নোদে ডাকাতের নবরত্ন

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

তার ভালো নাম নদীয়াচন্দ্র সর্দার। কিন্তু ব্যবহার হয় না বলে নামটা সে নিজেও বোধহয় ভুলে গেছে। চুনাবেড়িয়া, কাগজিবাগান, গাজনভেড়ি, বামুনচরা—সুন্দরবনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এরকম পনেরো বিশটা গ্রামগঞ্জের লোকের কাছে সে স্রেফ নোদে ডাকাত নামেই পরিচিত। নোদের নাম শুনলেই এ তল্লাটের লোকজন ভয়ে কাঁপতে শুরু করে।

নোদের গায়ে অসীম শক্তি। তার তিরিশজনের দলটিও সেইরকম। কেউ বাঘা লেঠেল, কেউ সড়কি চালানোয় ওস্তাদ, আবার কারুর সুনাম বল্লম ছোড়ায়। তবে লোকে বলে, নোদে ডাকাতের আসল শক্তি হল তার গুপ্তচর-বাহিনী। গ্রামে-গ্রামে, ঘরে-ঘরে, নোদের গুপ্তচর ছড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে কেউ বোষ্টম, কেউ বহুরূপী, কেউ পুরোহিত। জেলে, জোলা, কামার, কুমোর সবার মধ্যেই নোদে ডাকাতের চর লুকিয়ে রয়েছে। কোনো বাড়িতে পয়সাকড়ি জমা হলে মুহূর্তের মধ্যে নোদের কানে সেই খবর পৌঁছিয়ে যায়। তারপরেই হা রে রে রে রে।

নোদে ছোটবেলায় ক্লাস সেভেন অবধি লেখাপড়া শিখেছিল। যা শিখেছিল তার বেশিরভাগই সঙ্গে-সঙ্গেই ভুলে মেরে দিয়েছে। কিন্তু কেমন করে যেন মুঘল সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার কথাটা তার মনে একেবারে পাকাপাকিভাবে গেঁথে গিয়েছিল। স্কুল ছাড়ার পর নোদে যখন ক্যানিং ইস্টিশনে চায়ের দোকানে চাকরি নিল, তখনও সে রাত্তিরবেলায় প্ল্যাটফর্মে শুয়ে শুয়ে ভাবত, আমার যদি কোনওদিন অনেক পয়সা হয় তাহলে আকবরের মতন একটা নবরত্ন সভা বানাব।

এখন নোদের হাতে সত্যিই অনেক পয়সা। তার বয়সও হয়েছে বেশ। এখনো তাকে সেই নবরত্ন সভা বানানোর স্বপ্নটা ছেড়ে যায়নি। তাই পঞ্চাশ-বছরের জন্মদিনে নোদে তার শাগরেদদের এক জায়গায় জড়ো করে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিল। তাদের ভালো করে বুঝিয়ে দিল নবরত্ন সভা বস্তুটি কী, এবং সেটি বানানোর জন্যে কী কী করতে হবে।

শাগরেদরা নবরত্ন সভার প্ল্যান শুনে একটুও খুশি হল না। নোদের ডানহাত ছিল কানা তেওয়ারি। বাঁ-চোখটা কানা হলে কী হয়, তেওয়ারির গাদাবন্দুকের টিপ ছিল অব্যর্থ। তো সেই তেওয়ারিই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সর্দার, এইসব আর্টিস্ট-ফার্টিস্টগুলো অত্যন্ত ভালোমানুষ, কমজোরি আর ক্যাবলা হয়। পুলিশে তাড়া করলে এরা দৌড়তে পারবে না। ছোরাছুরি চালাতে পারবে না। এদের যদি দলে ঢোকান, তাহলে আমাদের দলটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

তেওয়ারির কথা শেষ হওয়ার পর নোদের আরেক শাগরেদ জীবন হাঁড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি যদি নবরত্নই বানাবেন তাহলে আমাদের এই লাইনে যারা রত্ন আছে তাদের নিয়েই বানান না। এই যে ছিঁচকে চোর শম্ভু পাড়ুই একটা কানখুসকি দিয়ে যে কোনো আলমারি, সিন্দুক কিংবা ব্যাঙ্কের ভল্ট চিচিং-ফাঁক করে দিতে পারে! সে কি মানসিং-এর থেকে কম রত্ন?

তারপর ধরুন গাজনভেড়ির তারক মান্না, যাকে লাইনের সবাই ট্রাক মান্না বলে ডাকে। সে হচ্ছে গাড়িচোর। ছোটখাটো গাড়ি নয়, মালভর্তি ট্রাকের দিকেই তারকের নজর। ওইজন্যেই ট্রাক মান্না নাম। পার্কিং করে রাখা ট্রাকের লক কেমন করে যে সে মুহূর্তের মধ্যে খুলে ফেলে সে এক রহস্য। আর তেমনি সাঙ্ঘাতিক তার ড্রাইভিং। চুরি করা গাড়ি নিয়ে তারক মান্না যখন ভাগে, তখন পুলিশের গাড়ি ফুল-ইস্পিডে তাড়া করেও তার টিকি ছুঁতে পারে না।

কাকে ছেড়ে কার কথা বলি বলুন? ধরুন সিঁদেল চোর চিড়েতন। একটা সরু সিঁদকাটি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বারো ইঞ্চি চওড়া পাথরের দেয়ালে সুন্দর সিঁদ কেটে দেবে। একটু আওয়াজ হবে না। ঘরের ভেতরে এক কণা ধুলো বালি ঝরে পড়বে না।

এই তো, নজনের মধ্যে তিনজনের নাম তো এখুনি বলে দিলাম। বাকিগুলো না হয় আমাদের মধ্যে থেকেই বেছে নিন। তা নবরত্নের দলে ঢুকতে পারলে ইনাম পাব তো সর্দার?

নোদে এতক্ষণ শান্তভাবে ওদের কথা শুনছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড চটে গিয়ে বলল, উল্লুক কাঁহিকা! চোর ছ্যাঁচড় আর ভদ্রলোকের তফাত বুঝিস না? সারাদিন তোদের সঙ্গে কাটিয়ে সন্ধের পরে নিজের সভাঘরেও কি চোর-ডাকাতদের নিয়ে বসব?

সবাই ভয়ে ভয়ে বলল, তাহলে?

সেখানে থাকবেন গায়ক। তিনি আমাকে গান শোনাবেন। থাকবেন কবি। কবিতা শোনাবেন। তারপরে কী যেন বলে? চিত্রকর। তিনি সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকবেন। এইরকম সব গুণী লোকজন দরকার। তোদের ঠিক একমাস টাইম দিলাম। তারমধ্যে যদি এরকম ন'টা গুণী লোককে ধরে নিয়ে না আসতে পারিস তাহলে আমি দল ভেঙে দিয়ে হংকং চলে যাব।

হংকং চলে যাওয়াটা অবশ্য নেহাত কথার কথা। সবাই জানে, নোদে মাতলা-নদীর ওপাড়ে যেতে ভয় পায়। আজ অবধি শেয়ালদা ইস্টিশন দেখেনি। ওর যত দাপট এই বাদাবন আর লাগোয়া গ্রামগুলোর মধ্যে। ওর দলের লোকজনের অবস্থাও তাই। সকলেই এই বাদাবনের বাঘ। বড় শহরে গেলে রাস্তা পেরোতে পা কাঁপে।

সেইটাই হয়ে গেল সমস্যা। ভগবানের এমন বিচার—যত বড়-বড় গাইয়ে, ফিল্মস্টার, আর্টিস্ট, লেখক, সবারই বাস যেন কলকাতা, বর্ধমান কিংবা শিলিগুড়ির মতন বড় শহরগুলোয়। কিন্তু তাদের তো নোদের সভায় তুলে আনা যাবে না। তাহলে উপায়?

কানা তেওয়ারি, জীবন হাঁড়ির মতন নোদের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ শাগরেদ বিস্তর মাথা-টাথা চুলকে ঠিক করল, অগত্যা লোকাল মাল দিয়েই কাজ চালাতে হবে।

স্থানীয় প্রতিভার খোঁজ শুরু হল।

নোদে সব শুনে বলল, যা করবি কর। কিন্তু একটা ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছি। মানী মানুষের সম্মান যেন নষ্ট না হয়।

পাঁচ শাগরেদের মাথায় দ্বিতীয়বার বাজ পড়ল। পুরো ডাকাতি-জীবনে একমাত্র শ্মশানকালীর পুরোহিতকে ছাড়া আর কাউকে তারা বিশেষ সম্মান টম্মান দেখায়নি। দেখানোর দরকারও পড়েনি। এখন কীসে কার সম্মানে আঘাত লাগবে সেই পাঠ তারা নতুন করে নেবে কার কাছে?

অনেক ভেবে-টেবে ওরা ঠিক করল, প্রাথমিক কাজটা ইনফর্মারদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হোক। ওরাই ঠিক করুক গুণী লোক কারা আছেন। তারপর না হয় তেওয়ারি কিংবা জীবন হাঁড়িরা ফিল্ডে নামবে।

ইনফর্মারের সেরা ইনফর্মার ছিল কঞ্চিভাঙা গ্রামের হিরু ঘটক। সত্তর বছরের ওপর বয়স। নাদুস নুদুস চেহারা। ধবধবে ফরসা গায়ের রং। পরনে আধ ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি। মুখে হাসিটি সবসময়ে লেগেই রয়েছে। দোষের মধ্যে কানে একটু কম শোনেন।

এই তল্লাটের সমস্ত লোকজন বিয়ের পাত্র-পাত্রী খোঁজার জন্যে হিরু ঘটকের ওপরেই চোখ বুজে ভরসা করে। সেইজন্যে সমস্ত বাড়িতে হিরু ঘটকের অবাধ যাতায়াত। বিয়ের যোগাড়যন্ত্র কেমন হল, কবে বরের বাবা মরাইয়ের ধান বিক্রি করে সিন্দুকে টাকা এনে তুললেন, কবে মেয়ের মা কলকাতার দোকান থেকে গয়না গড়িয়ে বাড়ির আলমারিতে এনে ঢোকালেন—এই সব খবরই ঘটক মশাইয়ের কাছে অনায়াসে পৌঁছিয়ে যেত।

আর তারপরেই সেইসব খবর পৌঁছে যেত নোদে ডাকাতের কানে।

কাকপক্ষীতেও জানত না হিরু ঠাকুরের রোজগারের এই দ্বিতীয় রাস্তার কথা। এমনকী তার স্ত্রী-ছেলেমেয়েও নয়। সেই হিরুকেই নিজেদের আস্তানায় ডেকে পাঠাল কানা তেওয়ারি।

সুন্দরবনের জঙ্গলের মধ্যে কম করে সাতখানা ডেরা আছে নোদে ডাকাতের। সরু সরু খালে নৌকা বেয়ে সেইসব ডেরায় পৌঁছতে হয়। পুলিশ তো কোন ছার, জঙ্গলের কাঠুরে বাউলে মউলেরা অবধি সে সব ডেরার রাস্তা চেনে না। এখন যেখানে নোদে তার দলবল নিয়ে রয়েছে সেই জায়গাটার নাম বাশুলির ঘাট। সরু একটা খালের ধারে ডাকাতকালীর মন্দির। মন্দির থেকে একটু দূরে পুরোনো আমলের একটা ভাঙা প্রাসাদকে সারিয়ে-সুরিয়ে নিয়ে ডাকাতের দল ডেরা বেঁধেছে। ওদের দলেরই তিনটে ছেলে কঞ্চিভাঙা থেকে হিরু ঘটককে ছিপ-নৌকায় চাপিয়ে সেখানে নিয়ে এল। তারপর হাজির করল কানা তেওয়ারির সামনে।

তেওয়ারি সরাসরি কাজের কথায় চলে এল। বলল, ঠাকুরমশাই, মিঞা তানসেনের নাম শুনেছেন?

বিতান সেন? শুনব না কেন? কঞ্চিপোতায় বাড়ি। শ্যামাপদ সেনের ছোট ছেলে। যেন বোম্বে ফিলিমের হিরো একখানি। সারাদিন চকরা-বকরা জামা গায়ে দিয়ে, বাইক নিয়ে ফটর ফটর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক পয়সা রোজগারের মুরোদ নেই, তবু বিতানের বাবুয়ানি দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যাবে। তা, তুমি কি তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ের দেওয়ার কথা ভাবছ না কি?

ওঃ! কেবল বাজে কথা! রাগে গরগর করে উঠল কানা তেওয়ারি। বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার কানটা একেবারে গেছে দেখছি। বিতান সেন নয়, বিতান সেন নয়। মিঞাআআ তাআআনসেন। আকবর নামে এক বাদশা ছিলেন। তাঁর সভার গাইয়ে ছিলেন ওই মিঞা। শুনেছেন তাঁর নাম?

না বাবা, শুনিনি। তা কী হয়েছে সেই তানসেনের? বিয়ে হচ্ছে না? বয়স কত হল? গোত্র কী? গান গেয়ে পয়সাকড়ি পায়?

তেওয়ারি কপাল চাপড়ে বলল, যাগগে, ছাড়ুন তার কথা। আপনি বলুন দেখি, ভালো গাইয়ে এ তল্লাটে কে আছে?

এতক্ষণে হিরু ঘটক একটু একটু গণ্ডগোলের আঁচ পেতে শুরু করেছেন। কানা তেওয়ারির কথাগুলো তো ঠিক পাত্রীর বাপের মতন শোনাচ্ছে না। তিনি বললেন, গাইয়ে দিয়ে কী করবে বাবা তেওয়ারি?

আপনার শ্রাদ্ধে কীর্তন গাওয়াব। এবার আর চাপা গরগর নয়, একেবারে বেঘো হুঙ্কার। যা বলছি জবাব দিন। কাছাকাছির মধ্যে ভালো গাইয়ে কে আছে?

হিরু ঘটকের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি তড়বড় করে বলতে শুরু করলেন, গাইয়ের সেরা গাইয়ে কড়াইপোঁতার জমিদারবাড়ির বড়কর্তা শ্রীবিন্দু লাহিড়ী। এদিকের যাত্রাপার্টির কথা ছেড়েই দাও, কলকাতার হরিশচন্দ্র অপেরায় অবধি এককালে বিবেকের ভূমিকায় গান গেয়ে আসর মাত করে দিতেন। এখন নেহাত বয়স হয়েছে, কলকাতা অবধি যাতায়াত করতে পারেন না, তাই। কিন্তু তবু বলব, মরা হাতি লাখ টাকা।

ব্যস, ব্যস। আর বলতে হবে না। এই মানকে। নোট করছিস?

ঘরের একপাশে মেঝেয় বসে একটা ছোকরা-ডাকাত কাগজ কলম নিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছিল। সে তেওয়ারির প্রশ্নে ঘাড় হেলাল।

আচ্ছা ঠাকুরমশাই, এবার বলুন, ছবি কে ভালো আঁকে?

এ আবার জিগ্যেস করতে হয়? কেন, তুমি করালি পেন্টারের নাম শোনোনি? এদিকের যত বাস, মিনিবাস, লরি, টেম্পো, ম্যাটাডোর দেখতে পাও, তাদের গায়ে যত চটিজুতো, পদ্মফুল, শিংওয়ালা রাক্ষস, শকুন্তলার হরিণ—সব ওই করালি কর্মকারের হাতের কাজ। করালি চকদিঘির মোড়ে একটা ছোট ঘরে বসে কাজ করে। দেখলেই চিনতে পারবে। ঘরটার সামনে সবসময় গাড়ির গাদি লেগে আছে।

আচ্ছা, এবার বলুন, কবি কে আছে?

হিরু ঘটকের মুখে এতক্ষণে একটু হাসি ফুটল। বললেন, কবির অভাব নেই। এই ব্লকেই সত্তরজন মতন আছে। সকলেই দাবি করে সেই-ই সেরা। তবে আমার মনে হয় আমাদের কঞ্চিপোতারই মেঘবাহন সাঁপুই নামে ছেলেটির লেখার হাত ভালো। আমার এক যজমানের জন্যে একটা বিয়ের কবিতা লিখে দিয়েছিল—'তুমি আমাদের বড় প্রিয় রাঙামামি/ কেন না আজকে যে হবে তোমার স্বামী/ সেই ভজা হল আমাদের রাঙামামা/ কিনে দিয়েছে সে আমাকে নতুন জামা।' কেমন?

তেওয়ারি বলল, আমার তো খুব চমৎকার লাগল। কেমন মামার সঙ্গে জামার মিল দিয়েছে! খুব শক্তিমান কবি। এখন নোদে সর্দারের কেমন লাগে কে জানে! যাগগে, ওটাকেই আপাতত তুলে নিয়ে আসি। এই মানকে, নাম-ঠিকানা নোট করেছিস?

'তুলে নিয়ে আসি' কথাটা শুনে হিরু ঘটক একবার জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। সন্ধেবেলার ঝুঁঝকো অন্ধকারে বাঁশবনের আড়ালে ডাকাতকালীর মন্দিরটা দেখা যাচ্ছে। শেষ বিকেলের একটা আলোর ফলা একেবারে সরাসরি হাঁড়িকাঠটার ওপরে এসে পড়েছে। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় জিগ্যেস করলেন, তুলে নিয়ে আসি মানে? লোকগুলোকে বলি দেবে না কি?

কানা তেওয়ারির ভালো চোখটায় আগুন জ্বলে উঠল। সে হিস হিস করে বলল, এদের বলি দেব কি না এখনও ভেবে দেখিনি। তবে আজ এখানে যা যা কথা হল, তার একটাও যদি বাইরে বেরোয়, তাহলে আপনার মুণ্ডুটা নির্ঘাত নামিয়ে দেব। এই মানকে, ঘটকমশাইকে নগদ বিদায় দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয়।

মানিকলাল নামে ছোকরা ডাকাতটা নোটবই রেখে হিরু ঘটকের হাত ধরে বলল, চলুন ঠাকুরমশাই।

দুই

কড়াইপোঁতা গ্রামের জমিদার শ্রীবিন্দু লাহিড়ীমশাই হাঁক পাড়লেন—কোই হ্যায়?

নিতান্ত অভ্যেসের বশেই আজও এরকমভাবে ডাকেন শ্রীবিন্দুবাবু। যেন আগেকার দিনের মতন তিরিশটা কাজের লোক আছে, ডাক শুনে তার মধ্যে যে কোনো একজন ছুটে আসবে। আসলে আছে তো শুধু সনাতন হালদার। সনাতনই বহুদিন ধরে জমিদারবাড়ির একমাত্র কর্মচারী। রাঁধুনি বলো রাঁধুনি, দারোয়ান বলো দারোয়ান, হুঁকোবরদার বলো হুঁকোবরদার। আবার মোসাহেব বললেই বা আটকাচ্ছে কে? তাই শুধু সনাতন বলে ডাকলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু ওই যে, অভ্যেস।

তা অন্যদিন 'কোই হ্যায়' ডাক শুনে ধীরেসুস্থে গামছায় হাত মুছতে মুছতে সনাতন দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। আজ সে এল না।

শ্রীবিন্দুবাবু প্রথমে চটে গেলেন। তারপরে ভাবলেন, এইরে! সনাতনকে নোদের দলবল মেরে ফেলেনি তো? তারপরেই মনে হল, ধুর, সনাতনকে মারবে এরকম লোক এখনো পৃথিবীতে জন্মায়নি। আসলে তার নিজের ডাকটাই যথেষ্ট জোরালো হয়নি। তিনি আরেকবার হাঁক পারলেন—কোই হ্যায়?

উঁহু। হচ্ছে না। সেই কালোয়াতি মেজাজটাই আসছে না। আসলে কাউকে যদি পায়ে দড়ি বেঁধে কড়িকাঠের সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তাহলে তার গলা থেকে কিছুতেই বাজখাই আওয়াজ বেরোতে পারে না। এই সত্যিটাই আজ ঠেকে শিখলেন কড়াইপোঁতার জমিদার শ্রীবিন্দু লাহিড়ী।

এমনিতে এই মুহূর্তে সনাতনকে যে শ্রীবিন্দুবাবুর খুব প্রয়োজন ছিল তা নয়। দরজায় খিল লাগানো হয়েছে কি না দেখার দরকার নেই, কারণ দুশো বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ির দরজা দুটোকে আজ একটু আগে নোদে এক লাথিতে ভেঙে ফেলেছে। হুঁকো সাজার তো প্রশ্নই ওঠে না। নীচের দিকে মুখ, ওপরদিকে ঠ্যাং, এই অবস্থায় হুঁকো খেতে গিয়ে গায়ে আগুন লেগে মরবেন না কি? ওসব কিছু নয়। কিন্তু একটা বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছেন তিনি। সেইজন্যেই সনাতনকে ডাকা। একটা ঘুরঘুরে-পোকা তখন থেকে তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে একবার করে পায়ের দিকে উঠছে আর একবার করে মাথার দিকে নামছে। ওই পোকাটাকে তাড়াতে পারলে বড় ভালো হত। সেইজন্যেই সনাতনের কথা মনে পড়ছিল।

শ্রীবিন্দুবাবু এবার চিঁ-চিঁ করে নিতান্ত সাধারণ মানুষের গলায় ডাকলেন, সনাতন! সনাতনরে! কোথায় গেলি বাপ?

এইবার একটি লোক দরজা দিয়ে উঁকি মারল। রোগা হিলহিলে গিরগিটির মতন চেহারা। মাথাজোড়া টাক, কিন্তু দু-কানে গোছা গোছা চুল। ভুরুদুটোও শুঁয়োপোকার মতন হৃষ্টপুষ্ট। কথা শুনে বোঝা গেল সে-ই সনাতন। চৌকাঠের ওপাশে দাঁড়িয়ে সনাতন উত্তর দিল, কোথায় আবার যাব? গোয়ালঘরে খড়ের গাদার মধ্যে লুকিয়ে বসেছিলাম। ওঃ, গা, হাত-পা একেবারে বিছুটির মতন চুলকোচ্ছে।

চুলকে নে, চুলকে নে। প্রাণভরে চুলকে নে। তারপর হাত খালি হলে আমাকে এখান থেকে নামা।

সনাতন বলল, এক্ষুনি কিছু করতে পারব না বড়কর্তা। আরো কিছুক্ষণ ওইভাবেই থাকতে হবে। নোদের চ্যালারা তো রণপায়ে চেপে চট করে ছাদের হুকে দড়ি পড়িয়ে আপনাকে টাঙিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু আমার তো আর পায়ে রণপা বাঁধা নেই। আমি ওই হুকের নাগাল পাই কেমন করে? বাজারে ইলেকট্রিকের দোকান থেকে একটা মই যোগাড় করে নিয়ে আসি। তারপর আপনাকে নামাচ্ছি।

শ্রীবিন্দুবাবু করুণ গলায় বললেন, তাহলে অন্তত ঘুরঘুরে পোকাটাকে পিঠ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে যা। প্রচণ্ড কাতুকুতু লাগছে যে। আর সইতে পারছি না।

একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে সনাতন শ্রীবিন্দুবাবুর জামার ফাঁক থেকে পোকাটাকে বার করে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর বলল, আর একটা কথা বলবার আছে।

বলে ফেল।

আপনার দোতলার ঘরের সিন্দুক...

আর বলিস না, আর বলিস না সনাতন! আর্তনাদ করে উঠলেন শ্রীবিন্দুবাবু। বুঝতে পারছি। ভেঙেছে। ভেঙে ভেতরের সব সোনা রুপোর মেডেল নিয়ে পালিয়েছে। ও হো হো হো। নোদে আমার এত বড় সর্বনাশ কেন করল রে? ওই মেডেলগুলো ছাড়া আমার আর কীই-বা আছে?

সনাতন ঝুলন্ত বড়বাবুর মুখটা তার কাঁধের গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে বলল, আগে থেকেই এত ভাবেন কেন বলুন তো? কিচ্ছু নেয়নি। সিন্দুক খুলেছে, কিন্তু ভেতরের একটা জিনিসেও হাত দেয়নি।

শ্রীবিন্দুবাবু একটা বিশাল হাঁফ ছেড়ে বললেন, নেয়নি? ওঃ, বাঁচালি সনাতন। কিন্তু কেন নেয়নি বল তো।

সনাতন নাক সিঁটকিয়ে বলল, কথাটা শুনতে কি আপনার ভালো লাগবে? আপনি যতই ওগুলোকে সোনা রুপোর মেডেল বলুন, আসলে তো সব ব্রোঞ্জ আর টিন। যাত্রার আসরে যারা আসে তাদের মধ্যে ক'টা লোক সোনা রুপো চোখে দ্যাখে বলুন তো যে, আপনার গান শুনে সোনা রুপোর মেডেল দেবে? ওইজন্যেই ওগুলো নেয়নি। কিন্তু কথাটা সেটা নয়। আসল কথাটা হল, সিন্দুকটা কেউ ভাঙেনি। ওটা খুলেছে।

শ্রীবিন্দুবাবু ঝুলন্ত অবস্থাতেই একটা খাবি খেলেন। বললেন, বলিস কি! আমার দাদুর আমলের ইম্পোর্টেড সিন্দুক। জার্মানিতে তৈরি। স্টিলের বডি, নম্বর মেলানো লক সেই লক নোদে খুলে ফেলল!

সনাতন বলল, বড়বাবু, ওটা নোদে ডাকাতের কাজ নয়। ওরা জানে কেবল হাতুড়ি শাবল দিয়ে পিটিয়ে ভাঙতে। এরকম সূক্ষ্ম কাজ ওদের দ্বারা হবে না। এ অন্য কোনো গুণধরের হাতের কাজ। আরেকটা কথা বলি। ডাকাতরা সামনে ছড়িয়ে থাকা দামি দামি থালা বাসন, ঝাড় লণ্ঠন, ফুলদানি, কিছুই যখন নিল না, তখন খামোকা ওপরের ঘরে গিয়ে সিন্দুক ভাঙতে যাবে কেন? ওরা তো এসেছিল আপনাকে নিয়ে যেতে।

তাহলে সিন্দুকটা কে খুলল? সেই লোক গেল কোথায়?

সেইটাই তো প্রশ্ন। ভারি চিন্তিত মুখে মাথা নাড়তে নাড়তে সনাতন মই আনবার জন্যে বাজারের দিকে হাঁটা লাগাল।

সনাতন চলে যাওয়ার পর ঝুলতে ঝুলতেই শ্রীবিন্দুবাবু আজ রাতে বাড়িতে ডাকাত পড়ার কথাটা ভাবছিলেন।

নোদে যে এই জমিদারবাড়িতে এসেছিল কেন, সেটাই অনেকক্ষণ শ্রীবিন্দুবাবুর মাথায় ঢুকছিল না।

এই ঘণ্টাখানেক আগের ঘটনা। তিনি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, নীচে দশ-বারোটা লোক বেশ তেড়েমেড়ে কথা বলছে। লাথি মেরে দরজা ভাঙছে। ওরা দরজা ভাঙল, ঘরে ঢুকল, কিন্তু দামি জিনিসপত্র ঘরে যা ছিল কোনওটাই ছুঁয়ে দেখল না। তারপর তো একটা কানা লোক ওপরে উঠে এসে তার ঘাড় চেপে ধরে বলল, এই ব্যাটা, তুই গান গাস?

অমনি পেছন থেকে আরো ভয়ংকর একটা লোক সেই কানা লোকটার গালে একটা থাবড়া কষিয়ে দিয়ে বলল, তেওয়ারি, তোকে হাজারবার বলে দিয়েছি না, গুণীর সম্মান করবি। তারপর শ্রীবিন্দুবাবুকে নমস্কার করে বলল, চলুন লাহিড়ি মশাই। পালকি প্রস্তুত। আমার নবরত্নসভায় যোগ দেবেন চলুন।

তেওয়ারি নামে লোকটা গালে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, এই লোকটা...স্যরি, এই ভদ্দরলোক সত্যি-সত্যিই ছিরিবিন্দু কি না সেটা দেখে নেবেন তো। জমিদারেরা কখনো এরকম ছেঁড়া গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায়? এটা মনে হয় সনাতন। জমিদারবাড়ির কাজের লোক।

শ্রীবিন্দুবাবু প্রচণ্ড অপমানিত হয়ে বলতে গেলেন, না হে! আমিই জমিদার শ্রীবিন্দু লাহিড়ি। আমি যাত্রাপালার বিখ্যাত গায়কও বটে। কিন্তু কথা বলতে গিয়েই শ্রীবিন্দুবাবু টের পেলেন আবারো তার গলা বসে গেছে। এটা পুরোনো রোগ। টেনশন হলেই গলা বসে যায়। কত যাত্রাপালার ফার্স্ট শো যে এই করে মাটি করেছেন তার গোনাগুন্তি নেই।

ওদিকে তেওয়ারির কথাটা নোদে ডাকাতের মনে ধরেছে। সে পরীক্ষা করার জন্যে বিনীতভাবে বলল, বড়বাবু, একটা গান ধরেন না। একটু শুনি।

কেউ নিজে থেকে তার গান শুনতে চাইছে, এরকম সৌভাগ্য অনেকদিন হয়নি। তিনি আপ্রাণ চেষ্টায় গলার শির-টির ফুলিয়ে একটা খেয়াল গাইতে গেলেন। কিন্তু গলা দিয়ে যে আওয়াজটা বেরোল তাতে নোদে এবং তেওয়ারি দুজনেই দু-কানে হাত চাপা দিয়ে দৌড়ে পালাল। শ্রীবিন্দুবাবু শুনতে পেলেন, দৌড়তে-দৌড়তেই নোদে বলছে, তুই আমাকে বাঁচালি তেওয়ারি। এই গাধাটাকে নবরত্নের জন্যে নিয়ে গেলে কী হত বল তো?

তেওয়ারি বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এরকম আমি অনেকবার আপনাকে বাঁচিয়েছি। বলতে গেলে রোজই বাঁচাই। কিন্তু এখন জমিদারবাবুকে খুঁজবেন কোথায়?

নোদে বলল, চল তিনতলাটা দেখে আসি। শিল্পী মানুষ তো, নির্জনে বসে গান গাইছেন বোধহয়। আর তার আগে মানিককে বল এই গাধাটাকে নীচে নিয়ে গিয়ে কড়িকাঠের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখতে। ঘণ্টাতিনেক শীর্ষাসনে থাকলে ওর গলার উন্নতি হবে।

ওঃ! কী অপমান, কী অপমান!

কাছাকাছি সময়েই আরেকজন লোক অপমানিত হতে-হতেও হল না। তার নাম শম্ভু পাড়ুই।

বহুদিন তক্কে তক্কে থেকে সেদিনই সন্ধবেলায় শম্ভু জমিদারবাড়ির তিনতলায় উঠে পড়েছিল। এমনিতে এ বাড়ির কোনো জায়গাতে যেতেই খুব একটা অসুবিধে নেই। এত বড় বাড়িতে মানুষ তো মাত্র দুটি—শ্রীবিন্দু লাহিড়ি আর সনাতন হালদার। এমনকী, কত বাড়িতে দরজার কাছে এক দুটো নেড়িকুত্তা শুয়ে বসে থাকে। বড়বাবুর গানের দাপটে এ বাড়িতে তাও নেই। তবে বড়বাবুর একটা বদ অভ্যেস হল সারাদিন বাড়ির এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো চক্কর মেরে বেড়ানো। ওই চক্কর মারতে মারতেই তিনি 'ধাপা ধাপা মানি মাপা' ইত্যাদি বলে গলা সাধতে থাকেন।

শম্ভু খেয়াল করে দেখেছিল, একমাত্র শনিবার রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত জমিদারমশাই ঘোরাঘুরি করেন না। সেই সময়টায় উনি জলসাঘরে বসে গুরুজির ধ্যান করেন। আজ ঠিক সেই সময়টাতেই শম্ভু চুরির মতলবে জমিদারবাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। চুপিচুপি উঠে পড়েছিল একেবারে তিনতলায়।

সেখানে নিজের মনে কাজ করে যাচ্ছিল শম্ভু। সিন্দুকটার স্টিল বডি। আট সংখ্যার কম্বিনেশন লক খুলতে বেশ বেগ পেতে হল। আজ শুধু কানখুসকিতে হল না। একটা সেফটিপিন, দুটো কয়েন, কিছুটা সুতলি দড়ি এসবেরও প্রয়োজন হল। এর থেকেই বোঝা যায় কাজটা কত কঠিন ছিল।

কাজে ডুবে গিয়ে গুনগুন করে গান গাইছিল শম্ভু। সবে মাত্র পটাং করে সিন্দুকের ডালাটা খুলেছে, আর ঠিক তখনই পেছন থেকে কে যেন হেঁড়ে গলায় বলে উঠল, হ্যাঁ, একেই বলে জমিদার। দেখুন কেমন টকটকে ফরসা রং, বাবরি চুল, ছ'ফিট হাইট। দেখুন দেখুন সর্দার। কেমন নিজের সিন্দুকের সামনে বসে পূর্বপুরুষের ধনসম্পত্তি অবলোকন করছেন আর গান গাইছেন। গলাও কত মধুর, আহা!

এত জোর চমকে উঠেছিল শম্ভু যে আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল। তবে সে অনেক ঘাটের জল খেয়েছে। ভেতরের চমকানি ভেতরে রেখেই ঘুরে বসল। গম্ভীর গলায় বলল, কে হে তোমরা? বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢুকেছ কেন?

দুজনের মধ্যে যে লোকটার দুটো চোখই আস্ত আর চেহারাটা যমদূতের মতন, সে হাতজোড় করে বলল, অপরাধ নেবেন না কর্তা। আসলে বহুদিনের বদভ্যেস, তাই কড়া না নেড়ে, লাথি মেরে দরজাদুটো ভেঙে ফেলেছি। তা ওর জন্যে না হয় কিছু মূল্য ধরে দিয়ে যাব। আর কোনো ক্ষতি করিনি। ও হ্যাঁ, অধমের নাম নোদে। লোকে বলে নোদে ডাকাত।

নোদে ডাকাতের নাম শুনে শম্ভুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফস করে খালি হয়ে গেল। তবে বরাবরই সে দেখেছে যত বিপদ বাড়ে, ততই তার মাথাটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসে। এখনও তার ব্যতিক্রম হল না। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল, বাঁচতে গেলে জমিদারবাবু সেজেই বাঁচতে হবে। তাই উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে বলল, আচ্ছা বেশ। তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম। এবার বিদায় হও। ডাক্তার আমাকে বলে দিয়েছে এগারোটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নিতে। আমি নীচে গেলাম।

নোদে তাড়াতাড়ি বলল, সে আপনি চিন্তা করবেন না হুজুর। এখান থেকে আমার ডেরায় যেতে পালকিতে আর ছিপ-নৌকায় একঘণ্টাও লাগবে না। সুদাম, বিশে, মানকে ওরাই আপনাকে ঘাড়ে করে পৌঁছে দেবে। আর ওখানে যারা আছে তারা এতক্ষণে গাওয়া ঘিয়ের ময়ান দিয়ে সাদা ময়দা মাখতে শুরু করেছে। আপনি পৌঁছবেন আর আপনার সামনে পাঁঠার মাংস সহযোগে একথালা লুচি ধরে দেবে।

শম্ভু সড়াৎ করে জিভের জল টেনে নিয়ে মনে মনে বলল, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। মুখে বলল, কেন? তোমার ডেরায় যাব কেন?

আজ্ঞে তেমন কিছু না। আমি একটা নবরত্ন সভা বানাচ্ছি। সেখানে আপনি একটু আমাদের গান-টান গেয়ে শোনাবেন, এই আর কি।

শম্ভু আরেকবার ভাবল। কাজটা তেমন কিছু কঠিন নয়। গানটা সে বরাবরই ভালো গায়। শুধু গান গেয়ে যদি কিছুদিন নোদে ডাকাতের আস্তানায় জামাইআদর খেয়ে আসা যায় মন্দ কী?

তবু সে চোখ পাকিয়ে বলে উঠল,—বটে! আমার গান শুনতে চাস? জানিস আমার এক এক আসরের ফিজ কত? চার হাজার টাকা।

নোদে দু-কানে হাত ঠেকিয়ে বলল, ছি ছি ছি। টাকা দিয়ে কি আপনার প্রতিভা মাপা যায়? আমি আপনাকে এক বছরের জন্যে চারশো সোনার মোহর দেব। এবার চলুন। দেরি হয়ে গেলে আবার লুচি ঠান্ডা হয়ে যাবে।

শম্ভু একবার সামনে খোলা সিন্দুকটার দিকে তাকাল। এটা কি বন্ধ করে যাওয়া উচিত? ধুর ছাই, কী হবে বন্ধ করে? ভেতরে তো শুধু টিন আর ব্রোঞ্জের ক'টা চাকতি। কানখুসকিটা পকেটে পুরে সে বলল, চলো তবে, ক'টা দিন ঘুরেই আসি। সামনের বৈশাখমাসের আগে ছেড়ে দিও কিন্তু। ইন্দোরের মহারাজা তার মেয়ের বিয়েতে আমাকে গাইতে বলে রেখেছেন। না গেলে বন্ধুত্ব থাকবে না।

সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে শম্ভু পাড়ুই যখন নোদের পালকিতে চাপছে, তখনই তার চোখে পড়ল নীচের বৈঠকখানার কড়িকাঠ থেকে আসল জমিদার শ্রীবিন্দু লাহিড়ি মাথা নীচের দিকে করে ঝুলছেন। মনে মনেই দু-কান মুলল শম্ভু। মনে মনেই বলল, অপরাধ নেবেন না বড়বাবু। আমরা পাপী-তাপী মানুষ। পাপ আরেকটু বাড়ল, এই আর কি।

শ্রীবিন্দুবাবু অবশ্য শম্ভুকে নিয়ে নোদেদের চলে যাওয়াটা খেয়াল করেননি। তিনি প্রথম থেকেই নিজের মন্দ কপালের কথা ভেবে যাচ্ছিলেন। অন্য কোনোদিকে তার মন ছিল না। ভাবনার মধ্যেই কখন যে সনাতন ঘরে ঢুকে মই লাগিয়ে তার পায়ের দড়ি খুলে দিয়েছে তা তিনি খেয়ালই করেননি। সনাতনের মতন বুদ্ধিমান লোক আর হয় না। সে আগে থাকতেই শ্রীবিন্দুবাবুর মাথার নীচে একটা তোশক পেতে রেখেছিল। তাই দমাস করে মেঝেতে পড়লেও তিনি সেরকম চোট পেলেন না। গা, হাত-পা ঝেড়েঝুড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেন—কোই হ্যায়?

সনাতন বিরক্ত মুখে বলল, আঃ! সামনেই তো আছি। খামোকা চেঁচাচ্ছেন কেন?

না, একটু দেখে নিলাম, গলাটা আগের অবস্থায় ফিরেছে কি না। এইটুকু একটা হাঁক, তার মধ্যেই পঞ্চম থেকে নিষাদ ছুঁয়ে কেমন ধৈবতে ফিরে এলাম সেটা খেয়াল করেছিস? তারপর একটু ভেবে নিয়ে যোগ করলেন,—নোদে লোকটা ডাকাত হলেও অনেক জ্ঞান ধরে। হক কথা বলেছিল, শীর্ষাসনে ঝুলে থাকলে গলা ঠিক হয়ে যায়। জানা রইল। এরপর থেকে গলা চোকড হয়ে গেলে নিজেই ঝুলে পড়ব, কী বলিস?

সনাতন বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,—সে আপনার যা ইচ্ছে আপনি করুন। আমি খালি ভাবছি, যে লোকটা সিন্দুক খুলেছিল, সে গেল কোথায়?

তিন

রাতের শেষ প্রহর। অল্প অল্প কুয়াশা ছিল। যদিও ফাগুন মাস, তবু হু-হু করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। সময়টা যে চিড়েতন খুব একটা ভুল বেছেছিল তা নয়। এমন আবহাওয়ায় লোকজন সহজে ঘর ছেড়ে বেরোতে চায় না। তবে কপাল খারাপ হলে সব হিসেবই গণ্ডগোল হয়ে যায়।

খবর ছিল সাঁপুইবাড়ির ছোট মেয়ে বিয়ের পরে বাপের বাড়ি ফিরেছে। এখন সাতদিন ওই বাড়িতেই থাকবে, তারপর অষ্টমঙ্গলায় জামাই বাবাজীবন এসে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। একতলার দক্ষিণের ঘরে মেয়েটা ঠাকুমার সঙ্গে শুচ্ছে।

এগুলো আসল খবর নয়। আসল খবর হল, আহ্লাদি মেয়েটা বিয়ের সবক'টা গয়না গায়ে পরেই ঘোরাঘুরি করছে। এমনকী রাতে শোয়ার সময় অবধি গায়ে পনেরো ভরি সোনা নিয়ে শোয়।

চিড়েতন নিজে বিকেলের দিকে এসে একবার সবকিছু খতিয়ে দেখে গেছে। দক্ষিণের ঘরে বাগানের দিকে একটাই জানলা। এই শীতে সেই জানলা নিশ্চয় ভেতর থেকে বন্ধ থাকবে। তা থাক। দরজা জানলা দিয়ে ঘরে ঢোকার কথা চিড়েতনের মতন বনেদি চোরেরা ভাবতেও পারে না। দরজা খোলা থাকলেও তারা দেয়ালে সিঁদ কেটেই ঘরে ঢোকে।

আজ বিকেলেই একটু দূরে একটা চায়ের দোকানে বসে আয়েস করে চা খেতে খেতে সেই দেয়ালগুলোও খেয়াল করে দেখেছিল চিড়েতন। দেয়াল তো নয়, যেন দুর্গের পাঁচিল। চওড়ায় বারো ইঞ্চির এক সুতো কম নয়। সিমেন্ট বালির গাঁথনি।

নাঃ, পনেরো ভরি সোনা তাকে এমনি এমনি কেউ দেবে না। চিড়েতন বুঝে গিয়েছিল কপালে আজ খাটুনি আছে। বাড়ি ফিরে সে ষোলো-নম্বর সিঁদকাঠি-টাকে বালিপাথরে ঘষে ঘষে একেবারে বল্লমের ফলার মতন ঝকঝকে করে তুলেছিল। রাত দুটো বাজতেই চিড়েতনের বউ তাকে জাগিয়ে দিয়ে হাতে তেলের বাটি ধরিয়ে দিয়েছিল। সারা গায়ে চপচপে করে তেল মেখে, হাতে সিঁদকাঠি আর ঠোঁটে নিদুলি বিড়ি নিয়ে চিড়েতন পৌঁছে গিয়েছিল সাঁপুই বাড়ির দক্ষিণের ঘরের লাগোয়া বাগানে। দেয়ালের কাছে ভারি সুবিধেমতন একটা কালমেঘের ঝোঁপও পেয়ে গিয়েছিল, যেটার আড়ালে বসে কাজ করলে কেউ দেখতে পাবে না।

চিড়েতন কাজ শুরু করেছিল রাত তিনটে নাগাদ। সেই কাজ যখন শেষ হল তখন বাজে প্রায় চারটে। দেয়ালের শেষ ইটটা হাতের টানে আলগা করে চোখটা সেই ফুটোয় লাগাল চিড়েতন। অন্ধকার ঘর। কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে নাক ডাকার ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এইটাই তো ঘুম গভীর হওয়ার সময়। নিশ্চিন্ত মনে টপাটপ আরও দু-একটা ইট খসিয়ে ফেলে ঘরের ভেতর সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ল চিড়েতন। এবং ঢোকা মাত্রই কে যেন বলে উঠল, এসেছ কি নিয়তি আমার? এত দেরি করে কেউ আসতে? তুমি বুঝি রমাকান্ত কামার? হাতে বুঝি ধানকাটার কাস্তে?

গলাটা ঠাকুমার নয়, নতুন বউয়ের তো নয়ই। দিব্যি ব্যাটাছেলের গলা। ভয়ের চোটে চিড়েতনের পা দুটো পাথর হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, আজ্ঞে না। আমি রমাকান্ত নই তো। আমি এই ইয়ে...রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। খুব শীত করছিল। তখনই চোখে পড়ল আপনার ঘরের দেয়ালে একটা গর্ত। শীতের হাত থেকে বাঁচতে গর্তটা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। তা, আপনি যদি বলেন, এখনই বেরিয়ে যাচ্ছি।

বেরিয়েই যাচ্ছিল চিড়েতন। কিন্তু অন্য তরফ থেকে আর কোনও সাড়াশব্দ নেই দেখে আবার ফিরে এল। বিছানা থেকে ভেসে আসছে নাক ডাকার ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ শব্দ। এতক্ষণে চোখটাও অন্ধকারে সয়ে এসেছে চিড়েতনের। সে দেখল, খাটের ওপর শুয়ে রয়েছে সাঁপুইবাড়ির সেজোছেলে মেঘবাহন সাঁপুই। খবরাখবর জোগাড় করার সময় এর কথাও শুনেছিল বটে চিড়েতন। বছর চব্বিশ বয়স। খুব রোগা, মাথায় বাবরি চুল, দাঁতগুলো বেশ উঁচু। ছেলেটা না কি কবিতা লেখে।

চিড়েতন অবাক হয়ে দেখছে—শুধু লেখে না, ঘুমের মধ্যেও কবিতা বলে।

চিড়েতন ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে। তখনই মেঘবাহন আবার সুর করে বলতে শুরু করল, তুমি প্রেত? না কি লেডি ম্যাকবেথ? থেলো হুঁকো হাতে নিয়ে তুমি কি ওথেলো? কানু বিনে ধেনু-গুলি কে নেবে গোঠে লো?

ব্যাপারটা এতক্ষণে চিড়েতনের একটু ধাতস্থ হয়েছে। বুঝতেই পারছে, শেষ মুহূর্তে কোনও কারণে মেয়ের জায়গায় মেয়ের দাদা এসে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু এত পরিশ্রম পুরোপুরি বরবাদ হবে? চিড়েতন চটপট হাতের কাছে যা পেল, এই যেমন একটা টেবিল-ঘড়ি, দুটো হাতঘড়ি, ক্যাশ টাকা তিনশো মতন, সব একটা শান্তিনিকেতনি ঝোলায় পুরে সিঁদের ফুটো গলে আবার বাইরে বেরিয়ে এল। ঝোলাটা বলাই বাহুল্য কবি মেঘবাহন সাঁপুইয়ের। ওটা নিয়েই তিনি বিভিন্ন কবি-সম্মেলনে কবিতা পাঠ করতে যান।

তখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। পুব আকাশটা সবে একটু ফরসা হয়েছে। চিড়েতন এদিক-ওদিক চেয়ে, বাগানের পাঁচিল টপকে, পেছনের পোড়ো জমিটা ধরে হাঁটতে শুরু করল। এখান দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষজনের মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা কম, তাই বড় রাস্তা ছেড়ে সে মাঠের পথটাই ধরল। কিন্তু ওই যে কথায় বলে, কপাল খারাপ হলে সব হিসেবই ভুল হয়ে যায়। দু-পা হেঁটেছে কি হাঁটেনি, দুটো যমদূত যেন মাটি ফুঁড়ে চিড়েতনের পথ আটকে দাঁড়াল।

সত্যিকারে তো আর মাটি ফুঁড়ে ওঠেনি। আসলে লোকদুটো একটা আকন্দের ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। চিড়েতন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকদুটো আরও কয়েক হাত এগিয়ে এসে আকর্ণবিস্তৃত হাসল। চিড়েতনের মনে হল যেন দুটো হারমোনিয়ামের ডালা খুলে সাদা ঝকঝকে রিডগুলো বেরিয়ে এল। একটা লোক হাতজোড় করে বলল,—প্রাতঃপেন্নাম। খবরটা তাহলে ঠিকই পেয়েছিলাম। আপনি এই পথেই রোজ মর্নিং-ওয়াক করতে যান।

চিড়েতন আরেকটু হলে বলেই ফেলেছিল, মর্নিং-ওয়াক নয় তো, চুরি করে ফিরছিলাম। কোনোরকমে সামলে নিল।

অন্য লোকটা, যার একটা চোখ কানা, সে বলল, সর্দার! এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক নয়। লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়ে গেছে। কবির সঙ্গে কাজের কথাটা সেরে ফেলুন।

দশাসই চেহারার লোকটাকে অনেকক্ষণ থেকেই চিড়েতনের কেমন যেন চেনাচেনা লাগছিল। 'সর্দার' ডাকটা শুনেই তার মনে পড়ে গেল—এ তো নোদে ডাকাত! পুলিশের থানা থেকে এই মুখের পোস্টারই তো সন্ধান চাই বলে হাটতলায় মেরে দিয়ে যায়। চিড়েতনের পা-দুটো হঠাৎ ঠক ঠক করে কাঁপতে শুরু করল। কিছুতেই সেই কাঁপুনি সে থামাতে পারছিল না।

নোদে ডাকাত ভারি বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, আমি একটা নবরত্ন সভা তৈরি করছি। তাতে কবির জায়গাটা আপনাকে নিতে হবে। বছরে চারশো মোহর ফিজ দেব। একেবারে আসল আকবরি মোহর। মুনাব্বরপুরের দারোগার বাড়িতে ডাকাতি করে পেয়েছিলাম।

চিড়েতনের বুদ্ধি খুব ধারালো। মুহূর্তের মধ্যে সে ব্যাপারটা ধরে ফেলল। সাঁপুইবাড়ির বাগান থেকে বেরোতে দেখে এই ডাকাতদুটো তাকেই কবি মেঘবাহন সাঁপুই বলে ভুল করেছে। তাছাড়া তার গায়ে এখন মেঘবাহনের রংচঙে চাদর, কাঁধে মেঘবাহনের শান্তিনিকেতনি ঝোলা। ভুল হতেই পারে।

প্রশ্ন হল, ভুলটা কি সে ভাঙাবে? চারশো মোহরের লোভ বড় লোভ। কিন্তু কবিতা শোনাতে বলছে যে। তার কী হবে?

যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। কানা তেওয়ারি নোদে ডাকাতের কানে কানে কী একটা বলা মাত্রই নোদের ভুরুদুটো পাকিয়ে উঠল। সে চিড়েতনের গায়ের কাছে সরে এসে বলল, কিছু মনে করবেন না কবিবর। একটা কবিতা শোনান দেখি।

কবিতা? শুকনো গলায় জিগ্যেস করল চিড়েতন। এই তো, কবিতাই তো লিখছিলাম এতক্ষণ ধরে। কাঁধের ব্যাগের মধ্যে সিঁদকাঠি আর ঘড়ি-টড়ি খচমচ করে উঠল। সেগুলোকে গায়ের সঙ্গে চেপে ধরে চিড়েতন বলল, পুরোটা লেখা হয়নি অবশ্য, তবে শুরুটা বলতে পারি। শুনবেন?

শোনান, শোনান। জলদগম্ভীর স্বরে বলল নোদে।

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। পাড় হয়ে যায় গোরু, পাড় হয় গাধা। দুইধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। কেমন?

অতি চমৎকার। কিন্তু কবিতাটা কেমন যেন শোনা শোনা মনে হচ্ছে।

সে তো হবেই। গোরু, গাধা, কাশবন, হাঁটুজল এসব শব্দ তো সারাক্ষণই শুনছেন। চেনা চেনা লাগবে না?

নোদে বিচক্ষণের মতন ঘাড় নেড়ে বলল, অতি ন্যায্য কথা। চলুন তাহলে। পায়ে হেঁটে গ্রামটা ছাড়িয়ে যাই। তারপর পালকিতে উঠবেন, কেমন?

চিড়েতন বিরস মুখে বলল, আবার হাঁটতে হবে? আমরা কবিরা আবার হাঁটাহাঁটি একদম পছন্দ করি না। চলার ছন্দ আর কবিতার ছন্দ একসূত্রে গাঁথা কি না। যাগগে, এর পর থেকে পারলে একটা মোটরগাড়ির ব্যবস্থা রাখবেন।

নোদে বিনয়ী ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়লেও কানা তেওয়ারির ডান চোখটা এই কথা শুনে দপ করে জ্বলে উঠল।

চার

চকদিঘির মোড়ে করালি পেন্টারের দোকানের সামনে মানকে ব্যাজার মুখে বসেছিল। সে একা বসেছিল না। তারই মতন আরো প্রায় পনেরো কুড়িটা লোক এদিকে-ওদিকে বসে-দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। ওরা সবাই নানারকমের গাড়ির ড্রাইভার কিংবা খালাসি। গাড়ির গায়ে ছবি আঁকাতে এসেছে। ওদের মধ্যে মানকেই শুধু গাড়ির গায়ে ছবি আঁকাবে না। তারও একটা গাড়ি আছে ঠিকই, তবে সেই গাড়ি সে এনেছে করালি কর্মকারকে তুলে নিয়ে যেতে।

করালি পেন্টার না কি ভীষণ বদমেজাজি লোক। সামান্য তর্কাতর্কি হলেই লোকের গায়ে রঙের ডিবে ছুঁড়ে মারে। সেইজন্যে নোদের দলের মধ্যে আলোচনা করে স্থির করা হয়েছে শ্রীবিন্দু লাহিড়ী কিংবা মেঘবাহন সাঁপুইকে যেমন কথাবার্তা বলে নিয়ে আসা হয়েছে, এর বেলায় আর সেরকম করে কাজ নেই। হয়তো প্রস্তাব শুনে রাস্তার মধ্যেই ডাকাত ডাকাত করে চেঁচাতে আরম্ভ করে দেবে। তার চেয়ে গায়ের জোরে তুলে এনে, তারপর ধীরেসুস্থে বোঝালেই চলবে।

কিন্তু করালি যে কোথায় গেল সেই কথাটাই কেউ বলতে পারছিল না। এমনিতে নাকি সে সকাল আটটার মধ্যে দোকানে ঢুকে যায়। তারপর ঘুরে ঘুরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর বডিতে ছবি আঁকে। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা অন্যদিকে গড়াচ্ছে। এদিকে সর্দারের কড়া হুকুম—কোনো অবস্থাতেই করালিকে না নিয়ে ফেরা চলবে না।

কেবল চা আর বেকারির বিস্কুট খেয়ে মানকের মুখ টক হয়ে গেল। দুপুর দুটো নাগাদ একটু দূরে একটা ভাতের হোটেলে গিয়ে ওরা তিনজন ভাত খেয়ে এল। ভেবেছিল ফিরে এসে দেখবে করালি এসে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় করালি? দোকানের সামনে থেকে গাড়ির ভিড় হালকা হয়ে গিয়েছে। মানকের সামনে দিয়েই আরো দুটো ম্যাটাডোর মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। অন্য ড্রাইভাররাও বলাবলি করছিল, নাঃ, আজকে আর কাজ হবে না। পেন্টারের মনে হচ্ছে শরীর-টরির খারাপ হয়েছে। কাল আবার আসতে হবে।

বিকেল পাঁচটা বাজতেই আকাশের আলো কমে এলো। করালি পেন্টার যদি আসেও তাহলে সে নিশ্চয় এই আলোয় আর ছবি আঁকবে না। কাজেই করালির খাতায় যে ক'টা গাড়ির নাম লেখানো ছিল, তাদের ড্রাইভারেরা দোকানের সামনে গাড়ি পার্ক করে রেখে বাড়ি ফিরে গেল।

রইল শুধু মানকে আর তার দুই শাগরেদ।

মানকেদা! একজন শাগরেদ ডাকল। বলছি কী, সোজা করালি পেন্টারের বাড়িতে চলে গেলেই হত না? ওখান থেকেই তুলে নিতাম।

মানিক বলল, তার আর দরকার হবে না।

কেন?

ওই দ্যাখ, পেন্টারমশাই এসে গেছেন।

মানিক যেদিকে আঙুল দেখাচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে শাগরেদ দুজন দেখল, সত্যিই। ওরা করালি পেন্টারের যেমন ডেসক্রিপশন শুনেছিল, সেইরকমই একজন লোক একটা মালবোঝাই ট্রাকের গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তিনজন পা টিপে টিপে লোকটার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

তারক মান্না গত দুদিন ধরে এই ট্রাকটার ওপরে নজর রাখছে। ট্রাক বোঝাই নতুন এ.সি. মেশিন। গাড়িটা কলকাতা থেকে এসেছে। বডিতে রঙ করানো শেষ হলেই এদিকের নানান শহরে এ.সি. মেশিনের ডেলিভারি দিতে শুরু করবে। তবে তার আগেই তারক ওটাকে নিয়ে পালাবে বলে ঠিক করে রেখেছে।

ঈশ্বর করুণাময়। এমনিতে করালি পেন্টারের দোকানের সামনে মেছোবাজারের মতন ভিড় লেগে থাকে বলে তারক গাড়ি চুরির স্কোপ পাচ্ছিল না। কিন্তু আজকে করালি না আসায় জায়গাটা সন্ধের মধ্যেই একেবারে শুনশান হয়ে গেল। এই ট্রাকের ড্রাইভার আর খালাসিও একটু আগে রাতের খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে বাজারের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। এই হচ্ছে সুযোগ। যা করার এখনই করতে হবে। তারক অন্ধকারের মধ্যে গা মিশিয়ে চুপিচুপি ট্রাকের ড্রাইভার-কেবিনের দরজার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে একটা চ্যাপটা স্টিলের পাত বার করে চাবির ফুটোয় ঢোকাতে যাচ্ছে, এমন সময় পেছন থেকে সরু-মোটা তিনরকমের গলায় একসঙ্গে তিনজন বলে উঠল, 'নমস্কার স্যার'।

তারক হাতটা আস্তে করে নামিয়ে নিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। এরা কারা রে বাবা? প্লেন ড্রেসের পুলিশ নয় তো? তিনজনের মধ্যে কারুরই অবশ্য পুলিশের মতন ভুঁড়িদাস চেহারা নয়, দিব্যি ছিপছিপে পেটানো শরীর। তবু বলা যায় না। পুলিশ না হয়ে মিলিটরিও হতে পারে। গত মাসে তারক অন্ধকারের মধ্যে বুঝতে না পেরে মিলিটারিদের রেশন-ভর্তি একটা ট্রাক নিয়ে ভেগেছিল। সেই থেকে মিলিটারিরাও তাকে খুঁজছে।

তবে পুলিশ কিংবা মিলিটারি হলে কি তার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকত, না তাকে নমস্কার জানাত?

তিনটে ছেলের মধ্যে যাকে দেখলে সবথেকে বেশি ভয় লাগে, সে একটু এগিয়ে এল। তারপর বলল, আমার নাম মানিকলাল সাহা। ওই ছবিগুলো আপনি এঁকেছেন?

ট্রাকের গায়ে রোগা হাতি, মোটা পরী, সবুজ পদ্মফুল, শিংওয়ালা রাক্ষস ইত্যাদি নানারকমের ছবি আঁকা ছিল। সবই আগের দিন করালি পেন্টার এঁকে রেখে গিয়েছিল। তারক মান্না একবার সেদিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। কেন? আপনার এরকম ছবি চাই?

আপনার হাতে ওটা কী?

এটা? তারক একবার চট করে তালা খোলার যন্ত্রটা দেখে নিয়ে বলল, এটা দিয়েই তো গাড়ির গা থেকে পুরোনো রং চেঁছে তুলি। তা না-হলে নতুন রং লাগাব কেমন করে?

ও, আচ্ছা।

এই লোকটাই যে করালি-পেন্টার সে ব্যাপারে মানিকলাল নিঃসন্দেহ হল। তারপর বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল, আপনি একবার আমার গাড়িটা দেখবেন?

তারক মান্না ভাবল, আপদ বিদায় করে আসি, তারপর নিজের কাজে হাত দেওয়া যাবে। তাই মানিকলালকে বলল, চলুন দেখে আসি। যদিও এমনিতে আমার স্টুডিয়োতে কাজ করাতে গেলে সাতদিন আগে থেকে নাম লেখাতে হয়।

এর ঠিক দু-মিনিট বাদে গাড়ি-চোর তারক মান্নার নাকের ওপর চেপে বসল ক্লোরোফর্মে ভেজানো রুমাল। জিপের পেছনের সিটে তাকে শুইয়ে দিয়ে মানিকলাল গাড়ি হাঁকালো বাশুলিঘাটের ডেরার দিকে।

মানিকদের গাড়িতে চেপে তারক মান্না যখন নোদে ডাকাতের আস্তানায় এসে পৌঁছল, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। হাত-পা বাঁধা তারককে যখন ওরা জিপের পেছনের সিট থেকে চ্যাংদোলা করে নামাচ্ছে তখনই পড়বি তো পড় একেবারে নোদের মুখোমুখি পড়ে গেল। নোদে অবাক হয়ে বলল, এ কী রে! এ কাকে তুলে নিয়ে এলি? আমার ডায়েরিতে আগামি একমাসের মধ্যে কোনো কিডন্যাপিং-এর কেস নেই তো।

মানিকলাল একগাল হেসে বলল, ইনিই চিত্রশিল্পী, সর্দার। আপনার নববর্ষ সংখ্যার জন্যে...।

চোওওপ! প্রচণ্ড জোরে এক হুঙ্কার ছাড়ল নোদে। ম্যাগাজিন পড়ে-পড়ে মাথাটা একেবারে গেছে দেখছি। 'নববর্ষ সংখ্যা' আবার কী? বল, নবরত্ন সভা। তা শিল্পীকে বেঁধে এনেছিস কেন? ওনার ইজ্জত নেই?

মানিক মাথা চুলকে বলল, ভয়ংকর ইজ্জত আছে সর্দার। এই দেখুন হাত-পা-বাঁধা অবস্থাতেই আমার হাতে কেমন কামড়ে রক্ত বার করে দিয়েছেন। তাছাড়া বেচারামের পাঁজরে এমন জোড়া পায়ে লাথি কষিয়েছেন যে, সে এখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।

নোদে ওসব কথায় পাত্তা না দিয়ে জিগ্যেস করল, ছবি কেমন আঁকেন?

আমরা তো ছবি-টবি ভালো বুঝি না। বিভিন্ন গাড়ির বডিতে উনি যা এঁকেছিলেন তার কিছু ফটো আমার মোবাইলের ক্যামেরায় তুলে নিয়ে এসেছি। আপনি দেখুন।—এই বলে মানিকলাল তার স্মার্ট-ফোনের স্ক্রিনে নোদেকে কয়েকটা ছবি দ্যাখাল। একটা ছবিতে ছিল কদমগাছের নীচে শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন, গাছের ডালে একটা ময়ূর পেখম ঝুলিয়ে বসে আছে আর এদিকে-ওদিকে দু-চারটে গরু চরছে।

ময়ূরটার রং টকটকে লাল, কারণ, ছবিটা আঁকার সময় করালির নীল রং ফুরিয়ে গিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণের সাইজ গরুগুলোর অন্তত ছ'গুণ। ছবিটার নীচে আবার বড় বড় অক্ষরে লেখা, 'হিংসে কোরো না, তোমারও হবে'। কী হবে কে জানে? গরু হবে, না বাঁশি হবে, না ময়ূর হবে?

কিন্তু সেই ছবি দেখেই নোদে একেবারে মুগ্ধ। বলল, ক'দিন আগে এক দারোগার সঙ্গে কাজের কথা সারতে গিয়ে দেখি, তার বাড়ির দেয়াল-ভর্তি মডার্ন আর্ট। একে তো কোনোটাই আসল নয়, সব কপি। তার ওপরে তেমনি সব ছবির ছিরি। একটা মেমসাহেবের ছবি ছিল—হাসছে না ভেংচি কাটছে বোঝা মুশকিল। সেই ছবিটার নাকি ভয়ংকর নামডাক। দারোগাবাবু লোমানিশা না কী যেন একটা নাম বলেছিলেন ওই মেমসাহেবের।

মানিকলাল যথেষ্ট পড়াশোনা করা ছেলে। পয়সা বেশি পাওয়া যায় বলে ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে ডাকাতি করতে এসেছে। সে নোদে সর্দারের কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, আপনি কি মোনালিসার কথা বলছেন নাকি?

ঠিক ঠিক। তুই তার মানে ছবিটা দেখেছিস। এবার তাহলে বল, এই কেষ্টঠাকুরের ছবির পাশে ওই সোনামাসি দাঁড়ায়?

মানকে একবার আড়চোখে সর্দারের কোমরে গোঁজা রিভলভারটার দিকে তাকিয়ে বলল, খেপেছেন? কীসে আর কীসে? কেষ্টঠাকুরের মুখের হাসিটা দেখুন তো। বত্তিরিশটা দাঁত গুণে নেওয়া যাবে। কাউকে বলে দিতে হবে, উনি হাসছেন না কাঁদছেন? আমি বলছি সর্দার, এরকম শিল্পীকে পেলে স্বয়ং সম্রাট আকবরও লুফে নিতেন।

তাহলে ওনাকে বন্ধনমুক্ত কর। জ্ঞান ফিরলেই সন্দেশ আর দইয়ের লস্যি খেতে দে। আর খাতা পেনসিল রংটং যা লাগে সব কাল সকালেই ক্যানিং-এর বাজার থেকে আনিয়ে দিবি। কাল থেকে উনি আমার পোর পোর পোরট...।

পোর্ট্রেট বলতে চাইছেন?

হ্যাঁ, সেই জিনিসটা আঁকবেন।

মানিকলাল একটু টেনশনে ছিল, করালি পেন্টার জ্ঞান ফিরে পেয়ে না জানি কেমন ব্যবহার করেন। কিন্তু তিনি বেশ ভালোমানুষের মতনই ব্যবহার করলেন।

আসল করালি হলে কী হত বলা যায় না, কিন্তু নকল করালি, মানে তারক মান্না দেখল বাইরে এখন হাওয়া বড্ড গরম। পুলিশ আর মিলিটারি একযোগে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই সময়ে ক'টাদিন ডাকাতের ডেরায় গা ঢাকা দিয়ে বসে থাকলে মন্দ হয় না। তার ওপরে এরা তাকে ছবি আঁকার জন্যে যা ফিজ দেবে বলছে, সারা বছর ট্রাক-ডাকাতি করলেও সেই পয়সা সে রোজগার করতে পারে না।

তারক তাই এক কথায় সভা-চিত্রকর হতে রাজি হয়ে গেল।

পাঁচ

ওরা তিনজনেই অভিনয় করছিল, এবং বেশ ভালোই অভিনয় করছিল।

শম্ভু পাড়ুই তো গানটা বরাবরই খাসা গায়, কাজেই জমিদার শ্রীবিন্দু সাজতে তার একটুও অসুবিধে হল না।

চিড়েতন কপাল জোরে মেঘবাহন সাঁপুইয়ের কাঁধ-ব্যাগের মধ্যে মেঘবাহনেরই একটা মোটা কবিতার খাতা পেয়ে গেল। তাতে দেড়হাজারের ওপর কবিতা রয়েছে। সে ভেবে দেখল, নবরত্ন সভায় যদি রোজ একটি করেও কবিতা পড়ে, তাহলেও বছর পাঁচেক অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবে। আর পাঁচবছরের মধ্যে কি সে নিজে কবিতা লিখতে শিখে যাবে না?

নোদে ডাকাতের পোর্ট্রেট আঁকা নিয়ে একটু মুশকিলে পড়েছিল তারক মান্না। শেষ অবধি অবশ্য সে ব্যাপারটার একটা সহজ সমাধান করে ফেলল। বিভিন্ন থানা থেকে নোদের ছবি দিয়ে যে 'সন্ধান চাই'-এর পোস্টার মারা হত, তারই কয়েকটা নোদের চ্যালারা সর্দারকে দেখাবার জন্যে খুলে নিয়ে এসেছিল। সেগুলো সিঁড়ির তলায় ডাঁই করে রাখা ছিল। ওরকম একটা বড়সড় পোস্টার নিয়ে ক্যানভাসের ওপরে সেঁটে, তার ওপরে রং বুলিয়ে দিব্যি পোর্ট্রেট বানিয়ে ফেলল তারক মান্না। সেই ছবির মাথায় আবার বুদ্ধি করে একটা সোনালি মুকুটও এঁকে দিয়েছিল। রাজবেশে নিজের ছবি দেখে নোদের তো আর আহ্লাদ ধরে না। সে তক্ষুনি তারক মান্নাকে নিজের আঙুলের হিরের আংটি দিয়ে সম্মানিত করল।

নোদে ডাকাত এবং তার নবরত্ন-সভার তিন রত্ন বেশ ফুর্তিতেই ছিল, কিন্তু নোদের যত চ্যালা-চামুণ্ডা মনে মনে গজরাচ্ছিল। কারণ, গত একমাস সন্ধেবেলাটা সর্দার আস্তানার বাইরে পা-ই দিচ্ছেন না। ডাকাতির কাজটা কানা তেওয়ারি কিংবা মানিকলালের নেতৃত্বেই করে যেতে হচ্ছে। তার ফলে ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে। সর্দারের মতন অমন সাহস আর শক্তি তো আর কারুর নেই। আর তেমনি তার বুদ্ধি। তিনি না-থাকলে দলের শক্তি অর্ধেক হয়ে যায়।

এই তো, গত শ্রাবণমাসেই নামখানা থানার জাঁদরেল দারোগা বক্রেশ্বর সতপথী বিরাট পুলিশ বাহিনী নিয়ে তাদের তাড়া করেছিলেন। তারা ছুটছে রণপায়ে চড়ে আর পুলিশে তাড়া করছে জিপ নিয়ে। সকলেই ভেবেছিল, আজ আর রক্ষা নেই। কিন্তু সর্দার সোজা নামখানা ফেরিঘাটে গিয়ে একটা টুরিস্ট-লঞ্চ ছিনতাই করে নিলেন। টুরিস্টদের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দারোগাবাবুকে বললেন, আমাদের চলে যেতে দাও, না-হলে এই নিরীহ মানুষগুলো একটা একটা করে মরবে।

বক্রেশ্বর সতপথীর সামনে সেদিন জুলজুল করে নোদের দলের পলায়ন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

সেই লঞ্চে করেই সেদিন তারা বাশুলির ঘাট অবধি চলে এসেছিল। চলার পথে টুরিস্টদের সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। ওরা ডাকাতদের সঙ্গে চিলি-চিকেন আর ফ্রায়েড-রাইস ভাগ করে খেয়েছিল। এমনকী ডাকাতদলের সঙ্গে গ্রুপফি-ও তুলেছিল। ওদের ম্যানেজার নোদে সর্দারের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করে বলেছিলেন, রোমাঞ্চের খোঁজেই তো সুন্দরবনে বেড়াতে আসা মশাই। বাঘের বদলে ডাকাত দেখতে পেলাম, এ তো আমাদের পরম সৌভাগ্য।

সেইসব দিনের কথা ভেবে কানা তেওয়ারি, জীবন হাঁড়ি এবং অন্যান্য ডাকাতরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ব্যস, ওইটুকুই। নোদে ডাকাতকে গিয়ে কারুর বলার সাহস নেই, সর্দার, আজকে গান-বাজনা থাক। চলুন ডাকাতি করতে যাই।

আজকাল সর্দার একটা লম্বা ঘাঘরার মতন ড্রেস পরছেন। তার কোমরে বাঁধা এতবড় একটি বাঁকানো তলোয়ার। মাথায় তবলার বিঁড়ের মতন একটা রংচঙে পাগড়ি। একমাস আগেও গালভর্তি দাড়ি ছিল, সেটা কামিয়ে ফেলেছেন। এখন শুধু নাকের দুপাশ দিয়ে নেমে এসেছে হালকা গোঁফ।

সব দেখেশুনে মানিকলাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, একেবারে ক্লাস সেভেনের ইতিহাস বইয়ে যেমনটি ছিল।

অন্য ডাকাতদের অত পড়াশোনা নেই। তারা একসুরে প্রশ্ন করল, কী ছিল রে মানকে?

বাদশা আকবরের ছবি। ওই ছবিটাই সর্দারের মাথায় থেকে গেছে। নিজেও সেইরকমই সাজছেন।

জীবন হাঁড়ি বলল, সর্দার কাল আমাকে বলছিলেন দীন ইলাহি প্রচার করতে বেরোবেন। সেটা কী জিনিস রে?

মানিকলাল আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সে যখন দরকার পড়বে তখন বলব। এখন শুনলে তোমার রাতের ঘুম চটে যাবে। ঘুমোও।

কানা তেওয়ারি মেঝেতে একটা ঘুসি মেরে বলল, নাঃ, ব্যাপারটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা করতে হবে। সবাই বুদ্ধি লাগা।

জীবন হাঁড়ি বলল, একদিন সর্দার যখন ঘুমোবেন তখন ওই শিল্পী তিনটেকে কচুকাটা করে মাটির নীচে পুঁতে ফেললে হয় না?

মানিকলাল ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, তোমার ভাবনাগুলো বড্ড মোটা দাগের জীবনদা। ওরা হারিয়ে গেলে সর্দার প্রথম কাদের ধরবেন?

জীবন হাঁড়ি বলল, তাই তো! তাহলে তুই-ই একটা কিছু উপায় ভাব মানকে।

মানকে বলল, ভাবছি।

ওরা খুব বেশি ভাবনাচিন্তা করার আগেই নোদে সর্দার ওদের তলব দিল। সর্দারের মুখ দেখেই ওদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। নোদে চোখ পাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার? নবরত্নের তিনটি রত্ন জোগাড় করেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? আর ছ'টার কী হবে?

ওরা জিগ্যেস করল, আর ছ'জন কেমন গুণের মানুষ হবে সর্দার?

নোদে বলল, আরে বীরবলকেই তো এখনো পাইনি। সে ছিল দারুণ রসিক লোক আবার একইসঙ্গে দারুণ বুদ্ধিমান। এরকম একজনকে জোগাড় কর দেখি। আর বাকি পাঁচজনকে নিয়ে সেরকম হ্যাপা নেই। যে-কোনওরকম একটা ট্যালেন্ট থাকলেই চলবে।

ওই 'ট্যালেন্ট' শব্দটা শুনেই মানিকলালের মাথার মধ্যে পিড়িং করে একটা আইডিয়া খেলে গেল। সে নোদের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, সর্দার, একটা কাজ করতে পারবেন? তাহলে একেবারে ছ'টা ট্যালেন্ট একসঙ্গে তুলে নিয়ে আসতে পারবেন। তারমধ্যে কমেডিয়ান, ম্যাজিশিয়ান সব থাকবে। চিংড়ি ধরার জালে যেমন পার্শে, তোপসে, চাঁদা, বাচা, সবরকমের মাছ উঠে আসে, সেইরকম।

কী কাজ? নোদে জিগ্যেস করল।

ক'দিন আগে নামখানা বাজারে শ্রীবিন্দুবাবুর জন্যে হারমোনিয়াম কিনতে গিয়ে দেখলাম আগামী সতেরো তারিখ রোববার নামখানা ইস্কুলে একটা রিয়েলিটি শোয়ের জন্যে ট্যালেন্ট হান্ট আছে।

বটে? তা কী হবে ওখানে গিয়ে?

কী বলছেন সর্দার! পুরো বাদাবনের যত ট্যালেন্ট আছে সবাই সেদিন ওখানে নিজেদের ট্যালেন্ট দেখাতে যাবে। কেউ হয়তো চল্লিশ মিনিট ধরে হাতে ভর দিয়ে হাঁটতে পারে, কেউ ঘাড়ের ওপর দিয়ে পা ঘুরিয়ে আনতে পারে। কেউ হরবোলা, কেউ ম্যাজিক দেখায়। সবাই রোববার ওই ইস্কুলের গেটে লাইন দেবে।

নোদের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, তাই নাকি! ওদের মধ্যে থেকেই বেছেবুছে ছ'জনকে তুলে নিয়ে এলেই তো হয়।

মানকে বলল, ঠিক এই কাজটার কথাই বলছিলাম। তবে একটা বিষয় সর্দার। তুলে আনার ব্যাপারটা ওইদিন করতে যাবেন না। আপনি যাদের পছন্দ তাদের নাম-ঠিকানা নোট করে নিয়ে আসবেন। আমরা পরে একসময় গিয়ে তেনাদের নিয়ে আসব।

শুনেই নোদের হাতটা তলোয়ারের হ্যান্ডেলের দিকে চলে গেল। ভুরু কুঁচকে বলল, কেন? ওইদিন নিয়ে আসতে কী অসুবিধে?

মানিকলাল তাড়াতাড়ি বলল, রাগ করবেন না সর্দার। ওইদিন মিডিয়ার লোক ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে চারিদিকে গিজগিজ করবে। ভারি নাছোড়বান্দা হয় লোকগুলো। হয়তো আমাদের পেছন পেছন এই বাশুলিঘাটের ডেরাতেই চলে এল। তখন কি আর ডাকাতি করে খেতে পারব?

হুঁ। একটু ভেবে নোদে বলল, তাহলে দলবল নিয়ে যাব না বলছিস?

মানকে ঘাড় নাড়ল।

একা যাব?

মানকে ঘাড় হেলাল।

নোদে বলল, বেশ। তাই হবে।

মানকে মনে মনে বলল, জয় গুরু।

ছয়

নামখানা থানার দারোগা বক্রেশ্বর সতপথীর মনে সুখ নেই। তিনি সৎ লোক, কাজের লোক। সাহসেরও কমতি নেই। তিরিশ-বছরের কর্মজীবনে বহু থানায় ঘুরেছেন। সব জায়গাতেই চোর, গুন্ডা-বদমাশদের ঢিট করে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু চাকরিজীবনের শেষদিকে এই নামখানা থানাতে এসেই সব গণ্ডগোল হয়ে গেল।

বাপরে বাপ! কী ভয়ংকর গুন্ডা-বদমাশের জায়গা এই থানার এরিয়াটা। একটা সিঁধেল-চোর আছে, নাম চিড়েতন। একটা তালা খোলার ওস্তাদ আছে, নাম শম্ভু পাড়ুই। আর একটা লরি-চোর আছে, সেটার নাম তারক মান্না। তিনটেই একেবারে যাকে বলে পাকা-ওস্তাদ। গত পাঁচ মাসে বক্রেশ্বরবাবু অনেকবার ওদের ধরবার চেষ্টা করেছেন। পারেননি।

শুধু তিনটে চোর থাকলে সামলে নিতে পারতেন। থানার এলাকার মধ্যে খুন-খারাপি না হলে ওপরওলারা অতটা পাত্তা দেন না। কিন্তু খুন-খারাপিই বা বাদ দেওয়া যাচ্ছে কোথায়? নোদে ডাকাত রয়েছে না?

খুন রাহাজানি অপহরণ কিচ্ছু বাদ দিচ্ছে না লোকটা। আর প্রত্যেকটা ঘটনার পরেই ওপরওলার কাছ থেকে বক্রেশ্বরবাবুর কাছে ওয়ার্নিং আসছে—সতপথী, এই লাস্ট-টাইম। এরপর কিন্তু নোদেকে ধরতে না-পারলে তোমার ডিমোশন হবে। মাইনে কেটে নেব। পেনশনও আটকে দিতে পারি চাইলে। নোদেকে ধরো। নোদেকে ধরো।

ধরো বললেই ধরা যায় নাকি? একি ছেলের হাতের মোয়া! প্রথমত নোদের গুপ্তচরের জালটা ব্যাপক লম্বা। সেটা এই থানার মধ্যেও ছড়িয়ে রয়েছে। বক্রেশ্বরবাবু নোদের খোঁজে বেরোলেই নোদের কাছে ঠিক সেই খবর পৌঁছিয়ে যায়, আর সে তখন ডেরা পালটায়। এখন যেখানে সুন্দরবনের গহন জঙ্গল, এককালে সেখানে কোন রাজবংশের যেন রাজত্ব-টাজত্ব ছিল বলে শুনেছেন বক্রেশ্বরবাবু। এখনো জঙ্গলের মধ্যে বড় বড় দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। ওরকম বেশ কয়েকটা দুর্গ সারিয়ে সুরিয়ে নিয়ে নোদে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে।

বক্রেশ্বরবাবুর বড়সাহেব একদিন জিগ্যেস করেছিলেন, সুন্দরবনের মধ্যে আস্তানা? বলো কি বক্রেশ্বর! ওদের বাঘে ধরে না?

বক্রেশ্বরবাবু কাষ্ঠ হেসে বলেছিলেন, ওকে বাঘে ধরবে কী স্যার? নোদেই উল্টে বাঘকে ধরে। আমার কাছে প্রমাণ রয়েছে, ব্যাটা বাঘ মেরে চামড়া পাচার করে।

স্কাউন্ড্রেল!

আমাকে বলছেন? চমকে উঠেছিলেন বক্রেশ্বরবাবু।

না, না! তোমাকে বলব কেন? ওই নোদেকেই বলছি। বক্রেশ্বর, তুমি ওই গ্যাংটাকে গারদে ঢোকাও। আমি তোমাকে ডবল প্রোমোশন দেব।

চেষ্টার কসুর করছেন না বক্রেশ্বরবাবু। একবার তো প্রায় ধরেই ফেলেছিলেন। কিন্তু নোদেটা এমন ভয়ানক পাজি যে, লঞ্চ ভর্তি টুরিস্টের দলকে ঢালের মতন ব্যবহার করে পালালো।

আজকেও সকালবেলায় থানায় বসে নোদের কথাই ভাবছিলেন বক্রেশ্বরবাবু। গত একমাস ধরে কী জানি কেন চারদিক বেশ শান্ত হয়ে রয়েছে। চিড়েতন, শম্ভু কিংবা তারকের হাতে কেউ সর্বস্বান্ত হয়েছে এমন কোনো খবর নেই। নোদের দলও গত একমাসে তিনটে-মাত্র ডাকাতি করেছে। যারা দেখেছে তারা বলছে, তার একটাতেও নোদে নিজে অংশ নেয়নি।

কেন?

গোঁফে তা দিতে দিতে বক্রেশ্বর সতপথী সেই কথাটাই ভাবছিলেন। নোদে গেল কোথায়? ওর আসন কি কেউ টলিয়ে দিল? ডাকাতদলের মধ্যে এটা খুব হয়। একজন সর্দারের বয়স হলেই তার দলের কমবয়সি কোনো মেম্বার তাকে হঠিয়ে নিজে সর্দার হয়ে বসে।

ইদানিং নোদের দল যে-ক'টা ডাকাতি করেছে, সবক'টাতেই নাকি নেতৃত্ব দিয়েছে মানকে বলে এক ছোকরা ডাকাত। যারা দেখেছে তারা বলে, ছেলেটার গায়ের জোর নোদের মতন না হলেও বুদ্ধির জোর সাংঘাতিক। পড়াশোনা জানে। বন্দুকের টিপও অব্যর্থ। তার মানে সর্দার হওয়ার জন্যে একেবারে ফিট ক্যান্ডিডেট।

ছেলেটাকে যদি একবার সামনাসামনি পাওয়া যেত। দুঁদে দারোগা বক্রেশ্বর সতপথী এর আগেও অনেকবার কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলেছেন।

ওনার চিন্তার মধ্যেই ইউনিফর্মের পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। বক্রেশ্বরবাবু বললেন, হ্যালো।

দারোগাসাহেব বলছেন?

বলছি। আপনি কে বলছেন?

আমাকে তো চিনবেন না। চেনার দরকারও নেই।

সতপথী বুঝতে পারছিলেন উল্টোদিকের গলাটা একটা কমবয়সি ছেলের। কত বয়স হবে তার? পঁচিশ? তিরিশ? তার বেশি নয়। তিনি কড়াগলায় জিগ্যেস করলেন, আমার পার্সোনাল মোবাইলের নম্বর পেলে কোথায়?

উল্টোদিকের ছেলেটা বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালো না। উল্টে একটু হেসে বলল, মোবাইল-নাম্বার তো সামান্য জিনিস স্যার। আপনার ক্লাস-এইটের মার্কশিটের কপি অবধি আমাদের কাছে আছে। অঙ্কে সতেরো পেয়েছিলেন।

বক্রেশ্বর সতপথী রাগলেন না। বরং ওর কথার মধ্যে 'আমাদের' শব্দটা মনে মনে নোট করে রাখলেন। ও কোনো গ্যাং-এর কথা বলছে।

বলো, কী বলতে চাও। সতপথী কথার জের টেনে বললেন।

নোদে ডাকাতকে ধরতে চান তো? নোদে পরশু, মানে রোববার, নামখানা হাইস্কুলের ট্যালেন্ট-হান্টে যাচ্ছে—একা।

সঙ্গে দলবল থাকছে না? অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন দারোগাবাবু।

না। আরেকটা কথা বলি শুনুন। নোদে দাড়ি কামিয়ে ফেলেছে। মাথায় আজকাল পাগড়ি পরে। এগুলো বলে রাখলাম, যাতে ওকে দেখলে চিনতে ভুল না হয়।

ধন্যবাদ মানিকলাল।

না, না, ধন্যবাদের কী আছে? এইটুকু বলেই হঠাৎ ছেলেটা চুপ করে গেল। মানিকলাল বুঝতে পেরেছে যে, ও দারোগার ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। 'না, না, ধন্যবাদের কী আছে?' এই কথাটুকু বলে স্বীকার-ই করে ফেলেছে যে, সে-ই মানিকলাল।

ফোনটা ডিসকনেক্ট করে দিয়ে সতপথী মনে মনে হাসলেন। তিনি ইচ্ছে করেই মানিকলালকে জানিয়ে দিলেন যে, উনি তাকে চিনে ফেলেছেন। এর পর নোদেকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মানিকলাল জান লড়িয়ে দেবে। কারণ, নোদে বাইরে থাকলে ঠিক খুঁজে বার করবে, কে পুলিশকে খবর দিয়েছিল। পুলিশের মধ্যে ওর গুপ্তচরের অভাব নেই। তাদের মধ্যেই কেউ না কেউ ঠিক বলে দেবে যে, মানিকই ইনফর্মেশনটা দিয়েছিল। আর তখন মানিকলাল নোদের হাত থেকে বাঁচবে না।

বক্রেশ্বর সতপথী তার মস্ত বড় হাতের থাবার এক চাপড়ে টেবিলের ওপরে রাখা বেলটা এত জোরে বাজালেন যে, থানার কুকুরটা অবধি ছুটে এলো, ব্যাপারটা কী দেখতে। সেকেন্ড অফিসার সুব্রত সেনকে বক্রেশ্বর বললেন, শোনো সুব্রত। থানার সমস্ত স্টাফকে ডেকে পাঠাও। ইমিডিয়েটলি।

একটু বাদে সেপাই, কনস্টেবল, সাব-ইনস্পেক্টর মিলিয়ে তিরিশ জন লোক ও.সি.-র চেম্বারে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল। বক্রেশ্বরবাবু বললেন, তোমাদের মোবাইল ফোনগুলো আমার হাতে দাও। সুব্রত, তুমিও। সবক'টা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে নিজের আলমারিতে ঢুকিয়ে দিলেন বক্রেশ্বর সতপথী। তারপর থানার মেন গেটে তালা লাগিয়ে দিয়ে চাবিটা নিজের পকেটে রেখে দিলেন।

সুব্রত সেন জিগ্যেস করল, এসবের মানে কী স্যার?

মানে হচ্ছে, রোববার অবধি আমরা এখানেই থাকব। বাইরে থেকে বঙ্কুবিহারী আমাদের খাবার জল, টিফিন, ভাত, সব দিয়ে যাবে। রোববার সকালে একটা অপারেশন আছে। সেটা হয়ে গেলে সবাই মোবাইল ফেরত পাবে। বাড়িও যেতে পারবে। অবশ্য যদি বেঁচে থাকো।

রোববার দিনটা এমনিতে ডাকাতদলের ছুটির দিন। ওইদিন সবাই বেলা করে ওঠে। তারপর অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করে। নিজেরাও একটু শ্যাম্পু-সাবান মেখে চান-টান করে। কিন্তু সেই রোববার নোদে উঠে পড়ল ভোর পাঁচটায়।

ঘুম থেকে উঠে ভালো করে চান করে নতুন এক-সেট বাদশাহি পোশাক গায়ে চড়াল। তারপর গেস্টরুমে গিয়ে হেঁড়ে গলায় হাঁক ছাড়ল,—গায়কমশাই উঠুন, শিল্পী উঠুন, চিত্রকর উঠে পড়ুন হে।

নোদের তিনটি রত্ন-ই নিশাচর প্রাণী বিশেষ। বহুদিনের অনভ্যেসের ফলে তারা রাতে ঘুমোতে পারে না, দিনের বেলায় অনেক বেলা অবধি ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেয়। তবু সর্দারের ডাক, কিছু করার নেই। চোখ কচলাতে কচলাতে তিনজনেই উঠে পড়ল। বলল, কী ব্যাপার জাঁহাপনা?

চলুন, নামখানা ইস্কুলে ট্যালেন্ট-হান্ট দেখতে যাব।

চিড়েতন, তারক আর শম্ভু ভাবল, মন্দ নয়। একদিন অন্তত শিল্পচর্চার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। তারা ঝটপট তৈরি হয়ে সর্দারের সঙ্গে নীচে নামল। এরপর নোদে যে হলঘরটায় ওর দলের লোকজন ঘুমোয় সেই ঘরটায় ঢুকে মানিকলালকে ঠেলে জাগালো। বলল, চল, বাইরে চল।

মানিকলাল কাঁচা ঘুম থেকে উঠে ভালো করে বুঝতে পারছিল না সর্দার তাকে কী বলছেন। তবু নোদের পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে এল।

নোদে তাকে বলল, চটপট তৈরি হয়ে নে। তোর কথামতন আমরা ট্যালেন্ট-হান্ট দেখতে যাচ্ছি। তুই আমাদের সঙ্গে যাবি।

মাথায় বাজ পড়লেও মানকে এতটা চমকাত না। তার চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, 'আমরা' মানে?

আমি, তিন রত্ন আর তুই। ব্যস, এই পাঁচজন।

আপনাকে যে বললাম, দলবল না নিয়ে যেতে। আপনি রাজিও তো হলেন।

মারব মাথায় তলোয়ারের হ্যান্ডেল দিয়ে এক বাড়ি। এইটা একটা দল হল? লোকে বেড়াতে গেলে সঙ্গে বন্ধুবান্ধব থাকে না? ড্রাইভার থাকে না? ওনারা আমার বন্ধু আর তুই আমার ড্রাইভার। এখন আর বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করিস না। এগারোটা থেকে ওরা প্রতিযোগীদের নাম লেখাবে। চল।

মানিক বুঝতে পারল সে নিজের পাতা জালে নিজেই বিচ্ছিরিভাবে ফেঁসে গেছে। নোদের সঙ্গে আজ থাকা মানে পুলিশের হাতে ধরা পড়া। পালাবার চেষ্টা করলে এমনকী গুলি খেয়েও মরতে হতে পারে। কিন্তু এখনই বা নোদেকে কাটাবার উপায় কী?

ইস, নোদেসর্দার যে ড্রাইভিং জানে না, এটা সে কেন হিসেবের মধ্যে ধরতে ভুলে গেল? নিজের মাথায় নিজেরই চাঁটি মারতে ইচ্ছে করছিল মানিকলালের।

ওদিকে নোদে কিছুক্ষণ চোখ সরু করে মানকের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুই এত কী ভাবছিস রে? এরকম তো আগে দেখিনি। আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে।

না, না, সর্দার! সন্দেহের কিছু নেই। এই দেখুন না, টুথব্রাশটা খুঁজে পাচ্ছি না। চিরুনিটাই বা কোথায় রাখলাম? এইসব বলে অনেক রকমভাবে দেরি করানোর চেষ্টা করল মানকে, কিন্তু শেষ অবধি নোদের সঙ্গে তাকে বেরোতেই হল। দুর্গা নাম জপতে জপতে সে জিপের ড্রাইভারের সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করল।

ঠিক ওই একই সময়ে ট্যালেন্ট হান্টের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র তিনজনের সঙ্গে বন্ধ ঘরে মিটিং করতে বসলেন বক্রেশ্বর সতপথী আর সুব্রত সেন। উদ্যোক্তারা প্রথমে একটু কাঁউমাঁউ করছিলেন,—না, স্যার, এটা কীভাবে হয় স্যার? আমাদের অনারেবল জাজ-রা সকলেই নিজের নিজের ফিল্ডে এক-একজন দিকপাল। শ্রদ্ধা সচদেবা বলিউডের সিনেমা পরিচালক। সাগ্নিক বাংলা ব্যান্ডের নামকরা গায়ক। রকি হালদার নামকরা কোরিওগ্রাফার। তাদের সঙ্গে আপনারা দুজন পুলিশ-অফিসার কেমন করে জাজের আসনে বসবেন?

বক্রেশ্বর সতপথী তাই শুনে ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, পুলিশ বলে কি মানুষ নই নাকি? আমরাও গান-বাজনা বুঝি। আর আপনারা এই যে অনুষ্ঠান করছেন, তার পারমিশন নিয়েছেন? যান, সব বন্ধ করে দিন। উদ্যোক্তা বিপদ বুঝে তাড়াতাড়ি বললেন,ও-কে, ঠিক আছে। চলুন স্যার, আসন গ্রহণ করবেন।

মঞ্চের পেছনে মেক-আপ রুমের দিকে যেতে যেতে সেই উদ্যোক্তা ফিসফিস করে জিগ্যেস করলেন,—গুলিগোলা চলবে না তো স্যার? চারদিকে অনেক বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে থাকবে।

বক্রেশ্বরবাবু বললেন, আরে না। একদম শান্তিতে কাজ হয়ে যাবে। আপনি শুধু চটপট যেভাবে বলেছি সেইভাবে আমাদের মেকআপটা করিয়ে দিন।

ও-কে স্যার।

ওনাদের নিয়ে উদ্যোক্তা যখন মেক-আপ রুমে ঢুকলেন তখন ঘড়িতে সাড়ে দশটা। স্কুলের গেটে অলরেডি তিনশো মানুষের লাইন পড়ে গেছে। একশো ছাপ্পান্ন থেকে একশো আটান্ন নম্বরে যে তিনজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছে তাদের আমরা চিনি। চিড়েতন, শম্ভু আর তারক। লাইন থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে নোদে সর্দার আর মানকে। মানকে একটা গামছা দিয়ে মুখ আর মাথা জড়িয়ে রেখেছে। তার ওপরে চোখে একটা সানগ্লাসও পরে নিয়েছে। নোদে নিজেকে লুকোবার কোনো চেষ্টা করছে না, কারণ সে ভালো করেই জানে, কামানো গাল, পাগড়ি আর শলমা-জরির কাজ করা জোব্বার জন্যে তার মা-ও তাকে নোদে বলে চিনতে পারবে না।

চিড়েতন শম্ভু আর তারক তিনজনেরই প্রবল ইচ্ছে করছিল লাইন থেকে বেরিয়ে দৌড় লাগায়। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। মানকে আর নোদে দুজনেরই জামার নীচে লুকোনো পিস্তল রয়েছে।

আসবার পথেই নোদে তার প্ল্যান ওদের বুঝিয়ে বলেছে। নোদে বলেছে, আপনারাই হলেন ট্যালেন্ট-হান্টে আমাদের গেট-পাশ। এমনিতে তো আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেবে না। আপনারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিন, আমি আর মানকে আপনাদের গার্জেন সেজে ভেতরে ঢুকে যাব। কী ব্যাপার, আপনাদের মুখগুলো এমন শুকনো লাগছে কেন বলুন তো?

চিড়েতন বলেছিল, না, মানে ব্যাপারটা কী জানেন? এখানে তো কমবয়সি অখ্যাত শিল্পীরা ভিড় জমিয়েছে। এদের মধ্যে আমার মতন একজন প্রতিষ্ঠিত গায়ক গান গাইবে, এটা কি ভালো দেখায়?

তারক আর শম্ভুও খড়কুটোর মতন চিড়েতনের যুক্তি আঁকড়ে ধরে বাঁচবার চেষ্টা করেছিল। সমস্বরে বলে উঠেছিল, তাই তো। আমাদের মতন চিত্রকর, কবি, এদেরও কি এইসব মফসসলের প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া মানায়?

শুনে চলন্ত জিপের মধ্যেই নোদে হাঃ হাঃ হাঃ করে ভুঁড়ি দুলিয়ে অনেকক্ষণ হেসেছিল। তারপর বলেছিল আসলে আপনারা ইতিহাস ভুলে গেছেন। এই যে, মহান বাদশা আকবর। তিনিও তো বোঁদের ঝুড়ির ভেতরে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে বুঁদির কেল্লার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। না কীরে মানকে?

মানকে গাড়ি চালাতে চালাতে জবাব দিয়েছিল, আকবর নন, ছত্রপতি শিবাজী। বুঁদির কেল্লাই বা পেলেন কোথায়? ছিলেন তো আগ্রায় গৃহবন্দি। ওখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

নোদে একটুও দমে না গিয়ে বলল, সে যাই হোক। মোদ্দা কথাটা কী দাঁড়াল? অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। প্রয়োজনে সবাইকেই সব করতে হয়। আপনারা আজ না হয় একটু খারাপ করেই পারফর্ম করবেন, যাতে নতুন আর্টিস্টরাই সিলেক্টেড হয়। কিন্তু, নাম আপনাদের লেখাতেই হবে। নইলে ছাড়ব না।

অবশ্য আসল নাম লেখাব না। করালি, শ্রীবিন্দু, মেঘবাহন—সব ন্যাতপেতে নাম; নবরত্নসভার মেম্বারদের অমন নাম মানায় না। শ্রীবিন্দুবাবু, আপনার নাম হবে মিঞা তানসেন। মেঘবাহন, আপনি হলেন ফৈজি। আর করালিবাবু, আপনার নাম বাসবন। আমার পষ্ট মনে আছে, আকবরের সভাসদদের এরকমই সব নাম ছিল।

নোদেডাকাতের কথা শুনে সেই যে ওরা তিনজন ঘামতে শুরু করেছে, এখনো সমানে ঘেমে চলেছে।

সাত

স্কুলের হলঘরে তিলধারণের জায়গা নেই। মানকে একবার চারদিকটা মেপে নিল। না, পুলিশের প-ও দেখা যাচ্ছে না। ডায়াসের ওপর পাঁচজন বিচারকের সামনে একের পর এক প্রতিযোগী পারফর্ম করে যাচ্ছে। বিচারকদের মধ্যে দুজনের বিশাল চেহারা দেখে অনেকক্ষণ ধরেই দর্শকেরা বলাবলি করছিল 'ওনারা কুস্তির জাজ নাকি?'

নানান রকমের পারফর্মেন্স দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল। মানকের টেনশন ততক্ষণে অনেকটাই কমে গিয়েছিল। সেটা আবার মাথাচাড়া দিল নোদে সর্দারের কথায়। একশো পঞ্চান্ন নম্বর প্রতিযোগী চমৎকার ম্যাজিক দেখাল। তার নাম জয় মল্লিক। বাড়ি গোসাবা। নোদে সর্দার পাশের সিট থেকে ফিসফিস করে বলল, মানকে, নোট কর। একে চাই।

মানকে মনেমনে বলল, আপদ। পুলিশগুলো দেখা যাচ্ছে ভয়ংকর ভীতু। এত ভালো ইনফর্মেশনটা দিলাম, কোনো অ্যাকশনই নিল না! এখন এই নোদেটার আন্ডারেই অনন্তকাল পড়ে থাকতে হবে দেখছি।

এবার একশো ছাপ্পান্ন নম্বরের পালা। অ্যানাউন্সার ডাক দিলেন—মিঞা তানসেন।

স্টেজের ওপরে তানসেন হারমোনিয়াম নিয়ে গুছিয়ে বসে চমৎকার একটা শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে ফেললেন।

জাজের চেয়ার থেকে সুব্রত সেন পাশের চেয়ারে বসে-থাকা দারোগাবাবুর দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, স্যার, এটা শম্ভু পাড়ুই। তালা খোলার ওস্তাদ। কবে থেকে তানসেন নাম নিয়ে গান গাইতে শুরু করল জানি না।

তাই নাকি? বক্রেশ্বর গলা তুলে ডাক দিলেন,—ভলান্টিয়ারস, মিঞা তানসেন সিলেক্টেড হয়েছেন। ওনাকে ফর্ম ফিল আপ করাবার জন্যে নিয়ে যাও।

দুজন তাগড়া চেহারার ভলান্টিয়ার যেভাবে শম্ভুর দুটো কাঁধ চেপে ধরে তাকে উইংসের পাশে নিয়ে গেল তা দেখে নোদে ডাকাতের ভুরু দুটো কুঁচকে গেল।

অ্যানাউন্সার ঘোষণা করলেন,—একশো সাতান্ন নম্বর, ফৈজি। ইনি কবিতা পাঠ করবেন।

চিড়েতন স্টেজে উঠল। তারপর গদগদ গলায় খাতা খুলে একটা কবিতা পাঠ করল। সুব্রত সেন আবার বক্রেশ্বরের কানে ফিসফিস করল,—স্যার, চিড়েতন। সিঁধেল চোর। এসব কী ঘটছে স্যার? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

বক্রেশ্বর বললেন, বুঝবার অনেক সময় পাব। আগে কালো-গাড়িতে তোলো।

দর্শক আসনে বসেছিল মেঘবাহন সাঁপুই। একটু আগে সে-ও একটা স্বরচিত কবিতা পড়েছে, কিন্তু কবিতাটাকে কেউ ভালো বলেনি। এখন সে বিরসমুখে অন্যদের পারফর্মেন্স দেখছিল। ফৈজির কবিতা শেষ হতেই সে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করতে শুরু করল,—স্যার, স্যার! এই লোকটা আমার কবিতা চুরি করেছে।

কোনো প্রমাণ আছে, এটা আপনার কবিতা? বক্রেশ্বর জাজের চেয়ার থেকে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন।

প্রমাণ কেমন করে থাকবে স্যার? পুরো খাতাটাই তো সিঁধ কেটে চুরি করে নিয়েছে।

বেচারা মেঘবাহনের কথা কেউ বিশ্বাস করল না। উল্টে সিঁধ কেটে কবিতার খাতা চুরি করে নিয়েছে শুনে সবাই তাকে প্যাঁক দিয়ে বসিয়ে দিল। বিশাল চেহারার সেই জাজ টেবিল চাপড়িয়ে বললেন, চুপ করুন সবাই। উনি সত্যিই বড় কবি। ওনার নামে মিথ্যে অপবাদ দেবেন না। যান তো ভাই ফৈজি, আপনি পাশের ঘরে গিয়ে ফর্ম ফিল-আপ করে আসুন। ভলান্টিয়াররা কোথায় গেলে? এনাকে নিয়ে যাও।

আবার দুজন যমদূতের মতন ভলান্টিয়ার এসে চিড়েতনের দু-কাঁধ ধরে তাকে উইংসের পাশ দিয়ে বের করে নিয়ে গেল।

নোদে ডাকাতের মুখটা মেঘের মতন কালো হয়ে গেল। সে পাশ ফিরে মানিককে কিছু বলতে গিয়ে দেখল, সিট ফাঁকা। মানিক কখন উঠে বাইরে বেরিয়ে গেছে কে জানে! নোদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, তারও এক্ষুনি বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু এখনো চিত্রকর বাসবনের পারফরমেন্স বাকি। সেটা না দেখে যায় কেমন করে?

বলতে-বলতেই অ্যানাউন্সমেন্ট হল,—পরের প্রতিযোগী, একশো আটান্ন নম্বর। নাম বাসবন। ইনি মুহূর্তের মধ্যে চমৎকার পোর্ট্রেট আঁকতে পারেন। দর্শকদের মধ্যে থেকে দয়া করে পাঁচজন উঠে আসুন। ইনি পাঁচমিনিটের মধ্যে তাদের পোট্রের্ট এঁকে দেবেন।

দর্শকদের মধ্যে কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠবারও সময় পেল না। তার আগেই কুস্তিগিরের মতন চেহারার সেই দুজন জাজ দুদিক থেকে বাসবনের দু-হাত চেপে ধরে তাকে নিয়ে স্টেজ থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় আবার তাদের মধ্যে একজনের গোঁফটাও খুলে পড়ে গেল।

অডিয়েন্সের লোকজন সবে যখন ভাবছে এটা রিয়েলিটি শো-এর নতুন কোনো চমক নাকি, তখনই তাদের ঠিক মাঝখান থেকে জবড়জং আলখাল্লা পরা একটা লোক হাতে রিভলভার নিয়ে লাফিয়ে উঠল আর তার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল সামনের আর পেছনের সারিতে বসা অন্তত দশজন লোক। তারা আলখাল্লা পরা লোকটাকে ঘেরাও করে নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে গেল।

স্কুলের মাঠে কালো-গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বক্রেশ্বর সতপথী অন্যান্য পুলিশ অফিসারদের বললেন, ওয়েল ডান মাই বয়েজ। এটা বোধহয় আমার লাইফের বিগেস্ট ক্যাচ। শুধু নোদে নয়, তার সঙ্গে আরো তিনটে দাগী চোর। আশা করি এবার এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে।

পুলিশের ভ্যানটা গুড়গুড় করে স্কুলের মাঠটা পেরিয়ে পাকা রাস্তায় পড়ল। তারপর স্পিড তুলল। পেছন পেছন অন্য দুটো গাড়িতে সুব্রত সেন, বক্রেশ্বর সতপথী এবং আরও পাঁচজন অফিসার হাতে খোলা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গাড়িটাকে পাহারা দিয়ে চললেন।

সুব্রত সেন নার্ভাস গলায় বক্রেশ্বর বাবুকে জিগ্যেস করলেন, আমরা এখন নোদেকে নিয়ে কোথায় চলেছি স্যার?

কেন? গম্ভীর-গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলে বক্রেশ্বর সতপথী।

না, মানে আমি শিওর, এতক্ষণে নোদের দলের লোকেরা জেনে গেছে তাদের সর্দার ধরা পড়েছে। ওরা নির্ঘাত থানা অ্যাটাক করবে।

দারোগা বক্রেশ্বর মুচকি হেসে বললেন, সেই সম্ভাবনার কথা কি আর আমি ভেবে রাখিনি? আমার সঙ্গে বড়সাহেবের কথা হয়ে গেছে। নোদেকে এই তল্লাটেই রাখব না। ওকে নিয়ে গিয়ে তুলব কলকাতার একটা থানায়। এখন সেখানেই যাচ্ছি আমরা।

সন্ধে ছ'টা নাগাদ কলকাতার সেই কয়েদখানার মধ্যে নোদে, চিড়েতন, শম্ভু আর তারককে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলেন বক্রেশ্বর সতপথী। দেখলেই বোঝা যায়, কয়েদখানাটা বানানো হয়েছে ডেঞ্জারাস ক্রিমিনালদের জন্যে। মেঝের সঙ্গে গাঁথা আছে বড় বড় লোহার কড়া। থানার পাহারাদার সেরকম এক একটা কড়ার সঙ্গে নোদে আর তিন রত্নের প্রত্যেকের পা চেন-তালা দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর কয়েদখানার লোহার পাল্লায় মস্ত বড় দুটো তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বক্রেশ্বর সতপথীকে স্যালুট করে বলল, চিন্তা করবেন না স্যার। এর ওপরে সারারাত বাইরে পাহারা থাকবে। ওদিকের রাস্তার ওপরেও দুজন গার্ড সারারাত রাইফেল নিয়ে পাহারা দেবে। এই নদেরচাঁদ কত বড় সুন্দরবনের বাঘ এবার দেখে নেব।

বক্রেশ্বরবাবু মনে হল সব দেখেশুনে স্যাটিসফায়েড হলেন। বললেন, চলো হে সুব্রত। বাড়ি ফেরা যাক। কাল দুপুরে এদের যখন কোর্টে তোলা হবে তখন তো আবার আমাদের আসতে হবে।

আট

ছোট্ট ঘরটার মধ্যে পায়ে চেন বাঁধা অবস্থায় ওরা চারজন বসেছিল। ছাদ থেকে একটা টিমটিমে বালব ঝুলছে। ভেতরে প্রচণ্ড গরম, কারণ, ঘরটার চারটে দেয়ালই নিরেট। জানলা দূরে থাক, একটা ঘুলঘুলি অবধি নেই।

রাতে ওদের খেতে দেওয়া হয়েছিল চামড়ার মতন শুকনো রুটি আর ধুঁধুলের তরকারি। একমাস আগে হলেও হয়তো শম্ভু চিড়েতন কিংবা তারক সেই খাবার খেয়ে নিত, কিন্তু গত একমাস নোদের ডেরায় নিয়মিত পোলাও কালিয়া লুচি পায়েস-টায়েস খেয়ে ওদের অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। আর নোদে নিজে তো গত বিশবছর রুটি খায়নি। কাজেই চারজনেই খাবারের থালা ঠেলে সরিয়ে দিল।

নোদে এতক্ষণ কড়িকাঠের দিকে চেয়ে আকাশ-পাতাল কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে শম্ভুর দিকে তাকাল। করুণ গলায় বলল, আমাকে যে এরা ধরে আনল তার কারণ বুঝতে পারি। কিন্তু লাহিড়িমশাই, আপনার মতন একজন বনেদী জমিদারকে কেন পুলিশে ধরল?

তারপর তারকের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি তো জীবনে লরির গায়ে ছবি আঁকা ছাড়া কিছুই করেননি করালিবাবু। আপনাকেই বা দারোগা আর তার চ্যালা স্টেজ থেকে ওইভাবে ধরে নিয়ে এল কেন?

চিড়েতনের হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, মেঘবাহনবাবু! আমি তো ভাবতেই পারছি না, পুলিশের হাতে একজন কবির এইরকম হেনস্থা!

উত্তরে চিড়েতন বলল, আহা থাক থাক। এসব কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছেন কেন? আরে বেঁচে থাকতে গেলে মানুষকে কত কী-ই দেখতে হয়। এই নিয়ে আমি ইংরিজিতে একটা কবিতা লিখেছিলাম, টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার, হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইউ আর।

শম্ভু আপনমনে সুর করে গাইল,—সুন্দরের বন্ধন নিষ্ঠুরের হাতে ঘুচাবে কে-এএএ?

ওদের মধ্যে তারক মান্না একটু মাথামোটা। সে ফস করে বলে ফেলল—কথায় আছে না, 'অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ'?

ভাগ্যিস নোদে অন্যমনস্ক ছিল, তাই তারকের কথাটা খেয়াল করল না।

বাইরে থেকে রাতের পাহারাওলা হাঁক দিয়ে বলল, এই তোরা আর কথা বলিস না। এবার গলা শুনলে ডাণ্ডা পেটা করব। চুপচাপ শুয়ে পড়। এই বলে ঘরের একটামাত্র বালব বাইরে থেকে সুইচ টিপে অফ করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল।

অন্ধকার কয়েদখানার ভেতরে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছে। কামড়ালে মনে হচ্ছে গা থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিল। মেঝের ওপর দিয়ে খরগোশের সাইজের ইঁদুর দৌড়োদৌড়ি করছে। নোদে অবাক হয়ে দেখল এসবের মধ্যেই তার সাধের নবরত্নসভার তিন রত্ন টান টান হয়ে শুয়ে পড়েছে। একটু বাদে তিনজনেরই এমন নাক ডাকতে শুরু করল যে, নোদের মনে হল সে তার সুন্দরবনের ডেরাতেই বসে রয়েছে। ওখানেও রাত বাড়লে দূর থেকে ভেসে আসা বাঘের গর্জন ঠিক এমনই শোনাতো।

বসে থাকতে থাকতে নোদের চোখদুটোও কখন যেন লেগে এসেছিল। হঠাৎ খুট করে সামান্য একটা শব্দে তার চটকা ভেঙে গেল। চোখ খুলতেই দেখতে পেল, কয়েদখানার দেয়ালের গায়ে একটা বড়সড় গর্ত। মানে যাকে বলে সিঁধ। অবশ্য দরজার কাছ থেকে সেটাকে আড়াল করে বসে রয়েছেন চিত্রকরমশাই।

নোদে ডাকাতকে উঠে বসতে দেখে চিড়েতন চট করে বগলের নীচে ছোট সিঁদকাঠিটাকে লুকিয়ে ফেলে বিনীত-ভঙ্গিতে বলল, আর ঘুমোবেন না জাঁহাপনা। এবার আমাদের বেরোতে হবে।

শম্ভু বলল, হ্যাঁ, দেরি হলে আবার রাস্তায় লোকজন জমে যাবে। চলুন, রওনা হই।

নোদের মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। সে ইশারায় পায়ে তালা দিয়ে আটকানো মোটা চেনটার দিকে ইশারা করল।

শম্ভু ভারি তাচ্ছিল্যমাখা গলায় বলল, ওঃ, ওসব খোকাখুকুদের খেলনা নিয়ে ভাববেন না জাঁহাপনা। দেখি, এদিকে পা-টা একটু বাড়ান। এই বলে একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে কি একটু খোঁচাখুঁচি করতেই চেনের সঙ্গে লাগানো তালাটা খুলে পড়ে গেল।

তারক বলল, আমাদেরগুলোও খুলে দাও ভাই। এতক্ষণ একভাবে বসে থেকে পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেছে। শম্ভু ওদের দুজনের পায়ের তালা খুলে দিয়ে নিজেরটাও খুলল। তারপর সিঁধের গর্ত দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে বলল, এটা দোতলা। মাটি থেকে পনেরো ফুট উঁচু। দাও, চেনগুলো দাও।

চারটে চেন নিয়ে একটার সঙ্গে একটাকে তালা দিয়ে জুড়ে ফেলল শম্ভু। সব মিলিয়ে একটা বিশ ফুট লম্বা চেন তৈরি হল। শম্ভু সেটার একটা প্রান্ত মেঝের কড়ায় বেঁধে ফেলল। অন্য প্রান্তটা ঝুলিয়ে দিল সিঁধের বাইরে।

চেন বেয়ে সবার আগে নামল চিড়েতন। তারপর শম্ভু। তারপর নোদে। সবার পেছনে তারক।

তারক নামার আগে মোটামুটিভাবে ইট সাজিয়ে দেয়ালের গর্তটাকে ঢেকে দিয়ে এল, যাতে ওরা বেরোনোর পরে-পরেই ওটা পাহারাদারের চোখে না পড়ে যায়।

তিন রত্ন অবিকল খ্যাঁকশেয়ালের মতন বাগানের ঝোঁপঝাড় আর ঘাসের আড়াল দিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে এগোচ্ছিল, শুধু নোদে হাঁটছিল ঘুমের ঘোরে হেঁটে যাওয়া মানুষের মতন থপথপ করে। তার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছিল না। এরা কারা? এরাই কি তাকে এতদিন গান শুনিয়েছে, কবিতা শুনিয়েছে, ছবি এঁকে দেখিয়েছে?

সে যাই হোক, ওদের সঙ্গে নোদেও থানার পাঁচিলটা টপকে প্রায় বেরিয়ে পরেছিল, কিন্তু হঠাৎই পাঁচিলের মাথা থেকে নোদের হাতটা আলগা হয়ে গেল আর ঝনঝন আওয়াজ করে সে খসে পড়ল নীচে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা খালি বালতির ওপর।

কে ওখানে? হাতের রাইফেলটা বাগিয়ে ধরে দৌড়ে এল একজন পাহারাদার।

নাকের ডগায় রাইফেলের নলের ফুটো দেখে নোদে চোখ বুজে ফেলল। বুকের ভেতর দিয়ে গুলি চলে গেলে কেমন লাগে কে জানে!

এই পাহারাদারটাই সন্ধেবেলায় নিজের হাতে নোদের পায়ে চেন লাগিয়ে এসেছিল। এখন ভোরবেলায় সেই নোদেকেই বিলকুল হাত-পা খোলা অবস্থায় বাগানের জমিতে পড়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্তের জন্যে সে অসাবধান হয়ে পড়ল। ওই সময়টুকুর মধ্যেই পাঁচিলের ওপরে ফস করে জ্বলে উঠল একটা দেশলাইকাঠি।

পাহারাওলা বন্দুকটা তুলে ধরল পাঁচিলের ওপরে বসে থাকা ছোটখাটো লোকটার দিকে। দেশলাইয়ের আলোয় চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল, তাই চোখ কুঁচকে জিগ্যেস করল, তুই কে?

উত্তর এল, আমি চিড়েতন স্যার। একটা বিড়ি খাচ্ছিলাম।

পরক্ষণেই চিড়েতনের নিদুলি-বিড়ির ধোঁয়া ভস করে এসে ঢুকে গেল পাহারাওলার নাকে। তার হাঁটুদুটো আপনা থেকেই বেঁকে গেল। একটা ন্যাকড়ার পুতুলের মতন সে লটপট করে মাটির ওপরে পড়ে গেল।

স্তম্ভিত নোদের দিকে তাকিয়ে তারক বলল, অল ক্লিয়ার। এবার হাতটা বাড়ান জাঁহাপনা। আমরা আপনাকে পাঁচিল পার করে দিচ্ছি।

থানা থেকে বেরিয়ে ওরা চারজন ফুটপাথ ধরে দৌড়চ্ছিল। পেছনে ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল পুলিশ-জিপের হুটারের কেঁ-কেঁ আর্তনাদ। একটু বাদে রাস্তার মোড়ে দেখা গেল লাল-নীল আলোর ঝলকানি। একসঙ্গে দুটো জিপ ওদের তাড়া করেছে। চিড়েতন দৌড়তে-দৌড়তেই বলল, তীরে এসে তরী ডুববে না কি রে, তারক?

তারক বলল, হাসিও না তো তুমি চিড়েদা। ইয়ার্কির একটা সময় অসময় আছে। এই বলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পেট্রোল ট্যাঙ্কারের কেবিনের দরজার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল। কী যে হল ঠিক বোঝা গেল না, কিন্তু বাকি তিনজন অবাক হয়ে দেখল, ড্রাইভার-কেবিনের দরজাটায় তারকের হাত ঠেকতেই সেটা ম্যাজিকের মতন খুলে গেল। তারক লাফ মেরে উঠে বসল ড্রাইভারের সিটে। ঠিক তিন সেকেন্ড লাগল তার ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে, যদিও নোদে হলফ করে বলতে পারে গাড়ির চাবি কোত্থাও ছিল না।

যতক্ষণে নোদে, চিড়েতন আর শম্ভু হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কেবিনের মধ্যে ঢুকেছে ততক্ষণে জিপগুলো আর একশো মিটার দূরেও নেই। তবে তারকের পক্ষে ওটাই যথেষ্ট। ভোরের ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে বিদ্যুতের মতন দৌড়ল তেলভর্তি পেট্রোল ট্যাঙ্কার। নামখানার কাছাকাছি একটা সরু খালের ওপর একটা কাঠের ব্রিজ ছিল। যেহেতু ওদের সকলেরই এটা চেনা এলাকা তাই ওরা সবাই জানে ব্রিজটার অবস্থা ভালো নয়। লোকে সাইকেল নিয়ে এই ব্রিজ পেরোতে ভয় পায়। যদি ভেঙে পড়ে! তবু তারক কীভাবে যে ব্রিজের মাঝখান অবধি ট্যাঙ্কারটাকে চালিয়ে নিয়ে এল সে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।

গাড়িটাকে ব্রিজের ঠিক মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তারক বলল, শিগগির নেমে এসো তোমরা। দৌড়ও! দৌড়ে পেরিয়ে যাও বাকি ব্রিজটা। আমি একটু পরে আসছি। এই বলে তারক অয়েল-ট্যাঙ্কারের পেছনের তেল বেরোবার পাইপটা প্যাঁচ ঘুরিয়ে খুলে দিল আর সঙ্গে-সঙ্গেই গলগল করে তেল গড়িয়ে পড়ল। তারক ধীরেসুস্থে একটা বিড়ি ধরিয়ে নিজেও ব্রিজটা পেরিয়ে গেল।

দু-মিনিটের মধ্যে পুলিশের জিপদুটো ব্রিজের অন্য মুখে পৌঁছে গেল। তারক মান্না ঠোঁটের জ্বলন্ত বিড়িটা টুসকি মেরে ছুঁড়ে দিল তেলের ধারার মধ্যে। সেই ধারা বেয়ে হিস হিস শব্দে আগুন ছুটল ট্যাঙ্কারের দিকে। তারক দু-কানে আঙুল দিয়ে দৌড়তে শুরু করল।

প্রথম জিপটার সামনের চাকাদুটো সবেমাত্র ব্রিজের ওপরে উঠেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিস্ফোরণ হল। জ্বলন্ত অয়েল ট্যাঙ্কার সমেত ব্রিজের মাঝের অংশটা প্রথমে অনেকখানি লাফিয়ে উঠল, তারপর বিকট শব্দে ডুবে গেল নদীর মধ্যে।

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে নোদে, চিড়েতন, শম্ভু আর তারক সেই দৃশ্য দেখল। তারপর কোনো কথা না বলে হাঁটা লাগাল বাশুলিঘাটের জঙ্গলের দিকে।

শেষ দৃশ্য

পরের দিন। নোদে ডাকাতের সভাঘরটা আছে ঠিকই, কিন্তু সিংহাসন-টিংহাসন কিছুই নেই। ওল্টানো ড্রাম, ভাঙা মোড়া, প্যাকিং-বাক্স—যে যা পেয়েছে তার ওপরেই বসেছে। আগে ওরা এইভাবেই বসত।

দলের লোকেদের ঠিক মাঝখানে একটা হাতল-ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসে রয়েছে নোদে। তার পরণে লুঙ্গি আর হাতকাটা ফতুয়া, যেরকমটা সে চিরকাল পরে এসেছে। রাজবেশের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। দু-দিন না কামানোর ফলে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তার মানে নোদে আবার দাড়ি রাখতে শুরু করেছে।

কানা তেওয়ারি বলল, সর্দার, আপনি ডেকেছিলেন। আমরা সকলেই এসেছি। শুধু মানকের এখনো কোনো খোঁজ পাইনি। হিরু ঘটক অবশ্য বললেন, সেই যেদিন আপনি ট্যালেন্ট-শো থেকে ধরা পড়লেন, সেদিন সন্ধেবেলাতেই হতভাগা নাকি ওনার বাড়িতে দু-মিনিটের জন্যে মুখ দেখিয়েছিল। জিগ্যেস করেছিল হরিদ্বার কিংবা কনখলে ওনার চেনা কোনো গুর-টুরু আছে নাকি, যার কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসী হওয়া যায়।

নোদে হাত ঝাড়ার ভঙ্গি করে বলল, ছাড় ওই হতভাগার কথা। কাজের কথায় আয়।

জীবন হাঁড়ি বলল, কোন কাজটার কথা বলব সর্দার? গত একমাসে মেলা কাজ জমে গেছে। গাজনভেড়ির বকুল মণ্ডলের মেয়ের বিয়ে। ক্যাশ সতেরো লক্ষ টাকা বকুলের আলমারিতে শুয়ে হাই তুলছে আর ভাবছে আমরা কখন গিয়ে তাদের উদ্ধার করব। হিঙ্গুলগঞ্জ বাজারের মনসা-জুয়েলারির মালিক বোম্বে থেকে চল্লিশ লাখ টাকার হিরে আনিয়েছে। সেটাও এক্ষুনি নিয়ে আসতে পারলে ভালো হত। তারপর ধরুন, কঞ্চিভাঙার দুধকুমার ঘোষের ঘিয়ের ব্যবসা। সারা মাসের ঘি বিক্রির টাকা কম করেও পনেরো লাখ...

নোদে হাত তুলে বলল, আঃ!

জীবন হাঁড়ি থতমত খেয়ে থেমে গেল। অবাক গলায় বলল, কী হল সর্দার?

ওসব কাজ পরে হবে। আগে নবরত্ন সভাটা কমপ্লিট করি।

নোদের তিরিশজন শাকরেদ তাই শুনে একসঙ্গে বলে উঠল, হায় হায়!

এমনকী তারক মান্না, চিড়েতন আর শম্ভু পাড়ুই অবধি অবাক হয়ে নোদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, এত কাণ্ডের পরেও? লোকটার কি লজ্জা বলে কিছু নেই?

নোদের কিন্তু বিকার নেই। বরং মনে হচ্ছিল সে যেন গোঁফের ফাঁকে মুচকি মুচকি হাসছে। অবশ্য বেশিক্ষণ হাসিটা রইল না। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, শোন জীবন। তুই আমাকে প্রথমদিনেই বলেছিলিস, নবরত্ন সভা যদি বানাতেই হয় তাহলে আমাদের লাইনের লোক দিয়েই বানানো ভালো। সেদিন তোর কথা শুনিনি, তার জন্যে শাস্তিও পেয়েছি। জীবনে এই প্রথম নোদে ডাকাতের গায়ে পুলিশের হাত পড়েছে।

জীবন কাঁচুমাঁচু মুখে বলল, আহা, ওসব কথা যেতে দিন না সর্দার।

না। যেতে দিলে চলবে কেন? নবরত্ন কমপ্লিট করতে হবে না? আমার এই তিন রত্ন তো রইলেনই। চিড়েতন, শম্ভু আর তারক। তোরা আরো ছজন ঠিক এইরকম চোখ ধাঁধানো রত্ন খুঁজে বার কর। আছে নাকি, এমন রত্নের খোঁজ তোদের কাছে?

সঙ্গে সঙ্গে সভাঘরে ভারি একটা হুলুস্থুলু পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে বলতে শুরু করল, আছে সর্দার, আছে।

এ বলে, স্মাগলার কানা চণ্ডীকে খবর দেব?

ও বলে, ওয়াগন-ব্রেকার সাগীর মিঞাকে ডেকে আনি সর্দার?

সে বলে, জাল নোট ছাপায় যে বিজন মাইতি, তাকে ভুললে চলবে না কিন্তু।

নোদে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাকে প্রাণ চায় নিয়ে আয়। কিন্তু শেষ অবধি কে কে নবরত্নসভায় ঠাঁই পাবে সেটা ঠিক করবেন এই তিন রত্ন, যারা না-থাকলে আমাকে বাকি জীবনটা জেলের ঘানি ঘোরাতে হত। চলো হে তারক। চলো চিড়েতন। শম্ভু, আর বসে থেকো না।

ওরা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কোথায় যাব সর্দার। গান শুনতে হলে এখানে বসেই শুনুন না। নাকি কবিতা পাঠ হবে? বলেন তো এখানেই ক্যানভাস টাঙিয়ে ছবি আঁকছি।

নোদে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল, নিকুচি করেছে গানের। নিকুচি করেছে আবৃত্তি আর ছবির। আমি তোমাদের সঙ্গে বসে এখন কলকাতার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক লুঠের প্ল্যান বানাব। সেটাই হবে আমার দাক্ষিণাত্য-বিজয়। চলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%