দুখিরাম সর্দারের প্রায়শ্চিত্ত...

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

বিশু মন্ডলের কথা শুনে মিনতি ঝংকার দিয়ে বলল –‘প্রায়শ্চিত্ত! চালাকি পেয়েছেন নাকি! একটা পয়সাও দেব না বলে দিলাম। বিশু মন্ডল কোন পরিস্থিতিতেই মাথা গরম করে না আজও মিনতির মেজাজ দেখে উত্তেজিত হবার লক্ষন দেখাল না, শান্ত স্বরেই বলল –‘দ্যাখো গ্রামে ছেলেপুলে নিয়ে সব গেরস্থের বসবাস, তোমাদের জন্য তো আর সবাইকে বিপদে ফেলতে পারি না, হয় জরিমানার টাকা মিটিয়ে দাও, নাহলে কাল থেকে গ্রামের কেউ তোমাদের সঙ্গে কোনরকম লেন দেন যে রাখবে না সে তো আগেই বলেছি’। মানিক প্রথম থেকেই এই মিটিঙে উপস্থিত থাকলেও এতক্ষণ কোনরকম উচ্চবাচ্য করেনি এবার গলা চড়িয়ে বলল –‘মন্ডল কাকা এটা কি আঠারশ শতাব্দী পেয়েছেন নাকি, যে গোরু অপঘাতে মরেছে বলে আমাদের একঘরে করবেন, বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু কলকাতা থেকে মিডিয়া ডেকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ব দেখে নেবেন’। মন্ডল মুচকি হেসে নাকে একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন –‘দ্যাখো হে তুমি যখন স্কুলে মাস্টারি করো, বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু আছে নিশ্চয়ই! তা তোমার বাবা যখন বেঁচে ছিল তখন কারনে অকারনে অনেককেই একঘরে করে ছেড়েছিল তখন তোমার মনে হয়নি সেটা কোন শতাব্দী? এখন দিনকাল পাল্টেছে, তোমাদের মেনে নিতে একটু সময় লাগবে সেটা বুঝি, তবে ভুলে যেও না হে এই গ্রাম পঞ্চায়েত কিন্তু এখন আমাদের দখলে আর ওই যে কলকাতার কথা কি সব বলছিলে না, সেখানেও কিন্তু আমাদের লোকজনই সব বসে রয়েছে’। মন্ডলের যুক্তিতে মিনতি আর মানিক দুজনেই দমে গেল। কথাটা অবশ্য বজ্জাত বুড়োটা মিথ্যে বলেনি, মাত্র কয়েকটা বছর আগেও সর্দারদের এই ছোট-কোদালিয়া গ্রামে কি প্রতাপটাই না ছিল! মিনতির তো গুমোরে মাটিতে যেন পা পড়তেই চাইত না কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে আজ তাদের পার্টির ঘোর দুর্দিন! ক্ষমতা চলে গেছে বিপক্ষের হাতে যার ফলে ওই উটকো মন্ডল বুড়োটা বেমক্কা গ্রামের মাতব্বর হয়ে বসেছে। নানারকম ফন্দিফিকির এঁটে সে যে সর্দারদের হেনস্থা করার সুযোগ খুঁজবে সেটা মিনতি অবশ্য আগেই বুঝতে পেরেছিল। উপায়ন্তর না দেখে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে মিনতি বলল –‘টাকাটা কমান, এতো টাকা আমরা দিতে পারব না’। যেন দারুন একটা মজার কথা শুনেছে এই ভাবে মন্ডল খি খি করে হেসে উঠল, বলল –‘হাসালে দেখছি! তোমরা পারবে না! তাহলে এই গ্রামে আর কে পারবে শুনি? হারান তো বছর বছর গ্রামের এতো সেবা করল যে কাঁচা ভিটে থেকে পাকা দোতলা উঠল, অনেকের সর্বস্য হরণ করে বিঘে বিঘে জমিও হল সেই জমিতে চাষাবাদও দিব্যি হয়, ছেলের স্কুলে চাকরি পাকাপোক্ত হয়েছে তারপরেও এতো কান্নাকাটি কিসের হে’? বিভাস ভটচাজ পঞ্চায়েতের একজন সদস্য হাসি মুখে বলল –‘তা তোমরা যদি খরচ বাঁচাতে চাও তাহলে বিনি পয়সার রাস্তাটাই নাহয় নিলে, তেমন কিছু তো নয় মোটে দিন সাতেকের ব্যাপার, গৃহকর্তার গলবস্ত্র হয়ে ভিক্ষা সংগ্রহ আর কুশাসনে শয়ন, সারাদিন অভুক্ত থেকে রাতে ওই ভিক্ষান্নেই স্বপাক হবিষ্যি ভোজন, সামান্য কৃচ্ছসাধন মানিক হাসতে হাসতেই সেরে ফেলবে, কি বল হে তোমরা’? একথায় উপস্থিত সকলে সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। মানিক এবার বেশ ঘাবড়ে গেল, বুড়ো গুলো তো মহা ঘোড়েল! তাকে প্যাঁচে ফেলে জব্দ করতে চাইছে। সমবেত গুঞ্জনের ওপর নিজের গলা চাপিয়ে বলল –‘ও সব আমাকে দিয়ে হবে না, আপনারা অন্য রাস্তা দেখুন’। মন্ডল বলল –‘তাহলে তো কথা হয়েই গেল কাল সকালে এসে দশ হাজার টাকা রেখে যেও। পাঁচ হাজার টাকায় ব্রাহ্মণ ভোজন হবে আর বাকি অর্ধেকটা পঞ্চায়েত তহবিলে জমা থাকবে কেমন’! মিনতি যেন গভির চিন্তায় ডুবে ছিল হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল –‘টাকা দেওয়া যাবে না আমরা নাহয় প্রায়শ্চিত্তই করব, ওই যে বললেন না সাতদিনের ব্যাপারটা’। এই কথায় ঘরে মৃদু গুঞ্জন উঠল। মণ্ডল আর ভবেশ ভটচাযেরা বিলক্ষণ সন্তুষ্ট হয়ে পড়ল, তাদের আজন্ম শত্রু ওই হারান সর্দারের ছেলেটার গলায় গামছা দিয়ে যদি ভিক্ষা করিয়ে নেওয়া যায়, টাকার বদলে সেটাই বা মন্দ কিসের!

অন্য দিকে মানিকের মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। মা বুড়িটার কি শেষে ভীমরতি ধরল নাকি! কয়েকটা টাকার জন্য নিজের সন্তানকে হাড়ি-কাঠে বলি দিতে চাইছে এ কেমন মা?। মিনতির মুখের উপর রোষকষায়িত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রভাবিত করার চেষ্টা অবশ্য বিফলে গেল। মিনতি কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই বলে চলল –‘আপনাদের কথাই রইল, বাড়ির কর্তা গোবধ পাপ খন্ডনের জন্য যথাবিহিত প্রায়শ্চিত্ত করবেন’। ভবেশ ভটচাজ তেড়িয়া মেজাজে বলল -‘তবে এই ব্যাপারে কোনরকম ফাঁকিবাজী কিন্তু আমরা বরদাস্ত করব না সেটা আগেই বলে দিচ্ছি’। মিনতি শান্ত স্বরে বলল –‘যদি আপনাদের মনে সন্দেহ থাকে তাহলে বলে দিন ঠিক কি করতে হবে’। -‘যদি সবার চোখের সামনে প্রায়শ্চিত্তটা হয় তাহলেই কিন্তু আমরা মানব নচেৎ নয়’। মন্ডল গ্রামের মাতব্বর বেশিক্ষণ চুপ থাকলে তার মানসম্মান খর্ব হতে পারে, সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল –‘তাহলে ওই কথাই ঠিক হল, প্রায়শ্চিত্ত হবে গায়ের চণ্ডীমণ্ডপে, সবার চোখের সামনে, এই সাতদিনে বাড়িতে যাতায়াত বা পরিবারের কারো বিন্দুমাত্র সংশ্রব চলবে না, ভিক্ষে জুটলে খাবে না জুটলে উপবাস, শয়ন হবে দাওয়াতে খড়ের ওপর, কোনরকম নিয়মভঙ্গ হচ্ছে কিনা নজরে রাখতে সর্বক্ষণ একজন পাহারায় থাকবে, কি রাজি তো’? মিনতি দৃঢ় স্বরে বলল –‘রাজি’! মানিকের মাথার ভিতরটা এতক্ষণে যেন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, মা বুড়িটাকে সে তীর্থ করার অছিলায় বৃন্দাবন নিয়ে যাবে তারপর বিধবা ভিখিরিদের মাঝে বসিয়ে চম্পট দেবে, তখন বুড়ি বুঝবে কতো ধানে কতো চাল! ভবেশ ভট্‌চাজ প্রসন্ন স্বরে বলল –‘তাহলে আর কি, আমার কাছে একটা পুরানো থান রয়েছে এখুনি আনিয়ে দিচ্ছি মানিককে বলো শার্ট পেন্টুল ছেড়ে সেটা পরে নিক’। মিনতি এবার যেন আকাশ থেকে পড়ল –‘মানিক! সে কেন থান পরতে যাবে’? বিশু মন্ডল বিস্মিত স্বরে বলল –‘তাহলে এতক্ষণ কিসের কথা হচ্ছিল শুনি’! মিনতি নাটকীয় ভাবে বলল –‘সে কথাই তো ভাবছি, আপনারা বললেন বাড়ির কর্তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, মানিক আবার কবে বাড়ির কর্তা হল! আমার স্বামীর অবর্তমানে দেওর দুখিরাম আমাদের অভিবাবক সেটা আপনাদের না জানার তো কথা নয়’। মন্ডল আর তার দল সমস্বরে বলে উঠল–‘দুখিরাম মানে তোমাদের ওই দুখু’! মিনতি ভালো মানুষের মতো মুখ করে বলল –‘আজ্ঞে উনিই। এমন ঠাণ্ডা মেজাজের মন্ডলও এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, বলল –‘ইয়ার্কি করছ! দুখু কবে থেকে তোমাদের কর্তা হল ওকে তো বাড়ির চাকর বলেই এতকাল জেনে এসেছি’। মিনতি শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলল –‘বাড়ির টুকিটাকি কাজ করলেই কেউ চাকর হয়ে যায় না, এতো খবর রাখেন আর এটা বুঝি জানেন না উনি আমার স্বামীর আপন খুড়তুতো ভাই’। মন্ডলরা এবার যথার্থই বিপাকে পরে গেল। দুখিরাম যে সর্দারদের আত্মীয় এটা গ্রামের সবার জানা থাকলেও ক্ষেত্র বিশেষে কারো মাথায় থাকে না। তাছাড়া নেহাত ফালতু একটা লোককে নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজনটাই বা কিসের? ভবেশ ভট্‌চাজ হতাশ কণ্ঠে বলল –‘কিন্তু দুখুটা যেমন হাবা তাতে সব ঠিকঠাক করতে পারবে কি’? মিনতি উজ্জ্বল মুখে বলল –‘আপনারা তো নজর রাখার জন্য রইলেন, ভুল করলে শুধরে নেবেন নাহয়’। মন্ডলের মেজাজ বিগড়ে গেছে তেঁতোমুখে বলল –‘এটা ভালো বুদ্ধি করেছ, তবে বলে দিলাম এই গ্রামে থাকতে হলে ন্যায্য ভাবে থাকতে হবে নাহলে কিন্তু দূর করে দেব’। মানিক তেড়েমেরে কিছু বলতে যাচ্ছিল মিনতি হাত চেপে ধরতে চুপ করে গেল।

সপুত্র মিনতি বিদায় নিতেই ভবেশ ভট্‌চাজ বলল –‘দেখলে কেমন জাঁহাবাজ মেয়েমানুষ! জরিমানাও দিল না আবার কায়দা করে শাস্তিটাও চাপিয়ে দিল ওই হতভাগা দুখুটার ঘাড়ে’। মণ্ডল রাগে গস গস করতে করতে বলল -‘তোমরা গ্রামের সবাইকে বলে দাও কেউ যেন একটা চালও ভিক্ষে না দ্যায় দেখি ব্যাটা কি খেয়ে উপোষ ভাঙে’। সামন্ত বলল –‘সেটা কি ঠিক হবে হে, লোকটা যদি মরে যায়’। মণ্ডল বলল –‘সেটাই তো দরকার, যদি মরে তাহলে সব দায় ওই মা বেটার উপর চাপিয়ে এমন শোধ তুলব তখন বুঝবে’। তবে মুখে যতই আস্ফালন করুক না কেন, মিনতির কূটবুদ্ধিতে হেরে গিয়ে মণ্ডলদের উৎসাহ ঠাণ্ডা হয়ে পড়ল। এরপর আজকে আর আড্ডা তেমন জমল না এক এক করে সবাই ঘরমুখো হয়ে পড়ল।

দুখিরাম লোকটা নিতান্তই সাদা-সিধে, সবরকম ছল-চাতুরী ঘোর প্যাঁচের সঙ্গে সম্পর্কহীন। দিনভর গা-গতর ঢেলে পরিশ্রমের ফাঁকে মাঝে মধ্যেই কোথায় যে চলে যায় আর আনমনে কিসব বিড়বিড় করে বলে আর কিসব ভেবেই বা হেসে ওঠে কেউ বোঝে না। চারপাশের জগতটায় কি হচ্ছে জানার না আছে আগ্রহ না আছে নিজের ব্যাপারেও বিন্দুমাত্র কৌতুহল। লোকে হাবভাব দেখে তার নাম রেখেছে হাবা দুখি। অপরিসীম নির্লিপ্ততায় ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ শোষণের বোঝা মাথায় নিয়ে নির্বিকার দুখিরাম নিজেতে মগ্ন হয়ে জীবনের পয়তাল্লিশটা বছর পেরিয়ে এসেও আজো একই রকমের উদাসীন। হয়ত বিধাতার অমোঘ ইচ্ছেতেই তার বাবা ছেলের নাম দুখিরাম রেখেছিল, যদিও তখন পর্যন্ত দুখির জীবনে দুঃখের তিলমাত্র আভাষও ছিল না। জীবনের প্রথম দশ বারোটা বছর বাবা মায়ের অপত্য স্নেহে স্বপ্নের মতো কাটলেও মায়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর সাথে সাথে পরিস্থিতির আমুল পরিবর্তন ঘটে গেল। স্ত্রীর শোকে দুখির বাপ মদ ধরল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেও পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বিদায় হল। অনাথ দুখির আশ্রয় হল জ্যাঠা পরাণ সর্দারের ভিটেতে। লেখাপড়া দুখির মাথায় কোনদিনও ঢোকে নি তাই জ্যাঠাও আর ও পথ মারালেন না। দুখিকে লাগিয়ে দিলেন বাড়ির কাজে। দুখির বাবা কিছু চাষের জমি আর বাস্তুভিটে রেখে গেছিলেন সেগুলি দ্রুত জ্যাঠার হাতে চলে গেল। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দুখির কপালে জুটতে লাগল শুধু গালিগালাজ আর চড়চাপড়। কয়েকবছর পরে জ্যাঠাও ইহলোক ত্যাগ করলেন। পরাণ সর্দারের ছেলে হারান চড়া মেজাজের দাপুটে লোক। রাজনীতির কারবারিদের সংশ্রবে এসে খুব তাড়াতাড়ি নিজের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টায় উঠে পরে লেগে গেল। গ্রামের অনেকের জমি জমা শেষ সম্বলটুকুও হারানের শক্ত হাতের মুঠোয় মিলিয়ে গেল। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে গাছাড়া হল কারও বা মাথা ফাটল কিন্তু হারানকে কেউ জব্দ করতে পারল না। একদিন সবাইকে অবাক করে এরকম দুর্দান্ত হারান নিজেই হঠাৎ মৃত্যুর কাছে হেরে গেল।

হারান মারা যাবার পরে বাড়ির চাকর নিতাই দুখিকে বারকয়েক বুঝিয়েছে এখানে বিনা পয়সায় গাধা মজদুরি করে কোন লাভ নেই, নিতাই পাশের গ্রামে প্রতাপ হাজরার বাড়িতে চাকরি নিয়েছে, রাজি থাকলে দুখিরও একটা হিল্লে সে করে দিতে পারে। সেখানে মাইনেও পাওয়া যাবে আর পেট ভরে দুবেলা খাওয়াও জুটবে। দুখি উত্তর দ্যায় নি শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই থেকেছিল। কি জানি কেমন একটা অভ্যাস হয়ে গেছে, নিজের ভালোমন্দ ভাবার ইচ্ছে আর ক্ষমতা দুটোই যেন হারিয়ে ফেলেছে। নিতাই বিরক্ত হয়ে বলেছিল –‘সাধে কি তোমায় লোকে হাবা বলে ডাকে’। এরপর আর একদিন নিতাই এসেছিল দুখির সঙ্গে কথা বলতে মিনতি দেখতে পেয়ে বঁটি হাতে রে-রে করে তেড়ে গেছিল। সেই যে নিতাই ছুটে পালাল আর সাহস হয় নি এমুখো হবার। এদিকে নিতাই চাকরি ছেড়ে চলে যাবার পরেই আবার নতুন সমস্যার সৃষ্টি হল তার জায়গায় জগা নামের যে ছেলেটা কাজে লাগল সে যেমন ফাঁকিবাজ তেমন নিস্কর্মা, গোঁদের উপর বিষ-ফোঁড়া আবার মেজাজটাও তেড়িয়া। মিনতি একদিন জগাকে ধমকাতে গেছিল সে মুখের উপর স্পষ্ট জবাব দিয়ে দিয়েছে এর থেকে ভালো কাজ তাকে দিয়ে হবে না দরকার পরলে বাবুরা অন্য লোক দেখুক। এই হয়েছে উৎপাত! আগেকার যুগ হলে ছোরাকে জুতিয়ে সিধে করে দেওয়া যেত কিন্তু এখন দিনকাল পাল্টেছে। মণ্ডলদের চটিয়ে গ্রামের কারোর সাহস নেই সর্দারদের কাজে লাগে। নেহাৎ ছেলেটা আধপাগলা ভবঘুরে গোছের, অন্য গ্রাম থেকে এসে জুটেছে তাই! এখন এই জগাই হল যত নষ্টের গোঁড়া।

সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার হয়ে ছিল। জগা নিয়মমাফিক গোরু-বাছুর গুলোকে নদীর পারে চড়াতে নিয়ে গেছিল। গোরুগুলো যতক্ষণ ঘাস চিবুতে থাকে ততোক্ষণে জগা বেশ একটা দিবানিদ্রা দিয়ে নেয়, যদিও সেদিন ঘুমটা ঠিক জমিয়ে হল না। এদিকে নদীর পারের শ্মশানটায় এক তান্ত্রিক বাবাজী কিছুদিন হল আস্তানা গেড়েছেন। জগা বারদুয়েক সেখানে ঢু মেরে এসেছে যদি কিছু নেশার বস্তু জোটে, কারন গাঁজায় দম মারাটা জগার পুরনো অভ্যাস, তবে সাধুবাবার হাত দিয়ে মাছি গলে না, প্রতিবারেই খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়েছে তবে আজ কোন কারনে বাবাজী খোস মেজাজেই ছিলেন, জগাকে দেখতে পেয়ে আপনজনের মতো আপ্যায়ন করে গাজার ছিলিম হাতে ধরিয়ে দিলেন আর নিজেও সেবন করতে শুরু করলেন। এদিকে কিছুক্ষনের মধ্যেই আকাশ কালো করে মেঘের আনাগোনা শুরু হল সামান্য পরে বজ্রপাত সহ তুমুল বৃষ্টি। অকস্মাৎ প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ দেখে গোরু বাছুরগুলো বিষম ঘাবড়ে এদিক ওদিক ছুটে পালাতে শুরু করল। কাজলি বাছুরটা তার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে একটা জামরুল গাছের নিচে দাড়িয়ে ছিল, হয়ত তার জান্তব বুদ্ধিতে এই জায়গাটাই নিরাপদ মনে হয়েছিল। ঠিক তখনই আকাশের বুক চিড়ে রুপালী আলোর তীব্র একটা ফালি আছড়ে পড়ে বিশাল ওই গাছ আর কাজলি দুজনকেই একসাথে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। জগা সেসময় অবশ্য পুরোদমে মৌতাতে ডুবে ছিল।

আজকের সকালটা কেমন যেন অন্যরকম! দুখিরামের কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কাকভোরে উঠে প্রতিদিনের মতো প্রাতকৃত্য সম্পন্ন করতে যাচ্ছিল এমন সময় ভাইপো মানিক এসে হাজির, এমনিতে মানিক দুখিকে বিশেষ পাত্তা টাত্তা দ্যায় না কিন্তু আজ সে বেশ হেসে হেসে কথা বলছে, এমনকি দারুন অবাক করে দুখিকে কাকা বলেও সম্বোধন করল। খানিক পরেই মিনতি বউদিও এলো তার হাতে একটা সাদা থান কাপড়। আজ আর মুখ ঝামটা গালিগালাজ নয় বউদিও এতো বছরে এই প্রথম দুখির সঙ্গে হেসে কথা বলল। মানিক বলল –‘কাকা চল স্নান সেরে নিয়ে থানটা পড়ে নাও’। দুখি বোকার মতো মুখ করে বলল–‘এখন চান কেন করব? ক্ষেতে কাজ রয়েছে যে’! মানিক অবুঝ কাকার বোকামি দেখে করুণার হাসি হাসল, বলল –‘সে কি! আজ যে তুমি প্রায়শ্চিত্ত করতে যাবে, তা স্নান না করলে হবে’। দুখিরাম তাও বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে মিনতি ধৈর্য হারিয়ে ঝাঁজিয়ে উঠে বলল –‘ওরে মানিক ওকে বুঝিয়ে কাজ নেই তাড়াতাড়ি তৈরি করে চণ্ডীমণ্ডপে দিয়ে আয় দেখি’। মানিক এবার বিষম তাড়া লাগিয়ে বলল –‘চল কাকা আর দেরি নয়’। মানিকের তাড়নায় দুখিকে পুকুরে গিয়ে দুটো ডুব দিতেই হল, এবার হাতে থান ধরিয়ে মানিক বলল –‘সাতদিন চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে থাকবে, ভিক্ষে করে খাবে, আর হ্যা যেখানেই ভিক্ষে করো না কেন এবাড়ি আসা চলবে না কেমন, প্রাশ্চিত্ত হলে পর আবার বাড়ি চলে আসবে, মোটে একটা সপ্তাহ ও দেখতে দেখতে কেটে যাবে’। দুখিরাম কিছুই বুঝল না কিসের প্রায়শ্চিত্ত? মানিক সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তাকে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়ে দিল। মন্ডলেরা বলেছিল তারা সর্বক্ষন নজর রাখবে, কিন্তু মানিকের বদলে দুখি প্রায়শ্চিত্ত করতে আসায় তাদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে। কেউ একজনও দেখতে এলো না দুখি কি করছে।

দুখিরাম সারা গ্রাম চষে ফেলল, কিন্তু কেউ একমুঠো চালও দিল না। কারুর কাছে চাল ছিল না এমন নয়, লোকে তাকে ঘৃণা করে তাও নয়। আসলে বিবাদ-মান দুই গোষ্ঠীর কোন্দলে মাথা গলাবার সাহস হল না কারোর।

আষাঢ় মাসের নিশুতি রাত। গতকাল খুব একচোট বৃষ্টি হয়েছে, আকাশের অবস্থা দেখে আজকেও বৃষ্টির সম্ভবনা পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যাচ্ছে না। দুখির সারাদিনে কোনরকম দানি পানি জোটে নি। বিশেষ তলিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা না থাকলেও দিনভর লোকের দোরে দোরে ঘুরে আর প্রচুর কুকথা শুনে দুখির কেমন একটা বোধ হয়েছে এই লোকগুলো কালকেও তাকে কিছু ঠেকাবে না তাহলে কি একবার পাশের গ্রামে গিয়ে দেখবে? কিন্তু তারাও যদি খালি হাতেই ফিরত পাঠায়। খিদের জ্বালায় দুখি চোখের সামনে সাদা বেগুনি ছোপ দেখতে শুরু করল, হঠাৎ মনে পড়ল চণ্ডীমণ্ডপ থেকে ত্রিশ পা হাটলেই সুবল মল্লিকের ফলের বাগান। আজকেও চোখে পড়েছে গাছের ডালগুলো টসটসে পেয়ারার ভারে একেবারে যেন হেলে পড়তে চাইছে। ওই পাঁচিল টপকানোটা তেমন কিছু ব্যাপার নয় ও দুখি অনায়াসেই পারবে তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বাগান পাহারা দেবার জন্য একটা জাঁদরেল দারোয়ান রয়েছে ধরা পরলে আর দেখতে হচ্ছে না একেবারে মাথা ফাটিয়ে রেখে দেবে। পেটের তাড়নার সামনে ভয় বেশিক্ষণ দাড়াতে পারল না, দুখি ঠিক করল অন্তত খানদুয়েক রসালো পেয়ারা সে জোগাড় করবেই। না খেয়ে মরার চেয়ে লাঠি খেয়ে মরা ঢের ভালো।

পাঁচিল টপকে মল্লিকদের বাগান থেকে বড় দেখে কয়েকটা পেয়ারা উপরে নিয়ে দুখি একপাশে সরে এলো। বাগানে ঢুকেই সে দেখে নিয়েছে পেটমোটা দারোয়ান খটিয়া পেতে শুয়ে তার-স্বরে নাক ডাকিয়ে চলেছে। ক্ষিদের বেগ যখন তীব্র আকার ধারন করে তখন মানুষের ধীরে সুস্থ্যে খাওয়ার ধৈর্য থাকে না, দুখির এখন সেই অবস্থা। এদিকে শক্ত পেয়ারা গোগ্রাসে গিলতে গিয়ে উটকো বিপত্তি ঘটল। বড়সড় একটা টুকরো আড়াআড়ি ভাবে ঢুকে গেল গলার ঠিক মধ্যিখানটায়। পলক ফেলার আগেই দমবন্ধ হয়ে দুখিরাম বাগানের বৃষ্টি ভেজা নরম মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

দুখিরামের মৃত্যুতে কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করল না। দু-পক্ষই সামান্য হলেও ঘাবড়ে গিয়েছিল। মন্ডলের আশঙ্কা হল তাদের চাপে প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে কেউ মারা গেছে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ঝঞ্ঝাট বাধতে পারে, আর মিনতির ভয় হল ব্যাপারটা জানাজানি হলে সবাই হয়ত তাদের দিকেই আঙুল তুলবে। নিতান্ত অবহেলায় গ্রামের শ্মশানে দুখির শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। দুখির শ্রাদ্ধের জন্য খরচ করাটা মিনতির নেহাৎ বাড়াবাড়ি বলেই মনে হল, তাই শ্রাদ্ধ শান্তি কিছুই হল না। এরপর হাবা দুখিরামকে সবাই দ্রুত ভুলে গেল, শুধু একজন লোক ছাড়া। সে হল মল্লিকদের বাগানের দারোয়ান যুধিষ্ঠির।

আজকাল আর রাতে যুধিষ্ঠিরের ঘুম আসে না। আগে বাগানে একটা চক্কর দিয়ে খাটিয়ায় গামছা পেতে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ত কিন্তু যেদিন চোরটা চুরি করতে এসে মরল সেদিন থেকে রাতের ঘুম দিনের আরাম সবকিছু তার ভেগেছে। সুবল মল্লিকের পায়ে ধরে যুধিষ্ঠির অনেক কান্নাকাটি করেছিল কিন্তু তাতেও বাবুর মন ভেজেনি, তার সাফ কথা রাতে ডিউটি করতেই হবে অন্যথায় সে নিজের রাস্তা দেখে নিক। চাকরি ছাড়তে যুধিষ্ঠিরের আপত্তি নেই কিন্তু আগে অন্য কিছু জুটবে তবেই না। শালা অনন্ত আশ্বাস দিয়েছে সরস্বতী পুজোর আগেই একটা কিছু ব্যাবস্থা করে দেবে। অনন্তর অনেক চেনা-জানা, যুধিষ্ঠির এখন ওর ভরসাতেই রয়েছে।

দুখির মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পরে কার্তিক মাসের একটা পূর্ণিমার রাত। বাতাসের ছোঁয়ায় ঠাণ্ডা হিমেল আমেজ। মাঝ রাতে গায়ে মোটা চাদর মুরি দিয়ে একাকী যুধিষ্ঠির খাটিয়ায় বসে বাগান পাহারা দিচ্ছে। গত চারমাস ধরে রোজই সে নিজের কিশোর পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ছেলে সঙ্গে থাকলে তাও বুকে খানিকটা সাহস পাওয়া যায়। রাত বিরেতে বাগান জুড়ে যখন অদৃশ্য কারো দুদ্দাড় পায়ে চলার আওয়াজ পাওয়া যায় যুধিষ্ঠির তখন গুঁতো মেরে রাজুর ঘুম ভাঙিয়ে তোলে। বিরক্ত কণ্ঠে রাজু জিগ্যেস করে -‘কি হল’? যুধিষ্ঠির ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলে ওঠে -‘ওরে রাজু পেচ্ছাপ করতে যাবি না বাপ’!-না! রাজু পাশ ফিরে শুয়ে পরে। আজ আর রাজু সাথে আসে নি। বউ কমলা বড় দজ্জাল মেয়েমানুষ, বেরোবার সময় কোমরে আঁচল বেঁধে তেড়ে এলো –‘বলি কি মনে করে এই শীতের রাতে ছেলেটাকে ওই লক্ষ্মীছাড়া বাগানে নিয়ে চললে এরপর একটা অসুখ বিসুখ বাধালে সামলাবেটা কে শুনি’। যুধিষ্ঠিরের আর কমলাকে ঘাঁটাতে সাহসে কুলায় নি। দূরছাই! সংসারের উপর ঘেন্না ধরে গেছে। যুধিষ্ঠির খাটিয়ার উপর শরীর এলিয়ে দিল। ঘুমিয়ে রাত কাবার করে দেওয়া যাক। চুলোয় যাক বাগান।

সবে মাত্র ঘুমের আমেজটা এসেছে এমন সময় যুধিষ্ঠিরের যেন মনে হল একটা ছায়ামূর্তি যেন তার মাথার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ধরফর করে উঠে বসে দেখল সব পূর্ববৎই রয়েছে। নিশুতি রাতে এই বাগানে আজ কি ঘটবে কে জানে! অপঘাতের মরা বলে কথা। উপায়ন্তর না দেখে যুধিষ্ঠির চিৎকার করে রাম নাম করতে শুরু করল। প্রায় ঘন্টাখানেক গলা ফাটিয়ে জপ করার পর বুকে হাঁপ ধরে গেল। খাটিয়ার তলায় কলসিতে জল রাখা ছিল তার খানিকটা গলায় তেড়ে ঢেলে দিতেই এবার আবার নিম্নচাপ উপস্থিত হল আগেকার দিন হলে খেয়াল খুশিমতো যত্রতত্র হাল্কা হতে কোন বাধা ছিল না, কিন্তু কিছুদিন আগে ভূত-বিতারণ মাদুলিটা নগদ একশো টাকায় কিনে হাতে পরার সময় তান্ত্রিক পুরোচন মশাই সাবধান করে দিয়েছেন প্রসাব বহির্গমন কালে দুষ্ট প্রেতাত্মা অসতর্ক মনুষ্যের শরীরে আশ্রয় গ্রহন করিয়া থাকে অথএব নিশাকালে শরীরে জমে থাকা জলজ বস্তুসমুহ শুধুমাত্র ঈশানকোনে অথবা পুকুর পারে কিংবা কাঁঠাল গাছের তল ব্যাতিত অন্যত্র ত্যাগ করা অনুচিৎ। এই বাগানে কাঁঠাল গাছ একটাও নেই আর ঈশানকোণটা যে কোথায় তা ঈশ্বরই বলতে পারবেন, যুধিষ্ঠিরের মাথায় তা ঢুকবে না, তবে পুকুর অবশ্য একটা রয়েছে। লাঠিটা শক্ত হাতে চেপে যুধিষ্ঠির এগিয়ে চলল। পুকুরের স্থির জলে পূর্ণিমার চাঁদটা গোল থালার মতো ফুটে রয়েছে। যুধিষ্ঠির জলত্যাগের উদ্দেশ্যে আর একটু এগিয়ে গেল। হঠাৎ দমকা হাওয়ার বেগ পিছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিল। যুধিষ্ঠির বেদম ঘাবড়ে গিয়ে এদিক ওদিক চাইতে লাগল। অকস্মাৎ পুকুরের ওপারে চোখ পড়তেই প্রসাব মাথায় উঠল। সাদা থান পরনে এক বৃদ্ধা যেন তার দিকেই চেয়ে ফোকলা মুখে হেসে চলেছে। তলিয়ে বিচার করলে যুধিষ্ঠির বুঝতে পারত ওপারে কলা গাছের গায়ে চাঁদের আলো ঠিকরে এরকম দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই সে ঠিক এমনটাই দেখে আসছে কিন্তু ভয়ে বুদ্ধিভ্রষ্ট লোকে আবার কবে যুক্তির ধার ধারে। প্রচণ্ড আতংকের সঙ্গে উর্বর কল্পনাশক্তি মিশিয়ে যুধিষ্ঠীর চর্মচক্ষে দেখতে পেল দুখিরামের প্রেতাত্মা পুকুরের ওপার থেকে দু হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তার গলা লক্ষ্য করে। হিক্কার তুলে এবার ভারী শরীরটা ধপাস্‌ করে উপুড় হয়ে পড়ল পুকুর পাড়ের নরম কাঁদামাটির উপর।

কথায় বলে গুজব আগুনের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়ায়, তাছাড়া কোদালিয়া গ্রামের মানুষজন এতদিনে তেলে ভাজার মতো মুচমুচে আর লোভনীয় একটা বিষয় পেয়েছে। কয়েকদিন পথে ঘাটে হাটে বাজারে চায়ের দোকান রেলষ্টেশন সর্বত্র এই নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে চলল। দুখিরামের প্রেতাত্মা রাতের বেলা যুধিষ্ঠিরকে একা পেয়ে নাকি পুকুরের পাঁকে পুতে মারার চেষ্টা করেছিল। এযাত্রায় যে যুধিষ্ঠির প্রানে বেচে ফিরেছে সেটা নেহাত কপালগুনে। সাতদিন কাটতে না কাটতে ফের হই হট্টগোল শুরু হল। পাচুগোপাল ঢালী শহরে চাকরি করে। সপ্তাহান্তে ফি শনিবারে গ্রামের বাড়ি এসে সোমবার ভোরের ট্রেনে আবার কর্মস্থলে ফিরত যাওয়াটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এই শনিবারে ষ্টেশনে নেমেই তার দেখা হয়ে গেল বাল্যবন্ধু দুলুর সঙ্গে। দুলু আবার গলা ভেজাতে দারুন ওস্তাদ। দুলুর পাল্লায় পরে পাচুও না-না করতে করতে বোতল খুলে বসল। দেখতে দেখতে সময় উড়ে গেল। রাত হয়েছে, শুঁড়িখানা বন্ধ হবার সময়। দুলু ষ্টেশন চত্বরেই শুয়ে পড়ল, সে আজ আর বাড়ি যাচ্ছে না, পাচুরও ইচ্ছে করছিল দুলুর পাশেই শুয়ে পরে কিন্তু পরিবার অপেক্ষায় রয়েছে তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে বাড়ির পথ ধরল। এত রাতে ভ্যান রিক্সা পাওয়ার আশা বৃথা তাই পাচু টলায়মান পায়ে হেটেই বাড়ির রাস্তা ধরল। পাচুর মনে আজ বড় ফুর্তি বেশ নেশা হয়েছে। বেসুরো গলায় হিন্দি গানের কলি গাইতে গাইতে একসময় এসে হাজির হল মল্লিক বাগানের পাচিলের ঠিক সামনে। হঠাৎ একটা পুরনো কথা মনে পড়তেই পাচুর নেশা মাথায় উঠল। লোকে বলে না এই বাগানটায় নাকি ভূত আছে! পাচু স্খলিত পায়ে তাড়াহুড়ো করে ছুটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল পাচিলের গায়ে। মাথাটা বুঝি ফেটেই গেল। কোনোক্রমে কপালে হাত বুলিয়েই ভয়ে ভয়ে তাকাল তাল গাছের দিকে। নেশাগ্রস্থ ঘোলা চোখের দৃষ্টিতে পাচু যেন দেখতে পেল হাবা দুখি তালগাছের মাথায় বসে নিজের পেটে হাত বুলাচ্ছে, পাচুর দিকে দৃষ্টি পড়তেই দুখি নাকি স্বরে বলে উঠল –‘ওরে পাঁচু এদিকে আয় তোর রক্ত চুষে খাব? পাচুগোপালের মদের নেশা কেটে গেছে, প্রাণের দায়ে রেসের ঘোড়ার মত ছুট লাগাল, তবে রাস্তার মাঝে খানাখন্দে বার চারেক আছাড় খেয়ে তার যে দুটো কষের দাঁত ভাঙল সে অবশ্য অন্য কথা। কোদালিয়া গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ এরপর একযোগে অভিযোগের আঙুল তুলল সর্দারদের দিকে। শ্রাদ্ধ শান্তি হয় নি বলেই দুখিরামের আত্মা কুপিত হয়েছে অবিলম্বে শাস্ত্রানুসারে পারলৌকিক ক্রিয়াসম্পন্ন করতে হবে। মিনতি অবশ্য সবাইকে ভেটো দিয়ে ছাড়ল। শ্রাদ্ধ করতে হয় গ্রামের লোকে করুক চাঁদা তুলে, ফালতু ব্যাপারে সে একপয়সাও খরচ করতে নারাজ।

গোরু মরার পরে সেই যে জগার চাকরিটা গেল আর দ্বিতীয় কোন কাজের চেষ্টাই সে করেনি, প্রতিদিন গাধার খাটুনি খেটে খেটে জীবনের উপরে কেমন যেন একটা ঘেন্নাই ধরে গেছিল। ওই যে শ্মশানের ভবনাথ তান্ত্রিক! কি সুখেই না বেঁচে আছে লোকটা। না আছে কলুর বলদের মতো ছুটে বেরাবার তাড়না না কারো হুকুম মানার গরজ। জগা সোজা গিয়ে সাধুর পায়ে ধরে পড়ল। ভবনাথ খুশীই হল, গাঁজার কল্কে সাজা, পা টিপে দেওয়ার জন্যেও তো লোকের প্রয়োজন। জগা এরপর শ্মশানের আশ্রমেই পাকাপোক্ত আস্তানা গেড়ে বসল।

জগা আজ গ্রামের কারও ক্ষেত খুঁড়ে আলু নিয়ে এসেছিল, মালসার আগুনে গুরু শিষ্য মিলে তাই পুড়িয়ে খাচ্ছিল। কাল থেকে পেটে দানা পড়ে নি। জুড়োতে তর সইছে না। আলু এত গরম যে জিভ পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু কিবা করার আছে একবার পেটের মধ্যে চালান করে দিতে পারলে ঠাণ্ডা করার অনেক যন্ত্রপাতি রয়েছে। খেতে খেতে ভবনাথ আক্ষেপ করে বলল –‘তুই বড়ই অপয়া রে জগা, যদ্দিন না ছিলি গেরামের লোকেরা কতো কিছুই না দিয়ে যেত, কলা বল্‌, মুলো বল্‌, মাছ, মাংস, নগদ টাকা দুহাতে নিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারতাম না আর এখন’? জগা নেড়ি কুকুরের মতো খ্যাঁক করে বলল -‘ফালতু বকবে না বলে দিলাম, তোমার ওষুধে কারো তেমন কাজ হয়নি লোকে তাই সরে পড়েছে, ফের যদি আমাকে দোষ দিয়েছ তো’! জগার মারমুখি মেজাজ দেখে ভবনাথ মিষ্টি কথায় ভোলাবার চেষ্টা করে বলল–‘আমারে ভুল বুঝিস না রে শাগরেদ আসলে আমি বলতে চেয়েছি’। জগা ভবনাথের কথায় কান না দিয়ে বলল –‘সত্যি করে বলো দেখি তো, ভূত ধরার কোন বিদ্যে তোমার সত্যিই জানা আছে না নেই’? ভবনাথ চোখ কপালে তুলে বলল –‘ওলা-ওঠার বাচ্চা চেলা হয়ে গুরুকে সন্দ! দূর হ হতভাগা’! জগা একদলা আলু গিলে বলল –‘আজ শুনে এলাম গ্রামে ভুতের উৎপাত শুরু হয়েছে, আমরা যদি ভূতটাকে ধরে দিতে পারি তাহলে শুধু আলু চিবিয়ে থাকতে হবে না’। রোজগারের গন্ধে ভবনাথের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বলল –‘সব কথা খুলে বল দিকিনি’।

রাতের বেলায় এরপর লোকের চলাফেরা করাই দায় হয়ে পড়ল। দুখিরামের অতৃপ্ত আত্মার প্রতিশোধ স্পৃহা দুর্দান্ত ভাবে সক্রিয় হয়ে ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলল। কোনদিন রাত দুপুরে কেউ সজোরে মন্ডলের কড়া নাড়িয়ে সরে পরছে তো পরের দিন মাঝরাতে ভবেশ ভটচাযের বাড়ির পিছন থেকে নাকিসুরে পুরুষকণ্ঠের সে কি কান্না। ভুতের কান্না কানে গেলে অমঙ্গলের আর শেষ থাকে না সারারাত ভটচাজ আর তার পরিবার কানে তুলো গুঁজে রামনাম করেই কাটিয়ে দিল। শেষ রাতে আবার নতুন উৎপাত। মিনতির পেটের মধ্যিখানে হঠাৎ জব্বর একটা মোচড় দিয়ে উঠতেই সে পড়িমরি করে উঠে পড়ল। পাড়া-গার শৌচাগার সাধারণত বাসস্থান থেকে একটু তফাতেই রাখা হয় তা সর্দারদের বাড়ির ব্যাবস্থাও অনেকটা সেরকম। হাতে একটা জ্বলন্ত হ্যারিকেন নিয়ে দ্রুত পায়ে উঠোন পেরিয়ে সবে মাত্র পায়খানার দরজা ভেজিয়ে মিনতি উবু হয়ে বসেছে, টিনের দরজা এবং চালের উপর বৃষ্টির মতো ঢিল পড়তে লাগল। মিনতি সহজে ভয় খাওয়ার পাত্রী নয়, এক টানে দরজা খুলে তখুনি বাইরে আসতেই একটা ঢিল এসে হাতের কব্জিতে সজোরে আঘাত করল, মিনতির যন্ত্রনাকাতর হাত থেকে হ্যারিকেনটা মাটিতে পরে সশব্দে চুরমার হয়ে কাঁচের টুকরো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। জীবনে প্রথম বারের জন্য মিনতি টের পেল ভয় কাকে বলে, সামনে ঘন অন্ধকারে জন মনুষ্যের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। ঢিল পরা যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল তেমনি অকস্মাৎ বন্ধও হয়ে গেল। পায়খানার পাশে টিনের চাল দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় কোনোক্রমে হাত পা ধোবার কাজ সেরেই মিনতি ছুট লাগাল ঘরের দিকে হঠাৎ পিছন থেকে নাঁকিসুরে কে যেন বলে উঠল –‘বঁউদি প্যাটে বড় জ্বালা’! ঘরের দরজা বন্ধ করে মিনতি মেঝেতে বসে থরথর করে কাঁপতে লাগল।

পরদিন সকালে গ্রামে স্বশিষ্য তান্ত্রিক ভবনাথ এসে হাজির হল। প্রথমেই সে গিয়ে বিশু মন্ডলের দরজায় কড়া নাড়ল। মন্ডল কাল রাতে ভুতের ভয়ে দুচোখের পাতা এক করতে পারে নি, এমন সময় ভবনাথকে দেখে মেজাজটা গেল খিচড়ে, তিক্তকণ্ঠে বলল –‘কিহে এতো সকালে কেউ ভিক্ষে চাইতে আসে? আবার দেখছি সঙ্গে ওই অকর্মার ধারি জগাটাকেও জুটিয়েছ, যেমন গুরু তার তেমন চেলা’। ভবনাথ বিনয়ের অবতার সেজে জিভ কেটে বলল –‘কি যে বলেন! আমি কখনো কারো বাড়ি এসে হাত পেতেছি, কখনো দেখেছেন? দেখলাম আপনাদের সামনে বিপদ এসে উপস্থিত হয়েছে তাই আর শ্মশানে পরে থাকতে পারলাম না জগাকে বললাম চল একবার নাহয় গেরাম থেকে ঘুরেই আসা যাক’। মন্ডল ব্যাকা চোখে তাকিয়ে বলল –‘কিসের বিপদ হে’।

ভবনাথ বলল –‘আমার কথা একটু মন দিয়া শোনেন দেখি। কাল মাঝরাতে শ্মশানে বসে হোমের আগুনটা সবেমাত্র জ্বালসি হঠাৎ দমকা বাতাসের ঘায়ে গেল সব লণ্ডভণ্ড একসা হয়ে। কি আর করি! জগারে বললাম ফের একবার সব ঠিক মতো সেজে দিতে, তা আবার সেই এক জিনিস ঘটি গেল, নাকে কেমন একটা বাসি মরার গন্ধ আসতিই বুঝলাম এ হচ্চি গিয়া দুষ্ট হাওয়া বাতাসের কারসাজি তবে আমিও হলাম কিনা তান্ত্রিক সর্বানন্দের একেবারে খাস চেলা আমার সঙ্গে চালাকি! তখুনি শরীর বন্ধন করে ভূত-ডামর মন্তরটা আউরাতে শুরু করলাম তা আর যায় কোথায়! ব্যাটাচ্ছেলে সামনে এসে হাজির হল, দেখলাম চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছরের একটা জোয়ান মদ্দ! বলল ক্ষিদার জ্বালায় নাকি মরছে, এখন পিতিজ্ঞ্যে করেছে গেরামের কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবে না, আমি অনেক বোঝালাম, ভয় দেখালাম বাড়াবাড়ি করলি ভস্ম করি ছাড়ব তা সে কি আমার কথা শোনে! উল্টে আমাকেই চোখ রাঙাতি লাগল বলে এখুনি গেরাম ছেড়ে যাও দিকি নইলে লোক গুলানের সাথে সাথে তুমাকেও মেরে পচা খালের পাঁকে পুতে রাখব, এরপর হল কি আরও কিছু মন্তর পরে ভূত ব্যাটাকে বেধে ফেলার আগেই সে গেরামের দিকে পাইপাই করে ছুট লাগাল’। মন্ডল হা করে এতক্ষণ ভবনাথের কথা শুনছিল। গত রাতের অভিজ্ঞতা নিয়ে এতো সকালে কারো সঙ্গে কোন আলোচনাই হয় নি তাই ভবনাথের কথায় তার খানিকটা বিশ্বাস জন্মে গেল।

মন্ডল বলল –‘তা এই ভুতের কিছু উপায় করা যায় না’?

-‘সে জন্যিই তো সকাল সকাল আপনার দুয়ারে আসতি হল আমি থাকতি যদি ওই ভুতের বাচ্ছা কারুকে দুঃখ কষ্ট দ্যায় তাহলে উপরে জেয়ে গুরু মরাজেরে এই পোড়া মুখপানা দেখাব কুন সাহসে বলতি পারেন’? ভবনাথ ঝোলা থেকে খানকয়েক তাবিজ মাদুলি বের করল –‘ল্যান কত্তা বাড়ির সবাইকে বলেন চান করে হাতে পরি নিতে, মায়েরা বাম হাতে আর বাবারা ডান হাতে পরলিই হবে’। মন্ডল সন্দেহের দৃষ্টে চেয়ে বললেন –‘টাকা পয়সা লাগবে না তো হে’? ভবনাথ দুহাত জোর করে ছলছল চোখে বলল –‘বিদ্যে বেচে খাব! কি যে বলেন? তবে এই তাবিজ গুলান তৈয়ার করতে পরিমাণ মতো মধু আর জটামাংসী লেগেছে সেগুলান তো আবার কিনতি হবে, আর আজকাল সাধুকেও কেউ কিছু বিনি পয়সায় দ্যায় না। তাই একটা মাদুলি মোটে বিসটাকা কত্তা মোটে টাকা বিস’। মন্ডলগিন্নি দরজার আড়ালে দাড়িয়ে সব শুনছিলেন এবারে বলে উঠলেন –‘তুমি বাবা আমাদের পাঁচখানা দিও, টাকাটা বড়কথা নয় কিন্তু তোমার এই তাবিজে কাজ হবে তো’? ভবনাথ কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে বলল –‘কি যে বলেন মা! এই তাবিজ গায়ে থাকলে ভূত পিশাচ দশ হাত দূর থেকে পালাবে, বাবা ভূতনাথের দিব্যি, তবে কি জানেন মা এর ক্ষ্যামতা কিন্তু শুধু এক হপ্তার মাত্র, তারপর আবার নতুন তাবিজ পরতি হবি’। মন্ডল মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার মনে এটা এখন প্রতি সপ্তার খরচ হয়ে দাঁড়াল। ভবনাথ উঠে পড়ল তার এখন মেলা কাজ গ্রামের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে। সবাইকে দারুন বিপদ থেকে পরিত্রাণ করে তবেই তার ছুটি।

গ্রামের সবকটা বাড়ি ঘুরে, সবাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে গুরু শিষ্য শেষেমেসে সর্দার বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল। অন্যসময় জগাকে দেখলে মিনতি হয়ত একটা তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে ছাড়ত কিন্তু আজকে আর কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর ধারে কাছে গেল না। মিনতিকে গোলাপ বউ আগেই খবর দিয়ে রেখেছে, তান্ত্রিক বাবা গ্রামের ঘরে ঘরে ভূতমারণ তাবিজ ফিরি করছে। ভবনাথকে দেখে মিনতি বলল -‘এসব কি হচ্ছে বল তো বাবা আমার দেওর বেঁচে থাকতে চরিত্রবান মানুষ ছিল বলেই জানতাম, কখনো মেয়েমানুষের পায়খানার দিকে নজর দিয়েছিল এমন কথা কেউ বলতে পারবে না, সারাজীবন ধরে খাওয়ালাম পরালাম কখনো আমার মানিকের সঙ্গে তফাৎ করিনি সেই কিনা শেষে’? মিনতি তার ডানহাতটা তুলে দেখাল, কব্জিতে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। ভবনাথ বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল –‘মা বড়ই বেদনা পেয়েছ দেখসি, কিন্তু কি করবা সে কি আর আগের মানুষ রইছে, পিশাচ জন্ম নেবার পর এরকমই সব হই থাকে, তা মা আমারে একটা কথা বল দিকিন কাল রেতের বেলা কি দিয়ে ভাত খেসলে?। মিনতি একটু ভেবে বলল –‘কলমির শাক আর চুনো মাছ দিয়ে ভাত, বাবা’। ভবনাথ এবার মাথায় হাত দিয়ে উঠোনে বসে পড়ল। -‘সব্বনাশ ঘোর সব্বনাশ’। মিনতি ঘাবড়ে গিয়ে জিগ্যেস করল –‘কি হল বাবা’? -‘কি আর বলব মা! চুনো মাছের গন্ধে প্রেত পিশাচের মুখে নোলা ঝরে, ওই মাছ পেটের ভিতর পাঁক খেয়ে যে বিষ্ঠা পাকায়সে সেও যে অপদেবতার ভারী প্রিয়, এখুন বুঝতে পারসো মা মড়া দেওর কেন তোমার পিছনে লেগেছিল’। মিনতি উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল –‘তাহলে কি হবে বাবা! চুনো মাছ খাওয়া কি ছেড়ে দেব’? ভবনাথ আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল –‘কেন খাবি না মা আলবাত খাবি, আমি এই বাড়ি বন্ধন করে তবেই যাব, এরপর কোন শালা ভুতের পোঁ এসে তোর পায়খানায় উঁকি মারে দেখি! আর যদি এসেও যায় তক্ষুনি পুড়ে খাক হয়ে যাবে’। ভবনাথ এরপর দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারণ সমেত বাড়ির চারপাশে তিরিং বিড়িং করে লাফিয়ে বিষম নাচানাচি শুরু করে দিল। মিনতি গোলাপ বউ আর চাকর নব বিস্ফারিত দৃষ্টে তান্ত্রিকের কান্ডকারখানা দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে ঘর্মাক্ত কলেবরে বসে ভবনাথ বলল –‘হয়ে গেছে মা মন্তর পরে দেগে দিসি এবারে আমারে কিছু খোরাকি দিয়া বিদেয় করো দেখি’। মিনতি আঁচলের খুট থেকে একশো-টাকার একটা নোট হাতে ধরিয়ে দিতেই ভবনাথ আর দেরি না করে হাটা দিল। এক সপ্তাহের মতো যথেষ্ট খোরাকি জুটে গেছে। এবার মৌজ করে গাঁজায় দম দেবার জন্য তার প্রানটা ছটফট করছে। গ্রামের প্রান্তে এসে ভবনাথ জগার হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলল –‘যা দেখি ঝটপট কিছু ভালো দেখে খাবার দাবার আর মদ নিয়ে আয় দিনি’। জগা চলে যাচ্ছিল ভব পিছু ডাকল –‘দেরি করিস নে রে বাপ, আমার কিন্তু প্যাটে উনুন জ্বলছে’। জগা ‘এই যাচ্ছি’ বলে ছুট লাগাল। আজ ওর মনে বড় আনন্দ, তার ওস্তাদ যে এতো ভালো ক্যানভাসার সেটা এতদিন টের পায়নি, ওই শিয়ালের মতো চালাক মণ্ডলটাকেও কেমন বোকা বানিয়ে টাকা আদায় করে ছাড়ল। তাছাড়া মতলবটাও খাটিয়েছে জবর এক রাতের খেলাতেই গ্রামের পাজী লোকগুলো কাত, এমনিতে তো একটা পয়সাও কেউ ঠেকাবে না কিন্তু ঠ্যালায় পড়লে সব কেমন জব্দ! জগা তাড়াতাড়ি শুঁড়িখানার উদ্দেশ্যে ছুট লাগাল, চোলাই মদ আর গাঁজা তো চাইই সঙ্গে খানিকটা খাসীর মাংসও কিনে নিয়ে যাবে, কতদিন যে ভালো করে মাংস খাওয়া হয় নি! আলজিভে আসা গরম জলটা মুখের ভিতর টেনে জগা দ্রুত হাটা দিল।

দুখিরামের শ্রাদ্ধ! ভয়ে ভক্তিতে মিনতিকে রাজি হতেই হয়েছে, না হয়ে অন্য উপায় অবশ্য ছিল না, গ্রামের লোকে যতই বলুক না কেন, শেষ না দেখে সে ছাড়ত না। সব কটা মেনীমুখোকে তার ভালোই চেনা আছে, কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়, অকৃতজ্ঞ দুখির আত্মা নিজের অন্নদাতাকেও ছেড়ে কথা বলছে না। ত্রিলোচন পুরোহিত এসে বিধিমত মন্ত্রোচ্চারণ করে পারলৌকিক কাজ সেরে দক্ষিণা এবং বস্তা ভর্তি দানসামগ্রী নিয়ে বাড়ি মুখো হলেন। পাঁচটা বামুন ভুরিভোজ করে টাকা ট্যাঁকে গুঁজে দোক্তা পান চিবুতে চিবুতে দুখির আত্মাকে স্বর্গে যাবার নিদান দিয়ে বিদায় হল, পরে রইল শুধু মানিকের মাথা জোড়া মসৃণ একটা টাঁক। হাজার হোক কুঁপিত আত্মা বলে কথা, চুল কি প্রানের চেয়েও বড়! গ্রামের লোকে যেন হাঁপ ছেড়ে বাচল, যাক বাবা এতদিনে অতৃপ্ত আত্মার শান্তি হল, এরপর হয়ত ওই বেয়াক্কেলে দুখিটা রাত বিরেতে কাউকে খামোকা জ্বালাতে আসবে না।

গ্রাম থেকে ঘুরে আসার পর কয়েকটা দিন কেটে গেছে। এর মাঝে ভবনাথ আর জগা চুটিয়ে খাসীর মাংসভাত খেয়ে আর দিনভর গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে থেকেছে কিন্তু রসদ এবার শেষের দিকে, হাতে যা সামান্য টাকা রয়েছে তাতে মাংস খাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় তবে মদের দুটো বোতল জুটে যেতেই পারে, সকালের দিকে জগা গ্রামে গেছে সেগুলি সংগ্রহ করতে আর তার অপেক্ষায় ভবনাথ ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পরছে। অনেক পরে জগাকে দেখে ভব রুক্ষ স্বরে বলল –‘ওরে হারামীর পো, ভাবলাম তুই বুঝি মরেই গেলি, এতক্ষণ করছিলিটা কি’? ভবনাথ একটা বিশ্রী ইঙ্গিত করল। জগাকে গালিগালি দিলে সেও সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা খিস্তি করতে ছাড়ে না কিন্তু এইমুহূর্তে তাকে দেখে যথেষ্ট বিমর্ষ বলেই মনে হল। হতাশ কণ্ঠে বলল –‘এই বোতল দুটোই শেষ আর কিছু জুটবে না, গ্রামে গিয়ে দেখে এলাম ওরা ভুতের শ্রাদ্ধ করছে, ত্রিলোচন পুজারি তোমার থেকেও বেশি সিধে ঘরে তুলে ফেলল, এরপর আমরা গ্রামে গেলে কেউ একটা চাকতিও ঠেকাবে না’।ভবনাথ বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে বলল –‘ওরে জগা তুই বড় তাড়াতাড়ি ভেবড়ে যাস, দেখে নিস পরের বারে লোকে আরও বেশি দেবে’। -‘সেটা কি ভাবে শুনি’? -‘যেভাবে আগে দেসল সেভাবেই দেবে’। -‘লোকের ভয় কেটে গেছে, আর মানবে না’। -‘যখন রেতের বেলা মাথায় ঢিল পাটকেল পড়বে, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কেউ ভ্যাঁভ্যাঁ করে কাদবে, তখন কুন শালার বুকে এতো পাটা আছে যে দিবেক্‌ লাই’।

জগা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ভবনাথ বিরক্ত কণ্ঠে তাকে থামিয়ে দিল –‘তুই বড় বাজে বকিস, এবার ঠাণ্ডা মেরে যা দিকিন তোর বকবকানিতে আমার আবার নেশা কেটে যাবে’।

দুখিরামের শ্রাদ্ধের পর একটা সপ্তাহ আর নতুন কিছু ঘটেনি। সবাই ধরেই নিয়েছে অতৃপ্ত প্রেতাত্মা বিদায় নিয়েছে তবে এখনও গাঁয়ের লোকেদের মল্লিক বাগানের সামনে দিয়ে যেতে গা ছমছম করে বয়োজ্যেষ্ঠরা নতুন বউ আর পোয়াতি মেয়েদের নিষেধ করে বলেছেন, খবরদার যেখানে সেখানে একা একা ঘুরে বেরিয়ো না অপদেবতার নজর লেগে গেলে আর দেখতি হবে না। হাটে বাজারে আড্ডার মাঝে শুধু ভুতের গল্পটাই আজকাল যা চলছে অন্য কথায় লোকে যেন রুচিই হারিয়ে ফেলেছে। কথায় কথায় জানা গেছে গ্রামের অনেকেই স্বচক্ষে ভূত দেখেছে কেউ কেউ তো আবার ভুতের পাল্লায় পরে পিতৃদত্ত প্রাণটাই খোয়াতে বসেছিল। সবাই এখানে গলার জোরে অন্যকে থামিয়ে নিজের কাহিনীটা আগে ভাগে শুনিয়ে রাখতে চায়, তবে সমস্যা একটাই এখানে শ্রোতার চেয়ে বক্তার সংখ্যা অনেকগুন বেশি। গ্রামের ছেলে মেয়ে বুড়ো সবাইকে ভুতের নেশায় পেয়েছে অনেকেই শ্মশানে গিয়ে ভবনাথ বাবার কাছ থেকে তাবিজ কবচ মাদুলি নিয়ে আসতে লাগল যার ফলে ভবনাথেরও আয় বন্ধ হল না। এর মধ্যে আবার একটা ভূত ছাড়াবার কেসও ভবনাথের হাতে এসেছিল। ধুধুলিয়া গ্রামের হারাধন বাগের যুবতী বউটাকে দানোয় পেয়েছিল তা ভবনাথ গিয়ে দানো হতভাগাকে ঝ্যাঁটা মেরে মেরে নরকের রাস্তা দেখিয়ে এলো আর বউটাকে হাসপাতালের, কেনোনা বিষাক্ত সেপ্টিকের ঘাগুলোকে সারাতে বেচারিকে বেশ কিছুদিন ভুগতে হল। এরকম করে দুটো মাস কেটে গেল, তবে উত্তেজনার পারদ ইতিমধ্যে নামতে শুরু করেছে। এখন আর কেউ তেমন ভুতের গল্প করেও না শুনতেও উৎসাহ পায় না। তান্ত্রিক একদিন দেখল তার দোকানে খদ্দেরের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, শেষে অবস্থা এমন হল, মনে হল এরপর বোধহয় দুবেলা জোটানোই মুশকিল হয়ে পরবে। ভবনাথ ঠিক করল আর একবার পুরনো খেলা খেলবে, তারপরে দেখাই যাক কি হয়!

কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাত। শীতের তীব্র প্রকোপে গৃহহীন নেড়ি কুকুরের দল বিশ্রী শব্দে কেঁদেই চলেছে, যেন তাদের থামার কোন ইচ্ছেই নেই। জগা পরিকল্পনা অনুযায়ী গায়ে কম্বল মুরি দিয়ে মিনতিদের উঠোনের জামরুল গাছের ডালে গা ঢাকা দিয়ে বসে আছে। ভবনাথ লন্ঠন দিয়ে আলোর সংকেত করলে জগা তার ঝুলি থেকে ঢিল বের করে সর্দারদের চালে নিক্ষেপ করা শুরু করবে, তারপর এখানকার কাজ মিটে গেলে একবার হালদারদের দরজায় কড়া নেড়ে, সব শেষে শ্মশান লাগোয়া ভবেশ ভটচাজের বাড়ির পিছনে খানিক কান্নাকাটি করে একছুটে পালাবে। এই ঠাণ্ডার রাতে গ্রামের রাস্তায় কেউ তাকে দেখে ফেলার জন্য ঘুরে বেড়াতে পারে, সে সম্ভবনা অবশ্য ভবনাথ আর জগা দুজনেই উড়িয়ে দিয়েছে। শ্মশানের দিক থেকে আসা আলোর একটা ক্ষীণ রেখা জগার প্রতীক্ষার অবসান ঘটাল। এরপর কিছুক্ষণ ধরে সর্দার বাড়ির সর্বাঙ্গে ইট বৃষ্টি হতে লাগল একটা জানলার কাঁচ ভাঙল আর গোয়ালের টিনের চালে ঢিলের বারংবার আঘাতে বেশ একটা মুর্ছনার সৃষ্টি হল। ইটের ভান্ডার ফুরিয়ে যেতেই আবার সব চুপচাপ সর্দার বাড়ি থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না, জগা নিশ্চিন্ত হল কাজ শেষ হয়েছে এখানে আর না থাকাই ভালো।

মিনতির ঘুম জানলা ভাঙার শব্দেই ভেঙে গেছে। এবারে সে আর আগের বারের মতো ভয়ে সিঁটিয়ে গেল না। ইটবৃষ্টি থামতেই পা টিপে টিপে দরজা খুলে বাইরে আসতেই পলায়ন মুখি জগার মুখোমুখি হয়ে পড়ল। অন্ধকারে জগাকে ঠিকমতো চিনতে না পারলেও এ যে মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নয় মিনতির বুঝতে অসুবিধে হল না। জগা এসময় কাউকে আশা করেনি, দুদ্দাড় পায়ে ছুটে পালাবার চেষ্টা করতেই মিনতি চিৎকার করে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। নিজেকে ছাড়াবার জন্য জগা প্রচণ্ড ঘুসি মেরে মিনতির চোয়াল দুফাক করে দিল। রক্তাক্ত চোয়াল ধরে মিনতি মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই জগা দৌড় লাগাল কিন্তু গায়ের কম্বলে পা জড়িয়ে মুখ থুবড়ে উঠোনের মাঝে পরে গেল। মিনতি প্রান বাজী রেখে জগার বা-পায়ের গোড়ালি চেপে ধরল। মুক্ত হবার অমানুষিক চেষ্টায় জগা উন্মত্তের মতো ডানপা দিয়ে মিনতির মুখে লাথির পর লাথি মারতে লাগল। মিনতি আর সহ্য করতে পারল না, একসময় তার বজ্রমুষ্ঠি শিথিল হয়ে এলো। বন্ধন আলগা হতেই জগা উঠে দাঁড়াল কিন্তু আর কোন লাভ হল না, জীবনের জন্য জগার দৌড় আজ এই সর্দারবাড়ির উঠোনে শেষ হয়ে গেছে। মিনতির চিৎকারে মানিক আর বাড়ির চাকরেরা ছুটে এসেছে। সাতটা জোয়ান একসঙ্গে তাকে ঘিরে ধরল। এতোগুলো লোকের সঙ্গে জগা একা পারবে কি করে, সবাই মিলে তাকে গোয়ালঘরে বেঁধে রাখল। বাকি রাতটা জগার উপর দফায় দফায় অকথ্য অত্যাচার চলতে লাগল।

সকাল হতে না হতে খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আজ ভারী মজার দিন। গ্রামের জোয়ান বুড়ো সবাই পড়িমরি করে হাতের কাছে যে যা পেল লাঠি লোহার খুন্তি কি নিদেন পক্ষে একটা বাশের কঞ্চি তাই নিয়েই ছুটল। ভূতের ভয় দেখিয়ে বোকা বানিয়ে ফায়দা লোটা! গ্রামের উৎসাহী যুবকেরা এর মধ্যে একফাকে শ্মশানে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছে। বিপদের গন্ধ পেয়ে চতুর ভবনাথ অবশ্য পালাতে দেরি করে নি, ওটাকে পাওয়া গেলে হুল্লোড়টা আরও জমত, যাকগে যে হারামজাদা-টাকে ধরা গেছে সেটাকেই উচিৎ শিক্ষা দেওয়া যাক। প্রহারে প্রহারে জর্জরিত হয়ে জগা ইতিমধ্যে আধমড়া হয়ে পড়েছে। গলার ভিতরটা যেন জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে, বুকের মাঝখান থেকে একটা অসহ্য ব্যাথা দুমড়ে মুচরে তার সমগ্র চেতনাকে আছন্ন করে ফেলতে চাইছে। জগার গলা থেকে একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরল। অতি কষ্টে জলের জন্য আবেদন করতেই কে যেন একদলা থুতু তার মুখে ছিটিয়ে দিল। গ্রামের ছেলে ছোকরার দল খানিক বিরতির পর আবার সোৎসাহে ঝাপিয়ে পড়ল। জগার শরীরের সর্বত্র লাঠি খুন্তি ধারাল অস্ত্রের কোপ পড়তে লাগল। খুব বেশি সময় লাগল না জগার নিথর দেহটা গোয়ালের কাঁদা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

পরের কয়েকদিন গ্রামে পুলিশের যাতায়াত বেড়ে গেল। এইসব ব্যাপারে পুলিশ সেরকম কিছু করতে পারে না এখানেও তাই হল। কয়েকজন সাতে পাঁচে না থাকা লোককে অকারন ধমক চমক করে শেষে একটা গন-ধোলাইএর মামলা সাজিয়ে তদন্ত বন্ধ করে দিল। ভবনাথের কোন খোঁজ অবশ্য আর পাওয়া গেল না কেউ বলল তাকে নাকি উড়িষ্যাগামী ট্রেনে যেতে দেখা গেছে, আবার কেউ বলল সে নাকি আজকাল তারাপীঠের শ্মশানে আস্তানা গেড়েছে। যাই হোক ভবনাথের ব্যাপারটাও এর সাথেই চাঁপা পড়ল।

নরহত্যার পর দেখতে দেখতে দুটো বছর কেটে গেছে। কোদালিয়া গ্রামে যেন শনির দশা চলছে। প্রকৃতির খামখেয়ালীপানায় গত দুবছরে চাষবাসের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। অনেকেই সর্দার আর মন্ডলদের কাছে ধারকর্জ করে বসেছে। এরপর শোধ দিতে না পারলে কি যে হবে? ত্রিলোচন পুরোহিত বলছিল ছোড়াটাকে ওইভাবে পিটিয়ে মারা নাকি ঠিক হয় নি, তার অভিশাপ লেগেছে। কে জানে এরপর অদৃষ্টে কি আছে! মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে।

রাত দ্বিপ্রহর! সর্দারদের বাড়িতে সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, এক মিনতি ছাড়া। দিনকাল পালটাচ্ছে সেটা মিনতি মেয়েমানুষ হয়েও বুঝতে পারে কিন্তু মানিক লেখাপড়া জানা ছেলে হয়েও কেন যে বোঝে না। হারান সর্দারের যুগ আর নেই। যদিও গ্রামের অর্ধেক লোকের ঘটি বাটি সর্দারদের কাছে বাঁধা তাহলেও মিনতি এই মেনী-মুখোগুলোকে ভয় পেতে শুরু করেছে। এদের চোখের এমন অদ্ভুত দৃষ্টি সে আগে কখনো দেখেনি, হিংস্র জন্তু যেন রক্তের স্বাদ পেয়েছে। সামনে দাঁড়াবার মতো বুকের পাটা এদের একটারও নেই কিন্তু পিছন থেকে! মিনতি শিউড়ে উঠল। সে জানে না ঠিক কেন কিন্তু একটা চাপা উদ্বেগ তার বুকে পাথরের মতো চেপে বসছে কিছুতেই শান্তি পেতে দিচ্ছে না। মন বলছে অদূর ভবিষ্যতে এই গ্রামে বিরাট কোন অঘটন ঘটবেই! মিনতির চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটল। বাড়ির চালে ঢিল বৃষ্টি হওয়া শুরু হয়েছে ঠিক দুবছর আগে যেমন হয়েছিল। কোমরে শাড়িটা শক্ত করে গুঁজে হাতে বঁটি নিয়ে সাবধানে কপাট খুলে মিনতি বাইরে এলো। চাঁদের আলোয় উঠোনটা ঝকঝক করছে। ইটবৃষ্টি যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল তেমনই বন্ধ হয়ে গেল। আওয়াজ পেয়ে মানিক আর নবও বেরিয়ে এসেছে কিন্তু কোথাও কোন মানুষের চিহ্ন দেখা গেল না। একে অপরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টে তাকিয়ে তিনজনেই হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল আর তখুনি যেন মাটি ফুড়ে তাদের সামনে রক্তাক্ত কলেবরে দুহাত প্রসারিত করে হাজির হল দুবছর আগে লাশ হয়ে যাওয়া জগা। জগার মাথাটা বিশ্রীভাবে দুফাক হয়ে গেছে সেখান থেকে রক্তের ধারা চুইয়ে চুইয়ে কপাল গড়িয়ে ছেড়া গেঞ্জির উপর পরছে। হঠাৎ যেন মিনতি বায়স্কোপের মতো চোখের সামনে দেখতে পেল রুক্ষ মাটির উপর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অনেক গুলি মৃতদেহ পরপর শুইয়ে রাখা আছে যার একটাকে চিনতে পেরে তার বুকের ভিতরটা ভীষণ ভাবে কেঁপে উঠল এ যে মানিক! সবার চোখের সামনে পৈশাচিক অট্টহাসি করে জগার শরীরটা আচমকা ধোয়ার মতো ভেঙে গলে বাতাসে মিলিয়ে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%