প্রতিশোধ

সঞ্জয় ভট্টাচার্য

হাওড়া থেকে প্রায় ছঘন্টা ট্রেন জার্নির পর যে স্টেশনে এসে হিমাদ্রি নামল সেখান থেকে জলাধুংড়ি এখনও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। নির্জন স্টেশনে দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিঁর ডাক স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, চারপাশে বুনো ঝোপ আর বড়ো বড়ো গাছের চাঁদোয়ায় সূর্যের আলো বাঁধা পেয়ে কেমন যেন রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কয়েক পা এগিয়ে গেলে যে চায়ের দোকানটা দেখা যাচ্ছে সেখানে এসে দাড়াতে দোকানদার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল।

-জলাধুংড়ির গাড়ি পাওয়া যাবে?

লোকটা চায়ের গ্লাস ধুতে ধুতে বলল -মোরের মাথায় নিতাইয়ের সাইকেলের দোকানের সামনে থেকে রিকশা ধরে নিন। লালু পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে দোকানির উদ্দেশ্যে বলল -ভালো করে চা খাওয়াও দিনি, সঙ্গে আর কিছু আছে?

-নেড়ো বিস্কুট আর মুড়ির মোয়া

-ওতেই হবে

লালু শব্দ করে চা আর মোয়া খেতে শুরু করেছে সেই ফাঁকে হিমাদ্রি একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিল।

-বাবু চা খাবেন? হিমাদ্রি না বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ কি মনে হতে বলল -আচ্ছা দাও,

মাটির ভাড়ে ধোয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতেই পুরোনো স্মৃতি মনে পরল। সাত বছর আগে এমন কোথাও চা খাবার কথা হিমাদ্রি কষ্ট করেও কল্পনা করতে পারত না কিন্তু এতোগুলো বছর জেলের ঘানি টেনে এখন আর কিছুই যেন গায়ে লাগে না। কালুর খাওয়া মিটেছে, ঝুলিটা কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়াল -চলেন বাবু। ষ্টেশন চত্বরটা হেঁটে পার হয়ে কিছুদুর এগিয়ে যেতেই নিতাইয়ের সাইকেল দোকান দেখা গেল। একজন বুড়ো লোক সাইকেলের টায়ার মেরামত করছিল, অপরিচিত লোক দেখে গুরুত্ব না দিয়ে ফের নিজের কাজে মন দিল। -এখানে ভ্যানরিকশা পাওয়া যাবে? বুড়ো সন্ধিগ্ন কণ্ঠে বলল -কোথায় যাবেন?

-জলাধুংড়ি

বুড়ো কাজ করতে করতে হাঁক পাড়ল -জগা অ্যাই জগা। দরমা দেওয়া ঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ এলো -কি হইসে

-জলাধুংরির সওয়ারি এসেছে। জগা একটা অল্পবয়েসি ছোকরা বোধহয় কিছু খাচ্ছিল, গামছায় হাত মুছতে মুছতে বেড়িয়ে এলো -আমার এখন হাটে যাবার আছে ওপথে গেলে দেরি হয়ে যাবে তবে বেশি ভাড়া পেলে যাব।

হিমাদ্রি বিরক্তির স্বরে বলল -যা নেবার নেবে এখন তাড়াতাড়ি চলো।

জনবসতি এলাকা ছাড়িয়ে অনেকটা চলে আসা গেছে, রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিয়ে জিজ্ঞাসা করল -কোথায় উঠবেন বাবু গরমেন্টের লজে?

-চৌধুরীদের বাংলোটা জানা আছে?

-ওবাড়ির অবস্থা খুব খারাপ একেবারে সাপ বাদুড়ের আস্তানা,

-ওখানেই যাব। সামনে একটু উঁচু মতো জমি পেয়ে ছোকরা এবার দাঁতে দাঁত চেপে প্যাডেল ঠেলতে লাগল আর হিমাদ্রিও নিজের চিন্তার মধ্যে ডুবে গেল, পুরানো সব স্মৃতি যেগুলো এতবছর তাকে শুধু দুঃখই দিয়ে এসেছে, দীর্ঘ সাত বছর জেলের চার দেয়ালের মধ্যে প্রতিদিন একটাই বাসনা তীব্র আকার ধরে হিমাদ্রিকে জীবনীশক্তি জুগিয়ে এসেছে। শেখরের প্রতি অব্যক্ত ঘৃণা। কয়েক মাস আগে জেল থেকে বেরিয়ে জানতে পারল ফাঁকি দিয়ে শেখর আবার পালিয়েছে আর এবারে পাকাপাকি ভাবেই, জলাধুংরির পৈতৃক বাংলোয় গায়ে আগুন দিয়ে ও যে কেন আত্মহত্যা করেছে তার হদিশ কারো কাছে নেই । প্রচণ্ড দুঃখে হিমাদ্রি ভেঙেই পড়েছিল, সুলগ্নার খোঁজ বোধহয় আর কখনই পাওয়া যাবে না। অকস্মাৎ বদ্রু গুনিন এর খবরটা কানে এলো। অনেক আশা নিয়ে মুর্শিদাবাদের অজ গায়ে গিয়েও খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছিল। পরিকল্পনা শুনে বদ্রু তো চটে লাল, মুখের ওপরেই বলে দিল -আপনি পাগল নইলে এইসব জিনিস নিয়ে ছেলেখেলা করতে সাহস করেন, লাখ টাকা দিলেও ওকাজ আমি করব না। হতোদ্যাম হয়ে হিমাদ্রি গাড়ি চালিয়ে বড়ো রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছিল হঠাৎ লালু ছুটতে ছুটতে এসে গতি রোধ করল, বলল -বাপের মাথা খারাপ তাই আপনারে ফিরায়ে দিসে কামটা আমি করে দেব তবে একটু বেশি টাকা লাগব, বিশ হাজার লাগবে।

-তুমি পারবে?

-বাপের কাছ থেকে সব বিদ্যেই আমার শেখা হয়ে গেছে আপনি চিন্তা করেন নাই।

-আপনারা কি চৌধুরীবাবুদের কেউ? রিকশাওয়ালার কথায় চিন্তার জাল ছিন্ন হতে হিমাদ্রি বিরক্ত হল এ ছোড়া প্রয়োজনের বেশি কথা বলছে।

লালু এতক্ষণ চুপ করে রাস্তার দুধারে জঙ্গল দেখছিল এবার গলা পরিস্কার করে বলল -বাবু আপনার ওই বিলিতি সিগারেট একটা দিবেন। সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিতেই লালু ওর থেকে একটা কিং সাইজ গোল্ডফ্লেক বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল। রিকশার চাকা থমকে দাঁড়িয়েছে। রিকশাওয়ালা ঘোষণা করল -এসে গেছি বাবু এই আপনার চৌধুরী ভিলা।

শাল আর মহুয়ার জঙ্গলের মধ্যে বিঘেখানেক জমির ওপর পাঁচিল ঘেরা পুরনো বাড়ি। বাংলোর অবস্থা নেহাতই জীর্ন যাকে বলে একেবারে ভগ্নদশা প্রাপ্ত, দেয়ালে দেয়ালে বটগাছের শিকড় জড়িয়ে সর্বত্র বড়বড় ফাটল, দেখে মনে হয় অনেক বছর মানুষের পা এবাড়িতে পরেনি। হিমাদ্রি মনে মনে গালাগাল দিল, হতভাগা মরার জায়গা পায়নি, বাড়ির এই ভগ্নদশা তারপর আবার এ অঞ্চলটার বিশেষ বদনাম আছে, পুরো এলাকাটাই নকশালদের ঘাঁটি, ভয়ে আজকাল শখের ভ্রমণপিপাসুর দল এপথ মাড়ানোই ছেড়ে দিয়েছে।

ভেতরে ঘুরে ঘুরে হিমাদ্রি বাড়িটা খুটিয়ে দেখল, বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া জমি অনেকটা। সদর দরজায় আলতো চাপ দিতেই একটা চামচিকে প্রায় মুখের ওপর ডানা ঝাপ্টিয়ে উড়ে গেল। নিচের তলায় তিনটে ঘর সঙ্গে রান্নাঘর বাথরুম, সামনে রেলিং দিয়ে ঘেরা লম্বা বারান্দা, হলঘরের মাঝবরাবর ভাঙাচোরা কাঠের সিঁড়ি দুতলায় উঠে গেছে, ওই সিঁড়িতে পা রাখাটা নিতান্তই মুর্খামি হবে বিবেচনায় হিমাদ্রি আর তাই নিয়ে মাথা ঘামাল না। লালু ঝাঁটা সঙ্গে করে নিয়েই এসেছে হলঘরটা পরিস্কার করে চাদর পেতে বসল। হিমাদ্রি সুটকেস থেকে স্যান্ডুইচ আর চায়ের ফ্লাস্ক বের করল। প্লেটে খাবার সাজিয়ে লালুকে দিল আর নিজেও খেতে শুরু করল। এবাড়ির কোন এক ঘরে শেখর আত্মহত্যা করেছে, তবে ঠিক কোন ঘরটায় সেটা জানা বোধহয় কোনভাবেই সম্ভব নয়। খাওয়া হয়েছে, লালু বিশ্রী ঢেঁকুর তুলে বলল -বাবু পাউরুটির মধ্যি ওটা কি মাংসের পুর ছিল?

হিমাদ্রি সোজা কাজের কথায় চলে এলো -অমাবস্যা সাতটা দশে, রাত জাগতে হতে পারে তুমি কি একটু রেস্ট নিতে চাও? লালু মাথা নেড়ে বলল -আপনি বরং রেস্ট করেন আমি কাজ খানিক এগায়ে রাখি। হিমাদ্রি ঘড়ি দেখল এখন চারটে বাজে সুর্যাস্ত পাঁচটা একত্রিশে বিশ্রামের প্রয়োজন নেই, বরঞ্চ এই সুযোগে বাড়ির চারপাশে একটু পায়চারী করে আসা যাক।

বাংলোর বাইরে উঠোনে এসে হিমাদ্রি জুত করে সিগারেট ধরাল, নেহাৎ দরকার তাই নইলে এই লোকটাকে তার একেবারেই বরদাস্ত হচ্ছে না অবশ্য জেলে এর থেকেও ইতর শ্রেণীর লোকজনের সঙ্গে তাকে দিন কাটাতে হয়েছে। জেলের দিনগুলো মনে পড়তেই হিমাদ্রির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, নাঃ শেখরকে তার চাই, জ্যান্ত না হোক মৃতই! হিমাদ্রির আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় শেখর তার সাথে এমনটাও করতে পারে! দীর্ঘ ত্রিশ বছরের বন্ধুত্ব তারপর এক ব্যাবসায় অংশীদার জমি বাড়ির দালালী করতে করতে হঠাৎ একদিন হাত লাগাল চোরাচালানের কাজে যোগাযোগটা অবশ্য শেখরের মাধ্যমেই হয়েছিল, নতুন কারবারে ফুলে ফেঁপে উঠতে দেরি হল না, তারপর এলো সুলগ্না। হিমাদ্রির সুন্দরী স্ত্রী, বন্ধুত্বে চিড় ধরার সেই শুরু। হিমাদ্রির মনে হল শেখর যেন বন্ধুপত্নির প্রতি অকারন মনোযোগ প্রদর্শন করছে আর এতোটা সাহস সে পাচ্ছে সুলগ্নারই প্রস্রয়ে। হিমাদ্রির চিন্তায় ছেঁদ পড়ল, একটা রোমশ বাদুড় কয়েক পাক খেয়ে সামনের পুকুরটার জলে জিভ ঠেকিয়ে চৌধুরীবাড়ির দিকে উড়ে গেল। সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে, হিমাদ্রি বাড়ির ভিতর রওয়ানা দিল।

লালু ইতিমধ্যে বোতল খুলে বসেছে। হিমাদ্রি বিরক্ত কণ্ঠে বলল -এখন আবার এসব কেন? লালু ঘোলা চোখ মেলে তাকাল -একটু নেশা না করলে বাবু কাজ করা যায়! মনে জোর চাই তো, আমার কথা শুনলে বলব আপনিও একটু চড়িয়ে নেন বিলিতি পানি আছে নাকি কিছু! কথাটা হিমাদ্রির মনে ধরল আজ রাতে যাই ঘটুক না কেন নার্ভ স্ট্রং রাখতে হবে। পকেট থেকে চাবি বের করে স্যুটকেশটা খুলতেই ভুরু কপালে উঠল। বাক্স খুলে কেউ ঘাটাঘাটি করেছে, যদিও তালা যথারীতি আগের মতোই ঝুলছে এবং অক্ষত ভাবেই। হিমাদ্রি আড় চোখে লালুর দিকে চাইল লোকটা তাহলে পাকা চোর। হিমাদ্রি ধীরে সুস্থে বাক্স বন্ধ করল কালুকে এখন কিছু বুঝতে দেওয়া উচিৎ হবে না আগে কাজ মিটুক তারপর দেখা যাবে। মাথার উপর দিয়ে ফরফর করে কিছু উড়ে যেতেই হিমাদ্রি চমকে উঠল, সেই বাদুড়টা বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে। বাদুড়টা কড়িকাঠটাকে দুবার প্রদক্ষিণ করে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল আর সাথে সাথে সুর্যটা ডুবে চারপাশে অন্ধকার ছেয়ে গেল। এমার্জেন্সী লাইট দুটো দুদিক দিয়ে জ্বেলে দিতেই ঘরের মধ্যে পরিস্কার ভাবে আবার সবকিছু দেখা গেল।

লালু কাজ শুরু করেছে। মড়ার খুলির উপর সিঁদুর মাখিয়ে সেটাকে ত্রিকোণ আকারের একটা আয়নার সামনে এমনভাবে রেখেছে যাতে প্রতিবিম্বটা সোজা গিয়ে ওর ওপরে পরে, চারপাশে কয়েকটা কালো রঙ করা মাটির পাত্রে সুপুরি আর সিঁদুর মাখিয়ে দুর্বোধ্য সব মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছে যার বিন্দু-বিসর্গ না বুঝলেও হিমাদ্রি অনুভব করল উচ্চারণের সুরটায় কেমন যেন একটা বিষণ্ণ মাদকতা আছে, মুর্গিটা ঝিমিয়ে যাওয়া নিস্তেজ চোখ মেলে চেয়ে ছিল লালু সেটাকে হাতে তুলে নিয়ে অভ্যস্ত হাতে মুণ্ডুটা ধর থেকে আলাদা করে ফেলতেই সদ্য মৃত মুর্গির পা দুটো দুর্দান্ত রকম ছটফট শুরু করল। লালু শক্ত হাতে গলাটা মাটির পাত্রের মাঝে চেপে ধরল একসময় ওটা রক্তে ভরে যেতেই কাটা মুর্গিটাকে ছুড়ে ফেলে রক্তটা খুলির গায়ে ভালো করে লেপে দিতে দিতে খুলিটাকে আগুনে সেঁকতে শুরু করল ঠিক যেমন কুমোরে মাটির তৈরি জিনিস তাপে শুকিয়ে পোক্ত করে।

হঠাৎ লালু যেন ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল খুলিটা হাত থেকে ছিটকে পরে একপাক গড়িয়ে যেন নিজে থেকেই সোজা হয়ে বসল। দারুণ বিস্ময়ে হিমাদ্রি লক্ষ্য করল খুলির কাঠামোর উপর তার একসময়ের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু শেখরের স্পষ্ট আদল ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। ধীরে ধীরে সাদা হাড়ের ওপর চামড়া মাংসের প্রলেপ পড়ল, কাটা মাথায় যেন জীবনের রঙ ধরল, শেখরের বন্ধ চোখের পাতা খুলে গিয়ে সরাসরি তার পুরনো বন্ধু হিমাদ্রির দিকে স্থির দৃষ্টে চেয়ে যেন ফুঁসতে লাগল। হিমাদ্রি মতো সাহসী মানুষও এই দৃষ্টি দেখে ঘাবড়ে গেল, কি বুনো আর হিংস্র এই চোখের দৃষ্টি, হিমাদ্রি তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা ঘড়ঘড়ে কণ্ঠ বিলাপ করে উঠল -কি অসহ্য যন্ত্রণা? জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। লালু কাঁপা স্বরে বলল হিমাদ্রিকে উদ্দেশ্য করে বলল -যা জানতে চান জিগান, মনশক্ত করে খুলির সামনে দাঁড়িয়ে হিমাদ্রি বলল -চিনতে পারিস শেখর আমি হিমাদ্রি। খুলি কোন উত্তর দিল না। হিমাদ্রি ফের জিগ্যেস বলল -শেখর সুলগ্না কোথায় আছে বলে দে? খুলি আগের মতোই নিরুত্তর রইল। হিমাদ্রি হতাশভঙ্গীতে লালুর দিকে ফিরতেই চমকে উঠল, লালু কোথায়? এক্ষুনি তো পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল! অকস্মাৎ বাড়ি কাঁপিয়ে বিকট অট্টহাসি। আওয়াজটা আসছে খুলির চোয়ালের ফাঁক দিয়ে সেইসঙ্গে হাড়ে-হাড়ে ঠোকাঠুকির খটাখট শব্দ। হিমাদ্রির বুকের ভিতরে যেন ভয়ের ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। পরিচিত স্বরে খুলি বলে উঠল -জোচ্চোরটা পালিয়েছে। তবে যাবে কোথায়? এবাড়ির চৌহদ্দি ডেঙ্গাবার ক্ষমতা ওর হবে না, ভেবেছিল ভণ্ডামি করতে করতে একসময় তোর মাথায় ঘা মেরে টাকাপয়সা হাতিয়ে ভেগে পড়বে কিন্তু আমি যে সত্যি সত্যি এসে হাজির হব সেটা আন্দাজ করতে পারে নি। হিমাদ্রির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে কোনোক্রমে বলল -তুমি কি শেখর? মুহুর্তের বিরতির পর খুলি বলে উঠল -পুরনো বন্ধুর কণ্ঠস্বর চিনতে তো অসুবিধে হবার কথা নয়। হিমাদ্রি কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না, কালুর ভরসায় এতবড় ঝুকি নেওয়াটা যে আহাম্মকের কাজ হয়েছে সেটা ভালোই বুঝতে পারছিল, শেখরই আবার কথা শুরু করল বলল -যে আশায় এতদূর ছুটে এসেছিস আজ রাতে তার পুর্তি অবশ্যই ঘটবে সুলগ্নার সাথেও দেখা হবে নিশ্চয়ই তবে তার আগে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর চাই, আমাকে এভাবে পুড়িয়ে মারার কি খুব দরকার ছিল? হিমাদ্রির দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, পকেটে হাত দিতে রিভলভারটার ছোঁয়া পেতেই খানিকটা সাহস ফিরত এলো। বিকৃত স্বরে বলল -বেশ করেছি আরও হাজার বার পুড়িয়ে মারতে হলেও আপসোস হবে না। বন্ধুর বউএর সঙ্গে লুকিয়ে ফুর্তি মারার সময় ভেবেছিলি পার পেয়ে যাবি তাই না? চালাকি করে তোকে এই জংগলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, আগে থেকেই আমার ভাড়া করা লোকেরা রেডি ছিল তবে এটা ভাবতে পারিনি তুই হারামজাদা সুযোগ বুঝে আমার বউকেও সঙ্গে নিয়ে কাটবি। খুলির হাঁ থেকে কর্কশ শব্দ ভেসে এলো -যখন সুলগ্নাকে রাতের পর রাত লোভী নেকড়েগুলোর সামনে ফেলে দিতিস তখন মনে হয়নি ও তোর বউ, মনে হল যখন ও আমার সাহায্যে তোর কবল থেকে পালাল। হিমাদ্রি রিভলভার হাতে তুলে ঠাণ্ডা গলায় বলল -গুলি করার আগে একটাই কথা জিগ্যেস করব সুলগ্না কোথায়?

-সেটা তোর ওই ভাড়া করা লোকগুলোকে জিগ্যেস করলে জানতে পেতিস। আমাকে পুড়িয়ে মারার পর যারা তাদের মালকিনকেও ছাড়েনি। পাঁচজনে মিলে রেপ করে এবাড়ির উঠোনে জ্যান্ত কবর দিয়েছে। হিমাদ্রির আর সহ্য হল না করোটি লক্ষ্য করে রিভলভারের ঘোড়া টিপল একে একে তিনবার। সবকটা হাড় গুড়ো গুড়ো হয়ে এদিক ওদিক ছিটিয়ে পড়ল। এবার হিমাদ্রি পিছু হটল, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বিদায় নিতে হবে। যদিও পালানো সম্ভব হল না দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে শেখর, ওর মুখটা বিশ্রী ভাবে পুরে গেছে, চোখের মনিটা যেন কোটর থেকে ঠেলে বেড়িয়ে আসবে, মনে হচ্ছে। শেখর পোড়া ঠোঁট দুটো ফাঁক করে হাসল -সুলগ্নার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যাচ্ছিস যে, ওই দ্যাখ। প্রচণ্ড আতংকে শেখরের আঙুল লক্ষ্য করে তাকিয়ে হিমাদ্রি দেখল কড়িকাঠে যে বাদুড়টা এতক্ষণ ঝুলছিল সেটা যেন মানবীর আকৃতি ধারণ করে মেঝের ওপর নেমে এলো আর এই আধা মানুষ আধা জানোয়ারের মুখটা অবিকল তার এককালের স্ত্রী সুলগ্নার মতো। সুলগ্নার দুচোখ যেন প্রতিহিংসায় জ্বলছে ঠোঁটের ভাজে বীভৎস হাসি, দুহাত বাড়িয়ে সুলগ্না এগিয়ে আসতে লাগল হিমাদ্রির দিকে। সুলগ্না আর হিমাদ্রির মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমছে। এদিকে হিমাদ্রির বুকের ভিতরটা যেন হাপরের মতো ওঠা-নামা করছে। হঠাৎ একটা কাঁপুনি দিয়ে হিমাদ্রি মেঝের ওপর সশব্দে উপুড় হয়ে পড়ল। এখন তার চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে সেগুলো যেন তার পুরনো বন্ধু শেখরের মতোই কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%