শৈলেন ঘোষ
দেখতে-দেখতে শীত এসে গেল। দূরে পাহাড়ের মাথায়-মাথায় বরফ জমতে শুরু করেছে। আর ক’দিন পরে বরফ পড়তে শুরু করবে। শিরশিরে হিমেল বাতাস সেই কথা জানান দিচ্ছে।
বুড়ো-আপেলগাছ একদিন জয়কে বলল, “শীত এসে গেল।”
জয় বলল, “হ্যাঁ, এবার ক’টা দিন তোমায় একলা থাকতে হবে।”
গাছ চমকে উঠল। বলল, “কেন?”
জয় উত্তর দিল, “ক’টা দিন এখানে থাকব না। দূরের দেশে চলে যাব।”
অবাক হল আপেলগাছ। জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবি?”
“জানো না, শীত পড়লে, দলবেঁধে আমরা আর-এক দেশে উড়ে যাই? বরফের ঠাণ্ডা গায়ে লাগলে আমরা বাঁচব কেমন করে? আর, তা ছাড়া বরফ যখন পড়বে আমরা যে তখন খাবারও পাব না।” উত্তর দিল জয়।
পাখির কথা শুনে বুড়ো-আপেলগাছের বুকটা যেন শিউরে উঠল। বলল, “তুই সত্যিই চলে যাবি পাখি? বরফ এত নির্দয়, তোকেও কষ্ট দেয়? তুই চলে গেলে আমি একা থাকব কেমন করে?”
“তুমি ভেবো না আপেল-বুড়ো। শীত গড়িয়ে বসন্ত এলেই আমি আবার আসব। আবার তোমায় গান শোনাব।” উত্তর দিল জয়।
“আহা! বসন্তের দিনগুলি কী সুন্দর। বসন্তের দিনগুলিতে আগে কত-না সাজে সেজেছি আমি। আমার ডালে সবুজে-সবুজে উছলে পড়ত নতুন পাতা। কত রঙ, কত আনন্দ। কিন্তু আজ? আজও বসন্ত আসে দিকে-দিকে রঙ ছড়িয়ে, কিন্তু আমার জন্যে সে কিছুই আনে না। এমনকী, আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। এত তাচ্ছিল্য কেন যে করে! এত অবহেলা! আমি কি বুড়ো, তাই?
আপেল-বুড়োর কথা শুনে জয়ের একটুখানি বুক, দুঃখের ভারে উপচে গেল। বলল, “মন খারাপ কোরো না আপেল-বুড়ো। বসন্ত কিছু নাই আনুক, আমি আনব। আমি তোমার বন্ধু। অচেনা সেই দূর দেশ থেকে আমি নিয়ে আসব, তুমি যা চাইবে।”
বুড়ো-গাছ বলল, “তুই তো ছোট্ট পাখি। তুই আর আমার জন্যে কী আনবি!”
“বলো না, কী চাও?” জিজ্ঞেস করল জয়।
“পাররি?”
“হ্যাঁ, পারব।”
বুড়ো-আপেলগাছ থামল। হয়তো কিছু ভাবল। তারপরে বলল, “পাখি, যদি তোর কষ্ট হয়?”
“আমার কিচ্ছু কষ্ট হবে না। বলো না, তোমার কী চাই?”
“যদি তোর সত্যি কষ্ট না হয় পাখি, তবে পারিস তো আমার জন্যে একটু ভালবাসা নিয়ে আসিস!”
থমকে গেল পাখি। তার মুখের কথা যেন মুখেই হারিয়ে গেল। কেননা, তার তো জানা নেই, কোথায় গেলে সে ভালবাসা খুঁজে পাবে! একটু ভালবাসা কোথায় পাওয়া যায়! চোখ দুটি তার ছলছলিয়ে উঠল বুড়ো-আপেলগাছের জন্যে। তারপর আনমনেই সে বলে ফেলল, “হ্যাঁ আনব, তোমার জন্যে ভালবাসাই আনব আপেল বুড়ো।” বলা শেষ না হতেই তার চোখের জলের ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে মাটিতে।
সময় হয়ে গেল। বাতাসে তুষার ভেসে আসার আগেই, জয় নামে ওই ছোট্ট পাখিটি, হাজার-হাজার পাখির সঙ্গে উড়ে চলল আর-এক দেশে। নীল আকাশে অগুনতি রঙের ঢেউ তুলে ওদের ডানাগুলি দুলে ওঠে। ওরা উড়ে চলে কখনও ধুধু মাঠের ওপর দিয়ে। কখনও গভীর বন ছাড়িয়ে। সবুজ খেত পেরিয়ে। কখনও উত্তাল নদী ছাড়িয়ে। ওরা যাবে, গভীর সমুদ্রের বুকে সেই বন-সবুজের দ্বীপে। সেখানের আকাশে বসন্ত। শুধুই বসন্ত। খুনখুনে শীত-বুড়িটার সাধ্য কী, সেখানে তার পাকা চুলের তুষার ছড়িয়ে দেয়! কিংবা হাত বাড়িয়ে খামচে দেয় ওই ছোট্ট-ছোট্ট পাখিদের! সত্যি! পাখিদের এ যেন এক দুঃসাহসিক অভিযান। যত বিপদ, যত ভয় সব জয় করে ওরা এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাবে, সূর্যের নিশান লক্ষ রেখে, সেই দক্ষিণে। কত না অজানা পাখির সঙ্গে কত না অচেনা পাখির পরিচয় হবে। কত কথা, কত গল্প হবে। কত বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে।
অথচ এবারের এই অভিযানে জয় যেন ওই হাজার-হাজার পাখির আনন্দের দোসর হয়ে উঠতে পারে না। বন্ধু-আপেলগাছের কথা তার বারবার মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায়, তার সেই ছোট্ট কথাটা, পারিস তো আমার জন্যে একটু ভালবাসা নিয়ে আসিস।’ যতবার মনে পড়ে, ততবারই যেন বুকখানা তার শিউরে ওঠে। মন তার আকুল হয়ে বলে ওঠে, “বলো, বলো, কোথায় গেলে আমি ভালবাসা পাব, আপেল-বুড়োর জন্যে একটু ভালবাসা?”
উত্তর পায় না জয়। তবু সে উড়ে যায় আর ভাবে, না-জানি শীতের বুড়ি নিঃসঙ্গ ওই আপেলগাছকে এখন কত কষ্ট দিচ্ছে। সে-কথা যত ভাবে, ততই তার কষ্ট হয়!
পাখি উড়ছে দলে-দলে, সকাল থেকে দুপুর। সময় বয়ে যায়। হারিয়ে যায় একটি-একটি চেনা-পথ, চেনা-দেশ। উড়তে-উড়তে সন্ধ্যা নামে। সূর্যের সোনা-রঙে আকাশ ছেয়ে যায়। একটু পরেই আঁধার নামবে। তারপরেই ঘুমের রাত নেমে আসবে ওই অসংখ্য পাখির চোখেও।
সত্যি রাত এল।
পাখিদের ক্লান্ত ডানাগুলি গাছে-গাছে স্থির হয়ে থেমে যায়। সামনে শুধু গাছ। কত গাছ। তারই একটি ডালে বসে বসে জয় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। ঘুম আসে না চোখে। মন তার অস্থির হয়ে বারবার বলে ওঠে, ‘রাতের আঁধার কি আজ একটু তাড়াতাড়ি আকাশ থেকে মুছে যাবে না?’
আর একটি পাখি, সে-ও ঘুমোয়নি। সে-ও বসে ছিল জয়েরই পাশে, আর-একটি ডালে। সেই পাখিটি অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল জয়কে। কী জানি, কী মনে হয়েছিল তার, হঠাৎ জয়কে জিজ্ঞেস করল, “এখনও জেগে আছ?”
জয় থতমত খেয়ে গিয়েছিল অচেনা পাখির গলা শুনে। চকিতে তার দিকে ফিরে তাকাল জয়। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও জয় বুঝতে পারল, পাখিটি তারই মতো ছোট্ট। পাখিটি বলল, “আমার নাম টুটু। যদি আপত্তি না থাকে তোমার নামটা জানতে পারি কি?”
“জয়।”

টুটু জিজ্ঞেস করল, “অনেকক্ষণ থেকে জেগে আছ। ঘুমোবে না?”
জয় উত্তর দিল, “ঘুম পাচ্ছে না।”
টুটু আশ্চর্য হল। বলল, “আজ এতটা পথ এসেছ, ঘুম তো পাবারই কথা। আমি তো ঘুমিয়েই পড়েছিলুম। তোমার ডানার শব্দে আমার আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। কাল আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ো। নইলে শরীর বইবে না।”
জয় কোনও উত্তরই দিতে পারল না।
টুটু নামে সেই পাখিটি আবার বলল, “যদি কিছু মনে না করো, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কী কথা?”
“শরীরটা কি তোমার ভাল নেই?”
মুখটা নিচু করল জয়।
টুটু খুবই ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল জয়ের কাছে। বলল, “আমি কি তোমায় সাহায্য করতে পারি?”
“অনেক ধন্যবাদ। আমার শরীর ঠিকই আছে,” উত্তর দিল জয়।
“কিন্তু তোমার যে একটা কিছু হয়েছে, এটা তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে?” টুটু যেন জয়ের খুব আপনজনের মতো কথাটা জিজ্ঞেস করল।
জয় আবার চুপ করে রইল।
“কী কষ্ট হচ্ছে তোমার, আমায় বলতে পারো না?” টুটু জিজ্ঞেস করল।
উত্তর দিতে দোনোমনো করল জয়।
টুটু বলল, “অবিশ্যি অসুবিধে থাকলে বোলো না। তবে এটা ঠিক, আমাকে বিশ্বাস করে বললে, আমি তোমার ক্ষতি করব না। আমায় বন্ধু ভাবতে তুমি দ্বিধা করলে, আমি দুঃখ পাব।”
হঠাৎ যেন একঝলক খুশি জয়ের মুখে উছলে উঠল।
টুটু আবার বলল, “এখন অনেকদিন একসঙ্গে থাকতে হবে আমাদের। প্রত্যেক বছর আমাদের এই অভিযানে কত বিপদ আসে, কত কষ্ট। আমরা যদি অন্যকে বন্ধুর মতো না দেখি, বন্ধুর কষ্টে যদি এগিয়ে না আসি, তবে আকাশের নীচে এই পৃথিবীতে একসঙ্গে বেঁচে থাকার মানে আছে?” তার কথা শুনে কী যে ভাল লাগল। জয়ের সমস্ত মনটা যেন নিমেষে ভরে গেল। সে আর চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, “এ-সময়ে হঠাৎ তোমার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের কথা। আমার সব কথা তোমাকে আমি নিশ্চয়ই বলব। জানি না, সে সব কথা শুনে তুমি আমায় কী ভাববে!”
“কিচ্ছু ভাবব না। তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পারো।”
“তবে শোনো,” জয় বলল, “আমার এক বন্ধুর কথা ভেবে আমি বড় কষ্ট পাচ্ছি।”
আশ্চর্য হল টুটু। জিজ্ঞেস করল, “বন্ধুর জন্য কষ্ট পাচ্ছ? কে তোমার সেই বন্ধু?”
“এক বুড়ো-আপেলগাছ।”
টুটু আরও অবাক হল, “আপেলগাছ! কী হয়েছে তার?”
জয় বলল, “আমার সেই বুড়ো-আপেলগাছ এখন বড় একা। তার কাছে কেউ যায় না, তাকে ভালবাসে না। কেউ চেয়েও দ্যাখে না তার দিকে। কেননা, তার না আছে সবুজ পাতার জৌলুস, না যৌবনের খুশির ছোঁয়া। এখন শুধু তার দেহে শুকনো ডালপালাগুলো এধার-ওধার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লিকলিক করছে। দেখে আমার বড্ড কষ্ট হল। তাকে গান শোনালুম। তার ডালে-ডালে নেচে-নেচে তাকে আনন্দ দিলুম। আর বললুম, কেউ না-থাক, আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। তারপর দেশ ছেড়ে যাবার আগে তার কাছে যখন বিদায় চাইলুম, দুঃখে তার বুক ভরে গেল। আমিও পারলুম না। আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠল।” বলতে-বলতে জয় থামল। তার গলা কাঁপছে। অন্ধকারে দেখা গেল না, হয়তো তখন তার চোখেও জল গড়িয়ে পড়ছে।
সামলে নিল জয়। তারপর আবার বলল, “এক কঠিন কাজ সে আমায় দিয়েছে।”
টুটু জিজ্ঞেস করল, “কী কাজ?”
“দূর-দেশ থেকে ফেরার সময় তার জন্যে আমায় একটু ভালবাসা নিয়ে যেতে বলেছে।”
“ভালবাসা!” চমকে উঠল টুটু।
“আমি তাকে কথা দিয়েছি। কিন্তু আমি তো জানি না, কোথায় গেলে ভালবাসা খুঁজে পাব?” বলে টুটুর দিকে চাইল জয়। জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানো?”
কিন্তু টুটুর মুখ দিয়ে ছোট্ট একটি শব্দ অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এল, “না।”
“হায়!” হতাশায় দীর্ঘশ্বাস পড়ল জয়ের।
এবার টুটুর গলার স্বর স্পষ্ট হল। সে বলল, “হতাশ হোয়ো না বন্ধু। আমি আছি তোমার সঙ্গে। আমরা দু’জনে একসঙ্গে আপেল-বুড়োর জন্যে ভালবাসা খুঁজে বেড়াব। এসো, এখন ঘুমিয়ে পড়ি।”
বন্ধুর আশ্বাস শুনে খুশিতে ভরে গেল জয়ের মন। এখন সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। অন্তত একটা কথা সে তো এখন জানে যে, এই মুহূর্তে সে আর একা নয়। তার মনের কথা বলার মতো একজন বন্ধু তো সে এখন পেয়েছে। সে-বন্ধু তারই মতো আর-এক পাখি। ছোট্ট, সুন্দর। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়েছিল জয়। ভারী নিশ্চিন্ত, স্বস্তির ঘুম।
জয়ের যখন ঘুম ভাঙল, আকাশে তখনও তেমন আলো ফোটেনি। কিন্তু আলোর খবর পৌঁছে গেছে পুব দিকে। চোখ চাইতেই সে দেখল, অসংখ্য পাখির সকলেই জেগে উঠেছে। টুটুও জেগেছে। সে জয়ের দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখছে আর হাসছে। চোখে চোখ পড়তেই সে জিজ্ঞেস করল, “কী, ঘুম ভাঙল?”
“ঘুমিয়ে পড়েছিলুম,” জয় উত্তর দিল। যেন একটু-একটু লজ্জা পেয়েছে সে।
টুটু বলল, “আকাশে আর-একটু আলো ফুটলে মাটিতে নেমে পেট ভরে খেয়ে নিতে হবে। চেয়ে দ্যাখো, জায়গাটা বেশ ভাল। মনে হচ্ছে। অনেক পোকামাকড় পাওয়া যাবে। আজই আমাদের দক্ষিণের সমুদ্র ধরার জন্য পাড়ি দিতে হবে।”
জয় বলল, “ও, তা হলে আজই সেই তেপান্তরের মাঠ পেরোতে হবে আমাদের?”
“বলতে পারো তেপান্তর,” উত্তর দিল টুটু, “তবে, এ-যুগে তো আর সেই তেপান্তর নেই, সেই রূপকথার রাজপুত্রের তেপান্তর।”
জয় বলল, “হ্যাঁ, এ-তেপান্তরের হাল আমার জানা আছে। আমি তো আর এই প্রথম দক্ষিণে যাচ্ছি না। ক’বছর আগে আমি মায়ের সঙ্গে প্রথম যাই দক্ষিণে বন-সবুজের দ্বীপে। সেবার দক্ষিণে সেই দ্বীপে আমার দুটি ভাই হয়েছিল। আমারও জন্ম সেই দক্ষিণে।”
টুটু বলল, “তুমি দেখছি আমারই মতো।”
কথা বলতে-বলতেই আলো ফুটে উঠল। পাখিরা খাবারের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে দিল। উঃ! সে কী কিচির-মিচির হুল্লোড়। জায়গাটা একটা মস্ত জলার ধারে। তখনও সেই মস্ত জলার ঝকঝকে জলে দু-একটি শালুকফুল উঁকি মারছে।
টুটু বলল, “জয়, খাবার খুঁজতে-খুঁজতে যেন অন্যমনস্ক হোয়ো না। একটু নজর রেখো চারদিকে। গতবছর এইখানেই আমাদের মারবার জন্যে বন্দুক ছুঁড়েছিল পাখি-শিকারির দল।”
আঁতকে উঠল জয়। বলল, “হ্যাঁ, মনে আছে মনে আছে! বন্দুকের গুলিতে আমাদের দলের অনেক পাখি মারাও গিয়েছিল এইখানে।”
টুটু বলল, “কে জানে, এবারও কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে তাক কষছে কিনা!”
অবশ্য এবার আর তেমন কিছু হল না।
খাবারের পালা চুকে গেলে, সেই জলার ধার ছেড়ে এবার পাখিরা আবার আকাশ-পথে পাড়ি দিল। চলল সেই তেপান্তরের মাঠের দিকে।
সত্যি, মাঠটা ভীষণ বড়। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে নজরই যায় না। ওরা জানে, এই মাঠটা পেরোতে অনেকটা সময় চলে যাবে, মাঠ তো মাঠ, সত্যিই মাঠ খাঁ-খাঁ করছে। খাবারের কথা ছেড়ে দাও, মাথা খুঁড়লে একফোঁটা জল পর্যন্ত পাবে না। এমনকী, একটু যে জিরিয়ে নেবে, তেমন একটি গাছেরও টিকি দেখতে পাবে না। অবিশ্যি মাঠের সেই শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট পুকুরমতো আছে। সেখানেই যা একটু জল পাওয়া যায়। খুব তেষ্টা পেলে ওই পুকুরেই গলা ভিজিয়ে নিতে পারো। ইচ্ছে করলে চান করে গাটাও ঠাণ্ডা করে নিতে অসুবিধে নেই।
এখন আকাশ-ভর্তি আলো। আকাশের প্রায় মাঝ বরাবর চলে এসেছে সূর্য। অসংখ্য উড়ন্ত পাখির গায়ে-গায়ে আলোর ঝিলিমিলি। পাখিদের ছায়া পড়েছে মাঠের ওপর। সেই ছায়া দেখে মনে হচ্ছে, নকশা-কাটা একটা মস্ত কার্পেট মাটির ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। পাখিদের কোনও ক্লান্তি নেই। তাদের ডানাগুলি খুশিতে উঠছে-নামছে। কেউ-কেউ হাওয়ায় ভাসছে, কিংবা দুলছে। একদল কলতান শুরু করলে, আর একদল। আনন্দে গান শুরু করে দেয়।
টুটু বলল, “সবাই কী খুশি দ্যাখো জয়!”
“দেখছি তাই।” জয় উত্তর দিল।
টুটু আবার বলল, “তোমার ভাল লাগছে না?”
“খুব,” উত্তর দিল জয়, “দলবেঁধে নতুন দেশে পাড়ি দিতে কার না ভাল লাগে বলো? তবে আমার বারবার সেই আপেল-বুড়োর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। জানি না, এই শূন্য আকাশে উড়তে-উড়তে কোথায় তার জন্যে ভালবাসা খুঁজে পাব।”
“জয়,” হঠাৎ কেমন যেন এক আতঙ্ক-জড়ানো গলায় চিৎকার করে ডাক দিল টুটু।
চমকে উঠল জয়, “কী হল?”
“দেখতে পাচ্ছ?” টুটুর গলায় ভীষণ উত্তেজনা।
“কী?”
টুটু যেন আর্তনাদ করে উঠল, “একঝাঁক বাজপাখি। আমাদের আক্রমণ করতে আসছে!”
সত্যিই, কী ভয়ঙ্কর দ্রুতগতিতে বাজপাখির ঝাঁক ছোঁ-মারার জন্যে গোঁত দিচ্ছে। আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল পাখির দলের ওপর। আশ্চর্য, এতক্ষণ কেউ খেয়ালও করেনি। এমন অতর্কিতে আক্রমণ করল যে, সবাই হতবাক হয়ে গেছে। তাদের সেই কলতান মুহূর্তে যেন আর্তনাদ হয়ে উঠল। হাজার-হাজার পাখি নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে প্রাণপণ ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল। সমস্ত দলটা চোখের নিমেষে ভেঙে ছত্রখান হয়ে গেল। যারা পারল পালাল। যারা, পারল না, ধরা পড়ল। বাজপাখির খোঁচা-খোঁচা নখ ততক্ষণে তাদের খামচে ধরেছে। খানিক চিৎকার করে, নিশ্চুপ হয়ে গেল তারা চিরদিনের মতো।
আকাশে তো আর লুকোবার জায়গা নেই! সুতরাং মরো, না হয় মরার জন্যে চরকি খাও। জয় আর টুটুরও এই অবস্থা। কখনও মৃত্যুর নাগালের কাছাকাছি এসে পড়ছে, আবার কোনও রকমে বাঁচছে। এমনি করতে করতে প্রাণপণে ছুট দিল তারা যেদিকে পারল। বাজপাখির হিংস্র দৃষ্টি এড়িয়ে তারা বাঁচল বটে, কিন্তু দলছুট হয়ে কোন্দিকে যে হারিয়ে গেল, বোঝা গেল না। রক্ষে এই, জয় আর টুটু কেউ কারও কাছছাড়া হয়নি। দু’জনেই বেঁচে আছে। কিন্তু কতক্ষণ আর এমনি করে বেঁচে থাকবে। এখনও তারা আকাশে ছুটছে। তারা জানে, যে-কোনও মুহূর্তে আবার বাঁপিয়ে পড়তে পারে বাজপাখি। সুতরাং যত শক্তি আছে সব শক্তি দিয়ে উড়ে পালাও।
আর বোধহয় বেশিক্ষণ তারা উড়তে পারবে না। কেননা, ভয় যখন দু’হাত দিয়ে গলাটা টিপে ধরে তখন তো বুকের নিশ্বাস আপনাআপনি স্থির হয়ে যায়। সুতরাং এখনই তাদের থামতে হবে। থামবার আগে চট করে একবার পিছু ফিরে দেখার চেষ্টা করল টুটু, শত্ৰু কত দূরে! কিন্তু পিছু ফিরে থমকে গেল টুটু। আঁতকে চিৎকার করে উঠল, “জয়।”
জয়ও ফিরে তাকাল। দেখল, পেছনের আকাশ শূন্য। তাদের সেই হাজার-হাজার সঙ্গীর একজনকেও দেখা গেল না। এমনকী, সেই নৃশংস বাজপাখির একটাও নজরে পড়ল না।
হাঁপাতে-হাঁপাতে টুটু অতি কষ্টে বলল, “আমরা দলছুট হয়ে অন্যদিকে ছিটকে এসেছি।”
বে-দম হয়ে কথা বলতে জয়ের ভারী কষ্ট হচ্ছে। তবু কোনওরকমে ঢোক গিলতে-গিলতে জিজ্ঞেস করল, “বাজপাখি কি সকলকেই মেরে ফেলল?”
টুটু উত্তর দিল, “কী জানি।”
“এখন কী হবে তা হলে?” জয়ের যেন দম আটকে আসছে।
“তাও জানি না।”
আর কোনও কথা বলার শক্তি নেই দু’জনেরই। চুপচাপ।
কিন্তু উড়তে-উড়তে জয়ের ডানা দুটো যেন হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। যেন টলে পড়ছে জয়। বুঝি এক্ষুনি আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে! তাই দেখে চেঁচিয়ে উঠল টুটু, “কী হল জয়?”
“সমুদ্র আর কত দূর?” অতি কষ্টে প্রশ্ন করল জয়।
“এখনও অনেক দূর,” উত্তর দল টুটু। বলল, “আজ আর বোধহয় পৌঁছতে পারব না।”
টুটুর কথাটা শেষ হতে না-হতেই আচমকা দেখা গেল, আকাশের ওই উপর থেকে জয় একটা ঢেলার মতো মাটিতে গোঁত খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। দেখার সঙ্গে-সঙ্গে টুটু গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “জয়...”
জয় ততক্ষণে মাটিতে পড়ে গেছে। অবশ্য শেষ মুহূর্তে, আপ্রাণ চেষ্টা করে ডানাটা হাওয়ায় মেলে ধরেছিল জয়। তাই আঘাত তেমন লাগল না। কিন্তু নির্জীব হয়ে মাটিতে সে লুটিয়ে পড়ল। দম বুঝি এক্ষুনি ফেটে পড়ে।
চোখের পলকে টুটুও নেমে এসেছে। একেবারে জয়ের কছে। ভীষণ ভয় পেয়ে গেল টুটু। কারণ, যেখানে জয় পড়েছে, সেখানে না আছে গাছ, না ঘাস। খটখটে শুকনো একটা ফাঁকা জায়গা। কেউ দেখে ফেললে, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আর সত্যি-সত্যি যদি কেউ দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাত বিপদ। এই বিপদের কথা মনে হতেই সে যে কী করবে আর না করবে, কিছুই ঠাওর করে উঠতে পারে না। একবার যদি জয়ের দিকে তাকায়, তত পাঁচবার সে এদিক-ওদিক ফিরে দেখে। না, কেউ নেই। উৎকণ্ঠায় মুখ তার এইটুকু হয়ে গেছে। অবশ্য সে ইচ্ছে করলে এক্ষুনি পালাতে পারে। এমনকী ইচ্ছে করলে নিজে লুকিয়ে থাকার মতো একটা জায়গাও খুঁজে বার করতে পারে। কিন্তু সে-কথা টুটু এখন ভাবতেই পারে না। জয় তার বন্ধু। এই বিপদের সময় যে বন্ধুকে ফেলে পালায় তাকে শয়তান ছাড়া আর কী বলা যায়। হতে পারে টুটু একটা ছোট্ট পাখি। তাই বলে তার মনটা তো আর ছোট্ট নয়। সুতরাং ক্ষণেক দেরি না করে, জয়কে তার দুটি ডানা দিয়ে আড়াল করে জড়িয়ে রাখল। জয় তখনও হাঁপাচ্ছে। হাঁপাচ্ছে টুটুও। তবু সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, টুটু জয়ের বুকটা নিজের শরীরের উত্তাপে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল। নিজের বন্ধুকে বাঁচানোর জন্যে, এখন টুটুকেই যদি কেউ মারে, ক্ষতি নেই। তার প্রাণের বদলে বন্ধু যদি বাঁচে, তার চেয়ে বেশি আর কী চাইবে, ওই ছোট্ট পাখি টুটু!
ভয়ে আর ভাবনায় অনেকক্ষণ কেটে গেল।
“টুটু!” হঠাৎ ডাকল জয়। নিস্তেজ গলার স্বর।
টুটু প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল জয়ের ডাক শুনে। অবাক চোখে তার দিকে খানিক চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখন ভাল বোধ করছ?”
“ভাল,” জয় উত্তর দিল।
হ্যাঁ, জয়ের বুকের ওপর থেকে ডানা দুটি সরিয়ে নিয়ে টুটু দেখল, সত্যি, জয় এখন আর হাঁপাচ্ছে না। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেশ খানিকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে। ব্যস্ত হয়ে টুটু জিজ্ঞেস করল, “উড়তে পারবে?”
“আর একটু বসলে কোনও অসুবিধে আছে?” জয় প্রশ্ন করল।
“অসুবিধে নেই। তবে জায়গাটা একদম ফাঁকা। বলা যায় না কিছু।” টুটু উত্তর দিল।
“আমার জন্যে তুমি কেন বিপদ মাথায় নাও! তুমি বরং একটু আড়াল খুঁজে লুকিয়ে পড়ো। আমার যা হয় হবে।”
জয়ের এ-কথা শুনে টুটু হয়তো একটু ব্যথা পেল। বলল, “ছিঃ, ছিঃ! তুমি এ কী বলছ জয়? তোমার দুঃসময়ে, তোমাকে ফেলে রেখে আমি পালাব? তুমি না আমার বন্ধু! মরতে হয় তো দু’জনেই মরব।”
বুঝি বা জয়ের চোখের পাতা দুটি ছলছল করে উঠল টুটুর এই কথা শুনে। সে চুপ করে রইল। মনে-মনে ভাবতে লাগল, এর নামই কি ভালবাসা?
একটু পরেই জয় উঠতে পারল। একটু পরে সে হাঁটতেও পারল। ডানা ছড়িয়ে তুড়ুক-তুড়ুক সে লাফাতে পারল। তারপরে বলল, “টুটু, এবার আমি উড়তে পারব।”
“পারবে?” খুশিতে উছলে গেল টুটুর মুখখানি।
“হ্যাঁ, পারব। কিন্তু আমরা যাব কোথায়? আমরা যে দল-ছাড়া হয়ে গেছি!” জিজ্ঞেস করল জয়।
“ভয় নেই জয়। আমাদের যেতে হবে দক্ষিণে। দক্ষিণের পথ তো আমরা চিনি। যেতে-যেতে আমরা নিশ্চয়ই আবার সবাইকে দেখতে পাব।” উত্তর দিল টুটু।
“কিন্তু আকাশটা দেখতে পাচ্ছ টুটু?” জিজ্ঞেস করল জয়।
টুটু আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।”
“আধাঁর নামলে তখন কী হবে?”
টুটু বলল, “মনে হচ্ছে আজ আমাদের এখানেই কোথাও রাত কাটাতে হবে।”
“থাকার জায়গা তো কোথাও দেখছি না,” উত্তর দিল জয়।
“এসো, দেখি। কোথাও আশ্রয় দেখতে পাই কি না! উড়তে পারবে তো?” টুটু জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ পারব,” বলে জয় ডানা মেলে দিল আকাশে।
টুটুও ফুড়ুত করে জয়ের পাশে উড়ে গেল। টুটু উড়তে-উড়তে চেঁচিয়ে উঠল, “ওদিকে নয়। এদিকে এসো। চলো, দক্ষিণ দিকেই এগিয়ে যাই।”
জয় দক্ষিণ দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “ঠিক বলেছ। যতটা এগিয়ে থাকা যায়।”
তারপর দু’জনেই নিশ্চুপ। ওদের উড়ন্ত ডানায় মৃদু হাওয়ার স্পর্শ লেগে শনশন শব্দ ভেসে আসছে শুধু। ওদের চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কখনও শূন্য আকাশের এদিক-ওদিক চোখ ঘুরছে-ফিরছে, আবার কখনও আশ্রয়ের জন্য নীচে চোখ মেলে ধরছে।
হঠাৎ জয় কথা বলল, “তোমাকে কষ্ট দিলুম।”
“কিসের কষ্ট?” জিজ্ঞেস করল টুটু।
“তুমি না থাকলে আমি হয়তো বাঁচতুম না,” জয়ের উত্তর।
“আমিও তো বলতে পারি, তুমি ছিলে বলে ওই হিংস্র বাজপাখির কবল থেকে আমি বেঁচেছি।” জবাব দিল টুটু।
“বাজের যেন আমাদের দেখলেই যত খিদে পায়, তাই না টুটু?”
টুটু বলল, “আরও যে কত রকমের শত্রু আমাদের চারপাশে সবসময় ঘুরঘুর করছে। কেউ আমাদের রক্ত খেয়ে পেট ভরাতে চায়। কেউ আমাদের বন্দুক ছুঁড়ে খুন করতে চায়। কেউ অতর্কিতে জাল ছুঁড়ে আমাদের ধরে হাটে-হাটে ব্যবসা করে বেড়ায়। কেউ খাঁচায় বন্দী করে আমাদের পোষ মানায়।”
“এরা সব শয়তান, চোর,” জয়ের গলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ,” উত্তর দিল টুটু, “জানো আমি একবার এই রকম এক পাখি-চোরের হাতে প্রায় ধরা পড়েছিলুম।”
যেন আঁতকে উঠল জয়, “এঃ, বল কী!”
“ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি,” বলে একটু থেমে টুটু আবার বলল, “হ্যাঁ, ভাগ্য তো বটেই, কিন্তু আমাদের সাহসের জোরটাও কম ছিল না।”
“কী রকম?” খুব উদ্গ্রীব হয়ে জয় জিজ্ঞেস করল।
“তবে শোনো,” উড়তে-উড়তেই বলতে শুরু করল টুটু, “সেবার অন্য আর-একটা দলের সঙ্গে ঠিক এমনি করে আমি গরমের দেশে যাচ্ছিলুম। আমরা ঠিক করেছিলুম, প্রথম দিনই নদী পেরিয়ে সন্ধের আগেই বনে আশ্রয় নেব। বনের দূরত্ব ছিল অনেকটা, আর হাওয়া বইছিল আমাদের বিপরীত দিকে। কাজেই বেশ কষ্ট করে হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছিল। পথটা হবে প্রায় তিনশো মাইল। এ তো আর এমন কিছু নয়। ঘণ্টায় ষাট-সত্তর মাইল বেগে উড়তে তো আমরা সহজেই পারি। সুতরাং পাঁচ-ছ’ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবার কথা। মাঝে আবার পেটে কিছু দেবার জন্যে একটা জলা জায়গায় কিছুক্ষণ থামতে হল। খেয়েদেয়ে আবার পাড়ি। নদী পেরোলুম, বনেও ঢুকলুম। অবশ্য হাওয়ার জন্যে সময় একটু বেশিই লাগল। আমাদের দলের পাখিরা যদি এই পথটুকু আসতে কিছুটা কাহিল হয়ে থাকে, তবে সেটা এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তারা বিশ্রাম নেবার আশায় গাছে-গাছে তড়িঘড়ি বসার জন্য এতই ব্যস্ত হয়ে উঠল যে, দেখল না পাখি-চোর আমাদের ধরবে বলে এধারে-ওধারে জাল পেতেছে। কিন্তু কী ভাগ্য, আমি দেখতে পেয়েছিলুম সেই জালের ফাঁদ। পাখির দল ফাঁদে পা দেবার আগেই আমি চিৎকার করে উঠলুম, ‘বন্ধুরা সাবধান! গাছে ফাঁদ! ’

“হাজার-হাজার পাখির দল আমার আচমকা চিৎকারে এমন ঘাবড়ে গেল যে, বসতে গিয়েও থমকে গেল তারা। চোখ মেলে দেখতেই তাদের হুঁশ হয়েছে। তাই তো, গাছে তো সত্যিই ফাঁদ! অমনি সঙ্গে-সঙ্গে তারাও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘সামনে ফাঁদ, সামনে ফাঁদ।’ চিৎকার করতে করতে পালাবার পথ খুঁজতে লাগল। পাখি-চোরের দল ঘাপটি মেরে বসে ছিল বনের আড়ালে। তাদের ফাঁদের ফাঁসটা যে আমরা নজর করে ফেলেছি, বুঝতে পেরেছিল তারা। অমনি একেবারে চোখের পলকে এধার-ওধার দিয়ে হইহই করে তারা বেরিয়ে এল। তাদের হাতে ছিল তীর-ধনুক। তীর ছুটল আকাশের দিকে। হাজার-হাজার পাখি প্রাণের ভয়ে যে যেদিকে পারল, পালাল। যারা পালাতে পারল না, তাদের কারও বুকে, কারও চোখে, কারও মুখে তীরের ফলা আঘাত হানল। তারা লুটিয়ে পড়ছে আকাশ থেকে মাটিতে। ঠিক এই সময়ে আমার বুকখানা ভীষণ সাহসে ফুলে উঠল। আমি বুঝতে পারলুম, এখন যদি রুখে না দাঁড়াই, তবে আরও অনেকে মরব আমরা। সুতরাং আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘বন্ধুগণ, ভয় পেয়ে পালালে, আমাদের নিস্তার নেই। আমরা অনেকে এখনও বেঁচে আছি। এসো, শয়তান চোরগুলোর ওপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পালালে মরব, শত্রুর সামনে রুখে দাঁড়ালে বাঁচব। আমরা ছোট হতে পারি, কিন্তু আমরা সবাই এক। আমাদের শক্তি কম কিসে!’
“এই কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে যাদু-মন্ত্রের মতো কাজ হল। সমস্ত পাখি দলে-দলে সেই নচ্ছার চোরগুলোর ওপর লাফিয়ে পড়ে আঘাত হানতে লাগল। আমাদের ঠোঁটের ঠোক্করে ওদের মুখে-চোখে রক্ত ঝরে পড়ে। আমাদের নখের খোঁচায় ওদের শরীরে জ্বালা ধরে যায়। ডানার ঝাপটায় চারদিক অন্ধকার দ্যাখে। চোরের দল আমাদের এই আচমকা আক্রমণের জন্যে একদম তৈরি ছিল না। তারা তো হতভম্ব হয়ে গেছে। তারপর যখনই ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারল, তখন লাগিয়ে দিলে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি। জঙ্গলের মধ্যে হুলুস্থুলু কাণ্ড। আমাদের মতো ছোট্ট-ছোট্ট পাখির কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে সেই চোর-বাহাদুরের দল আর দাঁড়ায় সেখানে! যে যেদিকে পারল, মারল ছুট। ‘ভাগ, ভাগ!’ ওঃ! তারপর আমাদের সে কী আনন্দে চিৎকার শুরু হয়ে গেল। আমি নিজে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলুম যে, একটা.চোরকে একা পেয়ে তার পেছনেই একা-একা লড়ে গেলুম। ব্যস! একেবারে বোকার মতো কাজটা করে বসলুম। দল বেঁধে তাড়া করা এক। আর আমার মতো একটা ছোট্ট পাখির ওই জাঁদরেল চোরটার সঙ্গে লড়াই করা একেবারে অন্য ব্যাপার। চোরটা যেই দেখেছে, আমি একলা, অমনি সে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার হাতে যে একটা জাল, এটা আমি একদম লক্ষ করিনি। আমি যেই তার মাথায় ঝাপটা মারতে গেছি, ব্যস, সে সঙ্গে-সঙ্গে জালটা ছুঁড়ে দিয়েছে। যাঃ! আমি জালের ভেতর বন্দী! আমার আর পালাবার পথ নেই! ওই শক্ত জালটা ছেঁড়ার ক্ষমতা আমি আর কোথায় পাব! অগত্যা জালের ভেতর ছটফট করতে করতে আমি চিৎকার করে উঠলুম। কিন্তু বৃথাই গলা ফাটানো। লোকটা আমাকে সেই অবস্থায় জালে বন্দী করে, বনের গভীরে ঢুকে পড়ল। তারপর একটা বেশ নিরিবিলি জায়গা দেখে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে জালের ভেতর চোখ রেখে আমাকে এমন করে দেখতে লাগল, যেন এক্ষুনি গিলে খেয়ে ফেলবে। আমার ঠোক্কর খেয়ে বেচারার সারা শরীর রক্তে দগদগ করছে। তার ওই বেহাল অবস্থা দেখে, আমার এমন বিপদেও কী করে যে হাসি পাচ্ছিল, আমি এখন নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাই। অবাক হবারই তো কথা! কেননা, তখন তো আমার প্রাণটি ওই চোরের হাতে ঝুলছে। ওই তো, দ্যাখো না, চোরবাবাজি আমাকে মারার জন্যে জালের মধ্যে হাত পুরল। আমার গলাটা সে খপ করে খামচে ধরে, আমায় টেনে বার করে আনল। আমার মনে হল, এক্ষুনি আমি দম আটকে মরে যাব। উফ! চোরের পাঁচটা আঙুল যেন জাঁতাকলের মতো আমাকে টিপে ধরেছে! আমার আর টুঁ শব্দটি করার মতো ক্ষমতা নেই। ডানা ঝাপটিয়ে, ঠোঁট উঁচিয়ে ছটফট করতে করতে ভাবতে লাগলুম, আঃ! এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। মরতে আমার এখনও এত দেরি হচ্ছে কেন!
“এমন সময় হঠাৎ আমি যেন শুনতে পেলুম আমার সঙ্গীরা চিৎকার করছে। আমাকে বলছে, ‘ভয় নেই টুটু, আমরা এসে পড়েছি। ’
“আমি বুঝতে পারলুম, আমি ধরা পড়ার পর তারা চুপিচুপি ওই চোরের পিছু নিয়েছে। আমি দেখতে পেলুম, তারা চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাখি-চোরের ওপর। আবার লেগে গেল ঝটাপটি। আমি তোমায় বলব কী, সেই চোরটা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, আমাকে ছেড়ে দিয়ে মারল ছুট! উঃ! ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে দে হাওয়া।
“আমি বেঁচে গেলুম। কিন্তু তখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি বেঁচে আছি। আমার বুকের ভেতরটা তখন এমন তোলপাড় করছিল, মনে হচ্ছিল, তক্ষুনি বুঝি আমার বুকের নিশ্বাস থেমে যাবে।”
টুটুর কথা শুনতে শুনতে জয় যেন একেবারে বোবা হয়ে গেছে। কিছুই খেয়াল করেনি। খেয়াল করেনি, কতক্ষণ উড়েছে, কতটা এসেছে। সূর্য যে সন্ধ্যার রঙ ছড়িয়ে এক্ষুনি আকাশের আড়ালে মুখখানি লুকিয়ে ফেলবে, তাও নজর করার সময় ছিল না জয়ের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন