ড্রাকুলা

অমিতাভ পাল

গুপিমামা মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি এসে হাজির হলেন হাজারিবাগে৷ গায়ের কোটটা খুলতে খুলতে বললেন, 'ভাগ্যিস জামাইবাবুর পাঠানো এয়ারোগ্রামটা ঠিক সময়ে পেয়েছিলাম, নইলে তো হাজারিবাগের বদলে কলকাতা চলে যেতাম আর সেখানে গিয়ে দেখতাম, বাড়ির গেটে তালা ঝুলছে৷'

গরমের ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে আমি আর আমার বোন বেড়াতে এসেছি হাজারিবাগ৷ এখানে আমরা এসে উঠেছি একটা বাংলো বাড়িতে৷ অনেকটা জায়গা নিয়ে বাংলোটা৷ চারপাশে উঁচু প্রাচীর৷ বাংলোর পিছনে নানা ধরনের ফলের গাছ৷ আম, জাম, জামরুল, লিচু৷ কয়েক ঝাড় কলা গাছও আছে৷ একটা বড়ো কাঁঠাল গাছের নীচে বাংলোর কেয়ারটেকার বংশীলালের ঝুপড়ি৷ সে, তার বউ ও ছেলেকে নিয়ে ঝুপড়িতেই থাকে৷ ঝুপড়ির সামনে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে তার শাকসবজির বাগান৷

বাংলোর সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা৷ সেখানে গুটিকয়েক জুঁই, হেনা, কামিনীর ঝাড় এবং একটা ডানা ভাঙা কংক্রিটের পরি প্রমাণ দিচ্ছে, সেখানে এককালে সাজানো-গোছানো বাগান ছিল৷ পরিচর্যার অভাবে এখন আগাছার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে৷

বাবুরা বেতন হিসেবে যে টাকা দেন, তাতে বংশীলালের সংসার চলে না৷ তাই ফুলের বাগানের চেয়ে সবজির বাগানের দিকেই তার নজর বেশি৷ খাঁটি দুধের জন্য সে একটা গাই পুষেছে৷ একটা ছোটো বাছুরও আছে৷ বংশীর বউয়ের একটি ছাগল আছে৷ ছাগলটির তিনটি ছোটো ছোটো বাচ্চা৷

এখানে যারা হাওয়া বদলের জন্য আসে, তাদের ফাইফরমাশ খেটেও উপরি কিছু আয় করে বংশীলাল ও তার বউ৷

বউ যখন কাজ করে ছেলেটি টলমল করে ঘুরে বেড়ায় বাংলোর মধ্যে৷ ছেলেটির নাম শ্যামলাল৷ দু-একদিনের মধ্যেই মুড়কির সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেছে তার৷

মা মামাকে শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে, তোর যা স্বভাব, সেখানে এবার কোনো গোলমাল বাধাসনি তো?'

'গোলমাল আমি বাধাই না, কপালের ফেরে শুধু গোলমালে জড়িয়ে পড়ি৷'

'এবারে আবার কার সঙ্গে গোলমালে জড়ালি?'

'স্প্লেনডিড ব্রোকেড৷'

'সেটা আবার কী?'

'একধরনের পোকা৷'

মার চোখ কপালে, 'পোকা!'

'পোকাকে সব সময় তুচ্ছ ভাবা ঠিক নয়৷ মালয়েশিয়ার তামান নেগারার জঙ্গলে আমরা গিয়েছিলাম স্প্লেনডিড ব্রোকেডের খোঁজে৷ আমরা মানে আমি আর মালয়েশিয়ার বিখ্যাত পতঙ্গবিদ ড. হামজা বিন জইনুদ্দিন৷ এই পোকা যে-সে পোকা নয়, হেমলক খেয়েও হজম করে ফেলতে পারে৷'

'হেমলক মানে কি সেই বিষ, যা খাইয়ে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে হত্যা করা হয়েছিল?'

মাথা নাড়লেন গুপিমামা৷ মা শুধোলেন, 'তুই সেই হেমলক-খেকো পোকার খোঁজ করছিলি কেন?'

'একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি হেমলকের প্রতিষেধক বানাতে চায়৷ আমরা কাজ করছিলাম তাদের হয়ে৷ একটি ক্ষুদ্র পোকা কী করে হেমলকের মতো তীব্র বিষ খেয়ে বেমালুম হজম করে ফেলে, সেই প্রক্রিয়াটা জানতে পারলে হেমলকের প্রতিষেধক খুঁজে বার করা অনেক সহজ হবে৷'

গুপিমামা থামলেন৷ মুড়কি তাঁকে থামতে দিলে তো? সে শুধোল, 'তারপর কী হল, গুপিমামা?'

গুপিমামা বললেন, 'আমরা দিনের বেলা স্প্লেনডিড ব্রোকেডের খোঁজে ঘুরে বেড়াতাম জঙ্গলে আর রাতে জঙ্গলের মধ্যে ক্যাম্প করে থাকতাম৷'

'জঙ্গলে থাকতে তোমাদের ভয় করত না?'

'ভয় করবে কেন? হিংস্র জন্তুর হাত থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সঙ্গে ছিল দু-জন রাইফেলধারী মালয়েশিয়ান ফরেস্ট গার্ড৷ পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, শুধু রাইফেলের উপর ভরসা করাটা আমাদের ঠিক হয়নি৷ রাইফেলের সাহায্যে জঙ্গলের হিংস্র জন্তুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করা যায় কিন্তু জঙ্গলের পোকামাকড়ের হাত থেকে আত্মরক্ষা করা যায় না৷'

এসব কথায় মুড়কির মন ছিল না৷ তাই সে শুধোল, 'মামা, যে পোকাটাকে খুঁজতে তোমরা জঙ্গলে গিয়েছিলে, সেই পোকাটাকে খুঁজে পেলে?'

'পেলাম আর কোথায়, তার আগেই তো নিজে অসুস্থ হয়ে পড়লাম৷ কুয়ালালামপুরের সরকারি হাসপাতালে সাত দিন কাটিয়ে, একটু সুস্থ হতেই তোদের কাছে চলে এলাম৷'

মার চোখে-মুখে উদবেগ, 'কী হয়েছিল তোর?'

'কী যে হয়েছিল, সেটাই তো ভালো করে বোঝা গেল না৷ তবে জঙ্গলের কোনো পোকামাকড় যে কামড়েছিল, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই৷ পরে শুনেছিলাম হাসপাতালে আমাকে নাকি কয়েক বোতল রক্ত দিতে হয়েছিল৷'

গুপিমামা আসার পর হাজারিবাগে আমাদের ছুটির দিনগুলি হইহই করে কাটতে লাগল৷ কয়েকদিনের মধ্যেই হাজারিবাগ লেক, ক্যানারি হিল, বর্ষোপানি গুহা এবং হাজারিবাগ ন্যাশনাল পার্ক আমাদের দেখা হয়ে গেল৷

সকাল ছ-টা বাজতে-না-বাজতেই মা তাগাদা দিতে শুরু করলেন৷ আজ আমরা যাব হাজারিবাগ থেকে পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরের রাজরাপ্পায়৷ গুপিমামা প্যান্ট-শার্ট পরার পর কোটের দিকে হাত বাড়াতেই মা চেঁচিয়ে বললেন, 'পোকা-টোকা আছে কি না দেখে পরিস৷'

মামার চোখে-মুখে বিস্ময়, 'পোকা?'

'কাল তোর কোটটা গুছিয়ে রাখতে গিয়ে দেখি, ভিতরে পোকা গিজ-গিজ করছে৷ আমি অবশ্য পোকাগুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কোটটাকে ভালো করে রোদ খাইয়ে তুলে রেখেছি৷'

মামার মাথায় তখনও পোকা ঘুরছে৷ শুধোলেন, 'কীরকম পোকা?'

'শুঁয়োপোকার মতো দেখতে খুদে খুদে বাদামি রঙের পোকা৷'

'মন্টিদি, জায়গাটা আমাকে দেখা তো, ঠিক কোথায় ঝেড়েছিলি কোটটা৷'

মা আঙুল তুলে জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন, 'কেন, কোনো ভুল হয়েছে নাকি?'

জায়গাটা ঝোপঝাড় আর আগাছায় ভরতি৷ একটা লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড় সরিয়ে সরিয়ে মামা পোকা খুঁজতে শুরু করলেন৷ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর হতাশ হয়ে গুপিমামা বললেন, 'ভুল নয় রে মন্টিদি, হয়তো সর্বনাশ হয়ে গেছে৷'

জলপ্রপাতের ধারে পিকনিক হল৷ রাজরাপ্পার বিখ্যাত ছিন্নমস্তার মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখাও হল কিন্তু আজকের বেড়ানোটা অন্যদিনের মতো জমল না৷ গুপিমামা চুপচাপ৷ আমাদের সঙ্গ দিলেন ঠিকই কিন্তু তাতে কোনো স্ফূর্তি ছিল না৷ সারাক্ষণ ডুবে রইলেন গভীর কোনো চিন্তায়৷ আমি বেশ কয়েকবার তাঁকে আপন মনে বিড়বিড় করতে শুনলাম, 'সর্বনাশ, সর্বনাশ হয়ে গেছে৷'

রাতে মা শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে, সকালে পোকার ব্যাপারটা শোনার পর থেকে তুই কেমন যেন থম মেরে গেছিস৷ কী এত ভাবছিস?'

'ভাবছি পোকার কথা৷'

'সামান্য গুটিকয়েক খুদে খুদে পোকা, তাদের নিয়ে কী এত ভাবার আছে?'

'মালয়েশিয়ার জঙ্গলে যখন ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, তখন কোনো পোকা নিরাপদ আস্তানা ভেবে আমার কোটের লিনেনের গায়ে ডিম পেড়েছিল৷ কোটের সঙ্গে সেই ডিমও এসেছে এখানে৷ সেই ডিম ফুটে বেরিয়ে এসেছে খুদে খুদে পোকা৷ বুঝতে পারছি না রে মন্টিদি, না জেনে যাদেরকে মালয়েশিয়া থেকে এ দেশে এনেছি, তারা আমাদের বন্ধু, না শত্রু৷'

'বন্ধু হোক বা শত্রু, কাল যা চড়া রোদ উঠেছিল, দেখ গিয়ে তারা এতক্ষণে হয়তো মরে কাঠ হয়ে গেছে৷'

আমরা ভেবেছিলাম আমাদের পুরো ছুটিটা হাজারিবাগে ঘুরে বেড়িয়ে হইহই করে কাটবে৷ তার বদলে আমি, মুড়কি আর গুপিমামা লাঠি আর প্রজাপতি ধরা জাল হাতে ঝোপঝাড় আর গাছপালায় পোকা খুঁজে বেড়াতে শুরু করলাম৷ মুড়কি অবশ্য ব্যাপারটাতে বেশ মজাই পাচ্ছে৷ বিদেশি পোকার চেয়ে রঙিন প্রজাপতি ধরার দিকেই তার বেশি উৎসাহ৷ সারাদিন প্রজাপতির পিছনে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে৷ প্রতিদিন দু-চারটে করে প্রজাপতি তার জালে ধরাও পড়ছে৷ গুপিমামা খুঁটিয়ে দেখার পর তাদের ছেড়েও দিতে হচ্ছে৷

খোঁজাখুঁজি বিস্তর হচ্ছে কিন্তু বিদেশি পোকা ধরা পড়ছে না একটাও৷ মার অবশ্য একটাই কথা, 'পোকা থাকলে তো ধরা পড়বে৷ চড়া রোদে সব পোকা মরে গেছে৷'

'তাই যেন হয় রে, মন্টিদি৷'

'খুদে খুদে দু-চারটে পোকা যদি বেঁচে থাকেও, তাতে কী এমন ক্ষতি হবে?'

গুপিমামার সেই একই কথা, 'সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে৷'

মা এবার একটু বিরক্ত হলেন, 'সেদিন থেকে তোর মুখে সর্বনাশ কথাটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেল৷ ভণিতা না করে এবার একটু খোলসা করে বল তো গুপে, কী এমন সর্বনাশ হতে পারে?'

মামা বললেন, 'তবে তো একটা গল্প বলতে হয়৷'

গল্পের কথায় আমরা সবাই হইহই করে উঠলাম৷

মা চটপট এক প্লেট পকোড়া ভেজে আনলেন, সঙ্গে গরম চা৷ গরম চায়ে চুমুক দিয়ে মামা বললেন, 'আঠারো-শো উনসত্তর সালের মে মাসের আট তারিখটা আমেরিকার ইতিহাসে একটা অভিশপ্ত দিন৷'

'কেন, অভিশপ্ত কেন?'

'সেটা বোঝা যাবে একটু পরেই৷ তার আগে সূত্রপাতটা কী ভাবে হল, সেইটে বলি৷'

'বেশ তাই বল৷'

'আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস স্টেটের একটি ছোটো শহর মেডফোর্ড, লোকসংখ্যা হাজার পঞ্চাশের মতো৷ ওই ছোটো শহরের ততোধিক ছোটো তাঁর ল্যাবরেটরিতে সকালে ঢুকে প্রফেসর লিওপোল্ড ট্রুভেলো দেখলেন, পেট্রিডিসে রাখা পোস্ত দানার মতো ডিমগুলি ফুটে গুটিকয়েক ছোটো ছোটো লার্ভার জন্ম হয়েছে৷ প্রফেসর এই পোস্ত দানার মতো ডিমগুলি সংগ্রহ করে এনেছিলেন ইউরোপ থেকে৷ এই ডিমগুলি ছিল জিপসি মথের৷ সেই সময় আমেরিকায় জিপসি মথের কোনো অস্তিত্ব ছিল না৷'

'তাহলে প্রফেসর সেধে সেধে ওই পোকার ডিম আনতে গেলেন কেন?'

'আমেরিকাতে সেই সময় রেশম পোকার মড়ক লেগেছিল৷ এই মড়কের কারণ রেশম মথের পেব্রাইন নামে জীবাণু ঘটিত একধরনের রোগ৷ এর ফলে আমেরিকায় রেশমের চাষ মারা খাচ্ছিল৷ প্রফেসর পরীক্ষা করে দেখছিলেন, জিপসি মথের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে নতুন প্রজাতির কোনো রেশম মথ সৃষ্টি করা যায় কি না, যা পেব্রাইন রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে৷"

'তবে তো প্রফেসরের উদ্দেশ্য ছিল সাধু৷'

'অবশ্যই সাধু উদ্দেশ্য কিন্তু সামান্য একটা ভুল করেছিলেন তিনি৷'

'কী ভুল?'

'পোকাগুলিকে সেই অবস্থায় রেখে তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন৷ ফিরে এসে যা দেখলেন, তাতে তাঁর মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়৷ গুটিকয়েক জিপসি মথের লার্ভা গুটি গুটি পায়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে পালিয়ে গেছে৷'

'তাতে আর কী হয়েছে? সব ক-টি নিশ্চয় পালিয়ে যায়নি৷ ঘরের মধ্যেও নিশ্চয় ছিল বেশ কিছু লার্ভা৷'

'তা অবশ্য ছিল কিন্তু ততক্ষণে প্রফেসর এবং তাঁর সহকারীরা বুঝতে পেরেছিলেন, কী বিপর্যয় তাঁরা ডেকে এনেছেন৷ সঙ্গে সঙ্গে ল্যাবরেটরির মধ্যে যে কয়টি লার্ভা ছিল, তাদের ধরে ধরে মেরে ফেললেন এবং ল্যাবরেটরির বাইরের বাগানে পলাতক পোকাগুলিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন৷ প্রফেসর আর তাঁর সহকারীরা মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ালেন বাগানের প্রতিটি গাছপালা এবং ঝোপঝাড়৷ পলাতক পোকার একটাকেও খুঁজে পেলেন না৷

'উপায়ান্তর না দেখে অগত্যা প্রফেসর তাঁর বাগানের সমস্ত গাছপালা কেটে ফেললেন এবং বাগানে আগুন লাগিয়ে সমস্ত ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ফেলেন৷ এটা করার পর প্রফেসর কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত হলেন এই ভেবে যে সম্ভবত আর কোনো জিপসি মথের লার্ভা বেঁচে নেই, সব পুড়ে মরেছে৷'

মা গালে হাত দিয়ে শুনছিলেন৷ গুপিমামা একটু থামতেই বলে উঠলেন, 'এ তো দেখছি, রীতিমতো মশা মারতে কামান দাগার মতো ব্যাপার৷'

'কামান কী বলছিস রে মন্টিদি, গোটা একটা সেনাবাহিনী নামিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি৷'

'কী বলছিস রে, গুপে?'

'কয়েকটা বছর কাটল নির্বিঘ্নে৷ জিপসি মথের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না৷ ধীরে ধীরে আমেরিকাবাসী ভুলেই গেল জিপসি মথের কথা৷ ইতিমধ্যে মারা গেলেন প্রফেসর লিওপোল্ড ট্রুভেলো৷'

'তোদের মতো তথাকথিত বিজ্ঞানীরা বড্ড তিলকে তাল করিস৷'

'তিলকে তাল নাকি তালকে তিল, সেটা বোঝা গেল বছর কুড়ি পরে৷ প্রথমে মেডফোর্ড শহরের বাসিন্দারা লক্ষ করলেন, রাস্তার ধারের, পার্কের বা বাগানের একের পর এক গাছ নেড়া হয়ে যাচ্ছে৷ শীত আসতে তখনও অনেক দেরি৷ সবে গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে৷ শীতকালে কোন কোন গাছের পাতা ঝরে যায়, সে তো সবাই জানে৷ কিন্তু এ তো ঝরে পড়া নয়, স্রেফ উবে যাচ্ছে গাছের সবুজ পাতা৷ ভালো করে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে শুঁয়োপোকা এসে শহরটাকে যেন ঘিরে ধরল চারপাশ থেকে৷ রাস্তাঘাট, পাঁচিল, ঘরের দেয়াল চারদিকে থিকথিক করছে শুঁয়োপোকা৷ এই শুঁয়োপোকা আমেরিকাবাসীর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত৷ বেলচা দিয়ে রাস্তায় রোড রোলার চালিয়ে, হোস পাইপে গরম জল ছিটিয়ে কিংবা কেরোসিন তেল ছড়িয়ে আগুন লাগিয়েও তাদের নিকেশ করা যাচ্ছে না৷ একটা দলকে নিকেশ করতে-না-করতেই দলে দলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে চারদিক থেকে৷ চাষিদের মাথায় হাত৷ মাঠের পর মাঠের ফসল সাফ৷ ফসল উৎপন্ন না হলে মানুষ খাবে কী? রেললাইনের উপরেও থিকথিক করছে শুঁয়োপোকা৷ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল৷ বাইরে থেকে খাদ্যবস্তু নিয়ে আসাও অসম্ভব হয়ে পড়ল৷ মানুষ শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করল৷ গৃহপালিত জীবজন্তু খাদ্যের অভাবে মারা পড়তে লাগল৷'

মার যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ তাই শুধোলেন, 'মাত্র হাতে গোনা গুটিকয়েক পোকা থেকে এত?'

গুপিমামা আমাকে বললেন, 'একটা সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক দিচ্ছি৷ অঙ্কটা কষে উত্তরটা শুধু জানিয়ে দে তোর মাকে৷'

আমি উঠে গিয়ে খাতা পেনসিল নিয়ে এলাম৷ মামা বললেন, "একটা স্ত্রী মথ একবারে এক-শো কুড়িটা ডিম পাড়ে৷ সেই এক-শো কুড়িটা ডিম ফুটে এক-শো কুড়িটা লার্ভা এবং তার থেকে এক-শো কুড়িটা মথের জন্ম হয়৷ ধরা যাক, সেই এক-শো কুড়িটা মথের অর্ধেক পুরুষ এবং অর্ধেক স্ত্রী৷ এইভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে একটি স্ত্রী মথ থেকে পাঁচ বছর পরে কতগুলি মথের জন্ম হবে?'

আমি অঙ্ক কষে উত্তর দিলাম, 'একশো পঞ্চান্ন কোটি বাহান্ন লক্ষ৷'

এবার মামা সরাসরি মাকেই প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে বিশ বছর পরে একটা মাত্র স্ত্রী মথ থেকে কত সংখ্যক মথের জন্ম হতে পারে?'

'অঙ্কে আমি মোটেই কাঁচা ছিলাম না, ইশকুল কলেজে ভালোই নম্বর পেতাম৷ তাই বলে এত বড়ো অঙ্ক শুধু খাতা পেনসিলে কষা, আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷'

মামা গম্ভীরভাবে বলেন, "আমার পক্ষেও সম্ভব নয়৷ প্রফেসরের ল্যাবরেটরি থেকে তো একটা মাত্র মথ পালায়নি, পালিয়েছিল অনেকগুলি৷ তাদের থেকে যেসব মথের জন্ম হয়েছিল, তার মধ্যে নিশ্চয়ই বেশ কিছু ছিল স্ত্রী মথ৷ সেই বেশ কিছু স্ত্রী মথ থেকে বিশ বছর পরে এই বিপুল পরিমাণ মথের জন্ম হওয়া কি অসম্ভব?'

মা ঘাড় নাড়লেন, 'খুবই সম্ভব৷'

'উনিশ-শো এক সালে আমেরিকার দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জিপসি মথের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল৷ উনিশ-শো সাত সালে সেই এলাকাটা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ছাব্বিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার৷'

মার চোখে-মুখে আতঙ্ক৷ কপাল চাপড়ে বলে উঠলেন, 'কী সর্বনাশা!'

'কোনটা?'

'না জেনে তোর কোর্টের সঙ্গে আসা পোকাগুলোকে বাইরে ফেলে দিলাম৷ এখন কী হবে?'

'সব পোকাই যে এমন বিধ্বংসী ও ক্ষতিকারক হবে, তার কোনো মানে নেই৷ অনেক পোকা আবার উপকারীও হয়৷'

মামা বললেন বটে কথাগুলো, আমার যেন মনে হল, মামার গলাটা মিনমিনে শোনাল৷

এরপর থেকে আমরা জোর কদমে নেমে পড়লাম পোকা খুঁজতে৷ বংশীলাল আর তার বউও হাত মেলাল আমাদের সঙ্গে৷ মামার নির্দেশে বাগানের ঝোপঝাড় সব কেটে ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল৷ আমরা শুধু বাংলোর মধ্যে নয়, বাংলোর বাইরের আশপাশের এলাকাতেও পোকার খোঁজে ঢুঁ মারতে লাগলাম৷ ছুটির বাকি দিনগুলি আমাদের কাটতে লাগল রীতিমতো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে৷ তবে এই যুদ্ধ রাম-রাবণ বা কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের মতো নয়, সামান্য গুটিকয়েক পোকার বিরুদ্ধে৷

ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল৷ একদিন সকালে উঠে দেখলাম, বংশীলালের তিনটি ছাগল ছানার একটি মরে পড়ে আছে৷ সামান্য ব্যাপার৷ ছাগল ছানা তো মরতেই পারে৷ তবে শ্যাম খুব কান্নাকাটি করল, কারণ ছাগল ছানাটি ছিল তার খেলার সঙ্গী৷

আর একদিন গভীর রাতে বংশীলালের বাছুরটি তারস্বরে ডাকাডাকি শুরু করল৷ গোরুর পালে বাঘ পড়লে গোরুর পাল যেমন চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, অনেকটা সেইরকম৷ ঘুম ভেঙে আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম৷ বাছুরটা বাঁধা আছে বংশীলালের উঠোনে৷ আমরা টর্চ জ্বালিয়ে চারদিক খুঁজে দেখলাম৷ বাঘ তো দুরের কথা, আশেপাশে একটা শেয়ালেরও দেখা পেলাম না৷ আমরা কিন্তু স্পষ্ট দেখলাম, বাছুরটির নিষ্পাপ বড়ো বড়ো দু-টি চোখে আতঙ্কের ছাপ৷

আমাদের ছুটি শেষ হয়ে আসছে৷ আমরা বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছি৷ এমন সময়ে একদিন সকালে শুনতে পেলাম, কেউ যেন বুক চাপড়ে কাঁদছে৷ কান্নার শব্দটা আসছে বংশীলালের বাড়ির দিক থেকে৷ একটু পরেই হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল বংশীলাল৷ সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে একটি কথাই বার বার বলতে লাগল৷ তার কথা থেকে আমরা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না, 'আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে গো, সর্বনাশ!'

আমরা সবাই এসে জড়ো হলাম বংশীলালের উঠোনো৷ বংশীলালের বউ শ্যামকে কোলে নিয়ে বসে আছে আর বুক চাপড়ে কাঁদছে৷ শ্যাম নেতিয়ে পড়েছে তার মায়ের কোলে৷

মামা একটা ধমক দিয়ে বললেন, 'এখন কান্নাকাটির সময় নয়৷ শ্যামকে এখনই নিয়ে চলো হাসপাতালে৷'

শ্যামকে হাজারিবাগ সদর হাসপাতালে ভরতি করা হল৷ রোগীকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু বললেন, 'শরীর থেকে রাতারাতি অনেকটা রক্ত বেরিয়ে গেছে৷ তাই রোগী এমন নেতিয়ে পড়েছে৷ রোগীকে এখনই রক্ত দিতে হবে৷'

শ্যামকে দু-বোতল রক্ত দিতে হল৷ পাঁচ দিন হাসপাতালে থাকার পর অবশেষে শ্যাম পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এল৷ আমরা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম৷

সন্ধ্যে বেলা চায়ে চুমুক দেবার এক ফাঁকে মা শুধোলেন, 'শরীরে কাটা নেই, ছেঁড়া নেই, এমনকী রক্তক্ষরণের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই৷ তাহলে শরীর থেকে রাতারাতি রক্ত বেরিয়ে গেল কী করে?'

গুপিমামা চুপ করে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন৷ তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, 'ক্ষরণ নয় রে মন্টিদি, শোষণ৷ কেউ হয়তো শরীর থেকে রক্ত শুষে নিয়েছে৷'

মুড়কি হইহই করে উঠল, 'ড্রাকুলা৷ ড্রাকুলাই তো শরীর থেকে রক্ত শুষে খায়৷'

মামা তাকিয়ে আছেন মুড়কির দিকে৷ তাঁর মুখ চোখের চকচকে ভাবটা আমাদের নজর এড়াল না৷ একসময় তিনি বলে উঠলেন, 'ঠিক বলেছিস রে মুড়কি, এ নিশ্চয়ই ড্রাকুলার কাজ৷ কাল থেকে আমরা ড্রাকুলার খোঁজে বেরোব৷'

মা বললেন, 'গুপে তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে লেখা আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকারের উপন্যাসের একটি কুখ্যাত চরিত্র হল ড্রাকুলা, যে নাকি মানুষের রক্ত শুষে খেত৷ উপন্যাসের ড্রাকুলা কি জ্যান্ত হয়ে হাজারিবাগে আসবে শ্যামলালের রক্ত শুষে খেতে?'

পরের দিন সকালে মুড়কি আর গুপিমামার চেঁচামেচিতে আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম বাইরে৷ মুড়কি মাথার উপর দু-হাত তুলে লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে, 'ধরেছি, ধরেছি, আমি ড্রাকুলাকে ধরেছি৷'

মা শুধোলেন, 'কই দেখি, কেমন তোর ড্রাকুলা?'

এবার এগিয়ে এলেন মামা৷ হাতটা তুলে ধরলেন মার মুখের সামনে৷ মামার হাতে আলপিনে গাঁথা একটা পোকা৷ পোকাটাকে ভালো করে দেখে মা বললেন, 'এ তো একটা প্রজাপতি৷'

গুপিমামা বললেন, 'প্রজাপতি নয় রে মন্টিদি, এটা একটা মথ৷ ক্যালিপট্রা থালিকট্রি বা ভ্যাম্পায়ার মথ, এরা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের শরীর থেকে রক্ত চুষে খায়৷'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%