রিনুর রক্ষাকবচ

দীপান্বিতা রায়

Cov13

একটা ছাতারের চ্যাঁ চ্যাঁ চিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেল রিনুর৷ রোজই অবশ্য ভোর বেলায় পাখিদের ডাকাডাকিতেই ঘুম ভাঙে তার৷ আলো ফোটার আগেই জানলার পাশের আমলকি গাছটার ডালে বসে শিস দেয় একজোড়া দোয়েল৷ আধোঘুমে সেই ডাকটা শুনতে ভালো লাগে৷ ছাতারের ডাক অবশ্য মোটেই মিষ্টি নয়৷ বিশেষ করে ছাতারেগুলো সবসময়ই চার-পাঁচটা একসঙ্গে মিলে এমন একটা শোরগোল বাধায় যে, আশপাশের সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে৷

তবে ঘুম ভেঙে গেলেও তখনই বিছানা ছেড়ে উঠল না রিনু৷ রবিবার৷ তাই স্কুল যাওয়ার তাড়া নেই৷ মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়তে যেতে হবে, কিন্তু সেও বেশ খানিকটা বেলায়৷ এখন তো মোটে সাড়ে ছ-টা! তার শোবার ঘরের পুব দিকে একটা মস্ত জানলা আছে, তার মাথার ওপরে আধখানা চাঁদের মতো করে কাচ বসানো৷ আগে নাকি নানা রঙের কাচই ছিল৷ তবে সেসব ভেঙে গিয়ে এখন শুধুই সাদা কাচ৷ ভোরের আলো একটা লম্বা তিরের মতো সেই কাচের ভিতর দিয়ে এসে কোনায় রাখা পড়ার টেবিলের পায়াটা সবে ছুঁয়েছে মানেই রিনু নিশ্চিত জানে ঘড়িতে এখন ঠিক সাড়ে ছ-টা৷

বিছানায় শুয়ে লাল মেঝের ওপর এই আলোর রেখাটাকেও চুপ করে শুয়ে থাকতে দেখছিল রিনু৷ টেবিলের ওই পায়াটার পিছন থেকে একটা ফাটা দাগ টেবিল পেরিয়ে, ঘরের মেঝের ওপর দিয়ে গিয়ে উলটোদিকের দেওয়ালে মিশেছে৷ ছোটোবেলায় রিনুর মনে হত, এই দাগটা যেন আসলে একটা নদী৷ যেটা অনেক দূর থেকে বয়ে এসে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে মিশেছে৷ নিজের অঙ্ক খাতার পাতা ছিঁড়ে নৌকা বানিয়ে সেই নদীতে ভাসিয়ে আপন মনে খেলা করত তখন৷ সে অবশ্য অনেকদিন আগের কথা৷ রিনু তখন নেহাতই একটা দু-ঝুঁটি বাঁধা খুদে৷ আর এখন তো রীতিমতো মাধ্যমিক পাস করে উচ্চমাধ্যমিকের জন্য তৈরি হচ্ছে৷ কিন্তু তবু মেঝের ওপর ওই লম্বা আলোর রেখাটা দেখে কেমন যেন সেই নদীর কথাটা আবার মনে পড়ে গলার কাছটা ব্যথা করে উঠল৷

এটা হয়েছে রিনুর৷ যবে থেকে তাদের এই মুখার্জি ভিলা বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথাটা পাকা হয়েছে, তখন থেকেই মাঝে মাঝে রিনুর গলার কাছটা এরকম কারণে-অকারণে ব্যথা করে ওঠে৷ আসলে এই রংচটা, চলটা ওঠা, জায়গায় জায়গায় বট-অশ্বত্থের চারা-গজানো, বিবর্ণ জানলা, ভাঙা খড়খড়ি, জংধরা কবজায় সাতকেলে পুরোনো বিশাল বাড়িটা রিনুর খুব পছন্দ৷ এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছে তার৷ হাঁটতে শেখার পর থেকেই সে তুরতুর করে ছোটো ছোটো পায়ে গোটা বাড়িটা ঘুরে বেড়াত৷

আরও একটু বড়ো হওয়ার পরই অতবড়ো বাড়িটার সব গলি-ঘুঁজি তার মুখস্থ হয়ে গেল৷ মস্ত বাড়ি৷ একতলা-দোতলা মিলিয়ে প্রায় গোটা কুড়ি ঘর৷ এছাড়া খোলা বারান্দা, ঢাকা বারান্দা, উঠোন, ছাদ এসব তো আছেই৷ বাড়িতে লোক বলতে কুল্লে চারজন৷ রিনু, তার মা-বাবা আর দাদু, মানে রিনুর ঠাকুদা৷ খাওয়া শোয়া বসা সব মিলিয়ে গোটা পাঁচ-ছয় ঘরেই তাদের কাজ চলে যায়৷ বাকি ঘর তালা বন্ধই থাকে৷ অধিকাংশই খালি, ধুলোয় ভরা৷ কয়েকটাতে কিছু পুরোনো, ভাঙাচোরা জিনিসপত্র আছে৷ বড়ো একটা চাবির গোছা দাদুর ঘরের দেওয়ালে পেরেকে ঝোলে৷ রিনু মাঝে-মধ্যেই সেটা নিয়ে এপাশ-ওপাশের তালা দেওয়া ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে৷ হড়াস করে জানলা খুলে দিয়ে কার্নিশে বাসা বাঁধা পায়রাগুলোর আচমকা ঝটপটিয়ে উড়ে যাওয়া দেখে৷ সোঁদা লেগে যাওয়া দেওয়ালের অদ্ভুত ছাপছোপে আঙুল বোলায়৷ আর একটু যখন ছোটো ছিল তখন ওই বাদামি, ধোঁয়াটে দাগগুলোকে কল্পনায় মেঘের দেশ, ঘন জঙ্গল কিংবা কুলোর মতো কানওলা রাক্ষসের দল ভাবত৷

আসলে রিনু ছোটোবেলা থেকেই একটু শান্ত, আপনভোলা মেয়ে৷ একা একা থাকাই তার অভ্যাস৷ ভাই-বোন তো আর কেউ নেই৷ রিনুর বাবা এক ছেলে৷ তার দাদুরা দুই ভাই৷ কিন্তু এক ভাই বহু বছর আগেই বিদেশে চলে গেছিলেন৷ তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই৷ দাদুর বাবারা তিন ভাই ছিলেন৷ কিন্তু দু-জন খুব অল্পবয়সেই মারা যান৷ তাই তুতো ভাই-বোন বলতে যা বোঝায় তাও রিনুর নেই৷ স্কুলে দু-একজন বন্ধু আছে ঠিকই, কিন্তু রিনুর আসল বন্ধু এই বাড়িটাই৷

শুধু বাড়ি বলাটা বোধ হয় ঠিক নয়৷ বাড়ির সঙ্গে রয়েছে বাগান৷ দাদুর কাছে গল্প শুনেছে একসময় সুন্দর লন, ফুলের কেয়ারি, পাথরের ফোয়ারা ছিল৷ এখন সেসব কিছু না থাকলেও বাগানটা রিনুর খুব পছন্দের৷ মস্ত মস্ত আম, জাম, আমড়া, বেল, আমলকি এইরকম সব নানা গাছে চারিদিকটা সবুজ হয়ে থাকে৷ গাছগুলোতে অনেকরকম পাখির বাসা৷ ভোর না হতেই তারা রিনুর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়৷ খুরখুরে কাঠবেড়ালি ছুটোছুটি করে৷ ঘাস আর আগাছার জঙ্গলগুলো বাবা কিছুদিন পরপরই লোক লাগিয়ে কেটে সাফ করে দেয় বলে সাপখোপের ভয় নেই৷ রিনু তাই নিশ্চিন্তে বাগানে খেলে বেড়ায়৷ ইচ্ছে হলেই গাছে চড়ে পেয়ারা চিবোয়, কাঁচা আম পাড়ে৷ আমড়া কুড়িয়ে আনে৷

বাড়িতে আরও একটা জায়গা রিনুর খুব প্রিয়, সেটা হল ঠাকুরদালান৷ থ্যাবড়ামুখো, নাকভাঙা দুটো সিংহ-বসানো গেটের ডান পাশে শ্বেতপাথরের ফলকের ওপর লেখা আছে মুখার্জি ভিলা৷ গেট দিয়ে ঢুকে সুরকি ঢালা রাস্তায় খানিকটা এগোলে মূল বাড়িতে ঢোকার দরজা৷ দরজার পাশে সিমেন্টের ঢালাই করা দুটো বেঞ্চ আছে৷ সেখানে আগে দেউড়ির দারোয়ান বসত৷ এখন প্রায়ই পাড়ার দুটো পাজি নেড়ি উঠে শুয়ে থাকে৷ সেখান দিয়ে ঢুকেই বড়ো বড়ো থাম দিয়ে সাজানো ঠাকুর দালান৷ কালো-সাদা শ্বেতপাথরে বাঁধানো মেঝে৷ প্রায় হাত তিনেক উঁচু বারান্দা দিয়ে ঘেরা৷ বারান্দার ধারিতে গোল করে সিমেন্টের ওপর নানারকম কারুকাজ করা৷ মূল দরজার ঠিক উলটোদিকে চারধাপ সিঁড়ি উঠে প্রতিমা বসানোর জায়গা৷ প্রতিবছর এখানেই দুর্গাপুজো হয়৷ ছোট্ট পুজো৷ আয়োজনও সামান্য৷ কিন্তু পুজোর চারটে দিন যে রিনুর কী আনন্দে কাটে৷ সামনের বছর বাড়ি বিক্রি হয়ে গেলে পুজোও যে বন্ধ হয়ে যাবে! ভাবতে গেলেই চোখে জল এসে যায়৷

কারুর ইচ্ছে না থাকলেও, বাড়িটা বিক্রি না করে যে তার বাবার আর কোনো উপায় নেই, সেটা সে বুঝতে পারে৷ বাবা যে কারখানায় কাজ করতেন, সেটা আচমকা বন্ধ হয়ে গেল৷ মা সকাল বেলায় একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়ায়৷ সেখানকার মাইনে আর দাদুর পেনশনই এখন রিনুদের ভরসা৷ বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেলে সেখানে একটা বড়ো আবাসন তৈরি হবে৷ রিনুদের জায়গাটা কলকাতার লাগোয়া, তাই জমির দামও খুব বেশি৷ তারা দুটো ফ্ল্যাট আর বেশ কয়েক লক্ষ টাকা পাবে৷ দাদুর সঙ্গে বাবা যখন আলোচনা করছিল তখন শুনেছে রিনু৷ সব ভেবে-চিন্তে, দাদু আর মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাবা৷ তবে তাতে তো আর মন খারাপ কমে না৷ রিনুর মায়েরও খুব মন খারাপ৷ ঠাকুরদালানের পাশের বারান্দায় সন্ধ্যে বেলা পাড়ার গরিব বাচ্চাদের নিয়ে একটা স্কুল চালায় মা৷ বাচ্চাগুলো খুব ফুর্তি করে আসে, খেলা করে, গল্প শোনে, বই পড়ে৷ বাড়ি বিক্রি হলে স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাবে৷ বৈঠকখানায় বন্ধুদের সঙ্গে বাবার তাস খেলা বন্ধ হবে৷ সিমেন্টের বেঞ্চে বসে বিকেল বেলা পাড়ার বুড়োদের সঙ্গে দাদুর আড্ডা বন্ধ হবে৷ আর রিনুর যে কত কী বন্ধ হবে, তার কোনো গোনাগুনতিই নেই৷

সকালে পড়ার বই খুলে বসলেও এসব কথাই মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল রিনুর৷ পড়ায় মন বসছে না দেখে ঠিক করল বই গুটিয়ে ড্রয়িং খাতাটা নিয়ে বেরোবে৷ ভালো ছবি আঁকতে পারে রিনু৷ তার ইচ্ছে, মুখার্জি ভিলা বিক্রি হওয়ার আগে বাড়ির ভিতর-বাইরে সবকিছুর যতগুলো সম্ভব স্কেচ করে নেবে৷ যাতে পরে মন খারাপ হলে সেগুলো অন্তত খুলে দেখা যায়৷ আজ তার ইচ্ছে ছিল বাড়িতে ঢোকার দরজাটার সামনে বসে সেখান থেকে ঠাকুরদালানটা কেমন দেখায় তার একটা স্কেচ করার৷ কিন্তু দাদুর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মজার দৃশ্য দেখে চোখ আটকে গেল রিনুর৷ তার দাদু মহীতোষ মুখার্জি একসময় খুবই সুপুরুষ ছিলেন৷ এখনও তার বেশ টকটকে ফর্সা রং, গায়ের চামড়া ঢিলে হয়ে গেলেও শরীর জবুথবু নয়৷

শীতের দিনে মহীতোষের অভ্যাস হল ভালো করে সারা গায়ে তেল মেখে বেশ কিছুক্ষণ রোদে বসে থেকে তারপর স্নান করতে যাওয়া৷ ছোটো তেলধুতিখানা পরে ভালো করে গা-হাত পায়ে তেল মেখে বসে ছিলেন দাদু৷ কিন্তু শীতের মিঠে রোদ্দুরে এমন আরাম হয়েছে যে, কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছেন৷ ইজিচেয়ারে বেখেয়ালে ঘুমিয়ে পড়া দাদুকে দেখে এমন মজা লাগল রিনুর যে, সে ঠিক করল আগে দাদুর একটা ছবি এঁকে ফেলা যাক, তারপর নাহয় ঠাকুরদালানে যাওয়া যাবে৷ চট করে একটা মোড়া পেতে বসে বসে দাদুর স্কেচ করতে লাগল রিনু৷ বাঁ-হাতখানা চোখের ওপরে রেখেছেন মহীতোষ৷ ডান হাতটা আলগোছে কোলের ওপর রাখা৷ ধুতিটা গুটিয়ে আছে হাঁটুর অনেকটা ওপরে৷ বাঁ-পাশে পেটের নীচের দিকে একটা কালো আঁচিল৷ ডান ঊরুর ওপরে গোল কালো উলকি৷ দ্রুত হাতে পেনসিল চালাতে চালাতে উলকিটার কাছে এসে একবার থমকাল রিনু৷ এই উলকিটা তার চেনা৷ তার বাবারও ডান ঊরুতে এরকম উলকি আঁকা আছে৷ মুখার্জি বাড়ির নিয়ম হল সব পুরুষের ডান ঊরুতে এই উলকি আঁকা থাকবে৷ বাচ্চার অন্নপ্রাশনের আগে তার পায়ে এই উলকিটা এঁকে দেওয়া হয়৷ একটা গোল, তার মধ্যে কীসব যেন আঁকা৷ এর কী মানে রিনু জানে না৷ তবে এর পিছনের গল্পটা জানে৷ এটা নাকি মুখার্জি বাড়ির রক্ষাকবচ৷ যদিও কবচটা শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য কেন, সেটা তার জানা নেই৷ শোনা কথা হল, অনেক বছর আগে এক সন্ন্যাসী, তখন যিনি বাড়ির কর্তা তার পায়ে এই উলকি এঁকে দিয়ে বলেছিলেন, যতদিন এটা এ বাড়ির পুরুষদের শরীরে থাকবে, ততদিন তাদের কোনো ক্ষতি হবে না৷ তাদের ধনদৌলত-প্রতিপত্তি সব বজায় থাকবে৷ কিছুই অবশ্য থাকেনি৷ রিনুর দাদুর বাবার দুই ভাই মারা গেছে৷ ব্যবসার ক্ষতি হয়ে অবস্থা পড়ে গেছে৷ লোকে ঠকিয়ে নিয়েছে৷ কিন্তু উলকি পরার সংস্কার ঠিক বজায় আছে৷

Cov14

আসলে যেকোনো পুরোনো বড়ো পরিবারের নিজস্ব কিছু গল্প থাকে৷ রিনুর ধারণা এই উলকির ব্যাপারটাও এরকম একটা গল্প৷ সেরকমই তাদের বাড়ির আর একটা গল্প হল দুর্গা প্রতিমার গয়না৷ ছোটোবেলা থেকেই দাদুর মুখে গল্পটা শুনে এসেছে রিনু৷ এই মুখার্জি ভিলা যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই দাদুর প্রপিতামহের আমলে নাকি এই বাড়িতে মহা ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হত৷ চার দিন ধরে এলাকার লোক পাত পেতে খেত ঠাকুরদালানের লম্বা বারান্দায়৷ ঢাক-ঢোলের বাজনা আর আত্মীয়স্বজনে সারা বাড়ি গমগম করত৷ এইসব উলকি পরার গল্পও শুরু হয়েছিল তাঁর আমলেই৷ তা সেই সময় বাড়ির প্রতিমাকে নাকি সাজানো হত সোনার গয়নায়৷ মাথার মুকুট থেকে পায়ের নূপুর পর্যন্ত সবই ছিল সোনার৷ প্রতিমার গলায় সাতনরি হারই পরানো হত সাত-আটখানা৷ এছাড়া চিক, সিঁথি, নখ, বাজুবন্ধ এসব তো ছিলই৷ গয়না পরতেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, এমনকী কার্তিক, গণেশও৷ ষষ্ঠীর রাতে বাড়ির কর্তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মাকে সব গয়না পরাতেন৷ পুজোর চার দিনের জন্য দেউড়িতে সড়কিধারী চারজন পাহারাদার থাকত৷ আর ঠাকুরদালানে ঠিক প্রতিমার পায়ের সামনে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন কর্তামশাই নিজে৷ দশমীর সকালে ঘট বিসর্জনের পর আবার সেইসব গয়না খুলে একটা বেশ বড়োসড়ো তামার বাক্সে ভরা হত৷ তারপর বাক্সটি নিয়ে কর্তা নিজের ঘরে চলে যেতেন৷ সারা বছর গয়না থাকত তাঁর জিম্মাতেই৷ কিন্তু কোথায় যে থাকত সেকথা কেউ জানত না৷ মুশকিল হল একবার পুজোর কিছুদিন পরে আচমকা সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্তামশাই মারা গেলেন৷ তারপর বহু খোঁজাখুঁজি করেও সেই গয়নার বাক্সের আর কোনো সন্ধান মিলল না৷ বাধ্য হয়েই সেবছর ডাকের সাজ পরানো হল প্রতিমাকে৷ তারপর থেকে সেই নিয়মই চলে আসছে৷

রিনুর দাদু অবশ্য মনে করেন পুরোটাই গল্পকথা৷ ওরকম গয়না হয়তো আদপেই ছিল না৷ লোকের মুখে মুখে কোনো কারণে রটেছে৷ আর নয়তো থাকলেও ব্যবসার কারণে কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে কর্তামশাই নিজেই সেগুলোকে বিক্রি করে দিয়ে এইসব রটিয়েছিলেন যাতে বাড়ির অন্যরা তাঁকে কিছু বলতে না পারে৷ এইসব আজগুবি গল্প তখনকার দিনে লোকজন বিশ্বাস করত৷ মুখার্জি ভিলার ছাদে পূর্ণিমার রাতে পরিরা নেমে এসে নাচ-গানের আসর বসায় এমন গল্পও তো রিনু শুনেছে৷ দাদুর স্কেচ করতে করতে এইসবই ভাবছিল রিনু৷ কিন্তু বারে বারেই তার চোখ আটকে যাচ্ছিল দাদুর পায়ের উলকিটার দিকে৷ আগে কোনোদিন তেমনভাবে খেয়াল করেনি, কিন্তু আজকে একটু ভালো করে দেখে মনে হল উলকির ভিতরে ঠিক হিজিবিজি নয়, একটা নকশা যেন আঁকা রয়েছে৷ কী ভেবে খাতাটা রেখে দিয়ে নিজের স্মার্টফোনটা নিয়ে এল রিনু৷ তারপর বেশ কাছ থেকে উলকিটার একটা ছবি তুলে সেটা নিজের মেইলে পাঠিয়ে রাখল৷

সন্ধ্যে বেলা কোচিং ক্লাস ছিল৷ বাড়ি ফিরতে রাত প্রায় ন-টা৷ খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপে ছবিটা ডাউনলোড করল রিনু৷ নকশাটা বেশ অদ্ভুত৷ প্রথমে একটা চৌকো আঁকা হয়েছে৷ তার ভিতরে পর পর দুটো গোল৷ দুটো গোলের মাঝখানের অংশটায় মনে হচ্ছে যেন চৌখুপ্পি কাটা৷ নকশার ঠিক মাঝখানে একটা কিছু আঁকা রয়েছে৷ ঠিক বোঝা না গেলেও মনে হচ্ছে একটা বাটির মতো জিনিস যার থেকে সরু সরু লাইন অনেকটা ধোঁয়ার মতো ওপরের দিকে উঠে গেছে৷ খুব ভালো করে দেখেও এই অদ্ভুত নকশার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না রিনু৷ বেশ রাত পর্যন্ত এরকম একটা বিদঘুটে ছবি নিয়ে নাড়াচড়া করে মাথাটা খানিকটা গরমই হয়ে গেল, বাকি রাতটাও ঘুম হল না ঠিকঠাক৷

বড়োদিনের ছুটি পড়ে গেছে৷ এই ছুটিতে বাড়ির স্কেচগুলো যত বেশি সম্ভব করে ফেলবে ঠিক করে রেখেছে রিনু৷ তাই সকাল সকাল কাগজপত্র নিয়ে ঠাকুরদালানে এসে, বেশ একটু ভেবে-চিন্তে প্রতিমার বেদির উলটো দিকে বসে আঁকা শুরু করবে ঠিক করল৷ এখান থেকে পুরো ঠাকুরদালানটাই স্পষ্ট দেখা যায় আর একটু এপাশ-ওপাশ করে নিলে ছবিতে অনেকগুলো মাত্রাও আসে৷ কিন্তু আঁকতে শুরু করে একটু পরে মনে হল কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে না৷ ডিটেলিং-এ একটু ফাঁক থেকে যাচ্ছে৷ কারণ ঠাকুরদালানের মেঝে থেকে বারান্দা পর্যন্ত যে জায়গাটা, সেখানে পঙ্খের কাজ করা আছে৷ কিন্তু বহুদিন সেগুলো পরিষ্কার করা হয়নি বলে সেই নকশা প্রায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷ নকশার ধরনটা অন্তত বোঝার জন্য একটা গামলায় জল, ছোবড়া আর সাবান নিয়ে বারান্দার একটা কোনা পরিষ্কার করতে বসল রিনু৷ ময়লা, শ্যাওলা উঠে গিয়ে নকশাটা যখন ভালো করে বোঝা গেল তখন রিনু ভারি আশ্চর্য হয়ে দেখল যে, সেই উলকির নকশাই আঁকা আছে এখানেও৷ তবে উলকিটা সম্ভবত কয়েক প্রজন্ম ধরে আঁকায় কিছুটা বদলে গেছে৷ এখানে নকশাটা অনেকটা স্পষ্ট৷ গোলের মাঝখানের জিনিসটা যে একটা ধুনুচি এবং তার থেকে ধোঁয়া উঠছে সেটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে৷

কিন্তু রক্ষাকবচ তো শুধু পুরুষদের শরীরেই আঁকার কথা৷ তাহলে গোটা দেওয়াল জুড়ে এরকম নকশা করার মানেটা কী? গোটা বাড়িটাকেই রক্ষাকবচে মুড়ে ফেলা? ভাবতে ভাবতেই আরও খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে ফেলে রিনু বুঝতে পারল পঙ্খের যে ছোটো ছোটো চৌকোনো কাজ দেওয়াল জুড়ে রয়েছে, তার মূল নকশাটা একরকম হলেও পুরোটা কিন্তু একরকম নয়৷ ধুনুচির সঙ্গে প্রতিটা খোপেই একটা করে আলাদা ছবি রয়েছে৷ তার মধ্যে সিংহ, কর্কট, মেষ এইসব রাশির ছবিগুলো রিনু চিনতে পারল৷ এছাড়া ঠাকুরের পুজোর নানা উপকরণের ছবিও রয়েছে৷ সবই যে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে তাও নয়৷ আরও কোনো কিছুর নকশা আছে কি না বোঝার জন্য ছোবড়া দিয়ে জোরে জোরে নকশাগুলো ঘষছিল রিনু৷ এইসময় হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটল৷ রিনুর হাতের চাপে একটা চৌকোনা জায়গা ঠিক দরজার পাল্লার মতোই ভিতরে ঢুকে গিয়ে একটা খোপ বেরিয়ে পড়ল৷ ভিতরে একটা শ্বেতপাথরের ছোট্ট ফলক৷ তার ওপর বাংলায় ১ লেখা৷ আর তার নীচে একটা অদ্ভুত ছবি আঁকা৷ এই উলকির নকশার কি তাহলে কোনো বিশেষ মানে আছে? নকশা আর এই পঙ্খের কাজ কি ইচ্ছে করেই একরকম করা হয়েছে?

কিন্তু এর উত্তর তো জানা নেই৷ একবার ইচ্ছে হল একদৌড়ে দাদুকে গিয়ে সবকিছু বলে৷ তারপরে নিজেই বুঝতে পারল, দাদু নিশ্চয় এ বিষয়ে কিছু জানে না৷ জানলে সেই গল্প সে এতদিনে শুনে ফেলত৷ তার থেকে নিজেই চেষ্টা করে দেখা যাক, সত্যিই পিছনে কোনো রহস্য আছে, নাকি তার জমিদার পূর্বপুরুষের কোনো আজগুবি খেয়াল৷ যদিও রিনুর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল যে এটা শুধু খেয়াল নয়৷ এর মধ্যে লুকিয়ে আছে জটিল কোনো ধাঁধা৷ সেই ধাঁধার সমাধানের জন্য এরপর তাকে খুঁজে বের করতে হবে দ্বিতীয় ধাপ মানে ২ কোথায় লেখা আছে সেই জায়গাটা৷ কিন্তু অতবড়ো ঠাকুরদালানের কোথায় সেটা লুকানো আছে বুঝবে কী করে? রিনু চটপট ছবি আঁকার জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলল৷ তারপর যে চৌকোনো জায়গাটা পিছন দিকে সরে গেছিল সেটা টেনে আগের জায়গায় আনতেই সেটা গেল খুট করে আটকে৷ কিছুতেই আর খোলা যায় না৷ বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টার পর রিনু বুঝতে পারল ওখানে যে ধুনুচির ছবিটা আঁকা আছে, তার পাশে কাঠি কাঠি মতো আরও একটা কিছুর ছবি আছে৷ সেই ছবিটার ওপর একটা একটু উঁচু মতো জায়গায় চাপ দিলে তবেই ওটা খুলছে৷ নিজের স্মার্ট ফোনে পুরোটার একটা ছবিও তুলে রাখল সে৷

রাতে নিজের ঘরে কম্পিউটারের পর্দায় উলকির নকশার ছবিটা ভালো করে দেখতে দেখতে রিনু একসময় বুঝতে পারল নকশাটা আসলে তাদের ঠাকুরদালানেরই নকশা৷ মূল স্কোয়ারটা হচ্ছে বারান্দা৷ তারপর ঠাকুরদালানের মেঝে৷ মাঝের চৌখুপ্পিগুলো আসলে ওই পঙ্খের কাজ করা জায়গাটা৷ তার মানে এটা নিশ্চিত, এই উলকির নকশার মধ্যে এমন কিছু আছে যে, রিনুর দাদুর প্রপিতামহ চেয়েছিলেন তাদের বংশের উত্তরাধিকারীরা মনে রাখুক৷ তাঁর সময়ে তো মেয়েদের উত্তরাধিকারী ভাবা হত না, তাই শুধু ছেলেদের শরীরেই এই উলকি আঁকার নিয়ম চালু করেছিলেন তিনি৷ কিন্তু নকশার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই বিশেষ জিনিসটা কী? কীভাবেই বা সেখানে পৌঁছানো যাবে?

নতুন কোনো সূত্রের আশায় সেদিনের তোলা ছবিটাও কম্পিউটারের পর্দায় ফেলে বড়ো করে দেখতে শুরু করল রিনু৷ ছবিতে ধুনুচির পাশের কাঠি কাঠি জিনিসগুলো যে কী সেটা সামনে থেকে দেখে ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না৷ কিন্তু ছবিটা বড়ো করার পর রিনুর মনে হল সেগুলো সম্ভবত জ্বলন্ত ধূপকাঠি, যা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ কিন্তু ধূপকাঠি কীসের প্রতীক হতে পারে? আগুন, পুজোর উপাচার, দাহ্য কোনো বস্তু... ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বিদ্যুত চমকের মতো রিনুর মাথায় বুদ্ধির ঝিলিক খেলে গেল৷ তাদের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় সন্ধ্যা আরতিতে ধুনো পোড়ানোর নিয়ম৷ একচালার মূর্তির দু-পাশে দু-টি ধুনুচি রাখা থাকে৷ আরতি চলার সময় একটু পরে পরেই তাতে অল্প করে ধুনো ছড়িয়ে দেওয়া হয়৷ সাধারণত পুজোর সময় এই কাজটা রিনু নিজেই করে৷ উলকির নকশাতেও একটা জ্বলন্ত ধুনুচির ছবি আছে৷ তার মানে কি এটাকে আরতির সময় বোঝানো হচ্ছে? সেক্ষেত্রে অন্য ছবিটারও একটা মানে পাওয়া যাচ্ছে৷ মুখার্জি বাড়িতে দুর্গার আরতি শুরু হয় ধূপ দিয়ে৷ তাহলে ধূপের ছবির পিছনে ১ লেখারও একটা মানে পাওয়া যায়৷ রাত হয়ে গেছে অনেক৷ কিন্তু তবু উত্তেজনায় টানটান হয়ে বসে রিনু৷ তাদের বাড়ির পুজোর সব নিয়ম-কানুনই তার মুখস্থ৷ ধূপের পর আরতি হয় পঞ্চপ্রদীপ দিয়ে৷ তার মানে তার অনুমান যদি ঠিক হয় তাহলে যেখানে ধুনুচির সঙ্গে পঞ্চপ্রদীপ আঁকা আছে সেটাই হবে ২ লেখা জায়গা৷

কিন্তু সঙ্গের ছবিটা কীসের সেটা তো বোঝা যাচ্ছে না৷ ছবিটা যেন পুরোটা আঁকা হয়নি৷ খানিকটা অসম্পূর্ণ৷ অনেকক্ষণ দেখেও তার কোনো মর্মোদ্ধার করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয় রিনু৷

উত্তেজনায় রাতে ঘুম হয়নি ভালো৷ সকালে উঠতে তাই একটু দেরিই হয়ে গেল৷ মা রাগারাগি করছিল কিন্তু সেসবে একটুও গুরুত্ব না দিয়ে তাড়াতাড়ি জলখাবার খেয়েই বালতি, সাবান আর ছোবড়া নিয়ে হাজির হল ঠাকুরদালানে৷ একটু একটু করে পরিষ্কার করতে লাগল পঙ্খের নকশা৷ বেশ অনেকটা জায়গা পরিষ্কার করার পর একসময় খুঁজে পাওয়া গেল ধুনুচির পাশে আঁকা পঞ্চপ্রদীপ৷ দুরুদুরু বুকে প্রদীপের নীচের দিকে সামান্য উঁচু জায়গায় জোরে চাপ দিতেই ঠিক আগের মতোই পাথর সরে গিয়ে খোপ বেরিয়ে এল৷ সেখানে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা ২ আর সঙ্গে আগের মতোই অদ্ভুত একটা ছবি আঁকা৷ পঞ্চপ্রদীপের পর জলশঙ্খ, তারপর ত্রিপত্র মানে বেলপাতা, রেশমবস্ত্র আর শেষে চামর৷ এইভাবেই তো হয় আরতি৷ তার মানে পরপর এগুলো খুঁজে বার করতে হবে৷ সবগুলো যদি মেলে তবে শেষে কী পাওয়া যাবে...

উত্তেজনায় ঠিকমতো ভাবতে পারে না রিনু৷ হাতের পাতা ঘেমে যায়৷ শিরদাঁড়া শিরশির করে৷

টানা তিন দিন ধরে ঠাকুরদালানের বারান্দার নীচের পঙ্খের কাজ পরিষ্কার করল রিনু৷ মা বকাবকি করেছে৷ কাজের মাসি অভয়াদি এসেছে সাহায্য করার জন্য৷ কিন্তু রিনু তাকে ফেরত পাঠিয়ে পুরোটাই নিজে করেছে৷ এক-এক করে জলশঙ্খ, ত্রিপত্র, রেশমবস্ত্র, এমনকী শেষ পর্যন্ত চামরও খুঁজে পাওয়া গেল৷ যদিও ছবিগুলো খুবই অস্পষ্ট৷ জানা না থাকলে বোঝা কঠিন৷ তবে রিনুর অনুমান যে সঠিক সেটা বোঝা যাচ্ছিল, কারণ প্রতিটির পিছনেই ১, ২ করে সংখ্যা লেখা ছিল৷ আর প্রতিটি ফলকেই সঙ্গে ছিল অনেকটা একই ধরনের অদ্ভুত একটা করে ছবি৷ রিনুর আশা ছিল আরতির শেষ উপাচার মানে চামরের ছবি যেখানে থাকবে সেখানে নিশ্চয় নতুন কোনো সূত্রের সন্ধান পাওয়া যাবে৷ কিন্তু ৬ লেখা শ্বেতপাথরের টুকরোর গায়েও ঠিক একইরকম একটা ছবি ছাড়া আর কিছু নেই দেখে ভারি মন খারাপ হয়ে গেল তার৷ তাহলে কি সবটাই নেহাতই কারুর আজগুবি পাগলামো? কিন্তু তার জন্য এত হিসেব করে একটা ধাঁধা সাজানো হবে? তিন দিন টানা পরিশ্রম করার পর শরীর মন দুই-ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল রিনুর৷ তা ছাড়া বেলাও গড়িয়ে গেছে অনেকটাই৷ তাই খানিকটা হাল ছাড়া মন নিয়েই সে ফিরে এল নিজের ঘরে৷

হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে খাবার ঘরে গিয়ে রিনু দেখল, টেবিলে বসে মা তার স্কুলের বাচ্চাদের জন্য নতুন খেলনা বানাচ্ছে৷ চারিদিকে ছোটো-বড়ো পেস্টবোর্ডের টুকরো, রং, তুলি, আঠা, কাঁচি সব ছড়ানো৷

বড়ো একটা হাঁসের ছবি এঁকেছে মা৷ তারপর সেটাকে কয়েক টুকরোয় ভাগ করেছে৷ প্রতিটা টুকরোয় নম্বর লেখা৷ জিগস পাজল৷ নম্বরগুলো ঠিকমতো সাজালেই গোটা হাঁসটা তৈরি হয়ে যাবে৷ ছবিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যায় রিনুর৷ কোনোরকমে খাওয়া শেষ করে এক দৌড়ে চলে আসে নিজের ঘরে৷ প্রতিটা স্ল্যাবের ওপরে আঁকা ছবিগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে সাজাতে চেষ্টা করে৷ একটু একটু করে খাপে খাপে বসাতে থাকে টুকরোগুলো৷ ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় মাঝরাত ছুঁয়েছে তখন তৈরি হয় একটা গোটা অবয়ব৷ রিনু অবাক হয়ে দেখে সেটা একটা সিংহ৷ এমনি সিংহ নয়, তাদের দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে যে ঘোড়ামুখো সিংহ থাকে ঠিক সেই সিংহের ছবিই তৈরি হয়েছে এই টুকরোগুলো মিলে৷

বারান্দার নীচের অংশটা পুরোটাই পরিষ্কার করা গেছে৷ তাই রিনু ধরেই নিয়েছিল ঘোড়ামুখো সিংহ খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধা হবে না৷ কিন্তু খুব খুঁটিয়ে পুরো জায়গাটা দেখেও যখন তার কোনো সন্ধান মিলল না, তখন বেশ খানিকটা অবাকই হল সে৷ তাহলে কি শেষ পর্যন্ত কূলে এসে তরী ডুববে? কিন্তু এতদিনে বেশ খানিকটা জেদও চেপে গেছে রিনুর৷ মুখার্জি বাড়ির রক্ষাকবচের রহস্য তাকে ভেদ করতেই হবে৷ তাই আর একবার ভালো করে পুরো জায়গাটা দেখার জন্য উঠতেই চোখে পড়ল, তিন ধাপ সিঁড়ি উঠে, যেখানে ঠাকুরের বেদি, সেই বেদির গায়েও রয়েছে একইরকম পঙ্খের কাজ৷ উলকির নকশায় শুধুমাত্র বারান্দার নীচের অংশটার ছবি আছে বলে এদিকটায় এতদিন মন দেয়নি সে৷ বারান্দায় উঠে এসে বেদিটা খুঁটিয়ে দেখতে গিয়েই চোখে পড়ল ঘোড়ামুখো সিংহের ছবি৷ প্রতিবার পুজোর সময় বেদিটা পরিষ্কার করা হয় বলে তুলনায় ছবিটা অনেক বেশি স্পষ্ট৷ ঠাকুরদালানে কেউ নেই৷ এইসময় কারুর আসার সম্ভাবনাও নেই৷ তবু চারিদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে দুরুদুরু বুকে সিংহের ছবিটার সামনে হাঁটু মুড়ে বসল রিনু৷ এতদিনে সে বুঝে গেছে প্রতিটা ছবিতেই সামান্য উঁচু একটা গোলমতো জায়গা থাকে৷ সেটাতে বেশ জোরে বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিতে হয়৷ তবেই স্ল্যাবটা সরে৷ এখানে সেই গোলমতো জায়গাটা একেবারে সিংহের ল্যাজের নীচে, বাঁ-দিকের কোনায়৷ নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা সেই উঁচু জায়গাটার ওপর রেখে প্রাণপণে চাপ দেয় রিনু৷ খুট করে একটা শব্দ হয়ে খুলে যায় স্ল্যাবটা৷ নাঃ, এবার আর কোনো নম্বর লেখা শ্বেতপাথরের টুকরো নেই৷ ভিতরে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা৷ সাবধানে হাত ঢোকাতেই, হাতে ঠেকে একটা বাক্সের মতো কিছু৷ বেশ ভারী৷ কোনোরকমে গায়ের জোরে সেটাকে টেনে বার করে আনে রিনু৷ একটা বেশ বড়ো বাক্স৷ তামার রংটা যদিও সবজেটে হয়ে গেছে, কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না৷ বাক্সটা বাইরে এনে খুব সাবধানে ডালাটা খুলেই চমকে ওঠে সে৷ শীতের বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ঝলমল করে ওঠে বাক্স-ভরতি গয়না!

Cov15

বাড়ি বিক্রি হবে না৷ প্রোমোটরকে জানিয়ে দিয়েছে বাবা৷ বাক্সে হার, চুড়ি, বালা এসব ছাড়াও কিছু খুচরো গয়না আর কয়েকটা পুরোনো আমলের গিনি ছিল৷ সেগুলো বিক্রি করেই বাড়ি সারানো হবে ঠিক হয়েছে৷

মা দুর্গা নিশ্চয় চাইছিলেন না তাঁর পুজো বন্ধ হয়ে যাক৷ তাই এতদিন বাদে প্রতিমার হারিয়ে যাওয়া গয়নার সন্ধান মিলল৷ বাড়ি বিক্রির আর প্রশ্নই উঠছে না৷ বরং মায়ের ধনেই তাঁর সেবার বন্দোবস্ত হোক৷

সেদিন গয়নার বাক্সটা কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর বাবাকে কথাগুলো বলেছিল দাদু৷

তবে যেটুকু একান্ত প্রয়োজন সেটুকুই শুধু বিক্রি করা হবে৷ বাকি গয়না থাকবে ঠাকুরের জন্যই৷ শুধু বউমা যদি কোনোদিন তার স্কুলটাকে বড়ো করতে চায়, তাহলে ওই গয়নায় হাত দিতে পারে৷ আর রিনু যদি কখনো চায়, তাহলে ওকে সব গয়না দিয়ে দিতে হবে৷ এ হল তোমাদের প্রতি আমার আদেশ৷

কথা শেষ করে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলে চোখের কোল মুছে নিয়েছিল দাদু৷ আশ্চর্য হয়ে দাদুর কোলের কাছে সরে এসে রিনু জিজ্ঞাসা করেছিল, কাঁদছ কেন দাদু? তোমার আনন্দ হয়নি?

খুব আনন্দ হয়েছে দিদিভাই৷ আনন্দেই তো কাঁদছি আমি৷ তবে গয়নার বাক্স পাওয়া গেছে বলে সেই আনন্দে কিন্তু কাঁদছি না৷...

তবে কেন কাঁদছ দাদু?

আমি যে আরও বড়ো গুপ্তধন পেয়েছি দিদিভাই৷ একবার ভেবে দেখো, এত বছর ধরে এই বাড়ির প্রতিটি ছেলের পায়ে ওই উলকি আঁকা হয়েছে৷ অথচ কারুর কোনোদিন ওটা খুঁটিয়ে দেখার কথা মাথাতেই আসেনি৷ ওই ঠাকুরদালান সত্তর বছর ধরে রোজ দেখেও আমার মনে হয়নি যে ওখানে এরকম কিছু লুকানো থাকতে পারে৷ আর তুমি, নিজে মাথা খাটিয়ে, একলার বুদ্ধিতে এতবড়ো একটা কাজ করে ফেললে৷ তোমার মতো একটি মেয়ে যদি এ বাড়িতে না জন্মাত, তাহলে তো মুখার্জি বাড়ির সম্পদ অন্যের হাতে চলে যেত৷ বাড়ি ভাঙার সময় প্রমোটারই তো এই বাক্সের সন্ধান পেত৷ এত বড়ো গুপ্তধন যার বাড়িতে আছে তার তো অন্য ধনসম্পদের কোনো দরকার নেই৷ তাই আমি ঠিক করেছি এখন থেকে ওই গয়নায় শুধু তোমার অধিকার৷ আমি জানি, তোমার হাতে কখনো ওই সম্পদের অমার্যাদা হবে না৷

Cov16
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%