পঙ্গপাল

অমিতাভ পাল

গুপিমামা আসেন দুম করে৷ আবার চলেও যান দুম করে৷ কোথায় যান, কেন যান, তার কোনো হদিস দিয়ে যান না৷

গুপিমামা সম্পর্কে আমরা জানি যতটুকু, জানি না তার চেয়ে ঢের বেশি৷ আমরা এখনও জানি না গুপিমামা থাকেন কোথায়, কী করেন৷ মা অনেকবার জানতে চেয়েছেন, 'হ্যাঁরে গুপে, তুই থাকিস কোথায়, করিস কী?'

'থাকি যেখানে যেমন, করি যখন যা পাই৷' এই হল গুপিমামার খাস জবাব৷ যখন হাতে কোনো জবরদস্ত কাজ থাকে না, তখন এসে জোটেন আমাদের সঙ্গে৷

এবার এসেছেন অনেকদিন পরে, প্রায় বছর দেড়েক বাদে৷ এই বছর দেড়েক গুপিমামার কোনো খোঁজখবর ছিল না৷ তাই মা একটু ক্ষোভের সঙ্গে জানতে চাইলেন, 'কীরে গুপে, এতদিন বাদে কী মতলবে?'

'কোনো মতলব নেই রে, মন্টিদি৷ অনেকদিন তোর হাতের সুক্তো, মৌরলা মাছের বাটি-চচ্চড়ি আর পটলের দোরমা খাইনি৷ তাই চলে এলাম৷'

'শুধু সুক্তো, বাটি-চচ্চড়ি আর পটলের দোরমার টানে?'

'মুড়কি আর মণ্ডার টানটাও কম নয়৷ বেশিদিন বাইরে থাকলেই টের পাই৷'

মা শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে, এখন কোথা থেকে?'

গুপিমামা জবাব দেবার আগে আমি বলে দিলাম, 'দিল্লি থেকে৷ কি গুপিমামা, ঠিক বলিনি?'

গুপিমামা সায় দিলেন, 'একদম ঠিক৷'

মুড়কি বড়ো বড়ো চোখ করে তাকাল আমার দিকে, 'তুই কী করে জানলি রে, দাদা?'

'গুপিমামার লাগেজের গায়ে দিল্লি এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেকিং এর ছাপ্পা মারা স্টিকার লাগানো আছে৷ দেখিসনি?'

মুড়কি বলল, 'দেখেছি, তবে খেয়াল করিনি৷'

গুপিমামা বললেন, এই খেয়াল করাটাই আসল ব্যাপার৷ ভালো করে খেয়াল করলে যেকোনো রহস্যের অর্ধেক সমাধান আপনা থেকেই হয়ে যায়৷ বাকি অর্ধেকটার জন্য সামান্য একটু ব্রেন কালচার করতে হয়৷'

মুড়কি ফিসফিস করে শুধোল, 'ব্রেন কালচারটা কী রে, দাদা?'

'এগ্রিকালচার যেমন ফসলের চাষবাস, পিসি কালচার যেমন মাছের চাষবাস, ব্রেন কালচার তেমনি মগজের চাষবাস৷'

মা শুধোলেন, 'এবার দিল্লিতে তোর কীসের কালচার ছিল?'

গুপিমামা বললেন, 'বিশেষ কোনো কালচার নয়৷ প্রাইম মিনিস্টার পাঠিয়েছিলেন৷'

মা জানতে চাইলেন, 'এত লোক থাকতে তোকে কেন? আবার কোনো ঝামেলা পাকিয়েছিস নাকি?'

'তা ঝামেলা একটা পাকিয়ে উঠেছিল ঠিকই, ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে না দিলে সর্বনাশ হয়ে যেত৷'

'কার সর্বনাশ, তোর নিজের নয় তো?'

'আমার নয়, দেশের৷ তাই পি এম আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, "সাবাস গোপীনাথ৷ তুমি যেভাবে দেশকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করেছ, তাতে তোমার একটা নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত৷"'

মা শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে, তুই কী এমন কাজ করেছিস যে তোর একটা নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত!'

'ক-টা ঘাসফড়িং মেরেছিলাম৷'

'বাড়িতে যখন পোষা ময়না পাখিটা ছিল, আমাদের মুড়কি আর মণ্ডা রোজ দু-বেলা মুঠো মুঠো ঘাসফড়িং ধরে এনে পাখিকে খাওয়াত৷ এত সামান্য কাজের জন্য তোকে...'

কথার মাঝখানেই মুড়কি ফোড়ন কাটল, 'ক-টা ঘাসফড়িং মেরেছিলে, গুপিমামা?'

'সঠিক সংখ্যাটা বলতে পারব না৷ তবে মোটামুটি একটা ধারণা দিতে পারি৷'

'তাই দাও৷'

'এরা ঘুরে বেড়ায় দল বেঁধে৷ এদের এক-একটা দল লম্বা-চওড়ায় হাজার-বারো-শো বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে৷ পাল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় তাই এরা পঙ্গপাল নামে পরিচিত৷ প্রতিবর্গ কিলোমিটারে এদের সংখ্যাটা হতে পারে আশি মিলিয়ন৷ তাহলে বারো-শো বর্গ কিলোমিটারে এদের সংখ্যাটা কত হয়, হিসেব করে দেখ৷'

আমি চটপট মুখে মুখে হিসেব করে বললাম, 'ছিয়ানব্বই-এর পিঠে ন-টা শূন্য৷'

মা বোধ হয় সংখ্যাটা একবার আঁচ করতে চেষ্টা করলেন৷ সুবিধে করতে পা পেরে শুধোলেন, 'আদতে সংখ্যাটা কত?'

আমি বললাম, 'ন-হাজার ছ-শো কোটি৷'

সংখ্যাটা শুনে চমকে উঠলেন মা, 'এ যে বিরাট সংখ্যা রে, গুপে৷'

'এই বিরাট সংখ্যক পঙ্গপালকে ঠিক সময়ে সাবাড় করতে না পারলে কী সর্বনেশে কাণ্ড হত বল দিকি?'

'কী কাণ্ড?'

'রাজস্থান, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ত৷'

'পঙ্গপালের জন্য দুর্ভিক্ষ হবে কেন?'

'মাঠে ফসল না ফললে দুর্ভিক্ষ তো হবেই৷ ওরা মাঠের পর মাঠ খেতের ফসল সাবাড় করে দিত৷ ওদের খাবার বহরটা তো কম নয়৷'

'কীরকম?'

'প্রতিদিন একটা পঙ্গপাল তার নিজের ওজনের সম পরিমাণ খাদ্য খেয়ে ফেলতে পারে৷ তার পরিমাণ প্রায় দু-গ্রামের মতো৷ নয় হাজার ছ-শো কোটি পঙ্গপালের জন্য প্রতিদিন কত খাদ্য লাগবে, সেই পরিমাণটা একবার হিসেব করে দেখ৷'

শেষের কথাটা আমাকে৷ আমি অঙ্ক কষে পরিমাণটা বললাম, 'এক লক্ষ বিরানব্বই হাজার মেট্রিক টন৷'

'প্রতিদিন এই পরিমাণ ফসল সাবাড় করতে করতে এগিয়ে চলে এই পঙ্গপালের ঝাঁক৷ তাই যেসব এলাকার উপর দিয়ে এরা উড়ে যায়, সেইসব এলাকার মাঠে ফসল বলতে আর কিছু থাকে না৷ তাই এইসব এলাকায় অবধারিত ভাবে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ৷'

গুপিমামা বললেন, 'জন্মেই এরা পেটুক হয় না বা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় না৷ জীবনের গোড়ার দিকে এরা একা একা থাকে৷ তখন এরা আর পাঁচটা ঘাসফড়িং-এর মতোই নিরীহ৷ জীবনের একটা সন্ধিক্ষণে এসে এদের মস্তিষ্কে সেরেটোনিন নামে একটা রাসায়নিকের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়৷ তার ফলে এদের গায়ের রং যায় বদলে এবং আচার আচরণেও আসে পরিবর্তন৷ তখন এরা দল বাঁধতে শুরু করে এবং বুভুক্ষু হয়ে ওঠে৷ এদের এই শারীরিক এবং আচরণগত পরিবর্তন এতটাই ব্যাপক যে, বহুদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিঃসঙ্গ ঘাস ফড়িং এবং দলবেঁধে থাকা পঙ্গপালকে ভাবতেন দু-টি আলাদা পতঙ্গ৷ সেরেটোনিন-এর কেরামতিটা আবিষ্কারের পর এদের হাইড অ্যান্ড জেকিল স্বরূপটা ধরতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা৷'

মা বললেন, 'ফসলের খেতে পোকামাকড় মারার জন্য যে সমস্ত ওষুধ পাওয়া যায়, সেই সমস্ত ওষুধ ছিটিয়ে তো এদের দমন করা যেতে পারে৷'

গুপিমামা বললেন, 'মোটেই তা করা যায় না৷ তার প্রধান কারণ এরা ছড়িয়ে থাকে বিশাল এলাকা জুড়ে৷ কখনো কখনো সেই ঝাঁকের বিস্তৃতি হাজার বারো-শো বর্গ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়৷ এত বিশাল এলাকা জুড়ে কীটনাশক ওষুধ ছড়ানো কোনো একজন কৃষকের পক্ষে সম্ভব নয়৷ সেটা সম্ভব হতে পারে কেবল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে৷ তাও সম্ভব হয় না৷ তার কারণ, এরা ফসলের খেতে নামে রাতের অন্ধকারে৷ দিনের বেলাটা কাটায় উড়ন্ত অবস্থায়৷ উড়ে যায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়৷'

মা শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে কীটনাশক ওষুধ ছিটিয়ে যদি মারা না যায় তবে কয়েক-শো বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পঙ্গপালের ঝাঁককে তুই মারলি কী করে?'

গুপিমামা বললেন, 'আমি কি আর মেরেছি? ওরা নিজেরাই মারা পড়েছে থর মরুভূমির বুকে৷ মরুভূমির মধ্যে সবুজ গাছপালা কিংবা ফসলের খেত পাবে কোথায়? ওরা মরেছে দিনের পর দিন খেতে না পেয়ে এবং মরুভূমির প্রচণ্ড তাপে দগ্ধ হয়ে৷'

'তবে যে বললি পি এম তোর পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়েছেন?'

'দিয়েছেনই তো৷ পঙ্গপালের ঝাঁকটাকে পথ ভুলিয়ে মরুভূমির দিকে পাঠিয়ে দেবার জন্য৷'

'পঙ্গপালের ঝাঁক কি বাড়ির পোষা হাঁস-মুরগির পাল নাকি যে ডাকলেই তোর পিছু পিছু মরুভূমির মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়বে?'

গুপিমামা রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, 'সেইটাই তো আসল রহস্য৷'

মা বললেন, 'সেই রহস্যটাই তো শুনতে চাইছি৷'

গুপিমামা বললেন, 'তবে তো গোড়া থেকেই খুলে বলতে হয়৷'

পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে প্রায়ই পঙ্গপালের উপদ্রব হয়৷ তাই ওইসব দেশের কোনো কোনোটিতে পঙ্গপাল দমনের সুসংহত উদ্যোগ গড়ে উঠেছে৷ আমাদের দেশে এখনও সেরকম কোনো উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি৷ তবে চেষ্টা শুরু হয়েছে৷ কারণ গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিম ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে স্থানীয়ভাবে পঙ্গপালের ছোটোখাটো ঝাঁক দেখা যাচ্ছে৷ ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও কম-বেশি হচ্ছে৷ তাই ব্যাপক আকার ধারণ করার আগে সরকারি স্তরে আমাদের দেশেও পঙ্গপাল দমনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে৷

সেই উদ্যোগের সূচনা হিসাবে গুপিমামা গিয়েছিলেন ইথিওপিয়ায়৷ বলা ভালো, তাঁকে পাঠানো হয়েছিল সে দেশের পঙ্গপাল দমনের সরকারি ব্যবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার জন্য৷ গুপিমামা বললেন, 'সেখানেই আবার দেখা হল ড. জলিলের সঙ্গে৷'

মা শুধোলেন, 'আবার মানে? আগে কোথাও দেখা হয়েছিল নাকি?'

গুপিমামা বললেন, 'কেমব্রিজে৷'

জলিল কেমব্রিজে গিয়েছিলেন পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণের উপরে উচ্চতর গবেষণার জন্য৷ সেই সময় গুপিমামাও সেখানে ড. ম্যালকম বারোজের সঙ্গে পঙ্গপালের উপরে কাজ করছিলেন৷

জলিল ছাত্র হিসেবে ছিলেন বুদ্ধিমান এবং তুখোড় কিন্তু প্রচণ্ডভাবে ভারতবিদ্বেষী৷ একবার প্রকাশ্যে তিনি ভারতবিদ্বেষী মন্তব্য করায় কেমব্রিজের ভারতীয় ছাত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে খেপে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন৷ কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কড়া ব্যবস্থা নিতে পারেন, এই আশঙ্কা করে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং 'আর কখনো এই ধরনের মন্তব্য করব না' এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছিলেন৷

ভিতরে ভিতরে তিনি রাগে ফুঁসছিলেন৷ একবার গুপিমামাকে ক্যাম্পাসের মধ্যে একলা পেয়ে তিনি শাসিয়েছিলেন, 'দেখে নেব৷'

মা শুধোলেন, 'বেছে বেছে শুধু তোকে শাসাল কেন?'

গুপিমামা নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন, 'এই মামাই যে ভারতীয় ছাত্রদের নেতৃত্ব দিয়েছিল৷'

মা বললেন, 'এ তো গেল কেমব্রিজের কথা, এবার ইথিওপিয়ার কথা বল৷'

গুপিমামা বললেন, 'লোকটি ততদিনে শুধু জলিল থেকে ড. জলিল৷'

নানা ঘাটের জল খেতে খেতে ড. জলিল শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছিল ইথিওপিয়ায়৷ সরকারি লোকাস্ট কন্ট্রোল বিভাগের রীতিমতো একজন হোমরাচোমরা ব্যক্তি৷ এতদিন পরেও গুপিমামাকে দেখে ঠিক চিনতে পারলেন, 'কী রে, তুই এখানে? এবারে কার কাছে নালিশ করবি?'

গুপিমামা বললেন, 'কারও কাছে নালিশ করতে আসিনি৷ এসেছি, ইথিওপিয়া সরকারের লোকাস্ট কন্ট্রোল উদ্যোগের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে৷'

'তবে তো আমার চ্যালাগিরি করতে হবে৷ পারবি তো আমাকে গুরু বলে মানতে?'

'গুরুর মতো আচরণ করলে নিশ্চয়ই পারব৷'

চ্যালাগিরি করতে মামার কোনো আপত্তি ছিল না৷ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে মামা বুঝতে পারলেন, জলিলের কাছ থেকে বিশেষ কিছু লাভ হবে না৷ টেকনিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার দেখানোর পরিবর্তে উপদেশ মূলক ভাষণ দেবার দিকেই যেন তাঁর আগ্রহটা বেশি৷

ইথিওপিয়া সরকারের অনুমতিপত্র ছিল মামার সঙ্গে৷ তাই নিজের উদ্যোগে ঘুরে ও দেখে যতটা সম্ভব জানা ও বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি৷

ড. জলিলের টেবিলের উপরে মিহি জালের তৈরি একটা খাঁচা৷ খাঁচার মধ্যে গুটি কয়েক ডেজার্ট লোকাস্ট৷

কৌতূহল দমন করতে না পেরে একদিন গুপিমামা তাঁকে শুধোলেন, 'কী ব্যাপার?'

হেঁয়ালি করে ড. জলিল বললেন, 'মগজ ধোলাই৷'

পঙ্গপালের মগজ ধোলাই৷ ব্যাপারটা কীরকম যেন গোলমেলে ঠেকল মামার কাছে৷ তাই জানতে চাইলেন, 'মানে?'

'মগজ ধোলাই মানে মগজ ধোলাই৷ পঙ্গপালের মগজটা খুব ছোটো৷ তার চেয়েও বহুগুণ ছোটো একটা সিলিকন চিপকে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেব সেই মগজের মধ্যে৷ সেই চিপ-এর মধ্যে অ্যাডভানস প্রোগ্রামিং করা থাকবে৷ তারপরের কাজটা তো আমার হাতের মুঠোয়৷ রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে যেমন নির্দেশ পাঠাব, বাধ্য ছেলের মতো সেইভাবে চলবে পঙ্গপাল৷'

মামা শুধোলেন, 'গুটিকয়েক পঙ্গপাল রিমোটের নির্দেশে চললেও গোটা ঝাঁক কি চলবে?'

পালটা প্রশ্ন করলেন ড. জলিল, 'একটা রানি মৌমাছি কি গোটা মৌমাছির ঝাঁককে নিয়ন্ত্রণ করে না?'

'তা অবশ্য ঠিক৷'

'গুটিকয়েক বিশেষ পঙ্গপালও সক্ষম গোটা পঙ্গপালের ঝাঁককে নিয়ন্ত্রণ করতে৷ যেকোনো ঝাঁক বা দলের ধর্ম এই৷ দলের নেতৃস্থানীয়রা যেদিকে যাবে, গোটা দল তাদের অনুসরণ করবে৷'

একটু দম নিয়ে গুপিমামা বললেন, 'দেশে ফিরে জোর কদমে কাজ শুরু করে দিলাম৷ জুন মাসের শেষের দিকে ফাও-র কাছ থেকে একটা সতর্ক বার্তা এসে পৌঁছোল ভারত সরকারের মাধ্যমে আমাদের কাছে৷'

মা শুধোলেন, 'হ্যাঁরে গুপে, ফাও-টা কী?'

'ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন সংক্ষেপে এফ.এ.ও.৷ ইউ.এন.ও. বা ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশন-এর একটি সংস্থা৷ এই ফাও-এর একটি বিভাগের কাজ পঙ্গপালের গতিবিধির উপরে নজর রাখা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে আগাম সতর্ক করা৷'

'সতর্কবার্তায় কী ছিল?'

'ইথিওপিয়া থেকে একটি পঙ্গপালের ঝাঁক ধেয়ে আসছে আরব সাগরের উপর দিয়ে৷ আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে ঝাঁকটি এসে পড়বে ভারতীয় উপমহাদেশে৷ ভারতীয় উপমহাদেশ বলতে শুধু ভারতবর্ষ নয় ভারতবর্ষ, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান৷'

মা শুধোলেন, 'ওই তো খুদে খুদে পোকা, ওরা কি পারবে বিস্তীর্ণ আরব সাগর পাড়ি দিতে?'

'সাগর তো তুচ্ছ, ওরা তুড়ি মেরে মহাসাগর ডিঙিয়ে যেতে পারে অনায়াসে৷ কয়েক বছর আগে পঙ্গপালের একটা ঝাঁক মাত্র দশ দিনে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল৷'

'সতর্কবার্তা পেয়ে তোরা কী করলি?'

'আমরাও পঙ্গপালের ঝাঁকটার উপরে নজর রাখতে শুরু করলাম৷ ঝাঁকটা আরব সাগর পেরিয়ে ঢুকে পড়ল পাকিস্তানে৷ সিন্ধু উপত্যকা ধরে এগিয়ে যেতে লাগল উত্তর দিকে৷ জুলাই মাস৷ সিন্ধু উপত্যকা জুড়ে ফসলের ভরা মরসুম৷ আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম৷'

'স্বস্তির নিশ্বাস কেন?'

'সিন্ধু উপত্যকার শস্যশ্যামল প্রান্তর ছেড়ে পঙ্গপালের ঝাঁক রাজস্থানের শুখা প্রান্তরের দিকে মুখ ফেরাবে কেন? সেই সম্ভাবনা নেই দেখে আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম৷'

'তারপর?'

'পঙ্গপালের ঝাঁকটা ফসলের খেতে নামল না৷ টানা উড়ে চলল উত্তর দিকে৷ ফৈজাবাদ হয়ে লাহোরের দিকে না গিয়ে হঠাৎ মুখ ফেরাল পূর্ব দিকে৷ তখনই আমি, বুঝতে পারলাম ড. জলিলের মগজ ধোলাই এবার শুরু হয়েছে৷ আমিও প্রস্তুত হয়েই ছিলাম৷ প্রায় পঞ্চাশটা পঙ্গপালের দলকে আগে থেকে মগজ ধোলাই দিয়ে রেখেছিলাম৷ যেই না পঙ্গপালের ঝাঁকটা ফিরোজপুর হয়ে ঢুকে পড়ল পাঞ্জাবে আমিও ছেড়ে দিলাম আমার সৈনিকদের৷ আমার খুদে কম্যান্ডোর দলটি নিঃশব্দে মিশে গেল পঙ্গপালের মূল ঝাঁকের সঙ্গে৷'

'তারপর?'

'তারপর আর কী! ঘরে বসে রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টেপা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ ছিল না৷'

আমি আর থাকতে না পেরে শুধোলাম, 'ড. জলিলের কম্যান্ডো বাহিনীর নির্দেশ না মেনে পঙ্গপালের ঝাঁক তোমার কম্যান্ডোদের নির্দেশ মানবে কেন?'

গুপিমামা বললেন, 'ড. জলিলের বাহিনীতে কম্যান্ডোর তুলনায় আমার কম্যান্ডোর সংখ্যা অন্তত দশগুণ বেশি৷ এও ঝাঁক বা দলের ধর্ম৷ যেদিকে বেশি সংখ্যক যাবে গোটা দলটাও তাদেরকে অনুসরণ করবে৷'

গুপিমামা থামলেন৷ বাকিটুকু শোনার জন্য মুড়কি যেন অস্থির হয়ে উঠল, 'ও গুপিমামা বলো না, তারপর কী হল?'

গুপিমামা বললেন, 'তারপর আমার মগজ ধোলাই করা কম্যান্ডোবাহিনী গোটা পঙ্গপালের ঝাঁকটাকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে চলল থর মরুভূমির মাঝখানে৷ সেখানে না আছে জল, না আছে ফসলের খেত৷ দিনের বেলায় সূর্য সেখানে আগুন ঝরায়৷ ড. জলিলের পঙ্গপালের ঝাঁক মরুভূমির প্রখর তাপে ধান ফুটে খই হওয়ার মতো মারা পড়ল সেখানেই৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%