পুস্প-বিস্ময়

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সুপ্রকাশ স্টেটসম্যানের পাতা ওলটাচ্ছিল। নন্দিনী বাজারের ব্যাগটা ডাইনিং টেবিলের ওপর ফেলে সেই যে বাথরুমে ঢুকেছে সুপ্রকাশ ভালোই জানে অন্তত মিনিট চল্লিশের আগে আর বেরোচ্ছে না। ঠিক এমন সময় বেলটা বেজে উঠল। ঘড়িতে এখন সাড়ে-নটা, সুপ্রকাশ খানিকটা বিরক্তই হল, বাবলু বাড়ি থাকলে তাকেই বলত দরজাটা খুলে দিতে কিন্তু সে আবার দুদিনের জন্য মামার বাড়ি গেছে। যাইহোক কাপ টেবিলে রেখে দরজা খুলতেই আর এক প্রস্থ বিস্ময়ের পালা। ফুলের তোড়া হাতে একজন অপরিচিত যুবক দাঁড়িয়ে। ছেলেটি হাতে ধরা চিরকুটে চোখ রেখে বলল -নন্দিনী বসু এখানেই থাকেন।

-হ্যা কি ব্যাপার!

-ডেলিভারী আছে একটু ওনাকে ডেকে দিন

-আমাকে দিলেই হবে। ছেলেটি একটা কাগজের রসিদ সুপ্রকাশের দিকে এগিয়ে ধরল -এটায় সই করে দিন

তোড়া হাত-বদল করে সুপ্রকাশের জিম্মায় চলে এলো। সুপ্রকাশ প্রেরকের কলামে চোখ বুলিয়ে দেখল জায়গাটা ফাঁকা। ছেলেটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছিল সুপ্রকাশ জিগ্যেস করল -এটা যে পাঠিয়েছে তার নাম লেখা নেই কেন? ছেলেটি মাথা চুলকে বলল -সে তো বলতে পারব না স্যার আমার কাজ ছিল ডেলিভারী করা ব্যাস্‌ কিছু জানতে চাইলে লেক মার্কেটে আমাদের দোকানে ফোন করতে পারেন। ছেলেটি চলে গেল।

সুপ্রকাশ তোড়াটাকে ডাইনিং টেবিলের কোনে রেখে দিল। নন্দিনী বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। প্রতিদিন এই সময়টা সে ঠাকুরের ছবির সামনে ধুপ হাতে দাঁড়িয়ে মিনিট খানেক বিড়বিড় করে কিসব বলে আজও তাই করছিল। সুপ্রকাশ একটু অপেক্ষা করল। নন্দিনীর কাজ শেষ হতেই সুপ্রকাশ রসিকতার ছলে বলে উঠল-তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। তোড়াটা নন্দিনীর চোখেও পড়েছে বলল -এটা কোত্থেকে এলো?

-তোমার কোন ওয়েলউইশার পাঠিয়েছে।

-আমাকে, নন্দিনীর কণ্ঠে বিস্ময়।

-হ্যা নন্দিনী বসু যদি তোমার নাম হয়ে থাকে তাহলে তোমাকেই।

-ফুল কে পাঠাল? কৌতূহল সামলাতে না পেরে নন্দিনী তোড়াটাকে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেছে, কিন্তু কোনরকম হদিশ করতে না পেরে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল। সুপ্রকাশ তীক্ষ্ণ চোখে তার স্ত্রীকে জরিপ করতে করতে জেরা করল -কে পাঠিয়েছে তুমি জানো না।

-জানলে বলতাম না। নন্দিনীর স্বরে বিরক্তির আভাষ। সুপ্রকাশ আর কথা না বাড়িয়ে থলে হাতে বেড়িয়ে পড়ল।

আজকে আর জুত করে বাজার করা হল না, মনের ভিতরটা কেমন যেন খঁচখঁচ করছে। এ আবার কেমন বেয়াক্কেলে রসিকতা! পয়সা খরচ করে করলটাই বা কে? নন্দিনীর বাপের বাড়িতে তো আছে দাদা আর বৌদি, ওরা ফুল পাঠাবে এটা ভাবার কোন কারন নেই এছাড়া নন্দিনীর বন্ধু বান্ধবীর সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত। অবশ্য বাবলুর স্কুলের কিছু গার্জেনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়ে থাকতে পারে তবে সেটা কি এতদূর ঘনিষ্ঠতায় পৌছেছে যে ফুল চালাচালির পর্যায়ে চলে গেছে। বাজারের পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরতে সুপ্রকাশ দেখল নন্দিনী ফুলগুলো সুন্দর করে ভাসে সাজিয়ে রেখেছে। সুপ্রকাশের মনে হল নন্দিনী যেন আজ অন্য দিনের চাইতে একটু বেশি উৎফুল্ল, গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে রান্নাঘরের কাজ সারছে। গলা খাকড়ে সুপ্রকাশ জিগ্যেস করল -ফোন করেছিলে?

-কাকে?

-তোমার বন্ধুদের

নন্দিনী অবাক চোখে তাকিয়ে বলল -কোন বন্ধুকে?

-কেন জানবে না ফুলটা কে পাঠিয়েছে। নন্দিনী যেন আকাশ থেকে পড়েছে এমন ভাব করে বলল -খেয়ে দেয়ে কাজ নেই নাকি! সকাল থেকে ওই নিয়ে পরেছো, যে পাঠিয়েছে সে যখন নিজের ভুল ধরতে পারবে তখন নিজের কপাল চাপড়াবে। সুপ্রকাশ মুখ ভার করে থাকল। নন্দিনী সবই জানে কিন্তু ওকে জানতে দিতে চায় না। সুপ্রকাশ নন্দিনীর বিয়ের বারো বছর কেটে গেছে, সম্বন্দটা ছোটমামা এনেছিলেন তার কোন বন্ধুর আত্মীয় মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুজছিলেন। বিয়ে হয়ে গেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে ঘর আলো করে বাবলু বাবুর আগমন। সুপ্রকাশ আর পিছনে তাকাবার সময় পেল না। সংসারের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে খরচের বহরও বেড়েই চলল, চাকরিতে বেশ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে সুপ্রকাশ আজ কোম্পানির এরিয়া সেলস্‌ ম্যানেজার। সাফল্য এসেছে কিঞ্চিৎ মুল্য চুকিয়ে। দিনে বারো তেরো ঘন্টা কাজের পর পরিবারের জন্য আর সময় হাতে থাকে না, যথারীতি এই নিয়ে নন্দিনীর বিস্তর অভিযোগ। সুপ্রকাশ মনে মনে ভাবে সে যদি আজ যদি এতোটা উদ্যোগে ঝাপিয়ে না পড়ত তাহলে গড়িয়ায় এই ফ্ল্যাটের বদলে এখনো মুলেন স্ট্রীটের সেই এক কামড়া ভাড়ার ঘরে থাকতে হত, আর বাবলুরও ইংলিশ মিডিয়মে পড়া হত না। সপ্তাহজুরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পর রবিবার করে বন্ধু জয়ন্তর আড্ডায় গিয়ে তাস খেলে আর সামান্য মদ্যপান করে যদি সময় কাটায় সেখানে নন্দিনীর কিবা বলার থাকতে পারে। সুপ্রকাশের মাঝে মধ্যে নন্দিনীকে ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়, সংসারের জন্য তার যে এই স্যাক্রিফাইসটা সেটা খোলা চোখেও দেখতে পায় না। শুধু নিজেরটা বোঝে।

সেদিন বিকেলে আর তাসের আড্ডায় মন বসল না। পরপর কয়েকটা বাজী হেরে সুপ্রকাশ হাতের তাসগুলো টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। জয়ন্ত আড় চোখে তাকিয়ে বলল -কি হল হাল ছেড়ে দিলি।

-আজ লাক ফেভার করছে না

প্রদিপ কয়েকদান জিতেছে, খোশমেজাজে বলল -আগের সপ্তাহে তো মাল বড় বড় ডায়ালগ দিচ্ছিলে তখন জিতছিলে কিনা।

জয়ন্ত ব্যাচেলার মানুষ, উচ্চপদে কর্মরত। সংসারের ঝামেলা নেই সুযোগ পেলেই ব্যাগ গুছিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে চলে যায় আর প্রতি শনি রবিতে ফ্ল্যাটে বন্ধুদের আসর বসায়, তাস মদ জুয়া দাবা সবই চলে যে যার রুচি অনুযায়ী বেছে নাও। সুপ্রকাশ উঠে পড়ছে দেখে অসীম হাহা করে উঠল -উঠলি কোথায় সবে তো আটটা বাজে।

-একটা দরকারি কাজ আছে বাড়ি যাই।

নন্দিনী তখন টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। সুপ্রকাশকে দেখে অবাক হয়ে জিগ্যেস করল -কি ব্যাপার এতো তাড়াতাড়ি চলে এলে যে। সুপ্রকাশ মনের ভাব গোপন রেখে বলল -এমনি মাথাটা ধরেছে তাই ভাবলাম।

-ভালো করেছ। নন্দিনী কফি করে নিয়ে এলো। সুপ্রকাশ আর করে কি, কফি খেতে খেতে স্ত্রীর সঙ্গে বাংলা সিরিয়াল দেখতে লাগল। রাবিশ! নন্দিনী এইসব দেখে সময় নষ্ট করে। ডিনারে মুর্গির ঝোল আর আটার রুটি খেয়ে সাড়ে এগারোটা নাগাদ শুয়ে পড়ল, সকালে আবার অফিসের তাড়া। নন্দিনী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সুপ্রকাশ ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েক বছর আগেও কি সুন্দর চেহারা ছিল নন্দিনীর। কিন্তু বাচ্ছা হবার পর থেকেই সেই যে শরীরের বাঁধন নষ্ট হয়ে গেল সে আর ঠিক হল না। ঠিক করার গরজও অবশ্য নন্দিনী দেখায় নি। যেখানে সেখানে মেদ জমে এখন তো পুরোদস্তুর গিন্নী গিন্নী লাগে। যদিও ওর বয়স এখনো পঁয়ত্রিশ পেরোয়নি। সময়ের আগেই যেন মধ্যবয়সে পৌছে গেছে ওরা। সুপ্রকাশ আলো নিভিয়ে ঘুমের চেষ্টা করল।

সুপ্রকাশের অফিস যোধপুর পার্কে, সেখান থেকে লেক মার্কেট পনের মিনিটে যাওয়া যায়। মল্লিক ফ্লাওয়ারিতে গিয়ে খোঁজ খবর করে অবশ্য তেমন লাভ কিছু হল না। নগদ টাকা বুঝে পেলে এরা কাস্টোমারের ঠিকুজি কুষ্ঠি নিয়ে মাথা ঘামায় না। দোকানের মালিক অনেক কষ্টে মনে করলেন 'একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক এসে অর্ডার দিয়ে গেছিলেন ব্যাস্‌ এইটুকু!' সহকর্মী বরুন সব শুনে বেশ গম্ভিরভাবে মাথা নাড়ল -আজকাল আর কোনকিছুর গ্যারান্টি দেওয়া যাচ্ছে না তুই বউএর ওপর একটু নজর রাখ আর ফ্যামিলিতে একটু বেশি টাইম দে।

জানুয়ারি মাসের দশ তারিখে প্রথমবার ফুলের তোড়া আসার পর প্রায় তিনটে মাস কেটে গেছে। সুপ্রকাশের কাছে ব্যাপারটা আগাগোড়াই রহস্যময়, নন্দিনীও এব্যাপারে কোন হদিশ যোগাতে পারেনি। ব্যাপারটা মাথায় এলে আজও মনের ভিতরটা কেমন যেন হয়। আজ এপ্রিল মাসের তেরো তারিখ, আজকের দিনে কি একটা বিশেষ ব্যাপার রয়েছে সুপ্রকাশ কিছুতেই মনে করতে পারছে না। সকাল নটায় যথারীতি অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে এদিকে নন্দিনীর যে কি হয়েছে সকাল থেকেই মুখ ভার করে বসে আছে। বাবলুকে অকারন ধমক চমক করে যাচ্ছে। টেবিলের ওপর ডালের বাটিটা এত জোরে রাখল যে তা থেকে খানিকটা ডাল ছিটকে কভারের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। সুপ্রকাশের বিরক্তি সপ্তমে চড়েছে। ভাবল নন্দিনীকে ডেকে দুটো কথা শুনিয়ে দিলে হয় এমন সময় দরজায় বেলের শব্দ। সুপ্রকাশ তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে যা দেখল তাতে চোখ কপালে ওঠার দশা। ফুলের তোড়া হাতে একজন লোক দাঁড়িয়ে।

-নন্দিনী বসু আছেন?

-নন্দিনী, সুপ্রকাশ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল

-আমি কি কানে শুনতে পাই না নাকি। গজগজ করতে করতে নন্দিনী এসে হাজির হয়ে থমকে দাঁড়াল। যথারীতি তোড়া হাতবদল হল এবং এবারেও প্রেরকের নামের জায়গা বিলকুল ফাঁকা। ডেলিভারির লোকটি বিদায় হতেই সুপ্রকাশ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল -আমি একটা সহজ কথার সোজা-সাপ্টা জবাব চাই। তোমার এই গোপন অ্যাডমায়ারারটা কে? নন্দিনীও মেজাজে কম যায় না। সুপ্রকাশের ওপর গলা তুলে বলল -কি বলতে চাও ঠিক করে বল তো?

-আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই তুমি কোন ফিলমস্টার নও যাকে লোকে বুকে পাঠিয়ে সম্বর্ধনা জানাবে,যে জোচ্চোরটা চোরের মতো লুকিয়ে ফুল পাঠাচ্ছে তাকে বলে দিও বুকের পাটা থাকলে সামনে এসে হাত ধরুক,ধরে নিয়ে যাক।

-ছি সুপ্রকাশ তুমি এতো নীচ সেটা জানতাম না

-ও আমি নীচ আর উনি হচ্ছেন রঙ্গমঞ্চের মহানায়িকা, সম্প্রতি নায়ক বদলেছেন।

-দ্যাখো একদম বাজে কথা বলবে না জানোয়ার কোথাকার

-আমি জানোয়ার আর তুমি কি? হঠাৎ বাবলুর দিকে চোখ পড়তেই সুপ্রকাশ সংযত হয়ে পড়ল, এতক্ষণ ওদের দুজনের কেউই খেয়াল করেনি বাবলু দেয়ালের এক কোনে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুপ্রকাশ আর কথা না বাড়িয়ে হনহন করে হাটা দিল। অফিসে ঢুকবার ঠিক মুখে হঠাৎ সুপ্রকাশ নিজের ভুল টের পেয়ে পেল। আজ তেরোই এপ্রিল নন্দিনীর জন্মদিন!

বরুন সব শুনে বলল -দেখলি এখানেই তুই মার খেয়ে গেলি তোর বউএর প্যাসিভ প্রেমিক ঠিক ওর জন্মদিন মনে রেখেছে তাই তো ফুল পাঠিয়েছে। একেবারে ঠিক দিনে ঠিক সময়ে। সুপ্রকাশ চিন্তিত স্বরে বলল -কি করে বুঝলি প্যাসিভ! অ্যাকটিভও তো হতে পারে। বরুন বিজ্ঞের মতো বলল -আগে থেকেই কাউকে ভিকটিমাইজ করাটা ঠিক নয়, হতে পারে নন্দিনী তেমন কিছু জানেই না সুযোগ বুঝে কোন এক হারামী ননস্টপ চান্স লাগিয়ে যাচ্ছে। সেটা তোকে খুঁজে বের করতে হবে। সুপ্রকাশের মনে হল বরুন হয়ত ঠিক কথাই বলেছে সে অবশ্য ততোক্ষণে কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে। দেখাই যাক এরপর কি হয়।

সন্ধ্যেবেলা সুপ্রকাশ বাড়ি ফিরতে এবারে নন্দিনীর অবাক হবার পালা। ভেবেছিল আজ একটা তুলকালাম কাণ্ড বুঝি হবে কিন্তু সুপ্রকাশ সে রাস্তাই মাড়াল না। উল্টে নন্দিনীর জন্য সুন্দর কাজ করা একটা তাঁতের শাড়ী নিয়ে এসেছে। ডিনারে নামজাদা বাঙালি রেস্তোরায় গিয়ে চিতল মাছের মুইঠ্যা আর চিংড়ি মালাইকারী দিয়ে দারুণ খাওয়া দাওয়া হল। ফেরার পথে ট্যাক্সির পিছনের সিটে বসে নন্দিনী বিস্মিত কণ্ঠে বলল -আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না দিনটা তোমার মনে ছিল। সুপ্রকাশ হাসল, নিপুন অভিনেতার হাসি। মুখে বলল -সারপ্রাইজ।

এরপর নন্দিনীর জন্য আরও কিছু সারপ্রাইজ লাইন দিয়ে এলো। সুপ্রকাশ আজকাল অফিস ছুটি হলেই বাড়ি চলে আসছে। ফি রবিবার জয়ন্তের আড্ডায় যাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। বাবলু আর নন্দিনীকে এখন আগের থেকে অনেক বেশি সময় দিচ্ছে। বাবলু অনেকদিন ধরেই আব্দার জুড়েছে দার্জিলিং যাবে, তার প্রায় সব বন্ধুই ঘুরে এসেছে শুধু ওরই যাওয়া হয় নি। সুপ্রকাশ দীর্ঘদিন ছুটি নেয়নি তাই দিন সাতেকের ছুটি সহজেই মঞ্জুর হয়ে গেল। ঘোষ ট্র্যাভেলস্‌কে বলে ট্রেনের টিকিটও যোগার হয়ে গেল। তবে বাড়িতে এসবের বিন্দুবিসর্গও জানাল না এবং সেটা খুব ভেবে চিন্তেই। টিকিট সাতাশ তারিখের, পঁচিশে থার্ড-আই ডিডেকটিভের রিপোর্টিং তারিখ। গত দেড়মাস ধরে প্রতিনিয়ত ওরা নন্দিনীকে ফলো করে আসছে। দার্জিলিং যাত্রার ব্যাপারে বাড়িতে জানিয়ে সুপ্রকাশ সবাইকে দারুণ চমক দেবে যদি না পঁচিশ তারিখে তার নিজের জন্যই বড় ধরনের কোন চমক না হাজির হয়। উদ্বেগে সুপ্রকাশের বুকের ভিতরটা ধুকপুক করতে লাগল।

শতাব্দী এক্সপ্রেসের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরে আরাম করে বসে বসু পরিবার দার্জিলিং যাত্রা করছে। বাবলু তো উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে। সুপ্রকাশের বুকের ভার নেমে গেছে। থার্ড-আই এর ঝানু গোয়েন্দা বিমল দে জানিয়েছে নন্দিনী পুরোপুরি নির্দোষ। কোনরকম গর্হিত কাজের সঙ্গেই তার বিন্দুমাত্র যোগ নেই। শুধু এখনই নয় অনেক আগেকার সেই ওর কলেজ জীবনের হদিশ লাগিয়েও গোয়েন্দারা নন্দিনীর তেমন কোন সংশ্রব খুঁজে বের করতে পারে নি। সেসব নাহয় ঠিক আছে তাহলে নিয়মিত ফুল পাঠায় কোন মক্কেলে? তারও জবাব আবিস্কার করে বিমলবাবু জানিয়েছেন ওটা নেহাতই একটা কো-ইনসিডেনস্‌। একতলার ফ্ল্যাটের জীবনবাবু কয়েক মাস হল দুজন এয়ার হস্টেসকে পেয়িং গেস্ট হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন। তাদের একজনের নাম নন্দিনী বোস। মেয়েটির প্রচুর বয়ফ্রেন্ড যারা মাঝেমধ্যেই ওকে নানারকমের উপহার পাঠিয়ে থাকে। ডেলিভারীর ছেলেগুলোর ভুলে কয়েকবার ওই ফুল একতলার বদলে তিনতলায় আপনার ফ্ল্যাটে পৌছে গেছে।

প্যান্ট্রি থেকে খাবারের ট্রে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। আলু-ঢ্যাঁড়সের ঘ্যাঁট চিকেন কষা আর সরু চালের ভাত। প্লাস্টিকের কাটায় মাংসের টুকরো বিঁধে মুখে পুরে সুপ্রকাশ বলল -খুশি তো? কেমন চমকে দিলাম বলো! নন্দিনী নিজের প্লেট থেকে এক খন্ড মাংস বাবলুর প্লেটে তুলে প্রসন্ন মুখে সুপ্রকাশের দিকে চাইল। সুপ্রকাশ আর একটা টুকরো কাটায় আঁটকে বলল -তবে এর থেকেও বড় সারপ্রাইজ তোমার জন্য আছে। নন্দিনী জিজ্ঞাসু দৃষ্টে চেয়ে রয়েছে দেখে সুপ্রকাশ হামবড়াই হাসি হেসে বলল -তুমি বোধহয় বুঝতেই পারোনি ফুলের বুকেগুলো কে পাঠিয়েছিল। তোমার মুখটা কিন্তু দেখার মতো হয়েছিল। নন্দিনীর চোখ কপালে ঠেকেছে কোনোক্রমে বলল -তুমি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সুপ্রকাশ এবারে বেশ একটা এলেমদার মার্কা হাসি হাসল।

ট্রেন নিউজলপাইগুড়ি ষ্টেশনে এসে থেমেছে। নন্দিনী একটু আড়াল পেতেই মোবাইলে বাল্যবন্ধু অপর্ণাকে ধরেছে। এতক্ষণ হাসি চেপে রাখাই দায় হচ্ছিল। সুপ্রকাশ যখন মিথ্যে বলে তখন ওর মুখটা এমন বেকুবের মতো দেখায়। এই আনন্দের সময় নন্দিনী অপর্ণাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে শান্তি পাচ্ছে না। একটা সময় সংসারে ক্রমশ গুরুত্ব হারাতে হারাতে নন্দিনীর আত্মবিশ্বাসেও যেন চিড় ধরতে শুরু করেছিল।ফুল পাঠানোর বুদ্ধিটা অপর্নারই, শুধু তাই নয় অফিসের পিওন জনার্দনকে দিয়ে বাকি ব্যাবস্থাও সেই করেছে। নন্দিনী সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল 'এতে কি লাভ হবে'। অপর্ণা নিজের মতো ব্যাখ্যা করেছে 'সুপ্রকাশ যদি তোকে আজও ভালোবাসে তাহলে এর প্রতিক্রিয়া দেখতেই পাবি আর এরপরেও যদি দেখিস চোখ বুজে রয়েছে বুঝবি নিজের সম্বন্দে ভাবার সময় এসে গেছে' নন্দিনীর মন তৃপ্তির আমেজে ভরে উঠেছে। সে জেনে গেছে সুপ্রকাশ তাকে এখনো ভালোবাসে, এবং ঠিক আগের মতোই ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%