॥ ৩ ॥

শৈলেন ঘোষ

গল্প শেষ করে টুটুই চেঁচিয়ে উঠল, “এ কী, সন্ধে হয়ে গেল যে!”

জয়ের যেন তখন চমক ভাঙল, “এঁঃ! তাই তো!”

টুটু বলল, “ওই দ্যাখো, গাছ”

“কই?”

“ওই যে, সামনে!”

“একে বলে বরাত। এক্ষুনি আকাশ আঁধারে ডুবে যাবে। যাক, একটা আশ্রয় পাওয়া গেল।” উত্তর দিল জয়।

টুটু সামনে চোখ স্থির রেখে বলল, “মনে হচ্ছে অনেক গাছ।”

জয়ও ভাল করে দেখার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “মনে তো হচ্ছে অনেক। তাড়াতাড়ি চলো।”

দেখতে-দেখতে দু’জনেই গাছের মাথার ওপর উড়ে এল। দু’জনেই দেখতে পেল, চারদিকে অগুনতি গাছ। ডালে বসার আগে একটা গাছের পাতার ফাঁক-ফোকরগুলো দু’জনেই একটু পরখ করে দেখে নিল। না, তেমন বিপজ্জনক কিছু নজরে পড়ছে না। দুজনেই বসে পড়ল। আঃ! কী আরাম!

জয়ই বলল, “বেঁচে ওঠার পর এতক্ষণে বেশ একটা নিরাপদ জায়গা পাওয়া গেল। কী মনে হচ্ছে টুটু তোমার? বেশ ভাল না?”

জয়ের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে টুটু জিজ্ঞেস করল, “তোমার খিদে পাচ্ছে না জয়?”

“পেলেইবা কী! তোমার বুঝি খুব খিদে পাচ্ছে?” বলে জয় টুটুর মুখের দিকে চাইল।

টুটু বলল, “পাওয়াটা কিছু আশ্চর্যের নয়। সেই কখন খেয়েছি। তারপরে এই ধকল! বাব্বা!”

জয় জিজ্ঞেস করল, “এখানে খাবার পাবে কোথায়?”

“আমার মনে হয়, গাছের আড়ালে-আবডালে খুঁজলে খাবার কিছু মিলে যেতে পারে। তোমার পিঁপড়ে ভাল লাগে?” টুটু প্রশ্ন করল।

“পিঁপড়ে মন্দ না। তবে আমার বেশি ভাল লাগে কেঁচো।” উত্তর দিল জয়।

টুটু হাসল। বলল, “গাছে আর কেঁচো পাবে কোথায়? চেষ্টা করলে পিঁপড়ে পাওয়া যেতে পারে।”

“চলো তবে, তাই দেখা যাক,” বলে জয় তুড়ুক করে লাফ মেরে গাছের ওপরবাগের একটা ডাল ধরল।

দেখাদেখি টুটুও লাফাল। বলল, “চটপট মিলে গেলে ভাল। বেশিক্ষণ খোঁজাখুঁজি করা যাবে না। দেখতে পাচ্ছ আকাশের অবস্থা? সন্ধ্যারাতের তারা ফুটতে আরম্ভ করেছে।”

“হ্যাঁ, এরপর অন্ধকারে অন্ধ হয়ে চুপটি করে ডালে বসে থাকো,” উত্তর দিল জয়।

তারপর জয় একবার এ-ডালে ওঠে, টুটু একবার ও-ডালে লাফায়। একটা দুটো পোকা দেখলেই টকাস করে কামড়ে ধরে, টুকুস করে গালে পোরে।

হঠাৎ জয় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল টুটুকে। বলল, “টুটু, তুমি কোনওদিন চালভাজা খেয়েছ?”

“হ্যাঁ, একবার আমরা শখ করে চিনদেশে গিয়েছিলুম। তারপর সেখান থেকে উড়তে-উড়তে বাংলাদেশ। তখন চালভাজা খেয়েছি।” উত্তর দিল টুটু।

“বেড়ে খেতে, কী বলো?”

“দারুণ।”

“তার সঙ্গে যদি আবার ছোলা, বাদাম মেখে দাও, রক্ষে নেই,” বলেই জয় ঝপ করে একটা ঝিঁঝিঁপোকা দুটি ঠোঁটের ফাঁকে কবজা করে ধরে গিলে ফেললে। ফেলেই আবার ওপরে উঠতে শুরু করল।

“এই, এই, সাপ!” টুটু একেবারে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে।

টুটুর চিৎকার শুনে জয় আগুপিছু কিছু না দেখে মেরেছে এক গোঁত গাছের ওপর থেকে নীচে। সঙ্গে-সঙ্গে সাপও মেরেছে এক ছোবল। যাঃ! ফসকে গেছে! সাপের ছোবল জয়ের ঘাড়ে না পড়ে, পড়ল গিয়ে গাছের ডালে, ঠকাস! উফ্‌, কী বাঁচান বেঁচে গেল জয়। আর একটু হলেই জয়ের ঘাড়ে পড়েছিল সাপের ছোবল! সাপ তো শিকার ফসকে রেগে কাঁই। কী তার ফোঁসফোঁসানি! এই মারে তো, সেই মারে! আর মারবে কাকে! দু’বন্ধু তখন গাছ ছেড়ে হাওয়া। এখন তুমি গাছের ডালে যত পারো তড়পাও! তাদের আর ধরতে হচ্ছে না।

কিন্তু এদিকে যে আর-এক কাণ্ড। আকাশের অন্ধকার যে চারদিক ঘিরে ফেলছে। কী তাড়াতাড়ি রাত নেমে আসছে পৃথিবীর কোণে-কোণে! এই অন্ধকারে পাখি কতক্ষণ দেখতে পাবে! কী মুশকিল! জয় আকাশে উড়তে-উড়তেই ব্যস্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “টুটু, তুমি আমার কাছে-কাছে থাকো।”

টুটুর গলাতেও আতঙ্ক। বলল, “এই তো, আমি তোমার কাছে-কাছেই আছি। কিন্তু এরপর তো আর কিছুই দেখতে পাব না!”

জয় তেমনি ব্যস্ত হয়েই বলল, “কিন্তু আমি সামনে একটা কী দেখতে পাচ্ছি।”

টুটু খুবই উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কই?”

“ওই যে!”

একটু ভাল করে ঠাওর করে টুটু চেঁচিয়ে উঠল, “জয়, মনে হচ্ছে একটা পোড়োবাড়ি।”

“তবে চলো, চলো, শিগগির চলো,” জয়ের যেন আর তর সইল না। বলল, “আজ রাতটা কোনওরকমে ওই পোড়োবাড়িতেই কাটাতে হবে।”

“ঠিক বলেছ,” বলে টুটু জয়ের সঙ্গে তীরবেগে উড়ে এসে একটা পাঁচিলের ওপর নেমে পড়ল। নেমে, সুড়ুত-সুড়ুত করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দু’জনেই ভাঙা-কড়িকাঠের ফোকরে সেঁধিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন! উফ!

ঘরে ঢুকে জয়ও কথা বলে না, টুটুও চুপ। দমটাকে সামলাতে কিছুক্ষণ অন্তত চুপচাপ থাকাই ঠিক। ঝামেলার যেন শেষ নেই। একটার পর একটা লেগেই আছে। যাক! এখন তো কিছুটা নিশ্চিন্তি!

অনেকক্ষণ পর জয়ের মুখেই প্রথম কথা ফুটল, “টুটু, অন্ধকারে তোমাকে দেখা যাচ্ছে না।”

“আমি তোমার পাশে, এই তো!”

জয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, “যাক বাবা! মনে হয় রাতটা বেশ ভালই কাটবে, কী বলো?”

টুটু উত্তর দিল, “বলা যায় না। যেভাবে একটার পর একটা অঘটন ঘটছে!”

“সত্যি! দলছাড়া হয়ে আমরা দু’জনে এখন যে কোথায় যাব, কী করব, কিছুই জানি না। আবার সবাইকে খুঁজে পাব কি না, তারও কিছু ঠিক নেই।” কেমন যেন হতাশার সুর জয়ের গলায়।

“যত নষ্টের গোড়া বাজপাখির দল।” উত্তর দিল টুটু।

“ঠিক বলেছ। কী ভয়ঙ্কর হিংসুটে চেহারা!”

“শুধু হিংসুটে বলছ কেন, বলো খুনি, রক্তপিশাচের দল।” টুটুর কণ্ঠ যেন ক্ষিপ্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল।

“হুশ্‌শ্‌। হুশ্‌শ্‌শ্‌।” এই রে, ঘরের ভেতরে যেন মানুষের গলার স্বর! টুটু আর জয়ের গলা শুনে তাড়া দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

জয় আর টুটু দু’জনেই থতমত খেয়ে গেছে। দু’জনেই একদম চুপ। দেখা গেল, ঘরের মধ্যে হঠাৎ যেন একটা ছায়া নড়েচড়ে উঠল। মনে হল উঠে দাঁড়াল। ওপর দিকে তাকাল। আচমকা হাঁক পাড়ল, “গণেশ।”

ব্যস। এক হাঁকেই দুই পাখির আত্মারাম খাঁচাছাড়া! তাদের আর একচুল বুঝতে বাকি রইল না যে, ঘরের মধ্যে একজন মানুষ হাঁক পেড়েছে।

“এই গণেশ,” কোনও সাড়া না পেয়ে আবার চেঁচাল লোকটা।

“যাই বাবু।”

“লণ্ঠনটা নিয়ে আয়।”

“আসছি এক্ষুনি।” বলে দেখতে-দেখতে লণ্ঠন হাতে গণেশ ঢুকল। ঘরে আলো ছড়িয়ে পড়ল। দেখা গেল গণেশের বাবু বিছানায় শুয়ে-শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। ঘরের ভেতর পাখির ক্যাঁচ-ক্যাচানিতে ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে। তাই ঘরে গণেশ ঢুকতেই তিনি বললেন, “দ্যাখ তো, মনে হচ্ছে ঘরে পাখি ঢুকেছে।

অমনি গণেশ নামে সেই লণ্ঠন-হাতে লোকটা, লণ্ঠনটা ওপরে তুলে ড্যাবড্যাব করে ঘরের আনাচে-কানাচে লক্ষ করতে লাগল।

হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক যা ভাবা, কড়িকাঠে তার নজর পড়ে গেছে। সে দেখতে পেয়েছে জয় আর টুটুকে। দুটিতে ঘাপটি মেরে বসে আছে। দেখতে পেয়েই গণেশ চেঁচাল, “আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর, ঘরে দুটো রঙচঙে পাখি ঢুকেছে। দারুণ দেখতে!”

লোকটা বলল, “কই রে?”

“আজ্ঞে, ওই যে কড়িকাঠে।”

“তাই তো! কোত্থেকে এল বল তো?”

“মনে হয় তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছে।”

“দ্যাখদিকিনি ধরতে পারিস কি না।”

“হ্যাঁ-হ্যাঁ, খুব পারব,” বলে সেই গণেশ নামে লোকটা লণ্ঠনটা মাটিতে রেখে, একটা অ্যায়সা লম্বা লাঠি নিয়ে কড়িকাঠে খোঁচা দিলে। বুঝতেই পারছ, জয় আর টুটুর অবস্থা! তখন তো গাঢ় অন্ধকার। সুতরাং তখন পাখির চোখেও আলো নেই। খোঁচা খেয়ে দু’জনেই প্রাণ বাঁচাতে অন্ধকারেই চরকি খেতে লাগল। যে-পথ দিয়ে তারা সেই ঘরে ঢুকেছিল, অন্ধকারে সে-পথের হদিস তারা কেমন করে খুঁজে পাবে? উড়তে-উড়তে এ-দেওয়ালে, ও-দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে, ঝাপটা মারছে, ছিটকে পড়ছে।

হু-ই-ই দ্যাখো, জয় পথটা দেখতে পেয়েছে। জয় চেঁচিয়ে উঠল, “টুটু, এদিক দিয়ে পালিয়ে এসো!”

জয় পালাল। কিন্তু টুটু পারল না। বেচারা বেদম হয়ে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ল ঘরের কোণে। ধরা পড়ে গেল গণেশর হাতে।

গণেশ চেঁচিয়ে উঠল, “ধরেছি বাবু।”

বাবু জিজ্ঞেস করল, “আর একটা?”

“দেখতে পাচ্ছি না।”

“দ্যাখ্‌, এখানেই আছে কোথাও।”

গণেশ তখন বাবুর কথামতো এক হাতে টুটুকে চিপটে ধরে হাঁপাহাঁপি করে জয়কে খুঁজতে লাগল। কিন্তু পাবে কোথায়? সে তখন বাইরে বেরিয়ে দে-চম্পট!

গণেশ যখন খুঁজতে-খুঁজতে হালাক হয়ে গেছে, তখন গণেশের বাবু বলল, “যাক গে, ছেড়ে দে। আর খুঁজতে হবে না। মনে হয় পালিয়েছে।”

তখন গণেশ বলল, “তা হলে এখন এটাকে নিয়ে কী করি? কোথায় রাখব, খাঁচাটাচা তো নেই।”

“একটা কিছু চাপা দিয়ে রাখ!”

গণেশ বলল, “চাপা দেবারই বা কী আছে। একটা টিনের ক্যানেস্তারা আছে, তাও ফুটোফাটা। চাপা দিয়ে রাখলে পালাবে।”

লোকটা বলল, “তা হলে এক কাজ কর, দড়ি দিয়ে ঠ্যাং বেঁধে ক্যানেস্তারার ভেতরে ফেলে রাখ। তারপর সকালে দেখা যাবে।”

“সেই ভাল,” গণেশ সায় দিল। তারপর সত্যি-সত্যি টুটুর ঠ্যাং বেঁধে ক্যানেস্তারায় চাপা দিয়ে রাখল।

টুটু অবশ্য ঘাড়-ঠ্যাং ছুঁড়ে ডানা ঝাপটে গণেশের হাত ফসকে পালাবার অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মানুষের মুঠির ভেতর থেকে পালানো অতই সহজ! অগত্যা টুটু অন্ধকার রাতে, পোড়োবাড়ির ভাঙাঘরে টিনের ভেতর পড়ে-পড়ে কোঁকাতে লাগল। জানতেও পারল না জয় কোথায় লুকিয়ে পড়েছে।

সারারাত ছটফট করেছে টুটু ক্যানেস্তারার ভেতর। আর ওদিকে গোটা রাতটা পোড়োবাড়ির বাইরের ঝোপে লুকিয়ে-লুকিয়ে জয় ভেবেছে, রাত কাটতে আর কত দেরি!

তারপর সত্যি যখন রাত গড়িয়ে ভোরের আলো আকাশে ছড়িয়ে পড়ব-পড়ব করছে, তখন জয় ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল। সে জানে না টুটুর কী হয়েছে। সারারাত কী উৎকণ্ঠায় কেটেছে তার। তাই আবার সে ভাঙাঘরে ঢোকার জন্যে উঁকি দিল। না কোনও সাড়া নেই। তা হলে বোধহয় সবাই ঘুমোচ্ছে! টুক করে সে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। বাইরে যদিও তখন ধীরে-ধীরে আঁধার কাটছে, একটু-একটু আলো, কিন্তু ঘরের ভেতর তো আর তা নয়! তখনও অন্ধকার। নিস্তব্ধ। এমন কী, একটু আগে পর্যন্ত টুটুর ঝটপটানির শব্দটা শোনা যাচ্ছিল। এখন তাও স্থির। সুতরাং জয় ফুড়ুত করে ঘরে ঢুকেই যে চটজলদি টুটুর খোঁজ পেয়ে যাবে, তেমন কোনও উপায়ই নেই। তাই সে বাধ্য হয়েই খুব নিচু গলায় ডাক দিল, “টুটু!”

হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছে টুটু। জয়ের গলা শুনে সে ছটফট করে উঠেছে। টুটুও খুব নরম সুরে সাড়া দিল, “জয়?”

“হ্যাঁ, আমি জয়। তুমি কোথায়?”

“আমি টিনের ভেতর বন্দী!”

“বন্দী!” জয় চমকে উঠল।

টুটু তেমনি নিচু স্বরেই বলল, “আমায় দড়ি দিয়ে বেঁধে টিনের ভেতর চাপা দিয়ে রেখেছে।”

“কই টিন?” ব্যস্ত হয়ে জয় জিজ্ঞেস করল।

“দেখতে পাচ্ছ না?”

জয় বলল, “দেখতে পাব কেমন করে! বাইরে যদিও ভোর হয়েছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখনও অন্ধকার।”

“তুমি তা হলে এক কাজ করো,” টুটু উত্তর দিল, “আমার পা বাঁধা, কিন্তু ডানা খোলা। আমি টিনের গায়ে ডানার ঝাপটা মারি। তুমি শুনে-শুনে খুঁজে নাও।”

“ঠিক বলেছ!” জয় টুটুর বুদ্ধির তারিফ করেই উত্তরটা দিল।

সত্যি, টুটু অনেক কসরত করতে করতে টিনে ডানার ঝাপটা মারতে লাগল, ঝনাত, ঝনাত। আর জয়ও সেই শব্দ শুনতে-শুনতে টিনটাকে খুঁজতে লাগল। অবশ্য তখন ভোরের আকাশ পোড়োবাড়ির ঘরের ভেতরেও আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং টিনটাকে ঠাওর করতে জয়কে খুব একটা মেহনত করতে হল না। টিনের ক্যানেস্তারাটা তার নজরে তো পড়লই, সেইসঙ্গে সে দেখতে পেল তার গায়ের ফুটোফাটাও। জয় আগুপিছু কিছু ভাবল না, নিমেষ দেরিও করল না। ঝটপট ফুটোর মধ্যে শরীরটা গলিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সত্যি, এমন কষে টুটুর ঠ্যাং-এ দড়ি বাঁধা হয়েছে যে, শত চেষ্টা করলেও বাছাধনের উড়ে পালাবার উপায় নেই।

জয় বলল, “টুটু, কিচ্ছু ভেবো না। আমি ব্যবস্থা করছি।” বলে জয় নিজের ঠোঁট দিয়ে কখনও টেনে, কখনও ঠোক্কর মেরে সেই দড়ি কাটতে লাগল। একটু করে দড়ির বাঁধন খুলছে, জয়ের যেন ততই ভয় বাড়ছে! যদি লোকগুলোর ঘুম ভেঙে যায়!

উঃ! কী কষে বেঁধেছে রে বাবা! বেচারি টুটুর বাঁধনের চাপে পা বুঝি ছিঁড়ে যায়!

অবশ্য আর ভয়ের কিছু নেই। শেষ বাঁধনটা খুলে যেতেই টুটু আনন্দে দিশেহারা হয়ে সেই ক্যানেস্তারার ভেতরেই জয়কে জড়িয়ে ধরল। জয় বলল, “টুটু, আর দেরি নয়। চলো, চলো বেরিয়ে পড়ি! নইলে আবার বিপদ হতে পারে।”

টুটু সুট করে ফুটোর ভেতর থেকে মাথা গলিয়ে একবার বাইরেটা দেখে নিল। না, কেউ দ্যাখেনি। ওই তো ঘুমে সব অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। টুটু ফিসফিস করে জয়ের কানের কাছে ঠোঁট এনে বলল, “সব ঘুমোচ্ছে।”

জয় বলল, “তবে শিগগির বেরিয়ে পড়ো!”

টুটু ফুটোর ওপর তুড়ক করে লাফিয়ে উঠে চোখের পলকে ফুড়ুত করে দে-হাওয়া! সঙ্গে-সঙ্গে তার পেছনে জয়ও দিল লম্বাছুট, ফুড়ুত-ফুড়ুত-ফুড়ুত! উঃ! দু’জনের পাখায় তখন কী দুরন্ত গতি! এখন তাদের ধরতে পারে, এমন কার সাধ্যি আছে!

অবশ্য উড়তে-উড়তে বেশ খানিকটা কাহিল হয়ে পড়ছিল টুটু। হবেই তো, কাল সারারাত বেচারি একফোঁটা ঘুমুতে পারেনি। সারারাত টিনের ভেতর ছটফট করেছে। সুতরাং এখন উড়তে কষ্ট হলে তুমি তাকে দোষ দিতে পারো না। অথচ একটু থেমে যে জিরিয়ে নেবে, এমন সাহসও হচ্ছিল না। খিদেও পাচ্ছে। তাই বলে এমন নয় যে, এক্ষুনি পেটে কিছু না পড়লে ‘বাবা গো, মা গো, খেতে দাও গো’ বলে, হাত-পা ছুঁড়ে পাড়া মাথায় করতে হবে!

চুপচাপ উড়তে-উড়তে অনেকখানি আকাশ-পথ পেরিয়ে এল তারা। দেখতে-দেখতে সূর্যও ঝলমল করে আকাশ উপচে উছলে পড়েছে। এ-সময়টা পাখিদের ভারী ভাল লাগার সময়। সকালে পাখিদের পালকে রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়লে, খুশি যেন গান হয়ে তাদের গলায় ঝরে যায়। কিন্তু এখন এই দুই পাখির তো আর খুশির সময় নয়। তাই ভোরের সূর্য ভালবেসে যতই তাদের গায়ে-গায়ে ছড়িয়ে পড়ুক, গলা তাদের গান গেয়ে আকাশের বুক আনন্দে ভরিয়ে দেবে না। এখন তারা কেমন করে বেঁচে থাকবে, এই ভাবনায় ছটফট করছে। দল ভেঙে ছিটকে পড়েছে তারা। যতই হোক্‌, দলবেঁধে থাকলে সাহসও থাকে। কিন্তু এখন তারা দু’জন মাত্র। কে জানে শেষ অবধি বন-সবুজের দ্বীপে পৌঁছতে পারবে কি না! কে জানে, এই দুঃসময়ে আপেল-বুড়োর জন্যে কোত্থেকে তারা ভালবাসা খুঁজে পাবে!

হঠাৎ জয়ই কথা বলল, “টুটু, হাওয়ার তেজ বেড়েছে, বুঝতে পারছ?”

টুটু বলল, “হ্যাঁ, সমুদ্রের হাওয়া।”

জয় অবাক হল, “সমুদ্র কি এসে গেল?”

“না, দেরি আছে,” উত্তর দিল টুটু।

“আরও কতটা?”

“বেশ খানিকটা।”

জয় উড়তে-উড়তে টুটুর মুখের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “এবার একটু থামলে হয় না?”

টুটু বলল, “আরও একটু চলো। আমার মনে হচ্ছে, আর একটু গেলে, একটা গরম জলের ফোয়ারা পাব আমরা। সেখানে থেমে একটু চান করে নেব। গরম জলে পালক ভিজিয়ে চান করে নিলে, ক্লান্তি কেটে যাবে।”

“সেই ভাল,” উত্তর দিল জয়।

সুতরাং থামল না তারা। উড়ে চলল, আরও অনেকটা।

উড়তে-উড়তে হঠাৎ জলের শব্দ শোনা গেল। ঠিক যেন নূপুরের রিমঝিম। হঠাৎ উঁচু-নিচু কিছু পাথর, কিছু-কিছু গাছের ঝোপ নজরে পড়ল।

টুটু জিজ্ঞেস করল, “শুনতে পাচ্ছ?”

“পাচ্ছি, জলের শব্দ,” উত্তর দিল জয়।

“এখানেই সেই ফোয়ারা।”

জায়গাটা চোখে পড়তেই কী ভাল লেগে গেল জয়ের। চেঁচিয়ে উঠল, “টুটু, কী চমৎকার জায়গা। আমি তো আগে কখনও এদিকে আসিনি।”

টুটু বলল, “এবারেও আসতে না। আসলে এটা তো আমাদের দক্ষিণে যাওয়ার পথ নয়। বিপদই তো আমাদের এদিকে টেনে এনেছে।”

জয় খুব উদ্‌গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এদিক দিয়ে আমরা দক্ষিণের সেই বন-সবুজের দ্বীপে যেতে পারব তো?”

“হ্যাঁ, আমরা তো দক্ষিণেই চলেছি,” উত্তর দিল টুটু, “তবে পথটা একটু ঘুর হয়ে গেল, এই যা! আর যদি কোনও গণ্ডগোলে না পড়ি তবে, সমুদ্রের সেই বন-সবুজের দ্বীপে ঠিক সময়েই পৌঁছে যাব।” একটু থেমে টুটু আবার বলল, “এবার নামতে হবে। ওই দ্যাখো, গাছের ফাঁকে গরম-জলের ফোয়ারা। কেমন পাথরের ফাঁক দিয়ে উপচে পড়ছে!”

“কী সুন্দর!” খুশিতে উছলে উঠল জয়ের চোখ দুটি। জিজ্ঞেস করল, “তা হলে নামি?”

“হ্যাঁ, এসো এই গাছটায়।”

দু’জনেই হুশ-হুশ করে গাছের ডালে নেমে পড়ল।

“আঃ! এখন একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল,” জয় যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

“চান করবে তো?" জিজ্ঞেস করল টুটু।

“নিশ্চয়ই,” জয়ের গলায় খুশির আমেজ।

“তবে চলো।”

দু’জনেই আবার ফুড়ুত করে উড়ে এসে জলের ধারে নামল। কী নির্জন, নিঝুম চারদিকটা। গাছগাছালি। প্রজাপতি। ফড়িং। এত বড়-বড় মথ। ফুলের রঙবাহার। ভাঙা পাথরের চাঁই। তার ফাঁকে গরম-জলের ফোয়ারা। উছলে এদিক-ওদিক পথ খুঁজতে-খুঁজতে বেয়ে চলেছে। এমনি একটা ছোট্ট সোঁতার জলে ডানা ঝাপটে দু’ বন্ধুতে চান করে নিল। ভারী আরাম। ভিজে পালকের জল ঝেড়ে ফেলার জন্যে এমন গা-ঝাড়া দিল, মনে হল দুটি পাখি যেন দু’মুঠো রঙিন তুলো। গায়ে একটু রোদের তাপ ছুঁইয়ে দু’জনে আবার উঠে পড়ল গাছে।

জয় বলল, “দেখেছ, যতক্ষণ ভয় থাকে ততক্ষণ খিদে থাকলেও খেতে ইচ্ছে করে না। এখন একটু-একটু ইচ্ছে করছে, না টুটু?”

টুটু বলল, “ভয় যে কেটে গেছে, কী করে বুঝলে?”

জয় উত্তর দিল, “এমন চমৎকার একটা জায়গায় যে আপদ থাকতে পারে, সেটা বিশ্বাস করতে মন চায় না।”

“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, জায়গাটা খুবই চমৎকার। তবে ভয় যে কখন কোথা দিয়ে আসে কেউ বলতে পারে না।” জবাব দিল টুটু।

জয় বলল, “তা ঠিক।”

টুটু বলল, “আর বেশিক্ষণ গাছে বসে না-থাকাই ভাল। চলো, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। এবার সমুদ্রের পথে পাড়ি দিতে হবে। সন্ধের আগেই বন-সবুজের দ্বীপে আমাদের পৌঁছতেই হবে। তা না হলে মুশকিল।”

খাওয়া সেরে বেশ কিছুটা উড়ে আসার পরই নজরে পড়ল সমুদ্র। দূর থেকে তার শব্দটা তখন মনে হচ্ছিল, কত ক্ষীণ। এখন গর্জন হয়ে যেন ধমক মারছে। পাখিরা তো আর সমুদ্রকে ভয় পায় না। আকাশের নীচে জলের ঢেউ তুলে সমুদ্র যতই গর্জন করুক, পাখিদের বয়ে গেছে। পাখিরা তখন সুদূর আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায়। সমুদ্র নাগালই পায় না।

সমুদ্রের এই দেশে এর আগে জয় কোনওদিন আসেনি। তাই সে ভীষণ উৎসুক হয়ে চারদিকটা দেখতে-দেখতে উড়ে আসছিল।

“তুমি এদিকে কতবার এসেছ টুটু?” হঠাৎ জয়ই জিজ্ঞেস করল।

টুটু উত্তর দিল, “একবারই”

“দেখছি, তোমার সব মনে আছে।”

টুটু হাসল।

“আমি এদিকে কোনওদিন আসিনি, তাই এত ভাল লাগছে,” খুব খুশি হয়ে জয় বলল।

টুটু বলল, “হ্যাঁ, ভাল লাগার মতোই জায়গা। সমুদ্রের কোলে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ঝাউ-পাইনের বন। দু’একটি দেবদারু গাছ। তীর-ভর্তি সোনা-ছড়ানো বালি।

হাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। সমুদ্রের বুঁক থেকে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘও ভেসে আসছে। মাঝে-মাঝে সূর্যের মুখ ঢাকা পড়ছে, আবার ঝলসে উঠছে। লুকোচুরি খেলা যেন। ওদের উড়ে চলার গতিও কিছুটা কমেছে। তা হলেও আর ভয় নেই। এসে পড়েছে ওরা। সামনে সমুদ্র!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%