পূরণজিতের রত্নভাণ্ডার

দীপান্বিতা রায়

Cov5

শুয়ে আছে তৃণা৷ মাথার পাশে বেডসাইড ল্যাম্পটাও নেভানো৷ কিন্তু দীপক জানেন, তৃণা ঘুমোয়নি৷ অপেক্ষা করছে কাকামণির জন্য৷ কাকামণি মাথায় হাত বুলিয়ে গল্প না বললে ঘুমোতে পারে না তৃণা৷ দীপক তাই হাতের কাজটা দ্রুত শেষ করছিলেন৷ অফিসে একটা রিপোর্ট জমা দিতে হবে আগামীকাল৷ বেশিরভাগটাই হয়ে গেছে৷ বাকিটুকুর জন্য ল্যাপটপের কি-বোর্ডে দ্রুত আঙুল চালাতে চালাতে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল দীপকের৷ গত দেড় বছরে তাঁর জীবনটা কী অসম্ভবরকম বদলে গেছে৷

দীপক ব্যাচেলার মানুষ৷ মধ্যপ্রদেশের এই ছোট্ট শহরের কলেজে দশ বছর অধ্যাপনা করছেন৷ ছাত্রদের ইতিহাস পড়ান৷ নিজেও সারাদিন ইতিহাস নিয়েই মেতে থাকেন৷ বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যেসব দুর্গ আছে তা নিয়ে দীপকের আগ্রহের শেষ নেই৷ বহু অজানা তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছেন, লেখালেখি করেছেন৷ ইতিহাসবিদ মহলে দীপক মুখার্জি একটা পরিচিত নাম৷

এসব নিয়েই দিব্যি কেটে যাচ্ছিল দিন৷ মা-বাবা মারা গেছেন অনেকদিন৷ তাঁরা দুই ভাই৷ দাদা ব্যস্ত ডাক্তার৷ কলকাতায় জমজমাট প্র্যাকটিস৷ দাদা সময় পেতেন না বলে ছুটি-ছাটায় দীপকই চলে যেতেন কলকাতায়৷ দাদা-বউদির সঙ্গে এন্তার আড্ডা আর তৃণার সঙ্গে হইচইয়ে দিব্যি কেটে যেত সময়৷

সেই দিনটা এখনও দীপকের স্পষ্ট মনে আছে৷ বর্ষাকাল৷ মধ্যপ্রদেশের এই এলাকাগুলোয় বর্ষা ভারি মনোরম৷ ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে৷ দীপকের বাড়িটা শহরের ভিড়ভাট্টা থেকে একটু দূরে৷ চারপাশটা অনেকটাই ফাঁকা ফাঁকা৷ বাড়ির কাছেই ছোট্ট টিলার ওপর একটা পুরোনো কেল্লার ভগ্নাবশেষ৷ সেই ভাঙা কেল্লা, সবুজ ঘাস, দীপকের বাড়ির লাল টালির চাল সবকিছুর ওপর বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ৷ আপনমনে রবীন্দ্রসংগীত গুনগুন করতে করতে হাঁটছিলেন দীপক৷ এমনসময় বুকপকেটে মোবাইলটা বাজল৷ অচেনা নম্বর৷ ফোনটা ধরলেন দীপক৷ ওপাশ থেকে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি প্রতীক মুখার্জির ভাই বলছেন?

ভারি আশ্চর্য হয়ে দীপক বললেন, হ্যাঁ আমি ডা. প্রতীক মুখার্জির ভাই দীপক মুখার্জি বলছি...

আমি শিলিগুড়ি পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি৷ সিকিম থেকে ফেরার পথে ডা. মুখার্জির গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে৷ আপনাকে স্যার যত দ্রুত সম্ভব এখানে আসতে হবে৷

কয়েক মুহূর্ত কথা বলার মতো শব্দ খুঁজে পাননি দীপক৷ তারপর কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, দাদা, দাদা কেমন আছে? বউদি, তৃণা...

তিনজনেই শিলিগুড়ি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভরতি৷ আপনার দাদা-বউদির কন্ডিশন খুবই সিরিয়াস৷ মেয়েটির বোধ হয় তেমন কিছু হয়নি৷ আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন৷

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর দীপক কীভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন কিংবা কীভাবে প্লেনের টিকিট বুক করে পরদিন বিকেলে শিলিগুড়ি পৌঁছেছিলেন এখন আর মনে করতে পারেন না৷ হাসপাতালে যখন পৌঁছোলেন, ততক্ষণে বউদি মারা গেছেন৷ দাদা বোধ হয় শুধু দীপককে দেখার অপেক্ষায় অনেক কষ্টে প্রাণটুকু ধরে রেখেছিল৷ ভাইয়ের হাত ধরে শুধু দু-টি শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন প্রতীক, তৃণা রইল...

শিলিগুড়িতেই দাহকার্য সেরে তৃণাকে নিয়ে কলকাতায় ফিরেছিলেন দীপক৷ তৃণা তখন এগারো৷ সিকিম থেকে ফেরার সময় স্কিড করে গাড়ি খাদে পড়ে যায়৷ সামান্য একটু কেটে-ছড়ে যাওয়া ছাড়া তৃণার তেমন কোনো আঘাত লাগেনি৷ কিন্তু একসঙ্গে মা-বাবাকে হারিয়ে অসম্ভব শকে সে কেমন যেন একটা পাথরের মতো হয়ে গেছিল৷ চোখে এক ফোঁটা জল নেই৷ মুখে একটাও কথা নেই৷ দীপক সারাক্ষণ আগলে রাখছিলেন তৃণাকে৷ কিন্তু তবু কলকাতায় ফেরার তিন দিনের মাথায় আর একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল৷ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যেতে গিয়ে পা দুমড়ে পড়ে গেল তৃণা৷ ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে দেখলেন যে, তার পায়ের সাড় চলে গেছে৷ অনেক চেষ্টা করলেন দীপক, অনেক ডাক্তার দেখালেন৷ কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না৷ গত দেড় বছর হাঁটতে পারে না তৃণা৷ চলাফেরা সবই হুইলচেয়ারে৷

কিছুদিন আগে সুইজারল্যান্ড থেকে একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক এসেছিলেন ভোপালে৷ মানস কুলকার্নি নামে দীপকের একজন ডাক্তার বন্ধু আছেন এখানে৷ তিনি সবটাই জানেন৷ তৃণাকে খুবই স্নেহ করেন৷ কুলকার্নি এবং দীপক দু-জনে মিলে তৃণাকে নিয়ে ভোপালে গিয়ে সেই ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন৷ কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি কিছুই৷

কলকাতার পাট চুকিয়ে দিয়েছেন দীপক৷ তৃণা এখানে স্কুলে ভরতি হয়েছে৷ হুইলচেয়ারেই স্কুলে যায়৷ বাড়িতে লছমি ওর দেখাশোনা করে৷ পড়াশোনা করে তৃণা৷ কিন্তু কথাবার্তা প্রায় বলেই না৷ খুশিতে ঝলমলে মেয়েটাকে এ বাড়িতে আনার পর একটিবারের জন্যও হাসতে দেখেননি দীপক৷

ল্যাপটপটা বন্ধ করে উঠে পড়েন দীপক৷ পায়ের শব্দে চোখ মেলে তাকায় তৃণা৷ দীপক এসে তার খাটের পাশে বসেন৷ নরম রেশমের মতো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, আজ কীসের গল্প শুনবি মামন?

তোমার যা ইচ্ছে৷

ভাইঝির চুলে বিলি কাটতে কাটতে দীপক একটু সময় ভেবে নেন৷ নিজে ইতিহাসের লোক বলে, বেশিরভাগ সময় ইতিহাসের গল্পই বলেন৷ আবার কখনো নিজের ছোটোবেলার পড়া গল্প কিংবা অভিজ্ঞতার কথাও শোনান৷

আজ বরং তোকে একটা অন্যরকম গল্প বলি মামন৷ তুই আমাদের বাড়ির পাশে টিলার ওপরে ওই দুর্গটা দেখেছিস তো? দুর্গ বলে অবশ্য এখন আর ওটাকে বোঝা যায় না৷ ভাঙাচোরা একটা ইটের স্তূপ৷ মাঝে মাঝে দু-একটা বুরুজের মাথা৷ কিন্তু আমার অভিজ্ঞ চোখে প্রথমবার দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম যে এই পোড়ো জায়গাটার পিছনে একটা অতীতের গল্প আছে৷ সত্যি কথা বলতে কী জানিস মামন, আমি এই বাড়িটা পছন্দ করেছিলাম, ওই দুর্গটা দেখেই৷

কিন্তু মুশকিল হল কী, ওটা যে কার দুর্গ ছিল, কতদিন আগে ছিল, সে সম্বন্ধে এখানকার মানুষজন প্রায় কিছুই বলতে পারল না৷ দু-একজন যা বলল, তা একেবারে আজগুবি নয়তো মনগড়া৷ কিন্তু আমি তো হাল ছাড়ার পাত্র নই৷ তাই খোঁজ করতেই থাকলাম৷ স্থানীয় লাইব্রেরিতে ঢুঁ মেরেছি৷ বয়স্ক মানুষ দেখলে যেচে কথা বলেছি৷ একটা জিনিস আমার মনে হয়েছিল, এই দুর্গের যিনি অধিপতি ছিলেন, তাঁর নাম সম্ভবত ছিল বিক্রম৷ কারণ এই দুর্গটাকে সবাই বিক্রমগড় বলে৷

দুর্গের গড়ন আর ইট দেখে আমার মোটামুটি একটা আন্দাজ হয়েছিল যে এটা কোন শতকে তৈরি৷ তাই আমি ওই বিক্রম নামটাকে আশ্রয় করেই ওই সময় যেসব রাজারা এই অঞ্চলগুলোয় রাজত্ব করেছেন, তাঁদের সম্বন্ধেও খোঁজখবর শুরু করি৷ কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মধ্যপ্রদেশের ইতিহাসে বিক্রম নামে কোনো রাজার সন্ধান পাওয়া গেল না৷ তারপর একদিন আমার একজন অফিস কলিগ আমায় বললেন, ড. মুখার্জি আপনি তো বিক্রমগড়ের ইতিহাস নিয়ে খোঁজ করছেন, আমার মনে হয় আপনি একবার অনন্ত দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করুন৷

আমি একটু আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলাম, অনন্ত দেশাই কে?

দেশাই সাহেবও ইতিহাসের প্রফেসার ছিলেন৷ আমাদের এই এলাকা নিয়ে উনি অনেক কাজ করেছেন৷ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ওনার ছেলে এসে ওনাকে কানাডা নিয়ে চলে গেছিল৷ কাল আমার স্ত্রীর কাছে শুনলাম, মাস খানেকের জন্য নাকি উনি এসেছেন৷ আপনি গিয়ে দেখা করতে পারেন৷

অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হবেন?

না করার তো কিছুই নেই৷ আপনিও ইতিহাসের অধ্যাপক৷ সেই পরিচয়েই যাবেন৷ ভালো মানুষ৷ আলাপ করলে ভালো লাগবে৷

পরদিন রবিবার ছিল৷ ঠিকানা নিয়ে চলে গেলাম সকাল বেলা৷ শহরের দক্ষিণ দিকে, অভিজাত পাড়ায় সুন্দর বাংলো প্যাটার্নের দোতলা বাড়ি৷ অনন্ত দেশাই বাড়িতেই ছিলেন৷ লম্বা মেদহীন চেহারা৷ মুখে একটা সৌম্য, প্রশান্তির ছাপ৷ আমি বিক্রমগড় সম্বন্ধে জানতে ঠিকানা খুঁজে ওনার বাড়ি এসেছি শুনে, মুখে একটা যেন খুশির আলো খেলে গেল৷ চা আনতে বলে, আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বইয়ে ভরা নিজের দেড় তলার ঘরটিতে বসালেন৷ তারপর বললেন, বেটা, আমি বিক্রমগড় নিয়ে অনেক খোঁজখবর করেছি৷ অনেককিছু জানতেও পেরেছি৷ চেষ্টা করেছিলাম জায়গাটাকে যদি একটা ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা দেওয়া যায়৷ কিন্তু পারিনি৷ কেউ কোনোদিন আমার কাছে বিক্রমগড় সম্বন্ধে জানতেও চায়নি৷ আমি কয়েকদিনের মধ্যেই আবার বিদেশ চলে যাব আমার ছেলের কাছে৷ আর হয়তো ফিরবও না৷ তাই তুমি যখন আমার কাছে জানতে চাইছ, তখন আমি তোমাকে সবটাই বলব৷

চা এসে গেছিল৷ চায়ে চুমুক দিয়ে অনন্ত দেশাই বলতে শুরু করলেন, সময়টা মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় দ্বিতীয় শতক৷ তুমি ইতিহাসের লোক৷ তাই বুঝতেই পারছ, সেটা হল গুপ্তরাজাদের সময়৷ এই সময়টাকে ভারতের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বা ধ্রুপদি যুগও বলা হয়৷ সিংহাসনে বসেছেন সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত৷ তাঁর অধীনে এক ক্ষুদ্র সামন্তরাজা ছিলেন পূরণজিৎ৷ কোনো এক যুদ্ধে এই পূরণজিৎ সমুদ্রগুপ্তের প্রাণরক্ষা করেন৷ পুরস্কার হিসাবে সম্রাট তখন মধ্যপ্রদেশের এই অঞ্চলের শাসনভার তাঁকে দেন৷ পরিব্রাজক বংশের উত্তরসূরী পূরণজিৎ ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং কর্মঠ মানুষ৷ স্থাপত্যশৈলী সম্বন্ধে তাঁর ভারি আগ্রহ এবং অগাধ জ্ঞান ছিল৷ শোনা যায় তাঁর নিজের আঁকা নকশা অনুসারেই এই দুর্গ তৈরি করা হয়৷ দুর্গটি শুধু দেখতে সুন্দর ছিল না, বসবাসের জন্যও খুবই আরামদায়ক ছিল৷ মধ্যপ্রদেশের এই ভীষণ গরমেও দুর্গের ভিতরে যাতে শীতল, আরামদায়ক পরিবেশ থাকে তার ব্যবস্থা করেছিলেন পূরণজিৎ৷ সেই কারণেই প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময় সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত নিজে এই দুর্গে এসে কিছুদিন থাকতেন৷ পূরণজিৎ এবং তাঁর স্ত্রী শৈব্যার দীর্ঘদিন কোনো সন্তান হয়নি৷ অবশেষে যখন ছেলে হল, তখন সেই ছেলের নামেই দুর্গের নাম রাখা হল বিক্রমগড়৷

সেই সময় গুপ্তবংশের রাজাদের সবথেকে বড়ো শত্রু ছিল হুনরা৷ তারা আকস্মিকভাবে আক্রমণ করত৷ লুঠপাট করে, মানুষজনকে মেরে চলে যেত৷ পূরণজিৎ যথেষ্ট দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন৷ কিন্তু আমি যতদূর তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি, তাতে মনে হয়, কোনো একদিন রাতে হুনরা হঠাৎই বিক্রমগড় দুর্গ আক্রমণ করে৷ পূরণজিৎ একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না৷ তিনি তাঁর স্ত্রী এবং সন্তান তিনজনেই হুনদের হাতে মারা যান৷ হুনরা দুর্গ লুঠ করে আগুন লাগিয়ে দিয়ে চলে যায়৷ দুর্গের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে যায়৷ তারপর থেকেই দুর্গটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং আর কেউই সম্ভবত ওখানে কোনোদিন বাস করেনি৷

কথা শেষ করে একটুখানি সময় চুপ করে রইলেন অনন্ত দেশাই৷ তারপর বললেন, তুমি তো বললে অনেকদিন ধরেই এবিষয়ে খোঁজখবর করছ৷ স্থানীয় মানুষদের কাছে বিক্রমগড় সম্বন্ধে নিশ্চয় নানারকম গল্প শুনেছ৷ গুপ্তধনের গল্প কিছু শুনেছ?

আমি একটু হেসে বললাম, তা তো শুনেইছি৷ এই ধরনের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে সব জায়গাতেই এরকম গল্প শোনা যায়৷ দুর্গের ভিতরে নাকি অনেক ধনরত্ন লুকোনো আছে৷ এক প্রেতাত্মা সেসব পাহারা দেয়৷ রাতের অন্ধকারে যারা সেইসব ধনরত্নের খোঁজে সেখানে ঢুকেছে, তারা কেউই ফিরে আসেনি... এইসব আজগুবি নানা কথাবার্তা৷

অনন্ত দেশাই মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনলেন, তারপর একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ সাধারণত এরকমটাই হয়৷ তবে এক্ষেত্রে কথাগুলোর বোধ হয় খানিকটা ভিত্তি আছে৷

আমি একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কীরকম?

পূরণজিতের নানারকম রত্ন সংগ্রহের নেশা ছিল৷ বণিকদের কাছে সুন্দর রত্ন পেলে বহু স্বর্ণমুদ্রা দিয়েও তিনি সেগুলি কিনে নিতেন৷ তাঁর এই নেশার কথা জানতেন সম্রাট সমুদ্রগুপ্তও৷ তাই প্রতিবার গ্রীষ্মের দিনগুলি এখানে কাটিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় পূরণজিৎকে একটি করে দুর্লভ রত্ন তিনি উপহার দিতেন৷ এইভাবে বহু দুর্মূল্য রত্নের অধিকারী হয়েছিলেন পূরণজিৎ৷ তাঁর দুর্গের ভিতর একটি চোরাকুঠুরিতে সেগুলি রাখা থাকত৷ এই রত্নের খবর সম্ভবত হুনদের কাছেও পৌঁছেছিল৷ সেই কারণেই সামান্য একজন সামন্তরাজা হওয়া সত্ত্বেও পূরণজিতের দুর্গ তারা আক্রমণ করে৷ তবে রত্নের সন্ধান সম্ভবত তারা পায়নি৷ সেই রাগেই হুন দলপতি দুর্গে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুকুম দেন৷

আপনি কি এইসব তথ্য কোনো ইতিহাসের বই কিংবা গবেষণাপত্রে পেয়েছেন?

আমার কথা শুনে অনন্ত দেশাই এবার একটু হেসে বললেন, তুমি ঠিকই ধরেছ৷ এইসব তথ্য আমি কোনো বইতে পাইনি৷ এগুলো আমি শুনেছি আমার দাদা মানে ঠাকুর্দার মুখে৷ আসলে আমাদের পূর্বপুরুষ কোনো এক সর্বদমন নাকি ছিলেন রাজা পূরণজিতের মন্ত্রী৷ হুনরা যেদিন দুর্গ আক্রমণ করে সেদিন তিনি দুর্গে ছিলেন না৷ তাই বেঁচে যান৷ তারপর থেকেই এইসব গল্প বংশ পরম্পরায় আমাদের পরিবারের মধ্যে চলে আসছে৷ যদিও এর কতটা সত্যি আর কতটা জল মেশানো জানার কোনো উপায় নেই৷

অনন্ত দেশাই কথা শেষ করে আবার একটু সময় চুপ করে রইলেন৷ তারপর কেমন যেন ইতস্তত করে, গলা নামিয়ে বললেন, দেখো দীপক, তোমাকে আমার ভারি ভালো লেগেছে৷ আমার ছেলে-মেয়ে দু-জনেই বিদ্বান এবং বুদ্ধিমান৷ কিন্তু তাদের ইতিহাসে কোনো আগ্রহ নেই৷ তা ছাড়া তারা ঠিক করে ফেলেছে যে, আর কখনো দেশে ফিরবে না৷ তাই আমি ভেবেছিলাম কথাগুলো কাউকে বলব না৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোমাকে বলে যেতে পারি৷ আমাদের পরিবারের একটি মন্ত্র আছে৷ ছেলে-মেয়ে সবাইকে সেই মন্ত্র শিখতে হয়৷ শিখতে হয় বলাটা বোধ হয় ঠিক হল না৷ আসলে যখনই আমাদের কুলদেবতার পুজো হয়, পুজোর শেষে সকলে মিলে মন্ত্রটা বলে৷ ছোটোবেলা থেকে শুনে শুনে আপনিই সবার মুখস্থ হয়ে যায়৷ আমারও তাই হয়েছে৷ কিন্তু কোনোদিনই মন্ত্রটার যে কী মানে, বোঝার চেষ্টা করিনি৷ বিষয়টা নিয়ে মাথাও ঘামাইনি৷ কানাডায় ছেলের বাড়িতে সকলে বেরিয়ে যেত৷ আমি একলাই থাকতাম৷ একদিন পুজো শেষ করে একা একাই ওই মন্ত্র উচ্চারণ করছি, হঠাৎ মনে হল আচ্ছা মন্ত্রটার মানে কী? ভাষাটা খানিকটা সংস্কৃত ঘেঁষা হলেও পুরোপুরি সংস্কৃত নয়৷ মুখে মুখে চলে আসায় কিছু শব্দও নিশ্চিত বদলে গেছে৷ তবু অনেকদিন ধরে অনেক চেষ্টা করে আমি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রটার শব্দগুলো এবং তার মানে উদ্ধার করতে পেরেছি৷ অবহট্ট ভাষায় লেখা একটি দশ লাইনের শ্লোক৷ সাধারণভাবে পড়লে একটা মজার ছড়া বলেই মনে হয়৷ কিন্তু আমার ধারণা এটা আসলে সেই রত্নের চোরাকুঠুরিতে ঢোকার সংকেত৷ আমার পূর্বপুরুষ সর্বদমন হয়তো কোনোভাবে এটা জানতে পেরেছিলেন৷ কিন্তু নিজে রহস্যভেদ করতে পারেননি৷ পরবর্তী প্রজন্মের কেউ যদি এই ধাঁধার সমাধান করতে পারে, এই আশায় কুলদেবতার মন্ত্র হিসাবে শিখিয়ে দিয়ে গেছিলেন৷

তোমাকে কি উনি ওই শ্লোকটা দেখিয়েছিলেন কাকামণি?

Cov6

তৃণার প্রশ্ন শুনে একটু চমকে উঠলেন দীপক৷ সাধারণত গল্প শোনার সময় তৃণা কোনোদিন কোনো কথা বলে না, প্রশ্নও করে না৷ গল্প শেষ হলে চুপ করে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে৷ তাই একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ দেখিয়েছিলেন৷ অনন্ত দেশাই সেই শ্লোকটার ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন৷ সেই অনুবাদটা তিনি সেদিন আমাকে দেন৷ আমি আবার সেটার বাংলা অনুবাদও করেছি৷ যদিও অনেক ভেবেও মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারিনি৷ আমার অবশ্য ধারণা গুপ্তধন-টন কিছু নেই৷ সব পুরোনো কেল্লারই এরকম গল্প থাকে৷ যদি কিছু থেকেও থাকে, এতবছরে নিশ্চয়ই কেউ-না-কেউ সেসব খুঁড়ে তুলে নিয়ে গেছে৷ তবে এই ধরনের ধাঁধাঁ সলভ করার একটা বেশ মজা থাকে৷ তুইও দেখতে পারিস ইচ্ছে করলে৷ আমার ডেক্সটপে অনন্ত শ্লোক বলে সেভ করা আছে৷ অনন্ত দেশাই নিজেও এটা সলভ করতে পারেননি৷ কিন্তু আজ তো অনেক রাত হয়ে গেলরে মামন, এবার ঘুমিয়ে পড়৷ আমি পাশের ঘরেই আছি৷

রোজকার মতোই, পরদিন দুপুর আড়াইটে নাগাদ স্কুলবাস নামিয়ে দিয়ে গেল তৃণাকে৷ লছমি দাঁড়িয়ে ছিল৷ হুইলচেয়ার ঠেলে ঘরে নিয়ে এল৷ হাত-মুখ ধুয়ে, খেতে বসিয়ে লছমি বলল, বেবি, আমাকে একটু দোকানে যেতে হবে৷ তুমি খাওয়া সেরে নিজের ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট করো, কেমন৷

মাথা নাড়ল তৃণা৷ লছমি বেরিয়ে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে খাবারটা খেল৷ পনিরের তরকারি করেছে লছমি৷ পনির খেতে খুব ভালোবাসত তৃণা৷ মা খুব ভালো সুন্দর পনির রেঁধে দিত৷ এখন পনির মুখে দিলে কেমন যেন কাগজের মতো মনে হয়৷ মায়ের মুখটা মনে পড়ে৷ কখনো কাউকে কিছু বলে না৷ কিন্তু কোনোদিনই দু-টুকরোর বেশি পনির খেতে পারে না৷ আজও সামান্য খেয়ে পনিরের বাটিটা সরিয়ে রাখল তৃণা৷ বাকি খাবারটা শেষ করে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ কী মনে করে ঢুকে পড়ল কাকামণির ঘরে৷ টেবিলের ওপরই কাকামণির ল্যাপটপটা রাখা আছে৷ ডেক্সটপে অনন্ত শ্লোক সেভও করা আছে৷ তার ওপর ক্লিক করতেই পাতাটা খুলে গেল৷ একটা ছোট্ট দশ লাইনের ছড়া৷

বাবুই বাসায় জোনাক জ্বলে

লাল-নীল সব পাখনা মেলে

আলোর কাঠি ভুঁয়ে পড়ে

চোখ ধাঁধাবে দেখলে তারে

কিন্তু তবু নজর রাখো

আলো-আঁধার দু-ভাগ করো

যেদিন আলোর পাল্লা ভারী

মাঝ-দুপুরে করবে আড়ি

রাগবে আলো ছুটবে সোজা

নাকটি ধরে সারবে খোঁজা

মায়ের কাছে তৃণা বেশ ভালো বাংলা শিখেছে৷ বাংলা গল্পের বই পড়ারও তার অভ্যাস আছে৷ কিন্তু তবু এই বিদঘুটে ছড়ার মাথামুণ্ডু কিছুই সে বুঝতে পারল না৷ বারদুয়েক ছড়াটা পড়ে, তৃণা কাকামণির প্রিন্টার থেকে একটা প্রিন্ট আউট নিয়ে নিল৷ ল্যাপটপটা বন্ধ করতে গিয়ে চোখে পড়ল বিক্রমগড় বলে একটা ছবি ডেস্কটপে সেভ করা আছে৷ সেটা খুলে একটু অবাকই হল তৃণা৷ ছবিটা একটা আস্ত দুর্গের৷ তবে তার সঙ্গে ওই ভাঙ্গাচোরা বিক্রমগড়ের বেশ মিল আছে৷ সেটারও একটা প্রিন্ট আউট নিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে নিজের ঘরে ফিরে এল তৃণা৷

সেদিন রাতে দীপক যখন গল্প বলতে এলেন, তখন তৃণা বলল, কাকামণি তুমি ওই কালকের গল্পটাই আমাকে আর একবার বলো৷ আমার খুব ভালো লেগেছে৷ আমি কিন্তু ওই শ্লোকটার একটা প্রিন্ট আউট তোমার ল্যাপটপ থেকে নিয়েছি৷ আর এই ছবিটা কি বিক্রমগড়ের?

তৃণাকে বহুদিন বাদে এতগুলো কথা বলতে দেখে ভালো লাগল দীপকের৷ একটু হেসে বললেন, তুই ঠিকই ধরেছিস মামন৷ এটা বিক্রমগড়েরই ছবি৷ তবে বলতে পারিস কল্পনা থেকে আঁকা৷ ব্যাপারটা তোকে একটু বুঝিয়ে বলি৷ আমার একটা সফটওয়্যার আছে, তাতে কোনো জিনিস বা চেহারার কিছু কিছু ফিচারস তুই যদি ফিড করিস, তাহলে আসল চেহারাটা কেমন হতে পারে তার একটা ছবি তৈরি করা যায়৷ আমি এখন ওই গড়ের যতটুকু অবশিষ্ট আছে সেগুলো ফিড করায় ছবিটা এরকম দাঁড়িয়েছে৷ কম্পু বাবাজির ওপর আস্থা রাখলে বলা যেতেই পারে দ্বিতীয় শতকের ওই দুর্গের চেহারাটা আসলে অনেকটা এরকম ছিল৷ কিন্তু মামন তুই কি সত্যিই ওই ছড়াটা থেকে কিছু খুঁজে বার করার চেষ্টা করছিস?

তৃণা কোনো উত্তর দেয় না৷ চুপ করে থাকে৷ দীপক আবার বলেন, আমার কিন্তু মনে হয় এগুলো সবই গল্প কথা৷ অনন্ত দেশাই নিজেও তো ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চিত নন৷ তা ছাড়া এত বছরের ব্যাপার৷ কথাগুলো কোথায় উলটেপালটে গেছে তাই বা কে জানে৷

পরদিন সকালে স্কুলে গিয়েও ছড়াটার কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল তৃণার৷ তৃণা জানে এক্ষেত্রে একদম ধাপে ধাপে এগোতে হয়৷ কারণ একটা লাইনের সঙ্গে অন্য লাইনের অর্থটা জুড়ে থাকে৷ প্রথম দুটো লাইন বুঝতে না পারলে তার পরেরগুলো বোঝা সম্ভব নয়৷ ছড়াটা মুখস্থ হয়ে গেছে তৃণার৷ প্রথম লাইনটায় বলছে, বাবুই বাসায় জোনাক জ্বলে, লাল-নীল পাখনা মেলে৷

বাবুই পাখির বাসা তৃণা চেনে৷ বইতে ছবি দেখেছে৷ ঘাসে বোনা উলটানো কুঁজোর মতো দেখতে৷ মায়ের কাছে শুনেছে বাবুই পাখি নাকি জোনাকি পোকা ধরে নিজের বাসায় এনে খায়৷ অনেক সময় পোকাগুলো বাসার ভিতর আটকে গিয়ে দিপদিপ করে জ্বলে৷ দূর থেকে দেখলে মনে হয় বাবুই পাখি বাসায় আলো জ্বেলেছে৷ কিন্তু জোনাকির তো লাল-নীল পাখনা হয় না৷ ভাবতে ভাবতেই ম্যামের কথাও শুনছিল তৃণা৷ ম্যাম তখন সমুদ্রের নীচে কীরকম নানা রঙের পাথর, প্রবালের স্তর থাকে পড়াচ্ছিলেন৷ শুনতে শুনতে হঠাৎ তৃণার মনে হল, আচ্ছা জোনাকিগুলো যদি সত্যিকারের জোনাকি না হয়ে রত্ন হয়! রত্নেরও তো গা থেকে আলো বেরোয় আর সেগুলো তো নানা রঙেরও হতে পারে৷ মাথার মধ্যে চিড়িক চিড়িক করতে লাগল তৃণার৷ বাড়ি এসে প্রিন্ট আউটটা বার করেও কয়েকবার ভালো করে পড়ার পর মনে হল, ঠিকই বুঝতে পেরেছে সে৷ কেউ যাতে সহজে বুঝতে না পারে, তাই রত্ন না বলে জোনাকি বলা হয়েছে৷ আর সেগুলো রাখা আছে বাবুই পাখির বাসায়, মানে পাখির বাসার মতো কোনো একটা জায়গায় বা পাখি বাসা করতে পারে এরকম কোনো জায়গায়৷

কিন্তু তারপরের দুটো লাইন তো কিছু বোঝা যাচ্ছে না৷ আলোর কাঠি ভুঁয়ে পড়ে, চোখ ধাঁধাবে দেখলে তারে৷ আলোর কাঠি ব্যাপারটাই বা কী আর সেটা মাটিতে পড়লে চোখ ধাঁধিয়েই বা যাবে কেন? দুর্গের ছবিটাও খুব ভালো করে দেখল তৃণা৷ কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না৷

সেদিন দীপক খুব ক্লান্ত ছিলেন৷ শরীরটাও ভালো ছিল না৷ তাই তারপরের দিন তৃণা বলল, কাকামণি, তুমি তো ওই দুর্গের ভিতরে গেছ৷ ভিতরটা কেমন আমাকে একটু বলো না৷

দীপক একটু হেসে বললেন, এখনও দেখছি তোর মাথা থেকে পোকাটা যায়নি৷ আচ্ছা দাঁড়া, ওই ছবিটা দেখিয়ে বলি, তাহলে তুই বুঝতে পারবি৷ দুর্গটার মোটামুটি চারকোনা৷ পুরোপুরি আয়তক্ষেত্র নয়, একটা দিক খানিকটা বেঁকে গেছে৷ প্রত্যেক কোণে একটা করে বুরুজ ছিল৷ তার মধ্যে পশ্চিম আর দক্ষিণ দিকের বুরুজের ভগ্নাবশেষ এখনও রয়েছে৷ ভিতরের ঘরগুলো প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ তবে সিঁড়িটা এখনও কিছুটা রয়েছে৷ দুর্গের মাঝখানে একটা বড়ো চাতাল রয়েছে৷ তাকে ঘিরেই বাকি ঘরগুলো৷ ওই চাতালটাতে একটা মজার ব্যাপার আছে৷ আমি আগে কোনো দুর্গে ওটা দেখিনি৷ চাতালের মাঝখানে গোল গোল আয়নার মতো কাচ বসিয়ে একটা নকশা করা আছে৷ অনেকগুলোই ভেঙে গেছে৷ কিন্তু বেশ কয়েকটা এখনও আছে৷ মনে হয় রাজা পূরণজিৎ বেশ একটু শৌখিন মানুষ ছিলেন৷ তাই নানাভাবে তিনি দুর্গটা সাজিয়েছিলেন৷

কাকামণির কথাগুলো শুনছে তৃণা৷ কিন্তু তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে পরের লাইন দুটো৷ আলোর কাঠি মানে কি তাহলে আলোর রশ্মি৷ সূর্যের আলোর রশ্মি যদি কাচের ওপর পড়ে তাহলে তো চোখে ধাঁধাঁ লাগবেই৷ কিন্তু তাহলেও নজর রাখতে হবে৷ তার মানে আলোটা কোনদিকে যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে৷ প্রতিফলন৷ ফিজিক্সে পড়েছে তৃণা৷ আয়নার ওপর যদি একটা পারপেন্ডিকুলার লাইন টানা হয়, তাহলে আলোর রশ্মি তার সঙ্গে যে কোণ তৈরি করে আয়নায় পড়বে, প্রতিফলিত রশ্মিও ঠিক একই কোণ তৈরি করবে৷ তার মানে আলোটা একটা ডেফিনিট অ্যাঙ্গেলে যাচ্ছে৷ সেটা কি তাহলে কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্টকে চিহ্নিত করছে?

ঘুমিয়ে পড়লি নাকি, মামন?

কাকামণির কথার উত্তর দেয় না তৃণা৷ চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকে৷ তৃণা ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে উঠে পড়েন দীপক৷ আলতো হাতে ভেজিয়ে দেন ঘরের দরজা৷ আর অমনি উঠে বসে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালে তৃণা৷ সংকেতের চারটে লাইনের মানে বোঝা গেছে৷ এর পরের লাইনটাও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে৷ আলো-আঁধার দু-ভাগ করো৷ আগে যদি সূর্যের আলোর কথা বলা হয়ে থাকে, তাহলে এখানে নিশ্চয় দিন-রাতের কথা বলা হচ্ছে৷ কিন্তু আলোর পাল্লা ভারী কথাটার মানে কী? যেদিন মেঘ নেই, বেশ ঝকঝকে রোদ আছে? অনেক ভেবেও আলোর পাল্লা কীভাবে ভারী হবে সেটা বুঝতে না পেরে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে তৃণা৷

পরদিন সকালে স্কুলে গিয়েও সারাদিন মাথার মধ্যে ঘুরঘুরে পোকা৷ পড়াশোনা বিশেষ কিছুই মাথায় ঢুকল না৷ গরমের ছুটির পর সবে স্কুল খুলেছে৷ কিছুদিন বাদেই পরীক্ষা৷ কিন্তু তৃণা এখন ওই চারটে লাইন ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না৷ পরপর দুটো দিন কেটে গেল৷ এগোনো গেল না একচুলও৷ তৃতীয় দিনে, একটা ঘটনা ঘটল, সেটাও আবার স্কুলেই৷ ভূগোলের ক্লাস৷ সুরেশ ফোগত ক্লাস নিচ্ছেন৷ ভালো পড়ান৷ একটা মোমবাতি আর গ্লোব নিয়ে কীভাবে দিন-রাত হয় বোঝাচ্ছেন৷ মন দিয়ে শুনছে তৃণা৷ পড়াতে পড়াতে ফোগত ব্যাখ্যা করলেন, কীভাবে ২১ ডিসেম্বর আমাদের এই গোলার্ধে সব থেকে ছোটো দিন আর বড়ো রাত হয়৷ আর একইভাবে ২১ জুন সবথেকে বড়ো দিন আর ছোটো রাত হয়৷ শুনতে শুনতে হঠাৎ তৃণার মনে হল তার মাথার মধ্যে একটা ছোটোখাটো বিস্ফোরণ হল৷ পরের লাইনগুলোর অর্থ তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে! যেদিন আলোর পাল্লা ভারী মানে সবথেকে বড়ো দিন৷ সেদিন মাঝদুপুর মানে বারোটার সময় আলোর কাঠি, মানে আলোর রশ্মি এসে পড়বে কাচের ওপর৷ তখন সেটি ধরে নাক বরাবর এগোলেই পাওয়া যাবে গুপ্তধনের সন্ধান৷

পরক্ষণেই চমকে উঠে তৃণা খেয়াল করল, আজ হচ্ছে ১৯ জুন৷ তার মানে ঠিক এক দিন পরেই আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ৷ তৃণা যদি ওই সময় ভাঙা দুর্গে পৌঁছোতে পারে, তাহলে এই শত শত বছর ধরে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের সন্ধান কি সে পাবে? কিন্তু যাবে কী করে তৃণা? সে তো হাঁটতেই পারে না৷ তাহলে কি কাকামণিকে সব কথা খুলে বলবে? কিন্তু কাকামণি তো বিশ্বাসই করে না যে ওখানে গুপ্তধন আছে৷ যদি তার কথাকে গুরুত্ব না দেয়? যদি ইমপর্ট্যান্ট মিটিং আছে বলে ওইসময় যেতে রাজি না হয়? বাবা হলে নিশ্চয় রাজি হত৷ বাবা কখনো তৃণার কোনো কথা অবিশ্বাস করত না৷ লুকিয়ে নিজের চোখের জল মুছে নেয় তৃণা৷ তারপর ঠিক করে কাউকে কিছু বলবে না, সে একলাই যাবে ভাঙা দুর্গে৷

২১ জুন সকাল বেলা তৃণা কাকামণিকে বলে যে, তার শরীরটা ভালো নেই৷ জ্বর জ্বর লাগছে৷ আজ স্কুলে যাবে না৷ তৃণা কোনোদিনই স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো আপত্তি করে না৷ তাই অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই৷ নিয়মমাফিক সকাল ন-টা নাগাদ দীপক কলেজে বেরিয়ে যান৷ লছমিও রোজকার মতো কাজকর্ম সেরে, তৃণার খাবার গুছিয়ে সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাড়ি চলে যায়৷

তৃণা আগেই তার হুইলচেয়ারের পকেটে একটা ছোটো খুরপি, ছুরি, দড়ি, আরও দু-একটা টুকিটাকি জিনিস গুছিয়ে রেখেছিল৷ তার চেয়ারটা খুবই ভালো৷ খুব সহজে ব্রেক দেওয়া যায়৷ উঁচু-নীচু রাস্তায় চলতেও খুব একটা অসুবিধা হয় না৷

রাস্তার বাঁক ঘুরে লছমি নিজের বাড়ির দিকে চলে যেতেই চাবিটা হাতে নিয়ে হুইলচেয়ার চালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে তৃণা৷ দরজাটা টেনে বন্ধ করে ঘাসজমির ওপর দিয়ে সোজা এগোয় ভাঙা দুর্গটার দিকে৷ খুব একটা অসুবিধা হয় না৷ কিন্তু দুর্গটা বাড়ি থেকে যতটা কাছে মনে হয় আসলে কিন্তু তা নয়৷ পথ বেশ অনেকটাই৷ প্রাণপণে চেয়ার চালিয়ে তৃণা যখন দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছোয় তখন ঘড়িতে বারোটা বাজতে দশ৷ এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা দিয়ে দুর্গের মূল প্রবেশপথ যেটাকে মনে হচ্ছিল সেদিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ ঘটে যায় একটা দুর্ঘটনা৷ একটা বড়ো পাথরের পাশ কাটাতে গিয়ে উলটে যায় হুইলচেয়ারটা৷ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তৃণা৷ কোনোরকমে উঠে বসে চেষ্টা করে চেয়ারটাকে সোজা করতে৷ কিন্তু পারে না৷ অথচ ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে টিক টিক করে৷ চেয়ারের আশা ছেড়ে প্রাণপণে হামাগুড়ি দিয়ে দুর্গের দিকে এগোয় তৃণা৷ অসম্ভব অসহায় লাগছে তার৷ দুর্গের খোলা চাতালটা দেখা যাচ্ছে একটু দূরেই৷ আগের তৃণা কয়েক লাফে পৌঁছে যেতে পারত সেখানে৷ অথচ এখন তার কিছু করার নেই৷

চাতালে যখন পৌঁছোল তৃণা, তখন ঘড়িতে বারোটা বেজে দুই৷ সময় পেরিয়ে গেছে৷ অসহায় কান্নায় দু-চোখ জলে ভরে যায় তৃণার৷ কিন্তু ধুলোমাখা হাতে চোখ দুটো মুছতেই তৃণা বুঝে যায়, মাহেন্দ্রক্ষণ যায়নি, ঘড়িটা তার মিনিট দুয়েক পিছিয়ে হাঁটছে৷ কারণ বাঁ-দিকে মাটিতে পোঁতা একটা গোল কাচের ওপর ভাঙা বুরুজের ফাঁক দিয়ে সোজা এসে পড়েছে সূর্যের আলো৷ সেই আলোর প্রতিফলিত রশ্মি সরাসরি গিয়ে পড়েছে উলটোদিকের দেওয়ালের একটা শ্যাওলা ধরা বাদামি রঙের পাথরের ওপর৷ পাথরটার ঠিক পাশের খাঁজেই শুকনো ঘাস আর কাঠিকুটি দিয়ে বানানো একটা পাখির বাসা৷ প্রাণপণ চেষ্টায় সেই পাথরটার নীচে পৌঁছোয় তৃণা৷ কিন্তু পাথরটা বেশ উঁচুতে৷ দেওয়াল ধরে ধরে কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের জোরে পাথরটাকে ঠেলে তৃণা৷ প্রথমে একটু নড়ে ওঠে পাথরটা৷ তারপর আরও একটু জোর দিতেই আলগা হয়ে সরে যায়৷ নীচে একটা ছোটো ফোকর৷ তার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিতে শুকনো ঘাস, মাকড়সার জালের সঙ্গে হাতে ঠেকে ধাতব কিছু৷ পাথরের ঘষায় আঙুল ছড়ে গেলেও হাল ছাড়ে না তৃণা৷ প্রাণপণ চেষ্টায় বার করে আনে একটা ছোটো গোল জিনিস৷ অনেকটা পুরোনো দিনের পানের বাটার মতো দেখতে একটা বাক্স৷ মেটে সবুজ রঙের৷

Cov7

বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলতে যাবে তৃণা এমন সময়, কী পেলি রে তৃণা?

কাকামণির গলা৷ চমকে তাকিয়ে তৃণা দেখে ছোটো-বড়ো পাথরগুলো ডিঙিয়ে এগিয়ে আসছে কাকামণি৷

কাকামণি, দেখো দেখো আমি গুপ্তধন পেয়েছি! পূরণজিতের রত্নের বাক্স... উত্তেজনায় গলা বুঝে আসছে তৃণার৷

তাড়াতাড়ি খুলে দেখ বাক্সে কী আছে৷

গোল বাক্সটায় একপাশে একটা ছোট্ট ছিটকিনি মতো৷ সেটা ধরে টান দিতেই খুলে যায় বাক্সটা৷ চমকে উঠে তৃণা দেখে বাক্স-ভরতি তার খুব পছন্দের সুইস চকোলেট!

একী কাকামণি, মণি-মুক্তো তো নেই! বাক্সে তো খালি চকোলেট...

তৃণার গলায় বিস্ময়-ক্ষোভ-হতাশা মাখামাখি৷

গুপ্তধন তো তুই পেয়েই গেছিস মামন৷ তুই কি খেয়াল করেছিস যে, তুই কেমন আগের মতোই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস! কেমন দৌড়ে এলি আমাকে দেখেই!

চমকে উঠে নিজের দিকে তাকায় তৃণা৷ সত্যিই তো৷ সে তো আগের মতোই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ ততক্ষণে হাসতে হাসতে এগিয়ে এসেছেন ডা. কুলকার্নিও৷

স্যরি তৃণা বেটি৷ তোমার একটু মন খারাপ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটা খুব দরকার ছিল৷ আসলে তোমার মনে আছে তো আমরা তোমাকে ভোপালে নিয়ে গিয়ে সুইজ্যারল্যান্ডের একজন ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম৷ উনি বলেছিলেন, তোমার এই যে কোমরের নীচ থেকে প্যারালিসিস হয়ে যাওয়া, এটা সাংঘাতিক শক থেকে হয়েছে৷ এটা থেকে তোমাকে নিজেকেই নিজের ইচ্ছেশক্তির জোরে বেরিয়ে আসতে হবে৷ কিন্তু সেই ইচ্ছেটা তোমার কিছুতেই হচ্ছিল না৷ আসলে আমরা জানি, মা-বাবার জন্য তোমার এত মন খারাপ করে যে, তোমার সব ইচ্ছেই নষ্ট হয়ে গেছে৷ সেজন্য তোমার কাকা সারাক্ষণই দুঃখ করত৷ তারপর একদিন মি. মুখার্জির কাছে তুমি ট্রেজার হান্ট খেলতে খুব ভালোবাসতে শুনে আমার মাথায় আইডিয়াটা আসে৷ বাকিটা অবশ্য সবই ওনার প্ল্যান৷ তোমাদের ভূগোলের টিচার সুরেশ ফোগতকেও আমরা দলে টেনে নিয়েছিলাম৷ উনি সেদিন ইচ্ছে করেই ক্লাসে ওই চ্যাপ্টারটা পড়িয়েছিলেন৷ আমাদের আশা ছিল যে হিন্টটা তুমি কাজে লাগাতে পারবে৷

আসলে ওই পূরণজিতের ইতিহাসটা কিন্তু সত্যি মামন৷ আমি শুধু গুপ্তধনের ব্যাপারটা তোকে বানিয়ে বলেছিলাম৷ ওই সংকেতটাও এমনভাবে তৈরি করেছিলাম যাতে তুই সলভ করতে পারিস৷ আসলে এখানে মেঝেতে পোতা গোল গোল কাচগুলো দেখেই আমার সংকেতটা মাথায় এসেছিল৷ তবে তোর যাতে আমার ওপর কোনো ভরসা না থাকে, সেজন্য ইচ্ছে করেই বারবার বলতাম যে, ওই গুপ্তধনের কথাটায় আমি বিশ্বাস করি না৷ তুই আমার ওপর রাগ করছিস না তো সোনা?

দু-হাত দিয়ে কাকামণির গলা জড়িয়ে ধরে তৃণা বলে ওঠে, একটুও না, আমি তো আবার হাঁটতে পারছি৷ আমি তো জানি, এবার আমি সত্যিকারের গুপ্তধনের খোঁজেও বেরোতে পারব৷ তখন কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে কাকামণি৷

Cov8
অধ্যায় ১ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%