বরাভয়

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

এক

“মৃত্যু মানে কী মাম্মা?”

প্রশ্নটা শুনেই বুকের মধ্যিখানটা ধক করে উঠল। তোতা আমার মেয়ে। নভেম্বরে পাঁচে পড়েছে। আজকাল মুখ খুললেই মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে নানারকমের প্রশ্ন করে। প্রশ্নগুলো মূলত দু’ধরনের। জটিল প্রশ্ন আর বড় প্রশ্ন। খুব ভাল করে খেয়াল করে দেখেছি সরল-সোজা প্রশ্নে আমার তোতাটার ঠিক মন ভরে না। আর সোজা উত্তরে তো কদাপি নয়। ইদানিং মেয়েটার এই অসীম কৌতূহলের সামনে সারাক্ষণই ভয়ে কেমন জড়সড় হয়ে থাকি আমি। সমাজের যা পরিস্থিতি, তাতে পাঁচ বছর তিন মাসের একটা মেয়েকে সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আবার বানিয়ে বানিয়ে যে মিথ্যে গল্প শোনাব, তাতেও ধরা পড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। তোতার বাবা অবশ্য মোটামুটি সেফ জোনে বাস করে। সকাল সকাল তার অফিসে বেরোনোর তাড়া আর বেশ রাত করে বাড়ি ফিরে থাকে গুচ্ছের ফাইলপত্র দেখার কাজ। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লাডলির দরবারে সেগুলোকেই অজুহাত হিসেবে পেশ করে প্রতিবার দিব্যি মুক্তি পেয়ে যায় দীপাঞ্জন। কিন্তু মেয়ের প্রশ্ন বাণের হাত থেকে আমি আর কিছুতেই রেহাই পাই না। খেতে-শুতে-উঠতে-বসতে আমাকে তো তোতার মুখোমুখি হতেই হয়। আমারই হয়েছে শাঁখের করাত!

আমাদের মেয়ে একটা মর্নিং স্কুলে পড়ে। বেশ ভাল স্কুল। নামডাক আছে। নিয়মের কড়াকড়িও খুব। অনেক ঝাড়াই বাছাই করে মেয়ের জন্য আমরা স্কুল বেছেছিলাম জানেন! রীতিমত হোমওয়র্ক করে আমাদের দুজনকে ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। পাখি পড়ানোর মত করে দীপাঞ্জন আমায় ট্রেনিং দিয়েছিল তখন। সে কী টেনশন আমার! সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারব তো? আমাদের তোতা সিলেক্ট হবে তো? তবে শেষ রক্ষাটা হয়েছিল। সোম থেকে শনি ঠিক সকাল সাতটায় তোতাদের ক্লাস শুরু হয়। জন্ম থেকেই আমার মেয়েটা লেট রাইজার। ও যখন এক্কেবারে ছোট, তখন খিদে পেলেও চুপটি করে বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকত। পাছে ঘুম নষ্ট হয়ে যায়! এখন অবশ্য ভোর ভোরই উঠে পড়ে। স্কুলে ভর্তির পর যেনতেন প্রকারেণ প্রথম মাসটা কাটিয়ে ফেলেই লক্ষ্মী মেয়েটা দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। ভোরবেলা স্নান করতে গিয়েও তেমন কান্নাকাটি করে না আর। মোজা পরে চুপটি করে পায়ের অস্বস্তি সহ্য করে। পা দাপিয়ে কী টান মেরে খুলে দেয় না আর। সমাজের ইঁদুর দৌড়ে একমাত্র কন্যাটির নাম লিখিয়ে দিয়ে গর্বিত আমিও বেশ নিশ্চিন্ত এখন। ওই স্কুলে নামকরা সব বি সি এস অফিসারেরা পড়েছেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ররা শৈশবে খেলে বেড়িয়েছেন ওই স্কুলেরই মাঠে। আশা করি আমার তোতাও একদিন কেউকেটা হবে।

শুরুর দিকে উঠতে বসতে আমার সাহায্য নিত মেয়ে। এখন আর ভাবতে হয় না। নিজে নিজে রেডি হতে শিখছে ও। উল্টে আমাকেই তাড়া মারে। বুঝি, ও আসলে স্কুলে যেতে বড় ভালবাসে। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বাচ্চা তো, স্কুলেই বন্ধু খুঁজতে যায়। আমার তোতাটা আবার বড্ড মিশুকে। চট করে একেবারে অচেনাকে মানুষকেও আপন করে নিতে পারে। এখন তোতা অনেক বন্ধুও পেয়ে গিয়েছে স্কুলে। এরমধ্যে একদিন স্কুল কামাই করতে বলেছিলাম। মেয়ে কী উত্তর দিল জানেন?

“ভুলে গেলে নাকি মাম্মা? আজ তো আমাদের টিফিন বক্স বদলের দিন। আমি না গেলে ফ্রেন্ডরা রাগ করবে না? আচ্ছা, যদি কাল অফ করি?”

ওর পাকা পাকা কথা শুনে আমি মুখ টিপে হাসি। আগামী দিন যে টিফিনের বদলে অন্য একটি স্বাদু অজুহাত মেয়ের জিহ্বাগ্রে তৈরি হয়ে থাকবে সেটা আমার জানা। দুপুরের দিকটায় হাতে খানিকটা সময় বাঁচে। পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা-গল্প হয়। এই তো সেদিন আমার ক্লাসমেট তুলিকা বলছিল,

“সময় থাকতে থাকতে আর একটা নিয়ে নে সুমি। তুই তো হাউজ ওয়াইফ। তোর সুযোগ আছে। তোতাটা দেখতে দেখতে আরও বড় হয়ে যাবে। দিন দিন আরও সাবলম্বী হবে। কী করবি তুই তখন?”

“আবার? ধুর, আর ওসব নয়।”

খুব কৌশলে তুলিকাকে কাটিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন। আসল কথাটা ওকে বলতে যাব কেনও? সত্যি বলতে কী, আমারও ইচ্ছে হয়। আবার একটা প্রাণকে পেটে ধরি। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখি। আবার সেই মিঠে কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করে পেটের ভেতর নরম তুলতুলে একটা পুতুলের কচি শরীর গড়ে তুলি। মাঝে মাঝে রান্না চাপিয়ে নাভির ওপর হাত রেখে আনমনে আমি নিজের গর্ভাবস্থার কথা ভাবি। তোতা তখন পেটে! কত কেয়ারলেস ছিলাম! ও যে আসছে সে-কথা জানতে জানতেই সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গিয়েছিল। ওই সময়েও অনেক রাত আচমকাই দীপাঞ্জনের সঙ্গে স্রোতে ভেসে গিয়েছি। কখনও কখনও উত্তাল ঢেউয়ের উপর আমাকে বসিয়ে দেদার মজা লুটেছে দীপাঞ্জন। ভাল কি আমারও লাগেনি? ভাবনায় ডানা মেলে আবার আমি ফিরে যাই ওই দিনগুলোয়। কল্পনা করতে জানলে তো টাইমমেশিন লাগে না, তাই না! জানলার বাইরে পাঁচিলের ওপর হয়ত তখন এক জোড়া পায়রা সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। জীবনে এই ওদের প্রথম বার! লাজুক সঙ্গিনীটি বড্ড ঘোরাচ্ছে কামুক নরটিকে। দূর থেকে ডাকতে ডাকতে উড়ে যাচ্ছে দুটো ইষ্টিকুটুম পাখি। এক জোড়া পাতিহাঁস নিরালায় পুকুরের শ্যাওলা ধরা সবজে কোণে গভীর প্রেমে মগ্ন। তারা হয়ত জানেও না, কলমি লতার ঝোপের ভেতর একটা কালকেউটে ফণা তুলে অনাগত ডিমটার কথা ভেবে চলেছে ক্রমাগত। মাদীর পেট হলেই উপোস দেবে কেউটে। সারা শরীর দিয়ে অনুভব করে নেবে আদিম অনন্ত খিদেবোধ! তারপর একদিন গপ করে গিলে নেবে আস্ত ডিম। জুতো কারখানায় বারোটার বাঁশি পড়ছে ভোঁ... ভোঁ... শব্দে। তোতা পেটে থাকতে দীপাঞ্জন কত সময় কাটাত আমার সঙ্গে! রাত বারোটা একটায় পর্যন্ত আমার জন্য আইসক্রিম, মিষ্টি দই, মালাই কুলফি আনতে ছুটত বিনা বাক্যব্যায়ে। আর এখন? একে অন্যের কাছে প্রায় অচেনা হয়ে পড়েছি আমরা। শরীর-মনের দূরত্ব বেড়েছে। আরও বাড়ছে।

ঘড়ি ধরে ঠিক ছটায় আমরা মা আর মেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। লাল সিমেন্টের দালানের পাশে ঝাঁকড়া হয়ে থাকা এরিকার সবুজ পাতাগুলোতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়েই তোতা আমার বাঁ হাতটা জড়িয়ে শেষের আগের সিঁড়িটা থেকে লাফ দিয়ে উঠোনে নামে।

“মাম্মা সেই পুচু পাখির বাসাটা কি এখনও এইখানে আছে? একটু দেখিইই মাম্মা? একটু...!”

নিচু হয়ে পাখির বাসা খুঁজতে যায় মেয়ে।

“না না না তোতা। তোমাকে বলেছি না, হাত দেবে না। দিতে নেই মা। ছানা পাখিরা ভয় পাবে না?”

চেঁচিয়ে উঠি। আমি তো জানি, বাচ্চা সমেত বাসার দিকে অচেনা হাত এগিয়ে এলে মায়ের ঠিক কেমন অনুভূতি হয়! তোতার আগেও যে দু-দুবার স্বপ্ন জমা হয়েছিল আমার গর্ভে। ধরে রাখতে পারিনি তাদের। আচমকাই আমার শরীর থেকে অহেতুক জমা অভিমানের মত বেরিয়ে গিল তারা। দ্বিতীয়বার থকথকে রক্তের ভেতর স্পষ্ট একটা শিশুর অবয়ব দেখেছিলাম আমি। দুঃস্বপ্ন! বাধা পেয়ে তোতা প্রথমে থমকে দাঁড়ায়। তারপর সমঝদারের মত ঘাড় নাড়ে। যেন ভয় পাওয়া ব্যাপারটাকে ও কত বোঝে!

“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ মাম্মা। ওরা ভয় পাবে। বাই বাই পুচু পাখি...।”

হিহি করে হাসতে হাসতে অদেখা পক্ষীশাবকদের বিদায় জানিয়ে মেয়েটা ছুটে আসে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাড়ার মোড় পর্যন্ত আমরা গল্প করতে করতে হেঁটে যাই। আমাদের গল্পে অবাধে আসা যাওয়া আছে অনেকেরই। মিকি কিংবা মিনি মাউস, ছোটা ভীম, ডোরেমন-নবিতা। সোয়া ছ’টার সময় মোড়ের মাথায় নিতাই দার দোকানের সামনে উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্কুলবাসটা এসে দাঁড়ায়। চোখের পাতা থেকে রূপকথার ছোট্ট ছোট্ট ফড়িংগুলোকে হাওয়াতে উড়িয়ে দিয়ে ঘুমভাঙা পাখির বাচ্চার মত আমার তোতাও গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। ডানা ঝাপটায়। মিটিমিটি চোখে একবার আমায় দেখে। মনে মনে বুঝি জিজ্ঞেস করে,

“এবার তবে ডানা মেলি মাম্মা?”

আমি আনমনে আকাশের দিকে দেখি। মেঘ নেই তো? পরক্ষণেই একটুকরো মিঠে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে টুক করে বাসে উঠে জানালার ধারের সিটে বসে অভ্যেসবশত গোলাপি রঙের ফোলা ফোলা হাতের পাতা নেড়ে আমায় টা টা করে তোতা। ওর মুখের অনাবিল হাসিটুকু দেখে মন ভরে যায়। নিজেকে পরিপূর্ণ লাগে। আর কী? এইটুকুই তো চায় একজন মা। পাঁচ-ছ’ ঘণ্টার জন্য বুকের খাঁচা থেকে মেয়েকে বিদায় জানিয়ে অনেকগুলো ছোট বড় ট্যারা বাঁকা প্রশ্নচিহ্ন মনের মধ্যে গেঁথে আমি বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ডিমের খোলা ভেঙে বেরোনো ছানা ঠিকমত উড়তে শিখে গেলে মা পাখিও কি এইভাবেই বাসায় ফিরে আসে? একেবারে একলা একলা?

দুই

আজকাল সকালের দিকটায় রোজই গাঢ় কুয়াশা। আমার তোতার গায়ে উলের হাতকাটা সোয়েটারের ওপর ঘন নীল রঙের ফুলহাতা হুডি জ্যাকেট। জ্যাকেটের পকেট থেকে মোটাসোটা বাদামি রঙা কাঠবেড়ালি উঁকি মারছে। দুহাতে একটা ফোলা চীনেবাদাম ধরে রয়েছে সেটা। থ্রি-ডি প্রিন্ট করা জ্যাকেট। হঠাৎ দেখলে সত্যি বলে ভুল হয়। গতবার শীতে উলেন মেলা থেকে বায়না করে এই জ্যাকেটখানা কিনেছিল তোতা। ওর পানপাতার মত মুখটা হুডির ভেতর থেকে সামান্য বেরিয়ে রয়েছে। দুই গালে আলতো করে পন্ডস এর কোল্ড ক্রিম মাখিয়ে দিয়েছি। গোলাপের গন্ধ বেরুচ্ছে। গত সপ্তাহে নিচের পাটির একটা দাঁত পড়েছে তোতার। হাসলে এখন কী যে মিষ্টি দেখায়! চোখের কোলে আঙুল ঘষে ওর কানের পিছনে আমি কাজলের ফোঁটা দিয়ে দিলাম। আমার চাদরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছটফটে ভঙ্গিতে হাঁটছিল মেয়েটা। হাঁটতে হাঁটতেই ফুটপাথের ওপর ভেঙে পড়া কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল ওর। গতি কমিয়ে তোতা থমকে দাঁড়াল। সম্ভবত গতকাল বিকেলেই গাছটাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। মিউনিসিপ্যালিটির উদ্যোগে রাস্তা চওড়া হবে। মাস খানেক আগে বাড়ি বাড়ি নোটিশ এসেছিল। অনেকেই বাধা দিচ্ছিলেন। সকলের দেখাদেখি আমরাও।

“গাছটা কেটে ফেলা কি সত্যিই খুব প্রয়োজন?”

“আরে বউদি, এত চাপ নিচ্ছেন কেনও? মাটি থাকলে ওরম গাছ আবার কত জন্মাবে। আমরা আছি তো নাকি? পরের বর্ষায় সব ব্যাবস্থা করে দোব।”

ছেলেটার নাম দীপেন না উপেন কী যেন! ঠিক মনে পড়ছে না। ওই একটা কথার লেজ ধরেই সে আমার গায়ে পড়ে অনর্গল বকতে শুরু করেছিল।

“উরিশালা! বউদি দেখছি টবেও অনেক গাছপালা করেছেন। গার্ডেনিং শখ নাকি বউদির?”

দীপাঞ্জন বিরক্ত হয়েই আমাকে ঘরের ভেতর পাঠিয়ে দিয়েছিল সেদিন। ছেলেদের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া লোভের আগুন বোধহয় ছেলেরাও দেখতে জানে! গাছটা কাটার ব্যাপারে আমাদের কারও আপত্তিই ধোপে টেকেনি। ক্লাবের লোকজন সই সাবুদ নিয়ে চলে গেল। ভাঙা বুড়ো গাছ এখন অসনাক্ত মৃতদেহের মত অর্ধেক রাস্তা দখল করে পড়ে রয়েছে। কৃষ্ণচূড়াটাকে দেখে গত রবিবার দুপুরে শোনা নতুন শব্দটা নিয়ে আচমকাই একটা প্রশ্ন করে বসল তোতা। “মৃত্যু কী?” রবিবার দুপুরে রেডিও চ্যানেলে “সবুজের মৃত্যু” নামে একটা অডিও স্টোরি শুনেছিল তোতা। শিশুদেরই গল্প অথচ নামটা যেন বড্ড গভীর। তার পর থেকেই দেখছি কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে আমার মেয়ে যেন অনেকখানি বড় হয়ে গিয়েছে। মনে মনে একটা উত্তর তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিলাম আমি। এলোপাথাড়ি শব্দ ঘাঁটছিলাম। কিছু তো একটা বলতে হবে! আমার হাতটা ধরে হাল্কা ঝাঁকুনি মারল মেয়ে।

“ও মাম্মা?”

“কী রে তোতা?”

“বললে না তো? মৃত্যু মানে কী?”

চুপ করেই রইলাম। তোতা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। মনে মনে অনেক কাটাছেঁড়া করেও একটা যুতসই উত্তর সাজাতে পারছি না আমি। আসলে মৃত্যু যে ঠিক কী নিজেকে সে কথা বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনও সঠিক উত্তর পাচ্ছি না। তোতাকে আর কী জবাব দেব? অবশেষে স্কুলের বাসটা এসে বাঁচিয়ে দিল আমায়। মেয়ের মুখ ব্যাজার। আনমনে হাত নাড়তে নাড়তে স্কুল চলে গেল সে। তোতার হাসি দেখতে পাইনি আমি। বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। হ্যাঁ রে মেয়ে, এত কঠিন প্রশ্ন কেউ ধরে নাকি মাকে? বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম কৃষ্ণচূড়ার মোটা মোটা ডালগুলোকে করাত দিয়ে কেটে আলাদা করা হচ্ছে। অঙ্গ উপাঙ্গহীন স্থূল কাণ্ডটা খানিকটা পরিত্যক্ত মাংস পিণ্ডের মত একধারে পড়ে রয়েছে। রক্ত ছিল না, তবুও আমার মনে হল লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে শুকনো পিচের রাস্তা। তৃষ্ণার্ত রাস্তা! ফুটপাথে একটা রংচটা লোডার এসে দাঁড়িয়েছে। কটা লোক গম্ভীর মুখে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ আলোচনা করছে। গোটা ব্যাপারটা কেমন যেন বিবর্ণ, বিষণ্ণ, অযাচিত আর অমীমাংসিত। অনেকটা সংসারে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া কোনও অশীতিপর বৃদ্ধের শ্মশানযাত্রার মত। আমার গায়ে কাঁটা দিল। মনের ভেতর থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করছে, ওই মেয়েটাকেও কি এইভাবেই চলে যেতে হবে...? ওহ, দেখেছেন, ওই মেয়েটার কথা তো বলতেই ভুলে গিয়েছি আপনাদের! গত সপ্তাহে দিল্লিতে একটা বীভৎস ধর্ষণ হয়েছে!

***

বেডরুমে টিভি চলছে। দীপাঞ্জন এখন একটা পপুলার বাংলা খবরের চ্যানেল দেখছে। টিভির ভলিউম বেশ উঁচুর দিকে। মন দিয়ে না শুনলেও কথাগুলো কানে আসে। ঘরে উঁকি মেরে দেখি, তোতা বাবার পাশে বসে হাঁ করে খবর গিলছে। আমার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। জোরে চেঁচিয়ে উঠে বললাম,

“এই তোতা কী দেখছিস তুই?”

মেয়েটা চমকে উঠে টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিল। এখন অবাক হয়ে আমার দিকে দেখছে। উফ! কী বোকা আমি! কী দেখছে সেটা কি আর ও জানে? নিজেকে একটু গুছিয়ে গলাটা নরম করে বললাম,

“তোতা, একবার পাশের ঘরে যাও তো মা। মিউ কী করছে দেখে এস তো! মিউমিউ তোমাকে খুঁজছিল জান!”

তোতার চমকে তাকানোর দৃশ্যটা ছোট ছোট একরাশ কালো মাকড়শার মত শিরা উপশিরা বেয়ে আমার সারা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। আচ্ছা, ও কি সত্যিই চমকে উঠল? ঠিক দেখলাম তো আমি? চোখের ভুল নয়ত! তবে কি খবরের বিষয়বস্তুও বুঝে ফেলেছে তোতা? সোনালি চুলওয়ালা কথা বলা মেয়েটাকে বুকে আঁকড়ে তোতা ধীরে ধীরে পাশের ঘরে চলে গেল। যেতে যেতেই আমার দিকে একবার পিছন ঘুরে দেখল। আমার মনে হল, মেয়েটার চোখে জল চিকচিক করছে। না, আমার বকুনির ভয়ে নয়, একটা বিকটাকার সর্পিল লিঙ্গের হাঁ-মুখ থেকে বার হয়ে আসা লক্ষ লক্ষ নারী মাংসলোভী স্যাঁতসেঁতে শুঁড়ের ভয়ে। হ্যাঁ আমি নিশ্চিত, ওই ভয়েই আমার মেয়ে কাঁদছে। কতদিন আর সবকিছু লুকিয়ে রাখব আমি? মেয়েরা যে জন্ম থেকেই বুঝতে জানে। গন্ধ পায়। আমি চোখ পাকিয়ে তোতার বাবার দিকে তাকালাম।

“মেয়ের সামনে আবার নিউজ চ্যানেল খুললে তুমি? কতবার বলতে হবে তোমায়? খবরগুলো ওর কানে না দিলেই কি নয় দীপাঞ্জন?”

আমার মেজাজ বিগড়েছে দেখে দীপাঞ্জন একটু ঘাবড়ে গেল। আসলে গত সাতদিন ধরে বাংলা ইংরেজি হিন্দি প্রতিটা নিউজ চ্যানেলে সেই মেয়েটাকে নিয়ে একটানা আলোচনা চলছে। দফায় দফায় বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হচ্ছে। মিডিয়া যা গেলাচ্ছে ইডিয়ট বক্সের সামনে বসে বাধ্য দর্শকরা সোনা সোনা মুখ করে তাই গিলে নিচ্ছেন। রক্ত, মাংস, বিকৃত যৌনাচার কিছুতেই না নেই তাঁদের। কাটাছেঁড়া বিশ্লেষণ চলছে ওইদিনের ধর্ষণের প্রক্রিয়াটা নিয়ে। কিন্তু সেদিন যখন কটা পুরুষ মানুষ শুধুই নেশা আর অশিক্ষার ঘোরে নিজেদের উপাঙ্গ উদ্ধত করে মেয়েটাকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, কে ছিল সামনে? নিজে চোখে কে দেখে এসেছে ওই নারকীয় লীলা? যে মেয়ে ওই তীব্র নির্যাতনের শিকার, সে তো এখন সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ! ঈশ্বররূপী ওই লিঙ্গ তাকে বোবা বানিয়ে ছেড়েছে। তবুও খানিক বাদে বাদে ঘুম থেকে জেগে উঠে সে নাকি লিখে জানাচ্ছে নিজের যন্ত্রণার কথা। অবাক হচ্ছি আমি। লিখে লিখে কি কষ্ট বোঝানো যায়? এত যন্ত্রণা সহ্য করেও কি এখনও সবটা মনে রয়েছে তার? কড়া হাতে কে তাকে চড় মেরে পায়ে ফেলেছিল প্রথমে, ধারাল নখ দিয়ে কে টেনে ধরেছিল লালচে কালো নরম চুলের মুঠি, কে তার নরম নিষ্পাপ স্তনের আগায় উন্মাদ শ্বাপদের মত দাঁত বসিয়ে রক্তের স্বাদ নিয়ে চীৎকার করে উঠেছিল দানবের মত, সওব মনে রেখেছে সে? এখনও? মরে যেতে যেতেও? পুরু সাদা ব্যান্ডেজে ঢাকা ম্লান মুখটার কথা ভাবলেই আমি শিউরে উঠি। শুধু আমার নয়, এ অবস্থা এখন অনেকেরই।

মাংসল ছিদ্র দিয়ে তার শরীরে অনুপ্রবেশকারী কাচের বোতল, লোহার রড, হাতের মুঠো আর বর্শার ফলার মত তীক্ষ্ণ চোখগুলোর কথা ভেবে হাত নিশপিশ করে উঠছে আমাদের। রক্তচাপ বাড়ছে অথচ রাগ চেপে রাখা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এ পোড়া দেশে পাবলিকের রাগ দেখানোর জায়গা কোথায়? মুখোমুখি আলোচনায়? বন্ধের দিনে রেললাইনের ওপর ধর্নায় বসে? নাকি সেফ খেলার ময়দান ফেসবুকে? এসবের পাশাপাশি আরও কয়েক পা উন্নতির দিকে এগিয়ে ট্যালেন্টেড বুদ্ধিজীবীরা বড়জোর দু’ তিনটে লাইন ট্যুইট করে ক্ষোভ উগরে দিতে পারেন। কিন্তু তারপর? মোল্লার দৌড় তো সেই মসজিদ পর্যন্তই সীমিত তাই না? পৃথিবীর বুকে রাত নেমে এলেই গরম গরম ডাল ভাত গিলে স্বচ্ছ চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তে হবে আমাদের। নিজেদের টিকিয়ে রাখবার জন্য ঘুটঘুটে অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে ভাবতে হবে বংশবিস্তারের কথা। পাঁজরে যতই সেঁকো বিষ জমুক না কেনও, জনতার ঘুমিয়ে পড়াটা মাস্ট! গত পরশু আমার বৌদি মাছ কুটতে কুটতে বলছিল,

“কী ইচ্ছে করছে জানিস সুমি? ইচ্ছে করছে এই আঁশ বটিখানা তুলে নিয়ে গিয়ে একটা করে কোপ বসিয়ে দিই ছেলেগুলোর গলায়! জানোয়ারের বাচ্চাগুলোর একটা আবার নাবালক জানিস! মাত্র ষোল বছর বয়স। এখনই এত খিদে? এমন পিশাচের মত খিদে কি কারও থাকতে পারে? মাগো মা! যাইহোক, তুই আমাদের মেয়েটাকে একটু সাবধানে রাখিস সুমি। রাস্তায় ঘাটে কোথাও অযথা ঝামেলায় জড়াস না। বুঝেশুনে প্রতিবাদ করিস। অথবা অন্যায় দেখলেও মুখ খুলিস না। বুঝলি?”

ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবাই কেনও আমাদের পাঁচ বছরের মেয়েটার কথা বলছে? কী আছে ওর শরীরে? নারী শরীর বলতে যা বোঝায়, তোতার দেহে তার চিহ্নমাত্র ফুটে ওঠেনি এখনও। শিশির ধোওয়া একটা পদ্মকুঁড়ির মত ছোট্ট কোমল গোপনাঙ্গ ওর! তাড়াহুড়ো করে ফোন ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। মেয়েটার অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তার ক্ষুদ্রান্ত্রের কিছুটা অংশ নাকি ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল! ষোল বছরের ছেলেটাই নাকি রড ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টেনে বার করে এনেছে সব। অপারেশন করে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। উফ! আমি যত চেষ্টা করছি তার কথা ভাবব না, কিছুতেই ভাবব না, ঘুরে ফিরে ঠিক মনে পড়ে যাচ্ছে। ওই দগদগে ক্ষতগুলোর কথা ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিতে থাকে এখন। অন্তর্বাস খুলে উবু হয়ে যখন বাথরুম করতে বসি তলপেটটা মোচড় দিয়ে ব্যথা ওঠে। ভয় হয় হঠাৎ আমার যোনিটা ফেটে গিয়ে ভেতরের কিছুটা অংশ শরীরের বাইরে বেরিয়ে পড়বে না তো? ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটবে না তো! হতেও তো পারে। হয়ত ভেসে যাবে সাদা কমোড। ঝাঁ চকচকে মার্বেলের মেঝে। আমি দেখতে পাই, বিদ্যুৎচালিত ধারাল করাত হাতে ওরা আমার পাকানো নাড়িগুলো কাটতে আসছে। সাদা পোশাক পরা জনা কয়েক বুদ্ধিমান মানুষ দীপাঞ্জনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমার শরীর থেকে আমারই অংশ আলাদা করে দেবেন এবার যাতে আমার ভাল অঙ্গে পচন ছড়িয়ে না পড়ে। এসব ভাবটে ভাবতেই রাতের সব খাবার হড়হড় করে আমার মুখ দিয়ে উঠে আসে। বমি করতে করতেই মেঝের ওপর বসে পড়ি।

আচ্ছা, ইন্দ্রের সহস্রযোনি প্রাপ্তির গল্পটা মনে আছে আপনাদের? আমি তখন বেশ ছোট! আমাদের মামাবাড়ির পাড়ায় এক বৃদ্ধা থাকতেন। রাঙা দিদা বলে ডাকতাম আমরা। পুরাণের ওই গল্পটা রাঙা দিদার মুখেই আমি প্রথমবার শুনি। যোনি জিনিসটার কাজ যে ঠিক কী তখনও জানতাম না। সত্যি বলতে কি ওই শব্দটাই প্রথম শুনেছিলাম দিদার মুখে। জোর করে সহবাস কাকে বলে সে সম্পর্কেও কোনও ধারণা ছিল না আমার। আদর আর শাসনের ঘেরাটোপে তখন পুতুল খেলনা নিয়ে জীবন আমার। ওসব জানব কী করে? রাঙা দিদা পাড়া গাঁয়ের মানুষ। বছর এগারো বারোর মেয়ে মানে একজন সম্পূর্ণ নারীই বুঝতেন তিনি। আসলে আমার তখন যা বয়স সেই বয়সে তো দিদার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। স্বামীর আগের পক্ষের চার ছেলে মেয়ে নিয়ে জমিয়ে সংসার শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। সম্ভবত ইচ্ছে অনিচ্ছে ভুলে দিদাকে স্বামীর শয্যাসঙ্গিনীও হতে হত। তা সেই রাঙা দিদার মুখে শুনেছিলাম, দেবরাজ ইন্দ্রের কুকীর্তির কথা। ঋষি গৌতমের পত্নী অসীম রুপবতী অহল্যাকে কাছে পাওয়ার জন্য ইন্দ্র নাকি দীর্ঘ সময় ধরে সুযোগ খুঁজছিলেন। অবশেষে একদিন কাম তাড়না সামলাতে না পেরেই গৌতমের ছদ্মবেশ ধরেন ইন্দ্র। দীর্ঘ দিনের উপোসী শরীরে স্বামীর পরশ পেয়ে অহল্যাও আর আটকাতে পারেনি নিজেকে। ঋষি গৌতমের অভিশাপে ইন্দ্রের সারা শরীরে ফুটে উঠেছিল নারি জননাঙ্গ। সহস্রটি যোনি। আমি কী ভাবি জানেন? ভাবি ওই নোংরা, মেয়ে শরীর পিয়াসি ধর্ষকগুলোরও একই শাস্তির প্রয়োজন। মৃত্যু নয়! মৃত্যু মানে তো পরিত্রাণ। সমস্ত যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি। আমি চাই ওদের শরীর বদলে হয়ে যাক অন্ধকার সুড়ঙ্গের মত হাজারটা যোনিপথ। আর দিনে, রাতে লক্ষবার পাতাল থেকে উঠে আসা বিরাট লিঙ্গরূপী শয়তান সেই সংকীর্ণ যোনিপথ চিরে প্রবেশ করুক ওদের অন্দরে। ফালাফালা করে দিক চামড়া, মাংস, শিরা, উপশিরা, যকৃৎ, হৃদপিণ্ড সবকিছু। সঙ্গম যাদের কাছে এতখানি কাম্য, নৃশংস সঙ্গমই হোক না তাদের শাস্তির একমাত্র উপায়। শরীরের সমস্ত তরল নিঃশেষিত হলে কোনও এক ফুটফুটে শিশুকন্যার বিছানার শিয়রে তারা পড়ে থাকুক সহস্রাক্ষু পাহারাদার সেজে। আসতে যেতে তাদের পায়ে দলে যাক কুমারী মেয়েরা।

***

এই কদিনে শহরে ছোট বড় অসংখ্য মোমবাতি মিছিল হয়েছে। আমি রাস্তায় বেরোতে পারিনি তবে ঠাকুরঘরে নিয়মিত বাতি জ্বালিয়েছি। হাতজোড় করেছি পাথরের মূর্তির সামনে। ধর্ষিতা মেয়েটার জন্য সারা দেশ একজোট হয়ে প্রার্থনা করছে। কিন্তু আমার মন বলছে ও মেয়ে আর বাঁচবে না। কী করবে ও ওইভাবে বেঁচে? জোশ টকস এর মত কোনও বড় প্ল্যাটফর্মে আত্মসংগ্রামের কাহিনি শোনাতে যাবে? উদ্বুদ্ধ করে বেড়াবে নব্য ধর্ষিতাদের? নাকি মেডিক্যাল টিমের হাতের গিনিপিগ হয়ে তাদের সঙ্গে দুনিয়া সফর করবে? সেমিনারে সেমিনারে নিজেকে প্রদর্শন করে বলবে,

“দেখুন মেয়েরা, ভাল করে দেখুন তো, নাড়িভুঁড়ি ছাড়াও আমি কেমন বেঁচে আছি দেখুন। অতএব আপনারা নিশ্চিন্তে ধর্ষিতা হতে পারেন। বাধা না দিয়ে ধর্ষণকারীকে সাহায্য করুন। মেলে দিন নিজের অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ। যৌনাঙ্গ ছাড়াও ক্ষুধার্ত পুরুষকে রড, লাঠি, কাচ, পাথর ব্যাবহার করতে দিন। পরম উল্লাসে সে আপনার ত্বক, মাস ভেদ করুক। একটু যন্ত্রণা হবে, রক্তপাত হবে, তবে ভয়ের কারণ নেই। আমাদের দেশের উন্নত চিকিৎসা ব্যাবস্থা রয়েছে তো! আপনাদের আবার বাঁচিয়ে তুলবেন এদেশের জীবন্ত ঈশ্বরেরা।”

ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ কেউ হাত তুলে প্রশ্ন করবেন,

“আচ্ছা, বীরাঙ্গনা শুনেছি আপনার জরায়ু নাকি ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে! আচ্ছা, ভবিষ্যতে আপনি কি কখনও মা হতে পারবেন? আই মিন ফিটাস ক্যারি করতে সমস্যা হবে না তো?”

চোখে সংশয় নিয়ে মেয়েটি এইবার তাকাবে মেডিক্যাল টিমের দিকে। কী হল? এটা তো স্ক্রিপ্ট বহির্ভূত প্রশ্ন! উত্তর জানা নেই ধর্ষিতার। অবশেষে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নেবেন রক্ষকরা। পাবলিককে বোঝাবেন নিজেদের মত করে। মা হওয়া এমন কী আর আহামরি ব্যাপার? বায়োলজিক্যাল চাইল্ড না হলেও রক্ত মাংসের সন্তান লাভের হাজারটা পথ রয়েছে। দরকারে আরও আরও উপায় আবিষ্কার করে ফেলবেন বিজ্ঞান। চিন্তা কীসের? এই যে এতদিন পর জানা গেল, মানুষের শুক্রাণু নাকি ইল মাছের মত দৌড়োয় না, চরকির মত পাক খেতে খেতে ডিম্বাণুর দিকে ধেয়ে যায়। জানত নাকি কেউ? তেমনিই ওপর মহল থেকে আবার জানিয়ে দেওয়া হবে, মনের জোরেও সন্তান উৎপাদন সম্ভব। এইটুকু আশ্বাস পেয়েই বাহবা আর হাততালিতে গোটা হল ফেটে পড়বে। ধর্ষিতাদের জন্য দেশের নতুন পরিকল্পনা বলে কথা! বাস্তবায়িত হল নাকি হল না, সেটা আর কে দেখে?

এই মেয়েটা যদি বেঁচেও যায়, ঘরের চার দেওয়ালে লুকিয়ে নিয়ে পরিবারেরই কেউ যে তাকে নোংরা বলবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? সমাজ না আমাদের সরকার? আমি যে এক তাল কালো ঝুলের নেগেটিভ ভাবছি, বুঝতে পেরেই দীপাঞ্জন খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরল। নিঃশব্দে ওর মুখের দিকে তাকালাম। ভীষণ উত্তেজনায় ঘামছি। শরীরটা কেমন যেন থরথর করছে। ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। কিন্তু মুখে কিচ্ছুটি বলতে পারছি না। আমরা দুজনেই চুপ। ভয়টা আমাদের মেয়েকে নিয়ে। ও শুনে ফেললেই আবার নতুন একটা প্রশ্ন করে বসবে। দীপাঞ্জন সরে যাবে। ওর প্রশ্নের সামনে থেকে আমি তো পালাতে পারব না। তখন হবে আর এক বিপদ! আসলে আমরা যেদিকেই যাচ্ছি একশ আটটা চোখ বার করে সেই লিঙ্গটা আমাদের লক্ষ করছে। একটা ভাসমান ব্লেডের মত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের। যেন একটু সুযোগ পেলেই গলার নলিটা কেটে দেবে। অথবা মুখগহ্বর দিয়ে শিশ্নরূপী শুঁড় ঢুকিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে দেবে অন্দরের সবকিছু।

আমাদের তোতার শ্রবণশক্তি প্রখর। আই কিউ দুর্দান্ত। স্কুলের প্রতিটা প্যারেন্টস টিচার মিটিং-এ মেয়ের কীর্তিতে অভিবাদন জানানো হয় আমাদের। তাই তো ওকে লুকিয়েই খুব সতর্ক হয়ে আমরা আপডেটটুকু জেনে নিচ্ছি প্রতিবার।

তিন

দিন দশেক আগে ধর্ষিতা মারা গেল। আসল নামটা আমি এখানে লিখতেই পারতাম, কিন্তু নিয়ম! ওই নিয়মের হাতেই তো আজীবন মার খেয়ে গেলাম আমরা। খবরে দেখিয়েছে জানেন, সুগন্ধি ফুলের ভারি ভারি মালার আড়ালে ঢাকাঢুকি দিয়ে খানিকটা যেন চুপি চুপিই তাকে পুড়িয়ে ফেলা হল। সিরিয়াস মুখে সংবাদ পাঠক বলে গেলেন কান্নার শব্দ বাড়লে বাইরে জনরোষ বাড়ার ভয় ছিল। তাই এই লুকোচুরি। মেয়ের বাবা মাকে রাজি করিয়ে তবেই কাজ করেছে সরকার। ব্যাস আর কী! দীপাঞ্জন আবার নর্মাল রুটিনে ফিরে গিয়েছে। উদয়াস্ত গাধার মত খাটুনি তার। খবর টবর দেখার বিশেষ সময় হয় না। আমার বৌদিও মনের সুখে নতুন একটা আসন ধরেছে। কী যেন নাম সেলাইটার! সেদিন বলেছিল। মনে রাখতে পারিনি! মানসিক অশান্তি নিয়ে বোধহয় সেলাইয়ের মত আদুরে শিল্পের নাম মনে রাখা সম্ভবও নয়।

সেদিন অফিস থেকে ফিরে যাহোক দুটো দানা পানি মুখে গুঁজেই দীপাঞ্জন মড়ার মত ঘুমিয়ে পড়ল। চারদিকে পিন ড্রপ সাইলেন্স। মোবাইলটা চাদরের তলায় লুকিয়ে নিয়ে আমি মৃতার ছবি দেখছিলাম। রোজই দেখি তাকে। রোগাটে চেহারা, মাজা মাজা গায়ের রং, টিকালো নাক আর একঢাল চুল। আহামরি কিছু দেখতে ছিল না। কেবল তার চোখদুটো ছিল বড্ড গভীর! না, গভীর ঠিক নয়। চোখদুটোতে অস্বাভাবিক একটা টান! অপার্থিব ওই চোখ দেখতে দেখতেই ভোররাতের দিকে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। আমি দেখলাম দীপাঞ্জন আর আমার মাঝে তোতা নেই। আমাদের মেয়ের বদলে আমাকে ছুঁয়ে বিছানায় শুয়ে রয়েছে মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো সেই মেয়েটা। হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই মেয়েটা। সেইদিন স্পষ্ট টের পেলাম একটা গোলমাল শুরু হয়েছে আমার মাথার ভেতরে। প্রথম দু’দিন আমার মনে হল ভুল দেখছি। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। অচেনা অজানা একটা ধর্ষিতা মেয়ে আমাদের মাঝে এসে শুয়ে থাকবে কেনও? আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইবেই বা কেনও? তাকে তো আমি চিনি না, জানি না, জীবনে কোনওদিন দেখিওনি। আর সবচেয়ে বড় কথা হল সে তো এখন মৃতা। সৎকার হয়ে গিয়েছে তার। আমার মত সাধারণ একজন গৃহবধূকে সে নিজের কথা বলতে ছুটে আসবে কেনও? কী করতে পারি আমি তার জন্য? আমার আর কতটুকু ক্ষমতা? কিন্তু না, বারবার তাকে দেখা আসলে আমার মনের ভুল ছিল না।

গত দশদিনে আরও কিছু নতুন খবর ছাপা হয়েছে। কাগজের তৃতীয় পাতায়, পঞ্চম পাতায় কিংবা ষষ্ঠ পাতার ওপরের দিকে জায়গা করে নিয়েছে একঝাঁক নতুন মেয়ে। তেরো থেকে তিরাশির সাহসিনী তারা। উঁহু, নিজের নামে নয়। ছদ্ম বিশেষণে তাদের গল্প জেনেছে পাবলিক। এখন ওই মেয়েটার চোখদুটো যেন আরও সক্রিয়। সবসময় আমার আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। গ্যাসের নব থেকে কিচেন ক্যাবিনেট সর্বত্র নজরদারি চালায়। ঘুমের মধ্যেও বারবার তাড়া করে আমাকে। এই ধরুন দুপুরের কাজকর্ম সেরে একটা গল্পের বই পড়ছি। হালকা প্রেমের গল্প। শোওয়ার ঘরের জানলার পর্দা দুটো হাওয়ায় ডানা মেলে উড়ছে। দেওয়ালের গায়ে রোদের আলপনা ফুটেছে। গোলাকার, চৌকোণা, তিনকোণা নানারকম আকারের আলপনা। হঠাৎ সেই আলপনাই বদলে হয়ে যায় ধর্ষিতা মেয়ের চোখজোড়া। আগুনের মত ফুঁসতে ফুঁসতে তারা আমাকে দেখাতে শুরু করে গায়ে কাঁটা দেওয়া একটা রেপ সিন। আমার কান ফাটিয়ে দিতে থাকে মেয়েটার চিৎকার। দেখতে দেখতে মুহূর্তের মধ্যে আমার সারা ঘর লাল রক্তে ভরে যায়। আমি সেই রক্তের স্রোতে ভাসতে থাকি। হাবুডুবু খেতে থাকি।

***

আজকাল আমি সারাক্ষণ ভাবি তোতা বড় হলে ওকে ঠিক কেমন দেখতে হবে! কেমন! কেমন? আমার মত মাঝারি গড়ন হবে নাকি দীপাঞ্জনের মত লম্বা চওড়া হবে ও? মেয়েটা বড় হয়ে গেলে ওকে আমি আগলাব কেমন করে? আজকাল তো সবাই পাশ্চাত্যের পোশাক পরছে। তোতাও নিশ্চয়ই পরবে। হট প্যান্ট, রিভিলিং ড্রেস কিংবা মিনিস্কার্ট! ওর বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেলে কী করব আমি? বাসি বিছানা গোছাতে গোছাতে, ডালে ফোড়ন দিতে দিতে, গরম তেলে নুন-হলুদ মাখানো কাটাপোনার টুকরো ছাড়তে ছাড়তে এসবই আমার চিন্তা। একান্তই ব্যক্তিগত। দীপাঞ্জনকে বললে সে মোটেই বুঝবে না। তাছাড়া আমি বলতেও যাই না কখনও। তোতাকে খাওয়াতে, শোওয়াতে, ওঠাতে, বসাতে বারবার তার জামা প্যান্ট চেক করি। রক্ত লেগে নেই তো কোথাও? কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই?

“তোতা, মাম্মাকে তুমি সবকিছু বল তো তোতা? কোনও কথা হাইড করবে না কিন্তু!”

মেয়েটা গাল ফুলিয়ে হাওয়া দিয়ে কুলকুচি করতে করতে জানতে চায়,

“হাইড অ্যান্ড সিক কি বাজে গেইম মাম্মা?”

আমি হোঁচট খেতে খেতে বলি,

“মাম্মার সঙ্গে খেলতে নেই ওটা। বুঝেছ?”

বহু কষ্টে মেয়েকে বোঝাই কেউ ওর ছোট্ট শরীরের ঢাকা জায়গা গুলোতে হাত দিলে সে যেন গলা ফাটিয়ে কেঁদে ওঠে। চেঁচিয়ে উঠে সাহায্য চায়। মুঠি পাকিয়ে হাত ছোঁড়ে। লাথি মারে নোংরা লোকেদের মুখে, বুকে, দু’পায়ের মাঝখানে। খিমচে দেয় চোখ আর নাকে। ওকে বোঝাতে বোঝাতে আমি নিজেই ভয়ে আঁতকে উঠি। মেয়েটা হয়ত ভয় পায় মাকে দেখে। কুঁকড়ে আমার কোলের কাছে সরে আসে।

আমি ভাল নেই। এক মুহূর্তের জন্যও আমি শান্তি পাই না। গোটা রাত এপাশ ওপাশ করে করে দু চোখের তলায় ঘন কালি জমিয়ে ফেলেছি। গত মাসের সিটিং-এ ডাক্তার সেন বকুনি দিয়ে বলেছেন,

“দুশ্চিন্তাগুলো একটু কমান মিসেস মিত্র। এই বয়সে আপনার এত দুশ্চিন্তা কীসের? এইভাবে চললে তো আপনি সম্পূর্ণ...”

ভেবেছিলাম ডাক্তারকে একবার জিজ্ঞেস করি,

“আপনার ঘরে কি কন্যাসন্তান আছে ডাক্তার বাবু? যোনিওয়ালা কোনও শরীর আছে আপনার বাড়িতে? থাকলে হয়ত আজ আপনারও এই দশাই হত।”

কিন্তু পারিনি। ওই যে চক্ষুলজ্জা! সেটাই অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

চার

কথায় আছে না, “যেখানে ভূতের ভয়...সেখানেই সন্ধ্যা হয়।” আমার ভয়টাও একদিন সত্যি হয়ে গেল জানেন! সেদিন দেখি তোতাদের স্কুলের নাম খবরে বলছে। ঘটনাটা অত্যন্ত তেতো। স্কুল থেকে ফেরা ইস্তক আমার মেয়েটা চুপ করে রয়েছে। খোদ পুলিশ কমিশনার বিষয়টা দেখছেন। প্রধান অভিযুক্ত তোতাদের ক্লাস টিচার। তিনি ছাড়াও বাস ড্রাইভার, আর হেড সুইপার রয়েছেন তালিকায়।

কান্নার মত আওয়াজ শুনে তালা বন্ধ বাথরুম থেকে একটা বাচ্চা মেয়েকে উদ্ধার করে এনেছে দারোয়ান। বাচ্চাটার সাদা জামা রক্তে ভিজে জবজব করছিল। ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে বমি করে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল সে। চেতন আর অবচেতনের মাঝের অতল শূন্যতায় ডুবতে ডুবতেও সেই মেয়ে কাঁপা কাঁপা আঙুল তুলে অপরাধীকে সনাক্ত করেছে। টিভি চালিয়ে কুটনো কাটতে বসেছিলাম আমি। খবরটা কানে আসতেই দুটো আঙুল আড়াআড়িভাবে বঁটিতে বসে গেল। পড়ি কী মরি করে মেয়ের স্কুলে ছুটে গেলাম। গেটের সামনে দাঁড়িয়েই কাঁদতে কাঁদতে তোতা জড়িয়ে ধরল আমায়,

“সহেলি আমার বন্ধু মাম্মা। শী ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর খুব পেইন হচ্ছে মাম্মা। ও খুব কাঁদছিল জান। সহেলির কী হয়েছে মাম্মা? বল না। বল না। ওকে কি কেউ মেরেছে?”

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। ভয়ে আমার হৃদপিণ্ড তখন গলার কাছে উঠে এসেছে। সহেলি না হয়ে মেয়েটা যদি আমার তোতা হত!

ব্যাস! ওইটুকুই। আমার মাথায় একটা বাজ ফেলে দিয়ে আমার কথা বলা পুতুলটা আজ এক্কেবারে চুপ করে গিয়েছে। মুখটা শুকিয়ে ম্লান। একটাও কথা নেই। আর কোনও প্রশ্ন করছে না তোতা। এই সমাজের নিত্য চলমানতার মাঝে, সভ্য তথাকথিত শিক্ষিত সভ্য নারী পুরুষের মধ্যে ক্যামোফ্লাজ করে থাকা সেই বিরাট লিঙ্গটা গলন্ত লাভা উগরে দিতে দিতে ওকে আজ চুপ করিয়ে দিয়েছে। অথচ কী অদ্ভুত কাণ্ড দেখুন, এখন আর আমার ভয় করছে না। আজ আর আমি মেয়ের প্রশ্নের সামনে থেকে পালাতে চাইছি না।

বাড়ি নিয়ে এসে তোতাকে যত্ন করে স্নান করিয়ে দিলাম। আজও বারবার ওর পদ্মকলির মত অঙ্গটা পরীক্ষা করেছি। সকলের আড়ালে ওকেও কেউ...? না, এখনও আমার মেয়ের দিকে কালো হাত এগয়ে আসেনি। ওর পছন্দের বাটিতে চকলেট কেক আর মিল্ক কুকি সাজিয়ে দিয়েছি। স্নান করিয়ে যখন তোতার গা মোছাচ্ছিলাম, তখনই সে এসে পড়েছে। দেওয়ালের গায়ে ফুটে ওঠা চোখদুটো আমি খেয়াল করেছি। আসলে আমাদের মধ্যে এখন একটা অদ্ভুত সিনক্রোনাইজেশন কাজ করে। আমি কী ভাবছি সে বুঝে ফেলে। তবে আজ সে একেবারে আসল চেহারা নিয়েই এসেছে। আঁকায়, কবিতায়, গানে ডানা ফানা লাগিয়ে লোকজন তাকে পরি সাজায় বটে, কিন্তু আদতে তো সে একটা মেয়ে। রক্ত মাংসের অত্যন্ত সাধারণ এক মেয়ে। মরে পচে দুর্গন্ধ হয়ে সমাজের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়া একটা ক্রাইমের শিকার।

তোতাকে বেডরুমে নিয়ে এসে টিভির ভলিউম বাড়িয়ে বাংলা খবরের চ্যানেলটা চালিয়ে দিলাম। অ্যাঙ্কর ওদের স্কুলের কথাই বলছেন। সন্দেহ করা হচ্ছে তোতাদের ক্লাসটিচার মিহির মুখার্জী একজন পিডোফিল। বিকৃতকাম একটা মানুষ। জেরার মুখে লোকটা নাকি নিজের ভাইঝিকে অ্যাবিউজ করার কথাও বলে ফেলেছে। আমার গাটা গুলিয়ে উঠছিল শুনতে শুনতে। এসবের মাঝেই দীপশিখার মা আমাকে ফোন করল। খুব ভয় পেয়েছে বেচারি। বলল,

“মেয়েকে আর আমি ওই স্কুলে পাঠাব না সুমি।”

“দেখ, যা ভাল বুঝিস কর। তবে, মেয়েটার কাছে আর কিছু লুকিয়ে রাখিস না।”

“তুই কি পাগল হলি সুমি? রেপ কেসের কথা অতটুকু মেয়েকে বলব কী করে?”

হাসলাম। বলব না বলব না করে আর কতদিন কাটাব আমরা? তোতা এখন আমার ওড়নাটা হাতে জড়িয়ে চুপটি করে আমার কোলে শুয়ে রয়েছে। কী অস্বাভাবিক শান্ত লাগছে ওকে! আমার কথা বলা পুতুলটাকে যেন জাদু মন্ত্র পড়ে কেউ সত্যিকারের পুতুল বানিয়ে দিয়ে গিয়েছে! কলের পুতুল। উঠতে বললে উঠবে। বসতে বললে বসবে। একবারও অবাধ্য হবে না। মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আমি দেখছি ওর মাথার কাছে নিঃশব্দে এসে বসেছে সেও। অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ক্ষতচিহ্ন। চোখ দুটো লাল। সেই জায়গাটা থেকে রক্ত ঝরছে অবিরাম যেখানে দাঁত নখ আর লোহার রড গেঁথে দিয়েছে মানুষ। হবে না? নেকড়ের চেয়েও ভয়ানক যে মানুষের আক্রমণ! তবে তার মুখে চোখে আজ আর যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই। বরং খানিকটা আলোর আভা ঢেকে রেখেছে সরল মুখখানা।

আমরা ঠিক করেছি তোতাকে আজ সব বলে দেব। সওব। যা কিছু জানতে বুঝতে ওর শিশুকাল ওকে বাধা দেবে ঠিক করেছিল, আমরাই ওকে লিখিয়ে পড়িয়ে বুঝিয়ে দেব সব। তারপর বাকিটা তোতার হাতে। সোনালি চুলের মেয়েকে কোলে নেবে নাকি নরম তুলতুলে বুকের কাছে আঁকড়ে রাখবে বাঘের নখের মত ধারালো কোনও অস্ত্র সেটা না হয় ও নিজেই ঠিক করে নেবে।

ঘড়ির কাঁটা ক্রমেই এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। টিক...টিক...টিক...

আমরা উদগ্রীব। হঠাৎ আমার কোল ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে বসল আমার বাচ্চাটা। তারপর অবাক দৃষ্টিতে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,

“মাম্মা, ধ...র্ষণ কী মাম্মা? ভীষণ ভয়ের কিছু?”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%