প্রজাপতি খামার

অমিতাভ পাল

কলকাতা থেকে ট্রেনে নাগপুর৷ নাগপুর থেকে ভাড়ার গাড়িতে সাকোলি৷ সাকোলিতে যখন নামলাম, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে ঝুঁকেছে৷ গাড়িতে সময় লাগল ঘণ্টা তিনেক৷ ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে ছোটখাটো শহর সাকোলি৷

এখান থেকে নাগজিরার জঙ্গল আরও বাইশ কিলোমিটার৷ কিছুক্ষণের মধ্যে এসে হাজির হল ড. কালের দূত, সঙ্গে বাহন৷ জঙ্গল সাফারির উপযুক্ত জিপটি সে নিজেই চালিয়ে এসেছে৷ শক্তপোক্ত চেহারার আদিবাসী যুবক, জাতিতে রাজগোন্দ৷ নাম, রামুন ভালওয়াই৷ বেশ চালাক চতুর এবং চটপটে৷ সে নিজেই বলল, 'আমি স্যারের ড্রাইভার কাম অ্যাসিস্ট্যান্ট৷'

মহারাষ্ট্রের ভান্ডারা এবং গন্দিয়া জেলা জুড়ে নাগজিরার জঙ্গল৷ গোখুরি হিলসের চড়াই-উতরাই ভেঙে গাড়ি ছুটল৷ উঁচু-নীচু ঢেউ খেলানো লালমাটির রাস্তা৷ শুরুতে কাঁটাগাছ, ঝোপঝাড় আর বাঁশঝাড়ের দুর্ভেদ্য পাঁচিল৷ ক্রমশ জঙ্গল গভীর হল৷ পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অইন, হলদু, মহুয়া, বিজা, শিমুল, জিওল, শিভান, ধাওদা ও বয়ড়ার জঙ্গল৷

গাছপালা ও প্রাণীবৈচিত্র্যে এই বনাঞ্চলের কোনো তুলনা হয় না৷ এখানে পাওয়া যায় চৌত্রিশ রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণী, এক-শো ছেষট্টি ধরনের পাখি এবং ছত্রিশ প্রজাতির সরীসৃপ৷

নিবারণবাবু শুধোলেন, 'বাঘ, সিংহ আছে নাকি?'

'আফ্রিকা এবং ভারতের গির ছাড়া সিংহ আর কোথাও পাওয়া যায় না৷ এখানে আছে বাঘ, চিতাবাঘ, বাইসন, নীলগাই, বুনো শুয়োর এবং বুনো কুকুর৷ তবে নাগজিরার আসল খ্যাতি কিন্তু অন্য কারণে৷'

'কী কারণ?'

'প্রজাপতি৷ ভারতে প্রায় পনেরো-শো প্রজাতির প্রজাপতি পাওয়া যায়৷ তার মধ্যে শুধু নাগজিরাতেই পাওয়া যায় উনপঞ্চাশ রকমের প্রজাপতি৷'

রাস্তার ধারে একটি বিশাল মহুয়া গাছ৷ গাছের গুঁড়িতে দিক নির্দেশক ফলক আটকানো৷ ফলকের গায়ে লেখা 'লেপিডপটেরা ফার্ম' সঙ্গে একটি রঙিন প্রজাপতির ছবি৷ গাছের পাশ দিয়ে ঢালু হয়ে নেমে গেছে ফরেস্ট ট্রেইল বা জঙ্গলে জন্তুজানোয়ারদের পায়ে চলার সংকীর্ণ রাস্তা৷ আমাদের গাড়ি মুখ ঘুরিয়ে সেই রাস্তা ধরল৷

আমরা এসেছি ড. কালের আমন্ত্রণে তাঁর প্রজাপতি খামার দেখতে৷ ড. গজানন দিগম্বর কালে আমার অনেকদিনের বন্ধু, সেই সঙ্গে একজন নামকরা পতঙ্গবিদ৷ কাল রাতে বোঝা যায়নি৷ সকালে ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, জঙ্গলের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় পাশাপাশি কয়েকটা কাঠের বাড়ি৷ বড়োটি ড. কালের গবেষণাগার৷ তাঁর দু-পাশে দু-টি অপেক্ষাকৃত ছোটো বাড়ি৷ একটিতে থাকেন ড. কালে, অন্যটি অতিথিশালা৷ আপাতত সেটি বরাদ্দ হয়েছে আমাদের জন্য৷

সামনে অনেকটা ফাঁকা উঠোন৷ উঠোন পেরিয়ে কয়েকটি ঝাঁকড়া কদম ও পিয়াশাল গাছ৷ তাদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বেশ কিছু চালাঘর৷ এই ঘরগুলিতে থাকে স্থানীয় কিছু আদিবাসী পরিবার৷ ছোটোখাটো একটা আদিবাসী কলোনি৷ কলোনির মহিলা ও পুরুষেরা ড. কালের খামারেই কাজ করে৷

কলোনিটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ড. কালের প্রজাপতি খামার৷ গোটা এলাকাটা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ আলাপ পরিচয়ের পর্ব গতকাল রাতেই মিটে গিয়েছিল৷ ব্রেকফাস্টের পরে ড. কালে আমাদের সঙ্গে নিয়ে বেরোলেন তাঁর প্রজাপতি খামার দেখাতে৷ ড. কালে নিবারণবাবুর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হেসে শুধোলেন, 'কাল রাতে ভালো ঘুমিয়েছেন তো?'

নিবারণবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, 'তোফা ঘুমিয়েছি, মশাই৷ তবে মাঝে মাঝে, ওই কী যেন বলে, বার্কিং ডিয়ারের ডাকে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল৷'

'শুধু বার্কিং ডিয়ারের ডাক, আর কিছু শোনেননি? নেকড়ের ডাক, চিতার গর্জন, বাঘের হালুম?'

নিবারণবাবুর চোখে-মুখে খেলে গেল আতঙ্কের ঢেউ৷ তিনি মাথা নাড়লেন ডাইনে বাঁয়ে, 'না৷'

ড. কালে বললেন, 'মাস কয়েক আগে একটা চিতাবাঘ রাতের অন্ধকারে চুপিসাড়ে ঢুকে পড়েছিল আদিবাসী কলোনিতে৷'

'তারপর?'

'কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চুপিসাড়ে সে একটা ঘরে ঢুকে পড়েছিল৷ তারপর থেকে কলোনির লোকেরা রাতে মশাল জ্বেলে তিরধনুক আর দেশি বন্দুক নিয়ে কলোনি পাহারা দেয়৷'

কথায় কথায় গেট পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছি খামারের মধ্যে৷ চারপাশে ঝোপঝাড় আর গাছে গাছে লতাপাতার বেষ্টনী৷ বিচিত্র ধরনের বুনোফুলে ঝোপঝাড় আলো হয়ে আছে৷ ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে৷ নিবারণবাবু একসময় আমাকে ফিসফিস করে বললেন, 'আমাদের উচ্ছে বা ঝিঙ্গের খেতে নানা ধরনের প্রজাপতি আসে বটে, তবে একসঙ্গে এত প্রজাপতি আমি আগে কখনো দেখিনি৷'

বিস্ময়ের ঘোর আমারও চোখে-মুখে৷ আমি বললাম, 'আমিও দেখিনি৷'

আমাদের ফিসফিস করে বলা কথা হয়তো ড. কালের কানে গিয়েছিল৷ তিনি বললেন, 'নাগজিরার জঙ্গলে যত রকমের প্রজাপতি দেখতে পাওয়া যায়, তাদের বেশিরভাগকেই এখানে পাবেন৷ তা ছাড়াও এখানে দেখতে পাবেন বিদেশের বিচিত্র ধরনের কিছু প্রজাপতি৷ এখানে তাদের আমরা সযত্নে লালনপালন করি৷'

সকাল আটটা৷ এর মধ্যেই কলোনির পুরুষ ও মহিলারা খামারের কাজে লেগে পড়েছেন৷ কেউ গাছপালার পরিচর্যা করছেন, কেউ প্রজাপতির৷ রামুন আমাদের দেখতে পেয়ে হাত নাড়ল৷ সে ঘুরে ঘুরে শ্রমিকদের কাজ তদারকি করছে৷ বাবা ও মায়েরা যখন যে যার কাজে ব্যস্ত, কলোনির ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা আপনমনে ঘোরাঘুরি করছে, ঝোপেঝাড়ে লুকোচুরি খেলছে বা প্রজাপতির পিছনে অহেতুক ছোটাছুটি করছে৷ সকালের আলো এসে পড়েছে ফুলের পাপড়িতে, প্রজাপতির ডানায় এবং গাছপালার সবুজ পাতার উপরে৷ ঝলমল করছে চারিদিক৷ ড. কালে বললেন, 'প্রাকৃতিক জঙ্গলের কিছুটা এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই খামার৷ এখানে যত রকমের ঝোপঝাড় দেখছেন, তারা সবাই এখানকার নয়৷ গাছে গাছে যেসব লতাপাতা জড়িয়ে আছে, তারাও সবাই এখানকার নয়, কিছু কিছু গাছপালাও৷ বিশেষ বিশেষ ধরনের প্রজাপতির জন্য বিশেষ বিশেষ ধরনের ঝোপঝাড়, লতাপাতা ও গাছপালা বাইরে থেকে এনে এখানে লাগানো হয়েছে৷'

নিবারণবাবু শুধোলেন, 'তাহলে আপনি বলছেন, প্রজাপতিরা খুব খুঁতখুঁতে?'

'খুব৷ সব প্রজাপতি সব গাছের পাতায় ডিম পাড়ে না, সব প্রজাপতির শুককীট সব গাছের পাতা খায় না, আবার সব শুককীট সব গাছে গুটি বাঁধে না৷ এক-একধরনের প্রজাপতির জন্য চাই এক-একধরনের গাছপালা৷'

দু-টি আদিবাসী মেয়ে একটি কাঁটাঝোপের উপরে ঝুঁকে একটা প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছিল, দেখতে পেয়ে ড. কালে চেঁচিয়ে বললেন, 'অ্যায়, তোরা ওখানে কী করছিস? হুমড়ি খেয়ে পড়লে গায়ে কাঁটা ফুটবে যে৷'

তাদের বয়েস পাঁচ-ছয়ের বেশি নয়৷ শুনতে পেয়েছে তারা৷ ঘুরে দাঁড়াল৷ তারপর সটান জবাব দিল, 'কই, ওর গায়ে তো ফুটছে না?'

একটা প্রজাপতি ঝোপের উপরে উড়তে উড়তে এসে বসল একটা কাঁটার ডগায়৷ মেয়ে দু-টির লক্ষ সেই দিকে৷ ড. কালে বললেন, 'ওটা তো প্রজাপতি৷ তোরা কি প্রজাপতি?'

মেয়ে দু-টি নির্দ্বিধায় জবাব দিল, 'আমরাও প্রজাপতি৷ আমরা সারাদিন প্রজাপতির সঙ্গে খেলা করি, প্রজাপতির পিছনে ছুটে বেড়াই, প্রজাপতির সঙ্গে কথাও বলি৷'

'প্রজাপতির মতো উড়তে তো পারিস না৷'

'পারি তো, দেখবে তুমি?'

মেয়ে দু-টি কোমর থেকে একটু ঝুঁকে, হাত দু-টি টান টান করে শরীরের দু-পাশে ছড়িয়ে দিল৷ তারপর প্রজাপতির ডানার মতো হাত দু-টি নাড়তে নাড়তে, দু-পায়ে লাফাতে লাফাতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল৷ নিবারণবাবু সস্নেহে বলে উঠলেন, "উররেব্বাস, এ তো সত্যিকারের প্রজাপতি, শুধু একজোড়া করে ডানা নেই৷"

নিবারণ হালদারের বলার ঢঙে আমি হেসে ফেললাম৷ ড. কালের ঠোঁটেও খেলে গেল রহস্যময় হাসি৷ সামনের একটা ঝোপে সাদা রঙের ফুল ফুটেছে৷ তার উপরে উড়ছে একঝাঁক প্রজাপতি৷ চকচকে কালো রং, ডানার প্রান্তভাগে সারি সারি সাদা ছোপ৷ ঝাঁকটা দেখিয়ে ড. কালে শুধোলেন, 'ওগুলো কী?'

মেয়ে দু-টি ঘাড় ঘুরিয়ে এক ঝলক দেখে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, 'কমন ইন্ডিয়ান ক্রো৷'

'আর ওগুলো?'

প্রজাপতির ডানায় খাড়াভাবে সবুজাভ সাদা দাগ৷ এবারও ওরা অবলীলায় জবাব দিল, 'ব্ল্যাক রাজা৷'

এত ছোটো ছোটো মেয়েদের প্রজাপতির চেনার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে আমি রীতিমতো বিস্মিত৷ নিবারণবাবুও বিস্মিত, তবে অন্য কারণে৷ তিনি শুধোলেন, 'আমরা তো প্রজাপতিকে প্রজাপতি বলেই চিনি৷ তাদের আবার আলাদা আলাদা নাম আছে নাকি?'

ড. কালে বললেন, 'আছেই তো, যেমন এই মেয়েটির নাম শুকি আর ওই মেয়েটির নাম মুকি৷ শুকি আর মুকি সোনান্নে৷'

অপেক্ষাকৃত বড়ো মেয়েটি ফুঁসে উঠল, 'না না, আমার নাম মুকি নয়৷ আমার নাম শুকি আর ওর নাম মুকি৷'

ড. কালে বললেন, 'এরা দুই পিঠোপিঠি বোন, কলোনিতে থাকে৷ এদের মা ও বাবা খামারে কাজ করে আর এরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায় প্রজাপতিদের সঙ্গে৷ এদের জন্ম প্রজাপতি খামারে, এরা বেড়ে উঠেছে প্রজাপতিদের সঙ্গে৷ খুব ছোটো থেকে দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে খামারের প্রায় সমস্ত প্রজাপতির নাম এরা জেনে ফেলেছে শুধু নয়, তাদেরকে আলাদা আলাদা করে চিনতেও পারে৷ আমার খামারে অনেকেই আসেন প্রজাপতি দেখতে এবং প্রজাপতি চিনতে৷ ভাবছি, আর একটু বড়ো হলেই এদেরকে আমার খামারের গাইড করে নেব৷'

আমি বললাম, 'এখনই ওদের যা বুৎপত্তি, কাজটা ওরা ভালোই পারবে৷'

এবারে ড. কালে সরাসরি মেয়ে দু-টিকে বললেন, 'এঁরা আমার বন্ধু৷ অনেক দূর থেকে এসেছেন প্রজাপতি দেখতে৷ কীরে, পারবি নাকি ঘুরে ঘুরে এঁদেরকে প্রজাপতি দেখাতে, ভালো করে দেখাতে হবে কিন্তু?'

এতক্ষণ শুধু খেলে বেড়াচ্ছিল৷ এখন একটা কাজের মতো কাজ পেয়ে, ওদের চোখমুখ দেখে মনে হল, খুব খুশি হয়েছে৷ একসঙ্গে ঘাড় নাড়ল, 'পারব৷'

গাইড হিসাবে শুকি ও মুকির কোনো তুলনা নেই৷ লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে, চেঁচিয়ে, চোখ পাকিয়ে তারা আমাদের প্রজাপতি চেনাতে শুরু করল, 'ওই যে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে কালো রঙের প্রজাপতি, ভালো করে দেখো, ওদের ডানায় চওড়া এলোমেলো দাগ৷ ওদের নাম, লাইম বাটারফ্লাই আর এই যে কালোর উপরে সাদা দাগ৷ এরা হল, কমন সেলর৷ নীচু হয়ে দেখো ঝোপের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে আছে, রং কালো, সামনের ডানার ধারে সাদা সাদা ছোপ এবং পিছনের ডানার মাঝখানে এক সারি সাদা দাগ৷ ওর নাম, কমন মরমোন৷'

বিশাল খামার, অজস্র প্রজাপতি৷ যেমন বিচিত্র তাদের ডানার নকশা, তেমনি বিচিত্র তাদের রঙের বাহার৷ প্রজাপতির এই বিপুল আয়োজন একদিনে দেখে ওঠা অসম্ভব৷ দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে গেল৷ আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম৷ কিন্তু আমাদের খুদে গাইডরা রোদে ঘেমে নেয়ে উঠেছে, তবুও তাদের উৎসাহে একটুও ভাঁটা পড়েনি৷ অগত্যা আমরাই একসময় ক্ষান্ত দিলাম৷

খামারের মধ্যে মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল সূক্ষ্ম তারের জাল দিয়ে ঘেরা জায়গা৷ ড. কালে আমাদের নিয়ে এলেন সেইরকম একটা ঘেরা এলাকার কাছে৷ জালের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন নিবারণবাবু, 'ঝাঁকে ঝাঁকে কী উড়ছে, শালিখ পাখি নাকি?'

একটি শালিখ পাখি তার ডানা দু-টি দু-পাশে টান টান করে ছড়িয়ে দিলে যে আকার দাঁড়ায়, প্রায় সেই আকারের এক ঝাঁক প্রজাপতি উড়ছে জাল-ঘেরা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে৷ ড. কালে বললেন, 'কুইন আলেকজান্দ্রাজ বার্ড উইং৷ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো প্রজাপতি৷ প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের পাওয়া যায় পাপুয়া নিউগিনির জঙ্গলে৷'

নিবারণবাবুকে লক্ষ করে ড. কালে শুধোলেন, 'গুটি থেকে বেরোনের পর একটা প্রজাপতি কতদিন বাঁচে?'

নিবারণবাবু তাকালেন আমার দিকে৷ আমি বললাম, 'বাড়ির বাগানে যে সমস্ত প্রজাপতিকে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াতে দেখি, তারা সাধারণত বাঁচে পাঁচ থেকে সাত দিন৷'

একটা লোহার গেটের সামনে এসে আমরা দাঁড়ালাম৷ জায়গাটা সুরক্ষিত, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ গেটে ভারী তালা ঝুলছে৷ পকেট থেকে চাবি বার করে নিজের হাতে তালা খুললেন ড. কালে, 'আমি ছাড়া এখানে আর কারও ঢোকার অনুমতি নেই৷'

'আমরা?'

'আপনারা আমার অতিথি৷ গবেষণাগারের লব্ধ জ্ঞান এখানে আমি হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখি৷'

একটা কাঁঠাল গাছের গুঁড়ি থেকে বড়ো বড়ো কাঁঠালের মতো বস্তু ঝুলছে৷ তার পাশেই একটা তাল গাছ৷ তার ছাতার মতো পাতা থেকে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসার মতো বস্তু৷ কাঁঠাল গাছের বস্তুটি কাঁঠাল নয়, তাল গাছের বস্তুটিও বাবুই পাখির বাসা নয়৷ তাদের চারপাশে শুঁয়োপোকা এমনভাবে থিকথিক করছে যে, ভিতরের বস্তুটি যে কী, বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই, আবার কোনো কোনো বস্তুর চারপাশ শক্ত আবরণে ঢাকা৷ আমি সবিস্ময়ে জানতে চাইলাম, 'এগুলো কী?'

ড. কালে বললেন, 'প্রজাপতির গুটি৷'

কৌতূহল দমন করতে পারলেন না নিবারণবাবু৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'এত বড়ো একটা গুটি থেকে কি একসঙ্গে অনেক প্রজাপতি তৈরি হবে, নাকি মস্ত বড়ো একটা প্রজাপতি?'

চোখ পিটপিট করে হাসতে লাগলেন ড. কালে৷ তারপর রসিকতা করে বললেন, 'বাবুই পাখির বাসার মতো ছোটোগুলি থেকে উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি আর কাঁঠালের মতো বড়োগুলি থেকে উড়ুক্কু শেয়াল৷'

নিবারণবাবু আরও কী সব জানতে চাইছিলেন, ড. কালে তাকে জোর করে থামিয়ে দিয়ে আমাকে শুধোলেন, 'কি বিজ্ঞানীমশাই, আপনি কি দেখেছেন উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি আর উড়ুক্কু শেয়াল?'

'দেখব না কেন? উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি হল ফ্লাইং স্কুইর‍্যাল, পেটাউরিসটা ফিলিপ্পেনসিস আর উড়ুক্কু শেয়াল হল ফ্লাইং ফক্স মানে বাদুড়, টেরোপাস জাইগানটিয়াস৷'

নিবারণবাবু শুধোলেন, 'ফ্লাইং ফক্স বা বাদুড়ের ব্যাপারটা তো জানি কিন্তু ফ্লাইং স্কুইর‍্যালটা কী?'

'একধরনের কাঠবেড়ালি৷ তাদের সামনের হাত দু-টি শরীরের সঙ্গে পাতলা চামড়া দিয়ে জোড়া, অনেকটা হাঁসের পায়ের আঙুলগুলো যেমন জোড়া থাকে৷ তার ফলে বাতাসে ভর করে বেশ কিছুটা দূর এরা উড়ে যেতে পারে৷'

গভীর রাতে হইচই আর চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল৷ পর পর কয়েক রাউন্ড গুলির আওয়াজও পেলাম৷ বেরিয়ে এলাম ঘরের বাইরে৷ গোলমালের শব্দটা আসছে কলোনির দিক থেকে৷

জ্বলন্ত মশাল নিয়ে লোকজন ছোটাছুটি করছে৷ কারও হাতে বল্লম, আবার কারও হাতে তিরধনুক৷ কেউ কেউ প্রচণ্ড শব্দে পটকা ফাটাচ্ছে৷ খোঁজ নিয়ে জানলাম, রাতে কলোনির মধ্যে চিতাবাঘ ঢুকে পড়েছিল৷ কেউ বলল, দুটো, কেউ বলল তিনটে৷ বাঘের সঠিক সংখ্যাটা জানা না গেলেও, এইটুকু বুঝলাম যে সংখ্যাটা এক নয়, একাধিক৷

জঙ্গলে এমন ব্যাপার নতুন কিছু নয়৷ তাই কিছুক্ষণের মধ্যে গোলমাল, চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে গেল৷ যে যার ঘরে ফিরে গেল৷ নিশুতি রাতের জঙ্গলে একটানা ঝিঁঝি পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে কাঁকর হরিণের ডাক ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলাম না৷

সকালে ঘুম ভেঙে গেল নিবারণবাবুর ডাকাডাকিতে, 'উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন, সাংঘাতিক একটা ঘটনা ঘটে গেছে৷'

'কীরকম?'

'শুকি আর মুকিকে পাওয়া যাচ্ছে না৷'

'কখন থেকে?'

'শুকি আর মুকি শুয়েছিল বাড়ির বাইরের দিকের একটা ঘরে৷ কাল রাতে কেউ খেয়াল করেনি৷ জানাজানি হল আজ সকালে৷ কলোনিতে শোরগোল পড়ে গেছে৷'

'কোথায় গেল মেয়ে দু-টি?'

'সবাই তো বলছে, কাল রাতেই ওদের চিতাবাঘে তুলে নিয়ে গেছে৷'

চিতাবাঘ তুলে নিয়ে গেলে এতক্ষণে বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই৷ তবুও কলোনির পুরুষ ও মহিলারা দলে দলে ভাগ হয়ে চারদিকে বেরিয়ে পড়ল খুঁজতে৷ হাতে টাঙি, বল্লম, তিরধনুক, যার যা আছে, তাই নিয়ে৷

খবরটা শুনে আমাদেরও মন খারাপ হয়ে গেল৷ কাল সকালেই দেখেছি ফুটফুটে মেয়ে দু-টিকে প্রজাপতির পিছনে ছোটাছুটি করতে, ভাবটা যেন, পারলে প্রজাপতিদের সঙ্গে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়৷ আমরাও তাই ঘরে বসে থাকতে পারলাম না৷ একটা দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম৷

আমাদের দলটা খামারের কাছেপিঠের জঙ্গল বিট করতে করতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল কাপালা দেওর দিকে৷ গোখুরি হিলসের মাথায় রাজগোন্দদের একটা মন্দির আছে৷ সেই মন্দিরের দেবতা কাপালা দেও৷ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে দুর্গম পথ৷ চড়াই-উতরাই ভেঙে আমাদের এগোতে হচ্ছিল৷ চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য অসাধারণ৷ তবে সেই দৃশ্য উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা আমাদের নেই৷

পথে অনেক গউর দেখলাম৷ দেখলাম কয়েকটা বুনো শুয়োর৷ তবে কোনো বাঘ কিংবা চিতাবাঘের দেখা পেলাম না৷

দুপুর গড়িয়ে গেল৷ জঙ্গলের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে৷ তাই আর বেশিদূর এগোনো গেল না৷

ফেরার পথে সামনের একটা চাকওয়া গাছের পাতার নড়াচড়া লক্ষ করে নিবারণবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি!'

আমিও ঘুরে তাকালাম৷ মাথার উপর দিয়ে একটা কাঠবিড়ালি প্রায় শ-আড়াই ফিট উড়ে গিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের মধ্যে ঢুকে গেল৷ এইটুকু সময়ের মধ্যে আমি যা দেখার দেখে ফেলেছি৷ বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া৷ আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, 'না এটা মোটেই ফ্লাইং স্কুইর‍্যাল বা পেটাউরিসটা ফিলিপ্পেনসিস নয়৷'

'উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি নয়?'

'না৷ এর ডানা মোটেই উড়ুক্কু কাঠবিড়ালির মতো নয় বরং অনেকটা বাদুড়ের ডানার মতো, তবে চিত্রবিচিত্র এবং রঙিন৷ সম্পূর্ন নতুন কোনো প্রজাতির প্রাণী, আগে কোথাও দেখা যায়নি৷'

বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত কত প্রাণী চিরদিনের মতো হারিয়ে যাচ্ছে, আবার কত নতুন প্রাণীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে৷ প্রকৃতি এখনও রহস্যময়৷ তার সমস্ত রহস্যের অবগুন্ঠন আজও সে খুলে ধরেনি মানুষের সামনে৷ তাই আমি বিস্মিত হলেও অবাক হইনি৷

তখনই নতুন এই কাঠবিড়ালি প্রজাতিটি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করলাম৷ কিন্তু অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় তা আর সম্ভব হল না৷ মনের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা নিয়ে ফিরে এলাম৷

আমি উৎসাহের সঙ্গে আমার এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা ড. কালেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে শোনালাম৷ তিনি দু-একবার ডাইনে বাঁয়ে শুধু মাথা নাড়লেন কিন্তু মুখে কিছু বললেন না৷ হয়তো তাঁর কাছে এটা নতুন কিছু নয়, আগেই তিনি এর সন্ধান পেয়েছেন৷

তারপর পাঁচ-ছটা দিন কেটে গেল শুকি আর মুকিকে নিয়ে৷ খামারকে কেন্দ্র করে চারপাশের সাত-আট কিলোমিটার জুড়ে অনেক খোঁজাখুঁজি হল৷ ওদের যেমন কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না, তেমনি আবার তাদের যে বাঘে তুলে নিয়ে গেছে, তারও কোনো নির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা গেল না৷

শুকি ও মুকির ব্যাপারটা থিতিয়ে যাবার পর আমরা আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করলাম৷ প্রবল উৎসাহে নতুন প্রজাতির উড়ুক্কু কাঠবিড়ালির ব্যাপারে খানাতল্লাশি শুরু করলাম৷ এবারে আর পায়ে হেঁটে নয়৷ রামুনের জঙ্গল সাফারির জিপে চড়ে৷ নিয়ম করে প্রতিদিন জঙ্গল তোলপাড় করে ফেলতে লাগলাম৷ কোনোদিন গাউরগাট্টির দিকে, তো কোনোদিন হাতিখোদরা বা চোরখামারার দিকে৷

জায়গাটার নাম অন্ধারবন৷ নিবিড় বন, দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ঢোকে না৷ রাস্তার একটা বাঁক ঘুরতেই আমাদের নজরে পড়ল একটা অভিনব দৃশ্য৷ রাস্তার মাঝখানে দু-টি জন্তু নিজেদের মধ্যে জোর লড়াই শুরু করেছে৷ রামুন সবেগে জিপ চালিয়ে জন্তু দু-টির প্রায় সামনে এসে সজোরে ব্রেক কষল৷ ভড়কে গিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই থামিয়ে কটমট করে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে৷ পর মুহূর্তে একটা জন্তু লাফ দিয়ে সটান ঢুকে পড়ল গভীর জঙ্গলে৷ অন্য জন্তুটি ডানা মেলে উড়ে গেল৷ মাথার উপরে বারকয়েক চক্কর মেরে অন্ধারবনের অন্ধকারে হারিয়ে গেল৷ নিবারণবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ফ্লাইং ফক্স৷'

অভূতপূর্ব এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম৷ প্রথমে গলা দিয়ে কোনো কথাই বেরোল না৷ তারপর একটু ধাতস্থ হবার পর আমি বললাম, 'ফ্লাইং ফক্স মানে তো বাদুড়৷ কিন্তু এটা বাদুড় নয়, একটা সত্যিকারের উড়ন্ত শেয়াল৷'

প্রথমে ফ্লাইং স্কুইর‌্যাল বা উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি নয়, সত্যিকারের ডানাওয়ালা একটা উড়ন্ত কাঠবিড়ালি৷ তারপর ফ্লাইং ফক্স বা বাদুড় নয়, সত্যিকারের ডানাওয়ালা একটা উড়ন্ত শেয়াল৷

আমি বললাম, 'নাগজিরার জঙ্গল শুধুমাত্র বায়োডাইভারসিটি হটস্পট নয়, জৈব বৈচিত্রের রীতিমতো একটা খনি৷ বিশ্বের তাবৎ জীব বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি এতদিন এদিকে পড়েনি কেন?'

ড. কালে হাসলেন৷ হাসিটা আমার স্বাভাবিক মনে হল না, গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যময়৷ বললেন, 'নাগজিরার জঙ্গল থাকবে নাগজিরাতেই৷ জীববিজ্ঞানীদের সন্ধানী দৃষ্টি এইসব আজব জীবদের আগে কোনোদিন খুঁজে পায়নি, পরে কোনোদিন খুঁজে পাবে না৷'

আমি বিস্ময়টা চেপে রাখতে না পেরে শুধোলাম, 'মানে?'

'মানেটা বুঝতে আর কয়েকটা দিন সময় লাগবে৷'

গত কয়েকটা দিন আমরা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি৷ ভিন্ন প্রজাতির উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি এবং উড়ুক্কু শেয়ালের কথা জানাজানি হলে বিশ্বের তাবৎ জীববিজ্ঞানী মহলে যে বিপুল আলোড়ন উঠবে, ভাবলেই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷ বিশদ তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নাগজিরার জঙ্গল আমরা তোলপাড় করে ফেলেছি৷ কিন্তু ওই এক বার, দ্বিতীয় বারের জন্য কারও দেখা পাইনি৷

সেদিন একটু হতাশ হয়েই ফিল্ড ট্রিপটা মাঝপথেই বাতিল করে আমরা তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম৷ খামারে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল ড. কালের সঙ্গে৷ তিনি একটা বিরাট প্রজাপতি ধরার জাল নিয়ে প্রজাপতির ঝাঁকের পিছনে ছোটাছুটি করছেন৷ দেখতে পেয়েই জালটা রেখে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বোধ হয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝে ফেললেন৷ হেসে বললেন, 'একটু ধৈর্য ধরুন৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার অনেক প্রশ্নের জবাব, আপনি নিজেই পেয়ে যাবেন৷'

আমরা এসে বসলাম একটা শিমুল গাছের নীচে৷ এখান থেকে সেই ঝাঁকড়া কাঁঠাল গাছটা স্পষ্ট দেখা যায়, যার কাণ্ড থেকে কাঁঠালের মতো কয়েকটা বস্তু ঝুলছে৷ ড. কালে বললেন, 'ওগুলো আমার গবেষণার ফসল, এক-একটি প্রজাপতির গুটি৷'

এখন বিকেল হলেও খামারের মধ্যে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে৷ তবুও দূর থেকে মনে হল, একটা গুটি যেন নড়াচড়া করছে৷ একটু পরেই নড়াচড়াটা বেশ বেড়ে গেল, অনেকটা যেন ঝড়ের বাতাসে দোল খাবার মতো৷ এইভাবে চলল আরও কিছুক্ষণ৷ তারপর সহসা গুটির নীচের দিকটা ফেঁসে গিয়ে ধপাস করে কিছু একটা পড়ল গাছের নীচে৷ আমরা দূর থেকেও শুনতে পেলাম সেই শব্দ৷ কৌতূহল দমন করতে না পেরে নিবারণবাবু ছুটে যাচ্ছিলেন সেই দিকে, ব্যাপারটা কী ঘটছে, ভালো করে দেখার জন্য৷ ড. কালে তাঁর হাত ধরে জোর করে টেনে বসিয়ে দিলেন তাঁর পাশে৷

আলোর দৃশ্যমানতা দ্রুত কমে আসছে৷ গাছের নীচে একটা কিছু নড়াচড়া করছে৷ বারকয়েক চারপায়ে টলমল করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও মাটিতে পড়ে গেল৷ আরও কয়েক বার চেষ্টার পর সে উঠে দাঁড়াল৷ একবার চারপাশে তাকিয়ে দেখল৷ তারপর ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল, "হুক্কা হুয়া-আ-আ-৷"

নিবারণবাবু বলে উঠলেন, 'শেয়াল!'

বার কয়েক মাটিতে ডানা ঝাপটাল৷ তারপর ডানা মেলে আমাদের মাথার উপর দিয়ে হারিয়ে গেল জঙ্গলের গভীরে৷ আমরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেইদিকে৷ ড. কালে বললেন, 'শুধু শেয়াল নয়, উড়ুক্কু শেয়াল৷'

একদিন কথায় কথায় নিবারণবাবু বললেন, 'স্যার, আমাকে একটা উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি বানিয়ে দিন৷ আমি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাঁচায় রেখে পুষব৷'

ড. কালে বিষণ্ণভাবে বললেন, 'তাতে খুব একটা লাভ হবে না৷ এই উড়ুক্কু কাঠবেড়ালির ডানা দু-টি প্রজাপতির৷ প্রজাপতির সত্তা নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে এই ডানা৷ তাই এই ডানার মধ্যে জন্তুটির পরমায়ু সঞ্চারিত হয়নি, হয়েছে প্রজাপতির পরমায়ু৷'

একটু থামলেন ড. কালে৷ ঘুরে তাকিয়ে আমাকেই প্রশ্ন করলেন, 'গুটি থেকে বেরোনোর পর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি কতদিন বাঁচে?'

পুরোনো প্রশ্ন৷ জবাবটাও তাই তৈরি ছিল৷ আমি বললাম, 'সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন৷'

'প্রাকৃতিক নিয়মে ওই সময়ের পরে ডানা দু-টির স্বাভাবিক মৃত্যু হবে এবং আপনিই খসে পড়বে৷'

আমি হাঁফ ছাড়লাম৷ প্রকৃতির নিয়ম পালটে দিয়ে কৃত্রিমভাবে নিত্যনতুন জীব সৃষ্টির ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবার যে প্রবল আশঙ্কা ছিল, তা নেই জেনে আমি আশ্বস্ত হলাম৷

আমাদের সময় কাটতে লাগল খামারের মধ্যে ঘুরে-ফিরে প্রজাপতি দেখে এবং জঙ্গলের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করে৷ এর মধ্যেই একদিন ঘটল সেই চমকপ্রদ ঘটনাটা৷

গভীররাতে বাইরে কার যেন পায়ের শব্দ৷ উঠোন জুড়ে দুপদাপ শব্দ করে কেউ কি দৌড়ঝাঁপ করছে? ঘুম ভেঙে গেল৷ বিছানায় উঠে বসলাম৷ জানালায় চোখ পড়ল৷ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর৷ নিবারণবাবুকে ডেকে তুললাম৷ দু-জনে দরজা খুলে বাইরে এলাম৷ বনজ্যোৎস্নায় আলোকিত বনস্থলিকে মনে হচ্ছে যেন কোনো রূপকথার দেশ৷ ঝিঁঝির একটানা সুরেলা তানের সঙ্গে মাঝে মাঝে সংগত দিচ্ছে কাঁকর হরিণের ডাক৷

সামনের ফাঁকা উঠোন জুড়ে একটি লোক একটা বিরাট প্রজাপতি ধরার জাল নিয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে৷ কাছে আসতেই চিনতে পারলাম, ড. কালে৷ আমি সবিস্ময়ে শুধোলাম, 'আপনি কি চাঁদের আলোয় প্রজাপতি ধরে বেড়াচ্ছেন?'

তিনি হয়তো এই সময়ে আমাদের এইখানে আশা করেননি, তার উপরে আমার এই প্রশ্ন৷ একটু থতমত খেয়ে গেলেন৷ আমতা আমতা করে বললেন, 'দুটো প্রজাপতি, খুব বড়ো, খামার থেকে বেরিয়ে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছিল চাঁদের আলোয়৷ আমি তাদের ধরতে যেতেই উড়ে পালাল৷'

ড. কালে হাঁফাচ্ছেন৷ বুঝতে পারলাম, তিনি বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এদের পিছনে দৌড়ঝাঁপ করছেন৷ উঠোনের একপাশে গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি বসার জায়গা৷ একটু জিরিয়ে নেবার জন্য ড. কালে তার উপরে গিয়ে বসলেন৷ আমরাও গিয়ে বসলাম তাঁর পাশে৷

চন্দ্রালোকিত অরণ্যের অপরূপ শোভা দেখতে দেখতে আমরা বোধ হয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম৷ ড. কালেকে উশখুশ করতে দেখে তাঁকে অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকালাম৷ খামারের দিক থেকে অস্পষ্ট দু-টি ছায়ামূর্তি হাত ধরাধরি করে এগিয়ে আসছে৷

চঞ্চল হয়ে উঠলেন ড. কালে৷ ঝুঁকে পড়ে মাটি থেকে তুলে নিলেন প্রজাপতি ধরার জালটা৷ ছুটে যেতে চাইলেন সেই ছায়ামূর্তির দিকে৷ এবারে আমি তাঁকে জোর করে টেনে বসিয়ে দিলাম আমার পাশে৷

ক্রমশ মূর্তি দুটো স্পষ্ট হল৷ ছোটো ছোটো দু-টি মেয়ে চাঁদের আলোয় ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে আমাদের দিকে৷ আরও কিছুটা কাছে আসতে আমরা তাদের চিনতে পারলাম৷ বিস্ময়ে আমাদের দমবন্ধ হবার উপক্রম আর সেই সুযোগে এক ঝটকায় আমার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ড. কালে তেড়ে গেলেন সেই দিকে৷

আমরা দমবন্ধ করে বসে আছি, যেন কোনো রুদ্ধশ্বাস নাটকের শেষ দৃশ্যের অভিনয় শুরু হয়েছে৷ মেয়ে দু-টি সামনের দিকে ঝুঁকে হাত টান টান করে ছড়িয়ে দিল দু-পাশে৷ তারপর আলতো করে শরীরটাকে ভাসিয়ে দিল বাতাসে আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের পিঠের ডানা খুলে গেল৷ প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে হাত ধরাধরি করে তারা উড়তে শুরু করল৷

ডানার উপর চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে৷ সেই ডানা প্রজাপতির ডানার মতোই চিত্রবিচিত্র এবং রামধনুর রঙে রঙিন৷ মাথার উপরে কয়েক পাক দিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে চাঁদের আলোয় ভাসতে ভাসতে তারা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল৷

বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে নিবারণবাবু সহর্ষে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'শুকি আর মুকি৷'

আমি বললাম, 'শুধু শুকি আর মুকি নয়, শুকপরি আর মুকপরি!'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%