সঞ্জয় ভট্টাচার্য
শ্রীমান বিশ্বনাথ সেন ওরফে বিশু, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সী পাশ করতেই পিতৃদেব শ্রী সত্যব্রত সেন সংবাদপত্রের পাত্রী চাই বিভাগে বড়সড় একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে বসলেন, ধনী ব্যাবসায়ীর একমাত্র পুত্রের জন্য উপুযুক্ত পাত্রী চাই, পাত্রের দুটি বাড়ি তিনটে গাড়ি দুটি কুকুর প্রচুর বিষয় সম্পত্তি দাবী শুধু একটাই, পাত্রীকে রুপে লক্ষ্মী গুনে সরস্বতী হতে হবে। বিজ্ঞাপনের চটকে প্রায় তিনশো চিঠি ধেয়ে এলো যার মধ্যে বাছাই করাই মুশকিল! বিশুর মায়ের তো দেখে দেখে মাথায় হাত পরার যোগাড়। হ্যাকাচ্চি সব মেয়েদের বাপগুলো কিরকম নির্লজ্জের মতো মিথ্যের ফুলঝুরি ছোটায়! এইসব আম-বেগুনের মতো বেলে মুখপানার দল নাকি পরমা সুন্দরী! যত্তসব! অনেক ঝাড়াই বাছাইয়ের পরে অবশেষে পাঁচটা পাত্রীর ছবি মনে ধরল। শুরুতেই বিরাট ধাক্কা! অতি আধুনিকা বজ্জাত মেয়েটি জানিয়ে দিল এরকম নাদুস নুদুস স্বামী নিয়ে রাস্তায় বের হতে তার লজ্জা করবে। পরের তিনটে পাত্রী অবশ্য তেমন কিছু না বললেও কথাবার্তা একটু এগিয়েই হোঁচট খেতে শুরু করল, সেনদের বিষয়আশয়ও বিশেষ কাজে এল না। পাঁচ নম্বর পাত্রীটি পরমা সুন্দরী হলেও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারভুক্ত। মেয়ের বাবা তো বোকার মতো এমন সুযোগ ছাড়তে পারেন না। জ্যৈষ্ঠ মাসের একটা গোধূলি লগ্নে শুভদৃষ্টি সুসম্পন্ন হয়ে গেল।
নতুন বউ অদিতির রুপের বাহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান্নার হাতটিও খাসা। সেন বাড়ির সবাই অচিড়ে বৌমার গুণমুগ্ধ হয়ে পড়ল। সমস্যায় পড়ল শুধু একজন। সে লোক আর কেউ নয়, স্বয়ং বিশু নিজেই। রূপসী বউ পেয়ে সে যে আহ্লাদে আটখান্ হয়ে থাকবে সেটা সম্ভব হল না, চারপাশের লোকজনের টিপ্পনি কটু কাটব্য শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হবার যোগাড় হয়ে এলো। চিরদিনের ভোজনরসিক বিশুর মধ্যপ্রদেশ কখন যে আয়ত্তের বাইরে চলে গিয়েছে সেটা নিয়ে ফালতু মাথা ঘামানোর প্রয়োজন এতদিন বোধ না হলেও এখন এর নেগেটিভ দিকটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। গায়ের রঙটাও তার একটু চাঁপা তবে সেটা বেশিরভাগ বঙ্গযুবকদের চেয়ে এমন কি আর নিকৃষ্ট! তবে এতসব কিছু ছাপিয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হল মাথাজোড়া মসৃণ টাকটা। পৈতৃক সম্পত্তির সাথে সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে এটাও একটা বাড়তি পাওনা।
বিয়ের মণ্ডপেই বিশুর আক্কেল গুম হয়ে গেছিল, কোত্থেকে একটা কেলেকুজো বুড়ি হাজির হয়ে কান্নাকাটি করে মেজাজটাই নষ্ট করে দিয়েছিল। বুড়ির সেকি আস্পর্ধা তার সামনে দাঁড়িয়ে কিনা বলে -ওরে নিতাই পয়সার লোভে তুই মেয়েটাকে জলে ফেলে দিলি বাবা, শেষে এই মেয়ের এই বর! বলি এর থেকে যে বাঁদরও ভালো ছিল বাপু।
-'বাঁদর' মানুষের এই পুর্বপুরুষটির সঙ্গে নিজের অসংখ্য তুলনা শুনে বিশু চিড়িয়াখানায় গিয়ে মিলিয়ে এসেছে, নাঃ লোকে বাজে কথা বলছে, বরঞ্চ এই জন্তুটার সঙ্গে অফিসের বস গুপ্তসাহেবের মুখশ্রীর বিশেষ মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অথচ এই গুপ্তসাহেবই কিনা বউভাতে একগলা খেয়ে ঢেঁকুর তুলে যাবার সময় বলে গেলেন -কংগ্রাচুলেশনস্ সেন ইউ আর অ্যা লাকি ম্যান, এ যেন সেই বাঁদরের গলায় মুক্তামালা!
সহকর্মি সঞ্জয়কে মনের দুঃখ খুলে বলতে সে মুচকি হেসে সিগারেটে টান দিয়ে বলল -ব্যাপারটা কি জানিস এতদিনে তোর চেহারা নিয়ে কারো কোন অবজেকশান ছিল না কিন্তু তোদের এই বেআক্কেলে কম্বিনেশনটা লোকের চোখে খটকাচ্চে, তার থেকে তুই জিমে গিয়ে আগে ভুঁড়িটার একটা ব্যাবস্থা কর, গায়ের রঙ আর ফেস কাটিংটা বাদ দে, ও দুটোর কিছু করা যাবে না তবে টাকেরও তো শুনছি আজকাল নানারকম উপায় বেরিয়েছে।
বহুত আচ্ছা বিশু জিমেই যাবে আর টাকেরও শেষ দেখে ছাড়বে।
জিমে গিয়ে অবশ্য বিশেষ সুবিধে হল না। একমাস ধরে নানাধরনের কসরৎ প্যাঁচ পয়জার করে গলার দুপাশের শিরাগুলো বিশ্রী ভাবে ফুলে ওঠা ছাড়া তেমন কিছুই লাভ হল না। সঞ্জয় বলল -ট্রেনারটা ফালতু ছিল ঠিকমতো ট্রেনিং দিলে এই দশা হয়? টাক নিয়েও হাজার বিড়ম্বনা! একজন একরকম কথা বলে তো অন্যজন অন্যরকম। হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট না সায়েন্টিফিকালি টেস্টেড হেয়ার থেরাপী? বিশুর মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করল, অবশেষে সে একটা কড়া সিদ্ধান্ত নিল ফালতু লোকের কথায় কান দিয়ে আর মনের শান্তি নষ্ট করবে না। যা ভাবা সে কাজ!
কয়েকটা দিন বেশ কেটে গেল। অদিতির হাতে রান্না করা মোগলাই পরোটা আর কষা মাংসের স্বাদ যে একবার চেখেছে তার জীবন ধন্য। বিশু আজকাল প্রতিরাতে এই দিয়েই ডিনার সারছে। দেখতে দেখতে দেহের ওজন কয়েক কিলো আরও বেড়ে গেল, সে বাড়ুক! পুরুষ মানুষকে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকতে হয় বিশু এতদিনে সেটা বেশ বুঝে গেছে।
আজ অদিতির জন্মদিন। বিশু ঠিক করল বউকে সারপ্রাইজ দেবে, প্ল্যানমাফিক দামি উপহার কিনে পিছনের দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকল, এখন চুপি চুপি গয়নার বাক্সটা বিছানার উপর রাখলেই হল, অদিতি যখন এটা দেখবে তখন তার কিরকম চমক লাগবে ভাবতেই বিশুর দারুন আনন্দ হল। পা টিপে বিশু শোবার ঘরে ঢুকে বাক্সটা বিছানার ঠিক মাঝখানে সাজিয়ে রাখল, কেউ টেরও পেল না। সেন গিন্নী রোজ এইসময় কীর্তনের আসরে যান, আজো তার ব্যাতিক্রম ঘটে নি। অদিতি পাশের বাড়ির মেয়ে টুসির সঙ্গে বসবার ঘরে গল্পগুজব করতে ব্যাস্ত, বিশু অধীর অপেক্ষা করতে লাগল কখন যে টুসি বিদায় নেবে। বসবার ঘর থেকে শোবার ঘরের দূরত্ব বেশি নয়। বিশু শুনতে পেল টুসি বলছে -জানো তো বৌদি বাবা আমার একটা সম্বন্দ দেখেছেন, পাত্র পক্ষের না চালকলের দারুন ব্যাবসা আর অঢেল সম্পত্তি, তবে ছেলেটা নাকি দারুন কালো একটু বেঁটে আর প্রচুর মোটা এই যা।
অদিতির স্বর শোনা গেল -দেখিস তাই বলে আবার কোন শিম্পাঞ্জীর গলায় মালা দিস নে যেন।
টুসি -কি যে বল বৌদি, তেমন হলে আমি বেঁকে বসব না।
অদিতির দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল -আমিও যদি তাই পারতাম।
টুসি প্রসঙ্গ পাল্টাল -জানো বৌদি ছোট কাকা না অফিসের কাজে মুম্বাই গেছে, গেলবারে আমার জন্য একটা ক্রীম নিয়ে এসেছিল যেটা গায়ে মাখলে না চামড়ায় এমন জেল্লা ছাড়ে যে কি বলব, এবারে দুটো আনতে বলেছি আরেকটা তোমার জন্য।
অদিতি -ওরে বাবা! আর গ্লেস চাই না রে, এরপর তো তোদের দাদার পাশে রাস্তায় আর হাঁটাই যাবে না!
টুসি -সত্যি বৌদি দাদাকে তোমার পাশে একদম মানায় না।
আবার অদিতির দীর্ঘনিশ্বাস শোনা গেল।
কয়েক দিন হল বিশু গুম মেরে আছে তো আছেই, শেষে সঞ্জয় চেপে ধরতে মনের দুঃখটা উজার করে দিল। সব শুনেটুনে সঞ্জয় বলল -সিরিয়াস ব্যাপার, প্রবলেম হল মেয়েরা বিয়েটা কিন্তু করে ওই গাড়ি বাড়ি টাকাকে তারপর যখন সেসব কিছু পাওয়া হয়ে যায় তখন নজর পরে পাত্রটির দিকে আর তখুনি খুঁতগুলো দেখতে দেখতে চোখ মটকায়!
বিশু হতাশ ভাবে বলল -সে নাহয় হল, কিন্তু এখন কি করা যায় বল তো? এইভাবে
বৌয়ের চোখে ছোট হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বিয়ে না হওয়াটাই বোধহয় ভালো ছিল।
সঞ্জয় একটু চিন্তা করে বলল -বিকেল পাঁচটায় ত্যাগরাজ হলে বিকাশ চোপড়ার স্পিরিচুয়াল সেমিনার আছে, আমার কাছে দুটো ইনভিটেশান কার্ড রয়েছে, চল একবার গিয়ে দেখা যাক, হয়ত কোন সল্যুশান বেরিয়ে আসবে।
-এই বিকাশ চোপড়াটা কে?
সঞ্জয় চোখ কপালে তুলল -সেকি তুই ওনার নাম শুনিস নি? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে চিনের চেয়ারম্যান সবাই কোন না কোন সময়ে ওনার কাছে উপকৃত। কুড়ি বছর পরে দেশে ফিরেছেন লন্ডন থেকে, কলকাতায় এসেছেন শুধু দুদিনের জন্য, কতো লোকের কঠিন সব সমস্যার সমাধান যে উনি করেছেন একবার গিয়েই দ্যাখ না।
বিকেল পাঁচটায় অনেক আশা নিয়ে বিশু সঞ্জয়ের সঙ্গে ত্যাগরাজ হলে হাজির হল। প্রেক্ষাগৃহের সামনে তখন হাউসফুল বোর্ড ঝুলছে। বিশুদের বসার জায়গা মোটামুটি সামনের দিকেই হয়েছে। কোন আসনই খালি নেই, এতে চোপরা সাহেবের জনপ্রিয়তার আন্দাজ করা যায়। সুসজ্জিত এবং সুবেশিত ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলাগণ আসন দখল করে বসে রয়েছেন, চারপাশে বিভিন্ন প্রকার সেন্ট পারফিউম আঁতরের গন্ধে বিশুর গা কেমন গুলিয়ে উঠল। এদিকে অনুষ্ঠান শুরু হবার সময় বিকেল পাঁচটায় কিন্তু চোপড়ার তো দেখা নেই। মঞ্চে বসে একজন স্থূলাকার ব্যাক্তি সেতার বাজিয়ে চলেছে। বিশু এই সুযোগে সঞ্জয়কে জিগ্যেস করল ইনি কি বাবাজী গোছের কিছু নাকি? সঞ্জয় বিরক্ত হয়ে বলল -ওই বাবাজী কনসেপ্টটা মধ্যবিত্ত আর লেবার ক্লাসের জন্য, এলিট ক্লাসের জন্য হল গিয়ে স্পিরিচুয়াল হিলিং স্পেশালিষ্ট যারা কসমিক ভাইব্রেশান থেকে হাইপার এনার্জী ডাউনলোড করে হিউম্যান ওয়েলফেয়ারে ভাইটাল কন্ট্রিবিউশান করে থাকেন। বিশু অবাক কণ্ঠে বলল -ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে, একটু বুঝিয়ে বলবি। সঞ্জয় মুখ খোলার আগেই সেতারের ঝংকার স্তব্ধ হল, পেটমোটা লোকটা সেতার বগলদাবা করে মঞ্চ থেকে হাঁটা লাগিয়েছে। সঞ্জয়ের চোখেমুখে উত্তেজনার আভাষ-ওই মিঃ চোপড়া এলেন বলে।
আর তখুনি মঞ্চে প্রবেশ করলেন প্রায় ছফুট লম্বা সাদা স্যুট পরিহিত সৌম্য চেহারার একজন ভদ্রলোক, লোকটিকে দেখতে সাহেবদের মতো, নাম জানা না থাকলে বিশু একে ভারতীয় বলে ভাবতেই পারত না। প্রেক্ষাগৃহের সবাই ততক্ষণে উঠে দাড়িয়েছে। চোপড়া হাত তুলে অভিবাদন গ্রহন করে নিখুঁত ইংরেজিতে ভাষণ শুরু করলেন, 'আলো শব্দ জগত সবই ভ্রম, সত্য শুধু তুমি নিজে' তারপর হঠাৎ প্রথম সারীতে বসে থাকা একজন সাদা শার্ট খাকি প্যান্ট পরিহিত ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বললেন - ইউ স্যার, ধরে নেওয়া যাক লাইফ তোমাকে রসগোল্লা আর সন্দেশ না দিয়ে একটা টক পাতিলেবু উপহার দিয়েছে এবার তাহলে তুমি কি করবে? সাদা শার্ট বিগলিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চোপড়াকে নমস্কার করে বললেন -থ্যাংক ইউ সাবজি ফর দিস অপরচুনিটি। ভদ্রলোক এবার উপস্থিত দর্শকদের দিকে ফিরে বললেন -মাই নেম ইজ ব্রিজকিশোর, আর্মেনিয়ান ষ্ট্রীটে হামার প্লাস্টিক বালটির বেওসা আছে, এখানে কারো যদি কুনো বালটি কি মগ্ চাই হামাকে কন্ট্যাক্ট করলে বহুত সস্তায় দিয়ে দেব। বাল্ক অর্ডারে বঢ়িয়া ডিস্কাউন্টের গ্যারান্টি ভি আছে, ঔর সবসে ইম্পর্ট্যান্ট বাত এই আছে কি এটা হামাদের তিন পুরুষের বেওসা, কোনরকম চুরি-চামারি, চিটিংবাজি হবার বিলকুল চান্স নেই। ব্রিজকিশোর আবার চোপড়ার দিকে ফিরে বললেন -ওই যে কি বললেন না স্যার, টক লেবু, হামি ওটা লিয়ে ভগওয়ানজীকি চরণে রেখে বহুত কেঁদে বলব হে প্রভু নেক্সট টাইম আমাকে জরুর সন্দেশ রসগুল্লা দেবেন তাহলে আই প্রমিস হাফ রসগুল্লা হামি আপনাকে ভি দেবে, পুরা মাল কখনই একা হজম করবে না' বিকাশ চোপড়ার অবস্থা দেখে মনে হল তিনি যেন মাথার চুল ছিঁড়বেন, চিৎকার করে বললেন –রাবিশ, টোটাল রং কনসেপ্ট! দেয়ার ইস্ নো গড্ নো হেভেন্ অনলি ইউ, ইফ ইউ হ্যাভ এ লেমোন মেক ইট অ্যা লেমোনেড্। বিশু একথায় চমৎকৃত হল, তাইত! এতদিন তো এভাবে ভাবা হয়নি, জীবন তোমাকে একটা পাতিলেবু দিলে তার থেকে রস বানিয়ে পান করো। চোপড়া দীর্ঘ সময় ধরে বৃক্ততা করলেন তবে বিশুর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে লেবু আর তার রস্ চমৎকার! একসময় ভাষণ শেষ হল। বিশু ছুট লাগাল চোপড়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেখানে আর এক বিপত্তি। ভিড়ের ঠেলায় হুমড়ি খেয়ে খোদ চোপড়ার গায়ের উপর ধরমরিয়ে পড়তেই, দেহরক্ষী চোখ গরম করে বলল -খবর্দার চোপড়া সাহেবের ধারে কাছে ঘেঁষবেন না, দূরে সরে যান বলছি। বিশু থতমত খেয়ে বলল -মানে আমি ওনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছিলাম। দেহরক্ষী জানাল তাজ বেঙ্গল হোটেলে আগামীকাল দুপুর দুটোয় আধঘন্টার সময় পাওয়া যেতে পারে, দক্ষিণা পাঁচ হাজার।
পাঁচ হাজার টাকার টিকিট কেটে বিশু চোপড়ার সঙ্গে দেখা করে এলো। প্রথমে চোপড়া সব শুনে একচোট হাসলেন। জিমে আর বিউটি পার্লারে যাবার পরামর্শ দিলেন কিন্তু বিশুকে গো ধরে থাকতে দেখে অবশেষে নিমরাজি হয়ে বললেন -দেখো সেন কসমিক ভাইব্রেশান থেকে সুপারন্যাচারাল এনার্জি ডাউনলোড করা মুখের কথা নয়, তোমাকে ডিটারমাইন্ড দেখে বলছি, তবে মনে রাখবে এভরি সাকসেস হ্যাজ অ্যা প্রাইস্।
বিশু বলল -আজ্ঞে আমি মুল্য চুকাব।
চোপড়া স্মিতহাস্য করে জিগ্যেস করলেন -তোমার জীবনের সব থেকে প্রিয় বস্তুটির নাম বল?
বিশু একটু ইতস্তত করে বলল -আজ্ঞে মোগলাই পরোটা আর খাসীর কষা মাংস একটু বেশি ঝাল দিয়ে।
চোপড়া গম্ভির মুখে বললেন -হু বুঝেছি! আজ থেকে যতদিন পর্যন্ত না কার্যে সিদ্ধি লাভ হচ্ছে ততদিন এর কথা মনেও আনবে না খাওয়া তো দুরস্থান।
বিশু দোনোমনো করে বলল -আর কখনই কি খাওয়া যাবে না।
চোপড়া হেসে বললেন -না হে যেদিন কার্যোদ্ধার হবে সেদিন থেকে আর কোন বাঁধা থাকবে না। যাইহোক পতঞ্জলির যোগসূত্র থেকে সর্বসিদ্ধি মন্ত্রটা তোমায় দিচ্ছি আজ থেকে আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত দিনে দশ হাজার বার জপ করবে, আমিষ আহার পরিত্যাগ করতে হবে, শীত অথবা গ্রীষ্ম প্রত্যহ ভোর চারটেয় ঠাণ্ডা জলে স্নান সারতে হবে, কি পারবে?
বিশু দৃঢ়স্বরে বলল -নিশ্চয়ই পারব।
-বেশ তবে আজ থেকেই লেগে যাও, লেট দেয়ার বি লাইট ইন ইওর লাইফ।
প্রথমেই বিশু নিজের শোবার ঘর আলাদা করে নিল। সেনবাবু আর সেন গিন্নী হা হা করে ছুটে এলেন -তোর মাথা খারাপ হল নাকি! কোন এক ভন্ডের পাল্লায় পরে কিসব শুরু করেছিস। বিশু কড়া গলায় জানিয়ে দিল কাজের চাপ অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছে তাই কিছুদিন একা থাকা তার বিশেষ প্রয়োজন। অদিতির অনুরোধ উপরোধ অভিমান কিছুই তার সংকল্পে বাঁধা হতে পারল না।
দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর কেটে গেছে, বিশ্বনাথ সেন ওরফে বিশুর জীবনে এর মধ্যে অনেক গুলো নতুন ঘটনা ঘটেছে। সেনবাড়ি আজকাল নতুন এক অতিথির আগমনে সর্বক্ষণ গমগম করছে। বিশু অদিতির আদরের ছোট্ট মিনুর দস্যিপানায় বাড়ির সবাই তঠস্থ, কখন যে সে কি করে বসে সেই ভয়ে সেনকত্তা থেকে চাকর রামু সবাই অস্থির। অদিতির হয়েছে মুশকিল একরত্তি মেয়েটাকে একটা ধমক অবধি দেওয়া যাবে না তাহলে সেনবাবু আর সেনগিন্নী মিলে বাড়ি মাথায় করতে কিছু বাকি রাখবেন না। ওদিকে নিজের কত্তাটিকে যে এই বিষয়ে কিছু বলবেন সে গুঁড়ে বালি! বিশু আজকাল তার স্ত্রীর সঙ্গে প্রয়োজনের বাইরে বাক্যালাপ করা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছে। স্বামীর এই শীতল উপেক্ষা অদিতির বুকে যেন ইদানীং কাঁটার মতো ফুটছে।
কিছুদিন যাবত বিশু চাকড়ি ছেড়ে বন্ধু সঞ্জয়ের সঙ্গে পার্টনারশীপে নিজেদের কাজ শুরু করেছে। ডালহৌসী পাড়ায় তাদের অফিস 'মিত্র অ্যান্ড সেন অডিটরস্' কাজের সূত্রে ইতিমধ্যে একবার বিদেশভ্রমণ অবধি হয়ে গেছে। বিশুর চেহারাতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া, আয়নার সামনে দাড়ালে নিজেকে কেমন অচেনা বোধ হয়, কোথায় সেই বুকের নিচে থেকে নেমে আসা তিন কিলো ওজনের ভুড়ি আর কোথায় সেই থলথলে মেদবহুল শরীর। গত পাঁচবছরের কঠোর সংযমে বাড়তি সবটুকু মেদ ঝরে গিয়ে বিশু এখন একজন চোস্ত অ্যাথলেটের মতোই চনমনে ফিট। অফিসে যাওয়ার পথে ডেকার্স্ লেনে মোগলাই কাটলেট ভাজার গন্ধে মন যখন আনচান করে ওঠে তখন বিশু হনহন করে হাঁটা লাগায়, ওদিকে তাকালে সংযমহানীর সমূহ আশংকা।
কঠোর তপস্যার আজ পাঁচ বছর পুর্ন হতে চলেছে। প্রতিদিনের মতোই ভোর চারটেয় উঠে ঠান্ডা জলে স্নান সেরে বিশু নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। মন আজ কেমন যেন উতলা হয়ে রয়েছে। কি হবে আজ? আজকের দিনে যদি চোপড়া সাহেব বেঁচে থাকতেন তাহলে একটু সাহস পাওয়া যেত, ফাইলে রাখা দুবছর আগের একটা সংবাদপত্রের কাটিং খানিক নেড়েচেড়ে বিষণ্ণ মনে রেখে দিল। চোপড়ার মৃত্যুসংবাদ। বিশু আজ অফিসে যাবে না সারাদিন এই ঘরে বসে চোপড়ার শেখানো পদ্ধতিতে মন্ত্রের জপ করে যাবে, বাড়িতে সে আগেভাগে বলেই রেখেছে, কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে। ধীরে ধীরে বিশু নিজের মধ্যে ডুবে গেল। গত পাঁচবছরে যা কখনো হয় নি আজ তাই ঘটল। বিশু সম্পুর্ন রুপে ধ্যানের রাজ্যের গভীরে প্রবেশ করল। কতক্ষণ এই অবস্থা ছিল কোন হুঁশ ছিল না হঠাৎ অন্ধকার ঘরে অপার্থিব আলোর ঝলকানি আর তার আড়াল থেকে যেন অন্য জগত থেকে ভেসে আসা গম্ভির অথচ মিষ্ট কণ্ঠস্বরে কেউ বলে উঠল -তোমার প্রচেষ্টা সফল হল, যে বাসনা নিয়ে তুমি এই কঠিন ব্রতে লিপ্ত হয়েছিলে তা ফলপ্রদ হতে চলেছে, আগামীকাল প্রাতঃকালে ভিনদেশী কোন মানব তোমার সাক্ষাতপ্রার্থি হবে। অকস্মাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকাশ চোপড়ার হাস্যমুখ। বিশু স্পষ্ট শুনতে পেল চোপড়া উদ্দাক্ত কণ্ঠে বললেন -মাই সন্ লেট দেয়ার বি লাইট ইন ইওর লাইফ।
সেই রাতটা বিশুর একপ্রকার জেগেই কাটল। ঘুমের আশা ত্যাগ করে বারান্দায় পায়চারী করে বাকি রাতটুকু পার করল। পূবের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে অভ্যাসবশত গায়ে ট্র্যাকস্যূট চাপিয়ে প্রাতঃভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল। বেরোবার আগে অবশ্য রামুকে বলে গেল কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে এলে যেন বসিয়ে রাখা হয়। রামু গজগজ করতে করতে বলল -এই সাত সকালে আবার কে দেখা করতে আসবে বাপু!
ঘন্টাখানেক পার্কে ঘুরে বিশু বাড়ির রাস্তা ধরল। এখনো সাতটা বাজেনি, বিদেশী লোকটা আসা না পর্যন্ত সে আর বেরোচ্ছে না। সবে মাত্র সদর দরজায় লোহার গেটটায় হাত দিয়েছে বাজখাই কণ্ঠের আহ্বান কানে এলো -বাবুজী। বিশু চমকে ফিরে দেখল দশাশই চেহারার একটা কাবুলিওয়ালা যেন মাটি ফুড়ে তার পিছনে এসে দাড়িয়েছে। লোকটার গায়ে কুর্তা পাঞ্জাবী মাথায় সাদা পাগড়ি দুগালের পাশ দিয়ে ঘন কালো দাড়ি। লোকটা নমস্কারের ভঙ্গি করে ভাঙা হিন্দিতে বলল -নমস্তে বাবুজি আমার নাম দিলাওয়ার খাঁ, আমি কাবুল থেকে আসছি, আমার কাছে স্পেশাল একটা জিনিস আছে, আপনার জন্যে এনেছি। বিশু মনে মনে হেসে অযথা প্রশ্নে সময় নষ্ট না করে লোকটিকে সোজা নিজের ঘরে নিয়ে এলো। ভাগ্যিস এতো সকালে সেনবাবুর ওঠার অভ্যাস নেই নাহলে এতক্ষণে এইরকম কাউকে বাড়ির ভিতর দেখলে হয়ত একটা হৈচৈ বাধিয়ে বসতেন। অদিতি বাথরুমের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল আগুন্তুককে দেখে হকচকিয়ে গিয়ে বিশুর দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টে চাইল। বিশু ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে স্ত্রীর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলাওয়ারকে বসতে বলল।
দিলাওয়ার তার ঝোলা থেকে একটা শিশি বের করে বিশুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল -বাবুজি এ খাঁটি আফগানী তেল আছে মাথায় মাখলে চুল গজাবে আর লাইফে কখনো কোন রোগ অসুখও আপনার করবে না। দাম মাত্র দশ টাকা। বিশু শিশির ঢাকনাটা খুলে একটু শুঁকে বলল-এ তো সর্ষের তেলের মতো লাগছে।
-হা লেকিন এ অন্য জিনিস। রাতে খাওয়ার পর তেল মাথায় মেখে শোবেন সকালে উঠে দেখবেন, মাথাভর্তি চুল। বিশু দশটা টাকা হাতে দিতেই দিলাওয়ার উঠে দাড়াল -চলি বাবুজি আমাকে বহুত দুর যেতে হবে। লোকটাকে বিদায় করে বিশু তেলের শিশিটা নিয়ে পড়ল। একবার মনে হল এটাকে সঙ্গে রেখে দিলে কেমন হয় পরমুহুর্তেই আবার পরিকল্পনাটা বাতিল করতে হল। কাঁচের শিশি বলে কথা! রাস্তায় ঘাটে যদি ভেঙে যায়, নাঃ এর থেকে এটা বাড়িতে থাকাই ভালো। বিশু শিশিটাকে যত্ন করে ড্রয়ার বন্দী করে ঘরের দরজা বন্ধ করল। তার এই ঘরে সাধারণত কেউ আসে না, সুতরাং তেল যে নিরাপদেই থাকবে বিশু নিশ্চিত। ঘর থেকে বেরোতেই অদিতির মুখোমুখি হয়ে পরল।
-লোকটা কেন এসেছিল
-তেল বেচতে
অদিতি ভ্রু তুলে বলল -তেল বেচতে! কিসের তেল? রান্নার!
-হু, বিশু সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
ব্রেকফাস্টে প্রতিদিনের মতো চিড়ে দই কলা দেখে বিশুর মেজাজ খিচড়ে গেল। গলা উঁচিয়ে হাঁক দিল -শুনছ!
অদিতি মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করছিল, স্বামীর ডাকে এগিয়ে এলো -কি হয়েছে?
বিশু তিতকুটে মুখে বলল –এসব আর খেতে ইচ্ছে করছে না। আজ রাতে মোগলাই পরোটার সাথে খাসীর মাংস কষা করবে একটু বেশী ঝাল দিয়ে, রামুদাকে বাজারে পাঠিয়ে জিনিস সব আনিয়ে নাও।
অদিতি চোখ কপালে তুলে বলল -তুমি তো ওসব খাওয়া ছেড়েই দিয়েছ, হঠাৎ কি হল?
বিশু অপ্রয়োজনীয় কথার উত্তর না দিয়ে দই চিড়েতে মন দিল।
বিকেলে বিশুর ফোন আসার পর থেকেই অদিতি তাড়াহুড়ো শুরু করে দিল, কে জানে বাবা অফিস থেকে এসে যদি মুখের সামনে মাংস পরোটা দেখতে না পায় কি মুর্তি যে ধরবে, যা মেজাজ হয়েছে আজকাল! মাংসটা দীর্ঘসময় ধরে কষিয়ে কষিয়ে হাতে ব্যাথা ধরে গেল এখনো মোগলাই পরোটার পুরো কাজটাই বাকি আছে, এমন সময় মিনু এসে আব্দার জুড়ল পাশের বাড়ির টুম্পা আইসক্রিম কিনছে তারও একটা চাই। অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল -যা ঠাম্মীকে গিয়ে বল, কথাটা বলেই খেয়াল হল সেনবাবু আর সেনগিন্নী আজ বিকেলে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়ি গেছেন, অদিতি মিনুকে আলতো করে ধমক লাগাল -যা এখন বিরক্ত করিস না, যদিও মিনু তার দাবী পরিত্যাগ করার বিন্দুমাত্র লক্ষণ দেখাল না। হঠাৎ জানালার একেবারে কাছে থেকে আইস্ক্রীমওয়ালার ডাক কানে আসতেই মিনু চঞ্চল হয়ে রান্নার টেবিলের উপর লাফ দিয়ে উঠে দাড়াল, আর তখুনি তার পায়ের ঠেলায় বাসনপত্র সব ছত্রাকার হয়ে পড়ল। অদিতি হায় হায় করে উঠল, নতুন আনা তেলের ডিবেটা উল্টে গড়াগড়ি খাচ্ছে তার ভিতর হতে সবটুকু তেল টেবিলে আর মেঝেয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে সে এক বিচ্ছিরি কান্ড! দারুন রোষে মিনুর পিঠে একটা চাপড় মারতে এগিয়ে যেতেই ক্ষুদে শয়তান পড়িমড়ি করে ছুট লাগিয়ে নাগালের বাইরে চলে গেল।
অদিতি একরাশ চিন্তা নিয়ে বসে পড়ল। পাড়ার মুদিখানাটা কি কারনে যেন আজকে বন্ধ ওদিকে রামুও গেছে সেনবাবুর সঙ্গে, নাহলে তাকে বাজারে পাঠানো যেত। হঠাৎ অদিতির মনে আশার আলো জেগে উঠল -তাইত! উনি সকালে খানিকটা রান্নার তেল কিনেছিলেন না, সেটা বোধহয় ও ঘরেই রয়েছে, রোসো এখন ওই তেলেই কাজ চলুক পরে রামু এলে তেল আনিয়ে শিশিটাতে ভরে দিলেই হবে, কত্তা কিছুই টের পাবেন না। চিন্তা কার্যে পরিণত হতে বেশি দেরি হল না। আফগানী তেল কড়াইতে ঢেলে বেশ জুত করেই অদিতি পরোটা ভাজল।
অনেকদিন পরে প্রাণভরে মোগলাই সহযোগে কষা মাংস খেয়ে বিশু তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নিজের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কাল রাতেও ঘুম হয়নি এবার শুতে পারলে বাঁচে। ঘরে খিল এটে বিশু তেলের শিশিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল, বুকের ভিতরটা যেন অকারনেই ধুকপুক করতে শুরু করেছে। শিশির ঢাকনা খুলে এবার পুরো তেলটা মাথায় ঢেলে ভালোমতো রগড়ে বিশু আলো নিভিয়ে দিল। কাল সকালে ফলাফল দেখা যাবে!
সকাল পাঁচটায় ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজতে বিছানায় শুয়েই বিশু অনেকটা আশা আর কিছুটা আশংকা নিয়ে মাথায় হাত বুলাল। তেল চপচপে মসৃণ টাকে হাতটা পিছলে যেতেই বিশু লাফিয়ে উঠল। আয়নার সামনে এসে দাঁড়াতে ভিমরি খাবার যোগাড় হল। এতবছরের পুরনো টাক আগের মতোই সগৌরবে অবস্থান করছে, বিশুর মনে হল মাথার ওপর টাকটা যেন তাকে ভেংচি কেটে হাসছে। তাহলে কি সব মিথ্যে চিটিংবাজি! ধুর্ত! অমানুষ! বিশু শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ল। ধপাস্ করে চেয়ারে বসে পড়তেই এবারে নজর পড়ল নিজের পেটের দিকে। একি! কিমাশ্চর্যম! বিশু তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। বুকের নিচে থেকে পেট ভর্তি ঘন কালো চুলে ভর্তি হয়ে গেছে। হতবাক বিশু পেট ধরে উন্মাদের মতো চিৎকার ছাড়ল -হায় হায় আমার একি হল? বাচাও বাচাও। আর তখুনি বোধহয় জ্ঞ্যানও হারিয়ে ফেলল।
জ্ঞ্যান ফিরতে বিশু দেখল বাড়ির সবাই তাকে উদ্বিগ্ন মুখে ঘিরে রয়েছে। পেটের উপর চুলের গোছটার আরও বৃদ্ধি ঘটেছে। ওটা এখন ঢাল বেয়ে কোমর ছাড়িয়ে হাঁটুর কাছে নামতে চাইছে। বিশু সেদিকে চেয়ে ডুকড়ে কেঁদে উঠল -আমি কি দোষ করলাম আমাকে বলে দাও? সেনবাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন -এসব আবার কোথা থেকে উদয় হল? অদিতি তারিফের দৃষ্টে চেয়ে বলল -উফ কি দারুন ঘন আর রেশমের মতো মোলায়েম, এই চুল যদি আমার মাথায় গজাত! বিশু আবার বুকফাটা বিলাপ করে উঠল। একটু ধাতস্থ হতে বলল -পাঁচ বছর তপস্যার পর পরশু রাতে সিদ্ধি লাভ হল যার ফলে কাল ওই আফগানী তেলটা পেলাম কিন্তু চুলটা মাথায় না গজিয়ে কেন যে পেটে হল জানি না। সবার চোখ বিশুর দিকেই আবদ্ধ ছিল কিন্তু কেউ যদি তখন অদিতির দিকে চাইত দেখত তার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মিনু এতক্ষণ সবকিছু মন দিয়ে দেখছিল শুনছিল, বেশীক্ষণ চুপ করে থাকা তার স্বভাব বিরুদ্ধ। সুযোগ পেয়ে সে বলে উঠল -বাবার কেন এমন হয়েছে আমি জানি। অদিতি একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে মিনুর হাত ধরে টান দিল -বাঁদর মেয়ে কোথাকার! সবসময় বড়দের মধ্যে কথা বলা চলো পড়তে বসবে বলছি। সেনগিন্নী ঝাঁজিয়ে উঠলেন -শুধু শুধু মেয়েটাকে বকছ কেন বৌমা? মিনু একছুটে ঠাকুমার কাছে সেঁধিয়ে বলল -বা-রে আমি যে দেখলাম সেদিন তুমি বাবার ঘর থেকে তেল এনে রান্না করলে। মিনুর কথা কানে যেতেই বিশুর পেটের চুলগুলো সব একসাথে খাড়া হবার উপক্রম হল। ঝানু গোয়েন্দার মতো কায়দা করে মিনুকে কাছে ডেকে জিগ্যেস করল -মামনি সেদিন ঠিক কি হয়েছিল বল তো? মিনু সোৎসাহে বলতে লাগল -সেদিন না সব তেল পরে গেল তারপর মা তোমার তেল দিয়ে রান্না করল, পরে রামুদা নতুন একটা প্যাকেট নিয়ে আসতেই ওই বোতলে ঢেলে দিল। বিশু এতক্ষণে সব বুঝেছে আর সাথে সাথে তার রক্তচাপও তড়াক করে মাথায় চেপে বসেছে। বিশু বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বসতেই অদিতি ঘাবড়ে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করল -মোটেও আমার দোষ নয়।
বিশু ঘরঘরে স্বরে বলল -ইরেসপনসিবল শয়তানি!
-তুমিই তো বলেছিলে তেলটা রান্নার! যঃ পলয়তি সঃ জীবতি, বিশুকে উন্মত্তের মতো ছুটে আসতে দেখে অদিতি -ক্ষেপে গেছে রে, বলে দুদ্দাড় ছুট লাগিয়েছে, কোনোক্রমে দৌড়ে শোবার ঘরে ঢুকেই অদিতি দরজায় খিল এঁটে দিল। বিশু দুর্দান্ত বেগে ছুটেও তার অর্ধাঙ্গিনিকে কব্জা করতে না পেরে দারুণ আক্রোশে দরজায় দমাদ্দম কিল মারতে লাগল। সেনবাবু হাহা করে ছুটে এলেন -তুই কি শেষে পাগল হলি নাকি? বৌমার গায়ে হাত তুলতে চাস। সেনবাবু আরও কিছু বলতেন কিন্তু ছেলের রুদ্রমুর্তি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে মানে মানে সরে পড়লেন। নিদারুন হতাশায় বিশু মেঝের উপর বসে পড়ল। পাঁচ বছরের অমানুষিক প্রচেষ্টা শেষে এইভাবে জলে গেল।
গত দুদিন হল বিশু খাওয়া দাওয়া একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছে, অফিসে যাওয়ার তো প্রশ্নই নেই। সকাল হলে নাপিত এসে পেটটা মসৃণ করে কামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু রাত নামার আগেই ফের গোছা গোছা চুলের রাশি পেট ভেদ করে বেড়ে চলেছে তো চলেছেই। বিশু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মাংস পরোটা খাবার লোভটা যদি সংযত করতে পারত তাহলে হয়ত জীবনটা আজ অন্যরকম হত। মাঝখানে সঞ্জয় এসে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল -যদি বলিস তাহলে প্রেসে একটা খবর দিয়ে দিই, রাতারাতি ফেমাস হয়ে যাবি। বিশু রেগে চিৎকার করে উঠল -সঞ্জয় যদি বাড়ির বাইরে এই খবরটা গেছে তাহলে কিন্তু তোর মুখ আর দেখব না বলে দিলাম।
সঞ্জয় মুখ ব্যাজার করে বলল -তুই যখন চাস না তখন কেন বলতে যাব।
বারান্দার এক কোনে স্তূপাকার চুলের বোঝা দেখতে দেখতে বিশুর হঠাৎ বিকাশ চোপড়ার মুখটা মনে পড়ল। কি চমৎকার কথাই না বলতে পারত লোকটা, কি যেন বলেছিলেন -ইফ ইউ হ্যাভ এ লেমোন মেক ইট অ্যা লেমোনেড্, আরে তাইত! বিশুর পেটের চুলগুলো হাওয়ায় দুলে উঠল। বেশ হয়েছে এই টক লেবুটাকেই রস বানিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাবে বিশু। একটা পরিকল্পনা মাথায় আসতেই বিশু চনমন করে উঠল। মোবাইল বের করে তখুনি কয়েকটা নম্বর ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে সঞ্জয়ের স্বর শোনা গেল। বিশু সংক্ষেপে নিজের মতলবটা বলতেই উত্তেজনার রেশটা সঞ্জয়ের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল -আইডিয়াটা দারুন খাটিয়েছিস তো।
-প্ল্যানটা তাহলে চলবে বলছিস
-চলবে মানে আলবাৎ চলবে। আমি এখুনি আসছি।
বিশু ফোন রেখে বিজয়গর্বে মুঠো পাকিয়ে বলল -ইয়েস্
অদিতি নিরাপদ দূরত্বে থেকে বিশুর উপর নজর রাখছিল, সেদিকে চেয়ে বিশু গম্ভির স্বরে বলল -এই তুমি এদিকে এসো। খানিক ইতস্তত করে ভয়ে ভয়ে অদিতি এগিয়ে এলো-ওগো তোমার মাথা, মানে শরীর ঠিক আছে তো? অদিতিকে ভীষণ অবাক করে বিশু হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে গাঢ় স্বরে বলল -আজ থেকে আর আলাদা ঘরের দরকার নেই আমরা এখন থেকে একসাথেই থাকব।
অদিতির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল -সত্যি!
-হ্যা, তবে সবার আগে সঞ্জয়ের জন্য কিছু খাবারের ব্যাবস্থা করো ও সোজা অফিস থেকে আসছে।
-মোগলাই পরোটা করব সাথে খাসীর মাংস কষা।
বিশু নিঃস্পৃহ স্বরে বলল -ওই জিনিসের নাম আমার সামনে আর কখনো তুলবে না।
সঞ্জয় চলে গেছে। তার এখন বিস্তর কাজ। এক্সপোর্ট লাইসেন্স বের করাটা চাট্টিখানি কথা নয় তারপরে যুতসই একটা ক্যাটালগ তৈরি করতে হবে এছাড়া বিদেশী খদ্দেরদের সঙ্গে যোগাযোগ সাড়ার হ্যাপাটাও কিছু কম নয়। তবে সবার আগে নতুন একটা চকচকে সাইনবোর্ডের ব্যাবস্থা করতে হবে। নামটা বিশুই ঠিক করে দিয়েছে।
“Sen & Mitra Exporters
Finest quality hair suppliers”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন