সৈকত মুখোপাধ্যায়

উঠোনে পা দিতে না-দিতেই পিসিমা হাঁউমাঁউ করে তেড়ে এসে আমাকে পাকড়াও করলেন।
আট কিলোমিটার পথ রোদ্দুরের মধ্যে হেঁটে এলাম—পায়ে এত বড় ফোসকা পড়েছে, ঘেমে চান করে গেছি। সকাল থেকে একটা নকুলদানাও পেটে যায়নি। উপরন্তু সজনেগাছ থেকে কখন কী জানি, ঘাড়ে একটা শুঁয়োপোকা পড়েছিল। ঘাড়টা ফুলে পাঁউরুটির মতন হয়ে গেছে। পিসিমার কিন্তু সে সব দিকে খেয়ালই নেই। দাওয়ায় উঠবার সময়টুকু অবধি দিলেন না, উঠোনের মাঝখানেই আমাকে এমন খামচে ধরলেন যে, আমি রোগা মানুষ, আরেকটু হলে মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলাম। তারপর শুরু হল প্রশ্নবাণ—হ্যাঁ-রে কেতু, তাকে দেখে এলি? হ্যাঁ-রে, সত্যিই কি সে কান নাচাতে পারে?
বললাম, শুধু পারে বললে কম বলা হয় গো পিসিমা। বেদম নাচাতে পারে। বাড়ির লোকজন টেপরেকর্ডারে যখন যে গান চালিয়ে দিচ্ছে সেই তালে কান নাচাচ্ছে। কাল রাতে আমি ওদের বাড়ি ঢোকার পর থেকে কতরকম দেখলাম জানো? প্রথমে পিলু রাগে একটা ঠুংরির সঙ্গে...
কিছু মনে করিস না বাবা কেতু, তুই তো সুরের ব্যাপারে গাধার অধম। কেমন করে বুঝলি, ওটা পিলু রাগ? খাম্বাজ কিংবা চন্দ্রকোষ নয়?
আঃ, পিসিমা। কান নাচিয়েই তো বুঝিয়ে দিল। কানদুটো তখন পিলপিল করে নাচছিল। তাহলে কি রাগটাকে পিলু বলা যায় না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ বাবা, যায়। নিশ্চয়ই যায়। তারপর বল।
তারপর খরবায়ু বয় বেগে। বিশ্বাস করবে না পিসিমা, যতবার 'হাঁইয়ো হাঁইয়ো হাঁইয়ো' হচ্ছে ততবারই দুটো কান নৌকোর দাঁড়ের মতন আগুপিছু করছে। মাথা কিন্তু একদম স্থির।
পিসিমা চোখ বুজে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, কমবয়সে তিনিও ঠিক ওরকমটাই পারতেন রে কেতু। তোদের তো তখনও জন্ম হয়নি। রাশিয়ার মহাকাশযাত্রী ইউরি গ্যাগারিনের সম্মানে একটা কানের নাচ বানিয়েছিলেন, নাম দিয়েছিলেন স্পুটনিক নৃত্য। কালীপুজোর সময়ে আমাদের পাড়ার ফাংশানে ঝাড়া পনেরো মিনিট ধরে সেই কানের নাচ দেখালেন। অরবিটে কিছু গণ্ডগোল হয়ে থাকবে। যখন বাড়ি ফিরলেন, দেখি বাঁ-কানের জায়গায় ডান কান আর ডান কানের জায়গায় বাঁ-কান। ধরিয়ে দিতে আবার মেলা কসরৎ করে ঠিক করে ফেললেন অবশ্য।
'তিনি' মানে পিসিমার পরলোকগত স্বামী, আমার পিসেমশাই—ঈশ্বর রাখোহরি বন্দোপাধ্যায়। অবশ্য এখন তাঁর নামের আগে ঈশ্বর বসানো ঠিক হচ্ছে কিনা জানি না। কারণ পিসেমশাই আবার জন্ম নিয়েছেন। জন্ম নিয়েছেন পিসিমার গ্রাম করলাবাগান থেকে আটমাইল দূরে অন্য এক গ্রামে। সে গ্রামের নাম উচ্ছেমাচান। আমি এইমাত্র সেইখান থেকেই ফিরছি।
একটুখানি গোড়ার কথা বলে নেওয়া ভালো।
কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়ে বাড়িতে ঘোষণা করলাম, আমি আর পড়াশোনা করব না। চাকরিও না। তাই শুনে বাবা বললেন, তাহলে কী করবে? ব্যবসা?
সে একরকম বলতে পারো। আমি গোয়েন্দাগিরি করব। নিজের ইনভেস্টিগেশন অফিস খুলে বসব।
বাবা বললেন, হুঃ। সত্যিকারের প্রাইভেট ডিটেকটিভ বলে কিছু হয় না, সেটা জানো কি? গোয়েন্দা চরিত্রগুলো শুধু গল্পের মধ্যেই থাকে। যেমন অরণ্যদেব কিংবা ব্যাটম্যান—সেইরকমই। পুলিশের একটা গোয়েন্দাবিভাগ থাকে ঠিকই, কিন্তু তারাও পুরোপুরি ছকে বাঁধা কাজ করে। সেসব কাজে মোটেই রোমাঞ্চ নেই। তা ছাড়া ও চাকরি পেতে গেলে পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়েই পেতে হয়।
আমি বললাম, পুলিশের গোয়েন্দা কে হতে চাইছে? বললাম না, নিজের মতন করে তদন্ত চালাতে চাই?
এই কথা শুনে বাবা-মা'র মুখের অবস্থা এমন হল বলবার কথা নয়। বাড়ির আবহাওয়া ভয়ংকর গুমোট হয়ে গেল। খুবই অস্বস্তিতে পড়েছিলাম। কিন্তু তাই বলে জীবনের ব্রত তো আর ত্যাগ করতে পারি না। এমন সময় আমার বিন্তিপিসির কাছ থেকে একটা চিঠি এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিল।
বিন্তিপিসি বাবার পিসতুতো দিদি হন। বাঁকুড়ার একটা অজপাড়াগাঁয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। শুনেছি পিসেমশাই ছিলেন ওখানকার জমিদার। তিনি মারা গেছেন বারো বছর আগে। বছর পনেরো আগে একবার ওখানে গিয়েছিলাম। তখন আমার বয়েস মাত্র ছয় কি সাত। বিন্তিপিসির মেয়ে শিপ্রাদির তখনও বিয়ে হয়নি। ওর সঙ্গে কতরকমের খেলা যে খেলেছিলাম। ক'দিন বেশ মজা করে ঘুরেছিলাম, মনে পড়ে। তারপর এত বছরের মধ্যে আর পিসির বাড়ি যাওয়াও হয়নি, তাঁর সঙ্গে দেখাও হয়নি। এই নিয়ে পিসিমা অনেক অভিমান ভরা চিঠি দেন। কিন্তু কী করব? আমার কলকাতা ছেড়ে কোথাও গিয়ে বেশিদিন থাকতে ভালো লাগে না। বাবা অবশ্য মাঝে-মাঝেই দিদির বাড়ি যান। বাবার হাত দিয়ে বিন্তিপিসিমা আমার জন্যে নারকোলের চিড়ে, সিড়ির নাড়ু, ম্যাচা ইত্যাদি নানান সুখাদ্য পাঠিয়ে দেন।
সেই বিন্তিপিসিমাই পোস্টকার্ডে লিখলেন, প্রাণাধিক কেতু! শুনলাম তোমার কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। একবার যদি এই অবসরে পিসিমার বাড়ি ঘুরে যাও তো বড় ভালো হয়। একটা ব্যাপারে বিশেষ চিন্তায় পড়েছি, তোমার সাহায্য পেলে ভালো হয়...ইত্যাদি।
সন্ধেবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বাবা চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, বিন্তিদিরও হয়েছে বুদ্ধিভ্রংশ। সাহায্য চাওয়ার আর লোক পেল না, তোকে ডাকছে। অবশ্য কেরালা না কর্ণাটকে কোথায় যেন বাঁদরকে ট্রেনিং দিয়ে গাছ থেকে নারকোল পাড়ায় বলে শুনেছি। সে-ও তো একরকমের সাহায্যই হল।
তারপর মুচকি হেসে যোগ করলেন, বড়দির কিছু উপকার হোক না হোক, করলাবাগানে গেলে তোর যে পোয়াবারো হবে এটা বলতে পারি। বড়দির বাড়ির পেছনেই সাঁওতাল মাঝিদের পাড়া। তারা মাঠ থেকে খরগোশ আর তিতির ধরে এনে বাড়িতে বিক্রি করে যায়। ওসব মাংস যদি একবার খাস, জীবনে আর মুরগি-টুরগি মুখে তুলতে পারবি না। তা ছাড়া পেছনের মজা পুকুরটা থেকে এত বড় বড় কইমাছ কানে হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরের আঁশবটির কাছে এসে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। চার-পাঁচটা কালো গরুর দুধের সর জ্বাল দিয়ে বামুনমাসি ঘড়া ঘড়া ঘি বানিয়ে রাখে, আর সেই ঘি দিয়ে ওইসব মাছ-মাংস রাঁধে বড়দির আমিষ রান্নাঘরের ইনচার্জ গোপালঠাকুর।
বাবার মুখে এমন লোভনীয় বিবরণ শুনে, তিনি যে একটু আগে আমাকে ইনডাইরেক্টলি বাঁদর বলেছেন, সে দুঃখটা অনেকটা কমে গেল। তা ছাড়া পিসিমার বাড়ি সম্বন্ধে আমার কিছু অদ্ভুত স্মৃতিও ছিল। পিসেমশাইদের দেড়শো বছরের পুরোনো বিশাল বাড়িটার কথা আবছা মনে পড়ে। জমিদারবাড়ি বলতে যেরকম ছবি চোখে ভাসে বাড়িটা ছিল ঠিক সেইরকম। সে বাড়িতে ফুটবলমাঠের মতন বড় ছাদ, ছাদের পাঁচিলের ওপর পরির মূর্তি আর মেহগনি কাঠের সিঁড়ি যেখানে বাঁক নিচ্ছে সেখানে পেল্লায় ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাল্লায় বসানো নানা রঙের কাচের শার্সি।
সব মিলিয়ে মনে হল বিন্তিপিসির বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসা ভীষণ দরকার। তাই তক্ষুনি আমি আমার কলেজের ব্যাকপ্যাক থেকে পড়ার বইখাতা, ক্যালকুলেটর, পেন সব বার করে দিয়ে, সেখানে জামাপ্যান্ট আর কয়েকটা ভালো ভালো ভূতের আর গোয়েন্দা গল্পের বই ঢুকিয়ে নিলাম। পরের দিন সকাল হতে না হতেই রওনা হলাম করলাবাগানের উদ্দেশে। মাত্র তিনবার বাস আর দুবার নৌকো পাল্টাতেই সেখানে পৌঁছে গেলাম, অসুবিধে কিছু হল না। তবে সময় লাগল অনেক। পিসিমার বাড়ি যখন ঢুকলাম ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে।
আমাকে দেখে পিসিমা আহ্লাদ কোথায় রাখবেন ভেবেই পান না। সেই বিকেলেই গাওয়া ঘিয়ের লুচি, আলুরদম, বেগুনভাজা আর এত বড় বড় ক্ষীরমোহন না খাইয়ে ছাড়লেন না। তারপর আমাকে নিয়ে বেরোলেন বাড়ি আর বাগান দেখাতে। আমবাগান, পেয়ারাবাগান, কাজলদিঘি, শ্যামরাইয়ের মন্দির এইসব দেখেটেখে শেষকালে পিসিমা আমাকে নিয়ে সেই জমিদারবাড়ির ছাদে উঠলেন। তখন দূরে গন্ধেশ্বরী নদীর ওপাড়ে সূর্য ডুবছে। চারিপাশে ছোট ছোট গ্রামের মাথায় ঘন হয়ে উঠছে সাঁজালের নীলচে ধোঁয়ার স্তর। আকাশপথে ঝাঁকে ঝাঁকে শালিক আর টিয়া সারা দিনের শেষে কলকল করতে করতে বাসায় ফিরছে। এর মধ্যেই পিসিমা ভারি দুঃখ দুঃখ মুখ করে বললেন, বড় দোটানায় পড়েছি, বুঝলি বাবা কেতু।
অবাক হয়ে বললাম, কীসের দোটানা পিসিমা?
পিসিমা বললেন, তুই পুনর্জন্মে বিশ্বাস করিস?
বললাম, গল্পটা ভালো হলে অবশ্যই বিশ্বাস করি। ভালো রহস্য গল্প হলে তার প্রতিটি কথায় আমি বিশ্বাস করি—কাউন্ট ড্রাকুলা, লকনেস মনস্টার, বুনিপ, খগম, সেপ্টোপাস সঅঅব। বিশ্বাস করতে করতে আমার পিঠে কাঁটা ফুটে ওঠে, গা শিরশির করে, অঙ্কে ছত্তিরিশ আর কেমিস্ট্রিতে উনচল্লিশ পাই, তবু বিশ্বাস করতে ছাড়ি না। পুনর্জন্ম নিয়েও আমি অনেক ভালো গল্প পড়েছি। যেমন ধরো...
আমাকে থামিয়ে দিয়ে পিসিমা ভারি আহত গলায় বললেন, তার মানে বিশ্বাস করিস না। কিন্তু তাহলে এটা কী? এই বলে পিসিমা আঁচলের গেঁরো খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে আমার হাতে দিলেন। চার নম্বর রুলটানা খাতা থেকে ছেঁড়া পাতা। সেই পাতার দু-পিঠ জুড়ে উড পেনসিলে কোনও বাচ্চা ছেলের ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া হস্তাক্ষরে লেখা একটা চিঠি। কমে আসা আলোয় চোখটোখ কুঁচকে কোনওরকমে পড়লাম। তাতে লেখা আছে, কল্যাণীয়া বাসন্তী—বাসন্তী হল গিয়ে বিন্তিপিসির ভালো নাম। তুমি তো জানোই কয়েকটা বড় কাজ শেষ না করেই পৃথিবী ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। সেইজন্যেই আবার ফিরে এলাম। অবশ্য এসেছি তাও এগারো বছর হয়ে গেল। কিন্তু নতুন জন্মে আগের জন্মের কথা মনে পড়তে কয়েকবছর সময় লেগে গেল কি না, তাই তোমাকে জানাতে একটু দেরি হয়ে গেল।
নিশ্চয় ভাবছ কোথায় জন্ম নিয়েছি, কেমন আছি? জন্ম নিয়েছি উচ্ছেমাচানের শিবনাথ পাটোয়ারির বাড়িতে। শিবু যে গতজন্মে আমার ম্যানেজার ছিল তা নিশ্চয় ভোলোনি? তবে এ জন্মে ও আমার দাদু।
আমি কেমন আছি? সে কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। আমি রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমএ, জমিদার থাকোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র বংশধর—সেই আমাকে কিনা এরা—মানে আমার বাবা-মা বলে যারা নিজেদের পরিচয় দেয়—তারা ধুতি পরতে চাইলে বাধা দেয়! এত বড় স্পর্ধা, বলে কি না বাচ্চা ছেলে, হাফপ্যান্ট পরে থাকো! ভাবতে পারো গিন্নি, আজ সকালে বাবা বলে লোকটা আমার কান ধরে দুই চড় মেরেছে? আমার অপরাধ কী? না, ওর হুঁকোটা পড়ে আছে দেখে তাতে দুটো টান দিয়েছিলাম, আর ও সেইটা দেখে ফেলে। আরে, আমি জমিদার রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়, আমার নিজের চারখানা গড়গড়া ছিল, একটা রুপোর, একটা মোরাদাবাদী পেতলের আর দুটো বেলজিয়ান গ্লাসের, আমার নেশার জন্যে দিনে তিনপোয়া খাঁটি অম্বুরি তামাক লাগত—সেই আমাকে কি না সস্তার হুঁকোয় দুটো টান দেওয়ার জন্যে মার খেতে হবে?
তবু সবকিছুই সহ্য করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এবার ঘোর বিপদ সমাসন্ন। সামনের সপ্তাহে আমার স্কুলের অঙ্ক পরীক্ষা। বলা হয়নি বুঝি, আমি এখন ক্লাস ফাইভে পড়ছি। যা বলছিলাম। এতদিন অবধি তো অঙ্ক ক্লাসে গতজন্মে শেখা যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ দিয়ে দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু সরল আর সুদকষা তো আমি গত জন্মেও পারতাম না, সে আর কেউ না জানুক, তুমি ভালোই জানো। এবার পরীক্ষায় তো ওই দুটি চ্যাপটারই রয়েছে। মানে হাজার মাথা খুঁড়লেও আমি পাশ করব না, আর পাশ না করলে শিবুর ব্যাটা মথুরা, মানে মথুরানাথ, মানে যে লোকটা ভাবে সে আমার বাবা, সেই মথুরা আমাকে ঠেঙিয়ে বৃন্দাবন দেখাবে।
অতএব স্বামী হিসেবে তোমার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, সত্বর এই ঠ্যাঙারে বাবা-মা'র কাছ থেকে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও।
হাতের লেখা ছ্যাড়াং ভ্যাড়াং হলেও পুরো চিঠিটায় বানান-টানান কিন্তু নির্ভুল। মনে হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারডিগ্রি জন্মান্তরেও কাজ করে যাচ্ছে। পিসিমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি চোখে জল। মুখ থমথম করছে। দেখে ভারি কষ্ট হল। বললাম, আমাকে কী করতে হবে পিসিমা?
পিসিমা বললেন, দ্যাখ কেতু। আমিও লেডি ব্রেবোর্নে পড়া মেয়ে। ব্যাপারটা যে কত অবাস্তব, অসম্ভব তা কি আর আমিও বুঝছি না? কিন্তু এই ছোট্ট চিঠিটার মধ্যেই কতগুলো তথ্য রয়েছে, যেগুলো ওনার আর আমার ছাড়া বাইরের কারুর পক্ষে জানা মুশকিল।
যেমন?
যেমন, তিনি দিনে ক'পোয়া তামাক খেতেন, তিনি সরল আর সুদকষা জানতেন কি না—এসব কথা বাইরের লোক কেমন করে জানবে বল তো? ঘরের কথা বাইরে গেল কেমন করে, এক যদি না তিনিই সত্যি করে আবার জন্ম নিয়ে থাকেন!
চিন্তিত মুখে বললাম, তাই তো!
তবু আমি এত সহজে বিশ্বাস করব না বুঝলি? সেই জন্যেই তোকে ডেকেছি। তুই ব্যাপারটা নিজে আগে ভালো করে বোঝ, তারপরে কী বুঝলি আমাকে বল। তারপরে আমি ডিসিশন নেব।
আমি অন্তত শ'খানেক গোয়েন্দাগল্পের বই গুলে খেয়েছি, তাই এর পরের প্রশ্নটা কি হবে তা আমাকে ভাবতেই হল না। আপনা থেকেই জিভের ডগায় চলে এল—আচ্ছা পিসিমা, চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছল কী করে?
ভারি বুদ্ধি করে পাঠিয়েছে। খবরের কাগজের ভাঁজে। উচ্ছেবাগানে একটিমাত্র লোক কাগজ নেন, শিবনাথ পাটোয়ারি। আর এ-গ্রামে আমি। মনে হয় ওদের বাড়ি ছেড়ে কাগজওয়ালা এদিকে রওনা হওয়ার আগেই শিবনাথবাবুর নাতি কাগজের ভাঁজে চিঠি রেখে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা নিতান্ত প্রয়োজনের খাতিরেই আমার মাথায় চলে এল। করেও ফেললাম। আচ্ছা পিসিমা, পিসেমশাইয়ের এমন কোনও শরীরলক্ষণ কিংবা গুণের কথা বলতে পারো, যেটা দিয়ে তাকে নির্ভুলভাবে আইডেন্টিফাই করা যাবে?
পিসিমা উত্তর দিলেন, শরীরের লক্ষণ তোর কাজে লাগবে না। সত্তর বছরের চিহ্নগুলো কি আর এগারো বছরের শরীরে খুঁজে পাবি? সেই টাকও পাবি না, সেই ভুঁড়িও পাবি না। তবে মোক্ষম একখানা গুণের কথা তোকে বলে দিতে পারি যেটা লাখে একটি লোক পারে কি না সন্দেহ। তোর পিসেমশাই পারতেন। দারুণ কান নাচাতে পারতেন তিনি।
যা উচ্ছেমাচানে গিয়ে একবার এই গুণটি মিলিয়ে দেখে আয় তো বাবা।
পরদিন দুপুরে জমিদারবাড়ির দেড়শো বছরের পুরোনো কুঁয়োর হিমঠান্ডা জলে স্নান সেরে, গোপালঠাকুরের রান্না অতি উপাদেয় পোলাও মাংস খেয়ে, রওনা হয়ে গেলাম উচ্ছেমাচান গ্রামের দিকে। পকেটে দুদিন আগের কাগজে বেরোনো একটা বিজ্ঞাপনের কাটিং—
'সম্ভাব্য নোবেলপ্রাইজ প্রাপক বিজ্ঞানীর গবেষণার কাজে সহায়তার জন্য সর্বসময়ের সহকারী প্রয়োজন। যোগ্যতা মাধ্যমিক পাশ। যাহারা গাছে চড়ায় এবং দৌড়োনোয় দক্ষ, তাহাদেরই অগ্রাধিকার। খাওয়া থাকা ফ্রি। বেতন আলোচনা সাপেক্ষ।
—যোগাযোগ কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারি। গ্রাম উচ্ছেমাচান। জেলা বাঁকুড়া।'
বিজ্ঞাপনটা পিসিমাই কাগজ থেকে কেটে রেখেছিলেন। কাল আমার হাতে তুলে দিলেন। কী বুদ্ধি ভাবা যায়! ঠিক ধরেছেন এইটাই হতে পারে আমার পাটোয়ারি বাড়িতে ঢুকবার গেটপাস।
ভাগ্যিস ব্যাগের সামনের খাপে মাধ্যমিকের সার্টিফিকেটের দুটো ফটোকপি সেই কলেজে ভরতি হওয়ার সময় থেকে পড়েছিল। আজ মনে হচ্ছে কাজে লেগে যাবে। আর যে ছেলের শুশুনিয়ায় পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নেওয়া আছে, গাছে চড়া তার কাছে আর কী কঠিন কাজ?
কিন্তু যাই বলো ভাই, বিজ্ঞাপনটা বেশ অদ্ভুত। বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে গাছে চড়া কিংবা দৌড়োনোর কী সম্পর্ক? অবশ্য একটু অন্যভাবে ভাবলে বোঝা যায় যে, এই পৃথিবীতে সফল বিজ্ঞানীদের সহকারীদের নানান অদ্ভুত কাজই করতে হয়েছে। জোহান মেন্ডেলের জন্যে তার সহকারীকে মটরশুঁটি চাষ করতে হয়েছে। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের সহকারীকে ঘুড়ি ওড়াতে হয়েছে। ফ্যারাডে যে ব্যাঙের ঠ্যাংগুলো নিয়ে বিদ্যুৎবর্তনীর পরীক্ষা করেছিলেন, সে ব্যাংগুলোকেই কি আর তিনি নিজে ধরে এনেছিলেন? তবু সেই সব সহকারীদের নাম ইতিহাস ভুলে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমি তো আর সত্যি সত্যি কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারির সহকারীর চাকরি করতে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি ওই ছুতোয় কৃষ্ণনাথের দাদা শিবনাথের জাতিস্মর নাতির কাছাকাছি যদি ক'দিন থাকতে পাওয়া যায় সেই আশায়। কাজেই কার নাম ইতিহাসে লেখা রইল, আর কার রইল না, তাতে আমি কেন দীর্ঘশ্বাস ফেলব?
উচ্ছেমাচানে ঢুকে কোনটা কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারির বাড়ি বুঝতে পারছিলাম না। উল্টোদিক থেকে এক বৃদ্ধ মুখটা একদম উচ্ছের রস গেলার মতন বিতিকিচ্ছিরি করে এদিকেই আসছিলেন। দেখেই মনে হল উচ্ছেমাচানের অরিজিন্যাল বাসিন্দা। কাজেই তার কাছে গিয়েই প্রশ্ন করলাম, দাদু, কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারির বাড়ি কোনটা বলতে পারেন?
কে? কেষ্টখ্যাপা?
খ্যাপা! না, বোধহয়। নোবেল প্রাইজ পেতে পারেন বলে লিখেছেন যে!
লিখেছে না কি? কই দেখি!
পকেট থেকে বিজ্ঞাপনের কাটিংটা বার করে বৃদ্ধের হাতে দিলাম। তিনি সেটা পড়ে বেশ খানিকক্ষণ খ্যাঁকখ্যাঁক খুসখুস করে হাসলেন। তারপর বললেন 'সম্ভাব্য' নোবেল লরিয়েট তো। আরে বাবা, 'সম্ভাব্য' তো সব কিছুই। আমিও তো সম্ভাব্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তুমিও তো সম্ভাব্য জুতোচোর। কাজেই সম্ভাব্য নিয়ে যথাসম্ভব কম ভাবব। সম্ভাব্য—কম ভাবব। সম্ভাব্য—কম ভাবব। এই বলে নিজের কবিতায় নিজেই মোহিত হয়ে হাঁটা লাগালেন। কোনওরকমে তার হাত থেকে বিজ্ঞাপনের কাটিংটা ছিনিয়ে নিয়ে আমি আবার গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল ভারি অদ্ভুত এক দৃশ্য।
দেখি কী, এক বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক পরনে ঢোলা প্যান্ট-শার্ট, মাথায় ক্রিকেট ক্যাপ, সাইকেল নিয়ে একটা বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে তিনি বাড়ি থেকে বেরোবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, তবে প্রস্তুতিটা বেশ অদ্ভুত রকমের। আমার আগেই কাজকর্ম নেই এরকম দশ-বারোটা লোক মজা দেখবার জন্যে রাস্তার উল্টোদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেছে। আমিও তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
একটা বছর কুড়ি-বাইশের জোয়ান ছেলে চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ির ভেতর থেকে বেরোল। তার হাতে একটা দড়ি। দড়ির অন্যপ্রান্তে একটা কালো বেড়াল বাঁধা রয়েছে। অনিচ্ছুক বেড়ালটাকে টানতে টানতে নিয়ে আসছিল ছেলেটা আর চেঁচাচ্ছিল, মনে রাখবেন ছোটকর্তা, আমি আপনাদের মুনিষ। চাষ করবার জন্যে আমাকে রাখা হয়েছে। আপনাকে দু'বেলা অযাত্রা করানোর জন্যে নয়।
সাইকেল নিয়ে ভদ্রলোকটি মিহি গলায় বললেন, আহা চটছিস কেন তারক? এ তো একটা সাময়িক ব্যাপার, মানে যাকে বাংলায় বলে টেম্পোরারি। একটা সহকারী পেয়ে গেলে কি আর তোকে এসব কাজ করতে বলব? নে, ওটাকে তুলে ধর। তুলে আমার মুখের সামনে ঘোরা।
সে আর আমাকে শেখাতে হবে না। তারক গজগজ করতে করতেই বেড়ালটাকে পাঁজাকোলা করে ধরে সাইকেলওলার মুখের সামনে দুবার ঘোরাল। তারপর সেটাকে আবার দড়ি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ভেতরে কোথাও বেঁধে রেখে আসতে গেল বোধহয়।
এদিকে সাইকেলওয়ালা চেঁচাচ্ছেন—তারক, এবার দু-নম্বর আইটেম। জলদি। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আরে বাবা, আসছি আসছি। এত তাড়া দিলে হয় না কি? তারক আবার দৌড়োতে দৌড়োতে বাড়ির ভেতর থেকে বেরোল। এবার তার হাতে একটা লাল প্লাস্টিকের বালতি। বালতিটা ওই লোকটার পায়ের কাছে নামিয়ে, তার ভেতরে দু-হাত ডুবিয়ে তারক একটা ছোট কচ্ছপ বার করে আনল। তারপর অবিকল আরতি করায় কায়দায় সেটাকে লোকটার মুখের সামনে কয়েকবার ঘুরিয়ে আবার বালতির মধ্যে নামিয়ে রাখল। পুরো সময়টাই ভদ্রলোক কচ্ছপটার মুখের দিকে বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইলেন। সেই অবস্থাতেই হাঁক ছেড়ে রাস্তার উল্টোদিকের লোকদের, মানে আমাদের বললেন, এই যে সব কুসংস্কারগ্রস্ত ভারতবাসী। দেখছ তো আমি এইসব অযাত্রা দেখে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি?
সমবেত কণ্ঠে উত্তর এল—হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-অ্যা।
তবু দ্যাখো আমার কোনও অকল্যাণ হবে না। এই সাইকেল চালিয়ে কুসুমপুর যাব, আবার ঠিকঠাক ফিরে আসব। আচ্ছা এবার তোমরা সবাই শনি শনি বলো।
লোকগুলো নিশ্চয় প্রতিদিন দুপুরে এখানে আসে, কারণ দেখা গেল সবকিছুতেই তারা বেশ অভ্যস্ত। টুপি পরা ভদ্রলোক চেঁচাতে বলা মাত্র তারা তারস্বরে শনি, শনি শনি বলে চেঁচাতে লাগল। আর তাদের সেই চিৎকারের মধ্যে তিনি বীরপুরুষের মতন লাফিরে সাইকেলে উঠে, বোঁ করে বেরিয়ে গেলেন সামনের রাস্তায় এবং...
এবং বড়জোর দশহাত গিয়েই শুকনো ডাঙায় কি জানি কেমন করে সাইকেল শুদ্ধু হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
সমবেত জনগণ একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলল, যাঃ। কেষ্টখ্যাপা আজও পড়ে গেল। এই বলে তারা দিব্যি যে যার পথ ধরল। এমনকী তারককে অবধি কোথাও দেখতে পেলাম না। যাই হোক, বুঝতে পারলাম ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে গেছি।
আমি দৌড়ে গিয়ে কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারির দু-বগলের তলায় হাত দিয়ে তাকে তুলে দাঁড় করালাম। তারপর ভালো করে চেক করে দেখলাম, কোথাও কেটেছে কুটেছে কি না। ভদ্রলোকের কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আর কাউকে সামনে না পেয়ে আমাকেই বলতে লাগলেন, এক্সপেরিমেন্টটা কিছুতেই সাকসেসফুল হচ্ছে না, বুঝেছেন? রোজই দশ পা যেতে না যেতে আছাড় খাচ্ছি। অথচ আমার ক্যালকুলেশন বলছে অযাত্রা বলে কিছু নেই। বেড়ালের লোমের স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটির পরিমাণ এতই নগণ্য যে তা আমার সাইকেলের ব্যালেন্স কোনওভাবেই টলাতে পারে না। কচ্ছপের খোলের ম্যাগনেটিক ফিল্ড সম্বন্ধেও একই কথা। তাহলে গণ্ডগোলটা হচ্ছে কোথায় বলুন তো।
কী আর বলব? চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেয়ে কেষ্টখ্যাপা, থুড়ি, কৃষ্ণবাবু বললেন, আরে, তুমি আবার কে? এ গাঁয়ের লোক বলে তো মনে হচ্ছে না।
বললাম, আমি আপনার বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির আশায় এসেছি।
অ। বাড়ি কোথায়?
বললাম, করলাবাগান।
আচ্ছা বেশ। আর কেউ যেহেতু আসেনি, কাজেই তোমাকেই চাকরিতে বহাল করলাম। ওই যেসব কোয়ালিফিকেশনের কথা লিখেছিলাম...আহা থাক থাক। দেখাতে হবে না। নাম কী তোমার?
আসল নামটাই বলে দিলাম, কুন্তল চ্যাটার্জি।
বেশ, বেশ। চলো, ভেতরে চলো। আগে চা মুড়ি খাও। তারপরে আমার গবেষণার ব্যাপারটা তোমায় বুঝিয়ে দেব।
পাটোয়ারি বাড়িতে ঢুকলাম। গ্রামের বাড়ি যেরকম হয়। মাঝখানে বিরাট উঠোন। উঠোন ঘিরে চারদিকে টিনের চালের মাটির ঘর। উঠোনে পা দেওয়া মাত্র খালিগায়ে ধুতি পরা এক বয়স্ক ভদ্রলোক বেশ ব্যক্তিত্বময় গলায় জিগ্যেস করলেন, সঙ্গে ওটি কাকে নিয়ে ঢুকছ কেষ্ট?
দাদা, এটি আমার নবনিযুক্ত ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট, চঞ্চল।
চঞ্চল নয়, কুন্তল। আমি ভুলটা শুধরে দিলাম।
ধুতিপরা ভদ্রলোক যে শিবনাথ পাটোয়ারি সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। চোখের দৃষ্টিটা খুব তীব্র। মনে হল যেন আমার ভেতর অবধি দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দুয়েকটা প্রশ্নও করলেন—করলাবাগানের কাদের বাড়ির ছেলে আমি, কোন ইস্কুলে পড়েছি—এইসব। পিসিমা যেমন যেমনটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ঠিক তেমন তেমন উত্তর দিয়ে গেলাম। মনে হল শিবনাথবাবু আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। বললেন, যাও, ভেতরে যাও। কেষ্ট, ওকে তোমার ল্যাবরেটরি ঘরেই থাকবার ব্যবস্থা করে দাও। তবে শকুনের খাঁচাটা বাইরে বার করে দিও।
শকুন! আমার ভিরমি খাবার অবস্থা। শকুন কেন? শকুন কি গান গায়, না কথা বলে, যে তাকে খাঁচায় করে পোষা হচ্ছে!
আমার প্রশ্ন শুনে শিবনাথবাবু বিষণ্ণভাবে বললেন, কী বলব বাবা? সবই আমার কপাল। আরও কীসব যেন বলতে যাচ্ছিলেন। কৃষ্ণনাথ আমাকে শুনতে দিলেন না। হাতে এক টান মেরে বললেন, আঃ চল তো এখন। বউদি গরম গরম পেঁয়াজি ভাজছে। ঠান্ডা হয়ে যাবে। তারপর একটু আড়ালে গিয়েই দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, শকুন কেন? বেবুন কেন?—সে সবই তো বুঝিয়ে বলব। দাদার সামনে ওসব প্রশ্ন না করলেই হচ্ছিল না?
চা খাওয়ার পর ল্যাবরেটরি ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেনও অবশ্য। যেটুকু বুঝলাম, তা হল এই যে বাঙালি নানারকমের অযাত্রা নিয়ে মাথা ঘামায়—এই কাঁচকলা দেখিস না, মাকুন্দ দেখিস না, বাঁয়ে শিয়াল দেখিস না বেড়ালে যেন রাস্তা না কাটেরে, কেউ যেন পেছু না ডাকেরে, হাঁচির দিকে সতর্ক নজর রাখুন—তা কৃষ্ণপদ দেখাতে চাইছেন যে এসব বস্তু কিংবা প্রাণীর এমন কিছু জোর নেই যে আমাদের কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটায়।
একটা মোটা ডায়েরি খুলে কেষ্টবাবু বললেন, বুঝলে ভোম্বল...
আজ্ঞে ভোম্বল নয়, কুন্তল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, কুন্তল। শোনো কুন্তল। আমি না অলরেডি কাঁচকলার টক্সিন মেপে ফেলেছি। হাঁচির ভেলোসিটিও দ্যাখা হয়ে গেছে। সে সব পরিমাণে একেবারে নগণ্য, বুঝলে? আমাদের কোনও ক্ষতি করতেই পারে না। তবু মানুষ এইসব নিয়ে অশান্তিতে ভোগে। ওই অশান্তি দূর করাই আমার ব্রত, বুঝলে?
তার পরেই ভারি উদাস স্বরে বললেন, কি জানি ওরা আমাকে কোন বিভাগে নোবেল প্রাইজ দেবে। বিজ্ঞান, না শান্তি?
রোয়াকে বড়সড় একটা খাঁচার মধ্যে বসে শকুনির বাচ্চাটা আমার দিকে হিংস্র চোখে তাকাচ্ছিল। ওটাকে সবেমাত্র পরশু তারক শ্মশানের বটগাছ থেকে পেড়ে এনেছে। এই কাজের জন্যে সে পাঁচশো টাকা নিয়েছে কৃষ্ণবাবুর কাছ থেকে। তবে শকুনি নিয়ে গবেষণার ব্যাপারটা কৃষ্ণবাবুর পক্ষে খুবই বেদনাদায়ক হয়েছে বলে শুনলাম। তারক ওনার মুখের কাছে অযাত্রা পাখিটিকে তুলে ধরা মাত্রই সেই পাখির ছানা লম্বা গলা বাড়িয়ে টপ করে কৃষ্ণনাথের চশমাটা মুখে পুরে কপ করে গিলে নিয়েছে।
আসল মোষের শিং-এর তৈরি ফ্রেম ছিল, বুঝলে। দুঃখ দুঃখ মুখ করে আমাকে বললেন কৃষ্ণবাবু।
আমি বললাম, তাহলে আর শকুনির বাচ্চা লোভ সামলায় কী করে বলুন দেখি?
কৃষ্ণনাথবাবু তাই শুনে নিরীহ মুখ করে বললেন, শেয়াল নিয়ে আশা করি এসব সমস্যা হবে না। তুমি বাবা চম্বল আমাকে কাল বিকেলের মধ্যে বাঁশবাগান থেকে একটা শেয়ালের বাচ্চা ধরে এনে দিও তো।
ওনার এই আদেশ শুনে এত জোর চমক খেলাম যে পিনদত্ত নামটা অবধি শুধরে দেওয়ার কথা মাথায় এল না। চম্বল? ঠিক আছে চম্বলই সই। কাল বিকেলের আগে যে করে হোক পালাতেই হবে এই পাগলাগারদ থেকে। না হলে নির্ঘাত শেয়াল কিংবা বনবেড়ালের কামড় খেয়ে জলাতঙ্ক হয়ে মরব।
মুখে বললাম, আচ্ছা। এনে দেব।
কিন্তু তাতেই কি যন্ত্রণার শেষ আছে? কেষ্টখ্যাপার মাথায় দেখলাম সারাক্ষণই পোকা নড়ছে। প্যান্টের পেছনে তেলেভাজার তেলটা মুছে নিয়ে বললেন, চলো। এবার বেরোনো যাক।
অবাক হয়ে বললাম, কোথায়?
আয়রনম্যান প্রহ্লাদ পাকড়াশির বাড়ি। প্রহ্লাদের নাম শুনেছ তো? গতবছরে মিস্টার বাঁকুড়া হয়েছিল। আড়াআড়িভাবে টেস্টপেপার ছিঁড়তে পারে। দাঁতে কামড়ে লোহার রড বেঁকাতে পারে। দেহের ওজন আড়াইশো কেজি। পাশের পাড়াতেই ওর বাড়ি। চলো।
ক্যা ক্যা ক্যানো? অমন বিচ্ছিরি লোকের বাড়ি যাবেন কেন?
ঠিক বলেছ। লোকটা মহা বিচ্ছিরি। বাড়ির একতলার ওপর দোতলা তুলছে। সবাই যেমন করে, প্রহ্লাদও তেমনি লোকের কুদৃষ্টি কাটানোর জন্যে নতুন গাঁথনির ওপর ছেঁড়া জুতো আর ভাঙা ঝুড়ি টাঙিয়েছে। কত করে বললাম, ভাই, আমাকে একটু তোমার ছাদে উঠে ভাঙা ঝুড়ির রেডিয়েশন মাপতে দাও, তা ব্যাটা সে তো দিলই না। উলটে শাসিয়ে রাখল, আমার বাড়িতে যদি পা দিয়েছ তা হলে তোমার মুণ্ডুটা ছিঁড়ে জুতোর পাশে টাঙিয়ে রাখব। কত বড় পাষণ্ড ভাবো তো। বিজ্ঞানচেতনা বলতে কিছুই নেই। যাগগে এখন তুমি এসে গেছ। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। এসব কাজ এখন থেকে তুমিই করবে। এই নাও গাইগার কাউন্টার। চলো, ওর ছাদে উঠে রেডিয়েশন মাপবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে পেট চেপে ধরে বিছানার ওপর আছাড় খেয়ে পড়লাম। গড়াগড়ি খেতে খেতে বললাম, ওরে মা রে, বাবা রে, পিসেমশাই রে। ভয়ানক পেটব্যথা করছে যে রে। এরা আমাকে কী তেলেভাজা খাওয়াল, ফুড পয়জনিং হয়ে গেল না কি গো-ও-ও-ও!
কৃষ্ণনাথ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর শকুনের ছানাটার দিকে। বিড়বিড় করে বললেন, অযাত্রার ব্যাপারটা কিছুতেই এড়ানো যাচ্ছে না দেখছি। শকুনের নজর পড়েছে কী এমন শুভকাজটা বানচাল হয়ে গেল। যাগগে। কালকেই না হয় যাব। পৃথিবীর এমন কোনও শক্তি নেই যে আমাকে চিরকাল দাবিয়ে রাখবে।
আমি কোঁ-কোঁ করতে করতে মুখ গুঁজে পড়ে রইলাম। মনে মনে বললাম, বাপরে। আজকের মতন ফাঁড়াটা কাটল।
কেতু, এই কেতু! ওঠ, ওঠ! বাসন্তী কি তোকে এখানে ঘুমোবার জন্যে পাঠিয়েছে?
পেটব্যথার অভিনয় করতে গিয়ে কৃষ্ণনাথের তক্তাপোষের ওপরে শুয়ে সত্যিকারেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পিঠের ওপরে ছোট ছোট হাতের ধাক্কা আর কচি গলায় ডাক শুনে ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
কী রে? তোকে বাসন্তী কী করবার জন্যে পাঠিয়েছে, আর তুই কী করছিস? আমার চৌকির পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলল একটা নীল হাফপ্যান্ট পরা দশ-বারো বছরের বাচ্চা ছেলে। তার এক হাতে একটা ছোট ক্রিকেট ব্যাট আর অন্য হাতে হুঁকো।
রাগে গা জ্বলে গেল। বললাম, বড়দের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় শেখোনি?
বাচ্চাটা মুচকি হেসে বলল, একই কথা আমিও তোকে বলতে পারি। বুঝতে পারছি চোখ থেকে এখনও ঘুমটা পুরোপুরি ছাড়েনি। তাই বুঝতে পারছিস না। আমি কে?
কে তুমি? কড়া গলায় বললাম।
ততোধিক কড়া গলায় বাচ্চাটা বলল, বুঝতে পারছ না? আমি তোমার পিসেমশাই, রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাচ্চাটার চোখে-মুখে এমন ভয়ঙ্কর এক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠল যে আমি সড়াৎ করে বিছানা ছেড়ে নেমে তাকে প্রণাম করার জন্যে ঝুঁকে পড়লাম। বাচ্চাটা হাত তুলে আশীর্বাদ করার ভঙ্গি করে বলল, থাক, থাক। কেউ দেখে ফেললে আবার তোমার পরিচয় নিয়ে নানান কথা উঠবে। যাগগে, বাড়ির খবর সব ভালো তো? কমল, মন্দিরা ওরা সবাই ভালো আছে? কমলের প্রোমোশন হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে নাকি?
আমার বনবন করে মাথা ঘুরছিল। কমল আমার বাবার নাম, মায়ের নাম মন্দিরা। বললাম, তুমি...মানে আপনি আমার বাবা-মাকে চেনেন?
ছেলের কথা শোন। ভারি মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে হাসল বাচ্চাটা। আরে কমল যে আমার শালারে। আমার যখন বিয়ে হয় তখন ও স্কুলে পড়ে। আমার সঙ্গেই প্রথম ইডেনে টেস্ট ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল। বিশ্বাস না হয় বাড়ি ফিরে বাবাকে জিগ্যেস করে দেখিস।
তোমার...স্যরি আপনার নাম কী, পিসেমশাই? মানে এ জন্মে?
ছেলেটা ভারি করুণ মুখ করে বলল, লজ্জার কথা আর বলিস না। কোথায় অমন রাশভারী একটা নাম ছিল—রাখোহরি। তার বদলে এ জন্মে ওরা কী নাম দিল? না, পুষ্পকুমার। ছোঃ। আবার ঢং করে পুষ্প বলে ডাকে। এসব ওই শিবেটার বুদ্ধি। অবশ্য বুদ্ধি জিনিসটা ওর ছিলই বা কবে? আমারই তো ম্যানেজার ছিল।
বাচ্চাটা নামকরণের দুঃখ ভোলার জন্যেই বোধহয়, হুঁকোয় একটা জোরসে টান দিল। অবশ্য সেটায় আগুন ছিল না। তারপর বলল, আমি একটু ভেতর বাড়িতে যাই, বুঝলে। অঙ্ক শেখানোর জন্যে মাস্টারমশাই আসবেন। ঝামেলার একশেষ। মনে হয় হুঁকোর বাড়ি মেরে সবক'টার মাথা ফাটিয়ে দিই। যাই হোক, ঘণ্টাখানেক বাদে একবার ওদিকে এসো। তোমার পিসিমার মনে যাতে আমাকে নিয়ে কোনও সন্দেহ না থাকে সে ব্যবস্থা করে দেব।
জাতিস্মর বালকটি বেরিয়ে যাওয়ার পরে আমিও আর ঘরে থাকতে পারলাম না। মাথায় ঠান্ডা হাওয়া লাগানোর জন্যে উচ্ছেমাচানের রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।
সন্ধের পর গ্রামের রাস্তা যেরকম শুনশান হয়ে যায় এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। কিছুটা হাঁটবার পরেই ঘরবাড়ি ছাড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় চলে এলাম। এখন দুদিকে শুধু চাষের খেত আর ঝোপঝাড়। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু কাদের গোয়াল থেকে যেন গরুর হাম্বারব ভেসে আসছে। ঝোপের মাথায় মুঠো মুঠো জোনাকি জ্বলছে। আমি মাথা নীচু করে হাঁটছি আর একমনে ভাবছি, তাহলে কি অলৌকিকেই বিশ্বাস করতে হবে।
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম গ্রামের সীমানায় বড় বটগাছটার নীচে। দিনের বেলায় এখানে অনেক লোক বসে গুলতানি করে। কিন্তু এখন বাঁধানো বেদিটার ওপর শুধু শুকনো পাতা খড়খড় শব্দ করে উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে লোভ হল। সারাদিনের গরমের পর এখন বেশ সুন্দর শীতল হাওয়া ছেড়েছে। বেদিটার একধারে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসলাম। এমন সময় একদম পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, আচ্ছা, বিতংস শব্দটার মানে তো নিষ্ঠুর, তাই না?
তাকিয়ে দেখি চেনা মুখ। সকালবেলায় যাকে কৃষ্ণনাথের বাড়ির ঠিকানা জিগ্যেস করেছিলাম, সেই বুড়ো। গায়ে একটা কালো পাঞ্জাবি, তাই অন্ধকারের থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। বুড়ো আমাকে তাকাতে দেখে আবারও জিগ্যেস করল বিতংস মানে কী? নিষ্ঠুর তো?
আমি বললাম, না তো। নৃশংস মানে নিষ্ঠুর। কিন্তু বিতংস মানে হরিণ ধরার ফাঁদ।
এইরে। আচ্ছা ললন্তিকা মানে তো অভিধান, না কি?
আরে ধ্যাত। চলন্তিকা বলে একটা বাংলা অভিধান আছে ঠিকই, কিন্তু ললন্তিকা মানে নাভি পর্যন্ত লম্বিত হার।
সর্বনাশ করেছে, বলে বুড়ো দুই হাতে কপাল টিপে থম মেরে বসে রইল। শেষকালে বাধ্য হয়েই আমি জিগ্যেস করলাম, মশাইয়ের পরিচয়টা জানতে পারি?
আমি গ্রামীণ কবি মন্দার মণ্ডল। নাম শোনেননি আমার? সে কী! সাপ্তাহিক কৃষিবার্তাতে তো নিয়মিত আমার কবিতা ছাপা হয়। মাসিক জ্যোতিষচর্চাতেও 'দেবতার গ্রাস' নামে একটা দীর্ঘ কবিতা ছাপা হয়েছে। এমনকী চকবাজার বারোয়ারি সমিতির পুজোর স্যুভেনিরেও আমার 'সোনার তরী' নামে একটা কবিতা ছাপিয়েছিল গতবার। ওরাই তো আমাকে গ্রামীণ কবি উপাধিটা দিয়েছে।
তা ইয়ে, আপনার সর্বনাশটা হল কীসে?
আর বলেন কেন। একটা কবিতা লিখে আজকের ডাকেই কলকাতার বড় পত্রিকায় পাঠালাম। তাতে একটা লাইন ছিল এইরকম—বিতংস শিক্ষক ছাত্রকে ললন্তিকা ছুড়ে মেরেছে। আসলে বলতে চেয়েছিলাম নিষ্ঠুর শিক্ষক ছাত্রকে ডিকসনারি ছুড়ে মেরেছে। কিন্তু আপনি যা বলছেন তাতে তো সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। তারপরেই হঠাৎ বুড়ো ভয়ংকর খেপে গিয়ে বলল, সব গণ্ডগোলের মূলে এই শিবুদা। চোদ্দোদিন আগে আমার বাংলা অভিধানটা নিয়ে গেছে। আর ফেরত দিল আজ একটু আগে।
শিবুদা মানে শিবনাথ পাটোয়ারিমশাই?—জিগ্যেস করলাম।
আবার কে? বলে কি না গুপ্তধনের সংকেত উদ্ধার করবে। সেই ঘোড়াড্ডিমের সংকেত না কি ভারি কঠিন বাংলায় লেখা। এদিকে আমার কবিতাটবিতা সব চুলোয় গেল। মন্দার মণ্ডল রাগের চোটে একমুঠো শুকনো বটপাতা মুখে পুরে চিবিয়ে ফেলল।
আমি মন্দার মণ্ডলের আরও কাছে ঘেঁষে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, গুপ্তধনটা কোথায় আছে সে ব্যাপারে পাটোয়ারিমশাই কিছু আলোকপাত করেছেন না কি?
ওই তো, করলাবাগানের জমিদারবাড়িতে। মানে রাখোহরি বাঁড়ুজ্জ্যের বাড়িতে। আমি বললাম, শিবুদা! ও বাড়িতে যদি গুপ্তধন থেকেই থাকে, তাতে তোমার কী? সে তো পাবেন রাখোহরিবাবুর বিধবা ইস্ত্রী। তা, বলে কী, ছাড় তো ইস্ত্রী। তুই কবিমানুষ, এসব প্যাঁচ পয়জার বুঝবি না। ও বাড়িতে আর দুয়েকদিনের মধ্যে আমার এজেন্ট ঢুকিয়ে দিচ্ছি। সে-ই সব হিরে-জহরত বার করে নিয়ে চলে আসবে।
এই অবধি বলে মন্দার মণ্ডল হঠাৎ ভারি আপনজনের মতন আবদারের ভঙ্গিতে বলল, ভাই আপনিই আমাকে বাঁচাতে পারেন। মুখ দেখেই বুঝতে পারছি আপনি কলকাতার লোক। কলেজ স্ট্রিটের এই ঠিকানাটায় গিয়ে একবার আমার কবিতার পাণ্ডুলিপিটা সংশোধন করে দিয়ে আসবেন?—এই বলে পকেট থেকে একটুকরো কাগজ আর কলম বার করে, খসখস করে একটা ঠিকানা লিখে আমার বুকপকেটে গুঁজে দিল। তারপর, আচ্ছা, আসি তাহলে নমস্কার—বলে হনহন করে হাঁটা লাগাল গ্রামের দিকে।
আমার তখন ওসব ঠিকানা টিকানার দিকে খেয়াল ছিল না। মনে মনে ভাবছি, এইবার হিসেব মিলছে। তাই তো ভাবি, হঠাৎ পিসিমার পেছনে জাতিস্মর লাগল কেন? ব্যাটা পুষ্পকুমার! তোমার বুকের ভেতরে মধুর বদলে এমন কীট! তুমি পিসেমশাইয়ের ভেক ধরে জমিদারবাড়ির গুপ্তধনের সন্ধানে চলেছ? আচ্ছা বেশ। আমারও নাম কুন্তল চ্যাটার্জি। দেখি বুদ্ধির খেলায় তুমি আর তোমার দাদু জেতেন, না আমি জিতি।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওবাড়ি থেকে বেরোনোর পর একঘণ্টা কেটে গেছে। মনে পড়ল, পুষ্প আমাকে বলেছিল একঘণ্টা বাদে ভেতর বাড়িতে যেতে, কী নাকি মজা দেখাবে। আমি পা চালিয়ে পাটোয়ারি বাড়ির অন্দরমহলে গিয়ে পৌঁছোলাম।
পৌঁছোলাম অবশ্য এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে। সেই মুহূর্তে শিবনাথ পাটোয়ারি এক দশাসই চেহারার ভদ্রলোককে প্রচণ্ড বকাবকি করছেন। বলছেন, তুমি অঙ্ক শেখাতে এসেছ, অঙ্ক শেখাবে! না পারলে মাস্টারি ছেড়ে দেবে। কিন্তু আমার নাতির কান মুলে দাও কোন আক্কেলে? জানো ওর কানদুটো পাঁচলাখ টাকায় ইনসিওর করা আছে?
দশাসই অঙ্কের মাস্টার মিনমিন করে বললেন, আঁজ্ঞে, তিরিশ বছর ধরে মাস্টারি করছি। এই উচ্ছেমাচান আর করলাবাগানের একটা গোটা জেনারেশনের কান আমার হাতে পড়ে লম্বা হয়ে গেছে। কিন্তু বাপের জন্মে কখনও শুনিনি কারুর কান ইনসিওর করা থাকে।
কেমন করে শুনবে? বলি কেমন করে শুনবে? আবার খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠলেন শিবনাথ পাটোয়ারি। আর কারুর কানে কি এমন শিল্পীসত্তা লুকোনো থাকে।
শিল্পীসত্তাটা কী জিনিস? কোনও নতুন ব্র্যান্ডের বিড়ি বুঝি? উঁচু ক্লাসের ছাত্ররা মাঝে মাঝে কানের মধ্যে পোড়া বিড়ি লুকিয়ে রাখে বটে। তা ছাড়া আর কিছু লুকিয়ে রাখা যায় বলে তো শুনিনি কখনও।
ওঃ মাস্টার। তুমি একটি যাকে বলে ইনকরিজিবল। শিল্পীসত্তা মানে হল গিয়ে...হল গিয়ে...যাগগে। তুমি নিজের চোখে দেখে যাও ওর কানের মধ্যে কী আছে। দ্যাখো কী জিনিস তুমি নষ্ট করতে বসেছ। এদিকে এসো তো দাদুভাই!
পুষ্পকুমার তার দাদুর ডাক শুনে পায়ে পায়ে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
এই তারক, টেপরেকর্ডারটা নিয়ে আয়। চালা দেখি একটা ভালো দেখে জদ্দন বাঈয়ের ঠুংরি। হাঁক ছাড়লেন শিবনাথ পাটোয়ারি।
চার ব্যাটারির টেপরেকর্ডারে দিব্যি গমগম করে গান বেজে উঠল, আর তার সঙ্গে শুরু হল পুষ্পকুমারের কানের ভেলকি। দুটো কান যেন দুটো খুদে পরি।—কিংবা জিপসি মেয়ে। গানের তালে তালে তারা মনের আনন্দে কোমর দুলিয়ে নাচছে। আহা, জোচ্চোর হোক আর যাই হোক, এই বিদ্যেটা দারুণ রপ্ত করেছে বটে পুষ্পকুমার, এ কথা আমি মানতে বাধ্য।
মেনে নিলেন অঙ্কের টিউটরও। জীবনে এই প্রথমবার বোধহয় তিনি নিজের কানে হাত দিলেন। বললেন, কান মুলছি শিবুবাবু। অন্যায় হয়ে গেছে। না জেনে অমন ডেলিকেট জিনিসে হাত দিয়ে ফেলেছি। এ তো মারাদোনার হাঁটুতে লাথি মারার চেয়েও গর্হিত অপরাধ। না, বাবা পুষ্পকুমার। তোমার সরলের উত্তর যদি একশোবাহাত্তর পূর্ণ ছত্তিরিশের দুশোউনচল্লিশও আসে তাহলেও আমি তোমাকে আর মারব না। সাশ্রুনয়নে অঙ্ক স্যার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
ঘরের এককোণায় বসে কৃষ্ণনাথ পোষা শকুনিকে দরবেশ খাওয়াচ্ছিলেন। তার দিকে চেয়ে শিবনাথ বললেন, বুঝলি কেষ্ট, এইরকম কান নাচাতে দেখেছিলাম আর একজনকেই। কপালে দু-হাত জোর করে ঠেকিয়ে বললেন, আমার মনিব—রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দেবতুল্য লোক ছিলেন বুঝলি। ওই কান নাচানো ছাড়া জীবনে আর কোনও কিছুর দিকেই মনোযোগ দিতেন না।
আমার গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল পুষ্পকুমার। পরিষ্কার শুনলাম, সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, হ্যাঁ হতভাগা। সেই সুযোগে তুমি আমার কম টাকা নয়ছয় করেছ? নেহাত আমার মৃত্যুর পর বাসন্তী হিসেব নিকেশের ভারটা নিজের হাতে নিয়েছিল। তাতেই তো তোমার চাকরিটা গেল।
মনে মনে ভাবলাম, ওইটুকু ছেলে এমন নিখুঁত অভিনয় কেমন করে করতে পারে? কেমন করে অবলীলায় বলে যেতে পারে এইসব ঘোর বৈষয়িক কথাবার্তা?
না কি, পুষ্পকুমার সত্যিই আমার নতুন করে জন্ম নেওয়া পিসেমশাই? গ্রামীণ কবি মন্দার মণ্ডলই আসলে মিথ্যেবাদী? গুপ্তধনের গল্পটা বানিয়ে বানিয়ে বলে গেল? কিন্তু ওর তাতে কী স্বার্থ?
শিবনাথ তাঁর নাতির গজরানি শুনতে পাননি। আপন মনেই বলে চললেন, জীবনের শেষদিকে এসে ঝোঁক চেপেছিল একটা নাচের দল খুলবেন। কান নাচিয়েদের দল বলাই বাহুল্য। আমিই কলকাতায় গিয়ে সেই দলের নাম রেজিস্ট্রি করে আনলাম। সাইনবোর্ড লেখানোও হয়ে গেল। নাম দিয়েছিলেন 'কানাচ বৃন্দ।' কানাচ বুঝলি তো? কান নাচান যাঁরা। বহুব্রীহি সমাস।
তারপরে তো মানুষটাই চলে গেলেন। পেছনে পড়ে রইল তাঁর স্বপ্ন। ফোঁ-ও-ওস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শিবনাথ পাটোয়ারি।
আবারও আমি ভাবলাম, শিবনাথ পাটোয়ারি কি সত্যিই ঠক? জোচ্চোর? কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে ওনার গলা থেকে এমন খাঁটি বিষণ্ণতা ঝরে পড়ে কী করে?
সবকিছুই তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল আমার মাথার মধ্যে।
এমন সময়ে পুষ্পকুমারের মা আমার হাতে বড় এক গ্লাস দুধ-সাবু ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও ভাই। আজ রাতে এইটুকুই খাও। শুনলাম খুব পেট ব্যথা করছিল। তা হলে সলিড কিছু খাওয়া ঠিক হবে না।
দুধ-সাবুটা কোনওমতে গলার নীচে চালান করতে করতে দেখলাম শকুনটা মন দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হল চোখে চোখ পড়তে একটু মুচকি হাসল। অর্থাৎ বলতে চাইল, অযাত্রা আছে কি নেই দেখতে পাচ্ছেন তো কেতুবাবু? ওদিকে কচি পাঠার ঝোলের গন্ধে পাটোয়ারিবাড়ি ম-ম করছে, আর এদিকে আপনি দুধ-সাবু খাচ্ছেন।
সবার অলক্ষ্যে গ্লাসের শেষ সাবুটুকু শকুনটার মাথার ওপর উপুড় করে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম।
আমার থাকার জায়গা, মানে কৃষ্ণনাথের ল্যাবরেটরির দিকে এগোতে এগোতেই বুঝতে পারলাম পেছনে ছোট ছোট পায়ের হালকা শব্দ উঠছে। দাঁড়িয়ে গেলাম। পুষ্প এসে আমার সঙ্গ ধরল। ফিসফিস করে বলল, দেখলে তো কান নাচানো?
বললাম, হুঁ।
এবার চট করে করলাবাগানে গিয়ে তোমার পিসিমাকে সব রিপোর্ট করো। আমি কিন্তু এক্ষুনি এ বাড়ির লোককে বায়না করে এমন উদ্ব্যস্ত করে তুলব যে তারা বাধ্য হবে আমাকে করলাবাগানে পৌঁছে দিতে। অঙ্ক পরীক্ষা তো এসেই গেল। তার আগে পালাতে চাই।
পিঠে স্কুল ব্যাগ নিয়ে এই ভোরবেলায় কোথায় চললে কুন্তল?
পা টিপেটিপে পাটোয়ারি বাড়ির বেড়া টপকে বেরোতে গিয়ে পুষ্পকুমারের মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। তবে এইটুকুতে ঘাবড়াবার ছেলে কেতু চাটুজ্যে নয়। অক্লেশে বলে দিলাম, শেয়াল ধরতে দিদি। ব্যাগ না থাকলে শেয়ালছানাকে তুলে আনব কেমন করে?
শেয়াল কী হবে? খুড়োমশাইয়ের এক্সপেরিমেন্টের জন্যে বুঝি? সত্যি, আর পারা যায় না মানুষটাকে নিয়ে। তা সাবধানে কাজ কোরো। শেয়ালে আবার কামড়ে-টামড়ে না দেয়।
আর শেয়াল। উচ্ছেমাচান গ্রামের চৌহদ্দি পার হয়েই লম্বা লম্বা পা ফেলে একটানা একেবারে পিসিমার বাড়ির উঠোনে পৌঁছে হাঁফ ছেড়েছি। পথে আসতে আসতেই ঠিক করে নিয়েছিলাম গ্রামীণ কবি মন্দার মণ্ডলের কথা পিসিমাকে কিছুই জানাব না। কোনও সন্দেহের বীজ ঢুকতে দেব না তার মনে। বরং এমন কথাই বলব যাতে পুষ্পকুমারই যে পুনর্জন্ম নেওয়া পিসেমশাই সে ব্যাপারে যেন তার একটুও সন্দেহ না থাকে।
তবেই না বিন্তিপিসি উদ্যোগ নিয়ে পুষ্পকুমারকে এই বাড়িতে ঢোকাবেন। আর তখনই না শিকারিকে তার নিজের জালে জড়িয়ে ফেলা যাবে। হাঃ-হাঃ-হাঃ।
বিন্তিপিসিকে যে কী বললাম সে তো গল্পের শুরুতেই বলেছি। পুষ্পকুমারের কান নাচানোর যাকে বলে ভুয়সী প্রশংসাই করলাম। পিসিমাকে পরিষ্কার বলে দিলাম, পুষ্পকুমার পাটোয়ারিই যে আসল রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়, কান নাচানোর ক্লাব খোলবার জন্যে নবকলেবরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, এ ব্যাপারে আমার অন্তত কোনও সন্দেহই নেই।
পিসিমা আমাকে রুপোর থালায় ভাত বেড়ে দিয়ে, পাশে বসে ঝালর লাগানো হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতে করতে বললেন, হ্যাঁ রে কেতু, কীভাবে ওনাকে তা হলে নিজের বাড়িতে ফেরত আনা যায় বল দেখি।
আমি লিচুর পায়েসে চুমুক দিয়ে বললাম, ওসব ব্যবস্থা করে এসেছি। তোমাকে ও নিয়ে ভাবতে হবে না। আচ্ছা পিসিমা...।
বল বাবা।
তোমাদের এই বাড়িতে গুপ্তধন আছে বলে কিছু শুনেছ?
ও মা! সে তো বিয়ে হয়ে এ-বাড়িতে আসার পর থেকেই শুনছি। এঁনাদের বংশের আদি পুরুষ ছিলেন সামন্তরাজা। সুলতানি আমলে তাঁর মতন অনেক ছোটখাটো জমিদারই সুলতানের সৈন্যদের হাতে লুঠ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বেশ কিছু সম্পত্তি সরিয়ে রেখেছিলেন। সেই সরিয়ে রাখা ধনদৌলতই না কি এখনও দেয়ালের চোরাকুঠুরির মধ্যে রয়ে গেছে। ওই গুপ্তধনের গল্পের জন্যেই এবাড়ির কোনও ব্যাটাছেলে আর কোনও কাজকর্ম করল না। তারা সারাজীবন শুধু নবাবি চালে খাওয়া-দাওয়া, ওঠা-বসা করল, আর পুরো বাড়িটার প্রতিটা ইটের খাঁজে গুপ্তধন খুঁজে গেল।
কেউ কিছু পেলেন?
আমার শ্বশুরমশাই সিঁড়ির নীচে এক লুকোনো ঘুলঘুলি থেকে দুখানা সোনার মোহর পেয়েছিলেন। তার আগে বা পরে আর কেউ কিছু পেয়েছে বলে শুনিনি। এই করতে করতে যা হয়—আস্তে আস্তে জমি জায়গা গয়নাগাটি সব বিক্রি হতে শুরু করল। বিক্রি হতে হতে এখন এই বাড়িটা আর বিঘে পঞ্চাশেক জমি বাকি আছে। তাও থাকত না, যদি না আমি শক্ত হাতে হাল ধরতাম। তোর পিসেমশাই তো এ-জগতের মানুষ ছিলেন না। সারাক্ষণ গানবাজনা নিয়েই পড়ে থাকতেন। কিন্তু তুই এসব কেন জিগ্যেস করছিস রে?
না, ওই উচ্ছেমাচানে একটা লোকের মুখে শুনলাম কিনা এ-বাড়িতে গুপ্তধন আছে—তাই।
যতসব বাজে কথা। থাকলে কি আর চোদ্দোপুরুষ ধরে খোঁজাখুঁজির পরেও তা বেরোত না?
আমি পিসিমার কথার প্রতিবাদ করলাম না। হাত-মুখ ধুয়ে দোতলায় উঠলাম। প্রকাণ্ড একটা ঘরে পিসিমা আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ঘরটার মাঝখানে জাহাজের মতন বড় আবলুশ কাঠের এক পালঙ্ক। কাল রাতে ঘুম হয়নি বললেই চলে। ভাবলাম এই বেলা একটু ঘুমিয়ে নিই। কিন্তু বালিশে মাথা ঠেকানোর পরেও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম বিজ্ঞানী কৃষ্ণনাথের কথা, গ্রামীণ কবি মন্দার মণ্ডলের কথা, সর্বোপরি পুষ্পকুমারের কথা।
ভাবছিলাম পিসিমা বলছেন বটে গুপ্তধন নেই। কিন্তু তাই যদি না থাকবে, তাহলে পাটোয়ারিরা দাদু নাতি মিলে এমন জুয়াচুরি কারবারটা করছেই বা কেন?
ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে আসছিল। পাশ ফিরে শুতে গিয়ে বুকপকেটে একটা কাগজ খড়মড় করে উঠল। বার করে দেখলাম সেই কাগজের টুকরোটা যেটার ওপর মন্দার মণ্ডল কলকাতার পত্রিকা অফিসের ঠিকানা লিখে দিয়েছিল। ফেলেই দিতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, কাগজটার যে পিঠে ঠিকানা লেখা তার উল্টোপিঠে বড় বড় অক্ষরে কবিতার মতন কী যেন লেখা আছে। মুক্তোর মতন হাতের লেখাটা যে মন্দার মণ্ডলের নয় তা স্পষ্ট। তাড়াতাড়ি উঠে বসে বিছানার ওপর কাগজটাকে সমান করে পাতলাম। পাতাটার ওপরে সাল তারিখ ছাপা আছে। তার থেকেই বোঝা যাচ্ছে ডায়েরিটা অনেক পুরোনো। বারো বছর আগের।
পিসিমা তখনও নীচে রান্নাঘরে খুটখাট করে কী সব কাজ করছিলেন। আমি একসঙ্গে তিনটে করে সিঁড়ি টপকে হুড়মুড়িয়ে তার কাছে পৌঁছিয়ে পাতাটা তার চোখের সামনে খুলে ধরলাম। বললাম, পিসিমা, দ্যাখো তো এই হাতের লেখাটা চেনো কি না?
পিসিমা বললেন, ও মা, তা আর চিনব না? এ তো তোর পিসেমশাইয়ের হাতের লেখা রে। কোথায় পেলি?
আমি সে কথার কোনও উত্তর না দিয়ে আবার দৌড়োতে দৌড়োতে দোতলায় নিজের ঘরে এসে খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। চোখের সামনে রইল সেই কাগজটা। কোনও সন্দেহ নেই, এ আমার পিসেমশাইয়ের নিজের হাতে লেখা গুপ্তধনের ঠিকানা। সারাজীবন খুঁজতে খুঁজতে তিনি নিশ্চয়ই মৃত্যুর ঠিক আগে খুঁজে পেয়েছিলেন এই বাড়িতে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের হদিশ। তারপর সাংকেতিক ভাষায় লিখে রেখেছিলেন, পরে সুবিধেমতন কোনও এক সময়ে খুঁড়ে তুলবেন ভেবে। সে সময় তিনি আর পাননি।
সেই ছোটবেলা থেকে কত গল্প-উপন্যাসে গুপ্তধনের সংকেতের কথা পড়েছি। ভয়ংকর জটিল সব ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করে প্রখর বুদ্ধির গোয়েন্দারা পৌঁছেছে, লুকোনো ধনাগারে। কত স্বপ্ন দেখেছি একদিন আমিও ওইরকম ভাবে খুঁজে বার করব গুপ্তধনের চাবিকাঠি। আজ সেই স্বপ্ন আমার সার্থক হতে চলেছে।
কাগজটার দিকে পুরোপুরি মনসঃযোগ করতে পারছিলাম না অবশ্য। মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন পাক খাচ্ছিল। পিসেমশাইয়ের ডায়েরির কাগজটা মন্দার মণ্ডলের পকেটে এল কোত্থেকে?
ভাবতে ভাবতে একটা সম্ভাবনার কথাই মনে এল। পাটোয়ারিমশাই এই পাতাটা চুরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন পিসেমশাইয়ের ম্যানেজার। পিসেমশাইয়ের মৃত্যুর পরেও বেশ কিছুদিন এই বাড়িতে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। সেই সময়েই কোনওভাবে গুপ্তধনের হদিশ লেখা ডায়েরিটা তাঁর চোখে পড়ে যায়। পুরো ডায়েরিটা সরালে পিসিমার চোখে পড়ে যাবার ভয় ছিল। তাই শিবনাথ পাটোয়ারি এই একটা পাতাই ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে পকেটস্থ করেন।
তারপর তিনি যখন মন্দার মণ্ডলকে তার ডিকশনারি ফেরত দেন, তখন নিশ্চয় ডিকশনারির পাতার ভাঁজের মধ্যে করে তাঁর অজান্তেই চলে আসে এই ছেঁড়া পাতাটা। গ্রামীণ কবি জিনিসটার মূল্য না বুঝেই এটাকে পকেটস্থ করে। তারপর দিয়ে দেয় আমার হাতে।
অবশ্য এই দুদিনে শিবনাথ পাটোয়ারিকে যতটা চিনেছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে ওই কাগজের একাধিক কপি তাঁর কাছে সযত্নে রাখা আছে। কাজেই এটা খোয়া গেলেও তাঁর খুব একটা কিছু যাবে আসবে না।
কিন্তু এটা যদি তিনি জানতে পারতেন যে কাগজটা এখন তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কুন্তল চ্যাটার্জির হাতে, তাহলে তাঁর মুখের ভাবটা কেমন হত? কথাটা ভাবতেই আমার ঠোঁটে যাকে বলে 'ক্রুর হাসি' ফুটে উঠল। সামনে আয়না নেই বলে আফসোস হল।
মনে মনে বললাম, শিবনাথবাবু! প্যাঁচটা আপনি ভালোই কষেছিলেন। দীর্ঘ তিরিশ বছর আপনি রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে পাশে ছায়ার মতন থেকেছেন। রাখোহরি ব্যানার্জির চালচলন, কথাবার্তা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, মুদ্রাদোষ, বাচনভঙ্গি—সবই আপনার মুখস্থ। সেই সবই আপনি ধীরে ধীরে আপনার নাতি পুষ্পকুমারকে শিখিয়েছেন। সেই শিক্ষা নিয়ে রাখোহরিবাবুর নব-অবতার হিসেবে এইবার পিসিমার বাড়িতে অবতীর্ণ হবে পুষ্পকুমার। তারপর গুপ্তধন খুঁজে বার করার কাজটাও সে-ই করে ফেলবে। অন্তত আপনি নিশ্চয়ই সেইরকমই আশা করছেন।
কিন্তু আপনাকে হতাশ হতে হবে। কারণ, সেই সংকেত এখন আমার হাতেও পৌঁছে গেছে।
অন্য চিন্তা থেকে মনটাকে সরিয়ে একাগ্রভাবে তাকালাম সামনে মেলে রাখা কাগজটার দিকে। স্বীকার করা ভালো, দেখে একেবারেই খুশি হলাম না। এই হেঁয়ালিতে জটিলতা থাকতে পারে কিন্তু সৌন্দর্য একেবারেই নেই। তা না থাক। আসল জিনিস হল গুপ্তধন। তুমি যে-কোনও ম্যাড়ম্যাড়ে ধাঁধার হাত ধরে সেই গুপ্তধনের কাছে পৌঁছোলেও হিরে-জহরতের ঔজ্জ্বল্য একই থাকবে।
এমন সময় নীচের উঠোন থেকে একটা হইহই-রইরই আওয়াজ উঠল। দৌড়ে বারান্দায় বেরিয়ে রেলিং দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুষ্পকুমার। বাড়ির পুরোনো চাকরবাকরদের নাম ধরে বেদম চেঁচাচ্ছে সে। এই গোপাল, শিগগির আমার গড়গড়া নিয়ে আয়। রাধার মা, তুমি আমার চটিজোড়া কোথায় রাখলে? তার পরেই চিৎকার শুরু হল—বাসন্তী! বাসন্তী!
পিসিমা একতলার দালানে দাঁড়িয়ে চোখদুটোকে রসগোল্লার মতন করে পুষ্পকুমারের কাণ্ডকারখানা দেখছিলেন। এবার নিজের নাম শুনে তাড়াতাড়ি উঠোনে নেমে এসে স্নেহমাখা গলায় বললেন, কী হয়েছে বাবা?
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল পুষ্পকুমার। বাবা! বাবা মানে? জানো না আমি কে? ইডিয়ট কেতুটার মুখে তো খবর পাঠিয়েছিলাম, আমি আসছি। সে কিছু বলেনি বুঝি?
কী বলব, শুনে এমন নার্ভাস হয়ে গেলাম, যে টপ করে রেলিং-এর আড়ালে বসে পড়লাম। জোচ্চোর হোক আর যাই হোক, পুষ্পকুমারের মেজাজটা যে জমিদার রাখোহরির মতনই সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। কী জানি যদি রাগের চোটে চটি-টটি ছুড়ে বসে।
পিসিমাই তাড়াতাড়ি সিচুয়েশন ম্যানেজ করলেন। বললেন, না-না, বলবে না কেন? বলেছে। কিন্তু বুঝতেই পারছ, অনেকদিন বাদে তোমাকে দেখছি তো! তা ছাড়া চেহারাছবিও আর আগের মতন নেই। তাই একটু গণ্ডগোল হয়ে গেছে।
যাগগে যাগগে। সে তো হতেই পারে। একটু নরম হলেন পুনর্জাত পিসেমশাই। তুমি দুটো কাজ করো এক্ষুনি। এক, আমার গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি নিয়ে এসো। দুই আমার নাচঘরের চাবি খোলার ব্যবস্থা করো। কত বছর যে ওঘরে ঢুকিনি। আর পারছি না।
পিসিমা দ্রুতপায়ে দোতলায় উঠে এলেন, কারণ এখানেই পিসেমশাইয়ের পূর্বজন্মের ঘর। সেই ঘরে জামাকাপড়ের আলমারি। আলমারিতে গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি।
আমি দেখলাম, পিসিমার নাক টাক লাল, চোখদুটোও ছলছল করছে। আমি সামনে গিয়ে বললাম, কী হয়েছে পিসিমা? কাঁদছ কেন?
কেতু রে, আমার আর কোনও সন্দেহ নেই। এ তোর পিসেমশাই ছাড়া কেউ নয়। দ্যাখ না, দেয়ালের ওই ছবিটার সঙ্গে মিলিয়ে দ্যাখ। সেই জোড়া ভুঁরু, বোঁচা নাক, খাঁড়া খাঁড়া কান। সেই টেলিফোনের মতন গায়ের রং। এমনকী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াবার ভঙ্গিটাতেও কোনও তফাত নেই। এ তোর পিসেমশাই না হয়ে যায় না।
পিসিমা বলার আগেই ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছিলাম। সত্যিই পুষ্পকুমারের সঙ্গে পিসেমশাইয়ের চেহারায় অনেক মিল। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না, এটা কেমন করে সম্ভব! হাবভাব চালচলন নকল করা যায়, কিন্তু চেহারা নকল করে কেমন করে? এটা কি নিতান্তই সমাপতন? না কি ধুরন্ধর শিবনাথ পাটোয়ারি রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে চেহারার মিল আছে এমন একটা ছেলেকেই খুঁজে পেতে নিয়ে এসেছেন? এনে, তাকেই নিজের নাতি বলে চালাচ্ছেন? মনে হল দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা সত্যি হলেও হতে পারে।
যাই হোক। পুষ্পকুমার যেরকম জোরের সঙ্গে এই বাড়িতে এন্ট্রি নিয়ে নিল, তাতে বেশ বুঝতে পারছি ওকে আটকানো মুশকিল হবে। বেশি কথা কী বলব, ওর মা-বাবাকেই দেখলাম চোখ মুছতে মুছতে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে উচ্ছেমাচানের দিকে চলে যেতে। কিছুতেই তারা নিজেদের ছেলেকে ফেরত নিয়ে যেতে পারলেন না। অবশ্য ওদের ব্যাপারটাও অভিনয় হতেই পারে। গুপ্তধন পেলে পাটোয়ারি বাড়ির সকলেই নিশ্চয় তার ভাগ পাবে।
পিসিমাদের বাড়িতে ভারী বিশ্বস্ত এক নেপালি দারোয়ান আছে। তার নাম হরি প্রধান। এই এত বড় ফাঁকা বাড়িটাকে সেই বুক দিয়ে আগলে রাখে। বিন্তিপিসি ছাড়া আর কারুর হুকুম মানে না। এখন পিসির কথামতন সে একতলার বন্ধ নাচঘরের দরজা জানলা খুলতে শুরু করল।
এগারো বছরের সেই বালক গম্ভীরমুখে আমাকে বলল, বুঝলে কেতু, আজ বারো বছর বাদে এই ঘরে ঢুকব। কী আনন্দ যে হচ্ছে কী বলব। ওই ঘরে সিন্দুকের মধ্যে রয়ে গেছে আমার 'কর্ণ কুন্তি সংবাদ' নৃত্যনাট্যের কস্ট্যুম, 'নদীর নাম কর্ণফুলি' নাটকের সিন, 'কর্ণ দিও না মুলে' যাত্রাপালার ঢাল-তলোয়ার।
বুঝতেই পারছিলাম এই সেই 'কানাচ নাট্য সংস্থা'র রিহার্সাল রুম।
আধঘণ্টা বাদে ফিরে এসে দেখি পুষ্পকুমার তখনও সিন্দুকগুলোর মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এটা বার করছে, ওটা ওল্টাচ্ছে। জিগ্যেস না করে পারলাম না—কিছু খুঁজছ না কি পুষ...ইয়ে পিসেমশাই।
বোধহয় নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল বলেই পুষ্পকুমার খেয়াল করল না যে ওকে তুমি বলে ফেলেছি। তবে আমার কথার উত্তরটা ঠিকই দিল। খুব স্বাভাবিক স্বরে বলল, এক জোড়া পেতলের মাকড়ি। মধ্যপ্রদেশ থেকে আনিয়েছিলাম। আমার সামনের নাটক 'আকাশে বাতাসে কানাকানি'-তে হিরোইনের ওটা পরার কথা। কোথায় যে রেখেছিলাম!
মনে মনে বললাম, মাকড়ি, না মোহর?
পুষ্পকুমারটা এমন ধুরন্ধর কী বলব!
সে ব্যাটা রাতে পিসেমশাইয়ের নিজস্ব কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসে, পিসেমশাইয়ের রুপোর থালায় করে পিসেমশাইয়ের প্রিয় তিতিরের রোস্ট দিয়ে অনেকটা ভাত খেল। গড়গড়াটা অবশ্য চাইল না; বলল, গলা খুশখুশ করছে। খাওয়া-দাওয়ার পর কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে আকাশ ভরা সূর্য তারা গানটার সঙ্গে কান নাচাল। এই অবধি সব মেনে নেওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এর পরেই যা করল তাতে তো আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। সে ঘোষণা করল, আজ থেকে রাতে হরি প্রধান এবাড়ির গেটের কাছে ওর যে ঘর রয়েছে সেখানে না শুয়ে নাচঘরের দরজার সামনে শোবে।
এই কথা শুনে পিসিমাও ভারি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ওঘরে তো ভাঙাচোরা জিনিস ছাড়া কিছুই নেই। হঠাৎ ওখানে পাহারা বসানোর কী হল?
পুষ্পকুমার সে কথার কোনও জবাবও দিল না, কিন্তু নিজের জেদও ছাড়ল না। আর পিসিমার কথাই বা কী বলব, তিনিও এটাকে স্বয়ং রাখোহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদেশ হিসেবেই মেনে নিলেন।
পুষ্পকুমারের এই চালাকির কারণ বুঝতে পারলাম কেবল আমি। ওর নিশ্চয়ই কোনওভাবে সন্দেহ হয়েছে যে আমি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেছি। তাই আমি যাতে ওঘরে ঢুকতে না পারি তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। আমি নিশ্চিত, ও নিজে আবার কাল সকালে ওঘরে ঢুকে খোঁজাখুঁজি শুরু করবে। ওর এই প্ল্যান বুঝতে পেরে রাগে আমার গা জ্বলে গেল। উপরন্তু ব্যাটা দেখি বগলে একটা বালিশ নিয়ে গুটিগুটি আমার পাশে এসেই শুয়ে পড়ল, এবং বললে বিশ্বাস করবে না, হঠাৎই ঠিক এগারো বছরের বালকের ভঙ্গিতেই বলল, তোমার ওই বইগুলো থেকে একটা ভূতের গল্প শোনাও না।
আমার অবাক ভাবটা বোধহয় মুখে ফুটে উঠেছিল, তাই দেখে আমার পূর্বজন্মের পিসেমশাই তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আমি তো গতজন্মেও ভূতের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসতাম।
কী আর করি, পড়ে শোনালাম একটা গল্প। গল্প শুনে পুষ্পকুমার রীতিমতন ভয় পেয়ে গেল। আমাকে জড়িয়ে ধরে শুলো। একটু বাদে ঘুমিয়েও পড়ল অবশ্য। আর সত্যি কথা বলছি, ওর ঘুমন্ত মুখটা আমার যে-কোনও শিশুর মতনই সরল, নিষ্পাপ লাগছিল।
আমার কিন্তু একটুও ঘুম পাচ্ছিল না। গত দুদিনের রোমহর্ষক কাণ্ডকারখানায় মাথাটা গরম হয়ে গিয়ে থাকবে। তাই আমি মাথার কাছে রাখা লণ্ঠনের আলোয় একটা গোয়েন্দা গল্পের বই পড়তে শুরু করলাম।
এই ভাবে কতক্ষণ কেটে গেছিল খেয়াল করিনি। হঠাৎই একটা অস্পষ্ট ধুপধাপ আওয়াজ শুনে আমার মনোযোগ বইয়ের থেকে চলে গেল নীচের উঠোনের দিকে। আমি লাফ মেরে খাট থেকে নেমে দৌড়ে বেরোলাম বারান্দায়, এবং সেখান থেকে ঝুঁকে পড়ে যা দেখলাম, তাতে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। দেখলাম হরি প্রধান হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলেছে। চোখ-টোখ কচলে আরেকবার ভালো করে তাকালাম। না, হাওয়ায় ভাসছে না। ওকে কেউ কাঁধে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। দৌড়ে যতক্ষণে নীচে নামলাম, ততক্ষণে হরির কিডন্যাপার পিসিমার বাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বাইরের রাস্তায় পা দিয়েছে। আমি পেছন পেছন দৌড়োলাম। লোকটা বোধহয় আমার পায়ের শব্দ পেয়েই থমকে দাঁড়াল। তারপর বাঁ-হাত দিয়ে কাঁধের ওপরে শুয়ে থাকা হরিকে ভালো জড়িয়ে ধরে ডান হাতটা ঢোকাল ট্রাউজারের পকেটে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, ওই হাতটা যখন পকেট থেকে বেরোবে তখন তাতে ধরা থাকবে একটা কোল্ট রিভলভার, কারণ সমস্ত রহস্য কাহিনিতে সেরকমটাই লেখা থাকে।
কিন্তু না। বেরোল একটা ছেঁড়া রুমাল। তাই দিয়ে লোকটা ভালো করে ঘাম-টাম মুছল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ভারি অবাক হয়ে বলল, এ কী, অ্যাসিস্ট্যান্ট যে! তুমি সকাল থেকে কোথায় হাওয়া হয়ে গেলে বলো তো। এরকম করলে তো তোমাকে চাকরিতে পার্মানেন্ট করা মুশকিল হবে।
হঠাৎ করেই কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারির একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলাম, লুকোবার কোনও সুযোগই পেলাম না। অতএব আমতা-আমতা করে উত্তর দিলাম, এই তো, শিয়াল খুঁজছিলাম।
আরে, উচ্ছেমাচানের চারিদিকে এত শেয়াল, শেয়ালের জ্বালায় গাছে একটা কাঁঠাল পাকতে পায় না, আর তুমি শেয়াল খুঁজতে চলে এসেছ করলাবাগানে! খুব হয়েছে বাবা, তোমাকে আর শেয়াল ধরতে হবে না। আপাতত আমার সঙ্গে এই বোঝাটায় একটু হাত লাগাও দেখি। চলো, রাত থাকতে থাকতে দুজনে মিলে একে আমার ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে তুলি।
আরেকটু হলে বলে ফেলছিলাম, হরি প্রধানকে কোথায় নিয়ে চললেন? তার পরেই খেয়াল হল, আমার তো হরিকে চেনবার কথা নয়। তাই বোকা সেজে জিগ্যেস করলাম, ওই লোকটা কে? ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
আরে, একে ভগবান আমার রিসার্চের জন্যে পাঠিয়েছেন, অথচ এ কিছুতেই আমার বাড়ি যাবে না। কত করে বুঝিয়েছি, কত টাকা দিতে চেয়েছি, তা এ খালি বলবে কী, উয়ো সব রিসার্চ-টিসার্চ হামরো কাম নেই ছ। বাধ্য হয়ে আজ দিয়েছি ব্যাটার নাকে এক বোতল ক্লোরোফর্ম ঢেলে।
আমার বিস্ময় আর রাখার জায়গা পাচ্ছিলাম না। কোন গুণ বা দোষের জন্যে বেচারা হরি প্রধান কাঁচকলা, ভাঙা ঝুড়ি, শেয়ালছানা কিংবা কচ্ছপের সঙ্গে এক আসনে বসার সম্মান লাভ করল? সেই কথাটাই জিগ্যেস করলাম কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারিকে।
সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণবাবু হরি প্রধানকে ধপাস করে ঘাসজমির ওপর ফেলে দিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য মুদগল!...
আমি বললাম, মুদগল নয় স্যার, কুন্তল।
ওই একই হল। তুমি কি এই লোকটার মুখটা দেখতে পাচ্ছ না কুন্তল? এগিয়ে এসো! ভালো করে দ্যাখো! দেখতে পাচ্ছ, এই নেপালিটার সারা মুখে একটিও গোঁফ-দাড়ি নেই? মানে এ হল বিশুদ্ধ মরকন্দ, সোজা বাংলায় মাকুন্দ।
খনার বচন শোনোনি—'যদি দ্যাখো মাকুন্দচোপা, এক পাও না বাড়াও বাপা?'
লোকের বিশ্বাস এই ধরনের মাকুন্দের মুখ দেখা মানে চুড়ান্ত অযাত্রা। কিন্তু আমি কাল সকালের মধ্যেই এর মুখটা স্ক্যান করে দেখিয়ে দেব যে সেটা নিতান্তই অন্ধবিশ্বাস।
অনেকক্ষণ থেকেই আমাদের চারিদিকে চাপা গোঁ-গোঁ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। জোড়ায় জোড়ায় অনেকগুলো সবুজ চোখ জ্বলছিল। কৃষ্ণবাবু হরি প্রধানকে কাঁধ থেকে মাটিতে ফেলে দেওয়া মাত্র সেই গর্জনের আওয়াজ বেশ জোরালো হয়ে উঠল, জ্বলন্ত চোখগুলোও আরও এগিয়ে এল। সেইদিকে তাকিয়ে আমি বললাম, বিশ্বাসটা খুব একটা অন্ধ নয় বোধহয় স্যার।
মানে?
মানে, আপনার যাত্রাটা খুব একটা ভালো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না আমার। মাকুন্দকে একেবারে ঘাড়ে চাপিয়ে বেরিয়েছেন তো! তাই কপালে ঢের দুঃখ আছে।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হরি প্রধানের অনুগত দশখানা তাগড়া নেড়িকুত্তা বিকট শব্দ করে কৃষ্ণনাথ পাটোয়ারিকে তাড়া করল।
কোনও মানুষ যে এত স্পিডে দৌড়োতে পারে তা কৃষ্ণবাবুকে সেদিন না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। তবু পুরোটা বাঁচলেন বলে মনে হল না। একটু বাদে কুকুরগুলো যখন হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরল, তখন তাদের একটার মুখে দেখলাম কৃষ্ণবাবু ধুতির কাছা-টা জয়পতাকার মতন ধরা। এটা নিশ্চিত যে সারমেয়বাহিনী তাকে একেবারে উচ্ছেমাচানের ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে দিয়ে ফিরেছে।
হঠাৎ খেয়াল হল যে আমার সামনে আপনা থেকেই এক সুবর্ণসুযোগ এসে দাঁড়িয়েছে। হরি প্রধান অজ্ঞান। কৃষ্ণবাবু হাওয়া। পিসিমা, পুষ্পকুমার কারুর সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চয়ই দুজনেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। তা হলে আমিই বা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছি কোন আক্কেলে? এখনই গিয়ে গুপ্তধনটা খুঁজে বার করলেই তো হয়। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, আছে। সংকেত লেখা কাগজটা যথাস্থানেই রয়েছে। ভোরের আলো ফুটিফুটি করছে। লোকজন জেগে ওঠার আগে ঘণ্টাখানেক সময় পাব। আমি সুট করে ঢুকে পড়লাম পিসেমশাইয়ের নাচঘরে।
আবছা আলোয় চোখটাকে সইয়ে নিতে একটু সময় লাগল। তারপর পকেট থেকে হেঁয়ালি লেখা কাগজটা বার করে ভালো করে দেখলাম। যথারীতি প্রথমেই একটা নকশা। দেখে মনে হচ্ছে অনেকগুলো লোহার আংটা জুড়ে জুড়ে লম্বা চেন বানানো হয়েছে, তারপর সেরকম অনেকগুলো চেন দিয়ে একটা মানুষের গলা থেকে কোমর অবধি অংশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়েছে। হাতদুটো অবশ্য নকশাতে নেই। এর মানে কী?
চারপাশে তাকালাম। আগে যা দেখেছি তাইই রয়েছে—ডাঁই করে রাখা ভাঙা আলমারি, সিন্দুক, থিয়েটারের ক্যানভাসে আঁকা ড্রপসিন, এমনকী মরচে পড়া নকল অস্ত্রশস্ত্র অবধি। ভালো করে দেখতে দেখতে একটা জিনিস নজরে পড়ল, যেটা আগে দেখিনি। একদিকের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে একটা বর্ম। মিউজিয়ামে এরকম জিনিস দেখেছি। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ যখন চালু হয়নি তখন সৈন্যরা পোশাকের নীচে এরকম বর্ম পরত। ইস্পাতের বিনুনি দিয়ে তৈরি এই বর্ম তির কিংবা তলোয়ারের আঘাত থেকে তাদের শরীরকে বাঁচাত। এই জিনিসটার ছবিই তো আমার হাতে ধরা নকশাটায় আঁকা আছে দেখছি।
বাঃ! এত তাড়াতাড়ি সাফল্য পাব তা তো ভাবিনি। আমি একটা সিন্দুক দেওয়ালের দিকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে সেই বর্মটার নীচে দাঁড় করালাম। তারপরে সিন্দুকের ওপর উঠে সাবধানে দেওয়াল থেকে ওটাকে পেড়ে ফেললাম। বর্মটা সরানোর পরে দেওয়ালটার যে অংশটা বেরিয়ে এল সেটার মধ্যে প্রথমে কোনও অস্বাভাবিকতা বুঝতে পারিনি। মনে হয়েছিল অন্য সবজায়গার মতনই চুনকাম করা সাদা দেওয়াল। কিন্তু কি মনে হতে জায়গাটায় হাত বোলাতেই বুঝতে পারলাম একটা জায়গা একটু বেশি ঠান্ডা। একটা ভাঙা তলোয়ারের ফলা দিয়ে সেই জায়গাটা একটু ঘষতেই চুনকাম উঠে একটা লোহার পাত বেরিয়ে এল।
ইউরেকা! এটা তো নিশ্চয় দেওয়ালে গাঁথা আয়রন চেস্টের পাল্লা।
কিন্তু এ কীরকম পাল্লা? না আছে হাতল, না আছে চাবি। এমনকী একটা কবজা অবধি চোখে পড়ছে না কোথাও। তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস রয়েছে। লোহার পাতটার ওপর খুব হালকাভাবে চৌখুপি কাটা আছে। এবার কী করণীয়? হাতের কাগজটার দিকে তাকালাম।
লেখা আছে 'চার ঘর সোজা। দুই ঘর ফেলে দিয়ে তারপর তিন ঘর উল্টো।' আচ্ছা বেশ। আমি পাল্লাটার ঠিক মাঝখানের বড় বর্গক্ষেত্রটা থেকে গুনে গুনে চারটে ছোট বর্গক্ষেত্র ধরে আঙুলটাকে ওপরে তুললাম, পৌঁছে গেলাম ওপরের ডান কোণে। এরপর বাঁ-দিকে দুটো বর্গক্ষেত্র টপকে গিয়ে আঙুলটাকে নামাতে শুরু করলাম—তিন ঘর।
এবার? কাগজটাকে চোখের কাছে তুলে এনে দেখলাম লেখা আছে 'দু-ঘর করে ফেলতে ফেলতে চার সারি নেমে আসুন।' ওরে বাবা! এ যে ভয়ানক জটিল ব্যাপার। যাই হোক, দুটো করে ঘর বাদ দিয়ে নেমে এলাম চার সারি।
তারপর? আবার তাকালাম সংকেতের দিকে। কী আশ্চর্য! এর মানে কী?—'এবার বোতামের ঘর বসান!'
আঙুলটা যে ঘরটায় এসে থেমেছিল সেই ঘরটা ভালো করে খুটিয়ে দেখলাম। আরে! সত্যিই তো একটা ছোট বোতামের মতন কী যেন উঁচু হয়ে আছে এইখানটায়! আমি দুর্গা বলে চাপ দিলাম বোতামটার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে মসৃণভাবে লুকোনো কবজার ওপর ঘুরে গেল লোহার পাল্লাটা। বেরিয়ে এল দেওয়ালের ভেতরে লুকোনো সিন্দুক।
একটু বাদে আমি পা টিপেটিপে নাচঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে বেরিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে সিঁড়ির মুখে পৌঁছেছি কী পৌঁছোইনি, হঠাৎ হাঃ-হাঃ, হোঃ-হোঃ, হিঃ-হিঃ, খ্যাক-খ্যাক, খিকখিক ইত্যাদি চোদ্দোরকম হাসির শব্দে করলাবাগানের আকাশ বাতাস কেঁপে উঠল। এত ঘাবড়ে গেলাম কী বলব! পা দুটো যেন জমে পাথর হয়ে গেল।
তারপর থামের আড়াল থেকে, দেয়ালের ফোকর থেকে, গলির বাঁক থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল লুকিয়ে থাকা মানুষজন। তখনও হাসির চোটে তারা ভালো করে হাঁটতে পারছে না। কে নেই তাদের মধ্যে?
পিসিমা আছেন।
পুষ্পকুমার আছে।
শিবনাথবাবু আছেন।
পুষ্পকুমারের বাবা-মা আছেন।
সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, আমার বাবাও রয়েছেন।
পিসিমাই সবার আগে এগিয়ে এসে আমার চিবুক ধরে আদর করে বললেন, তাহলে কেতুবাবুর গোয়েন্দাগিরি সমাপ্ত হল? আমার উল বোনার খাতার ছেঁড়া পাতা নিয়ে...ও হোঃ-হোঃ-হোঃ। সোয়েটারের প্যাটার্ন এঁকে রেখেছিলাম...তার দু-ঘর সোজা, তিন ঘর উল্টো নিয়ে এতক্ষণ ধরে গুপ্তধন খোঁজা...হিঃ-হিঃ-হিঃ। এত মজা বহুদিন পাইনি রে কমল।
পুষ্পকুমারও মুখ-চোখ লাল করে হাসছিল। বাবা তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, দিদি, তোমার এই নাতিটা কিন্তু একটা জিনিয়াস। শিপ্রা, তোর ছেলের জবাব হয় না। জাতিস্মরের ভূমিকায় ও যদি এত ভালো অভিনয় না করত, তাহলে আমাদের প্ল্যানটা মাঠে মারা যেত।
অবাক হয়ে পুষ্পকুমারের মায়ের দিকে তাকালাম। এই তাহলে সেই শিপ্রাদি! ছোটবেলায় যার সঙ্গে অনেক খেলেছিলাম? তার মানে পুষ্প আমার ভাগনে?
শিপ্রাদি এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, আমাদের বাড়ি এক রাত রইলি, কিন্তু এমনই কপাল খারাপ তোকে দুধ-সাবুর বেশি কিছু খাওয়াতে পারলাম না। আজ কিন্তু ছাড়ছি না, কেতু। দুপুরে উচ্ছেবাগানে তোদের সবার নেমন্তন্ন।
আমি সিঁড়ির প্রথম ধাপে বসে পড়েছিলাম। বললাম, আমার মাথা ঘুরছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু বুঝিয়ে বলো।
বাবা বললেন, বুঝিয়ে বলার কী আছে? দিদি আর তার মেয়ের বাড়ির সকলে মিলে তোর ঘাড় থেকে গোয়েন্দাগিরির ভূত নামানোর জন্যে একটা বড়সড় নাটক করল আর কী। অবশ্য নাটকটার পরিচালক আমিই।
আমি বললাম, কান নাচানো?
বাবা বললেন, পুষ্প ও কাজটা ছোটবেলা থেকেই দারুণ পারে। কী জানি কেমন করে পারে! কিন্তু জামাইবাবু, মানে তোমার স্বর্গত পিসেমশাই সাতজন্মেও পারতেন না। ওই মিলটুকু আমাদের বানানো গল্প।
আমি বললাম, কৃষ্ণনাথবাবুর বিজ্ঞাপন?
বাবা বললেন, আমিই কলকাতায় কাগজের অফিসে ওটা দিয়েছিলাম। যাতে তুমি ভাবো স্রেফ কপালজোরে পাটোয়ারি বাড়িতে এন্ট্রি পেলে। আসলে আমরাই তোমাকে ওখানে ঢুকিয়েছি।
আমি বললাম, তার মানে অযাত্রা নিয়ে ওনার গবেষণা...
আরে ধুর, ধুর! কৃষ্ণদা হচ্ছেন ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী। ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। আমাদের প্ল্যান শুনে ঝুলোঝুলি করে বললেন আমাকে একটা পার্ট দে। তাই এই পার্টটা ওনার জন্যে বানালাম।
আমি বললাম, গ্রামীণ কবি মন্দার মণ্ডল?
বাবা একটু লজ্জা পেয়ে বললেন ওটা আমিই সেজেছিলাম। অ্যাকটিংটা আশা করি খারাপ লাগেনি? ওইটুকু না-হলে ষড়যন্ত্রের প্লটটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হত না।
আমি আর কিছু জিগ্যেস করার আগেই বাবা বললেন, পুষ্প যে কেমন করে তোমার পিসেমশাইয়ের আগের জন্মের সমস্ত খুটিনাটি জানল, সেটা আশা করি বুঝতে পারছ।
আমি বললাম, সেইজন্যে ওর চেহারার সঙ্গে পিসেমশাইয়ের এত মিল! এই সোজা কথাটা বুঝতে এত দেরি হল আমার! ছিঃ। তাহলে গত দুদিন ধরে যা ঘটছে, তার মধ্যে কোথাও কোনও সত্যি নেই?
বাবা মুখটা কাঁচুমাচু করে বললেন, আছে। পাহারা সরানোর ব্যাপারে হরি প্রধানকে কিছুতেই রাজি করা যাচ্ছিল না। অগত্যা ওকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করতে হল। আর সেই চেষ্টা করতে গিয়ে কৃষ্ণদাকে সত্যিই কুকুরের তাড়া খেতে হল। ওনার পা মচকে গেছে। বাড়িতে শুয়ে আছেন। আর হরি ওর নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছে। বিকেলের আগে ঘুম ভাঙবে বলে মনে হচ্ছে না। এইটুকুই যা দুর্ঘটনা। বাকিটা ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে।
তারপর আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে যোগ করলেন—যে জিনিসটা প্রমাণ করার জন্যে এত কিছু করলাম, সেটা তোমার মাথায় ঢুকেছে কি?
আমি বললাম, কী জিনিস?
ইউ আর নট এ বর্ন গোয়েন্দা। একজন গোয়েন্দার কাছে এতগুলো ফাঁকি এতক্ষণ ধরে লুকিয়ে রাখা যায় না। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছ যে গোয়েন্দাগিরি তোমার কর্ম নয়।
আমি বললাম, না।
না মানে? বাবা বেশ চটে গেলেন আমার উত্তর শুনে। এখনও বোঝোনি?
আমি আবারও বললাম, না বুঝিনি।
কেন?
আমি পায়জামার পকেট থেকে একতাড়া মোহর বার করে পিসিমার বাড়ির দালানের মার্বেল বাঁধানো মেঝের ওপর ছড়িয়ে দিলাম। ভোরের আলোয় শ'খানেক সোনার চাকতি ঝলমল করে উঠল। যারা এতক্ষণ বেদম হাসছিল, তাদের মুখে আর কথা নেই। আপাতত তাদের চোখগুলোও ছানাবড়া।
সবাই যাতে শুনতে পায় এইভাবে আমি বললাম, হ্যাঁ, পিসিমার ওই উলের ডিজাইন ফলো করেই এই গুপ্তধন আমার হাতে এসেছে। তা হলে গোয়েন্দার জীবিকা খারাপ হল কীসে শুনি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন