উইম্যান অ্যান্ড ডার্কনেস

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

তিতাস একটি নদীর নাম। হ্যাঁ, এতদিন পর্যন্ত তাইই ছিল। তবে নদীটা এখন সোমত্ত এক মেয়ে। কালো মেয়ে! ভালো কিনা সে বিচার না হয় আপনারাই করলেন! ভর দুপুরে এক গেলাস বরফ জলের ভেতর গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা আরামের মত একখানা মেয়ে এই তিতাস। কেমন আরাম? ধরে নেওয়া যাক, শীৎকারজাত “আহ” শব্দটির অণুতে পরমাণুতে যেমন আরাম মিশে থাকে, ঠিক তেমন। কৈশোর পর্যন্ত তিতাস নামের মেয়েটার বিশ্বাসই হত না যে তারও বিয়ে হতে পারে। সে শুনেছিল, কালো বলেই তার রমা মাসিকে বর ভালবাসেনি কোনওদিন। শীত গিয়েছে, গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষা এসেছে রমা মাসির বর তাকে বিছানায় নেয়নি। চিরটাকাল মানে মরে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত রান্নাঘরের স্যাঁতসেঁতে কোণে পাঁপড় ভাজার মত ফুলে ওঠা দেওয়ালের পাশে বাবু হয়ে বসে নুন, লেবু, কাচালংকা আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখা পান্তা গিলে গিয়েছে তিতাসের রমা মাসি। হয়ত বুকের ভিতরের দাউদাউ আগুনটাকে একটুখানি ঠাণ্ডা করবে বলেই। সে সামনে বসলে তিতাসের সুদর্শন মেসো নাকি ঘেন্নায় মুখ বিকৃত করে উঠে যেত। রমা মাসি ভাত পাতে একটু আলু সেদ্ধ কী এক পলা সরষের তেল নিতে গেলেই তার শাশুড়ি বলতেন, সারাদিন খালি খাই-খাই। রাক্ষুসির মত খাই-হাঁ। জালার মত পেট! সাক্ষাৎ তাড়কা এসেছেন গো আমার ঘরে! মাগো মা! হাতের গ্রাস হাতে নিয়েই বসে থাকত রমা মাসি। এক গভীর রাতে বাড়ির খোলা উঠোনে দাঁড়িয়েই তিতাসের সেই মাসি ঢকঢক করে এক বোতল অ্যাসিড খেয়ে নিয়েছিল। জিভ থেকে নিচের দিকটা জ্বলে ডাহা খাক হয়ে গিয়েছিল তার।

আঠেরো উনিশ বছর পর্যন্ত বড় দানার চিনি আর লেবু ঘষে-ঘষে কুচকুচে কালো হাঁটু, ফাটা-ফাটা কালো কনুই, কালো বগল আর দুটি ভারি থাইয়ের মুখোমুখি সংঘর্ষে তৈরি হওয়া কালো দাগ তুলে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাত তিতাস। সুন্দর না হলে যদি ওকেও না নেয় কেউ? কিন্তু দুম করে একদিন সব ভুল ভেঙে গেল। তিতাস জানতে পারল কালো মানে আসলে একটা অতল কুয়ো। সুতীব্র আকর্ষণ! রহস্য! হাবুডুবু খাওয়ার মত সবুজাভ নীল গরলের স্রোত। কালো মানে উল্টোদিকটা দেখতে না পাওয়া দী...র্ঘ এক সুড়ঙ্গ। সমুদ্রের মত বিরাট আকাশ। রক্তবর্ণ ঢেউ থেকে উঠে আসা অনেকগুলো উদ্ধত ছায়া। আর গোল থালার মত এক লাল চাঁদ, প্রতি পূর্ণিমা রাতে যার গা থেকে কাঁচা মাংসের গন্ধ বেরোয়!

বছর পনেরো পরঃ

চিলটা উড়ে এসে কার্নিশে বসেছে আবার। চাক দোয়েলের মত পিড়িং পিড়িং সুর তুলে সারা ছাদ ঘুরে জামা কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল তিতাস। চিকনের কাজ করা সায়া, ব্লাউজ, দুখানা কালো ব্রেসিয়ার ওর নিজের। তমোঘ্নর মায়ের চারটে শাড়ি আর দুটো হাউজ কোট। বৃষ্টিটা একটুখানি ধরেছে। তিন দিন আগের মেশিনে কাচা আধশুকনো কাপড়চোপড় থেকে দশ বছরের বাচ্চার পেচ্ছাপের মত উগ্র আর ভ্যাপসা গন্ধ ছাড়ছে। ভালভাবে রোদ খাইয়ে নিতে হবে। শাশুড়ির হলদে শাড়ির আঁচলটা হাওয়ায় উড়ে নাকের কাছে আসতেই ওয়াক তুলতে গিয়েও তিতাস সামলে নিল নিজেকে। একটুতেই এখন বমি উঠে আসে। ঘৃণাবোধ আগে এতখানি প্রবল ছিল না। দূরের বাঁশঝাড় থেকে কী একটা পাখি ডেকে চলেছে একটানা। কালো মেঘের ডাকের মত উদাস সেই ডাক। তিতাসের মনের ভেতরটা কেমন যেন উথাল পাথাল হচ্ছিল। আচমকাই রোঁয়া ওঠা নাইলনের দড়িটার খোঁচা খেল আঙুলের মাথায়। থলথলে লইট্যাগুলো কুটতে গিয়ে ওর অনামিকার মাথাটা বঁটিতে বসে গিয়েছে সকালে। গলগল করে রক্ত বেরিয়েছে। কাটা জায়গাটা ফাঁক হয়ে এখন আবারও রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। টাটকা ক্ষত চিনচিন করে উঠেছে। অথচ লেশমাত্র যন্ত্রণা নেই ওর মুখে। পাকা গিন্নির মত মনে মনে হিসেব কষছে তিতাস। দড়িটা বদলাতে হবে। একদিকের বাঁশও বদলে ফেলতে পারলেই ভাল। সবই কেমন যেন পুরনো হয়ে আসছে। নেশা নেশা। শ্যাওলা সবুজ! কালো কালো! হঠাৎ তিতাসের মনে হল, পুরনো মানেই তো মোহ। তার হাত থেকে নিস্তার আছে নাকি? মনে হতেই চিলের সঙ্গে ওর চোখাচোখি! মুহূর্তের জন্য আগুনের মত কিছু একটা দপ করে জ্বলে উঠেও মিলিয়ে গেল দুজনের চোখের ভেতর। পুজো করা মনসা গাছের পাশে কীসের যেন সরু সরু সাদা হাড় এনে ছড়িয়েছে পাখিটা। হাড় বজ্জাত একখানা! দাঁতে দাঁত ঘষল তিতাস। ওর দেখাদেখি প্যারাপিটে ঠোঁট ঘষছে চিল। কী দেখাতে চাইছে! পচা মাংসে একবারও মুখ দেয়নি আজ? খুব জোরে হাসি পেয়ে গেল তিতাসের। কাটা আঙুলটা মুখে পুরে চোখ বুজে নিজের রক্তটুকু চুষে নিল ও। চিল হাঁ করে তাকিয়ে রইল তিতাসের মুখের দিকে। ঠোঁটের ওপর আলতো করে জিভটা বুলিয়ে নিল তিতাস।

“তোর জন্য কোনটা নেব রে তিতি? আমি কিন্তু সবুজটাই বেছেছি। নীল রংটা তো আবার ফর্সাদের মানায় ভাল!”

হোয়াটসঅ্যাপে দুটো সিল্ক ঢাকাইয়ের ছবি পাঠাল তিতাসের ননদ। এইমাত্র। গভীর করে ছুরির দাগ বসানো পমফ্রেটের রূপালি বুকে আদা, রসুন, জিরে, হলুদের পেস্ট মাখাতে মাখাতে তিতাস নিজের হাতদুটো খুব ভাল করে লক্ষ করছিল। ফোলা ফোলা পাতার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে তুলির মত লম্বা লম্বা আঙুল। গোলগাল, চওড়া কব্জি। ঘড়িটা, বালাটা কাপটে বসে। বেশ দেখায়। কিন্তু, ঠিক কালো তো বলা চলে না ওকে। মাজা মাজা রং। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা বলে যাকে। বড় ননদ তবুও কথায় কথায় খোঁটা মারবেই। রোগা, কালো, তিতাসের কপালটাও নাকি বেশ উঁচু! ঢিবির মত! অথচ ওই বড় ননদের একটা বুকে ক্ষয় রোগ বাসা বেঁধেছে। ওটা হয়ত বাদই চলে যাবে। অমন একটা খুঁতওয়ালা শরীর নিয়ে কী করবে সে? অঙ্গহানি দেবীর কি পুজো হয়েছে আজ পর্যন্ত যে এখন হবে? ননদের কথায় তিতাস পাত্তাও দেয় না। সুন্দরী আর ফর্সা তো ওর স্কুলের বন্ধু রিমিতাও ছিল। কী হল? অমন উদ্দাম প্রেম আর তারপর ধূমধাম করে বিয়ের সাড়ে ছ’মাসের মাথায় বাড়িসুদ্ধ সকলের জন্য মাটন বিরিয়ানি রাঁধতে গিয়ে একদিন হঠাৎই সিনথেটিক কাপড়ে আগুন ধরে গেল মেয়েটার। সেভেনটি পার্সেণ্ট পুড়ে গিয়েছিল রিমিতা। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন নাকি বলেছিল মেয়ের মাথার ঠিক ছিল না। একা একা কথা বলত সে। রাতে ঘুমোত না। মারা যাওয়ার আগে রিমিতা একবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখতে চেয়েছিল শুধু। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অলোকেশ আবার একটা বিয়ে করে নিয়েছে। গতবছর শীতে ওদের ইকো পার্কে দেখেছে তিতাস। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল দুজনের প্রেম জমে একেবারে ক্ষীর। হা হা করে হাসছিল আলকেশের নতুন বউটা। বাদাম খেতে খেতে বারবার লুটিয়ে পড়ছিল বরের গায়ে। মেয়েটাকে অনেকটা বেটি বুপের মত দেখতে। চৌকো মুখ, গোল গোল চোখ, মাথায় কালো কোঁকড়া চুলের মুকুট। যতবার তার আঁচল খসে যাচ্ছিল গোল গলা ব্লাউজের উপর থেকে সদ্য বেক করে রাখা নরম-গরম কাপ কেকের মত ফ্যাকাশে বুকদুটো বেরিয়ে পড়ছিল খানিকটা করে। বেগনি রঙের স্বচ্ছ শাড়িটা সে যে ইচ্ছে করেই পরে এসেছে তিতাস বেশ বুঝতে পেরেছিল। সেয়ানা মাল! গাছের খেতে খেতেই দুহাতে তলার কুড়িয়ে নিতে জানে। এসব মেয়ের খিদে বেশি। কটা চ্যাংড়া ছেলের সঙ্গে চোখে চোখে কথা চালাচালি করছিল মেয়েটা। তিতাসকে চিনতে পেরেও সেদিন কথা বলেনি অলোকেশ। বললেই অবশ্য ও অবাক হত বেশি। সেদিন সারা রাত ধরে তিতাস ওর স্বপ্নে রিমিতাকে দেখেছিল। দেখেছিল, কোথা থেকে যেন দু-খানা ম্যাজিক বিন কুড়িয়ে এনেছে অলোকেশ। খানিকটা ধুলো মাটি পেয়েই সেই বিন দুটো তরতরিয়ে উঠে গিয়েছে মেঘের রাজ্যে। বিনগাছের একটা ডালে বসে দু-হাতে বিরাট একটা ভ্যানিলা কাপকেক ধরে অলোকেশ খুব হাসছে। আর মাঝে মাঝে কেকের মধ্যিখানে বসানো উঁচু কিসমিসটা দাঁতে কামড়ে সেটার চারদিকে গোল করে জিভ বুলিয়ে মিঠে রস চেটে নিচ্ছে। একেবারে নিচে উবু হয়ে মাটিতে বসে হাউহাউ করে কাঁদছে রিমিতা। তার চুলগুলো তখনও পুড়ছে। গা হাত-পা থেকে ঝলসানো মাংস খুলে খুলে পড়ছে মাটির ওপর।

শনিবার-শনিবার লেসের কাজ করা কালো ব্রেসিয়ার আর মিড রাইজ প্যান্টি পরে সাদা চাদর পাতা নিভাঁজ বিছানায় বসলেই তমোঘ্ন কেমন যেন বদলে যায়। বিছানার তলার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে একটা হিলহিলে জলঢোঁড়া হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরে তিতাসকে। প্রবল চাপে পাশাপাশি প্রায় জুড়ে থাকা জায়েন্ট সাইজ মিটবলের মতো বুকদুটোর মধ্যে সুগভীর খাদ। বিপজ্জনক তো বটেই! কত প্রাণ যে ওইখানেই চলে গিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। চেরা জিভ বার করে সাপটা মুখ ঘষতে থাকে সেইখানেই। তিতাসের কালো চামড়ায় জড়িয়ে থাকা জলপাই বাদামি রং মেশানো সরীসৃপটাকে মানায় ভাল। গর্ব হয় ওর। জন্মসূত্রে গায়ে হালকা রঙ পায়নি বলে মনের মধ্যে যত ছাইরঙের পাখি পুষে রাখা, খাঁচা খুলে তাদের উড়িয়ে আদিমতম খেলায় মেতে ওঠে তিতাস। ওর গায়ের পদ্মগন্ধে সাপটার স্ফীত মুখ হাঁ হয়ে চটচটে লালা গড়াতে থাকে। ধীরে ধীরে চোখ খুলে মাথা নিচু করে চেনা গুহায় ঢুকে পড়তে চায় দাঁড়াশটা। শ্বাস বন্ধ করে তিতাস অন্তিম সুখের জন্য অপেক্ষা করে। ঘুরে ফিরে যেই না সে বেরুবে অমনি তার গলা জড়িয়ে জিজ্ঞেস করবে,

“দেখেছ, কোথায় কোথায় কতখানি মেঘ জমা হয়েছে দেখেছ তো?”

তিতাস প্রতিবারই জিজ্ঞেস করে। উত্তর মেলে না। এ সাপের সে চোখ কোথায়? এ যে কেবল রিপুর দাস! ছোটবেলায় বাস্তুসাপ দেখলেই আধবাটি দুধে বেশ করে গুড়ের বাতাসা আর কলা গুলে নিয়ে পিছন পিছন ঘুরত তিতাস। সব সময় কেনও ব্যাঙ, ইঁদুর, ছুঁচো গিলবে? মুখ বদলাতে কি ওদেরও ইচ্ছে হয় না? তিতাসের বশে এসেছিল দু’ দুখানা মদ্দা। সে অবশ্য আগের কথা। বিষের ভয় নেই বলে বশ করা কঠিন নয়। খাবারের লোভ দেখালেই হয়। আগানে বাগানে দাপিয়ে বেড়ানোর সময় ওরা পিছু নিত তিতাসের। সে কথা সকলকে বলত না ও। খুব কাছের গোটা তিন চার বন্ধু জেনে গিয়েছিল বটে! একবার তো হয়েছে কী, তিতাসের বড় মামী বেড়াতে এসে দেখে ফেললেন গোলাপখাস আমের সবচেয়ে নিচু ডালে পা ঝুলিয়ে বসে দু’হাতে দুখানা সাপ ধরে মুখে মুখ লাগিয়ে আদর করছে তিতাস। থুতুতে, আঠালো লালায়, আশীবিষে একেবারে মাখামাখি অবস্থা। তিতাসের টেপজামাটা ভিজে সপসপ করছে। সাপ দুটো চেরা জিভ বার করে একবার তিতাসের গাল চেটে দিচ্ছে। একবার গলায় আদর করছে। ওর মামীর সে কী চেঁচামেচি! মোটাসোটা ফরসা আদুরে স্বভাবের মহিলা তো হাঁপিয়ে কেঁদেকেটে এক্কেবারে টুকটুকে লাল হয়ে গিয়েছিলেন। বারবার বলছিলেন,

“তুই কি মেয়ে নাকি মা মনসা? যদি কামড়ে নিত?”

তিতাস বলেছিল,

“ওমা কামড়াবে কেন গো মামী? ওরা ভালবাসে তো!”

“কাকে ভালবাসে? তোকে?”

“তা নয়ত কী?”

সেই দৃশ্য মনে করে তিতাস অবশ্য অনেক দিন পর্যন্ত প্রাণ খুলে হেসেছে আর বিষম খেয়েছে।

বছর খানেক আগে পর্যন্ত প্রতিটা শনিবার তিতাসকে বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যেত তমোঘ্ন। বারবিকিউ নেশন, আমিনিয়া কোনও কোনওদিন দাদা-বউদির বিরিয়ানি। তারপর ভবঘুরের মত এদিক সেদিক খানিক ঘুরে বেড়িয়ে খাবার কিছুটা হজম করে নিয়ে একে অন্যকে জাগাতে জাগাতে ফিরে আসা। এই ছিল ওদের ধরাবাঁধা রুটিন। রবিবারগুলো নিজেদের ভেতরে বুঁদ হয়েই কেটে যেত দিব্য। দুপুরের আশেপাশে সকাল হলে, ক্লান্তিতে একে অন্যকে জোঁকের মত আঁকড়ে জোম্যাটোতে খাবারের অর্ডার দেওয়া। চাটনি মাখামাখি দইবড়ার দই তিতাসের ঠোঁটে, গলায়, বুকের গর্বিত বৃন্তে মাখিয়ে কতবার যে জিভ দিয়ে চেটে নিয়েছে তমোঘ্ন! ধবধবে ফরসা তমোঘ্ন বলে কালো মেয়েদের গায়ে নাকি একটা অন্যরকম বুনো স্বাদ থাকে। অনেকটা ব্লু বেরির ফুলের মত। হবে হয়ত! তবে তিতাস যতবার নিজের গায়ে জিভ বুলিয়েছে শুধু কাঁচা নুন আর মিঠে জলের স্বাদই পেয়েছে। ব্যাটাছেলেদের জিভের স্বাদকোরকগুলো নিশ্চয়ই একটু হলেও আলাদা। আজকাল শনিবার করে বাড়িতে মাছ আসছে খুব। কাঁটাওয়ালা, বেশি আঁশযুক্ত অথবা নেড়া নেড়া পিচ্ছিল দেহের মাছ। মৌরলা, পুঁটি, চিংড়ি, ইলিশের শুঁটকি! তিতাসের শাশুড়ি পছন্দ করেন সেইসব মাছ, সময়ের গল্প নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে যাদের কানকো আর লেজের সঙ্গে। তমোঘ্ন একদম সময় পায় না এখন। সত্যি নয়, ওটা আসলে তার অজুহাত। সময় শব্দটাকে ভারি অদ্ভুত লাগে তিতাসের। দুনিয়াসুদ্ধ লোকের যার যা হচ্ছে অথবা হচ্ছে না কমবেশি সবাই এই সময়কেই বলি কা বখরা সাজিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। কী জ্বালা বলুন তো দেখি? কার যমজ বাচ্চা হবে আর কার বউ অ্যাকাউন্ট সাফ করে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ব্যাংকক কেটে পড়বে, সেটা কি আর সময় জানে নাকি? তমোঘ্ন হাড়ে হাড়ে ভয় পায় তার মাকে। মায়ের সামনে অন্য মহিলার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও সাহস করে না। গত জুলাইতে যখন বর্ষার সঙ্গে নাছোড়বান্দা প্রেমিকের মত সঙ্গী হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের গভীর নিম্নচাপ, তিতাসের শাশুড়ি পাকাপাকিভাবে ওদের রাজারহাটের ফ্ল্যাটে এসে উঠলেন। বর্ধমানে দেশের বাড়িতে থাকলে ছেলের জন্য তাঁর মনটা নাকি বড্ড কাঁদে! মা এসে পড়তেই ছেলে আবার আগের মত ছোট্টটি মনে করতে লাগল নিজেকে। মায়ের আঁচলে আঁচলে ঘোরা, কথায় কথায় আদিখ্যেতা; এক একটা দিন তো মায়ের ঘরেই গোটা রাত কেটে যেতে লাগল তার। তমোঘ্ন একপ্রকার ভুলেই গেল যে আট বছর অতিক্রান্ত সে বিবাহিত। বরের মধ্যে আমূল বদল লক্ষ করেছে তিতাস। আজকাল তো বন্ধ দরজার আড়ালে বউকে আদর করতে গিয়েও তমোঘ্ন ঠিকমত মনোযোগ দিতে পারে না। ভয়ে ভয়ে বারবার দরজার দিকে তাকায়। তিতাস বুঝতে পারে ওর বর একটু একটু করে কুঁকড়ে নেতিয়ে পড়ছে। ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে। তরোয়ালের ফলার মত তমোঘ্ন একতাল নরম মাটির চেয়েও ভ্যাদভ্যাদে আর গলনশীল হয়ে যাচ্ছে। তিতাসের অবশ্য তেমন কোনও অভিযোগ নেই। শুধু রবিবার রবিবার মুরগির বড় বড় তিনকোণা পিসের পরিবর্তে হাড় থেকে ছাড়ানো সাদাটে গোলাপি মাংসের তাল যখন তেল মাখিয়ে ভাল করে মিস্কিতে পিষে নিতে হয়, তিতাসের মধ্যে নতুন করে একতাল খিদে চাগাড় দিয়ে ওঠে। ভয়ানক খিদে! ওর ইচ্ছে করে রাজহাঁসের মত গ্রীবাখানা ঝুঁকিয়ে দাড়িম ফলের মত পুরুষ্টু বুকের ফোলা বৃন্ত কামড়ে মুহূর্তে নিজেকেই রক্তাক্ত করে ফেলে। নিজের ভেতর থেকে নিংড়ে নিয়ে আসে পাত্র ভরা অমৃত। কাচের বাটিতে মাংসের থোকা থোকা কিমা তুলে নুন, লংকা মিশিয়ে দুহাত দিয়ে ভাল করে চটকায় তিতাস। তারপর নাকের কাছে আঙুলগুলো ধরে থাকে অনেকক্ষণ। রবিবারের এই মাংস মাংস গন্ধটা গোটা সপ্তাহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে ওকে। দুপুরের সময়টুকু দরজায় ছিটকিনি তুলে কব্জি ডুবিয়ে দু’হাতে পর্ণ সাইট ঘাঁটে ও। লাইভ শো থেকে আলাপ হওয়া দুজনের সঙ্গে ফোনে কথাও হচ্ছে নিয়মিত। ভীষণ প্রফেশনাল ওরা! না, দুজন নয়, তিতাসের মোট তিনজন রয়েছে। তিন নম্বরটা আনকোরা হলেও এক্কেবারে তিতাসের মনপসন্দ। তার সঙ্গে একবার ডেটও করেছে। জিগোলো অপেক্ষা ছেলেটা একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। চোখদুটো অবিকল ওই বুনো চিলটার মত লালচে আর গভীর। আগুন আগুন! একবার ছুঁয়ে দিলেই গলগল করে গলে যাবে যে কোনও মেয়ে! ও যখন খুব কাছ থেকে হাঁ করে দেখে, তিতাসের ভারি বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কেমন যেন কঠিন হয়ে যায়। চকোলেট মাখানো একটা কাঠি আইসক্রিমের জন্য প্রাণটা ছটফট করে ওঠে ওর।

***

দুধে আলতা জবার কলিগুলোতে সাদা সাদা তুলোর মত পোকা ধরেছে। খুব জ্বালাচ্ছে। একটা করে কুঁড়ি ফুলে ফেঁপে বড় হয়, জবাটা খুশিতে চনমন করে ওঠে আর তখুনি গুঁড়ো গুঁড়ো আপদ এসে জড়িয়ে ধরে কচি বোঁটার কাছটা। তিতাস যতবার সরিয়ে দেয়, ওরা আবার ফিরে আসে রক্তবীজের মত। দুর্বল হতে হতে কুঁড়িটা নিঃশব্দে খসে যায় একদিন। বিকেলের পর খুব কাছে এসে বসলে তিতাস গাছটার কান্না শুনতে পায়। অসুখটার নাম তো ওর জানা নেই। তবুও মালির কথামত দু চিমটে লাল পাউডার আর দু চিমটে সাদা পাউডার এক বোতল জলে ঝাঁকিয়ে গুলে মন ভরে নাইয়ে দেয় গাছটাকে। বিকেলের হালকা রোদে ঝলমল করে ওঠে যুবতি জবার পাতা, কাণ্ড, মনও। তার কানের কাছে দু’একটা মিষ্টি কথা বলে তিতাস। যদি ঘায়ে একটু মলম লাগে!

“কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি বল তো! এই তো গেল বছর এতটুকু একটা বাচ্চাকে কিনে আনলাম। তোকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসেছিলাম জানিস! একবারের জন্যও নিচে রাখিনি, যদি তোর ডাল পাতা ভেঙে যায়! আর আজ দেখ, তোর গা ভরতি কুঁড়ি!”

পরম স্নেহে জবার গায়ে হাত বোলাতে থাকে তিতাস। মেয়েদের শরীরের বাড় লাউগাছের ডগার মতই। তরতরিয়ে এগোতে শুরু করলে আর পিছে ফিরে তাকাবে না। গাছের পাতাগুলোতে তিতাস আলগোছে চুমু খায়। জবা এখন লজ্জা পেতে শিখেছে আবার! হোক না স্বজাতির ছোঁয়া! থিরথির করে সে কাঁপে! সে ঢেউ তিতাসকেও ছুঁয়ে যায়। দুই নারীর দুঃখের আদানপ্রদান অনেকটা স্বমেহনের মতই তৃপ্তিদায়ক। ফ্ল্যাটবাড়ির কমন ছাদের একটা ছোট অংশ তিতাসদের একার। সেইখানেই প্রাণের সুখে বাগান করেছে ও। নয়নতারা, নিশিপদ্ম, টগর, ড্রাগন ফলের গাছ, দু তিনটে বনসাই...। বনসাইগুলো আসলে ছেঁটে রাখা স্বপ্ন। তিতাস মানে, একটু আশকারা পেলেই ওরা আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। তাই বুঝি শক্ত হাতে বেঁধে রেখে হাত পায়ের সঙ্গে রুখে দেওয়া হয়েছে ওদের মনের বাড়ও। তিতাস ওদের থেকে রামধনু আর চাঁদের দেশের গল্প শোনে। খুব পরিচিত ভঙ্গিতে থুঃ থুঃ করে জবার গায়ে একটু থুতু ছিটিয়ে দিয়ে পিছন ঘুরেই দেখে শাশুড়ি দাঁড়িয়ে। চমকে ওঠে তিতাস।

“বৃথাই এত তোয়াজ করছ বৌমা। এ গাছটা রেখে আর লাভ নেই! ফুল ধরে না। কিস্যু না। ওই টবে বরং অন্য কিছু লাগাও। তুলে ফেলে দাও দিকিনি! এমন গোলাপি জবা বনে বাদাড়ে কত পাওয়া যায়!”

শাশুড়ি নিজেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। উপড়ে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ান গাছটার গোড়ার দিকে। তিতাসের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে বাধা দেয় ও। জীবনও তো কত মেলে! পথে-ঘাটে হাটে-বাজারে যত্রতত্র জীবনের ছড়াছড়ি! লোকে বলে বটে জীবনের দাম নেই। তা বলে একটা জীবনকে শিকড় সমেত উপড়ে ফেলে দেবে তিতাস? খুন করবে? তাও কি হয়? কুঁড়ি ঝরে যায় কি গাছের দোষে নাকি? ওটা তো অসুখ। ট্রিটমেন্ট চলছে জবার। ভিটামিন, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ইউ এস জি, ডায়েট মেনে খাওয়া দাওয়া, শান্ত মনের মধ্যে একটা কচি তুলতুলে শরীরের ছবি আঁকা। হ্যাঁ, তিতাসেরও চিকিৎসা চলছে বটে! নামিদামি ডাক্তার। ভিজিট এমন যে সকলে দিতে পারে না। তমোঘ্ন দিচ্ছে। সে শাখা প্রশাখা ছড়াতে চায়। ডাক্তাররাও মরিয়া; কিন্তু কোথায় যে গলদ ধরা পড়ছে না কিছুতেই। এই নিয়ে তিন তিনবার তিনমাস পেরোতে না পেরোতেই রক্ত হয়ে বয়ে গিয়েছে সম্ভাবনাগুলো। তিতাসের কিন্তু সত্যিই কোনও ভুল ছিল না। তমোঘ্ন একবারও দোষ দেয়নি ওকে। বাথরুমে গিয়ে তাজা রক্ত দেখে ওইখানেই তিতাসের মাথা ঘুরে গিয়েছিল শেষবার। পা দুটো ছড়িয়ে বসে পড়েছিল ও। আদর করে ওকে বুকে তুলে ধরেছিল তমোঘ্ন।

“তুমি তো কোনও ভুল করনি। তবে কাঁদছ কেন তিতাস? নিজেকে সামলাও লক্ষ্মীটি! শান্ত হও প্লিজ! আবার চেষ্টা করব আমরা। এত সহজে হার মানব না। কিছুতেই না।”

নিজেকে গুছিয়ে নিতে, শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে বাথরুম থেকে বাইরে নিয়ে যেতে সময় লেগেছিল তিতাসের। শুধু তো রক্ত নয়, রক্তের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল যেটা সেটাকে লুকোবে কোথায় সেই চিন্তাও তো ছিল ওর মাথায়। আগের দু দুখানা বাওয়া ডিমের পর আশা ছিল তৃতীয় বার হয়ত ফলে প্রাণ থাকবে। কিন্তু নাহ! সময়ের আগেই ছাইরঙের যে বস্তুটা তিতাস প্রসব করেছিল, তার ভিতরে ভ্রূণ বলে কিছু ছিল না। ছিল আঠালো জল আর খানিকটা চাক বাধা রক্ত! কাঁদতে কাঁদতেই আছাড় মেরে ডিমটাকে ভেঙে ফেলেছিল তিতাস! তমোঘ্ন ভালবাসায় খাদ নেই ঠিক, কিন্তু যে পুরুষ ওর শরীরে প্রাণের বীজ ফেলতে পারে কবে পাবে তার সঙ্গ? কবে?

তিতাস তখন সবে ক্লাস সিক্সে উঠেছে। প্যাংলা প্যাংলা হাত পা। গলার কণ্ঠাদুটো বড্ড উঁচু। দুধকমলের কলির মত সুচালো মুখ বুকদুটো ফুটব ফুটব করছে। কোমরের দিকটা বরাবর একটু ভারি ওর। তাও, টেপজামা পরেই এখানে ওখানে খেলে বেড়াত। সারাক্ষণ একটা পাখির মত ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে বেড়ানো! মেয়েটার জ্ঞানগম্যি বলে কিছুই ছিল না। কখনও আমগাছে উঠে বাঁদরের মত দোল খেত তো কখনও গলায় ঝুমকো জবার মালা পরে নিজেই বিয়ের কনে সাজত। কাঁঠালের পাতা, আমের আঁটি, মাটির হাঁড়ি-কুড়ি এই নিয়ে ওর বিরাট একটা সংসার ছিল। সেই সময় একদিন স্কুল থেকে ফিরে শরীরের মধ্যে সে কী অস্বস্তি! মোচড় দিয়ে পেটে যন্ত্রণা শুরু হল তিতাসের! কুলের আচার, না ঝুরিভাজা ছড়ানো ঘুগনি কোনটা যে পেটের ভেতর ঢুকে বেইমানি করেছে তিতাস কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। মাকে না বলে তলপেটে নারকেল তেল আর জল মালিশ করে, বেশ করে লেবু মাখানো জোয়ান চিবিয়ে খেয়েও সেই যন্ত্রণা কিছুতেই কমছিল না। এক সময় তো মাথাটা ঝিমঝিম করে ওয়াক উঠতে লাগল। বমির সঙ্গে সাদা ফ্যানা বেরুল অনেকটা। সারা সন্ধে “দ” হয়ে শুয়ে ছটফট করার পর ও দেখল সাদা টেপজামার নিচের দিকটা রক্তে ভিজে একেবারে লাল। ভিজে গিয়েছে সাদা বেডকভার, পাশের বালিশটাও। সুতির প্যান্টিও থকথকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দু’হাতে সেই আঠালো রক্ত মেখে ভয়ে, ঘেন্নায়, অব্যক্ত কষ্টে হাউহাউ করে কেঁদে উঠেছিল তিতাস। সেই থেকেই মাসের ওই দিনগুলোয় ওর ঠাকুরঘরে ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। ঠাকুরের পাত থেকে নকুলদানা, বাতাসা, চিনির মঠ তুলে খাওয়ার স্বাধীনতাও গেল। অকারণে আগানে বাগানে টো টো করে বেড়ালেও জোর বকুনি খেতে হত।

তখন চতুর্থ বার মেয়ের শরীর খারাপ হয়েছে। কাপড় চোপড় সব জোগাড় করে দিয়ে কী একটা দরকারে তিতাসের মা গিয়েছিলেন বাপের বাড়ি। বুড়ি ঠাকুমা মুখে জর্দা দেওয়া পান গুঁজে একতলার ঠাণ্ডা ঘরে ঘুমিয়ে কাদা। অনেক দিন দেখা হয় না বলে দস্যি মেয়েটা ফন্দি এঁটে পোষা দাঁড়াশ দুটোকে চুপিচুপি ডেকে নিয়েছিল চিলেকোঠার ঘরে। ও ব্যাটারাও আপত্তি করেনি এতটুকু। কে জানত, সব হিসেব সেইদিনই বদলে যাবে? পা ছড়িয়ে বসে একটুখানি খেলা করার পরেই কেমন যেন আঁশ গন্ধে ভরে যেতে লাগল গোটা ঘর। তিতাস দেখল ওর ফ্রকের নিচে ছড়ানো পা দুটোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে একটু একটু করে দড়ির মত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠছে সাপদুটো। ওমা! ভোজবাজী নাকি? তারপর ওর দিকে একবার ফিরে দেখেই প্রবল আক্রোশে ফোঁস ফোঁস করতে করতে একে অন্যকে পেঁচিয়ে ধরল ওরা। পুরুষে পুরুষে সেদিন সে কী লড়াই! কেউ বলেনি, তবুও তিতাস বুঝে গিয়েছিল লড়াইটা আসলে ওকে নিয়েই। বুঝে গিয়েছিল নারী আর পুরুষ একেবারেই আলাদা। সখ্য হতেই পারে, কিন্তু বেশ কিছু শর্তও থাকে সঙ্গে। ঘরের কোণে কুঁকড়ে বসে তিতাস সেদিন প্রথম শঙ্খ লাগা দেখল। তারপর আর কোনওদিন ওরা একসঙ্গে আসেনি তিতাসের কাছে। হঠাৎ কোনও বাঁকের মুখে দেখা হয়ে গেলেও চুপচাপ রাস্তা বদলে নিয়েছে। তিতাসের পায়েও তখন বেড়ি পড়তে শুরু হয়েছে। ভারি বুক, ভারি পাছা, মেয়েকে চোখে চোখে রাখতেন মা কাকিমারা। কম দেখা হতে হতে হঠাৎ করেই একদিন সাপ দুটো হারিয়ে গেল তিতাসের জীবন থেকে। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাদের চিহ্ন পেল না তিতাস। কুয়োর পাড়ে ছ্যাতলা ধরা ইটের পাঁজায়, রান্নাঘরের পিছনে জড় করে রাখা মাটির মালসা, সরা, হাঁড়ি-কড়ার ভেতর, গোয়াল ঘরের পিছনে উঁচু করে রাখা শুকনো নারকেল পাতার স্তূপে কোথাও ছিল না ওরা। কোথাও না। কিছুদিন একলা একলা ঘোরার পর তিতাসের আলাপ হল একটা হুলোর সঙ্গে। শুধুই আলাপ, বন্ধুত্ব হয়নি একটুও। বরং কারণে অকারণে হুলোটার থাবা চাটা দেখে তিতাসের খুব ভয় করত। সারাক্ষণ মনে হত ওর থাবায় টাটকা রক্ত লেগে রয়েছে। কিছুদিন যেতে না যেতেই মেয়েটার বদ্ধমূল ধারণা হল যে হুলো বেড়ালটা আসলে একটা খুনি। প্রমাণ পেতেও অপেক্ষা করতে হয়নি। একদিন মাঝরাতে খচমচ খচমচ শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে উঠে তিতাস দেখে হুলোটা ওর বিছানার পাশে বসে এক মনে কী যেন একটা চিবোচ্ছে। টর্চের আলো জ্বালতেই গোঁ গোঁ করে গর্জন করে উঠল সেটা। তার সবুজ চোখদুটো থেকে ছিটকে বেরোচ্ছিল অভিসম্পাত। শুধু কি তাই? শিকারের ওপর আলো পড়তে মুহূর্তেই তিতাসের গায়ের প্রতিটা রোম খাড়া হয়ে উঠল। একটা সদ্যোজাত কুকুর বাচ্চা! পেটটা ফেটে গিয়ে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। ছোট্ট হাঁয়ের ভেতর থেকে নীলচে গোলাপি একরত্তি জিভটা উঁকি মারছে! সাদার ওপর বিস্কুট রঙের ছাপওয়ালা লোমে ঢাকা ছোট্ট মাংসপিণ্ডটা ফেলেই অপার্থিব ম্যাঁও চিৎকারে কানে তালা লাগিয়ে বেড়ালটা খোলা জানলার বাইরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি তিতাস। তার ঠিক চারদিন পর থেকেই বেড়ালটা ওকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করে দিল। এক একদিন তো স্নানের সময় পর্যন্ত কাচের জানালার বেদির ওপর বসে একদৃষ্টে তিতাসের নগ্ন শরীরের দিকে চেয়ে থাকত ওটা। যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে। তিতাস তখন ভিজে শরীরে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে একলা থাকলে আজও সেই খুনি হুলোটাকে দেখতে পায় ও। জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় অবিকল মানুষের ভাষায় শয়তানটা বলে ওঠে,

“এবার..এবার তো তোমার পালা গো খুকুমণি। এত ভয় পেলে চলবে কী করে? এস! আমার কাছে এস।”

ইদানিং একটা নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে। তিতাসদের রান্নাঘরের জানলা খোলা পেলেই কালচে বাদামি রঙের একটা বেড়াল ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বলা নেই কওয়া নেই, সোজা ভাগ বসাচ্ছে থালা ভরা মাছ ভাজায়। তিতাস দেখেছে মাছের গন্ধ পেলেই বেড়ালটা কেমন যেন বেপরোয়া খুনির মত হয়ে ওঠে। বকুনি কিংবা মারের ভয় পায় না এতটুকু! এত মাছ আগে কখনও রাঁধেনি তিতাস। কখনও না। তমোঘ্ন তো কোনওকালেই মাছ মাংসের ভক্ত নয়। আর তিতাস নিজে মাংস পেলেই খুশি। এখন অবশ্য ওদের ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা কোণে আঁশের গন্ধ। মাঝে মাঝে দুপুরের গরম হাওয়ার সঙ্গে দু’ চারখানা রূপালি আঁশ টবের গাছের পাশে কিংবা সানশেডের ওপর উড়ে উড়ে বেড়ায়। গরম ভাতে ঠাণ্ডা দুধ সহযোগে ফোটানো ঝিঙের ঝোল ঢেলেও মুখে গ্রাস তুলতে পারে না তিতাস। গা গুলিয়ে ওঠে। ওর শাশুড়ি আসলে একটা মাছের পোকা। মাছের ডিম, ভেতরটা হয়ত ভাজার পরে আধ কাঁচা নরম নরম রয়ে গিয়েছে, বেশ খানিকটা মাছের তেল দিয়ে ভাত মেখে গবগব করে তাইই খেয়ে নেবেন। ইয়া বড় মাছের মাথা চিবিয়ে, অক্ষিগোলক, ঘিলুফিলু চেটে, চুষে একেবারে ধুলো করে ফেলবেন। সুড়ুত, সুরুপ, হুশহাশ নানা আওয়াজে সামনে বসা তখন দায়! এক একদিন টেবিলের ঠিক উল্টোদিকে খেতে বসা স্থুলকায়া ফরসা মহিলাকে একটা আস্ত মেনি বেড়াল বলে মনে হয় তিতাসের। আবার কোনও কোনওদিন ঘুমের মধ্যে মনে হয় বুকের ওপরে চেপে বসে গলায় কামড় লাগিয়েছে ওই মেয়ে বিড়ালটাই। মেনিটার লাল হাঁ এর ভেতর শূন্যে চরে বেড়াচ্ছে সদ্য ডিম ফুটে বেরনো ছোট্ট ছোট্ট চারা মাছ! তারপর হঠাৎই বোয়ালের মত বড় একটা মাছ এসে চারাগুলোকে গিলে ফেলে। তিতাস চেঁচিয়ে ওঠে। বিড়ালটার হাঁ ঠিক যেন একটা ভুলভুলাইয়া। মাছগুলো ওইখানে বন্দি জেনেও মুক্তির পথ তাদের কেউ দেখিয়ে দিতে পারবে না। চারাগুলোকে বাঁচানোর জন্য হাত বাড়ালেই তিতাসের কোমরে প্রবল টান অনুভূত হয়। কেউ যেন ওকে মাটি থেকে টেনে তুলে ফেলতে চাইছে। বাচ্চা হয়নি বলে কি ওকেও একদিন উপড়ে ফেলবেন শাশুড়ি? তিতাসের মত শ্যামলা মেয়েও তো কত আছে এই দুনিয়ায়!

“আমাকে একজোড়া ব্ল্যাক মুর দেবেন।”

পেট শপের ছেলেটা তিতাসকে খুব ভাল করে চেনে। মুচকি হেসে তাড়াতাড়ি কাজে হাত লাগাল সে। তিতাস নতুন পোষ্য পছন্দ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

“ও...ওই যে, ওই যে, বাড়িটার পাশে যে দুটো লুকোচুরি খেলছে ওদের তুলুন। হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের।”

অভ্যস্ত হাতে জলের ভেতর ছোট্ট নেটটা ডুবিয়ে সাবধানে দুটো কালো মাছ তুলে নিল ছেলেটা। লম্বা পলিথিনের মুখে রাবার ব্যান্ড জড়াতে জড়াতে তিতাসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“সঙ্গে দুটো রেডক্যাপ দিয়ে দিই ম্যাডাম? লাল আর কালো দেখতে খুব ভাল লাগবে।”

“না। না। আমি তো শুধু কালোই রাখি।”

দোকান ঘরে কাচের পাত্র ভরতি জলের ভেতর চরতে চরতে বাকিরা তাকিয়ে দেখল তাদের একজোড়া স্বজাতি চলেছে শান্তির আশ্রয়ের পথে।

তিতাসদের বসার ঘরে বিরাট বড় একটা কাচের বাড়ি। কারুকাজ করা কাঠের টেবিলের নিচে ঝুঁকে পড়ে ছোট্ট লাল সুইচটা টিপে দিতেই জলের তলার ঘুমন্ত জগৎ ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। নীল জলে কালো কালো মাছ। খেলছে, ঘুরছে। খুনসুটি করছে। আজ আরও দুজন নতুন বন্ধু এসেছে ওদের। অ্যাকোয়ারিয়ামের ঢাকনা খুলে তিতাস খুব ধীরে ধীরে পলিথিনের প্যাকেটটা জলের মধ্যে উপুড় করে দিল। ডুব ডুব ডুব...ডুব্বুৎ করে আওয়াজ হল। লাল নীল হলুদ সবুজ কিছু দানা জলে ভাসিয়ে কাঠের চেয়ার টেনে নিয়ে এইবার তিতাস গালে হাত দিয়ে বসবে কাচের বাড়ির পাশে।

“শোন বৌমা, আসছে মঙ্গলবার ফলহারিণী অমাবস্যা। আমি শাস্ত্রীজীর চেম্বারে যাব। তুমিও কিন্তু যাবে আমার সঙ্গে। কোনও বাহানা চলবে না।”

বিকেল বিকেল পাগলি বুড়ির মাথার জটার মত নারকেল ছোবড়ায় ধুনো, কর্পূর, বাতাসা গুঁজে ওপর থেকে সুগন্ধি ঘি ছড়িয়ে পোড়াতে শুরু করেছেন তমোঘ্নর মা। গুলগুল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দশতলার ওপরে ফ্ল্যাটের ভেতর শ্বাস নেওয়া দায়। ঘরময় ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়ানো লম্বা চওড়া মানুষটার দিকে তাকিয়ে তিতাসের হঠাৎ মনে হল হাতে একটা নরকরোটি ধরে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সাক্ষাৎ কোনও যক্ষিনী। এবার বুঝি ওর বুকের তাজা গরম রক্ত চাইবে! তন্ত্র মন্ত্র, ঝাড়ফুঁক করতে ওস্তাদ তিতাসের শাশুড়ি। ছেলের বংশ বাড়িয়ে তবেই ছাড়বেন তিনি। তার জন্য ওই লোকটার কাছে যেতেই হবে। অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা। ওই ভণ্ডটা আসলে কিছুই জানে না। রাগে গজগজ করে গাল কামড়ায় তিতাস। কিন্তু সামনে আপত্তি জানানোর সাহস ওর নেই। কুনো ব্যাঙের মত ড্যাবড্যাব করে মেয়েছেলেদের বুক পাছা মাপা ছাড়া ওই লোকটা আর কী করতে পারে? দেখলেই মনে হয় কতযুগ হয়ে গিয়েছে লোকটা কারও সঙ্গে শোয়নি! যৌনতা বলে কিচ্ছু নেই তার জীবনে! তবুও ওকে যেতেই হয় শাশুড়ির সঙ্গিনী হয়ে। খড়খড়ে দেওয়ালে সারি সারি অদ্ভুত দর্শন দেবীমূর্তি টাঙানো আলো আঁধারি মেশানো একটা হলঘরের মেঝেতে রোঁওয়াওঠা লাল শতরঞ্জির ওপর মাথা নিচু করে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মনে মনে সে সময় চিলের কথা ভাবে তিতাস। কেমন হত যদি চিলটা উড়ে এসে এখুনি ভণ্ড লোকটার বুকের ওপর চেপে বসে তীক্ষ্ণ দুই ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে দিত ওই ময়লা চোখদুটো! আহ! এমন হলে সত্যি সত্যিই বুক জুড়িয়ে যাবে তিতাসের।

এবার এসে থেকেই তিতাস লক্ষ করছে লোকটার মেজাজ যেন তিরিক্ষে। অন্যদিন খালি গায়ে থাকলেও কোমরে একটা লাল ধুতি জড়ানো থাকে। আজ একেবারে আধল্যাংটা! এখান সেখান থেকে মেদগুলো আঙুরের থোকার মত ঝুলছে। কৌপিনটা যে কোনও সময় খুলে পড়তে পারে। কী একটা যজ্ঞ হচ্ছে। খানিক আগেই ছাগ বলি হয়েছে হাড়িকাঠে। কালো কুচকুচে ছাগ মুণ্ডটা রাখা রয়েছে মাটির সরায়। তার মাথার ওপর লাল টকটকে একটা জবাফুল। ছাগলটার চোখদুটো এখনও কী জীবন্ত! সেদিকে দেখে তিতাসের বুক কেঁপে উঠল। আগুনের ধারে বসে পাগলের মত মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর হুংকার ছাড়ছে শাস্ত্রী। ভক্তরা একে একে ঝুলি বাড়িয়ে ভিক্ষার মত চেয়ে নিচ্ছে সমস্যার সমাধান। তিতাসের শাশুড়িও হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলেন।

“বাবা, আমার ছেলের বউ-এর ব্যাপারটা দেখবেন বলেছিলেন আজ।”

“আহ! স্পষ্ট করে বলবি তো! সমস্যা কী তার?”

তিতাসের শাশুড়ি একটু ইতস্তত করলেন।

“আজ্ঞে...বাচ্চা হচ্ছে না।”

“ওহ! মনে পড়েছে। মাগীটা বাঁজা বলেই তো মায়ের চরণে এসেছিলি তুই। বেশ! বেশ! আমি তো আগেই বলে দিয়েছি, কেউ পেট বেঁধে রেখেছে! মেয়েছেলে নয়, একটা ব্যাটাছেলে।”

শাস্ত্রী চোখ বুজে দুলছেন। তিতাসের শাশুড়ি পুত্রবধূর দিকে একবার দৃষ্টি বাণ ছুঁড়ে দিলেন।

“কাটান শুনে নে। মাটির সরার ওপর একটা গোটা পান পাতা রাখবি। তার ওপর সিঁদুর আর সরিষার তেল দিয়ে “ল” লিখে, গনগনে আগুনে লাল করে পোড়ানো একখানা কালো মাছ শুইয়ে দিবি। মাছের গায়ে দিবি তেল সিঁদুরের তিনটে ফোঁটা। বার বেলায় ঠিক বারোটার সময় তিন মাথার মোড়ে রেখে আসতে হবে সরাটা। কিন্তু সাবধান! পিছন ফিরে দেখা চলবে না। কী! যা বলছি, মনে থাকবে তো? ভুল করলে কিন্তু সব দায় নিজের।”

“ভুল হবে না বাবা। তবে আমাদের সব সমস্যা মিটে যাবে তো? যা চাই তাইই পাব তো?”

“বিশ্বাস নেই যখন আসিস কেনও মাগী? যাহ্‌ যাহ্‌ যাহ্‌! ফালতু বকাস না আমায়।”

এবারও লোকটা সারাক্ষণ শ্যেণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তিতাসের শরীরের দিকে। আগে যতবার এসেছে ততবারই তিতাসকে তারিয়ে তারিয়ে দেখেছে এই লোক। কিন্তু এবার যেন জ্যান্ত গিলে নিচ্ছে। খুব ভয় করছিল তিতাসের। ওর শাশুড়ি ভক্তিভরে চোখ বুজে গলায় কাপড় দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন মোটা লোকটার পায়ের ওপর। পাঁচ হাজার এক টাকা দক্ষিণা দিয়ে মহিলা যখন উঠতে যাবেন, সেইসময় তিতাস খেয়াল করল লোকটার দুপায়ের কড়ে আঙুল দুটোই সবচেয়ে লম্বা। অন্ধকার ঘরে লাল মোমবাতির আলোয় কপালে সিঁদুর মাখা লোকটাকে একটা মানুষখেকো রাক্ষসের মত লাগছে। শাশুড়ি যতবার তুকতাক করতে চেয়েছেন, বাধা দিয়েছে তিতাস। অলস দুপুরগুলোতে গালে হাত রেখে ঠায় বসে কালো কালো মাছেদের খেলা দেখতে যে বড় ভালবাসে ও। ওদের মধ্যে থেকে একটা মাছকে আগুনে ধরে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেললেই ও মা হতে পারবে? বিশ্বাস করে না তিতাস।

***

“তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”

তিতাসের রোমহীন চকচকে ডান পাটায় ঠোঁট ঘষতে ঘষতে ঝাঁকড়া চুল সামলে ওর তিন নম্বর বলে উঠল,

“মা, আর দিদি। দিদির ব্লাড ক্যান্সার। বাঁচবে না। তোমার?”

মাটির শঙ্খের মত নরম বাদামি স্তনে এখন পুরুষালি হাত! লম্বা লম্বা আঙুলগুলো চারধার থেকে বাটির মত চেপে ধরেছে অমৃতফল! মিঠা রস নিংড়ে নেবে এইবার। আরামে চোখ বুজে আসছিল তিতাসের। কতবার যে কত চরিত্রে ও নিজেকে ভাঙছিল আর গড়ছিল তার কোনও হিসেব নেই। তবুও উত্তরে হেঁয়ালি করতে ভুলল না।

“আমার? আমার বাড়িতে......একটা বয়স্কা মেনি বিড়াল, একটা শামুক আর...আর অনেক অনেক কালো মাছ। অনেএএক।”

ছেলেটা ততক্ষণে তিতাসের মোটা থাই বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে। তিরতির জলের প্রবাহের মত কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে তিতাসের কোমরে, নাভিমূলে, পিঠে। বক্ষ বৃন্তদুটি কাষ্ঠকঠিন হয়েছে আগেই। অনেক...অনেক দিন পর আবার ভেতর থেকে গভীর তাগিদ অনুভব করছে ও। ওর ফুশিয়া লাল নেলপালিশ পরা পায়ের আঙুলগুলো যখন টপাটপ মুখে পুরছিল ছেলেটা, তখনই ও আড়চোখে তাকিয়ে দেখে নিয়েছে তিন নম্বর গনগনে লোহার রডের মত তেতে রয়েছে। হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে এত আগুন। তার চওড়া কাঁধ আর গ্রিক দেবতার মত সুঠাম শরীর থেকে গরম ধোঁয়ার মত ভাপ বেরুচ্ছে। গলগল করে ঘামছে তিতাস। হঠাৎ একটু থেমে হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটা তার স্পেশাল ক্লায়েন্টকে জিজ্ঞেস করল,

“বিড়াল আর মাছ একসঙ্গে? তোমার বাড়িতে কি ভয় নেই?”

“সেইটাই তো ভয়! চারদিকে বড্ড ভয় জান! ভীষণ ভীষণ কালো!”

“হুঁ...?”

ভয় বলতেই হ্যাঁচকা টেনে তিতাসকে বুকে জড়িয়ে নিল ছেলেটা। না, যা যা তিতাসের পছন্দ সব মনে রেখেছে। দিনে রাতে একাধিক মনমরা মহিলাকে ভাল লাগিয়েও তো কিচ্ছু ভোলেনি এ ছেলে। তিতাসের নখ বসে গেল মসৃণ পিঠে। চরম আশ্লেষে একে অন্যকে চুমু খেতে খেতে তিন নম্বর ছেলে আর তিতাস নিজেদের কালো মাছ ভাবতে শুরু করল। ওদের হাত আর পাগুলো মিলিয়ে গিয়ে শরীর থেকে আড়াআড়ি কোণাকুণি তিনটে করে ফিনফিনে পাখনা বেরিয়ে এল। বদলে গেল শরীরের চাহিদা, ইচ্ছে, গোপনাঙ্গ সবকিছু। হোটেলের ঘর ভরতি নীল জল। পা ডুবে যায়, গা ডুবে যায়, লেজের আগায় ঢেউ, থইথই কাঁপন! ওরা জল কেটে কেটে সাঁতার কাটতে শুরু করল। কী হালকা লাগছে ওদের! একটা ডুবুরি মুখ থেকে বাতাস ছেড়ে ছেড়ে বুদবুদ বানাচ্ছে অনবরত। মস্ত মস্ত স্বপ্ন নিয়ে গ্যাস বেলুনের মত ফুলো বুদবুদ জলের ওপরে উঠে যাচ্ছে। চরম লাস্যময়ী মৎস্যকন্যা দুহাতে ভরা যৌবন সামলে শ্বেত পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিতাস আর তিন নম্বর তার চারধারে এক পাক ঘুরে বালি ছিটিয়ে ছুটে গেল ডুবুরির গা ঘেঁষে। যাওয়ার সময় তিতাস স্পষ্ট দেখল ঈর্ষায় ডুবুরির চোখ দুটো রক্ত লাল। কখনও পাথরের দুর্গে, কখনও ঘাসের ওপরে, কখনও জলের নীচে ডুবে থাকা চেয়ার, টেবিল, সোফায় মাখামাখি রমণে, কখনও দংশনে দংশনে, আক্রমণে, স্বমেহনে নখের টানে ছিটকে পড়ল তিনটে চারটে কালো আঁশ! সন্ধ্যায় ফেরার সময় সেগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার কথা আর মনে রইল না কারও। তিন নম্বরের সার্ভিস সত্যিই দারুণ। সুপার্ব! সে তুলনায় রেট কম। তিতাস আবারও আসবে তার সঙ্গে। এখন তো আর আপনিও বলছে না। বেশ বন্ধু হয়ে গিয়েছে। নিটোল কালো হাতদুটো দিয়ে ফরসা ছেলেটার গলা জড়িয়ে “আমার জন্য কী করতে পার?” জিজ্ঞেস করতেই সে তিতাসের কানে কানে ফিসফিস করে বলেছে,

“খুন করতেও প্রস্তুত!”

আর কী চাই? অর্পিতা যতবার স্পা করানোর জন্য পার্কস্ট্রিটের “ডিজায়ার” স্যালোঁতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবে তিতাস ততবার একটু একটু করে জীবন কিনে নেবে।

***

সেদিন রাতের মেনুতে মাছ ছিল না। পাতলা ডাল, আলু পটলের মাখোমাখো ঝাল তরকারি, ডিম ভাজা আর স্যালাড। খেতে বসে শশা চিবোতে চিবোতে হঠাৎই তিতাসের শাশুড়ির ভুরুতে ভাঁজ।

“এ কী গো বৌমা, তোমার নাকছাবিটা গেল কোথায়? ভরা অমাবস্যায় সোনা হারালে নাকি? কী অলুক্ষুণে ব্যাপার! মা গো! তোমার কি কিচ্ছু খেয়াল থাকে না?”

ঘামে ভেজা বুকদুটোর ভয়ার্ত ওঠানামা টের পেল তিতাস। শাশুড়ি যাকে সোনা বলছেন সে তো আসলে হলুদ নয়, সাদা সোনা। সাদা সোনার ডালে হীরের ঝিকমিক ফুল! এত রাতে, এত অন্ধকারে আলোই ঠাহর করা যায় না; তিতাস কোথায় খুঁজবে সেই ভাললাগা, সেই নাকফুল? নীল জলের ভেতর সোনার গুঁড়োর মত বালি। পা রাখলেই আঙুলে লেগে যায়। গা রাখলে মনের মধ্যেও সোনার রং! সেখানেই হয়ত কোথাও...। অথবা সঙ্গী মাছের আঁশের খাঁজে! কী করে আনবে এখন?

তমোঘ্ন বিশেষ পাত্তা দিল না মায়ের কথায়। তার মতে ওরকম চার পাঁচ হাজার অনেক যায় এদিক ওদিক। আবার চলে আসবে। ওই নিয়ে সিন ক্রিয়েটের কোনও দরকার নেই। অসাবধানতায় পড়ে যেতেই পারে নাক থেকে। ফালতু ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার মত সময় নেই তার। অফিসে কাজের প্রেসার বেড়েছে। সুতো ধরে মা টান মারলেও সে আর বাঁদর নাচন নাচছে না এখন।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিতাসের অ্যাকোয়ারিয়ামটার সামনে দাঁড়িয়ে কালো মাছগুলোকে বিষ নজরে দেখছিলেন ওর শাশুড়ি। কালো মাছ অপয়া। কালো রংটাই অপয়া। তিতাসও যে সতীলক্ষ্মী নয়, বলাই বাহুল্য! তবে মাছগুলো আসতে না আসতেই সোনা গেল! ওদের রেখে দিলে আরও যে কত কী যাবে ছেলের সংসার থেকে? চিন্তার মেঘ জমছিল প্রৌঢ়ার ভারি মুখে। চোখের আগুনেই মাছগুলোকে দগ্ধ করছিলেন তিনি। তারপর হঠাৎই “মাথাটা খুব ঝিমঝিম করছে” বলে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে তিতাসের মুখের ওপর দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন।

***

ঘরের মধ্যে বিষাক্ত বাষ্পের মত কিছু একটা জমা হয়েছে। প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে। শ্বাসের সঙ্গে ভিতরে ধুকছে পোড়া পোড়া গন্ধ। চোখ খুলেও কিছু ঠাহর করতে পারলেন না প্রৌঢ়া। দুই চোখে ভারি আঠার মত ঘুম। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,

“বাবু...বাবু...একটু জল দে তো।”

তার পরক্ষণেই চিল চীৎকারে কেউ যেন তাঁর কানের পর্দা ফালাফালা করে দিল। এত তীক্ষ্ণ সে শব্দ যে নাক কান দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসার উপক্রম! কীসের ডাক এটা! তমোঘ্নর মায়ের মনে হল তিনি একটা অসহায় ছোট্ট ইঁদুর বাচ্চার মত কুঁকড়ে শুয়ে রয়েছেন। ঘরের মাথা থেকে ছাদ সরে গিয়ে উন্মুক্ত আকাশটা দেখা যাচ্ছে। ইট বালি সিমেন্টের চাঁই পড়ে রয়েছে মেঝেতে। আর উপরে দৃশ্যমান আকাশ রক্ত জবার মত লাল! কেমন যেন থম মেরে আছে প্রকৃতি! পুঞ্জ পুঞ্জ কালো মেঘ জমেছে আকাশের বুকে। একটা বিকট দর্শন পাখি দুই পাশে ডানা ছড়িয়ে উর্ধগগন থেকে নেমে আসছে তীর বেগে!

“ওমা ওমা...ওমা গো...!”

আর্তনাদ করে উঠলেন মহিলা। দু হাতের আঙুল জড় করে জোরে জোরে চোখ কচলাতে লাগলেন। কিন্তু না মনের ভুল বা দুঃস্বপ্ন কিছুই না। চোখের সামনে বাস্তবেই ঘটছে সব। সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছেন তিনি। মুখের লালা শুকিয়ে গিয়েছে। প্রাণপণে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন; কিন্তু নাহ! কালা জাদুতে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে কেউ! ছেলেকে ডাকার চেষ্টা করেও মহিলা বিফল হলেন। গলার শিরা ফুলে কণ্ঠনালীতে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে; কিন্তু শব্দ নেই।

পাখিটা মাটির ওপর বসেছে। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এগিয়ে আসছে এক পা এক পা করে। কিন্তু...ওকী! শরীরটা পাখির হলেও মাথাটা তো নয়! এ কে? দেখতে দেখতেই এক লাফে তিতাসের শাশুড়িকে চিত করে শুইয়ে ফেলে তাঁর বুকের ওপর চড়ে বসল জন্তুটা। গলায় ঝুলছে লাল জবার মালা। ডানার নিচ থেকে বার করে এনে বড় বড় পালকে ঢাকা অদ্ভুত দুটো হাত বাড়িয়ে দিল সে। কী বলা যায় একে? ভয় পেতে পেতেও মহিলা ভাল করে দেখলেন জন্তুটার মাথা মানুষের বা বলা ভাল একজন পুরুষের মুখ। ছোট ছোট পালকে ঢাকা তবে দিব্যি বোঝা যায়। নাক ও ঠোঁটের বদলে কেউ জুড়ে দিয়েছে নাসারন্ধ্রওয়ালা দুটি ধারাল চঞ্চু! জন্তুটার চোখ জ্বলছে নিভছে। তার দৃষ্টি থেকে ঝরে পড়ছে কাঁচা মাংসের লোভ! মুখটা আরও আরও নিচে নামিয়ে আনছে সে। তারপর এক ঝটকায় মাথাটা উপরের দিকে প্রায় উল্টে ফেলে তীব্র একটা শব্দ করে উঠল জন্তুটা। উজ্জ্বল লাল আলজিভ দেখা গেল স্পষ্ট! শব্দ তরঙ্গের আঘাতে সেটা কাঁপছে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড! মহিলার চোখ জুড়ে নেমে এল ঘন আঁধার। সারা শরীরে একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলেন তিনি।

মাটি থেকে যখন বেশ কিছুটা উঠে গিয়েছেন, নিম্নে শুধুই শূন্য, আর ছাই রঙের ধোঁয়া তমোঘ্নর মায়ের ঘোর কেটে গেল। তিনি দেখলেন পাশ ফিরে শূন্যে ঝুলে রয়েছেন তিনি। তাঁর মাথাটা একপাশে হেলে পড়েছে। বুঝতে একটু সময় লাগল। এমন ঘটনা যে কল্পনারও অতীত! খানিক বাদে শরীর দুমড়ে পায়ের দিকে তাকাতেই প্রৌঢ়া দেখলেন তাঁর পেটের কাছটা কামড়ে ধরে তাঁকে নিয়ে একটা কালো দরজার দিকে উড়ে যাচ্ছে সেই পক্ষী মানব! ব্যাস! আর কি সহ্য করা সম্ভব? যদি আধাআধি কেটে যায় শরীর, তাও ভাল। তবুও মুক্তির জন্য লড়তে হবে। লড়তেই হবে। হাত পা ছুঁড়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপণে চেঁচাতে লাগলেন মহিলা। হয়ত কোনও সুস্পষ্ট কথা বেরুল না, কিন্তু গোঙানি, কান্না তো তৈরি হচ্ছে। জন্তুটা একটু অস্থির! ধরা পড়ার ভয় পাচ্ছে হয়ত! বার দুই তিন ঝটকা মেরে শিকারকে ডাইনে বাঁয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে সে হঠাৎই হাঁ করে ফেলল। খোলা ছাদের ভেতর দিকে পড়ে যেতে যেতে চোখ বুজে ফেললেন মহিলা।

সেই রাতে প্রায় আড়াইটে নাগাদ একটা গোঙানির শব্দে আচমকা তিতাসের ঘুম ভেঙে গেল। ওর শাশুড়ি ভয়ে চেঁচাচ্ছেন। কাঁচা ঘুম ভেঙে যেতে তমোঘ্নর মাথায় তখন আগুন। মায়ের জন্য নিজের জিভে মায়াদয়ার মধু মাখাতে পারল না সে।

“সারাদিন বসে বসে শুধু সিরিয়াল গিলবে আর তিতাসের খুঁত ধরবে। এখন আবার বলছ চিল এসে গলায় ঠুকরে দিয়েছে।”

“হ্যাঁ রে। বিশ্বাস কর। বিশ্বাস কর। সত্যি বলছি আমি। এ...এ...এই দেখ, রক্ত...!”

শাশুড়ির সাদা হাউজকোটের বুকের কাছে লাল লাল রক্তের ছোপ! গলায় আঁচড়! উত্তেজনায় ছেলের সামনেই বুকের ভাঁজ পর্যন্ত জামা নামিয়ে দেখাচ্ছেন তিনি। তিতাস দেখতে পেয়েছে কামড়ের চিহ্ন। কিন্তু তমোঘ্ন পাথরের মত কঠিন। তার মা আর কিছুতেই বঝাতে পারছে না তাকে।

“শোন মা, আমার মনে হয়, দেশের বাড়িতেই তুমি ভাল ছিলে। শহুরে জীবন যাপনে তো তুমি অভ্যস্ত নও! পরের উইকে বরং তোমাকে রেখে আসব আমি। শান্তিতে কাজটা করতে পারব তাহলে। যতসব সাইকো জুটেছে আমার কপালে...”

অদ্ভুত একটা নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল তিতাস-তমোঘ্নর ফ্ল্যাটে। শোওয়ার ঘরে ফেরার সময় তিতাস দেখল ব্যালকনিতে লাগানো নাইলনের জালের বেশ কিছুটা অংশ ছিঁড়ে হাঁ হয়ে রয়েছে। কথা রাখতে সে তাহলে সত্যিই এসেছিল!

***

ঠুক্...ঠুক্ শব্দটা ছাদের দিক থেকেই আসছিল। টপ ফ্লোরে থাকলে এই এক সমস্যা! যখন তখন লোকে ছাদে আসবে আর ঘুমের বারোটা বাজবে। দুষ্টু বাচ্চাকাচ্চা এসে অনেক সময় গাছের ডালপালা ছেঁড়ে। টবের মাটি খুঁড়ে গাছের শেকড় নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আর বল খেলা সেও তো রয়েছে! শাশুড়ি ছিলেন যখন তিতাস মন দিয়ে বাগানের দেখভাল করতে পারত না। সারাক্ষণ কোনও না কোনও কাজ চাপিয়ে রাখতেন ওর ঘাড়ে। আর আড়ালে মুখ বাঁকিয়ে বলতেন “আদিখ্যেতা!” খোলা পাখিকে খাঁচায় বেঁধে রেখে যে কী আনন্দ পায় মানুষ তিতাস বুঝতে পারে না। গত মঙ্গলবার মাকে বাড়ি দিয়ে এসেছে তমোঘ্ন। কেউ ছাদে গেলেই তিতাস দেখতে যায় এখন। আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে সব। ফিরে আসছে একলা থাকার সমস্ত অভ্যাস। তমোঘ্নর হারানো সাহসও। দরজা খোলা রেখেই সে এখন হালুম করে বউয়ের গায়ে লাফিয়ে পড়ে।

বিরাট ছাদের কোণে আজও উড়ে এসে বসেছে তিতাসের পিরিতের চিল। অন্যদিনের চেয়ে একটু যেন উদাস! নির্জীব মত। তিতাসের বড্ড মায়া হল। এক পা এক পা করে সেইদিকে এগিয়ে নিঃশব্দে হাসল ও। চিলের চোখেও ওর হাসির প্রতিফলন! হাসলে হাসে, কাঁদলে কাঁদে! আয়নাও এমন সৎ হয় না সব সময়! একে হারালে চলবে কেনও? হীরের চেয়েও এ যে দামি। নিজের সব খুশি এই পুরুষ পাখিটার নামে ও বিনা দ্বিধায় লিখে দিতে পারে।

দুপুরে তমোঘ্নর ফোন এসেছিল। বর্ধমানের বাড়িতে তালা দিয়ে তার মা এবার তীর্থে যেতে চাইছেন। চিলটা নাকি সেখানেও হানা দিয়েছে। রাতে ঘুমোতে দিচ্ছে না। ভয় দেখাচ্ছে। খবরটা শোনা ইস্তক তিতাসের মনের আগুন শ্রাবণের শীতল বর্ষণে শান্ত হয়ে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে আদর মেখে এখুনি চিলের সঙ্গে উড়ে যেতে। উভয়ের হাসিতে আলোতে গোধূলি আকাশ ভরে গিয়েছে অপরূপ এক আলোয়। তিন নম্বর শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেও তিতাস ঠিক এইরকম আলোই দেখতে পায় তার চোখে। ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে পালকে বারবার মুখ মুছে নিচ্ছে চিল। তার ঠোঁটের ওপরে, পায়ের নখে, বুকের কাছে শুকনো শুকনো রক্ত লেগে রয়েছে। আপাতত আর কোনও কাজ নেই তার।

“এতদিন আসিসনি কেনও? আমাকে ছেড়ে থাকতে তোর বুঝি কষ্ট হয় না আজকাল?”

চিলের মাথা নিচু। চোখে চোখ রাখতে সংকোচ নাকি অপরাধবোধ এসে চেপে ধরল? একটুও অপেক্ষা না করে ডানার মত হাত মেলে দিল তিতাস। মুখ উঁচু করে ঠিক দু’বার কাঁচা মাংসের গন্ধ নিল চিল। তারপর একবার গা ঝাড়া দিয়ে উড়ে এল। প্রেমিকার বাহু আঁকড়ে বসে তার কানের নরম লতিতে, গলা ছুঁয়ে বুকের ভাঁজে জোরে জোরে মাথা ঘষতে শুরু করল। তিতাসের বুক খোলা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আঁচড়ের কামড়ের দগদগে ক্ষত! আদরের ক্ষত! ফিসফিস করে তিতাস বলল,

“তাড়াতাড়ি। একটু তাড়াতাড়ি...কর শয়তান। তোকে ঘুম পাড়িয়ে অনেকদিন পর আজ বাইরে ডিনার করতে যাব!”

ধারালো ঠোঁটদুটো দিয়ে প্রেমিকার রক্ত বর্ণ অধর কামড়ে ধরেছে শিকারি পাখি। সমস্ত পার্থিব আবরণ ছিঁড়ে যাচ্ছে তিতাসের। বাদামি পেলব ত্বক ঢেকে যাচ্ছে কুচো কুচো কালো পালকে। একটু একটু করে শরীর ভাঙছে ও। হাঁটু মুড়ে বসতে বসতে প্রকৃত সঙ্গীকে চাপিয়ে নিচ্ছে পিঠের ওপর। ওর অন্দরে প্রকোষ্ঠ তৈরি হচ্ছে। স্বপ্ন ধারণের সময় যে আসন্ন! তিতাসের সঙ্গীটিও স্বভাবসুলভ আক্রোশে আঁকড়ে ধরেছে ওকে।

এমন রমণীয় মূর্তির ঠিক পিছনেই উল্লাসে দুলে উঠছে আধমরা জবা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে হয়ত এবার ওর ডালে একটা নতুন কুঁড়ি আসবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%