ভালো ভূতের গল্প

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

গণেশ গ্রামের ছেলে, বাড়ির অমতে কলকাতায় চাকরি করতে এসে পড়ল মহাবিপদে। তার বাবা বলেন পরের গোলামি করার থেকে চাষবাস করা ঢের ভালো আর এই করেই তো উনি এতো বিষয় আশয় করেছেন, এদিকে গণেশের মেজাজের সঙ্গে অজ-গ্রামের পরিবেশটা একদম খাপ খায় না। তাছাড়া এমে পাশের ডিগ্রি নিয়ে যদি সেই চাষের কাজেই মজুর খাটাতে হয় তাহলে তো সবই বৃথা। অতএব খানিকটা জেদের বশেই প্রেসের চাকরি নিয়ে শহরে চলে আসা।

জেনিথ প্রিন্টার্সের অফিস গড়িয়ার কানুনগো পার্কে। প্রেসের ম্যানেজার রাধুবাবুর মুখে সবসময় একরাশ বিরক্তি যেন লেগেই রয়েছে। গণেশকে আপাদমস্তক দেখে বললেন -দ্যাখো ছোকরা দুটো জিনিস আমি সহ্য করতে পারি না এক কাজে ফাঁকি মারা আর দুই হল গিয়ে দেরি করে আসা! এই দুটো উপসর্গের একটাও যদি আমার চোখে পড়ে! রাধুবাবুর চোখে ভয়ংকর ইঙ্গিত! গণেশ যথাসাধ্য ঘাড় হেলিয়ে দিল -কথা দিলাম স্যার পড়বে না।

রাধুবাবুকে আশ্বস্ত করে এলেও গণেশ নিজে পড়ল মহা দুশ্চিন্তায়, কাজটা মন দিয়ে করলেও গোবরডাঙা থেকে কলকাতা এতোটা রাস্তা কি উড়োজাহাজে চড়ে আসবে? এদিকে ওই রাশভারী ম্যানেজারকে সে কথা বোঝায় কে! নাঃ কাছাকাছির মধ্যে একটা বাসস্থানের ব্যাবস্থা তাকে দেখতেই হচ্ছে।

সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন দেখে কয়েক জায়গায় ঢুঁ মেরে আক্কেল গুম হবার যোগার। এক কামড়ার ঘরেরও যা ভাড়া সবাই হাঁকছে তাতে মাইনের পুরোটা ওতেই চলে যাবে, কলকাতায় চাকরি করা বোধহয় বেশীদিন ভাগ্যে নেই। গণেশের মনমরা হাবভাব দেখে অফিসের সাহাবাবু এগিয়ে এলেন, সব শুনেটুনে বললেন -তোমার সমস্যার এক মুহুর্তে সমাধান হতে পারে যদি তোমার বুকে খানিকটা সাহস থাকে?

গণেশ হতাশ ভাবে মাথা নাড়ল -নাঃ অতো সাহস নেই, মাইনের পুরোটা গচ্চা দিলে খাব কি?

সাহাবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন -না হে আমি অন্যরকম সাহসের কথা বলছি, তুমি তো শিক্ষিত ছেলে ভুতে ভয় পাও নাকি? গণেশ একটু চিন্তা করে বলল

-তেমন কিছু নয়, এই তো আমার বাবা খোলা চোখেই বারকয়েক ভুত দেখেছে একেবারে সিনেমা থিয়েটারের মতো, আমি অবশ্য চোখের সামনে দেখিনি কিন্তু একবার পাশের গেরামে এক তালগাছের নিচে পেচ্ছাপ করে শাঁকচুন্নি কি ব্রহ্মদত্যি একটা কিছুকে দিয়েছিলাম বেজায় চটিয়ে, তারপরে হল কি একটা পাঁকা তাল সড়সড় করে মাথার ওপর পড়েছিল আর কি! আমি সময়মত ঘাড় কাত করে বাচলাম। আর একবারের ঘটনা বলি! সাহাবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন -ব্যাস্‌ ব্যাস্‌ ওতেই হবে, এই রবিবারে আমার সঙ্গে একজায়গায় চলো দেখি।

ঢাকুরিয়ার শরৎ ঘোষ গারডেন রোডে দু-কামড়ার ফ্ল্যাটটা দেখে তো গণেশের আহ্লাদে আটখান হবার যোগাড় বাথরুম রান্নাঘর মিলিয়ে দুর্দান্ত ব্যাবস্থা সঙ্গে আবার লাগোয়া বারান্দাও রয়েছে উপরি পাওনা একটা খাট বালিশ চাদর সমেত আর এতকিছুর ভাড়া মোটে তিনশো! বাড়িওয়ালা আর কেউ নয় সাহাবাবুর নিজের ভায়রাভাই, ব্যাজার মুখে বললেন -দ্যাখো এক হারামজাদা এই ফ্ল্যাটে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আমায় ফাঁসিয়েছে, তারপর বিল্ডিঙয়ের বদমাইশ লোকগুলো সুযোগ বুঝে ভুতের এমন গুজব রটিয়েছে যে কেউ আর এখানে ভাড়া থাকতে চাইছে না তুমি যদি একটা বছর এখানে থেকে যাও তবে ওই মাসগেলে তিনশো টাকাও ফিরত পেয়ে যাবে, কি রাজি তো? গণেশ ঢোঁক গিলে বলল -তাই বলে গিয়ে সোজা ভুতের বাসায় গিয়ে সেধোব! সেটা কি ঠিক হবে? সাহাবাবু গণেশের পিঠে চাপড় মেরে বললেন -তোমার মতো স্মার্ট, মডার্ন আর শহুরে ছেলে এইটুকুতেই ঘাবড়ে গেলে এই তো আমিই, কতোগুলো রাত এখানে একা কাটিয়ে দিয়েছি, কই আমার চোখে তো কিছু পড়ল না! গণেশ আশান্বিত স্বরে বলল -আপনি এখানে থেকেছেন? সাহা ভায়রাভায়ের সঙ্গে অর্থপুর্ন দৃষ্টি বিনিময় করে বলল -তাহলে আর বলছি কি তুমি কালকেই জিনিসপত্র সব নিয়ে এসো আর হ্যা ফ্ল্যাট-বাড়ির লোকগুলো ভয় দেখাতে নানারকম গপ্পো ফাদবে তুমি কিন্তু বাজে কথায় কান দেবে না ওদের আসল উদ্দেশ্য হল সস্তায় ফ্ল্যাটটা হাতিয়ে নেওয়া বুঝেছ! গণেশ হাসিমুখে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল সে বুঝেছে।

পঞ্জিকা মিলিয়ে শুভদিন দেখে গণেশ অবসর অ্যাপার্টমেন্টের চারতলার ফ্ল্যাটে নিজের বাক্সটা এনে ফেলল। ভুতে ভয় নেই এমন কথা সে বুক বাজিয়ে বলতে পারবে না কিন্তু সাহাবাবু যদি আবার গেয়ো ভেবে বসেন তাই সাতপাঁচ চিন্তা না করেই রাজি হয়ে গেছে এখন যাচাই করা দরকার এখানকার ভুতের ব্যাপারটা আসল নাকি নকল। অনেক সময় গুজব রটিয়েও কিছু রসিক লোক ভুত খাঁড়া করে ফেলে, এখানেও তেমন কিছু হলে গণেশ হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।

শিয়ালদা থেকে গণেশ নতুন তোয়ালে কিনেছে আর একটা বডি লোশন যেটা মাখলে নাকি গা থেকে পুরুষালী গন্ধ বেরোয়, আর মেয়েরা ঘুরে ঘুরে তাকায়, তাছাড়া একটা দক্ষিনি সিনেমার হিন্দি ডাবিং দেখে, নায়কের নকলে দুই কানের নিচে থেকে বেশ লম্বা একটা জুলফিও রাখতে শুরু করেছে, এতে বেশ একটু আধুনিক আর স্মার্ট দেখাবে বলেই তার ধারণা। খানিকটা লোশন হাতে ঢেলে বুকে পিঠে ঘসতেই উৎকট গন্ধে গা পাকিয়ে এলো, মাগো এইসব বাস কলকাতার মেয়েদের পছন্দ! মরুকগে, যে দেশে যেমন নিয়ম, তেমনটাই তো চলতে হবে! গণেশ র‍্যাপিডেক্স ইংলিশ ওয়ার্ডবুকটা খুলে পড়তে শুরু করল, ঝাড়া দুঘন্টা ইংরেজি চর্চার পর ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসতে লাগল, এদিকে ঘড়ির কাটাও দশটা ছুয়ে ফেলেছে, গণেশ মনে মনে প্রার্থনা জানাল 'হে রামকৃষ্ণদেব কৃপা করুন ওই অপদেবতাটি আবার যেন রাতবিরেতে জ্বালাতে হাজির না হন'। আলো নিভিয়ে গণেশ শুয়ে পড়ল।

রাত্রি দুটো অবধি সব নির্বিঘ্নেই কাটল তারপর ধাতব শব্দে গণেশের ঘুম ভেঙে গেল। রান্নাঘরে কেউ যেন বাসনপত্র নাড়াচাড়া করছে। আপাদমস্তক চাঁদর মুরি দিয়ে গণেশ আকুল স্বরে ডাকল -রামকৃষ্ণদেব বাচান! গণেশের প্রার্থনার জোরেই হোক বা যে কারনেই হোক ভোজবাজীর মতো তক্ষুনি সব শান্ত হয়ে গেল, মনে মনে ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার ঘুমের চেষ্টা চালাল, সবে মাত্র তন্দ্রা এসেছে হঠাৎ কে যেন টান মেরে গায়ের চাদরটা তুলে ফেলল। গণেশ ধড়ফড় করে উঠে বসে চারপাশে চাইল, কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না! ফের চাদরের মধ্যে গুটিসুটি মেরে গণেশ ভয়ে ঠঁকঠঁক করে কাঁপতে লাগল, ভয়ংকর বিপত্তি! সেখানেও অন্য দেহের ছোঁয়া, যাইহোক না কেন গণেশ চোখ খুলছে না! অন্য শরীরটা ইতিমধ্যে কষে জড়িয়ে ধরেছে, গণেশও তুফান মেলের স্পীডে রামনাম জপ করতে শুরু করেছে। এবার মোটামোটা দুটো আঙুল লম্বা জুলফিটা ধরে দিয়েছে মোক্ষম টান! ওরে বাপ! যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে চোখ খুলে যেতেই দেখতে পেল ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি চৌকো মুখ হিংস্র দৃষ্টে তার ওপর হুমড়ি খেয়ে চেয়ে আছে। হিক্কার তুলে গণেশ জ্ঞ্যান হারাল।

লাঞ্চ ব্রেকে গণেশ সাহাবাবুকে চেপে ধরল - ওই ফ্ল্যাটে দানোর বাস আর আপনি নাকি ওখানে রাত কাটিয়েছেন, ভুতে আপনাকে ছেড়ে দিল?

সাহাবাবু নির্বিকার স্বরে বললেন -প্রথম প্রথম আমার সঙ্গেও ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করেছিল তারপর সব ঠিক হয়ে গেল, কয়েকটা দিন থেকেই দ্যাখো না, ও ভুত নিজে থেকেই পালাবে। গণেশ অসন্তুষ্ট স্বরে বলল -মাপ করুন আমি আর একটা দিনও ওই বাড়িতে থাকছি না।

সাহাবাবু মুখে জর্দাপান ফেলে আয়েশ করে চিবুতে চিবুতে বললেন -সে তোমার ইচ্ছে আমি বলার কে, তবে তিরিশ হাজার টাকাটা কি আজকেই দেবে?

গণেশ ভ্রু কুঁচকে বলল -কীসের ত্রিশ হাজার?

সাহাবাবু ড্রয়ার থেকে একটা টাইপ করা কাগজ বের করে গণেশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন -এগ্রিমেন্টের তিন নম্বর শর্তটা ভালো করে পড়ে দেখো ভায়া যদি ওই বাড়ি তুমি একবছর আগে ছেড়েছ অথবা সাতদিনের বেশি অন্যত্র বাস করেছ তবে ত্রিশ হাজার টাকার পেনাল্টি দিতে হবে, তুমি কিন্তু সজ্ঞানেই সই করেছ।

গণেশ হায়হায় করে উঠল -একি অন্যায় না বলে কিসব সই করিয়ে নিয়েছেন। সাহাবাবু মুচকি হেসে বললেন -কপিটা নিয়ে গিয়ে ভালো করে পড়ো, পাঁচ হাজারের জিনিস তিনশোয় পাচ্ছো কি এমনি এমনি!

গণেশের গলা খাঁদের মধ্যে ঢুকে গেছে কোনরকমে বলল -ফের ওই ভুতের পাল্লায় পড়ার থেকে মরে যাওয়া ভালো। গণেশের অবস্থা দেখে বোধহয় সাহাবাবুর দয়া হল তিনি একটু চিন্তা করে বললেন -দ্যাখো আমি যতদূর জানি ভুতের যত উৎপাত ওই রাতের বেলাতেই হয়, তুমি যদি চাও তাহলে ম্যানেজারকে বলে ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি এখন থেকে নাইট ডিউটি করো আর দিনে ঘুমাও, দিনের আলোয় তো আর ভুতের ভয় নেই। গণেশ আর কি করে নিরুপায় ভাবে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিল সে রাজী।

রবিবার বাড়ি গিয়ে গণেশ জলপোড়া আর মন্ত্রপূত সিঁদুর নিয়ে এসেছে। ফ্ল্যাটের সর্বত্র সেসব ছড়িয়ে বুকে একটু সাহস এলো। এবার এখানকার রবাহুত বাসিন্দাটাকে একটু কড়কে দেওয়া দরকার, গণেশ বুক চিতিয়ে চিৎকার ছাড়ল-এই ভুত হারামী, শোন আমি তোর পরোয়া করি না, আই ডোন্ট কেয়ার, আই ডোন্ট কেয়ার, আণ্ডারস্ট্যান্ড! হঠাৎ কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল–কেয়ার তোর বাপেও করবে । গণেশ মারাত্মক চমকে উঠল, একি রে বাবা! দিনদুপুরে এসব কি? ভুতের জুলুমবাজি তো রাত নামলে পর। নাঃ নির্ঘাত ভুল শুনেছে, রাতদিন ভুতের চিন্তা করে করে এবার বোধহয় মাথাটাই বিগড়োবে। দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে গণেশ ইংরেজি চর্চায় মন দিল। আজকের বিষয় হল ইংরেজি উচ্চারণের তারতম্য। বইয়ের পাতায় মোটা মোটা অক্ষরে লেখা 'see sells sea shells on the sea shore' গণেশ তারস্বরে আবৃত্তি শুরু করল সী সেলস্‌ সি সেলস্‌ অন দি শি শোর' ঝাড়া আধঘণ্টা মুখস্থ চলার পর কানের খুব কাছে আবার সেই স্বর, এবারে যেন খানিকটা পীড়িত -উফঃ তুই থামবি! গণেশের বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল এদিক ওদিক চেয়ে জোর গলায় বলল -ক্যা রে তুই? কাপুরুষ! লুকিয়ে ভয় দেখাস! সাহস থাকে তো সামনে আয়…হারামী, সাথে সাথে জুলফি ধরে ভয়ংকর হ্যাঁচকা টান। বাপরে বাপ! মনে হল এবারে বোধহয় শখের জুলফিটা উপড়ে ফেলে তবেই ছাড়বে। একমুহুর্ত নষ্ট না করে গণেশ উল্কার বেগে ছুট লাগাল। পিছনে বিছানার ওপরপড়ে রইল ডাই করা খাতাপত্র আর র‍্যাপিডেক্স ইংলিশ স্পিকিং কোর্স।

অবসর অ্যাপার্টমেন্টের সামনেই মডার্ন হেয়ার কাটিং সেলুন, গণেশ ঝড়ের বেগে ঢুকে একটা চেয়ার দখল করে বসল। ছোকরা নাপিত এগিয়ে এসে জিগ্যেস করল -কি হবে চুল না দাড়ি?

-জুলফি

ছোকরা ভ্রু কুঁচকে বলল -মানে?

-আমার জুলফি দুটো উড়িয়ে দেবে ভাই একেবারে গোঁড়া থেকে।

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। গণেশ তার রুম পার্টনারের সঙ্গে মোটামুটি আপোষ করে ফেলেছে। জলপোড়া আর সিঁদুরে যখন কিছু হবার নয় তখন অন্য রাস্তাই ধরা যাক। এবার আর চ্যালেঞ্জে নয় একেবারে হাতজোড় করেই গণেশ নিজের সমস্যার কথা জানিয়েছে। ওই সাহা আর তার ভায়রা মিলে এমন প্যাঁচে ফেলেছে যে ফ্ল্যাট ছাড়লে তিরিশ হাজার টাকা দিতে হবে, সে গরীব মানুষ এতো টাকা পাবে কোথা থেকে? এরপর হয়ত জেল হবে, জেল থেকে বেরবোর পর তার বাবা নিশ্চয়ই তাকে চাষের কাজেই জুতে দেবেন, গণেশের পুরো জীবনটাই বরবাদ।এখন ভুতদাদা যদি একটু দয়া করেন তাহলে গণেশ কথা দিচ্ছে সুর্য ডোবার পর কখনো এই বাড়িতে পা রাখবে না। ভুত বোধহয় রাজীই হল, কারন সে আর কোন উচ্চবাচ্য করল না।

সময় নিজের নিয়মে বয়ে চলেছে। ওদিকে কর্মক্ষেত্রে গণেশের গুরুত্ব বাড়ছে তাই আজকাল ডিউটির পরে ওভারটাইমও করতে হচ্ছে, অবশ্য এর ফলে ঠিকমতো বিশ্রামটা কপালে জুটছে না। ভুতকে দেওয়া কথা রাখতে বিকেল পাঁচটার আগেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে হয় তারপর হয় কোন পার্কে নাহয় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সময় কাটানো। রাত্রি বারোটা থেকে গণেশের কাজের সময় কিন্তু সে ঘন্টাদুয়েক আগেই পৌছে যায়, রাধুবাবু বিলক্ষণ সন্তুষ্ট, মনে মনে ভাবেন ছোকরা আর যাই হোক ফাঁকিবাজ নয়।

গত কয়েকদিনে প্রচুর ধকল গেছে, সকালে কাজ থেকে ফিরে বিছানায় পরিশ্রান্ত শরীরটা এলিয়ে দিতেই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো, এমনকি ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার কথাও খেয়ালে রইল না। হঠাৎ কীসের শব্দে ঘুম ভেঙে যেতেই লাফিয়ে উঠে বসল, একি! দিনের আলো শেষ হয়ে যে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে, আজ হয়েছে আর কি! চপ্পলে পা গলিয়ে হুড়মুড় করে ছুটতে গিয়ে আর এক বিপত্তি। কিসে যেন ঠোক্কর লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই শক্ত দেয়ালে মাথাটা গেল ঠুকে, আর তখুনি বিটকেল আওয়াজ কানে এলো -অন্ধ নাকি রে তুই চোখে দেখিস না! গণেশ ভয়ে ভয়ে বলল -ভুতদাদা এমন ভুল আর হবে না আজকের মতো মাপ করে দাও। ভুত যেন গণেশের কথায় মজা পেয়েছে এমনভাবে বলল -মাপ করে দেব যদি আমার একটা কাজ করিস?

-আজ্ঞে বলুন করব।

অশরীরীর উৎসাহভরা কণ্ঠস্বর শোনা গেল -শুঁটকি মাছ এনে খাওয়াতে পারিস? বড়ো ইচ্ছে করছে।

-সে আর কি এমন ব্যাপার, এখুনি নিয়ে আসছি।

শুঁটকি মাছ ভাজার গন্ধে গণেশের গা ঘিনঘিন করছে ওদিকে অশরীরী কণ্ঠস্বর সাগ্রহে রান্নার তদারকি শুরু করেছে, তেলটা ভালো করে ফুটিয়েছিস তো, কাচালঙ্কা একটু বেশি করে দে পিঁয়াজ এতো কম দিলি কেন? ভালো করে কষা দেখি, আঃ কি সুগন্ধ ছেড়েছে। গণেশ মুখে হাসি ঝুলিয়ে আদেশ পালন করে চলেছে,ভূত-পিশাচকে চটিয়ে কাজ নেই বাবা, শেষে হিতে বিপরীত না হয়ে যায়। রান্না শেষ করে থালায় সাজিয়ে দিতেই ভুত লম্বা শ্বাস টেনে বলল -হয়ে গেছে খাওয়া শেষ। গণেশ বিস্মিতকণ্ঠে বলল -সেকি দাদা খেলেন কই? সবই তো পড়ে রইল! অশরীরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল -ওই গন্ধ শুঁকেই আমার খাওয়া হয়ে গেছে অবশ্য তুই যদি চাস মাছগুলো খেতে পারিস। গণেশ আঁতকে উঠল ওরে বাবা ভুতের এঁটো খেয়ে কি শেষে রসাতলে যাবে। ঢোঁক গিলে বলল -না মানে দাদা যদি রাগ না করেন আমার পেটটা আবার তেমন ভালো নেই।

আরেক দিন ভুত বায়না ধরেছে কাঁকরা খাবে। গণেশ যথারীতি লঙ্কা রসুন দিয়ে কষিয়ে যাচ্ছে পিছন থেকে আওয়াজ ভেসে এলো -তোর নাম কি যেন?

-আজ্ঞে গণেশ ঘোষ

-বাড়ি কোথায়?

-গোবরডাঙ্গা

-বাঙাল নাকি?

গণেশ রুষ্ট হলেও মনের ভাব গোপন রেখে বলল -না

-বাঙাল না হলেও কিন্তু তুই যে গ্রামের চাষা সে আমি ঠিক বুঝেছি।

গণেশের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। অপ্রসন্ন স্বরে বলল -দাদা খামোকা আমাকে তখন থেকে অবজ্ঞা করে যাচ্ছেন, গ্রামের ছেলে হলেও জেলা কলেজ থেকে পাশ দেওয়া ছাড়া ডিটিপি কোর্সেও ডিস্টিনক্‌শান পেয়েছি, আমি মোটেই ফ্যালনা নই।

ভুত তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল -চে গুভেরার নাম শুনেছিস? জন লেনন বা নিদেনপক্ষে এলিজাবেথ গিলবার্ট কে বল তো?

গণেশ ঘাড় গোঁজ করে পেঁয়াজ কাটতে থাকে।

-তাই বলছিলাম তোর কোন ক্লাস নেই।

গণেশ মিনমিন করে প্রতিবাদ করল -তা দাদা এতো কালচার নিয়ে শুঁটকি মাছের মতো অখাদ্যি খান কোন মুখে শুনি? ভুত ফ্যাস্‌ করে বলল -বেঁচে থাকতে বার্গার ফ্রাই আর স্যান্ডউইচ ছাড়া মুখে কিছু রুচত না কিন্তু মরার পর থেকে কেন জানি না শুধু ওই শুঁটকি আর পচা চিংড়িতেই মন পড়ে থাকে, মরলে বুঝি এমন দশাই হয়।

অবসরের বাসিন্দারা গণেশকে এড়িয়ে চলাই পছন্দ করে, ভুতের আস্তানায় যে লোক গুছিয়ে চলতে পারে সে নিজেও যে কম বিপদজনক নয় সে বিষয়ে সবাই একমত। গণেশের অবশ্য এতে বিশেষ অসুবিধে হচ্ছে না, সে ভালোই আছে। মানুষের থেকে ভুতকেই আজকাল তার অধিক নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে। গল্পচ্ছলে ভুত নিজের পরিচয় জানিয়েছে, নাম অভিক সেনগুপ্ত বাড়ি ছিল ঠাকুরপুকুরে সাতাশ বছরের তরতাজা যুবক অভিক চাকরি করত নামকরা বেসরকারি কোম্পানিতে।

সেদিন বাড়ি ঢুকতেই অভিকের স্বর ভেসে এলো -মালতী কে?

গণেশের কান লাল হয়ে উঠল -আপনি আমার ডায়েরী খুলে পড়েছেন কেন?

-আমাদের খুলতে হয় না, বন্ধ মলাটের ভিতরেই দেখতে পারি, যাইহোক বিয়ে করবি নাকি টাইম-পাস।

-আজ্ঞে টাইম পেলেই বিয়ে করব। অশরীরি অভিক যেন নিজের মনে বলতে লাগল -ভালোবাসা সবার জন্য নয় বুঝলি চালাকরা মজা লোটে আর বোকারা ফাঁসে। আমিও ভালবেসেছিলাম তিয়াসাকে, মনে হত ওকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব, একদিন তিয়াসা জানাল সে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল! কতোরকম চেষ্টা যে করলাম কিন্তু ওর মত পাল্টানো গেল না, শেষে ঝোঁকের মাথায় ওই যে সিলিং ফ্যানটা দেখছিস ওতে দড়ি খাটিয়ে ঝুলে পরলাম। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ তারপর অভিকই বলল -এর কিছুদিন পর তিয়াসা বিয়ে করে নতুন বরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেল।

বিশেষ দরকারে দিন তিনেকের ছুটি নিয়ে গণেশ গ্রামে গেছিল। মালতীর সঙ্গে বিয়ের কথা পাড়তেই তার বাবা একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। পুকুরপাড়ের জমিটা নিয়ে মানিক ঘোষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিবাদ এবারে আদালত অবধি গড়িয়েছে আর সেই লোকের মেয়েকেই ঘরে তোলার কথা বলে এমন কুলাঙ্গার এই পেনোটা। খবরটা মানিক ঘোষের কানে যেতে সেও গেছে বেজায় ক্ষেপে, মালতীর এই কার্তিকেই বিয়ে দিয়ে ছাড়বে তা সে অন্ধ ল্যাংড়া বেকার যার সাথেই হোক না কেন, সবার আগে মানিক মেয়ের ঘর থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দিল। এসব ডামাডোলের মাঝে মালতী তার পেনোদাকে চিরকুট পাঠিয়েছে, প্রয়োজনে সে বাড়ি ছেড়ে এককথায় বেড়িয়ে আসবে। গণেশ মালতীকে কথা দিতে পারেনি। চাকরিটা সবে মাত্র পাকা হলেও মাইনে এতোই কম যে ওই দিয়ে কলকাতায় ঘর ভাড়া করলে আর খাবার জুটবে না, মাথায় একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে গণেশ গ্রাম ছেড়ে শহরের পথে পা বাড়াল।

পরপর তিনটে ভুল চোখে পড়তে ম্যানেজার রাধুবাবুর ভ্রু কপালে উঠল। অন্য কেউ হলে এর জন্য কড়া কথা বলতে তার বাধত না কিন্তু নতুন ছোড়াটাকে তিনি আজকাল ভরসা করতে শুরু করেছেন তাই ডেকে পাঠিয়ে শান্ত স্বরেই বললেন-কি হে ডিজাইনটা কপি করতে এতোগুলো ভুল হয় কি করে শুনি? গণেশ উত্তর না দিয়ে আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে রাধুবাবু আবার বললেন -দ্যাখো আমার মনে হয় লাগাতর নাইট ডিউটির ধকল তুমি সামলাতে পারছ না, দুটো দিন বিশ্রাম নাও তারপর দিনে কাজ কর রাতে ঘুমাও। গণেশ সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে রাধুবাবুর ঘর থেকে নিস্ক্রান্ত হল।

বাড়ি ঢুকেই গণেশ কাতর স্বরে ডাক পাড়ল -ও অভিকদা শুনছেন,

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর উত্তর দিল -কি হয়েছে?

-মরার সময় কি খুব কষ্ট হয়েছিল?

-কে মরবে তুই! মেয়েটা লেঙ্গি মারল নাকি?

গণেশ কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল -তাহলে তো ল্যাটা চুকেই যেত কিন্তু এমন সতীলক্ষ্মী মেয়ে ওই মালতী চোখের সামনে ওর অন্যত্র বিয়ে হতে দেখার চেয়ে ভালো বিষ খেয়ে আপনার দলে নাম লেখানো। অশরীরী খুশির গলায় বলল -তা মন্দ নয় অনেকদিন তো একা রইলাম এবার নাহয় একটা সঙ্গী পাওয়া যাবে, তা মরার আগে তোর ঝামেলাটা কি একটু খুলে বলবি। সব শুনেটুনে ভুত হাই তুলে বলল -এই ব্যাপার তা এখানে নিয়ে এলেই তো হয়ে যায়। গণেশ মনমরা স্বরে বলল -সে কি করে হবে গেরস্থ বাড়ি বলে কথা! অপদেবতার সঙ্গে বাস করলে যদি অকল্যাণ হয়!

অভিকের ক্রুদ্ধ স্বর শোনা গেল -তবে তুই শালা আমাকে ভাগাতে চাস!

-না মানে তেমন নয় কিন্তু মালতীর কথাটাও একবার ভেবে দেখুন সব জেনে ফেলার পর সে কি আর এই বাড়িতে থাকতে চাইবে?

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে অভিক শান্ত স্বরে বলল -ঠিক আছে চলে যাব যদি তুই আমার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করে দিস।

-গণেশের চোখে আশার আলো ফুটে উঠল -কি করতে হবে বলে দিন দাদা।

-খাটের ওপর চাদরটা সরিয়ে গদির মাঝ বরাবর কেটে ফ্যাল দেখি। অভিকের আদেশটা অদ্ভুত মনে হলেও বিনাবাক্যব্যায়ে রান্নাঘর থেকে বড় ছুড়িটা এনে গদি ফুড়ে ফেলতেই একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বেড়িয়ে এলো যার মধ্যে সযত্নে রাখা অনেকগুলো হাজার টাকার নোট।

ম্লান স্বরে অভিক বলতে লাগল -ওতে পুরো দুলাখ আছে গুনে দেখতে পারিস, টাকাটা ব্যাংক থেকে তুলেছিলাম তিয়াসার জন্য, মৃত্যুর আগে ঝোঁকের মাথায় এই গদিতে লুকিয়ে রাখি, আমি মরার পর ওরা ওই গদিটা ঘেঁটে দেখার দরকার মনে করেনি, তাই টাকাটা এখনো আছে। সামান্য বিরতি দিয়ে অভিক আবার ধরা গলায় বলল -বাবা মা আমার জন্য কতো কষ্ট করেছিলেন, তিয়াসার মিডলক্লাশ পরিবেশ পছন্দ হবে না ভেবে ঠাকুরপুকুরের বাড়ি ছেড়ে এই ফ্ল্যাটে চলে এলাম, এরপর একবারের জন্যেও ওদের খোঁজ করি নি। মৃত্যুর পর দেখতে পেলাম বাবার সঞ্চয় প্রায় শেষ, টাকার অভাবে মায়ের ক্যানসারের চিকিৎসা হচ্ছে না আর আমি পৃথিবীর সব থেকে স্বার্থপর অমানুষ নির্বোধ মরার পরেও অনুশোচনায় তিলে তিলে জ্বলে মরছি। গণেশের চোখের সামনে অভিকের বায়বীয় অবয়ব একটু একটু করে ফুটে উঠল। অভিকের দুচোখ হতে জলের ধারা গড়িয়ে বিন্দু বিন্দু হয়ে বাষ্পে মিশে যেতে লাগল। একটু ধাতস্থ হতে অভিক চোখের জল মুছে বলল -তুই খাঁটি মানুষ, আমি জানি তোকে বিশ্বাস করে ঠকব না এই টাকা-কটা আমার বাবার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে মুক্তি দে ভাই, কথা দিচ্ছি তোদের এই বাসস্থান চিরতরে ছেড়ে চলে যাব। অভিকের দুঃখে গণেশের চোখের কোনও ভিজে এসেছিল ভারি স্বরে বলল-ঠিকানাটা বলুন পৌছে দিয়ে আসছি।

ঠাকুরপুকুরের বাছাড় পাড়া রোডের সরু গলিটার শেষ মাথায় রঙচটা পলেস্তারা খসা পুরানো আমলের বাড়িটার সদর দরজায় বার কয়েক কড়া নাড়ার পর ওপর থেকে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এলো -কে?

গণেশ উচুগলায় বলল -এখানে সোমেন সেনগুপ্ত থাকেন কি? লোলচর্ম বৃদ্ধ দোতলার জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বললেন -কি দরকার?

-একটু ভিতরে আসতে পারি, দরকার ছিল? জানালা বন্ধ হয়ে গেল, এরপর দীর্ঘ প্রতিক্ষা, গণেশের এক একটা মিনিট ঘন্টার সমান মনে হতে লাগল। প্রায় দশমিনিট অপেক্ষার পর দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে একজন সৌম্যদর্শন বয়স্ক ব্যাক্তি। লম্বাটে তোবড়ানো মুখে ক্লান্তি আর বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। পরনের অপরিছন্ন লুঙ্গি আরে গায়ের শতছিন্ন গেঞ্জিটা আর্থিক অসাচ্ছল্যের পরিচয় দিচ্ছে। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু দৃষ্টে চেয়ে রয়েছেন দেখে গণেশ গলা খাকড়ে বলল -আমি অভিকের বন্ধু, আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। বৃদ্ধ রীতিমতো চমকেছেন, বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠে বললেন -সে তো তিন বছর আগেই, কিন্তু তোমাকে তো চিনলাম না! গণেশ ইতস্তত করে বলল -অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না তো তাই! বৃদ্ধ সরে দাঁড়ালেন -ভিতরে এসো।

বাড়ির ভিতরটা বাইরের থেকেও সৃষ্টিছাড়া জীর্ন,পর্দাবিহীন জানালা দিয়ে সুর্যের আলোয় ঘরটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল, চামড়া খসা দেয়ালগুলোতে কতদিন যে রঙের পোঁচ পড়েনি, মেঝেয় আর সর্বত্র ধুলোর পুরু আস্তরণ। আসবাব বলতে কয়েকটা বেতের চেয়ার আর ঘরের মাঝখানে পেতে রাখা একটা তক্তপোষ।বৃদ্ধ গামছা দিয়ে চেয়ারটাকে বারদুয়েক ঝেড়ে বললেন -বসো। তক্তপোষের ওপর পা তুলে বসে বৃদ্ধ জিগ্যেস করলেন -তুমি কি ওর অফিসের বন্ধু নাকি ইউনিভার্সিটির? গণেশ মনে মনে তৈরিই ছিল, বলল -যাদবপুরের যে ফ্ল্যাটে আপনার ছেলে থাকত আমি আজকাল সেখানে ভাড়ায় থাকি। হঠাৎ বৃদ্ধ যেন কেঁপে উঠলেন, ভাঙাচোরা মুখে ফুটে উঠল অজস্র জিজ্ঞাসা। গণেশ হাতের ব্যাগটা বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল -এতে দুলাখ টাকা রয়েছে আপনার ছেলের শেষ রোজগার। বৃদ্ধের ঠোঁটদুটো থরথর করে কেঁপে উঠল, শুকিয়ে যাওয়া গলায় বললেন -তুমি কেন এসেছ? গণেশ শান্ত স্বরে বলল -নিছক আবেগের বশে অভিক নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে কিন্তু তারপর সে বুঝেছে কতো বড়ো একটা ভুল হয়ে গেছে, যদি আপনারা তাকে ক্ষমা করে দ্যান তাহলে সে নিশ্চিন্ত মনে চলে যেতে পারে। বৃদ্ধের চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল গড়াতে শুরু করেছে, ঢুকে যাওয়া স্বরে বলতে লাগলেন -ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই খামখেয়ালী, মাথায় যা চাপত করে ফেলত, পরিণতি নিয়ে ভাবত না। সংযত হয়ে বৃদ্ধ এবার গণেশের হাত চেপে অনুরোধের ভঙ্গিতে বললেন -তার সঙ্গে আমার একবারটি কথা বলিয়ে দেবে বাবা। গণেশ মাথা নিচু করে বলল -অভিকদা বলেছে সে আমার সঙ্গেই আসবে হয়ত এই ঘরের কোথাও এক কোনে বসে সে আমাদের কথা শুনছে। বৃদ্ধ চঞ্চল হয়ে উঠলেন অন্ধের মতো ঘরের চারপাশে হাতড়াতে হাতড়াতে বলতে লাগলেন -অভি তুই কি এখানে, জানিস ডাক্তারে বলেছে তোর মা আর একমাসও থাকবে না একবারটি তার সঙ্গে দেখা কর, মরার আগে সে অন্তত এইটুকু শান্তি নিয়ে মরুক, আয় বাবা আমার সঙ্গে উপরে আয়। বৃদ্ধ আকুল স্বরে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষয়াটে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার দিকে হাটা লাগিয়েছে, মাঝে মধ্যে পিছন ফিরে বলছে -অভি তুই আসছিস তো? গণেশ দেখতে পেল বায়বীয় অভিকের আবছা ধোয়াটে শরীর বৃদ্ধের পিছন পিছন মাথা নিচু করে ভেসে চলেছে। হূহূ করে কান্না এসে গেছিল, একছুটে বেড়িয়ে এসে রাস্তায় হাঁটা লাগিয়ে দিল, তার কাজ ফুরিয়েছে এখানে থাকার আর কোন প্রয়োজন নেই।

ক্লান্ত পায়ে গণেশ ফ্ল্যাটে ফেরত এলো, ডাকে মালতীর চিঠি এসেছে। ঘরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলিয়ে হাঁক ছাড়ল -অভিকদা আপনি আছেন? কোন সাড়াশব্দ নেই, অভিক তার কথা রেখেছে। খাম ছিড়ে চিঠি খুলে পড়তেই গণেশের ভুরুতে ভাঁজ পড়ল। মালতী জানিয়েছে তার বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেছে, হাতে আর মোটে একটা সপ্তাহ। গণেশ দৃঢ় হল, এবারে একটা হেস্তনেস্ত করতেই হচ্ছে, যদি মানিক ঘোষ মালতীকে জোর খাটিয়ে আটকে রাখে তাহলে হয়ত থানায় খবর দিয়েই কিছু ব্যাবস্থা করতে হবে।

গণেশের চিন্তায় ছেদ পড়ল, দরজায় কলিং বেলের মৃদু শব্দ। গণেশ বিস্মিত হল তার এই ফ্ল্যাটে তো সাধারণত কেউ আসে না, দরজা খুলতে গণেশের বিস্ময় আরও চড়ল। সামনে দাঁড়িয়ে সাহাবাবু আর তার ভায়রাভাই। সাহাবাবুই প্রথম কথা বললেন -কি হে গণেশ খবর ভালো তো?

-হ্যা

-আমি অজিতকে বললাম গণেশ একটা বাহাদুর ছেলে, একা থেকে ভুতের গুজবটা কেমন উড়িয়ে দিল আর তাইতো শেষেমেসে ভাড়াটে পাওয়া গেছে, বুঝলে পুরো আট হাজার টাকায় ভাড়া যাচ্ছে এই ফ্ল্যাট, তা তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে কতো সময় লাগবে, কালকের মধ্যে পারবে? গণেশের মাথায় কিছু ঢুকছিল না বোকার মতো জিগ্যেস করল -কিসব বলছেন আপনাদের সঙ্গে তো আমার একবছরের কন্ট্র্যাক্ট ভুলে গেলেন নাকি! সাহাবাবু নির্লিপ্তকণ্ঠে বললেন -দ্যাখো হে তোমার স্বভাব দেখছি পাল্টাল না এগ্রিমেন্টটা আজও পড়ে ওঠো নি। পাঁচ নম্বর শর্তে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে বাড়িওয়ালা যখন চাইবেন আটচল্লিশ ঘন্টার নোটিশে চলে যেতে হবে। গণেশের নাকের ওপর এগ্রিমেন্টের কপি ঝুলিয়ে সাহাবাবু কড়া গলায় বললেন -দুদিন সময় দিলাম হে নাহলে অন্য ব্যাবস্থা নেব!

সাহাবাবুরা বিদায় হতেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় গণেশ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। সব স্বপ্ন ধুলিস্যাত! মালতীর সামনে এবার কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবে, প্রচন্ড হতাশায় গণেশের মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল, বিছানার ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে চিন্তায় ছটফট করতে করতে একসময় অবসাদে চোখ জুড়িয়ে এলো।

ঘুম ভাঙতেই মাথা যন্ত্রণাটা ফিরত চলে এলো, হঠাৎ গণেশের মাথায় অদ্ভুত একটা খেয়াল চাপল, এভাবে হেরে যাওয়ার থেকে ভালো সেও অভিকের মতো আত্মহত্যা করে ওই সাহাদের জব্দ করে, এ জীবনে আর এই ফ্ল্যাট বাছাধনদের ভাড়া দিতে হচ্ছে না। যা ভাবা তাই কাজ। বিছানার চাদর সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ টানাটানি করে গণেশ হাল ছেড়ে দিল। নাঃ একাজ তাকে দিয়ে হবে না। হঠাৎ তাকে ভীষণ চমকে কানের কাছে খিঁখিঁ হাসি। অভিকের কন্ঠস্বর বেজে উঠল -কিরে ঝুলবি না! কখন থেকে মজা দেখব বলে অপেক্ষা করছি।

-আপনি এখনো যান নি

-চলেই যাচ্ছিলাম হঠাৎ মনে হল তুই একটা ঝামেলায় পড়তে চলেছিস তাই শেষবারের জন্য ফিরত এলাম

গণেশ বলার চেষ্টা করল -বাড়িওয়ালা আর সাহা মিলে

অভিক মাঝখানে বাঁধা দিল -সব দেখেছি, শুনেছি, না পড়ে কাগজে সই করিস কেন? যাকগে এবার আমার কথা মন দিয়ে শোন আর যেমনটা বলব ঠিক তেমনটা করবি।

দুদিন পরের কথা। সাহাবাবু ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে অফিসে ঢুকেই গণেশের খোঁজ করলেন, গণেশ তখন সদ্য আসা প্রেস ম্যাটারটা চেক করছিল সাহাবাবুকে দেখে বিরক্তিতে মুখ ঘুড়িয়ে নিল। সাহাবাবু বিগলিত হাসি হেসে বললেন -এই যে ইয়ংম্যান খবর কি? গণেশ কেজো স্বরে বলল -আমি এখন একটু ব্যাস্ত পরে কথা বলবেন। সাহাবাবু গণেশের হাত চেপে কাতরস্বরে বললেন -পরে আর সময় হবে না ভাই আমাকে বাঁচাও।

-হাত ছাড়ুন, কি হয়েছে?

-কি বলব গণেশ তুমি চলে যাওয়া ইস্তক এমন অনুশোচনা শুরু হয়েছে যে নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠেছে, গিন্নী বলল কোন আক্কেলে ওই ভালোমানুষ ছেলেটাকে তোমরা তাড়ালে হ্যা, অজিত তো লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছে না নইলে সে নিজেই আসত, তা ভায়া যা হবার হয়ে গেছে এখন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসো, তোমার ফ্ল্যাট তুমিই সামলাও। গণেশ গম্ভিরভাবে বলল -বুঝলাম কিন্তু আমার আবার অন্য জায়গায় ঘর ভাড়া নেওয়া হয়ে গেছে। সাহাবাবু হায়হায় করে উঠলেন -সে কি হে তোমার প্রানে কি একফোঁটা দয়ামায়া নেই, আমি যে অজিতকে বড়োমুখ করে বলে এসেছি। গণেশ গাম্ভির্যভাব বজায় রেখে বলল -মিথ্যে কথাগুলো শুনতে বেশ লাগল কিন্তু যদি চান আমি আপনার কাজে আসি তাহলে ঝেড়ে কাশুন দেখি। সাহাবাবু ইতস্তত করে বললেন -ভাইরে তুই যে ভুতের এতবড় ওঝা সেটা আমাদের জানা ছিল না জানলে তোকে ঘাটাতাম না। ওই ফ্ল্যাটের ভুত হারামজাদা আমার শালীর বড় ছেলেটার ওপর ভর করে বাড়ির সবাইকে দফায় দফায় পেদিয়ে সর্ষেফুল দেখাচ্ছে, আমায় তো ওরা খুব মান্যি করে তাই গেছিলাম মুসাবিদা করতে, দেখতে পেয়ে দরজার ডাসাটা দিয়ে গোড়ালিতে এমন ঠোকা মেরেছে যে ফুলে একসা, এরপর বেল্লিকটা শাসিয়েছে আগের বাসিন্দা যদি ওই ফ্ল্যাটে এখনি ফেরত না আসে তাহলে শালীর ছেলেকে ছেড়ে আমার ওপর ভর করে পাঁচতলার ছাঁদ থেকে শূন্যে ঝাঁপ মারবে। গণেশ হাসি চেপে বলল -একটা শর্তে রাজী হতে পারি এবারে কন্ট্র্যাক্ট হবে পাঁচ বছরের জন্য আর এগ্রিমেন্টে উটকো শর্ত রাখা চলবে না, অবশ্য এবার চুক্তিপত্র গণেশ ভালো করে দেখে তবেই সই করবে। সাহাবাবু সম্মতিসূচক মাথা নাড়তেই গণেশ ফের বলে উঠল -আর ভাড়া কিন্তু ওই তিনশো। সাহাবাবু ব্যাজার মুখে বললেন -সে যা ভালো বোঝ।

মনে মনে অভিককে ধন্যবাদ জানিয়ে গণেশ তৈরি হল।একটু আগে ফোন করেছিল, কপালগুনে ফোনটা মালতীই তুলেছিল, গণেশ জানিয়ে দিয়েছে সে আর দুঘন্টার মধ্যেই আসতে চলেছে, মালতীও প্রস্তুত। বিকেল চারটের ট্রেনটা ধরতে হলে আর দেরি করা চলবে না। গণেশ রামকৃষ্ণদেবের ছবিতে প্রণাম ঠুকে জোরকদমে হাঁটা লাগাল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%