সায়ন্তনী বসু চৌধুরী
সেপ্টেম্বরের অন্তিম দিন। অন্ধকার এখন ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। সকাল সন্ধে একতলার হলঘরে বসে বড় কাচের জানালা দিয়ে যে আকাশটা আমি দেখি তার রং এখন জমাট বাঁধা রক্তের মত কালচে লাল। এমন রং, এমন আকাশ আমার আগে দেখা নয়। সরকার পাড়ার গলিটাকে আজ আর বন্ধু বলে মনে হচ্ছে না আমার। অথচ এই গলির প্রত্যেকটি নুড়ি পাথরও আমার চেনা। একটু আগেই চড়াইয়ের মত ছোট্ট ছোট্ট দু’ ঝাঁক পাখি বিক্ষিপ্তভাবে পাক খাচ্ছিল আকাশে। সাধারণত বাসা ভাঙলে কিংবা ডিম হারিয়ে ফেললে ওরা এইভাবেই এক জায়গায় গোল করে চক্কর কাটে। অবাক হয়ে দেখছিলাম। হাতে ধরা সিগারেটটা আমার আয়ুর মত ধিকিয়ে ধিকিয়ে পুড়ে যাচ্ছিল। অনিবার্য ক্ষয় আটকাবে কে? তখনই থানা থেকে ফোনটা এল।
“হ্যালো! মিস্টার দত্ত কথা বলছেন?
গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে বললাম,
“হ্যাঁ, বলছি। বলুন।”
“লালবাজার থেকে সরকার বলছি। একটা খবর আছে মিস্টার দত্ত। দিন চারেক আগে বাইপাস থেকে একটা বডি এসেছে বুঝলেন! আপনার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ঠিক পরের দিন। ইয়ং মেল। বয়স আন্দাজ পঁচিশ ছাব্বিশ। ফর্মাল শার্ট প্যান্ট পরা। আপনারা যদি একবার দেখে যেতেন.....”
অ্যাসিসট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর ইন্দ্রজিত সরকারের পরের কথাগুলো আমি আর শুনতেই পাইনি। শুনতে চাইছিলাম না বলেই কি কানে ঢুকল না? ঠিক জানি না! কার্য কারণ বিশ্লেষণ করে এখন আর কিচ্ছু বলতে পারব না। রিসিভার কানে চেপে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম যুগ যুগান্তর ধরে আমার ঘরের মেঝেতে শুয়ে থাকা শান্ত ধুলোর কণাগুলো পাক খেতে খেতে আচমকাই একটা আভ্যন্তরীণ ঝড় হয়ে উঠছে। শুকনো পাতার মত ভাসতে ভাসতে টেলিফোনের টেবিল ছাড়িয়ে কথাগুলো অনেকটা পথ পেরিয়ে গেল সামনের দিকে। শূন্যের দিকে। তাদের আমি ধরার চেষ্টাও করলাম না। পুপুর কান্নায় আমার কানদুটো প্রায় বন্ধ। অভ্যেসবশত রিসিভার নামিয়ে রাখল আমার হাত। বুবাইয়ের কিনে দেওয়া ছাপা শাড়ির আঁচল মুখে চাপা দিয়ে পুপু ফোঁপাচ্ছে। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ও। ওর দিকে তাকিয়ে নিজেকে একটা আস্ত অপদার্থ বলে মনে হল। গত কটা বছরে পুপুর চেহারা যে হারে ভেঙেছে তার জন্য কি আমি দায়ী নই? কতটা সময় দিয়েছি আমি এই সংসারে? অথচ আজ আমার অদ্ভুত একটা গিল্টি ফিলিং হচ্ছে। আমি চাইছি পুপু আমাকে বারবার “অক্ষম” বলে হেনস্থা করুক। যৌবনে কোনও মেয়েকে যখন রূঢ় ভাষায় প্রত্যাখ্যান করতাম, তখন ঠিক এইরকমই মনে হত আমার। সে মেয়ে হয়ত আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন সাজিয়ে ফেলে অনুতাপে দাউদাউ করে জ্বলছে তখন। গালাগালি, শাপশাপান্ত করে আমার গুষ্টিসুদ্ধ সকলের মুখে ঘৃণাজলে ছিটিয়ে দিচ্ছে, নিরুত্তাপ ভাবটা মুখে ফুটিয়ে তুলতাম ঠিকই; কিন্তু মনে হত জগত সংসারের ঘৃণ্যতম অপরাধী আমি। হ্যাঁ আমিই। তবে পঁয়ত্রিশ পেরোনোর পর আর কখনও অমন হয়নি। বুবাইটা সারাক্ষণ চোখের সামনে ঘুরঘুর করত বলেই কি অপরাধ মাখা কালো অনুভূতিটা আর জড়িয়ে ধরত না আমায়? হবে হয়ত!
পুপুর মুখ অমাবস্যার রাতের মত কালো আর থমথমে। বেরুবার আগে ও ঘরের কাপড়টাও বদলাতে চাইল না। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাতে জল মেখে উসকো খুশকো চুলের ওপর দিয়ে আনমনে হাতদুটো একবার বুলিয়ে নিল। তারপর দেওয়ালে ঝোলানো মা কালীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ভগবান বলে কিচ্ছু নেই জান! থাকলে কি আর আজ...!”
পুপু আবার কাঁদছে। এবার বেশ জোরে শব্দ করে। বাড়ির দরজায় তালা মেরে এখন বডি শনাক্ত করতে চলেছি আমরা। হয়ত ওটাই আমাদের ছেলের বডি। পরশুর আগের দিন থেকে ছেলে বাড়ি ফেরেনি। রাত দশটায় যখন পারিজাতের ফোন এল আমরা কর্তা গিন্নি বেশ খুশি মনেই টিভি দেখছিলাম তখন। পুপু সেদিন শাহী পনির রান্না করেছিল। পনীর বুবাইয়ের পছন্দের খাবার। ছেলেটা ফিরলে একসঙ্গে খেতে বসব বলে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। পারিজাতের কথায় নিমেষেই সমস্ত তাল কেটে গেল। সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে কে যেন খানিকটা কালো ছাই ছড়িয়ে দিয়ে গেল আমাদের চলার পথে।
“বুবাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে কাকু? সাড়ে সাতটা থেকে ওর ফোন ট্রাই করছি। এতক্ষণ তো অফ থাকে না কোনওদিন!”
টেবিলের ওপর থেকে ছোট্ট মোবাইলটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ছেলের নম্বর ডায়াল করতে লাগল পুপু। একবার...দুবার...তিনবার...এমনকী বিশতম বারেও নম্বরটা সুইচড অফই বলল। লক্ষ করলাম, মুহূর্তেই সব আলো মুছে গিয়ে কুয়াশার একটা ভারি চাদর নেমে আসছে পুপুর মুখে।
“ছেলেটার কী হল বলত? এরকম তো কখনও করে না! তবে কি অফিসে কোনও সমস্যা হল অথবা রাস্তায়? রাস্তা পেরোতে গিয়ে তো কত দুর্ঘটনাই ঘটে!”
দুশ্চিন্তায় ঘেমে নেয়ে পুপু আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। আমি মোবাইলে একেবারেই পারদর্শী নই। টেলিফোনের টেবিলের নিচে রাখা ছোট্ট ডায়েরিটা ঘেঁটে ঘেঁটে ছেলের অফিসে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতে, মোবাইলে, এমনকী একে একে তার তিনজন বসকেও ফোন করে ফেললাম আমি।
“শৌণক দত্ত আজ অফিস থেকে কখন বেরিয়েছে বলতে পারবেন কেউ? আমি ওর বাবা বলছি। আসলে ছেলেটা এখনও বাড়ি ফেরেনি তো! বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”
কিন্তু না! কেউই আমাদের একমাত্র ছেলের কোনও খোঁজ দিতে পারল না। বুবাই রোজ ট্রেনে যাতায়াত করে। ইতোমধ্যে স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে কোনও ট্রেন লেট করেনি। নিউজ চ্যানেলগুলোতে বড় কোনও দুর্ঘটনার খবরও নেই। আমাদের কথা একবারও না ভেবেই ঘড়ির কাঁটা ঘোড়া হয়ে দৌড়তে লাগল। পুপু একে একে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগে থাকা সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে জানাতে শুরু করেছে। এক একজন এক একরকম ভয় দেখাতে দেখাতে আমাদের দুটো বুড়োবুড়িকে ঠেলতে ঠেলতে হাওয়ার বেগে চলন্ত গাড়িওয়ালা চওড়া হাইওয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। চোখ বাঁধা অবস্থাতে একে অন্যকে আঁকড়ে রইলাম আমরা। মনে আশা ছিল, বুবাই এসে যদি আমাদের হাত ধরে রাস্তাটুকু পার করে দেয়! কিন্তু...
গেট থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে গলিটুকু পেরোলেই বড় রাস্তা। হাতছানি দিয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে নিলাম।
“কহাঁ জানা হ্যায় সাহেব জ্বী?”
“সিধা লালবাজার চল।”
খেয়াল করলাম লালবাজার শুনে ড্রাইভার একটু অস্থির হয়েও কায়দা করে ভাবটা লুকিয়ে নিল। পুপু আমার কাঁধে মাথা রেখে শক্ত করে চোখদুটো বন্ধ করে রয়েছে। জানি ও জেগেই আছে। কিন্তু বড় ক্লান্ত। পরশু রাত থেকে বেচারি কিচ্ছুটি দাঁতে কাটেনি। না খেয়ে থাকলে ওর শরীর খারাপ হয়ে যায়। একটা চাপা অস্বস্তি আমারও হচ্ছে। তবে আমি কিছুইতেই চোখ বুজতে পারছি না। দু’চোখের পাতা এক হলেই নানান স্মৃতির টুকরো জুড়ে জুড়ে বুবাইয়ের মুখটা ছবির থেকেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দিনের আলোর মত ঝকঝকে ছেলে আমাদের! গতবছর এম বি এ শেষ করল! সামনে মার্চেই ওর প্রথম প্রোমোশন আসার কথা! এইভাবে হারিয়ে গেল! কোথায় গেল! চারপাশের এত আলো, এত সম্ভাবনা, এত রঙিন স্বপ্ন ছেড়ে কোথায় যেতে পারে বুবাই? অভিমান করে কোন অন্ধকারে লুকিয়ে বসে রয়েছে ও?
***
এখন শীতকাল নয়। ট্যাক্সির ইনসাইড রিয়ার ভিউ মিররে দেখছি জমাট বাঁধা খানিকটা কুয়াশা একটা বিশালাকার সাদা ড্রাগনের রূপ ধরে আমাদের ট্যাক্সিটাকে ধাওয়া করে আসছে। কেনও জানি না, ভয় ভয় করছে আমার। কুয়াশাটা যদি আমাদের ধরে ফেলে তাহলে তো আর ফেরার উপায় থাকবে না! বহু বছর আগে একটা ইংরিজি সিনেমাতে দেখেছিলাম, গোটা পরিবার জনমানব শূন্য নির্জন ভ্যালিতে ছুটি কাটাতে গিয়ে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই ঘন কুয়াশার ভেতরে হারিয়ে গেল। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাবা মা আর ছেলে একে অন্যকে দেখতে পাচ্ছে না। নিজেদের গলা শুনতে পাচ্ছে। অথচ দেখা মিলছে না কিছুতেই! ঘটনার বেশ কিছুদিন পর একজন পুলিশ অফিসার পাঁচ জনের টিম নিয়ে ওদের খুঁজতে এলেন। পুলিশ অফিসার আবার মহিলার মানে মা’টির প্রাক্তন। সিনেমার মোড় ওইখানেই যা একটুখানি ঘুরে গেল। কিন্তু আসল বিষয়বস্তু বিশেষ বদলাল না। ঘাস, লতাপাতা, পাথর, টিলা, পোড়ো বাড়ির ভেতরে খুঁজে খুঁজে হয়রান হলেন অফিসার নিজেও। আর সেই বাবা মা ছেলেটা জঙ্গলের ভেতর একই রাস্তায় বারবার ফিরে ফিরে আসতে লাগল। গাছের গায়ে পাথর দিয়ে কত দাগ কাটল ওরা! গায়ের জামা কাপড় ছিঁড়ে ছিঁড়ে ডালে বাঁধল। অথচ সব চিহ্ন কোথায় যেন মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই। না খেতে পেয়ে পেয়ে তিনটে মানুষ তখন চরম মাংসাশী। তাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বুনো পাখি, বিড়াল, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, ছুঁচো চোখের সামনে যা দেখতে পায় কাঁচা চিবিয়ে খায়। কিচ্ছু না পেলে নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনে গুটির মত দেখতে একরমক সবুজ পোকার লার্ভা। সেগুলোই ভালো করে চিবিয়ে নেয়। পোকামাকড়ের লালা লেগে মানুষ তিনটের ঠোঁট, গাল, জিভ পুড়ে গিয়েছে। কথা বলতে, হাসতে, কাঁদতে, ভালবাসতে ততদিনে প্রায় ভুলেই গিয়েছে তারা। এইভাবে ভুল ভুলাইয়ার মত ভ্যালিটার ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে তারা তিনজন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেল এক সময়। উঁচু উপত্যকার একেবারে শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দুপাশে দুই হাত মেলে একে একে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল গভীর এক খাদের গর্ভে। পড়ে যেতে যেতে ওরা অবশ্য একে অন্যকে দেখতে পেয়েছিল; কিন্তু তখন তো আর ফেরার উপায় নেই। মাটির টান শিকারি মৃত্যুর মত বিরাট হাঁ করে ওদের গিলে নিচ্ছে তখন। মানুষ তিনটে মরে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ অফিসারের নিখোঁজ হওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়ল মিডিয়ায়।
আমাদের বুবাইটা তখন বেশ ছোটো। ইমম্যাচিওরড। সিনেমাটা দেখে খুব কেঁদেছিল ও। আমার বেশ মনে আছে, সে রাতে ছেলেটার জ্বর এসে গিয়েছিল। সেদিন আমার আর পুপুর মাঝখানে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। কচি কচি আঙুল দিয়ে সারা রাত আমার জামা আঁকড়ে ছিল। বড় হয়েও ও বোধহয় আমাদের হারিয়ে ফেলার ভয় পেত। মাঝে মাঝে অকারণেই আমাকে কিংবা ওর মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করত। ফ্যালফ্যাল করে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। বুবাই কোথায় গিয়েছে না জানলেও ওর স্পর্শ আমি অনুভব করতে পারছিলাম। চশমাটা খুলে নিয়ে হাঃ হাঃ করে বুকের গরম ভাপ বার করে জামার হাতায় কাচ দুটো মুছে নিলাম। আজকাল বড্ড আকাশ কুসুম ভাবি। এই সময় হঠাৎ কুয়াশা হতে যাবে কেন? হ্যাঁ, বৃষ্টি অবশ্য নামতে পারে।
“ও ড্রাইভার ভাই, বৃষ্টি এল নাকি গো?”
“নহি তো সাহেব। মৌসম আজ বড়া সুহানা হ্যায়। গরমি ভী কাফী কম। আচ্ছা লগ রাহা হ্যায়।”
ড্রাইভার গুনগুন করে কী যেন একটা গান ধরেছে। তার আঞ্চলিক ভাষা মনে হচ্ছে। খুশির গান। চুপ করে গেলাম আমি। বারণ করব ভেবেছিলাম। কিন্তু মনে হল সেটা কি ঠিক হবে? ছেলে হারিয়েছে আমাদের। ক্যাব ড্রাইভার তো শোক পালন করতে বাধ্য নয়। বাইরে বৃষ্টিও নেই! তাহলে কি সবই আমার মনের ভুল? বৃষ্টি বোধহয় আমার মনের ভেতরে ঝরছে। চারদিকটা তাই এরকম ঘষা ঘষা ঝাপসা লাগছে। কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে পুপু। নিঃশ্বাসের তালে তালে ওর অপ্রশস্ত পিঠটা ওঠানামা করছে। ঘুমোলে ওকে এখনও বেশ সুন্দর দেখায়। সেই একুশ বছরের মেয়েটার মত। কোমল, নিষ্পাপ আর কুমারী। আমাদের ছেলেকেও এমনই আদুরে লাগত। বুবাই ঘুমোলে মনে হত যেন কোনও দেবশিশু দোলনায় ঘুমিয়ে রয়েছে। এই তো পঁচিশ বছর আগেও ছেলেটা ঘুমোলে দোলনার পাশে বসে হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম আমি। মা ধমক দিতেন।
“আহ্ বড়ো খোকা! এইভাবে হাঁ করে ঘুমন্ত বাচ্চাকে দেখতে নেই রে। জানিস না, বাপ মায়ের নজর বড্ড তাড়াতাড়ি লেগে যায়! তুই আর বড় হলি না রে!”
ছেলে ঘুম থেকে উঠলে বিজোড় সংখ্যায় শুকনো লঙ্কা এনে ওর গায়ে মাথায় বুলিয়ে দিতেন আমার মা।
“বালাই আপদ বিদেয় হোক। বিদেয় হোক। আমার দাদুভাইটা সুস্থ থাক, ভাল থাক।”
বুবাই জুলজুল করে দেখত। ফোকলা মাড়ি বার করে হাসত। তারপর লংকাগুলো নিয়ে গিয়ে উনুনের গনগনে আঁচে পুড়িয়ে ফেলতেন মা। রান্নাঘরের চারদেওয়ালের ভেতরে চিড়বিড় করে লাল লংকা পুড়ত আর বাড়িসুদ্ধু সকলে হেঁচে কেশে মরতাম। ভারি মজা হত আমার। মা বেঁচে থাকলে আজ গোটা বাড়ি মাথায় তুলতেন। নাতি অন্ত প্রাণ ছিলেন তিনি। আচ্ছা, বুবাইয়ের জন্ম থেকে আজ অবধি এই ছাব্বিশটা বছরে মোট কতবার ওকে নজর দিয়েছি আমি? কোনও হিসেব নেই; তবুও আঁতিপাতি করে স্মৃতি হাতড়ে গুনতে লাগলাম। একবার...দুবার...তিন...চার...পাঁচ...অসংখ্যবার। অসংখ্যবার আমার ছেলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি আমি। লোভাতুর চোখে আমার সন্তানকে দেখেছি ওর প্রতিটা হাসি শেষ হওয়ার পরে। প্রতিটা সাফল্যের পরে। প্রতিবার ওর পাঞ্জবি পায়জামা পরার পরে। তবে কি আমার নজরের দোষেই আজ......!
পুপু যেদিন আমার জীবনে এল, মনে হয়েছিল আজন্মের জমা ধুলোবালি পেরিয়ে আমার ভাঙা মন্দিরে প্রবেশ করে কোনও পূজারিণী বুঝি সজোরে ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। আনন্দে গোটা রাত জেগেছিলাম। সম্ভবত সেই প্রথম আমি ভোর হতে দেখি। অথচ কী আশ্চর্য, যাকে একটু একলা পাব বলে রাতের পর রাত জেগে কাটিয়েছি, সেই পুপুকে মুখ ফুটে মনের কথা বলতে গিয়েই একদিন আবিষ্কার করলাম আসলে আমি জন্ম বোবা। আরও একবার হাত পা ছুঁড়ে যুদ্ধ করে মায়ের গর্ভ থেকে বাইরের আলোয় বেরিয়ে আসতে হবে আমাকে। বুবাই যেদিন পুপুর কোলে এল, সেদিন আমি বরফের মতো শান্ত হয়ে ছিলাম। ভীষণ ভয় করছিল আমার। আসন্ন দিনগুলোর কথা ভেবে বারবার ঘেমে যাচ্ছিলাম। সময়ের এত আগে জন্ম নিচ্ছে আমাদের সন্তান! কী হবে? বাঁচবে তো? অথচ সেই প্রথম দিনই একটা ম্যাজিক হয়ে গেল! বুবাইকে হারিয়ে ফেলতে ফেলতেও ফিরে পেলাম। মিনিট পনেরো ধরে পুপুকে পরীক্ষা করে ডাক্তার বলেছিলেন,
“আপনিই তো হাজব্যান্ড না? আপনাকেই বেছে নিতে হবে। আইদার মাদার অর বেবী। তাড়াতাড়ি করুন, সময় কম। খুব ব্লিডিং হচ্ছে।”
পুপুর বাবা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার মায়ের ছিল সবেতেই তাড়া দেওয়া স্বভাব।
“কী রে বড় খোকা? কী এত ভাবছিস? তুই লিখে দে না আমরা বৌমাকেই চাই।” মা নিজে থেকেই এগিয়ে গিয়েছিলেন অবশেষে।
“ডাক্তার বাবু, মাদারকে বাঁচান আপনি। মাদারকে। পুপুকে আমরা ফিরে পেতে চাই।”
“বেশ। কিন্তু ফর্মে সই করতে হবে আপনার ছেলেকে। আপনার কথায় তো আমরা কিচ্ছু করতে পারব না ম্যাডাম।”
কথাগুলো বলার আগে মা কি সেদিন একবারও ভেবেছিলেন? নিজে হাতে একজন বাবা লিখে দেবে সে তার সন্তানকে বাঁচাতে চায় না! কী মিথ্যে! কী ভয়ানক মিথ্যে! হাসপাতালের কাগজে নাম সই করে সেদিন আমি পুপুকেই বেছে নিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, আমাদের সন্তানকে আমি হারাতে চাইনি। পুপুকেও যে হারাতে চেয়েছিলাম তেমন নয়। তবে অনাগত ওই শিশুটিকে একটিবার ছোঁওয়ার জন্য আমার মন বিদ্রোহ করে কাঁদছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছিল ওঁদের। বিশ্বাস করুন, অপারেশন থিয়েটারের আলো নিভে যেতেই আমার কানে কানে কে যেন বলে গেল হারাইনি, তাকে আমি হারাইনি। সে আছে। তারও অনেক ঘণ্টা পর, কাচের বাক্সের বাইরে দাঁড়িয়ে ভয়মাখা চোখে বুবাইকে দেখলাম আমি। ফোলা ফোলা আধবোজা চোখ, অল্প ফাঁক হয়ে থাকা ছোট্ট ঠোঁট, লালচে চামড়া, একটা জলজ্যান্ত বাচ্চা! ওকে ছুঁতে যে কী ইচ্ছে করছিল আমার!
আজ আমি আবার বুবাইকে দেখতে যাচ্ছি। সেবার আমাদের পরিবারের সকলে ছিলেন। আর এবার আশপাশের লোকেরা সম্পূর্ণ অচেনা। এর আগে কোনওদিন আমি মর্গে যাইনি। কাউকে শনাক্ত করতে আমাকে কখনও ডেকে পাঠায়নি পুলিশ। হঠাৎ মনে হল, আমাদের কোনও আপনজনও তো এইভাবে হারিয়ে যায়নি কোনওদিন! জীবনে এই প্রথম বার কারও ডাকে নিজের ছেলেকে চিনতে যেতে হচ্ছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার তাই না? সময় এইভাবে দাবার চাল চালতে পারে? ভাবা যায়! পুপুর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলাম,
“আচ্ছা, বুবাইকে আমরা ঠিক চিনতে পারব তো?”
পুপু কেঁদে ফেলল।
একটু আগেই পারিজাত ফোন করেছিল। বুবাইয়ের গার্লফ্রেন্ড। কলেজের সময় থেকেই ওরা একে অন্যকে ভালোবাসে। শুরু থেকেই আমরা ব্যাপারটা জানতাম। বুবাই আমাদের কাছে কোনও কথা লুকোয়নি কোনওদিন। মেয়েটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে নানা কথা বলে যাচ্ছিল। তবে কনফিডেন্স আছে মেয়ের।
“কাকিমা ঠিক আছেন তো কাকু? একঘণ্টার মধ্যেই আমরা আসছি। চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবেন।”
“বেশ। সাবধানে এস তোমরা।”
“টেক কেয়ার কাকু।”
পারিজাত! কী সুন্দর নাম! মেয়েটাও বড় মিষ্টি। স্বর্গের ফুলের মতই সুন্দর, প্রাণোচ্ছ্বল। আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে পুপুর একটা মেয়ের শখ ছিল। বারবার বলত, মেয়ে হলে এই করব, ওই করব। আমি বুঝেছিলাম, পারিজাতকে পেয়ে পুপুর সেই সুপ্ত শখটা পূরণ হচ্ছে। আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ও। আলমারি ঘেঁটে ঘেঁটে যত আনকোরা গাঢ় রঙের শাড়ি একধারে সাজিয়ে রেখে পুপু একদিন বলেছিল,
“এসব আর আমার কী হবে? মেয়েটা এসে পরবেখন। কী সুন্দর চেহারা ওর! খুব মানাবে। কী বল?”
বুবাই হারিয়ে গেলে এই মেয়েটা কি আর মনে রাখবে আমাদের? পুপুর শাড়িগুলো কে পরবে? আর কি আমাদের সঙ্গে দেখা হবে পারিজাতের? হয়ত না। হয়ত...
***
আমাদের মুখের সামনে একটা প্লাস্টিকের পাউচ তুলে ধরা হয়েছে। গম্ভীর গলায় একজন অফিসার বললেন,
“বডির কাছ থেকে এই দুটো জিনিস পাওয়া গিয়েছে মিস্টার দত্ত। ভাল করে দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা!”
স্বচ্ছ প্লাস্টিকে মোড়া আকাশি রঙের লিনেনের শার্টের হাতার খানিকটা অংশ দেখেই পুপু চীৎকার করে উঠল। আকাশি নীলের ওপর রক্তের দাগ। শুকিয়ে হালকা বাদামি হয়ে এসেছে।
“এই দেখ, এটা বুবাইয়ের শার্ট। হ্যাঁ, এটা আমার বুবাইয়েরই শার্ট। গতবার পুজোয় ছেলেটা প্যান্টালুনস থেকে কিনল না! আমি জানতাম। আমি জানতাম নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে।”
পুপু কাঁদতে কাঁদতে থরথর করে কাঁপছে। পাউচের ভেতরের অন্য জিনিসটা হল একটা ফার্স্ট ট্র্যাক ঘড়ি। ঘড়িটা আমার খুব চেনা। সেটা দেখে ইস্তক অস্বস্তি চেপে বসেছে আমার বুকে। যতটা সম্ভব উত্তেজনা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।
“খানিকটা ছেঁড়া কাপড় দেখেই তুমি নিশ্চিত হচ্ছ কী করে পুপু? জামাকাপড় তো আর একখানা ম্যানুফ্যাকচার করা হয় না! হয়ত একই ব্র্যান্ডের একই রঙের শার্ট। তোমার ছেলে ছাড়া আর কেউ কি ওই শার্ট কেনেনি?”
হাতের পাতা দিয়ে চোখ মুছে ছেঁড়া হাতায় লেগে থাকা সাদা রঙের বোতামটা দেখিয়ে পুপু বলল।
“সাদা সুতো ছিল না বলে সেদিন কালো দিয়ে টেঁকে দিয়েছিলাম। বুবাই খুঁতখুঁত করতে করতে হাতাটা গুটিয়ে নিয়েছিল। স্পষ্ট মনে আছে আমার। এই দেখ। এটাও কি আমি চিনতে পারব না? মায়ের চোখ কি এত ভুল করবে প্রসূন?”
আমার কাছে আর কোনও জবাব নেই। এ কী করে সম্ভব? আমাকে গুড নাইট না বলেই বুবাই ঘুমিয়ে পড়েছে? আমি সুগারের ওষুধ খেয়েছি কিনা সেটাও জানতে চাইল না একবার? না, আমার মন বলছে, এ আমার বুবাইয়ের শার্ট নয়। আমার আত্মজ শৌনক দত্তর ছোঁওয়া এ কাপড়ে লেগে নেই। এতটা খারাপ কিছুতেই পারে না। আমি জোর করেই পুপুর চিন্তার ওপর আমার মত আরোপ করে দিচ্ছি। আবার দেব। একশবার বলব এই জামা আমার ছেলের নয়। কিছুতেই নয়। কিন্তু জানেন, কুয়াশার মত ভয়টা ভেতর থেকে আবার আমায় আঁকড়ে ধরছে। ভয়ংকর একটা ময়াল সাপের মত পায়ের দিক থেকে পেঁচিয়ে ধরে ভয়টা...ভয়টা এখন একটু একটু করে আমার বুকের দিকে উঠে আসছে। ঠিক যেমন বুবাইয়ের স্কুলের প্রথম অ্যাডমিশন টেস্টের দিন হয়েছিল। ওর মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিনে হয়েছিল। ওর শেষ পরীক্ষার দিনে, ওদের ক্যাম্পাসিং-এর দিনে হয়েছিল আমার, আজ অবিকল তেমন হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে আমার। থেকে থেকে জল তেষ্টা পাচ্ছে। ছেলে আর স্ত্রীয়ের হিম্মত বাড়িয়ে গিয়েছিলাম আমি একা। অথচ ভেতরে ভেতরে নিজের যে কী হয়েছিল সে কেবল আমিই জানি। বুবাইটার প্রত্যেকটা কঠিন দিনে একসঙ্গে একশোটা শকুন আমার হৃদপিণ্ড ঠুকরে ঠুকরে খেত। প্রকাশ্যে সে যন্ত্রণা কাউকেই দেখাতাম না, কিন্তু লুকিয়ে রাখা; সেও তো আর এক যন্ত্রণাই। না, আমি আজও দেখাব না কিচ্ছু। মাথা উঁচু করে পুপুর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বারবার ধমকে ওকে থামিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বডির ওপর থেকে চাদরটা সরে গেলেই যদি বুবাইয়ের মুখটা বেরিয়ে আসে...! উফ! দৃশ্যটা কল্পনা করতেই আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।
“আচ্ছা, আমাদের কি মর্গের ভেতরে যেতেই হবে? অন্য কোনওভাবে কাজটা সারা যায় না?”
“না। আর তো কোনও উপায় নেই। এটুকু যে আপনাকে করতেই হবে মিস্টার দত্ত। এটাই ফর্মালিটি।”
এ এস আই সরকার আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন। অনবরত সাহস যোগাচ্ছেন। এমন নরম প্রকৃতির অফিসার সাধারণত দেখা যায় না। তবে পুপুর সঙ্গে কথা বলার সাহস অফিসারের নেই। ছেলেটার বয়স আসলে খুব বেশি নয়। মেরেকেটে ছত্রিশ সাঁইত্রিশ হবে। হয়ত পুপুর মনের ভেতরকার ভাংচুরটা আন্দাজ করতে পারছেন। আড়ে আড়ে বারবার পুপুর দিকে তাকাচ্ছেন অফিসার সরকার।
***
মর্গ! জীবনে প্রথমবার পা রাখলাম এই জায়গাটায়। একটা ভূতুড়ে বাড়ির মত নিস্তব্ধ এই জায়গা। অশুভ বাতাসে স্থির হয়ে রয়েছে। মৃতদের অস্থায়ী আবাসন! জনমানস শূন্য, নির্জন অথচ এই অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যের ঠিক নিচেই চাপা পড়ে রয়েছে কানের পর্দা ফাটানো অসংখ্য পৈশাচিক চিৎকার, অতৃপ্তি ভরা কান্না আর প্রিয়জনেদের কাছে ফিরে যাওয়ার আর্তি। মৃত মানুষদের সাধারণত আমরা চিন্তাভাবনাহীন বলেই মনে করি। মরণকে বলে থাকি শেষ ঘুম! কিন্তু জমাট বাঁধা স্তব্ধতা আর পুরু বাতাস কেটে কলকাতা পুলিশের কাঁটাপুকুর মর্গের লম্বা করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হল, এই যে এইখানে একটা কামরায় বন্দি হয়ে শুয়ে রয়েছে থরে থরে শীতল আর কঠিন মৃতদেহ, আসলে তাদের মত দুশ্চিন্তা আমাদের কারও মনেই নেই। কারও না। কেউ হয়ত অফিস ফেরতা বাড়িতে বাজার নিয়ে যাবে বলেছিল। হয়ত কেউ বলেছিল, মেলাইয় নিয়ে গিয়ে ছেলেকে একগাদা গ্যাস বেলুন কিনে দেবে। রাতে বাড়ি ফিরে মেয়েকে শোনাবে ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমির গল্প। বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লে খোলা ছাদে হাজার হাজার তারার আলোয় পাশাপাশি পাতা চেয়ারে বসে বউয়ের মান ভাঙিয়ে দুটো মিষ্টি কথা বলবে। কারও ঘাড়ে নিশ্চয়ই বাবা মায়ের দায়িত্ব ছিল। ওষুধপত্র, থেরাপি, ডাক্তার, এক্সরে সবকিছু থেমে গিয়েছে একটি মৃত্যুতে। শুধুমাত্র মৃত্যু নামের একটা ছোট্ট, না না ছোট্ট নয়, বিরাট বড় একটা ঘটনার জন্য সেই সওব কাজ বাকি রাখিয়ে, সব দেওয়া কথা ভাঙিয়ে দিয়ে সময় তাদের কেমন করে জাপটে ধরে রেখেছে এইখানে, এই নির্জন বাড়িটার একটা ঘরের ভেতর। থামতে চায়নি তারা, অথচ তাদের জীবনের ঘড়ি জোর করে থামিয়ে দিয়েছে কেউ! প্রতিটা শিরার ভেতরে রক্তস্রোত স্থির হয়ে গিয়েছে আচমকাই! কী অসহনীয় কষ্ট! আমার মনে হল বুকের ভিতরে সমস্ত অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যাচ্ছে। হৃদপিণ্ডের লাব-ডাব থেমে গেলেও অবাক হব না।
এযাবৎ শুধু টিভিতে আর সিনেমার পর্দায় মর্গ দেখেছিলাম। সাব ইন্সপেক্টর সরকার বললেন আমাদের যেতে হবে স্টোরেজ রুমে। কোল্ড স্টোরেজ রুম! ভল্ট বন্দি হয়ে বডিরা শুয়ে রয়েছে সেখানে! পৃথিবী থেকে সদ্য মুছে গিয়েছে সেইসব শরীরের নাম। কারও কারও আবার নাম পরিচয়ও জানা যায়নি। হারিয়ে যাওয়া মানুষের মত চাক বাঁধা অন্ধকারের ভেতর গুঁড়ি মেরে অথবা কুঁকড়ে শুয়ে রয়েছে সেই শরীর! আমরাও তো সেইরকম একটি বডিকেই চিনতে এসেছি। সে নাকি এইখানে ঘুমিয়ে রয়েছে সাড়ে চারদিন।
বিরাট বড় হল ঘর। হাল্কা নীল রঙের হাফহাতা জামা পরা কমবয়সী একটা ছেলে চাবি ঘুরিয়ে ভারি দরজাটা ধাক্কা মেরে খুলে দিল। তারপর আমাদের মাথা থেকে পা অবধি জরীপ করে নিল একবার। ওরাই এই ঘরের ডিউটিতে থাকে। ডোম। ঘরটায় ঢুকতেই মৃত্যুর নেশাতুর গন্ধ নাকে এল আমার। এ গন্ধ আমার চেনা। মা মারা যাওয়ার পর এই গন্ধটা প্রথমবার পেয়েছিলাম আমি। জলের চেয়েও গাঢ় কোনও তরলে দিন পাঁচ ছয় চিনি ভিজিয়ে রাখলে এরকম একটা নেশা নেশা বিদঘুটে গন্ধ বের হয়। ভ্যাপসা অথচ মাথা ঝিম ধরানো গন্ধ। চোখের সামনে আলো জ্বলছে। ছেলেবেলায় বুবাই যখন অঘোরে ঘুমোত ওকে আমি পাহারা দিতাম। হতচ্ছাড়া মশাগুলো মশারির মধ্যে সেঁধিয়েও ছেলেটার ঘুম ভাঙিয়ে দিত। ছেলের হাতে পায়ে গায়ে গালে লাল লাল র্যাশ হয়ে যেত। সকলেই বলত বুবাইয়ের রক্ত নাকি মিঠে। তাই ওকে মশা কামড়ায় বেশি। রাতে একবার উঠে পড়লে ছেলে আর কিছুতেই ঘুমোতে চাইত না। পুপুর বড্ড ঝঞ্ঝাট হত সেসময়। আমি রাত জেগে ছেলেটার পাহারদার সাজতাম। ওকে কাঁধে ফেলে বারান্দায়, বসার ঘরে, গরমের দিনে খোলা ছাদেও, এমনকী রাস্তাতেও পায়চারি করেছি কত! গুনগুন করে লালাবাই গাইতে গাইতে চাঁদের মা বুড়ির কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছি আমার ছেলের ভাগের নিরাপদ ঘুম! আমার ওই ঘুম পাড়ানি গানের সুরে আসতে আস্তে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বুবাই। ছেলেকে মুনে বসে থাকতে থাকতে কত রাত যে আমার বিনা ঘুমেই কেটে গিয়েছে তার হিসেব করিনি কোনওদিন! অথচ আজ একটা শয়তানি ঘুম, অসময়ের ঘুম আমাদের মাঝে গোটা পাহাড় দাঁড় করিয়ে দিল!
নীল জামা পরা ছেলেটা আচমকাই একটা ভল্টের হাতল ধরে টান মারল। ওষুধের উগ্র গন্ধওয়ালা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আমার গায়ে এসে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। মনে হল, আমাদের ছেলে, আমাদের শৌনক এখুনি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে আমায়। কোমর পিঠ স্ট্রেইচ করতে করতে বলবে,
“কী গো বাবা, এত দেরি করলে কেনও তোমরা? সেই কখন থেকে এই ছোট্ট ট্রেটায় শুয়ে রয়েছি! একটু জলদি আসবে তো? শুয়ে থেকে থেকে আমার ঘাড় পিঠ টনটনিয়ে উঠেছে! তোমাদের না সবেতেই লেট!”
নিজস্ব কায়দায় ডোমটাকে ধমকে উঠলেন ইন্সপেক্টর।
“আবে গাণ্ডু, কুড়ি নম্বরটা বললাম তো! কোনও কথা কান করে শুনিস না। রাতের নেশা এখনও কাটেনি দেখছি?”
ছেলেটা মাথা নিচু করে নিল। সারি সারি স্টিলের ভল্ট। অনেকটা লকারের মতই। প্রতিটাতেই কি কারও না কারও ছেলে ঘুমিয়ে রয়েছে? সাত রাজার ধন, সোনা মানিক? সাদা কুয়াশায় আচ্ছাদিত শান্তির ঘুমই কি ওদের একমাত্র উপহার? এই যে নীল জামা পরা ছেলেটা কি এ কি আসলে ঘুমজগতের পাহারাদার? কাজের চাপে আমাদের বুবাইটা কত রাত ভাল করে ঘুমোতে পারেনি! শুধু কাজ কেনও? তারও অনেক আগে থেকে পড়াশোনার চাপে ও রাত জাগত। বাবা হিসেবে আমি হয়ত ওকে বেশি চাপ দিয়েছি। আর একটু নরম হলে কি আমি বেশি ভাল বাবা হতে পারতাম? জানি না। কিচ্ছু জানি না আমি। কিন্তু এখন এসব ভাবছি কেনও? কী লাভ আর এসব ভেবে? আমার মাথাটা একদম কাজ করছে না। বুবাই আছে। আমাদের বুবাই আছে। বুবাই আছে। একটানা নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে পজিটিভ চিন্তার ট্র্যাকটাই হারিয়ে ফেলেছি দেখছি। পুপু আমাকে আঁকড়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আর কাঁদছে না ও। উত্তেজনায়, ভয়ে, চাপা আতংকে কেমন যেন চুপ হয়ে গিয়েছে। আর পারিজাত! সামনের নভেম্বরেই তো বুবাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে! মেয়েটার মুখের দিকে তাকানোর সাহস আমার নেই। আমি শুধু আবছা আবছা দেখেছি মেয়েটা এসে গিয়েছে।
কুড়ি নম্বর ভল্টটা খুলে গেল। ট্রে তে শোয়ানো ছ’ফুট লম্বা একটা নির্মেদ শরীর। টানটান, দৃঢ়। আমাদের বুবাই জিমে যেত। ছেলের আর আমার উচ্চতা প্রায় একই। উনিশ বিশের ফারাক। না ধরলেও চলে। ছেলে বলত বাপ লম্বা। আর আমি বলতাম আমার ছেলেই দীর্ঘদেহী। অফিসার ইন্দ্রজিত সরকার আমার কাঁধে হাত রেখেছেন।
“নিজেকে সামলান মিস্টার দত্ত। জানি, এ কাজ সহজ নয়। তবুও করতে তো হবে।”
সাদা ধবধবে কাপড়টা সরে যাবে। এইবার...। এইবার...! হঠাৎ মনে হল, সাদা আচ্ছাদনের নীচে স্টিলের টেবিলের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছি আমি, এই প্রসূন দত্ত। আমার বডি শনাক্ত করতে এসেছেন মিসেস শর্বরী দত্ত আর ছেলে শৌনক দত্ত। ছেলেটা মাকে শক্ত করে আঁকড়ে রেখেছে নিজের বুকে। বারবার বলছে,
“কেঁদো না মা। কেঁদো না। বাবার বডি নয় এটা। আমার মন বলছে সব ঠিক আছে। বাবা ঠিক ফিরে আসবে। দেখো!”
ছেলের কথা শুনে ট্রের ওপর শুয়ে শুয়ে হাসছি আমি। কত পরিণত মানুষের মত কথা বলছে বুবাই! আমার জন্য পুপুটা খুব কাঁদছে। বুবাই তাকে সান্ত্বনা দিয়েই চলেছে। বুদ্ধিমান ছেলে আমার! এরই মধ্যে সাদা চাদরের আবরণ সত্যি সত্যিই সরে গিয়েছে কখন, আমি টেরও পাইনি। আমার চোখের তারার ওপর একটা সাদা সর পড়েছে যেন! হঠাৎই দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল পারিজাত। পার্থিব ধাক্কা আর একরাশ স্নিগ্ধ গোলাপের সুগন্ধ ঝাপটা মারল আমার নাকে।
“কাকু...এটা শৌনক নয় কাকু, এ...এটা আমাদের শৌনক নয়। আই নিউ ইট! আমি জানতাম।”
বডিটা আমি দেখিনি, চোখের দৃষ্টিকে আমি আবছায়ায় আড়াল করে নিতে পারি। লাল নীল সবুজের আবছা একটা আবরণ তৈরি করে চোখের সামনেটা বিলকুল ঢেকে দিতে পারি। ঠিক যেমন করেছিলাম ছেলের রেজাল্ট দেখার সময়। পুপুকে প্রথমবার প্রেম নিবেদন করার সময়। পুপুর সি-সেকশন অপারেশন সেরে ডাক্তার যখন বেরিয়ে আসছিলেন, সেই সময়ে। পুপু কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“যার ছেলেই হোক, বাবা মায়ের সঙ্গে যেন শেষ দেখাটুকু হয়। হে ঈশ্বর দয়া কর! অনেক পরীক্ষা নিয়েছ আমাদের। এইবার আমার বুবাইটাকে সুস্থভাবে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।”
অনেক কটা নাম, অনেক অনেক না লেখা গল্প পেটের ভিতর চেপে মর্গের দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ক্যাঁচ শব্দটা মিলিয়ে গিয়েও ভারি বাতাসের বুকে নখের আঁচড় কেটে গিয়েছে। নরকের ঠাণ্ডা আবহ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছি আমরা। পুপু আর পারিজাত এখন অনেকটাই হাল্কা। ওদের বিশ্বাস বুবাই ঠিক ফিরে আসবে। হয়ত আর কটাদিন পর। কিংবা ক’মাস পর। অফিসার আরও কী কী বলে যাচ্ছিলেন। আমি কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনতে চাইছি না বলেই পাচ্ছি না। এবার অবশ্য সবকিছুর কারণ আমার কাছে পরিষ্কার। আমি ওদের কারও সাথে নেই, অথচ ওদের সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটতে হচ্ছে আমায়। আসলে চেক চেক শার্ট আর প্যান্ট পরা আমি, প্রসূন দত্ত, এখন এক পা এক পা করে সেই সিনেমায় দেখা নির্জন ভ্যালিটায় ঢুকছি। কুয়াশা...বাপরে কী ঘন কুয়াশা জমেছে চারিদিকে! আমি জানি না কেনও হঠাৎ এইখানে এলাম। কখন এসে পড়লাম। পারিজাতের ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা এখনও কানে আসছে।
“চাদরটা যখন সরাচ্ছিল না, আমার দম আটকে আসছিল, জান কাকিমা। তবে আমার মন বলছে, শৌনক ঠিক আছে! আমাদের এত প্রার্থনা বিফল হবে না, বল কাকিমা?”
পারিজাতের মা বাবাও পুপুকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ঈশ্বরকে স্মরণ করছেন ওঁরা। আমি ওঁদের কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমার মুখে, চোখে, কানে, ত্বকে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের ওপর এখন ঘন কুয়াশার আস্তরণ! রাক্ষসের মত বিকট হাঁ করে কুয়াশা আমাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। লোকের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে একটু আগেও আমি হাঁটছিলাম, এখন রীতিমত ছুটছি। সেই সিনেমাটায় যেমন দেখেছিলাম, যুবক বাবা দু’হাতে কুয়াশা সরিয়ে সরিয়ে ছেলেকে খুঁজছে। আমিও তাইই করছি এখন। দু’হাতে, প্রাণপণে ভারি ধোঁওয়া কেটে কেটে আমার বুবাইয়ের দিকে এগোনোর রাস্তা খুঁজে মরছি আমি। না, এখন আর কিছুতেই চোখ বন্ধ করব না। আর পালাব না আমি।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা মনের মধ্যে উঁকি মারল। আচ্ছা, উনিশ নম্বর ভল্টে যে শুয়ে রয়েছে সে যদি আমাদের বুবাই নাই হবে, তাহলে বডির পাশে ওই ঘড়িটা কী করছিল? ওই ঘড়ি তো আমি চিনি। দুমাস আগে বেল্ট চেঞ্জ করে এনেছিল বুবাই। পুপু ছেলের জামা কাপড়ের হিসেব রাখলেও ঘড়ি, চশমার, রিস্ট ব্যান্ডের কালেকশন সম্বন্ধে কিচ্ছু জানে না। তবে কি এতক্ষণ ধরে যা ভাবছিলাম, আসল ঘটনাটা ঠিক তার উল্টো? বুবাইকে আমি কোনওদিন নরম হতে শেখাইনি। কী করে শেখাব? আমরা তো নরম হতেই জানি না। মাথায় যদি একবার খুন চাপে, আমাদের এই খোলস ফুঁড়ে যে রক্তলোভী কদাকার জন্তুটা বেরিয়ে আসে সেটাকে কজনই বা দেখেছেন? বুবাই যদি শক্ত হাতে কোনও মানুষের গলার নলির ওপর চাপ দেয়, তাহলে তো...! আসলে প্রচণ্ড রাগ হলে আমার ছেলেটা তেমনই করে কিনা! কায়দা করে সরকারকে জিজ্ঞেস করলাম,
“আচ্ছা অফিসার, ছেলেটির মৃত্যুর কারণ নিয়ে কী যেন বলছিলেন তখন?”
“ওহ হ্যাঁ, কেসটা অদ্ভুত জানেন তো মিস্টার দত্ত! যদিও বেওয়ারিশ বডি নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না কেউ। তবুও এই বডিটার সারা গায়ে কোথাও একটা আঁচড় পর্যন্ত নেই। শুধু স্পাইনাস প্রসেসে সিভিয়ার ইঞ্জুরি। চলতি কথায় বলতে গেলে ঘাড়টা মটকে দিয়েছে কেউ।”
দুয়ে দুয়ে চার করতে কি আমাদের মত জীবের খুব সময় লাগে? আমি নিশ্চিত এ কাজ বুবাই ছাড়া আর কারও হতে পারে না। কারও না। এক মুহূর্তের জন্য আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম, এই কলকাতা শহর, ইট কাঠ পাথরের এই কৃত্রিমতাময় জঙ্গল থেকে বেশ খানিকটা দূরে সবুজ গাছগাছালি ঘেরা একটা অন্ধকার ঝুপসি জায়গার ভেতর দুটো দীর্ঘ হাঁটু মুড়ে মুখটা গুঁজে উবু হয়ে বসে রয়েছে আমার ছেলে। আমার বুবাই। মুখটা লম্বাটে হয়ে অনেকখানি ঝুলে গিয়েছে। ওর পিঠের ওপরে পাশাপাশি ঈষৎ উঁচু দুটি জন্মদাগ থেকে চামড়া মাংস হাড় সরে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে প্রমাণ সাইজের দু’খানা কালো ডানা। বুবাইয়ের চিকন চামড়ার রং এখন আর ফরসা নয়। কিছুটা লালচে। বাদামি ঘেঁষা। ওর শ্বদন্ত দুটোও কি বেরিয়ে এসেছে? হঠাৎ মনে হল, আমার ছেলেটা কি নিজেকে দেখেছে এইভাবে? দেখেছে কি ওর আঙুল থেকে নখ, কান থেকে নাক এখন আমূল বদলে গিয়েছে। যদি ও নিজেকে দেখেও থাকে, আমি নিশ্চিত ভেতরে ভেতরে ভয়ে, লজ্জায় আর ঘৃণায় ও এখন জ্বলছে। এতদিন একটু একটু করে মিথ্যে কথা বলতে বলতে আমি যে স্নেহের মোড়কটায় আমার আত্মজকে আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম, আগলে রেখেছিলাম, আজ নির্ঘাত সেটা ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বাবাকে একটা অপদার্থ মিথ্যুক ছাড়া আর কীই বা ভাববে বুবাই? নিজেকে যে কী ভীষণ বোকা আর ভীরু বলে মনে হচ্ছে আমার, সেটা আপনাদের কী করে বোঝাই? আমি পারতাম জানেন। ওকে স...বটা বলে দিতে পারতাম আমি! বোধ হয় বলে দেওয়াই উচিত ছিল আমার। আর কেউ না জানলেও আমি তো জানতাম, আমাদের রক্তের দোষ একদিন না একদিন ঠিক ফুটে বেরুবে। বুবাই নিজের ক্রোধকে প্রশমিত করতে পারবে না। আমাদের পক্ষে যে সেটা সম্ভব নয়। নোংরা কালো পূতিগন্ধময় হাতগুলো ওর অক্ষিকোটর, নাসারন্ধ্র, ওর কর্ণছিদ্র ভেদ করে একদিন ঠিক বাইরে বেরিয়ে আসবে। শিকারের খোঁজে ছেলেটাকে তারা পথে পথে ছুটিয়ে মারবে। রক্ত আর মৃতদেহের গন্ধ শুঁকিয়ে শুঁকিয়ে পাগলা করে দেবে। অন্ধকার ঝোপের ধারে নেড়ি কুকুরের মত জিভ বার করে বসে থাকবে বুবাই। কাতরাবে, কষ্ট পাবে; কিন্তু কিছুতেই মুক্তি মিলবে না। আমরা কেউ ওই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাইনি। ওই ঘন আন্ধকারকে জয় করে কেউই আলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারিনি। দাদু পারেননি, বাবা পারেনি আর আমি...আমি তো চূড়ান্ত অসফল! একটা হেরে যাওয়া মানুষ। প্রথম যৌবনেই আমি মারাত্মক ভুলটা করে ফেলেছিলাম। লোকে ভেবেছিল আমার পিসতুতো ভাই রূপক আসলে পা পিছলে পড়ে গিয়েছে। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। চারতলার ওপর থেকে ওকে ঠেলে দিয়েছিলাম আমি। হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই। আমার এই দুটো হাত দিয়ে আচমকা সজোরে ধাক্কা মেরেছিলাম রূপকের পিঠে। বেচারা তাল সামলাতে পারেনি। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পিসি পিসেমশাই খুব ভেঙে পড়েছিলেন। আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে অতীতের সেই পাপ বিষাক্ত ছোবলে ছোবলে আমাকে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। রূপককে আমি মারতাম না। কিন্তু কলেজের প্রতি পরীক্ষায় ও যে আমার থেকে কিছু নম্বর বেশি পাচ্ছিল। ওর সঙ্গে দেখা করবে বলে পুপু যে তিনদিন ক্লাস বাংক করেছিল। সেগুলোই তো আমাকে পাগল করে তুলছিল। কী করে ভুলে থাকতাম আমি সেসব? তবে আমাকে কেউ ধরতে পারেনি। একবারের জন্যও নিজের ভেতরের কালরূপটাকে আমি আমাকে টপকে যেতে দিইনি। বুবাইকেও পারতে হবে। আঙুলের খাঁজে লেগে থাকা সমস্ত পাপ, রক্ত, লালা, দুর্গন্ধ ধুয়ে ফেলে ওকে আবার মূল স্রোতে মিশে যেতে হবে। না হলে আমার বংশ, আমাদের বংশ, আমাদের এই রক্তের উদ্দাম প্রবাহকে কে আগামীর দিকে বয়ে নিয়ে যাবে? কে?
না, আর একটা মুহূর্তও দেরি করা চলবে না। পা চালাতে হবে আমায়। দরকার পড়লে আমি এই সাড়ে পঁয়ষট্টি বছরের প্রসূন দত্ত, গোটা গল্পের শেষটাই আজ বদলে দেব। তবুও শৌনক দত্ত ওরফে বুবাইকে তো খুঁজে আনতেই হবে। না হলে ওই ছ’ফুট উচ্চতার ফুটফুটে তরুণ দেহটার হাতের মুঠোয় আটকে থাকা আকাশি নীল লিনেন শার্টের টুকরো আর পথের ধুলোয় গড়াগড়ি যাওয়া ফার্স্ট ট্র্যাক ঘড়িটার নেপথ্যের দাঁড়ানো আমারই ঔরসজাত কুঞ্চিত চর্ম, লোলজিহ্ব, কঙ্কালসার কুচক্রী কালো জীবটির কথা যে আপনাদের অজানা থেকে যাবে পাঠক!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন