ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

‘হুঁ, তুমি! তোমার নাম ম্যাকফারলেন?’
মুখ তুলে প্রশ্ন করলেন মি. স্কেটন৷
তাঁর সামনে যে অপরূপ মূর্তিটি দাঁড়িয়ে ছিল, তার চেহারাটা সত্যি দর্শনীয় বস্তু৷ রোগাও নয়, মোটাও নয়, লম্বা একহারা শরীর, মাথা ভরতি আগুনের মতো লাল টকটকে ঝাঁকড়া চুল, চুলের নীচে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ ছাড়া মুখের কোনো অংশ দৃষ্টিগোচর হয় না, কারণ চোখ দুটি ছাড়া লোকটির সমস্ত মুখের ওপর বাঁধা আছে পুরু কাপড়ের আস্তরণ বা ‘ব্যান্ডেজ’৷
মি. স্কেটনের প্রশ্নের উত্তরে আগুন্তুক বললে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার নাম ম্যাকফারলেন৷’
স্কেটন বললেন, ‘তোমার কথা আমি শুনেছি৷ তুমি নাকি জেল খেটেছ? যাই হোক, ভালোভাবে যদি বাঁচতে চাও আমি তোমাকে সুযোগ দিতে পারি৷ হুঁ, আর একটা কথা— পাথর ভাঙার কাজ সম্পর্কে তোমার কোনো অভিজ্ঞতা আছে?’
পুরু কাপড়ের তলা থেকে ভেসে এল অস্ফুট হাস্যধ্বনি, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, পাথর ভাঙার কাজই তো করেছি৷’
ম্যাকফারলেন তার জামা গুটিয়ে ডান হাতখানা তুলে ধরলে মি. স্কেটনের সামনে— মি. স্কেটন দেখলেন তার বাহু বেষ্টন করে ফুলে উঠেছে দড়ির মতো পাকানো মাংসপেশি!
স্কেটন মুখে কিছু বললেন না, কিন্তু বুঝলেন ওই হাতের মালিক অসাধারণ শক্তির অধিকারী৷
ম্যাকফারলেন বললে, ‘শুধু পাথর ভাঙা নয়, আমি—’ একটু থেমে সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাইল স্কেটনের দিকে, ‘আমি ভালো লড়াই করতেও জানি৷’
‘বেশ, বেশ,’ স্কেটন বললেন, ‘তোমার মুখখানা দেখে সে-কথাই মনে হচ্ছে আমার৷ অত বড়ো একটা ব্যান্ডেজ কেন বাঁধতে হয়েছে সে-কথা আমি জানতে চাইব না, আমি শুধু বলব— ম্যাকফারলেন! যদি ভালোভাবে বাঁচতে চাও তবে তোমাকে সেই সুযোগ দিতে আমার আপত্তি নেই৷ তোমাকে আমি কাজে বহাল করলুম৷ এখন যাও৷’
ম্যাকফারলেনের দুই চোখ ঝকঝক করে উঠল, হাত তুলে সে মি. স্কেটনকে অভিবাদন জানাল, তারপর তার দীর্ঘ দেহ অদৃশ্য হয়ে গেল তাঁবুর দ্বারপথে৷
উত্তর ক্যানাডার দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও ঝোপঝাড় ভেঙে তৈরি হচ্ছিল একটা পথ৷ যে দলটা ওই রাস্তা তৈরির কাজে নিযুক্ত হয়েছিল, মি. স্কেটন সেই দলের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক৷
পাথর ভেঙে রাস্তা তৈরির কাজ করতে যে লোকগুলো এগিয়ে এসেছিল, তারা বিলক্ষণ কষ্টসহিষ্ণু— তবে দলের সবাই যে খুব শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ ছিল তা নয়৷ মারপিট দাঙ্গাহাঙ্গামা মাঝে মাঝে লাগত৷ মি. স্কেটন জানতেন ওটুকু সহ্য করতেই হবে৷ দারুণ ঠান্ডার মধ্যে পাথর ভেঙে যারা জীবিকা নির্বাহ করতে এসেছে, তাদের কাছে একেবারে শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার আশা করা যায় না৷ তবু যথাসম্ভব গোলমাল এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন মি. স্কেটন৷ তাই যেদিন তিনি শুনলেন ম্যাকফারলেন নামে একজন জেলখাটা কয়েদি তাঁর কাছে কাজ চাইতে এসেছে, সেদিন তিনি একটু অস্বস্তি বোধ করলেন৷ অবশ্য মি. স্কেটন জানতেন অপরাধীকে ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ দিলে অনেক সময় তার চরিত্র সংশোধিত হয়— স্বভাব-দুর্বৃত্তদের কথা অবশ্য আলাদা, তারা সুযোগ পেলেই সমাজবিরোধী কাজকর্ম অর্থাৎ চুরি ডাকাতি খুন প্রভৃতি দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়৷ কিন্তু ম্যাকফারলেনের কথাবার্তা শুনে স্কেটনের মনে হল লোকটি স্বভাব-দুর্বৃত্ত নয়, ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ পেলে সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে সে কুণ্ঠিত হবে না৷ সেইজন্যই ম্যাকফারলেনকে কাজে বহাল করলেন মি. স্কেটন৷
স্কেটনের অনুমান ঠিক হয়েছিল কিনা জানতে হলে পরবর্তী ঘটনার বিবরণ জানা দরকার৷ সে-কথাই বলছি...
ম্যাকফারলেন যখন মি. স্কেটনের কাজে বহাল হল, তখন শীতের মাঝামাঝি৷ আবহাওয়া খুবই কষ্টকর৷ ক্যানাডা অঞ্চলে শীতকালে ঝড় হয়৷ ঝড়বৃষ্টির জন্য অনেক সময় সাময়িকভাবে কাজকর্ম বন্ধ রাখা হত৷ রাস্তা তৈরির কাজে যে লোকগুলো নিযুক্ত হয়েছিল তারা সেই সময় ভিড় করত ব্যায়ামাগারের মধ্যে৷ ব্যায়ামাগারটি তৈরি করে দিয়েছিলেন মি. স্কেটন দলের লোকদের জন্য৷ নানা ধরনের খেলা হত সেখানে৷ তবে দলের লোকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল ‘বক্সিং’ বা মুষ্টিযুদ্ধ৷ স্কেটনের দলভুক্ত শ্রমিক ছাড়া অন্যান্য লোকজনও আসত মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে৷
সেদিন রবিবার৷ ব্যায়ামাগারের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধের আসর জমছে না৷ লাল পোশাক গায়ে চড়িয়ে দস্তানা পরিহিত দুই হাত তুলে সগর্বে পদচারণা করছে একটি বলিষ্ঠ মানুষ এবং চারপাশে দণ্ডায়মান জনতার দিকে তাকিয়ে গর্বিত কণ্ঠে ‘চ্যালেঞ্জ’ জানাচ্ছে বার বার৷ কিন্তু তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসছে না কোনো প্রতিযোগী— এর আগে যে কয়জন তার সামনে মোকাবেলা করতে এসেছিল তারা সবাই বেদম মার খেয়ে কাবু হয়ে পড়েছে৷
লোকটি শুধু শক্তিশালী নয়, মুষ্টিযুদ্ধের কায়দাও সে ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে— সে পাকা ‘বক্সার’৷

‘আমি লড়তে রাজি আছি’, জনতার ভিড় ঠেলে একটি দীর্ঘকায় মানুষ এগিয়ে এল, তার মাথার ওপর লটপট করছে রাশি রাশি আগুন রাঙা চুল আর ওষ্ঠাধরে মাখানো রয়েছে ক্ষীণ হাসির রেখা— ম্যাকফারলেন!
রক্তকেশী নবাগতকে সোল্লাসে অভ্যর্থনা জানাল সমবেত জনতা—
‘দস্তানা লাগাও৷ ওর হাতে মুষ্টিযুদ্ধের দস্তানা পরিয়ে দাও৷’
ম্যাকফারলেনের উন্মুক্ত পুরোবাহুর (forearm) দিকে দৃষ্টিপাত করলে মুষ্টিযোদ্ধা— দড়ির মতো পাকানো মাংসপেশিগুলি তার একটুও ভালো লাগল না৷
নীরস কণ্ঠে মুষ্টিবীর জানতে চাইল, ‘ইয়ে— তুমি— তুমি কি বলে— মানে, বক্সিং লড়তে জান তো?’
‘না, জানি না,’ ম্যাকফারলেন উত্তর দিলে, ‘তবে শিখতে দোষ কী? আজ থেকে তোমার কাছেই বক্সিং শিখব৷’
লড়াই শুরু হল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই বুঝল, ম্যাকফারলেন শক্তিশালী মানুষ বটে, কিন্তু মুষ্টিযুদ্ধে সে একেবারেই আনাড়ি৷ তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বজ্রমুষ্টি তার মুখে ও দেহে আছড়ে পড়ল বারংবার— কোনোরকমে দুই হাত দিয়ে আত্মরক্ষা করতে লাগল ম্যাকফারলেন৷ কয়েকটি মার সে বাঁচাল বটে কিন্তু পাকা মুষ্টিযোদ্ধার সব আঘাত সে আটকাতে পারল না৷ তার মুখের উপর দেহের উপর আছড়ে পড়তে লাগল ঘুসির পর ঘুসি৷
জনতা ওই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিল না, কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, ‘ওহে বোকারাম, হাত চালাও, শুধু শুধু দাঁড়িয়ে মার খাও কেন?’
জনতার চিৎকারে কর্ণপাত করলে না ম্যাকফারলেন, অন্যান্য মুষ্টিযোদ্ধার মতো সরে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টাও সে করলে না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে দু-হাত দিয়ে ঘুসি আটকাতে লাগল এবং আঘাতের পর আঘাতে হয়ে উঠল জর্জরিত৷
আচম্বিতে ম্যাকফারলেনের বাঁ-হাতের মুঠি বিদ্যুদবেগে ছোবল মারল প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে! প্রতিদ্বন্দ্বী মুষ্টিবীর মাটির ওপর ঠিকরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল!
একটি ঘুসিতেই লড়াই ফতে!
তীব্র উল্লাসে চিৎকার করে জনতা ম্যাকফারলেনকে অভিনন্দন জানাল৷ সেই মুহূর্তে তার নূতন নামকরণ করল— ‘রেড’ অর্থাৎ লাল৷ লাল চুলের জন্যই ওই নাম হয়েছিল তার৷ আমরাও এখন থেকে ম্যাকফারলেনকে ‘রেড’ নামেই ডাকব৷
সন্ধ্যার পরে নিজের ঘরে বসে ধূমপান করছিলেন মি. স্কেটন৷ হঠাৎ সেখানে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল একটি শ্রমিক৷ শ্রমিকটি জানাল তাদের দলভুক্ত একটি অল্পবয়সি ছেলেকে দলেরই একজন লোক স্নানের চৌবাচ্চার মধ্যে ঠেসে ধরেছিল, ছেলেটি ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, মি. স্কেটনের এখনই একবার আসা দরকার৷
স্কেটন তাড়াতাড়ি ছুটলেন৷ অকুস্থলে গিয়ে তিনি দেখলেন, একটি অল্পবয়সি কিশোর শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে— তার দেহে কোনো বস্ত্রের আচ্ছাদন নেই, ভয়ে তার বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে!
স্কেটন তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে বিছানায় শুইয়ে উপযুক্ত শুশ্রূষার ব্যবস্থা করলেন৷ ছেলেটির ‘নিউমোনিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, স্কেটনের যত্নে সেই যাত্রা বেঁচে গেল৷
পূর্বোক্ত ঘটনার চার দিন পরে স্কেটনের ঘরে আবির্ভুত হল এক বিপুলবপু পুরুষ৷ লোকটির মস্ত বড়ো শরীর ও রুক্ষ মুখচোখ দেখলেই বোঝা যায় মানুষটি খুব শান্তশিষ্ট নয়৷
লোকটি স্কেটনের বেতনভোগী শ্রমিক৷ তার দুর্দান্ত স্বভাবের জন্য স্কেটন তাকে পছন্দ করতেন না৷
আগন্তুক কর্কশ স্বরে বললে, ‘মি. স্কেটন, দেখুন হতভাগা রেড আমার কী অবস্থা করেছে!’
মি. স্কেটন দেখলেন লোকটির দুই চোখের পাশে ফুটে উঠেছে আঘাতের চিহ্ন৷
স্কেটন বললেন, ‘রেড তোমাকে মারল কেন?’
খুব মোলায়েম স্বরে লোকটি বললে, ‘আমি কিচ্ছু করিনি স্যার৷ হতভাগা রেড হঠাৎ এসেই আমাকে দু-ঘা বসিয়ে দিল৷ আমি স্যার ঝগড়াঝাঁটি পছন্দ করি না৷ আমি আপনার কাছে নালিশ জানাতে এসেছি৷’
স্কেটন অবাক হয়ে ভাবলেন যে মানুষ চিরকালই দুর্বিনীত ও দুর্দান্ত স্বভাবের পরিচয় দিয়ে এসেছে, সে হঠাৎ আজ আঘাতের পরিবর্তে আঘাত ফিরিয়ে না-দিয়ে শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো জানাতে এল কেন?
মুখে বিস্ময় প্রকাশ না করে স্কেটন বললেন, ‘তুমি যাও৷ যদি রেড দোষ করে থাকে আমি তাকে শাস্তি দেব৷’
অনুসন্ধান করে আসল খবর জানলেন মি. স্কেটন৷ সমস্ত ঘটনাটা হচ্ছে এই—
ওই ‘ঝগড়াঝাঁটি পছন্দ না-করা’ লোকটি কয়েকদিন আগে অল্পবয়সি ছেলেটিকে জলের মধ্যে চেপে ধরেছিল৷ দলের শ্রমিকরা ব্যাপারটা পছন্দ করেনি, কিন্তু সাহস করে কেউ প্রতিবাদ জানাতে পারেনি৷ ওই লোকটা ছিল পয়লা নম্বরের ঝগড়াটে, আর তার গায়েও ছিল ভীষণ জোর— তাই সবাই তাকে ভয় করত যমের মতো৷
অকুস্থলে ম্যাকফারলেন উপস্থিত ছিল না৷ পরে সমস্ত ঘটনাটা যখন সে সহকর্মীদের মুখ থেকে জানল, তখনই সে ঝগড়াটে লোকটির কাছে কৈফিয়ত চাইল৷ ফলে মারামারি৷ রেডের হাতে মার খেয়ে ‘শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকটি’ স্কেটনের কাছে অভিযোগ করতে এসেছিল৷
সব শুনে স্কেটন বললেন, ‘রেড যা করেছে, ভালোই করেছে৷’
এক রাতে স্কেটন যখন শুতে যাওয়ার উদ্যোগ করছেন, সেই সময় তাঁর সামনে কাঁচুমাচু মুখে এসে দাঁড়াল রেড৷
স্কেটন প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’
রেড একটু হাসল, বোকার মতো ডান হাত দিয়ে বাঁ-কানটা একটু চুলকে নিল, তারপর মুখ নীচু করে বললে, ‘স্যার! ঘুমাতে পারছি না স্যার!’
—ঘুমাতে পারছ না! কেন?
—ওরা বড়ো গোলমাল করছে স্যার৷
স্কেটন কান পেতে শুনলেন৷ শ্রমিকদের শয়নকক্ষ থেকে ভেসে আসছে তুমুল কোলাহল ধ্বনি৷
মি. স্কেটন ঘড়ির দিকে তাকালেন৷ রাত্রি গভীর, যেকোনো ভদ্রলোকই এখন শয্যার বুকে আশ্রয় নিতে চাইবে৷
মুখ তুলে গম্ভীর স্বরে স্কেটন বললেন, ‘তোমার হাতে তো বেশ জোর আছে শুনেছি— তবে তুমি ঘুমাতে পারছ না কেন?’
রেড কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল, তারপরই তার চোখে-মুখে খেলে গেল হাসির বিদ্যুৎ৷ ‘স্যার! স্যার! আপনি কী বলছেন স্যার? আপনি কি—’
বাধা দিয়ে স্কেটন বললেন, ‘শোনো! তাঁবুর লোকজনদের মধ্যে যাতে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় থাকে তুমি সেই চেষ্টাই করবে৷ আজ থেকে তুমি হলে এই দলের ‘‘পুলিশম্যান’’! বুঝেছ?’
এক মুহূর্তের মধ্যে যেন রূপান্তর ঘটল মানুষটির৷ জ্বলজ্বল করে উঠল রেডের দুই চোখ, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্কেটনকে সে অভিবাদন জানাল, তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে অদৃশ্য হয়ে গেল মুক্ত দ্বারপথে৷
দশ মিনিটের মধ্যেই শ্রমিকদের কোলাহলমুখর শয়নকক্ষ হয়ে গেল নিস্তব্ধ এবং নিবে গেল বৈদ্যুতিক আলোর দীপ্তি৷
রেড তার কর্তব্য পালন করেছে!
মি. স্কেটন শয্যাগ্রহণ করার উপক্রম করলেন আর ঠিক সেই সময়ে বেজে উঠল টেলিফোন৷ যন্ত্রটাকে তুলে নিলেন স্কেটন৷
টেলিফোনের তারে এক উদবেগজনক সংবাদ পেলেন স্কেটন৷ তাঁর আস্তানা থেকে কয়েক মাইল দূরে রাস্তা তৈরির জন্য গড়ে উঠেছিল আর একটা ঘাঁটি৷ এ ঘাঁটির প্রহরী টেলিফোনে জানিয়ে দিল যে, তাদের ঘাঁটি থেকে একটি অতিশয় ভয়ংকর মানুষ স্কেটনের আস্তানার দিকে যাত্রা করেছে৷ প্রহরীর মুখ থেকে আরও বিশদ বিবরণ জানা গেল— ওই গুন্ডাপ্রকৃতির লোকটা নাকি তাদের ঘাঁটিতে খুব উপদ্রব শুরু করেছিল, প্রহরী তাকে বাধা দিতে গিয়ে দারুণ মার খেয়েছে৷
আবার ভেসে এল টেলিফোনে প্রহরীর কণ্ঠস্বর৷ ‘লোকটির নাম টারজান৷ অন্তত ওই নামেই সে নিজের পরিচয় দেয়৷ বাঘের মতো ভয়ংকর মানুষ ওই টারজান৷ মি. স্কেটন, আপনি সাবধানে থাকবেন৷’
‘আমি সতর্ক থাকব৷’
স্কেটন টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন৷
পরের দিন সকালেই স্কেটনের ঘরে ‘টারজান’ নামধারী মানুষটির শুভ আগমন ঘটল৷
স্কেটন বই পড়ছিলেন৷ বই থেকে মুখ তুলে তিনি আগন্তুকের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন৷
চিতাবাঘের মতো ছিপছিপে পেশিবহুল বলিষ্ঠ দেহ, দুই চোখের দৃষ্টিতে এবং মুখের রেখায় রেখায় নিষ্ঠুর বন্য হিংসার পাশবিক ছায়া— টারজান?
গম্ভীরভাবে স্কেটন বললেন, ‘তুমি টারজান? আগের ঘাঁটির প্রহরীকে তুমি মেরেছ?’
স্কেটনের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলে আগন্তুক, কুৎসিত হিংস্র হাস্যে বিভক্ত হয়ে গেল তার ওষ্ঠাধর, ‘হ্যাঁ, আমার থাবাগুলো বড়ো ভয়ানক৷’
‘শোনো টারজান,’ স্কেটন বললেন, ‘ইচ্ছে করলে তুমি এখানে কাজ করতে পারো৷’
‘হ্যাঁ?’
লোকটি অবাক হয়ে গেল৷ এত সহজে কাজ পেয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি৷ স্পষ্টই বোঝা গেল, মালিকের তরফ থেকে এই ধরনের প্রস্তাব আসতে পারে এমন আশা তার ছিল না৷
‘হ্যাঁ, আর একটা কথা বলে দিচ্ছি,’ স্কেটন বললেন, ‘এখানে গোলমাল করলে বিপদে পড়বে৷ এই ঘাঁটিতে এমন একটি মানুষ আছে যে তোমাকে ইচ্ছে করলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে পারে৷’
নীরব হাস্যে ভয়ংকর হয়ে উঠল টারজানের মুখ, ‘ও! ওই লালচুলো মানুষটার কথা বলছেন বুঝি? তার কথা আমার কানে এসেছে৷ আমি ওই লালচুলোর সঙ্গে একটিবার দেখা করতে চাই৷’
‘ভালো কথা৷ খুব শীঘ্রই তার সঙ্গে তোমার দেখা হবে টারজান৷’
মি. স্কেটন আবার তাঁর হাতের বইতে মনোনিবেশ করলেন৷ টারজান কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু স্কেটন একবারও বই থেকে মুখ তুললেন না৷
অগত্যা টারজান স্কেটনের ঘর থেকে বেরিয়ে শ্রমিকদের শয়নকক্ষের দিকে পদচালনা করলে৷
স্কেটন জানতেন টারজানের সঙ্গে ম্যাকফারলেন ওরফে রেড-এর কলহ অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে তাঁর আশঙ্কা সত্যে পরিণত হবে কে জানত?
স্কেটনের কাছে যেদিন টারজান এসেছিল সেদিন রেড অকুস্থলে উপস্থিত ছিল না৷ কয়েক মাইল দূরে রাস্তা তৈরির কাজে সে ব্যস্ত ছিল৷ রাত্রিবেলা যখন সে শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট শয়নকক্ষে উপস্থিত হল, তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত দৃশ্য—

মস্ত বড়ো ঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে টারজান, ‘এইখানে এমন কোনো মানুষ নেই যে আমার সঙ্গে লড়তে পারে৷’
দরজার কাছে স্থির হয়ে দাঁড়াল রেড৷
শয়নকক্ষের মাঝখানে মস্ত বড়ো থামটার ওপর সজোরে পদাঘাত করে চেঁচিয়ে উঠল টারজান, ‘যেকোনো লোক— হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেকোনো লোককে আমি মেরে ঠান্ডা করে দিতে পারি৷’
‘তাই নাকি? যেকোনো লোককে তুমি মেরে ঠান্ডা করে দিতে পারো?’ হাসতে হাসতে বললে রেড, ‘কিন্তু আমাকে তুমি ঠান্ডা করতে পারবে না৷’
কথা বলতে বলতে একহাত দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল রেড, এইবার ক্ষিপ্রহস্তে গায়ের গরম জামাগুলো সে খুলে ফেলল৷
শার্টের আস্তিন গুটিয়ে রেড ধীরে ধীরে এগিয়ে এল টারজানের দিকে! চরম মুহূর্ত!
মিষ্টি হাসি হেসে মধু ঢালা ঠান্ডা গলায় রেড বললে, ‘কী হে স্যাঙাত— তুমি তৈরি?’
রেড স্কটল্যান্ডের অধিবাসী৷ সে শক্তিশালী মানুষ৷ তার লড়াইয়ের অস্ত্র হচ্ছে দুই হাতের বজ্রমুষ্টি৷
টারজান বর্ণসংকর— তার বাপ ফরাসি, মা রেড ইন্ডিয়ান৷ সেও বলিষ্ঠ মানুষ৷ কিন্তু তার লড়াইয়ের ধরন আলাদা৷ ছলে-বলে-কৌশলে যেভাবেই হোক শত্রু নিপাত করতে সে অভ্যস্ত; ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’, এই হল তার নীতি৷
দুই বিচিত্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরের সম্মুখীন হল৷
টারজান খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে এল৷ রেড-এর বলিষ্ঠ দুই হাতের কবলে ধরা পড়ার ইচ্ছা তার ছিল না— হঠাৎ বিদ্যুদবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে শত্রুর মাথায় প্রচণ্ড মুষ্ট্যাঘাত করলে, প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই অপর হাতখানি সবেগে আঘাত হানল শত্রুর উদরে এবং চোখের পলক ফেলার আগেই ছিটকে সরে গেল প্রতিদ্বন্দ্বীর নাগালের বাইরে৷
টারজানের চোখ দুটো এতক্ষণ ক্রোধে ও ঘৃণায় জ্বলছিল জ্বলন্ত অঙ্গারখণ্ডের মতো, কিন্তু এইবার তার বিস্ফারিত চক্ষুতে ফুটে উঠল আতঙ্কের আভাস৷
তার একটি আঘাতেও শত্রুর দেহ স্পর্শ করতে পারেনি! রেড আক্রমণ করলে না, স্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল শত্রুর জন্য৷
আবার আক্রমণ করল টারজান৷ চিতাবাঘের মতো দ্রুত ক্ষিপ্রচরণে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, ক্রুদ্ধ সর্পের ছোবল মারার ভঙ্গিতে তার দুই হাত বারংবার আঘাত হানল শত্রুর দেহে, তারপর আবার ছিটকে সরে এসে উপস্থিত হল পরবর্তী আক্রমণের জন্য৷
টারজানের চোখে এইবার স্পষ্ট ভয়ের ছায়া৷ শত্রুর একজোড়া বলিষ্ঠ বাহু তার প্রত্যেকটি আঘাত ব্যর্থ করে দিয়েছে! দু-খানি হাত যেন দুটি লোহার দরজা— ইস্পাত-কঠিন সে-হাত দুটির বাধা এড়িয়ে টারজানের আঘাত রেড-এর শরীর স্পর্শ করতে পারেনি একবারও!
টারজান এইবারে অন্য উপায় অবলম্বন করলে৷ জ্যা-মুক্ত তিরের মতো তার দেহ ছুটে এল শত্রুর উদর লক্ষ করে৷ ওই অঞ্চলে নদীর ধারের গুন্ডারা সাধারণত পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে লড়াই করে, হাত দিয়ে সেই ভীষণ আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা যায় না৷ কিন্তু রেড হুঁশিয়ার মানুষ, সেও অনেক ঘাটের জল খেয়েছে, অন্যান্য বারের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করল না— সাঁৎ করে একপাশে সরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর পায়ে পা লাগিয়ে মারল এক টান!
পরক্ষণেই টারজানের দেহ ডিগবাজি খেয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ল বন্ধ দরজার ওপর!
সমবেত জনতার কণ্ঠে জাগল অট্টহাস্য! টারজানের দুর্দশা তারা উপভোগ করছে সকৌতুকে!
টারজান উঠে দাঁড়াল৷ ভীষণ আক্রোশে সে ধেয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে, তারপর হঠাৎ শূন্যে লাফিয়ে উঠে রেড-এর মাথায় করলে প্রচণ্ড পদাঘাত৷
লাথিটা রেড-এর মাথায় চেপে পড়েনি, মুখের ওপর দিয়ে হড়কে গিয়েছিল— পলকে টারজানের একটি জুতোসুদ্ধ পা ধরে ফেলল রেড৷ কিন্তু শত্রুকে সে ধরে রাখতে পারল না৷ মাটির ওপর সশব্দে আছড়ে পড়েই আবার উঠে দাঁড়াল টারজান৷
উল্লসিত জনতার চিৎকারে ঘর তখন ফেটে পড়ছে! হ্যাঁ, একটা দেখার মতো লড়াই হচ্ছে বটে!
তবে দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিল এটা সাধারণ লড়াই নয়৷ প্রথম প্রথম হয়তো যোদ্ধাদের মধ্যে কিছুটা খেলোয়াড়ি মনোভাব ছিল, কিন্তু এখন তাদের মাথায় চেপেছে খুনের নেশা৷
টারজানের জুতোর তলা ছিল লোহা দিয়ে বাঁধানো৷ রেড-এর মুখের ওপর সেই লৌহখণ্ড এঁকে দিয়েছে রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন৷
রেড-এর গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা, চিবুকটা একপাশে বেঁকে গেছে আঘাতের বেগে৷
হর্ষধ্বনি থেমে গেল৷ রক্তমাখা ক্ষতচিহ্ন এইবার সকলের চোখে পড়েছে৷
হঠাৎ সকলের নজর পড়ল টারজানের উপর৷ প্রায় ২০০ মানুষের দেহের অঙ্গে অঙ্গে ছুটে গেল বিদ্যুৎ-শিহরন— টারজানের হাতের মুঠিতে ঝকঝক করছে একটি ধারালো ছোরা!
জনতা নির্বাক৷ দারুণ আতঙ্কে তাদের কণ্ঠ হয়ে গেছে স্তব্ধ৷
নিঃশব্দে বাঘের মতো গুঁড়ি মেরে টারজান এগিয়ে এল শত্রুর দিকে— রেড তখন নিবিষ্ট চিত্তে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করছে৷
ভীষণ চিৎকার করে আক্রমণ করল টারজান৷ এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল চারটি হাত আর চারটি পায়ের দ্রুত সঞ্চালন, তারপরেই মৃত্যু-আলিঙ্গনে বদ্ধ হয়ে স্থির প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী!
একহাত দিয়ে টারজানের ছোরাসুদ্ধ হাত চেপে ধরেছে রেড, অন্য হাতের পাঁচটা আঙুল চেপে বসেছে শত্রুর কণ্ঠদেশে৷ টারজানও নিশ্চেষ্ট নয়, সে ছোরাসুদ্ধ হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রাণপণে এবং অপর হাতের আঙুলগুলো দিয়ে রেড-এর গলা টিপে ধরেছে সজোরে৷
ঘরের মধ্যে অতগুলি মানুষ স্তব্ধ নির্বাক৷ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখেও কোনো আওয়াজ নেই৷ নিঃশব্দে চলছে মৃত্যুপণ লড়াই৷
হঠাৎ মট করে একটা শব্দ হল— রেড-এর শক্ত মুঠির মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল টারজানের কবজির হাড়, অস্ফুট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল টারজান৷
দুই হাত কোমরে রেখে ধরাশায়ী শত্রুর দিকে দৃষ্টিপাত করলে রেড৷ টারজান উঠল না, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে৷
ভগ্নস্বরে রেড বললে, ‘ওকে এবার একটু জল দাও৷ দেখছ না, মানুষটা যে অজ্ঞান হয়ে গেছে...’
মি. স্কেটন ভুল করেননি৷ ম্যাকফারলেন ওরফে রেড সত্যিই ভালো লোক৷ পরবর্তী জীবনে ম্যাকফারলেন ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছিল এবং সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে সে কুণ্ঠিত হয়নি৷
আষাঢ় ১৩৭৬

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন