॥ ৬ ॥

শৈলেন ঘোষ

খুব ভোরেই ঘুম ভেঙেছিল জয় আর টুটুর। চোখ খুলেই অবাক হয়ে গেল তারা। দ্যাখে কী, অমন, শ’য়ে শ’য়ে শঙ্খচিল পাইনগাছের ডালে এসে জমায়েত হয়েছে। সবার চোখ জয় আর টুটুর দিকে।

“ঘুম ভাঙল?” পাইনগাছ জিজ্ঞেস করল।

জয় বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।”

পাইনগাছ, বলল, “এবার তোমাদের যাবার সময় হয়েছে। ওরা তোমাদের জন্যে খাবার এনেছে। কিছু খেয়ে নাও।”

জয় আর টুটু পেটভরে খেয়ে নিল।

শঙ্খচিল বলল, “তোমাদের বিদায় জানাবার জন্যে সবাই এসে পড়েছে। আর দেরি কোরো না।”

পাইনগাছ বলল, “ছোট্ট পাখি, তোমরা সুন্দর! তোমাদের কথা ভুলব না কোনওদিন। আবার যদি কখনও আসো, খুব ভাল লাগবে আমাদের।”

টুটু আর জয় একসঙ্গে বলে উঠল, “তোমাদের কথা আমরা কোনওদিনও ভুলব না। কক্ষনো না,” তারপর একটু থেমে আবার বলল, “এবার তা হলে বিদায় দাও পাইন-দাদা!”

“বিদায়!” পাইনগাছের গলা কেঁপে উঠল।

“বিদায়!” শঙ্খচিল বুঝি চোখের জল সামলাতে পারে না।

তারপর যত পাখি সেখানে জড়ো হয়েছিল, সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “বিদায়!”

সঙ্গে-সঙ্গে অসংখ্য পাখি বাতাসে ডানা ছড়িয়ে আকাশে ভেসে উঠল। জয় আর টুটুও আকাশে উড়ল। দক্ষিণে মুখ ঘোরাবার আগে আবার ডাক দিল, “বিদায়।” তারপর সমুদ্রের আকাশে ডানা মেলে ভেসে গেল।

ওই পাখির দল তাদের অনুসরণ করল। সমুদ্রের বেশ কিছুটা পথ দুই পাখির সঙ্গী হল তারা। তারপর বিদায় জানিয়ে মাঝ-সমুদ্রের বুক থেকে তীরের দিকে ফিরতে লাগল। তখন জয় আর টুটু সমুদ্রের শূন্য আকাশে দুটি বিন্দুর মতো ধীরে-ধীরে মিলিয়ে গেল।

উড়তে-উড়তে হঠাৎই চিৎকার করে উঠেছিল টুটু, “জয়, ওই দ্যাখো, আগে-আগে আমাদের দল উড়ে যাচ্ছে!”

“কই?”

“ওই তো সামনে!”

“তাই তো” জয় আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারপর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের না-হয় দেরির কারণ আছে। ওরা এত দেরি করে কোত্থেকে আসছে?

টুটু বলল, “দ্যাখো, ওদেরও হয়তো ঝড়ে পড়তে হয়েছিল।”

জয় বলল, “চলো, আর একটু তাড়াতাড়ি গেলে হয়তো ওদের ধরে ফেলতে পারব।”

সত্যি, জয় আর টুটু কী দ্রুত উড়ে এল। দেখতে-দেখতে দলের মধ্যে মিশে গেল। আঃ! তারপর কী আনন্দ! এ জিজ্ঞেস করে, ‘কোথা ছিলে?’ ও বলে, ‘দেরি কেন?’ এ এক গল্প বলে, ও এক গান শোনায়।

সে কী হাসিখুশি, মজা।

সমুদ্রের বুকে সেই খুশির কলতান ছড়িয়ে-ছড়িয়ে আরও খানিকটা উড়ে আসার পর, ওই তারা দেখতে পেয়েছে সেই বন-সবুজের দ্বীপ। তখন আবার আর একরাশ আনন্দের ঢেউয়ে দুলে উঠল পাখিদের রঙিন ডানাগুলি।

বিকেলেই ওরা পৌঁছে গেল বন-সবুজের দ্বীপে। সবুজ তো সত্যিই সবুজ। এক গভীর অরণ্য। ঘন গাছের দুর্গ দিয়ে ঘেরা যেন সেই দ্বীপ। পাখির দল অরণ্যের বুকের ওপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর আকাশে উড়তে-উড়তে আরও গভীরে পৌঁছে গেল। সমুদ্রের বাতাস এখানে আসে, কিন্তু তার সে ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখা যায় না। শোনাও যায় না তার হম্বিতম্বি। এখানে শুধু গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ। ভারী গম্ভীর। অদ্ভুত রহস্যে ভরা।

এই নিয়ে বোধহয় এখানে জয় পাঁচবার এল। টুটুও তাই। মায়েরা শীতের দেশ থেকে উড়ে এসে এখানে ডিম পাড়ে। জয়ের মতো এবারও কত পাখির জন্ম হবে এই বনের গাছে-গাছে। অবশ্য টুটুর জন্ম আরও একটু দক্ষিণে। তা হোক,কিন্তু এখন দু’জনের ভারী বন্ধুত্ব; কেউ কাউকে কাছছাড়া করতে চায় না। একই সঙ্গে একই গাছে বাসা বাঁধল টুটু আর জয়। এখন বেশ ক’টা দিন এখানে থাকতে হবে। বেশ ক’টা দিন এই বন-সবুজের দ্বীপে তাদের আস্তানা গড়ে উঠবে। কী ভাল বলো? এই বনের অন্য পাখিরা, কিম্বা অন্য কোনও পশু প্রাণী ঝগড়া করে ওদের বলবে না, ‘এ-দেশ আমাদের। আমাদের দেশে তোমরা কার হুকুমে প্রবেশ করেছ? তোমরা এখনই এখান থেকে ভাগো, নইলে ডাণ্ডা মেরে তোমাদের ঠাণ্ডা করে দেব!’

কিন্তু উলটে দ্যাখো, বনের অন্য পাখিরা ওদের দেখে কত খুশি। ওরা উড়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে কেমন আদর করে এ-দেশের পাখিরা ওদের আশ্রয় দিল! এমনকী, গাছে-গাছে ওই যে অত বাঁদর, তারাও দ্যাখো, নতুন অতিথিকে দেখে কত খুশি! ডালে-ডালে তারা কেমন হুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। সত্যি, বাঁদরের ছানাগুলোকে দেখলে কী দারুণ মজা লাগে। মায়ের পেটের মধ্যে ঠ্যাং জড়িয়ে কেমন জুলজুল করে দেখছে জয় আর টুটুকে।

হ্যাঁ, এই বনে বাঁদর কেন, বাঘও আছে। বাঘ আছে, হরিণ আছে, সাপ আছে। এমনকী হাতিও আছে। ফেউ কী খ্যাঁকশেয়ালের কথা ছেড়ে দাও। তারা তো থাকবেই। সব্বার সঙ্গে আবার দেখা হবে। দেখা হবে, সেই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে। গত বছর সেই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে জয়ের ভাব হয়েছে। কে জানে এই একবছর বাদে সে জয়কে চিনতে পারবে কি না! যাই হোক, আজ তো আর খোঁজ করা যাবে না তার। আজ সবাই খুব ক্লান্ত। খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই হয়। তারপর কাল সকাল থেকে বন-সবুজের দ্বীপে নতুন সংসার পাতবে পাখিরা। সামনে ঝিল। ওই ঝিলে বাঘ জল খেতে আসে। আসে হরিণ, হাতি সক্কলে। ওই ঝিলে পাখিরাও চান করবে। আর ঝিলের ধারে পোকা খুঁজে-খুঁজে পেট ভরাবে। ঝিলের জল ভারী পরিষ্কার। আয়নার মতো ঝকঝক করছে।

ক্লান্ত পাখিরা ঘুমিয়ে পড়ল। রাতও গভীর হল। রাতের বনে ঝিঁঝিঁর ডাক। অসংখ্য জোনাকি। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে তাদের আলোর চুমকিগুলি ঝিলমিল করে ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক-অনেক দূরে কখনও-বা বাঘের গর্জনে হঠাৎ-হঠাৎ চমকে ওঠে বনের নির্জনতা। কোথাও বা গাছের ডালে একটি-দুটি পাখির ডানার ঝটপটানি। কিংবা গিরগিটির টক্‌টকানি।

জয়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল খুব ভোরেই। ঘুম ভাঙতেই জয় ডাক দিয়েছিল টুটুকে। তারপর দু’জনেই এ-গাছ থেকে ও-গাছে উড়ে-উড়ে ভারী আনন্দে ছোটাছুটি করতে লাগল।

ছুটতে-ছুটতে জয়ই বলল, “এই বনে বেশ একটা মজা আছে।”

টুটু উত্তর দিল, “আমারও এখানে এলে এত ভাল লাগে!”

“কিন্তু জানো টুটু, এত ভাল লাগার মধ্যেও বুড়ো-আপেল-গাছের কথা আমার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে।” জয় বলল, “আমি তো এখনও জানি না কোত্থেকে তার জন্যে আমি ভালবাসা নিয়ে যাব।”

হঠাৎ টুটু চেঁচিয়ে উঠল, “জয়, জয়, হাতি!”

হ্যাঁ তো রে! ও বাবা, মায়ের সঙ্গে আবার একটা বাচ্চা! কেমন টুক-টুক করে হেঁটে চলেছে! বাচ্চাটাকে দেখে কী হাসিই না পাচ্ছে! হাসি পাবারই কথা। মায়ের ওই দশাসই চেহারার পাশে বাচ্চাটাকে মনে হচ্ছে যেন খেলনা-হাতি। কেমন শুঁড় নাড়ছে, আর কুতকুত করে এদিক-ওদিক চাইছে।

বাচ্চাটাকে দেখে জয় আর টুটুর এত মজা লেগে গেল যে, তারাও চলল সঙ্গে-সঙ্গে ফুড়ুত-ফুড়ুত এ-গাছে ও-গাছে লাফ দিয়ে। একটু যেতে দু’জনেই বুঝতে পেরেছে, হাতি-মা ছেলেকে নিয়ে ঝিলে চলেছে। আর দেখতে-দেখতে হাতি যখন সত্যি ঝিলে চলে এল, তখন আকাশের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিলের জলে ঝিলিমিলি খেলছে। জলের সামনে মা এসে দাঁড়াল। খুব সতর্ক চোখে চারপাশটা দেখে নিল। না, কাউকে দেখতে পেল না। ভাবল, যাক, কেউ দ্যাখেনি। সত্যি কেউ দ্যাখেনি। কিন্তু দুটো যে ছোট্ট পাখি তার পিছু নিয়েছে সেটা আর হাতি-মা টের পাবে কী করে! গাছে অমন কত পাখি ডাকাডাকি করছে! ভয় তো শুধু ব্যাঘ্রমহাশয়কে। তিনিও তো তেষ্টা পেলে হুট করে চলে আসেন এই ঝিলের ধারে জল খেতে। অবশ্য এখন যে তিনি আসবেন না, এ-কথাটা না জেনে কি আর হাতি-মা ছানাকে নিয়ে এসেছে এখানে! বনের বাসিন্দারা ভারী সতর্ক। কে যে কখন কোথায় থাকে, তারা সব জানে। তবু সাবধানের মার নেই। তাই হাতি-মা আশপাশটা আবার ভাল করে দেখে তারপর ঝিলে নামল। ওই দ্যাখো, মায়ের দেখাদেখি বাচ্চাটাও কেমন গুটগুট করে নামছে! কী সাবধানী-মা দেখেছ! ছেলেকে কেমন আগলে আছে! ব্যস, তারপরেই শুরু হয়ে গেল জল নিয়ে হাতি-মায়ের ফোয়ারার খেলা। হাতি-মা শুঁড়ে জল টানে আর ছেলের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। আবার কখনও শুঁড়ের জল আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের গা ভিজিয়ে নেয়। ই-ই-ই! আচমকা ফোয়ারার জল একবার লেগে গেছে জয় আর টুটুর গায়ে। ঠিক হয়েছে! যেমন এগিয়ে যাওয়া। দু’জনেই জলের তোড়ে নাকানিচোবানি খেয়ে হাঁপানি শুরু করে দিল।

আরে, আরে! ও কী, ও কী! ওই দ্যাখো, একদল হরিণ এসেছে ঝিলে জল খেতে। অবশ্য হাতি-মা ছেলেকে নিয়ে যেখানে চান করছে, তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হরিণের দল জল খায় আর হাতির চান দেখে।

ইশ্‌-শ্‌-শ্‌! কী হল দ্যাখো! মা-হাতিটা কী বজ্জাত দেখেছ! শুড়ে জল নিয়ে আচমকা হরিণের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। হরিণের দল একদম হকচকিয়ে গেছে। মারল ছুট। এখন আর ছুটলে কী হবে! জলে নেয়ে-ভিজে একশা! একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মাথা-গা ঝাড়া দিয়ে জুলজুল করে দেখতে লাগল। আর এ-ওর গায়ে গা ঘষতে লাগল। দেখে, কী মজা লেগে গেছে জয় আর টুটুর। দু’জনেই গাছের ওপর থেকে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠেছে।

আচ্ছা, জয় হাসতে-হাসতে থমকে গেল কেন? কী দেখল জয়? মনে হচ্ছে, দলের ভেতর তার বন্ধু হরিণছানাও আছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ। জয় ঠিক চিনতে পেরেছে। ওই তো! দ্যাখো, দ্যাখো, একবছরে কত বড় হয়ে গেছে!

জয় গাছ থেকে ফুড়ুত করে উড়ে ডাক দিল, “টুটু, এসো, এসো, দেখবে এসো, আমার বন্ধু হরিণছানা!”

“কই?” টুটুও জয়ের পিছু-পিছু উড়ে চলল।

জয় হরিণ-বন্ধুর মাথার ওপর উড়ে আসতে, হরিণও তাকে চিনতে পেরেছে। অমনি সেই হরিণছানাও আকাশবাগে মাথা তুলে জয়কে দেখে লাফিয়ে উঠল। লাফাতে-লাফাতে আনন্দে ছুট দিল বনের ভেতরে। জয় আর টুটুও ডাক দেয় আর হাওয়ায় নাচতে-নাচতে হরিণের পিছু নেয়।

অনেকখানি ছুটে এসে হরিণ আনন্দে চার পা তুলে নাচে। জয় আর টুটুও আকাশ থেকে প্রায় তার গায়ের কাছে উড়ে এসে ডানা ছড়িয়ে দোল খায়। সে কী আনন্দ! শেষে জয় আর টুটু দু’জনেই হঠাৎ তার পিঠের ওপর বসে পড়ে চিৎকার শুরু করে দিল। হরিণও তাদের পিঠে নিয়ে সে কী ছুট। গাছের বাঁদরগুলো তাই না দেখে খুশিতে গাছের এ-ডালে, ও-ডালে নাচানাচি শুরু করে দিল। সত্যি, সে কী অদ্ভুত দৃশ্য!

কী হল? ছুটতে-ছুটতে হরিণটা আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল কেন? চোখের সামনে ওই ঝোপটার মধ্যে স্থির চোখে কী দেখছে? ঝোপের ভেতরটা যেন একটু-একটু নড়ছে। হ্যাঁ, ঠিক যা ভাবা, ঝোপের মধ্যে ডোরাকাটা একটা বাঘ। কেমন ঘাপটি মেরে বসে আছে। হরিণটাকে দেখে লোভে ল্যাজ নাড়ছে। দেখে ফেলেছে টুটু। সঙ্গে-সঙ্গে আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠেছে, “বাঘ!”

আর বলব কী, চোখের পাতা পড়ার আগেই হরিণছানাটা মেরেছে এক লাফ। মেরেই ছুট। জয় আর টুটু শূন্যে মারল এক ডিগবাজি। মেরেই দেখতে পেল, বাঘটা হালুম করে একটা হাঁক পাড়ল। বুক তো কাঁপলই, বন পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তারপর ঝোপ ডিঙিয়ে মারল এক লাফ! মেরেই হরিণের পেছনে ধাওয়া করল।

হরিণ তখন ছুট-ছুট! বাঘও নাছোড়বান্দা। তখন সেই বনের ভেতর বাঘ আর হরিণের কী সাংঘাতিক ছুটন্ত লড়াই শুরু হয়ে গেল।

জয় আর টুটুর মুখ তো শুকিয়ে এইটুকু! উড়তে-উড়তে জয় আর টুটু কখনও বাঘের মাথার ওপর আসে, কখনও আসে হরিণের মাথার ওপর। তাদের বন্ধুকে এখন বাঘের হাত থেকে কেমন করে যে বাঁচাবে, দু’জনের কেউই জানে না।

বলো, ওই ছোট্ট হরিণটা, এই ধুমসো রাক্ষসটার সঙ্গে কতক্ষণ পারবে? শেষে টুটুই চেঁচিয়ে উঠল। বলল, “জয়, আমাদের যদি মরতে হয় তো মরব। এসো, উড়তে-উড়তে বাঘের চোখে নখ ফুটিয়ে দিই!”

জয় উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমাদের প্রাণ দিয়ে যদি বন্ধুর প্রাণ বাঁচে তার চেয়ে সুখ আর কী আছে।” বলে জয় আর টুটু এবার বাঘের সঙ্গে লড়াই শুরু করল। বাঘ যেদিকে ছোটে, ঠিক তার উলটো দিক থেকে জয় আর টুটু তার দিকে উড়ে আসে। টুটুই প্রথম ছোঁ-মারার মতো ছুটন্ত বাঘের দিকে তার পায়ের নখ উঁচিয়ে নেমে এল। দিল খুঁচিয়ে! যাঃ! ফসকে গেছে। তার নখের খোঁচা বাঘের চোখে না লেগে, লাগল মাথায়। উরি বাবা! বাঘের তখন সে কী মূর্তি। টুটুকে ধরার জন্য থাবা উঁচিয়ে শূন্যে মারল এক ডিগবাজি। কিন্তু ততক্ষণে টুটু হুশ্‌। আকাশে হাওয়া খাচ্ছে। এই তালে হরিণও ছুট-ছুট! বাঘের নাগালের অনেকটা দূরে ভোঁ-কাট্টা! কিন্তু এর নাম বাঘ। অত সহজে ছাড়বার পাত্তর ইনি নন। আবার হরিণের পেছনে মারল তাড়া। এবার জয়ের পালা। চোখের নিমেষে জয় সোজা গোঁত মেরে বাঘের সামনে। মেরেছে ঠোঁটের ঠোক্কর একবার চোখের ভেতর। মেরেই ফুড়ুত! একেবারে হুউ-উ-শ, আকাশে!

এক ঠোক্করেই বাঘের চোখ ফুটো। বুঝতেই পারছ, তখন বাঘের কী বেহাল অবস্থা। আর হরিণকে ধরবে কী, কানা চোখের জ্বালা নিয়ে ব্যাঘ্রমশাই সেইখানেই হুমড়ি খেয়ে হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিল। কার আর ঘাড়ে ভূত চেপেছে যে, বাঘের হাঁক শুনে তার কাছে ছুটে যায়! সুতরাং এখন যত পারো চিৎকার করো, বয়ে গেছে কারও শুনতে!

হরিণ তো পালালই, জয় আর টুটুও হাওয়া। অবশ্য জয় আর টুটু হরিণের পিছু আর ছুটল না। দু’জন নিজেদের গাছেই ফিরে এসেছে। উফ্‌! ভীষণ হাঁপাচ্ছে দু’জনেই। হবেই তো! বাঘের সঙ্গে লড়াই করা কি এই ছোট্ট পাখির কম্ম! কিন্তু দ্যাখো, হতে পারি ছোট্ট, গায়ে জোর না-ই থাক, কিন্তু সাহস আর বুদ্ধি থাকলে যে, শক্তিশালী শত্রুকে ঘায়েল করা যায়, এই দুটি ছোট্ট পাখি সেইটাই কেমন দেখিয়ে দিল। তবে বাপু, হরিণের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে অমন অসাবধানী হওয়া উচিত হয়নি। একটা কিছু অঘটন ঘটে গেলে, তখন কী হত?

জয় আর টুটু অনেকক্ষণ গাছের ফাঁকে চুপটি করে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর কানা-বাঘের আর হম্বিতম্বি শোনা গেল না। হয়তো বাঘটা চোখের যন্ত্রণা নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে পালিয়েছে। এই গভীর বনে কোথায় যে বাঘের ঘর, সে তো জয় আর টুটু কেউ জানে না। জানলেই বা কী! ভাবছ, তারা যাবে সেখানে? খেপেছ, আর ও-পথ মাড়াতে আছে!

কিন্তু মনটা বড় ছুক-ছুক করছিল জয়ের। তাই তো, হরিণটা গেল কোথায়! চুপটি করে সেই কথাটাই সে ভাবছিল। হঠাৎ টুটু কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, “কী জয়, চুপ করে আছ কেন?”

“ভাবছি।”

“কী?”

“বাঘটাই বা কোথায় গেল, হরিণটারই বা কী হল?”

টুটু বলল, “বাঘের কথা ছেড়ে দাও। যা মার খেয়েছে, পালাতে পথ পায়নি। এখন বাছাধনকে একটি চোখ সম্বল করে বেঁচে থাকতে হবে। তবে হরিণটা যে কোথায় গেল, সেইটাই চিন্তার। চলো, খুঁজে আসি!”

জয় বলল, “হ্যাঁ, আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম। চলো।”

দুটিতে আবার উড়ল বনের গাছে-গাছে। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল হরিণছানাকে। কোথায় পাবে তাকে? প্রাণের ভয়ে সে যে কোথায় লুকিয়ে আছে, খুঁজে পাওয়া খুবই শক্ত। তার ওপর দ্বীপটাও তো আর একটুখানি নয় যে, বললেই একটা চক্কর দিয়ে আসবে। অনেকটা উড়লে তবে এই দ্বীপে সেই যেখানে মানুষ বাস করে, সেখানে পৌঁছতে পারবে। তা সে একবারে বনের শেষ প্রান্তে। তা বলে এ-মানুষরা শহরের মানুষের মতো অমন নয়। এরা কাপড়ও পরে না, জামাও গায়ে দেয় না। ভাবছ, দেখলে লজ্জা করবে? মোটেই না। কী সুন্দর গাছের ছাল আর গাছের পাতার বাহারি-পোশাক তাদের গায়। তার ওপর ছেলেদের মাথায় বনফুলের মুকুট। আর মেয়েদের গায়ে কত রকমের রঙিন পাথরের অলঙ্কার। ঝকমকে রঙ মেখে তারা যখন হাতে বর্শা নিয়ে গান গেয়ে নাচে, কী বলব তোমাদের, দারুণ লাগে। এই বর্শাটাকেই ভয়। বনের বাঘ যদি কখনও-সখনও খাবারের খোঁজে মানুষের আস্তানায় ঢুকে পড়ে, তবে ওই বর্শাই তাদের রক্ষা করে। ওই বর্শা দিয়ে বাঘের বংশ নাশ করে ছেড়ে দেবে।

জয় আর টুটু উড়তে-উড়তে একেবারে মানুষের সেই আস্তানার কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তবু সেই হরিণের দেখা মিলল না। অগত্যা ফিরে আসতে হল। কী আর করা! খুব মন খারাপ হয়ে গেল দু’জনেরই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%