নমিতার স্বপ্ন

দীপান্বিতা রায়

Cov9

ভোর বেলায় মা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নমিতাকে ডেকে দেয়৷ সকালে যে অনেক কাজ৷ স্কুলের পড়া তো আছেই৷ তা ছাড়া স্টোভে তাদের দুই ভাই-বোনের জন্য ভাতে-ভাত রান্না করে নিতে হয়৷ মা তো বড্ড সকালে বেরোয়৷ তখন আর কিছুই করার সময় থাকে না৷ খাওয়া হয়ে গেলে বাসন ক-টাও ধুয়ে রাখে নমিতা৷

ভোর থেকে অতগুলো বাড়িতে কাজ করে মায়ের যে আর শরীরে দেয় না, সেকথা কি আর সে বোঝে না৷ মা না বললেও তাই রোজই হাঁড়িতে চালও একটু বেশি নেয়৷ দুপুরে ফিরে তাহলে আর মাকে রাঁধতে হয় না৷ সেদ্ধ ভাতের সঙ্গে দুটো শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে নেয়৷ তারপর একটু বিশ্রাম করে আবার বেরোয়৷ ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়৷

মা বাড়ি এসে রান্না বসায়৷ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে, বাসন মেজে মা শোয়৷ ঘুমোয় না কিন্তু৷ মা জানে এই সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে নমিতা৷ সারাদিন কত কথা জমে থাকে তার৷ স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা, দিদিমণিদের কথা৷ সবটুকু মাকে না বললে ভালো লাগে না নমিতার৷ মাও শোনে খুব মন দিয়ে৷ নিজের স্কুলে পড়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে৷ কেমন সুন্দর দুটো কলাবিনুনি বেঁধে স্কুলে যেত৷ চিত্রা, সবিতাদের সঙ্গে কত গল্প, খুনসুটি৷ সেসব যেন গত জন্মের কথা৷ তবু মেয়ের কথা শুনতে শুনতে মাঝে মাঝেই মনের মধ্যে ঝিলিক দিয়ে যায় পুরোনো স্মৃতি৷

সবসময় যে গল্প করে তাও কিন্তু নয়৷ অনেক সময় মাকে গল্প পড়েও শোনায়৷ বই পড়তে ভালোবাসে নমিতা৷ তাদের স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই দেয়৷ কোনো গল্প ভালো লাগলেই মাকে পড়ে শোনায়৷ এমনি করেই নমিতার মাও জেনে ফেলেছে ব্যাং রাজপুত্রের গল্প, তুতু-ভুতুর মজার মজার কাণ্ডকারখানা৷ সব গল্প হয়ে গেলেও ঘুমোনোর আগে মা কিন্তু রোজ একটা কথাই জিজ্ঞাসা করে মেয়েকে, ভালো করে পড়ছিস তো মা? তোকে কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে৷ তবে আমাদের কষ্ট ঘুচবে৷

নিঃশব্দে ছোট্ট ঘাড়টি নাড়ে মেয়ে৷ আসলে এই বড়ো হওয়ার স্বপ্নটা মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল তার বাবা৷ তখন অবশ্য তারা এত গরিব ছিল না৷ বাবা একটা ব্যাটারি কারখানায় চাকরি করত৷ সেখানেই ছোটো কিন্তু পাকা কোয়ার্টারেই থাকত৷ বাবা নিজে মাধ্যমিক পাস করেছিল৷ পড়ার ইচ্ছে ছিল খুব৷ কিন্তু পেটের জ্বালায় কাজে ঢুকে যায়৷ তাই নমিতাকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন যেন বাঁধ মানত না৷ মেয়ে বড়ো হবে, কলেজে পড়বে, চাকরি করবে৷ মা হাসত কিন্তু রাগ করত না৷ বাবার ইচ্ছেয় ভরসা ছিল মায়ের৷

কিন্তু কারখানাটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল৷ চাকরি নেই৷ বাবা এদিক-ওদিক ঘুরে নানারকম কাজ করে কোনোরকমে সংসার টানত৷ কারখানাটা খুলল মাস ছয়েক পরে৷ কিন্তু নমিতার বাবা ও আরও কয়েকজন ছাঁটাই হয়ে গেল৷ কোয়ার্টার ছেড়ে তখনই নমিতারা এসে উঠল এই গোবিন্দপুরের বস্তিতে৷ তখনও ভরসা হারায়নি বাবা৷ বার বার মা-কে বলত, চিন্তা কোরো না৷ ঠিক কিছু একটা জোগাড় হয়ে যাবে৷ তুমি শুধু মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখো৷

তারপর তো বাবাও আচমকা মরে গেল৷ মা-কে বেরোতে হল কাজে৷ নমিতা আর পুঁটকে ভাইটাও যেন হঠাৎ করেই বড়ো হয়ে গেল অনেকটা৷ তবে এত কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে স্কুল ছাড়ায়নি মা৷ নমিতাও চেষ্টা করে প্রাণপণে৷ পড়াশোনায় তার খুব মন৷ দিদিমণিরা বলেন মাথা খুব পরিষ্কার৷ প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হয় বলে স্কুল থেকেও অনেক সাহায্য করে৷ কিন্তু তাতেও কি আর সবটা হয়৷ এই তো গত বছর সারা ভারত জুড়ে অঙ্কের একটা প্রতিযোগিতা হল৷ ফর্ম ভরতে পাঁচ-শো টাকা লাগবে৷ দশের মধ্যে হতে পারলে মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে স্কলারশিপ৷ কোথা থেকে এত টাকা পাবে? তাই পরীক্ষাটা দিতে পারেনি নমিতা৷ কিন্তু পরীক্ষা দিলে হয়তো পেয়ে যেত স্কলারশিপ৷ কত সুবিধা হত মায়ের৷ এবছরও ওই পরীক্ষার জন্য ফর্ম ভরতির সময় হয়ে আসছে৷ কিন্তু নমিতা জানে তার ভাগ্যে পরীক্ষা দেওয়া নেই৷ তার নিজের মনটা তাই এজন্য বড্ড ভার হয়ে আছে ক-দিন৷

একদিন রাতে গল্প করার সময় মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল নমিতা, আচ্ছা মা, গল্পে যে পড়ি, রাজকন্যা এমন আংটি পেল, যার কাছে যা চাইবে তাই পাবে৷ তেমন আংটি কি সত্যি পাওয়া যায়?

মা হেসে ফেলে বলেছিল, না মা, ওরকম আংটি কেউ পায় না৷ ও শুধু গল্পে থাকে৷

আর গুপ্তধন? ওই যে বলে মাটি খুঁড়ে ঘড়া ঘড়া মোহর পেয়েছে, সোনার গয়নাভরা বাক্স পেয়েছে, ওসব কি সত্যি? তাহলে তো আমরাও এদিক-ওদিক খুঁড়ে দেখতে পারি৷

না সোনা, ওরকমও হয় না৷ আমিও ছোটোবেলায় বাবার মুখে ওরকম অনেক শুনেছি৷ বাবাদের গ্রামের কে নাকি জমিতে হাল দিতে গিয়ে একঘড়া মোহর পেয়েছিল৷ ভাঙা মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়েছিল সোনার গয়নাভরা বাক্স৷ কিন্তু এসবই হল গল্প৷ লোকের মুখে মুখে কথাটা চলে আসছে৷

মায়ের সব কথাই বিশ্বাস করে নমিতা৷ কিন্তু এই কথাটা কেন জানি না বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করেনি তার৷ রাত্তির বেলায় মায়ের পাশে ছোটো চৌকিটাতে শুয়ে তার ভাবতে ভালো লাগে যে, সেও ওরকম একটা মোহরের ঘড়া খুঁজে পেয়েছে৷ এই বস্তিটা ছেড়ে তারা চলে গেছে একটা ছোট্ট সুন্দর বাড়িতে৷ মাকে আর অন্য বাড়িতে কাজ করতে যেতে হয় না৷ নমিতা যদিও জানে যে তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না৷ তবু তার কল্পনায় গড়ে তোলা সেই ছোট্ট বাড়িটাতে বাবাও তাদের সঙ্গে থাকে৷

আগের দিন রাতেও এরকমই একটা মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল নমিতা৷ সকালে যখন মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল তখনও সেই স্বপ্নের রেশ যেন তার চোখে লেগে আছে৷ তাই একটু অন্যমনস্কভাবেই ঘর থেকে বেরিয়েছিল, সামনের টাইম কল থেকে হাত-মুখটা ধুয়ে নেবে বলে৷ ডিসেম্বর মাসের কনকনে ঠান্ডা৷ এই ভোর বেলায় কলতলাটা তাই একদম ফাঁকা৷ মুখ ধুয়ে ফিরে আসছে নমিতা, হঠাৎ মনে হল বাড়ির পিছনে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে৷ ক-দিন ধরেই সকালে খুব কুয়াশা পড়ছে৷ কয়েক হাত দূরের জিনিসও ভালো করে দেখা যায় না৷ নমিতাদের ঘরটা বস্তির একেবারে শেষপ্রান্তে৷ বাড়ির পিছনেই একটা ঝাঁকড়া আকন্দ গাছ৷ তারপর কালকাসুন্দের ঝোপটা পেরিয়ে গেলেই রেল লাইনের ধারের ফাঁকা জমি৷ গলার আওয়াজটা আসছে ওই কালকাসুন্দের ঝোপটার কাছ থেকেই৷ একটু ভয় পেলেও, এত ভোরে ওখানে কারা কী করছে দেখার জন্য আকন্দর ঝাড়টার দিকে এগোয় নমিতা৷ ঘন কুয়াশায় খুব ভালো বোঝা না গেলেও তিনটে লোককে অস্পষ্ট দেখতে পায়৷ খুব দ্রুত হাতে মাটি খুঁড়ছে তারা৷ ফিসফিস করে কথা বলছে নিজেদের মধ্যে৷ তারপর একটা বস্তার মতো কিছু গর্তের ভিতর রেখে সেটা ভাঙা ঝুড়ি, গাছের ডাল দিয়ে ঢেকে দেয়৷ মাটি খোঁড়ার জিনিসপত্রগুলো চটপট তুলে নিয়ে জোরপায়ে হাঁটা দেয় রেল লাইন বরাবর৷ কুয়াশার ভেতরে তাদের চেহারাগুলো মিলিয়ে গেলে সংবিত ফেরে নমিতার৷

কী লুকিয়ে রেখে গেল ওরা? নিশ্চয় গুপ্তধন৷ অস্পষ্ট কথাবার্তায় যেটুকু শুনেছে, তাতে বোঝা গেছে দু-একদিনের মধ্যেই তারা ফিরে এসে জিনিসটা তুলে নিয়ে যাবে আবার৷ কিন্তু তার আগেই তো নমিতা দখল নিতে পারে গুপ্তধনের৷ আর কেউ তো এই লুকিয়ে রাখার ঘটনাটা দেখেনি৷ কিন্তু না বলে অন্যের জিনিস যে নেওয়া উচিত নয়৷ তাতে চুরি করা হয়৷ দু-পা এগিয়েও আবার থমকে দাঁড়ায় নমিতা৷ কিন্তু গুপ্তধনের ক্ষেত্রেও কি সেই কথাটা খাটে? এত এত গুপ্তধনের গল্প পড়েছে নমিতা৷ কত গরিব চাষির ছেলে মোহরের ঘড়া পেয়েছে, জেলের মেয়ে মুক্তোর হার খুঁজে পেয়ে গলায় পরেছে, কই কোথাও তো তাদের কেউ চোর বলেনি৷ নাঃ, তার মানে গুপ্তধন খুঁজে পেলে তাকে চুরি বলা যায় না৷

Cov10

মনস্থির করে ফেলে নমিতা৷ কালকাসুন্দের ঝোপের পিছনে গিয়ে ভাঙা ঝুড়িটা সরাতেই চোখে পড়ে বস্তাটা৷ পুরোনো একটা ফুটো ফুটো চটের বস্তা৷ দেখে বোঝাই যায় না এর ভিতরে মণিমুক্তো আছে৷ কিন্তু আছে তো নিশ্চয়৷ এত যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছে যখন৷ বস্তাটা টেনে তোলে নমিতা৷ বেশ ভারী৷ কষ্ট করেই টেনে নিয়ে আসে বাড়ির দিকে৷ তারপরই মনে হয়, বাড়িতে রাখবে কী করে? মা যদি গুপ্তধনের কথাটা বিশ্বাস না করে? ওই লোকগুলো ফিরে এসে খোঁজ করলে যদি দিয়ে দেয়৷ না, বাড়িতে রাখা চলবে না৷ কিন্তু কোথায় রাখা যায় তাহলে? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়৷

গোবিন্দপুরের যে বস্তিতে তারা থাকে, তার ঠিক পিছনেই একটা বেশ চওড়া রাস্তা৷ রাস্তার ওপারে বিশাল রবীন্দ্রসরোবর লেক৷ লেকের ঠিক মাঝখানটায় আছে একটা দ্বীপ৷ নানারকম গাছপালায় ভরতি৷ সেখানে কেউ থাকে না৷ মস্ত মস্ত গাছে পানকৌড়ির বাসা৷ শীত পড়লেই ঠান্ডার দেশ থেকে পাখিরা উড়ে আসে এখানে৷

এই সবুজ রঙের ছোট্ট দ্বীপটা খুবই পছন্দ নমিতার৷ বস্তির লোকেরা বলে ভূত আছে ওখানে৷ তাই ভয়ে কেউ যায় না৷ কিন্তু নমিতার ভয়ডর কম৷ সাঁতারও খুব ভালো কাটে৷ তাই বার দুয়েক সে একলাই গেছে ওই দ্বীপে৷ ভূত-টুত মোটেই নেই৷ বরং নানরকম পাখি আর প্রজাপতি আছে৷ আর আছে অজস্র বাদুড়৷ সেগুলো সারাদিন মাথা নীচু করে ঝোলে আর সন্ধ্যে নামতেই ডানা মেলে আকাশে৷ নমিতার ধারণা এই বাদুড়গুলোকেই আসলে ভূত ভাবে বস্তির ছেলেরা৷ নমিতার মনে হল, ওই দ্বীপে তো কেউ যাবে না৷ তাহলে ওখানেই আপাতত লুকিয়ে রাখা যাক গুপ্তধন৷

বস্তির লোকেরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই কাজটা করতে হবে৷ তাই আর দেরি করে না নমিতা৷ বস্তাটা টানতে টানতে রাস্তা পেরিয়ে সোজা চলে যায় লেকের ধারে৷ শীতের সকালে লেকের জল বরফের মতো ঠান্ডা৷ কিন্তু তবু সে বস্তাটাকে নিয়ে জলে নামে৷ একহাতে সাঁতার কেটে অতি কষ্টে পৌঁছোয় দ্বীপটায়৷ পাড়ের কাছের একটা গাছের গুঁড়ি ধরে ওপরে উঠে বস্তাটাও টেনে তোলে৷ প্রথমে ভেবেছিল পাড়ের কাছেই বস্তাটা রেখে ফিরে আসবে৷ কিন্তু তারপর ভয় হয়৷ যদি কেউ দূর থেকে দেখতে পেয়ে চলে আসে৷ তাই সেটাকে টেনে একটু ভিতরের দিকে নিয়ে গিয়ে একটা ঝোপের ভিতর ঠেসে ঢুকিয়ে দেয়৷ ততক্ষণে বেজায় হাঁফিয়ে গেছে নমিতা৷ সারা গা ভেজা৷ শীতও করছে খুব৷ কিন্তু তবু ফিরে যাওয়ার আগে একবার বস্তাটা খুলে ভিতরে কী আছে দেখতে ইচ্ছে করে৷

বস্তার মুখটা একটা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা৷ দড়ি খুলে বস্তার মুখটা ফাঁক করে ভিতরে উঁকি দিয়ে প্রথমটায় কিছুই বুঝতে পারে না৷ শক্ত শক্ত গোল থালার মতো কী যেন রাখা আছে ভিতরে৷ তারপরেই চমকে উঠে দেখে থালার নীচ থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা লম্বা গলা আর কতুকুতে দুটো চোখ৷ গোটা দশেক অদ্ভুত দেখতে কচ্ছপ৷ খোলার ওপরে কেমন যেন তারা তারা ছাপ৷ বস্তার মুখ খোলা পেয়ে গুটিগুটি বেরিয়ে আসছে৷ সোনার থালা নয়, মণিমাণিক্য, মোহর কিছু নয়, শেষকালে কিনা কচ্ছপ! দুঃখে-হতাশায় কেঁদে ফেলে নমিতা৷ চোখের জল মুছতে মুছতেই ফিরে আসে বাড়িতে৷

লজ্জায় মাকে কচ্ছপের কথাটা বলেনি নমিতা৷ মা-তো বলেইছিল গুপ্তধন শুধু গল্পে থাকে৷ তবু সে বোকার মতো মায়ের কথায় বিশ্বাস করেনি৷ অত ভোর বেলা ঠান্ডা জলে নেমে জ্বর এসেছিল বলে পরপর কয়েক দিন স্কুলেও যেতে পারেনি৷ তার শরীর খারাপ বলে মাও সেদিন তাড়াতাড়ি কাজের বাড়ি থেকে ফিরেছে৷ ঘরের সামনের চিলতে বারান্দায় বসে আছে দু-জনে৷ এমন সময় দুটো হাতবাঁধা লোককে সঙ্গে নিয়ে গোটাকতক পুলিশ আর দু-জন ভদ্রলোক এসে হাজির৷ নমিতাদের বাড়ি ছাড়িয়ে কালকাসুন্দের ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে লোকগুলো কী যেন বলছে দেখে নমিতাকে ছেড়ে মা এগিয়ে যায় সেদিকে৷

এইখানেই রেখেছিলাম স্যার৷ এই ঝোপটার ভিতরে...

ঝোপ থেকে এগুলো কি তাহলে পাখি হয়ে উড়ে গেল নাকি রে?

না স্যার, বস্তার মুখ শক্ত করে বাঁধা ছিল...

আবার মিথ্যে কথা৷ ঠিক করে বল কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস৷

পিঠে পুলিশের রুলের গুঁতো খেয়ে হাউমাউ করে উঠলেও ফের একই কথা বলে লোকটা৷ ততক্ষণে বস্তির আরও কিছু লোকজন এসে জুটেছে৷

কেউ এখানে কোনো বস্তা দেখেছ?

পুলিশের কথায় মাথা নাড়ে সবাই৷ মায়ের সঙ্গে মাথা নাড়ে নমিতাও৷

তার মানে মিথ্যে কথা বলছে৷ অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে৷ আপনি চিন্তা করবেন না স্যার৷ লক-আপে আচ্ছা মতো ধোলাই পড়লে ঠিক সব কথা বেরোবে৷

আসলে খুব ডেলিকেট ব্যাপার তো৷ তিন-চার দিন তো হয়ে গেছে অলরেডি৷ মুখ বাঁধা বস্তায় থেকে যদি মরে যায়, তাহলে ব্যাপারটা খুবই খারাপ হবে৷ যাই হোক, কিছু তো করার নেই, দেখুন আপনারা কী করতে পারেন৷

লোকগুলো ফিরে যাচ্ছে৷ পুলিশগুলো এগিয়ে গেছে খানিকটা৷ ভদ্রলোক দু-জন পিছনে৷ হঠাৎ মায়ের দিকে একপলক তাকিয়েই এক দৌড়ে গিয়ে যিনি কথা বলছিলেন সেই লোকটার জামার পিছনটা ধরে টানে নমিতা, আমি জানি কোথায় আছে কচ্ছপগুলো...

চমকে ওঠেন ভদ্রলোক, তুমি জানো? তুমি দেখেছ? কোথায় আছে?

লেকের ভিতরে যে দ্বীপটা আছে ওখানে৷

নৌকা নিয়ে তখনই যাওয়া হল দ্বীপে৷ বন দফতরের দুই কর্তা, দু-জন পুলিশ আর নমিতা৷ বস্তাটা যেখানে রাখা ছিল তার আশেপাশেই খুঁজে পাওয়া গেল কচ্ছপগুলোকে৷ মোট ন-টা কচ্ছপ৷ সবগুলোরই পিঠটা কীরকম এবড়ো-খেবড়ো মতো আর তাতে তারা তারা ছাপ৷

এগুলো কী তুমি জানো নমিতা?

জানব না কেন? এগুলো তো কচ্ছপ...

হ্যাঁ, কচ্ছপ ঠিকই, তবে এগুলো একটা বিশেষ ধরনের কচ্ছপ...

নমিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গোঁফওলা ভালোমানুষ চেহারার ভদ্রলোক বললেন, এগুলোকে বলে ইন্ডিয়ান স্টার কচ্ছপ৷ ওদের পিঠের ওপর যে তারা তারা দাগ দেখছ, ওই জন্যই এরকম নাম৷ আমাদের দেশে আর শ্রীলঙ্কায় পাওয়া যায়৷ আসলে এগুলো হল বিরল প্রজাতির কচ্ছপ, তার মানে পৃথিবী থেকে এরা আস্তে আস্তে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে৷ তাই আমাদের কাজ হল খুব সাবধানে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা৷ সেজন্যই এদের ধরা বারণ৷কিন্তু কিছু দুষ্টু লোক আছে যারা এগুলোকে ধরে বাজারে বিক্রি করে দেয়৷

বিক্রি করে দেয় কেন?

অনেকে কেনে তো৷ কেউ খাবার জন্য কেনে আবার অনেকে মনে করে এর থেকে নানারকম ওষুধ তৈরি করা যাবে৷ সেজন্যই তো এগুলোর সাংঘাতিক দাম৷ এই ন-টা কচ্ছপের কত দাম জানো?

অবাক হয়ে আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়ে নমিতা৷

প্রায় ৮ লক্ষ টাকা৷ ওই লোকগুলোও বিক্রি করে বাইরে পাচার করে দিত৷ আমরা ওদের বাঁচাতে পারতাম না৷ এখন বুঝতে পারছ তো, তুমি কত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করে ফেলেছ৷

এবার একটু লজ্জা পেয়ে নমিতা বলে, আমি আসলে ভেবেছিলাম বস্তায় গুপ্তধন আছে৷ তাই চুপিচুপি ওটাকে এখানে এনে রেখেছিলাম৷ তারপর অবশ্য খুলে দেখলাম ভিতরে কচ্ছপ!

নমিতার কথা শুনে পরস্পরের দিকে তাকালেন বন দফতরের দুই অফিসার৷ তারপর একজন একটু হেসে বললেন, আচ্ছা দেখা যাক, কচ্ছপের বস্তায় সত্যি কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া যায় কি না৷

কথাগুলোর মানে অবশ্য নমিতা তখন বোঝেনি৷ কিন্তু কয়েক দিন বাদেই থানা থেকে একজন পুলিশ এসে বলে গেল কচ্ছপগুলো উদ্ধারের জন্য সরকার থেকে দশ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে নমিতাকে৷ মায়ের সঙ্গে গিয়ে সে যেন টাকাটা নিয়ে আসে৷

Cov11

অঙ্কের পরীক্ষাটা দেবে নমিতা৷ ফর্ম জমা দেওয়া হয়ে গেছে৷ কচ্ছপ উদ্ধারের ঘটনাটা কাগজে বেরিয়েছিল৷ তাই দিদিমণিরাও খুব খুশি৷ সব মিলিয়ে নমিতার মনটা এখন ভারি খুশি খুশি৷ সেদিন রাতে খাওয়ার পর তাই মাকে নমিতা বলল-আমি তোমাকে বলেছিলাম না মা, গুপ্তধন পাওয়া যায়৷ তখন তুমি বিশ্বাস করোনি৷ এখন দেখো পাওয়া গেল কি না৷

যা বলেছিস... কচ্ছপ যে আবার গুপ্তধন হতে পারে, সে আর আমি জানব কী করে বল৷

এমনি কচ্ছপ না মা, স্টার কচ্ছপ, পিঠের ওপর তারা তারা দাগ, বিলুপ্ত প্রজাতি... ওই কাকুটাকে আমি বলেছি বড়ো হয়ে আমিও ওদের মতোই এইরকম সব হারিয়ে যাওয়া প্রাণী উদ্ধারের কাজ করব... আমার খুব ইচ্ছে হয়েছে...

কথা বলতে বলতেই আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে নমিতা৷ তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মা বুঝতে পারে সে এবার এক অন্যরকম গুপ্তধনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে৷

Cov12
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%