ঘুম আসে! অত কথা কী, আমার একটুও ঘুম পাচ্ছিল না। সেই অবাক করা রাতটা জেগে জেগেই কাটিয়ে দেবার জন্যে আমার মনটা ছটফট করছিল। তাই দাদুকে জিজ্ঞেস করলুম, তুমি বুঝি ঘুমোবে?

দাদু লম্বা লম্বা পা দুটো এপাশে-ওপাশে ভাঁজ করে একটা হাড়গোড় ভাঙা ‌দ‌ এর মতো গুটিয়ে শুতে শুতে বলল, দেখি, চেষ্টা তো করতে হবে।

আমি বললুম, আমার ঘুম পাচ্ছে না।

তবে জেগে থাক। কিন্তু কী করবি বসে বসে? দাদু একটা ছোট্ট হাই তুলে জিজ্ঞেস করল।

বসে থাকতেই ভালো লাগছে আমার। আমি উত্তর দিলুম।

অবাক স্বরে দাদু জিজ্ঞেস করল, একলাটি শুধু শুধু?

আমি বললুম, একলা কই? তোমরা তো আছ।

দাদু বলল, দেখিস একটু পরেই ঘুম পাবে!

তখন শোব। আমি উত্তর দিলুম।

আমায় কিন্তু তখন ডেকো না। বলে দাদু মুচকি মুচকি হাসল।

আমি বললুম, আমি কাউকেই ডাকব না। ঘুমোও তোমরা।

ঠিক আছে। বলে দাদু পা-দুটো সুবিধেমতো একটা জায়গায় রাখার জন্যে এপাশ-ওপাশে ঘুরে শুল। আমি আকাশের দিকে মুখ ফেরালুম।

আমি বুঝতে পারছি দাদু তখনও ঘুমোয়নি। মা আর দিদিমাও উশখুশ করছে। গাড়ির কামরায় তখনও অনেক লোক নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে আর নয়তো অকাতরে নাক ডাকাচ্ছে। আমিও নিশ্চিন্তে গাড়ির জানলায় চিবুক ঠেকিয়ে কত কী ভাবছি। এমন সময় অসম্ভব একটা ঝাঁকুনি লাগল, তারপর একটা প্রচন্ড শব্দ। আমি কিছু বুঝতে-না-বুঝতেই ছিটকে পড়লুম। ভীষণ লাগল। আর আমি কিচ্ছু জানি না।

বুঝতেই পারছিস, আমাদের গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। আমরা সেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি।

আমি যখন প্রথম চোখ মেলি, তখন আমার সারা অঙ্গে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। আমি একটুও নড়াচড়া করতে পারছি না। অসহ্য কষ্ট। একটা নরম বিছানায় শুয়ে আছি। আমার তেষ্টা পাচ্ছে। আমি অনেক কষ্টে অস্পষ্ট গলায় জল জল বলে ডাক দিচ্ছি। জল এল। একজন নার্স। আমি বুঝতে পারলুম আমি হাসপাতালে। আমার মুখে একটু একটু করে জল ঢেলে দিল নার্সটি। আঃ! তারপর আমি অসহায়ের মতো সেই নার্সটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। তারপরেই আকুলি-বিকুলি করে এপাশে-ওপাশে চোখ ফেরাতে লাগলুম। আমার মা, দাদু, দিদিমা কাউকেই দেখতে পেলুম না। আমার ভেতরটা ছটফট করে উঠল। আমি পা ছুড়তে গেলুম পারলুম না। আমার দুটো পা-ই শক্ত করে বাঁধা। প্রথমটা আমার কেমন যেন সব ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল, কিছুই বুঝতে পারছিলুম না। তারপর ধীরে ধীরে আমার সব মনে পড়ে গেল। সেই রেলগাড়ি, সেই জানলায় মুখ ঠেকিয়ে আমি বসে আছি। বসে বসে আকাশ দেখছি। তারপর সেই ভীষণ শব্দ। আমি চমকে উঠলুম। তক্ষুনি চিৎকার করে ডাক দিলুম, মা-আ-আ। মা সাড়া দিল না।

আমি ভালো হয়ে গেলুম। আমি জানতে পারলুম, আমার আর আপন বলতে কেউ বেঁচে নেই। সেই দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। অগত্যা হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে আমি চললুম এক অনাথ আশ্রমে। তারপর? সে আরেক মস্ত গল্প। সেগল্প আরেক দিন শোনাব। আজ রাত হয়ে গেছে, ঘুমিয়ে পড়। সকাল সকাল উঠতে হবে।‌ বলে ভোলানাথের মা চুপ করে গেলেন।

সেলিম কথা বলতে পারল না। অনেকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইল সেই ছোট্ট ঝুপড়িটা। বাইরে শুধু ঝিঁঝির শব্দ।

ভোলানাথের মা জিজ্ঞেস করলেন, ‌কী রে, ঘুমিয়ে পড়লি?‌ ‌না।‌ উত্তর দিল সেলিম। তার গলা যেন ধরা ধরা।

‌আমি ভাবলুম তুই ঘুমোচ্ছিস। আমি বুঝি নিজেই আবোল-তাবোল বকে গেলুম।‌

সেলিম বলল, ‌তোমার শেষ গল্পটা শুনলে মানুষের চোখে কি ঘুম আসে?‌

মা বললেন, ‌সেকথা তো অনেক দিন আগের কথা।‌

‌একথা ভোলা যায় না।‌ উত্তর দিল সেলিম।

‌ঠিক বলেছিস।‌ বলে ভোলানাথের মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আর কোনো কথা বললেন না। সেলিমও না। নিস্তব্ধ হয়ে গেল ঝুপড়িটা সেই রাতের মতো।

যদিও সেদিন অনেক রাত অবধি সেলিমের চোখে ঘুম আসেনি, যদিও মায়ের সেই গল্পের রেশটা অনেক রাত অবধি তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল, তবুও তার ঘুম ভাঙল অনেক সকালে। আজ যেন সেলিম অন্য মানুষ। আজ যতবারই সেলিম ভোলানাথের মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল, ততবারই কেমন একটা মমতায় তার মনটা ভরে উঠছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল তার নিজেরই আম্মার কথা। এমন কষ্ট তার মা-ও কত পেয়েছে। সে-কষ্ট সেলিমই তাকে দিয়েছে। সেলিম মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এক মাকে সে কষ্ট দিয়েছে, এই মাকে সে যেমন করে হোক সুখী করবে। সে ঠিক করে ফেলল এখনই সেই ভদ্রলোকের কাছে যাবে। সেই মালিকের কাছে। তাই মাকে বলল, ‌মা আমি যাচ্ছি, তুমি আমায় আশীর্বাদ করো যেন কাজটা আমার হয়।‌

মা হাসলেন। সে যেন কত দুঃখ মেশানো হাসি। তারপর বললেন, ‌তোর নামটা যেন ভুলে যাস না বাবা। তুই ‌শম্ভু‌, ‌শম্ভুনাথ‌। মনে থাকবে তো?‌

সেলিম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, ‌আর কখনো ভুলি। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। এখন ঠিক মনে থাকবে।‌

তারপর সেলিম বেরিয়ে গেল।

সারাটা রাস্তা যেতে যেতে সে কত কথাই-না ভাবছিল। ভাবছিল, চাকরি করে যত পয়সা পাবে, সব রেখে দেবে এই মায়ের কাছে। অর্ধেক খরচ হবে সংসারে আর বাকিটা জমবে। জমতে জমতে যেদিন অনেক পয়সা হয়ে যাবে, সেদিন ঝুপড়ি ছেড়ে এই মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে আম্মা আর আব্বাকে খুঁজতে। তারপর ছোট্ট একটা ঘর বানাবে সেলিম। সেই ঘরে থাকবে ওরা সক্কলে। থাকবে তার আম্মা, আব্বা আর এই মা। সকলের দুঃখ্যু ঘোচাবে সেলিম। সকলের জন্যে আনবে হাসি আর আনন্দ। তারপর সেলিম খুঁজতে বেরোবে সেই পাখি। সেই দুধসাদা পাখি পাহাড়ের ওপর মিনারের চূড়ায়। তারপর...

সে ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেল মালিকের আস্তানায়। যখন পৌঁছোল, তখন বেশ রোদ উঠে গেছে। সেলিম মালিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মালিক ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। সেলিম কুঁকড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‌আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন।‌

মালিক সেলিমের মুখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে উত্তর দিলেন, ‌উ হামার মালুম আছে।‌ বলে একটু থামল। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর আবার বলল, ঠিক আছে। কাম হোবে। ইধার থোড়া বোস।‌

সেলিম আনন্দে চমকে উঠল। সে প্রায় খুশিতে আত্মহারা হয়ে বসে পড়ল মালিকের সামনে। বসে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌তা হলে আমি কখন আসব?‌

মালিক বলল, ‌হামি দেখছি।‌ বলে গলা চড়িয়ে ডাক দিল, ‌রাজু-উ-উ, আরে এ রাজু-উ-উ।‌

‌—হাঁ হুজুর-র...।‌ দূর থেকে রাজু সাড়া দিল।

সেলিম এক অজানা উত্তেজনায় নিশ্বাস চেপে রাজুর পথের দিকে চেয়ে রইল। সে এদিকেই আসছে। প্রায় ছুটতে ছুটতে সে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখে কেমন যেন ছমছম করে উঠল সেলিমের ভেতরটা। একখানা হাড় বার করা খটখটে মুখ। তার ওপর নাকটি এমন বেঁকে বসে আছে যে, দেখলেই মনে হবে মারামারির চিহ্ন। নাকের নীচে ঝোলানো গোঁফ! গায়ে একটা চেক চেক জামা। তার সঙ্গে পাজামা। সব দেখে যেকোনো মানুষেরই মনে একটা সন্দেহ সন্দেহ ভাব জেগে উঠবে। সেলিম অবশ্য প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও, তার মনের কথাটা সে বুঝতে দিল না কাউকে। নিজেও মুখে একটা হাসি হাসি ভাব এনে রাজুর মুখের দিকে তাকাল। রাজু মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‌বলিয়ে সাব!‌

—‌দো ভাঁড় চা বোলাও!‌ মালিক হুকুম করল।

রাজু নামে লোকটা চলে গেল। সেলিম মালিকের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, মালিক লোকটাকে তো ভালোই মনে হচ্ছে। অথচ রাজু নামে লোকটার চেহারা অমন বদখত কেন! তবে হ্যাঁ, মানুষের চেহারা দেখলেই তো আর মানুষের মতিগতি বোঝা যায় না। কার মধ্যে কী আছে সে আর কে হাত গুনে বলতে পারে!

সেলিম চেয়েই রইল মালিকের মুখের দিকে। যেমন আগে চেয়ে চেয়ে দেখছিল, তেমনি করেই দেখতে লাগল। মালিক মুখখানা ভারি মোলায়েম করে হাসছে। মালিকের হাসি দেখে সেলিমেরও ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটা সাহস এসে গেল। সে আর থাকতে পারল না, হট করে জিজ্ঞেস করে বসল, ‌আমি কি তাহলে আজ থেকেই কাজ করব?‌

—‌করবি, করবি, ওতো বেস্ত হচ্ছিস কেনো! থোড়া জিরিয়ে লে! চা-উ পিয়ে সোব কথা হোবে।‌ বলে মালিক সেলিমের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিলে। সেলিমের বুকটা যেন দু-হাত ফুলে উঠল।

‌আচ্ছা, সাঁচ বোল তো, ভোলানাথের মা তোর কোন আছে?‌ মালিক হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল।

সঙ্গে সঙ্গে সেলিমের ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেছে। তার মুখের ভয়টা পাছে মালিকের চোখে পড়ে যায়, তাই আগুপিছু আর কিছু না ভেবে সে বলে উঠল, ‌আমার মাসি।‌

‌অ।‌ বলে মালিক একটু চুপ করে রইল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, ‌তোর ঘোর কোতো দূরে?‌

—সেলিমের মুখে কে যেন ঝটপট উত্তর বসিয়ে দিল, ‌আমি তো এখন মাসির কাছেই আছি।‌

‌—তোর বাপ-মা?‌

সেলিম থমকে গেল। তারপর বলে ফেলল, ‌নেই।‌

মালিক জিভটা দাঁতে ঠেকিয়ে চুকচুক করে একটা আওয়াজ করল। যার মানে, আহা! তারপর গলাটা ভার ভার করে বলল, ‌বহুত আফশোস-কি বাত। ঠিক আছে। হামি তোর আচ্ছা বেওস্থা কোরে দিব। তু একদম বাচ্ছা আছিস। মোট-উট তু বইতে শিখবি না! আউর ওভি বহুত মেহনতের কাম আছে। আমি তোকে দুসরা কাম দিব।‌

সেলিমের ধড়ে যেন প্রাণ এল। যাক, এতক্ষণ সে যে এতগুলো মিথ্যে কথা বলল, লোকটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। তাই সেলিম আহ্লাদে আটখানা হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌কী কাজ?‌

কিন্তু মালিকের উত্তর দেবার আগেই রাজু দু-ভাঁড় চা দু-হাতে সামলাতে সামলাতে সেখানে হাজির হল। মালিক সেলিমকে বলল, ‌লে, পিয়ে লে?‌

সেলিম একটু দোনোমনো করল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌আমার?‌

মালিক হাসতে হাসতে বলল, ‌হাঁ রে বাবা। থোড়া পিয়ে লে।‌ সেলিম হাত বাড়িয়ে রাজুর হাত থেকে ভাঁড়টা নিল। সঙ্গে সঙ্গে তার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেল, মালিক লোকটা খুব ভালো। সেলিম চায়ে চুমুক দিল।

মালিক রাজুর হাত থেকে আরেকটা ভাঁড় নিজের হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‌তোকে যে কামটা দিব, একদোম সোহোজ কাম। হামার একটো সোনা-চাঁদির দোকান আছে। তু সে-দোকানে ফাইফরমাশ খাটবি। শেখবি তো?‌

রাজু বলল, ‌হ্যাঁ পারব।‌

—‌কুছু গোলমাল করবি না তো?‌

রাজু বলল, ‌আমাকে কাজটা দিয়েই দেখুন-না।‌

‌ঠিক হ্যায়।‌ বলে মালিক রাজুকে দেখিয়ে সেলিমকে বলল, ‌এই যো দেখছিস রাজুবাবুকে, হামার দোকানের ম্যানেজার। সব দেখাশুনা কোরে। এর কোথা তোকে শুনতে হবে। যা বলবে করবি।‌

সেলিম নিমেষে কেমন যেন মুষড়ে গেল। আবার একবার ভালো করে রাজুর মুখখানা দেখল। ভারি গম্ভীর সেই মুখ।

‌ইয়াদ রাখিস, সোকাল দোশটার সময় দোকান খুলা হোবে, তুই দোশটার সময় আসবি। সারাদিন কাম করবি। রাত্তির বেলা ঘোরে যাবি। রাজি?‌ বলে মালিক সেলিমের মুখের দিকে তাকাল।

সেলিম রাজুকে ভয় পেলেও কাজটা যে সে পেয়েছে, এই আনন্দেই তার মনের ভেতরটা লাফাচ্ছিল। সে ওই গরম চা-টা প্রায় গিলেই খেয়ে ফেলল। গালটা পুড়ল। কিন্তু উত্তেজনায় সে কিছু টেরই পেল না।

‌—তুই আজসেই শুরু কোরে দে।‌ মালিক বলল, ‌কুছু অসুবিধা হোবে না তো?‌

সেলিম জবাব দিল, ‌না না। অসুবিধা কেন হবে!‌

‌তবে এর সঙ্গে যা‌, বলে মালিক রাজুকে বলল, ‌লে যাও ইসকো।‌

রাজু সেলিমকে ডাক দিল, ‌আও!‌

সেলিম উঠে দাঁড়াল। চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ মালিক ফের জিজ্ঞেস করল, ‌হাঁ হাঁ। তোর নামটা যেন কী আছে?‌

সেলিমের বুকটা ভয়ে ধড়ফড় করে উঠেছে। ‌সে...‌ এইটুকু বলেই সেলিম থমকে গেল। আর একটু হলে মুখ ফসকে আবার তার আসল নামটাই বেরিয়ে পড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে সে উত্তর দিল, ‌শম্ভুনাথ।‌

‌হাঁ হাঁ, শম্ভুনাথ, বলে মালিক হুকুম করল, ‌ঠিক আছে, যা!‌

‌আরে শুন শুন!‌ আবার ডাকল মালিক।

সেলিমের যেতে যেতেও যাওয়া হল না। দাঁড়াল।

—‌তু নোকরি করবি, পয়সার কোথা তো কুছু হোলো না?‌

সেলিম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

‌কত লিবি বোল?‌ মালিক জিজ্ঞেস করল।

সেলিম বলল, ‌সে আমি আর কী বলব। আপনি যা দেবেন।‌

‌—ঠিক আছে। এখন এক-শো টাকা করে দিব। যদি কাম আচ্ছা করিস, পোরে আরও দিব।‌

খুশিতে ডগমগ করতে করতে সেলিম রাজুর সঙ্গে চলে গেল।

দোকানটা বড়ো। ঠুকঠাক শব্দ। স্যাকরার ঠুকঠাক। পাঁচ জন লোক সোনা-চাঁদির গয়না গড়ছে। অন্য এক জন লোক খদ্দেরের সঙ্গে দর কষাকষি করছে। শো-কেসে চোখ-জুড়োনো সব গয়না সাজানো। সেলিমের তো দেখেই চক্ষু ছানাবড়া!

রাজুর সঙ্গে সেলিম দোকানে ঢুকতেই যা হয়, সবাই একেবারে হুমড়ে পড়ে তাকে দেখতে লাগল। রাজু সবাইকে পরিচয় করাল। বলল, ‌এ শম্ভুনাথ আছে। আজ থেকে দোকানে কাম করবে।‌

এরই মধ্যে একজন বলল, ‌যাক ভালো হল। একজন লোকের তো দরকার ছিলই।‌

‌তবে ছেলেটার বয়স কম‌, আরেক জন বলল।

‌কী নাম বললে যেন?‌ অন্য আর একজন জিজ্ঞেস করল।

‌শম্ভুনাথ।‌ সেলিম নিজেই উত্তর দিল।

মালিকের সোনা-চাঁদির দোকানে সেলিম শম্ভুনাথ ছদ্মনামে সারাদিন কাজ করল। এটা-ওটা ফাইফরমাশ খাটল। কাউকে জল দিল। কারও জন্যে চা আনল। যাক তবু রক্ষে, শম্ভুনাথ নামটা সে ঠিকঠাক খেয়াল রেখেছে। যখনই কেউ শম্ভুনাথ বলে ডেকেছে, সেলিমের সাড়া দিতে একটুও ভুলচুক হয়নি। সে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিয়েছে, ‌যাই হুজুর।‌ তবে একটা কথা, মাঝে মাঝে সোনা-চাঁদির ঝলমলানি দেখে তার অবশ্য চোখ ঝলসে যাচ্ছিল। তা যাক। তাই বলে যে সেলিম হ্যাংলার মতো সেইদিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বসেছিল, তা যেন কেউ মনে ভেবো না।

সারাদিন নির্ঝঞ্ঝাটে কাজ করল সেলিম। তারপর যখন ছুটি পেল, মালিকের সঙ্গে দেখা করতে ভুলল না। দেখা করে ঘরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে রাজ্যের গল্প করল সেলিম। মা শুধু বার বার একটি কথা মনে করিয়ে দিলেন, ‌যাই করো আর তাই করো বাবা, খেয়াল রাখিস তুই আর সেলিম নোস, তুই শম্ভু, শম্ভুনাথ।‌

সেলিম বলল, ‌সে আর বলতে! আমি আজ এক বারের জন্যেও এ কথাটা ভুলে যাইনি। আর ভুলবও না। তোমাকেও একটা কথা বলি, আজ থেকে তুমিও আমায় আর সেলিম বলে ডেকো না। তোমার হারিয়ে যাওয়া ছেলে ভোলানাথের মতো আজ থেকে আমিও শম্ভুনাথ।‌

সেলিম ক-দিন পরে সত্যিই তার আসল নামটা ভুলে গিয়ে শম্ভুনাথ হয়ে গেল। একদিনের জন্যেও তার মুখ ফসকাল না। ভারি খুশিমনে কাজ করতে লাগল সেলিম। তার কাজের তারিফও করতে লাগল মালিক।

কিন্তু একদিন ঘটে গেল সেই ভয়ংকর কান্ডটা। সেদিনও দোকানে কত ক্রেতা আসছে। সেলিমও তাদের ‌আসুন আসুন‌ বলে খাতির করে ডাকছে। তারা মনের মতো গয়নাগুলি পরখ করছে, কেনাকাটা করছে। কাজ শেষ হলে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সেলিম দেখল, একজন ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে এটা-ওটা দেখছে, নাড়ছে, একটা ছেড়ে অন্য আরেকটা দেখাতে বলছে। ভদ্রলোকটিকে দেখতেও যেমন, তার পোশাক-পরিচ্ছদও তেমন। টকটকে গায়ের রং, ইয়া লম্বা-চওড়া চেহারা, টিকোলো নাক, আর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে যেন। দেখলেই মনে হয়, কত ব্যস্ত ভদ্রলোক। দু-এক বার তার চোখের দৃষ্টি সেলিমের মুখের ওপর যে পড়েনি, তেমন না। তবে সে-দৃষ্টি এমন কিছু নয়। যেন দেখার জন্যে দেখা। হেন জিনিস নেই, ভদ্রলোক দেখছে না। ধরো সেই ছোট্ট একটা আংটি থেকে শুরু করে একটা দামি হিরে-বসানো হার পর্যন্ত। ঠিক বটে, ওই হিরে-বসানো হারটা দেখে সেলিমেরও চোখ ঝলসে উঠছিল। এতদিন সে এই দোকানে কাজ করছে, কিন্তু এই হিরের হারটা তো সে কোনোদিন দেখেনি। দেখবেই-বা কেমন করে! এ তো আর বাইরে থাকে না। সিন্দুকে বন্ধ থাকে। হয়তো সিন্দুকে আরও কত কী আছে! দামি দামি আরও কত গয়না। আরও কত মণি-মুক্তো। সত্যি, এসব যারা কেনে তারা না-জানি কত বড়োলোক! কত তাদের পয়সা! এই ভদ্রলোকটিকেও দেখে মনে হচ্ছে এরও অনেক পয়সা। এমন ধোপদুরস্ত মানুষের অনেক পয়সা না থেকে পারে!

সেলিম অবাক হয়ে গেল একটা ব্যাপার দেখে। ভদ্রলোক এত ঘাঁটাঘাঁটি করল বটে, কিন্তু কিনল না কিছুই। এমন ভাব করছে যেন পছন্দ হচ্ছে না কোনোটাই। কিন্তু সেলিমের কাছাকাছি এসে হঠাৎ এমন একটা হোঁচট খেয়ে গেল ভদ্রলোক যে, একেবারে সেলিমের ঘাড়ের ওপর ধপাস! অত বড়ো একটা মানুষ ঘাড়ে পড়লে সেলিম টাল সামলাবে কেমন করে! দু-জনেই দোকানের ভেতর চিতপটাং!

ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে ভদ্রলোক ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। নিজের পোশাকের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‌পা-টা এমন হড়কে গেল!‌

সেলিমও অবিশ্যি ততক্ষণে উঠে পড়েছে। ভদ্রলোক মুখখানা কাঁচুমাচু করে সেলিমকে জিজ্ঞেস করল, ‌লেগেছে নাকি ভাই?‌

সেলিমের জামাতে একটু-আধটু ধুলো লেগেছিল। ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‌না না, তেমন কিছু নয়।‌

ভদ্রতা করে একথা তো বলতেই হয়! কিন্তু সেলিম আঘাতের ব্যথাটা হাড়ে হাড়ে মালুম পাচ্ছে।

‌কিছু মনে কোরো না ভাই,‌ বলে ভদ্রলোক ঝটপট দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

যাক গে, ভদ্রলোক তো আর ইচ্ছে করে সেলিমের ঘাড়ে পড়েনি। এমন ঘটনা হতেই পারে। আর হচ্ছেও তো আকছার। তবে হ্যাঁ, হাত-পা ভাঙলেই বিপদ! সুতরাং দোকানের আর সকলে সেলিমের দিকে চেয়ে মুচকি হাসল বটে, তবে সেলিম আর কিছু না ভেবে নিজের কাজে মন দিল।

কাজ করতে করতে হঠাৎ যেন সেলিম থমকে যায়! তার বুকপকেটে কী যেন একটা খসখস করছে! না, সে তো পকেটে কিছু রাখেনি। ঝট করে পকেটে হাত পুরে দিল। এ কী!

একটা দলা-পাকানো কাগজ! কী আছে কাগজে! তাড়াতাড়ি খুলে ফেলল কাগজের দলাটা। কী যেন সব লেখা কাগজটার গায়ে। সেলিম তেমন লেখাপড়া শেখেনি ঠিকই, তবে তাকে একেবারে মুখ্যু বলতে পারো না তুমি। একটু-আধটু হলেও সে পড়তে পারে। দোকানঘরের একটা আলমারির আড়ালে দাঁড়িয়ে লেখাটা পড়তে লাগল সেলিম। তাতে লেখা:

আমি এই দোকানে কিছুই কিনতে আসিনি। আমি তোর খোঁজ নিতে এসেছিলুম মাত্র। ভাবিস না আমি সত্যিই বুঝি পা ফসকে তোর ঘাড়ে পড়েছি। এই কাগজটা তোর পকেটে ঢুকিয়ে দেবার জন্যে আমার পা ইচ্ছে করেই ফসকানো। আমি জানি, তুই নিজের নাম ভাঁড়িয়ে শম্ভুনাথ হয়েছিস। তোর আসল নাম সেলিম। মিথ্যে নামে তুই এখানে কাজ করছিস। তোর দোকানের মালিক যদি একথাটা জানতে পারে, তবে তোর আর নিস্তার নেই। তোকে কেটে ফেলবে। আর আমি ইচ্ছে করলেই এই কথাটা মালিকের কানে তুলে দিতে পারি। কিন্তু তা আমি দেব না। তোর কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছেও আমার নেই। তবে কিন্তু তোকে আমার হয়ে একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজটা তোর পক্ষে করাও এমন কিছু শক্ত নয়। এইমাত্র আমি যে হিরের হারটা দেখছিলুম, ওটা তোকে সিন্দুক থেকে যেমন করে হোক সরাতে হবে। সরিয়ে আমার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অবশ্য এর জন্যে তোকে আমি অনেক বকশিশ দেব। আর তা যদি না করিস, তোর মালিককে আমি সব বলে দেব। বলে দেব ভোলানাথের মা তোর কেউ নয়। তোর বাবার নাম হাসান। তারপরেও যদি মালিক তোকে কিছু না বলে, তখন আমি আছি। আমার হাতে তুই নিস্তার পাবি না। কাজটা করার জন্যে তোকে আমি একটা দিন সময় দিলুম। যখনই সিন্দুকটা খোলা দেখবি, তখনই তক্কে তক্কে হাতসাফাই করতে হবে তোকে। আমি কাল রাত বারোটার সময় শহরের ব্রিজের ওপর তোর জন্যে অপেক্ষা করব। গির্জার ঘণ্টায় রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তোর দেখা যেন পাই। হার যদি না-ও পাস, তবুও আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে তোকে। সাবধান, কেউ যেন জানতে না পারে। কাউকে যদি বলিস তবে বুঝতেই পারছিস, আমিও তোকে ছেড়ে দেব না। সুতরাং আবার বলি, বাঁচতে যদি চাস, সাবধান!

সেলিমের মাথায় যেন বাজ পড়ল। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করে দিল সেলিম। এখন সে কী করবে! সব কেমন যেন ধন্দ লেগে যাচ্ছে তার। কখনো ভাবছে এখনই সে এখান থেকে পালায়। আবার কখনো ভাবছে পালিয়েই-বা সে কোথায় যাবে! সেলিম বুঝতে পেরেছে, লোকটা তার নাড়িনক্ষত্র সব জানে। পালালেও তার নিস্তার নেই। কী ভয়ংকর বিপদ তার! সেলিমের যেন কান্না পাচ্ছিল।

ঠিক এই সময়েই আবার মালিক এসে পড়ল দোকানে। সেলিম তাকে দেখে থতোমতো খেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি হাতের কাগজটা জামার পকেটে লুকিয়ে ফেলে ফ্যালফ্যাল করে মালিকের মুখের দিকে চেয়ে রইল। মালিক সেলিমকে দেখে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‌শম্ভুনাথ, কাম ঠিকঠাক হচ্ছে তো?‌

সেলিম গলায় ঢোক গিলতে গিলতে বলল, ‌হচ্ছে।‌

‌তোর পয়সা-উইসার জরুরত হলে হামাকে বলবি।‌ বলে মালিক সেলিমের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। বোঝা গেল, সেলিমের কাজে মালিক খুব খুশি।

কিন্তু সেলিম বুঝতে পারল না মালিককে কী বলবে। তাই কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে।

আর পয়সা! এখন সে কেমন করে এই বিপদ থেকে নিস্তার পাবে সেই কথাটা ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে উঠছে। তার মনের কথাটা মালিক যদি বুঝতে পারে। এক্ষুনি যদি জিজ্ঞেস করে বসে কিছু!

না, মালিক জিজ্ঞেস করল না কিছু। মালিক তার সামনে থেকে চলে গেল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সেলিম। কিন্তু এখন? কী করবে? কেমন করে বাঁচবে সে! সে কি সত্যিই সিন্দুকের ভেতর থেকে হারটা চুরি করবে! একথা সে ভাবতেই পারে না। প্রথমে সেলিম যাই-ই ভেবে থাকুক, এখন সে জানে, মালিক লোকটা মোটেই খারাপ নয়। আর রাজু লোকটাকেও দেখতে অমন হলে কী হবে, খুব ভালো। এখন সেলিমই মিথ্যে নাম ভাঁড়িয়ে এইসব মানুষকে ঠকিয়েছে। তার যে বরাতে এখন কী আছে, সেকথা কে বলতে পারে! তার ওপর ওই হারটা সিন্দুকের ভেতর থেকে হাতড়ানো, সে-ও কি সহজ কাজ! সিন্দুকের চাবি সবসময় ম্যানেজার নিজের কাছে কাছে রাখে। দোকানেও সবসময় লোক। ইচ্ছে করলেই তো আর চুরি করা যায় না। না, না, সেলিম চুরির কথা একদম ভাবতে পারে না। কিন্তু চুরি না করলেও তার বিপদ। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে সেলিম। ভাবতে ভাবতে এমন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে, এক কথা শুনতে অন্য কথা শুনছে। এটা আনতে বললে, অন্যটা নিয়ে আসছে। কিছুই যেন তার কানে ঢুকছে না। তার চোখের সামনে বারে বারে চমকে উঠছে সেই লোকটার মুখখানা। অমন ভদ্র দেখতে অথচ কী বদবুদ্ধি! কী ভয়ংকর! সেলিম ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফ্যালে যেন! বল, কত কষ্ট করে সে এমন একটা কাজ পেল, সে-ও তার বরাতে সইল না। তাকে একাজ ছেড়ে পালাতে হবে। এই দোকানে আজই বোধ হয় তার শেষ দিন। কিন্তু পালিয়ে সে যাবে কোথায়! ওই কাগজটা পড়লে কে-না বুঝতে পারে সেলিমের হাঁড়ির খবর লোকটার জানা আছে। অথচ সেলিম লোকটাকে চেনেই না। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না কে লোকটা! শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারছে না কোথায় তাকে দেখেছে!

আতঙ্কে নাজেহাল হয়ে সেলিম ঘরে পৌঁছোল। পৌঁছোল ভোলানাথের মায়ের সেই ঝুপড়িতে।

‌কী রে সেলিম, ছুটি হয়ে গেল?‌ ঘরে ঢুকতেই মা খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিমের মুখে কথা ফুটল না।

সেলিমের মুখের চেহারা দেখে কেমন যেন মনে হল তাঁর। অমন হাসি-খুশি ছেলেটার হঠাৎ কী হল! মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‌বাবা সেলিম, শরীর ভালো নেই?‌

সেলিমের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। মা অবাক হলেন। ছেলেটা কাঁদে কেন? অস্থির গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‌কী হয়েছে রে তোর?‌

‌আমি বিপদে পড়েছি মা,‌ বলে সেলিম চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল।

‌কীসের বিপদ রে? অ্যাঁ, তুই কি তোর আসল নামটা বলে ফেলেছিস?‌ মা উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

‌না মা। সেসব কিছু নয়। আমাকে একজন অচেনা লোক ওই মালিকের দোকান থেকে একটা হার চুরি করতে বলেছে। বলেছে চুরি করে তাকে পৌঁছে না দিলে সে মালিককে বলে দেবে আমি শম্ভু নই, সেলিম।‌

উদবিগ্ন মা কী ভীষণ ভয় পেলেন। উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‌লোকটা কে?‌

‌আমি চিনি না,। জবাব দিল সেলিম।

‌—তোকে সে চিনল কী করে?‌

‌—তা-ও জানি না।‌

—‌এখন?‌

‌আমিও ভেবে পাচ্ছি না কিছুই। এই দ্যাখো এই কাগজটায় সে লিখেছে, এই কথাটা ফাঁস করে দিলে আমাকে মেরে ফেলবে।‌ বলে সেলিম তার পকেট থেকে সেই দলা-পাকানো কাগজটা বার করে মা-কে দেখাল।

মা কাগজটা হাতে নিলেন। একটা ভয়ের উত্তেজনায় তিনি যেন হাঁপাতে লাগলেন। কী করবেন এখন, সেই ভাবনায় অস্থির হয়ে তিনি ছটফট করতে লাগলেন। ভাবলেন, হায় রে, এই ছেলেটাও বুঝি শেষ হয়ে যায়!

‌কী ভাবছ মা?‌ ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল সেলিম।

মা বললেন, ‌ভাবছি তোকে নিয়ে পালাব।‌

‌—কোথায়?‌

‌—যেখানে হোক।‌

‌—আমি আর মালিকের দোকানে কাজ করব না?‌

‌ও-কাজ তোকে ছাড়তে হবে। নইলে তুই মরবি।‌ বলে তিনি সেলিমের মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর চোখও ছলছল করে উঠল। তারপর তিনি আবার বললেন, ‌দ্যাখ, আমি মরে গেলে কারাও ক্ষতি হবে না। কিন্তু তুই এখন ছোটো। এই পৃথিবীতে তোকে এখন অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে। তোরা বাঁচলেই পৃথিবী বাঁচবে, সুন্দর হবে। আমরা সব স্বার্থপর, পাপী। আমরা কারাও ভালো করতে পারি না, কিন্তু আমাদের যে ভালো করে তারই আমরা ক্ষতি করি। আমরা নিজেরা বাঁচব বলে অন্যকে মারতে চাই। বুঝতে পারছিস না, এবার তোর পালা! ওরে সেলিম তোকে নিয়ে এখান থেকে আমাকে পালাতেই হবে।‌

সেলিম ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌পালালে আমাদের চলবে কী করে? তোমাকে খেতে দেব কেমন করে?‌

‌সেলিম আমার কাছে যা আছে, ক-টা দিন তো চলে যাবে। তার পরের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন তোকে বাঁচানোই আমার একমাত্র কাজ। তোকে বাঁচতে হবে সেলিম, তোর আম্মা আর আব্বার জন্যে। তাঁদের খুঁজে বার করবি তুই। তাঁদের দুঃখ ঘোচাবি। তোকে তাঁদের কাছে পৌঁছে দিলেই তবে আমার ছুটি। আয়, আজ রাতেই আমরা এখান থেকে চলে যাব।‌

‌তোমার এই ঘর?‌ জিজ্ঞেস করল সেলিম।

‌এ কী আর আমার? ভোলানাথকে নিয়ে মাথা গুঁজব বলে পথের ধারে একটু ঠাঁই করে নিয়েছিলুম। কবে বলতে কবে বাবুরা ভেঙে দেবে, কে বলতে পারে! বাবা সেলিম, তুই যখন আছিস, আমার বিশ্বাস ফের ঘর হবে আমাদের। আমাদের দুঃখ ঘুচবে।‌

মায়ের কথা শুনে নির্বাক হয়ে গেল সেলিম। মনে মনে ভাবল, আহা রে, সব মানুষই যদি ভোলানাথের মায়ের মতো হয়! এমনই সদয় মানুষ!

হ্যাঁ সত্যিই সেদিন গভীর রাতে নিজের আস্তানা ছেড়ে সেলিমের হাত ধরে পথে বেরিয়ে পড়লেন ভোলানাথের মা। দু-একটা যা ঘটি-বাটি সম্বল ছিল সেগুলো সব পোঁটলায় বেঁধে সেলিম কাঁধে নিল। তারপর অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলল অন্ধকার রাতে। কিন্তু তারা খেয়াল করল না আকাশে তখন ছিটেফোঁটা মেঘ জমেছে, তারা হাঁটতেই থাকল। কোথায় যাচ্ছে তারা জানে না। কপালেও যে কী আছে, সে-ও তাদের জানা নেই। শুধু এগিয়ে যেতে হবে। এক বৃদ্ধা এক কিশোরের হাত ধরে এগিয়ে চলেছেন। সেলিমকে বাঁচাতে হবে। তাকে অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছে দিতে হবে। মায়ের মন, সে কি জাত মানে না ধর্ম?

হঠাৎই সেলিম কথা বলল অনেকক্ষণ হাঁটার পর। তার মাকে জিজ্ঞেস করল, ‌কোথায় যাব আমাদের ঠিক নেই যখন, চলো-না আমরা সেই দুধসাদা পাখির দেশে যাই!‌

তিনি বললেন, ‌সে-পথ তো আমি চিনি না।‌

সেলিম উত্তর দিল, ‌আমার আম্মার জানা ছিল, সেই পথ কোন দিকে।‌

তিনি বললেন, ‌তাহলে আগে তাঁদেরই খুঁজতে হবে আমাদের।‌

সেলিম হতাশ স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‌এই পথে কি তাদের খুঁজে পাব?‌

‌এই পথে না পেলে অন্য পথে যাব।‌ মা জবাব দিলেন।

সুতরাং তারা হাঁটতেই লাগল। হাঁটতে হাঁটতে কত খানাখন্দ পেরোল তারা। কত পথ পেছনে ফেলে এল। নিস্তব্ধ রাতের বাতাসে তাদের ক্লান্তির নিশ্বাস কত-না ছড়িয়ে পড়ল। তবু তখনও সকাল এল না। কিন্তু আকাশ মেঘে মেঘে ঢেকে গেল। সেলিম ভাবে, কষ্ট হোক, তবু সকাল যেন আরও একটু দেরিতে আসে। আরও অনেকটা পথ তাদের যেতে হবে। যেতে হবে সেইখানে, যেখানে গেলে সেই লোকটা সেলিমকে আর কোনোদিনই খুঁজে পাবে না। আর কোনোদিনই তাকে বলবে না, সেই হিরে-বসানো হারটা চুরি করতে। সে ভেবে ভেবে অবাক হয়ে যায়। সত্যিই তো ওই লোকটা কে? সেলিমকে কেমন করে চিনল সে। কোথা থেকে যেন কী হয়ে গেল। সেলিম ভাবে এত কান্ড কিছুই হত না, যদি সে আম্মা আর আব্বার কথা শুনত। ছি ছি! নিজেকে নিজেই ধিক্কার দেয় সেলিম মনে মনে। আর ভাবে, যেমন করেই হোক তাদের সে খুঁজে বার করবে। যে-পথে গেলে তাদের দেখা পাবে সেই পথেই যাবে।

দেখতে দেখতে মেঘে ঢাকা আকাশে আলো ফুটছে। মা আকাশের দিকে তাকালেন। সেলিমও চোখ মেলল। মা বললেন, ‌মেঘ করেছে, বৃষ্টি হবে।‌

সেলিম জিজ্ঞেস করল, ‌তা হলে তখন কী হবে?‌

‌কোথাও আশ্রয় নিতে হবে আমাদের।‌ ‌এখন আমরা এ কোথায় এসেছি?‌ জিজ্ঞেস করল সেলিম। মা উত্তর দিলেন, ‌আমিও জানি না।‌

তবে ভোরের আলো ওই মেঘ ডিঙিয়ে আর একটু ফুটতেই স্পষ্ট মনে হল এটা একটা শহর জনপদ। একটু পরেই শহর জমজমাট হয়ে উঠবে তখন কিন্তু সবাই দেখে ফেলবে তাদের। তবে অবশ্য বাঁচোয়া এই যে, শহরে কেউ কারও জন্যে মাথা ঘামায় না। সুতরাং সেলিম আর মাকে নিয়ে কেউ কোনো সন্দেহও করবে না। কেউ জিজ্ঞেসও করবে না কোথা থেকে এল তারা, কোথায় যাবে! শহরের লোক এতসব জমা-খরচ নিয়ে হিসেব কষতে বসে না। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, ওরা নিজেরাই হাঁটতে হাঁটতে বেহাল হয়ে পড়েছে অথচ থামতে পারছে না। থেমেই-বা করবে কী! কোথায় থাকবে, কোথায় খাবে কিছুরই তো ঠিকঠিকানা নেই। সুতরাং তারা আরও একটু কষ্ট করে খানিক হাঁটল। এমনই সময়ে হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকাল। চমকে দাঁড়ালেন মা। সেলিম থমকে তাকাল আকাশের দিকে।

ঝড় উঠল। হঠাৎ উঠে তুলকালাম লাগিয়ে দিলে। বাড়িগুলোর গায়ে গায়ে ঝাপটা মেরে বাতাস হুংকার ছাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে এলোমেলো এদিক-ওদিকে। আকাশে উড়তে উড়তে কাকগুলো যে কোন দিক বলতে কোন দিকে ছুটছে, নিজেরাই বুঝতে পারছে না। নিমেষে ধুলোতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল চারদিক। বাজ পড়ল। দুর্যোগ ঘনিয়ে এল।

সেলিম বলল, ‌মা, এখানে কোথাও একটু দাঁড়ালে হয় না?‌

মা বললেন, ‌আর একটু কষ্ট কর বাছা। এখানে না দাঁড়ানোই ভালো।‌ সুতরাং সেলিম আর কথা বাড়াল না। কিন্তু তাদের আর যাওয়াও হল না বেশি দূর। কেননা, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। তবুও তারা থামল না। জোরে জোরে পা ফেলল।

কিন্তু এবার সেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি মেঘ ভেঙে ঝমঝম করে নেমে এল।

মা বললেন, ‌আর হাঁটা যাবে না।‌

সেলিম বলল, ‌ঠিক বলেছ। এসো ওই সামনের বাড়িটার বারান্দার নীচে দাঁড়াই।‌

দাঁড়াল তারা। ভিজে গেছে খানিকটা। দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই মুষলধারে বৃষ্টি! রাস্তার লোকজন সব যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। দোকান পসরার ঝাঁপ পড়ছে। নিমেষের মধ্যে তুলকালাম কান্ড! যেমন বৃষ্টি, তেমনি ঝড়। একটা টিনের চাল উড়তে উড়তে পড়বি তো পড় একেবারে রাস্তার মধ্যিখানে। কারও ঘাড়ে যদি পড়ত, আর দেখতে হত না! রাস্তায় জল দাঁড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে একটু একটু করে। জলের সঙ্গে ঝড়ের ঝাপটাও বাড়ছে শোঁ শোঁ শব্দে। সেলিম আর মা-ও পারছেন না দাঁড়াতে। জল বাড়ছে, ওরাও এক-পা দু-পা করে পিছু হটছে। সামনে-দূরে ঘরের দরজা-জানলা দুমদাম পড়ছে, বন্ধ হচ্ছে। অবশ্য বারান্দার নীচে এবাড়ির দরজাটা এখনও খোলা। আর থাকতে না পেরে সেলিম দরজা ডিঙিয়ে ঢুকে পড়ল, মা-ও ঢুকলেন। বাড়ির দোরগোড়ায় আশ্রয় নিলেন। ফিরে ফিরে সেলিম উঁকি দেয়। কে আছে বাড়ির ভেতর? ভেতরটা বেশ বড়ো। অথচ জনমানুষ দেখা যাচ্ছে না। কেউ না থাকলেই ভালো। নিশ্চিন্তে খানিকক্ষণ দাঁড়ানো যায়।

দু-জনেই ভয়ে কুঁকড়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল তার দিকে

ঠিক বটে, এখন দু-জনেই বৃষ্টির হাত থেকে বেঁচেছে। কিন্তু ভয়ের হাত থেকে তো আর নিস্তার পায়নি। তা ছাড়া এমনি করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাও তো কম কষ্টের নয়। এখন কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কে জানে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, বৃষ্টিও সহজে ছাড়ছে না। কী ঝমঝমানি!

সেলিম বোধ হয় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সত্যি বলতে কী, সারারাত হেঁটে এখন ভীষণ ক্লান্তি লাগছে তার। এখন একটু বসতে পেলেই সেলিম বাঁচে যেন। তাই সে বলল, ‌মা, এসো, এখানে একটু বসি।‌ বলে সে নিজেই বসে পড়ল সেই দোরের গোড়ায়।

মা বললেন, ‌কেউ কিছু যদি বলে?‌

সেলিম উত্তর দিল, ‌আমরা দুর্যোগে পড়েছি। এখন তো উপায় নেই আমাদের। কেউ যদি বলে, চলে যাব।‌

মা-ও যেন পারছিলেন না আর। তিনি বসলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‌যদি বৃষ্টি না থামে আজ?‌ মা বসতেই সেলিম জিজ্ঞেস করল।

মা বললেন, ‌কী জানি, কী হয়!

সেলিম বলল, ‌এখন ক-টা বাজল তাও তো জানতে পারছি না।‌ বলতে বলতে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।

মা উত্তর দিলেন, ‌না, বোঝা যাচ্ছে না। আকাশটা মেঘে একেবারে ঢেকে গেছে।‌

সেলিম আকাশটা উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল। বারান্দার ফাঁক দিয়ে দেখতেও পেল। তারপর হতাশায় একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, ‌না:।‌ তারপর চুপ করে গেল।

অনেকক্ষণ কারও যেন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। বসে বসে ঝিমুনি আসছিল সেলিমের। মাঝে মাঝে চোখের পাতা বুজে আসছিল। শেষে আর থাকতে পারল না। সেই দরজার ফাঁকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম তো আর ছোটো-বড়ো কারও ধার ধারে না। তাই আকাশটা দেখতে দেখতে মায়েরও হাই উঠতে লাগল। তিনিও ক্লান্ত। সেলিমের পাশেই একটু জায়গা করে শুয়ে পড়লেন। তারপর আর কিছুই জানতে পারলেন না।

অনেকক্ষণ পর হঠাৎ দু-জনেরই একসঙ্গে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দু-জনেই ধড়ফড় করে উঠে পড়েছিল। দু-জনেই একসঙ্গে শুনতে পেয়েছিল একজন মানুষের ডাকাডাকি। দেখতে পেয়েছিল একজন বৃদ্ধ মানুষকে। দু-জনেই ভয়ে কুঁকড়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল তাঁর দিকে।

‌এটা কি শোবার জায়গা?‌ বৃদ্ধ ধমকে উঠলেন। সেলিমকে বললেন, ‌আমাকে ডাকতে পারিসনি? ওঠ।‌

তারা কথা বলতে পারল না। যেমন করে তাকিয়ে ছিল, তেমনই জড়োসড়ো হয়ে চেয়েই রইল।

‌ওঠ ওঠ!‌ সেই বৃদ্ধ মানুষটি আবার হাঁক পাড়লেন।

এবার দু-জনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনও বৃষ্টি পড়ছে। মুষলধারে আগের মতোই। এখন রাস্তাঘাটে আরও বেশি জল থইথই করছে। এই আশ্রয় থেকে ওই রাস্তায় নামলে দেখতে দেখতে ভিজে ঢোল হয়ে যাবে। অথচ তাদের এখন রাস্তায় না নেমে উপায় নেই। সুতরাং সেলিম সেই পোঁটলাটা কাঁধে নিয়ে মাকে অস্ফুটস্বরে বলল, ‌চলো।‌

‌কোথায় যাবি?‌ বৃদ্ধ মানুষটি জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিম বা মা কেউ-ই উত্তর দিতে পারল না। দু-জনেই দরজা পেরিয়ে বাইরে পা রাখল।

‌আরে এই ছেলে, এই ঝড়-জলে মাকে নিয়ে কোথায় যাবি?‌ তিনি যেন বাধা দিলেন।

সেলিম আর মা দু-জনেই মুখ ফিরিয়ে সেই বৃদ্ধ মানুষটির দিকে তাকাল। মানুষটির মুখে আলতো হাসি ছুঁয়ে আছে। শিহরন লাগল সেলিমের। মা মাথা হেঁট করলেন। সেলিম অবাক হয়ে তাঁকে দেখতে লাগল। বয়স হয়েছে হয়তো অনেক, কিন্তু সুঠাম দেহ। মাথার চুলে পাক ধরেছে। গাল-ভরতি দাড়ি। সেলিমের তাঁকে দেখে যেন মনে হল, লোকটা কি তবে ভালো!

সেলিমকে তিনি আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, ‌মা বুঝি?‌ মা চমকে তাঁর দিকে তাকাতেই সেলিম বলে ফেলল, ‌হ্যাঁ।‌

‌তা তোরা আমাকে ডাকতে পারিসনি?‌ কেমন যেন নরম সুরে কথাগুলো তিনি বলে ফেললেন। বলে একটু থামলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‌তোর নাম কী?‌

সেলিম আবার থতোমতো খেয়ে গেল। মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তারপর তার যে কী মনে হল, নিজের আসল নামটাই সে বলে দিল, ‌সেলিম।‌

‌ও! তাহলে তোরা আমাদেরই জাত।‌ বলে বৃদ্ধ ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‌এই ঝড়-বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া চলবে না। আয় ভেতরে আয়!‌

সেলিম আবার দেখল মাকে।

বৃদ্ধ বললেন, ‌অমন করে মাকে দেখতে হবে না। এই দুর্যোগে তো আর যাওয়া চলবে না। আয় আমার সঙ্গে।‌ বলে তিনি ডাক দিলেন।

কিছুটা ইতস্তত করল তারা দু-জনেই। কিন্তু বৃদ্ধ আর এক বার বলতেই দু-জনাই বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল।

বাড়িটা খুব বড়ো না হলেও বেশ বড়ো। সামনে একটা মস্ত উঠোন। উঠোনের চারদিকে গাছগাছালি। বৃষ্টির একটানা ঝমঝমানিতে মনে হচ্ছে গাছগুলো যেন সব লক্ষ্মী ছেলের মতো মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে।

ওই বৃষ্টির একটানা শব্দ ছাড়া বাড়ির ভেতর থেকে আর কারও সাড়া তারা শুনতে পাচ্ছিল না। আরও ক-পা যেতেই একটা ঘরের দরজা ঠেলে বৃদ্ধ বললেন, ‌এখানে বোস তোরা। ঘুমোতে হয় তো এখানেই মায়ে-ছেলেতে শুয়ে পড়।‌

ঘরের দরজাটা খুলে যেতেই দেখা গেল ঘর-ভরতি জামা এদিকে-ওদিকে টাঙানো। জামা তৈরির নানান ছিট কাপড় ডাঁই করা। ঘরের মেঝের একপাশে মস্তবড়ো একটা শতরঞ্জি বিছানো। তার ওপর জরির বাণ্ডিল। আর জরির কাজ-করা একটা জামা আধখ্যাঁচড়া হয়ে পড়ে আছে। এপাশে-ওপাশে কতগুলো বসবার টুল আর দেওয়াল ঘেঁষে একটা তক্তাপোশ—বিছানা পাতা।

বৃদ্ধ বললেন, ‌এটা আমার কারখানা।‌

সেলিম কী বুঝল জানি না। কিন্তু মা বুঝলেন, লোকটি বোধ হয় জামা তৈরি করেন।

—‌ভেতরে আয়, বোস!‌ তিনি ওই তক্তাপোশটায় বসতে বললেন।

সেলিমের বুক দুরুদুরু করতে লাগল। মায়ের মুখে ভাবনার রেখা উঁকি দিল। তারা দু-জনেই বসতে দোনামোনা করছিল। তার ওপর নিজেদের কাপড়-জামারও যা দুরবস্থা।

কিন্তু বৃদ্ধ আবার বললেন, ‌আরে বাবা কিচ্ছু হবে না, বোস‌!‌

সেলিম আর মা বসে পড়লেন সেই খাটের ওপর। বসে বসে বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন আর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন।

বৃদ্ধ বললেন, ‌আকাশ যেরকম খেপেছে, সহজে ঠাণ্ডা হবে বলে মনে হয় না।‌ বলতে বলতে বৃদ্ধ একটা ঘরের জানলা খোলবার জন্যে ছিটকিনি টানলেন। তিনি ধরতে-না-ধরতেই জানলার পাল্লা দুটো ঝড়ের ঝাপটায় দুমদাম করে খুলে গেল। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‌এই সেরেছে!‌ বলে পাল্লা দুটো আবার খুব জোরে ঠেলে ধরলেন। প্রায় কুস্তি করেই ছিটকিনিটা এঁটে দিলেন। কিন্তু এতক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে, ঘরের ভেতর একঝাপটা বৃষ্টির ছাঁট ঢুকে একাকার করে চলে গেল। তারপর তিনি বললেন, ‌আজ আর বোধ হয় কেউ আসবে না।‌

কারা আসবে না, কাদের কথা তিনি বলছেন, সেলিম সেকথাটা বুঝতে পারল না। কিন্তু দেখতে পেল সেই বৃদ্ধ শতরঞ্জির ওপর বসলেন। বসে সেই আধখ্যাঁচড়া জরির কাজ-করা জামাটা হাতে নিলেন। চোখের চশমাটা নাকের ডগায় একটু নামিয়ে জরির কাজ করতে লাগলেন।

সেলিম এতক্ষণে বুঝতে পারল লোকটি ওস্তাগর।

তিনি বললেন, ‌এটা কারখানা, আর আমার দোকান হল বাজারের কাছে। এখানে জামা সেলাই হয়, দোকানে বিক্রি হয়।‌ তারপর একটু চুপ করে জামায় দু-চারটে ফোঁড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‌তোরা কোথায় থাকিস?‌ বলে চশমার ফাঁক দিয়ে তিনি সেলিমের মুখের দিকে তাকালেন।

সেলিম থতোমতো খেয়ে গেল। কী বলবে বুঝতে না পেরে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মা চট করে বলে উঠলেন, ‌আমাদের ঘরদোর নেই বাবা।‌

‌সেকী!‌ অবাক হলেন বৃদ্ধ।

মা সঙ্গে সঙ্গে আবার বললেন, ‌আর বোলো না বাবা, রাস্তার ধারে একটা ঝুপড়ি যা-ও ছিল ছেড়ে দিতে হল। এখন রাস্তায় রাস্তায় কাটাচ্ছি।‌

‌ছেলেটাকে লেখাপড়া শেখাওনি?‌ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

একটু-আধটু জানে।‌ মা উত্তর দিলেন।

‌তোমাদের চলছে কেমন করে?‌

এবার মা উত্তর দিতে পারলেন না।

বৃদ্ধ যেন ব্যস্ত হলেন। বললেন, ‌এই দ্যাখো, পয়সাকড়ি উপায় না করলে চলবে?‌

মা বললেন, ‌একটা কাজ করছিল ছেলেটা, তা সেও গেল।‌

‌কী রে, কাজ করতে পারিস? সেলিমকে জিজ্ঞেস করলেন সেই বৃদ্ধ ওস্তাগর।

সেলিম উত্তর দিল, ‌পারি।‌

—‌সেলাই-ফোঁড়া পারিস?‌

সেলিম বলল, ‌কখনো করিনি।‌

‌ঠিক আছে তোকে আমি শিখিয়ে দেব।‌ বলে বৃদ্ধ সেলিমের মুখের দিকে তাকালেন। সেলিম কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। খুশির উত্তেজনাটাকে চেপে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।

—বোধ হয় থামবে না বৃষ্টি। বৃদ্ধ জামাটা ছুঁচ দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে করতে বললেন, ‌আজ সব মাটি।‌ তারপর হঠাৎ তাঁর কী মনে হল, হাতের কাজটা থামালেন তিনি। ওদের মুখের দিকে চাইলেন। তারপর বললেন, ‌কিছু তো খাসনি তোরা?‌

দু-জনেই চুপ।

—‌আরে ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! আমিও তেমনি। তোদের যে খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে এটা একদম ভুলে বসেছি। দাঁড়া দাঁড়া।‌ বলে তিনি হাতের কাজটা সেইখানেই ফেলে ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন।

সেলিম কেমন যেন ভয়ে ভয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মায়েরও মুখে-চোখে উৎকন্ঠা।

‌লোকটার কী মতলব, কে জানে!‌ মায়ের মুখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত চাপা স্বরে সেলিম বলল।

মা বললেন, ‌আমিও তাই ভাবছি!‌

তারপর সেলিম অত্যন্ত সন্তর্পণে ক-পা এগিয়ে এল। দরজার আড়াল থেকে উঁকি মারল। দেখল বাড়ির ভেতরটা কেমন যেন এক রহস্যময় নির্জনতায় ছমছম করছে। তার ওপর একটানা বৃষ্টি সে-রহস্য যেন আরও গভীর করে তুলেছে। সেলিম ডিঙি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নি:সাড়ে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। তারপর ঝড়ের ঝাপটা একটু কমতেই সে যেন একটা অস্পষ্ট চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেল। শব্দটা যে কোনদিক থেকে আসছে, সেটা হদিশ করার জন্য ভারি সতর্কতার সঙ্গে এদিক-ওদিক ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছু সন্ধান পাবার আগেই সে দেখতে পেল সেই বৃদ্ধকে। হাতে খাবারের থালা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছেন। সেলিম তাঁকে দেখে চট করে ঘরে ঢুকে পড়ল। তিনি দেখে ফেলেছেন সেলিমকে। হেসে উঠেছেন। তিনি ঘরে ঢুকে দেখেন, সেলিম পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‌কী রে বাইরে কী দেখছিলি অমন করে?‌ তিনি খাবারের থালা টুলের ওপর রাখতে রাখতে সেলিমকে জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিম আমতা আমতা করে বলল, ‌না, মানে, এমনি।‌

খবরদার, খবরদার, ওদিকে যাসনি। আমার গুণধর ছেলে দুটো এখন ঝগড়া করছে। হয়তো একটু পরে রক্তারক্তি কান্ড ঘটে যাবে।

বলে বৃদ্ধ একটু থামলেন। সেলিম আর মায়ের মুখের দিকে তাকালেন। বৃদ্ধের মুখে ম্লান হাসি। তারপর তিনি আবার বললেন, ‌এবাড়িটা আমার। আমি বুড়ো হয়েছি। ভাবছে ক-দিন পরেই তো মরব আমি। তাই আমার সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ভায়েরা এখন থেকেই কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে।‌

মা-ও কথা বলতে পারছেন না। সেলিমও চুপ করে রইল।

‌জানি আশ্চর্য লাগছে শুনতে। আশ্চর্য নয় রে আশ্চর্য নয়, সব সত্যি। আমার ধাড়ি ধাড়ি ছেলেগুলো দিব্যি পায়ের ওপর পা রেখে খাচ্ছে, একটি কুটোও নাড়ছে না। আর বুড়ো বাপটা যে খেটে খেটে মরছে, সেকথা কেউ ভাবেও না ঘুণাক্ষরে। অথচ সব চাই ওদের। একটুও দয়া-মায়া নেই রে, বুড়ো বাপটার জন্যে একটুও মমতা নেই।‌

বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই তিনি সামলে নিলেন। তারপর বললেন, ‌যাক গে, মরুক গে, নে তোরা খেয়ে নে!‌

বৃদ্ধের কথা শুনতে শুনতে সেলিমের বুকের নিশ্বাসটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। কষ্ট হচ্ছিল তার। মনে মনে ভাবছিল, এমনি করে সে-ও তো তার আম্মা আর আব্বাকে কত দুঃখ দিয়েছে। অনুতাপে সে যেন বোবা হয়ে গেছে এই মুহূর্তে।

‌—কী রে, খা!‌ সেলিমকে অমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বললেন। তারপর মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি অনুরোধ করলেন, ‌লজ্জা কোরো না মা। আমি তোমার ছেলের মতো। খেয়ে নাও।

মা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। একটি কথাও বলতে পারলেন না।

সেলিম অবশ্য আর দেরি করল না। খাবারের থালায় হাত দিল।

বৃদ্ধ বললেন, মানুষ কি বুড়ো হলেই তার সব শেষ হয়ে যায়। তার বুঝি আর সাধ-আহ্লাদ থাকতে নেই। আমি যে জীবনভর তোদের জন্যে এত করলুম, এত ভালোবাসলুম, জীবনপাত করে তোদের মানুষ করলুম, আর এখন কিনা তোরাই আমার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছিস!‌ বলতে বলতে বৃদ্ধ হঠাৎ হেসে উঠলেন। যেন পাগল হয়ে গেলেন তিনি। তারপর যখন থামলেন তখন তাঁর চোখের পাতা দু-টি অশ্রু-ফোঁটায় চিকচিক করছে। অশ্রুর ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়ার আগেই বৃদ্ধ সামলে নিলেন নিজেকে। আবার সেই আগের মানুষটির মতোই তাঁর মুখে মৃদুহাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‌আমিও এমন ছেলেমানুষির মতো করছি। নে নে, খেয়ে নে!‌

কিন্তু খাওয়া হল না। হঠাৎ একটা চেঁচামেচি শুনতে পাওয়া গেল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে সেই চিৎকার এই ঘরে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বৃদ্ধ এবার এতটুকু বিচলিত হলেন না। শুধু বললেন, ‌ওই, মারামারি শুরু হয়ে গেল।‌

এবার মা কথা বললেন। তিনি ভয় পেয়েছেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‌এবার আমরা তবে যাই বাবা।‌

‌কোথায় যাবে?‌ বৃদ্ধ দৃঢ় গলায় বললেন। ‌—এটা আমার বাড়ি, তোমরা আমার অতিথি। যতদিন খুশি আমি তোমাদের এখানে রেখে দেব। কে কী বলবে।‌

শুনতে পাওয়া যাচ্ছে মারামারির আস্ফালন। বৃদ্ধ তবুও অবিচল। বিড়বিড় করে বললেন, ‌মরুক, জাহান্নমে যাক। আমার এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।‌

...ঝননন কাচ ভাঙল। কেউ হয়তো চেয়ার ছুড়ল। কেউ টেবিল উলটে দিল। তারপর ধস্তাধস্তি লেগে গেল।

বৃদ্ধ আর থাকতে পারলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‌ওরে কুকুরের দল, তোদের বুদ্ধিসুদ্ধি কবে হবে। ভদ্রমানুষের মতো বাঁচতে শিখলি না। আমার মুখ যে কালি করে দিলি তোরা।‌

লড়াই হচ্ছে বৃদ্ধের দুই ছেলের মধ্যে। দুটো ছেলেই বৃদ্ধকে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। দু-জনেই মারামারি থামিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বৃদ্ধের দিকে তেড়ে এল। গলা চড়িয়ে খেঁকিয়ে উঠল, ‌তোমার জন্যে আমাদের এই অবস্থা। যত নষ্টের গোড়া হচ্ছ তুমি। তুমিই আমাদের ঝগড়া জিইয়ে রেখেছ।‌

বৃদ্ধ রাগে ফুঁসতে লাগলেন। বললেন, ‌ওরে হতচ্ছাড়ার দল, আমি না থাকলে যে তোরা পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াতিস। অকর্মের ধাড়ি সব। বসে বসে গিলছিস, আবার আমাকেই দুষছিস। তবে শুনে রাখ হতভাগারা, এই সম্পত্তি আমি কাউকে দেব না। আমি রাস্তার লোক ডেকে সব বিলিয়ে দেব, তবু তোদের আমি একটা কানাকড়িও দেব না। যা করতে পারিস করে নিগে যা।‌

একটা ছেলে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মতো ধেয়ে এল বৃদ্ধের দিকে। হাতের সামনে একটা ফুলদানি দেখে সেইটাই ছুড়ে দিল বৃদ্ধের দিকে। তিনি চোখের পলকে সরে গেলেন। কিন্তু সেটা সটান আঘাত করল সেলিমের কপালে। দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সেলিম। চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল সে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সে জ্ঞান হারাল। তার কপাল কেটে রক্ত পড়ছে গলগল করে।

সেলিমের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। বৃষ্টিও থেমেছে। প্রথমে চোখ মেলেই ও মায়ের মুখখানি দেখতে পেল। সেলিম শুয়ে আছে সেই তক্তাপোশটার ওপর। মা সেলিমের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। তাঁর চোখে-মুখে উদবেগ। বৃদ্ধ মানুষটি উৎকন্ঠায় ঘরের ভেতরে আনচান করছেন। সেলিম বুঝতে পারল, তার মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। চোখ চাইতেই মা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‌কষ্ট হচ্ছে বাবা?‌

সেলিম কিছুই বলতে পারল না।

বৃদ্ধও ছুটে এলেন সেলিমের কাছে। চিন্তার রেখাগুলি এতক্ষণ তাঁর মুখের ওপর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেলিম চোখ চাইতেই তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ভারি স্নেহমাখা মুখে তিনি সেলিমের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওর চিবুকে হাত দিয়ে বললেন, ‌আমি আছি, তোর ভয় কীসের?‌

ভয় তো পাবেই সেলিম। ওর চোখের সামনে এখনও সেই মারামারির ভয়ংকর দৃশ্যটা জ্বলজ্বল করছে। উঃ! কী জঘন্য সেই চিৎকার! কী কুৎসিত আস্ফালন!

সেলিমের পাশেই একটা টুলের ওপর এককাপ দুধ ছিল। বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি সেই কাপটি হাতে নিয়ে বললেন, ‌এই দুধটা খেয়ে নে!‌

সেলিম মুখ ফিরিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল, দেখল মা ভয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছেন। তারপর সেলিম নীরব দৃষ্টিতে আর একবার বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

বৃদ্ধ দুধের কাপটা ওর মুখের কাছে ধরতেই সেলিম হাঁ করল। বৃদ্ধ একটু একটু করে দুধ ঢেলে দিলেন সেলিমের মুখে। আঃ! ভারি ভালো লাগল সেলিমের।

সেলিম এখন বুঝতে পারল, বৃষ্টি থেমে গেছে। কেননা, বৃষ্টির সেই ঝমঝম আর সে শুনতে পাচ্ছে না। সে ওঠবার চেষ্টা করল। পারল না। বৃদ্ধ ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‌খবরদার, খবরদার, এখন উঠিস না।‌

সেলিম হতবাক হয়ে বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকাল। তারপরেই সে যেন দেখতে পেল সেই ফুলদানিটা উড়ে আসছে তার দিকে। সেলিম ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। তাড়াতাড়ি কপালে হাত রাখতেই সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। যন্ত্রণাটা একটু কমতেই সেলিম ক্লান্ত স্বরে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‌বৃষ্টি থেমে গেছে মা?‌

মা সেলিমের চিবুকটি ধরে বললেন, ‌হ্যাঁ বাবা।‌

‌—চলো, এবার তবে আমরা চলে যাই।‌

বৃদ্ধ সেলিমের কথা শুনে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‌কোথায় যাবি? না না, কোথাও যেতে হবে না তোদের। তোরা এখানেই থাকবি।‌

মা তাঁর কথা শুনে মাথা হেঁট করলেন।

সেলিম বৃদ্ধের কথা শুনে নিষ্পলকে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের দিকে। চোখ ছলছলিয়ে উঠল তার। তারপর সে কান্না-কাঁপা গলায় বলল, ‌আমাদের যেতেই হবে। আমরা সেই দুধসাদা পাখির দেশে যাব। সেই পাহাড়চূড়ার মিনারে।‌

বৃদ্ধ বিস্ময়ে তাকালেন সেলিমের মুখের দিকে, তারপর বললেন, ‌দুধসাদা পাখির দেশ যে অনেক দূরে।‌

‌হলেই-বা দূর। তবুও যেতেই হবে।‌ উত্তর দিল সেলিম।

বৃদ্ধ বললেন, ‌সেখানে কেউ যেতে পারে না।‌

‌কেউ পারে না বলে আমিও পারব না, এ আপনি কেমন করে ভাবছেন?‌ জবাব দিল সেলিম।

বৃদ্ধ থামলেন। কিছু ভাবলেন। হয়তো সেলিমকে শান্ত করার জন্য আশ্বাস দিলেন—ঠিক আছে, আমিও তোদের সঙ্গে যাব।‌

সেলিমের আঘাতে আহত মুখখানা মুহূর্তে উদবেল হয়ে উঠল। সে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌সত্যি?‌

বৃদ্ধ সেলিমের গালের ওপর তাঁর আদরমাখা হাতখানি রেখে বললেন, ‌হ্যাঁ রে।‌

সেলিমের ঠোঁট দুটি খুশিতে কেঁপে উঠল।

রাত হয়েছে। রাত গড়িয়ে গড়িয়ে গভীর হয়েছে, তবুও সেলিমের চোখে ঘুম আসেনি তখনও। বৃদ্ধও চলে গেছেন নিজের ঘরে। ঘরের একটি কোণে মোমবাতি জ্বলছে। ছায়াগুলি কাঁপছে। আরেকটি নরম অস্পষ্ট গলার শব্দ তার কানে ভেসে আসছে। সে আঁতিপাঁতি করে তাকাল ওদিক-ওদিক। দেখল সেই অন্ধকার রাতে মোমের আলোর নীচে মা বসে আছেন। বসে বসে প্রার্থনা করছেন তাঁর দেবতাকে। আকুল হয়ে তিনি বলছেন, ‌হে জগৎপিতা, তুমি ছেলেটাকে একটু দয়া করো। হে প্রভু, ওর আম্মা আর আব্বাকে এর কাছে ফিরিয়ে দাও। ওকে একটু সুখ দাও!‌ বলতে বলতে মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

সেলিমও আর থাকতে পারল না। সে কেঁদে ফেলল। কেঁদে কেঁদে অস্ফুটস্বরে ডাক দিল, ‌মা-মা-মা!‌

মা চমকে উঠলেন। নিজের চোখের জল মুছে ফেললেন, তারপর সেলিমের কাছে ছুটে এলেন। মাথায় হাত রাখলেন। সেলিমকে ঘুম পাড়ালেন।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেছিল সেলিমের। সে উঠে বসল। না, এখন আর উঠতে কষ্ট হচ্ছে না তার। পাশেই মা শুয়ে আছেন, এখনও ঘুমোচ্ছেন। সেলিম নেমে এল বিছানা থেকে। জানলাটা বন্ধ। খুলে ফেলল। একঝলক ভোরের বাতাস ওর মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। আকাশ আজ ভারি পরিষ্কার। কাল সারাদিন বৃষ্টিতে চান করে আজ সতেজ গাছগাছালি। পাখিদের কলতান। সেলিম জানলার গরাদে মাথা ঠেকাল। তারপর ওই আকাশের দিকে চেয়ে মনে মনে বলল, ‌হে আল্লা, তুমি আমার মায়ের ভালো করো। আমি ছাড়া ওঁর যে আর কেউ নেই। চিরদিন যেন আমার মা হয়ে থাকেন তিনি।‌

হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে গেল।

সেলিম চমকে পিছু ফিরল।

‌—সেলিম।‌

সেই বৃদ্ধ মানুষটি ঘরে ঢুকলেন। তাঁর সাড়া পেয়ে মায়েরও ঘুম ভেঙে গেল। তিনি উঠে বসলেন। সেলিম এগিয়ে এল সেই বৃদ্ধের কাছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‌এখানে দাঁড়িয়েছিলি কেন?‌

সেলিম বলল, ‌দেখছিলুম।‌

বৃদ্ধ সেলিমের মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, ‌দেখি তোর কপালটা! আর ব্যথা নেই তো?‌

সেলিম উত্তর দিল, ‌একটু একটু।‌

বৃদ্ধ বললেন, ‌আজ থাক, কাল তোকে দোকানে নিয়ে যাব। আমি তোকে কাজ শেখাব। আমার কাছে কাজ করবি তুই।‌

সেলিম জিজ্ঞেস করল, ‌আপনি যে বললেন, আমার সঙ্গে দুধসাদা পাখির দেশে যাবেন?‌

‌হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাব। তুই ভালো করে কাজ শেখ। পয়সা জমুক। তারপরে তো!‌ জবাব দিলেন বৃদ্ধ।

সেলিম আর কথা বাড়াল না।

বৃদ্ধ বললেন, ‌চ আমি অন্য ঘরে তোদের থাকার ব্যবস্থা করেছি। এক্ষুনি সব লোকজন এসে পড়বে। কাজ শুরু হবে। বৃষ্টির জন্যে কাল কেউ আসতে পারেনি।‌

সেলিম পোঁটলাটা আবার ঘাড়ে নিল। তারপর মায়ের সঙ্গে বৃদ্ধের পেছনে পেছনে আর একটা ঘরে হাজির হল।

‌এটা তোদের থাকার ঘর। পছন্দ?‌ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।

সেলিম বলল, ‌খুব ভালো।‌

‌এই কুর্তা আর পাজামাটা তোর। আর এই কাপড়টা তোর মায়ের। ময়লা পোশাক ছেড়ে এগুলো পরে নে।‌ বলে বৃদ্ধ চলে গেলেন।

পরের দিন বৃদ্ধ ওস্তাগরের সঙ্গে সেলিম সত্যিই কাজে গেল। মা রইলেন বাড়িতে একা। বৃদ্ধ ওস্তাগরের দোকানটা কী সুন্দর সাজানো-গোছানো। বাইরের দু-দিকে দুটো শোকেস। একদিকে একটা মেয়েপুতুল ঝলমলে পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে আরেকটা শোকেসে একটা সাহেবপুতুল কোট-প্যান্ট পরে মুখ বেঁকিয়ে হাসছে। তার মাথার টুপিটা প্রায় কপালের ওপর তেরছা হয়ে ঝুলে আছে। সেইসঙ্গে আরও কতসব রঙিন পোশাক সাজানো। অন্তত দশ-পনেরো জন লোক দোকানে কেনাবেচার কাজ করছে। বৃদ্ধ ওস্তাগর দোকানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কুর্নিশ করে অভিবাদন করল তাঁকে। বৃদ্ধ ওস্তাগর ওরই মধ্যে একজন বয়স্ক কর্মীকে ডেকে বললেন, ‌এর নাম সেলিম। আজ থেকে ছেলেটি এখানে কাজ করবে।‌

সেই বয়স্ক কর্মীটি মাথা হেলিয়ে জবাব দিল, ‌ঠিক আছে হুজুর।‌ তারপর বৃদ্ধ ওস্তাগর সেলিমকে বললেন, ‌তোর কিচ্ছু ভয় নেই। ইনি যেমন যেমন বলবেন সেইমতো চলবি। আজ অবশ্য তোকে কোনো কাজ করতে হবে না। আজ শুধু দ্যাখ। দ্যাখ কী হচ্ছে না হচ্ছে।‌

আনন্দে সেলিমের গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। এতখানি ঘাড় বেঁকিয়ে সেলিম খুশিতে উছলে উঠে বলল, ‌আচ্ছা।‌

খুশি হবারই কথা। এমন একটা মস্ত দোকানে হঠাৎ যে সে এমনই একটা চাকরি পেয়ে যাবে ভাবতেই পারে না সেলিম। সে অবাক হয়ে ভাবছে আর দোকানের হালচাল দেখছে।

তা হলেও দুর্ভাবনা তো আর মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। একটার পর একটা বিপদ কাটছে আবার আসছে। কে জানে এবার আবার কী হয়।

অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে সেলিম দোকানের এদিক থেকে ওদিকে যাতায়াত করছিল। বাহারি পোশাকগুলো কখনো হাত বুলিয়ে পরখ করছে, কখনো-বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধুই দেখছে। পোশাকের গায়ে গায়ে ছোট্ট ছোট্ট কাগজে দাম লেখা। সেগুলোও উলটে-পালটে দেখছে সেলিম। দেখতে দেখতে হঠাৎ একবার যেন চোখে ধাঁধা লেগে গেল সেলিমের। একটা জামার গায়ে পিন দিয়ে একটুকরো কাগজ আঁটা। সেই কাগজে তার যেন নাম লেখা রয়েছে—‌সেলিম‌। সেলিম হকচকিয়ে গেল। এই জামাটার গায়ে তার নাম লেখা কেন? এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে সেলিম ভাবতে লাগল কাগজটা কি সে খুলে দেখবে! অস্থির হয়ে উঠল সেলিম। সে সত্যিই আর থাকতে পারল না। তক্কে তক্কে হঠাৎ একফাঁকে সে পিনটা খুলে কাগজটা হাতের মুঠোয় লুকিয়ে ফেলল। তার মনে হল, কাগজের ভাঁজে যেন কিছু লেখা আছে। তার বুক দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। আবার সেই কাগজ। আবার কি সেই লেখা! সেলিম আর পারল না। কাউকে কিছু বললও না। সুযোগ বুঝে ঝট করে সে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল রাস্তায়! একটা বাড়ির পেছন দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে সেই কাগজটা সে পড়তে লাগল:

তুই ভেবেছিস পার পেয়ে গেলি। আমার চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ ভাবিস না। আমিই সেই লোক বুঝতে পারছিস তো। সেই সোনা-চাঁদির দোকানে তোর সঙ্গে আমার মোলাকাত হয়েছিল। সেখানে তুই নাম ভাঁড়িয়ে শম্ভুনাথ হয়ে চাকরি করছিলি। পাছে তুই আমাকে চিনতে পারিস, তাই আজ আমি ছদ্মবেশে এসেছিলুম। তোকে বলেছিলুম, সেই সোনা-চাঁদির দোকান থেকে একটা হার সরিয়ে ফেলে আমায় পৌঁছে দিতে। তুই দিসনি। উলটে আমাকে ফাঁকি দিয়ে তুই এখানে পালিয়ে এসেছিস। এখানে এসেও তুই ভোলানাথের মাকে নিজের মা বলে মিথ্যে পরিচয় দিয়েছিস। তুই ‌সেলিম‌ বলেই বৃদ্ধ ওস্তাগর তোকে আশ্রয় দিয়েছে। কারণ বৃদ্ধ ওস্তাগর আর তোর ধর্ম এক। কিন্তু যখনই বৃদ্ধ ওস্তাগর জানতে পারবে তুই যাকে মা বলছিস সে তোর নিজের মা নয়, সে ভোলানাথের মা তখনই তোর সময় ঘনিয়ে আসবে। তোকে তো মরতেই হবে, সঙ্গে সঙ্গে ভোলানাথের মা-ও। আর বুঝতেই পারছিস, তোর এই গোপন কথাটা আমি ছাড়া আর কেউই জানে না। সুতরাং তোর প্রাণটি এখন আমার হাতে। যদিও তুই আমাকে এক বার ফাঁকি দিয়েছিস, তবুও আর এক বার আমি তোকে সুযোগ দিতে পারি। তোকে আমি আর একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বলছি। আর সে-দেখা তোকে আজই করতে হবে। আজ রাত্রি বারোটার সময় আমি ওস্তাগরের বাড়ির পেছনের রাস্তায় তোর জন্যে অপেক্ষা করব। তুই বেরিয়ে আসবি। কেউ না জানতে পারে। কাউকে বললে—বুঝতেই পারছিস আমিও তোকে ছেড়ে দেব না। সুতরাং সাবধান। মনে রাখিস, আজ রাত্রি বারোটা!

সেলিম কাগজটা হাতে নিয়ে নিশ্চল পাথরের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। তার মুখখানা আতঙ্কে থমথম করছে। তারপর হুঁশ হতেই সে কাগজখানা ঝটপট পকেটে লুকিয়ে ফেলল। দ্রুতপায়ে সে দোকানে ঢুকে বিহ্বল চোখে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। আর ভাবতে লাগল ছুটি হতে আরও কত দেরি!

আজ অবশ্য সেলিমের চাকরির প্রথম দিন, সুতরাং তাড়াতাড়িই তার ছুটি হয়ে গেল। সারাদিন সে দোকানে ছিল বটে, কিন্তু ওই চিঠিটা পড়ার পর থেকে আর কিছুতেই তার মন বসছিল না। বারে বারে অন্যমনস্ক হয়ে সে শুধু ওই কাগজটার কথাই ভাবছিল। সত্যি, এরপর সে কী করবে!

আজ অন্য মানুষ সেলিম। বাড়িতে পৌঁছে সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরে মা একাই ছিলেন।

‌কী রে ঘরের দরজা বন্ধ করছিস কেন?‌ মা জিজ্ঞেস করতে-না-করতেই সেলিম মায়ের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল।

‌কী হল রে?‌ সেলিমের কান্না দেখে মা হকচকিয়ে গেলেন।

‌মা আমি আবার বিপদে পড়েছি।‌ বলে সেলিম যেন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।

উদবিগ্ন মা জিজ্ঞেস করলেন, ‌কীসের বিপদ?‌

সেলিম পকেট থেকে কাগজটা বার করল। পড়ে ফেলল। তারপর মাকে জিজ্ঞেস করল, ‌আমি কী করব, বলে দাও মা!‌

মা হতভম্বের মতো চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর দৃঢ় গলায় বললেন, ‌কিছুই করতে হবে না তোকে। যা করার আমিই করব।‌

‌তুমি?‌ অবাক হল সেলিম।

‌হ্যাঁ, আমি। আজ রাত্রে আমার কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমোবি তুই। দেখি তোর কে কী করে!‌ বলতে বলতে মায়ের চোখ দুটি ঝলসে উঠল।

সেলিম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌বৃদ্ধ ওস্তাগর যদি সব জানতে পারেন?‌

‌আমরা তো কোনো দোষ করিনি। তিনিই আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। এখন যদি তিনিই আমাদের মারতে চান, মরব আমরা। তবু অন্যায়ের কাছে মাথা হেঁট করব না।‌ মা উত্তর দিলেন।

মায়ের এই কঠোর মূর্তি সেলিম এর আগে আর কখনো দেখেনি। তাই আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না সেলিম। ঘুমের রাত পর্যন্ত সে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল। আর যতক্ষণ অপেক্ষা করল সেলিম, ততক্ষণ মায়ের মুখখানা সে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ভারি দৃপ্ত সেই মুখ।

মায়ের মুখখানা দেখতে দেখতে সাহসে ভরে উঠল সেলিমের বুকটা। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল সেলিম। ঘরের আলো নিভে গেল।

অনেক রাতে হঠাৎ সেলিমের ঘুম ভেঙে গেল। আচমকা সে ধড়ফড় করে উঠে পড়েছিল। থমকে গেছিল সেলিম। কেননা ঘরে আলো জ্বলছে অথচ মা নেই। কোথায় গেলেন তিনি! সেলিম বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরের দরজার দিকে চোখ পড়তেই সেলিম চমকে উঠেছে। দরজা খোলা। দরজার দিকে একটু এগোতেই দেখতে পেল একটা চিরকুট। সেলিম তাড়াতাড়ি তুলে নিল চিরকুটটা। তাতে লেখা:

সেলিম আমি যাচ্ছি। এ দুনিয়ার কিছু মানুষ তোকে আমাকে একসঙ্গে থাকতে দেবে না। আমি কোনোদিনই সেলিমের মা হতে পারব না। আর সেলিমও আমার কোনোদিন শম্ভুনাথ হতে পারবে না। সুতরাং আমি যতই মিথ্যে আশা নিয়ে তোকে বুকে আগলে রাখতে চাইছি, তুই ততই বিপদে পড়ছিস। ওরে সেলিম, তোকে বাঁচতে হবে। আমার জন্যে বারে বারে তোর জীবন বিপন্ন হচ্ছে। এই বিপদ থেকে তোকে যে কেমন করে বাঁচাব আমি নিজেও জানি না। এখন আমার মনে হচ্ছে, তোর কাছ থেকে আমি সরে গেলেই বুঝি তুই বাঁচার আশ্রয় খুঁজে পাবি। তাই আমি চলে যাচ্ছি। ওরে সেলিম, আমার নিজের ছেলে চলে গেলে তোকে কুড়িয়ে পেয়ে আমি দুঃখ ভুলেছিলুম। আজ তোকে ফেলে চলে যাচ্ছি বলে হয়তো এ দুঃখের ভার আর আমি সইতে পারব না। তুই সুখী হ এর বেশি আর যে আমার কিছুই বলার নেই।

ইতি মা।

চিঠিটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেলিমের বোবা মুখখানা উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠল। তার বুকের নিশ্বাসটা কী প্রচন্ড শব্দে ছড়িয়ে পড়ছিল সেই নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে। নিজেকে সামলে রাখার ক্ষমতা সে যেন হারিয়ে ফেলেছে। সে বুঝি এখনই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে!

না, সে কাঁদল না। সে দ্রুত পায়ে ঘরের দরজাটার দিকে এগিয়ে এল। খোলা দরজা দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। নিশুতি রাত, কেউ কোত্থাও নেই। রাস্তায় বেরোবার দরজাটার কাছে গিয়ে সে দেখল সেটাও খোলা। তার মা এই রাস্তা দিয়েই পথে নেমেছে। সেও নেমে পড়ল পথে। তারপর দ্রুত ছুটতে শুরু করল।

বেশি দূরে যেতে হল না সেলিমকে।

—‌সেলিম।‌ সেই অন্ধকার রাতে এক গম্ভীর কন্ঠস্বরের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল সে।

—‌তোর জন্যে আমি অপেক্ষা করছি।‌ সেই কন্ঠস্বর যেন ধমকের সুরে গর্জে উঠল।

সেলিম ফিরে দাঁড়াল। সেই অন্ধকারে তার চোখের দৃষ্টি আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে লাগল সেই মানুষটাকে। দেখতে পেল না।

‌—তোকে রাত্রি বারোটার সময় এইখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলুম। বারোটা অনেকক্ষণ বেজে গেছে। এত দেরি করার কারণ?‌ তার কন্ঠে রোষ।

‌আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসিনি। আপনার কথার উত্তর আমি দেব না।‌ সেলিম সাহসে বুক ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

তাকে এবার দেখতে পেল সেলিম। সে হঠাৎ যে কোত্থেকে তার সামনে এসে দাঁড়াল বুঝতেই পারল না সেলিম। একটা কালো কুচকুচে চাদর তার সারা অঙ্গে ঢাকা রয়েছে। মুখখানাও চেনা যায় না। শুধু কুতকুতে চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে—জ্বলছে।

‌সেলিম।‌ দাঁতের ওপর দাঁত রেখে সে যেন গর্জন করে উঠল। ‌বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। আমার চোখকে তুই একবার ফাঁকি দিয়েছিস, বার বার পারবি না। আমার কথা তোকে শুনতে হবে। যদি বাঁচতে চাস, আমাকে অনুসরণ কর। আমি যা যা বলব সেইভাবে তোকে চলতে হবে। তোর সেই পুরোনো মালিকের সোনা-চাঁদির দোকান থেকে আমাকে সেই সোনার হারটা যেমন করে হোক তোকে এনে দিতে হবে। এর বেশি এখন আর আমার কিছু বলার নেই। পালাবার চেষ্টা করিস না, পারবি না। ভালোয় ভালোয় আমার সঙ্গে আয়!‌

‌না-আ-আ-আ।‌ আচমকা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল সেলিম। চিৎকার করেই সে ছুট দিল।

থতোমতো খেয়ে গেছিল সেই ছদ্মবেশী লোকটা। সেও মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সেলিমের পেছনে তাড়া লাগালে। নিস্তব্ধ রাতটা দু-জনের পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে উঠল।

সেলিম প্রাণপণে ছুটছে। তার পেছনে ভয়ংকর আতঙ্কের মতো সেই মানুষটা এগিয়ে আসছে। সেলিম তারও চেয়ে অনেক দ্রুত ছুটে চলেছে সামনের দিকে।

‌সেলিম দাঁড়া, নইলে মরবি।‌ ছুটতে ছুটতে সে চিৎকার করে উঠল।

সেলিম দাঁড়াল না।

‌আবার বলছি দাঁড়া।‌ সে আর এক বার হাঁক পাড়ল।

সেলিম এবারও শুনল না।

তখন সেই ছদ্মবেশী লোকটা তার আবরণের আড়াল থেকে একটা ছোরা বার করে ছুড়ে দিল সেলিমের দিকে। উড়ন্ত ছোরাটা ছিটকে পড়ল সেলিমের পায়ের কাছে—লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। সেলিম থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখের পলকে ছোরাটা তুলে নিল মাটি থেকে। মুহূর্তের মধ্যে ছুড়ে দিল সেই ছুটন্ত ছদ্মবেশী শয়তানটার দিকে। দেখল না কী হল তার, সে আবার ছুটতে শুরু করে দিল। শুধু শুনতে পেল একটা আর্তনাদ, ‌আঃ!‌ তারপর আর কিছু জানে না।

সেলিম বেশিক্ষণ ছুটল না। এক্ষুনি তাকে লুকিয়ে পড়তে হবে। কে জানে ছোরাটা সেই লোকটাকে আঘাত করল কি না। অন্ধকারে এলোপাথাড়ি ছুটতে ছুটতে সে থামল। ব্যস্ত হয়ে পিছু ফিরে ফিরে সে দেখতে লাগল। কাউকে সে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু এখানে সে লুকোবেই-বা কোথায়। এদিক-ওদিক খুঁজতে সে অবশ্য একটা ঘুপচিমতো জায়গা পেয়ে গেল। আগু-পিছু কিছু না ভেবেই তড়িঘড়ি সেখানেই সেলিম ঢুকে পড়ল, সেই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে। কিন্তু সে জানতে পারল না সেটা একটা ঘোড়ার আস্তাবল।

চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ! আচমকা চিৎকার করে উঠল একটা ঘোড়া। অন্ধকারে ঠাওর করতে না পেরে সেলিম ঘোড়াটারই ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। ঘোড়াটা প্রচন্ড জোরে সেলিমের গায়ে পেছনের পা চালিয়ে দিলে। কিছু বোঝবার আগেই সেলিম ছিটকে পড়ল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে আস্তাবলের মেঝেয় গড়াগড়ি খেতে লাগল। এখন আর তার উঠে পালাবার ক্ষমতাও নেই। সুতরাং সেই অন্ধকার রাতে আস্তাবলের ভ্যাপসা গন্ধে পড়ে পড়ে সে কাতরাতে লাগল।

অনেকক্ষণ পর সকাল হল। অন্ধকার কেটে আলো ফুটতেই সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে আস্তাবলের চেহারাটা। দেখেছে একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাস চিবোচ্ছে, পা ঠুকছে। একটু দূরে আস্তাবলের বাইরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয়, গাড়িটা টানে এই ঘোড়াটাই। গাড়িটা যদিও ঢরঢরে, কিন্তু ঘোড়াটা যেন টগবগ করছে। গায়ের রংটাও ভারি অদ্ভুত, গাঢ় নীল। থেকে থেকে লেজ নাড়ছে, মাছি তাড়াচ্ছে আর ঘাড় ফিরিয়ে সেলিমকে দেখে নিচ্ছে। চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারছে না সেলিম। আঘাতের যন্ত্রণাটা এখনও ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে তাকে। অথচ এখানে এভাবে পড়ে থাকলে সে ধরা পড়ে যাবে। তাই সে হামাগুড়ি দিল। চেষ্টা করল এখান থেকে বেরিয়ে যাবার।

‌কে রে, আস্তাবলে ঢুকেছে!‌ কর্কশ গলায় পিছু থেকে কেউ কড়কে উঠল।

সেলিম চমকে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে দ্যাখে একজন মধ্যবয়সি লোক চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার মুখখানা চৌকো, কপালটা চ্যাপটা, ড্যাবড্যাবে চোখ। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সামনের ছোপধরা দাঁত দুটো একটু বেরিয়ে আছে। পরনে পাজামা আর গায়ে একটা জামা। খুব ময়লা না হলেও ফর্সা বলা যায় না। পায়ে একটা নাগরা, যত রাজ্যের ধুলো তাতে। সেলিম লোকটাকে দেখেই বুঝতে পারল, ওই গাড়ি আর এই ঘোড়াটা নিশ্চয়ই এরই।

—‌চুরি করতে ঢুকেছিস?‌ লোকটা এবার আরও একটু এগিয়ে এল, একেবারে সেলিমের মুখের সামনে।

সেলিম অসহায়ের মতো তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

‌—ওঠ।‌ সে ধমক মারল।

সেলিম ওঠবার চেষ্টা করেও উঠতে পারল না।

‌কী হয়েছে তোর?‌ বলে সে সেলিমের ঘাড়টা ধরে টান মারল। সেলিম যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল।

তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়ে অবাক হয়ে সেই লোকটা সেলিমের আগাপাশতলা দেখতে লাগল, আর সেলিম ভারি করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বলল, ‌বুঝতে পেরেছি, তুই হতভাগা পুলিশের তাড়া খেয়ে এখানে ঢুকেছিস। অন্ধকারে দেখতে পাসনি, ঘোড়াটা মেরেছে চাট।‌ বলে লোকটা চোখ পাকিয়ে সেলিমের হাতটা ধরল, তারপর কড়া মেজাজে জিজ্ঞেস করল, ‌কোথায় চুরি করতে ঢুকেছিলি?‌

সেলিম কোনো কথাই বলতে পারল না। কাঁচুমাচু মুখ করে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

‌—বল, নইলে এক্ষুনি পুলিশ ডাকব।‌ সে ভয় দেখাল।

সেলিমের চোখে জল এল।

‌—কাঁদলেও পার পাবি না।‌ কী তার হম্বিতম্বি! —‌আমার নাম রহিম কোচোয়ান। এই শহরে আমাকে চেনে না কে! আমি ঘোড়ার গাড়ি চালাই। গাড়ি ভাড়া খাটাই। একবার হাঁক পাড়লেই হল। পুলিশের বড়োবাবু থেকে ছোটোবাবু সবাই ছুটে আসবে। বল, কী করেছিস তুই?‌

সেলিমের যন্ত্রণা তখনও একটুও কমেনি। কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছে। তবুও সে এবার বলেই ফেলল, ‌আমি চোর নই।‌

—‌তবে সাধু!‌ বলে লোকটা বিচ্ছিরি মুখ করে সেলিমকে তেড়ে উঠল। —‌মিথ্যে কথা বলছিস! একফোঁটা ছেলে এই বয়সেই এইসব দুর্বুদ্ধি! পুলিশের ধোলাই-ই আসল দাওয়াই।‌

সেলিমের চোখের জল উপচে পড়ল। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, ‌বিশ্বাস করুন, আমি চোর নই। একটা লোক আমাকে ছোরা নিয়ে তাড়া করেছিল। আমি অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেয়ে এখানে ঢুকে পড়েছি।‌

—সেই লোকটা তেমনি তিরিক্ষি মেজাজে ধমকে উঠল, ‌কেন, তুই কী করেছিলি?‌

‌আমি কিচ্ছু করিনি। লোকটাকে আমি চিনিও না।‌ উত্তর দিল সেলিম।

‌তোর নাম কী?‌ সে জিজ্ঞেস করল।

সেলিম ইতস্তত না করে বলল, ‌সেলিম।‌

—‌উঁ! বাড়ি কোথায়?‌

‌—আমার বাড়ি নেই।‌

—‌মানে?‌

সেলিম চুপ করে রইল।

‌—বলছিস না যে?‌ সে আবার কড়কে উঠল।

সেলিমের চোখ দুটি আবার ছলছল করে উঠল।

সে বলল, ‌কী হয়েছে সত্যি করে বল, আমি কিচ্ছু বলব না।‌

সেলিম আকুল হয়ে বলল, ‌বিশ্বাস করুন, আমি কিচ্ছু করিনি। আমি আমার আম্মা আর আব্বার কাছে থাকতুম। কিন্তু... বলতে গিয়ে গলা আটকে গেল সেলিমের।

—‌থামলি কেন?‌

না, আর থামল না সেলিম। আস্তাবলের মেঝের ওপর ধীরে ধীরে উঠে বসল সেলিম। দেহের যন্ত্রণাটা অগ্রাহ্য করার জন্যে মুখের চোয়াল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে খানিক কী ভাবল। তারপর একটি একটি করে তার জীবনের সব ঘটনাই সে বলে গেল। শুনতে শুনতে হতবাক হয়ে গেল রহিম কোচোয়ান। তার ওই কঠিন মুখখানাও সেলিমের দুর্ভাগ্যের কথা শুনে ভার হয়ে গেল। খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে সেলিমকে দেখল। তারপর কী মনে হল রহিম কোচোয়ানের, সেলিমের বুকখানা নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলল, ‌ঠিক আছে, তোর কিচ্ছু ভাবনা নেই। দেখি তোর গায়ে কে হাত দেয়। আমি তোর সব ব্যবস্থা করে দেব। তোর যা হারিয়ে গেছে, সব খুঁজে পাবি তুই। নে, এখন ওঠ।‌

সেলিম উঠে দাঁড়াল।

সে বলল, ‌তুই আমার কাছে থাকবি। আমি এখানে একা থাকি। আমার ছেলে-বউ দেশে থাকে। তোকে আমি ঘোড়ার গাড়ি চালাতে শিখিয়ে দেব। যতদিন-না তোর আম্মা-আব্বাকে খুঁজে পাস, ততদিন তুই আমার সঙ্গে কাজ করবি। রাজি?‌

সেলিম ঘাড় নাড়ল। আর মনে মনে ভাবল আবার কী বিপদ আসে কে জানে।

আস্তাবলের লাগোয়া রহিম কোচোয়ানের থাকার ঘর। রহিমের হাত ধরে সেলিম সেই ঘরেই এল। একটা ছোট্ট তক্তাপোশের ওপর সেলিম বসল। রহিম বলল, ‌ঘোড়াটা খুব জোরেই মেরেছে তোকে।‌

সেলিম আহত পা-টা একটু হাত বুলিয়ে দেখল।

রহিম বলল, ‌ভাঙেনি এই যা রক্ষে।‌

পাক্কা দুটো দিন সেলিম বিছানা ছেড়ে উঠল না। দু-দিন পরে সেলিমের পায়ের ব্যথা অনেকটা কমে গেল। আরও দু-দিন পরে যখন সেলিমের চলতে-ফিরতে আর কোনো কষ্ট হল না, সেদিন রহিম কোচোয়ান বলল, ‌আজ থেকে আমার সঙ্গে তোর কাজ শুরু। আমার পাশে বসে দেখবি, রাস্তাঘাটে আমি কেমন করে ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছি। আমি একটি-একটি করে তোকে সব শিখিয়ে দেব।‌

না-চাইতেই যে সেলিমের ভাগ্যে এমন একটা কাজ জুটে যাবে, এ তো ভাবতেই পারে না সে। ভেতরে ভেতরে যদিও তার আনন্দ হচ্ছিল খুবই, তবুও বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের কথা। সেলিম মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, একদিন তার আম্মা আর আব্বার সঙ্গে তাকেও খুঁজে বার করবে। কিন্তু সেই ছদ্মবেশী লোকটা যদি আবার সেলিমের পিছু নেয়। তখন? এই ভয়টা কিন্তু সেলিম কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারল না। আর এই ভয়টা মাথায় নিয়েই সেলিম রহিম কোচোয়ানের সঙ্গে তার ঘোড়ার গাড়ি চেপে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।

যাক, তবু রক্ষে প্রথম দিনটা তার ভালোয় ভালোয় কেটে গেল। সেই লোকটাকেও সে দেখতে পেল না, আর কোনো অঘটনও ঘটল না। সারাদিন সে কত রাস্তায় ঘুরল। কত মানুষের দেখা পেল। এখান থেকে সেখান, কত জায়গায় সওয়ারি তাদের গাড়িতে চেপে আনাগোনা করল। সেলিম মনে মনে ভাবল, ভারি মজার কাজ তো! বলতে কী, গাড়িটা যদিও ঢরঢর করছে, কিন্তু ঘোড়াটা দারুণ ডগমগে। লিকলিকে চাবুকের মতো চেহারা, অথচ গায়ের জোর দ্যাখো! যেন হেলায়-ফেলায় গাড়িটা টেনে চলেছে। তাই বুঝি রহিম ঘোড়াটার নাম রেখেছ তুফান।

সারাদিন খাটাখাটুনির পর রাত্রি বেলা ঘরে ফিরে একটু জিরিয়ে রহিম কোচোয়ান সেলিমকে বলল, ‌আয় আমার সঙ্গে। এবার দ্যাখ, আমি কী করি।‌

রহিম কোচোয়ান সেলিমকে আবার আস্তাবলে নিয়ে এল। রহিম নিজেই ঘোড়াটাকে দলাই-মলাই শুরু করে দিলে। সেলিমকে বলল, ‌শিখে রাখ, এমনি করে তোকেও করতে হবে।‌

সেলিম অবাক হয়ে দেখতে লাগল।

আরও ক-টা দিন কেটে গেল। ভাগ্য বলতে হবে, এই ক-দিনে সেলিমের জীবনে আর কোনো দুর্ঘটনাই ঘটল না। সে নিশ্চিন্তে রহিম কোচোয়ানের আশ্রয়ে থেকে গাড়ি-ঘোড়ার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এখন তার নি:সঙ্গ জীবনে আপনজন এই রহিম নামে লোকটি। চেহারাটা তো বদখত বটেই, তেমনই মেজাজটাও তিরিক্ষি। সেলিম মাঝেমধ্যে ধমক-ধামক খেলেও লোকটাকে নির্দয় কেউ বলতে পারবে না। সেলিমের মতো একটা অজানা অচেনা রাস্তার ছেলেকে এমন করে কে আশ্রয় দিয়ে যত্ন-আত্তি করবে। হ্যাঁ, সেলিম তাকে চাচা বলেই ডাকে—রহিমচাচা। সেই চাচার সঙ্গে থাকতে থাকতে এখন সেলিমও একটি খুদে কোচোয়ান হয়ে গেছে। যে-ঘোড়াটা একদিন সেলিমকে পা দিয়ে আঘাত করে ভীষণ আহত করেছিল, রহিম চাচার সেই ঘোড়াটাই এখন সেলিমের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। এই প্রিয় বন্ধুর কাছে যখন একা থাকে সেলিম, তখন তার মুখের দিকে চেয়ে আপন মনে বলে, ‌তুফান, একদিন তোকে নিয়ে আমার আম্মা আর আব্বাকে খুঁজতে বেরোব। আমার মায়ের তল্লাশি করব। কী রে যাবি তো?‌

ঘোড়াটা চেয়ে থাকে ওর মুখের দিকে।

দেখতে দেখতে আরও ক-টা বছর কেটে গেল। সেলিম এখন একাই গাড়ি চালাতে পারে। এখন একাই গাড়ি চালিয়ে পয়সা উপায় করে তার রহিমচাচার হাতে এনে দেয়। রহিমচাচা বুড়ো হচ্ছে। সেলিম বড়ো হচ্ছে। আর ঘোড়াটার বয়েস বাড়ছে। ছ্যারছ্যারে গাড়িটাও লটপট করছে।

একদিন রহিমচাচা হঠাৎ বলল, ‌সেলিম, ভাবছি এবার ক-টা দিনের জন্যে দেশ থেকে ঘুরে আসব। তুই তো কাজকম্ম শিখে গেছিস, ক-টা দিন চালিয়ে নিতে পারবি না?‌

সেলিম বলল, ‌হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব পারব। তুমি চলে যাও। ছেলে-মেয়েদের দেখে এসো। তুমি ফিরে এলে আমি আবার ছুটি নেব। আমার যে সব কাজই বাকি আছে। আমি যে এখনও আমার আম্মা-আব্বাকে খুঁজে পাইনি। আমার মায়েরও খোঁজ পাইনি। আমাকে যে যেতে হবে সেই দুধসাদা পাখির দেশে। এত কাজ কবে করব আমি। তাড়াতাড়ি ঘুরে এসো।‌

‌হ্যাঁ রে হ্যাঁ, আমি জলদি জলদি ফিরে আসব। তারপর আমাকেই তাদের খোঁজ করতে হবে। কেননা, তোর বিয়ের কথাটা তো পাড়তে হবে তাদের কাছে।‌ বলে রহিমচাচা হো হো করে হেসে উঠল।

সেলিম লজ্জা পেল।

ক-দিন পরে রহিমচাচা সত্যিই দেশে চলে গেল, আর সেলিম একা একা এই শহরে তুফানের সহিস হয়ে গাড়ি চালাতে লাগল।

সত্যি, ভারি আশ্চর্য কথা কিন্তু! সেলিম সেই যে রহিমচাচার কাছে এসেছে, তারপর থেকে, আর কোনো বিপদও হয়নি তার। না তাকে কেউ ভয় দেখিয়েছে, না কেউ তার পিছু নিয়েছে। আর সত্যি বলতে কী, সেই ভয়ংকর দিনগুলির কথা সেলিম ধীরে ধীরে ভুলেও গেছে। তা হয়েও তো গেল অনেক দিন। সেলিম তো আর এখন সেই ছোট্ট ছেলেটি নয়। এখন সে বড়ো হয়েছে। এত্তখানি বুক, অ্যায়সা চেহারা। গাল-ভরতি দাড়ি। সে যখন গাড়ির চালে বসে চাবুক ঘুরিয়ে তুফানকে ছুটিয়ে ছুটিয়ে গাড়ি হাঁকায়, তখন দারুণ দেখতে লাগে সেলিমকে।

—‌আচ্ছা, রহিমচাচা কবে যেন দেশে গেল?‌

‌সে তো হয়ে গেল অনেক দিন। চাচা তো বলে গেল, ক-দিন পরেই আসবে। কেন, আসে না কেন?‌ ব্যস্ত হয়ে ওঠে সেলিম।

তবুও সেলিমকে অপেক্ষা করতে হবে। কত রাত সে অন্ধকারে অন্ধকারে অপেক্ষা করল। কত দিন তার মিছেই কেটে গেল। তবুও এল না রহিমচাচা। ভয় পেল সেলিম। তবে কি রহিমচাচা আর আসবে না! তবে কি রহিমচাচাও তাকে একলা ফেলে চলে গেল! এমনি করে তো সেলিমকে একলা ফেলে চলে গেছে তার আম্মা আর আব্বা! চলে গেছে তার কুড়িয়ে পাওয়া মা। সেলিমকে হারাতে হয়েছে সোনা-চাঁদির দোকানের সেই মালিককে, বৃদ্ধ ওস্তাগরকে। নির্জন এই আস্তাবলের ঘরটার ভেতর এইসব কথা একাকী ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে ওঠে সেলিম। কী ভীষণ নি:সঙ্গ এখন সে! এই মস্ত পৃথিবীতে শব্দের কত-না তরঙ্গ। কত কথা, কত সুর, কত হাসি, কত গান। শুধু সেলিমেরই মুখে শব্দ নেই। কারও সঙ্গে মনের একটি কথাও সে বলতে পারে না। এই ঘরটা যেমন শূন্য, বোবা তেমনি সেলিমও যেন নির্বাক নিষ্প্রাণ। ছটফট করে ওঠে সেলিম। দম বন্ধ হয়ে আসে তার।

‌চিঁ-হিঁ-হিঁ।‌ হঠাৎ ডেকে ওঠে কেন তুফান?

আনমনা সেলিম থতোমতো খেয়ে যায়। হ্যাঁ, তুফান নামে ওই ঘোড়াটাই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। সেলিম ছুটে যায় তার কাছে। তার গলাটা জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে, ‌ওরে তুফান, আমায় ছেড়ে সবাই চলে গেল। এখন তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই। এখন তুই ছাড়া আমার মনের কথা আর কে শুনবে! ওরে তুফান, এই শূন্য ঘরটা কী ভয়ংকর ফাঁকা। ঘরের এই বোবা দেওয়ালগুলো চোখ মটকে আমাকে তাচ্ছিল্য করে। রাতের অন্ধকারে ঘরের ওই কড়িকাঠগুলো আমাকে দেখে হাততালি দেয়। আমি ঘুমোতে পারি না। এখন তুইও যদি আমায় ছেড়ে চলে যাস, আমি বাঁচব কাকে নিয়ে!‌

ঘোড়াটা সেলিমের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ যখন সেলিমের হাতটি তার কপাল ছুঁয়ে আদরে ভরে যায়, তখন সে আবার ডেকে ওঠে, ‌চিঁ-হিঁ-হিঁ।‌

সেই ডাক শুনে সেলিমের বুকটা যেন আশায় উপচে ওঠে। সে বলে, ‌আর আমার ভয় নেই। তুই আছিস, তোকে নিয়েই আমি আবার পথে বেরোব। খুঁজে বার করব আমার আম্মা-আব্বাকে, আমার মাকে, রহিমচাচাকে। তারপর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পাহাড়ে উঠব। সেই দুধসাদা পাখির মিনারে যাব।‌

ঘোড়াটা চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকে।

পরের দিন সত্যিই সেলিম সকাল সকাল উঠল। তুফানকে পেট ভরে খেতে দিল। তারপর তুফানের পিঠে চেপে সে বেরিয়ে পড়ল। সে এখন খুঁজে বার করবে তার আপন মানুষগুলিকে। এই পৃথিবীর আনাচেকানাচে তাদের সন্ধান করবে।

কিন্তু হায় রে! সেলিম কি জানে না, সময় যে অনেক বয়ে গেছে! পৃথিবীর বুকে বুকে কত শীত কত বসন্ত এসেছে, চলে গেছে। বয়েস বেড়েছে সবার। সেও তো আর সেই ছোট্ট সেলিমটি নেই। সুতরাং সে তো আর কোনোদিন খুঁজে পাবে না তাদের।

তুফান ছুটে যায়, সেলিম তার পিঠে বসে আতালি-পাতালি খুঁজে বেড়ায়। পৃথিবীটা কত বড়ো, কোথায় খুঁজবে সে। কোথায় যাবে সেলিম? কোন অরণ্যে? কোন জনপদে?

খুঁজতে খুঁজতে একটির পর একটি বছর কেটে যায়। কত বার যে বর্ষার নূপুর বাজিয়ে গেল বৃষ্টিফোঁটারা, কত বার যে সবুজে উছলে উঠল পৃথিবীর মাটি, তবুও সেলিম থামল না। এগিয়ে চলল তুফানকে নিয়ে, কিন্তু খুঁজে পেল না কাউকেই।

একদিন হঠাৎই সেলিমের যেন খেয়াল হল, তুফান তো আর তেমন করে ছোটে না! তেমন করে ডাকে না। কদম পায়ে লাফায় না। তুফানকে ভালো করে দেখে সেলিম। আরও ভালো করে! দেখতে দেখতে চমকে ওঠে। একী, তুফান যেন বুড়ো হয়ে গেছে! সেই টগবগিয়াল ঘোড়াটা এখন যেন কেমন একটা নির্জীব জন্তু! ভয় পায় সেলিম। বুঝতে পারে, তারও যেন যৌবন ফুরিয়ে গেছে। সে তুফানের পিঠ থেকে নেমে পড়ে। একটা নদীর কিনারে এসে নিজের ছায়া দেখে। সে যে নিজেকেই নিজে চিনতে পারে না। এত বয়েস হয়ে গেছে তার! এত বুড়ো!

হ্যাঁ, বুড়োই হয়েছে সেলিম। মাথার চুলগুলো সব পেকে গেছে তার। দাড়িতে পাক ধরেছে। হবেই তো, সময় তো আর থেমে নেই।

তাই আরও ক-টা বছর কেটে গেল।

পৃথিবীর রাস্তায় রাস্তায় বন্দরে-নগরে এখন এক বৃদ্ধ মুশাফিরের মতো ঘুরে বেড়ায় সেলিম, তুফানের পিঠে। তার দেহটা বেঁকে কুঁজো হয়ে গেছে। নড়বড় করছে। শিথিল হয়ে গেছে দেহের চামড়া। মুখের আনাচেকানাচে বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোখের দৃষ্টিও তার ক্ষীণ। আর তুফানেরও এখন একই হাল। খুটখুট করে হাঁটে। হুটহাট করে যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপায়। তারপর আকাশের দিকে তাকায়। কে জানে আকাশে কী দেখে সে।

একদিন সেলিমেরও তুফানের পিঠে বসে বসে হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ পড়ে যায়। চমকে ওঠে সেলিম। সামনে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের চূড়ায় একটা মিনার। সেলিম ঝটপট দাঁড় করায় তুফানকে। বার বার দেখতে দেখতে ভাবে, তবে কি ওটাই সেই দুধসাদা পাখির মিনার! অস্থির হয়ে ওঠে সেলিম। তুফানকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একটা অবুঝ বাচ্চাছেলের মতো আকুল হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‌তুফান, মিনার!‌

তুফান ধুঁকতে ধুঁকতে যেমন করে ওই আকাশটা আগে দেখছিল, তেমনিই করে আবার দেখল।

সেলিম আর থাকতে পারল না। তুফানের পিঠ থেকে ঝপ করে নেমে পড়ল। রাস্তায় যে লোকটিকে সে সামনে দেখল তাকে বলল, ‌ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?‌

লোকটি থামল। সেলিমের মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌কী কথা?‌

সেলিম বলল, ‌দেখতে পাচ্ছেন তো ভাই, আমি বুড়ো হয়েছি। চোখে কম দেখি তাই জিজ্ঞেস করছি, পাহাড়ের চূড়ায় ওটা কী দেখা যাচ্ছে?‌

‌মিনার।‌ সে উত্তর দিল।

‌মিনার! উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল সেলিম। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, ‌ওই মিনারে কি দুধসাদা পাখি থাকে?‌

‌লোকে বলে।‌ লোকটি জবাব দিল।

‌আপনি কখনো দেখেননি?‌ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল সেলিম।

‌—না।‌

‌—আপনি কখনো মিনারে যাননি?‌

লোকটি উত্তর দিল, ‌কেউ পথ খুঁজে পায় না।‌

যেন হতাশায় চুপসে গেল সেলিম। তারপর আপন মনেই বলে ফেলল, ‌পথ আমি খুঁজে বার করব।‌

—‌কেন, আপনি যাবেন নাকি?‌

‌দেখি!‌ উত্তর দিল সেলিম।

‌এই বয়সে!‌ বলে লোকটা সেলিমের মুখের ওপর আঙুল তুলে হেসে উঠল। কী তাচ্ছিল্যভরা সেই হাসির শব্দ। তারপর হাসতে হাসতে চলে গেল।

সেলিম কিন্তু চলে গেল না। সেইখানে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। আরও কিছুক্ষণ পাহাড়ের চূড়াটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর তুফানকে বলল, ‌পারবি না তুফান ওই চূড়ায় আমাকে নিয়ে যেতে?‌

তুফান আকাশটার দিকে মুখ তুলে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল।

কিন্তু সেলিম আর দাঁড়াল না। সে তুফানের পিঠে চাপল। তারপর খুঁজতে লাগল পথ, ওই পাহাড় চূড়ায় মিনারের পথ।

সময় চলে যায়। পথ মেলে না।

আরও বয়েস বাড়ে সেলিমের, তুফানের। হায় রে! জীবনের সময় বুঝি শেষ হয়ে আসে। আর বুঝি যাওয়া হল না ওই মিনারে। বড্ড ব্যস্ত হয়ে ওঠে সেলিম।

পথ নাই থাক। সেলিম ঠিক করল, সে তুফানকে নিয়ে ওই কঠিন পাথর ডিঙিয়েই চূড়ায় উঠবে। হ্যাঁ, সত্যিই তুফান এগিয়ে চলল। পাহাড়ের পাথরে তুফানের পায়ের শব্দ ওঠে। অনেক, অ-নে-ক উঁচুতে সেই মিনার। কত পথ যেতে হবে তাকে! তবু সে থামে না। চলতে চলতে পিছলে যায়। ধাক্কা খায়। সামলে নেয়। আবার ওঠে। তার সারাগায়ে ঘামের ফোঁটাগুলি টুপটাপ ঝরে পড়ার আগেই সেলিম মুছে দেয় আর ভাবে, শেষ অবধি যেতে পারবে তো তুফান!

আহা রে! হোঁচট খেতে খেতে তুফানের পা কেটেছে! পায়ের ক্ষতগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই ক্ষত দিয়ে রক্তের বিন্দুগুলি গড়িয়ে পড়ছে। কে জানে, এই রক্তের বদলে সে তার প্রভুকে মিনারে পৌঁছে দিতে পারবে কি না।

দ্যাখো, দ্যাখো, ওই তো মিনারটা—কাছেই। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেলিমের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তবে সে কি সত্যিই এসে গেছে!

কিন্তু একী! তুফান অমন টলমল করছে কেন? ও কি আর পারছে না? পারছে না ওপরে উঠতে?

সেলিম দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তুফানকে আদর করে চেঁচিয়ে উঠল, ‌শাবাশ, শাবাশ তুফান! আর একটু চ‌ বাবা! আর একটু গেলেই ওই দ্যাখ, সেই মিনার।‌

কিন্তু তুফান বুঝি আর পারছে না। এই বুঝি সে মুখ থুবড়ে আঘাত পায়! শক্ত হয়ে দাঁড়াবার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে তুফান—টলছে। এলোমেলো পা ফেলছে। আর কতটা উঠতে হবে?

হুররে! এই তো সেই মিনার। তুফান পৌঁছে গেছে। তুফানের পিঠ থেকে ঝটপট নেমে পড়ল সেলিম। তুফানের দুটো গাল দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে ওর কপালে একটা চুমু খেল সে। তুফান নিশ্চুপ, হাঁপাচ্ছে। এই নির্জন পাহাড়চূড়ায় তার নিশ্বাসের শব্দটা কী প্রচন্ড জোরে আছড়ে পড়ছে। আর দাঁড়াতে পারল না তুফান, লুটিয়ে পড়ল সেই কঠিন পাথর ঘেরা পাহাড়ের চূড়ায়। জুলজুল করে দেখতে লাগল তার প্রভুকে। ভারি করুণ তার সেই দৃষ্টি। তারপর দেখতে দেখতে কখন যেন সে চোখ বুজে ফেলল। কখন যেন থেমে গেল তার বুকের শব্দটা।

সেলিম জানতেও পারল না, তার শেষ বন্ধুটি এই পৃথিবী থেকে এইমাত্র তাকে ছেড়ে চলে গেল। জানবে কেমন করে! তখন যে তার দৃষ্টি তুফানের মুখের ওপর থেকে মিনারের চূড়ায়। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সেলিম। একটি পাথরের ওপর আরেকটি পাথর গেঁথে কে গড়েছে এমন মিনার! হাত বাড়ায় সেলিম। স্পর্শ করে। শিহরন জাগে। এই মিনারের সোপান বেয়ে এখন তাকে উঠতে হবে ওপরে। আজ যে সে দুধসাদা পাখির গান শুনবে সেখানে!

কিন্তু হায়! কেমন করে উঠবে সেলিম অত ওপরে! এখন যে সে বুড়ো থুত্থুড়ে!

হোক সে বুড়ো। একটি পাথরের সোপান থেকে আরেকটি পাথরের সোপানে সে পা ফেলে। এগিয়ে চলে একা একা। সে যেন এক নি:সঙ্গ অভিযাত্রী।

কিন্তু কতক্ষণ পারবে সে একা একা এই চড়াই ভাঙতে!

যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না। সে এগিয়ে যাবে।

না, পারল না সে। বুড়ো মানুষটার রক্ত যেন হিম হয়ে আসে। বুকের নিশ্বাস দুরন্ত গতিতে বয়ে চলে। বসে পড়ে সেলিম সোপানের ওপর। কিছুক্ষণ থামে বিশ্রাম নেয় আবার দাঁড়ায় সে। দু-পা ফেলে আবার বসে পড়ে। পা যেন আর বইছে না—কাঁপছে। বুকে ভর দেয় সেলিম। বুকে ভর দিয়ে হাঁটে। একটি ধাপ পেরিয়ে আরেকটি ধাপ সে এগিয়ে যায়। পাথরে পাথরে ঘষে যায় তার বুকের পাঁজর। আঘাত লাগে, রক্ত পড়ে তবু সে থামে না।

কিন্তু লক্ষ্য আরও কত দূরে? সেলিম যে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

না, ক্লান্তি তাকে আজ ঘায়েল করতে পারবে না। সে যেমন করে হোক আজ জয় করবে এই দুধসাদা পাখির মিনার। তার আম্মার গল্প আজ সত্যি হবে।

সেলিমের হাতের মুঠি যেন শিথিল হয়ে আসছে। তার চোখের দৃষ্টি কেন এত ঝাপসা হয়ে আসছে! মাথাটা টলছে যেন। শেষ ধাপে সেলিম পৌঁছে গেছে কি?

হ্যাঁ, এইমাত্র সেলিম মিনারের শেষ সোপানটি বুকে হেঁটে পার হল। সোপানের শেষ পাথরে সেলিমের রক্তের শেষ চিহ্নটি আঁকা হয়ে গেল। মিনারের চূড়ায় লুটিয়ে পড়ল সেলিম। না, আর সে দাঁড়াবে না। দাঁড়াতে পারবে না। আর সে দু-হাত তুলে খুশিতে চিৎকার করে বলতে পারবে না, আম্মা, এই দ্যাখো আমি তোমার গল্পের মিনারে উঠেছি। এবার আমি দুধ-সাদা পাখির গান শুনব।‌

মিনারের মাথায় মুঠো মুঠো আলো ছড়িয়ে আকাশটা নেমে এসেছে। ঝলমল করছে চারদিক। ওই দ্যাখো, সেই পাখি। ওই দ্যাখো, এই উজ্জ্বল নীল আকাশটার ওপার থেকে সে ডানা মেলে উড়ে আসছে। দ্যাখো দ্যাখো, তার সাদা ডানার আড়ালে যেন সারা আকাশটা ছেয়ে গেল। যেদিকে চাও সাদা আর সাদা। তারপর বাতাসে যেন সুরের শব্দ ভেসে উঠল। কে গান গায়! ওই কি সেই দুধসাদা পাখির কন্ঠ! আঃ! কী মধুর!

সেলিমের চোখ দুটি বুজে যায়। ওর মনে হয়, এপাখি যেন তার আম্মা! ছোট্ট সেলিমকে গান শোনাচ্ছে এই মিনারের আকাশে। তারপর সেলিম ঘুমিয়ে পড়ল।

অধ্যায় ১ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%