দানো

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

কোলের ভিতরে মাথার বালিশখানা গোল্লা করে পাকিয়ে বিছানার পিছনের মাটির দেওয়ালে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসল পায়রামামা। পদ্মকাটা স্টিলের বাটিতে ঘরে ভাজা বাদাম আর টকঝাল চানাচুর সহযোগে মুড়ি মেখে দিয়েছে দিম্মা। পাশে ইয়া বড় সাইজের চার-পাঁচটা কাঁচালংকা, যাকে বলে একেবারে গার্ডেন ফ্রেশ! মুড়িমাখা থেকে ভুরভুর করে আমতেলের গন্ধ বেরুচ্ছে। কানা উঁচু থালার উপর ধবধবে সাদা তিনখানা চায়ের কাপ। আদা-এলাচ দেওয়া ঘন দুধ-চা থেকে সরু সুতোর মতো ধোঁয়া উঠছে। বাটি থেকে একগাল মুড়ি তুলে আলগোছে মুখে পুরে আরামে চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল পায়রামামা। তারপর খানিক চিবিয়ে সুরুপ করে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল “আ---হ!” হাবুল আর আমি হাঁ করে মামার মুখের দিকে চেয়ে বসে ছিলাম। আসলে মামাকে দেখলেই ভূতের গল্প শোনার জন্য আমাদের প্রাণটা হাঁকুপাঁকু করে ওঠে। এমনিতে আমরা ডাকাবুকো অকালপক্ক ছেলে। খোদ কলকাতা শহরের বুকে জন্ম। ভূতটুত তেমন মানি না। তাছাড়া ক্লাস টেনে ওঠার পর থেকেই নিজেদের কেমন যেন প্রাপ্তবয়স্ক বলে মনে হচ্ছে। স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট ব্যাবহার করছি সেই ক্লাস সেভেন থেকে। সেই সুবাদে আমাদের একেবারে অজানা বলে আর প্রায় কিছুই নেই এই জগতে। কার্যকারণ দেখিয়ে তর্কটর্কও বেশ ভালই করি দুই ভাই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, পায়রামামার গল্পগুলো শুনলে রাতবিরেতে ছোট বাইরে যেতে হলে ভয়ে এখনও হৃদপিণ্ডটা কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে। রোমাঞ্চে সারা শরীরের রোম খাড়া হয়ে সজারুর কাঁটার মতো উঁচু হয়ে যায়। ভূত-প্রেত ঠিক নয়; মামাবাড়ির নির্জন গ্রাম্য পরিবেশে রাতের ঘন অন্ধকারে নিরবিচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতায় ওই ভয়-ভয় ভাবটাকেই আমরা দুই ভাই বড্ড উপভোগ করি।

আমাদের মামাবাড়িতে এখনও যৌথ পরিবার। প্রতি বেলায় ছটা-ছটা বারোটা পাত পড়ে। উৎসব অনুষ্ঠানের দিনে সেটাই বেড়ে হয় দশ-দশ কুড়ি। প্যারীচাঁদ দত্ত মায়ের খুড়তুতো ভাই। মজা করে আমরা পায়রামামা বলে ডাকি। পায়রামামা থাকে দিল্লিতে। খোদ রাষ্ট্রপতি ভবনে একটা উঁচু পদে চাকরি করে। বছরে একবার কী দুবার দিন দশেকের লম্বা ছুটি নিয়ে বেণীপুরে গ্রামের বাড়িতে আসে মামা। ব্যাচেলর মানুষ। দেশের বাড়ি, পরিবারের জীবিত কটা লোক আর বৃদ্ধা মা ছাড়া মামার আর তেমন কোনও পিছুটান নেই। তা এবার প্রায় বছর খানেক পর মামাবাড়ি এসে হঠাৎই পায়রামামার সঙ্গে দেখা। কলকাতায় কী একটা দরকার আছে বলে মামা দেশের বাড়ি এসেছে।

শ্রাবণ মাস। ভরা বর্ষা। সন্ধের আগে থেকেই একটানা ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। বিরাম বিশ্রামের নাম গন্ধটুকু নেই। উঠোনটা জলে ভরে গিয়ে এখন একটা ছোটখাট ডোবা। নালা কেটেও জমা জল বাগে আনা যাচ্ছে না। আমরা রয়েছি মাটির ঘরে। উল্টোদিকে পাকা দোতলা। দিম্মা, মেজদিদা আর কাজের মেয়ে গৌরিমাসি সেখানে রান্নার তোড়জোড় করছে। ছোটদাদু পাকা দালানের কোণে বসে একমনে চা খাচ্ছে। রেডিওতে পুরনো দিনের একটা হিন্দি গান বাজছিল। যদিও বৃষ্টির শব্দে গানের কলি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ভিজে বাতাসে ভর করে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ভাজা ইলিশের লোভনীয় গন্ধ। রাতের মেনু বোধহয় খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা। বড়দাদুর বিছানায় মামাকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছি আমরা। আমি আর আমার যমজ ভাই হাবুল। মাঝে মাঝে অবশ্য তিন মামাতো ভাইয়ের জন্যই মনটা অস্থির-অস্থির করছে; তবে কুছ পরোয়া নেহি। কাল তারা এসে পড়লে না হয় আবার এক রাউন্ড গল্প শোনা যাবে। পায়রামামা তো আর এখুনি ফিরছে না। আমরাও থাকছি আরও সাত আটদিন।

যে ঘরটায় আমরা বসেছি এখানে বড়দাদু থাকতেন। এখন দিম্মা একা থাকে। বড়দাদু, মেজদাদু দুজনেই গত হয়েছেন অনেক বছর হল। এই ঘরের বয়স আন্দাজ একশ পনেরো। উলুটি করা মসৃণ দেওয়াল। অনেকটা আজকের যুগের প্যারিস ওয়ালের মত। জানলা, দরজার মাথায় সুন্দর কারুকাজ। বড়রা বলেন, দুটো না তিনটে কাঁসার বাটি ঘষে দেওয়ালগুলোকে মাখনের মত মসৃণ করে তোলা হয়েছিল। সেই বাটিগুলোর ধাতু ক্ষয়ে নাকি একেবারে পাতলা গিয়েছিল। এখানে এলে দিম্মার সঙ্গে আমরা এই ঘরেই ঘুমোই। দুর্দান্ত গরমের দিনেও দারুণ ঠাণ্ডা থাকে ঘরটা। ভারি আরাম হয়। বিছানার পাশের জানলাটা এখন অর্ধেক ভেজানো। মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে দামাল হরিণ ছানার মতো ঘরের ভেতরে ঢুকে ছুটোছুটি করছে। জানলার পাল্লাগুলো খটখট শব্দে একবার খুলছে, আবারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিকেল থেকে লোডশেডিং। এসব গ্রামের দিকে এক দু-ফোঁটা বৃষ্টি পড়লেই কারেন্ট বাবাজী গোটা রাতের মতো হাওয়া হয়ে যান। কখনও কখনও আবার দু-তিন দিন পাত্তা পাওয়া যায় না। বড় হ্যারিকেনটা রয়েছে ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিলের ওপর। হাওয়ার তালে তার হলদে আলো নেচে নেচে উঠছে। আমাদের দুই ভাইয়ের দিকে একবার ভাল করে দেখে নিয়ে ভুরু কুঁচকে পায়রামামা জানতে চাইল,

“আমাদের আরও একটা ভাই ছিল। তোরা নিশ্চয়ই তার কথা শুনিসনি? কী? তাই তো?”

আমি আর হাবুল মুখ চাওয়াচায়ি করে বললাম,

“না তো! আমরা তো ছোটবেলা থেকে তোমাদের তিনজনকেই দেখে আসছি। শ্যামামামা, তুমি আর বিপুলমামা।”

“মানিক! ছোটকার ছেলে। আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাই। এক মাসও বাঁচেনি।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপটা ডান হাতে তুলে দুটো চুমুক দিয়ে উদাস চোখে পায়রামামা দূরের দেওয়ালের দিকে তাকাল। ছাইরঙা মাটির দেওয়ালের গায়ে আমাদের বড় বড় বাঁকাচোরা ছায়া। ডাইনে বাঁয়ে নড়ছে। মানুষের অবয়ব ভেঙে অনেকটা অতিমানবের মতো বিকট, কদাকার। ছায়াশরীরগুলো খেয়ালের বশেই আপন করে নিয়েছে পিঠের ওপর কুঁজ, মাথার মাঝে অদ্ভুত স্ফীতি, দু-জোড়া বিকৃত প্র্যতঙ্গ! যেন কোনও দক্ষ অঙ্গ প্রতিস্থাপক খেলার ছলে মানুষের ছায়ার সঙ্গে অতিরিক্ত অঙ্গের ছায়া জুড়ে জুড়ে তৈরি করছেন নতুন প্রজাতির অদ্ভুতদর্শন কোনও অতিআঙ্গিক ছায়াজীব। হঠাৎ দমকা ঝোড়ো হাওয়ার ধাক্কায় বাগানের সুপুরি গাছগুলোর ভিজে পাতা একসঙ্গে খসখস খসখস শব্দ করে উঠল। মনে হল, ঘরের পিছনে বাগানের মধ্যে কারা যেন ফিসফিসিয়ে উঠল হঠাৎ! সে আওয়াজ ঠিক প্রাকৃত নয়। যারা কথা বলছে, হাজার চেষ্টা করলেও তাদের গলা কিছুতেই সাধারণ মানুষের কণ্ঠের মত শোনাবে না। গাটা কেমন শিরশির করছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, অবচেতন মনে একটু একটু করে জেগে উঠছে নিষিদ্ধ অনুভূতি লাভের আকাঙ্ক্ষা। সেটা আন্দাজ করেই আপন মনে কী যেন ভেবে নিয়ে পায়রামামা শুরু করল আমাদের মামাবাড়িরই এক অজানা অধ্যায়ের গল্প।

“তখন আমরা ছেলেমানুষ বুঝলি! বছর দশ বারো বয়স। লেখাপড়ায় একদম মন বসে না। অকাজেই সময় কাটাই বেশি। মাঝে মাঝে ছোট বোনটাকে নিয়ে খেলাধুলো করি। আমরা তিন ভাই মানে তোদের বড়মামা শ্যামাদা, আমি আর বিপুল তিনজনই ছিলুম ভয়ানক ডানপিটে। বই পত্তরের নাম শুনলেই গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত সে সময়। বাংলার পাঁচের মত মুখ করে পিঠে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যেতাম। বাড়িতে মাস্টার রাখলে মাসখানেকের বেশি টিকত না। বাবা কিংবা জেঠু অনুরোধ করলে স্কুলের মাস্টারমশাইরা হাত তুলে দিতেন ততক্ষণাৎ। পাড়া থেকে স্কুল সর্বত্রই তখন আমাদের চূড়ান্ত বদনাম। মা-জেঠিমা কিছুতেই আমাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারত না।

সারাদিন মাঠে ঘাটে টো টো করে বেড়াই। দামড়া সাইকেল নিয়ে মাঝ মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি নিরুদ্দেশের পথে। ইটখোলার ময়দানে গোটা দুপুর ঘুড়ি নিয়ে হুড়োহুড়ি করি। জেলেপাড়ার ছেলেদের দেখাদেখি লাফ দিয়ে পানাপুকুরে নেমে জ্যান্ত মাছ ধরি দাঁতে কামড়ে। লোকের বাগানের আম, কাঁঠাল পেড়ে আনি বিনা দ্বিধায়। সন্ধের পর গেরস্থ বাড়ির টিনের চালের ওপর আধলা ইট ছুঁড়ে মেরে লোকজনকে ভয় দেখাই। আমাদের দস্যিপনায় অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের লোক বাড়ি বয়ে মায়েদের কথা শোনাতে আসত। উনুনে পোড়া বাঁশ, চ্যালা কাঠ, গরম খুন্তির বাড়ি হামেশাই খেতে হত আমাদের; কিন্তু দৌরাত্ম্য আর কিছুতেই কমত না। সেসময় জ্যাঠামশাই মানে তোদের বড়দাদু দু’হপ্তায় একবার বাড়ি আসতেন। আর আমার বাবা আসতেন মাসে একবার। বেশ মনে আছে, বাবা আর জেঠা এসে জুতো না খুলেই আমাদের কাণ্ডকারখানার লিস্টি দেখতে বসতেন। তিন ভাইয়ের শাস্তি হত অপরাধের রকম বুঝে। প্রায়শই বাড়ির পেছনের বাগানে নির্বাসন দেওয়া হত আমাদের। খালিপেটে গোটা রাত বাগানে কাটাতে হবে। হাজার কান্নাকাটি করলেও ছাড় পাওয়া যাবে না। সমুখ দরজা আর খিড়কির দরজা বন্ধ করে দিলে বাড়ির উঠোনে ঢুকতে পেতুম না আমরা। ঘরের পেছনেই ঘুরঘুর করতুম। তারপর ক্লান্ত হয়ে ঝিমুনি এলে গোয়ালঘর থেকে খড়ের গাদা তুলে এনে কাঁঠালতলায় পেতে শুয়ে থাকতুম তিন ভাই। আমাদের তিনজনের মধ্যে শ্যামাদা ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান। মাঝরাতে খিদের জ্বালায় যখন চোখে জল আসার উপক্রম হত, শ্যামাদা আমাদের দু-ভাইকে নিয়ে গোয়ালে ঢুকে দুধেলা গোরুটাকে বলত,

“বুধিয়া রে, ভাই দুটোর বড্ড খিদে পেয়েছে। বাড়ি থেকে তো আমাদের শাস্তি দিয়েছে। এখন কোথায় যাই বল?”

বললে বিশ্বাস করবি না, ওই রাতদুপুরে বুধিয়া গোরুর বাঁটে মুখ লাগিয়ে আমরা দুধ খেতুম। গোরুটা কী বুঝত কে জানে! চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। রাটি কাড়ত না। এইরকম করেই দিন কাটছিল দিব্য। তা সেবার বর্ষায় জেঠা আর বাবা মিলে বড় পিসি পিসেমশাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ছোটকার বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন বুঝলি! বারুইপুরের রায়চৌধুরীদের একমাত্র মেয়ে। রায়চৌধুরীদের তখন বিরাট নামডাক! একসময়কার জমিদার বলে কথা! পাকা কথা হতে না হতেই নতুন কাকিমার বাড়ি থেকে হাঁড়ি বোঝাই মালপোয়া, জলভরা সন্দেশ, নিমকি, রাবড়ি সব এসে গেল। আমাদের জন্য এল ছিটের জামা আর হাফ প্যান্ট। মায়েদের জন্য চওড়া পাড়ের তাঁতের কাপড়। নতুন কাকিমা মানুষটা এবাড়িতে আসার আগেই আমাদের সকলের মন জয় করে নিল। ভালমন্দ খাবার খেয়ে, উপহারের জামা পরে অধীর আগ্রহে কাকিমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলুম আমরা। দিন যায়, মাস যায়, ছোটকার বিয়ের তারিখ এগিয়ে এগিয়ে আসে। তারপর ডিসেম্বরের কনকনে ঠাণ্ডায় একদিন বিকেল বিকেল ধুতি পাঞ্জাবি পরে বরযাত্রী সেজে সকলে মিলে ছোটকাকে নিয়ে বিয়ের আসরে হাজির হলুম। এলাহি আয়োজন! আত্মীয় কুটুমরা তো ধন্য ধন্য করে অস্থির। পরের দিন রোদ ঝলমলে সকালে নতুন কাকিমা বউ হয়ে এল আমাদের এই বাড়িতে। ফরসা টুকটুকে মিষ্টি দেখতে সেই নতুন কাকিমা ছমছম ছমছম করে পায়ের নূপুর বাজিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াত। মিষ্টি গলায় প্রতিদিন সকালে গান গাইত। তারপর মায়েদের সঙ্গে রান্নাঘরে গিয়ে টুকটাক কাজকর্ম শিখত। আমাদের সঙ্গে তার ভারি ভাব জমেছিল জানিস! গরমের দুপুরে কচিকাঁচাদের নিয়ে দল পাকিয়ে বাগানে বসে কাকিমা পেয়ারা, কালো জাম, নুন লংকা দিয়ে মাখা কাঁচা আম খেত। কতই বা বয়স ছিল তার, এই সতেরো আঠারো হবে। ছোটকা তখন কলেজ শেষ করে ভার্সিটিতে পড়ছে। কলকাতার মেসে থাকত। ছুটিছাটা ছাড়া বাড়িতে আসতে পারত না। তবে ছোটকা গ্রামে এলে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে শানের ঘাটে মাছ ধরতে যেতুম। সারাদিন গোটা গ্রামটা চষে বেড়াতুম। কী যে মজা হত! নতুন কাকিমা লেখাপড়াও জানত। স্কুলের কাজে মাঝে মাঝে আমাদের অল্পবিস্তর সাহায্য করত। বাউন্ডুলেপনা কমিয়ে সন্ধের দিকটায় তখন খাতা বই নিয়ে তার ঘরে বসে পড়াশোনা করতুম আমরা।

সময় বয়ে চলল ঘড়ির কাঁটার মত। প্রায় বছর দুয়েক পর, জেঠিমা একদিন আমাদের তিন ভাইকে ডেকে বলল,

“সারা দুপুর কীসের এত দাপাদাপি লাফালাফি চলে রে তোদের? পাড়ার লোকে যে ছিঃ ছিঃ করে, মন্দ বলে সে খেয়াল আছে? আর এই নতুন বৌটাও হয়েছে তেমনি। ধিঙ্গি মেয়ে অথচ লজ্জা ঘেন্না বলে কিচ্ছুটি নেই! এই যে, কান খুলে শুনে নে, নতুন বউকে এখন থেকে আর একদম বিরক্ত করবি না বুঝলি! তার শরীরটা ভাল নেই।”

আমরা তো আকাশ থেকে পড়লুম। শরীর ভাল নেই মানে? বলে কী জেঠিমা? কাকিমা তো দিব্যি হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, গান গাইছে, গপ্পের বই পড়ছে, সেলাই করছে! এই তো গতকালও হারাধনের বরফ কল থেকে ঠাণ্ডা কুলফি আনিয়ে খেল। তবে? কীসের শরীর খারাপ! বাড়ির কাউকে যে জিজ্ঞেস করব সে আর সাহসে কুলোলো না। তিন ভাই মিলে আলোচনা করেও কোনও কূল-কিনারা পেলাম না। ওদিকে নতুন কাকিমাকে সেইদিন থেকেই একপ্রকার ঘরবন্দি করে দেওয়া হল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় মা, জেঠিমা, কমলা দি পালা করে তার জন্য খাবারদাবার, ফল, দুধ ইত্যাদি নিয়ে যায়। কিন্তু কাকিমা আর ঘর থেকে বেরোয় না। কারও সঙ্গে মেলামেশা করে না। আমরাও কাকিমার ঘরে যেতে পারি না। একদিন আমাদের বাড়ির ধানঝাড়া মাসি এসে বেনেপাড়ার পোড়া-মা তলার এক খাবলা মাটি আর দুটো মাদুলি দিয়ে গেল। সেই সঙ্গে জেঠিমাকে বলে গেল,

“নতুন বউকে এখন চোখে চোখে রেখ গো কত্তা মা। এই তো তার পেত্থমবার! রাতবিরেতে বেরুলে মেয়েটা যেন চুলে একখান গিঁট পাইকে নেয়! তোমাদের বাড়িটা বাপু খারাপ জমির ধারে। চারদিকে বড় বড় গাছপালা, কোথায় যে কার বাস কে জানে!”

চোখের সামনে নিত্যদিন এমন কিছু ঘটনা ঘটছিল, যেগুলোর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমরা। প্রথম প্রথম কৌতূহল ছিল অসীম। তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত আগ্রহ থিতিয়ে একসময় মনের মধ্যেই চাপা পড়ে গেল। ছেলে ছোকরার মন তো। কখন যে কীসে মজে! তবে পুকুর ধারের গাছ থেকে আঁশফল, ফলসা পাড়লে অথবা মিত্তিরদের নিচু তলার বাগান থেকে কাঁচা আমড়া, পাকা তেঁতুল জোগাড় করতে পারলেই বাগানের দিক থেকে চুপি চুপি কাকিমার ঘরের জানলায় গিয়ে দিয়ে আসতাম আমরা। খেয়াল করতাম, বেচারির চোখের তলায় ঘন হয়ে কালি পড়েছে। অত সুন্দর মানুষটা শুকিয়ে কেমন যেন দড়ির মত হয়ে গিয়েছে। কোটরে ঢোকা ক্লান্ত চোখ দেখলে মনে হত চোখদুটোর জায়গায় আসলে ফাঁকা ফাঁকা দুখানা গর্ত! আবছা উদাস দৃষ্টি। গায়ের জামা ঢলঢল করছে। হাতদুটো সরু কঞ্চির মত দুপাশে ঝুলছে। একটু জোরে চাপ দিলেই মট করে ভেঙে যেতে পারে। পিঠটা বেঁকে গিয়ে বয়স্ক মানুষদের মত “দ” হয়ে গিয়েছে। নতুন কাকিমার সেই আলো ঝলমলে রূপ আর নেই। কপালটা এই এত্তখানি চওড়া। গালের হাড়দুটো ঠেলে উঠেছে। রুগ্ন হাড়সার আর কেমন যেন কমজোরি হয়ে গিয়েছে আমাদের কাকিমা। বিপুল ফিসফিস করে আমার কানে-কানে বলত,

“জানিস ভাই, জেলেদের ছেলেরা বলে পাঁচি ডাইনিতে নজর দিলে নাকি এমন হয়। দেখিস, কাকিমার সব রক্ত চুষে নেবে ডাইনিটা। মেরে ফেলবে রে! আমাদের নতুন কাকিমাটাকে বোধহয় মেরেই ফেলবে।”

আমি ভয়ে ভয়ে কাকিমার ঘরের সিলিং এর দিকে তাকাতাম। কেউ ওঁত পেতে নেই তো সেখানে? এখুনি সকলকে চমকে দিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে লাফিয়ে পড়ে কাকিমার ঘাড়টা মটকে দেবে না তো? আবার নতুন কাকিমার পায়ের পাতা দুটো দেখে নেওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছেও উঁকি মারত মনে। বলা তো যায় না! কোনদিন হয়ত জানতে পারলাম, আমাদের কাকিমা আসলে মানুষই নয়! ঠাকমার মুখে তো আর কম গল্প শুনিনি! বিয়ের পরে পরেই এ-গ্রামের নগেন কাকার বউকে নাকি পেত্নিতে ধরেছিল। ইচ্ছেমত পায়ের পাতা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে ফেলতে পারত সে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল খুলে রাত বিরেতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ত কচি কচি ছেলেমেয়ের কাঁচা রক্ত খাবে বলে। কে নাকি একবার তাকে পাড়ার মোড়ের কদম গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতেও দেখেছিল। অনেক ছোটবেলায় শোনা গল্পগুলো মনে পড়তে আমাদের মনের মধ্যে নানা তোলপাড় চললেও কাকিমা বেচারি কিন্তু তার তিন কিশোর বন্ধুকে দেখে খুব আনন্দ পেত। ক্ষীণ গলায় বলত,

“কবে যে আবার তোদের সঙ্গে খেলতে যেতে পারব! আবার যে কবে গাছে চড়তে পারব! কী রে, তোরা

আমায় খেলতে নিবি তো আবার?”

“আচ্ছা, তবে যে মায়ের কাছে শুনেছি ছোটদাদু বিয়েই করেনি! ছোটদিদাকে তো আমরা কোনওদিন দেখিনি! তিনি এখন কোথায় পায়রামামা?”

সাগ্রহে জানতে চাইলাম। মামা নিজের ডানহাতটা উঁচু করে আমাকে থামিয়ে বলল,

“দাঁড়া দাঁড়া। আগে পুরোটা শোন। নিজেই বুঝতে পারবি।”

“এইভাবে চলতে চলতেই ছ-সাত মাস কেটে গেল। তখন সবেমাত্র ভাদ্র পড়েছে। সাত-আটদিন ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে লোডশেডিং আর পচা ভাদুরে গরম। আকাশ থেকে জল পড়া থামে তো গুমোট গরমটা ছুটে এসে আবার জাপটে ধরে। দম বন্ধ হয়ে আসে। আমাদের মনে হত সকলের অলক্ষ্যে কেউ যেন গ্রামটাকে একবার ভেজাচ্ছে আর একবার পোড়াচ্ছে।

স্কুলে পরীক্ষা চলছিল। দোতলায় ঘরবন্দি হয়ে শ্যামাদা আর বিপুলকে নিয়ে জোর কদমে পড়াশোনা চালাচ্ছি। শ্যামাদা আমাদের এক ক্লাস উঁচুতে। তার একটু বেশিই চাপ। তবে পড়াশোনার ফাঁকে বড়দের কথাবার্তা শুনলেই কান খাড়া করে বাইরের পরিস্থিতিও বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতাম আমরা। নতুন কাকিমার অবস্থা যে খুব একটা ভাল নয়, মায়েদের কথা শুনে সেটা দিব্যি বুঝতে পারতাম। ওরই মধ্যে একদিন বেলাবেলি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি, বাবা আর জেঠু বাড়ি এসেছেন। সঙ্গে ব্রিফকেস হাতে একজন শহুরে মহিলা ডাক্তার। তিনি বারবার ঘড়ি দেখছেন আর খুব ধীরে ধীরে গম্ভীর মুখে কীসব যেন বলছেন। বুঝতে আর বাকি রইল না যে বড়দের মধ্যে কিছু জরুরি আলোচনা চলছে। ওদিকে উঠোনের কোণে কাঠের জ্বালে বড় গামলায় জল গরম করছে কমলাদি। আমাদের দেখেই মা তাড়াতাড়ি ছুটে এল,

“এই যে শ্যামা, বিপুল এসে পড়েছিস তোরা? যা তো বাবারা দোতলার ঘরে গিয়ে পড়তে বসে যা। সামনে অঙ্ক পরীক্ষা না? একদম সময় নষ্ট করিস না। কমলাদিকে দিয়ে এখুনি তোদের জলখাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, আমি না ডাকা পর্যন্ত কিন্তু নিচের তলায় আসবি না, কেমন?”

ভারি অবাক হলাম। বাবা, জেঠা কেউ একবার জানতেও চাইলেন না আমাদের পরীক্ষা কেমন হয়েছে। জামা কাপড় ছেড়ে, যাহোক করে কলতলায় হাতমুখ ধুয়ে বইপত্তর সঙ্গে নিয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। গরম গরম লুচি আর বেগুন ভাজা পৌঁছে দিয়ে গেল কমলাদি। খাবারটা সবেমাত্র মুখে তুলেছি বুঝলি, নতুন কাকিমার প্রবল চিৎকারে আর কান্নায় আমাদের সারা বাড়িটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে কী ভয়ানক আর্তনাদ! সে কী কান্না! যেন কেউ ধারালো কিছু দিয়ে কাকিমার হাত পা কেটে নিচ্ছে। গায়ের কাঁচা মাংস যেন খুবলে খাচ্ছে। সেই বিকট চেঁচানি এখনও আমার কানে বাজে রে! খাবার যেমন কে তেমন থালাতেই পড়ে রইল। পড়াশোনায়ও কি তখন আর মন বসে নাকি? আমাদের তিনজনেরই আসলে খুব ভয় করছিল জানিস। ওরকম কিছু তো আগে শুনিনি কোনোদিন। বারবার মনে হচ্ছিল কাকিমা বুঝি আর বাঁচবে না। বিপুল প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল। আসলে নতুন কাকিমাকে না আমরা কাকিমা কম, বন্ধু মনে করতাম বেশি।

সন্ধ্যার মুখে হঠাৎই কান্নার আওয়াজ থেমে গেল। সারা বাড়ি তখন আবার আগের মত নিস্তব্ধ। শুনশান। তবুও দরজা খুলে বেরোতে পারলাম না আমরা। মায়ের নিষেধ ছিল যে! যাইহোক, প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক পর কমলাদি রাতের খাবার দিতে এলে শ্যামা দা আর আমি তাকে চেপে ধরলাম।

“নতুন কাকিমার কী হয়েছে গো কমলাদি? ওরকম করে কাঁদছিল কেন? তুমি তো সব জান, তোমাকে বলতেই হবে।”

কমলাদি একটু প্রথমটায় খানিকটা বিরক্ত হয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল,

“ওসব আমি জানি না বাপু। শহর থেকে এক ডাক্তারনি এসেছিল। সেটুকুই দেখেছি। আমি তোমাদের বাড়ি ঝিগিরি করতে আসি, ভেতরের কতা জানব কেমন করে খোকাবাবু? নাও নাও এখন তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড় তো দেখি।”

শ্যামা দা তেড়ে উঠল,

“মিথ্যে কথা। তুমি সব জান। তোমাকে রোজ কাকিমার ঘরে যেতে দেখেছি। এখন জানি না বললেই হল?”

কমলাদি বুড়ি মানুষ। আমরা তিনজন মিলে বুড়িকে চেপে ধরে পেড়াপিড়ি শুরু করতে শেষটায় সে কেঁদেই ফেলল। ভীষণ ভয় পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“ছোওওট বউয়ের একখানা ছেলে হয়েছে গো খোকা। কিন্তু...কিন্তু...”

কমলাদির কথা আর কে শোনে তখন? আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম আমরা।

“ওহ! তাই বল! ওইজন্য ডাক্তার এসেছিল। বুঝেছি এইবার। ভাই হয়েছে আমাদের? এ তো দারুণ খবর! এখুনি ভাইকে দেখতে যাব আমরা।”

কিন্তু বুড়ি কমলাদি আমাদের জড়িয়ে ধরে বারবার বাধা দিতে থাকল।

“খবরদার...খবরদার বলছি...ওখেনে যেওনি গো খোকাবাবু। ও...ও...ওটা কোনও মানুষের ছেলে নয়। আমি নিজের চোখে দেকিচি। ও...ওটা একটা দানো।”

কমলাদির কথা শুনেই আমার মাথায় খুন চেপে গেল।

“দানো? সে আবার কী? কী সব যা তা বকছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে কমলাদি? আমাদের ভাই মানুষ নয়, দানো? দাঁড়াও নিচে গিয়ে এখুনি জেঠুকে বলছি সব। এসব বলেছ শুনলে না ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোমায় তাড়াবেন জেঠু।”

কমলাদি বেচারি আর কিছুই বলল না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফোঁপাতে লাগল। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। ঠোঁটদুটো থিরথির করে কাঁপছে। ভয়ে দরদর করে ঘামছিল বুড়িটা। যেন সত্যি সত্যিই কোনও দত্যি কী দানোকে দেখে ফেলেছে।

হাতে হ্যারিকেন নিয়ে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়েই আমরা তরতরিয়ে একতলায় নামতে লাগলাম। চৌত্রিশটা সিঁড়ি। তখনও নেড়া, পাশের গার্ড ওয়ালটা তৈরি হয়নি। মানুষের পায়ের আওয়াজে সিঁড়িঘরের ঘুলঘুলির ভেতর থেকে সরসর করে সরে গেল কালো রঙের একজোড়া নেংটি ইঁদুর। সেদিকে তাকিয়ে একবার যেন মনে হল ইঁদুর দুটোর চোখ লাল টুনি বাল্বের মত জ্বলছে আর নিভছে! হ্যারিকেনের হলদে আলোয় টিনের ছাউনিতে আটকে থাকা টিকটিকিটার ছায়া কুমীরের বাচ্চার মত বড় মনে হচ্ছিল। আমরা হাঁটছিলাম, আর সে ছায়াও গুঁড়ি মেরে আমাদের পিছু পিছু চলছিল। পূর্ণিমার রাত। বৃষ্টি ধরে গিয়ে চাঁদ উঁকি মেরেছে আকাশের চওড়া বুকে। ধূসর কালো আর নীল মেঘ ভেসে ভেসে চলেছে অজানা কোনও দেশের দিকে। ম্লান জ্যোৎস্নার আলোয় সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখলাম তোদের দিম্মা মানে আমার জেঠিমা বারান্দায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বাবা আর জেঠুর মুখ থমথমে, গম্ভীর। বাড়ির পরিবেশটা বড় অচেনা লাগছিল সেদিন। সেই সময় চারদিকের নৈঃশব্দ্য ভেঙে হঠাৎ নতুন কাকিমার ঘরের দিক থেকে অপার্থিব একটা শব্দ ভেসে এল। অনেকটা...অনেকটা প্রলম্বিত সুরে গোঙানির মত বুঝলি! আমাদের তো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে কী বিকৃত আওয়াজ! নিশুতি রাতে বাঁশ বনের ভিতর থেকে শেয়ালের বাচ্চা কেঁদে উঠলে অনেকটা ওইরকম শোনায়। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। ওই আওয়াজটা কোনও শিশুর কান্না নাকি জন্তুর চিৎকার সেটা বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে মাঝ সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি আর বিপুল। বিপুল আমার হাতটা টেনে ধরল। শ্যামাদা আমাদের মধ্যে বড় আর সাহসীও। পায়ে পায়ে এগিয়ে জেঠিমার পিঠে হাত রেখে সে বলল,

“ওমা মা, ভাইকে আমরা দেখব না মা?”

জেঠিমা কিচ্ছুটি বলল না। পাথরের মত অনড় হয়ে বসে রইল। মা কোথায় ছিল জানি না। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমাদের প্রচণ্ড বকাবকি করতে লাগল,

“কী রে? তোদের বলেছিলাম না নিচে আসবি না! বড়রা যখন নিষেধ করছে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। আর শ্যামা, তোকেও বলিহারি যাই বাবা। তুই তো ওদের বড় দাদা। তোর তো এটুকু বুদ্ধি থাকা উচিত। যা, শিগগির ভাইদের নিয়ে ওপরে চলে যা। আর এক মুহূর্তও দাঁড়াবি না এখানে। যা বলছি!”

আমরা দ্রুতপায়ে উল্টোমুখে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে লাগলাম। আর আমাদের পিছনে সেই পৈশাচিক কান্নার বেগ ক্রমাগত বেড়েই চলল। অনুভব করলাম, একটু একটু করে গোটা বাড়িটা একটা অন্ধকার বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। বুঝলাম ভয়ানক কোনও অঘটন ঘটতে চলেছে। নরক থেকে উঠে আসা একটা মিশকালো ছায়া বিরাট হাঁ করে আমাদের গোটা বাড়িটাকেই গ্রাস করে নিচ্ছে খুব ধীরে ধীরে। তাড়াতাড়ি আবার দোতলার ঘরে ঢুকে পড়লাম। শ্যামাদা দড়াম করে দরজায় খিল তুলে দিল। মন পড়ে রইল ওইদিকেই। কমলাদির কথাগুলো বারবার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে রাতে আর কিচ্ছু পড়াশোনা হল না। খুব খিদে পেয়েছিল; কিন্তু ভয়ে, উৎকণ্ঠায় কিছু খেতেও পারলাম না কেউ।

পরের দিন ছুটি ছিল। ঘুম ভাঙল বেশ বেলায়। ভয়ে ভয়ে নিচের তলায় নেমে দেখি সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক। জেঠিমা রান্নাঘরে। কমলাদি নিচু হয়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। মাঝে মাঝেই কোমরে ব্যথায় “ওরে বাবারে! মরে গেলুম রে” করে ডাক ছাড়ছে। সবাই যার যার নিজের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু কারও মুখে হাসি নেই। বাড়িতে একটি শিশু জন্মালে যে আনন্দের পরিবেশ থাকে, নতুন কাকিমার ছেলে হতে আমাদের বাড়ির অবস্থা হয়েছিল ঠিক তার উল্টো। সকালের জল খাবার খাইয়ে দাইয়ে আমাদের আবার দোতলায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। সেদিন বাবা আর জেঠু পালা করে আমাদের পাহারা দিতে লাগলেন। কখনও ছাদে পায়চারি করেন তো কখনও ঘরে ঢুকে মাদুরে বসে অঙ্ক খাতা দেখে আমাদের অঙ্ক কষতে দেন। তবে সবকিছুই যে আমাদের ওপর বাড়তি নজর রাখার জন্য করা হচ্ছিল, সেটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি।

ঠিক তিনদিন পরে শনিবার ভর দুপুরে তারস্বরে বাবা পঞ্চাননের নাম নিতে নিতে কালীকেষ্টদা আমাদের বাড়ি এসে হাজির। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই বলল,

“কই গো, বাড়ির সব লোকজন গেলে কোথায়? মায়েরা কই? মুখ দেখাও! আমার মা যে আমায় আদেশ করে তোমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন গো।”

কালীকেষ্টদা লোকটাকে দেখতে শুনতে অতি সাধারণ হলে কী হবে লোকে বলত সে নাকি অনেক কিছু জানে। তন্ত্রমন্ত্র সবই নাকি তার নখের আগায়। মায়েরাও খুব সম্মান করত তাকে। গলায় কাপড় দিয়ে পা ছুঁয়ে প্রণাম করত। কালীকেষ্টদা বোধহয় সেদিন নতুন কাকিমার ছেলেকে দেখতেই এসেছিল। আমরা তো নিচে যেতে পারলাম না। ছাদ থেকে উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখতে লাগলাম। ভগবানের নাম নিয়ে কাকিমার ঘরে ঢুকে মিনিট দুয়েকের মাথায় ভয়ানক ভয় পেয়ে ছিটকে বেরিয়ে এল কালীকেষ্টদা। উঠোনের একেবারে মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সারা মুখে লাল সিঁদুর লেপটে রয়েছে। মাথার চুল এলোমেলো। কোমর পর্যন্ত লম্বা জটাগুলো বড় বড় সাপের মত দুলছে। চোখদুটো ঠিকরে প্রায় বেরিয়ে এসেছে। জোরে জোরে মাথা দোলাতে দোলাতে ইষ্টদেবতার নাম জপতে জপতে সে বলতে লাগল,

“এ কী! এ কী! এ আমায় কাকে দেখতে পাঠালি মা! এ যে সাক্ষাৎ শয়তান। এতো নরক থেকে উঠে এসেছে। কী অঘটন! কী অঘটন!”

জেঠিমা মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল তখুনি। বাবা আর জেঠু দুই হাত জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল,

“তবে উপায় কী কালীকেষ্ট? কিছু একটা কর।”

কালীকেষ্টদা হুঙ্কার ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“উপায়? উপায় আর কিছুই নেই গো। এ বাচ্চার তেষ্টা দুধে মিটবে না। মায়ের বুকের কাঁচা রক্ত ছাড়া একে তোমরা কীসে সন্তুষ্ট করবে? তোমাদের ঘরে পিশাচ এসেছে গো পিশাচ। নাও, ধ্বংসের জন্য তৈরি হও এবার।”

তারপর জেঠিমার দিকে তাকিয়ে একটুখানি নরম হয়ে শান্ত গলায় বলল,

“ওঠ মা ঠাকরুন। মন কঠিন কর। কেঁদে আর কী লাভ বল? এ তো তোমাদের বংশেরই পাপের ফল। আহা বেচারি নতুন বউ! তাকে রক্ষা কর রে জগজ্জননী। তোকে তোর এই ছেলের মাথার দিব্যি!”

কালীকেষ্টদার কথা শুনে আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলাম! চলতে ফিরতে উঠতে বসতে এমনি এমনিই গা ছমছম করে। রাতে প্রায়ই উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। বিছানা থেকে নেমে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খেতেও সাহস পাই না। রাতে বাথরুমে যেতে হলে তখন আমরা তিন ভাই একসঙ্গে যেতাম। তার মধ্যে নতুন কাকিমা থেকে থেকেই মানিক, আমার সোনা-মানিক, সাত রাজার ধন মানিক আমার... বলে বলে ছেলেটাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করত। কাকিমার গলা শুনে কিনা জানি না, তবে বাচ্চাটা মাঝে মাঝেই সেই অদ্ভুত গোঙানির মতো শব্দ করে উঠত। আরও ভয় পেয়ে যেতাম আমরা। গা শিরশির করে উঠত। আমরা দু’ভাই শ্যামদাকে জিজ্ঞেস করতাম,

“হ্যাঁ রে দাদা নতুন কাকিমার ছেলেটা কি সত্যিই মানুষ নয়? মানিক কি সত্যিই পিশাচ? নাকি দানব? কী মনে হয় বলত?”

দাদা চুপ করে থাকত। মনে মনে ভাবতাম মানিকটা বড় হলে না জানি কেমন হবে? সে যদি সত্যি সত্যিই সব্বার রক্ত চুষে খায়! আমাদের ভয় কাটানোর জন্য কাউকে কিচ্ছু না বলেই শ্যামাদা একদিন অদ্ভুত একটা কান্ড করে বসল জানিস! একদিন সন্ধেবেলায় চুপিচুপি বাইরের ঘরের দাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ফিরে এসে যা বলল তাতে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।

“ঘরে বন্দি থেকে থেকে নতুন কাকিমার মাথাটাই বোধহয় খারাপ হয়ে গেছে রে! আমায় দেখে কেমন অদ্ভুতভাবে ছুটে এল জানিস! তারপর জানলার গরাদ ধরে হাসতে হাসতে বলল, কেন এসেছিস এখানে? যা, পালিয়ে যা। শিগগির পালিয়ে যা। নাহলে আমার ছেলে তোকে কামড়ে খেয়ে নেবে। যা যা পালিয়ে যা! ও শুধু রক্ত খায় জানিস!”

ওই কথা শুনে আমাদের ভয় আরও বিশ গুণ বেড়ে গিয়েছিল। বাড়িতে যে কী ঘটছিল তার বিন্দু বিসর্গ বুঝতে পারছিলাম না। তারওপর আর একটা অদ্ভুত সমস্যাও শুরু হল সে সময়। কালীকেষ্টদা আমাদের বাড়িতে আসার কদিন পর থেকেই গ্রামের লোকজন, কম বয়সী ছেলেপুলেরা আমাদের দেখতে পেলেই ডেকে ডেকে মানিকের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল।

“হ্যাঁ রে পায়রা ছেলেটাকে তোরা দেখেছিস? শুনলুম নাকি তার একখানা চোখ কপালে? আর একটা নাকি মাংসের ডেলার মত? নাক বলে নাকি কিছুই নেই? মুখ ভরতি সরু সরু দাঁত? পেটের কাছ থেকে নাকি আরও দুখানা পা বেরিয়ে এসেছে? ও মাগো! হ্যাঁ রে, ওকে দেখে তোদের ভয় করে না?”

অনেকে আবার আমাদের এড়িয়েও যেত। ভয়-আতঙ্ক-কৌতূহল সব মিলিয়ে আমাদের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত।

এতক্ষণ আমরা চুপ করে শুনছিলাম। গল্পের মাঝে কথা বলা পায়রামামার না-পসন্দ। তাই একটা কথাও বলিনি আমরা। কোনও প্রশ্ন করিনি। হাবুল আর থাকতে পারল না। জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছা পায়রা মামা, তুমি যেমন বলছ, তাতে মনে হচ্ছে মানিক কোনও গঠনগত ত্রুটি নিয়ে জন্মেছিল। ইন্টারনেট ঘাঁটলে এমন একাধিক বাচ্চার ছবি দেখা যায় সে কথা কি জান? কনজয়েনড টুইন, ডিফর্মড বেবি এসব তো আজকের দিনে জলভাত! একটা শরীর দুটো মাথা। একটা মাথা, একাধিক হাত-পা। আবার চোখ, নাক, মুখ ইত্যাদি সুগঠিত নয়। এক কথায় অদ্ভুতদর্শন! গায়ের চামড়া খসখসে, সরীসৃপের মত! শুনেছ নিশ্চয়ই! বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এমন বহু কেস কিন্তু সামনে এসেছে। যদিও অজ্ঞ লোকজন এধরনের বাচ্চাকে ঈশ্বর কিংবা শয়তান ভেবে বসে। ইউটিউব ঘাঁটলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচারেরও নানা ভিডিও দেখা যায়।”

এই বলে হাবুল আমার দিকে তাকাল,

“এই টুবুল তোর মনে আছে, সেবার মামাবাড়ি এসে মাঘের মেলায় আমরা গঙ্গা-যমুনাকে দেখতে গিয়েছিলাম!”

আমি সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালাম।

“তার কেসটাও তো এরকমই। তুই ভাব না, একই শরীরে দু-খানা মেয়ের মাথা, বুকের পর থেকে শরীরের নিচের অংশটা জোড়া। দুজনেই হাসছে, কথা বলছে। দুজোড়া হাতে ভর দিয়ে চলাফেরা করছে। ওসব দেখে লোকের মনে তো অন্যরকম ভাবনা আসতেই পারে। অনেকে ওদের “স্পাইডার সিস্টারস” নামে চেনে। আর তুই নিশ্চয়ই খেয়াল করেছিলি ওদের পেটের কাছ থেকে ঝুলছিল আর একটা ছোট পা! অপেক্ষাকৃত সরু আর বাঁকা! আসলে ওরা আইডেনটিক্যাল টুইনস। ভ্রূণ অবস্থায় শরীর দুটো আলাদা হয়নি! আর রইল বাকি, জন্মের সময় দাঁত থাকার ব্যাপারটা? ওটাও আমার জানা। ন্যাটাল টিথ বলে। ২০০০ টি শিশুর মধ্যে একজনের এমন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রতিটা কেসই খুব রেয়ার। তাই সাধারণ মানুষ অবাক হয়।”

হাবুলের দারুণ আউট নলেজ। ও সারাদিন সায়েন্সের নানা বিষয় নিয়ে ইন্টারনেটে পড়াশোনা করে। আমিও ওর কথায় সায় দিলাম।

“হ্যাঁ রে। আমার মনে আছে। মেলা থেকে ফিরে সেবার তুই কিছু ছবিও দেখিয়েছিলি আমায়।”

“ইয়েস!”

আমাদের আলোচনা শুনে পায়রা মামা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল,

“অতকিছু জানি না রে হাবুল, টুবুল। আমাদের এই গ্রামে তখন কোথায়ই বা ভাল ডাক্তার? আর কোথায়ই বা শিক্ষিত মানুষ? বছর আঠাশ বছর আগে না ছিল মানুষের যুক্তি দিয়ে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা, না ছিল ইন্টারনেট। শারীরিক ত্রুটি মানেই তখন অপদেবতা, ভূত-পিশাচের জন্ম। অভিশাপ। মায়ের কর্মফল। কিংবা বাপের গ্রহদোষ! তবে একটা ব্যাপার জানিস তো, কখনও কখনও এমন কিছু ঘটে যায় বিজ্ঞানও যার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না। আমরা যেটা নিজের চোখে দেখেছিলাম, সেটাই বা ভুলি কী করে? বিজ্ঞানে তো তার ব্যাখ্যা নেই!”

“কী? কী দেখেছিলে তোমরা?”

উত্তেজনায় গলা চড়িয়ে আমরা দুই ভাই একসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। পায়রা মামা আবার বলতে শুরু করল।

“পরীক্ষা তখন শেষ হয়েছে। আমাদের মাথায় সবসময় ঘুরঘুর করছে কী করে নতুন কাকিমার ঘরে ঢুকে সত্যিটা জানা যায়। সারাটা দিন তক্কে তক্কে থাকি, কিন্তু বড়দের দৃষ্টি এড়িয়ে ঠিক সুবিধে করতে পারি না। তার মধ্যেই বাড়িতে একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে গিয়েছে। দিন চারেক আগে আমাদের বুধিয়া গাইয়ের বাছুরটাকে গলায় দুটো বড় ফুটো সমেত উদ্ধার করেছে দুধ দোয়ানোর ছেলে কানু। বাদাম গাছের নিচে মরে পড়েছিল বাছুরটা। তার সমস্ত রক্ত শুষে খেয়ে ছিবড়ে করে ফেলে গিয়েছিল কোনও দাঁতাল জন্তু। ওদিকে ছোটকা মানিককে দেখতে পর্যন্ত আসেনি। সেই নিয়ে নতুন কাকিমা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করেছে। সারাদিন খালি কাঁদে। এই গ্রাম থেকেই কানাঘুষো খবর পৌঁছেছিল ছোটকার কানে। পরে বুঝেছিলাম, বোধহয় অসম্মানের ভয়ে অথবা দুঃখেই কাকা বাড়ি আসেনি। কাকিমার বাপের বাড়ির লোকজন নাতি দেখতে এসে ভয় পেয়ে সেই যে গিয়েছে আর একটাও খবর নেয়নি। বাড়িতে তীব্র অশান্তি চলছিল তখন। কিন্তু আমাদের অবস্থা ছিল অদ্ভুত! বাড়ির লোকজন, জ্ঞাতিগুষ্টি সবাই মানিককে চোখের দেখাটুকু দেখেছে শুধু আমরাই একবারও দেখিনি। আসলে ওই কৌতূহল আমরা আর চাপতে পারছিলাম না। সত্যি ঘটনাটা একবার চাক্ষুষ করার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। অবশেষে একদিন রাতে অপ্রত্যাশিতভাবেই সুযোগ এসে গেল। অফিসের কাজে বাবাকে কলকাতা ফিরতে হয়েছে। জেঠু বাড়িতেই রয়েছেন তবে তাঁর পনেরো দিনের ছুটি প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। শ্যামাদা বলল,

“দেখ ভাই, এখন তো আর বৃষ্টি-বাদলা নেই। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আজ রাতেই কাকিমার ঘরে যাব। কাকিমা নিশ্চয়ই কাউকে বলবে না।”

আমি আর বিপুল তো যমজ। এই তোদের মত। ছোট থেকেই আমাদের চিন্তাভাবনায় খুব মিল। আমরা ভয় পেয়ে বললুম,

“সেটা কি ঠিক হবে দাদা? যদি ধরা পড়ে যাই?”

শ্যামাদা বলল,

“ভয় কী রে? ধরা পড়ে গেলে মার খাব। দরকার হলে বাগানে রাত কাটাব। কিন্তু সত্যিটা একবার দেখে তবে ছাড়ব। মানিককে নিয়ে লোকে কত কথা বলে বল তো! ও আমাদের ভাই হয়। একবার বিষয়টা দেখব না?”

আমাদেরও মনে হল শ্যামাদা ঠিকই বলছে। বাইরের লোকজন আমাদের দেখতে পেলেই নানা কথা জিজ্ঞেস করে। আড়ালে আবডালে হাসি তামাশাও চলে আমাদের বাড়ি নিয়ে। ছোটকা আর কাকিমাকে নিয়ে নানা জনে নানা কুকথা রটিয়ে বেড়ায়। এমনকি...এমনকি মানিকের জন্মের পর নতুন কাকিমাকে অনেকে পিশাচীও বলেছে। বড়দের কানেও নিশ্চয়ই ওসব কথা এসেছিল। কিন্তু তাঁরা চুপ করে রয়েছেন বলে আমরাও যে থেমে থাকব তার তো কোনও মানে নেই!

শ্যামাদার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। রাত তখন দুটো কী আড়াইটে হবে। তিন ভাই পা টিপে টিপে খুব সাবধানে একতলায় তলায় নেমে এলাম। অমাবস্যা। উঠোনের মধ্যিখানে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাতা বাহারের গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল কারা যেন গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে রয়েছে। বাঁশঝাড়ের দিক থেকে কর্কশ স্বরে একটা হুতুম প্যাঁচা ডেকে উঠল। আমরা তো গ্রামের ছেলে। ওসবে যথেষ্ট অভ্যস্ত ছিলাম। তবুও কেনও জানি না ভয় করছিল সেদিন। মাটির ঘরের খড়ের চালের ভেতর কী যেন একটা খড়খড় করে উঠে তাড়াতাড়ি পালাল। ভাম বিড়ালটিড়াল ছিল হয়ত! রাত্রিবেলা ইঁদুর ধরার জন্য ওগুলো খড়ের চালের ভিতরে এসে লুকিয়ে থাকত। বাগানের দিক থেকে একটা তক্ষ সাপের আবছা ডাক ভেসে এল। তক্ষ তক্ষ তক্ষ...! গাছপালাগুলো এক্কেবারে স্থির। ভয়ানক ঝড় আসার আগের নিস্তব্ধতা ছেয়ে রয়েছে আমাদের বাড়ির ভেতরে। আজ তোদের যুক্তি দিয়ে সেই পরিবেশের বর্ণনা দিচ্ছি ঠিক কথা; কিন্তু সেই রাতে আমাদের কাছে সবই ছিল অস্বাভাবিক। নিদারুণ অতিপ্রাকৃত!

সঙ্গে দুই ব্যাটারির টর্চটা রয়েছে; কিন্তু জ্বালাচ্ছি না। যদি ধরা পড়ে যাই! তিনজন গায়ে গায়ে ঘেঁষে ঘেঁষে চলেছি। উঠোন পেরিয়ে ধীর পায়ে বাইরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। বাইরের ঘরটা আঁতুড়ঘর। বারান্দার ধারে কিছু মাটির হাঁড়িকুড়ি আর গাছ থেকে পাড়া ডাব রাখা। সেগুলোকে ডিঙিয়ে এগিয়ে গেলাম জানলার কাছে। বারান্দার দিকে জানলাটা সামান্য ফাঁক করা। ঘরের ভেতর থেকে হলুদ আলোর কাঁপা কাঁপা আভা আসছে। আমাদের হাত-পা তখন বরফের মত ঠাণ্ডা। উত্তেজনায় বুক ধড়াস ধড়াস করছে। গলার কাছে কী যেন একটা এঁটুলি পাকিয়ে রয়েছে। ঢোঁক গিললেও নামছে না। বাথরুম পাচ্ছে না তবুও তলপেটে কেমন একটা চাপ চাপ ভাব। সেদিন সত্যি সত্যিই খুব ভয় করছিল জানিস! ফিসফিস করে শ্যামাদাকে বললাম,

“এই দাদা কাকিমাকে কি ডাকবি? নাকি এই জানলা দিয়েই...”

হাজার কৌতূহল থাক, অজানাকে জানার আগ্রহ থাক, আসলে তো তিনজনই ছোট ছিলাম! আমার কথায় শ্যামাদা রাজি হয়ে গেল।

অতি সন্তর্পণে জানলার কাছে গিয়ে একটা পাল্লা ধরে ধীরে ধীরে ডিঙি পেড়ে বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু...কিন্তু...ওকী! কী বলব তোদের! ভেতরের দৃশ্যটা দেখেই আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। সাঁই-সাঁই করে মাথাটা চক্কর খেল তিন-চারবার।”

“কেনও? কী ছিল ঘরের ভেতরে?”

পায়রামামা একদম চুপ। উত্তেজনায় ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে আমাদের। বাইরে আবার তেড়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে বিকট শব্দে পরের পর বাজ পড়ছে। এবাড়িতে এখনও ইনভার্টারের ব্যবস্থা নেই। কারণ দাদু দিদারা ছাড়া এখানে আর কেউ থাকে না। বয়স্ক মানুষদের আধুনিক করে তোলা সহজ নয়। বড়মামা আর বিপুলমামা কাছেই বারুইপুরের ফ্ল্যাটে থাকে নিজেদের পরিবার নিয়ে। মাসে দু-তিনবার আসা যাওয়া করে। হ্যারিকেনের তেল এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ঘরের ভেতরে নিভু নিভু ম্লান আলো! পায়রামামা গলাটা খাদে নামিয়ে নিয়ে বলল,

“জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, নতুন কাকিমা ঘুমে অচেতন। তার রোগাভোগা কাঠিসার শরীরটা বিছানার সঙ্গে প্রায় মিশে গিয়েছে। একেবারেই চেনা যাচ্ছে না তাকে। আর...আর তার ঠিক বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে রয়েছে টকটকে লাল রঙের একটা এত্ত বড় মাংসের ডেলা। কেমন যেন লম্বাটে, ফোলা মতো। মাংসপিণ্ডটার গায়ে ফোস্কার মত অসংখ্য স্ফীতি। অনেকটা টিউমারের মত বুঝলি তো? কিন্তু মানুষের বাচ্চার আকৃতির সঙ্গে সেই বস্তুটার, হ্যাঁ হ্যাঁ বস্তুই বটে...সেটার কোনও মিল ছিল না। মাথা, হাত, পা আলাদা করে কিছুই প্রায় বোঝা যাচ্ছিল না। বাইরের ঘরের আবছা আলোয় সেই পিণ্ডটার গা তেলের মত চকচক করছিল। আমাদের গলা তখন শুকিয়ে একেবারে কাঠ! ঢোক গিলতেও পারছি না। চোখের পাতা পড়ছে না আমাদের। হাঁ করে কেবল তাকিয়েই রয়েছি ওই পিণ্ডটার দিকে। একটু ভাল করে খেয়াল করতেই বুঝলাম, মাংসপিণ্ডটায় আসলে হাত বলে কিছু নেই। পাশ বালিশের মত শরীরটার দুপাশ থেকে দুটো শুঁড়ের মতো লম্বা জিনিস বেরিয়ে নতুন কাকিমার ব্লাউজের ভিতর ঢুকে গিয়ে তার বুকটা পেঁচিয়ে ধরেছে। চুকচুক করে একটা হালকা আওয়াজ হচ্ছে। আমি আর চুপ করে থাকতে পারিনি রে। ভয়ে খুব জোরে “বাবাগো” বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। বিপুল ছিল আমাদের দুজনের পিছনে। সে ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে জেঠুর ঘরের দিকে দৌড় মেরেছে। শ্যামাদার আর আমার পা গুলোকে কেউ যেন শক্ত করে ধরে রেখেছিল। কিছুতেই নড়তে পারছিলাম না আমরা।

আ...আর আমার সেই চিৎকার শুনে মানিক, মানে নতুন কাকিমার সেই অদ্ভুত ছেলেটা কী করল জানিস? নিজের ঘাড়টা পুরোটা পিছনের দিকে ঘুরিয়ে সরাসরি আমাদের দিকে তাকাল। উফ! কী যে বীভৎস সেই মুখ! আজও আমি ভুলতে পারিনি ওকে! কমলাদির কথাগুলো তখন আমার কানে বাজছে।

“ওটা মানুষ নয় গো খোকাবাবু। মানুষের বাচ্চা অমন হয় না। কখনও হয় না। ও.....ও....ওটা একটা দা...নো! দানো...।”

হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। দানোই। একটা ছোট্ট দানোই বটে! কপালের ওপর এত বড় একটা চোখ, টকটকে লাল। আর নাক-মুখ-গাল-কপাল সব অদ্ভুত। একদম বিকৃত। একটা গোটা শিশুকে কেউ যেন ভারি লোহার হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে-পিষে-দলে দলে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছে। থ্যাবড়া মাংসের ডেলার মত ফোলা মাথাটার নিচের দিকে একটা বড়সড় গর্ত। তার দু-পাশ থেকে চুঁইয়ে পড়ছে তাজা লাল রক্ত! মুখের ভেতরে কাঁটার মত সরু সরু অনেক দাঁত! অনেক। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলাম আমি। আমার গা গুলিয়ে উঠে হড়হড় করে খানিকটা বমি হয়ে গিয়েছিল। তারপর...তারপর আর কিছুই মনে নেই রে। শ্যামদা আর আমি দুজনেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম বোধহয়!

পায়রামামার কথা শেষ হতে না হতেই দিম্মার ডাক কানে এল।

“টুবুল, হাবুল, কই রে, সাড়ে দশটা বাজল, খাবি আয় এইবার।”

পায়রামামা আমাদের তাড়া দিয়ে উঠে পড়ল,

“চল চল আর দেরি করে লাভ নেই। ভাজা ইলিশ ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আসল মজাটাই তো মাটি!”

আমাদের ঘোর তখনও কাটেনি। মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন কিলবিল করছে।

“কিন্তু...শেষটা বললে না তো? কী হল তাদের? এখন তারা কোথায়?”

মামার মুখে স্মিত হাসি।

“কী আবার হবে রে? ওই ঘটনার দিন পাঁচেক পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়ির সকলের মুখ থমথমে। নিধু ডাক্তার বাইরের ঘর থেকে ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। জেঠু তাঁর হাতদুটো চেপে ধরতে, সদর দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে ডাক্তার বলল,

“না। আমার আর কিছুই করার নেই গো বড়দা। মা-সন্তান দুজনেই শেষ।”

কান্নাকাটি শুরু করে দিল সবাই। নিধু ডাক্তার অবশ্য বলেছিল জানিস, অস্বাভাবিক রক্তাল্পতাই নাকি মা আর ছেলের মৃত্যুর কারণ ছিল। রক্তাপ্লতা থেকেই হার্টফেল হয়ে গিয়েছিল ওদের। এই রক্তাল্পতা মানে জানিস তো? বলেই মুচকি হেসে নিজেই উত্তরটা দিল পায়রা মামা। অ্যানিমিয়া রে অ্যানিমিয়া!”

মাটির ঘর থেকে বেরুতে যাব, হাবুল আমার পেটে একটা গোঁত্তা মারল। ওর চোখ অনুসরণ করে দেখি ছোটদাদু মাটির দাওয়ার একপাশে উবু হয়ে বসে রয়েছেন। তাঁর উদাস দৃষ্টি ঘন অন্ধকারে আবছা হয়ে আসা বাইরের ঘরটার দিকে নিবদ্ধ। মনের ভিতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%