শৈলেন ঘোষ
জয় আর টুটু অনেক বাধা ভেঙে সমুদ্রের তীরে পৌঁছে গেল। এবার আরও খানিকটা উড়ে গেলে বন-সবুজের দ্বীপ।
টুটু নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “যাক বাঁচা গেল! সমুদ্রে পাড়ি দেবার আগে এসো জয়, একটু জিরিয়ে নিই।”
জয় বলল, “ঠিকই বলেছ, একটু দম নিয়ে যাওয়াই ভাল।”
অন্য সময় হলে টুটুও হয়তো এ-কথা বলত না, আর জয়ও হয়তো সায় দিত না। কিন্তু কালকের ধকলটা টুটুর গায়েগতরে তো এখনও মালুম দিচ্ছে। সুতরাং এতটা একটানা উড়ে আসার পর, একটু বিশ্রাম নিতে চাইলে সেটা কিছু অন্যায় নয়।
দু’জনেই গাছে বসে পড়ল।
উরি ব্যস! দ্যাখো, দ্যাখো, সমুদ্রের সঙ্গে পাহাড়ের কী সাংঘাতিক লড়াই হচ্ছে। সমুদ্রের কিনারে জলের ওপর পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ-ছোঁয়া ঢেউগুলো বারবার পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হার মানছে না। আবার গা-ঝাড়া দিয়ে লাফিয়ে পড়ছে প্রচণ্ড তেজ দেখিয়ে। আঘাতে-আঘাতে জলের বিন্দুগুলি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মনে হচ্ছে সেই জলবিন্দু যেন আকাশ-ভর্তি ধোঁয়া।
সমুদ্র যতই আঘাত করুক, পাহাড় কিন্তু শান্ত। নড়েও না, চড়েও না। ঢেউয়ের দানবকে সে যেন থোড়াই কেয়ার করছে।
পাহাড় আর সমুদ্রের এই লড়াই দেখতে-দেখতে জয় বলল, “দ্যাখো টুটু, যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই দেখছি আঘাত করার জন্যে সবাই একেবারে উঁচিয়ে আছে। তুমি সমুদ্র আর পাহাড়ের কথা ছেড়েই দাও না! আমাদের কথাই ধরো। কেউ আমাদের মারতে চায়। কেউ আমাদের ধরে খাঁচায় বন্দী করতে চায়। নয়তো রঙিন পালকগুলো আমাদের গা থেকে উপড়ে নিয়ে, বিকিকিনির পসরা করতে চায়।”
টুটু চুপ করে রইল।
“কী, চুপ করে আছ যে?” অবাক হল জয়,“আমার কথা শুনছ না? তুমি কি অন্য কিছু ভাবছ?”
“হ্যাঁ, ভাবছি আজ এখানেই থেকে যাব।”
“কেন?” চমকে চাইল জয়।
“আকাশটা ভাল ঠেকছে না,” উত্তর দিল টুটু, “মাঝপথে আবার যদি কোনও বিপদ হয়!”
“ঠিক বলেছ।” জয় আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ আকাশের অবস্থা ভাল নয়। আজ এখানেই থেকে যাওয়া ভাল।”
ছোট্ট ওই দুটি পাখির মস্ত এই সমুদ্রের তীরে থাকার কোনও অসুবিধে ছিল না। পাহাড়ের গা ভেঙে-ভেঙে ওই অত গাছ। তা ছাড়া অফুরন্ত খাবার। বেশ নিশ্চিন্তেই একটা রাত কাটিয়ে দেওয়া এমন কিছু ব্যাপার নয়। তা ছাড়া কালকের দিনটা আসতেও তো আর বেশি সময় নেই। একটু পরেই বিকেল হবে। তারপরেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। টেনে ঘুম দাও। ঘুম ভাঙলেই সকাল। ব্যস! আবার চলল। অবশ্য এখানে থাকার একটাই অসুবিধে। তা হল, জায়গাটা একটু উটকো। তার ওপর দমকা হাওয়া সমুদ্রের বুক থেকে যেমন ছুটে আসছে, তেমনি ভেসে আসছে গর্জন। তা হোক। তবু কী মজা! চারদিকে শুধু মজা! তুমি যদি একটু চোখ মেলে দ্যাখো, দেখবে বেলাভূমির ওপর কত কী! কখনও দেখবে বড়বড় শামুক গুটি-গুটি হেঁটে বেড়াচ্ছে। দেখবে কচ্ছপ চুপটি করে শুয়ে আছে। যদি বরাত খুব ভাল হয় তিমিমাছও নজরে পড়ে যেতে পারে! কত ঝিনুক, কাঁকড়া!
দু’জনেই সমুদ্রের ধারে একটি গাছের একই ডালে বসে পড়েছিল। বসে-বসে টুটুর চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। মাঝে-মাঝে ঢুলে পড়ছিল টুটু। আর জয়, ঠায় সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে বসে ছিল। দেখতে পাচ্ছ, কত গাঙচিল? ঢেউ-এর সঙ্গে কেমন খেলা করছে! গায়ে নীল-সাদা ছোপ-ছোপ, টুকটুকে লাল ঠোঁটওলা ইয়া পেল্লাই হাঁসগুলোর কাণ্ড দেখেছ! ওই অত উঁচু ঢেউগুলোকে ভয়ই পাচ্ছে না। ঢেউ যেখানে তীরের ওপর এসে লুটিয়ে পড়ছে সেখানে দিব্যি ঠোঁট ঠেকিয়ে খাবার খুঁজছে। হয় শামুক ধরে গালে পুরছে, নাহয় গেঁড়ি। কিংবা ছোট্ট-ছোট্ট মাছ।
দ্যাখো, দ্যাখো! দুটো অ্যায়সা বড় কাঁকড়া কেমন গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে! দেখেছ, দাঁড়াগুলো কী মোটা-মোটা! ও কী রে বাবা, দু’জনেই যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল! ও বাবা কেমন তালে-তালে দাঁড়াগুলো ওঠাচ্ছে নামাচ্ছে। নাচছে নাকি! হ্যাঁ তো রে! কী নাচ, কী নাচ!
জয় সেই নাচ দেখে আর থাকতে পারল না। চেঁচিয়ে টুটুকে ডাক দিল, “টুটু, টুটু, নাচ দ্যাখো!”
টুটু ধড়ফড় করে চোখের পাতা খুলে ফেলেছে। ঢুলতে-ঢুলতে টুটু এখন সত্যিই ঘুমোচ্ছিল। জয়ের ডাক শুনে ঘুমচোখে সেইদিকে তাকাতে সে-ও দেখতে পেল, সত্যিই তো, দুটো খাড়া-খাড়া দাঁড়াওলা কাঁকড়া বেমালুম ঝটাপটি করছে!
জয় টুটুর মুখের দিকে চেয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে বলল, “চলো টুটু, নাচ দেখে আসি!”
সত্যি বলতে কী, তাজ্জব নাচের সেই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে টুটু এতই অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, তখন তার ঘুমটুম কোথায় হাওয়া! সে-ও তাই জয়ের কথায় সায় দিয়ে বলল, “চলো! দেখেই আসি!”
“কোথায় যাবে?” কে যেন হঠাৎ বাধা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
থতমত খেয়ে গেছে টুটু আর জয় দু’জনে সেই গলার স্বর শুনে। কারণ এ-ডাক তাদের একদম অপরিচিত। উড়তে গিয়েও ওড়া হল না। খুব অবাক-দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক চাইতে লাগল জয় আর টুটু।
তাকে দেখতে পেয়েছে টুটু। টুটু আর জয়কে সে দেখছে। জয়ের চোখও তার দিকে পড়তে একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে জয়। সেই গাছে, ঠিক তাদের মাথার ওপরে আর একটা ডালে একটা শঙ্খচিল বসে আছে। আসলে তার মুখ দেখে বোঝা মুশকিল তার মেজাজটা খুশি-খুশি, না রাগী রাগী।
জয় আর টুটুকে তার দিকে অমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে, সেই শঙ্খচিলটা আবার বলল, “মনে হচ্ছে ভয় পেয়ে গেছ! ভয় পাবার কিছু নেই। তোমরা যা করতে যাচ্ছিলে, সেই করাটা ঠিক হচ্ছিল না বলেই আমি তোমাদের বাধা দিলুম। তোমরা ভেবেছ ওই কাঁকড়া দুটো নাচছে! না, না, ওটা নাচ নয়, লড়াই। ওই দুটো ধুমসো কাঁকড়া ফাঁক পেলেই লড়াই করে। দ্যাখো, এখন একবার ভাল করে চেয়ে দ্যাখো, লড়াইটা কেমন জমেছে। এর নাম হাড্ডাহাড্ডি লড়াই!”
জয় আর টুটু চকিতে শঙ্খচিলের মুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার সেই কাঁকড়া দুটোর দিকে চাইল। আরে তাই তো! কাঁকড়া দুটো দাঁড়া দিয়ে কী ভীষণ খটাখটি লাগিয়েছে!
“তোমরা এ-পাড়ায় কী মনে করে?” শঙ্খচিলটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল।
“আমরা দক্ষিণে যাচ্ছিলুম,” উত্তর দিল জয়।
“ও, গরমের দেশে?”
“হ্যাঁ,” জয় আর টুটু দু’জনেই একসঙ্গে বলে উঠল।
“তা দুটিতে কেন? দলের আর সবাই?”
“আমরা দলছুট হয়ে এদিকে চলে এসেছি।”
“কী রকম?” শঙ্খচিল একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।
জয় বলল, “একদল বাজপাখি আমাদের দলকে আক্রমণ করেছিল। আমাদের দলের অনেককে তারা ছোঁ-মেরে ধরে নিয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের গোটা দলটা ছত্রাকার হয়ে যে যেদিকে পারল পালাল। আমরা দু’জনে কোনক্রমে এদিকে পালিয়ে এসেছি।”
“ওটি কে? তোমার ভাই নাকি?”
“ও আমার বন্ধু, টুটু। আমার নাম জয়।”
“তোমার বন্ধুটি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মনে হয়!”
“হ্যাঁ, বিপদে পড়লে যা হয়,” উত্তর দিল জয়।
শঙ্খচিল বলল, “বিপদের এখন হয়েছে কী! আরও বিপদ আসছে।”
জয় আর টুটু দুজনেই থতমত খেয়ে তার মুখের দিকে চাইল।
শঙ্খচিল বলল, “এ-বিপদ শুধু তোমাদের নয়, আমাদেরও।”
জয় আর টুটু আতঙ্কে কুঁচকে গেল।
শঙ্খচিল আবার জিজ্ঞেস করল, “দক্ষিণের কোন্ দেশে যাবে?”
“সমুদ্রের বুকে, সেই বন-সবুজের দ্বীপে,” খুব ভয়ে-ভয়েই উত্তরটা দিল টুটু|
“তা হলে তো আর কথাই নেই,” শঙ্খচিল উত্তর দিল, “এখনও খেয়াল করোনি, বাতাসে একটু-একটু ঝোড়ো-হাওয়ার গন্ধ ভেসে আসছে! আকাশে ছেঁড়া-মেঘ উড়ে যাচ্ছে! এই দুপুরের রোদেও কেমন একটা পাঁশুটে রঙ! সমুদ্রের দিকে তাকাও, দ্যাখো, ঢেউগুলো কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে! মনে হচ্ছে ঝড় উঠবে।”
জয় আর টুটু দু’জনেই বোবা হয়ে শঙ্খচিলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা আকাশে মেঘও দেখেছে, বাতাসের তেজও বুঝেছে। কিন্তু ঝড় উঠতে পারে, এ-কথাটা তো তাদের মাথায় ঢোকেনি!
সেই শঙ্খচিল আবার বলল, “অন্তত আরও দুটো দিন তোমরা এখান থেকে বেরোতে পারছ না। আমার মনে হচ্ছে, আজ রাতের মধ্যেই যা হোক একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে। আর বরাত যদি সহায় হয়, ঝড় এদিকে না এসে অন্য দিকেও চলে যেতে পারে।”
টুটু আর জয় দু’জনেরই মুখ শুকিয়ে আমচুর।
ওদের মুখের দিকে চেয়ে শঙ্খচিল হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতে বলল, “আরে বাবা, এ-সব কথা ভেবে ঘাবড়ালে চলে। এই নিয়েই তো বেঁচে আছি আমরা। আর যখন মরবার সময় হবে কেউ ঠেকাতে পারবে না!”
জয় আমতা-আমতা করে বলল, “কিন্তু আমাকে তো বেঁচে থাকতেই হবে। বুড়ো-আপেলগাছ যে আমার পথের দিকে চেয়ে বসে থাকবে!”
শঙ্খচিল জয়ের কথা শুনে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চাইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপেলগাছ?”
“হ্যাঁ, ভারী দুঃখী। তাকে কেউ ভালবাসে না। তাই আমাকে তার জন্যে একটু ভালবাসা নিয়ে যেতে বলেছে।”
শঙ্খচিল একটু গম্ভীর হয়েই জিজ্ঞেস করল, “তার ডালে বুঝি আর ফুল ফোটে না? ফল ধরে না?”

“না,” জয় উত্তর দিল, “বুড়ো হয়ে গেছে যে!”
শঙ্খচিল মুখে কী একটা অস্পষ্ট শব্দ করল। তারপর বলল, “বুড়োর জন্যে ভালবাসা খুঁজে পাওয়া ভারী শক্ত। যাকে ভালবাসলে কোনও কাজে আসবে না, তাকে কেউ ভালবাসা দিতে চায়? তবু যদি বুড়ো ডালে দু’একটা ফলও ফলত, তা হলেও কথা ছিল।”
শঙ্খচিলের কথা শুনে জয়ের মুখের কথা যেন হারিয়ে গেল। মুখখানা কাচুমাচু করে সে টুটুর মুখের দিকে চাইল।
শঙ্খচিল হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “দাঁড়াও, দাঁড়াও! ওই দ্যাখো, কাঁকড়া দুটোর কী দুর্দশা হয়েছে।”
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের কথা শুনে চটপট ফিরে দ্যাখে, হ্যাঁ তো রে, দুটোই কাত হয়ে পড়ে-পড়ে কাতরাচ্ছে!
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, “কী বুঝছ?”
টুটু আর জয় দু’জনেরই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “বোকার মতো, নিজেদের মধ্যে যেমন মারামারি করা!” বলে কাঁকড়া দুটোর দিকেই তাকিয়ে রইল।
“তোমাদের খিদে পাচ্ছে না?” হঠাৎ যে শঙ্খচিল কাঁকড়া দুটোর ওই অবস্থা দেখতে-দেখতে এই কথাটা জিজ্ঞেস করবে, ভাবতে পারেনি জয়, টুটু, কেউই। সুতরাং দু’জনেই একটু হকচকিয়ে গেল।
টুটু আর জয় দু’জনকেই চুপ থাকতে দেখে আবার শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, “কী? খাবে না কিছু?”
টুটু এবার চট্ করে উত্তর দিল, “খেয়েছি তো!”
শঙ্খচিল বলল, “সে তো অনেকক্ষণ আগে। দ্যাখো, ধীরে-ধীরে আকাশ কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। এরপর যে কী হবে, তোমরাও জানো না, আমিও জানি না। দ্যাখো, স্বর্গের রাস্তা অনেক দূর। স্বর্গে যদি যেতেই হয় তো, অতটা রাস্তা খালি পেটে হাঁটা খুবই শক্ত। সুতরাং চলো, কিছু খেয়ে তৈরি থাকি। ওই পাহাড়টার ডান দিকে একটা সরোবর আছে। সেখানে পোকামাকড় ভর্তি। এসো আমার সঙ্গে।” বলে শঙ্খচিল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিল। জয় আর টুটু তার পিছু নিল। আর মনে-মনে যেন কেমন ভাল লেগে গেল তাকে।
সমুদ্রের গর্জন বাড়ছে। দমকা বাতাস গাছে-গাছে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। পাঁশুটে আকাশ এখন মেঘে-মেঘে ছেয়ে গেছে। বনের পাখি, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এখন সবাই জানতে পেরেছে, বিপদ আসছে!
শঙ্খচিলের সঙ্গে উড়তে-উড়তে জয় আর টুটু যে-জায়গাটায় এল, সেটা পাহাড়ের একদম ওপরে। কাচের মতো ঝকঝকে জলে টলমল করছে একটি সরোবর। চারদিকে গাছ আর গাছ। ঘন গাছের পাতার আড়ালে একবার যদি লুকিয়ে পড়া যায়, তবে হয়তো ঝড়ের ধাক্কাটা সামলে যেতে পারে। শঙ্খচিল সরোবরের ধারে একটি গাছ দেখে চেঁচাল, “এসো, এখানে বসে পড়ি।”
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের পাশে বসে পড়ল।
শঙ্খচিল বলল, “দেখেছ, কত তাড়াতাড়ি ঝড় এসে পড়ল! খাওয়া হল না।”
জয় বলল, “ভাগ্যিস তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তুমি বারণ করলে, তাই। নইলে সমুদ্রে পাড়ি দিলে আমাদের কী হত বলো তো?”
হঠাৎ টুটু চেঁচিয়ে উঠল, “জয়, মজা দ্যাখো, মজা দ্যাখো!”
জয় টুটুর চেঁচামেচি শুনে চটপট ফিরে তাকিয়ে দ্যাখে, অন্তত দুশো, তিনশো, কি আরও বেশি হবে, গোদা-গোদা গোসাপ গাল ফুলিয়ে সামনের গাছে হুড়োহুড়ি করছে। সত্যি, কী বীভৎস দেখতে লাগছে! গায়ে কাঁটা দেয়! দেখতে-দেখতে জয় আর টুটুর মুখের চেহারাই পালটে গেছে। এমন নয় যে, তারা কখনও গোসাপ দ্যাখেনি। অনেকবার দেখেছে। কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো গোসাপের গাছের ওপর এমন তাণ্ডব তাদের কখনও চোখে পড়েনি। ভাবো একবার, একদঙ্গল গোসাপ একবার এ-ডালে লাফাচ্ছে, ও-ডালে উঠছে। কখনও জিভ বার করছে। ল্যাজ নাড়ছে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! মনে হচ্ছে, গোটা গাছটাই যেন গোসাপের পোশাক গায়ে দিয়ে ঝড়ের হাওয়ায় ঝটাপটি খাচ্ছে!
শঙ্খচিল জয় আর টুটুর মুখ দেখে হেসে উঠল, “কী বুঝছ?”
টুটু জিজ্ঞেস করল, “এত গোসাপ কেন?”
শঙ্খচিল বলল, “কই এত! এ তো ক’টা। সমুদ্রের তীরে, গাছের ওপর গাদা-গাদা গেছো-গোসাপ বাস করে। তোমরা কখনও দ্যাখোনি বুঝি?”
জয় জিজ্ঞেস করল, “ওরা অমন হুল্লোড় করছে কেন?”
শঙ্খচিল বলল, “ঝড় আসছে যে! ভয় পেয়েছে। দ্যাখো না, এক্ষুনি সব কোথায় চম্পট দেয়!”
বলতে না বলতেই সেই অগুনতি গোসাপ ওই গাছের ওপর থেকে তরতর করে নামতে শুরু করে দিল। সে কী প্রাণের ভয় তাদের। এ-ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে, ও তার মাথা টপকে মারলে ছুট। কে আগে পালাতে পারে, সেই নিয়ে ধস্তাধস্তি। যেন আগে পালালেই প্রাণে বাঁচবে!
দেখতে-দেখতে গাছ ফাঁকা!
জয় আর টুটু হাঁদার মতো সেইদিকে তাকিয়ে রইল বটে, কিন্তু গোসাপগুলো যে কোথায় গা-ঢাকা দিল, দেখতে পেল না।
“নাচ দেখবে নাকি?” হঠাৎ শঙ্খচিলটা হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করল।
জয় আর টুটু একমুখ আগ্রহ নিয়ে শঙ্খচিলের দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ,” শঙ্খচিল বলল, “একটু আগে তো সমুদ্রের তীরে কাঁকড়ার লড়াই দেখেছ। এতক্ষণ গাছের ওপর গোসাপের কাণ্ডকারখানা দেখলে। এখন যদি ব্যাঙের নাচ দেখতে চাও, আমার সঙ্গে এসো!” বলে শঙ্খচিল ডানা ঝাপটিয়ে ঠিক সরোবরের কাছ বরাবর আর-একটা ঝাউগাছের ওপর এসে বসল। জয় আর টুটুও তার সঙ্গে গেল।
এতক্ষণ একটানা সমুদ্রের গর্জনটাই ওদের কানে বেজেছে। কিন্তু এখানে, এই সরোবরের তীরে যে হাজারখানেক ব্যাঙ আকাশে মেঘ দেখে চেঁচামেচি করে নাচানাচি করছে, এটা ওরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
শঙ্খচিল বলল, “ওই দ্যাখো!”
সত্যি, দেখতে-দেখতে জয় আর টুটু অবাক হয়ে গেল। সেই সরোবরের ধার ঘেঁষে ব্যাঙেদের সে কী লাগ-বঙা-বঙ নাচ আর গান। অবাক চোখে দেখতে-দেখতে শেষকালে হেসে কুটোকুটি হয়ে গেল জয় আর টুটু।
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে?”
টুটু বলল, “অবাক দেশের আজব ব্যাঙ।”
জয় বলল, “সত্যি, আজবই বটে! সোনাব্যাঙ, কোলাব্যাঙ, গোদাব্যাঙ, খ্যাঁদাব্যাঙ, ব্যাঙ-ব্যাঙাচি কত দেখেছি, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো ব্যাঙের নাচা-গানা কখনও দেখিনি!”
শঙ্খচিল বলল, “এই নাচা-গানা এখন চলল। বুঝতে পারছ তো, ঝড় তৈরি হচ্ছে। আকাশও সাজছে। এদিকে সন্ধেও এগিয়ে আসছে। এসো, জঙ্গলটার এইদিকে ঢুকে পড়ি। চলো, দেখবে চলো, এইদিকে কী গভীর জঙ্গল।”
শঙ্খচিলের সঙ্গে জয় আর টুটু সেই জঙ্গলেই ঢুকে পড়ল।
শঙ্খচিল বলল, “জঙ্গলের ভেতরটা তবু অনেকটা নিরাপদ। গাছে-গাছে ঠেসাঠেসি। ঠিক যেন গলা-জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। যাই বলো, তাই বলো, গাছেদের মধ্যে বেশ একটা বন্ধুত্ব আছে। একেই বলি একতা। ঝড়ের বিপদ এলে একসঙ্গে রুখে দাঁড়ায়। জানো তো, সবাই এক হলে, বিপদ নিজেই ভয়ে পালায়। তাই গাছেদের আমার খুব ভাল লাগে।”
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের কথা শুনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
ঝড় উঠছে। জঙ্গলের মধ্যে শোঁ-শোঁ শব্দ শুরু হয়ে গেছে। গাছের ডালে-ডালে ঠোকাঠুকি লেগে গেছে। এদিকে আকাশের ঝোড়ো-মেঘের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আঁধার রাত ঘনিয়ে আসছে।
“এসো, এইখানেই বসি।” বলে শঙ্খচিল একটা বেশ ঘন-পাতাওলা পাইনগাছে বসে পড়ল। জয় আর টুটুও বসল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসবার সঙ্গে-সঙ্গে ওদের চোখেও অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল। এখন শুধু শুনতে পাবে সমুদ্রের গর্জন, ঝড়ের তাণ্ডব আর গাছে-গাছে ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা। স্থির হয়ে বসে কার সাধ্যি।
শঙ্খচিল বলল, “দুর্যোগ শুরু হয়ে গেছে। তোমরা একটু সাবধানে থেকো। আমি অন্ধকারে তোমাদের ঠিক ঠাওর করতে পারছি না।”
জয় বলল, “আমরা ঠিক আছি।”
বলতে-বলতেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
টুটু বলল, “বৃষ্টি পড়ছে।”
শঙ্খচিল উত্তর দিল, “আজ ঘুমের দফারফা!”
বৃষ্টি দেখে, জয়ের মুখখানা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে। সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপেল-বুড়োর কী হবে শঙ্খচিল?”
শঙ্খচিল বলল, “এখন দ্যাখো, ঝড় কোন্ দিকে যায়! পুবে যেতে পারে, পশ্চিমেও বাঁক নিতে পারে। উত্তরে না-গেলেই ভাল। তোমার আপেল-বুড়ো রক্ষা পেয়ে যাবে।”
“কে হে, শঙ্খ নাকি?” ঝড়ের ধাক্কায় হাঁপাতে-হাঁপাতেই কেউ যেন শঙ্খচিলকে ডাক দিল।
টুটু বা জয় বুঝতে পারল না, কে ডাক দিল। কিন্তু শঙ্খচিল বুঝতে পারল। বুঝতে পারল, যে-গাছের ডালে সে বসে আছে, সেই পাইনগাছই তাকে ডাকল। তাই সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ পাইন-দাদা, আমি!”
পাইনগাছ বলল, “কী বিপদ বল দিকি! আবার ঝড় উঠল। এই ক’দিন আগেই তো একচোট হয়ে গেল! সমুদ্র যেন খেপেই আছে।”
“তা বটে,” শঙ্খচিল উত্তর দিল, “সেবার কী সাংঘাতিক জলোচ্ছ্বাস হল বলো? সমুদ্রের একটা মস্ত ঢেউ ঝড়ের ধাক্কায় ডাঙায় আছড়ে পড়ে কত দূর পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিল বলো? কত ঘরবাড়ি, গাছপালা, মানুষজন, পশুপাখি সেই জলের তোড়ে কোথায় যে ভেসে গেল, তার আর হদিস পাওয়া গেল না।”
পাইনগাছ বলল, “হ্যাঁ, আমার এই এত উঁচু মাথার চেয়ে আরও উঁচু ছিল সেই জলোচ্ছ্বাস। আমি তো কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে গেলুম। কিন্তু আমার বন্ধু ঝাউগাছ সেই ধাক্কা সামলাতে পারল না। বয়েস হয়েছিল তো! আহা! বেচারা জলের তোড়ে মাটি উপড়ে কোথায় যে ভেসে গেল আর খোঁজ পাওয়া গেল না। বন্ধুর জন্যে মনটা প্রায়ই খারাপ লাগে।”
ঝাউগাছের কথা শুনে জয়ের বুকটা ঢিপঢিপ করে কেঁপে উঠল।
পাইনগাছ বলল, “এ দুটি কি তোমার সঙ্গে?”
জয় আর টুটু দু’জনেই বুঝতে পারল, পাইনগাছ তাদের কথাই জিজ্ঞেস করছে।
শঙ্খচিল উত্তর দিল, “হ্যাঁ দাদা, আমার সঙ্গে।”
পাইনগাছ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আগে দেখিনি তো?”
শঙ্খচিল বলল, “না, এ-দুটি এদেশের নয়। দক্ষিণে যাচ্ছিল।”
“ও গরমের দেশে?”
“হ্যাঁ, বন-সবুজের দ্বীপে।”
“তা এ-পথ দিয়ে কেন?”
“বাজপাখির তাড়া খেয়ে দলছুট হয়ে এদিকে চলে এসেছে।”
“রক্ষে,” একটা যেন নিশ্চিন্তির হাওয়া শোনা গেল পাইনগাছের গলায়। বলল, “বাজপাখির দৃষ্টি এড়িয়ে প্রাণে বাঁচা মানে কপালের অনেক জোর। এখন আবার ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হল। দেখা যাক কপাল রক্ষা করতে পারে কি না!”
শঙ্খচিল বলল, “ছেলে দুটি ভাল।”
পাইনগাছ উত্তর দিল, “দেখে মনে হচ্ছে।”
শঙ্খচিল বলল, “জানো পাইন-দাদা, ছেলে দুটি ভালবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
“এঁঃ!” পাইনগাছ অবাক হয়ে চমকে উঠল। বলল, “ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলুম না তো!”
শঙ্খচিল তখন সেই পাইনগাছকে জয়ের বন্ধু আপেল-গাছের কথা বলল। সব শুনে পাইনগাছ থমকে রইল কিছুক্ষণের জন্যে। তারপর জয়ের দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, “বাঃ!”
আর কথা বলা গেল না। কেননা, ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টি। রাতের আকাশে ঝড়ের মেঘ। চারদিকে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। উত্তাল সমুদ্রের বিশাল-বিশাল ঢেউগুলো যেন ক্ষিপ্ত দানবের মতো লাফিয়ে পড়ছে তীরে। মনে হয় সেই দানব, পাহাড়ের গায়ে সেই বনভূমির ছোট-বড় সব গাছের ঝুঁটি ধরে নাড়ানাড়ি করে দিচ্ছে। শুধু গর্জন। জয় অথবা টুটু, পাইনগাছ কিংবা শঙ্খচিল সবাই আতঙ্কে স্তব্ধ। সবাই এখন বাঁচার জন্যে প্রাণপণে যুদ্ধ করছে সেই দুর্যোগের সঙ্গে! কিন্তু এ কী! গাছের ডালে হঠাৎ জয় আর টুটুকে দেখা যাচ্ছে না তো! তাই তো, কী হল তাদের!
অনেকক্ষণ পর, তখনও গভীর রাত, একটু যেন ঝড়ের দাপট কমল। বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে পাইনগাছ। ক্লান্ত স্বরেই ডাক দিল, “ওহে শঙ্খ, ঠিক আছ তো?”
গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে শঙ্খচিল তখনও হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে-হাঁপাতেই বলল, “বেঁচে গেছি। বিপদ বোধহয় কাটল।”
গাছ বলল, “অনেকটা। ঝড় পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে।”
শঙ্খচিল বলল, “পাইন-দাদা, আমাদের সঙ্গী দুটি ঠিক আছে তো?”
গাছ বলল, “কই, আমার ডালে তো দেখছি না তাদের!”
“ঐঃ,” চমকে উঠল শঙ্খচিল, “গেল কোথায়?”
পাইনগাছ ব্যস্ত হয়ে বলল, “ধাক্কা সামলাতে পারেনি হয়তো! দ্যাখো
আবার, কোথাও মুখ থুবড়ে পড়ল কি না। ছোট্ট তো।”
শঙ্খচিলও ঠিক ততটা ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞেস করল, “এখন তা হলে কী করা যায়?”
পাইনগাছ বলল, “এই অন্ধকারে কিছু তো করা যাবে না। ভোর হলে তখন খোঁজ করতে হবে।”
আসলে, পাইনগাছের কথাই ঠিক, জয় আর টুটু ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। গাছের ডাল ফসকে গেছে ছিটকে। খানিকটা দূরে মুখ থুবড়ে কাদায় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে! উঃ! কী ভীষণ লেগেছে তাদের! তবু রক্ষে, দু’জনে প্রায় একই জায়গায় পড়ে আছে। কাদায় এমন লেপটে গেছে যে, নড়াচড়া করারও ক্ষমতা নেই তাদের। এখন জঙ্গলের সাপখোপ ওদের খোঁজ পেয়ে গেলে, আর কিছু করার থাকবে না। সুতরাং কাদার ওপর বেশি লাফালাফি না করে জয় আর টুটু চুপচাপ পড়ে রইল।
বাকি রাতটুকু কী দুশ্চিন্তায় না কাটল শঙ্খচিলের। সত্যি, ওই ছোট্ট পাখি দুটোকে বড্ড ভাল লেগে গেছে তার। ওই ছোট্ট পাখির মন দুটি যেন টুকরো সোনার ঝিকিমিকি আলোর মতো ঝলমলে। তাই পাখি দুটির জন্যে গাছে বসে অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল শঙ্খচিল।
হঠাৎ পাইনগাছ কথা বলল, “এখনও ছটফট করছ কেন হে, শঙ্খ , এবার নিশ্চিন্তে একটু ঘুমিয়ে নিতে পার। আর ভয় নই। দেখতে পাচ্ছ না, বৃষ্টি থেমেছে, হাওয়ার দাপট কত কমেছে, সমুদ্রেরও আর তেমন আস্ফালন নেই।”
শঙ্খচিল উত্তর দিল, “সবই তো বুঝছি পাইন-দাদা, কিন্তু ওই পাখি দুটির জন্যে মন যে বড় উতলা হয়ে আছে।”
“কী করবে বলো,” পাইনগাছ বলল, “তোমারও কিছু করার নেই, আমিও কিছু করতে পারি না। তবু সকাল হওয়ার আগে কোনও কিছু করার কথা ভাবাও তো যাচ্ছে না।”
শঙ্খচিল নিরাশ হয়ে উত্তর দিল, “সেই তো মুশকিল।”
সুতরাং ভোরের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল শঙ্খচিল। একফোঁটা ঘুমও তার চোখ ছুঁতে পারল না। ঠায় জেগে বসে রইল আকাশের দিকে চেয়ে। কখন ছড়িয়ে পড়বে আকাশ থেকে একটু আলোর রোশনাই? আর কত দেরি?
ভোর হল। আকাশের আলো মাটির বুকে নেমে আসতেই মনে হল, বুঝিবা কাল রাতে এখানে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়ে গেছে। চারিদিকে ধ্বংসের চিহ্ন। গাছপালা ভেঙেছে। সরোবরের জল উপচে পড়েছে। কেউ মরেছে, কেউ আহত হয়েছে। ঝড়ের ধাক্কায় সমুদ্রের বুক থেকে হাজার-হাজার গেঁড়ি-শামুকের খোলা, ঝিনুক ছিটকে এসে বেলাভূক্তিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলো দেখার সঙ্গে-সঙ্গে শঙ্খচিল গাছের ডাল ছেড়ে আকাশে উড়ল। উড়তে-উড়তে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “জয়, টুটু।” কিন্তু কোথায় তারা! খুঁজে-খুজে ডেকে-ডেকে জেরবার হয়ে গেল শঙ্খচিল, তবু জয় আর টুটুর সাড়া মিলল না।
পাইনগাছ দূর থেকে শঙ্খচিলকে বলল, “খুঁজে পাওয়া মুশকিল মনে হচ্ছে। দ্যাখো, হয়তো এখান থেকে আরও কিছু দূরে ছিটকে পড়েছে।”
শঙ্খচিল তখন কাছ থেকে দূরে, আরও দূর উড়ে-উড়ে ডাকতে লাগল। তার ডাক শুনে আরও অনেক-অনেক পাখি হাজির হল সেখানে। “কী হয়েছে? কী হয়েছে?” বলে তারাও জয় আর টুটুকে আতালিপাতালি খুঁজতে লাগল।
আচ্ছা, ওখানে কী ওটা। ওই যে টুকটুক করে নড়ছে! ওই কি টুটু? হ্যাঁ ওই তো জয়! একজন হঠাৎ দেখতে পেয়ে চিল-চেঁচিয়ে ডাক পাড়ল, “ওই তো সেই ছোট্ট পাখি! ওই তো সেই ছোট্ট পাখি!”
“কই? কই?” অনেক-অনেক পাখি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে এদিক-ওদিক উড়তে লাগল।
“ওই তো! ওই তো।”
হ্যাঁ, ঠিক তো! ওই তো! দেখতে পেয়েছে। সবাই দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে জয় আর টুটু দুটি পাখিকেই। একটা ঝোপের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে তিরতির করে কাঁপছে। না পারছে উড়তে, না পারছে দাঁড়াতে।
তখন সেই বন্ধু শঙ্খচিল “জয়, টুটু”, বলে চেঁচিয়ে উঠে ঝপ করে নেমে পড়ল সেই ঝোপের মধ্যে। সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধু শঙ্খচিল ঝট করে আলতো ঠোঁটে চেপে জয়কে তুলে নিল। অন্য আর একটা শঙ্খচিল টুটুকেও তুলে নিল। নিয়ে, উড়তে-উড়তে আবার সেই পাইনগাছে এসে বসল।
খবরটা রটে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে যেখানে যত শঙ্খচিল ছিল, সব সেখানে হাজির। সক্কলে সেই পাইনগাছের ওপর জড়ো হয়ে, জয় আর টুটুর ওই অবস্থা দেখে, কেউ আস্তে, কেউ ফিসফিস করে, কথা বলা শুরু করে দিল। অবশ্য এতজন একসঙ্গে কথা বললে, সে ফিসফিস করে বলো, আর জোরেই বলো, একটা হট্টগোল তো হবেই। তাই পাইনগাছ একটু ধমক দিয়েই সবাইকে বলল, “ওহে, তোমরা সক্কলে মিলে এত হইহই করছ কেন? জানো না, অসুস্থ প্রাণীর কাছে বেশি হল্লা করলে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
সবাই চুপ করে গেল।
“তোমরা বরঞ্চ এক কাজ করো,” আবার গাছ বলল, “পারো তো ক’টা পোকা ধরে আনো! কাল থেকে বেচারিদের খাওয়া নেই। আশা করা যায় পেটে কিছু পড়লে তাড়াতাড়ি সামলে উঠবে।”
পাইনগাছের কথা মুখ থেকে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সব ক’টা পাখি পোকা আনতে হইহই করে এদিক-ওদিক উড়ে চলল। আর শঙ্খচিল ওদের শরীরে নিজের ডানা বিছিয়ে দুই পাখির বুকের রক্ত গরম করতে লাগল।
দ্যাখো, দ্যাখো, হালকা মেঘের ফাঁকে আকাশের ওই দূরে কেমন একটা সোনালি আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে! মানে, আকাশ পরিষ্কার হতে আর দেরি নেই। মনে হয়, কিছুক্ষণ পরেই সূর্যের আলোয় উপচে যাবে চারদিক।
পাইনগাছ বলল, “রোদ উঠতে আর দেরি নেই। যাক অল্পস্বল্পের মধ্যে দিয়ে দুর্যোগটা কেটে গেল।”
“আর কিছু না-পেয়ে নিষ্ঠুর ঝড় বাচ্চা পাখি দুটোকে শুধু আঘাত করে গেল।” উত্তর দিল শঙ্খচিল।
পাইনগাছ জিজ্ঞেস করল, “এখন ভালর দিকে মনে হয় কি?”
“এখন ওরা আমার বুকের নীচে,” জবাব দিল শঙ্খচিল।
“হাঁপাচ্ছে কি?”
“এখন অনেকটা স্থির হয়েছে।”
“বেঁচে গেল,” একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল পাইনগাছ।
শঙ্খচিল বলল, “ এই অবস্থায় এখন যে ওরা কেমন করে বন-সবুজের দ্বীপে যাবে, সেইটাই চিন্তার ব্যাপার। তার ওপরে, যেতে হবে সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে।”
“দ্যাখো কী হয়,” উত্তর দিল পাইনগাছ।
“শঙ্খচিল!” হঠাৎ কে ডাকল? জয় না?
শঙ্খচিল তাড়াতাড়ি ডানা সরিয়ে নিল। দেখল, জয় আর টুটু দু’জনেই উঠে বসার চেষ্টা করছে। দুজনেই জলে-কাদায় একাকার হয়ে আছে।
“শঙ্খচিল!” আবার ডাকল জয়, “আমি একটু বসব।”
শঙ্খচিল ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পারবে?”
“হ্যাঁ।”
টুটু বলল, “আমিও পারব।”
“পড়ে যাবে না তো?”
জয় আর টুটু দু’জনেই একসঙ্গে বলল, “না, না, পড়ব না।”
পাইনগাছ বলল, “ঠিক আছে, ওদের একটু বসতেই দাও!”
জয় আর টুটু দু’জনেই উঠে বসল। শঙ্খচিল তার ঠোঁটের আলতো স্পর্শে জয় আর টুটুর গায়ের কাদাগুলো ধীরে-ধীরে মুছে দিতে লাগল। ধীরে-ধীরে জয় আর টুটুর পালকের রঙগুলি কাদার আড়াল থেকে ফুটে বেরিয়ে আবার রঙিন হয়ে ঝলসে উঠল।
সূর্যের মুখ দেখা গেল এতক্ষণে। তাও এক ঝলকের জন্যে।
দেখতে-দেখতে পাখির দল ঠোঁটে পোকা নিয়ে একে-একে হাজির। কারও ঠোঁটে কেঁচো, কারও ঠোঁটে ফড়িং, কারও-কারও পিঁপড়ে। জয় আর টুটু কি রাক্ষস নাকি! অত খাবে কী করে! তাই দেখে পাইনগাছ হাসতে-হাসতে বলল, “এ যে একেবারে যজ্ঞি বসে গেল।”
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, “তুমি কী খাবে, জয়?”
জয় বলল, “একটা কেঁচো।”
টুটু বলল, “দুটো ফড়িং।”
সত্যি কী ভীষণ খিদে পেয়েছিল দু’জনের। একেবারে গপগপ করে গিলে খেয়ে ফেলল জয় আর টুটু একটা কেঁচো আর দুটো ফড়িং।
পাইনগাছ একটু হাসতে-হাসতেই বলল, “বাকিগুলো আর রেখে কী হবে, সবাই মিলে খেয়ে শেষ করে ফেলো।”
“তা ঠিক, তা ঠিক,” বলে সবাই মিলে পোকামাকড়ের ভোজ বসাল সেই পাইনগাছের পাতার আড়ালে।
একটু পরেই জয় আর টুটুর রঙিন ডানা যেন আপনা থেকে নিশপিশ করতে লাগল। মনে হল, ডানাগুলি যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
তাই দেখে পাইনগাছ বলল, “ছটফট করার কোনও কারণ নেই। ডানা মেলে আকাশে ওড়ার এখনও সময় হয়নি। এখনও তোমাদের বিশ্রামের দরকার।”
জয় বলল, “আকাশ তো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমাদের যে দেরি হয়ে যাবে!”
পাইনগাছ বলল, “জানি, সময়ের দাম খুবই বেশি। তবু, শরীরটা ঝরঝরে না হলে সময়ের জন্যে একটু অপেক্ষা করতে হবে বইকী!”
শঙ্খচিল বলল, “ঠিক বলেছ পাইন-দাদা! আমরা রয়েছি। জয় আর টুটুর ভাবনার তো কিছু নেই।”
জয় বলল, “জানি, তোমরা ছিলে বলেই আমরা প্রাণে বাঁচলুম। তোমরা ছিলে বলেই আবার আকাশ-ভরা রোদের আলো আমাদের চোখের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।”
পাইনগাছ একটু হাসল। তারপর বোধহয় আকাশের দিকে চাইল। আকাশটাকে একটু দেখে অস্ফুট স্বরে বলল, “এরই নাম ভালবাসা।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন