দীপান্বিতা রায়

শীতের ছুটিটা এবার এক্কেবারে মাটি৷ এমনিতে লং ড্রাইভে যাওয়াটা ভারি পছন্দ৷ কিন্তু এবার তো আর শঙ্করপুর, মন্দারমণি কিংবা বকখালি যাওয়া হচ্ছে না৷ এবার তারা যাবে চড়কডাঙা৷ যেমন নামের বাহার তেমনি জায়গারও৷ বীরভূমের কোনো এক অজ গ্রাম৷ শান্তিনিকেতন থেকেও প্রায় এক ঘণ্টার ড্রাইভ৷ ওখানে থাকবে তিন দিন৷ ফেরার পথে শান্তিনিকেতনে একদিন৷ তার মানে ফিরতে ফিরতে বড়োদিনের সব মজা খতম৷ স্কুল খোলার সময় হয়ে যাবে৷
কিন্তু মুশকিল হল একবার যদি বাবা কিছু ঠিক করে ফেলে তার থেকে নড়ানো মুশকিল৷ এই যেমন চড়কডাঙায় যাওয়া নিয়ে রুনাইয়ের আপত্তি শুনেই সাফ বলে দিল, না না ওসব হবে না৷ শীতের ছুটিতেই যাব৷ মাসিদিদা নব্বই পেরিয়ে গেছে৷ কবে মরে যায় তার কোনো ঠিক আছে? পুজোর সময় যেতে বলেছিল, তখন তো বেড়াতে যাওয়ার টিকিট কাটা ছিল বলে হল না৷ এবার যেতেই হবে৷
চড়কডাঙায় এর আগে ওরা কেউ কোনোদিন যায়নি৷ এবার যে যাওয়া হচ্ছে তার কারণটাও অদ্ভুত৷ চড়কডাঙায় থাকেন মাসিদিদা৷ মানে রুনাইয়ের ঠাকুমার মাসি প্রভাবতী মিত্র৷ বাবার কাছে রুনাই শুনেছে আগে এই মাসিদিদারা কলকাতাতেই থাকতেন৷ শ্যামবাজারের কাছে তাঁদের একখানা দোতলা পুরোনো বাড়ি ছিল৷ ঠাকুমার সঙ্গে বাবা ছোটোবেলায় বেশ কয়েকবার সেখানে গেছে৷ সেই বাড়ির ছাদে চমৎকার ঘুড়ি ওড়ানো যেত৷ আর গেলেই মাসিদিদা ভালো ভালো সব খাবারদাবার বানাত৷ মাসিদাদু পণ্ডিত মানুষ ছিলেন৷ ইতিহাস পড়াতেন৷ নাম-ডাকও ছিল বেশ৷ কিন্তু রিটায়ার করার পর তিনি হঠাৎ ঠিক করলেন কলকাতায় আর থাকবেন না৷ চড়কডাঙায় অনেকখানি জমি কিনে বাড়ি-বাগান তৈরি হল৷ দিদা আর দাদু সেখানে গিয়ে থাকতে শুরু করলেন৷ তাঁদের একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে৷ কিন্তু অত শখ করে বাড়ি তৈরি করলেও সেখানে দাদুর বেশিদিন থাকা হয়নি৷ চড়কডাঙায় যাওয়ার কিছুদিন পরেই দাদু মারা যান৷ তারপর থেকে মাসিদিদা সেখানে একলাই আছেন৷ দাদুর ইচ্ছে ছিল চড়কডাঙায় একটা স্কুল তৈরি করার৷ দিদাই সেটা তৈরি করেছেন৷ স্কুলের কাজকর্ম আর ছোটো ছেলেপিলেদের নিয়ে দিব্যি আছেন৷
এই মাসিদিদা মাস তিনেক আগে হঠাৎ একটা চিঠি লিখে জানান যে, তাঁর বাড়ির লাইব্রেরিতে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ইতিহাসের বই আছে৷ সেগুলো তিনি রুনাইয়ের বাবাকে দিয়ে দিতে চান৷ এছাড়াও তাঁর কিছু জরুরি কথা বলার আছে৷ রুনাইরা যদি একবার চড়কডাঙায় আসে তাহলে খুব ভালো হয়৷ রুনাইয়ের বাবা হিমাদ্রি বসুও ইতিহাসের অধ্যাপক৷ বাড়ি-ভরতি নানারকম ইতিহাসের বই৷ মাসিদিদার চিঠি পেয়ে বাবা তো আহ্লাদে আটখানা৷ চিঠিতে ফোন নম্বর দেওয়া ছিল৷ তখনই ঠিক হয়ে গেল যে, শীতের ছুটিতে তারা যাবে চড়কডাঙায়৷ একসঙ্গে নাতবউ আর নাতির ছেলেকে এই প্রথম দেখবে, তাই তিনিও খুব খুশি৷
বোলপুর পৌঁছোতেই সাড়ে বারোটা বেজে গেল৷ সেখান থেকে জিপিএস অন করে চড়কডাঙার রাস্তা ধরল বাবা৷ দু-পাশে ধান উঠে যাওয়া শুকনো মাঠের মাঝে মাঝে আলু কিংবা সর্ষে খেতের সবুজ-হলুদ ছোপ৷ ঝকঝকে নীল আকাশ৷ চড়া রোদ থাকলেও কনকনে শুকনো ঠান্ডা হাওয়া গাড়ির কাচ নামালেই চোখে-মুখে ঝাপটা মারছে৷ হু-শ করে একটা মস্ত মাছরাঙা উড়ে গিয়ে বসল ইলেকট্রিকের তারে৷
চড়কডাঙায় পৌঁছে রাস্তার ধারের একটা চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করতেই মাসিদিদার বাড়িটা দেখিয়ে দিল৷ বড়ো গেটের ভিতর নুড়ি-বিছানো রাস্তা দিয়ে গাড়ি ঢুকতেই মাসিদিদা এগিয়ে এল৷ দেখে বোঝা যায় না নব্বই পেরিয়েছে৷ এখনও বেশ সোজা-শক্ত চেহারা৷ মাথার চুল অবশ্য সাদা৷ এসো, ভিতরে এসো, একলাটি থাকি৷ কতদিন বাদে আজ বাড়িটা কেমন ভরা ভরা লাগবে৷
বেশ বড়ো দোতলা বাড়ি৷ একতলায় বসার ঘর, রান্নাঘর, ঠাকুরঘর, আরও কী কী সব যেন আছে৷ দোতলায় শোবার ব্যবস্থা৷ দোতলার ঢাকা বারান্দায় বেতের সোফাসেট৷ বাড়ির লাগোয়া বাগান৷ সামনের দিকে ফুলের গাছ আছে৷ পিছনে সবজি ফলেছে৷ পাঁচিলের ধার ঘেঁষে বড়ো বড়ো গাছ৷ দুপুরে খাওয়ার পর রুনাই চলে এসেছিল বাগানে৷ বাড়ি বাগান সবই ভালো৷ কলকাতার থেকে অন্যরকম৷ কিন্তু একলা ঘুরে বেড়ানোটা বোরিং৷ একটা অন্তত বন্ধু যদি থাকত... মনে মনে ভাবছিল রুনাই৷
পৌষ মাস৷ দুপুর একটু গড়াতেই সূর্যের আলো চায়ে ভেজানো মুড়ির মতো মিইয়ে গিয়ে শীতের জোর বাড়িয়ে দিল৷ তাও হয়তো বাগানে আরও একটু থাকা যেত৷ কিন্তু হঠাৎ রুনাই দেখল তার মাথার ওপর ঠিক মশার একটা স্তম্ভ তৈরি হয়েছে আর সেটা সে যেদিকে যাচ্ছে ঠিক সেদিকে তার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে৷ প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে রুনাই নিজের গলা থেকে মাফলারটা খুলে নিয়ে প্রচণ্ড জোরে নাড়িয়ে প্রথমেই সেই মশার স্তম্ভটা ভেঙে দিল৷ তারপর একদৌড়ে ঢুকে পড়ল বাড়িতে৷
চড়কডাঙায় কারেন্ট আছে৷ কিন্তু আলোর জোর বেশ কম৷ মা-বাবা ঘুম থেকে উঠে বড়োদিদার সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করছে৷ মাসিদিদা রুনাইকে এই নামেই ডাকতে বলেছে৷ বাইরে ততক্ষণে অন্ধকার জমে উঠেছে৷ দেখে মনে হচ্ছে যেন কত রাত৷ অথচ ঘড়ির কাঁটা বলছে মাত্র ছ-টা৷ কী করে এই লম্বা সন্ধ্যেটা কাটাবে ভেবেই কান্না পেয়ে গেল রুনাইয়ের৷ আর কান্না চাপতে গিয়ে ঢুকল লেপের ভিতর৷ ঘুমিয়েই পড়েছিল বোধ হয়৷ হঠাৎ মনে হল কে যেন তাকে দেখছে৷ ভালো করে চোখ মেলতেই দেখে তার বয়সিই একটা ছেলে৷ ছোটো করে ছাঁটা চুল, খাড়া কান৷ ঘরে ঢুকে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ রুনাই তাকাতেই একগাল হেসে বলল, আমি হরি৷ ঠাকমা বলল, তুমি এঘরে আছ৷ আমি তো কাল থেকে ভাবছি কখন তোমার সঙ্গে দেখা হবে৷ ইশকুলের চড়ুইভাতি ছিল তো তাই দেরি হয়ে গেল৷
হরির কথা বলার মধ্যে একটা গ্রাম্য টান আছে৷ জামা-কাপড়ও রুনাইয়ের অন্য বন্ধুরা যেরকম পরে সেরকম নয়৷ কিন্তু তবু চড়কডাঙার মতো জায়গায় তার সমবয়সি একটা ছেলে তো৷ রুনাই লেপ সরিয়ে লাফ দিয়ে উঠে বসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল৷
একরাতের মধ্যেই হরি আর রুনাইয়ের দারুণ ভাব হয়ে গেছে৷ হরির মা-বাবা দু-জনে মিলে বড়োদিদার বাড়ির সব কাজকর্ম দেখাশোনা করে৷ চড়কডাঙার স্কুলে রুনাইয়ের মতো হরিও ক্লাস সেভেনে পড়ে৷ লেখাপড়া করে না মোটেই৷ সারাদিন শুধু এদিক-ওদিক খেলে বেড়ায়৷
পরদিন সকাল বেলা হরি রুনাইকে নিয়ে বেরোল গ্রাম দেখাতে৷ চড়কডাঙা ছোটো গ্রাম৷ যদিও সেখানে দেখার জায়গা কিছু কম নেই৷ হরিদের স্কুল আর তার বিশাল খেলার মাঠ তো আছেই৷
তা ছাড়া পদ্মবিল, ভগা বেদের বাড়ি (যার ঘরে পরপর ঝাঁপিতে সাপ রাখা), জেলেপাড়া, সাঁওতালপাড়া এসব দেখে সূর্য যখন বেশ মাথার ওপর তখন হরি বলল, ডাকাতে কালীর মন্দির দেখতে যাবি রুনাই?
সেটা আবার কোথায়?
দূর আছে একটু৷ নদী পেরিয়ে যেতে হয়৷
তাহলে এখন যাবি? বাড়ি ফিরতে দেরি হলে যদি মা বকে? খেয়ে নিয়ে দুপুর বেলা যাই বরং...
দুপুরের পর আর ওখানে যাওয়া যায় না রে৷
কেন?
ভূত আছে তো৷
ভূত?
গলাটা হঠাৎ খাদে নেমে যায় হরির৷ রুনাইয়ের প্রায় কানে কানে বলে, হ্যাঁ রে ভূত আছে, গুপ্তধনও আছে৷
শুনেই তো রুনাইয়ের চোখ গোল গোল, চুল খাড়া খাড়া৷
ডাকাতে কালীর মন্দিরটা অনেক পুরোনো বুঝলি রুনাই৷ বাবার কাছে শুনেছি অনেক বছর আগে ওই জঙ্গলের ভিতর একদল ডাকাতের আস্তানা ছিল৷ তারা ওই মন্দিরে পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে যেত৷ তারপর সোনাদানা, গয়নাগাটি যা ডাকাতি করে আনত, সব ওই মন্দিরের পাশে পুরোহিতের ঘরের মাটির নীচে একটা ছোট্ট কুঠুরিতে রেখে দিত৷ তখন তো আর অত পুলিশ-টুলিশ ছিল না৷ তাই ডাকাতরা ধরাও পড়ত না৷ এমনি করে নাকি অনেক সোনাদানা ওখানে জমা করেছিল৷ তারপর একবার এলাকায় একজন ভয়ানক কড়া দারোগা এল৷ সে তক্কে তক্কে থেকে ধরে ফেলল ওই ডাকাতদলকে৷ ব্যাস সব্বাইকে নিয়ে গিয়ে একেবারে গারদে বন্দি৷
আর সেই সোনাদানাগুলো?
সেগুলো রয়ে গেল৷ এখনও ওখানেই আছে৷ কালীমন্দিরের যে পুরোহিত, তার ঘরের মাটির নীচেই তো সেই চোরাকুঠুরি৷ সেই পুরোহিত আসলে কাপালিক৷ এমনিতে দেখলে অবশ্য বোঝা যায় না৷ তোর-আমার মতোই কথাবার্তা বলে৷ কিন্তু লাল কাপড় পরে আর লাল লাল চোখ৷ ওর পোষা ভূত আছে অনেকগুলো আর সাপও আছে৷
পোষা সাপ?
হ্যাঁ রে৷ পুরোহিতের ঘরের ভিতর নাকি চামুণ্ডার আসন পাতা৷ তার নীচে কুঠুরিতে ঢোকার দরজা৷ সেখানেই পাহারা দেয় সাপটা৷ আর ভূতগুলোকে দিনের বেলায় ও একটা বাক্সের মধ্যে পুরে রাখে৷ সন্ধ্যে হলেই ছেড়ে দেয়৷
দূর... সব বাজে কথা৷ সাপ পোষ মানে না৷ আমি বিজ্ঞান বইতে পড়েছি৷ আর ভূত বলে কিছু নেই...
ওসব তোদের কলকাতায় বলে৷ চড়কডাঙায় সবাই জানে ধানু পুরোহিত ভূত পোষে৷ দুপুরের পর ওদিকে কেউ গেলেই ঘাড় মটকে দেয়৷ তোর ওই বড়দিদার যিনি বর মানে তোর বড়দাদু রে, তাকেও তো ধানু পুরোহিতের ভূতই মেরেছে৷
তুই কী করে জানলি?
সবাই তো তাই বলে৷ মন্দিরের কাছেই একটা ছোটোমতো টিলা আছে৷ সবাই বলে চড়কের টিলা৷ ওখান থেকে মন্দিরটা স্পষ্ট দেখা যায়৷ তোর দাদু নাকি মাঝে মাঝে ওই টিলার ওপরে বসে থাকত, ঘুরে বেড়াত৷ নিশ্চয়ই পুরোহিত ভেবেছিল গুপ্তধনের দিকে নজর দিচ্ছে৷ তাই ভূত দিয়ে ঘাড় মটকে দিয়েছে৷ অনেকে তো আবার বলে চোরাকুঠুরিতে ঢুকেও পড়েছিল৷ একটা গিনির বাক্স নিয়ে যখন চলে আসছে, তখন পুরোহিত ওকে দেখে ফেলে৷ ব্যাস, সেদিন রাতেই মটাস৷
কথাটা ঠিক বিশ্বাস না হলেও গা-হাত-পা একটু শিরশির করে ওঠে রুনাইয়ের৷ বাবার কাছে সে শুনেছে বড়োদাদুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল৷
ভয়টা অবশ্য প্রকাশ করে না রুনাই৷ বরং একটু নির্লিপ্ত ভাব দেখিয়েই বলে, মন্দিরে কি এখন আর পুজো-টুজো হয়? কেউ যায়?
পুজো হবে না কেন! রোজ পুজো হয়৷ শনি-মঙ্গলবারে গ্রামেরও অনেকে পুজো দিতে যায়৷ কালীপুজোর সময় মেলা বসে...
রুনাইকে চুপ করে থাকতে দেখে হরি এবার জিজ্ঞাসা করে, যাবি ডাকাতে কালী দেখতে, নাকি ভয় করছে?
ভয় যে একটু লাগছিল না তা নয়৷ কিন্তু হরির কথাটা শুনে রীতিমতো প্রেস্টিজে লেগে গেল রুনাইয়ের৷ সে কলকাতার ছেলে৷ সাহেব স্কুলে পড়ে৷ তাকে কিনা চড়কডাঙায় এসে ভূতের ভয় পেতে হবে? তাই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বলে, যাবই তো৷ মন্দির দেখব আর সেই গুপ্তধনের জায়গাটাও একবার দেখে আসব৷
সে কী রে! সে তো কাপালিকের বাড়িতে৷
বাইরে থেকে উঁকি মেরে দেখা যাবে না? কাপালিক কি সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকে?
একটুখানি ভেবে নিয়ে মাথা নাড়ে হরি, উপায় একটা হতে পারে৷ তাহলে চল তাড়াতাড়ি৷ কাপালিক তো সকালে মন্দিরে আসে পুজো করতে৷ অনেকক্ষণ ধরে পুজো করে, অনেক বেলায় মন্দির বন্ধ করে বাড়ি যায়৷ এখন যদি যাই, তাহলে কাপালিক নিশ্চয়ই মন্দিরে থাকবে৷ সেই সুযোগে আমরা ওর বাড়িটা দেখে আসব৷ তবে খুব সাবধান, ধরা পড়লে কিন্তু খুব বিপদ৷
আরে দুর, ধরা পড়ব কেন! একটু তো শুধু উঁকি মেরে দেখব৷
চড়কডাঙা গ্রাম শেষ হয়ে যাওয়ার পর খানিকটা শুকনো মাঠ৷ এলোমেলো আগাছা আর পলাশ গাছ গজিয়ে আছে এদিক-ওদিক৷ সেটা পেরোলেই কুনকি নদী৷ নেহাতই ছোটো৷ শীতকালে জলও নেই৷ সরু তিরতিরে একটা জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে৷ মাঝের দুটো ছোটো পাথরে পা দিয়ে দিব্যি পেরিয়ে গেল দুই বন্ধু৷ ওপারে একটু এগোলেই চড়কের টিলা৷ টিলাটা বেশ লম্বা৷ তবে চওড়া খুব বেশি নয়৷ অনেকটা পাঁচিলের মতো দেখতে৷ ভাঙাচোরা ইট পাথরের টুকরোয় ভরতি৷ টিলার মাথায় উঠতেই মন্দিরটা দেখা গেল৷

মন্দিরের দরজা খোলা৷ তার মানে পুরোহিত মন্দিরেই আছে৷ পুজো করছে...
কানের কাছে ফিসফিস করল হরি৷ চোখের ইশারায় হরিকে এগোতে বলে, মাটিতে পড়ে থাকা বেশ কয়েকটা পাথরের টুকরো জ্যাকেটের পকেটে ভরে নিল রুনাই৷ সত্যি যদি সাপ-টাপ থাকে তাহলে ঢিল মেরে তাড়ানো যাবে৷
ছোটো মন্দির৷ মাটির দেওয়াল৷ ওপরে খড়ের চাল৷ সামনে একটুখানি দাওয়া মতো৷ মন্দিরের তুলনায় ঠাকুরের মূর্তি কিন্তু খুব ছোটো নয়৷ কুচকুচে কালো কালীমূর্তিটা দেখলে একটু ভয় ভয়ই লাগে৷ দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে পুরোহিত পুজো করছে৷ লাল কাপড় পরা ঠিকই তবে কাপালিক বলতেই রুনাইয়ের চোখের সামনে যেরকম একটা বিশাল দশাসই চেহারা ভেসে ওঠে, পিছন থেকে দেখে ঠিক সেরকম মনে হচ্ছে না৷ পুরোহিত জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণ করছে আর মাঝে মাঝেই হাতের ঘণ্টাটা নাড়ছে৷ মন্দিরের চারপাশে আর কোনো মানুষজন নেই৷ শনি-মঙ্গলবার নয় বলে সম্ভবত কেউ পুজো দিতেও আসেনি৷
হরির পিছু পিছু বিড়াল পায়ে মন্দিরটা পেরিয়ে পিছন দিকে চলে গেল রুনাইও৷ পিছনে একটুখানি এগোলেই একখানা মাটির বাড়ি৷ তার চারপাশে বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটুখানি বাগান৷ দু-চারটে জবা-টগরের গাছ রয়েছে৷ বাড়ির পিছন দিকে ছোটো একটা কুয়ো৷ দড়ি-বালতি রাখা আছে৷ ঘরের দরজায় শিকল তোলা৷ হরি আর রুনাই চারপাশটা ঘুরে দেখল৷ কিন্তু ভিতরে কী আছে কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷ পিছন দিকে একটা জানালা থাকলেও সেটা বন্ধ৷
চল না শিকল খুলে ভিতরটা দেখে আসি, চাপা গলায় বলল রুনাই৷
ওরে বাবা, তারপর যদি পুরোহিত চলে আসে?
আরে আসবে কেন? দেখলি না পুজো করছে৷ তুই তো বললি পুজো করতে অনেকক্ষণ সময় লাগে৷
ঘরের ভিতর যদি ভূতগুলো থাকে?
দিনের বেলায় কোথাও ভূত থাকে না৷ ভূতেরা আলো সহ্য করতে পারে না, তুই জানিস না?
সাপ থাকে যদি?
আমি পকেটে করে ঢিল এনেছি৷ ঢিল মেরে সাপ তাড়িয়ে দেব৷ চল না দেখি সত্যিই গুপ্তধন আছে কি না৷
রুনাইয়ের সাহস দেখে খানিকটা সাহস হয় হরিরও৷ এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গিয়ে শিকলটা খুলে ফেলে রুনাই৷ ছোটো ঘর৷ একপাশে একটা চৌকি পাতা৷ অন্যদিকে দু-চারটে রান্নার বাসনপত্র, হাঁড়ি-কড়াই রাখা৷ কিন্তু চামুণ্ডার আসনটা কোথায়?
ওই যে ওই দিকে...
হরি ইশারা করতে কোণের দিকে তাকায় রুনাই৷ ঘরের ভিতরটা অন্ধকার বলে প্রথমটায় চোখে পড়েনি৷ চোখ সয়ে যেতে দেখতে পায় একটা সিঁদূর মাখা ছোটো ত্রিশূল মাটিতে পোঁতা৷ তার সামনে একটা চারকোনা সিমেন্টের স্ল্যাব৷ ওপরে একটা আংটা লাগানো৷ ত্রিশূলের পাশে একটা কোশাকুশি আর তামার ঘটি রাখা আছে৷ পাশে একটা কম্বলের আসন৷ সাপ কিংবা ভূত কোনোকিছুই অবশ্য দেখা যাচ্ছে না৷
ওইটার নীচেই চোরাকুঠুরিতে ঢোকার রাস্তা... কানের কাছে হরির ফিসফিস শুনে ত্রিশূলটার দিকে এগোয় রুনাই৷
যাস না, যাস না! কাপালিক জানতে পারলে ভয়ানক বিপদ হবে...
কিন্তু ততক্ষণে গুপ্তধন উদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে রুনাই৷ তাই বন্ধুর কথায় কান না দিয়ে এগিয়ে গিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে তুলে ফেলে স্ল্যাবটা আর তারপরেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে পিছিয়ে যায়৷ স্ল্যাবের নীচে চোরাকুঠুরির দরজা-টরজা কিছুই নেই৷ কিন্তু তিনটে মড়ার মাথার খুলি রাখা রয়েছে৷ অন্ধকার ঘরে সাদা হাড়গুলো যেন দাঁত বের করে হাসছে৷
ওরে বাবারে! এগুলোই তার মানে ভূত রে...
বলেই তিরবেগে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায় হরি৷ ততক্ষণে সাহস উবে গেছে রুনাইয়েরও৷ হাতের স্ল্যাবটা মাটিতে ফেলে দিয়ে সেও ছুটে বেরিয়ে এসে দেখে মন্দিরের দিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে সেই লাল কাপড় পরা কাপালিক৷
রুনাই পালা! চেঁচিয়ে ওঠে হরি৷
প্রাণপণে ছুটতে থাকে রুনাই৷ পিছনে কাপালিক তাড়া করে আসছে কি না দেখার সময়টুকুও নেই৷ চড়কের টিলা, কুনকি নদী পেরিয়ে একেবারে গ্রামের ভিতরে ঢুকে দম নেয় দু-জনে৷ তারপর আবার দৌড় দেয় বাড়ির দিকে৷
দোতলার বারান্দায় বসে ইতিহাসের কয়েকটা বই দেখতে দেখতে হিমাদ্রি মাসিদিদাকে বলল, চিঠিতে তুমি আরও কীসব জরুরি কথা আছে বলেছিলে না? সেটা কী?
সেটা যে কী আমি নিজেও খুব ভালো জানি না বাপু৷ তবে যেটুকু জানি সেটুকুই তোকে বলি৷ মারা যাওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে থেকে তোর মেসোদাদু কেমন যেন একটু অস্থির হয়ে পড়েছিল৷ রোজই সকাল হলেই বেরিয়ে যেত৷ বেশ একটু বেলা করে ফিরত৷ একদিন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার বলো তো? তোমার যেন সারাক্ষণ কেমন একটা অস্থির অস্থির ভাব৷ কী হয়েছেটা কী? আমার কথা শুনে তোর দাদু একটু গম্ভীরভাবে বলল, আসলে আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে৷ সেটা যদি ঠিক হয় তাহলে ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ৷ কিন্তু আমি এখনও নিশ্চিত হতে পারছি না৷ মনে হচ্ছে একবার কলকাতা যেতে হবে৷ তোর দাদুর কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝিনি৷ তার ঠিক দু-দিন পরেই উনি মারা যান৷ হঠাৎ এরকম একটা সাংঘাতিক ঘটনায় আমি এসব কথাবার্তা ভুলেও গেছিলাম৷ কিন্তু তোর জন্য বইগুলো গোছাতে গিয়ে ওনার ডাইরিটা হাতে পড়ল৷ দেখলাম তাতেও মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে উনি একইধরনের কথা লিখে গেছেন৷ তাই মনে হল তোকে একবার বলি৷
মাসিদিদার কথার উত্তরে হিমাদ্রি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ঘটাং করে জোরে গেটটা খুলে ছুটে ভিতরে ঢুকল হরি আর রুনাই৷ দু-জনেরই মুখ লাল, প্রবল হাঁপাচ্ছে৷
ও কী রে, অমন ছুটতে ছুটতে কোথা থেকে এলি? এতখানি বেলা পর্যন্ত কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলি? শিগগির উপরে আয়৷ হরি ঘরে যা, তোর মা খুঁজছিল৷
বড়োদিদার ডাক শুনে দোতলায় উঠে আসে রুনাই৷ ততক্ষণে রুনাইয়ের মা শর্মিষ্ঠাও চলে এসেছে বারান্দায়৷ রুনাইকে ঠেলে স্নান করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তক্ষুনি৷ গায়ের জ্যাকেটটা চেয়ারের ওপর খুলে রেখে গেছে রুনাই৷ সেটা তুলে রাখতে গিয়ে গজগজ করে শর্মিষ্ঠা৷ কীসব ঢিলপাটকেল পকেটে পুরেছে দেখো একবার, দামি জ্যাকেটটার একেবারে দফা রফা... বলতে বলতেই পাথরের টুকরোগুলো পকেট থেকে বার করে ফেলে দিতে যাচ্ছিল শর্মিষ্ঠা কিন্তু সেদিকে একবার তাকিয়েই চমকে ওঠে হিমাদ্রি, দাঁড়াও দাঁড়াও ফেলো না... আমাকে দাও তো ওগুলো...
পাথরের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে হিমাদ্রি৷ শর্মিষ্ঠা আর মাসিদিদা দু-জনেই একটু অবাক৷ ততক্ষণে স্নান সেরে বেরিয়ে এসেছে রুনাইও৷
এগুলো তুমি পেলে কোথায়?
বাবার কথায় প্রথমে একটু চুপ করে থেকে ভয়ে ভয়ে রুনাই বলে, এগুলো চড়কের টিলা থেকে কুড়িয়েছিলাম...
চড়কের টিলা! সেটা আবার কোথায়?
সে তো অনেক দূরে৷ কুনকি নদী পেরিয়ে যেতে হয়৷ অতদূরে গেছিলি নাকি রে তোরা?
বড়োদিদার কথায় ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়ে রুনাই৷
কেন গেছিলি ওখানে?
হরি বলল ওখানে ডাকাতে কালীর মন্দির আছে তাই...
মন্দির দেখতে গেছিলে তুমি... উঁহু... অন্য কোনো কারণ আছে... সত্যি কথা বলো৷
নিজের ছেলেকে খুব ভালো চেনেন হিমাদ্রি৷ ধরা পড়ে গেছে বুঝে রুনাই মরিয়া হয়ে বলে, হরি বলল, ওখানে গুপ্তধন আছে৷ কাপালিকের ঘরে চামুণ্ডার আসন, তার নীচে চোরাকুঠুরিতে বাক্স-ভরতি সোনা-মোহর রাখা থাকে...
পেয়েছ গুপ্তধন?
না, চোরাকুঠুরিতে গুপ্তধনের বাক্স নেই৷ তিনটে মড়ার মাথার খুলি রাখা আছে শুধু...
সে কী রে, তোরা কি ধানু পুরোহিতের ঘরে ঢুকেছিলি নাকি?

ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়ে রুনাই, চুপিচুপি ঢুকেছিলাম৷ কিন্তু বেরোনোর সময় ধরা পড়ে গেলাম৷ তেড়ে আসছিল, আমরা ছুটে পালিয়ে এসেছি...
এই পাথরের টুকরোগুলো দরকার হয়েছিল কেন?
হরি বলেছিল, গুপ্তধন পাহারা দেয় একটা সাপ, তাই চড়কের টিলা থেকে এগুলো কুড়িয়েছিলাম...
ঢিল ছুড়ে সাপ তাড়াবে বলে তো? বুঝেছি৷ না বলে অন্যের বাড়িতে ঢুকেছিলে গুপ্তধন চুরি করতে... ধানু পুরোহিতের লাঠির বাড়ি পিঠে পড়লেই ঠিক শিক্ষা হত৷
বাবার কথা শুনে মুখটা ছোটো হয়ে যায় রুনাইয়ের৷
মাসিদিদার কাছ থেকে চড়কের টিলার রাস্তাটা জেনে নিয়ে সকাল সকালই বেরিয়ে গেছিল হিমাদ্রি৷ একটু বেলায় যখন ফিরে এল তখন তার মুখচোখ রীতিমতো জ্বলজ্বল করছে৷
মাসিদিদা, শিগগির এদিকে এসো৷ দাদু কী বলতে চেয়েছিল সেটা মনে হচ্ছে বুঝতে পেরেছি৷
কী বুঝতে পেরেছিস রে?
এই দেখো...
বলতে বলতে কাঁধের ঝোলা থেকে আগের দিন রুনাই যেরকম পাথরের টুকরো এনেছিল সেরকমই কতগুলো পাথরের টুকরো বার করে টেবিলে রাখে হিমাদ্রি৷ তারপর তার থেকে কয়েকটা বেছে নিয়ে বলে, ভালো করে দেখো৷ এটা একটা মূর্তির মাথা, এটা একটা পাখি, এটা কোনো একটা পাত্রের ভাঙা টুকরো... বুঝতে পারছ?
তার মানে? মাসিদিদা আর শর্মিষ্ঠা দু-জনেই অবাক৷
কালকে ওগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল৷ ওই চড়কের টিলার নীচে কোনো প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ চাপা পড়ে আছে৷ এই যে পাতলা ইটের টুকরো দেখছ এরকম ইট দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সময়ে তৈরি হত৷ ওখানে মাটি খুঁড়লে এরকম আরও অনেক কিছু নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে৷
সে কী রে! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার!
হ্যাঁ মাসিদিদা৷ আমার ধারণা দাদুও এটা আন্দাজ করেছিল৷ কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছিল না৷ সেইজন্যই কলকাতা যাওয়ার কথা বলেছিল৷ আমি কালই এগুলো আমাদের ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গিয়ে দেখাব৷ হতেই পারে এখান থেকে ইতিহাসের এমন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসবে যা আগে কেউ কখনো জানতই না৷
চোখ গোল করে বাবার কথা শুনছিল রুনাই আর হরি৷ তাদের দিকে তাকিয়ে এবার হিমাদ্রি বলল, এটার পুরো কৃতিত্বটাই রুনাই আর হরির৷ ওরা সাহস করে গুপ্তধন খুঁজতে না গেলে তো এসব কিছু জানাই যেত না৷ তবে মজার কী বল তো রুনাই, ডাকাতে কালীর মন্দিরে কিন্তু কোনো গুপ্তধন নেই৷ ওটা একটা গল্প৷ ধানু পুরোহিত নিরীহ লোক৷ কাপালিকের ভেক ধরে থাকে লোকে যাতে ভয়ে কিছু বেশি প্রণামি দেয়৷ আসল গুপ্তধন কিন্তু লুকিয়ে আছে চড়কের টিলার নীচে৷ হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার নিদর্শন, যার খবর এখনও কেউ জানে না৷ সেই গুপ্তধন আবিষ্কার করেছিস তোরা দু-জন৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন