ট্রাইটনের শাঁখ

অমিতাভ পাল

পিঠের ঢাউস ব্যাগটা নামিয়ে রেখে গুপিমামা বলে উঠলেন, 'যুদ্ধ জয় করে ফিরলাম রে, মন্টিদি৷'

রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন মা৷ গুপিমামার সাড়া পেয়ে পড়ার ঘরে বই, খাতাপত্র ফেলে আমরাও এসে হাজির৷ আমরা মানে আমি আর আমার বোন৷ আমার নাম মণ্ডা এবং আমার বোন মুড়কি৷ মুড়কি আমার চেয়ে তিন বছরের ছোটো৷ এবারে মামা এলেন প্রায় বছর ঘুরিয়ে৷ এতদিন পরে মামাকে পেয়ে মা-র চোখেমুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস কিন্তু মুখে কপট রাগ, 'গুপে, তোকে না বলেছি, যেখানে-সেখানে যার-তার সঙ্গে মারপিট করবি না৷ তবুও তুই মারপিট করে এসেছিস?'

গুপিমামা প্রবলভাবে মাথা নাড়তে লাগলেন৷ চেহারাটা তো কাঠির ডগায় আলুরদমের মতো৷ আমার ভয় হল, কাঠির ডগা থেকে দমের আলুটা না ছিটকে পড়ে৷ মামা বললেন, 'মারপিট নয় রে, মন্টিদি৷ এ হল যুদ্ধ, জলে-স্থলে মহাযুদ্ধ৷'

মুড়কি আমার হাতে একটা চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল, 'হ্যাঁ রে দাদা, মারপিট আর যুদ্ধের মধ্যে তফাত কী?'

আমি বললাম, 'ছোটোরা যুদ্ধ করলে তাকে বলে মারপিট আর বড়োরা মারপিট করলে তাকে বলে যুদ্ধ৷'

মা বললেন, 'তা একে শুধু যুদ্ধ না বলে মহাযুদ্ধ বলছিস কেন?'

মামা বললেন, 'রামায়ণে রাম-রাবণের যুদ্ধ চলেছিল তেরো দিন ধরে, মহাভারতে কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ আঠারো দিন আর আমাদের যুদ্ধ চলল টানা পাঁচ বছর৷ সময়ের নিরিখে তাই একে মহাযুদ্ধ তো বলা যেতেই পারে৷'

'কোথায় হল এই মহাযুদ্ধ?'

'দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে৷'

এইসব কথাবার্তার মাঝখানে মুড়কি গুপিমামার হাত ধরে টানাটানি শুরু করল৷ ইঙ্গিতটা পরিষ্কার, এবার গল্পটা শুরু করো৷

মামা শুরু করলেন৷ তবে তখনই নয়৷ সন্ধ্যে বেলা বসার ঘরে খাটের উপর পা তুলে বাবু হয়ে বসলেন৷ মায়ের হাতের গরম চিকেন পকোড়ার সঙ্গে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে জমিয়ে শুরু করলেন, 'প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পেনসিলের ডটের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোটো ছোটো দ্বীপ৷ প্রচলিত মানচিত্রে এদের কোনো উল্লেখ নেই এবং অধিকাংশের কোনো নামও নেই৷ কেনিংটন তেমনই একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বীপ৷ দ্বীপটি আমেরিকার বিখ্যাত কেনিংটন কেক সংস্থার মালিক কেনিংটন পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷ বর্তমানে এর মালিক কেনিংটন পরিবারের ছোটো ছেলে ডেভিড কেনিংটন৷

‘ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে হলেও ছেলেবেলা থেকে ডেভিড ছিল অন্যরকম৷ ব্যাবসার চেয়ে ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফির দিকে তার ঝোঁক ছিল বেশি৷ আর সে ছিল সত্যিকারের একজন প্রকৃতি প্রেমিক৷ একশৃঙ্গ গণ্ডারের ফোটো তোলার জন্য সে যখন কাজিরাঙার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সেই সময় তার সঙ্গে আমার আলাপ এবং পরে বন্ধুত্ব৷

'বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারার সময় অন্য মূল্যবান সম্পত্তির পরিবর্তে স্বেচ্ছায় সে এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি চেয়ে নেয় এবং তার পারিবারিক ব্যাবসার অংশ দাদাদের কাছে বেচে দিয়ে মোটা টাকার মালিক হয়৷ সেই টাকায় সে দ্বীপটিকে নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তোলে এবং সেখানেই থাকতে শুরু করে৷

'দ্বীপটি ছোটো৷ আয়তনে কয়েক হেক্টর মাত্র কিন্তু ছবির মতো সুন্দর৷ দ্বীপটিকে ঘিরে প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত নীল জল, তাকে ঘিরে প্রবাল প্রাচীর৷ দ্বীপটি সমুদ্রতল থেকে সামান্য উঁচু৷ উন্মুক্ত সমুদ্রের ঢেউ যেকোনো মুহূর্তে ডুবিয়ে দিতে পারে ক্ষুদ্র দ্বীপটিকে, কিন্তু পারে না৷ দ্বীপের উপর আছড়ে পড়ার আগেই চারপাশের প্রবাল প্রাচীর রুখে দেয় সমুদ্রের তাণ্ডব৷ দ্বীপটিকে ঘিরে তাই সৃষ্টি হয়েছে শান্ত জলের লেগুন বা জলাশয়৷

'সকালে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে অন্যমনস্কভাবে একটা ফোটোগ্রাফি জার্নালের পাতা ওলটাচ্ছিল ডেভিড৷ হঠাৎ তার নজর গেল বাইরের দিকে৷ সেখান থেকে ছোট্ট কাঠের জেটিটা স্পষ্ট দেখা যায়৷ জেটিতে বাঁধা তার প্রিয় স্পিডবোট৷ লেগুনের জলে সাদা রাজহাঁসের মতো অল্প অল্প দুলছে৷ এই বোটটায় চেপে সে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ে দ্বীপটার চারপাশে চক্কর কাটতে বা ছিপ ফেলে মাছ ধরতে৷ তার নজর গেল দ্বিতীয় একটা স্পিড বোটের দিকে৷ ভারি অবাক হল সে৷ এখানে সাধারণত বাইরের কেউ আসে না৷ বোট থেকে নামল গাঁট্টাগোট্টা চেহারার একজন লোক৷ লোকটি কাছে এসে বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করল, এই দ্বীপটার মালিক কে?

'লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখল ডেভিড৷ আগে কোথাও দেখেছে কি? মনে করতে পারল না৷ লোকটির ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্নের জবাব সে ভদ্রভাবেই দিল, আমি৷

'আমি তো বুঝলাম কিন্তু মা-বাবার দেওয়া নাম-টাম একটা কিছু তো আছে, নাকি তাও নেই?

'ডেভিড কেনিংটন৷

'হুম, তুমিই তা হলে সেই কেকওয়ালা জন কেনিংটনের ছেলে৷

'আপনার কি কোনো সন্দেহ আছে?

'সত্যি বলতে কী ছোকরা, আমার একটু সন্দেহ ছিল৷

'সন্দেহের কারণটা কী জানতে পারি?

'কেকওয়ালার ব্যাটা কেকের ব্যাবসা ছেড়ে একটা রুক্ষ আর নির্জন দ্বীপের মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে, কথাটা আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি৷

'আপনার বিশ্বাস হয় কি হয় না তাতে আমার কিছু আসে যায় না৷ এবার বলুন তো আপনি কে?

'সে কী হে ছোকরা, আমাকে তুমি চেন না? আমি হলাম বিখ্যাত জেনকিন্স হোটেল চেনের মালিক৷ আমার নাম রবার্ট জেনকিন্স৷

'তা আপনার মতো একজন স্বনামধন্য ব্যক্তির কী উদ্দেশ্যে এই রুক্ষ এবং নির্জন দ্বীপে আগমন, জানতে পারি কি?

'আঁচ করো, আঁচ করো৷ ঠিক ঠিক আঁচ করতে পারলে জবাবটা নিজেই পেয়ে যাবে৷

'এই রুক্ষ আর নির্জন দ্বীপে আপনি একটা হোটেল খুলতে চান৷

'রবার্টের ভাটার মতো চোখ খুশিতে লাফাতে শুরু করল, এই হল খাঁটি ব্যাবসাদারের মতো কথা৷ অথচ তোমার বৃদ্ধ বাবা ছিল গোঁয়ারগোবিন্দ৷ অনেক চেষ্টা করেও এই সহজ কথাটা তার মাথায় ঢোকাতে পারিনি৷ ঠিক হোটেল নয়, এখানে খুলব একটা বিলাসবহুল রিসর্ট৷ আজকালকার উঠতি পয়সাওয়ালারা নির্জনে ছুটি কাটাতে খুব পছন্দ করে৷ আর জায়গাটা যদি হয় নীল সমুদ্রের মাঝখানে ছবির মতো সুন্দর একটা দ্বীপ, তবে তো কথাই নেই৷ হইহই করে চলবে আমার ব্যাবসা৷

'আপাতত তার কোনো আশা নেই৷

'আশা নেই মানে?

'মানে খুব সহজ৷ আপনাকে আমি আমার দ্বীপে হোটেল খুলতে দেব না৷

'আরে ছোকরা, তোমার দ্বীপে খুলব কেন, আমার দ্বীপে খুলব৷ টাকা দিয়ে গোটা দ্বীপটা কিনে নেব আমি৷

'কেউ বেচলে, তবেই না আপনি কিনবেন৷ দ্বীপটা আমি বেচব না৷

'মুখের উপর না বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল রবার্ট৷ সড়াৎ করে পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে তাক করল ডেভিডের দিকে, আলবাত বেচবে৷ তোমার বুড়ো বাপকে ছেড়ে দিয়েছি বলে, ভেবো না ছোকরা, তোমাকেও ছেড়ে দেব৷

'হঠাৎ নাটকীয়ভাবে চেঁচিয়ে উঠল ডেভিড, এই যে মি. জেনকিন্স, আমাকে ছেড়ে আগে নিজের টুপিটা সামলান!

'হকচকিয়ে গেল রবার্ট৷ টুপিটা সামলানোর জন্য বাঁ-হাতটা বাড়াল মাথার দিকে কিন্তু তার আগেই টুপিটা মাথা থেকে ছিটকে পড়ল বেশ কিছুটা দূরে৷ টুপিটা খুঁজতে গিয়ে নজরে পড়ল, তাঁর বাঁ-পাশে একটু দূরে একটা গাছ৷ সেই গাছের নীচে একজন লোক তার মাথার দিকে বন্দুক তাক করে আছে৷ তার ডান দিকে আরও একজন৷ রবার্ট বুঝতে পারল, তাদের একজনের নিপুণ নিশানায় তার মাথার টুপিটা পাখির মতো উড়ে গিয়েছে৷ তারা দু-জন দ্বীপের দুই সশস্ত্র রক্ষী৷ মুচকি হেসে ডেভিড বলল, এবার কি তবে মাথা?

'শয়তানের মতো খিকখিক করে হাসতে লাগল রবার্ট, বদলা নেওয়ার কাজটা যে বাকি রয়ে গেল৷ তাই মূল্যবান মাথাটা এখনই খোয়াতে চাই না৷

'বেশ, তাহলে মূল্যবান মাথাটা নিয়ে এবার চটপট কেটে পড়ুন৷

'রাগে গজগজ করতে করতে জেটির দিকে পা বাড়াল রবার্ট৷ জেটিতে অপেক্ষা করছিল তার স্পিড বোট৷ সে গিয়ে উঠল তার বোটে৷ বোটটা চলতে শুরু করতেই সে রীতিমতো হুমকির সুরে চেঁচিয়ে বলল, কাজটা মোটেই ভালো করলে না, ছোকরা৷ আবার আমি আসব৷ আসল বোঝাপড়াটা হবে তখন৷

'রবার্ট নিজে এল না কিন্তু কয়েকদিন পরেই এল তার হুমকি চিঠি৷ অতি বিশ্রী ধরনের হাতের লেখায় ততোধিক বিশ্রী ভাষায় লিখেছে, লোকে বলে, আমার নাকি খুব টাকার গরম৷ আমি বলি, আমার শুধু টাকার গরম নয়, আমার মাথাটাও বড্ড গরম৷ তবুও যথাসাধ্য মাথা ঠান্ডা রেখে এই চিঠি লিখছি৷ কত টাকা চাই তোমার? তোমার ওই ক্ষুদ্র এবং রুক্ষ দ্বীপটাকে টাকার নোট দিয়ে ঢেকে দিতে যত টাকা লাগে, তত টাকা দিতে আমি রাজি৷ ভালোয় ভালোয় দ্বীপটা আমাকে বেচে দিয়ে তুমি তোমার বাপ-ঠাকুরদার কেকের ব্যবসায় মন দাও, আর যদি রাজি না হও, ঈশ্বরের দিব্যি, তোমার ওই পুঁচকে দ্বীপটাকে আমি সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেব৷

'চিঠিটা বারকয়েক পড়ল ডেভিড৷ আপনমনে মুচকি হাসল সে৷ লোকটির শুধু মাথা গরম নয়, মাথা খারাপও৷ মাথা খারাপ না হলে কি কেউ ভাবতে পারে, একটা আস্ত দ্বীপকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়ার কথা?

'এরপর নিরুপদ্রবে কেটে গিয়েছে বছর দুয়েক৷ রবার্টের দিক থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ উলটে লোকটির সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে ডেভিড জানতে পারল, জেনকিন্স নামে কোনো হোটেলের অস্তিত্বই নেই আমেরিকায়৷ লোকটি মিথ্যাবাদী, ঠকবাজ এবং একজন পাকা জুয়াড়ি৷ কোনো একটা জালিয়াতির কেসে পুলিশের জালে ধরা পড়ে এখন জেল খাটছে৷ আশ্বস্ত হল ডেভিড৷ আপাতত ধূর্ত লোকটির দিক থেকে বিপদের কোনো আশঙ্কা নেই৷

'বিপদটা শেষ পর্যন্ত এল সম্পূর্ণ অন্য দিক থেকে৷

'একদিন সকালে দ্বীপের চারপাশটা ঘুরে দেখতে গিয়ে ডেভিডের নজরে পড়ল, দ্বীপের এক দিকের প্রবাল প্রাচীরের কিছুটা অংশ যেন ধসে পড়েছে৷ সেই ভাঙা অংশের ফাঁক দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে দ্বীপের উপকূলে৷ এখনও পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যদিও খুব সামান্য কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল৷

'বিপর্যয় ঠেকানোর মতো কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে ডেভিড আমাকে একটা চিঠি লিখল৷ ছোট্ট চিঠি কিন্তু চিঠির প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছে তার উদবেগ এবং দুশ্চিন্তা৷ সে লিখেছে, একটা আস্ত দ্বীপকে কি কেউ সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দিতে পারে? ধূর্ত রবার্টের হুমকিতে নিতান্ত কথার কথা ভেবে এতদিন নিশ্চিন্ত ছিলাম৷ এখন আর নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই৷ যা করার এখনই করতে হবে, নইলে অচিরেই কেনিংটন দ্বীপ তলিয়ে যাবে প্রশান্ত মহাসাগরের জলের গভীরে৷

'আগেও দু-একবার গিয়েছি৷ ডেভিডের আমন্ত্রণে ছবির মতো সুন্দর দ্বীপটিতে ছুটি কাটিয়ে এসেছি৷ একজন ধূর্ত লোক হুমকি দিয়ে বলল আর অমনি আস্ত একটা দ্বীপ জলের নীচে তলিয়ে যেতে শুরু করল! এও কি সম্ভব? ব্যাপারটা কী হতে পারে, দূর থেকে আঁচ করা সম্ভব নয়৷ তাই নিজেই গিয়ে হাজির হলাম৷

'আমাকে কাছে পেয়ে ডেভিড উগরে দিল তা সমস্ত উদবেগ ও আশঙ্কা-একটু একটু করে যদি ধসে পড়তে থাকে প্রবাল প্রাচীর, তবে তো একদিন পুরো প্রাচীরটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর তখন... বলতে গিয়ে শিউরে উঠল সে, ...প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মত্ত জলরাশি পুরো দ্বীপটাকেই গ্রাস করে ফেলবে৷

'আমি বললাম, অসম্ভব নয়৷ কারণ, সমুদ্রতল থেকে দ্বীপটির উচ্চতা খুব সামান্য৷

'তবে কি দ্বীপটিকে বাঁচানোর কোনো উপায় নেই?

'আছে কি নেই, এখনই বলা সম্ভব নয়৷ সবার আগে প্রবাল প্রাচীর ধসে পড়ার কারণটা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে৷

'এর পিছনে কি ধূর্ত রবার্টের হাত থাকতে পারে?

'অসম্ভব নয়৷

'তা কী করে সম্ভব? তাকে তো আমেরিকার পুলিশ আটকে রেখেছে জেলে৷

'এখন আর সব যুদ্ধ সামনাসামনি হয় না৷ আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েও যুদ্ধ করা যায়৷

'কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার তো চক্ষু চড়কগাছ৷ আগে যেখানে প্রবাল প্রাচীরের ফাঁকে ফাঁকে রংবেরঙের ট্রিগার, হক, বাটারফ্লাই অ্যাঞ্জেল বা ক্লাউন মাছকে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি, এখন সেখানে দেখলাম কাঁটার মুকুটধারী অজস্র তারামাছকে৷ ক্রাউন অফ থর্নস স্টারফিশ৷ এই তারামাছ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো তারামাছগুলোর মধ্যে অন্যতম৷ এদের গোলাকৃতি শরীরের পরিধি ষাট সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়৷ সতেরো থেকে একুশটা বাহু থাকে শরীরের চারপাশে৷ প্রতিটি বাহুর উপরে মুকুটের মতো সাজানো থাকে তীক্ষ্ণ কাঁটার সারি৷ কাঁটাগুলো থেকে নির্গত হয় এক ধরনের বিষাক্ত তরল৷ কাঁটার সাহায্যে এই বিষাক্ত তরল শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে সহজেই শত্রুকে কাবু করে ফেলতে পারে৷ তাই জলের নীচে এই তারামাছকে কেউ ঘাঁটাতে সাহস করে না৷

'প্রবাল হল একধরনের অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী৷ এরা দলবদ্ধ ভাবে গড়ে তোলে প্রবাল কলোনি বা প্রাচীর৷ কাঁটার মুকুটধারী তারামাছেরা হামলা করে এই প্রবাল প্রাচীরে, খেয়ে ফেলে জীবন্ত প্রবাল বা পলিপ৷

'ডেভিড শুধোল, এইরকম একটা ছোটো প্রাণীর পক্ষে কি আস্ত প্রবাল প্রাচীর খেয়ে ফেলা সম্ভব?

'আমি বললাম, সম্ভব৷ খাওয়ার ব্যাপারে এরা এক-একটা খুদে রাক্ষস৷ এরকম একটা তারামাছ বছরে প্রায় ছয় বর্গমিটার পর্যন্ত জীবন্ত প্রবাল প্রাচীর খেয়ে ফেলতে পারে৷

'আগে তো কখনো এদেরকে এখানে দেখিনি৷ এরা এল কোথা থেকে?

'এ হল সেই ধূর্ত রবার্টের কাজ৷

'পুরো প্রবাল প্রাচীরটা জুড়ে কিলবিল করছে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তারামাছ৷ রবার্ট যত ধূর্তই হোক, তার পক্ষেও কি সম্ভব এত সংখ্যক তারামাছ বাইরে থেকে এনে এখানে ফেলা?

'সম্ভব নয় এবং তার দরকারও নেই৷ বিশ-পঞ্চাশটিই যথেষ্ট৷ একটা তারামাছ একসঙ্গে প্রায় দু-কোটি ডিম পাড়ে৷ ডিম ফুটে বাচ্চা এবং তাদের বেঁচে থাকার গড় হার যদি মাত্র শূন্য দশমিক এক শতাংশও হয়, একটা তারামাছ থেকে জন্ম হয় প্রায় বিশ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক তারামাছ৷ সুতরাং বিশ-পঞ্চাশটা তারামাছ গত দু-বছরে বংশ বিস্তার করে এসে দাঁড়িয়েছে এই লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটিতে৷

'ডেভিড বলল, একদল জেলেকে নামিয়ে দিই, তারা জাল ফেলে জল থেকে ছেঁকে তুলুক আর ধরে ধরে মেরে ফেলুক ওই ক্ষুদে শয়তানদের৷

'তাও একরকম অসম্ভব৷ এরা ঘুরে বেড়ায় প্রবালের ডালপালার ফাঁকে৷ সুতরাং জাল ফেলে ছেঁকে তোলা সম্ভব নয়৷ ডুবুরি নামিয়ে হাতে একটা-একটা করে ধরা হয়তো সম্ভব৷ কিন্তু তাতে করে বছরে যতগুলোকে মারা সম্ভব হবে, জন্মাবে তার চেয়ে অনেক বেশি৷ এরা রক্তবীজের বংশধর৷ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেও রেহাই নেই৷ প্রতিটি টুকরো থেকে গজিয়ে উঠবে এক-একটি পূর্ণাঙ্গ তারামাছ৷

'তা হলে উপায়?

'লাখ টাকার প্রশ্ন কিন্তু উত্তরটা জানা নেই৷

'কাতরভাবে ডেভিড বলল, যত টাকা লাগে, আমি দেব৷ শুধু একটা উপায় খুঁজে বের করো বন্ধু৷

'যার সঙ্গে লড়তে হবে, তার সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান থাকাটা জরুরি৷ টানা দশ দিন কাটালাম লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে বইপত্র ঘেঁটে৷ কাঁটার মুকুটধারী এই তারামাছটি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল, কিন্তু জানা গেল না, সমুদ্রের নীচে লক্ষ লক্ষ তারামাছকে ধ্বংস করার কোনো বিশেষ উপায়৷ অগত্যা বেরিয়ে পড়লাম উপায় খুঁজতে৷ ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হলাম অস্ট্রেলিয়ায়, যদি কোনো সুলুকসন্ধান পাওয়া যায়৷ কারণ এখানেই আছে পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর, গ্রেট বেরিয়ার রিফ৷

'হন্যে হতে চষে বেড়ালাম অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূল এবং গ্রেট বেরিয়ার রিফ৷ গ্রেট বেরিয়ার রিফ এলাকাটা মোটেই ছোটোখাটো নয়, প্রায় তিন লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার চারশো বর্গ কিলোমিটার৷ তার মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দু-হাজার ন-শো ছোটো-বড়ো দ্বীপ৷

'প্রায় মাস তিনেক ডেভিডের পয়সায় অস্ট্রেলিয়া সফর করে, অবশেষে ফিরলাম কেনিংটনে৷ আমি ফিরতেই ডেভিড সাগ্রহে জানতে চাইল, কিছু পেলে?

'আমি বললাম, বিশেষ কিছু পাইনি৷ অস্ট্রেলিয়ার প্রবাল সমুদ্রে স্কুবা ডাইভিং করে তুলে এনেছি শুধু গুটিকয়েক শামুক৷

'আর কিছু না?

'উৎসাহের আলো জ্বলে উঠেছিল ডেভিডের চোখে-মুখে৷ আমার কথা শুন দপ করে নিভে গেল সেই আলো৷ শামুকগুলো এনেছিলাম একটা ঝোলায় ভরে৷ ঝোলাটা ডেভিডের হাতে দিয়ে আমি বললাম, আপাতত এগুলো ছড়িয়ে দাও প্রবাল প্রাচীরের গায়ে৷

'ডেভিড কোনো কথা বলল না৷ পরাজিত ও বিধ্বস্ত সৈনিকের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে৷ তার কাছে বিদায় নিয়ে আমি ফিরে এলাম৷ আসার সময় শুধু বলে এলাম, আবার দেখা হবে৷'

মা শুধোলেন, 'আবার দেখা হয়েছিল?'

গুপিমামা বললেন, 'দেখা হয়েছিল তিন বছর পরে৷ আমাকে দেখেই ডেভিড আনন্দে জড়িয়ে ধরল আমাকে৷ এবারে দেখলাম, ভাঙা প্রাচীরের জায়গায় গড়ে উঠেছে নতুন প্রবাল প্রাচীর৷ তিন বছর আগে যেখানে দেখেছিলাম লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি কাঁটার মুকুটধারী তারামাছ, এবার সেখানে দেখলাম অজস্র শামুক৷ শিকার ধরার জন্য শামুকের থাকে একটি বিশেষ অঙ্গ৷ একে বলে রাডুলা৷ এই রাডুলার গায়ে থাকে করাতের মতো সারি সারি দাঁত৷ এই করাতের মতো দাঁত দিয়ে জ্যান্ত তারামাছকে এরা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে৷ তারপর তারিয়ে তারিয়ে খায়৷'

মুড়কি অনেকক্ষণ থেকে উশখুশ করছিল৷ সুযোগ পেয়েই প্রশ্ন করল, 'গুপিমামা, তুমি এত কষ্ট করে অস্ট্রেলিয়ায় যেতে গেলে কেন? আমাদের পুকুরেই তো কত শামুক আছে৷'

হেসে ফেললেন গুপিমামা৷ বললেন, 'এরা যে-সে শামুক নয় রে, এরা হল ট্রাইটনস ট্রামপেট৷ এরা এক-একটা লম্বায় প্রায় ষাট সেন্টিমিটার৷ তাহলে কত বড়ো হল?'

মুড়কি দু-হাত ফাঁক করে দেখাল৷ আমি বললাম, 'দু-ফুট৷'

মামা বললেন, 'সমুদ্রের দেবতার নাম পোসাইডন৷ পোসাইডনের ছেলের নাম ট্রাইটন৷ ট্রাইটনও পোসাইডনের মতো একজন গ্রিক দেবতা৷ আমাদের শ্রীকৃষ্ণের যেমন পাঞ্চজন্য শাঁখ, ট্রাইটনের তেমনি ট্রাইটনস ট্রামপেট৷'

গুপিমামা তাঁর ঝোলা থেকে বের করলেন একটা মস্ত বড়ো শাঁখ৷ মা-র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা তোর জন্য৷'

এত বড়ো শাঁখ মা আগে কখনো চোখেই দেখেননি৷ তাই খুশিতে শাঁখটা হাতে নিয়ে ফুঁ দিতেই শঙ্খধ্বনিতে গমগম করে উঠল চারদিক৷ যেন মামার যুদ্ধজয়ের ঘোষণা করল সগৌরবে৷

অধ্যায় ১ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%