সৈনিকের প্রথম অভিজ্ঞতা কায়না

ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

প্রথম পরিচ্ছেদ

রহস্যময় মৃত্যু

কায়না!

মৃত্যুগহ্বর!

হ্যাঁ, উত্তর রোডেশিয়ার স্থানীয় ভাষা ‘কায়না’ শব্দটির অর্থ—‘যাতনাদায়ক মৃত্যুগহ্বর’!

‘কায়না! একবার, মাত্র একবারই ওই ভয়ানক শব্দ উচ্চারণ করেছিল স্থানীয় পুলিশ কর্মচারী, তারপরই তার মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল৷’

‘ভারি আশ্চর্য ব্যাপার তো!’ মি. হুইংক্লির মুখে পূর্বোক্ত ঘটনা শুনে চমকে উঠলেন পর্যটক আত্তিলিও গত্তি, ‘কথাটা বলার সঙ্গেসঙ্গে মৃত্যু হল?’

‘হ্যাঁ৷’— উত্তর রোডেশিয়ার প্রাদেশিক কমিশনার মি. হুইংক্লি বললেন, ‘স্থানীয় পুলিশ জনৈক নিরুদ্দেশ ব্যক্তির সন্ধান করতে গিয়েছিল৷ ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে সে তার বক্তব্য পেশ করতে উদ্যত হয়, কিন্তু ‘‘কায়না’’ শব্দ উচ্চারণ করার সঙ্গেসঙ্গেই তার মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির উপর৷ ঘটনাটা হঠাৎ শুনলে খুব অদ্ভুত ও অলৌকিক মনে হয়, তবে একটু ভেবে দেখলে সমস্ত বিষয়টার একটা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা করা সম্ভব৷ লোকটির হূৎপিণ্ডের অবস্থা ভালো ছিল না, আর অনেকটা পথ সে দৌড়ে এসেছিল— তাই অত্যধিক পরিশ্রম ও উত্তেজনার ফলে দুর্বল হূৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটা খুব অসম্ভব নয়৷ আমি স্থানীয় অধিবাসীদের মুখে দু-বার ‘‘কায়না’’র নাম শুনেছি৷ কিন্তু প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারও ‘‘কায়না’’ সম্বন্ধে কোনো জ্ঞাতব্য বিষয় আমার কর্ণগোচর হয়নি; কারণ সেবারেও মৃত্যু এসে অতর্কিতে বক্তার কণ্ঠরোধ করেছিল৷’

আত্তিলিও বললেন, ‘প্রথমবারের ঘটনা তো শুনলাম৷ দ্বিতীয়বারের ঘটনাটা বলুন৷’

কমিশনার মি. হুইংক্লি বললেন, ‘একটি স্থানীয় বৃদ্ধার মুখে আমি দ্বিতীয়বার ওই কথাটা শুনেছিলাম৷ সে আমাকে জানিয়েছিল, কায়নার ভিতর তার চার পুত্র সন্তানকে নিক্ষেপ করা হয়েছে৷ আর কোনো কথা শোনার সুযোগ আমার হয়নি৷ কারণ ওইটুকু বলেই বৃদ্ধা চুপ করেছিল৷’

আত্তিলিও প্রশ্ন করলেন, ‘ভয়ে চুপ করেছিল?’

উত্তর এল— ‘না৷ সেই মুহূর্তেই তার মৃত্যু হয়েছিল৷’

আত্তিলিও বৃদ্ধার মৃত্যুকে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করেছিলেন, কিন্তু কমিশনার হুইংক্লি জানালেন আত্তিলিওর সন্দেহ অমূলক৷

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন মি. হুইংক্লি, তারপর বললেন, ‘আমার মনে হয় কায়নার কথা উল্লেখ করেছিল বলেই যে বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছিল তা নয়, বরং ঠিক উলটো ব্যাপারটা ঘটেছিল৷’

‘অর্থাৎ আপনি বলতে চান মৃত্যু আসন্ন বুঝেই বৃদ্ধা কায়নার বিষয়ে উল্লেখ করতে সাহস পেয়েছিল?’

‘হ্যাঁ৷ স্থানীয় অধিবাসীদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সজাগ৷ আসন্ন মৃত্যুকে তারা অনুভব করতে পারে৷ অন্তিম মুহূর্তে বৃদ্ধা কায়নার রহস্য ফাঁস করে দিতে চেয়েছিল; দুর্ভাগ্যক্রমে তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মৃত্যু তার কণ্ঠ রোধ করে৷’

গল্প করতে করতে পূর্বোক্ত ঘটনা দুটির বিবরণ দিচ্ছিলেন উত্তর রোডেশিয়ার প্রাদেশিক কমিশনার মি. হুইংক্লি এবং দুই বন্ধুর পাশে বসে সাগ্রহে তাঁর কথা শুনছিলেন আত্তিলিও গত্তি৷ বন্ধু দুটির নাম প্রফেসর ও বিল৷ বন্ধুদের সম্পূর্ণ নাম আত্তিলিও তাঁর কাহিনির মধ্যে উল্লেখ করেননি, অতএব আমরাও তাঁদের ‘প্রফেসর’ আর ‘বিল’ নামেই ডাকব৷

প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীতে যুদ্ধ করেছিলেন কমান্ডার আত্তিলিও গত্তি৷ যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আফ্রিকার জীবজন্তু ও মানুষ সম্বন্ধে বিভিন্ন জ্ঞাতব্য তথ্য সংগ্রহ করার জন্য উক্ত মহাদেশের কয়েকটি স্থানে তিনি ভ্রমণ করতে উদযোগী হয়েছিলেন৷ ওই কাজে তাঁর সহায় ছিলেন পূর্বোক্ত দুই বন্ধু, প্রফেসর ও বিল৷ উত্তর রোডেশিয়ার একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত অনেকগুলো জলাভূমি আবিষ্কার করেছিলেন আত্তিলিও এবং তাঁর দুই বন্ধু৷ শুধু তাই নয়, বিস্তীর্ণ জলাভূমিগুলোর অবস্থান নির্ণয় করার উপযুক্ত একটি মানচিত্রও তাঁরা তৈরি করে ফেলেছিলেন৷ স্থানীয় গভর্নর অভিযাত্রীদের সাফল্যে খুশি হয়ে তিন বন্ধুকে নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করেছিলেন৷ আহারাদির পর তাঁরা গভর্নরের লাইব্রেরিতে এলেন কফি পান করার জন্য৷

প্রফেসর হঠাৎ উত্তর রোডেশিয়ার বনভূমি সম্বন্ধে একটা মন্তব্য করলেন৷ জলাভূমিগুলো পরিদর্শন করে ফিরে আসার সময়ে ওই অঞ্চলের ‘গ্রানাইট’ পাথর দেখেই তিনি উত্তেজিত হয়েছিলেন—

‘এমন অদ্ভুত নিসর্গ দৃশ্য আমি আফ্রিকার কোনো জায়গায় দেখিনি৷’

অরণ্যের পটভূমিতে অবস্থিত অসংখ্য প্রস্তরসজ্জিত গুহার দৃশ্য বিলকেও অভিভূত করে দিয়েছিল৷

নৈশভোজে উপস্থিত রাজপুরুষদের মধ্যে প্রাদেশিক কমিশনার মি. হুইংক্লি ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি উত্তর রোডেশিয়ার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত— ওই অঞ্চলের কোনো বৈশিষ্ট্যই তাঁর অজানা ছিল না৷

মি. হুইংক্লি বললেন, ‘কোনো শ্বেতাঙ্গ এই অঞ্চল পরিদর্শন করেননি৷ এখানে গাড়ি চলার রাস্তা নেই৷ যতদূর জানি, খনিজ দ্রব্যও পাওয়া যায় না৷ ‘মাম্বোয়া’ নামক যে নিগ্রো জাতি এখানে বাস করে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়৷ তারা লাজুক প্রকৃতির এবং শ্বেতাঙ্গদের সংস্পর্শে আসতে অনিচ্ছুক— সরকারও তাদের ঘাঁটিয়ে অনর্থক বিপত্তির সৃষ্টি করতে চান না৷’

মি. হুইংক্লির কথা শুনে প্রফেসর ও বিল দুজনেই দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন৷ তাঁরা দুজনেই উৎসাহের সঙ্গে জানালেন যে, ওই অঞ্চলের বিচিত্র নিসর্গ-দৃশ্য দেখে তাঁদের ধারণা হয়েছে প্রকৃতি দেবীর বহু গোপন তথ্য সেখানে লুকানো আছে এবং আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের পক্ষে সেই গোপন রহস্যগুলো আবিষ্কার করা খুব কঠিন হবে না৷ আত্তিলিও কোনো কথা বলেননি, সঙ্গীদের সঙ্গে তিনি একমত হতে পারেননি তখন পর্যন্ত— ওই ধরনের অভিযানের সাফল্য সম্বন্ধে তাঁর দ্বিধা ছিল, তাই কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেননি আত্তিলিও সাহেব৷

মি. হুইংক্লি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আপনারা যদি মৃত্যুগহ্বর আবিষ্কার করতে পারেন, তাহলে একটা কাজের মতো কাজ হয় বটে!’

‘মৃত্যুগহ্বর! সে আবার কী?’

তিন বন্ধুই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন৷

কমিশনার মি. হুইংক্লি তখন যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে— ‘কায়না’ নামক এক মৃত্যুগহ্বরের কথা স্থানীয় অধিবাসীদের মুখে শোনা যায় বটে, কিন্তু বাস্তব জগতে উক্ত স্থানের সত্যিই কোনো অস্তিত্ব আছে কি না সে-বিষয়ে তিনি খুব নিঃসন্দেহ নন৷ হয়তো সবটাই গুজব অথবা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন স্থানীয় মানুষের কল্পনার ব্যাপার৷ তবে পর পর দু-বার ‘কায়না’ শব্দটি যে মি. হুইংক্লির শ্রুতিগোচর হয়েছিল সে-কথাও তিনি জানিয়ে দিলেন এবং তারপর পুলিশ কর্মচারী ও বৃদ্ধার মৃত্যু নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল সেই আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ এই কাহিনির শুরুতেই বলা হয়েছে৷

সব কথা শুনে বিল আর প্রফেসর ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন৷ সম্ভব হলে সেই মুহূর্তেই তাঁরা মৃত্যুগহ্বরের সন্ধানে যাত্রা করতে প্রস্তুত! আত্তিলিও বন্ধুদের কথায় খুব উৎসাহ প্রকাশ না-করলেও কায়না-অভিযানে তাঁর আপত্তি ছিল না৷ শেষকালে অবশ্য বিপদের গুরুত্ব বুঝে প্রফেসর ও বিল পিছিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মহাযুদ্ধের সৈনিক আত্তিলিও গত্তি একবার কাজ শুরু করে পিছিয়ে আসতে রাজি হলেন না— উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বার বার তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে৷

সেসব কথা ক্রমশ প্রকাশ্য৷

গভর্নরের বাড়ি থেকে নিজেদের আস্তানায় ফিরে আসতেই তিন বন্ধু অভিযানের পরিকল্পনা স্থির করে ফেললেন৷ তাঁরা জানতেন স্থানীয় সরকার তাঁদের সাহায্য করবেন৷ কিন্তু সরকারের সাহায্য পেলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না৷ কাজটা খুবই কঠিন৷ মাম্বোয়া জাতির প্রধান ব্যক্তিরা অভিযাত্রীদের উদ্দেশ্য জানতে পারলে বিভিন্ন উপায়ে তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে এবং সেই বাধাবিপত্তি জয় করে প্রায় ৩০,০০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে শ্বাপদ-সংকুল অজানা স্থানে এক গোপন গুহার অস্তিত্ব আবিষ্কার করা যে কতখানি কঠিন, সে-কথা অন্তত আত্তিলিওর অজ্ঞাত ছিল না— বিপদের গুরুত্ব বুঝেই তিনি এই অভিযান সম্পর্কে প্রথমে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি৷ কিন্তু অভিযানের দায়িত্ব গ্রহণ করে আত্তিলিওর মনের ভাব বদলে গেল৷ বাস্তব জগতে যদি সত্যিই মৃত্যুগুহার অস্তিত্ব থাকে, তবে যেমন করেই হোক ওই জায়গাটা খুঁজে বের করার প্রতিজ্ঞা করলেন আত্তিলিও৷

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ত্রয়ী

কমান্ডার আত্তিলিও গত্তি যে প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্রপক্ষের বাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে আফ্রিকা মহাদেশ সম্বন্ধে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার জন্যই আফ্রিকা ভ্রমণে উদযোগী হয়ে উত্তর রোডেশিয়াতে পদার্পণ করেছিলেন, সে-কথা এই কাহিনির প্রথম পরিচ্ছেদেই বলা হয়েছে৷

কিন্তু সেনাবাহিনীর মানুষটি হঠাৎ সৈনিকের ভূমিকা ত্যাগ করে পর্যটকের ভূমিকা গ্রহণ করতে উৎসুক হয়ে উঠলেন কেন সে-কথা জানতে হলে কমান্ডার সাহেবের পূর্বজীবন নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার৷ প্রফেসর ও বিল নামে আত্তিলিওর যে দুজন বন্ধুর নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গেও বর্তমান কাহিনির পাঠকদের বিশেষ পরিচয় হওয়ার প্রয়োজন আছে৷

প্রথমেই ধরা যাক আত্তিলিওর কথা, কারণ তিনি হলেন এই কাহিনির নায়ক৷

সুদীর্ঘ চার বৎসর ধরে জ্বলতে জ্বলতে প্রথম মহাযুদ্ধের সর্বগ্রাসী অগ্নি যখন নির্বাণলাভের উপক্রম করছে— অর্থাৎ যুদ্ধের শেষ দিকে— হঠাৎ আহত হলেন আত্তিলিও সাহেব৷ চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে মিশরে পাঠানো হল৷ আত্তিলিওর বুকে গুলি লেগেছিল; তার উপর ‘ফ্লু’ রোগের আক্রমণ তাঁকে যক্ষ্মার কবলে ঠেলে দিল৷ মাত্র তেইশ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে আত্তিলিও খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন৷ চিকিৎসক তাঁকে বললেন, সাহারা মরুভূমিতে সূর্যের তাপে উত্তপ্ত বালির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকলে আত্তিলিওর অসুখ ভালো হয়ে যাবে৷

আত্তিলিও ডাক্তারের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন৷ গরম বালির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে তিনি বসে থাকতেন৷ মাত্র একমাস পরেই তিনি সবিস্ময়ে লক্ষ করলেন, তাঁর দেহ রোগমুক্ত হয়েছে এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছেন৷

ইতিমধ্যে বিস্তর আরব-বেদুইনের সঙ্গে তিনি ভাব জমিয়ে ফেলেছেন৷ মরুভূমির মধ্যে একটা সজীব নরমুণ্ড দেখে তারা কৌতূহলী হয়ে ছুটে আসত এবং লুপ্ত বালুকার গর্ভে আত্তিলিওকে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করত৷ ওই সময়ে আরবি ভাষার সঙ্গে আত্তিলিওর পরিচয় হয়৷

সাহারার তপ্ত বালি আত্তিলিওর যক্ষ্মারোগ সারিয়ে দিল৷ গুলির আঘাতে তাঁর দেহে যে-ক্ষত হয়েছিল, সেই ক্ষতস্থানও শুকিয়ে গেল৷ কিন্তু এইবার এক নতুন দুরারোগ্য ব্যাধি তাঁকে আক্রমণ করল৷ যক্ষ্মার চেয়েও মারাত্মক এই রোগের নাম আফ্রিকা-জ্বর৷ এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ আফ্রিকাকে ভালোবেসে পাগল হয়— অরণ্য, পর্বত, নদী ও মরুভূমি-সজ্জিত এই বিশাল মহাদেশ তার দ্বিপদ ও চতুষ্পদ সন্তানদের নিয়ে বিদেশি মানুষকে এমন দুর্ভেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে ধরে যে, কিছুতেই তার নিস্তার থাকে না৷ আফ্রিকা-জ্বরে আক্রান্ত মানুষ পৃথিবীর কোনো স্থানেই স্বস্তি পায় না—বার বার সে ঘুরে ফিরে আসে আফ্রিকার বুকে, বন্য প্রকৃতির সাহচর্য উপভোগ করার জন্য৷ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন বিদেশি এই আফ্রিকা-জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন৷

পূর্বোক্ত আফ্রিকা-জ্বর আত্তিলিও সাহেবকে আক্রমণ করেছিল৷ নিউইয়র্কে গিয়ে তিনি আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করার আয়োজন শুরু করলেন৷ উক্ত মহাদেশের বিষয়ে বিভিন্ন জ্ঞাতব্য তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তিনি একটি অভিযান পরিচালনা করার সংকল্প করেন এবং ওই কাজে তাঁকে সাহায্য করার উপযুক্ত মানুষের সন্ধান করতে থাকেন৷ সেই সময়ে প্রফেসরের সঙ্গে আত্তিলিও গত্তির সাক্ষাৎ হয়৷ আত্তিলিওর অভিযানে বিজ্ঞান-বিষয়ক যেকোনো ব্যাপারেই প্রফেসরের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হত৷ প্রফেসরের সম্পূর্ণ নাম উল্লেখ করেননি আত্তিলিও; তিনি ভদ্রলোককে প্রফেসর বলেই ডাকতেন, আমরাও তাই ডাকব৷ আত্তিলিওর লিখিত বিবরণী থেকে শুধু এইটুকু জানা যায় যে, প্রফেসর একজন ফরাসি চিকিৎসক৷

এবার বিলের কথা বলছি৷ সংবাদপত্রে অভিযান-পরিচালনার কাজে সহকারীর জন্য যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন আত্তিলিও, সেই বিজ্ঞাপন দেখেই বিল আকৃষ্ট হয়৷ বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে বিল একটি আবেদনপত্র পাঠিয়েছিল৷ চিঠি পড়ে আত্তিলিও জানতে পারলেন যে, বিল মোটা মাহিনায় একটি হিসাব-পরীক্ষার প্রতিষ্ঠানে কার্যে নিযুক্ত আছে এবং অবসর সময়ে পড়াশুনা করে প্রত্নতত্ত্ব সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছে৷ হিসাবপরীক্ষা ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে বিল যেটুকু জ্ঞান সঞ্চয় করেছে, সেই অভিজ্ঞতা আত্তিলিওর কাজে লাগতে পারে বলেই বিলের বিশ্বাস এবং আত্তিলিও যদি তাকে অভিযানে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে হিসাবপরীক্ষার অফিসে মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে সে যে সাগ্রহে অভিযানে যোগ দিতে রাজি আছে, এই কথাও জানিয়ে দিয়েছে বিল লিখিত আবেদনপত্রে৷

এই ধরনের বহু চিঠি আসত প্রতিদিন, কিন্তু বিলের চিঠি হঠাৎ আত্তিলিওর খুব ভালো লেগে গেল৷ পত্রযোগে তিনি বিলকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন৷ প্রথম দর্শনেই তিনি বিলকে পছন্দ করলেন, কয়েক মিনিট কথা বলেই তিনি বুঝলেন, ঠিক বিলের মতো মানুষকেই তাঁর প্রয়োজন৷ বিলের পূর্বজীবন সম্বন্ধে আলোচনা করে আত্তিলিও জানলেন, মাত্র পাঁচ বৎসর বয়সেই এক দুর্ঘটনার ফলে সে পিতৃমাতৃহীন হয়েছিল৷ বিলের এক আত্মীয়া তাকে সন্তানস্নেহে পালন করেছিলেন, তাঁর যত্নেই বিল মানুষ হয়েছে৷ যে-দুর্ঘটনার ফলে বিল তার মা-বাবাকে হারিয়েছিল, সেই ঘটনার কথা সে আত্তিলিওকে বলেনি৷ পরে অবশ্য বলেছিল, কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে— অবশ্যম্ভাবী ভয়াবহ পরিণাম সম্বন্ধে অবহিত থাকলেও নিয়তির নিষ্ঠুর চক্রান্তকে বাধা দিতে পারেননি আত্তিলিও৷ যে-দুর্ঘটনার ফলে বিল প্রথমে মা এবং পরে বাবাকে হারিয়েছিল, সেই ঘটনার বিশদ বিবরণ আগে শুনলে হাতিশিকারের জন্য বিলের অস্বাভাবিক আগ্রহের কারণ অনুমান করে আত্তিলিও সাবধান হতেন, কিছুতেই তাকে আফ্রিকায় নিয়ে যেতেন না৷

বিলের মা-বাবা যে অভাবিত ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, নিউইয়র্কে সংঘটিত সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা হচ্ছে বাস্তব জীবনের এক ভয়াবহ নাটক; এবং সেই নাটকের রক্তরঞ্জিত শেষ দৃশ্যের যবনিকা পড়েছিল অরণ্য-আবৃত আফ্রিকার অন্তঃপুরে৷

যথাসময়ে সেই কাহিনি আমরা জানতে পারব৷

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

নাম-মাহাত্ম্য

গভর্নরের বাড়ি থেকে নৈশভোজে আপ্যায়িত হয়ে নিজেদের আস্তানায় ফিরে আসার পথে তিন বন্ধুর মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল এবং সেই আলোচনার ফলে তাঁরা যে মৃত্যুগহ্বরের সন্ধানে অভিযান চালানোর সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন, সে-কথা আগেই বলেছি, এখন দেখা যাক পরবর্তী ঘটনার স্রোত তিন বন্ধুকে কোন পথে নিয়ে যায়৷

কয়েকদিন পরের কথা৷ সন্ধ্যার পর তাঁবুতে বসে আছেন তিন বন্ধু৷ তাঁবুর পর্দা সরিয়ে রাতের খানা নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল একটি ছোকরা চাকর৷ তিন বন্ধু লুব্ধ দৃষ্টিতে দেখলেন, ছোকরার হাতের উপর মস্ত বড়ো থালাতে ঝোলের মধ্যে শুয়ে একটা মুরগি, সর্বাঙ্গ থেকে ধূম-উদগিরণ করছে৷ চিকেনকারি! গরম!

তিন বন্ধুর রসনা সজল হয়ে উঠল৷

হঠাৎ কী খেয়াল হল, প্রফেসর বলে উঠলেন, ‘কায়না!’

ঝন-ঝনাৎ! অ্যলুমিনিয়ামের থালাটা ছোকরার হাত থেকে ছিটকে পড়ল মাটির উপর!

দারুণ ক্রোধে চেঁচিয়ে ওঠার উপক্রম করলেন আত্তিলিও, কিন্তু তাঁর মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরিয়ে আসার আগেই চাকরটা তিরবেগে তাঁবুর বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

আত্তিলিও তৎক্ষণাৎ চাকরদের তাঁবুর দিকে পা চালিয়ে দিলেন৷ কিন্তু যথাস্থানে পৌঁছোনোর আগেই তিনি শুনতে পেলেন কয়েকটা উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, পরক্ষণেই দ্রুত ধাবমান পায়ের আওয়াজ৷...

তিন বন্ধু হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, তাঁরা তিনজন ছাড়া আশেপাশে কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই, নিগ্রো চাকররা সবাই অদৃশ্য হয়েছে৷

না, সবাই নয়, জামানি নামক জুলু জাতীয় যে রাঁধুনিটি অভিযাত্রীদের একান্ত বিশ্বাসের পাত্র ছিল, সেই লোকটি স্থান ত্যাগ করে পালায়নি৷ পলাতক পাঁচটি চাকরই ছিল উত্তর রোডেশিয়ার স্থানীয় অধিবাসী৷ প্রফেসরের মুখে ‘কায়না’ শব্দটি শোনার সঙ্গেসঙ্গেই ছোকরা চাকর সকলের কাছে সেই সংবাদ বিতরণ করেছে এবং তার ফলেই বিহ্বল হয়ে মানুষগুলো যে গা-ঢাকা দিয়েছে, এ-বিষয়ে অভিযাত্রীদের কোনো সন্দেহ ছিল না৷

রাতের লোভনীয় খাদ্য মাটির উপর গড়াগড়ি দিচ্ছে, চাকররা উধাও হয়েছে জিনিসপত্র ফেলে, তিন বন্ধুর চোখ-মুখ কিন্তু আনন্দে উজ্জ্বল৷ একটা স্পষ্ট সত্য তাঁরা বুঝতে পেরেছেন: ভৃত্যদের দারুণ আতঙ্ক প্রমাণ করেছে মৃত্যুগহ্বর অলীক কল্পনা নয়৷ বাস্তব জগতেই বিরাজ করছে ওই ভয়-দেখানো ভয়ানক ‘কায়না’৷

শুকনো খাদ্যের টিন খুলতে খুলতে অভিযাত্রীরা প্রতিজ্ঞা করলেন, ‘কায়না’ নামের ওই বিভীষিকাকে যেমন করেই হোক তাঁরা আবিষ্কার করবেন৷

প্রতিজ্ঞা করা সহজ, প্রতিজ্ঞা রাখা সহজ নয়৷

উত্তর রোডেশিয়ার স্থানীয় মানুষ মাম্বোয়ারা অভিযাত্রীদের এড়িয়ে চলতে লাগল৷ মাম্বোয়া জাতির কোনো লোকের কাছে পথের সন্ধান চাইলে সে ভুল পথের নির্দেশ দিত, কাজ করতে বললে পলায়ন করত ঊর্ধ্বশ্বাসে৷ চারদিক থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসত তিন বন্ধুর কানে, এখানে-ওখানে চোখে পড়ত শূন্যে ভাসমান ধোঁয়ার কুণ্ডলী— মাম্বোয়াদের সংকেত৷

অভিযাত্রীদের উদ্দেশ্য এখন আর মাম্বোয়াদের অজানা নয়৷ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ভেসে যায় ধোঁয়ার অক্ষরে লেখা কুণ্ডলীপাকানো দুর্বোধ্য সতর্কবাণী— ‘সাবধান! সাদা মানুষ এসেছে মৃত্যুগহ্বরের সন্ধানে৷’

ঢাকের আওয়াজ ও ধোঁয়ার সাংকেতিক অর্থ সঠিকভাবে বোধগম্য না হলেও মাম্বোয়াদের মনোভাব অভিযাত্রীরা বুঝতে পেরেছিলেন৷

গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরেও জনপ্রাণীর সাক্ষাৎ পেলেন না তিনবন্ধু৷ অভিযাত্রীদের আগমন-সংবাদ আগেই পেয়ে যেত গ্রামবাসীরা এবং সঙ্গেসঙ্গে তারা যে স্থান ত্যাগ করত সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই! অভিযাত্রীরা বুঝলেন, মাম্বোয়া-জাতি তাঁদের ‘বয়কট’ করছে!

অবশেষে তাঁরা জেলা-কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে সব কথা খুলে বললেন৷ কমিশনার তাঁদের কথা শুনে সহানুভূতি প্রকাশ করলেন এবং সক্রিয়ভাবে অভিযাত্রীদের সাহায্য করতে সচেষ্ট হলেন৷ কিন্তু মাম্বোয়াদের মধ্যে যারা কমিশনারের একান্ত অনুগত ছিল, তারাও তাঁর কথায় অভিযাত্রীদের দলে যোগ দিতে রাজি হল না৷ অবশেষে চারজন মাম্বোয়া বন্দি অভিযাত্রীদের দলে কাজ করতে সম্মত হল৷ তারা বোধ হয় ভেবেছিল, দিনের পর দিন বন্দি অবস্থায় গাধার খাটুনি না-খেটে (ওই সময়ে একটা রাস্তা তৈরির কাজে তারা নিযুক্ত ছিল) যদি পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছু অর্থ উপার্জন করা যায়, তাহলে ক্ষতি কী? তা ছাড়া, ভালোভাবে কাজ করলে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জেলা কমিশনার৷ অতএব বন্দি চারজন মহা উৎসাহে অভিযাত্রীদের দলে যোগ দিল৷

ইতিমধ্যে কমিশনার সাহেবের সঙ্গে অভিযাত্রীদের দস্তুর মতো বন্ধুত্ব পেয়ে গেছে৷ কমিশনার বেশ বুদ্ধিমান মানুষ, তিনি রটিয়ে দিলেন গুহাবাসী জন্তুজানোয়ার দেখার জন্যই অভিযাত্রীরা এই অঞ্চলে পদার্পণ করেছেন৷ ধাপ্পায় কাজ হল; মাম্বোয়ারা অভিযাত্রীদের সঙ্গে কিছুটা সহজভাবে মেলামেশা শুরু করল৷ তিন বন্ধু এবার সাবধান হয়েছেন৷ কায়নার নাম-মাহাত্ম্য যে বিপত্তির সূচনা করেছিল, তা এত শীঘ্র ভুলে যাওয়ার কথা নয়— কেউ আর কায়নার নাম মুখে আনতেন না৷

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

গুহাতে মৃত্যুর হানা

কায়না-অভিযান ভালোভাবে চালানোর জন্য একটা মানচিত্রের প্রয়োজন ছিল৷ কিন্তু উক্ত বস্তুটিকে কোথাও পাওয়া গেল না বলে অভিযাত্রীরা ঠিক করলেন, তাঁরা নিজেরাই এলাকাটা পরিদর্শন করে একটা চলনসই মানচিত্রের খসড়া তৈরি করে নেবেন৷

কাজটা দু-চার দিনের মধ্যে হওয়ার নয়, বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার৷ তাই যে কয়দিন ওটা তৈরি না হয়, সেই কয়দিনের জন্য একটা স্থায়ী আস্তানার প্রয়োজন৷ অতএব স্থায়ীভাবে একটা তাঁবু খাটানো হল৷ তাঁবুটা যেখানে পাতা হয়েছিল সেই জায়গাটার চারিদিকে পড়েছিল অজস্র ‘গ্রানাইট’ পাথর৷ সমস্ত অঞ্চলটা যেন গ্রানাইট পাথরের রাজত্ব— যেদিকে চোখ যায় খালি পাথর আর পাথর৷

একটা তাঁবু খাটিয়েই কাজ শেষ হল না৷ জিনিসপত্র সাজসরঞ্জাম মজুত করার জন্য কয়েকটা কুঁড়েঘর তোলা দরকার— কিন্তু শক্ত পাথুরে-মাটির ওপর খুঁটি পুঁতে ঘর তোলা কি দু-চারজনের কাজ? তা ছাড়া বাক্স-বন্দি অজস্র সাজসরঞ্জাম বহন করার জন্যও তো কিছু লোকের দরকার৷ খুঁটিনাটি আরও যেসব কাজ ছিল তার জন্যও লোক চাই, অর্থাৎ বেশ কিছু জনমজুর না হলে অভিযাত্রীদের আর চলছে না৷

তিন বন্ধুর সঙ্গে যে চারজন মাম্বোয়া-বন্দি কাজ করার জন্য এসেছিল, তাদের, এবার পদোন্নতি ঘটল৷ খাটুনির কাজ থেকে মুক্তি দিয়ে আত্তিলিও তাদের জনমজুর সংগ্রহ করার কাজে নিযুক্ত করলেন— তারা হয়ে গেল ‘রিক্রুটিং অফিসার’!

কাজটা তাদের খুব পছন্দ হয়েছিল; ওই কাজে তারা যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল৷ মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক এবং নানারকম উপহার পেয়ে মাম্বোয়ারা ভারি খুশি; সেই সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই লুব্ধ জনতার স্রোত এমনভাবে বাড়তে লাগল যে মাসখানেক পরেই অভিযাত্রীরা দেখলেন লোকের অভাবে বিপন্ন হওয়ার কোনো কারণ আর নেই৷

মাম্বোয়ারা খুব মন দিয়ে কাজ করতে লাগল৷ মাম্বোয়া সর্দার অভিযাত্রীদের জানাল, তার প্রজাদের মধ্যে চারজনকে তাঁরা বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছেন বলে সে ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ এবং সবরকমে তাঁদের সাহায্য করতে সে প্রস্তুত৷ বন্দি চারজন স্থানীয় মানুষ, অন্তত শতাধিক গুহার অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা ওয়াকিবহাল, তবু যদি প্রয়োজন হয় সর্দার নিজে তাঁদের সাহায্য করবে— অবশ্য যদি তাঁরা সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করেন৷

খুব ভালো কথা৷ খুব আনন্দের কথা৷ বিল ও প্রফেসর মাম্বোয়া-সর্দারের কথায় ও ব্যবহারে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন৷ কিন্তু আত্তিলিওর মনে খটকা লাগল— হঠাৎ মাম্বোয়ারা অভিযাত্রীদের সাহায্য করার জন্য এতটা ব্যাকুল হয়ে উঠল কেন? এটা অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ নয় তো? আত্তিলিও বন্ধুদের কাছে তাঁর সন্দেহ প্রকাশ করলেন না, মনের কথা মনেই চেপে রাখলেন৷

অভিযানের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে চালানোর জন্য অভিযাত্রীরা পরামর্শ করতে বসলেন৷ পরামর্শের ফলে স্থির হল, প্রত্যেক দিন তিন বন্ধু তিন দিকে যাবেন৷ বন্দি মাম্বোয়া চারজনের মধ্যে দুজন যাবে প্রফেসরের সঙ্গে, দুজন যাবে বিলের সঙ্গে এবং জামানি নামক জুলু-অনুচরটি থাকবে আত্তিলিওর সঙ্গে৷ পূর্ব-সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটি দল হবে তিনটি ভিন্ন পথের পথিক৷

অল্প সময়ের মধ্যে একটা বৃহৎ এলাকা পরিদর্শন করার পক্ষে ওই পরিকল্পনা খুবই উপযোগী ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভাবতে গেলে বলতে হয় পরিকল্পনাটা ছিল অতিশয় মারাত্মক৷ কারণ, গুহার মধ্যে প্রবেশ করে অভিযাত্রীদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো হিংস্র জন্তুর সম্মুখীন হন, তবে সম্পূর্ণ এককভাবেই তাঁকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হবে৷ নিগ্রোদের মধ্যে কেউ গুহার ভিতর প্রবেশ করতে চাইবে না— তারা অপেক্ষা করবে গুহার বাইরে এবং গুহার ভিতর থেকে আচম্বিতে শ্বাপদকণ্ঠের হিংস্র গর্জন কানে এলে তারা যে পদযুগলের দ্রুত ব্যবহার না-করে যথাস্থানে দাঁড়িয়ে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা আছে কি? নিগ্রোরা স্থানীয় মানুষ, খুব সহজেই পথ চিনে তারা তাঁবুতে ফিরে আসতে পারবে, কিন্তু বিদেশি অভিযাত্রী শ্বাপদের কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে পারলেও গুহার বাইরে এসে নিগ্রোদের দেখা না-পেলে আবার বিপদে পড়বেন— ছোটো বড়ো অসংখ্য গ্রানাইট পাথরের দুর্গ, সুড়ঙ্গ আর গোলকধাঁধা ভেদ করে তাঁর পক্ষে সঠিক পথের নিশানা ধরে তাঁবুতে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব৷

এইসব বিপদের সম্ভাবনা তুচ্ছ করেই অভিযাত্রীরা অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন৷ বিপদ যে হয়নি তা নয়, হয়েছিল৷ জামানি এবং মাম্বোয়া পথপ্রদর্শকেরা সকলেই গুহার সান্নিধ্য অপছন্দ করত৷ পথ দেখিয়ে গুহার সামনে নিয়ে যেতে তাদের আপত্তি ছিল না, কিন্তু গুহার প্রবেশপথ থেকে প্রায় ফুট পঞ্চাশ দূরে এসেই তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ত, কিছুতেই আর অগ্রসর হতে চাইত না৷ তাদের দোষ নেই; কয়েকদিনের ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে তাদের ভয় পাওয়ার যুক্তিসংগত কারণ ছিল৷

একটা অজানা গুহার মধ্যে একদিন হঠাৎ বিলের সঙ্গে একটা হায়নার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল৷ বিল গুলি ছুড়ল—গুহার অস্পষ্ট অন্ধকারে তার নিশানা ভালো হয়নি— ফলে জন্তুটা মরল না৷ আহত হল৷ দ্বিতীয়বার গুলি চালিয়ে হায়নাটাকে হত্যা করার আগে জন্তুটা বিলের হাঁটুতে একবার নখের আঁচড় বসিয়েছিল৷ বিল ক্ষতটার দিকে নজর দেয়নি৷ হায়না মেরে সে গুহার বাইরে বেরিয়ে এসেছিল এবং তারপরেও ক্ষতচিহ্নটাকে ‘সামান্য আঘাত’ বলে তুচ্ছ করেছিল৷ তাচ্ছিল্যের পরিণাম বিলের পক্ষে ভালো হয়নি৷ সেইদিনই সন্ধ্যার সময়ে তার ক্ষতটা এমন ভীষণভাবে বিষিয়ে উঠল যে আত্তিলিও ভাবলেন বিলকে বাঁচানোর জন্য ওই পা-টিকে হয়তো কেটে ফেলতে হবে৷ সৌভাগ্যক্রমে ‘পদমর্যাদা’ অক্ষুণ্ণ রেখেই বিল সেযাত্রা আরোগ্য লাভ করতে সমর্থ হয়৷

আর একবার ভারসাম্য হারিয়ে প্রফেসর হঠাৎ পড়ে গেলেন একটা শুকনো গাছের ডালপালার মধ্যে৷ ডালগুলোতে পাতা ছিল না একটিও৷ কিন্তু কাঁটা ছিল প্রচুর পরিমাণে৷ কাঁটার আঘাতে প্রফেসরের জামাকাপড় হল ছিন্নভিন্ন, দেহের চামড়ায় হল একাধিক ছিদ্রের সৃষ্টি এবং ওই ছিদ্রপথে কাঁটার বিষ প্রফেসরের রক্তে ঢুকে তাঁকে শয্যাশায়ী করে দিল৷ কাঁটার মধ্যে কী ধরনের বিষ ছিল ভগবানই জানেন— ঝাড়া দশদিন ধরে প্রফেসর ভুগলেন প্রচণ্ড জ্বরের আক্রমণে৷

জ্বরের কবল থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে একটু সুস্থ হয়েই প্রফেসর আবার মৃত্যুগহ্বরের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন৷ এবার আর কাঁটা নয়, দু-দুটো সিংহের সঙ্গে প্রফেসরের দেখা হল একটা অজানা গুহার মধ্যে৷ প্রফেসর গুলি ছুড়লেন, গুলি লাগল না৷ সিংহরা আক্রমণের চেষ্টা না-করে বিদ্যুদবেগে গুহার বাইরে অদৃশ্য হল— রাইফেলের গর্জিত অগ্নিশিখা তাদের মোটেই পছন্দ হয়নি৷ প্রায় অন্ধকার গুহার ভিতর দু-দুটো সিংহের মারাত্মক সান্নিধ্য থেকে অক্ষত অবস্থায় পরিত্রাণ পেয়ে খুশি হয়ে প্রফেসর বাইরে বেরিয়ে এলেন, কিন্তু তাঁর মাম্বোয়া সঙ্গীদের তিনি দেখতে পেলেন না৷ প্রফেসর বুঝলেন হয় তারা সিংহের কবলে পড়েছে, আর না হয় সিংহদের দেখে গা ঢাকা দিয়েছে৷ শেষোক্ত সন্দেহই সত্যি, সিংহদের দেখে তারা দৌড়ে পালিয়েছিল৷ প্রফেসর যদি বুদ্ধিমানের মতো গুহার সামনে অপেক্ষা করতেন তাহলে তিনি অনেক দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতেন৷ কারণ, মাম্বোয়ারা তাঁবু থেকে আত্তিলিওকে নিয়ে অকুস্থলে ফিরে এসেছিল৷ প্রফেসরকে অবশ্য সেখানে পাওয়া যায়নি৷ মাম্বোয়াদের না দেখতে পেয়ে প্রফেসর নিজেই তাঁবুতে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন এবং দিশাহারা হয়ে গন্তব্যস্থলের বিপরীত দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ বিস্তর খোঁজাখুঁজি করে মাম্বোয়াদের সাহায্যে আত্তিলিও যখন আড়াই দিন পরে প্রফেসরকে আবিষ্কার করলেন, তখন ক্ষুধা তৃষ্ণা এবং জ্বরের আক্রমণে ভদ্রলোকের অবস্থা রীতিমতো শোচনীয়৷

আমাদের কাহিনির নায়ক স্বয়ং আত্তিলিও সাহেবও সঙ্গীদের মতোই গুহার ভিতর বিপন্ন হয়েছিলেন৷

সিংহ নয়, হায়না নয়, একটি ছোটো গোলাকার মাংসপিণ্ডের রোমশ শরীরের উপর হোঁচট খেয়ে আত্তিলিও প্রাণ হারাতে বসেছিলেন৷ একদিন বিকেল বেলা আত্তিলিওর বিশ্বস্ত অনুচর জামানি তাঁকে একটা সুড়ঙ্গের সামনে এনে জানাল ওটা একটা গুহার প্রবেশপথ৷ পথটা ছিল নীচু, খুবই সংকীর্ণ৷ অতি কষ্টে ভিতরে প্রবেশ করলেন আত্তিলিও, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন৷ অনেকক্ষণ ওইভাবে চলার পর তাঁর মনে হল এতক্ষণে বোধ হয় তিনি সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে গুহার ভিতর পৌঁছেছেন৷ হাতের টর্চ জ্বেলে তিনি দেখলেন তাঁর অনুমান সত্য— বিজলিবাতির ক্ষীণ আলোকধারা হারিয়ে গেছে এক অন্ধকার-আচ্ছন্ন গুহার বিপুল বিস্তৃতির মধ্যে৷ ওই বিশাল গুহার অভ্যন্তরে পদার্পণ করলে প্রস্তরবেষ্টিত গলিপথগুলোর ভিতর পথ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে, অতএব ভিতর দিকে এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ হবে কি না ভাবতে লাগলেন আত্তিলিও এবং ভাবতে ভাবতেই হামাগুড়ি-দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন তিনি৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে পায়ের উপর সেই বস্তুটির অস্তিত্ব অনুভব করলেন! সঙ্গেসঙ্গে গুহার শান্ত নীরবতা ভঙ্গ করে জেগে উঠল একটা শব্দ ‘ফাঁসস’! পরক্ষণেই জুতোর চামড়ার উপর ধারালো বস্তুর সংঘাতের শব্দ!

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

জ্ঞান হারালেন আত্তিলিও

টর্চের আলোটা তাড়াতাড়ি ঘুরিয়ে পায়ের উপর ফেলে আত্তিলিও দেখলেন, তাঁর জুতোর সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে হলুদের উপর কালো কালো ছাপ-বসানো একটা রোমশ ফুটবল! সেই অতিজীবন্ত ও অতি ক্রুদ্ধ ফুটবলের মতো গোলাকার বস্তুটির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে মার্জারকণ্ঠের গর্জনধ্বনি, সঙ্গেসঙ্গে জুতোর উপর ধারালো নখের আঁচড় কাঁটার শব্দ৷

লেপার্ডের বাচ্চা!

বিড়াল জাতীয় জীবের স্বভাব অনুযায়ী বাচ্চাটা সমস্ত দেহটাকে গোল করে পাকিয়ে আত্তিলিওর জুতোটাকে চেপে ধরেছে এবং তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে মোটা ‘হান্টিং বুট’-এর চামড়া!

বাচ্চাটার চেষ্টা সফল হত কি না বলা মুশকিল, কিন্তু আত্তিলিও তাকে সেই সুযোগ দিলেন না৷ সজোরে লাথি মেরে বাচ্চাটাকে তিনি দূরে সরিয়ে দিলেন৷ জন্তুটার ছিটকে পড়ার আওয়াজ শোনা গেল৷ অন্ধকার গুহার গর্ভে শ্বাপদ-শিশুর ছোটো শরীরটা আত্তিলিওর দৃষ্টিগোচর হল না, কিন্তু রুষ্ট প্রতিবাদ ভেসে এল তাঁর কানে— ‘ফ্যাঁস ফ্যাঁস’ শব্দে বাচ্চাটা তার বিরক্তি ও ক্রোধ জানিয়ে দিচ্ছে!

আচম্বিতে সেই শব্দে সাড়া দিয়ে গর্জে উঠল আরও অনেকগুলো বাচ্চা লেপার্ড: ‘ফ্যাঁস, ফ্যাঁস, ফ্যাঁসস’...

অন্ধকারের ভিতর শ্বাপদ শিশুদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারলেন না আত্তিলিও, কেবল তাদের ক্রুদ্ধ বিড়ালের মতো গর্জনধ্বনি তাঁর কানে ভেসে আসতে লাগল৷

আত্তিলিও ভয় পেলেন৷

অনেকটা লেপার্ডের মতো দেখতে চিতা নামক যে-জন্তুটি আফ্রিকার জঙ্গলে বাস করে, সেই চিতার বাচ্চা দেখলে তিনি ভয় পেতেন না; কিন্তু আত্তিলিওর অভিজ্ঞ চক্ষু ভুল করেনি, জন্তুটা চিতার বাচ্চা নয়, লেপার্ড-শিশুই বটে৷ চিতা ভীরু জানোয়ার, লেপার্ড হিংস্র ও ভয়ংকর৷ যেকোনো জায়গায়, যেকোনো লেপার্ড মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক, বিশেষ করে বাচ্চার বিপদের আশঙ্কায় অন্ধকার গুহার ভিতর ক্ষিপ্ত লেপার্ড-জননীর আক্রমণ যে কতখানি মারাত্মক হতে পারে, সে-কথা অনুমান করেই আত্তিলিওর মতো দুঃসাহসী মানুষও ভয় পেয়েছিলেন৷

তিনি বুঝেছিলেন, দিনের বেলা অন্ধকার গুহার আশ্রয় ছেড়ে বাচ্চাদের মা বড়ো লেপার্ডটা বাইরে বেড়াতে যাবে না— সে নিশ্চয়ই গুহার ভিতরে কোথাও অবস্থান করছে এবং বাচ্চাদের নিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্যে যে দ্বিপদ জন্তুটি তার আস্তানায় অনধিকার প্রবেশ করেছে, তাকে আক্রমণ করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে৷ অন্ধকারের মধ্যে আত্তিলিও বাচ্চাদের মা বড়ো লেপার্ডটাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না, কিন্তু অন্ধকারে অভ্যস্ত একজোড়া শ্বাপদচক্ষু যে তাঁর গতিবিধি লক্ষ করছে, সে-কথা অনুমান করেই আত্তিলিও অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলেন৷

বাচ্চাগুলো ফ্যাঁস ফ্যাঁস শব্দে এতক্ষণ ক্রোধ প্রকাশ করছিল, হঠাৎ তারা একসঙ্গে চুপ করে গেল৷ আত্তিলিওর অনুমান এইবার নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হল: বাচ্চাদের আকস্মিক নীরবতা বড়ো লেপার্ডটার সান্নিধ্য প্রমাণ করে দিয়েছে৷

পালাতে পারলে আত্তিলিও পালিয়েই যেতেন৷ কিন্তু অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে হামাগুড়ি দিয়ে চলার সময়ে আক্রান্ত হলে অসহায়ভাবে মৃত্যু বরণ করতে হবে, আত্মরক্ষার চেষ্টা করাও সম্ভব হবে না৷ অতএব পলায়নের চিন্তা ছেড়ে গুহার ভিতর দাঁড়িয়ে যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য তিনি প্রস্তুত হলেন৷ গুহার দেয়ালে পিঠ রেখে আত্তিলিও টর্চের আলো ঘুরিয়ে বড়ো লেপার্ডটাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে লাগলেন৷

হঠাৎ তাঁর মাংসপেশিগুলো আড়ষ্ট হয়ে গেল— দুটো বিরাট পাথরের মাঝখানে টর্চের আলোকধারার মধ্যে ভেসে উঠেছে একজোড়া বৃহৎ নিষ্পলক চক্ষু!

চোখ দুটো গোল, সবুজ এবং জ্বলন্ত!

মা-লেপার্ড!

বিপদের মুখোমুখি হতেই বিপদের ভয় কেটে গেল৷ আত্তিলিওর কম্পিত হাত দুটো হঠাৎ সৈনিকের অভ্যস্ত দৃঢ়তায় রাইফেল ও টর্চ আঁকড়ে ধরল, টর্চের আলোতে জ্বলন্ত চোখ দুটির উপর নিশানা স্থির করতে লাগলেন আত্তিলিও৷

লেপার্ড লাফ দিল৷ সঙ্গেসঙ্গে ছুটল রাইফেলের গুলি৷ গুলি লাগল, কিন্তু শ্বাপদের গতি রুদ্ধ হল না৷ সশব্দে লেপার্ড এসে আছড়ে পড়ল গুহার প্রস্তর-প্রাচীরের উপর৷ শ্বাপদের নিশানা ভুল হয়নি, কিন্তু আত্তিলিও স্থান পরিবর্তন করেছেন বিদ্যুদবেগে৷ লেপার্ড দ্বিতীয়বার আক্রমণ করার আগেই আবার গর্জে উঠল রাইফেল, গুলি জন্তুটার মস্তিষ্ক ভেদ করে তাকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল৷

তীব্র উত্তেজনা কেটে যেতেই আত্তিলিও ক্লান্তি বোধ করলেন৷ কিন্তু ওই বিপজ্জনক গুহার মধ্যে বিশ্রাম করার ইচ্ছা তাঁর ছিল না৷ সুড়ঙ্গের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি দ্রুতবেগে হামাগুড়ি দিতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই গুহার বাইরে এসে প্রখর সূর্যালোকের নীচে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন৷

জীবনে সর্বপ্রথম জামানি তার প্রভুর আদেশ অমান্য করল৷ সে কিছুতেই মৃত লেপার্ডের দেহ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিতে রাজি হল না৷

‘না, মাসাংগা, না’,— জামানি বলল, ‘এই জন্তুটার চামড়া আমি ছাড়াতে পারব না৷ এটা লেপার্ড নয়, এটা হচ্ছে লেপার্ডের দেহধারী প্রেতাত্মা! ওটার চামড়া ছাড়িয়ে নিলেই প্রেত ওই দেহ থেকে বেরিয়ে আমাকে আক্রমণ করবে৷ মাসাংগা! এই দেশটা ভালো নয়, আমাদের এখনই এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত৷’

আত্তিলিও অবশ্য জামানির উপদেশে কর্ণপাত করেননি৷ মাঙ্গোয়াদের সন্দেহ চলে গেছে, অভিযাত্রীরা এখন তাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছেন৷— এই হচ্ছে অনুসন্ধান-কার্য চালানোর উপযুক্ত সময়, এখন কি ফিরে যাওয়া যায়? মাম্বোয়াদের এখন ধারণা হয়েছে, অভিযাত্রীরা কেবল গুহার ভিতর জন্তুজানোয়ার দেখার জন্যই এখানে এসেছেন৷ এটা অবশ্য তাদের কাছে পাগলামি, তবে এই ধরনের পাগলামিকে প্রশ্রয় দিতে তাদের আপত্তি নেই৷ সাদা মানুষরা যদি গুহার মধ্যে ঢুকে জন্তুজানোয়ারের আঁচড়-কামড় খেতে চায় এবং সেই কাজে সাহায্য করলে যদি টাকাপয়সা, সিগারেট আর নানারকম উপহার পাওয়া যায়, তাহলে তাদের সাহায্য করতে আপত্তি কী? তবে হ্যাঁ, কায়নার কথা না-বললেই হয়৷

অবশ্য অভিযাত্রীরা কায়নার নাম আর ভুলেও উচ্চারণ করতেন না৷

একদিন হঠাৎ দুটি মাম্বোয়ার কথা আত্তিলিওর কানে এল৷ আত্তিলিও ছিলেন তাঁবুর ভিতরে, মাম্বোয়ারা তাঁকে দেখতে পায়নি৷ তিনি শুনলেন একজন মাম্বোয়া বলছে, ‘খুব সম্ভব যে পাঁচটা ছেলে আগে সাদা মানুষের কাজ করত, তারা ভুল করেছে৷ বোধ হয় ওরা সাদা মানুষের কথা বুঝতে পারেনি৷’

তার সঙ্গী বলল, ‘হতে পারে৷ কিংবা হয়তো ওটা ছিল সাদা মানুষের ক্ষণিকের খেয়ালমাত্র৷ তবে সেই খেয়াল কেটে গেছে, আমরা এখন যেদিকে যেতে বলি ওরা সেইদিকেই যায়৷ ওরা যেদিকে গেলে আমাদের মাতববররা বিপদ হবে বলে মনে করে, সেদিকে ওরা কখনোই পা বাড়ায় না৷’

আত্তিলিওর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে৷ মাম্বোয়াদের বিশ্বাস অভিযাত্রীরা মৃত্যুগহ্বর নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না৷ মানচিত্রটা নিয়ে আত্তিলিও দাগ দিতে লাগলেন৷ তাঁর পরিকল্পনা ছিল খুবই সহজ৷

মাম্বোয়ারা নিশ্চয়ই কায়নার ধারেকাছে অভিযাত্রীদের উপস্থিতি চাইবে না, অতএব মৃত্যুগহ্বর যেখানে অবস্থান করছে তার থেকে দূরে দূরেই মাম্বোয়ারা তাঁদের পরিচিত করার চেষ্টা করবে৷ যে জায়গাগুলো একবার দেখা হয়ে যায়, ম্যাপের গায়ে সেই জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে রাখতেন অভিযাত্রীরা৷ ম্যাপটাতে দাগ দিতে দিতে এক সময় তাঁরা নিশ্চয় দেখতে পাবেন, কোন এলাকাটা বাদ দেওয়া হচ্ছে৷ একবার যদি তাঁদের চোখে ধরা পড়ে, একটা নির্দিষ্ট এলাকা মাম্বোয়ারা এড়িয়ে যাচ্ছে, তাহলে সেই অঞ্চলটায় অভিযান চালালেই মৃত্যুগহ্বরের সন্ধান পাওয়া যাবে৷

কিন্তু হ্যাঁ, এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে৷

যেসব এলাকায় যাওয়া হয়েছে, ম্যাপের গায়ে সেই এলাকাগুলিকে ফুটকির দাগ বসিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে; এখন পেনসিলের লাইন টেনে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন জায়গা ম্যাপের উপর চক্রাকারে ছড়িয়ে আছে, অর্থাৎ সেইসব স্থানে এখন পর্যন্ত অভিযাত্রীদের পায়ের ধুলো পড়েনি৷ কিন্তু সেই ছোটো ছোটো টুকরো টুকরো অনাবিষ্কৃত এলাকার পরিধি বড়ো কম নয়৷ এইভাবে আর কতদিন অভিযান চালানো সম্ভব? ইতিমধ্যেই অভিযাত্রীরা বেশ কয়েকবার বিপদে পড়েছেন৷ অজানা গুহার অন্ধকারে অনিশ্চিত প্রত্যাশায় দিনের পর দিন জীবন বিপন্ন করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? তিন মাস তো হয়ে গেল, আর কত দিন?

অতএব পরামর্শ সভা বসল৷

প্রফেসর এবং বিল অভিযান চালানোর বিপক্ষে রায় দিলেন৷ প্রফেসরের বক্তব্য হচ্ছে: তিন মাস অনুসন্ধান চালিয়ে এক-শো উনত্রিশটা গুহার ভিতর তাঁরা পদার্পণ করেছেন, কিন্তু মৃত্যুগহ্বর এখন পর্যন্ত তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয়নি৷ কায়নার অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রফেসর মোটেই নিঃসন্দেহ নন৷ তিনি আরও জানালেন এই অঞ্চলের বিভিন্ন গুহার মধ্যে প্রাচীন গুহামানবের বসবাসের নিদর্শন এবং বিবিধ প্রকার খনিজবস্তুর অস্তিত্ব তাঁদের দৃষ্টিপথে ধরা দিয়েছে৷ অথচ এইসব দিকে চোখ না-দিয়ে অর্থ আর সময়ের অপব্যয় করা হচ্ছে এক অলীক বস্তুর পিছনে! অতএব এই অভিযান এখনই বন্ধ করা উচিত৷

বিলও প্রফেসরকে সমর্থন জানাল, দুজনেরই মত হচ্ছে: ‘চুলোয় যাক কায়না৷ মরীচিকার পিছনে ছুটে এসে অনেক বস্তুর সান্নিধ্য আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি, যেগুলো প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাণীবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিরাট আবিষ্কার বলে গণ্য হতে পারে৷’

অকাট্য যুক্তি৷ তবু আত্তিলিও বন্ধুদের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না৷ আত্তিলিও শেষ চেষ্টা করলেন, ‘কিন্তু আমি স্বকর্ণে শুনেছি একজন মাম্বোয়ার কথা৷ লোকটা তার সঙ্গীকে বলছিল আমরা নাকি কখনোই সেদিকে যাইনি যেদিকে আমাদের গতিবিধি মাম্বোয়া-প্রধানরা পছন্দ করে না৷’

বিল বলল, ‘খুব সম্ভব আমাদের অজ্ঞাতে কায়নার সামনে দিয়ে আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আসল জায়গাটা ছাড়িয়ে মাম্বোয়াদের সঙ্গে আমরা অন্যদিকের গুহায় গুহায় ঘুরেছি৷ এই দশ বছর ধরে ঘোরাঘুরি করলেও আমরা মৃত্যুগহ্বরের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারব না৷’

‘ঠিক আছে’— আত্তিলিও বললেন, ‘যেসব গুহাতে খনিজদ্রব্য বা ঐতিহাসিক বস্তুর নিদর্শন আছে বলে মনে হয়, তোমরা সেইসব গুহাতে সন্ধান চালিয়ে আবিষ্কারের সম্মান লাভ কর— তোমাদের আমি কায়নার পিছনে সময় নষ্ট করতে বলব না৷ সঙ্গে যত খুশি লোক নাও, তাতেও আপত্তি নেই৷ কিন্তু এতদিন ধরে এত কষ্ট সহ্য করার পর এত তাড়াতাড়ি আমি হাল ছাড়তে রাজি নই৷ অন্তত আরও একমাস আমি দেখব৷ নির্দিষ্ট একমাসের মধ্যে যদি কোনো ফল না-পাই, তাহলে কথা দিচ্ছি আমি ‘‘কায়না অভিযানে’’ ইস্তফা দেব৷’

আত্তিলিওর প্রস্তাবে কারো আপত্তি হল না৷ ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর এই প্রস্তাব গৃহীত হয়৷

পরের দিন ১৫ সেপ্টেম্বর স্বয়ং মাম্বোয়া-সর্দার আত্তিলিও সাহেবের সঙ্গী হল৷ ইতিপূর্বে সর্দার তাঁদের উপদেশ, নির্দেশ দিয়েছে, কোথায় কোন পথে গেলে নূতন নূতন গুহার সন্ধান পাওয়া যাবে জানিয়েছে, কিন্তু সে ব্যক্তিগতভাবে কখনো অভিযাত্রীদের সঙ্গী হয়নি৷ খুব সম্ভব সে বুঝেছিল, অভিযাত্রীরা শীঘ্রই তাদের দেশ ছেড়ে বিদায় নেবেন৷

সর্দারের সঙ্গে কয়েকজন মাম্বোয়া অনুচর ছিল৷ তারা সকলেই বিভিন্ন গুহার সন্ধান দিয়ে আত্তিলিওকে সাহায্য করতে চাইল৷ উৎসাহের আধিক্যে আত্তিলিও সেদিন তেরোটা নূতন গুহা পরিদর্শন করে ফেললেন৷ একদিনে এতগুলো গুহা অভিযাত্রীদের মধ্যে কেউ ইতিপূর্বে পরিদর্শন করতে পারেননি৷ চোদ্দো নম্বর গুহাটার মুখে যখন আত্তিলিও পদার্পণ করলেন তখন সন্ধ্যা প্রায় আগত, অস্পষ্ট অন্ধকারের প্রলেপ পড়েছে পৃথিবীর বুকে৷

আত্তিলিও চোদ্দো নম্বর গুহার মধ্যে প্রবেশ করলেন৷ সঙ্গীরা গুহার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷

গুহার মধ্যে তখন অস্পষ্ট অন্ধকার৷

আত্তিলিও চমকে দেখলেন, আবছা আলো-আঁধারের ভিতর থেকে তাঁর দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক বিরাট সর্পদানব— পাইথন!

এত মোটা আর এত লম্বা সাপ কখনো দেখেননি আত্তিলিও৷ চকিতে রাইফেল তুলে তিনি গুলি চালালেন৷ পাইথনের মাথা উড়ে গেল ছিন্নভিন্ন হয়ে, কিন্তু তার মুণ্ডহীন বিরাট শরীরটা মৃত্যুযাতনায় আত্তিলিওর চারপাশে আছড়ে পড়তে লাগল একটা অতিকায় চাবুকের মতো!

আত্তিলিও অনায়াসে ছুটে পালাতে পারতেন, কিন্তু তাঁর বুদ্ধিভ্রংশ হল৷ সেইখানে দাঁড়িয়েই তিনি বার বার গুলি চালিয়ে সরীসৃপের অন্তিম আস্ফালনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন৷ অজগর-জাতীয় বৃহৎ সরীসৃপের দেহ মৃত্যুর পরেও বেশ কিছুক্ষণ অন্ধ আক্ষেপে কুণ্ডলীর পর কুণ্ডলী পাকিয়ে ছটফট করতে থাকে৷ এই সাপটাও ছিল বিরাট— তার চামড়া ছাড়িয়ে পরে যখন মাপ নেওয়া হয়েছিল, তখন দেখা গিয়েছিল পাইথনটার দৈর্ঘ্য হচ্ছে আটত্রিশ ফুট এবং দেহের সবচেয়ে স্থূল জায়গাটার মাপ হচ্ছে তিন ফুট নয় ইঞ্চি!

এত মোটা, এত লম্বা একটা সর্পিল দেহ যদি চাবুকের মতো সজোরে কোনো মানুষের গায়ে আছড়ে পড়ে, তাহলে মানুষটার যে অবস্থা হয়, আত্তিলিও সাহেবেরও সেই অবস্থা হল, জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে ক্ষণিকের জন্য তিনি অনুভব করলেন একটা মস্ত পাহাড় যেন তাঁর দেহের উপর ভেঙে পড়ছে! পরক্ষণেই তার চৈতন্যকে লুপ্ত করে নামল মূর্ছার অন্ধকার...

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

পথের নিশানা

জ্ঞান ফিরে এলে আত্তিলিও দেখলেন, তিনি তাঁবুর মধ্যে তাঁর নিজস্ব বিছানাতে শুয়ে আছেন এবং তাঁর কপালে কাপড় ভিজিয়ে ঠান্ডা জলের প্রলেপ দিচ্ছে জামানি৷

ক্লান্তিজড়িত স্বরে প্রফেসর আর বিলকে ডেকে দিতে বললেন আত্তিলিও৷ তাঁকে চোখ মেলে চাইতে দেখে মহা খুশি জামানি৷ একগাল হেসে সে জানাল, তাঁরা দুজনেই বাইরে বেরিয়ে গেছেন, কিন্তু মাসাংগার কথা বলা উচিত নয়৷

আত্তিলিওর সমস্ত সত্তা আবার ডুবে গেল গভীর নিদ্রার অন্ধকারে...

দ্বিতীয়বার চোখ মেলে আত্তিলিও দেখলেন, তাঁর মাথার কাছে একটা আলো জ্বলছে, বন্ধুরাও কাছেই আছে৷ প্রফেসর আত্তিলিওকে ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন, ‘আত্তিলিও যদি কথা বলার চেষ্টা না-করে তবে সমস্ত ঘটনা খুলে বলতে তাঁর আপত্তি নেই৷ অজ্ঞান হওয়ার কারণটা প্রফেসরের মুখ থেকেই শুনলেন আত্তিলিও— সর্পদানবের দেহের প্রবল ধাক্কায় ছিটকে পড়ে একটা পাথরে মাথা ঠুকে যাওয়ার ফলেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন৷

জামানি, মাম্বোয়া-সর্দার এবং দলবল গুহার ভিতর রাইফেলের ঘন ঘন গর্জন শুনেই বুঝেছিল, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ কিন্তু প্রথমে কেউ সাহস করে ভিতরে প্রবেশ করেনি৷ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও তিনি যখন বেরিয়ে এলেন না, তখন জামানির অনুরোধে মাম্বোয়া-সর্দার গুহার মধ্যে প্রবেশ করতে রাজি হয়৷ গুহার ভিতর অচৈতন্য অবস্থায় আত্তিলিওকে পড়ে থাকতে দেখে তারা তাঁকে তুলে আনে এবং সবাই মিলে ধরাধরি করে তাঁর দেহটাকে বহন করে নিয়ে আসে তাঁবুতে৷ আত্তিলিও এই পর্যন্ত ধৈর্য ধরে শুনেছিলেন, কিন্তু যখন প্রফেসর জানালেন, আটদিন ধরে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, তখন চমকে উঠলেন আত্তিলিও— ‘আটদিন! বলে কী!’

‘চুপ করো!’— প্রফেসর চমকে উঠলেন, ‘বিশ্রাম নাও৷ কথা বলবে না৷ সব ঠিক আছে৷ আমি আর বিল তোমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি৷’

আত্তিলিও হাতের ওপর ছুঁচ ফোটার যন্ত্রটা অনুভব করলেন— ইঞ্জেকশন৷ আলোটা নিভে গেল৷ দু-জোড়া পা নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল তাঁবুর বাইরে৷ দু-চোখের পাতার নিদ্রার স্পর্শ সমগ্র অনুভূতি ও চৈতন্যকে অবলুপ্ত করে নামছে নিবিড় অন্ধকার... আত্তিলিও ঘুমিয়ে পড়লেন...

একমাস পরে নভেম্বরের ২১ তারিখে প্রফেসর রায় দিলেন আত্তিলিও এইবার স্বচ্ছন্দে কাজকর্ম করতে পারেন৷ বিগত একমাস গত্তি সাহেবকে কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি, দুই বন্ধু তাঁকে বিশ্রাম নিতে বাধ্য করেছিলেন৷ প্রফেসরের ঘোষণা শুনে মহা উৎসাহে আত্তিলিও অনেকদিন পরে ম্যাপ খুলে বসলেন৷ ম্যাপটার গায়ে এক জায়গায় খুব বড়ো করে একটা ফুটকির চিহ্ন দেওয়া হয়েছে৷ চিহ্নিত স্থান হচ্ছে সেই গুহা, যেখানে একমাস আগে আত্তিলিও অতিকায় পাইথনের দেখা পেয়েছিলেন৷ চিহ্নটার পাশে কে যেন পেনসিল দিয়ে লিখে রেখেছে: ‘শুক্রবার ১৩ অক্টোবর৷ শুভদিন৷ হুররে!’

‘শুভদিন, না ঘোড়ার ডিম!’— আত্তিলিও বলে উঠলেন, ‘আবার হুররে লিখে আনন্দ জানানো হয়েছে! কেন? এত আনন্দ কীসের?’

‘দেখো, দেখো, ভালো করে দেখো৷’ বিল গর্জন করে উঠল৷

আত্তিলিও ভালো করে দেখলেন, সঙ্গেসঙ্গে বিস্ময়ের চমক— ‘কী!’

এইবার আত্তিলিও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন৷ সুদীর্ঘ বিশ্রাম হূত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় যে সময়টা তিনি অতিবাহিত করেছেন সেই সময়ে বিল আর প্রফেসর পরিদর্শন করেছেন গুহার পর গুহা৷ যেসব এলাকা দেখা হয়ে গেছে, সেখানে ফুটকির চিহ্ন৷ চিহ্নগুলোকে লক্ষ করলে দেখা যায়, কেবল পূর্ব ও দক্ষিণেই ফুটকির ছড়াছড়ি৷ ফুটকিগুলো সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটা জায়গাকে বৃত্তের আকারে ঘিরে ধরেছে৷ একটু অসমান আর খাপছাড়া হলেও ফুটকিগুলো মোটামুটি একটা সরলরেখার রূপ ধরেই এগিয়েছে এবং বৃত্তের আকারে যে-স্থানটিকে ঘিরে ফেলেছে, সেটা সুগোল না হলেও বৃত্ত বটে৷ ওই বৃত্তাকার স্থানটির চারপাশেই ফুটকি-চিহ্ন দেখে বোঝা যায় ওই জায়গাটা এখন পর্যন্ত দেখা হয়নি৷ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ফুটকিগুলো সোজা এগিয়ে এসে যেখান থেকে ঘুরে অনাবিষ্কৃত অঞ্চলটাকে নির্দিষ্ট করছে, সেই চিহ্নর বেষ্টনী শুরু হয়েছে ঠিক পাইথনের গুহার পর থেকে৷ অর্থাৎ পাইথনের গুহা অবধি সোজাসুজি এগিয়েছে অভিযাত্রীরা, কিন্তু উক্ত গুহার পরবর্তী স্থানে পদার্পণ করেই তাঁরা বামে ও দক্ষিণে ঘুরে গেছেন৷ কিন্তু কেন? হ্যাঁ, ঘুরে যাওয়ার কারণটা বেশ স্পষ্ট৷ চিহ্নিত স্থানের লিখিত তারিখ দেখলেই বোঝা যায় পাইথনের গুহার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা বিল আর প্রফেসরকে বাঁয়ে আর ডাইনে নিয়ে গেছে, সরলরেখা ধরে তাঁদের এগিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি৷ ক্রমাগত বাঁয়ে আর ডাইনে ঘুরেছেন তাঁরা, ফলে আবিষ্কৃত স্থানগুলোতে ফুটকির চিহ্ন পড়ে পরিত্যক্ত জায়গাটাকে বৃত্তের আকারে পরিস্ফুট করেছে ম্যাপের ওপর৷

স্পষ্টই বোঝা যায়, ওই জায়গাটার উপর প্রফেসর আর বিলের উপস্থিতি পছন্দ করে না মাম্বোয়ারা, তাই তারা প্রফেসর ও বিলকে অন্যদিকে নিয়ে গেছে৷ আরও শোনা গেল আত্তিলিও যখন বিশ্রাম নিতে বাধ্য হয়ে বিছানায় শুয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন, সেই সময় বিল আর প্রফেসরকে ‘সাহায্য’ করার জন্য রোজই এসেছে মাম্বোয়া-সর্দার স্বয়ং— দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ওই জায়গাটা থেকে অভিযাত্রীদের দূরে রাখার জন্য তার প্রচেষ্টা দুই বন্ধুই লক্ষ করেছেন৷ প্রফেসর ও বিলের মনোভাব বুঝতে পারেনি মাম্বোয়া-সর্দার; কারণ, সব বুঝেও কিছু না-বোঝার অভিনয় করেছেন দুই বন্ধু আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে— তার ফলেই মানচিত্রের গায়ে ফুটকি-চিহ্ন বেষ্টিত গোল জায়গাটা ধরা পড়েছে৷

ম্যাপের উপর ওই গোল চিহ্নবিহীন জায়গাটা দেখতে দেখতে আত্তিলিওর গলা থেকে একটা অস্ফুট অর্থহীন শব্দ বেরিয়ে এল৷ প্রফেসর হাসলেন, ‘হ্যাঁ, ওইখানেই আছে— কোনো সন্দেহ নেই এ-বিষয়ে৷’

দারুণ উৎসাহে চাঙ্গা হয়ে উঠলেন আত্তিলিও৷ কায়না সম্বন্ধে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, এখন আবার আশায় উদ্দীপনায় তাঁর রক্তে উৎসাহের জোয়ার লাগল৷ প্রফেসরের ওষুধের চাইতে ম্যাপের চিহ্নগুলো তাঁর স্বাস্থ্যের পক্ষে বেশি উপযোগী হয়েছে সন্দেহ নেই৷

পরের দিন সকালে সবাই যখন বেরিয়ে গেল, আত্তিলিও তখন জামানিকে ডেকে তার সঙ্গে গল্প করতে শুরু করলেন৷ আত্তিলিও বুঝেছিলেন জামানির সাহায্য ছাড়া তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না৷ খুব সাবধানে ধীরে ধীরে তিনি জামানির সামনে প্রলোভনের জাল ফেলতে শুরু করলেন, সেইসঙ্গে জুলু জাতির স্বাভাবিক মর্যাদাবোধ ও অহংকারে সুকৌশলে আঘাত দিয়ে কার্যসিদ্ধির চেষ্টা চলল... আত্তিলিও কি বোঝেন না, জামানি তার দেশ জুলুল্যান্ডে ফিরে যেতে চায়? এই হতভাগা মাম্বোয়াদের দেশ আর ভালো লাগে না সে-কথাও তিনি জানেন৷ তিনি নিজেই কি এই দেশ পছন্দ করছেন? মোটেই না, মোটেই না৷ তবে কাজ শেষ না-করে তো এই পাথুরে-নরক ছাড়ার উপায় নেই৷ জামানি যদি তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে চায়, তবে তারও উচিত হবে তাঁকে সাহায্য করা; কারণ কার্যসিদ্ধি হলেই তো তিনি চটপট এখান থেকে সরে পড়তে পারবেন৷ আর আত্তিলিওর যে ‘অপেরা হ্যাট’ টুপিটার মধ্যে দারুণ সব জাদুবিদ্যা লুকানো আছে বলে জামানি বিশ্বাস করে, সেই টুপিটা তো জামানিকেই উপহার দিতে চাইছেন তিনি৷ তবে এমন একটা মূল্যবান উপহারের বিনিময়ে তারও কি মাসাংগাকে সাহায্য করা উচিত নয়?... কায়না-আবিষ্কারের পর আত্তিলিও নিশ্চয়ই তাকে জুলুল্যান্ডে নিয়ে যাবেন, সমস্ত জুলুল্যান্ডের মানুষ অবাক হয়ে দেখবে— হ্যাঁ, একটা পুরুষের মতো পুরুষ বটে জামানি৷

জামানি প্রথমে আত্তিলিও কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারেনি, পরে যখন বুঝল, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল৷ তবে জুলু জাতির আদর্শ ‘পুরুষের মতো পুরুষ’ হলে তো মাম্বোয়াদের কায়নাকে ভয় করা চলে না, তাই বুক ঠুকে শপথ করে জামানি বলল, কায়না অভিযানে সে মাসাংগাকে সাহায্য করবে৷ মাম্বোয়াদের কথাবার্তা সে শুনতে চেষ্টা করবে এবং কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য শ্রুতিগোচর হলে সেই সংবাদ সে আত্তিলিওকে জানাবে৷

আত্তিলিও অবশ্য ভালোভাবেই জানতেন, কোনো গোপন রহস্যের সন্ধান পেলেও জামানি চট করে তাঁকে সংবাদ দেবে না৷ কিন্তু তাঁর জুলু অনুচরটি তাঁদের সবাইকে ভালোবাসত, কাজেই নানারকম ছলছুতোয় সে যে তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করবে, সেই ভরসা তিনি রাখতেন৷ বিশেষ করে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, জুলুল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলে সে হয়তো কিছুটা দুঃসাহস প্রকাশ করতে পারে৷ আর একটা ছোটোখাটো বিষয়কেও বোধ হয় জামানি উপেক্ষা করবে না— ‘অপেরা হ্যাট’ টুপিটার প্রলোভন খুব তুচ্ছ নয় তার কাছে৷

সপ্তম পরিচ্ছেদ

ভয়াবহ পর্বত

১৯২৮ সালের ২৯ নভেম্বর সকাল বেলা আত্তিলিও ঘোষণা করলেন নিহত পাইথনের গুহাটাকে তিনি আর একবার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন৷

পূর্বোক্ত গুহার সামনে এসে বিল ও প্রফেসর দুটো ভিন্ন পথ অনুসরণ করলেন৷ অজানা পথে হয়তো তাঁরা বিপদে পড়তে পারেন, তাই অত্যন্ত উদবিগ্ন হয়ে তার দলের সবচেয়ে বলিষ্ঠ লোকগুলোকে নিয়ে মাম্বোয়া-সর্দার তাঁদের সাহায্য করতে অগ্রসর হল৷

আত্তিলিও বর্তমানে পাইথনের গুহার খুব কাছাকাছি থাকতেন, অতএব তাঁকে সাহায্য করার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনি মাম্বোয়া-সর্দার৷ তবু সাবধানের মার নেই, তাই সর্দারের আদেশে ছয়জন মাম্বোয়া আত্তিলিওর সঙ্গে থেকে গেল৷ ওই লোকগুলো ছিল দুর্বল ও ব্যক্তিত্বহীন৷ নিতান্ত নিয়মরক্ষার জন্যই তারা আত্তিলিওর সঙ্গে ছিল৷ এক নজরে লোকগুলোর চেহারা জরিপ করে আত্তিলিও বুঝে নিলেন নিষিদ্ধ এলাকায় জোর করে প্রবেশ করতে চাইলে এরা তাঁকে বাধা দিতে পারবে না৷

হঠাৎ জামানি বলে উঠল, ‘ওই যে মাসাংগা! তুমি একটা বুনো শুয়োর চাইছিলে না? ওই দেখো, একটা শুয়োরের পায়ের ছাপ৷’

কোনোদিনই শুয়োর মারতে চাননি আত্তিলিও সাহেব, বিশেষ করে সেই মুহূর্তে আফ্রিকার বৃহত্তম বন্য শূকরও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত না৷ কিন্তু তিনি জামানির অব্যক্ত ইশারা বুঝতে পারলেন৷ জমির উপর সত্যি সত্যিই ‘ওয়ার্ট হগ’ নামক বন্য শূকরের টাটকা পায়ের ছাপ ছিল৷ পদচিহ্নগুলো এগিয়ে গেছে নিষিদ্ধ এলাকাটার দিকে৷ মাম্বোয়ারা পায়ের ছাপগুলো দেখেছিল, তারা সন্ত্রস্তভাবে পরস্পরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল৷ আত্তিলিও সেদিকে দেখেও দেখলেন না৷ এমন উৎসাহের সঙ্গে তিনি মাম্বোয়াদের ঠেলতে ঠেলতে শূকরের পায়ের ছাপগুলোর দিকে এগিয়ে চললেন যে, তারা কোনো ছুতো ধরে আপত্তি করারও সময় পেল না৷ কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরে তাঁদের চোখে পড়ল একটা পাহাড়৷ ভীষণ-দর্শন, প্রস্তরবহুল ওই পাহাড়টা দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্র মাম্বোয়ারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল৷

‘কী হল? শিকার কোথায়?’—আত্তিলিও প্রশ্ন করলেন৷

‘ওই যে৷’ অনেক দূরে একটা কম্পিত ঘাসঝোপের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করল একজন মাম্বোয়া৷

‘এগিয়ে চলো৷’ জামানি হুকুম দিল৷

কিন্তু কেউ আর এক পা নড়ল না৷

‘চলে এসো আমার সঙ্গে’, ধমকে উঠলেন আত্তিলিও, ‘তোমরা কি পুরুষমানুষ, না আর কিছু?’

পুরুষমানুষরা এবার পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল৷ নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে সামনে এগিয়ে গেল৷ আবার থামল৷ যে-লোকটি আত্তিলিওর দুই নম্বর বাড়তি বন্দুকটা বহন করছিল, সে অস্পষ্ট জড়িতস্বরে কী যেন বলল৷ বলার সঙ্গেসঙ্গে সে হাতের বন্দুক মাটিতে নামিয়ে রাখল৷ তৎক্ষণাৎ তার পাশে যে লোকটি দড়ির বান্ডিল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে দড়িটাকে মাটিতে ফেলে দিল৷ তৃতীয় ব্যক্তি খাদ্য ও বিভিন্ন সরঞ্জামপূর্ণ থলিটাকে ফেলে ভারমুক্ত হল৷ পরক্ষণেই তারা একসঙ্গে ছুটতে শুরু করল৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আত্তিলিওর দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে অদৃশ্য হল ছয়টি ধাবমান মনুষ্য-মূর্তি৷

আত্তিলিও এইবার পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করলেন৷ পাশে ভয়ার্ত জামানি৷ অদূরে পাহাড়—পাথরে পাথরে রুক্ষ, শ্রীহীন, অনুর্বর৷ চারিদিক চুপচাপ শান্ত৷ কোথাও জীবনের সাড়া নেই, একটি পাখি পর্যন্ত ডাকছে না৷ এই নীরবতা অস্বস্তিকর৷ মানুষের মন এমন জায়গায় আনন্দ পায় না! আফ্রিকার পরিবেশ এখানে প্রস্তরসজ্জায় রুক্ষ, স্তব্ধতায় ভয়ংকর৷

জামানি মাম্বোয়াদের ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো মাটি থেকে তুলে নিল৷ দারুণ আতঙ্কে তার দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি হচ্ছিল৷

‘চলে এসো পাহাড়ের উপর,’— ধমকে উঠলেন আত্তিলিও, ‘তুমি না জুলু-যোদ্ধা?’

মনে হল জামানি মূর্ছিত হয়ে পড়ে যাবে৷ কিন্তু আত্তিলিও তার গর্বে ঘা দিয়েছেন—একটিও কথা না-বলে সে সোজা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল৷

পাহাড়ের তলায় অনেকগুলো বড়ো বড়ো পাথর ছিল৷ পাথরগুলোর ভিতর থেকে একটা সংকীর্ণ গিরিপথের সন্ধান পাওয়া গেল৷ ওই পথ বেয়ে উপরে উঠে আত্তিলিও দেখলেন, তাঁরা দুজন যেখানে এসে পৌঁছেছেন, সেটা হচ্ছে পাহাড়ের চূড়ার উপর অবস্থিত একটা প্রশান্ত প্রশস্ত সমতল জায়গা৷

সমতল জায়গাটার একপাশে দুটো মস্ত পাথর আত্তিলিওর দৃষ্টিকে আকর্ষণ করল৷ তিনি সেদিকে এগিয়ে গেলেন৷

পাথর দুটোর মাঝখানে দেখা গেল একটা গর্ত৷ গর্তটা প্রায় গোলাকার, চওড়ায় সেটা বারো ফুটেরও বেশি৷

কায়না?...

কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু আত্তিলিওর দৃঢ় ধারণা হল, গর্তটাই কায়না৷ নিজের চোখকে তিনি প্রায় বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—মাসের পর মাস যার জন্য কষ্ট সহ্য করেছেন অভিযাত্রীরা, নিদারুণ বিপদের মুখে প্রাণ বিপন্ন করেছেন বারংবার— সেই মৃত্যুগহ্বর আজ আত্তিলিওর পায়ের তলায়৷

একবার উঁকি দিয়ে গর্তের ভিতর দৃষ্টিকে চালনা করলেন আত্তিলিও৷ কিন্তু দেখা গেল না৷ দুর্ভেদ্য অন্ধকারের ভিতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ তাঁর নাকে ধাক্কা মারল৷ আত্তিলিও সেই গন্ধটা সহ্য করতে পারলেন না, পিছিয়ে এলেন৷

গহ্বরের নিবিড় অন্ধকারের ভিতর কিছুই চোখে পড়ছে না৷ কিন্তু গর্তটা কি খুব গভীর? পাথরটা এক দেয়াল থেকে আর এক দেয়ালে বাড়ি খেতে খেতে অনেকগুলো শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি করল, কিন্তু একেবারে তলা থেকে পাথরটার পতনজনিত শব্দ শুনতে পেলেন না তিনি৷ এবার একটা বড়ো পাথর তিনি ছুড়ে দিলেন৷ একটা অস্পষ্ট শব্দ গর্তের তলা থেকে ভেসে এল৷ আত্তিলিও বুঝলেন পাথরটা নীচে পৌঁছোল৷

‘জামানি,’ আত্তিলিও বললেন, ‘এইবার তুমি নিশ্চয়ই টুপিটা পাবে৷’

নিতান্ত কর্তব্যবোধেই জামানি ধন্যবাদ দিল৷ তার চোখে-মুখে উৎসাহ বা আনন্দের কোনো চিহ্ন আত্তিলিও দেখতে পেলেন না৷

জামানির দোষ নেই৷ স্বয়ং আত্তিলিও সাহেবই কি খুব উৎসাহ বোধ করছিলেন? ওই অন্ধকার গহ্বরের ভিতর কোনো অজ্ঞাত বিভীষিকা লুকিয়ে আছে কি না কে জানে! এটাই যে কায়না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, শুধু অনুমানের উপর নির্ভর করে একটা রহস্যময় গহ্বরের অন্ধকার গর্ভে প্রবেশ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

সাফল্যের মুখে এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন আত্তিলিও৷ বর্তমানে তাঁর অবস্থাটা হল, যাকে বলে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’! এই মুহূর্তে তাঁর কর্তব্য কী হতে পারে সেটাই তিনি বুঝতে পারছিলেন না৷ একবার ভাবলেন শূন্যে রাইফেলের আওয়াজ করে প্রফেসর আর বিলকে ডাকলে হয়? তারপর মনে হল, ওরা এখন কোথায় আছে কে জানে! যদি অনেক দূরে থাকে, তাহলে তো গুলির শব্দ শুনতে পেলেও আত্তিলিও যে তাদের ডাকছেন এই কথাটা বুঝতে পারবে কি? গুলি তো কত কারণেই চালানো হয়৷ তারপর মাম্বোয়া-সর্দার? সেও তো এক সমস্যা৷ বিল আর প্রফেসরের সঙ্গে মাম্বোয়া-সর্দারও তো তার দলবল নিয়ে আসবে৷ তারা যে সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে বিদেশিদের মৃত্যুগহ্বরের ভিতর ঢুকতে দেবে, এমন তো মনে হয় না!

অবশ্য এত সব ভাবনাচিন্তা না-করে আত্তিলিও তাঁবুতে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন এবং পরের দিন তাদের নিয়ে এখানে চলে আসতে পারতেন অনায়াসে৷ এই সহজ উপায়টা যে তাঁর মাথায় আসেনি, তা নয়৷ কিন্তু উপায়টা মনে হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই তিনি সেটাকে নাকচ করেছেন৷ কী বলবেন তিনি বন্ধুদের কাছে? মৃত্যুগহ্বর আবিষ্কার করেও তার ভিতর তিনি একা প্রবেশ করতে সাহস পাননি? বন্ধুদের সাহায্য গ্রহণ করা জন্য ফিরে এসেছেন? এমন কথা বলতে পারবে না মহাযুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিক কমান্ডার আত্তিলিও গত্তি৷

অতএব আত্তিলিও ঠিক করলেন, ওই গহ্বরের ভিতর ঢুকে আজই তিনি ভিতরটা দেখবেন৷ দড়িটাকে তিনি হস্তগত করলেন, তারপর গর্তের মুখে অবস্থিত প্রকাণ্ড পাথর দুটোর মধ্যে একটার সঙ্গে দড়িটা বাঁধলেন৷ দড়ির একপ্রান্ত পাথরের সঙ্গে বাঁধা হল, অপর প্রান্তটা তিনি বাঁধলেন নিজের কোমরের সঙ্গে৷ যে-থলিটার মধ্যে খাবারদাবার এবং নানা ধরনের যন্ত্রপাতি ছিল, সেটার ভিতর থেকে সব কিছু তিনি বের করে ফেললেন৷ তারপর সেই থলিটা বুকে ঝুলিয়ে তিনি প্রস্তুত হলেন মৃত্যুগহ্বরের ভিতর অবতরণ করার জন্য৷ থলিটা অবশ্য একেবারে শূন্যগর্ভ ছিল না, দুটি নিতান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুকে থলির মধ্যে ভরেছিলেন আত্তিলিও— টর্চ এবং পিস্তল৷

জামানিকে ডেকে আত্তিলিও বললেন, সে যেন কোনো কারণেই স্থানত্যাগ না করে৷ তারপর তিনি তাকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে দড়ি ধরে তাঁকে ধীরে ধীরে গর্তের ভিতর নামাতে হবে৷ জামানির ওষ্ঠাধর নড়ে উঠল৷ কিন্তু শব্দ শোনা গেল না৷ সম্মতিসূচক ‘ইয়েস, মাসাংগা’ কথাটা তার ঠোঁটের ভিতরেই জমে গেল, উচ্চারিত হল না৷ দারুণ আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল জামানি, তবু সে নির্দেশ-অনুযায়ী দড়িটা ধরল৷ সাবধানে আস্তে আস্তে, তাকে দড়ি ছাড়তে বললেন আত্তিলিও৷ লাটাই থেকে যেভাবে সুতো ছেড়ে ঘুড়ি ওড়ানো হয়, ঠিক সেইভাবেই জামানিকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল৷ তবে ঘুড়ি ওঠে উপরদিকে, এখানে আত্তিলিও নামছেন নীচের দিকে এবং সুতোর স্থান নিয়েছে জামানির হাতের দড়ি আর লাটায়ের স্থান গ্রহণ করেছে একটা মস্ত পাথর৷

খুব সন্তর্পণে আত্তিলিও নামতে শুরু করলেন৷ গর্তের মুখে পা রাখতে-না-রাখতেই কয়েকটা পাথর তাঁর পায়ের ধাক্কায় গর্তের মধ্যে ছিটকে পড়ল সশব্দে৷ সেই শব্দে সাড়া দিয়েই যেন অন্ধকার গহ্বরের ভিতর থেকে কী-একটা বস্তু ছুটে এল৷ আর পরক্ষণেই—

পরক্ষণেই আত্তিলিওর মুখের উপর পড়ল এক প্রচণ্ড থাপ্পড়! সঙ্গেসঙ্গে কানের পর্দা ফাটিয়ে এক তীব্র চিৎকার!

অষ্টম পরিচ্ছেদ

মৃত্যু-বিভীষিকা

মুখের উপর সজোরে চপেটাঘাত পড়তেই আত্তিলিও চোখ বন্ধ করে ফেললেন এবং তাড়াতাড়ি সামনে ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলেন দড়িবাঁধা পাথরটাকে৷

একটা মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রইলেন তিনি, তারপর সম্মুখে দৃষ্টিপাত করে তিনি দেখলেন, আক্রমণকারী জীবটি হচ্ছে মস্ত বড়ো একটা নিশাচর পাখি! অন্ধকারে গহ্বরের ভিতর থেকে উড়ে আসার সময়ে তাঁর মুখের উপর পাখিটার ডানার ঝাপটা লেগেছিল৷ অন্ধকারে অভ্যস্ত নিশাচর দিনের আলোর মধ্যে এসে প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েছিল, গহ্বরের কাছেই একটা শুকনো গাছের ডালপালার মধ্যে চুপ করে বসে ছিল পাখিটা৷

এই ঘটনাটা অবশ্য আত্তিলিওর পক্ষে মঙ্গলজনক হয়েছিল৷ পাখিটা তাঁকে ভবিষ্যতের ভয়াবহ সম্ভাবনা সম্পর্কে সাবধান করে দিল—জামানির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলে তাঁর অবস্থা যে কতদূর শোচনীয় হতে পারে, এই ঘটনায় তার প্রমাণ পেলেন আত্তিলিও৷

জামানির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পেলেন, সে দড়ি ছেড়ে মাটির উপর শুয়ে পড়েছে! হাত বাড়িয়ে পাথরটা না-ধরলে তাঁর দেহটা ছিটকে পড়ত গহ্বরের ভিতর এবং তলদেশে পতিত হয়ে অথবা পাথরের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে তাঁর অবস্থা যে হত নিতান্ত শোচনীয়, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷

আত্তিলিও ঠিক করলেন, গর্তের ভিতর নামার সময়ে তিনি আর জামানির উপর নির্ভর করে নিজের জীবনকে বিপন্ন করবেন না৷ জামানিকে ভূমিশয্যা ত্যাগ করতে বললেন তিনি৷ খুব সাবধানে ধীরে ধীরে মাথা তুলল জামানি, তারপর বিস্ফারিত দুই চক্ষুর ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে চারদিক নিরীক্ষণ করতে লাগল৷

‘ভ-ভভূত!’ সহসা আর্তনাদ করে উঠল জামানি, তার ভীত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে পূর্বোক্ত নিশাচর পক্ষীর উপর!

‘ভূতের নিকুচি করেছে!’ বলে আত্তিলিও একটা পাথর ছুড়ে মারলেন৷ মস্ত বড়ো পাখিটা ডানা ঝটপট করে শূন্যে লাফিয়ে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

‘কী? দেখেছ?’

আত্তিলিও জামানির মুখের দিকে তাকালেন৷ জামানি মাথা নেড়ে জানাল, দেখেছে৷ কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি দেখেই আত্তিলিও বুঝলেন, উড়ন্ত জীবটির ‘পক্ষিত্ব’ সম্বন্ধে জামানির সন্দেহ দূর হয়নি৷ খুব সম্ভব সে ভাবছিল, ওটা পাখি না হয়ে একটা ছদ্মবেশী প্রেতাত্মাও হতে পারে!

আত্তিলিও আর জামানির সঙ্গে কথা বললেন না, নেমে পড়লেন গহ্বরের ভিতর৷ এইবার অবশ্য তিনি দড়িটাকে জামানির হাতে সমর্পণ করেননি; খুব সাবধানে ঝুলতে ঝুলতে তিনি নামতে শুরু করলেন দড়ি ধরে৷ যে-পাথরটার সঙ্গে আত্তিলিওর দেহসংলগ্ন দড়িটা বাঁধা ছিল, সেই পাথরটা ছিল খুবই গুরভার, অতএব তাঁর দেহের ভারে পাথরটা স্থানচ্যুত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না৷

আত্তিলিও নামছেন, নামছেন আর নামছেন...উপর থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ আলোর আভাসও ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল; তাঁর মাথার উপর, পায়ের নীচে, সামনে পেছনে চতুর্দিকে বিরাজ করছে এখন সীমাহীন অন্ধকার, অন্ধকার আর অন্ধকার...

গুহার প্রস্তর-প্রাচীর থেকে বেরিয়ে আসা একটা পাথরে আত্তিলিওর পা ঠেকল৷ পাথরটা খুব ধারালো, কিন্তু সেটার উপর দেহের ভার ছেড়ে দিয়ে নির্ভর করা যায়৷ আত্তিলিও কিছুক্ষণ সেই পাথরটার উপর পা রেখে বিশ্রাম করলেন, তারপর আবার দড়ি ধরে অবতরণ-পর্ব...

কয়েকটা আলগা পাথর আত্তিলিওর দেহের ধাক্কা খেয়ে সশব্দে ছিটকে পড়ল, কয়েকটা নিশাচর পক্ষী ডানা মেলে উড়ে গেল, তাদের ডানার শব্দ ভেসে এল আত্তিলিওর কানে৷

গহ্বরের প্রস্তর-প্রাচীর থেকে বেরিয়ে-আসা পাথরগুলো পা দিয়ে অনুভব করছিলেন আত্তিলিও এবং মাঝে মাঝে ওই পাথরগুলোর উপর পা রেখে তিনি ক্লান্ত বাহু দুটিকে বিশ্রাম দিচ্ছিলেন৷ পর পর চারটে পাথরের উপর বিশ্রাম নিয়ে পঞ্চম পাথরটির উপর অবতীর্ণ হলেন আত্তিলিও৷ একহাতে দড়ি আঁকড়ে অন্য হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরে তিনি গুহার তলদেশ আবিষ্কার করার চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু গর্তের চারপাশের দেয়াল থেকে ছোটো-বড়ো অসংখ্য পাথর বেরিয়ে এসে দেয়ালটাকে এমন অসমান করে তুলেছে যে, টর্চের আলো সেই প্রস্তরের বেষ্টনী ভেদ করে গুহার তলায় পৌঁছাতে পারল না৷ আত্তিলিও সবিস্ময়ে ভাবতে লাগলেন: পঁচাত্তর ফিট দীর্ঘ রজ্জুর দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে গেছে, উপর থেকে তাঁর কণ্ঠস্বরে সাড়া দিয়ে জামানির উত্তরের রেশ অষ্পষ্ট হয়ে দুজনের মধ্যে এক ভয়াবহ দূরত্বের আভাস দিচ্ছে, কিন্তু গহ্বরের তলায় পা দেওয়া তো দূরের কথা, তলদেশ এখনও রয়েছে তাঁর দৃষ্টিসীমার বাইরে! গর্তটা নিশ্চয়ই অতল অসীম নয়, কিন্তু এই ভূতুড়ে গহ্বরের গভীরতা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে? কোথায় কত দূরে গেলে পাওয়া যাবে নীচের মাটি?

হঠাৎ আত্তিলিওর পায়ের তলায় পাথরটা নড়ে উঠল৷ চমকে উঠে তিনি দড়িটা চেপে ধরার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না— পাথরটা তাঁর দেহের ভারে স্থানচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়ল; সঙ্গেসঙ্গে আত্তিলিও সাহেবও ছিটকে পড়লেন সীমাহারা শূন্যতার মাঝে!

তাঁর দেহটা দেয়াল থেকে দেয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে নীচের দিকে পড়তে লাগল, গুহার পাত্র-সংলগ্ন ধারালো পাথরগুলো ধারালো ছুরির মতোই নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে দংশন করতে লাগল বারংবার, হঠাৎ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আত্তিলিওর দেহটা স্থির হয়ে গেল৷ পঁচাত্তর ফিট লম্বা দড়ির দৈর্ঘ্য শেষ হয়ে গেছে৷ রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় শূন্যে ঝুলতে লাগলেন আত্তিলিও, তাঁর মনে হল, কোমরে-দড়ি বাঁধা তাঁকে দু-টুকরো করে ভেঙে ফেলতে চাইছে!

আত্তিলিও সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে একটা আঠার মতো ঘন চটচটে বস্তুর উষ্ণ অস্তিত্ব অনুভব করলেন: রক্ত৷ ধারালো পাথরগুলো খোঁচা মেরে তাঁর পতনোন্মুখ শরীরটাকে রক্তাক্ত করে তুলেছে৷ কিন্তু রক্তাক্ত ক্ষতগুলোর চাইতে তাঁকে বেশি কষ্ট দিচ্ছে দড়িটা৷ কোমরের উপর, পাঁজরের দু-পাশে শক্ত দড়ি যেন কেটে কেটে বসছে৷ তবে সৌভাগ্যের বিষয় আত্তিলিওর শরীরটা এখনও আস্ত আছে, ভগ্নাংশে পরিণত হয়নি৷ বুকের সঙ্গে বাঁধা থলির ভিতর থেকে টর্চটা বার করে আত্তিলিও সেটাকে জ্বেলে ফেললেন এবং চারদিকে দৃষ্টি চালনা করে অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করলেন৷ গুহাটা মোটামুটি বৃত্তাকার৷ তার আনুমানিক ব্যাস প্রায় চল্লিশ ফিট৷ গুহার ছাদ এবং ভূমির ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় শূন্যে দোল খাচ্ছেন আত্তিলিও; পূর্বোক্ত দুটি স্থানের দূরত্ব তাঁর দেহের থেকে প্রায় দশ-বারো ফুট হবে৷ গুহার নীচে মাটি প্রায় দেখা যাচ্ছে না, অগণিত নরকঙ্কাল ও অস্থিময় নরমুণ্ডের আবরণে গুহার তলদেশের মৃত্তিকা প্রায় অদৃশ্য৷ অস্থিপঞ্জরগুলো কোথাও ধবধবে সাদা, কোথাও-বা সময়ের স্পর্শে হলুদ হয়ে এসেছে৷

ঝুলতে ঝুলতে আর দুলতে দুলতে আত্তিলিও টর্চের আলোটাকে গুহা-গহ্বরের কিনারাতে ফেললেন৷

গুহার দেয়াল যেখানে নেমে এসে গুহাভূমিকে স্পর্শ করেছে, সেইখানেই মেঝের উপর এক জায়গায় আত্তিলিওর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল; হাড়ের স্তূপের মধ্যে কিছু যেন নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে৷

সচল বস্তুগুলোর স্বরূপ নির্ণয় করার জন্য উৎসুক হয়ে উঠলেন আত্তিলিও৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওই জায়গাটা তিনি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷

অকস্মাৎ দারুণ আতঙ্কে তাঁর শরীরের রক্ত যেন বরফ হয়ে গেল৷ স্তূপীকৃত অস্থিপঞ্জর আর কঙ্কাল-করোটির মধ্যে বিচরণ করছে কয়েকটা কেউটে সাপ! আত্তিলিও গুনে দেখলেন, সেখানে অবস্থান করছে সাত-সাতটি বিষধর সরীসৃপ৷

টর্চের আলোতে বিরক্ত হয়ে কেউটেগুলো অনধিকার প্রবেশকারীকে সন্ধান করছে৷ তাদের দীর্ঘ মসৃণ দেহ কুণ্ডলী পাকাচ্ছে৷ আবার খুলে খুলে যাচ্ছে৷

সাপগুলো বুঝতে পারল, তাদের বিরক্তির কারণটি কোথায় অবস্থান করছে৷ শত্রুর নাগাল না-পেয়ে হিংস্র আক্রোশে ফণা তুলে তারা দুলতে লাগল— একবার পেলে হয়৷

অনেকের ধারণা, কেবলমাত্র ভারতবর্ষের মাটিতেই কেউটে সাপের বাস দেখা যায়৷ ওই ধারণ ভুল৷ কেউটে পরিবারের অন্তর্গত অন্তত চারটি বিভিন্ন জাতের সাপ আফ্রিকাতে বাস করে৷ উপযুক্ত ভয়াবহ তথ্য আত্তিলিও সাহেবের অজ্ঞাত ছিল না; তিনি এ-কথাও জানতেন যে, দেহের যেকোনো স্থানে কেউটের ছোবল পড়লে তাঁকে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরলোকের যাত্রী হতে হবে৷

আত্মরক্ষার জন্য তিনি যা করলেন, তা পরবর্তীকালে তাঁর নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে৷ বাঁ-হাতের টর্চ ঘুরিয়ে তিনি সাপগুলোর উপর আলো ফেললেন এবং ডান হাতের পিস্তল থেকে গুলিবর্ষণ করতে শুরু করলেন৷ পরপর ছয়বার অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠল পিস্তল, প্রত্যেকটি গুলি অভ্রান্ত লক্ষ্যে ছয়টি সরীসৃপের দেহ বিদ্ধ করল— একটিও গুলি ব্যর্থ হল না৷

সাত নম্বর কেউটের দিকে ফাঁকা পিস্তলটা ছুড়ে মারলেন আত্তিলিও, সাপটা চট করে গুহার গায়ে একটা ফাটলের ভিতর ঢুকে অদৃশ্য হল৷

দড়িটা আত্তিলিওর কোমরে কেটে বসছিল, সেই যন্ত্রণা আর তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না৷ ‘যা থাকে বরাতে’ মনে করে শরীরটাকে রজ্জুর বন্ধন থেকে মুক্ত করে তিনি লাফিয়ে পড়লেন গুহার মেঝের উপর৷ সাপগুলো তখনও মৃত্যুযাতনায় ছটফট করছিল, আত্তিলিও জুতো-পরা পায়ের লাথি চালিয়ে সেগুলোকে নিরাপদ ব্যবধানে পাঠিয়ে দিলেন৷ তারপরই একটা অস্থিময় নরমুণ্ডের উপর হোঁচট খেয়ে তিনি পড়ে গেলেন!...

কতক্ষণ মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন সে-কথা আত্তিলিও নিজেও বলতে পারবেন না৷ জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে আহত ও রক্তাক্ত শরীরের পরিচর্যায় মনোনিবেশ করলেন৷ উপর থেকে ছিটকে পড়ার সময়ে পাথরের খোঁচা লেগে যেসব জায়গা কেটেকুটে গিয়েছিল, সেই ক্ষতস্থানগুলোর উপর তিনি ‘ব্যান্ডেজ’ বেঁধে ফেললেন৷ অবশ্য সেইজন্য তাঁকে পরনের শার্টটা ছিঁড়ে ফেলতে হয়েছিল৷ গহ্বরের গায়ে যে-ফোকরটার ভিতর দিয়ে সাত নম্বর সাপটা অন্তর্ধান করেছিল, সেই ফুটোটার কাছে গিয়ে আত্তিলিও লক্ষ করলেন বাইরের বাতাস পূর্বোক্ত গর্তটার ভিতর দিয়ে সশব্দে গুহার ভিতর প্রবেশ করছে৷ আত্তিলিও এইবার বুঝলেন, আশি ফিট গভীর এই গহ্বরের ভিতর সাপগুলো কোন পথে এসেছে৷ স্তূপীকৃত অস্থিপঞ্জরের ভিতর থেকে একটা হাড় নিয়ে তিনি চটপট ওই ফোকরটার মুখ বন্ধ করে দিলেন৷

এতক্ষণে আত্তিলিও সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাঁর দেহে রক্ত চলাচল করছে স্বাভাবিকভাবে৷ এই ভয়ানক গহ্বরটা যে ‘কায়না’, এ-বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই তাঁর৷

মাম্বোয়া-সর্দারদের আদেশে এই সুগভীর গহ্বরের মধ্যে অপরাধীদের নিক্ষেপ করা হত৷ অপরাধের গুরুত্ব সবসময় খুব বিবেচ্য নয়, মাম্বোয়া-সর্দার বা মাতববরদের অপ্রীতিভাজন হলেই উক্ত ব্যক্তিকে বিসর্জন দেওয়া হত কায়নার গর্ভে৷ মাম্বোয়ারা এই রীতি পছন্দ করত না, কিন্তু তারা জানত কেউ যদি শ্বেতাঙ্গদের কাছে মৃত্যুগহ্বরের সন্ধান দেয়, তবে মাম্বোয়া-সর্দারদের আদেশে সেই ব্যক্তির মৃত্যু অনিবার্য৷ সেইজন্যই তারা মুখ খুলত না৷ কিন্তু স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু যখন কাছে এগিয়ে এসেছে তখনই তারা মুখ খুলতে চেয়েছে৷ আত্তিলিওর মনে পড়ল নিগ্রো পুলিশম্যান ও স্থানীয় বৃদ্ধা স্ত্রীলোকটির কথা৷ মরার আগে তারা মৃত্যুগহ্বরের রহস্য ফাঁস করে দিতে চেয়েছিল, কারণ তারা বুঝেছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মাম্বোয়া-সর্দারদের নাগালের বাইরে চলে যাবে৷ দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরার করার আগেই মৃত্যুর স্পর্শে তাদের জিহ্বা হয়ে যায় স্তব্ধ৷ ওইসব ঘটনাগুলো বার বার আত্তিলিওর মনে পড়তে লাগল৷

মৃত্যুগহ্বরের ভিতর যেসব মানুষ মৃত্যুবরণ করছে, তাদের কথা মনে হতেই শিউরে উঠলেন আত্তিলিও৷ অনাহারে আর তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুযাতনা ভোগ করেছে ওইসব হতভাগ্যের দল, তিল তিল করে শুকিয়ে তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে মৃত্যুর দিকে৷ সেইজন্যই এই গুহার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কায়না’ অর্থাৎ যাতনাদায়ক ‘মৃত্যুগহ্বর’৷

নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য যুগ যুগ ধরে মাম্বোয়া-সর্দাররা এই প্রথা বাঁচিয়ে রেখে জনসাধারণের উপর নিষ্ঠুর সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে৷ মাম্বোয়া জাতির মাতববরদের এই নৃশংসতায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই— পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় সর্বদেশে সর্বক্ষেত্রে এই ধরনের একদল লোক সন্ত্রাসের সৃষ্টি করে ব্যক্তিগত কায়েমি স্বার্থকে বজায় রাখার জন্য৷

আত্তিলিও হঠাৎ চমকে উঠলেন: এসব তিনি কী ভাবছেন? মানুষের দুঃখকষ্টের কথা না-ভেবে তাঁর নিজের কথাই এখন চিন্তা করা উচিত৷ মাম্বোয়াদের মধ্যে প্রচলিত একটা ভয়ানক প্রবাদবাক্য তাঁর মনে পড়ল— ‘এখানে যে প্রবেশ করে, তার উদ্ধারের আশা নেই!’

আত্তিলিওর মনে হল, মূর্খের মতো অন্য মানুষের দুঃখের কথা ভেবে তিনি মূল্যবান সময়ের অপচয় করছেন৷ যদি এই গহ্বরের বাইরে তিনি না যেতে পারেন, তবে তাঁর দেহের কঙ্কালটিও একদিন এই গুহার অস্থিস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকবে৷ আত্তিলিও এইবার মৃত্যুগহ্বরের গর্ভ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন৷

দড়িটা উপরে ঝুলছিল৷ আত্তিলিও সেটাকে লক্ষ করে লাফ মারলেন৷ বৃথা চেষ্টা, লাফিয়ে ওই দড়িটাকে করায়ত্ত করা সম্ভব নয়৷ তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেন, প্রতিধ্বনি তাঁকে বিদ্রূপ করল, উপর থেকে জার্মানির কণ্ঠস্বরে কোনো উত্তর এসে পৌঁছাল না তাঁর কাছে৷

আত্তিলিও এইবার অন্য উপায় অবলম্বন করলেন৷ অনেকগুলো পাথর আর নরকঙ্কাল টেনে জড়ো করলেন দড়িটার নীচে, তারপর ওই পাথর আর হাড়ের স্তূপের উপর আরোহণ করে এক সময়ে দড়িটাকে স্পর্শ করতে সক্ষম হলেন৷

কিন্তু এখনও ঝামেলা অনেক— দড়ির শেষ প্রান্তে যে গিঁট আছে সেটাকে না-খুললে চলবে না৷ ইতিমধ্যে টর্চের ব্যাটারি শেষ হয়ে এসেছে, আলোটা কাঁপতে শুরু করল৷ আত্তিলিওর সমস্ত শরীর তখন অবসাদে ভেঙে পড়তে চাইছে, কেবল দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি তাঁকে দু-পায়ের উপর খাড়া করে রেখেছিল! কম্পিত হস্তে দড়ির গিঁটটা একসময়ে খুলে ফেললেন আত্তিলিও৷ পিস্তল আর টর্চ ব্যবহারের যোগ্য ছিল না, তাই সে দুটির পরিবর্তে কয়েকটা হাড়ের টুকরো আত্তিলিও তাঁর হাতের থলির মধ্যে ভরে নিলেন৷ শ্রান্ত দেহে অনেকটা দূরত্ব তাঁকে দড়ি ধরে অতিক্রম করতে হবে, ওই অবস্থায় হাড়গোড় দিয়ে ওজন বাড়িয়ে নিজেকে ভারগ্রস্ত করলে বিপদের সম্ভাবনা আছে বুঝেও মৃত্যুগহ্বর থেকে কিছু নিয়ে যাওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারেননি আত্তিলিও৷ জীবনের আশা তিনি ত্যাগ করেছিলেন, তবু যদি জীবিত অবস্থায় কায়নার বাইরে পদার্পণ করতে পারেন, তবে ওই হাড়গুলো বিল আর প্রফেসরের সামনে প্রমাণস্বরূপ দাখিল করতে পারবেন ভেবেই আত্তিলিও বাড়তি ওজনের ঝঞ্ঝাট বহন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন৷

হাত আর পায়ের সাহায্যে যেভাবে মানুষ সাধারণত দড়ি বেয়ে উপরে উঠে, সেইভাবে চেষ্টা করলে খুব সম্ভব আত্তিলিও ব্যর্থ হতেন৷ শ্রান্ত-ক্লান্ত বাহু ও পায়ের মাংসপেশি সুদীর্ঘ রজ্জুপথে বেশিক্ষণ তার দেহভার বহন করতে পারত কি না সন্দেহ৷ তাই আত্তিলিও একটা কৌশল অবলম্বন করলেন৷ দড়িটাকে তিনি দক্ষিণ ঊরুর তলা দিয়ে চালিয়ে দিলেন, তারপর যে-অংশটা তিনি অতিক্রম করছিলেন, দড়ির সেই অংশটুকু ডান দিকের ঊরুর তলা দিয়ে ঘুরিয়ে দক্ষিণ বাহুর ঊর্ধাংশের উপর ফেলে দিচ্ছিলেন৷ এইভাবে যে দড়ির বেষ্টনী তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে ডান পা ঝুলিয়ে রেখে বাঁ-পা দিয়ে গুহার দেয়ালে বেরিয়ে-আসা পাথরের মাঝে মাঝে ধাক্কা মেরে উপরে উঠেছিলেন আত্তিলিও৷ দোদুল্যমান রজ্জুর দুটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে এবং আত্তিলিওর দুই পায়ের মাঝখানে ঘর্ষিত হয়ে শূন্য পথে ভাসমান দেহের ভারসাম্য রক্ষা করছিল; ফলে ক্লান্ত শরীরটা অল্প আয়াসেই ঝুলিয়ে রেখে মাঝে মাঝে দম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন তিনি৷...

তবু মাঝে মাঝে ক্লান্ত মুঠির বাঁধন খুলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, মাঝে মাঝেই দড়ির উপর শিথিল হয়ে এসেছে হাতের আঙুলগুলো, কিন্তু কিছুতেই হাত ছাড়েননি আত্তিলিও, শক্ত করে বার বার আঁকড়ে ধরেছেন দড়িটাকে...

গহ্বরের উপরদিকে তিনি যত উঠছিলেন, নিরেট অন্ধকার ততই হালকা হয়ে গহ্বরের বহির্দেশে উজ্জ্বল সূর্যালোকের অস্তিত্ব ঘোষণা করছিল৷ সেই আলোর আভাসই প্রেরণা দিয়েছে, শিথিল আঙুলের বাঁধন খুলে যেতে আবার দড়িটাকে চেপে ধরেছেন দৃঢ় মুষ্টিতে৷

আত্তিলিও উপরে উঠতে লাগলেন অতি কষ্টে, ধীরে ধীরে, অতি সন্তর্পণে...

অবশেষে এক সময় তিনি গহ্বরের মুখে এসে পৌঁছালেন৷ মাথাটা গর্তের বাইরে ঠেলে দিয়ে সামনে দৃষ্টিপাত করলেন: ভগবানকে ধন্যবাদ, জামানি যথাস্থানেই অবস্থান করছে৷

আত্তিলিওকে দেখামাত্রই জামানির দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, ওষ্ঠাধর হল বিভক্ত এবং সর্বশরীরে জাগল কম্পিত শিহরন!

‘সাহায্য করো,’ আত্তিলিও ভগ্নস্বরে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি করো!’

জামানি অবরুদ্ধ কণ্ঠে আর্তনাদ করে, ‘মাসাংগা! তোমার নিজের আত্মা!’

আত্তিলিওর হাত ধরার চেষ্টা না-করে সে ধপাস করে মাটির উপর পড়ে গেল৷

আত্তিলিও পড়ে যাচ্ছিলেন, কোনোরকমে হাত বাড়িয়ে গহ্বরের মুখে দড়ি বাঁধা পাথরটা চেপে ধরে পতন থেকে আত্মরক্ষা করলেন৷ তারপর শেষ শক্তি দিয়ে নিজের পতনোন্মুখ দেহটাকে টেনে আনলেন গহ্বরের বাইরে৷ শ্রান্ত ও অবসন্ন শরীরে অতি কষ্টে শ্বাস টানতে টানতে আত্তিলিও শুনলেন জামানির আর্তনাদ— ‘মাসাংগা! তুমি মরে গেছ! আমি জানি, তুমি মরে গেছ! মরে তুমি ভূত হয়েছ! তবে কেন থলির মধ্যে তোমার মুণ্ডু আর হাড়গুলো নিয়ে এলে আমার কাছে! মাসাংগা! আমি তোমার বিশ্বস্ত অনুচর, আমার সঙ্গে তোমার এ কী ব্যবহার, মাসাংগা!’

আত্তিলিও হাসে নি!

হেসে ওঠার ক্ষমতা তাঁর তখন ছিল না৷

শারদীয়া ১৩৭৯

সকল অধ্যায়
১.
বাঘিনী
২.
মরণ খেলার খেলোয়াড়
৩.
অগ্নিপরীক্ষা
৪.
সবজান্তার শাস্তি
৫.
টারজানের প্রতিদ্বন্দ্বী
৬.
জনতার প্রতিনিধি
৭.
অসুর বনাম মহিষাসুর
৮.
আত্মা ও দুরাত্মা
৯.
সংকেত
১০.
নিশানা নির্ভুল
১১.
দানবের ক্ষুধা
১২.
দুর্যোধনের গদা
১৩.
ক্যারাটে মৃত্যুবাহী
১৪.
জেহাদ
১৫.
আঁধার রাতের পথিক
১৬.
মরণ-ফাঁদ
১৭.
দুঃস্বপ্নের রাত
১৮.
দ্বৈরথ
১৯.
অস্ট্রেলিয়ার লাল আতঙ্ক
২০.
দানবের অপমৃত্যু
২১.
নরকের প্রহরী
২২.
নায়কের জন্ম
২৩.
তাইগরেরো
২৪.
সৈনিকের প্রথম অভিজ্ঞতা কায়না
২৫.
সৈনিকের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা শয়তানের ফাঁদ
২৬.
সৈনিকের তৃতীয় অভিজ্ঞতা শত্রু
২৭.
সৈনিকের চতুর্থ অভিজ্ঞতা শত্রু (দ্বিতীয় খণ্ড)
২৮.
সৈনিকের পঞ্চম অভিজ্ঞতা নরখাদক দেবতা
২৯.
সৈনিকের ষষ্ঠ অভিজ্ঞতা প্রতিহিংসা
৩০.
দেবী দর্শন
৩১.
ডুয়েল

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%