জুয়া

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

রোহতকের গুলাঠি প্যালেসের সামনে দাড়িয়ে বিকাশ আর একবার টাইয়ের নটটা ঠিক করে নিল। বুকের ভিতরটা এখনো কেমন ঢিপ ঢিপ করছে, নির্বিচারে করে ফেলা আলপটকা ফোনটা তাকে একেবারে মহারাজার সদর দরজায় এনে হাজির করেছে, এবারে বাকিটা ভালোয় ভালোয় মিটলে হয়! মোবাইলের স্ক্রীনে একবার সময়টা দেখে নিল, ছটা বাজতে দশ মিনিট বাকি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছটায়। বিকাশ একটা সিগারেট ধরাল, আগামী মিনিট পাঁচেক এই ধোঁয়ায় দিব্যি উড়ে যাবে।

বিকাশ দত্ত একটি বিখ্যাত কিচেন-ওয়ের কোম্পানির সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। বিগত তিন মাস যাবত কোম্পানি তাকে হরিয়ানা পাঞ্জাব জোনে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে রেখেছে। এই তিন মাসের পারফরম্যান্স তার কেরিয়ার রেকর্ডে বিশেষ গুরুত্ব পাবে, যদিও দুর্ভাগ্য বশত বিকাশ এবারে তেমন সুবিধে করে উঠতে পারেনি। হিন্দিটা বিকাশের তেমন খোলতাই নয় তায় আবার এই অঞ্চলে হরিয়ানভি টানে যে ভাষা চলে সেটা রপ্ত করতে করতেই সময় ফুরিয়ে গেল, সেলস টার্গেট অ্যাচিভ আর হল না। এদিকে মেয়াদ শেষ! আগামী সপ্তাহে তুফান এক্সপ্রেসের স্লীপার ক্লাশে হাওড়া ফেরার টিকিটের ব্যাবস্থাও হয়ে গেছে, তারপরই সেলস রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসের কাছে জবাবদিহি করতে হবে ভেবেই বিকাশের রাতের ঘুম ছুটে গেছিল, এমন সময় হঠাৎ জনৈক প্রেমকিশোর গুলাঠির ল্যান্ডলাইন নম্বরটা ডিরেক্টরি থেকে বের করে ফোন করতেই একজন রাশভারী স্বরের অধিকারী পুরুষকণ্ঠ বলে উঠল –ইয়েস! বিকাশ সংক্ষেপে চিমনির বিবরণ দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইতে ওপার থেকে কিছুক্ষণের স্তব্ধতার পর উত্তর এলো –সি মি টুমোরো অ্যাট সিক্স পিএম শার্প, এরপর ভদ্রলোক নিজের ঠিকানা জানিয়ে ফোন কেটে দিলেন। সহকর্মিদের ঠিকানাটা দেখিয়ে রাস্তা বুঝে নেবার জন্য জিগ্যেস করতেই অফিসে ছোটখাট একটা শোরগোলই পরে গেল। ব্রাঞ্চ হেড কর্তার সিং এসে বললেন –তোমার কোন ধারণা আছে কার সঙ্গে দেখা করতে চলেছ? বিকাশ বোকার মতো চেয়ে আছে দেখে তিনিই ফের বললেন –হি ইজ নান এলস্‌ বাট দ্য গ্রেট মহারাজা অফ রোহতাক হিজ হাইনেস্‌ প্রেমকিশোর গুলাঠী। সহকর্মীদের মুখ থেকে বিকাশ আরও জানতে পারল, এই মহারাজটির রাজত্ব অনেক কাল আগে চলে গেলেও এদের পারিবারিক সম্পত্তির পরিমান এখনো কোন রাজার চেয়ে কম নয়। সমগ্র অঞ্চলের মানুষজন এই রাজপরিবারকে এখনো যথেষ্ট সম্ভ্রমের চোখেই দেখে, এহেন মহারাজ আজ পর্যন্ত কোন সেলসম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও কেউ কখনো শোনেনি, বাড়ি ডেকে সময় দেওয়া তো দূরঅস্ত! সহকর্মীদের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে বিকাশ বুঝে গেল না বুঝে সে বেশ দারুন কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে। কর্তার বিকাশের কাঁধে চাপড় মেরে বলল –গুড চান্স ফর ইউ, যদি রাজাসাহেবের থেকে অর্ডার নিয়ে আসতে পারো তবে এই অফিসে তোমার অনারে আমি পার্টি দেব, গুড লাক!

ঘড়িতে ছটা বাজল, এবার বিকাশের মনে হল তার এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। বিশাল আকারের লোহার গেটটার দিকে এগিয়ে যেতেই উর্দিধারি দারোয়ান স্বপ্রশ্ন দৃষ্টে চাইল। বিকাশ গলা খাকড়ে তার আসার কারন বলতে দারোয়ান তাচ্ছিল্যের দৃষ্টে চাইল, ভাবখানা এমন যেন রাজাসাহেব এমন একজন অকিঞ্চিৎকর লোকের সঙ্গে দেখা করতে পারেন সেটা হতেই পারে না, বিকাশের আগাপাস্তলা চোখ দিয়ে মাপতে মাপতে লোকটি ইন্টারকম থেকে কাউকে ফোন করল, ওদিকে কি কথা হল বিকাশ শুনতে পেল না তবে লোকটির আচরণে কিছুটা পরিবর্তন দেখা দিল, দ্রুত হাতে গেট খুলে দিয়ে ভিতরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল –ওদিকে সিকিউরিটি অফিসে গিয়ে নাম এন্ট্রি করে নিন। দুপাশে ঘন সবুজ ঘাসের গালিচার মাঝে সাদা নুড়ি পাথরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিকাশের মনে হল সে যেন হঠাৎ কোন স্বপ্নের দেশে এসে হাজির হয়েছে। সিংহদরজা থেকেই শুরু হয়েছে কেয়ারি করা ফুলের বাগান যাতে গোলাপ, গাঁদা, জুই, চন্দ্রমল্লিকা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের নাম না জানা ফুলের ঢল। বামন আকৃতির নারকেল গাছের সাড়ি দেওয়া বৃত্তের মধ্যিখানে দুধ সাদা সুরম্য প্রাসাদ। একপাশে প্রশস্ত টেনিস খেলার কোর্ট অন্যপাশে মার্বেল পাথরে তৈরি সুইমিং পুল যেটা টলটলে স্বচ্ছ নীল জলে টইটুম্বর হয়ে রয়েছে। বিকাশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই রাজকীয় বৈভব দেখে যাচ্ছিল হঠাৎ পুরুষ কণ্ঠের আহ্বানে সম্বিৎ ফিরল। সামনে একচিলতে সিকিউরিটি অফিস থেকে দশাসই চেহারার একজন ব্যাক্তি এসে বিকাশকে আহ্বান জানাল, নাম ঠিকানা আসার কারন ইত্যাদি লিখতে বলল। কথামতো বিকাশ সব খাতায় লেখার পর পালোয়ানের মতো লোকটি বিকাশকে অনুসরণ করতে বলে প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করল। প্রকাণ্ড আকারের হল ঘরের একটা বিলাসবহুল কাউচের দিকে ইঙ্গিত করে পালোয়ান বলল –আপনি এখানে আরাম করে বসুন, হিজ হাইনেস্‌ উইল বি হেয়ার এনি মোমেন্ট। বিকাশের চোখ ইতিমধ্যে ছানাবড়া হয়ে গেছে, নেহাতই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সে, রাজা রানিদের অনেক গল্প পরে থাকলেও, রাজপ্রাসাদ জিনিসটা যে এমন কিছু হতে পারে সেটা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারত না, কসবায় ওর যে সাড়ে-পাঁচশ স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটটা রয়েছে তার থেকে বড় বোধহয় এই প্রাসাদের বাথরুম হবে, বিশাল হলঘরের ছাদটা পেল্লায় উঁচু, ব্রিটিশ আমলের বাড়ি গুলোর মতো। সিলিঙয়ে একাধিক মহার্ঘ ঝাড়বাতি ঝুলছে আর দেয়াল গুলোতে প্রমান আকারের সব ওয়েল পেন্টিং। তৈলচিত্র গুলো বেশিরভাগই এই বংশের রাজপুরুষদের, গায়ে আলখাল্লা, মাথায় পাগড়ি আর সবারই কোমরে প্রমান সাইজের তলোয়ার। একজন উর্দিধারি আর্দালি এসে বিকাশকে বলল –মহারাজা আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। বিকাশ তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে বুঝতে পারল সে বেকায়দায় পরে গেছে, এতো পুরু আর নরম এই সোফার গদিটা যে বিকাশের শরিরের পশ্চাদ্দদেশ কখন যে এতে ডুবে গেছে সে খেয়াল এতক্ষণ করেনি, বুঝল উঠে দাঁড়াবার সময়, দুবারের চেষ্টায় হাতে ভর দিয়ে যখন সে উঠে দাঁড়াল রাজাসাহেব ততোক্ষণে এসে হাজির হয়েছেন। বিকাশ দুহাত জোর করে নমস্কারের ভঙ্গি করে বলল –গুড ইভনিং ইয়োর হাইনেস্‌। রাজাসাহেব কোন উত্তর না দিয়ে বিকাশকে আপাদমস্তক দেখে নিলেন তারপর মুখোমুখি একটা সিঙ্গল কাউচে বসে বিকাশকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। বিকাশ এবারে বেশ সাবধানে সোফাটায় বসল। রাজাসাহেবের বয়স হয়েছে, প্রায় ষাটের কাছাকাছি, ধবধবে ফরসা রাজকীয় চেহারা। উচ্চতায় ছফুটের কাছাকাছি, তবে এর প্রধান বৈশিষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত দুটো ধারাল চোখে যার দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা যায় না, অন্তত বিকাশের তো তাই মনে হল। রাজাসাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে যেন বিকাশকে মাপজোক করে নিচ্ছিলেন, বিকাশের অস্বস্তি বাড়ছিল, সামান্য পরে রাজাসাহেব খাটি সাহেবি উচ্চারনে বললেন –আর ইউ ফ্রম সাউথ ইন্ডিয়া? বিকাশের খর্বকায় চেহারা আর কৃষ্ণ গাত্রবর্ন দেখে অনেকেই এমন প্রশ্ন তাকে আগেও করেছে। বিকাশ আকর্নবিস্তৃত একটা হাসি হেসে বলল –নো স্যার, সরি হাইনেস্‌ আই অ্যাম বেঙ্গলি অ্যান্ড ফ্রম কলকাতা, মানে ক্যালকাটা। রাজাসাহেব বললেন –সো ইউ আর ফ্রম দ্যা রেস অফ দ্যা গ্রেট নেতাজী সুভাষ বোস। বিকাশ যথাসম্ভব বিনয়ী হয়ে হাসার চেষ্টা করল। রাজাসাহেব এবার কাজের কথায় চলে এলেন –আমার সময় কেন চেয়েছিলে? বিকাশের এবার একটু সংকোচ বোধ হতে শুরু করল। গত তেরো বছর ধরে সে এই কাজই করে আসছে, কোম্পানির প্রোডাক্ট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাছে মার্কেট করা যদিও এমন উচ্চকোটির ক্লায়েন্টের মুখোমুখি বসে চিমনির গুনাগুণ কি বোঝাবে ভেবে পেল না, তাছাড়া এই মহারাজটি জীবনে কোনদিন রান্নাঘরের চৌহদ্দি মাড়িয়েছেন বলে তো মনে হয় না। বরঞ্চ এর রাধুনি বা খানসামার সঙ্গে বসতে পারলে হয়ত অনেক সহজে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেত। বিকাশ চিমনির বিষয়ে বলতে শুরু করল, কিছুক্ষণ বলার পর সে লক্ষ্য করল রাজাসাহেবের মন অন্য কোথাও পরে আছে, তিনি যেন বিকাশের কোন কথাই শুনতে পাচ্ছেন না, হঠাৎ রাজাসাহেব বিকাশকে থামতে ইঙ্গিত করলেন। শান্তকন্ঠে জিগ্যেস করলেন –তোমার সবথেকে দামি চিমনির প্রাইস কতো? বিকাশ ক্যাটালগ্‌ খুলে দাম বলতে যাচ্ছিল, রাজাসাহেব বাধা দিয়ে বললেন –আচ্ছা সে যাই হোক না কেন, কথা দিচ্ছি আজ এবাড়ি থেকে যাবার সময় তুমি পেমেন্ট নিয়ে যাবে, এ ব্যাপারে আমার আর্দালি রাম সিং, যা বলার তোমাকে বলবে। বিকাশ অত্যন্ত খুশি হয়ে ধন্যবাদ জানাল –থ্যাংক ইউ, ইয়োর হাইনেস্‌। রাজাসাহেব যেন মজা পেয়েছেন এমনভাবে বিকাশের দিকে চেয়ে হালকা স্বরে বললেন –ওয়েট জেন্টলম্যান, এব্যাপারে আমার একটা শর্ত আছে, তোমার জিনিস বিক্রি হবে ঠিকই তবে বিনিময়ে আমার একটা গল্প তোমাকে শুনতে হবে আর বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে একটা প্রীতি উপহার তোমাকে আমি দেব, না কিন্তু বলতে পারবে না, কেমন? বিকাশ বিন্দুমাত্র না ভেবে বলল –আমি রাজি, ইয়োর হাইনেস্‌ আপনার গল্পও শুনব আর আপনার গিফট নিতেও আমার কোন আপত্তি নেই। রাজাসাহেব তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন –সব কথা না শুনেই রাজি হয়ে গেলে, তবে মনে রেখো এর সাথে সাথে তোমার পিছিয়ে যাবার রাস্তা আর কিন্তু রইল না। বিকাশ দৃঢ়প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল –এতো দামি চিমনি বিক্রি করতে পেরেছি তাও আবার আপনার মতো ক্লায়েন্টের কাছে, কোম্পানির চোখে আমি হিরো হয়ে যাব, এর জন্য আপনি অন্য কিছু বললেও রাজি হয়ে যেতাম। রাজাসাহেব খুশি হয়ে বললেন –তবে কফি খেতে খেতে কথা হোক।

কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে রাজাসাহেব বললেন –ওয়েল বেঙ্গলি বাবু, রামায়ন, মহাভারত এসব হিন্দু সেক্রেড টেক্সট গুলো পরা আছে। বিকাশ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল –ছোটবেলায় পড়েছি ইয়োর হাইনেস্‌।

-ফাইন, মহাভারতের কাহিনীর অন্তিম পর্বে কি ঘটেছিল, বলতে পারো?

বিকাশ বলল –পাণ্ডবেরা যুদ্ধে জিতেছিল আর কৌরবেরা হেরেছিল। –আফটার দ্যাট? বিকাশ একটু ভেবে বলল –পাণ্ডবেরা বোধহয় মহাপ্রস্থানের পথে স্বর্গের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিয়েছিল। রাজাসাহেব বিরক্তিসূচক শব্দ করে বললেন –তুমি তো পায়ের পর সোজা মাথায় গিয়ে হাজির হলে, মাঝখানে বডিটা কি ভ্যানিশ হয়ে গেল, এনিওয়েস তাহলে আমিই বলি শুনে নাও, যুদ্ধ মিটলে জ্যেষ্ঠপাণ্ডব হবার সুত্রে যুধিষ্ঠির সিংহাসনে বসলেন আর তার পাটরানী হলেন দ্রৌপদী। যুধিষ্ঠির অত্যন্ত প্রজাবৎসল এবং উদার হৃদয় সম্রাট ছিলেন, ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সবার জন্য সুশাসনের ব্যাবস্থা করতে তিনি কোন খামতি রাখেন নি। তবে সবার আগে তিনি যেটা করেছিলেন সেটা আর কিছু নয় পাশা খেলার নামে জুয়া নিষিদ্ধ করা। এই আদেশে লঙ্ঘনকারীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। আশেপাশের অন্যান্য সব রাজ্য থেকে নতুন সম্রাট আর তার মহিষীর জন্য দুর্মূল্য সব উপঢৌকন আসতে শুরু করল, মনি মানিক্য আর দুষ্প্রাপ্য রত্নে যুধিষ্ঠিরের রাজভান্ডার ভরে উঠতে বেশী সময় লাগল না, এই ধনভাণ্ডারের অনেকটাই সম্রাট প্রজাহিতে খরচ করলেন। পাণ্ডবেরা প্রজা হিতৈষী হবার সাথে সাথে শিল্পকলারও বোদ্ধা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, সম্রাট যুধিষ্ঠির একদিন তার রাজ্যের একজন শিল্পীর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেলেন তার নির্মিত কয়েকটি শিল্পকলার ওপর রায়দান করার জন্য। একদিন সময় করে সম্রাট দরিদ্র শিল্পীর গৃহে পদার্পন করলেন, শিল্পি প্রচুর উৎসাহের সঙ্গে নিজের শিল্পকর্ম যুধিষ্ঠিরকে দেখাতে লাগলেন, মোট পাঁচটা এমন ভাস্কর্য নির্মান করা হয়েছিল, সেসময় পাণ্ডবদের জীবনের পাচটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এর একটিকে দেখে যুধিষ্ঠিরের প্রচণ্ড ক্রোধ উৎপন্ন হল, সেটি আর কিছু নয় শকুনির সঙ্গে পাশাখেলার মুহূর্তের খন্ডচিত্র। নিজের দুর্বলতম মুহূর্তের অমন জীবন্ত প্রতিচ্ছবি যুধিষ্ঠিরের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। অভিশাপ দিয়ে যুধিষ্ঠির বলেছিল এই ভাস্কর্য যে ব্যাক্তি নির্মাণ করেছে আর যে কেউ একে ঘরে সাজিয়ে রাখবেন উভয়ের সর্বনাশ অনিবার্য। পরে মাথা ঠাণ্ডা হতে যুধিষ্ঠির নিজের ভুল শোধরাবার জন্য নতুন কয়েকটা খণ্ডবাক্য এর সঙ্গে জুড়ে দিলেও একটা অভিশাপ কিন্তু এর সঙ্গে জুড়ে রইলই।

বিকাশ মনোযোগ দিয়ে রাজাসাহেবের কথা শুনছিল। যদিও এসব প্রসঙ্গ তার কি কাজে লাগবে সে কিছুই বুঝতে পারছিল না, তবে যারা সেলস্‌ মার্কেটিং-এর কাজ করে থাকেন তারা জানেন ধৈর্য এই পেশায় টিকে থাকার একটি অলিখিত শর্ত। বিকাশ এতবছরে এই অভ্যাসটুকু অন্তত রপ্ত করে ফেলেছে। রাজাসাহেব কাউচ ছেড়ে উঠে দাড়িয়েছেন দেখে বিকাশও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রাজাসাহেব বললেন –ইউ উড্‌ বি সারপ্রাইজড্‌ টুঁ নো, সেই পাথরের স্লেটটা আজ এতো হাজার বছর পরেও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, ডু ইউ ওয়ান্ট টুঁ সি দ্যাট? এব্যাপারে বিকাশের বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও রাজাকে খুশি করার জন্য সে খানিক আগ্রহ দেখাল। -ফলো মি, বলে রাজাসাহেব ঘরের অন্যপ্রান্তে গিয়ে দেয়ালের গায়ে সাঁটা একটা বাহারি স্ট্যান্ডের ওপর লাগানো ভেলভেটের পর্দা সরিয়ে দিলেন। পর্দার আড়াল থেকে যেটা বেরোল সেটা একটা দেড়ফুট লম্বা বাই দুফুট চওড়া কালো স্লেটের মতো চতুষ্কোণ, যার ওপর পাথর কেটে কয়েকটা অবয়ব তৈরি করা হয়েছে। একটা বড় সভাগৃহের মতো যেখানে দুজন মানুষকে ঘিরে প্রচুর লোকজন রয়েছে, এদের বেশভূষা কেমন যেন বিচিত্র, নিম্নাঙ্গে ধুতির মতো কিছু একটা জড়ানো যেটা আবার হাটুর ওপর কোঁচর দিয়ে বাঁধা আর সর্বশরিরে প্রচুর পরিমানে গয়না। এদের মধ্যে একজন লোক যাকে কিছুটা বয়স্ক মনে হচ্ছে সে সোৎসাহে সামনের দিকে দুহাত ছড়িয়ে দাড়িয়ে, উল্টোদিকে বসে থাকা যুবকটি যেন শোকে দুঃখে ম্রিয়মাণ, তার ঝুকে যাওয়া মাথা দেখে সে কথাই মনে হতে বাধ্য। মোটের ওপর মহাভারতের চরিত্রদের ছবি এযাবৎ বিকাশ যা দেখে এসেছে এই স্লেটের খোদাই অন্তত তার সঙ্গে মিলছে না। রাজাসাহেব যেন বিকাশের মনের কথা ধরতে পেরেছেন এমনভাবে হেসে বললেন –আমি জানি তুমি কি ভাবছ। রাজা রবি বর্মার ছবিগুলো দেখে একজন অ্যাভারেজ ইন্ডিয়ান মহাভারত রামায়ণের চরিত্রদের টাইপ কাস্ট করে ফেলে তবে অ্যাকচুয়াল সময়ে তো আর বর্মা-সাহেব ছিলেন না, যাই হোক, লেটস্‌ গেট ব্যাক টুঁ দ্যা সিটিং এরিয়া।

রাজাসাহেব কাউচে বসে বিকাশকে বললেন –বেঙ্গলি বাবু তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব, সঠিক উত্তর দেবে, মিথ্যে বললে লোকসান কিন্তু তোমার নিজেরই হবে। বিকাশ একথার কি উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে চুপ করে বসে রইল। রাজাসাহেব সামান্য বিরতির পর বললেন –তুমি তো গ্যাম্বলার তাই না, বিকাশ সাংঘাতিক চমকে উঠল, সে অবশ্যই মাঝেমধ্যে তাসের জুয়া খেলে, রেসের মাঠেও বারকয়েক গিয়েছে, তবে কখনই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে কিছু করেনি। এই নিয়ে একসময় মা তাকে বকাবকি করতেন, আর আজকাল কেয়া টের পেলে অশান্তি করে, কিন্তু সেসব এই লোকটির তো জানার কথা নয়। বিকাশ সসংকোচে বলল –একটু আধটু চলে, তেমন কিছু নয়।

মহারাজ সহাস্যে বললেন –নিশ্চিন্ত হলাম জেনে যে আমার হিসেবে ভুল হয়নি, অবশ্য হবার কথাও নয়, গতকাল সকাল থেকেই মনের ভিতর কেমন যেন হচ্ছিল, বুঝেছিলাম ওই স্লেটের নতুন মালিক কোন না কোন ভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেই, যাইহোক এবারে আমার কথা মন দিয়ে শোন, একটু আগে যে স্লেটটা দেখালাম সেটা তোমার হতে চলেছে। ওটার একটা বিশেষ গুন আছে, সম্রাট যুধিষ্ঠিরের অভিশাপের বলে ওটা অধিকারীর জীবনের ধারা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বুদ্ধিমান ব্যাক্তি সঠিক প্রয়োগ করে এর থেকে দুর্দান্ত লাভ ওঠাতে পারে তেমনি নেগেটিভ মানসিকতার হঠকারী লোককে ধ্বংসের দোরগোড়ায় ঠেলেও দিয়ে আসতে পারে। ছটা সুযোগ ও তোমাকে দেবে, তিনবার জয় আর তিনবার পরাজয়, ছটা দানই কিন্তু তুমি খেলতে বাধ্য। বোর্ডটা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখবে, শুধু যখন কাউকে জুয়ায় আহ্বান জানাবে তার সামনে এই পটচিত্রের আবরণ উন্মোচন করবে, এই পটচিত্র স্বচক্ষে দেখেও তোমার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করবে এমন মানুষ এই পৃথিবীর বুকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেননি। তবে খেয়াল রাখবে জুয়ার বাজি যেন ন্যায়সঙ্গত হয়, দুপক্ষের জামিন সমান না হলে কিন্তু এই চিত্র ফল দেবে না।

-কিন্তু, বিকাশ না বলে পারল না, -যারা জুয়া খেলে, হেরেও অনেক সময় পাওনা মেটাতে চায় না, তেমন কিছু হলে, বিকাশকে বলতে না দিয়ে রাজাসাহেব বলে উঠলেন –সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই, প্রতিপক্ষ এখানে জীবন দিয়ে হলেও দাবী মেটাবে তেমন আবার পরাজিত হলে কিন্তু পালাবার কোন জো থাকবে না খেয়াল রেখো। বুদ্ধি করে একে হ্যান্ডেল করো তাহলে জীবনে আর দুঃখ থাকবে না। আর ছনম্বর দান যেদিন শেষ হয়ে যাবে অপরিচিত কাউকে যার জুয়ার নেশা আছে এই পট উপহারে দিয়ে দেবে, ইনফ্যাক্ট খুঁজে বের করতে হবে না সে লোক নিজেই তোমার কাছে আসবে, তবে দেবার আগে সব কথা অবশ্যই বলে দেবে, দ্যাটস ইট্‌। রাজাসাহেব উঠে দাঁড়ালেন –এবার আমার ডিনারের সময় হয়ে গেছে তাই উঠতে হচ্ছে, তোমার চেক রাম সিং এর কাছ থেকে নিয়ে যেও।

কেয়া খুটিয়ে খুটিয়ে পটটা দেখছিল, একসময় বিরক্ত হয়ে খাটের একপাশে রেখে বলল–ধুস্‌ এর কোন মানে হয় না, যতসব গাঁজাখুরি গপ্পো। বিকাশ বলল –হতে পারে কিন্তু একবার টেস্ট করে দেখতে ক্ষতি কীসের? –এই বাহানায় তুমি আবার জুয়ায় পয়সা ওড়াও সেটি হচ্ছে না। বিকাশ রহস্যভরা কণ্ঠে বলল –আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে, রাজার কথামতো এই পটের সামনে কেউ জুয়া খেলার প্রস্তাব ফেরাতে পারবে না, আমরা এমন কাউকে এখানে ডেকে অফার করতে পারি যে লোকের জুয়ায় কোন ইন্টারেস্ট নেই! কেয়া ভুরু তুলে বলল–তেমন লোক কোথায় পাবে? বিকাশ গভীর স্বরে বলল –চোখ কান খোলা রাখলে তেমন লোক হাতের নাগালেই পাবে। কেয়া জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে দেখে বিকাশ হাসল, বলল –গণেশবাবুর শালার সঙ্গে কাল দেখা হল, ভদ্রলোক বললেন দেশের জমি বিক্রি করে টাকা নিয়ে এসেছেন মেয়ের চিকিৎসার জন্য। কেয়া বিস্মিত দৃষ্টে চেয়ে আছে দেখে বিকাশ বলল –লোকটা আর যাই হোক না কেন জুয়াড়ি টাইপ নয়, তাছাড়া মেয়ের চিকিৎসার টাকায় বাজি ধরবে, এমন ক্যারাক্টার তো কখনই নয়, তারপরেও যদি আমার কথায় রাজি হয়ে যায় তাহলে! বিকাশ নিজের কথা অসম্পুর্ন রেখে মুচকি হাসল। কেয়া দ্বিধাগ্রস্থ স্বরে বলল -কিন্তু ভদ্রলোক খামোখা এখানেই বা আসতে যাবেন কেন? বিকাশ মৃদু হেসে বলল –সে ব্যাবস্থা করা আমার হয়ে গেছে, মাছ অলরেডি চাড়া গিলে ফেলেছে, লোকটাকে বলেছি আমার ক্যানসার স্পেশালিষ্ট ডা সোমের সঙ্গে পরিচয় আছে, ওকে খুব সহজেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাইয়ে দেব। কেয়া চোখ বড় বড় করে বলল–তুমি পারো বটে বানিয়ে বানিয়ে বলতে! বিকাশ মুচকি হেসে বলল –কাল সন্ধ্যে ছটার সময় ভদ্রলোক এখানে আসবেন, একটু চায়ের ব্যাবস্থা রেখো।

বিকাশের প্রতিবেশী গণেশ দাসের আত্মীয় পুলিন মণ্ডল বর্ধমানের বাসিন্দা, সম্প্রতি তার একমাত্র কন্যাসন্তানের লিউকোমিয়া ধরা পরায় ভদ্রলোকের এইমুহুর্তে দিশাহারা অবস্থা, চিকিৎসার বিপুল খরচ সামাল দিতে একে একে জমি বাড়ি সব কিছুতেই হাত পরে গেছে তাহলেও সুরাহা কিছুই হচ্ছে না, মারণ কর্কট রোগ একটু একটু করে মেয়েটির শরিরের রক্তকণিকা-গুলোকে গ্রাস করে চলেছে। ভদ্রলোক কথামতো আজ বিকাশের দরজায় এসে হাজিরা দিয়েছেন, টাটা মেমোরিয়ালের ডাঃ সোমের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই ঘুরছেন, বিকাশের বদান্যতায় যদি সেটা হয়ে যায়। কেয়া ইতিমধ্যে অতিথিদের আগমনবার্তা বিকাশকে মোবাইলে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে, বিকাশ ইচ্ছে করেই দশমিনিট দেরি করে এলো। গনেশবাবু আর তার শ্যালক বিকাশকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, বিকাশও প্রচুর আন্তরিকতা দেখিয়ে ওদের বসতে বলে, ফোন কানে ধরে অভিনয় শুরু করল, ফোনের ওপারে অবশ্য কেয়া রয়েছে, ঘরের ভিতর থেকে, কাল্পনিক কিছু কথোপকথনের পরে হতাশ ভঙ্গিতে বিকাশ ফোন রেখে দিয়ে বলল -এই সপ্তাহে চান্স নেই, ডাক্তারবাবু ফুল বুকড্‌ তবে উনি কথা দিয়েছেন সামনের সপ্তাহে সোম বা মঙ্গলবার দেখে দেবেন। পুলিনবাবুকে খানিক আশ্বস্ত দেখাল, বললেন –হবে তো, প্লিজ একটু দেখবেন। বিকাশ মুখে সহানুভূতির ভাব ঝুলিয়ে বলল –ও দ্বায়িত্ত্ব আমার। বিকাশ এবার জমিয়ে গল্প জুড়ল, হাসপাতাল গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সামাজিক অবক্ষয় পর্যন্ত। গল্প করতে করতে বিকাশ নজর রেখে চলেছে তার অতিথিদের প্রতি, দুজনেই যেন উশখুশ করছে, বিকাশের বৃক্ততা শেষ হলেই যে হাঁটা লাগাবে বেশ বোঝা যাচ্ছে, বিকাশ এবার অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল দেয়ালে ঝোলানো পটচিত্রের দিকে। গনেশবাবু খানিক কৌতুহলি হয়ে জিগ্যেস করলেন –ওটা আবার কোত্থেকে যোগার করলে, অ্যান্টিক পিস্‌ নাকি? বিকাশ এবারে সরাসরি কাজের কথায় চলে এলো, -আচ্ছা পুলিনবাবু আপনার এদফায় মেয়ের চিকিৎসার খরচ কতো পরবে? এরকম প্রশ্নে ভদ্রলোক দুজনেই একটু হকচকিয়ে গেলেন, পুলিনবাবু সামান্য দ্বিধা নিয়ে বললেন –বোধহয় দুলাখ টাকার মতো লাগবে। বিকাশ বলল –পুরো টাকাটা আপনার কাছে আছে নিশ্চয়ই? পুলিনবাবু নিচুস্বরে বললেন –একলাখের মতো আছে, বাকিটা একজন ধার দেবে বলেছে। বিকাশ ঠোঁট চিপে বলল –এভাবে আর কত ধার করবেন, শেষে তো মশাই শোধ দিতে গিয়ে ঘটি বাটি বিক্রি হয়ে যাবে। পুলিনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন –যা হবার হবে, কি আর করা যাবে। বিকাশ যেন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে এমন ভাবে বলল –কিন্তু ধরুন এই টাকাটা আপনি কোথাও থেকে পেয়ে গেলেন আর শোধ করার ঝামেলাও রইল না তাহলে কেমন হয়? পুলিনবাবু খানিক অবাক হয়ে বললেন –সেটা কিভাবে সম্ভব? বিকাশ যেভাবে তার ক্লায়েন্টদের কোম্পানির স্কীম বোঝায় সেভাবে পুলিনবাবুকে বোঝাতে শুরু করল –খুব সামান্য ব্যাপার, আপনার ভালোর জন্যই বলছি, ধরুন আপনার কাছে একলাখ আছে, আর আমার কাছেও ওই একলাখ টাকাই রয়েছে, এবারে আপনার দরকার দুলাখ টাকা, আমি আর আপনি দুজনে তাসের বাজি খেললাম, আপনি জিতে গিয়ে নিজের টাকার সঙ্গে আমার টাকা যোগ করে মেয়ের চিকিৎসা করে ফেললেন, ধার দেনায় আর জড়াতে হল না। গণেশবাবু এতক্ষণ বিকাশের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন এবারে তীব্র প্রতিবাদ করে বললেন –তুমি কি বাড়ি ডেকে আমাদের সঙ্গে ইয়ার্কি করছ নাকি? পুলিন জুয়া খেলবে তোমার সঙ্গে! আর যদি হেরে যায় তাহলে কি হবে? বিকাশ আশ্বস্ত করার চেষ্টায় বলল –আগে থেকেই নেগেটিভ ভাবছেন কেন? উনি তো জিততেও পারেন। গনেশবাবু তীব্র ভর্তসনার সুরে বললেন –তোমার মতলব আমি বুঝে গেছি, পুলিন ওঠো, এখানে আসাই আমাদের উচিৎ হয়নি। পুলিনবাবু এতক্ষণে গভীর চিন্তামগ্ন ভাবে চুপ করেই বসে ছিলেন যেন দুজনের কারও কথাই তার কানে যায়নি। এবার ধীরে ধীরে বললেন–আমার কিন্তু মনে হচ্ছে বিকাশবাবু ঠিক কথাই ভেবেছেন, আমার কাছে আর জমিও বিশেষ নেই বিক্রি করার মতো, বিকাশবাবুর ওই টাকাটা পেলে আমি বর্তে যাব। গণেশবাবু কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তার শ্যালকের দিকে চেয়ে বললেন –তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? মেয়ের চিকিৎসার টাকায় জুয়া খেলবে?পুলিনবাবু নিচুস্বরে বললেন –ওই মেয়ের জন্যই খেলব।-তবে তোমার যা খুশি কর আমি চললাম, গনেশবাবু দুদ্দাড় করে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেলেন। বিকাশ এসে পুলিনবাবুর কাঁধে হাত রেখে মিষ্টি স্বরে বলল –কাল বিকেলে এইসময় টাকাটা নিয়ে আসবেন, নগদে কিন্তু! আর হ্যা আমিও টাকা রেডি রাখব, যে জিতবে সে পুরো ক্যাশ নিয়ে বাড়ি যাবে। পুলিনবাবু যেন ঘোরের মধ্যে আছেন এমনভাবে বললেন –আচ্ছা ঠিক আছে।

দত্ত দম্পতির সবরকম আশংকাকে অমুলক প্রমান করে সন্ধ্যে ছটা নাগাদ ডোরবেল বেজে উঠল। বিকাশ দরজা খুলে অতিথিদের আপ্যায়ন করল। গতকাল যতই রাগ দেখিয়ে চলে যান না কেন গনেশবাবু তার শালার সঙ্গে আজকেও এসে হাজির হয়েছেন, তবে তিনি যে বিকাশের ওপর দস্তুর মতো চটেছেন সেটা তার মুখভঙ্গি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ওদিকে বিকাশও তৈরি হয়েই রয়েছে, নিজেদের জয়েন্ট একাউন্ট থেকে একলাখ টাকা তুলে ঘরে এনে রেখেছে, আর কেয়াও আজ বিকেলে তার টিউশনিগুলো ফাঁকি দিয়েছে, এই জুয়ায় কি ফলাফল হয় সেটা না দেখে তার স্বস্তি হবে না, তাছাড়া জয়েন্ট একাউন্টের টাকাটা দুজনেরই, কেয়া কিছুতেই বিকাশকে ওই টাকায় ছিনিমিনি খেলতে দিত না, দিয়েছে তার কারন ওই পটের অলৌকিক ক্ষমতার ওপর তার কিছুটা বিশ্বাস জন্মে গেছে তাছাড়া ওই পুলিনবাবু লোকটাকেও নেহাত গোবেচারা গোছের মনে হয়েছে, বিকাশ নিশ্চয়ই ভদ্রলোককে অতি সহজেই হারিয়ে দেবে, তবে এই খেলার ফলাফল উল্টো হলে কিন্তু ব্যাপারটা আর সহজ থাকবে না, আর সেটা বিকাশেরও অজানা নয়।

গনেশবাবু রুঢ় স্বরে বললেন –পুলিন জীবনে তাস খেলেনি, ওর হয়ে আমি খেলব। বিকাশ উদারভাবে বলল –চলবে। টি টেবিলের ওপর তাসের গোছ ছড়ানো ছিল, বিকাশ তুলতে যাচ্ছিল, গনেশবাবু বাধা দিয়ে বললেন

–উহু আগে আমি চেক করে দেখব ওর মধ্যে কোন জোচ্চুরি আছে কিনা। বিকাশ মনে মনে চটে গেলেও বাইরে কোনরকম প্রতিক্রিয়া দেখাল না। গনেশবাবু একটা একটা করে প্রত্যেকটা তাস উল্টে দেখে নিলেন। বিকাশ কড়া চোখে নজর রাখছিল এবার বলল –তাস তো দেখলেন এবারে বাজির টাকা বের করুন। পুলিনবাবু ঘাড়ে ঝোলানো সাইডব্যাগ থেকে একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করলেন। বিকাশ গুণে নিল তাতে পঞ্চাশটা দুহাজার টাকার নোট একটা রবার ব্যান্ড দিয়ে বাধা রয়েছে। বিকাশের কাছেও দুটো পাঁচশ টাকার বাণ্ডিল রয়েছে সেটা সে গনেশবাবুর দিকে এগিয়ে দিল। দুলাখ টাকা টি টেবিলের এককোনে রাখা হল, আজকের এই বাজি যে জিতবে সে পাবে। তাসের গোছ নিয়ম মেনে শাফল করা হল, ছটা করে তাস দুপক্ষের হাতে পড়েছে। এবারে দান দেখাবার পালা। এই শীতকালেও পুলিনবাবুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। দুশ্চিন্তা যে বিকাশেরও কিছু কম হচ্ছে তেমন নয়, জুয়া সে আগেও অনেক খেলেছে কিন্তু এতটাকার বাজির কথা কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি, একটা আষাঢ়ে গল্প শুনে এতবড় ঝুঁকি নেওয়াটা বোধহয় হঠকারিতা হয়ে গেছে। এই বাজি হারলে কেয়া যে কি করবে ভেবেই বিকাশের আতংক হচ্ছে। এদিকে গনেশবাবু হাতের চাল দেখিয়ে দিয়েছেন। তার মুখে একটা আত্মপ্রত্যয়ের ভাব হঠাৎই ফুটে উঠেছে, তার হাত থেকে বেড়িয়েছে একটা হরতনের বিবি ইস্কাবনের রাজা আর রুইতনের গোলাম। বিকাশের শরিরে একটা কাঁপুনি ধরে গেছে, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে সে হাতের তাস টি-টেবিলের ওপর ফেলে দিল। পুলিনবাবু দেখে বিকট আর্তনাদ করে উঠলেন। টেবিলের ওপর শোভা পাচ্ছে একটা ইস্কাবনের টেক্কা একটা হরতনের টেক্কা আর একটা রুইতনের টেক্কা।

দত্ত দম্পতির ঘোর যেন কাটতেই চাইছে না। এরকম কোন গল্প শুনলে বিকাশ গাঁজাখুরি ভেবে পরিহাস করত, কিন্তু চোখের সামনে যা ঘটল সেটাকে তো মানতেই হবে। বিকাশের এখন প্রচণ্ড আফসোস হচ্ছে, রাজাসাহেব স্পষ্ট বলে দিয়েছেন এই পট শুধুমাত্র তিনটে বাজি জেতাবে, তার মধ্যে একটা নষ্ট হয়ে গেল সামান্য একলাখ টাকার জন্য। কেয়া মাঝে বুদ্ধি দিয়েছিল, নেপালের ক্যাসিনোতে পট-টাকে নিয়ে গিয়ে কোটি টাকার বাজি লড়তে, কিন্তু বিকাশ সব কিছু বিবেচনা করে সে মতলব বাতিল করে দিয়েছে। এক তো কোটি টাকা তার নেই বাজি লড়ার জন্য, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোন ব্যাক্তির সাহায্য নিতে হতে পারে, যাতে বিকাশের আপত্তি আছে, তার থেকে এই বাড়ির ড্রয়িংরুমই সবথেকে নিরাপদ, শিকারকে ফাঁদে ফেলে ধীরে সুস্থে গায়ের মাংস কেটে নিলেই বা দেখছে কে? বিকাশ আর কেয়া এর মধ্যে হিসেব করে দেখেছে তাদের ব্যাংকের যাবতীয় অর্থের পরিমান আর লকারে গচ্ছিত গয়না মিলিয়েও তিন লাখের বেশি হচ্ছে না, বিকাশ অফিসে লোনের জন্য দরখাস্ত দিয়ে রেখেছে, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। দরকার হলে কেয়াও চেষ্টা করবে যদি কিছু টাকা ধারে কোথাও থেকে যোগার করা যায়। এরমধ্যে নতুন একটা সমস্যা হয়েছে, গনেশবাবু পাড়ায় রটিয়ে বেড়াচ্ছেন বিকাশ নাকি জোচ্চোর! তার আত্মীয়ের টাকা মেরে সে বহাল তবিয়তে আছে, বিকাশ সব অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও আজকাল পাড়ায় সবাই যেন তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, বিকাশও পাড়ার লোকেদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলছে, ব্যাস আর কয়েকটা দিন, দুটো বড়সড় হাত মারতে পারলেই তাকে পায় কে।

অবশেষে বিকাশের লোন মঞ্জুর হল। তবে যতটা বিকাশ আশা করেছিল ততটা মেলেনি, মোটের ওপর দুলাখ টাকা পাওয়া গেছে, বিকাশ আর কেয়া তাড়াতাড়ি একটা হিসেব মিলিয়ে নিল, আগের চারলাখ আর এই ঋণের দুলাখ মোট ছলাখ। টাকা যা হোক যোগার হয়েছে, এবারে শিকার টার্গেট করা বাকি, দত্ত দম্পতি নিজেদের চেনা জানা মানুষদের একটা লিস্ট তৈরি করল। ছলাখ নগদ ফেলে বাজি ধরবে কার্যক্ষেত্রে এমন মানুষ দত্তদের চেনাজানা গণ্ডির মধ্যে নেহাতই বিরল দেখা গেল। দু-একজনকে যদিও বা শর্টলিস্ট করা গেল, হয় বিকাশ তাদের কাউকে বাতিল করে দিল অথবা কেয়ার মনের মতো হল না, বেশির ভাগ বাদ গেল শুধু একই পাড়ায় থাকেন বলে, পাড়ার কাউকে আর এসবে জড়িয়ে বিকাশ নিজের ঝঞ্ঝাট বাড়াতে রাজি নয়।

শিকার অবশেষে জুটে গেল এবং সহজেই। বিকাশের অফিসের বস্‌ শ্যামল পাকড়াশি। বিকাশ প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল, চাকরির জায়গায় জট পাকানোটা ঠিক হবে কিনা! কিন্তু কেয়া সাহস যোগাল, স্ত্রীর যুক্তিও বিকাশের অকাট্যই মনে হল। দুটো বড় দাও মারতে পারলে বিকাশের আর এই তুচ্ছ চাকরির কিবা প্রয়োজন, তাছাড়া জুয়ায় হেরে নিশ্চয়ই পাকড়াশি সাহেব ফলাও করে রটাতে যাবেন না। বিকাশ শনিবার সন্ধ্যেয় পাকড়াশিকে সস্ত্রীক নেমন্তন্ন করে বসল, উপলক্ষ্য তো হাতেই মজুত, লোন অনুমোদন হওয়ার আনন্দ উদযাপন।

শনিবার সন্ধ্যে সাতটা। বিকাশের ফ্ল্যাটে উপস্থিত সস্ত্রীক রঞ্জন পাকড়াশি, এক্সেল মডিউলারের বড়কর্তা, বিকাশের ওপরওয়ালা। বসের আতিথেয়তায় বিকাশ কোন খামতি রাখেনি। বসের স্ত্রী বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসেন জেনে নামকরা দোকানের মাটন বিরিয়ানির সাথে চিকেন চাপ, দুরকমের ডেজার্ট, ভীমনাগের সন্দেশ আর নানারকমের স্টার্টারের ঢালাও বন্দোবস্ত হয়েছে। তরল পানীয়ের মধ্যে শ্যাম্পেন হুইস্কি আলাদা ভাবে রাখা আছে, পাকড়াশি সাহেবের অবশ্য খাদ্যের চেয়ে পানিয়েই ঝোঁক বেশী দেখা গেল। রাত যেমন গড়াতে লাগল, আড্ডার গতিপ্রকৃতিও ভিন্নরূপ নিতে শুরু করল। পাকড়াশি ইতিমধ্যে কয়েক পেগ গলা দিয়ে ঢেলে দিয়েছেন কাজে কাজেই খানিক প্রগলভ হয়ে পড়েছেন। পাকড়াশি গিন্নি ব্রেক চেপার সামান্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কর্তা তাতে জল ঢেলে দিয়েছে –আরও রাখো তো গাড়ি তো ড্রাইভারে চালাবে আমরা একটু মাতাল হলেই বা কি এসে গেল। বিকাশ এতক্ষণ যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবার যেন সেটা সামনে দেখতে পেল। দেয়ালে ঝোলানো পটের দিকে পাকড়াশির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল –স্যার ওই পটচিত্রটা দেখেছেন, পাকড়াশি ঘোলাটে চোখে সেদিকে চেয়ে বলল –ওটা আবার কিহে? আদিবাসীদের কিছু আর্টপিস নাকি? বিকাশ হেসে বলল –ওটা যুধিষ্ঠিরের পাশা খেলার একটি পটচিত্র, যাইহোক আজ এই আনন্দের দিনে আমারও একটু গ্যাম্বল করতে ইচ্ছে করছে, যদি স্যার আপনার আপত্তি না থাকে। পাকড়াশি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন –বেশ তো হোক না, আমিও অনেকদিন পোকার খেলিনি, হয়েই যাক একটা দান। বিকাশ মুচকি হেসে বলল –ঠিক আছে স্যার তাহলে কতটাকার বাজি হবে? পাকড়াশি তাচ্ছিল্যে ভরা স্বরে বললেন–দেখো তোমার পকেটে কত আছে, তুমি যত লাগাবে আমিও ততোই ঢালব, প্রমিস্‌ করছি। বিকাশের ঠোটের কোনে যে হাসিটা খেলে গেল সেটা লক্ষ্য করার মতো অবস্থায় পাকড়াশি ছিলেন না, থাকলে হয়ত সতর্ক হবার সুযোগ পেতেন। পাকড়াশি গিন্নি মাঝখানে টুকে বললেন –বিকাশ ভেবেচিন্তে বেট করবে বলে দিলাম ওনার সঙ্গে গ্যাম্বল করে আজ পর্যন্ত কেউ কিন্তু জেতে নি। বিকাশ হাসতে হাসতে বলল–তাহলে তো খেলাটা জমবে ম্যাডাম, আর আমিও নাহয় একটু বেশী করেই বাজি ধরব। ইতিমধ্যে বিকাশ বেডরুমের ভিতর থেকে একটা ছোট হ্যান্ডব্যাগ এনে হাজির করেছে, ব্যাগের চেন টেনে খুলে গোছা গোছা দুহাজার টাকার নোট বের করে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখতে শুরু করল। একসময় নোটের দুটো সমান্তরাল লাইন তৈরি করে বিকাশ বলল –গুণে দেখুন স্যার পুরো ছলাখ আছে, এটাই আমার আজকের বেট। পাকড়াশিরা এতক্ষণ বিকাশের কাণ্ডকারখানা বিস্ফারিত দৃষ্টে দেখছিলেন এবার দুজনে একসঙ্গে বললেন –মানে? পাকড়াশি গিন্নি তেমন নেশা করেননি, তিনিই প্রথম মুখ খুললেন–বিকাশ তুমি খেপেছ? কেয়া তোমার হাসব্যান্ডের কি মাথা খারাপ হল নাকি নেশা চড়ে গেছে! কেয়া ছদ্মরাগ দেখিয়ে বলল –তাইত বিকাশ তুমি কি ক্ষেপে গেলে নাকি? বিকাশ সোফায় গা এলিয়ে বসে বলল –আপনিই তো বললেন স্যার যতখুশি লাগাতে পারি, তাই লাগিয়ে দিলাম, তাছাড়া এক্ষুনি তো ম্যাডাম নিজের মুখেই বললেন আপনি কখনো হারেন নি তাহলে আর চিন্তা কীসের? পাকড়াশি গিন্নি চিৎকার করে বললেন –তুমি ক্ষেপে গেছ বলে তো আমরাও ক্ষেপে যাই নি। তোমার জুয়া তুমি একাই খেল, আমরা চললাম। পাকড়াশি হঠাৎ শান্ত স্বরে বললেন –যা করছ ভেবে চিন্তে করছ আশা করি। পাকড়াশি গিন্নি বিস্মিত কণ্ঠে বললেন –তোমার কি এতো নেশা হয়ে গেছে যে ওকে মাথায় তুলছ। পাকড়াশি শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন –তেমন নেশাও হয়নি, তুমি তো জানোই আজ পর্যন্ত জুয়ায় আমাকে কেউ হারাতে পারেনি, আমি নিজেই ওসব খেলা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তবে আজকে মনে হচ্ছে শেষ একবার খেলা যেতেই পারে। পাকড়াশি এবার বিকাশের দিকে ফিরে বললেন –ছলাখ ক্যাশ আমার কাছে এইমুহুর্তে নেই তবে গাড়িতে চেকবই আছে, যদি রাজি থাকো তাহলে চেকে সই করে দিতে পারি। বিকাশের ঠোঁটের কোনে যুদ্ধজয়ের হাঁসি ফুটে উঠল, বলল –অন্য কেউ হলে রাজি হতাম না, অবশ্য আপনার কথা আলাদা, আসুন স্যার তবে গেমটা শুরু করা যাক।

পাকড়াশির কাছ থেকে ছলাখ আদায় করার পর প্রায় একমাস কাটতে চলল। তিনটে জ্যাকপটের মধ্যে দুটো খরচ হয়ে গেছে, তাও মোটে সাত লাখ টাকার বিনিময়ে, কি হয় আজকের যুগে ওই সাত লাখে! অথচ একটু বুদ্ধি খাটালে হয়ত আজকে কোটি টাকার মালিক হওয়াও কিছু অসম্ভব হত না, বিকাশের মনোবেদনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। শেষ দানটা বিকাশ কিছুতেই নষ্ট হতে দিতে চায় না, প্রয়োজন হলে ফ্ল্যাট বিক্রি করে বাজি লাগাতেও বিকাশ পিছপা হবে না, তবে সব কিছু যোগ করেও যতটা অর্থ সংগ্রহ হবে তা লাগিয়ে কোটিপতি হবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে না। প্রবল দুশ্চিন্তায় বিকাশের রাতের ঘুম অবধি নষ্ট হতে বসল। এদিকে কর্মস্থান আর বাসস্থান দুদিকেই নতুন সমস্যার উৎপত্তি হয়েছে। বাজি হারার জ্বালা পাকড়াশি ভুলতে পারছে না, কথায় কথায় বিকাশের কাজের খুঁত ধরে অপদস্ত করাটা এখন পাকড়াশির রুটিনে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগে বিকাশের কাজে গাফিলতির অভিযোগ এনে হেড-অফিস থেকে শো-কজের নোটিশ হাজির হয়েছে, বিকাশ ভালোই জানে এর পিছনে কলকাঠি নেড়েছে আর কেউ না, তার কাছে জুয়ায় টাকা খোয়ানো ওই রঞ্জন পাকড়াশি। বিকাশ অবশ্য শো-কজ নিয়ে ভাবিত নয়, যা হোক একটা উত্তর দিয়ে দিলেই হবে, আর কি এসে গেল ওই তুচ্ছ চাকরির থাকা না থাকায়! বিকাশের মন প্রাণ শুধু একটা কেন্দ্রবিন্দুতেই নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে, জুয়ার তিন নম্বর বাজিতে।

জুন মাসের মাঝামাঝি। আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। কেয়ার বিকেলের দিকে ক্লাশ টুর দুটো বাচ্চাকে পড়াতে যাবার কথা কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে আর বাড়ির বাইরে পা রাখতে মন চাইছে না, ফোন করে একটা অজুহাত দেখিয়ে টিভির রিমোট হাতে বসে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল, এমন সময় দরজায় খুট করে একটা শব্দ হল। বিকাশ এসেছে। কেয়াকে দেখে খানিক অবাক হয়ে বিকাশ বলল–টিউশনি যাওনি? কেয়া হাসল –ধুস্‌ গেলে তোমার দশা হত! বিকাশ আগাপাস্তলা ভিজে এসেছে, গায়ের বর্ষাতিটা খুলতে খুলতে বলল –সে ভালোই করেছ যা দুর্যোগ। বিকাশ বাথরুমের দিকে ভিজে জামাকাপড় পাল্টাবার জন্য চলে গেল আর কেয়াও সেই ফাঁকে কিচেনে গেল দুকাপ চা তৈরি করে নিয়ে আসতে।

চা খেতে খেতে বিকাশ খোলা জানালা দিয়ে চেয়ে দেখল। হাওয়ার বেগ আর বৃষ্টির দাপটে সামনের ডুমুর গাছটা তখন প্রবলভাবে দুলছে। জুত করে একটা গোল্ডফ্লেক ধরিয়ে বিকাশ একটা লম্বা টান দিয়ে কেয়ার দিকে চাইল, ও তখন রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেল পাল্টে পাল্টে মনের মতো প্রোগ্রাম খুঁজে চলেছে। বিকাশ বলল –আজকে শুনলাম মল্লিকদের বাড়িটা প্রোমোটারে নিচ্ছে। কেয়া টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বলল–কে মল্লিক?–ওই যে তুমি বাচ্চা-দুটোকে পড়াতে যাও না, গীতাঞ্জলী পার্কে তার পাশে অত বড় বাড়িটা তোমার চোখে পরেনি? কেয়া বিশেষ উৎসাহ না দেখিয়ে বলল –ও।

-পুরো সাত কাঠা জায়গা আছে, শুনলাম নাকি সাড়ে তিন কোটিতে যাচ্ছে। কেয়ার যেন হঠাৎ কিছু মনে পরে গেল, এমনভাবে বল–একদিক দিয়ে ভালোই হচ্ছে, ওই বাড়ির লোকটা রকে বসে বসে মেয়ে দেখে, এমন নির্লজ্জের মতো চেয়ে থাকে যে ওর সামনে দিয়ে যেতেও গা ঘিনঘিন করে। বিকাশ একমুহুর্ত চুপ করে রইল তারপর বলল –কাল বিকেলে ওকে আমাদের ফ্ল্যাটে নেমন্তন্ন করেছি।কেয়া হাতের রিমোট ছুড়ে ফেলে সোজা হয়ে বসল, উত্তেজিত স্বরে বলল –মানে!

বিকাশ ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিল –মানে একটাই, ওই সাড়ে তিন কোটির বাড়িটা আমার চাই! -তাই বলে ওই ফালতু লোকটাকে এনে ঘরে ঢোকাবে? কেয়ার গলায় যুগপৎ বিস্ময় আর বিরক্তি ফুটে উঠল। বিকাশ কেয়াকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল –দুটো বাজি জিতে আমরা পেয়েছি মোট সাত লাখ, এই টাকায় আজকাল কিছু হয়? তাছাড়া পাকড়াশী যেভাবে পিছনে লেগেছে, চাকরি আর বেশিদিন থাকবে না, এই শেষ দাও-টা যদি ঠিক ঠাক লাগাতে না পারি তাহলে কিন্তু আমরা ফিনিশ, ভেবে দেখো ওই টাকায় আমাদের জীবনটাই পালটে যেতে পারে। আর এই রথতলায় থাকার কোন প্রশ্নই নেই, এখানকার পাট চুকিয়ে আমরা নিউটাউন রাজারহাটে চলে যাব যেখানে আমাদের কেউ চেনে না। কেয়া বিকাশের কথা শুনছিল, এবারে বলল –ঠিক আছে কিন্তু বিনিময়ে তুমি বাজিতে কি লাগাবে? বিকাশ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল–কেন এই ফ্ল্যাটটা? কেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –লোকটা যখন আসবে তখন কিন্তু আমি বাড়িতে থাকব না। বিকাশ সামান্য হেসে বলল –তাতে কোন অসুবিধা নেই?

বিকাশের পরবর্তি টার্গেট! মল্লিকবাড়ির কর্তা বরেন মল্লিক, বয়স বছর পঞ্চাশ। ভদ্রলোক ডালহৌসির একটা মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টারে সামান্য মাইনের চাকরি করেন, বিয়েও করেছিলেন, বউ টেকেনি, প্রেমিকের হাত ধরে বরেনকে কলা দেখিয়েছে, সেই থেকে বরেন আর ও চৌকাঠ মারায়নি। সংসার বলতে শুধু বুড়ি পিসি আর সে নিজে। বরেনের জীবনের একমাত্র আশা ভরসা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এই বসতবাড়িটা, যেটা আবার দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর শরিকি মামলার গেঁড়োয় আটকে থাকার পর মাত্র কিছুদিন আগে কোর্টের রায় বেরিয়েছে, বরেনের স্বপক্ষে। ভাগ্য পরিবর্তনের সাথে সাথে বরেন মল্লিকের অবদমিত ইচ্ছেগুলো ফের ডানা মেলতে শুরু করেছে। পাড়ার মধ্যেই অল্পবয়েসি মেয়ে-বউ গুলো যে এতো সুন্দর বরেনের যেন আগে সেটা চোখেই পরেনি।

পরদিন বৃহস্পতিবার, কেয়ার টিউশনি নেই কিন্তু বরেন মল্লিককে এড়াবার জন্য সে আগেভাগে তার এক বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে আড্ডায় মেতেছে, অতিথি বিদায় হলে পর যথাসময়ে আসবে। তাতে অবশ্য বিকাশ বিশেষ ভাবিত নয়, সে অতিথি আপ্যায়নের সবরকম ব্যাবস্থাই করে রেখেছে, পাড়ার দোকান থেকে ফিশফ্রাই কাটলেট এনে মজুত করেছে আর চা তৈরি করাটা কি আর শক্ত কাজ সেটা বিকাশ ভালোই পারে। বিকাশ ঘনঘন ঘড়ি দেখছে ছটা বাজতে আর বেশী দেরি নেই, এদিকে বৃষ্টিরও বিরাম নেই, শেষ অব্দি মল্লিক যদি না আসে তাহলে সবই অর্থহীন। হঠাৎ মিষ্টি সুরে কলিং বেলটা বেজে উঠে বিকাশকে নিশ্চিন্ত করল। দরজার ওপারে দাড়িয়ে বরেন মল্লিক। সাদর অভ্যর্থনা করে মল্লিককে বসিয়ে বিকাশ কিচেনে গেল চা করতে। বরেন মল্লিক উচ্চকণ্ঠে হাঁক পারল –বিকাশভাই বৌদিকে বল চায়ে চিনি কম দিতে। বিকাশ মনে মনে বিরক্ত হল, এর মধ্যে আবার বৌদিকে টানা কেন হে?

বরেন মল্লিক চায়ে চুমুক দিতে দিতে এদিক ওদিক চাইছে, আড্ডায় যেন তার মনই নেই, বিকাশ লোকটার ওপর কড়া নজর রেখে চলেছে, ওর চোখ যে কি খুঁজছে সেটা না বোঝার মতো কাঁচা ছেলে সে নয়? বিকাশ, মল্লিককে খুশি করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে কাটলেটের প্লেট এগিয়ে দিতে মল্লিক একটা তুলে কামড় বসিয়ে বলল –বৌদিকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

-ওর টিউশনি আছে একটু বেড়িয়েছে।

-পরে ফিরবে তো তাহলে নাহয় দেখা করেই যাব।

-উঁহু আজকে আর ফিরবে না, ওখান থেকে সোজা বাপের বাড়ি চলে যাবে। মল্লিক যেন হঠাৎ কথা বলার উৎসাহ হারিয়ে ফেলল, মিনিট পাঁচেক বিকাশের কথা শুনে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে বলল –তাহলে এবারে ওঠা যাক কি বল, এরপর বৃষ্টি আরও বাড়লে মুশকিল হবে। বিকাশের নিজেরও আর ভালো লাগছে না এই লোকটার সঙ্গ, সে শুধু একটা সুযোগ খুজছিল এবারে আর ভনিতা না করে সোজাসুজি প্রসঙ্গে চলে এলো –বরেনদা একটা জিনিস হাতে এসেছে, আপনাকে না দেখিয়ে পারছি না, বরেন মল্লিক তেমন আগ্রহ না দেখিয়ে বলল –কি জিনিস ভাই? -আপনি একমিনিট বসুন, আমি আসছি। বিকাশ উঠে যেতেই বরেনও উঠে দাড়িয়েছে বিদায় নেবার জন্য, বিকাশ প্রায় তখুনি ফিরত এলো হাতে একটা চৌকো কাঠের বাক্স মল্লিকের সামনে ধরে বলল –এবারে একটু মন দিয়ে দেখুন। মল্লিক কয়েকটা মুহুর্ত পটের দিকে চেয়ে বলল –এটা আবার কি জিনিস? বিকাশের মল্লিকের শিক্ষা-রুচির ওপর তিলমাত্র ভরসাও নেই, সে ভালোই জানে এই পটচিত্রের মূল্যায়ন মল্লিকের দ্বারা হবে না, যদিও বিকাশের কাজ হয়ে গেছে সে পটটা সাবধানে টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে বলল –জুয়া খেলার একটা ছবি, অনেক যুগ আগে এটা তৈরি হয়েছে, ওই পটের দিকে চেয়ে দেখুন ওরা কেমন জুয়া খেলছে, আমার তো ইচ্ছে করছে ওদের মতো খেলতা আসুন একহাত হয়ে যাক। মল্লিক হালকা চালে বলল –চল তাহলে একশো টাকার একটা বাজি লড়া যাক, যে জিতবে টাকা তার।

বিকাশ হাসল –উঁহু একশো টাকার জন্য নয়, আসুন আমরা আরও বড় কিছু পাবার জন্য খেলি। -আমার কাছে এখন শদুয়েকের বেশি নেই। বিকাশ বরেন মল্লিকের কাঁধ চেপে সোফায় বসিয়ে দিল বলল –আমার কথা একটু মন দিয়ে শুনুন দাদা, আমি বড় কিছু ভাবছি যাতে আমারও লাভ হবে আর আপনারও। আমি ভাবছি আপনার ওই সাত কাঠার বাড়িটার কথা আর আমি ভাবছি আমার এই ফ্ল্যাট-টারও কথা যে জিতবে সে নিয়ে নিক। এবার হঠাৎ বরেন মল্লিকের মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বেড়িয়ে এলো আর তার অসতর্ক হাতের ঠেলায় টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপটা উল্টে মেঝেতে একরাশ চা ছড়িয়ে পরল।

বরেন মল্লিক ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় নিল। মেঝেতে চোখ রেখে সে যেন নিজের মনে কিসব বিড়বিড় করে বলে চলছিল, বিকাশ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোয়ার রিং ছাড়ল, এই পুরো সময়টা সে বরেন মল্লিকের ওপর থেকে নজর সরায়নি, আগের দুবারের অভিজ্ঞতা থেকে বিকাশ দেখেছে শিকার বশ হতে কিছুটা সময় নেয় এবারেও সেই একই জিনিস ঘটছে। একটু পরে বরেন মল্লিক মুখ তুলে বলল–আমি রাজি, কিন্তু তুমি বাজিতে কি লাগাবে? বিকাশ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল –সিম্পল ব্যাপার বাড়ির বদলে বাড়ি, আমার এই ফ্ল্যাট। -তোমার এই ফ্ল্যাটের সাইজটা কি জানতে পারি?–সাতশো স্কোয়ার ফুট-এর বাজার দর কত হবে তোমার মনে হয়? বিকাশ এই প্রথম হোঁচট খেল, এর আগে এরকম প্রশ্নের সম্মুখিন তাকে হতে হয়নি। সংকোচের সঙ্গে উত্তর দিল –তা প্রায় বাইশ লাখ হবে। বরেন মল্লিক ততোক্ষণে পকেট থেকে মোবাইল বের করে হিসেব নিকেশ করতে শুরু করে দিয়েছে, সামান্য পরে বিকাশের দিকে চেয়ে বলল –উঁহু সবমিলিয়ে আঠার লাখের বেশি নয়, সরি ভাই, আমার সাড়ে তিন কোটির বাড়ির বিনিময়ে তোমার আঠার লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। বরেন মল্লিক উঠে পড়েছিল বিকাশ তাড়াতাড়ি বলল –আমার কাছে সাত লাখ নগদ রয়েছে, ওটাও লাগিয়ে দেব।

-তাহলেও পঁচিশ লাখের বেশি হচ্ছে না, এর জন্য আমি ঝুঁকি নিতে পারব না। বিকাশ মুহ্যমানের মতো বরেন মল্লিকের চলে যাওয়া দেখছিল, এই প্রথম যুধিষ্ঠিরের পট কাজে এলো না, তবে কি এর যাদু শেষ হয়ে গেল! চৌকাঠ ডিঙাতে গিয়ে হঠাৎ বরেন মল্লিক থমকে দাঁড়াল, বিকাশের দিকে ফিরে বলল –অবশ্য এখনো জুয়া খেলা যেতে পারে, তবে আমার বাড়ির বদলে তোমার এই ছোট ফ্ল্যাট বা টাকা নয়, যদি তুমি এমন কিছু বাজি রাখো যেটা আমার বিশেষ প্রয়োজন! বিকাশ বিভ্রান্তের মতো চেয়ে বলল –তেমন কিছু কি আছে আমার কাছে? বরেন মল্লিক সোজাসুজি বিকাশের চোখে চোখ রেখে বলল–কোটি টাকার জিনিস আছে হে, তোমার সুন্দরী বউ! এক মুহুর্তের মধ্যে বিকাশের শরিরের সব রক্ত গিয়ে যেন মাথায় জড়ো হল, ঘুষি মেরে বরেন মল্লিকের নাকটা ফাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটাকে দমন করলেও গলার আওয়াজটাকে সংযমে রাখতে পারল না, প্রচণ্ড চিৎকার করে বলল –শুয়োরের বাচ্চা বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।

পরের কয়েকদিন অনেকগুলো ঘটনা পরপর ঘটে গেল। প্রথমে তো বিকাশ কেয়াকে কিছুতেই বলে উঠতে পারেনি, কেন বরেন মল্লিকের সঙ্গে জুয়া খেলা যাবে না। সে ভেবেছিল কেয়া এমন একটা কুৎসিত প্রস্তাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাবে, বিকাশ যে কেন মল্লিকের গালে শক্ত হাতে চড় কষায়নি সে কৈফিয়তও নিশ্চয়ই চাইবে। বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটল না। কেয়া সব শুনেটুনে ঠাণ্ডা মাথায় বলল –লোকটা যত পার্ভার্ট ততটাই আহাম্মক দেখছি।

-মানে? কেয়া রহস্যভরা হাসি হেসে বলল –যদি তুমি জেতো তাহলে ওই বাড়ি আমাদের, আর বাইচান্স হেরেও গেলে, লোকটা কি করে নেবে? স্বাধিন দেশে মেয়েরা কি জুয়ায় লাগাবার জিনিস নাকি? লোকটাকে পুলিস দিয়ে এমন ধোলাই খাওয়াব যে ওর সব রস বেরিয়ে যাবে। বিকাশ স্ত্রীর পরামর্শে উৎফুল্ল হয়ে উঠল –তাইত! এভাবে ভাবলে তো এই বাজিটায় ঝুঁকি কিছুই থাকছে না। বিকাশ আর দেরি করল না, অবিলম্বে বরেন মল্লিকের কাছে খবর গেল, বিকাশ জুয়ার শর্তে রাজি।

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল বরেন মল্লিক একজন পোড় খাওয়া ধুরন্দর ব্যাক্তি। তার কাছ থেকে ফিরতি প্রস্তাব এলো স্বয়ং কেয়াকে ষ্ট্যাম্প পেপারে হলফনামা দিতে হবে যে জুয়ার শর্তে তার কোন আপত্তি নেই এবং তার স্বামি হেরে গেলে তাকে বাকি জীবন স্বেচ্ছায় বরেন মল্লিককে সঙ্গ দিয়ে যেতে হবে, শুধু তাই নয় এই হলফনামা এবং পুরো ঘটনার সাক্ষী রইবেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী যাতে পরে বিকাশ বা কেয়া কেউ এই ব্যাবস্থাকে অস্বীকার করতে না পারে। এবারে বিকাশের হঠাৎ ভয় হতে শুরু করল। আগের দুটো বাজি জিতেও বিশেষ লাভ কিছু হয়নি, কিছু টাকা হয়ত হাতে এসেছে কিন্তু পরিনামে জুটেছে পাড়ায় দুর্নাম এবং কর্মক্ষেত্রে বিড়ম্বনা, শেষ বাজিতে কি তবে জীবনের ধারাটাই পাল্টে যাবে। কেয়া সব শুনেছে আর তার পর থেকেই কেমন যেন গুম হয়ে গেছে, বিকাশেরও আর কিছুই ভালো লাগছে না মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে ওই পট-চিত্রটা হাতে না এলেই বোধহয় ভালো হত।

বিকাশের চাকরিটা গেল। শোকজের যথোপযুক্ত উত্তর না পেয়ে ম্যানেজমেন্ট তাকে বরখাস্ত করতে বেশি চিন্তাভাবনা করেনি, বিকাশ নিজের তরফ থেকে কর্তাদের বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হবে যে না সেটা অবশ্য বিকাশের জানাই ছিল, পাকড়াশী তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। উদ্বেগ আর হতাশায় বিকাশ দুপুর বারোটার মধ্যেই ফ্ল্যাটের নিভৃতে আশ্রয় নিয়েছে। এই সময় কেয়া স্কুলে থাকে, একদিক দিয়ে ভালো! বিকাশ এখন কিছুক্ষণ একাই থাকতে চাইছে। বিকেল তিনটে নাগাদ ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে খুলে গেল, কেয়া এসেছে। কেয়ার শরিরি ভাষা থেকে স্পষ্ট যে সে ভয়ানক উত্তেজিত, এতোটাই যে অসময়ে বিকাশকে দেখে তার যে কৌতূহল জাগার কথা সেটাও লোপ পেয়েছে। কেয়া এক এক করে হাতের ব্যাগ, জলের বোতল, ছাতা সব বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলতে ফেলতে গজগজ করতে শুরু করেছে, বিকাশ জিজ্ঞাসু দৃষ্টে চাইতে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল –ওই শয়তান লোকটা এখানে সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে তুমি আমাকে ওর সাথে জুয়ার বাজিতে চড়াচ্ছিলে, পাড়ার ফালতু ছেলেগুলো আমাকে দেখলে আজকাল টিটকিরি দিচ্ছে আর বুড়ো গুলো অবধি এমন চোখে তাকাচ্ছে যেন আমি কোন প্রস্টিটিউট। বিকাশ সহমর্মিতায় স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখল, কেয়ার মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছে, বলল –বিকাশ এপাড়ায় আর থাকা যাবে না, চল আমরা অন্য কোথাও চলে যাই। বিকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –আমিও তাই ভাবছি। এতক্ষণে কেয়ার যেন হুঁশ ফিরল সে অবাক স্বরে জানতে চাইল –তুমি এসময় বাড়িতে? বিকাশ জোর করে মুখে একটা হাসি ফোটাবার চেষ্টা করে বলল –চাকরিটা গেছে।

সেরাত্রে আর কারও চোখে ঘুম এলো না। বিকাশ আর কেয়া দুজনেই বুঝতে পারছিল এভাবে মাঝপথে ঝুলে থাকা আর সম্ভব নয়, মাঝদরিয়ায় নৌকো নিয়ে বসে থাকলে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচা যায় না। ঘড়িতে প্রায় চারটে বাজে, বিকাশ জানে তার স্ত্রীর চোখ থেকেও ঘুম উড়ে গেছে, শুধুমাত্র ঘুমাবার অভিনয় করে চলেছে, বিছানার ওপর সোজা হয়ে বসে বিকাশ মৃদুস্বরে বলল – ঘুমালে নাকি?–‘উঁহু’। কেয়া বিষণ্ণ স্বরে উত্তর দিল। বিকাশ বলল –‘ভাবছি পট-টাকে ভেঙ্গে ডাস্টবিনে ফেলে দেব’।কেয়া উঠে বসেছে, স্বাভাবিক স্বরে বলল –‘তারপর’। -‘তারপর আমরা এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাব’। কেয়া হাসল শ্লেষ মেশানো তীক্ষ্ণ হাসি, বলল –‘আর হয়না বিকাশ, আমাকে একটা স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইলের স্বপ্ন দেখিয়ে তুমি পিছিয়ে আসতে পারো না, তাছাড়া তোমার এতো ভয়ই বা কীসের? আগের দুটো বাজি তো তুমি জিতেছ! -‘কিন্তু এবার যদি অন্যরকম কিছু হয়’? কেয়া বেডসুইচ টিপে টেবলল্যাম্প জ্বালিয়ে দিল, হালকা নরম আলো এসে পরল কেয়ার সুন্দর মুখের ওপর, সেদিকে তাকিয়ে বিকাশ চমকে উঠল। আলো আধারির খেলার মধ্যে নিজের স্ত্রীকে হঠাৎ অদ্ভুতভাবে অপরিচিত লাগতে শুরু করেছে। কেয়ার কণ্ঠস্বর যেন ভেসে এলো অনেকদুর থেকে –‘এখন আর পিছোতে পারো না বিকাশ, এই বাজি তোমাকে লড়তে হবেই’।

বিকাশের ফ্ল্যাটে মুখোমুখি বসেছে বিকাশ আর বরেন মল্লিক। দুজনের মাঝে টিপয়ে তাসের গোছ সাজানো রয়েছে, তাসের ভাগ বাটোয়ারা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, দুই জুয়াড়িকে গোল করে ঘিরে রেখেছে দুজন সাক্ষী, বরেন মল্লিকের সঙ্গী দুই আইনজীবী আর আছে কেয়া, বিকাশ আড়চোখে বরেনকে লোভী দৃষ্টে কেয়াকে জরিপ করতে দেখেছে, আর মনে মনে কল্পনা করছে বাড়িটা হাতে এলে পর বরেনকে হিড়হিড় করে কিভাবে টেনে বের করবে। বাজি শুরু হল, প্রথম দান অবশ্য বিকাশই দিল, হরতনের সাত, বরেন হাতে ধরা তাস থেকে একটা বেছে নিয়ে টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলল ইস্কাবনের নয়, বরেনের হাতে কি তাস পড়েছে সেটা বিকাশের জানার কথা নয়, সে জানেও না কিন্তু নিজের হাতে যে তাসের গোছা আছে সেটা বিকাশকে খুব স্বস্তি দিচ্ছে না, একমুহুর্ত সময় নিয়ে বিকাশ পরের চাল ফেলল, রুইতনের গোলাম। বরেন তীক্ষ্ণদৃষ্টে বিকাশের চালের দিকে নজর রাখছিল এবারে বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে নিজের দ্বিতীয় চাল চেলে দিল এবং যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গেই, চিরিতনের বিবি, বিকাশের এবার ভয় করতে শুরু করেছে, এই শীতের বিকেলেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে, বরেন মল্লিককে এতো আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে কেন? বিকাশ হাতের তাস টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়াল। ঘরে উপস্থিত সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চাইল, বিকাশ গলা খাকড়ে বলল –‘আসলে ব্যাপারটা বে-আইনি হয়ে যাচ্ছে, এভাবে জুয়া খেলা যায়না, উচিৎও নয়, আমি আর খেলব না’। বরেন হাঁহাঁ করে বলল –‘প্রস্তাব তো তুমিই করেছিলে এখন কি হল’? বিকাশ রুঢ় স্বরে বলল –‘তুই আমার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যা হারামি নাহলে লাথি মেরে তাড়াব’। বরেন পাল্টা চিৎকার করে বলল –‘নিজের বউকে জুয়ায় লাগায় যে হারামি হচ্ছে সেই’। বিকাশ প্রচণ্ড রাগে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু উকিল মাঝখানে হস্তক্ষেপ করে বললেন –‘এগ্রিমেন্টে সাইন করে তবে এই খেলার ব্যাবস্থা হয়েছে, এখন মাঝপথে এভাবে যদি আপনি কুইট করতে চান তাহলে সেটা আপনার বাজিতে হেরে যাওয়া বলে গণ্য হবে, সেক্ষেত্রে আপনার স্ত্রী বরেন মল্লিককে সঙ্গ দিতে বাধ্য হবেন, তার থেকে দানটা শেষ করলে ভালো হয়না’! বিকাশের ক্রোধাগ্নিতে যেন কেউ বরফজল ঢেলে দিল, ওভাবে এগ্রিমেন্টে সই করাটা যে গর্দভের মতো কাজ হয়ে গেছে সেটা অনুধাবন করে বিকাশের নিজের গালেই এবারে চড় কষাতে ইচ্ছে করছে। বিকাশকে কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের মতো বসে থাকতে দেখে অ্যাডভোকেট ব্যানার্জী বললেন –‘আপনার চালটা শেষ করুন বিকাশবাবু’। কাঁপা কাঁপা হাতে বিকাশ নিজের তাস টেবিলের ওপর ফেলে দিল, চিড়িতনের দশ নম্বর, টেবিলের উল্টোদিকে বরেনের মুখে একটা কুটিল হাসির রেখা ফুটে উঠল, ক্রমশ হাঁসিটা চওড়া হয়ে উঠল, বরেন চিড়িতনের রাজাকে টেবিলের ওপর ফেলে পৈশাচিক ভাবে হেসে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে বিকট স্বরে আর্তনাদ করে চেয়ার উল্টে বিকাশ মেঝেতে গড়িয়ে পরল।

গত তিনটে সপ্তাহ বিকাশের জীবনের সবথেকে দুর্যোগপুর্ন কেটেছে, প্রথম যেদিন বরেন কেয়ার সঙ্গে রাত কাটিয়েছিল, বিকাশ জীবন্মৃতের মতো শুধু দেখে গেছে, ইচ্ছে হয়েছিল টুটি চিপে লোকটাকে খুন করে ফেলে, কিন্তু সাহস যোগার করতে পারেনি, কেয়াকে নিয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা মনের কোথাও এখনও লুকিয়ে রয়েছে, কেয়া প্রথম রাতের পর ভেঙ্গে পড়েছিল, কিন্তু ইদানীং একটা পরিবর্তন তার মধ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বরেন মল্লিকের মহার্ঘ উপহার গুলো গ্রহণ করতে এখন ওর বোধহয় তেমন অসুবিধে হচ্ছে না। বিকাশ কেয়াকে নিষেধ করতে চেয়েছিল কিন্তু ওর বিশ্রী কটূক্তি শুনে আর কিছু বলে উঠতে পারেনি, আজকাল পাড়ায় হাটতে গেলেও নানারকম ব্যাঙ্গোক্তি শুনতে হচ্ছে পাড়ার ভদ্রলোকেরা বিকাশের সঙ্গে একপ্রকার কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে, অবশ্য বিকাশেরও আর কারও সঙ্গে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কেয়া আজকাল স্কুলের পরে আর সোজা বাড়ি আসেনা, অনেক রাতে ফেরে, বিকাশ সব খবরই পায়, বরেন মল্লিক কেয়ার শখ মেটাতে কোনরকম খামতি রাখছে না, প্রোমোটারের কাছ থেকে পাওয়া টাকা দেদার ঢালছে শাড়ি গয়না রেস্টুরেন্টের বিল মেটাতে। বিকাশ অনেক ভেবেছে, ভেবে রাস্তা খুঁজে বের করেছে, সমস্যার সমাধান এবার সে করেই ছাড়বে। রাত নটা নাগাদ কেয়া বাড়ি ফিরল, বরেন মল্লিক ট্যাক্সি করে ছেড়ে দিয়েছে, বিকাশ আর অপেক্ষা করল না ব্রিফকেস হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পরল, কেয়া দেখেও যেন দেখল না। বরেন মল্লিকের বাড়ি যেতে পায়ে হেটে দশ মিনিটের মতো লাগল, বিকাশ যখন গিয়ে হাজির হল বরেন মল্লিক তখন মেজাজে বোতল খুলে বসেছে। বিকাশকে দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল –‘এখানে কি চাই’? বিকাশ সংযতকণ্ঠে বলল –‘তোর সাথে আর একবার জুয়ায় বাজি ধরতে চাই’। বরেন মল্লিক শেয়ালের মতো খ্যাঁক করে বলল–‘বাজি লড়বি? তোর কাছে আছে কি যে লাগাবি’! –‘আমার ফ্ল্যাটটা এখনও আছে আর ব্যাংকে সাত লাখ টাকা, সব দিয়ে দেব তবে হেরে গেলে তুই জীবনে কেয়ার ছায়া আর মাড়াবি না আর এই শহর থেকেও চিরদিনের মতো বিদায় হবি, কথা দিতে হবে’। বরেন যেন হাত নেড়ে বিকাশের কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল –‘তোর বউ যা সুখ আমাকে দিচ্ছে তার কাছে অন্য সব কিছু ফিকে, এবার তুই আমার কথা শোন, কেয়াকে ডিভোর্স দিয়ে দে, ওকে আমি বিয়ে করে নেব, আর তোকেও নাহয় কিছু পয়সা দিয়ে দেব’। বিকাশ অতিকষ্টে নিজেকে সংযত রেখে হাতের স্যুটকেসটা খুলে ফেলল, দ্রুতহাতে যুধিষ্ঠিরের পট-টাকে বরেনের মুখের সামনে তুলে ধরে বলল –‘এদিকে তাকিয়ে বলে দে তুই জুয়া খেলবি না’? বরেনের হাতে ধরা গ্লাস থেকে খানিকটা মদ ছলকে পড়ল। ভ্যাবাচাকা খেয়ে পটের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে বলল –‘এটা তো আগেও দেখেছি’। বিকাশ তাড়াতাড়ি পট বাক্সবন্দী করে বলল –‘এবার বল’? বরেন কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইল তারপর ধীরে ধীরে বলল –‘হোক তাহলে, তবে যেমনটা তুই চাচ্ছিস তেমনভাবে নয়, এখন যা, ভেবে চিন্তে খবর দেব’।

বরেন মল্লিক ঘাগু লোক, আগেও একবার বিকাশ তার প্রমান পেয়েছে, তাই এবারে যখন শর্তের লিস্ট হাতে এলো বিশেষ অবাক হল না, তবে কপালে চিন্তার রেখাগুলো আরও কিছুটা প্রকট হল। বিকাশের প্রস্তাবে বরেন রাজি তবে পরিবর্তে তার যে শর্তগুলো রয়েছে মেনে নিলে বিকাশের চিতার কাঠের অর্ডার দেবার সময় উপস্থিত হবে।মল্লিক এবার বিকাশকে ঘটি-বাটি সমেত উচ্ছেদ করার মতলব এটেছে। জুয়ায় হারলে বিকাশের ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা আর ফ্ল্যাট কেয়ার নামে লিখে বিবাহ-বিচ্ছেদের দস্তাবেজে সই করে কপর্দকশুন্য অবস্থায় বের হয়ে যেতে হবে। জিতলে অবশ্য মল্লিক চিরতরে বিকাশের জীবন থেকে বিদায় হতে বাধ্য থাকবে। বিকাশ একবার পটের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আগের বার এই পট তার সাথে বেইমানি করেছে, এবারে কি করবে? বিকাশ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল এবারে যদি হারতেই হয় তাহলে মল্লিকেরও জেতা হবে না। নির্দ্বিধায় চুক্তিপত্রে সই করে দিল বিকাশ।

আবার জুয়ার আসর বসেছে বিকাশের বসার ঘরে। থমথমে মুখে একে অপরের বিপরীতে বসে দুজন খেলোয়াড়। বরেন মল্লিক স্বভাবতই অপ্রসন্ন। কেয়ার সাহচর্যে আজকাল তার সময় বেশ ভালোই কাটছে, ফের জুয়ার ঝুঁকি নেওয়াটা তার মোটেই সুবিধের ঠেকছে না, আগের বার কপালগুনে জিতে গিয়ে মজা লোটার যে সুযোগটা ভাগ্য তার ঝুলিতে পড়ে পাওয়া ষোল আনার মতো তুলে দিয়েছে সেটা হঠকারীর মতো খুইয়ে ফেলার মতো আহাম্মকি আর কিছু হতে পারেনা, কিন্তু ওই ছোড়াটা যে কি ম্যাজিক করে কে জানে, বরেন বোকার মতো রাজি হয়ে আর এগ্রিমেন্টে সইসাবুদ করে এখন পস্তাচ্ছে। বিকাশ অবশ্য মল্লিকের মতো এতোটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ নয়, তার হারাবার আর বিশেষ কিছু নেই, আর যদি এই বাজি নেহাতই হারতে হয় তাহলে বিকাশের প্যান্টের পকেটে বিশেষ কায়দায় তিনভাজ করা একটা ধারালো ছুরি লুকানোই রয়েছে, বরেন মল্লিকের পাঁজরে ঢুকিয়ে দিয়ে পরাজয়ের গ্লানি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে সে! তারপরে যদি জেল খাটতেই হয় তবে তাতেও পিছপা হবে না বিকাশ।

আগের বারের মতোই দুজন ভাড়া করা উকিলের সামনে জুয়া পর্ব শুরু হল। খেলা চলল কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে বলা যেতে পারে বিকাশ তার ঝোলায় এসে পরা তিনটে সর্বশ্রেষ্ঠ তাস ফেলেও এর থেকে বেশি কিছু করতে পারল না। তাস তিনটে হল হরতনের দশ রুইতনের সাত আর চিড়িতনের ছয়, জবাবে বরেন মল্লিক ফেলল হরতনের রাজা ইস্কাবনের রানি আর চিড়িতনের টেক্কা। টিপয়-টাকে হাত দিয়ে ঠেলে মেঝের ওপর উল্টিয়ে মল্লিক হিংস্র উল্লাস করে উঠল, এতদিন বিনা বাধায় পরস্ত্রীর শরির ভোগ করলেও মনের মধ্যে উদ্বেগের একটা কাঁটা ফুটে তাকে শান্তি পেতে দ্যায়নি, সেটা এই বিকাশ ছোড়াটা, মার খাওয়া বিষাক্ত শাপ কোন সময় যে ছোবল মেরে বসবে সে আশংকায় মল্লিক যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় ছিল, কিন্তু আজকের পর আপদ বিদায় হবে, আর মল্লিকের কাজে বাঁধা দেবার মতো কেউ রইল না। মল্লিকের আনন্দোল্লাস অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না, বিকাশ উঠে দাঁড়িয়ে সোজা ওর থুতনিতে প্রচণ্ড বেগে ঘুষি চালিয়ে দিল, বরেন এমন আক্রমনের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না, দারুন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মল্লিকের কষ গড়িয়ে তাজা রক্তের স্রোত নেমে আসছে দেখে বিকাশের মাথায় খুন চেপে বসল, পকেট থেকে ছুরিটা বের করে বিকাশ ঝাঁপিয়ে পড়ল বরেন মল্লিকের বুকের ওপর।

ছুরিটা উঁচিয়ে ধরে বিকাশ সজোরে আঘাত হানল, মল্লিক দ্রুত ডানহাত এগিয়ে নিজের গলা বাচিয়ে নিতে পারলেও ছুরির ধারালো ফলাটা হাতের পাতার মধ্যে আড়াআড়ি ভাবে গেঁথে বসল, মল্লিক কানফাটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠল, বিকাশ পড়ল মুস্কিলে, অস্ত্রটা দিয়ে ফের আঘাত হানতে হলে প্রথমে সেটাকে হাত থেকে খুলে বের করা দরকার কিন্তু ছুরিটা অস্থিসন্ধির মধ্যে ঢুঁকে এমনভাবে আটকে গেছে যে কিছুতেই সেটা টেনে বের করা সম্ভবপর হচ্ছে না, বিকাশ প্রাণপণে ছুরির হাতল ধরে টানাটানি শুরু করতেই মল্লিকের দাপাদাপি আর আর্তনাদের মাত্রা একেবারে চরম পর্যায়ে পৌঁছল। আইনজীবী দুজন এতক্ষণ নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুই জুয়াড়ির লড়াই দেখছিলেন এবারে বিকাশকে অস্ত্রহীন বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, বেশি বেগ পেতে হলনা, কিছুটা বলপ্রয়োগ আর ধাক্কাধাক্কি করে বিকাশকে তার নিজের বাথরুমেই বন্দী করা গেল। তারপর উকিলবাবুরা চটপট দুটো ফোন করে নিজের দ্বায়িত্ব সারলেন, একইসাথে দুটো গাড়ি কসবার রথতলায় এসে হাজির হল, একটা অ্যামবুলেন্স বরেন মল্লিককে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। আর পুলিসের ভ্যানে কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে তোলা হল আসামী বিকাশকে।

নিজের সম্বন্দে নতুন একটা উপলদ্ধি ইদানীং বিকাশের হয়েছে, নিজেকে এতদিন যতোটা বেপরোয়া আর সাহসী সে ভেবে এসেছে কার্যক্ষেত্রে হৃদয়ঙ্গম করছে বাস্তবে তা-সে নয়। গত দেড়মাস যাবৎ প্রতিনিয়ত পুলিসের মার সহ্য করে আর জেল হাজতের ক্লেদাক্ত পরিবেশ তার আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদাবোধের কফিনে শেষ পেরেকটা পুতে দিয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে বিকাশের জেল হাজত হবার পর থেকে সে এখন একজন বিচারাধীন বন্দী। দমদম সেন্ট্রাল জেলের একটা দশ বাই আট সেল এইমুহূর্তে বিকাশের ঠাই হয়েছে। ওই একই সেল দাগী আসামী আমিনুলেরও আস্তানা। আমিনুল মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে একজন ব্যাবসাদারের হয়ে কাজকর্ম করে, অবশ্য সে ব্যাবসার পুরোটাই গোলমেলে, তাই মাঝে মধ্যেই পুলিসের লোকেরা তাকে তুলে এনে জেলে রেখে দ্যায়, কিছুদিন পর আবার বন্দোবস্ত হয়ে গেলে, ছাড়া পেতেও অসুবিধে হয়না, গত কয়েকবছর ধরে এমনটাই চলে আসছে, আমিনুলের সঙ্গে বিকাশের তেমন ঘনিষ্ঠতা না হলেও মোটামুটি কাজ চালিয়ে নেবার মতো একটা সখ্যতা তৈরি হয়েই গেছে। আমিনুলের অনেক কথাই বিকাশ শুনেছে আর নিজের ব্যাপারেও জানিয়েছে তবে যতোটা জানানো যেতে পারে ঠিক ততোটাই। এরমধ্যে প্রায় দুবার বিকাশকে আদালতে তোলা হয়েছে, জজসাহেব হয়ত জামিন মঞ্জুরও করে দিতেন তবে জামিনদারের অভাবে বিকাশকে প্রতিবার জেলেই ফেরত যেতে হয়েছে, বিকাশ আশা করেছিল কেয়া হয়ত তার এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াবে কিন্তু সে গুঁড়ে বালি! বিকাশের আজকাল মনে হচ্ছে কেয়া যেন ভুলেই গেছে তার জীবনে বিকাশ নামে কোন লোকের অস্তিত্ব কখনো ছিল।

বিকাশ একদিন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেল, বরেন মল্লিক কেস তুলে নিয়েছে বিনিময়ে বিকাশকে জুয়ার শর্ত মেনে বিচ্ছেদের দস্তাবেজে সই করার সাথে সাথে গচ্ছিত টাকা আর ফ্ল্যাট থেকেও হাত ঝেড়ে নিতে হয়েছে, কপর্দকশুন্য অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়ে বিকাশ অনুভব করল ফের একবার তাকে জীবন শুরু করতে হবে সম্পুর্ন নতুন ভাবে এবং খালি হাতে।

সুভাষগ্রামে বুড়ি পিসীর বাড়িতে এসে উঠল বিকাশ, এছাড়া অন্য কোথাও যাবার জায়গা তার নেই, বাবার মৃত্যুর পর এই পিসীর আশ্রয়ে অনেকগুলো বছর কাটিয়েছে বিকাশ, পিসীও বিকাশকে মায়ের স্নেহই দিয়ে এসেছেন বরাবর, আশা ছিল বিকাশও তাঁকে মায়ের মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করবে না কিন্তু কেয়ার এইসব উটকো ঝামেলা একেবারেই অপছন্দ ছিল, তাই বিকাশও এতবছর বুড়ির খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি, কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে তাই বিকাশ বাধ্য হয়েই মাথা নিচু করে পিসীর দরজার কড়া নারল। স্নেহ বড় বিষম বস্তু, বিকাশের ওপর জমে থাকা এতবছরের অভিমান আর বিতৃষ্ণা একমুহুর্তে গলে জল হয়ে গেল, বুড়ি হাসিমুখেই বিকাশকে গ্রহণ করল, তবে সব কথা শুনে এটা জানিয়ে দিতেও দেরি করলেন না যে বয়সের ভারে তিনি এখন আর আগের মতো সেলাইয়ের কাজ করতে পারেন না, সামান্য যেটুকু সঞ্চয় আছে তা ওষুধ আর দুমুঠো ডাল ভাতের পিছনেই ব্যয় হয়ে যায় অতএব দীর্ঘদিন থাকার পরিকল্পনা থাকলে বিকাশ যেন কিছু রোজগারের রাস্তা এখনি দেখে রাখে।

বিকাশ একটা ক্যুরিয়র সংস্থায় কাজ পেয়েছে, সারাদিন ঘুরে ঘুরে চিঠিপত্র, পার্সেল সব বিভিন্ন ঠিকানায় বিলি করা, কাজটায় পরিশ্রম যতই থাকুক না কেন মাইনে সে তুলনায় নিতান্তই কম। তবে মোটের ওপর বিকাশের তাতে চলে যাচ্ছে, বুড়ি পিসীর তো প্রয়োজন খুবই সামান্য আর বিকাশের নিজের শখ আহ্লাদ সব চুলোয় গেছে, বেঁচে থাকাটাই যেখানে মুখ্য অতিরিক্ত কিছুর আশা সেখানে বিলাসিতা।

সেদিন ডেলিভারির কাজ সেরে সন্ধ্যে নাগাদ ফিরতেই পিসী একটা ব্রাউন পেপারে মোরা প্যাকেট বিকাশের হাতে ধরিয়ে দিলেন, এটা আজ দুপুরে ডাকে এসেছে। সেন্ডারের নামের জায়গায় কেয়ার নাম দেখে উদগ্র কৌতূহলে বিকাশ খামটা ছিড়ে ফেলতেই ভিতর থেকে বের হয়ে এলো যুধিষ্ঠিরের জুয়া খেলার পট আর সেইসঙ্গে কেয়ার হাতে লেখা একটা চিরকুট। অপয়া পটটাকে আর নিজের জিম্মায় রাখতে চায়না কেয়া তাই যার জিনিস তাকেই ফেরত দেওয়া হল।পট হাতে ধপাস করে বিছানার ওপর বিকাশ বসে পড়ল। যে ভীষণ যন্ত্রণাকে মনের কোনে প্রতিনিয়ত পুতে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে সেটা যেন ফোয়ারার মতো ঠেলে উঠে বিকাশকে ভাসিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে ধাতস্থ হয়ে বিকাশ খামের দিকে নজর দিল, প্রেরকের ঠিকানা দেখাচ্ছে যোধপুর পার্ক, তবে কি কেয়া রথতলার ফ্ল্যাটে আর থাকেনা, বিষয়টা বিকাশকে ভাবিয়ে তুলল, অনেক চিন্তা ভাবনার পর বিকাশ অবশেষে একটা স্থির সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হল।

ঠিকানার সূত্র ধরে অবশ্য কেয়ার হদিশ বের করা খুব কঠিন হল না। পরের তিনটে দিন কাজ কামাই করে কয়েকটা দরকারি খবর বিকাশ সংগ্রহ করে ফেলল, বরেন মল্লিক রথতলার পাট চুকিয়ে কেয়াকে নিয়ে যোধপুর পার্কের অভিজাত এলাকায় সংসার জমিয়েছে, তবে বিয়ে করেনি, রক্ষিতা হিসেবেই রেখেছে, বাড়ি বিক্রির টাকায় বরেন এখন রীতিমতো বড়লোক, দামি গাড়ি কিনেছে, কিছু তোষামুদে বন্ধুও জুটেছে। বিকাশ সবই দেখল, বুঝল, মনের মধ্যে যে আগুনটা এতদিনে নিবু নিবু হয়ে জ্বলছিল সেটা ইন্ধন পেয়ে একেবারে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।

সেরাতটা বিকাশের চোখে আর ঘুম এলো না। জেগে জেগে ঘড়ির কাঁটার দিকে অস্থিরভাবে চেয়ে রইল, মনের মধ্যে যে ঝড় উঠেছে তা সহজে শান্ত হবার নয়, যতক্ষণ বরেন মল্লিক এই পৃথিবীর বুকে ঘুরে ফিরে বেড়াবে ততোক্ষণ আর বিকাশের জীবনে শান্তি ফিরত আসার সম্ভাবনা তিলমাত্র নেই। অনেক বেলা অবধি বিকাশ বিছানায় পরে রইল, এরমধ্যে পিসী কয়েকবার এসে ডাকাডাকি করে গেছে, বিকাশ কান দেয়নি, শেষে বুড়ি তিতিবিরক্ত হয়ে হাল ছেড়েছে। বিকাশ শুয়ে শুয়ে পরিকল্পনা ভেঁজে চলেছে, বরেনের মৃত্যুই এখন বিকাশের একমাত্র লক্ষ্য, তবে নিজের হাতে খুন করার মতো হঠকারিতা সে আর করবে না, আগের বারের অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝে গেছে মানুষ খুন করাটা সবাইকে দিয়ে হয় না অন্তত তাকে দিয়ে তো হবেই না, কিন্তু প্রতিশোধ বিকাশের চাইই চাই, আর সে উপায়ও তার মাথায় এসেছে, জেলে থাকাকালীন আমিনুলের সঙ্গে বিকাশের বন্ধুত্ব হয়েছিল, আজ প্রয়োজনে সে কি বিকাশকে সাহায্য করবে না? একটা চেষ্টা অন্তত বিকাশকে করতেই হবে।

বেলা বাড়তে বিকাশ সুভাষগ্রাম থেকে গার্ডেনরিচ এলাকার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ল। কোথায় গেলে আমিনুলকে পাওয়া যাবে সেটা বিকাশের মোটামুটি মনে আছে। দুটো ট্রেন পাল্টিয়ে বিকাশ মাঝেরহাট ষ্টেশনে এসে হাজির হল, এখান থেকে একটা উপচে পরা ভিড় বাসে করে আক্রা রোডের সংযোগস্থলে পৌঁছে বড় কবরস্থানটা খুঁজে বের করতে হবে, কবরস্থান পাওয়া গেল এবং বেশ সহজেই, অসুবিধে হল পাশের সরু গলিটায় ঢুঁকে, এ যেন গোলকধাঁধা! একফালি সরু গলির দুপাশে ঘিঞ্জি বস্তি, হাজার মানুষের মেলায় জায়গাটা যেন গমগম করছে। মূল গলি থেকে অসংখ্য শাখা প্রশাখা বেড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিকাশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক চেয়ে সামনের রকে বসে থাকা একজন মধ্যবয়স্ক ব্যাক্তিকে জিগ্যেস করল –‘এখানে আমিনুল কোথায় থাকে বলতে পারেন’? লোকটি বিকাশকে পাল্টা প্রশ্ন করল –‘এখানে অনেক আমিনুল থাকে, আপনি কাকে খুঁজছেন’? –‘মসজিদগলির আমিনুল, যার কপালে একটা কালো জরুল আছে’। লোকটা এবার বিকাশের দিকে অদ্ভুতভাবে চাইল, বলল –‘ডান দিকের গলিতে গিয়ে শেষ বাড়ি’। লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিকাশ এগিয়ে গেল, ভিড় হট্টগোল এড়িয়ে যখন বিকাশ মাজারের কাছাকাছি পৌঁছল দেখতে পেল দেখল কয়েকজন যুবক ক্যারাম বোর্ডের সামনে গুটি সাজিয়ে খেলায় মত্ত, বিকাশ একটু গলা ঝেড়ে আমিনুলের খোঁজ করতেই যুবকদের মধ্যে একজন তুড়ি বাজিয়ে বলল –‘মেরে পিছে আও’! এবারে যে গলিটার মধ্যে বিকাশ ঢুকল সেখানে লোকের ভিড় তুলনামূলক ভাবে কম, ঘুপচি ঘরগুলোর মধ্যে থেকে অবশ্য চাঁপা গলায় মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, পরিবেশটা যেন কেমন সন্দেহজনক। বিকাশের হঠাৎ ভয় করতে শুরু করল, সে গলা উঁচিয়ে বলল –‘আমিনুল এখানে থাকে’? যুবকটি পিছন না ফিরেই উত্তর দিল –‘হা হা আমিনুল ভাই’। একটা ঝুপড়ির বন্ধ দরজায় যুবকটি কড়া নাড়তে ভিতর থেকে সাবধানী কণ্ঠ ভেসে এলো–‘কৌন’?-‘ম্যায় কাদের, আমিনুলভাই হ্যায়’। ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল লুঙ্গি পাঞ্জাবী পরা একজন লম্বাচওড়া লোক দরজা খুলে দাঁড়াল, লোকটি ইশারা করে বিকাশকে ঘরের ভিতর আসতে বলল, একমুহুর্ত ইতস্তত করে বিকাশ ঝুপড়ির মধ্যে প্রবেশ করল।

ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকেই বিকাশ বুঝতে পারল সে বেকায়দায় পরে গেছে। পালোয়ানের মতো দুজন লোক মিলে তাকে দুদিক দিয়ে চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে লুঙ্গি পরা লোকটা একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে বিকাশের মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলল, এরপর তিনজন মিলে ঠেলতে ঠেলতে বিকাশকে একটা কাঠের চেয়ারে বসিয়ে ওর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে বিকাশ বাঁধা দেবার কোন সুযোগই পেল না, অবশ্য এখানে বাঁধা দিয়েও কিছু করে উঠতে পারত তেমন ধারণা বিকাশের একেবারেই ছিল না। লোকগুলো বিকাশের শরিরের সর্বত্র হাত চালিয়ে যখন কোন অস্ত্রের সন্ধান করতে পারল না তখন জিগ্যেস করল –‘তুই কি পুলিসের লোক’? -‘না’। -‘তবে কি কাসিম পাঠিয়েছে’? বিকাশ শুকনো মুখে জানাল, পুলিসের লোক তো সে নয়ই আর কাসিম নামটা জীবনে প্রথম শুনল’। লুঙ্গি পরা লোকটা গম্ভিরভাবে বলল –‘আমিনুলকে কেন খুজছিস’?–‘আমিনুল আমার বন্ধু, জেলে দুজনে একসঙ্গেই ছিলাম, তাই’। লুঙ্গি পরা লোকটা বলল -‘আমিনুলকে ফোন করেছি, ও যতক্ষণ না আসছে তুই এই ঘরে আটকে থাকবি’। লুঙ্গি পরা লোকটা ইঙ্গিত করতে এবারে বাকি দুজন বিকাশকে ছেড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল, যাবার আগে অবশ্য ঘরের দরজায় তালা লাগাতে ভুলল না, দমবন্ধ করা পরিবেশে দরজায় শিকল তোলার শব্দটা বিকাশের কানে যেন অসহ্য লাগল।

আধঘণ্টা পরে ঘরের দরজা খুলে গেল, একটা পরিচিত মুখ দেখে বিকাশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, আমিনুল এসে উপস্থিত হয়েছে। আমিনুল সোৎসাহে বলল –‘আরে এ তো আমার দোস্ত বিকাশভাই আছে, তা কি ব্যাপার দোস্ত কোন খবর না দিয়ে হঠাৎ’? বিকাশ ম্লান হেসে বলল –‘খবর দেব কি করে, তোমার নাম্বার আমার কাছে নেই’। আমিনুল দাঁত বের করে হেসে বলল –‘ঠিক কথা, তোমার একটু তকলিফ হল, কিন্তু আজকাল পুলিসের ঝামেলাটা আগের থেকে বেড়েছে তাছাড়া আমাদের অ্যান্টি পার্টি তো আছেই, কাকে বিসওয়াস করব বল’? বিকাশ এসব কথার আর কি উত্তর দেবে, চুপ করেই রইল। এবার শুরু হল অতিথি সৎকারের পালা, সেব্যাপারে আমিনুল বেশ দরাজ দেখা গেল, দড়ির খাটিয়ায় বসিয়ে লাচ্ছা পরোটা আর মুর্গির ঝোল এনে হাজির করল। খিদে বিকাশের ভালোমতোই পেয়েছে, সেই দুপুর বেলা সামান্য ডাল ভাত খেয়ে বেড়িয়েছে, মাংস পরোটা পেয়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগল। একটু পরে আমিনুল কাজের কথায় চলে এলো, বলল –‘তা দোস্ত হঠাৎ আমাকে কেন মনে পড়ল’? বিকাশ আগে থেকেই ভেবে এসেছিল কি বলবে, রেখে ঢেকে যতটুকু না বললেই নয়, সেভাবে মোদ্দা কথাটা হাজির করল, অবশ্যই কিছু জল মিশিয়ে, আমিনুল সব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল –‘সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আমি কি করব বল’? বিকাশ আমিনুলের হাত চেপে ধরে অনুনয় করে বলল –‘আমাকে বাচাও আমিনুলদাদা, লোকটা রোজ রাতে আমার বউয়ের সাথে আমার চোখের সামনে শুচ্ছে, কিন্তু আমি কিছু করতে পারছি না, তোমরা এর একটা বিহিত করে দাও আমি বাকি জীবন তোমার গোলাম হয়ে থাকব’। আমিনুল হাসল, বলল –‘হাত ছাড়ো বিকাশভাই, আমার বস বিলাল আহমেদ বড় এলেমদার আদমি, কতরকম কারবার করে উনি যে কত লোককে রুজি রোজগার দিচ্ছেন, তা তোমার মতো দুঃখী মানুষ কেউ এসে ধরলে সুপারি নিয়ে উনি তাদের তকলীফও কম করে দ্যান, চল তোমাকে ওনার কাছে নিয়ে যাচ্ছি, এখুনি আমাকে যেসব কথা বললে ওনাকে বলে দেখো, তোমার কাজ হয়ে যাবে’।

বিলাল আহমেদ ব্যাবসাদার লোক, তার কাজ কারবারের ধাঁরা সন্দেহজনক হলেও অনেক লোককে যে তিনি রুজি রোজগার দিচ্ছেন সেটা অন্তত আমিনুল বাড়িয়ে বলেনি, বিলাল আহমেদ ধৈর্য ধরে বিকাশের সবকথা শুনলেন, শুনেটুনে বললেন –‘কাম হয়ে যাবে, তবে দশলাখ টাকা লাগবে’। কথা শুনে বিকাশের মাথার চুল খাঁড়া হয়ে গেল, কোনরকমে বলল –‘কিন্তু বিলালভাই আমার কাছে অত টাকা নেই’? আমিনুল ফিসফিস করে বলল –‘কত টাকা দিতে পারবে ঠিক করে বল’? বিকাশ কি উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল, আমিনুল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, বিলাল হাত তুলে থামতে ইঙ্গিত করল, তারপর বলল –‘তোমার কাছে দেবার মতো একটা পয়সাও নেই, তাইত’! বিকাশ উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল। সামান্য পরে বিলাল বলল –‘পয়সা নেই বুঝেছি, কিন্তু তুমি যদি চাও তাহলে আমাদের কিছু কাজ করে দিতে পারো, তারপর নাহয় ভাবা যাবে, কি মঞ্জুর’। বিকাশ আশান্বিত স্বরে বলল –‘বলুন কি করতে হবে’।-‘তেমন কিছু নয়, তুমি তো ক্যুরিয়রে কাজ কর, আমাদের হয়েও সেই কাজটা করে দাও, আমাদের লোকের ওপর পুলিসের নজর পড়েছে, কিন্তু তোমাকে কেউ চেনে না, তুমি শুধু কয়েকটা কনসাইনমেন্ট কালেক্ট করে আমার বলা জায়গায় ডেলিভারি করে দেবে, ব্যাস’।-‘আপনি যা বলছেন আমি করে দেব, কিন্তু তারপর আমার কাজ হবে তো’? বিলাল আহমেদ গম্ভিরভাবে বলল –‘ডিল ফাইনাল করে আমি কখনো কথার খেলাপ করিনা, এবার তুমি যেতে পারো’।

পরদিন বিকাশের মোবাইলে অপরিচিত নম্বর থেকে নির্দেশ ভেসে এলো, বিকাশ মনে মনে তৈরিই ছিল, সেক্সপিয়র সরণীর জনৈক সুন্দর আগরওয়ালের কাছ থেকে একটা ব্রিফকেশ নিয়ে হাওড়ার ফরশোর রোডে কৈলাসনাথ ত্রিপাঠির কাছে পৌঁছে দিয়ে এলো, বিকাশের অবশ্য কোন ধারণাই নেই ওই ব্রিফকেশে ভিতর কি থাকতে পারে, আর জেনেই বা সে কি করবে। পরদিন বিকাশের ফোন আবার বেজে উঠল, নতুন আদেশ হল তাকে আজ সকাল সাড়ে দশটায় সুন্দর আগরওয়ালের কাছে রিপোর্ট করতে হবে, বাকি কাজ সব আগরওয়ালই বুঝিয়ে দেবে। আগরওয়ালের অফিস সেক্সপিয়র সরণী থানা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে সাউথ ম্যানসনের ছতলায়। আগরওয়াল ফোনে ব্যাস্ত ছিলেন, বিকাশকে সামনের চেয়ারে বসতে বলে কিছু দরকারি কাজ সেরে নিলেন, একটু পরে বললেন –‘বিলালভাই এর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, কাল আপনার কাজে উনি খুশি হয়েছেন, তাই আজকে বিগার রেসপনসিবিলিটি দিতে বলেছেন, একটা কনসাইনমেন্ট পিক-আপ করে মুম্বাই নিয়ে যেতে হবে। বিকাশ খানিক বিরক্ত হয়ে বলল –‘কিন্তু মুম্বাই যেতে হবে এমন কথা তো ছিল না’।

-‘আমাদের লাইনে কখন কোথায় যেতে হবে আগে থেকে ঠিক থাকে না তবে আপনার অসুবিধে কিছু হবে না যাতায়াত প্লেনে হবে, আপনার কাজ শুধু কয়েকজন দুবাইযাত্রী শ্রমিককে এয়ারপোর্ট কভার করে দেওয়া, বেচারিরা আগে কখনো প্লেনে ওঠেনি, ঘাবড়ে গিয়ে কিসব করে বসে, ওদের জাস্ট একটু গাইড করবেন, দ্যাটস্‌ ইট। বিকাশ নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে আগরওয়াল পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল –‘তাহলে একবার বিলালের সঙ্গে কথা বলে নিন’। ফোন বিকাশের হাতে আসতে ওপার থেকে বিলালের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো –‘বিকাশ একটু বম্বে থেকে ঘুরে এসো, মোটে একদিনের কাজ’। -‘কিন্তু’। বিকাশকে বলতে না দিয়ে ফের বিলালই বলল –‘কথা দিচ্ছি তোমাকে আর বেশি খাটাব না, বম্বে থেকে এসে সোজা আমার সঙ্গে দেখা করবে, তোমার প্রবলেমটা এবার সল্ভ করে দেব’। বিকাশ আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিল, আগরওয়াল নোটের একটা গোছা বিকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল –‘এটা সঙ্গে রাখুন, দরকার লাগতে পারে, টিকিট আর কনসাইনমেন্ট আপনাকে এয়ারপোর্টে হ্যান্ডওভার করা হবে, বাকি ইন্সট্রাকসন সময়মতো ফোনে পেয়ে যাবেন।

স্পাইসজেটের এয়ারবাসটা যখন টেক-অফ করল তখন সঙ্গীদের হাবভাব দেখে বিকাশের হাসি পেয়ে গেছিল, তিনজন বিড়ি শ্রমিককে নিয়ে বিকাশ মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে উড়ে চলেছে, ছেলেগুলির বয়স একুশ থেকে পঁচিশের মধ্যে, নামের লিস্টও বিকাশের কাছে রয়েছে, নাসির, আলম আর পল্টু। এরা সবাই বসিরহাটের হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে, আপাতত মুম্বাই যাচ্ছে মেডিকেল টেস্টের জন্য, সেখান থেকে ছাড়পত্র পেলে আরবদুনিয়ার দরজা খুলতে আর কোন বাঁধা থাকবে না। ছেলেগুলোর উৎসাহ দেখে বিকাশের বেশ ভালো লাগল, মুম্বাই এয়ারপোর্টের টার্মিনালে নামতে বিকাশের নামের পোস্টার হাতে ধরা ড্রাইভারের উর্দি পরা লোক এগিয়ে এসে বলল–‘আপ বিকাশবাবু’? বিকাশ সম্মতি জানাতে লোকটি বলল –‘চলুন আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি’।গাড়িতে বসে বিকাশ প্রশ্ন করল –‘কোথায় চলেছি ভাই আমরা’? –‘সান্তাক্রুজ, ড্যাফোডিল নার্সিং হোমে’।

প্রায় দুঘন্টার ওপর বিকাশ ড্যাফোডিল নার্সিং হোমে এসে বসে রয়েছে, আসামাত্র ছেলেগুলিকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এর মধ্যে বিকাশকে লাঞ্চ দেওয়া হয়েছে, রুটি আর চিকেন কারি। খেয়ে দেয়ে বিকাশ অপেক্ষা করে আছে মিঃ কাপুরের জন্য, বিলালের কথামতো বিকাশের ফিরতি টিকিট এই লোকটাই তার হাতে তুলে দেবে। অবশেষে কাপুর এলো, স্থুলাঙ্গার টাকমাথা একজন মধ্যবয়স্ক ব্যাক্তি, লোকটি সোজা কাজের প্রসঙ্গে চলে গেল, বলল –‘বিলাল আহমেদের একটা পার্সেল আছে যেটা তোমাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে, তবে প্লেনে গেলে চলবে না, ওখানে চেকিং কড়া, ধরা পরে যাবে তাই আমরা ট্রেনের টিকিটের বন্দোবস্ত করেছি, রাতের হাওড়া মেলটা ধরলে নিরাপদে পৌঁছে যাবে, আর হ্যা তোমার সঙ্গে এই শিউলাল যাবে, যদিও ব্যাগটা থাকবে তোমার কাছেই, হাওড়া ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে ওটা শিউলালের হাতে তুলে দেবে, ব্যাস’।-‘তাহলে ওর হাতেই ব্যাগটা দিয়ে দিন না আমাকে আর এসবের মধ্যে কেন জড়াচ্ছেন’? -‘না বিলালভাই তেমনটা চাচ্ছেন না, তাছাড়া শিউলাল দাগি ক্রিমিনাল, ওর ওপর পুলিসের নজর পড়তে পারে, কিন্তু তোমাকে কেউ সন্দেহ করবে না, এখন এই ঘরে খানিকটা রেস্ট নিয়ে নাও বিকেলে আলাদা আলাদা গাড়ি করে তোমাদের দুজনকে ষ্টেশনে পৌঁছে দেওয়া হবে, আর হ্যা ট্রেনে তোমাদের সিট পাশাপাশি হলেও একে অপরের সঙ্গে কোনরকম কথাবার্তা চলবে না, মাথায় রাখবে যেন তোমরা নিজেদের চেনোই না’। কাপুর বিকাশের হাতে হাওড়া মেলের থ্রী টিয়ারের একটা টিকিট ধরিয়ে দিল তারপর ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হল, প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় বিকাশ কপালের রগ টিপে সোফায় গা এলিয়ে দিল।

মুম্বাই সেন্ট্রাল ষ্টেশনে মেলা লোকের ভিড়, হাওড়া ষ্টেশন যতই পেল্লায় হোক না কেন বিকাশের মনে হল, এর তুলনায় যেন কিছুই নয়। লোকে এখানে যেন ঘোড়ায় জিন দিয়ে ছুটছে, অসাবধান হলে ধাক্কা লেগে যাবার সমূহ সম্ভাবনা, বিকাশ প্ল্যাটফর্মে একটা খালি সিট খুঁজে পেতে বসল, তখুনি তার পাশে দৈত্যাকার একটা লোক এসে বসল, এই লোকটা আর কেউ নয়, শিউলাল, নার্সিং হোম থেকে বেরনো অবধি এই শিউলাল তাকে একমুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল হতে দ্যায়নি, একবার বিকাশ বাথরুমে যেতে লোকটি সেখানেও ওকে অনুসরণ করেছে, নীরব চোখের শাসানিতে বুঝিয়ে দিয়েছে কোনরকম চালাকি করলে তার ফল খারাপ হবে। হাতের ব্যাগে কি আছে বিকাশ জানে না তবে জিনিসটা যে মুল্যবান কিছু সে বিষয়ে তার মনে সন্দেহ আর তিলমাত্র নেই। -‘মেরা সিট ছেষাট নম্বর ঔর তুমহারা বাষট, রাতকো বাথরুম জানা হো তো ব্যাগ সিটপে রাখনা’। ফিসফিস করে বিকাশের উদ্দেশ্যে বলল শিউলাল অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে, বিকাশ কোন কথা না বলে চুপ করে রইল। হঠাৎ শিউলালের মধ্যে অস্বাভাবিক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল, ষণ্ডা মতো কজন লোক প্ল্যাটফর্মে এসে ইতিউতি চাইছিল, তাদের দেখেই যে শিউলালের এই উদ্বেগ সেটা পাশে বসা বিকাশের নজর এড়াল না। শিউলাল একটা মারাঠি সংবাদপত্রে যথাসম্ভব মুখ ঢেকে বসে পড়ল, যদিও তাতে লোকগুলোকে বোকা বানাতে পারল না। উত্তেজনার বশে লোকটি খেয়াল করেনি কাগজটা সে উল্টো করে ধরে রেখেছে আর তাতেই ধরা পরে গেল। বিষয়টা লোকগুলোর চোখে পড়েছে, তারা সটান এসে কাগজ ধরে টান দিতেই শিউলাল সামনের লোকটাকে প্রবল ধাক্কা মেরে ছুটে পালাবার চেষ্টা করল, যদিও সফল হতে পারল না, ততোক্ষণে ষণ্ডামার্কা লোকগুলো একসাথে ঝাঁপিয়ে পরে শিউলাল পালোয়ানকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল তারপর পিছেমোড়া করে হাতে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল। বিকাশের আর বুঝতে বাকি রইল না এরা সব পুলিসের লোক। মজা দেখবার জন্য তখন এদিকে ভিড় জমে গেছে, ভিড়ের মধ্যে থেকে টুকরো টুকরো কথা বিকাশের কানে এলো, হিন্দিতে কেউ বলল এ ওই নার্সিং হোমের কিডনি পাচার কেস, যেটা এখন টিভিতে দেখাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে বড় স্ক্রীনের টিভিতে খবর শোনাচ্ছে, সেখানে তখন রাজ্যের লোকের জটলা, বিকাশ একপ্রকার ছুটে গিয়ে টিভির সামনে দাঁড়াল, টিভির পর্দায় যা দেখল তাতে বিকাশের মাথার চুল খাঁড়া হবার উপক্রম। টিভিতে এখন দেখাচ্ছে ড্যাফোডিল নার্সিং হোম, যেখানে রেইড করে পুলিস কিডনি পাচারকারি একটা দলকে গ্রেফতার করেছে, নার্সিং হোমের মালিক আশিস কাপুরকে গ্রেফতার করে পুলিসের ভ্যানে তোলা হচ্ছে সে দৃশ্যটা বেশ ফলাও করে বারে বারে দেখানো হচ্ছে, খবরে আরও বলল পশ্চিমবঙ্গ আর বিহার থেকে কিছু লোককে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফাঁদে ফেলে এনে হাজির করা হয়েছে, তাদের উদ্ধার করার সাথে সাথে দলের বাকি সদস্যদের খোঁজ চলছে, এর জন্যে অন্য কয়েকটা রাজ্যের পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এবার বিকাশের ভীষণ ভয় হতে শুরু করল। পুলিস এখনও পর্যন্ত তার খোঁজ পায়নি ঠিকই কিন্তু পেতে কতক্ষণ? তারপর! বিলাল তাকে ভালোই ফাঁসিয়েছে, সংকটের এই মুহুর্তে বিকাশের কাজে এলো তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, মার্কেটিং এর পাকা খেলোয়াড়রা ভালোই জানে কিভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকে সুযোগ বের করে নিতে হয়, বিকাশ এই বেয়াড়া সময়েও নিজের ঘুটি খেলার সুযোগ দেখে ফেলল, এখন দরকার সামান্য সাহস আর কিছুটা ভাগ্যের সাহায্যের, সাহস বিকাশের আছে আর ভাগ্য! ভাগ্যলক্ষ্মী যে সাহসীদের সহায় হয় সে কে না জানে। এরমধ্যে বিকাশের মোবাইল বেজে উঠল, বিলাল ফোন করেছে, ফোনটা কেটে সুইচ অফ্‌ করে বিকাশ প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে গেল, হাওড়া মেল প্ল্যাটফর্মে এসে হাজির হয়েছে।

জেনারেল কম্পার্টমেন্টে একেবারে গাদাগাদি ভিড়। কোনরকমে ভিড় ঠেলে উঠতে পারলেও বসার আশা দুরস্ত। বিকাশ থ্রী-টিয়ারের টিকিট ছিড়ে ফেলে সাধারণ কামরায় ওঠাটাই নিরাপদ মনে করল। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে আটটা ছুতেই ট্রেন চলতে শুরু করল। ঘণ্টা দুয়েক চলার পর কিছু যাত্রী বিভিন্ন ষ্টেশনে নেমে পড়তে কামরা একটু খালি হল, অন্তত ভদ্রভাবে দাঁড়াবার মতো জায়গাটুকু পেয়ে বিকাশ হাঁপ ছেড়ে বাচল। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা এবার একবার খুলে দেখা দরকার, বিলালকে চ্যালেঞ্জ জানাবার আগে নিজের ওজন বুঝে নেওয়াটা এইমুহুর্তে আশু প্রয়োজন। চলন্ত গাড়ির এক-চিলতে বাথরুমে ঢুঁকে বিকাশ ভিতর থেকে ছিটকিনি এঁটে দিল, এবার সময় হয়েছে ব্যাগের ভিতর কি আছে সেটার হদিশ করার। চামড়ার ব্যাগের চেন টেনে খুলতেই একরাশ খবরের কাগজ বেরিয়ে পড়ল। কাগজগুলো সরিয়ে ফেলতেই হলুদ বর্নের ছটায় বিকাশের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ব্যাগের মধ্যে থরে থরে সাজানো ধাতব বিস্কুট, সবই সোনার। এখানে গুণে দেখার সুযোগ নেই, তবে বিকাশের মনে হল কমপক্ষে একশোটা তো হবেই, আর এর বাজারদর কোটির অংকে তো নিশ্চয়ই। বাথরুমে বেশিক্ষণ থাকলে লোকের সন্দেহ হতে পারে, বিকাশ বেরিয়ে এসে একটা খালি সিট পেয়ে বসে পড়ল, এখন মাঝরাত, সহযাত্রীদের সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে তাই বিকাশের ছটফটানি কারো চোখে পরল না, নাহলে তার এই অস্থির হাবভাব নিশ্চয়ই সন্দেহের উদ্রেক করত।

পরের দিন আর রাতটা বিকাশের ট্রেনের কামড়াতেই কেটে গেল। দূরত্বকে দুরমুশ করতে করতে মানুষের সৃষ্ট যন্ত্রদানব ছুটে চলেছে আলো অন্ধকারের বুক চিড়ে, ভিতরে বসে বিকাশ নিজের স্নায়ুর সঙ্গে কঠিন লড়াই করে চলেছে, চাইলে এই রাজার সম্পদ নিয়ে সে বিশাল ভারতবর্ষের কোন অজ্ঞাত কোনায় নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে, সবকিছু ভুলে, কিন্তু তার মন বলছে সে হবে পলাতকের জীবন, এইসব মাফিয়াদের নেটওয়ার্ক সর্বত্র ছড়ানো, মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ের বোঝা তাকে কখনো শান্তির জীবন পেতে দিতে পারে না, তাছাড়া নতুন জীবন শুরু করতে হলে পুরনো হিসেবটাও চুকানো জরুরি, বরেন মল্লিক এখনও বহাল তবিয়েতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। একঢিলে দুই পাখিই মারবে বিকাশ, বিলাল আহমেদের থেকে নিশর্ত মুক্তি আদায় করবে আর বরেনকেও চিরতরে মুক্তি দেবে।

তৃতীয় দিন বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ হাওড়া মেল খড়গপুর জংশনে এসে পৌছতেই বিকাশ ব্যাগ হাতে নেমে পড়ল। ট্রেন অবশ্য হাওড়া অবধি যাবেই, কিন্তু ষ্টেশনে বিলালের লোকজন নজর রাখতে পারে অতএব ও রিস্ক নেওয়া অনুচিত, বিকাশ ঝটপট দুটো কাজ সেরে ফেলল একটা ব্রিফকেস কিনে তাতে সোনাগুলো ভরে পুরনো ব্যাগটা ফেলে দিল, একাজটা করতে অবশ্য একটা সস্তার গেস্টহাউসে ঘরভাড়া করতে হল, কিছু টাকাও খসল, কিন্তু এখন ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নয়। দ্বিতীয় কাজটা হল একটা গাড়ি ভাড়া করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়া, বিকাশ ড্রাইভারকে আগাম জানিয়ে রাখল আটটার আগে পৌঁছে দিতে পারলে ডবল বখশিশ! রোজ রোজ রোজগারের এমন সুযোগ গাড়িওয়ালার কাছে এসে উপস্থিত হয়না, চার টায়ারের ওপর ভর করে চলা গাড়ি যেন পাখা মেলে উড়ে চলল।

পরের সাতটা দিন বিকাশ ক্রমাগত নিজের ঠিকানা পাল্টে চলল, সবার আগে সুভাষগ্রামে পিসীর বাড়ি থেকে জুয়ার বোর্ডটা তুলে নিল, পিসীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, বুড়ির দিকে চেয়ে বিকাশের মনটা হঠাৎ যেন হুহু করে উঠেছিল, ধরা গলায় বলল –‘যদি বেচেবর্তে থাকি কথা দিচ্ছি তোমার জীবনে আর দুঃখ থাকবে না। বুড়ি কি বুঝেছিল কে জানে? কোনরকম প্রশ্ন করেনি, বিকাশ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল বুড়ির চোখের কোনে জলের বিন্দু। সময় নষ্ট না করে বিকাশ বেরিয়ে পড়ল, প্রথমে বউবাজারের সোনাপট্টিতে গিয়ে একটা বিস্কুট বেচতে হাতে যে পরিমান নগদ এলো দেড়টা মাস তাতে সচ্ছলভাবে চলে যাবে। এবারে বিকাশ শেয়ালদার একটা সস্তার লজে ঘর নিয়ে উঠল, আত্মগোপন করার জন্য এরকম আস্তানাই এই পরিস্থিতিতে তার জন্য আদর্শ। টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিকাশ অবশ্য বিশেষ একটা খবরের ওপর নজর রেখে চলেছে, মুম্বাইয়ের কিডনি কাণ্ডে আরও কিছু অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে, কিছুকে পুলিস খুঁজছে, পশ্চিমবঙ্গেও পুলিস কিছু লোককে খুঁজে বেড়াচ্ছে। শেয়ালদায় বেশিদিন থাকা বিকাশের নিরাপদ মনে হল না, সে এরপর চলে গেল তারকেশ্বরে সেখানে একটা দিন কাটিয়ে চলে গেল বর্ধমান, ফের আস্তানা পাল্টে বিকাশ এসে হাজির হল হাওড়ায়, এতদিন বিকাশ নিজের ফোনটাকে সুইচ অফ করেই রেখেছিল, এবারে ওটাকে খুলে প্রথম ফোনটা করল বিলাল আহমেদকে। ওপার থেকে বিলালের চাঁপা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো –‘বিকাশ তুমি কোথায় আছো? আমার মাল কোথায়’? বিকাশ মুচকি হেসে বলল –‘আপনার জিনিস আমার কাছে একদম সেফ আছে তবে সেটা নিতে হলে আপনাকে এখানে আসতে হবে, অন্য কাউকে পাঠালে হবে না আর হ্যা একাই আসবেন কিন্তু, সঙ্গে যেন অন্য কেউ না থাকে’। অন্যদিক থেকে বিলালের কঠিন স্বর ভেসে এলো –‘তুমি কি আমার সঙ্গে গেম খেলছ’? -‘গেম কি আপনি একাই খেলবেন স্যার, অন্য লোকে খেলতে পারেনা’। একমুহূর্তের নিস্তব্ধতার পর বিলাল বলল –‘রাজি, কোথায় আসতে হবে বলো’। -‘আমার নেক্সট ফোনের জন্য অপেক্ষা করুন, সব জানিয়ে দেব’। বিকাশ ফোন সুইচ অফ করে দিল।

অন্তিম যুদ্ধের জন্য বিকাশ প্রস্তুত হতে শুরু করল। প্রতিদ্বন্দ্বী এখানে প্রবল শক্তিশালী, তার সামনে বিকাশ নিতান্ত তুচ্ছ, নগণ্য। লোকবল অস্ত্রশস্ত্র কিছুই নেই শুধুমাত্র উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের ভরসায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষতে হবে, বিলাল আহমেদের মতো মাফিয়া ডন-কে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার অর্থ যে সাক্ষাৎ মৃত্যু সেটা না বোঝার মতো নির্বোধ বিকাশ নয়। আজন্ম নাস্তিক বিকাশ মনে মনে সেই কখনো না মানা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাল, ‘এবারের মতো আমার সহায় হও, প্লিজ শুধু একবার’। দুর্বলতা ঝেড়ে বিকাশ সোজা হয়ে দাড়াল, প্ল্যান একটা ছকে রাখাই আছে, এবার দরকার সেটাকে সঠিক ভাবে কাজে লাগানো। সবার আগে বিকাশ গেল রাসেল স্ট্রীটের একটা নামকরা হোটেলে, নগদ টাকা দিয়ে ঘর বুক করে, সোনা ভরা ব্রিফ-কেসটা হোটেলের লকারে গচ্ছিত রাখল, হোটেলের হেল্প ডেস্ক থেকে সারাদিনের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করে এরপর রওয়ানা দিল উত্তর চব্বিশ পরগনার উদ্দেশ্যে, পরের ঘুটিটা সে ওখান থেকেই চালবে।

ব্যারাকপুরে গান্ধিঘাটের উত্তরদিকে রামবাগান লেনের সরু গলিটার দুদিকে দুটো লজের অবস্থান বিকাশের আগে থেকেই জানা ছিল, অফিসের কাজে এখানে আগেও তাকে আসতে হয়েছে, জায়গাটা তাই পরিচিত। আলাদা আলাদা ভাবে দুটো লজে গিয়েই সে দোতলার বারান্দা-ওয়ালা মুখোমুখি দুটো ঘর ভাড়া করে ফেলল, ঘরদুটো ভালো করে পরিক্ষা করে বিকাশ নিশ্চিন্ত হল, যে ঘরটা থেকে গলির শেষ প্রান্ত অবধি দেখা যায় বিকাশ সেখানেই আস্তানা গাড়ল, তাছাড়া এই লজে একটা বাড়তি সুবিধেও বিকাশ পেয়ে যাচ্ছে, লজের পিছনে জমাদারদের ব্যাবহারের লোহার একটা ঘোরানো সিঁড়ি আছে, বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হলে যেটা কাজে লাগতে পারে। হোটেল থেকে নিয়ে আসা গাড়িটাকে বিকাশ রেখেছে ওই সিঁড়ির একহাতের মধ্যে, ড্রাইভারকে বিকাশ পইপই করে বুঝিয়েছে সে যেন গাড়ি ছেড়ে একমিনিটের জন্য কোথাও না যায়, প্রয়োজনে বিকাশ এই গাড়ি করে চম্পট দিতে পারবে।

এবার সবার আগে সদ্য কেনা দামি দূরবীনটা ব্যালকনির রডের সঙ্গে শক্ত করে বাধল, এতে করে এই গলিতে যে কেউই প্রবেশ করুক না কেন বিকাশের নজর এড়িয়ে ঢুকতে পারবে না, তাছাড়া রাস্তার ওপারের লজের ভিতরেও নজর রাখতে সুবিধে হবে, যুধিষ্ঠিরের পটটাকে কাঁচের গোল টেবিলটার ওপর সাজিয়ে, নিউ মার্কেট থেকে সদ্য কেনা বিশেষ ধরনের তাসগুলো আর একবার পরিক্ষা করে বিকাশ নিশ্চিন্ত হল। ব্যাবস্থা মোটামুটি করে ফেলে বিকাশ নিচের রেস্টুরেন্টে গেল লাঞ্চ করতে, খাওয়া দাওয়া সেরে বিকাশ আবার নিজের জন্য বরাদ্দ ঘরে ফিরে এলো, এখন একটু বিশ্রামের দরকার, শরির মন যথাসম্ভব তাজা রেখে তাকে এগোতে হবে লড়াইয়ের ময়দানে। বিকেল চারটে নাগাদ বিকাশ ফোন করল বিলালকে –‘গাড়ি নিয়ে সোজা ব্যারাকপুর চলে আসুন, যেমন কথা হয়েছে, একা আসবেন আর হ্যা সাথে কিন্তু কোন অস্ত্র রাখলে চলবে না’। বিলাল রুক্ষ স্বরে বলল –‘ঠিক আছে, লেকিন আমার মাল যেন রেডি থাকে’। বিকাশ হাসল, বলল –‘পেয়ে যাবেন, এখন সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়ুন’।

যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে, বিকাশ পজিশন নিয়ে নিল, নিউ বেঙ্গল লজের বারান্দায় উপুড় হয়ে শুয়ে চোখে দূরবীন লাগিয়ে গলিটার ওপর নজর রাখতে শুরু করল, গলিটার একদিকে ডেড-এন্ড হওয়াতে বিকাশ এই জায়গাটার নির্বাচন করেছে, আজ এই গলিতে যেই আসুক না কেন বিকাশের চোখ এড়িয়ে এক পাও চলতে পারবে না, এখন আর ঢিল দিলে চলবে না, সতর্ক দৃষ্টি মেলে বিকাশ নিচের দিকে চেয়ে রইল। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ, রামবাগান লেনের সরু গলিটায় একটা মারুতি ডিজায়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে বিলাল আহমেদ বেড়িয়ে এসে এদিক ওদিকে সতর্ক দৃষ্টে জরিপ করে পকেট থেকে মোবাইল বের করল। বিকাশ নিজের মোবাইল অন করে দিতেই বিলালের নম্বর স্ক্রীনে ফুটে উঠল। -‘কোথায় তুমি’? -‘একা এসেছেন’? -‘হ্যা’। সামনে যে বেঙ্গল গেস্ট হাউসের বোর্ড দেখছেন ওর রিসেপশনে গিয়ে বলুন, দুশো পাঁচ নম্বর ঘরের চাবি দিয়ে দেবে, ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করুন’। ফোন কেটে দিয়ে বিকাশ বিলালের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে থাকল। বিকাশের নির্দেশ মতো বিলাল গেস্ট-হাউসের সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই বিকাশের চোখের আড়ালে চলে গেল। বিকাশ আবার গলির ওপর নজর রাখতে থাকল, বিলালের পিছন পিছন তার দলের লোকেরা এসে হাজির হয় কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া বিকাশের একান্ত প্রয়োজন, মাঝে মধ্যে অবশ্য উল্টোদিকের ঘরে বসে থাকা বিলালের উপরেও নজর রাখতে হচ্ছে, বিলাল ঘনঘন ঘড়ি দেখছে, তার মুখে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠছে, দূরবীনের লেন্সের ভিতর দিয়ে বিকাশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। আধঘন্টা পরে যখন সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেল না, ফোন করতে বিলালের গলা থেকে রাগ আর বিরক্তি ঝড়ে পড়ল–‘বিকাশ আমার টাইমের দাম আছে’। -‘আপনাকে অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত, এবারে একটু সিকিউরিটি চেক হবে বিলালভাই, আপনার পাঞ্জাবির আর প্যান্টের পকেট উপুড় করে দেখান, আমি একটু ভেরিফাই করতে চাই। বিলাল বিনাবাক্যব্যায়ে বিকাশের আদেশ পালন করল। সন্দেহ করার মতো কিছু না পেয়ে বিকাশ বলল –পাঞ্জাবিটা গা থেকে খুলে ফেলুন, আমি দেখতে চাই বডির ভিতর কিছু লুকানো আছে কিনা? দূরবীনের শক্তিশালী লেন্সের ভিতর দিয়ে বিলাল আহমেদের মুখ একেবারে নিখুত স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, সে মুখের অভিব্যাক্তিতে ক্রোধের গনগনে আগুন যেন ফুটছে, যদিও বিলাল কোন প্রতিবাদ করল না, সন্তুষ্ট হয়ে বিকাশ বলল –ঠিক আছে। বিলাল বলল –এবারে কি প্যান্ট-টা খুলব? তুমি দেখবে! বিকাশ হেসে বলল–আরে না না ওসব চাই না, এবারে এই লজ থেকে বেড়িয়ে রাস্তার উল্টো দিকে অন্য আরেকটা লজ দেখতে পাবেন, নিউ ক্যালকাটা গেস্ট হাউস সেখানে রুম তিনশ সাতে চলে আসুন, বাকি কথা ওখানেই হবে’।

পাঁচ মিনিট পরে তিনশ সাতের দরজায় টোকা পড়তেই বিকাশ হাসিমুখে দরজা খুলে দাঁড়াল। বিলাল ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে বলল –‘আমার মাল কোথায়’? বিকাশ হেঁসে বলল –‘ভিতরে এসে বসুন মালও পেয়ে যাবেন’। বিলাল আর কথা না বাড়িয়ে প্রবেশ করতে বিকাশ সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বসতে বলে টি-পয়ের ওপর রাখা যুধিষ্ঠিরের পট তুলে দিয়ে বলল –‘আপনার মাল বুঝে নিন’। ভ্যাবাচাকা খাওয়া বিলালের হাতে যেটা উঠল সেটা সোনার কোন বিস্কুট নয়, যুধিষ্ঠিরের জুয়া খেলার পট। বিলালের গলার স্বর সপ্তমে চরল, চিৎকার করে বলল –‘হারামজাদা, ইয়ার্কি করছিস! আমার জিনিস কোথায়’? -‘গালাগালি করবেন না প্লিজ, আপনার মাল ঠিক জায়গাতেই রয়েছে, আর আপনি সেটা পেয়েও যাবেন যদি জুয়ায় আমাকে হারাতে পারেন আর নিতান্তই যদি জুয়া খেলতে না চান তাহলে এই বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলে দিন আপনি রাজি নন’। বিলাল প্রচণ্ড রোষকষায়িত দৃষ্টিতে বিকাশের দিকে চেয়ে রইল তারপর ধীরে ধীরে বলল –‘কেন যে তোর কথা শুনছি আমি জানি না, এতক্ষণে তোকে খুন করে ফেললেই বা কে দেখত, যাকগে কি বাজি লাগাবি তুই’? -‘কেন ওই সোনার বিস্কুটগুলো, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যখন ওগুলো আমি নিয়ে এসেছি, তখন আমারও তো কিছুটা হক থাকে কিনা’? বিলাল উত্তর করছে না দেখে ফের বিকাশই বলল –‘আমাদের মধ্যে যে জিতবে সোনা তার, এই নিয়ে অন্য পার্টির কোন অবজেকসন থাকবে না, আর হ্যা আপনার হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আমি অনেক ঝুঁকি নিয়েছি, হেরে গেলে আমার অন্য কাজটাও আপনাকে করে দিতে হবে’। -‘কি কাজ’? -‘এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন, আমার শত্রু বরেন মল্লিককে পৃথিবী ছাড়ার ব্যাবস্থাটাও যে আপনাকেই করতে হবে’। বিলালের শান্ত মুখের ওপর হিংস্র রেখা খেলে গেল, একটু পরে ধাতস্থ হয়ে বলল –‘তাস আছে’?

আজকে বিকাশ হারবে না, কিছুতেই না। বোর্ডের কাজ শেষ হয়েছে, বিলালকে জুয়ার আসরে বসানো গেছে, এবারে যেটা হবে সেটা বিকাশের হাতের কাজ, নিউ মার্কেট থেকে কেনা বিশেষ ধরনের তাসের ভেল্কী, সাফল করার পর সুকৌশলে বিকাশ তিনটে বিশেষ চিহ্ন দেওয়া তাস, যা অন্যের পক্ষে এক নজরে ধরা কঠিন নিজের ভাগে তুলে নিল। প্রথম চাল বিকাশ দিল, হরতনের গোলাম, জবাবে বিলাল ফেলল হরতনেরই দশ, এবার বিকাশের পালা, টেবিলে পড়ল ইস্কাবনের রানি, বিলাল দিল চিড়িতনের রানি, বিকাশ মনে মনে হাসল, এবার বিলাল সাহেব তোমার খেলা শেষ, বিকাশ ফেলল ইস্কাবনের রাজা আর তক্ষুনি টেবিলের ওপর বিলালের চাল দেখে বিকাশের মাথা ঘুরে গেল, ইস্কাবনের টেক্কা, বাজি শেষ, বিকাশ ফের হেরেছে, কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব! বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে তৈরি করা এই তাসগুলোতে কোন টেক্কাই থাকার কথা নয়, বিকাশ উন্মাদের মতো তাসের গোছ হাতড়াতে শুরু করল, বিলালকে এখন অনেক রিল্যাক্সড দেখাচ্ছে, হেঁসে বলল –‘তুমি হেরে গেছ, বিকাশবাবু এখন কি খুজছ’? বিকাশ চিৎকার করে বলল –‘কিন্তু আমার তো হারার কথা নয়! তুই শালা কি দুনম্বরি করেছিস বল’? বিলালের কণ্ঠস্বর এবার কঠিন হয়ে উঠল, বলল –‘সোনা কোথায় রেখেছিস’। বিকাশ কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে, তিরবেগে ছুটে দরজার কাছে চলে গেল, বিলাল যদি তাকে ধরে কব্জা করতে পারে তো চেষ্টা করে দেখুক। বিলাল অবশ্য বাঁধা দেবার কোন চেষ্টাই করল না, উল্টে তাকে দেখে মনে হল বিকাশের কাণ্ডকারখানায় সে যেন বেশ মজাই পেয়েছে। দ্রুত হাতে লক খুলে বিকাশ বেরোতে গিয়ে অবশ্য বাঁধা পেল, দরজা আগলে বিলালের গুন্ডারা দাঁড়িয়ে, লোকগুলো বিকাশকে চেপে ধরে বিলালের সামনের চেয়ারটায় এনে বসাল, বিলাল অন্যদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে যুধিষ্ঠিরের পটটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, কিছুক্ষণ পর বিকাশের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টে চেয়ে বলল –‘কি মনে হয় বিকাশ, এতোবড় বিসনেস আমি এমনিই খাঁড়া করেছি, ব্যাক-আপ ছাড়া এতদূরে এমনিই চলে আসব।

বিকাশ আর একবার বন্দী হয়েছে, মেটিয়াবুরুজের সেই অপরিসর ঘরটায়, যেখানে আগেও একবার তাকে বন্দী করা হয়েছিল, তবে সেটা ছিল সাময়িক আর এবারে বিকাশ নিজেই তার আশা ভরসা সব হারিয়ে ফেলেছে। আজ সন্ধ্যেবেলা জুয়ার বাজিতে হারার পর বিলাল আর তার দলবল বিকাশকে বন্দী করে এই ঘরে এনে আটক করেছে। সোনা কোথায় আছে বিকাশ সেটা বলে দিতে অবশ্য দেরি করেনি, বিলাল কয়েকজনকে নিয়ে নিজেই গেছে রাসেল স্ট্রীটের হোটেলে। সোনা পাওয়ার পর বোধহয় তাকে আর বাচিয়ে রাখার প্রয়োজন বিলালের হবে না, যুধিষ্ঠিরের পটটা দেখে বোধহয় বিলালের কৌতুহলের উদ্রেক হয়েছে তাই সেটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, পটটা এইমুহূর্তে বিকাশের পায়ের কাছেই পরে রয়েছে। বিকাশ এখন যে ঘরটায় রয়েছে সেখানে তাকে পাহারা দেবার মতো শুধু একজন লোকই মোতায়েন রয়েছে, এ হচ্ছে বিলালের সহোদর ভাই আনোয়ার, পায়ের কাছে পরে থাকা পটটা দেখে বিকাশের মনে হল শেষ একটা সুযোগ তার সামনে এখনও রয়েছে যদি কোনরকমে ওই আনোয়ারকে বাগে আনা যায় তবে সেটা বেশি দেরি করলে হবে না কেননা বিলাল যেকোন সময় চলে আসতে পারে, একবার বিলাল এসে হাজির হলে বিকাশের মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে যে আর দেরি করবে না সেটা বিকাশ ভালোই জানে। বিকাশ মৌতাতে মজে থাকা আনোয়ারের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করে বলল –‘আনোয়ারভাই তবে কি তোমরা আমাকে মেরে ফেলবে’। আনোয়ার কোন উত্তর না দিয়ে শুধু বিশ্রী ভাবে হাসল। বিকাশ ফের বলল –‘দেখো মারতে হয় মারো, কিন্তু মরে যাবার আগে আমার কিছু জিনিস আছে যেটা কাউকে দিয়ে যেতে চাই, তুমি নেবে’। আনোয়ার ভেংচি কেটে বলল –‘তোর ডেডবডি গুম করার সময়, যা কিছু আছে সব আমরা খুলে নেব এখন চুপ করে থাক, আমার নেশা কেটে গেলে কিন্তু ফালতু ধোলাই খাবি’। বিকাশ একমুহুর্ত চুপ থেকে তারপর বলল -‘আমার পায়ের কাছে যে পাথরের স্লেটটা পরে আছে ওটার বাজারে দাম অনেক, যদিও কেউ জানে না, তুমি একবার ওটা হাতে তুলে দেখো’। আনোয়ার এবারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে গালাগাল করে উঠল –‘শালা মাদারচোদ কাহিকা, নেশা ছুটিয়ে ছাড়বি’। দুপা উঠে এসে বিকাশের গালে বিশাল একটা থাপ্পড় কষিয়ে আনোয়ার এবারে যুধিষ্ঠিরের পট হাতে তুলে নিল, কিছুক্ষণ গভিরভাবে দেখে বলল –‘কি দাম হবে এর মার্কেটে’। বিকাশ এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল, বলল –‘ফরেন মার্কেটে এর দাম কয়েক কোটি, তবে এটা তুমি এমনি পাবে না, আমাকে জুয়ায় হারাতে পারলে তবেই দেব’। আনোয়ার হলুদ ছোপওয়ালা দাঁত বের করে হাসল, বলল –‘শালা একটু পরে তোকে মেরে পুতে দেব আর তুই আমাকে চ্যালেঞ্জ করছিস, তোর হিম্মত তো কম নয়’? চড়ের ঘায়ে বিকাশের গাল মাথা ঝনঝন করছিল, পরিস্থিতি বিবেচনায় মাথা ঠান্ডা রাখলেও কণ্ঠস্বরে তিক্ততা ফুটে উঠল, বলল -‘যদি চাও এটা বিলালভাইএর হোক, তবে ঠিক আছে’। আনোয়ার আবার দরজার সামনে বসে গাঁজার কল্কেতে টান দিয়ে ঝিমুতে লাগল, বিকাশ অবশ্য জানে মাছ টোপ গিলে ফেলেছে কিন্তু এতো দেরি হলে তো মুশকিল হয়ে যাবে, একবার বিলাল এসে হাজির হলে আর কিছু করার থাকবে না। প্রায় পাঁচমিনিট পর আনোয়ার চোখ খুলে বলল –‘জিতলে ওই বোর্ডটা আমাকে দিবি’। বিকাশ উৎসাহিত হয়ে বলল –‘সে আর বলতে কিন্তু হেরে গেলে তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে’। আনোয়ার মুখ খিস্তি করে বলল –‘শুওরের বাচ্চা তোকে ছেড়ে দিয়ে কি আমি মরব’। বিকাশ ভিতরে ভিতরে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে, এই আনোয়ার লোকটা অযথা সময় নষ্ট করছে, যেকোন সময় বিলাল এসে যাবে। আরও প্রায় দশ মিনিট পর মৌতাত ভেঙ্গে আনোয়ার বলল –‘জুয়া খেলবি কিসে, এখানে শুধু একটা লুডো খেলার বোর্ড আছে আর কিছু নেই’। -‘ওতেই হবে, লুডোর গুটি দিয়েই হবে’। আনোয়ার এবার ঘরের কোন থেকে একটা বিবর্ন লুডোর ডাইস নিয়ে এলো। বিকাশের বাঁধন খুলে দিতে দুজনে মেঝেতে একে অপরের সামনে বসল। আনোয়ার বলল–‘আগে আমি চালব, তারপর তুই’। বিকাশ অবশ্য যেকোন প্রস্তাবেই রাজি। মুঠোর মধ্যে ডাইসটাকে ভালো করে ঝাঁকিয়ে আনোয়ার মেঝেতে গড়িয়ে দিল। প্রথম চালেই ছক্কা, আনোয়ার আনন্দে হইহই করে উঠল –‘দেখেছিস শালা’। গুটি এবার বিকাশের হাতের মুঠোয়, সে কয়েকবার উপর নিচে ঝাঁকিয়ে ফেলে দিতে একই ফল, ছক্কা! আনোয়ার একটু সন্ধিগ্ন হয়ে ডাইসটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল, নাঃ সবই তো ঠিক আছে, ফের ডাইস পাঁক খেয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল, আবার ছক্কা, আবার বিকাশের পালা এবং সেই ছক্কা, আনোয়ারের শেষ চাল উপস্থিত, তার নেশা এতক্ষণে কেটে গেছে, বিপদের গুরুত্বটা হঠাৎ মাথার মধ্যে খোঁচা মারতে শুরু করেছে, জুয়ায় হেরে গেলে এই বাঙালিটাকে ছেড়ে দিতে হবে তখন কি বিলালভাই তাকে আর আস্ত রাখবে! ভয়ে ভয়ে আনোয়ার শেষ চাল দেগে দিল, কাঁপা কাঁপা হাতে ফেলে দেওয়া ডাইস দুটো পাঁক খেয়ে স্থির হয়ে পড়ল, এবারে পাঁচ। বিকাশের মাথায় আর কোন চিন্তার বোঝা নেই সে জানে যাই ঘটুক না কেন ছনম্বর এই বাজিটা তার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। নিশ্চিন্ত মনে বিকাশ নিজের দান খেলল, ডাইস বেশ কয়েকটা পাঁক খেয়ে স্থির হয়ে পড়ল, সেদিকে তাকিয়ে আনোয়ার আর্তনাদ করে উঠল –‘বিলালভাই হামকো জিন্দা নেহি ছোরেঙ্গে’। বিকাশ সোল্লাসে বলল –‘আমার আবার ছয় পড়েছে আনোয়ার, এই গেম আমি জিতেছি, এবারে তুমি নিজের কথা রাখো’। আনোয়ার ঘাবড়ে যাওয়া স্বরে বলল –‘লেকিন আমার কি হবে, বিলালকে আমি কি বলব’। বিকাশ ঠাণ্ডা মাথায় বলল –‘তোমার পিস্তলটা আমাকে দাও, বলবে আমি ওটা ছিনিয়ে নিয়ে ভেগেছি’। আনোয়ার বিনাবাক্যব্যায়ে কোমরের বেল্ট থেকে পিস্তল খুলে বিকাশের হাতে তুলে দিয়ে বলল, তবে একঠো গোলী আমার পায়ে মেরে পিছনের দরজা দিয়ে ভাগো, বিলাল ভাববে আমি সত্যি কথা বলছি’। গলির মুখে ইঞ্জিনের ঘরঘর শব্দ শোনা গেল, আনোয়ার ভয় খাওয়া স্বরে বলল –‘ওই বিলালভাই এসে গেছে তাড়াতাড়ি করো, এরপর দুজনেই মরব’। কয়েকটা ভারী পদশব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে, বিকাশ আর দেরি করল না, পিস্তলের ঘোরা আনোয়ারের পা লক্ষ্য করে দেগে দিল। প্রচণ্ড শব্দ সঙ্গে সঙ্গে বারুদের কটু গন্ধে ঘর ভরে গেল। আনোয়ার পা ধরে কুঁইকুঁই করে মেঝেতে শুয়ে পড়ল, আর বিকাশও পিছনের দরজা খুলে ছুটতে শুরু করল। বন্দর এলাকার কানাগলি! যে ওয়াকিবহাল নয় তার কাছে মরনফাদ। বিকাশ আজ সেই ফাঁদে আটকা পড়েছে, পায়ের শব্দগুলো ক্রমশ তার কানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, একটু পরেই যে লোকগুলো তাকে ধরে ফেলবে সেবিষয়ে বিকাশের মনে আর কোন সন্দেহ নেই। কাছাকাছির মধ্যে লোহার একটা বড়সড় ড্রাম চোখে পড়তে বিকাশ সেটার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। সামান্য পরেই বিলাল আর তার চারজন সঙ্গী এস গলির মুখে হাজির হল, প্রত্যেকের হাতেই খোলা রিভলভার মুখে শিকারের উত্তেজনা, ওরা এদিক ওদিক চাইছে, কান পেতে পায়ের আওয়াজ শোনার চেষ্টা করছে, বিকাশ দলটাকে আরও একটু কাছে আসতে দিল, ওরা ড্রামটার খুব কাছে এসে পড়েছে, একটা বাঁক ঘুরলেই বিকাশকে দেখতে পেয়ে যাবে, অবশ্য সে সুযোগ বিকাশ দেবে না, মরতে যখন হবেই তখন সেও মেরে মরবে, তবে সবকটাকে নিতে না পারলেও অন্তত বিলালকে তার চাই। আততায়ীরা খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে আর অপেক্ষা না করে বিকাশ বিলালের হাঁটু লক্ষ্য করে পিস্তল দেগে দিল, বিকট চিৎকার করে বিলাল সিমেন্টের চাতালের ওপর আছড়ে পড়ল। আক্রমণকারীরা এমন পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, একমুহূর্তের জন্য যেন বেকুব হয়ে গেল, বিদ্যুত গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে বিকাশ পিস্তল থেকে আরও দুটো গুলি খরচ করল, বিলালের পেট আর বুক লক্ষ্য করে, বিলালের গলা অবধি একটা আর্তনাদ এসে আটকে গেল, তার বিস্ফারিত চোখ দুটো ততোক্ষণে চিরদিনের মতো স্থির হয়ে গেছে। আর তখুনি ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট এসে বিকাশের গলা বুক পেট ফুটো করে পিছনের রঙচটা দেয়ালটার পলেস্তরা খসিয়ে ফেলল। বিকাশের প্রাণহীন দেহটা আছড়ে পড়ল বিলালের মৃতদেহের একেবারে ঠিক পাশেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%