তাইগরেরো

ময়ূখ চৌধুরী (প্রসাদ রায়)

প্রথম পরিচ্ছেদ

প্রথম দর্শনেই তিক্ততার সৃষ্টি!

আর্নস্ট হস্তক্ষেপ না-করলে তখনই শুরু হত মারামারি৷ দুই পক্ষের মাঝখানে দাঁড়াল আর্নস্ট, ফাভেলকে মিষ্টি কথায় শান্ত করে ছোটোভাইকে সে টেনে নিয়ে গেল একপাশে, তারপর বলল, ‘বহুদিন পরে তোর সঙ্গে দেখা হল আলেক্স৷ দারুণ ভালো লাগছে৷’

দীর্ঘকাল পরে দাদার দেখা পেয়ে সাশাও খুব খুশি হয়েছিল, কিন্তু ফাভেল নামে অপরিচিত মানুষটির অভদ্র আচরণ তার মন থেকে সব আনন্দ মুছে দিয়েছিল— ক্রুদ্ধ স্বরে সে প্রশ্ন করল, ‘লোকটা কে?’

আর্নস্ট বিব্রত বোধ করল, ‘ওর নাম ফাভেল৷ লোকটা ব্রেজিলের স্থানীয় বাসিন্দা, আমার সঙ্গে এক কারখানায় কাজ করে৷’

‘এমন অভদ্র মানুষের সঙ্গে তুমি কাজ কর?’

‘ইয়ে— মানে— একেবারে একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো যায় না৷ লোকজনের সঙ্গে মিশতেই হয়৷ এখানে ফাভেলের চাইতেও খারাপ লোক আছে৷ ফাভেল আমার বন্ধু নয়, সহকর্মী মাত্র৷ ওকে নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই৷ তারপর তোর খবর কী?’

সাশা জানাল দেশ থেকে, অর্থাৎ রাশিয়া থেকে, চিঠি পেয়ে সে আর্নস্ট সিমেলের বর্তমান ঠিকানা জানতে পেরেছে৷ অনেক ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা সহ্য করে ‘পাসো ফানডো’ শহরে এই হোটেলের ভিতর দাদাকে সে পাকড়াও করেছে৷ আর্নস্ট আগে ছিল ব্রেজিলের ‘মাত্তো গ্রসো’ নামক অরণ্যসংকুল স্থানে, পরে স্থান পরিবর্তন করে উপস্থিত হয়েছে এই ‘পাসো ফানডো’ শহরে...

আজকের ব্যাপার নয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেকার কথা৷ আর্নস্ট সিমেল আর সাশা সিমেল দুই ভাই৷ জাতে তারা রুশ৷ কিন্তু জন্মস্থান ল্যাটভিয়া৷ বড়ো ভাই আর্নস্ট ছোটোবেলা থেকেই কিছুটা খামখেয়ালি আর বেপরোয়া৷ কোনো বিষয়ে ঝোঁক চাপলে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না-করেই সে এগিয়ে যেত এবং অজানা বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করত না কিছুমাত্র৷ কোনো এক অশুভ মুহূর্তে তার মনে হল হিরার জন্য বিখ্যাত ব্রেজিলের মাত্তো গ্রসো নামক বনভূমিতে হিরার সন্ধান পেলে রাতারাতি অগাধ অর্থের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে— সঙ্গেসঙ্গে সে রওনা হল পূর্বোক্ত স্থানের উদ্দেশে৷ তারপর বেশ কয়েক বছর সে নিরুদ্দেশ... দীর্ঘকাল পরে বাড়িতে তার চিঠি এল— জানা গেল আর্নস্ট সিমেল এখন আর মাত্তো গ্রসোতে নেই, রয়েছে ব্রেজিলেরই পাসো ফানডো নামক শহরে৷

বড়ো ভাইকে ছোটোবেলা থেকেই দারুণ ভালোবাসত আশা সিমেল৷ খামখেয়ালি স্বভাবের বেপরোয়া আর্নস্ট ছিল ছোটোভাই সাশার চোখে মস্ত ‘হিরো’! কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে সাশা যখন যৌবনে পা দিয়েছে সেইসময় একটা অবাঞ্ছিত ঘটনায় সমগ্র পৃথিবী সম্পর্কে তিক্ত হয়ে উঠল সে— কাজকর্মে ইস্তফা দিয়ে সে পৌঁছে গেল পাসো ফানডো শহরে এবং বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর বড়োভাই আর্নস্টের দেখা পেল সেখানকার একটা হোটেলের মধ্যে৷ দীর্ঘ অদর্শনের পর মিলনের আনন্দ ভালো করে উপভোগ করতে পারল না দুই ভাই— ফাভেল নামে একটি স্থানীয় মানুষ হঠাৎ অপমান করে বসল ছোটো ভাই সাশাকে৷ ব্যাপারটা কোনোমতে সামলে নিল আর্নস্ট৷ মালপত্র একটা হোটেলে রেখে পায়ে হেঁটে দাদার খোঁজে বেরিয়েছিল সাশা, পরের দিন জিনিস নিয়ে চলে এল দাদার আস্তানায়৷

কলকবজার কাজ দুই ভাইয়েরই জানা ছিল৷ ভাঙা যন্ত্রপাতি আর অকেজো অস্ত্র মেরামতে আর্নস্ট ছিল অতিশয় দক্ষ৷ দাদার মতো পাকা ওস্তাদ না হলেও মোটামুটি কলকবজার কাজ জানত সাশা৷ দাদার সঙ্গে কথা বলে সাশা জানতে পারল আর্নস্ট এখন হিরার সন্ধান ছেড়ে স্থানীয় একটি জার্মান ব্যবসায়ীর কারখানায় যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ করছে৷ দাদার খামখেয়ালি স্বভাব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকলেও হিরার সন্ধান ছেড়ে হঠাৎ একটা অখ্যাত শহরে মিস্ত্রির কাজ নিয়ে দাদাকে জীবিকানির্বাহ করতে দেখে সাশার মনে হল ব্যাপারটা অহেতুক খামখেয়ালি কাণ্ড নয়— এর ভিতর কিছু রহস্য আছে৷ আর্নস্ট জামা খুলতেই রহস্য কিছুটা পরিষ্কার হল— তার কাঁধের উপর দেখা গেল একটি অর্ধশুষ্ক ক্ষতচিহ্ন! মনে হয়, অস্ত্রাঘাতের ফলেই ওই চিহ্নটার সৃষ্টি হয়েছে৷ সাশা অনুমান করল মাত্তো গ্রসো নামক স্থানে কারো সঙ্গে বিবাদের ফলেই ওই চিহ্নটার সৃষ্টি এবং সেই সংঘর্ষের জন্যই পরবর্তীকালে হিরার সন্ধান ছেড়ে স্থানত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে আর্নস্ট৷ তবু ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করল না সাশা, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাশা বুঝেছিল ব্রেজিলের মানুষগুলো বিশেষ শান্তশিষ্ট নয়৷ ফাভেলের প্রসঙ্গে দাদার কথাটা তার মনে পড়ছিল বার বার— ‘এখানে ফাভেলের চাইতেও খারাপ লোক আছে’...

আগেই বলেছি দাদার মতো ওস্তাদ মিস্ত্রি না হলেও যন্ত্রপাতির কাজ জানত সাশা৷ অতএব যে-কারখানায় দাদা কাজ করত, সেখানে কাজ জুটিয়ে নিতে সাশার অসুবিধা হল না৷ মালিকের ব্যবহার ভালো, সে সাশাকে পছন্দও করত, কিন্তু ফাভেলের কুনজরে পড়ে গেল সাশা সিমেল৷ প্রথম দিনেই যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটেছিল, পরবর্তীকালে সেই বিরোধ এগিয়ে চলল এক ভয়াবহ সম্ভাবনার দিকে৷ সাশা আর আর্নস্ট প্রাণপণে বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত, কিন্তু সহ্য করার একটা সীমা তো আছে— সাশা বুঝতে পারছিল অদূর ভবিষ্যতে একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবে, মানসিক তিক্ততা সেইদিন গড়িয়ে যাবে রক্তাক্ত সংঘর্ষের দিকে...

এইবার পাঠকদের সঙ্গে বর্তমান কাহিনির অন্যতম প্রধান চরিত্রের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে— ডম কার্লোস! ওই নামটির সঙ্গে জড়িত ছিল পাসো ফানডো শহরের যাবতীয় বাসিন্দার শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও আতঙ্ক!

দক্ষিণ আমেরিকা তথা ব্রেজিলের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ছিল খুবই খারাপ৷ পাসো ফানডো শহরকেও ওই নিয়মের ব্যতিক্রম বলা চলে না৷ সেই প্রায়-অরাজক শহরে স্বেচ্ছায় শান্তিরক্ষকের কর্তব্য পালন করতে এগিয়ে এসেছিল একটি রেড ইন্ডিয়ান৷ অবশ্য সেই ‘পবিত্র কর্তব্যপালন’ করার জন্য সে অর্থগ্রহণ করত জনসাধারণের কাছ থেকে৷ ডম কার্লোস নামক ওই ব্যক্তি রাজ্য সরকারের কাছ থেকে মাইনে পেত না৷ শান্তিরক্ষার কাজটাকে সে বেছে নিয়েছিল স্বাধীন পেশা হিসেবে৷ অত্যন্ত বিপজ্জনক পেশা সন্দেহ নেই— তবে ওই পেশার উপযুক্ত মানুষ ছিল ডম কার্লোস— বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্রে তার নিশানা ছিল অব্যর্থ৷

পাসো ফানডো শহরের অত্যাচারিত বা নিহত মানুষের আত্মীয়স্বজন যখন কার্লোসের কাছে ‘সুবিচারের’ আশায় উপস্থিত হত, তখনই প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হত ডম কার্লোস৷ সরকারি বিচারক অপরাধীকে প্রাণদণ্ড দিলে সেই দণ্ড কার্যকরী করে সরকারি জল্লাদ;— কিন্তু ডম যখন অপরাধীকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করত, তখন সেই দণ্ড কার্যকরী করার ভার গ্রহণ করত স্বহস্তে৷ খুনিদের হত্যা করার পর তাদের কানগুলো কেটে রেখে দিত সে৷ ওগুলো তার যুদ্ধজয়ের স্মৃতিচিহ্ন বা স্মারক৷

বন্দুক-পিস্তলের নিশানায় সিদ্ধহস্ত ডম কার্লোসের ভয়ে শহরের সমাজবিরোধী দুর্বৃত্তরা খুন করার আগে একটু চিন্তা করত৷ খুন করার পর নিজেরও খুন হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ সম্ভাবনাকে ভয় করে না এমন খুনি পাসো ফানডো শহরেও নিতান্ত বিরল৷ অপরাধীরা অবশ্য আত্মরক্ষার চেষ্টা করত৷ দুর্বৃত্তের কবলে একটি চোখ হারিয়েছিল ডম কার্লোস, তবে উক্ত ব্যক্তিকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল প্রাণ দিয়ে৷ প্রৌঢ়বয়স্ক, একচক্ষু, রোগা চেহারার ডম কার্লোস নামক মানুষটি ছিল চোর-ডাকাত আর খুনিদের কাছে মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন৷ কিন্তু ওই পেশাদার শান্তিরক্ষকটি আর্নস্ট আর সাশাকে খুব ভালোবাসত৷ মানবচরিত্র সম্পর্কে দস্তুরমতো অভিজ্ঞ ছিল ডম কার্লোস— সরল সাদাসিধে স্বভাবের জন্যই তার বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল দুই ভাই৷

ফাভেলের সঙ্গে দৈনন্দিন কলহ যখন চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে, সেইসময় একদিন পরামর্শ ও উপদেশের জন্য ডম কার্লোসের দরজায় উপস্থিত হল সাশা সিমেল...

দূর দিগন্ত থেকে অস্তায়মান সূর্যের রক্তিম রশ্মি ছড়িয়ে পড়ছিল ‘রিও গ্র্যান্ড ডো সাল’ নামে উদ্ভিদ-আচ্ছন্ন প্রান্তরের বুকে৷ সেই প্রান্তর ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ভিতর দিয়ে চলে গেছে বিখ্যাত মাত্তো গ্রসোর রহস্যময় অরণ্য, যেখানে ঘন উদ্ভিদ ও জলাভূমির বুকে অবস্থান করছে বিভিন্ন ও বিচিত্র মৃত্যুফাঁদ— শ্বাপদ, সরীসৃপ, চোরাবালি!

কিন্তু বিশাল প্রান্তর ও দূরবর্তী অরণ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্য বা অস্তায়মান সূর্যের আলোছায়ার খেলা দেখে মুগ্ধ হওয়ার অবকাশ ছিল না সাশার— সে সোজা এসে দাঁড়াল ডম কার্লোসের সামনে৷

ডম কার্লোস

শহরের বাইরে অরণ্য ও নগরের সীমানার উপর ডম কার্লোসের বাড়ি৷ বাড়িটার মধ্যে বৈশিষ্ট্য কিছু না-থাকলেও দরজার দিকে তাকালে যেকোনো মানুষের পিলে চমকে যাবে৷ দরজার উপর সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি মানুষের কান! যে-অপরাধীদের প্রাণদণ্ড দিয়েছে কার্লোস, ওগুলো তাদের মুণ্ড থেকে কর্তিত স্মারকচিহ্ন৷ বহু যুদ্ধজয়ের নীরব সাক্ষী৷

কার্লোসকে ডাকাডাকি করার দরকার হল না৷ একটা কাঠের টুলের উপর বাড়ির সামনে বসে ছিল সে৷ পাশে দাঁড়িয়ে ‘লোবো’ নামে কুকুরটা প্রভুর আদর উপভোগ করছিল মহানন্দে৷ সাশাকে দেখে সাদর অভ্যর্থনা জানাল ডম কার্লোস৷

সাশা বিলক্ষণ উত্তেজিত ছিল৷ বাজে কথায় সময় নষ্ট না-করে তৎক্ষণাৎ ফাভেল-ঘটিত সমস্যার কথা জানিয়ে সে পরামর্শ চাইল ডম কার্লোসের কাছে৷

‘আমাদের এখানে, অর্থাৎ ব্রেজিলে আমরা একটা নীতি অনুসরণ করি,’ সাশার মুখের উপর একটিমাত্র চক্ষুর তীব্র দৃষ্টি স্থাপন করে ডম কার্লোস বলল, ‘আমরা অন্যের ব্যাপারে নাক গলাই না, গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে ঝগড়াও করি না৷ কিন্তু আমায় যদি কেউ অপমান করে বা আক্রমণ করে, তাহলে তাকে হত্যা করতে আমি কিছুমাত্র দ্বিধা করব না৷ যে-লোক তোমাকে অপমান বা আক্রমণ করতে পারে, সে হচ্ছে খ্যাপা কুকুরের শামিল— তাকে তোমার খুন করাই উচিত৷ এই যে লোবো, ও যদি তোমাকে কামড়াতে যায়, তাহলে ওকে মেরে ফেলতে কি তুমি দ্বিধা করবে?’

যাকে নিয়ে এই ভয়াবহ মন্তব্য, তার দিকে একবার সস্নেহে দৃষ্টিপাত করল কার্লোস৷ প্রভুর চোখে চোখ রেখে ঘন ঘন লাঙ্গুল আন্দোলিত করে প্রভুকে সমর্থন জানাল লোবো৷ যেমন মনিব, তেমনি কুকুর!

লোবোর উপর থেকে চোখ সরিয়ে সাশার মুখের দিকে তাকাল কার্লোস, ‘তবে একটা কথা মনে রেখো৷ ফাভেলকে খুন করলে আমি আর লোবো তোমাকে অনুসরণ করব৷ কারণ, ফাভেলের আত্মীয়স্বজন নিশ্চয়ই আমায় টাকা দিয়ে খুনিকে হত্যা করতে বলবে, আর পেশা অনুসারে আমিও তোমাকে বা তোমার ভাইকে— অথবা দুজনকেই— হত্যা করতে বাধ্য হব৷ বন্ধুদের কান কেটে নিতে আমার খুবই খারাপ লাগবে, কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটলে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গেই আমার অপ্রীতিকর কর্তব্য পালন করতে হবে৷ এটাই আমার পেশা যে!’

ডম কার্লোসের বক্তব্য শেষ হলে সাশা বলল, ‘তাহলে তুমি আমায় ফাভেলকে এড়িয়ে চলতে বলছ?’

‘না, না,’ কার্লোস বলল, ‘তোমার বিবেক যা বলবে, তুমি তা-ই করবে৷’

‘আমি ওই খুদে ভোঁদড়টাকে এড়িয়ে চলতে পারি না,’ সাশা বলল, ‘কারণ, আমরা এক জায়গায় কাজ করি৷ আর আমি ওর ভয়ে পালিয়ে যেতেও চাই না৷ সেটা সম্ভব নয় আমার পক্ষে৷’

‘না, তুমি ফাভেলকে এড়িয়ে যেতে পারবে না,’ কার্লোস হাসল, ‘মনে হচ্ছে লোবোকে নিয়ে আমার বন্ধুদের পিছনে আমাকেই তাড়া করতে হবে, আর শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাদের কানগুলো কেটে আনতে হবে৷ সিনর সিমেল, তোমায় আমি একটা উপদেশ দিচ্ছি, শোনো৷ এখন তুমি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছ, প্রতিপক্ষের দম্ভ তুমি সহ্য করতে পারছ না— কিন্তু মাত্তো গ্রসোর প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষ এবং জানোয়ার তোমায় পরিবেশের উপযুক্ত করে তুলবে৷ সেখানে গেলে তুমি বুঝতে পারবে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা কেমনভাবে করতে হয়৷’

একটু থেমে ডম কার্লোস আবার বলতে লাগল, ‘রিও সাও লরেংকো নামে যে-জায়গাটা আছে, সেখানে গেলে সম্ভবত তুমি একজন বুড়ো ইন্ডিয়ানের দেখা পাবে৷ ঠিক কোথায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে, সেটা আমি যথাসময়ে তোমাকে জানিয়ে দেব৷ তার নাম জোকুইম গুয়াতো৷ লোকটি ওস্তাদ ‘‘তাইগরেরো’’৷ কারো সাহায্য না-নিয়ে বর্শা দিয়ে সে ‘‘তাইগর’’ মারতে পারে৷’

দক্ষিণ আমেরিকার জাগুয়ারকে স্থানীয় মানুষ ‘তাইগর’ বলে৷ সাশা শুনেছিল রেড ইন্ডিয়ানরা বর্শা দিয়ে জাগুয়ার শিকার করে৷ অবশ্য তারা দলবদ্ধ হয়ে জাগুয়ারকে আক্রমণ করে৷ কারো সাহায্য না-নিয়ে সম্পূর্ণ এককভাবে যে নিঃসঙ্গ শিকারি বর্শা দিয়ে জাগুয়ার মারতে পারে, তাকেই ‘তাইগরেরো’ আখ্যা দেওয়া হয়৷

তবে তেমন কোনো মানুষ সাশার চোখে পড়েনি৷ তাইগরেরোর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল৷ সন্দেহ অকারণ নয়— তাইগরেরো সম্পর্কে অনেক গালগল্প শোনা যায় বটে, কিন্তু স্বচক্ষে তাইগরেরোকে শিকার করতে দেখেছে, এমন মানুষের সাক্ষাৎ পায়নি সাশা সিমেল৷ এই প্রথম সে ‘জোকুইম’ নামে এক তাইগরেরোর কথা শুনল ডম কার্লোসের মুখে৷

‘জোকুইম লোকটা জঙ্গলকে জানে,’ কার্লোস বলতে লাগল, ‘মানুষ যেমন নিজের বৈঠকখানার প্রত্যেকটি আসবাবপত্র চেনে, ঠিক তেমনিভাবেই জঙ্গলকে চিনেছে জোকুইম গুয়াতো৷ সে নিজের হাতে পঁয়ত্রিশটা তাইগর বর্শা দিয়ে মেরেছে৷ শিকারের সময় সে কারো সাহায্য নেয় না৷ ব্যাপারটা যে কতখানি বিপজ্জনক, সে-বিষয়ে তোমার ধারণা নেই৷ জঙ্গল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে তোমার বন্দুক বা পিস্তল কোনো কাজে লাগবে না৷ তাইগর তোমাকে মুহূর্তের মধ্যে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, হাতের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগই তুমি পাবে না৷ আমি নিজেও বন্দুক-পিস্তলের ব্যাপারে নিতান্ত আনাড়ি নই’—

হঠাৎ কথা থামিয়ে হাতের এক ঝটকায় অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে কোমর থেকে পিস্তল তুলে নিল কার্লোস, ‘কিন্তু পাকা পিস্তলবাজ হলেও জঙ্গলের মধ্যে যে সবসময় আত্মরক্ষা করতে পারব, এমন আস্থা আমার নিজের উপরেও নেই৷ বন্ধু সিমেল— তোমার বয়স কম, লম্বায় তুমি প্রায় ছ-ফুট হবে, দেখে বোঝা যায় গায়ে বেশ জোর আছে— কিন্তু তাইগরের সামনে তোমার এই গায়ের জোর কোনো কাজে লাগবে না৷ পূর্ণবয়স্ক তাইগর প্রায় নয় ফুট লম্বা, দেহের ওজন চারশো পাউন্ডের কাছাকাছি৷ তার ধারালো নখ দিয়ে সে তোমার বুক চিরে ফাঁক করে দিতে পারে৷ তাইগরের দৈহিক শক্তি তোমার চাইতে অনেক বেশি এবং সে দস্তুরমতো বিপজ্জনক৷ তুমি পারতপক্ষে ফাভেলকে খুন করতে চাইবে না— কিন্তু তাইগর তোমার সূক্ষ্ম ন্যায়নীতির ধার ধারে না, সে তোমায় সুযোগ পেলেই হত্যা করবে আর সম্ভবত খেয়েও ফেলবে৷ সিমেল ভায়া, জীবন সম্বন্ধে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার, না হলে একদিন হয়তো প্রাণ দিয়েই তোমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে৷ আমার মনে হয় আর্নস্টকে নিয়ে এখনই জোকুইম গুয়াতোর সঙ্গে তোমার দেখা করা উচিত৷ তার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য তোমরা জানতে পারবে, সভ্য মানুষের অভিধানে আজ পর্যন্ত যা লেখা হয়নি৷’

একটু থেমে লোবোর ঘাড় চুলকে দিল কার্লোস, তারপর আবার বলতে লাগল, ‘কয়েক বছর আগে জোকুইম গুয়াতোকে আমি তাইগর শিকার করতে দেখেছি৷ সেই সময় ‘‘জারোয়াস’’ নামে জলাভূমির পূর্বদিকে একটা বিশাল গোশালার রক্ষণাবেক্ষণ করতাম আমি৷ জায়গাটা রয়েছে রিও আরাগুয়া আর উত্তর প্যারাগুয়ের মাঝখানে৷ ওই অঞ্চলে বাস করে অসংখ্য তাইগর৷ তাদের কবলে প্রতি বৎসর হাজার হাজার গোরু-বাছুর মারা পড়ে৷

জোকুইম আর আমি একদিন ভোর হওয়ার একটু আগে ঘোড়ায় চড়ে দুটো কুকুর নিয়ে একটা তাইগরের সন্ধানে যাত্রা করেছিলাম৷ জন্তুটা কিছুদিন ধরে ভীষণ উপদ্রব করছিল৷ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেসঙ্গে কুকুর দুটো তাইগরের পায়ের ছাপ আবিষ্কার করল একটা খাঁড়ির ধারে৷ পদচিহ্নের আকৃতি ও গভীরতা দেখে বুঝলাম জন্তুটা মস্ত বড়ো, দেহের ওজন সাড়ে তিনশো পাউন্ডের কম হবে না৷ তাইগর সাঁতার কাটতে ওস্তাদ, জলে নেমে সে কোথায় সরে পড়েছে কে জানে৷ কিন্তু দুপুরের দিকে কুকুর দুটো একটা দ্বীপের মতো জায়গার উপর তাইগরকে ঘেরাও করে ফেলল৷ দ্বীপের চারপাশে জল খুব গভীর নয়, কিন্তু কাদায় পিছল জলাভূমির মধ্যে পা রাখাই মুশকিল৷ জলের উপর এখানে-ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস আর বর্শার ফলার মতো ভাঙা গাছের ডাল প্রতিপদে আমাদের বাধা দিচ্ছিল৷ জলাভূমির পাড়ে ঘোড়া রেখে আমরা জলে নেমেছিলাম৷ আমার হাতে রাইফেল, জোকুইমের হাতে বর্শা৷ বর্শার দৈর্ঘ্য ছয় ফুটের মতো, তার মধ্যে ফলাটাই হবে দু-ফুট লম্বা৷

জোকুইম একবার হাত নেড়ে আমাকে জলার মধ্যে নামতে বারণ করল৷ কিন্তু আমি তখন তাইগরটাকে শিকার করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছি, জোকুইমের নিষেধ না-শুনে রাইফেল হাতে এগিয়ে চললাম অগভীর জল ভেঙে দ্বীপটার দিকে৷ অভিজ্ঞ শিকারির নির্দেশ অমান্য করার ফল পেলাম হাতে হাতে— জলের মধ্যে অদৃশ্য লতার ফাঁসে পা জড়িয়ে সশব্দে আছড়ে পড়লাম৷ হাতের রাইফেল ছিটকে পড়ে অদৃশ্য হল জলাভূমির গর্ভে এবং আমার নাকে-মুখে হুড়-হুড় করে ঢুকল কাদা-মাখা জল৷

কোনোমতে নিজেকে সামলে দ্বীপের কাছে ডাঙার মাটিতে হাত রাখলাম, তারপর মুখ তুলেই দেখতে পেলাম জঙ্গলের রাজা তাইগরকে৷ একটা মস্ত গাছে পিঠ দিয়ে সে রুখে দাঁড়িয়েছে আর কুকুর দুটো জলের ধারে দাঁড়িয়ে জন্তুটার উদ্দেশে চিৎকার করছে তারস্বরে৷ তাইগর মাঝে মাঝে এগিয়ে এসে কুকুর দুটোকে লক্ষ করে থাবা চালাচ্ছে, সৌভাগ্যের বিষয় প্রত্যেকবারই ফসকে যাচ্ছে তার থাবার নিশানা৷

সেই সময় রাইফেল হাতে থাকলে অনায়াসে জন্তুটাকে গুলি করে মারতে পারতাম৷ রাইফেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল অসহ্য যন্ত্রণার শিহরন— গোড়ালি মচকে গেছে, আমার এখন দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই৷

সেই অবস্থাতেই জোকুইমকে দেখলাম৷ সে তাইগরের খুব কাছে প্রায় দশ ফুটের মধ্যে এসে পড়েছে৷ আমি বুঝলাম জন্তুটা যদি এখন তাকে আক্রমণ করে, তাহলে পিছিয়ে এসে জলাভূমির মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করার সময় সে পাবে না৷ আমি চেঁচিয়ে তাকে সাবধান করতে গেলাম, কিন্তু কুকুরের চিৎকারে আমার কণ্ঠস্বর ডুবে গেল— জোকুইম আমার গলার আওয়াজ শুনতে পেল না...

বাঁ-হাতে বর্শা ধরে ডান হাত দিয়ে একতাল কাদামাটি তুলল জোকুইম, তারপর সেই মাটির তালটাকে ছুড়ে মারল তাইগরের মুখে৷ ফল হল বিস্ময়কর— প্রকাণ্ড হাঁ করে জোকুইমের দিকে ফিরল তাইগর, তার গলা থেকে বেরিয়ে এল ভীষণ গর্জনধ্বনি৷ জন্তুটার ফাঁক-হয়ে-যাওয়া চোয়ালের প্রকাণ্ড হাঁ দেখে আমার মনে হল জোকুইমের পুরো শরীরটাকেই সে বুঝি এক কামড়ে গিলে ফেলবে৷

জোকুইম তখন জন্তুটার থেকে প্রায় দশ ফিট দূরে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিন্তু তাইগরের ভয়ংকর বিকৃত মুখের উপর তার দৃষ্টি নেই, সে তাকিয়ে আছে জন্তুটার পায়ের দিকে৷

পরে জেনেছিলাম বর্শাধারী শিকারি ওইভাবেই লড়াই করে— কারণ, তাইগর যতই দাঁত খিঁচিয়ে গর্জন করুক না কেন, শিকারিকে নাগালের মধ্যে পেতে হলে প্রথমেই তাকে পা চালাতে হবে, অর্থাৎ লাফ মারতে হবে৷ তাই শ্বাপদের পায়ের দিকেই নজর রাখে শিকারি, মুখের দিকে নয়৷

অরণ্য-সম্রাটকে কাদা ছুড়ে অপমান করার পর পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় যায়নি, এর মধ্যেই দুই হাতে বর্শা বাগিয়ে চরম মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হয়েছে জোকুইম— মাটির দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে বর্শার ধারালো ফলা, ডান দিকের পাঁজর আর কনুইয়ের মাঝখানে চেপে ধরা আছে বর্শার কাষ্ঠদণ্ড৷

তাইগর ঝাঁপ দিল চোখের নিমেষে৷ একটা কালো-হলুদ বিদ্যুৎ যেন চমকে উঠল মুহূর্তের জন্য, পরক্ষণেই কী ঘটল ঠিক বুঝতে পারলাম না— শুধু দেখলাম জন্তুটা শূন্যে পাক খেয়ে মাটির উপর ছিটকে পড়ল চিত হয়ে৷

আমি দেখলাম, জোকুইমের বর্শা তাইগরের বুকের মধ্যে বসে গেছে এবং সে প্রাণপণ শক্তিতে বর্শার ডান্ডাটা ধরে জন্তুটাকে মাটিতে চেপে রাখার চেষ্টা করছে৷ তাইগরের ওজন রেড ইন্ডিয়ান শিকারির চাইতে তিনগুণ বেশি, কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা করেও জন্তুটা জোকুইমকে ঠেলে সরিয়ে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়াতে পারল না... বর্শার ফলা বুকের মধ্যে আরও গভীর হয়ে ঢুকে যেতে লাগল... অবশেষে রক্তাক্ত দেহে মৃত্যুবরণ করল তাইগর...

সেই ঘটনার কথা আমি জীবনে ভুলতে পারব না৷ ওটা শিকার নয়, লড়াই৷ কোনো সাদা চামড়ার মানুষ ওভাবে লড়াই করতে পারে না৷ ওইভাবে তাইগরকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে বধ করার ক্ষমতা রাখে কয়েকজন রেড ইন্ডিয়ান৷ তারাও বোধ হয় শেষ হয়ে গেছে৷ জোকুইম ছাড়া কোনো জীবিত তাইগরের সাক্ষাৎ আমি পাইনি৷ সাশা, আমার কথা শোনো, যেভাবেই হোক জোকুইমের সঙ্গে দেখা করো৷ ব্রেজিলের মাটিতে তোমার মতো বিদেশির বেঁচে থাকা কঠিন, এখানে বাঁচার কৌশল তোমায় শেখাতে পারে একমাত্র জোকুইম৷’

সাশা অবশ্য ডম কার্লোসের উপদেশ শিরোধার্য করে তৎক্ষণাৎ জোকুইমের আস্তানার উদ্দেশে যাত্রা করেনি৷ কিন্তু কিছুদিন পরেই ফাভেলের সঙ্গে কলহ যখন রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হল, তখন যে-ঘটনাচক্রের আবর্তে সাশা সিমেল একদিন তাইগরের সান্নিধ্যে এসে পড়েছিল এবং ব্রেজিলের জনপদ, অরণ্য ও জলাভূমির বুকে নরঘাতক দ্বিপদের ছুরি, বন্দুক আর নরখাদক শ্বাপদের শানিত নখদন্তকে যেভাবে ফাঁকি দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল— সেইসব চমকপ্রদ বিবরণ পরিবেশিত হয়েছে বর্তমান কাহিনির পরবর্তী অংশের বিভিন্ন পরিচ্ছেদে...

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

খুব ছোটোবেলা থেকেই সাশা সিমেল ছিল দাদা আর্নস্টের অনুরাগী ভক্ত৷ আর্নস্ট চিরকালই গৃহবিমুখ, যাযাবর৷ সাশা যখন বারো বছরের বালক, সেইসময় আর্নস্ট গৃহত্যাগ করে দক্ষিণ আমেরিকায় চলে যায়৷ কিছুকাল পরে সিমেল পরিবারের সকলে জানতে পারল আর্জেন্টিনার নৌসেনাদলে যোগ দিয়েছে আর্নস্ট৷ তখন থেকেই সাশা ভেবে রেখেছিল বড়ো হয়ে সে দাদার কাছে চলে যাবে৷ কয়েক বৎসর পরে আর্জেন্টিনার একটা রেলপথ যেখানে তৈরি হচ্ছে, সেখানেই অনেক খোঁজাখুঁজি করে দাদাকে ধরে ফেলল সাশা৷ তখন আর সাশা নিতান্ত বালক নয়, দস্তুরমতো এক বলিষ্ঠ যুবক৷ যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সামর্থ্য তার হয়েছে৷

আর্নস্ট আর সাশা আবার বিচ্ছিন্ন হল৷ আর্নস্ট চলে গেল উত্তর দিকে ব্রেজিল নামক প্রদেশে হিরার সন্ধানে, আর সাশা যেখানে গেল সেই জায়গাটার নাম হল বুয়েনাস এয়ার্স৷

এরপর বহুদিন দাদার দেখা পায়নি সাশা৷ একবার মাত্র একটা চিঠি পেয়েছিল সে দাদার কাছ থেকে৷ সেই চিঠির সূত্র ধরে পাসো ফানডো শহরে এসে এক জার্মান ইঞ্জিনিয়ারের কাছে অনুসন্ধান করে আর্নস্টের হদিশ পেয়ে গিয়েছিল সাশা৷

জার্মানটির নির্দেশ অনুসারে একটি ভোজনাগারে ঢুকেই সাশা তার দাদাকে দেখতে পেল৷ কিন্তু দুই ভাইয়ের মিলনের আনন্দকে তিক্ত করে দিল ফাভেল নামে একটি লোক৷ আর্নস্টের সঙ্গে একই টেবিলে বসে পানভোজন করছিল ওই লোকটি৷ তার চেহারাটা ছোটোখাটো হলেও স্বভাব ছিল অতিশয় উগ্র৷ প্রথম দর্শনেই সাশাকে সে অপমান করে বসল৷ আর্নস্ট তৎক্ষণাৎ বাধা না-দিলে নির্ঘাত সাশার ঘুসি পড়ত ফাভেলের মুখে৷ দৈহিক শক্তিতে ফাভেল কোনোমতেই সাশার সঙ্গে পাল্লা দিতে সমর্থ ছিল না, হয়তো এক ঘুসিতেই সে ঠিকরে পড়ত মাটিতে৷ কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটলে পরবর্তীকালে সাশার জীবন যে বিপন্ন হতে পারে, সে-বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল আর্নস্ট— সেইজন্যই ব্যাপারটাকে ‘মুখোমুখি’ থেকে ‘হাতাহাতি’ পর্যন্ত গড়াতে দেয়নি সে৷

ভোজনাগার থেকে ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে এল আর্নস্ট এবং কিছুদূর হেঁটে গিয়ে প্রবেশ করল একটি কুঁড়েঘরে৷ সাশা বুঝল ওই কুটিরটি এখন দাদার আস্তানা৷

‘আলেক্স!’ আর্নস্ট বলল, ‘মাত্তো গ্রসো জায়গাটাতে ছড়ানো আছে রাজার ঐশ্বর্য! শুধুমাত্র তুলে নেওয়ার অপেক্ষা৷’

সাশা বলল, ‘তা তো বুঝলাম৷ কিন্তু তুমি তাহলে ফিরে এলে কেন?’

‘আমার মদ ফুরিয়ে গিয়েছিল৷ জঙ্গলে তো মদ পাওয়া যায় না৷ তাই মদ কিনতে এখানে এসেছিলাম৷ কিন্তু আমার ঘোড়াটা এখানে এসেই হঠাৎ মারা গেল৷ গায়ে হেঁটে অতদূর যাওয়া সম্ভব নয়৷ অথচ ঘোড়া কেনার মতন যথেষ্ট টাকাও আমার কাছে নেই৷ অতএব এখানেই একটা রুপার দোকানে কাজ নিলাম৷ তোকেও ওখানে একটা কাজ আমি জুটিয়ে দিতে পারব আলেক্স৷ তারপর কিছু টাকা হলে দুই ভাই আবার ফিরে যাব মাত্তো গ্রসোর জঙ্গলে— বুঝেছিস? সেখানে ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি হিরা, যাকে বলে রাজার ঐশ্বর্য৷’

‘কিন্তু দাদা,’ সাশা বলল, ‘ওই জার্মানটা আমায় বলছিল তুমি নাকি অসুস্থ— সত্যি?’

‘এমন কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়,’ আর্নস্ট বলল, ‘কাঁধে একটা পুরানো ক্ষত আছে৷’

আর্নস্ট তার শার্ট খুলে ফেলল৷ সাশা দেখল দাদার কাঁধে একটা শুষ্ক ক্ষতচিহ্ন ছড়িয়ে আছে৷

‘এটা একটা শয়তানের উপহার৷ তবে আবার একদিন লোকটার সঙ্গে আমার নিশ্চয়ই দেখা হবে৷ সে আমাকে যা দিয়েছে, সেইদিনই তাকে সুদে-আসলে তা ফিরিয়ে দেব৷’

সাশা ভাবতে লাগল মাত্তো গ্রসো নামে জায়গাটা ছেড়ে আসার সঙ্গে ওই ক্ষতচিহ্নটার হয়তো কিছু যোগসূত্র আছে— নিতান্ত অকারণে শুধুমাত্র মদ কেনার জন্য ‘রাজার ঐশ্বর্য’ ফেলে পাসো ফানডো শহরে চলে আসেনি আর্নস্ট৷

অনেকদিন পরে দুই ভাই-এর দেখা— কথা বলতে বলতেই রাত শেষ হয়ে গেল৷ নিজের মালপত্র একটা হোটেলে রেখে দাদার সন্ধানে পথে বেরিয়েছিল সাশা৷ এবার জিনিসগুলো নিয়ে সে দাদার কুঁড়েঘরে এসে ঢুকল৷ স্থির হল দুই ভাই এখন এখানেই থাকবে৷ হের আলবার্ট স্মিথ নামে যে জার্মান রৌপ্য-ব্যবসায়ীর দোকানে আর্নস্ট কাজ করে সেখানেই ছোটো ভাইকে একটা কাজ জুটিয়ে দেবে আর্নস্ট৷ কিছু টাকা জমাতে পারলেই আবার হিরার সন্ধানে মাত্তো গ্রসোতে হানা দেবে আর্নস্ট—এবার আর একা নয়, সঙ্গে থাকবে ছোটো ভাই সাশা৷

পরের দিনই কাজে লেগে গেল সাশা সিমেল৷

একটি প্রকাণ্ড রোলার চালিয়ে রুপোর পাতগুলিকে পাতলা চাদরে পরিণত করার জন্য সাশা এবং আরও দুটি লোককে নিযুক্ত করেছিল মালিক৷ সাশা তার পাশের লোকটির মুখের দিকে তাকায়নি— নিবিষ্টচিত্তে সে মালিকের নির্দেশ অনুসারে কাজ করছিল৷ হঠাৎ খুব ধীরে মৃদুস্বরে কেউ তাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘সিনর সিমেল! তুমি বুঝি মালিককে তোমার গায়ের জোর দেখিয়ে খুশি করতে চাও? তোমার দেশে যে জানোয়ারগুলো ভার বহন করে, তারা বোধ হয় কথা কয় না?’

সচমকে কণ্ঠস্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াল সাশা৷ আবার চমক! কণ্ঠস্বরের মালিক ফাভেল! ভোজনাগারের মধ্যে আগের দিন যার সঙ্গে হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল— সেই ব্যক্তি!

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

কেটে গেছে ছয়টি মাস৷ ওই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে সাশা৷ রুপোর জিনিস তৈরি করা ছাড়া আরও একটি বিদ্যা রপ্ত হয়েছে তার৷ সাশা এখন বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র মেরামত করতে পারে৷ জার্মান মালিকটি শুধু রুপোর কারবার করে না, বিকল আগ্নেয়াস্ত্র মেরামত করার দায়িত্বও সে গ্রহণ করে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে৷ তার বেতনভোগী কর্মচারীর দল ওই কাজগুলি করে৷ বলাই বাহুল্য, সাশা এবং তার বড়োভাই আর্নস্ট উক্ত কর্মচারীদের দলভুক্ত৷ সাশা ভোজনাগারে আড্ডা দিতে না-গেলেও সহকর্মীদের সঙ্গে সে মেলামেশা করত, কাজেই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে তার অসুবিধা হয়নি৷ কিন্তু ফাভেল ছিল একটি ব্যতিক্রম, সাশার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে সে রাজি হল না৷

হঠাৎ দুটি ঘটনা ঘটল পর পর৷ যার ফলে পাসো ফানডো শহরে দুই ভাইয়ের মানমর্যাদা বাড়ল এবং ফাভেলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটল৷

একদিন বিকালে আর্নস্ট তার ছোটোভাইকে জানাল প্যারাগুয়ে থেকে একটি ‘বলবান মানুষ’ শহরে উপস্থিত হয়েছে৷ শহর-চত্বরে সে তার অসামান্য দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করবে সেইদিনই সন্ধ্যায়৷ কৌতূহল চরিতার্থ করতে আর্নস্টের সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হল সাশা৷

যথাস্থানে গিয়ে দুই ভাই দেখল সজ্জিত মঞ্চের চারপাশে প্রচুর জনসমাগম ঘটেছে৷ উক্ত বলবান মানুষটি মঞ্চের উপর ওঠেনি, নীচে দাঁড়িয়ে জনতার সপ্রশংস দৃষ্টি উপভোগ করছে৷ লোকটির চেহারা সত্যিই প্রশংসা করার মতন এ-কথা একনজর তাকিয়েই মেনে নিল দুই ভাই৷ লোকটির নামও জানা গেল— সিনর মার্সেলো ক্যাসারাস৷

উক্ত মার্সোলোর কাঁধের উপর ছড়ানো ছিল একটা জাগুয়ারের চামড়া এবং ওই চামড়াটা তার কোমরে এসে আবদ্ধ হয়েছে একটা প্রশস্ত কৃষ্ণবর্ণ চর্মবন্ধনী বা ‘বেল্ট’ দিয়ে৷ তার পা থেকে অধমাঙ্গ কালো মোজার মতন এক ধরনের আঁটোসাঁটো পোশাকে ঢাকা রয়েছে৷ পোশাকের ভিতর দিয়েই লোকটির জানু ও পায়ের বৃহৎ পেশিগুলি দৃশ্যমান হয়ে জনতার মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করছে৷ লোকটির গায়ের রং বাদামি, পেশিস্ফিত শরীরের গঠন বুঝিয়ে দিচ্ছে শরীরের অধিকারী অসাধারণ শক্তিমান৷ তার চোয়াল প্রকাণ্ড, ওষ্ঠাধর পুরু, নাক বাজপাখির ঠোঁটের মতন বাঁকা৷ নাকের বাঁকা গড়নের জন্য মনে হয় লোকটি সর্বদাই বিরক্তির সঙ্গে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে৷ তবে মুখের গঠন যেমনই হোক না কেন, লোকটি আদৌ বদমেজাজি নয়— কারণ, জনতার অভিনন্দনকে স্বীকৃতি জানিয়ে তার ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠেছে নীরব হাসির আভাস৷

‘মার্সেলো হচ্ছে সবচেয়ে বলিষ্ঠ মানুষ,’ মঞ্চের উপর থেকে হেঁকে বলল একটি বিরলকেশ খর্বকায় ব্যক্তি, ‘এমনকী বনের জাগুয়ারও মার্সেলোকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়৷’

বেঁটেখাটো মানুষটি— নিশ্চয়ই সে মার্সেলোর ম্যানেজার— আবার হাঁক দিল, ‘ওহে আমার আদরের খোকা, এবার মঞ্চের উপর শুয়ে পড়ো৷ তোমার অমানুষিক শক্তির পরিচয় দাও সকলের কাছে৷ ভালোমানুষের ছেলেরা তোমায় দেখতে এসেছে, তাদের হতাশ কোরো না৷’

জাগুয়ারের চামড়াটা একটানে খুলে ফেলল মার্সেলো, পরক্ষণেই প্রকাণ্ড লাফ মেরে উঠে এল মঞ্চের উপর এবং শুয়ে পড়ল চিত হয়ে৷

ম্যানেজারের ইঙ্গিতে বিপুলবপু এক নিগ্রো প্রকাণ্ড এক নেহাই এনে রাখল মার্সেলোর বুকের উপর; তারপর প্রায় এক ইঞ্চি পুরু একটি লোহার ডান্ডা ওই নেহাই-এর উপর রেখে সরে দাঁড়াল৷

‘সিনর! তোমায় দেখে মনে হচ্ছে তুমি বেশ শক্তিমান পুরুষ,’ বেঁটে ম্যানেজার হঠাৎ ভিড়ের ভিতর দণ্ডায়মান সাশার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল, ‘হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে ওই লোহার ডান্ডাটাকে তুমি ভেঙে ফেলতে পারো?’

তৎক্ষণাৎ এক লাফে মঞ্চের উপর উঠে এল সাশা৷ নীচে যেখানে দাদা দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে তাকাল সে— দেখল আর্নস্টের ঠোঁটে কৌতুকের হাসি— অর্থাৎ দাদা তাকে সমর্থন করছে৷

‘বাঃ! সিনর সিমেল, তুমি যোগ্য ব্যক্তিকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছ,’ ভেসে এল বিদ্রূপশানিত কণ্ঠস্বর, ‘একটা ষাঁড়ের বিরুদ্ধে আর একটা ষাঁড়! বাঃ! চমৎকার!’

স্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াতেই সাশা কণ্ঠস্বরের মালিককে দেখতে পেল— ফাভেল!

আরও একজন ফাভেলের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল— আর্নস্ট৷

এই রে! এই বুঝি দাদা ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাভেলের উপর— সাশা ইশারায় আর্নস্টকে নিষেধ করতে উদ্যত হল৷ কিন্তু ঠিক সেই সময় ম্যানেজার তার জামার হাত ধরে টানল এবং বুঝিয়ে দিল সাশাকে কী করতে হবে৷ নেহাই-এর উপর বসানো লোহার ডান্ডার গায়ে ছেনিটাকে ধরে রাখবে বিশালদেহী নিগ্রো— ওই ছেনিতে হাতুড়ি মেরে ডান্ডাটাকে ভেঙে দুই খণ্ড করার দুরূহ কর্তব্যটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পড়েছে সাশার উপর৷

‘আমি জোরে আঘাত করে ডান্ডা ভেঙে ফেলতে পারি,’ সাশা বলল, ‘কিন্তু লোকটা যে তাহলে মারা পড়বে৷’

‘মার্সেলোর কিছু হবে না,’ ক্ষুদ্রকায় ম্যানেজার হাসল, ‘তুমি সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করো৷’

‘সোজাসুজি আঘাত করবে ঠিক ছেনির উপর,’ তলা থেকে ভেসে এল ফাভেলের কণ্ঠস্বর, ‘ষাঁড়েরও কিছু দক্ষতা থাকা দরকার৷ দেখো, যেন আঘাতটা ফসকে না যায়৷’

সাশা দাদার দিকে তাকাল— আর্নস্ট ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, এখনই বুঝি সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাভেলের ঘাড়ে৷ হাত নেড়ে দাদাকে কিছু করতে নিষেধ করল সাশা, তারপর মঞ্চের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়াল৷

‘সিনর ফাভেল! তুমি বোধ হয় তোমার গায়ের জোর দেখাতে চাও?’ সাশা ফাভেলকে উদ্দেশ করে বলল, ‘আমি ঠিক এই কাজটা করতে উৎসুক নই৷ বেশ তো— তুমিই উঠে এসো, দেখ এই হাতুড়িটা যদি তুলতে পারো৷’

ফাভেলের মুখ বিকৃত হয়ে গেল৷ দারুণ ক্রোধে তার দুই চোখ জ্বলে উঠল আগুনের মতো— পরক্ষণেই হাতের সিগারেট মঞ্চের খুঁটিতে ঘষে নিবিয়ে দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে অদৃশ্য হয়ে গেল জনতার মধ্যে৷

সাশা এবার হাতুড়িটা তুলে নিল৷ পরপর তিনবার সজোরে আঘাত হানল সে৷ দু-টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল লৌহদণ্ড৷ মার্সেলো এবার একহাতের বগলে নেহাইটাকে চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল৷ দারুণ উল্লাসে চিৎকার করে তাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল সমবেত জনতা৷ মৃদুহাস্যে জনতাকে অভিবাদন জানাল মার্সেলো৷

জনতার উৎসাহ এবার মার্সেলো আর সাশার মধ্যেও খেলোয়াড়ি মনোভাব জাগিয়ে তুলল৷ সাশাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দাঁতে কামড়ে চেয়ার সমেত সাশাকে শূন্যে তুলে ফেলল মার্সেলো৷ তারপর একটা মোটরগাড়ি ছুটে এসে মার্সেলোর বুকের উপর দিয়ে চলে গেল৷ পরপর আরও কয়েকটি খেলা দেখিয়ে দর্শকদের বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দিল প্যারাগুয়ের ‘বলিষ্ঠ মানুষ’! রাত পর্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে সব খেলা দেখল সাশা, তারপর ম্যানেজারকে ডেকে বলল, ‘আমরা যদি একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করি, তাহলে বিশাল এক জনতার সমাবেশ ঘটবে৷’

বেঁটে ম্যানেজার হঠাৎ সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল, ‘কীরকম প্রতিযোগিতার কথা বলছ তুমি?’

‘কুস্তি,’ সাশা বলল, ‘ওই বিদ্যাটা আমার ভালোই জানা আছে৷’

‘তুমি কেমন পারিশ্রমিক আশা কর?’ ম্যানেজার জানতে চাইল, ‘অবশ্য যদি পারিশ্রমিকের অর্থ গ্রহণ করার জন্য তুমি জীবিত থাকো৷’

সাশা বলল, ‘যে জিতবে, সে সমস্ত টাকা পাবে৷’ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল দাদা আর্নস্ট, সে সাশার হাত চেপে ধরল৷ ‘তুমি নিতান্ত নির্বোধ, আলেক্স,’ আনস্ট বলে উঠল, ‘লোকটা তোমাকে দু-টুকরো করে ভেঙে ফেলবে৷’

‘তাহলে টিকিট বিক্রি যে-টাকা উঠবে, সবটাই সে নিয়ে যাবে,’ সাশা ম্যানেজারের দিকে তাকাল, ‘তুমি কী বল?’

মার্সেলো পাশে এসে হাসিমুখে সাশার কথা শুনছিল৷ ম্যানেজার কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, ‘আমি খুনি নই৷’

‘তুমি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি না হও, তাহলে স্বীকার করো তুমি ভয় পেয়েছ,’ সাশা বলল৷

মার্সেলোর মুখের হাসি মুছে গেল, ললাটে ফুটল কুঞ্চনরেখা৷

‘মার্সেলো কাউকে ভয় পায় না,’ ম্যানেজার বলল, ‘তোমার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী হবে৷’

আর্নস্ট ছেটো ভাই সাশার নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লেও সাশার মনে দুশ্চিন্তা ছিল না একটুও৷ সাশা জানত মার্সেলো প্রচণ্ড শক্তিশালী পুরুষ, সে যদি চেপে ধরতে পারে, তাহলে সাশার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলবে অনায়াসে— কিন্তু ক্ষিপ্র গতি ও কৌশলের সাহায্যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে যে পরাস্ত করা যাবে, এ-বিষয়ে সাশা ছিল নিশ্চিত৷ মার্সেলো অমানুষিক শক্তির অধিকারী হলেও মল্লযুদ্ধ সম্বন্ধে তার যে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সেটাও বুঝতে পেরেছিল সাশা৷

স্থানীয় একটি নাট্যশালায় পূর্বোক্ত প্রতিযোগিতার স্থান নির্ণয় করা হল৷ আর্নস্ট এবং সাশা ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা করে প্রতিযোগিতার খবর জানিয়েছিল৷ ডম কার্লোস বলল সে যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত টিকিট বিক্রি না হয়, ততক্ষণ সে টিকিটঘরের ভিতর বিক্রেতাদের সঙ্গেই অবস্থান করবে৷ শুধু তাই নয়—টিকিট বিক্রির সমস্ত টাকা সে নিজের কাছেই রাখবে প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত৷

আর্নস্টের দিকে তাকিয়ে ডম কার্লোস বলল, ‘সিনর ফাভেল আর তোমাদের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে এটা আমি লক্ষ করেছি৷ যাতে কোনো অশান্তি না হয়, সেইজন্যই আমি প্রতিযোগিতা চলার সময়ে উপস্থিত থাকব৷’

‘ফাভেল যেন সতর্ক থাকে,’ চাপা গলায় গর্জে উঠল আর্নস্ট, ‘আমি ওই ইঁদুরটার অসভ্যতা অনেকদিন সহ্য করেছি৷ বেশি বাড়াবাড়ি করলে ওকে এবার উচিত শিক্ষা দেব৷’

নির্দিষ্ট দিনে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সাশা দেখল মঞ্চের কিনারায় বসে আছে ফাভেল৷ সে একা নয়, তার আশেপাশে রয়েছে একদঙ্গল লোক, স্পষ্টই বোঝা যায় ওরা সবাই ফাভেলের স্যাঙাত— সকলের মুখেই জ্বলছে সিগারেট, ধোঁয়ার আড়ালে মানুষগুলোর মুখ হয়ে গেছে অস্পষ্ট৷ মাঝে মাঝে লোকগুলোকে চাপা গলায় কিছু বলছিল ফাভেল৷ সাশা একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পেল৷

প্রথম রাউন্ডে বার বার আক্রমণ করল মার্সেলো৷ প্রত্যেকবারই তার আক্রমণ এড়িয়ে জমিতে-পেতে-রাখা ক্যানভাসের উপর তাকে ফেলে দিল সাশা৷ মার্সেলো অবশ্য প্রতিবারই লম্ববান অবস্থা থেকে দণ্ডায়মান হয়েছে এবং খ্যাপা ষাঁড়ের মতন তেড়ে গেছে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে৷ হঠাৎ একবার মার্সেলোর কোমর জড়িয়ে ধরে কুস্তির এক প্যাঁচে তাকে জমিতে পেড়ে ফেলল সাশা৷ মার্সেলো তার শরীরটাকে বাঁকিয়ে ফেলল, ঘাড়ের পেশিগুলোর প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে কাঁধ দুটোকে জমির উপর তুলে রাখল— কিছুতেই সাশা তাকে চিত করতে পারল না৷ প্রথম রাউন্ডের লড়াই সমান সমান হল৷

দ্বিতীয় রাউন্ডে সাশার শ্বাসকষ্ট শুরু হল— ফাভেল ও তার বন্ধুদের সিগারেট উদগিরণ করছে ধূম্রজাল এবং সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মঞ্চের উপর উঠে এসে বিব্রত করছে সাশাকে৷ মাঝে মাঝেই ধোঁয়ার আক্রমণে কেশে উঠছে সাশা৷

হঠাৎ লড়াই থামিয়ে মঞ্চের ধারে এসে দাঁড়াল সাশা, নীচে ফাভেলের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, ‘তুমি যেভাবে সিগারেট ফুঁকছ, ওভাবে কেউ সিগারেট টানে না৷ ধোঁয়ার জন্যে আমাদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে৷ দর্শকরা এখানে এসেছে কুস্তি দেখতে— আশা করি তাদের কথা ভেবে তোমরা আর সিগারেট টানবে না৷ এভাবে ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাশতে কাশতে কুস্তি লড়া সম্ভব নয়৷’

ফাভেল হাতের সিগারেট ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে আগুন নিবিয়ে দিল৷ তার বন্ধুরাও তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল৷ তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল লড়াই৷ কৌশল ও শক্তির যুদ্ধে কৌশলই জয়ী হল৷ অর্থাৎ সাশার কাছে পরাজিত হল মার্সেলো৷

মঞ্চের উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ফাভেল ও তার বন্ধুদের দেখতে পেল সাশা৷ ফাভেলের মুখ রক্তহীন বিবর্ণ— সাশা বুঝল ফাভেল মার্সেলোর উপর বাজি ধরেছিল, সেই বাজি সে হেরে গেছে৷ সাশার শরীর ও মন তখনও উত্তপ্ত, তখনও সে থেকে থেকে কাশছে, ফাভেলকে দেখেই তার মাথায় ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল৷ দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে সে ফাভেলের সামনে দাঁড়াল৷

‘সিনর ফাভেল! তুমি যদি আমার মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছড়িয়ে দিতে চাও,’ সাশা বলল, ‘তাহলে আমি যখন একা থাকব, তখনই ওই কাজটা করো৷ তুমি আর তোমার বন্ধুরা শুধু আমাকেই বিব্রত করোনি, প্যারাগুয়ে থেকে যে ভদ্রলোক এখানে এসেছেন জনতাকে আনন্দ দিতে— তাঁকেও তোমরা যথেষ্ট জ্বালিয়েছ৷’

ফাভেলের জবাবের জন্য অপেক্ষা না-করে পাশের দরজা দিয়ে মঞ্চের পিছন দিকে চলে গেল সাশা৷ হঠাৎ কেউ তাকে স্পর্শ করল৷ ঘুরে দাঁড়িয়ে ডম কার্লোসকে দেখতে পেল সাশা৷ কার্লোসের পাশে দাদা আর্নস্ট৷

‘এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে চলে এসো,’ কার্লোস বলল, ‘জামাকাপড় ছাড়ার দরকার নেই৷ সমস্ত টাকাপয়সা আর তোমার পোশাক পরিচ্ছদ আমার কাছেই রয়েছে৷ বাইরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে একটা ঘোড়ার গাড়ি৷ চলে এসো চটপট, এখন আর একটা কথাও নয়৷

পথে কোনো কথা হল না৷ ডম কার্লোস শুধু একবার বলেছিল জনতার মধ্যে অসন্তাোষ আর ক্ষোভ সে লক্ষ করেছে৷ আর্নস্টের কুটিরে পৌঁছে তারা যখন ধূমপান করছে, সেইসময় সাশাকে লক্ষ করে কার্লোস বলল, ‘তুমি ফাভেলকে চটিয়ে কাজটা ভালো করনি৷ তুমি তাকে অপমান করেছ৷ ফাভেল বাজি হেরে বেশ কিছু টাকা গচ্চা দিয়েছে৷ তার উপর তোমার কথায় উপস্থিত সকলেই বুঝেছে ফাভেল বাজি হেরেছে৷ টাকা আর ইজ্জত, দুটোই সে হারিয়েছে৷ সেইজন্য তোমাকেই সে দায়ী করবে৷ কিছুতেই সে তোমাকে ক্ষমা করবে না৷’

সাশা উদ্ধতভাবে জবাব দিল, ‘ফাভেল আমার ক্ষতি করতে পারবে না৷ সে যদি আমার সঙ্গে লাগতে আসে, তাহলে সে-ই বিপদে পড়বে৷’

ডম কার্লোস বলল, ‘আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ না৷ আমাদের রীতিনীতি তোমাদের মতো নয়৷ আমরা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য জীবন বিপন্ন করতে পারি, কিন্তু অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না৷ এইভাবে প্রতি মুহূর্তে ফাভেলকে ছোটো করার চাইতে তাকে খুন করলেও তার প্রতি যথেষ্ট দয়া দেখানো হত৷’

পূর্বোক্ত ঘটনার পর কয়েকটা মাস অতিবাহিত হল৷ মার্সেলোকে কুস্তিতে হারিয়ে বেশ মোটা টাকা পেয়েছিল সাশা আর আর্নস্ট৷ কিন্তু তারপর যা ঘটল, তার ফলে দুই ভাইয়ের সঙ্গে ফাভেলের বিবাদ আরও জটিল এবং আরও মারাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে চলল৷

ডম কার্লোস একদিন এসে সিমেল ভাইদের জানাল পাসো ফানডো শহরে ‘লিওন বেদুইনো’ নামে এক দুর্ধর্ষ তুর্কি মল্লযোদ্ধা উপস্থিত হয়েছে৷ লোকটি সাও পাওলো শহরে যাওয়ার পথে পাসো ফানডোতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যাবে— উদ্দেশ্য, এই শহরে কুস্তি লড়ে কিছু অর্থ উপার্জন৷

‘খবরদার,’ ডম কার্লোস সাশাকে বলল, ‘তুমি বেদুইনোর সঙ্গে কুস্তি লড়তে যেয়ো না৷ ওই লোকটা মাংসপেশির র্চ্চা করে নিজেকে ‘‘বলিষ্ঠ’’ বলে প্রচার করে না৷ কিন্তু ওই তুর্কি মল্লযোদ্ধা ভীষণ শক্তিমান— দক্ষিণ অঞ্চলে এক ইংরেজ কুস্তিগিরের সে ঘাড় ভেঙে দিয়েছে৷ হয়তো মানুষ খুনের অভিযোগে লোকটাকে আমি গ্রেপ্তার করতে পারি৷ তুমি বেদুইনোর সঙ্গে শক্তিপরীক্ষা করতে গেলে তোমার জীবন বিপন্ন হবে৷ আমি তোমায় সতর্ক করে দিচ্ছি৷’

শহর-চত্বরে যেখানে মার্সেলোর সঙ্গে লড়াই করেছিল সাশা, সেইখানেই এক রবিবার সন্ধ্যায় জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করল তুরস্ক-দেশীয় মল্লযোদ্ধা— লিওন বেদুইনো৷ লোকটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল সাশা— যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া, বৃষস্কন্ধ, কবাটবক্ষ; শালগাছের গুঁড়ির মতো পেশিস্ফীত দুই বাহুর অধিকারী বেদুইনোকে দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা অমিতশক্তিধর৷ সাশার পূর্বতন প্রতিদ্বন্দ্বী মার্সেলো এই মল্লবীরের তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ৷ দেহের তুলনায় বেদুইনোর মাথাটি খুবই ছোটো, নাকের তলায় বিশাল গোঁফ দুই প্রান্তে সরু হয়ে উঠে গেছে গালের দুই ধারে এবং তার স্থূল ওষ্ঠাধরে যে নীরব হাসির রেখা খেলা করছে, তাতে সরল কৌতুকের পরিবর্তে ফুটে উঠেছে নিষ্ঠুর হিংসার আভাস৷ প্রথম দর্শনেই লোকটিকে অপছন্দ করল সাশা সিমেল৷

মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে বেদুইনো চ্যালেঞ্জ জানাল— জনতার মধ্যে যদি কোনো সাহসী মল্লযোদ্ধা থাকে, তাহলে সে তার সঙ্গে কুস্তি লড়তে রাজি৷

এইবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে বেদুইনোর সর্বাঙ্গ জরিপ করল সাশা৷ লোকটার কাঁধ ও পৃষ্ঠদেশ বিশাল মাংসপেশিতে সমৃদ্ধ৷ সাশা জানত কাঁধ আর পিঠের বৃহৎ মাংসপেশি মল্লযুদ্ধ বা কুস্তির পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়৷ কিন্তু ওই ধরনের পেশি বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধের পক্ষে অসুবিধাজনক৷ কারণ, কাঁধ ও পিঠের স্থূল মাংসপেশি প্রচণ্ড শক্তির আধার হলেও দ্রুত আঘাত হানতে অপারগ— অতএব যে মাংসপেশির বিস্তার কুস্তির পক্ষে অত্যাবশ্যক, সেই পেশিশক্তি বিদ্যুৎবৎ ক্ষিপ্র বক্সার বা মুষ্টিযোদ্ধার বিরুদ্ধে একেবারেই অকেজো৷ সাশা বুঝে নিল কুস্তিতে বেদুইনোকে পরাস্ত করতে না-পারলেও মুষ্টিযুদ্ধে তাকে সে নির্ঘাত হারাতে পারবে৷

মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে মল্লবীরকে উদ্দেশ করে সাশা বলল, ‘বেদুইনো, আমার একটি শর্ত যদি মেনে নাও, তাহলেই আমি কাল রাতে তোমার সঙ্গে কুস্তি লড়তে রাজি আছি৷’

ভ্রূ কুঁচকে বেদুইনো সন্দিগ্ধকণ্ঠে বলল, ‘শর্তটা কী?’

‘কাল রাতে আমি তোমার সঙ্গে কুস্তি লড়ব৷ কিন্তু তার পরের রাতে আমার সঙ্গে তোমার দশ রাউন্ড বক্সিং লড়তে হবে৷ রাজি?’

কয়েকটি মুহূর্ত চিন্তা করল বেদুইনো, তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আমি রাজি আছি৷’

সাশার হঠকারিতায় খুব অসন্তুষ্ট হল ডম কার্লোস, ‘কুস্তির দুই রাউন্ড যদি কোনোরকমে আত্মরক্ষা করতে পারো, তাহলে তুমি বেঁচে যাবে সাশা৷ তবে বেদুইনোকে তুমি কিছুতেই হারাতে পারবে না৷’

সাশা বলল, ‘কথাটা ঠিক৷ ওই দু-রাউন্ড আমি কোনোরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব৷ তবে ঘুসির লড়াইতে লোকটাকে আমার কাছে হার মানতে হবে এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷’

মার্সেলোর সঙ্গে লড়াইতে যে নাট্যশালাটিকে নির্বাচন করা হয়েছিল, এবার বেদুইনোর সঙ্গে কুস্তির জন্য সেই জায়গাটাই নির্বাচিত হল৷

এক বিশাল জনতার সমাবেশ ঘটেছিল কুস্তি দেখার জন্য৷ ডম কার্লোস স্বয়ং উপস্থিত ছিল অকুস্থলে, তার সঙ্গে ছিল ছয়জন শান্তিরক্ষক পুলিশ৷ সাশাকে কার্লোস জানাল সমাগত জনতার মধ্যে বহু লোক এসেছে পিস্তল বা রিভলভার নিয়ে৷

সাশা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, ‘কেন?’

কার্লোস বলল, ‘পিস্তলধারীদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে ফাভেলের বন্ধুবান্ধব৷ তবে আমি তোমার বন্ধুদেরও সতর্ক করে দিয়েছি— তারাও পিস্তল নিয়ে এসেছে৷ ফাভেল যদি গুলি চালায়, তাহলে তাকে আমি বাধা দিতে পারব না, কিন্তু ব্যাপারটা যাতে সমানে সমানে হয় সেটা আমি দেখব৷’

ফাভেলের যে একটি ‘পরিকল্পনা’ ছিল, সেটা পরে প্রমাণ হল৷ আর সেই ‘পরিকল্পনা’ সাশাকে সম্ভাব্য মৃত্যু অথবা গুরুতর জখম হয়ে পঙ্গুত্বের দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল৷

লড়াই শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাশা বুঝতে পারল বেদুইনো লোকটা মার্সেলের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী৷ কুস্তির কায়দাকানুনও সে ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে৷ সাশা তার জীবনে কখনো এমন ভয়ংকর কুস্তিগিরের পাল্লায় পড়েনি৷ সে বুঝতে পারছিল তুর্কি পালোয়ান যদি তাকে একবার দুই হাতের বাঁধনে বন্দি করতে পারে তাহলে তার পরাজয় অবধারিত— এমনকী হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হয়ে যাওয়াও নিতান্ত অসম্ভব নয়৷ আত্মরক্ষার জন্য মাঝে মাঝে সাশা দড়ির উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ছিল৷ কুস্তির নিয়ম অনুসারে দড়ি ছেড়ে রিং-এর ভিতরে না-আসা পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপেক্ষা করতে হয়— বেদুইনোকেও তাই ওই সময়টুকু আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে হচ্ছিল৷

একবার যখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মাথায় মাথা লাগিয়ে পরস্পরকে হাত দিয়ে কাবু করার চেষ্টা করছে, সেইসময় হঠাৎ এক ধাক্কায় সাশার মাথাটা একপাশে কাত হয়ে গেল— সঙ্গেসঙ্গে একটা তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ উঠে এল মাথার বাঁ-দিক থেকে! তুরস্কের কুস্তিগির সাশার বাঁ-কান কামড়ে ধরেছে! সাশার ঘাড় বেয়ে গড়িয়ে নামছে লাল রক্তের ধারা!

বেদুইনোর চর্বিবহুল বিশাল উদরে প্রচণ্ড বেগে ঘুসি মারল সাশা৷ ফল হল তৎক্ষণাৎ— দম নেওয়ার জন্য বেদুইনো হাঁ করতেই কানের উপর কামড়টা আলগা হয়ে গেল৷

‘আবার যদি কামড়াতে চেষ্টা করো,’ দাঁতে দাঁত ঘষে সাশা বলল, ‘এটা তাহলে আর কুস্তি থাকবে না, একেবারে খুনোখুনি হয়ে যাবে৷’

বেদুইনো চাপা গলায় গর্জন করে কিছু বলল, তার মুখের ভাব হয়ে উঠল ভয়ংকর— সে আবার ঝাঁপ দিল সাশাকে লক্ষ করে৷ আবার দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল; সেইসময় অস্ফুট স্বরে বেদুইনো জানিয়ে দিল একবার যদি সে প্রতিদ্বন্দ্বীর গলাটা নাগালের মধ্যে পায়, তাহলে শ্বাসরোধ করে তাকে সে হত্যা করবে৷ হত্যার অপরাধে ক্রুদ্ধ জনতা হয়তো তাকে ফাঁসি দিতে পারে, কিন্তু সেই ঝুঁকি নিতে সে প্রস্তুত৷ সাশা বুঝল লোকটা ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, এই লড়াই এখন আর প্রতিযোগিতার লড়াই নয়— সাশার পক্ষে এটা এখন প্রাণ বাঁচানোর লড়াই৷

আবার বেদুইনের মতো হাত ছাড়িয়ে সরে গেল সাশা৷ খ্যাপা ষাঁড়ের মতোই তার দিকে আবার তেড়ে এল বেদুইনো৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে সাশার কানে এল ফাভেলের তীব্র চিৎকার— ‘ওহে তুর্কি যোদ্ধা! এই সাদা চামড়ার মানুষটাকে খুন করো!’

সঙ্গেসঙ্গে পিস্তল তুলে শূন্যে গুলি ছুড়ল ফাভেল৷ তৎক্ষণাৎ চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়াল ডম কার্লোস, পরক্ষণেই তার পিস্তল সগর্জনে অগ্নিবর্ষণ করল মাথার উপর ছাতের দিকে৷ সেই আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আরও কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে উঠল জনতার ভিতর থেকে৷ বেদুইনো গুলির শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর মঞ্চ থেকে নেমে অন্তর্ধান করল বিদ্যুদবেগে!

শূন্যে পিস্তল নাচিয়ে ডম কার্লোস সবাইকে শান্ত হতে বলল৷ সকলেই জানত কার্লোসের পিস্তল কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না, তাই যারা গুলি ছুড়েছিল তারা হাতের অস্ত্র পকেটে লুকিয়ে সুবোধ বালকের মতো শান্ত হয়ে দাঁড়াল৷ ম্যানেজার জানিয়ে দিল নাট্যশালার ভিতর এমন আচরণ করা অত্যন্ত অন্যায় এবং পরবর্তী রাত্রে মুষ্টিযুদ্ধের প্রতিযোগিতা হবে না৷ কিন্তু দর্শকরা তখন লড়াইয়ের নেশায় মত্ত, তারা চিৎকার করে আপত্তি জানাতে লাগল৷

প্রতিযোগীদের জন্য যে-ঘরটা নির্দিষ্ট ছিল, সেই ঘরে কার্লোসকে নিয়ে প্রবেশ করল সাশা৷ সেখানে তখন বেদুইনো দ্রুতবেগে গায়ে জামা চড়াচ্ছে, তার চোখ মুখ থেকে মিলিয়ে গেছে হিংস্র আক্রোশের আভাস৷ সাশাকে দেখেই সে বলে উঠল, ‘আমি পেশাদার কুস্তিগির৷ আমি মুষ্টিযোদ্ধা নই৷ বক্সিং আমি লড়তে জানি না৷ আমি এখনই এই জায়গা থেকে চলে যেতে চাই৷’

ডম কার্লোস তাকে আশ্বাস দিয়ে জানাল পরের রাতে ওখানে আর গুলি চলবে না৷ বেদুইনো বলল, টিকিট বিক্রির অর্ধেক টাকা যদি লড়াই শুরু হওয়ার আগেই তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে মুষ্টিযুদ্ধ লড়তে রাজি আছে৷ সাশা তার প্রস্তাবে সম্মতি জানাল৷ বেদুইনোর ব্যবহারে সাশা খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিল, মুষ্টিযুদ্ধের আসরে লোকটাকে ভালো হাতে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই সে প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল৷

মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হল পূর্বোক্ত নাট্যশালায় রাত্রে৷ দেখা গেল বেদুইনো দক্ষ মল্লযোদ্ধা হলেও মুষ্টিযুদ্ধে সে নিতান্তই আনাড়ি৷ মুখের উপর কয়েকটা ঘুসি পড়তেই সে হঠাৎ দাঁত দিয়ে তার হাতের দস্তানার ফিতা খুলতে সচেষ্ট হল৷

সর্বনাশ! সাশা বুঝল মুষ্টিযুদ্ধের দস্তানা থেকে হাত দুটিকে মুক্ত করতে পারলেই বেদুইনো তাকে আক্রমণ করবে এবং তাহলে সাশার প্রাণসংশয় অবধারিত৷ শরীর ঝুঁকিয়ে বেদুইনো দাঁত দিয়ে ফিতা খুলছিল, একটা হাত দস্তানা থেকে মুক্ত করে সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চাইল সাশার দিকে৷ তৎক্ষণাৎ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বেদুইনোর চোয়ালে ঘুসি মারল সাশা৷ বেদুইনো সেই আঘাত সহ্য করতে পারল না, ছিটকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল৷ সাশা এত জোরে ঘুসি চালিয়েছিল যে, তার কবজি প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল— কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কারো সঙ্গে করমর্দন করার অবস্থাও ছিল না তার৷

সাশা জয়লাভ করাতে বিলক্ষণ খুশি হয়েছিল ডম কার্লোস৷ সে সাশাকে অভিনন্দন জানাতে এল প্রতিযোগীদের জন্য সংরক্ষিত ঘরে৷ সাশা বলল, লড়াইয়ের আগে বা পরে সে একবারও ফাভেলকে দেখতে পায়নি৷

‘সে ছিল মঞ্চের কাছেই৷ তুমি তাকে দেখতে পাওনি,’ কার্লোস বলল, ‘তবে আমি ছিলাম বলে সে এবার তোমায় ঘাঁটাতে সাহস পায়নি৷ কিন্তু ফাভেল তোমাকে ভবিষ্যতে বিপদে ফেলবে এটা জেনে রাখো৷ তুমি তাকে লোকের চোখে হেয় করেছ৷ সে ওই অপমান কখনো ভুলবে না সাশা৷’

বেদুইনোর সঙ্গে লড়াইতে নেমে সাশা যে-টাকা পেয়েছিল, সেই টাকায় দুটি খচ্চর ও একটি ঘোড়া কিনল সাশা আর আর্নস্ট৷ কিছু যন্ত্রপাতিও কিনল তারা৷ আর একটি খচ্চর কিনতে পারলেই দুই ভাই হিরার সন্ধানে মাত্তো গ্রসোতে রওনা হতে পারে৷ একটি খচ্চরকে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য রাখল সাশা, নাম দিল ‘বেদুইনো’!

মার্সেলো আর বেদুইনোর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে পাসো ফানডো শহরে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল সাশা৷ বিশেষ করে রুপার কারখানার সহকর্মী শ্রমিকরা সাশার কৃতিত্বে খুবই খুশি হয়েছিল৷ তবে ফাভেল যে সাশা সম্পর্কে তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল প্রায়ই৷ অবশ্য সোজাসুজি সাশার সঙ্গে সে অভদ্র ব্যবহার করেনি একবারও৷

কারখানার পিছনে একটা ঘরে শ্রমিকদের খেতে দেওয়া হত; ওই ঘরে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের সময়ে ভুল করে বসে পড়েছিল সাশা৷ ফাভেল সাশার ঠিক পিছনেই ছিল, সে হঠাৎ বলে উঠল, ‘সরে যাও, কুত্তার বাচ্চা! এটা আমার জায়গা৷’

মুহূর্তের মধ্যে ঘর হয়ে গেল স্তব্ধ৷ সকলেই ভাবছিল এই বুঝি শুরু হয় মারামারি৷ কিন্তু না— সাশা ভুল স্বীকার করে তার নিজের জায়গায় সরে গেল৷ একবার তার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল, আর্নস্ট রাগে আগুন হয়ে গেছে, ভাইয়ের আচরণ সে পছন্দ করেনি— যেকোনো সময়ে ফাভেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আর্নস্ট৷

যাই হোক, সেদিন আর কিছু ঘটল না৷ সেই ঘটনার পরেই ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল সাশা৷ সাক্ষাৎকার হওয়ার পরে তাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল এবং যে-আলোচনার ফলে জোকুইম গুয়াতো ‘তাইগরেরো’ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল সাশা সিমেল— সেইসব কথা সবিস্তারে প্রথম পরিচ্ছদেই বলা হয়েছে, পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক৷

ফাভেলের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চেয়েছিল আর্নস্ট৷ ছোটোভাই সাশার গা বাঁচিয়ে সরে যাওয়ার ব্যাপারটা তার মোটেই পছন্দ হয়নি৷ সে নিজেই ফাভেলকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল৷ সাশার অনুরোধে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে সে স্থানত্যাগ করে চলে যেতে রাজি হল৷ ডম কার্লোসও দুই ভাইকে স্থানত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিল, কারণ পাসো ফানডো শহরে থাকলে ফাভেলের সঙ্গে সিমেল-ভাইদের খুনোখুনি ঘটতে পারে যেকোনো মুহূর্তে৷ দু-দিন পরে রাত থাকতেই দুই ভাই শয্যাত্যাগ করল৷ পরিকল্পনা অনুসারে আর্নস্ট একটি ঘোড়া আর দুটি খচ্চর নিয়ে মালপত্র সমেত উত্তর দিকে রওনা দেবে এবং তিনদিনের পথ পার হয়ে রিও উরুগুয়ে ছাড়িয়ে ভাইয়ের জন্য ক্লিভল্যন্ডিয়া নামক স্থানে অপেক্ষা করবে৷ হের স্মিথের রুপার কারখানার অবশিষ্ট কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করে সাশা তার বেদুইনো নামে খচ্চরটার পিঠে চড়ে যাত্রা করবে এবং দাদার সঙ্গে মিলিত হবে পূর্বনির্দিষ্ট স্থানে৷

আর্নস্টকে বিদায় দিয়ে হের স্মিথের কারখানার দিকে চলল সাশা বেদুইনোর পিঠে চড়ে৷ পথের মধ্যে ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা হল সাশার৷ একটা প্রকাণ্ড সাদা টুপি মাথায় চড়িয়ে খচ্চরের পিঠে বসেছিল ডম কার্লোস৷ সাশাকে দেখে হাসিমুখে টুপি খুলে অভিবাদন জানাল কার্লোস, ‘সুপ্রভাত, সিনর সাশা৷ আজ সকালেই আমার কুকুর লোবো খুব চিৎকার করছিল৷ খুব শীঘ্রই আমি আর লোবো কোনো অপরাধীর পিছনে তাড়া করব এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ লোবোর চিৎকার হচ্ছে সেই অভিযানের পূর্বসংকেত৷’

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

কারখানার কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সাশা মালিককে জানিয়ে দিল আর্নস্ট কাজ ছেড়ে চলে গেছে৷ অসমাপ্ত কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করে সাশা নিজেও কারখানা ছেড়ে চলে যাবে অন্যত্র৷ দু-দুজন দক্ষ কারিগর তার কারখানা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে মালিক দুঃখপ্রকাশ করল৷ ফাভেল কিছু বলল না৷ কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল লোকটা খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছে৷ হের স্মিথ তার বিদায়ভাষণ জানানোর পর সাশা হঠাৎ এগিয়ে এসে ফাভেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, ‘আমি চিরদিনের মতো বিদায় গ্রহণ করছি, আর কখনো এখানে ফিরে আসব না৷ আমার উপর কারো রাগ বা বিদ্বেষ থাকলে আমি দুঃখিত হব৷ সিনর ফাভেল, তুমি কি আমার সঙ্গে করমর্দন করবে না?’

অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নত হয়ে অভিবাদন করল ফাভেল, তারপর সাশার প্রসারিত হাত চেপে ধরল, ‘নিশ্চয়ই সিনর৷ আমি সানন্দে তোমার হাতে হাত মেলাচ্ছি৷ তোমার মতো গুণী মানুষের বিচ্ছেদ সমগ্র কারিগর-সম্প্রদায়ের পক্ষেই দুঃখজনক৷’

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে মালিক হের স্মিথকে উদ্দেশ করে সে বলে উঠল, ‘আমার যন্ত্রপাতিগুলো আমি একবার পরীক্ষা করব, আশা করি কেউ কিছু মনে করবে না৷’

ইঙ্গিতটা অত্যন্ত অপমানকর৷ সাশার মনে হল কেউ যেন তাকে সজোরে থাপ্পড় মারল৷

হের স্মিথ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তুমি ও-কথা বললে কেন? তোমার খুব অন্যায় হয়েছে ফাভেল৷’

ফাভেল বলল, ‘ও আমার যন্ত্র নিয়ে কাজ করছিল৷ ও চলে যাওয়ার আগে আমার জিনিসগুলো ঠিক আছে কি না, সেটা আমি দেখে নিতে চাই৷’

সাশা ফাভেলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল৷ সে বুঝতে পারছিল ফাভেলের দিকে তাকিয়ে থাকলে সে আর রাগ সামলাতে পারবে না৷ তার মনের যে অবস্থা, তাতে একবার লড়াই শুরু হলে ফাভেলকে খুন না-করে সে থামতে পারবে না৷ মুখ নামিয়ে সে একমনে কাজ করতে লাগল...

সারাদিন কাজ করেও হাতের কাজ শেষ করতে পারেনি সাশা, তাই রাতেও সে কাজ করছিল৷ একটা রুপোর তৈরি রেকাব প্রায় শেষ করে এনেছিল সাশা, এইবার শুধু কয়েকটা সূক্ষ্ম কাজ হয়ে গেলেই তার ছুটি৷ কারখানায় কেউ ছিল না, সাশা একাই কাজ করছিল৷ হঠাৎ একটা শব্দ শুনে সাশা ঘুরে দাঁড়াল এবং দেখল তার পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে ফাভেল৷

প্রায় সঙ্গেসঙ্গে দরজাটা খুলে গেল, ভিতরে প্রবেশ করল হের স্মিথ৷ ফাভেলকে দেখে সে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এত রাত্রে কীজন্য এখানে এসেছ?’

তীব্রস্বরে উত্তর দিল ফাভেল— সাশাকে শোনানোর জন্যই সে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘আমার যন্ত্রপাতিগুলো যথাস্থানে আছে কি না দেখতে এসেছি৷’

সাশা তার হাতের দিকে তাকাল৷ যে-ফাইলটা নিয়ে সে কাজ করছিল, সাধারণত সেইটা দিয়েই ফাভেল কাজ করে৷ তবে কারখানার যন্ত্রপাতিগুলোর মালিক হচ্ছে হের স্মিথ৷ সে ছাড়া অপর কেউ কোনো যন্ত্রের মালিকানা দাবি করতে পারে না৷

সাশা তার জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ সঙ্গেসঙ্গে একটা ভারী লোহার যন্ত্র তুলে নিল ফাভেল৷ তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সাশা ‘র‌্যাক’ থেকে তার টুপি আর কোট তুলে নিল এবং হের স্টিথকে উদ্দেশ করে বলল, ‘বিদায় সিনর! আমার কাজ শেষ করে গেলাম৷ পারিশ্রমিক আমি আগেই পেয়ে গেছি৷ সুতরাং আমাদের মধ্যে দেনাপাওনার ব্যাপারটাও মিটে গেল৷’

সাশা বেরিয়ে গেল, কিন্তু জায়গাটা ছেড়ে চলে গেল না৷ কারখানা থেকে একটু দূরে একটা গাছের ছায়ায় অন্ধকারের মধ্যে আত্মগোপন করে সে ফাভেলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল৷ যাই হোক, কারখানার মধ্যে হের স্মিথকে সাক্ষী রেখে সে কিছু করতে ইচ্ছুক ছিল না৷ আজকের অপমান সহ্য করা যায় না— ফাভেলকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে শিকার-সন্ধানী শ্বাপদের মতো অপেক্ষা করতে লাগল সাশা৷

একটু পরে হের স্মিথের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে৷ ফাভেলকে ‘গুড নাইট’ জানিয়ে বিদায় নিচ্ছে মালিক৷ তারপরেই হঠাৎ নিবে গেল কারখানার আলো৷ দরজা বন্ধ করে ফাভেল বাইরে এসে দাঁড়াল৷ এইবার এগিয়ে এল সাশা, ডাকল, ‘ফাভেল!’

কণ্ঠস্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াল ফাভেল, পরক্ষণেই চিৎকার করে উঠল, ‘ডাকাত! ডাকাত!’

সাশা ছুটে এল ফাভেলের দিকে৷ গোলমাল শুনে যেকোনো সময়ে অকুস্থলে চলে আসতে পারে হের স্মিথ৷ না, এখন এখানে মালিকের উপস্থিতি চায় না সাশা৷ ইতিমধ্যে একটা পিস্তল বার করে ফেলেছে ফাভেল, কিন্তু অস্ত্রটা ব্যবহার করার সুযোগ পেল না সে— মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটাকে ছিনিয়ে নিল সাশা৷ ফাভেল একহাতে সাশার মুখে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছিল আর অন্য হাত দিয়ে চেষ্টা করছিল পিস্তলটা আবার হস্তগত করতে— তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল একটা দুর্বোধ্য জান্তব ধ্বনি!

কারখানার পার্শ্ববর্তী যে-বাড়িটায় হের স্মিথ বাস করে, সেখান থেকে হঠাৎ ভেসে এল তার গলার আওয়াজ, ‘ফাভেল! কী হয়েছে? কীসের গোলমাল শুনছি ওখানে?’

এখনই এখানে হের স্মিথ ছুটে আসবে— লড়াই চটপট শেষ করার জন্য অস্থির হয়ে উঠল সাশা, পিস্তলের বাঁট দিয়ে সজোরে হাতুড়ির মতো আঘাত হানল ফাভেলের মাথায়৷ একটা ভোঁতা ধাতব শব্দ এবং ফাভেল হল ধরাশয্যায় লম্বমান৷ সাশা ঝুঁকে দেখল ফাভেলের মুখ চাঁদের আলোতে ফ্যাকাশে সাদা মনে হচ্ছে, রক্তহীন সেই বিবর্ণ মুখে প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই৷

সাশা সোজা হয়ে দাঁড়াল৷ এবার পালাতে হবে৷ সে ফাভেলকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, খুন করতে চায়নি৷ তবে খুন যখন হয়েই গেছে, তখন পালানো ছাড়া উপায় নেই৷ কিন্তু সে স্থানত্যাগ করার আগেই নিকটবর্তী ঝোপ থেকে একটা মূর্তি উঠে দাঁড়াল— তার মাথার উপর সাদা টুপিটা দেখেই মানুষটাকে চিনতে পারল সাশা৷ ডম কার্লোস!

‘শেষ পর্যন্ত এই কাণ্ডটা ঘটালে?’ কার্লোস বলল, ‘তুমি আমার কথামতো শহর ছেড়ে চলে গেলে না কেন? তাহলে এই ব্যাপারটা ঘটত না৷’

ধরাশায়ী ফাভেলের দিকে সে তাকাল, একবার পা দিয়ে নিস্পন্দ দেহটাকে স্পর্শ করল৷

‘লোকটা আমায় চোর বলেছিল,’ সাশা বলল, ‘ওর কাছে কৈফিয়ত না-নিয়ে আমি চলে যেতে পারি না৷’

‘চোর বলার জন্য আবার কৈফিয়ত কীসের?’ কার্লোস বলল, ‘হয় তুমি চুরি করেছ, নয়তো চুরি করনি৷ এক্ষেত্রে আমি ধরে নিচ্ছি তুমি চুরি করনি৷’

‘আলবত আমি চুরি করিনি৷’ সাশা ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ‘মুর্খটাকে আমি সেই কথাটাই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলাম৷’

‘তুমি বেশ ভালোভাবেই সে-কথা বুঝিয়ে দিয়েছ,’ কার্লোস বলল, ‘এখন আমাকে বুঝতে হবে লোকটা এখনও বেঁচে আছে কি না৷ তুমি এখন এখান থেকে চটপট সরে পড়ো৷ হের স্মিথ এখানে এসে পড়বে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে৷’

বাক্যব্যয় না-করে তৎক্ষণাৎ স্থানত্যাগ করল সাশা৷ বেদুইনোর পিঠে দীর্ঘ বনপথ অতিক্রম করে সে যখন একটা নদীর ধারে এসে পৌঁছাল, তখন ভোরের আলো দেখা দিয়েছে৷ নদী পার হয়ে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে অগ্রসর হল সাশা৷ হঠাৎ পিস্তলের আওয়াজ পেয়ে সে চমকে উঠল৷ শব্দ লক্ষ করে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতেই তার চোখে পড়ল নদীর অপর তীরে উচ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে ডম কার্লোস৷ সাশার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় ঘটতেই মাথা থেকে কার্লোস সাদা টুপিটা খুলে ফেলল এবং পিস্তল তুলে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ল৷

সাশা বুঝল কার্লোস ইচ্ছা করলে পথের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলতে পারত৷ মনে মনে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাশা বেদুইনোকে ছুটিয়ে দিল নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে৷

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পাসো ফানডোর চাইতে অনেক ছোটো শহর ক্লিভল্যন্ডিয়া৷ সেখানে পৌঁছে একটা ক্যান্টিনের ভিতর দাদা আর্নস্টকে খুব সহজেই খুঁজে পেল সাশা৷ ওই শহরে সব মিলিয়ে প্রায় ছ-শো নরনারী বাস করে৷ এখানে দুপুর মানেই দিবানিদ্রার সময়৷ ক্যান্টিনে যখন সাশা প্রবেশ করল, তখন সেখানে বসে ছিল আর্নস্ট একা, দ্বিতীয় কোনো প্রাণী সেখানে উপস্থিত ছিল না৷

সাশার মুখের দিকে তাকিয়েই আর্নস্ট বুঝতে পারল একটা কিছু গোলমাল হয়েছে৷

‘তোর নিশ্চয়ই বিপদ হয়েছিল?’ আর্নস্টের প্রশ্ন৷

সাশা মাথা নেড়ে সায় দিল৷ তারপর সমস্ত ঘটনা খুলে বলল৷

‘লোকটা যে মারা গেছে, সে-বিষয়ে তুই কি নিশ্চিত?’

‘আমার মনে হয় ফাভেল মারা গেছে৷ না হলে ডম কার্লোস আমার পিছনে নদী পর্যন্ত ধাওয়া করত না৷’

‘ডম কার্লোস যেমন ধূর্ত, তেমনই বিচক্ষণ,’ আর্নস্ট বলল, ‘খুব সম্ভব তুমি ওই এলাকা ছেড়ে চলে গেছ কি না সে-বিষয়ে সে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল৷ মুখে সে যা-ই বলুক, তোমার পিছনে তাড়া করার ইচ্ছা তার কখনোই ছিল না৷’

কয়েক বছর পরে সাশা জানতে পেরেছিল তার দাদার অনুমান নির্ভুল৷ পাসো ফানডো ছেড়ে ডম কার্লোস যখন সাশাকে অনুসরণ করেছিল, সেইসময় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল ফাভেল— মারা যায়নি৷ দু-দিন ধরে সাশাকে অনুসরণ করেছিল ডম কার্লোস৷ তার কারণ, সাশা যে উক্ত প্রদেশ ত্যাগ করেছে সে-বিষয়ে সে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হতে চেয়েছিল৷ অবশ্য তখন সাশা জানত না যে, ফাভেল বেঁচে আছে৷ সে ধরে নিয়েছিল ফাভেলের হন্তারক হিসেবে পুলিশ তাকে খুঁজছে৷ অতএব ক্লিভল্যন্ডিয়া ছেড়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়ার জন্য সাশা ব্যস্ত হয়ে উঠল৷ পরের দিন সকালেই দুই ভাই ক্লিভল্যান্ডিয়া ছেড়ে মাত্তো গ্রসোর পথে উত্তর দিকে রওনা হল৷

হিরা যেখানে পাওয়া যায়, সোজাসুজি সেই জায়গাটার দিকে অগ্রসর হতে সাহস পেল না দুই ভাই৷ কারণ, পথ অতিশয় দুর্গম, অজস্র জলাভূমির মাঝখানে পথের দিশা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা তো আছেই, তার উপর বনবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের কবলে পড়ার ভয় রয়েছে৷ তাদের খপ্পরে পড়লে সশরীরে ফিরে আসার সম্ভাবনা অতিশয় ক্ষীণ৷ কাজেই দেরি হলেও ঘোরাপথে— যে-পথে জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে লোকালয় দেখা যায়— সেই পথে যাওয়াই নিরাপদ৷

আরও একটি বিষয় সাশার মনে ঝড় তুলেছিল৷ জোকুইম গুয়াতো নামে যে-লোকটির কথা ডম কার্লোস তাকে বলেছিল— বাস্তবে সত্যিই তার অস্তিত্ব আছে কি না জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল সাশা৷ সে জানত মাত্তো গ্রসোর মালভূমিতে যে হিরা পাওয়া যায়, তার সন্ধান পাওয়ার জন্যই উদগ্রীব হয়ে রয়েছে তার দাদা৷ কিন্তু হিরা নয়— জোকুইম নামক অসাধারণ মানুষটি সম্পর্কেই অধিকতর কৌতূহলী ছিল সাশা৷ যদি সত্যিই বাস্তবে ওই লোকটির অস্তিত্ব থাকে, তাহলে মার্সেলো আর বেদুইনোর সঙ্গে লড়াইয়ের চাইতেও অনেক বেশি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চলেছে সাশা৷

দাদার কাছে মনের গোপন ইচ্ছা খুলে বলল না সে, শুধু সাও লরেংকোর দিকে যে বনপথ চলে গেছে, সেই পথ ধরতে দাদাকে পরামর্শ দিল৷ কার্লোসের কাহিনি যদি সত্য হয়, তাহলে ওই পথে গেলেই জোকুইমের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে৷

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

কয়েক সপ্তাহ ধরে পূর্ব প্যারাগুয়ের আবাদ করা জমির উপর দিয়ে অশ্ব ও অশ্বতর চালিয়ে ভ্রমণ করল দুই ভাই৷ ‘মাতে’ বা ব্রেজিলের চা এখানেই জন্মায়৷ যেসব জায়গায় আবাদ করা হয়নি, সেইসব জায়গাতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে নিবিড় অরণ্য৷ পথ চলতে চলতে যেখানে লোকালয় পাওয়া গেছে, সেইখানেই বিশ্রাম নিয়েছে আর্নস্ট আর সাশা৷ লোকালয় থেকে তারা খাদ্য সংগ্রহ করেছে তো বটেই, অধিকন্তু টাকা রোজগার যা করেছে, তা-ও পরিমাণে নেহাত কম নয়৷ ব্রেজিলের ওইসব অরণ্যবেষ্টিত স্থানে যেসব মানুষ থাকে, তারা বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র রাখলেও ওইসব অস্ত্রের যত্ন নিতে জানে না৷ ফলে বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি অস্ত্র প্রায়ই অকেজো হয়ে যায়৷ দুই ভাই ওই অকেজো অস্ত্রের মেরামতির কাজে খুবই দক্ষ হয়ে উঠেছিল এবং তাদের খ্যাতি ছাড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন গ্রামে ও শহরে৷ তাদের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় না-থাকলেও ভ্রাম্যমাণ পথিকের মুখে দক্ষ মিস্ত্রি হিসাবে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূরদূরান্তে৷

একদিন একটা ছোটো জনবসতির মধ্যে যখন তারা ঘোড়া আর খচ্চর চালিয়ে এসে পড়েছে, সেইসময় একটি প্রবীণ পুরুষ তাদের অভিবাদন জানিয়ে বলল, ‘আমি এই এলাকার মেয়র৷ আমার নাম ইউসোবিও৷ আমি বোধহয় দুই বিখ্যাত রুশ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলছি, যারা অকেজো বন্দুক-পিস্তল মেরামত করতে জানে এবং অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তোলে?’

গভীর অরণ্যের মধ্যেও যে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সে-কথা জেনে দুজনেই খুব আশ্চর্য হল, খুশিও হল৷ সাশা মেয়রকে বলল নানা ধরনের ওষুধ তারা সঙ্গে রাখে বটে, রোগ সারানোর চেষ্টা করে এ-কথাও মিথ্যা নয়— তবে সেজন্য তারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করে না৷

জনবসতির এক পাশে বাঁশ আর পাতা দিয়ে একটা গির্জা তৈরি করা হয়েছে৷ গির্জার পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে একটা অগভীর নদী৷ ওই নদীর ধারে বয়স্ক মানুষটির নির্দেশ অনুসারে ঘোড়া আর খচ্চরদের নিয়ে গেল আর্নস্ট৷ উদ্দেশ্য— জন্তুগুলোর পিঠ থেকে মালপত্র খুলে তাদের ভারমুক্ত করা এবং নদীর জলে তাদের তৃষ্ণা নিবারণের সুযোগ দেওয়া৷

‘কয়েকদিনের জন্য যদি একটা ঘর ভাড়া পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের সুবিধা হয়,’ সাশা বলল, ‘যে কয়দিন আমরা থাকব, সেই ক-টা দিন আমরা চুপচাপ বসে থাকব না— যেসব অকেজো বন্দুক-পিস্তল আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, সেগুলোকে আমরা আবার ব্যবহারের উপযুক্ত করে দেব৷’

বয়স্ক মানুষটি জানাল থাকার ব্যবস্থা করতে তার অসুবিধা হবে না৷ তারপর সে বলল, ‘প্রথমেই একটা গুরুতর ব্যাপারে আমি তোমাদের সাহায্য চাইব৷ আমার বাড়িতে একজন অতিথি আছে৷ তার দুই পায়ে ঘা হয়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে, লোকটা আর হাঁটাচলা করতে পারছে না৷’

আর্নস্ট গেল তাদের বহনকার্যে নিযুক্ত পশুগুলোর পরিচর্যা করতে নদীর ধারে, আর সাশা গেল ইউসোবিও নামে বয়স্ক মানুষটির সঙ্গে তার অতিথিকে দেখতে৷

একটি কুঁড়েঘরের ভিতর শায়িত অবস্থায় লোকটিকে দেখতে পেল সাশা৷ লোকটি ব্রেজিলের অধিবাসী, কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়৷ সাময়িকভাবে কোনো কার্যে নিযুক্ত হলে সেই কাজ সম্পন্ন করে এবং পরবর্তী কাজের সন্ধান করতে থাকে৷ বর্তমানে এই অঞ্চলে এসে বিপদে পড়েছে— পোকার কামড়ে তার দুই পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে এমনভাবে বিষিয়ে উঠেছে যে, তার এখন চলাফেরা করার ক্ষমতা নেই৷ লোকটির নাম অ্যাপারিসিও৷ সে জানাল যদি তার পা দুটোকে যথাযথ চিকিৎসা করে তাকে কেউ সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিতে পারে, তবে উক্ত চিকিৎসককে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে সন্তুষ্ট করতে সে প্রস্তুত৷

‘গ্যারাপাটা’ নামক পোড়ার কামড় খুব মারাত্মক৷ পূর্বোক্ত পোকার কামড়েই অ্যাপারিসিওর পা দুটির অবস্থা হয়েছে অতিশয় শোচনীয়৷ পচনক্রিয়া প্রায় শুরু হয়ে গেছে৷ অক্লান্ত সেবা আর উপযুক্ত ঔষধ প্রয়োগ করে তিন সপ্তাহের মধ্যেই লোকটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলল সাশা৷ কথাবার্তার মধ্য দিয়ে ওই সময়ের ভিতর লোকটির সঙ্গে সাশার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল৷ কথায় কথায় সাশা জানাতে পারল সাও লরেংকো নামে জায়গাটার কাছাকাছি একজন ‘তাইগরেরো’ থাকে বলে শুনেছে অ্যাপারিসিও৷ তবে কথাটা কতটা সত্যি তা বলতে পারল না সে৷ বনাঞ্চলে সত্যমিথ্যা জড়িয়ে নানা ধরনের রটনা শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের মুখে৷ অ্যাপারিসিও জানাল লরেংকোর কাছে অবস্থিত তাইগরেরা সম্পর্কে খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে বাস্তবে ওইরকম কোনো শিকারির অস্তিত্ব নেই— সমস্তটাই বাজে গুজব৷ কিন্তু সাশা মনে মনে স্থির করল সত্যমিথ্যা সে যাচাই করবে নিজের চোখে; সেই কাজটা করতে হলে অ্যাপারিসিওকে নিয়ে তাকে যাত্রা করতে হবে নির্দিষ্ট স্থান অভিমুখে৷

সাশা জানত তার দাদা কিছুতেই জঙ্গলের মধ্যে তাদের পথচলার সঙ্গী হতে চাইবে না৷ তাই সে আর্নস্টকে বলল ‘তুমি এখন কোক্সিম শহরে থাকো৷ আমি আর অ্যাপারিসিও যাব উত্তর দিকে৷ তারপর পছন্দমতো একটা শহরে আবার আমরা মিলিত হব৷’

আর্নস্ট খুবই বিরক্ত হল, ‘আমি জানি তুমি সেই বুড়ো ইন্ডিয়ান শিকারির খোঁজ করতে চলেছ৷ বেশ, যাও— আমি জঙ্গলের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে রাজি নই৷ আমি চাই মানুষের সাহচর্য— শহর কিংবা গ্রাম, যেখানে মানুষের বসতি আছে, আমি সেখানে থাকতে চাই৷’

তখন স্থির হল এখন আর্নস্ট থাকবে কোক্সিম শহরে, তারপর ভাইয়ের কাছে খবর পেলে অন্য কোথাও— খুব সম্ভব ‘কুয়ারা’ শহরে— অপেক্ষা করবে সাশার সঙ্গে আবার মিলিত হওয়ার জন্য৷ ইতিমধ্যে সাশা আর অ্যাপারিসিও অগ্রসর হবে বনজঙ্গল ভেদ করে ‘সাও লরেংকো’ নামে জায়গাটার দিকে৷

যাত্রা শুরু করার আগে বড়ো ভাই আর্নস্টের আপত্তি সত্ত্বেও তাদের পাসো ফানডো শহর ত্যাগ করার আসল কারণ, অর্থাৎ ফাভেল-ঘটিত দুর্ঘটনার বিবরণ সাশা খুলে বলল অ্যাপারিসিওর কাছে৷ সব শুনে অ্যাপারিসিও বলল, ‘আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেই মাত্তো গ্রসোতে এসব ব্যাপার নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না৷ পাসো ফানডোর পুলিশ তাদের এলাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের নিয়ে এতই বিব্রত যে, অন্য এলাকায় গিয়ে আসামিকে পাকড়াও করার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের নেই৷ অতএব ফাভেলের ব্যাপারে তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো৷’

পরের দিন তিনজন যাত্রা করল উত্তর দিকে অবস্থিত কোক্সিম শহরের দিকে৷

সপ্তম পরিচ্ছেদ

আর্নস্ট রইল কোক্সিম শহরে৷ সাশা ও অ্যাপারিসিও উত্তর-পশ্চিম দিকে দুর্গম বনজঙ্গল আর জলাভূমি পেরিয়ে অগ্রসর হল সাও লরেংকো নামে জায়গাটার দিকে৷ সাশা শুনেছিল এইসব অঞ্চল তাইগরের প্রিয় বাসস্থান৷ সতর্ক হয়ে যাতায়াত না-করলে হিংস্র শ্বাপদের আক্রমণে যেকোনো সময়ে পথিকের মৃত্যু ঘটতে পারে৷

একদিন সন্ধ্যায় একটা আধ-শুকনো জলাশয়ের ধারে অভিযাত্রীদের তাঁবু পড়ল৷ অ্যাপারিসিও একটা হরিণকে গুলি চালিয়ে মেরেছিল৷ মৃতদেহটাকে তাঁবুর কাছেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হল— উদ্দেশ্য ছিল, পরের দিন ওই মাংস দিয়েই উদরের ক্ষুধাকে তৃপ্ত করা হবে৷

গাছের ডালে দোলনার মতো ‘হ্যামক’ টাঙিয়ে তার মধ্যে শুয়ে পড়ল সাশা আর অ্যাপারিসিও৷ গভীর রাত্রে হঠাৎ সাশার ঘুম ভেঙে গেল৷ অগ্নিকুণ্ডের আগুন প্রায় নিবে এসেছে, অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে জ্বলছে একটা গোলাপি আভা৷ মাথার উপর রাতের আকাশে জ্বলছে অসংখ্য তারা, নীচে অরণ্যের বুকে রাজত্ব করছে ঘনীভূত অন্ধকার৷

সাশা যখন ঘুম ভাঙার কারণটা নির্ণয় করার চেষ্টা করছে, সেইসময় একটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়ংকর শব্দ তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করল—

হাড় ভাঙার আওয়াজ!

দাঁতের চাপে হাড় ভাঙার ক্ষমতা রাখে ওই অঞ্চলে একটি মাত্র জানোয়ার—

তাইগর!

দারুণ আতঙ্কে সাশার শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল৷ প্রথমে সে ভেবেছিল তাইগরের শিকার হয়েছে অ্যাপারিসিও, কিন্তু একটু দূরে আর একটি গাছের ডালে ঝোলানো হ্যামকের মধ্যে অ্যাপারিসিওর উপবিষ্ট দেহ অন্ধকারের মধ্যেও অস্পষ্টভাবে সাশার দৃষ্টিগোচর হল৷ সে বুঝতে পারল গাছের ডালে ঝোলানো হরিণের মৃতদেহটাকে মাটিতে টেনে নামিয়ে সেটাকে ভক্ষণ করছে একটি তাইগর৷ হরিণের হাড়গুলো কড়মড় শব্দে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তাইগরের শক্তিশালী দুই দাঁতালো চোয়ালের চাপে...

হাড় ভাঙার আওয়াজ থামল একটু পরে৷ তারপর শোনা গেল ঘাসের উপর দিয়ে কোনো গুরুভার বস্তু টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ এবং কিছুক্ষণ পরে সেই শব্দও গেল মিলিয়ে৷ সাশা বুঝল মৃত হরিণের দেহটাকে বনের মধ্যে নিয়ে গেল তাইগর— অবশিষ্ট মাংস পরবর্তীকালে কাজে লাগবে বলে৷

কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর অ্যাপারিসিওর মৃদু কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সাশা, ‘সিনর— জেগে আছ?’

মাথার কাছে গাছের ডালে চামড়ার ফিতায় আটকানো খাপ থেকে পিস্তলটা হস্তগত করে নেমে এল সাশা৷ অ্যাপারিসিও তার ‘ফ্ল্যাশলাইট’ জ্বালল— যেখানে হরিণটা ঝুলছিল, সেখানে এখন কিছুই নেই৷ দুজনে সারারাত্রি জেগে কাটিয়ে দিল— বলা তো যায় না, আরও একটি ক্ষুধার্ত তাইগরের আবির্ভাব যদি ঘটে এবং মৃগমাংসের অভাবে নরমাংস দিয়েই যদি উক্ত শ্বাপদ উদরের ক্ষুধাকে তৃপ্ত করতে চায়, তাহলে নিদ্রিত মানুষের পক্ষে তাকে বাধা দেওয়া অসম্ভব— নিদ্রা যেখানে চিরনিদ্রায় পরিণত হতে পারে, সেখানে রাত্রি জাগরণের কষ্ট নিতান্তই তুচ্ছ...

সকালের আলোতে মধ্যরাতের অতিথির পদচিহ্ন চোখে পড়ল; হরিণটাকে গাছের ডাল থেকে টেনে নামানোর সময়ে তার নখের চিহ্ন গভীর হয়ে মাটিতে বসে গেছে!

সেই রাতের অভিজ্ঞতা দুজনকেই ভীত ও সতর্ক করে দিল৷ তারা বুঝল নিশ্চিন্তে নিদ্রা গেলে যেকোনো মুহূর্তে সেই নিদ্রা চিরনিদ্রায় পরিণত হতে পারে৷ পূর্বোক্ত অভিজ্ঞতার পর থেকে রাত্রে তারা পালা করে জেগে থাকত— একজন যখন নিদ্রাসুখ উপভোগ করত, অপর ব্যক্তি তখন জাগ্রত অতন্দ্র প্রহরায়৷

একদিন অপরাহ্ণে ঘোড়া আর খচ্চর চালিয়ে ঢালু জমি দিয়ে যখন তারা অগ্রসর হচ্ছে, সেইসময় সবুজ জঙ্গলের ভিতর কুণ্ডলী-পাকানো ধোঁয়া তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল৷ ওই ধোঁয়া লক্ষ করে এগিয়ে গিয়ে একটা লোকালয়ের সন্ধান পেল তারা৷ জনৈক স্থানীয় অধিবাসীকে প্রশ্ন করে তারা জানল এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি গোচারণের জন্য সংরক্ষিত; মালিকের নাম ডম জুয়ায়ো কাজাংগো৷ একটা সাদা বাড়ির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে স্থানীয় লোকটি জানিয়ে দিল ওই বাড়িতেই বাস করেন মালিক মহাশয়৷

নির্দিষ্ট সাদা বাড়িতে গিয়ে দুজনেই মালিকের সঙ্গে পরিচিত হল৷ ডম জুয়ায়ো বয়স্ক ব্যক্তি, তার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু সে এখনও যুবকের মতো শক্তসমর্থ৷ নিজেদের পরিচয় দিয়ে সাশা জানাল সে একজন ভ্রাম্যমাণ মিস্ত্রি, সঙ্গী অ্যাপারিসিও তার সহকারী৷ বন্দুক, পিস্তল থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের যন্ত্রপাতি তারা মেরামত করতে পারে— সিনর জুয়ায়ো কাজ দিলেই তাদের দক্ষতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারবেন৷

সিনর জুয়ায়োর বাড়িতে অচল হয়ে পড়ে ছিল ছয়টি সেলাইয়ের কল৷ ওইগুলো মেরামতের জন্য পারিশ্রমিকের অঙ্ক স্থির করতে গিয়েই সাশা বুঝল লোকটি অতিশয় কৃপণ৷ জুয়ায়োর পোষা গোরুর সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার, পার্শ্ববর্তী অরণ্যভূমি থেকে শুরু করে গয়াজ প্রদেশ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ জমি তার অধিকৃত, কিন্তু একটি পয়সা খরচ করতে গেলে তার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে!

সাশার ক্যামেরাটি জুয়ায়োর মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল, সে জানতে চাইল এই হতচ্ছাড়া জায়গা থেকে কোন ধরনের ছবি তুলতে চায় সশা? উত্তরে সাশা জানাল তার সহকারী অ্যাপারিসিওর কাছে সে শুনেছে এই জায়গাটা তাইগরদের প্রিয় বাসস্থান, তাই সে ক্যামেরা এনেছে তাইগরের ফটো তোলার জন্য৷

‘আমার অনেকগুলো গোয়ালের মধ্যে একটি গোয়ালে এখন একটা তাইগর আছে,’ ডম জুয়ায়ো বলল, ‘তুমি ইচ্ছা করলে তার ফটো নিতে পারো৷’

গোয়ালের মধ্যে তাইগর! সাশা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, ‘জানোয়ারটা কী জীবিত?’

‘অবশ্যই না৷ ওটা মরে গেছে৷ ওর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বার হচ্ছে৷ তবে ফটোতে তো আর গন্ধ পাওয়া যাবে না৷ ফটো তোলার জন্য আমি তোমার কাছে টাকাপয়সা চাইব না৷’

সাশা জানাল মালিক মহাশয়ের উদারতায় সে অভিভূত, কিন্তু সেই উদারতার সুযোগ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়— কারণ, মৃত নয়, জীবন্ত তাইগরের ফটো তুলতেই সে উৎসুক৷

উত্তরে জুয়ায়ো জানাল জীবন্ত তাইগরের ফটো তোলার জন্য যে-ব্যক্তি নিজের প্রাণ বিপন্ন করে, সে নিরেট মুর্খ৷

সাশা অবশ্য গোয়ালে অবস্থিত মৃত তাইগরের ফটো তুলে নিজেকে বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে সচেষ্ট হল না৷ অতএব প্রসঙ্গটা ওখানেই চাপা পড়ে গেল৷

কয়েকদিন পরের কথা— সাশা পূর্বোক্ত সেলাই-এর কলগুলোকে মেরামত করার চেষ্টা করছে, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সেখানে উপস্থিত হল ডম জুয়ায়ো৷

‘আমার দুই ছেলে কাল পশ্চিম দিকে শিকার করতে যাবে,’ জুয়ায়ো বলল, ‘একটা তাইগর ভীষণ উৎপাত করছে৷ আমার অনেকগুলো গোরু জন্তুটার কবলে মারা পড়েছে৷ সেটাকে মারার জন্যই যাবে আমার দুই ছেলে৷ ইচ্ছে করলে তুমিও যেতে পারো ওদের সঙ্গে৷ হয়তো জ্যান্ত তাইগরের ছবি তোলার সুযোগ পাবে তুমি৷’

বলাই বাহুল্য, এমন সুযোগ হাতছাড়া করল না সাশা৷ জর্জ আর বার্নারদো নামে মালিকের দুই ছেলের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে সাশা যাত্রা করল তাইগর শিকারের উদ্দেশে৷ তাদের সঙ্গে চলল একদল শিকারি কুকুর৷ মাটিতে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কুকুরের পাল এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের অনুসরণ করছিল অশ্বারোহী দুই ভাই৷ খুব মনোযোগের সঙ্গে ব্যাপারটা লক্ষ করছিল সাশা পিছন থেকে৷ তার দুই সঙ্গী কুকুরের সাহায্যে শিকার করতে অভ্যস্ত হলেও ওই ধরনের শিকারে সাশা ছিল অনভিজ্ঞ৷

কয়েক মিনিট ঘোড়ার পিঠেই চতুষ্পদ ও দ্বিপদ শিকারিদের অনুসরণ করতে চেষ্টা করল সাশা, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ঘন ঝোপ আর লতার বেড়াজাল ভেদ করে ঘোড়া চালানো অসম্ভব হয়ে উঠল৷ তখন ঘোড়াটাকে একটা গাছে বেঁধে রেখে সাশা দৌড়াতে শুরু করল৷ বড়ো ভাই জর্জও ঘোড়া থেকে ছেড়ে পায়ে হেঁটেই অগ্রসর হচ্ছিল— একটু পরে তাকে আর কুকুরের দলটাকে দেখতে পেল সাশা৷ কুকুরগুলো একটা মস্ত গর্তের সামনে তখন বৃত্তাকারে ঘুরছিল৷

জর্জ গর্তটাকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কায়তেতু’! অর্থাৎ শুয়োর!

যাচ্চলে! তাইগরের পরিবর্তে শুয়োর! কুকুরগুলো প্রথমে তাইগরের পিছু নিয়ে পরে শুয়োরের গন্ধে আকৃষ্ট হয়েছিল, অথবা প্রথম থেকেই কুকুরদের চালচলন বুঝতে ভুল করেছিল দুই ভাই— সেটা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারল না সাশা৷ তবে তাইগরের পরিবর্তে শুয়োর শিকারের সম্ভাবনা তাকে আদৌ উৎসাহিত করতে পারেনি৷ কিন্তু জর্জ আর বার্নারডো শূকরমাংস ভোজনের আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল, মহা উৎসাহে তারা আগুন ধরিয়ে দিল গর্তের মুখে৷ কিছুক্ষণ পরেই গর্তের ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে একটা শুয়োর দৌড় দিল ঘন জঙ্গলের দিকে৷ তৎক্ষণাৎ গর্জে উঠল রাইফেল, লুটিয়ে পড়ল বুলেট-বিদ্ধ শূকরের মৃতদেহ৷

সেই রাতে সুস্বাদু বরাহমাংস দিয়ে নৈশভোজন সমাপ্ত করল তিন শিকারি৷ তিনজন একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লে বিপদ ঘটতে পারে, তাই রাত্রে পালা করে জেগে থাকাই উচিত বলে বিবেচনা করল জর্জ আর সাশা৷ বার্নারদো বয়সে ছোটো বলে তাকে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার কর্তব্য থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল৷

পরের দিন খুব ভোরে উঠে আবার কুকুর নিয়ে তাইগরের সন্ধানে ছুটল তিন শিকারি৷ কিছুক্ষণ পরেই অগ্রবর্তী সারমেয়-বাহিনীর দলপতির কণ্ঠে জাগল গভীর গর্জন! কুকুরের ভাষা বুঝতে পারত জর্জ আর বার্নারদো— দলপতির কণ্ঠস্বর শুনেই তারা বুঝে নিল সারমেয়-বাহিনী এইবার তাইগরের সন্ধান পেয়েছে৷ শব্দ লক্ষ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল জর্জ, অন্য দুজন তাকে অনুসরণ করল৷

কিছুদূর যাওয়ার পর কর্দমাক্ত জমির উপর তাইগরের থাবার চওড়া দাগ তাদের চোখে পড়ল৷ পদচিহ্ন যেখানে রয়েছে, সেখানে এক ইঞ্চি গভীর কয়েকটি গর্তের সৃষ্টি করেছে তাইগরের ভয়ংকর নখগুলো!

‘জন্তুটা লাফ দিতে প্রস্তুত হয়েছিল,’ জর্জ মৃদুস্বরে বলল, ‘না হলে মাটিতে নখের দাগ দেখাই যেত না৷’

এতক্ষণ পর্যন্ত সাশার কল্পনাতেই ছিল তাইগরের অবস্থান, কিন্তু এইবার সে জন্তুটার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হল এবং সঙ্গেসঙ্গে তার ধমনীতে রক্তস্রোত চঞ্চল হয়ে সর্বাঙ্গে জাগিয়ে তুলল উত্তেজনার শিহরন!

কুকুরগুলো ছুটতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্তর্ধান করল শিকারিদের দৃষ্টিসীমার অন্তরালে৷ সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে কুকুরগুলোকে অনুসরণ করতে সচেষ্ট হল তিন শিকারি৷ শিকারকে তাড়া করার আগে ক্যামেরাটাকে বার্নারদোর হাতে তুলে দিয়েছিল সাশা৷

আচম্বিতে ভয়ংকর শব্দে বেজে উঠল কুকুরের তীব্র কণ্ঠস্বর! ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে শব্দ লক্ষ করে ছুটল জর্জ আর সাশা৷ সামনেই একটা ঝোপ, সেটা পার হতেই সাশার চোখে পড়ল একটা ভয়াবহ দৃশ্য— ঝোপের পরেই যে ফাঁকা জায়গাটা রয়েছে, সেখানে মাটির উপর শুয়ে রক্তাক্ত শরীরে ছটফট করছে একটা কুকুর, তার বিদীর্ণ উদর থেকে বেরিয়ে এসেছে ভিতরের নাড়িভুঁড়ি! জন্তুটাকে যন্ত্রণা থেকে আশু মুক্তি দিতে তার মাথা লক্ষ করে গুলি ছুড়ল সাশা— সব শেষ৷

ঠিক সেইসময় সামনের বনভূমির দিকে সাশার দৃষ্টি আকর্ষণ করল জর্জ৷ জর্জের ইঙ্গিত অনুসারে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতেই যে-দৃশ্যটি সাশার চোখের সামনে ফুটে উঠল— পরবর্তীকালে সেইরকম দৃশ্য বহুবার দর্শন করলেও প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতা সাশা কোনোদিনই ভুলতে পারবে না—

মাটি থেকে প্রায় বিশ ফুট উপরে একটা গাছের ডালে বসে শিকারিদের নিবিষ্টচিত্তে নিরীক্ষণ করছে তাইগর!

তার চোখের দৃষ্টিতে ভয় বা ক্রোধের চিহ্ন নেই, আছে শুধু কৌতূহলের আভাস!

সাশা পরে জানতে পেরেছিল বনবাসী পশুদের মধ্যে তাইগরকে ভয় করে না একটিমাত্র জানোয়ার— পেকারি! ওই জন্তুটা হচ্ছে একধরনের বুনো শুয়োর; আকারে ছোটো, স্বভাবে ভয়ংকর৷ পেকারিরা সর্বভুক, আমিষ বা নিরামিষ কোনো খাদ্যেই তাদের আপত্তি নেই৷ তাইগরকে দেখলেই পেকারিরা দল বেঁধে আক্রমণ করে৷ দলের মধ্যে পড়ে গেলে তাইগরের আর রক্ষা নেই, কয়েকটি শত্রুকে হত্যা করলেও দলবদ্ধ পেকারির আক্রমণে মৃত্যু তার অবধারিত৷ তাই পেকারির দল তাইগরকে আক্রমণ করলেই সে চটপট গাছে উঠে পড়ে৷ গাছের তলায় অনেকক্ষণ আস্ফালন করার পর পেকারিরা যখন বুঝতে পারে তাইগরকে তারা আর ধরতে পারবে না, তখন তারা দল বেঁধে স্থানত্যাগ করে৷ এতক্ষণ গাছের উপর বসে সাগ্রহে দলটাকে লক্ষ করছিল তাইগর, এইবার হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে দলছুট একটা পেকারিকে মুখে তুলে নিয়ে সে বিদ্যুদবেগে সরে পড়ে দলটার নাগালের বাইরে৷ এই তাইগরটাও বোধ হয় কুকুর আর মানুষের মিলিত দলটাকে পেকারি-জাতীয় জীব ভেবে নিয়ে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিল৷

সাশা এইবার তাইগরের দিক থেকে ফিরে জর্জের দিকে চাইল৷ সে আশা করেছিল জর্জ গুলি চালানোর জন্য প্রস্তুত হবে, কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়েই সাশা বুঝতে পারল ছেলেটি ভীষণ ভয় পেয়েছে— নিদারুণ আতঙ্কে তার বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে৷

ফিসফিস করে অত্যন্ত মৃদুস্বরে সাশা বলল, ‘যাও, বার্নারদোকে ডেকে নিয়ে এসো৷ তার কাছে আমার ক্যামেরা রয়েছে৷’

জর্জ ধীরে ধীরে পা ফেলে অকুস্থল থেকে অদৃশ্য হল এবং একটু পরেই ছোটো ভাই বার্নারদোকে নিয়ে ফিরে এল যথাস্থানে৷ বার্নারদোর হাত থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে নিজের রাইফেলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল সাশা, ‘রাইফেলটা ধরো৷ আমি যখন ছবি তুলব, তখন যদি জন্তুটা আক্রমণ করে, তাহলে তুমি ওকে লক্ষ করে গুলি চালাবে৷’

তাইগরকে দেখে বার্নারদো দাদার মতোই ঘাবড়ে গিয়েছিল, তবে রাইফেলটা সে হাত বাড়িয়ে নিতে ভুলল না৷

সাশা ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করে শাটার টিপে দিল৷ একটা অস্পষ্ট শব্দ উঠল৷ ঠিক সেই মুহূর্তেই কুকুরগুলো হঠাৎ নীরব হয়ে পড়েছিল— শাটার টেপার ক্ষীণ শব্দ তাইগরের কানে যেতেই সে হঠাৎ ঘুরে বসে সাশার উপর তার দুই চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টি স্থাপন করল৷

‘রাইফেলটা আমার হাতে দাও,’ ফিসফিস করে বার্নারদোকে বলল সাশা৷ সে একবারও তাইগরের দিক থেকে চোখ সরায়নি৷ যখন রাইফেলের বাঁট তার হাত স্পর্শ করল, ঠিক সেই মুহূর্তে এক লাফ মেরে বিশ ফুট উঁচু বৃক্ষশাখা থেকে মাটির উপর এসে পড়ল তাইগর! কুকুরগুলো তৎক্ষণাৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাইগরের ভয়ংকর থাবার নাগাল থেকে দূরে সরে গেল; আর হঠাৎ ভীষণ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল বার্নারদো৷

কুকুরগুলো আবার মিলিতভাবে আক্রমণ করতে ছুটে এল তাইগরের দু-পাশে৷ কিন্তু কুকুরদের দিকে ফিরেও তাকাল না অতিকায় মার্জার, তার জ্বলন্ত দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ হয়েছে বার্নারদোর উপর৷ একটি হাতের মুঠি সজোরে মুখের উপর চেপে ধরেছে বার্নারদো, যেন ভিতর থেকে ঠেলে-ওঠা একটা আর্ত-চিৎকার সে রুখে দিতে চাইছে প্রাণপণে এবং বিস্ফারিত দুই চক্ষের ভয়ার্ত দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছে অদূরবর্তী তাইগরকে৷

বার্নারদোকে লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাইগর, সঙ্গেসঙ্গে অগ্নি-উদগার করে গর্জে উঠল সাশার রাইফেল৷ সাশা দেখল একটা প্রকাণ্ড থাবা বাতাস কেটে ছুটে এল, পরক্ষণেই মাটিতে ছিটকে পড়ল বার্নারদো৷ আবার গুলি ছুড়ল সাশা তাইগরকে লক্ষ করে৷ সাশার উলটোদিক থেকে তাইগরের মাথায় গুলি চালাল জর্জ৷ একসঙ্গে দুটি বুলেটের আঘাতে প্রকাণ্ড জন্তুটা কুণ্ডলী পাকিয়ে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে পড়ল৷

বার্নারদো তখন হাঁটু পেতে বসে পড়েছে৷ সাশা দেখল তার শার্ট অনেকটা জায়গা নিয়ে লম্বালম্বিভাবে ছিঁড়ে গেছে৷ প্রথমে সাশা ভেবেছিল তাইগরের ধারালো নখ বার্নারদোর পাঁজর বিদীর্ণ করেছে— পরে দেখা গেল তা নয়, তাইগরের থাবার তালু সজোরে আঘাত করে ছেলেটিকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে এবং সেই আঘাতের ফলেই ছিঁড়ে গেছে শার্ট— ভয়ংকর নখগুলো বার্নারদোর শরীর স্পর্শ করতে পারেনি, সে ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত৷

ওই ঘটনার পর বহু তাইগর শিকার করেছে সাশা৷ ত্রিশটি বছর কাটিয়েছে সে দক্ষিণ আমেরিকার বনে জঙ্গলে৷ ওই সময়ের মধ্যে তিনশো তাইগর মেরেছে সে৷ নিহত জন্তুগুলোর মধ্যে অন্তত তিরিশটি পশুর সম্মুখীন হয়েছিল সে বর্শা হাতে৷ তবে দক্ষিণ আমেরিকার বনরাজ্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট তাইগরকে সে কখনো ঘৃণা করতে পারেনি— ভয়াল সুন্দর ওই হিংস্র জীবটি সম্পর্কে সে পোষণ করত শ্রদ্ধামিশ্রিত এক অদ্ভুত ভালোবাসা!

অষ্টম পরিচ্ছেদ

তাইগর শিকারের পর কেটে গেল দুটি সপ্তাহ৷ ওই সময়ের মধ্যে যেসব বিকল যন্ত্র মেরামতের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল সাশা, সেই যন্ত্রগুলোকে সে সারিয়ে ব্যবহারের উপযুক্ত করে দিল৷ তারপর পারিশ্রমিকের অর্থ গ্রহণ করে ডম জুয়ায়োকে বিদায় জানিয়ে সাও লরেংকোর পথে রওনা হল সাশা৷ বলাই বাহুল্য, সঙ্গে ছিল পথের দিশারী অ্যাপারিসিও৷

প্রায় মাস দুই ধরে বনজঙ্গল আর বিপজ্জনক জলাভূমি অতিক্রম করে সাও লরেংকোর কাছাকাছি সিনর শিকো পিন্টো নামে এক ভূস্বামীর গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করল সাশা ও অ্যাপারিসিও৷

ওই সময়ের মধ্যে দাদা আর্নস্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোনো উপায় ছিল না সাশার৷ বনের পথে সরকারি ডাকবিভাগ সম্পূর্ণ অচল, স্থানীয় মানুষ সম্পূর্ণ নির্ভর করে বেসরকারি ব্যবস্থার ওপর৷ এখানে আসার আগে এক র‌্যাঞ্চ মালিকের অতিথি হয়েছিল সাশা৷ সেখানে সে শুনল খুব শীঘ্রই একটি লোক স্থানীয় অধিবাসীদের চিঠিপত্র নিয়ে রওনা দেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আত্মীয়স্বজনের কাছে ওই চিঠিগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য৷ পূর্বোক্ত পত্রবাহকের হাতে চিঠি দিয়ে কোক্সিমে দাদা আর্নস্টকে খবর পাঠাল সাশা— কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কুয়াবা শহরে এসে দাদা আর্নস্টের সঙ্গে দেখা করবে সে৷

সিনর শিকো পিন্টো নামে যে ভূস্বামীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিল সাশা, সে ছিল ওই অঞ্চলের একজন চিনির কারবারি৷ সাশা আর অ্যাপারিসিওর সাময়িক বাসস্থান হিসাবে বরাদ্দ ছিল একটি মাটির কুঁড়েঘর৷ সিনর শিকোকে দুজনেই কথা দিয়েছিল চিনির কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো তারা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে এবং ওই কাজ শেষ না-করে তারা স্থানত্যাগ করবে না৷

ডম কার্লোসের ‘তাইগরেরো’ কাহিনির সত্যাসত্য নির্ণয় করার জন্য এখন বদ্ধপরিকর হল সাশা৷ এবার সে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবে৷ না হলে এই ব্যাপারটা নিয়ে সে আর মস্তিষ্ককে ঘর্মাক্ত করবে না৷

এক রাতে সে সিনর শিকোকে প্রশ্ন করল, ‘সিনর শিকো, আপনি কি এই অঞ্চলে জোকুইম গুয়াতো নামে কোনো রেড ইন্ডিয়ান শিকারিকে জানেন? শুনেছি, ওই লোকটা শুধুমাত্র বর্শা দিয়ে তাইগর শিকার করে?’

‘জোকুইম?’ সিনর শিকো একটু চিন্তা করল, ‘হ্যাঁ, এই নামে একটি লোক আছে বটে৷ ‘‘গুয়াতো’’ হচ্ছে রেড ইন্ডিয়ান জাতির একটি শাখার নাম৷ অর্থাৎ জোকুইম ওই গুয়াতো শাখার অন্তর্গত একটি মানুষ৷ লোকটা আমার কাছে মাঝে মাঝে কাজ করে৷ কিন্তু গ্রীষ্মকালে যখন তাইগররা গোরুবাছুরের উপর হামলা করে, সেইসময় ‘‘ফাজেন্দা আলেগর’’ নামে যে বিশাল র‌্যাঞ্চ বা গোচারণ-ভূমি বহমান নদীর উত্তরদিকে কুয়াবা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে— সেই র‌্যাঞ্চের হয়ে ভাড়াটে শিকারি হিসাবে কাজ করে জোকুইম গুয়াতো৷’

আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর সাশা সিনর শিকোর কাছে জানতে পারল যে, প্রায় তিরিশ বছর আগে জোকুইম এই অঞ্চলে আসে৷ শোনা যায় সে কুড়িটা হিংস্র তাইগরকে বর্শা দিয়ে শিকার করেছে৷ লোকটি কারো সাহায্য নেয় না, একাই শিকার করে— অবশ্য কুকুরের দল তাকে তাইগর শিকারে সহায়তা করে৷

সাশা জানতে চাইল রেড ইন্ডিয়ান জাতি কি কারো সাহায্য না-নিয়ে একা শিকার করতে অভ্যস্ত?

উত্তরে সিনর শিকো জানাল তারা এককভাবে তাইগরের মুখোমুখি হতে চায় না৷ তারা দল বেঁধে শিকার করে৷ তাদের হাতে থাকে তিরধনুক আর জাগায়া (বর্শা)৷ তবে রেড ইন্ডিয়ান জাতির মধ্যে দু-একজন নিঃসঙ্গ তাইগর-শিকারির কথা মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে৷ কিন্তু বর্তমানে জোকুইম গুয়াতো হচ্ছে একমাত্র শিকারি যে সম্পূর্ণ এককভাবে বর্শা হাতে তাইগরের বিদ্যুৎবৎ ক্ষিপ্র আক্রমণের সম্মুখীন হওয়ার সাহস রাখে৷ লম্বা লম্বা ঘাস আর জলাভূমির মধ্যে রাইফেল নিয়ে লক্ষ্য স্থির রাখা অসম্ভব, সেখানে বর্শা হচ্ছে একমাত্র নির্ভরযোগ্য অস্ত্র৷

‘জোকুইম বর্শাধারী শিকারি’, সিনর শিকো বলল, ‘তার মতন নির্ভীক মানুষ আমি আর একটিও দেখিনি৷’

সিনর শিকো আরও বলল, ‘আমার মনে হয় বনবাসী তাইগরদের মধ্যেও জোকুইমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে৷ বর্শাধারী তাইগরেরো এখন অত্যন্ত বিরল, তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে৷’

কয়েকদিন পরের কথা... সিনর শিকোর নির্দেশ অনুসারে নদীর পশ্চিমদিকে অশ্বারোহণে যাত্রা করল সাশা, সঙ্গে অপরিহার্য সঙ্গী অ্যাপারিসিও৷ কিছুদূর যাওয়ার পরে একটা ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর তাদের চোখে পড়ল৷ কাছে গিয়ে তারা দেখল অর্ধভগ্ন ও বিধ্বস্ত কুটিরের দরজাটা চামড়ার বাঁধনে আটকে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে— ঘরের ভিতরটা অন্ধকার, সেখানে কোনো মানুষ বাস করে বলে মনে হয় না৷

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সাশা হাঁক দিল, ‘ভিতরে কেউ আছে?’

দরজা ঠেলে একটি রেড ইন্ডিয়ান বাইরের উজ্জ্বল সূর্যালোকে আত্মপ্রকাশ করল৷ লোকটির সঠিক বয়স অনুমান করা অসম্ভব— মনে হয় ষাট হবে— কিন্তু তার গায়ের চামড়া এখনও টান টান, কুঁচকে যায়নি একটুও৷ লোকটির পরনে নীল প্যান্ট আর খাকি শার্ট— শার্টের হাতা কনুইয়ের কাছে ছিঁড়ে উড়ে গেছে— পা নগ্ন, জুতো নেই৷

লোকটিকে দেখেই সাশা বুঝতে পারল সে মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত হয়েছে৷ সাশার মনটা খারাপ হয়ে গেল— তার দাদা আর্নস্টের কথাই সঠিক প্রমাণিত হল— বনজঙ্গল ভেঙে এত কষ্ট করে এত দূরে এসে সে আবিষ্কার করল একটি নেশাখোর মাতাল বুড়ো রেড ইন্ডিয়ানকে! কী আফশোস!

যাই হোক গাছের সঙ্গে ঘোড়া বেঁধে লোকটির ইঙ্গিতে সঙ্গীকে নিয়ে কুটিরের মধ্যে প্রবেশ করল সাশা৷ কুঁড়েঘরের ভিতরটা খুব নোংরা আর দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ৷ বেশ বোঝা যায় লোকটি এখানে একলাই বাস করে৷ ছোটো ঘরটার একধারে একটা ছেঁড়াখোঁড়া তাপ্পিমারা হ্যামক টাঙানো আছে৷ হ্যামকের তলায় একটা ‘জাগ’ কাত হয়ে পড়ে ঘরের মালিকের বর্তমান অবস্থার ‘কারণ’ নির্দেশ করছে!

সাশা বিনীতভাবে বলল, ‘তুমিই কি সেই বিখ্যাত তাইগরেরো, যার কথা আমি শুনেছি?’

লোকটির কালো চোখ দুটিতে বিদ্যুতের মতো জ্বলে উঠল বুদ্ধির দীপ্তি, কিন্তু তার মুখের ভাব রইল আগের মতোই অসাড়, সেখানে অনুভূতির কোনো চিহ্ন নেই৷ সাশা ঘরের ভিতরটা খুঁটিয়ে দেখল— কয়েকটা তির আর ধনুক ছাড়া একটা প্রকাণ্ড বর্শা তার চোখে পড়ল৷ বর্শাটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল সাশা— চওড়া একটা লোহার ফলা কাষ্ঠদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে৷ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ফলার দুই পাশ কোনো বস্তুকে কেটে ফেলার উপযুক্ত করা হলেও জিনিসটা তেমন ধারালো হয়নি৷

বুড়ো রেড ইন্ডিয়ান সাশার সামনে এসে দাঁড়াল, ‘তুমি আমার মনিব সিনর শিকো পিন্টোর কাছ থেকে আসছ?’

সাশা জানাল বর্তমানে সে পূর্বোক্ত সিনর শিকোর কাছ থেকেই আসছে বটে; কিন্তু অনেক দূরবর্তী যে-অঞ্চলে তাইগর-শিকারি হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে, সেই ‘রিও গ্র্যান্ড দো সাল’ নামে জায়গাটা থেকেই সে এসেছে কেবলমাত্র খ্যাতনামা ‘তাইগরেরো’র সঙ্গে আলাপ করতে৷

‘আমার মনিবের কাছ থেকে তুমি কি কোনো প্রস্তাব এনেছ?’ বুড়ো বলল, ‘নদীর কাছাকাছি নীচু জমিতে এখন তাইগরের দেখা পাওয়া যাবে৷ বর্ষা শুরু হলে তারা এই উঁচু জমির উপর উঠে আসবে৷ এখন এই জায়গাটাতে যে-জন্তুটার তুমি দেখা পাবে, তার নাম সাকুয়ারানা৷’

ব্রেজিলের স্থানীয় ভাষায় ‘সাকুয়ারানা’ বলতে বোঝায় ‘পুমা’ বা ‘কুগার’৷ তাইগরের মতোই পুমাও বিড়াল-জাতীয় পশু, তবে আকারে ছোটো এবং স্বভাবও তাইগরের মতো ভয়ংকর নয়৷

জোকুইম হঠাৎ দরজার বাইরে এসে হাঁক দিল, ‘দ্রাগাও!’ কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা লালচে-বাদামি রং-এর কুকুর দৌড়ে এল সেখানে৷ জোকুইম কুকুরটাকে আদর করতেই সে সজোরে গা ঘষতে লাগল লোকটার দুই পায়ে৷

‘সাও লরেংকোর মধ্যে আমার দ্রাগাও হচ্ছে সবচেয়ে পাকা শিকারি,’ জোকুইম বলল, সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটাকে সাদরে চুম্বন করল সে, তারপর সাশার দিকে ফিরে তাকাল সে, ‘তুমি দ্রাগাও আর আমার সঙ্গে শিকার করতে চাও, সিনর? বেশ তো, কাল সকালেই আমরা শিকারের সন্ধানে যাত্রা করব৷’

জোকুইম আবার তার কুটিরের মধ্যে অন্তর্ধান করল৷ সাশা আর অ্যাপারিসিও ঘোড়ায় চড়ে ফিরল তাদের আস্তানার দিকে৷ সাশা যে খুব বিরক্ত ও হতাশ হয়েছে, তার হাবভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল অ্যাপারিসিও৷ সে সাশাকে বলল, ‘ওই বুড়ো রেড ইন্ডিয়ান সম্পর্কে চট করে কিছু ভেবে নিয়ো না৷ তাহলে ঠকবে৷’

নবম পরিচ্ছেদ

পরের দিন খুব ভোরে, তখনও দিনের আলো ভালোভাবে ফুটে ওঠেনি— সাশা শুনতে পেল তার দরজায় কেউ ধাক্কা মারছে৷ দরজা খুলে সাশা দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে জোকুইম৷ তার ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন, নিম্নাঙ্গে একটা নীল প্যান্ট, প্যান্টের তলার দিকটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রকাণ্ড একজোড়া বুটজুতোর ভিতর৷ লোকটির চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার, হাবভাবে নেশার চিহ্নমাত্র নেই৷

‘দ্রাগাও আর আমি প্রস্তুত৷’ জোকুইম বলল, ‘তুমি তৈরি হলেই আমরা যাত্রা করতে পারি৷’

পরক্ষণেই অন্ধকারের মধ্যে চলন্ত ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল সে!...

এমন অনাড়ম্বর শিকার অভিযান আগে কখনো সাশার চোখে পড়েনি৷ সাধারণত শিকারে যাওয়ার আগে শিকারিরা গরম কফি অথবা ‘মাতে’ (চা) পান করে, তারপর একটি সরলরেখায় সারিবদ্ধ হয়ে তারা প্রবেশ করে বনের মধ্যে৷ এখানে সেসব কিছুই হল না৷ সাশা পোশাক পরে রাইফেল হাতে ঘরের বাইরে আসতেই হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়াল জোকুইম, ‘এবার আমরা যাচ্ছি৷’

কথাটা বলেই সে চলতে শুরু করল৷ পিছনে অনুসরণরত সাশার দিকে সে ফিরেও চাইল না৷

ঘর থেকে বেরিয়ে জোকুইমের সঙ্গে চলে আসার আগে অ্যাপারিসিওর ঘুম ভাঙিয়ে তাকে সঙ্গে আনেনি সাশা৷ পরে বুঝল কাজটা সে ভালোই করেছিল৷ বুড়ো জোকুইমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সাশা যখন হাঁফিয়ে পড়ছিল, সেইসময় তার মনে হল দুর্বলতার সাক্ষী হিসাবে অ্যাপারিসিওর উপস্থিতি তার ভালো লাগত না৷

কিছুক্ষণ চলার পর তারা জোকুইমের কুঁড়েঘরের সামনে এসে পড়ল৷ একবারও না-থেমে চলন্ত অবস্থাতেই সজোরে লাথি মেরে বুট দুটোকে জোকুইম ঘরের মধ্যে ছুড়ে ফেলল এবং নগ্ন পদেই হাঁটতে শুরু করল নিকটবর্তী অরণ্যের দিকে...

ঘন জঙ্গলের সবুজ শ্যামলিমার বুকে রক্তাভ বিদ্যুতের মতন চমকে উঠছিল দ্রাগাওর লালচে বাদামি শরীর, পরক্ষণেই আবার অন্তর্ধান করছিল শিকারিদের দৃষ্টির অন্তরালে অরণ্যের গর্ভে৷ দ্রাগাওকে আর দেখতে না-পেলেও ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জোকুইমের পিঠ আর মাথা দেখতে পাচ্ছিল সাশা৷ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল জোকুইম, সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, ‘সাকুয়ারানা৷’

সাশা তাকিয়ে দেখল একটা মস্ত গাছের তলায় ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে সারমেয় ভাষায় ‘চ্যালেঞ্জ’ জানাচ্ছে দ্রাগাও, তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে পূর্বোক্ত গাছের ডালে উপবিষ্ট একটি পুমার দিকে৷

পুমা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না৷ কিন্তু কোণঠাসা হলে যেকোনো জানোয়ারই হিংস্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে৷ গাছের উপর পুমার অবস্থাও সেইরকমই৷ যেকোনো মুহূর্তে অরণ্যের শান্তিভঙ্গ হতে পারে রক্তাক্ত যুদ্ধে৷ সময় থাকতে পুমার একটা ছবি তুলে না-রাখলে পরে হয়তো সেই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না— অতএব ক্যামেরাকে বন্ধনমুক্ত করে পুমার ফটো তুলল সাশা৷

জোকুইম আন্দাজেই বুঝল ক্যামেরার কাজ হয়ে গেছে, সে হাত বাড়িয়ে রাইফেলের দিকে ইশারা করল৷ সাশা বুঝল তাকেই এখন গুলি চালাতে হবে৷ সে রাইফেল তুলল, সঙ্গেসঙ্গে শূন্যে একটি নিখুঁত অর্ধবৃত্ত রচনা করে লাফ দিল পুমা এবং এসে পড়ল মাটি থেকে কয়েক ফুট মাত্র উঁচু একটা ডালের উপর৷ দ্রাগাও তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল৷ লক্ষ্য স্থির করে গুলি ছুড়ল সাশা৷ তৎক্ষণাৎ আবার লাফ মারল পুমা৷ গুলি লাগল তার বুকে৷

মরণাহত পুমা মাটিতে পড়ল, কিন্তু তখনও তার লড়াইয়ের উদ্যম শেষ হয়নি৷ সে এবার ঝাঁপ দিল সাশার দিকে৷ একইসঙ্গে আক্রমণ করল জোকুইম আর দ্রাগাও৷ জোকুইমের বর্শা এবং দ্রাগাও একইসঙ্গে ছুটল পুমার কণ্ঠ লক্ষ করে— বর্শা, দ্রাগাও আর পুমা মিলিত হল শূন্যপথে৷ দ্রাগাওর কণ্ঠভেদ করে বর্শাফলক বিদ্ধ হল পুমার কাঁধের ঠিক পিছনে৷ পুমার দেহ যখন মাটিতে ছিটকে পড়ল, তখন সে প্রাণহীন মৃত৷ তবু সাশা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না, জন্তুটার মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আবার গুলি ছুড়ল৷

বর্শা ফেলে দিয়ে মরণাপন্ন দ্রাগাওকে জড়িয়ে ধরল জোকুইম৷ কিছুক্ষণ পরে জোকুইমের আলিঙ্গনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করল দ্রাগাও৷ শোকবিহ্বল জোকুইমের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল এখানে তার উপস্থিতি অনাবশ্যক৷ ক্যামেরাটাকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে সে নিঃশব্দে স্থানত্যাগ করল...

পরের দিন সকালেই জোকুইম হাজির সাশার কুটিরে, সঙ্গে শিকলে বাঁধা দুটি কুকুর৷ একটি কুকুর আকারে ছোটো, কিন্তু দেহের গঠনে বোঝা যায় যে দস্তুরমতো শক্তিশালী পশু৷ অন্য কুকুরটি সঙ্গীর চাইতে দৈহিক আয়তনে বড়ো, দেখলে মনে হয় এই জন্তুটাও শরীরে যথেষ্ট শক্তি রাখে৷

জোকুইম বলল, ‘যতদিন আবার চাঁদ না-উঠছে, ততদিন আমি আর শিকারে যাব না৷ এই দুটি কুকুরের মধ্যে একটিকে তুমি রাখতে পারো, এরা দুজনেই শিকারে ওস্তাদ৷ অবশ্য দ্রাগাওর সঙ্গে ওদের তুলনা চলে না, কিন্তু ও-রকম কুকুর তো একটাই হয়৷’

জোকুইম বড়ো কুকুরটিকে দেখিয়ে বলল, ‘ও শিকারের পিছনে তাড়া করার সময়ে মুখ দিয়ে একটুও আওয়াজ করে না৷ ওর সঙ্গে শিকারে গেলে ওকে ভালো করে জানা দরকার৷ ছোটোটার নাম ভ্যালেন্ট৷ আমার মনে হয় ছোটো কুকুরটি তোমার উপযুক্ত সঙ্গী হবে৷’

সাশা বলল, ‘বেশ ছোটো কুকুরটিকেই আমি নিলাম৷’ জোকুইম তার কথা রেখেছিল৷ সাশা যতদিন চিনির কারখানায় ছিল ততদিন সে শিকারে বার হয়নি৷ তবে সাশার মনে ক্ষোভ বা দুঃখ ছিল না, সে দস্তুরমতো খুশি— ডম কার্লোস তাকে যা বলেছিল, তা নিশ্চিত সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে৷ সে অবশ্য জোকুইমকে তাইগর শিকার করতে দেখেনি৷ তাইগর বা জাগুয়ারের সঙ্গে পুমার যথেষ্ট তফাত— কিন্তু সাশা বুঝেছিল জোকুইমের পক্ষে বর্শার সাহায্যে জাগুয়ার শিকার আদৌ অসম্ভব নয়৷

কিছুদিন পর সিনর শিকোর কাছে বিদায় নিয়ে সাশা বেরিয়ে পড়ল কুয়াবা অভিমুখে, যেখানে দাদা আর্নস্ট তার জন্য অপেক্ষা করছে৷ সঙ্গে ছিল বিশ্বস্ত সহচর অ্যাপারিসিও৷

জঙ্গলের পথে পথে সারা শীতকালটা কেটে গেল, গ্রীষ্ম যখন শুরু হচ্ছে, সেইসময় একদিন তারা এসে পৌঁছাল কুয়াবা শহরের দ্বারে৷ তখন সন্ধ্যা আগত, তাই শহরে না-ঢুকে প্রান্তসীমায় তাঁবু খাটিয়ে তারা রাত কাটাল এবং পরের দিন সকালে প্রবেশ করল কুয়াবা শহরের মধ্যে৷ শহর চত্বরে একটি ‘বলিতো’ (ক্যান্টিন) নামক বিপণিতে তারা আর্নস্টকে দেখতে পেল৷ সে একটা টেবিলের সামনে বসে ছিল, ভাইকে দেখে হাত তুলে অভ্যর্থনা জানাল৷

সাশা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আর্নস্টকে পর্যবেক্ষণ করল৷ সে একইরকম আছে— সোনালি দাড়ি, বিশাল বক্ষ, দৃঢ় পেশিবদ্ধ বলিষ্ঠ বাহু— কিন্তু দেহে নয়, মনের দিক থেকে দাদা যেন বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷

কয়েকটা কথা বলার পর আর্নস্ট যা বলল, তা শুনে দাদার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেল না সাশা৷

আর্নস্ট বলল, ‘আমরা যখন কোক্সিমে ছিলাম, তখন সেখানকার পুলিশ জানিয়েছিল একটি ছোটোখাটো চেহারার লোক আমাদের খোঁজ করেছিল৷ আমরা লোকটা সন্ধান পাইনি৷ ব্যাপারটা তোর মনে আছে সাশা?’

‘তার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম৷ তুমি বললে তাই মনে পড়ল৷ তা সেই লোকটার তুমি সন্ধান পেয়েছ?’

মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে আর্নস্ট বলল, ‘আমি তাকে শুধু খুঁজে পাইনি, স্বচক্ষে দেখেছি এই শহরে৷ লোকটির নাম সিনর ফাভেল!’

দশম পরিচ্ছেদ

আর্নস্টের কথা শুনে প্রথমে খুবই আনন্দিত হয়েছিল সাশা— ফাভেল তাহলে বেঁচে আছে!— খুনের দায় থেকে তাহলে সাশা অব্যাহতি পেয়েছে! যদিও ফাভেলের মতো মানুষের খুন হওয়াই উচিত৷

কিন্তু একটু পরেই আনন্দের পরিবর্তে জাগল প্রচণ্ড ক্রোধ— ফাভেল তাহলে দূরদূরান্ত পেরিয়ে তাদের ধাওয়া করছে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য! সাশা স্থির করল এবার দেখা হলে ফাভেলকে সে জেনেশুনে ঠান্ডা মাথায় খুন করবে৷ আর্নস্টও ফাভেলকে মেরে নিশ্চিন্ত হতে চায়— তবে সাশার পরিবর্তে সে নিজেই হতে চায় হন্তারক৷

দুই ভাই বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও ফাভেলকে কোথাও দেখতে পেল না৷ প্রথম তাকে দেখেছিল আর্নস্ট, তার সঙ্গে ছিল কয়েকটি লোক— সম্ভবত বন্ধুবান্ধব৷ অত লোকের সামনে দোকানের মধ্যে ফাভেলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পারেনি আর্নস্ট, সে ফাভেলকে একা পেতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রথম দর্শনের পর আর কোনোদিনই আর্নস্ট ফাভেলের সাক্ষাৎ পায়নি৷

কিছুদিন কুয়াবা শহরে কাটিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুসারে হিরার সন্ধানে যাত্রা করল দুই ভাই৷ তখনও অ্যাপারিসিও ছিল তাদের সঙ্গে৷ মাত্তো গ্রসোর বনভূমিতে হিরার লোভে ছুটেছিল আরও বহু মানুষ৷ শুধু স্থানীয় মানুষ নয়— অনেক বিদেশিও এসে ভিড় করেছিল মাত্তো গ্রসোর খাঁড়ির ধারে ধারে হিরার লোভে৷

সেই হীরক-অভিযানে বারংবার বিপদে পড়েছে দুই ভাই এবং ভাগ্যের আশীর্বাদে মরতে মরতে বেঁচে গেছে অনেকবার৷ সেসব কাহিনি সবিস্তারে বলার জায়গা এখানে নেই— তাই সংক্ষেপে বলছি উক্ত অভিযানে তারা সফল হয়েছিল, বেশ কিছু অর্থের মালিক হয়েছিল দুই ভাই— তারপর একদিন এই ভবঘুরে জীবনে বিরক্ত হয়ে বড়ো ভাই আর্নস্ট একটি স্থানীয় মেয়েকে বিবাহ করে সংসারী হল এবং ছোটো ভাই সাশা তার ‘বেদুইনো’ নামক অশ্বতরটির পিঠে চেপে ‘ভ্যালেন্টো’ নামে কুকুরটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অরণ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য৷

সাকুয়ারানা (পুমা)

আসলে দুই ভাইয়ের চরিত্র ছিল দুধরনের৷ আর্নস্ট ছিল ঘরমুখো, বনজঙ্গল ছিল তার দুই চোখের বিষ৷ সাশার মন ছিল বহির্মুখী— অরণ্যের স্নিগ্ধ শ্যামলিমা এবং বিপজ্জনক পরিবেশ তাকে আকর্ষণ করত সর্বদা— তাই সুযোগ পেলেই ঘর ছেড়ে সে ছুটত বনের দিকে৷

বেশ কয়েকমাস ধরে বন থেকে বনে আর গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে সাশা এসে উপস্থিত হল তার পুরাতন আস্তানা সিনর শিকো পিন্টো নামে চিনির কারবারির গৃহে৷ সিনর শিকো সাদর অভ্যর্থনা জানাল সাশাকে৷ অ্যাপারিসিও তখন সিনর শিকোর বাসস্থান থেকে কয়েক মাইল দূরে সিনর পেসো নামে এক ভূস্বামীর কাছে কিছু কাজের দায়িত্ব নিয়েছিল৷ সাশা তাকে বলেছিল চিনির কলে তার কিছু কাজ বাকি আছে, সেই কাজগুলো সারা হয়ে গেলে সে এসে দেখা করবে অ্যাপারিসিওর সঙ্গে— পরবর্তী কর্তব্য তারা স্থির করবে দুজনে মিলে৷ কিন্তু কোনো কাজেই মন দিতে পারছিল না সাশা, সে ছটফট করছিল তাইগরেরো জোকুইম গুয়াতোর সঙ্গে দেখা করার জন্য৷ জোকুইমের সঙ্গে আরও একবার শিকারে যাওয়ার ইচ্ছাটা তাকে অস্থির করে তুলেছিল৷

ইতিপূর্বে যে-কুটিরে সাশা আশ্রয় নিয়েছিল, এইবারও সে কুঁড়েঘরটিকেই সে সাময়িক অবস্থান বলে গ্রহণ করল৷ সিনর শিকোর কাছে সাশা জানতে চাইল জোকুইম এখন এই অঞ্চলে আছে কি না৷ সিনোর শিকো বলল সে বর্তমানে এখানে না-থাকলেও আশা করা যায় দিন দুই পরেই সে উপস্থিত হবে তার নিজস্ব আস্তানায়৷

নির্ভুল অনুমান— ঠিক দু-দিন পরেই দুটি কুকুর নিয়ে সাশার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল জোকুইম৷ তখনও দেখা গেল কুকুরের আশ্চর্য স্মরণশক্তি— ভ্যালেন্টো নামে যে-কুকুরটাকে জোকুইম উপহার দিয়েছিল, সেই কুকুরটা মহা উৎসাহে অভ্যর্থনা জানাল তার পুরানো মনিবকে৷

চিনির কারখানাকে ঘিরে চারপাশে যে ঘন জঙ্গল অবস্থান করছিল, সেইদিকে তাকিয়ে জোকুইম বলল, ‘তাইগররা নীচু জমি ছেড়ে এখন উঁচু জমিতে উঠে আসছে৷ বর্ষা নামলে তারা নীচু জমিতে থাকে না৷ আগামী দিনটা বাদ দিয়ে পরশুদিন খুব ভোরে আমি আসব৷ তুমি প্রস্তুত থেকো সিনর সাশা— আমরা দুজনে আবার একসঙ্গে শিকার করতে যাব৷’

নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে চারটি প্রকাণ্ড কুকুর নিয়ে জোকুইম হাজির হল সাশার দরজায়৷ কিন্তু কুকুরদের দলপতি হিসাবে ছোটোখাটো ভ্যালেন্টকেই সে নির্বাচন করল৷

‘দ্রাগাওর পরে ভ্যালেন্টই হচ্ছে সবচেয়ে সেরা কুকুর,’ জোকুইম বলল, ‘সে কখনো ভুল করে না৷ অন্য কুকুরগুলো ভুল করে তোমাকে অন্যপথে চালনা করতে পারে৷’

এখানে বলে রাখা ভালো কুকুরদের দলপতি বলতে কী বোঝায়৷ সারমেয়-বাহিনীর মধ্যে দলপতি ছাড়া অন্যান্য কুকুরগুলো শিকল-বাঁধা অবস্থায় শিকারিদের সঙ্গে থাকে৷ দলপতি শিকারের গন্ধ বা পদচিহ্ন অনুসরণ করে অগ্রসর হয়৷ তার গলার শিকল সেইসময় খুলে দেয় শিকারি৷ দলপতির পিছনে অন্যান্য কুকুরদের শিকল ধরে শিকারি চলতে থাকে৷ একেবারে শেষ মুহূর্তে শিকারের কাছাকাছি এসে সব কয়টি কুকুরের গলার শিকল খুলে শিকারি তাদের ছেড়ে দেয় এবং সারমেয়-বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করে শিকারের সম্মুখীন হয়ে যথাকর্তব্য স্থির করে৷ সুতরাং শিকার-অভিযানে কুকুরদের দলপতির ভূমিকা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ৷ শিকারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে একমাত্র দলপতি৷

তিনঘণ্টা ধরে বনের পথে ছুটে চলার পর একটা জাগুয়ারের (তাইগর) পায়ের ছাপ দেখতে পেল শিকারিরা৷ ভ্যালেন্টোর সঙ্গে অন্যান্য কুকুরগুলোকেও শিকারিরা মুক্তি দিল— তৎক্ষণাৎ দলপতি ভ্যালেন্টোকে অনুসরণ করে তিরবেগে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল কুকুরদের দল...

হঠাৎ তীব্র হয়ে বেজে উঠল কুকুরের উল্লসিত চিৎকার৷ সাশা বুঝল কুকুরগুলো তাইগরকে দেখতে পেয়েছে৷ জোকুইমের সঙ্গে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল শব্দ লক্ষ করে...

একটু পরেই তারা কুকুরগুলোকে দেখতে পেল৷ একটা ঘন ঝোপের বাইরে দাঁড়িয়ে তারা তারস্বরে চিৎকার করছে৷ সাশা বুঝতে পারল ওই ঝোপের ভিতরেই লুকিয়ে আছে তাইগর৷

এল তাইগর (জাগুয়ার)

আচম্বিতে হলুদ আর কালো ফোঁটাফোঁটা একটা দেহ বিদ্যুতের মতো ছিটকে এল ঝোপের বাইরে— ক্রুদ্ধ জাগুয়ার এতক্ষণে শত্রুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, এতক্ষণে অতিক্রম করেছে তার ধৈর্যের সীমা— শত্রুর আস্ফালন শুনে আর নিশ্চেষ্ট থাকতে রাজি নয় অরণ্য-সম্রাট!

কুকুরগুলো তাইগরকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে ধরে কামড় বসানোর উপক্রম করেছিল, কিন্তু তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত থাবার নাগালের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে কামড়াতে সাহস পাচ্ছিল না৷ তারা জানে খুব বলিষ্ঠ কুকুরও তাইগরের নখের থাবার প্রচণ্ড চপেটাঘাত সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে না— তাই তাইগর থাবা চালালেই তারা ছিটকে সরে যাচ্ছিল তার নাগালের বাইরে৷

জোকুইম এসে পৌঁছাল ক্রুদ্ধ তাইগরের প্রায় বিশ গজ দূরত্বের মধ্যে৷ জন্তুটার চেহারা তখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে৷ যে-পুমাটাকে মেরেছিল জোকুইম, অথবা যে-জাগুয়ারটাকে বার্নারদো আর জর্জের সঙ্গে শিকার করেছিল সাশা, এই জন্তুটা একেবারেই তাদের মতন নয়— এটা যেমন হিংস্র, তেমনই নির্ভীক৷ অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে সে কুকুরগুলোকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে, সেইসঙ্গে তার গলা থেকে বেরিয়ে আসছে রুদ্ধ রোষের চাপা গর্জনধ্বনি৷

জোকুইম ততক্ষণে পৌঁছে গেছে তাইগরের দশ গজের ভিতর৷ নতুন শত্রুর আবির্ভাব হতেই তার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল তাইগর, তার দুই চোখ হিংস্র আক্রোশে জ্বলে উঠল দু-টুকরো জ্বলন্ত কয়লার মতো৷ সে বুঝল এই হচ্ছে তার আসল শত্রু, একে নিপাত করতে পারলেই আজকের যুদ্ধে তার জয় নিশ্চিত৷ জোকুইমও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাইগরের দিকে— দুই হাতের শক্ত মুঠিতে বর্শাদণ্ড জমির সঙ্গে সমান্তরাল, বর্শার ফলা জমি থেকে দু-ফুট উপরে স্থির হয়ে রয়েছে৷

হঠাৎ জোকুইমের একটা পা মাটির উপর ধাক্কা মেরে এগিয়ে এল৷ একটা শুকনো মাটির ঢেলা ছিটকে এসে আঘাত করল তাইগরের মুখে৷ সঙ্গেসঙ্গে তাইগর ঝাঁপ দিল জোকুইমকে লক্ষ করে৷ শানিত বর্শাফলক চমকে উঠল, পশুর দেহ বিদ্ধ করল, পিছিয়ে গিয়ে আবার আঘাত হানল৷ দ্বিতীয়বারের আঘাত তাইগরকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল৷ উদ্যত রাইফেল তুলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সাশা, কিন্তু ধরাশায়ী দেহটার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন দেখতে না-পেয়ে অস্ত্রটা নামিয়ে নিল৷ এই লড়াইতে অংশগ্রহণ করেনি সাশা, অরণ্যসম্রাটের সঙ্গে জোকুইমের দ্বন্দ্বযুদ্ধে সে ছিল নীরব দর্শক৷

মুগ্ধ দৃষ্টিতে জোকুইমের দিকে তাকিয়ে সাশা বলল, ‘রিও গ্র্যান্ড সাল থেকে আমার বন্ধুরা যে-দৃশ্য দেখার সম্ভাবনা আছে বলে আমায় উৎসাহিত করেছিল, সেই দৃশ্যই আজ দেখার সৌভাগ্য হল আমার৷ তুমি তাহলে একজন তাইগরেরো!’

জোকুইম বলল, ‘আজকের দিনের স্মৃতি হিসাবে মরা জন্তুটার চামড়া তুমি ছাড়িয়ে নিয়ে যাও৷ এর পরে তুমি নিজের হাতেই তাইগর শিকার করে তার চামড়া ছাড়িয়ে নিতে পারবে৷’

পনেরো দিন পরে আবার জোকুইমের সঙ্গে কুকুরের দল নিয়ে শিকার করতে গেল সাশা৷ সেদিন আর রাইফেল ছিল না সাশার হাতে, ছিল একটা মজবুত ‘জায়াগা’ (বর্শা) আর কোমরের খাপে ছিল পিস্তল৷ সেদিন শিকারিদের বেশিক্ষণ ছুটোছুটি করতে হল না৷ অল্প সময়ের মধ্যেই তারা শিকারের সন্ধান পেল৷ কুকুরগুলো একটা অল্পবয়সি পুরুষ তাইগরকে ঘিরে ফেলেছিল৷ জন্তুটা বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে কুকুরগুলোকে আক্রমণ করতে চেষ্টা করছিল৷ কিন্তু মানুষ দুটিকে দেখেই কুকুরদের ছেড়ে সে দ্বিপদ শত্রুদের দিকে আকৃষ্ট হল৷ প্রায় তিরিশ গজ দূর থেকে সে ঝড়ের মতো ছুটে এল সাশার দিকে৷ জোকুইম যেভাবে শিখিয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই বর্শাটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরেছিল সাশা, বর্শাফলক ছিল জমির দিকে নীচু হয়ে৷ জন্তুটা লাফ দিলেই তলা থেকে বর্শা চটপট উপরে তুলে জন্তুটার গলা বা বুকে বিঁধিয়ে দিতে হবে৷

বুনো জানোয়ার কখন কী করবে তা আগে থেকে বলা যায় না৷ এই জন্তুটা ছুটে এসে সাঁৎ করে একপাশে সরে এল৷ মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সাশা, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জন্তুটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে— বর্শাফলকও ঘুরল তাইগরের দিকে, জমির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল রেখায় নত হয়ে— তাইগর লাফ দিলেই ফলাটা সবেগে উপরের দিকে উঠে যাবে, বিদ্ধ করবে জানোয়ারের গলা বা বুক৷

কিন্তু তাইগর লাফাল না৷ সোজা ছুটে এল সাশাকে আক্রমণ করতে— তার ক্রোধবিকৃত ভয়ংকর মুখটা প্রায় জমির সঙ্গে মিশে গেছে! দারুণ আতঙ্কে বর্শা নিয়ে আঘাত হানল সাশা তাইগরের গলা লক্ষ করে৷ কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বর্শাফলক বিঁধল তাইগরের কাঁধে৷

আঘাতের ধাক্কা জন্তুটাকে সাশার সামান্য বাঁ-দিকে সরিয়ে দিল, ফলে নখরযুক্ত ভয়ংকর থাবার নিশানা একটুর জন্য ফসকে গেল৷ কিন্তু ভারসাম্য সামলাতে না-পেরে সামনের দিকে ছিটকে পড়ল সাশা, সেই অবস্থাতেই সে শুনতে পেল তাইগরের অবরুদ্ধ গর্জন প্রচণ্ড হুংকারে ফেটে পড়ছে৷ কোনোরকমে হাঁটুতে ভর করে নিজেকে তাইগরের নাগালের বাইরে সরিয়ে নিল সাশা৷

ওই অবস্থায় তাইগর তাকে আক্রমণ করলে তার মৃত্যু ছিল নিশ্চিত৷ কিন্তু সেই সুযোগ পেল না শ্বাপদ— বিদ্যুৎচমকের মতো জন্তুটার বক্ষ বিদীর্ণ করে দিল জোকুইমের বর্শা৷ কয়েক মুহূর্ত ছটফট করে স্থির হয়ে গেল তাইগর৷ তার মৃত্যু হল৷

রক্তাক্ত বর্শার ফলাটাকে তাইগরের দেহ থেকে টেনে নিয়ে সাশার দিকে তাকিয়ে হাসল জোকুইম, ‘তুমি বড়ো তাড়াতাড়ি চার্জ করেছিলে সিনর৷’

সাশা বুঝল কেন তাকে জোকুইম একা একা শিকার করতে দেয়নি৷ ক্ষিপ্রহস্তে বর্শা চালিয়ে যেভাবে সে পুমাকে হত্যা করেছিল, সেইসঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত মারা পড়েছিল তার প্রিয় কুকুর দ্রাগাও— এবং এইমাত্র যেভাবে সে সাশার প্রাণ বাঁচাল তাইগরকে মেরে— সেই বিদ্যুৎবৎ ক্ষিপ্র সঞ্চালনে বর্শাকে চালিত করার ক্ষমতা কয়েকদিনের মধ্যে কোনো শিকারি আয়ত্ত করতে পারে না৷ নিখুঁতভাবে আঘাতের সময় নির্ধারণ এবং নির্ভুল নিশানায় আঘাত করার ক্ষমতা আয়ত্ত করা সম্ভব হয় অনেকগুলো বর্শার লড়াইতে জয়ী হওয়ার পরে— শ্বাপদের নখদন্ত বনাম বর্শার লড়াইতে শিকারির মৃত্যু হতে পারে যেকোনো মুহূর্তে৷

ওই ঘটনার পর জোকুইমের পাশে দাঁড়িয়ে আরও কয়েকটা তাইগর শিকার করল সাশা৷ ধীরে ধীরে তার নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস গড়ে উঠল৷ কিন্তু তখনও তাকে এককভাবে শিকারে যেতে দিতে সম্মত হল না জোকুইম৷

‘সিনর, তুমি অনেক বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে শিকার করতে পার, কিন্তু একমুহূর্তের জন্য তোমার ভুল হতে পারে,’ জোকুইম বলেছিল, ‘আর তোমার মৃত্যু ঘটতে পারে ওই একটি মুহূর্তেই৷’

বর্ষা শুরু হল৷ প্রবল বৃষ্টিতে ডুবে গেল নীচু জমি৷ বৃষ্টির জল জমে গিয়ে জলাশয় আর জঙ্গল অনেক জায়গাতেই একাকার হয়ে গেল৷ জলস্রোতে প্লাবিত নিম্নভূমি থেকে উঠে এল সব জন্তু উচ্চভূমির শুষ্ক আশ্রয়ে৷ তৃণভোজীদের সঙ্গে মাংসাশী তাইগরের দলও উঠে এল নীচু জমি থেকে উঁচু জমির উপর৷

‘আমাকে একবার উত্তর-পশ্চিম দিকে যেতে হবে,’ জোকুইম বলল, ‘খবর পেয়েছি একটা তাইগর ওখানে ভীষণ উপদ্রব করছে৷ শুধু গোরুবাছুর নয়, তার কবলে প্রাণ হারাচ্ছে বহু মানুষ৷ ওই জন্তুটাকে না-মারা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই৷’

চিনির কলে যে-কাজে হাত লাগিয়েছিল সাশা, সেই কাজটা তখনও শেষ হয়নি৷ তাই দূরবর্তী স্থানে শিকার-অভিযানে জোকুইমের সঙ্গী হতে পারল না সে৷ কিন্তু কয়েকদিন পরে যখন নিকটস্থ অঞ্চলে একটি তাইগরের উপস্থিতির সংবাদ এল এবং জানা গেল ওই জায়গাতে ঘোড়ার পিঠে পৌঁছানো যায় একদিনের মধ্যেই— তখন ‘বেদুইনো’ নামক অশ্বতরটির পৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে তিনটি শিকারি কুকুরের সঙ্গে পূর্বোক্ত স্থানের উদ্দেশে যাত্রা করল সাশা৷ বলাই বাহুল্য ওই তিনটি কুকুরের মধ্যে ভ্যালেন্টা নামে জোকুইমের জ্যান্ত উপহারটিও ছিল৷

একাদশ পরিচ্ছেদ

একটি গোশালা থেকে ঘোড়ায় চড়ে সিনর শিকো পিন্টোর অধিকৃত জমিতে ফিরে আসার সময়ে তাইগরটাকে দেখতে পেয়েছিল৷ জনৈক ভৃত্যশ্রেণির লোক৷ দূর থেকে জন্তুটাকে কিছুক্ষণ অনুসরণ করার পর লোকটি দেখল ঘন ঘাসঝোপের ভিতর জন্তুটা অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তখন ফিরে এসে সিনর শিকোকে তাইগরের উপস্থিতির খবরটা জানিয়ে দিল লোকটি৷

যেখানে তাইগরকে দেখা গিয়েছিল, বর্ণনা অনুসারে সেই জায়গাটার উদ্দেশেই কুকুর নিয়ে খচ্চরের পিঠে যাত্রা করেছিল সাশা৷ কিন্তু তুমুল বৃষ্টিপাতের ফলে বনপথ এমন দুর্গম হয়ে পড়েছিল যে, সময়মতো সেখানে সে পৌঁছাতে পারেনি— একটা রাত তাকে বনের মধ্যে কাটাতে হয়েছিল৷

পরের দিন সকাল হতেই কুকুরগুলোকে নিয়ে রওনা হল সাশা৷ বেদুইনো নামে খচ্চরটাকে প্রথমে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে কুকুরগুলোকে নিয়ে সাশা পায়ে হেঁটেই চলেছিল তাইগরের খোঁজে— কিন্তু পরে সে ভেবে দেখল ওইভাবে বেদুইনোকে বেঁধে রাখলে বেচারা বেঘোরে মারা পড়তে পারে৷ তাইগর যখন বুঝতে পারে শত্রু তার পিছু নিয়েছে, তখন অনেক সময় চক্রাকারে ঘুরে এসে পিছন থেকে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ ঘাসঝোপের ভিতর কুকুর বা মানুষ চলাচলের সময় শব্দ হয়, কিন্তু তাইগর সেখানে নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারে— তাই পিছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত শিকারি বিপদ বুঝে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পায় না; মুহর্তের মধ্যে শিকারি পরিণত হয় শিকারে৷ এই তাইগরটাও যদি সে-রকম কিছু করে, তাহলে বেচারা বেদুইনো নিরুপায়ভাবে মৃত্যুবরণ করবে— পলায়ন বা লড়াই করার সুযোগই থাকবে না তার৷ তাই ঘন ঘাসঝোপের ভিতর খচ্চরের পিঠে চলাচল করতে অসুবিধা হলেও সাশা বেদুইনের বাঁধন খুলে উঠে বসল তার পিঠে এবং বাহনকে চালনা করল ধাবমান কুকুরদের পিছনে৷

কুকুরগুলো ছুটতে ছুটতে সাশার দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল৷ ঘন লতাগুল্ম আর ঝোপঝাড়ের বাধা ভেদ করে কুকুর যেভাবে ছুটতে পারে, সেভাবে ছুটতে পারে না খচ্চর— বিশেষত পিঠের উপর আরোহীকে বহন করতে হলে তার গতিবেগ আরও কমে যায়৷

কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার কুকুরগুলোকে দেখতে পেল সাশা৷ একটা ঘন ঘাসঝোপের বাইরে দাঁড়িয়ে তারা যেভাবে চিৎকার করছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় ওই ঝোপের মধ্যেই রয়েছে তাইগর৷ ঘন জঙ্গলের মধ্যে তাইগরের মোকাবিলা করা বর্শাধারী শিকারির পক্ষে খুবই কঠিন৷ সাশার মনে পড়ল জোকুইম লড়াইয়ের জন্য সর্বদাই ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়েছে, ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে কখনোই তাইগরকে আক্রমণ করেনি৷

এমন সমস্যায় আগে কখনো পড়েনি সাশা৷ সে যদি এখন পিছিয়ে আসতে চায়, তাহলে পিছন থেকে আক্রান্ত হতে পারে— সে-রকম কিছু ঘটলে সে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হবে না এবং তার কুকুরগুলোর জীবনও হবে বিপন্ন৷ আবার এগিয়ে গিয়ে ঝোপের মধ্যে আন্দাজে বর্শা দিয়ে খোঁচাখুঁচি করাও নিরাপদ নয়— হঠাৎ যদি তাইগর ঝাঁপ দেয়, তাহলে বর্শা তুলে বাধা দেওয়ার সময় পাওয়া যাবে না, নখদন্তের শানিত আলিঙ্গনে মুহূর্তের মধ্যে দেহ হবে ছিন্নভিন্ন৷

কিন্তু সাশাকে বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে হল না৷ ঝোপের ভিতর থেকে কালো-হলুদ রং-এর একটা শরীরী বিদ্যুৎ সগর্জনে ছিটকে এল ফাঁকা মাঠের উপর এবং তিরবেগে ছুটে এল সাশার দিকে৷ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বর্শাটা তলা থেকে উপরে তুলে আক্রমণ প্রতিরোধ করল সাশা, শানিত বর্শাফলক ঢুকে গেল তাইগরের বুকে৷ এ-রকম ক্ষেত্রে শিকারি প্রাণপণ শক্তিতে বর্শাটা ঠেলে ধরে আর আহত তাইগর চেষ্টা করে বর্শার বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে এসে শিকারিকে নখদন্তের মৃত্যু-আলিঙ্গনে বন্দি করতে— দুই পক্ষের ঠেলাঠেলির ফলে বর্শাফলক ক্রমশ গভীর থেকে আরও গভীর হয়ে ঢুকে গিয়ে তাইগরকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দেয়৷

কিন্তু বুনো জানোয়ার কখন কী করবে তা কেউ বলতে পারে না৷ এই তাইগরটাও যা করল, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না সাশা৷ চটপট পিছিয়ে এসে নিজের শরীরটাকে বর্শাফলকের দংশন থেকে মুক্ত করে নিল তাইগর, তারপর নতুন উদ্যমে আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে লাগল৷ তার বুকের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে বটে, কিন্তু সেই রক্তপাত তুচ্ছ করেও জন্তুটা কতক্ষণ জীবিত থেকে লড়তে পারবে, সেটা বুঝতে পারল না সাশা৷ লড়াই যদি দীর্ঘসময় ধরে চলে, তবে তীব্র উত্তেজনা স্নায়ুর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে সাশাকে দুর্বল করে ফেলবে এবং মানুষের শক্তি নিয়ে শ্বাপদের প্রবল জীবনীশক্তির সঙ্গে বেশিক্ষণ পাল্লা দেওয়া সম্ভব হবে না— লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে সাশার পরাজয় ও মৃত্যু অবধারিত৷ এখন তাইগর যদি ধৈর্য হারিয়ে উদ্যত বর্শাফলকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলেই মঙ্গল৷ কিন্তু জন্তুটার চালচলন দেখে তার মতলব কিছুই বুঝতে পারছে না সাশা— শ্বাপদ জ্বলন্ত চক্ষে তাকে নিরীক্ষণ করছে, শত্রু মুহূর্তের জন্য অসাবধান হলেই সে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়বে...

হঠাৎ জোকুইমের সঙ্গে তাইগরের বিগত দ্বন্দ্বযুদ্ধের দৃশ্যটা সাশার মনে পড়ল৷ পা দিয়ে লাথি মেরে একটা শুকনো ঢেলাকে সে ছুড়ে দিল তাইগরের দিকে৷ ফল হল তৎক্ষণাৎ— ভীষণ গর্জন করে সাশাকে লক্ষ করে ঝাঁপ দিল তাইগর৷ সঙ্গেসঙ্গে ক্ষিপ্রহস্তে আঘাত হানল সাশা— আহত শ্বাপদের রক্তাক্ত বুকে আরও গভীর ছিদ্র সৃষ্টি করে ঢুকে গেল বর্শার ফলা৷

তাইগরের জীবনীশক্তি ফুরিয়ে এসেছিল৷ ধীরে ধীরে স্থিরী হয়ে এল তার অন্তিম আস্ফালন৷ সাশা এইবার বর্শাদণ্ডকে ঠেলে তাইগরকে চিত করে শুইয়ে ফেলল৷ কিছুক্ষণ নিহত পশুর বক্ষে বিদ্ধ বর্শার ডান্ডায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাশা৷ তার দেহে তখন অপরিসীম ক্লান্তি৷ সাশা বুঝতে পারল লড়াইটা যদি আর এক মিনিট স্থায়ী হত, তাহলে এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত৷ স্নায়ুর উপর উত্তেজনার ওই অস্বাভাবিক তীব্র চাপ বহুক্ষণ ধরে সহ্য করতে পারত জোকুইম— কিন্তু তার চাইতে কম বয়স এবং অধিকতর দৈহিক শক্তি থাকলেও জোকুইমের মতো লৌহকঠিন স্নায়ুর অধিকারী হতে পারেনি সাশা৷

...তাইগরের চামড়া খুলে নিল সাশা, তারপর সারমেয়-বাহিনী নিয়ে অশ্বতর-পৃষ্ঠে আরোহণ করে ফিরে গেল নিজস্ব আস্তানায়৷ সিনর শিকো তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, ‘চামড়া দেখেই বুঝতে পারছি জন্তুটা ছিল প্রকাণ্ড৷ দু-দুটো গভীর আঘাতচিহ্ন বুঝিয়ে দিচ্ছে তুমি বর্শা চালিয়েছিলে দু-বার৷ সিনর, তুমি এখন একজন তাইগরেরো!’

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

সিনর শিকোর যেসব বিগড়ে-যাওয়া যন্ত্র মেরামত করার ভার নিয়েছিল সাশা, সেই কাজগুলো শেষ হতেই সে ফিরে গেল অ্যাপারিসিওর কাছে পূর্বনির্দিষ্ট ঠিকানায়৷ দেখা হওয়ামাত্র অ্যাপারিসিও জানাল তার জন্য দুটি খবর অপেক্ষা করছে— একটি সুসংবাদ, আর একটি দুঃসংবাদ৷ সাশা বলল, সে আগে দুঃসংবাদটি শুনতে চায়৷

অ্যাপারিসিও জানাল কয়েকদিন আগে মাত্তো গ্রসোর একটি অধিবাসীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়৷ কথাবার্তার ফাঁকে হঠাৎ অ্যাপারিসিও বলে ফেলেছিল সাশা সিমেল ও তার বড়ো ভাই আর্নস্ট সিমেল তার পরিচিত৷ শোনামাত্র লোকটি রাগে আগুন হয়ে ওঠে৷ অ্যাপারিসিও প্রথমে ভেবেছিল মাত্তো গ্রসোর লোকটি বুঝি সাশাকেই গালিগালাজ করছে, সে লোকটার গলা টিপে ধরার উপক্রম করেছিল— কিন্তু একটু পরে সে যখন বুঝতে পারল সাশা নয়, লোকটির আক্রোশের উৎস হচ্ছে আর্নস্ট— তখন সে আর লোকটিকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি৷ তবে তার মনে হয় আর্নস্টকে ওই লোকটির কথা বলে সতর্ক করে দেওয়া উচিত, না হলে সে বিপদে পড়তে পারে৷

সাশার মনে পড়ল পাসো ফানডো শহরে প্রথম যখন তার সঙ্গে আর্নস্টের দেখা হয়, সেইসময় আর্নস্টের কাঁধের উপর একটা ক্ষতচিহ্ন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং সেটার উৎপত্তির কারণ জিজ্ঞাসা করলে অত্যন্ত হিংস্রভাবে আর্নস্ট জানিয়েছিল ওটা তাকে উপহার দিয়েছে একটা শয়তান!

একটি নয়, আরও একটি দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল সাশার জন্য৷ অ্যাপারিসিও বলল, ‘সিনর, ফাভেল নামে তোমার শত্রুটি আমোলার শহরে এসেছিল৷ যে-লোকটির কাছে ফাভেল তোমার খোঁজখবর নিচ্ছিল, সৌভাগ্যক্রমে সে ছিল আমার বন্ধু৷ আমার বন্ধুই আমাকে ফাভেলের কথা বলে দেয়, অবশ্য তোমার সম্পর্কে একবারও মুখ খোলেনি৷’

সাশা ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ‘তোমার বন্ধুর সঙ্গে অবার যদি ফাভেলের দেখা হয়, তাহলে সে যেন ফাভেলকে আমার ঠিকানা জানিয়ে দেয়৷ আমি কাউকে ভয় পাই না, কারো কাছ থেকে পালাতেও চাই না৷ আর্নস্ট এখন অ্যাবোব্রাল শহরে আছে৷ আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি৷ সেখান থেকে ফিরে এসেই আমি ঘোড়ার পিঠে যাত্রা করব আমোলার দিকে৷ আশা করি ফাভেলকে সেখানে পাওয়া যাবে৷’

মুচকি হেসে অ্যাপারিসিও জানাল ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে এখন আমোলার দিকে যাওয়া সম্ভব নয়৷ কারণ বন্যার জলে সমস্ত পথঘাট ভেসে গেছে৷ তবে যাতায়াত করার জন্য সে একটা ‘নতুন উপায়’ মাথা খাটিয়ে বার করেছে৷ এই ‘নতুন উপায়’ হচ্ছে পূর্বে উল্লিখিত ‘সুসংবাদ’! স্থানীয় এক ভূস্বামীর একটি বজরা অনেকদিন হল অকেজো হয়ে পড়ে আছে৷ লোকটির এখন খুব টাকার দরকার৷ অ্যাপারিসও উক্ত ভূস্বামীর সঙ্গে দরদাম করে অত্যন্ত কম দামে নৌকাটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে৷ লোকটি তো বিক্রি করতে পারলে বাঁচে, এখন সাশার সম্মতির জন্যই অপেক্ষা করছে অ্যাপারিসিও৷ সাশা মত দিলে খুব সুন্দরভাবে নিজের হাতে নৌকাটাকে সে সারিয়ে ফেলতে পারে৷ নৌকায় চড়ে সহজেই তারা বিভিন্ন গ্রাম ও র‌্যাঞ্চে যাতায়াত করতে পারবে এবং অকেজো বন্দুক-পিস্তল মেরামত করে অর্থোপার্জনও হবে যথেষ্ট৷

পরিকল্পনাটা খুবই পছন্দ হল সাশার৷ নৌকাটি কিনে নিয়ে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই সেটাকে চমৎকার করে সারিয়ে নিল অ্যাপারিসিও৷ সাশা ওইখানেই অ্যাপারিসিওকে অপেক্ষা করতে বলে ঘোড়ার পিঠে রওনা হল অ্যাবোব্রাল শহরের দিকে, যেখানে অবস্থান করছিল বড়ো ভাই আর্নস্ট৷

আর্নস্টের সঙ্গে দেখা হল যখন, সেইসময় তার সঙ্গে অনেক লোকজন ছিল৷ রাত্রে নিরিবিলিতে সাশা জানাল মাত্তো গ্রসোর এক অধিবাসী আর্নস্টকে অনুসরণ করছে, তার উদ্দেশ্য ভালো নয়— এইভাবে লেগে থাকলে একসময় লোকটা আর্নস্টকে বাগে পেয়ে যাবে৷ বিশেষত কুয়াবা শহরটা আর্নস্টের পক্ষে মোটেই নিরাপদ নয়৷

‘আমার সন্দেহ হচ্ছে পেদ্রো ভাকা নামে লোকটা আমাকে অনুসরণ করছে,’ আর্নস্ট বলল, ‘ওই লোকটাই আমাকে পিছন থেকে গুলি করেছিল৷ অবশ্য পেদ্রো ছাড়া আমার আরও কয়েকজন শত্রু আছে৷ আমার পাঁজরে ছুরি ঢোকাতে পারলে তাদের সকলেই খুশি হবে৷’

‘শোনো আর্নস্ট’ সাশা বলল, ‘আমি তোমার আগেই কুয়াবা শহরে চলে যাব, আর ওই পেদ্রো ভাকা নামে লোকটাকে খুঁজে বার করে ব্যাপারটার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করব৷ তারপর পাকড়াও করব ফাভেলকে, তার সঙ্গে আমার যে বোঝাপড়া বাকি আছে, সেটাও চুকিয়ে ফেলব৷ আমরা যেন পলাতক আসামি, আমাদের পিছনে সবাই তাড়া করে ফিরছে— এই ব্যাপারটা আর চলতে দেব না আমি৷ শিকারি যাতে শিকারে পরিণত হয়, তাই করব৷’

আর্নস্ট মাথা নেড়ে বলল, ‘আলেক্স, আমি কুয়াবাতে চলে যাব বলে ঠিক করেছি, কোনো কারণেই তার নড়চড় হবে না৷ অ্যাবোব্রাল শহরের চাইতে কুয়াবা অনেক ভালো শহর, ওখানে আমাদের উপার্জনও হবে অনেক বেশি৷’

সাশা বুঝল আর্নস্ট তার সিদ্ধান্তে অনড়৷ অতএব ঘোড়ায় চড়ে সে ফিরে গেল ‘র‌্যাঞ্চ ট্রায়াম্ফ’ নামক স্থানে প্রিয়সঙ্গী অ্যাপারিসিওর কাছে৷

ঘোড়া খচ্চর প্রভৃতি বিক্রয় করে তারা বজরা ভাসাল নদীর বুকে৷ ওই বৃহৎ নৌকা বা বজরার নাম তারা রেখেছিল ‘অ্যাডভেঞ্চারিরা’— পোর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ ‘অ্যাডভেঞ্চারার’ বা ভ্যাগ্যান্বেষী!

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

হাতে টাকাপয়সা কম ছিল বলে কোরাম্বা শহরে কিছুদিন থেকে যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ নিল সাশা আর অ্যাপারিসিও৷ ওই জায়গাটাতে ভালো কাজ-জানা মিস্ত্রির খুবই অভাব ছিল, তাই কাজ পেতে তাদের অসুবিধা হল না৷ বেশ ভালো উপার্জন হল তাদের৷

১৯২৫ সালে বজরা চালিয়ে তারা একটা ছোটো গ্রামে এসে পৌঁছোল৷ পাথরের তৈরি একটা জেটি ডাঙা থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট এগিয়ে এসে নদীর বুকে শেষ হয়েছে৷ জেটির গায়ে নদীর প্রবল জলস্রোত ক্রমাগত ধাক্কা মারার ফলে গভীর নালার সৃষ্টি হয়েছিল৷ ওই নালার ভিতর নোঙর-করা কয়েকটা নৌকা জলের উপর দুলছিল৷

বড়ো নৌকা বা ডাকবিভাগের ‘লঞ্চ’ নোঙর করার জন্য জেটির গায়ে কয়েকটা বড়ো বড়ো খুঁটি পোঁতা ছিল, তারই মধ্যে দুটি খুঁটির সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারিরা নামে বজরাটিকে বাঁধা হল— তারপর প্রয়োজনীয় কয়েকটা জিনিস ক্রয় করার জন্য নদীতীরে অবস্থিত কুঁড়েঘরগুলোর দিকে অগ্রসর হল সাশা৷ সে আশা করেছিল ওই কুটিরগুলোর মধ্যে কোনো বলিচো (দোকান) পাওয়া যাবে, যেখান থেকে দরকারি জিনিসগুলো সে অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করতে পারবে৷ সাশার নিত্যসঙ্গী অ্যাপারিসিও রয়ে গেল বজরার মধ্যে জিনিসপত্র পাহারা দিতে৷

কুটিরগুলোর কাছাকাছি এসে একটি ছোটোখাটো মানুষকে দেখতে পেল সাশা৷ লোকটির পরনে ছিল সাদ কোট আর গাঢ় রং-এর একটি প্যান্ট৷ নিকটবর্তী একটি কুটির থেকে বেরিয়ে লোকটি উঁচু জমির উপর দিয়ে হেঁটে জেটির ধারে এসে দাঁড়াল৷ প্রথমে লোকটির দিকে সাশা ভালোভাবে নজর দেয়নি, কিন্তু বারো ফুট দূরত্বের মধ্যে এসে লোকটি যখন থমকে দাঁড়াল এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাশার দিকে চেয়ে রইল, তখনই তার দিকে আকৃষ্ট হল সাশা৷

‘সিমেল!’

লোকটার মুখে নিজের নাম শুনে চমকে উঠল৷ ভালো করে তার দিকে তাকাতেই সাশার সর্বাঙ্গ দিয়ে ছুটে গেল উত্তেজনার তীব্র শিহরন— ফাভেল!

প্রথম বিস্ময়ের চমক কেটে যেতেই এক প্রচণ্ড ক্রোধ সাশার চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে দিল৷ দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে অগ্রসর হল ফাভেলের দিকে৷

ফাভেল পিছিয়ে যেতে লাগল, সঙ্গেসঙ্গে চিৎকার, ‘সিমেল! তুমি জাহান্নমে যাও৷ যদি সঠিকভাবে লড়াই করতে চাও, তাহলে চলে এসো!’

সাশা দৃঢ়পদে এগিয়ে চলল ফাভেলের দিকে— এসপার কি ওসপার, আজকেই হয়ে যাবে চরম বোঝাপড়া!

পিছিয়ে এসে জেটির শেষপ্রান্তে দাঁড়াল ফাভেল, তারপর নালার মধ্যে নোঙর করা একটা নৌকায় লাফিয়ে পড়ে সে হাঁক দিল, ‘চলে এসো সিমেল, চলে এসো৷ এখানেই আমি লড়ব তোমার সঙ্গে৷’

দোদুল্যমান নৌকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াই করতে গেলে সাশা তার দৈহিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে না ভালোভাবে— সেইজন্যই ওইখানে দাঁড়িয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাল ফাভেল৷

কিন্তু লড়াইটা কেমন জমত, আর ফলাফল কী হত, সেটা অজানাই রয়ে গেল— কারণ, ভারসাম্য সামলাতে না পেরে নৌকা থেকে নদীর জলে পড়ে গেল ফাভেল৷ সে তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে তীরের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল৷ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সাশা৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে একটি লোক চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী সর্বনাশ— ওরা আসছে!’

শুধু ওই লোকটি আর সাশা নয়, ছোটোখাটো একটি জনতা তখন সমবেত হয়েছে নদীতীরে৷ তাদের সকলেরই ভয়ার্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে নদীর দিকে— কর্দমাক্ত জলে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলে একটা অদৃশ্য ঝড় এগিয়ে আসছে ফাভেলের দিকে!

পিরানহা! রাক্ষুসে মাছ! ব্রেজিলের বিভিন্ন নদীতে বাস করে মাংসলোলুপ হিংস্র পিরানহা মাছ৷ তাদের কবলে পড়লে কারো রক্ষা নেই৷ একটা বলিষ্ঠ ষাঁড়কে কয়েক মিনিটের মধ্যে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে ওই রাক্ষুসে মাছের ঝাঁক— পড়ে থাকে শুধু তার মাংসহীন কঙ্কাল!

একটা লোক বাঁশ হাতে দৌড়ে এল ফাভেলকে উদ্ধার করতে৷ সাশার মন থেকে তখন ক্রোধ দূর হয়ে গেছে— বিপন্ন ফাভেলকে উদ্ধার করার জন্য সে জেটির উপর এসে বাঁশটা ফাভেলের দিকে বাড়িয়ে ধরল৷ কিন্তু ফাভেল বাঁশটাকে ধরল না, অথবা বাঁশটাকে সে দেখতে পায়নি এমনও হতে পারে— কারণ, অন্ধের মতন সে তখন সাঁতার কাটছে তীর লক্ষ করে৷ দেখতে দেখতে আলোড়িত জলরাশির তরঙ্গ ধরে ফেলল ফাভেলকে— রক্তে লাল হয়ে উঠল নদীর জল! কোনোরকমে তীরে উঠল ফাভেল, তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঝরছে লাল রক্তের ধারা, তার দেহের বিভিন্ন অংশ কামড়ে ধরে ঝুলছে অনেকগুলো নাছোড়বান্দা পিরানহা মাছ! তার বুক আর পেটের অধিকাংশ স্থানই ছিন্নভিন্ন, কোনোরকমে টলতে টলতে সে এগিয়ে গেল একটা কুঁড়েঘরের দিকে৷ তাকে সাহায্য করতে ছুটে এল অনেক লোক— কিন্তু তারা তার কাছে পৌঁছানোর আগেই কুটিরের দরজা ঠেলে ঢুকে গেল ফাভেল, পরক্ষণেই কুটিরের ভিতর থেকে ভেসে এল পিস্তলের আওয়াজ!

ইতিমধ্যে নৌকা থেকে নেমে এসেছে অ্যাপারিসিও৷ একজন বৃদ্ধ সাশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘সিনর! লোকটা কি তোমার শত্রু? ওঃ কী ভীষণ যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেল বেচারা!’

রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন ফাভেলকে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সাশা৷ অ্যাপারিসিও তাকে জড়িয়ে ধরে বজরার মধ্যে ঢুকে গেল৷ সাশা আর ফাভেলের মৃতদেহ দেখতে কুটিরের ভিতর প্রবেশ করেনি৷ যারা ভিতরে ঢুকেছিল, তারা পরে সাশাকে জানিয়েছিল যে, ফাভেলের পেটের প্রায় অর্ধেক অংশ মাছের দল খেয়ে ফেলেছিল— ফাভেল যদি তার পিস্তল থেকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা না-করত, তাহলেও সে কয়েক মিনিটের বেশি বাঁচত না৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জানা গিয়েছিল ওই গ্রামে বেশ কয়েকমাস ধরে বাস করছিল ফাভেল৷ সে যে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই সাশার সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে ওই অঞ্চলে এসে পড়েছিল, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷

অ্যাপারিসিও সাশাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘সিনর আলেকজান্দ্রা! এই ঘটনার জন্য তুমি নিজেকে দায়ী মনে করে কষ্ট পেয়ো না৷ লোকটার অন্তরের ঘৃণাই তার মৃত্যু ডেকে এনেছে— তুমি তার মৃত্যুর জন্য দায়ী নও৷’

সাশা জানত ফাভেলের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী নয়৷ কিন্তু সে যদি নিজের হাতে ফাভেলকে হত্যা করত, সেটা অনেক ভালো ছিল— এমন বীভৎসভাবে অসহ্য যন্ত্রণাভোগ করে তাকে মরতে হত না৷ জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই ফাভেলের কোনো মূল্য ছিল না সাশার কাছে— কিন্তু নরখাদক মাছের ভক্ষ্য হয়ে যেভাবে সে মৃত্যুবরণ করল, সেই ভয়াবহ মৃত্যুর দৃশ্য সাশাকে অত্যন্ত বিচলিত করে তুলল৷ অ্যাপারিসিওকে নিয়ে সে আবার বজরা ভাসাল বন্য পৃথিবীর বুকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য...

পরিশিষ্ট

সাশা সিমেলের ঘটনাবহুল জীবনের কাহিনি সবিস্তারে বলতে গেলে ছোটোখাটো একটি মহাভারত সৃষ্টি হবে৷ তাই সংক্ষেপে শোনাচ্ছি ১৯৪২ সালের ‘তাইগরেরো’র ভূমিকা থেকে অবসর গ্রহণ করেছিল সাশা৷ জোকুইম গুয়াতো নামে যে রেড ইন্ডিয়ান শিকারি তাকে বর্শা হাতে লড়াই করতে শিখিয়েছিল, তার সঙ্গে জীবিত অবস্থায় আর সাশার দেখা করার সুযোগ হয়নি৷ একটা দুর্দান্ত জাগুয়ারের পিছনে তাড়া করার সময় নদীর ধারে নিহত জোকুইমের কঙ্কাল আর ভাঙা বর্শাটা আবিষ্কার করেছিল সাশা৷ তাইগরের কবলেই প্রাণ হারিয়েছিল তাইগরেরো জোকুইম গুয়াতো৷

অনেকগুলো তাইগরের ভবলীলা সাঙ্গ করার পর ১৯৪০ সালে এডিথ নামে একটি শ্বেতাঙ্গ রমণীকে বিবাহ করে সাশা সংসারী হয়েছিল৷ মাত্তো গ্রসোর জঙ্গলে শিকার করতে এসেছিল ওই মেয়েটি৷ এডিথকে শিকারে সাহায্য করার জন্যই সাশা তার সঙ্গী হয়েছিল৷ আক্রমণোদ্যত ক্ষিপ্ত জাগুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভুল নিশানায় তাকে গুলি চালাতে দেখেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সাশা— পরে শিকারসঙ্গিনী হয়েছিল তার জীবনসঙ্গিনী৷

বড়ো ভাই আর্নস্টের সঙ্গেও আর দেখা হয়নি সাশার৷ আর্নস্টকে আড়াল থেকে গুলি চালিয়ে খুন করেছিল গুপ্তঘাতক৷ সাশার কথা শুনে সতর্ক হলে হয়তো অমন শোচনীয়ভাবে মৃত্যু ঘটত না আর্নস্টের৷

নির্মল বুক এজেন্সী

সকল অধ্যায়
১.
বাঘিনী
২.
মরণ খেলার খেলোয়াড়
৩.
অগ্নিপরীক্ষা
৪.
সবজান্তার শাস্তি
৫.
টারজানের প্রতিদ্বন্দ্বী
৬.
জনতার প্রতিনিধি
৭.
অসুর বনাম মহিষাসুর
৮.
আত্মা ও দুরাত্মা
৯.
সংকেত
১০.
নিশানা নির্ভুল
১১.
দানবের ক্ষুধা
১২.
দুর্যোধনের গদা
১৩.
ক্যারাটে মৃত্যুবাহী
১৪.
জেহাদ
১৫.
আঁধার রাতের পথিক
১৬.
মরণ-ফাঁদ
১৭.
দুঃস্বপ্নের রাত
১৮.
দ্বৈরথ
১৯.
অস্ট্রেলিয়ার লাল আতঙ্ক
২০.
দানবের অপমৃত্যু
২১.
নরকের প্রহরী
২২.
নায়কের জন্ম
২৩.
তাইগরেরো
২৪.
সৈনিকের প্রথম অভিজ্ঞতা কায়না
২৫.
সৈনিকের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা শয়তানের ফাঁদ
২৬.
সৈনিকের তৃতীয় অভিজ্ঞতা শত্রু
২৭.
সৈনিকের চতুর্থ অভিজ্ঞতা শত্রু (দ্বিতীয় খণ্ড)
২৮.
সৈনিকের পঞ্চম অভিজ্ঞতা নরখাদক দেবতা
২৯.
সৈনিকের ষষ্ঠ অভিজ্ঞতা প্রতিহিংসা
৩০.
দেবী দর্শন
৩১.
ডুয়েল

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%