॥ ৭ ॥

শৈলেন ঘোষ

এমনি করে তিন দিন কাটল তাদের বন-সবুজের দ্বীপে। এমনি করে আর কতদিন তাদের থাকতে হবে এখানে। বন-সবুজের দ্বীপে যেন সবসময় বসন্ত। অথচ উত্তরে এখন শীত। সেখানে এখন হিমেল বাতাস আর তুষারের ঝঞ্ঝা। বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে জয়ের। আবার মনে পড়ে যায় বুড়ো-আপেলগাছের কথা। তার জন্য আরও একটু ভালবাসা খুঁজে পেল না জয়। ভালবাসা না পেলে সে কেমন করে দাঁড়াবে আপেলগাছের সামনে! কোন্ মুখে সে বলবে, “তোমার জন্য ভালবাসা আনতে পারিনি আপেল-বুড়ো!”

যতই দিন যাচ্ছে, ততই যেন জয়ের মনটা মুষড়ে পড়ছে। তবে কি সে আর কোনওদিন বুড়ো-আপেলগাছের কাছে যাবে না!

না, সে যাবে। নিশ্চয়ই যাবে। তাকে যেতেই হবে। এখন জয় সব ছেড়ে এই ভালবাসার খোঁজেই ঘুরে বেড়াবে। খুঁজবে এই বন-সবুজের কোণে-কোণে!

কিন্তু হায়! তা আর হল না।

কেন?

কেননা, এই বন-সবুজের দ্বীপে সেদিনের রাত এসেছিল এক ভয়ঙ্কর মূর্তি ধরে। শান্ত রাতের নিস্তব্ধতা এই বনে সেদিনও ছিল তেমনই। রাতের ছায়ায় সেদিন তেমনই ঘুমিয়ে পড়েছিল পাখিরা, ঘুমিয়ে পড়েছিল পশুরা, গাছপালা, লতাপাতা সবাই। শুধু জেগে ছিল জয় আর টুটু। গল্প করেছিল দুটিতে একটু বেশি রাত অবধি। তারপর ওরাও ঘুমিয়ে পড়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ গভীর রাতে ওদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। চমকে জেগে উঠেছিল জয় আর টুটু পাখিদের মরণ-কান্নায় আর পশুদের আর্তনাদে। জেগে দ্যাখে কী, বাতাস কাঁপিয়ে হুহু শব্দে আগুনের শিখা ছুটে আসছে এক গাছের মাথা ছুঁয়ে আর এক গাছে। এ কী সর্বনাশ! এ যে বনে আগুন লেগে গেছে! যেদিকে তাকাও, আগুন আর আগুন। বিশাল বিশাল গাছ দাউদাউ করে জ্বলছে আর কী প্রচণ্ড আওয়াজ করে ডালপালাগুলো ফেটে পড়ছে। গাছে-গাছে ঘষে-ঘষে একী দাবাগ্নি ছুটে আসছে! পশু-পাখি যে যেখানে ছিল প্রাণের ভয়ে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। কিন্তু বন ছেড়ে তারা কোথায় পালাবে? আগুন আর আগুন। আকাশ যেন রক্তে রাঙা হয়ে ঝলসে উঠেছে। গাছের পাখিরা সেই রক্ত-রাঙা আকাশে কানামাছির মতো ঘুরপাক খেয়ে চিৎকার করছে। জয় আর টুটুও চরকি খেতে-খেতে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল, জানা গেল না। পশুরাই বা কতক্ষণ আগুনের হাত থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে! আগুনে বন্দী হয়ে কেউ মরে, কেউ দগ্ধে-দগ্ধে চিৎকার করে। কেউ বাঁচাবার নেই। বলা যায়, যারা বেঁচে আছে তারা তখন অসহায়ের মতো বাঁচার জন্যে আগুনের সঙ্গে লড়াই করছে।

সেই রাক্ষুসে আগুনের দাপটে যখন বন-সবুজ দ্বীপের সব সবুজই শেষ হয়ে গেল, তখন ভোর হয়ে গেছে। এখানে-ওখানে তখনও আগুন ধিকধিক করছে। এখানে-ওখানে আগুনে দগ্ধ মৃত পশুদের দেহ ছড়িয়ে আছে। পাশেপাশে লুটিয়ে আছে আগুনের শিকার কত পাখি! তবে কি জয় আর টুটুও এই আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেল!

এ কী! হঠাৎ এই ধ্বংসের রাজ্যে একটি ছোট্ট ছেলে কোত্থেকে এল। হ্যাঁ, ওই তো! তবে কি বনের শেষে সেই যে জংলি মানুষেরা বাস করে, এই ছোট্ট ছেলেটি সেখান থেকে ছুটে এসেছে! কেমন হতাশ চোখে দেখছে চারদিক! ভীষণ দুঃখে ভার হয়ে আছে তার চোখ দুটি। হয়তো-বা জলের কণা চিকচিক করছে তার চোখের কোণে। ও কি কাঁদছে? হয়তো তাই। কেননা, যে সবুজ-বনের আলো-আঁধারে সে ছুটে-ছুটে খেলা করেছে এতদিন, গাছের ডালে-ডালে লাফালাফি করেছে, গান গেয়েছে, সে-বন আর সে দেখতে পাবে না কোনওদিন। এখন আকাশটা যেন বড্ড একলা। আকাশের সব আলো যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে বন-সবুজের আগুনে পোড়া ছাইয়ের ওপর। বনের কপালে একটি ছোট্ট রুপোলি ফোঁটার মতো সেই যে জল-তকতকে ঝিল, তারও বুক-ভর্তি আজ কালো ছাইয়ের স্তূপ। ইচ্ছে করলে জঙ্গলের সেই ছেলেটি আর ঝিলের জলে লাফিয়ে পড়ে এপার-ওপার তোলপাড় করতে পারবে না। আজ যেন তার সব হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে তার বন্ধু এই সবুজ বন।

দেখতে-দেখতে হাঁটে। হাঁটতে-হাঁটতে তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। তারপর সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওই ছাইগাদার ওপর কী যেন একটা নড়ছে। ছুটে গেল সেইখানে। তুলে নিল। এ যে একটা পাখি! আহা রে, আগুনে দগ্ধ হয়ে এখনও বেঁচে থাকার জন্যে ছটফট করছে। এ কী! এ যে জয়! ছেলেটি আর জানবে কী করে যে, এর নাম জয়! তার কাছে জয় শুধু একটি পাখি। ছেলেটি দু’হাতের আলতো মুঠি দিয়ে জয়কে তুলে নিল বুকে। তারপর ছুটল। ছুটল ঘরের দিকে। আর জয় ছেলেটির বুকের ভেতর নিশ্বাস ফেলতে-ফেলতে ভাবতে লাগল, আর কতক্ষণ! তার সময় বোধহয় শেষ হয়ে এসেছে। বুড়ো-আপেলগাছ তো কোনওদিন জানতে পারবে না এ-কথা। হয়তো সে ভাববে, জয় তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে পালিয়ে গেছে অন্য কোথাও! কিন্তু কে তাকে বলবে, জয় তাকে ভোলেনি। ভুলবে না কোনওদিন। সে যে তার বন্ধু।

ছেলেটি ছুটতে-ছুটতে পাতায়-ছাওয়া একটি ছোট্ট কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ডাক দিল, “মা, মা!”

“কী হয়েছে?” ভেতর থেকে মা সাড়া দিল।

“দেখবে এসো!”

মা বেরিয়ে এল।

“একটা পাখি,” মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে জয়কে দেখাল।

“ইশ! ছিঃ ছিঃ, পুড়ে গেছে।” মা যেন শিউরে উঠল, “আয়, আয়, ঘরে নিয়ে আয়।” মা ব্যস্ত হয়ে ছেলেকে ঘরের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল।

জয়ের কী কষ্টই না হচ্ছে। যতই হোক, সে তো ছোট্ট একটা পাখি। আগুনের জ্বালা সে কখনও সহ্য করতে পারে!

“পাখিটাকে নিয়ে কী করব মা?” ছেলে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।

মা ছুটে, ঘরের পেছন দিক থেকে একটা কী-যেন বুনোগাছ ছিঁড়ে নিয়ে এল। তারপর ছেলেকে বলল, “গাছের পাতা নিঙড়ে ওর গায়ে রস ছড়িয়ে দে।”

ছেলে মায়ের কথা শুনে জয়কে নিজের কোলে রেখে পাতার রস ছড়িয়ে দিল জয়ের আগুনে আহত বুকে, ডানায়, পিঠে। আঃ! কী আরাম লাগছে জয়ের। জ্বালার যন্ত্রণা যেন নিমেষে মিলিয়ে যাচ্ছে। আহা! সারাক্ষণ যদি এই রস তার সারা গায়ে ছড়িয়ে দেয়!

অনেকক্ষণ ধরে মা আর ছেলে এমনি করে জয়কে নিয়ে পড়ে রইল। অনেকক্ষণ পর জয়ের চোখে যেন একটু-একটু ঘুম জড়িয়ে আসছে। যখনই তন্দ্রায় চোখের পাতা একটু বোজে, তখনই যেন চমকে ওঠে। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে অজান্তে। সারাক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে ওই ছোট্ট ছেলেটির কোলে মাথা রেখে।

ছেলেটি ডাকল। বলল, “দ্যাখো মা, পাখি ঘুমোচ্ছে।”

মা ক’টা নরম কচিপাতা ঘরের মেঝেয় বিছিয়ে দিয়ে বলল, “আস্তে-আস্তে এখানে শুইয়ে দে!”

ছেলেটি জয়কে পাতার বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও তার পাশে বসল। বসে-বসে দেখতে লাগল, পাখির ছোট্ট বুকখানা থিরথির করে কাঁপছে। কখনও-কখনও তার আহত ডানা দুটি হঠাৎ-হঠাৎ চমকে ওঠে, আবার স্থির হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

সেই সকাল থেকে অনেকক্ষণ ঘুমোল জয়। যখন তার ঘুম ভাঙল, তখনও সে দেখল, ছেলেটি বসে আছে তার পাশে, তার মুখের দিকে চেয়ে। হঠাৎ কী মনে হল, ওঠার চেষ্টা করল জয়। ছেলেটি সঙ্গে-সঙ্গে তাকে ধরে ফেলল। মুখে শব্দ করল, “না-ন্‌-না, চ্ছু- চ্ছু।” বলে আবার শুইয়ে দিল। শুয়ে পড়ে জয় মিটমিট করে দেখতে লাগল ছেলেটিকে।

এ কী আশ্চর্য, এখন তো জয়ের জ্বালা-যন্ত্রণা কিছুই নেই! সে কি তবে ভাল হয়ে গেল! তা কী করে হবে? ওই দ্যাখো না, তার ডানার পালকগুলি কেমন পুড়ে ঝলসে গেছে! কে জানে, সে আর উড়তে পারবে কি না! সত্যি, জয় যদি আর উড়তে না পারে!

ছেলেটি আলতো হাতের ছোঁয়া দিয়ে জয়ের ডানায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর আদর করে বলল, “পাখি, চুপটি করে শুয়ে থাকো। নইলে ডানায় লেগে যাবে!”

জয় কী বুঝল কে জানে! কিন্তু ছেলেটির নরম গলার ওই মিষ্টি শব্দগুলো এত ভাল লেগে গেল, জয় আর একটুও ছটফট করল না। তখন ছেলেটি ছুটে গিয়ে একটা পাতার বাটিতে করে একটু জল নিয়ে এল। তারপর সেই জল ফোঁটা-ফোঁটা জয়ের ঠোঁটে দিতেই, আঃ, জয়ের বুকটা যেন ভরে গেল। মনে হল, নতুন করে তার জীবনটা বুকের ভেতর দুলে উঠছে। সে হয়তো পারবে, নিশ্চয়ই পারবে ওই আকাশে ডানা মেলে আবার উড়ে যেতে। কিন্তু সে আবার কবে? কত দিন পরে? সে কথা কে বলবে! আর সত্যিই যদি ভাল হয়ে ওঠে জয়, সত্যিই যদি তার ডানা দুটি আবার হাওয়ায় ভেসে ওঠার জন্য আকুলিবিকুলি করে, তখন এই ছোট্ট ছেলেটি তাকে বন্দী করে রাখবে না তো!

হ্যাঁ, জয় বন্দী হয়েই রইল। ক’দিন পরে জয় যখন সত্যিই ডানায় ভর দিয়ে তুড়ুক-তুড়ুক করে মাটির ওপর নাচতে লাগল, তখন ছেলেটিও খুশিতে নেচে উঠল। মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে, মা’কে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “মা, পাখি নাচছে!” তারপর গাছের ডালপালা দিয়ে তার জন্যে খাঁচা তৈরি হল। সেই খাঁচায় বন্দী হল জয়।

খাঁচায় বন্দী পাখিকে কত গান শোনায় ছেলেটি। তার সঙ্গে কত কথা বলে। কত আদর করে। হায় রে! এ-আদর কেমন করে ভাল লাগবে জয়ের। সে যে বন্দী! ওই আকাশ যে তাকে বারবার হাতছানি দেয়। হাতছানি দেয় বুড়ো-আপেলগাছ। মনে পড়ে যায় টুটুর মুখখানি। আহা! টুটু কি বেঁচে আছে? না, আগুনের জ্বালায় সেও ঝলসে শেষ হয়ে গেছে! জয় কাঁদে আর ভারী মনমরা হয়ে বসে থাকে খাঁচার ভেতর বন্দী হয়ে। আর হয়তো মনে-মনে ছেলেটিকে বলে, “ছোট্ট ভাইটি আমার, তুমি আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ। এ-কথা তো আমি কোনওদিনই ভুলতে পারব না। এবার আমার এই খাঁচার দরজা খুলে আমার আকাশ আমাকে ফিরিয়ে দাও!”

একদিন সকালে জয়ের খাঁচাটি বাইরে একটি গাছের ডালে ঝুলছিল। আকাশের দিকে চেয়ে হঠাৎ যেন জয় থতমত খেয়ে যায়! ও কে আকাশে উড়ে যায়! উড়ে-উড়ে কী যেন সে খুঁজে বেড়াচ্ছে! আনন্দে চিৎকার করে ওঠে জয়! উড়ে যায় একটি পাখি। চিনতে পেরেছে জয়! ও যে টুটু! গলা ফাটিয়ে ডাক দিল জয়, “টুটু-উ-উ!”

টুটু শুনতে পায়নি। তাই সে ফিরেও তাকাল না।

ভারী ব্যস্ত সুরে আবার চেঁচিয়ে উঠল জয়, “টুটু, টুটু-উ-উ!”

এবার টুটু চমকে থামে। এদিক-ওদিক চাইতে-চাইতে হঠাৎ তার নজর পড়ে যায় খাঁচার দিকে। তীরবেগে সে নেমে আসে ওই আকাশ থেকে খাঁচার ওপর। সেও চিৎকার করে ওঠে, “জয়...!”

জয় খাঁচার ভেতর লাফিয়ে উঠে ওর মুখের কাছে মুখ এনে উত্তেজনায় হাঁপাতে-হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে, “তুমি ভাল আছ টুটু?”

টুটুও তেমনি খুশিতে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি? তুমি কেমন আছ জয়?”

জয় বলল, “আমি বন্দী।”

“আমি তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি কতদিন ধরে।” টুটু উত্তর দিল।

জয় জিজ্ঞেস করল, “এখন কী হবে টুটু?”

টুটু বলল, “আমি তোমায় মুক্ত করে নিয়ে যাব!”

“কেমন করে?”

“যেমন করে একদিন তুমি আমাকে মুক্ত করেছিলে। আমিও তেমনি আমার সব শক্তি দিয়ে তোমার খাঁচার বাঁধন ভেঙে ফেলব,” উত্তর দিল টুটু। উত্তর দিয়েই, ডালপালা দিয়ে তৈরি সেই খাঁচায় ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতে লাগল টুটু। উফ্‌! কী শক্ত!

দেখে ফেলেছিল সেই ছেলেটি। আশ্চর্য, সে ছুটে গেল না খাঁচার দিকে। তাড়া দিল না টুটুকে। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। অবাক হয়ে দেখতে থাকে। তারপর কী জানি, কী ভাবল সে, চিৎকার করে ডাকল, “মা-আ-আ।”

ছেলের চিৎকার শুনে ছুটে আসে মা, “কী রে?”

ছেলেটি খাঁচার দিকে আঙুল তুলল, “দ্যাখো, খাঁচার ওপর আর একটা পাখি।”

মা’ও দেখল। মা অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল, “ওর বন্ধু বোধহয়।”

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “মা, বন্ধুকে বুঝি আর এক বন্ধু খাঁচার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে ডাক দিচ্ছে?”

মা বলল, “হ্যাঁ বাবা! খাঁচা তো ওদের ঘর নয়। খাঁচার ভেতর পাখিকে আমরা বন্দী করে রেখেছি। হয়তো পাখি কষ্ট পাচ্ছে। তাই বন্ধু ওকে খাঁচা ভেঙে নিয়ে যেতে এসেছে।”

ছেলে বলল, “তা হলে তো এতদিন পাখিকে আমরা খুব কষ্ট দিয়েছি।”

মা উত্তর দিল, “কাউকে বন্দী করে রাখলে তার তো কষ্ট হয় বাবা।”

মায়ের কথা শুনে ছেলেটির মুখখানি যেন দুঃখে ভার হয়ে গেল। একটু কিছু ভাবল ছেলেটি। তারপর বলল, “তা হলে মা, আমি পাখিকে ছেড়ে দিই। এখন তো পাখি ভাল হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আকাশে উড়তে পারবে।”

মা এ-কথার কোনও উত্তর দিল না। কেমন যেন স্নেহমাখা চোখে চেয়ে রইল ছেলের দিকে।

ছেলেটি খাঁচার কাছে এগিয়ে গেল। টুটু এতক্ষণ খাঁচার ওপর ঠোঁটের আঘাত করছিল। ছেলেটিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয় পেল টুটু। উড়ে গেল। ছেলেটির মাথার ওপর উড়তে-উড়তে চেঁচাতে লাগল, “ভয় পেও না জয়, আমি আছি।”

ছেলেটি খাঁচার দরজা খুলে ফেলল। হাত বাড়িয়ে দিল জয়ের দিকে। জয় ঝটপটানি শুরু করে দিল খাঁচার ভেতর। সে এখন সত্যি ভয় পেয়েছে! জয় ভাবল, তবে কি ছেলেটি তাকে মারবে!

কিন্তু না। নরম হাতের মুঠির ভেতর আলতো করে ধরে সে জয়কে বাইরে নিয়ে এল। জয়ের মুখের কাছে নিজের মুখটি এনে স্থির চোখে তাকাল খানিক। তারপর বলল, “ওরে পাখি, তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আমি এতদিন তোকে কত ভালবেসেছি। কত যত্ন করেছি। বিশ্বাস কর, আমি কিন্তু একটুও জানতুম না, এই খাঁচার ভেতর বন্দী থেকে আমার এত যত্নেও তুই কষ্ট পেয়েছিস। আজ বুঝতে পেরেছি, তোকে বন্দী করে আমি ভুল করেছি। আমি তোর কেউ নই। তোর বন্ধু ওই বনের পাখি। তোর বন্ধু ওই আকাশ। তোর জন্যে আমার মনে যত কষ্টই হোক, তোকে আর আমি দুঃখ দেব না। তুই উড়ে যা পাখি, তোর বন্ধুর সঙ্গে ডানা মেলে আকাশে উড়ে যা। সঙ্গে নিয়ে যা আমার এই ছোট্ট ভালবাসা।” বলে ছেলেটি জয়ের কপালে একটি ছোট্ট চুমু খেয়ে তার হাতের মুঠি খুলে দিল।

জয় চোখের পলকে বাতাসে ডানা মেলে দিল। সেই ছোট্ট ছেলের মাথার ওপর ডানা মেলে উড়তে-উড়তে সে যেন বাতাসে কান্না ছড়িয়ে কঁকিয়ে উঠল, “ও আমার ছোট্ট বন্ধু, এতদিন আমি আমার আপেল-বুড়োর জন্যে দিকে-দিকে ভালবাসা খুঁজে বেড়িয়েছি। পাইনি। আজ আমি পেয়েছি। আমার কপালে এই যে তুমি ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দিলে, এই আমার ভালবাসা। এই ভালবাসাই আমি নিয়ে যাব আপেল-বুড়োর কাছে। ও আমার ছোট্ট বন্ধু, তোমার দয়ার কথা আমি ভুলব না, কোনওদিনও না। তুমি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছ। তুমি সুন্দর। ফুলের চেয়েও সুন্দর। হে বন্ধু, বিদায়! বিদায়!” বলতে বলতে অঝোর ধারায় জয়ের চোখের জল আকাশ থেকে মাটিতে ঝরতে লাগল।

ছেলেটি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আকাশে। তার যেন মনে হল, আকাশের ওই ছোট্ট পাখির কণ্ঠ দিয়ে অনেক কান্নার গান একসঙ্গে বাতাসে লুটোপুটি খাচ্ছে।

উড়তে-উড়তে জয় আনন্দে উত্তাল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “টুটু-উ-উ।”

টুটু ছুটে এল জয়ের কাছে।

জয় উত্তেজনায় হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, “টুটু, আমি পেয়েছি, আপেল-বুড়োর জন্যে ভালবাসা খুঁজে পেয়েছি। ওই আমার ছোট্ট বন্ধু, তার ওই ছোট্ট দুটি ঠোঁট দিয়ে আমার কপালে ভালবাসা এঁকে দিয়েছে। এই ভালবাসাই আমি আপেল-বুড়োর জন্যে নিয়ে যাব। চলো টুটু, এক্ষুনি চলো। দেশে ফিরে যাই!” বলতে বলতে জয় তীব্র গতিতে উড়ে চলল। টুটুও থামল না।

সেই ছোট্ট ছেলেটি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। দেখল, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধু শূন্যে উড়তে-উড়তে হারিয়ে যাচ্ছে, দূরে, অনেক দূরে। তারপর আকাশের সঙ্গে আকাশ হয়ে যেন হারিয়ে গেল। ঠিক তক্ষুনি ছেলেটি গেল মায়ের কাছে। মা’কে জড়িয়ে শূন্য খাঁচাটার দিকে তাকিয়ে রইল ছলছল চোখে।

কতদিন পর আবার দেশে ফিরে এল জয় আর টুটু। শীত চলে গেছে। এখন এখানে বসন্ত। গাছে-গাছে নতুন পাতা। রঙিন ফুল। যত পাখি দেশ ছেড়ে দক্ষিণে গিয়েছিল, তারা সবাই ফিরতে পারেনি। যারা ফিরে এসেছে, তারা আবার গাছে-গাছে গান শুরু করে দিয়েছে।

ফিরে এসেছিল জয় আর টুটুও। জয় হাসিখুশিতে আকাশে লুটোপুটি খেতে-খেতে চিৎকার করছিল, “আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আমি তোমার জয়। আমি তোমার জন্যে ভালবাসা নিয়ে এসেছি।”

হঠাৎ জয় থমকে যায়। ঠিক যেখানে সেই বুড়ো-আপেলগাছ দাঁড়িয়ে ছিল, মনে হচ্ছে, সেখানেই তো সে এসেছে। আপেল-বুড়োকে তো দেখতে পাচ্ছে না! অবাক হয়ে টুটুকে জিজ্ঞেস করে, “আপেল-বুড়োকে দেখছি না তো! তবে কি আমরা অন্য কোথাও চলে এলুম?” বলেই জয় আবার ডাকল, “আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আমি জয়। তোমার জন্যে ভালবাসা নিয়ে এসেছি। এই দ্যাখো, আমার কপালে আঁকা!”

সাড়া পেল না জয়। দেখতে পেল না আপেল-বুড়োকে। তখন সে এখানে-ওখানে, আকাশে-বাতাসে আকুল হয়ে চিৎকার করতে লাগল, “আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো!”

বাতাস ভেসে যায়। কিন্তু আপেল-বুড়োর সাড়া পাওয়া যায় না।

অনেক, অনেকক্ষণ সে ডাকল। জয়কে অমন আকুল হয়ে চিৎকার করতে শুনে একটি পাখি ওর কাছে উড়ে এল। জিজ্ঞেস করল, “কাকে ডাকছ তুমি?”

“এইখানে যে বুড়ো-আপেলগাছ ছিল, তাকে খুঁজছি আমি,” উত্তর দিল জয়।

“আর তো তাকে খুঁজে পাবে না,” পাখি বলল।

“কেন?” জয় ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

পাখি বলল, “সেই বুড়ো-আপেলগাছকে তো কেটে ফেলেছে! জানো না, যেখানে সে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ধুঁকছিল, সেখান দিয়ে নতুন রাস্তা হবে?”

“না-আ-আ-আ!” আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল জয়।

শূন্য আকাশে প্রতিধ্বনি উঠল, ‘না-আ-আ-আ।’ তারপর সেই প্রতিধ্বনি হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে হারিয়ে গেল দূরে, অনেক দূরে।

হারিয়ে গেল দূরে, আরও অনেক দূরে, জয়ও। হারিয়ে গেল আকাশে। তার আকাশ-বন্ধু টুটুর সঙ্গে। আর তারা ফিরল না।

———

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%