সৈকত মুখোপাধ্যায়

ক্রিসমাসের ছুটিতে ফুটিডাঙায় বেড়াতে এসেছি। সেটা কোনো নতুন কথা নয়। জন্মানোর পর থেকেই তো ফুটিডাঙায় আসছি, অনেকসময় বছরে দুবার। তবে আগে যতবার এসেছি, বাবা-মা সঙ্গে ছিল। আর এইবার বাবা আমাকে সন্ধেবেলায় হাওড়া-স্টেশনে জগন্নাথ-এক্সপ্রেসে চাপিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। আমি ভোর পাঁচটায় একা-একাই পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ফুটিডাঙার ছোট্ট প্লাটফর্মটায় নেমে পড়লাম।
একজন ক্লাস নাইনের পড়ুয়ার পক্ষে এটা তেমন কিছু কঠিন কাজ নয়।
স্টেশনে দাদাইয়ের গাড়ি আমার জন্যে ওয়েট করছিল। আমি পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করে মাকে শুধু একটা মেসেজ করে দিলাম—রিচড সেফলি।
'দাদাই' মানে আমার নিজের দাদুর জ্যাঠতুতো দাদা। আমাদের বংশে উনিই সবার চেয়ে বয়সে বড়। এখন ওঁর সাতাশি বছর বয়স, তবে চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। দিব্যি সুন্দর ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, হাতে একটা রুপোর মুঠি লাগানো বেতের লাঠি নিয়ে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাঁটাচলা করেন। গমগমে গলায় ওনার রেস্তোরাঁ 'ফুটিডাঙা ফুডহাউস'-এর কর্মচারীদের হাঁকডাক করে কাজ করান।
দাদাইয়ের ছেলে নেই। একটিই মেয়ে, যাকে আমরা সোনাপিসি বলে ডাকি। তিনিও আবার থাকেন অনেকদূরে, নেপালের বীরগঞ্জে। আমার বাবা-মাকে দাদাই ছেলেমেয়ের মতনই ভালোবাসেন আর আমি ওঁর সবচেয়ে আদরের নাতি। আমিও দাদাই আর বড়ঠাম্মাকে খুব ভালোবাসি। বেশিদিন ওদের দুজনকে না দেখলে মনকেমন করে। তাছাড়া কাজুগাছের বাগানে ঘেরা দাদাইয়ের বাড়িটা একেবারে ফরেস্ট-বাংলোর মতন সুন্দর আর চুপচাপ। দাদাইয়ের রেস্তোঁরার রান্নার নামডাক যদিও আকাশছোঁয়া, কিন্তু বাড়িতে বড়ঠাম্মা প্রতিদিন যেসব সুখাদ্য রেঁধে আমাকে খাওয়ায় সেগুলোও কম কিছু নয়।
এইসব মিলিয়ে ফুটিডাঙার একরকমের আকর্ষণ আছে ঠিকই। কিন্তু আসল আকর্ষণটা হল দাদাইয়ের গল্প। সেসব যে কি উদ্ভুট্টি আর গা-শিরশিরে কাহিনি সে তোমাদের কী বলব।
অনেকেই বলে, দাদাইয়ের ওসব গল্পকে সত্যি বলে না ধরাই ভালো। তাদের মধ্যে বড়ঠাম্মাও রয়েছে, যে বড়ঠাম্মা কিনা দাদাইয়ের আপন বউ এবং বাষট্টিবছর একসঙ্গে ঘর করে দাদাইকে নাকি হাড়ে-হাড়ে চিনে ফেলেছে।
সে যাই হোক, বড়ঠাম্মা প্রায়ই বলে, 'উনি কী বলতে কী বলছেন তার নেই ঠিক। বুল্টুসোনা! তুমি যেন ওনার কথা শুনে সত্যিই ভেবে বোসো না যে, জিভের তলায় সাদা শিমূলের শেকড় রেখে অঙ্ক কষলে সব অঙ্ক ঠিক হবে। তা যদি হত তাহলে উনি নিজে ম্যাট্রিকে দু'বার ফেল করে রেস্তোরাঁ খুলতেন না। আমাদের কমবয়সে কলকাতায় সাদা শিমূলের গাছ কিছু অমিল ছিল না।'
বড়ঠাম্মাকে কেমন করে বোঝাব, আমি সত্যি আর আজগুবির মধ্যে তফাৎ করার মতন বড় হয়ে গেছি। সাদা শিমূল-টিমুল বিশ্বাস করি না মোটেই। কিন্তু তাই বলে কি গোয়াবাগানের সেই জমিদারের নায়েব, যার বুকে গুলি করে জমিদার মেরে ফেলেছিল আর যে-নায়েব তারপর থেকে যখন-তখন অন্ধকার গলির মধ্যে দাদাইদের পথ আটকে 'বুক গেলো রে' বলে চিৎকার করে উঠত, তার কথাটাও অবিশ্বাস করব?
যাই হোক, দাদাইদের আসল বাড়ি ছিল ওই গোয়াবাগানেই। সেখানেই দাদাই আর তার অন্য দুই ভাইবোন থাকত। দাদাইয়ের অনেক গুণ ছিল। ভালো ক্রিকেট খেলত। বেহালা বাজাত। সেই বেহালার বাক্সের মধ্যে ভরে বিপ্লবীদের রিভলভার-পিস্তল ইত্যাদিও সাপ্লাই দিয়ে এসেছে অনেকবার। বিপ্লবীদের গোপন ডেরায় সামান্য উপকরণ দিয়ে রান্নাবান্নার কাজটাও অনেকসময় দাদাইকেই করে দিয়ে আসতে হত। কিন্তু দোষের মধ্যে পড়াশোনা করতে দাদাই মোটে ভালোবাসত না।
দাদাইয়ের কথার মধ্যে কোনো লুকোছাপা নেই। নিজেই আমাকে বলেছে, দ্বিতীয়বারেও যখন ম্যাট্রিকে ফেল করলাম তখন বাবা তাঁর নিজের আপিসের বড়সাহেবকে ধরে আমার জন্যে একটা চাকরি ঠিক করে ফেললেন। চাকরিটা হচ্ছে সাদা চামড়ার লোকেদের জন্যে তখনকার দিনে রেলগাড়িতে যে স্পেশাল কামরা থাকত তার দেখভালের কাজ। তাই শুনেই আমি কাউকে কিছু না বলে গৃহত্যাগ করলাম।
তারপর যা ঘটেছিল, সে কাহিনি শুনলে তোমাদেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।
বাড়ি থেকে পালানোর পর দাদাই সাতপাঁচ কিছু না ভেবেই হাওড়া স্টেশনে ঢুকে পড়ল। দাদাইয়ের মা একটা লক্ষ্মীভাঁড়ে খুচরো পয়সা জমাতেন। পালানোর সময় সেই ভাঁড়টা দাদাই হাতসাফাই করেছিল। তাছাড়া নিয়েছিল একটা গামছা আর একবোতল চকোলেট-পাউডার। ও জিনিসটা নাকি দাদাইদের ছোটবেলাতে আমেরিকা থেকে আমদানি করা হত। রোজ একচামচ চুরি করে না খেলে দাদাইয়ের ঘুম হত না।
হাওড়ায় টিকিটঘরের লাইনে দাঁড়িয়ে দাদাই শুনল, ঠিক সামনের লোকটা পুরী যাবার টিকিটের দাম জানতে চাইছে। টিকিট-কাউন্টারের ক্লার্ক যেই না বলেছেন দু-আনা ভাড়া, অমনি লোকটা গজগজ করতে করতে টিকিট না কেটেই ট্রেন ধরতে চলে গেল। দাদাইয়ের পালা আসতেই দাদাইও টিকিট-কাউন্টারের ফোঁকর দিয়ে ভাঁড়ভাঙা একটা দু-আনা পয়সা বাড়িয়ে ধরে বলল, আমাকে একটা পুরীর টিকিট দেবেন আর কোন ট্রেনটা সেদিকে যায় সেটাও একটু বলে দেবেন।
টিকিট-কাউন্টারের ভদ্রলোক বললেন, এগারো নম্বর প্লাটফর্ম থেকে পুরী প্যাসেঞ্জার ছাড়ছে। উঠে পড়ো।
দাদাই তাই করল। তারপর পুরী-প্যাসেঞ্জার ভারি অনিচ্ছা নিয়ে চলতে চলতে রাত তিনটের দিকে একটা স্টেশনে থামতেই দাদাই জানলা দিয়ে দেখতে পেল টিকিটের লাইনের সেই লোকটা প্লাটফর্ম দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
দাদাই বুঝল পুরী এসে গেছে; দাদাইও তাড়াহুড়ো করে প্লাটফর্মে নেমে পড়ল। সেই লোকটা সম্ভবত টিকিট-চেকারের হাত এড়াতেই একটা লোহার রেলিঙের ফাঁক গলে কোনদিকে সটকে পড়ল কে জানে। দাদাই স্টেশনের গেট দিয়ে ভদ্রলোকের মতন বেরোতে যেতেই চেকারসাহেব হাত বাড়িয়ে বললেন, টিকেট প্লিজ!
দাদাই তাঁর হাতে টিকিটটা ধরিয়ে দিল। চেকারসাহেব ভালো করে টিকিটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার দাদাইয়ের হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, পুরী যাবে তো এখানে নেমে পড়লে কেন?
দাদাই অবাক হয়ে বলল, কেন? এটা কি পুরী নয়?
সাহেব মুখে কিছু না বলে ভারি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে আঙুল তুলে স্টেশনবাড়ির ছাদে লাগানো সাইনবোর্ডটার দিকে দেখিয়ে দিলেন। সাইনবোর্ডটার ওপরে একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছিল বলে স্টেশনের নামটা পড়া যাচ্ছিল। দাদাই দেখল, ইংরিজিতে লেখা আছে 'ফুটিডাঙা'।
দাদাই সঙ্গে-সঙ্গেই বুঝতে পারল, উইদাউট টিকিটের লোকটা ঝামেলা এড়ানোর জন্যে পুরী পৌঁছনোর আগেই এই ছোট স্টেশনটায় নেমে পড়েছে। পরে বোধহয় বাস-টাস ধরে পুরী যাবে।
দাদাই ভারি বিমর্ষ হয়ে পড়ল। মনে মনে ভেবে নিয়েছিল পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে বেহালা বাজিয়ে প্রচুর পয়সাকড়ি উপার্জন করবে। তো সেই কাজে প্রথমেই এমন বাধা পড়ে গেল। মনখারাপ তো হওয়ারই কথা।
চেকার-সাহেবের কাছেই দাদাই জেনে নিল যে, পুরী যাবার পরের গাড়িটা আসতে তখনো চারঘণ্টা দেরি আছে। অতএব দাদাই ফুটিডাঙা জায়গাটাই একটু দেখে আসবার জন্যে বেরোল।
স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই দাদাইয়ের মুখে একটা ভিজে-ভিজে, আঁশটে-আঁশটে হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল। কানে বাজল ছাদের ওপরে লোহার বল গড়ানোর মতন অবিরাম গুমগুম আওয়াজ আর স্টেশন-রোড ধরে কিছুটা এগিয়ে একটা বাঁক নিতেই দাদাই তটস্থ হয়ে পড়ল।
হ্যাঁ, দাদাই বলেছে জীবনে প্রথমবার সমুদ্রের তটে দাঁড়ালে যে-কোনও মানুষের মনে যে ফিলিংস-টা আসে, তার থেকেই 'তটস্থ' শব্দটা এসেছে। সেদিন ভোরবেলায় দাদাই ফুটিডাঙার তট থেকে জীবনে প্রথমবার সমুদ্র দেখল।
অত রাতে সমুদ্রসৈকত ছিল একেবারে জনমানবহীন। বিশাল ঢেউগুলো ভেঙে পড়ার সময় ফসফরাসের আলোয় উজ্জ্বল ফেনারা আঙুল নেড়ে যেন দাদাইকে কাছে ডাকছিল। দাদাই নিশিপাওয়া মানুষের মতন অন্ধকার বালুতীর ধরে সমুদ্রের দিকে হাঁটা দিল আর বড়জোর একশো মিটার যেতে না যেতেই সাদা, গোল আর শক্তমতন কি একটা জিনিসে ঠোক্কর খেলো।
তারপর আরেকটা ঠিক ওইরকম জিনিসে আরেকবার ঠোক্কর খেল দাদাই।
তৃতীয়বার হোঁচট খাওয়ার পরেই দাদাইয়ের মাথায় একটা ভয়ংকর চিন্তা এল। দাদাইয়ের হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, এরকম নির্জন বালুচরেই তো মানুষ খুনটুন করে ডেডবডি ফেলে দিয়ে যায়! আমি যে গোল, সাদা আর শক্তমতন জিনিসগুলোতে ঠোক্কর খাচ্ছি সেগুলো মড়ার খুলি নয় তো! এই কথা ভাবতেই দাদাইয়ের হাঁটুদুটো এমন কাঁপতে শুরু করল যে, দাদাই আর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, বালির ওপরেই বসে পড়ল।
আর তারপরেই নিজের মনে ফিকফিক করে হেসে ফেলল।
না-হেসে উপায় ছিল না, কারণ, যে জিনিসগুলোকে দাদাই মড়ার খুলি বলে ভেবেছিল, আসলে সেগুলো ছিল ফুটি। বালির চরায় স্থানীয় লোকেরা ফুটির চাষ করেছে।
ততক্ষণে অন্ধকারটা একটু হালকা হয়ে এসেছে। দাদাই দেখল যতদূর চোখ যায়, ফুটির লতাগুলো শুকিয়ে বালির সঙ্গে মিশে গেছে আর বালিমাটির তীর জুড়ে অসংখ্য বড় বড় ফুটি ছড়িয়ে রয়েছে। এখন শুধু ওগুলোকে তুলে বাজারে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা। দাদাই বুঝতে পারল, এইজন্যেই জায়গাটার নাম ফুটিডাঙা।
সেই ছড়িয়ে থাকা ফুটিগুলোর মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই দাদাই পেটের মধ্যে খিদের মোচড় টের পেল। স্বাভাবিক। আগেরদিন সকালবেলায় বাড়িতে চা-বিস্কুট খাওয়ার পরেই ম্যাট্রিকের রেজাল্ট আউট হল আর তারপরেই দাদাইয়ের বাবা কুরুক্ষেত্র কাণ্ড শুরু করলেন। তার মানে, প্রায় চব্বিশঘণ্টা দাদাই না খেয়ে রয়েছে।
বাড়ি থেকে পালানোর উত্তেজনায় কথাটা এতক্ষণ দাদাইয়ের খেয়াল ছিল না, কিন্তু চারিদিকে রসাল ফুটিগুলোকে দেখে মনে পড়ে গেল। দাদাই ঠিক করল একটা ফুটি খেয়েই উপোস ভাঙবে। এমনিতে ফুটি জিনিসটার সঙ্গে একটু তালপাটালি মিশিয়ে খেতেই দাদাই চিরকাল অভ্যস্ত। কিন্তু ফুটিডাঙার নির্জন চরে পাটালিগুড় আর কোথায় পাবে? এমনিই সই। এই ভেবে দাদাই অন্ধকারের মধ্যে একটা বড়সড় ফুটি দু-হাতে ধরে টান মেরে তুলতে গেল আর সঙ্গে-সঙ্গেই ফুটিটা 'বাপরে মারে! কোন অপোগণ্ড আমার ঘাড়টা ভেঙে দিল রে!' বলে চিৎকার শুরু করল।
দাদাই একই সকালে দ্বিতীয়বার তটস্থ হয়ে পড়ল। এতই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে মুখ দিয়ে শুধু 'ফু ফু ফু ফু' করে একটা শব্দ বার হচ্ছিল। 'ফুটি কেমন করে চেঁচায়' এই সহজ কথাটাও পুরোপুরি বলে উঠতে পারছিল না।
অবশ্য কিছু বলার দরকারও পড়ল না। মুহূর্তের মধ্যে বালির স্তূপ ঠেলে সরিয়ে একজন সিড়িঙ্গে মতন লোক তেড়েমেড়ে উঠে দাঁড়াল। দাদাই বুঝতে পারল, ফুটি ভেবে সে এই লোকটারই মুণ্ডিত মস্তক ধরে টান মেরেছিল।
লোকটি প্রায় সাতফুট লম্বা, ডিগডিগে রোগা। গায়ের রং ধবধব করছে ফরসা। চুল দাড়ি গোঁফ সব পরিষ্কার করে কামানো। আরেকটা বিশেষত্ব হল, দুটো চোখের মণি দু-কোনায় ফিক্সড। মানে ভয়ঙ্কর ট্যারা।
লোকটা কোমরে দু-হাত রেখে চিৎকার করে বলল, কে রে তুই শয়তানের অনুচর, আমার নিরানব্বই ঘণ্টার যোগসমাধির পাকাঘুঁটি এইভাবে জোচ্চুরি করে কাঁচিয়ে দিলি?
ততক্ষণে প্রাথমিক শক কাটিয়ে দাদাইয়ের মধ্যে থেকেও গোয়াবাগানের বিপ্লবীঘেঁষা ছেলেটা বেরিয়ে এসেছে। দাদাইও কোমরে দু-হাত রেখে সমান মেজাজে উত্তর দিল,—আমি কে সেটা জেনে লাভ নেই। কিন্তু আপনি কোন আক্কেলে এমন খোলা জায়গায় মুণ্ডুটুকু বার করে শুয়ে আছেন? ধ্যান করবেন তো নিজের ঘরে শুয়ে করতে পারেন না?
দাদাইয়ের মেজাজ দেখে লোকটা কেমন যেন ফুস করে নিভে গেল। মিয়োনো গলায় বলল, ওরে বাপধন আমার! মুনি-ঋষিদের কি আর নিজের ঘর বলে কিছু থাকে? যাগগে, এমনিতেই আমি বুঝতে পারছিলাম এ যাত্রায় আমার সিদ্ধিলাভ হবে না। আর ঘণ্টাখানেক বাদে নিজেই উঠে পড়তাম, না-হয় তার খানিক আগেই তুই আমাকে তুলে দিলি। তাতে এমন কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি।
দাদাই জিগ্যেস করল, কেমন করে বুঝলেন, সিদ্ধিলাভ হবে না?
লোকটা কাঁচুমাচু গলায় বলল, বড্ড খিদে পেয়ে গেছে যে। চোখ বুজলেই ঈশ্বরের বদলে গব্যঘৃতে ভাজা লুচি, হিং দিয়ে ছোলার ডাল, বুঁদিয়ার রায়তা, দরবেশ এইসবের ছবি দেখছিলাম। বীজমন্ত্রের বদলে কানে বাজছিল ডুবো তেলে বেগুন ভাজার কলকল শব্দ। তা বাপ, তোর কাছে খাবারদাবার কিছু আছে নাকি? থাকলে একটু খাইয়ে এই ত্রিকালজ্ঞ ঋষির প্রাণটা বাঁচা।
দাদাইয়ের মনটা চিরকালই খুব নরম। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি কিনা সেটা পরে বোঝা যাবে, আপাতত একজন রোগা লোক খেতে চাইছে এটাই যথেষ্ট। ভাঙা লক্ষ্মীভাঁড়ে ফুটির রসে চকো-পাউডার মিশিয়ে দাদাই লোকটিকে খেতে দিল। লোকটিও তাই খেয়ে দাদাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিশুদ্ধ সংস্কৃতে ঝাড়া সাতমিনিট ধরে আশীর্বাদ করলেন। তারপর বাংলায় বললেন, ওরে, এ কী অমৃত তুই আমাকে খাওয়ালি? খিদে তো মিটলই, উপরন্তু শরীরে যা এনার্জি পাচ্ছি, মনে হচ্ছে এক্ষুনি একলাফে গোমুখ চলে যাই। সেখানে গিয়ে পুনর্বার ধ্যানে বসি।
দাদাই বলল, সেই ভালো। ওখানে আপনি যত ইচ্ছে বরফের ওপর মুণ্ডু বার করে শুয়ে থাকুন, কেউ টান মারবে না। অবিশ্যি এক যদি ইয়েতি বা স্নো-লেপার্ডে না দেখে ফেলে। আচ্ছা, আমি চলি। না-হলে ট্রেন ফেল করব।
লোকটি তাই শুনে বললেন, দাঁড়া দাঁড়া। চলি বললেই কি এমন উপকারী ছেলেকে চলে যেতে দেওয়া যায়? একটু ভাবতে দে। তারপর কিছুক্ষণ দাদাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন,—হুঁ, তোর নাম বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। পিতা গোলোকনাথ চক্রবর্তী। তিনি কাল সকালে তোকে খড়ম পেটা করেছিলেন। তুই মায়ের লক্ষ্মীভাঁড় চুরি করে বাড়ি থেকে পালিয়েছিস। চুরি করাটা অন্যায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাড়ি থেকে পালানোটাকে অন্যায় বলতে পারছি না। এই কর্মের ফলে তুই-যে শুধু নিজের অন্নসংস্থান করবি তাই নয়, বহু মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিবি।
দাদাই সঙ্গে-সঙ্গে বালির ওপরে ডাইভ মেরে ঋষিটির পা জড়িয়ে ধরল। বলল, ঋষিবর, না বুঝে আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফেলেছি। আমাকে মাফ করুন। আপনি তো দেখছি সত্যিই ত্রিকালজ্ঞ। তো, আমি যে আপনাকে চকো...ইয়ে অমৃত খাওয়ালাম, আমাকে একটা বর-টর দেবেন না?
ঋষি বললেন, কী বর চাস?
সামনের বারের ম্যাট্রিকের সবক'টা প্রশ্নপত্রের অ্যাডভান্স-কপি। ইয়ে...সম্ভব হলে উত্তরসমেত।
ঋষি বললেন, দ্যাখ বাবা বিষ্টুপদ! একে তো অমন অন্যায় কাজ আমি করতে পারব না। আর দ্বিতীয়ত, তোকে প্রশ্নপত্র জল দিয়ে গুলে খাইয়ে দিলেও তুই যে পাশ করতে পারবি না সেটা তুই ভালোই জানিস। গতবার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পিতাপুত্রের বয়সের অঙ্কে তোর উত্তর বেরিয়েছিল পিতার বয়স পনেরো আর পুত্রের বয়স পঁয়তাল্লিশ। ফিজিক্স পরীক্ষায় 'সাহারায় কেন মরীচিকা দেখা যায়'—এর উত্তরে তোদের পাড়ার ডাক্তার মনতোষ সাহা রায়ের মেয়ে মরীচিকা সাহা রায়কে নিয়ে একপাতা প্রবন্ধ লিখে এসেছিলিস। আর কত বলব? দিব্যনয়নে তোর পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে আমার মতন শান্ত লোকেরও মাথায় খুন চেপে যাচ্ছে।
এই বলে ঋষিটি সমুদ্রের ঠান্ডা জল আঁজলায় নিয়ে চোখে আর ঘাড়ে থাবড়াতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে দাদাই ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল, তাহলে কী বর দেবেন?
ঋষি বললেন, বর-টর নিয়ে কী করবি? ওসব শর্টকাট রাস্তায় বেশিদূর এগোনো যায় না। তার চেয়ে বলি কী, রন্ধনশিল্পে তোর জন্মগত প্রতিভা রয়েছে। তুই আমার কাছে বছরখানেক থাক। তোকে চোল আর মল্লযুগের এইসান সব সি-ফুডের প্রিপারেশন শিখিয়ে দেব যে, তোর হাতের রান্না খাওয়ার জন্যে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসবে।
তাই হল। পরের এক-বছর দাদাই সারারাত লাঠি নিয়ে ঋষিবরের মুণ্ডু আগলাত, পাছে শেয়ালে ফুটি ভেবে কামড় না-দিয়ে বসে আর দিনের বেলায় ওনার রেসিপি অনুযায়ী সমুদ্রশসা, তারামাছ, রাক্ষুসে কাঁকড়া এইসব দিয়ে নানারকমের টেস্টি খাবার বানিয়ে ওনাকে খাওয়াত আর নিজেও খেত। একবছরের মাথায় এক ভোরবেলায় ঋষিবর বালির নীচ থেকে ভাসতে ভাসতে ওপরে উঠে জমি থেকে পাঁচ-হাত ওপরে স্থির হলেন। তারপর দাদাইকে বললেন, কায়াসাধনা কি হেলাফেলার জিনিস? এই দ্যাখ, লঘিমা-বিদ্যেটা কেমন আয়ত্বে চলে এল। এইবার ভাসতে ভাসতে পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় চলে যেতে পারব। যাবও তাই।
দাদাই ছলছলে চোখে বললেন, তাহলে আমার কী হবে, ঋষিবর?
ঋষিটি দাদাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, সে কীরে? এখনো চিন্তা করছিস? শোন। আর-এক বছরের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হবে। এই ফুটিডাঙার ওপর দিয়েই নতুন হাইওয়ে চলে যাবে সাউথ-ইন্ডিয়ার দিকে। তুই এখানেই জমি কিনে একটা রেস্তোরাঁ শুরু কর। এই একবছর ধরে যা-যা শেখালাম সেগুলোই রেস্তোরাঁর মেনুতে রাখবি। দেখবি, তোকে আর পয়সার জন্যে ভাবতে হবে না। এই বলে ঋষিবর পোঁ করে আরো দশহাত ওপরে উঠে গেলেন।
ওপরের দিকে তাকিয়ে দাদাই আকুল হয়ে বললেন, প্রভু, কোথায় চললেন সেটা তো বলে যান। না-হলে আপনার সঙ্গে দেখা করব কেমন করে?
হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতেই ঋষিবর উত্তর দিলেন, সত্তর বছর পরে তোর ব্যবসায় একটা ফাঁড়া আসবে। আমি নিজের হাতে কাটান না দিলে আর কেউ সেদিন তোকে বাঁচাতে পারবে না। তখন আবার আমি আসব। কিছু মনে করিস না। কোথায় যাব বলতে পারছি না কারণ সেটা নিজেই এখনও ঠিক জানি না। আপাতত যেদিকে দু-চোখ যায় চলে যাব। আচ্ছা, এখন আসি।
বললেন বটে 'এখন আসি'। কিন্তু মোটেই যেতে পারলেন না। বাকসিদ্ধ ঋষি তো...ওই যে একবার বলে ফেলেছিলেন 'যেদিকে দু-চোখ যায় চলে যাব', ওইটিই হয়েছিল মুশকিল। বলার সময় মনে ছিল না, ওনার দুটো চোখ দুদিকে যায়। ফলে একবার ডানদিকে একবার বাঁদিকে কাটা ঘুড়ির মতন লাট খেতে খেতে ঋষিবর হাঁপিয়ে উঠলেন। ব্যাপারটা ধরতে পেরে দাদাই-ই আবার চেঁচিয়ে বলল, শিগগির চোখ বন্ধ করুন ঋষিবর। বলুন, নাক বরাবর যাব।
ঋষিবর এবার তাই করলেন এবং হুশ করে সমুদ্রের ও-পাড়ে মিলিয়ে গেলেন। দাদাই ও ফুটিডাঙার কমিশনার সাহেবের কাছ থেকে লক্ষ্মীভাঁড়ের অবশিষ্ট এগারো টাকা সাতআনা দিয়ে সাত বিঘে পোড়ো জমি কিনে একটা চালাঘরের রেস্তোরাঁ বানিয়ে ফেলল।
গুরুদেবের ভবিষ্যদ্বাণী মতন পরের বছরেই দেশ স্বাধীন হল। দাদাইয়ের সেই পোড়ো জমির গা ঘেঁষে বিশাল হাইওয়ে তৈরি হল। সেই হাইওয়ে দিয়ে প্রতিদিন গড়ে আট-হাজার মালবাহী ট্রাক মেডিসিন থেকে মসলিন, টমেটো থেকে টারবাইন সমস্তরকমের মাল নিয়ে ভারতের উত্তর-দক্ষিণে যাতায়াত করতে শুরু করল আর সেই ড্রাইভারদের মধ্যে অনেকেই দুপুরের আর রাতের খাবারের জন্যে দাদাইয়ের রেস্তোরাঁটাকেই সুবিধাজনক মনে করল।
ট্রাক-ড্রাইভারদের মুখে-মুখেই দাদাইয়ের রেস্তোরাঁ 'ফুটিডাঙা ফুডহাউস-এর নাম কোয়েম্বাটুর থেকে কোলকাতা অবধি ছড়িয়ে পড়ল। ক্রমশ সবাই মেনে নিল সি-ফুডের এমন আশ্চর্য আয়োজন কোথাও নেই।
আগে তো শুধু ট্রাক-ড্রাইভার আর লরির খালাসিরা এখানে খেতে আসতেন। আজকাল শহরের টুরিস্টরাও লং-ড্রাইভে পুরী পৌঁছনোর আগে ফুটিডাঙায় গাড়ি দাঁড় করান সি-ফুডের লোভে। তাদের মধ্যে অনেকেরই মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া কিংবা জাপানের মতন সি-ফুডের স্বর্গরাজ্যগুলো ঘোরা হয়ে গেছে। তবু তাঁরাও একবাক্যে স্বীকার করেন, ফুটিডাঙা ফুডহাউসের মতন এমন আশ্চর্য সুন্দর স্বাদ তাঁরা কোনও দেশের খাবারে পাননি।
প্রথম থেকেই আরো একটা ব্যাপার দাদাইয়ের সুনাম বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। কীভাবে যেন সেই সত্তরবছর আগেই প্রচার হয়ে গিয়েছিল যে, এই রেস্তোরাঁর সমস্ত রেসিপি নাকি এক যোগীপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া। তাই এখানকার খাবার খেলে অসুখ-বিসুখ তো হয়ই না, উল্টে আয়ু বেড়ে দু-গুণ হয়ে যায়। আমি দাদাইয়ের মুখে অবশ্য নিজের তৈরি খাবার নিয়ে এরকম কোনও দাবি কখনও শুনিনি। তবে গুজবের তো আর বাপ-মা থাকে না, সে নিজের মনেই ছড়িয়ে পড়ে।
বাবা বলে, ইচ্ছে করলে দাদাই নাকি কলকাতা পুনে ব্যাঙ্গালোরের মতন বড়-বড় শহরেও কয়েকটা ব্র্যাঞ্চ খুলতে পারত, কিন্তু ঋষিবরের স্মৃতিধন্য ফুটিডাঙা ছেড়ে আর কোথাও যাবে না বলেই দাদাই ওই ফুটিডাঙা ফুডহাউস নিয়ে সন্তুষ্ট রয়েছে।
তাছাড়াও আরও একটা কারণ রয়েছে—সেটা নিশ্চয় তোমরা আন্দাজ করতে পারছ। গুরুদেব যে সব মালমশলা দিয়ে দাদাইকে রান্না করতে শিখিয়েছিলেন, তার অনেকগুলোই ফুটিডাঙার সমুদ্রসৈকতে ভোরের জোয়ারে ভেসে আসে। দাদাই সেগুলোর চেহারাটুকুই চেনে কিন্তু নাম জানে না। দাদাইয়ের বিশ্বাস, শুধু ফুটিডাঙার সমুদ্রের জলেই ওদের জন্ম হয় আর সেই জলের গভীর থেকেই ওরা ঋষিবরের আশীর্বাদে প্রতিদিন দাদাইয়ের রান্নাঘরের উদ্দেশে ভেসে আসে। সেইজন্যেই ফুটিডাঙা ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া দাদাইয়ের পক্ষে সম্ভব হল না।
দাদাই এখনো রোজ ভোরে দুজন কর্মচারীকে নিয়ে ফুটির খেত পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে হাঁটতে যায়। আমি এখানে থাকলে আমিও যাই। ফেরার পথে ওই কর্মচারী দুজন ঝুড়ি ভর্তি করে দাদাইয়ের দেখিয়ে দেওয়া নানারকমের সমুদ্রশৈবাল, কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি কুড়িয়ে আনে। তার সঙ্গে কুমড়ো বেগুন কাঁচকলা ইত্যাদি মিশিয়ে দাদাইয়ের অনেকদিনের বিশ্বস্ত রাঁধুনি বুদ্ধিধরকাকা সারাদিন ধরে নানারকমের অমৃত রাঁধে। সেসব রান্না অবশ্য দাদাই-ই তাকে হাতে ধরে শিখিয়েছে।
ওই ঝিনুক-শামুক কুড়োতে গিয়েই সেই কাণ্ডটার সূত্রপাত হল, যেটার কথা তোমাদের তখন থেকে বলতে চাইছি।
ঠিক সাত দিন আগের ঘটনা। আমি, দাদাই, বিশুদা আর চম্পকদা সেদিন ভোরবেলায় সি-বিচে ঘুরতে গেছি। বিশুদা আর চম্পকদার বয়স কুড়ি-বাইশ মতন হবে। ওরা দাদাইয়ের হোটেলে কাজ করে। ওদের কাঁধে দুটো বড় বড় তালপাতায় বোনা ঝুড়ি, দাদাইয়ের হাতে লাঠি আর আমার হাতে লম্বা একটা আঁকশি। দাদাই দেখিয়ে দিলে আমি ওই আঁকশিটা দিয়ে নানারকমের শ্যাওলা-ট্যাওলা টেনে পাড়ে নিয়ে আসি। বিশুদা আর চম্পকদা সেগুলো দিয়ে ঝুড়ি বোঝাই করে।
দিব্যি চলছিল আমাদের কালেকশনের কাজ। ভোরবেলা বলে সি-বিচে আমরা চারজন ছাড়া আর লোকজন ছিল না। সূর্য ওঠার আগে সমুদ্রের ওপরে যেমন হালকা একটা কুয়াশার চাদর জড়িয়ে থাকে সেদিনও তেমনি ছিল। হঠাৎ চম্পকদা বলে উঠল, ওটা কী?
চম্পকদা যেদিকে আঙুল দেখাচ্ছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখি কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা কালো মতন কিছু এগিয়ে আসছে।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে আমাদের চারজনের মধ্যে কারুর মনেই সন্দেহ রইল না যে, ওটা একটা নৌকা ছাড়া কিছু নয়। মাঝারি-সাইজের একটা নৌকা ঢেউয়ের টানে তীরের দিকে এগিয়ে আসছিল, কিন্তু সেই এগিয়ে আসার মধ্যে কোনও স্থিরতা ছিল না। বড় বড় ব্রেকারের ধাক্কায় একবার এদিকে, একবার ওদিকে আছড়ে পড়ছিল নৌকাটা। হাল ধরার কেউ নেই নাকি? সত্যিই, আমরা কোনও মাঝিকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।
নৌকা জিনিসটা ফুটিডাঙার সমুদ্রে একেবারেই আশা করা যায় না, কারণ, এখানকার জলে অনেক বড়-বড় পাথর রয়েছে। তীর থেকে সমুদ্রের দিকে নৌকা নিয়ে যেতে গেলেই সেইসব পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নৌকার তলা ছ্যাঁদা হয়ে যায়। সমুদ্র থেকে তীরে ফিরবার সময়ও একইরকম বিপদের সম্ভাবনা। ফুটিডাঙায় তাই মাছ ধরার চল নেই।
তাহলে ওটা কাদের নৌকা?
চারজনেই নিশ্চয় একই কথা ভাবছিলাম, কিন্তু সম্ভাব্য উত্তরটা দাদাইয়ের মুখ থেকেই এল। দাদাই নিজের মনেই বলে উঠল, হয়তো কোথাও কোনো জাহাজডুবি হয়েছে। সেই জাহাজের লাইফবোট ভাসতে ভাসতে এদিকে চলে এসেছে।
দাদাইয়ের মুখ থেকে শুধু কথাটা বেরোনোর অপেক্ষা। বিশুদা ঝপাং করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণপণে সাঁতার কেটে গিয়ে নৌকাটার দুটো কানা ধরে ঠেলতে ঠেলতে সেটাকে পাড়ে নিয়ে আসবার চেষ্টা শুরু করল।
একা কাজটা করতে বোধহয় ওর একটু কষ্টই হচ্ছিল, তাই দু-একবার গলা তুলে ডাক দিল—আয় না চম্পক। একটু হেল্প কর!
চম্পকদা কিন্তু তখনও নির্বিকার মুখে ওর স্মার্টফোনে উদ্ধারকার্যের ভিডিওই তুলে যাচ্ছে। অগত্যা আমিও জলে নেমে বিশুদার সঙ্গে হাত লাগিয়ে নৌকাটাকে ঠেলেঠুলে পাড়ে তুললাম। একটু বাদেই পায়ের তলায় জমি পেয়ে গেলাম। এবার বাকি কাজটুকু সারতে...মানে নৌকাটাকে শুকনো ডাঙায় তুলে আনতে চম্পকদাও হাত লাগাল।
এতক্ষণ অবধি ঢেউয়ের ঝাপটায় নৌকাটাকে ভালো করে দেখতে পাইনি। এবার দেখলাম। কাঠের তৈরি বেশ অদ্ভুত ধরনের নৌকা। কোথাও লোহার পেরেক-টেরেক দেখলাম না। খড়ের দড়ি দিয়ে কাঠের তক্তাগুলো জড়িয়ে বাঁধা হয়েছে। জোড়ের মুখগুলো আলকাতরা না কী যেন মাখিয়ে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে সমুদ্রের কাছে ওসব কিছু না। ইতিমধ্যেই তক্তাগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে। এসব দেখে আমি দাদাইকে বললাম, না দাদাই, এটা লাইফবোট কোনোমতেই নয়। আমার মনে হচ্ছে এটা কোনো উন্মাদ অভিযাত্রীর নৌকা—থর হেয়ারডালের 'কনটিকি এক্সপিডিশন' পড়ে কেউ ওই ধরনের পুরোনো আমলের জলযান বানিয়ে সমুদ্র পেরোতে গিয়েছিল। তারপর ইয়ে...যা হবার তাই হয়েছে।
চম্পকদা ভিডিয়ো-মোড পাল্টে এবার চারদিক থেকে নৌকাটার স্টিল ফোটো তুলতে শুরু করল। ফ্রেমের মধ্যে আমরাও ছিলাম নিশ্চয়, কারণ মাঝে-মাঝেই ও চেঁচাচ্ছিল—ও মালিক, একটু এদিকে মুখটা ঘোরান তো। বিল্টু, তুমি আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসো—এইসব। দাদাই হাসতে হাসতে বলল, ছবি পরে তুলবি চম্পক। আগে নৌকার ভেতরে কী আছে দেখে নে।
আমরা চারজনেই নৌকার উঁচু কিনারা ধরে পাটাতনের দিকে মুখ বাড়ালাম আর তক্ষুনি এমন শক খেলাম যে, জীবনে ভুলব না। দেখলাম, পাটাতনের ঠিক মাঝখানে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। দুটো বিশাল পোড়ামাটির হাঁড়ি দু-হাতে জড়িয়ে ধরে অবাক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর বোঁচা নাক, ছোট ছোট চোখ। পরনে একটা চোখধাঁধানো চকরাবকরা আলখাল্লা। মাথায় বিশাল পাগড়ি। মুখভর্তি সাদা দাড়িগোঁফ।
সমবয়সি বলেই বোধহয় আমাদের মধ্যে দাদাইকেই তাঁর বেশি পছন্দ হল। হাঁড়িদুটোকে ছেড়ে দিয়ে দুটো হাত আকাশের দিকে তুলে দাদাইয়ের দিকে মাথাটা একটু ঝোঁকালেন। তারপর বললেন, ত্বম নাকুরু কালিবাঙ্গান দেহি হামান ওয়াস্তা।
দাদাই নার্ভাস হয়ে বলল, হামানদিস্তা চাইছে নাকি রে বিল্টু? সে তো হোটেলে না গেলে দিতে পারব না।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবার হতাশ গলায় এবং পরিষ্কার বাংলায় বললেন, আজ্ঞে না। ওটা আমাদের সিন্ধু সভ্যতার মুখের ভাষা। ওর মানে, আমি এখানে কেমন করে এলাম?
ভারি অবাক হয়ে বললাম, ও ভাষা শিখলেন কেমন করে? এখনো তো প্রত্নতাত্বিকেরা হরপ্পার শিলালিপি পড়তেই পারেননি।
বৃদ্ধ ছোট চোখ আরও ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রত্নতাত্বিক লাগবে কেন? আমি তো মহেঞ্জোদাড়োর মানুষ। মাতৃভাষা শিখতে কারুর প্রত্নতাত্বিক লাগে? তোমার লেগেছিল?
ইতিমধ্যে চম্পকদা আর বিশুদা ওনাকে নৌকা থেকে পাঁজাকোলা করে নামিয়ে একবোতল কোকাকোলা খাইয়েছে। ফলে উনি একটু সুস্থ বোধ করছিলেন নিশ্চয়, কারণ, তারপরেই উনি নিজের সম্বন্ধে আর ওনার নৌকা সম্বন্ধে গড়গড় করে অনেক কিছু বলে গেলেন।
জানা গেল, ওনার নাম মোহনজি দারুক। বাড়ি একদম প্রপার মহেঞ্জোদাড়ো শহরে, পাবলিকের স্নানাগারের পাশের গলিতে। গতকাল রাত্রিবেলায় শ্রী দারুক একটা ছাগলের বিনিময়ে দুটো হাঁড়ি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন।
এইখানে বিশুদা যেই না জিগ্যেস করেছে, ছাগলটাকে দিয়ে দিতে হল কেন? পকেটে পয়সা ছিল না? অমনি মোহনজি বিশুদাকে উল্টে প্রশ্ন করলেন পয়সা আবার কেমন জিনিস? খায়, না মাথায় মাখে?
বিশুদা ঢোক গিলে চুপ করে গেল। আমি নিজের মনে ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই তো। মহেঞ্জোদাড়োর মানুষ পয়সা কাকে বলে জানবেন কেমন করে? তখনো তো মুদ্রার প্রচলন হয়নি। বিনিময় প্রথায় কেনা-বেচা হত।
যাই হোক, জানা গেল মোহনজি সিন্ধুনদীর ভাঁটার স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কোথাও কোনও জনপ্রাণী ছিল না। এমন সময় হঠাৎ যেন নদীর জল দু-ভাগ হয়ে মোহনজির নৌকাটাকে গিলে ফেলল। ঘন অন্ধকারে তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না, শুধুই শোঁ-শোঁ করে একটা শব্দ কানে আসছিল। মোহনজি তো ভয়ের চোটে চোখ বন্ধ করে ভগবান পশুপতিকে ডাকাডাকি করছিলেন। তবে চোখ বন্ধ থাকলেও তিনি এটা বেশ বুঝতে পারছিলেন যে, তাঁর নৌকাটা ডোবেনি। বরং মোহনজির মনে হচ্ছিল সেটা যেন আকাশে উড়ছে। নদীর নীচে আকাশ কোথা থেকে আসে সেটাও তিনি প্রাণপণে ভাববার চেষ্টা করছিলেন।
এমন সময় হঠাৎ আলো ফিরে এল, জল ফিরে এল। মোহনজি চোখ খুলে দেখলেন নৌকা আবার জলে ভাসছে; তবে নদীর জলে নয়, সমুদ্রের জলে। তীরে তার আজন্মপরিচিত মহেঞ্জোদাড়োর শষ্যাগার, পয়ঃপ্রণালী এইসবের বদলে পেল্লায় উঁচু-উঁচু ঘরবাড়ি, চওড়া রাস্তা আর চারচক্র যান দেখা যাচ্ছে, যেগুলোকে আবার গরুতেও টানছে না। কীসে টানছে পশুপতিই জানেন। তারপর তো এই আমরা নৌকাসমেত তাঁকে পাড়ে টেনে তুললাম।
এই অবধি শুনে দাদাই বলল, দাঁড়ান। একটু পায়ের ধুলো নিই। যিশুখ্রিস্টের থেকে বয়সে আপনি অন্তত দু-হাজার বছরের বড় বলেই মনে হচ্ছে। টাইম-গ্যাপে পড়েছিলেন, সেটাও নিশ্চিত। প্রশ্ন একটাই, টাইম গ্যাপে পড়লে কি মানুষ সব ভাষা শিখে যায়? বাংলা বলছেন কেমন করে?
মোহনজি তাই শুনে বললেন, হ্যাঁ, আমি নিজেও অবাক হয়ে যাচ্ছি। মনে মনে যা ভাবছি উল্টোদিকের লোকজন তার নিজের ভাষায় সেটাই শুনতে পাচ্ছে। শুধু 'লোকজন'ই বা বলি কেন? এই তো একটু আগে একপাল ডলফিনের সঙ্গেও দিব্যি কথাবার্তা চালিয়ে এলাম। ওরা আমার নৌকার পাশে-পাশেই সাঁতার কাটছিল। সমুদ্রের জলে পলিউশন নিয়ে দুঃখ করছিল।
দাদাই বলল, বাকিটা বাড়ি ফিরে শুনব। ওহে চম্পক! একটু মোবাইলটা রেখে ওনার হাতটা ধরো। দেখছ তো, কাহিল হয়ে পড়েছেন। চলো, আমার বাড়ি নিয়ে চলো ওনাকে।
চম্পকদা বেজারমুখে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে এল।
এরপর আমরা মোহনজিকে নিয়ে সোজা চলে এসেছিলাম দাদাইয়ের বাড়ি। ওনার ভাঙাচোরা নৌকাটা আর ব্যবহারের যোগ্য ছিল না, তাই সেটাকে আবার সমুদ্রেই ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। পোড়ামাটির হাঁড়িদুটোকে কিন্তু উনি কিছুতেই ছেড়ে আসতে রাজি হলেন না। কারণ হিসেবে যা বললেন, সেটাও চমকপ্রদ। উনিও দাদাইয়ের মতন একটা রেস্তোরাঁর মালিক। শুধু তাই নয়, দাদাইয়ের মতন উনিও আশ্চর্য উঁচুদরের সেফ, মানে রাঁধুনি। মহেঞ্জোদাড়োয় নাকি ব্যবসাসূত্রে সারা ভারতের লোক আসে আর তারা মোহনজির রান্না করা শূল্যপক্ক মাংস মিশ্রিত পীত অন্ন না খেয়ে শহর ছাড়ে না।
মাংস মেশানো হলুদ ভাতের কথা শুনে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, তাহলে খ্রিস্টপূর্ব দু-হাজার সালেও ভারতবর্ষে বিরিয়ানি এত পপুলার ছিল! ইতিহাস বইতে এসব কাজের কথা কেন যে লেখে না!
বুঝলাম, হাঁড়িদুটো সেইজন্যেই মোহনজি দারুকের কাছে অত জরুরি। উনি আশা করছেন, আবার একটা সুবিধেমতন সময়ের ফোঁকর খুঁজে বার করে মহেঞ্জোদাড়ো ফিরে যেতে পারবেন এবং বিরিয়ানির ব্যবসাটাও আবার চালু করতে পারবেন।
আমি, দাদাই, বিশুদা আর চম্পকদা, আমরা চারজন আর বড়ঠাম্মা ছাড়া আর কেউ জানল না মোহনজির কথা। বাড়ির দোতলায়, আমার আর দাদাইয়ের ঘরের মাঝের একটা ঘরে ওঁর থাকার ব্যবস্থা হল। ওঁকে বললাম, এই ঘর থেকে বেশি বেরোবেন না আর রংচঙে আলখাল্লাটা ছেড়ে এই পাজামা-পাঞ্জাবিটা পরে নিন। আপনার এই বিশাল পাগড়ি আর রঙিন আলখাল্লা অনর্থক লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
উনি গোমড়ামুখে গজগজ করে উঠলেন, লুকিয়ে থাকতে বলছ কেন? আমি খুন করেছি না ডাকাতি করেছি?
আমি বললাম, সেসব কিছু করেননি। তবে আপনার মূল্য যে কতখানি সেটা আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনি একটা জীবন্ত ইতিহাস। এখনো অবধি যে হরপ্পালিপির পাঠোদ্ধার করা যায়নি, সেই লিপিরহস্য আপনি একমিনিটে সমাধান করে দিতে পারেন। আপনার কথা জানাজানি হলে আপনাকে আর রক্ষা করতে পারব না, কিডন্যাপড হয়ে যাবেন। যাগগে, সেসব কথা পরে হবে এখন। আপাতত আপনি স্নান করে জামাকাপড় ছেড়ে নিন। আমরা একসঙ্গেই খেতে বসব।
ধুতিপাঞ্জাবি পরার পরে মোহনজিকে একেবারেই সাধারণ বাঙালি ভদ্রলোকের মতন দেখতে লাগছিল। কথাবার্তাতেও মহেঞ্জোদাড়োর থেকে মেদিনীপুরের টানটাই যেন বেশি লাগল। ওনাকে সে কথা বলায় অবশ্য উনি সেই পুরনো কথাই বললেন—উনি নাকি আদৌ কোনো কথাই বলছেন না। উনি শুধু কথাগুলো মনে মনে ভাবছেন আর আমরা সেগুলোকে নিজেদের টানটোন মিশিয়ে শুনছি। তা হবে হয়তো। পৃথিবীতে কতরকমের আশ্চর্য ঘটনাই তো ঘটে।
মোহনজিকে খাইয়ে বড়ঠাম্মা ভারি খুশি হল। কে বলবে ওনার চার হাজার বছরের ওপর বয়স? আমাদের তিনজনের ভাত একাই খেলেন। তবে খেতে খেতে বারবারই বলছিলেন আমাদের সিন্ধুনদীতে এই পার্শেমাছটা পাওয়া যায় না, আমাদের শালিধানের চালগুলো আরেকটু মোটা হলেও বেশি মিষ্টি, আমরা চিকেন খাই না, তিতিরপাখি খাই, ইত্যাদি। একবার বলতে গেলাম, ওগুলো সব পাস্ট-টেন্স হবে—'মাছটা পাওয়া যেত না, চালটা বেশি মিষ্টি ছিল, তিতিরপাখি খেতাম'। কিন্তু দাদাই প্রায়ই বলে, মা ব্রুয়াৎ অপ্রিয়ম সত্যম। মোহনজির গোটা জীবনটাই যে এখনকার পৃথিবীর চোখে পাস্ট টেন্স হয়ে গেছে সে কথাটা সত্যি হলেও মোহনজির নিশ্চয় শুনতে ভালো লাগবে না। তাই চেপে গেলাম।
রাত অবধি তেমন কিছুই হল না। রাতের খাবার খাওয়ার পরে দাদাই সিঁড়ির মুখের কোলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে নিজের ঘরে শুতে চলে গেল। ঠাম্মি তো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমারও সারাদিনের উত্তেজনায় ঘুম পাচ্ছিল খুব। তাই শুয়ে পড়লাম, ঘুমিয়েও পড়লাম তখনই। কিন্তু একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তিতে মাঝে মাঝে ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল কী যেন একটা দেখেছি, যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে করতে পারছি না, কিন্তু মনে করতে পারলে একটা বড়সড় বিপদ এড়ানো যেত।
শেষমেষ একেবারে ভোররাতে মনে পড়ে গেল সেই অসঙ্গতিটার কথা, যেটার কথা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। কথাটা আর কিছুই নয়, মোহনজির নৌকায় লোহার ব্যবহার ছিল না ঠিকই, কিন্তু ওনার রঙিন আলখাল্লাটার গলার কাছে একটা বড়সড় বোতাম ছিল। যদ্দুর মনে পড়ছে বোতামটা পোড়ামাটিরই তৈরি ছিল, যেমন পোড়ামাটির বোতাম মহেঞ্জোদাড়োর খননস্থলে অনেক পাওয়া গেছে। কিন্তু সিন্ধুসভ্যতার সময়ে সেগুলোর ব্যবহার ছিল গয়না কিংবা সিলমোহর হিসেবে। পোশাকের বোতামঘরে বোতাম লাগিয়ে সেটাকে ধরে রাখার বিদ্যে মানুষ শিখল এই তো সেদিন—থার্টিন্থ সেঞ্চুরিতে। তাহলে মোহনজির আলখাল্লায় বোতাম এল কোথা থেকে?
তার মানে লোকটা জোচ্চোর, ফ্রড। আমি লাফ মেরে বিছানা থেকে নেমে পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বিছানা ফাঁকা, কেউ নেই।
ওয়াশরুমে কেউ নেই, ডাইনিং হলে না, কিচেনেও না।
শেষ অবধি বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম লোহার রেলিং-এর সঙ্গে মোহনজির পাঁচ-গজ পাগড়ির একপ্রান্ত বাঁধা, অন্য দিকটা লনের কাছাকাছি ঝুলছে।
মোহনজি পালিয়েছেন।
আমার চেঁচামেচিতে সবাই উঠে পড়ল। খবর শুনে দাদাই খুব গম্ভীর গলায় বলল, মানুষকে অবিশ্বাস করাটা ভালো কাজ নয় বিল্টু। পালাবেন কেন? উনি আবার টাইম-গ্যাপে পড়ে মহেঞ্জোদাড়োয় ফিরে গেছেন। সবই তাঁর ইচ্ছা। ব্রহ্মময়ী তারা। পার করো মা, পার করো।
আমি তবু গোঁয়ারের মতন জামার বোতামের কথা, পাগড়ির কথা এইসব বলতে লাগলাম। দাদাই বলল, উনি যদি জোচ্চোরই হন, তাহলেও তুই বল তো, একবেলা আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে ওনার কী লাভ হল?
এই প্রশ্নটার উত্তর সেদিন আমি দিতে পারিনি। পরেরদিন সকালবেলায় আর উত্তর দেওয়ার দরকারই রইল না। এমনিতেই সবাই সব বুঝে গেলাম। কারণ, পরপর কয়েকটা জিনিস ঘটে গেল।
এক, ভোরবেলায় সমুদ্রের তীরে হাঁটতে যাওয়ার সময় অনেক ডাকাডাকি করেও চম্পকদাকে পাওয়া গেল না। ফুডহাউসের পেছনদিকে একটা ঘরে চম্পকদা থাকত। আমরা সেই ঘরে গিয়ে দেখলাম, উইথ ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ সে হাওয়া।
দুই, বেলা একটু বাড়তেই চোখে পড়ল, পুরো ফুটিডাঙা জুড়ে, বিশেষ করে ফুটিডাঙা ফুডহাউসের আশেপাশের বাড়ির পাঁচিলে, লেটারবক্সের গায়ে, নারকোল গাছের গুঁড়িতে আর রিকশার পেছনে কারা যেন অজস্র হ্যান্ডবিল সেঁটে দিয়ে গেছে। তাতে লেখা—
সিন্ধু বিরিয়ানি হাউস
চোল পহ্লব যুগের সি-ফুড তো অনেক খেলেন। এবার চেখে দেখুন মহেঞ্জোদাড়োর বিরিয়ানি। প্রাগৈতিহাসিক রাঁধুনির নিজের হাতে রান্না করা বিরিয়ানি খেয়ে যান। মাত্র দশটাকা প্লেট। শুভ উদ্বোধন আগামী পয়লা জানুয়ারি।
তিন, বিকেলের মধ্যেই চম্পকদার মোবাইলে তোলা সেই স্টিল-ফোটো আর ভিডিয়োগুলো সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেল। মোহনজির নৌকা তীরে এসে লাগছে। মোহনজি নৌকার পাটাতনের ওপর হাঁড়ি আঁকড়ে ধরে বসে আছেন। তিনি আমাদের সামনে তাঁর আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বলছেন আর দাদাই টাইম-গ্যাপ দিয়ে তার ব্যাখ্যা করছে—এই সব ছবিই লোকের হাতে-হাতে, থুড়ি, ফোনে-ফোনে ঘুরতে লাগল। বিশেষ করে ফুটিডাঙার স্কুল, কলেজ আর নাগরিকদের গ্রুপগুলোর ওয়ালে এইসব ছবিতে যা লাইক আর কমেন্ট পড়তে শুরু করল বলার নয়।
সেইসব কমেন্ট দেখে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলাম। সবারই বক্তব্য মোটামুটি এক—বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর মতন মহান লোকের সামনে যা ঘটে গেছে তা কখনোই ফোটোশপের কেরামতি হতে পারে না। উনি কোনওরকম চালাকির আশ্রয় নেবার মানুষই নন। ছেলেখেলারও বয়স নেই ওনার। কাজেই মোহনজি সত্যিই মহেঞ্জোদাড়োর মানুষ।
এইখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। ফুটিডাঙার বহু মানুষ দাদাইয়ের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। তার কারণ, দাদাইয়ের রেস্তোরাঁকে কেন্দ্র করে এখানে একটা বেশ বড়সড় বাজার তৈরি হয়ে গেছে। ফুটিডাঙা ফুডহাউসের সামনে প্রতিদিন শয়ে-শয়ে ট্রাক দাঁড়াচ্ছে। পর্যটকেরাও পুরীতে পৌঁছনোর আগে ফুটিডাঙায় গাড়ি থামিয়ে সি-ফুড দিয়ে অভিনব লাঞ্চ সেরে যাচ্ছে। দাদাইয়ের হোটেলে যারা খেতে আসেন তারাই সেই বাজারের কাস্টমার। তাদের জন্যেই রেস্তোরাঁর গেটের দুদিকে সারি সারি মিষ্টির দোকান, শাড়ির দোকান, হস্তশিল্পের দোকান এইসব বসে গেছে। সেগুলোরও বয়স কম হল না। দাদাইয়ের রেস্তোরাঁর কল্যাণে সেই দোকানগুলোও ভালোই চলে।
চলে না শুধু অন্য কোনো রেস্তোরাঁ। এতবছরের মধ্যে আরও দু-চারজন যে সেরকম চেষ্টা করেনি তা নয়, কিন্তু কোনোটাই চলেনি। ফুটিডাঙা ফুডহাউসের বিপুল জনপ্রিয়তা, গুড-উইল আর কী বলব, কিছুটা দাদাইয়ের ওই স্বপ্নাদ্য রেসিপি নিয়ে ভক্তিটক্তির জেরেই এর আগে যে-ক'টা রেস্তোরাঁ খুলেছিল, সবকটাই বড়জোর এক-দু-বছর চলেই উঠে গেছে। তবে দাদাইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যারা হেরে গিয়েছিলেন তারাও ব্যাপারটা খুব স্পোর্টিংলি-ই নিয়েছিলেন এতদিন। তাদের মধ্যে অনেকেই দাদাইয়েরই সাহায্য নিয়ে অন্য লাইনে ফলাও কারবার করছেন। তাদের আমি সন্ধেবেলায় দাদাইয়ের সঙ্গে বসে গল্পগুজবও করতে দেখেছি।
তবে চম্পকদা অন্য টাইপের ছেলে। সে বেশ আটঘাঁট বেঁধেই কাজে নেমেছে এবং দাদাইয়ের শিলনোড়া দিয়েই দাদাইয়ের দাঁতের গোড়া উপড়োবার ব্যবস্থা করেছে। কেন সেটা বলি।
মোহনজি গায়েব হবার পর দুদিন যেতে না-যেতেই ফুটিডাঙা ফুডহাউসের লাগোয়া একটা খালি জমিতে বেশ বড়সড় একটা ঘর উঠে গেল। শালগাছের খুঁটির ওপরে খড়ের চালা। ছাদের ওপর আলো-জ্বালানো সাইনবোর্ডটা লেগে গিয়েছিল ঘর শেষ হওয়ার আগেই। তার গায়ে বাংলা ইংরিজি আর ওড়িয়া হরফে লেখা ছিল 'মহেঞ্জোদাড়ো বিরিয়ানি হাউস। প্রোপ্রাইটর চম্পকবরণ জানা'।
ইতিমধ্যে হ্যান্ডবিল আর সোশাল মিডিয়ায় ছবির কল্যাণে কারুর বুঝতে বাকি ছিল না—কীসের জন্যে, কে ওই বিশাল চারচালা বানাচ্ছে। তাই শয়ে-শয়ে লোক হা করে সেই উদীয়মান রেস্তোরাঁর দিকে তাকিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, বিষ্ণুপদ চক্রবর্তীর মতন লোক যখন সিন্ধু-সভ্যতার রাঁধুনিকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করেছেন, তখন সে অরিজিনাল না হয়ে যায়ই না। এখন শুধু সেই আশ্চর্য রাঁধুনিকে চোখে দেখা আর তার রান্না সিন্ধু-বিরিয়ানি চেখে দেখার অপেক্ষা।
চম্পকদা ওর নতুন রেস্তোরাঁ তৈরির তদারকি করতে করতে কান খাড়া করে পাবলিকের এইসব কথাবার্তা শুনত আর শয়তানের মতন মিচকি মিচকি হাসত। আমাকে দেখলে এমন হাবভাব করত যেন চেনেই না। খুব দুঃখ পেতাম। বড়ঠাম্মার কাছেই গল্প শুনেছি, চম্পকদার বাবা-মা দুজনেই দাদাইয়ের হোটেলে কাজ করতেন। স্মল-পক্সে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহের ভেতরে তাঁরা দুজনেই মারা যান। চম্পকদার তখন মাত্র সাত বছর বয়স।
সেই সাত বছরের বাচ্চাকে বড়ঠাম্মা আর দাদাই-ই বুকে করে মানুষ করেছে। ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়িয়েছে। তারপর চম্পকদা নিজেই নাকি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। তখন দাদাই চম্পকদাকে ফুটিডাঙা ফুডহাউসের কাজে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। হিসেবের মাথা পরিষ্কার বলে চম্পকদা আস্তে আস্তে রেস্তোরাঁর ক্যাশিয়ারের জায়গাটাও পেয়ে গিয়েছিল।
যেদিন চম্পকদা ফুটিডাঙা ফুডহাউস ছেড়ে চলে গেল, তার ঠিক দু-দিন পরে দুপুরে দাদাইয়ের সঙ্গে দাবা খেলতে খেলতে নিজের মনে বলে ফেলেছিলাম, চম্পকদা এত পয়সা কোথা থেকে পাচ্ছে কে জানে।
দাদাই আমার কথা শুনে একটু ইতস্তত করে বলল, কথাটা কাউকে বলব না ভেবেছিলাম। তুই জানতে চাইলি বলে বলছি। বুঝলি বিল্টু, আজ অনেকদিন বাদে আমি নিজে হিসেবের খাতাপত্র খুলে বসেছিলাম। এসব কাজ তো চম্পকই করত। ভাবলাম, ও তো আর নেই। নিজেই আবার শুরু করি।
কী বলব তোকে, খাতা খুলে হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখি, গত ছ'মাস ধরে রেস্তোরাঁর ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্টে প্রায় সাত লক্ষ টাকার ক্যাশ জমাই পড়েনি। এবার বুঝতে পারছিস, চম্পক ওর বিরিয়ানি-হাউস বানানোর টাকা কোত্থেকে পাচ্ছে?
চম্পকদার কাণ্ড শুনে আমি দাদাইকে জিগ্যেস করেছিলাম, পুলিশে খবর দেবে না? এ তো রীতিমতন ক্রাইম।
দাদাই মুখ শুকনো করে বলেছিল, মুশকিল কী জানিস? তোর বড়ঠাম্মা চম্পককে ভীষণ ভালোবাসে। ও পালানোর পর থেকে এমনিতেই খুব মনমরা হয়ে রয়েছে। তার ওপরে এইসব কুকীর্তির কথা যদি জানতে পারে, তাহলে তো মরেই যাবে। তাই ঠিক করেছি কাউকে কিছু বলব না।
মন কি একা বড়ঠাম্মারই খারাপ? আমাদের সবারই তো মনখারাপ। সেই মনখারাপ নিয়েই একদিন বিকেলের দিকে সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে সেই জায়গাটায় চলে এলাম, যেখানে ঝাউবন শুরু হয়েছে। খুব সুন্দর এই জায়গাটা। ঝাউয়ের পাতার মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার শনশন শব্দ, ধু-ধু বালি চরার ওপরে রঙবেরঙের ঝিনুক, লালকাঁকড়াদের দৌড়োদৌড়ি। কিছুক্ষণ এখানে চুপ করে বসে থাকলে এমনিতেই যে-কোনওরকমের মনখারাপ সেরে যায়।
বসেই ছিলাম একটা ছোটখাটো বালির ঢিবির ওপরে। বসে বসে মোহনজির কথা ভাবছিলাম। লোকটা যে মহেঞ্জোদাড়ো থেকে আসেনি সেটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কোথা থেকে এসেছে তাহলে? আসল নামটাই বা কী?
পেছন থেকে কে যেন বলল, ওর আসল নাম খগেন নাটুয়া। লাইনের লোকজন সম্মান দিয়ে বলে খগেন কাটুয়া। পকেট কাটা, সিঁদ কাটা, গলার সোনার চেন কাটা—এইসব কাটাকাটির কাজে ওর তুল্য কেউ এদিকে নেই। তাই কাটুয়া।
যে-প্রশ্ন আমি মুখে উচ্চারণ করিনি, শুধু মনে মনে ভেবেছি, তার উত্তর দেয় কে? ভয়ে আর বিস্ময়ে আমি জমে পাথর হয়ে গেলাম। একটা বড়সড় লালকাঁকড়া সেই সুযোগে আমার বাঁ-হাত দিয়ে উঠে গলায় একটা চক্কর খেয়ে ডান হাত বেয়ে নেমে গেল। কিছু করতে পারলাম না।
ইতিমধ্যে পেছন থেকে আবার কথা ভেসে এল—বাড়ি কোথায় জানতে চাইছিলে না? খগেনের বাড়ি ফুটিডাঙা থেকে চার কিলোমিটার দূরে কাশিবাড়ি গ্রামে।
কোনওমতে নিজেকে বোঝালাম, শোনো বিল্টু, তুমি ক্লাস নাইনে পড়ো। তোমার নাকের নীচে হালকা গোঁফ গজিয়েছে। গলাটাও ভারী হচ্ছে। ভয়ে কাঠ হয়ে যাওয়াটা তোমাকে মোটেই মানায় না। তারপর বড় করে তিনবার শ্বাস নিয়ে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম এবং ওই এক মুভমেন্টেই পেছনদিকে ঘুরে গেলাম।
সিড়িঙ্গে মতন লোকটা একটা ঝাউ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল। সে বোধহয় ভাবতে পারেনি আমি অমন স্প্রিঙের পুতুলের মতন লাফিয়ে উঠব। চট করে একটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে সরে গিয়ে সেখান থেকেই মুখ বার করে বলল, এ কী! বুড়োমানুষকে এরকম করে ভয় দেখায় নাকি?
আমি বললাম, কে কাকে ভয় দেখিয়েছে মশাই? আপনি যে আমার মন পড়ছিলেন, তার বেলা? এই দেখুন, ভয়ের চোটে আমার হাতের চেটো কেমন ভিজে গিয়েছে।
তাই নাকি? হে হে হে হে। তাহলে তো শোধবোধ হয়েই গেল—বলতে বলতে লোকটা গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে আমার দিকে দু-পা এগিয়ে আসতেই দেখলাম, তার পরনে সাদা ধুতি আর উড়নি। তিনি প্রায় সাত ফুট লম্বা, গায়ের রং ফর্সা, চুল দাড়ি সব পরিষ্কার করে কামানো আর...আর দুটো চোখের মণি দুদিকে ফিক্সড।
আমি বললাম, স্যার! ঋষিবর! আপনি এসে গেছেন?
ফুটিডাঙা স্টেশন-রোডের ধারে একটা থার্ডক্লাস হোটেলের নামটা বেশ বাহারের—টুটিফুটি। সেই হোটেলেরই একটা ঘরে ভাঙা তক্তাপোশের ওপরে ঋষিবরের মুখোমুখি বসেছিলাম। ঘরটা একেই ড্যাম্প ধরা, স্যাঁতসেঁতে। তার ওপরে জানলায় লাগানো তারের জালগুলোও ছিঁড়ে গেছে। আমাদের ঘিরে তাই লক্ষ-লক্ষ মশা পিলপিল করছিল। চাপড় দিয়ে দু-একটাকে মারতে মারতে বললাম, এত মশা কামড়াচ্ছে। ডেঙ্গু-টেঙ্গু না হয়ে যায়।
বলামাত্রই ঋষিবর ঝুলির ভেতর থেকে একটা ঘন-সবুজ রঙের চামচিকে বার করে ঘরের ভেতরে ছেড়ে দিলেন আর সেই চামচিকেটাও দিব্যি মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত মশাটশা খেয়ে নিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে আবার ওনার ঝুলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। ঋষিবর গর্বিত গলায় বললেন, এ-জিনিস সব জায়গায় পাবে না। পিরেনিজ পর্বত থেকে কয়েকটা নিয়ে এসেছিলাম। তোমাকে দুটো দেব।
তারপর আমার কিনে আনা পটেটো চিপসের প্যাকেটটা থেকে চিপস খেতে খেতে বললেন, শোনো ভাই বিল্টু। তোমার দাদুকে আমি সত্তর বছর আগেই বলেছিলাম...
আমি বললাম, জানি। বলেছিলেন, সত্তর বছর বাদে ওনার ব্যবসায় একটা বিপর্যয় নেমে আসবে আর তখন ওনাকে বাঁচাতে আপনি আবার দেখা দেবেন।
ঋষিবর বিগলিত হেসে বললেন, বিষ্টুটা তোমাকে সবই বলে দিয়েছে দেখছি। পাগল ছেলে।
ওনার কথার ধরনে একটু চমকে গেলাম, কারণ উনি যাকে 'বিষ্টু' বলছেন, 'পাগল ছেলে' বলছেন, তাঁর মাথাভর্তি পাকা চুল; চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। দাঁতগুলোও সব বাঁধানো। এদিকে ঋষিবরের চেহারাটা তো দেখছি সত্তর বছরেও একটুও বদলায়নি।
কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, সেই দুঃসময় এসে গেছে স্যার। আপনাকে আর নতুন করে কী বলব? আপনি তো ত্রিকালজ্ঞ।
ঋষিবর বললেন, চম্পককে নিয়ে ভাবছ তো? ঘাবড়িও না। ও যতই ওস্তাদ হোক, যাকে পার্টনার বানিয়েছে সেই খগেন কাটুয়া অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোক। গত বছরেই তো চন্দনপুরের জমিদার লক্ষ্মণবাবুর বাড়ির দেয়ালে সিঁদ কাটবার সময় হাতের ওপর দিয়ে টিকটিকি চলে গিয়েছিল বলে জমিদারবাড়ির দারোয়ান তেওয়ারিজিকে রাত দুটোর সময় ডেকে তুলেছিল।
আমি অবাক। বললাম, বলেন কী! চুরি করতে গিয়ে দারোয়ানকে ডেকে তুলেছিল কেন?
তেওয়ারিজি তো খুব পুজোআচ্চা করেন। খগেন সেটা জানত। তাই ওনার কাছে খগেন একটু গঙ্গাজল চেয়েছিল, হাতটা ধোবে বলে। খেয়াল ছিল না, হাতে তখনও সিঁদকাটিটা ধরা ছিল।
তারপর?
তারপর আর কী? বেদম গণধোলাই খেয়েছিল। পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও হয়েছিল, কিন্তু কাটুয়াকে কে কারাগারে আটকাবে? সবেমাত্র ক'দিন আগেই ও কয়েদখানার মেঝেতে সুড়ঙ্গ কেটে বেরিয়ে এসেছে। তাই বলছিলাম, ওই খগেনকে দিয়েই এমন প্যাঁচ মারব যে...
আমি বললাম, কিন্তু খগেন কি খুব ইম্পর্ট্যান্ট? ও তো আর বিরিয়ানি রাঁধবে না।
ঋষিবর বললেন, আহা। রাঁধবে তো খড়গপুরের দুজন রাঁধুনি। কিন্তু সেটা বললে তো আর চম্পক তোমাদের সঙ্গে কম্পিটিশনে নামতে পারবে না। তাই ও রেস্তোরাঁর সামনে আলখাল্লা পাগড়ি-টাগড়ি পরিয়ে ওই খগেনকেই বসিয়ে রাখবে। বলা যায় না, ওর হাতে দু-একটা কাঠের তৈরি হাতা-খুন্তিও ধরিয়ে দিতে পারে। মহেঞ্জোদাড়োয় তো লোহার ব্যবহার ছিল না। লোকে ভাববে সত্যিই বুঝি মহেঞ্জোদাড়োর লোক বিরিয়ানি রাঁধছে। খগেনেরও এতে সুবিধে। সারাক্ষণ ছদ্মবেশে ছদ্মনামে দিন কাটাবে। পুলিশে ওকে খুঁজে পাবে না।
আমি কিছুক্ষণ মাথাটাথা চুলকে বললাম, খগেন-টগেনের মতন এত বাঁকাচোরা রাস্তা ধরার প্রয়োজন কী স্যার? আপনার মন্ত্রবলে চম্পককে চামচিকে বানিয়ে দিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।
অসন্তুষ্ট সুরে ঋষিবর বললেন, আমার মন্ত্র অত সস্তা জিনিস নয়, বুঝলে? ও মন্ত্রের অনেক বড়বড় কাজ আছে। তাছাড়া তোমার দাদুকে যেটা বলেছিলাম, সেটা তোমাকেও আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। শর্টকাটের দ্বারা কোনো মহৎ কার্য হয় না। মন্ত্রটন্ত্র নয়, একদম লৌকিক উপায়ে চম্পকের রেস্তোরাঁর বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছি, দ্যাখো না। তোমাকে শুধু একটা কাজ করতে হবে।
আমি জিগ্যেস করলাম, কী কাজ স্যার?
শোনো বিল্টু! এমনি-এমনি আমি এই হোটেলে এসে উঠিনি। চম্পক এই রেস্তোরাঁরই দোতলার একটা ঘরে তোমাদের মোহনজী, মানে খগেন নাটুয়াকে লুকিয়ে রেখেছে। তোমার কাজ হচ্ছে খগেনকে যতরকমভাবে পারা যায় ভয় দ্যাখানো। পারবে?
আমি বললাম, নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। ও কাজটা আমি খুব ভালো পারি। আমার বোন বুজকুড়ি ক্লাস সেভেনে পড়ে। তাকে একজন ভদ্রমহিলাই বলতে পারেন। তবু এখনও মাঝে মাঝে ভয় দেখিয়ে ওর আত্মারাম খাঁচাছাড়া করে দিই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আজ তো ডিসেম্বরের আঠাশ তারিখ হয়েই গেল। মাঝখানে আর মাত্র তিনটে দিন। পয়লা জানুয়ারিই চম্পকদার রেস্তোরাঁ উদ্বোধনের দিন। যা করার এই তিনদিনের মধ্যেই করতে হবে।
ঋষিবর খালি প্যাকেটের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে মন দিয়ে লুকিয়ে-থাকা চিপসের কুচি খুঁজছিলেন। আমার কথা শুনে বললেন, আহা ভুলে যাচ্ছ কেন আমি দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি...ইয়ে, কী দেখছি সেটা না-হয় এখন সারপ্রাইজই থাক। তবে এটুকু বলতে পারি, চিন্তার কিছু নেই।
পরের আধঘণ্টায় আমি ঋষিবরের কাছ থেকে নানারকম বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এলাম।
বলতে বাধ্য হচ্ছি, ঋষি হতে পারেন, কিন্তু ওনার বদবুদ্ধি কম নয়।
ফুটিডাঙায় ছোটবেলা থেকেই আসছি তো। তাই এখানে আমার একটা বন্ধুর দল তৈরি হয়ে গেছে। তোতোন, বকাই, সন্তু আর মিচকে—ওদের চারজনেরই বয়স আমার কাছাকাছি। ওরাও ক্লাস নাইনে পড়ে।
না, ভুল বললাম। মিচকে পড়ে ক্লাস সিক্সে, যদিও ওর বয়স আমারই মতন। আসলে মিচকে একটু দেরি করে পড়াশোনা শুরু করেছে।
ওর জীবনটা ভারি অদ্ভুত।
ওর বাবার নাম শ্যামসুন্দর দাশ। আমি সুন্দরকাকা বলে ডাকি। সুন্দরকাকা ছিলেন বংশপরম্পরায় শিকারি। চোরাশিকারি।
এখন সব শিকারিই চোরাশিকারি। কারণ, জন্তু-জানোয়ার ধরা বা মারাটা একদমই বেআইনি। তবু সুন্দরকাকা সেই বেআইনি কাজটাই করতে বাধ্য হতেন, কারণ, ওঁর আর কোনও কাজ জানা ছিল না।
ফুটিডাঙা থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে একটা বিশাল জলাজমি রয়েছে, তার নাম মানিকবিল। মানিকবিলে শীতকালে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে। সুন্দরকাকা সেই পাখিগুলোকে ফাঁদ পেতে ধরে বাজারে লুকিয়েচুরিয়ে বিক্রি করতেন। চোরাবাজারে বুনোহাঁসের মাংসের দাম বেশ চড়া।
তাছাড়াও ওই মানিকবিলের জঙ্গল থেকেই সুন্দরকাকা ফাঁদ পেতে হনুমানের বাচ্চা ধরতেন।
যারা হাইওয়ে দিয়ে মালভর্তি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যায়, তাদের কাছে বাচ্চা-হনুমানের কদর খুব। লরির ড্রাইভার-কেবিনের মাথায় যদি একটা পোষা হনুমানকে বেঁধে রাখা যায় তাহলে সে পাহারাদার কুকুরের মতন কাজ করে। ড্রাইভার বা খালাসির অজান্তে কারুর সাধ্য থাকে না তখন লরির মাথায় উঠে তেরপল সরিয়ে মাল চুরি করে।
ফুটিডাঙা ফুডহাউসের ঠিক পেছনেই একটা খালিজমির ওপরে ট্রাকগুলো রাত্তিরে বিশ্রাম নেয়। একদিন সেখানে চুপিচুপি একটা হনুমানের ছানা বিক্রি করতে গিয়ে সুন্দরকাকা দাদাইয়ের কাছে ধরা পড়ে গেলেন। দাদাই সুন্দরকাকার দুঃখের কথা মন দিয়ে শুনল। শুনল যে ওঁর বাড়িতে একটা ছোট বাচ্চা আছে, যাকে উনি স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি। দাদাইয়ের খুব কষ্ট হয়েছিল।
মনের কষ্ট মনে চেপে রেখে চুপ করে বসে থাকবার লোকই নয় দাদাই। এক মাসের মধ্যে দাদাই ফুটিডাঙা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান আর বনদপ্তরের অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে মানিকবিলে ইকো টুরিজমের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। বিলের ধারে কয়েকটা সুন্দর কটেজ, বিলের জলে পাখি দেখার জন্যে নৌকা আর চারিদিকে হেঁটে বা সাইকেলে ঘোরার জন্যে ভালো রাস্তা—এইসব দাদাই কিছুটা নিজের পয়সায় আর কিছুটা সরকারি টাকা জোগাড় করে বানিয়ে দিয়েছিল।
দাদাইয়ের শর্ত ছিল, মানিকবিলে টুরিস্টদের পাখি দেখানোর জন্যে গাইডের চাকরিটা সুন্দরকাকাকেই দিতে হবে। বনদপ্তরের অফিসারেরা প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করেছিলেন ঠিকই। বলেছিলেন, ওই চোরাশিকারিকে ওখানে ঘুরতে দিলে পাখি কি আর একটাও থাকবে? কিন্তু শেষ অবধি দাদাইয়ের জেদ দেখে সুন্দরকাকাকে ওখানে গাইডের কাজ করার পারমিশানটা দিয়েও দিয়েছিলেন। এসব ছ'বছর আগের কথা।
তখন থেকেই সুন্দরকাকা বদলে গেছেন। এখন সুন্দরকাকা নিজে তো পাখি মারেনই না, অন্য জায়গা থেকে কেউ শিকার করতে এলে তাদেরও আটকান। আর গাইড হিসেবে তো সুন্দরকাকার জবাব-ই নেই। জন্ম থেকে যিনি জঙ্গলে ঘুরছেন, পাখি আর জীবজন্তুদের তার চেয়ে ভালো কে চিনবে?
সুন্দরকাকাকে একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পরেই দাদাই যে কাজটা করেছিল সেটা হল, মিচকে-কে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া। তবে ওই যে বললাম, একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।
বিশুদার সাইকেলটা ধার নিয়ে পরেরদিন ভোরবেলাতেই চলে গেলাম মানিকবিলের পাড়ে সুন্দরকাকার বাড়ি। আমি পৌঁছনোর আগেই সুন্দরকাকা একদল টুরিস্টকে নিয়ে পাখি দেখাতে চলে গিয়েছিলেন। মিচকে ওদের ছিমছাম ছোট্ট ঘরটার রোয়াকে বসে একটা ডানাভাঙা হাঁসের ব্যথার জায়গায় চুন-হলুদ লাগাচ্ছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে এত খুশি হল যে বলবার কথা নয়। তবে অবাকও হল বেশ। আমি কেন এসেছি বুঝতে পারছিল না।
আমি ওর পাশে বসে বললাম, মিচকে, তুই ফাঁদ-টাদ পেতে পাখি ধরার কায়দাগুলো ভুলে যাসনি তো?
মিচকে বলল, ধ্যাৎ, ভুলব কেন? ছোটবেলায় শেখা জিনিস যায় তা কেউ ভোলে না।
শোন। আগামী দুদিনে আমার অনেকগুলো বার্ডস আর অ্যানিম্যালস লাগবে—জ্যান্ত।
মিচকে বলল, ছিঃ! ওসব কাজ আমরা আর করি না। কী করবি তুই পাখি নিয়ে? খাবি?
আমি বললাম, না। দুটো বদমাইশকে দেশছাড়া করব। আপাতত আমাকে একটা কালো বেড়াল জোগাড় করে দে। আমি রাত একটার সময় তোর জন্যে ফুটিডাঙা স্কুলের পেছনের মাঠে ওয়েট করব। ওখানেই নিয়ে আসিস। আশা করি কাকু-কাকিমার ঘুম না ভাঙিয়ে বেরোতে পারবি?
মিচকে আসন্ন কোনো অ্যাডভেঞ্চারের আশায় আমাকে ফিসফিস করে বলল, গুলতিটা সঙ্গে নেব নাকি? এককালে ওটা থেকে পোড়ামাটির বাঁটুল ছুড়ে আমি বনবেড়ালও মেরেছি।
আমি একটু ভেবে বললাম, নিয়ে নে।
রাত একটা। তারিখটা ছিল ইংরিজি ক্যালেন্ডারের হিসেবে উনত্রিশ ডিসেম্বর। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়েছিল। সমুদ্রের ঢেউগুলোও যেন ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যেই আমি আর মিচকে সেই থার্ডক্লাস হোটেলটার পেছনের ঘোরানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছি খগেন নাটুয়া ওরফে মোহনজির ঘরের পেছনের জানলার কাছাকাছি। বাকি কাজটা মিচকেই করল। ওকে আগেই আমার সমস্ত প্ল্যান বলে রেখেছিলাম।
ওই ঘোরানো সিঁড়ি থেকেই পা বাড়িয়ে কী অক্লেশে যে মিচকে হোটেল-বাড়ির কার্নিশে উঠে পড়ল, না দেখলে বিশ্বাস হবে না। তারপর খগেনের ঘরের বন্ধ জানলাটা শুধুমাত্র একটা চুলের কাঁটার সাহায্যে যে কেমন করে খুলে ফেলল সেটাও এক রহস্য। বাকি কাজটা অবশ্য সহজই ছিল। পিঠের ব্যাকপ্যাক থেকে কালো বেড়ালটাকে বার করে মিচকে খগেনের ঘরের মধ্যে ছেড়ে দিল। তারপর গুলতির একটামাত্র গুলি খরচা করে নাইটল্যাম্পের বাল্বটা ভেঙে দিয়েই জানলা বন্ধ করে নীচে নেমে এল। আমরা যে যার বাড়ি ফিরে গেলাম। কেউ কিছু জানল না।
পরেরদিন ন্যাচারালি ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হল। দাদাই আমাকে অন্যদিনের মতন ভোরবেলায় ডেকে তোলেনি। সত্যিকথা বলতে কি দাদাই নিজেও সেদিন অনেক বেলা অবধি বিছানা ছেড়ে ওঠেনি। সত্তর বছরের মধ্যে আজকেই প্রথম ফুটিডাঙা ফুডহাউস বন্ধ রইল। দাদাইকে জিগ্যেস করলাম, কেন গো দাদাই? রেস্তোরাঁ খুলছ না কেন? দাদাই ক্লান্তগলায় বলল, আর কোনওদিনই খুলব না। আমার মনটা ভেঙে গেছে। ভাবছি এবার বুড়োবুড়ি এখানকার পাট তুলে বীরগঞ্জে সোনাইয়ের কাছেই গিয়ে থাকব।
আমি দাদাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, অত ভেঙে পোড়ো না। ঋষিবর তো আছেন।
দাদাই রেগেমেগে বলল, কোথায় আছেন?
আরেকটু হলে বলেই ফেলেছিলাম, স্টেশন রোডে হোটেল টুটিফুটির চারশো-বারো নম্বর ঘরে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আহা, এখানে থাকার দরকার কী? উনি রিমোট কন্ট্রোলেই অনেক কিছু করে ফেলতে পারেন। ওনার একটা ভবিষ্যদ্বাণী যখন ফলে গেল, সত্যিই যখন তোমার সঙ্গে শত্রুতা করল কেউ, তখন বাকিটাও নিশ্চয় ফলবে। উনি ঠিকই তোমাকে বাঁচাতে ফিরে আসবেন।
দাদাইয়ের মুডটা তাই শুনে একটু ভালো হল এবং তখনই বিছানা থেকে নেমে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে চলে গেল। আমিও মুখ-টুখ ধুয়ে আমার ঘরে ফিরে চার্জার থেকে মোবাইলটা খুলে অন করলাম। অন করা মাত্রই স্ক্রিনের ওপরে ফুটে উঠল—শুভমস্তু। তোমার কালো বেড়াল কাল রাত্তিরে তো কামাল করে দিয়েছে। মজা দেখবে যদি তো চলে এসো।
আমি অবাক হয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি জানি, ঋষিবরের কাছে কোনও ফোন নেই। আর এটা ঠিক মেসেজও নয়, স্ক্রিনের ওপর স্ক্রিন-সেভারের মতন লেখাগুলো ফুটে উঠেছে। উনি এসব ঘটাচ্ছেন কেমন করে?
বড়ঠাম্মাকে বললাম, আমি তোতোন বকাইদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে যাচ্ছি। দেরি হলে চিন্তা কোরো না। তারপর বিশুদার সাইকেলে চড়ে পড়িমড়ি করে পৌঁছে গেলাম হোটেল টুটিফুটির দরজায়; তারপর সিঁড়ি ভেঙে চারতলার ওই ঘরটায়। এই হোটেলের অনেক ঘরেরই দরজা-জানলায় ছিটকিনি-টিটকিনির বালাই নেই। চারশো-বারো নম্বর ঘরেরও একই দশা। আলতো করে ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। দেখি ঋষিবর চৌকির ওপরে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। তবে ওনার শরীরটা চৌকির সঙ্গে লেগে নেই। ইঞ্চিছয়েক ওপরে ভাসছে।
আমার মুখ দিয়ে বোধহয় কোনও বিস্ময়ের শব্দ বেরিয়ে এসেছিল। ঋষিবরের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে আমাকে দেখতে পেয়ে লজ্জিতমুখে ধপাস করে বিছানায় নেমে এলেন। তারপরে উঠে বসলেন। আমাকে বললেন, বোসো। আসলে হয়েছে কী জানো, রাতে শোয়ার পরে বুঝতে পারলাম, চৌকিটা আসলে ছাড়পোকার আড়ত। আমার চামচিকেগুলো আবার ছাড়পোকা খায় না, গন্ধ লাগে বোধহয়। সারারাত ছারপোকার কামড়ের চোটে অস্থির, ঘুমোতে পারি না। শেষকালে সূর্য ওঠার পরে ধ্যানট্যান সেরে এই হাওয়ার ওপরে শুয়ে একটু ঘুমোতে পারলাম। ঘুমিয়ে পড়ার আগে অবশ্য তোমাকে মানসবার্তাটি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পেয়েছ তো?
বুঝলাম, আমার মোবাইলে ওই অদ্ভুত মেসেজটিই ওনার 'মানসবার্তা'।
ঋষিবর নিজের মনে খু-খু করে একটু হেসে নিয়ে বললেন, ঘুম না আসার ওটাও একটা কারণ। মানে দোতলায় খগেনের ওই চেঁচামেচি। ঘরের মধ্যে বন্দি অবস্থাটা তোমাদের বেড়াল একেবারেই পছন্দ করেনি। ফলে খগেনের মশার-টশারি ছিঁড়ে, ওর মুখে আঁচড়ে দিয়ে, একেবারে যাকে বলে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
আমি বললাম, তারপর?
খগেন তো প্রাণপণে 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করছিল। কিন্তু অত রাতে ওই ঠান্ডার মধ্যে কে ওকে বাঁচাতে বেরোবে। অগত্যা আমিই মেঝেটেঝে ভেদ করে ওর ঘরে নেমে গেলাম। না, না। মেঝে দেখে কিছু বুঝতে পারবে না। ছায়াশরীরে গিয়েছিলাম কিনা; ওতে ঘরবাড়ি ভাঙে না।
আমি আবারও জিগ্যেস করলাম—তারপর?
বন্ধ ঘরের মধ্যে হঠাৎ আমাকে আবির্ভুত হতে দেখে খগেনের অজ্ঞান হয়ে যাবার দশা। বোধহয় আমাকেও ভূত ভেবেছিল। কিন্তু তারপর যেই না আমি বেড়ালটার দিকে আঙুল তুলে বলেছি, 'পুনর্মূষিক ভব' আর বেড়ালটাও তক্ষুনি একটা নেংটি ইঁদুর হয়ে এক দৌড়ে নালির গর্তে সেঁধিয়ে গেছে, অমনি আমার পা জড়িয়ে ধরে খগেনের সে কী কান্নাকাটি। বলে প্রভু, আমাকে বাঁচান। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, মহেঞ্জোদাড়ো বিরিয়ানি হাউসের ওপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। না-হলে ওই যমদূতের মতন বেড়ালটা কেন আমার নাকে খামচে দেবে? ওই খিমচোনোর দাগটা কি একটা আইডেন্টিফিকেশন মার্ক হয়ে রইল না? তাছাড়া আমার পার্টনার চম্পকেরও কাল পা মচকে গেছে। খড়গপুরের রাঁধুনি দুজনের ভয়ংকর ডায়ারিয়া হয়েছে। এসব কীসের ইঙ্গিত?
আপনি কী বললেন?
আমি বললাম, খুবই খারাপ ইঙ্গিত। শনি নয়। শনির চেয়েও শক্তিশালী একটি গ্রহ তোদের ক্ষতি করতে চাইছে। সামুদ্রিক-খাবারের সঙ্গে টক্কর দিতে নেমেছিস তো, তাই সমুদ্রের দেবতা নেপচুন তোদের পেছনে লেগেছেন। আপাতত সমুদ্রের ধারে যাস না আর নুন খাস না। তাতে যদি কাজ না হয়, আমি এই হোটেলেরই চারশো-বারো নম্বর ঘরে আছি। আমার কাছে আসিস।
আমি ঋষিবরকে বললাম, সে কী! আপনি কি সত্যিই ওদের দলে চলে গেলেন নাকি?
ঋষিবর বললেন, ধ্যাৎ পাগল। বিষ্টু বলে আমার ছেলের মতন। ওকে কখনো ছাড়তে পারি? শোনো ভাই বিল্টু। আজ তোমাকে একই কায়দায় খগেনের ঘরে একটা ভুতুম প্যাঁচা ছেড়ে দিতে হবে। পারবে তো?
আমি কিছুক্ষণ হা করে সেই মহাপুরুষের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, পারব। তারপর ঋষিবরের পায়ের ধুলো নিয়ে ওই সাইকেলেই রওনা দিলাম মানিকবিল।
মিচকের নাম এমনি-এমনি মিচকে হয়নি। ব্যাটা ভারি চালাক। আমি ওকে কাল রাতের ঘটনা পুরোটা বলতেই ও জিগ্যেস করল, তারপর? গুরুদেব আবার কিছু চাইছেন নাকি?
আমি বললাম, ঠিকই ধরেছিস। একটা ভুতুম প্যাঁচা।
মিচকে বলল, তাহলে তো এখনই বেরোতে হয়। রাত হয়ে গেলে প্যাঁচাদের ধরা অসম্ভব। বিলের যেদিকটা দিয়ে রেললাইন গিয়েছে, ওদিকেই একটা পাকুড়গাছের কোটরে একটা মস্ত বড় ফিশিং-আউল থাকে। চল, ওটাকেই নিয়ে আসি।
তবে একটা কথা ঋষিবরকে বলে দিস। এই প্যাঁচাটাকে কিন্তু ইঁদুর-টিদুর বানিয়ে দিলে চলবে না। প্যাঁচা হিসেবেই আমাকে ফেরত দিতে হবে। এনডেঞ্জারড বার্ড তো, তাই।
তিরিশে ডিসেম্বর, রাত একটা। মোটামুটি আগের রাতের ঘটনাগুলোরই পুনরাবৃত্তি হল। সেই লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে প্যাঁচা ঢোকানো, গুলতি মেরে বালব ফাটানো এবং পালানো। তবে তফাতের মধ্যে আজকে পালাতে-পালাতে পেছন থেকে একটা বাপরে-মারে বলে আর্তনাদ শুনতে পেলাম, যেটা গতকাল শুনিনি। বুঝলাম, প্যাঁচা বেড়ালের থেকে অনেক চটপটে।
পরেরদিন যতক্ষণে আমার মোবাইলের স্ক্রিনে গুরুদেবের মানসবার্তা ঢুকেছে, ততক্ষণে আমি হোটেল টুটিফুটির দিকে অর্ধেক রাস্তা চলে গেছি। তবে বার্তার মধ্যে যেহেতু লেখা ছিল 'তোমার ওই শিকারি বন্ধুটিকেও সঙ্গে নিয়ে এসো' তাই মাঝপথেই সাইকেল ঘুরিয়ে মানিকবিলের দিকে চলে গেলাম এবং মিচকে-কে ডবল ক্যারি করে পৌঁছলাম টুটিফুটির দরজায়।
না, প্রথমেই একেবারে সদর-দরজা অবধি চলে যাইনি ভাগ্যিস। রাস্তার বাঁক থেকে যে-লোকটাকে উদভ্রান্তের মতন ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাকে কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছিল। একটা নীল লুঙ্গি হাফ করে পরা। গায়ের গেঞ্জিটা ছেঁড়াখোড়া। সারা মুখে আঁচড়-কামড়ের দাগ। এই শীতের সকালেও একটা ছাতা দিয়ে মাথা আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর ভয়ে ভয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। আকাশের দিকে নজর ছিল বলেই লোকটা আমাকে দেখতে পেল না এবং সেইজন্যেই বেঁচে গেলাম। কারণ ততক্ষণে আমি মোহনজি ওরফে খগেন কাটুয়াকে চিনে ফেলেছি আর চিনতে পারা মাত্রই পোঁ করে সাইকেল ঘুরিয়ে অন্য একটা গলি ধরে পৌঁছে গেছি রেস্তোরাঁর পেছনের দরজায়।
ওই খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকেই চারতলায় চারশো-বারো নম্বর ঘরে চলে গেলাম। ঋষিবরকে জিগ্যেস করলাম, কী ব্যাপার? খগেন কাটুয়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কেন? প্যাঁচাটাকে এখনো ছেড়ে রেখেছেন নাকি?
ঋষিবর বললেন, না, না। প্যাঁচার ব্যবস্থা তো কাল রাতেই করে দিয়েছি। তবু খগেনের ভয় যাচ্ছে না। ঘরে তো থাকবেই না, রাস্তাতেও প্যাঁচার ভয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আপনি ওকে কী বললেন?
ঋষিবর বললেন, কী আর বলব? বললাম, বাবা খগেন। বেড়ালের শত্রু কে বলো তো?
খগেন বলল, কুকুর।
আর প্যাঁচার শত্রু?
কাক।
আমি বললাম, তোমাকে আমি কয়েকটি মন্ত্রপূত কুকুর আর কাক দেবো। তুমি চিন্তা কোরো না। সেগুলিকে সবসময় কাছে-কাছে রাখবে। তাহলেই ওই কালো বেড়াল আর ভুতুম প্যাঁচা তোমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। তাহলে মিচকেবাবু...
ঋষিবরকে আর কিছু বলতে হল না। তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মিচকে বলল, কুকুর আর কাক ধরে আনতে হবে তো? নো প্রবলেম।
ঋষিবর ভারি খুশি হয়ে বললেন, অনেক উন্নতি করবে তুমি মিচকে। এই নাও, তোমার প্যাঁচা। কথা দিয়েছিলাম ফিরিয়ে দেবো।—এই বলে ঋষিবর একটা শামুকের খোল মিচকের হাতে ধরিয়ে দিলেন।
আমরা দুজনেই অবাক হয়ে খোলটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম। ভাবছিলাম, এর মধ্যে প্যাঁচা কোথায়! ঋষিবর আমাদের মুখের অবস্থা দেখে বললেন, এখন সাতসকালে তোমরা যদি জলজ্যান্ত প্যাঁচাটাকে ফেরত নিয়ে যেতে তাহলে সব ফাঁস হয়ে যেত না? তাই অণিমা-মন্ত্রে ওকে অণু আকারে ওই খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছি। প্যাঁচার বাসার মধ্যে খোলটাকে রেখে একবার শুধু বলবে 'অলটিয়াস সিটিয়াস ফর্টিয়াস'। তাহলেই দেখবে উনি ডানা ঝাড়া দিয়ে খোলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
তোমাদের যে-গল্পটা শোনাতে বসেছিলাম, সেটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
ছ'টা নেড়িকুত্তা জোগাড় করতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি। তোতোন, বকাই, সন্তু আর মিচকে এই চারজনের পোষা নেড়িকুত্তার সংখ্যা বারো। তার মধ্যে থেকেই একটু নিরীহ দেখে ছ'টা কুকুরকে গলায় নারকোল দড়ি বেঁধে ওরা নিয়ে এসেছিল হোটেল টুটিফুটির পেছনের রাস্তায়।
কাকগুলো ফাঁদে ধরা পড়ার পরে সারাদিন খুব চেঁচামেচি করেছিল। শুধু নিজেরাই করেনি, ওদের জ্ঞাতিগুষ্ঠি মিলে হাজারখানেক কাক মানিকবিলের পরিবেশ যাকে বলে একেবারে কলুষিত করে তুলেছিল। তবে এখন রাত হয়ে গেছে বলে দিব্যি চুপচাপ খাঁচার মধ্যে বসে আছে।
ঋষিবর আগেই আমাকে হোটেলের পেছনের জমিতে একটা খালি ঘর দেখিয়ে রেখেছিলেন। আগে ওটা গ্যারেজ ছিল। এখন আর ব্যবহার হয় না। আমরা কাক আর কুকুরগুলোকে ওই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বেশ খানিকটা দুরে গা-ঢাকা দিয়ে বসে দেখছিলাম, কী হয়।
পয়লা জানুয়ারি রাত একটা। রাত পোয়ালেই নতুন বছর। চারদিকে নববর্ষ উদযাপনের বাজি-টাজি ফুটছিল। তারমধ্যেই রেস্তোরাঁর পেছনের দরজা দিয়ে ঋষিবর খগেনের কাঁধে হাত রেখে বেরিয়ে এলেন। দুজনে মিলে ঢুকে পড়লেন খালি গ্যারেজটার মধ্যে। একটু বাদে আবার বেরিয়েও এলেন দুজনেই। আমাদের খুব কাছে দাঁড়িয়েই ওনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। শুনলাম, ঋষিবর খগেনকে বলছেন, তোমাকে কাল একটা ভ্যানরিকশা ভাড়া করে এগুলোকে মহেঞ্জোদাড়ো বিরিয়ানি হাউসে নিয়ে যেতে হবে।
খগেন মিনমিন করে বলল, তাতে লোক-জানাজানি হবে না? তার চেয়ে এখানেই রেখে দিয়ে যাই না।
ঋষিবর ধমকে উঠলেন—খেপেছ? মরতে চাও? তোমরা সি-ফুডের বারোটা বাজাবার জন্যে রেস্তোরাঁর উদ্বোধন করবে আর নেপচুন সেটা মুখ বুজে দেখবেন? এই কাক আর কুকুরগুলো যদি সঙ্গে না থাকে, তাহলে ওই উদ্বোধনের সময়েই কালোবেড়াল আর প্যাঁচারা তোমাকে ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণ করবে। তোমাকে তো মেরে ফেলবেই, চম্পককেও ছাড়বে না।
এই অবধি শুনে আমরা হ্যান্ডবিল সাঁটতে বেরোলাম। একহাজার হ্যান্ডবিল, প্রত্যেকের ভাগে ছিল দু-শো করে। সেই কাজ সেরে, শেষ অবধি লেপের তলায় যখন ঢুকলাম, তখন ঘড়িতে বাজে আড়াইটে। বলে রাখা ভালো, আমাদের প্রত্যেকেরই শান্তিপূর্ণভাবে বাড়িতে ঢোকা-বেরোনোর বিকল্প রাস্তা ছিল। গুরুজনদের যাতে অসময়ে ঘুম না ভাঙে সেটা দেখা ক্লাস নাইনের ছেলেদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সে যাই হোক, কাল দুপুর থেকে কেমন রগড় জমবে সেই কথা ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম থেকে উঠতে স্বাভাবিকভাবেই দেরি হয়ে গেল খুব। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দশটা বাজে। পয়লা জানুয়ারি, সকাল দশটা। দাদাই আর বড়ঠাম্মাকে দেখতে পেলাম না। বুড়িপিসি রান্নাঘরে কুটনো কুটছিল। বলল, চম্পকের নতুন হোটেলে কী যেন গণ্ডগোল হচ্ছে। মাসিমা-মেসোমশাই তাই দেখতে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
সত্যিই দূর থেকে একটা হইহই আওয়াজ ভেসে আসছিল। সন্দেহ নেই, সেটা অনেক লোকের একসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিৎকারের আওয়াজ।
ব্রাশে টুথপেস্টের বদলে দাদাইয়ের সেভিং-ক্রিম লাগিয়ে ফেলেছিলাম। তবে তখন আর ওসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার মতন সময় ছিল না। কোনোরকমে দুটো কুলকুচি করে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনলাম পেছন থেকে বুড়িপিসি চেঁচাচ্ছে,—আমার ডানপায়ের হাওয়াইটা পায়ে গলিয়ে চলে যাচ্ছ যে বড়। 'ধুত্তোর' বলে দুটো চটিই পা থেকে খুলে, খালি-পায়েই দৌড়লাম। গেট দিয়ে বেরোতে গেলে রাস্তা একটু বেশি পড়ে যায়, তাই দক্ষিণদিকের পাঁচিল টপকে নামলাম গিয়ে একেবারে চম্পকদার নতুন রেস্তোরাঁর সামনে। ততক্ষণে রেস্তোরাঁটাকে ঘিরে অন্তত হাজারখানেক লোকের ভিড় আর সেই ভিড়ের একেবারে পেছনে দাঁড়িয়ে তোতোন, বকাই, সন্তু আর মিচকে নিরীহ-মুখে মজা দেখছে।
একবার আড়চোখে দেখে নিলাম, চারিদিকে পাঁচিল, গাছের গুড়ি, দেয়াল-টেয়াল এসব জায়গায় কাল রাতে যে হ্যান্ডবিলগুলো সেঁটে দিয়েছিলাম, সেগুলো ঠিকঠাকই আছে। কেউ ছিঁড়ে ফেলার সময় পায়নি। প্রত্যেকটা হ্যান্ডবিলে লেখা—পাতিকাকের কাউয়া-বিরিয়ানি। দেশি কুকুরের কুত্তা-বিরিয়ানি। সেইজন্যেই মাত্র দশটাকা প্লেট। বিশ্বাস না-হলে মহেঞ্জোদাড়ো-রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আসুন।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখার দরকার ছিল না। ততক্ষণে সেই ছ'টা নেড়িকুত্তা আর ছ'টা কাকের খাঁচাকে উত্তেজিত জনতা রান্নাঘর থেকে রেস্তোঁরার সামনেই টেনে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে চম্পকদা, খগেন নাটুয়া আর দুই রাঁধুনিকে। ধোলাইয়ের তোড়জোড় চলছে। চম্পকদা গলা ফাটিয়ে পাবলিককে কী যেন বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ কিছু শুনতে চাইছে না।
এতটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। সবেমাত্র মনে-মনে ঋষিবরের মুণ্ডপাত করতে শুরু করেছি, এমন সময় হুটার বাজিয়ে পুলিশের দুটো গাড়ি ভিড়-টিড় ছত্রখান করে অকুস্থলে এসে ব্রেক কষল এবং কেউ কিছু বোঝার আগেই ওদের চারজনকে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমার সামনে দিয়ে গাড়িদুটো বেরিয়ে যাবার সময় একবার যেন দেখলাম, দু-নম্বর জিপের পেছনের সিটে ঋষিবর বসে আছেন।
সবাই চলে যাবার পর মিচকে কুকুর আর কাকগুলোকে মুক্ত করে দিল। তোতোন আর বকাই একবার রেস্তোরাঁর পেছনদিকটায় ঘুরে এসে আমার কানে-কানে বলল,—ওদের রান্নাঘরে কিন্তু বিরিয়ানি রান্নার সব উপকরণ মজুত। এমনকী এক ডেকচি-ভর্তি রেওয়াজি খাসির মাংস অবধি। কী করা যায় বল তো। সব কি নষ্ট হবে?
মনে পড়ল আজ পয়লা জানুয়ারি। বললাম, সেক্ষেত্রে মানিকবিলের ধারে পিকনিক করা যায়। পরে না-হয় চম্পকদাকে চাঁদা তুলে দাম মিটিয়ে দেব। আপাতত সাইকেলের ক্যারিয়ারে হাঁড়ি-কড়া চাপা। আমি চট করে বড়ঠাম্মাকে বলে আসি যে, পিকনিক করতে যাচ্ছি।
উপসংহার
বড়দিনের ছুটি ফুরিয়ে গেল, আমিও কলকাতায় ফেরার ট্রেন ধরার জন্যে ফুটিডাঙা স্টেশনে এসে দাঁড়ালাম। আমাকে বিদায় দিতে এসেছিল আমার চার বন্ধু আর চম্পকদা।
হ্যাঁ, চম্পকদাকে সেদিন থানা থেকে ছাড়িয়ে আনবার জন্যে যে-দুজন গিয়েছিল তারা হল দাদাই আর বড়ঠাম্মা। ওদের দুজনেরই মত হল, ছেলেপিলেরা একটু ভুলচুক করেই ফেলে। তাই বলে কি তাদের জেলখানায় থাকতে হবে?
ওদিকে চম্পকদাও ভীষণ অনুতপ্ত। কিন্তু ও যখন দাদাইকে সাত-লাখ টাকা ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিল তখন দাদাই আর সে-টাকা ফেরত নেয়নি। বলেছিল, তোকে ওই টাকা মূলধন হিসেবেই দিলাম চম্পক। তুই অন্য কোথাও গিয়ে তোর মনের মতন ব্যবসা শুরু কর। তারপর যেদিন সামর্থ্য হবে সেদিন ওটা আমাকে ফেরত দিস।
চম্পকদা বলেছে, ও খড়গপুরে বইয়ের দোকান খুলবে।
এই হল এবারের অভিজ্ঞতা। ট্রেন ঢুকছে। চলি, হ্যাঁ?
ও, দেখেছ! একটা কথা বলতে ভুলেই গেছি। একটু আগে ব্যাকপ্যাকের চেন খুলে জলের বোতলটা বার করতে গিয়ে শুনি ব্যাগের ভেতর থেকে কিচমিচ আওয়াজ আসছে। ভাবলাম, ইঁদুর-টিদুর ঢুকে গেল নাকি রে বাবা! তারপর ওপর থেকে কয়েকটা জামাকাপড় সরিয়ে দেখি, ও মা! ইঁদুর কোথায়? একটা ছোট্ট সোনালি খাঁচার মধ্যে ট্রাপিজের খেলা দেখাচ্ছে দুটো সবুজ চামচিকে। খাঁচার আংটার সঙ্গে গাঁথা ভূর্জপত্রের কার্ডে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা—
তোমারে কীই-বা দিতে পারি।
দিয়ে গেনু জীবন্ত মশারি।
ইতি
ঋষিবর।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন