তিনু তান্ত্রিকের পুঁথি

সৈকত মুখোপাধ্যায়

বর্ধমান শহর থেকে তিরিশ মাইল উত্তরে হিজলতলা গ্রাম। সেখান থেকে আবার পুবদিকে দু-মাইল হেঁটে গেলে ভূতচণ্ডী নদী। নদীতে জল নেই বললেই হয়। সাদা বালির ধু-ধু চরার মধ্যে দিয়ে তিরতির করে একটুখানি ঘোলাটে স্রোত বয়ে চলেছে। চরার বুকে একটা জায়গায় কয়েকটা বাবলা আর খেজুরগাছের জটলা। ওইখানেই গ্রামের শ্মশান। শ্মশানের নামও ভূতচণ্ডী।

জনপ্রাণীহীন জায়গাটাকে ঘিরে শুকনো কাশের ঝোপ এলোমেলো হাওয়ায় শিরশির করে কেঁপে ওঠে। ভর দুপুর বেলাতেও শেয়ালগুলো নির্ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে বেড়ায়। হয়তো কখনও একটা বিশাল শিমূলগাছের মগডালে বসে ক'টা দাঁড়কাক মানুষের মতন গলায় খা-খা বলে ডাক ছাড়ে। সব মিলিয়ে ভারি ভৌতিক একটা পরিবেশ।

শ্মশানের অদূরেই একটা টিলার মতন উঁচু জমি। জায়গাটা উঁচু বলেই অনেকদূর থেকে দেখা যায় তার মাথায় একটা জরাজীর্ণ বাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। খেয়াল করলে একটা ভেঙে পড়া মন্দিরের চুড়োও দেখা যাবে। সেটার মাথায় বড়সড়ো বটগাছ গজিয়ে উঠেছে।

ওই টিলাটার দিকে হিজলতলা কিংবা আশেপাশের অন্যান্য গ্রামের লোকজন পারতপক্ষে পা বাড়ায় না। কোনও কারণে ভূতচণ্ডী নদী পেরিয়ে ওপাড়ে যাওয়ার দরকার পড়লে তারা ওই টিলাটাকে পাশ কাটিয়ে, অনেক ঘুরে অন্য একটা জায়গা দিয়ে নদী পার হয়। বংশানুক্রমে তারা ওরকমটাই করে আসছে। কারণ, ওটাই হল পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক ত্রিনাথ রুদ্রের ভিটে। এদিকের দশটা গাঁয়ের লোক যাকে তিনু তান্ত্রিক বলেই জানে। আজ থেকে দুশো বছর আগে ওই ভিটেতে বসেই তিনি তন্ত্রসাধনা করেছিলেন।

তিনু তান্ত্রিকের নামে নানান গুজব এখনও হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। তার মধ্যে প্রধান যে গুজব, সেটা হল—তিনু তান্ত্রিক এখনও জীবিত রয়েছেন। যে-কোনওদিন তিনি তার ভিটেতে ফিরে আসতে পারেন। যদিও বেঁচে থাকলে হিসেব মতন তাঁর বয়েস হত এখন আড়াইশোর ওপর।

এতদিন কি কোনও মানুষ বাঁচতে পারে?

এরকম তর্ক শুনলে হিজলতলার গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ বটকেষ্ট সামন্ত ভারি কুপিত হয়। বটকেষ্টর নিজের বয়েস একশোর কাছাকাছি। তিনু তান্ত্রিক আড়াইশো বছর কীভাবে বেঁচে থাকবেন এরকম প্রশ্ন কেউ তুললে সেও সমান তেজে উত্তর দেয়, কেন? যেভাবে তিনি তিনটে ভূতকে দিয়ে পালকি বওয়াতেন, যেভাবে ওই ভূতচণ্ডীর শ্মশানে প্রতি অমাবস্যায় মড়া জাগিয়ে তুলতেন, যেভাবে তিনি খালি হাতের চেটোয় আগুন জ্বালিয়ে অন্ধকার রাস্তায় পথ হাঁটতেন, সেইভাবেই তিনি দুশো-তিনশো যত বছর ইচ্ছে বেঁচে থাকবেন! তিনি কি সাধারণ মানুষ ছিলেন, যে তোমাদের মতন মাত্তর সত্তর-আশি বছরেই দান ছেড়ে দেবেন?

অকাট্য যুক্তি। এর পরে তিনু তান্ত্রিকের ফিরে আসার ব্যাপারটায় কেউই খুব একটা অবিশ্বাস করতে পারে না।

হিজলতলা গ্রামে এখন যত মানুষ বাস করে তারা সকলেই ছোটবেলা থেকে তিনু তান্ত্রিকের নানান গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছে। এখন যারা ছোট তারাও ইস্কুলে ছুটি থাকলে দুপুরবেলায় চলে আসে বটঠাকুরদার বাড়ি। রাতে আসে না, কারণ বটকেষ্ট সামন্তর কাছে অমন ভয়ংকর ভয়ংকর গল্প শুনে তারপর অন্ধকার রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরাটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তারা দুপুরেই আসে, যখন চারিদিক নিস্তব্ধ, আমড়াগাছের পাতার আড়ালে বসে একটা ঘুঘু কেবল একটানা ডেকে যায়। সেইরকম সময়েই বটকেষ্টকে ঘিরে বসে, গোল গোল চোখ করে, হিজলতলার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তিনু তান্ত্রিকের গল্প শোনে।

বটকেষ্ট বলে, বুঝলিরে দাদা-দিদিরা, দুই আড়াইশো বছর আগে দিনকাল ছিল এখনকার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। এখন তো গ্রামে গ্রামে মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, ঘরে ঘরে ইলেকট্রিকের আলো, টেলিফোন। তখন তো এসব কিছুই ছিল না। রাত হলেই পুরো দেশটা যেন অন্ধকারের মুঠিতে বন্দি হয়ে যেত। বহু দূরে-দূরে এক-একটা গ্রাম, মাঝখানে পাঁচ ক্রোশ দশ ক্রোশ ফাঁকা জায়গা। এক জায়গায় মানুষের পাশে বিপদে আপদে অন্য জায়গার মানুষ পৌঁছতেই পারত না। আর এই সুযোগেই বড় বড় ডাকাতের দল গজিয়ে উঠেছিল। তারা এক-একটা ছোট গাঁয়ে ঢুকে সমস্ত লুঠপাট করে নিয়ে একেবারে তছনছ করে দিত। নির্বিঘ্নে ডাকাতি সেরে তারা রণপায়ে চড়ে মাঠঘাট পেরিয়ে কোনও জঙ্গলের মধ্যে লুকোনো ডেরায় গা ঢাকা দিত। তখন তো কুড়িখানা গ্রামের জন্যে একটা করে পুলিশ থানা থাকত, তাতে কয়েকজন মাত্র লাঠিধারী জমাদার। ডাকাতের দলের সঙ্গে তারা এঁটে উঠবে কেন?

তবে অন্য সমস্ত গ্রাম ডাকাতের ভয়ে কাঁপলেও, এই হিজলতলা গ্রামে আমাদের পূর্বপুরুষেরা নির্ভয়ে থাকতেন। কেন বল তো? কারণ আমাদের গ্রামে ছিলেন তিনু তান্ত্রিক।

তোরা হয় তো ভাবছিস, তিনু তান্ত্রিক ছিলেন তো কী হয়েছে? তিনি তো সাধক মানুষ, পুজোআচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ডাকাতদের সঙ্গে তো আর লড়তে যেতেন না।

তিনি লড়তেন না তো কী হয়েছে? তার চ্যালা চামুণ্ডারা ছিল না?

আমার দাদুর মুখে শোনা তার বাবার ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা বলি শোন। একবার আমাদের গ্রামেরই সে আমলের এক পয়সাওয়ালা লোক রাসু মণ্ডল তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্যে কলকাতা থেকে গয়না গড়িয়ে এনে বাড়ির সিন্দুকে রেখেছেন। মানকে ডাকাতের দল ঠিক সে খবর পেয়ে গেল। রাত গভীর। হঠাৎ গাঁয়ের চারপাশটা মশালের আলোয় লাল হয়ে গেল, আর তার সঙ্গে বুকের রক্ত হিম করে দেওয়া সেই আওয়াজ—হা রে রে রে রে!

আমার প্রপিতামহের তখন পাঁচ-ছ'বছর বয়েস। মাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন। রাসু মণ্ডলের বাড়ির লোকজনের কান্নাকাটির আওয়াজ অত দূর থেকেও তাঁর কানে আসছে। হঠাৎ ম্যাজিকের মতন ডাকাতদের চিৎকার থেমে গেল। দুয়েকবার শুধু বাপরে মারে করে আর্তনাদ শুনেছিলেন, ব্যস। আর কিচ্ছুটি না।

ভোর না-হতেই গ্রামের লোকজন বাইরে বেরিয়ে দেখেছিল এক আশ্চর্য দৃশ্য। মানকে আর তার দলের সবক'টা লোককে কারা যেন পিছমোড়া করে বেঁধে গাঁয়ের চণ্ডীমণ্ডপে ফেলে রেখে গেছে। বেশিরভাগ ডাকাতই অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। শুধু দলের সর্দার মানকের জ্ঞান ছিল। সে তখনও ভয়ে শিউরে শিউরে উঠছে। গ্রামের লোকেদের প্রশ্নের উত্তরে সে জানাল গ্রামের সীমানা পেরিয়ে ভেতরে পা দেওয়ামাত্র তারা দেখে কি, এক রক্তাম্বর পরিহিত সন্ন্যাসী দুদিকে দু-হাত বাড়িয়ে তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন। মানকে দুর্ধর্ষ ডাকাত। অনেক মানুষ খুন করেছে। সামান্য এক সন্ন্যাসীকে সে ভয় পাবে কেন? তাই বল্লমটা নিয়ে সবেমাত্র সন্ন্যাসীর দিকে তাক করেছে, অমনি পেছন থেকে কে যেন বল্লমের ফলাটা ধরে তাকে সবশুদ্ধু শূন্যে ছুড়ে দিল। কুড়িহাত দূরে একটা গোবরের গাদার ওপর পড়ে মানকে অবাক হয়ে দেখল তিনজন লম্বা কালো লোক তার কুড়িজন চ্যালাকে বেধড়ক পেটাচ্ছে, অস্ত্রশস্ত্র কিছুই মানছে না। দু-হাতে ধরে তলোয়ার-সড়কি-বল্লম সব প্যাঁকাটির মতন মট মট করে ভেঙে ফেলছে।

একবার ঘুরতে ঘুরতে লোক তিনটে তার কাছাকাছি এসে পড়েছিল। তখনই তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মানকে। তারপর জ্ঞান ফিরতে দেখে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে।

রাসু মণ্ডল মানকেকে একবারটি গরম দুধ সাবু খাইয়ে একটু চাঙ্গা করে জিগ্যেস করলেন, কেন, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলিস কেন?

মানকে বলল, হব না? তিনটে লোকেরই মুখ একেবারে একরকমের, কঙ্কালের মতন। সে মুখে না আছে মাংস, না আছে চামড়া। ওরা মানুষ ছিল না।

মানকের শাগরেদদের মধ্যে অনেকের ততক্ষণে জ্ঞান ফিরে এসেছে। তারাও একবাক্যে বলল, তারা মানুষ ছিল না। তিনটে মানুষের ক্ষমতা নেই তাদের ওই কুড়িজনের দলকে খালি হাতে পিটিয়ে আধমরা করে রেখে যায়।

মানকে মাঝে-মাঝেই বলছিল, তার একজন লোক না কি কম পড়ছে। এসেছিল কুড়িজন কিন্তু এখন গুনে পাচ্ছে উনিশ। তাই শুনে গ্রামের লোকেরা বলল, যাঃ যাঃ! উনিশটা যে পাচ্ছিস এটাই তোর ভাগ্য। তা ছাড়া তুই গুনতে শিখলি কবে? পাঠশালায় তো কোনওদিন যাসনি।

মানকে ভারি ব্যাজার মুখে বসে রইল, আর কেবলই বলতে লাগল, উঁহু, আমার মোটেলাল নামে চ্যালাটাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। সে গেল কোথায়?

একটু পরেই থানা থেকে পুলিশ এসে গোরুর গাড়ি বোঝাই করে মানকে আর তার দলবলকে নিয়ে গেল। দাদুর মুখে শুনেছি, অত বড় ডাকাতদলের মোকাবিলা করার জন্যে থানার বড়বাবু পরে সোনার মেডেলও পেয়েছিলেন। সুযোগসন্ধানী আর কাকে বলে?

এর পর একটা কাজই বাকি ছিল। রাসু মণ্ডলকে সামনে রেখে গ্রামবাসীরা ছুটল ভূতচণ্ডী শ্মশানের দিকে, তিনু তান্ত্রিককে কৃতজ্ঞতা জানাতে। আমার দাদুর বাবাও তাদের পেছন পেছন গিয়েছিলেন। সেদিনই প্রথম তিনি তিনু তান্ত্রিককে কাছ থেকে দেখেছিলেন। লোকটার চেহারা ছিল ছোটখাটো, রোগাসোগা, লাল ধুতি আর চাদরটা গায়ে ছিল ঠিকই, গলায় পাথরের একটা মালাও ছিল বলে তার মনে আছে, কিন্তু জটা দাড়ি ওসব কোনও ঝামেলা ছিল না। ধুতি টুতি পরিয়ে দিলে ঘরোয়া লোক বলেই মনে হবে। শুধু ঘরোয়া লোকের চোখ থেকে ওরকম আলো ঠিকরে পড়ে না। সেদিনের পরেও আমার প্রপিতামহ কয়েকবার তিনু তান্ত্রিকের মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রতিবারই দেখেছেন ওইরকম তীক্ষ্ন আলোর রেখা তাঁর চোখের মণির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।

যাই হোক, সেদিন তো সবাই তিনু তান্ত্রিকের পা ছুঁয়ে প্রণাম-টনাম করল। রাসু মণ্ডল কৃতজ্ঞতা জানাবার জন্যে একটা সোনার মোহর প্রণামি দিলেন।

আর সকলে মন্দিরের চাতালে বসে তিনু তান্ত্রিকের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল। কিন্তু আমার দাদুর বাবা তো তখন খুবই ছোট, তার এক জায়গায় বসে থাকতে ভালো লাগবে কেন? তাই তিনি সবার চোখের আড়ালে পা টিপে টিপে মন্দিরের পেছন দিকটায় চলে গেলেন। ইচ্ছে ছিল পেছনের জঙ্গলটায় খুঁজে দেখবেন একটা বেজির বাচ্চা পান কি না। কিন্তু বেজি খুঁজতে গিয়ে যা দেখলেন তাতে তো তার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দশা।

হিজলতলার ছেলেপুলেরা এতক্ষণ নিঃশব্দে বটকেষ্টর কাহিনি শুনছিল, কোনও কথা বলেনি। এবার তারা গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে বলল, কী, কী? কী দেখলেন তোমার দাদুর বাবা?

দেখলেন কী, বাগানের এক কোণে বট, বেল, নিম এরকম ক'টা গাছ জড়জড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের নীচে একটা বড়সড়ো বেদি। আমার প্রপিতামহ গাঁয়ের লোকের কাছে শুনেছিলেন, তিনু তান্ত্রিকের পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে। সেখানে বসে তিনি সাধনা করেন। বুঝলেন, ঘুরতে ঘুরতে সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনের কাছে চলে এসেছেন।

গাছপালার আবছায়ায় চোখটা একটু সয়ে যেতেই দাদুর বাবা সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখতে পেলেন। বেদির সামনে একটা তেল সিঁদুর মাখানো হাঁড়িকাঠ। আর হাঁড়িকাঠে গলা আটকে যে বিশাল চেহারার ঝাঁকড়াচুলো লোকটা পড়ে আছে সে মানকে সর্দারের হারিয়ে যাওয়া চেলা মোটেলাল ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। সবচেয়ে বড় কথা, তিনটে রোগা মতন লোক সেই হাড়িকাঠের আশেপাশে বসে নানান কাজ করছে। কেউ খাঁড়ায় শান দিচ্ছে, কেউ মোটেলালের গর্দানে তেল মাখাচ্ছে। হঠাৎ দাদুর বাবার পায়ের নীচে মট করে একটা শুকনো কাঠি ভেঙে যেতেই লোক তিনটে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। এই দেখ, বলতে গিয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। দাদুর বাবা দেখলেন, মানকে ডাকাত যেমনটি বলেছিল, ঠিক তেমনি তাদের মুখ। মানুষ নয়, আস্ত কঙ্কাল তিনখানা।

সেদিন কোনওরকমে আমার প্রপিতামহ সেই বাগান থেকে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরে ধপাস করে উঠোনে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তার পরেও বহুদিন ভয়ের চোটে রাতে ঘুমোতে পারেননি।

দুই

বটকেষ্টর এসব গল্প অনেক বছর আগের। মাঝখানের দুশো বছরে তিনু তান্ত্রিকের সেই বিশাল মন্দির অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। মন্দির ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরদোরগুলোও আর আস্ত নেই। পঞ্চমুণ্ডির আসনটার গায়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ওই বেদিটার সামনে একটা বড়সড়ো পাকুড় গাছের ডালে পাশাপাশি বসে পা দোলাচ্ছিল সেই কঙ্কাল তিনটে।

গত দুশো বছর ধরেই তারা তিনুর ফাঁকা আশ্রমে ওইভাবে বসে বসে পা দোলাচ্ছে। ভূতেরা তো বুড়ো হয় না, তাদের মৃত্যুও নেই। তাই তাদের সময়ের হিসেব বলেও কিছু থাকে না। ওই তিনজনের কেবলই মনে হচ্ছে এই একটু আগেই তাদের প্রভুকে গ্রামের লোকেরা খাটিয়ায় চাপিয়ে হরিধ্বনি দিতে দিতে শ্মশানে নিয়ে গেল। আর তারপর থেকেই ওদের হাতে কাজকর্ম বলে আর কিছু রইল না। অগত্যা তারা পা না দুলিয়ে আর করে কী?

ওরা কেবলই ভাবছিল, তিনু তান্ত্রিক এক্ষুনি ফিরে আসবেন। ফিরে এসেই তাদের দিয়ে যথারীতি জল তোলাবেন, বাসন মাজাবেন, পালকি বওয়াবেন, দরকার পড়লে ঘুঁটেও দেওয়াবেন। ওঃ কি খাটুনিটাই না খাটান প্রভু ত্রিনাথ রুদ্র। তবু টুঁ শব্দ করার উপায় নেই। তাহলেই তান্ত্রিকের হাতের মন্ত্রের মার। সে মারের জ্বালা চাবুকের মারের থেকেও অনেক বেশি।

সাধারণত তান্ত্রিকদের পোষা ভূতেরা তান্ত্রিকের মৃত্যুর পরে মুক্তি পেয়ে প্রেতলোকে চলে যায়। কিন্তু তিনু তান্ত্রিক একদম বুঝতে পারেননি যে তিনি মারা যেতে বসেছেন। তাঁকে অবশ্য দোষও দেওয়া যায় না। মানুষের যতরকমের রোগ হতে পারে সবকিছুর জন্যেই তাঁর দেহবন্ধন করা ছিল। কিন্তু বার্ড-ফ্লু তো আর ঠিক মানুষের রোগ নয়, পাখির অসুখ। তাই সেটার বিরুদ্ধে তাঁর দেহবন্ধন কাজ করল না। শনিবারে জঙ্গলগ্রামের লোকেদের প্রণামি দিয়ে যাওয়া দুটো তিতিরপাখি রোস্ট করে খেলেন, আর রোববারেই জ্বর বাড়তে বাড়তে সাবাড়। মাঝখান থেকে হল কী, অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দুর বাঁধনটা কেটে দিয়ে যেতে পারলেন না। হ্যাঁ, ভূত তিনটেকে তিনু তান্ত্রিক ওই নামেই ডাকতেন—অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু। তারা ওই ভিটের সঙ্গেই বাঁধা পড়ে রইল।

একথা ঠিক যে, অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দুর ওপর তিনু তান্ত্রিক মাঝেমধ্যেই ভয়ংকর চটে যেতেন। চটে গিয়ে তাদের বাণও মারতেন আর বাণের জ্বালায় তারা তিড়িংবিড়িং করে লাফাত সে কথাও ঠিক। কিন্তু এই রাগের জন্যে তিনু তান্ত্রিককে পুরোপুরি দোষী করা যায় না। ভূত তিনটে ছিল ভারি মাথামোটা। উপরন্তু, যখন মানুষ ছিল, তখন তারা তিনজনেই গোবিন্দপুর রাজসভার এক বিখ্যাত গানের ওস্তাদের পাশে বসে বাদ্যযন্ত্র বাজাত—একজন তবলা, একজন সারেঙ্গি, আরেকজন তানপুরা। ওস্তাদ ছিলেন চড়া স্কেলে গান গাওয়ার জন্যে বিখ্যাত। ফলে তার তিনজন বাজনদারই বেশ কিছুটা কালা হয়ে গিয়েছিল। ভূত হওয়ার পরেও তাদের সেই কানের দোষ কাটেনি, উলটে বেড়ে গিয়েছিল।

তো, সেই বুদ্ধু এবং কালা তিন চাকর-ভূতের জ্বালায় তিনু তান্ত্রিকের জীবনটা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মাঝে-মাঝেই দুঃখ করে বলতেন, এই তো সেদিন কামাখ্যা গেলাম। পিশাচসিদ্ধ বিনয়বাবুর ঘরে দেখে এলাম কেমন লক্ষ্মী একটা মেয়ে কাজ করছে। বিনয়বাবুর গোয়ালে প্রায় শ'খানেক ভেড়া। জন্মগত ভেড়া নয় অবশ্য, সবক'টাই এক কালে মানুষ ছিল। তা সেই একশো ভেড়ার দেখাশোনার ভার ওই একটা ছোট্ট মেয়ের ওপরে। জল খাওয়াচ্ছে, ঘাস খাওয়াচ্ছে, লোক দিয়ে তাদের চমৎকার পশমের সুতো কাটাচ্ছে, এমনকী সেই সুতো দিয়ে কম্বলটা অবধি ওই বাচ্চা মেয়েটাই বুনছে। পেত্নী বলে বুঝতেই পারতাম না, যদি না লম্বা হাত বাড়িয়ে আমার পাত থেকে মাছভাজা চুরি করে নিত। আর আমার এই তিন অপদার্থকে দ্যাখো। বললাম, আমার 'খড়মটা' নিয়ে আয় তো! অমনি কোথা থেকে এক ঝুড়ি 'করমচা' এনে হাজির করল। এবার এই করমচাগুলো নিয়ে কি আমি স্বর্গে যাব?

তাঁর সেসব দুঃখের কথা অবশ্য কেউই শুনতে পেত না, কারণ তিনু তান্ত্রিকের নানারকমের বিদঘুটে সাধনার ঠেলায় তাঁর স্ত্রী একমাত্র ছেলে চতুরনাথের হাত ধরে প্রায় একবস্ত্রে বাপের বাড়ি বেনারসে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিলেন কেবল দশ বছরের ছেলে চতুরনাথের পুঁথিপত্তরের থলি আর দোয়াত কলমটুকু। চতুরনাথ পড়াশোনা করতে ভারি ভালোবাসত। পুঁথি না নিয়ে সে কোত্থাও যেত না।

এর কিছুদিন পরেই তিনু তান্ত্রিকের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার আগে তার সঙ্গে স্ত্রী বা ছেলের আর দেখা হয়নি।

সে যাই হোক, মাঝের এই দুশো বছরে অনুস্বর বিসর্গরা একটা কাজ খুব ভালো করেই করেছে। তারা তিনু তান্ত্রিকের ভিটেতে বাইরের একটা লোককেও পা দিতে দেয়নি। বাইরের লোক কম আসেনি কিন্তু। তিনুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ডাকাবুকো লোকেরা ওই ভিটেতে ঢুকবার জন্যে কেবলই ছোঁক ছোঁক করতে শুরু করেছিল। এখনও, এই দুশো বছর বাদেও যে দু-চারজন সে চেষ্টা করে না তা নয়।

কেন বলো তো?

পরশপাথরের লোভে।

তিনু তান্ত্রিক জীবিত থাকতে থাকতেই হিজলতলা আর আশেপাশের গ্রামে একটা খবর খুব ছড়িয়ে গিয়েছিল। তিনু তান্ত্রিক না কি পরশপাথর তৈরি করার চেষ্টা করছেন। নানা ঘটনা দেখেই তাদের মনে এরকম বিশ্বাস জন্মেছিল। যেমন, খালে বিলে শাকপাতা তুলে বেড়াত যে অন্নদা বুড়ি, সে প্রায়ই বলত, তিনুঠাকুরের পোষা ভূতদের সে নাকি দেখেছে হাঁটুজলে নেমে কী সব লতাপাতার খোঁজ করছে। তারপর গ্রামের দশকর্মা ভাণ্ডারের মালিক রাঘব আঢ্য একদিন ফিসফিস করে রাসু মণ্ডলকে বলল, তিনু তান্ত্রিক না কি তাকে বর্ধমান থেকে এক কিলো পারদ এনে দেওয়ার অর্ডার দিয়েছেন। দুশো বছর আগে সারা পৃথিবীর লোকই জানত, পরশপাথর তৈরির প্রধান উপকরণ হল গিয়ে পারদ।

তিনুঠাকুর যে পরশপাথর বানাচ্ছেন তার আরেকটা সূত্র পাওয়া গেল কানাই চোরের কাছ থেকে।

তখনকার দিনে সমস্ত গ্রামেই একটা করে ছিঁচকে চোর থাকত। বাস্তু-সাপ যেমন ঘরের উঠোনেই থাকে, তেমনি ওই বাস্তু-চোরেরাও গ্রামের মধ্যেই কাজকারবার চালাত, তার বাইরে যেত না। খুব বেশি ক্ষতিও করত না কারুর। বাড়ির বাইরে ভুলক্রমে থালাটা গেলাসটা পড়ে থাকলে সেটুকু উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত। তা ছাড়া রান্নাঘরে ঢুকে পান্তা চুরি করে খাওয়া, জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে গামছাটা নিয়ে পালানো, এসব তো ছিলই।

হিজলতলার পোষা চোর ছিল কানাই। তার চুরির ব্যাপারটা সকলেই জানত, কিন্তু কেউই তাকে বিশেষ কিছু বলত না। তবে কখনও ভুলক্রমে কারুর মাটির দেয়ালে বড়সড় সিঁদ কেটে ফেললে কানাইয়ের কান ধরে টেনে এনে তাকে দিয়েই আবার সেটা সারানো হত। তো সেই কানাই-ই একদিন রাসু মণ্ডলের কাছে সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যটাই ফাঁস করে দিল।

কয়েকদিন আগেই তিনু তান্ত্রিক না কি তার কাছ থেকে একটা পুরোনো কামান কিনেছেন।

কানাইয়ের কথা শুনে হিজলতলা গ্রামের মোড়লদের তো ভয়ে ভিরমি লাগার উপক্রম। কামান কিনেছেন মানে! এবার কি তান্ত্রিক মশাই পুরো গ্রামের সবক'টা লোককেই বলি দেওয়ার কথা চিন্তা করেছেন? কামানের এক গোলায় সবাইকে মায়ের পায়ে পাঠিয়ে দেবেন?

চণ্ডী মণ্ডপের একধারে বসে তারাপদ নাপিত রাসু মোড়লের চুল কাটছিল। তারাপদ খুব ধীরস্থির লোক। মাথাটাও খুব পরিষ্কার। সে চুল কাটা থামিয়ে বলল, আপনারা আগে থেকেই হাঁউমাউ করবেন না তো। আগে পুরো ব্যাপারটা শুনতে দিন। হ্যাঁ রে কানাই, তুই কামান পেলি কোত্থেকে?

কানাই মাথা-টাথা চুলকে বলল, সেটা ব্যবসার গুহ্য কথা। বলা যাবে না।

মারব এক থাপ্পর, চুরি ব্যবসা লাটে উঠিয়ে ছাড়ব। শিগগির বল, কোত্থেকে কামান পেলি।

ওই যে কয়েকবছর আগে পলাশি গাঁয়ের আমবাগানে নবাববাহাদুরের সঙ্গে গোরা সেপাইদের যুদ্ধ হয়েছিল না। তা সেই যুদ্ধেরই একটা কামান মাটির তলায় চাপা পড়েছিল। আমি মাটি-টাটি খুঁড়ে নিয়ে এসেছিলুম। ভেবেছিলাম আপনাদের দশজনের বাড়ি থেকে লোহা-লক্কড় যা সরিয়েছি তার সঙ্গে ওটাও কালোয়ারদের কাছে বিক্রি করে দেব।

তারপর?

সবে বলদের পিঠ থেকে ছালায় মোড়া জিনিসটা আমার বাড়ির উঠোনে নামিয়েছি, দেখি কি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তান্ত্রিক মশাইয়ের পালকিটা এসে আমার সামনে মাটি ছুঁল। আমাদের চোরেদের এমনিতে ভূত-প্রেতে ভয়টা কমই থাকে। রাতের অন্ধকারে ঘোরাফেরা কি না। কিন্তু অস্বীকার করব না, তিনু তান্ত্রিককে দেখে আমারও বুকটা ভয়ে দুরদুর করে উঠেছিল। তখন রাত দুটো বাজে। একটা কুকুর অবধি কোথাও জেগে নেই। উনি খবর পেলেন কেমন করে যে, আমি এইমাত্র বাড়ি পৌঁছলাম?

যাই হোক, তিনি সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন। বললেন, কানাই, কামানটার ওজন কত?

আমি বললাম, ছোট কামান, তার ওপরে জং লেগে আর্ধেকটা ক্ষয়ে গেছে। কত আর হবে, এই ধরেন তিরিশ সের।

শুনে তান্ত্রিকমশাই ভারি খুশি হলেন। বললেন, বাঃ, বাঃ। ঠিক যেমনটা চাইছিলাম। তা, কত হলে এটা আমায় বেচবি?

আমি বললাম, দু-টাকা দেবেন।

চণ্ডী মণ্ডপের লোকজন কানাইয়ের কথা শুনে আঁতকে উঠল। বলল, সে কী রে কানাই? অমন মানুষের থেকে তুই পয়সা চাইলি? বুকের পাটা তো কম নয়!

কানাই বলল, তা বললে কেমন করে হবে? ব্যবসার ব্যাপারে কাউকে কিছু ছাড়া যায় না কি?

যাগগে, যাগগে। তারপর কী হল, বল।

তারপর আর কী হবে? কামানটাকে উনি একবার চাপড়ে দিয়ে বললেন, যা, যা। আমার মন্দিরের উঠোনে গিয়ে বস। আমি আসছি। অমনি সেই তিরিশ সের ওজনের লোহার কামান দিব্যি পোষা পায়রার মতন উড়তে উড়তে ভূতচণ্ডীর দিকে চলে গেল আর তিনিও ধুতির খুঁট থেকে আমাকে দুটো টাকা দিয়ে পালকি চড়ে আশ্রমের দিকে রওনা দিলেন।

তারাপদ নাপিত বলল, শুনলেন তো! মিথ্যেই আপনারা গোলার ভয় পাচ্ছিলেন। ওই জং ধরা কামান থেকে গোলা ছোঁড়া যায়? আর তা ছাড়া, তিনুমশাইয়ের যদি আমাদের বলি চড়ানোর ইচ্ছেই থাকত তাহলে কি আর মিছিমিছি দু-টাকা খরচা করতেন? অনুস্বর, বিসর্গদের হাতে তিনটে খাঁড়া আর হাঁড়িকাঠ দিয়ে পাঠিয়ে দিলে ওরাই তো রাতারাতি কাজ সেরে ফিরে যেত।

গ্রামের মোড়লরা সমস্বরে প্রশ্ন করলেন, সে তো ঠিক কথাই, কিন্তু তাহলে কামান কেনার উদ্দেশ্য?

তারাপদ মিচকে হেসে বলল, এটাও বুঝলেন না? পরশপাথর।

অ্যাঁ!

আজ্ঞে হ্যাঁ, আমাদের ঘরে আর কতটুকু লোহা থাকে বলুন। যেটুকু থাকে—এই ধরুন ছুরি-কাঁচি-বঁটি পেরেক—ওগুলো তো আবার সোনায় বদলে গেলে কাজে লাগবে না। তাই তিনু তান্ত্রিক তিরিশ সের বাতিল লোহা কিনে রাখলেন আর কি। পরে সময় মতন তিরিশ সের সোনা বানিয়ে বিক্কিরি করবেন—এই বলে তারাপদ তার নাপিতের বাক্সটা গুছিয়ে নিয়ে হাটতলার দিকে হাঁটা লাগাল।

তবে সমস্ত জল্পনা কল্পনাকে সত্যি বলে প্রমাণ করে দিলেন তিনু তান্ত্রিক নিজেই। মৃত্যুর ঠিক আগে, যখন তাঁকে ঘিরে ধরে গ্রামের লোকেরা হা-হুতাশ করছে, তখন হঠাৎই একবার বন্ধ চোখ দুটো খুলে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সূত্র লেখা পুঁথিটা যে কোথায় হারিয়ে ফেললাম। আমার অত বড় কাজটা আর শেষ হল না।

রাসু মণ্ডল এবং অন্যান্যরা তাই শুনে তিনু তান্ত্রিকের মুখের কাছে কান নামিয়ে এনে জিগ্যেস করলেন, কী বানাচ্ছিলেন ঠাকুরমশাই? জিনিসটা কী?

কিন্তু আর কোনও কথার উত্তর দেওয়ার আগেই তিনু তান্ত্রিকের প্রাণটা বেরিয়ে গেল। তবে তার শেষ কথা থেকে এইটা আর কারুর বুঝতে বাকি রইল না, যে তিনি সত্যিই পরশপাথর বানানোর কাজেই মশগুল ছিলেন।

দেখতে দেখতে তিনু তান্ত্রিকের হারানো পুঁথির গল্প চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল—সেই পুঁথি, যাতে পরশপাথর তৈরির সূত্র লেখা আছে। ওই ভিটের মধ্যেই কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই সেই পুঁথি রয়ে গেছে। তা ছাড়া আর যাবে কোথায়?

সেই পুঁথির খোঁজে বহু লোক তিনু তান্ত্রিকের ভিটেয় লুকিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। বহু বছর কেটে গেলেও এখনও মাঝেমধ্যে দু-একজন হাড়হাভাতে লোক যে অমন চেষ্টা করে না তা নয়। তবে দুশো বছর আগেই হোক বা এখন, সকলের ভাগ্যেই ভূতের কিল জোটে। আর সে কিল খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতন মানুষ এখনও জন্মায়নি। অতএব তিনু তান্ত্রিকের ভিটে তার ভাঙাচোরা দেয়াল আর ঘন জঙ্গলে ভরা বাগানের আড়ালে সমস্ত রহস্যকে লুকিয়ে দুশো বছর ধরে ভূতচণ্ডীর শ্মশানের ধারে একইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

তিন

চৌপটনাথের বয়েস সতেরো বছর তিন মাস। তার আসল নামটা যে কী, সেটা এখন বলা মুশকিল। যখন সে ছোট ছিল তখন থেকেই বেনারসের লোকজন তাকে চৌপটনাথ বলে ডাকে, কারণ, যে কাজেই সে হাত দেয় সেই কাজই 'চৌপট' মানে গণ্ডগোল হয়ে যায়।

কাজ বলতে গবেষণা। মানুষের কাজে লাগে এরকম নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কারের চেষ্টা।

কাশীর গোধূলিয়া মোড় থেকে যে সরু গলিটা এঁকেবেঁকে বিশ্বনাথের মন্দিরের দিকে চলে গেছে, সেই গলিরই মাঝামাঝি জায়গায় একটা বহু পুরোনো বাড়িতে বাবা-মা'র সঙ্গে চৌপটনাথ বাস করে। তার চারিদিকে যারা থাকে তারা কেউ মন্দিরের পাণ্ডা, কেউ ব্যবসায়ী আবার কেউ স্রেফ মাস্তান। এরকম পরিবেশে বড় হয়েও চৌপটনাথের মাথায় কেমন করে যে গবেষণার ভূত চাপল সেটাই একটা গবেষণার বিষয়। তবে চৌপটনাথের বাবা বলেন, এটা তাদের রক্তে আছে।

চৌপটনাথের প্রতিভার পরিচয় গোধূলিয়ার লোকজন প্রথম পেয়েছিল যখন তার বয়েস মাত্র দশ। ঘটনাটা এইরকম—

কাশীর গলিতে অনেক বেওয়ারিস ষাঁড় ঘুরে বেড়ায়। শুধু ঘুরেই বেড়ায় না, তারা সরু গলি আটকে শুয়েও থাকে। যুগ যুগ ধরে সেইসব ভয়ালদর্শন কিন্তু ভদ্র ষাঁড়দের পাশ কাটিয়েই মানুষজন যাতায়াত করেছে। কিন্তু চৌপটনাথের মাথায় হঠাৎ ভূত চাপল, কাশীর গলিকে ষাঁড় মুক্ত করতে হবে।

চৌপটনাথ বইপত্তর ঘেঁটে দেখল, ষাঁড় ভয় পায় একমাত্র সিংহকে। অতএব সে অনেক মাথা-টাথা খাটিয়ে একটা ভেঁপু বানাল যেটার আওয়াজ না কি সিংহের ডাকের মতন। একটা ষাঁড় চৌপটদের বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে জাবর কাটছিল। চৌপট এক্সপেরিমেন্ট করার জন্যে তার কানের কাছে গিয়েই সেই সিংহমার্কা ভেঁপুটা পুরোদমে বাজিয়ে দিল। সিংহের ডাক তার পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউই শোনেনি, তবে সে ডাক যে এরকম হতে পারে না সেটা তারা তক্ষুনি বুঝে গেল। কারণ, ভেঁপু থেকে যে আওয়াজটা বেরোল সেটা অনেকটা ইলিচ মিলিচ কিলিচ ধরনের। সেই আওয়াজ শুনে ষাঁড়টা নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল আর প্রায় একই সঙ্গে চারিদিকে সমস্ত বাড়ির ছাদ পাঁচিল বারান্দা দুপদাপ হুমহাম শব্দে কাঁপতে লাগল।

বেনারসে শুধু ষাঁড়ই থাকে না, অজস্র হনুমানও থাকে। দেখা গেল চৌপটনাথের অদ্ভুত ভেঁপু সারা শহরের সমস্ত হনুমানকে সেই গলির মধ্যে টেনে এনেছে। ব্যাপারটা কী হল বুঝতে না পেরে চৌপটনাথ আরও একবার ভেঁপুতে ফুঁ দিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা গোদা হনুমান তুড়িলাফ মেরে এগিয়ে এসে এক চড়ে চৌপটনাথকে মাটিতে শুইয়ে দিল। তারপর শয়ে শয়ে হনুমান মিলে সেই গলিতে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করে দিল। যেসব পাড়া-প্রতিবেশী চৌপটনাথের ষাঁড় তাড়ানো দেখতে এসেছিল তারা কেউই আস্ত বাড়ি ফিরতে পারল না। কারুর একগোছা চুল, কারুর আধখানা কান হনুমানদের মুঠোয় রয়ে গেল।

পরে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির এক প্রাণীবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাউন্ডপ্রূফ ল্যাবরেটরির মধ্যে ভেঁপুটাকে বাজিয়ে পরখ করে বলেছিলেন, ওর আওয়াজটা অবিকল ছানা হনুমান বিপদে পড়লে যেরকম শব্দ করে বাবা-মাকে ডাকে সেইরকম।

সেই ঘটনায় কিংবা দুর্ঘটনায় চৌপটনাথের আবিষ্কারের উৎসাহে একটুও ভাঁটা পড়েনি। বছরতিনেক বাদে সে বানিয়ে ফেলল জিলিপি ভাজার মেশিন। গোধূলিয়া মোড়ের বিখ্যাত তেওয়ারি ব্রাদার্সের মিষ্টির দোকানে প্রথম দুদিন সেই মেশিন দারুণ কাজ করল। গরম ঘিয়ের কড়াইয়ের ওপর জিলিপি-মেশিন নিজে থেকেই ঘুরে ঘুরে, সবেদার গোলা ফেলে, পরের পর জিলিপি ভেজে চলল। শুধু তাই নয়, ভাজা হওয়ার পর রোবট-মেশিন নিজেই সেই জিলিপি তুলে রসের কড়াইয়ে ডোবাল, আবার রস থেকে তুলে প্লেটে প্লেটে সাজিয়েও দিল। একজন ময়রা যতক্ষণে কুড়িটা জিলিপি ভাজে, চৌপটের মেশিন সেই একই সময়ে একশোটা জিলিপি ভেজে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল।

এখানেই শেষ নয়, চৌপটনাথের আশ্চর্য মেশিনে চিরকালের চেনা প্যাঁচালো চেহারার বদলে নানান ডিজাইনের জিলিপি তৈরি হতে লাগল। হাঁস, হাতি, ফুল, পাতা—যে যেরকম বলছে চৌপটনাথ মেশিনকে সেইভাবে অ্যাডজাস্ট করে দিচ্ছে, আর সেইরকম ডিজাইনের জিলিপি তৈরি হচ্ছে।

তেওয়ারি ব্রাদার্সের মালিক বদ্রিনাথ তেওয়ারি আনন্দের চোটে চৌপাটনাথকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাল শিবরাত্রি। কাল তোমার এই আশ্চর্য মেশিন আমি সারা কাশীর লোককে দেখাব, তারপর তোমার নাম নোবেল প্রাইজের জন্যে পাঠাব।

শিবরাত্রির সন্ধেয় গোধূলিয়া মোড় লোকে লোকারণ্য। বিনা পয়সায় জিলিপি খাবার লোভে হাজারখানেক মানুষ জড়ো হয়েছে। তার মধ্যে ভয়ংকর বদমেজাজি সাধুও রয়েছে প্রায় শ'খানেক। সবকিছু ভালোই চলছিল। জিলিপি মেশিনে হু-হু করে নানান নকশার জিলিপি তৈরি হচ্ছিল। লোকের হাতে হাতে মুহূর্তের মধ্যে সেসব জিলিপি ভ্যানিশও হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একজন ভারি নামজাদা সাধুর কি খেয়াল হল, তিনি চৌপটকে বললেন, বেটা ইধার আও।

চৌপট ভয়ে ভয়ে সাধুবাবার দিকে এগিয়ে গেল।

সাধুবাবা তাকে হিন্দিতে যা বললেন তার অর্থ হল, বেটা, আমার অনেকদিনের ইচ্ছে জিলিপির প্যাঁচ দিয়ে আমার নাম লেখা হবে। সেই জিলিপি আমি ঠাকুরকে উৎসর্গ করব। ময়রারা লেখাপড়া জানে না, তাই আমার এই ইচ্ছে পূরণ করতে পারেনি। তুমি লেখাপড়া জানা ছেলে। জিনিয়াস। একবার চেষ্টা করে দ্যাখো তো পারো কি না।

চৌপট জিগ্যেস করল, আপনার নাম কী বাবা?

পরমন্তপ অষ্টাবক্র গৌরমণ্ডলেশ্বর ত্যাগপুণ্যব্রত।

চৌপটনাথ কাষ্ঠ হেসে বলল, এ আর কঠিন কাজ কী? পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার মেশিনকে এমন অ্যাডজাস্ট করে দিচ্ছি যে সে জিলিপি দিয়ে আপনার নাম লিখে দেবে। পাঁচ মিনিট নয়, পনেরো মিনিট ধরে মেশিনে নানারকম খুটখাট করে কপালের ঘাম মুছে চৌপটপাথ উঠে দাঁড়াল। বলল, হ্যাঁ, রেডি।

বদ্রিনাথ তেওয়ারি খুব ভক্ত মানুষ। পরমন্তপ মহারাজের মতন এমন মহাত্মার আশীর্বাদ পাওয়ার আশায় সে প্রায় পুকুরের মতন বড় একটা কড়াইয়ে এক কড়াই ঘি গরম করে জিলিপি মেশিনের নীচে বসিয়ে দিয়ে বলল, হ্যাঁ, বেটা চৌপট। তুমি নিশ্চিন্তে এই পুরো কড়াই ভরে ওনার নাম লিখে দাও।

চৌপটনাথ মেশিনের বোতাম টিপল। ক্যাঁ ক্যাঁ ক্যাঁ করে একটা কানফাটানো আওয়াজ হল। তার পরেই সেই রোবট-মেশিন এক বালতি জিলিপির গোলা তুলে সোজা পরমন্তপ মহারাজের দিকে ছুঁড়ে দিল। সেখানেই শেষ নয়, এর পরে দুটো লোহার হাত দিয়ে গোলায় চোবানো মহারাজকে তুলে ধরে সেই মেশিন ফুটন্ত ঘিয়ের কড়াইয়ের দিকে নিয়ে চলল। ভাগ্যিস বদ্রিনাথ তেওয়ারি ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে মেন সুইচ অফ করে দিয়েছিল, না হলে সেদিনই পৃথিবীতে প্রথম মানুষের পুরভরা জিলিপি ভাজা হত। এর পর থেকে পরমন্তপ মহারাজের চেলারা রাস্তাঘাটে যেখানেই চৌপটনাথকে দেখতে পেত সেখানেই তাকে ত্রিশূল নিয়ে তাড়া করত।

তখন থেকেই তার চৌপটনাথ নামটা চালু হয়ে গেল।

চৌপটের দু-একটা এক্সপেরিমেন্ট যে সফল হয়নি তা নয়। যেমন, পেঁয়াজ কাটবার সময় যাতে চোখে জল না আসে সেইজন্যে সে একটা চমৎকার গ্যাসমুখোশ আবিষ্কার করেছিল। তা ছাড়া অনেক লোকই চান করবার আগে চশমা খুলে রেখে তারপর আর সেটা খুঁজে পায় না। এদিক হাতড়ায়, ওদিক হাতড়ায়। তাদের জন্যে সে একটা ছোট্ট টিপের মতন অ্যালার্ম আবিষ্কার করেছিল, যেটা চশমার ডাঁটিতে লাগিয়ে রাখলে পাঁচমিনিট অন্তর-অন্তর জলতরঙ্গের মতন আওয়াজ করে বাজতে থাকবে। ফলে চশমা হারিয়ে ফেলার আর কোনও ভয় থাকবে না। কিন্তু এসব জিনিস তৈরি করার খরচ এত বেশি পড়ে গিয়েছিল যে লোককে সস্তায় দেওয়া যেত না। দাম শুনে চৌপটের প্রতিবেশী গিন্নিরা বলেছিল, তার চেয়ে আমরা বরকে দিয়ে পেঁয়াজ কাটিয়ে নেব আর কর্তারা বলেছিল, আমরা বউকে দিয়ে বিনা পয়সায় চশমা খুঁজিয়ে বার করব।

মোট কথা চৌপটের আবিষ্কারগুলো একেবারেই জনপ্রিয় হল না।

উপরন্তু চৌপটনাথ হায়ার সেকেন্ডারিতে দারুণ রেজাল্ট করা সত্ত্বেও আইআইটি-র এনটেন্স পরীক্ষায় পাশ করতে পারল না। চৌপটনাথের মনে বড় ধাক্কা লাগল। তা ছাড়া অনেকদিন থেকেই তার মনে হচ্ছিল বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে বসে থেকে কোনওদিন কেউ কোনও মহৎ কাজ করতে পারেনি। সব মিলিয়ে সে ঠিক করল গৃহত্যাগ করবে।

গৃহত্যাগ তো করবে, কিন্তু যাবে কোথায়? এসব ক্ষেত্রে অর্ধেক লোক যায় হিমালয়ে সন্ন্যাসী হতে আর অর্ধেক লোক যায় মুম্বই, ফিল্মস্টার হওয়ার জন্যে। এরমধ্যে কোনওটাই চৌপটনাথের পছন্দ ছিল না। জিলিপি কাণ্ডের পর থেকে সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর তার ভারি অ্যালার্জি জন্মে গিয়েছিল। জটা দেখলেই মাথা চুলকোত। আর ফিল্মস্টার হতে গেলে যেরকম লম্বা-চওড়া চেহারা লাগে তাও তার ছিল না। তা ছাড়া সে তো চায় আবিষ্কারক হতে। তার জন্যে দরকার নির্জন জায়গা আর যথেষ্ট টাকাপয়সা। সেসব কোথায় পাওয়া যাবে?

হঠাৎই চৌপটের মনে পড়ে গেল, ছাদের ঠাকুরঘরে ঠাকুরের আসনের পাশে রেখে দেওয়া তামার বাক্সটার কথা।

ওই বড়সড়ো বাক্সটা নিয়েই না কি তার দাদুর দাদু দুশো বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়ে এই বেনারসে চলে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার মা। তারপর থেকে পুরুষানুক্রমে চৌপটনাথদের বাড়িতে ওই বাক্সটা পুজো পেয়ে আসছে। ওই বাক্সের মধ্যে সেই অতিদূর পূর্বপুরুষের স্মৃতিজড়ানো কিছু জিনিসপত্র রয়েছে। ওই বাক্সটায় হাত ছেঁয়ানোর ব্যাপারে বাড়ির গুরুজনদের কড়া বারণ ছিল। চৌপট সে বারণ কোনওদিন অমান্য করেনি। তবে আজ তার মনে হল, অত পুরোনো বাক্স যখন, তখন খুঁজলে কি ওর মধ্যে দু-চারটে সোনার মোহর-টোহর পাওয়া যাবে না?

যদি যায়, তাহলে আপাতত পথখরচ আর ছোটখাটো একটা ল্যাবরেটরি তৈরির খরচা উঠে যাবে। তাহলে সে আর একদণ্ডও এই বাড়িতে থাকবে না।

দুপুরে বাবা যখন অফিস চলে গেলেন আর মা একটা সিরিয়াল দেখতে দেখতে টিভিটা চালিয়ে রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন, তখন চৌপটনাথ পা টিপে টিপে ঠাকুরঘরে গিয়ে সেই কলঙ্কধরা তামার বাক্সটা খুলে ফেলল।

বাক্সের ভেতরে দুশো বছরের পুরনো বাতাস বন্ধ হয়ে ছিল। প্রথমেই সেই বাতাসের ভ্যাপসা গন্ধ চৌপটের নাকে ধাক্কা মারল। তারপর চৌপটনাথ ভেতরের জিনিসগুলো একে একে বার করে মেঝের ওপর সাজিয়ে রাখল। একটা দশ-বারো বছরের ছেলের মাপের ছোট ছোট ফতুয়া আর ধুতি কয়েকটা। সেই মাপেরই খড়ম। গুলতি, লাট্টু, মার্বেলের গুলি এরকম কয়েকটা খেলার জিনিস। এত বাজে বাজে জিনিস কেমন করে যে তার বাড়ির লোকজন এতদিন ধরে জমিয়ে রেখেছে তাই ভেবেই চৌপট অবাক হয়ে গেল। সবচেয়ে নীচে রাখা ছিল একটা মাটির দোয়াত আর খাগের কলম। দোয়াতটার কালি অনেকদিন আগেই শুকিয়ে খড়খড়ে হয়ে গেছে। আর ছিল অনেকগুলো তালপাতার পুঁথি।

চৌপটনাথ আগে কখনও তালপাতার পুঁথি দেখেনি। তাই সে একটু আগ্রহ নিয়ে সেগুলো উলটে পালটে দেখতে শুরু করল। একটু বাদেই আগ্রহ হারিয়েও ফেলল অবশ্য। কারণ পুঁথিগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল সেগুলোতে ওই বাচ্চা ছেলেটাই দেবনাগরী আর ফারসিতে হাতের লেখা প্র্যাকটিস করেছে। বাচ্চা ছেলেটা যে কে, সেটাও চৌপটনাথের বুঝতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। পুঁথির মলাটে নাম লেখা ছিল—চতুরনাথ দেবশর্মা। ইনিই চৌপটনাথের সেই পূর্বপুরুষ, যিনি বাংলাদেশ ছেড়ে উত্তরপ্রদেশে চলে এসেছিলেন।

হতাশ চৌপটনাথ সমস্ত জিনিসপত্র আগের মতোই বাক্সের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখতে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা পুঁথির দিকে তার চোখ পড়তেই সে চমকে উঠল। এই পুঁথির মলাট দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, অন্য পুঁথিগুলোর থেকে এটা একেবারেই আলাদা। জ্বলজ্বলে খয়েরি রঙের একরকমের কালিতে মুক্তোর মতন হস্তাক্ষরে সেই মলাটের ওপর লেখা আছে ত্রিনাথ রুদ্রের পুঁথি।

সেই পুঁথি হাতে নিয়ে আধো অন্ধকার ঠাকুরঘরের মেঝেয় বহুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইল চৌপটনাথ। ঠাকুমার মুখে অনেকবার সে শুনেছে এই পুঁথির গল্প। তাদের বহু আগের পূর্বপুরুষ ত্রিনাথ তান্ত্রিক না কি এই পুঁথি হারিয়ে যাওয়ার শোকে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগেও তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, পুঁথিটা হারিয়ে যাওয়ার ফলেই তিনি পরশপাথর তৈরি করে যেতে পারলেন না। তার মানে তিনি যখন পুঁথির খোঁজে আশ্রম তোলপাড় করছিলেন তখন সেই পুঁথি তার ছেলের পাঠশালার বইখাতার মধ্যে মুখ গুঁজে বসেছিল। ভাবো কাণ্ড একবার।

চৌপটনাথ খুব সাবধানে পুঁথির প্রথম পাতাটা ওলটাল। দেখল পুরোনো আমলের বাংলা হরফে সেই পাতায় লেখা আছে—যাহার স্পর্শ মাত্রে সকলই নবীন হইয়া উঠে তাহারই আবিষ্কার কল্পে সাধনা শুরু করিলাম।

শেষ পৃষ্ঠায় লেখা—অতএব ইহাই সেই সাত রাজার ধন এক মানিকের প্রস্তুত প্রণালী।

চৌপটনাথ মেঝেতে একটা ডিগবাজি খেল। তারপর ঠাকুরের আসনের পাশ থেকে মায়ের লক্ষ্মীভাঁড়টা নিয়ে স্কুলব্যাগে ঢোকাল। পুঁথিটা ওই ব্যাগে পুরে নিল। নীচে নেমে ওই একই ব্যাগে চটপট দু-চারটে জামাকাপড়, টুথব্রাশ আর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির প্যাকেটটাও ভরে নিল। তারপর সাবধানে বাড়ির সদর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে, পায়ে হেঁটেই রওনা দিল বেনারস স্টেশনের দিকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই একটা হাওড়া যাওয়ার ট্রেন আছে। সেটা বর্ধমান হয়েই যায়।

চার

অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু পা দোলানো থামিয়ে চটপট পাকুড় গাছের ডাল থেকে মাটিতে নেমে পড়ল। প্রভু ফিরে এসেছেন।

অনুস্বর, চন্দ্রবিন্দুর পাঁজরে একটা খোঁচা মেরে জিগ্যেস করল, ওনাকে এত ঝকমকে লাগছে কেমন করে বল তো? চুলটুল সব কালো হয়ে গেছে, গালের চামড়া টান টান! মনে হচ্ছে বয়েসটাও সিকিভাগ হয়ে গেছে।

চন্দ্রবিন্দু বলল, স্বর্গ থেকে ঘুরে এলেন, ঝকমকে লাগবে না? মনে কর, ধোপার বাড়ি থেকে যখন কাপড়চোপড় ধোলাই ইস্তিরি হয়ে ফিরে আসে, তখন কেমন দেখতে লাগে?

বিসর্গ আর অনুস্বর তাই শুনে গম্ভীরভাবে মাথা দুলিয়ে বলল, তা ঠিক।

সত্যিকারের ত্রিনাথ রুদ্র তো আর স্বর্গ থেকে ফেরেননি, ফিরেছে তার অধস্তন দশম পুরুষ চৌপটনাথ রুদ্র। সে সারা রাত বিচ্ছিরি একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে কাঠের সিটে বসে কাটিয়েছে, শোবার জায়গা পায়নি। দুপুরবেলা বর্ধমানে স্টেশনে নেমে বাসি কচুরি আর আলুরদম খেয়েছিল। তার পর থেকেই ভয়ংকর পেট কামড়াচ্ছে। সেই অবস্থাতেই ভিড়ে ভরতি বাসে ঝুলতে ঝুলতে হিজলতলা।

হিজলতলায় নেমে একজন দোকানদারকে জিগ্যেস করেছিল, আচ্ছা, ত্রিনাথ রুদ্রের আশ্রমটা কোনদিকে বলতে পারেন? সেই দোকানদার বেশ সন্দেহ মেশানো চোখে তাকিয়ে উল্টো প্রশ্ন করেছিল—কেন ভাই, সেখানে কী দরকার?

চৌপটনাথের মাথা খুব সাফ। চটপট উত্তর দিয়েছিল, না, মানে ওই মন্দিরে আমার মায়ের বহু পুরোনো একটা মানত ছিল কি না। আমি পরীক্ষায় পাশ করলে ঠাকুরকে বাতাসা ভোগ দেবেন। সেই বাতাসা নিয়েই এসেছিলাম।

লোকটা চিন্তিত মুখে বলেছিল, বাতাসা কি তারা খাবেন? কাঁচাখেকো দেবতা সব। যাই হোক, এনেছ যখন দিয়ে এসো। ওই দিকে দু-মাইল হাঁটলেই দেখতে পাবে, ঢিবির মাথায় ভাঙা ঘরবাড়ি। ওটাই তিনু তান্ত্রিকের ভিটে।

এই অবধি শুনেই চৌপটনাথ চলে যাচ্ছিল। সেই দোকানদার দোকানের বাইরে গলা বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, শোনো ভাই, দৌড়ে যাবে আর ছুটে ফিরে আসবে। প্রয়োজনের বেশি এক মিনিটও থাকবে না। জায়গাটার ভয়ংকর বদনাম।

সেই কথা শুনে চৌপট তখন মনে মনে হেসেছিল। ভেবেছিল, গাঁয়ের লোকগুলোর ভারি কুসংস্কার। তবে এখন এই সন্ধের মুখে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঢিপির মাথায় উঠেই সে যে পরিস্থিতির সামনে পড়ে গেল, তাতে তাকে মানতেই হল ব্যাপারটা কুসংস্কার নয়। আশ্রমের ভেঙে পড়া পাঁচিলের গায়ে ঝুলে পড়া দরজা। সেই দরজা পেরিয়ে ভেতরের উঠোনে পা দেওয়া মাত্র তিনটে কঙ্কাল কোথা থেকে দৌড়ে এসে তাকে ঘিরে ধরল। অজ্ঞান হওয়ার জন্যে যেটুকু সময় লাগে সেটুকুও চৌপটনাথ পেল না। তার আগেই একটা কঙ্কাল তার গায়ে একটা দামি কিন্তু ছেঁড়া শাল জড়িয়ে দিল। আরেকটা কঙ্কাল তার জুতো জোড়া পা থেকে খুলিয়ে ওইরকমই বহু পুরোনো একজোড়া চটি পরিয়ে দিল। তৃতীয় ভূতটা একটা রূপোর ঘটিতে করে হাত মুখ ধোয়ার গরম জল এনে তার সামনে রাখল।

চৌপাটের সারা শরীরে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। তবু তার মধ্যেও সে খেয়াল করে দেখল, ভূত তিনটের মধ্যে হিংস্রতার কোনও চিহ্নই নেই, বরং ওরা নিজেরাই যেন ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে। চৌপটের মনে পড়ে গেল ঠাকুমার কাছে শোনা তিনু তান্ত্রিকের গল্পগুলো। তিনু না কি তিনটে ভূতকে চাকর বানিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। তাদের দিয়ে যাবতীয় কাজকর্ম করাতেন এবং কাজে ভুল হলে ভয়ানক শাস্তি দিতেন। তাদের নাম ছিল অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু।

এরাই তাহলে সেই তিন ভূত? এরা নিশ্চয় তাকে তিনু তান্ত্রিক বলে ভুল করেছে। সেইজন্যেই ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। চৌপট মনে মনে ভাবল, নাঃ এদের ভুলটা ভাঙানো একেবারেই উচিত হবে না। কে বলতে পারে, ভুলের সঙ্গে সঙ্গে তার ঘাড়টাও ভেঙে যাবে না। অতএব, নিতান্তই পরীক্ষামূলকভাবে চৌপটনাথ গলা তুলে হাঁক ছাড়ল—এই-ই বেয়াদপ! ঘরদোর এত নোংরা করে রেখেছিস যে? যা, এক্ষুনি পুরো বাড়িটা ঝাঁট-পাট দিয়ে পরিষ্কার কর!

বলা মাত্রই তিন ভূত যেন তিনটে ঘূর্ণিঝড়ের মতন তিনু তান্ত্রিকের ভিটের আনাচে-কানাচে বাঁই-বাঁই করে একবার পাক খেয়ে এল। ভূতেদের কাজের দক্ষতা সম্বন্ধে চৌপটের কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। খুব কম মানুষেরই থাকে। সে মুগ্ধ হয়ে গেল। দু-মিনিটের মধ্যে পুরো ভিটে ছবির মতন পরিষ্কার করে দিয়ে তিন ভূত তার সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়াল। চৌপট ভারীক্কি সুরে বলল, বাঃ! বেশ বেশ, এবার আমাকে একটু চানের...।

চানের জায়গাটা দেখিয়ে দাও, বলতে গিয়েও চৌপট চটপট সামলে নিল। নিজের বাড়ির চানের জায়গা ভুলে যাওয়াটা ঠিক কথা নয়। তাই সে ভেবেচিন্তে বলল চানের জল দে।

বড় বড় পেতলের বালতি ভরে চানের জল চলে এল। ব্যাগ থেকে তোয়ালে বার করে চৌপট দেখল, সাবান আনা হয়নি। সে গলা তুলে ডাকল, চন্দ্রবিন্দু, এই চন্দ্রবিন্দু!

নিজের গলার আওয়াজ শুনে চৌপটনাথ নিজেই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন কর্তৃত্বের সুরে সে কবে থেকে হাঁকডাক করতে শিখল? তিনু তান্ত্রিকের ভূত তার শরীরে ঢুকে যায়নি তো?

যাই হোক, তার ডাক শুনে চন্দ্রবিন্দু ছুটে এল। পাথরের মেঝের ওপর তার হাড়ের পায়ের খটখটানিটা শুনতে চৌপটনাথের মন্দ লাগল না। সবই অভ্যেসের ব্যাপার। বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভূতটাকে সে বলল, সাবান নিয়ে আয়।

ভূতটা মুহূর্তের মধ্যে একটা ভাঙাচোরা কামান এনে চানঘরের মেঝেয় সযত্নে নামিয়ে রাখল।

তিনু তান্ত্রিক যে কত দুঃখে মেজাজ হারাতেন, সেটা তার উত্তরপুরুষ হাড়ে হাড়ে টের পেল। চৌপটনাথ তারস্বরে চিৎকার করে উঠল।—কালার ডিম! তোকে কামান আনতে বলেছি? সাবান নিয়ে আয়, সাবাআআন!

তিন ভূত বোকার মতন দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চৌপট বুঝতে পারল, ভুলটা ওদের নয়। ভুলটা তার। দুশো বছর আগে শেষবারের মতন যখন ওরা তিনু তান্ত্রিকের হুকুম তামিল করেছে, তখন গ্রাম বাংলায় গায়ে মাখা সাবানের চল ছিল না। তাই ওরা সাবান চেনে না। মনে মনে একটু লজ্জা পেয়ে চৌপটনাথ বলল, যাগগে ছেড়ে দে। তার চেয়ে কিছু খাবারের ব্যবস্থা কর। বহোত ভুখ লেগেছে।

কী খাবেন প্রভু?—তিন ভূত সমস্বরে জিগ্যেস করল।

যা চাইব তাই পাওয়া যাবে না কি? প্রশ্নটা করে ফেলেই মনে মনে জিভ কাটল চৌপট। ভুলেই গিয়েছিল যে, সে এখন তিনু তান্ত্রিকের রোলে অভিনয় করছে, আর তিনু তান্ত্রিকের তো জানা উচিত কী পাওয়া যাবে আর কী পাওয়া যাবে না! অতএব সে তাড়াতাড়ি কথা পাল্টিয়ে বলল, বেশি কিছু খাব না। একটু বেনারসের কচুরি আর রাবড়ি নিয়ে আয়।

তিন ভূত অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত বাদে তারা আবার ফিরেও এল। দালানের এক কোণে আসন পড়ল, রুপোর থালা গ্লাস সাজানো হল। সেই আসনে চৌপটনাথ বসার পরে অনুস্বর তার থালায় গরম গরম কচুরি তরকারি আর রাবড়ি পরিবেশন করল। চৌপটনাথ অবাক হয়ে দেখল, তাদের বাড়ির মুখের সেই বিখ্যাত মিষ্টির দোকান তেওয়ারি ব্রাদার্সের প্যাকেট থেকে অনুস্বর খাবার বার করছে।

হঠাৎ চৌপটের মনে পড়ে গেল, দুশো বছর আগে বেনারসে একটাই মিষ্টির দোকান ছিল, সেটা ওই তেওয়ারি ব্রাদার্স। তার মানে কি ভূতগুলো টাইম-ট্র্যাভেল করেছে? দুশো বছরের ওদিকেই শুধু যাতায়াত করতে পারে ওরা? তার চেয়ে আধুনিক কোনও সময়ে ওদের প্রবেশ নিষেধ?

হতে পারে। ওদের শক্তি তো আসলে তিনু তান্ত্রিকের শক্তি। তিনুর সেই শক্তি ছিল দুশো বছর আগে অবধি। অতএব তার এদিকে অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দুর নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই।

চমৎকার খাঁটি ঘিয়ে ভাজা কচুরি আর আসল গোলাপি আতরের গন্ধে ভুরভুর রাবড়ি খেতে খেতেও চৌপটনাথের মনে একটু দুঃখ হল। সবে সে প্ল্যান করছিল, ভূতগুলোকে দিয়ে কয়েকটা ব্র্যান্ডেড জুতো আর টি-শার্ট আনাবে! বোঝাই যাচ্ছে সে আশায় চিটেগুড়। এরা ধুতি খড়ম ছাড়া কিছুই আনতে পারবে না। তবু পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে খাওয়াদাওয়ার পর চৌপটনাথ বিসর্গকে হুকুম করল একটা ঘড়ি নিয়ে আয় দেখি।

যা ভেবেছিল তাই। বিসর্গ মুহূর্তের মধ্যে একটা বালিঘড়ি নিয়ে চলে এল। দুশো বছর আগের জিনিস।

রাজকীয় পালঙ্কে শুয়ে চৌপটনাথ সেই বালিঘড়িটাকে একবার সোজা একবার উপুড় করে খেলা করতে করতে কখন যে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিল তা সে নিজেই জানে না। ঘুম ভেঙে প্রথমেই চৌপটের চোখে পড়ল তিনখানা কঙ্কালের মুখ। হাউমাউ করে উঠতে গিয়েও সে জোর সামলে নিল। বুঝতে পারল, অভ্যেস হতে সময় লাগবে। ইতিমধ্যে অনুস্বর একজোড়া টকটকে লাল ধুতি আর চাদর তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, প্রভু, সন্ধ্যাপূজার সময় হল। আজ অমাবস্যা। নরবলির জোগাড় করব কি?

চৌপটনাথ লাল চাদরে মুখ লুকিয়ে কয়েকবার খাবি খেল। তারপর বলল, মায়ের আদেশ, আজ থেকে নরবলি বন্ধ। এমনকী পুজো-টুজোও আপাতত বন্ধ থাকবে।

তারপর একটু ভেবে যোগ করল, অবশ্য পাঁঠাবলিটা তোরা চালিয়ে যেতে পারিস। মাংসটা একটু ঝাল কম দিয়ে রান্না করবি।

তিন ভূত খুশি হয়ে দুশো বছরের ওপার থেকে কচি পাঁঠা খুঁজে আনতে বেরোল। সেই অবসরে চৌপটনাথ তার ব্যাগ থেকে তিনু তান্ত্রিকের জরাজীর্ণ পুঁথিখানা বার করে জানলার ধারে গিয়ে বসল।

টিলার মাথায় ঘর। জানলা দিয়ে অনেকদূর অবধি দেখতে পাওয়া যায়। চৌপটনাথ দেখল, সূর্যাস্তের শেষ আভাটুকু ভূতচণ্ডী নদীর জলে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। আশেপাশের বালুচর আর কাশঝোপ ক্রমশ ধূসর থেকে কালো হয়ে আসছে। হঠাৎ চারিদিকের নৈঃশব্দকে দুমড়ে-মুচড়ে তীব্রস্বরে ক'টা শেয়াল কিছুক্ষণ ডেকে উঠেই আবার চুপ করে গেল। ভূতের সঙ্গেই আপাতত তার ওঠাবসা, তাই চৌপটনাথ ভূতের ভয় পেল না। কিন্তু অন্যরকম একটা ভয়ে তার শিরদাঁড়াটা শিরশির করে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, যদি ঠাকুমার গল্প সত্যি হয়? সত্যিই যদি ত্রিনাথ তান্ত্রিক অমর হন? যদি তিনি এই মূহূর্তে ফিরে এসে বলেন, কে রে তুই দুঃসাহসী কিশোর, আমার এই পবিত্র সাধনক্ষেত্রকে অপবিত্র করার স্পর্ধা দেখাচ্ছিস?

মনে মনে দুবার রামনাম জপ করে চৌপটনাথ সেই পুঁথিখানা খুলে আবার পড়তে বসল। পাতার পর পাতা শুধু নানানরকমের অজানা লতাপাতা, অজানা ধাতু, অজানা প্রাণীদের ঠোঁট পালক নখের বর্ণনায় ভর্তি। স্বর্ণগোধূমের গাছ কোথায় পাওয়া যায়? কৃষ্ণসীস কীরকম ধাতু? বাতুলমক্ষিকা মানে কী, পাগল মৌমাছি? অথচ এইসব মিশিয়েই না কি তিনু তান্ত্রিক তার সেই অদ্ভুত জিনিসটা বানিয়েছিলেন, 'যাহা হস্তগত হইলে বৃদ্ধ মানুষও ডিগবাজি না খাইয়া থাকিতে পারিবে না।' সে জিনিস পরশপাথর ছাড়া আর কী হতে পারে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পরশপাথর তৈরির এসব কাঁচামাল জোগাড় করবে কারা?

উত্তরটা কঠিন নয়। যারা তিনু তান্ত্রিকের জন্যে জোগাড় করেছিল তারাই চৌপটনাথের জন্যেও জোগাড় করে দেবে—অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু। সেই জন্যেই তো চৌপটনাথের বেনারস থেকে এখানে আসা। না হলে তো ওই পুঁথি মিলিয়ে ওখানে বসেই পরশপাথর বানিয়ে ফেলত।

হাতে পরশপাথর পেলে সে ঠিক ক'টা জিনসের প্যান্ট কিনবে আর ক'টা জুতো, সেটাই ভেবে ঠিক করতে পারছিল না চৌপটনাথ। না কি আস্ত একটা শপিং-মলই কিনে নেবে? ল্যাপটপ, কম্পিউটার, গেমস, মিউজিক সিস্টেম এগুলোর কথাও ভুললে চলবে না। আচ্ছা, একবার ওয়ার্ল্ড ট্যুর করে এলে কেমন হয়। পৃথিবীর যেখানে যা কিছু ভালো ভালো জিনিস সব প্লেনে চাপিয়ে...কিন্তু যদি প্লেনে অত কিছু নিয়ে উঠতে না দেয়?

ধুত্তেরি! তা হলে প্লেনটাই কিনে নেব।

আগামী দিনের সেই সুখের কথা ভাবতে ভাবতে চৌপটনাথ নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। কতক্ষণ ওইভাবে জানলার ধারে বসেছিল খেয়াল নেই। সাড় ফিরল মাংস রান্নার মনভোলানো গন্ধে। ভাগ্যিস দুশো বছর আগেও মানুষ পাঁঠার কালিয়া রাঁধতে জানত।

চৌপটনাথ হাত-মুখ ধুয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল। হাঁক ছেড়ে বলল, অনুস্বর, লুচি বানিয়েছিস?

পাঁচ

আরে, দাঁড়া দাঁড়া দাঁড়া। ব্যথায় মরে গেলাম যে।

পালকির ভেতরে বসে থাকা চৌপটনাথের চিৎকারে বাতাসের বুক দিয়ে ভেসে চলা ভূতের পালকি দমাস করে দাঁড়িয়ে গেল। সামনে থেকে চন্দ্রবিন্দু বিনীত স্বরে জিগ্যেস করল, কী হল প্রভু?

কী হল মানে? তিনজনে মিলে পালকি বইছিস কেন? সারাক্ষণ একপাশে কেতরে বসে থাকতে হচ্ছে। শিরদাঁড়ায় মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি মারছে। আরেকজন বেহারা কই?

বিসর্গ খুব অবাক হয়ে বলল, প্রভুর কি সব বিস্মরণ হয়ে গেল?

কী বিস্মরণ হবে? মেজাজ দেখিয়ে জিগ্যেস করল বটে চৌপটনাথ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে একটু ঘাবড়াল। বোঝাই যাচ্ছে চতুর্থ বেহারা না থাকার কারণটা তিনু তান্ত্রিকের জানা উচিত ছিল। কিন্তু সে তো আর সত্যিকারের তিনু তান্ত্রিক নয়।

মনে পড়ছে না প্রভু? খণ্ড ত-এর কঙ্কালের হাড়গুলো যে ক্যালসিয়ামের অভাবে নষ্ট হয়ে গেল। সব গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পড়ে গেল। আপনি তো কত করে বলেছিলেন একটু বেশি করে ডিম দুধ এইসব খেতে। কিন্তু সে তো শুনলই না। ইদিকে পালকির মধ্যে বাঁকাবিহারী হয়ে শুয়ে থেকে থেকে আপনারও সারা শরীরে বাত ধরে গেল।

চৌপট মনে মনে ভাবল, ও হো! তা হলে খণ্ড ত বলে একটা চার নম্বর কঙ্কালও ছিল?

মুখে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে। আসলে স্বর্গ থেকে ঘুরে আসার পরে দুঃখের কথা-টথাগুলো মাঝে-মাঝেই ভুলে যাচ্ছি দেখছি। যাই হোক। এখন আমাকে পালকি থেকে নাবা। একটু হাত-পাগুলো ছড়াই।

ভাসমান পালকি থেকে লাফ মেরে নেমে পড়ল চৌপটনাথ। এখানে আসার পরে পনেরো দিন কেটে গেছে। যখন এসেছিল, তখন ছিল অমাবস্যা। এখন পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় ভূতচণ্ডীর চারপাশটা চমৎকার দেখতে লাগছে। ঝির ঝির করে হাওয়া বইছে। একটা পাপিয়া পিউ কাঁহা পিউ কাঁহা বলে অবিশ্রান্ত ডেকে চলেছে। শ্মশানে একদল লোক মড়া পোড়াতে এসেছিল। তারা চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেল তিনু তান্ত্রিকের ভিটের দিক থেকে একটা পালকি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। তিলমাত্র দেরি না করে লোকগুলো বাপরে মারে বলে পিঠটান দিল। থামল গিয়ে একেবারে হিজলতলা গ্রামে। বলল, এতদিন বিশ্বাস করিনি, আজ স্বচক্ষে দেখলাম।

কী দেখলি রে—সবাই জিগ্যেস করল।

তিনু তান্ত্রিক ফিরে এসেছেন। দেখলাম তার ভূতের পালকি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে।

শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে গাঁয়ের স্কুলের হেডমাস্টারমশাইও ছিলেন। আর সকলে গাঁজা খেতে পারে, কিন্তু তিনি তো আর খাবেন না। তিনিও যখন একই কথা বলছেন, তখন বিশ্বাস না করে উপায় কী? অতএব হিজলতলার লোকেরা ভূত তাড়ানোর জন্যে অষ্টপ্রহর নাম-সংকীর্তনের ব্যবস্থা করল।

যাই হোক, সে তো হিজলতলার সমস্যা। তিনু তান্ত্রিকের ভিটেতে ওসব সমস্যার কোনও আঁচই পৌঁছয় না, কারণ ওই বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনও জ্যান্ত লোক আসে না। সেখানে চৌপটনাথ খাচ্ছে দাচ্ছে, মাঝে মাঝে বেনারসি ঘরানায় ঠুমরি গাইছে। অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দুও মালিকের এই খোশমেজাজ দেখে ভারি খুশি। তাদের আর আগের মতন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় না। পুজোপাট নরবলি-টলি বন্ধ। গরু-টরু আর নতুন করে কেনা হয়নি, তাই ঘুঁটেও দিতে হয় না। তারা যে গতজন্মে বাজনদার ছিল সেটা অনেকবছর বাদে চৌপটনাথের গান শুনে তাদের আবার মনে পড়ে গেল। যে যার বাজনা নিয়ে চৌপটের সঙ্গে সংগত করতে বসল। অনুস্বর তবলা বাজায়, বিসর্গ সারেঙ্গি আর চন্দ্রবিন্দু তানপুরা। খণ্ড ত বেঁচে থাকতে চমৎকার হারমোনিয়াম বাজাত। কিন্তু সে তো আর নেই। তার অভাবে অন্য তিনটে ভূত মাঝে মাঝে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদে, আর চৌপটনাথকে বলে, প্রভু আপনি আরেকটা ভূত নিয়ে আসুন। তাতে আপনার পালকিটাও ঠিক ঠিক সমানভাবে চলবে আর আমাদের গানের আসরটাও জমবে।

এই কথা শুনলেই চৌপটনাথ নার্ভাস হয়ে যায়। তার মনে হয় এরা যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে যে সে তিনু তান্ত্রিক নয়, মন্ত্রতন্ত্র কিছুই জানে না, তাহলে তক্ষুনি নিশ্চয় ওর ঘাড়টা মটকে ওই ভূতচণ্ডীর সাদা বালির চড়ায় বডিটা পুঁতে ফেলবে। কাজেই মিছিমিছি সাহস দেখিয়ে সে বলত, দাঁড়া দাঁড়া। সব মড়াতে কি ভালো চাকর হয়? দরকার গরুর গাড়ি চাপা পড়ে মরেছে এরকম একটা মৃতদেহ। খোঁজ পেলে বলিস, তক্ষুনি চাকর বানিয়ে ফেলব।

ভূত তিনটে তাই শুনে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। গরুর গাড়ি চাপা পরে মরবে এরকম লোক কি পৃথিবীতে আছে? আছে নিশ্চয়। না হলে আর প্রভু বলবেন কেন?

গরুর গাড়ি চাপা পড়ে মরা লোক খুঁজে না পেলেও, অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু কিন্তু তিনু তান্ত্রিকের পুঁথির লিস্টি মিলিয়ে মিলিয়ে পরশপাথর তৈরির মালমশলা প্রায় সবই জোগাড় করে ফেলল। কাজটা ওদের পক্ষে কিছুই কঠিন ছিল না। কারণ, এক তো আগে একবার তিনুর আমলে ওসব জিনিস জোগাড় করতে হয়েছিল। তা ছাড়া ওই লিস্টির মধ্যে কোনও জিনিসটাই আধুনিক নয়। অতএব জলা-জঙ্গল ঢুঁড়ে তারা লালহুতোমের লেজের পালক, চন্দ্রপর্পটির শেকড়, বেতো হিরার টুকরো সব জোগাড় করে এনে চৌপটনাথের গবেষণাগারে জড়ো করতে লাগল, আর চৌপটনাথ ওই পুঁথি দেখেই কখনও এটা গুঁড়ো করে, কখনও ওটা পুড়িয়ে কখনও অন্য একটা কিছুকে সেদ্ধ করে একসঙ্গে মিক্সিতে ঘুঁটে, রোদে শুকিয়ে, সে এক দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে তুলল।

আরও দিন পনেরো বাদে চৌপটনাথ বুঝতে পারল, তার কাজ প্রায় শেষের মুখে। কারণ, সমস্ত উপকরণ চিটেগুড়ের জলে ভিজিয়ে রাখার ফলে পাত্রের নীচের দিকে আস্তে আস্তে হলুদ সরের মতন কী যেন একটা জমছে। তিনু তান্ত্রিকের বক্তব্য যদি সত্যি হয়, তাহলে ওই সরের মতন জিনিসটাই সেই সাত রাজার ধন এক মানিক।

চৌপট বুঝতে পারছিল ওই জিনিসটাই আস্তে আস্তে কঠিন পরশপাথর হয়ে যাবে।

সে তো না হয় হল। কিন্তু তারপর সে কী করবে? এরকম মহা আশ্চর্য এক আবিষ্কারের কথা সারা পৃথিবীর লোককে জানাতে হবে তো। ঘুরে ঘুরে নিউ-ইয়র্কে, লন্ডনে, টোকিয়োয় ডেমনস্ট্রেশন দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা নিজের চারিদিকে বিশাল এক সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে হবে, না হলে পরশপাথর লুঠ হয়ে যাবে। সে মাত্র সতেরো বছরের ছেলে, অত সব কাজ একা হাতে করবে কেমন করে?

টিভি-ফিভি দেখে চৌপটনাথের ধারণা হয়েছিল প্রতিভাবানদের হয়ে এসব ঝামেলার কাজকর্ম সামলায় তাদের স্পনসর। তারাই টাকা ঢালে, কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়, ফাংশন-টাংশন অ্যারেঞ্জ করে, সিকিউরিটির ব্যবস্থাও তারাই করে দেয়। কিন্তু স্পনসরই বা চৌপটনাথ পাবে কোথায়? অতএব একদিন রাতে খেতে বসে সে অনুস্বরকে বলল, অনুস্বর একটা কাজ করতে পারবি?

হুকুম করুন প্রভু।

একটা স্পনসর ধরে আনতে পারবি?

কী বললেন আজ্ঞে?—অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু তিনজনেই তাদের করোটির কানের ফুটোগুলো চৌপটের মুখের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

স্পনসর স্পনসর। স্পনসর বুঝিস তো কাকে বলে?

তিন কঙ্কালেই এতখানি করে ঘাড় হেলাল। জিগ্যেস করল কবে লাগবে প্রভু?

কেন, দেরি হবে না কি?

সে তো একটু হবেই। অনেকখানি সময় উজিয়ে যেতে হবে কি না।

চৌপট একটু অবাক হয়ে ভাবল, স্পনসর জিনিসটা তো আধুনিক বলেই জানতাম। এরা আবার সময় উজিয়ে যাওয়ার কথা বলে কেন!

যাই হোক, শেষ অবধি তিন দিন চৌপটনাথকে ওই বাড়িতে একা রেখে, অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু একসঙ্গে স্পনসরের খোঁজে বেরোল। যাওয়ার আগে তারা চৌপটের জন্যে চেঙ্গিজ খানের রান্নাঘর থেকে খুব ভালো শুকনো মাংস আর তন্দুরি রুটি এনে দিয়েছিল। সে সব খাবার থলিতে নিয়ে চেঙ্গিজের সৈন্যরা দিনের পর দিন যুদ্ধ অভিযান চালাত। আর এ তো মাত্র তিনদিনের ব্যাপার। খাবার নষ্ট হল না।

তিন দিন কেটেও গেল ঠিকঠাক। চতুর্থদিন বিকেলে চৌপটনাথ একমনে তার গবেষণাগারে একটা কাচের জারকে খড়ের আগুনে গরম করছিল। ভেতরের লাল তরলটা আস্তে আস্তে বেগুনি রঙে বদলে যাচ্ছিল। একটু বাদে কাজ শেষ করে অবশিষ্ট খড়ের আঁটিটা চৌপটনাথ জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলবে বলে হাতটা বাড়ানো মাত্র জানলার বাইরে থেকে একটা বিশাল গরুর মতন মাথা ভারি আহ্লাদি মুখ করে তার হাত থেকে সেটা টেনে নিয়ে চোখ ঢুলুঢুলু করে চিবোতে শুরু করল।

চৌপটনাথ এত অবাক হল যে, খালি হাতটা গুটিয়ে নিতেও সে ভুলে গেল। দোতলার জানলায় গরু! তাও ঠিক স্বাভাবিক গরুর মতনও লাগছে না তো! গরু যদি তো শিং কই? তা ছাড়া মুখটাই বা ওরকম হালকা সবুজ আঁশে ঢাকা কেন?

মুহূর্তের মধ্যে খড়ের আটিটা শেষ করে সেই সবজেটে গরুটা মাথাটা জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।

চৌপট রিফ্লেক্স অ্যাকশনে পেছিয়ে গেল। কিন্তু পেছিয়ে গিয়েও কি নিস্তার আছে? মাথাটা তার দিকে এগোচ্ছে তো এগোচ্ছেই। ওদিকে পেছোতে-পেছোতে চৌপটের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল। ততক্ষণে প্রায় পনেরো ফুট লম্বা একটা গলা ঘরের ভেতরে ঢুকে এসেছে। ওই গলার আরও কতটা তখনও বাইরে রয়েছে কে জানে!

জন্তুটা খড়খড়ে জিভ বার করে চৌপটনাথের গালটা চেটে দিল। তারপর বিছানা থেকে একটা বালিশ মুখে করে তুলে নিয়ে আবার গলাটা গুটিয়ে মাথাটাকে ঘরের বাইরে বার করে নিল। ভয়ের চোটে চৌপটনাথের কী যেন একটা মনে পড়ি পড়ি করেও মনে পড়ছিল না। হঠাৎই তার কানে এল খ্যা, খ্যা, খট খট করে বিচ্ছিরি হাসির শব্দ। কঙ্কাল ছাড়া ওরকম বিশ্রী হাড়ের খটখটে আওয়াজ করে কেউ হাসতে পারে না। ঘাড় ঘুরিয়ে চৌপটনাথ দেখল, তিন ভূত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুলে দুলে খুব হাসছে। নিশ্চয় তার ভয় দেখে মজা পেয়েছে।

রাগে চৌপটনাথের গা জ্বলে উঠল। সে খেঁকিয়ে উঠে জিগ্যেস করল, ওটা কী?

যেটা মনে পড়ছিল না, সেটাই অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু একসঙ্গে বলে উঠল—কেন প্রভু, ডায়নোসর।

ডায়নোসঅঅঅর! চৌপট নিজের মাথার চুল খামচে ধরে ছাদ সমান লাফ দিল। কে তোমাদের ডায়নোসর আনতে বলেছে, উজবুক কাঁহিকা?

কেন প্রভু, আপনিই তো বললেন।

ডায়নোসর আনতে বলেছিলাম? স্পনসর, স্পনসর খুঁজে আনতে বলেছিলাম। ওঃ ভগবান, এ আমি কোন কালা এবং মুর্খদের হাতে এসে পড়লাম। চৌপটের হাত-পা ছড়িয়ে বসে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তার সময় পেল না। বালিশটা খেয়ে সেই তৃণভোজী ডায়নোসর নিশ্চয়ই খুব তৃপ্তি পেয়েছিল। সে ভুররর করে একটা ডাক ছাড়ল। তারপর আবার লম্বা গলাটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। এবার লক্ষ খাটের তোশক।

চৌপটনাথ এগিয়ে আসা মাথাটাকে পাশ কাটিয়ে ঘরের বাইরে এল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এক দৌড়ে পেছনের বাগানে চলে গেল, যেখানে ডায়নোসরটা দাঁড়িয়ে ছিল। প্রাণীটাকে গোটাগুটি দেখবার লোভ সে সামলাতে পারছিল না। পেছনের বাগানে পৌঁছে সে দেখল দেখবার মতোই একটা চেহারা বটে সেটার। অন্তত চল্লিশ ফুট উঁচু। তার মধ্যে গলাটাই হবে বিশ ফুট। পুরো শরীরটাই সবজেটে আঁশে ঢাকা। মুখটা একটু থ্যাবড়া আর নাকের ফুটোদুটো মস্ত বড় হওয়ার জন্যে প্রাণীটার মুখে সবসময়েই বেশ একটা মজা পাওয়ার ভাব লেগে আছে।

ডায়নোসরটা আড়চোখে চৌপটকে একবার দেখে নিয়ে খুব সাবধানে মাথাটাকে বিশ ফুট উঁচু থেকে জমির কাছে নামিয়ে আনল, তারপর আলতো করে তার পায়ে ঘষে দিল। সঙ্গে গুররর করে সেই ডাক। হঠাৎ চৌপটের খুব মায়া পড়ে গেল প্রাণীটার ওপর। সে বেশ বুঝতে পারছিল, অত বড় চেহারা হলেও এ একটা হরিণের থেকেও বেশি নিরীহ। সম্ভবত ভীতুও, না হলে তাদের গায়ে গায়ে ঘুরবে কেন, কবেই তো মাঠঘাট ভেঙে দৌড় দিত।

ভেজা ভেজা ঠান্ডা ঠান্ডা মাথাটায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চৌপটনাথ ডাক দিল—দীনু, দীনু!

ডায়নোসরটা সাড়া দিল—গুরররর।

চোখটা একটু ভিজে উঠল চৌপটের। কাশীর বাড়িতে তার পোষা নেড়িকুত্তার নাম দীনু। তাদের বাড়ির রোয়াকেই বেশিরভাগ সময়ে দীনু শুয়ে বসে থাকে। চৌপট যখনই বাইরে থেকে ফেরে তখনই তার গায়ের ওপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে আহ্লাদের একশেষ করে দেয়।

কতদিন চৌপটনাথ সেই দীনুকে দেখেনি। সেইজন্যেই বোধহয় ভগবান এই দীনুকে পাঠিয়ে দিলেন। চৌপটনাথ অনুস্বর, বিসর্গকে ডেকে বলে দিল দীনুর জন্যে ভালোমন্দ কিছু খাবার নিয়ে আসতে। ভূতেরা বলল, যে আজ্ঞে।

পরদিন ভোরে হিজলতলার কানাই মণ্ডল দাঁতন করতে করতে উঠোনের বাইরে বেরিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। বাড়ির উল্টোদিকেই তার একটা আড়াই বিঘের কলাবাগান ছিল। কাল রাত অবধিও ছিল। এখন আর সেটা নেই। জায়গাটা নিকোনো উঠোনের মতন তকতক করছে।

ছয়

স্পনসর তো পাওয়া গেল না। এ দিকে পরশপাথর নিয়েও একটু ঝামেলা হয়েছে। জারের নীচে জমে থাকা সেই হলদে মতন চিটচিটে জিনিসটা কিছুতেই তো শক্ত হচ্ছে না।

সেদিন দুপুরে চৌপটনাথ আবার তিনু তান্ত্রিকের পুঁথি নিয়ে বসল। খুঁটিয়ে সবক'টা পাতা পড়ে দেখল, তিনু তান্ত্রিক কোথাও বলেননি যে, জিনিসটা পাথরের মতোই হবে। চৌপটনাথ মনে মনে ভাবল, তাহলে হয় তো তিনি পরশপাথরের বদলে পরশ মলম আবিষ্কার করেছিলেন। সে যাই হোক, জিনিসটার ছোঁয়ায় লোহা সোনা হলেই হল। পাথর হল কি মলম হল, তা নিয়ে চিন্তা কীসের?

কম্পিত বক্ষে চৌপটনাথ ডাক দিল—অনুস্বর! বিসর্গ! চন্দ্রবিন্দু!

বারান্দার একদিকে রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে তিন ফালি রোদ্দুর এসে পড়েছিল। সেই রোদ্দুরের ফালি তিনটে মুহূর্তের মধ্যে জমাট বেঁধে তিনটে কঙ্কাল হয়ে গেল। উত্তর এল—বলুন প্রভু।

একটু লোহা এনে দিতে পারবি? স্যাম্পেলটা টেস্ট করে দেখব।

মোয়া বললেন? খইয়ের মোয়া না চিড়ের মোয়া প্রভু?

চৌপটের মাথাটা আবার চড়ৎ করে গরম হয়ে গেল। সে তারস্বরে চেঁচাল—মোয়া নয়, লোহা লোহা। আয়রন স্টিল, ইস্পাত।

ভয়ের চোটে তিন ভূত রেলিং টপটে নীচে লাফিয়ে পড়ল। একটু বাদেই ফিরেও এল অবশ্য। বিসর্গের হাতে বলির খাঁড়াটা।

চৌপটনাথের রাগ পড়ে গেল। হাত বাড়িয়ে খাঁড়াটা নিয়ে বলল, এই তো বেশ বুদ্ধি আছে। এবার এখানে বসে দেখ, কীরকম ম্যাজিক হয়। লোহার খাঁড়া কীরকম সোনা হয়ে যায়। এই বলে জারের তলা থেকে সেই হলুদ মলম হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে খাঁড়াটার গায়ে ঘষে ঘষে মাখাতে লাগল।

কিছুই হল না। লোহার খাঁড়া লোহারই রয়ে গেল। চৌপটনাথ ফ্যালফ্যাল করে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, তারপর নিজের ঘরে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সেদিন চন্দ্রবিন্দু শখ করে মাগুর মাছের হিংলি আর ঘি-ভাত বানিয়েছিল। কিন্তু চৌপটনাথ খেতেই নামল না।

সারা রাত বসে বসে চৌপটনাথ তিনু তান্ত্রিকের পুঁথির সঙ্গে নিজের কাজ মিলিয়ে দেখল। সমস্ত স্টেপগুলো বার বার চেক করল। কোথাও কোনও খুঁত খুঁজে পেল না। তাহলে কেন পরশ মলম কাজ করছে না? কিছুই বুঝতে না পেরে চৌপটনাথের মাথা গরম হয়ে উঠল। এরকম আশ্চর্য পুঁথি ক'জন হাতে পায়? সে কি সেই পুঁথি পেয়েও কিছু করতে পারবে না। ছোটবেলা থেকে তাকে যে আত্মীয়স্বজন পাড়াপড়শি সকলে চৌপটনাথ বলে ডাকে, সে কি সত্যিই তাই? পরশপাথর বানানোর স্বপ্নটাও কি শেষ অবধি চৌপট হয়ে যাবে?

গরম মাথায় ভোরের হাওয়া লাগানোর জন্যে চৌপটনাথ জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছুটা দূরে নদীর ধারে দীনু ঘাড় উঁচু করে একটা তালগাছের পাতা চিবোচ্ছিল। সেখান থেকেই সে ঠিক দেখতে পেল চৌপট জানলার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। মহা উল্লসিত হয়ে যে ঘোয়াক ঘোঁৎ শব্দ করতে করতে, ঘাড় দোলাতে দোলাতে এদিকে দৌড়ে এল। কাছাকাছি এসেই দীনু অভ্যেস মতন আদর খাবার জন্যে জানলা দিয়ে মাথাটা ভেতরে গলিয়ে দিল। চৌপট অবাক হয়ে দেখল, দীনুর কুলোর মতন কানটা ধরে একটা রোগামতন লোক ঝুলছে। লোকটার বয়েস হবে চল্লিশ-বিয়াল্লিশ।

ঘরের মধ্যে দীনু তার মাথাটা গলানো মাত্র লোকটাও হাত ছেড়ে দিয়ে ঝপাস করে ঠিক চৌপটের সামনে মেঝেতে ল্যান্ড করল। তারপর লুঙ্গির পেছনটা হাত দিয়ে ঝেড়েঝুড়ে ভারি স্মার্ট ভঙ্গিতে চৌপটের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলল, গুড মর্নিং।

গত একমাসে চৌপট এই প্রথম জ্যান্ত মানুষের মুখ দেখল। ভারি অবাক হয়ে সে বলল, মর্নিং। দীনুর মাথায় উঠলেন কেমন করে?

দীনু কে? ওই গোসাপটা বুঝি? আরে ওর মাথায় উঠব কেন? উঠেছিলাম তো তালগাছের মাথায়, তাড়ির হাঁড়ি পাড়তে। হঠাৎ এই গোসাপটা এসে গাছটাকে ধরে এমন ঝাঁকাতে শুরু করল যে, পড়ে যাই আর কি। বাধ্য হয়ে ওনারই কানটা জাপটে ধরে ঝুলে পড়লাম।

চৌপটের বেশ লাগছিল লোকটাকে। কেমন যেন ঢুলু ঢুলু চোখ। তার ওপরে একটা চল্লিশ ফুট উঁচু ডায়নোসরকে যে লোক গোসাপ ভাবতে পারে, সে তো খুব একটা সাধারণ মানুষ নয়। তাই চৌপট খাটের একটা পাশ ঝেড়েঝুড়ে তাকে বলল, বসুন না। একটু আলাপ করি। আপনার নাম কী? থাকেন কোথায়?

আমার নাম নিশিপদ প্রামাণিক। গ্রামের লোক আদর করে নেশাপদ বলে ডাকে।

কেন, নেশাপদ বলে কেন?

ওই-ই-ই, একটু নেশাভাঙ করে থাকি কিনা। লাজুক হেসে মাথা চুলকে বলল নিশিপদ। তারপর চৌপটকে চমকে দিয়ে বলল, আপনি যেমন তিনু তান্ত্রিকের বংশধর, আমিও তেমনি তারাপদ নাপিতের বংশধর।

অবাক চৌপটনাথ বলল, আপনি বুঝলেন কেমন করে আমি ত্রিনাথ রুদ্রের বংশধর?

ওই দ্যাখো। আমি কি ভূত না কি, যে এই সামান্য কথাটা বুঝব না?

চৌপট চট করে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল, অনুস্বর বিসর্গরা কাছাকাছি আছে কি না। নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, আর কী জানেন?

সবই জানি। রোজই ওই তালগাছে হাঁড়ি পাড়তে যাই, আর আপনার কাণ্ড-বাণ্ড আড়চোখে দেখি আর হাসি। খুব উঠেপড়ে লেগেছেন পরশপাথর বানানোর জন্যে।

পরশপাথরের কথাও জানো?

এই দেখুন। আপনি তো হাসালেন আমাকে। আমার পনেরো পুরুষ আগের পূর্বপুরুষ তারাপদ প্রামাণিক আর আপনার পনেরো পুরুষ আগের পূর্বপুরুষ ত্রিনাথ রুদ্র, দুজনের ভারি ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল সে কথা জানেন না?

চৌপটনাথ বলল, সত্যিই জানতাম না। ঠাকুমা কোনওদিন বলেননি আমাকে।

আহা, কেউ না বললেও একটু কমনসেন্স অ্যাপ্লাই করবেন তো। ভেবে দেখুন, আর সমস্ত কাজ ভূতকে দিয়ে হয়, একটি বাদে। কী কাজ বলুন তো?

কী কাজ?

দাড়ি কামানো। তিনু তান্ত্রিক মরে গেলেও কখনও অনুস্বর বিসর্গদের ক্ষুরের সামনে নিজের গলা বাড়িয়ে দিতেন না। বলা কি যায়, কখন রাগের চোটে কুচ করে নলিটি কেটে দেয়। তাই দাড়ি কামানোর জন্যে তার প্রতিদিন তারাপদ নাপিতকেই দরকার পড়ত। দাড়ি কামাতে কামাতে আমাদের দুই পূর্বপুরুষে অনেক সুখ-দুঃখের কথা হত।

চৌপটনাথ জিগ্যেস করল কেমন সুখ-দুঃখের কথা? তিনু তান্ত্রিকের কোনও দুঃখ ছিল না কি?

নিশিপদ হেসে বলল, আপনি তো বাচ্চা মানুষ, তাই জানেন না। দুঃখ ছাড়া ভগবান কাউকে পৃথিবীতে পাঠান না। একটা বড় দুঃখ তো ছিলই, ওই যে ছেলে-বউ ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তা ছাড়া...।

তা ছাড়া?

তা ছাড়া আগে থেকেই ছিল আরেক কষ্ট—বাতের যন্ত্রণা।

বাত!

হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাত। অবাক হচ্ছেন কেন? শরীরটা তো তার মানুষেরই ছিল। সেই শরীরে অত তেঠ্যাঙা পালকি চাপা সহ্য হয়, বলুন তো। প্রতিদিন যদি মাইলের পর মাইল একদিকে হেলে তিন কঙ্কালের কাঁধে চড়ে অমন লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরতে হয়, তাহলে বাত ধরবে না?

ঠিক বলেছেন তো। উত্তেজনায় খাড়া হয়ে বসল চৌপটনাথ। একদিন ওই তেঠ্যাঙা পালকিতে চেপেছিলুম। আজ অবধি পাঁজরায় ব্যথা হয়ে রয়েছে। তা, আমার সেই অতি অতি অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহ নিজে অত বড় সাধক ছিলেন। একরকমের বৈজ্ঞানিকও বলা যায়। তা তিনি নিজের বাতের ব্যথার জন্যে কোনও চিকিৎসা বার করতে পারলেন না?

করেছিলেন, করেছিলেন। এমন কাণ্ড করেছিলেন যে, শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে। কথাটা জানতেন কেবল আমার সেই পূর্বপূরুষ—তারাপদ নাপিত। আর পুরুষাণুক্রমে আমরা, মানে প্রামাণিক ফ্যামিলির লোকেরা জানতাম। এতদিন অবধি বাইরের কাউকে এসব কথা বলিনি। তবে আপনার ব্যাপার আলাদা। রুদ্র বংশের রক্ত আপনার শরীরে বইছে। আপনাকে তো সব বলাই যায়। ট্র্যাকশান কাকে বলে জানেন?

ট্র্যাকশান? হঠাৎ করে নিশিপদর কথা ট্র্যাক বদলানোয় চৌপট ঘাবড়ে গেল। বলল, ওই যে হাত-পায়ের সঙ্গে নানারকম ওয়েট টোয়েট ঝুলিয়ে যে ফিজিওথেরাপি করে...?

এক্কেবারে সঠিক বলেছেন। শুনলে বিশ্বাস করবেন না, আজ থেকে দুশো বছরেরও বেশি আগে, এই বাংলাদেশে বসে, সেই মহাপুরুষ ট্র্যাকশানের পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। নিজে নিজেই ব্যথা কমানোর জন্যে ট্র্যাকশান নিতেন। তখন তো এতরকমের যন্ত্রপাতি ওঠেনি। নিজেই কুয়ো থেকে জল তোলার ওই চাকা, যাকে পুলি বলে, বিছানার খাটে সেই পুলি লাগিয়ে ওজন ঝোলানোর ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন।

ও হো হো! উত্তেজিত হয়ে বলল চৌপট। সেই বিছানা তো এখনও ওই ঘরে রয়েছে। আমি খালি অবাক হয়ে ভাবি, বিছানার ফ্রেমে কুয়োর চাকা লাগানো কেন?

বেশ, এবার তো বুঝলেন? তারপর শুনুন না। শুধু পুলি হলেই তো হল না, তার সঙ্গে ঝোলানোর ওজন তো চাই। তিনুমশাই হিসেব করে দেখেছিলেন, পায়ের সঙ্গে তিরিশ সের ওজন ঝোলাতে হবে। তবেই ব্যথা কমবে। তখনকার দিনে তো এত ডামবেল বারবেল ওঠেনি, তাই তারাপদ নাপিত বুদ্ধি বাতলে দিয়েছিলেন। তিনু তান্ত্রিক তার বুদ্ধিতেই কানাই চোরের কাছ থেকে একটা পুরোনো কামান কিনেছিলেন। সেই কামান পায়ে ঝুলিয়ে ট্র্যাকশান নিতেন।

নিশিপদর এই কথা শুনে চৌপটনাথ পাঁচ মিনিট হাঁ করে বসে রইল। তারপর কোনওরকমে বলল, আমাদের পরিবারে তো অন্যরকম গল্প চালু আছে। তিনি না কি পরশপাথর ঠেকিয়ে সোনা করবেন বলে ওই কামানটা কিনেছিলেন।

নিশিপদ খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলল, ধুর মশাই। ও গল্প তো তারাপদ নাপিতই বানিয়ে বানিয়ে সবাইকে শুনিয়েছিলেন। অত বড় একজন সাধক বাতের ব্যথায় ভুগছেন শুনলে লোকে ভক্তি শ্রদ্ধা করত? তার চেয়ে পরশপাথরের গপ্পটা অনেক বেশি, কী বলে রোমহর্ষক নয়?

এই অবধি শুনেই চৌপট হাত-পা নেড়ে চিৎকার করে উঠল। হতেই পারে না। পরশপাথর তিনি বানিয়েছিলেন, বানিয়েছিলেন, বানিয়েছিলেন। আমার কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে। এই দেখুন তিনু তান্ত্রিকের পুঁথি। ত্রিনাথের ছেলে চতুরনাথ রুদ্রের পড়ার বইয়ের সঙ্গে মিশে ভুল করে এই পুঁথি বেনারসে চলে গিয়েছিল। আমি খুঁজে পেয়েছি। এই দেখুন তিনি লিখেছেন...

কী লিখেছেন? মুচকি হেসে নিশিপদ জিগ্যেস করল। পড়ুন তো দেখি, কি লিখেছেন।

সমান তেজে চৌপটনাথ জবাব দিল—এই তো প্রথম পাতাতেই লিখেছেন, যাহার স্পর্শ মাত্রে সকলই নবীন হইয়া উঠে তাহারই আবিষ্কার কল্পে সাধনা শুরু করিলাম। শেষকালে লিখেছেন অতএব ইহাই সেই সাত রাজার ধন এক মানিকের প্রস্তুত প্রণালী। তা ছাড়াও লিখেছেন ইহা হস্তগত হইলে বৃদ্ধ মানুষও ডিগবাজি না খাইয়া থাকিতে পারিবে না।

তা এর মধ্যে পরশপাথরটা পেলেন কোথায় বলুন দেখি।

তা হলে যে সবাই বলে।

সে তো তারাপদ নাপিতের প্রচারের সুফল। আসলে আপনার পূর্বপুরুষ কী বানিয়েছিলেন জানেন? বাতের ওষুধ মশাই, বাতের ওষুধ। তাও এমনই দুর্ভাগ্য যে পুঁথিটা হারিয়ে যাওয়ায় সে ওষুধ আর নিজে ব্যবহার করতে পারলেন না। যাগগে আমি এবার উঠি। আর সকালের দিকে আপনার পোষা জীবটাকে যদি একটু বেঁধে রাখেন তাহলে বড়...এ কী! আপনি কাঁদছেন না কি? ব্যাপারটা কী বলুন তো?

সত্যিই চৌপটনাথ কাঁদছিল। এত বড় একটা স্বপ্ন যদি এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তাহলে কে না কাঁদবে? কিন্তু নিশিপদ অনেকক্ষণ ধরে তার কানে কানে কী সব বলল। কী জানি বোঝাল। একটু বাদেই দেখা গেল চৌপটনাথের মুখে হাসি আর ধরে না।

পরেরদিনই চৌপটনাথ তার স্কুলব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বর্ধমান স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। যাওয়ার আগে অনুস্বর, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দুকে সত্যিকথাটা বলেই গেল। বলে গেল যে, তাদের আর এখানে পড়ে থাকবার দরকার নেই, কারণ তাদের প্রভু অনেক বছর আগেই মারা গেছেন। তিনি আর ফিরবেন না। চৌপট তাদের এ-ও বলে গেল, সে তাদের তিনজনের নামে গয়ার পিণ্ডি দিয়ে দেবে। তাহলেই তারা মুক্তি পেয়ে যাবে। তবে তার আগে তাদের একটা কাজ করতে হবে। দীনুকে তার নিজের দেশে, নিজের কালে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে।

তিনু তান্ত্রিকের ভিটে ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় চৌপটনাথ তার জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটা করে গেল। কঙ্কালরা কাঁদতে পারে, ডায়নোসরও, যদিও তাদের কারুরই চোখ থেকে জল পড়ে না।

উপসংহার

তোমরা যদি এর পরে কেউ কাশী বেড়াতে যাও তাহলে উনিশ নম্বর গোধুলিয়া লেনের বাড়িটা একবার দেখে এসো। সেখানে আগের সেই দুশো বছরের পুরোনো বাড়িটা আর নেই। তার জায়গায় বিশাল ঝা চকচকে এক তিনতলা প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দিনে রাতে যখনই যাও, দেখবে সেই বাড়ির সামনে বাতের রুগিদের লম্বা লাইন লেগে আছে। ওই বাড়ি থেকেই বিক্রি হয় বাতের ব্যথার মহৌষধ—ত্রিনাথ তৈল।

স্যুট-প্যান্ট পরে যে দুজন মানুষ সব কিছুর তদারকি করে বেড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে একজন চৌপটনাথের বাবা। অন্যজনকেও একটু খেয়াল করলে চিনতে পারবে। হ্যাঁ, সেই নিশিপদ প্রামাণিক। তিনু তান্ত্রিকের পুঁথির ফর্মুলা মেনে এই ওষুধ তৈরির বুদ্ধিটা সেই তো চৌপটনাথকে দিয়েছিল।

চৌপটনাথ অবশ্য এখন বাড়িতে নেই। সে আই আই টি কানপুরে কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে। সেখানে সকলেই তাকে তার আসল নামে ডাকে—কৌস্তনাথ রুদ্র।

এত সবকিছু বলে দেওয়ার পরেও তোমরা যদি অবাক হয়ে ভাবো যে, বাতের তেলের প্যাকেটের ওপর একটা হাসিখুশি ডায়নোসরের ছবি কেন, তা হলে আমার আর কিছু বলার নেই।

অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%