দীপান্বিতা রায়

বক্তৃতা যে দিতে হবে সেটা জানা ছিল আগে থেকেই৷ বলার জন্য ভালো ভালো কথাও অনেক ভেবে এসেছিল আফরোজা৷ আসলে ভাবতেও ঠিক হয় না৷ সুধীর মল্লিকের প্রসঙ্গ উঠলে ভালো কথা এমনিই মনের মধ্যে ঢেউয়ের মতো চলে আসে৷ কত কথা, কত স্মৃতি, এত বড়ো মাপের একজন মানুষ, তাঁকে নিয়ে বলতে শুরু করলে যেন শেষই হতে চায় না৷ অথচ কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখো, স্টেজে উঠে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সেসব কিছুই যেন মনে পড়ল না৷
সামনে সার দিয়ে বসে আছে একঝাঁক কচিমুখ৷ তাদের ঝকঝকে চোখের ওপর দিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আফরোজা বলল, আজ তোমাদের একটা গল্প বলি শোনো৷
বেশ অনেকদিন আগের কথা৷ প্রায় তিরিশ বছর তো হবেই৷ ধর্মতলার কাছে একটা ব্যস্ত রাস্তা আছে যার নাম সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড, সবাই বলে এস. এন. ব্যানার্জি রোড৷ লম্বা রাস্তা৷ তার একটা অংশে রোজ সবজি বাজার বসে৷ গ্রামের চাষিরা তাদের খেতের পটল, ঝিঙে, লাউ, কুমড়ো সব ঝুড়িতে ভরে ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ স্টেশনে আসে৷ সেখান থেকে এই বাজার তো একটুখানি পথ৷ শহরের বাজারে তাজা সবজির কদর বেশি, দামও ভালো পাওয়া যায়৷ তাই এই ব্যবস্থা৷
এরকমই এক চাষি সকাল সকাল এসে সেই বাজারে বসত৷ একলা মানুষ৷ সবজির ঝুড়ি বওয়া, খদ্দের সামলানো, টাকা গুছিয়ে রাখা সব তো আর একহাতে করা যায় না৷ তাই তার বউও আসত সঙ্গে৷ আর আসত বছর ছয়-সাতের ছোট্ট মেয়ে মুন্নি৷ আসলে বাড়িতে তো তাদের আর কেউ নেই৷ অত ছোটো মেয়েকে রেখে আসবে কার কাছে? যতক্ষণ সবজি বেচা-কেনা চলত, ততক্ষণ মুন্নি মায়ের পিছনে বসে কখনো আপন মনে খেলত, কখনো ঘুমোত, কখনো আবার চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য বায়না করত৷
মুন্নির বাবা যেখানে বসত তার ঠিক পিছনেই ছিল একটা বড়ো দোতলা বাড়ি৷ সেখানে থাকতেন এক ভদ্রলোক৷ বয়স প্রায় পঞ্চাশ৷ এলোমেলো সাদা চুল৷ অগোছালো কাঁচাপাকা দাড়ি আর ভারি মায়াময় দু-টি চোখ৷ মাঝে মাঝেই তিনি সবজি কিনতে এসে মুন্নির বাবার সঙ্গে গল্প জুড়তেন৷ ঘর-সংসারের কথা, চাষবাসের কথাও জানতে চাইতেন৷
একদিন সেই ভদ্রলোক যখন দোকানে এসেছেন মুন্নি তখন মায়ের কাছে চা-পাঁউরুটি খাওয়ার বায়না ধরেছে৷ মায়ের সেদিন মেজাজ খারাপ৷ সকাল থেকে বিক্রিবাটা প্রায় কিছুই হয়নি৷ হাতে পয়সাকড়ি নেই৷ তার মধ্যে শুরু হয়েছে মুন্নির বায়না৷ মা তো রেগেমেগে মেয়ের গালে দিয়েছে ঠাস করে এক চড়৷ ব্যাস, মুন্নিও অমনি গলা ছেড়ে শুরু করেছে কান্না৷ মুন্নির কান্না দেখে সেই ভদ্রলোক তো অস্থির৷ আহা রে, ওইটুকু মেয়ে, খিদে পেয়েছে বলেই তো বায়না করছে৷ মাকে বলে তাড়াতাড়ি মুন্নিকে তিনি নিয়ে এলেন নিজের বাড়ি৷ একবাটি মুড়ি-বাতাসা পেয়েই কান্না ভুলে গেল মুন্নি৷ কিন্তু তারপর থেকে ওই বাড়িতে রোজ আসা-যাওয়া শুরু হয়ে গেল তার৷ ভদ্রলোককে মুন্নি ডাকত দাদু বলে৷ রোজ দাদুর বাড়ি চলে যেত মুন্নি৷ বড়ো বাড়ি৷ একতলা-দোতলা মিলিয়ে বেশ অনেকগুলোই ঘর৷ একলাই থাকত দাদু৷ কাজের লোক ছিল কয়েকজন৷ তারাই বাড়ি দেখাশোনা করত৷ মুন্নির সঙ্গে তাদেরও বেশ ভাব হয়ে গেছিল৷
দাদুর বাড়িতে গেলেই একটু পরে একবাটি দুধ-মুড়ি, কিংবা দুধ-পাঁউরুটি বরাদ্দ ছিল তার৷ পেট ভরে খেয়ে প্রথম প্রথম বাড়ির ভিতরে আপনমনে খেলে বেড়াত মুন্নি৷ তবে কিছুদিন পরে দাদু কতগুলো রংচঙে বই নিয়ে এসে অ-আ পড়াতে শুরু করল৷ খারাপ লাগত না৷ যদিও পড়ার থেকেও বইয়ের ছবি দেখা বেশি পছন্দ ছিল তার৷ একটা বদ অভ্যাসও ছিল মুন্নির৷ কাগজ কুচানো৷ ছোটো রংচঙে কাগজের টুকরো দেখলেই আপনমনে সেগুলি কুচিয়ে ফেলে খেলা করত সে৷ একটা ছোটো বাক্সের মধ্যে নানা রঙের কাগজের কুচি জমিয়েও রাখত৷ এটা খুব অপছন্দ ছিল দাদুর৷ একবার তো দাদুর একটা বই থেকে পাতা ছিঁড়ে নিয়ে কুচিয়ে ফেলায় খুব জোরে বকুনিও খেয়েছিল৷
দাদুর ঘর, বারান্দা, ছাদ যেখানে খুশি যেতে পারত মুন্নি৷ শুধু একতলায় একটা মস্ত লম্বা ঘরে ঢোকা ছিল বারণ৷ ওটা দাদুর কাজের ঘর৷ মাঝে মাঝে পরপর বেশ কয়েকদিন ওই ঘরে দরজা বন্ধ করে কাজ করত দাদু৷ তখন মুন্নির সঙ্গে দেখা হত না৷ বই নিয়ে বসাও হত না৷ আবার একদিন সকালে গিয়ে দেখত বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে দাদু৷ সেদিন অনেক গল্প হত৷ রাজা-রানির গল্প, শেয়াল আর দুষ্টু বুড়ির গল্প আরও কত কী৷ মুন্নি বেশ বুঝতে পারত, দাদুর মনটা বড্ড খুশি খুশি আছে৷ চোখ দুটো কেমন যেন আলো আলো৷ তাই তার খুব ইচ্ছে করত ওই ঘরটায় ঢুকে দেখে ওখানে কী আছে৷ কেন ওখানে দু-চার দিন কাটিয়ে আসার পরই দাদুর মনটা অমন খুশি খুশি হয়ে ওঠে৷ কিন্তু উপায় ছিল না কোনো৷ দাদু না থাকলে ঘরের দরজায় মস্ত তালা ঝুলত৷ এমনকী দাদু যদি কোনো কারণে কলকাতার বাইরে যেত, তখনও ওই ঘরের দরজা খুলে ঢুকত না কেউ৷
শেষ পর্যন্ত একদিন থাকতে না পেরে দাদুকেই জিজ্ঞাসা করল, তোমার ওই ঘরে কী আছে গো? আমার বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু কেউ আমায় ঢুকতে দেয় না৷ দাদু গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, উঁহু... ওই ঘরে গুপ্তধন আছে৷ ওখানে আমি ছাড়া অন্য কারও ঢোকা বারণ৷
ততদিনে দাদুর কাছেই আলাদিনের গল্প শুনে গুপ্তধন মানে যে অনেক অনেক বস্তা-ভরতি সোনাদানা-হিরে-মুক্তো তা মুন্নি জেনে গেছে৷ তাই খুব অবাক হয়ে বলল, তবে যে সবাই বলে ওঘরে তুমি কাজ কর!
করিই তো৷ আমার তো গুপ্তধন নিয়েই কাজ৷ ওখানে বসে বসে আমি গুপ্তধন তৈরি করি৷
গুপ্তধন আবার তৈরি করা যায় নাকি৷ সে তো ডাকাতরা লুটপাট করে নিয়ে আসে৷ দাদুর কথা কিছুই মাথায় ঢুকল না মুন্নির৷ পরের দিন তালা বন্ধ দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকবার চিচিং ফাঁকও বলল কিন্তু দরজা একটুও খুলল না৷
দাদুকে সেকথা বলাতে দাদু একটু হেসে বলল, ওটা তো আমার গুপ্তধন৷ আমি ওটা খুঁজে বার করেছি৷ ওই দরজা খোলার মন্ত্রও তাই শুধু আমি জানি৷
আমাকে মন্ত্রটা শিখিয়ে দাও না৷
ও মন্ত্র কাউকে শেখানো যায় না মুন্নি৷ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়৷ আর একবার গুপ্তধন খুঁজে পেলে মন্ত্রও আপনা-আপনিই মনের মধ্যে চলে আসে৷ শিখিয়ে দিতে হয় না৷
দাদু মাঝে মাঝে এমন সব অদ্ভুত কথা বলে যে কিছুই বোঝা যায় না৷ তাই ও নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়নি মুন্নি৷ তবে গুপ্তধনের ব্যাপারটা কিন্তু সে ভোলেনি৷ বাড়িতে খেলা করার সময় কিংবা স্টেশনে আসার রাস্তায় সে খুব ভালো করে চারিদিকটা নজর করে দেখত, কোথাও কোনো গুহা আছে কি না৷ অচেনা কোনো মানুষকে ডাকাতের মতো দেখতে মনে হলে সাবধানে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে বোঝার চেষ্টা করত লুঠ করা সোনাদানা তারা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে৷ সবজি বাজারের পাশের চায়ের দোকানে এক মোটা গোঁফওলা লোক রোজ চা খেতে আসত৷ তার গলাটাও বেশ মোটা আর ভারী মতো৷ মুন্নি ঠিক বুঝতে পেরেছিল ও একজন ডাকাত৷ তাই সাহস করে একদিন জিজ্ঞেসও করেছিল৷ কিন্তু তার কথা শুনে লোকটা এমন হা-হা করে হেসে, মুন্নিকে হাঁটুর ওপর বসিয়ে, কিশমিশ দেওয়া মিষ্টি কেক কিনে দিল যে তাকে আর গুপ্তধনের কথাটা জিজ্ঞাসাই করা গেল না৷
মুন্নি যখন ধরেই নিয়েছে তার আর গুপ্তধন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তখনই ঘটল একটা মজার ঘটনা৷ দাদু কয়েকদিনের জন্য কলকাতার বাইরে গেছে৷ সেদিন তাই মুন্নি বারান্দায় বসে মনের সুখে কাগজ কুচি করছিল৷ নানা রঙের কাগজের কুচির যখন একটা বেশ স্তূপ তৈরি হয়েছে, তখন হঠাৎ কী মনে হল, দাদু তাকে যে ড্রয়িং খাতাটা দিয়েছিল, সেটাতে আঠা দিয়ে কাগজগুলো সাঁটতে বসল সে৷ নিজের ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি কাগজের কুচি বসাচ্ছে আর কেমন সব অদ্ভুত ছবি তৈরি হচ্ছে৷ কোনোটা যেন একটা গাছ৷ কোনোটা বিড়াল, কোনোটা আবার সিংহ লাফ দিচ্ছে৷ এই নতুন খেলাটা খুব পছন্দ হল মুন্নির৷ অনেকক্ষণ ধরে এরকম এলোমেলো কাগজ আটকে একসময় মা ডাক দেওয়ায় খাতাটা বারান্দায় ফেলে রেখেই বাড়ি চলে গেল৷
পরদিন সকালে এসে দেখে, দাদু রাতে ফিরে এসেছে৷ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে, হাতে সেই ড্রয়িং খাতাটা৷ দেখেই তো মুন্নির ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে৷ এক্ষুণি দাদু নিশ্চয় কাগজ কুচি করার জন্য বকবে৷ দাদু কিন্তু বকল না মোটেই৷ বরং কেমন একটা জ্বলজ্বলে চোখে মুন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, খাতায় এই ছবিগুলো কে করেছে, তুমি?
ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়ে মুন্নি৷
কী দেখে করেছ?
কিছু দেখিনি তো৷ এমনি এমনিই করলাম৷
কাগজ কোথায় পেলে?
এবার মাথা নীচু হয়ে যায় মুন্নির৷
তোমার টেবিল থেকে খবরের কাগজ নিয়েছিলাম৷ আর এই নীল, সবুজ কাগজটা কুড়িয়ে পেয়েছি৷
আমার সামনে বসে আর একটা করো তো দেখি৷
দাদু নিজে উঠে গিয়ে বেশ কয়েকটা খবরের কাগজ আর রঙিন বইয়ের পাতা এনে দিল মুন্নিকে৷ ততক্ষণে মুন্নির ভয় কেটে গেছে৷ ও দিব্যি কাগজগুলো কুচিয়ে, ছিঁড়ে আপনমনে সাঁটতে লাগল খাতায়৷ আজকের ছবিটা একটু অন্যরকম হল৷ মুন্নিদের গ্রামের বাড়ি৷ বাগান৷ সেখানে একটা মস্ত হলুদ ফুল ফুটে আছে৷ আকাশে সুর্য আর পাখি উড়ছে৷

খাতাটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে মুখটা কেমন যেন আলো আলো হয়ে গেল দাদুর, মুন্নি, তোকে একদিন বলেছিলাম না, নিজের গুপ্তধন নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়৷ এই দেখ, তুই কেমন তোর গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেছিস৷ এবার শুধু চিচিং ফাঁকের মন্ত্রটা ঠিকঠাক শিখে নিতে হবে...
শিখিয়ে দিয়েওছিল দাদু৷ ওই ছোট্ট মেয়েটাকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল কোলাজ তৈরির নানা নিয়মকানুন৷ ওরকমভাবে ছেঁড়া কাগজের টুকরো দিয়ে আঁকা ছবিকে কোলাজ বলে সেটা নিশ্চয়ই তোমরা জানো৷ মুন্নি কিন্তু জানত না৷ তার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে বই আনিয়েছিল দাদু৷ কলকাতায় কোনো কোলাজের এগজিবিশন হলেই নিজে সঙ্গে করে দেখাতে নিয়ে যেত৷ আসলে দাদুও ছিল একজন খুব নামকরা শিল্পী৷ সেই মস্ত গুপ্তধনের ঘরটা ছিল স্টুডিয়ো৷ সেখানে বসে দাদু ছবি আঁকত৷ নিজে গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিল বলে মুন্নির ভিতরের গুপ্তধন চিনিয়ে দিতেও অসুবিধা হয়নি দাদুর৷
মুন্নি আস্তে আস্তে বড়ো হল৷ কোলাজ শিল্পী বলে তার অনেক নামডাকও হল৷ তাকে তখন আর কেউ মুন্নি বলে ডাকে না, সবাই বলে আফরোজা ইমাম৷ কিন্তু বড়ো হয়েও সে কিন্তু সেই গুপ্তধনের গল্পটা ভোলেনি৷ তারপর একদিন দাদু ঠিক করল এখানে আর ছবি আঁকতে তার ভালো লাগছে না৷ এবার স্বর্গে গিয়ে ভগবানের পাশে বসে ছবি আঁকবে৷ তাই রং তুলি গুটিয়ে সোজা হাঁটা দিল স্বর্গের রাস্তায়৷ যাওয়ার সময় মুন্নিকে কানে কানে কয়েকটা কথা বলে গেল শুধু৷
দাদু চলে যাওয়ার পর মুন্নির খুব মন খারাপ হয়েছিল৷ কিন্তু একদিন যখন তোমাদের স্কুলের দিদিমণিরা মুন্নিকে গিয়ে বলল যে, দাদুর স্মরণে একটা সভা হচ্ছে আর সেখানে মুন্নিকেও বক্তৃতা দিতে হবে, অমনি মুন্নির মনে পড়ে গেল দাদুর শেষ কথাগুলো৷ দাদু বলেছিল, তোমাদের সব্বাইকে বলতে যে, মুন্নির মতোই তোমাদের সবার মনের ভিতরেই একটা গুপ্তধনের বন্ধ গুহা আছে৷ সেটাকে শুধু খুঁজে বার করতে হবে৷ তারপর দেখবে চিচিং ফাঁকের মন্ত্র কেমন আপনা থেকেই শিখে গেছ৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন