সায়ন্তনী বসু চৌধুরী
কিছুক্ষণ আগেও আমার হাত দুটো নিশপিশ করছিল। লোভ সংবরণ করতে গিয়ে এবড়ো খেবড়ো মাটিতে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম। এখন অস্বস্তিটা আগের থেকে অনেক কম, তবে খানিকটা দুশ্চিন্তা গলার কাছে দলা পাকিয়ে রয়েছে। কেউ দেখে ফেলবে না তো? আমার পায়ের শব্দে সে যদি সচেতন হয়ে যায়! যদি পালটা আক্রমণ করে? আমার বুকটা হাঁপরের মত ওঠানামা করছে। কপালের চামড়ায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। হৃদপিণ্ডটা যেকোনও মুহূর্তে ফেটে যেতে পারে। আবার একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে ডুব দিতে চলেছি আমি। বুঝতে সবই পারছি; কিন্তু কী করব? অতল খাদের কিনারা থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র যে আমার জানা নেই! মাথার পেছন থেকে আবার উঠে আসছে সেই অদ্ভুত ব্যথা। উফ্ অসহ্য! সরু সরু সাপের মত কিলবিল করতে করতে ব্যথাটা আমাকে পেড়ে ফেলছে ক্রমশ। যন্ত্রণার তীব্রতায় আমার সমস্ত বোধ এখন আচ্ছন্ন। এইসময় এক টুকরো কাচের বড্ড দরকার ছিল জানেন! হ্যাঁ হ্যাঁ, কাচ, আয়নার কাচ। নিজের চোখে চোখ রেখে কড়া গলায় আমি নিজেকে বোঝাতে পারতাম, না, আর না। কিছুতেই না। আর ভুল করব না আমি। মুক্তি চাই, এই অন্ধকার থেকে এবার আমার চিরতরে মুক্তি চাই...। কিন্তু নেই। আকাশের মত অমন উদার কাচ কোথাও নেই। এই পৃথিবীতে নিজের চোখে নিজের লোভ, নিজের পাপ দেখবার মতো আয়নাও নেই। তাই তো আমি অন্যকে দেখাই। লোভ, পাপ, সত্যি-মিথ্যে সব সওব। আমার নিজের পক্ষে অবশ্য চোখ বুজে ফেলা ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব নয়।
ঘন ঘন মাথা নাড়াচ্ছিলাম। মেয়েটার নরম গোলাপি ত্বক, জোনাকির মত চকচকে চোখ জোড়া আমাকে একটা নেশার গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। চোরাবালির মতো নরম আর আকর্ষক অন্ধকারের ভেতর গুটিয়ে বসে তার প্রতিটা বিভাজিকায় টকটকে লাল রক্তের ছাপ দেখার জন্য পাগলের মতো ছটকাচ্ছিলাম আমি। বুঝতে পারছিলাম, ডান হাতের আঙুলের মাথা থেকে একটা কনকনে ঠাণ্ডা শিহরণ ক্রমশ বুকের দিকে উঠে আসছে। হৃদপিণ্ডটা একবার থমকাচ্ছে, আবারও চমকে উঠে চলতে শুরু করছে। আমি এখন তার বসার ঘরে। ডান হাতে শোওয়ার ঘর। আবছা হলুদ আলো ভেসে আসছে সেখান থেকে। খাওয়ার টেবিলের ওপর চূড়া করে ফল সাজিয়ে রেখেছে সে। কাচের পাত্রে একুশ বছর বয়সী নারীর স্তনের মতো সুগঠিত, অভিমানী লাল টুকটুকে আপেল, বিড়ালনেত্রের মত উজ্জ্বল টোপাটোপা সবজে আঙুর; আমি নিশ্চিত এখনও কেউ দাঁত বসায়নি এদের গায়ে। ছড়ানো কাচের প্লেটে সাদাটে মসৃণ মাংস। বোধহয় সদ্য আগুনে ঝলসে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে রাখা হয়েছে। মাংসের গা থেকে ছুরি তুলে নিয়ে আমি এক পা এক পা করে এগোতে লাগলাম। উঁহু ভুল করিনি। ঘরের ভেতরে ঢুকে বাঁ-দিকে ঘুরে যেতেই পর্দা টানা স্নানঘর। মানুষের রক্তের আঁশটে গন্ধে কেমন যেন পাগল পাগল লাগছিল আমার।
***
বাথটবের সফেন জলে মেয়েটা জিওল মাছের মতো খেলছে। ঘাই মেরে একবার উপরে উঠেই আবার ডুব। জলের ওপরে শুধু বুদবুদ! ঠিক যেন একটা জ্যান্ত মৎসকন্যা। ফটোশপের দৌলতে যেসব ফিরিঙ্গি কন্যা জলপরী হয়ে বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে মানুষের মন মাতিয়ে বেড়ায়, এ মেয়ে তাদের চেয়ে ঢের ঢের সুন্দরী। কেতাদুরস্ত চুলের স্টাইল তার গালের ওপর কুচিকুচি ভেজা চুলের আলপনা এঁকে দিচ্ছে। বাদামি চুল আর নীল চোখের মোমপুতুলটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে একটা ধূর্ত বুনো শেয়াল তার মাথার কাছে ওৎ পেতে বসে রয়েছে। শীতের সকালে রোদের ওম মেখে নেওয়ার সময় সুখপিয়াসী পায়রা যেমন করে চোখ বুজে বসে থাকে, এই মেয়েও তেমনি ঠাণ্ডা জল মেখে নেওয়ার অনন্ত প্রত্যাশায় চোখদুটো বন্ধ করে রেখেছে। দক্ষ শিকারীর মতো সুনিপুণ কৌশলে আমার ভেতরের পাপী জন্তুটা একটু একটু করে জেগে উঠছে। ঘ্রাণ নিচ্ছে, আবার জাগিয়ে তুলছে সীমাহীন ক্ষুধা। আমার শরীরটাও বাধ্য পোষ্যের মত সেই শিকারির আদেশ পালন করছে। জানি, করবেও। এইভাবে আরও এক দেড় ঘণ্টা আমি ওর প্রতিটা আদেশ পালন করব। ওর আজ্ঞা পালন করা ছাড়া আমার তো আর বিশেষ কোনও কাজ নেই।
আচমকাই বাথটবের জল ভেতর মেয়েটা খাবি খেতে লাগল। ফরসা পা দুটো দাপাতে-দাপাতে গোঁ-গোঁ করতে করতে নেতিয়ে পড়ছে সে। হয়ত, দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে ক্রমে নিস্তেজ হচ্ছে, আর আমি জাগছি। একটু একটু করে শক্তি ফিরে পাচ্ছি আমি। একসময় ঘষঘষে শ্বাসের শব্দটা শোনা মাত্রই আমার ভাল লেগে গেল তাকে। নিজেকে উজাড় করে দেব বলে মৎস্যকন্যার দুটো হাত পিছমোড়া করে টেনে ধরলাম। যন্ত্রণায় ডানা কাটা পাখির মত ছটফট করতে লাগল আমার লজ্জাবতী লতা। যেন কোনও পুরুষের ছোঁয়াই পায়নি এতদিন। নাটক, উফ কী ভাল নাটকই না জানে আমার রঙ্গিলি ল্যায়লা! তার ধবধবে সাদা মার্বেলের মত বুকদুটো একবার এদিকে একবার ওদিকে দুলছে। আমার অতলে মন্থনের প্যাঁচ! এসময় মাথা তুলে থাকা দায়! হঠাৎ জলের ভেতরে তানপুরা বাজতে শুরু করল। কী মারাত্মক সেই সুর! শরীর নিংড়ে নিয়ে আসছে টাটকা অমৃত! মূর্ছা যেতে যেতেও আমি দেখলাম, নদীর কিনারা ধরে হেঁটে চলেছি। ক্লান্ত, অবসন্ন আর বালুময় শরীর রক্তগন্ধে মাতাল। নিজেকে হাত ধরে প্রবেশ করাতে লাগলাম চলাচলহীন এক কাল পথে। পিচ্ছিল, কঠিন তবুও যে কী সুখ, কী যে আরাম, তা বুঝি বর্ণনা করা যায় না!
শিকারের মুখের ওপর কাপটে বসেছে একটা চওড়া হাত। মোটা মোটা আঙুলগুলো নখ সমেত তার মুখের চামড়ায় বসে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা তীব্র আর্তনাদ! “বাঁচাও...বাঁচাও...বাঁচাও...” ভাসমান ফেনা ক্রমশ লাল হতে লাগল। সাবানের বুদবুদগুলো গিলে নিচ্ছে যাবতীয় যন্ত্রণা। জলের ভেতর কাতরাতে কাতরাতে একসময় একেবারে স্থির হয়ে গেল মেয়েটা। তার গলায় জমা রক্তের আলপনা আর দুই পায়ের মাঝে আপনা থেকেই চিত্রিত হয়েছে রক্তফুল! তারপর চারিদিকে শুধু শান্তি আর নৈঃশব্দ্য।
***
নিথর শরীরটাকে আমি উল্টোদিক থেকে কষে ধরেছি। তার ঘাড়ের ওপর ফোঁস ফোঁস করে আমার নিঃশ্বাস পড়ছে। বডিটা এখন একদম ঠাণ্ডা। একদিন এই শরীরেই কত বিদ্যুৎ ছিল! করাতের মত ধারালো কঠিন অস্ত্রটা দিয়ে একটা একটা করে প্রত্যঙ্গ কাটছি আর শরীরটার ভার একটু করে কমে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই ঝাঁকুনি লেগে বডি থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। গাঢ় কালচে রক্ত! কোথাও আবার রক্তের স্রোত অপেক্ষাকৃত শান্ত। প্রাবল্য যেখানে আছে, আমি ভিজছি। শালা, বেঁচে থাকতে চোখের জলে ভিজিয়ে শান্তি হয়নি, এখন রক্তে স্নান করাচ্ছে। মেয়েরা সত্যিই ভারি অদ্ভুত! বডির বুকের কাছটা ফাঁক হয়ে পাঁজর বেরিয়ে পড়তেই মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমার চেনা হৃদপিণ্ডটা এখনও ধুকপুক করছে! কিন্তু কী করে সম্ভব? মারা যাওয়ার চার ঘণ্টা পরেও কি হৃদয় জেগে থাকে? হঠাৎই আমার গা গুলিয়ে উঠল। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। সকালে যা কিছু উদরস্থ করেছিলাম, তার বেশিটাই উগরে দিলাম শুকনো ঘাসের ওপর। ঘাসগুলো আমার বমি শুষে নিচ্ছে। মেয়েটাকে ঠেসেঠুসে বস্তায় পুরে টলতে টলতে বাড়ির লন থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। এ তল্লাটে কেউ থাকে না এসময়। শুনশান জায়গা দেখে তবেই না মাল বাড়ি নিয়েছিল। লীলাখেলা কি আর সব জায়গায় হয়? গাড়ির ডিকিতে পঞ্চাশ-ষাট কেজির ভারি বস্তাটা ঠেলে ঢোকাতে গিয়ে বুকের কাছে সজোরে ধাক্কা খেলাম। “ব্লাডি হোর” বলে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। “মরে গিয়েও জ্বালাচ্ছিস হারামজাদী মাগী!” ব্যাস! ওইটুকুই...। দূরে সরতে সরতে দেখলাম, দোতলার কার্নিশে বসে আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে একটা কালপ্যাঁচা! আচমকাই কর্কশ গলায় ডেকে উঠল সেটা। বাঁক পেরোতেই আবার সব অন্ধকার। জমাট বাঁধা নিরেট অন্ধকার।
কতক্ষণ যে ওভাবে ছিলাম আমার ঠিক মনে নেই। অচেতন অবস্থায় কয়েক সেকেন্ড কাটানোর পরেই আমার মুখের ওপর ঠাণ্ডা বাতাস লাগতে শুরু করল। মনে হল অন্ধকারটা পাতলা হয়ে সরে যাচ্ছে। অবাঞ্ছিত মেঘ অন্যদিকে ভেসে গিয়ে আমার চোখের সামনে আবছা একটা আলোর উৎস ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আলোটা ঢাকা রয়েছে কোনও অর্ধস্বচ্ছ্ব পর্দার আড়ালে। একটা উজ্জ্বল বিন্দু ক্রমাগত নড়ছে। কেউ বারংবার নির্দেশ দিচ্ছেন। “এবার ধীরে ধীরে চোখদুটো খুলুন। খুলুন খুলুন।” বিন্দুটার দুলুনির গতি কমছে। আমিও যেন কোনও গভীর মোহপাশ থেকে মুক্তি পাচ্ছি। আমার চোখের পাতাদুটো হালকা হতে হতে একসময় এক ঝাঁক স্বভাবচঞ্চল প্রজাপতি হয়ে গেল। চোখ পিটপিট করতে শুরু করলাম।
আর চোখ খুলতেই দুটো উর্দিপরা ষণ্ডামার্কা লোক কলার টেনে সোজা করে চেয়ারে বসিয়ে দিল আমায়। শুরু হল তৃতীয় দফার জেরা। একটু একটু করে আবার আমার মনে পড়তে লাগল নিধির কথা।
***
নিধি সেনগুপ্তা। আমার সঙ্গে মুম্বইতে আলাপ। হেড অফিসের একটা ছোট্ট ট্রেনিং প্রোগ্রামে যোগ দিতে সেবার আমি মুম্বই গিয়েছিলাম। ঘনসউলি স্টেশন থেকে খানিকটা দূরে কোপারখৈরানের একটা ঝাঁ-চকচকে অ্যাপার্টমেন্টে থাকার ব্যাবস্থা করে দিয়েছিল কোম্পানি। টাওয়ার ফোরে বারোতলার ওপরে ফ্ল্যাট। আটদিন থাকার সুযোগ। ফ্ল্যাটের ভেতরটা এক ঝলক দেখেই মাথাটা ঘুরে গেল। বিরাট হলঘর, লাগোয়া ওপেন কিচেন, ছোট্ট ব্যালকনি, সেখানে সেক্সি বান্ধবীর মত দোল খাচ্ছে পাতাবাহার আর মানিপ্ল্যান্ট, দারুণ সুন্দর ডেকরেট করা ডাইনিং টেবিল! কী নেই? হলঘরের পেল্লায় টেলিভিশন সেটের সামনে আরামদায়ক সোফা। ছুঁলে মনে হবে লাল ভেলভেট কেকের গায়ে হাত বোলাচ্ছি। নরম গদিতে গা ডুবিয়ে দিতেই আরামে আমার চোখ দুটো বুজে এল। সারাদিনের পরিশ্রম মাদকের কণার মত ছড়িয়ে পড়ে আমার প্রতিটা শিরা-উপশিরা অবশ করে দিচ্ছিল। ঝিমুনির মধ্যে খুটখাট একটা শব্দ কানে যেতে চোখ খুলে দেখি আমার সামনেই এক সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে।
“হাই, আমি নিধি।”
মেয়েটা হাসছিল। তবে কি পাশের রুমটা এই মেয়েটাকে দেওয়া হয়েছে? কী অব্যাবস্থা রে বাবা! কোথায় একটু হাত পা ছড়িয়ে শান্তিতে এই প্রাসাদের মত ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার মজা লুটে নেব তা নয়, একটা মেয়েছেলের সামনে সারাক্ষণ কুঁকড়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে? বিরক্তিতে আমার মুখ থেকে একটা অদ্ভুত আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল। নিধি ছিল প্রখর বুদ্ধিমতী। ব্যাপারটা চট করে ধরতে পেরে গেল সে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুহূর্তেই এক গাল হেসে আমাকে আশ্বস্ত করতে বলল,
“আজ আর একটাও রুম ফাঁকা পাওয়া গেল না তো, তাই...। বাট ডোন্ট ওরি! কাল সকালেই আমায় নতুন রুম অ্যালট করে দেবে। কটা ঘণ্টা একটু অ্যাডজাস্ট করে নিন প্লিজ।”
মেজাজটা এক্কেবারে খিঁচড়ে গিয়েছিল। লম্বা লম্বা ঠ্যাং নেড়ে মেয়েটা একবার এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছিল আবার ফিরে এসে টেবিলে বসে ল্যাপটপ নিয়ে খুটুরখাটুর করছিল। প্রতি দশ মিনিটে হাঁপকাশের রোগীর মত টেনে টেনে কোঁকাচ্ছিল তার মোবাইলটা। মোবাইল তুলে সে “হ্যালো” বলা মাত্রই আমি তাকাচ্ছিলাম আর আকর্ষক শরীরটা আমাকে প্রবল লোভ দেখাচ্ছিল। কী ফিগার মাইরি! অত কাছ থেকে অমন আগুনের মতো মেয়ে আমি তার আগে দেখিনি। কখনও দেখিনি।
“শান্তিতে টিভিও দেখতে দেবে না! এমন সুন্দর নিরালায় সাক্ষাৎ দাবানলের মত একটা মেয়েছেলে কে চেয়েছিল বাল? ধুরশালা!”
বিরক্ত হয়েই নিজের কামরায় ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মাল অলরেডি গায়েব! ঘড়িতে তখন নটা বেজে সাত। এর মধ্যেই পাখি ফুড়ুৎ! সারারাত নিশ্চিন্তে ঘুমানোর
পর, সকালে উঠে গতরাতের ব্যাবহারের কথা ভেবে খানিকটা হলেও অনুতাপ হচ্ছিল আমার। একটা মেয়েই তো এসেছিল, বাঘ বা ভালুক তো নয়! যাইহোক, মুখ হাত ধুয়ে কফি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
গুলমোহর গাছে ঘেরা হেড অফিসের বিশালায়তন ক্যাম্পাসে পা রাখতে না রাখতেই সেই নিধির সঙ্গে আবার দেখা। মোমের মত নরম ফরসা হাতখানা বাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল মেয়েটা। কথায়-কথায় জানলাম, ডিসকভার ইন্ডিয়া প্রোগ্রামের জন্য গুরগাঁও থেকে এসেছে নিধি। আমি গিয়েছিলাম হলদিয়া থেকে। আমাদের দুজনের ডেজিগনেশন একই। কিন্তু মেয়েটা আমার জুনিয়র। তাই পে-স্কেলও বেশ কম। প্রথম দিনের সেশনেই আমাদের আলাপটা জমে উঠল। তবে আধঘণ্টায় টের পেয়েছিলাম আমাদের দুজনের মধ্যে একটা তফাৎ স্পষ্ট। আমি মফসসলের আর সে যে মেট্রো সিটির সেটা আমাদের এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়। একসঙ্গে গায়ে গা ঠেকিয়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, বিকেলের জলখাবার আর চা খেয়ে মেয়েটাকে আমার এতই ভাল লেগে গিয়েছিল, যে ওকে আমি নতুন ঘরের জন্য দরখাস্ত করতে বারণ করে দিলাম।
“থাক না। আলাপ যখন হয়েই গেল, আবার অ্যাপ্লিকেশন করার মানে হয় না। কাটিয়ে দাও বস।”
নিধি ছিল অসম্ভব স্মার্ট আর পলিশড একটা মেয়ে। চলনেবলনে কথায় ভ্রূকুটিতে যে কোনও ফিল্ম অ্যাকট্রেসকেও সে টেক্কা মারতে পারত। মারকাটারি ফিগার, দুর্দান্ত ফেসকাটিং, গোলাপি মোমের মত গায়ের রং, মেয়ে তো নয়, যেন একটা গোটা প্যাকেজ! কাজু কুকিজের গায়ে ছোট্ট ছোট্ট কামড় বসাতে বসাতে আমার চোখে চোখ রেখে সে প্রশ্ন করল,
“কী ব্যাপার? কাল তো মুখ বাঁকাচ্ছিলে, আজ একদম অন্য সুর! অ্যাডভান্টেজ নেওয়ার ইরাদা আছে না কী?”
ছোট্ট করে বাঁ-চোখটা মেরে দিল নিধি।
আমি খানিকটা হতভম্ব হয়ে গিয়ে বললাম,
“মানে? আরে, একটা মেয়ের সঙ্গে পাশাপাশি রুমে থাকতে লজ্জা পাচ্ছিলাম আর আমি নেব অ্যাডভান্টেজ? কী যে বল না মাইরি!”
নিধি মুচকি হাসল।
“না, ঠিক তা নয়। আসলে ভয় কিন্তু দু’তরফে থাকাই ভাল। অ্যাডভান্টেজ, সে তো আমিও নিতে পারি; তাই না?”
তারপর আমার গালের ওপর আলতো করে একটা আঙুল বুলিয়ে ঠোঁটের কাছে এসে ইচ্ছে করেই নখের ডগাটা ফুটিয়ে দিল মেয়েটা। আমি আর কথা বাড়াইনি। কিন্তু অঘটনটা ঘটেই গেল। সেদিনের পর থেকে নিধির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে বাড়তে একটামাত্র কম্বল আর কমন কফিমাগে এসে দাঁড়ায়। প্রথম প্রথম আমি যে নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করিনি তা নয়; কিন্তু নিধির নীলচে চোখ আমায় এক অন্য জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। আমি আর নিজেকে বাঁধতে পারতাম না। মন হত, তার ডাকে সাড়া না দিলে মরুভূমির মত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে আমার বুকটা। ওই কটা দিন আমি সময়ের হাতেই নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম। একটা মেয়ে যে অমন আগুনের মত জ্বালা ধরাতে পারে, বরফের ছুরির মতো বুকে বিঁধে যেতে পারে, নিধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ না হলে আমার বোধহয় জানাই হত না। তবে, আমার মত অল্প চেনা মানুষের প্রতি মেয়েটার প্রগাঢ় বিশ্বাস দেখে খানিকটা অবাকও হয়েছিলাম। যদি প্রেম না-ই থাকবে, তাহলে একটা অচেনা ছেলের সঙ্গে এইভাবে খোলামেলা মেলামেশা কি সম্ভব? সামান্য চুমুটুমু হলে না হয় মানা যেত; কিন্তু নিধি তো আমাকে ডুবিয়ে মারছিল। সেই সঙ্গে নিজেও ডুবতে চাইছিল অতলে।
আমি বলতে পারিনি। চতুর্থ দিন আমাকে হাত পা নাড়াতে না দিয়ে ভুখা শেরনীর মত নিজেই আমার কোমরের ওপর লাফিয়ে উঠে মিনিট চারেকে কাজ সেরে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে নিধিই আমাকে প্রোপোজ করে ফেলল। ওকে জাপটে ধরে আমি বলেছিলাম,
“সামনের মাসেই আমার প্রোমোশন। আর দেরি করব না। এই ডিসেম্বরেই বিয়েটা সেরে ফেলব আমরা। কী বল?”
“হোয়াট?”
ব্রেসিয়ারের হুক লাগাতে লাগাতে মুখটা বিকৃত করে উঠে বসল নিধি। সাদা চাদরটা বুকের কাছে গিঁট দিয়ে বেঁধে নিতে নিতে বলল,
“হাউ মিডলক্লাস আদিত্য? এইমাত্র ভালবাসি বলেছি বলেই কি ডিসেম্বর মাসে বিয়ে করতে হবে? তুমি না রিয়েলি স্টুপিড!”
সেই প্রথম আমি আহত হয়ে থেমে গিয়েছিলাম। আমার জীবনে যে ক’জন মেয়ে এসেছে, প্রথম বার ঠোঁটে ঠোঁট রাখা মাত্রই তারা প্রত্যেকে নিরাপত্তা চেয়েছে। একসঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এ কেমন স্বাধীনচেতা মেয়ের হাতে আমি নিজেকে তুলে দিলাম? প্রতি রাতে নিধির কাছে পরাস্ত হতে হতে আমি যেন একটু একটু করে ফুরিয়ে যাচ্ছিলাম। গ্রামের বাড়ির কথা, মায়ের কথা, নিজের হাতে তৈরি ছোট্ট ফুলবাগানটার কথা বড্ড মন পড়ত আমার। ট্রেনিং শেষ হওয়ার আগেই নিধি আমাকে দিয়ে নিজের সমস্ত শর্ত মঞ্জুর করিয়ে নিয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার, হাজার বার ভেবেও, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যাস করেও আমি তাকে না বলতে পারিনি।
***
হলদিয়ায় ফিরে এসে কাজে আর মন বসত না। সারাক্ষণ মনে হত নিধিকে ফোন করি। দেখি মেয়েটা কী করছে, কী খাচ্ছে। তার প্রতি মুহূর্তের খবর জানার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। আগেও আমার জীবনে প্রেম এসেছে, বহুবার এসেছে; কিন্তু ওই মেয়েটার বেলায় আমি আর নিজের অধীনে ছিলাম না। দিনের মধ্যে সাত আটবার আমি ফোন করতাম। কোনও সময় নিধি গদগদ সুরে প্রেমালাপ করত আবার কোনও কোনও দিন নোংরা কথা বলে ঝগড়া জুড়ে দিত। অবাক হয়ে যেতাম আমি। একটা শিক্ষিত মেয়ের মুখের ভাষা অত খারাপ হতে পারে! আমার কোনও ধারণা ছিল না। পুরুষের সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা একটা মেয়েকে খানিকটা হলেও বাধ্য করে তোলে, বশে আনে; কিন্তু নিধি উল্টে আমাকেই ডমিনেট করতে চাইত।
প্রায় আট ন-মাস ওইভাবে কাটার পর বসের হাতে পায়ে ধরে খানিকটা জেদ করেই আমি দিল্লির ট্যুর নিয়ে বসলাম। মায়ের সঙ্গে একপ্রস্থ বচসা হল। নিধিকে আমি কিছুই জানাইনি। ইচ্ছে ছিল সশরীরে ওর ফ্ল্যাটে হাজির হয়ে ওকে অবাক করে দেব। কিন্তু এয়ারপোর্টে পৌঁছান মাত্র আমাকে অবাক করে দিয়ে নিধিই একটা রিসর্টে ডেকে নিল আমায়। তারপর একটি সুদর্শন ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিল। রোহণ। ছেলেটা নিধির পাশে এমন করে বসেছিল, যেন কোনও সিংহ নিজের শিকার আগলে রেখেছে। কিছুই আর বুঝতে বাকি ছিল না আমার।
আমি স্পষ্ট দেখলাম, নিধির বুক দুটো ক্ষতবিক্ষত, সেখান থেকে ঝুঁঝিয়ে রক্ত পড়ছে আর খসখসে জিভ বার করে রোহণ সেই রক্ত চেটে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে পাকা লেবুর মতো হলদে চোখে আমার দিকে চেয়ে হাসছে।
“থামলে কেন আদিত্য? তারপর বল। তারপর কী হয়েছিল...? সত্যিটা জানা দরকার আমাদের। চুপ করে থেক না। বল বল। সময় কম। খুনটা করলে কেনও তুমি? মারলে কেনও মেয়েটাকে? শুধু অন্য একজনকে পাশে নিয়ে বসেছিল বলে?”
ইনভেস্টিগেশন অফিসার উত্তেজিত স্বরে কিছু ঘৃণ্য শব্দ ব্যাবহার করে আমার ঘাড়ের কাছটা চেপে ধরলেন। ভেবেছিলেন আমার খুব লাগবে। ব্যথায় কেঁদে উঠব আমি। কিন্তু...কিন্তু তিনি হয়ত জানেন না ঘাড় তো আমাদের শরীরের সবচেয়ে নরম অংশ। ব্যথা লাগে না, ঘাড়ে হাত দিলে আমাদের আরাম লাগে। আমি অফিসারের হাতে মুখটা ঘষে নিলাম। তারপর আবার বলতে লাগলাম।
নিধির সঙ্গে আমি তার ফ্ল্যাটেই গিয়েছিলাম সেদিন। কোনও কথাতেই যখন না বলিনি, তখন শেষ পর্বেই বা কী করে বলতাম বলুন? আমাকে সামনে বসিয়েই একের পর এক পেগ সাবাড় করল সে। তারপর গভীর রাতে আমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলল, ওরা বিয়ে করতে চায়। নিধি আর সেই লম্বা চওড়া রোহণ নামের ছেলেটা! আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। খুব কান্না পাচ্ছিল। অত দূর থেকে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আমি যে ওইরকম একটা উপহার পেতে চলেছি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি কোনোদিন। ওকে আমি ভালবাসতাম। খুব খুব খুব ভালবাসতাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন অফিসার, সেদিনও ওকে না বলতে পারিনি। দুহাত একেবারে আলগা করে দিয়েছিলাম...। নিধিকে আঘাত করার কথা আমি আজও স্বপ্নে ভাবতে পারি না।
“তবে খুনটা করল কে? তোর বাপ? কী ভাবছিস শুয়োরের বাচ্চা, গল্প শুনিয়ে পার পেয়ে যাবি?”
অফিসার ফোঁস করে উঠলেন। থাবার মতো হাতটা আমার কাঁধের দিকে এগিয়ে আনতে লাগলেন। গলা টিপে ধরবেন নাকি?
এইবার...এইবার বোধহয় আসল রূপে দেখা দেওয়া দরকার। অনেকক্ষণ...অনেকক্ষণ ধরে মানুষগুলোর অত্যাচার সহ্য করছি। হাতদুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে পিঠটা উঁচু করে আমি গা লম্বা করলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে হলের আলোটা নিভে গেল। চার চারটে মানুষের চোখের সামনে থেকে ছ’ ফুট লম্বা একটা মানুষ থেকে কালো কুচকুচে লোমে ঢাকা আপাত নিরীহ তুলতুলে একটা হুলো বিড়াল হয়ে যেতে আমার যা মজা লাগল না, সে আর কী বলব!
“আদিত্য? এ কী? এ কী? গেল কোথায় ছেলেটা? কোথায় গেল?”
পকেট থেকে লোডেড মেশিন বার করে ফেলেছেন অফিসার। ব্ল্যাংক ফায়ার করবেন নাকি! হা হা হা! সুর করে ম্যাও...ডাকটা ছেড়েই জানলার গরাদ গলে রাস্তায় লাফিয়ে পড়লাম আমি।
অফিসার তখনও বিড়বিড় করেই চলেছেন,
“এ...এইভাবে চোখের সামনে থেকে একটা মানুষ গায়েব হয়ে গেল কী করে?”
এ কী পাঠক? এ কী? আপনারা অবাক হচ্ছেন কেনও? দীর্ঘদিন তাড়া খেতে খেতে পাগল হয়ে যাওয়া একটা হুলো বিড়াল যে প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখ থেকে পছন্দের শিকার কেড়ে নিতে পারে, সেটা কি আপনারা জানেন না? নাকি জানলার গরাদ গলে বিড়ালকে কখনও বদ্ধ ঘরের বাইরে বেরোতে দেখেননি? অ্যাঁ?
হা হা হা হা...!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন