শয়তান

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

এক

টয়ট্রেন থেকে নেমে কার্শিয়াং স্টেশনে পা রাখতেই হৃদির মনটা ভাল হয়ে গেল। আগস্ট মাস। আবহাওয়া বেশ মনোরম। সমতলের উৎকট গরমটা এখানে নেই। বাতাসে একটা স্নিগ্ধ আমেজ ছড়িয়ে রয়েছে। হাতঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, নয় নয় করেও ঘড়ির কাঁটা আড়াইটে পেরিয়েছে মিনিট পাঁচেক আগেই। বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। অন্ধকার নেমে আসবার আগে হালকা হলুদ রঙের পড়ন্ত রোদ্দুরে চারদিক ঝলমল করছে। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের সবুজ উপত্যকা আর দূরের আবছা নীলাভ পাহাড় দেখতে দেখতে এতটা পথ এসেছে হৃদি। এখনও ঘোর কাটেনি। ওর দু’চোখে লেগে রয়েছে পাহাড়ের নেশা। কার্শিয়াং স্টেশনের টিকিট ঘরটা যেন লেবু হলুদ রঙের একটা ছিমছাম বাড়ি। লালচে বাদামী পালিশ রঙের দরজা জানলায় সাদা রঙ করা লোহার নেট লাগানো। নিষ্পাপ মুখের লোকজন এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে। কমলালেবু রঙের ফোলা ফোলা নরম গালওয়ালা বাচ্চাগুলো মায়েদের কোল থেকে নিচু হয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে উঁকি দিচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক। মা আর সন্তানের বাঁধন। অপলক চোখে তাকিয়ে ছিল হৃদি। বাচ্চাগুলোকে দেখলেই আদর করে কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে করবে, এতই মিষ্টি!

খানিকটা সময় কাটিয়ে লোকজনের কথাবার্তা শুনে হৃদি বুঝল অনেকেই দার্জিলিঙের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। কথায় আছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সারাজীবনে কোথাও যাক আর নাই যাক, দীঘা, পুরি আর দার্জিলিংটা তারা ঘুরবেই ঘুরবে। তবে প্রচলিত প্রবাদ বুঝি সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে খাটে না। দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে হৃদি এর আগে কখনও পাহাড়ে বেড়াতে আসেনি। সমুদ্রও চোখে দেখেনি। পাহাড়ের প্রতি মেয়েটার যাবতীয় ভালবাসা ওই কল্পনাতেই। শৈলশহর শব্দটা ভূগোলের বইতে হৃদি বহুবার পড়েছে। মনে মনে কিছু পাহাড়, আর সবুজ ঘেরা উঁচু নিচু পাথুরে পথ কল্পনা করে নিয়েছে। ছেলেবেলায় লম্বা গ্রীষ্মের ছুটিতে ওর স্কুলের বন্ধুরা পাহাড় থেকে বেড়িয়ে এসে যখন হাত পা নেড়ে নানান গল্প বলত, মুগ্ধ হয়ে শুনত হৃদি। বন্ধুদের গল্প শুনে শুনেই ড্রয়িং খাতার পাতায় সস্তা প্যাস্টেল রঙে ওর ছবি আঁকার শুরু। বরফে ঢাকা পাহাড়ি উপত্যকার নানা ছবি স্বপ্ন পেরিয়ে বাস্তবে চুনকাম করা দেওয়ালের গায়ে স্থান পেত। সেসব অবশ্য একেবারেই ছোটবেলার কথা। তারপর ক্রমে সংসারের চাপ বিকট কালো ছায়ার মত বড় হতে হতে কখন যে নির্মল কৈশোরটাকে কেড়েই নিল সেটা আর আজ ঠিক মনে পড়ে না হৃদির।

স্টেশনের বাইরেই একটা কালো রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে। দেখতে অনেকটা মাথা ঢাকা জিপের মত। লাল রঙের সোয়েটার পরা রোগারোগা লম্বা একটা ছেলে গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখেচোখে কেমন যেন উদাস কবি-কবি ভাব। আশেপাশে কী হচ্ছে সেদিকে ওই ছেলের কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই। অথচ তার ডান হাতে “ওয়েলকাম হৃদি” লেখা একটা ছোট্ট বোর্ড। প্রায় দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। হৃদির নজর খুব প্রখর। ও দেখে ফেলেছে আর বুঝেও ফেলেছে ছেলেটাকে ফাদার পাঠিয়েছেন। হৃদি হাত নাড়াতেই ছেলেটা পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। চওড়া হেসে ছোট ছোট চোখদুটো প্রায় বুজে ফেলে হাতজোড় করে নমস্কার করে বলল,

“ম্যাডাম, আমি ছোটু। ফাদার রুস্তম আমাকে পাঠিয়েছেন। আমিই আপনাকে স্কুল পর্যন্ত নিয়ে যাব।”

একগাল হেসে হৃদিও প্রতিনমস্কার জানাল ছোটুকে। যদিও ওর মনটা একটু খারাপ হল। ইস, যদি নিজে নিজে স্কুলটা খুঁজে যাওয়ার অনুমতি পেত, কী মাজাটাই না হত! হয়ত পথ হারিয়ে এই পাহাড়ে ঘেরা শহরটাকে আরও ভাল করে চিনে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেত। সাত-পাঁচ নানা কথা ভাবছিল হৃদি। আর ছেলেটা লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল। হাসি-হাসি মুখের বেশ শান্ত স্বভাবের ছেলে ছোটু। একটু পাগলাটে। সে হয়ত আশাও করেনি যে হৃদি তাকে প্রতিনমস্কার জানাবে। তাই আচমকা ভাল ব্যাবহার পেয়ে আরও লজ্জা পেয়ে গিয়েছে। যাইহোক, ইতস্তত ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে কাটিয়ে আবার আগের মত তৎপর হয়ে হৃদির হাত থেকে সাধারণ ট্রলি ব্যাগখানা প্রায় কেড়ে নিয়ে খানিকটা ব্যস্তটা দেখিয়েই ছোটু বলল,

“আসেন ম্যাডাম, আসেন। দেরি করলে ফাদার বড্ড অসন্তুষ্ট হন। আমাকে জোর বকুনি দেন। ফাদার রুস্তম কিন্তু ভীষণ রাগি আছেন ম্যাডাম!”

তাড়াতাড়ি গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে দিল ছোটু। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে হৃদি গাড়িতে উঠে বসল। বেশ বড় গাড়ি। পেছনের সীটে চারজনের বসার জায়গা। একজন যাত্রী থাকলে তো আয়েশ করেই বসা যায়। আবার শুয়েও পড়া যায় দিব্য। বেশ লাগছিল হৃদির। কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই অস্বস্তিটা ওকে ঘিরে ধরল। ভাল লাগার মিঠে আমেজটা ফিকে হতে শুরু করল। গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দেওয়ার মিনিট দশ কি পনেরো পর থেকেই একটা কাঁপুনি লাগা হাড় হিম করা ঠাণ্ডার অনুভূতি আচমকাই জড়িয়ে ধরল ওকে। মনে হল বরফ ঠাণ্ডা একটা স্রোত যেন দুপাশ থেকে ক্রমাগত ওকে আঁকড়ে ধরছে। গলার ওড়নাটাকে মাথার ওপর থেকে একটা পাক ঘুরিয়ে নিল হৃদি। সেইসঙ্গে একটু অবাকও হল বটে! কই বাইরে যখন দাঁড়িয়ে ছিল, তখন তো শীত করছিল না! আর শীত করবেই বা কেন? বাইশ-তেইশ ডিগ্রিতে কোনও সুস্থ মানুষের ঠাণ্ডা লাগে নাকি? জ্বরটর আসছে কিনা কে জানে? ওদিকে হৃদি গুছিয়ে বসতে না বসতেই একটাও অতিরিক্ত শব্দ ব্যয় না করে ছোটু ইঞ্জিন স্টার্ট করে দিয়েছে। জিপ গাড়ি এখন পাগলা ঘোড়ার মত ছুটছে। দেখতে দেখতে চোখের নিমেষেই স্টেশন চত্বর পেরিয়ে চারপাশে মানুষের ব্যস্ততা, কোলাহল, ছোট্ট বাজার সবকিছু অতিক্রম করে ফেলল ড্রাগনের মতো দেখতে কালো গাড়িটা। তারপর ঝপাঝপ চার পাঁচটা সরু সরু বাঁক ঘুরেই পাইন বনের মধ্যেকার একটা ক্ষীণ রাস্তা ধরে ছুটতে লাগল। স্টেশন থেকে এই শুনশান ঘন পাইন বন পর্যন্ত রাস্তাটা হৃদি ঠিকমত ঠাহর করতেই পারল না। ওর মনে হল গাড়িটাকে একপ্রকার উড়িয়ে নিয়েই ছোটু যেন পাইন বনে ঢুকে পড়েছে হঠাৎ। জানলার কাচের মধ্যে থেকে দূরের দিকে তাকিয়ে হৃদি আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। খুব সম্ভবত কাছাকাছি এলাকায় কোন মানুষের বসতি নেই। পাইন গাছগুলো মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে। কোনও এক অজানা কর্তব্য পালনের জন্যই সোজা হয়ে আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে তারা। যেন কেউ মায়ামন্ত্র পড়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে তাদের। যুগ যুগ ধরে তারা আর নড়বে না, একটাও কথা বলবে না। একভাবে কেবল দাঁড়িয়ে থাকবে। পাইনের বনভূমির ওপর ধূসর চাদরের মত কুয়াশা ছেয়ে রয়েছে। নিশ্ছিদ্র আর মন কেমন করা কুয়াশা। স্টেশনের মনোরম জায়গাটা থেকে বেরিয়ে এই জনমানবহীন কুয়াশা ঢাকা অঞ্চলে এসে পড়ে হৃদির মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে। হঠাৎই ওর মনে হল, ঝোঁকের বশে মা আর ভাইকে কলকাতায় ফেলে রেখে কেন যে এত দূরে আসতে গেল! তবে কি এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া ডাহা ভুল হয়ে গেল? আর কী দেখা হবে ওদের সঙ্গে?

গাড়ির ভেতর কনকনে ঠাণ্ডাটা কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। বাইরের ম্লান দৃশ্যের বিষণ্ণতা আর অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ক্লান্তি যেন অক্টোপাসের মতো শুঁড় বিছিয়ে একটু একটু করে হৃদিকে চেপে ধরছিল। তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিল ওর। হঠাৎই ঠাণ্ডা কমে গিয়ে বেশ উত্তাপ অনুভূত হল। হৃদির মনে হল, কারা যেন ওর দুপাশে এসে গা-ঘেঁষে বসেছে। তিন-চারজন সহযাত্রীর মধ্যিখানে বসে থাকলে যেমন একটা উষ্ণ অনুভূতি হয়, অনেকটা তেমন। চট করে ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে গেল। আর আচমকাই বাইরের দিকে তাকিয়ে ওর বুকের মধ্যেটা ছ্যাঁত করে উঠল।

চেরা চুলের মত ক্ষীণ বাঁকওয়ালা একটা খাড়া রাস্তায় ঢুকে পড়েছে গাড়িটা। একপাশে গভীর খাদ আর অন্যপাশে উঁচু উপত্যকা। হৃদির ভীষণ ভয় করছে। এদিকে ছোটু একটাও কথা বলছে না। কী অদ্ভুত ছেলে রে বাবা! মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে একভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। এই যাত্রাপথ একটা দীর্ঘ যুগের মতো মনে হচ্ছিল হৃদির। ও মিশুকে। কথা বলতে, মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে ভালবাসে। একটানা চুপ করে থাকতে থাকতে দমবন্ধ হয়ে আসছিল। তাই কী একটা ভেবে নিয়ে, নিজে থেকেই ছোটুর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল হৃদি।

“স্কুলটা কি অনেক দূরে ভাই ছোটু?”

“না না। এই তো প্রায় পোঁছেই গিয়েছি।”

“ওহ! তাই বল। আমি ভাবলাম রাত হয়ে যাবে বোধহয়!”

“না না। রাতে তো বিপদ! জানেন ম্যাডাম রাতে ওদিকে...”

রাতের প্রসঙ্গ এসে পড়ায় স্বভাবসুলভ প্রগলভতায় ছোটু কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই থমকে গিয়ে গলাটা একবার ঝেড়ে নিপুণভাবে কথাটা লুকিয়ে নিল। হৃদি বেশ ধরতে পেরেছে ছেলেটার চালাকি। ছেঁড়া কথা জোড়া লাগাতে তারপর ছোটু নিজে থেকেই আমতা আমতা করে বলল,

“নাহ, মানে খাড়াই পথ তো! এখন আর কথায় অন্যমনস্ক হওয়া চলবে না। আপনি গান শুনবেন ম্যাডাম? গান চালিয়ে দিই? দাঁড়ান, আমার কাছে ভাল ভাল গান আছে।”

***

দুই

ফিকে সাদাটে স্কুল বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছিল একটা বাচ্চা ছেলে। অদ্ভুত ধরনের ফরসা! না, ঠিক ফরসা নয়। ফিরিঙ্গিদের মতো সাদা চামড়ার একটা বাচ্চা। মাথার চুলগুলোও কালো নয়। পোড়া তামাটে রঙের। ছেলেটার হাতে লাঠি জাতীয় কিছু একটা রয়েছে। স্কুলের সামনের বাগানের বেগনি রঙের ফুলের ঝাড়ের ওপর সেই লাঠি দিয়ে সপাং-সপাং করে বাড়ি মারছিল ছেলেটা। হৃদির কৌতূহল হল। বাচ্চাটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে বলে একটু পা চালিয়েই এগোতে লাগল ও। বেশ দুষ্টু এবং অস্থির প্রকৃতির বাচ্চা। এধরনের শিশুরা সাধারণত মনখোলা আর মিশুকে হয়। চেনা-অচেনার বালাই থাকে না এদের। তবে দূর থেকে দেখে বাচ্চাটাকে বেশ সুস্থ স্বাভাবিক বলে মনে হলেও কাছে এসে ডাকতেই হৃদির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখ ভেংচে অদ্ভুত একটা অঙ্গভঙ্গি করল সে। তারপর আচমকাই থুঃ করে হৃদির গায়ে খানিকটা থুতু ছিটিয়ে গাছগাছালি ঘেরা বাগানের মধ্যে দিয়ে নিমেষে কোথায় যেন দৌড়ে পালিয়ে গেল। ঘটনাটা এতটাই অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে গেল যে হৃদি হতভম্ব হয়ে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটা পালিয়ে যেতেই ওর মনে হল, এই রে বাচ্চাটা কোনদিকে পালালো সেটা তো ঠিক খেয়াল করা হল না!

একে নতুন একটা জায়গা, তায় চোখের সামনেই এমন প্রাসাদোপম স্কুলবাড়ী। বাগানের সবুজেও চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। দুধ সাদা রঙের বিরাট বিরাট দেওয়াল আর থাম। ব্রিটিশ আমলের অসাধারণ স্থাপত্য কর্ম। দুধসাদা বললে অবশ্য একটু ভুল বলা হবে। দেওয়ালের সাদার ওপর কেমন যেন একটা হলদে রঙের পোঁচ পড়ে গিয়েছে। অনেকদিন রঙ না করালে সাদা দেওয়ালের যেমন অবস্থা হয়, অনেকটা সেইরকম। হৃদি নিজের চোখ দুটোকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও আশাবাদী যে এই চাকরিই ওর জীবন আমূল বদলে দেবে। মায়ের ক্রনিক সমস্যা, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এবার ভাল হসপিটালে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারবে ও। ভাইটা পড়াশোনায় ভাল। সামনের বছর একটা ভাল কলেজে ভর্তি করাতে হবে তাকে। ব্যক্তিগত সুখের ভাবনায় মেয়েটা বোধহয় খানিকটা আনমনা হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই ফাদার রুস্তমের ডাকে ওর সংবিৎ ফিরল। গত দশ বছরে কার্শিয়াং এর এই প্রাইভেট বোর্ডিং স্কুলটি ফাদার রুস্তমের অভিভাকত্বে দারুণ নাম করেছে। “হোলি চাইল্ড” নামের এই স্কুল বিল্ডিংটি স্বাধীনতার আগে একটি ব্রিটিশ পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। শোনা যায়, সেই পরিবারেরই একজন বংশধর এই স্কুলটি স্থাপন করেছিলেন। তিনিই ছিলেন হোলি চাইল্ডের প্রথম প্রিন্সিপাল। তারপর অবশ্য বহুবছর এই স্কুলবাড়ি বন্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল। যদিও ইন্টারনেট ঘেঁটে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিটির নামধাম বা পরিচয় সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। মাস ছয়েক ধরে হৃদি অনেক রিসার্চ করেছে কিন্তু হোলি চাইল্ড স্কুলের ইতিহাস সম্পর্কে প্রামাণ্য কোনও নথি সংগ্রহ করতে পারেনি। যতবার মনে হয়েছে, এই বুঝি কিছু পেয়ে যাবে, এই বুঝি হাতে কোনও মূল্যবান ছবি বা প্রমাণ এসে পড়বে, ততবার লক্ষ্যকে ছুঁয়ে ফিরে আসতে হয়েছে ওকে। এমনকী ছোটুও বিশেষ কিছুই বলতে পারল না। এর আগে অবশ্য ফাদারের সঙ্গে ইমেইল মারফৎ অথবা টেলিফোনে অনেক কথা হয়েছে। তখনও হৃদি স্কুলটার অতীত সম্পর্কে তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেনি। শুধুমাত্র কাজের কথাতে সময় চলে গিয়েছে। পরে চাকরিটা পেয়ে গিয়ে হৃদির মনে হয়েছিল মাটি খুঁড়ে ইতিহাস তুলে আনার কীইবা দরকার! একটা ভাল মাস-মাহিনার চাকরি, সঙ্গে মাথা গোঁজার জন্য নিরাপদ আশ্রয় আর সুখের ভবিষ্যৎ এছাড়া ওর তো আর কিচ্ছু জানার দরকার নেই। নাইবা আগ বাড়িয়ে পাকামি করল।

“স্বাগতম! আমাদের এই পুণ্যভূমিতে তোমাকে অভ্যর্থনা জানাই মিস হৃদি। এই পবিত্র মাটিতে যখন পা রেখেই ফেলেছ, তখন আজ থেকে তুমিও আমাদেরই একজন। তাঁর অপার কৃপা তোমাকে ঘিরে থাকুক সারাক্ষণ।”

শান্ত অথচ আন্তরিকতাভরা কণ্ঠে হৃদির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ফাদার রুস্তম। অসম্ভব তেজ এই ব্যক্তির চোখেমুখে! প্রথম দর্শনেই ফাদার রুস্তমকে পিতার স্থান দিয়ে ফেলল হৃদি। স্মিত হেসে করমর্দন করে ফাদারের পিছন পিছন ও স্কুল বিল্ডিং এর দিকে এগোল। ফাদারের বাচনভঙ্গি, তাঁর কণ্ঠস্বর, হাঁটাচলা হৃদিকে মুগ্ধ করছে। কী অসীম আভিজাত্যের ছাপ এই ব্যক্তির মধ্যে! এইরকম একজন মানুষকে কেবল অনুসরণই করা যায়। স্কুল বিল্ডিংয়ের একতলায় প্রধান কার্যালয়, বিরাট লাইব্রেরি, কনফারেন্স হল, ফাদারের নিজস্ব কেবিন থেকে শুরু করে চারতলা বিল্ডিং এর বেশ কয়েকটি ক্লাসরুম ঘুরে ঘুরে দেখানোর পর ফাদার রুস্তম বললেন,

“তুমি তো লম্বা সফর করে এসেছ, তাই এখন আর তোমাকে প্রার্থনা গৃহে নিয়ে যাচ্ছি না হৃদি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নাও, সন্ধ্যার পরে না হয় সেখানে যেও। দেখা হবে।”

ফাদারের কেবিনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় হৃদির হঠাৎ মনে হল জানালার বাইরে সেই ছোট্ট ছেলেটিকে যেন একবার দেখতে পেল সে। মুহূর্তের জন্য উঁকি মেরেই ছেলেটি আবারও কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গেল। লুকিয়ে লুকিয়ে বড়দের কথা শোনা তো মোটেই ভাল স্বভাব নয়। তবে বাচ্চা ছেলেরা এরকমই দুষ্টুই হয়ে থাকে। তাদের কি আর সহজে শেখানো যায়? ব্যাপারটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না হৃদি।

স্কুল বিল্ডিং থেকে একটু দূরে ময়দানের কিনারায় একটি বাড়ির দোতলায় হৃদির থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ফাদার। কাচের পাল্লাওয়ালা বড়-বড় জানলা। আর মাথার ওপরে টিনের চাল। কথায় কথায় ফাদার বলছিলেন যে বেশ ক’বছর আগেও নাকি দূর-দূর থেকে মাস্টারমহাশয় ও দিদিমণিরা এখানে আসতেন। তাঁদের থাকার জন্যই স্কুল বিল্ডিংয়ের পাশে এই বাড়িটা তৈরি করানো হয়েছিল। কিন্তু এখন যে যার মতো আলাদা থাকার বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। অনেকেই কাছাকাছি জায়গার বাসিন্দা। কাছাকাছি অঞ্চলে যদি হৃদির মতো মিউজিকে পারদর্শী আর কোনও ক্যান্ডিডেট থাকত, তাহলে ফাদার রুস্তম কোনোদিনই ওকে এখানে থেকে পড়ানোর কথা বলতেন না। যাইহোক হৃদির পক্ষে অবশ্য ভালোই হয়েছে। এইরকম একটা সুযোগের বড্ড দরকার ছিল ওর। থাকার ঘরটি হৃদির একার পক্ষে বেশ বড়। দেওয়ালে নানাধরনের হাতে আঁকা ছবি টাঙানো রয়েছে। বেশিরভাগ ছবিতেই একটি দুধে আলতা রঙের বাচ্চা ছেলে। যেন অবিকল দেবশিশু। হৃদি বেশ কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখল। তারপর ঘরের আসবাবগুলোর দিকে তাকিয়ে ভ্যাবলার মতো ভাবল, এতকিছুর তো কোনও দরকারই ছিল না। স্টাডি টেবিল, চেয়ার, বুকশেল্ফ, ড্রেসিং টেবিল, ওয়াডরোব! সামান্য কটা জামাকাপড় আর কটা পছন্দের বই ছাড়া ওর তো আর কিছুই রাখার নেই। এত আসবাব নিয়ে ও করবেটা কী? আসলে সবই করুণাময় ঈশ্বরের কৃপা। এতো সুন্দর সাজানো ঘরে থাকতে পারবে, ও কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। ছেলেবেলায় একখানা পুতুলের ঘরের বড় শখ ছিল ওর। কিন্তু এক কামরার একখানা ভাড়া ঘরে থেকে আলাদা খেলাঘরের স্বপ্ন দেখাটাও বোধহয় বিলাসিতা। বাবা মারা যাওয়ার পর ওই পুঁচকে ঘরেই কোনোমতে মা আর ভাইকে নিয়ে থাকত হৃদি। মুহূর্তেই ওর ইচ্ছে হল কলকাতায় ছুটে গিয়ে মা আর ভাইকে নিয়ে আসে। এত সুন্দর একটা ঘর দেখলে তারা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে যাবে। কিন্তু নাহ! সেটা সম্ভব নয়। একাই থাকতে হবে এখানে। সেটাই এই চাকরীর প্রধানতম শর্ত! অগত্যা ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে মায়ের নম্বর ডায়াল করল হৃদি। ট্রেন থেকে নেমে মাকে একবার জানিয়েছিল বটে। আসলে মা ভাইকে ছেড়ে এই প্রথম ওর এত দূরে আসা তো! মন কেমন করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মায়ের সঙ্গে গুনে গুনে দুটো তিনটে কথা হবার পরেই টিঁ-টিঁ-টিঁ শব্দ করে কল ডিসকানেক্ট হয়ে গেল। যাব্বাবা! এখানে এত নেটওয়ার্কের সমস্যা! আগে জানা ছিলো না! ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ কোনোভাবেই আর মা-ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। আবার কখন সিগন্যাল আসবে তার অপেক্ষা। মনে মনেই বিড়বিড় করল হৃদি,

“ধুর! ঘরটার একটা ছবিও পাঠান গেল না!”

বাগানের দিকের জানলার সামনে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের সংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল হৃদি। ফাদার রুস্তম বলে দিয়েছেন কিচেনে কিছু কাঁচা খাবারদাবার রাখা আছে। দেশি ডিম, দুধ, মাংস আর কিছু ফল। একটা কোয়ার্টার পাউরুটিও আছে। হৃদি একেবারে নতুন বলেই প্রথম কদিন কেয়ারটেকার কিংবা ছোটু দরকারি সব জিনিসপত্র এনে দেবে। পরে রাস্তাঘাট চিনে গেলে নিজের বাজারহাট নিজেকেই করে নিতে হবে।

কলকাতা থেকে যথাক্রমে বাস, ট্রেন, গাড়ি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ষোল সতের ঘণ্টা জার্নি করে এসে হৃদির খুব ক্লান্ত লাগছিল। রাস্তায় খাবারদাবার বলতে তেমন কিছুই পায়নি। দশ টাকার ম্যাগি ত্রিশ টাকায় কিনে খেতে হয়েছে। তাতেও প্রচণ্ড ঝালে ঠোঁট জ্বলে গিয়েছে। বহুক্ষণ বাদে পেটে সামান্য খাবার পড়তেই চোখের পাতা ভারি হয়ে ঘুম নেমে এল। ঘড়িতে যে ততক্ষণে সোয়া ছটা বেজে গিয়েছে সেদিকে আর খেয়াল রইল না। হৃদির অবচেতনে ফাদারের একটি কথাই কেবল অ্যালার্মের মতো জেগে রইলো,

“সন্ধ্যার পরে প্রার্থনাকক্ষে চলে এস। দেখা হবে।”

তিন

ক্লান্ত অবসন্ন হৃদি ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে একটা আবছা ডাক শুনতে পাচ্ছিল। বহুদূর থেকে ভেসে আসছে ছেঁড়া-ছেঁড়া নারীকণ্ঠ। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল ও। ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতেই কে যেন ওর কানে-কানে বলল,

“ডাকটা অনুসরণ করে চল হৃদি। থেম না।”

কিছুটা এগোতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা গলিপথের মুখে গিয়ে দাঁড়াল হৃদি। সরু সুড়ঙ্গের মতো একটা জায়গা। অন্ধকারের প্রাবল্যে ভালমতো ঠাহর করা যায় না সামনে কী আছে! তবুও সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে পারল না হৃদি। বাতাস ক্রমশ ভারি হচ্ছে। ওর দম আটকে যাচ্ছে। কিন্তু ফেরার পথ নেই। যে পথে হৃদি হেঁটে এসেছে, পিছনে সেই পথ যেন মিলিয়ে গিয়েছে অনন্ত শূন্যে। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। না সামনে, না আশপাশে। মোহগ্রস্তের মতো কতক্ষণ চলেছে হিসেব রাখেনি মেয়েটা। কালোটুকু কাটতেই চোখে পড়ল ম্লান একটা আলোর উৎস। ঘোর কাটছে। হৃদি বুঝতে পারছে নিকষ অন্ধকারে পেরিয়ে কখন যেন একটা বিরাট হলঘরে পৌঁছে গিয়েছে ও।

ঘরটা যে হোলি চাইল্ড স্কুলবিল্ডিংয়েরই একটা ঘর সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ওর চারপাশে সারে সারে কালো গাউন পরা মহিলা আর পুরুষের ভিড়। কিন্তু কারোরই মুখ দেখা যাচ্ছে না। অর্ধসস্বচ্ছ পর্দায় সব্বার মুখ ঢাকা। কেউ কি মারা গেলেন? নাহ! তা কী করে হবে? হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল হৃদি। হলঘরের ঠিক মাঝখানে একটা অদ্ভুতদর্শন লাল গোলকের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে ও। ওর ঠিক সোজাসুজি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর একটি বড় সিংহাসন। উজ্জ্বল লাল আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে ওই সিংহাসন থেকে। কী ওটা! হৃদির ভীষন ভয় করছে। দেখতে দেখতেই নারী পুরুষ নির্বিশেষে হলঘরে জড়ো হওয়া প্রত্যেকটা মানুষ হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। হৃদি দেখল, বিকট আকারের একটা কালো ছায়ামূর্তি একটু একটু করে ম্লান হলুদ আলো ভেদ করে মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছে। কে ও?

হৃদির মনে একাধিক প্রশ্ন; কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে না ও। ও তো একেবারেই নতুন এখানে। ফাদার ছাড়া আর কাউকে চেনেও না। এটা কি কোনও বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান? কিন্তু ও কী করে এল এখানে? এমন প্রার্থনার ঘর, এমন আচার ও জীবনে দেখেনি। ওর সারা শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। বিনবিন করে ঘাম হচ্ছে কপালের, ঠোঁটের ওপর, গলায় আর বুকে। হাত-পাগুলো আড়ষ্ট আর অবশ। এক্কেবারেই নড়তে পারছে না হৃদি। কথা বলতে চেয়েও মুখ ফুটে কোনও শব্দ করতে পারছে না। উফ! কী কষ্ট!

আচমকাই ঝনঝন শব্দে ওর ঘুম ভেঙে গেল। ঘোর কাটিয়ে থতমত খেয়ে উঠে বসে হৃদি দেখল ঘরের দরজা হাট করে খোলা। পাল্লাটা দুলছে আর কে যেন একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে কি ঘুমোতে যাওয়ার আগে ও দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল? কে জানে! হতেও পারে। টেবিলের ওপরে রাখা কাচের ফুলদানিটা মাটিতে পড়ে চৌচির। মেঝেময় টুকরো-টুকরো কাচ। ইস! আসতে না আসতেই একটা ক্ষতি হ্যে গেল! কী সুন্দর ছিল জিনিসটা। হৃদির মনে হল বিকেলবেলা দেখা সেই বাচ্চা ছেলেটাই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছে। যদিও ঘুম জড়ানো চোখে ঠিক দেখেছে কিনা ও নিজেও জানে না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই হৃদির খেয়াল হল ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছে। ওকে এখন প্রার্থনা গৃহে যেতে হবে।

***

নতুন জায়গা, নতুন চাকরি। প্রায় দশদিন কেটে গিয়েছে হৃদির। কতখানি মানিয়ে নিতে পেরেছে আর কতটা পারেনি সেটা নিয়ে ও এখন ভাবিত নয়। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই দশটা দিনে ওকে ক্লাস নিতে হয়েছে মোটে চারদিন। বাকি দিনগুলোতে ফাদার রুস্তমের কথামতো সন্ধ্যার পরে প্রার্থনা গৃহে বসে হৃদি পিয়ানো বাজিয়েছে। গানও গেয়েছে। “বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দেবে নাকি এরা?” প্রশ্নটা নিজেকেই দু-তিনবার করেছে হৃদি। তবে আর্ট কিংবা মিউজিকের টিচারদের তো আর সারাবছর সমান কাজের চাপ থাকে না। কে জানে, একটু পুরনো হলে ওকে হয়ত অন্যান্য বিষয়ের ক্লাস নিতেও বলা হবে। আর যদি এইরকমই চলতে থাকে, ও হায়ার স্টাডি শুরু করবে।

এখানকার প্রার্থনা গৃহের পরিবেশটা হৃদির একেবারেই ভাল লাগেনি। যত দিন যাচ্ছে হলটায় ঢুকলেই ওর অস্বস্তি বাড়ছে। প্রভু যীশুর বিশালায়তন মূর্তিটি কেমন যেন বেমানান। কোনও দিব্য তেজ নেই। নেই পবিত্রতার ছাপ। কেমন যেন করুণ ও বিধ্বস্ত। ম্লান! থরে থরে সাজানো স্ফটিকের ফ্লাওয়ার ভাসে রাখা সাদা ফুলের তোড়াও শুকনোপ্রায় ও অনুজ্জ্বল। প্রার্থনাগৃহে আলোর প্রাবল্য নেই। নেই কোনও পবিত্র গন্ধ। হৃদি সেখানে মৃত্যুর উপস্থিতি টের পায়। স্পষ্ট। এ কি প্রার্থনা কক্ষ, না মূর্তিমান পাপের আঁতুড়ঘর? প্রতিদিনই হৃদির মনে হয় প্রভুকে এখানে বন্দী করে রেখে একদল বিরোধী প্রাণী তাঁর অস্তিত্বের ওপর চরম অত্যাচার চালাচ্ছে। প্রতিরাতে নিজের ঘরে ফিরে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চায় হৃদি। মায়ের সঙ্গে কথা হলে বারবার বলে ভাল না লাগার কথা। কিন্তু সমস্যা তো অন্য জায়গায়। চাকরিটা ছাড়লে চলবে না। হৃদির এই চাকরির ওপরেই ওর পরিবার সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। হৃদি ভাবে, কোন কুক্ষণে কোন অপবিত্র অভিশাপ স্পর্শ করেছে ওর হৃদয় যে ও প্রার্থনার সময়েও মৃত্যু, আঁধার আর নরকের কথা চিন্তা করে?

এখানে আসার পর প্রথমদিনেই যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা কি বোবায় ধরা ছিল? প্রশ্নটা হৃদির মাথায় চেপে বসেছে। সেই ছোটবেলা থেকে ভয়ানক আর অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা হৃদির একটা সমস্যা। বাবা বেঁচে থাকতে কত রাত যে ওকে জাগিয়ে দিয়েছেন, মনে পড়লে কান্না পায়। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তবে হাতের ওই দাগ! ওটা কী? মনের ভুল? ঘুম ভেঙে উঠেই সেদিন খুব ভাল করে দেখেছিল হৃদি, ফুলহাতা টপের আড়াল থেকে ডান হাতের কব্জির ওপরে ছাল ওঠা-ওঠা খানিকটা কাঁচা ক্ষত উঁকি দিচ্ছিল। তিনখানা আবছা ছয়ের মত। এখন শুকিয়ে গিয়েছে। তবে একটু খেয়াল করলেই ইংরেজির ছয় তিনটে দিব্যি বোঝা যায়। তিনটে ছয়! কী অর্থ এর? এইরকম কাজ ঠিক কার হতে পারে সেটা নিয়ে হৃদি চিন্তায় আছে। তবে নিজে নিশ্চিত না হয়ে ফাদারকে কিচ্ছু জানাতে চায় না ও। কিন্তু প্রথমদিনের স্বপ্নের ভেতরের সবটুকু অনুভূতিই হয়তো মিথ্যে ছিলো না হৃদি সেটা হাড়ে হাড়ে বোঝে। আজকাল নিজেকে বড্ড একলা মনে হয় ওর। এই অচেনা জায়গায় কাকেইবা মনের কথা বলবে? হৃদির বয়সী যেসব টিচার স্কুলে পড়াতে আসেন, তাঁরা কেউই তেমন মিশুকে নয়। সবাই ফাদারকে ভীষণ ভয় পান আর মুখ বুজে নিজের কাজটুকুই করে যান। নিয়মের বাইরে এক পা গেলেও যেন সকলের বিপদ হতে পারে।

এর আগেও হৃদি একটা স্কুলে চাকরী করেছে। ইয়ং টিচারদের নিজস্ব একটা গ্রুপ ছিল সেখানে। আনন্দ, হুল্লোড়, পিকনিক কত কী হত! ছাত্রছাত্রীরাও ছিল দারুণ মজার ছিল। কিন্তু হোলি চাইল্ডের ছাত্রছাত্রীরা বড্ড বেশি চুপচাপ। ক্লাস চলাকালীন একটাও বাইরের কথা বলে না। অকারণে প্রশ্ন করে না, হাসে না, এমনকী দুষ্টুমিটুকুও করে না। হাসির কথা বলে, মজার মজার ছড়াগান গেয়েও হৃদি ছাত্রদের থেকে কোনও সাড়া পায়নি। নতুন ছাত্রদের সামলাতে নাকাল হবে ভেবে যেসব ট্রিক শিখে এসেছিল সেগুলো প্রয়োগ করার দরকারই পড়েনি। ক্লাস ফাইভ সিক্সের বাচ্চাদের থেকে এতোটা ম্যাচিওরিটি আশা করা যায় না। প্রতিদিন হৃদি অবাক হয়। সকলের অলক্ষ্যে তার চোখ খুঁজে চলে প্রথম দিনের সেই দুষ্টু ছেলেটিকে। অথচ তার দেখা পায় না হৃদি। এরই মধ্যে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। একদিন সন্ধ্যার পর প্রার্থনাকক্ষে পিয়ানো বাজাতে বাজাতে হৃদির মনে হল বেদীতে আসীন প্রভুর মূর্তিটি যেন ওকে কিছু বোঝাতে চায়। ওর চোখের সামনে মিনিট পাঁচেকের জন্য ঘন অন্ধকার ছেয়ে গেল। আর কেউ কিছু বুঝতে পারল কিনা হৃদি জানে না। ও দেখল, প্রভু যীশুর দু-চোখ বেয়ে ঝরঝর করে রক্তের ধারা বইছে। তাঁর ক্রুশবিদ্ধ ক্ষতস্থান থেকেও বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরে পড়ছে মেঝের ওপর। আচমকাই “রক্ত রক্ত” বলে চেঁচিয়ে উঠল হৃদি। কিন্তু কোথায় কী? পরমুহূর্তেই সব আগের মতো। একেবারে স্বাভাবিক। হৃদির অদ্ভুত আচরণে প্রার্থনা গৃহে উপস্থিত সকলেই বেশ অবাক হলো। নির্বিকার মুখে ফাদার রুস্তম বললেন,

“আমার মনে হচ্ছে তুমি ক্লান্ত আর অসুস্থ হৃদি। যাও, এখন আর কোন কথা নয়। নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর।”

প্রবল আপত্তি জানিয়ে কিছু বলার আপ্রাণ চেষ্টা করলো হৃদি; কিন্তু পারল না। ফাদারের কথাগুলো ভারি পাথরের মতো কঠিন। সে কথার সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারও নেই। কারও না। হৃদি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে ফাদার রুস্তম হাল্কা হেসে আবারও কথাগুলো বললেন,

“তুমি যাও হৃদি, বিশ্রাম নাও। তোমার সব কথা আমি পরে শুনব। কথা দিলাম।”

ঘরে ফিরে আসার সময় হৃদির সঙ্গে আবারও সেই ছোট ছেলেটির দেখা। ফাদারের অফিসের পাশে বাগানের লোহার দোলনাটায় বসে একা একা দোল খাচ্ছিল বাচ্চাটা। অবাক কাণ্ড! হৃদিকে দেখা মাত্রই বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে দাঁড়াল এবং গম্ভীর মুখে চেয়ে রইল। হৃদি তাকে নিজের কাছে ডাকল। কিন্তু নাহ। আবারও আগের মতো পালিয়ে গেল ছেলেটা। সারাদিনের ধকলের পর এইসব আবোলতাবোল ঘটনায় হৃদির মাথা ঝিমঝিম করছিল। কোনমতে টলতে টলতে নিজের ঘরে গিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল ও। মায়ের কথা বারবার ওর মনে পড়তে লাগল। কিন্তু ও নিরুপায়। হাত থেকে মাটিতে পড়ে গিয়ে গত সপ্তাহে ওর মোবাইল ফোনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে।

চার

হৃদি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে আজকাল। এই অভিশপ্ত জায়গাটা ওকে বেঁচে বাড়ি ফিরতে দেবে কিনা ও জানে না। সেদিন মোবাইল ঠিক করাতে গিয়ে হৃদি যখন দোকানদারকে বলেছিল যে সে ক্যাথলিক স্কুলের নতুন মিউজিক টিচার, তখন দোকানদারের মুখচোখ ভয়ে কেমন যেন শুকিয়ে গিয়েছিলো। প্রথমে তো সে ফোনটাই ঠিক করতে চাইছিলো না, পরে অবশ্য বেশি টাকার লোভ দেখাতে যাহোক করে কাজটা করে দিয়েছে। এই জায়গাটা যে অভিশপ্ত সে বিষয়ে হৃদি এখন এক্কেবারে নিশ্চিত। কিন্তু ফাদার রুস্তম তো ওকে চাকরি ছাড়তে দেবেন না। এক বছরের আগে কোনও পরিস্থিতিতেই হৃদি চাকরিতে ইস্তফা দিতে পারবে না। যদি দেয় তাহলে সমস্ত অগ্রিম মাহিন ফেরত দিতে হবে ওকে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারেই সে কথা স্পষ্ট লেখা আছে। আসলে নিজের অজান্তেই হৃদি একটা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। যতই হাত-পা কামড়াক মুক্তি মিলবে না।

যত দিন যাচ্ছে আশপাশের লোকজনের আচরণ অদ্ভুতভাবে বদলে যাচ্ছে। হৃদি বোঝে ফাদারের নির্দেশেই ওকে সকলে চোখে চোখে রাখে এখন। মেয়েটার অস্বস্তি হয়। ও কি চোর না ডাকাত? কী এমন আছে এই স্কুলে যেটা ও নিয়ে পালাবে? নাকি কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে ওকে এখানে আনা হয়েছে? তাই এই প্রহরা? কী সেই উদ্দেশ্য? রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে হৃদি আকাশ কুসুম ভেবে চলে। ভয়ে আতঙ্কে ওর গলা বুজে আসে, তবুও বয়স্কা মাকে হৃদি কিছুই বলতে পারে না। বাচ্চা ভাইটা আশায় আছে, দিদি অনেক উপহার নিয়ে ফিরবে! সে হয়ত কল্পনাও করতে পারবেনা যে তার দিদির সব হিসেব উল্টে গিয়েছে। কোন অভিশাপে এই শয়তানের বাড়িতে বন্দি হয়ে আছে হৃদি, সেটা ও নিজেও জানে না। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় ফাদার রুস্তম নিজেই একটা আস্ত শয়তান।

প্রায় প্রতিটা রাতই একটা ঘোরের মধ্যে কাটে হৃদির। মাঝরাতের পর থেকে বুকে তীব্র কষ্ট হয়। কোনমতে ঘুম এসে গেলেও মনে হয় পাহাড়ের মতো একটা বোঝা বুকের ওপর চেপে বসে আছে। দিনের পর দিন হৃদির চেহারা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। চোখের কোলে কালি, পাংশুটে মুখচোখ। বুকে, পেটে, নাভিতে এবং যোনির আশেপাশে নখের আঁচড় দেখে চমকে ওঠে হৃদি। বালিশে মুখ গুঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদে। এ শরীর ওর হতে পারে না। তবে কি খোদ শয়তানের নজর পড়েছে ওর ওপরে? মায়ের সঙ্গে আর ফোনে কথা হয় না আজকাল। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও ফাদার রুস্তমের কথামতো ঘোরের মাথায় হৃদি কাজ করে চলে। আর বাকিটা সময় মড়ার মতো নিজের ঘরে পড়ে থাকে। গান শোনে না, বই পড়ে না, সারাক্ষণ একমনে প্রভুকে ডেকে চলে। বিছানায় শুতে রীতিমতো ভয় পায় হৃদি। রাতের অন্ধকারে চোখের পাতা ভারি হয়ে এলে দলে দলে পিশাচ সাধিকারা নেমে আসে। হৃদিকে টেনে নিয়ে যায় একটা গাঢ় অন্ধকার ঘরের দিকে। ওর শরীরটাকে সম্পূর্ণ অনাবৃত করে একটি বিশেষ তরলে স্নান করিয়ে দেয় তারা। নানারকম মন্ত্রপাঠ আর উপাচারের মধ্যে দিয়ে রাত গভীর হয়। পাতাল থেকে উঠে আসা এক উন্মাদ পুরুষ জন্তু ওর শরীরটাকে আক্রমণ করে। জোর করে হিংস্র সহবাসে লিপ্ত হয়। তীব্র যন্ত্রণা আর গোঙানিতে ভরে যায় গোটা ঘর। প্রথমদিকে সাড় থাকে হৃদির। ও সব বুঝতে পারে। কিন্তু বাধা দিতে চেয়েও কিচ্ছু করতে পারে না বেচারি। শেষের দিকটায় আর কিছুই অনুভূত হয় না। কোনও গন্ধ, কোনও স্পর্শ ওর শরীর ছুঁতে পারে না। ভোরের একটু আগে আবারও হৃদিকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে যায় তারা। ফাদার রুস্তমও সঙ্গে থাকেন। তাঁর উপস্থিতি হৃদি স্পষ্ট বুঝতে পারে, কিন্তু চোখ খুলে প্রতিবাদ করতে পারে না। সে শক্তি ওর আর নেই। ও এখন অন্য কারও বশীভূত। সকাল আর রাতের এই দ্বৈত জীবনযাপন কি সত্যি না সবটাই মিথ্যে কল্পনা? হৃদি কিছুই জানে না।

***

ফাদারের কেবিনে মাথা নীচু করে বসেছিল মেয়েটা। প্রায় দশমাস আগে যে সুস্থ সবল সুন্দরী মেয়েটা হোলি চাইল্ড ক্যাথলিক স্কুলে চাকরি করতে এসেছিল এ যেন সে নয়। মেয়েটার হাড় জিরজিরে ময়লা শরীরটা স্থূল পেটের ভারে সামনের দিকে নুয়ে পড়েছে। সামান্য হাঁটাচলা করলেই শিরদাঁড়া ভেঙে যেতে পারে। সরু সরু হাতদুটো দুইদিকে ঝুলে রয়েছে। দেহের ভারে কাঠির মত পা দুখানা কাঁপছে। কোটরে ঢোকা চোখ, শুকনো ঠোঁট আর রক্তহীন ফ্যাকাশে সাদা মুখ। লজ্জা, ঘেন্না আর ভয়মিশ্রিত রাগে ওর চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। হৃদির মানতে অস্বস্তি হচ্ছে যে প্রতিটা রাতের ওই অস্বস্তিকর সময়গুলোতে আসলে একটা নোংরা খেলা চলেছে ওর সঙ্গে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ! নিজের অজান্তেই এইভাবে কারও হাতের পুতুল সেজে থেকেছে ও এতগুলো দিন! বারবার ধর্ষিতা হয়েছে? দিনের পর দিন একটা নরকের জীবের সামনে ওর শরীরটাকে টোপের মত বিছিয়ে দিয়েছে একদল মানুষ! মানুষ নাকি তারাও আসলে পিশাচ? তীব্র জিঘাংসায় কেঁপে ওঠে মেয়েটা। মনের মধ্যে প্রতিশোধের চিন্তা আসতেই ওর অস্বাভাবিকরকমের স্ফীত পেটের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। হৃদি কেঁদে ফেলে। নাভির ভেতরের দিক থেকে শিরদাঁড়া হয়ে বুকের দিকে ঠেলে উঠছে একটা প্যাঁচানো ব্যথা। ওহ! আচ্ছা! শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধা শয়তান এখন ওর মস্তিষ্কের চিন্তাও জেনে যাচ্ছে! ওকে আঘাতও করছে এখন! বাহ!

“হে ঈশ্বর! কী পাপে আমাকে এমন সাজা দিলে?”

কাঁপা কাঁপা দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল হৃদি। ফাদার রুস্তম এগিয়ে এসে ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন। মানুষটা এখন আগের চেয়ে অনেক নরম, সহানুভূতিশীলও বটে। পিতৃস্নেহে হৃদিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে রুস্তম বললেন,

“এমন কথা ভুলেও বলিস না রে মেয়ে। পাপে ঢাকা এই পৃথিবীর কতজন এই মহান কাজের দায়িত্ব পায় বল মা? তুই নিষ্পাপ বলেই তো আমাদের ঈশ্বর তোকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তুই তাঁর সন্তানকে জন্ম দিতে চলেছিস। আনন্দ কর হৃদি। এর চেয়ে বড়ো পুণ্যের কাজ আর কীই বা হতে পারে? জানিস তো, স্বয়ং প্রভুও আমাদের আরাধ্যের করুণায় টিকে আছেন!”

হৃদি আর্তনাদ করে উঠল।

“চুপ করুন ফাদার। আরাধ্য! কাকে আরাধ্য বলছেন আপনি? ঈশ্বর তো কেবল একজন। প্রভু যীশু। আর আমার শরীরে যে বাসা বেঁধেছে সে নরকের পিশাচ। সাক্ষাৎ শয়তান। আমার গর্ভের এই বীজ সে তো অবৈধ। শয়তানের জারজ সন্তান। তাই না?”

মুহূর্তেই ফাদারের চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে হৃদির গালদুটো টিপে ধরলেন তিনি,

“খবরদার! খবরদার বলছি! পিশাচ সম্রাটের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে এসব পাপ কথা মুখে আনছিস হতভাগী? তোকে একেবারে চুপ করিয়ে দিতে আমার একটা সেকেন্ডও সময় লাগবে না, সেটা নিশ্চয়ই জানিস? এমনিতেও তাঁর ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন আসন্ন। তাই মনটাকে পবিত্র রাখ। আর কটাদিনের কাজ বাকি আছে। তারপর তোর ছুটি। একেবারে ছুটি। উপযুক্ত মূল্য নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাস।”

প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় বেল টিপে দুই মহিলা সহকারীকে ডেকে নিলেন রুস্তম। হৃদিকে সঙ্গে নিয়ে তারা সেই অন্ধকার ঘরটার দিকে এগিয়ে চলল। হৃদি জানে, আপত্তি জানিয়ে আর কোনও লাভ নেই। এই মৃত্যুপুরী থেকে কেউ ওকে বাঁচাতে আসবে না। হাজার চীৎকার করলেও ওর ডাক অন্ধকূপের পাঁচিলের বাইরে পৌঁছবে না।

***

একটা উঁচু বেদীর ওপরে শুয়ে রয়েছে হৃদি। তীব্র যন্ত্রণায় ওর গোটা শরীর ফেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নাভির ভেতর থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে উঠে আসছে ফণাধারী এক বিষাক্ত সাপ। পেটের সন্তান নিজের প্রকোষ্ঠ ভেদ করে হাত পা ছুঁড়ে মায়ের ফুসফুসে আঘাত করছে। হৃদির মুখ থেকে বলকে বলকে রক্ত উঠে আসছে। মেয়েটার কান্নায় আর চীৎকারে বাতাস চীরে যাচ্ছে। ওকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে অন্ধাকারের আহ্বায়করা। সকলের চোখে অসীম আগ্রহ আর অপেক্ষা। একটা মানুষের কাতর কান্নায়, তীব্র চীৎকারে আরাম পাচ্ছে তারা। আরাধ্য আসছেন নিজের ভক্তদের মাঝে। এর চেয়ে আনন্দের মুহূর্ত আর কী হতে পারে? তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে সকলেই শিরা কেটে তাজা রক্ত দিতে প্রস্তুত। ভক্তদের প্রত্যেকের হাতে ত্রিকোণাকার ধারালো ফলার মতো অস্ত্র। সামনে রাখা লোহার বাটি। মানবীর নাড়ি ছিঁড়ে যেই মাত্র শয়তানের পুত্র ভূমিষ্ঠ হবে, ভক্তরা রক্ত দিয়ে অভিষেক করবে তাকে।

শুরু হতে চলেছে একটি নতুন যুগ। যেখানে সত্যি থাকবে না, পবিত্রতা থাকবে না, জীবন থাকবে না; গোটা সংসার জুড়ে রাজত্ব করবেন মূর্তিমান শয়তানের ঔরসজাত প্রথম পুত্র। শয়তান ও পবিত্র কুমারী নারীর শারীরিক মিলনে যার জন্ম তাঁকে আরাধনা করে উপাসকরা আরও আরও শক্তিশালী হবে। এবার হয়ত অমরত্বও পেয়ে যেতে পারে তারা।

খানিকটা দূরে চোখমুখহীন পাথরের মূর্তির কাছে হাঁটুমুড়ে বসে আছেন ফাদার রুস্তম। তাঁর মাথা নীচু। হৃদির শারীরিক অবস্থার অবনতি গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে তাঁকে। শক্তিমান শয়তানের কাছে বারেবারে ক্ষমা চাইছেন তিনি। নিজের জীবনের বদলে তিনি হৃদির সব দোষ ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করছেন নরকের সম্রাটের দরবারে। আসন্ন শিশুটির জন্ম স্বাভাবিক হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু হৃদি যে ক্রমশই ঝিমিয়ে পড়ছে। প্রসবের শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলছে ওই মেয়ে। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার তবুও আগুনের মতো গনগনে গরম হল্কা বইছে। পাতাল থেকে উঠে আসছে বিষাক্ত বাষ্প। অদ্ভুত গরমে আর অস্বস্তিতে হৃদির ঘোর কেটে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছে না সে। মনে হচ্ছে, এখুনি তার হৃদযন্ত্র অবশ হয়ে যাবে। অথবা বুকের খাঁচা দুমড়ে ভেঙে উপরে উঠে আসবে। সেইসঙ্গেই পেটের চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে নাড়ি জড়ানো রক্তে মাখা একটি কুচকুচে কালো অক্টোপাস। নরক অধিপতির প্রথম সন্তান।

একটু একটু করে নিজের মস্তিষ্কের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে হৃদি। চোখের সামনে একটা কদাকার বিকট অবয়ব দেখতে পাচ্ছে ও। বিশাল লম্বা দেহ। চওড়া বুক, লম্বা গলা, মুখাবয়ব একটি ক্রূর নেকড়ের মতো। মাথার চুল কাঁধ ছাপিয়ে নীচে নেমেছে। দানবটা এখন হাসছে। উল্লাস করছে। তার মুখের দুইদিক থেকে বেরিয়ে এসেছে দুটি শ্বদন্ত। গনগনে আগুনের ভাঁটার মত দুই চোখ থেকে পাপ ঠিকরে বেরোচ্ছে। উরুর নীচ থেকে ইংরেজি এল অক্ষরের মতো বাঁকা দুটি পায়ের পাতা আসলে তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত থাবা। থামের মতো পা দুটির মাঝে তরোয়ালের ফলার ন্যায় পুরুষাঙ্গ। এই বিকট জন্তু এল কোথা থেকে?

পশুটার মুখ থেকে বীভৎস গর্জন আর আগুনের মতো হলকা বেরিয়ে আসছে। গরম ভাপে হৃদির নগ্ন শরীর ঢেকে যাচ্ছে একটু একটু করে। তবে কি এ-ই শয়তান! আজ সাক্ষাৎ শয়তানকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে হৃদি! একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে মেয়েটা। মাত্র ক’ঘণ্টা আগেও যে নিজের মৃত্যুকামনা করছিল সেই এখন নিজের সন্তানকে একটিবার স্পর্শ করার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। স্বয়ং শয়তান তার গর্ভে বীজ পুঁতে দিয়ে তাকে ধন্য করেছেন। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

***
পাথরের বেদীর ওপর রক্তমাখা শরীরে বসে আছে হৃদি। প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাবে ওর পা দুটো ভেজা। ডান হাতের কব্জির ওপর শয়তানি সংখ্যার উল্কিটা এখন জ্বলজ্বল করছে। তিনটে ছয়! কোলে সদ্যোজাত সন্তান। কিন্তু এ কী? এই মুখ যে ওর বড় চেনা। এ তো একেবারে প্রথমদিন দেখা অপূর্বদর্শন শিশুটির অবয়ব। নিজের অজান্তেই হৃদির ঠোঁটে হাসি খেলে গেল। ওর কোলে শুয়ে আনন্দে হাত পা ছুঁড়ে খেলছে ওর সন্তান। কখনওবা খিদের চোটে আকাশ ফাটানো কান্নায় কানে সমবেত সকলের তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতির নিয়মেই হৃদির উন্মুক্ত স্তনবৃন্ত থেকে ফোঁটা ফোঁটা গাঢ় হলুদ দুধ ঝরে পড়ছে শিশুটির গায়ে। কিন্তু মায়ের দুধে তো এ শিশুর পিপাসা মিটবে না। এর চাই তাজা রক্ত। নররক্ত! সদ্যোজাতকে ঘিরে ঈশ্বর বিরোধীদের উল্লাস চলছে। কালো যুগের ভগবান তাঁর ভক্তদের মাঝে এসছেন সশরীরে। এমন আনন্দের তিথি বারবার মেলে না। ফাদার রুস্তম দুহাত তুলে অভিবাদন জানাচ্ছেন সবাইকে।

হঠাৎই হৃদির কোলে শোয়া শিশুটি তীক্ষ্ণ হুঙ্কার ছেড়ে একলাফে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকলকে অবাক করে দিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে গেল রুস্তমের সামনে। চতুর গিরগিটি যেমন করে দেওয়াল বেয়ে হাঁটে, তেমনি করেই দানব শিশু রুস্তমের গা বেয়ে উঠতে লাগল। খুব বেশি নয়, মাত্র মিনিটখানেক সময় নিল সে। মুহূর্তের মধ্যেই শয়তানের প্রিয় শিষ্য রুস্তমের গলার নলি থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগল। নিথর দেহটি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। হা হা করে অট্টহাস্য করে উঠল বেদীতে আসীন হৃদি,

“দীর্ঘকাল তাঁর সেবা করেছ ফাদার। যাও, এবার তুমি বিশ্রাম নাও। ছুটি... এবার তোমার ছুটি।”

উপাসকরা লুটিয়ে আছে হৃদির পায়ে। ফাদার রুস্তমের পরে এই মেয়েটিই তবে এখন ঈশ্বরবিরোধী গোষ্ঠীর দলপতি। হ্যাঁ, স্বয়ং শয়তানের অর্ধাঙ্গিনী এই মেয়ে। একে চটায় কার সাধ্য?

ওদিকে হৃদির গর্ভজাত শয়তানের পুত্রটি এখন বিকৃত ভঙ্গিতে হামা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাইরের দুনিয়ার দিকে। তাকে দ্রুত মিশে যেতে হবে সাধারণের ভিড়ে। তবেই তো এ জগতের বুকে যাবতীয় কালো ছড়িয়ে দিতে পারবে। সাবধানে থাকবেন, কিচ্ছু বলা যায় না, আপনি, আমি যে কেউ হতে পারি তার পরের শিকার।

সমাপ্ত

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%