সৈকত মুখোপাধ্যায়

প্রতিবছরের মতন এ-বছরেও মাঘ মাসে মামুদগঞ্জের বিরাট মাঠটায় পীরবাবার মেলা বসেছে। একশো বছরের পুরোনো মেলা। মেলায় যারা দোকান দিয়েছেন তারাও কেউ এই মেলায় নতুন নন।
মেলার দোকানদারদের ব্যাপারটা বেশ মজার। তাদের কারুরই বাঁধা দোকান থাকে না। গ্রীষ্মের দুটো মাস বাদ দিয়ে এই বাংলায় সারা বছরই কোথাও না-কোথাও মেলা চলে, আর সেসব মেলার ক্যালেন্ডার ওই দোকানি-ভাইদের মুখস্থ। একটা মেলা শেষ হলেই তারা ডেরাডান্ডা গুঁটিয়ে রওনা দেন পরের মেলার দিকে; সেখান থেকে আবার আরেকটায়। এইভাবে বছরের পর-বছর নানান মেলায় একসঙ্গে যাতায়াত, একসঙ্গে কেনাবেচা, একসঙ্গে মেলার ছাউনিতে বসবাস করতে করতে তাদের মধ্যে একরকমের আত্মীয়তাই গড়ে ওঠে।
মামুদগঞ্জের মেলার মাঠের উত্তরদিকে, গাছপালার আড়ালে একটা বড় দিঘি আছে। মেলায় যে শ-তিনেক দোকান বসে, সেইসব দোকানের মালিক আর কর্মচারীরা ওই দিঘির জলেই একমাস ধরে চান-টান সারেন। কিন্তু এই মাঘ মাসে রাত বারোটার তাণ্ডব-ঠান্ডায় যে কেউ ওই বরফজলে নেমে চান করবে, সেটা অবিশ্বাস্য।
তাই সেদিন ভেলপুরিওলা শিবশঙ্কর পাঁড়ে বেচাকেনার শেষে দিঘিতে বর্তন ধুতে এসে যখন দেখল একটা লম্বামতন কী যেন বুকজলে দাঁড়িয়ে ডুবের পর ডুব মারছে, তখন তার ভূতের কথাই আগে মনে পড়ল। সে বেশ জোরেই বলে উঠল—রাম রাম রাম রাম। অমনি ভূতটা তড়বড় করে জল থেকে উঠে এসে, পাঁড়েকে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, চুপ কর হতভাগা। ভেলপুরি বেচতে বেচতে তোর বুদ্ধিশুদ্ধিও দেখছি ভিজে মুড়ির মতন মিইয়ে গেছে।
পাঁড়ে ভারি অবাক হয়ে বলল, আই বাপ, খেতীশদাদা যে! আন্ধেরেমে চিনতে পারিনি। তো আপনি দাদা এই ঠান্ডায় আস্নান করতেছেন কেন? বুখার হয়ে মরবেন নাকি?
শিবু পাঁড়ের খেতীশদাদা, মানে ক্ষিতীশদাদা, মানে পুতুলনাচের দলের মালিক ক্ষিতীশ অধিকারী ভিজে গায়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, চান না করলে যে স্কিন-ডিজিজ হয়ে মরতাম সেটা ভাবছিস না, ছাগল কোথাকার।
ইসকিন ডিজিজ মতলব? খুজলি? কিঁউ খেতীশদাদা, কিঁউ? খুজলি কেনো হোবে আপনার?
কেনো না হোবে? পাঁড়েকে আবার ভেঙচি কাটলেন ক্ষিতীশ অধিকারী। শো-এর শেষে অন্তত কুড়িখানা পচা ডিম আর চল্লিশখানা পচা টমেটো মাথায় পড়েছে। সারা গা থেকে মুরগির দোকানের মতন গন্ধ ছাড়ছিল। খুজলি হবে না তো কি গায়ে গোলাপের বাগান হবে? এই এতক্ষণ ধরে সোডা দিয়ে ঘষেমেজে গা পরিষ্কার করলাম।
পাঁড়ে চোখ গোলগোল করে বলল, হায় রাম! এতক্ষণে সমঝ মে এল।
উত্তুরে হাওয়ায় কাঁপতে-কাঁপতে গামছা দিয়ে গা মুছছিলেন ক্ষিতীশবাবু। শিবু পাঁড়ের কথা শুনে গা মোছা থামিয়ে, ভারি সন্দেহের সুরে বললেন, কি সমঝমে এল ভাই শিবু?
এহি বাত কি, কেনো আজ সাম-সে চ্যাংড়া লেড়কার দল হামার দুকানে এসে পোচা টোমাটোর ঢুন্ডছিল। উস কি বাদ এগ-রোলের দু-কান থেকে পোচা আন্ডা ভি খরিদ করে কেনো লিয়ে গেলো। আব সমঝ গিয়া। বাচ্চাগুলো উও সব গন্ধা-চিজ আপনাকেই ছুঁড়িয়ে মারসে। খি খি খি খি খি।
ভিজে ধুতিটা ছাড়তে গিয়ে ক্ষিতীশবাবু হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তার ধুতির পাড়ে তখনো একটা পচা ডিম আটকে রয়েছে। সেটাকে সযত্নে তুলে নিয়ে তিনি হাস্যরত শিবু পাঁড়ের ঠিক ব্রহ্মতালুতে ভাঙলেন। তারপর গজগজ করতে করতে রওনা দিলেন তার পুতুলনাচের তাঁবুর দিকে।
সার্কাস, মরণকূপ কিংবা ম্যাজিকওয়ালার মতন পুতুলনাচও মেলার এক বড় আকর্ষণ। ক্ষিতীশবাবুদের আদি বাড়ি মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায়। সেখানে আজ থেকে একশো বছর আগে তার দাদুর বাবার হাতে এই পুতুলনাচের দল গড়ে উঠেছিল। তিনিই নাম দিয়েছিলেন 'পাঁশকুড়া পাপেট অপেরা'।
পুতুলনাচের দলের যিনি মালিক হন, তিনিই পালা লেখেন, গানে সুর দেন, আবার টাকাপয়সার হিসেবও থাকে তাঁরই হাতে। তাকে বলা হয় অধিকারী। এখন পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার মালিক ক্ষিতীশ অধিকারী।
ক্ষিতীশবাবুও পালা লেখেন। তার আবার দুটি রকম আছে। পৌরাণিক, মানে রামায়ণ-মহাভারত কিংবা মঙ্গলকাব্যের ঘটনা নিয়ে লেখা পালা। আর ঐতিহাসিক, অর্থাৎ শাজাহান, শিবাজী, রানা প্রতাপ এনাদের গল্প। তবে ইতিহাস কিংবা পুরাণ দুটোর কোনওটাই তিনি পড়েননি বলে প্রায়ই একই পালার মধ্যে দুরকমের মাল-মেটিরিয়াল মিশে যায়।
হয়তো চলছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যু-বধের দৃশ্য। হঠাৎ সেখানে কোত্থেকে দিব্যি হ্যাট-কোট পরে, কোমরে রিভলভার ঝুলিয়ে একটা সাহেব-পুতুল ঢুকে 'রে রে সপ্তরথী, অদ্যাবধি দেখিস নাই শ্বেতাঙ্গ-বিক্রম। পলাশীপ্রান্তরে আজি দেখরে কামানবাজি, ক্লাইভের দম'—এই বলে তলোয়ার নিয়ে নেচেকুদে একাকার করে দিল আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্ষিতীশবাবুর চেলাচামুণ্ডারাও চকলেট বোম-টোম ফাটিয়ে কামানের ঘোর শব্দ তুলে বসল। সেসব এমনই গল্প যে, ঘটনার স্রোতে শেষ অবধি অভিমন্যু বাংলার নতুন নবাবও হয়ে যেতে পারে কিংবা ক্লাইভ বসতে পারে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে। কখন কী হবে সেটা ক্ষিতীশবাবুর ইচ্ছের ওপরে নির্ভর করে। মানে পালা লেখার সময় তার মুড কীরকম ছিল তার ওপরে।
গ্রামগঞ্জের দর্শকেরা এসব ছোটখাটো ব্যাপারে সেরকম মাইন্ড করে না। প্রতিদিনই নানান আশ্চর্য ঘটনা দেখে থাকে বলে তাদের মানসিক হজমশক্তি শহরের দর্শকদের থেকে অনেক বেশি। ধরো, ক্ষিতীশবাবুর লেখা কোনো পালায় লোহার বাসরঘরে কালসাপ ঢুকে লখিন্দরের বদলে সম্রাট শাজাহানকেই ছুবলে দিল। তাতে অবাক হওয়ার কী আছে? চাষের কাজ করতে গিয়ে এ বছরে যদি মণ্ডলপাড়ার পকাই মণ্ডল সাপের কামড় খায়, তার মানে কি পরের বছর চড়কডাঙার মেহবুবকে আর সাপে কাটবে না? যত্তসব!
কিন্তু ইদানীং পাঁশকুড়া পাপেট অপেরায় যা বিচ্ছিরি কাণ্ড শুরু হয়েছে, সেটা ওই আটআনার শতরঞ্চির দর্শকদের পক্ষেও হজম করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেইজন্যেই খোঁজ পড়ছে পচা ডিম আর ধ্বসা টমেটোর। কী কাণ্ড সেটা বলার আগে পুতুলনাচের টেকনিকাল ব্যাপারটা তোমাদের একটু জানা দরকার।
পৃথিবীর নানান দেশে নানারকমের পুতুল দিয়ে পুতুলনাচ দেখানো হয়। তবে মোটামুটিভাবে তাদের দু-ভাগে ভাগ করা যায়। একরকমের পুতুলনাচে পুতুলগুলো হয় ছোট্ট ছোট্ট আর হালকা। তাদের হাত-পা ঘাড় সব ল্যাগবেগে। আলগা জয়েন্টগুলোতে সুতো বেঁধে, সেই সুতোর টানে ওদের হাত-পা নাড়িয়ে-চারিয়ে নাচানো হয়। ওইরকম পুতুলনাচে স্টেজের মাথাটা থাকে খোলা। যারা পুতুল নাচায়, তারা ওই খোলা ছাদের মধ্যে দিয়ে পুতুলগুলোকে সুতোয় ঝুলিয়ে নাচায়। তোমরা যারা 'সাউন্ড অফ মিউজিক' সিনেমাটা দেখেছ, তারা নিশ্চয় 'হাই অন আ হিল, আ লোনলি গোটহার্ড...' গানটার সঙ্গে ওইরকমের একটা দুর্দান্ত পুতুলনাচের দৃশ্য মনে করতে পারছ।
আর-এক ধরনের পুতুলনাচে মানুষের সাইজের বড় বড় পুতুলকে উঁচু করে তুলে নাচানো হয়। এখানে স্টেজের নীচের দিকটা টিনের বেড়া দিয়ে আড়াল করা থাকে। আড়ালের একপাশে থাকে দর্শক। অন্যপাশে যারা পুতুলকে নাচাচ্ছে তারা নিজেদের লুকিয়ে রেখে পুতুলগুলোকে মাথার ওপরে উঁচু করে ধরে চলাফেরা করে। তখন মনে হয় পুতুলরা নিজেরাই বোধহয় চলাফেরা করছে। তবে, বুঝতেই পারছ, এই ধরনের পুতুলনাচে পুতুলগুলোর কেবল মাথা থেকে কোমর অবধিই দেখা যায়। তার নীচে আর দেখবে কী? সেখানে তো শুধুই একটা লাঠি, যেটাকে শক্ত করে দু-হাতে ধরে নাচিয়েরা পুতুলকে নাচায়। এই পুতুলগুলোও একটু-আধটু হাত-পা-ঘাড় নাড়াতে পারে।
পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার পুতুলগুলো এই দ্বিতীয় দলের পুতুল। টিনের আড়াল থেকে তাদের নাচিয়ে, হাঁটিয়ে অ্যাকটিং করানো হয়। তবে কিনা পুতুলরা তো আর কথা বলে না, তাই তাদের হয়ে আড়াল থেকে কথাগুলো বলে দেন ক্ষিতীশ অধিকারী আর তার জনা-দুই শাগরেদ। তাদের মধ্যে একজনের নাম শম্ভু জানা। শম্ভুর চেহারাটা মা দুর্গার অসুরের মতন হলে কী হয়, গলার আওয়াজটা মেয়েদের মতন সরু। শম্ভু তাই রানি, সন্ন্যাসিনী, দেবী, এদের ডায়ালগগুলো বলে। ওটাই ওর স্পেশালিটি।
ইদানীং যে-কারণে পাঁশকুড়া পাপেট অপেরায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তার নাম সেলফোন। আরো ভালো করে বলতে গেলে বলতে হয় স্মার্টফোন। ক্ষিতীশবাবুর দলের প্রত্যেকটা ছেলের হাতে একটা করে ওই স্মার্টফোন অষ্টপ্রহর খোলা রয়েছে। তারা স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না। ওইদিকে তাকিয়েই পুতুল নাচাচ্ছে। ওইদিকে তাকিয়েই ডায়ালগ বলছে। ফলে ব্যাপার যা দাঁড়াচ্ছে তা এক কথায় ভয়ানক।
যেমন, যেদিন শিবু পাঁড়ের সঙ্গে দিঘির পাড়ে ক্ষিতীশবাবুর দেখা হল, সেদিনই অধিকারীমশাই বুক ঠুকে শুরু করেছিলেন রাজপুত আর মোগলদের যুদ্ধ নিয়ে লেখা পালা 'চিতোরগড়ের গেরিলা সন্ন্যাসী'। গ্রিনরুমে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিলেন রানা প্রতাপ, আওরঙ্গজেব, রানি পদ্মিনী সবার পুতুল। হাজারবার করে চ্যালাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কার পরে কে ঢুকবে, কোথায় দাঁড়াবে, কোন পার্টটাই বা বলবে। শম্ভু জানা বলবে রানি পদ্মিনীর ডায়ালগ, বিকাশ মাইতি বলবে রানা প্রতাপের ডায়ালগ আর পল্টু বলে একটা ছেলে বলবে আওরঙ্গজেবের পার্ট—এরকমটাই ঠিক ছিল। ছোটখাটো পার্টগুলোর জন্যে পার্ট বলবে অন্য কমবয়সি ছেলেরা। ওই কমবয়সিরাই পুতুলগুলোকে কাঁধের ওপরে তুলে নাচিয়েও থাকে।
শুরুটা দিব্যি হয়েছিল। দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল, কেমন করে কাশীনাথ নামে এক মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় চিতোরের অজেয় দুর্গের দরজা দিয়ে ঢুকে আসছে একের পর এক মোগল সৈন্য। দর্শক আসনের সামনে একটা কাঠের চেয়ারে ক্যাশবাক্স নিয়ে বসেছিলেন ক্ষিতীশবাবু। দেখতে দেখতে তার নিজের ঠোঁটের ফাঁকেও বেশ একটু গর্বের হাসি ফুটে উঠেছিল।
কিন্তু একটু বাদেই যখন সেই একই দরজা দিয়ে দশমাথা-ওলা রাবণ ঢুকে এসে মেয়েলি গলায় সেই বিশ্বাসঘাতক কাশীনাথকে বলল, 'বলো তো সখী, আমি যে চিতোরেশ্বরকে খবর দেওয়ার জন্যে পায়রা উড়িয়েছিলাম, সে কেন এখনো ফিরল না?' তখনই অধিকারীমশাইয়ের মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। দর্শকদের মধ্যে থেকেও 'এ কে রে' 'এ কে রে' আওয়াজ উঠল।
সেখানেই শেষ হলে তবু কথা ছিল। কিন্তু একটু পরেই যখন স্বয়ং হনুমানজি নাচতে নাচতে এসে একদম বিনা কারণেই লেজের আগুনে চিতোরগড় ছারখার করে দিলেন, তখন দর্শকদের ধৈর্যের আর বাধ মানল না। দমাদ্দম পচা ডিম আর টমেটো পড়তে লাগল অধিকারীমশাইয়ের মাথায়। কোনোরকমে বগলে ক্যাশবাক্সটি আঁকড়ে তিনি দৌড় লাগালেন পাশের সার্কাসের তাঁবুর দিকে। মালিকটি অধিকারীমশাইয়ের দীর্ঘদিনের পরিচিত। কোনোরকমে তাকে দড়ির মই দিয়ে টেনেটুনে তাঁবুর মাথার কাছে তুলে দিয়ে সে যাত্রা মারধোরের হাত থেকে বাঁচালেন।
ওই তাঁবুর টং থেকেই নেমে এসে, রাত বারোটার সময় দিঘিতে চান করতে গিয়েছিলেন ক্ষিতীশ অধিকারী।
নেত্যমাসি ঘর মুছছিল। টুবলু দুমদাম করে পা ফেলে তার সামনে গিয়ে কোমরে দু-হাত রেখে দাঁড়াল। নেত্যমাসি মুখ না তুলেই বলল,—আঃ, টুবলু! তুমি বড় হয়েছ। এখনো কি বলে দিতে হবে, ভিজে মেঝের ওপরে চলাফেরা করতে নেই। যাও খাটের ওপরে পা তুলে বসো। মেঝে শুকোলে নামবে।
এমনিতে টুবলু নেত্যমাসিকে বেশ সমঝে চলে, কারণ নেত্যমাসি তাকে জন্ম থেকে দেখছে। তাছাড়া মাসি কানে একটু কালা এবং চোখে ভালো দেখতে না পেলে কী হবে, গলায় ভয়ংকর জোর আর মা-ঠাকুমা সবাই ওর কথাকে খুব গুরুত্ব দেয়। এমনকী বাবা অবধি। কিন্তু এই মুহূর্তে টুবলু খুবই টেনশনের মধ্যে রয়েছে। নেত্যমাসিকে কথাটা জিগ্যেস না করলেই নয়। সে বলল, মাসি, তুমি আমার স্ক্র্যাচিং-রোবটটা দেখেছ? সত্যি কথা বলো।
মাসি ঘর মুছতে মুছতে খাটের তলায় ঢুকে পড়েছিল। সেখান থেকেই খনখনে গলায় উত্তর দিল,—কেরাচিনি? দিনের বেলায় কেরাচিনি তেল নিয়ে কী করবে মানিক? রাতে লোডশেডিং হলে আমি তোমায় লণ্ঠন জ্বেলে দেব এখন। বাচ্চা মানুষ, আগুনে হাত দিতে নেই।
টুবলু চট করে একবার নাকের নীচে আর থুতনির ওপর সদ্য গজিয়ে ওঠা রোঁয়াগুলোয় হাত বুলিয়ে নিয়ে বলল, মাসি! প্রথম কথা, আমি বাচ্চা মানুষ নই। ক্লাস টেনে পড়ি। দ্বিতীয় কথা, আমি কেরোসিন তেল খুঁজছি না। খুঁজছি স্ক্র্যাচিং রোবট...স্ক্র্যাচিইইইং রোবঅঅঅট!
মাসি খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে বলল, সেটা কি তোমার বানানো কোনো নতুন খেলনা? আমি আজ তোমার ঘরে ঢুকে কোনো খেলনায় হাত দিইনি। সত্যি বলছি। তবে একটা এত বড় ঘুরঘুরে পোকা মেঝের ওপরে ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরছিল। সেটাকে ঝ্যাঁটার এক বাড়ি মেরে ফেলে দিয়েছি। না মারলে ওটা তোমাকেই কামড়াতো।
টুবলুর চোখদুটো আতঙ্কে গোলগোল হয়ে উঠল। সে বলল, ও মাসি! কোথায় ফেলেছ? পোকাটাকে কোথায় ফেলেছ, বলো না!
মাসি বলল, কোথায় আবার ফেলব? তোমার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের বাগানেই ছুঁড়ে দিলাম তো।
টুবলু আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে বেরিয়ে গেল এবং থামল গিয়ে একেবারে বাইরের বাগানে, তার ঘরের জানলার নীচে। একটু খুঁজতেই সে ঘাসের মধ্যে রোবটটাকে পেয়ে গেল। এই রোবটটা ছোট, সরু এবং পেটফোলা ঠিকই। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, এর পুরো বডিটাই সে বানিয়েছে চকচকে একরকমের অ্যালয়-মেটাল দিয়ে। তাছাড়া এটার সামনের দিকে দুটো ফোটো-সেন্সর সারাক্ষণ দপদপ করছে আর পেটের কাছে পা-ই বা কোথায়? সেখানে তো টুথব্রাশের মতন সিলিকনের দাঁড়া। কতটা চোখ খারাপ হলে নেত্যমাসি এটাকে ঘুরঘুরে পোকা বলে ভাবতে পারে সেটা ভেবেই রাগে দুঃখে টুবলুর চোখে জল চলে এল।
স্ক্র্যাচিং-রোবটটাকে যত্ন করে হাতের ওপর তুলে নিয়ে টুবলু দেখল বড়সড় ক্ষতি কিছু হয়নি। মনে হয় ঝ্যাঁটার বাড়িতে ভেতরের ছোটখাটো কোনো সার্কিট খুলে গেছে। সারিয়ে ফেলা যাবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোবটটাকে হাতে নিয়ে টুবলু তার ঘর-কাম-ওয়ার্কশপের দিকে হাঁটা লাগাল। এমনিতে ওই ঘরে বাবা, মা, বোন কাউকে সে ঢুকতে দেয় না। কিন্তু নেত্যমাসিকে আটকানো যায় না। দু-বেলা সে ন্যাতা, ঝ্যাঁটা এইসব বিপজ্জনক জিনিস নিয়ে ঢুকবেই ঢুকবে এবং একটা কিছু অনিষ্ট করে বেরিয়ে আসবে।
কয়েকদিন আগেই মাসি ঠিক এইভাবে তার ক্লিনিং-রোবটটাকে ইঁদুর-ধরা কলের মধ্যে আটকে ফেলেছিল। ওই রোবটটাকে সে তৈরিই করেছিল এমনভাবে, যাতে মেঝের ওপরে যে-কোনো একটা ছোট পার্টিকল পড়ে থাকলেই রোবটটার সেন্সরে সেটা ধরা পড়ে, আর অমনি সেটাকে একটা সাকসনের মধ্যে চুষে নিয়ে সেটা আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসে।
মা জিনিসটা দেখে খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল এই এতদিনে আমার ছেলে একটা কাজের জিনিস বানিয়েছে। বাব্বা! আমাদের ঘরের মেঝে তো মেঝে নয়, যেন কুরুক্ষেত্র। কত আর পরিষ্কার করে পারা যায়। এরকম মেশিন কয়েকটা থাকলে আর বারবার ঝাঁট দিতে হয় না।
টুবলু কেমন করে জানবে, শুধু মা-ই নয়, ঘর মুছতে গিয়ে নেত্যমাসিও ক্লিনিং-রোবটটার নড়াচড়া দেখেছে এবং সঙ্গে-সঙ্গেই ইঁদুর মারার শপথ নিয়ে ফেলেছে।
প্রথমে নাকি মাসি ইঁদুর মারা বিষই দিয়েছিল। কিন্তু বিষ খেয়ে রোবট মরছে এরকমটা তো হয় না। তাই পরেরদিন মাসি বাজার থেকে খাঁচার মতন ইঁদুরকল কিনে এনে যেই না তার মধ্যে একটুকরো রুটি রেখেছে অমনি ক্লিনিং রোবটের সেন্সরে ধরা পড়েছে সেই রুটির ছবি। সে বোঁ করে এসে সাকসন দিয়ে মেরেছে রুটির টুকরোয় টান আর অমনি ঝড়াৎ করে খাঁচার দরজাও গেছে বন্ধ হয়ে।
সেদিন রোবটটাকে মা-ই বাঁচিয়েছিল। নেত্যমাসি যখন বীরবিক্রমে ওটাকে খাঁচা শুদ্ধু জলে ডুবিয়ে মারতে যাচ্ছে, তখন মা-ই দৌড়ে এসে মাসির হাত থেকে সেটাকে কেড়ে নিয়ে আলমারির মাথায় তুলে রেখেছিল। ইস্কুল থেকে ফেরার পর টুবলু শুনেছিল, নেত্যমাসি তখনো গজগজ করছে—একটা নেংটি ইঁদুরের জন্যে তোমার প্রাণে এত দয়া, দিদি! কই, আমাকে তো কখনো একখানা বেনারসি শাড়ি দিলে না?
টুবলু বাবা-মা'র কাছ থেকে ওর সমস্ত রিসার্চের কাজে ভরপুর সাপোর্ট পায়। এমনিতে টুবলুর বাবা ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। চাষবাসের কাজ দেখে আর অন্য কিছুর সময় পান না। ছেলে ইস্কুলে পড়ছে, বছর-বছর ফার্স হচ্ছে, এতেই তিনি খুশি ছিলেন।
কিন্তু যেদিন টুবলুর ক্লাস-টেনের হাফইয়ার্লি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোল, সেদিন হেডমাস্টারমশাই বাবাকে ডেকে পাঠালেন। হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে টুবলু শুনেছিল, তিনি বাবাকে বলছেন, তারকবাবু, আপনার ছেলে তথাগত শুধু ভালো রেজাল্টই করবে না, ফার্স্ট সেকেন্ড একটা কিছু হয়ে আমাদের মামুদগঞ্জ অ্যাকাডেমির মুখ উজ্জ্বল করবে, এই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বিজ্ঞানে এমন প্রতিভা আমি এতবছর মাস্টারি করেও দেখিনি। ও অনেক কিছুই করে, যেগুলোকে আপনাদের খালি চোখে পাগলামি মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে সেগুলো ওর প্রতিভার বিকাশেই কাজে লাগবে। তাই ওর কোনো কাজে বাধা দেবেন না।
তারপর থেকেই বাবা বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছে, টুবলুর ঘরে যেন কেউ না ঢোকে, টুবলুকে যেন কেউ কাজের মধ্যে ডিস্টার্ব না করে।
আর সকলে সে কথা শুনলেও নেত্যমাসি কিছুতেই শুনবে না। অবশ্য নেত্যমাসি যদি ঘর পরিষ্কার না করে তাহলে ঘরের দশা কী হবে সেটাও ভাববার। বাবা একবার আমতা আমতা করে বলেছিল, তাহলে কি অন্য একজন লোক দেখব? ইয়ে...মানে যে চোখে দেখতে পায়, কানে শুনতে পায় আর বেশ বাধ্য? তাতে টুবলুরই সবার আগে চোখে জল চলে এসেছিল। ও ছোটবেলা থেকে নেত্যমাসিকেই আরেকটা মা বলে জেনে এসেছে কিনা। ছেলের চোখে জল দেখে তারকবাবু আর ও ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেননি।
এই যে ঘুরঘুরে পোকার মতন দেখতে স্ক্র্যাচিং-রোবটটা, এটাও কিন্তু টুবলু বানিয়েছিল নেত্যমাসির জন্যেই। মায়ের জন্যে যেমন ক্লিনিং-রোবট, নেত্যমাসির জন্যে স্ক্র্যাচিং রোবট। টুবলু অনেকদিন ধরেই দেখছে, সারা গরমকালটা মাসি ঘামাচিতে খুব কষ্ট পায়। পিঠের দিকে হাত ঘুরিয়ে, পাখার ডাঁটি দিয়ে পিঠের কতটুকুই বা চুলকোনো যায়?
নিজের ঘরে বসে টুবলু ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় রোবটটাকে সারিয়ে ফেলল। তারপর দালানে বেরিয়ে এসে দেখল, নেত্যপিসি কাজকর্ম সেরে রোদ্দুরে মাদুর পেতে ঘুমোনোর উদ্যোগ করছে। সে রোবটটাকে পিসির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, পিসি, এই নাও।
নেত্যমাসি প্রথমটায় হাঁউমাঁউ করে উঠলেও, টুবলুর মুখের দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়ে রোবটটাকে নিল। কিন্তু তারপর যখন ওটাকে খাবে না মাথায় মাখবে বুঝতে পারছিল না, তখন টুবলুই রোবটটাকে পিসির কাঁধের কাছে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। অমনি সেই রোবট ব্রাসের মতন পা দিয়ে আলতো করে পিসির চামড়া আঁকড়ে ধরে গুরগুরিয়ে পিঠ বেয়ে ওঠানামা করতে লাগল আর সেই খোঁচা খোঁচা ব্রাশের আঁচড়ে পিসির চোখ তক্ষুনি আরামে বুজে গেল। তাও তো এখন শীতকাল, ঘামাচির বালাই নেই। গরমকালে এই জিনিস যে তাকে কত জ্বালার থেকে অব্যহতি দেবে তাই ভেবেই পিসি টুবলুর মাথাটা টেনে ধরে একটা হামি খেলেন।
টুবলু যথারীতি একবার নাকের নীচের রোঁয়াগুলোয় হাত বুলিয়ে নিয়ে বলতে যাচ্ছিল,—আঃ পিসি, আমি ক্লাস টেনে পড়ি। কিন্তু তার আগেই ওদের পেছন থেকে কোনো এক মহিলা সরু গলায় বলে উঠলেন, বেঁচে থাকো বাবা। বিদেশের বিজ্ঞানীরা কি দেশের মানুষের এইসব সমস্যা বুঝবে? তার জন্যে তোমার মতন দেশের ছেলেদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
টুবলু কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে মহিলা, বালিকা, কাউকেই খুঁজে পেল না। বরং দেখল, অবিকল মা দুর্গার অসুরের মতন দেখতে একটা লোক হাসিহাসি মুখে তাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। টুবলুকে অবাক করে দিয়ে সেই অসুরটাই আবার মা-লক্ষ্মীর মতন গলায় বলে উঠল, মেলা-কমিটির চেয়ারম্যান তাহলে আমাকে ভুল জায়গায় পাঠাননি। তোমার প্রতিভা তো দেখছি ভয়ংকর। ইয়ে, আমার নাম শম্ভু জানা। পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার ভাইস ক্যাপ্টেন।
নেত্যমাসি মেয়েলি গলা শুনে খানিকক্ষণ চোখ কুঁচকে শম্ভু জানার মুখটা দেখার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ছিঃ মা। চুলগুলো না-হয় বেটাছেলের মতন করে ছেটেছ। জামা-প্যান্টও পরেছ মরদের মতন। তাই বলে নাকের নীচে অত বড় গোঁফ এঁকে ঘুরতে হবে? এই বলে কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
শম্ভু জানা বিরক্তমুখে বলল, এঃ, বুড়িটার তো মাথা খারাপ দেখছি। চলো ভাই। আমরা পিছনের বাগানে গিয়ে শান্তিতে কথা বলি।
টুবলুদের বাগানের বকুলবেদিতে বসে
শম্ভু জানা গত কয়েকদিনের শো-এ যা যা বিপর্যয় হয়েছে, এবং যে-কারণে হয়েছে, সব কথাই টুবলুকে খুলে বলল। বলল, দুঃখের কথা কী বলব ভাই, মন দিয়ে রানি পদ্মিনীর পার্ট বলছি। হঠাৎ চোখ তুলে দেখি রাবণরাজার পুতুলটাকে এক-হাতে চাগিয়ে তুলে ঘাটালের পকাই বলে ছেলেটা স্টেজে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। পকাইয়ের চোখদুটো অন্য হাতে ধরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে এমন আটকে রয়েছে যে, যতই ডাকি, যতই ইশারা করি, কিছুই শুনতে পায় না। এখন তুমিই বলে দাও, এই বিপদ থেকে কেমন করে আমরা উদ্ধার পাব?
টুবলু অবাক হয়ে বলল, কিন্তু আমি তো পুতুল নাচাতে জানি না। আমার গায়ে অত জোরও নেই। আমি কী করব বলুন তো।
শম্ভু মাথা চুলকে বলল, আমিও তো তাই ভাবছি। কিন্তু মেলা-কমিটির চেয়ারম্যান, তোমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই গোপীনাথবাবু যে অত জোর দিয়ে বললেন, কেউ যদি তোমাদের বাঁচাতে পারে তো ক্লাস টেনের ফার্স্টবয় তথাগত সান্যালই পারবে।
এদিকে আমাদের তো শো বন্ধ হবার জো। পুতুলনাচ না দেখালে খেতে পাব না, আবার দেখালে মার খেয়ে মরব। উভয়সঙ্কট আর কাকে বলে? তুমি একটু মাথা খাটাও ভাই। গোপীনাথবাবু অত পণ্ডিত মানুষ। তাঁর কথা তো মিথ্যে হবার নয়। এই বলে শম্ভু জানা দুঃখিত মুখে মেলার মাঠের দিকে হাঁটা লাগাল।
আজ আবার সাড়ে আটটা থেকে শো রয়েছে। আজকের পালা মেঘনাদের পাতালপ্রবেশ। অ্যাকচুয়ালি কালকে যে রাবণরাজার পুতুল, হনুমানের পুতুল সব ভুল করে স্টেজে উঠে গিয়েছিল, তাদের আজকেই নাচবার কথা ছিল। কিন্তু এদিকে আবার আজকেই রাত ন'টায় ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচের ডাইরেক্ট টেলিকাস্ট শুরু হবে। তারপরে কি আর ছোঁড়াগুলোকে মোবাইল থেকে নড়ানো যাবে? কী জানি শেষ অবধি কী হয়!
শম্ভু জানা বিদায় নেওয়ার পর টুবলুও ওর নিজের ঘর-কাম-ওয়ার্কশপে ঢুকে ভেতর থেকে খিল তুলে দিল। শম্ভু জানার কাছ থেকে ওদের দলের ছেলেদের মোবাইলের নেশা-টেশার কথা অনেক কিছুই সে শুনল ঠিকই, কিন্তু কেমন করে যেন নাচের পুতুলগুলোর চেহারাটাই টুবলুর মাথার মধ্যে গেঁথে গেল। আচ্ছা, পুতুলগুলোর সম্বন্ধে ঠিক কী কী বলেছিল শম্ভুদা?
প্রথমত পুতুলগুলো হালকা মেটিরিয়ালে তৈরি। পেপিয়ার ম্যাসে বা কাগজের মণ্ড, শোলা, রাংতা এইসব দিয়ে ওগুলোকে বানানো হয়। ওজনে হালকা না-হলে মাথার ওপরে ওই মানুষপ্রমাণ পুতুলগুলোকে অতক্ষণ ধরে তুলে রাখা কঠিন হত।
দ্বিতীয়ত, সব পুতুলকেই আসলে একইরকমের দেখতে। নাটকে নামার আগে জ্যান্ত অ্যাকটরদের যেমন মেক-আপ দিয়ে নানান রোলের জন্যে তৈরি করা হয়, পুতুলদের ক্ষেত্রেও তাই। যেমন ধরো, একটা পুতুল যেদিন সন্ন্যাসী সাজবে, সেদিন তাকে গেরুয়া পোশাক পরিয়ে দেওয়া হল। মাথায় লাগিয়ে দেওয়া হল জটাজুট আর গালে দাঁড়িগোঁফ। তারপর হাতে একটা কমন্ডলু ধরিয়ে দিতেই সন্ন্যাসীঠাকুর রেডি। সেই পুতুলটাকেই যদি পরেরদিন রাজা বানাতে হয় তাহলে তাকে জরির পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া হবে। মাথায় থাকবে বাবরি চুল, নাকের নীচে কার্তিকের মতন গোঁফ আর হাতে কমন্ডলুর বদলে তরবারি।
তৃতীয়ত, এটাই সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট। প্রত্যেকটা পুতুল আসলে ফাঁপা। শুধু খোলস। শরীরের ভেতরে কিছু থাকে না। এটাও করা হয় পুতুলগুলোকে হালকা করে বানাবার জন্যে।
এই কথাগুলো মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎই টুবলুর মাথার ভেতরে একটা আগ্রহের জন্ম হল। যে-কোনও বিজ্ঞানীর চাই এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ। পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার এই মোবাইল-বিপ্লব তাকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। টুবলু পরিষ্কার বুঝতে পারল, যে-জিনিসটা সে এই মুহূর্তে ডেভেলাপ করার কথা ভাবছে, সেটাকে হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখার এমন সুযোগ বড় একটা আসবে না।
কাজেই একটু বাদেই টুবলু একটা রিকশা নিয়ে মেলার মাঠের দিকে রওনা হল। আধঘণ্টার মধ্যেই সে আবার ফিরেও এল। ফিরল সেই একই রিকশায়, তবে এবার ওর পায়ের কাছে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা বড়সড় জিনিস শোয়ানো ছিল, যেটা যাবার সময় ওর সঙ্গে ছিল না। কারুর সাহায্য ছাড়াই টুবলু দিব্যি জিনিসটাকে দু-হাতে ধরে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। তার মানে ওটা দেখতে বড় হলেও ওজনে হালকা।
যখন সে নিজের ঘরে ঢুকছে তখন মা একবার জিগ্যেস করল, ওটা আবার কী নিয়ে এলি?
টুবলু গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,—গিনিপিগ।
মা আর কিছু বলল না।
তারপর সেই বিকেল থেকে টুবলু ঘরে খিল দিয়ে একটানা কাজ করে গেল। কেউ তাকে ডাকলো না, কারণ হেডমাস্টারমশাইয়ের বারণ আছে কাজের সময় ওকে যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে। অন্যদিন হলে হয়তো নেত্যমাসি ওকে জলখাবার খাওয়ানোর জন্যে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করত। কিন্তু আজ নেত্যমাসিও অন্য একটা ব্যাপারে ভীষণ ব্যস্ত।
নেত্যমাসি আজ পুতুলনাচের পালা দেখতে চলেছে।
প্রতি বছরই মাসি বেশ কয়েকবার মেলায় যায়। ওর দেশে ফেলে আসা নাতি-নাতনিদের জন্যে পুতুল-টুতুল কেনে, নিজের জন্যেও কেনে মাদুর হাতপাখা এইসব। টুবলুদের বাড়ির সবার জন্যেই মনে করে মেলা থেকে কিছু না কিছু কিনে আনে নেত্যমাসি। টুবলুর বাবার জন্যে কাচের অ্যাশট্রে, ওর মায়ের জন্যে বাহারি ভ্যানিটি ব্যাগ, বোনের জন্যে পুতুল এইসব। টুবলুকেও বন্দুক, মাটির বেহালা, জলভরা বেলুন এইসব কিনে দেয়। সেগুলো হাতে নিয়ে টুবলু হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তবে, মাসির চোখে যে তার বয়স একটুও বাড়েনি সেটা সে দিব্যি বুঝতে পারে। মেলার মাঠে মাসির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পুতুলনাচ। এমনিতে কমজোরি কান আর চোখ নিয়ে মাসি অনেক জিনিসই এনজয় করতে পারে না। টিভির সিরিয়াল-টিরিয়াল কখনো-সখনো দেখে ঠিকই, বুঝতে না পেরে একটু বাদেই উঠে চলে যায়। কিন্তু ক্ষিতীশ অধিকারীর চড়া সুরের পালা মাসির কানে দিব্যি ধরা পড়ে। বড়সড় পুতুলগুলোকে চোখে দেখতেও খুব একটা অসুবিধে হয় না। সেইজন্যেই মাসি ফাঁক পেলেই পীরবাবার মেলায় পুতুলনাচের আসরের একেবারে সামনের রো-য়ে বসে পড়ে।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। মাসি মেলার চিন্তায় অন্যমনস্ক ছিল। বাবা মা বোন তো এমনিতেই ডাকাডাকি করবে না। কাজেই টুবলু নিশ্চিন্তমনে রাত আটটা অবধি একটানা কাজ করে হাতের কাজটা শেষ করল। ঠিক সময়েই শেষ হয়েছে। একটু বাদেই শম্ভুদা এটাকে নিতে আসবে। ওদের পালা শুরু সাড়ে আটটায়। এই বাবাজিও তখন খেল দেখাবে।
বাবাজিই বটে। ক্ষিতীশ অধিকারী বিরচিত 'মেঘনাদের পাতালপ্রবেশ' পালার ইনিও একজন নায়ক। জাম্বুবান।
প্রমাণ সাইজের পুতুলটার সারা গায়ে লম্বা কালো লোম, মুখটা ছুঁচলো। থার্মোকলের মুলোমার্কা দাঁত আর রাংতার লম্বা নোখওয়ালা থাবা লাগিয়ে জাম্বুবানকে বেশ একটা ভালুকের চেহারা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে খুব একটা ভুল করেননি অধিকারীমশাই। রামায়ণের জাম্বুবান আসলে ছিল ঋক্ষরাজ, মানে ভালুক।
সেই জাম্বুবান কিংবা ভালুকবাবাজি টুবলুর ওয়ার্কিং-বেঞ্চের ওপরে চুপচাপ শুয়েছিল, একটা পুতুলের যেমন চুপচাপ শুয়ে থাকা উচিত। ওটার কানের পেছনে একটা ছোট বোতামকে অফ থেকে অন পজিশনে ঘুরিয়ে দিল টুবলু। জাম্বুবানের চোখদুটো পিটপিট করে উঠল। কিন্তু ঠিক তখনই একটা কাণ্ড হল। শম্ভু জানার কাছ থেকে টুবলুর মোবাইলে একটা ফোন এল।
টুবলু যেই না মোবাইলটা তুলে কানে লাগিয়েছে, অমনি সেই জাম্বুবানের পুতুল বিছানার ওপর খাড়া হয়ে বসে, টুবলুর গালে বসিয়ে দিল এক পেল্লায় চড়। টুবলু সঙ্গে সঙ্গে চোখে অন্ধকার দেখল। জাম্বুবানও টুবলুর ঘরের দরজা খুলে, পেছনের বাগানের বেড়া ডিঙিয়ে, অন্ধকার মাঠের মধ্যে নেমে গেল।
একইসময় নেত্যমাসি সদর-দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটু ঘুরপথে ওই একই মাঠে গিয়ে পড়ল। টুবলুদের বাড়ি থেকে মেলায় যেতে হলে এই মাঠটাই শর্টকাট। এটা পেরোলেই মেলাতলা। ওই তো দূরে মেলার আলো দেখা যাচ্ছে। পিসি বুঝতে পারল দেরি হয়ে গেছে, পালা শুরু হতে আর দেরি নেই। একটু তাড়াতাড়ি চলতে পারলে ভালো হত। কিন্তু মাঠটা আজকে বড়ই অন্ধকার। যদিও শুক্লপক্ষ চলছে, কিন্তু আকাশে আজ কোত্থেকে যেন অসময়ের মেঘ জমেছে। চাঁদ তারা কিছুই নেই। পিসি মনে মনে ভাবল, একজন চলনদার থাকলে ভালো হত—যার হাত ধরলে আর চোখে দেখে দেখে পথ চলার প্রয়োজন হত না।
ভাবতে না-ভাবতেই একটা বিরাট লোমশ হাত এগিয়ে এসে মাসির হাত ধরে খুব যত্ন করে তাকে এগিয়ে নিয়ে চলল।
মাসি কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে তার ভগবানদত্ত চলনদারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ও বুঝেছি। ভুতনাথবাবুর বেটা তো তুমি? কেষ্ট? পাড়ার মধ্যে তোমার দাঁতগুলোই সবচেয়ে ইয়ে, মানে সুন্দর কিনা। বেঁচে থাকো বাবা। বুড়ি মাসির প্রতি কত দরদ! তা বাবা তোমার এই ফুলহাতা সোয়েটারের উল-টা যে বড্ড খরখরে ঠেকছে। আর ভুষো-কালো রংটাও ভালো নয়। মেলা থেকে কিনেছ বুঝি? হতভাগা দোকানদার তোমায় এক্কেবারে ঠকিয়ে দিয়েছে।
ইতিমধ্যে ঝমাঝম প্যাঁ-পোঁ করে পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার নতুন পালা শুরু হয়ে গেছে। সীতা আর জাম্বুবান ছাড়া বাকি প্রায় সমস্ত চরিত্রই একবার করে মঞ্চে ঘুরে গেছে।
সীতাকে মঞ্চে তোলা যায়নি, কারণ শম্ভু জানা সেই যে টুবলুবাবুর বাড়ি থেকে জাম্বুবানের পুতুলটা ফিরিয়ে আনতে গেছে, সে এখনো ফেরেনি। সে না থাকলে সীতার ডায়ালগ বলবে কে? ক্ষিতীশ অধিকারী একবার মোবাইলে ওকে ধরেছিলেন। তা শম্ভু খুব আশ্চর্য কথা জানাল। ও বলল, জাম্বুবান নাকি টুবলুবাবুকে এক চড়ে অজ্ঞান করে দিয়ে কোথায় পালিয়েছে।
জাম্বু পালাবে মানে? তার নিজের চোখের সামনে কারিগরেরা কাগজের মণ্ড দিয়ে ওটাকে তৈরি করেছে। ওটার কি প্রাণ আছে যে পালাবে?
তিনি শম্ভুকে প্রচণ্ড এক ধমক দিতেই শম্ভু তাড়াহুড়ো করে বলল, এখন টুবলুবাবু একদম সুস্থ এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই শম্ভু পুতুলনাচের আসরের দিকে ফিরছে। অধিকারীমশাই যেন একটু সাবধানে থাকেন। এই বলে ফোন কেটে দিল।
তারপর থেকেই ক্ষিতীশবাবু মঞ্চের সামনে ক্যাশবাক্স আঁকড়ে ধরে বসে আছেন আর ভাবছেন, জাম্বুবানের পুতুলটাকে শেষ অবধি না পাওয়া গেলে তো ভারি মুশকিল। মেঘনাদের পাতাল প্রবেশের ব্যাপারে জাম্বুর একটা বড় ভূমিকা আছে। ওরই তো যজ্ঞগৃহের মেঝেয় গর্ত খুঁড়ে মেঘনাদকে কিডন্যাপ করে নিয়ে পালাবার কথা।
দুঃখের কথা, কিছুক্ষণের মধ্যেই পুতুলনাচের মঞ্চে যা বিচ্ছিরি ব্যাপার শুরু হল তাতে অধিকারীমশাইয়ের মাথা থেকে শম্ভু আর জাম্বুর চিন্তা বিলকুল বেরিয়ে গেল।
ঠিক ন'টার সময় শুরু হল ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচের লাইভ টেলিকাস্ট। সঙ্গে-সঙ্গে যারা পুতুল নাচাচ্ছিল, যারা ডায়ালগ বলছিল, মায় যারা টিনের দেয়ালের ওদিকে মাইকের সামনে বসে হারমোনিয়াম কিংবা বাঁশি-টাশি বাজাচ্ছিল সকলেরই পকেট থেকে পটাপট বেরিয়ে এল স্মার্টফোন। পালার গল্পও তৎক্ষণাৎ ঘেঁটে 'ঘ' হয়ে গেল।
ইন্দ্রজিতের যজ্ঞগৃহে কেমন করে যে মিঞা তানসেন ঢুকে পড়ে গান ধরলেন আর সেই গান শুনে কেনই বা তেনজিং নোরগে এভারেস্টের চুড়োয় হাসি হাসি মুখে পতাকা উড়িয়ে দিলেন, সেসব কিচ্ছু বুঝতে না পেরে দর্শকেরা পকেট থেকে পচা ডিম বার করে তৈরি হল।
ওদিকে ঠিক সেই সময়েই মাঠের মধ্যে নেত্যমাসি জাম্বুবানের সোয়েটারের নিন্দে করে বসল। কেষ্ট নামটা জাম্বুবানের ভালো লাগল না বোধহয়। কিংবা এমনও হতে পারে, গায়ের লোমের নিন্দে তার পছন্দ হয়নি। যাইহোক, সে হঠাৎই মুখ দিয়ে একটা হাড় হিম করা গর্জন ছেড়ে পিসির হাত ধরে একরকম উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে পুতুলনাচের আসরে বসিয়ে দিয়ে, নিজে এক লাফে টিনের দেওয়াল টপকে ওদিকে চলে গেল—যেদিকে অন্য পুতুলরা নাচানাচি করছে, সেইদিকে। সবকিছু দেখেশুনে নেত্যমাসি শতরঞ্চির ওপরেই চোখ উল্টে মুচ্ছো গেল।
নেত্যমাসির মুর্চ্ছা যাওয়াটা দর্শকদের তেমন চোখে পড়ল না। কারণ, মঞ্চের উলটোদিক থেকে বীরবিক্রমে জাম্বুবানকে এনট্রি নিতে দেখে তারা ততক্ষণে ভীষণই মুগ্ধ। ডিম-টিম আবার পকেটে পুরে রেখে তারা ক্ল্যাপ দিয়ে জাম্বুবানকে অভিনন্দন জানাল।
কিন্তু ক্ল্যাপের উত্তরে জাম্বু যেটা শুরু করল, তার সঙ্গে তুলনা করলে হনুমানের লঙ্কাকাণ্ড কিংবা শিবের তাণ্ডবনৃত্যকে নিতান্ত ছেলেখেলা বলে মনে হবে। যার যার হাতে মোবাইল ছিল তাদের প্রত্যেককে সেই ভালুক-পুতুল ধরে ধরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। পুতুলনাচের কলাকুশলীদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব পড়ে গেল।
দর্শকেরা প্রথমটায় ভেবেছিল বোধহয় গল্পের প্রয়োজনেই জাম্বুবানের মাথা খারাপ দেখাতে হয়েছে; একটু বাদে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যখন তাদের মধ্যেও যারা কানে মোবাইল ফোন লাগিয়ে বসেছিল তারাও জাম্বুবানের চড় খেয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখল, তখন দেড়মিনিটের মধ্যে পুতুলনাচের আসর ফাঁকা হয়ে গেল।
টুবলু আর শম্ভু জানা দৌড়তে দৌড়তে আসরে ঢুকে দেখল, সেখানে তিনটি মাত্র লোক। শতরঞ্চির ওপরে শুয়ে নেত্যমাসি ঘুমোচ্ছে। ক্ষিতীশ অধিকারী ক্যাশবাক্স বুকে জড়িয়ে রামনাম জপছেন। আর জাম্বুবান মন দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনগুলোর ব্যাক-কাভার খুলে একমনে সিমকার্ড চিবিয়ে খাচ্ছে।
টুবলু পা টিপে টিপে জাম্বুবানের পেছনে গিয়ে তার কানের পেছনের সুইচটাকে অন থেকে অফ করে দিতেই জাম্বুবান নেতিয়ে পড়ে গেল—একটা কাঠের পুতুলের যেভাবে পড়ে থাকা উচিত।
সেদিনই রাতে টুবলুদের রান্নাঘরে নেত্যমাসি রাশি রাশি লুচি ভাজছিল আর টুবলুর মা দালানে পাত পেড়ে বসে-থাকা খাইয়েদের সামনে সেই লুচি আর কিমার তরকারি গরম গরম পরিবেশন করছিলেন। খাইয়েদের মধ্যে পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার অধিকারী আর সমস্ত কলাকুশলী তো ছিলেনই, তাছাড়াও ছিলেন টুবলুর বাবা, মামুদগঞ্জ অ্যাকাডেমির হেডমাস্টারমশাই আর টুবলু নিজে।
হেডমাস্টারমশাই একটানা আটটা লুচি খাওয়ার পর এক-ঢোক জল খেয়ে জিগ্যেস করলেন, গণ্ডগোলটা কোথায় হল তথাগত?
টুবলু লজ্জিতমুখে বলল, ইনটেলিজেন্ট রোবট বানানোর ইচ্ছেটা অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে কাজ করছিল স্যার। ক্লিনিং-রোবট, স্ক্র্যাচিং-রোবটের সাকসেসের পরে বুঝতে পারছিলাম, মানুষের মতন রোবট বানানোটাও এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। পজিট্রনিক ব্রেনটেন সব তৈরি করেই রেখেছিলাম, শুধু শরীরটা বানাবার মতো টেকনোলজি খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
তাই শম্ভুদার মুখে পুতুলনাচের ফাঁপা পুতুলের কথা শুনেই মনে হল, এক ঢিলে দুই পাখি মারলে কেমন হয়। আমার অ্যান্ড্রয়েড রোবটের একটা ট্রায়ালও হয়ে যায়, আবার সেটার মাথায় যদি মোবাইল-ফোনের প্রতি একটা ঘৃণা ঢুকিয়ে দিতে পারি, তাহলে ওদেরও একটু শিক্ষা হয়ে যায়।
শেষ কথাটা টুবলু খুব ফিসফিস করে বলল। কারণ, যাদের শিক্ষা হয়েছে তারা সকলেই ধারে কাছে বসে লুচি খেতে খেতে টুবলুদের টিভিতে ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার ওয়ান ডে ম্যাচ দেখছিল। কারুর কপালে স্টিকিং-প্লাস্টার, কারুর হাঁটুতে ব্যান্ডেজ। শুধু এখন তাদের কারুর কাছেই আর মোবাইল ফোন নেই।
টুবলুর বাবা বললেন, তারপর?
টুবলু বলল, শুধু রোবটের ব্রেনটাকে টিউনিং করার সুযোগ পেলাম না। একটা ব্লান্ডার করে বসলাম। ভুলে ওর সামনে শম্ভুদার কল রিসিভ করে ফেললাম আর ও ফোন দেখেই বিরক্ত হয়ে আমাকে কষাল চড়। তবে তাতে আমার দুঃখ নেই। ওর ক্ষমতা কতদূর যেতে পারে তার তো একটা টেস্ট হয়ে গেল।
হেডমাস্টারমশাই বোঁদের পায়েসের বাটিতে চুমুক দিয়ে বললেন, বুঝলাম। তবে একটা কথা বলি বাবা তথাগত। তোমার মাধ্যমিক পরীক্ষার আর বেশিদিন বাকি নেই। এখন থেকে সব এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ রাখো। আমি চাই না, আমার সবচেয়ে উজ্জ্বল ছাত্রটি ভালুকের চড় খেয়ে পরীক্ষার সময় বিছানায় শুয়ে থাকুক। কেমন?
টুবলু ঘাড় হেলিয়ে জানাল সে রাজি।
ঠিক এই সময়েই হেডমাস্টারমশাইয়ের পকেটে বিকট শব্দে মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কুড়িজন কলাকুশলী পাত ছেড়ে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। ভয়ে তাদের চোখ গোলগোল হয়ে গেছে। অনেকেই জুতোর মধ্যে পা গলিয়ে ফেলেছিল অবধি। তাদের আশ্বস্ত করার জন্যে টুবলুও দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচাতে শুরু করল,—ভয় পাবেন না, ভয় পাবেন না। যাকে ভয় পাচ্ছেন সে আর আগের মতন নেই। ওই দেখুন।
টুবলু হাত তুলে দ্যাখাল, দালানের একপাশে মাটির বেহালা, টিনের কামান, কাঠের চাকি-বেলন ইত্যাদির সঙ্গে গুছিয়ে রাখা আছে জাম্বুবানের পুতুল। নেত্যমাসি ওর নাতনির খেলার জন্যে ওটাকে নিয়ে যাবে বলেছে। এবছর পাঁশকুড়া পাপেট অপেরার গণ্ডগোলে তার নাতনির জন্যে পেলাস্টিকের পুতুল কেনা হয়ে ওঠেনি কিনা, তাই শুনে ক্ষিতীশ অধিকারী পুতুলটা মাসিকে প্রেজেন্ট করেছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন