অমিতাভ পাল

জাহাজ থেকে সমুদ্রে
জলের উপরে মাথা তুলে ওয়াতিয়া শিস দিয়ে উঠল, 'ও-য়া-তি-য়া-৷' ওয়াতিয়া একটি মেয়ে ডলফিন৷ ওরা অনেকে মিলে একটি পড বা দল তৈরি করে৷ পডে কয়েকটি থেকে কয়েক-শো ডলফিন থাকতে পারে৷ ওয়াতিয়ার পডে আছে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় পঁচিশটি ডলফিন৷ দলে বেশিরভাগ মেয়ে৷ দু-টি মাত্র পুরুষ৷ দু-টিই শিশু৷ তিন থেকে ছ-বছর বয়স হলেই পুরুষ ডলফিন পড থেকে আলাদা হয়ে যায়৷ তখন তারা দু-চারজন মিলে ছোটো ছোটো দলে ঘুরে বেড়ায়৷
দলে সকলের আলাদা আলাদা নাম৷ সেই নাম অবশ্য ঠিক মানুষের নামের মতো নয়৷ সিগনেচার হুইসল বা সাংকেতিক শিস৷ ওয়াতিয়ার সিগনেচার হুইসল শুনতে অনেকটা কাঁপা কাঁপা শব্দে ও-য়া-তি-য়া-র মতো৷ তাই তার নাম ওয়াতিয়া৷
এই সিগনেচার হুইসল দিয়ে সে যে শুধু তার নামটা প্রকাশ করে, তা নয়৷ হুইসলের কম্পাঙ্কের পরিবর্তন বা তীক্ষ্ণতার হেরফের করে সে তার মনের নানা ধরনের ভাবও প্রকাশ করতে পারে৷ যেমন, ভয়-ঘৃণা, রাগ-বিদ্বেষ, আতঙ্ক-আনন্দ, এই সব৷
সিগনেচার হুইসল শুনে ওয়াকা তার ঠোঁটের ডগা দিয়ে আলতো করে খোঁচা দিল ওয়াতিয়ার পেটে৷ জানতে চাইল, 'কী ব্যাপার?' ওয়াতিয়া তার হাতডানা বা পেকটোরাল ফ্লিপার দিয়ে তার মাথায় আলতো চাপড় মেরে বলল, 'চোখ খুলে একবার তাকিয়ে দেখো না!'
ওয়াকা এখনও শিশু৷ তার বয়স মাত্র এক বছর৷ সে সব সময় তার মা ওয়াতিয়ার কাছে থাকে৷ সাঁতার দিতে দিতেও সে একটি হাতডানা দিয়ে ছুঁয়ে থাকে মাকে৷ মা যাতে চোখের আড়াল না হয়, তাই সে অন্য চোখটি বন্ধ রেখে এক চোখে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে৷ মা তাকে সাঁতার দিতে দিতেই দুধ খাওয়ায়, হাত ডানা দু-টি দিয়ে বুকের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়৷
ওয়াতিয়ার শিস শুনে দলের সকলে এসে জড়ো হল তার কাছে৷ ফ্লক বা লেজপাখনা দিয়ে তিনবার ঝাপটা মারল জলের উপর৷ মুখটা সামনের দিকে বাড়িয়ে শিস দিয়ে উঠল, 'ক-উ-ই-হা-জ-৷'
সকলেই সামনের দিকে ঘুরে তাকাল৷ না, তখনও কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ দেখতে না পেলেও সকলেই বুঝতে পারল, দূরে একটা জাহাজ৷
অনেক দূরে ভেসে যাচ্ছে একটা জাহাজ৷ না দেখেও বুঝল কী করে ওয়াতিয়া? এই বোঝার ব্যাপারটা বেশ জটিল৷ জলের মধ্যে ডলফিন নানা তরঙ্গের শব্দ ছুড়ে দেয়৷ শব্দ দূরের বস্তুতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে৷ সেই শব্দ কানে শোনা যায় না, কিন্তু ধরা পড়ে ডলফিনের বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাহক অঙ্গে৷ প্রতিধ্বনিত শব্দ বিশ্লেষণ করে ডলফিন বুঝতে পারে বস্তুর অবস্থান, তার আকার, আয়তন, আরও অনেক কিছু৷ একে বলে, ইকোলোকেশন৷
জাহাজটা ভেসে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে৷ ছোটো কার্গোশিপ৷ মালবাহী জাহাজ৷ সমুদ্রে জাহাজের সন্ধান পেলেই ওরা ছুটে আসে৷ বো-রাইডিং বা জাহাজের সামনে ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে ভেসে যেতে দারুণ মজা৷
জাহাজের ডেকে দু-জন রেলিঙের উপর ঝুঁকে গল্প করছেন৷ একজন পুরুষ এবং অন্যজন মহিলা৷ দু-জনে কথাবার্তায় এত মশগুল যে, কেউ খেয়াল করেননি কেবিনের দরজা খোলা৷ দরজার ফাঁক দিয়ে টলমল পায়ে একটি বাচ্চা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে ডেকের ধারে৷ আর দু-পা এগোলেই সে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে গিয়ে পড়বে জলে৷
আঁতকে উঠল ওয়াতিয়া৷
বাচ্চাটি ডেকের একেবারে ধারে এসে পড়েছে৷ সে আর স্থির থাকতে পারল না৷ ডুবসাঁতারে এগিয়ে এল কাছে৷ লেজ ঘুরিয়ে সজোরে ঝাপটা মারল৷ চোখে-মুখে জলের ঝাপটা লাগতেই ঘুরে তাকালেন তাঁরা৷ এতক্ষণে নজরে পড়ল৷ চিৎকার করে ছুটে এলেন মহিলাটি, 'ডলফি!'
বাচ্চাটি সামনে পা ফেলতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল৷ তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের কোলে৷
ওয়াতিয়া জল থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখল, মেয়েটির মা তাকে আদর করছেন৷ ঘাড়ে মুখ ঘষছেন৷ নাক দিয়ে নাকে টোকা মারছেন৷ এগালে ওগালে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুকচুক শব্দ করছেন৷ ওয়াতিয়া ভাবল, এভাবেই তবে মানুষ তার বাচ্চাকে আদর করে৷ সেও ঠিক তাই করল৷ ওয়াকার ঘাড়ে মুখ ঘষল৷ নাক দিয়ে ওয়াকার নাকে টোকা মারল৷ গালে মুখ ঠেকিয়ে চুকচুক শব্দ করল৷ প্রাণীজগতে বোধ হয় একমাত্র ডলফিন শব্দ ও অঙ্গভঙ্গি, দুইই অনুকরণ করতে পারে৷
মেয়েটির বাবা এতক্ষণে এগিয়ে এসেছেন কাছে৷ মায়ের কোলে মেয়ে৷ বাবার আদর পেয়ে মেয়েটি হাসছে খিলখিল করে৷ এবারে মা বোধ হয় মেয়েকে বুলি শেখাতে শুরু করলেন, 'বলো মাম্মি৷'
মেয়েটি আধো-আধো উচ্চারণ করল, 'মাম্মি৷'
বাবা ঘাড় নাড়লেন, 'না, বলো পাপা৷'
সে এবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করল, 'মাম্মি!'
তার বয়স আট মাস৷ এতদিনে সে তার মা-বাবার ভাষার ওই একটিমাত্র শব্দ আয়ত্ত করতে পেরেছে৷
বাতাস বইছিল৷ সমুদ্রের ঢেউ নাচানাচি করছিল৷ ডলফিনের ঝাঁকটি জাহাজের আগে আগে মনের আনন্দে সাঁতার কাটছিল৷
দুপুরের আগে হঠাৎই পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে গেল৷ বাতাস বইছে না৷ ঢেউ উঠছে না৷ সমুদ্র অস্বাভাবিক রকমের শান্ত৷ ওয়াতিয়া জলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে কী যেন বোঝার চেষ্টা করল৷ প্রথমে হাতডানা দিয়ে জলের উপর ঝাপটা মারল৷ তারপর একপাক ঘুরে গেল৷ ওরা বুঝতে পারল, ঝড় আসছে৷ সি-টর্নেডো৷

ওরা জানে, ঘূর্ণিঝড়ে উপরের সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠে৷ প্রবলভাবে আলোড়িত হয়৷ সমুদ্রের ঢেউ আকাশ ছুঁতে চায়৷ তখনও সমুদ্রের নীচে তেমন আলোড়ন ওঠে না৷ গভীর সমুদ্র থাকে অপেক্ষাকৃত শান্ত৷ ডলফিনের ঝাঁকটা ডুব দিল গভীরে৷
সকলের সঙ্গে ওয়াতিয়াও ডুব দিল৷ ওয়াকাকে বুকে জড়িয়ে হুস হুস করে নামছিল সে৷ গভীর থেকে আরও গভীরে৷ চারপাশে পাতলা সবুজ অন্ধকার৷ যত গভীরে নামবে, অন্ধকারও তত ঘন হবে৷
নামতে নামতে হঠাৎ থামল ওয়াতিয়া৷ ঘাড় ঘুরিয়ে কী যেন বোঝার চেষ্টা করল৷ ওয়াহুই পডের সবচেয়ে বয়স্ক ডলফিন৷ দিদিমার বয়সি৷ সে বলল, 'কী হল?'
'বিপদের আঁচ পাচ্ছি৷'
আসলে তার মন পড়ে আছে জাহাজে৷ মা ও তাঁর কোলের বাচ্চাটির জন্য মন কেমন করছে তার৷ ওয়াকাকে দিদিমার কাছে রেখে সে বলল, 'আসছি৷'
একটু দূরেই হুস করে ভেসে উঠল ওয়াতিয়া৷ এখান থেকে জাহাজটা দেখতে পাচ্ছে সে৷ ডেকের উপর নাবিকরা দৌড়ঝাঁপ করছে৷ ভালো করে লক্ষ করেও ডেকের উপরে সেই মা ও মেয়েকে দেখতে পেল না সে৷
আকাশে কোনো মেঘ নেই৷ অনেক দূরে সমুদ্র থেকে উঠে আকাশের দিকে মাথা তুলেছে একটি কালো থাম৷ তারপর আরও একটি৷ থামগুলো একজায়গায় স্থির নেই৷ এগিয়ে আসতে আসতে মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে, নতুন করে মাথা তুলছে আকাশে৷ দূর থেকে মনে হচ্ছে কালো থাম, আসলে জলস্তম্ভ৷ পাক খেতে খেতে উঠছে আকাশের দিকে৷
অনেক উপরে, প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচুতে কোথা থেকে এসে হাজির হল এক টুকরো ধূসর মেঘ৷ ক্রমশ ধূসর থেকে কালো, তার চেয়ে ঘন কালো৷ তারপর ভয়ংকর কোনো দৈত্যের মতো আক্রোশে মোচড় খেতে লাগল৷ তার কালো লেজটা দুলছে শূন্যে৷ ক্রমশ বাড়ছে লম্বায়৷ এবার চারদিক কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠল আকাশ৷
এতক্ষণ যে সমুদ্র শান্ত ছিল, সেও এবার গর্জন করে ফুঁসে উঠল৷ বিশাল একটা জলস্তম্ভ পাক খেতে খেতে উঠতে লাগল আকাশের দিকে৷ জলস্তম্ভের মাথায় চেপে জাহাজটাও উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে৷
সমুদ্র আর আকাশ মিলিত হল মাঝপথে৷ প্রচণ্ড সংঘর্ষে ঝলসে উঠল চারিদিক৷ বিদ্যুতের নীল শিখা ঘন ঘন ছোবল মারছে আকাশের গায়ে৷ লড়াইটা দীর্ঘস্থায়ী নয়৷ প্রবল গর্জন তুলে আছড়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে৷ উত্তাল হয়ে উঠল সমুদ্র৷ বিপুল ঢেউয়ের ধাক্কায় ওয়াতিয়া ছিটকে পড়ল দূরে৷ সমুদ্রের গভীরে ডুব দেওয়ার আগে সে শুধু দেখতে পেল, জাহাজটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গিয়েছে৷
জলোচ্ছ্বাসের প্রবল ধাক্কায় জাহাজটা যেখানে আছড়ে পড়ল, সেখান থেকে ওয়াতিয়া খুব দূরে ছিল না৷ সেই মুহূর্তে নিজেকে বাঁচানো ছাড়া অন্য কোনো দিকে তার খেয়াল ছিল না৷
বেশ কিছুটা নিরাপদ গভীরতায় নেমে আসার পর খেয়াল হল৷ সে কি শুধু একাই ডুবছে, নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ?
তার ডান দিকের হাতডানাটা ধরে ঝুলছে কেউ৷ সাঁতার কাটার সময় ওয়াকা তাকে ছুঁয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু এভাবে তো জাপটে ধরে না৷ তা ছাড়া ওয়াকার শরীর তো এত হালকা নয়৷ শরীরে মোচড় দিয়ে তার সহজাত দক্ষতায় তাকে পিঠে তুলে নিল ওয়াতিয়া৷ তারপর হুস হুস করে উঠতে লাগল উপরে৷
জলের উপরে ভেসে উঠল ওয়াতিয়া৷ এতক্ষণে সে হাঁপ ছাড়ল৷ দমভরে শ্বাস নিল৷ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তার পিঠের উপরে একটা খুদে মানুষ! তার নাকে-মুখে জল ঢুকে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে৷ তার নিশ্বাসও পড়ছে না৷ সে কি বেঁচে আছে? ওয়াতিয়া শরীরটাকে নাচিয়ে নাচিয়ে ঝাঁকুনি দিতে লাগল৷ গলগল করে কিছুটা জল বেরিয়ে গেল তার নাক-মুখ দিয়ে৷ তাকে পিঠে নিয়ে জল কেটে কেটে ছুটে বেড়াতে লাগল সে৷
আরও কিছুটা জল বেরিয়ে যাওয়ার পর চোখ মেলল খুদে মানুষ৷ নাকে-মুখে জল ঢুকে তার দমবন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল সে৷ বাইরের বাতাসে বুক ভরে দম নিয়ে এতক্ষণে সে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, 'মাম্মি!'
ডলফিনের ঝাঁকে ডলফি
ঝড় থেমে গিয়েছে৷ সমুদ্র শান্ত৷ প্রাথমিক বিপর্যয়টা কাটিয়ে ওঠার পর হাঁপ ছাড়ল ওয়াতিয়া৷ তার পিঠের উপরে ডলফি৷ মায়ের গলা জড়িয়ে ধরার মতো সে জাপটে ধরে আছে তার ডরসাল ফিন বা পিঠপাখনা৷ পা দুটো ঝুলিয়ে দিয়েছে তার পিঠের দু-পাশে৷ একটু আগেও সে ভয়ে কাঁদছিল৷ এখন তার কান্না থেমেছে৷ বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখছে৷ চারপাশে জল, শুধু জল৷
ডলফিনের ঝাঁকটা ভেসে উঠেছে জলের উপর৷ ওয়াতিয়ার শিস শুনতে পেয়ে তারা দ্রুত সাঁতার কেটে এগিয়ে আসছে৷ ওয়াকাই প্রথমে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের গায়ে৷ সেই ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে পড়েই যাচ্ছিল ডলফি, কোনোরকমে সামলে নিল৷
'দেখতে পাচ্ছিস না?'
ওয়াকা আগে খেয়াল করেনি৷ এতক্ষণে দেখল, 'ও কে?'
ওয়াতিয়া বলল, 'উইকি৷'
উইকি মানে বাচ্চা বা ছোটো৷ ওয়াকা খুশিই হল৷ বুকের হাতডানা দু-টি নেড়ে তালি দিয়ে উঠল, 'আমাদের সঙ্গে থাকবে?'
'তুই কি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারিস?'
'না৷'
'ও থাকবে কী করে? ওকে আমরা ওর মা-র কাছে ফিরিয়ে দেব৷'
ডলফিনের ঝাঁকটা সাঁতার কাটতে কাটতে ফিরে এল সেই জায়গায়, যেখানে জাহাজটা ছিল৷ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সকলেই৷ অনেকখানি এলাকা জুড়ে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করল৷ কোথায় জাহাজ? তার চিহ্ন কোথাও নেই৷ ওয়াহুই বলল, 'তোমরা থাকো৷ আমি একবার ঘুরে আসি৷'
সে ডুব দিল৷ তিনশো-সওয়া তিনশো মিটার গভীরে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দিল তার সন্ধানী শব্দতরঙ্গ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত শব্দতরঙ্গ ফিরে এল তার কাছে৷
হুস করে ভেসে উঠল সে৷ সকলেই তাকে ঘিরে ধরল, 'বুঝতে পারলে কিছু?'

ওয়াহুই বলল, 'জাহাজটা ডুবে গিয়েছে৷ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে সমুদ্রের নীচে৷'
ডলফিনের ঝাঁকটা সাঁতার কেটে এগোচ্ছে৷ মাঝখানে ওয়াতিয়া৷ তাকে ঘিরে আছে বাকি সকলেই৷ তার দু-পাশে ওয়াতুই আর ওয়াকুই৷ দু-টি ডানপিটে ডলফিন৷ ডলফিকে গার্ড করে সাঁতার কাটছে৷ কোনোভাবে পিছলে গেলেও ডলফির জলে পড়ার আশঙ্কা নেই৷ ভয় কেটে গিয়েছে তার৷ ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তার গায়ে৷ সে খুব মজা পাচ্ছে৷ হাসছে খিলখিল করে৷
একটানা ঘণ্টা তিনেক সাঁতার কেটে তারা এসে পড়ল পরিচিত এলাকায়৷ প্রতিটি পডের মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট এলাকা থাকে৷ সেই এলাকার মধ্যেই সাধারণত তারা থাকে৷ ঘুরে বেড়ায়, শিকার খোঁজে৷
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এই এলাকাটা খুব গভীর নয়৷ গোটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে মাঝারি ও ছোটো আকারের অনেক দ্বীপ৷ সামনে একটা অ্যাটল বা প্রবাল দ্বীপ৷ সবুজ গাছপালায় ঢাকা৷ ঘোড়ার খুরের মতো৷ মাঝখানে সমুদ্র আটকা পড়েছে৷ তৈরি হয়েছে উপহ্রদ বা লেগুন৷
দ্বীপটিকে ঘিরে চারপাশের সমুদ্র তাদের নিজস্ব এলাকা৷
খাঁড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল ঝাঁকটি৷ লেগুনের জলে শেষ বিকেলের আলোছায়া৷ সকালে যারা বেরিয়েছিল সমুদ্রবিহারে, সেই সব সিন্ধুসারসের দল একে একে ফিরে আসছে নীড়ে৷
অন্ধকার নামছে লেগুনের জলে৷ ভাবনায় পড়ে গিয়েছে ডলফিনের ঝাঁক৷ ডলফি সাঁতার জানে না৷ জলে ভেসে থাকতেও শেখেনি৷ কোথায় রাখে তাকে?
ছোট্ট ডলফি৷ সারাদিন তার উপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে৷ সন্ধ্যে হতে-না-হতেই সে নেতিয়ে পড়ল৷ তাকে পিঠে নিয়েই জলের উপরে ভেসে রইল ওয়াতিয়া৷ তার বুকের কাছে ওয়াকা৷ তাদের ঘিরে ঝাঁকের বাকি সকলেই৷
সমুদ্রে বিপদের ঝুঁকি সব সময়৷ রাক্ষুসে হাঙর আর হিংস্র ব্যারাকুডা সুযোগ পেলেই আক্রমণ করে৷ তবে ডলফিনের ঘুম খুব পাতলা৷ তারা সব সময় সজাগ থাকে৷ মস্তিষ্কের আধখানা যখন ঘুমে অচেতন, বাকি আধখানা তখন জেগে থাকে৷
ওয়াতিয়া এবং ঝাঁকের অনেকেই সারারাত জেগেই কাটাল৷ দিদিমা ওয়াহুই তো তার একটা হাতডানা দিয়ে সারারাত ছুঁয়ে রইল ডলফিকে৷
ভোর হল৷ ঘুম ভেঙে জেগে উঠেই ডলফি কান্নাকাটি শুরু করল৷ ওয়াকার দিদি ওয়াতুই৷ তারচেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো৷ সে হাতডানা চাপড়ে তাকে শান্ত করার অনেক চেষ্টা করল৷ ডলফি হাত-পা ছুড়ছে৷ গলা ফুলিয়ে চিৎকার করছে৷ ওয়াতুই কিছুতেই তাকে থামাতে পারছে না৷ দেখেশুনে ওয়াহুই বলল, 'খিদে পেয়েছে৷'
ঝাঁকের কয়েকজন ছুটে গেল তার জন্য খাবার খুঁজতে৷
একজন ধরে আনল একটা ছোটো চিংড়ি৷ সমুদ্রের চিংড়ি ডলফিনদের খুব পছন্দ৷ লেগুনের জলে ডুব দিয়ে আর-একজন তুলে আনল একগোছা জলজ শ্যাওলা৷ এই শ্যাওলাও ডলফিনদের কাছে ভারি উপাদেয়৷
চিংড়িমাছটা মুখে গুঁজে দিতেই ডলফি ওয়াক তুলে ফেলে দিল৷
শ্যাওলার গোছা তার মুখে ঠেসে ধরতেই সে থু-থু করে উগরে দিল৷
দিদিমা ওয়াহুই বলল, 'ও অন্য কিছু খায় না৷ শুধু দুধ খায়৷'
ওয়াকা জলে ডুবে ডুবেই ওয়াতিয়ার বুকের দুধ পান করতে পারে৷ ডলফি কি আর পারবে?
সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে ওয়াতিয়া শরীরটা কাত করল৷ ডলফি গড়িয়ে পড়ল তার পিঠ থেকে৷ ঝাঁকের দু-টি ডলফিন আগে থেকেই তৈরি ছিল৷ জলে পড়ার আগেই তাকে পিঠের উপরে লুফে নিল৷ জলের উপরে ওয়াতিয়া চিত হয়ে ভেসে উঠল৷
আজ নিয়ে তিন দিন ডলফি এসেছে ডলফিনের ঝাঁকে৷ কেটেছে ডলফিনের পিঠে৷ কখনো ওয়াতিয়া, কখনো ওয়াহুই, আবার কখনো ওয়াতুই বা অন্য কারও পিঠে৷ অসুবিধে তো হবেই৷ সে এমন কিছু নয়৷ খিদে পেলেই সে ওয়াতিয়া বা অন্য কোনো মা-ডলফিনের দুধ খায়৷ ডলফিনের পিঠেই খেলা করে৷ ঘুম পেলে ডলফিনের পিঠেই ঘুমিয়ে পড়ে৷ তাকে সারাক্ষণ ঘিরে থাকে ডলফিনের ঝাঁক৷
অসুবিধে বরং বেশি ডলফিনদের৷ ডলফিকে আগলে রাখতে গিয়ে সারাক্ষণ তারা তটস্থ৷ তাকে ফেলে দূরে কোথাও যেতে পারছে না৷ ঠিকমতো শিকার ধরা যাচ্ছে না৷ এক জায়গায় কি আর পর্যাপ্ত শিকার মেলে? কোনোরকমে খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটছে তাদের৷
ওয়াতিয়া আগেই বুঝেছে৷ দলের বাকিরাও ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে৷ তাদের পিঠে পিঠে ডলফির চিরকাল কাটবে না৷ তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে ডলফির জন্য মোটামুটি একটা নিরাপদ আশ্রয়৷
দুপুরের আগেই একটা খবর পাওয়া গেল৷
ওয়াতিয়া একটু বেশি খুঁতখুঁতে৷ তাকে সঙ্গে নিয়ে পুরো ঝাঁকটা রওনা হল সেই দিকে৷ তার পছন্দ হলে তবেই হয়৷ প্রবালপ্রাচীরের গায়ে একটা ছোটো গুহা৷ গুহার মুখে জল এসে খেলা করছে৷ ছলাৎছল শব্দ উঠছে৷ কাছেই প্রবালের একটা ঝাড়৷ ঝাড়ে ফুলের মতো ফুটে আছে রংবেরঙের প্রবাল৷
গুহার মুখটা ঢালু হয়ে উঠে গিয়েছে উপরের দিকে৷ উপরে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা৷ মসৃণ ও সমতল৷ শান-বাঁধানো চাতালের মতো৷ লেগুনের জল বাড়লে গুহার ঢালু জায়গাটা হয়তো ডুবে যাবে কিন্তু চাতালের উপরে জল ওঠার কোনো আশঙ্কা নেই৷
উপরে একটা ঝাঁকড়া গাছ৷ ডালপালা মেলে ছায়া ফেলেছে গুহার উপরে৷ ডালে ডালে পাখির বাসা৷
জায়গাটা পছন্দ হয়েছে ওয়াতিয়ার৷ সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ডলফির দিকে৷ বলল, 'পছন্দ তো?'
ডলফি কী বুঝল, কে জানে! সে খিলখিল করে হেসে উঠল৷
ডলফির হাতেখড়ি
ডলফিনের ঝাঁকটা লেগুন ছেড়ে সমুদ্রে যেতে শুরু করেছে৷ শিকারের জন্য সমুদ্রে তাদের যেতেই হয়৷ তবে বেশি দূর যায় না৷ ডলফিকে একা ফেলেও যায় না৷ তাকে নিয়ে ওয়াতিয়া থাকে৷ আর থাকে ওয়াতুই৷ মাঝে-মাঝে দলের অন্য দু-একটি ডলফিনও থেকে যায়৷
নিজেদের জন্য তারা লেগুনের জলে শিকার করে৷ ছোটো ছোটো মাছ বা চিংড়ি৷ তাতে অবশ্য পেট ভরে না৷ তাদের জন্য ফেরার সময় মুখে করে শিকার ধরে আনে দলের অন্যরা৷ ওয়াতিয়াদের তাতেই হয়ে যায়৷
ডলফি গুহার চাতালে টলমল পায়ে ঘুরে বেড়ায়৷ কখনো চাতালের ধারে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকে৷

ওয়াকা ভেবে ভেবে একটা নতুন খেলা বের করেছে৷ জল বাড়লে গুহার ঢালু জায়গাটা ডুবে যায়৷ জল উঠে আসে একেবারে চাতালের মুখে৷ দু-টি হাতডানার সাহায্যে গুটিগুটি করে সে চলে আসে চাতালের কাছে৷ বুকে ভর দিয়ে মুখ বাড়ায়৷ চুপিচুপি তার লম্বা নরম ঠোঁটটা ঘষে দেয় ডলফির গায়ে৷ সুড়সুড়ি লাগে৷ সে হেসে ওঠে খিলখিল করে৷ হাসতে হাসতে হাততালি দেয়৷ ডলফি যত হাসে, ততই মজা পায় ওয়াকা৷ আরও বেশি করে সুড়সুড়ি দেয়৷
নির্জন গুহার মধ্যে সারাক্ষণ যে ডলফির একা একা কাটে, তা নয়৷ বরং দিনের বেশিরভাগ সময় ওয়াতিয়া বা ওয়াতুইয়ের পিঠে চড়ে সে ঘুরে বেড়ায় লেগুনের জলে৷
সব ডলফিনের একটা করে নাম থাকে৷ সে নাম আসলে একটি সিগনেচার হুইসল বা শনাক্তকরণ শিস৷ ডলফির কোনো নাম নেই৷ একদিন ওয়াহুই বলল, 'এবার তো এর একটা নাম দিতে হয়৷'
ওয়াতিয়া বলল, 'কী নাম?'
ওদের পডের নাম 'ওয়া'৷ পডনেম অনেকটা মানুষের পদবির মতো৷ ডলফিনের ক্ষেত্রে পডনেম থাকে শুরুতে৷ তাই তাদের দলের সকলের সিগনেচার হুইসলের শুরুটা হয় 'ওয়া' দিয়ে৷ ওয়াতিয়া, ওয়াহুই, ওয়াতুই, ওয়াকা, এইরকম৷ ওয়াতিয়া তার ছেলে ওয়াকার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ডলফির নাম রাখল ওয়াপা৷
এর পর শুরু হল ডলফিকে তার সিগনেচার হুইসল শেখানোর পালা৷ প্রথমে শুরু করল ওয়াতিয়া৷ তারপর পালা করে দলের বাকি সকলেই৷ এমনকী ওয়াকাও বাদ পড়ল না৷ ডলফির কানের কাছে একটানা শিস দিতে লাগল৷ সেই শিস শুনতে অনেকটা কাঁপা কাঁপা উচ্চারণে 'ও-য়া-পা-'র মতো৷
ডলফির কান ঝালাপালা৷ অতিষ্ঠ হয়ে সে কান্নাকাটিও করল বিস্তর৷ এইভাবে সে হয়তো তার প্রতিবাদ জানাতে চেষ্টা করল৷ ডলফিনরা তাতে অবশ্য একটুও দমল না৷ তার কানের কাছে তারা একটানা চালিয়ে গেল তাদের শিস৷
অবশেষে একদিন ডলফি তার আধো আধো বুলিতে উচ্চারণ করল, 'ও-য়া, ও-য়া, ও-য়া-পা-৷'
সেই শিস হুবহু ডলফিনের শিসের মতো হল না, হল তার অক্ষম অনুকরণ৷ তাতেই খুশি ডলফিনরা৷
শুরুটা করল দিদিমা ওয়াহুই৷ তার জানা সবচেয়ে মধুর শিস৷ জলতরঙ্গের মতো সেই শিস ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে৷ সেই সুরে উছলে উঠল আনন্দ ও উচ্ছ্বাস৷
আনন্দে মস্ত একটা লাফ দিল ওয়াকা৷ শূন্যে তিন-তিনটে ডিগবাজি খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে৷
খুশির চোটে ওয়াতিয়া ডলফিকে পিঠে নিয়ে তিন পাক ঘুরে নিল৷
ওয়াতুই লেজে ভর দিয়ে জলের উপরে উঠে দাঁড়াল৷ হাতডানা নেড়ে সকলকে ডেকে বলল, 'আয়, আজ সকলে মিলে একটু আনন্দ করি৷'
চারদিক থেকে নানা বিচিত্র সুরে শিস দিয়ে উঠল সকলে৷ তারপর ডলফিকে ঘিরে একটি বিলম্বিত শিসের তালে তালে নাচতে শুরু করল তারা৷
মানুষের ভাষার একটি মাত্র শব্দ 'মাম্মি' রপ্ত করতে পেরেছিল ডলফি৷
আর এগারো মাস বয়সে সে ডলফিনের ভাষায় প্রথম শব্দটি আয়ত্ত করে ফেলল৷ সেই শব্দটি তার নিজের নাম, ও-য়া-পা৷
সিগনেচার হুইসল দিয়ে ডলফির হাতেখড়ি হল৷ মনের বিভিন্ন ভাব প্রকাশের জন্য ডলফিনরা নানা ধরনের শিস দেয়৷ সেসবের কিছুই জানে না ডলফি৷ সে জানে মাত্র দু-টি উপায়৷ হাসি এবং কান্না৷
ভয় পেলে সে কাঁদে, খিদে পেলেও কাঁদে৷ বিরক্ত হলে কাঁদে, আবার ঘুম পেলেও কাঁদে৷ কান্নার এত ভাষা ওয়াতিয়া একটু-আধটু বুঝতে পারলেও দলের বাকিরা পারে না৷
তেমনই তার হাসিরও আছে নানা ভাষা৷ সব হাসির মানে ওয়াতিয়া বুঝতে পারে না৷ আনন্দের হাসি, খুশির হাসি বুঝতে পারে ওয়াতিয়া৷ কিন্তু সে যখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসে, তখন তার মানে বুঝতে পারে না৷ দিদিমা ওয়াহুইকে দেখলে খিলখিল করে সে হাসতে শুরু করে৷ আবার ওয়াতুকাকে দেখলে মুখগোমড়া করে থাকে, একটুও হাসে না৷ কারণটা বুঝতে পারে না ওয়াতিয়া৷
ওয়াকার বাবা ওয়াতুকা৷ সে দলে থাকে না৷ মাঝে মাঝে আসে তাদের খোঁজখবর নিতে৷
ডলফিনের ঝাঁকে থাকতে হলে ডলফিনদের ভাষা শিখতে হবে৷ ভাষা না শিখলে সে বুঝবে কী করে, বোঝাবেই বা কী করে?
ডলফিকে ডলফিন করে তোলার দায়িত্ব ওয়াতিয়া নিজেই নিয়েছে৷
ওয়াতিয়ার নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই৷ তার এখন অনেক কাজ৷ ওয়াকার পাশাপাশি ডলফিকেও সে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমুদ্রের জীবনে অভ্যস্ত করে তুলতে চায়৷
একদিন ডলফিকে পিঠে চাপিয়ে ওয়াতিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল লেগুনের জলে৷ ছোটো ছোটো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল তার গায়ে৷ মজা পাচ্ছিল ডলফি৷ খিলখিল করে হাসছিল৷
হঠাৎ ওয়াতিয়া টুপ করে ডুব দিল জলে৷ তার পিঠে ডলফি৷ ডলফিও তলিয়ে গেল জলের নীচে৷ একটু পরেই ভুস করে ভেসে উঠল ওয়াতিয়া৷ নাকে-মুখে জল ঢুকেছে ডলফির৷ তার কান্না শুনে ছুটে এল ওয়াহুই, 'এটা তুই কী করলি?'
গলায় ঝাঁঝ ফুটল ওয়াতিয়ার, 'কী আবার? ওকে জলে ডুব দিতে শেখাচ্ছি৷'
ওয়াহুই বলল, 'তাই বলে তুই ওকে জলে চুবিয়ে মারবি নাকি?'
রেগে উঠল ওয়াতিয়া, 'মারব৷ আমার মেয়েকে আমি জলে চুবিয়ে মারব, নাকি জলে ভাসিয়ে মারব, সে আমি বুঝব৷'
দিদিমা ওয়াহুইকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে আবার টুপ করে ডুব দিল জলে৷
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়াহুই বলল, 'দেমাক!'
দেমাক তো বটেই৷ ডলফির মতো বাচ্চা আছে নাকি আর কোনো ডলফিনের? কথাটা মুখে মুখে ছড়িয়েছে অনেক দূর৷
একদিন হুয়াপডের কয়েকটি ডলফিন বেড়াতে এল ওয়াপডের এলাকায়৷ ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়৷ এপাড়া থেকে ওপাড়ায় যাওয়ার মতো এক পডের এলাকা থেকে অন্য পডের এলাকায় যাতায়াতের রেওয়াজ আছে তাদের মধ্যে৷ ওয়াতিয়ার সমবয়সি একটি ডলফিন তাকে বলল, 'ডলফিনদের মুখে মুখে ওয়াপার কথা অনেক শুনেছি৷ তাই দেখতে এলাম৷'
গর্বে ফুলে উঠল ওয়াতিয়ার বুক, 'ভারি দুষ্টু৷ কোনো কথা শোনে না৷ কোনো কিছু শিখতেও চায় না৷'
কৌতূহল চাপতে পারল না সে, 'আচ্ছা, ওর লেজ আছে? পাখনা আছে? আমাদের মতো সাঁতার কাটতে পারে?'
ওয়াতিয়া মুচকির হাসল, 'কাটবে কী করে? ওর তো পাখনার জায়গায় দুটো হাত, লেজের জায়গায় পা৷'
কথা বলতে বলতে সকলেই এসে জুটল গুহার মুখে৷ সকলের চোখে-মুখে আগ্রহ৷ ওয়াতিয়া গুহার মধ্যে মুখ বাড়িয়ে শিস দিয়ে উঠল, 'ও-য়া-পা৷'
গুহার ভিতর থেকে ভেসে এল, 'ও-য়া-তি-য়া৷' সকলের চোখে-মুখে বিস্ময়৷ ঢালু জায়গাটা জলে ডুবে আছে৷ ওয়াতিয়া ঢুকে গেল গুহার মধ্যে৷ তারপর বেরিয়ে এল বাইরে, তার পিঠের উপরে ডলফি৷ সকলেই ঘিরে ধরল তাকে৷ সেই ডলফিনটা আবার বলল, 'জলে ডুব দিতে পারে?'
ওয়াতিয়া জবাব দিল, 'একটু-আধটু৷'
হুয়াপডের অন্য একটি ডলফিন বলে উঠল, 'সমুদ্রে থাকবে, অথচ ভালো ডুবসাঁতার জানে না৷ তবে তো ভারি মুশকিল৷'
ওয়াতিয়া চোঁ চোঁ করে সাঁতার কাটতে শুরু করল৷ ঝড়ের বেগে এগিয়ে গেল সামনে৷ শূন্যে একটা লাফ দিল৷ ওয়াতিয়া কি ডলফিকে পিঠে নিয়ে পক্ষীরাজের মতো আকাশ ছুঁতে চাইছে?
শরীরটাকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ডলফিকে ছুড়ে ফেলে দিল দূরে৷ হুয়াপডের ডলফিনরা হায় হায় করে উঠল৷ ওয়াতিয়া কি পাগল হয়ে গিয়েছে?
অনেকটা দূর থেকে ডুবসাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে আসছে ডলফি৷ ওয়াতিয়ার কাছে এসে সে একবার লাফিয়ে উঠল জলের উপর৷ অনেকটা ঘোড়ায় চড়ার মতো ভঙ্গিতে সে চেপে বসল ওয়াতিয়ার পিঠে৷
হুয়াপডের ডলফিনরা বিস্ময়ে হতবাক৷ গর্বে চওড়া হল ওয়াতিয়ার বুক৷
মহাসমুদ্রের ছেলেধরা
ডলফি এখনও সমুদ্রের জলে ভাসতে ভাসতে ঘুমিয়ে নিতে পারে না৷ ওয়াকার সঙ্গে লেগুনে দাপাদাপি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে৷ তখন সে গুহার চাতালে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে৷ ঘুম পেলে ঘুমিয়েও নেয়৷
ডলফি ঘুমোচ্ছে৷ ওয়াতিয়া কাছেপিঠে লেগুনের জলে ছোটোখাটো শিকার ধরার চেষ্টা করছিল৷ ও লক্ষ করল একটা বড়ো মাছ৷ মাছটা ছোটো কিন্তু ভারি চালাক, এঁকেবেঁকে ছুটছে৷ শিকারের নেশায় পেয়েছে তাকে৷ ওয়াতিয়াও ছুটছে৷ হঠাৎ খেয়াল হল অনেকটা দূরে চলে এসেছে, শেষ পর্যন্ত মাছটাকেও সে ধরতে পারল না৷
দ্রুত সাঁতার কেটে ফিরে এল ওয়াতিয়া৷ গুহার কাছে আসতেই বুকটা তার ছাঁৎ করে উঠল৷ ডলফির গায়ের গন্ধ পাচ্ছে না কেন? হুমড়ি খেয়ে পড়ল গুহার মধ্যে৷ ওই তো, চাতালের ওইখানে তো শুয়েছিল ডলফি৷ এখন নেই৷ কোথায় গেল সে?
জলের জীব ডলফিন৷ ডাঙায় তারা টিকতে পারে না৷ তবুও সে উঠল৷ হাতডানায় ভর দিয়ে আঁচড়-পাঁচড় করে উঠে পড়ল চাতালে৷ মেঝেতে বুক ঘষটে ঘষটে সে গুহার ভিতরে আঁতিপাঁতি করে খুঁজল৷
পাথরের মেঝেয় ঘষা লেগে তার বুকের দু-এক জায়গায় কেটেছড়ে গেল৷ কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ পাগলের মতো খুঁজছে সে৷
গুহার ভিতর থেকে ঝাঁপ দিয়ে ছিটকে এসে পড়ল লেগুনের জলে৷ জলের উপরে মুখ তুলে চিৎকার করে উঠল, 'ও-য়া-পা৷'
তার তীক্ষ্ণ করুণ শিস বাতাসে তরঙ্গ তুলে ছড়িয়ে পড়ল দূর থেকে দূরে৷
শিস শুনে আগেই ছুটে এল ওয়াকা৷ তাকে দেখে ঝাঁঝিয়ে উঠল ওয়াতিয়া, 'এতক্ষণ কোথায় ছিলি? উইকিকে দেখেছিস?'
ওয়াকা বলল, 'উইকি ঘুমোচ্ছে৷ তাই আমি একা একাই খেলা করছিলাম৷ আমি তো তাকে দেখিনি৷'
রাগে ফেটে পড়ল সে৷ লেজ ঘুরিয়ে সজোরে একটা ঝাপটা মারল ওয়াকার গায়ে, 'সারাক্ষণ শুধু খেলা আর খেলা! উইকির দিকে নজর রাখতে পারিস না?'
খুব লেগেছে৷ অন্য সময় হলে কেঁদেই ফেলত ওয়াকা৷ মুখ বুজে সহ্য করল৷ মায়ের মাথার এখন ঠিক নেই৷ বুঝতে পেরেছে সে৷
কিছুক্ষণের মধ্যে ঝাঁকের সকলেই ফিরে এল৷ দূর থেকে তারা শুনতে পেয়েছে ওয়াতিয়ার শিস৷ ঝাঁকের সকলেই ছড়িয়ে পড়ল লেগুনের জলে৷ জল তোলপাড় হয়ে উঠল৷
সূর্য ডুবে যাচ্ছে৷ সন্ধ্যে নামছে লেগুনের জলে৷ সমুদ্রপাখির ঝাঁক বাসায় ফিরছে৷ সারাদিন খোঁজাখুঁজির শেষে ঝাঁকের ডলফিনরা একে একে ফিরে এল৷ শুধু ফিরে এল না ডলফি৷
ক্ষোভে ও হতাশায় ওয়াতিয়ার অবস্থা পাগলের মতো৷ বারবার লেজের ঝাপটা মারছে নিজের গায়ে৷ ডলফিকে একা ফেলে কেন সে মাছটাকে তাড়া করতে গেল?
মা-র অবস্থা দেখে ভয়ে কাছে ঘেঁষতে সাহস পাচ্ছে না ওয়াকা৷ একটু দূরে দূরেই ছিল৷ দিদিমার কাছে ঘুরঘুর করছিল৷ তাকে ডেকে ওয়াহুই বলল, 'ওয়াপার শোকে তোর মা প্রায় পাগল হয়ে উঠেছে৷ তোকে দেখতে না পেলে একেবারে পাগল হয়ে যাবে৷ তুই মার কাছে যা৷'
ভয়ে ভয়ে সে এল৷ ডলফির চিন্তায় ওয়াতিয়া কি এতক্ষণ ভুলে গিয়েছিল ওয়াকাকে? তাকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরল৷ মা-র বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ওয়াকা বলল, 'কাল ঠিক ওয়াপাকে খুঁজে আনব৷'
চমকে উঠল ওয়াতিয়া, 'উইকি কোথায়, তুই জানিস?'
ওয়াকা বলল, 'ঠিক জানি না৷ তবে তুমি যখন ওয়াপাকে পিঠে নিয়ে সাঁতার দিচ্ছিলে, ওই হুপোমুখো ডলফিনটা জুলজুল করে তাকিয়েছিল ওয়াপার দিকে৷'
কথাটা শুনতে পেয়েছে ওয়াতুইও৷ সে বলল, 'আমিও দেখেছি, ওর দু-চোখ লোভে চকচক করছিল৷'
দিদিমা ওয়াহুই বলল, 'হুয়াপডের ওর কী যেন নাম?'
ওয়াতিয়া জবাব দিল, 'হুয়াকুই৷'
ওয়াহুই বলল, 'কোনো ভুল নেই৷ হুয়াকুই ডলফিকে চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে৷'
সারারাত ডলফিনের ঝাঁকটা জেগেই কাটাল৷
হুয়াকুই পালাচ্ছে৷ পালাচ্ছে তার পরিচিত এলাকা ছেড়ে হুয়াপডের তার পুরোনো সঙ্গীদের ফেলে৷ সে চলে যাচ্ছে অনেক দূরে৷ উত্তরের কোনো অপরিচিত সমুদ্রে৷ সেখানে হুয়া কিংবা ওয়াপডের কেউ কখনো যাবে না৷
অনেক দিন কেটেছে তার হুয়াপডের সঙ্গে৷ মায়া পড়ে গিয়েছিল দলের সকলের উপরে৷ সে মায়াও তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে তার কাছে৷
ডলফিনের পড মানুষের পরিবারের মতো সুদৃঢ় সামাজিক নিয়মে বাঁধা নয়৷ অনেকটাই শিথিল৷ সেখানে সকলেই স্বাধীন৷ যে কেউ স্বেচ্ছায় দলে ঢুকতে পারে, আবার বেরিয়েও যেতে পারে৷ কেউ কাউকে বাধা দেয় না৷
হুয়াকুইয়ের পিঠে ডলফি৷ এমন উত্তাল সমুদ্র সে আগে কখনো দেখেনি৷ প্রথমে সে হাত-পা ছুড়েছে৷ কান্নাকাটিও করেছে৷ তার প্রতিবাদ জানিয়েছে৷ এখন ভয় পেয়ে চুপ করে গিয়েছে৷
বড়ো বড়ো ঢেঠ এসে আছড়ে পড়ছে তার গায়ে, নাকে-মুখে জল ঢুকছে৷ পিছলে পড়ার ভয়ে সে হুয়াকুইয়ের পিঠডানা জাপটে ধরে আছে৷ বড়ো ঢেউ দেখলে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ছে৷ মুখ গুঁজছে হুয়াকুইয়ের পিঠে৷ ঢেউ সরে গেলে আবার মুখ তুলছে৷
হুয়াকুই অবলীলায় লাফ দিয়ে উঠছে ঢেউয়ের মাথায়৷ আবার ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে নীচে৷ ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে দ্রুত সাঁতার কাটছে সে৷ অন্য কোনো দিকে খেয়াল নেই৷ সে চাইছে ঝড়ের বেগে উড়ে যেতে৷ ডলফিকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারে চলে যেতে চায় দূরে, বহু দূরে৷
বেশি দূর অবশ্য যেতে পারে না৷ চারদিক থেকে চারটি ডলফিনের পড তাকে ঘিরে ধরল৷
ডলফিনের শিসে ভর করে খবর চলে গিয়েছে এক পড থেকে অন্য পডে৷ নেই নেই, ওয়াপার কোনো খবর নেই৷ হুয়াকুইয়েরও কোনো খোঁজ নেই৷ পড ছেড়ে সেও পালিয়েছে৷
অবশেষে উত্তরের একটা পড থেকে ভেসে এল সন্ধানী শিস৷ খবর এসেছে৷ দেখা গিয়েছে একটা নিঃসঙ্গ ডলফিনকে আরও উত্তরের দিকে ভেসে যেতে৷
উত্তরের পডগুলোকে রিলে সিস্টেমে তারাই জানিয়ে দিল, নিঃসঙ্গ ডলফিনের উপরে নজর রাখতে এবং তার সঙ্গে কোনো উইকিকে দেখলে তাকে আটক করতে৷
বৃত্ত ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে৷ চারদিক থেকে পডগুলো এগিয়ে আসছে হুয়াকুইয়ের দিকে৷ শেষ পর্যন্ত একটা ছোটো জায়গার মধ্যে আটকে পড়ল সে৷
ওয়াতিয়া সোজা এগিয়ে গেল তার কাছে৷ তাকে দেখেই হুয়াকুই তার হাতডানা দু-টি দিয়ে বুক চাপড়ে কুঁইকুঁই করে শিস দিয়ে উঠল৷ এই শিস অনেকটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার মতো চাপা৷
ওয়াতিয়া চেঁচিয়ে উঠল, 'ও-য়া-পা!'
ডলফিও সাড়া দিল৷ ঢেউ দেখে সে আর ভয় পেল না৷ ঝাঁপ দিল উত্তাল সমুদ্রে৷ ওয়াতিয়া কাছে থাকলে কোনো কিছুকে সে ভয় পায় না৷
এই প্রথম সে সাঁতার কাটল মহাসমুদ্রে৷ ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে সে এসে উঠল ওয়াতিয়ার পিঠে৷
ডলফিনের দল হুয়াকুইকে মেরে তাড়িয়ে দিল৷ সে একবার পিছন ফিরে দেখল৷ তারপর ধীরে ধীরে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলল অজানা উত্তরের উদ্দেশে৷
ডলফিকে নিয়ে আনন্দ করতে করতে ফিরে চলল সকলেই৷ ফেরার পথে হুয়াপডের একটি বয়স্ক ডলফিন বলল, 'বেচারি!'
ওয়াতিয়া বলল, 'কে, হুয়াকুই?'
সে বলল, 'ওর বাচ্চাটাকে কিছুদিন আগে হাঙরে খেয়েছে৷ সেই থেকে বেচারি মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াত৷ তাই হয়তো ওয়াপাকে দেখে . . .'
কথাটা শেষ হল না৷ ঘাড় ঘুরিয়ে নিল ওয়াতিয়া৷ করুণ বিষণ্ণ দৃষ্টি তার৷ তাকিয়ে রইল উত্তর সমুদ্রের দিকে৷
এরপর বেশ কয়েক দিন কেটে গিয়েছে৷ একদিন ওয়াহুই বলল, 'শুনেছিস ওয়াতিয়া?'
ঘুরে তাকাল সে৷ কথাটা শেষ করল ওয়াহুই, 'হুয়াপডের সেই ডলফিনটা হাঙরের পেটে গিয়েছে৷'
মুখ ঘুরিয়ে নিল ওয়াতিয়া৷ একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার, 'বেচারি!'
প্রবালপুরীর জলকন্যা
ওয়াতিয়া এবং দলের সকলে যখন শিকার করে, তখন ডলফি আর ওয়াকা লেগুনের জলে খেলা করে বেড়ায়৷ খেলাটা মজার৷ অনেকটা লুকোচুরির মতো৷ তবে ডাঙায় নয়, জলে৷ একজন ডুব দিয়ে লুকিয়ে পড়ে জলের নীচে৷ অন্যজন তাকে খুঁজে বের করে৷ এইভাবে চলতে থাকে খেলাটা৷ তবে জলের বেশি গভীরে যায় না, উপরের দিকেই থাকে৷
ওয়াকা জলে ডুব দিল৷ চোঁ চোঁ করে নামতে শুরু করল৷ ডলফিকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য গভীরে, আরও গভীরে৷ এত গভীরে কি ডলফি তাকে খুঁজে পাবে? সে চাপা একটা শিস দিল৷ অনেকটা লুকোচুরি খেলার 'কু' দেওয়ার মতো৷
ডলফি একটা কানে হাতচাপা দিয়ে অন্য কানটা জলে ডুবিয়ে ওয়াকার গতিবিধি বুঝতে চেষ্টা করল৷ এই ব্যাপারটা তার নিজের আবিষ্কার৷ জলের নীচের ক্ষীণ শব্দ জলের উপরে শোনা যায় না, কিন্তু জলে কান ডুবিয়ে রাখলে সেই শব্দ কানে ধরা পড়ে৷
ওয়াকার শিস শুনতে পেয়েছে সে৷ শব্দটা আসছে জলের অনেক গভীর থেকে৷ বুক ভরে দম নিল সে৷ তারপর পানকৌড়ির মতো মাথা নীচু করে টুপ করে ডুব দিল৷
শব্দের দিকে কান খাড়া রেখে নামছে ডলফি৷ নীচে, আরও নীচে৷ এত নীচে সে আগে কখনো নামেনি৷ আরও কিছুটা নামার পর সে থামল৷ অবাক হয়ে গেল৷ এ কোথায় এল সে? এ কি স্বপ্নের কোনো রাজপুরী?
সামনে তোরণ৷ দু-টি প্রবালপ্রাচীর খাড়া উঠে গিয়ে মাথার উপরে খিলান তৈরি করেছে৷ রাজপুরীতে কি কোনো উৎসব? তোরণের গায়ে ফুল ও লতাপাতার সাজ৷ বিচিত্র ধরনের সমুদ্র আগাছার ফাঁকে ফাঁকে ফুলের মতো ফুটে আছে সি-অ্যানিমোন৷ পাপড়িগুলো স্থির নয়, নড়াচড়া করছে৷ লাল, হলুদ ও গোলাপি কর্ষিকাগুলো মেলে ধরছে, আবার গুটিয়ে যাচ্ছে৷
তোরণ পেরিয়ে ডলফি ঢুকে পড়ল বাগানে৷ স্বর্গের বাগান৷ নানা ধরনের ঝোপঝাড়৷ তাদের ডালপালা শাখাপ্রশাখা যুক্ত প্রবালের৷ কী তাদের বিচিত্র রূপ, কী তাদের বিচিত্র বর্ণ৷
গাছের ডালে ডালে সবুজ ও সোনালি রঙের পাখি৷ তাদের লাল টুকটুকে বাঁকা ঠোঁট, যেন টিয়া পাখিটি৷ প্যারট ফিশ বা টিয়া মাছ৷
উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতির ঝাঁক৷ ডাঙার প্রজাপতির মতো তাদের ডানায় রঙের চমক, নকশার বাহার৷ আসল প্রজাপতি তো নয়৷ বাটারফ্লাই ফিশ বা প্রজাপতি মাছ৷
তোরণের পাশেই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে দ্বাররক্ষীর দল৷ তাদের হাতে নীল রঙের পাখা৷ ডলফি চলে গেল পাশ দিয়ে৷ তারা পাখা দুলিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাল৷ হুবহু পাখার মতো৷ তবে পাখা নয়, প্রবাল৷ সি ফ্যান বা সমুদ্রপাখা৷
একজায়গায় দেখল সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অর্কেস্ট্রাবাদকের দল৷ তাদের পিঠে লাল রঙের ব্যাগপাইপ৷ এরা অরগ্যান পাইপ প্রবাল৷
পুরো উৎসবের মেজাজ৷ রাজপুরীর উদ্যানে একটি গাছ৷ গাছ, নাকি আগাছা? অনেকটা সাজানো বড়োদিনের গাছের মতো তার ডালপালায় অসংখ্য তারা ঝুলছে৷ তবে রঙিন কাগজের নয়, নানা রঙের স্টার বা তারা মাছ৷
সারা বাগান জুড়ে ফুলের ছড়াছড়ি৷ গাছে ফুটে আছে, ঝরে পড়ে আছে মাটিতে৷ কত রকমের, কত রঙের৷ সত্যিই তো আর ফুল নয়, ফুলের মতো প্রবাল৷ হোলিপোরা, আরকোপোরা, পেন্নাটুলা, অ্যালসিওনিয়াম, আরও কত৷
বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজপুরীর রাজনন্দিনীর দল৷ কী তাদের পোশাক-আশাক, কী তাদের রূপ৷ লাল, নীল, হলুদ ও বেগনি রঙের ওড়না গায়ে ডলফিকে অভ্যর্থনা জানাল ঝাঁকে ঝাঁকে পরি মাছ বা এঞ্জেল ফিশ৷
ডলফির আপ্যায়নের জন্য পাতা হয়েছে খাবার টেবিল৷ তার উপরে বড়ো বড়ো সোনার বাটি৷ উঁকি দিয়ে দেখল সে৷ ওগুলো বাটির মতো সোনালি রঙের প্রবাল৷ কাপ-কোরাল৷

ঘুরে ঘুরে দেখছে ডলফি৷ তার দু-চোখে বিস্ময়৷ এত বড়ো রাজপুরীতে কি রাজা নেই? রাজা থাকলেও সেই রাজার মাথায় কোনো রাজমুকুট থাকে না? পথের মাঝখানে লুটোচ্ছে মণিমাণিক্য খচিত রাজমুকুট বা মুকুট প্রবাল৷ ক্রাউন কোরাল৷
ডলফির খুব ইচ্ছে হল একটা মুকুট প্রবাল নিয়ে আসবে ওয়াকার জন্য৷ কিন্তু শক্তভাবে আটকে আছে পাথরের গায়ে৷ অনেক টানাটানি করেও তুলতে পারল না৷ হাল ছেড়ে দিয়ে হাত বাড়াল একটা মজার জিনিসের দিকে৷
হাত নেই, পা নেই৷ লেজ নেই, পাখনা নেই৷ শরীর বলতে কিছু নেই, শুধু মাথা৷ মাথার উপরে ড্যাবডেবে দু-টি চোখ, পিছনে ছোট্ট একটা টিকি৷
আলতো করে ছুঁয়ে দিল ডলফি৷ এবার চোখের সামনেই ঘটতে লাগল ব্যাপারটা৷ হাপুস হাপুস করে জল খেতে লাগল সে৷ খেতে খেতে হয়ে গেল গোলগাল একটা ফুটবল৷ ভালোই হল৷ এটা নিয়ে যাবে সঙ্গে করে ওয়াকার সঙ্গে বল খেলবে৷
দু-হাতে ডলফি জাপটে ধরল বলটা৷ এতক্ষণ খেয়াল করেনি, বলের গায়ে সরু সরু কাঁটা৷ কাঁটাগুলো লেপটে ছিল গায়ের সঙ্গে৷ জাপটে ধরতেই খাড়া হয়ে উঠল৷ দু-একটা ফুটতেই সে ছুড়ে ফেলে দিল বলটা৷
সি-হেজহগ বা শজারু মাছের কাঁটার খোঁচা খেয়ে তার হাত জ্বলছে৷ এদিকে দমও ফুরিয়ে আসছে৷ রাজপুরীর সবটা দেখা হল না৷ না হোক, আর একদিন সে আসবে৷ হুস হুস করে সে ভেসে উঠল উপরে৷
ডলফির পিছনে পিছনে ওয়াকা, একটু দূরে ভুস করে ভেসে উঠল সেও৷ ওয়াকা দেখতে পেয়েছে তাকে৷ খুশিতে তার চোখ-মুখ ডগমগ করছে৷ লেজ ও ডানায় জলের ঝাপটা তুলে ছুটে আসছে তার দিকে৷ কাছে আসতে ডলফি তাকে জড়িয়ে ধরল, 'এতক্ষণ কোথায় ছিলি?'
ওয়াকা ছাড়িয়ে নিল নিজেকে৷ ডলফির মুখের কাছে মুখ তুলে হাঁ করল৷ তার মুখের মধ্যে দপদপ করছে এক টুকরো লাল আগুন৷ ডলফি তার মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল রক্তবর্ণের একখণ্ড রক্তপ্রবাল৷ দুষ্প্রাপ্য, চট করে পাওয়া যায় না৷
ডলফির মুখে খুশির ঝিলিকের মতো সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে৷
হাত-পা ছড়িয়ে ডলফি শুয়ে আছে গুহার চাতালে৷ সবে সন্ধ্যে হয়েছে৷ রাতের সমুদ্রে কত ধরনের ভয়৷ ভয়ংকর হাঙর ঘুরে বেড়ায়৷ রাক্ষুসে ব্যারাকুডা সুযোগ খোঁজে৷ গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে অক্টোপাস৷ বিপদের কি আর শেষ আছে?
ডলফি জলে ভাসতে ভাসতে ঘুমোতে পারে না৷ ডলফিনের মতো আধোঘুম আর আধোজাগরণে সজাগ থাকতে পারে না৷ তাই সন্ধ্যে হতে-না-হতেই ওয়াতিয়া তাকে জোর করে পাঠিয়ে দিল গুহায়৷
অথচ রাতের সমুদ্র কী মায়াময়৷ এই সময়টা আকাশে চাঁদ ওঠে৷ চাঁদের ছায়া পড়ে সমুদ্রের জলে৷ আকাশে ঝিকমিক করে অজস্র তারা৷ জলেও চিকমিক করে ফসফরাসের আলো৷ চাঁদের আলোয় লেগুনের জলে সাঁতার কাটতে তার খুব ইচ্ছে করে৷ ইচ্ছে করে চিত হয়ে ভাসতে ভাসতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে৷ কত দিন দূর থেকে সে দেখেছে, চাঁদের আলোয় ওয়াকাকে জলপরিদের সঙ্গে খেলা করতে৷
গুহার ভিতরে অন্ধকার৷ সে তাকিয়ে আছে বাইরে৷ গুহার বাইরে বিশাল সমুদ্র৷ তার একচিলতে শুধু দেখতে পাচ্ছে সে৷ সেখানে চাঁদের আলো পড়ে ঝলমল করছে৷ জলে আলোর খেলা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল সে৷
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল৷ ওয়াকার সঙ্গে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রবালের রাজপুরীতে৷ কীসের যেন উৎসব৷ চারদিকে আলো জ্বলছে৷ গানের সুর ভেসে আসছে৷ বিচিত্র কোলাহলে গমগম করছে রাজপুরী৷
সহসা আলো নিভে গেল৷ চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ গানের সুর কেটে গিয়েছে৷ কোলাহল থেমে গিয়েছে৷ পথ হারিয়ে ফেলেছে তারা৷ অন্ধকার রাজপুরী থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছে না৷
হঠাৎ দেখল, বড়ো বড়ো দু-টি লাল চোখ৷ অন্ধকারে কটমট করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে৷ ওয়াকা হাতডানা দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে তার গলা৷ ভয় পেয়ে গিয়েছে সে৷ চেঁচিয়ে উঠল, 'ও-য়া-তি-য়া!'
ওয়াতিয়া হয়তো কাছেই ছিল৷ ছুটে এল গুহার মধ্যে৷ গুহার ঢালু অংশটা জলে ডুবে গিয়েছে৷ ওয়াতিয়া শিস দিয়ে উঠল, "কী হয়েছে?"
ভয়ে ডলফি কথা বলতে পারছে না৷ তার গলা দিয়ে শুধু গোঙানির মতো একটা শব্দ বেরোল, "ও-ই তো!"
গুহার মধ্যে বড়ো বড়ো দু-টি লাল চোখ৷ অন্ধকারে দপদপ করছে৷ জ্বলছে আর নিভছে৷
ওয়াতিয়া বুঝতে পারল ব্যাপারটা৷ বলল, "এই ব্যাপার!"
জলের সঙ্গে গুহার মধ্যে ভেসে এসেছে দু-টি লন্ঠন মাছ৷ তাদের লেজের আলো জ্বলছে আর নিভছে৷ ওয়াতিয়া একটি মাছ মুখে নিয়ে ছুড়ে দিল চাতালের উপর৷ ডলফি অবাক বিস্ময়ে দেখল অন্ধকার কেটে গিয়ে লালচে আলোয় ভরে গিয়েছে গুহা৷
এর পর থেকে সন্ধ্যে হলেই ওয়াতিয়া একটি লন্ঠন মাছ ধরে ছুড়ে দিত গুহার মধ্যে৷ ডলফি ঘুমোত৷ তার মাথার কাছে জোর কমিয়ে রাখা লন্ঠনের মতো সারারাত আলো ছড়াত সেই মাছ৷
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ
লেগুনের জলে ভেসে উঠেছে একটা মোরে ইল৷ বড়ো নয়, ছোটো৷ এমনিতে শিকার দেখলেই ওয়াতিয়া তাড়া করে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর৷ ইল মাছটাকে দেখেও সে গা করল না৷ ঘুরে তাকাল ডলফি ও ওয়াকার দিকে৷ ভাবটা যেন, দেখি, ওরা কী করে!
ডলফি ও ওয়াকা, দু-জনের কেউই এখনও শিকার করতে পারে না৷ ওয়াতিয়ার মনের ভাবটা বুঝতে পেরে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল ইল মাছটার ঘাড়ে৷
বিপদ বুঝে ছিটকে বেরিয়ে গেল মাছটা৷ এঁকেবেঁকে সাঁতার কাটছে৷ তাড়া করছে ডলফি এবং ওয়াকা৷ ওয়াতিয়া যাচ্ছে তাদের পিছু পিছু৷
ইল মাছটা তাদের ছুটিয়ে নিয়ে এল অনেকটা দূর৷ বেশ বুঝতে পারছে, এভাবে ছুটে বেশিক্ষণ সে রেহাই পাবে না৷
তাই বাঁচার তাগিদে সে ঢুকে পড়ল প্রবালপ্রাচীরের গায়ে একটা সরু ফাটলের মধ্যে৷ দু-জনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল৷ ওয়াকা ফাটলের মধ্যে তার ঠোঁটটা ঢোকানোর চেষ্টা করল, ডলফি তার হাত৷ ফাটলটা সরু৷ তাই পারল না কেউ৷
ওয়াতিয়া তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই ভালো করে দেখল ফাটলের মুখ৷ বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে মানুষের পরেই ডলফিন, তারপর শিম্পাঞ্জি৷ সরে গিয়ে প্রবালপ্রাচীরের গায়ে কী যেন সে খুঁজছে৷ খুঁজতে খুঁজতে সে পেয়েও গেল একটা স্করপিয়ন ফিশ বা মাকড়সা মাছ৷ লেজটা সরু৷ লেজে বাঁকানো হুকের মতো বিষাক্ত কাঁটা৷ মাকড়সা-মাছটা ধরে তার লেজের সরু কাঁটাটা ফাটলের মধ্যে ঢুকিয়ে খোঁচা দিতে লাগল সে৷
মাকড়সা মাছের বিষাক্ত হুল দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছে মোরে ইল৷ বেরিয়ে আসছে গর্ত ছেড়ে৷ ফাটলের মুখ দিয়ে মাথাটা বের করতেই ডলফি ঝাঁপিয়ে পড়ল, দু-হাতে জাপটে ধরল ইল মাছের মাথা৷
ডলফির হাতের মুঠোয় মাছটা ছটফট করছে৷ ডলফির প্রথম শিকার৷ মাছসুদ্ধ হাত মাথার উপর তুলে সে শিস দিয়ে উঠল, 'ধরেছি!' তাদের হাতখানা নেড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল ওয়াতিয়া এবং ওয়াকা৷
কখনো কখনো লেগুনের বাইরে গিয়েও শিকার করে ডলফি৷ তবে একা নয়, দলের সঙ্গে৷
দ্বীপের বাইরে উন্মুক্ত সমুদ্র৷ সেখানে বড়ো বড়ো ঢেউ৷ ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে প্রবালপ্রাচীরের গায়ে৷ ঢেউয়ের ধাক্কায় মাঝে মাঝে বড়ো শিকারও চলে আসে এদিকে৷ দল বেঁধে শিকার করার একটা আলাদা মজা আছে৷ হইচই করা যায়৷
একদিন সমুদ্রের জলে ভেসে এল একটা স্কুইড৷ ডলফিনের ঝাঁকের নজর এড়ায়নি৷ অনেকটা দূর থেকে তারা ঘিরে ফেলল তাকে৷ এত বড়ো স্কুইড ডলফি আগে কখনো দেখেনি৷ প্রায় কুড়ি ফুট লম্বা৷ তার মুখের চারপাশে হাতের মতো দশটা শুঁড়৷ সাপের মতো কিলবিল করছে৷ তার মধ্যে দুটো তো প্রায় লম্বায় তিরিশ ফুট৷ মাথার উপরে মৃত্যু গহ্বরের মতো বিশাল দু-টি কালো চোখ৷ মুখ হাঁ করে গিলে খেতে আসছে৷ ওয়াকা বা ডলফিকে এক এক গ্রাসে গিলে ফেলবে৷ তার ঠোঁট কোদালের মতো বড়ো আর খুরের মতো ধারালো৷
ডলফি ভয় পেয়ে গিয়েছে৷ দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে৷ ওয়াতিয়া বলল, 'এ আর এমন কী বড়ো! এর চেয়েও অনেক বেশি বড়ো আমি দেখেছি৷'
স্কুইডের চেহারাটা টর্পেডোর মতো৷ শুধু চেহারায় নয়, গায়ের জোরেও স্কুইড কম যায় না৷ লড়াই বাধলে বিশাল চেহারার স্পার্ম তিমিকেও জায়ান্ট স্কুইড ঘায়েল করতে পারে৷
শুরুতে সে জল তোলপাড় করে তেড়ে আসছিল৷ কিন্তু ডলফিনের ঝাঁকটা এগিয়ে যাচ্ছে তার দিকে৷ বৃত্ত ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে৷ চারপাশে এত ডলফিনকে দেখে শেষ পর্যন্ত বোধ হয় একটু ঘাবড়ে গেল স্কুইড৷
পিছু হটছে সে৷ আক্রমণের বদলে পালানোর চেষ্টা করছে৷ পালাবে কোন দিকে? চারদিক থেকে তো ডলফিনরা ঘিরে ফেলেছে তাকে! শেষ চেষ্টা হিসেবে ধোঁকা দিয়ে পালাতে চাইছে৷ ফানেলের মতো ইংকজেট দিয়ে কালি ছিটিয়ে দিচ্ছে জলে৷ কালি তৈরি হয় তার শরীরের ইংকস্যাকে৷ এই কালি অনেকটা পেনের কালির মতো৷ শোনা যায়, এই কালি দিয়ে এক ক্যাপ্টেন তার জাহাজের লগবুক লিখেছিলেন৷
স্কুইডের ছিটোনো কালিতে জল কালো হয়ে উঠেছে৷ ভালো করে দেখা যাচ্ছে না কিছু৷ সটকে পড়ার ধান্দা করছে সে৷ তবে ডলফিনের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়৷ ঝাঁকটা কাছে এসে পড়েছে৷ চারদিক থেকে ছেঁকে ধরেছে তাকে৷ যখন বুঝল, পালানোর কোনো উপায় নেই, তখন সে মরিয়া হয়ে উঠল৷ ক্রুদ্ধ আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল ডলফিনের ঝাঁকের উপর৷
দশ-দশটা হাত নিয়ে তেড়ে আসছে স্কুইড৷ ময়াল সাপের মতো ভয়ংকর সেই হাতের নাগাল এড়াতে ডলফিনরা সরে যাচ্ছে দূরে৷ হাত গুটিয়ে নিলে আবার তেড়ে যাচ্ছে৷ ডলফিনরা জানে, একবার কোনো রকমে পেঁচিয়ে ধরতে পারলে, আর নিস্তার নেই৷ পিষে মেরে ফেলবে তাদের৷
শুঁড়ে সারি সারি ছোটো বাটির মতো জিনিস৷ সেই বাটির ধার বরাবর করকরে ধারালো দাঁত৷ একবার পেঁচিয়ে ধরলে সেই দাঁত গায়ের চামড়া কেটে ঢুকে যাবে মাংসের গভীরে৷ ক্ষতবিক্ষত করে দেবে সারা শরীর৷
যেকোনো যুদ্ধের একটাই নীতি৷ হয় মারতে হবে, নয়তো মরতে হবে৷ তাই সে মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ এই অবস্থা কোনো উইকির পক্ষে নিরাপদ নয়৷ ওয়াতিয়া পইপই করে ডলফি ও ওয়াকাকে বলল, 'চলে যা, চলে যা৷ অন্তত দূরে কোথাও গিয়ে দাঁড়া৷'
উত্তেজনা চরমে৷ এ সময়ে কি কেউ চলে যেতে পারে? উত্তেজনার আঁচে টগবগ করে ফুটছে তারা৷ ওয়াতিয়ার কথায় ওয়াকা কান দিল না৷ গা করল না ডলফি৷
ঝাঁকের বড়োদের সঙ্গে তাল রেখে তারাও তেড়ে যাচ্ছিল ক্ষিপ্ত স্কুইডের দিকে৷ আবার ফিরেও আসছিল৷ তাল দিতে দিতে একসময় তাল কেটে গেল ওয়াকার৷ অন্যমনস্ক, নাকি অসাবধান?
সকলে ফিরে এলেও সে পারল না৷ পিছিয়ে পড়ল৷ ভয়ংকর দৈত্যটা সুযোগের সন্ধানে ছিল৷ তার সামনের দু-টি শুঁড় অন্য শুঁড়ের চেয়ে বেশি লম্বা৷ তার একটাকে দড়ির ফাঁস ছুড়ে শিকার করার মতো ছুড়ে দিল ওয়াকার দিকে৷ জ্যান্ত দড়ির ফাঁস জড়িয়ে গেল ঠিক তার হাতডানার নীচে৷ সে চেঁচিয়ে উঠল, 'ও-য়া-পা!'
ডলফি ছিল ঠিক তার সামনে৷ নিজের নাম শুনে ঘুরে তাকাল৷ ভয়ে শিউরে উঠল৷ সে কেবল ওই এক মুহূর্তের জন্য৷ শুঁড়ের প্যাঁচে ওয়াকা ছটফট করছে৷ দৈত্য তাকে গায়ের জোরে টানছে নিজের দিকে৷
ডলফির চোখের সামনে থেকে মুছে গিয়েছে সবকিছু৷ আকাশ, সমুদ্র, ডলফিনের ঝাঁক, এমনকী সেই বিশালকায় দৈত্য৷ কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে৷ তার চোখের সামনে শুধু রুপোলি রঙের একটি পুচ্ছ৷ সেই পুচ্ছ যন্ত্রণায় আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে৷ হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে তার৷ সে শূন্যে একটা ভল্ট খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ দৈত্যের হাত থেকে ওয়াকাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তার লেজ ধরে ঝুলে পড়ল৷
দৈত্য স্কুইড অন্য লম্বা হাতটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে৷ পেঁচিয়ে ধরল তার কোমর৷ তারপর দু-জনকেই টানতে লাগল তার নিজের দিকে৷
ঘটনাটা ঘটে গেল চোখের পলকে৷ ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়েছে গোটা দলটা৷ থমকে দাঁড়িয়েছে৷ একটু দূর থেকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখছে সেই দিকে৷ ওয়াতিয়ার বুকফাটা চিৎকারে সংবিৎ ফিরল তাদের৷ ফেটে পড়ল ওয়াহুই, 'কী দেখছিস তোরা, মজা?'

একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল সকলেই৷ ওয়াহুই ছুটছে উলটো দিকে৷ যেখানে প্রবালপ্রাচীরের গায়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ৷ বুড়ি দিদিমা সকলকে লড়িয়ে দিয়ে নিজে কি ভঙ্গ দিল রণে? বুড়ি কি পালাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে?
রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে ওয়াহুই৷ তার পিছুপিছু ওয়াতুই আর ওয়াকুই৷ তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে সে৷ হাতে সময় খুব কম৷ যা কিছু করার, করতে হবে চটপট৷
একটু পরেই তারা ফিরে এল রণক্ষেত্রে৷ সঙ্গে এনেছে একটা ভারী পাথর৷ পাথরটা মুখে করে বয়ে এনেছে ওয়াহুই নিজে৷ অন্য দু-জনের মুখে দু-টি লম্বাটে ধরনের জমাট প্রবালের খণ্ড৷ সামনের দিকটা তিরের ফলার মতো ছুচলো৷
মাঝখানে ওয়াহুই৷ তার দু-পাশে অন্য দু-জন৷ তার সবচেয়ে আদরের দুই নাতনি৷ সুইসাইড স্কোয়াড৷ সেই স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিচ্ছে দিদিমা ওয়াহুই নিজে৷
দৈত্যস্কুইডের শুঁড় দু-টি উঠে গিয়েছে উপরে৷ শূন্যে ঝুলছে ডলফি ও ওয়াকা৷ ডলফির চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে৷ যন্ত্রণায় হাত-পা ছুড়ছে সে৷
ওয়াকার জিভ বেরিয়ে পড়েছে৷ লেজটা কাঁপছে থরথর করে৷
শূন্য গর্তের মধ্যে একজোড়া ফুটবল পাক খাচ্ছে৷ চোখ ঘুরছে জায়ান্ট স্কুইডের৷ তার হাঁ-করা মুখ আকাশের দিকে৷ রোদ পড়ে ঝলসে উঠছে তার করাল দাঁত৷ তার হাঁ-করা মুখের ঠিক উপরেই ঝুলছে ওয়াকা এবং ডলফি৷ ধীরে ধীরে তার হাত দুটো নেমে আসছে হাঁ-করা মুখের দিকে৷
সমুদ্র তোলপাড় হয়ে উঠল৷ একসঙ্গে তিন-তিনটে মিসাইল চার্জ হল৷ সুইসাইড স্কোয়াডের তিনটি ডলফিন জ্যান্ত মিসাইলের মতো ছুটে যাচ্ছে প্রচণ্ড গতিতে৷ চোখ বন্ধ তাদের৷ চোখ খোলা রেখে কি এভাবে মৃত্যুর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়?
দৈত্য স্কুইডের মুখ হাঁ৷ চোখ আকাশের দিকে৷ লক্ষ ওয়াকা এবং ডলফিন৷
মাঝের ডলফিনটি আগেই থামল৷ সেই রাক্ষুসে হাঁ থেকে একটু দূরে৷ লাফিয়ে উঠল জলের উপরে৷ তার মসৃণ বুকের উপরে রোদ পড়েছে৷ চকচক করছে৷ ওয়াহুই তার শরীরটাকে ধনুকের ছিলার মতো পিছনের দিকে বাঁকিয়ে প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিল৷ গুলতি ছিটকে বেরোনোর মতো তার মুখ থেকে পাথরটা ছিটকে গিয়ে পড়ল সেই রাক্ষুসে হাঁ-এর মধ্যে৷
ভারী পাথরটা আটকে গিয়েছে জায়ান্ট স্কুইডের মুখের মধ্যে৷ পাথর-ভরতি মুখ নিয়ে সে ঘুরে তাকাল৷ কটমট করে তাকাচ্ছে৷ যেন সে চোখ দিয়েই গিলে ফেলতে চাইছে তাকে৷ ক্রোধে তার গায়ের রং বদলাচ্ছে ঘন ঘন৷ ধূসর থেকে তামাটে, তামাটে থেকে বাদামি, বাদামি থেকে কালো, আবার ধূসর৷
ওয়াতুই ঝাঁপিয়ে পড়ল তার চোখের উপরে৷ একই সঙ্গে ওয়াকুইও৷ রাইফেলের দু-টি বুলেট যেন তার চোখ ফুটো করে বেরিয়ে গেল৷ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে তার বিশাল শরীর৷ ওয়াতুই এবং ওয়াকুই জমাট প্রবালের ধারালো ছুরি আমূল বসিয়ে দিয়েছে তার দু-চোখে৷
অবাক হয়ে দেখছে সকলেই৷ দিদিমা ওয়াহুই আর তার আদরের দুই নাতনির বিপুল বিক্রম৷ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওয়াতিয়াও দেখছিল৷ ক্রোধে তার সারা শরীর কাঁপছে৷ সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না৷
ঘাড় গোঁজ করে ছুটে যাচ্ছে সে৷ তার তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে সজোরে আঘাত হানল জায়ান্ট স্কুইডের দু-চোখের ঠিক মাঝখানে৷ শরীরের দুর্বলতম স্থান৷ শরীরের সমস্ত স্নায়ু এসে জট পাকিয়েছে দু-চোখের মাঝখানে৷ ওয়াতিয়া পাগলের মতো বারবার আঘাত করতে লাগল সেখানে৷
শিথিল হয়ে আসছে জায়ান্ট স্কুইডের সারা শরীর৷ কুঁকড়ে যাচ্ছে সে৷ ময়ালের মারণপ্যাঁচে আলগা হয়ে আসছে৷ শেষ পর্যন্ত ওয়াকা ও ডলফি খসে পড়ল জলে৷
দু-টি ডলফিন ছুটে গিয়ে বুক পেতে লুফে নিল তাদের৷
যুদ্ধ শেষ৷ ভারী পাথরটা ছুড়ে মারতে গিয়ে ওয়াহুইয়ের ঘাড়ে চোট লেগেছে৷ ঘাড় সোজা করতে পারছে না সে৷ দুটো ডলফিনের কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে সে৷ ওয়াতিয়াকে দেখতে পেয়ে সে ডাকল৷ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার৷ তবুও সে ফিসফিস করে বলল, 'উইকি দুটো কেমন আছে?'
ওয়াতিয়ার গলা বোজা৷ তার চোখ ফেটে জল আসছে৷ কান্না চেপে কোনোরকমে সে জবাব দিল, 'ভালো৷'
তৃপ্তির হাসি ফুটল ওয়াহুইয়ের মুখে৷
যুদ্ধজয়ের সেনাপতিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে চলল বিজয়ী ডলফিনের ঝাঁক৷
অক্টোপাসের নাচ
শিকারে তেমন হাত না পাকালেও সাহস বেড়েছে ডলফির৷ সাধারণত দলের সঙ্গে শিকার করে সে৷ মাঝে মাঝে ছিটকেও যায়৷
একটা ম্যাকারেল মাছকে তাড়া করছে সে৷ মাছটা ছুটছে জল কেটে কেটে৷ ডলফিও ছুটছে তার পিছু পিছু৷ ঘটনা ঘটছে প্রবাল দ্বীপের কাছে৷ প্রাচীরের বাইরের দিকের উন্মুক্ত সমুদ্রে৷
প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে মাছটা এসে ঢুকে পড়ল একটা গুহার মধ্যে৷ প্রবাল প্রাচীরের গায়ে গুহাটা৷ দূর থেকে আগেও দেখেছে ডলফি৷ গুহাটা বেশিরভাগ সময় জলে ডুবে থাকে৷ তাই চট করে নজরে পড়ে না৷ জল সরে গেলে গুহার কিছুটা অংশ জেগে ওঠে জলের উপরে৷
মাছটাকে তাড়া করে ডলফিও ঢুকে পড়ল গুহার মধ্যে৷ গুহাটা গভীর সুড়ঙ্গের মতো৷ অর্ধেকটা ডুবে আছে জলে৷ মাথার উপরের দিকটা ফাঁকা৷ ছাতের গায়ে জলের দাগ দেখে বুঝতে পারল সে জল বাড়লে গুহাটা জলে ভরে যায়৷
তেরছাভাবে সূর্যের আলো এসে পড়েছে গুহার মুখে৷ সামনের দিকটা আলোকিত কিন্তু ভিতরটা ঝাপসা অন্ধকারে ঢাকা৷ গুহার মধ্যে ঢুকে মাছটাকে আর খুঁজে পেল না ডলফি৷ হয়তো অন্ধকারে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে অথবা বাইরে যাওয়ার জন্য অন্য কোনো রাস্তা আছে, সেখান দিয়ে সটকে পড়েছে৷
বাইরে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াল ডলফি৷ সহসা তার যেন মনে হল, কেউ তার ডান পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে৷ সে তাকাতে লাগল চারপাশে৷ প্রথমে সে কিছুই দেখতে পায়নি৷ ভালো করে নজর করতেই তার চোখে পড়ল, অন্ধকারে মিটমিট করে জ্বলছে কুতকুতে দু-টি বাঁকা চোখ৷
ভয় পেয়ে গিয়েছে ডলফি৷ তাড়াতাড়ি বাইরে যাওয়ার জন্য লাফ দিল৷ পায়ে টান পড়েছে৷ দড়ি বেঁধে হ্যাঁচকা টান দিল কেউ৷ বাইরে যাওয়ার বদলে ছিটকে গিয়ে পড়ল গুহার মধ্যে৷ দেওয়ালে ঠোক্কর লেগে কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে৷
অদৃশ্য শত্রু এবার তার সামনে৷ গুহার মুখ আগলে বসে আছে৷ তার নির্দিষ্ট কোনো আকার নেই৷ শরীর বলতে যা বোঝায়, তা আসলে একটা ঢ্যাপঢ্যাপে বস্তা৷ গুহার চারপাশের দেওয়ালের সঙ্গে গায়ের রং মিলিয়ে সে গা-ঢাকা দিয়ে ছিল৷ আলোয় এসে তার গায়ের রং পালটে গেল ধূসর৷ আশ্চর্য বহুরূপী সে৷ চটপট রং বদলে নিজেকে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে৷ প্রমাণ আকারের একটা পরিণত অক্টোপাস৷
দু-চোখে বিভীষিকা দেখছে ডলফি৷ সামনে সারাটা গুহা জুড়ে সাপের মতো কিলবিল করছে আট-আটটি শুঁড়৷ এক-একটি শুঁড় লম্বায় প্রায় ষোলো ফুট৷ শুঁড়গুলো কি বেরিয়েছে দেহের সামনে থেকে?
না, অক্টোপাসটা আক্রমণ করছে না ডলফিকে৷ খেলা করছে তার সঙ্গে৷ অনেকটা শিকারি বিড়ালের মতো৷ ইঁদুর শিকার করে সে সঙ্গেসঙ্গে তাকে মেরে খেয়ে ফেলে না৷ খেলা করে তার সঙ্গে৷ তারপর খেলিয়ে খেলিয়ে মারে৷
ডলফির পায়ের ফাঁসও এখন আলগা৷ পুরোপুরি মুক্ত সে৷ শুধু তার চোখের সামনে আটটি শুঁড় চার জোড়া সাপের মতো মাথা দুলিয়ে নাচছে৷ নাচতে নাচতে তার ঘাড়, মাথা ও নাক ছুঁয়ে যাচ্ছে৷
খেলাটা চলল বেশ কিছুক্ষণ ধরে৷ তারপর অক্টোপাসটা উঠে দাঁড়াল তার চার জোড়া পায়ের উপর ভর দিয়ে৷ শুঁড়গুলোকে সে পায়ের মতো ব্যবহার করে গুহার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল৷
হেলছে, দুলছে, সামনে ঝুঁকে পড়ছে৷ কখনো সে চার পায়ে ভর দিয়ে চার হাত চারপাশে ছড়িয়ে নাচের ভঙ্গিতে ঘুরপাক খাচ্ছে৷ ভয়ে থরথর করে কাঁপছে ডলফি৷
অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে৷ এবার সে থেবড়ে বসল গুহার মুখে৷ হাত বাড়াল ডলফির দিকে৷
অক্টোপাসের আটটা হাত এগিয়ে আসছে গুটিগুটি করে৷ ডলফিও গুটিগুটি করে পিছু হটছে৷ হটতে হটতে তার পিঠ ঠেকেছে দেওয়ালে৷ অসহায়ভাবে সে আর্তনাদ করে উঠল৷
অক্টোপাসের একটা হাত এগিয়ে এসে ডলফির ডান পায়ে শক্ত ফাঁসের মতো আটকে গিয়েছে৷ অন্য হাতও এগিয়ে আসছে৷ জড়িয়ে ধরেছে তার বাঁ-পা৷ টানছে তাকে নিজের দিকে৷ প্রথমে মৃদু টান৷ আদর করে কাছে টানার মতো৷ তারপর গায়ের জোরে৷
গুহার দেওয়াল খাঁজকাটা৷ ডলফি মরিয়া হয়ে দু-হাত দিয়ে জাপটে ধরল খাঁজকাটা একটা পাথর৷ এগিয়ে আসছে আরও দু-টি হাত৷ ডান হাতের তলা দিয়ে পিঠ ঘুরে উঠে আসছে সামনের দিকে৷ ইতিমধ্যে এগিয়ে আসছে বাকি হাতগুলোও৷ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে তাকে৷
আট হাতের প্রবল টানে অক্টোপাস তাকে টানছে৷ গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে পাথরটা জাপটে ধরে আছে ডলফি৷ তার মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে৷ পাথরের ধারালো খাঁজ তার নরম হাতে দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে৷ হাত কেটে রক্ত পড়ছে তার৷
অক্টোপাসটা ভীষণ রেগে গিয়েছে৷ অনেকটা মানুষের গোঙানির মতো রাগে গরগর করছে সে৷ রাগলে তার গায়ের রং দ্রুত বদলায়৷ গায়ে ফুটে উঠেছে রামধনুর সাতটা রং৷ যেমন ভয়ংকর, তেমনই মনোমুগ্ধকর৷ এই দৃশ্য কাছ থেকে নয়, দূর থেকে উপভোগ করার মতো৷ শিকার ও শিকারির মরণপণ টাগ-অফ-ওয়ার৷ আট হাতে প্রবল মোচড় দিল অক্টোপাস৷ ডলফির পা উপরের দিকে, মাথা নীচে৷ এক পাক ঘুরে গেল সে৷ আলগা হয়ে গেল তার হাতের দৃঢ়মুষ্টি৷ পর মুহূর্তেই একটা হ্যাঁচকা টান৷ হাতের পাথরটা ফসকে গেল৷ ছাতের নীচে শূন্যে ঝুলছে ডলফি৷
ধীরে মুখ বের করছে অক্টোপাস৷ এতক্ষণ তার মুখ দেখা যায়নি৷ থলথলে ব্যাগের মতো চেহারা৷ তার কোনো গোপন খাঁজের আড়ালে ঢাকা ছিল৷
ডলফির ঝুলন্ত শরীর ধীরে ধীরে নেমে আসছে তার মুখ লক্ষ করে৷ সে হাঁ করছে তাকে গিলে খাওয়ার জন্য৷ তার ধারালো চোয়াল টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো৷ তুলনায় অনেক, অনেক গুণ বড়ো৷
দারুণ শক্ত সেই চোয়াল৷ তার নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে গোটা একটা ঝুনো নারকেল ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় মড়মড় করে৷
কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে৷ মুহূর্তের প্রতীক্ষা৷ ভয়ংকর দুই চোয়ালের মাঝখানে ঝুলে আছে ডলফি৷ ভয়ে অসাড়৷ শরীর থেকে অনেকখানি রক্তও বেরিয়ে গিয়েছে৷ এখন তার মধ্যে কোনো অনুভূতি কাজ করছে না৷
শিকার মুখে তুলতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল অক্টোপাস৷ সূর্য তার পিছনে৷ সামনের দেওয়ালে এ কার ছায়া পড়েছে? মস্ত হাঁ-করা মুখ৷ মুখের মধ্যে সারি সারি দাঁত বাঁকানো ছুরির মতো৷ ছায়া দেখে চমকে উঠল সে৷
প্রতিক্রিয়া হল অভূতপূর্ব৷ ডলফিকে ছুড়ে ফেলে দিল গুহার এক কোণে৷ নিমেষের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল সে৷
প্রচণ্ড ক্রোধে গর্জন করে উঠল৷ গায়ের রং পালটে গিয়েছে৷ ক্রোধে রক্তের মতো লাল৷
গ্যালন গ্যালন জল খেয়ে ফুলে উঠেছে তার ব্যাগের মতো তোবড়ানো শরীর৷ তারপর সহসা সংকুচিত হতে শুরু করল৷ রকেটের প্রপালশনের মতো শরীরের জল বেগে বেরিয়ে আসছে তার পিছনের ছোটো ফানেলের মতো মুখ দিয়ে৷ তার শুঁড়গুলো একসঙ্গে জড়ো হয়ে পিছনে ধূমকেতুর পুচ্ছের মতো আকার নিয়েছে৷ তারপর ধূমকেতুর মতোই তীব্র বেগে ছিটকে বেরিয়ে গেল সে বাইরে৷
ডলফির শরীর থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে৷ হাঙর কি বহুদূর থেকেও রক্তের গন্ধ টের পায়? রক্তের গন্ধে ছুটে এসেছে ভয়ংকর এক ম্যাকো হাঙর৷
মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে এলে কে না খেপে যায়৷ পেটে খিদে থাকলে বা খেপে গেলে সমুদ্রে হাঙরের মতো দুঃসাহসী আর কেউ নেই৷ নিজের চেহারার চেয়ে দশ গুণ বড়ো তিমিকেও সে আক্রমণ করতে পিছপা হয় না৷ চলন্ত কোনো জাহাজকে জ্যান্ত কোনো প্রাণী ভেবে আক্রমণ করার জন্য তেড়ে আসে৷ গায়ের শক্তিতে ছোটোখাটো জাহাজকেও সে ডুবিয়ে দিতে পারে৷ লাফাতে সে ওস্তাদ৷ জলের উপরে পনেরো-কুড়ি ফুট অনায়াসে লাফাতে পারে৷ হাঙর খায় না এমন জিনিস নেই৷
'ম্যাকো' মাওরি শব্দ৷ মানে, নীল বিদ্যুৎ৷ নীল বিদ্যুৎশিখার মতো ক্ষিপ্র তার গতি৷ ম্যাকো হাঙর, সমগ্র হাঙরকুলের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর৷
প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী৷ কেউ কারও চেয়ে কম যায় না৷ ক্ষিপ্ত অক্টোপাস আক্রমণ করে বসল ম্যাকো হাঙরকে৷ ম্যাকো পেয়েছে রক্তের গন্ধ৷ সে এখন খুনি হাঙর৷
গুহার সামনেই শুরু হয়ে গেল ভয়ংকর লড়াই৷ অক্টোপাসের আট বাহুর আলোড়নে সমুদ্র আলোড়িত৷ ম্যাকো হাঙরের শক্তিশালী লেজের ঝাপটায় ঝড় উঠল সমুদ্রে৷
আসল লড়াইটা হচ্ছে বাইরে৷ ডলফির চোখের আড়ালে৷ গুহার মধ্যে বসে সে শুধু তার আঁচ পাচ্ছে৷ তাতেই তার দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা৷ ক্রুদ্ধ গর্জনে কাঁপছে চারদিক৷ প্রবল জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ছে গুহার মধ্যে৷ মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকের মতো দু-একটা ঝলক৷ তাতেই শিউরে উঠছে সে৷
সহসা আর-এক বিপদ৷ সমুদ্রে হয়তো জোয়ার এসেছে৷ গুহার জল বাড়তে শুরু করেছে৷
অক্টোপাসটা গুহা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ডলফি সুযোগ খুঁজছে পালানোর৷ পালিয়ে যাওয়ার পথ আগলে সাক্ষাৎ দুই শয়তান৷ শিকারের দখল নিয়ে মরণপণ লড়াই চলছে৷ তাদের পাশ কাটিয়ে সে যায় কী করে? চোখের সামনে দিয়ে তাদের একমাত্র শিকারকে কি তারা চলে যেতে দেবে?
যুদ্ধ যতই দীর্ঘস্থায়ী হোক, একসময় শেষ হবে৷ যুদ্ধের শেষে কেউ-না-কেউ হারবে৷ বিজয়ী ফিরে আসবে তার শিকারের খোঁজে৷ একবার ডলফি অক্টোপাসের মুখ থেকে ফিরে এসেছে৷ আর-একবার কি সে ফিরতে পারবে ম্যাকো হাঙরের মুখ থেকে?
একটু একটু করে জল বাড়ছে৷ ডলফি তার মাথাটাকে উঁচু করে ভাসিয়ে রেখেছে জলের উপরে৷ জল বাড়তে বাড়তে গুহার ছাত ছুঁইছুঁই৷ তার মাথা ঠেকেছে ছাতের গায়ে৷
হাঙর কিংবা অক্টোপাসের পেটে যেতে হয়তো কিছুটা দেরি আছে, কিন্তু জলে ডুবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে আর বেশি দেরি নেই৷ জল তার চিবুক ছাড়িয়ে ঠোঁটে এসে ঠেকেছে৷ একটু বাতাসের জন্য সে ঘাড় কাত করে নাকটা ঠেকিয়ে রেখেছে ছাতের গায়ে৷
সহসা দু-চোখে সে অন্ধকার দেখল৷ কালো হয়ে উঠেছে সমুদ্রের জল৷ বিপদ বুঝলে স্কুইডের মতো অক্টোপাসও তার ইংকস্যাক খুলে কালি ছিটিয়ে দেয় জলে৷ কালো জলের সুযোগ নিয়ে অক্টোপাস তার শত্রুর চোখকে ফাঁকি দেয়৷ ডলফি কি পারবে অক্টোপাস কিংবা হাঙরের চোখকে ফাঁকি দিতে?
ফাঁকি দিতে না পারলেও জলে ডুবে মরার চেয়ে আর বেশি কী হবে? মরিয়া হয়ে উঠল সে৷ গুহার শেষ বাতাসটুকু শুষে নিয়ে সে ডুব দিল জলের গভীরে৷
যতটা পারে গভীরে নামছে ডলফি৷ তার মাথার উপরে দুই শয়তানের দাপাদাপি টের পাচ্ছে সে৷ শরীরের সমস্ত শক্তিকে জড়ো করেছে হাতে এবং পায়ে৷ জ্যান্ত টর্পেডোর মতো ছুটছে সে৷
বুকের সবটুকু দম শেষ হয়ে যাওয়ার পর ডলফি ভেসে উঠল৷ হাঁপাচ্ছে৷ চিত হয়ে ভাসছে৷ মুক্ত আকাশের নীচে বুকভরে দম নিয়ে সে ফিরে তাকাল৷ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সমুদ্র উত্তাল৷ কে জানে পৃথিবীতে আজ কার শেষ দিন৷ অক্টোপাস, নাকি ম্যাকো হাঙরের?
রাজা নেপচুনের তরবারি
প্রযুক্তি যুদ্ধের ছক কষছে ওয়াহুই৷ হাইটেক ওয়ার৷ যেমনটা হয় আধুনিক যুদ্ধে৷ তির-ধনুক বা অসি-বল্লম নিয়ে মুখোমুখি লড়াই নয়৷ এমনকী সাধারণ বন্দুক বা রাইফেল দিয়েও নয়৷ কম্পিউটারাইজড দূর নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ৷
জায়ান্ট স্কুইডটাকে শিকার করার পর কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন৷ দল বেঁধে বড়ো শিকারের সুযোগ আসেনি আর৷
সকাল থেকে তোড়জোড় শুরু হয়েছে৷ কয়েকদিনের আলস্য ঝেড়ে ফেলে চনমনে হয়ে উঠেছে ডলফিনের ঝাঁক৷ উৎসাহে টগবগ করে ফুটছে ওয়াকা ও ডলফি৷ দলের বড়োরা যখন শিকার করবে, তারা পোয়াবে উত্তেজনার আঁচ৷
ওয়াহুই একটা বড়ো শিকারের খোঁজ পেয়েছে৷ শিকারটা এখনও অনেক দূরে৷ দেখতে পায়নি সে, কিন্তু বুঝতে পেরেছে৷
লেগুন ছেড়ে সমুদ্রে এসে পড়ল ডলফিনের ঝাঁক৷ ওয়াহুই সকলকে অপেক্ষা করতে বলে নিজে ডুব দিল সমুদ্রের গভীরে৷ ইকোলোকেশন পদ্ধতিতে তরঙ্গ ছড়িয়ে দিল জলের মধ্যে৷
জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত ধরনের জীব৷ কোনোটা বড়ো, কোনোটা ছোটো৷ তাদের শরীরে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত শব্দ তরঙ্গ ফিরে আসছে তার কাছে৷ ধরা পড়ছে তার শব্দগ্রাহক অঙ্গে৷ সেই বিশেষ অঙ্গ শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে তাকে জানিয়ে দিচ্ছে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে সমুদ্রের কোথায় কোন শিকার ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ তাদের আকার, আয়তন, দূরত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে নানা খুঁটিনাটি তথ্য৷
ওয়াহুই ভেসে উঠল জলের উপরে৷ চকচক করছে তার দু-টি চোখ৷ তার চোখের ভাষা বুঝতে পারছে সকলেই৷ দারুণ কোনো শিকারের খোঁজ পেয়েছে সে৷ তবু নির্দিষ্ট করে জানার জন্য সকলেই এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, 'কী শিকার, কত বড়ো?'
চট করে ভাঙল না সে৷ দলের বেশিরভাগই তো তার নাতি ও নাতনির বয়সি৷ তাদের উৎকন্ঠা জিইয়ে রেখে মজা পেল ওয়াহুই, 'দাঁড়াও বাপু, একটু ভেবে নিই৷ বয়স হয়েছে, সব কিছু ঠিকঠাক মনে থাকে না৷'
গাম্ভীর্য বজায় রাখল, 'শিকার ভারি জবরদস্ত৷ খুনে তিমি বা রাক্ষুসে হাঙরও তাকে সমীহ করে চলে৷ সঙ্গে যা একখান অস্ত্র আছে, বাগে পেলেই শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে৷'
মুচকি হাসল ওয়াহুই, 'প্রায় সাড়ে চার ফুট লম্বা ফনফনে একটা ধারালো তলোয়ার৷ ভালো করে ভেবে দেখ৷ এমন শিকারের মহড়া কি তোরা নিতে পারবি?'
তিমি, হাঙর আর তলোয়ারের কথায় মুখ শুকিয়ে গিয়েছে সকলের৷ ঝাঁকের মধ্যে অস্ফুট গুঞ্জন উঠল৷ দু-একটা ডলফিন ফিসফিস করে কী যেন বলার চেষ্টাও করল৷ ওয়াহুই চেঁচিয়ে বলল, 'ভিতু আর কাপুরুষের দল! বড়ো শিকারে তোদের কাজ নেই৷ কুচোকচি আর চুনোপুঁটি শিকার করগে যা৷ ঘাড়ের ব্যথাটা আমার পুরো সারেনি৷ আমি বরং লেগুনে ফিরে যাই৷ একটু বিশ্রাম নিই৷"
ওয়াহুই বুঝতে পারল ওষুধে কাজ হয়েছে৷ হীনমন্যতা কেটে যাচ্ছে৷ লাফ-ঝাঁপ দিতে শুরু করেছে৷ সকলেই একসঙ্গে শিস দিয়ে উঠল, 'পারব৷'
ওয়ার স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে ফেলেছে ওয়াহুই৷ সকলকে কাছে ডেকে রণকৌশল বুঝিয়ে দিল সে৷ ঝাঁকটা দ্রুত সাঁতার কেটে এগিয়ে চলল গভীর সমুদ্রের দিকে৷
প্রায় এক ঘণ্টা মার্চ করে এগিয়ে চলার পর তাদের নজরে পড়ল আসল শিকার৷
বিরাট একটা সোর্ড ফিশ বা তলোয়ার মাছ৷ প্রায় চোদ্দো ফিট লম্বা৷ তার তলোয়ারটাই প্রায় সাড়ে চার ফিট৷ এই তলোয়ারের ধার লোহার জাহাজকেও ফুটো করে দিতে পারে৷ সমুদ্রের হিংস্র হাঙরও তলোয়ার মাছকে এড়িয়ে চলে৷ মুখোমুখি হলে তলোয়ার মাছই প্রথম তেড়ে গিয়ে আক্রমণ করে হাঙরকে৷ প্রথম সুযোগেই তলোয়ার আমূল বসিয়ে দেয় শত্রুর বুকে বা পেটে৷ দলবদ্ধভাবে ছাড়া সমুদ্রের সাধারণ কোনো জীব একা তাকে আক্রমণ করতে সাহস পায় না৷
বেশ কিছুটা দূরে ওয়াহুই তার ব্যূহ রচনা করল৷ তলোয়ার মাছের তিন দিক ঘিরে সৈন্যসমাবেশ করল৷ সৈন্যবাহিনীর মাঝখানে সে৷ যুদ্ধের সেনাপতি৷
বাহিনীর দুই প্রান্তে দুই দুঃসাহসিনী৷ ওয়াতুই আর ওয়াকুই৷ দলের উইকিরা সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায়৷ অনেকটা ইংরেজি ডব্লিউ অক্ষরের মতো তিনমুখী সাঁড়াশি আক্রমণে যাবে সৈন্যবাহিনী৷ তাই ডলফি রইল ওয়াতুই আর ওয়াহুইয়ের মাঝখানে আর ওয়াকা রইল ওয়াহুই এবং ওয়াকুইয়ের মধ্যে৷
রীতিমতো বিউগল বাজিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করল ওয়াহুই৷ ব্যূহ রচনা শেষ করে শিস দিয়ে উঠল৷ তারপর ঝাঁকের বাকি সকলেই৷ মহাসমুদ্রের বুকে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা৷ সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ল দূর থেকে, আরও দূরে৷
প্রস্তুতিপর্ব শেষ নিঃশব্দে ও নৈপুণ্যের সঙ্গে৷ একটুও টের পায়নি তলোয়ার মাছ৷ বুঝতেই পারেনি একটা গোটা ডলফিনবাহিনী তার ঘাড়ের উপরে নিশ্বাস ফেলছে৷ তাকে ঘিরে ফেলেছে তিন দিক থেকে৷ ডলফিনদের যুদ্ধকালীন শিস কানে যেতেই চমকে উঠল সে৷ প্রথম চোটেই ঘাবড়ে গিয়েছে৷ শুরুতেই অর্ধেক যুদ্ধ জিতে নিয়েছে ডলফিনবাহিনী৷
আক্রমণে যাচ্ছে ওয়াহুই৷ শূন্যে তিনটি ভল্ট খেয়ে চোঁ-চোঁ করে ছুটছে৷ অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে৷ দেখতে পাচ্ছে তার হিংস্র কুটিল লাল চোখ৷ তলোয়ারের ফলায় রোদ পড়েছে৷ ঝলসে উঠছে ফলা৷
আত্মরক্ষার তাগিদে ঘুরে দাঁড়াল তলোয়ার মাছ৷ সামনে তলোয়ার বাগিয়ে ছুটে আসছে সে৷ পিছু হটছে ওয়াহুই৷ দ্রুত ফিরে আসছে সে৷
এবারে আক্রমণে যাচ্ছে ওয়াতুই৷ শূন্যে লাফিয়ে উঠে তলিয়ে গিয়েছে জলের গভীরে৷ তাকে দেখতে পাচ্ছে না কেউ৷ ডুব সাঁতারে এগিয়ে গিয়ে ভুস করে ভেসে উঠেছে তলোয়ার মাছের ঘাড়ের কাছে৷ বিদ্যুৎ বেগে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তলোয়ারমাছ৷ তলোয়ার উঁচিয়ে তেড়ে আসছে তার দিকে৷ তলোয়ারের খোঁচা খাওয়ার জন্য দাঁড়াচ্ছে না৷ ডুব দিয়েছে জলের গভীরে৷ ডুব সাঁতার কেটে দ্রুত ফিরে আসছে সে৷
এর পর ওয়াকুই৷ টর্পেডোর মতো ছুটে গিয়ে ঢুঁ মেরেছে তার লেজে৷ লেজের ঝাপটা মেরে বোঁ করে করে ঘুরে গিয়েছে৷ তলোয়ার বাগিয়ে তাড়া করছে ওয়াকুইকে৷ এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি৷ ঝড়ের গতিতে ফিরে আসছে ওয়াকুই৷
পর্যায়ক্রমে আক্রমণ শানাচ্ছে ওয়াহুই, ওয়াতুই এবং ওয়াকুই৷ দলের বাকিরাও বসে নেই৷ তারাও আক্রমণে যাচ্ছে সুযোগ বুঝে৷
তলোয়ার মাছ একবার ঘুরছে ওয়াহুইয়ের দিকে৷ পরমূহূর্তে ওয়াতুই৷ তারপর ওয়াকুই৷ মুহুর্মুহু আক্রমণে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে ডলফিনবাহিনী৷ নিশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছে না সে৷
অদ্ভুত এই রণকৌশলের মুখে বির্পযস্ত হয়ে পড়েছে তলোয়ার মাছ৷ যত শক্তিশালী হোক, এইভাবে চালিয়ে যেতে পারলে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে৷ তখন পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজবে৷ এ কথা জানে বলেই চক্রব্যূহের একটা দিক খোলা রেখেছে ডলফিনবাহিনী৷ সেই পথ দিয়েই তাকে যেতে হবে, যেদিকে তারা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ সেইখানেই তো তার জন্য পাতা আছে অন্য এক ফাঁদ৷
চক্রব্যূহের খোলা মুখ দিয়ে পালাচ্ছে তলোয়ার মাছ৷ না, একটা ডলফিনের গায়েও সে তলোয়ারের আঁচড় কাটতে পারেনি৷ ডলফিনের ঝাঁক তাড়া করেছে তাকে৷ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে নির্ধারিত দিকে৷
সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাঁচটা ব্যারাকুডার একটা ঝাঁক৷ ইকোলোকেশন পদ্ধতিতে ঝাঁকটার খবর আগেই পেয়েছে ওয়াহুই৷
হিংস্রতায় ব্যারাকুডা কম যায় না৷ সমুদ্রে তাদের পরিচয় কোল্ড ব্লাডেড কিলার বা ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে৷ ধারালো ছুরির মতো দাঁত৷ সামনে শিকার পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে৷ লম্বায় এক-একটা ছ-ফুট৷
বুঝতেই পারেনি তলোয়ার মাছ৷ ডলফিনের তাড়া খেয়ে সে ঢুকে পড়েছে ব্যারাকুডার ঝাঁকে৷ ব্যারাকুডার দল তাকে ঘিরে ফেলেছে৷ এখন সে আরও ক্লান্ত, আরও বিপন্ন৷
ডলফিনের ঝাঁক থমকে দাঁড়িয়েছে৷ তলোয়ার মাছকে তাড়া করে তারা ঢুকিয়ে দিয়েছে ব্যারাকুডার ঝাঁকে৷ তারপর সরে এসেছে নিরাপদ দূরত্বে৷
এখন তারা নিশ্চিন্ত৷ তাদের হয়ে বাকি কাজটা করবে ব্যারাকুডার দল৷ ব্যারাকুডারা তাদের বন্ধু নয়, শত্রু৷ তবুও তারা সাহায্য নেয়৷ শত্রুর সাহায্যে শত্রুকে ঘায়েল করার কৌশল তারা রপ্ত করেছে বাঁচার তাগিদে৷ নইলে সমুদ্রে প্রবলপরাক্রান্ত শত্রুদের মাঝখানে তারা টিকবে কেমন করে?
অনেকটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে তলোয়ার মাছ৷ শক্তিসামর্থ্যের বেশিটাই খরচ হয়ে গিয়েছে ডলফিন ঝাঁকের পিছনে ছোটাছুটি করে৷ তবুও বাঁচার তাগিদে লড়ছে তলোয়ার মাছ৷ সে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা ব্যারাকুডার ঘাড়ে৷ তলোয়ার আমূল বসিয়ে দিল তার পেটে৷ রক্তে লাল হয়ে উঠেছে সমুদ্রের জল৷
রক্ত দেখে খেপে গিয়েছে ব্যারাকুডার ঝাঁক৷ সমুদ্রের জল তোলপাড়৷ চারদিক থেকে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা৷ মৃত ব্যারাকুডার শরীর থেকে তার তলোয়ার টেনে বের করার আগেই একটা হিংস্র ব্যারাকুডা মোক্ষম কামড়ে তার লেজ থেকে ছিঁড়ে নিল এক খাবলা মাংস৷ যন্ত্রণায় ছটপট করছে সে৷ তবুও সে আক্রমণের জন্য ঘুরে দাঁড়াল৷ রাক্ষুসে ব্যারাকুডা একটু দূরে দাঁড়িয়ে তারই লেজের মাংস পরম আয়াসে চিবিয়ে-চিবিয়ে খাচ্ছে৷ ক্ষিপ্ত হয়ে তার দিকে তেড়ে গেল তলোয়ার মাছ৷
এবার অন্য একটা ব্যারাকুডা৷ তার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে একটা চোখ খুবলে নিয়ে পালাচ্ছে৷ যন্ত্রণায় কাতর৷ তবু তাড়া করল তলোয়ার মাছ৷
আবার একটা ব্যারাকুডা৷ ছুটে এসে কামড়ে ঝুলে পড়ল তার গলায়৷ শেষ জীবনীশক্তিটুকু বেরিয়ে যাওয়ার আগেই তার তীক্ষ্ণ তলোয়ার এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গিয়েছে ব্যারাকুডার পিঠ ভেদ করে৷
পাঁচটা ব্যারাকুডার দুটো খতম হয়েছে তলোয়ার মাছের তলোয়ারের কোপে৷ বাকি তিনটি ব্যারাকুডা পেটে রাক্ষুসে ক্ষিদে নিয়ে তৈরি৷ এবার শুরু হবে মহাভোজ৷
ডলফিনের ঝাঁক অপেক্ষা করছিল একটু দূরে৷ ভোজ শুরু হওয়ার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা৷ জল তোলপাড় হয়ে উঠল তাদের লেজের ঝাপটায় আর হাতডানার আস্ফালনে৷ গোটা একটা ডলফিনবাহিনীর সঙ্গে রণক্লান্ত মাত্র তিনটে ব্যারাকুডা কি এঁটে উঠতে পারে? ডলফিনরা মেরেপিটে তাদের তাড়িয়ে দিল দূরে৷
সূর্য ডুবে যাচ্ছে সুমদ্রের বুকে৷ তার সোনালি বর্ণচ্ছটা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে ও জলে৷ ডলফি ও ওয়াকা তাকিয়ে আছে সেই দিকে৷
সমুদ্রে আছে বিশাল ও শক্তিশালী জীব, আবার ছোটোখাটো দুর্বল জীবও৷ শক্তিশালীদের দাপটে দুর্বলদের তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা৷ যায় না তো৷ কে তাদের শিখিয়ে দেয় বেঁচে থাকার মন্ত্র, টিকে থাকার কৌশল?
ওয়াহুইকে প্রশ্নটা করতেই সে বলল, 'সমুদ্রের রাজা৷'
তিমি নয়, হাঙর নয়, এমনকী বুদ্ধিমান ডলফিনও নয়৷ সমুদ্র শাসন করেন সমুদ্রের রাজা নেপচুন৷
একটু আগেই সমুদ্রের বুকে ঘটে গিয়েছে তাণ্ডব, সেখানে এখন সূর্যাস্তের প্রশান্তি৷ হয়তো জল এখনও লাল হয়ে আছে, রক্তের সবটুকু চিহ্ন হয়তো এখনও মুছে যায়নি৷ তবে সে আর কতক্ষণ?
সমুদ্রে ঢেউ উঠছে৷ সৃষ্টির আদিতে যেভাবে উঠত, এখনও সেইভাবেই উঠছে৷ সমুদ্র ফেরা পাখিরা ঘরে ফিরছে৷
মরা তলোয়ার মাছটাকে টানতে টানতে ডলফিনবাহিনীও ফিরে চলল লেগুনের দিকে৷
ভোর হয়েছে৷ ডলফি বেরিয়ে পড়েছে একা৷ কাল লেগুনে ফিরতে তাদের রাত হয়ে গিয়েছিল৷ তলোয়ার মাছটাকে লেগুনের এককোণে ফেলে রেখে তারা চলে গিয়েছিল৷
আজ সেখানে এসে দেখল মাছটার আর কোনো অবশিষ্ট নেই৷ পড়ে আছে তার কঙ্কাল৷ তরবারিটা আস্তই আছে৷
সে মাছের কঙ্কালটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল প্রবালপ্রাচীরের ধারে৷ দুটো পাথরের উপর রেখে অন্য একটা ভারী পাথর দিয়ে তরবারিটাকে আঘাত করতে লাগল ডলফি৷
মজবুত সে জানত, কিন্তু এতটা মজবুত তার জানা ছিল না৷ গায়ের জোরে আঘাত করছে৷ পরিশ্রমে তার গা দিয়ে ঘাম ঝরছে৷ পাথরের ঘষায় তার হাত কেটে গিয়েছে৷
অবশেষে ভাঙতে পেরেছে সে৷ ডগার দিক থেকে ফুট তিনেক একটা অংশ৷ প্রমাণ সাইজের একটা তরবারি৷ তীক্ষ্ণ৷ সাফল্যের আনন্দে শিস দিয়ে উঠল সে৷
তরবারিটা শক্ত মুঠোয় আকাশের দিকে তুলে ধরল৷ সকালের প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে তরবারির গায়ে৷ ঝলসে উঠছে তরবারির ফলা৷ আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছে ডলফি৷ তিমি নয়, হাঙর নয়, এমনকী অক্টোপাসও নয়৷ কাউকেই সে আর ভয় করে না৷ তার হাতে এখন রাজা নেপচুনের তরবারি৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন