ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

সিনোরিতার শেষ শিকার
ছিপছিপে লম্বা, নিখুঁত মুখ-চোখ, কাকের পাখার মতো কালো কুচকুচে একমাথা চুল— এক কথায় যাকে বলে অপূর্ব সুন্দরী, একবার তাকালে চট করে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না৷
কিন্তু রে বেনেট নামে যে-মানুষটি উত্তর আমেরিকার একটি পানাগারের মধ্যে গেলাসের তরল পদার্থে চুমুক দিচ্ছিল, সে মেয়েটির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিল না— কারণ, সেই মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর চাইতেও একজন শক্তসমর্থ অভিজ্ঞ ‘গাইড’ বা পথপ্রদর্শকের সাহায্য ছিল তার কাছে অনেক বেশি প্রয়োজনীয়৷
রে বেনেটের সঙ্গে একই টেবিলে বসেছিল তার বন্ধু ফ্রেড ও মেক্সিকান অনুচর কার্লো৷ পূর্বোক্ত মেয়েটি পানাগারের দরজা খুলে একবার রে-র দিকে দৃষ্টিপাত করল, তারপর এগিয়ে গেল কার্লোর দিকে৷
চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল কার্লো: ‘সিনর! আপনাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সিনোরিতা জেসুসিতা লোপেজ!’
সুন্দরী হাসল৷ অতঃপর উভয়পক্ষের করমর্দন, পরিচয়ের পালা শেষ৷ মেয়েটি এবার চেয়ারে বসে কার্লোর সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করল৷ কয়েক মিনিট পরেই অস্বস্তি বোধ করতে লাগল রে— কার্লো এবং জেসুসিতা যে-ভাষায় কথা বলছিল সেই স্প্যানিশ ভাষা ছিল দুই বন্ধুর কাছে দুর্বোধ্য৷ অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে রে বলে উঠল, ‘ওহে কার্লো, এবার কাজের কথা বলো৷ যে- গাইডটির এখানে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল, তার কী হল?’
কার্লো একটি মৃদু আদরের থাপ্পড় বসাল মেয়েটির কাঁধে: ‘তার সঙ্গে আপনাদের দেখা হয়েছে, সিনর৷ এই অঞ্চলের সেরা গাইড হচ্ছে জেসুসিতা৷ পায়ের ছাপ ধরে যারা ভাল্লুকের সন্ধান বলে দিতে পারে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ওস্তাদ হল এই মেয়েটি৷
কার্লোর কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল ফ্রেড এবং রে৷ দুজনেই বোকার মতো তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে৷ জেসুসিতা এবার হেসে উঠল, তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে স্থান ত্যাগ করল৷
দুই চোখে আগুন জ্বালিয়ে কার্লোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল রে: ‘কার্লো! তুমি কি ইয়ার্কি মারছ আমাদের সঙ্গে?’
‘না সিনর, না,’ দ্রুতবেগে হাত নাড়তে নাড়তে কার্লো জবাব দিল, ‘আমি সত্যি কথাই বলছি৷ ওই মেয়েটির বাবা ছিল মস্ত বড়ো শিকারি৷ আপনারা ভাল্লুক চাইছেন৷ ও ভাল্লুকের সন্ধান দিতে পারবে৷’
‘দেখ কার্লো, অনেক তোড়জোড় করে আমরা গ্রিজলি ভাল্লুক শিকার করতে এসেছি,’ রে তার মেক্সিকান অনুচরকে সাবধান করে দিল: ‘যদি তুমি আমাদের সঙ্গে রসিকতার চেষ্টা কর, তাহলে—’
কার্লো জানাল সিনরদের সে ঠাট্টার পাত্র মনে করে না৷ মেয়ে বলে সিনররা হয়তো জেসুসিতাকে অবজ্ঞা করছেন, কিন্তু এই অঞ্চলের অধিবাসীরা জানে মেয়ে হলেও ভাল্লুক শিকারের পক্ষে জেসুসিতা হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত গাইড৷ বাপ ছিল মস্ত শিকারি৷ বাপের কাছেই শিকারের তালিম নিয়েছে মেয়ে৷
জাগুয়ারের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে জেসুসিতার বাপ৷ বাবার মৃত্যুর পর শিকার এবং পথপ্রদর্শকের পেশা গ্রহণ করেছে জেসুসিতা৷ উপর্যুক্ত তথ্য পরিবেশন করে কার্লো জানাল ওই মেয়েটিকে নির্ভয়ে বিশ্বাস করা চলে, কোনোরকম গোলমাল বা ঝঞ্ঝাটের আশঙ্কা এক্ষেত্রে অমূলক৷ অনেক তর্কবিতর্কের পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুই বন্ধু কার্লোর উপদেশ গ্রহণ করল, স্থির হল মেয়েটিকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখা যেতে পারে৷
পরের দিন শহর থেকে একটু দূরে একটা গোলাবাড়ির কাছ থেকে জেসুসিতাকে তুলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে সকলে যাত্রা করল গ্রিজলি ভাল্লুকের সন্ধানে৷ তাদের গন্তব্যস্থল ছিল টেমেচিক প্রদেশের পশ্চিম দিকে অবস্থিত পাপাগচিক নদীর সন্নিহিত অঞ্চল৷
‘দিনটা ভারি সুন্দর, সিনর,’ ইংরেজিতে বলল জেসুসিতা৷
তার মুখে স্পষ্ট ইংরেজি শুনে দুই বন্ধু চমকে গেল৷ জেসুসিতা সবসময়েই কথা বলেছে স্প্যানিশ ভাষায়, এই প্রথম তার মুখে ইংরেজি শুনল দুই বন্ধু৷ জেসুসিতার ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গিও দেখার মতো৷ চলন্ত ঘোড়ার পিঠের ওপর এমন সহজভাবে সে বসে রয়েছে যে, মনে হয় তার দেহ অশ্বপৃষ্ঠে সংলগ্ন জিনেরই একটা অংশ মাত্র৷ জিনের সঙ্গে লাগানো আছে একটা কারবাইন (এক ধরনের বন্দুক), কটিবন্ধে ঝুলছে ছোরা; পরনে পুরুষের মতো শার্ট আর প্যান্ট, মুখের হাসিতে বেপরোয়া ঔদ্ধত্যের আভাস— দুই বন্ধু মনে মনে স্বীকার করল, হ্যাঁ একটা মেয়ের মতো মেয়ে বটে!
গল্প করতে করতে তারা এগিয়ে চলল৷ জেসুসিতার কথায় জানা গেল বারো বছর বয়স থেকেই সে বাপের শিকার-সঙ্গিনী, এবং ওই সময়েই সে প্রথম জাগুয়ার শিকার করে৷ বাপই তাকে শিখিয়েছে পুমা, জাগুয়ার প্রভৃতি বিড়াল-জাতীয় পশু এবং ভাল্লুকের পদচিহ্ন ধরে কেমন করে অনুসরণ করতে হয়৷ গাছের গায়ে নখের আঁচড় দেখে নখীর স্বরূপ নির্ণয় করার শিক্ষাও সে গ্রহণ করেছে বাপের কাছেই৷ তারপর হঠাৎ একদিন জাগুয়ারের কবলে প্রাণ দিল জেসুসিতার বাবা৷
রে তার আফ্রিকার অরণ্যে অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করল৷ হাতি, গণ্ডার, সিংহ প্রভৃতি হিংস্র জন্তু শিকারের রোমাঞ্চকর কাহিনি সাগ্রহে শুনতে লাগল জেসুসিতা৷ একটি আহত সিংহকে অনুসরণ করার ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিল রে; গল্পটা যখন খুব জমে উঠেছে, ঠিক তখনই হল ছন্দপতন— ধাঁ করে জিনের গায়ে লাগানো বন্দুকটা তুলে নিয়ে গুলি চালিয়ে দিল জেসুসিতা৷
*‘পেকারি,’ চেঁচিয়ে উঠল ফ্রেড৷
‘না, সিনর, সাধারণ বুনো শুয়োর,’ সংশোধন করে দিল জেসুসিতা৷
মাথা নেড়ে তাকে সমর্থন জানাল কার্লো৷
একটু জোরে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে মৃত জন্তুটাকে কার্লো নিয়ে এল৷ মালবহনকারী ঘোড়াগুলির ভিতর একটির পিঠে শূকরের মৃতদেহ বেঁধে নিয়ে আবার এগিয়ে চলল শিকারির দল৷
বন্দুকের শূন্য ঘরে একটা নতুন টোটা ভরে হাসল মেয়েটি, ‘এবার বেশ মজা করে শুয়োরের মাংস খাওয়া যাবে, কি বলো?’
রে অবাক হয়ে গিয়েছিল, বিস্মিত কণ্ঠে সে বললে, ‘তোমার হাতের টিপ খুব ভালো৷’
‘না, টিপ ভালো নয়, তবে খুব তাড়াতাড়ি আমি গুলি চালাতে পারি,’ জেসুসিতা বলল, ‘কোনো জানোয়ার কাছাকাছি থাকলে আমি বুঝতে পারি... আচ্ছা, এবার সেই সিংহের ব্যাপারটা বলো৷’
অসমাপ্ত কাহিনিটা এবার শেষ করার জন্য তাগাদা দিল সুন্দরী৷
গল্পটা শেষ হতেই কার্লো জানাল মধ্যাহ্নভোজনের সময় হয়েছে৷
...বিকালের দিকে পরস্পরের শিকারের অভিজ্ঞতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে তারা এগিয়ে চলল৷ মাঝে মাঝে গল্প থামিয়ে কার্লোকে পথের নির্দেশ দিচ্ছিল জেসুসিতা— কোন পথে গেলে ভাল্লুকের সন্ধান পাওয়া যাবে সেটা জানিয়ে দেওয়াই তো তার আসল কাজ, ওইজন্যই তাকে নিযুক্ত করেছে রে বেনেট৷ দূরবর্তী পর্বতমালার দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে তার বক্তব্য জানাচ্ছিল তরুণী গাইড৷
সন্ধ্যার সময়ে একটা পাহাড়ের তলা দিয়ে ঘুরে যাওয়ার সময়ে হঠাৎ রে-র চোখ পড়ল ওপরের দিকে, মনে হল পাথরগুলোর ফাঁকে ফাঁকে একটা চলন্ত ছায়ামূর্তির যেন আভাস পাওয়া যাচ্ছে৷ কাঁধের রাইফেল হাতে নামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷ বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, পাথরের আড়াল থেকে আবার দেখা দিল ছায়ামূর্তি, সঙ্গেসঙ্গে গর্জে উঠল রে-র হাতের রাইফেল৷ দূরত্ব ছিল প্রায় আড়াইশো গজের মতো, তবু লক্ষ্য ব্যর্থ হল না— ওপর থেকে গড়াতে গড়াতে পাহাড়ের নীচে এসে পড়ল একটা পুমার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ৷
‘গুলিটা চমৎকার চালিয়েছ,’ মন্তব্য করল জেসুসিতা৷
সঙ্গিনীর সামনে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরে মনে মনে খুশি হয়ে উঠল রে৷ সঙ্গে সঙ্গে তার এ-কথাও মনে হল যে, লক্ষ্য ব্যর্থ হলে লজ্জার সীমা থাকত না৷
অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে দেখে শিকারির দল তাঁবু ফেলল৷ পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু৷ রাত্রের দিকে একটা পাহাড়ের নীচে এসে পড়ল সবাই৷ কার্লো জানাল এই জায়গাটা স্থায়ীভাবে তাঁবু খাটানোর পক্ষে অত্যন্ত উপযুক্ত৷ অতএব, সেখানেই তাঁবু পড়ল৷
পরের দিন সকাল থেকেই শিকার অভিযান শুরু হল৷ শিকারের সঙ্গী হিসাবে ফ্রেড পছন্দ করল কার্লোর সান্নিধ্য, আর একদিকের জুটি হল মেক্সিকো-সুন্দরী জেসুসিতা লোপেজ এবং রে বেনেট৷ পর পর তিনদিন ধরে চলল শিকার-পর্ব৷ জেসুসিতা আর রে-র গুলিতে প্রাণ হারাল অনেকগুলি হরিণ আর পুমা, কিন্তু গ্রিজলি ভাল্লুকের দেখা পাওয়া গেল না৷ আরও দুটো দিন কাটল৷ ভাল্লুকদের মধ্যে কেউ শিকারিদের সঙ্গে দেখা করতে এল না৷ ফলে রে-র মেজাজ হয়ে উঠল উত্তপ্ত৷ মেজাজের দোষ নেই, গ্রিজলি ভাল্লুক শিকার করার জন্যই উত্তর আমেরিকার পার্বত্য অঞ্চলে হানা দিয়েছিল রে বেনেট৷ আফ্রিকার জঙ্গলে সিংহ শিকার করেও তৃপ্ত হয়নি সে, মাংসাশী পশুদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর জীব গ্রিজলি ভাল্লুকের সঙ্গে রাইফেল হাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামতে চেয়েছিল শিকারি রে বেনেট৷ পর পর পাঁচদিন ঘুরেও ভাল্লুকের সাক্ষাৎ না-পেয়ে সে বিরক্ত হয়ে উঠল, মনে হল জেসুসিতা লোপেজ নামে মেয়েটিকে ভাল্লুক শিকারের গাইড হিসাবে নিযুক্ত করে সে ভুল করেছে৷ সে ভাবতে লাগল, সুন্দরীর বন্দুকের টিপ ভালো বটে, কিন্তু ভাল্লুকের সন্ধান বলে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা তার নেই৷ কার্লোর কথায় মেয়েটির ওপর এতটা নির্ভর করা উচিত হয়নি৷
জেসুসিতার মেজাজও ভালো ছিল না, কথায় কথায় হঠাৎ দুজনের মধ্যে তর্ক বাধল৷ ফলে তপ্ত বাক্যস্রোত ছুটল এবং পরের দিন যখন শিকারির অভিযান শুরু হল তখন দেখা গেল জুটি বদল হয়েছে— কার্লোর সঙ্গে জুটেছে জেসুসিতা, ফ্রেডের সঙ্গী হয়েছে রে বেনেট৷
এখানে গল্প বলা থামিয়ে গ্রিজলি ভাল্লুক সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলছি৷ ওই জন্তুটির স্বভাব-চরিত্র এবং দৈহিক-শক্তির বিষয়ে যেসব পাঠক অবহিত নন, তাঁদের পক্ষে পরবর্তী ঘটনার ভয়াবহতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়— সেইজন্যই গল্প থামিয়ে বর্তমান প্রসঙ্গের অবতারণা৷
গ্রিজলি ভাল্লুকের দেহের ওজন বাঘ অথবা সিংহের চাইতে অনেক বেশি৷ বাঘ-সিংহের মতো চটপটে না হলেও ক্ষিপ্রতার অভাব গ্রিজলি পুষিয়ে নিয়েছে প্রচণ্ড দৈহিক শক্তি দিয়ে৷ ভারতীয় বাঘ এবং আফ্রিকার সিংহ কখনো দলবদ্ধ বন্য মহিষের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস করে না, কিন্তু গ্রিজলি ভাল্লুক বাইসনের পালে হানা দিয়ে শিকার সংগ্রহ করেছে এমন ঘটনা খুব বিরল নয়৷ জীবতত্ত্ববিদের মতে গ্রিজলি ভাল্লুক হচ্ছে মাংসাশী পশুদের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র, সবচেয়ে শক্তিশালী জীব৷ ভারতীয় ভাল্লুক কখনো কখনো মৃত পশুর মাংস ভক্ষণ করে বটে, কিন্তু জীবিত প্রাণী শিকার করে উদর পূরণের চেষ্টা সে করে না— ফলমূল, মধু প্রভৃতি নিরামিষ খাদ্যেই সে জীবনধারণ করতে অভ্যস্ত৷ নিরামিষে গ্রিজলির আপত্তি নেই, তবে শিকারের তপ্ত রক্তমাংসই তার প্রধান খাদ্য৷ পূর্বোক্ত ভয়ংকর জীবটিকে শিকার করার জন্যই ওই অঞ্চলে পদার্পণ করেছে রে আর ফ্রেড, বর্তমান কাহিনির জন্মও সেই কারণে৷
হ্যাঁ, ফেলে-আসা গল্পটাকে এবার আমরা আবার শুরু করতে পারি৷ আগেই বলেছি মন-কষাকষির ফলে রে আর জেসুসিতার জুটি বদল হয়েছে— শিকার অভিযানের ষষ্ঠ দিনে রে-র সঙ্গী ফ্রেড, মেক্সিকো-সুন্দরী জেসুসিতার সঙ্গ নিল কার্লো৷ সকলেই যাত্রা করেছিল অশ্বপৃষ্ঠে৷
একটা পাহাড়ের ওপর নাটকীয় সাক্ষাৎকার! তলা থেকে পাহাড় বেয়ে উঠছে দুই বন্ধু, এমন সময়ে আচম্বিতে কোথা থেকে তাদের সামনে আবির্ভুত হল বিপুলবপু এক গ্রিজলি ভাল্লুক৷ মুহূর্তের দৃষ্টি-বিনিময়, পরক্ষণেই পাহাড়ের গায়ে সারি সারি গাছের ফাঁকে শ্বাপদের দ্রুত অন্তর্ধান৷
বন্ধুকে তলা দিয়ে ঘোড়া চালাতে বলে পাহাড়ের উপরদিকে অশ্বপৃষ্ঠে অগ্রসর হল রে৷ এক মাইলের প্রায় এক চতুর্থাংশ যখন পার হয়ে এসেছে রে-র ঘোড়া, সেই সময় হঠাৎ রে শুনতে পেল রাইফেলের আওয়াজ৷
আওয়াজটা এসেছে তলা থেকে, অতএব শব্দের উৎসস্থল যে বন্ধুবর ফ্রেডের রাইফেল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ ঘোড়ার লাগাম টেনে স্থির হয়ে দাঁড়াল রে, তারপর কান পেতে অপেক্ষা করতে লাগল নূতন শব্দতরঙ্গের জন্য—
শব্দ এল, রাইফেলের যান্ত্রিক কণ্ঠ নয়— মনুষ্যকণ্ঠে চিৎকার৷ ফ্রেডের কণ্ঠস্বর বুঝতে পারল রে, কিন্তু দূর থেকে বন্ধুর বক্তব্য বুঝতে পারল না সে৷ আহত ভাল্লুক যদি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ে, তবে নিশ্চয়ই আর একবার রাইফেলের আওয়াজ শোনা যাবে— আর শ্বাপদ যদি নিহত হয়, তবে পর পর তিনবার শোনা যাবে রাইফেলের শব্দ, এই ব্যবস্থাই ছিল দুই বন্ধুর মধ্যে৷ এখন একবারের বেশি রাইফেলের আওয়াজ শোনা গেল না, তাই রে বুঝল গ্রিজলি ফ্রেডকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে৷ রাইফেলের শব্দটা এসেছে বাঁ-দিক থেকে, অতএব সেই দিকেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল রে৷
ঝোপজঙ্গলের বাধা ঠেলে ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াল রে-র ঘোড়া, সঙ্গেসঙ্গে ২৫ গজ দূরে আত্মপ্রকাশ করল পলাতক গ্রিজলি৷
প্রকাণ্ড ভাল্লুকটাকে দেখে ঘাবড়ে গেল রে-র ঘোড়া, সে হঠাৎ পিছনের দুটি পায়ে খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ রাইফেল বাগিয়ে ধরার চেষ্টা করছিল রে, কিন্তু তার চতুষ্পদ বাহন আচম্বিতে দ্বিপদ জীবে পরিণত হওয়ার ফলে ভারসাম্য হারিয়ে রে লম্বমান হল মাটির উপর এবং উইনচেস্টার রাইফেলটাও ছিটকে পড়ল হস্তচ্যুত হয়ে৷
মাটিতে শুয়েই সে ভাল্লুকটাকে দেখতে পেল৷ তার সামনে প্রায় ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে রক্তাক্ত শ্বাপদ— জন্তুটার পাঁজরের ওপর হাঁ করে রয়েছে একটা মস্ত ক্ষতচিহ্ন, আর সেখান থেকে ঝরঝর ঝরছে লাল রক্তের ধারা৷ রে বুঝল আজ তার রক্ষা নেই, ছিটকে পড়া রাইফেলটাকে উদ্ধার করার সময় আর পাওয়া যাবে না৷
তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর জীবন্ত পরোয়ানা!
মুহূর্তের জন্য রে-র মানসপটে ভেসে উঠল জেসুসিতার মুখ, তারপরেই বুকের উপর গুরুভার বস্তুর প্রচণ্ড চাপে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার যাতনাদায়ক অনুভূতি, পরক্ষণেই তার চেতনাকে লুপ্ত করে নামল মূর্ছার অন্ধকার...
জ্ঞান ফিরে পেয়ে রে দেখল তার ভূপতিত দেহের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কার্লো আর ফ্রেড এবং তার বাঁ-হাত জড়িয়ে অবস্থান করছে ছেঁড়া কাপড়ের একটা রক্তাক্ত আবরণ৷ অনাবৃত ঊর্ধ্ব-অঙ্গের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল তার শার্ট ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত, বাঁ-হাতটাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে তার দুই সঙ্গী৷
‘তোমার হাতটা ভীষণ জখম হয়েছে,’ ফ্রেড বলল, ‘তবে শরীরের অন্য কোথাও আঘাত লাগেনি৷’
‘তোমরা ঠিক সময়েই এসে পড়েছ,’ রে-র কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার আভাস৷
সঙ্গীদের সাহায্যে ধরাশয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল রে৷ এবার ভূপতিত গ্রিজলির মৃতদেহটা তার দৃষ্টিগোচর হল৷ রে দেখল ভাল্লুকের ঘাড়টা মুচড়ে প্রকাণ্ড মাথাটা বেঁকে গেছে একদিকে এবং তার কণ্ঠদেশ বিদীর্ণ করে জেগে উঠছে একটা সুদীর্ঘ ক্ষতচিহ্ন৷ রে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল এমন অদ্ভুত ক্ষতরেখার উৎপত্তি হল কেমন করে— রাইফেলের বুলেট তো এমন অদ্ভুতভাবে গলা কেটে ফেলতে পারে না!
রে প্রশ্ন করল, ‘জেসুসিতা কোথায়?’
‘শোন সিনর,’ গভীর বিষণ্ণ কণ্ঠে কার্লো বলল, ‘আমি আর জেসুসিতা একইসঙ্গে বেরিয়েছিলাম বটে, কিন্তু একটু পরেই আমাকে ছেড়ে দিয়ে মেয়েটি তোমাকে অনুসরণ করেছিল৷ শিকারির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বোধ হয় আসন্ন বিপদের আভাস পেয়েছিল মেয়েটি— আমার সঙ্গে যাত্রা করলেও একটু পরে আমাকে ছেড়ে সে তোমার পিছু নিয়েছিল৷ ভাল্লুক যখন তোমাকে আক্রমণ করে, সেই সময় সে বন্দুক ব্যবহার করতে সাহস পায়নি— কারণ তোমরা এত কাছাকাছি ছিলে যে গুলি চালালে তোমার প্রাণহানির সম্ভাবনা ছিল৷ বন্দুক ফেলে ছুরি হাতে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভাল্লুকের ওপর৷’
এইবার কার্লোর পাশে মাটির ওপর শায়িত প্রাণহীন দেহটাকে দেখতে পেল রে— ঘোড়ার জিন থেকে একটা কম্বল নিয়ে মৃতদেহের ওপর আবরণ টেনে দেওয়া হয়েছে, মরণঘুমে ঘুমিয়ে আছে মেক্সিকো-সুন্দরী সিনোরিতা জেসুসিতা লোপেজ!
আফ্রিকার অভিশাপ
১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে ‘সিয়েরা লিওন’ নামক স্থানে উপস্থিত হলেন একজন ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার৷ ভদ্রলোকের নাম হ্যারি উইগিনস৷
যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় সিয়েরা লিওন ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ৷ পূর্বোক্ত অঞ্চলের সৈন্যবাহিনীর জন্য পানীয় জল সরবরাহের বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলেন ব্রিটিশ সরকার৷ ওই পরিকল্পনাগুলিকে কার্যকরী করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার হ্যারি উইগিনস সুদূর ইংল্যান্ড থেকে আফ্রিকার মাটিতে পদার্পণ করলেন৷
বেশ কিছুদিন কাজ করার পর বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সরকারের পক্ষ থেকে হ্যারিকে পাঠানো হল রিজেন্ট নামক একটি নিগ্রো পল্লিতে৷ জায়গাটার নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলেন হ্যারি৷ কিন্তু জলের রিজার্ভয়ার বসাতে গিয়ে তিনি দেখলেন, পরিকল্পনা কার্যকরী করার প্রধান বাধা হচ্ছে ঘনসন্নিবিষ্ট লতাগুল্ম ও ঝোপজঙ্গলের নিবিড় সমাবেশ৷ জলের পাইপ বসাতে গেলে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা দরকার, অতএব একদল স্থানীয় মজুরকে জঙ্গল সাফ করার কার্যে নিযুক্ত করা হল৷
কয়েকদিন ভালোভাবেই কাজ চলল৷ তারপরই হল গোলমালের সূত্রপাত৷ একদিন সকাল বেলা কার্যস্থলের কাছাকাছি এসে হ্যারি অনুভব করলেন, চারিদিকে বিরাজ করছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা৷ মজুরদের কোলাহল অথবা জঙ্গলের ওপর ম্যাচেট নামক ধারালো অস্ত্রের আঘাতজনিত শব্দ একেবারেই শোনা যাচ্ছে না৷ সব চুপচাপ৷
এই অস্বাভাবিক নীরবতার কারণ অনুসন্ধান করতে অকুস্থলের দিকে সবেগে পদচালনা করলেন হ্যারি৷ যথাস্থানে গিয়ে হ্যারি দেখলেন, মজুরেরা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সামনে মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উপরে ঝুলছে এক অদ্ভুত দোলনা৷
দোলনাটাকে টাঙানো হয়েছে একটা ময়লা কাপড়ের সাহায্যে৷ নানারকম আজেবাজে জিনিস রয়েছে দোলনার ভিতরে৷ ওইসব জিনিসের মধ্যে যে-বস্তুটি হ্যারির দৃষ্টি আকৃষ্ট করল সেটি হচ্ছে সবুজ রং-এর একটি বোতল৷
বোতলটা শূন্যগর্ভ নয়, তার মধ্যে রয়েছে খানিকটা তরল পদার্থ৷ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে হ্যারি বুঝলেন, উক্ত তরল পদার্থটি ময়লা জল ছাড়া আর কিছুই নয়৷
একটা বিশ্রী দোলনার সামনে এতগুলো কাজের লোক কাজ না-করে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে হ্যারি খেপে গেলেন৷ মজুরদের সর্দারের কাছে কৈফিয়ত চাইতেই সে জানাল, ওটা ভূতের ওঝার জাদু; ওই বিপজ্জনক জাদুর দোলনাটা সরিয়ে নিলেই তারা মন দিয়ে কাজ করতে পারে৷
এই কথা শুনে হ্যারি দৃঢ়পদে দোলনার দিকে অগ্রসর হলেন! সঙ্গেসঙ্গে সমবেত জনতা ‘হাঁ হাঁ’ করে উঠল— মজুররা সভয়ে জানাল ‘মাসা’ যেন ওই দোলনা স্পর্শ না-করেন; কারণ যে-ওঝা ওখানে জাদু খাটিয়েছে, একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া অপর কেউ ওই দোলনা স্পর্শ করলে তার মৃত্যু অবধারিত৷
আফ্রিকাতে উইচ-ডক্টর বা ভূতের ওঝার প্রতাপ সাংঘাতিক৷ স্থানীয় মানুষ ওঝাদের যমের মতো ভয় করে৷ কিন্তু হ্যারি উইগিনস ইংরেজ; তিনি যখন শুনলেন, যে-ওঝা এই কাণ্ড করেছে তাকে ডেকে আনতে হলে পুরো একটা দিন বসে থাকতে হবে, তখন তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটল৷
লাথি মেরে দোলনাটাকে তিনি পাঠিয়ে দিলেন ঘন জঙ্গলের গর্ভে!
দারুণ আতঙ্কে নিগ্রো মজুরের দল মাটিতে শুয়ে পড়ল৷ একটু পরে মুখ তুলে তারা দেখল তাদের ‘মাসা’ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং তাঁর দেহের উপর মৃত্যুর কোনো লক্ষণ নেই৷
নিগ্রো মজুররা আশ্চর্য হয়ে গেল৷
তারা ভেবেছিল দোলনাতে লাথি মারার সঙ্গেসঙ্গে মাসার মৃত্যু হবে, কিন্তু হ্যারিকে জীবিত দেখে তাদের ধারণা হল ভূতের ওঝার চাইতে মাসা অনেক বড়ো জাদুকর৷
এমন ক্ষমতাশালী জাদুকর সহায় থাকলে আর ভয় কীসের? অত্যন্ত আশ্বস্ত হয়ে মজুরের দল কাজে লেগে গেল৷
তারপরেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা৷
দোলনাতে লাথি মারার এক সপ্তাহের মধ্যেই হ্যারি দেখলেন, তাঁর ডান হাতের মধ্যম আঙুলটি ভীষণ ফুলে উঠেছে, সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে দারুণ যন্ত্রণা৷
হ্যারি নিকটবর্তী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন৷ ওই চিকিৎসকটি শ্বেতাঙ্গ নন, চিকিৎসাশাস্ত্রে সুপণ্ডিত এক স্থানীয় অধিবাসী৷ দোলনাঘটিত ব্যাপারটি ইতিমধ্যেই উক্ত নিগ্রো চিকিৎসকের কানে এসেছিল, আঙুলের চিকিৎসা না-করে তিনি হ্যারিকে ওঝার সঙ্গে মিটমাট করার পরামর্শ দিলেন৷
বিজ্ঞানসম্মত ইউরোপীয় পদ্ধতিতে সুপণ্ডিত এক নিগ্রো চিকিৎসকের কাছে হ্যারি এমন ব্যবহার আশা করেননি৷ হ্যারি চিকিৎসা করার জন্যই চিকিৎসকের কাছে এসেছিলেন, উপদেশ চাইতে আসেননি৷ চটে-মটে তিনি স্থানত্যাগ করলেন৷ স্থানীয় নিগ্রো বন্ধুরাও হ্যারিকে বার বার ওঝার সঙ্গে দেখা করতে অনুরোধ করলেন, কিন্তু হ্যারি কারুর কথায় কান দিলেন না৷ তাঁর আঙুলের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হতে লাগল৷
ওই সময়ে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে আবির্ভুত হল এক দারুণ সংক্রামক জ্বরব্যাধি৷ সংক্রামক জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে নিগ্রো পল্লি ছেড়ে হ্যারি ‘ফ্রি-টাউন’ শহরে উপস্থিত হলেন এবং সেখানকার মিলিটারি হাসপাতালের শরণাপন্ন হলেন৷
হ্যারিরও জ্বর হয়েছিল৷ প্রায় চার মাস পরে সুস্থ হয়ে তিনি কার্যস্থলে ফিরে গেলেন৷ তাঁর আঙুলটা কিন্তু মিলিটারি হাসপাতালের নিপুণ চিকিৎসাকেও পরাজিত করল, আঙুলের ক্ষত কিছুতেই আরোগ্য লাভ করল না৷ হ্যারি ডান হাতটাকে একটা কাপড়ে বেঁধে গলার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতেন৷
হ্যারির বন্ধুবান্ধব এবং তাঁর অধীন নিগ্রো মজুররা বার বার তাঁকে ওঝার সঙ্গে দেখা করে মিটমাট করতে উপদেশ দিল৷ কিন্তু হ্যারি তাঁর সংকল্পে অটল, কিছুতেই তিনি ওঝার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেন না৷
হঠাৎ একদিন সকালে ওঝা নিজেই এল হ্যারির সঙ্গে দেখা করতে৷ ওঝার পোশাক- পরিচ্ছদে— অবশ্য যদি সেটাকে পরিচ্ছদ বলা যায়— সত্যিই কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল৷ তার অধমাঙ্গের কিছু অংশ আবৃত করে ঝুলছে বাঁদরের চামড়া এবং উক্ত বানরচর্মের সঙ্গে সংলগ্ন হয়েছে মানুষের হাতের হাড়, কঙ্কাল-করোটি, শুষ্ক গিরগিটি প্রভৃতি বিচিত্র ও বীভৎস জন্তু৷
পরস্পরের ভাষা বুঝতে যদি অসুবিধা হয়, সেজন্য হ্যারি তাঁর নিগ্রো ভৃত্যকে ওঝার সামনে হাজির করলেন৷ ভৃত্যটি ওঝার সান্নিধ্য পছন্দ করেনি, কিন্তু প্রভুর আদেশে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হল৷
অবশ্য কথাবার্তা বলতে বা বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হল না৷ আফ্রিকায় প্রচলিত ‘পিজিন ইংলিশ’ নামে অশুদ্ধ ইংরেজিতে কথোপকথন চলছিল৷
হ্যারির জিজ্ঞাস্য হল, ওঝার জাদুবিদ্যা তাঁকে আফ্রিকার মাটি থেকে বিতাড়িত করতে পারেনি কেন?
ওঝা জানাল, সে আশ্চর্য হয়েছে এবং সেইজন্যই সে মাসার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে৷ ওঝা আরও জানাল যে হ্যারির আঙুলের ক্ষত সে ভালো করে দিতে পারে, অবশ্য মাসা যদি তার সঙ্গে মিটমাট করতে সম্মত হয়৷
হ্যারি ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, ‘তুমি জাদুবিদ্যার সাহায্যে আমাকে মারতে পারবে না৷ এমনকী অস্ত্রের সাহায্যেও তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না৷’
নিজের গুলিভরা রিভলভার তিনি ওঝার হাতে দিয়ে বললেন, ‘যদি সাহস থাকে আমাকে গুলি করে মারো৷’
ওঝা রিভলভারটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, তারপর অস্ত্রটাকে হ্যারির হাতে ফেরত দিয়ে জানাল, এত ছোটো বন্দুক ছুড়তে সে অভ্যস্ত নয়৷
হ্যারি তৎক্ষণাৎ ভৃত্যকে তাঁর রাইফেল নিয়ে আসতে আদেশ করলেন৷
রাইফেল এল৷ ওঝা বলল, বন্দুক ছুড়তে তার ভালো লাগে না, সে তরবারি চালনা করতেই অভ্যস্ত৷
নাছোড়বান্দা হ্যারি ভৃত্য পাঠিয়ে নিকটবর্তী এক সৈনিক বন্ধুর কাছ থেকে একটা আর্মি সোর্ড আনালেন এবং সেই তলোয়ারটা তুলে দিলেন ওঝার হাতে৷
ওঝা অস্ত্রটার ধার পরীক্ষা করে শূন্যে দুই একবার তরবারি আস্ফালন করল, তারপর বলল, শ্বেতাঙ্গদের অস্ত্র সে ব্যবহার করতে পারবে না— অতএব এই তলোয়ার দিয়ে কোনো মানুষকে হত্যা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
আফ্রিকার স্মারক-চিহ্ন হিসাবে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা তরবারি ক্রয় করেছিলেন হ্যারি, এইবার সেই অস্ত্রটাকে তিনি ওঝার হাতে তুলে দিলেন৷
তলোয়ারটা সে হ্যারির হাতে ফিরিয়ে দিল৷
হ্যারি কিন্তু তাকে ছাড়লেন না৷ এক ধাক্কায় ওঝাকে মাটিতে ফেলে তিনি তলোয়ারের ফলা তার কণ্ঠদেশে স্থাপন করলেন, তারপর বললেন, ‘তুমি আমাকে মারতে পারবে না৷ কিন্তু আমি তোমাকে হত্যা করব৷ এখনই হত্যা করব৷’
বলাই বাহুল্য, লোকটিকে হত্যা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা হ্যারির ছিল না৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তাকে বে-ইজ্জত করার জন্যই হ্যারি এত কাণ্ড করছিলেন৷ দারুণ হাসির আবেগে তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, অবরুদ্ধ হাস্যকে দমন করার চেষ্টায় তিনি প্রাণপণে ক্রোধের অভিনয় করছিলেন৷
নিগ্রো ভৃত্যটি তাঁর কম্পিত কণ্ঠস্বরে অবরুদ্ধ হাস্যের পরিবর্তে নিদারুণ ক্রোধের আভাস অনুমান করে আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল৷
ওঝা কিন্তু বিশেষ ভয় পায়নি৷ হ্যারির হাতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সে বলল, ‘মাসা! ওই ওষুধটাই তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে৷’
হ্যারি সচমকে নিজের হাতের দিকে তাকালেন৷ দুই হাতের কবজির ওপর একসময় তিনি শখ করে উলকি আঁকিয়েছিলেন৷ ওঝা জানাল ওই উলকির চিহ্নই নাকি তাঁকে রক্ষা করেছে৷
ওঝা অসন্তুষ্ট হয়নি৷ সে হ্যারিকে আফ্রিকা ত্যাগ করতে বলল৷ সে আরও বলল, মাসা যদি আফ্রিকা না-ছাড়েন তবে তাঁর আঙুলের ঘা কিছুতেই সারবে না৷
ওঝার কথা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল৷ হ্যারি যতদিন আফ্রিকাতে ছিলেন ততদিন তাঁর আঙুলের ক্ষত তাঁকে যন্ত্রণা দিয়েছে৷ আফ্রিকা ছেড়ে ইংল্যান্ডে উপস্থিত হওয়ার পর তাঁর আঙুলের ঘা শুকিয়ে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে আরোগ্যলাভ করেন৷
উপরে বর্ণিত কাহিনিটি মনগড়া গল্প নয়, বাস্তব সত্য৷ কাহিনির স্থান, কাল, পাত্রের নামও যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে, কোনো কিছুর পরিবর্তন করা হয়নি৷
বোম্বেটে ব্ল্যাক বিয়ার্ড ও রবার্ট মেনার্ড
সাত সাগরের বুকে জাহাজ ভাসিয়ে যেসব জলদস্যু ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তাক্ত করে তুলেছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর, হিংস্র ও ভয়ংকর মানুষ হচ্ছে বোম্বেটে-সর্দার এডওয়ার্ড টিচ ওরফে এডওয়ার্ড ব্ল্যাক বিয়ার্ড৷ সাধারণ মানুষের কথা তো ছেড়েই দিলাম, দুর্ধর্ষ জলদস্যুরাও তাদের দলপতি ব্ল্যাক বিয়ার্ডকে যমের মতোই ভয় করত৷ ব্ল্যাক বিয়ার্ড তাঁর দলকে পরিচালনা করত কঠোর হস্তে৷ ক্রুদ্ধ হলে তার হাতে শত্রুমিত্র কারুরই রক্ষা ছিল না৷ উক্ত বোম্বেটে-দলপতির দৈহিক শক্তি ছিল অসাধারণ৷ একটা জোয়ান মানুষকে সে মাথার ওপর তুলে ফেলতে পারত অনায়াসে৷ বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের ওপর সন্ত্রাস ও বিভীষিকার রাজত্ব চালিয়েছিল বোম্বেটে ব্ল্যাক বিয়ার্ড৷ তার অধীনে জলদস্যুরা বহু জাহাজ লুঠ করেছিল এবং ওইসব জাহাজের নাবিক ও যাত্রীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল ব্ল্যাক বিয়ার্ডের আদেশ অনুসারে৷ কোনো মানুষকেই ভয় করত না ব্ল্যাক বিয়ার্ড৷ দ্বন্দ্বযুদ্ধে সে ছিল দুর্জয় যোদ্ধা৷
একদিন রাজকীয় নৌবহরের দুটি জাহাজ বোম্বেটে ব্ল্যাক বিয়ার্ডের জাহাজকে আক্রমণ করল৷ উক্ত জাহাজ দুটিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেনার্ড৷ প্রচণ্ড হট্টগোল ও মারামারির মধ্যেও মেনার্ডের সন্ধানী দৃষ্টি ব্ল্যাক বিয়ার্ডকে আবিষ্কার করতে সমর্থ হল৷ তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে বোম্বেটে দলপতিকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানালেন অসিধারী মেনার্ড৷ বলাই বাহুল্য সেই আহ্বানে সাড়া দিতে এক মুহূর্তও বিলম্ব করেনি বোম্বেটে ব্ল্যাক বিয়ার্ড৷ শুরু হল যুদ্ধ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্ল্যাক বিয়ার্ড বুঝল এ-শত্রু সহজ নয়— সে আজ শক্ত পাল্লায় পড়েছে৷ একবার এগিয়ে, একবার পিছিয়ে এবং চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ ধরে লড়াই চলল৷ দুই যোদ্ধারই সর্বাঙ্গ হল ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত৷ অবশেষে সমুদ্রের দিকে সংঘটিত যাবতীয় দ্বন্দ্বযুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এই লড়াই শেষ হয়ে গেল মেনার্ডের তরবারির এক দ্রুত সঞ্চালনে— জাহাজের রক্তরঞ্জিত পাটাতনের ওপর লুটিয়ে পড়ল মরণাহত ব্ল্যাক বিয়ার্ডের ঘৃণিত শরীর৷
তখনকার দিনে প্রচলিত সূক্ষ্মাগ্র সোর্ড বা সোজা তলোয়ার নিয়ে লড়াইটা হয়নি— দ্বন্দ্বযুদ্ধটা হয়েছিল কাটলাস (cutlass) নামক বাঁকা তলোয়ার নিয়ে৷
গিলস বোথাম ও টম ব্রাস
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ঠিক ক্রিসমাসের আগে লন্ডনের একটি ক্লাবে গিলস বোথাম ও টম ব্রাস নামক দুই ভদ্রলোকের মধ্যে ভীষণ তর্ক শুরু হল৷ তর্কের বিষয়বস্তু খুবই তুচ্ছ, কিন্তু শ্লেষসিক্ত কণ্ঠের বাদানুবাদের ফল হল অতিশয় মারাত্মক৷ বোথামের ক্রুদ্ধ কণ্ঠের চ্যালেঞ্জ তর্কযুদ্ধকে টেনে আনল ‘পিস্তল-ডুয়েল’ নামক ভয়াবহ দ্বৈরথের প্রাণঘাতী সম্ভাবনার মধ্যে৷ সাধারণত দিনের আলোতেই দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়ে থাকে৷ কিন্তু উত্তেজিত ভদ্রলোক দুটি আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারকে উপেক্ষা করেই তৎক্ষণাৎ ফয়সালা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন৷ ক্লাবের মধ্যে ‘ডুয়েল’ লড়া সম্ভব নয়, অতএব নিকটস্থ একটি মাঠের দিকে দুজনে রওনা হলেন৷ মধ্যস্থ হিসাবে দুটি সঙ্গী জোগাড় করতেও তাঁদের দেরি হয়নি৷ তখন তুষারপাত হচ্ছে৷ পিস্তলের নিশানা অস্পষ্ট করে তুলেছে সন্ধ্যার ছায়া— দুই প্রতিযোগী অন্ধকারকে অগ্রাহ্য করে পিস্তল তুললেন৷ মধ্যস্থের নির্দেশ পাওয়ামাত্র গুলি ছুড়লেন বোথাম৷ তাঁর লক্ষ্য ব্যর্থ হল৷ এবার পিস্তল তুললেন টম ব্রাস এবং ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর নিশানা স্থির করতে লাগলেন৷ মধ্যস্থ দুজন ও বোথাম বুঝলেন আজ আর রক্ষা নেই৷ কারণ, টম ব্রাস হলেন ‘ক্র্যাক-শট’— তাঁর হাতের গুলি কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না৷ নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলেন বোথাম৷ পিস্তলের লক্ষ্য স্থির করে গুলি চালাতে উদ্যত হলেন টম ব্রাস— আর ঠিক সেই মুহূর্তে নীরবতা ভঙ্গ করে সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে এল ক্রিসমাসের সংগীত-ধ্বনি৷ টম শুনলেন সুরের জাল বুনতে বুনতে গায়করা সমগ্র মানবজাতিকে পরস্পরের প্রতি প্রীতি ও স্নেহপরায়ণ হতে অনুরোধ করছে— অদ্ভুতভাবে সেই সংগীত টমের হূদয়কে পরিবর্তিত করল৷ উদ্যত পিস্তল নামিয়ে নিলেন টম ব্রাস...
যে ক্লাবঘরের ভিতর পূর্বোক্ত দ্বন্দ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, আবার সেইখানে দুই যুযুধানকে দেখা গেল, অবশ্যই তাঁদের হাতে পিস্তল ছিল না ছিল কাচের পানপাত্র৷ তাঁরা হাসিমুখে পরস্পরের ‘স্বাস্থ্য পান’ করছেন এবং তাঁদের পানপাত্রে স্থান পেয়েছে দুটি বিভিন্ন জাতের সুরা— যাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রথমে বাগযুদ্ধ ও পরে দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়৷
বেন স্টারডিভ্যান্ট ও জিম বোয়ি
১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ৷ টেক্সাস অঞ্চলে একটি পানাগারের ভিতর বসে তাসের জুয়া খেলা খেলছে একটি অল্পবয়সি কিশোর ও জনৈক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ৷ পূর্বোক্ত পুরুষটি ওই এলাকার একটি কুখ্যাত জুয়াড়ি ও দুর্ধর্ষ গুন্ডা— নাম, বেন স্টারডিভ্যান্ট৷ কিশোরটির নাম— ল্যাটি মোর৷
খেলা চলছে, ছেলেটি হেরে যাচ্ছে বার বার৷ তীব্র উত্তেজনায় তার বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত; বার বার বাজি হারছে বটে কিন্তু খেলা ছেড়ে ওঠার নাম করছে না৷
হঠাৎ পানাগারের দরজা ঠেলে একটি লোক ভিতরে প্রবেশ করল৷ খেলোয়াড়দের উপর একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে আগন্তুক একটু চমকে উঠল— কিশোরের পিতার সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত৷ ছেলেটি তাকে চিনতে না-পারলেও নবাগত মানুষটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বন্ধুপুত্রকে শনাক্ত করতে পেরেছিল৷ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আগন্তুক বুঝল ল্যাটি মোরকে অসৎভাবে ঠকিয়ে বাজির টাকা জিতে নিচ্ছে জুয়াড়ি বেন৷ অনভিজ্ঞ কিশোরের চোখে পাকা জুয়াড়ির জুয়াচুরি ধরা পড়ছে না, পরমানন্দে ল্যাটি মোরকে ঠকিয়ে তার টাকাগুলো পকেটস্থ করছে বেন স্টারডিভ্যান্ট৷
নবাগত মানুষটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে খেলা দেখল, তারপর ধীরপদে এগিয়ে এসে কিশোর ল্যাটি মোরের কাঁধে হাত রাখল: ‘তুমি চিনতে পারবে না, কিন্তু তোমার বাবা পারবেন৷ আমি তোমার পিতৃবন্ধু৷ তোমার তাস নিয়ে আমাকে একটু খেলতে দাও৷’
ল্যাটি মোর সম্মত হয়ে জায়গা ছেড়ে দিল, তার স্থান গ্রহণ করল নবাগত মানুষ৷ কিছুক্ষণ খেলার পর দেখা গেল বেন জুয়াচুরি করে যে-টাকাগুলো ল্যাটি মোরের কাছ থেকে জিতে নিয়েছিল, সেই টাকা আবার নবাগত মানুষটি জিতে নিয়েছে৷ শুধু তাই নয়— সর্বসমক্ষে বেন স্টারডিভ্যান্টের অসাধু আচরণের কথা প্রকাশ করে দিল আগন্তুক৷ টাকাগুলো অবশ্য সে পকেটস্থ না-করে ল্যাটি মোরকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেইসঙ্গে কিছু উপদেশ, ‘সাবধান! ভবিষ্যতে কখনো জুয়া খেলবে না৷’
মুখের শিকার ছিনিয়ে নিলে বাঘ যেমন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, বেন স্টারডিভ্যান্টের অবস্থাও হল সেইরকম৷ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে সে ছোরা বার করে আগন্তুককে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাল৷
বেচারা স্টারডিভ্যান্ট! সে ভাবতেও পারেনি, যে-লোকটিকে ছোরার ‘ডুয়েল’ লড়তে চ্যালেঞ্জ করেছে সেই লোকটি হচ্ছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা জিম বোয়ি! ছোরার লড়াইতে জিমের সমকক্ষ কোনো যোদ্ধা সে সময়ে ছিল না৷
জিম আত্মপরিচয় দিল না৷ ছোরা নিয়ে সে দ্বন্দ্বযুদ্ধের উদযোগ করল৷ লড়াই শুরু হল ‘মেক্সিকান ডুয়েল’ নামক রীতি অনুসারে৷ তখনকার দিনে ছোরা হাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধ লড়ার যেসব পদ্ধতি ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ‘মেক্সিকান ডুয়েল’৷ এই পদ্ধতি অনুসারে লড়াই করার আগে যোদ্ধাদের বাঁ-হাত দুটি শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয় এবং লড়াই শুরু করার নির্দেশ পাওয়ামাত্র খোলা ডান হাতে ছোরা নিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরকে আঘাত করতে থাকে নির্মমভাবে৷
পূর্বোক্ত রীতি অনুসারে লড়াই চলল কিছুক্ষণ ধরে৷ কয়েকবার নিজের ছোরা দিয়ে প্রতিপক্ষের আঘাত প্রতিহত করল জিম, তারপর হঠাৎ বিদ্যুদবেগে আঘাত হানল শত্রুর ডান হাতের উপর৷ শানিত ছুরিকা মুহূর্তের মধ্যে বেন স্টারডিভ্যান্টের দক্ষিণ হস্তে বিদ্ধ হল, দারুণ যাতনায় ছুরি খসে পড়ল স্টারডিভ্যান্টের হাত থেকে৷ জিমের হাতের ছোরা আবার ঝলসে উঠল, কিন্তু না— প্রতিদ্বন্দ্বীর দেহে নয়— দুই যোদ্ধার বাঁ-হাত আটকে যে দড়ির বাঁধনটা শক্ত হয়ে বসেছিল সেই দড়িটাকেই দংশন করল জিমের অস্ত্র৷
অসহায় বেনকে অনায়াসে হত্যা করতে পারত জিম, কিন্তু তা না-করে সে উদারভাবে শত্রুর হাতের দড়ি কেটে তাকে মুক্তি দিল৷
জিমের সঙ্গে যারা ছোরা হাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নেমেছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র বেন ছাড়া কোনো মানুষই পৃথিবীর আলো দেখার জন্য জীবিত ছিল না৷
বেন স্টারডিভ্যান্ট ছিল ভাগ্যবান পুরুষ৷
জেফারি হাডসন ও অফিসার ক্রফটস
জেফারি হাডসন ছিল ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসের অত্যন্ত স্নেহের পাত্র৷ অতি ক্ষুদ্রকায় বামন হলেও জেফারি ছিল অতিশয় সাহসী মানুষ৷ একবার রাজার বাগানে কয়েকটি ক্রীড়ারত শিশুকে যখন একটি অতিকায় টার্কি পাখি আক্রমণ করেছিল, সেইসময় তরবারি হাতে পাখিটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জেফারি হাডসন৷ ওই টার্কি পাখির দৈহিক আয়তন জেফারির চাইতে বড়ো ছিল, কিন্তু নিপুণ হাতে তরবারি চালিয়ে পাখিটাকে হত্যা করে হাডসন সেদিন শানিত নখচঞ্চুর আক্রমণ থেকে বিপন্ন শিশুদের রক্ষা করেছিল৷
সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মতোই মর্যাদাবোধ সম্পর্কে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল জেফারি হাডসন৷ একদিন ক্রফটস নামক জনৈক অফিসার হাডসনকে নিয়ে একটু মজা করার চেষ্টা করল৷ হাডসন খেপে গেল, সে ক্রফটসকে আহ্বান করল দ্বন্দ্বযুদ্ধে৷
এতটুকু একটা পুঁচকে মানুষ— রাজার খাবারের বাটির মধ্যে যে আত্মগোপন করে বসে থাকতে পারে— তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ? ক্রফটস তো হেসেই আকুল৷ হাসতে হাসতেই সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল৷ দ্বন্দ্বযুদ্ধে নির্দিষ্ট স্থানে যোগ দিতে এল জেফারি হাডসন৷ ক্রফটসও এসেছিল, তবে তার সঙ্গে তলোয়ার কিংবা পিস্তল ছিল না— অস্ত্র হিসাবে সে বাগিয়ে ধরেছিল একটা জল দেবার পিচকারি৷
দ্বিতীয়বার অপমানে হাডসন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল৷ তার সঙ্গে ছিল একজোড়া পিস্তল— একটা পিস্তল সে ক্রফটসের দিকে ছুড়ে দিয়ে তাকে অস্ত্র ব্যবহার করতে অনুরোধ করল৷
এবার আর পায়ে হেঁটে নয়৷ অশ্বপৃষ্ঠে পিস্তল হাতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরের সম্মুখীন হল৷
বামন জেফারি হাডসনের পিস্তল থেকে নিক্ষিপ্ত গুলি যখন ক্রফটসের বক্ষ ভেদ করল, তখনও তার মুখ থেকে হাসির রেখা মিলিয়ে যায়নি৷
হাসতে হাসতেই মৃত্যুবরণ করল অফিসার ক্রফটস৷
মসিয়ঁ দ্য গ্র্যান্ড প্রি ও মসিয়ঁ লে পিক
১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীর আকাশে এক আশ্চর্য দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়৷ যুদ্ধে যোগদানকারী দুই যোদ্ধার নাম হচ্ছে যথাক্রমে মসিয়ঁ দ্য গ্র্যান্ড প্রি ও মসিয়ঁ লে পিক৷ কোনো কারণে পূর্বোক্ত দুই ভদ্রলোকের মধ্যে মতান্তর ঘটেছিল, যার ফলে তাঁরা স্থির করলেন বেলুনে উঠে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করে তাঁদের কলহের মীমাংসা করবেন৷ খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মতো৷ যখনকার কথা বলছি সেই সময় ইউরোপের মানুষ, বিশেষ করে ফরাসিরা, কথায় কথায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে নেমে পড়তেন৷ কাজেই পূর্বোক্ত দুই ভদ্রলোকের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ব্যাপারটা এমন কিছু অভিনব ছিল না৷ কিন্তু আকাশে বেলুন উড়িয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিকল্পনা ইতিপূর্বে কারো মাথায় আসেনি৷ অতএব নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে সেই চমকপ্রদ ও অভূতপূর্ব দ্বৈরথের ফলাফল দর্শন করার জন্য ভিড় করল এক বিপুল জনতা৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই যোদ্ধাদের নিয়ে আকাশে উড়ল দুটি বেলুন৷ প্রত্যেক বেলুনের মধ্যে যুযুধানদের সঙ্গে ছিলেন একজন করে মধ্যস্থ৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই অট্টালিকাগুলোর মাথা ছাড়িয়ে দুটি বেলুন বেশ উপরে উঠে গেল৷ মাটি ছাড়িয়ে প্রায় আধ মাইল উপরে যখন বেলুনরা উড়ছে, সেই সময়ে মসিয়ঁ লে পিক তাঁর ‘ব্লান্ডারব্যাস’ (এক ধরনের বন্দুক) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে লক্ষ করে অগ্নিবর্ষণ করলেন৷ তাঁর লক্ষ্য ব্যর্থ হল৷ এইবার গুলি ছুড়লেন মসিয়ঁ গ্র্যান্ড প্রি৷ তাঁর নিক্ষিপ্ত গুলি মসিয়ঁ লে পিকের শরীর স্পর্শ করল না বটে, কিন্তু বেলুনের দেহ বিদ্ধ করে বেলুনটাকে ফাটিয়ে দিল৷ হতভাগ্য লে পিক ও তাঁর সঙ্গী মধ্যস্থকে নিয়ে বেলুনটা সবেগে আছড়ে পড়ল একটা বাড়ির ছাদের উপর এবং সেই আঘাতের বেগ সামলাতে না-পেরে দুটি মানুষই ঢলে পড়লেন মৃত্যুর ক্রোড়ে৷
হিউজ গ্লাস ও গ্রিজলি ভাল্লুক
ইতিহাসে যেসব দ্বন্দ্বযুদ্ধের ঘটনা পাওয়া যায়, সেইসব ঘটনার নায়করা যে সবসময় যুদ্ধের রীতি নীতি পালন করেছে এ-কথা বলা যায় না— কারণ মানুষের বিরুদ্ধে মানুষই যে সব সময় দ্বৈরথ রণে অবতীর্ণ হয়েছে এমন কথা বলা যায় না৷ পশু ও মানুষের দ্বন্দ্বযুদ্ধও ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করেছে একাধিকবার৷ ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে হিউজ গ্লাস নামক এক বিখ্যাত সীমান্তরক্ষী ও অভিযাত্রী আমেরিকার ‘রকি মাউন্টেন’ অঞ্চলে এক বিশালকায় গ্রিজলি ভাল্লুকের সম্মুখীন হয়েছিল৷ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিরাট ওই ভাল্লুক ছিল নয় ফুট লম্বা৷ হিউজ তার বন্দুক ব্যবহার করার চেষ্টা করল৷ গুলি লাগতেই ভাল্লুকটা খেপে গিয়ে তেড়ে এল হিউজের দিকে৷ দ্বিতীয়বার গুলি চালানোর আগেই প্রকাণ্ড এক থাবার আঘাতে হিউজের বন্দুকটা দূরে ছিটকে পড়ল এবং ভাল্লুকের পরবর্তী চপেটাঘাত হিউজকে করল ধরাশায়ী৷ রক্তাক্ত ও অবসন্ন দেহ নিয়ে হিউজ টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর কোমর থেকে শানিত ছুরিকা কোষমুক্ত করে চতুষ্পদ প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ বার বার ছুরিকাঘাত করে হিউজ তার শত্রুকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার চেষ্টা করছিল৷ কিন্তু ভাল্লুকটা তাকে এমন ভীষণভাবে জড়িয়ে ধরেছিল যে, হিউজের মনে হচ্ছিল তার শরীরের হাড়গুলি বুঝি এখনই ভেঙে যাবে৷
দেহের শেষ শক্তি জড়ো করে প্রাণপণে ছুরি চালাতে লাগল হিউজ...
হঠাৎ শিথিল হয়ে গেল ভাল্লুকের ভয়াবহ আলিঙ্গন, ধীরে ধীরে মাটির উপর লুটিয়ে পড়ল শ্বাপদের প্রাণহীন দেহ৷ হিউজ যুদ্ধে জয়ী হল বটে, কিন্তু ভাল্লুকের নখদন্ত তাকে প্রায় মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল৷ শরীরের মারাত্মক ক্ষতগুলি নিরাময় হতে বেশ সময় লেগেছিল; দীর্ঘ কয়েক মাস যন্ত্রণা ভোগ করার পর সুস্থ হয়ে উঠেছিল হিউজ গ্লাস৷
প্রতিশোধ
ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের একটি করদ-রাজ্যে একদা সংঘটিত এক ঘটনার ভয়াবহ বিবরণী শুনলে মনে হয় অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী প্রকৃতি দেবী কখনো কখনো তাঁর বন্য সন্তানের ওপর মানুষের অত্যাচার দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং তখনই তাঁর প্রতিশোধপরায়ণ ন্যায়দণ্ড নেমে আসে হতভাগ্য অপরাধীর মাথার উপর অদৃশ্য অমোঘ বজ্রের মতো!
ঘটনাটি নীচে দেওয়া হল...
বহু বৎসর আগে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের একটি অরণ্যসংকুল করদ রাজ্যে পদার্পণ করেছিলেন জনৈক ইউরোপের অধিবাসী; ভদ্রলোকের নাম ফ্র্যাঙ্ক বাক৷ নিছক দেশভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করার জন্য ফ্রাঙ্ক বাক সাহেব ভারতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন অর্থ উপার্জনের আশায়৷ ফ্র্যাঙ্ক বাকের পেশা ছিল অতিশয় অভিনব, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জীবন্ত বন্য পশু ধরে দেশবিদেশের সার্কাস ও চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষের কাছে জন্তুগুলোকে সরবরাহ করতেন তিনি, বিনিময়ে গ্রহণ করতেন প্রচুর অর্থ৷
ভারতবর্ষে তিনি এসেছিলেন কয়েকটা বাঘের জন্য৷ ইউরোপের একটি বিখ্যাত চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কয়েকটি ভারতীয় ব্যাঘ্র সংগ্রহ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন এবং ওইসব জীবন্ত ও বিপজ্জনক পণ্যের জন্য উক্ত প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ অর্থ দিতে সম্মত ছিলেন সেই টাকার অঙ্কটা মোটেই তুচ্ছ মনে করতে পারেননি ফ্র্যাঙ্ক বাক সাহেব৷
অতএব সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে ভদ্রলোক পদার্পণ করলেন ভারতের মাটিতে৷
যে করদ রাজ্যে ফ্র্যাঙ্কবাক উপস্থিত হয়েছিলেন, সেই রাজ্যে সরকারি চাকরি করতেন তাঁরই এক বন্ধু৷ উক্ত বন্ধুবর ছিলেন ইউরোপের মানুষ৷ তাঁর সঠিক নাম ফ্র্যাঙ্ক বাক আমাদের বলেননি, অতএব আমরা তাঁকে ‘মি. এক্স’ নামেই অভিহিত করব৷ করদ রাজ্যটির নাম জানাতেও বাক সাহেব রাজি নন, তাই পূর্বোক্ত রাজ্যটির নামও আমরা দিতে পারলাম না৷
যাই হোক, নামধাম জানতে না-পারলেও কাহিনির রসগ্রহণ করতে বোধ হয় আমাদের বিশেষ অসুবিধা হবে না—
যথাস্থানে পৌঁছে ফ্র্যাঙ্ক বাক খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলেন ওই রাজ্যের বনে-জঙ্গলে বাঘের অভাব নেই৷ ফ্র্যাঙ্কের বন্ধু পূর্বোক্ত মি. এক্স জানালেন সেইদিনই একটা মস্ত বাঘ মহারাজের ফাঁদে ধরা পড়েছে৷ বাঘটি এখন রাজার সম্পত্তি৷ তবে বাক সাহেব যদি জন্তুটাকে দেখতে চান তাহলে মি. এক্স তাঁকে অকুস্থলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন৷ বলাই বাহুল্য ফ্র্যাঙ্ক বাক জন্তুটাকে দেখতে চাইলেন এবং বন্ধুবর মি. এক্সের সঙ্গে যাত্রা করলেন নির্দিষ্ট স্থানের উদ্যেশে৷ একটু পরেই ধৃত পশুটিকে দেখতে পেলেন বাক সাহেব৷ এমন প্রকাণ্ড বাঘ ইতিপূর্বে কখনো তাঁর চোখে পড়েনি৷ কিন্তু সেইসঙ্গে এমন আর একটি দৃশ্য তাঁর দৃষ্টিগোচর হল, যা দেখার জন্য তিনি আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না৷
একটা সংকীর্ণ খাঁচার মধ্যে আবদ্ধ হয়েছে পূর্বোক্ত ব্যাঘ্র এবং খাঁচার গরাদের ফাঁকে লোহার সাঁড়াশি দিয়ে জনৈক ব্যক্তি চেপে ধরেছে বাঘের থাবা; আর একজন লোক অতিশয় মনোযোগ সহকারে থাবার নখগুলোকে উৎপাটিত করছে লৌহনির্মিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে৷ অতি সংকীর্ণ খাঁচার মধ্যে বাঘের নড়াচড়া করারও উপায় নেই, তাই ক্রোধে ও যাতনায় বার বার গর্জন করে বাঘ এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে— কিন্তু আত্মরক্ষার কোনো চেষ্টাই করতে পারছে না৷
ফ্র্যাঙ্ক বাক তাঁর বন্ধুর কাছে জানতে চাইলেন, এমন নিষ্ঠুরভাবে জন্তুটাকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে কেন? উত্তরে বন্ধুবর জানালেন, বাঘের থাবাগুলো থেকে এক-এক করে সবকয়টি নখই তুলে ফেলা হবে, কারণ এই কাজ করার আদেশ দিয়েছেন করদ-রাজ্যের অধীশ্বর স্বয়ং!
অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ফ্র্যাঙ্ক বাক স্থানত্যাগ করলেন৷
পরের দিন সকালে বাক সাহেবের আস্তানায় উপস্থিত হলেন মি. এক্স৷ বন্ধুর মুখে ফ্র্যাঙ্ক জানলেন বাঘটির সঙ্গে ছয়টি কুকুরের লড়াই হবে— রাজামশাই জানিয়েছেন মি. ফ্র্যাঙ্ক বাক যদি বাঘ আর কুকুরের লড়াই দেখতে চান, তবে যেন মি. এক্স-র সঙ্গে সেইদিনই সন্ধ্যার পর যথাস্থানে গমন করেন৷ অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে বাক সাহেব জানালেন বাঘের থাবা থেকে নখ তুলে ফেলা হয়েছে মাত্র বারো ঘণ্টা আগে, তার পায়ের ক্ষত থেকে এখনও নিশ্চয় রক্ত ঝরে পড়ছে— এই অবস্থায় ছয়টি হিংস্র কুকুরের বিরুদ্ধে বাঘকে যদি লড়াই করতে বাধ্য করা হয়, তবে সেটা লড়াই হবে না, হবে হত্যাকাণ্ড! এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড দেখার প্রবৃত্তি যে তাঁর নেই, সেই কথাই জানিয়ে দিলেন ফ্র্যাঙ্ক বাক৷
মি. এক্স জানালেন, বাঘের থাবা থেকে নখগুলোকে উৎপাটিত করেই রাজামশাই ক্ষান্ত হননি, তাঁর নির্দেশে বাঘের মুখটাকেও চামড়া দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে— সুতরাং বাঘ শুধু তার নখ থেকেই বঞ্চিত হয়নি, তার মুখের ধারালো দাঁতগুলিও এখন সম্পূর্ণ অকেজো৷ মি. এক্স আরও জানালেন, যে কুকুরগুলোকে বাঘের উপর লেলিয়ে দেওয়া হবে, সেগুলোর জন্ম হয়েছে অতি-বৃহৎ হাউন্ড-জাতীয় কুকুর ও বন্য নেকড়ের সংমিশ্রণে! ওই বর্ণসংকর নেকড়ে-কুকুরের আকৃতি-প্রকৃতি নেকড়ের চাইতেও ভয়ংকর৷ অতি ভয়াবহ ছয়-ছয়টি এমন রক্তলোলুপ জানোয়ারের আক্রমণে নখদন্তহীন অসহায় ব্যাঘ্রের শোচনীয় মৃত্যু দেখে আনন্দ পাবেন রাজামশাই আর সেই রাজকীয় পুলকের অংশগ্রহণ করার জন্যই ফ্র্যাঙ্ক বাক সাহেবকে সাদরে আহ্বান জানাচ্ছেন করদ-রাজ্যের অধীশ্বর; মহারাজের তরফ থেকেই উক্ত নিমন্ত্রণবার্তা বহন করে এনেছেন মি. এক্স৷
অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ফ্র্যাঙ্ক বাক জানালেন এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখতে তিনি ইচ্ছুক নন, আর মি. এক্স-এর মধ্যে যদি কিছুমাত্র মনুষ্যত্ব বোধ থাকে তবে তিনিও নিশ্চয়ই অকুস্থলে অনুপস্থিত থাকবেন৷
মুখ নীচু করে অস্পষ্ট স্বরে মি. এক্স জানালেন ওইরকম অনুষ্ঠানে যোগ দেবার আগ্রহ তাঁর নেই, কিন্তু যথাস্থানে না-গেলে তাঁর চাকরি থাকবে না বলেই নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে তাঁকে রাজ-আদেশ পালন করতে হবে৷
ক্রুদ্ধ ফ্র্যাঙ্ক বাক অতঃপর যে মন্তব্য করেছিলেন সেটা বন্ধুবরের পক্ষে আদৌ সম্মানজনক নয়৷ মি. এক্স চুপ করে বন্ধুর কটু উক্তি শুনলেন, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন একটি কথাও না-বলে...
সেদিনটা খুব ঘোরাঘুরি করার ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন ফ্র্যাঙ্ক বাক, তাই সন্ধ্যার একটু পরেই আহারাদির পালা শেষ করে নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মনোনিবেশ করলেন৷ ঘুমটা বেশ জমে এসেছিল, অকস্মাৎ তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করল বহু মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত কোলাহল-ধ্বনি৷ কান পেতে শব্দটা শুনতে শুনতে সাহেব অনুভব করলেন, প্রাসাদের দিক থেকে, অর্থাৎ যেখানে বাঘ আর কুকুরের লড়াই হওয়ার কথা সেই দিক থেকেই ভেসে আসছে জনতার কোলাহল৷
একটু পরেই একটা যান্ত্রিক শব্দ শোনা গেল, মনে হল বন্দুকের শব্দ৷ তারপরেই আবার বহু মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর৷
ফ্র্যাঙ্ক বাক শব্দতত্ত্ব নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামালেন না, শ্রান্ত শরীরকে আবার সমর্পণ করলেন নিদ্রার ক্রোড়ে৷
পরের দিন প্রভাতেই আবার বাক সাহেবের আস্তানায় আবির্ভুত হলেন মি. এক্স৷ বন্ধুকে সম্বোধন করে তিনি বললেন, ‘ওহে ফ্র্যাঙ্ক! কাল রাতে কী হয়েছিল জান?’
নীরস স্বরে ফ্র্যাঙ্ক বাক বললেন, ‘জানাজানির কী আছে? বাঘের মৃত্যু ছিল অবশ্যম্ভাবী৷ তাই হয়েছে নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ বাঘটা মারা পড়েছে বটে; তবে ওইসঙ্গে মারা গেছে একটি কুকুর, আর—’
‘আর?’
‘আর মহারাজের শিশুপুত্র!’
‘বল কী?’ আশ্চর্য হয়ে গেলেন ফ্র্যাঙ্ক বাক, ‘এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটল কী করে?’
অতঃপর মি. এক্স-এর মুখ থেকে যে আশ্চর্য ঘটনার বিবরণ শুনেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক বাক তা হচ্ছে এই:
একটা বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণের মাঝখানে ধৃত বাঘটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল৷ প্রাঙ্গণের চারপাশ ঘিরে দণ্ডায়মান সুউচ্চ প্রাচীরের ওপর থেকে প্রাচীর-বেষ্টিত আঙিনার দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা ছিল৷ বাঘ আর কুকুরের লড়াই দেখার জন্য পূর্বোক্ত স্থানে আসন গ্রহণ করেছিলেন রাজামশাই৷ মজা দেখার জন্য রাজ্যের বহু মানুষও সেখানে সমবেত হয়েছিল৷ নিরাপদে বসে পশুদের হানাহানি দেখার জন্যই রাজামশাই প্রাচীরবেষ্টিত ওই গোলাকৃতি প্রাঙ্গণটি তৈরি করেছিলেন৷ একটু পরেই প্রাচীরের গাত্র-সংলগ্ন দ্বারপথে ছয়টা নেকড়ে-কুকুর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজাটা আবার বন্ধ করে দেওয়া হল৷ কুকুরগুলো প্রথমে বাঘের কাছে আসতে চায়নি, দূরে দাঁড়িয়ে তারা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ডোরাদার জন্তুটিকে নিরীক্ষণ করতে লাগল৷ কিন্তু বাঘকে নিশ্চেষ্ট ও নীরব দেখে তাদের সাহস হল, এগিয়ে এসে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বোধ হয় তারা বাঘের অসহায় অবস্থা বুঝতে পারল— সঙ্গেসঙ্গে শুরু হল আক্রমণ৷ থাবা থেকে তখনও রক্ত ঝরছে, মুখও রয়েছে বাঁধা— তবু বাঘের শরীরের মর্মস্থানে কুকুরের দংশন মারাত্মক হয়ে চেপে বসতে পারল না— অদ্ভুত কৌশলে মাটির ওপর গড়াগড়ি দিয়ে বাঘ আত্মরক্ষা করতে লাগল৷ মাঝে মাঝে দু-একটা কুকুর কামড় বসাতে পারছিল বটে, কিন্তু সেই কামড় মারাত্মক দংশনে পরিণত হওয়ার আগেই বাঘ তার বিশাল গুরুভার দেহ দিয়ে এত জোরে প্রাচীরের দেয়ালের সঙ্গে আততায়ীদের চেপে ধরছিল যে, চাপের যাতনায় আর্তনাদ করে কুকুরগুলো কামড় ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছিল৷ এইভাবে প্রায় আধঘণ্টা লড়াই চলার পরেও দেখা গেল বাঘের দেহ প্রায় অক্ষত, কুকুরের দাঁত বাঘের শরীরে কোথাও রক্ত ঝরাতে পারেনি৷ হঠাৎ একটা কুকুর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঘের গলায় দাঁত বসিয়ে দিল৷ কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে না-পেরে বাঘ এইবার তার থাবা ব্যবহার করল— এক থাপ্পড়ে সে কুকুরটাকে তার গলার ওপর থেকে সরিয়ে দিল৷ বাঘের থাবা থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল, চড় মারার সময়ে তার চোখে-মুখে যে যন্ত্রণার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল সেটাও দর্শকদের চোখ এড়িয়ে যায়নি৷ আচমকা মার খেয়ে কুকুরটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল৷ দারুণ আক্রোশে সে আবার লাফ দিল বাঘের কণ্ঠদেশ লক্ষ করে৷ কুকুরের দুর্ভাগ্য— তার কামড় বাঘের গলার উপর পড়ল না, দাঁত বসল মুখ-বাঁধা চামড়ার ফাঁসের উপর৷ অন্ধ আক্রোশে কুকুরটা সেই চামড়ার বাঁধনটাকেই কামড়ে ধরল প্রাণপণে৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধারালো দাঁতের পেষণে কেটে গেল চামড়া— কিন্তু বাঘের মুখ তখনও সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হল না৷ এমন শক্ত করে চোয়ালের দু-পাশ দিয়ে মোটা চামড়ার বন্ধনী দেওয়া হয়েছিল যে, এক পাশের চামড়া কুকুরের কামড়ে ছিঁড়ে গেলেও অন্যদিকের চামড়ার বাঁধন বাঘকে পুরোপুরি হাঁ করতে দিল না— শুধু মুখের একদিক ফাঁক হয়ে বেরিয়ে এল একটিমাত্র দাঁত৷ তৎক্ষণাৎ সেই একটিমাত্র দাঁতের সম্পূর্ণ সদব্যবহার করল বাঘ, থাবা দিয়ে কুকুরটাকে চেপে ধরে বেরিয়ে-আসা দাঁতটাকে সে সজোরে বসিয়ে দিল শত্রুর দেহে৷ আমরা যেভাবে শুকনো খাদ্যের টিন ছুরি দিয়ে কেটে ফেলি, ঠিক সেইভাবেই কুকুরের শরীরটাকে লম্বালম্বিভাবে চিরে ফেলল বাঘ একটিমাত্র দাঁতের আঘাতে৷
কুকুরটা তখনই মারা পড়ল৷ অন্যান্য কুকুরগুলো ভয়ে বাঘের সান্নিধ্য ত্যাগ করে সরে গেল৷ বাঘ তাদের দিকে ফিরেও তাকাল না, লাফ মেরে সে পাঁচিলের উপর ওঠার চেষ্টা করতে লাগল৷
বাঘের লাফালাফিতে প্রথমে বিশেষ চিন্তিত হননি রাজামশাই, কারণ ইতিপূর্বেও অনেকগুলো বাঘ ওই প্রাঙ্গণের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে এবং প্রাচীরের উচ্চতা যে বাঘের নাগালের বাইরে, সেই সত্যও প্রমাণিত হয়ে গেছে অনেকবার৷
কিন্তু বাঘের একটা থাবা যখন পাঁচিলের মাথায় পড়ে ফসকে গেল, তখন রাজামশাই ভীত হয়ে পড়লেন৷ তিনি বুঝলেন এই সৃষ্টিছাড়া জন্তুটার সঙ্গে অন্যান্য বাঘের তুলনা চলে না— থাবায় নখ ছিল না বলেই সে উপরে উঠতে পারেনি, নখ থাকলে সেইবারই সে পাঁচিলের মাথায় নখ বসিয়ে উঠে পড়ত৷ বাঘের থাবা যে বার বার ফসকে যাবে তার কোনো ‘গ্যারান্টি’ নেই, অতএব রাজামশাই একজন ভৃত্যকে বন্দুক আনতে বললেন৷
বাঘ বন্দুকের জন্য অপেক্ষা করল না, প্রচণ্ড এক লম্ফপ্রদান করে সে উঠে পড়ল পাঁচিলের উপর৷ সমবেত জনতার কণ্ঠে জাগল ভয়ার্ত চিৎকার৷
বাঘ কোনোদিকে নজর দিল না, সোজা ছুটল সামনের দিকে৷ প্রাসাদের গায়েই রাজামশাইয়ের যে-বাগানটা ছিল সেই বাগানের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল বিদ্যুদবেগে—
তখন ঘোর গ্রীষ্মকাল, প্রাসাদের ভিতর রাজার একমাত্র শিশুপুত্র গরমে ছটফট করছিল, তাই তাকে নিয়ে বেরিয়েছিল রাজবাড়ির দাসী উদ্যানের মুক্ত বায়ু সেবন করতে৷ একটা ছোটো ঠেলাগাড়ির ওপর শিশু রাজকুমারকে বসিয়ে দাসী বাগানের পথে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, আচম্বিতে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সেখানে হল রুদ্রমূর্তি ব্যাঘ্রের আবির্ভাব৷
রাজপুত্রকে ফেলে দাসী দিল চোঁ চোঁ চম্পট, বাঘ তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করল না, ধেয়ে এল ঠেলাগাড়িতে উপবিষ্ট রাজপুত্রের দিকে৷
ইতিমধ্যে এসে পড়েছে বন্দুক৷ অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠেছে মানুষের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, মৃত্যুশয্যায় লুটিয়ে পড়েছে বাঘ৷ কিন্তু মরার আগে সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে সে পাঠিয়ে দিয়েছে শমন-ভবনে৷
একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে শোকে দুঃখে পাগলের মতো হয়ে গেছেন করদ-রাজ্যের অধীশ্বর৷
ইয়েলো হ্যান্ড ও বাফেলো বিল কোডি
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ১৭ জুলাই আমেরিকার পশ্চিম অংশে যে বিখ্যাত দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেই যুদ্ধের দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ইয়েলো হ্যান্ড ও বাফেলো বিল কোডি৷ রেড ইন্ডিয়ানদের এক দলপতির নাম ইয়েলো হ্যান্ড৷ বাফেলো বিল কোডি ছিল আমেরিকার তদানীন্তন সেনাবাহিনীর জনৈক অশ্বারোহী সৈনিক৷
যুদ্ধটা কী করে ঘটেছিল এইবার সেই কথাই বলছি৷ পূর্বোক্ত অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দল একদিন হঠাৎ আকস্মিকভাবে ‘শেনি’ জাতীয় রেড ইন্ডিয়ানদের একদল যোদ্ধার সামনে পড়ে গেল৷ রেড ইন্ডিয়ানদের ওই দলটা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিল, কিন্তু তারা আমেরিকার অশ্বারোহী সৈন্যদের আক্রমণের চেষ্টা করল না— কারণ, সর্দার ইয়েলো হ্যান্ড ইতিমধ্যেই কোডিকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে দল ছেড়ে এগিয়ে এসেছে৷ হঠাৎ এতগুলো লোকের ভিতর থেকে কোডিকে সর্দার কেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বেছে নিয়েছিল এই প্রশ্নটা হয়তো কারো মনে জাগতে পারে— তাই পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, সেই যুগে বাফেলো বিল কোডি নামটি ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের ক্রোধ আর ঘৃণার বস্তু৷ কারণ রেড ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে বিল কোডি অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিল৷ কোডিকে চিনতে পেরেছিল বলেই সর্দার ইয়েলো হ্যান্ড তাকে দ্বৈরথ রণে আহ্বান করেছিল৷ সর্দারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এল কোডি৷ সর্দারও অগ্রসর হল— দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরকে লক্ষ করে তিরবেগে এগিয়ে আসতে লাগল, হাতে তাদের গুলিভরা রাইফেল৷ ধাবমান ঘোড়ার পায়ে পায়ে মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন খুব কমে এসেছে, তখন হঠাৎ নিজের ‘উইনচেস্টার’ রাইফেল তুলে গুলি ছুড়ল কোডি৷ ইয়েলো হ্যান্ড গুলি চালানোর সময় পেল না, তার আহত ঘোড়া মাটির উপর লুটিয়ে পড়ল৷ পরক্ষণেই কোডি নিজের ধাবমান অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে ধরাশয্যা অবলম্বন করল৷ দুজনেই একসঙ্গে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর পরস্পরকে লক্ষ করে গুলি চালাতে লাগল উন্মাদের মতো৷ যোদ্ধাদের মধ্যে কেউ লক্ষ্য ভেদ করতে পারল না৷ অবশেষে যখন তাদের গুলি ফুরিয়ে গেল তখন অকেজো রাইফেল ফেলে দিয়ে তারা কটিবন্ধের খাপ থেকে টেনে নিল শানিত ছুরিকা৷ সতর্ক দৃষ্টিতে পরস্পরকে নিরীক্ষণ করতে করতে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল দুই যোদ্ধা, দুজনেই প্রতিদ্বন্দ্বীর পাঁয়তাড়ার মধ্যে ফাঁক খুঁজতে খুঁজতে ব্যস্ত... আচম্বিতে যেন এক অদৃশ্য হাতের ইঙ্গিতে দুজনেই ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যু-আলিঙ্গনে আবদ্ধ হল৷ সঙ্গেসঙ্গে ছুরির ফলকে ফলকে জাগল বিদ্যুতের চমক...
কিছুক্ষণের মধ্যেই জয় পরাজয়ের নিষ্পত্তি হয়ে গেল, ছুরিকাঘাতে ছিন্নভিন্ন ইয়েলো হ্যান্ড রক্তাক্ত দেহে মৃত্যুবরণ করল— মৃত্যুপণ দ্বৈরথে জয়লাভ করল বাফেলো বিল কোডি৷ শেনি-রেড-ইন্ডিয়ানরা তাদের সর্দারের মৃত্যুতে অভিভূত হয়ে পড়েছিল৷ একটি কথাও না-বলে তারা নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করল৷
মেজর জেমস জ্যাকসন ও রবার্ট ওয়াটকিন্স
অষ্টাদশ শতাব্দী ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যেসব দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়, সেইসব যুদ্ধে সূক্ষ্ম রুচিবোধ ও উদারতার অভাব থাকলেও ভীষণতার কোনো অভাব ছিল না— পাশবিক হিংসার প্রাণঘাতী উগ্রতায় তৎকালীন দ্বৈরথের ইতিহাস অতিশয় ভয়াবহ৷
১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আমেরিকার দুজন রাজনৈতিক নেতা পিস্তল হাতে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন৷ উক্ত দুই ভদ্রলোকের নাম ছিল মেজর জেমস জ্যাকসন ও রবার্ট ওয়াটকিন্স৷ দুই যোদ্ধাই গুলি ছুড়লেন, দুজনের লক্ষ্যই হল ব্যর্থ৷ আবার পিস্তলে গুলি ভরার চেষ্টা না-করে দুজনেই তিরবেগে ছুটে পরস্পরের নিকটবর্তী হয়ে পিস্তলের নীচে লাগানো ছোটো সঙিনের সাহায্যে শত্রু নিপাতের চেষ্টা করতে লাগলেন৷ ধারালো সঙিনের খোঁচায় দুজনেরই পোশাক-পরিচ্ছদ হল ছিন্নভিন্ন, দেহ হল রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত এবং একসময়ে দেখা গেল শ্রান্ত ক্লান্ত যোদ্ধাদের শিথিল মুষ্টি থেকে অস্ত্র দুটি পড়ে গেছে মাটির উপর৷ লড়াই তখনও শেষ হল না৷ জ্যাকসন আর ওয়াটসন এবার প্রয়োগ করলেন মুষ্টিযুদ্ধ হস্তে মুষ্টিযোগ— শুরু হল দারুণ ঘুসোঘুসি৷ প্রায় ঘণ্টাখানেক মারামারি করার পর দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই জ্ঞান হারিয়ে ধরাশায়ী হলেন৷
এমন সাংঘাতিক লড়াইয়ের পরেও জয় পরাজয়ের নিষ্পত্তি হল না৷ ওই দ্বন্দ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার বেশ কয়েক বৎসর পরেও যোদ্ধাদের কে বড়ো এই নিয়ে ভীষণ তর্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই বাগযুদ্ধ কখনো কখনো রূপান্তরিত হয়েছে প্রচণ্ড মুষ্টিযুদ্ধে৷
অনারেবল সমারসেট বাটলার ও মি. পিটার বারোজ
১৮০০ সালে কিলকেনি ফ্রেল্যান্ড নামক স্থানের নিকটবর্তী এক উন্মুক্ত প্রান্তরে পিস্তল নিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামলেন দুটি ভদ্রলোক৷ ওই ভদ্রলোক দুটির নাম অনারেবল সমারসেট বাটলার ও মি. পিটার বারোজ৷ শেষোক্ত ব্যক্তি ছিলেন ব্যারিস্টার৷ তবে বাটলার সাহেবের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে তিনি আদালতের আশ্রয় না-নিয়ে পিস্তলের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন— অতএব দ্বন্দ্বযুদ্ধ৷ মধ্যস্থের নির্দেশ পাওয়ামাত্রই যোদ্ধাদের পিস্তল গর্জে উঠল৷ বারোজ সাহেব ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলেন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বাটলার অক্ষত দেহ নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন অতি দ্রুত বেগে৷
একজন চিকিৎসক তাড়াতাড়ি ছুটে এসে ধরাশায়ী বারোজকে পরীক্ষা করে বললেন আহত ব্যক্তির মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বহির্গত হবে প্রাণবায়ু৷ কয়েক মিনিট তো দূরের কথা, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আহত বারোজ আর্তনাদ করলেন, তবু অনিবার্য মৃত্যুর কোনো লক্ষণই তাঁর দেহে দেখা দিল না৷ বিস্মিত চিকিৎসক আবার ভালো করে পরীক্ষা শুরু করলেন এবং মরণোন্মুখ বারোজ সাহেবের ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে একগাদা বাদামের সঙ্গে মারাত্মক গুলিটাকেও বার করে ফেললেন৷ চিকিৎসক বুঝলেন পকেটস্থ গাদা গাদা বাদাম আর একটি রৌপ্যমুদ্রার সংঘর্ষে পিস্তলের গুলির শক্তি কমে গিয়েছিল— বুলেট সজোরে আঘাত করে বারোজকে ফেলে দিয়েছিল বটে, কিন্তু বাদাম আর রৌপ্যমুদ্রার কাঠিন্য ভেদ করে বারোজকে জখম করতে পারেনি৷ বারোজ যখন চিকিৎসকের কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনলেন এবং জানলেন এখন আর তিনি মরছেন না, তখন ভারি আশ্চর্য হয়ে তিনি আর্তনাদ থামিয়ে ফেললেন এবং এক লাফে ভূমিশয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন৷ সঙ্গেসঙ্গে তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করল নিকটবর্তী চিকিৎসক ও মধ্যস্থের প্রবল অট্টহাসি৷ মি. পিটার বারোজের কর্ণমূল হল রক্তবর্ণ, চটপট পা চালিয়ে তিনি অকুস্থল ছেড়ে প্রস্থান করলেন দ্রুত বেগে৷
স্যার টমাস দ্য লা মার্চে ও স্যার জন দ্য ভিকঁৎ
১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে স্যার টমাস দ্য লা মার্চে নামক একজন ফরাসি নাইট স্যার জন দ্য ভিকঁৎ নামে জনৈক সম্ভ্রান্ত সাইপ্রিয়টের অধিবাসীকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন৷ একদল খ্রিস্টান সৈন্য তুর্কিদের হাতে বিপন্ন হয়েছিল এবং স্যার টমাসের মতে ওই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী স্যার জন দ্য ভিকঁৎ৷ অভিযোগ শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ভিকঁৎ তাঁর হাতের লৌহ-দস্তানা খুলে টমাসের সামনে ফেলে দিলেন৷ তখনকার দিনে ওইভাবেই একজন আর একজনকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করত— অতএব টমাস ও জনের মধ্যে যুদ্ধ হয়ে পড়ল অবধারিত৷
ইংল্যান্ডের ওয়েস্টমিনিস্টার নামক স্থানে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ডের সামনে পূর্বোক্ত দ্বৈরথ সংঘটিত হয়৷ প্রচলিত রীতি অনুসারে বিপরীত দুই দিক থেকে সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে দুই যোদ্ধা শূল হাতে পরস্পরকে আক্রমণ করলেন৷ কিন্তু প্রথম সংঘর্ষেই শূল দুটি গেল ভেঙে এবং যোদ্ধারাও আঘাতের বেগ সামলাতে না-পেরে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লেন মাটির উপর৷ উভয় যোদ্ধারই দেহ ছিল লৌহবর্মে আবৃত, শূলের ফলক ওই বর্ম ভেদ করতে পারেনি; কিন্তু প্রচণ্ড আঘাতে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে পদাতিকে পরিণত করে দিয়েছিল৷ অশ্বারোহীর পদ থেকে পদাতিক যোদ্ধার অবনত স্থানে নেমে আসলেও যোদ্ধাদের উৎসাহ একটুও কমেনি, কোষ থেকে তরবারি টেনে নিয়ে দুই বীর আবার রণরঙ্গে মেতে উঠলেন৷ তলোয়ারের খেলায় দুই পক্ষই সিদ্ধহস্ত, সংঘাতে সংঘাতে তীব্র ঝংকার-ধ্বনি তুলে ঝকমক জ্বলতে লাগল দুটি ঘূর্ণ্যমান তরবারি— কিন্তু যুযুধানরা কেউ সুবিধা করতে পারলেন না৷ অবশেষে হঠাৎ প্রচণ্ড সংঘর্ষে দু-খানা তলোয়ারই ভেঙে গেল৷ তলোয়ার ভাঙল, কিন্তু যুদ্ধ থামল না৷ লৌহ-দস্তানায় আবৃত বজ্রমুষ্টি তুলে দুই যুযুধান পরস্পরকে আক্রমণ করলেন৷ দুজনেরই সর্বাঙ্গ ছিল লৌহবর্মে ঢাকা, কিন্তু দূরদর্শী ফরাসি বীর যুদ্ধের বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন; তাঁর ডান হাতের দস্তানার বহির্ভাগে বসিয়ে দিয়েছিলেন ধারালো লোহার কাঁটা৷ তীক্ষ্ণ কণ্টক-সজ্জিত সেই লৌহময় বজ্রমুষ্টির প্রহার যখন স্যার ভিকঁতের মুখের উপর বৃষ্টিধারার মতো পড়তে লাগল, তখন তিনি পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন৷ মুখের লৌহ-আবরণ ভিকঁৎকে ওই ভয়াবহ দস্তানার বজ্রমুষ্টি থেকে বাঁচাতে পারল না৷ পরাজিত ভিকঁৎ হলেন ফরাসি বীর টমাসের বন্দি৷ এসব ক্ষেত্রে বিজয়ী যোদ্ধারা পরাজিত বন্দির কাছ থেকে মোটারকম ‘মুক্তিপণ’ দাবি করতেন এবং ওই অর্থ না-পেলে বন্দিকে মুক্তি দিতেন না৷ কিন্তু স্যার দ্যা লা মার্চে কোনো মুক্তিপণ দাবি না-করেই উদারভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন৷
প্রাণ নিয়ে খেলা
‘এমন বিপজ্জনক পেশা ধরলেন কেন আপনি? দুনিয়াতে করে খাওয়ার জন্য আর কোনো পথ কি আপনার চোখে পড়ল না?’
প্রশ্নটি করেছিলেন রাশিয়ার বিখ্যাত বৈমানিক ভ্যালেরি শোলোকভ৷
প্রশ্নের উত্তরে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি বললেন, ‘আপনার পেশাটি আরও বেশি বিপজ্জনক৷’
‘আজ্ঞে না মশাই,’ শোলোকভ হেসে উঠেছিলেন, ‘আপনার সঙ্গে জায়গা বদল করতে আমি রাজি নই৷’
হ্যাঁ, বৈমানিকের পেশা অত্যন্ত বিপজ্জনক বটে, কিন্তু একদল সিংহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখানোর কাজটা আরও বিপজ্জনক আর ভয়াবহ বলে মনে হয়েছিল— সেইজন্যেই সার্কাসের ক্রীড়ামঞ্চে বরিস অ্যাডারের খেলা দেখে উপর্যুক্ত মন্তব্য করেছিলেন রুশ বৈমানিক ভ্যালেরি শোলোকভ৷
বরিস অ্যাডার!
সোভিয়েট রাশিয়াতে সার্কাসের ইতিহাসে একটি নাম৷
রুশ জাতি চিরকালই সার্কাসের খেলায় অত্যন্ত দক্ষ৷ ‘ট্র্যাপিজ’, ‘রিং’, ‘বার’ এবং বিভিন্ন ধরনের জিমনাস্টিকস প্রদর্শনীতে তারা অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে, কিন্তু ১৯৩৫ সালের আগে সার্কাসের আসরে বন্য পশুর খেলায় বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি রাশিয়ার মানুষ৷ রাশিয়ার সার্কাসে হিংস্র জানোয়ার নিয়ে বরাবরই খেলা দেখিয়েছে জার্মান খেলোয়াড়৷ ১৯৩২ সালে রাশিয়ার ভরোনেজ শহরে জনৈক অসাধু জার্মান খেলোয়াড়ের লোভ আর অন্যান্য দাবির ফলে বন্য পশুর ক্রীড়ামঞ্চে একটি স্থানীয় মানুষের আবির্ভাব ঘটল, নাম তার বরিস অ্যাডার৷
ঘটনার সূত্রপাত কী করে ঘটল, সে-কথাই বলছি৷
সোভিয়েট রাশিয়ার ‘সার্কাস বোর্ড’ জনৈক মালিকের কাছ থেকে একদল সিংহ কিনে নিয়েছিল৷ পূর্বোক্ত সিংহদের নিয়ে যে-লোকটি খেলা দেখাত, সেও ছিল জার্মান— নাম কার্ল জেমেবাচ৷ কার্লের বদ্ধমূল ধারণা ছিল সে ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ওই সিংহদের নিয়ে খেলা দেখাতে পারবে না৷
অতএব পারিশ্রমিক অর্থের জন্য তার দাবি বাড়তে লাগল অন্যায়ভাবে এবং দাবি পূরণ না-করলে সে যে দেশে ফিরে যেতে পারে সেই চমৎকার সম্ভাবনার কথাটিও ‘বোর্ড’-কে জানিয়ে দিতে ভুলল না৷
কার্লের অন্যায় ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে ‘বোর্ড’ স্থির করল সিংহের খেলা দেখানোর জন্য অন্য খেলোয়াড় নিযুক্ত করা হবে৷ কিন্তু ব্যাপারটা সহজ নয়৷ রাশিয়ার খেলোয়াড় বিভিন্ন ধরনের সার্কাসের খেলায় দক্ষতা অর্জন করলেও বন্য পশু নিয়ে খেলা দেখাতে অভ্যস্ত নয়৷ সেই সময় বরিস অ্যাডার নামক জিমনাস্টিকসের খেলোয়াড়টি ঠিক করলেন তিনি নিজেই সিংহের খেলা দেখাবেন৷
‘বোর্ড’ প্রথমে আপত্তি তুলল— বুনো জানোয়ার নিয়ে খেলা দেখানো ভীষণ বিপজ্জনক, বিশেষ করে পশুরাজ সিংহকে নিয়ে ‘হাতে খড়ি’ করতে গেলে অনভিজ্ঞ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে যেকোনো মুহূর্তে৷
বরিস অ্যাডার একেবারে নাছোড়বান্দা—
‘বিদেশিরা অন্যায়ভাবে জুলুম করে টাকা আদায় করবে আর আমরা তাদের অন্যায় ব্যবহার সহ্য করব? রাশিয়াতে কি মানুষ নেই?’
অনেক তর্কবিতর্কের পর বোর্ড বরিস অ্যাডারকে সিংহের খেলা দেখাতে অনুমতি দিল৷ জিমনাস্টিকসের খেলায় ইস্তফা দিয়ে বরিস এলেন হিংস্র পশুদের নিয়ে খেলা দেখাতে৷ ‘অ্যানিম্যাল ট্রেনার’ বা পশুশিক্ষক হিসাবে তাঁর শিক্ষানবিশি শুরু হল পশুরাজ সিংহের ভয়াবহ সাহচর্যে৷... মস্কো থেকে খেলা দেখানোর অনুমতি পেয়েই অদূর ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষমাণ চতুষ্পদ ছাত্রদের দর্শন করতে এলেন বরিস অ্যাডার৷ প্রথম দর্শনের অনুভূতি যে খুব উৎসাহজনক হয়নি সে-কথা স্বীকার করতে তাঁর দ্বিধা নেই— অ্যাডার সাহেব সোজাসুজি বলেছেন যে, খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে বিপুলবপু ‘মরুচারী রাজন্যবর্গ’র দেহসৌষ্ঠব নিরীক্ষণ করতে করতে তাঁর সর্বাঙ্গে জেগে উঠেছিল আতঙ্কের শীতল শিহরন— মনে হয়েছিল, এই ভয়ংকর জানোয়ারগুলোকে তিনি কি বশ করতে পারবেন? এদের নিয়ে খেলা দেখানো কি সম্ভব হবে তাঁর মতো অনভিজ্ঞ মানুষের পক্ষে?
প্রথম যেদিন সিংহের খাঁচায় প্রবেশ করলেন বরিস অ্যাডার, সেইদিনই জন্তুগুলোর ভয়ংকর স্বভাবের পরিচয় পেলেন তিনি৷ খাঁচায় ঢোকার সঙ্গেসঙ্গেই তিন-তিনটি সিংহ তাঁকে লক্ষ করে তেড়ে এল৷ আক্রমণোদ্যত সিংহের রুদ্র মূর্তির সামনে বরিস সাহেবের অনভ্যস্ত স্নায়ু বিদ্রোহ ঘোষণা করল— দ্রুতবেগে পিছিয়ে এসে তিনি তাড়াতাড়ি খাঁচার দরজা বন্ধ করে দিলেন, ক্রুদ্ধ সিংহের মুখোমুখি মোকাবেলা করার সাহস সেদিন তাঁর হয়নি৷
কার্ল জেমবাচ তখন একগাল হেসেছিল বটে, কিন্তু পরের দিন যখন বরিস আবার সিংহের খাঁচায় প্রবেশ করলেন এবং দু-দুটো ক্রুদ্ধ সিংহের আক্রমণ এড়িয়ে তাদের নিয়ে খেলা দেখাতে শুরু করলেন, তখন তার মুখের হাসি মুখেই রয়ে গেল৷
কয়েকদিনের মধ্যেই সিংহদের স্বভাবচরিত্র সম্পর্কে অ্যাডার সাহেব সচেতন হয়ে উঠলেন৷ সব মানুষের স্বভাব একরকম হয় না, সিংহদের সম্পর্কেও একই নিয়ম প্রযোজ্য— মানুষের মতো তাদের চরিত্রেও বিভিন্ন দোষগুণের পরিচয় পাওয়া যায়৷ সার্কাসের দলে ‘প্রাইমাস’, ‘রিফি’ এবং ‘মুরাদ’ নামে তিনটি সিংহ ছিল অতিশয় ভয়ংকর ও কোপনস্বভাব, বিন্দুমাত্র সুযোগ পেলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত খেলোয়াড়ের ওপর— আবার ‘আলি’ নামে সিংহটি ছিল খুবই শান্ত ও ভদ্র৷ ওই আলির সঙ্গে বরিস অ্যাডারের বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে উঠেছিল৷ আলি ছাড়া ‘ক্রিম’ নামক আর একটি সিংহও অ্যাডার সাহেবকে বন্ধুত্বের মর্যাদা দিয়েছিল৷ একটি ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে পশুরাজ সিংহও মানুষের ভালোবাসার দাম দিতে জানে৷
একদিন বরিস যখন সিংহদের নিয়ে খেলা দেখাচ্ছেন সেইসময় অতর্কিতে দুটি সিংহ তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে মাটির ওপর পেড়ে ফেলল; কিন্তু নখদন্তের প্রহারে মানবদেহটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার আগেই আততায়ীদের ওপর বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতোই অবতীর্ণ হল বন্ধুবর ক্রিম৷ ক্রিমের আক্রমণে আততায়ীরা বরিস সাহেবের দেহের উপর থেকে সরে যেতে বাধ্য হল এবং তিনিও সেই সুযোগে উঠে দাঁড়িয়ে চটপট খাঁচার বাইরে এসে আত্মরক্ষা করলেন৷ বরিস অ্যাডার বুঝলেন, অরণ্যচারী সিংহও বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে জানে৷
সিংহের খেলা দেখাতে গিয়ে বরিস অ্যাডারের জীবন বিপন্ন হয়েছে বারংবার৷ ‘প্রাইমাস’ আর ‘রিফি’ নামের সিংহ দুটি বার বার অ্যাডার সাহেবকে আক্রমণ করেছে৷ তারা ছিল দুই সহোদর৷ বরিস অ্যাডার তাদের নামকরণ করেছিলেন ‘দুই দস্যু ভাই’৷
সহোদর ভাইদের মতোই ‘দুই দস্যু’র মধ্যে ছিল নিবিড় একতা ও বন্ধুত্বের বন্ধন৷ ওদের মধ্যে একজনের সঙ্গে বরিস অ্যাডারের লড়াই শুরু হলেই অপরজন তৎক্ষণাৎ অকুস্থলে এসে উপস্থিত হত৷ ভাইকে সাহায্য করার জন্য৷ ফলে একটির পরিবর্তে দুটি সিংহকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন বরিস অ্যাডার৷
একটি ঘটনার উল্লেখ করছি৷
সার্কাসে খেলা দেখানোর পর লোহার গরাদে ঘেরা সরু পথ দিয়ে খাঁচায় ঢোকার সময়ে হঠাৎ ‘রিফি’ বরিস অ্যাডারকে আক্রমণ করল৷ ফাঁকা রিভলভার দিয়ে আওয়াজ করে তিনি জন্তুটাকে ভয় দেখাতে চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু রিভলভারটা ঠান্ডায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল, শব্দ হল না— রিফি তৎক্ষণাৎ বরিসের রিভলভারসুদ্ধ ডান হাতটা কামড়ে ধরল৷ পরক্ষণেই অকুস্থলে রিফির ভাই প্রাইমাস-এর আবির্ভাব; এক মুহূর্ত বিলম্ব না-করে প্রাইমাস কামড় বসাল বরিস সাহেবের বাঁ-হাতের উপর— তারপর দুই ভাই মিলে টানাটানি করে শিকারকে খাঁচার ভিতর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল৷
সিংহ-চরিত্রে অভিজ্ঞ অ্যাডার বুঝলেন তারা যদি তাঁকে একবার গরাদে ঘেরা গলিপথের ভিতর থেকে নিজস্ব খাঁচার ভিতর নিয়ে যেতে পারে তাহলে আর রক্ষা নেই— দুই ভাই মিলে তাঁর শরীরটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়বে৷ বরিস চটপট তাঁর দুই পা লোহার গরাদের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে পায়ের সাহায্যে গরাদ আঁকড়ে ধরলেন, শুরু হল ‘টাগ-অব-ওয়ার’৷ আশেপাশে যারা ছিল তারা ভয়ে হতবুদ্ধি, দু-দুটি সিংহের কবল থেকে মানুষটাকে ছাড়িয়ে আনার সাহস বা ক্ষমতা কারুর নেই৷ হঠাৎ গরাদের সামনে এগিয়ে এল সার্কাসের এক খেলোয়াড়৷ সামনেই ছিল এক বালতি জল— খেলোয়াড়টি বালতি তুলে গরাদের ফাঁক দিয়ে জল ঢেল দিল সিংহদের গায়ে৷ মরুভূমির সিংহ রাশিয়ার তীব্র শীতল আবহাওয়াতে অভ্যস্ত নয়— হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে কনকনে ঠান্ডা জলের আক্রমণ বিখ্যাত সিংহ-বিক্রমকে কাবু করে দিল— ‘ঘেঁয়াওৎ’ শব্দে প্রতিবাদ জানিয়ে সিংহ দুটি শিকার ছেড়ে ছিটকে সরে গেল দূরে৷
বরিস এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না, এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে লৌহবেষ্টনীর বাইরে এসে চটপট লোহার দরজা বন্ধ করে দিলেন৷ সিংহেরা অবশ্য তৎক্ষণাৎ সগর্জনে ছুটে এসেছিল, কিন্তু বরিস তখন নাগালের বাইরে৷
সার্কাসের এক অখ্যাত খেলোয়াড়ের উপস্থিত বুদ্ধির জন্যই সেবার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে গেলেন বরিস অ্যাডার৷
বরিসের ঘটনাবহুল জীবনে তিনি বহুবার মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছেন৷ শুধু সিংহ নয়— বাঘ, লেপার্ড, ভাল্লুক প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের হিংস্র জানোয়ার নিয়ে তিনি খেলা দেখিয়েছেন৷ পরবর্তীকালে যে সুন্দরী মহিলাটির তিনি পাণিগ্রহণ করেছিলেন সেই মহিলাটিও সার্কাসের রঙ্গমঞ্চে হিংস্র পশুর খেলা দেখিয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে এবং স্বামীর মতোই অগণিত দর্শকের প্রশংসা অর্জন করেছেন মিসেস টামারা অ্যাডার৷
বরিস অ্যাডারের কথা বলতে গিয়ে তাঁর জীবনসঙ্গিনী সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না৷
আগেই বলেছি স্বামীর মতোই ওই মহিলাটিও বিভিন্ন হিংস্র পশুর খেলা দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছেন৷ সার্কাসের রঙ্গমঞ্চে খেলা দেখাতে গিয়ে একটি অতিশয় হিংস্র জীবের সঙ্গে টামারার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল৷
পূর্বোক্ত জীবটির নাম ছিল হ্যারি৷ উসুরি অঞ্চলের একটি বাঘ ও আফ্রিকার এক সিংহীর সংমিশ্রণে জাত হ্যারি নামের টাইগ্রন ছিল যেমন বিশাল দেহ ও প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী, তার স্বভাবও ছিল তেমনই ভয়ংকর৷ ওই অতিকায় অতি-ভয়ংকর টাইগ্রন ভীষণ ভয় করত সার্কাসের একটি ছোটোখাটো বাঘকে৷ ছোটোখাটো বাঘটির নাম ছিল রাজা৷ রাজা সুন্দরবনের জানোয়ার, বাঘের দলে সে ছিল সবচেয়ে ছোটো৷ রাজার স্বভাবচরিত্র বেশ ভালোই, কিন্তু হ্যারিকে দেখলেই তার মেজাজ হত খাপ্পা— নখদন্ত বিস্তার করে সে হ্যারিকে তাড়া করত আর ক্ষুদ্রকায় শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টায় শশব্যস্ত হয়ে পড়ত বিপুলবপু হ্যারি৷ বাঘদের নিয়ে খেলা দেখাতে গিয়ে রাজা আর হ্যারিকে নিয়ে এমন বিব্রত হয়ে পড়তেন বরিস যে, ভালো করে খেলার দিকে মন দেবার সুযোগ তাঁর হত না৷ অতএব বরিসের নির্দেশে রঙ্গমঞ্চের লৌহবেষ্টনীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন টামারা, তাঁর হাতে থাকত সুদীর্ঘ ‘পিচফর্ক’ (লম্বা লাঠির মুখে সাঁড়াশির মতো দুটি শানিত ফলক বসানো৷ পিচফর্ক খড় তোলার কাজে ব্যবহূত হয়, কিন্তু সার্কাসের খেলোয়াড়ের হাতে ওই বস্তুটি মারাত্মক অস্ত্র)৷
হ্যারিকে রাজা আক্রমণ করলেই খাঁচার ফাঁক দিয়ে পিচফর্কের সাহায্যে রাজাকে খোঁচা মারতেন টামারা এবং হ্যারিকে ছেড়ে নিজের জায়গায় গিয়ে খেলা দেখাতে বাধ্য হত রাজা৷ বারকয়েক খোঁচা খেয়েই রাজা বুঝল হ্যারিকে আক্রমণ করলেই টামারার পিচফর্ক তার দেহ বিদ্ধ করবে, অতএব সে শান্তভাবে হ্যারির সঙ্গে সহাবস্থান মেনে নিয়ে খেলা দেখাতে শুরু করল৷
একদিন বাঘগুলোকে তাদের নিজস্ব খাঁচার ভিতর থেকে রঙ্গমঞ্চের লৌহবেষ্টনীর মধ্যে এনে বরিস যখন খেলা দেখানোর উদ্যোগ করছেন, সেই সময়ে দৈবক্রমে টামারা আছেন কি নেই তা খেয়াল করেননি বরিস, কিন্তু টামারার অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করল রাজা তৎক্ষণাৎ— সগর্জনে সে তেড়ে গেল হ্যারির দিকে৷ হাঁকডাক! গর্জন! মহাকায় হ্যারি ছুটছে লৌহবেষ্টনীর ভিতর, পিছনে তার ক্ষুদ্রকায় রাজা৷
গোলমাল শুনে টামারা তাড়াতাড়ি এসে পড়লেন অকুস্থলে, হাতে তাঁর পিচফর্ক৷ হ্যারি চটপট লোহার গরাদের ধারে টামারার কাছে এসে দাঁড়াল, আর রাজাও হ্যারিকে ছেড়ে ফিরে গিয়ে বরিসের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সুবোধ বালকের মতো— টামারাকে দেখেই রাজার সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে, পিচফর্কের ধারালো অভ্যর্থনা তার ভালো লাগে না একটুও৷
গোলমাল মিটে যেতে হ্যারিও শান্তভাবে তার নিজের জায়গায় এসে বসল খেলা দেখাতে৷ কিন্তু খেলা শুরু করার আগে সে হঠাৎ টামারার দিকে ফিরে এক প্রচণ্ড হুংকার ছাড়ল— বোধ হয় বাঘের ভাষায় বলল, ‘ছিলে কোথায় এতক্ষণ? আর একটু হলেই গুন্ডাটা যে আমায় শেষ করে দিত!’
খাঁচার ফাঁক দিয়ে হ্যারির ঘাড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন টামারা এবং হ্যারিও সেই আদর উপভোগ করত শান্তভাবে৷ কিন্তু টামারাকে ভালোবাসলেও বরিস সম্পর্কে হ্যারির মনোভাব ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর— সুযোগ পেলেই সে সগর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে নখদন্তের আলিঙ্গনে বরিসকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার চেষ্টা করত৷ সার্কাসে খেলা দেখানোর আগে বন্য পশুকে নিয়ে খেলোয়াড় ‘রিহার্সাল’ বা তালিম দিয়ে থাকেন৷ প্রথম প্রথম ওই রিহার্সালের সময় এমন উগ্রমূর্তি ধারণ করত হ্যারি যে, খেলা দেখানো তো দূরের কথা— নিজের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় অস্থির হয়ে পড়তেন বরিস সাহেব৷
জানোয়ার যদি সবসময়েই খেলোয়াড়কে আক্রমণ করার চেষ্টা করে, তাকে দিয়ে খেলা দেখানো অসম্ভব৷ অতএব হ্যারিকে জব্দ করার একটা উপায় স্থির করলেন৷ কয়েকটা সোডার বোতল ভরতি বাক্স নিয়ে একদিন তিনি ঢুকলেন হ্যারির খাঁচায়৷ হ্যারি তাঁকে লক্ষ করে তেড়ে আসতেই একটা বাক্স তিনি ছুড়ে দিলেন জন্তুটার দিকে৷ শূন্যপথেই দাঁতে নখে লুফে নিয়ে বাক্সটাকে ভেঙে ফেলল হ্যারি, সঙ্গেসঙ্গে— ফটাস! প্রচণ্ড শব্দে সোডার বোতলের বিস্ফোরণ৷ হ্যারির পিলে গেল চমকে, এক লাফে সে পিছিয়ে গেল৷ কয়েকটি মিনিট সে হতভম্ব হয়ে ছিল, তারপরই আবার নূতন উদ্যমে সে বরিসকে আক্রমণ করল৷ বরিস তৈরি ছিলেন, সোডার বোতল ভরতি দ্বিতীয় বাক্স তাঁর হাত থেকে ছুটে গেল হ্যারির দিকে এবং প্রথমটির মতো দ্বিতীয় বাক্সটিও হ্যারির নখদন্তের আপ্যায়নে বিদীর্ণ হল প্রচণ্ড শব্দে৷ হ্যারি এবার কাবু হল, ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের গর্জিত কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিল ‘বাক্সের গর্জন’! আক্রমণের চেষ্টা ছেড়ে হ্যারি খেলোয়াড়ের নির্দেশ মানতে সচেষ্ট হল৷
হ্যারি ছাড়া আর একটি প্রাণী বরিসকে বিব্রত করে তুলেছিল৷ যে বাঘের দলটাকে নিয়ে বরিস খেলা দেখাতেন, সেই দলে জ্যাক নামে একটি মানুষখেকো বাঘ ছিল৷ নরখাদক শ্বাপদ নিয়ে কোনো খেলোয়াড় সচরাচর খেলা দেখায় না, কিন্তু বরিস ওই ভয়ংকর জন্তুটাকে নিয়েও খেলা দেখিয়েছেন৷ জ্যাকের আক্রমণে বরিসের জীবন বিপন্ন হয়েছে একাধিকবার— কিন্তু সদয় ব্যবহার, অসীম ধৈর্য ও অনুশীলনের ফলে মানুষখেকো বাঘও শেষ পর্যন্ত মানুষের বশীভূত হয়েছিল৷ বরিস বলেন, সদয় ব্যবহার দিয়েই তিনি জ্যাকের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন৷ হিংস্র শ্বাপদও তাহলে ভালোবাসার প্রতিদান দিতে জানে!
তবে বুনো জানোয়ারকে সবসময় বিশ্বাস করা চলে না৷ পাপা নামে একটি সিংহীকে শিশুকাল থেকেই পুষেছিলেন বরিস৷ পাপা সার্কাসের খাঁচায় থাকত না, থাকত বরিসের সঙ্গে একই বাড়িতে৷ কিন্তু পাপা যখন বড়ো হয়ে উঠল তখন বরিসের বাড়িওয়ালা বরিসকে জানিয়ে দিলেন তাঁর বাড়িটা তিনি বরিসকে ভাড়া দিয়েছেন বটে, কিন্তু একটা ধুমসো সিংহী নিয়ে সেখানে বসবাস করার অধিকার বরিসের নেই৷ অগত্যা বরিস পাপাকে সার্কাসের ভিতর একটা খাঁচায় রাখার ব্যবস্থা করলেন৷
পাপার স্বভাবচরিত্র ছিল চমৎকার৷ লাফঝাঁপ করে বেড়ালেও তার ব্যবহারে শ্বাপদসুলভ হিংস্র উগ্রতার চিহ্ন ছিল না একটুও৷ কিন্তু সার্কাসের খাঁচায় যাওয়ার পর থেকেই তার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটল৷ যারা সার্কাসে জন্তুদের দেখাশুনা করে সেই পশুরক্ষকদের দেখলেই সে হিংস্র হয়ে উঠত, ক্রুদ্ধ গর্জনে বিরক্তি জানাত বারংবার— বোধ হয় তার ধারণা হয়েছিল ওই লোকগুলোই তাকে বরিসের কাছ থেকে সরিয়ে এনে খাঁচায় আটকে রেখেছে৷ বরিস তার মনোভাব বুঝতেন, কিন্তু সার্কাসের খেলা নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, পাপার সঙ্গে যখনতখন দেখাসাক্ষাৎ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ নিঃসঙ্গ অবস্থায় পাপার চরিত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটল, সে হয়ে উঠল ভয়ংকরী৷
একদিন চরম বিপর্যয় ঘটল৷ বরিস এসেছেন অনেক দিন পরে, পাপাকে আদর করে বিদায় নেবার উদ্যোগ করছেন— অকস্মাৎ তাঁর কণ্ঠদেশ লক্ষ করে কামড় বসাল পাপা৷ তাড়াতাড়ি হাত তুলে বরিস গলা বাঁচালেন বটে, কিন্তু সিংহীর ধারালো দাঁতের আঘাতে তাঁর হাতের অবস্থা হল শোচনীয়৷ কোনোরকমে আত্মরক্ষা করে বরিস পাপাকে তার খাঁচার ভিতর ঠেলে দিলেন৷ পাপা এক কোণে গিয়ে বসে রইল চুপ করে৷ রক্তাক্ত হাতটা তুলে ধরলেন বরিস পাপার দিকে, বললেন, ‘দেখ কী করেছ! তোমার লজ্জা করে না? তোমাকে আমি এত ভালোবাসি, এই তার প্রতিদান?’
মাথা নীচু করে পাপা এগিয়ে এল৷ ধীরে ধীরে মুখ তুলে রক্তাক্ত হাতটা চাটতে শুরু করল৷ স্পষ্টই বোঝা গেল তার ব্যবহারে সে লজ্জিত৷ হঠাৎ খেপে গিয়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড সে করে ফেলেছে বটে, কিন্তু বরিসকে হত্যা করার ইচ্ছা তার ছিল না৷
যাই হোক, বরিস বুঝলেন তাঁদের আগেকার সম্পর্ক আর ফিরে আসবে না; কারণ পাপা যেভাবে তাঁর কাছ থেকে সেবা-যত্ন পেতে অভ্যস্ত, সেইভাবে তাকে দেখাশুনা করার সময় এখন বরিসের নেই৷ অতএব আবার দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সাবধান হওয়া ভালো— পাপাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল চিড়িয়াখানায়৷
বরিস অ্যাডার জীবনে বিভিন্ন ধরনের হিংস্র পশুর বন্ধুত্ব লাভ করেছেন এবং তাঁর আদরের চতুষ্পদ বন্ধুদের আক্রমণে তাঁর প্রাণ বিপন্ন হয়েছে বারংবার— তবু সার্কাসের রঙ্গমঞ্চে বরিসের আকর্ষণ কমেনি একটুও৷
বরিস অ্যাডার বলেছেন, ‘ওরা দু-একসময় ভীষণ দুষ্টুমি করে বটে, কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুষ্ট হলে বাপ কি কখনো সন্তান ত্যাগ করে? আমি ওদের ভালোবাসি; হোক না দুষ্ট, ওরা আমার গর্বের বস্তু৷’
কাহিনি রক্তসিক্ত
১৮৬৩ সাল, গ্রীষ্মের শেষ৷
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অধিকৃত মেক্সিকোর অন্তর্গত ‘কলোর্যাডো টেরিটরি’ নামক রাজ্যে স্থানীয় শাসনকর্তা গভর্নর জন ইভান্সের কাছে চিঠি পাঠাল একজন মেক্সিকোর অধিবাসী৷
তার নাম, ফিলিপ নিরিও এসপিনোসা৷
ফিলিপের চিঠিতে যা লেখা ছিল তার সারমর্ম হচ্ছে, যদিও সরকার তাকে ছাবিবশটি আমেরিকান কুকুরের মৃত্যুর জন্য দায়ী করছেন, তবু পত্রলেখকের মতে এ-বিষয়ে স্থানীয় অধিবাসী ও সৈন্যদের মতামত গ্রহণ করা উচিত, কারণ শেষোক্ত ব্যক্তিদের মতে পত্রলেখক কর্তৃক নিহত মানুষের সংখ্যা কম করেও চল্লিশ৷ তবে এ-বিষয়ে জোর করে কিছু বলা যায় না, লোকে হয়তো পত্রলেখককে একটু বেশি সম্মান দিয়ে থাকে৷ যাই হোক, এই খুনখারাপির ব্যাপারটা পত্রলেখকের কাছে অত্যন্ত ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে, তাই সে এখন শান্তি চায়৷ শান্তির মূল্য হিসাবে তার কিছু চাহিদা আছে— সদয় সরকার যদি সেই যৎসামান্য দাবি পূরণ করেন, তাহলে পত্রলেখক ফিলিপ তার অস্ত্র নামিয়ে দলের লোকদের খুনোখুনি থেকে নিরস্ত করতে রাজি৷ নিম্নলিখিত শর্তগুলি পত্রে উল্লিখিত ‘যৎসামান্য দাবি’—
(১) ফিলিপ এবং তার দলবল সম্পর্কে যেসব হত্যা, লুণ্ঠন ও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আছে, সেই অভিযোগগুলিকে প্রত্যাহার করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা করতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া চলবে না৷
(২) এসপিনোসা পরিবারভুক্ত যাবতীয় ব্যক্তির অধিকৃত পশুগুলিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মেনে নিতে হবে (ওই পশুগুলি লুঠের মাল বলে সন্দেহ হলেও সে-বিষয়ে অনুসন্ধান করা চলবে না) এবং কয়েক হাজার একর জমি পূর্বোক্ত ব্যক্তিদের দান করতে বাধ্য থাকবেন আমেরিকান সরকার৷ শুধু তাই নয়, ওইসব জমির কাছাকাছি গো-চারণের উপযুক্ত তৃণভূমিও জমির মালিকদের দান করবেন সদাশয় সরকার৷ (সব মিলিয়ে পত্রে লিখিত জমির পরিমাণ সমগ্র কলোর্যাডো রাজ্যের এক দশমাংশ তো বটেই)
(৩) ফিলিপ, তার ভ্রাতুষ্পুত্র এবং আরও দুজন এসপিনোসা পরিবারের যোগ্য ব্যক্তি ‘কলোর্যাডো ভলান্টিয়ার কোম্পানি’ নামক সেনাদলে ভরতি হতে চায়— অবশ্য সাধারণ সৈনিক হিসাবে নয়, ক্যাপ্টেন বা সেনানায়কের মর্যাদা দিয়েই উক্ত বাহিনীতে তাদের নিয়োগ করতে হয়৷ যোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে পত্রলেখক জানিয়েছে, অত্যন্ত অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্যে লড়াই করে তারা সরকারের ছাবিবশটি প্রজাকে হত্যা করেছে, কিন্তু তাদের তরফে মারা গেছে মাত্র একজন এসপিনোসা— এটাই কি তাদের যোগ্যতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নয়?
স্থানীয় শাসনকর্তা গভর্নর জন ইভান্স ফিলিপের চিঠি পেয়ে খুশি হলেন৷ দেশজোড়া অজস্র খুনখারাপির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীটিকে গ্রেপ্তার করার কাজটা সহজ হয়ে গেল৷ রাজধানী ওয়াশিংটনে ইভান্স সাহায্য চেয়ে পাঠালেন৷ উত্তর এল, ‘গৃহযুদ্ধ নিয়ে সরকার এখন অত্যন্ত বিব্রত, অতএব নিজস্ব ক্ষমতায় গভর্নর যেন বর্তমান সমস্যার সমাধান করেন৷’
গভর্নর ইভান্স ওয়াশিংটনের ভরসা না-করে এইবার নিজের ক্ষমতায় সমস্যার সমাধান করতে সচেষ্ট হলেন৷ চিঠিতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সরকারকে সময় দেওয়া হয়েছিল৷ ওই পত্রে ফিলিপ জানিয়েছিল তার যুক্তিসংগত ন্যায্য শর্তগুলি সরকার যদি মেনে নিতে রাজি না-থাকেন, তাহলে আবার সে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এবং তার ফলে আরও ৫৭৪ জন আমেরিকানের প্রাণহানি যে অবশ্যম্ভাবী এ-কথাটা যেন গভর্নর মনে রাখেন৷
গভর্নর ইভান্স ঘোষণা করলেন, ‘জীবিত বা মৃত ফিলিপ এসপিনোসাকে সরকারের কাছে যে হাজির করতে পারবে, সেই ব্যক্তিকে ২৫০০ ডলার পুরস্কার দেবেন সরকার৷’
এইবার পাঠকদের কাছে ফিলিপ এসপিনোসা নামক ভয়ানক মানুষটির পরিচয় দেওয়া দরকার৷ মেক্সিকো থেকে নিউ মেক্সিকোর ‘কাচেটি’ অঞ্চলে পদার্পণ করেছিল ফিলিপ, কিন্তু ঠিক কোন সময়ে তার আবির্ভাব ঘটেছিল সে-কথা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়৷ এসপিনোসা বংশ একটি বিরাট গোষ্ঠী— ভাই, ভাইপো, ভাগনে প্রভৃতি বিভিন্ন সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন নিয়ে বিরাট দল পরিচালনা করত পূর্বোক্ত ফিলিপ এসপিনোসা৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে সমগ্র স্প্যানিশ- মেক্সিকোর জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ ছিল এসপিনোসা বংশের অন্তর্গত৷
স্যান লুই উপত্যকা থেকে কলোর্যাডো রাজ্যের স্যান রাফাএল নামক পর্বতবেষ্টিত শহরে এসে প্রথম হানা দেয় ফিলিপ এবং তার দলবল— তারপর শুধু হত্যা ও লুণ্ঠনলীলার বীভৎস ইতিহাস৷
প্রথম প্রথম তারা ঘোড়া চুরি করত৷ একটা ঘোড়া বিক্রি করলে কম করেও পাঁচশো ডলারের প্রাপ্তিযোগ— অতএব বেশ কিছুদিন ওই লাভজনক ব্যাবসা চালিয়ে গেল ফিলিপের দল৷ দস্যুবৃত্তি করলেও তাদের মধ্যে রসবোধ ছিল বিলক্ষণ, তবে রসিকতার ধরনটা হয়তো সকলের কাছে উপভোগ্য ছিল না৷
দস্যুদের রসিকতার একটি উদাহরণ পাঠকদের সামনে উপস্থিত করছি:
সান্টা ফি থেকে গ্যালিসটিওর পথে একটা গাড়ি লুঠ করে দস্যুদল শকটচালকের পা দুটি এমনভাবে গাড়ির সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে দিল যে, বেচারার শরীরটা মাটির ওপর পড়ে রইল অসহায় অবস্থায়৷ লোকটিকে ওইভাবে ঝুলিয়ে রেখে গাড়ির ঘোড়া দুটিকে চাবুক মেরে দস্যুরা ছুটিয়ে দিল৷ শকটচালককে তারা খুন করেনি, কারণ উক্ত গাড়োয়ান ছিল মেক্সিকোর অধিবাসী৷ কিন্তু প্রাণে বাঁচলেও গাড়োয়ান বেচারার অবস্থা হয়েছিল অতিশয় শোচনীয়, পথের ওপর ঠোক্কর খেতে খেতে তার সর্বাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত৷ বলা বাহুল্য, দস্যুদের রসিকতা ওই গাড়োয়ানটির কাছে খুব উপভোগ্য মনে হয়নি৷
ঘোড়া চুরির ছোটো কাজে নিজেকে খুব বেশিদিন আবদ্ধ রাখল না ফিলিপ, বসন্তকাল শুরু হতে-না-হতেই দলবল নিয়ে হত্যা ও লুণ্ঠনকার্যে মনোনিবেশ করল সে৷ আরাকানসাস নদীতীরে এবং সাউথ পার্ক অঞ্চলে ফিলিপের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করাও সম্ভব হয়নি৷ ‘স মিল গালচ’ নামক স্থানটি দুর্বৃত্তদের হত্যালীলার ফলে নাম বদলে হয়ে গেল ‘ডেড ম্যানস ক্যানিয়ন’ অর্থাৎ ‘মৃত মানুষের খাদ’৷ পূর্বোক্ত স্থানে একটি কারখানার মধ্যে বাস করত ওই কারখানারই মালিক বৃদ্ধ হেনরি হার্কেন৷ হেনরির সহকারী ও অংশীদাররা কাজকর্মের শেষে স্থানত্যাগ করতেই অকুস্থলে আত্মপ্রকাশ করল ফিলিপ ও তার খুনে চ্যালাচামুণ্ডার দল৷ ওরা এতক্ষণ আড়াল থেকে নজর রাখছিল, এইবার বৃদ্ধকে একা পেয়ে আক্রমণ করল৷ কুঠারের প্রচণ্ড আঘাতে বৃদ্ধের মস্তক হল বিদীর্ণ, তারপর ঘরবাড়ি দরজার উপর চলল দুর্বৃত্তদের ধ্বংসলীলা৷ ঘরবাড়ির ভগ্নদশা দেখে প্রথমে রেড ইন্ডিয়ানদের সন্দেহ করা হয়েছিল, কারণ, ওই অরণ্যচারী জাতি কাউকে হত্যা করলে নিহত ব্যক্তির ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে যায়৷ তারপর আবার সন্দেহ পড়ল বৃদ্ধের দুই অংশীদারের উপর— তাদের নাম মি. ফার্সন ও মি. ব্যাসেট৷ পরে অবশ্য আসল ঘটনা জানা যায় এবং নিরাপরাধ ভদ্রলোক দুটিও মুক্তি পান৷
পরবর্তী ঘটনাগুলি হচ্ছে বীভৎস রক্তারক্তির ধারাবাহিক ইতিহাস৷ খুনের পর খুন করতে করতে সদলবলে ফিলিপ এগিয়ে চলল ক্যালিফোর্নিয়া গালচ নামক খনি-এলাকায়৷ জর্জ ব্রুস নামে একজন আমেরিকান ভদ্রলোককে তারা ওই অঞ্চলে খুন করেছিল৷ খুনের ধরনটা ছিল পূর্বে উল্লিখিত বৃদ্ধ হেনরির হত্যাকাণ্ডের অনুরূপ৷ স্থানীয় শেরিফ ও তার বাহিনী খুনিদের অনুসরণ করতে গিয়ে পথের মধ্যে আরও কয়েকটা রক্তাক্ত মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিল, কিন্তু খুনিদের সে গ্রেপ্তার করতে পারেনি৷
হত্যার তাণ্ডব চলল দীর্ঘদিন ধরে৷ প্রথম প্রথম খুনির স্বরূপ নির্ণয় করতে পারেনি সরকার— কে দায়ী এই হত্যাকাণ্ডগুলির জন্য? রেড ইন্ডিয়ান? সন্ত্রাসবাদী বিদ্রোহী? কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্ত, বিমূঢ়৷ অনেক সময় দেখা গেছে নিহত মানুষের ধনসম্পত্তি তার সঙ্গেই অবস্থান করছে, অর্থাৎ নিছক রক্তপিপাসাকে তৃপ্ত করার জন্যই খুন করেছে খুনি৷ স্থানীয় দস্যুরা এভাবে অনর্থক নরহত্যা করে না৷ মৃতদেহের মাথার চামড়া অক্ষত দেখে বোঝা যায় রেড ইন্ডিয়ানরাও ওইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী নয়, কারণ, রেড ইন্ডিয়ানদের প্রথা অনুসারে কাউকে হত্যা করলে নিহত ব্যক্তির চুলসুদ্ধ মাথার চামড়া তারা ছুরি দিয়ে কেটে নিয়ে যায়৷ মৃতদেহের অঙ্গে উজ্জ্বল পোশাকপরিচ্ছদ থাকলে সেগুলি অবশ্য খুনি লুঠ করত, আরও লুঠ করত ঘড়ি, আংটি, ছুরি প্রভৃতি বস্তু৷ মৃতদেহগুলো দেখলেই বোঝা যেত অন্ধ আক্রোশে হত্যাকারী তাদের উপর অস্ত্র চালনা করেছে৷ শুধু গুলি চালিয়ে নরহত্যা করে খুশি হত না খুনি, বারংবার ছুরিকাঘাত করে নিহত মানুষগুলোকে সে টুকরো টুকরো করে ফেলত৷ তবে খুনি যে খ্রিস্টধর্মের প্রতি অত্যন্ত অনুগত সে-বিষয়ে সন্দেহ ছিল না— নিহত মানুষের বুকের ওপর ছুরি দিয়ে আঁকা থাকত রক্তাক্ত ‘ক্রসচিহ্ন’ অথবা দুটো গাছের ডাল কেটে আড়াআড়িভাবে ‘ক্রস’ বেঁধে খুনি সেটাকে মৃতদেহের বুক ভেদ করে মাটির ওপর বসিয়ে দিত৷
যে-লোকগুলো খুন হয়েছিল, তারা প্রায় সকলেই ছিল খুনির অপরিচিত৷ নিহত ব্যক্তিদের একমাত্র অপরাধ, তারা ছিল আমেরিকান৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃদ্ধদের হত্যা করা হত৷ মনে হয়, ১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮ সালের মধ্যে মেক্সিকো এবং আমেরিকার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের সময়ে ওই বৃদ্ধরা আমেরিকা-সরকারের সঙ্গে জড়িত ছিল সন্দেহ করেই খুনি তাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল৷ মেক্সিকান ফিলিপ ছিল ঘোর সাম্প্রদায়িক— আমেরিকানদের উপর সে ছিল বেজায় খাপ্পা৷ তার ক্রোধের আগুনে প্রাণ বিসর্জন দিতে লাগল বহু আমেরিকান৷ কলোর্যাডো রাজ্যে এমন হত্যাপাগল হন্তারক আগে কখনো আত্মপ্রকাশ করেনি৷
ফিলিপ এসপিনোসাকে স্বচক্ষে দেখেও জীবিত আছে এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম৷ তবু সেই অল্পসংখ্যক মানুষের বর্ণনা থেকে জানা যায় পূর্বোক্ত নরঘাতক দুর্বৃত্ত নাকি যেমন লম্বা তেমনই চওড়া— দুই কালো চোখে তীব্র প্রখর দৃষ্টি, চেপটা নাক, চোয়াল ঘিরে ঘন দাড়ির জঙ্গল এবং মাথার ওপর সুদীর্ঘ কালো কেশের নিবিড় সমাবেশ৷
ফিলিপের নিত্যসঙ্গী ছিল ভিভিয়েন নামে একটি যুবক৷ ফিলিপের মতো বিপুল দেহ, প্রচণ্ড শক্তি ও দুরন্ত সাহসের অধিকারী না হলেও ভিভিয়েন ছিল পাকা খুনি— নরহত্যায় তার কুণ্ঠা ছিল না কিছুমাত্র৷ হিংস্র ও নির্মম ভিভিয়েন ছিল ফিলিপ এসপিনোসার যোগ্য সহচর৷
ফিলিপকে যে-মানুষটি প্রথম স্বচক্ষে দর্শন করেছিল, সে এক ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ান— নাম, এড মেটকাফ৷ ‘ফেয়ার প্লে’ থেকে ‘এলমা’ শহরে যাচ্ছিল এড, আচম্বিতে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বীভৎস দৃশ্য— পথের উপর একটি নিশ্চল নরদেহের উপর পরমানন্দে ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে দুটি মানুষ৷ বলাই বাহুল্য যে, লোক দুটি হচ্ছে ফিলিপ আর ভিভিয়েন৷ ধাবমান শকটের পথ ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি সরে গেল দুই খুনি, কিন্তু কাজে বাধা পড়ায় তাদের মেজাজ গরম হয়ে উঠল৷ শকটচালক এডকে লক্ষ করে গুলি ছুড়ল ফিলিপ, অব্যর্থ লক্ষ্যে বুলেট এসে পড়ল এডের বুকে৷ এড লুটিয়ে পড়ল গাড়ির মধ্যে অবস্থিত কাঠের স্তূপের উপর৷ কিন্তু লক্ষ্যভেদ করতে পারলেও এডকে খুন করতে পারেনি ফিলিপ— এডের বুকপকেটে ছিল একটা ছোটো বই, গুলিটা বইয়ের উপর পড়েছিল বলেই সে বেঁচে গেল৷ আঘাতের বেগ তাকে উলটে ফেলেছিল বটে, কিন্তু গুলি সেই বইটাকে ভেদ করে তার দেহ স্পর্শ করতে পারেনি৷
শকটচালক এড মেটকাফ হত্যাকারীদের বর্ণনা দিয়ে বলেছিল, ‘লোক দুটোর গায়ের রং ফর্সা নয়, সম্ভবত তারা রেড ইন্ডিয়ান৷ দুজনের মধ্যে যে-লোকটির বয়স বেশি তার মুখখানা থালার মতো, মাথায় লম্বা চুল; আড়েবহরে প্রকাণ্ড ওই খুনির কদাকার চেহারার দিকে তাকালে আতঙ্কে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়, মনে হয় একটা হিংস্র জন্তুর সামনে এসে পড়েছি৷ খুব চড়া রং-এর জমকালো পোশাক পরেছিল দুই খুনি, আর তাদের সর্বাঙ্গ ঘিরে ঝুলছিল মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র— রাইফেল, পিস্তল, ছোরা৷’
ফিলিপের হত্যালীলা চলল অবিরাম৷ ওইসব হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা অত্যন্ত একঘেয়ে আর বৈচিত্র্যহীন৷ কলোর্যাডো রাজ্যের শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে চলল ফিলিপ এসপিনোসার রক্তসিক্ত বিজয়-অভিযান৷
অবশেষে একদিন ‘মৌচাকে ঢিল’ পড়ল৷ লেফটেন্যান্ট জর্জ এল. শুপ নামক সেনাবিভাগের একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কনিষ্ঠ ভ্রাতা মারা পড়ল ফিলিপের হাতে৷ মৃত ব্যক্তি ছিল সৈনিক, তার মৃত্যুতে হইচই পড়ে গেল চারদিকে৷ সৈন্যরা যদি এমনভাবে খুন হয়, তবে জনসাধারণের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? এমন ভয়ানকভাবে ওই সৈন্যটিকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল যে, তার মৃতদেহ দেখে তাকে শনাক্ত করা যায়নি— সৈনিকের ছিন্নভিন্ন পরিচ্ছদ বা ‘ইউনিফর্ম’ থেকেই মৃত ব্যক্তির স্বরূপ নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছিল৷
ক্রোধ, ঘৃণা ও আতঙ্কে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল কলোর্যাডোর মানুষ৷ জন ম্যাকক্যানন নামে জনৈক প্রতিপত্তিশালী খনি-মালিক নিজে উদ্যোগী হয়ে একটি বেসরকারি বাহিনী গড়ে তুলল৷ বনপথে বিচরণ করতে অভ্যস্ত কুড়িটি স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে গঠিত ওই বেসরকারি বাহিনীর প্রত্যেকটি লোক ছিল লক্ষ্যভেদে সিদ্ধহস্ত, প্রাণ-দেওয়া-নেওয়ার রক্তাক্ত খেলা খেলতে তাদের আপত্তি ছিল না কিছুমাত্র৷ বন্দুক-পিস্তলে দক্ষ ভয়ংকর ওই মানুষগুলোর উপযুক্ত নেতা ছিল জন ম্যাকক্যানন৷ ম্যাকক্যাননের মুখে ছিল মস্ত দাড়ি, দেহ ছিল প্রকাণ্ড৷ দলবল নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে সে বেরিয়ে পড়ল হত্যাকারী ফিলিপের সন্ধানে৷
বনপথে ঘোরাফেরা করে জীবিকা নির্বাহ করতে যারা অভ্যস্ত, তাদের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেওয়া খুব কঠিন— সেইজন্যই বেছে বেছে ওই ধরনের মানুষ নিয়ে দল গঠন করেছিল ম্যাকক্যানন৷ কয়েকদিন অক্লান্তভাবে অনুসরণ করার পর ম্যাকক্যানন ও তার বাহিনী জঙ্গলের মধ্যে একদিন খুনিদের আবিষ্কার করতে সমর্থ হল৷
অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে বসেছিল দুই দুর্বৃত্ত, সঙ্গে ছিল তিনটি ঘোড়া৷ ম্যাকক্যাননের বাহিনী থেকে জো ল্যাম্ব নামে একটি লোক প্রথমে গুলি চালিয়েছিল৷ গুলি লাগল ভিভিয়েনের পায়ে, সে তৎক্ষণাৎ মাটির উপর ঝাঁপ খেয়ে শুয়ে পড়ল৷ আহত সঙ্গীর সাহায্যে ছুটে এল ফিলিপ এবং হিংস্রকণ্ঠে চিৎকার করতে করতে দু-হাতে পিস্তল ছুড়তে শুরু করল৷ অপরপক্ষও চুপ করে রইল না, অগ্নি-উদগিরণ করে গর্জে উঠল অনেকগুলো রাইফেল৷
একটা ঘোড়া আর্তনাদ করে ধরাশায়ী হল৷ তার দেহের আড়ালে দুর্বৃত্ত দুজন গা-ঢাকা দিয়ে গুলি চালাতে লাগল৷ সেই ম্যাকক্যাননের সঙ্গে ছিল আটজন স্বেচ্ছাসেবক, বাকি লোকজন সেখানে ছিল না৷ ওই আটজন লোক নিয়ে খুনি দুটোকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করল ম্যাকক্যানন৷ তার চেষ্টা সফল হল না, দুটি ঘোড়াকে একসঙ্গে ছুটিয়ে দিল ফিলিপ— একটার পিঠে সে বসেছিল, অপর ঘোড়াটার লাগাম ধরে জন্তুটাকে সে ব্যবহার করছিল জীবন্ত ও চলন্ত ঢালের মতো৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একটা ঘন ঝোপের মধ্যে প্রবেশ করল ঘোড়া দুটি; একটা ঘোড়াকে ছেড়ে দিয়ে অপরটির পিঠে সওয়ার হয়ে ঝড়ের মতো পার্বত্য পথ অতিক্রম করে অদৃশ্য হল ফিলিপ, পিছনে পড়ে রইল তার তরুণ অনুচরের মৃতদেহ৷ চার্লি কার্টার নামে একজন স্বেচ্ছাসেবক গুলি চালিয়ে ভিভিয়েনের মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছিল৷
ম্যাকক্যানন ও তার বাহিনী এবার অকুস্থল থেকে কয়েকটি থলি কুড়িয়ে পেল৷ অশ্বারোহীরা ওই ধরনের থলি ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বহন করে৷ বলাই বাহুল্য, থলিগুলো ছিল দুর্বৃত্তদের সম্পত্তি৷ এবার খানাতল্লাশি— থলিগুলোর ভেতর থেকে পাওয়া গেল কাপড়চোপড়, রিভলভার, ছোরা, ঘড়ি প্রভৃতি৷ ওই জিনিসগুলো ছিল দস্যুহস্তে নিহত একাধিক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷ ওইসঙ্গে একটা ডায়েরিও পাওয়া গিয়েছিল৷ ডায়েরিতে তারিখ দিয়ে বহু নরহত্যার সংবাদ লেখা রয়েছে— কেমন করে ওই আমেরিকানদের খুন করা হয়েছে সে-কথাও লেখা আছে সবিস্তারে৷ স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ওই ডায়েরির পাতা থেকে জানা গেল ৬০০ আমেরিকানকে হত্যা করার সংকল্প নিয়েছে ফিলিপ এসপিনোসা৷
আর একটা কাগজের স্তূপ থেকে এমন ভয়ানক প্রতিজ্ঞার কারণটা বোধগম্য হল৷ আমেরিকার সেনাবাহিনী বিগত যুদ্ধে মেক্সিকোর ওপর যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তার ফলে শোচনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল একটি এসপিনোসা বংশ৷ ওই বংশেরই ছেলে ফিলিপকে প্রতিশোধ নিতে উৎসাহিত করছিল তার বাপ৷ ছেলেও বাপের মান রেখেছে, অনেকগুলো আমেরিকানকে সে পরলোকে পাঠিয়েছে— সবসুদ্ধ ৬০০ আমেরিকানকে হত্যা না-করে সে ক্ষান্ত হবে না৷ সংখ্যাটা বিশেষ করে ছ-শো কেন হল সে-বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি৷
পূর্বোক্ত ডায়েরি ও জিনিসগুলো নিয়ে দলবলের সঙ্গে ফিরে এল ম্যাকক্যানন৷ ভিভিয়েনের মৃতদেহ অবশ্য তারা অকুস্থলেই ফেলে এসেছিল৷ ক্যালিফোর্নিয়া গালচ নামক স্থানে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে অভিনন্দন জানাল উল্লসিত জনসাধারণ৷
ম্যাকক্যানন ভেবেছিল স্বেচ্ছাসেবক চার্লির গুলিতে নিহত তরুণ ভিভিয়েনই দলের সর্দার, অতএব তার মৃত্যুতে এখন আপদের শান্তি৷ কর্তৃপক্ষ কিন্তু ম্যাকক্যাননের সঙ্গে একমত হতে পারেননি৷ কিছুদিন পরেই জানা গেল কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা অমূলক নয়— প্রচণ্ড বিক্রমে আবার আত্মপ্রকাশ করেছে ফিলিপ৷
ভিভিয়েনের মৃত্যুর পর এক সপ্তাহ যেতে-না-যেতেই ফিলিপের হাতের কাজ দেখা গেল— বিল স্মিথ নামে জনৈক নাগরিক প্রথমে খুন হল, পরবর্তী শিকার হল এক অখ্যাত সৈনিক৷
খবর নিয়ে জানা গেল ফিলিপ একটি নূতন সঙ্গী সংগ্রহ করেছে৷ নূতন সহচরটিও এসপিনোসা বংশের ছেলে, বয়স তার খুবই কম— নাম, জুলিয়েন৷ বয়সে কৈশোর অতিক্রম না-করলেও খুনোখুনিতে ওস্তাদ ছিল জুলিয়েন, মানুষ মারতে তার হাত কাঁপত না একটুও৷ ফিলিপ ও জুলিয়েনের কবলে প্রাণ হারাল আরও কয়েকজন অভাগা আমেরিকান৷
হত্যা-হাহাকারে পরিপূর্ণ বর্তমান নাটকের রক্তাক্ত রঙ্গমঞ্চে এইবার প্রবেশ করল এক দুর্ধর্ষ ব্যক্তি— টম টবিন৷
যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময় দুর্গম অরণ্যপথে রেড ইন্ডিয়ানদের আক্রমণে বহু আমেরিকানের প্রাণহানি ঘটেছে৷ ওই ভয়ংকর রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করত একদল আমেরিকার মানুষ— ইতিহাসে তাদের নামকরণ হয়েছে ‘স্কাউট’৷
পূর্বোক্ত স্কাউটরা ছিল নির্ভীক চরিত্রের মানুষ, বন্দুক-পিস্তলে তাদের নিশানা অব্যর্থ৷ বনপথে অনুসরণ-কার্যে দুঃসাহসী স্কাউটের অসাধারণ দক্ষতা আজও জনশ্রুতি ও ইতিহাসের গল্পকথা হয়ে আছে৷ পূর্বে উল্লিখিত টম টরিন ছিল ওইরকম এক স্কাউট৷
সেনাবাহিনী যখন অসহায় বলে প্রমাণিত হত, তখনই স্কাউটের সাহায্য গ্রহণ করতেন সেনাধ্যক্ষ৷ কিছুতেই ফিলিপকে জব্দ করতে না-পেরে কর্নেল ট্যাপ্পান চিরাচরিত পন্থা অবলম্বন করলেন— ‘ফোর্ট গারল্যান্ড’ দুর্গ থেকে কর্নেলের তলব পেয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হল স্কাউট টম টবিন৷ সেনাবাহিনী থেকে দুরূহ কাজের ভার নিলে দস্তুরমতো পারিশ্রমিক পেত ভারপ্রাপ্ত স্কাউট, অতএব টম টবিনও যে কিছু প্রাপ্তিযোগের আশা নিয়ে এসেছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷
কর্নেলের বক্তব্য শুনে টম টবিন জানাল একটিমাত্র যোগ্য সহকারী পেলেই সে ফিলিপ এসপিনোসার পশ্চাদ্ধাবন করতে রাজি, কিন্তু কর্নেল ট্যাপ্পান বললেন, ফিলিপের মতো ভয়ানক দস্যুর মোকাবেলা করতে হলে যথেষ্ট লোকবল প্রয়োজন— অতএব, তাঁর আদেশে পনেরোজন সশস্ত্র সৈনিক এগিয়ে এল টবিনকে সাহায্য করতে৷ ওই সেনাদল ছাড়া আরও একটি মেক্সিকান বালক ছিল টবিনের সঙ্গী৷ বালকটিকে নির্বাচন করেছিল টবিন স্বয়ং৷ ১৮৬৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে ফোর্ট গারল্যান্ড নামক দুর্গ থেকে টম টবিন যাত্রা করল হন্তারক ফিলিপ এসপিনোসার সন্ধানে৷
তিন দিন তিন রাত্রি ধরে চলল অবিরাম অনুসরণ-পর্ব, তারপর এক জায়গায় এসে কয়েকটা পায়ের ছাপ দেখে থামল মানুষ-শিকারির দল৷
উটা জাতীয় রেড ইন্ডিয়ানদের পায়ে পায়েই ওই চিহ্নগুলির সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু সেই পদচিহ্নগুলিকে মেক্সিকান খুনিদের পায়ের ছাপ মনে করে বিভ্রান্ত হল ছ-জন সৈন্য এবং টবিনের নির্দেশ অমান্য করে পূর্বোক্ত পদচিহ্নের অনুসরণ করতে সচেষ্ট হল৷ ফলে টবিনের লোকবল বেশ কিছু কমে গেল৷
পরের দিন সকাল ন-টা কি দশটার সময়ে টবিনের দল বনপথে দুটি ষাঁড়ের পদচিহ্ন আবিষ্কার করল৷ টবিন পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে বুঝতে পারল, জন্তু দুটিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্ত ফিলিপ এবং তার কিশোর সঙ্গী জুলিয়েন৷ নির্ভুলভাবে তাদের অনুসরণ করতে লাগল টবিন৷ কিছুক্ষণ করে দেখা গেল একটি ষাঁড়কে দস্যুরা ছেড়ে দিয়েছে৷ টবিন বুঝল, মেক্সিকান দস্যু দুটি মাংস খাওয়ার জন্য অপর ষাঁড়টিকে হত্যা করতে নিয়ে যাচ্ছে তাদের তাঁবুর দিকে৷
আবার শুরু হল অনুসন্ধান৷ ঘন জঙ্গল আর ঘাসঝোপের ভিতর দিয়ে অপরাধীদের পদচিহ্ন পাওয়া দুষ্কর, কিন্তু অভিজ্ঞ স্কাউট টবিনের শ্যেনচক্ষু একবারও ভুল করল না, স্থির লক্ষ্যে সে এগিয়ে চলল সৈন্যদের নিয়ে৷
এক জায়গায় গোল হয়ে উড়ছিল কয়েকটা কাক৷ টম টবিন অনুমান করল ওইখানেই ষাঁড়টাকে হত্যা করা হয়েছে৷ সে আবার অগ্রসর হল৷ প্রায় এক-শো গজ দূরত্ব অতিক্রম করার পর অনেকগুলো ম্যাগপাই পাখি (এক ধরনের মাংসাশী পাখি) তার চোখে পড়ল৷ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দুর্বৃত্তদের তাঁবুটাকে আবিষ্কার করল টবিন৷ সৈন্যদের ডেকে টবিন তাদের কথা কইতে নিষেধ করল৷ সে আরও বলল, হাত তুলে সংকেত জানালেই সকলে যেন রাইফেল বাগিয়ে বসে পড়ে, কিন্তু নির্দেশ না-পেলে কিছুতেই যেন গুলি না-চালায়৷
সঙ্গীদের সাবধান করে দিয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে একটি খুনিকে দেখতে পেল টবিন৷ ঠিক সেই সময় তার পায়ের তলায় একটা শুকনো গাছের ডাল মট করে ভেঙে গেল৷ শব্দটা শুনতে পেয়েছিল খুনি, শব্দ লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াতেই টবিনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময়৷
সচমকে এক লম্ফ ত্যাগ করে দস্যু রিভলভারে হাত দিল, কিন্তু সে গুলি চালানোর আগেই টবিনের রাইফেল থেকে নিক্ষিপ্ত গুলি অব্যর্থ সন্ধানে তার দেহ বিদ্ধ করল৷
আহত দুর্বৃত্ত চিৎকার করে উঠল, ‘হে যিশু, আমাকে দয়া করো!’ তারপরই সে সঙ্গীর উদ্দেশে হাঁক দিল, ‘পালাও, পালাও! আমি মারা গেলাম!’
রাইফেল গুলি ভরতে ভরতে টবিন দেখল নিকটবর্তী খাদের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক ধাবমান মূর্তি এবং তিরবেগে এগিয়ে চলল একটা ঘন ঘাসঝোপের দিকে—
দুই নম্বর খুনি৷
টবিন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওহে ছোকরার দল, গুলি চালাও৷’
তিনটি সৈনিক একসঙ্গে গুলি ছুড়ল৷ কিন্তু তাদের লক্ষ্য ব্যর্থ হল৷
ততক্ষণে টবিন তার রাইফেলে গুলি ভরে ফেলেছে৷
অভ্যস্ত আঙুলের স্পর্শে চকিত অগ্নিশিখার গর্জিত আবির্ভাব, পরক্ষণেই ধাবমান দস্যুর দেহ ধরাশয্যায় লম্বমান৷
এক গুলিতেই ফিলিপের কোমর ভেঙে দিয়েছে টবিন৷
ভাঙা কোমর নিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারল না ফিলিপ, তবু সে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হল না— একটা গাছ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে গাছটার দিকে এগিয়ে গেল ফিলিপ, তারপর সেই ধরাশায়ী বৃক্ষে পৃষ্ঠ স্থাপন করে বাগিয়ে ধরল রিভলভার৷ একটি সৈন্য টবিনের নির্দেশ অমান্য করে বীরবিক্রমে এগিয়ে গেল দস্যুর দিকে— কিন্তু ফিলিপের গুলি তার টুপি উড়িয়ে দিতেই বীরবরের চৈতন্য হল, চটপট পিছিয়ে এসে বনের আড়ালে সে আত্মগোপন করল৷
অবশেষে শিথিল হয়ে এল ফিলিপের হাত, অবশ মুষ্টি থেকে খসে পড়ল রিভলভার৷ টবিন চিৎকার করে শত্রুকে ডাকল, উত্তরে দুর্বল কণ্ঠে একটা শপথ উচ্চারণ করল ফিলিপ৷ এইবার এগিয়ে গেল টবিন, ফিলিপের চুলের মুঠি ধরে তার ঘাড়টাকে স্থাপন করল গাছের গুঁড়ির উপর, তারপর কটিবন্ধ থেকে খুলে নিল ছোরা— কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ না নিয়ে গেলে পুরস্কার মিলবে না৷
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও এতটুকু কাতর হয়নি দুর্দান্ত মেক্সিকান৷ শত্রুর দিকে তাকিয়ে ফিলিপ বলেছিল, ‘সিনর টবিন, কাজটা একটু তাড়াতাড়ি সারো৷ তোমার ছুরিতে তেমন ধার নেই!’
এসপিনোসা বংশের দুই খুনি ফিলিপ আর জুলিয়েনের ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে গারল্যান্ড দুর্গে উপস্থিত হল টবিন৷ একটা থলির ভিতর থেকে মুণ্ড দুটি বের করে গভর্নরের ডেস্কের উপর টবিন সাজিয়ে দিয়েছিল বলে শোনা যায়৷ সেই সময় সরকারি কোষাগারে টাকা ছিল না, তাই তৎক্ষণাৎ টবিনকে পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়নি— কিন্তু গভর্নর ইভান্স তাঁর পকেট থেকে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে একটি চমৎকার হরিণ-চর্মের পরিচ্ছদ এবং ভালো একটি রাইফেল টবিনকে উপহার দিয়েছিলেন৷
পরবর্তীকালে পুরস্কার হিসেবে যে-অর্থ টবিন পেয়েছিল, তার অঙ্কটা কম নয়—
১৫০০ ডলার!
একটি রাইফেল ও চারটি রিভলভার
গৃহযুদ্ধের আগে আমেরিকা মহাদেশের সীমানা বিস্তৃত হয়েছিল মিসিসিপি ছাড়িয়ে দূরদূরান্তরে এবং সেই সীমান্ত বিস্তারে সাহায্য করেছিল যে-অস্ত্রটি, তার নাম রাইফেল৷ কিন্তু গৃহযুদ্ধের পরবর্তীকালে পশ্চিম আমেরিকার পার্বত্য অঞ্চল ও সমভূমিতে সীমানা বিস্তারের কার্যে রাইফেলের স্থান অধিকার করল ক্ষুদ্রাকৃতি আগ্নেয়াস্ত্র— রিভলভার৷
আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের মানুষ অবশ্য রাইফেলকেই প্রাধান্য দিয়েছিল, কিন্তু পশ্চিম আমেরিকার অধিবাসীরা রাইফেলের পরিবর্তে রিভলভারকে জানাল সাদর অভ্যর্থনা৷
পূর্বাঞ্চলের অরণ্যচারী পদাতিকের মতো পশ্চিম আমেরিকার অশ্বারোহী অধিবাসীরাও ছিল যাযাবর৷ প্রতি মুহূর্তে বিপদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত ছিল দুই অঞ্চলের মানুষ৷ কিন্তু পরিবেশ ভিন্ন হওয়ার জন্যে পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ধরন ছিল একেবারেই আলাদা, তাই অস্ত্র হিসাবে একদল গ্রহণ করল দূরপাল্লার রাইফেল— আর একদল বেছে নিল কাছের থেকে বার বার আঘাত হানার মারাত্মক অস্ত্র, রিভলভার৷
পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীরা কাঠ কেটে আর শিকার করে জীবিকানির্বাহ করত৷ তারা পায়ে হেঁটে চলত, দু-হাত দিয়ে রাইফেল বাগিয়ে ধরতে তাদের অসুবিধা ছিল না৷ অধিকাংশ সময়েই দূর থেকে গুলি চালিয়ে তারা বন্য পশুকে বধ করত, তাই দূরপাল্লার শক্তিশালী রাইফেল ছিল তাদের প্রিয় অস্ত্র৷
অপরপক্ষে পশ্চিমের সমভূমির মানুষ পশুপালনকেই জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করেছিল এবং গৃহপালিত গোরুর পালের রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য তারা সর্বদাই ঘোড়ার পিঠে চেপে চলাচল করত৷ একহাতে লাগাম ধরে আর একহাত দিয়ে রাইফেল চালাতে অসুবিধা হয় বলেই পশ্চিম আমেরিকার মানুষ রাইফেলের চাইতে রিভলভারকেই প্রাধান্য দিয়েছিল৷
শিকারের পক্ষে রাইফেল অবশ্য প্রয়োজনীয়৷ রিভলভার মানুষ খুনের অস্ত্র, খুনির আদর্শ আয়ুধ! পশ্চিম আমেরিকার অধিবাসীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বুঝে নিল ঘোড়ার পিঠেই হোক আর মাটিতে দাঁড়িয়েই হোক, মানুষ মারার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হাতিয়ার হচ্ছে রিভলভার৷ পশ্চিম আমেরিকার বাসিন্দাদের মধ্যে খুনোখুনি ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার৷ কলহরত যোদ্ধাদের মধ্যে দূরত্ব থাকত বারো থেকে চবিশ হাতের মধ্যে— অত কাছ থেকে বন্দুকবাজ মানুষের পক্ষে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া অসম্ভব, কাজেই যে-ব্যক্তি প্রতিপক্ষের আগেই খাপ থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে গুলি চালাতে পারত সে-ই হত জয়ী৷ অর্থাৎ আঙুল এবং কবজির ক্ষিপ্র সঞ্চালনের উপরই জয়-পরাজয় নির্ভর করত অধিকাংশ সময়ে৷
ক্রমাগত অভ্যাসের ফলে কয়েকটি মানুষ ওই ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রে এমন সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিল যে, পলকের মধ্যে রিভলভার কোষমুক্ত করে তারা লক্ষ্য ভেদ করতে পারত অব্যর্থ সন্ধানে— ক্রুদ্ধ কেউটের ছোবল মারার মতোই ছিল তাদের হাত চালানোর কায়দা; যেমন ক্ষিপ্র, প্রাণঘাতী নিশানায় তেমনই নির্ভুল নিষ্ঠুর৷
সুতরাং গৃহযুদ্ধের পরে পশ্চিম আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে শুরু হল রিভলভারের জয়যাত্রা— ভোজনশালায়, খনি শ্রমিকের তাঁবুতে তাঁবুতে, পশুপালনের কেন্দ্রস্থলে এবং শহরে শহরে জাগল রিভলভারের কর্কশ গর্জনধ্বনি— দুর্ধর্ষ রেড ইন্ডিয়ানদের বার বার হটিয়ে দিয়ে সাদা মানুষের অধিকারভুক্ত সীমারেখা বাড়িয়ে দিল মৃত্যুবর্ষী রিভলভার, কিন্তু ওই ক্ষুদ্র অস্ত্রটির মহিমায় আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল পশ্চিম আমেরিকার বুকে৷
দাঙ্গাকারী ও আইন রক্ষকদের সেই সময়ে রিভলভারের আদর ছিল রাইফেলের চাইতে অনেক বেশি৷ রাইফেল দ্রুতবেগে অগ্নিবর্ষণে, অসমর্থ, মন্থর৷ রিভলভার ক্ষিপ্রগামী মৃত্যুর যন্ত্রদূত, হত্যাকারীর হাতে অমোঘ হাতিয়ার৷
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, পশ্চিম আমেরির ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত আগ্নেয়াস্ত্রের লড়াইতে চার-চারটি রিভলভারের গর্জিত মহিমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল একটি মাত্র রাইফেল৷
১৮৮৭ সালে, সেপ্টেম্বর মাসে ৪ তারিখে আরিজোনার হলব্রুক শহরে যে রক্তাক্ত যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল, তার বিবরণ দেওয়ার আগে পূর্বোক্ত হলব্রুক শহর সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা দরকার৷
চারদিকে বালি আর বালি, দক্ষিণে বালুকাসমুদ্রের বুকে সারিবদ্ধ পাহাড়— পাহাড়ের সারির মধ্যে অবস্থান করছে ‘অ্যাপাচি’ নামক দুর্ধর্ষ রেড-ইন্ডিয়ান জাতি— ওই মরু ও পর্বতবেষ্টিত হলব্রুক এক ক্ষুদ্র শহর৷ কিন্তু আকারে ছোটো হলেও একটি কারণে হলব্রুক শহরের কিছু গুরুত্ব ছিল— শহরের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছিল ‘সান্টা ফি’ রেল এবং ওই রেলপথ ছিল ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত৷ বড়ো বড়ো ‘র্যাঞ্চ’ বা গোশালা থেকে গোরুর পাল আসত হলব্রুক শহরে এবং সেখানেই বেচাকেনা চলত৷
হলব্রুক আকারে ক্ষুদ্র, প্রকৃতিতে ভয়ংকর৷ শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোকদের পক্ষে ওই শহরটি মোটেই আদর্শ স্থান ছিল না৷ ওই শহরে যারা ঘেরাফেরা করত তাদের কোমরে চামড়ার খাপে ঝুলত গুলিভরা রিভলভার এবং দেয়ালের মতো নিরেট কোনো বস্তুতে পিঠ না-লাগিয়ে তারা কেউ বসত না— কারণ, অতর্কিতে পিছন থেকে গুলি খাওয়ার ভয়ানক সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা সকলেই ছিল বিলক্ষণ সচেতন৷ কিন্তু পূর্বোক্ত ভয়ানক ভদ্রলোকরাও একটি মানুষকে সভয়ে এড়িয়ে চলত— মানুষটির নাম অ্যান্ডি কুপার৷
লোকটির নাম অ্যান্ডি কুপার কি অ্যান্ড ব্লেভান্স সে-বিষয়ে কিছু মতবিরোধ ছিল৷ অনেকের মতে অ্যান্ডি হচ্ছে ব্লেভান্স গোষ্ঠীর মানুষ, তবে ব্লেভান্স ভাইদের সৎভাই৷ অনেকের মত আবার অন্যরকম৷ তবে এ-বিষয়ে যে-গল্পটা সবচেয়ে প্রচলিত, সেটি হচ্ছে অ্যান্ডি ব্লেভান্স নামক মানুষটিকে টেক্সাস অঞ্চলের এক দুর্দান্ত শেরিফ খুনের অপরাধে গ্রেপ্তার করতে সচেষ্ট হয়— পূর্বোক্ত শেরিফ নাকি লক্ষ্য ভেদে সিদ্ধহস্ত এবং অপরাধীর সাক্ষাৎ পেলেই সে প্রথমে গুলি চালায়, পরে প্রশ্ন করে৷ এহেন শেরিফের কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই টেক্সাস থেকে পলাতক অ্যান্ডি ব্লেভান্স নাকি নাম বদলে অ্যান্ডি কুপার হয়ে গেছে৷
সে যাই হোক, অ্যান্ডি কুপার বা অ্যান্ডি ব্লেভান্স ছিল ভয়ানক ব্যক্তি৷ কুখ্যাত ব্লেভান্স পরিবারের সে ছিল নেতা৷ ওই পরিবারের সব মানুষই ছিল রিভলভার চালনায় সিদ্ধহস্ত৷ ভয়ংকর ঘটনার পর ঘটনার স্রোতে রচিত হয়েছিল ব্লেভান্স পরিবারের রক্তাক্ত ইতিহাস৷
মার্ক ব্লেভান্স ছিল বাপ, তার পাঁচটি পুত্র সন্তান— অ্যান্ডি, হ্যাম্পটন, চার্লস, জন এবং স্যাম৷ স্যামের বয়স ছিল মাত্র ষোলো, কিন্তু ওই বয়সেই সে রিভলভার ছুড়ত পাকা বন্দুকবাজের মতো৷
ম্যাগেল্লান পর্বতমালার বিস্তৃত তৃণ-আচ্ছাদিত উপত্যকা ছিল পশুচারণের পক্ষে চমৎকার জায়গা৷ প্রথমে ওখানে গোরুর পাল নিয়ে এল রাখালের দল, তারপরই হল সেখানে মেষপালকের আবির্ভাব৷ ফলে প্রচণ্ড কলহ৷ গোপালকদের সঙ্গে মেষপালকদের যুদ্ধ বাধল৷
গোপালকদের নেতৃত্ব দিয়েছিল গ্রাহাম পরিবার, বিরোধী মেষপালকদের নেতা ছিল টিউকসবেরি নামক আর একটি গোষ্ঠী৷ ওই যুদ্ধকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়— প্লেজেন্ট ভ্যালি ওয়ার, গ্রাহাম-টিউকসবেরি দাঙ্গা, ম্যাগেল্লান যুদ্ধ প্রভৃতি৷ আরিজোনা প্রদেশে সংঘটিত যাবতীয় দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল পূর্বোক্ত যুদ্ধ৷
ওই লড়াইতে অন্তত বিশ জন লোক মারা গিয়েছিল৷ ব্লেভান্স পরিবার ছিল গোপালকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী৷ ১৮৮৭ সালে জুলাই মাসে পরিবারের কর্তা মার্ক ব্লেভান্স হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল৷ সেই সময় তার পাত্তা পাওয়া যায়নি৷ সাত বছর পরে একটি ফাঁপা গাছের গুঁড়ির মধ্যে এক অস্থিময় নরমুণ্ডের সঙ্গে যে-রাইফেলটা পাওয়া গিয়েছিল, সেই রাইফেলটিকে মার্ক ব্লেভান্সের নিজস্ব অস্ত্র বলে শনাক্ত করা হয়েছিল৷ মুণ্ডহীন দেহটিকে উদ্ধার করা যায়নি, মার্কের হত্যাকারীরও সন্ধান করতে পারেনি কেউ৷
জুলাই মাসে মার্ক ব্লেভান্স মারা গেল, অগাস্টে দাঙ্গার বলি হল ব্লেভান্স পরিবারের দ্বিতীয় ব্যক্তি— মার্কের মেজো ছেলে হ্যাম্পটন ব্লেভান্স অতর্কিতে গুলি খেয়ে মৃত্যুবরণ করল৷
টিউকসবেরি দলের লোকরাই নিশ্চয় গুলি করে মেরেছিল হ্যাম্পটনকে৷ বাপ এবং পাঁচ ছেলের মধ্যে দুজন মারা পড়ল, রইল বাকি চার৷ মার্কের চারটি ছেলেই ছিল রিভলভার চালাতে ওস্তাদ৷ ষোলো বছরের কিশোর স্যামও লক্ষ্য ভেদ করতে পারত অব্যর্থ সন্ধানে৷ ওই চারটি ছেলেই প্রতিশোধ গ্রহণে কৃতসংকল্প, তারা টিউকসবেরির দলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সুযোগের প্রতীক্ষা করছিল সাগ্রহে৷
সুযোগ এল৷ টিউকসবেরিদের গোশালার কাছেই গুলির আঘাতে মারা পড়ল জন টিউকসবেরি এবং তার অংশীদার বিল জ্যাকব৷ দুজনকেই পিছন থেকে গুলি করা হয়েছিল৷ ব্লেভান্স পরিবারের এক বা একাধিক ব্যক্তি যে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী সে-বিষয়ে শহরবাসীর সন্দেহ ছিল না একটুও— কিন্তু, প্রমাণ কোথায়?
অ্যান্ডি কুপারের একটি দোষ ছিল৷ খুনখারাপি করে সে চুপচাপ থাকতে পারত না, নিজের বীরত্বের কাহিনি সে বলে বেড়াত বুক ফুলিয়ে৷ জোড়া খুনের ব্যাপারটাও সে চেপে রাখতে পারল না বা চাইল না— সগর্বে সে জানিয়ে দিল জন টিউকসবেরি ও বিল জ্যাকবকে সে নিজের হাতে গুলি করে মেরেছে৷
হলব্রুক শহরের মার্শাল লোকমুখে ব্যাপারটা জানতে পারলেন৷ মার্শাল মহাশয় জানতেন অ্যান্ডিকে গ্রেপ্তার করতে গেলে সে সুবোধ বালকের মতো ধরা দিতে রাজি হবে না এবং তাকে সাহায্য করতে ছুটে আসবে উদ্যত রিভলভার নিয়ে ব্লেভান্স পরিবারের চার ভাই— গরম গরম গুলির ঝড়ে প্রাণ বিপন্ন করে আইনরক্ষার আগ্রহ দেখালেন না মার্শাল, সব জেনেশুনেও তিনি চুপ করে রইলেন৷
সকলেই ভাবল ব্যাপারটা এখানেই চুকে গেল৷ কিন্তু তা হল না, আইন রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে শহরে প্রবেশ করল অশ্বারোহী নূতন শেরিফ— কমোডোর ওয়েন্স৷
নবাগত শেরিফের কয়েকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল৷ তার কোমরের বাঁ-দিকে খাপে-আটকানো রিভলভারের বাঁট ছিল সামনের দিকে ফেরানো— অর্থাৎ অস্ত্রটা হস্তগত করতে হলে তাকে নিজের শরীরের ওপর দিয়ে হাত চালাতে হবে৷ ওইভাবে খাপের রিভলভার বার করতে গেলে যথেষ্ট দেরি হয়, সকলেই জানে সঙিন মুহূর্তে বিদ্যুৎবেগে রিভলভার হস্তগত করে গুলি চালাতে না-পারলে প্রতিপক্ষের গুলিতে রিভলভারধারীর মৃত্যু অনিবার্য— অতএব, বন্দুকবাজ মানুষ মাত্রেই কোমরের ডান দিকে রিভলভার রাখে এবং অস্ত্রের বাঁট থাকে পিছনদিকে ফেরানো, কারণ, ওই অবস্থায় রিভলভারটাকে চটপট টেনে খাপ থেকে বার করা যায়৷
সুতরাং কোমরের বাঁ দিকে সামনের-দিকে-ফেরানো রিভলভারের বাঁট নিয়ে কমোডোর ওয়েন্স নামে নূতন শেরিফ যখন গুন্ডার রাজত্ব হলব্রুক শহরে প্রবেশ করল, তখন তাকে দেখে শহরবাসীর মুখে মুখে ফুটল বিদ্রূপের হাসি৷
ওয়েন্সের চেহারাও আদর্শ আইনরক্ষকের মতো ছিল না৷ দাঙ্গাহাঙ্গামায় অভ্যস্ত পাকা বন্দুকবাজ মানুষের মুখে-চোখে যে রুক্ষ কাঠিন্যের আভাস থাকে, গোঁফ-দাড়ি-কামানো ওয়েন্সের পরিচ্ছন্ন মুখে সেই ধরনের অভিব্যক্তি অনুপস্থিত— উপরন্তু মস্ত বড়ো টুপির তলা থেকে লম্বা লম্বা সোনালি চুল ঘাড় অবধি নেমে এসে তার চেহারাটাকে করে তুলেছে শৌখিন ভদ্রলোকের মতো৷
তবে হ্যাঁ, তার ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল লোকটি পাকা ঘোড়সওয়ার৷ ঘোড়ার পিঠে জিনের সঙ্গে ওয়েন্সের পায়ের ফাঁকে ঝুলছিল একটি উইনচেস্টার রাইফেল৷
হঠাৎ হলব্রুক শহরে শেরিফ হয়ে এই মানুষটি কেন প্রবেশ করল সে-কথা জানতে হলে কমোডোর ওয়েন্স সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা দরকার৷ কমোডোর ওয়েন্স এসেছিল টেক্সাস অঞ্চলে একপাল গোরুর রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য৷ একটি ‘র্যাঞ্চ’ বা গোশালার বেতনভোগী পরিচালক ছিল সে৷ সেই সময় তার বয়স ছিল ৩৫, নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ওয়েন্স ছিল সম্মানিত ব্যক্তি৷
একদিন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার টাকা লুঠ করার চেষ্টা করল তিনটি চোর৷ তাদের চেষ্টা অবশ্য সফল হয়নি, কিন্তু চোরদের তো গ্রেপ্তার করা দরকার?— তবে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধে কে? প্রত্যেকটি অপরাধী যেখানে খুন করতে অভ্যস্ত, সেখানে চোরের পিছনে তাড়া করা আর আত্মহত্যার চেষ্টা করায় তফাত কিছু নেই— অতএব শেরিফের দায়িত্ব নিয়ে শান্তিরক্ষার কর্তব্যপালন করার আগ্রহ কেউ দেখাল না৷
কিন্তু কমোডোর ওয়েন্সকে যখন আত্মহত্যার সহজ পথ দেখানো হল, অর্থাৎ শেরিফের পদে নিয়োগ করার প্রস্তাব দেওয়া হল, সে রাজি হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ৷ বিভিন্ন অঞ্চলের অপরাধীদের পাকড়াও করে ‘সেন্ট জন’ নামক ছোটো শহরের বিচারালয়ে উপস্থিত করার দায়িত্ব নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হলব্রুক শহরে এসে পৌঁছোল কমোডোর ওয়েন্স৷
তাবৎ হলব্রুক শহর ওয়েন্সকে দেখে হাসাহাসি করতে লাগল— লম্বা সোনালি চুল আর উলটোদিকে ফেরানো রিভলভার নিয়ে এই মেয়েমুখো শেরিফটা যে অতি শীঘ্রই গুলি খেয়ে মরবে, সে-বিষয়ে শহরবাসীর সন্দেহ ছিল না কিছুমাত্র৷
নূতন শেরিফ শান্তভাবে তার বাহিনীকে দাঁড় করাল ‘ব্রাউন অ্যান্ড কাইন্ডার’ নামে ভাড়াটে আস্তাবলের কাছে, তারপর ঘোড়াটাকে যথাস্থানে রেখে অফিসের ভিতর প্রবেশ করল৷
একটি ছোকরা এতক্ষণ অফিসে বসে ভাঙা বেহালা মেরামত করছিল৷ সে ওয়েন্সকে দেখে উঠে দাঁড়াল, তারপর বাইরে বেরিয়ে গেল ধীর পদক্ষেপে৷
ওই ছোকরা হচ্ছে জন ব্লেভান্স, ব্লেভান্স ভাইদের চতুর্থ ভ্রাতা৷ সে আগে কখনো ওয়েন্সকে দেখেনি, কিন্তু লোকের মুখে মুখে লম্বা চুলওয়ালা নূতন শেরিফের বর্ণনা তার শ্রুতিগোচর হয়েছিল৷ এখন ওয়েন্সকে দেখেই সে তার পরিচয় আন্দাজ করে নিল এবং ওইসঙ্গে এ-কথাও ভেবে নিল যে, নূতন শেরিফের হঠাৎ উপস্থিতির সঙ্গে তার বড়ো ভাই অ্যান্ডি কুপারের একটা অশুভ যোগসূত্রের কার্যকারণ সম্বন্ধ থাকা বিচিত্র নয়— হয়তো অ্যান্ডিকে গ্রেপ্তার করার জন্যই আবির্ভুত হয়েছে শেরিফ ওয়েন্স৷ অতএব কনিষ্ঠের কর্তব্য হিসাবে সে চটপট যাত্রা করল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অ্যান্ডির সন্ধানে, তাকে এখনই সাবধান করে দিতে হবে যে!
সত্যি কথা বলতে কী, ওয়েন্সের কাছে অ্যান্ডি কুপারের নামে একটা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল৷ কিন্তু পরোয়ানায় তাকে খুনি বলে অভিযুক্ত করা হয়নি, সেটা ছিল ঘোড়া চুরির অভিযোগ৷ ওয়েন্স আর অ্যান্ডি ছিল পূর্বপরিচিত৷ ওই ঘোড়া চুরির ব্যাপারটা নিয়ে আগেও তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল৷ এর মধ্যে চুরির অভিযোগ আদালতে উঠেছে, আর অভিযুক্ত অ্যান্ডি কুপারকে গ্রেপ্তার করার ভার নিয়ে হলব্রুক শহরে উপস্থিত হয়েছে কমোডোর ওয়েন্স৷ কিন্তু আসল ব্যাপারটা ছিল সকলের কাছেই অজ্ঞাত৷ তাই জন ব্লেভান্স যখন ভ্রাতৃবর অ্যান্ডিকে শেরিফের আগমন-সংবাদ পরিবেশন করতে ছুটল, সেও ভেবে নিল যে, সদ্য-সংঘটিত জোড়া খুনের তদন্ত করার জন্যই এই অঞ্চলে শেরিফ ওয়েন্সের শুভাগমন— অতএব অ্যান্ডি কুপারের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন৷
হলব্রুক পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে খোশমেজাজে আড্ডা দিচ্ছিল অ্যান্ডি কুপার৷ অকস্মাৎ হন্তদন্ত হয়ে সেখানে জন ব্লেভান্সের আবির্ভাব!
‘ওহে অ্যান্ডি, শহরে ওয়েন্স এসেছে৷’
‘জানি৷’ অ্যান্ডি বলল৷
অ্যান্ডি আগেই অশ্বারোহী ওয়েন্সকে দেখতে পেয়েছিল৷ তখন সে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি৷ কিন্তু এখন ভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সে হঠাৎ অনুভব করল, আবহাওয়া মোটেই সুবিধের নয়৷
অ্যান্ডি কুপার ছিল চোর এবং খুনি৷ অনেকবারই সে গোরু ঘোড়া চুরি করেছে৷ বহু চৌর্যবৃত্তির মধ্যে যেকোনো একটি চুরির অভিযোগ তার নামে থাকতে পারে, তার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে সদ্য সদ্য দুটি মানুষ খুন করে সে শহরময় তার কীর্তির কথা প্রচার করেছে নিজমুখে— এখন সেই খুনের অভিযোগে যদি ওয়েন্স তাকে গ্রেপ্তার করতে এসে থাকে তাহলে তো সময় থাকতে সাবধান হওয়া দরকার৷
মুহূর্তের মধ্যে সংকল্প স্থির করল অ্যান্ডি কুপার৷
‘আমি র্যাঞ্চে যাচ্ছি,’ জনকে উদ্দেশ করে বলল অ্যান্ডি৷
ক্যানিয়ন ক্রিক নামক স্থানে ব্লেভান্স পরিবারের একটি গোশালা ছিল৷ কয়েকটা গোরু ওখানে থাকত৷ অনেকে বলে, গোরু ঘোড়া চুরি করে পাচার করার জন্য লোকের চোখে ধুলো দিতে ওই গোশালাটি রেখেছে ব্লেভান্স পরিবার৷ ওই জায়গাটিরই উল্লেখ করেছিল অ্যান্ডি বন্ধুদের সামনে৷
ভাইকে তার পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিয়ে অ্যান্ডি তার ঘোড়াটাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বলল৷ যে-বাড়িতে ব্লেভান্সরা থাকত, সেই বাড়িটা ছিল পূর্বে উল্লিখিত ‘ব্রাউন অ্যান্ড কাইন্ডার’ নামে আস্তাবলটির কাছে৷ বন্ধুদের শুনিয়ে সে বলল বটে র্যাঞ্চই হচ্ছে তার গন্তব্যস্থল, কিন্তু ভাইকে আস্তাবল থেকে ঘোড়াটাকে নিয়ে যেতে বলে সে রওনা দিল বাড়ির দিকে— কমোডোর ওয়েন্সকে সে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল৷
আগেই বলেছি অ্যান্ডি এবং ওয়েন্স পরস্পরের পরিচিত ছিল৷ কাজেই হলব্রুক শহরের লোক ওয়েন্সের চেহারা ও হাবভাব দেখে যতই হাসাহাসি করুক, অ্যান্ডি ভালো করেই জানত কমোডোর ওয়েন্স কোন ধরনের মানুষ— অতএব তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে মোটেই ইচ্ছুক ছিল না অ্যান্ডি৷
এদিকে ওয়েন্স তার ঘোড়াটাকে আস্তাবলে রেখে দাঙ্গাবাজিতে অভ্যস্ত বন্দুকবাজ মানুষ যা করে তাই করছিল, অর্থাৎ রাইফেল ও রিভলভারের কলকবজা পরীক্ষা করে দেখছিল৷ রাইফেল সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে সে যখন রিভলভার পরিষ্কার করছে, সেই সময় হঠাৎ দুই ব্যক্তির আবির্ভাব— স্যাম ব্রাউন ও ডি. জি. হার্ভে৷ দুজনেই ছিল ওয়েন্সের বন্ধু৷ তাদের দেখামাত্রই ওয়েন্স প্রশ্ন করল, ‘অ্যান্ডি কুপারকে দেখেছ?’
উত্তর এল, ‘হ্যাঁ, সে এখন এই শহরেই আছে৷’
ঠিক তখনই প্রবেশ করল জন ব্লেভান্স, তারপর অ্যান্ডির ঘোড়াটাকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করল৷
তিনটি মানুষ নীরবে জনের কার্যকলাপ দেখল, তারপর মৌনভঙ্গ করল স্যাম ব্রাউন, ‘ওই ছোকরা হচ্ছে ব্লেভান্স ভাইদের এক ভাই৷ আর ওটা হচ্ছে অ্যান্ডি কুপারের ঘোড়া৷ অ্যান্ডি এখন শহর থেকে সরে পড়তে চাইছে৷’
কমোডোর ওয়েন্স একটিও কথা বলল না৷ হাতের রিভলভারটাকে উলটো করে বাঁ-দিকের খাপে ঢুকিয়ে দিল, তারপর উইনচেস্টার রাইফেলটা হস্তগত করে আস্তাবলের বাইরে পদার্পণ করল৷ আস্তাবলের কাছেই একটু দূরে রাস্তার উপরে অবস্থান করছিল ব্লেভান্স পরিবারের বাড়ি— আঙুল তুলে ওয়েন্সের বন্ধুরা তাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিল৷
বাড়িটা ছিল কাঠের তৈরি, একতলা৷ রাস্তা থেকে ১৫ ফুট দূরে অবস্থিত ওই বাড়ির সামনের দিকে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, তারপরই সমান্তরালভাবে চলে গেছে ‘সান্টা ফি’ রেললাইন৷ পূর্বে উল্লিখিত আস্তাবলের পুব দিকেই ছিল ব্লেভান্স পরিবারের বাড়ি৷ ব্লেভান্সদের বাড়ির কাছাকাছি আরও কয়েকটা ছোটো ছোটো বাড়ি ছিল৷ ব্লেভান্সদের বাড়ির ঠিক আগেই যে কামারশালাটা ছিল, সেখানে এসে দাঁড়াল কমোডোর ওয়েন্স— হাতে তার গুলি ভরা রাইফেল৷
বাড়ির সামনের দিকে দুটো জানালা, ভিতরে সম্ভবত দুটো ঘর৷ ওয়েন্সের বাঁ-দিকে খানিকটা ঢাকা জায়গা, বোধ হয় সেখানেও একটা ঘর রয়েছে এবং ওই জায়গাটার সংলগ্ন বারান্দাটা ঘুরে বাড়ির সামনের অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে৷ দুটি দরজার একটি রয়েছে ঢাকা জায়গাটার দিকে, আর একটি দরজা অবস্থান করছে বাড়ির প্রধান অংশের সম্মুখে৷
বাড়ির ভিতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন ছিল না ওয়েন্স৷ তার অজ্ঞাতে বাড়ির মধ্যে জমায়েত হয়েছিল কয়েকটি নারী ও পুরুষ৷
পুরুষদের মধ্যে ছিল স্বয়ং অ্যান্ডি কুপার, জন ব্লেভান্স, পরিবারের অন্যতম বন্ধু ও ওই বাড়ির অধিবাসী মোস রবার্টস এবং স্যাম হোস্টন ব্লেভান্স৷
মেয়েরা ছিল সংখ্যায় তিনজন— ব্লেভান্স ভাইদের বিধবা মাতা মিসেস মেরি ব্লেভান্স, ইভা ব্লেভান্স নামে একটি ভাই-বউ, এবং মিসেস অ্যামান্ডা গ্ল্যাডেন নামে পরিবারের এক বান্ধবী৷
শেরিফ ওয়েন্স যখন বাড়ির সামনে উঠানের উপর এসে দাঁড়াল, দরজাগুলি তখন বন্ধ ছিল৷ ওয়েন্স উঠান থেকে বারান্দায় উঠে এল, সঙ্গেসঙ্গে বাড়ির সংলগ্ন ঢাকা জায়গাটার মধ্যে চারটি মনুষ্যমূর্তি তার চোখে পড়ল৷
ওয়েন্স চিৎকার করে উঠল, ‘অ্যান্ডি কুপার, বাইরে এসো৷’
ছোটো ঘরের ভিতর থেকে বড়ো ঘরে প্রবেশ করল অ্যান্ডি, পরক্ষণেই দরজা খুলে গেল— ওয়েন্স দেখল তার সামনে দণ্ডায়মান অ্যান্ডি কুপার, হাতে খোলা রিভলভার৷
প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ঢাকা জায়গাটার সংলগ্ন দরজায় শব্দ উঠল, অর্ধমুক্ত দ্বারপথে ওয়েন্সের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একটি পরিচিত মানুষকে আবিষ্কার করল— উদ্যত রিভলভার হাতে জন ব্লেভান্স৷
কমোডোর ওয়েন্স তখন দুই ভাইয়ের মাঝখানে, তার অবস্থা রীতিমতো সংকটজনক৷ কিন্তু ওয়েন্সের চোখে-মুখে ভীতি বা উত্তেজনার চিহ্ন দেখা গেল না, রাইফেলটা যেমন কোমরের কাছে ধরা ছিল তেমনই রইল— শুধু তার দুই চোখের প্রখর দৃষ্টি নিশ্চল হয়ে রইল অ্যান্ডির ওপর, পিছনে জন ব্লেভান্সের গতিবিধি লক্ষ করার সুযোগ বা সময় ছিল না৷
শান্তস্বরে ওয়েন্স বলল, ‘কুপার, আমি তোমাকে চাই৷’
গর্জে উঠল খুনি, ‘কেন? আমাকে কী দরকার?’
‘তোমার নামে পরোয়ানা আছে৷’
‘কীসের পরোয়ানা?’
অনর্থক কথাবার্তা বলে কালক্ষেপ করতে চাইছিল অ্যান্ডি কুপার৷ ওই সময়ের মধ্যে বাড়ির ভিতর রিভলভারধারী তিন ব্যক্তি পছন্দমতো জায়গায় দাঁড়িয়ে ওয়েন্সের উপর নিশানা স্থির করার সুযোগ পাবে বলেই অ্যান্ডি সময় নষ্ট করছিল৷ ওয়েন্স হয়তো অ্যান্ডির উদ্দেশ্যে বুঝেছিল, কিন্তু কর্তব্য অনুসারে সে পরোয়ানার অভিযোগ ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হল৷
‘ঘোড়া চুরির যে ব্যাপারটা আগে তোমাকে বলেছিলাম, সেই অভিযোগই রয়েছে এই পরোয়ানাতে৷’
‘অপেক্ষা করো, এ-বিষয়ে আমি পরে ভেবে দেখব৷’
‘আমি অপেক্ষা করতে পারব না৷ এই মুহূর্তে তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে৷’
অকস্মাৎ চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল অ্যান্ডি কুপার, ‘আমি যাব না৷’
প্রায় একইসঙ্গে গর্জে উঠল রিভলভার ও রাইফেল৷
ওয়েন্স তার রাইফেল তুলে ধরার সময় পায়নি, কোমরের কাছে ধরা অবস্থাতেই সে ট্রিগার টিপেছিল৷ ওয়েন্স অনুভব করল তার দেহের পাশ দিয়ে ছুটে গেল লক্ষ্যভ্রষ্ট রিভলভারের তপ্ত বুলেট, কিন্তু অ্যান্ডি কুপার প্রতিদ্বন্দ্বীর রাইফেলকে ফাঁকি দিতে পারল না— অসহ্য যাতনায় অ্যান্ডির শরীর দুমড়ে গেল দু-ভাঁজ হয়ে, উইনচেস্টার রাইফেলের ভারী গুলির আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গেল তার পাকস্থলী৷
সমস্ত ঘটনাটা ঘটল মুহূর্তের মধ্যে৷ দু-দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই প্রায় প্রতিধ্বনির মতো আর একটি গুলির আওয়াজ শোনা গেল৷ খিড়কির দরজা থেকে গুলি চালিয়েছে জন ব্লেভান্স৷
অত কাছ থেকে জনের মতো পাকা বন্দুকবাজ কী করে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল বলা মুশকিল, খুব সম্ভব ওয়েন্স চটপট সরে গিয়েছিল— তবে গুলিটা যে ফসকে গিয়েছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ একটু দূরেই বাঁধা ছিল অ্যান্ডির ঘোড়া— ওয়েন্সের উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত বুলেট এসে লাগল তার গায়ে৷ জন্তুটা মারা পড়ল তৎক্ষণাৎ৷
ওয়েন্সের রাইফেল তখনও কোমরের কাছেই নীচু করে ধরা ছিল৷ অস্ত্রটাকে না-তুলে সেই অবস্থাতেই সে সাঁৎ করে জনের দিকে ঘুরে গেল এবং পরক্ষণেই অভ্যস্ত আঙুলের চাপে রাইফেল করল অগ্নি-উদগিরণ৷
পিছন দিকে ঘুরে পড়ে গেল জন ব্লেভান্স৷ গুলির আঘাতে তার একদিকের কাঁধ চূর্ণবিচূর্ণ৷
একলাফে বারান্দা থেকে নেমে রাস্তার উপর এসে দাঁড়াল ওয়েন্স, এর মধ্যেই সে রাইফেলের লিভার টেনে শূন্য গুলির খোল ফেলে নূতন টোটা ভরে ফেলেছে৷ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে দু-দিকের দরজার উপরই সে নজর রাখতে পারছিল৷ পলকের জন্য খোলা জানালা দিয়ে অ্যান্ডির দেহ তার চোখে পড়ল— টলতে টলতে ঘরের ভিতর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আহত খুনি৷ আবার গর্জে উঠল উইনচেস্টার রাইফেল, কিন্তু এবার ওয়েন্সের লক্ষ্য ব্যর্থ হল৷
ঠিক সময়েই সরে গিয়েছিল ওয়েন্স, কারণ সে রাস্তায় নেমে পড়ার সঙ্গেসঙ্গেই বাড়ির পুবদিকে ঘুরে সামনে এসে দাঁড়াল মোস রবার্টস, পরক্ষণেই সশব্দে অগ্নিবৃষ্টি করল তার হাতের রিভলভার৷
এতক্ষণের মধ্যে এই প্রথম ওয়েন্স গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করল৷ বাড়ির সামনে একটা ‘ওয়াগন’ দাঁড়িয়ে ছিল, সেই গাড়িটার পিছনে সরে এসে ওয়েন্স রাইফেল চালাল৷
প্রচণ্ড আঘাতে এক পাক ঘুরে পিছিয়ে গেল রবার্টস, তারপর টলতে টলতে আত্মগোপন করল বাড়ির পিছন দিকে৷
কিন্তু লড়াই তখনও শেষ হয়নি৷ অ্যান্ডির পরিত্যক্ত রিভলভারটা তুলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল প্রতিশোধ গ্রহণে কৃতসংকল্প কিশোর স্যাম হোস্টন ব্লেভান্স৷ সে রিভলভার তুলে ওয়েন্সের দিকে লক্ষ্য স্থির করতে লাগল৷ কিন্তু স্যামের রিভলভার অগ্নিবর্ষণ করার সুযোগ পেল না, তার আগেই ওয়েন্সের রাইফেলের গুলি অব্যর্থ সন্ধানে প্রতিবন্দ্বীর বক্ষ ভেদ করল৷ স্যামের মৃত্যু হল তৎক্ষণাৎ৷ তার প্রাণহীন দেহ দরজা দিয়ে এসে পড়ল মায়ের প্রসারিত বাহুবন্ধনের মধ্যে৷
কয়েক মিনিট পরে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল শেরিফ কমোডার ওয়েন্স৷ তার সঙ্গে এল আশেপাশে দণ্ডায়মান দর্শকের দল৷ মেয়েরা তখন চিৎকার করে কাঁদছে আর সাহায্য ভিক্ষা করছে৷
বাড়ির ভিতরের অবস্থা তখন বিধ্বস্ত রণক্ষেত্রের মতো৷ দেয়াল, মেঝে, আসবাবপত্র রক্তে রক্তময়৷ বিছানার উপর পড়ে আছে রবার্টসের দেহ, ওইখানেই এসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে সে৷ দরজার কাছে স্যামের প্রাণহীন শরীর মেঝের উপর লম্ববান; আর একটু দূরেই মায়ের ঘরে মেঝের উপর পড়ে অসহ্য যাতনায় ছটফট করছে অ্যান্ডি কুপার, তার উদর বিদীর্ণ করে দিয়েছে রাইফেলের বুলেট৷ আর্তস্বরে অ্যান্ডি বার বার অনুরোধ করছে তাকে যেন এই মুহূর্তে গুলি করে মেরে ফেলা হয়, এই যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারছে না৷
অ্যান্ডির মৃত্যু হল পরের দিন৷ চারজনের মধ্যে প্রাণে বেঁচেছিল শুধু জন ব্লেভান্স৷ অর্ধমূর্ছিত অবস্থায় সে বসেছিল একটা চেয়ারের উপর, তার সর্বাঙ্গ রক্তসিক্ত৷ সে আরোগ্যলাভ করেছিল৷ পরবর্তীকালে বিচারে তার কারাদণ্ডের আদেশ হয়৷
কিন্তু ওই ভয়ংকর রক্তাক্ত যুদ্ধে কমোডোর ওয়েন্স ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত৷ সে রাইফেল ছুড়েছিল পাঁচবার— তার মধ্যে একবারই সে ব্যর্থ হয়েছিল, বাকি চারটি গুলি লক্ষ্য ভেদ করেছিল অব্যর্থ সন্ধানে৷
দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিণাম
প্রথম পরিচ্ছেদ: হন্তারক
কথায় কথায় ঝগড়া৷ তারপরই মুষ্টিবদ্ধ হস্তের মুষ্টিযোগ৷
পশ্চিম আমেরিকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর শহর ফোর্ট গিবসন-এর একটি নৃত্যশালায় দুটি ক্রুদ্ধ যুবকের মধ্যে যে-লড়াইটা শুরু হয়েছিল, সেই মুষ্টিযুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিট পরেই— কিন্তু পরবর্তীকালে ওই দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিণাম সমগ্র দেশের বুকে ছড়িয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাস ও বিভীষিকার করাল ছায়া৷
ফোর্ট গিবসন শহর৷ ওই শহরের একটি নৃত্যশালায় রাতের আসর জমজমাট৷ পুরুষদের সঙ্গে মেয়েরাও যোগ দিয়েছে মহা আনন্দে; চলছে নাচগান, হইহুল্লোড়৷ হঠাৎ সামান্য কারণে ঝগড়া বাধল দুটি যুবকের মধ্যে৷ যুবকদের নাম ক্রফোর্ড গোল্ডসবি এবং জেক লিউইস৷
ক্রফোর্ডের বয়স লিউইসের চাইতে অনেক কম, তার শরীরটাও বেশ দশাসই জোয়ানের মতো৷ বিপুলবপু দীর্ঘদেহী ক্রফোর্ডের সামনে জেককে নিতান্তই নগণ্য মনে হয়৷ কিন্তু লিউইস মারামারিতে পোক্ত— বহুদিনের অভিজ্ঞতার ফলে সে মার খেতে যেমন অভ্যস্ত, মার ফিরিয়ে দিতেও তেমনই ওস্তাদ৷ অতএব ক্রফোর্ড যখন তার ঘুসি হজম করে পালটা ঘুসিতে তাকে মেঝের উপর শুইয়ে দিল, তখনই পরাজয় স্বীকার করতে রাজি হল না সে৷
হঠাৎ বাধা দিলেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, ‘ওহে ছোকরারা, তোমরা বাইরে গিয়ে ফয়সালা করো৷ এটা মারামারির জায়গা নয়৷ এখানে মহিলারা আছেন৷’
‘বেশ,’ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ক্রফোর্ডের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল লিউইস, ‘আমি বাইরে যাচ্ছি৷’
‘খুব ভালো কথা৷ আমিও যাচ্ছি,’ সদম্ভে উত্তর দিল ক্রফোর্ড৷
নাচঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল দুই যুযুধান৷
মে মাসের রাত্রি, আলো-আঁধার-মাখা রাজপথের উপর শুরু হল মারামারি৷ সজোরে ঘুসি চালাল ক্রফোর্ড৷ ছিটকে পড়ল জেক৷ পরক্ষণেই বিড়ালের মতো লঘু চরণে ভূমিশয্যা ত্যাগ করে লিউইস ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রমাণ হয়ে গেল শক্তির চাইতে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক বেশি৷ হাত ঝেড়ে লিউইস ঢুকল নাচঘরের ভিতর, বাইরে মাটিতে পড়ে রইল প্রহার-জর্জরিত ক্রফোর্ডের প্রায়-অচেতন অবসন্ন দেহ৷
কয়েকটি দর্শক ধরাধরি করে আহত ক্রফোর্ডকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল৷
‘ছেড়ে দাও!’ ক্রোধরুদ্ধ হিংস্র কণ্ঠে গর্জে উঠল ক্রফোর্ড, ‘আমাকে একা থাকতে দাও৷’
টলতে টলতে কয়েক পা এগিয়ে এসে একবার দাঁড়াল সে৷ তার দুই চোখ ঘুসির আঘাতে প্রায় বুজে এসেছে— সেই আধবোজা চোখের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি দরজার উপর নিবদ্ধ; ওই দরজা দিয়েই নাচঘরের ভিতর ঢুকেছে জেক লিউইস৷
আসরের মুক্ত দ্বারপথে ভেসে আসছে নৃত্যগীত ও বাদ্যযন্ত্রের মধুর ধ্বনি, কিন্তু সেই শব্দের তরঙ্গ ক্রফোর্ডের কানে প্রবেশের পথ পায়নি৷ তার অন্তরের অন্তস্থল ভেদ করে জেগে উঠেছে এক হত্যাপাগল হন্তারক, প্রতিশোধের হিংস্র আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ না-করে তার তৃপ্তি নেই৷
দুই হাতে মুঠো পাকিয়ে একবার মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটিকে সে নিরীক্ষণ করল৷ মুঠির হাড়গুলো ঘুসোঘুসির ফলে ক্ষতবিক্ষত৷ হাত দুটো নামিয়ে নিল ক্রফোর্ড, তারপর অস্পষ্ট ভগ্ন স্বরে বলে উঠল, ‘এই শেষ৷ হাতাহাতি মারামারির মধ্যে আমি আর নেই৷’
কাছাকাছি যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা পিছিয়ে গেল সভয়ে৷ কণ্ঠস্বরে খুনির উদগ্র আগ্রহ বুঝে নিতে তাদের একটু দেরি হয়নি৷
ক্রফোর্ড যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই জায়গাটার উপর আলো এসে পড়েছিল নাচঘরের ভিতর থেকে৷ ক্রফোর্ড গোল্ডসবি আলোকিত স্থান ত্যাগ করে ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারের ভিতর পদচালনা করল৷ তার দীর্ঘ দেহ রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই নাচঘরের দরজা ঠেলে বাইরে ছুটে এল ক্রফোর্ডের বান্ধবী ম্যাগি গ্লাস৷ সে চিৎকার করে ডাকল, ‘ক্রফোর্ড! ক্রফোর্ড!’
উত্তর এল না৷ আবার চিৎকার করে ডাক দিল তরুণী৷ রাতের অন্ধকার ভেদ করে এইবার ভেসে এল ক্রফোর্ডের কণ্ঠস্বর, ‘এখানে এসো না৷ এখন আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই না৷ পরে সাক্ষাৎ হবে৷ সম্ভবত নোয়াটা শহরে তোমার সঙ্গে আমি দেখা করতে পারব৷’
যেখানে তার ঘোড়াটা বাঁধা ছিল, সেইখানে এগিয়ে গেল ক্রফোর্ড— তারপর একলাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে বাহনকে চালনা করল তিরবেগে৷ সারারাত ধরে ছুটল ঘোড়া৷ ভোরের দিকে সে এসে পৌঁছোল বাড়িতে৷ ক্রফোর্ড তার ঘুমন্ত মা আর ভাইকে জাগাল না, নিঃশব্দে বাড়ির ভিতর ঢুকে সে অস্ত্র গ্রহণ করল এবং পথশ্রান্ত বাহনটিকে রেখে আর-একটি তাজা ঘোড়া বেছে নিল আস্তাবল থেকে৷
পরের দিন৷ বেশ বেলা হয়েছে৷ ধক ধক জ্বলছে সূর্যের আলো৷ ওল্ড টাউন শহরের জি. এল. বাউডেন নামক ভদ্রলোকটির গোলাবাড়ির দিকে হেঁটে চলেছে লিউইস৷ ওইখানেই সে কাজ করে৷
উঠোন পার হয়ে গোলাবাড়ির এলাকার মধ্যে লিউইস পদার্পণ করল৷ মাথা নীচু করে সে পদচারণা করছিল অন্যমনস্কভাবে, হঠাৎ তার কানে এল তীব্র কণ্ঠস্বর, ‘এই যে লিউইস! ঠিক সময়েই তুমি এসে পড়েছ!’
সচমকে মুখ তুলে লিউইস দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে গোল্ডসবি ক্রফোর্ড!
ক্রফোর্ডের মুখের ওপর বিগত রাত্রের প্রহার-চিহ্ন দিবালোকে সুস্পষ্ট, ক্ষতবিক্ষত সেই মুখে করাল ক্রোধের হিংস্র অভিব্যক্তি— লিউইস সভয়ে নিরীক্ষণ করল, ক্রফোর্ডের ডান হাতে রয়েছে একটা ভারী রিভলভার৷
মুহূর্তের মধ্যে লিউইস বুঝে নিল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মূর্তিমান মৃত্যুদূত; মহা আতঙ্কে পিছন ফিরে সে ছুটল৷ সঙ্গেসঙ্গে ছুটল রিভলভারের গুলি৷ লিউইস ছিটকে পড়ল মাটির উপর৷ তার মরণাহত দেহ একবার ছটফট করে উঠল৷ তৎক্ষণাৎ আবার গর্জে উঠল ক্রফোর্ডের রিভলভার৷ দ্বিতীয় বারের নিক্ষিপ্ত বুলেট লিউইসের শরীর থেকে জীবনের শেষ চিহ্ন মুছে দিল৷ মৃতদেহ পড়ে রইল নিশ্চল পাথরের মতো, রক্তে ভিজে গেল গোলাবাড়ির প্রাঙ্গণ৷
শান্তভাবে চারদিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ক্রফোর্ড৷ কিন্তু তার চোখ দুটো জ্বলছিল জ্বলন্ত কয়লার মতো৷
ক্রফোর্ড দেখতে পেল গোলাবাড়ির দরজা খুলে তার দিকে হাঁ করে চেয়ে আছেন বাউডেন৷ অত্যন্ত নির্বিকারভাবে হাত তুলে তাঁকে অভিনন্দন জানাল খুনি, ‘গুড মর্নিং, মি. বাউডেন৷’
প্রতি-অভিবাদনের জন্য না-দাঁড়িয়ে গোলাবাড়ি প্রদক্ষিণ করে সে এগিয়ে গেল তার ঘোড়ার দিকে৷ জন্তুটাকে একটা খুঁটির সঙ্গে সে বেঁধে রেখেছিল গোলাবাড়ির কাছেই৷ এইবার বাঁধন খুলে সে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হল৷ একটুও তাড়াহুড়ো না-করে সে দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল৷
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: তিন স্যাঙাতের ত্র্যহস্পর্শ যোগ
বাড়ির পথে যায়নি ক্রফোর্ড৷ সে জানত তার মাথার ওপর ঝুলছে ফাঁসির দড়ি; স্বচক্ষে তাকে খুন করতে দেখেছে বাউডেন৷ তার মুখ থেকে কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরবাসী জেনে যাবে জেক লিউইসকে খুন করেছে ক্রফোর্ড গোল্ডসবি৷ অশ্বারোহণে সে এগিয়ে চলল দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ক্রিক নেশান নামক প্রদেশ অভিমুখে৷
১৮৯৪ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে উইটাম্পকা শহরে এসে পৌঁছোল ক্রফোর্ড৷ পথশ্রমে সে তখন অবসন্ন, ক্ষুধার্ত৷ সঙ্গে টাকাকড়ি কিছু নেই, সম্বলের মধ্যে একটি শ্রান্ত ক্লান্ত অশ্ব, একটি উইনচেস্টার ৩০ রাইফেল এবং কোল্ট. ৪৪ রিভলভার৷ এক নজরে দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা অত্যন্ত বেপরোয়া এক পলাতক আসামি৷
একটি দোকানের সামনে বসে ছিল দুই ব্যক্তি৷ রূঢ় দৃষ্টি মেলে চারদিক পর্যবেক্ষণ করেছিল তারা৷ দুজনের মধ্যে যে লোকটি বয়সে বড়ো, সে হঠাৎ হাত তুলে বন্ধুর মতো হাঁক দিল, ‘ওহে ছোকরা! পিছন দিকের আস্তাবলে তোমার ঘোড়াটাকে নিয়ে যাও৷ আর জনকে বলো ঘোড়াটাকে দলাইমলাই করে কিছু দানাপানির ব্যবস্থা যেন করে দেয়৷ আমরা হচ্ছি জিম কুক আর বিল কুক৷ তুমি হয়তো আসার পথে আমাদের নাম শুনে থাকবে৷’
‘হয়তো শুনেছি,’ গোল্ডসবি সতর্কভাবে উত্তর দিল, ‘অবশ্য আমি যাদের কথা ভাবছি, তোমরা যদি সেই লোক হও৷’
‘আমরাই সেই লোক,’ জানাল জিম কুক৷
অল্পবয়সি খুনিটি অনেকদিন পরে পেট ভরে খেতে পেল৷ নতুন বন্ধুদের ব্যবহারে সে কৃতজ্ঞ বোধ করল৷ সে আরও লক্ষ করল উইটাম্পকা শহরের মানুষ তার বন্ধুদের সঙ্গে তাকেও যথেষ্ট সমীহ করছে৷ শহরবাসীর সমীহ করার কারণ ‘ভয়ে ভক্তি’— জিম আর বিল তদানীন্তন কালের দুর্ধর্ষ দস্যু৷ ক্রফোর্ড গোল্ডসবিকে পূর্বোক্ত দুই দস্যুর গৃহে অতিথি হতে দেখে শহরবাসী ভেবে নিয়েছিল নবাগত মানুষটিও নিশ্চয়ই ভয়ানক চরিত্রের এক দুর্বৃত্ত— না হলে সে দস্যুদের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করবে কেন?
কয়েকটা দিন কাটল৷ ক্রফোর্ড তখন বেশ সুস্থ৷ তার ঘোড়াটিও পরিচর্যার ফলে বেশ তাজা হয়ে উঠেছে৷ কুক ভাইরা বুঝল এইবার ক্রফোর্ডকে কাজে লাগানো যায়৷ তাদের দলে এখন নতুন মানুষ দরকার৷ ‘রতনে রতন চেনে’— ক্রফোর্ডকে দেখেই কুক ভাইরা বুঝে নিয়েছিল এই ছোকরা বেশ কাজের হবে৷
জিম কুক টোপ ফেলল,‘স্কেলস বুড়োর দোকানে বেশ ভালো টাকাকড়ি পাওয়া যেতে পারে৷’
মাছ টোপ খেল; ক্রফোর্ড বলল, ‘লুঠেরা মানুষ কাজের জায়গার কাছাকাছি বন্ধুবান্ধব রাখে৷ এই শহরের লোক আমাদের যথেষ্ট ইজ্জত দেয়৷ সুতরাং বন্ধু পাওয়া খুব কঠিন হবে না৷’
জিম বলল, ‘লুঠেরা মানুষ বন্ধুর পরোয়া করে না৷ লুঠেরার বন্ধু নেই, থাকতে পারে না৷ লুঠেরা যদি মনে করে তার বন্ধু আছে, আর সেই বন্ধুর ভরসা যদি সে করে তার দফা শেষ— খুব বেশিদিন তাকে দুনিয়ার আলো দেখতে হবে না৷’
ক্রফোর্ড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর বলল, ‘ঠিক আছে৷ তোমরা যা ভালো বুঝবে, তাই হবে৷’
এইসব কথা যেদিন হল, ঠিক তার পরের দিনই ‘স্কেলস মার্কেন্টাইল স্টোর্স’ নামে দোকানটার ওপর রিভলভার হাতে হানা দিল তিন দুর্বৃত্ত— জিম কুক, বিল কুক ও গোল্ডসবি ক্রফোর্ড৷
তারা মুখোশ অথবা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে আত্মপরিচয় গোপন করার চেষ্টা করল না৷ বুক ফুলিয়ে ডাকাতি করে টাকা নিয়ে সরে পড়ল তিন স্যাঙাত৷ শহর থেকে অনেক দূরে একটা বনের মধ্যে টাকাকড়ির ভাগবাঁটোয়ারা হল৷
গোল্ডসবি ক্রফোর্ড মনে মনে গর্ববোধ করতে লাগল— সে এখন সাধারণ খুনি নয়, ‘স্বনামধন্য’ কুক দস্যুদের যোগ্য সহকর্মী এক লুঠেরা সে!
কুক ভাইরা কিন্তু হতাশ হয়েছিল৷ জিম কুক তার লুঠের বখরা পকেটস্থ করে বলল, ‘ধ্যুৎ! কিচ্ছু হল না৷ আরও অনেক বেশি টাকা পাওয়া উচিত ছিল৷’
‘আরও অনেক জায়গা আছে যেখানে মালকড়ি পাওয়া যায়’, ক্রফোর্ড বলল, ‘শুধু সঠিক জায়গা চিনে হানা দেওয়া দরকার৷’
জিম বলল, ‘এই ক্রিক নেশান এলাকায় মালকড়ি বিশেষ নেই৷’
ক্রফোর্ড বলল, ‘চেরোকি এলাকাতে ভালো রেস্ত পাওয়া যায়৷’
জিম মন্তব্য করল, ‘তা যায়৷ তবে ওই জায়গার হাওয়া বড়োই ফাঁকা, আর ওই ফাঁকা হাওয়ার উপর ঠ্যাং ছুড়তে ছুড়তে শূন্যে ঝুলতে মোটেই ভালো লাগে না, বুঝেছ দোস্ত?’
বিল এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এইবার সে মুখ খুলল, ‘আরে! ফাঁসিতে ঝোলাতে হলে লুঠেরাকে আগে ধরতে হবে তো! আমরা সেই সুযোগ দেব কেন? আমার মনে হয় বব আর এফির সাহায্যে আমরা গা-ঢাকা দিতে পারব৷’
জিম সায় দিল, ‘তা বটে৷’
কুক ভাইরা যার কথা বলল সেই বব হার্ডিন হচ্ছে কুক ভাইদের শ্যালক৷ শালাবাবু কাজ করত এফি ক্রিটেনডেন নামে এক মহিলার সরাইখানাতে৷ সরাইখানাটির নাম ‘হাফওয়ে হাউস’৷ ওই হাফওয়ে হাউস ছিল ফোর্ট গিবসন ও টেলাকুয়া প্রদেশের মধ্যস্থলে অবস্থিত একমাত্র বিশ্রামাগার৷ পূর্বোক্ত দুটি প্রদেশের মধ্যে যাতায়াতকারী পথিকদের বিশ্রাম ও খাদ্যগ্রহণের জন্য হাফওয়ে হাউস ছাড়া অন্য কোনো সরাইখানা সেই অঞ্চলে ছিল না৷
বিল কুক বলল, ‘সে যাই হোক, ওই সরাইখানায় ববের কাছেই আমাদের যেতে হবে৷ স্কেলস বুড়োর দোকান লুঠ করার পর এখন আর এই এলাকার মানুষ আমাদের সুনজরে দেখবে না৷ অতএব চলো ববের কাছে৷’
পর্বতসংকুল পথের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চেপে তিন স্যাঙাত চলল বব হার্ডিনের সঙ্গে মোলাকাত করতে৷ অধিকাংশ সময়েই রাতের দিকে তারা ভ্রমণ করত অশ্বপৃষ্ঠে৷ ওইভাবে ঘোড়া চালিয়ে কয়েকটা পাহাড় পার হয়ে তারা এসে পৌঁছোল তাদের লক্ষ্যস্থল হাফওয়ে হাউস নামক পূর্বে উল্লিখিত সারাইখানাতে৷
বব এবং কর্ত্রীঠাকুরানি এফি মহানন্দে তাদের অভ্যর্থনা জানাল৷ তবে কয়েকটা দিন সেখানে কাটিয়েই তারা অধৈর্য হয়ে পড়ল৷ তা ছাড়া ব্যাপারটা ব্যয়সাপেক্ষ৷ এফি ঠাকুরানি ব্যাবসা করছে, বিনা পয়সায় দস্যুদের আশ্রয় ও আহার সে দেবে কেন?
নাঃ, এভাবে পকেটের টাকা খরচ করার কোনো মানে হয় না৷ অতএব পরামর্শ-সভা বসল তিন বন্ধুর মধ্যে৷ টেলাকুয়া শহরে অর্থ উপার্জনের উপায় আছে৷ উপায়টা অবশ্য অত্যন্ত বিপজ্জনক৷
গোয়িং স্নেক ও টেলাকুয়া পরগনার রাজধানী হচ্ছে টেলাকুয়া৷ রাজধানীতে আইনরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা— ফোর্ট স্মিথ থেকে যুক্তরাজ্যের এক দঙ্গল মার্শাল জমায়েত হয়েছে ওই শহরে৷ রাজধানী টেলাকুয়া তাই মার্শালদের সবচেয়ে বড়ো ডেরা, অর্থাৎ ‘হেড কোয়ার্টার’৷ ওখানে ডাকাতির চেষ্টা করা মানেই ভিমরুলের চাকে ঘা দেওয়া৷ কিন্তু তিন স্যাঙাত বদ্ধপরিকর৷ ওই শহরে মানুষজনের টাকা আছে, বিপদের ঝুঁকি না-নিলে লাভের আশা কোথায়?
‘মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার’— এই হচ্ছে তিন বন্ধুর প্রাণের কথা৷
অতএব জিম কুক পাঠিয়ে দিল শ্রীমতী এফিকে খবরাখবর সংগ্রহ করতে৷ বলাই বাহুল্য, লুঠের একটা অংশ এফির হস্তগত হবে এই ধরনের আশ্বাস তাকে দেওয়া হয়েছিল৷
দিন দুই পরে ফিরে এসে এফি জানাল অবস্থা অনুকূল, মার্শালরা এখন টেলাকুয়া শহরে অনুপস্থিত৷
জিম বলল, ‘তাহলে তুমি বলছ এখন নিরাপদে কাজ হাসিল করা যাবে?’
এফি সহাস্যে বলল, ‘আলবত! ভয়ের কোনো কারণ নেই৷’
তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জিম কুক একবার এফির দিকে তাকাল৷ তার মনে হল এফি যেন জোর করে সহজ হতে চাইছে৷ সে যেন একটু বেশিরকম হাসিখুশি, বড়ো বেশি সপ্রতিভ৷
জিম তার সঙ্গীদের একান্তে ডেকে চুপি চুপি বলল, ‘হাওয়া সুবিধের নয়৷ মনে হচ্ছে এফি শয়তানি করে কর্তাদের কাছে আমাদের খবর পাঠিয়েছে৷’
বিল বলল, ‘কিন্তু ও তো শহরে গিয়েছিল৷ খবর দিতে হলে শহরের ভিতর না-গেলেও চলত৷ এখান থেকেও খবর পাঠানো যায়৷’
জিম ঘাড় নাড়ল, ‘তা বটে৷ কিন্তু এফির হাবভাব আমার মোটেই ভালো লাগছে না৷’
তিন বন্ধু সতর্ক হয়ে গেল৷ দিনের আলোতে যে তাদের কেউ ধরতে আসবে না, এ-বিষয়ে তারা নিঃসন্দেহ৷ হঠাৎ যদি পলায়নের প্রয়োজন হয়, তাই ঘোড়াগুলিকে জিন লাগাম চড়িয়ে তারা তৈরি রাখল৷ তারপর চটপট শেষ করে নিল নৈশভোজন৷
ধীরে ধীরে রাত বাড়ে৷ ঘনিয়ে আসে অন্ধকার৷ তিন স্যাঙাতের চোখে ঘুম নেই৷ অনাগত বিপদের আশঙ্কায় তারা জেগে আছে অতন্দ্র প্রহরায়৷
অন্ধকারের ভিতর হঠাৎ লাগাম টানার শব্দ৷ ঘোড়ার জিনে চামড়ার মচ মচ আওয়াজ৷ কারা যেন আসছে!
ছায়াচ্ছন্ন রাতের আঁধারে আত্মগোপন করে অগ্রসর হল তিন পলাতক আসামি, হাতে তাদের উদ্যত রাইফেল৷
কয়েক মিনিট পরেই চেরোকি নেশান অঞ্চলের শেরিফ এলিস র্যাটলিং গোর্ড ঘোড়ায় চেপে সরাইখানার সম্মুখবর্তী ফাঁকা জায়গাটার উপর এসে দাঁড়াল; সঙ্গে তার একদল সশস্ত্র রক্ষী৷
রক্ষীদের নাম সিকুয়া হোস্টন, বিল নিকেল, আইজ্যাক গ্রিস, ব্র্যাকেট, হিকস, ডিক ক্রিটেনডেন ও জেক ক্রিটেনডেন৷ পূর্বোক্ত ডিক ক্রিটেনডেন হচ্ছে শ্রীমতী এফির পূর্বতন স্বামী (বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে বিচ্ছিন্ন) আর জেক হচ্ছে তার ভাই, অর্থাৎ এফির দেবর৷
দস্যুদের সন্দেহ সত্য৷ এফি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে৷
‘এবার ওদের একটু ওষুধ দেওয়া দরকার,’ শান্তস্বরে বলল ক্রফোর্ড; তারপরই গুলি ছুড়ল৷ লক্ষ্য ব্যর্থ হল না, ঘোড়ার উপর থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ল সিকুয়া হোস্টনের মৃতদেহ৷
পরক্ষণেই অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠল কুক ভাইদের জোড়া রাইফেল৷ লড়াই শুরু হল৷
রক্ষীবাহিনী পাগলের মতো ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারপর এদিক-ওদিক ছুটে আড়াল খুঁজে গুলি থেকে প্রাণ বাঁচাতে সচেষ্ট হল৷ আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো তীব্র হ্রেষাধ্বনি তুলে ছোটাছুটি শুরু করল৷ অন্ধকারের ভিতর থেকে শোনা গেল একাধিক যাতনাকাতর কণ্ঠে ক্রুদ্ধ শপথ-বাক্য ও অভিশাপ৷
তারপরই কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই যে এক বেটা!’
তৎক্ষণাৎ জাগল অনেকগুলো আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন-ধ্বনি, ছুটে এল তপ্ত বুলেটের ঝটিকা— জিম কুকের দেহ বিদ্ধ করল সাত-সাতটা গুলি৷
গুলির আওয়াজ থামাল কিছুক্ষণ পরে৷ আশেপাশের ঝোপঝাড়ে শব্দ উঠল; আগেকার আশ্রয়স্থল ছেড়ে আরও ভালো জায়গায় আড়াল খুঁজে সরে যেতে চাইছে বন্দুকধারী মানুষ৷ আবার জাগল নূতন শব্দের তরঙ্গ৷ অশ্বখুর-ধ্বনি৷ প্রায় আধ ঘণ্টা পরে শেরিফ বুঝল শিকার পলাতক— খুনিরা পালিয়েছে আধ ঘণ্টা আগেই৷
আহত জিম কুককে মাঝখানে নিয়ে অদ্ভুত কৌশলে ঘোড়া ছুটিয়ে বিল আর ক্রফোর্ড এসে পৌঁছোল কুক ভাইদের এক বোনের বাড়ি৷ বিল এবং ক্রফোর্ডের হাতে হাত মিলিয়ে আহত জিমকে ঘরের ভিতর দিয়ে আসতে সাহায্য করল ভগ্নী লু, তারপর ক্ষতগুলো ধুয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল৷
‘তোমরা এবার ওকে চটপট সরিয়ে নিয়ে যাও,’ লু বলল, ‘শেরিফ র্যাটলিং গোর্ড এখনই এখানে এসে পড়বে৷’
বিল বলল, ‘শেরিফ যদি বেঁচে থাকে তাহলে সে এখানে আসতে পারে বটে, কিন্তু জিমকে বাইরে নিয়ে গেলে সে নির্ঘাত মারা পড়বে৷’
লু উত্তর দিল, ‘তোমরা যদি ওকে এখনই বাইরে না-নিয়ে যাও, তাহলে কি ও বাঁচবে? এখানে থাকলে ও মরবে ফাঁসিতে ঝুলে৷’
তা বটে৷ লু-র যুক্তি অস্বীকার করতে পারল না দুই দস্যু৷ আহত সঙ্গীকে নিয়ে তারা বাইরে বেরিয়ে গেল৷ সঙ্গেসঙ্গে আঁধার রাতের গর্ভ ভেদ করে তাদের কানে ভেসে এল ধাবমান অশ্বের পদশব্দ৷ তারপরই সব চুপচাপ৷ একবার মার খেয়ে শেরিফ বুঝেছে পলাতক তিন আসামি অতি ভয়ংকর চরিত্রের মানুষ— ওরা অন্ধকারেও নির্ভুল লক্ষ্যে গুলি চালাতে পারে এবং নরহত্যা করতে তাদের দ্বিধা নেই বিন্দুমাত্র৷ দ্বিতীয়বার ভুল করল না শেরিফ র্যাটলিং গোর্ড, সদলবলে বাড়িটাকে ঘিরে ফেলল নিঃশব্দে৷
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর শেরিফ বুঝল শিকার পলাতক, সে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল৷
একটি গামলার ভিতর রক্তাক্ত জল দেখতে পেল শেরিফ৷ অভিজ্ঞ আইনরক্ষক বুঝল দস্যুরা একটু আগেও এখানে ছিল৷ লুর উদ্দেশে প্রশ্ন নিক্ষেপ করল শেরিফ, ‘তোমার ভাইদের সঙ্গে যে-লোকটি এখানে এসেছিল, সে কে? আমার মনে হয় ওই লোকটি হচ্ছে ক্রফোর্ড গোল্ডসবি৷’
লু মাথা নাড়ল, ‘না ক্রফোর্ড নয়৷ লোকটির বেশ বয়স হয়েছে৷ ভাইরা বলছিল ওর নাম চেরোকি বিল৷’
শেরিফের কবল থেকে ক্রফোর্ডকে বাঁচানোর জন্য যে মিথ্যা নামটি আবিষ্কার করেছিল কুক ভগ্নী লু, সেই নামটিই স্থায়ী হয়ে গেল ক্রফোর্ডের জীবনে— ক্রফোর্ড গোল্ডসবির পরিবর্তে জন্মগ্রহণ করল দস্যু চেরোকি বিল৷ পশ্চিম আমেরিকার কুখ্যাত নরহন্তা দস্যুদের ইতিহাসে চেরোকি বিল নামটি অতিশয় পরিচিত৷
১৮৯৪ সালে ৮ জুলাই রাত্রে শেরিফ র্যাটলিং গোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিল বিল৷ তারপর থেকে বিল অধিকাংশ সময়েই নিঃসঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়িয়েছে; লুঠতরাজ করেছে বিভিন্ন স্থানে, নরহত্যা করেছে একটার পর একটা৷ সেই বছরেরই শেষের দিকে যেসব অপরাধ সে করেছিল, সেই দুষ্কর্মগুলির তালিকা আছে ‘ফোর্ট স্মিথ আর্ক’ নামক স্থানে৷ ওই তালিকার দিকে দৃষ্টিপাত করলে জানা যায় নোয়াটা অঞ্চলে ট্রেন-ডাকাতিতে অভ্যস্ত আর এক দস্যুকে সে হত্যা করেছে, তারপর তার হাতে খুন হয়েছে পূর্বোক্ত দস্যুর শ্যালক জন ব্রাউন— অতঃপর বিল কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়েছে রেড ফর্ক অঞ্চলের ট্রেন, ওকমালজিতে পার্কিন্সনের দোকান, শ্যাটো এক্সপ্রেস অফিস, করেটার একটা ট্রেন এবং লেনাপা পোস্ট অফিস৷ মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে বারোটি নরহত্যা করেছিল বিল৷ নিহত বারো জনের মধ্যে শেষ ব্যক্তির নাম আর্নেস্ট মেলটন৷
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: শেষ সংঘাত
১৮৯৪ সালে নভেম্বর মাসের ৮ তারিখে লেনাপার রাজপথের উপর দিয়ে সবেগে ও সশব্দে ঘোড়া ছুটিয়ে চেরোকি বিল এসে থামল শাফেল্ট-এর দোকানের সামনে৷
সঙ্গে তার এক সহযোগী দস্যু, নাম ভার্ডিগ্রিস কিড৷
কিডের রাইফেল সগর্জনে কয়েকবার অগ্নিবর্ষণ করল, সঙ্গেসঙ্গে রাজপথ ফাঁকা৷ চেরোকি বিল দোকানে ঢুকল, হাতে তার উইনচেস্টার রাইফেল৷
তরুণ দোকানি শাফেল্টকে উদ্দেশ করে বিল বলল, ‘যা আছে সব নিয়ে যাব৷’
‘ঠিক আছে বিল, সব কিছুই তোমার,’ বলল শাফেল্ট, তারপর সিন্দুক খুলে দিল৷
শাফেল্টের দোকানের পাশেই একটা রেস্তোরাঁ বা ভোজনালয়৷ ওই রেস্তোরাঁ এবং শাফেল্টের দোকানের মাঝখানে অবস্থান করছিল খানিকটা ফাঁকা জায়গা৷ রেস্তোরাঁর একটি জানালা দিয়ে আর্নস্ট মেলটন সাগ্রহে ডাকাতির ব্যাপারটা দেখছিল৷ হঠাৎ বিলের দৃষ্টি পড়ল মেলটনের দিকে৷ বীরত্বের সাক্ষী হিসাবে দর্শক পেলে খুশি হত বিল, কিন্তু কী কারণে জানি না সেদিন মেলটনকে দেখেই তার মেজাজ ছিল বিগড়ে— ধাঁ করে রাইফেল তুলে সে গুলি চালিয়ে দিল৷ জানালার কাচ ভেঙে মেলটনের মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ হল৷ তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করল আর্নেস্ট মেলটন৷
এমন অকারণ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ না-করে থাকতে পারল না তরুণ শাফেল্ট: ‘লোকটাকে শুধু শুধু মারলে? কাজটা মোটেই ভালো হল না৷’
‘তুমিও বুঝি ওইভাবে মরতে চাও?’
‘না৷ বিল, তুমি আমার সোনাগুলি নিয়েছ৷ ওতেই খুশি থেকো, আমার প্রাণ নিয়ে তোমার কিছু লাভ নেই৷’
‘ঠিক আছে৷’
হত্যাকারী দোকানের বাইরে এসে ঘোড়ায় চাপল৷ ভার্ডিগ্রিস কিড এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল সঙ্গীর জন্য৷ দোকানের সামনে কয়েকবার গুলি ছুড়ে শহরবাসীকে বিদায় সংবর্ধনা জানাল দুই দস্যু, তারপর সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে শহর ত্যাগ করল৷
প্রায় দুই মাইল পথ অশ্বারোহণে অতিক্রম করার পর বিল তার সঙ্গীকে বলল, ‘এবার মালের বখরা নিয়ে তুমি সরে পড়ো৷ পরের সপ্তাহে টালসি শহরে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব৷ এখন আমি যাচ্ছি ম্যাগি গ্ল্যাসের সঙ্গে দেখা করতে৷ ম্যাগি আছে নোয়াটাতে তার আত্মীয়স্বজনের কাছে৷’
কিড বলল, ‘ওহে বিল, তোমার বান্ধবী ম্যাগির কাছে তুমি যেয়ো না৷ সবাই জানে তুমি ওখানে যাও৷ মার্শাল তোমাকে ওইখান থেকেই গ্রেপ্তার করবে৷ ভালো চাও তো ওইখানে যাওয়া ছেড়ে দাও৷’
রূঢ়স্বরে বিল বলল, ‘আমার ব্যাপার আমি ভালোই বুঝি৷ তুমি কি আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলাতে চাও?’
ভার্ডিগ্রিস কিড ব্যস্ত হয়ে জানিয়ে দিল সেরকম উদ্দেশ্য তার নেই৷
অতঃপর লুঠের মাল ভাগ হল৷ দুই দস্যু চলে গেল দুই দিকে৷ সেই রাতেই নোয়াটা শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে আইজ্যাক রজার্সের বাড়ির দরজায় এসে ধাক্কা দিল বিল৷ দরজা খুলে বিলকে দেখে ভারি খুশি রজার্স: ‘আরে দোস্ত যে! তাড়াতাড়ি ঘোড়া রেখে ভিতরে এসো৷’
‘আইজ্যাক, তুমি কেমন আছ?’ বিল বলল, ‘তুমি একবার নোয়াটাতে গিয়ে ম্যাগিকে নিয়ে এসো৷’
‘নিশ্চয়, নিশ্চয়৷’
‘পথে কারো সঙ্গে আজেবাজে কথা কইবে না৷ বুঝেছ আইক?’
‘আমাকে তুমি জান না, বিল? আমি কাউকে তোমার কথা বলব না৷’
‘আমার কথা অন্য লোককে বললে তোমাকে বেশিক্ষণ বাঁচতে হবে না, আইক৷’
‘ওভাবে কথা বলছ কেন? আমি কি তোমাকে বিপদে ফেলতে পারি? বিল, তুমি মিছিমিছি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ৷’
কিছুক্ষণ পরে ভাইঝি ম্যাগিকে নিয়ে ফিরে এল রজার্স৷ বিলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে জায়গা থেকে ভাইঝিকে আনতে রওনা হয়েছিল রজার্স, ঠিক সেই জায়গাতেই অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিল— হাতে তার নিত্যসঙ্গী রাইফেল, চোখের দৃষ্টি কঠোর এবং বিশ্লেষণে তীক্ষ্ণ৷
আইজ্যাক সরে যেতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ম্যাগি: ‘তোমার এখানে আসা উচিত হয়নি ক্রফোর্ড৷ আইজ্যাক তোমাকে ধরিয়ে দিতে চায়৷ আগেও তোমাকে সাবধান করে দিয়েছি আমি৷ কেন তুমি এখানে এলে?’
‘অনেকেই ও-কথা বলছে বটে, কিন্তু আমি জানি আইজ্যাক আমাকে ধরিয়ে দেবে না৷’
‘বিল স্মিথ এখানে অন্তত বার-ছয়েক এসে আইজ্যাকের সঙ্গে পরামর্শ করেছে৷’
‘স্মিথ ছাড়া আরও অনেক মার্শাল আমার পিছু নিয়েছে৷’ সদম্ভে ঘোষণা করল বিল, ‘আমি ওদের পরোয়া করি না৷’
পুরো দুটো দিন রজার্সের সঙ্গে কাটালেও রাইফেলটাকে বিল একবারও হাতছাড়া করেনি৷
সে সবসময়েই হাসিখুশি, কিন্তু তার সতর্ক দৃষ্টি সর্বদাই রজার্সের উপর৷ তৃতীয় দিন সকালে রজার্সের বাড়ি থেকে সে বেরিয়ে গেল৷ তারপর অশ্বপৃষ্ঠে টালসিতে গিয়ে ভার্ডিগ্রিস কিড এবং কুক ভাইদের সঙ্গে মিলিত হল বিল৷ কিন্তু কয়েকদিন পরেই রক্ষীবাহিনীর তাড়া খেয়ে আবার তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল৷
১৮৯৫ সালের জানুয়ারি ২৯ তারিখে আবার আইজ্যাক রজার্সের গৃহে উপস্থিত হল অশ্বারোহী বিল: ‘ওহে রজার্স, তুমি চটপট নোয়াটাতে গিয়ে ম্যাগিকে নিয়ে এসো৷ আমি বেশ কিছুদিন এখানে বিশ্রাম নেব৷ চারদিকে হাওয়া বড়ো গরম, গতিক সুবিধের নয়৷’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি বিশ্রাম করো বিল,’ রজার্স বলল, ‘রাইফেল রেখে দিয়ে একটু আরাম করো৷’
‘ওই কথাটি বলবে না আইজ্যাক৷ আমি রাইফেলের উপর নজর রাখি, তাই রাইফেলও আমার উপর নজর রাখে৷’
ক্রফোর্ড গোল্ডসবি বহু নরহত্যা করেছিল৷ তার ভগ্নীপতিকে সামান্য কারণে সে গুলি করে মেরে ফেলেছিল৷ অনেক মানুষকে সে খুন করেছে সম্পূর্ণ অকারণে৷ কিন্তু রজার্স যে তাকে ধরিয়ে দিতে চায় সে-কথা জেনেও কেন যে ওই লোকটিকে বিল খুন করেনি তা বলা মুশকিল৷ খুব সম্ভব রজার্সের সঙ্গে একটা বিপজ্জনক খেলায় নেমে সে মনে মনে আনন্দ আর উত্তেজনার চমক উপভোগ করেছিল৷ রজার্স যে এক সময়ে যুক্তরাজ্যের অন্যতম মার্শাল ছিল এবং বর্তমান ডেপুটি মার্শাল উইলিয়াম স্মিথের সঙ্গে চক্রান্ত করে সে যে বিলকে ধরতে চাইছে, সেইসব তথ্যও বিলের অজ্ঞাত ছিল না৷ রজার্সের আর এক প্রতিবেশী ক্লিং স্কেলসও বিলকে ধরিয়ে দিতে সচেষ্ট ছিল৷ শুধু পুরস্কারের লোভেই যে সে এই কাজ করছিল তা নয়৷ উইটাম্পকিন শহরে যে স্কেলসদের দোকানে বন্ধুদের নিয়ে বিল ডাকাতি করেছিল, সেই স্কেলসদের এক আত্মীয় ছিল ক্লিং স্কেলস৷
ম্যাগি গ্ল্যাস আবার সতর্ক করে দিল তার বন্ধুকে, কিন্তু চেরোকি বিল তার কথায় কান দিল না৷
রজার্স অবশ্য খুবই যত্ন করছিল তার অতিথিকে৷ আদর করে এক গ্যালন হুইস্কি নিয়ে এল সে বিলের জন্য৷ দুঃখের বিষয়, বিল সেই হুইস্কির স্বাদ গ্রহণ করতে রাজি হল না৷ রজার্স তার প্রতিবেশী ক্লিংকে নিয়ে এসেছিল তাস খেলার অন্যতম সঙ্গী হিসেবে৷ অতিথিকে সন্তুষ্ট করতে বিভিন্ন সুস্বাদু পদ রান্না করেছিল রজার্সের বউ৷ অবশ্য ওইসব রান্নার উপকরণ সংগৃহীত হয়েছিল চেরোকি বিলের টাকা থেকেই৷
টেবিলের উপর সাজানো আহার্য নিয়ে নৈশভোজনে বসেছিল বিল৷ চেয়ারে উপবিষ্ট বিলের পিঠ ছিল দেয়ালে, মুখ ছিল দরজার দিকে ফেরানো এবং কোলের উপর ছিল উইনচেস্টার রাইফেল৷
‘সারা দুনিয়া জানে তোমার বন্ধুরা তোমাকে ভালোবাসে’, ক্ষুণ্ণকণ্ঠে অভিযোগ জানাল রজার্স, ‘কিন্তু তুমি বন্ধুদের বিশ্বাস করো না৷ সত্যি, এটা খুবই অপমানের বিষয়৷’
বিলের ওষ্ঠাধরে ফুটল হিংস্র হাস্য; নির্বিকার স্বরে সে বলল, ‘আইক, ওই মাংসের পাত্রটা এগিয়ে দাও তো৷’
খাওয়া শেষ হলে তারা তাস খেলতে বসল৷ খেলা চলল ভোর চারটে পর্যন্ত; এর মধ্যে একবারও কোলের উপর থেকে রাইফেল নামায়নি বিল৷ তিন খেলোয়াড়ই অনুভব করছিল হাওয়া খারাপ, পরিবেশ সুবিধের নয়৷ অবশেষে চারটের সময় তিনজনেই শুয়ে পড়ল৷
একই খাটে একই বিছানায় শয্যা নিয়েছিল তিনজন৷ কিছুক্ষণ পরে অতি সন্তর্পণে খাট থেকে নিঃশব্দে নামল রজার্স, তৎক্ষণাৎ বিলের পা পড়ল মেঝের উপর এবং মুহূর্তপূর্বে শায়িত বিল হল রাইফেল হাতে দণ্ডায়মান!
মধুর হেসে বিল জানতে চাইল, ‘কোনো শব্দ-টব্দ শুনে উঠে পড়েছ বুঝি, আইক?’
আইক আবার শয্যা গ্রহণ করল৷ বিলও শুয়ে পড়ল তার নিজস্ব জায়গায়৷
একটু পরে আবার যেই আইক উঠেছে, সঙ্গেসঙ্গে বিলও উঠে দাঁড়িয়েছে রাইফেল নিয়ে এবং নিরীহ কণ্ঠে আইকের নিদ্রাভঙ্গের কারণ জানতে চেয়েছে৷ বার বার একই ঘটনার যখন পুনরাবৃত্তি ঘটল, তখন হতাশ হয়ে নিদ্রার ক্রোড়ে আত্মসমর্পণ করল আইক৷
ঘুম ভাঙতে আইক দেখল সে একাই শুয়ে আছে; চারদিকে ঝলমল করছে সূর্যালোক৷ সে বুঝল বেশ বেলা হয়েছে৷ শয্যাত্যাগ করে জামাকাপড় চড়িয়ে আইক রান্নাঘরে এসে দেখল ওই ঘরে খাওয়ার টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে বসে আছে বিল— কোলে নিত্যসঙ্গী রাইফেল, মুখে বিদ্রূপের মৃদু হাসি৷
স্কেলসও ছিল সেখানে, মিসেস রজার্স ‘ব্রেকফাস্ট’ বা প্রাতরাশ পরিবেশন করছিল৷ খাওয়া শেষ হলে তিনজনই চেয়ার পেতে উপবিষ্ট হল অগ্নিকুণ্ডের সামনে৷ শীতের দেশ, সকালের কনকনে ঠান্ডায় অগ্নিকুণ্ডের উত্তপ্ত সান্নিধ্য বেশ আরামদায়ক৷
হঠাৎ ঘরের ভিতর ঢুকল বিলের বান্ধবী ম্যাগি গ্ল্যাস৷ চঞ্চল-চরণে সে ঘরের এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ যাতায়াত করার সময়ে তার উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি ঘুরছিল উপবিষ্ট তিন ব্যক্তির মুখের উপর৷ কয়েকবার ওইভাবে ঘোরাঘুরি করার পর হঠাৎ বিলের পাশে এসে দাঁড়াল ম্যাগি এবং পুরোনো নাম ধরে সম্বোধন করে বলল, ‘ক্রফোর্ড! তুমি এখানে রয়েছ কেন? তাড়াতাড়ি চলে যাও এখান থেকে৷ তুমি কি জানো না, ওরা দুজনে তোমাকে ধরিয়ে দিতে চায়?’
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, অকারণে নরহত্যা করতে যার কিছুমাত্র দ্বিধা ছিল না, সেই চেরোকি বিল দুই চক্রান্তকারীর অসৎ উদ্দেশ্য জানতে পেরেও তাদের খুন করার চেষ্টা করেনি৷ বোধ হয় ষড়যন্ত্রকারীদের আশা-নিরাশার উদবেগপূর্ণ মুহূর্তগুলি সে উপভোগ করছিল; নিজের উপর তার আস্থা ছিল অপরিসীম৷
বান্ধবীর সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করে রজার্সের বাড়িতেই থেকে গেল বিল৷ সকালের পর দুপুর; আবহাওয়া থমথমে৷ প্রত্যেকেই নীরব৷ একটা আসন্ন দুর্ঘটনার ইঙ্গিত অনুভব করছিল সকলেই৷
আইক রজার্স সশব্দে গলা পরিষ্কার করল, তারপর ভাইঝিকে ডেকে বলল, ‘ম্যাগি, দোকানে গিয়ে ভালো দেখে কয়েকটা মুরগি নিয়ে এসো৷ বিল যখন এখানে আছে, ওকে ভালো করে খাওয়ানো দরকার৷ অতিথিকে আদর যত্ন করা আমাদের কর্তব্য৷’
একটু ইতস্তত করে পিতৃব্য রজার্সের হাত থেকে টাকা নিল ম্যাগি৷ একবার বিলের মুখে দিকে তাকাল সে, কিন্তু বিল নির্বিকার— বান্ধবীর মুখের দিকে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল না৷ অগত্যা একটা শাল টেনে মুরগি আনতে চলে গেল ম্যাগি৷
স্কেলস খানিকটা তামাক ও সিগারেট পাকানোর কাগজ পকেট থেকে বার করল এবং নিপুণ হস্তে পাকিয়ে ফেলল একটি চমৎকার সিগারেট৷ তারপর সিগারেট তৈরির ওই মালমশলা সে তুলে দিল বিলের হাতে৷ বিল জানাল ওইভাবে সিগারেট বানাতে সে অভ্যস্ত নয়, তবে চেষ্টা করতে তার আপত্তি নেই৷ অনভ্যস্ত হাতে একটা বিশ্রী হোঁতকা সিগারেট বানাল বিল, তারপর সঙ্গীদের কাছে দেশলাই চাইল৷ দুই সঙ্গী জানিয়ে দিল তাদের কাছে দেশলাই নেই৷
‘ওই তো আগুন, ওইখান থেকেই সিগারেট ধরাও,’ আঙুল তুলে অগ্নিকুণ্ড দেখিয়ে দিল রজার্স৷
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিল৷ নিত্যসঙ্গী রাইফেল তখনও তার হাতে৷ একহাতে রাইফেল ধরে অপর হাতে কাঠের স্তূপ থেকে একটা কাষ্ঠখণ্ড তুলে নিল সে৷ অগ্নিকুণ্ড থেকে কাঠের টুকরোটা জ্বালিয়ে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করতে সচেষ্ট হয়েছিল বিল এবং সেইজন্যেই সঙ্গীদের দিকে পিছন ফিরে সে ঝুঁকে পড়েছিল অগ্নিকুণ্ডের ওপর৷
মুহূর্তের জন্য সে সঙ্গীদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল, মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি সরে গিয়েছিল স্কেলস ও রজার্সের উপর থেকে৷
ওই একটি মুহূর্তই যথেষ্ট রজার্সের কাছে— বিড়ালের মতো ক্ষিপ্রবেগে, বিড়ালের মতোই নিঃশব্দে কাঠের স্তূপ থেকে একটি কাঠ তুলে নিল রজার্স— পরক্ষণেই প্রচণ্ড বেগে সেই কাষ্ঠখণ্ড পড়ল বিলের মস্তকে৷
অমন মোটা কাঠ দিয়ে অত জোরে বাড়ি মারলে যেকোনো জোয়ান মানুষের মাথা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যেত, কিন্তু বিল ছিল অসাধারণ শক্তিশালী— আঘাতের বেগে সে হাঁটু দুমড়ে পড়ে গেল, তবে কাবু হল না৷
বিলের রাইফেল হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল কাষ্ঠস্তূপের উপর, সেটাকে পুনরায় হস্তগত করার সুযোগ সে পেল না— তার আগেই বিলের উপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল রজার্স ও স্কেলস৷
এক ঝটকায় দুজনকে ছিটকে ফেলে দিয়ে বিল উঠে দাঁড়াল, তারপর সজোরে ঘুসি চালাতে লাগল আততায়ীদের লক্ষ করে৷
মারামারির শব্দ শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছিল মিসেস রজার্স৷ রাইফেলটাকে কাষ্ঠস্তূপের উপর পড়ে থাকতে দেখে মেয়েটি সেটাকে তুলে নিল, তারপর খেলা দরজা দিয়ে অস্ত্রটাকে ছুড়ে ফেলে দিল পাশের ঘরে৷
‘ওর রাইফেল এখন আমার কাছে!’ চেঁচিয়ে উঠল মিসেস রজার্স৷
খেপা ষাঁড়ের মতো গর্জন করছিল বিল৷ বাইরের দরজা দিয়ে বিল একবার ছুটে পালাতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু স্কেলস আর রজার্স একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরল৷ পরক্ষণেই তিনজন গড়িয়ে পড়ল মেঝের উপর৷ অন্তত বিশ মিনিট ধরে ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি আর ধস্তাধস্তি চলল তিনজনের মধ্যে৷ যুযুধানদের হস্তপদ ও দেহের আঘাতে চেয়ারগুলি হল টুকরো টুকরো৷ বিলের ক্রুদ্ধ গর্জন শুনে ছুটে এল তার বান্ধবী ম্যাগি গ্ল্যাস, কিন্তু ওই অবস্থায় বিপন্ন বন্ধুকে সাহায্য করার কোনো উপায়ই খুঁজে পেল না মেয়েটি৷
অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে ম্যাগি দেখল, বিলের রক্তাক্ত দেহটাকে মেঝের উপর চেপে ধরেছে দুই স্যাঙাত৷ কড়াৎ করে একটা শব্দ হল, ম্যাগির ভয়ার্ত দৃষ্টির সামনেই বিলের কবজিতে সশব্দে হাতকড়ি লাগিয়ে দিল রজার্স৷
প্রহারক্লিষ্ট ক্ষতবিক্ষত দেহে মেঝের উপর পড়ে বিল কিছুক্ষণ ধরে সজোরে শ্বাস গ্রহণ করল, তারপর উঠে বসল৷ রজার্সের দিকে তাকিয়ে বিল বলল, ‘আমি ভাবতেই পারিনি তুমি আমাকে ধরতে পারবে৷ আইক, তুমি অসাধ্য সাধন করেছ!’
আইক বলল, ‘জ্যান্ত অবস্থায় তোমাকে ধরতে পারব কি না সে-বিষয়ে আমারও সন্দেহ ছিল৷ একবার ভেবেছিলাম তোমাকে খুন করব৷’
বিল অনুনয় করে বলল, ‘সেই ভালো৷ আইক, তুমি বরং আমাকে খুন করো৷ পুরস্কারের টাকা তো তুমি পাবেই— সরকারের হাতে তুলে আমাকে ফাঁসিতে লটকে তোমার কী লাভ?’
রজার্স জানাল বিচারক পার্কারের সামনে সে চেরোকি বিলকে হাজির করতে চায়৷
‘কিন্তু বিচারে তো আমার ফাঁসির হুকুম হবে৷ তার চেয়ে তুমি আমাকে এখানেই মেরে ফেলছ না কেন?’
‘উঁহু’, রজার্স বলল, ‘ওরা তোমার মৃতদেহ চায় না৷ তোমাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে উপস্থিত করতে পারলে আমরা মোটা টাকা পুরস্কার পাব৷ সেইরকম চুক্তি হয়েছে আমাদের সঙ্গে৷’
বিল বলল, ‘তুমিও নিস্তার পাবে না আইক! মনে রেখো, আমার ভাই আছে! ক্লারেন্স তোমার উপর বদলা নেবে!’
রজার্স তাচ্ছিল্য জানিয়ে বলল, ‘ছাই করবে! তোমার ভাই ক্লারেন্স আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না৷’
নোয়াটা শহরে এসে রজার্স বিলকে তুলে দিল বিল স্মিথ নামক ডেপুটির হাতে৷ সশস্ত্র রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে ক্রফোর্ড গোল্ডসবি ওরফে চেরোকি বিলকে নিয়ে যাত্রা করল ডেপুটি বিল স্মিথ এবং তিনদিন ভ্রমণ করে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে আরকানসাস নদী পেরিয়ে উপস্থিত হল ‘ফোর্ট স্মিথ’ বিচারশালায়৷ পূর্বোক্ত বিচারশালাটি ছিল ওই অঞ্চলের একমাত্র আদালত৷
বিচারক আইজ্যাক পার্কার কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত উনষাট জন অপরাধী যে-কারাগারে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল, সেইখানেই বিচারের আগে বন্দি হয়ে রইল ক্রফোর্ড গোল্ডসবি ওরফে চেরোকি বিল৷
১৮৯৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিলকে উপস্থিত করা হল আদালতে বিচারের জন্য৷ বিচারক পার্কারের এজলাসে বিলের ফাঁসির হুকুম হয়েছিল, কিন্তু জে. ওয়ারেন রিড নামে জনৈক অ্যাটর্নির চেষ্টায় সাময়িকভাবে মুত্যুদণ্ড স্থগিত রইল৷
বিলকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল কারাগারে৷ সেইদিনই কারাগারের লৌহকপাটের ভিতর থেকে তরুণ হন্তারক আঘাত হানল৷
লরেন্স কিটিং ও ইয়ফ নামে দুজন কারারক্ষী খুনিদের তত্ত্বাবধান করছিল৷ সারিবদ্ধ লৌহপিঞ্জরের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে তালা লাগাচ্ছিল ইয়ফ৷ কোমরে রিভলভার ঝুলিয়ে বাইরে পায়চারি করছিল লরেন্স কিটিং৷
চেরোকি বিল যে লৌহপিঞ্জরে আবদ্ধ ছিল, ঠিক তার পার্শ্ববর্তী খাঁচাটা ছিল ডেনিস ডেভিন্স নামে জনৈক অপরাধীর বাসস্থান৷
উক্ত ডেনিসের খাঁচার তালা লাগাতে গিয়ে ইয়ফ দেখল চাবি লাগছে না, কারণ, তালার গায়ে চাবি লাগানোর ফুটোটাকে কাগজ ঢুকিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷
ব্যাপারটা সন্দেহজনক! খাঁচার রেলিং-এর ভিতর দিয়ে বাইরে রিভলভারধারী সঙ্গীর দিকে তাকাল ইয়ফ, ‘ওহে ল্যারি, এখানে একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷ ব্যাপার সুবিধের মনে হচ্ছে না৷’
আচম্বিতে বিলের খাঁচার দরজাটা খুলে গেল৷ লৌহকপাট ইয়ফের পৃষ্ঠদেশে আঘাত করল সজোরে৷ সঙ্গেসঙ্গে পার্শ্ববর্তী কারাকক্ষ থেকে ইয়ফের লৌহপিঞ্জরে প্রবেশ করল চেরোকি বিল, হাতে তার প্রকাণ্ড রিভলভার৷
(ভগবান জানেন রিভলভারটা সে কোথা থেকে জোগাড় করেছিল!)
খাঁচার দরজার ভিতর দিয়ে রিভলভারটা কিটিং-এর দিকে উঁচিয়ে ধরল বিল, উন্মুক্ত দন্তের ফাঁকে বেরিয়ে এল রোষরুদ্ধ অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর: ‘কিটিং! তোমার হাতের রিভলভার আমাকে দাও৷ তারপর হাত দুটো উপরে তোলো! চটপট করো!’
কিটিং হাত উপরে তুলল না, চটপট নামিয়ে আনল নীচে কোমরবন্ধে আবদ্ধ রিভলভারের বাঁটের উপর৷ কিন্তু অস্ত্রটাকে টেনে বার করার আগেই গর্জে উঠল বিলের রিভলভার৷ গুলি লাগল, কিটিং তবুও ধরাশায়ী হল না৷ আবার গুলি ছুড়ল বিল৷ এবার পড়ে গেল কিটিং৷ অপর রক্ষী ইয়ফ তখন খাঁচার ভিতরের দিকে লম্বা গলিপথ ধরে ছুট দিয়েছে৷ পর পর দু-বার তাকে লক্ষ করে বিল গুলি ছুড়ল৷
চারজন প্রহরী গুলির আওয়াজ শুনে অকুস্থলে ছুটে এল৷ টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল কিটিং, এগিয়ে গেল সহকর্মীদের দিকে৷ ‘চেরোকি বিল পালাতে চেষ্টা করছে,’ কিটিং বলল, ‘ও আমাকে খুন করেছে!’
কথাগুলো বলেই মাটিতে পড়ে গেল কিটিং৷ তার মৃত্যু হল তৎক্ষণাৎ৷
লরেন্স কিটিং-এর রিভলভারটা মাটিতে পড়ে ছিল৷ অস্ত্রটাকে কুড়িয়ে নিয়ে বিলের দিকে গুলি চালাল প্রহরী ম্যাককনেল৷ সঙ্গেসঙ্গে তাকে লক্ষ করে গর্জে উঠল বিলের রিভলভার৷ দুজনের নিশানাই ব্যর্থ হল, খাঁচার গরাদে প্রতিহত হয়ে সশব্দে ছিটকে গেল বুলেট৷
প্রহরীরা এক জায়গায় জড়ো হল৷ তারা বুঝেছিল চেরোকি বিল আর পালাতে পারবে না৷ কিন্তু তার কাছে গিয়ে তাকে বন্দি করবে কে? বিলের হাতে রিভলভার আছে, সুতরাং তার খাঁচার কাছাকাছি গেলেই যে গুলি খেয়ে মরতে হবে এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ বিলকে নিরস্ত্র করার কোনো উপায় প্রহরীদের মাথায় এল না৷
সমস্যার সমাধান করল বন্দি দস্যু হেনরি স্টার৷ সে তার কারাকক্ষ থেকে হাঁক দিয়ে বলল, ‘আমাকে যদি তোমরা বিলের কাছে যেতে দাও, তাহলে রিভলভারটা আমি নিয়ে আসতে পারি৷’
হেনরিকে অনুমতি দেওয়া হল৷ ডেপুটি মার্শাল ব্রুনার সাবধানবাণী শুনিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে হেনরি, তুমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো৷ কিন্তু খবরদার, শয়তানির চেষ্টা করতে যেয়ো না!’
কোন মন্ত্রে ক্ষিপ্ত বিলকে ঠান্ডা করেছিল হেনরি সে-কথা কারো জানা নেই, তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তাও কেউ বলতে পারে না— তবে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বিলের কারাকক্ষ থেকে রিভলভারটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল হেনরি স্টার৷ লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে অস্ত্রটাকে সে সমর্পণ করল ব্রুনারের হাতে৷
কারাগারের ভিতর থেকে খুনের খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়ল, লরেন্সের মৃত্যুসংবাদ শুনে খেপে গেল শহরের মানুষ৷ এক ক্ষিপ্ত জনতা কারাগার ঘেরাও করে দাবি জানাল হত্যাকারী বিলকে তাদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে— তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতেই তারা খুনির দণ্ড বিধান করতে চায়৷
বলা বাহুল্য, মার্শাল জনতার দাবি মানল না৷ দৃঢ়ভাবে সে জানিয়ে দিল, বিচারক পার্কার যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন— নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনসাধারণের নেই৷
১৮৯৫ সালের ২৪ অগাস্ট চেরোকি বিলকে আবার আদালতে হাজির করা হল৷
পরিশিষ্ট
বিচারক পার্কারের রায় অনুসারে ১৮৯৬ সালের ১৭ মার্চ ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করল ক্রফোর্ড গোল্ডসবি ওরফে চেরোকি বিল৷
মরার আগে বিশ্বাসঘাতক রজার্সের মৃত্যুসংবাদ শুনে গিয়েছিল বিল৷ সম্মুখযুদ্ধে গুলি করে রজার্সকে হত্যা করেছিল এক ব্যক্তি৷
ওই ব্যক্তির নাম ক্লারেন্স গোল্ডসবি— চেরোকি বিলের ভাই সে৷
উইনস্টন চার্চিল ও পাঠান দলপতি
লেখাপড়ায় কোনোদিনই ভালো ছিলেন না স্যার উইনস্টন চার্চিল, কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই তাঁর তলোয়ারের হাত ছিল পাকা৷ ছাত্রজীবনেই তলোয়ারের দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি শ্রেষ্ঠ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন৷ ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়গুলির মধ্যে তাঁর সমকক্ষ কোনো অসিযোদ্ধা ছিল না৷ ‘স্যান্ডহার্স্ট’ অঞ্চলে ‘রয়েল মিলিটারি কলেজ’-এ সৈনিকের শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন চার্চিল এবং সসম্মানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর ‘চতুর্থ হাসার’ নামক সেনাবিভাগের অন্যতম অধিনায়ক হয়েছিলেন৷ ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের এক পর্বতসংকুল স্থানে তিনি যখন অধীন সেনাদের নিয়ে টহল দিচ্ছিলেন, সেই সময়ে তাঁদের আক্রমণ করল একদল বিদ্রোহী পাঠান৷
ইংরেজ সেনাদলে সৈন্যসংখ্যা ছিল খুবই কম, তাই তারা পিছু হঠে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল৷ নিরাপদ স্থান থেকে চার্চিল দেখলেন তাঁর এক আহত সঙ্গী পাঠান দলপতির উদ্যত তরবারির নীচে বিপন্ন হয়ে পড়েছে৷ তিনি তৎক্ষণাৎ উচ্চকণ্ঠে পাঠান সর্দারকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানালেন৷
পাঠান দলপতি সেই রণ-আহ্বান উপেক্ষা করল না৷ আহত সৈনিককে ছেড়ে সে এগিয়ে গেল চার্চিলের দিকে৷ উদ্যত তরবারি হাতে মৃত্যুপণ দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হল দুই যোদ্ধা৷ পাঠান বিদ্রোহীরা সরে গিয়ে যোদ্ধাদের জায়গা করে দিল৷ উদবিগ্ন নেত্রে শত্রুর গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে করতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁয়তাড়া করল বেশ কিছুক্ষণ, তারপর অকস্মাৎ তীব্র ঝনৎকারে পরস্পরকে আলিঙ্গন করল দু-খানা শানিত তরবারি৷ পাঁচ মিনিট ধরে লড়াই চলার পর তরবারির এক দ্রুত সঞ্চালনে চার্চিল লড়াই শেষ করে দিলেন৷ রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ধরাশায়ী হল পাঠান-সর্দার৷ প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে এল বিদ্রোহী পাঠান-বাহিনী; কিন্তু তাদের চেষ্টা সফল হল না৷ ইংরেজ সেনাদের রাইফেলগুলো ঘন ঘন অগ্নিবর্ষণ করে পাঠানদের ঠেকিয়ে রাখল এবং সেই ফাঁকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেন উইনস্টন চার্চিল৷
জেনারেল অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ও চার্লস ডিকেনসন
জেনারেল অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন যেমন শক্তসমর্থ, তেমনি তাঁর কথাবার্তাও ছিল চোখা চোখা৷ রেখে-ঢেকে কথা বলতে তিনি জানতেন না, প্রয়োজনে উচিত কথা শুনিয়ে দিতে তিনি ইতস্তত করতেন না কখনোই, এবং তার ফলে যেকোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে তাঁর আপত্তি ছিল না কিছুমাত্র৷ ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে চার্লস ডিকেনসন নামে একটি কুখ্যাত জুয়াড়ির সঙ্গে তাঁর ঝগড়া বেধে গেল৷ আগেই বলেছি জেনারেল ছিলেন স্পষ্টবক্তা৷ তাঁর শানিত বাক্যবাণে বিপর্যস্ত জুয়াড়ি খেপে গিয়ে তাঁকে পিস্তলের দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাল৷
জুয়াড়ি ডিকেনসন ছিল পাকা পিস্তলবাজ৷ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ পনেরো বার পা ফেলে যতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, সেই দূরত্ব থেকে পিস্তলের গুলি চালিয়ে একটা দোদুল্যমান সুতোকে ছিঁড়ে ফেলতে পারত ডিকেনসন৷ জুয়াড়ি চার্লস ডিকেনসনের লক্ষ্য ভেদ করার সাংঘাতিক ক্ষমতা সম্বন্ধে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ ছিল অতিশয় অবহিত৷ জেনারেল অ্যান্ড্রুও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর নির্ভুল নিশানার কথা জানতেন, কিন্তু তবুও এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে বিলম্ব হয়নি এক মুহূর্তও৷ দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য তাঁর নির্বাচিত স্থানটির নাম ‘টেনেসি’৷
পিস্তলধারী দুই যোদ্ধার মধ্যবর্তী দূরত্ব ছিল মাত্র আট পা৷ পরস্পরকে লক্ষ করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পিস্তল উদ্যত করলেন৷ প্রথমেই গুলি ছুড়ল ডিকেনসন৷ মধ্যস্থরা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জেনারেল৷ প্রতিদ্বন্দ্বীর গুলি নিশ্চয়ই ব্যর্থ হয়েছে? পরক্ষণেই অগ্নি উদগিরণ করে গর্জে উঠল জেনারেল জ্যাকসনের পিস্তল এবং ডিকেনসনের মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর৷ বিবর্ণ রক্তহীন মুখে জেনারেল তাঁর জন্য অপেক্ষমাণ গাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন স্খলিত চরণে৷ জেনারেলের অবস্থা দেখে জনৈক মধ্যস্থ সন্দেহ করলেন ডিকেনসনের লক্ষ্য বোধ হয় ব্যর্থ হয়নি৷ সন্দেহ সত্য৷ জেনারেলের পাঁজরে বিদ্ধ হয়েছিল প্রতিদ্বন্দ্বীর গুলি৷ দাঁতে দাঁত চেপে সেই আঘাত সহ্য করে জেনারেল যখন তাঁর নিশানা স্থির করছিলেন, তখনও শত্রুর নিক্ষিপ্ত বুলেট তাঁর দেহের ভিতরেই ছিল! আহত জেনারেল পরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন৷ পরবর্তীকালে তিনি হয়েছিলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট৷
রব রয় ম্যাকগ্রেগর ও স্টুয়ার্ট যোদ্ধা
ডিউক অব মন্টরোজ স্কটল্যান্ডের রব রয় ম্যাকগ্রেগরকে তার নিজস্ব জমি থেকে বঞ্চিত করেছিলেন৷ উক্ত ডিউক ছিলেন অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারী ও অসাধু প্রকৃতির এক ইংরেজ৷ রব রয়ের জমি থেকে চালাকি করে তাকে উৎখাত করার পর জায়গাটা নিজেই দখল করে নিয়েছিলেন ডিউক অব মন্টরোজ৷ ফলে স্কটল্যান্ডের মাটিতে জন্ম নিল এক ইংরেজ-বিদ্বেষী দস্যু— রব রয় ম্যাকগ্রেগর৷
১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে ম্যাকগ্রেগর গোষ্ঠী তার প্রতিবেশী স্টুয়ার্ট বংশের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ল৷ স্টুয়ার্টদের দলপতি জানাল উভয়পক্ষ থেকে একজন করে নির্বাচিত যোদ্ধা যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে অসিহস্তে অবতীর্ণ হয়, তাহলে বহু মানুষের হতাহত হওয়ার সাংঘাতিক সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, কারণ দ্বন্দ্বযুদ্ধের ফলাফল থেকেই সমস্ত বিবাদের নিষ্পত্তি হতে পারে অনায়াসে৷ ধূর্ত স্টুয়ার্ট দলপতি জানত তার দলের নির্বাচিত যোদ্ধার সমকক্ষ কেউ নেই ম্যাকগ্রেগরদের মধ্যে৷ রব রয়কে সে গণ্য করেনি৷ সে ভেবেছিল বৃদ্ধ বয়সে রব রয় আর তলোয়ার ধরতে এগিয়ে আসবে না৷
স্টুয়ার্ট দলপতির ধারণা ভুল; স্টুয়ার্টদের নির্বাচিত যোদ্ধার সম্মুখীন হল অসিহস্তে স্বয়ং রব রয় ম্যাকগ্রেগর৷ বয়স তার যুদ্ধের উদ্যমকে থামিয়ে দিতে পারেনি৷ ষাট বৎসর বয়সেও রব রয় ছিল ম্যাকগ্রেগর গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ অসিযোদ্ধা৷
শুরু হল লড়াই৷ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ঢাল আর তলোয়ার নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করল৷ এক ঘণ্টার উপর লড়াই চলল— অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যের বিরুদ্ধে যৌবন-উদ্ধত শক্তির লড়াই৷ অবশেষে একসময়ে রব ক্লান্ত হয়ে পড়ল; তার বলিষ্ঠ বাহুকে আক্রমণ করল বয়সের ক্লান্তি অনিবার্যভাবে, ঘূর্ণিত অসির চমক হয়ে পড়ল মন্থর৷ সুযোগ বুঝে আঘাত হানল স্টুয়ার্ট যোদ্ধা— বিদ্যুদবেগে তার হাতের শানিত তরবারি প্রতিদ্বন্দ্বীর অসিধারী দক্ষিণ বাহুর মাংস ভেদ করে হাড় পর্যন্ত কেটে বসে গেল৷ রক্তসিক্ত বিদীর্ণ হস্তে আর অসিধারণ করতে পারল না রব, তার শিথিল মুষ্টি থেকে তলোয়ার খসে পড়ল৷ অবিচলিত প্রস্তরমূর্তির মতো স্থির হয়ে রব রয় অপেক্ষা করতে লাগল চরম আঘাতের জন্য৷ কিন্তু আঘাত পড়ল না৷ বৃদ্ধ রব রয়ের বীরত্ব দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল স্টুয়ার্ট যোদ্ধা৷ নিজের হাতে কাপড় ছিঁড়ে সে প্রবীণ যোদ্ধার ক্ষতস্থান বেঁধে দিল৷
ওই যুদ্ধই রব রয়ের জীবনের শেষ যুদ্ধ৷ পূর্বোক্ত দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর মাত্র তিন বৎসর বেঁচে ছিল৷ তারপর তার মৃত্যু হয়৷
ক্যাপ্টেন বয়েড ও মেজর ক্যাম্পবেল
১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি বিভাগে ক্যাপ্টেন বয়েড ও মেজর ক্যাম্পবেল নামক দুই সেনাধ্যক্ষের মধ্যে হঠাৎ বাদানুবাদ শুরু হল সেনানিবাসের মধ্যে৷ মেজর ক্যাম্পবেল অধীন সৈন্যদের উপর যে আদেশ জারি করেছিলেন, সেই আদেশ ক্যাপ্টেন বয়েডের পছন্দ হয়নি এবং তার ফলে উত্তপ্ত বিতর্কের অবতারণা৷ বয়েডের মতে মেজর সাহেবের পক্ষে ওই আদেশ জারি অনুচিত কার্য৷ মেজরের বক্তব্য, উচিত কাজই করেছেন তিনি৷ দুজনেই নিজস্ব ধারণায় অটল৷ তীব্রস্বরে বাদানুবাদ চলল কিছুক্ষণ, তারপর দেখা গেল ক্রুদ্ধ পদক্ষেপে স্থানত্যাগ করছেন ক্যাম্পবেল এবং তাঁকে অনুসরণ করছেন বয়েড৷ পরবর্তী ঘটনার সঠিক বিবরণ কেউ সংগ্রহ করতে পারেনি; তবে এটুকু জানা যায় যে, দুজনের মধ্যে পিস্তল নিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধ ঘটেছিল৷
একটা ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে ‘ডুয়েল’ হয়েছিল, অকুস্থলে কোনো মধ্যস্থ উপস্থিত ছিলেন না৷ আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ শুনে অকুস্থলে ছুটে এলেন কয়েকজন অফিসার৷ তাঁদের সামনে অতিশয় উদবিগ্ন স্বরে ক্যাম্পবেল তাঁর মরণাহত প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘বয়েড, সাক্ষীদের সামনে স্বীকার করো যে লড়াইটা ন্যায়সঙ্গতভাবেই হয়েছিল৷’
স্খলিতস্বরে বয়েড যা বললেন, সেই বক্তব্য হল ক্যাম্পবেলের পক্ষে মারাত্মক৷ ‘না, লড়াই ন্যায়সংগত হয়েছিল এ-কথা বলা যায় না৷ তুমি আমাকে প্রস্তুত হওয়ার সময় দাওনি৷ তুমি খুব খারাপ লোক, ক্যাম্পবেল৷’ ওইকথা বলার পরেই বয়েডের মৃত্যু হয়৷
ক্যাম্পবেলের বিচার হল৷ বয়েডের মৃত্যুকালীন উক্তি ক্যাম্পবেলকে ঠেলে দিল মৃত্যুর মুখে৷ বিচারে ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিলেন মেজর ক্যাম্পবেল৷
স্যার ডেভিড লিন্ডসে ও জন ওয়েলস
১৯৩০ সালে এক ভোজসভায় স্কটল্যান্ডের নাইট স্যার ডেভিড লিন্ডসে এবং ইংল্যান্ডের লর্ড জন ওয়েলস নামে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ক্রুদ্ধ বাদানুবাদ শুরু হয়৷ ইংরেজ ও স্কচদের মধ্যে কারা অধিকতর বীরত্ব ও সাহসের অধিকারী এই ছিল তাঁদের তর্কের বস্তু৷
‘হাত থাকতে মুখ কেন?’ এই নীতি অবলম্বন করলেন ইংরেজ জন ওয়েলস; প্রতিপক্ষকে তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানালেন৷
‘লন্ডন ব্রিজ’ নামে সেতুর ওপর রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সামনে দুই যোদ্ধা দ্বৈরথ-রণে ব্যাপৃত হলেন অশ্বপৃষ্ঠে৷
কিছুক্ষণ লড়াই চলার পর ইংল্যান্ডের লর্ড জন ওয়েলস প্রতিদ্বন্দ্বীর শূলের আঘাতে আহত হয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়লেন মাটির উপর৷ স্কটল্যান্ডের নাইট তখন ঘোড়া থেকে নেমে পদব্রজে অগ্রসর হলেন ভূপতিত শত্রুর দিকে৷
জনতা উৎকণ্ঠিতভাবে অপেক্ষা করতে লাগল৷ এখনই প্রচণ্ড আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন জন ওয়েলস৷ কিন্তু না, চরম আঘাত পড়ল না৷ স্কচ নাইট স্যার ডেভিড লিন্ডসে শত্রুর শিরস্ত্রাণ খুলে শুশ্রূষা শুরু করলেন৷ অকুস্থলে চিকিৎসকের আগমন না হওয়া পর্যন্ত তিনি শত্রুর পরিচর্যা থেকে বিরত হননি৷
পূর্বোক্ত ঘটনার পরে ইংল্যান্ডের লর্ড জন ওয়েলস ও স্কচ নাইট স্যার ডেভিড লিন্ডসের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্বের বন্ধন স্থাপিত হয়৷ পরবর্তী জীবনে তাঁরা কখনো ইংরেজ ও স্কচদের সাহস কিংবা বীরত্ব নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেননি৷
উইলিয়াম অসবোর্ন ও কর্নেল ম্যাগরুডার
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার ‘লজ এঞ্জেলস’ নামক স্থানে গণমান্য ব্যক্তিদের একটি ভোজসভা বসেছিল৷ ভোজসভা শেষে বাধল গণ্ডগোল৷ উইলয়াম অসবোর্ন নামে একটি লোক বলে বসল আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে মহান ব্যক্তি হচ্ছেন তার বাবা এবং তার কথার সত্যতা সম্বন্ধে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে সে ওই ব্যক্তিকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করতে প্রস্তুত৷

প্রতিবাদকারী ভদ্রলোকটির নাম হচ্ছে কর্নেল ম্যাগরুডার৷ ‘ডুয়েল’-এর নিয়ম অনুসারে যাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করা হয়, সেই ব্যক্তিরই যুদ্ধের অস্ত্র ও স্থান নির্বাচন করার অধিকার থাকে৷ কর্নেল ম্যাগরুডার বললেন, ‘আমি ডিলিঞ্জার পিস্তল নিয়ে লড়ব৷ লড়াই হবে এখনই, এই টেবিলের দু-পাশ থেকে৷’
দুটি ছোটো অথচ মারাত্মক পিস্তল তখনই এসে গেল৷ পিস্তল দুটিতে গুলি ভরে দেওয়া হল এবং টেবিলের দু-ধারে বসে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরকে লক্ষ করে উঁচিয়ে ধরল হাতের অস্ত্র৷ অসবোর্ন তখন ভয়ে কাঁপছে; কর্নেল শান্ত নির্বিকার৷ দ্বন্দ্বযুদ্ধের নিয়ম অনুসারে মধ্যস্থ নির্দেশ দিলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা গুলি চালায়, কিন্তু কাপুরুষ অসবোর্ন নির্দেশ আসার আগেই পিস্তলের ঘোড়া টিপে দিল৷ ভীত বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে অসবোর্ন নিরীক্ষণ করল তার প্রতিদ্বন্দ্বী অবিচলিত ও অকম্পিত হস্তে তার দিকে পিস্তলের লক্ষ্য স্থির করছে— নিক্ষিপ্ত গুলি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি৷ দারুণ আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে অসবোর্ন কর্নেলের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইল৷ কর্নেল পিস্তল না-চালিয়ে চালালেন পা— প্রচণ্ড পদাঘাতে তিনি অসবোর্নকে ছিটকে ফেলে দিলেন৷ বেচারা অসবোর্ন! সে জানত না যে, দুটি পিস্তলের মধ্যেই বুলেটের পরিবর্তে ভরে দেওয়া হয়েছিল বোতলের ছিপি!
___
* অত্যন্ত হিংস্র ও মাংশাসী শূকর জাতীয় পশু
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন