সবজান্তার শাস্তি

ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

বর্তমান কাহিনির পটভূমি হচ্ছে একটি মালবাহী জাহাজ এবং তরঙ্গ-গর্জিত উত্তাল সমুদ্র৷

সমুদ্রযাত্রাকে ভিত্তি করে যে-কাহিনি এখানে পরিবেশিত হচ্ছে, সেটি লিখেছেন একজন খ্যাতনামা ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন— ও-ব্রায়ান৷

ক্যাপ্টেন সাহেব বলছেন ঘটনাটি বর্ণে বর্ণে সত্য৷ আমরা তাঁর কথা বিশ্বাস করতে পারি৷ ও-ব্রায়ানের মতো দায়িত্বপূর্ণ কার্যে নিযুক্ত মানুষ ছাপার অক্ষরে ‘গুল’ মারবেন বলে মনে হয় না৷ ওই সামুদ্রিক নাটকে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তি আজও সশরীরে বর্তমান— তাই ক্যাপ্টেন তাঁর লেখার মধ্যে আসল নামগুলো বদলে দিয়েছেন৷

তা বদলান, লোকগুলোর সঠিক কুষ্ঠি-ঠিকুজি দিয়ে আমাদের কী দরকার? আমরা গল্প শুনতে পেলেই খুশি৷

আচ্ছা, এবার কাহিনি শুরু করছি—

‘এক্স’ জাহাজটা নেহাত ছোটোখাটো নয়, পাকা ২৫০০ টন তার ওজন৷ ১৯০৫ সালে অক্টোবর মাসে টাকামা অঞ্চলে এসে উক্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন কয়েকজন অভিজ্ঞ নাবিকের প্রয়োজন অনুভব করলেন৷

লোক নেওয়া হল৷

সর্দার খালাসির পদে নিযুক্ত হল যে লোকটি, তার চেহারাটা সত্যি দর্শনীয় বস্তু—

দেহ পেশিবহুল ও দৃঢ়, মুখ পাথরের মতো কঠিন নির্বিকার, কালো চুলে ঘেরা চওড়া কপালের নীচে একজোড়া কালো চোখের উগ্র দৃষ্টিতে রূঢ়তার প্রলেপ৷

নাম তার ‘ম’৷

বয়স প্রায় চল্লিশ৷

‘ম’ রূপবান ছিল না৷ কিন্তু পৌরুষের প্রভাবে ঢাকা পড়েছিল রূপের অভাব৷ প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল সে৷ সাধারণ নাবিকরা তার প্রতি আকৃষ্ট হত, উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তাকে উপেক্ষা দেখাতে সাহস করতেন না৷ জাহাজের কাজকর্মে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল৷ সে যদি তার কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত থেকে নিজের কাজে মনোনিবেশ করত তাহলে ব্যক্তিগত জীবনে সে নিশ্চয়ই উন্নতি করতে পারত৷

কিন্তু ‘ম’ হচ্ছে সবজান্তা মানুষ!

সব বিষয়েই সে ভালো বোঝে এবং অন্য লোকগুলো কিছুই বোঝে না, এই ছিল তার ধারণা৷

এই ধারণা পোষণ করে সে যদি ক্ষান্ত থাকত তবে কোনো অসুবিধা ছিল না, কিন্তু পৃথিবীর যাবতীয় মূর্খকে জ্ঞান দেওয়ার গুরুদায়িত্ব সে পালন করত অসীম নিষ্ঠার সঙ্গে!

‘এক্স’ জাহাজের কাজে নিযুক্ত হওয়ার পর আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই সে আবিষ্কার করে ফেলল যে ডেকের সাদা রংটা মোটেই ভালো হয়নি!

মাস্তুলের উজ্জ্বল রংটাও অতিশয় আপত্তিজনক মনে হল, তা ছাড়া অন্যান্য কলকবজার বিন্যাসব্যবস্থাও তার মনঃপূত হল না৷

পেনসিল কাগজ হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে যাবতীয় দোষত্রুটির বিশদ বিবরণ লিখতে লাগল সে৷

অবিলম্বে এইসব ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধন করা দরকার!

ডেকের ওপর দুজন শিক্ষানবিশ সকৌতুকে তার চালচলন লক্ষ করছিল, কিন্তু কোনো মন্তব্য করার সাহস তাদের ছিল না৷

‘ম’-র চেহারার মধ্যে ছিল এমন এক বন্য ব্যক্তিত্বের প্রকাশ যে সাধারণ মানুষ চট করে তার আচরণের প্রতিবাদ করতে সাহস পেত না৷

কিন্তু জাহাজের প্রধান মেট বা দ্বিতীয় অধ্যক্ষ ‘বি’ খুব সাধারণ মানুষ ছিল না৷ সে যখন দেখল বিনা কারণে কতকগুলি পুরোনো দড়ি বাতিল করে ‘ম’ নামধারী সর্দার-খালাসি নূতন দড়ি ব্যবহার করতে চাইছে তখন সে বাধা দিল—

‘মাল বাঁধার কাজ পুরানো দড়িতেই চলবে৷ নতুন দড়ি শুধু গিয়ার আর নোঙর বাঁধার কাজে ব্যবহার করা হয়৷ ভবিষ্যতে আমার অনুমতি ছাড়া তুমি নতুন দড়িতে হাত দেবে না৷’

নতুন দড়ির ফাঁসটা হাত থেকে ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল সর্দার-খালাসি—

‘তুমি যদি মনে করে থাক যে কথায় কথায় তোমার কাছে আমি অনুমতি নিতে ছুটব তাহলে তুমি ভুল করেছ৷’

‘ম’ স্থান ত্যাগ করার উপক্রম করলে, কিন্তু তাকে বাধা দিলে ‘বি’, ‘একটা কথা শুনে যাও৷ ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে কথা কইতে হলে স্যার বলবে, বুঝেছ?’

বিদ্রূপ-জড়িত হাসির সঙ্গে উত্তর এল, ‘বুঝেছি, স্যার!’

উইলসন নামে যে শিক্ষানবিশ নাবিকটি সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে সমস্ত ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল৷

তার সহযোগীকে সে বললে, ‘নতুন সর্দার-খালাসি আর আমাদের প্রধান মেট পরস্পরকে পছন্দ করছে না৷ একটা গোলমাল বাধবে মনে হচ্ছে৷’

উইলসনের ধারণা যে ভুল হয়নি, খুব শীঘ্রই তার প্রমাণ পাওয়া গেল৷

কয়েকদিন পরের কথা৷ ঠিক সাড়ে ছয়টার সময়ে সর্দার-খালাসির কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল প্রধান মেট ‘বি’—

‘ওহে সর্দার! কাল রাতে তোমাকে যে হুকুম দিয়েছিলাম আজ সকালেই তুমি সেটা ভুলে গেছ? সকাল ছয়টার মধ্যে আমি লোকজন লাগিয়ে ডেকটাকে পরিষ্কার করে রাখতে বলেছিলাম৷ এখন সাড়ে ছয়টা বাজে অথচ ডেক আগের মতোই ময়লা হয়ে পড়ে আছে৷ ওখানে একটিও লোক নেই— ব্যাপারটা কী? কাল রাতের কথা আজ সকালেই ভুলে গেলে? তোমার স্মৃতিশক্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে৷’

‘ম’ ধূমপান করছিল৷

সে নির্বিকার চিত্তে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললে, ‘আমি কিছুই ভুলিনি৷ আমার স্মৃতিশক্তি নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই৷ আসল কথা হচ্ছে যে ঘুমটা ভালো হলে কাজটাও ভালো হয়৷ তাই আমি ওদের আরও ঘণ্টা দুই ঘুমানোর অনুমতি দিয়েছি৷ ঠিক আটটার সময়ে ওরা কাজে লাগবে৷’

‘তুমি অনুমতি দিয়েছ? তুমি অনুমতি দেওয়ার কে? ফের যদি তুমি ‘‘ওপরচালাকি’’ কর তাহলে তোমাকে আমি সর্দার-খালাসির পদ থেকে খারিজ করে দেব৷’

‘তুমি আমায় খারিজ করবে?’ সর্দার-খালাসির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, ‘ওহে খোকা! যখন তুমি দোলনায় দুলতে দুলতে বোতলের দুধ খাচ্ছ তখন থেকে আমি জাহাজের কাজে লোকজন খাটাচ্ছি, বুঝলে?’

‘ম’ আরও যেসব কথা বলতে যাচ্ছিল সেগুলো নিশ্চয়ই ‘বি’-র পক্ষে খুব সম্মানজনক হত না, কিন্তু ‘বি’ তাকে আর কথা বলতে দিল না৷

সর্দার-খালাসির চোয়ালের উপর সে প্রয়োগ করলে, মুষ্টিবদ্ধ হস্তের নিদারুণ মুষ্টিযোগ!

আচমকা ঘুসি খেয়ে ছিটকে পড়ল ‘ম’৷

প্রথমে সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, তারপর বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে সে উঠে দাঁড়াল এবং খেপা ষাঁড়ের মতো গর্জন করে তেড়ে এল প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে৷

‘ম’-র শারীরিক শক্তি ছিল ‘বি’-র চাইতে অনেক বেশি৷

কিন্তু ‘বি’ পাকা মুষ্টিযোদ্ধা, তার বাঁ-হাতের বজ্রমুষ্টি বারংবার ছোবল মারল প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে৷

দেখতে দেখতে ‘ম’-র মুখের উপর ফুটে উঠল তপ্ত রক্তধারার বিচিত্র আলপনা৷

ডেকের ওপর ততক্ষণে ভিড় জমিয়েছে নাবিকের দল৷ ‘ম’-র রক্তমাখা মুখের অবস্থা দেখে একজন মন্তব্য করলে, ‘সর্দার-খালাসির হয়ে এসেছে৷’

কিন্তু ‘ম’ ‘পোড় খাওয়া’ মানুষ, এত সহজে সে হার মানতে রাজি হল না৷

দুই বাহু বিস্তার করে সে ‘বি’-কে জড়িয়ে ধরলে এবং চোখের পলক ফেলার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বীর দেহটাকে নিক্ষেপ করলে জাহাজের ডেকের ওপর!

একটা লোহার যন্ত্রের গায়ে ‘বি’-র মাথাটা সজোরে ঠোক্কর খেল, দারুণ যাতনায় লুপ্ত হয়ে এল তার চেতনা৷

আচ্ছন্ন অবস্থায় সে দেখতে লাগল রাশি রাশি সরষে ফুল!

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ‘বি’ যখন উঠে দাঁড়াল, তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী মুখের রক্ত মুছতে ব্যস্ত৷ দুই শত্রু পরস্পরকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করলে, তারপর ‘বি’ বললে, ‘লড়াই শেষ হয়নি৷ আমরা আবার লড়ব৷ দুজন সহযোগী আর একজন মধ্যস্থ এখানে থাকবে৷ যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে একজন লম্বা হয়ে শুয়ে না-পড়বে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চলবে— রাজি?’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে ‘ম’ বললে, ‘ঠিক আছে৷’

জাহাজের খালাসিরা মহা উৎসাহে কাজে লেগে গেল৷ বিকালের মধ্যেই ডেকের ওপর দড়িদড়া লাগিয়ে একটা সুন্দর মুষ্টিযুদ্ধের ‘রিং’ বা আখড়া বানিয়ে ফেলল তারা৷

সবাই প্রস্তুত৷ এবার লড়াইটা লাগলে হয়৷ অকস্মাৎ মূর্তিমান বিঘ্নের মতো অকুস্থলে উপস্থিত হলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন৷

চারদিকে চোখ বুলিয়ে তিনি বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার? সার্কাস-টার্কাস হবে নাকি?’

মেট সমস্ত ব্যাপারটা ক্যাপ্টেনকে বুঝিয়ে বললে৷

সব শুনে ক্যাপ্টেন সাহেব একটি বক্তৃতা দিলেন৷

সেই দীর্ঘ বক্তৃতার সারমর্ম হচ্ছে যে ঘুসির জোরে যারা মানুষের ভ্রম সংশোধন করতে চায়, তাদের সঙ্গে তিনি একমত হতে পারছেন না এবং তাঁর জাহাজে এই ধরনের বর্বরতা তিনি বরদাস্ত করবেন না কিছুতেই৷

ক্যাপ্টেনের কথার ওপর কথা চলে না৷ লড়াই বন্ধ হয়ে গেল৷

কয়েকদিন পরেই জাহাজের উপর হানা দিল প্রবল ঝটিকা৷ ক্যাপ্টেন ডেকের ওপর ছিলেন, জাহাজের একটা বৃহৎ অংশ ঝড়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়ল তাঁর মাথার ওপর এবং ওই ভাঙাচোরা অংশসমেত তাঁর দেহ ছিটকে পড়ল সমুদ্রের জলে৷

ক্যাপ্টেনকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না৷ উত্তাল তরঙ্গের বুকে হারিয়ে গেলেন জাহাজের প্রধান অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ‘জেড’৷

অন্যান্য খালাসিরা ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল৷ প্রধান মেট ‘বি’ এবং তার দুই সহকারী ভয়ার্ত নাবিকদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে প্রাণপণে যুদ্ধ করলে ঝড়ের বিরুদ্ধে৷

‘বি’-র উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসে সেবার ভরাডুবি থেকে রক্ষা পেল ‘এক্স’ জাহাজ৷

ক্যাপ্টেন তো আগেই মারা গিয়েছিলেন, এখন জাহাজ পরিচালনার ভার নেয় কে?

‘বি’ নিজেই এবার পোত-অধ্যক্ষ বা ক্যাপ্টেনের স্থান অধিকার করলে৷ জাহাজের ভাঙাচোরা অংশগুলি মেরামত করে সে নাবিকদের ডাকল৷ সমবেত মাঝি-মাল্লাদের উদ্দেশ্য করে সে জানিয়ে দিলে, যদিও পূর্ব-নির্ধারিত ব্যবস্থা অনুযায়ী জাহাজের গন্তব্যস্থল ছিল ‘পাগেট সাউন্ড’ নামক স্থান, কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় ‘এক্স’ জাহাজ এখন সেখানে যাবে না৷

জাহাজ যেখান থেকে সাগরে ভেসেছিল আবার সেই বন্দরেই ফিরে যাবে, অর্থাৎ জাহাজের গন্তব্যস্থল এখন পাগেট সাউন্ড নয়— লিভারপুল৷

‘ম’ হঠাৎ প্রতিবাদ জানিয়ে বললে, মেট-এর সিদ্ধান্ত তার মনঃপূত নয় এবং ‘বি’ যদি তার সঙ্গীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাহলে সে বুঝবে নাবিকরা কেউ তাকে সমর্থন করছে না৷

‘বি’ বললে, কারো মতামত জানতে সে এখানে নাবিকদের ডাকেনি৷

তার মতামত জানানোর জন্যই সে সকলকে ডেকে পাঠিয়েছিল৷

নাবিকদের ভিতর থেকে একটা মূলাটো জাতীয় বর্ণসংকর উঠে দাঁড়িয়ে ‘বি’-কে জানাল যে সে ‘ম’-র সঙ্গে একমত৷ জাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা ‘বি’-র নেই, অতএব পরিচালনার ভার ‘ম’-কে দেওয়া উচিত৷

খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো ঘুরে দাঁড়াল ‘বি’, ‘বাঃ! ক্যাপ্টেনের মৃত্যুর জন্য তুমিই তো দায়ী, এখন আবার লম্বা বক্তৃতা ঝাড়ছ?’

সমবেত নাবিকমণ্ডলী চমকে উঠল— এ আবার কী কথা?

‘বি’ আবার বললে, ‘ভেবেছিলুম কিছু বলব না৷ কিন্তু তুমি যখন মুখ খুলেছ তখন সত্যি কথাটা সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি৷ জাহাজের চাকা ঘোরানোর ভার ছিল তোমার ওপর— ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে ছিলেন তোমার পাশে৷ তুমি যদি চাকা ছেড়ে ভয়ে পালিয়ে না যেতে তাহলে হয়তো ক্যাপ্টেনের মৃত্যু হত না৷ ভীরু! কাপুরুষ! নিজে দোষ করে আবার বড়ো বড়ো কথা কইতে লজ্জা করে না! হ্যাঁ, তোমার সঙ্গীদের একটা কথা জানিয়ে দেওয়া দরকার— এখন থেকে তুমি দ্বিতীয় শ্রেণির নাবিক, প্রথম শ্রেণির থেকে তোমাকে আমি খারিজ করলুম৷ এখন তুমি অনেক কম টাকা পাবে আর বন্দরে পৌঁছেই তোমার নামে আমি নালিশ জানাব৷’

মূলাটো গজগজ করতে করতে চলে গেল৷

‘বি’-র সহকারী ব্যাপারটা পছন্দ করলে না৷

বর্ণসংকর মূলাটোটা পাকা গুন্ডা, ইতিপূর্বে একটি লোককে সে ছোরা মেরেছিল৷

‘বি’ অবশ্য এই ধরনের লোককে পরোয়া করে না৷

ছোরাছুরির ভয়ে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার মতো মেরুদণ্ডহীন মানুষ সে নয়৷

কিছুদিন পরে হল আর একটি দুর্ঘটনার সূত্রপাত৷

একজন নাবিক হঠাৎ ডেকের ওপর থেকে সমুদ্রের জলে পড়ে গেল৷ তাকে উদ্ধার করার জন্য নৌকা নামাতে গিয়ে নাবিকরা দেখল, নোঙর তোলার জন্য যে কাষ্ঠ-আধারটা ব্যবহার করা হয় সেটা যথাস্থানে নেই৷ কোনোরকমে ব্যবস্থা করে লোকটাকে সলিলসমাধি থেকে উদ্ধার করা হল বটে কিন্তু বেশ দেরি হয়ে গেল৷ ইতিমধ্যে হিংস্র সামুদ্রিক পক্ষীর আক্রমণে লোকটির হাত এবং মুখ হয়ে গেছে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত৷

‘ম’ বললে, যে লোকটি জলে পড়েছিল তার দুর্দশার জন্য দায়ী ‘বি’, কারণ তার আদেশেই ওই নোঙরগুলো খুলে ফেলা হয়েছিল৷ শুধু ওইটুকু বলে সে চুপ করলে না, তার আশেপাশে সমবেত নাবিক-বন্ধুদের সে বোঝাতে লাগল যে ‘বি’ মোটেই অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করার উপযুক্ত নয়৷

‘ম’-র বক্তব্যের মধ্যে যুক্তির অভাব থাকলেও বিদ্রূপের অভাব ছিল না কিছুমাত্র৷

‘বি’ একটু দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল৷ ‘ম’-র উচ্চকণ্ঠের মন্তব্যগুলি খুব সহজেই তার শ্রবণপথে প্রবেশ করছিল৷ সে বুঝল, নাবিকদের উপলক্ষ্য করে ‘ম’ কথাগুলো তাকেই শোনাতে চাইছে৷

‘বি’ সামনে এসে ‘ম’-কে সম্বোধন করে বললে, ‘শোনো ‘‘ম’’, আজ থেকে তুমি আর খালাসিদের সর্দার নও৷ তোমাকে আমি সর্দারের পদ থেকে খারিজ করে সাধারণ মাল্লার পদে বহাল করলুম৷ তোমার মাইনেও কমে গেল৷’

‘ম’-র মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল, দুই হাতের মুঠি পাকিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার কাজ আমি জানি৷ তুমি আমাকে খারিজ করবার কে? তোমার হুকুম আমি মানতে রাজি নই৷’

‘বি’-র কণ্ঠস্বরেও জাগল রোষের আভাস, ‘আমার কথা না-শুনলে তোমার হাতে আমি হাতকড়া লাগাব৷’

‘সত্যি?’ হা-হা শব্দে হেসে উঠল ‘ম’, ‘একবার চেষ্টা করে দেখো৷’

‘বি’-র আদেশে তার সহকারী একটা হাতকড়া নিয়ে এল কেবিন থেকে৷

একজন মাল্লা হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওহে মিস্টার! ‘‘ম’’-র সঙ্গে বেশি চালাকি করার চেষ্টা করলে তোমাকে আমরা ছেড়ে দেব না৷’

‘বাঃ! বাঃ!’ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল সেই বর্ণসংকর মূলাটো, ‘চমৎকার! চমৎকার! ভাইসব— আমরা থাকতে ওই খোকাটা আমাদের সর্দারকে অপমান করবে? ডান্ডাগুলো একবার নিয়ে এসো দেখি, বুড়ো খোকাকে ঠান্ডা করার দাওয়াই আমি বাতলে দিচ্ছি৷’

‘সাবধান!’ গর্জে উঠল ‘বি’, সাঁৎ করে পকেট থেকে সে টেনে আনল একটা চকচকে রিভলভার, ‘তোমাকে গুলি করে মারলে আমার কোনো শাস্তি হবে না৷ আইন আমার পক্ষে, সমুদ্রের বুকে জাহাজের ওপর বিদ্রোহের চেষ্টা আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ৷ বিদ্রোহীকে ঊর্ধ্বতন কর্মচারীর গুলি করার অধিকার আছে৷ অতএব সাবধান!’

সত্যি কথা৷ মূলাটোর উচ্চকণ্ঠ তৎক্ষণাৎ নীরব হল৷

‘বি’-র সহকারী ততক্ষণে হাতকড়া নিয়ে এসেছে৷

হাতকড়াটা সহকারীর হাত থেকে নিয়ে ‘বি’ সেটাকে ডেকের ওপর ছুড়ে দিলে, ‘নাও, এবার ওই হতভাগা ‘‘ম’’-র হাতে তোমরা লোহার বালা পরিয়ে দাও চটপট৷’

সামনে এগিয়ে এল এক জোয়ান খালাসি, ‘বি’-র চোখের ওপর চোখ রেখে সে বললে, ‘হ্যাঁ, চটপট করছি৷’ পরক্ষণেই এক লাথি মেরে সে হাতকড়াটাকে পাঠিয়ে দিলে জাহাজের নর্দমার মধ্যে! প্রকাশ্য বিদ্রোহ!

‘বি’ তার চওড়া কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে বললে, ‘বেশ, তোমরা যা খুশি করো৷ তবে একটা কথা জেনে রাখো, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ‘ম’-র হাতে হাতকড়া না-লাগাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কেউ তামাক কিংবা সিগারেট পাবে না৷ আমার আদেশ পালন না-করলে ধূমপান বন্ধ, বুঝলে?’

‘বি’ তার নিজের কেবিনে ফিরে এল৷

তিন দিনের মধ্যেই অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ল৷

‘বি’-র সহকারী শিক্ষানবিশ ছেলেটিকে সবাই মিলে এমন প্রহার করল যে ছেলেটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলল৷

খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠল ‘বি’, ‘শয়তানগুলোকে ভালোভাবে শিক্ষা দিতে হবে৷’

‘বি’ সোজা এসে ঢুকল ভাঁড়ার ঘরে৷

একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল বিদ্রোহী মাল্লার দল, তাদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করলে, ‘কী করতে চাও মিস্টার?’

‘বলছি, একটু অপেক্ষা করো৷’ জাহাজের রাঁধুনিকে ভাঁড়ার ঘর থেকে বাইরে এনে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলে ‘বি’, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ‘ম’-র হাতে হাতকড়া না-লাগাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের খাওয়াদাওয়া বন্ধ৷ ভাঁড়ার ঘর আর রান্নাঘর আমি তালা লাগিয়ে বন্ধ করে দিলুম৷’

সমবেত জনতার কণ্ঠে জাগল হিংস্র গর্জন-ধ্বনি৷

সাঁ করে উড়ে এসে একটা কাঠের ডান্ডা ‘বি’-র মাথা ঘেঁষে দরজার উপর সশব্দে আছড়ে পড়ল, একটুর জন্য সে বেঁচে গেল৷

বিনা বাক্যব্যয়ে পকেট থেকে রিভলভার বার করলে ‘বি’৷

রিভলভার দেখে বিদ্রোহী নাবিকদের আক্কেল-গুড়ুম হয়ে গেল৷ চটপট পা চালিয়ে তারা সরে পড়ল ‘বি’-র সামনে থেকে৷ ‘বি’-র ওষ্ঠাধরে জাগল তিক্ত হাসির রেখা, ‘গরম গরম গুলি খেতে বোধ হয় তোমাদের ভালো লাগবে না, কি বলো?’

তারপর পিছন ফিরে সে অকুস্থল ত্যাগ করলে৷

তার সঙ্গ নিলে দুজন সহকারী৷

সেদিন সন্ধ্যার পরেই আকাশের অবস্থা হয়ে উঠল শোচনীয়৷ ঘন মেঘের কালো ছায়া হানা দিল আকাশের গায়ে, অন্ধকার শূন্যে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে হেঁকে উঠল বজ্র— গর্জিত বাতাসের সঙ্গে নাচতে নাচতে নেমে এল প্রবল বৃষ্টিধারা৷

খালাসিরা কিন্তু কেউ জাহাজ রক্ষা করতে এগিয়ে এল না৷ ‘বি’ তার দুই সহকারীর সাহায্যে পালগুলো নামিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল৷

আচম্বিতে ছুটে এল কয়েকটা কাঠের ডান্ডা ‘বি’-র দিকে৷ একটা ডান্ডা ‘বি’-র পেটে লাগতেই তার হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে পড়ল৷ তৎক্ষণাৎ অন্ধকারের ভিতর থেকে ছুটে এসে ‘ম’ রিভলভারটা তুলে নিয়ে ‘বি’-র দেহ লক্ষ করে গুলি ছুড়ল৷ নিশানা ব্যর্থ হল, ‘বি’ লম্বা দৌড় মারল তার কেবিনের দিকে৷ তার পিছনে তাড়া করে ছুটে এল ক্ষিপ্ত মাল্লার দল৷

‘বি’-র দুই সহকারী এবার রঙ্গমঞ্চে ভূমিকা গ্রহণ করলে৷

একজন এগিয়ে এসে জনতাকে লক্ষ করে রিভলভার ছুড়ল৷ একটা কাতর আর্তনাদ ভেসে এসে জানিয়ে দিল রিভলভারের গুলি লক্ষ্য ভেদ করেছে৷

হঠাৎ অন্ধকারের বুকে বিদ্যুৎ হেনে উড়ে এল একটা মস্ত ছোরা৷ চিৎকার করে উঠল ‘বি’-র একজন সহকারী— ছোরাটা তার কাঁধের ওপর বসে গেছে৷

আহত ছেলেটির অবশ হাত থেকে রিভলভারটা টেনে নিয়ে ‘বি’ দু-বার গুলি চালাল৷ জাহাজের অন্ধকার গহ্বর থেকে কাতর আর্তস্বর জেগে উঠে জানিয়ে দিলে গুলি যথাস্থানে পৌঁছে গেছে৷

মাঝিমাল্লারা খেপে গেল৷ অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে তারা ছুড়তে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে কাঠের ডান্ডা আর লোহার টুকরো৷

‘বি’ তার দুই সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে ‘চার্টরুম’-এর ভিতর ঢুকে দরজায় ভিতর থেকে তালা লাগিয়ে দিলে৷

বন্ধ দরজার ওপর পড়তে লাগল আঘাতের পর আঘাত, কিন্তু ওক কাঠের শক্ত দরজা অত সহজে ভাঙা সম্ভব নয়৷

ইতিমধ্যে নূতন বিপদের সূত্রপাত৷

জাহাজের ওপর আছড়ে পড়ছে ক্ষিপ্ত ঝটিকা এবং তার তলদেশে আঘাত হেনে লাফিয়ে উঠছে তরঙ্গ-বন্ধুর উত্তাল সমুদ্র৷

চালকবিহীন জাহাজের তখন যায় যায় অবস্থা, এখনই বুঝি ভরাডুবি হয়৷

বিপদের গুরুত্ব বুঝে মাল্লারা লড়াই থামিয়ে জাহাজ বাঁচাতে ছুটল৷

কিছুক্ষণ পরেই আবার করাঘাতের শব্দ বেজে উঠল বন্ধ দরজার গায়ে, একজন নাবিক আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মি. বি— দরজা খোলো৷ জাহাজ প্রায় ডুবতে বসেছে৷ তুমি তাড়াতাড়ি এসো৷’

উদ্যত রিভলভার হাতে ‘বি’ দরজা খুলল৷

জলসিক্ত দেহে নাবিকটি চেঁচিয়ে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি এসো, জাহাজ ডুবছে!’

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে!

‘বি’ শান্তস্বরে বললে, ‘আমি কী করব? তোমাদের সর্দারের কাছে যাও৷’

‘সে হতভাগা জাহাজ চালাতে জানে না৷ এতক্ষণ ধরে সে উলটোপালটা হুকুম চালিয়ে জাহাজটাকে ডোবাতে বসেছে৷ তুমি ছাড়া কেউ এখন জাহাজ বাঁচাতে পারবে না— তাড়াতাড়ি চলো৷’

‘বি’-র প্রধান সহকারী এগিয়ে এল, ‘কিন্তু ‘‘বি’’ বাধা দিলে, ‘না৷ আগে এই লোহার বালা দুটো নিয়ে যাও’—

টেবিলের টানা খুলে ‘বি’ একজোড়া হাতকড়া তুলে ধরলে ‘ওই হতভাগা ‘‘ম’’ আর ছুরিমারা গুন্ডা মূলাটোকে আগে বন্দি করে নিয়ে এসো৷ আমার আদেশ পালিত না হলে আমি জাহাজের ভার গ্রহণ করব না৷’

একটানে হাতকড়া দুটো ছিনিয়ে নিয়ে নাবিকটি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেল৷

একটু পরেই একদল নাবিক ঘরে প্রবেশ করলে, তাদের সঙ্গে রয়েছে ‘ম’! তার দুই হাতে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে হাতকড়া৷

‘বি’ বললে, ‘আর একজন কোথায়? ওই মূলাটো গুন্ডা— তার কী হল?’

একজন নাবিক বললে, ‘পাজিটা ছুরি বার করেছিল স্যার৷’

‘হুঁ, তারপর?’

‘ইয়ে, মানে... ছুরিটা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমরা... মানে... ইয়ে’...

‘বি’ ধমক দিলে, ‘স্পষ্ট করে বলো কী বলতে চাও?’

‘ইয়ে, মানে— ঝটাপটি করতে করতে মূলাটোটা হঠাৎ কেমন করে জলে পড়ে গেল৷’

বাঁচা গেল৷

‘বি’ আর জেরা করলে না৷ সে বুঝল, যেভাবেই হোক গুন্ডাটা সমুদ্রগর্ভে সমাধিলাভ করেছে৷ সে দরজা খুলে বাইরে এসে জাহাজের ডেকের ওপর দাঁড়াল৷

‘এক্স’ জাহাজ সেযাত্রা বেঁচে গেল৷

‘বি’-র নির্দেশ অনুযায়ী প্রাণপণে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে মাল্লারা জাহাজটাকে রক্ষা করলে ক্ষিপ্ত সমুদ্রের গ্রাস থেকে৷

জাহাজ নিরাপদে পৌঁছে গেল তার নিজস্ব বন্দরে৷

সর্দার-খালাসি ‘ম’-কে গ্রেপ্তার করে বিচারকের সামনে উপস্থিত করা হল৷ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টির অভিযোগ৷

বিচারে অবশ্য তার শাস্তি হয়নি, উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা গেল না৷ বিচারক তাকে ছেড়ে দিলেন৷

তবে আদালতের দরবারে শাস্তি না-পেলেও ‘বি’-র হাতে যথেষ্ট নিগ্রহ এবং অপমান ভোগ করেছিল ‘ম’৷

সবজান্তা মানুষটির মানসপটে শুষ্ক ক্ষতচিহ্নের মতো চিরকাল জেগে থাকবে সেই লাঞ্ছনার ইতিহাস৷

বৈশাখ ১৩৭৭

সকল অধ্যায়
১.
বাঘিনী
২.
মরণ খেলার খেলোয়াড়
৩.
অগ্নিপরীক্ষা
৪.
সবজান্তার শাস্তি
৫.
টারজানের প্রতিদ্বন্দ্বী
৬.
জনতার প্রতিনিধি
৭.
অসুর বনাম মহিষাসুর
৮.
আত্মা ও দুরাত্মা
৯.
সংকেত
১০.
নিশানা নির্ভুল
১১.
দানবের ক্ষুধা
১২.
দুর্যোধনের গদা
১৩.
ক্যারাটে মৃত্যুবাহী
১৪.
জেহাদ
১৫.
আঁধার রাতের পথিক
১৬.
মরণ-ফাঁদ
১৭.
দুঃস্বপ্নের রাত
১৮.
দ্বৈরথ
১৯.
অস্ট্রেলিয়ার লাল আতঙ্ক
২০.
দানবের অপমৃত্যু
২১.
নরকের প্রহরী
২২.
নায়কের জন্ম
২৩.
তাইগরেরো
২৪.
সৈনিকের প্রথম অভিজ্ঞতা কায়না
২৫.
সৈনিকের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা শয়তানের ফাঁদ
২৬.
সৈনিকের তৃতীয় অভিজ্ঞতা শত্রু
২৭.
সৈনিকের চতুর্থ অভিজ্ঞতা শত্রু (দ্বিতীয় খণ্ড)
২৮.
সৈনিকের পঞ্চম অভিজ্ঞতা নরখাদক দেবতা
২৯.
সৈনিকের ষষ্ঠ অভিজ্ঞতা প্রতিহিংসা
৩০.
দেবী দর্শন
৩১.
ডুয়েল

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%