অমিতাভ পাল

চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বাইরে তাকালাম৷ আমি একটি বাংলা দৈনিকের সংবাদ বিভাগে চাকুরি করি৷ জরুরি কাজে এসেছি তিরুভনন্থপুরমে, উঠেছি একটা হোটেলে৷
হোটেলের সামনে রাস্তা৷ রাস্তার দু-পাশে বাজার৷ এখন সকাল আটটা৷ ইতিমধ্যেই বাজারে লোকজনের ভিড় লেগে গেছে৷ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে ছিলাম সেইদিকে৷ ফুটপাথে একটি লোক৷ তার বাঁ-কাঁধ থেকে ঝুলছে ছোটো ঢোলকের মতো একটি বাদ্যযন্ত্র৷ একটা সরু কাঠি দিয়ে যন্ত্রটি সে বাজাচ্ছে৷ বাজারের কোলাহলকে ছাপিয়ে দ্রিম দ্রিম শব্দ উঠছে৷ লোকটি বোধ হয় বাদ্যযন্ত্রটি বাজিয়ে লোক জড়ো করার চেষ্টা করছে৷
একজন, দু-জন করে কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটিকে ঘিরে একটা ভিড় জমে উঠল৷ এবার সে বাজনা থামিয়ে পকেট থেকে বার করল এক প্যাকেট তাস৷ দেখাতে শুরু করল খেলা৷ দেখতে দেখতে খেলা বেশ জমে উঠল৷ তার প্রমাণ পাওয়া গেল জনতার ঘন ঘন হর্ষোচ্ছ্বাস এবং হাততালির শব্দে৷
এখানে আসার আগে আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম আমাদের কাগজের রবিবারের পত্রিকা বিভাগের সম্পাদক বিনায়কদার সঙ্গে৷ আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, 'শুনলাম, তুমি নাকি তিরুভনন্থপুরম যাচ্ছ?'
আমি ঘাড় নাড়লাম, 'ঠিকই শুনেছেন৷'
'ই.কুন্নাপ্পিল্লির নাম শুনেছ তো?'
'ওয়ার্ল্ড ফেমাস ম্যাজিশিয়ান৷'
'কেরালার হ্যারি হুডিনি৷'
'কয়েক বছর আগে তিনি একবার কলকাতায় শো করতে এসেছিলেন৷ দেখার সুযোগ হয়েছিল, এককথায় অসাধারণ!'
'কতদিন আগে? নিশ্চয়ই বছর তিনেকের মধ্যে নয়?'
'তা হয়তো হবে৷ কেন বলুন তো?'
'কুন্নাপ্পিল্লির মতো একজন ব্যস্ত ম্যাজিশিয়ান গত তিন বছরে একটাও শো করেননি৷'
আমি অবাক হয়ে শুধোলাম, 'কেন?'
'সেটাই তো রহস্য৷ মিডিয়া হন্যে হয়ে ঘুরেছে তাঁর পিছনে কিন্তু সেই রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারেনি৷ শুনেছি, তিনি তিরুভনন্থপুরমেই থাকেন৷ তুমি যখন যাচ্ছই, একবার চেষ্টা করে দেখো, যদি কিনারা করতে পার৷ পারলে, সেটা আমাদের রবিবারের পত্রিকার জন্য হবে একটা দারুণ স্টোরি৷'
আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম, 'আমি তো তাঁর সম্পর্কে বিশদ কিছুই জানি না৷'
বিনায়কদা তাঁর কম্পিউটারের ফাইল ঘাঁটতে শুরু করলেন৷ কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা প্রিন্ট আউটের কপি আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'প্লেনে যাবার সময় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ো৷ কুন্নাপ্পিল্লির সম্পর্কে অনেক কিছু তোমার জানা হয়ে যাবে৷ বাকিটা তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে৷'
পুরো নাম ইট্টুমানুর কুন্নাপ্পিল্লি৷ বয়স পঞ্চাশের ধারে-কাছে, লম্বায় ছ-ফিটের উপরে৷ গায়ের রং কালো৷ হাত সাফাই এবং তাসের খেলায় দারুণ দক্ষ৷
তবে যে খেলার জন্য কুন্নাপ্পিল্লির সবচেয়ে বেশি নামডাক, সেটি কেরালার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা৷ প্রায় হাজার বছরের পুরোনো৷ খেলাটির কলাকৌশল এমনভাবে গোপন রাখা হয়েছিল যে খেলাটি একসময় বিলুপ্ত হতে বসেছিল৷ খেলাটিকে পুনরুদ্ধার করেন কেরালার ম্যাজিকের জনক ভাজহাকুন্নাম নিলাকান্দন নাম্বুথিরি৷ শুধু এই একটি ম্যাজিক শেখার জন্য কুন্নাপ্পিল্লি টানা তিন বছর তালিম নিয়েছিলেন নাম্বুথিরির কাছে৷ এই খেলার উপকরণ তৈরি হয় নারকেলের মালা এবং নারকেল কাঠ দিয়ে৷ খেলাটির নাম 'চেপ্পাম পান্থুম'৷
কলকাতায় বন্ধুরা দল বেঁধে দেখতে গিয়েছিলাম কুন্নাপ্পিল্লির ম্যাজিক শো৷
শুরু করেছিলেন তাসের খেলা দিয়ে আর শেষ করলেন কেরালার ঐতিহ্যবাহী সেই বিখ্যাত খেলা 'চেপ্পাম পান্থুম' দিয়ে৷ মাঝের ঘণ্টা তিনেক সময় আমাদের জেগে কাটল, নাকি ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের ঘোরে কাটল, বুঝতেই পারিনি৷
শো শেষ হবার পরেও আমরা ঠায় বসেছিলাম কয়েক মিনিট৷ তারপর অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলে উঠতেই সম্মোহনের ঘোর কাটিয়ে আমরাও জেগে উঠেছিলাম৷ আর ভিড়ে ঠাসা প্রেক্ষাগৃহ ফেটে পড়েছিল হাততালিতে৷
আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম নিজের মধ্যে৷ তুমুল হর্ষধ্বনির শব্দে আমি চমকে উঠে তাকালাম রাস্তার দিকে৷ জাদুর খেলা শেষ হয়েছে৷ এবার জাদুকর তার মাথার টুপিটি খুলে ভিক্ষার পাত্রের মতো বাড়িয়ে ধরল জনতার দিকে৷
এতক্ষণ যারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, তারা সুড়সুড় করে কেটে পড়তে শুরু করল৷ দু-চার জন অবশ্য যাবার সময় তাদের সাধ্যমতো দু-একটা টাকা বা আধুলি ফেলে গেল তার টুপির মধ্যে৷
চা জুড়িয়ে কখন জল হয়ে গেছে৷ হাতের কাপটা নামিয়ে রেখে আমি নেমে এলাম রাস্তায়৷ ইতিমধ্যে জাদুকর টুপিটা উপুড় করে দিয়েছে৷ পয়সাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে ফুটপাথে৷ উবু হয়ে বসে ফুটপাথের ধুলো থেকে একটা একটা করে পয়সা খুঁটে খুঁটে গুনে তুলছে জাদুকর৷
যৎসামান্য রোজগার৷ হয়তো এতেই তার সংসার চলে কোনোরকমে৷ তার মলিন চেহারা, বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে আমার একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল৷
জাদুকর উঠে দাঁড়াতেই আমার সঙ্গে চোখাচোখি হল৷ আমি শুধোলাম, 'আপনি ইট্টুমানুর কুন্নাপ্পিল্লিকে চেনেন?'
লোকটি তাকাল আমার দিকে, 'ম্যাজিশিয়ান?'
'শুধু ম্যাজিশিয়ান নয়, ওয়ার্ল্ড ফেমাস ম্যাজিশিয়ান৷'
'কী দরকার তাঁকে, শো করাবেন?'
'শুনেছি, বছর তিনেক হল, তিনি আর শো করেন না৷'
'ভুল শুনেছেন৷'
'সঠিকটা কী?'
লোকটি এবার সোজা তাকাল আমার মুখের দিকে৷ লোকটির চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মতো কঠিন, 'তিনি আর শো করতে পারেন না৷'
থাম্পানুরের রেসিডেনসিয়াল এলাকায় একটা গলির মধ্যে কুন্নাপ্পিল্লির বাড়ি৷ সারা দেশের লোক যাঁকে একডাকে চেনেন, তাঁর বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বার করতে কোনো অসুবিধা হল না৷
দোতলা বাড়ি৷ বাড়ির একতলায় বসার ঘর৷ ঘরটা হল ঘরের মতো বড়ো৷ ঘরের দু-দিকে দু-টি দেওয়ালজোড়া আলমারি৷ একটা ঠাসা দেশ-বিদেশের ম্যাজিকের বইয়ে, অন্যটিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে ম্যাজিকের সাজসরঞ্জাম৷
কুন্নাপ্পিল্লি বসে আছেন একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে৷ বয়সের তুলনায় একটু বেশি যেন বুড়িয়ে গেছেন৷ পরনে কেরালার সাধারণ লোকের ঘরে পরার প্রচলিত পোশাক৷
তিনি যেখানে বসে আছেন, তার ঠিক পিছনের দেওয়ালে বিশাল একটা অয়েলপেন্টিং৷ স্টেজের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন কুন্নাপ্পিল্লি৷ স্পট লাইটের আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখের উপরে৷ হাতে একগুচ্ছ তাস৷ শো শুরুর মুহূর্তের অনবদ্য ভঙ্গি৷
আমি বার বার তাকাচ্ছিলাম, একবার তাঁর দিকে এবং একবার তাঁর ছবির দিকে৷ তাঁর নজর এড়ায়নি৷ ম্লান হেসে বললেন, 'আমার অতীত এবং বর্তমান৷'
আমি এবার সরাসরি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, 'আপনি দুম করে ম্যাজিক ছেড়ে দিলেন কেন?'
তিনি একটু সময় চুপ করে রইলেন৷ তারপর বললেন, 'আমি ম্যাজিক ছাড়িনি, ম্যাজিক আমাকে ছেড়ে গেছে৷'
আমি বললাম, 'এ তো আপনার সত্যিকারের জবাব নয়, জবাবটা শুধু এড়িয়ে যাবার কৌশল৷'
কুন্নাপ্পিল্লি উঠে দাঁড়ালেন৷ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন আলমারির দিকে৷ ফিরে এসে বসলেন নিজের জায়গায়৷ সেন্টার টেবিলটা কোলের দিকে টেনে নিয়ে তার উপর সাজিয়ে রাখলেন ঝকঝকে পালিশ করা তিনটি নারকেলের মালা, তিনটি মালার সামনে তিনটি ছোটো রঙিন বল৷ আমি বুঝতে পারলাম, এবার তিনি আমার সামনে ম্যাজিক দেখাবেন৷ আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, 'এ তো আপনার সেই বিখ্যাত ম্যাজিক৷'
ঘাড় নাড়লেন কুন্নাপ্পিল্লি, 'চেপ্পাম পান্থুম৷'
তার পরের আধ ঘণ্টা সময় তিনি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন৷ টেবিলের উপর তাঁর দু-হাত ছুটছে যেন বিদ্যুত চমকাচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনটি বল৷ এই আছে, এই নাই, কোথায় যাচ্ছে, কোথা থেকে আসছে৷ চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে সব কিছু হচ্ছে, সম্ভব ও অসম্ভব, সব একাকার হয়ে যাচ্ছে৷ কী যে হচ্ছে কিংবা হচ্ছে না, বোঝাই যাচ্ছে না৷ নিঁখুত এবং অনবদ্য উপস্থাপনা৷ খেলা শেষ হতে নিজের অজান্তেই আমি হাততালি দিয়ে উঠলাম৷
তিনি আচমকা প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন আমার দিকে, 'কোনো খুঁত পেলেন?'
আমি সবিনয়ে বললাম, 'আমি সামান্য একজন দর্শক৷ কেরালার ম্যাজিকের জনক স্বয়ং ভাজহাকুন্নাম নিলাকান্দন নাম্বুথিরি আজ যদি আপনার সামনে বসে এই খেলা দেখতেন, তিনিও কোনো খুঁত খুঁজে পেতেন না৷'
'অথচ এই খেলা দেখাতে গিয়ে এমন কাণ্ড ঘটল যে, আমার ম্যাজিকের জীবন আচমকা শেষ হয়ে গেল৷'
'অবিশ্বাস্য৷'
'সত্যি অবিশ্বাস্য, লোকে বিশ্বাস করবে না৷'
'একজন জগদবিখ্যাত ম্যাজিশিয়ানের জীবনে কী এমন ঘটনা ঘটল যে খ্যাতির মধ্যগগনে থাকতে থাকতেই তাঁকে ম্যাজিক ছেড়ে দিতে হল? যতই অবিশ্বাস্য হোক, আমরা জানতে চাই৷'
'বেশ৷' বলেই তিনি চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন৷
'ওনাম কেরালার সবচেয়ে বড়ো উৎসব৷ এ সময় কেরালার প্রতিটি বাড়ি সেজে ওঠে রঙিন ফুলের আলপনায়৷ ছেলে-মেয়েরা নতুন পোশাক পরে পুলিকলি, কুমাত্তিকলি, থুম্বি থুল্লাল-এর নাচে ও গানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে৷ লোকগান এবং লোকনৃত্য এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ৷ জায়গায় জায়গায় বসে কথাকলির আসর৷
'তাই বছরের বাকি সময়টা দেশে-বিদেশে ম্যাজিক শো করে ঘুরে বেড়ালেও, প্রতি বছর ওনামের সময় আমি ফিরে আসি আমার নিজের শহর তিরুভনন্থপুরমে৷ এখানে আমার জন্ম, এখানেই আমার ম্যাজিকের হাতে খড়ি৷ এখানে ম্যাজিক দেখিয়েই ম্যাজিকের জগতে আমার প্রতিষ্ঠা৷ তাই এখানে ম্যাজিক শো করে আমি যে তৃপ্তি পাই, দুনিয়ার অন্য কোথাও সেটা পাই না৷ তাই প্রতি বছর ওনামের সময় টানা এক মাস এই শহরে আমি ম্যাজিক শো করি৷
'পুকালাম রংগোলি বা ফুলের আলপনা, ভল্লামকলি বা নৌকো বাইচ এবং কথাকলি ছাড়া ওনাম সম্পূর্ণ হয় না৷ ইদানিংকালে কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, তার সঙ্গে কুন্নাপ্পিল্লির ম্যাজিক শো৷
'বছর তিনেক আগের ঘটনা৷ সেবারও টানা সাত মাস ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালিতে ম্যাজিক শো করে সবে ফিরেছি নিজের শহরে৷ ওনাম শুরু হতে বাকি মাত্র সাত দিন৷ আমার শো-এর ব্যবস্থাপত্র প্রায় পাকা৷
'হল বুকিং হয়ে গেছে৷ প্রথম পাঁচটা শো-এর টিকিটও আগেভাগেই বিক্রি হয়ে গেছে৷ একদিন গেলাম চালাই বাজারে ম্যাজিকের টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে৷
'চালাই বাজার কেরালার অন্যতম ব্যস্ত এবং পুরাতন বাজার৷ লোকের ধারণা, এই বাজারে প্রায় সব কিছুই পাওয়া যায়৷ আবার এমন অনেক কিছুই পাওয়া যায়, যা হয়তো লোকে পাবার আশাই করেনি৷
'বাজারের একপাশে থিকথিকে ভিড় দেখে থমকে দাঁড়ালাম৷ উঁকি দিয়ে দেখলাম, একজন টুপি পরা লোক ম্যাজিক দেখাচ্ছে আর মুখে লম্বা-চওড়া বুলি আওড়াচ্ছে৷
'আমাকে এখানে সবাই চেনে ম্যাজিশিয়ানের পোশাকে, সাধারণ পোশাকে প্রায় কেউ চেনে না৷ তাই ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হল না৷
'একটা খালি কেটলি থেকে বার বার একটু একটু করে জল ঢালতে ঢালতে লোকটি বলল, এই ম্যাজিকটি শেখার জন্য জাদুকর এস. লাল আমার বাড়িতে তিন মাস হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন৷
'লোকটি একটি করে ম্যাজিক দেখাচ্ছে আর মুখে গালগপ্পের ফোয়ারা ছোটাচ্ছে৷ তার ম্যাজিক খুব সাধারণ মানের, যেমনটা দেখায় স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানরা৷ কিন্তু তার আসল ম্যাজিক অনর্গল গুল মারার দক্ষতায়৷ আর তাই দিয়েই সে তার চারপাশের ভিড়টাকে জমাট করে রেখেছে৷
'ভিড় ঠেলে চলেই আসছিলাম, হঠাৎ তার একটা কথা কানে আসতেই আবার থমকে দাঁড়ালাম৷ লোকটির হাতে এক প্যাকেট তাস৷ তাসের একটা সহজ খেলা দেখাতে দেখাতে সে বলে উঠল, আমার কাছে থেকে এই খেলাটা শিখে কুন্নাপ্পিল্লি এখন তাসের খেলায় বিশ্বের একজন সেরা ম্যাজিশিয়ান৷
'বিশ্বের ম্যাজিক দুনিয়ায় আমার তখন খুব নামডাক৷ কথাটা সিসের গুলির মতো এসে বিঁধল আমাকে৷ মুখে কোনো কথা বললাম না কিন্তু মনে মনে ফুঁসতে লাগলাম৷
'লোকটি প্যাকেট থেকে একটা তাস টেনে বার করে তুলে ধরল ভিড়ের সামনে, এটা কোন তাস?
'ভিড়ের থেকে জবাব এল, ইস্কাবনের বিবি৷
'তাসটি নিজের বুক পকেটে রাখল সে, বিবি এখন কোথায়?
'ম্যাজিশিয়ানের বুক পকেটে৷

'হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল সে, ধর, ধর, ধর, আমার বিবিকে চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে৷ তারপর ভিড়কে উদ্দেশ্য করে বলল, কে চুরি করেছ?
'ভিড়ের মধ্যে ফিসফাস কিন্তু কোনো জবাব এল না৷ ম্যাজিশিয়ান ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন নীল শার্ট পরা ছেলেকে ডাকল৷ ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখে এগিয়ে এল কাছে৷ ম্যাজিশিয়ান বলল, তুমি চুরি করেছ৷
'আমি চুরি করিনি৷
'এই দেখো, তোমার পকেটের মধ্যে ইস্কাবনের বিবি-বলেই ম্যাজিশিয়ান ছেলেটির বুক পকেট হাতড়াতে শুরু করল৷ ছেলেটির বুক পকেটে কিছুই পাওয়া গেল না৷ ম্যাজিশিয়ানের মুখ কাঁচুমাচু৷ এবার আর ফিসফাস নয়, ভিড়ের মধ্যে রীতিমতো গুঞ্জন উঠল৷
'কোনোরকমে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে ম্যাজিশিয়ান পরের খেলা দেখাতে শুরু করল৷ দুটো খালি টুপি ভিড়ের দিকে উঁচিয়ে ধরে ম্যাজিশিয়ান প্রশ্ন করল, টুপির মধ্যে কী আছে?
'একটা টুপির রং লাল এবং অন্যটি নীল৷
'ভিড়ের থেকে জবাব এল, খালি৷
'সে টুপি দু-টি উপুড় করে রাখল ফুটপাতের উপরে৷ তারপর ঝোলা থেকে একটা গোলা পায়রা বার করে লাল টুপির মধ্যে রাখল, পায়রা এখন কোথায়?
'ভিড় চেঁচিয়ে জবাব দিল, লাল টুপির মধ্যে৷
'ম্যাজিশিয়ান লাল টুপির চারপাশে হাত নেড়ে মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করতে করতে নাটকীয়ভাবে বলে উঠল, হুস৷
'তারপর লাল টুপিটা ভিড়ের দিকে তুলে ধরল৷ টুপির মধ্যে পায়রা নেই৷ ভিড় থেকে উড়ে এল প্রশ্ন, পায়রা গেল কোথায়?
'উড়ে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে নীল টুপির মধ্যে-বলেই সে ছোঁ মেরে তুলে নিল নীল টুপিটা৷ টুপিটা তুলতেই মুখ শুকিয়ে গেল তার৷ টুপির মধ্যে পায়রা নেই৷ এবারও তার মুখ কাঁচুমাচু, পায়রা কোথায় গেল, কোথায় গেল পায়রা?
'ততক্ষণে ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন ছাপিয়ে কটু মন্তব্য আর টিটকারির ফোয়ারা ছুটতে শুরু করেছে৷
'মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাজিশিয়ান৷ চিৎকার, চেঁচামেচির সঙ্গে ভিড় পাতলা হতে শুরু করল৷ রাস্তার পাশেই একটা দোতলা বাড়ি৷ বাড়ির কার্নিশে একটা গোলা পায়রা গলা ফুলিয়ে ডেকে উঠল, বক বক বক্কম!
'আমি এতক্ষণ একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ সুযোগ পেয়ে বলে উঠলাম, ওই যে!
'লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পায়রাটাকে দেখল৷ তারপর কটমট করে তাকাল আমার দিকে৷ তার চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মতো কঠিন৷
'আমি ফিরে আসছি, পিছনে দ্রিম দ্রিম শব্দ শুনে ফিরে তাকালাম৷ আগে খেয়াল করিনি, তার বাঁ-কাঁধ থেকে ঝুলছে একটি ছোটো বাদ্যযন্ত্র৷ তাতে সজোরে চাঁটি মারতে মারতে সে মিশে গেল চালাই বাজারের ভিড়ের মধ্যে৷
'দেখতে দেখতে এসে গেল ওনাম পরব৷ প্রতিবারের মতো সেবারও আমি শো শুরু করলাম ওনামের দ্বিতীয় দিন থেকে৷
'হলের সমস্ত সিট আগেই বুক হয়ে গেছে৷ প্রথম শোর পর্দা উঠতেই দেখলাম, ভিড় উপছে পড়ছে হলে৷ বাহুবলীকে স্মরণ করে খেলা শুরু করলাম৷ প্রথম খেলাটা উতরে গেল দারুণভাবে৷ হাততালিতে ফেটে পড়ল হল৷
'দ্বিতীয় খেলাটা আমার খুব জনপ্রিয় তাসের খেলা৷ প্রতিটি শোতে আমি চার থেকে পাঁচটি তাসের খেলা দেখাই৷ তাসের দ্বিতীয় খেলাটা দেখানোর সময় আমি একটা ভুল করলাম৷ অবশ্য দর্শক বুঝে ফেলার আগেই আমি ব্যাপারটা ম্যানেজ করে ফেললাম এবং খুব দ্রুত পরের খেলায় চলে গেলাম৷
'এরকম ছোটখাটো ভুল স্টেজে ম্যানেজ করার কৌশল সব ম্যাজিশিয়ানকে রপ্ত করতে হয়৷
'ব্যাপারটা ম্যানেজ হলেও শো-এর তাল কেটে গেল, কবিতায় ছন্দপতনের মতো৷ নিজের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছিল এবং মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম৷ তবুও বলব, পরের খেলাগুলি মোটের উপর ভালোই হল এবং দর্শকের হাততালিও কুড়োলাম৷
'শোয়ের শেষ এবং আমার বিখ্যাত খেলা চেপ্পাম পান্থুম৷ বলতে গেলে আমার বিশ্বজোড়া খ্যাতির জন্য এই খেলাটির অবদান সব চেয়ে বেশি৷ আমি এমন অনেক দর্শককে জানি, যারা শুধু আমার এই খেলাটি দেখার জন্য দিনের পর দিন টিকিট কেটে আমার ম্যাজিক শো দেখতে আসে৷
'প্রকৃতপক্ষে দেশে ও বিদেশে এই খেলাটি দেখায় মুষ্টিমেয় দু-চারজন ম্যাজিশিয়ান এবং তারা কেউই খেলাটি আমার মতো এমন অনায়াস দক্ষতায় দেখাতে পারেন না৷ খেলাটি দেখাতে লাগে একাগ্রতা, মনোযোগ এবং অঙ্কের নিখুঁত হিসেব৷
চেপ্পাম পান্থুম দেখানোর সময় বারে বারে আমার একাগ্রতা নষ্ট হচ্ছিল৷ কানের কাছে শুনতে পাচ্ছিলাম দ্রিম দ্রিম শব্দ৷ বুঝতে পারছিলাম না শব্দটা আসছে কোথা থেকে৷
'মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায় দু-একবার বল চালতে ভুল করলাম৷ কোনোরকমে সামলেও নিলাম৷ তবে খেলাটা সেদিন তেমন জমল না৷ খেলা শেষ হবার পর সেদিন হলে হাততালির ঝড় উঠল না৷ তার বদলে কানে এল ফিসফাস গুঞ্জন এবং দু-একটা বিদ্রূপ মন্তব্য৷
'শো শেষ হবার পর পর্দার ফাঁক দিয়ে ভিড়ের দিকে তাকালাম৷ ভিড়ের মধ্যে কোনো দর্শকের মুখ আমার চোখে পড়ল না, চোখে পড়ল শুধু একজোড়া চোখ৷ কটমট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মতো কঠিন৷
'এর পরের দু-দিনের শো আরও খারাপ হল৷ বার বার ভুল করলাম৷ লোকে হাততালির বদলে গালাগালি দিতে শুরু করল৷ টিটকারি, টিপ্পনি কাটতেও কসুর করল না৷ শো চলার সময় সারাক্ষণ কানে বাজছিল বিকট দ্রিম দ্রিম শব্দ৷ মাঝে মাঝে নিজেরই সন্দেহ হতে লাগল৷ শব্দটা বাইরে থেকে আসছে, নাকি নিজের বুকের ভিতর থেকে৷ হলের দর্শকদের দিকে তাকাতে পারি না৷ তাকালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দু-টি চোখ৷ কটমট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মতো কঠিন৷
'বাধ্য হয়ে চতুর্থ দিন থেকে শো বন্ধ করে দিলাম৷ আমার সহকারীদের বললাম, যারা অগ্রিম বুক করেছে, তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দিতে৷'
কুন্নাপ্পিল্লি থামলেন৷ আমি শুধোলাম, 'তারপর থেকে আপনি আর শো করেননি?'
মাথা নাড়লেন তিনি, 'না৷'
'একটু আগেই তো আপনি আমাকে দেখালেন আপনার সেই বিখ্যাত খেলা চেপ্পাম পান্থুম অনায়াস দক্ষতায়৷ আগের মতো সাবলীল এবং অনবদ্য৷'
তিনি কোনো কথা বললেন না, শুধু ম্লান হাসলেন৷
আমার মনে হল, আমিও যেন কানের কাছে শুনতে পাচ্ছি সেই বিকট দ্রিম দ্রিম শব্দ আর চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সেই দু-টি চোখ৷ কটমট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মতো কঠিন৷ আমি বললাম, 'আমিও কয়েকদিন আগে একজনকে দেখেছি ফুটপাথে ম্যাজিক দেখাতে৷'
তিনি চোখ তুলে তাকালেন আমার দিকে, 'কোথায়?'
'চালাই বাজারের কাছে৷'
'লোকটি কি ঢ্যাঙা?'
'সাড়ে ছ-ফিটের আশেপাশে৷'
'গায়ে?'
'ডোরাকাটা পাজামা এবং শার্ট৷'
'মাথায়?'
'চোঙার মতো টুপি?'
'সঙ্গে কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল?'
'লোকটির বাঁ-কাঁধ থেকে ঝুলছিল একটি ছোটো ঢোলক৷'
'ঢোলক নয়, কেরালার প্রচলিত লোকবাদ্য ইডাক্কা৷'
'এই কি তবে সেই লোক?'
'চালাই বাজারের আশেপাশে তাকে মাঝেমধ্যেই দেখা যায়৷ লোকমুখে খবর পেয়ে আমি বারকয়েক ধাওয়া করেছি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য৷ কিন্তু সেখানে গিয়ে আর তাকে খুঁজে পাইনি৷'
'আপনার ম্যাজিক ছেড়ে দেবার পিছনে কি এই লোকটিই দায়ী?'
তিনি মাথা নাড়লেন, 'না৷'
'তাহলে?'
তিনি এবার সরাসরি তাকালেন আমার দিকে, 'আমি নিজে৷'
'আপনি নিজে?'
'আমার অহংকার৷'
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তাঁর মুখের দিকে৷ এ আমি কী দেখছি, ওয়ার্ল্ড ফেমাস ম্যাজিশিয়ান কুন্নাপ্পিল্লির দু-চোখে চিক চিক করছে দু-ফোঁটা ম্যাজিক জল!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন