ভজুদাদুর নেকলেস

দীপান্বিতা রায়

Cov20

স্কুল থেকে ফিরে হাত-মুখটা ধুয়েই খাবার টেবিলে বসে পড়েছিল পিকু৷ কোনোরকমে খাওয়াটা সেরেই বেরিয়ে পড়তে হবে জিনিসপত্র নিয়ে৷ এ ব্লকের সঙ্গে বি ব্লকের ক্রিকেট ম্যাচ আছে আজ৷ পিকু হল বি ব্লকের ক্যাপ্টেন৷ তাই তার দেরি করার কোনো উপায় নেই৷ ওদের টিমের ফাস্ট বোলার মেহুলির আবার কাল অঙ্কের ক্লাস টেস্ট৷ অনেক কষ্টে মাকে বলে-কয়ে আজ খেলার পারমিশন পেয়েছে মেহুলি৷ কিন্তু কড়ার করতে হয়েছে ছ-টার মধ্যে খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরতে হবে৷ তাই দেরি হয়ে গেলে বিপদ৷ আধখানা পরোটা মুখে পুরে পিকু তাই গভীরভাবে ফিল্ডিং সাজানোর স্ট্রাটেজি ভাবছে এমন সময় মা এসে দাঁড়াল দরজায়, অত তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছ কেন?

মুখের পরোটাটা গিলে নিয়ে পিকু বলল, না না ঠিক আছে... আসলে আজ খেলা আছে তো...

খেলা তো আজ হবে না৷

মায়ের কথা শুনে সাংঘাতিক অবাক হয়ে যায় পিকু, আরে আমি আমাদের ক্রিকেট ম্যাচের কথা বলছি তো...

সি ব্লকের দাশগুপ্তবাবু কমপ্লেইন করেছে কাল তোদের বল লেগে বারান্দার ফুলের টব উলটে গেছে৷ তাই কমিটি আগে ইনস্পেকশন করে দেখবে কোথায় খেললে কারুর কোনো অসুবিধা হবে না, তারপর সেখানে খেলা হবে৷

মায়ের কথা শুনে রাগে-দুঃখে কান্না পেয়ে গেল পিকুর৷ এই জন্যই তো ফ্ল্যাটবাড়িটা বিচ্ছিরি লাগে আমার...৷ কাটজুনগরের ওই একতলা বাড়িটাই ভালো ছিল৷

রেগে-মেগে গজগজ করতে করতে উঠে যায় মা৷ নতুন ফ্ল্যাটের নিন্দে করলে মা খুব রেগে যায় পিকু জানে৷ কিন্তু কী আর করা যাবে৷ কাটজুনগরে কি আর কখনো এরকম ঘটনা ঘটতে পারত? বাড়িটা ছোটোমতো, একতলা ছিল ঠিকই, কিন্তু একটু এগোলেই বিশাল মাঠ৷ বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারি যাই-ই মারা হোক না কেন কারুর বাড়িতে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই৷

বর্ষাকালে খুশি মনে ফুটবল পেটাত পিকুরা৷ কাদা মেখে ভূত হয়ে বাড়ি ফিরত৷ কেউ কোনোদিন কিচ্ছুটি বলেনি৷ এখানে তো ফুটবল খেলার কোনো উপায়ই নেই৷ ক্রিকেটটাও বন্ধ হল এবার৷

অথচ এই মেঘমুলুক অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট কেনা হবে যখন ঠিক হল, তখন বাবা-মা দু-জনেই কত কিছু বলেছিল পিকুকে৷

একটা মস্ত বড়ো কম্পাউন্ডের মধ্যে চারটে ব্লক৷ তার মানে কত কত ছেলেপুলে বুঝতে পারছিস তো পিকু৷ কত বন্ধু হবে তোর৷ খেলাধুলো, পিকনিক সব একসঙ্গে করতে পারবি৷ আর খেলার জায়গাও তো অনেক৷ নীচে বিশাল ওয়াকিং ট্র্যাক, বাগান, সুইমিং পুল৷ ওখানে থাকলে দেখবি কত মজা৷

এখানে এসে সত্যিই অনেক বন্ধু হয়েছে পিকুর৷ কিন্তু বন্ধু থাকলে কী হবে, খেলবে কোথায়? ওয়াকিং ট্র্যাকে সকাল-বিকেল সবাই হাঁটে৷ তাই সেখানে খেলার উপায় নেই৷ বিশাল বাগান৷ কিন্তু তাতে শুধু সবুজ ঘাসের লন আর ধারে ধারে পাম গাছ লাগানো৷ ঘাস আবার অমন ছেঁটেছুঁটে কার্পেটের মতন করে রাখার কী দরকার পিকু বোঝে না৷ ওর দাদুর বাড়িতেও বেশ বড়ো বাগান আছে৷ সেখানে পেয়ারা, জামরুল এসব ফলের গাছও আছে৷ দাদুর বাড়ি গেলে দিব্যি পেয়ারা পেড়ে খায় পিকু৷ এখানে সেসবরেও বালাই নেই৷ ওই লম্বা ঢ্যাঙা পাম গাছগুলো বড়োদের কেন পছন্দ হয় ওর মাথায় ঢোকে না৷ কিন্তু বাগানে খেলার কথা উঠলেই সবাই হাঁ হাঁ করে ওঠে৷ ওখানে খেললে নাকি মাটি নষ্ট হয়ে যাবে৷ পরে নাকি দারুণ সুন্দর ফুলের বাগান তৈরির প্ল্যান আছে, সেসব আর করা যাবে না৷

তাহলে বাকি রইল পার্কিং লট৷ সেখানে তো গাড়ি রাখা থাকে৷ দুটো ব্লকের মাঝখানের খোলা জায়গাটায় এতদিন খেলত ওরা৷ এবার তাও বন্ধ হল৷

ভয়ানক মনমরা হয়ে পিকু নেমে এল নীচে৷ সিঁড়ির ধাপিতে পল্টন, রনো, মেহুলি, পাপান, ঝিলিক, বাপনরা বসে আছে৷ খবরটা শুনে ফেলেছে সবাই৷ তাই সবার মুখেই একটা গম্ভীর রাগ রাগ ভাব৷ পিকুকে দেখেই মেহুলি বলল, এটা খুব বাজে ব্যাপার রে৷ একটা টব উলটে গেছে বলে আমাদের ম্যাচটাই বন্ধ করে দিল! চল তো সবাই মিলে কমিটির কাকুদের গিয়ে বলি...

বলে কী হবে? আমাদের কথা কেউ শুনবে না৷ এক্ষুনি বলবে, স্কুলে তো সারাদিন খেলা হচ্ছে৷ আবার বাড়িতে এসে খেলার কী দরকার৷ পড়াশোনাও তো করতে হবে...

রনোর রাগত মুখের দিকে তাকিয়ে পিকু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় পিছন থেকে শোনা গেল ভজুদাদুর খ্যানখেনে গলা, কী ব্যাপার আজ খেলাধুলা নেই নাকি৷ এখানে বসে সবাই মিলে গুলতানি হচ্ছে যে...

ভজুদাদু হল মেঘমুলুক ফ্ল্যাটের মালি৷ ফ্ল্যাট তৈরি হওয়ার আগে এখানেই থাকত ভজুদাদু৷ একটা ছোট্ট খোলার বাড়ি আর একটুকরো জমি ছিল, যেখানে সবজি চাষ করত৷ জমিটা কিন্তু ভজুদাদুর নয়৷ তাই জমির মালিক যখন জায়গাটা বিক্রি করলেন, তখনই নাকি কথা হয়ে গেছিল, ভজুদাদুকে আবাসনে একটা কাজ দিতে হবে৷ সেইভাবেই মালির চাকরিটা পেয়েছে ভজুদাদু৷ বাউন্ডারি ওয়ালের ধারে, কেয়ার টেকারের ঘরের পাশে একখানা ছোট্ট ঘরও তাকে দেওয়া হয়েছে৷ সেখানে ভজুদাদু একলাই থাকে৷ এখন অবশ্য ভজুদাদুর কাজ শুধু লনের ঘাস ছাঁটা আর পাম গাছের দেখাশোনা৷ কিন্তু পরে যখন ফুলের বাগান তৈরি হবে তখন তার দেখাশোনাও করতে হবে তাকেই৷

ভজুদাদুর সঙ্গে আবাসনের ছোটো ছেলেপিলেদের ভারি ভাব৷ ছেলেরা দুষ্টুমি করলেও কখনো কিছু বলে না৷ নিজের ঘরে ছোটো ছোটো কুল মজিয়ে একরকম আচার তৈরি করে, সেটা বাচ্চাদের মাঝেমধ্যে খেতে দেয়৷ পিকু, রনো, মেহুলিরা সবাই তাই ভজুদাদুকে খুব পছন্দ করে৷

কিন্তু আজ তো তাদের সবার মন খারাপ৷ তাই দাদুকে দেখেও লাফিয়ে উঠল না কেউ৷ বরং পিকুই গম্ভীর গলায় বলল, আজ খেলা হবে না দাদু৷ আজ খেলা বন্ধ৷

কেন কেন? আজ তো তোমাদের ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল৷

আমাদের বল লেগে দাশগুপ্তদের বারান্দার টব উলটে গেছে৷ তাই আজ খেলা বন্ধ৷ কমিটি নতুন জায়গা খুঁজে দিলে তবে আবার খেলতে পাব৷

না না এটা তো ঠিক কথা নয়৷ তা কী করে হয়৷ আমি কমিটির বাবুদের বলব৷ তোমরা চিন্তা কোরো না সোনা৷ খেলার ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে...

ঝিলিকের করুণ গলা শোনা যায়, কিন্তু আজকের ম্যাচটা তো হল না দাদু৷ আমাদের বড্ড মন খারাপ হয়ে গেছে...

তাই তো তাই তো, কী করা যায় বলো তো...

চিন্তিত মুখে একটুখানি নিজের খড়খড়ে দাড়ি ওঠা গালে হাত বোলায় ভজুদাদু৷ তারপর আবার চনমনে হয়ে ওঠে, তোমরা সবাই এখানে গুছিয়ে বসো৷ আর কেউ থাকলে তাকেও ডেকে নিয়ে এসো৷ আমি ততক্ষণ হারুর দোকান থেকে এক গ্লাস চা নিয়ে আসি৷ আজ একটা খুব ভালো গল্প বলব...

আপনাকে চা আনতে যেতে লাগবে না৷ আমিই নিয়ে আসছি৷ চা তো আমিও খাব৷ আপনি বাবুয়াদের নিয়ে বসেন৷ দাঁড়ান, আগে আপনার জন্য একটা চেয়ার নিয়ে আসি৷

কেয়ারটেকার শিউশরণ কখন এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে কেউ খেয়াল করেনি৷ ভজুদাদুর মাটিতে বসতে কষ্ট হয়৷ তাই শিউশরণ একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে সিঁড়ির সামনে পেতে দেয়৷ একপাশে যাতায়াতের জায়গা ছেড়ে, সিঁড়ির ধাপে ওপর-নীচ করে বসে পড়ে পিকুরা৷ বি ব্লক থেকে ততক্ষণে বুবলা, বান্টি, মকাইরাও এসে পড়েছে৷ ভজুদাদু গল্প শুরু করে৷

তোমরা হয়তো জান, এই মেঘমুলুক কিংবা ওপাশের অলকনন্দা, এগুলো তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি এখানে থাকতাম৷ তখন এই জায়গাটার বেশির ভাগই ছিল চাষের জমি, পেয়ারা আর কলার বাগান৷ আমার নিজেরও একটা ছোট্ট ঘর ছিল৷ তার পাশের জমিতে শাকসবজি ফলিয়ে সেসব বাজারে বিক্রি করেই আমার চলত৷ পুরো এলাকাটার মালিক ছিলেন জমিদার মণিশঙ্কর রায়৷ এই আবাসনের পিছন দিকে যে চওড়া রাস্তাটা, সেটা দিয়ে যদি খানিকটা এগিয়ে যাও, তাহলে একটা বিশাল ভাঙাচোরা বাড়ি দেখতে পাবে৷ সারা গায়ে বট-অশ্বত্থের চারা গজিয়ে গেছে৷ জানলা-দরজার পাল্লাগুলো অনেক আগেই কারা খুলে নিয়ে গেছে৷ প্লাস্টার খসে গিয়ে ইট বেরিয়ে আছে চারিদিকে৷ শুধু লতা আর আগাছায় ঢেকে গেলেও, গেটে ঢোকার মুখে সিংহ দুটো আস্তই আছে এখনও৷ ওটাই ছিল জমিদার মণিশঙ্কর রায়ের বাড়ি৷

মণিশঙ্কর রায়ের শুধু যে জমিদারি ছিল তা নয়৷ তাঁর নানারকম ব্যাবসাও ছিল৷ তাই টাকাপয়সার কোনো অভাব ছিল না৷ বাড়ির সঙ্গে বিশাল বাগান৷ জমিদারবাবুর ছিল খুব গাছের শখ৷ দেশ-বিদেশ থেকে নানারকম ফুলের চারা-বীজ আনাতেন৷ সারা বছর বাগান আলো করে রকমারি ফুল ফুটত৷ ফলের গাছও ছিল নানারকম৷ শোনা যায় তাঁর বাগানের গাছের গোলাপজাম নাকি সাহেবসুবোদের বাড়িতেও ভেট পাঠানো হত৷

মণিশঙ্কর রায়ের প্রাসাদের মতো বাড়ি আত্মীয়স্বজন লোক-লশকরে জমজম করত৷ প্রতিবছর খুব ধুমধাম করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করতেন তিনি৷ তিন দিন ধরে আশপাশের সব গাঁয়ের মানুষ ভোজ খেত৷ জমিদার গিন্নি কমলাদেবী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী৷ তাঁর আবার খুব গয়নার শখ ছিল৷ নানারকম গয়না ছিল তাঁর৷ তবে তার মধ্যেও সবথেকে দামি আর সুন্দর ছিল একখানা হিরের নেকলেস৷ মাঝখানে টুকটুকে লাল চুনির লকেট৷ প্রতিবছর অষ্টমীর দিন সেই নেকলেস গলায় দিয়ে সন্ধ্যে বেলা রানিমা আসতেন ঠাকুরের আরতি দেখতে৷ তখন নাকি তাঁকে একেবারে দুর্গাপ্রতিমার মতোই দেখতে লাগত৷

সেটাও ছিল সেরকমই এক দুর্গাপুজোর অষ্টমী৷ সে বছর সন্ধিপুজো পড়েছিল সন্ধ্যেরাতেই৷ আরতি, সন্ধিপুজো সব হয়ে যেতে জমিদারবাবু আর গিন্নিমা তো বাড়িতে ফিরে গেছেন৷ সেদিন আবার পাশের গ্রামে যাত্রার আসর বসেছে৷ খুব নামকরা পালা৷ জমিদার বাড়ির চাকর-বাকর থেকে গ্রামসুদ্ধু লোক ঝেঁটিয়ে গেছে যাত্রা দেখতে৷ দেউড়িতে দু-জন দারোয়ান বোধ হয় ছিল৷ আর বাড়িতে ছিল মণিশঙ্করের অতি বিশ্বস্ত বুড়ো চাকর নটবর৷ সে আবার জমিদারের বাগানে মালির কাজও করত৷ মাঝরাতে, যখন বাড়ির ভিতরে সবাই গভীর ঘুমে, দেউড়ির দারোয়ানদেরও চোখে ঢুল এসেছে, সেই সময় ডাকাত পড়ল৷ বন্দুক-সড়কি হাতে, মুখে কাপড় বাঁধা ডাকাতের দল, দারোয়ানদের বেঁধে রেখে ভিতরে ঢুকে জমিদারবাবুর কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে রানিমার গয়নার বাক্স, টাকাপয়সা, মোহর সব লুঠপাঠ করে গেল৷ ডাকাতের গুলিতে জমিদার আর গিন্নিমা খুন হলেন৷

পরদিন সকাল থেকেই শুরু হল হইচই৷ পুলিশ এসে বাড়ি ঘিরে ফেলল৷ চারিদিকে খানাতল্লাশি হতে লাগল৷ ডাকাত অবশ্য ধরা পড়ল না৷ কিন্তু তারপর থেকে রায়বাড়ির সেই বোলবোলাও আস্তে আস্তে কমতে লাগল৷ দুর্গাপুজোও বন্ধ হয়ে গেল৷ আত্মীয়স্বজন, ছেলেপুলেরা বাড়ি ছেড়ে এদিক-ওদিক চলে যেতে লাগল৷ চারিদিকে রটে গেল মণিশঙ্কর রায় আর গিন্নিমার অতৃপ্ত আত্মা নাকি সারাক্ষণই বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়ায়৷ এদিক-ওদিক, আনাচেকানাচে ভোররাত্তিরে কিংবা ঝুঁঝকো সন্ধ্যেয় তাদের দেখাও যায়৷ এর পাশাপাশি আর একটা কথাও শোনা যেতে লাগল যে, ডাকাতরা রানিমার সব গয়না নিয়ে গেলেও, সেই হিরের নেকলেসখানা নিয়ে যেতে পারেনি৷ সেটা নাকি গয়নার বাক্সে থাকত না৷ রাখা থাকত দেওয়ালের গায়ে কোনো একটা চোরাকুঠুরিতে৷ রাজামশাই, গিন্নিমা আর নটবর ছাড়া সেই কুঠুরির সন্ধান আর কেউ জানত না৷ ডাকাতরাও তার সন্ধান পায়নি৷

নটবর নেকলেসের কোনো হদিশ দিতে পারেনি৷ মাথায় সড়কির ঘা খেয়ে নটবরকে ভুলে যাওয়া রোগে ধরেছিল৷ কোনো কথাই সে মনে রাখতে পারত না৷ কাজকর্মও কিছু করতে পারত না৷ শোনা যায়, জমিদারের ছেলেপুলেরা নাকি সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেছিল৷ কিন্তু নেকলেসের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি৷ তারপর তারা যখন বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, তখন বাইরের লোকেরাও ঢুকে খোঁজাখুঁজি-খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়েছে৷ কিন্তু কারুর ভাগ্যেই কিছু জোটেনি৷ তারপর একসময় সবাই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল৷ বাড়িটাও ফাঁকা পড়ে থেকে থেকে পোড়োবাড়ি হয়ে গেল৷

এই ডাকাতির ঘটনা যখন ঘটে, তখনই নটবরের বেশ বয়স হয়েছিল৷ কিন্তু তারপরেও অসুস্থ অবস্থায় অনেক বছর বেঁচে ছিল সে৷ একদম থুরথুরে বুড়ো৷ কানে ভালো শোনে না৷ চোখেও ভালো দেখে না৷ তার ছেলেপুলেরা অবশ্য তাকে বেশ যত্নেই রেখেছিল৷ বিশেষ করে তার নাতি৷ নাতি দাদুকে খুব ভালোবাসত৷ দাদুর দেখাশোনাও করত সেই নাতিই৷ যেদিন রাতে নটবর মারা যায়, সেদিনও তার কাছে ছিল সেই নাতিই৷ শোনা যায় মৃত্যুর খানিকক্ষণ আগে নাকি নটবরের মাথা পরিষ্কার হয়ে গিয়ে সব পুরোনো কথা মনে পড়ে গেছিল৷ ঘর থেকে অন্য সবাইকে বার করে দিয়ে, শুধু নাতিকে সেই হিরের নেকলেস কোথায় লুকোনো আছে সেই সন্ধান বলে দেয়৷ যদিও নটবর নাকি নেকলেসে হাত দিতে নাতিকে বারণ করেছিল৷ তার ধারণা ছিল ওই নেকলেস যেহেতু গিন্নিমার খুব প্রিয় ছিল, তাই মৃত্যুর পরেও তিনি নিশ্চিত ওর মায়া কাটাতে পারেননি৷ ওতে যে হাত দেবে তার সর্বনাশ হবে৷ নাতিকে এসব কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই নটবর মারা যায়৷ নাতিকে নটবর কী বলেছিল সেকথা বাড়ির আর কেউ জানতে পারেনি৷ নাতিও দাদুর গোপন কথাটি কাউকে বলেনি৷

Cov21

তারপর কী হল দাদু? নটবর মারা যাওয়ার পর ওর নাতি গিয়ে সেই নেকলেস বার করে আনল আর ওরা খুব বড়োলোক হয়ে গেল?

মেহুলির কথায় একটু হেসে মাথা নাড়ে ভজুদাদু, না দিদি, নটবরের নাতি তার দাদুর কথা অমান্য করেনি৷ সে ওই নেকলেস নেয়নি৷ তবে জায়গাটা চিনে নিয়েছিল৷ মাঝে মাঝে গিয়েও দেখে আসত৷

এখনও যায় নটবরের নাতি?

কী করে জানব বলো, এখনও যায় কি না৷ তাকে তো আর আমি চিনি না৷ তবে এই মুল্লুকের সব জমি ফ্ল্যাট তৈরির জন্য বিক্রি হয়ে গেলেও জমিদারবাড়িটা কিন্তু এখনও বিক্রি হয়নি৷ ওটা এখনও ওরকম ভূতুড়ে বাড়ির মতো পড়ে আছে৷

ইউনিট টেস্ট শুরু হয়ে গেছে৷ পিকুকে তাই এখন একটু বেশি রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হচ্ছে৷ বারোটা নাগাদ মা একবার তাগাদা দিয়ে গেল শুয়ে পড়ার জন্য৷ বই বন্ধ করে পিকু উঠতে যাচ্ছে, হঠাৎ চোখে পড়ল একটা অদ্ভুত জিনিস৷ তাদের আটতলার ফ্ল্যাট থেকে সেই পুরোনো ভাঙা জমিদারবাড়িটা দিব্যি দেখা যায়৷ ভজুদাদুর কাছে গল্প শোনার পর থেকে বাড়িটার ওপর আগ্রহ বেড়েছে পিকুর৷ স্কুলবাসে ফেরার সময় রোজই খুব মন দিয়ে বাড়িটা দেখে পিকু ৷ কল্পনা করার চেষ্টা করে বাড়ির কোন দেওয়ালের ভিতর চোরকুঠুরিতে রাখা আছে সেই হিরের নেকলেস৷ দিনের বেলায় তার ঘরের জানলা থেকেও দেখা যায় বাড়িটা৷ রাত্তিরে অবশ্য সবই অন্ধকারে ঢাকা৷ কিন্তু আজ হঠাৎ পিকুর মনে হল, ভাঙা বাড়িটার ভিতর থেকে ক্ষীণ একটা আলোর রেখা যেন দেখা যাচ্ছে৷ আলোটা বাড়িটার ভিতর থেকেই আসছে, নাকি বাড়ির পিছনের অন্য কিছুর আলো ভাঙা জানলার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সেটা অবশ্য বোঝা গেল না ঠিক৷ কিন্তু মনটা খচখচ করতে লাগল পিকুর৷ পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় রনো আর মকাইকেও কথাটা বলল সে৷

তাহলে কি এখনও লোকে হিরের নেকলেস খুঁজতে যাচ্ছে নাকি রে?

তা তো জানি না৷ কিন্তু অত রাতে অমন ভূতুড়ে বাড়িতে লোকে ঢুকবেই বা কেন?

আচ্ছা আমরাও তো সবাই মিলে একদিন ওখানে যেতে পারি৷ হতেই তো পারে যে আমরাই নেকলেসটা পেয়ে গেলাম৷ তাহলে কী সাংঘাতিক ব্যাপার হবে বল তো৷

মকাইয়ের কথা শুনে লাফিয়ে ওঠে রনো, ঠিক বলেছিস, পরীক্ষা শেষ হলেই চল একদিন যাব৷ শুধু আমরা তিনজন৷ আর কাউকে বলিস না কিন্তু৷ যদি শেষপর্যন্ত নেকলেস খুঁজে না পাই, তাহলে সবাই হাসাহাসি করবে৷

পুরোনো বাড়ি তো৷ সাপখোপ থাকতে পারে৷ সঙ্গে কার্বলিক অ্যাসিড, টর্চ এসব নিতে হবে...

গুপ্তধনের আলোচনায় সেদিন স্কুল যাওয়ার রাস্তাটা শেষ হয়ে যায় নিমেষে৷

নেকলেস অভিযানটা হবে পরীক্ষা শেষ হলেই৷ সেরকমই ঠিক হয়েছিল৷ কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল একটা অন্যরকম ঘটনা৷ প্রজেক্টের কয়েকটা জিনিস নেওয়ার জন্য স্কুল থেকে ফেরার সময় তার ক্লাসমেট সৌপ্তিকের বাড়িতে নেমে পড়েছিল রনো৷ বাড়িটা তাদের মেঘমুলুক থেকে বেশি দূরে নয়৷ হেঁটেই আসা যায়৷ কাজকর্ম শেষ হল যখন, তখন বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে৷ আকাশ মেঘে ঢাকা বলে অন্ধকারও হয়ে এসেছে একটু৷ ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটছিল রনো৷ রাস্তাটা গেছে সেই পুরোনো জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে৷ বাড়িটার কাছাকাছি যখন এসেছে হঠাৎ দেখে উলটো দিক থেকে ভজুদাদু আসছে৷ রনো ডাকতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই দেখল দাদু কেমন যেন সন্তর্পণে চারিদিকটা দেখে সুট করে ঢুকে পড়ল সেই ভাঙা বাড়ির গেটের ভিতর৷ ব্যাপার দেখে রনোর তো চোখ কপালে৷ কোনোরকমে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরেই, মকাইকে নিয়ে সোজা পিকুদের ফ্ল্যাটে৷

আমার মনে হচ্ছে ওই ভজুদাদুই আসলে নটবরের নাতি৷ নটবর তো মালী ছিল, ভজুদাদুও তো মালীর কাজই করে৷

ঠিক বলেছিস, মকাইয়ের কথায় সায় দেয় পিকু, তা ছাড়া ভজুদাদুও তো আগে এখানেই থাকত৷ বাবার কাছে শুনেছি এখানেই দাদুর বাড়ি ছিল...

তার মানে ভজুদাদু জানে যে হিরের নেকলেসটা কোথায় আছে...৷ রনোর গলায় চাপা উত্তেজনা৷ রনোর সঙ্গে একমত হয় অন্য দু-জনও৷

পিকু বলে, আমাদের তাহলে একটা প্ল্যান করতে হবে বুঝলি৷ এখন থেকে আমরা তিনজনেই ভজুদাদুর ওপর নজর রাখব৷ ভজুদাদু কখন ওই বাড়িতে যাচ্ছে সেটা খেয়াল রাখতে হবে৷ তারপর ওকে ফলো করে আমরাও ঢুকব বাড়ির ভিতরে৷ এমনভাবে ঢুকব যাতে দাদু টের না পায়৷ তারপর চুপিচুপি দেখে নেব নেকলেস কোথায় আছে সেই জায়গাটা৷

গ্রেট আইডিয়া৷ দাদু তো নেকলেস নেবে না৷ কিন্তু আমাদের তো কোনো সুপারস্টিশন নেই৷ আমরা তো জানি যে ভূত বলে কিছু হয় না৷ তাই আমরা ওই নেকলেস উদ্ধার করব...

উঃ কী থ্রিলিং ব্যাপার! আমার তো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷ নেকলেস উদ্ধার করতে পারলে দেখবি সব কাগজে আমাদের নাম দিয়ে ছবি বেরোবে, টিভির লোকেরা সব দৌড়ে আসবে...

আলোচনাটা আরও অনেকক্ষণ চলতে পারত৷ কিন্তু পিকুর মায়ের বকুনিতে থামাতে হল৷ তিন বন্ধু হাতে হাত মিলিয়ে আর একবার মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে ফিরে গেল বাড়িতে৷

ভজুদাদু যাচ্ছে আগে আগে৷ তার বেশ কিছুটা পিছনে পানের গুমটি, দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাস, মিষ্টির দোকানের থাম, এসবের আড়ালে চলেছে পিকু, মকাই আর রনো৷ কয়েকদিন ধরে নিয়মিত লক্ষ রেখে বোঝা গেছে, সন্ধ্যের এই মুখটাতেই রোজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুরোনো জমিদার বাড়ির দিকে যায় ভজুদাদু৷ আজ তাই প্ল্যান করে তিন বন্ধু পিছু নিয়েছে৷

পোড়ো বাড়িটার কাছাকাছি এসে ভজুদাদু একবার দাঁড়িয়ে পড়ে চারপাশটা দেখে নিল ভালো করে৷ তারপর ঢুকে গেল ভিতরে৷ রাস্তার ধারে দাঁড় করানো একটা ম্যাটাডোরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল পিকুরা৷ একটু অপেক্ষা করে তারাও গুটিগুটি ঢুকল ভিতরে৷ বিরাট বাড়ি৷ ভজুদাদু কোনদিকে গেল বোঝার উপায় নেই৷

তিনজনেই একটু হতভম্ব হয়ে পড়েছে৷ এমন সময় রনো বলল, ওই দেখ বারান্দায় পায়ের ছাপ পড়েছে৷ ওইদিকেই গেছে নিশ্চয়৷

ঠিকই তো৷ ধুলো-ভরতি বারান্দায় স্পষ্ট জুতোর ছাপ৷ সেটা দেখে দেখে এগোল তিনজনে৷ একটু এগোতেই একটা ভাঙা-চোরা ইট বার করা সিঁড়ি৷ পা টিপেটিপে উঠছে রনো৷ পিছনে মকাই আর পিকু৷ দোতলায় উঠেই একটা বড়োমতো ঘর৷ দরজা-জানলা কিছু নেই৷ তবে ঘরটা কিন্তু পরিষ্কার৷ এক কোণে একটা জলের কলসিও রয়েছে৷ তারপাশেই আরেকটা ঘরের দরজা দেখা যাচ্ছে৷ সেখান থেকে একটা হালকা আওয়াজ আসছে৷ মনে হচ্ছে কারা যেন নীচুস্বরে কথা বলছে৷ পাশের ঘরটা দেখার জন্য চুপিচুপি এগোচ্ছিল তিনজনে৷ এমন সময় ঘটে গেল একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷ মকাইয়ের পা লেগে একটা ইটের টুকরো গড়িয়ে গেল খড়খড় করে৷ আর অমনি পাশের ঘরটা থেকে ছুটে বেরিয়ে এল ভজুদাদু আর সঙ্গে পিকুদেরই বয়সি একটা বাচ্চা মতো ছেলে৷

তিনজনকে দেখে ভজুদাদু শুধু অবাক নয় খানিকটা যেন ভীত-সন্ত্রস্তও, একী! তোমরা এখানে এসেছ কেন?

আমরা এসেছি হিরের নেকলেস খুঁজতে৷ আমাদের মনে হয়েছে, তুমিই আসলে নটবরের নাতি৷ তার মানে তুমি জান যে, নেকলেসটা কোথায় আছে৷ তাই তোমার পিছন পিছন এসেছি৷

রনোর স্পষ্ট কথায় কেমন যেন একটু থতমত খেয়ে যায় ভজুদাদু৷ ফ্যাকাসে মতো হেসে বলে, আরে দুর, আমি কেন নটবরের নাতি হতে যাব৷ আর ওরকম নেকলেস তো আর সত্যি সত্যি ছিল না৷ অন্তত থাকলেও আমি জানি না৷ তোমাদের মন খারাপ ছিল৷ তাই সেদিন বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেছিলাম...

ভজুদাদুর কথাটা মোটেই বিশ্বাস হয় না তিনজনের কারুরই৷ পিকু বেশ গম্ভীরভাবে বলে, তাহলে রাত্তির বেলায় এই বাড়িতে আলো দেখা যায় কেন? তুমিই বা কেন রোজ বিকেলে এই ভাঙা বাড়িতে আসো? তোমার সঙ্গে এই ছেলেটাই বা কে?

এইবার মুখটা করুণ হয়ে ওঠে ভজুদাদুর৷ সঙ্গের ছেলেটাও ততক্ষণে বেশ ভয় পেয়েছে৷ ম্লান হেসে ভজুদাদু বলে, তোমরা যখন জেনেই ফেলেছ, তখন তো আর লুকিয়ে লাভ নেই৷ এর নাম হল মজিদ৷ মুর্শিদাবাদের অজ গ্রামে বাড়ি৷ ওর বাবা নেই৷ মা আর একটা ছোটো বোন৷ গঙ্গার ভাঙনে ওদের বাড়িঘর সব তলিয়ে যাওয়ায়, মজিদের মা ওকে কলকাতায় বাবুদের বাড়ি কাজ করতে পাঠায়৷ গ্রামেরই একজনের সঙ্গে এসেছিল৷ কথা ছিল কাজ করবে, থাকবে, খাবে৷ আর মাইনের টাকা পাঠিয়ে দেবে মায়ের কাছে৷ কিন্তু যাদের বাড়িতে মজিদ কাজে লেগেছিল, তারা একটুও ভালো লোক নয়৷ ওইটুকু ছেলেকে শুধু যে সারাদিন খাটাত তাই নয়, পেট ভরে খেতে দিত না, এমনকী মারতও৷ সহ্য করতে না পেরে মজিদ একদিন পালিয়ে যায়৷ কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? বাড়ি ফেরার তো পয়সা নেই৷ আর ফিরবেই বা কোন মুখে? তাই ও স্টেশনে একলা একলা বসে কাঁদছিল৷ সেই সময় ওকে চোখে পড়ে আমার৷ আমিই ওকে এখানে এনে লুকিয়ে রেখেছি৷ দু-বেলা খাবার দিয়ে যাই৷ চেষ্টা করছি যদি কোনো একটা কাজে ঢোকানো যায়৷

কিন্তু এই ভাঙাবাড়িতে ও একলা থাকে কী করে? তুমি ওকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও না কেন?

কমিটির নিয়ম আছে তো৷ আমি চাইলেই যে কাউকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখতে পারি না৷ তবে রাতে আমি এখানে চলে আসি৷ শিউশরণ জানে৷ ও গেট খুলে দেয়৷ আবার ভোর বেলা চুপিচুপি ফিরে যাই৷

ভজুদাদু বারণ করেছিল৷ তবু মাকে গিয়ে কথাটা বলে পিকু৷ মায়ের উদ্যোগেই পরদিন সন্ধ্যে বেলা কমিটির বিশেষ মিটিং ডেকে ঠিক হয়, মজিদকে ভজুদাদুর ঘরে থাকতে দেওয়া হবে৷

থাকবেই যখন, তখন তো সরকারি স্কুলে ভরতিও করে দেওয়া যায়৷ ওইটুকু ছেলেকে তো আর কাজ করতে পাঠানো যায় না৷ মাইনে লাগবে না৷ বই-খাতার খরচটা নাহয় সবাই মিলে দিয়ে দেওয়া যাবে৷

রনোর বাবার প্রস্তাবে ঘাড় নাড়ে অন্যরা৷ ঘরের কোণে এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল ভজুদাদু৷ এবার হাতজোড় করে বলে, আপনারা যখন এতখানি করলেন তখন আমিও কথা দিচ্ছি, আমার বেতন থেকে মাসে মাসে কিছু টাকা আমি ওর মায়ের নামে পাঠিয়ে দেব৷ ছেলেটা যতদিন না নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, ততদিন তো বেঁচে থাকতে হবে ওদের৷

চোখে চোখে ইশারায় ভজুদাদুর বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তটাও পাকা করে মিটিং ভেঙে যায়৷

কিন্তু হিরের নেকলেসটা তো পাওয়া গেল না বাবা! ভজুদাদুটাও কীরকম অদ্ভুত দেখো, এখন বলছে ওসব নেকলেস-টেকলেস কিছু নেই৷ সেদিন আমাদের মন ভালো করতে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলেছিল৷ আমি তো বলেছিলাম কীরকম একটা থ্রিলিং ট্রেজার হান্ট হবে, একটা গুপ্তধন পেয়ে যাব আমরা...

ব্যাজার মুখে কথাগুলো বলছিল পিকু৷ এমন সময় বেল বাজল৷

কী ব্যাপার ভজু, এসো এসো ভিতরে এসো...

ভজুদাদু আর তার পিছনে মজিদ ভিতরে এল৷ মজিদের হাতে একটা বড়োমতো বাক্স৷ দু-জনের মুখেই উদবেগের ছাপ৷ একটা ব্যাপার হয়েছে দাদা৷ আমার মনে হল আপনাকেই আগে বলি, তাই চলে এলাম... মজিদ এই বাক্সটা ওই ভাঙা বাড়িতে পেয়েছে৷ ও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে৷ কিন্তু পরের জিনিস তো...

মজিদের হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে বাবার দিকে বাড়িয়ে দেয় ভজুদাদু৷ মাঝারি আকারের একটা সাধারণ কাঠের বাক্স৷ তবে তার আংটায় একটায় ছোটো তালা লাগানো আছে৷

কোথায় পেলে বাক্সটা?

এবার মজিদ উত্তর দেয়, একলা একলা থাকতাম তো৷ সারাদিন বাড়ির ভিতরে ঘুরে বেড়াতুম৷ একদিন দেখলাম একটা কোণে পড়ে আছে৷ ধুলো-ময়লা ছিল৷ আমি ঝেড়ে নিয়ে ওটার ওপর বসতাম৷

মজিদের কথা শুনে পিকুর তো চুল খাড়া৷ তাহলে কি এই বাক্সেই নেকলেসটা আছে নাকি? বাবার কিন্তু মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷ দিব্যি মজিদের হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বলল, তালা দেওয়া আছে দেখছি৷

আপনিই খোলেন৷ দেখেন ভিতরে কী আছে৷

পিকু রান্নাঘর থেকে সাঁড়াশিটা নিয়ে আয় তো৷

পিকুকে উঠতে হয় না৷ সাঁড়াশিটা মা-ই এনে দেয়৷ সাঁড়াশি দিয়ে একটু চাপ দিতেই কুট করে ভেঙে যায় তালাটা৷ ডালাটা বাবা খুলতেই মা, পিকু, ভজুদাদু, মজিদ সবাই ঝুঁকে পড়ে একসঙ্গে৷ নাঃ, নেকলেস তো নেই৷ তবে ভিতরে ছোটো ছোটো আরও অনেকগুলো চ্যাপটা কৌটো রয়েছে৷ তার ভিতরেই কি তাহলে...

এর ওপরে তো আবার ইংরেজিতে কী যেন লেখা আছে... দ্য জেড ভাইন... সেটা আবার কী?

বাবা আরেকটা কৌটো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, এর ওপর লেখা আছে, প্যারটস বিক... মানে টিয়ার ঠোঁট... এটা কোকাই কুকে... এগুলো কী...

কৌটোগুলো খুলে দ্যাখেন দাদা...

বাবা সাবধানে একটা কৌটো খোলে৷ ভিতরে কালো কালো কী যেন রয়েছে৷

Cov22

এগুলো তো কোনো কিছুর বীজ মনে হচ্ছে৷ ব্যাপারটা কী? পিকু গুগুলে সার্চ দিয়ে দেখ তো এই কোকাই কুকে, জেড ভাইন এসবের মানে কী৷

ঝটপট বাবার ফোনটা নিয়ে সার্চ করতে শুরু করে পিকু, এখানে তো দেখছি, কোকাই কুকে একরকম ফুল৷ শ্রীলঙ্কায় হয়৷ কী সুন্দর দেখতে গো...

আমি বুঝতে পেরেছি দাদা... ভজুদাদুর গলায় একটা অদ্ভুত উত্তেজনা, এ হল জমিদারবাবুর বীজের বাক্স৷ ওনার তো মস্ত ফুলের বাগান ছিল৷ দেশ-বিদেশের ফুল ফুটত৷ সেইসব ফুলের বীজ, তার মানে উনি এই বাক্সে গুছিয়ে রাখতেন৷ আর চিন্তা নেই দাদা৷ মেঘমুলুকের বাগানে এবার এমন ফুল ফুটবে যে দূর দূর থেকে লোকে দেখতে আসবে৷ আর সেই গোলাপজামের বীজ যদি একটা পাই... তাহলে দেখবেন কেমন ফল ফলাই৷

ভজুদাদুর আনন্দ দেখে হেসে ফেলে বাবা, যাক, বাক্সটা তাহলে ঠিক লোকের হাতেই পড়েছে বলো৷ ভাগ্যিস মজিদ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল৷

একটা কথা আছে কিন্তু দাদা৷ পূর্বদিকের কোণটায় কিন্তু আমি গাছ লাগাব না৷ ওখানে ছেলেপিলেরা বল খেলবে৷ আপনি কমিটিকে বলে দেবেন৷

বাক্স নিয়ে ভজুদাদু আর মজিদ চলে গেছে৷ স্মার্ট ফোনটা একমনে দেখতে দেখতে বাবা বলল, তাহলে গুপ্তধনটা শেষ পর্যন্ত পাওয়াই গেল রে পিকু৷ গুগুলে যেরকম ছবি দেখছি, তাতে এইসব দ্য জেড ভাইন, কোকাই কুকেই কিংবা চকোলেট কসমস যদি সত্যিই আমাদের বাগানে ফোটে তাহলে তার বাহার কিন্তু হিরের নেকলেসের থেকে কিছু কম হবে না৷

Cov23
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%