॥ ৫ ॥

শৈলেন ঘোষ

রোদে ভরে উঠছে আকাশ। সমুদ্রের বুকে রোদের মণিমুক্তো ঝিকমিক করছে। পাহাড়ের গায়ে ঢেউয়ের উল্লাস লাফিয়ে পড়ছে। বৃষ্টির জলে চান করে সবুজ গাছগুলি এখন যেন রোদ পিঠে দিয়ে খুশিতে মাথা দোলাচ্ছে। গেছো-গোসাপের দল আবার দলবেঁধে পাহাড়ের পাথরে গা এলিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে শামুকছানারা উঁকিঝুঁকি মারছে। কী আনন্দ শঙ্খচিলেদের, ডানা মেলে উড়ছে। গাঙচিলের দল ঢেউয়ের ওপর দোল খেতে-খেতে মাছ খুঁজছে। আর নীল-সাদা হাঁসেরা সমুদ্রের বেলাভূমিতে গুগলি কিংবা গেঁড়ি খুঁজছে। ধরছে, খাচ্ছে আর গান গাইছে।

হঠাৎ পাইনগাছ বলে উঠল, “শঙ্খ, শঙ্খ, মেঘের পরে রোদ উঠলে মনে হয় না, গান গাই?”

শঙ্খচিল হইহই করে বলে উঠল, “বেশ হয়, তুমি গান গাইলে খুব মজা করে আমরা নাচব।”

পাইনগাছ হেসে উঠল, “দূর বোকা, আমার কি আর সে মুরোদ আছে! কেঠো-গলায় কি আর মিঠে-মিঠে গান হয়! বরঞ্চ তোমরা গাও, আমরা শুনি। তোমাদের সেই গানটা একবার শুনিয়ে দাও না, তোমাদের এই ছোট্ট দুটি অতিথিকে!”

“কোন গানটা?”

পাইনগাছ ভাবতে-ভাবতে বলল, “সেই যে, কী বলে যেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, সেই যে, সেই গানটা—ও পিসি গো...”

শঙ্খচিল আনন্দে হাসতে-হাসতে বলল, “ও তুমি কোন্‌ গানটার কথা বলছ বুঝতে পেরেছি,” বলে শঙ্খচিল যেই একটা লাইন গাইল অমনি সক্কলে একসঙ্গে গেয়ে উঠল:

ও পিসি গো, হায় গো পিসি, কত বড় মাছ,

ওই দ্যাখো না ডাঙায় উঠে লাগিয়ে দিল নাচ!

ও খুড়ি গো, ফোকলা-বুড়ি, থুড়ি-থুড়ি-থুড়ি,

কানের ভেতর খড়কে গুঁজে দাও কেন সুড়সুড়ি!

ও বলি তাই আমার এত পাচ্ছে কেন হাঁচি,

এই দ্যাখোসে নাকের ভেতর ঢুকে গেছে মাছি!

চুলকে মরি পেটের ভেতর উই-উকুনের বাসা,

বলো এবার শুনলে কেমন, গানটি কেমন খাসা?

উঃ! সে কী মজা! কেউ গাছের ডালে নেচে-নেচে গায়, কেউ আকাশে ডানা মেলে উড়ে-উড়ে, কেউ বা মাটিতে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে।

কী খুশি জয় আর টুটুর। তারাও যেন সব কষ্ট ভুলে, গান শুনে নিজেরাও নাচতে শুরু করে দিলে।

পাইনগাছ তাই না দেখে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, “বাঃ! বাঃ!”

নাচ-গানের জলসাটা চলল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ ধরে হাসি আর খুশিতে সারা পাইনগাছের ডালপালা দুলতে থাকল। সেই খুশির গান শুনে আকাশও যেন আরও ঝলমল করছে। নীল আর নীল, শুধু নীল।

জয় টুটুর কানের কাছে মুখ এনে চুপিচুপি বলল, “দ্যাখো টুটু, আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে!”

টুটু বলল, “হ্যাঁ, আর দেরি করা ঠিক নয়। চলো এবার যাই!”

জয় বলল, “এখান থেকে চলে যেতে মনটা ভীষণ খারাপ-খারাপ লাগছে, তাই না?”

টুটু উত্তর দিল, “খুব।”

হঠাৎ পাইনগাছ ওদের দেখে ফেলেছে। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করল, “কী, দুটিতে চুপিচুপি কী কথা হচ্ছে?”

জয় আর টুটু দু’জনেই থতমত খেয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে জয় বলল, “না, তেমন কিছু নয়।”

পাইনগাছ আরও জোরে হেসে উঠল। যেই হাসল, মগডালের পাতাগুলো খিলখিল করে উঠল। খিলখিল করতে করতেই পাইনগাছ বলল, “ভাবছ শুনতে পাইনি? আমার পাতায়-পাতায় কান। দ্যাখো বাপু, নীল আকাশ যতই হাতছানি দিক, কাল ভোরের আগে তোমাদের ছুটি হবে না।”

জয় আর টুটুর মুখ শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেল।

শঙ্খচিল পাইনগাছকে সায় দিয়ে বলল, “তা তো বটেই! শরীর যদি ঠিক মতো চাঙ্গা হয়ে না ওঠে, তো উড়তে-উড়তে মাঝ-সমুদ্রে বিপদ হলে, তখন কী হবে?”

পাইনগাছ বলল, “ঠিক কথাই তো। আমরা কি পাথর? আমাদের কি মন নেই? মনে দয়া-মায়া নেই? এভাবে তো দুটো ছোট্ট পাখিকে আমরা বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারি না!”

জয় আমতা-আমতা করল, “কিন্তু...”

তার কথা শেষ হবার আগেই পাইনগাছ বলল, “আমার কথা শোন রে পাখি। এই পৃথিবীতে আমার হয়ে গেল পঞ্চাশ বছর। ভাল-মন্দ কত কী দেখলুম। আমার ডালে কত পাখি এল, কত পাখি গেল। কত পাখির কত সুখের কথা শুনলুম, কত দুঃখের কথা। কত পাখি গান গেয়ে গেল আমার ডালে, কত পাখি নাচল। কিন্তু কোনও পাখিকে তো বলতে শুনলুম না, একটি বুড়ো-গাছের জন্যে সে ভালবাসা খুঁজতে বেরিয়েছে। ওরে পাখি, এইকথা শোনার পর থেকে তোদের জন্যে ভালবাসায় আমারই মন উপচে পড়ছে। আমিও যেদিন বুড়ো হব, যেদিন আমারও সবুজ পাতা ঝরে পড়বে, আমার শুকনো ডালপালাগুলো লিকলিক করবে, সেদিন হয়তো আর কেউ আসবে না আমার কাছে। সেদিন তোদেরই কথা শুধু মনে পড়বে আমার। তাই আজ যতক্ষণ পারি, আমার পাতার আড়ালে লুকিয়ে রেখে ভালবাসি তোদের।”

গাছের কথা শুনে ভারী মন খারাপ হয়ে গেল জয় আর টুটুর। আজই চলে যাওয়ার জন্যে আর তারা কথা তুলল না। সুতরাং কালই ভোরে যাওয়া ঠিক হল। জয় আর টুটু পাইনগাছকে বলল, “পাইন-দাদা, আজ আমরা থাকলে তুমি যদি খুশি হও, আমরা নিশ্চয়ই যাব না।”

পাইনগাছ খুশিতে দুলে উঠল। দুলতে-দুলতে বলল, “আঃ, কী যে ভাল লাগছে তোদের কথা শুনে!”

আজ সারাদিন পাইনগাছের কাছে কাছে থাকল জয় আর টুটু। কখনও এ-ডাল কখনও ও-ডালে। কখনও আবার গাছের ডাল ছেড়ে শঙ্খচিলের সঙ্গে উড়ে-উড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। পাইনগাছ মাথা তুলে দ্যাখে আর চেঁচায়, “ওহে শঙ্খ, বেশি দূরে যেও না! হারিয়ে যাবে।”

শঙ্খ বলল, “ভয় কোরো না, আমি সঙ্গে আছি।”

সারাদিন কত খেলা, কত হাসি আর কত খুশির কলতানে ভরে গেল সমুদ্রের তীরের সেই বন-পাহাড়। তারপর ধীরে-ধীরে যখন সূর্যের উত্তাপ কমতে লাগল, বিকেলের পড়ন্ত রোদের ঝাঁঝ কমল, তখন যেন জয় আর টুটুর মনটাও কেমন খারাপ-খারাপ করতে লাগল।

সন্ধ্যা নামার অনেক আগেই শঙ্খচিলের সঙ্গে জয় আর টুটু আবার পাইনগাছের ডালে এসে বসল। পাইনগাছ কী খুশি। বলল, “এসো, এসো, অনেক খেলাধুলো হয়েছে। এবার একটু গল্পগুজব করা যাক। আমাদের তো গল্প ছাড়া করারও কিছু নেই। সেই যে মাটিতে গেঁথে বসে আছি ব্যাস, নট নড়ন-চড়ন, নট কিচ্ছু” বলে নিজেই হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে আবার বলল, “তোমাদের মতো যদি আমার ডানা থাকত, তবে যে কী মজা হত!”

টুটু বলল, “পাইন-দাদা, মজা হত ঠিকই, কিন্তু তোমার এই বিশাল দেহটা নিয়ে যখন তুমি আকাশে উড়তে, উফ্‌, যা দেখতে লাগত না, মনে হত হাওয়াই-দত্যি!”

পাইনগাছ বলল, “আরে বাবা, সেইজন্যেই তো ভগবান হুড়কুষ্টি করে আমাদের মাটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।”

শঙ্খচিল বলল, “কিন্তু তোমাদের জন্যই তো পৃথিবী এত সুন্দর, এত সবুজ।”

পাইনগাছ শঙ্খচিলের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “কিন্তু পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পেলুম.কই? যেখানে জন্মেছি সেখান থেকে তো এক-পা হাঁটতে পারি না আমি। শুনেছি, পৃথিবীর দিকে-দিকে কত না চোখ-জুড়নো সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। শুনেছি, পৃথিবীর কোথাও আছে শুষ্ক মরুভূমি, কোথাও আছে শস্য-শ্যামলা সবুজ খেত। কোথাও আছে পাহাড়ের মাথায় তুষারের মুকুট। ঝরনা। কোথাও-বা শান্ত নদীর কুলুকুলু ধ্বনি। অবশ্য সমুদ্রের তীরে আমার জন্ম বলে, সমুদ্র আমার চোখে-চোখে। কিন্তু সমুদ্রের গভীরে যে কত অপূর্ব দৃশ্য আছে, সে আর আমি কোনওদিন দেখতে পাব না। শুনেছি সমুদ্রের নীচে অসংখ্য মাছ, অসংখ্য রঙিন গাছগাছালি। তেমনি কত না মণিমুক্তো। সবই শোনা রইল। দেখা আর কোনওদিন হবে না। শুনেছি, সমুদ্রের বুকে কোথাও-কোথাও আছে প্রবাল দ্বীপ। চোখ ঝলসানো পাথর আর পাথর সেখানে। সেই প্রবাল-দ্বীপ নিয়ে কত গল্প শুনেছি, কত স্বপ্ন দেখেছি।”

“কী গল্প শুনেছ পাইন-দাদা?” জিজ্ঞেস করল শঙ্খচিল।

“সে অনেক কথা।” উত্তর দিল পাইনগাছ।

“বলো না,” একই সঙ্গে আবদার করল জয় আর টুটু।

গাছ বলল, “সে যে অনেক সময় লাগবে!”

জয় আর টুটু বলল, “লাগুক না। আমরা তো আর চলে যাচ্ছি না এক্ষুনি।”

পাইনগাছ বলল, “বেশ, তবে শোনো৷” বলে পাইনগাছ গল্প বলতে শুরু করল। জয়, টুটু আর শঙ্খচিল শুনতে লাগল।

“অনেক, অ-নে-ক দিন আগে পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণে এক সমুদ্রে নীল আর সবুজ, লাল আর হলুদ রঙের পাথর দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক প্রবাল-দ্বীপ। আকাশ উপচে সূর্যের আলো যখন ছড়িয়ে পড়ত সেই রঙিনপাথরের গায়ে, তখন মনে হত, সে যেন এক স্বপ্নের দেশ। মনে হত, কোন্‌ এক সুখী রাজা সেখানে পৃথিবীর সব সেরা মণিমুক্তোগুলি সাজিয়ে-সাজিয়ে এক সুখের রাজত্ব গড়েছে। আসলে কিন্তু তা নয়। এ-দ্বীপ গড়ে উঠেছিল আপনা-আপনি। এখানে কোনও রাজাও ছিল না, তার রাজত্বও ছিল না। এখানে উড়ে আসত নীল-ডানার হাঁস। কত রঙের পাখি! কত রঙিন মাছের ছোট্ট-ছোট্ট সরোবর ছিল এখানে। একসঙ্গে থাকত। কেউ কাউকে হিংসা করত না। কোনও ঝগড়া ছিল না। ছিল আনন্দ আর হাসি। পাখিরা যখন গান গাইত, সরোবরের মাছেরা তখন জলের নীচে আনন্দে লুটোপুটি খেত। আর নীল-ডানার হাঁসেরা আকাশে উড়ে-উড়ে দোল খেত। কী সুখ না ছিল সেখানে!

“একদিন হল কী, ভয়ঙ্কর এক ঝড় উঠল সমুদ্রে। প্রবাল-দ্বীপের তীর ভাসিয়ে সমুদ্রের ঢেউ মাতামাতি শুরু করে দিল। সে যাই হোক, সমুদ্রের বুকে ঝড় তো হামেশাই ওঠে, আবার সময় হলে থেমেও যায়। কিন্তু একটা অদ্ভুত কাণ্ড হল। একজন লোভী জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে বেরিয়ে, সেই ঝড়ের মুখে পড়ল। কথা নয় তার বেঁচে থাকার। ঝড়ের ঘূর্ণিতে কখন তার জলের তলায় তলিয়ে যাবার কথা। কিন্তু আশ্চর্য, সে বেঁচে গেল! ঝড়ের ঝাপটায় তার নৌকো ঠেকল গিয়ে এই প্রবাল-দ্বীপে। ঝড়ে-জলে জেলে তো নাকানিচোবানি খেয়ে মরো-মরো। প্রাণটি কোনওরকমে তখনও তার বুকের মধ্যে ধিকিধিকি করছে। নৌকোর দাঁড় আঁকড়ে সে মুখ গুঁজে গোঙাচ্ছে!

“লোভী জেলে আরও অনেকক্ষণ নৌকোর ভেতর পড়ে-পড়ে ধুঁকল। তারপর আস্তে-আস্তে ঝড় কমল। সে যখন কোঁকাতে-কোঁকাতে উঠে বসল, তখন ঝড়ের মেঘ কেটে আকাশে রোদ উঠেছে। বুঝতেই পারছ, জেলের তখন কী মনের অবস্থা। কারণ, সে যে এখন কোথায় এসে পড়েছে, বুঝতেই পারছে না। ভয় আর আতঙ্কে সে দূর-সমুদ্রের বুকের দিকে চেয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। তারপর হঠাৎ যখন তার সেই প্রবাল-দ্বীপের ওপর চোখ পড়ল, চমকে উঠল সে। তার চোখ ঝলসে গেল। চারদিকে রঙ আর রঙ। সূর্যের আলোয়, রঙের ছটায়, সমুদ্র-বুকের সেই ছোট্ট দ্বীপটা যেন ঝলমল করছে। সে হন্তদন্ত হয়ে নৌকো থেকে নেমে পড়ল। চারদিকে চোখ মেলে সে দিশেহারা হয়ে গেল। ভয়টা নিমেষে উবে গেল মন থেকে। লোভে চোখ দুটো তার ঠিকরে বেরিয়ে আসে যেন! লোভী জেলে এক-একটা রঙিন পাথরে হাত দেয়, আর চিৎকার করে বুকে জড়িয়ে ধরে, ‘আমার, আমার।’ সে ভাবল, এই পাথর নিশ্চয়ই খুব মূল্যবান রত্ন। সমুদ্রের এই নিরালা বক্ষের এই মূল্যবান রত্নের মালিক সে! সুতরাং সে আনন্দে চিৎকার আর লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিল।

“হঠাৎ এই দ্বীপে এক অপরিচিত মানুষকে দেখে সেই দ্বীপের পাখিরা, সেই দ্বীপের প্রাণীরা অবাক হয়ে গেল। ভাবল, তাদের সুখের রাজ্যে কোথা থেকে এল এই মানুষ!

“সেই মানুষ কিন্তু তখন সেই রঙ-ঝলমল পাথরের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে, আর ভাবছে, সে এখন এই পাথর নিয়ে যাবে বন্দরে বন্দরে। এই পাথরের বেসাতি করে না-জানি তার কত পয়সা হবে! উফ্‌! এইকথা ভাবতে-ভাবতে তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। সে আর স্থির থাকতে পারে না। পাথর তুলে সে পাথরের গায়ে আঘাত করতে লাগল। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ পাথরগুলি টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে। সেই পাথর সে দু’হাত ভরে কুড়িয়ে নেয়, উত্তেজনায় হাঁপায় আর পাগলের মতো হোহো করে হেসে ওঠে। তার কোমরে জড়ানো ছিল একটা কাপড়ের ফেট্টি। সে তাড়াতাড়ি সেটা খুলে ফেলল। তারপর সেই ভাঙা পাথরের চাঁইগুলো সেই কাপড়ে বেঁধে ভাবল, ‘আগে এগুলো নৌকোয় রেখে আসি। আবার এসে নিয়ে যাব।’ এই ভেবে সে পাথরের বোঝাটা কাঁধে ফেলে, তার নৌকোর দিকে হাঁটা দিল।

“কিছুটা গিয়েই সে থমকে গেল। দেখল, অসংখ্য নীল-ডানার হাঁস তার পথের মাঝে দাঁড়িয়ে ডানা দোলাচ্ছে। জেলে প্রথমটা ওদের দেখে থমকে গেলেও, পরে গ্রাহ্যই করল না। হাত নেড়ে ‘হুশ, হুশ’ করে তাড়া মারল। তাড়া খেয়ে হাঁসগুলো কোথায় ছুটে পালাবে, তা নয়, তারা জেলের দিকে এগিয়ে চলল। জেলে ঘাবড়ে গেল! ভাবল, হাঁসের দল তাকে ভয় না পেয়ে তার দিকেই কেন এগিয়ে আসে! জেলে তখন একটা পাথর ছুড়ে দিল হাঁসের দিকে। আর দেখতে! চোখের পাতা পড়তেও দিল না। সেই হাঁসের দল ডানা ঝাপটে লাফিয়ে পড়ল জেলের ঘাড়ে। জেলে একা। হাঁসেরা তার তুলনায় ছোট্ট হলেও, দলে ভারী। এমনিতেই কথা আছে, একতাই বল। হাঁসের দল সেই একতার বলে জেলেকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল। করবেই তো! তাদের এই সুন্দর রঙে-রঙে সাজানো আনন্দের রাজ্যকে একজন লোভী মানুষ ভেঙে তছনছ করে দেবে, এ তারা কখনও সহ্য করতে পারে! সুতরাং হাঁসের দল ডানার ঝাপটা মেরে, পায়ের নখ ফুটিয়ে, ঠোঁটের ঠোক্কর দিয়ে সেই লোভী জেলেকে আধমরা করে ছাড়ল। অগত্যা সে যন্ত্রণায় হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘বাঁচাও, বাঁচাও!’ কিন্তু তখন কে তাকে বাঁচাবে! তার কাঁধে ঝোলানো সেই পাথরের বোঝা মাটিতে ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল। আর সে নিজে হাঁসের আক্রমণে পাথরের ওপর গড়াগড়ি খেতে-খেতে মাথা কুটতে লাগল। আঘাত যখন সে আর সহ্য করতে পারল না। যখন তার সারা শরীর রক্তে-রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে, তখন সে জ্ঞান হারাল।

“জেলের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন রাত। আকাশে চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারদিক। সমুদ্রের তরঙ্গের ওপর লক্ষ-লক্ষ চাঁদের কণা দোলা খাচ্ছে। রেশমের মতো নরম আলোর ওড়নাখানি লুটিয়ে পড়েছে সেই প্রবাল-দ্বীপের রঙিন পাথরের ওপর। আঃ! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেই লোভী জেলে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, তার সারা শরীরে ক্ষত, ব্যথা। কিন্তু মুহূর্তেই সে ভুলে গেল সব কিছু। চাঁদের আলোয় ঝলসে-ওঠা সেই পাথরের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো তার আবার লোভে জ্বলজ্বল করতে লাগল। মনে-মনে ভাবল, আর তাকে পায় কে! সেই হাঁসের দল এই গভীর রাতে আর তো এখানে আসতে পারছে না! সুতরাং সে চাঁদের আলোয় আবার পাথর ভাঙতে লাগল।

“হঠাৎ চমকে যায় জেলে! এ কী, কে যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! থমকে অবাক-দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে। একটি অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। তার গায়ে জ্যোৎস্নার ফিনফিনে আলোর পোশাক। মাথায় রঙিন রত্নের মুকুট। অঙ্গে রত্নখচিত কত না অলঙ্কার। তাকে দেখে জেলে নিজেই যেন পাথরের মতো স্থির।

“মেয়েটি কথা বলল, ‘কে তুমি?’

“আঃ! কী মধুর কণ্ঠস্বর তার। পৃথিবীর আকাশে-বাতাসে যত সুর আছে, সব যেন একসঙ্গে ঝরে পড়ল তার কণ্ঠ দিয়ে।

“কথা বলতে পারল না জেলে। হতভম্বের মতো চেয়ে আছে তার দিকে।

“মেয়েটি আবার বলল, ‘আমি প্রকৃতি মায়ের মেয়ে। ওই যে দেখছ, আকাশে জ্যোৎস্নায় ভরে আছে চাঁদ, ওই জ্যোৎস্নায় আমার তরী ভাসিয়ে আমি পৃথিবীর দিকে-দিকে ঘুরে বেড়াই। যারা পৃথিবীর সৌন্দর্য নষ্ট করে, আমি তাদের জন্য নিয়ে আসি মৃত্যু! তুমি জেনে রাখো, পৃথিবীর যেখানে যত সবুজবনের ছায়া ছড়িয়ে আছে, সে আমার মায়ের সৃষ্টি। পাহাড়ের মাথায় যে তুষারের মুকুট, সে আমারই মায়ের। পৃথিবীর দুই প্রান্তে শুভ্র তুষারের যে নদী বয়ে চলে, সে আমারই মায়ের দান। পৃথিবীর যেখানে যত নদী আছে, যত ঝরনা আছে কিংবা সমুদ্র আছে, সবই আমার মায়ের অধিকারে। তুমি লোভের বশে আমার প্রকৃতি-মায়ের এই চমৎকার প্রবাল-দ্বীপের রত্নভাণ্ডার লুঠ করছ। সুতরাং তোমার জন্যে আমিও এনেছি মৃত্যু!’

“‘না-আ-আ!’ হঠাৎ এক আহত পশুর মতো প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল সেই জেলে।

“সঙ্গে-সঙ্গে প্রকৃতি-মায়ের মেয়েও হেসে উঠল খিলখিল করে। তার হাসির সুরে জ্যোৎস্নার আলোয় সেই রঙিন দ্বীপ ঝলমল করে কেঁপে উঠল। হাসতে-হাসতে সে বলল, ‘মৃত্যুর নাম শুনে ভয় পেয়ে গেলে?’

“জেলে এবার কথা বলল। উত্তেজনায় গলা তার থরথর করে কাঁপছে। সে বলল, ‘তুমি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও। এ-দ্বীপ আমার। তোমার শক্তি থাকে, আমাকে বাধা দাও! দেখি তোমার কত ক্ষমতা! জেনে রাখো মেয়ে, আমি মানুষ। তোমার ওই প্রকৃতি-মা’কে আমি থোড়াই কেয়ার করি।’

“আবার হেসে উঠল সেই মেয়ে। বলল, “ওহে মানুষ, অত দম্ভ ভাল নয়। তুমি তো জন্মেছ আমারই মায়ের দয়ায়।’

“‘মিথ্যে কথা!’

“‘আমারই মায়ের শক্তিতে তুমি আজ বড় হয়েছ।’

“‘কে বলে সে-কথা? আমারই নিজের শক্তিতে আমি বড় হয়েছি।’

“মেয়েটি আবার হাসল। এক বোকা মানুষের আস্ফালন দেখে, তার মুখে এ যেন করুণার হাসি। হাসতে-হাসতে সে বলল, ‘ভারী বোকা তো তুমি। বোকারাই নিজের শক্তির বড়াই করে! তোমার শক্তি দিয়ে তুমি কি পারবে, সবুজ গাছের জন্ম দিতে? গাছে-গাছে ফুল ফোটাতে? পারবে কি রঙিন পাখির মতো কারও কণ্ঠে গান দিতে? অথবা প্রজাপতির মতো পাখার রঙে কাউকে রাঙিয়ে তুলতে? তোমার শক্তির জোরে তুমি কি পারবে ভূমিকম্পের সঙ্গে লড়াই করতে কিংবা অগ্ন্যুৎপাতের সামনে দাঁড়াতে?’

“জেলে চিৎকার করে উঠল, ‘পারি, পারি, সব পারি। একদিন সব পারব।’

“মেয়েটি এবার হাসল না। বলল, ‘সবই যদি পারো’ তা হলে তোমার জন্যে এই যে আমি মৃত্যু এনেছি, এও তুমি নিশ্চয়ই জয় করতে পারবে?’

“জেলের গলায় দম্ভ ফেটে পড়ল। সে বলল, ‘দেখি, কে আমাকে মারে! তুমি? তার আগে আমিই তোমাকে শেষ করে ফেলব।’ বলে সেই লোভী জেলে, ক্ষিপ্ত হয়ে তুলে নিল একটা মস্ত পাথর। তারপর চোখের পলকে সেই পাথর ছুঁড়ে দিল মেয়েটির দিকে। মুহূর্তও লাগল না। পাথর তার গায়ে আঘাত করার আগেই, সে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই অদৃশ্য মেয়ের কণ্ঠে গর্জে উঠল এক ভয়ঙ্কর হাসি। সেই হাসির শব্দে সেই সমুদ্র, সেই দ্বীপ, সেই জ্যোৎস্নার আলো সবই যেন আর্তনাদ করে কাঁপিয়ে তুলল দিগ্বিদিক। প্রথমটা ভয় পেল সেই জেলে। কিন্তু তারপরেই সে আবার সেই পাথরের টুকরোগুলি বোঝাই করতে লাগল তার কাপড়ের থলিতে।

“এখন চারদিক শান্ত। শুধু সমুদ্রের শব্দ। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে গর্জে উঠছে। জেলে ভাবল, এই সুযোগ। আর দেরি ঠিক নয়। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বোঝা আবার পিঠে ফেলে, সে তার নৌকোর দিকে হাঁটা দিল।

“সে থমকে দাঁড়ায়। তাই তো! তীরে এসে সে তো নৌকো দেখতে পাচ্ছে না! তবে কি সমুদ্রের এই কিনারে সে নৌকো বাঁধেনি। সুতরাং সে ছুটল এই কিনার থেকে আর এক কিনারে। সেখানেও তো নৌকো নেই! আতঙ্কে কেঁপে ওঠে তার সারা শরীর। তারপর সে এ-কূল থেকে ও-কূলে পাগলের মতো ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। কিন্তু কোথায় পাবে তার নৌকো! নৌকো তো ভেসে গেছে সমুদ্রের জলে-জলে কোথায়। সে কি আর দেখা যায়! হায় রে লোভী জেলে, প্রবাল-দ্বীপের সৌন্দর্য দেখে তখন তুমি এমনই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে, নৌকোটা যে তীরে বেঁধে রাখা দরকার, এ তুমি খেয়াল করলে না!

“জেলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। চিৎকার করে উঠল জেলে। উন্মাদের মতো দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে সে আর্তনাদ করতে লাগল, ‘বাঁচাও বাঁচাও!’ কিন্তু কে তাকে বাঁচাবে! এই নির্জন প্রবাল-দ্বীপে তার চোখের সামনে এখন এই কঠিন পাথরগুলো ছাড়া আর কিছু নেই। মরণ-ভয়ে ভীত এই মানুষটার চোখে এই পাথরগুলো এখন আর মূল্যবান রত্ন নয়! যেন এক-একটা ভয়ঙ্কর দৈত্য। তার গলাটা টিপে ধরার জন্যে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। জেলে প্রাণের ভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল। কিন্তু কোথায় পালাবে? যেদিকে ছোটে, সেই দিকেই যেন সেই পাথরের দৈত্য মুখ বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে ভয় দেখাচ্ছে। চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয় জেলে। কিন্তু এখন তার কান্না শোনার মতো একটি প্রাণীও নেই এই পাথরের রাজত্বে। ছুটতে-ছুটতে কাঁদতে কাঁদতে জেরবার হয়ে গেল সেই জেলে। শেষে, যখন তার বুকের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে এল ধীরে-ধীরে, যখন তার ক্লান্ত পা আর উঠছে না, তখন সে ছিটকে পড়ল ওই পাথরের ওপর মুখ থুবড়ে। তারপর আর কিছু জানা গেল না। জানা গেল না, সেইখানেই পড়ে-পড়ে সেই জেলের মৃত্যু হল। অথবা জানা গেল না, কোনও একদিন সমুদ্রেব জলোচ্ছ্বাস সেই দ্বীপে আছড়ে পড়ে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কি না!”

গল্প শেষ হল। গল্প শুনতে-শুনতে কেমন যেন থমথম করছে সক্কলের মুখ। কথা নেই। শুধু চোখের ওপর ভাসছে, সেই দ্বীপ, সেই জেলে, সেই পাথর আর জ্যোৎস্নার তরী বেয়ে নেমে আসা সেই মেয়ের মুখখানি।

পাইনগাছ কথা বলল, “শুনলে তো গল্প?”

টুটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আশ্চর্য গল্প।”

শঙ্খচিল বলল, “লোভ করলে মরণ ছাড়া আর পথ নেই।”

সবার কথা শেষ হলে, খুব যেন হতাশ গলায় জয় বলল, “এমন যেখানে লোভ, দম্ভ, সেখানে কোথায় খুঁজে পাব ভালবাসা?”

পাইনগাছ জয়ের কথা শুনে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, “কেন, আমাদের ভালবাসা কি ভালবাসা নয়? এই যে শঙ্খচিল তোমাদের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ভালবাসল, সে কি ভালবাসা নয়?”

লজ্জা পেল জয়। বলল, “না পাইন-দাদা, তোমাদের এ-ভালবাসার কথা ভুলতে পারি না আমরা। আমাদের ভুল বুঝো না! তোমাদের ভালবাসা না পেলে আমরা কি বাঁচতে পারতুম! আমার ভাবনা যে আপেলগাছের জন্যে।”

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। পাইনগাছ বলল, “আজ তোমরা আমার কাছেই থাকো। আমার ভাল লাগবে। রাত কাটলেই তো তোমরা চলে যাবে। বেশ লাগল তোমাদের। আবার কবে দেখা হবে জানি না। কে জানে কোন্‌দিন কী বিপদ আসে! যেদিন ওই সমুদ্র মনে করবে আমার কাজ শেষ হয়েছে, সেইদিনই সে ঝড়ের ধাক্কায় আমায় মাটিতে ঠেলে ফেল দেবে। জানি না সেদিন আসতে কত দেরি।” বলে পাইনগাছ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

শঙ্খচিল বলল, “ও-কথা কেন বলছ পাইন-দাদা?”

পাইনগাছ বলল, “না, জানো, হঠাৎ ওই ছোট্ট দুটো পাখিকে বিদায় দেবার কথা মনে আসতেই মনটা কেমন করে উঠল।” বলে হঠাৎ পাইনগাছের চোখ পড়ল জয় আর টুটুর চোখের ওপর। হো-হো করে হেসে উঠল পাইনগাছ। হাসতে-হাসতে বলল, “আরে, আরে, জয় আর টুটুর চোখে জল কেন? দূর বোকা, আমার কথা শুনে কাঁদে! ছিঃ, ছিঃ! কেউ দেখে ফেললে কী বলবে বল্‌ তো? আয়, আমার কাছে আয়!” তারপর আদর করে বলল, “একটা গান শোনাবি না আমাকে? নে, একটা গান শোনা! পাখির গান শুনতে আমার এত ভাল লাগে!”

জয় আর টুটুর চোখে তখনও জল টলটল করছে। তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে দু’জনেই ওই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুজনেই একই সুরে গেয়ে উঠল:

একটু কথার, একটু সুরে একটুখানি গান,

এই তো জানি ছোট্ট প্রাণের খুশির কলতান।

খানিক আলোয়, খানিক ছায়ায় বাতাসে ঢেউ তুলে,

মোদের গানে উঠুক সবার হৃদয়খানি দুলে।

ছোট্ট হাসির ছোট্ট খুশির বাজিয়ে যাব বাঁশি,

আলোর মতো মুক্তো দেব ছড়িয়ে রাশি-রাশি।

সন্ধ্যা নেমে এল। দূর সমুদ্রে সূর্যের শেষ চিহ্নটি ধীরে-ধীরে মুছে যাচ্ছে। পাইনগাছ বলল, “সত্যিই, কী চমৎকার! যেমন চমৎকার তোমাদের গান, তেমনি চমৎকার এই সন্ধ্যা। তোমাদের ঘুমের সময় এল। এই রাত তোমাদের শুভ হোক! তোমরা সুখী হও!”

ঘুমিয়ে পড়ল জয় আর টুটু। ঘুমিয়ে পড়ল তাদের পাশে শঙ্খচিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%