অবিশ্বাস্য

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

আমাকে যে একখানা আস্ত বেড়াল পুষতে হবে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি কোনোদিন। বেড়ালে আমার বরাবরের আপত্তি। ওই দেখুন, আপনারা আবার অন্য কিছু ভেবে বসবেন না যেন! আমি কিন্তু মশাই অন্ধবিশ্বাসী বা ভীতু কোনোটাই নই। আসলে সেই ছোট বয়স থেকেই আমি হলুম গিয়ে শিকারি কুকুরের ভক্ত। কুকুর মাত্রই আমার ভালোবাসার পাত্র, তবে জাতে শিকারি হলে তার প্রতি আলাদা একটা সম্ভ্রম, ভালবাসা জাগে। বুঝলেন না তো? যাকে বলে ওই আর কী সফট কর্ণার! তা, এক্কেবারে প্রথম জীবনে আমার ছিল একটা রামপুরী হাউন্ড কুকুর। হাউন্ডরা যে দুর্ধর্ষ শিকারি তা হয়ত অনেকেই জানেন। আশা করি তাদের গল্প আর আলাদা করে বলে দিতে হবে না। তখন আমি নেহাতই চোদ্দ বছরের ছোকরা। স্কুলে পড়ি। কুকুর পুষব, কুকুর পুষব করে বায়না জুড়ে দেওয়াতে আমার বাবা তাঁর এক সহকর্মীকে দিয়ে কুকুরের বাচ্চাটি আনিয়ে দিয়েছিলেন। সে ছিল আমার প্রাণের সঙ্গী। সাধ করে নাম রেখেছিলাম বাদশা। ব্যাটা মাত্র মাস তিনেক বয়স থেকেই বেশ জাঁদরেল গোছের হয়ে উঠেছিল। নবাবের মতো হালচাল নিয়ে বাদশা পুরো সাড়ে চোদ্দ বছর বেঁচেছিল। ভাবতে পারেন! তারপর এনেছিলাম একখানা ডোবারম্যান। বব। তার তেজও কিছু কম ছিল না। অচেনা মানুষ আমাদের ববের একটি হাঁকুনিতেই ভয়ে একেবারে ভিরমি খেয়ে যেত। পোষ্য আমার এখনও আছে। এটি আমার তিন নম্বর কুকুর। এও শিকারি। জাতে পিওর ব্রীড জার্মান শেফার্ড। নাম টাইগার। টাইগার যে তার নিজের নামের মাহাত্ম্যটি বেশ ভালোভাবেই জানে, আমার বাড়িতে যাঁদের যাতায়াত আছে, সেটা তাঁরা বেশ বোঝেন। মুখে কিছু বলেন না ঠিকই, তবে অধিকাংশ অতিথিই যে প্রাণ হাতে করে আমার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন আমি কিন্তু সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারি।

আমার স্ত্রী দর্শনা কোনোকালেই কুকুর নিয়ে বাড়তি আদিখ্যেতার পক্ষপাতি নয়। তার আবার বেড়াল পছন্দ। নরম নরম তুলোর মতো দুধ সাদা বেড়াল। আমরা দুজনেই পশুপ্রেমী; তবে সে পশুদের মতিগতি চাল-চলনে যে বিস্তর ফারাক, সেটা আমি বিয়ের আগে ঠিক বুঝতে পারিনি। বাড়িতে একটি পোষা জন্তু থাকলে, ঠেলায় ঠোক্করে তার হালচাল জানতে ঠিক যেটুকু চোখ কান খোলা রাখতে হয়, দর্শনার সঙ্গে আমার টাইগারের সম্পর্ক তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। এতগুলো বছরে দর্শনাকে কোনোদিন টাইগারের মাথায় হাত বোলাতে কিংবা বেচারার মুখের কাছে একটা মারি বিস্কুট ধরতে পর্যন্ত দেখিনি। আমার অনুপস্থিতিতে টাইগার চাকরবাকরের কাছেই থাকে। বিয়ের পর প্রায় দশ দশটা বছর যখন কেটে গেল এবং আমাদের কোনও সন্তান এল না; তখন একটা শীতের সকালে পেয়ারা, পেঁপে, আম, জাম আর রকমারি ফুলের গাছ ভরতি বাগান থেকে আমার স্ত্রী কোলে করে একটি দিন পাঁচেকের বেড়াল ছানা নিয়ে হাজির হল। স্ত্রীর মুখেই শুনলাম, ছানাটা নাকি আমাদের বাগানের এক কোণে বুড়ো আমগাছটার গোড়ায় শিশির ভেজা ঘাসের মধ্যে কুঁকড়ে শুয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। অতঃপর দর্শনার কোমল হৃদয়ে মায়ার উদ্রেক আর তাকে ঘরের ভেতর তুলে আনা। এদিকে বেড়ালের বাচ্চাটাকে দেখে টাইগার প্রথমেই প্রবল চীৎকার চেঁচামেচি করে আপত্তি জানাতে ছুটে গেল। আসল কথা হল, প্রথম দর্শনেই আমার সারমেয় পুত্র দর্শনার কোলে থাকা মার্জার কন্যাটিকে বিলক্ষণ চিনে ফেলেছিল। টাইগারের আচরণে দর্শনার সমস্ত রাগ এসে পড়ল আমার ওপর।

“সাধে কি আর বলে, যেমন বাপ, তার তেমন ব্যাটা! এইটুকু একটা তুলোর ডেলা, একেও তোমরা ঘরে থাকতে দেবে না? দেখছ না, বেচারির চোখ পর্যন্ত ফোটেনি! একটু বড় হতে দাও। আমি নিজেই দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসব। আর শুনে রাখ, তোমার এই কুকুরের জন্য কোনোদিন আমি নিজেও বাড়ি ছাড়ব।”

বুঝলাম জল অন্যদিকে গড়াচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দর্শনার বেড়াল পোষায় বাধা দেওয়া তো দূর, আমি আর মুখ খোলবার সাহসই পেলাম না। অগত্যা ছোট্ট সাদা মেনিরাণি আমার বাড়িতেই নিজের স্থায়ী জায়গা করে নিলেন। দুই ভিন্ন মেরুর আচরণ নিয়ে আমাদের দুজনকে আঁকড়ে দুটি না-মানুষ সন্তান বেশ আনন্দেই বড় হতে লাগল।

***

জলের গতিতে সময় এগোচ্ছে। মেনিরাণি বেশ বড় হয়েছে। মানুষ মায়ের কোল ছেড়ে বেরিয়ে সে এখন আমার ছেলে টাইগারের সঙ্গে দিব্যি লুকোচুরি খেলে। কখনও আবার ভাতৃসম টাইগারকে জড়িয়েই বেহুঁশ নয়নে ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে দেখা যায় টাইগারের নাকে কানে জিভ দিয়ে আদর করে দিচ্ছে মেনি। আবার অনেকসময় টাইগারকেও মেনির সেবাদাসের ভূমিকায় দেখি। টাইগারের বাটি থেকে ভগিনী মেনি আয়েশ করে দুধ-রুটি চেটে চেটে খায়। লক্ষ করি, বেশ আনন্দেই টাইগার নিজের খাবারের ভাগ দেয়। বুঝতে পারি, দুটিতে ভারি ভাব জমেছে। ওদের দুজনের এই ভাবের সুবাদেই টাইগারের সঙ্গে তার মালকিনের সম্পর্কের যে কিছুটা উন্নতি হয়েছে সেটাও আমার নজর এড়ায়নি। ইদানিং রবিবার করে দর্শনা টাইগারের জন্য মেটের ঝোল রেঁধে দিচ্ছে। টাইগারের গায়ে পোকা হলে আমাকে যেচে পরামর্শ দিচ্ছে,

“ওসব পাউডার, ওষুধ রাখ তো তুমি! নিমপাতা ফোটান জলে ওকে ভাল করে চান করিয়ে দাও। দেখবে, সওব পোকা মরে যাবে।”

সবকিছুই দিব্যি চলছিল; কিন্তু হঠাৎ তাল কেটে গেল। সেদিন সকালে বাগানের গোলাপঝোপ থেকে মেনিরাণির মৃতদেহ উদ্ধার করল আমাদের মালি। ঘটনাটা বিস্তারে বলি।

অফিস থেকে আমি দিন দশেকের ছুটি নিয়েছিলাম। মরশুম বদলের জ্বরে ভুগে শরীরটা কাহিল হয়ে গিয়েছিল। দর্শনাই বলেছিল রেস্ট নিতে।


“শোন, কদিন বাড়িতেই বিশ্রাম নাও। ওষুধ-পথ্যে শরীর একটু সারলে তখন অফিস যেও। আবার অনিয়ম কোর, বুঝলে! আমি বাধা দিতে যাব না। কিন্তু প্রবাদটা ভুলে যেও না, আপনি বাঁচলে তবেই বাপের নাম।”

যেসব মহিলা সন্তান সুখ পায় না, স্বামীই তাদের কাছে সন্তানতুল্য। অধিকার ফলানোর একটিমাত্র জায়গা। সে আমি হাড়ে হাড়ে বুঝি। তাই “না” বলতে পারিনি। বিনা বাক্যব্যয়ে বড় সাহেবের কাছে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।

ছুটির চতুর্থ দিন সকালে বাড়ির লনে পায়চারি করছিলাম আমি। টাইগার পায়ে পায়ে ঘুরছিল। হঠাৎ মালির ভয়ার্ত চীৎকার শুনে পড়িমরি করে বাগানের পুবদিকে ছুটে গেলাম। গিয়েই দেখি, বাগানের একেবারে শেষের দিকে দিশি লাল গোলাপের ঝোপের সামনে আমাদের মালি আর দুজন চাকর শুকনো বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে কী সব বলাবলি করছে। আমাকে দেখেই কাঁপা-কাঁপা গলায় মালি বলে উঠল,

“সাহাব, এ তো মেহসাহাবের বিল্লি...”

“অ্যাঁ?”

বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। দ্রুতপায়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম। হে ঈশ্বর! এ কী কাণ্ড! গোলাপঝোপের আড়ালে আমাদের বেড়ালটা মরে পড়ে রয়েছে। বেচারির গোটা শরীরে অগুনতি নখের আঁচড়। পিঠের আর পেটের চামড়া বেশ কিছু জায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে। সেখান থেকে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে জমাট বেঁধেছে ইতিমধ্যেই। মেনির মাথা বাদে সারা দেহটাকে কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দিয়েছে। আমাদের সাদা বেড়ালটা রক্তে ভিজে এক্কেবারে টকটকে লাল! চোখদুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। মুখটা হাঁ। মারা যাওয়ার আগে মেনিকে যে কী তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে সেটা আন্দাজ করে আমি শিউরে উঠলাম। আহা রে! বেচারি নিশ্চয়ই অনেক লড়াই করেছে! কিন্তু ওর চীৎকার তো আমরা কেউ শুনতে পাইনি! হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে সাত-পাঁচ ভাবছিলাম, তখনই আমার চাকর হরি হঠাৎ আমাকে ডেকে দেখাল,

“ও বাবু, এ-এই দেখুন, মেনির গলায় কীসে যেন কামড়ে দিয়েছে গো!”

“কই? দেখি দেখি!”

সামনে এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে বসে দেখি, বেড়ালটার গলার পাশে দুটো গভীর গর্ত। টাইগার একবার গর্জে উঠে মেনির দেহটার কাছে দৌড়ে এসে তিন-চারবার শুঁকেই কেমন যেন গুটিয়ে গেল। তারপর পেছনের দুই পায়ের ফাঁকে নিজের লোমশ লেজটা ঢুকিয়ে নিয়ে আমার পায়ের মধ্যে নিজের মাথাটা ঢুকিয়ে সরু গলায় কুঁই কুঁই করতে থাকল। টাইগারকে দেখে আমি তো অবাক হলাম। আমার রাশভারি জার্মান শেফার্ডকে এভাবে তো কখনও ভয় পেতে দেখিনি! হলটা কী? দর্শনা মেনির শরীরটা কোলের ভেতর জাপটে ধরে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল। বেড়ালটা মরে কাঠ হয়ে গিয়েছে। মৃতদেহের মরণসংকোচন দেখেই আন্দাজ করলাম, ঘটনাটা ঘটেছে প্রায় সাত-আট ঘণ্টা আগে। অর্থাৎ মাঝরাতের আশেপাশে। রাগের মাথায় গালিগালাজ করে দর্শনা শুরুতে আমার টাইগারকেই দোষ দিচ্ছিল।

“হতভাগা, খুনী একটা! এইটুকু বাচ্চাটাকে মেরে দিলি? এখন নাটক করে কাঁদছিস? অবশ্য তোর আর দোষ কী? তুই তো শিকারি কুকুর। শিকার ছাড়া আর কিচ্ছু জানিস না, তাই না?”

কিন্তু আমাদের রান্নার মেয়ে মঞ্জু যখন বলল যে টাইগার গতকাল সন্ধে থেকেই আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে ছিল, তখন তার থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে এবং দেবদেবীর নামে শপথ আদায় করে দর্শনা একটু শান্ত হল।

দর্শনার কাছে বকুনি খেয়ে টাইগারের মুখটা একেবারে ছোট্ট হয়ে গিয়েছিল। বিনা কারণে বেচারাকে বদনাম কিনতে হচ্ছে দেখে আমার মনটাও বিষণ্ণতায় ভরে উঠেছিল। লনে ফিরে ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে রইলাম। আমাদের লনে সাদা গোলাপগাছের পাশে আদরের মেনিরাণিকে কবর দিয়েছে দর্শনা। সমাধিটার ওপর একটা ঢিবি বানিয়ে তার ওপর বেল ফুলের চারা পুঁতে দিয়েছে মালি। টাইগার চুপচাপ ঢিবিটার ঠিক সামনে শুয়ে রয়েছে। ওর চোখদুটো ছলছল করছে। ব্যথায় কাতর। হঠাৎই লনের বাইরে অফিসের জীপ এসে দাঁড়াল। বিমল আমার জুনিয়র। সে একাই এসেছে। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে উঠে গেলাম। বিমলের চোখে মুখে একটা অদ্ভুত উত্তেজনার ছাপ। কোনোমতে “গুড মর্নিং” টুকু জানিয়ে সে বলল,

“এখুনি যেতে হবে মাথুর স্যার। বড়বাবুর জরুরি তলব। জঙ্গলের আওতায় মাজরা নামে দেহাতিদের গ্রামটাতে কাল রাতে দু-দুটো খুন হয়ে গিয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে কাজটা মানুষখেকোর।”

সিরিয়াস ব্যাপার! আর কথা না বাড়িয়ে আমি ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। পেশায় আমি একজন ফরেস্ট অফিসার। পোস্টিং উত্তর প্রদেশের বাহরাইচ জেলার কতর্নিয়াঘাট ফরেস্টে। এখানকার জঙ্গল বেশ ঘন। বেশ। বাঘ, চিতা, হাতি, হায়না, নীলগাই, বলগাহরিণ, কুমীর, নানা প্রজাতির সরীসৃপ, বিরল জাতের শকুন, গণ্ডার, জলহস্তী, পাখি কী নেই এই অরণ্যে! সেই সঙ্গে শাল, সেগুন, চন্দন ও নানা মূল্যবান গাছগাছালির আড়ত এই বন। এই অরণ্যের বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণের জন্য অদূর ভবিষ্যতেই উত্তরপ্রদেশ সরকারের তরফ থেকে এখানে কতর্নিয়াঘাট ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ভারতের বিখ্যাত অভয়ারণ্যগুলির একটি বলে চিহ্নিত হবে কতর্নিয়াঘাটের এই জঙ্গল। বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের সুযোগ সুবিধের জন্য জ্ঞান বিতরণ করা আর টুকটাক কিছু বেসিক কাজকর্ম ছাড়া সুখের চাকরী আমার। বনদপ্তরের এই বিশিষ্ট পদে যোগ দেওয়ার পর বাঘ-চিতাবাঘের হামলার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এবং চোরা শিকারীর উপদ্রব ছাড়া আর কোনও অহেতুক উৎপাত আমাকে সামলাতে হয়নি। মাঝে মাঝে নানা জাতের পরিযায়ী পাখি শিকার, বাঘ ও কুমীরের চামড়া চুরি এবং হাতির দাঁতের লোভে চোরা শিকারীরা এই অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়ে। তবে সময় থাকতে আমাদের দপ্তরে খবর এসে যায় বলেই তারা ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারে না। গোপন সূত্রে কানে আসে শিকারি মহলে অফিসার শিবনাথ মাথুরের অর্থাৎ আমার নাকি খুব বদনাম। সেই বদনামে অবশ্য আমার বুক ভরে যায়!

জঙ্গলের দিকে আসবার পথে বিমল যা শোনাল, তাতে আমার মতো উদাসীন মানুষের কপালেও চিন্তার গভীর ভাঁজ পড়েছে। মাজরা গ্রামের মুটে মজুর দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষদের কোনও একটা উৎসব ছিল গতকাল রাতে। শুধু ছেলেদেরই জমায়েত। রুটি আর বন মুরগী সহযোগে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া, পান এবং বাঞ্জারনদের নাচগান। মেয়েরা সব ছেলেপুলে নিয়ে ঘরেই ছিল। মাঝরাতের দিকে মরদরা ঘরে ফিরে আসে। তার কিছুক্ষণ পরেই পড়শি রামলালের চেঁচামেচি শুনে সবাই ছুটে গিয়ে দেখে রামলালের মাটির বাড়ির দালানে তার বৌ আর পাঁচ মাসের বাচ্চাটা মরে পড়ে রয়েছে। শাবল, বল্লম, লাঠিসোঁটা নিয়ে আঁতিপাতি করে খুঁজেও গ্রামের লোক কোনও জন্তু জানোয়ারের চিহ্ন খুঁজে পায়নি। কিন্তু মা আর বাচ্চার রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে মানুষখেকো ছাড়া ওকাজ আর কারও হতে পারে না। বাঘ ছাড়া ওভাবে আঁচড়াবে কে? কার অমন তীক্ষ্ণ ধারাল নখ?

ঘটনাস্থলে পৌঁছতে বাজল বেলা একটা। তিনজন জুনিয়র অফিসার আগে থেকেই রয়েছে সেখানে। ওদের মুখগুলো দেখলাম ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। রামলালের বাড়ির বারান্দায় ডেডবডি দুটি পাশাপাশি শোয়ানো। সাদা কাপড়ের ঢাকা সরিয়ে আমি থ’ বনে গেলাম। আমাদের মেনিরাণির মৃতদেহের সঙ্গে কী অদ্ভুত মিল! সেই একরকম নখের দাগ, গলার পাশে ঘাড়ের কাছে দুটো গভীর গর্ত। ঝুঁঝিয়ে রক্ত পড়েছে সেখান থেকে। শিশুটার দুটো চোখ ওপড়ানো। রীতিমতো ভয়ানক! শকিং!

পুলিশ ইন্সপেক্টর আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটু জোরই করলেন,

“বলছি কী মাথুর সাহাব, এটা নির্ঘাত তেন্দুয়ার কাজ। ভালো কথা বলি শুনুন, মালটাকে আজই খালাস করে ফেলুন মশাই। এরপর পরপর যদি আরও লোকজন বাচ্চাকাচ্চা মারে, তাহলে এরা কিন্তু হরতাল করতে পারে। তাতে চাপ বাড়বে বই কমবে না।”

কিন্তু বললেই তো আর বাঘ বা চিতা মেরে ফেলা যায় না! আমাদেরও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। ভারতের জঙ্গলগুলোতে বন্যপ্রাণী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। জঙ্গলে জঙ্গলে খদ্যের অভাব তাদের লোকালয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করছে। এই অবস্থায় কিছুতেই প্রমাণ ছাড়া হত্যার অভিযোগে দুম করে বাঘ মারা যাবে না। তাছাড়া কোন বাঘ একাজ করেছে সেটাই বা বুঝব কেমন করে? অনেক ভাবনাচিন্তা করতে হবে আমাদের। আমিই তো আর মাথা নই। হঠকারিতা করলে ওপরমহলের কাছে আমাকেও জবাবদিহি করতে হবে বৈকি!

***

বড় সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে দুটো টীম বানানো হল। একদল থাকবে গ্রামের পাহারায়। আর অন্যটা সার্চ টীম। তারা খুঁজবে। আর জঙ্গলের প্রান্তে গ্রামের চৌহদ্দিতে যদি কোনও খতরনাক জন্তু বা মানুষখেকো তেন্দুয়া এসেও থাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটাকে বন্দী করে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তারপর না হয় তাকে কোনও চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। অবশ্য পরিস্থিতি যদি একেবারেই বিপরীত হয়, তাহলে মারতেই হবে। কিন্তু বন্যপ্রাণকে আঘাত করা আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। এ ব্যাপারটা আমাদের জুনিয়র অফিসারদেরও বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। আমি নিজে রইলাম সার্চ টীমের সঙ্গে। তাদের গাইড করাই বেশি জরুরি।

প্রথম রাতটা ভালোয় ভালোয় কাটল। সারাদিন অনেক খুঁজেও আমরা পায়ের ছাপটাপ কিচ্ছু পেলাম না। তবুও জায়গায় জায়গায় গভীর গর্ত খুঁড়ে তার ওপর নিপুণভাবে লতাপাতাঘাস বিছিয়ে ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। রাতে আর কোনও নতুন অ্যাটাকের খবর এল না। ওদিকে বাছাধনও কী বুঝে জানি না, গা ঢাকা দিয়েই রইলেন। পরদিন দুপুরের পর বাড়ি ফিরে দেখি, আমাদের মালির বৌ এসে সদর দরজার কাছে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে বেশ তেড়ে কান্নাকাটি জুড়েছে। আমাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে দর্শনা বলল,

“কী হয়েছে জান? কাল রাতে ওদের গরুর বাছুরটাকে কীসে যেন মেরে দিয়ে গেছে। গোরুটার ঘাড়ের কাছেও কামড়ে মাংস তুলে নিয়েছে। সেটাও বোধহয় আর বাঁচবে না। গ্রামে কি আবার চিতা টিতা ঢুকল না কী গো?”

আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। মুখে বললাম,

“চিন্তা কর না। জঙ্গল এলাকায় এসব খুবই সাধারণ ব্যাপার। তবে আমার ধারণা, চিতা নয়। বন বেড়ালটেড়াল হবে। এদিককার জঙ্গলে এখন খাবারের যা যোগান আছে, তাতে বাঘ যে লোকালয়ে ঢুকবে না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।”

ওদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে ঠিক করে নিলাম আগামী দু-দিন আর বাড়ি ফিরব না। যে করেই হোক, দু-দিনের মধ্যে শয়তানটাকে ধরতেই হবে। নাহলে আমার শান্তি নেই। খিদে তেমন ছিল না। দর্শনা জোর করে থালায় ভাত আর চাপাটি বেড়ে দিল। যাহোক করে খাবারটুকু শেষ করে আবারও জীপ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। টাইগার আমার পায়ে-পায়ে হেঁটে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। গাড়িতে ওঠার সময় এক ঝলক তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। দেখলাম, বেচারার মুখটা শুকিয়ে এক্কেবারে ছোট্ট হয়ে গিয়েছে। দুচোখের কোলে জলের দাগ স্পষ্ট।

***

সন্ধে হব হব। আমি দলবল নিয়ে বনের গভীরে ঢুকলাম। গাছে গাছে বুনো পাখি, আর মাটিতে ধেড়ে ইঁদুর, ছুঁচো, বেজী নিদেনপক্ষে কিছু বিষাক্ত সাপখোপ আর বড়ো সাইজের গিরগিটি ছাড়া গ্রামের ধারের পাতলা জঙ্গলে আর বিশেষ কিছুই নেই। হ্যাঁ নীলগাই কিংবা হরিণ থাকতে পারে তবে বাঘ আর চিতার ডেরা এখানে নয়, আরও গভীর জঙ্গলে। রাত প্রায় বারোটা। প্রায় ছ’সাত ঘণ্টা পায়ে হেঁটে খোঁজাখুঁজি করে ক্লান্ত হয়ে জঙ্গলের সামান্য ভেতরে পৌঁছে আমরা মাচায় উঠে বসলাম। আমি আর বিমল একটায় আর অল্প দূরে তথাগত আর দুর্জয় আর একটা মাচায়। সার্চ টীমের অন্যান্যরাও এদিক ওদিক গাছের ওপর রয়েছে। উঁচু গাছের ওপর বাঁধা মাচাগুলো অনেকটা ট্রী-হাউসের মতোই। ফ্লাস্ক থেকে গরম চা ঢেলে বিমল আমার দিকে এগিয়ে দিল।

“নিন সার।”

চা শেষ করে বেশ খানিকক্ষণ শ্যেণ দৃষ্টিতে চারদিকটা মেপে নিচ্ছিলাম আমি; কিন্তু শেষ সেপ্টেম্বরের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাসে আরামে কখন যে আমার চোখদুটো লেগে গেল সেটা আর মনে নেই। চটকা ভেঙে উঠে শুনি বস্তির দিক থেকে তুমুল শোরগোল ভেসে আসছে,

“পাকড়ো উসকো, পাকড়ো। জলদি কর, জলদি। ভাগ না পায়! শালি শয়তানী বিল্লি।”

সেইসঙ্গে নারীকণ্ঠের মড়াকান্না,

“হা ভগবান, মার দিয়া রে, হামার বাচ্চি কো ছীণ লিয়া। হা ভগবান! ই ক্যায়া হো গ্যায়া!”

আমি আর বিমল মুখ চাওয়াচায়ি করে এক লাফে মাচা থেকে নেমে পড়লাম। সাথে দুর্জয়রাও। খুব সন্তর্পণে দেহাতিদের ঝুপড়ির দিকে এগোচ্ছি আমরা। সার্চ লাইট অফ। আমি চাই না আলো দেখে জন্তুটা পালাক। যতোটা সম্ভব কম শব্দ করে পা টিপে টিপে হাঁটছি। ওদিকে গ্রামের লোকজন মশাল হাতে বেরিয়ে পড়েছে। আগুনের ভয়ে জন্তুটাকে ফের জঙ্গলে ফেরত পাঠানোই ওদের উদ্দেশ্য, যাতে আমরা ঘুমপাড়ানী তীর ছুঁড়ে ওকে বন্দি করে ফেলতে পারি। হঠাৎই আমাদের চারজনকে চমকে দিয়ে তীক্ষ্ণ একটা “ক্যাঁও” শব্দ আলগোছে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে হাত দশেক দূর থেকে কী যেন একটা ছুটে পালালো। জন্তুটা বেশ বড়, লম্বাটে! ঝোপঝাড়ের শুকনো পাতা খচমচ খচমচ করে উঠল। আমার মন বলল এটা বাঘ নয়, অন্য কিছু। বাঘ হলে সেই গন্ধ আমি পেতাম। গুলি করব না করব না করেও নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না। মাথার মধ্যে থেকে কে যেন বলল জিনিসটা খারাপ। একে গুলি করাই শ্রেয়। একবার ভাবলাম, পরক্ষণেই এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় ট্রিগার টিপে আন্দাজেই গুলি চালিয়ে দিলাম। পর পর একটা দুটো তিনটে। “গুড়ুম গুড়ুম গুড়ুম!” শেষ গুলিটার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা পৈশাচিক চীৎকার আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দিল। বুকের ভেতর দিয়ে যেন একটা বীভৎস বৈদ্যুতিক কম্পন এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে গেল। বিমল বলে উঠল,

“খতম! হো গয়া সাহাব। খেল খতম শালার।”

তাজ্জব কী বাত! আলো জ্বেলে খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা দূরে বুনো ধুতুরা আর আকন্দ ফুলের ঝাড়ের পেছনে আমরা যার লাশ পেলাম, সেটা হাত খানেক লম্বা কুচকুচে কালো একটা বন বেড়াল! আমাদের মেনিও এর চেয়ে সাইজে বড় ছিল। এই বেড়ালটাই মানুষ মেরেছে! গরু-বাছুর মেরেছে! কিছুতেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। এইটুকু একটা বেড়ালের এত ক্ষমতা হতে পারে! যাই হোক ব্যাটা মরেছে, এই ভাল। ততক্ষণে আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া আলো ফুটেছে। গ্রামের আরও একটা বাচ্চা মারা গেছে কাল রাতে। তার বাপ-মা, দাদা-দাদী পাগলের মতো কান্নাকাটি করছে। তাদেরকে বুঝিয়েসুঝিয়ে আমরা চারজন বেরিয়ে এলাম। প্রথমে অফিস, তারপর সেখান থেকে যে যার আস্তানার উদ্দেশ্যে রওনা দেব।

আমার বাংলো জঙ্গল থেকে খানিকটা দূরে। ফিরতে প্রায় সন্ধ্যাই হয়ে গেল। মনের মধ্যে একটা শান্তির সুর বেজে চলেছে। কেন জানি না মনে হচ্ছে, দর্শনার বেড়ালটার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নিতে পেরেছি। এই কালো বেড়ালই যদি খুনি হয়, তাহলে এইই যে আমাদের মেনিরাণিকে মেরেছিল সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

বাড়ি ফিরে দেখি, পাওয়ার নেই। দুটো হ্যাজাক জ্বলছে। কাজের মেয়ে রান্না সেরে দিয়ে চলে গিয়েছে। দর্শনা বলল তার বাড়িতে কী একটা দরকার আছে, তাই সে নাকি বিকেল বিকেলই চলে গেছে। যাইহোক, গা হাত-পা ধুয়ে উনিফর্ম ছেড়ে বন্দুক টা দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখে আমি চেয়ারে এসে বসলাম। বেশ ক্লান্ত লাগছিলো। খাবার টেবিলের পাশের চওড়া জানলাটা খোলা। জানলাটায় কোনও গরাদ নেই। বাইরে ঠাণ্ডা হাওয়া চলছে। হুহু হাওয়ার তালে তালে নেচে উঠছে হ্যাজাকের আলো। আমায় খাবার বেড়ে দিয়ে, দর্শনা ঠিক জানলার সামনের চেয়ারটায় বসল। টাইগার উবু হয়ে বসে আমার কোলে মুখ ঘষছে। প্রায় তিনদিন পর মালিককে কাছে পেয়ে আজ সে ভীষণ খুশি। আমি বাঁ-হাতটা মাথায় রাখতে সে আরামে চোখ বুজে ফেলল। এক টুকরো গরম রুটি মুখে পুরে দর্শনার দিকে তাকিয়ে দেখি সে বেচারি রুটির কোণ ছিঁড়ে মাংসের ঝোলে মাখিয়ে হাতে নিয়েই বসে আছে। আহা রে! মেনিকে মনে পড়ছে নিশ্চয়ই! মেনি এইসময় দর্শনার পায়ের কাছেই বসে থাকত। তার কষ্টে প্রলেপ লাগাতে বললাম,

“দেখ, যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। দুঃখ পেয়ো না। তোমায় একটা বেড়াল বাচ্চা আনিয়ে দেবখন। তুমি পুষো।”

আমার চোখের দিকে খানিকক্ষণ অপলকে চেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল দর্শনা।

“না গো। তা আর হয় না! সেই চোখ না ফোটা বয়স থেকে ওকে আমি বড় করেছিলাম। আমার মেনির জায়গা আর কেউ নিতে পারবে না গো।”

হাজার কাঠখোট্টা হই, বুকের বাঁ দিকে একটা জ্যান্ত হৃদয় আমারও আছে। উঠে গিয়ে দর্শনার মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম। এদিকে টাইগার এসে নিঃশব্দে তার মায়ের পা চাটতে লাগল। মুখ সরিয়ে চোখ মুছে নিয়ে দর্শনা আমাদের ছেলের মাথায় হাত রাখল। আমি চেয়ারে ফিরে এসে ওদের দিকে চেয়ে রইলাম।

বেশ খানিকক্ষণের জন্য আমরা তিনটে প্রাণী বোধহয় একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম। হঠাৎ গত রাতের সেই কান ফাটানো “মিয়াঁও” চিৎকারটা জানলার দিক থেকে ছুটে এসে টেবিলের একেবারে মধ্যিখানে আছাড় খেয়ে পড়ল। ঝনঝন শব্দ করে মাংসের বাটিটা মেঝের ওপর ছিটকে গেল। তাকিয়ে দেখি, হাতখানেক লম্বা সকালের সেই বেড়ালটা লম্বায় এখন তিনগুণের চেয়েও বড়! তার পাকা লেবুরঙা হলদেটে চোখ দুটো থেকে গনগনে আগুন যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। জন্তুটার সারা গায়ের লোম কাঁটার মত খাড়া খাড়া হয়ে উঠেছে। দুটো কষ বেয়ে গড়াচ্ছে ঘন লাল রঙের টাটকা রক্ত! আমার স্ত্রীর দিকে তাক করে কালো বেড়ালটা খাবার টেবিলের ওপর ওঁৎ পেতেছে। যেকোনও মুহূর্তেই অ্যাটাক করতে পারে। দোনালা বন্দুকটা নেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ গতিতে দেয়ালের দিকে ছুটলাম আমি। কিন্তু যেমনি আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়েছি অমনি সে বেড়াল তীর বেগে লাফিয়ে সোজা দর্শনার বুকের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ার উপক্রম করল। “ও বাবাগো! ওগো! বাঁচাও বাঁচাও আমাকে!” কেঁদে আর্তনাদ করে উঠল দর্শনা। আমি কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম! কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চিৎকার করে চাকরদের ডাকার শক্তিটুকুও ছিল না! কিন্তু দর্শনার ক্ষতি করা কি এতই সোজা? টাইগার আমার আসলি শিকারি কুকুর না! সাচ্চা শেফার্ডের বাচ্চা সে। শয়তানটা তার মালকিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগেই টাইগার শূন্যে লাফিয়ে উঠে শরীরটা যতোটা সম্ভব স্ট্রেইচ করে মুখ আর পাঞ্জা দিয়ে লুফে নিল তাকে। বেড়ালটাকে মাটিতে ফেলেই সর্বশক্তি দিয়ে সেটার টুঁটি কামড়ে ধরল আমার টাইগার। হতভম্বের মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম আমি। কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে চোখের সামনে। কিন্তু হায়! এক পাও এগোতে পারছি না আমি। কালা জাদুতে আমার পা দুটো যেন মেঝের সঙ্গেই আটকে দিয়েছে কেউ। আমার বন্দুক ধরা হাত ঠাণ্ডা আর অবশ। চোখের পাতা পড়ছে না। আমার চোখের সামনেই টাইগারকে এক ঝটকায় আছড়ে ফেলল সে পিশাচ। “গরর গরর গর” করতে করতে একলাফে টাইগারের পিঠের ওপর চড়ে বসে বেচারার ঘাড়ের কাছটা ক্যাঁক করে কামড়ে ধরল। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল টাইগার। দর্শনা আর সহ্য করতে পারল না। জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। আর হ্যাজাকের হলদে আলোয় আমি...আমি স্পষ্ট দেখলাম বেড়ালের মতো ওই জন্তুটার তলপেটে আমারই ছোড়া গুলির নিশান।

হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক। ওটার পেটেই তো গুলি লেগেছিল গতকাল। এতক্ষণে আমি সম্বিৎ ফিরে পেয়েছি। শয়তান তার মায়াপাশ থেকে মুক্ত করেছে আমায়। দাঁতে দাঁত চেপে আমি খুনে বেড়ালটাকে তাক করে আবার গুলি ছুঁড়লাম। একটা, দুটো, তিনটে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের সবকটা আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল। হতচ্ছাড়া কালো বেড়ালটা একটা লম্বা লাফে টেবিলের ওপর থেকে সোওজা জানলার বাইরে গিয়ে পড়ল। আমার চোখের সামনে থেকে একরাশ ঘন কালো ঝুলকালি যেন ঝপ করে হাওয়াতে ভ্যানিশ হয়ে গেল। আমিও তার পেছনে ছুটলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! আগের দিন তিনটে আর আজ তিনটে অর্থাৎ মোট ছটা গুলি খাওয়া সেই মরা বুনো বেড়ালটাকে আমি আর কোত্থাও দেখতে পেলাম না।

ঘরে ফিরে দেখি টাইগার মাটিতে শুয়ে থরথর করে কাঁপছে। বেচারাকে বুকে টেনে মাথায় হাত রাখতেই কেঁদে উঠল সে। টাইগারের রক্তে আমার গোটা গা ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় ছটকাচ্ছে আমার বাচ্চাটা। মনে পড়ল, আট বছর আগে মাত্র মাসখানেকের বাচ্চাটাকে আমি কোলে করে নিয়ে এসেছিলাম। ফিডিং বোতলে করে ওকে দুধও খাইয়েছি। ওর ব্রিডার বলেছিলেন,

“আসলি শেফার্ডের বাচ্চা আছে, দেখবেন নিজের জান দিয়ে একদিন আপনার জান বাঁচাবে।”

আমার দুচোখ বেয়ে নোনা জল টুপটুপ করে টাইগারের মাথার ওপর পড়ছে। সে আর বেশীক্ষণ বাঁচল না। ঘোলাটে চোখে উদাসভাবে শূন্যের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দু’বার প্রচণ্ড জোরে কেঁদে উঠে আমারই হাতের ওপর নেতিয়ে পড়ল আমার সাধের শিকারি কুকুর... আমার টাইগার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%