সৈকত মুখোপাধ্যায়

জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়ে আরও ঘণ্টাতিনেক ঢিলে তালে চলার পরে লোকাল ট্রেনটা যখন ত্যাবড়াডাঙা ইস্টিশনে এসে থামল তখন সন্ধের অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে এসেছে। ডাক্তার ভজেন সান্যাল ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেডিং-বাক্স নিয়ে লাফ মেরে প্লাটফর্মে নামলেন। তারপর চারদিকে চেয়ে হাঁক ছাড়লেন,—কুলি! কুলি-ই-ই!
কোথায় কুলি? শুনশান প্লাটফর্মে কোথাও কোনও জনমানব নেই। হাঁক ডাক শুনে দুটো শিয়াল পাশের ভ্যারেন্ডা ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এসে তার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। বোঝাই যাচ্ছিল ওরা অনেকদিন মানুষ দেখেনি।
অগত্যা ডাক্তার ভজেন সান্যাল বাক্স প্যাঁটরা কাঁধে নিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে প্লাটফর্মের বাইরে বেরোলেন। মনে মনে কলকাতায় ছেড়ে আসা তার গিন্নির, মানে মিসেস সান্যালের মুণ্ডুপাত করলেন তিনি। গ্রামের দিকে যেন কেউ আর ট্রান্সফার হয় না। আসবার সময় পুরো সংসারটাই প্রায় ব্যাগের মধ্যে পুরে দিয়েছে। শিল নোড়াটাও দিতে চাইছিল। কোনও মতে সেটাকে আটকেছেন। তবু তাতেই এক-একটা লাগেজের ওজন হয়েছে বিশ কিলো।
বলাই বাহুল্য, কেউ তার কাছে টিকিট দেখতে চাইল না।
প্লাটফর্মের বাইরে এসে আরও অবাক হলেন ডাক্তার সান্যাল। কাছাকাছি সময়ের মধ্যে তো কোনও বিশ্বযুদ্ধ হয়নি। কিন্তু তাহলে সারা তল্লাটে এত বোম পড়ল কোথা থেকে? বোম না পড়লে কী একটা জায়গার চেহারা এরকম হয়?
কোনও সন্দেহই নেই এখানে আকাশ থেকে একটানা বোমাবর্ষণ হয়েছে, আর সেই বোমার আঘাতেই টিকিটঘর গুঁড়িয়ে গেছে, স্টেশন চত্বরের চা শিঙাড়ার দোকানগুলো মাটিতে শুয়ে পড়েছে, এমনকী দু-চারটে রিকশা অবধি পাঁপড় ভাজার মতন টুকরো হয়ে এদিকে ওদিকে পড়ে রয়েছে। ত্যাবড়াডাঙার মতন এমন সার্থকনামা জায়গা তিনি জীবনে দ্যাখেননি। পুরো জায়গাটাই কেমন করে জানি ত্যাবড়া হয়ে গেছে।
মুশকিল হচ্ছে, কলকাতায় বসে খোঁজখবর করে তিনি জেনেছেন যে, এই ত্যাবড়াডাঙা ইস্টিশনে নেমেই তাকে যেতে হবে চার মাইল দূরের শিড়িঙ্গেপুর গ্রামে, যে শিড়িঙ্গেপুরের গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে আগামী কয়েকবছর ডাক্তারি করতে হবে। কিন্তু এখন সেই গ্রামে তিনি যাবেন কেমন করে? আর কোনদিকেই বা যাবেন। অন্ধকারের মধ্যে যা দ্যাখা যাচ্ছে, তাতে তো মনে হচ্ছে দু-এক সারি ঘরবাড়ির পরেই ঘন শালবন শুরু হয়ে গেছে। ওর মধ্যে দিয়ে শিড়িঙ্গেপুরের পথ তিনি কেমন করে চিনবেন? কোনও লোকের দেখা না পেলে বিপদ।
লোকের দ্যাখা অবশ্য শিগগিরই পেলেন। দ্যাখা পাওয়ার থেকে বলা ভালো, তার গলা শুনতে পেলেন। পেছন থেকে কে যেন ফিসফিস করে বলল,—অমন বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন না স্যার। পাগলা হাতিটা ওই শালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখছে। চার্জ করল বলে। একদম দেরি না করে এখানে ঢুকে পড়ুন।
শুনেই একটুও দেরি না করে ডাক্তার ভজেন সান্যাল মালপত্তর ফেলে ডাইভ দিয়ে ভাঙা টিকিটঘরের পেছনে গিয়ে পড়লেন, আর তার পাশ দিয়ে উড়ন্ত এক পাহাড়ের মতন বেরিয়ে গেল খ্যাপা দাঁতাল। কিছুটা গিয়ে চারপায়ে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর শুঁড় দিয়ে দারুণ জোরে হাওয়া ছেড়ে বলল—ধু-উ-উ-স।
লক্ষভ্রষ্ট হয়েছে তো, সেই আক্ষেপে।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, ভজেন সান্যালের পাশে মাটিতে গুঁড়ি মেরে শুয়ে থাকা লোকটা উঠে দাঁড়াল। তারপর প্যান্টের পেছন থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ডাক্তার সান্যালকে বলল, চলুন স্যার। পাগলাটা এতক্ষণে তোর্সানদী পেরিয়ে ওপাড়ে চলে গেছে। খুব চালাক হাতি স্যার। রেলের টাইম-টেবিল মুখস্থ। ঠিক যখন ত্যাবড়াডাঙায় ট্রেন আসবার সময় হয়, তখনই এসে ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভজেন সান্যালও কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,—ইয়ে, আশা করি ওর কারণেই চারদিকের এমন যুদ্ধক্ষেত্রের মতন চেহারা?
—ঠিক ধরেছেন স্যার। দিন মালপত্রগুলো আমার হাতে দিন। চলুন, স্টেশনের পেছনদিকে টমটমকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। এবার দুর্গা বলে রওনা দিই। আপনারও তো বেশিক্ষণ খোলা জায়গায় থাকা উচিত নয়।
—কেন? খোলা জায়গায় থাকা উচিত নয় কেন? ভারি অবাক হয়ে লোকটাকে জিগ্যেস করলেন ডাক্তার সান্যাল।
—না, মানে পুলিশের চর তো চারদিকেই আপনাকে খুঁজছে।
—অ্যাই! তোমার নাম কী? পুলিশ আমাকে খুঁজবে কেন, হ্যাঁ?
—আমার নাম স্যার গুনু মইষাল। আমি আপনাদের নিজেদেরই লোক। আমার কাছে কিছুই গোপন নেই। আপনার নাম মদন তেলি। আপনার মাথার দাম এখন পাঁচ লক্ষ টাকা। ব্যারাকপুরের ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতিটার থেকেই সারা রাজ্যের পুলিশ আপনাকে গরুখোঁজা খুঁজছে। সেইজন্যেই না এই শিড়িঙ্গেপুরে আপনার পায়ের ধুলো পড়েছে।
মদন তেলি! ব্যারাকপুর! ব্যাঙ্ক-ডাকাতি! তুমি কী বলছ গুনু, আমার তো মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমি ডাক্তার ভজেন সান্যাল। শিড়িঙ্গেপুর হেলথসেন্টারে পোস্টিং নিয়ে এসেছি। আর ইয়ে, কোনও ব্যাঙ্ক-ডাকাতই বা শিড়িঙ্গেপুরে আসবে কেন? এখানে কি ব্যাঙ্ক আছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
এই কথা শুনেই না গুনু মইষাল ডাক্তার ভজেন সান্যালের পায়ে পড়ে গেল। বলল,—মাপ করবেন স্যার, ইয়ে ডাক্তারবাবু। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আমার কী দোষ বলুন? ফণী মুহুরিই তো আমাকে বলল, বিকেলের ট্রেনে মদন তেলি আসছে। শিগগির যা, নিয়ে আয় ওকে। সে ব্যাটা ডাকুটা যে-কোনও কারণে এসে পৌঁছোয়নি—তা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমিও আহাম্মকের মতন আপনাকেই ভেবেছি কিনা...ছি ছি ছি।
গুনুর লজ্জা দেখে ডাক্তার ভজেন সান্যালই তাকে সান্ত্বনা-টান্ত্বনা দিয়ে হাত ধরে টেনে তুললেন। একটু সামলে নিয়ে গুনু বলল, তবে একটা কথা বলি ডাক্তারবাবু। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে। মদন তেলির আসার কথা না থাকলে আমিও টমটমকে নিয়ে আসতাম না। আর আমি না এলে আপনিও শিড়িঙ্গেপুরে পৌঁছোতে পারতেন না। নিন, এখন চলুন দেখি।
স্টেশনের পেছনদিকে এসে কিন্তু ডাক্তার সান্যাল কোনও গাড়িই দেখতে পেলেন না। গুনুকে বললেন,—গুনু, তোমার টমটমকে বোধহয় হাতিতে তুলে নিয়ে চলে গেছে।
—বালাই ষাট। ওই তো টমটম ঘাস খাচ্ছে।
ডাক্তার সান্যাল খাবি খেলেন।—ঘাস খাচ্ছে মানে! গাড়িতে ঘাস খাচ্ছে?
—গাড়ির কথা কোথায় বললাম বলুন তো। শিড়িঙ্গেপুরের মতন বুনো জায়গায় আবার গাড়ি যেতে পারে না কি? হয় পায়ে হেঁটে যেতে হয়, না হলে ভরসা আমার টমটম। নেপালি মোষ স্যার। ইয়াকের রক্ত আছে ওর গায়ে। নিন, লাফ মেরে উঠে পড়ুন। ভয় কী? আমি তো ছাদনদড়ি ধরে পাশে পাশে যাচ্ছি।
এতক্ষণে ডাক্তার সান্যালের নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে চোখে জল এল। এ-ও লেখা ছিল কপালে? মোষের পিঠে চেপে চাকরি করতে যেতে হবে? কিন্তু উপায়ই বা কী? পরের ট্রেন আসার সময় হয়ে এল। টাইমটেবিল পড়া হাতিও ফিরে এল বলে। অতএব মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে ডাক্তার সান্যাল কোনওরকমে মোষের পিঠে চেপে বসলেন।
তবে হ্যাঁ। যেতে-যেতেই তিনি বুঝতে পারলেন, গুনুর কথা একবর্ণ মিথ্যে নয়। শিড়িঙ্গেপুরের রাস্তা বলে কিছুই নেই। কোমর সমান গভীর জল কাদা। কোথাও কোথাও ঘন নলখাগড়ার বন। এখানে-ওখানে আলেয়া জ্বলছে। সরসর শব্দ করে সাপখোপ চলাচল করছে। এই জলাজমি ভেঙে যদি কোনও প্রাণী চলতে পারে তবে তা একমাত্র মোষ। আর হয়তো কুমিরে পারে। কিন্তু কুমির তো মানুষকে পিঠে নিতে রাজি হবে না।
টমটম দিব্যি কিছুটা হেটে, কিছুটা সাঁতার কেটে সেই জলাজমি পেরিয়ে একটা অন্ধকার গ্রামের রাস্তায় ঢুকে পড়ল। তারপর গুনু মইষাল তার নাকের দড়ি ধরে নিয়ে চলল হেলথ সেন্টারের দিকে। হঠাৎই চারদিকের সেই অন্ধকারের মধ্যে উজ্জ্বল আলোর ছটায় ডাক্তারবাবুর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। দেখলেন রাস্তার মোড় ঘুরে তিনি এসে পড়েছেন আলো ঝলমলে এক বিরাট বাগানঘেরা বাড়ির সামনে। তার অবাক হওয়া দেখে গুনু বলল,—ডাক্তারবাবু, ওই আমাদের হোটেল। ওই হোটেলের মালিক ফণী মুহুরির আন্ডারেই আমি চাকরি করি। চাকরি মানে বাইরে থেকে যে সব বোর্ডাররা এসে ত্যাবড়াডাঙা স্টেশনে নামেন, তাদের টমটমের পিঠে চড়িয়ে হোটেলে নিয়ে আসার কাজ।
ডাক্তার ভজেন সান্যাল দেখলেন, দোতলা বাড়িটার ছাদে লাগানো আছে মানানসই-রকমের বড় এক আলোকিত সাইন-বোর্ড। তার গায়ে গোটা গোটা করে লেখা—
শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর
(ভারতের একমাত্র পুলিশমুক্ত অতিথি নিবাস)
মোষটা আবার চলতে শুরু করে দিয়েছে। চলন্ত মোষের পিঠ থেকে পেছন ফিরে অজ পাড়াগাঁয়ের বুকে গজিয়ে ওঠা এই মস্ত হোটেলের দিকে চেয়ে ভজেন সান্যাল গুনু মইষালকে জিগ্যেস করলেন—ব্যাপারটা কী হে গুনু? এই পাণ্ডব বর্জিত জায়গায় কারা সাধ করে থাকতে আসে? কাদের জন্যে এমন পেল্লাই হোটেল?
—জানবেন ডাক্তারবাবু, সবই জানবেন। শিড়িঙ্গেপুরে যখন এসেই পড়েছেন, তখন শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের কথা না জেনে উপায় কী? তবে আপাতত মোষের পিঠ থেকে নেমে পড়ুন। ওই দেখুন, আপনাকে দেখে শিবুদা, মানে শিবনাথ পাড়ুই ছুটে আসছে। উনি হলেন গে হেলথ সেন্টারের কম্পাউন্ডার। ইঞ্জেকশন দিতে গেলে ভয়ের চোটে নিজেই চোখ বুজে ফেলেন, ব্যান্ডেজ বাঁধলে দু-মিনিটে আলগা হয়ে খুলে যায়, কিন্তু রান্নার হাত অসামান্য। যান স্যার, সারাদিনে অনেক ধকল গেছে। আজ শিবুদার হাতের রান্না খেয়ে বিশ্রাম নিন। কাল থেকে দেখবেন কী আজব জায়গায় এসে পড়েছেন।
কাল অবধি অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না। সেদিন রাত্তিরেই খেল শুরু হয়ে গেল।
কলকাতা থেকে শিড়িঙ্গেপুরে এসে পৌঁছোতে দম বেরিয়ে গিয়েছিল ডাক্তার ভজেন সান্যালের। শিবনাথ কম্পাউন্ডারের রান্না করা অতি উপাদেয় পরোটা মাংস পেটে পড়তেই ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে এল।
হেলথ-সেন্টারের পেছন দিকেই ডাক্তারবাবুর সুন্দর কোয়ার্টার। শিবনাথ সেই কোয়ার্টারের ঘরদোর পরিষ্কার করে, বিছানা পেতে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হল। যাবার আগে বলে গেল—দরজা জানলাগুলো ভালো করে বন্ধ করে শোবেন ডাক্তারবাবু। যদিও তেনারা গ্রামের মধ্যে উৎপাত করেন না, তবে সাবধানের মার নেই।
ঘুম জড়ানো চোখে দরজা জানলা বন্ধ করতে করতে ডাক্তার সান্যাল একবার ভাবলেন, 'তেনারা' আবার কারা? শিবনাথ কি ভূতপ্রেতের কথা বলছে না কি? যত সব গেঁইয়া কুসংস্কার। তারপরেই ধপাস করে বিছানায় পড়লেন, আর টপাস করে ঘুমের সমুদ্রে তলিয়ে গেলেন।
কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমতে পারলেন কই? রাত তখনও কাটেনি। কে যেন ভজেন ডাক্তারের পিঠে সরু সরু আঙুলের খোঁচা মেরে ডাকল—ডাক্তারবাবু, ও ডাক্তারবাবু! দয়া করে একটু চলুন না আমার সঙ্গে।
সেই ডাকে ভজেন ডাক্তারের ঘুমের রেশ পুরোপুরিই কেটে গেল। কিন্তু চোখ খুলে তিনি প্রথমেই যা দেখলেন, তাতে তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। তিনি দেখলেন ঘরের সমস্ত দরজা জানলা যেমনটা লাগিয়ে শুয়েছিলেন তেমনটাই লাগানো রয়েছে। তাহলে তার পিঠের কাছে যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে ঢুকল কেমন করে? তবে তো নির্ঘাত শিবনাথ যে তেনাদের কথা বলছিল, তাদের মধ্যেই কেউ ঘরে ঢুকেছে। বোধহয় যমের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যই তাকে ডাকাডাকি করছে। ডাক্তার সান্যাল চট করে কম্বলটা মুখ অবধি টেনে নিয়ে জোর গলায় আবৃত্তি করতে লাগলেন—'রাম রাম রাম রাম।'
পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অশরীরী এবার চৌকিটাকে পেরিয়ে তার মুখের কাছে এসে দাঁড়াল। কাতর গলায় বলল,—ডাক্তারবাবু, আমি ভূত নই। রামকেষ্ট। বড় বিপদে পড়ে...।
রামকেষ্ট বলল না ভূতটা? ভূতের মুখে রাম নাম! উঁহু। তা তো সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে ভজেন ডাক্তার লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার কবজি চেপে ধরলেন। অ্যাই, কে রে তুই? ঘরে ঢুকলি কোথা দিয়ে? সিঁধ কেটেছিস?
—ছি ছি ডাক্তারবাবু। চোর বলে কি মানুষ নই। সরকারি ঘরবাড়ির...ইয়ে ক্ষতিসাধন করব?
—বাবা! নীতিবোধ দেখছি ষোলোআনা। তাহলে ঢুকলি কোথা দিয়ে।
রোগাসোগা চিমড়ে মতন লোকটা চোখের কোনা দিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে ঘরের ছাদের দিকে ইশারা করল।
ভজেন ডাক্তার ছাদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন টিনের ছাদের একটা টিন অল্প একটু ফাঁক হয়ে রয়েছে। কড়া চোখে রামকেষ্টর দিকে তাকাতেই সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলল—কিচ্ছু ভাববেন না ডাক্তারবাবু। আমি বেরোবার সময় সব ঠিক করে দিয়ে যাব। বাইরে থেকে কত ফিসফিস করে চেঁচালাম। তবু আপনার ঘুম ভাঙল না। তাই বাধ্য হয়েই...
—হয়েছে, হয়েছে। তা এত এমার্জেন্সিটা কীসের শুনি।
—আমার পাশের ঘরে থাকে অনুপ মোহান্তি। তার খুব হাঁপের টান উঠেছে। যাই যাই অবস্থা। আপনি একবার না গেলে লোকটা বেঘোরে মারা পড়বে।
—মোহান্তি? তার মানে উড়িষ্যার লোক। তা তুমি তো চোর। বন্ধুটির পরিচয় কী?
—আজ্ঞে স্মাগলার। মন্দিরের গা থেকে মূর্তি চুরি করে বিদেশে পাচার করে।
—বাঃ। খুব সুখের কথা। যাগগে। ডাক্তারের কাছে তো রুগির একটাই পরিচয়। সে রুগি। চলো, যাওয়া যাক। এ কী! তুমি আবার ওদিকে দেয়াল বেয়ে উঠছ কোথায়?
—দাঁড়ান। টিনটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে যাই। না হলে আবার প্যাঁচা কি বাদুড় ঢুকে পড়বে ঘরে।
ডাক্তারবাবুর ব্যাগ বয়ে নিয়ে রামকেষ্ট মহা খাতির করে তাকে যেখানে নিয়ে এল সেই জায়গাটা দেখে তো ডাক্তার সান্যালের চক্ষু চড়কগাছ। তিনি গেটের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, এ কী রামকেষ্ট! তুমি দেখছি আমাকে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে নিয়ে ঢোকাচ্ছ।
আঁজ্ঞে, তাই তো ঢুকতে হবে স্যার। আমরা তো এই হোটেলেই থাকি।
অগত্যা বাকি রাতটুকু ডাক্তারবাবু আর রামকেষ্টর অনুপ মোহান্তিকে নিয়েই কেটে গেল। ভোরের দিকে হাঁপানির টান কমে গিয়ে অনুপ মোহান্তি আরামে ঘুমিয়ে পড়ল। রামকেষ্ট ডাক্তারবাবুর পায়ে গড় হয়ে প্রণাম করে একটা বড়সড় সোনার চেন তার হাতে দিয়ে বলল, আমাদের লাইনে তো স্যার ক্যাশ টাকার খুব অভাব। তা, আপনি যদি ভিজিট হিসেবে এটা রাখেন...।
—ছিঃ। চুরির মালে ভিজিট নেব! ও তুমি রেখে দাও। আমার কিছু লাগবে না।
রামকেষ্ট কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল, আপনি স্যার দেবতা। চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
অনুপ মোহান্তির ঘর থেকে বেরিয়ে ডাক্তার সান্যাল আর রামকেষ্ট শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের দোতলার সুন্দর মোজেইক করা করিডর ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। তখনও সবে ভোর হচ্ছে। হোটেলের লোকজনের জাগার সময় হয়নি। ওরা প্রায় সিঁড়ির মুখে পৌঁছে গিয়েছিল, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন মিহি গলায় বলল, কোথায় চললে রামকেষ্ট? সঙ্গে উনি কে?
রামকেষ্ট ফিসফিস করে ডাক্তার ভজেন সান্যালকে বলল, ইনিই এই হোটেলের মালিক। ফণী মুহুরি। তারপর ফণী মুহুরির দিকে ফিরে বলল, সুপ্রভাত ফণীদা। ইনি শিড়িঙ্গেপুর হেলথ-সেন্টারের নতুন ডাক্তারবাবু। সবে জয়েন করেছেন। আর এমনই আমার কপাল, কালকেই ওনাকে রাত দুপুরে ঘর থেকে ডেকে আনতে হল।
ফণী মুহুরি এগিয়ে এসে ভক্তিভরে ডাক্তার সান্যালকে নমস্কার করল। ডাক্তার সান্যাল দেখলেন, ফণীর বয়েস প্রায় ষাটের কাছাকাছি হবে। ছোটখাটো চেহারা। পরণে ধুতি আর ফতুয়া। মুখে চোখে ধূর্তমি মাখানো।
ডাক্তার সান্যালকে ফণী বলল, সকাল হয়ে গেছে ডাক্তারবাবু। সারারাতই প্রায় জেগে আছেন। আমার গরিবখানায় এক কাপ চা খেয়ে গেলে হত না? এই হোটেল সম্বন্ধে নিশ্চয় আপনার কৌতূহল হচ্ছে। চলুন আপনাকে গল্পটা শোনাই।
যতটা না চায়ের লোভে, তার চেয়ে বেশি শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর সম্বন্ধে জানার আগ্রহে, ডাক্তারবাবু ফণীর চা পানের আমন্ত্রণে রাজি হয়ে গেলেন।
সামান্য আরশোলার গন্ধ ছাড়লেও চা-টা খেতে খারাপ লাগছিল না। ফণী মুহুরি নিজেও এক কাপ চা নিয়ে হোটেলের অফিসঘরে ডাক্তার সান্যালের মুখোমুখি বসে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ইতিহাস বলতে শুরু করল—
আমার আসল নাম ফণীন্দ্রনাথ বেরা। মেদিনীপুর কোর্টের বিখ্যাত উকিল জগদীশ মিত্তিরের মুহুরি ছিলাম প্রায় পঁচিশ বছর। তাই লোকের মুখে নামটা হয়ে গেছে ফণী মুহুরি।
এ সব প্রায় বছরপাঁচেক আগের কথা। চাকরি করতে ভালো লাগছিল না, বুঝলেন। কেবলই মন চাইত কিছু একটা স্বাধীন ব্যবসা করতে। কিন্তু কীসের ব্যবসা করি ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমনসময় একইসঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটল।
কুখ্যাত জালিয়াত জগন্নাথ জানার নামে পুলিশ মামলা দায়ের করল। জানতে পেরেই জগন্নাথ এক রাতের অন্ধকারে শরণাপন্ন হল আমার মনিব জগদীশবাবুর কাছে। জগদীশবাবু তাকে বললেন, আমি কেসটা নিচ্ছি। কিন্তু যতদিন না জিতছি তোমাকে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। তা না হলে, পুলিশ তোমাকে ধরবে, আর ধরলেই কম্বল ধোলাই দিয়ে সব কথা তোমার পেট থেকে বার করে নেবে। জগন্নাথ তখনকার মতন গা ঢাকা দিল। কিন্তু পুলিশের হাত এড়িয়ে বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারল না। ঠিক ধরা পড়ে গেল। সেই খবর পেয়ে জগদীশবাবু আমার সামনেই দুঃখ করে বললেন, এই লোকগুলোর শান্তিতে থাকার মতন জায়গার বড় অভাব হে ফণী। মালিকের সেই কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল।
এছাড়া আরও একটা ব্যাপার হল। জগদীশবাবুই একটা মামলার প্রয়োজনে আমাকে কয়েকটা কাজ দিয়েছিলেন। তার জন্যে পশ্চিমবঙ্গের থানাগুলোর ম্যাপটা আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে হচ্ছিল। দেখতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল, গজহট্ট আর ভৈরবডাঙা বলে উত্তরবঙ্গের দুই বড় শহরের মধ্যে শিড়িঙ্গেপুর বলে একটা ছোট গ্রাম আছে, যে গ্রামটার কোনও অস্তিত্ব ওই ম্যাপে নেই। মানে বুঝতে পারছেন? শিড়িঙ্গেপুরের ওপর পশ্চিমবঙ্গের কোনও থানারই কোনও কন্ট্রোল নেই।
দেখেই তো আমি ইউরেকা বলে লাফ দিয়ে উঠলাম। তাহলে তো শিড়িঙ্গেপুরই সেই স্বর্গোদ্যান যেখানে জগন্নাথের মতন মহাপুরুষেরা নিশ্চিন্তে দিনযাপন করতে পারে। ওখানে একটা হোটেল খুললে কেমন হয়?
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মেদিনীপুর থেকে শিড়িঙ্গেপুরে এসে জলের দরে বিঘেপাঁচেক জমি কিনলাম। চাকরি করে যা টাকা জমিয়েছিলাম সব খরচা করে এই হোটেল বানালাম।
—পুলিশের এদিকটায় নজর পড়েনি? এতক্ষণে প্রথম কথা বললেন ভজেন ডাক্তার।
—পড়লেই বা কী? কিছু করার তো আর উপাই নেই। সরকারি কাজকর্ম কীভাবে হয় জানেন তো? সংসদে বিল পাশ হয়ে শিড়িঙ্গেপুরের নাম পুলিশম্যাপে উঠবে, তারপর ঠিক করা হবে শিড়িঙ্গেপুরকে গজহট্টের সঙ্গে না কি ভৈরবডাঙার সঙ্গে জোড়া হবে। তবে না এখানে পুলিশ ঢুকবে। ও সব হতে হতে বিশ বছর কেটে যাবে, আর তার ঢের আগেই আমি পয়সা উশুল করে নেব।
তবে এখন কিন্তু আমি বোর্ডারদের সুখ-সুবিধের কোনও অভাব রাখিনি। ভেবে দেখলাম, চোর-ডাকাতগুলো যখন এই হোটেলে আসবে, তখন তো তাদের হাতে কাজ থাকবে না। তারা ছুটির মুডে থাকবে; আমরা পুরী, দার্জিলিং বেড়াতে গেলে যেমন থাকি আর কী। একটু ভালো খেতে পড়তে চাইবে। একটু নাটক-টাটক গান-টান শুনতে চাইবে। সে সবের ব্যবস্থা করলাম। এখানে আমার নিজের কুড়িটা গরু আছে। গোবর গ্যাসের প্ল্যান্ট আছে। সেই গ্যাসে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। টিভি নেই। কিন্তু গুনু মইষাল টমটমের পিঠে চেপে রোজ ত্যাবড়াডাঙা থেকে খবরের কাগজ নিয়ে আসে। ও জিনিসটা আমার বোর্ডারদের খুব দরকার বুঝলেন। কাগজ পড়ে যখন ওরা বুঝতে পারে কেস একটু হালকা হয়ে এসেছে, তখনই হোটেল ছেড়ে আবার আস্তে করে বাইরের জগতে মিশে যায়। আর যেতে তো হবেই বলুন। একটা ব্যাচ-ই যদি দিনের পর দিন সব ঘর বুক করে বসে থাকে, তাহলে অন্যেরা কী করবে? কত বদমাশ শিড়িঙ্গেপুরে আসবার জন্যে লাইন দিয়ে বসে আছে জানেন? ভগবানের দয়ায় এখন আমার লক্ষ লক্ষ টাকার বিজনেস। হেঃ হেঃ হেঃ।
তবে প্রথমদিকে রাঁধুনি নিয়ে খুব বিপদে পড়েছিলাম স্যার। কলকাতা ছেড়ে ভালো রাঁধুনি এই অজ গ্রামে আসতে চায় না। আপনার শিবুকে অনেক ভাঙিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওই বা সরকারি চাকরি ছাড়বে কেন? অগত্যা গ্রামেরই একটা ছেলে, আগে তেলেভাজার দোকান ছিল, তাকেই রাঁধুনি হিসেবে বহাল করলাম। সে এত বিশ্রী রাঁধত যে বলার কথা নয়। সেই রান্না খেয়ে বোর্ডারা বলত, এর চেয়ে পুলিশের হাতে আত্মসমর্পণ করে জেলখানার লপসি খাওয়াও ভালো। থাকতে না পেরে সত্যি-সত্যিই অন্য কোথাও গিয়ে গা ঢাকা দিত তারা।
কী করে যে খাওয়াদাওয়ার উন্নতি ঘটানো যায় সেই চিন্তায় তখন সারাক্ষণ মাথা ধরে থাকত আমার। এরকমই একদিন সন্ধেবেলায়, হোটেলের রান্নাঘরে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছি, আর দেখছি রাঁধুনিটা উনুনের ওপরে একটা কড়াইয়ে মুরগির ঝোল ফুটতে দিয়ে বাইরে বোধহয় বিড়ি-টিড়ি খেতে বেরিয়েছে। সেই ফুটন্ত ঝোলের দিকে তাকিয়ে আমারই গা গুলোচ্ছিল। যেমন ট্যালট্যালে রং, তেমনই বোঁটকা গন্ধ। তখন আমার হাতে সবসময়ে একটা মাথাব্যথার মলমের শিশি থাকত। সস্তার ওষুধ। মেদিনীপুর লোকালের কামরা থেকে পাঁচটাকা দিয়ে কিনেছিলাম। কিন্তু বেশ তেজ ছিল জিনিসটার। কপালে একটু ঘষে নিলে চিনচিন করত। মাথা যন্ত্রণাটা একটু কমত।
সেদিন আমি ঝোলের কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে শিশিটা নিয়ে যেই ঢাকনাটা খুলেছি, অমনি কেমন করে জানি হাত ফসকে গোটা শিশিটাই গিয়ে পড়ল ঝোলের কড়াইয়ে। আর বলব কী স্যার, সঙ্গে সঙ্গে সেই চিকেন কারির চেহারা আগাপাস্তালা বদলে গেল। যেমন হল তার আলতার মতন রং, তেমনি বেরোল তার খুশবু। আহা! যেন কেউ উপত্যকার সমস্ত দামি দামি মশলা বেঁটে তার মধ্যে ঢেলে দিয়েছে।
আমি হাতায় করে একটু ঝোল মুখে দিয়ে নাচতে শুরু করলাম, এমনই সেই ঝোলের অপূর্ব স্বাদ।
তারপর রাতে যখন বোর্ডারদের পাতে সেই ঝোল পড়ল তখন তারাও নাচল। অসম থেকে এসেছিল ব্যাচা বড়ুয়া, কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী। সে নাচল বিহু। গুজরাটের হিরেচোর প্রভু প্যাটেল নাচল গরবা। এমনকী গুরুভাই বলিসকি নামে এক রাশিয়ান অস্ত্রব্যবসায়ী তখন কিছুদিনের জন্যে এই হোটেলে গা ঢাকা দিয়েছিল, সে অবধি সেই চিকেন কারি খেয়ে পোলকা বলে একটা রাশিয়ান নাচ না নেচে পারল না।
বুঝলাম ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। পরেরদিনই মেদিনীপুরে গিয়ে ট্রেনের কামরার সেই ফেরিওলাকে খুঁজে বার করলাম। তার সঙ্গে সারা বছরের মলমের জন্যে কন্ট্রাক্ট করে এলাম। আর কলকাতার পেটেন্ট অফিসে গিয়ে নিজের নামে সেই চিকেন কারির রন্ধন প্রণালীর পেটেন্ট নিলাম। রেসিপিটার নাম দিলাম 'মুহুরি-মুসল্লম'। নামটা কেমন হয়েছে বলুন তো? যাই হোক, মুহুরি মুসল্লমের জন্যেই অনেক বোর্ডার এখন শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর ছেড়ে যেতে চায় না। হেঃ হেঃ হেঃ।
তা বোর্ডাররা না যেতে চাক, ডাক্তার সান্যাল দেখলেন তাকে এবার যেতেই হবে, কারণ বেলা হয়ে গেছে। এরপর হেলথসেন্টারে রুগির ভিড় বাড়তে শুরু করবে।
ফণী মুহুরি ডাক্তারবাবুকে গেট অবধি এগিয়ে দিতে গেল। ভজেন ডাক্তারের পাশে হাঁটতে হাঁটতে সে ভারি নিরীহ গলায় জিগ্যেস বলল, একটা কথা জিগ্যেস করব স্যার? আপনার এই অজপাড়াগাঁয় পোস্টিং হল কেন? মানে, আপনার যা সিনিয়রিটি তাতে তো কলকাতা ছেড়ে আসার কথা নয়। কোনও গণ্ডগোল হয়েছিল না কি?
ফণীর এই প্রশ্নের উত্তরে ভজেন ডাক্তার আপনমনে বললেন,—নাঃ, সেরকম গণ্ডগোল আর কী? শুধু নেমীচাঁদ খৈতানের একটা ল্যাজ বেরিয়ে গিয়েছিল।
—ল্যা-ল্যা-ল্যাজ! মানে পুচ্ছ! টেইল!
—হ্যাঁ। বেশি বড় নয়। এই ইঞ্চিদুয়েক হবে বড়জোর। তাও পরেরদিনই কেটেকুটে ঠিক করে দিয়েছিলাম। তাতেই সে মিনিস্টার টিনিস্টার ধরে আমাকে বদলি করে দিল।
একটু থেমে ডাক্তার সান্যাল যোগ করলেন—তবে তার জন্যেই আমার গবেষণার সুযোগ কলকাতার থেকেও বেশি। আচ্ছা চলি। নমস্কার।
হতভম্ভ ফণী মুহুরি ডাক্তার ভজেন সান্যালের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে অন্যমনস্কভাবে নিজের কোমরের পেছনটায় একবার হাত বুলিয়ে দেখে নিল, কিছু গজিয়েছে টজিয়েছে কি না।
গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার কথা আমরা আগে একটু বলেছি। শিড়িঙ্গেপুরের দুদিকে দুটো বড় গঞ্জ। দু-জায়গাতেই স্কুল রয়েছে। হাসপাতাল, পোস্টঅফিস, টেলিভিশন, বাজার হাট, এমন কি হ্যাঁ—দু-জায়গাতেই পুলিশের থানাও রয়েছে।
গজহট্ট থানার দারোগাবাবুর নাম ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে। আর ভৈরবডাঙার দারোগাবাবুর নাম রমেন পাইক। আশ্চর্যের ব্যাপার—এই দুই দারোগাবাবুর চেহারা এবং চরিত্রের ভারী মিল, যদিও তাদের মধ্যে কোনওরকম আত্মীয়তা নেই। দুজনেরই বেশ নাদুসনুদুস ভুঁড়দাস চেহারা। হাসিখুশি স্বভাব। দুজনেরই কাজকর্মে ভারি আলিস্যি। অফিসের ফাইলের তলায় লুকিয়ে গোয়েন্দা কিংবা ভূতের গল্পের বই পড়ার অভ্যেস রয়েছে দুজনেরই।
এ সবের জন্যে থানার কাজকর্মে কোনও অসুবিধে হত না। কেন না, গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার মতন শান্তিপূর্ণ জায়গা ভূ-ভারতে তিনটে ছিল না। অব্যবহারে দুই থানারই রাইফেল-টাইফেলে মরচে পড়ে গেছে। ফুটবল খেলার সময় রেফারি বাজাবে বলে পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা হইসলগুলো নিয়ে চলে গেছে। এমনকী সেপাইদের ব্যবহার করার জন্যে যে বেতের লাঠিগুলো কেনা হয়েছিল সেগুলো দিয়েও তাদের বউরা লাউ কুমড়োর মাচা বানিয়ে ফেলেছে বলে শোনা যায়।
এই পরিস্থিতিতে দুই দারোগাবাবুর মধ্যে যে গলায় গলায় বন্ধুত্ব তৈরি হবে তাতে আশ্চর্য কী? রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে একে অন্যকে ছেড়ে বেশিদিন থাকতে পারেন না। প্রায়ই দ্যাখা যায় গজহট্ট থানার জিপ এসে ভৈরবডাঙা থানার সামনে দাঁড়াল, না-হলে ভৈরব-ডাঙার জিপ গজহট্টের দারোগাবাবুর কোয়ার্টারের সামনে।
তারপর গম্ভীর মুখে দুজনে কোনও একটা থানার গাড়িতে উঠে রওনা হয়ে যান। কেউ জিগ্যেস করলে বলেন,—যৌথ তদন্তে যাচ্ছি। টপ সিক্রেট। এর চেয়ে বেশি কিছু বলা বারণ।
কেউ তাদের কথা বিশ্বাস করে না অবশ্য। কারণ দুই গঞ্জেরই সব্বাই জানে যে তাদের দারোগাবাবুরা হয় এতক্ষণে কোনও বড় দিঘির ধারে ছিপ ফেলে বসে গেছেন, কিংবা কোনও গাছের ছায়ায় দাবার ছক পেতেছেন।
এমনিতে দুই দারোগাবাবু তাদের এইসব যৌথ অভিযান লুকিয়ে চুরিয়ে করলেও, বছরে একটা দিন তারা বেশ হাঁকডাক করেই কাজে ফাঁকি মারেন। সেটা হল বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। দুজনেই যার যার থানায় বলে দিয়েছেন, ওইদিন ছুটি। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কাজ করলে বাবা বিশ্বকর্মা খুব রাগ করবেন, আর তার ফলে বন্দুক-টন্দুক জ্যাম হয়ে যাবে। বলা যায় না, থানার জিপগাড়িও ব্রেক ফেল করতে পারে। অতএব ওদিন একদম কেউ অফিসে ঢুকবে না।
সবাই বোঝে, এসব একদম বানানো যুক্তি। আসল কথা হল, দুই দারোগাবাবুরই ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচণ্ড নেশা। বিশ্বকর্মা পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই দ্যাখা যায়, দুই থানার সিপাইরা সারি দিয়ে বসে হামানদিস্তায় ভাঙা শিশিবোতল গুঁড়ো করছে, আর কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে ঘুরে তাদের কাজের তদারক করছেন ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে কিংবা রমেন পাইক। রাতের বেলায় দুই বন্ধু ঘরে খিল দিয়ে বসে ফিসফিস করে আলোচনা করেন—ওই মিহি কাচের গুড়োর সঙ্গে কী কী মিশিয়ে ভয়ংকর শক্তিশালী মাঞ্জা তৈরি করা যেতে পারে।
এ বছর হয়তো রমেন পাইক বললেন, বুঝলে ভোলা! শুনেছি পাহাড়ি ধুতরোর আঠার মার নেই। দিয়ে দেখবে না কি একটু? তো পরের বছর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জে বললেন, রমেন! যে ভাবে হোক সজারুর কাঁটার পাউডার যোগাড় করতে হবে। ও জিনিস মেশালে কারুর বাবার ক্ষমতা হবে না সেই মাঞ্জাকে টেক্কা দেয়।
ফরমুলা অনুযায়ী মাঞ্জা তৈরি হলে পর, থানার লম্বা বারান্দায় দুদিকের খুঁটিতে জড়িয়ে মিটারের পর মিটার সুতোয় সেই মাঞ্জা লাগানো হয়। সেই মাঞ্জা লাগানো সুতো যাতে হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে ভিজে না যায়, সেই চিন্তাতেও দুই দারোগার ঘুম আসে না।
এত কিছুর পরে যে সুতো তৈরি হয়—গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার মানুষ মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে—তেমন মাঞ্জা তারা কোনওদিন চোখে দেখেনি। ধারালো ব্লেডের মতন কড়কড়ে সুতোর টানে দারোগাবাবুদের ঘুড়ি বিশ্বকর্মা পুজোর দুদিন আগে থেকেই গঞ্জের আকাশে রাজার মতন উড়ে বেড়ায়।
আর সেসব ঘুড়িরই বা কী বাহার! লখনউ, কানপুর এমনকী মাঝে মাঝে টোকিয়ো কিংবা সাংহাই থেকেও সেসব ঘুড়ি অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নেন দুই দারোগা। বিরাট বিরাট ঘুড়িগুলো যখন অনেক উঁচুতে ওই নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়, তখন এই মাটিতে দাঁড়িয়েও তাদের রাগি ভিমরুলের মতন বোঁ-ও-ও, বোঁ-ও-ও গর্জন শুনে লোকের তাক লেগে যায়। গজহট্ট কিংবা ভৈরবডাঙার আর কোনও ঘুড়ি তাদের ঘুড়ির সঙ্গে আজ অবধি দু-মিনিটের বেশি প্যাঁচ খেলতে পারেনি।
এ বছরেও বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে ভৈরবডাঙার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি হিরামঞ্জিলের ছাদে দুই দারোগাবাবুর ঘুড়ি ওড়ানোর আসর বসেছিল। আয়োজনের কোনও কমতি ছিল না। খাওয়ার জন্যে থালা ভরতি জিলিপি, হাঁড়ি ভরতি মালাই শরবত, খিলি পান, প্যাকেট প্যাকেট সিগারেট এসব তো ছিলই। তাছাড়া অন্য ঘুড়ি ভোকাট্টা হলে দুয়ো দেবার জন্যে অন্যান্য বছরের মতন কাঁসর-ঘণ্টা ইত্যাদি নিয়ে দুই থানার দশ-দশ কুড়িটা কনস্টেবলও হাজির ছিল। তবে এ বছরের বিশেষ আকর্ষণ ছিল দুটো ভুভুজেলা। দারোগা রমেন পাইকের এক বন্ধু সাউথ আফ্রিকার বিশ্বকাপের আসর থেকে তার জন্যে নিয়ে এসেছিল এই বিকট বাঁশিদুটো। সকাল থেকে এই বেলা দশটার মধ্যেই দুই বন্ধু মিলে গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার বাঘা বাঘা ঘুড়িবাজদের প্রায় খান কুড়ি ঘুড়ি কেটে দিয়েছে : আর প্রত্যেকবারই পরাজিতদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে প্রবল উৎসাহে বেজে উঠেছে ভুভুজেলা।
বেলা বারোটা নাগাদ ভোলানাথ মনমরা গলায় তার বন্ধু রমেনকে বললেন—প্রতিযোগিতা না থাকলে কি কোনও খেলা খেলেই আরাম পাওয়া যায়? এই যে এত খরচা পাতি করে উজবেকিস্তান থেকে ঘুড়ি কিনে আনলাম, তা সেগুলো কি আর ওড়ানোর সুযোগ পাব না?
রমেন উত্তর দিলেন,—যা বলেছ ভাই ভোলা। সকালবেলা যে ঘুড়িটাকে আকাশে তুলেছিলাম, এখনও অবধি সেটাকেই কেউ কাটতে পারল না। গতিক দেখে মনে হচ্ছে, দিনের শেষে ওই ঘুড়িটাকে নিয়েই আমাদের লাটাই গোটাতে হবে।
ঠিক সেই সময়েই একটা প্যাঙলা মতন চাঁদিয়াল ঘুড়ি দারোগাবাবুদের বিরাট ঘুড়িটার আশেপাশে এসে মশার মতন পিনপিন করে উড়তে লাগল। সেদিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে রমেন পাইক মহা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন,—এই দ্যাখো! কোনও বাচ্চা ছেলে বোধহয় না বুঝে এদিকে ঘুড়ি বেড়েছে। একটু প্যাঁচ খেলে ছেড়ে দিই ওটাকে। কাটব না। কষ্ট পাবে।
নিতান্তই তাচ্ছিল্য ভরে রমেন পাইক চাঁদিয়ালের সঙ্গে প্যাঁচ লাগালেন। তারপর পাঁচ সেকেন্ডও কাটেনি। হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রমেন পাইকের উজবেকী ঘুড়ি সুতোর বাঁধন কেটে উজবুকের মতন লাট খেতে খেতে উড়ে চলল নিরুদ্দেশের পানে।
চোখের পাতা পড়লে তার শব্দ শোনা যাবে, এমনই নীরবতা নেমে এল হিরামঞ্জিলের ছাদে। সবাই বিস্ময়ে স্তব্ধ। এ কী হল! কেমন করে হল! গত দশবছরে যা ঘটেনি তা কেমন করে এই মুহূর্তে ঘটে গেল! একটা পুঁচকে চাঁদিয়াল এসে কেটে দিল দারোগাবাবুদের অপরাজেয় ঘুড়িকে?
ওদিকে বিজয়ী চাঁদিয়াল তখনও হিরামঞ্জিলের ছাদের ওপর তিড়িংতিড়িং করে লাফাচ্ছে; যেন তাল ঠুকে বলছে—আয়, কে আমার সঙ্গে প্যাঁচ খেলতে চাস চলে আয়।
ওড়াচ্ছে কে ঘুড়িটা? সবার চোখ চলে গেল চাঁদিয়ালের সুতোর উৎসের দিকে।
উৎসটি শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ছাদ। এত দূরে থেকেও দ্যাখা যাচ্ছে, সেই হোটেলের ছাদে অন্তত দশ-বারোটি লোক আনন্দের চোটে দু-হাত তুলে লাফাচ্ছে। নিশ্চয় কাঁসর-ঘণ্টাও বাজাচ্ছে। তার ক্ষীণ শব্দও যেন কানে এল পুলিশদলের। রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যের দাঁত কিড়মিড়ানির শব্দে ছাদের কার্নিশ থেকে কিছুটা প্লাস্টার খসে পড়ল।
ভোলানাথ বললেন—রমেন! টোকিও থেকে যে হারাকিরি ঘুড়িটা আনিয়েছিলাম ওটার কল বাঁধো দেখি। এবার আমাকে ওড়াতে দাও। ছিন্নভিন্ন করে দেব ওই চোরের দলের চালিয়াত চাঁদিয়ালকে।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দ্যাখা গেল হারাকিরিই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
হিরামঞ্জিলের ছাদ থেকে সবাই হাঁ করে দেখল, চাঁদিয়ালের সুতোর সঙ্গে হারাকিরির সুতোর যেই না প্যাঁচ লাগল, অমনি ইলেকট্রিক স্পার্কের মতন চিরচির করে একটু আগুন জ্বলে উঠল। পোড়া গন্ধও পাওয়া গেল একটু। তারপরেই দিগন্তের বুকে হারিয়ে গেল হারাকিরি।
এবারে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ছাদের কাঁসর-ঘণ্টা পেটানোর শব্দ দিব্যি পরিষ্কার শোনা গেল হিরামঞ্জিলের ছাদ থেকে। লাল চাঁদিয়ালের নাচ দ্যাখে কে!
দুই দারোগাবাবু হতভম্ভ হয়ে এ ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। এমন আগুনে মাঞ্জা লাগানো রয়েছে যে ঘুড়ির সুতোয়, তার সঙ্গে মোকাবিলা করা যাবে কেমন করে?
তবু তারা আবার ঘুড়ি ওড়ালেন। এবার যে লাটাইটা ব্যবহার করছেন তার সুতোয় 'কাইট-বাবা' নামে হরিদ্বারের এক সন্ন্যাসীর স্বপ্নে পাওয়া মাঞ্জা লাগানো আছে। সে মাঞ্জায় নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পদার্থ নীল স্ফটিকের গুঁড়ো মেশানো হয়। কাইট-বাবার পায়ে একহাজার টাকা প্রণামি দিয়ে, হরিদ্বার থেকে ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে অনেক কষ্টে মাত্র দশ গ্রাম সেই দুর্লভ মাঞ্জা নিয়ে এসেছিলেন। এ হচ্ছে ঘুড়ির জগতের ব্রহ্মাস্ত্র।
কাইটবাবার মাঞ্জা নিয়ে বোঁ ও ও করে উড়ে গেল হিরামঞ্জিলের ঘুড়ি। চোঁওও করে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের পুঁচকে চাঁদিয়াল, এবং...
এবং আবার অ্যাকশন রিপ্লে।
মানে আবার সুতোয় সুতোয় ঘসা লাগতেই চিড়চিড় করে আগুনের রেখা। পোড়া গন্ধ। লাট খেতে খেতে উড়ে গেল দারোগাবাবুদের সাধের ঘুড়ি। শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ছাদে এমন 'ভো-ও-ও কাট্টা-আ-আ' আওয়াজ উঠল যে এতদূরে বসেও কানে আঙুল দিতে হল পুলিশবাহিনীকে।
সারাদিনে মোটমাট তিরিশখানা ঘুড়ি কেটে দারোগাবাবুদের ফতুর করে দিল শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের চাঁদিয়াল।
শেষকালে সূর্য যখন অস্ত যাই যাই করছে তখন আর অপমান সহ্য করতে না পেরে ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যের মতন শান্ত লোক কোমর থেকে সার্ভিস-রিভলভার বার করে দুড়ুম করে গুলি চালিয়ে দিলেন চাঁদিয়ালের দিকে। বলাই বাহুল্য, দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে সেই গুলি চাঁদিয়ালের পাশ কাটিয়ে চাঁদের দিকে চলে গেল। শেষবার দারোগাবাবুদের দুয়ো দিয়ে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের টিম তাদের ঘুড়ি গুটিয়ে নিল।
শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের কাছে ল্যাজেগোবরে হওয়ার অপমানটা দুই দারোগার বুকে দ্বিগুণ হয়ে বেজেছিল, কারণ একে তো ঘুড়ির জগতে তাদের অপরাজেয় খেতাবটা মাটিতে লুটিয়ে গেল, আর গেল তো গেল এমন একদল লোকের হাতে যারা তাদের চাকরিজীবনেও গলার কাঁটা। দুনিয়ার চোর বদমাশগুলো এসে নাকের ডগায় বসবাস করছে। খাচ্ছেদাচ্ছে, বাঁশি বাজাচ্ছে। এ আর কত সহ্য হয়?
কিন্তু সহ্য না করেও উপায় নেই। পুলিশের আইন ভারি কড়া। কোনও থানার পুলিশই নিজের এরিয়ার বাইরে এক পা ফেলতে পারবে না। শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর তাদের কারুর এলাকার মধ্যেই পড়ে না।
উপরন্তু একবার দুই থানা মিলে জোরজার করে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে ঢোকার চেষ্টা মাত্র করেছিল, ফণী মুহুরি জলপাইগুড়ি আদালত থেকে অর্ডার বার করে এনে দুই থানার দারোগাবাবুরই হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। সেই অর্ডারে পরিষ্কার বলা ছিল, শিড়িঙ্গেপুর গ্রাম কোন থানার অধীনে, তা স্থিরীকৃত না হওয়া অবধি কোনও পুলিশ যেন ওই গ্রামে পা না দেয়। ব্যস। বারোটা বেজে গেল যৌথ অভিযানের।
বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে যা ঘটেছিল তার জ্বালা মন থেকে মিলোবার আগেই রমেন পাইক এবং ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে দিল্লির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতর থেকে একই ফোন পেলেন। ওদিকে নিশ্চয় বেশ বড় মাপের কোনও গোয়েন্দাকর্তাই বসেছিলেন। ফোনের বক্তব্য,—কুখ্যাত গুপ্তচর বাসব মুখার্জি নাকি ভারতের সমস্ত রাডার-ঘাঁটির ম্যাপ নিয়ে, পুলিশের তাড়া খেয়ে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে আশ্রয় নিয়েছে। সে এখন চুপচাপ ওই হোটেলে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করছে, কবে পুলিশের পাহারা একটু ঢিলে হয়। তখনই সে বর্ডার পেরিয়ে চম্পট দেবে।
দিল্লির গোয়েন্দাকর্তা আলাদা করে রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যেকে জিগ্যেস করলেন যে তারা বাসব মুখার্জিকে ধরার ব্যাপারে কোনও সাহায্য করতে পারে কি না?
দুজন দারোগাই তাকে জানিয়ে দিলেন যে, ধরতে পারলে তো তারা খুবই খুশি হতেন। কিন্তু আইনের প্যাঁচে আপাতত তা অসম্ভব।
দিল্লির গোয়েন্দাকর্তাকে দেখা গেল বেশ ঠান্ডামাথার মানুষ। একটুও উত্তেজিত না হয়ে তিনি নিজের মনেই হিন্দিতে যা বললেন, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়,—সোজা আঙুলে যখন ঘি উঠবে না তখন আঙুল বেঁকাতেই হবে। দেখছি কী করা যায়।
''বারুদবালক অক্ষয় কুমার মালাকারের সংবর্ধনা সভা।''
শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের একতলার কনফারেন্স রুমের দেয়ালে ঝলমলে ফেস্টুনে এই কথাগুলোই লেখা আছে।
ফেস্টুনের নীচে লম্বা টেবিল। টেবিলের ধারে সার দিয়ে রাখা আছে পাঁচটা চেয়ার। বাঁদিকের দুটো চেয়ারে বসে আছে ফণী মুহুরি আর রামকেষ্ট চোর। ডানদিকের চেয়ার দুটোর মধ্যে একটাতে একজন ফরসা সুপুরুষ ভদ্রলোক, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, সরু গোঁফ,—দেখলেই মনে হয় কোনও কলেজের লেকচারার হবেন। লেকচারার নয়, এই লোকটাই হচ্ছে কুখ্যাত স্মাগলার বাসব মুখার্জি। আর একটাতে মুশকো কালো পাহাড়ের মতন চেহারার এক অবাঙালি। তাকে সবাই চাক্কু বলরাম নামেই চেনে। বিহারের এই ডাকাতের নামে মোটমাট পনেরোটা খুনের মামলা আছে।
একদিকে ফণী মুহুরি আর রামকেষ্ট চোর, আরেক পাশে বাসব মুখার্জি আর চাক্কু বলরাম। মাঝের পাঁচনম্বর চেয়ারটায় বসে আছে শান্তশিষ্ট এক বালক। বয়েস বছর চোদ্দো-পনেরো হবে। গলায় মস্ত বড় গাঁদা ফুলের মালা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ও বারুদ-বালক অক্ষয় মালাকার। ওকে সংবর্ধনা দিতেই আজ সন্ধ্যায় কনফারেন্স রুমে সবাই জড়ো হয়েছে।
সভা পরিচালনা করবার জন্যে উঠে দাঁড়াল ফণী মুহুরি। গলা খাঁকরে শুরু করল,—সমবেত ভদ্রমহোদয়। দ্যাখা গেল এমন সম্বোধনে উপস্থিত সকলেই লজ্জায় অধোবদন হল। যাই হোক, ফণী মুহুরি বলে যেতে লাগল —আমার হোটেলে ইতিপূর্বে অনেক গুণী মানুষের পায়ের ধুলো পড়েছে। এখনও আপনারা যারা আছেন তারা সকলেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, বিপুল দুর্নামের অধিকারী। আশাকরি ভবিষ্যতেও শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে গুণী মানুষদের আগমন অব্যহত থাকবে।
তবু সবাইকে বাদ দিয়ে কেন অক্ষয় মালাকারের সংবর্ধনার আয়োজন করা হল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অক্ষয় সম্বন্ধে আপনাদের কিছু জানতে হবে।
বীরভূমের কানফাটা গ্রামটি বাজিকরদের গ্রাম। বাজিকর মানে ম্যাজিশিয়ান নয়। আতসবাজি বানায় যারা। তা এমনই এক বাজিকরের ঘরে মাত্র চোদ্দো বছর আগে অক্ষয় জন্মগ্রহণ করে।
জন্মে থেকেই সে মা-মাসিদের কোলে বসে বাজির মশলা ঘাঁটাঘাঁটি করছে। করতে করতে খেলার ছলে মাত্র পাঁচ বছর বয়েসে অক্ষয় একটা চারদোমা বানিয়ে ফেলল। সেই বাজি পরপর চারবার ফাটে। আর প্রত্যেকবার ফাটার সঙ্গে সঙ্গে চার রঙের আলোর ফুলকি ছোটে। পাঁচ বছরের শিশুর হাতে তৈরি সেই চারদোমা দেখে কানফাটা গ্রামের বুড়ো বাজিকরেরা বলল, কানাই মালাকারের ঘরে একটা প্রতিভার জন্ম হয়েছে বটে।
দশ বছর বয়েসে অক্ষয় যে বোমাটা বানাল তার আওয়াজে গ্রামের দুশো বছরের প্রাচীন বটগাছটা উলটে পড়ল।
আপনারা জানেন অপরাধ জগতে প্রতিভার কথা গোপন থাকে না। কিছুদিন বাদে যখন আমোদপুরের ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের আট ইঞ্চি পুরু লোহার চাদরে বানানো ভল্ট মাত্র একটা বোমার ঘায়ে গলে গেল, তখন বাংলার পুলিশও বুঝতে পারল, হ্যাঁ, কোথাও একজন মহাপুরুষ জন্মেছেন ঠিকই। কে তিনি? পুলিশ চারিদিকে তাকে খুঁজতে শুরু করল। বুঝতেই পারছেন তিনি আমাদের এই অক্ষয় ছাড়া কেউ নয়।
ইতিমধ্যে বিভিন্ন ডাকাতদলের কাছে অক্ষয়ের বানানো নানারকম বোমার চাহিদা ভীষণরকম বেড়ে গেল। কলকাতা, শিলিগুড়ি এমনকী সুন্দরবন থেকেও এজেন্টরা এসে কানফাটা গ্রামের কানাই মালাকারের কারখানার সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে এক পিস কানা-বোমার জন্যে। কানা-বোমা কি জিনিস জানেন তো? ধরুন পুলিশে আপনাকে তাড়া করেছে। আপনি পেছনে একটা কানা-বোমা ছুড়ে দিলেন। ব্যস, এমন চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলক বেরোবে, যে একঘণ্টার জন্যে পুলিশ অন্ধ। আপনি ইতিমধ্যে ধীরেসুস্থে চলে যান না, যেখানে যাবেন। তাছাড়াও ছিল মাখনচোর বোমা, চাঁদমালা বোমা, ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি বোমা...আরও কত কী।
কানাই মণ্ডল তার ছেলের কল্যাণে ফুলে ফেঁপে উঠল।
কিন্তু এত সুখ বেশিদিন সইবে কেন? কানাইয়ের প্রতিবেশীরা পুলিশের কাছে তার গোপন ব্যবসার কথা ফাঁস করে দিল। আর তারপর...বুঝতেই পারছেন, বেচারা অক্ষয়কে আশ্রয় নিতে হল এই শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে।
কিন্তু হিরের টুকরোকে আপনি ছাই চাপা দিয়ে রাখলেও সে আলো ছড়াবেই। এখানে এসে অক্ষয় তার বিরল প্রতিভা দিয়ে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমাদের চিরশত্রু পুলিশ বাহিনীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে। কেমন করে? আমাদের ঘুড়ির জন্যে আগুনে মাঞ্জা বানিয়ে।
সেই মাঞ্জার দুরন্ত কীর্তি আপনারা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছেন; কেমন করে দারোগাবাবুদের একের পর এক ঘুড়ির সুতো সেই মাঞ্জার স্পর্শে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
আঃ, রমেন আর ভোলানাথের চুন হয়ে যাওয়া মুখদুটো বাইনোকুলার দিয়ে দেখে সেদিন যে কী আনন্দ পেয়েছিলাম! তেমন আনন্দ বহুকাল পাইনি। তাই হোটেলের তরফ থেকে আমরা আজ অক্ষয়ের প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে 'বারুদবালক' উপাধি দিচ্ছি।
ফণীর বক্তৃতা শেষ হওয়া মাত্র শের-ই-শিরিঙ্গেপুরের কনফারেন্স-রুম হাততালির শব্দে ফেটে পড়ল। রামকেষ্ট চোর তার বক্তৃতায় বলল, যদিও আমার কাজের সঙ্গে বোমা-বারুদের বিশেষ সম্পর্ক নেই, শারীরিক দক্ষতার ওপরেই আমরা বিশেষ নির্ভর করি, তবু অক্ষয়ের বানানো মাঞ্জায় ঘুড়ি উড়িয়ে সেদিন যে আনন্দ পেয়েছি তার কথা কোনওদিন ভুলব না।
বাসব মুখার্জি বলল, আমরা ভারত সরকারের কাছে প্রস্তাব দেব আন্দামানের ব্যারন দ্বীপের আগ্নেয়গিরিটির নাম এই বারুদবালকের সম্মানে এখন থেকে 'অক্ষয়গিরি' রাখা হোক।
চাক্কু বলরাম বলল, কিঁউ ভাই অখষোয়া তুম বেঙ্গলমে টাইম বরবাদ করতে হো? মেরে সাথ মুঙ্গের চলো। উধার বোমা-বন্দুক কো খুলা বাজার চলতা হ্যায়। তুমকো হাম উধারকা সরপঞ্চ বানা দুঙ্গা।
এরপর অক্ষয়ের হাতে মানপত্র আর রুপোর বোমা তুলে দিল ফণী মুহুরি। হোটেলের তরফ থেকে সবাইকে ফিশফ্রাই আর কফি দেওয়া হল।
উপস্থিত বিশ-তিরিশজন বোর্ডার আর কর্মচারী সবে ফিশফ্রাই শেষ করে, যে যার কফির কাপ মুখে তুলেছে, এমন সময় আকাশ কাঁপানো আওয়াজ শোনা গেল,—ব্যোম কালী।
সকলে তো গলায় কফি আটকে, বিষম-টিষম খেয়ে একাকার। তারপর কোনওরকমে একটু সামলে দরজার দিকে চোখ তুলে দেখে, রক্তের মতন লাল ধুতি আর আলখাল্লা পরনে এক দশাসই তান্ত্রিক ঘরে ঢুকছে। তার বুক অবধি লম্বা কুচকুচে কালো দাড়ি আর কাঁধে লুটোচ্ছে বাবরি চুল।
—ব্যোম কালী শ্মশানবাসিনী। খেয়ে নে মা, সব পাপী-তাপীকে খেয়ে নে। হুঙ্কার দিতে দিতে সেই তান্ত্রিক সোজা এগিয়ে এল ফণী মুহুরিরা যেখানে বসে আছে সেই মঞ্চের দিকে। এমনই সেই তান্ত্রিকের ব্যক্তিত্ব যে, ঘরের মধ্যে যে যেখানে ছিল সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। চাক্কু বলরাম তান্ত্রিকের হুঙ্কার শুনেই, দীর্ঘদিনের অভ্যেসে, কোমরে লুকোনো ভোজালিখানা হাতে বার করে এনেছিল। তান্ত্রিকের চোখ পড়ল সেই দিকে—
—হাতে ওটা কী জিনিস বাবা বলরাম? হেঁড়ে গলাকে যতদূর মিষ্টি করা যায় করে জিগ্যেস করলেন তিনি।
টেবিলে একটা শশা পড়েছিল। বলরাম তাড়াতাড়ি ভোজালি দিয়ে সেই শশাটাকে কুচি কুচি কাটতে কাটতে বলল,—কই কিছু না তো। এই ফণীদা বললেন রাতের খাওয়ার জন্যে একটু স্যালাড কাটতে...তাই...ইয়ে।
—ও, ফণী? কোথায় ফণী? ফণী-ই-ই-ই!
ফণী মুহুরি টেবিলের তলায় ঢুকে পড়েছিল। এখন তার নাম ধরেই ডাকা হচ্ছে শুনে সেখান থেকে বের হয়ে এল। বেরিয়েই তান্ত্রিকের একেবারে মুখোমুখি।
—ওখানে কী করছিলে?
—এই তো। পকেট থেকে পেনটা পড়ে গিয়েছিল। কুড়োচ্ছিলাম।
—বেশ। তা বাবা ফণী। মায়ের আদেশ এখন যে আমাকে তোমার এখানেই কিছুদিন থাকতে হবে।
—আপনার মা আমাকে চেনেন বুঝি? কে বলুন তো? আরামবাগের মাসিমা বুঝি?
—ওঃ উজবুক। আমার মা মানে ব্রহ্মময়ী তারা। পাপীটাকে খেয়ে ফেল মা! খেয়ে ফেল! রাগের চোটে ছাদ ফাটিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন তান্ত্রিক।
রামকেষ্ট চোর এতক্ষণ কী যেন খোঁজাখুঁজি করছিল। হঠাৎ ঘরের কোণে আগের ক'দিনের পুরোনো নিউজ পেপারগুলো খুঁজে পেয়ে সে তাড়িতাড়ি ফণী মুহুরির পাশে এসে ফিসফিস করে কী সব যেন বলল। ফণীও তাড়াতাড়ি কাগজগুলোর পাতা উলটে দেখল। তারপর একগাল হেসে এগিয়ে গেল তান্ত্রিকের কাছে। বলল,—এই দেখুন স্যার...ইয়ে বাবা। আগে পরিচয়টা দেবেন তো। শুধুমুধু ভয়ের চোটে আমাদের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে যাচ্ছে। বসুন বসুন, আপনি এই সভাপতির চেয়ারটাতেই বসুন। এই কে আছিস? শিগগির ছ'টা ফিশফ্রাই নিয়ে আয় বাবার জন্যে।
তারপর ফণী মুহুরি নতুন উদ্যমে মাইকটা নিয়ে বলতে শুরু করল,—ভদ্রমহোদয়গণ! বলেছিলাম না, এই শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে গুণী মানুষদের পায়ের ধুলো চিরকাল পড়বে? বলতে না বলতেই চলে এসেছেন শ্মশানসিদ্ধ কাপালিক কালিসাধন। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। যার নাম আর ছবি গত ক'দিনের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় বড় করে ছাপা হচ্ছে, ইনিই সেই কালিসাধন চক্রবর্তী।
ফণী মুহুরির ঘাড়ের পেছন থেকে ফিসফিস করে চাক্কু বলরাম বলল, ফণীদা! আমি তো বাংলা পড়তে পারি না। তা ইনি কী জন্য মশহুর আছেন?
—ইনি শবসাধনার জন্যে নিজের হাতে গত ছ'মাসে ছ'টি শব তৈরি করেছেন। মানে ছ'টা লোককে মেরে ফেলেছেন।
সারা ঘরের দাগী ক্রিমিনালদের মুখ থেকেও এই খবরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।—ইসসস।
কালিসাধন তান্ত্রিক মন দিয়ে ঘরের সবার মুখের ভাব লক্ষ করলেন। তারপর ফিশফ্রাই চিবোতে চিবোতেই বললেন, কী আর করা যাবে? ছ'মাসে ছ'টি শবদেহ এমনিতে আমি পেতাম কোথায়? আর ছ'মাস ধরে শবসাধনা না করলে কি মারীচীদেবী আমাকে রাজা নৃসিংহদেবের গোপন ধনাগারের হদিশ দিতেন?
—কী কী কী? কী বললেন? সবাই হুমড়ি খেয়ে কালিসাধনের গায়ে উঠে পড়ে আর কী। কার ধনাগারের কথা বললেন?
—রাজা নৃসিংহদেবের। সেই ধনাগারে যে পরিমাণ হিরে জহরত আছে তাতে এখান থেকে কলকাতা অবধি একটা রাস্তা স্টোন চিপসের বদলে হিরে ব্যবহার করে বানিয়ে ফেলা যায়।
—আপনার জানা আছে সেই ধনাগারের হদিশ?
—তা আছে বইকি। না-হলে আর এত সাধনার অর্থ কী? সেই ধনাগার খুঁজে বার করতেই তো এখানে আসা।
—কোথায়? কোথায়? কোথায়? চারদিক থেকে হিন্দি বাংলা তেলেগু উড়িয়া এমনকী গ্রিক ভাষাতেও প্রশ্ন ভেসে এল। শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর আদত কসমোপলিটান জায়গা কিনা।
—সে তো এখনি বলা যাবে না। আদৌ কাউকে বলব কি না সেটা আমার ইচ্ছে। জয় কালী। সারাদিন বড় পরিশ্রম গেছে। বাবা ফণী, একটা লোককে বলো আমার ঘরটা দেখিয়ে দিতে। আমার কিন্তু টাকাপয়সা নেই। তোমাকে সোনার মোহরে পেমেন্ট দেব। অসুবিধে হবে না তো?
—কী যে বলেন স্যার...ইয়ে প্রভু। হেঁ হেঁ হেঁ। মোহরের কথায় ফণী একেবারে গলে জল।
—আর তুমি আমার রাতের খাবারটা ঘরেই পাঠিয়ে দিও। ও হ্যাঁ। দুজনের খাবার পাঠাবে।
—দুজনের কেন? অবাক গলায় জিগ্যেস করল ফণী মুহুরি।
—আমার একটা, আর জটাশঙ্কারের একটা?
—জটাশঙ্কর কে?
—আমার পোষা ভূত।
হতভম্ব ফণীর মুখের ওপর লাল চাদরের ঝাপটা মেরে কাপালিক তার ঘরের দিকে রওনা দিলেন।
সিঁড়ির মাঝামাঝি উঠেছেন। এমন সময়ে কে যেন কালিসাধনের চাদরের খুঁট ধরে টান দিল।
কে?—বলে ঘুরে দাঁড়ালেন কালিসাধন।
—আজ্ঞে একটা কথা জিগ্যেস করার ছিল।
কালিসাধন দেখলেন বাসব মুখার্জি কখন যেন তার পেছন পেছন উঠে এসেছে। তিনি একটু বিরক্ত হয়েই জিগ্যেস করলেন, কী কথা?
আজ্ঞে আপনি ত্যাবড়ডাঙা থেকে এখানে এসে পৌঁছোলেন কেমন করে? গুনু মইষাল তো জানত না আপনি আসছেন?
একটু থমকালেন কালিসাধন। তারপর জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, মারীচীসিদ্ধ মানুষের আবার বাহনের অভাব। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি একটা পাগলা হাতি দাঁড়িয়ে রয়েছে। বুঝলাম আমার জন্যেই মা ওটিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ওই কেষ্টর জীবটির পিঠে চড়েই চলে এলাম। তা তুই এত সব জানতে চাইছিস কেন?
একটু ধূর্ত হেসে বাসব মুখার্জি উত্তর দিল, নাঃ, আমি যেন ঘণ্টাখানেক আগে অনেক দূরে একটা হেলিকপ্টারের আওয়াজ পেয়েছিলাম।...মনের ভুলই হবে।
উলটোদিকে ঘুরে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা লাগাল বাসব মুখার্জি। চিন্তিত মুখে সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কালিসাধনও আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন।
হোটেল শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরকে ঘিরে রয়েছে তিন বিঘের বিরাট বাগান। বাগান ঘিরে উঁচু পাঁচিল। রামকেষ্ট চোর ভোরবেলায় সেই পাঁচিল বেয়ে ওঠানামা করছিল। রোজই করে। ক্যামাক স্ট্রিটের জুয়েলারিতে চুরির ব্যাপারে পুলিশ এখনও তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। যতদিন খোঁজাখুঁজি না থামে ততদিন তাকে এই হোটেলেই থাকতে হবে। কিন্তু এখানে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে গুপ্ত বিদ্যাগুলো ভুলে যাওয়াও তো কোনও কাজের কথা নয়। তাই রামকেষ্ট প্রতিদিন ভোরবেলায় শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের পাঁচিল বেয়ে ওঠানামা করে অভ্যাসটা বজায় রাখে।
গত রাতে অক্ষয়ের সংবর্ধনা সভা, তারপর কালিসাধনের আগমন,—এই সব নিয়ে মহা উত্তেজনা ছিল। তাই অন্য সকলের মতন রামকেষ্টরও ঘুমোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আজ ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু চোরেদের জীবনে ডিসিপ্লিনটা খুব বড় জিনিস। তাই ঘুমচোখেই রামকেষ্ট পাঁচিলের নীচে এসে দাঁড়াল। তারপর পেছন ফিরে সড়সড় করে কুড়ি ফুট পাঁচিলের ওপর অবধি উঠে গেল। নেমে এল। আরেকবার উঠল,—এক হাত আর এক-পা ব্যবহার করে। এই দ্বিতীয় পদ্ধতিতে যেই না সে পাঁচিলের একেবারে ডগায় গিয়ে চড়েছে, অমনি পাঁচিলের ওপাশ থেকে একটা মুখ একদম তার মুখের দু-ইঞ্চি দূরে ভেসে উঠল।
আরেকটু হলে চমক লেগে পড়েই যাচ্ছিল রামকেষ্ট। তাড়াতাড়ি অন্য হাত দিয়ে খপ করে পাঁচিলের ইট পাকড়ে ধরে পড়ে যাওয়াটা আটকাল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল,—এই, কে রে তুই?
উল্টোদিকের লোকটার অবস্থা আরও সঙ্গিন। হঠাৎ রামকেষ্টর সামনে পড়ে গিয়ে সে এমনই ভড়কে গেছে যে, তার পা দেয়াল থেকে ছেড়ে গেছে। এখন সে শুধু দুই হাতে পাঁচিলের কিনারাটা চেপে ধরে ঝুলছে। ওই ঝুলন্ত অবস্থাতেই লোকটা চিঁ চিঁ করে বলল,—আমাকে চিনতে পারছ না রামকেষ্ট? আমি ডাক্তারবাবু। ডাক্তার ভজেন সান্যাল।
আরে তাই তো! কী সর্বনাশ! পড়ে যাবেন যে। দাঁড়ান দাঁড়ান, আগে আপনাকে নীচে নামাই।
একরকম কাঁধে করেই ডাক্তার সান্যালকে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের বাগানের মধ্যে নামিয়ে আনল রামকেষ্ট। দুজনেই কিছুক্ষণ ঘাসের ওপর বসে হ্যা হ্যা করে হাঁপাল। তারপর রামকেষ্ট জিগ্যেস করল,—ব্যাপারটা কী বলুন তো ডাক্তারবাবু? আপনার মতন একজন মানুষের কি এইভাবে পাঁচিল টপকে ট্রেসপাস করা শোভা পায়?
লজ্জায় অধোবদন হয়ে ডাক্তার ভজেন সান্যাল বললেন,—কী করব বলো? সামনের পেল্লাই লোহার গেট বন্ধ। ঢুকব কোথা দিয়ে?
—কী আশ্চর্য! এত ভোরে আপনার এই হোটেলে দরকারটাই বা কীসের? একটু বেলা করে এলেই তো হত।
—না, না, রামকেষ্ট। তুমি বুঝবে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা কারুর জন্যে অপেক্ষা করে না। ভারি সিরিয়াস গলায় বললেন ডাক্তার ভজেন সান্যাল।—যদি টপকাতে না পারতাম, তাহলে আমি পাঁচিল ভেঙেই ঢুকতাম। কিন্তু ঢুকতে আমাকে হতই।
—কিন্তু কেন?
—গেছো মাকড়শার জন্যে।
রামকেষ্ট নিজের মাথাটা ধরে একবার বেশ জোরে ঝাঁকিয়ে নিল। তারপর বলল,—কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি তো; মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। আপনার কথাটাও ভালো শুনতে পেলাম না। আপনি কি 'মাকড়শা' বললেন? না কি কোনও ওষুধের নাম নিলেন? এই যেমন ধরুন ম্যাগসাল্ফ কিংবা মেক্সাফর্ম?
ডাক্তার সান্যাল একইরকম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন,—না, না। মাকড়শাই বলেছি। ঠিকই শুনেছ তুমি।
—কী করবেন ডাক্তারবাবু, এমন বিচ্ছিরি জিনিস নিয়ে?
—ব্যাপারটা কি জানো? টিকটিকি, মাকড়শা, তারপর লবস্টার মানে চিংড়িমাছ,—এদের ভারি আশ্চর্য একটা ক্ষমতা আছে। শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ যদি কেটে বাদও দিয়ে দেওয়া হয় তাহলেও এদের সেইসব অঙ্গ আবার গজিয়ে ওঠে।
—হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। সেসব তো কতই দেখেছি। টিকটিকির কাটা ল্যাজ আবার গজিয়ে যাচ্ছে, মাকড়শার ঠ্যাং, কোঁচোর ল্যাজ। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার গবেষণার সম্পর্কটা কী বলুন দেখি।
—বলতে পারি। কিন্তু তুমি আবার পাঁচ কান করবে না তো?
—রাম, রাম। অ্যাত্ত বড় জিভ কাটল রামকেষ্ট।—এই যে ফণীদার ক্যাশবাক্স থেকে কাল একশোটাকা গেঁড়িয়েছি, সে কথা কি কাউকে বলতে গেছি। আমার পেটে স্যার খুব কথা থাকে।
—বেশ। তাহলে কানটা এদিকে আনো। ফিসফিস করে বলি। আমি না, আমি না...বলবে না তো কাউকে?
—আরে না, না।
—আমি না মানুষের কাটা হাত-পা গজাবার চেষ্টা করছি।
ডাক্তার সান্যালের কথা শুনে রামকেষ্ঠ এমনই বড় হাঁ করে বসে রইল, যে সেই হাঁয়ের মধ্যে একটা বোলতা কিছক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার বেরিয়ে এল। সে টেরও পেল না।
রামকেষ্টর মুখের ওই অবস্থা দেখে ডাক্তার সান্যালের বেশ অপমানিত মনে হল নিজেকে। এই লোকটা কি তার প্রতিভায় বিশ্বাস করছে না, না কি? তিনি রামকেষ্টকে ডাকলেন,—এই, এদিকে এসো! হ্যাঁ, এই দ্যাখো। আমার মোবাইলে এটা কীসের ফটো তুলে রেখেছি দ্যাখো।
—ও বাবা! এটা আবার কী? ঢ্যাঁড়শ না কড়াইশুঁটি?
—ধ্যাৎ। ঢ্যাঁড়শ এরকম খয়েরি রঙের হয়? এটা নেমীচাঁদ খৈতানের ল্যাজ। ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে নেমীচাঁদের একটা পা কাটা পড়েছিল, বুঝলে? তো, আমি ভাবলাম নতুন ওষুধটা ওর শরীরে ইনজেক্ট করে দেখি, পা গজায় কি না। পা তো গজাল না। তার বদলে এই ল্যাজটা গজাল।
এটা এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়।
ধরো, গ্রাভিটেশন যখন প্রথম আবিষ্কার হল...তখন কি তার টানে গ্রহ নক্ষত্র ঘুরেছিল? ঘোরেনি তো? কী হয়েছিল?
না গাছ থেকে একটা আপেল খসে পড়েছিল। তেমনি এই ক্ষেত্রেও প্রথমে ল্যাজ গজাল। পরে নিশ্চয় পা গজাত।
কিন্তু নেমীচাঁদের টাকার গরম তো খুব। সে মহা চ্যাঁচামেচি করে আমাকে দেশ ছাড়া করল। করল তো করল, বয়েই গেল।
আমার গবেষণা তো বন্ধ থাকবে না!
তারপর ডাক্তার সান্যাল গলার স্বরটা আরও নামিয়ে রামকেষ্টকে বললেন,—আমার একটা উপকার করবে? এখানে যখন আসছি, তখন দেখলাম ফণী মুহুরি ওর চাকরকে নিয়ে মুটকি নদীর দিকে যাচ্ছে। জিগ্যেস করলাম, কোথায় চললেন? তো উত্তর দিল, আজ হোটেলের মেনুতে গলদা চিংড়ির মালাইকারি। তাই মুটকি নদীর জেলেদের কাছ থেকে গলদাচিংড়ি কিনতে যাচ্ছি। তুমি আমাকে ফণীর রান্নাঘর থেকে ক'টা জ্যান্ত চিংড়িমাছ, কী বলে, ওই গ্যাঁড়াফাই করে এনে দিতে পারবে?
রামকেষ্ট বলল,—বিলক্ষণ পারব। এ আর কঠিন কাজ কী? আপনি সেদিন আমার ডাকে বিনা পয়সায় মোহান্তির চিকিৎসা করে গেলেন, আর আমি কি এতই অকৃতজ্ঞ, যে আপনার জন্যে এইটুকু করব না? কী করবেন চিংড়িমাছ দিয়ে?
—ওই যে বললাম, কাটা পায়ের বদলে যাতে পা-ই গজায়, কানের জায়গায় কান, হাতের জায়গায় হাত, সেটা ঠিক করে ফেলব। এক্সপেরিমেন্টটা চালাতে হবে চিংড়িমাছের ওপরেই। পরে অবশ্য মানুষ লাগবে। আছে না কি তোমার জানাশোনার মধ্যে এরকম মানুষ, যার হাত পা কিছু কম আছে।
—ক'টা চাই? শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের বোর্ডারদের মধ্যে আদ্ধেকেরই তো ল্যাজ খসা টিকটিকির হাল। কারুর ছুরির কোপে একটা কান খসে পড়েছে। কেউ বোমা বানাতে গিয়ে সবক'টা আঙুলই খুইয়ে বসেছে। কারুর আবার পুলিশের গুলিতে জখম হয়ে একটা হাতই উধাও। তবে আপনি যদি ওই মেনিলাল না কি যেন বললেন, ওর ল্যাজ গজানোর গল্পটা তাদের সামনে করে বসেন, তা হলে কিন্তু কেউ আপনার গিনিপিগ হতে রাজি হবে না।
—আরে না, না। আমাকে কি অত বোকা ভেবেছ না কি? বেশ, তা হলে তুমি এখন আমাকে পাঁচিলটা পার করে দাও। আর চিংড়িমাছটা পেলেই কিন্তু...
—ও আপনি পেয়েই গেছেন ধরে নিন না।
রামকেষ্ট কিংবা ভজেন সান্যালের মধ্যে কেউই যেটা খেয়াল করলেন না, সেটা হল, একটা ঝোপালো লেবুগাছের পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের কথোপকথনের সমস্তটাই মন দিয়ে শুনে গেল বাসব মুখার্জি।
ডাক্তারবাবুকে পাঁজাকোলা করে পাঁচিল পার করিয়ে রামকেষ্ট যখন আবার হোটেলের উঠোনে পা দিল, তখন সেখানে মহা আশ্চর্য এক ব্যাপার ঘটছে। সবাই হাঁ করে ওপরের দিকে মুখ করে দেখছে, কাপালিক কালিসাধন দোতলার বারান্দায় পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছেন। সেটা কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়। সন্ন্যাসী মানুষ, ধ্যান ট্যান করতেই পারেন। কিন্তু তিনি বসে রয়েছেন শূন্যে...হাওয়ায়।
তার পেছনের দেয়ালটায় গাঢ় লাল রঙের একটা পরদা ঝুলছে। সেই পরদার সামনে একই রঙের রক্তাম্বর পরিহিত কালিসাধন পদ্মাসনে বসে রয়েছেন। মাটি থেকে ফুট চারেক ওপরে। কোলের ওপর দুই হাত, দুই চোখ বোজা।
মিনিটপাঁচেকের মধ্যেই ফণী মুহুরিও চাকরকে সঙ্গে নিয়ে মুটকি নদীর মাঝিদের থেকে মাছ কিনে ফিরল, এবং নিজের হোটেলে পা দিয়েই ওই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
স্তম্ভিত হয়েছিল রামকেষ্টও। তবু সে নিজেই অবাক হয়ে দেখল যে, তার একটা হাত আস্তে করে চাকরটার হাতে ধরা চুপড়িটার মধ্যে কেমন করে যেন সেঁধিয়ে গেল। সেই হাত যখন বাইরে এল, তখন তার মুঠোয় নীল নীল দাঁড়া নেড়ে কলবল করছে চারটে এ্যাই বড় বড় গলদাচিংড়ি। সবাই কালিসাধনের অলৌকিক ক্ষমতার উদাহরণ দেখতে এতই ব্যস্ত যে, কেউ রামকেষ্টর হাতসাফাই খেয়ালই করল না।
একটু পরেই অবশ্য কালিসাধন পা দুটোর ভাঁজ খুলে ধীরেসুস্থে হাওয়াই আসন থেকে মাটিতে পা ঠেকালেন। তারপরে হঠাৎই নীচে উঠোনের দিকে চোখ পড়ে যাওয়ায় দেখতে পেলেন শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের হতভম্ব আবাসিকদের। একগাল হেসে বললেন,—কী হে? সব যে এমন ঊর্ধ্বেনেত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছ? ও! ভাবছ বুঝি হাওয়ায় বসেছিলাম কেন? আসলে বয়েস হয়েছে তো। ঠান্ডা মেঝেতে বসলে কোমরটা কনকন করে।
ফণী গলা তুলে বলল,—না স্যার...স্যরি, প্রভু! আমরা ভাবছি আপনি হাওয়ায় ভাসলেন কেমন করে? আমরা তো পারি না!
—ও কিছু না। বারো বছর যদি একটিও মিথ্যে কথা না বলে থাকতে পারো, তাহলে তুমিও পারবে হাওয়ায় ভাসতে। একে বল লঘিমা সিদ্ধাই।
বা আ আ আ রো বছর!!!—নীচের উঠোন থেকে ফোসসস করে এমন এক সমবেত দীর্ঘশ্বাসের ঝড় উঠল যে তার ঝাপটায় দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কালিসাধনের কালো দাড়ির জঙ্গল কেঁপে উঠল। তিনি মুচকি হেসে পেছন ফিরে নিজের কামরায় ঢুকে পড়লেন।
নীচের উঠোন থেকে জয়ধ্বনি উঠল,—জয় বাবা কালিসাধন কাপালিকের জয়।
ঘরে ঢুকে গেলেন বলেই অবশ্য তিনি দেখতে পেলেন না, একটু বাদেই বাসব মুখার্জি ওপরের বারান্দায় উঠে এসে খুব দ্রুত সেই দেয়ালের লাল পরদাটা সরিয়ে দেখে নিল,—হ্যাঁ, যা ভেবেছে তাই। পরদার আড়ালে ফুট চারেক উঁচু একটা কাঠের টুল।
লাল পরদার সঙ্গে কালিসাধনের লাল পোশাক মিলে মিশে এমন দৃষ্টিবিভ্রমের সৃষ্টি হয়েছিল যে, নীচে থেকে কেউ বুঝতেই পারেনি ওখানে পরদাটা দেয়াল থেকে একটু এগিয়ে রয়েছে। বাসব মুখার্জির ঠোঁটের কোণে একটু মুচকি হাসি খেলে গেল। পরদা ঢাকা টুলের ওপর বসে কালিসাধন ভালোই লঘিমা সিদ্ধাই দেখিয়ে গেলেন তো।
সেই হাসি কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই মিলিয়ে গেল বাসব মুখার্জির মুখ থেকে। তার বদলে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল তার কপালে। কাপালিক মশাইয়ের শেষ খেলাটা যে তার সঙ্গেই হবে সে ব্যাপারে বাসবের সন্দেহ নেই। পারবে তো বাসব মুখার্জি, সেই খেলায় জিততে?
ডাক্তার ভজেন সান্যাল মন দিয়ে শিবু কম্পাউন্ডারের রান্না করা অতি উপাদেয় গলদা চিংড়ির মালাইকারি দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছিলেন। এমন সময়ে মূর্তিমান বিঘ্নের মতন বাসব মুখার্জি তার ঘরে ঢুকে তর্কবিতর্ক শুরু করে দিল—
ছি ছি ছি! বিজ্ঞান সাধনার নাম করে নিয়ে আসা গলদাচিংড়ি দিয়ে মালাইকারি বানিয়ে খাচ্ছেন, আপনার লজ্জা করে না?
—কে হে তুমি ডেঁপো ছোকরা? কিছু না জেনেই চ্যাটাং চ্যাটাং বুলি ঝাড়ছ?
—ছোকড়া টোকরা বলবেন না। আমার নাম বাসব মুখার্জি। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দাসংস্থা ইন্টারপোল আমার মাথার দাম ধরেছে দু-লক্ষ ইউরো। ছ'টা দেশের পুলিশ আমাকে দেখতে পেলেই গুলি করে মারবে। সে তো এমনি এমনি নয়। সব কিছু জেনে ফেলি বলেই আমি সবার কাছে এমন বিপজ্জনক। সেই আমি আপনার ওই সামান্য চিংড়ি চুরির ঘটনাটা জানতে পারব না?
ডাক্তার ভজেনের গলায় প্রথমে যেমন ঝাঁজ ছিল, বাসব নিজের ক্ষমতার কথা বলতেই তা অনেকটা মিইয়ে গেল। তিনি তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে উঠে হাতটাত ধুয়ে, বাসবের পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন,—খামোকা চটছ কেন বলো তো? খেয়াল করে দেখেছ কি, মালাইকারিতে একটাও চিংড়িমাছের বডি ছিল না? শুধু দাঁড়া, মানে ঠ্যাং।
—তাই না কী! তা তো খেয়াল করিনি। কেন চিংড়ি মাছের বডি খেলেন না কেন? অ্যালার্জি আছে না কি?
—কী যে বলো না পাগলের মতন। অ্যালার্জি থাকলে বডিতেও থাকবে, দাঁড়াতেও থাকবে। তা নয়। আসলে গবেষণার প্রয়োজনেই দাঁড়াগুলো কেটে ফেলতে হয় তো। তাই ভাবলাম নষ্ট করি কেন? তাই ইয়ে...একটা নারকেলও পড়েছিল গাছ থেকে...আর ধরো শিবু রাঁধেও অসাধারণ। এখনও একটু আছে। টেস্ট করবে না কি?
—আছে? দিন তাহলে একটু।
বাসব মুখার্জি ডাক্তার ভজেনের তক্তাপোশের ওপর দুই পা তুলে ভালো করে বসতে গিয়ে দেখল, একটা ব্যাপারে একটু অসুবিধা হচ্ছে। এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে সে পা দুটো ঝুলিয়েই বসল।
মালাইকারি খাওয়া শেষ করে, বাসব মুখার্জি ডাক্তার ভজেনকে কুণ্ঠিত স্বরে জিগ্যেস করল,—আপনার গবেষণা শেষ হতে আর কদ্দিন লাগবে?
বাসবের এই প্রশ্নে ডাক্তার ভজেন সান্যালের মুখটা শুকিয়ে গেল। তিনি ভারি ম্রিয়মান গলায় বললেন,—কিছুতেই ঠিকঠাক সল্যুশনটা বানাতে পারছি না, বুঝলে। সেই একই গণ্ডগোল। যে জিনিস যেখানকার নয়, সেই জিনিস সেখানে গজিয়ে যাচ্ছে। দ্যাখো না,—ওখানে চৌবাচ্চায় চিংড়িমাছগুলো খেলে বেড়াচ্ছে। সবটার পায়ের জায়গায় শুঁড় গজিয়েছে।
বাসব ঘরের চারপাশে তাকিয়ে বলল,—কই আপনার যন্ত্রপাতি সাজসরঞ্জাম তো কিছু দেখছি না।
—আছে আছে। সবই আছে। ভেতরের ঘরে। দেখবে না কি? চলো।
যে-কোনও বিজ্ঞানীর মতনই ডাক্তার ভজেন সান্যালও কেউ তার গবেষণার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালে ভারি খুশি হন। তিনি বাসব মুখার্জিকে নিজের ল্যাবরেটরি দ্যাখাতে নিয়ে চললেন।—
—ওই দ্যাখো মাকড়শার গ্ল্যান্ডের এক্সট্যাক্ট থেকে চোদ্দোরকমের প্রোটিন-শৃঙ্খল বানিয়ে রেখেছি। আর ওগুলো টিকটিকির।
—তাই ভাবছিলাম, শিড়িঙ্গেপুরের মতন জংলা জায়গায় টিকটিকি দেখি না কেন? সব আপনি ধরে এনেছেন, না?
বাসবের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ডাক্তার সান্যাল নিজের মনেই বলে চললেন,—প্রবলেম হল, মাকড়শার কোন প্রোটিনটার সঙ্গে টিকটিকির কোন প্রোটিনটা যে মেশাতে হবে সেটা সঠিক জানার কোনও উপায় নেই। বার বার করে দেখতে হবে। দেখছিও। অঙ্কের হিসেবে তিন হাজার ন'শোরকমের কম্বিনেশন হয়। তার মধ্যে গতকাল অবধি তিন হাজার আটশো নিরানব্বইরকমের কম্বিনেশন টেস্ট করা হয়ে গেছে। শেষ কম্বিনেশনটা ওই বুনসেন বার্নারের ওপর ফুটছে। হয় ওইটা থেকেই বেরিয়ে আসবে আমার কাটা হাত-পা গজাবার ম্যাজিক-ওষুধ, না-হলে আবার সব নতুন করে ভাবতে হবে।
কী জানি কেন, ডাক্তার সান্যালের এই কথায় বাসব মুখার্জির মুখটা কালো হয়ে গেল।
সেই দুপুরেই, দারোগা রমেন পাইক আর দারোগা ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জে ত্যাবড়াডাঙা স্টেশনের পেছনে একটা ভাঙা আটচালার নীচে বসে দাবা খেলছিলেন। অনেক কষ্টে এই মনোরম কিন্তু জনশূন্যে জায়গাটা তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন। এখানে কেউ তাঁদের দেখে ফেলবে সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, বুনো হাতির ভয়ে লোকে এই দিকে আসা ছেড়েই দিয়েছে। এখানে নিশ্চিন্তে বসে কিছুক্ষণ দাবাটাবা খেলে তাঁরা বাড়ির পথ ধরেন। অবশ্য বুনো হাতির ভয় তাদেরও যে নেই তা নয়। তাই পারত পক্ষে সন্ধের ট্রেনটা আসার সময় হয়ে গেলে তাঁরা এখানে থাকেন না। তাঁর ঢের আগেই জিপ নিয়ে রওনা হয়ে যান গজহট্ট কিংবা ভৈরবডাঙার দিকে।
সেদিনও তারা দাবা খেলছিলেন। রমেন পাইক তাঁর সাদা গজ দিয়ে ভোলানাথের একটা কালো ঘোড়া খেয়ে নিলেন। একটু পরেই ভোলানাথ সাদা নৌকাটাকে কালো রাজার দিকে দু-ঘর এগিয়ে দিয়ে হেঁকে উঠলেন, 'কিস্তি'।
রমেন পাইক কিস্তি সামলাবার চেষ্টা না করে কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে বসে রাইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় ডাকলেন, 'ভোলা'!
—কী হল?
—তুমি কি খেয়াল করেছ?
—কী খেয়াল করব?
—আমরা দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলছি? এটা ঠিক নয়।
ভোলানাথও কিছুক্ষণ গভীর অভিনিবেশে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,—তাই তো!
—নাঃ, এভাবে খেলা যায় না। বললেন রমেন পাইক।
—যা বলেছ। একমত হলেন ভোলানাথ বাড়ুজ্জ্যে।
—দাবা খেলতে গেলে মনের একটা স্থিরতা লাগে। ঘুঁটিগুলোকে বাক্সবন্দি করতে করতে বললেন রমেন পাইক।
—সেটা এখন আমাদের একদমই নেই। বোর্ডটাকে ফটাস করে ভাঁজ করে ফেললেন ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে।
—আর তার জন্যে দায়ী ওই অপয়া হোটেলটা। ওই শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর। দাঁত কিড়মিড় করলেন রমেন পাইক।
—ওঃ! একবার যদি ঢুকতে পারতাম ওই গ্রামটায়। শক্ত মাটির ওপরেই দমাস করে এক ঘুসি কষালেন ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে।
দুই দারোগার মনের শান্তি নষ্ট হবার মতন সাম্প্রতিক কারণটা ঘটেছে সবেমাত্র গতকাল।
বোধহয় বিশ্বকর্মা পুজোর দিনের সেই অপমানের জ্বালা ভোলবার জন্যেই দুই আমুদে দারোগা একটা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। এর আগেও অনেকবার এমন প্রতিযোগিতা হয়েছে। যা কিছু মেডেল, টফি, অন্যান্য প্রাইজ-টাইজ সবই প্রত্যেকবার গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার স্পোর্টস-ম্যানেরাই নিয়ে গেছে। শিড়িঙ্গেপুরের লোকগুলো প্রত্যাশামতনই রোগা ভোগা। জোরে হাঁটতে পারে না, তা দৌড়োবে কী? তাই শিড়িঙ্গেপুরের ভাগ্যে প্রত্যেকবারই জুটেছে কাঁচকলা।
দুই বড় গঞ্জ আর এক ছোট গ্রামের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখান দিয়েই বয়ে যাচ্ছে মুটকি নদী। শরতকালে মুটকির বুকে জল খুবই কম। সাদা বালির শক্ত চরায় ভেলভেটের মতন কচি ঘাস গজিয়েছে। সেই চরের কাশবন-টাশবন দুই দারোগার তত্ত্বাবধানে মুহূর্তের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেল। ম্যারাপ খাটানো হল। চুনের দাগ পড়ল। মাইক নিয়ে পাঁচটা রিকশা পাঁচদিন ধরে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কথা গজহট্ট আর ভৈরবডাঙায় প্রচার করে বেড়াল। শিড়িঙ্গেপুরে রিকশা ঢুকতে পারে না। তাই টমটমের পেছনে পোস্টার সেঁটে দেওয়া হল।
তারপর গতকাল মহা সমারোহের মধ্যে জেলাশাসক মহোদয় হুইশল বাজিয়ে স্পোর্টসের সূচনা করলেন।
শিড়িঙ্গেপুরের বর্তমান আবাসিকদের মধ্যে রামকেষ্ট সমেত চারজন ছিল চোর। তারা একশো মিটার, দুশো মিটার, হার্ডলরেস আর রিলে রেস,—এই চারটে প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিল। কথায় বলে গৃহস্থের দশদিন তো চোরের একদিন। গতকালটা দেখা গেল চোরের দিনই ছিল। গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার বাকি প্রতিযোগীরা ধারণাও করতে পারেনি তারা কাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। পারলে বোধহয় নাম উইথড্র করে নিত। যাই হোক, রেস শুরু হতেই দেখা গেল বাকি প্রতিযোগীরা পঞ্চাশ মিটার মতন এগিয়ে যাওয়ার পরে শিড়িঙ্গেপুরের চোরেরা দৌড় শুরু করছে, এবং হাসতে হাসতে ফার্স্ট হয়ে যাচ্ছে। হবেই। সারাজীবন যাদের পুলিশের হাত এড়াবার জন্যে দৌড়োতে হয়, তাদের সঙ্গে স্পোর্টসম্যানেরা পারবে কেন?
শিড়িঙ্গেপুর গ্রামের আদি বাসিন্দারা এমনি খেলা দেখতে এসেছিল। তারা কোনওদিন কোনও খেলাতেই জিততে পারেনি, তাই এবারেও জেতার আশা করেনি। কিন্তু প্রথম চার-পাঁচটা ইভেন্ট হয়ে যাওয়ার পরেই তারা শিড়িঙ্গেপুরের নামে গলা ফাটাতে শুরু করল, যদিও নিজেদের গ্রামের প্রতিযোগীগুলিকে তারা নিজেরাও ভালো চিনে উঠতে পারছিল না। যেমন রামকেষ্ট যখন একশো মিটারের দৌড়ে ফার্স্ট হল, তখন শিড়িঙ্গেপুরের মোড়ল নিতাই বাউড়ি বলল, ওটি তো আমাদের যতীন খুড়োর জামাই বটে। তাই শুনে তার বউ খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল। বলল, বুড়ো হয়ে তোমার মাথাটা গেছে। গ্রামের জামাই কখনও হাফফ্যান্ট পরে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সামনে দৌড়োয়? ওটা নলীনের ছেলে কলীন। কলকাতায় পড়তে গিয়েছিল। সবেমাত্র কালই বাড়ি ফিরেছে।
শিড়িঙ্গেপুরের লোকেরা যত চেঁচাচ্ছিল, ততই চিড়বিড় করে জ্বলছিলেন দুই দারোগা। এ কী হচ্ছে? এ তো সেই বিশ্বকর্মা পুজোর অ্যাকশন রিপ্লে হতে চলেছে।
আর সত্যি, হলও তাই।
দৌড় প্রতিযোগিতার পরে হাইজাম্প আর লংজাম্প।
সেখানে নাম দিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের কুখ্যাত ট্রেন-দস্যু লিঙ্গারেড্ডি। একশো কিলোমিটার গতিবেগে ছুটে চলা ট্রেন থেকে যে মানুষ লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ে পালায়, তার কাছে এসব লাফালাফি তো নিতান্তই ছেলেখেলা। সবক'টা ফার্স্ট প্রাইজ যে লিঙ্গারেড্ডি শুধু জিতে নিল তাই-ই নয়, দু-একটা বিশ্বরেকর্ডও করল।
পোলভল্টে নাম দিয়েছিল বিশে ডাকাত। সে এখনও রণপায়ে চড়ে ডাকাতি করে। রণপায়ে চড়েই বড় বড় পাঁচিল টপকে হারে-রে-রে করে জমিদারবাড়ির উঠোনে লাফিয়ে নামে। বলা বাহুল্য সেই ডাকটা সে এই প্রতিযোগিতার মাঠে ছাড়ল না, কারণ তাদের কোচ ফণী মুহুরি মাঠের বাইরে থেকে এসব ব্যাপারে কড়া নজর রাখছিল। কিন্তু তার জন্যে বিশের লাফের বহর কমল না একটুও। লাফের চোটে আরেকটু হলে মাঠ পেরিয়ে মুটকি নদীর জলে গিয়ে পড়ছিল সে।
এইভাবেই প্রতিযোগিতা এগিয়ে চলল। লোহার বল ছোড়ার ইভেন্টে তো প্রথম থেকে তৃতীয়, সবক'টা প্রাইজই শিড়িঙ্গেপুর জিতে নিল। কারণ, শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে বোমা ছোঁড়াতে ওস্তাদ এমন লোক ছিল ওই,—তিনজন।
হারতে হারতে দুই দারোগার শেষ ভরসা এসে ঠেকেছে দড়ি টানাটানি প্রতিযোগিতায়। কারণ সবাই জানে শিড়িঙ্গেপুরের লোকেরা ভারি শিড়িঙ্গে চেহারার হয়। তাদের গায়ে জোর টোর একদমই থাকে না। এবারেও দড়ির একদিক ধরে দাঁড়াল গজহট্ট আর ভৈরবডাঙার বাছাই দশজন পালোয়ান, আর অন্যদিকে শিড়িঙ্গেপুরের প্যাংলা চেহারার ন'টা লোক। মাঠে খুব সিটি-টিটি পড়ল। তার মধ্যেই শিড়িঙ্গেপুরের দশনম্বর জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়ে নিজের কোমরে দড়ি জড়িয়ে নিল চাক্কু বলরাম।
সারা মাঠ চুপচাপ। তার মধ্যেই রেফারির হুইশল। দড়ি ধরে দুদিকেই মরণপণ টান। তারপর ইঞ্চি ইঞ্চি করে দড়ি মাঝখানের ভারী শিড়িঙ্গেপুরের দিকে। সারা মাঠে শিড়িঙ্গেপুরের লোকেদের উল্লাস দেখে কে? রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে বেজার মুখে জেলাশাসকের হাতে পুরস্কার-টুরস্কার এগিয়ে দিতে লাগলেন, আর তিনিও হাসি হাসি মুখে শিড়িঙ্গেপুরের প্রতিযোগীদের পিঠটিঠ চাপড়ে তাদের হাতে তুলে দিলেন সেইসব উপহার।
সব শেষ হওয়ার পরে দুই দারোগা তাদের গাড়িতে করে জেলাশাসককে তার বাংলোয় পৌঁছে দিতে চললেন।
গাড়িতে উঠে জেলাশাসক বললেন, দিনটা বেশ আনন্দেই কাটল। শুধু একটা কথা ভেবে মনটা ভারি খচখচ করছে। শিড়িঙ্গেপুরের ওই প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের কোথায় যেন দেখেছি।
—হ্যাঁ, স্যার। আমাদেরও ঠিক ওরকম মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই খেয়াল করতে পারছি না। সমস্বরে জবাব দিলেন দুই দারোগা।
খেয়ালটা পড়ল একেবারে জেলাশাসকের বাংলোর সামনে এসে। গাড়ি থেকে নামামাত্রই তাদের তিনজনেরই চোখ আটকে গেল বাংলোর পাঁচিলের গায়ে লটকানো পুলিশের 'সন্ধান চাই' বিজ্ঞাপনটার দিকে। সেখানে এইমাত্র যাদের হাতে তারা প্রাইজ তুলে দিয়ে এসেছেন তাদের সবার ছবিই বেশ বড় বড় করে ছাপা রয়েছে।
বাংলোয় ঢোকার আগে, দুই দারোগার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে জেলাশাসক বলে গেলেন,—আপনাদের চাকরি কী করে থাকে সেটা আমি দেখছি।
ডাক্তার সান্যালের বাড়ি থেকে ফিরে, হোটেলে ঢুকতেই বাসব মুখার্জি দ্যাখে কী, শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে আবার হুলুস্থুলু কাণ্ড। এবং তার কারণ ওই কালিসাধন কাপালিক।
হয়েছে কী, দুপুরের দিকে হোটেলের উঠোনের নিমগাছের তলায় বসে অন্যান্য আবাসিকেরা হা করে কালিসাধনের কথা শুনছিল। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে সাধনা করার সময়ে কত রক্ষ যক্ষ ভূত প্রেত যে তার সাধনা নষ্ট করবার জন্য তাকে আক্রমণ করেছিল, তার ইয়ত্বা নেই। কালিসাধন সে সবে একটুও টলেননি। তবেই না মারীচী-দেবীর আশীর্বাদ পেলেন।
—তারপর? শ্রোতারা উদগীব।
—তারপর মা আমাকে জিগ্যেস করলেন, ব্যাটা কালি। কী চাস তুই? কীসের জন্যে এমন সাধনা?
—কী বললেন?
—বললাম, মা! সারাজীবন বড় দুঃখে কেটেছে। এমন বর দাও যাতে পৃথিবীর অন্য দুঃখী মানুষদের কষ্ট দূর করতে পারি। তখন মা বললেন, আচ্ছা, এই নে। রাজা নৃসিংহদেবের ধনাগারের সন্ধান দিয়ে দিলাম তোকে।
এই অবধি শুনে সকলের পক্ষে যে প্রশ্ন করা স্বাভাবিক, তাই-ই করল। সমস্বরে জিগ্যেস করল, ধনাগারটা কোথায়, গুরুদেব?
কোনও জবাব না দিয়ে, কালিসাধন একটা আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,—যাই। কাল সারারাত পুজো আচ্চায় কাটিয়েছি। খুব ঘুম পাচ্ছে। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন,—কী মুশকিল। জটাশঙ্কর আবার কোথায় গেল। ও না থাকলে আমার বিছানা করে দেবে কে?
সবাই অবাক হয়ে জিগ্যেস করল,—জটাশঙ্কর বলে এই হোটেলে কোনও চাকর তো নেই!
—আঃ, হোটেলের চাকর হবে কেন? বললাম না, জটাশঙ্কর আমার পোশা ভূত। জটা আ আ! এই ব্যাটা জটা-আ-আ!—গলা ফাটিয়ে ডাক ছাড়লেন কালিসাধন।
সঙ্গে সঙ্গে নিমগাছের মগডাল থেকে পরিষ্কার খোঁনা গলায় উত্তর ভেসে এল,—আঁজ্ঞে যাঁইঁইঁইঁ।
রামকেষ্ট, গুনু মইষাল, চাক্কু বলরাম, অক্ষয় মালাকার ইত্যাদি যারা কালিসাধনকে ঘিরে বসেছিল, তারা একবার শুধু ঘাড় তুলে সেইদিকে তাকাল। দেখল, গাছের ওপর কেউ নেই। শুধু ওপরের ক'টা ডাল অল্প অল্প দুলছে। ব্যস। বাপরে মারে করে সব হোটেলের দিকে দৌড় লাগাল। মুহূর্তের মধ্যে নিমগাছের তলা ফাঁকা।
দৌড়চ্ছিল ফণী মুহুরিও। হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে তার পাঞ্জাবি টেনে ধরল। ফণী প্রথমে ভেবেছিল জটাশঙ্কর। আরেকটু হলেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই বাসবের গলা শুনতে পেল,—অত ভয় পান কেন?
—ভয় পাব না! কী বলছ তুমি? দেখছ নিমগাছের মগডাল থেকে ভূত কথা বলছে।
—ভূত নয়। ভেইলোকুইজম।
—মানে?
—স্বরক্ষেপন বিদ্যা। ওই 'আঁজ্ঞে যাঁই' আওয়াজটা কালিসাধনের গলা থেকেই বেরিয়েছিল। ঠোঁট না নেড়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল নিমগাছের মগডালের দিকে। আর আপনারা ভাবলেন শব্দটা ওদিক থেকেই এসেছে। মেলায় কথা বলা পুতুল দেখেছেন তো? ওই একই কায়দা।
—তুমি বেশি পণ্ডিতি ফলিয়ো না, বুঝলে? তান্ত্রিক-টান্ত্রিককে নিয়ে ইয়ারকি মারতে নেই। দেবে যখন জটাশঙ্কর ঘাড়টা মটকে, তখন বুঝবে।
বাসব আর কথা না বাড়িয়ে মুচকি হেসে চলে গেল।
হেমন্তের বেলা। খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নেমে আসে। বিষণ্ণ দারোগা দুজন খেয়ালই করেননি, কখন যেন শালগাছের ছায়াগুলো লম্বা হতে হতে তাদের ভাঙা ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দুটো শেয়াল স্টেশনের দিক থেকে এসে একবার দারোগাবাবুদের দেখে নিয়ে মহা আক্ষেপে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল 'অক্কা পায়া, অক্কা পায়া'। তবু দারোগাবাবুদের হুঁশ ফিরল না। তারা বসে বসে গতকালের পরাজয় আর জেলাশাসকের হুমকির কথাই ভাবতে লাগলেন।
মড়মড় শব্দটা দুজনে একসঙ্গেই পেলেন।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন পাকা কাবাডি খেলোয়াড়েরা যেমন আগে বিপক্ষের খেলোয়াড়ের ফেরার পথটা আটকে দেয়, সেইভাবেই দাঁতালটা তাদের জিপগাড়িটাকে মন দিয়ে ভেঙে পাট পাট করছে।
রমেন পাইক কোমরের দিকে হাত নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভোলানাথ সেটা খেয়াল করে বললেন,—লাভ নেই। প্রথমত তোমার টিপ-এর যা অবস্থা, তাতে হাতির গায়ে গুলি লাগাতে পারবে না। আর দ্বিতীয়ত, রিভলভারের ওই খুদে গুলি গায়ে লাগলেও ওর কিছুই হবে না। মাঝখান থেকে আমাদের ওপর আরও চটে যাবে।
যুক্তি অকাট্য। অতএব রমেন পাইক কোমর থেকে হাত নামিয়ে নিলেন।
একটু বাদেই হাতিটা ওঁদের দিকে মুখ ফেরাল। তার দুই চোখে আগুন ঝরছে। বহুদিন খুন করার মতন মানুষ পায়নি। আর আজ একসঙ্গে দুজন। শাঁখের আওয়াজের মতন একটানা একটা আওয়াজ ছেড়ে হাতিটা মাথা নামাল। এবার দৌড় শুরু করবে। আর-এক দৌড়েই পায়ের তলায় পিষে ফেলবে এই ঝুপড়ি সমেত দুই দারোগাকে।
ভয়ের চোটে হাত-পা যেন জমে পাথর হয়ে গেছে রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যের। তাঁরা একটুও নড়তে পারছেন না; দৌড়োনো তো দূরের কথা। ঠিক সেই সময়েই শিড়িঙ্গেপুরের দিক থেকে হাঁটতে হাঁটতে কে যেন একটা লোক তাদের ঝুপড়ির মধ্যে এসে ঢুকল।
—এই দ্যাখো। তাই তো ভাবছি, এই সন্ধেবেলায় ত্যাবড়াডাঙায় এসে থাকার মতন বুদ্ধি আর কার হবে। দারোগাবাবুদের কথা খেয়ালই ছিল না। লোকটা ট্যাঁক থেকে একটা বিড়ি বার করল। তারপর রমেন পাইকের দিকে হাতটা বাড়িয়ে বলল,—আপনার খ্যাঁচকলটা একবার দিন তো স্যার।
—হা হা হা হাতি। হা হা হাতি। রমেন পাইক শরীরের কাঁপুনি থামিয়ে কোনওরকমে লোকটাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে ওইদিকে সাক্ষাৎ যমদূত দাঁড়িয়ে রয়েছে।
—সেইজন্যেই তো খ্যাঁচকলটা চাইছি। দিন আঁজ্ঞে। দেরি করবেন না।
কোনওরকমে পকেটে হাত ঢুকিয়ে লাইটারটা বার করে প্যাংলা মতন লোকটার বাড়িয়ে ধরা হাতের মধ্যে গুঁজে দিলেন রমেন পাইক, আর ঠিক সময়েই হাতিটা তাদের দিকে ভীমবেগে দৌড় শুরু করল।
একটুও তাড়াহুড়ো করল না লোকটা। লাইটারের আগুনে সাবধানে বিড়িটা ধরিয়ে নিয়ে একমুখ ধোঁয় টেনে নিল। ততক্ষণে হাতিটা প্রায় তাদের গায়ের ওপরে এসে পড়েছে। এক্ষুনি তারা সকলেই ওই পাহাড়ের মতন শরীরের নীচে পিষে যাবে। লোকটা পুরো ধোঁয়াটাই বেশ টিপ করে হাতিটার বাড়িয়ে ধরা শুঁড়ের ওপর হুশ করে ছেড়ে দিল। এবং সঙ্গে সঙ্গে অবাক কাণ্ড।
চার পায়ের ওপর ধুপ করে বসে পড়ল পাগলা হাতি। তার চোখ বুজে এল। গরগর করে নাক ডাকার আওয়াজও পাওয়া গেল যেন।
বিড়িটা পায়ের নীচে ভালো করে পিষে নিভিয়ে, লোকটা দারোগাবাবুদের বলল,—এবার চলুন স্যার। ওর পিঠের ওপর দিয়েই চলে আসুন না। ভয় নেই। আজ রাতের মধ্যে বাবাজিকে আর চোখ খুলতে হচ্ছে না। হুঁ-হুঁ বাবা। এন নাম নিদুলি বিড়ি। দাদু বলতেন বটে,—রামকেষ্ট! এই বিড়ির ধোঁয়া নাকে গেলে পাগলা হাতি অবধি ঘুমিয়ে পড়ে। লোকের ঘরে চুরি করতে ঢোকার আগে জানলা দিয়ে একটু ধোঁয়া ঘরের ভেতর চালিয়ে দিবি, তারপর নিশ্চিন্তে ঢাক ঢোল বাজিয়ে চুরি করবি। দাদুর সেই কথাটা অ্যাদ্দিনে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পেলাম।
একটু দম ফিরে পেয়ে রমেন পাইক তাদের এই উপকারী বন্ধুটির পরিচয় জানতে উদ্যোগী হলেন—
—নাম কী ভাই তোমার?
—আজ্ঞে রামকৃষ্ণ। রামকৃষ্ণ তস্কর। লোকে রামকেষ্ট চোর বলে ডাকে।
—অ। কালকে একশো মিটারে ফার্স্ট হয়েছিলে না?
—চিনে রেখেছেন দেখছি। এ তো বিপদের কথা হল। কান-টান চুলকে বলল রামকেষ্ট।
—তা এদিকে কোথায় এসেছিলে?
—মাফ করবেন। ওটি বড় গুহ্য কথা। বলতে পারব না। বললে জটাশঙ্কর আমার ঘাড় মটকে দেবে।
—জটাশঙ্কর কে? তোমার ভাই?
—যাঃ। কী যে বলেন। সে একটা প্রেতাত্মা। কালিসাধন কাপালিকের পোষা ভূত।
পাগলা হাতির খপ্পর থেকে রক্ষা পেয়ে পাগলের পাল্লায় পড়াটা কোনও কাজের কথা নয়,—এই ভেবে দুই দারোগা রামকেষ্টকে আর বেশি না ঘাঁটিয়ে তাড়াতাড়ি ভৈরবডাঙা আর গজহট্টের রাস্তা ধরলেন।
দারোগা দুজন দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই রামকেষ্ট আবার ত্যাবড়াডাঙা ইস্টিশনের প্লাটফর্মে গিয়ে দাঁড়াল। জলপাইগুড়ি থেকে সন্ধেয় ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। এই ট্রেনে একদল লোক আসছে। তারা সব কালিসাধন বাবার চ্যালাচামুণ্ডা। গুপ্তধন খুঁড়ে তুলতে তারা গুরুদেবকে সাহায্য করবে।
রামকেষ্টর অগাধ পূণ্যি যে, বাবা তাকেই নির্বাচন করেছেন সেই লোকগুলোকে পথ দেখিয়ে শিড়িঙ্গেপুরে নিয়ে আসার জন্য। শুধু তাই নয়, কাল রাত অবধি লোকগুলোকে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। না-হলে গ্রামের লোকেরা গুপ্তধনের কথা জেনে ফেলবে। তারা জানলেই গভর্মেন্ট জানবে, খবরের কাগজের লোকেরা জানবে। তখন আর গুপ্তধনের ধারে কাছেও কেউ যেতে পারবে না। সেই গা-ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থাপত্তর সব রামকেষ্টকেই করতে হবে। রামকেষ্ট অবশ্য মনে মনে ভাবে, এ ব্যাপারে তার চেয়ে যোগ্য লোক আর কেই-ই বা আছে? সারা জীবন তো পাবলিকের আর পুলিশের তাড়া থেকে বাঁচতে কখনও জলের পাইপের সঙ্গে জলের পাইপ হয়ে, কখনও ডাস্টবিনের সঙ্গে ডাস্টবিন হয়ে, আবার কখনও ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে ল্যাম্প পোস্ট হয়ে মিশে থাকতে হয়েছে। ক্যামুফ্লেজিং-এ তার মতন ওস্তাদ ভূ-ভারতে ক'টা আছে? সেটা জেনেই গুরুদেব তাকেই ওই লোকগুলোকে লুকোনোর ভার দিয়েছেন।
ট্রেন ঢুকতে তখনও একটু দেরি ছিল। গুরুদেবের কথা ভাবতে গিয়ে রামকেষ্টর হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, উনি আমাদের সবার ব্যাপারে এত খোঁজখবর পান কেমন করে! পরক্ষণেই মনে মনে জিভ কাটল সে। এমন কথা মনে আনাও পাপ। আফটার অল কালিসাধন মারীচীসিদ্ধ পুরুষ। ওনার অজানা আবার কিছু থাকতে পারে না কি?
এইসব ভাবতে-ভাবতেই ত্যাবড়াডাঙা লোকাল স্টেশনে ঢুকল। ট্রেন থেকে এগারোজন লোক নামল, গোড়াতে তাদের সবার পরনেই জলপাই রঙের উর্দি ছিল ঠিকই। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তারা আড়ালে আবডালে সরে গিয়ে কেউ চাষি, কেউ জেলে, কেউ আবার গ্রামের পোস্টম্যানের পোশাক পরে বেরিয়ে এল। বিড়ি ফুকছে, পিচিক করে পানের পিক ফেলছে, গামছা ঘুরিয়ে বাতাস খাচ্ছে,—কার সাধ্য বলে যে এরা এই তল্লাটের লোকই নয়। রামকেষ্ট মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হল যে, এই লোকগুলোকে শেখাবার মতন খুব বেশি কিছু বাকি নেই। সে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এসে একবার পেছন ফিরে চাইল। এগারোটা লোকই নানান দূরত্ব থেকে তাকে ফলো করছে। বাঃ-বাঃ। তারিফ না করে পারল না রামকেষ্ট। এই না-হলে গুপ্তধন খোঁজার টিম? দ্যাখো তো কেমন ট্রেনিং।
রামকেষ্টর পেছন পেছন লোকগুলো নির্বিঘ্নেই শিড়িঙ্গেপুর পৌঁছিয়ে গেল। তারপর রামকেষ্টর নির্দেশ মতন কেউ হাটতলায়, কেউ মন্দিরের চাতালে, কেউ বা মুটকি নদীর ঘাটে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। একটা রাতের তো ব্যাপার। কাল এই সময়ে রামকেষ্ট বড়লোক। কালিসাধন কাপালিক কথা দিয়েছেন তার এই উপকারের বিনিময়ে তাকে গুপ্তধনের ভাণ্ডার থেকে একবাক্স পোখরাজ মণি উপহার দেবেন। সেটা পেলে রামকেষ্ট চুরি করা ছেড়ে দেবে।
যে সন্ধেয় রামকেষ্ট কালিসাধনের শাগরেদদের পথ চিনিয়ে শিড়িঙ্গেপুরে নিয়ে এল, সেই রাত্রেই বারুদবালক অক্ষয়কুমারের ঘরের দরজায় তিনটে টোকা পড়ল। অক্ষয় দরজার পাল্লা ফাঁক করে দেখল, কাপালিক কালিসাধন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আঙুলের ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বলে তিনি নিজের ঘরের দিকে হাঁটা লাগালেন।
অক্ষয় ঘরে ঢোকা মাত্র কালিসাধন ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। জানলা টানলা সব আগে থেকেই বন্ধ ছিল। অক্ষয়ের হঠাৎ ভয়ংকর শীত করতে লাগল। ঘরটা যেন কেমন। একটা মাত্র লাল আলোর বালব জ্বলছে। তাতে চারিদিকে কেমন সব ছায়া খেলে বেড়াচ্ছে। ঘরের মেঝের ওপর একটা বাঘছাল পাতা আছে। সেই বাঘের মুণ্ডুটা যেন জীবন্ত হয়ে অক্ষয়কে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিল। সবথেকে বড় কথা দেওয়ালে একটা প্রকাণ্ড খাঁড়া ঝুলছে। ওই খাঁড়াটা দিয়েই কি এই কাপালিক এর আগে ছ'টা জলজ্যান্ত মানুষকে শবদেহে পরিণত করেছিলেন?
আজ কেন কালিসাধন তাকে ঘরে ডেকে আনলেন? কালিসাধনের কি আরো শবদেহ চাই? আজ কি তাহলে তার পালা? অক্ষয়ের কান্না পেতে লাগল। কিন্তু কালিসাধনের গম্ভীর প্রসন্ন কণ্ঠস্বরে একটু বাদেই তার ভয় কমেও গেল অনেকটা। কালিসাধন তাকে ডাকলেন—
—বাছা অক্ষয়!
—বলুন গুরুদেব।
—বাবার কারখানাটা নতুন করে বানাতে কত টাকা লাগতে পারে?
—সে অনেক টাকা গুরুদেব। আপনি সন্ন্যাসী মানুষ। শুনে কী করবেন?
—পাগল ছেলে। কাল যে গুপ্তধন পেতে চলেছি রে।
—তাতে আমার কী?
—এই দ্যাখো। তোর সাহায্য ছাড়া কি আমি পারব সেই ধনাগারে পৌঁছোতে?
—মানে?
ভারি অবাক হয় অক্ষয়। কোথায় ধনাগার, কোথায় সে? সাহায্যটা করবে কেমন করে? সেই কথাটাই সে জিগ্যেস করল কালিসাধনকে। উত্তরে কালিসাধন বললেন—
—সেদিন ধ্যানের মধ্যে যে গুপ্তধনের নকশা আঁকা তুলোট কাগজটা আমার কোলের ওপর খসে পড়েছিল, তাতে ধনাগারের অবস্থান কোথায় দেখানো ছিল জানিস?
—না বললে জানব কেমন করে? দুপুরে তো সবাই মিলে জিগ্যেস করলাম। তখন তো বললেন না। উলটে জটাশঙ্করকে ডেকে হুলুস্থুলুস বাঁধিয়ে দিলেন।
—কেন সবাইকে বলব বল দেখি? এসব কথা শোনারও একটা যোগ্যতা লাগে। তোর সেই যোগ্যতা রয়েছে। তাই তোকে বলছি। সেই গুপ্ত ধনাগার স্থূলাঙ্গিনী নদীর তীরে কৃশজনপদ শহরের মাটির নীচে চাপা পড়ে রয়েছে।
—অ।
—'অ' কী রে হতভাগা? এ কথা শুনেও তুই বলবি 'কোথায় ধনাগার, আর কোথায় আমি'?
—তাই তো বলব। কোথায় স্থূলাঙ্গিনী নদী আর কোথায়ই বা কৃশজনপদ শহর তার হদিশ কে রাখে? আমি কানফাটা গ্রামের বাইরে বিশেষ কিছু দেখিনি।
—ছাগল আর কাকে বলে? ওরে, স্থূলাঙ্গিনী-ই যে আমাদের হোটেলের পাশে মুটকি নদী। কৃশজনপদ...
—শিড়িঙ্গেপুর!!! উল্লাসে দুই হাতে তালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল অক্ষয়।
—আস্তে আস্তে। জটাশঙ্কর ওই শিলিং-এর কোনায় মাছির রূপ ধরে ঘুমোচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেলে অনর্থ করবে। হ্যাঁ, এবার বল কী বলছিলিস।
দেখা গেল ধনাগারের অবস্থান জানা মাত্র সে বিষয়ে অক্ষয়ের আগ্রহ পুরোমাত্রায় ফিরে এসেছে। সে গড়গড় করে বলে যেতে লাগল—
—গুরুদেব, কারখানাটা নতুন করে গড়ে তুলতে তিন লক্ষ পঁচিশ হাজার একশো একষট্টি টাকা বারো আনা লাগবে। আপনি যদি এই টাকাটা আমাকে ক্যাশে পেমেন্ট করেন তাহলে খুব ভালো হয়। সোনার মোহরেও আপত্তি নেই। কিন্তু হিরে টিরে দেবেন না। বেচতে অসুবিধা হয়। আর এর বিনিময়ে আপনি যা বলবেন আমি তাই করতে রাজি।
—বেশ বেশ। শুনে ভারি সুখী হলাম। একটা মুশকিলে পড়েছি, বুঝলি। আর সেই মুশকিল থেকে একমাত্র তুই-ই উদ্ধার করতে পারিস। হয়েছে কি জানিস? রাজা নৃসিংহদেবের কোষাগারের ওপরে তো হাজার বছরের মাটির স্তূপ জমা হয়েছে। জমা হতে হতে উঁচু ডাঙা তৈরি হয়ে গেছে। তার ওপরে একটা নিমগাছ গজিয়েছে। তাতেও অসুবিধা ছিল না। কিন্তু রিসেন্টলি সেখানে একটা হোটেলও তৈরি হয়েছে। নাম,—শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর।
—উড়িয়ে দেব।—দৃঢ় গলায় ঘোষণা করল অক্ষয়।
—অ্যাঁ?—এবার কালিসাধনের ভ্যাবাচাকা খাওয়ার পালা।
—আমি বারুদবালক অক্ষয়কুমার মালাকার। আমি ঘোষণা করছি, শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরকে আমি পাইডার বানিয়ে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেব। আপনি দেখবেন, বোমার আঘাতে গুপ্তভাণ্ডার অবধি সুড়ঙ্গের মতন গর্ত হয়ে গেছে। সেই গর্ত দিয়ে আমি আর আপনি বস্তা নিয়ে নেমে যাব। তারপর মুঠো মুঠো হিরে-জহরত সোনা-দানা গয়নাগাটি নিয়ে...উত্তেজনায় গলা বুজে এল অক্ষয়ের।
—এই তো। এই সাহায্যটুকুই তো তোর কাছে চাইছিলাম। পারবি তো ঠিক? তার পিঠে হাত দিয়ে জিগ্যেস করলেন কালিসাধন।
—আলবাত পারব। শুধু কিছু মালমশলা লাগবে।
—লিস্ট করে দিস। জটাশঙ্কর কাল দুপুরের মধ্যে গজহট্ট বাজার থেকে এনে দেবে। পাঁজিতে দেখলাম সন্ধে সাতটার সময়টাই ধন আহরণের পক্ষে শুভ। তাহলে ওই সাতটাতেই, হ্যাঁ? বারুদবালক অক্ষয়কুমার! দেখিয়ে দে তো বাবা তোর বারুদের খেলা।
কী যেন একটু ভেবে নিয়ে অক্ষয় বলল,—তবে একটা কথা। প্রাণীহত্যা করতে পারব না কিন্তু। ধুমধাড়াক্কা শুরু হওয়ার আগে হোটেল খালি করার দায়িত্ব আপনার।
—নিশ্চয়, নিশ্চয়। সে তোকে ভাবতে হবে না। তার জন্যে আমার লোক ফিট করা আছে। আর কেউ না থাকলে চাক্কু বলরাম তো আছেই। ও সবাইকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে...
কালিসাধন কাপালিকের কথা শেষ হবার আগেই বীভৎস খোনা এবং কর্কশ গলায় কে যেন জড়ানো সুরে কী বলতে লাগল। অথচ ঘরের মধ্যে মানুষ বলতে আর কেউ নেই। কালিসাধন তাড়াতাড়ি আসন ছেড়ে উঠে বললেন,—এই রে, কথাবার্তা শুনে জটাশঙ্করের ঘুম ভেঙে গেছে। পালি ভাষায় তোকে গালি দিচ্ছে। বৌদ্ধযুগের ভূত কি না! তুই এখন কেটে পড় বাবা অক্ষয়। না-হলে বিপদ ঘটবে।
অক্ষয় হুড়মুড়িয়ে ঘর ছেড়ে বেরোনো মাত্র কালিসাধন তার পেছনে দরজাটা ভালো করে এঁটে দিলেন। তারপর আসনের নীচে লুকিয়ে রাখা জোরালো অয়্যারলেস সেটটা বার করে এনে রাগত স্বরে বললেন,—আপনাকে হাজারবার বলেছি ইনস্পেক্টর রাঠোর, নিজে থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না। যাগগে, করেছেন যখন শুনে রাখুন। জিরো আওয়ার ঠিক হয়েছে আগামীকাল সন্ধে সাতটায়। জাল বিছিয়ে রাখবেন ঠিকঠাক। মাছি অবধি যেন এই হোটেলের চত্বর থেকে গলে না বেরোতে পারে। আর পার্টিকুলারলি নজর-টজর রাখবেন বাসব মুখার্জির ওপর। চোখে চশমা, সরু গোঁফ...হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনার কথা মানছি। চশমা খুলে রাখতে পারে, গোঁফ কামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু কাঠের পা-টা লুকোতে পারবে না।
ওয়াকিটকি-র ওই প্রান্ত থেকে বোধহয় কাঠের পা-এর প্রসঙ্গে ইনস্পেক্টর রাঠোর বিস্ময় প্রকাশ করলেন। কালিসাধন গলা নামিয়ে বললেন,—হ্যাঁ হ্যাঁ। বলছি কী আর তবে? কাঠের পা। দশবছর আগে একবার আমেরিকার মিশিগান হ্রদের ওপর আমাদের ইন্টারপোলের হেলিকপ্টার আর বাসবের হেলিকপ্টারে কানামাছি খেলা চলছিল। ওই একবারই হাতের মুঠোয় পেয়েছিলাম ব্যাটাকে। বাসব যখন দেখল আর বাঁচার উপায় নেই, তখন মারল ঝাঁপ। জলে না পড়ে পড়ল মিশিগান হ্রদের পাথুরে তীরে। ব্যস, ডান পা-টা মটাশ। আমাদের জেলখানার ডাক্তারবাবুই ফার্স্টক্লাস কাঠের পা বানিয়ে দিলেন। বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝবে না। কিন্তু আপনাকে সেইজন্যেই বলছি,—পা দুটো চেক না করে কাউকে ছাড়বেন না।
ও হ্যাঁ, আপনি কী জন্যে ফোন করেছিলেন তা তো বললেন না। কী বলছেন? হাটতলায় প্রচণ্ড মশা? ঘুমতে পারছেন না? তা এক কাজ করুন না। কিছু ভিজে খড় জ্বেলে নিন। খড়ের ধোঁয়ায় মশা পালাবে।
ঘুমোতে পারছিল না বাসব মুখার্জিও। এতদিনের গুপ্তচরের জীবনে এমন ভুল যে সে খুব বেশি করেনি তা নিশ্চিত। ভুল নয়? পুলিশের হাত এখানে পৌঁছোয় না বলে শিড়িঙ্গেপুরে লুকোতে এল। ভেবে দ্যাখেনি যে এখানে ঢোকা যত কঠিন, প্রয়োজনের সময়ে শিড়িঙ্গেপুর ছেড়ে পালানোটা তার চেয়েও বেশি কঠিন হতে পারে।
সেই ভুলের মাশুলই তাকে এখন গুনতে হচ্ছে।
সন্ধের সময় গিয়েছিল গুনু মইষালের নয়, টমটমের। মানে গোয়ালই বলা যায় আর কি। সেই গোয়ালেরই একদিকে খাটিয়ায় বসে গুনু গাঁজা খাচ্ছিল।
বাসব মুখার্জি একটু কিন্তু কিন্তু করে কথাটা বলেই ফেলল,—আমাকে আজ রাতেই ত্যাবড়াডাঙায় পৌঁছে দিতে হবে গুনু! যত পয়সা লাগে আমি তোমাকে দিতে রাজি।
—কথাটা পয়সার নয়, বুঝলেন।
—তবে?
—টমটমকে একজন নিয়ে চলে গেছেন।
—এই মরেছে! তোমার মোষকে তোমার গোয়াল থেকে নিয়ে গেল কে?
—বললে কি বিশ্বাস করবেন? আমি যে নিজেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। বসে বসে গাঁজা খাচ্ছি, আর ভাবছি, এত ভাগ্য কি গুনু মইষালের হতে পারে? দেবতা-টেবতাদের দেখা পাওয়া,—সে কি চাড্ডিখানি ব্যাপার, বলেন?
—ও গুনু! এসব কী হেঁয়ালি শুরু করলে বলো তো! দেবতা কোত্থেকে পেলে আবার?
—এই তো। সন্ধের মুখেই এলেন। এই গোয়ালেই। ঠিক যেখানটায় আপনি দাঁড়িয়ে আছেন ওইখানটাতেই দাঁড়িয়েছিলেন। মাথায় মুকুট, হাতে মুগুর।
—বটে? দেবতাটি কে, চিনতে পারলে?
—আমি মুখ্যু মানুষ, চিনব কেমন করে? তিনি দয়া করে নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন, গুনময় বর্মন কি তোমারই নাম না কি?
আমি তো অবাক। আমার নাম যে ভুজনোর সময় গুনময় দেওয়া হয়েছিল সে কথা তো আমার মায়েরও মনে নেই। গত তিরিশ বছর ধরে বিশ্বশুদ্ধু লোক গুনু গুনু করে ডাকছে কিনা। বললাম, হ্যাঁ স্যার!
তো তিনি বললেন, আমায় চিনতে পারো?
আমি বললাম, না স্যার।
তিনি বললেন, তা চিনবে কেমন করে? আমার তো আর সার্বজনীন পুজো হয় না! আমার নাম কৃতান্ত।
আমি একজন কৃতান্তকে চিনতাম। অনেকদিন আগে ময়নাগুড়ির হাটে দেখা হয়েছিল। তামাকপাতার ব্যবসা করত। ভাবলাম সে-ই বুঝি। বললাম, তুমি কি ময়নাগুড়ির কৃতান্ত লস্কর? তামাকপাতার ব্যবসা লাটে উঠেছে বুঝি? পেছনে পাওনাদার লেগেছে বলে কি শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে লুকোতে এসেছ?
এই শুনে দেবতাটি মুগুর নিয়ে আমায় মারতে এলেন। বললেন, এই না হলে মূর্খ বলেছি? আরে আমি আসল কৃতান্ত। মানে যমরাজ। মানুষের মৃত্যুর অধীশ্বর।
ভালো করে তাকিয়ে দেখি তাই তো! নল দময়ন্তী পালায় ছোটবেলায় কতবার ওনাকে দেখেছি। একেবারে সেইরকম কালো কুচকুচে তা-দেওয়া গোঁফ। সেইরকম লাল টকটকে চোখ। হাতে যেটাকে মুগুর ভাবছিলাম সেটা নিশ্চয়ই যমদণ্ড। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাঁউমাঁউ করে ওনার পায়ে ডাইভ দিলাম। বললাম, প্রভু আমার কি তাহলে সময় হয়ে গেল? আমার মাত্র তিরিশ বছর বয়েস। এখনও মা জীবিত। তবে কি ওই পাপিষ্ঠ ফণী মুহুরির খিদমদগারি খাটি বলেই এত শিগগির তুলে নিচ্ছেন?
আমার এই কথা শুনে যমরাজ মুচকি হাসলেন। বললেন কাজটা খারাপ করিস ঠিকই। ফণীর মতন লোকের সঙ্গে সংস্রব রাখা ঠিক নয়। তবে তোর বাঁচার মেয়াদ এখনও ফুরোয়নি। আরও অনেকদিন বাঁচবি তুই।
বললাম, তবে এই অধমের কুটিরে কী মনে করে?
যমরাজ বললেন, ওরে আমার বাহনটি যে গত দশ বছর ধরে তোর কাছে আটকা পড়ে আছে। ওকে এবার ছাড়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, টমটম?
উনি বললেন, টমটম বলে ডাকিস বুঝি? আহা, না জেনে স্বর্গমহিষকে ম্লেচ্ছ নামে ডেকে ফেলেছিস। ওতে দোষ নেই। তবে জেনে রাখ, ওর আসল নাম অঘোরবর্ণ। ভুল করে শচীর বাগানের পারিজাতগাছের ডাল চিবিয়ে ফেলেছিল বলে ইন্দ্রের অভিশাপে দশবছরের জন্যে ওকে পৃথিবীতে কাটিয়ে যেতে হল। তা, এই দশবছর আমার যে কী কষ্ট গেল সে আর তোকে কী বলব গুনময়। যখন যেখানে আত্মা ধরে আনতে যাই সেখানকার বাহন ভাড়া করে চালাই। এই তো কালকেই অস্ট্রেলিয়ায় যেতে হয়েছিল। এখনও কোমরে কী ব্যথা, বাপরে।
বললাম কেন প্রভু? কোমরে ব্যথা কেন?
ক্যাঙারুর পিঠে চাপতে হয়েছিল তো। সে যারা চাপেনি তাদের বোঝানো যাবে না। শালকের চুয়ান্ন নম্বর বাসের চেয়েও বেশি ঝাঁকুনি।
তারপর যমরাজ বললে,—যাগগে, এখন অঘোরবর্ণের দড়িটা খুলে আমার হাতে দে দেখিনি। আমাকে এক্ষুনি আবার গ্রিনল্যান্ডে যেতে হবে। মবি ডিক জাহাজ উলটে দিয়েছে। বহু লোক ঢেউয়ের মধ্যে খাবি খাচ্ছে। তাদের আর বেশিক্ষণ যন্ত্রণা দেওয়া ঠিক হবে না।
কী আর করব? এতদিনের সঙ্গী মোষটাকে ছাড়তে খুবই মায়া হচ্ছিল। ও যে এত বড় মাপের প্রাণী তা তো আর আগে বুঝিনি! চার খুরের ধুলো মাথায় ঠেকিয়ে বললাম, বাবা অঘোরবর্ণ! না জেনে অনেক ছিপটির বাড়ি মেরেছি বাবা। অপরাধ নিও না। এই বলে দড়ি খুলে যমরাজের হাতে ধরিয়ে দিলাম।
যমরাজ কোমর থেকে একটা হঙ্কিটঙ্কি বার করে...
—'হঙ্কিটঙ্কি' আবার কী জিনিস? বাসব মুখার্জি অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
—ওই যে পুলিশের কোমরে থাকে না। কালো মতন, লম্বা মতন। ফোনের মতন কথা বলে আর কথা শেষ হলে বলে ওভার।
—বুঝেছি। ওয়াকি টকি।
—হ্যাঁ, হঙ্কিটঙ্কি। তাই তো বললাম। সেই যন্ত্রটা বার করে কাকে যেন বললেন, 'ভীষণ সর্ষের ফুল'।
—তোমার মুণ্ডু। বলেছিল, 'মিশন সাকসেসফুল।' তোমার মতন গাঁজাখোরের হাতে ট্র্যান্সপোর্টের দায়িত্ব থাকলে মিশন ফেইলিওর হতে পারে কি? ব্যাটা রাঠোর মোষটাকে ঠিক সরিয়ে ফেলেছে। কেমন করে এখান থেকে বেরোই এবার?
রাগে গজগজ করতে করতে বাসব মুখার্জি আবার শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরেই ফিরে এসেছিল। সেই থেকেই তার চোখে ঘুম নেই।
পরদিন দুপুরবেলা। শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরে আসার পর থেকে রোজই এই সময়টায় কালিসাধন উঠোনের নিমগাছটার তলায় কিছুক্ষণ বসেন। অন্যান্য আবাসিকদের সঙ্গে গল্পগাছা করেন। দ্যাখা যায় তাদের অনেকের সম্বন্ধেই তিনি অনেক কিছু জানেন। তাতে অবশ্য লোকজন খুব একটা অবাক হয় না। যোগবল বলে একটা ব্যাপার তো আছেই।
আজকেই যেমন,—সবচেয়ে পিছনের সারিতে বসে থাকা খুব ভালোমানুষের মতন দেখতে এক বৃদ্ধকে ডেকে হঠাৎই তিনি বললেন, ওহে মিস্টার অ্যালবুকার্ক। আপনি তো আদতে গোয়ার লোক। তা ভিন্দালু খেয়েছেন কখনও?
অন্য সবাই তো বটেই। এই কথায় লোকটা নিজেও চমকে উঠল। দিব্যি ধুতি পাঞ্জাবি পরা সৌম্যদর্শন বাঙালি। ঘুম থেকে উঠে গুনগুন করে রামপ্রসাদী গান গাইছে। কবজি ডুবিয়ে আলুপোস্ত দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছে। সবাই লোকটাকে আলোকবাবু বলেই জানত। তার নাম অ্যালবুকার্ক! এ কি হতে পারে?
হতে যে পারে তা তো দ্যাখাই যাচ্ছে। কারণ লোকটা নিজেই হাতটাকে কচলে বলছে,—হে-হে। পঞ্চাশ বছর বউবাজারে বাস করছি। ভিন্দালু ছোটবেলায় খেয়ে থাকলেও এখন তো আর মনে পড়ে না প্রভু।
—তা তো বটেই। তা তো বটেই। জাল নোট ছাপার কায়দাকানুনগুলো মনে আছে তো? নাকি সেগুলোও ভুলে গেলেন?
আলোকবাবু মানে অ্যালবুকার্ক হাত জোড় করে বলল,—আপনার অগোচর তো কিছুই নেই বাবা। ও সব পাপ কাজ করে কোনওই লাভ হয়নি। দেখছেন তো পুলিশের ভয়ে ঘরসংসার ফেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এই শেষ যে দু-চার হাজার টাকা সঙ্গে রয়েছে সেগুলো চালিয়ে দিয়েই আমি...এই অবধি বলে, হঠাৎ কী যেন মনে পড়তেই মুখে হাত চাপা দিল অ্যালবুকার্ক।
পেছনের সারিতে বসেছিল ফণী মুহুরি। তারও কিছু একটা মনে পড়ল। ওখানে বসেই পকেট থেকে একতাড়া পাঁচশোটাকার নোট বার করে রোদ্দুরের দিকে তুলে পরীক্ষা করে দেখল। তারপর বিস্ময়ে শিহরিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। আপনমনেই বলল, দেখেছেন জোচ্চোরটার কাণ্ড। কালকেই গত এক মাসের হোটেলখরচা বাবদ পনেরো হাজার টাকা পেমেন্ট দিল, আর এখন দেখছি সবক'টা নোটই জাল! এই যে আলোকবাবু, না কি অ্যালবুকার্ক। এইসব নোট এক্ষুনি পালটে দিন। তা না হলে চাক্কু বলরামকে দিয়ে বেধড়ক মার খাওয়াব।
এই বলে গজগজ করতে করতে হোটেলের ভেতর নিজের অফিসঘরের দিকে হাঁটা লাগাল ফণী মুহুরি।
কালিসাধন বললেন, বাঁচা গেল।
আজ অবশ্য কালিসাধনকে অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশিই অস্থির দেখাচ্ছে। অস্থির দেখাচ্ছে আরও তিনজনকে। রামকেষ্ট চোর, চাক্কু বলরাম, এবং সর্বোপরি অক্ষয়কুমারকে। অন্য সকলের মধ্যে বসে থেকেও এরা যেন একটু বেশিই উশখুশ করছে। কালিসাধন সেটা খেয়াল করলেন। চোখের ইশারায় বললেন, দাঁড়া। জায়গাটা খালি করে দিচ্ছি।
এই সময়েই হোটেলের ছোঁড়া চাকরটা কেটলিতে লিকার চা নিয়ে এল। সবার হাতের গেলাসে চা ঢেলে দিয়ে চলেও গেল।
—আমার আবার র-চা সহ্য হয় না। একটু লেবু মিশিয়ে এটাকে লাইম-টি করেনি, কেমন? বললে তোমাদেরও দেব।—এই বলে কালিসাধন বাঁ-হাতটা আকাশের দিকে তুলে হাঁক ছাড়লেন,—জটাশঙ্কর, লেবু-উ-উ! শূন্য থেকে একটা লেবু তার হাতে আবির্ভূত হল।
—জটাশঙ্কর, ছুরি-ই-ই!—ডানহাতে ছোট একটা ছুরিও চলে এল।
শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের বাসিন্দাদের ইতিমধ্যে জটাশঙ্কর সম্বন্ধে ভয়টা একটু কমেছিল। তাই তারা সেদিনের মতন পালিয়ে তো গেলই না উপরন্তু ওদের মধ্যেই যারা একটু বেশি সাহসী, তারা নিজের নিজের চায়ের গ্লাস কালিসাধনের দিকে বাড়িয়ে ধরল, ভৌতিক লেবুর স্বাদ কেমন হয় দেখার জন্যে।
কালিসাধন রহস্যময় একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে লেবুটার গায়ে ছুরি বিঁধিয়ে দিলেন।
না, রস নয়। গলগল করে তাজা রক্ত বেরিয়ে এল লেবুর ভেতর থেকে।
আবারও বেশ ভালো করে একটা পোঁচ বসালেন লেবুর গায়ে। আরও রক্ত বেরিয়ে এল। ফোঁটায়-ফোঁটায় ঝরতে লাগল চায়ের গ্লাসে।
এতটা সহ্য হল না শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের বাসিন্দাদের। তারা ঠিক সেদিনের মতোই বাপরে মারে বলে হোটেলের দিকে দৌড়োল। তিনজন বাদে। অক্ষয়, বলরাম, আর রামকেষ্ট। কালিসাধন তাদের দেহশুদ্ধি করে দিয়েছেন কি না। কোনও ভূত প্রেত রক্ষ যক্ষ তাদের কিছু করতে পারবে না।
দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটাই দেখল আরেকজন। বাসব মুখার্জি। কাপালিক কালিসাধন যেভাবে তার আলখাল্লার ঝোলা হাতার ভেতর থেকে, চোখের পাতা ফেলার আগে, লুকিয়ে রাখা লেবু আর ছুরি হাতের মুঠোর নিয়ে চলে এল, তাতে লোকটা যে ম্যাজিকের চর্চা ছাড়েনি তা বোঝাই যায়। ওর এই গুণটার কথা বাসব মুখার্জি অনেক আগে থেকেই জানে। ইন্টারপোলে চাকরি নেওয়ার আগে কালিসাধন লন্ডনের পিকাডেলি থিয়েটারে ম্যাজিক দেখাত।
লেবুর ভেতর থেকে রক্ত বের করার খেলাটা অবশ্য একেবারেই ভারতীয় খেলা। ছোটবেলায় ফুটপাথে খেলা দেখিয়ে বেড়ানো এক বাজিকর বাসব মুখার্জিকে কৌশলটা শিখিয়ে দিয়েছিল। কৌশল আর কিছুই না, ছুরিটার ফলায় রক্তজবার রস বার বার ভালো করে মাখিয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। সেই ছুরি দিয়ে লেবু কাটলে লেবুর রসটাই অমন গাঢ় রক্তের চেহারা নেবে। কালিসাধন আজ সেই মাদারির খেলাটাই দেখাল।
এইসব ভাবতে-ভাবতেই বাসব মুখার্জি গায়ে জামাটা গলিয়ে গ্রামের রাস্তায় পা দিল। তার মন বলছে, বড় একটা বিপদ সামনে উপস্থিত। কিন্তু শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর আস্ত থাকতে সেই বিপদটা যে কীভাবে আসবে, তা সে বুঝতে পারছে না। তার মতন ক্রিমিনাল, যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, তারা যতক্ষণ স্বেচ্ছায় না শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর ছাড়ছে, ততক্ষণ তো কেউ তাদের ছুঁতে পারবে না। আদালতের নির্দেশেই আইনরক্ষকেরা আটকে যাবে।
আর তারা শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর ছাড়বেই বা কোন দুঃখে?
গ্রামের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কিছুটা অন্যমনস্কভাবেই বাসব মুখার্জি এসে পড়ল হেলথ-সেন্টারের সামনের রাস্তায়। বাইরের দাওয়ায় বসে ডাক্তার সান্যাল রুগি দেখছিলেন। তার মেজাজটা আজ বিশেষরকম তিরিক্ষে হয়ে আছে দ্যাখা গেল। একটা থুরথুরে বুড়ি এসেছিল চোখ দেখাতে। ভজেন সান্যাল তাকে খেঁকিয়ে উঠলেন,—অ্যাঃ, চোখ দেখাবে। কেন? চশমা নিয়ে কী করবে? কাগজ পড়বে?
—না বাবা। পেটে অত বিদ্যে আছে না কী, যে কাগজ পড়ব? কিন্তু মাঠ থেকে গোরুগুলোকে তো চিনে নিতে হবে।
বুড়ির কথা শুনে ডাক্তার ভজেন সান্যাল এতই অবাক হয়ে গেলেন যে তার আর রাগ করবার কথাও মনে রইল না। অবাক হয়ে বুড়িকেই জিগ্যেস করলেন,—এতটা চোখ খারাপ আবার হয় না কি, যে আস্ত একটা গরুকেও দেখতে পাবে না?
—হয় বাবা হয়। এই তো কালকেই গাইটা দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে দেখে তাকে খুঁজতে বেরোলুম। বেশ রাত হয়ে গেছে। এরপরেও গরুটাকে যদি গোয়ালে না তুলি তাহলে তো সেটাকে বাঘে টেনে নিয়ে যাবে।
তা খুঁজতে খুঁজতে দেখি কী অম্বিকে মোড়লের বাড়ির পেছনের কলাগাছের ঝোঁপটার মধ্যে আমার রাঙি গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গলার দড়িটা ধরে টান দিয়ে বললুম, চলরে রাঙি। রাত হয়েছে, ঘরে চল।
দড়িটা হাত দিয়েই কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। গোরু বাঁধার দড়ি তো এত মোটা হয় না। তারপর যেই না আরেকটু জোরে এক টান দিয়েছি, অমনি কাঁ আ আ আ করে কী শাঁখের মতন গর্জন। বুঝলেন তো ডাক্তারবাবু? স্বয়ং মহাকালবাবা ওইখানে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। আর আমি তার শুঁড় ধরে মেরেছি টান। কোনওরকমে পড়িমরি করে দৌড়ে বাড়ি ফিরে ঘরে খিল তুলে দিয়েছি। আর তখনই প্রতিজ্ঞা করেছি, চশমা না নিয়ে আর বাইরে বেরোচ্ছি না।
—হুঁ। এ তো ভাবার মতন ব্যাপার। হাতি অবধি চোখে পড়ছে না। এ চোখ কি অর্ডিনারি চশমা দিয়ে ঠিক হবে? না কি দূরবিনের কাচ বসিয়ে দেব চশমায়?
চিন্তাকূল মুখে ডাক্তার ভজেন সান্যাল প্রেসক্রিপশন লিখতে বসলেন।
বাড়ির সামনের দিকে ডাক্তার ভজেন সান্যাল ব্যস্ত দেখে, বাসব মুখার্জি ঘুরে বাড়ির পেছনে গিয়ে উপস্থিত হল। এদিকে ছোট্ট একটু বাগানের পরেই ল্যাবরেটারি ঘরের জানলা। মাঝখানে পাঁচিল-টাচিল কিচ্ছু নেই। বাসব জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখল, কালকে সেই বুনসেন বার্নারের ওপর যে দুরকম প্রোটিনের মিক্সচার ফুটছিল, আজ আর তার চিহ্নও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার বদলে যেটা রয়েছে, সেটা দেখেই বাসবের জিভে জল চলে এল। বেশ বড়সড় একটা চকোলেটের চৌকো টুকরো জানলার পাশেই একটা প্লেটের ওপর রাখা রয়েছে। সকালে ব্রেকফাস্ট না করেই বেরিয়ে পড়েছিল বাসব। এখন চকোলেটটা দেখে তার মনে পড়ল যে তার পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সে হাত বাড়িয়ে টপ করে প্লেট থেকে চকোলেটটা তুলে নিয়ে খপ করে মুখে পুড়ে নিল। তারপর প্যান্টের পেছনে হাত মুছে নিয়ে খোশমেজাজে ফিরে চলল শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের দিকে। চকোলেটটার স্বাদ সত্যই অপূর্ব। বাসব পৃথিবীর নানান জায়গার চকোলেট খেয়েছে। বেশিরভাগই অবশ্য জেলখানায় বসে। কিন্তু এমন বড়িয়া টেস্ট কোত্থাও পায়নি।
হোটেলে ফিরে চানটা কোনওরকমে করতে পারল বাসব মুখার্জি। মুহুরি মুসল্লম তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। একটা ঘুমের আমেজ তার চৈতন্যকে আস্তে আস্তে ঢেকে ফেলছিল।
জামা-প্যান্ট পরা অবস্থাতেই বিছানার ওপর হাত-পা এলিয়ে শুয়ে পড়ল বাসব, এবং সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তার আগে অবশ্য কাঠের পা-টা খুলে বিছানার নীচে রেখে দিয়েছিল।
ওই দুপুরেই, গজহট্ট থানার দারোগাবাবুর ঘরের ফোনটা বেজে উঠল।
ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে একটা রোমহর্ষক ভূতের গল্পের একদম শেষ পাতায় পৌঁছে গিয়েছিল। পাতা থেকে চোখ না সরিয়েই অত্যন্ত বিরক্ত মুখে ফোনটা ধরে বললেন, হ্যালো।
উলটোদিকে দিল্লির সেই গোয়েন্দাপ্রধান। পরিচয় দিতেই ভোলানাথ হাতের বই চট করে ফাইলের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।—হ্যাঁ স্যার, বলুন স্যার।
—মিস্টার ব্যানার্জি। যা বলছি শুধু শুনে যাবেন আর অর্ডার হিসেবে মান্য করবেন। কোনও প্রশ্ন করবেন না।—
—ইয়েস স্যার।
—আজ সন্ধে সাতটা বাজার একটু আগেই আপনার থানার ফুল টিম নিয়ে শিড়িঙ্গেপুর আর গজহট্টের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। সীমানা পেরোতে হচ্ছে না। কাজেই কোনও অসুবিধে নেই। কী? ক্লিয়ার তো?
—হ্যাঁ স্যার। তারপর?
—তারপর একটা ভারি মজা হবে। আপনি তো শুনেছি অফিস-টাইমে থানার বাইরে গিয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরেন। তাই আপনাকে এমন একটা উদাহরণ দিই যেটা আপনার বুঝতে একটুও অসুবিধে হবে না। তারপর নানান সাইজের মাছ নিজেরাই আপনার ছিপের সুতো ধরে ঝুলবে আর বলবে, আমাকে ডাঙায় তোলো। শিগগির ডাঙায় তোলো।
এই বলে গোয়েন্দাপ্রধান ফোন কেটে দিলেন। তার কাছ থেকে পরের ফোনটা পেলেন ভৈরবডাঙার থানার রমেন পাইক। ফোনের বক্তব্য একেবারে এক। শুধু রমেন পাইককে নির্দেশ দেওয়া হল ভৈরবডাঙা আর শিড়িঙ্গেপুরের সীমানা আগলাতে।
রমেন পাইক জিগ্যেস করেছিলেন,—আর মুটকি নদীর দিকটা?
—তার জন্যে অন্য লোক আছে। গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়েছিলেন গোয়েন্দা প্রধান।
কালিসাধন মোক্ষম সময়ে নিজের কামরায় ফিরেছিলেন। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই শুনলেন ওয়াকি টকিতে শব্দ উঠছে,—মসকুইটো কলিং এলিফ্যান্ট, মসকুইটো কলিং এলিফ্যান্ট।
—এলিফ্যান্ট স্পিকিং। বলে রাঠোর।
—আরে! আমার নাম ধরছেন কেন। একটু সাবধান হবেন তো। যাই হোক, শুনুন। মালপত্তর সব নিয়ে এলাম ভৈরবডাঙা থেকে।
—বেশ। তুমি এক কাজ করো। হোটেলের পাইপ বেয়ে উঠে অক্ষয়ের ঘরের জানলা দিয়ে জিনিসগুলো ওর ঘরে ফেলে দাও। মানে বুঝছ তো? শেষ অবধি ব্যাপারটার মধ্যে একটা অলৌকিকের মোড়ক রাখতে চাইছি। না হলে ব্যাটাদের মনে গুপ্তধনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিশ্বাসটা জিইয়ে রাখা যাবে না।
—মসকুইটো স্পিকিং। আপনি বড্ড শক্ত শক্ত বাংলা ব্যবহার করছেন এলিফ্যান্ট। এরকম কিন্তু কথা ছিল না। যাই হোক। আমি জানলা গলিয়ে দিলুম প্যাকেটটা অক্ষয়ের ঘরে। এবার আরও কী সব বললেন, সে আপনি করুন।
আচ্ছা আচ্ছা। ওভার।
—ওভার।
একটু বাদেই অক্ষয়কুমার উত্তেজিত হয়ে কালিসাধনের ঘরে ঢুকল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,—প্রভু, রামকানাই দেখছি সব মালপত্তর আমার ঘরের বিছানায় রেখে গেছে। এমনকী সেলোটেপটা অবধি আনতে ভোলেনি।
সারাদিন রুগি দেখে ডাক্তার ভজেন সান্যাল হাত-মুখ ধুয়ে নিজের প্রিয় ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন, এবং ঢুকেই একটা আকাশ ফাটানো চিৎকার করে উঠলেন,—শিবু, শিবু-উ-উ-উ! আমার সলিউশনটা কই?
কম্পাউন্ডার শিবনাথ দৌড়ে ঘরে ঢুকল। কী খুঁজছেন স্যার?
—আরে সলিউশন...সলিউশন। মানে ওই বার্নারে যেটা ফুটতে দিয়েছিলাম। গেল কোথায়?
—কী আর বলব স্যার। আপনার যেমন ভুলো মন। ভাগ্যিস আমি কাজের ফাঁকে একবার তুলো খুঁজতে এই ঘরে ঢুকেছিলাম। দেখি কী, আপনার ওই সলিউশন একেবারে পলিউশন হয়ে গেছে। পুড়ে আঙরা। ধোঁয়ায় ঘর ভরতি। আরেকটু হলে ঘরদোরে আগুন জ্বলে যেত। আমি ইসটোভ নিভিয়ে, পুড়ে খটখটে হয়ে যাওয়া দ্রব্যটি নিয়ে ওই জানলার ধারে ঠান্ডা হতে রেখে দিলুম। কই, পাননি?
—নাঃ। মনে হয় কাকে মুখে করে নিয়ে পালিয়েছে। একটুক্ষণ গুম হয়ে থেকে ডাক্তার সান্যাল বললেন,—যাগগে। বোঝাই যাচ্ছে, ও কিছু হয়নি। আবার নতুন করে সব ভাবতে হবে।
ডাক্তার সান্যাল একটা খসে যাওয়া টিকটিকির ল্যাজ মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে তৎক্ষণাৎ ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়লেন।
বাসব মুখার্জির ঘুম ভাঙল সন্ধে পৌনে সাতটার সময়ে...ভারি অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে।
চাক্কু বলরাম তাকে ঠেলা মেরে তুলল। বলল,—দাদা আর ঘুমোবেন না। তাহলে এই ঘুমই চিরনিদ্রা হয়ে যাবে।
চোখ কচলাতে কচলাতে বাসব জিগ্যেস করল,—কেন?
—আমরা হোটেলটা আর পনেরো মিনিট বাদে উড়িয়ে দেব কি না।
—অ। বলে বাসব বাথরুমে গিয়ে ধীরেসুস্থে মুখে-চোখে জল দিয়ে এল। তারপর ঘড়ি দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। একী রে বাবা! পৌনে সাতটা বাজে! সেই দুপুর বারোটা থেকে এতক্ষণ ঘুমোলাম!
—দাদা! তাড়াতাড়ি চলুন আর পাঁচমিনিট। বলরাম তাড়া লাগাল।
—আরে থামো তো। কেবল খিচিড়মিচিড়। কেন, হোটেল ওড়াবে কেন?
বাসব এই কথা বলা মাত্র বলরাম তার বিশাল দুই হাতের ওপর অনায়াসে বাসবকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের দোতলায় করিডর ধরে দৌড়োল। অবশ্য বেশিক্ষণ তাকে বাসব মুখার্জিকে বইতে হল না। কারণ করিডরে বেরোনো মাত্র বাসব বাইরে যে দৃশ্য দেখতে পেল, তাতে সে পরিষ্কার বুঝতে পারল বলরাম যথেষ্ট জোরে দৌড়োচ্ছে না। এখন বাঁচতে গেলে এর চেয়েও অনেক জোরে ভাগতে হবে। সে খচমচ করে বলরামের কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পাঁইপাঁই করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে, সেখান থেকে হোটেলের গেটের দিকে দৌড় লাগাল।
বাসব দেখেছিল, বারুদবালক অক্ষয় উঠোনে দাঁড়িয়ে ডিরেকশন দিচ্ছে, আর রামকেষ্ট সেই ডিরেকশন মতন শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ছাদ থেকে ইলেকট্রিকের তারের মতন কিছু খাটাতে খাটাতে নেমে আসছে। বলাই বাহুল্য, এই কাজের জন্যে রামকেষ্টর মই, সিঁড়ি, দড়াদড়ি কিছুই লাগছে না। সে দিব্যি সড়সড় করে দেওয়াল বেয়ে নেমে আসছে।
রামকেষ্ট শুধু ইলেকট্রিক তার খাটালে বাসব ভয় পেত না। কিন্তু তারের ফাঁকে ফাঁকে বড়সড় কালিপটকার মতন দেখতে ওই লাল লাল চোঙগুলো বাসব খুব ভালো করে চেনে। ওগুলো ডিনামাইট। হোটেল উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা ফাঁকা আওয়াজ নয়।
রাস্তায় বেরিয়ে বাসব দেখল, সে একা দৌড়চ্ছে না। শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের সমস্ত বাসিন্দাই তার একটু সামনে সামনে দৌড়ে যাচ্ছে। অবশ্য চারজন বাদে। কালিসাধন অ্যান্ড কোম্পানি, মানে অক্ষয়, বলরাম আর রামকেষ্ট।
আকাশে হালকা চাঁদের আলো থাকায় বাসব মুখার্জি এ-ও দেখতে পেল, যে ইতিমধ্যেই যারা গজহট্ট কিংবা ভৈরবডাঙার সীমানায় পৌঁছে গেছে তাদের মহা সমাদরে ডেকেডুকে অপেক্ষমান পুলিশের জিপে তুলছে রমেন পাইক আর ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জ্যে। বাসব সুট করে রাস্তার ধারে একটা ঝোঁপের আড়ালে চলে গেল। তারপর যেটা করল সেটা ভারি বিস্ময়কর।—
সরু গোঁফটাকে চড়চড় করে টান মেরে খুলে ঝোঁপের একপাশে ফেলে দিল সে। বোঝাই যাচ্ছে নকল গোঁফ লাগিয়েই এতদিন কাটাচ্ছিল।
চশমাটারও যে প্রয়োজন ছিল শুধু লোকের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যেই, তা বোঝা গেল যখন সেটাও গোঁফের পথই অনুসরণ করল।
ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে আর কয়েক পা হাঁটতেই বাসব দেখল, গ্রামের একটা বাড়ির উঠোনে দুটি জিনিস মেলা আছে,—একটা ময়লা ধুতি, আর একটা মাছ ধরার জাল। বাসব জামা-প্যান্ট ছেড়ে ধুতিটা মালকোঁচা দিয়ে পড়ল। তারপর জালটা কাঁধে ফেলে শিস দিতে দিতে চলল মুটকি নদীর ঘাটের দিকে।
—কী কত্তা? কই চললেন? এমন খাতিরের সম্বোধনে ঘাড় ঘুরিয়ে বাসব যা দেখল তাতে তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল। সে দেখল, এগারোজন কম্যান্ডো অত্যন্ত ভয়ংকর দেখতে এগারোটা মেশিন কার্বাইন হাতে মুটকি নদীর খেয়াঘাটকে পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে হাঁকটা তার কেউ ছাড়েনি। ছেড়েছে তাদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়নো বিশালবপু লোকটা। নকল দাড়িটা খুলে ফেলেছে ঠিকই। তবে কালিসাধনের পরনে এখনও সেই রক্তাস্বর।
—চললেন কই কত্তা? কইলেন না তো?
বেড়াল যদি হাসতে পারত তাহলে ইঁদুরকে দুই থাবার মধ্যে নিয়ে খেলা করার সময়ে সে বোধহয় ঠিক এইভাবেই হাসত, যেভাবে কালিসাধন হাসছে।
মনের ভেতর যাই হোক, বাসব মুখার্জিও বাঘা তেঁতুল। সে যথেষ্ট তেজের সঙ্গে জবাব দিল,—কেন, নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছি সেটা বুঝতে কি অসুবিধে হচ্ছে? তার ভরসা তার সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া চেহারা।
গোঁফ ছিল। গোঁফ নেই।
চশমা ছিল। চশমা নেই।
সাহেবি পোশাক ছিল। তা-ও নেই।
এই অবস্থায়, যতই সন্দেহ থাকুক, কালিসাধন পারবে কি তাকে ধরতে? যদি না...যদি না...! হ্যাঁ, যদি না কালিসাধনের মনে থাকে দশ বছর আগের সেই অ্যাকসিডেন্টটার কথা। তার কাঠের পায়ের কথা।
—রাতের বেলায় নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা! কেন? সারাদিনে এদিকে আসার সময় পাওনি?
কালিসাধনের মুখের হাসিটা দেখে বাসবের বুঝতে বাকি রইল না, যে কালিসাধনের দিব্যি মনে আছে, যে বাসবের একটা পা কাঠের তৈরি। সেইজন্যেই সে অত নিশ্চিন্ত মুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার চোখের নজর এখন সরাসরি খাটো ধুতির নীচে বেরিয়ে থাকা তার ডান পা-টার ওপর স্থির।
শেষ চেষ্টা হিসেবে বাসব বলল,—না গো। জামাইয়ের বড় অসুখ কিনা। তাই সারাদিন হেঁতালডাঙায় বোনের বাড়িতেই কাটাতে হল। এদিকে কিছু মাছ না ধরলে কাল হাটে বেচবই বা কী, আর খাবোই বা কী?
ঠিক এই সময়েই বিস্ফারণটা হল।
সে কী আওয়াজ! সে কী আলো! সে কী আকাশ জোড়া আগুনের শিখার লকলকানি।
শিড়িঙ্গেপুর গ্রামের যে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, সে সেই অবস্থাতেই কিছুক্ষণের স্ট্যাচু হয়ে গেল। ইন্টারপোলের জওয়ানরা হাতে কার্বাইন উঁচিয়ে, কালিসাধন হাসি হাসি মুখে, বাসব মুখার্জি কাঁচুমাঁচু মুখে, চোর বদমাইশ ডাকু,—যারা ভৈরবডাঙা কিংবা গজহট্টের দিকে দৌড়চ্ছিল তারা দৌড়ের ভঙ্গিতে, তাদের কালো গাড়িতে তোলবার জন্যে যে পুলিশেরা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা হাত বাড়ানো অবস্থাতেই জমে পাথর হয়ে গেল।
গুনু মইষাল প্রতিদিনই ব্যোম টান দিয়ে একটা করে গাঁজার কলকে ফাটায়। আজকে তার গাঁজার কলকে ফাটার সময়টা একেবারে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের বিস্ফোরণের সময়ের সঙ্গে মিলে গেল। গুনু চোখ বড় বড় করে তার হাতের কলকের অবশিষ্ট অংশটার দিকে চেয়ে রইল। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না,—এতটুকু একটা কলকে ফাটায় এত ভয়ানক আওয়াজ আর আলোর ঝলকানির উৎপত্তি হতে পারে।
পাগলা হাতিটা সবেমাত্র ত্যাবড়াডাঙা ইস্টিশনের দিকে রওনা হয়েছিল, সন্ধের ট্রেনটা অ্যাটেন্ড করার জন্যে। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফারণের শব্দে তার মাথার ভেতর থেকে যেন একটা ধোঁয়ার পরদা সরে গেল। তার মনে পড়ে গেল গদাধর নদীর তীরে তার মা, বাবা, ভাই, বোন সবাই কচি কচি সবুজ ঘাসজমিতে চরে বেড়ায়। সেই হাতির পাল এরকমই সন্ধ্যায় নদীর জলে গা ধুতে নামে। এ ওকে শুঁড়ে করে জল তুলে চান করিয়ে দেয়। এ ওর গায়ে আদর করে মাথা ঘষে। ওদের ছেড়ে এ আমি কোথায় চলে এসেছি! ভারি অবাক হয়ে ভাবল হাতিটা। তারপর চার পা তুলে দৌড়ল গদাধর নদীর চরার দিকে।
পনেরো মিনিট আগেও, ফণী মুহুরি চাক্কু বলরামের কথা বিশ্বাস করেনি। তার নিজের হোটেল ছেড়ে তাকে বেরিয়ে যেতে বলছে এই মাস্তানটা! কারণ এই হোটেলটা ওরা উড়িয়ে দেবে! কেন উড়িয়ে দেবে? না, এর নীচে না কী গুপ্তধন পোঁতা আছে। এর চেয়ে হাস্যকর কথা কেউ কখনও শুনেছে?
ফণী মুহুরিও হাসতে শুরু করেছিল। কিন্তু তারপরেই তার চোখে পড়েছিল হোটেলের দেয়ালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ফিউজগুলো বেয়ে আগুনের শিখা চিড়চিড় শব্দ করে ধেয়ে যাচ্ছে ডিনামাইট গুলোর দিকে।
ফণী আর দেরি করেনি। সামনে পড়ে থাকা টাকার ব্যাগটা তুলে নিয়ে দৌড়েছিল বাইরে। সেই দৌড় থামল এই বিস্ফোরণের আওয়াজে।
বিস্ফোরণের ধাক্কাটা মিলিয়ে যেতেই, সবার চোখের সামনে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের মস্ত বড় বাড়িটা বালি দিয়ে বানানো দুর্গের মতন ঝুরঝুর করে মাটিতে ঝরে পড়ল, আর সবাই অবাক হয়ে দেখল, কমলা আগুনের শেষ একটা হলকার সঙ্গে শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের মস্ত সাইন বোর্ডটা একটা ছুঁড়ে দেওয়া তাসের মতন কোথায় যেন উড়ে গেল।
ফণী সেই আগুনের আলোয় একবার হাতে ধরে থাকা টাকার থলিটার মুখ খুলে ভেতরে তাকাল। পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা থাকার কথা এর মধ্যে। গত পাঁচ বছরে হোটেল থেকে যা আয় হয়েছে সেই টাকা। এটা সঙ্গে থাকলে আরেকটা শের-ই-শিড়িঙ্গেপুর বানিয়ে নেওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। ফণী নিশ্চিন্ত হল টাকাগুলো ঠিক আছে দেখে। কিন্তু হঠাৎই তার খেয়াল হল, থলিটা? এটা তো তার নয়। তারটা ছিল চটের কাপড়ের তৈরি। আর এটা তো লাইলনের সুতো দিয়ে বোনা। এটা কেমন হল! টাকা ঠিক রইল, থলি বদলে গেল!
পাশ থেকে কে যেন দৌড় থামিয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,—ওটা আমার।
আলোকবাবু কিংবা অ্যালবুকার্ক।
—ওটা আমার থলি। আপনি ভেতরের কাগজগুলো রেখে দিয়ে থলিটা আমাকে ফেরত দিয়ে দিন। বাজার করতে কাজে লাগবে।
তার মানে? আস্তে আস্তে পরিস্থিতিটা ফণী মুহুরির কাছে পরিষ্কার হল। হোটেল উড়ে গেছে। হাতে আছে পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকার জাল নোট। আসলগুলো নিশ্চয়ই ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।
ফণী মুহুরি ধপ করে মাটির ওপরে বসে পড়ল।
সবার আগে সম্বিত ফিরে পেলেন কালিসাধন, কারণ তিনিই সবচেয়ে ভালো জানতেন কী ঘটতে চলেছে। একটা বড়সড়ো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি বললেন,—যাক, অনেকদিনের একটা পাপের আখরার বিনাশ হল। তারপর বাসবের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,—এই যে বাসবকুমার। অনেক ইয়ার্কি হয়েছে। এবার ভালোছেলের মতন চলো তো আমাদের সঙ্গে। ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে।
বাসব তেড়েমেড়ে বলল,—কাকে বাসব বলে ডাকছেন মশাই? আমার নাম অনন্ত। শিড়িঙ্গেপুরের ছয় পুরুষের বাসিন্দা। কোন দুঃখে বউ বাচ্চা ফেলে আপনাদের মতন অচেনা লোকের সঙ্গে যাব?
—বটে! গোঁফ কামিয়ে ফেললেই পরিচয় মুছে ফেলা যায় বুঝি? এই রাঠোর! তোমরা দুজন ওর দুটো হাত চেপে ধরো দেখি। আমি দেখি ও কেমন অনন্ত।—এই বলে কালিসাধন এগিয়ে এসে বাসব মুখার্জির ডান পা-টা মুচড়ে ধরে এক টান দিল।
বাপরে মারে পিসেমশাইরে বলে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল বাসব মুখার্জি। কালিসাধন ছিটকে পিছিয়ে এল। তারপর কোমরে হাত রেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল বাসব...না, না, অনন্তের দিকে। অনন্ত। নিশ্চয়ই অনন্ত। তা সে বাসবের সঙ্গে যতই মুখের মিল থাকুক না কেন।
বাসবের ডান পা-টা তো কাঠের তৈরি। আর এই লোকটার রীতিমতন রক্ত মাংসের পা।
ইসস! ছি-ছি। সন্দেহের বশে এক দরিদ্র মানুষকে এভাবে ব্যথা দিয়ে ফেললাম! নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল কলিসাধনের। তিনি অনন্তের কাছে এসে, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে, তার হাতে একশো টাকা দিয়ে বললেন,—যাও ভাই। যত ইচ্ছে মাছ ধরো। শুধু আমার এই বোকামির কথাটা কাউকে বলো না।
মুটকি নদীর ঘাটে একটা ছোট ডিঙি নৌকা বাঁধা ছিল। সেটায় উঠে বাঁধনদড়ি খুলে দিয়ে স্রোতে ভেসে পড়ল বাসব মুখার্জি। তারপর গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসল, কার বোকামির কথা সে কাকে বলবে? সে নিজেই কি কম বোকা? ঘুমের মধ্যে কখন যে ডাক্তার সান্যালের ওষুধের তেজে তার পা গজিয়েছে সেটা না হয় সে খেয়াল করেনি। কিন্তু একটু আগে ঝোঁপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে যখন ছদ্মবেশ নিচ্ছিল, তখন যে তার দুটো পা-ই মশার কামড়ে লঙ্কাবাটা লাগার মতন জ্বলছিল সেটা খেয়াল না করার কী মানে আছে?
বোকা...বোকা...মহামূর্খ সে নিজে। হঠাৎ দু-হাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল বাসব মুখার্জি। সেই কান্না কিছুটা যদি সত্যিকারের পা ফিরে পাওয়ার আনন্দে হয়, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি নকল পা-টা হারানোর দুঃখে,—সেটা নিশ্চয়ই শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ওই ঘরটার সঙ্গে এতক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ওই পা-টার মধ্যেই যে ঠাসা ছিল কয়েক কোটি টাকার প্ল্যাটিনাম,—তার গুপ্তচরবৃত্তি করে জমানো সারা জীবনের দৌলত।
ওই পা-টার মধ্যেই যে পাকিয়ে রাখা ছিল ভারতের রাডার ঘাঁটির মানচিত্র, বিদেশের বাজারে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারলেই যার দাম হত অকল্পনীয়।
অনেকদিন পরে বাসব মুখার্জি সত্যিকারেই দু-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল।
তার নৌকা ভেসে চলল নিজের মনে, মুটকি নদীর স্রোতে।
উপসংহার
দেরি হলেও সংসদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিড়িঙ্গেপুর গ্রামকে সমান দুই ভাগ করে গজহট্ট আর ভৈরবডাঙা থানার আন্ডারে নিয়ে আসা হয়েছে। এর ফলে রমেন পাইক বা ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জের কাজ কিছুই বাড়েনি। কারণ শের-ই-শিড়িঙ্গেপুরের ধ্বংসপ্রাপ্তির ফলে শিড়িঙ্গেপুর আবার এক শান্ত নিরিবিলি গ্রামেই পরিণত হয়েছে। পুলিশের সেখানে করার কিছুই নেই।
একেবারে কিছু নেই বলা অবশ্য ভুল। সেখানে বড় বড় মাছে ভরা দিঘির সংখ্যা অনেক। তাই দুই দারোগাকে মাঝেমধ্যেই নতুন পাওয়া এই তালুকে যৌথ অভিযানে যেতে হয়।
ফণী মুহুরি আর মেদিনীপুরে ফেরেনি। গজহট্ট বাজারেই সে একটা নতুন রেস্টুরেন্ট খুলেছে,—নাম 'ফণী কেবিন'। সেখানকার স্পেসালিটি মুহুরি-মুসল্লম খাবার জন্যে, তোমাদের অনেক আগে থেকে টেবিল বুক করে যেতে হবে। না হলে জায়গা পাবে না।
একই কথা বলা যায় ভৈরবডাঙা বাজারের 'বারুদভবন' সম্বন্ধে। ওটা অক্ষয়ের বাজি আর মাঞ্জা বিক্রির দোকান। অপরাধীদের সমূলে বিনাশ করতে অক্ষয়কুমার মালাকার পুলিশের সঙ্গে যেভাবে সহযোগিতা করেছিল, তার প্রতিদান স্বরূপ, তাকে পুলিশের তরফ থেকে ওই দোকানটা করে দেওয়া হয়েছে। এখন অক্ষয়ের তৈরি অপূর্ব সব আতশবাজি আর আগুনে মাঞ্জা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।
পুলিশের তরফ থেকে রামকেষ্ট আর চাক্কু বলরামেরও সব অপরাধ মাফ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা দুজনে এখন পুলিশেরই কম্যান্ডোবাহিনীতে চাকরি করে। খালি হাতে যুদ্ধে ওদের দুজনের জুড়ি নেই।
আর এই সবকিছুর পেছনে যে লম্বা চওড়া দাড়িওয়ালা মানুষটা রয়ে গেল, তার আসল নাম যে কালিসাধন নয় তা তো বুঝতেই পারছ। তবে সে নামটা যে কী তা বলা যাবে না। চাকরির খাতিরেই তাকে নাম আর চেহারা গোপন রাখতে হয়। হয়তো এই মুহূর্তেই তিনি তোমার আশেপাশেই কোথাও ঝালমুড়ি বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন কিংবা লটারির টিকিট। হয়তো নাম নিয়েছেন বভ্রুবাহন কিংবা শাস্ত্রসিন্ধু। কিছুই বলা যায় না তার সম্বন্ধে, তবে বাসবের কথা যে তার মাথায় সবসময়েই ঘুরছে এটা ঠিক। আর এইজন্যেই আমরা নিশ্চিত, ওই দুজনের আবার কোথাও দ্যাখা হবে। হবেই।
সেবারেও বাসব তার চোখে ধুলো দিতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন